Sunday, May 19, 2024
Homeলেখক-রচনারচনা সমগ্রঅগ্নিপুরুষ ১ (মাসুদ রানা) - কাজী আনোয়ার হোসেন

অগ্নিপুরুষ ১ (মাসুদ রানা) – কাজী আনোয়ার হোসেন

অগ্নিপুরুষ  (মাসুদ রানা) - কাজী আনোয়ার হোসেন

ঝাঁকড়া মাথা পাইন, নারকেল বীথি আর গাংচিলদের ডানা ঢেকে রেখেছে আকাশটাকে। বাতাসে দারুচিনি আর জলপাইয়ের গন্ধ। চারদিকে মিঠে-কড়া রোদ, ছায়ায় বসন্তের আমেজ। দূর সৈকতে ঝিনুক-লোভী কিশোরীরা স্কার্ট খানিকটা ওপরে তুলে ছুটোছুটি করছে, তেড়ে এসে পায়ে লুটিয়ে পড়ছে ভূমধ্যসাগর, তাদের ভেজা পায়ে ঝিকমিক করছে সোনালি রোদ। অলস দুপুর, রাস্তার পাশের একটা গাছ থেকে নিঃসঙ্গ এক কোকিল হঠাৎ জরুরি আবেদনের। সুরে কু-কু-কু করে ডেকে উঠছে, চোখ তুলে তাকাচ্ছে দুএকজন অন্যমনস্ক পথিক, নিঃশ্বাসে মদের গন্ধ।

দ্বীপের নাম কর্সিকা। বাস্তিয়া বন্দর।

দিন দুই বেশ গরম পড়েছে অথচ সময়টা শীতকাল। একজন বার মালিক বুদ্ধি করে একটা টেবিল আর খান কতক চেয়ার টেনে নিয়ে এসে ফেলেছে ছাল ওঠা পেভমেন্টে। ওখানে বসে একা এক বয়স্ক লোক হুইস্কি খাচ্ছে, তার চোখ পড়ে আছে ডকের দিকে। ডকে যাত্রার জন্যে তৈরি হচ্ছে একটা ফেরি, লিভোরনোয় যাবে ওটা।

প্রায় দুঘন্টা হয়ে গেল ওখানে বসে রয়েছে লোকটা। প্রথম দিকে পাঁচ-সাত মিনিট পরপরই গ্লাস ভরে দেয়ার জন্যে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল, শেষে বার মালিক গোটা একটা বোতল, প্লেট ভর্তি কালো জলপাই আর খোসা ছাড়ানো কাজু বাদাম রেখে গেছে তার টেবিলে। রাস্তায় আর পেভমেন্টে অনবরত বাকবাকুম। আওয়াজ তুলে গর্বিত ভঙ্গিতে হাঁটাহাঁটি করছে এক ঝাঁক পায়রা, হঠাৎ খেয়াল হলে ওগুলোর দিকে এক মুঠো করে কাজু বাদাম ছুঁড়ে দিচ্ছে আগন্তুক।

রাস্তার ওপারে, পেভমেন্টের ওপর বসে রয়েছে ছোট এক ছেলে। ভাঁজ করা হাঁটু দুটো এক করা, তার ওপর চিবুক রেখে গভীর মনোযোগের সাথে লোকটার জলপাই আর হুইস্কি খাওয়া লক্ষ্য করছে সে।

চারদিক শান্ত আর নিরিবিলি, টুরিস্টরা এ-সময় এদিকটায় আসে না। আগন্তুক ছাড়া ছেলেটার, দৃষ্টি কাড়ে এমন কিছু নেই আশেপাশে। কচি মনে কৌতূহল জাগিয়ে তুলেছে লোকটা। অদ্ভুত একটা স্থির, অচঞ্চল ভাব রয়েছে তার। মধ্যে, প্রয়োজন ছাড়া তার শরীরের কোন অংশ এক চুল নড়ে না। দুজনের মাঝখানে রাস্তা, মাঝে মধ্যে দুএকটা গাড়ি ছুটে যাচ্ছে, কিন্তু সেগুলোর দিকে একবারও তাকাচ্ছে না আগন্তুক। তাকিয়ে আছে ডক আর ফেরির দিকে।

মাঝে মধ্যে ছেলেটার দিকে চোখ পড়ছে তার। গম্ভীর মুখ, নিরাসক্ত দৃষ্টি। তার মুখে দুটো দাগ, একটা বা চোখের নিচে, আরেকটা কপালের ডান দিক। ঘেঁষে। সারা মুখে আধ ইঞ্চি লম্বা কুচকুচে কালো দাড়ি, নাকটা টিকালো, গায়ের রং রোদে পুড়ে তামাটে মত। কিন্তু ছেলেটার মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে তার চোখ জোড়া। মায়াভরা দুই চোখের মাঝখানে একটু যেন বেশি দূরতু, ভারি পাতা–সরু। হয়ে আছে, যেন সিগারেটের ধোয়া এড়াবার চেষ্টা করছে, অথচ লোকটা এই। মুহূর্তে ধূমপান করছে না।

হুইস্কির অর্ডার দেয়ার সময় লোকটাকে ঝরঝরে ফ্রেঞ্চ বলতে শুনেছে সে, কিন্তু তবু তার মনে হয়েছে এ লোক ফরাসী হতে পারে না। তার পরনের ঘন নীল ট্রাউজার, পোলো নেক সোয়েটারের ওপর ডেনিম জ্যাকেট খুবই দামি, কিন্তু বহু ব্যবহারে মলিন। তার পায়ের কাছে রাখা লেদার সুটকেসটাও তাই। অচেনা, নতুন লোক অনেক দেখেছে ছেলেটা, বিশেষ করে আগন্তুকদের চরিত্র আর আর্থিক অবস্থা বুঝে নেয়ার আশ্চর্য একটা ক্ষমতা আছে তার। কিন্তু এই লোকটা তাকে ধাঁধায় ফেলে দিয়েছে। এর আগে এই প্রকৃতির লোক সে কখনও দেখেনি। তার মনে হল, এই লোক জন্ম থেকে একা, নিঃসঙ্গ যাযাবর। মনে হল, এই লোককে বিশ্বাস করে কেউ কোনদিন ঠকবে না। লোকটা হাতঘড়ি দেখল, বোতল থেকে শেষ হুইস্কিটুকু গ্লাসে ঢেলে এক চুমুকে নিঃশেষ করল। বার মালিককে ডেকে টাকা দিল, কি যেন বলল তাকে; মুখ তুলে রাস্তার ওপারে বসা ছেলেটার দিকে একবার। তাকাল বার মালিক। লেদার সুটকেস হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল লোকটা, তারপর। রাস্তা পেরোবার জন্যে পা বাড়াল।

পেভমেন্টে স্থির বসে থাকল ছেলেটা, লোকটার এগিয়ে আসা দেখছে। লোকটা আরও কাছে আসতে বোঝা গেল, বেশ লম্বা সে, প্রায় ছয় ফুটের। কাছাকাছি। শরীরে একটু মেদ জমেছে, তবু আশ্চর্য হালকা পা ফেলে হাঁটতে পারে। হাঁটাটা অদ্ভুত, প্রথমে মাটি ছোয় পায়ের বাইরের অংশ বা কিনারাগুলো।

পাশ কাটাবার সময় ছেলেটার দিকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল লোকটা। প্রায়। দেড় বোতল মদ খেয়েও সহজ, সাবলীল ভঙ্গিতে হাঁটছে সে। লাফ দিয়ে উঠে। দাঁড়িয়ে এক ছুটে রাস্তা পেরোল ছেলেটা, টেবিলের ওপর ঝুঁকে খুজল তার জন্যে এটো কিছু পড়ে আছে কিনা। এই সময় বার থেকে বেরিয়ে এল প্রৌঢ় মালিক। তার গম্ভীর চেহারা দেখে পিছিয়ে আসতে শুরু করল বেচারা। পাঁচ হাত পিছিয়ে। এসে দাঁড়িয়ে পড়ল সে, কারণ লোকটার হাতে দুটো প্লেট দেখতে পেয়েছে। কিন্তু বারের ভিতর বা বাইরে কোন খদ্দের নেই।

চোখ ইশারায় কাছে ডাকল বার মালিক। প্লেট দুটো টেবিলে নামিয়ে রাখল। সে। কেউ যদি পায়রাগুলোকে এই বাদাম খাওয়ায়, প্লেট ভর্তি কাজু বাদাম, দেখিয়ে বলল, তাহলে, দ্বিতীয় প্লেটটা দেখাল এবার, এই জলপাইগুলো মজুরি। হিসেবে পাবে সে।

বার মালিকের দিকে নয়, ঘাড় ফিরিয়ে ডকের দিকে তাকাল ছেলেটা। লোকটাকে দেখতে পেল সে, ওর দিকে পিছন ফিরে ফেরিতে উঠছে। ফেরিতে উঠে লোকটা অদৃশ্য হয়ে গেল।

এগিয়ে এসে প্লেট থেকে দুটো জলপাই তুলে নিয়েই ঘুরল ছেলেটা, ছুটল। পিছন থেকে মালিক সবিস্ময়ে চেঁচিয়ে বলল, কি হল?

পরে। এক ছুটে রাস্তা পেরিয়ে কিনারায় এসে দাঁড়াল ছেলেটা। দুটো জলপাই মুখে পুরে দিয়েছে। পনেরো মিনিট পর ডক থেকে রওনা হল ফেরি। অল্প। কজন যাত্রী, তাদের মধ্যে থেকে আগন্তুককে খুঁজে নিতে কোন অসুবিধে হল না। পিছন দিকে রেইল ধরে একা দাঁড়িয়ে আছে লোকটা।

ধীরে ধীরে গতি বাড়তে লাগল ফেরির। কি এক সঙ্কোচ আর দ্বিধা জড়িয়ে। ধরলেও, সব কাটিয়ে উঠে এক সময় একটা হাত মাথার ওপর তুলে নাড়ল। ছেলেটা।

ফেরি তখন অনেক দূরে চলে গেছে। আগন্তুকের চোখ এত দূর থেকে দেখা যায় না, কিন্তু নিজের মুখের ওপর তার দৃষ্টি অনুভব করল ছেলেটা। পরিষ্কার। দেখল, রেইল থেকে হাত তুলল লোকটা, ছোট্ট করে একবার নাড়ল।

পরম আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল ছেলেটার মুখ। তোমার ভাল হোক, বিড়বিড় করে বলল সে। তোমার ভাল হোক!

এই আশীর্বাদ আগন্তুকের দরকার ছিল।

.

০২.
আলো-আঁধারির ভেতর অলস পায়ে হাটাহাটি করছে লরা আভান্তি, ঠোঁটে ক্ষীণ। একটু হাসির রেখা। এক সময়ে ফ্রেঞ্চ উইণ্ডোর সামনে দাঁড়াল সে, চোখের সামনে উদ্ভাসিত হল লেক। লেকের নিস্তরঙ্গ, কালো পারদের মত টলটলে পানিতে। ঝিলমিল করছে শেরাটন হোটেলের আলো।

লরা আভান্তির রূপের বুঝি কোন তুলনা হয় না। অভিজাত সমাজে তাকে বলা হয়, বিশুদ্ধ নিয়াপলিটান সৌন্দর্যের উৎকৃষ্ট নমুনা। যৌবন নয়, যেন ফুলের। কমনীয়তা; মুখ নয়, যেন শিশিরের স্নিগ্ধতা; চোখ নয়, যেন সাগরের গভীরতা। তবু, যার দেখার চোখ আছে, লরা আভান্তির চেহারায় বিদ্রূপ আর দুষ্ট ভাব সময়। সময় ঠিকই দেখতে পায় সে। তার নিটোল ঠোঁটে যৌনাবেদন ফুটে থাকে, বড় বড় চোখে মদির আহ্বান। তার মুখের সৌন্দর্য শতগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে চওড়া চোয়ালের নিখুঁত গড়ন, প্রায় গোল কপালের সাথে ভারি সুন্দর মানিয়ে গেছে। ঘন। কালো চুল সোজা নেমে এসে ভেতর দিকে ভাঁজ নিয়ে কাঁধ ছুঁয়েছে, তারপর অনেকগুলো ঢেউ তুলে সরু কোমর পর্যন্ত ঝুলে আছে। কোমর থেকে ওপরের দিকটা ক্রমশ চওড়া হয়ে উঠে গেছে। পা জোড়া লম্বা। মেদহীন পাঁজর, গলায়। কোন ভঁজ নেই। অর্ধবৃত্ত আকারের স্তন, ভরাট, এতটুকু ঢিলেঢালা ভাব নেই কোথাও।

পুরুষের লোভ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে জানে লরা, কিন্তু পুরুষমানুষ নিয়ে খেলার প্রবণতা তার জন্মগত। অভিজাত সমাজের হোমরা-চোমরা লোকজন তার চারপাশে ভিড় করে থাকে, ধরা দেয়ার ভান করে তাদের কাছে ডাকে সে, কিন্তু কখনোই ধরা দেয় না। এটাই তার সবচেয়ে প্রিয় খেলা। তার এই খেলার শিকার বেচারা স্বামী ভিটো আভান্তিও। স্ত্রীকে একান্ত কাছে পেতে রীতিমত সাধনা করতে হয় তার। গাধার সামনে মুলো ঝুলিয়ে রাখার মত পুরুষের সামনে নিজেকে ঝুলিয়ে রাখে লরা। এই খেলার স্বার্থে নিজেকেও তার বঞ্চিত করতে হয়, শরীরের চাহিদা অনেক সময়ই যথাযথ মেটে না। গত ডিসেম্বরেই তো ভিটো অনুযোগের সুরে বলেছিল, এ-বছর মোট কবার তোমাকে পেয়েছি গুণে বলে দিতে পারি।

লরার চেহারায় বিষণ্ণ একটু হাসি ফুটে উঠেছিল। তার জবাব ছিল, বেশি। কোন জিনিসই ভাল নয়। তাছাড়া, যতটা সম্ভব অক্ষত, অটুট থাকতে চাই আমি ঘাটাঘাটি করে নষ্ট করতে চাও কেন?

আর এক ঘন্টা পর, রাত আটটায়, তার সাথে গল্প করতে আসরে আলবারগো লোরান। গল্প মানে মুগ্ধ চোখে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকা আর লরার রূপের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা। লোরান আশা করবে লরা তাকে ডিনারের জন্যে থেকে যেতে বলবে, কিন্তু রা তার ধার দিয়েও যাবে না। পারিবারিক কোন অনুষ্ঠানে লোরানকে ডিনার খাওয়া যায়, কিন্তু লরা ব্যক্তিগতভাবে কখনও সে অনুরোধ ওকে করবে না।

আজ সাত দিন পর বিদেশ থেকে ফিরছে ভিটোও। ভিটো পৌঁছুবে নটায়, তার মানে লোরানকে আজ বেশি সময় দেয়া যাবে না, ভাবল লরা।

.

জানালার কার্নিসে ভাঁজ করা হাতের কনুই, তালুতে চিবুক ঠেকে আছে, ছল ছল করছে চোখ জোড়া। বন্দিনীর মন ভাল নেই।

লুবনা আভান্তি মায়ের সমস্ত সৌন্দর্য তো পেয়েইছে, পেয়েছে আরও অনেক বেশি করে। মা মেয়ের কাপে যেমন মিল আছে, তেমনি স্বভাবে আবার অমিলও আছে প্রচুর। মায়ের চেহারায় আছে গর্ব, মেয়ের চেহারায় সারল্য। মায়ের চোখে তির্যক কটাক্ষ, মেয়ের চোখে মায়া। লরা শান্ত, সতর্ক; লুবনা ছটফটে, প্রাণচঞ্চল। মা আত্মকেন্দ্রিক, নিজেকে নিজের ভেতর গুটিয়ে রাখে; আর মেয়ে নিজেকে প্রকাশ করার জন্যে ছটফট করে বেড়ায়।

কিন্তু এ এক শ্বাসরুদ্ধকর বন্দী জীবন। এই বয়সে তার খেলার সাথী দরকার, অথচ বাড়ির বাইরে পা বাড়ানো নিষেধ। ওর দেখাশোনার জন্যে ওকে সঙ্গ দেয়ার জন্যে আথিয়া আর গভর্নেস আছে বটে, কিন্তু দুজনের একজনকেও সহ্য করতে পারে না লুবনা। আথিয়া চাকরানী, মনিব কন্যার ওপর খবরদারি করার সুযোগ পেয়ে বাড়াবাড়ি করে ফেলে। এত কথা বলে না, এত কৌতূহল ঠিক নয়, এত হাসি ভাল নয়, বড় হচ্ছ এত লাফায় না–এই চারটে না ছাড়া আর কোন কথা নেই তার মুখে। গভর্নেস বুড়ি আরেক যন্ত্রণা। কেউ যে এমন অঙ্ক-পাগল হতে পারে, বুড়িকে না দেখলে বিশ্বাস হত না লুবনার। দুক্লাস ওপরের বই থেকেও অঙ্ক শিখতে হয় লুবনাকে, আর রোজই শুনতে হয়–সুখী হতে হলে জীবনটাকে এখন থেকে অঙ্কের নিয়মে সাজিয়ে নাও।

আর আছে বাবা। কিন্তু বাবার দেখা পাওয়া লুবনার জন্যে ভাগ্যের ব্যাপার। ব্যবসার কাজে বছরের বেশিরভাগ দিনই বাইরে থাকে বাবা। আর যখন ঘরে থাকে, তাকে দখল করে রাখে মা। লুবনার মনে হয়, বাবা তাকে ভালবাসলেও, আলাদা একটা অস্তিত্ব হিসেবে নয়, মায়ের একটা অংশ হিসেবে ভালবাসে।

আর মা যেন থেকেও নেই।

কেন যেন মাকে ভীষণ ভয় করে লুবনার। মা কখনও তাকে শাসন করে না, কখনও বকাঝকা করেছে বলে মনে পড়ে না, অথচ তবু মায়ের সামনে যেতে তার বুক কাঁপতে থাকে। নিজেকেই সে কতবার প্রশ্ন করেছে, মাকে আমার এমন পর। পর লাগে কেন? তাকে দেখলেই মা কেমন যেন গম্ভীর হয়ে যায়, সেটাই কি তার কারণ? তার ভাল-মন্দ কিছু জানতে চেয়েছে, তার কথায় কখনও হেসেছে, তাকে। কাছে ডেকে কখনও আদর করেছে কই, মনে পড়ে, না লুবনার। সামনে পড়ে। গেলে মা যেন কেমন অদ্ভুত চোখে তাকায় তার দিকে। তখন শুধু ভয় নয়, কেমন যেন সঙ্কোচ বোধ করে লুবনা, একটা আড়ষ্ট ভাব এসে তাকে কুকড়ে দেয়।

এই নিরানন্দ, বন্দী জীবনে একমাত্র খোলা জানালা ছিল স্কুল। কিন্তু আজ দুমাস হল স্কুলে যাওয়াও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বান্ধবীদের কথা মনে পড়ে লুবনার, মনে পড়ে টিফিন আওয়ারে সবুজ ঘাসে পা ছড়িয়ে বসে আইসক্রীম। খাওয়া আর দল বেঁধে হুটোপুটি করার কথা। আর মনে পড়লেই ঝাপসা হয়ে আসে দৃষ্টি, কান্না পায়।

নিঃসঙ্গ এক পাখির ছানা, খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখে বাগান থেকে ধরে নিয়ে এসে খাঁচায় পুরে রেখেছিল লুবনা–নিজেকে তার সেই কাতর পাখির মত লাগে। পাখিটাকে সঙ্গ দেয়ার জন্যে তবু তো সে ছিল; কিন্তু তার কে আছে?

সন্ধে থেকে দুবার মায়ের কাছে যাবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে সে। প্রথমবার ঘর থেকে বেরিয়েছিল, কিন্তু বারান্দা থেকে ফিরে এসেছে। দ্বিতীয়বার। সিঁড়ির মাথা পর্যন্ত পৌঁছেছিল, কিন্তু তারপর আবারও সাহস হারিয়ে ফেলে। লুবনা জানে, বাবা আজ ফিরে আসছে। কথাটা বলতে হলে আজই মাকে তার বলে রাখতে হবে।

মনে মনে সাহস সঞ্চয় করল লুবনা। বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল সে। দাঁড়ালে বোঝা যায়, লম্বায় মাকেও ছাড়িয়ে যেতে চলেছে সে। ঘর থেকে বেরুবার আগে। আয়নায় চোখ পড়ল, নিজের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন লজ্জা লাগল তার। এখনও সে রোগা, কিন্তু মুখে ফোলা ফোলা একটা ভাব দেখা দিতে শুরু করেছে। হাতে-পায়ে মাংস নেই, কিন্তু ওগুলো আশ্চর্যভাবে বদলে গিয়ে আরও সুন্দর একটা। গড়ন নিচ্ছে। হঠাৎ খচ করে বিধল প্রশ্নটা, মা কি তাকে ঈর্ষা করে?

অন্যমনস্কভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে এল লুবনা। মা-বাবার বেডরূমের সামনে কখন এসে দাঁড়িয়েছে বলতে পারবে না। ঘরের দরজা খোলা, ভেতরে নেই কেউ। মা কি তবে বাইরে কোথাও গেছে?

মা একা একা বেড়াতে চলে যায়, তাকে সাথেও নেয় না, বলেও যায় না।

ড্রইংরূমের দিকে এগোল লুবনা। ভারি, পুরুষালি একটা আওয়াজ আসছে। ওদিক থেকে। দূর থেকেই আলোকিত জানালা দেখা গেল, কিন্তু দরজা বন্ধ। গলাটা চিনতে পারল লুবনা, বাবার বন্ধু আলবারগো লোরান কথা বলছে। মার হাসির আওয়াজও শুনতে পেল সে।

আমার সাথে মা কখনও এভাবে হাসে না, ভাবল সে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। খানিক ইতস্তত করল, তারপর মৃদু টোকা দিল কবাটে।

ভেতর থেকে মা বলল, দাঁড়াও

লোরান কাকুর একটা কথাও পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছে না লুবনা, কথাগুলো চাপা পড়ে যাচ্ছে মার হাসিতে। একবার ইচ্ছে হল ফিরে যায়। কিন্তু মাকে কথাটা বলা একান্ত দরকার। বাবা হয়ত আবার কাল সকালেই দিন কতকের জন্যে অন্য। কোথাও চলে যাবে।

আরও পাঁচ মিনিট কাটল। আবার নক করবে কিনা ভাবল লুবনা। মা হাসছে। আর হাসছে। আওয়াজটা যেন ঘরের ভেতর ছুটে বেড়াচ্ছে.••একবার কাছে। আসছে, আবার দূরে সরে যাচ্ছে, ঘরের ভেতর ওরা ছুটোছুটি করছে নাকি! হঠাৎ, মাঝপথে থেমে গেল মার হাসি, কেউ যেন তার মুখে কিছু চাপা দিল। তারপর আর কোন আওয়াজ নেই।

আরও দুমিনিট পর দরজা খুলে গেল। মাকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল লুবনা।

ও, তুমি, বলল লরা, এ-সময় মেয়েকে তার কাছে আসতে দেখে একটু অবাকই হয়েছে সে।

অনেক দুঃখ আর অভিমান জমে আছে লুবনার বুকে, ইচ্ছে হল মাকে জড়িয়ে ধরে প্রাণ ভরে কাঁদে আজ। কিন্তু মার চোখে সেই দৃষ্টিটা ফুটে উঠতে দেখে আড়ষ্ট হয়ে গেল লুবনা। মা হাসছে না, শুধু তাকিয়ে আছে, সে তাকানোতে আদরও নেই। প্রশ্রয়ও নেই। লুবনার মনে হল, মার দৃষ্টি তার কাপড়, চামড়া, হাড়ভেদ করে শরীরের ভেতর চলে গেছে। সে যেন একটা দর্শনীয় বস্তু, মা যেন তাকে এই প্রথম। দেখছে।

কিছু বলবে? মেয়েকে পাশ কাটিয়ে ড্রেসিংরূমের দিকে এগোল লরা।

কয়েক সেকেণ্ড কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল লুবনা। তারপর ধীরে ধীরে ঘুরল। ইতিমধ্যে ড্রেসিংরুমের ভেতর ঢুকে পড়েছে লরা, দরজার কবাট ধরে অপেক্ষা করছে।

ধীর ভঙ্গিতে কয়েক পা এগোল লুবনা, তারপর দাঁড়িয়ে পড়ল, ড্রেসিংরূমের। দরজা থেকে আট দশ হাত দূরে। বুঝতে পেরেছে, মা দরজা বন্ধ করতে চাইছে।

আমি স্কুলে যেতে চাই, প্রচণ্ড জেদের সাথে বলতে চাইলেও গলায় তেমন জোর পেল না লুবনা। বাবাকে বল…

ঠিক আছে, বলল লরা। হঠাৎ অন্যমনস্ক দেখাল তাকে। দরজা বন্ধ করার সময় মেয়ের দিকে তার খেয়ালও থাকল না।

ঘাড় একদিকে একটু কাত হয়ে আছে লুবনার, ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল সে। বন্ধ দরজাটা যখন ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছে, ঝট করে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজের। ঘরের দিকে ছুটল। তার ফোপানর আওয়াজ কেউ শুনতে পেল না।

.

প্লেনে করে হংকং থেকে সিঙ্গাপুর, তারপর মিলান, মিলান থেকে গাড়ি হাঁকিয়ে কোমো-তে ফিরছে ভিটো আভান্তি। সাত দিন পর বাড়ি ফিরছে সে, বাড়ি ফেরার একটা আনন্দ আছে। দেশের বাইরে কোথাও গেলে বরাবর যা হয়, লরা আর লুবনার জন্যে উদ্বেগের মধ্যে ছিল সে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভাল নয়, কোন দিক থেকে কি বিপদ আসে কেউ বলতে পারে না। তাছাড়া, বাড়িতে একটা। সমর্থ পুরুষ মানুষ নেই।

একমাত্র ভরসা ওদের পারিবারিক বন্ধু লোরান। আলবারগো লোরান শুধু স্বনামধন্য ব্যক্তিই নয়, লোকটা পিঁপড়ের মত ব্যস্তও। কিন্তু দায়ে-বিপদে আভান্তি পরিবারের পাশে ঠিকই তাকে পাওয়া যাবে। ভিটো যখনই দেশের বাইরে কোথাও একা বা সস্ত্রীক গেছে, লোরান তার শত ব্যস্ততার মধ্যেও সময় করে নিয়ে ওদের বাড়িতে এসে খোঁজ-খবর নিয়েছে, বাড়িয়ে দিয়েছে সাহায্যের হাত। কৃতজ্ঞচিত্তে স্বীকার করল ভিটো, লোরানের মত বন্ধু হয় না।

কিন্তু বাড়ি ফেরার আনন্দটা পুরোপুরি উপভোগ করতে পারছে না ভিটো। অনেক দিন থেকেই গুমোট একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, এবার সেটা ঝড় তুলবে। কিছু কিছু ব্যাপারে সিদ্ধান্ত এবার নিতেই হবে। ভিটো জানে সিদ্ধান্তগুলো। পছন্দ হবে না লরার। ঝড়টা তখনই উঠবে।

তেরো বছর দাম্পত্য জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে ভিটো জানে এই সঙ্কটকে ছোট করে দেখা চলে না। বছরগুলো স্মরণ করল সে, নিজেকে প্রশ্ন করল, আমি কি সুখী?

এর কোন জবাব নেই। লরা শুধু স্ত্রী নয়, নয় কেবলমাত্র সুন্দরী নারী, লরা তার কাছে প্রচণ্ড একটা নেশা। বিয়ের আগে, প্রথম যেদিন লরাকে দেখে সে, ওর রূপ তাকে মাতাল করে দিয়েছিল। সেই ঘোর আজও কাটেনি, কাজেই এর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ভালমন্দ কিছুই সে বলতে পারবে না।

আসলে সহজ সরল একটা পরিস্থিতির শিকার সে। ভাগ্যগুণে তার স্ত্রী অসম্ভব সুন্দরী আর আত্মকেন্দ্রিক, নিজের শখ সাধ ছাড়া কিছু বোঝে না, চলে আপন। খেয়ালে। সে জানে লরা কোনদিন বদলাবে না, কাজেই হয় সে তাকে ত্যাগ করতে পারে, আর নয়ত মেনে নিতে পারে। সিদ্ধান্তটা কি হবে, অনেক দিন আগেই পরিষ্কার বুঝে নিয়েছে ভিটো। মেনে নেয়া সম্ভব, ত্যাগ করার কথা ভাবা যায় না।

বিয়ের পর প্রথম দিকে এই নেশা যতটা না ছিল মানসিক, তারচেয়ে বেশি। ছিল শারীরিক। রূপ সায়রে অবগাহন করে বেহুশ হয়ে ছিল সে। রূপ-যৌবনের সেই আকর্ষণ আজও আগের মতই অনুভব করে ভিটো, কারণ বিধি-নিষেধের বেড়া তুলে দিয়ে নিজেকে লরা দুর্লভ করে রেখেছে। তবে সেই আকর্ষণের সাথে। নতুন আরও কিছু যোগ হয়েছে এখন। দুষ্প্রাপ্য কোন বস্তুর মালিক হতে পারলে লোকে যেমন গর্ব বোধ করে, লরার মালিকানা স্বত্ব সেই গর্ববোধ জাগিয়ে দিয়েছে। ভিটোর মনে। লরা যাদের অধিকারে নেই তারা ঈর্ষা করে তাকে, কেউ কেউ শ্রদ্ধাও করে। তার ঘরে লরা আছে বলেই অভিজাত সমাজে আর বন্ধু মহলে তার এত খাতির। তার সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে লরা। খাতির আর মর্যাদার মোহ, এ-ও এক দুর্দান্ত নেশা।

লেকের কাছে এসে রাস্তাটা দুভাগ হয়ে গেছে। ল্যানসিয়া ডান দিকে বাঁক নিল। মেয়ের কথা মনে পড়তেই খচ করে একটা অপরাধ বোধ জাগল বুকে। লুবনাকে সে ভালরাসে। কিন্তু স্নেহ আর আদরের যতটুকু লুবনার প্রাপ্য ততটুকু তাকে দেয়া হয়ে ওঠে না। এর জন্যে কিছুটা দায়ী তার ব্যস্ততা, কিছুটা লরার অন্যায় আবদার। বাড়িতে যতক্ষণ থাকে ভিটো, তার ধারে কাছে কাউকে ভিড়তে দেয় না লরা। কোথাও বেড়াতে বা নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গেলে লরা চায় শুধু তারা। দুজনই যাবে। ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ভিটো।

.

ওরা তিনজন ডিনার খেতে বসেছে। চওড়া মেহগনি টেবিলের দুমাথায়, সামনাসামনি বসেছে ভিটো আর লরা। মাঝখানে লুবনা। পরিবেশন করছে মেইড। বসার এই ছক কেতাদুরস্ত আর আনুষ্ঠানিক, ঘরোয়া পরিবেশে আপনজনদের সান্নিধ্য ভাল লাগার যে অনুভূতি এনে দেয়, তিনজনের মধ্যেই তার বড় অভাব। লরার সাথে আজ কথা কাটাকাটি হবে, সেজন্যে টেনশনে ভুগছে ভিটো। আর ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরে তার যুদ্ধ-কৌশল কি হবে ঠিক করতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে লরা। তাছাড়া, ঘরে বসে ডিনার খেতে চিরকালই তার একঘেয়ে। লাগে। সবচেয়ে স্নান দেখাল লুবনাকে। বুক ভরা অভিমান তো আছেই, আবার তাকে স্কুলে যেতে দেয়া হবে কিনা এই অনিশ্চয়তায়ও ভুগছে সে।

আদর্শ স্ত্রীর মতই স্বামীকে অভ্যর্থনা জানিয়েছে লরা। কোমর জড়িয়ে ধরে চুমো খেতে দিয়েছে, টেনে নিয়ে গিয়ে সোফায় বসিয়েছে, নিজের হাতে মার্টিনি তৈরি করে দিয়েছে, গভীর আগ্রহের সাথে জানতে চেয়েছে বিদেশ-ভ্রমণ কেমন। লাগল। কিন্তু, লুবনা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই ভিটোকে সে অভিযোগের সুরে জানিয়ে দিয়েছে, মেয়ের মন ভাল নেই, ও স্কুলে যেতে চায়, কিছু একটা ব্যবস্থা। আর না করলেই নয়।

সায় দিয়ে মাথা ঝাঁকিয়েছে ভিটো, বলেছে, ব্যাপারটা নিয়ে ডিনারের পর আলোচনা করব। আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

মা-বাবা দুজনেই যে স্নায়ুযুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ডিনারে বসে সেটা টের পেয়ে গেল লুবনা। তার অনেক কথা বলার ছিল, কিন্তু পরিবেশ অনুমতি না দেয়ায় চুপচাপই থাকল। ডিনার শেষ হতে না হতেই উঠে দাঁড়াল সে, মা-বাবাকে চুমো খেল, অভিযোগের সুরে বলল, ঘরের ভেতর বসে থাকতে থাকতে আমার মাথা। ধরে গেছে, আমি শুতে যাচ্ছি।

অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা পিছনে রেখে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল লুবনা।

খানিক পর নিস্তব্ধতা ভাঙলো লরা, গভর্নেসকে ওর পছন্দ নয়।

কাঁধ ঝাঁকাল ভিটো। আসল সমস্যা সেটা নয়। ওর কোন বন্ধু নেই। আমরাও ওকে সঙ্গ দিতে পারি না। এই বয়সে মেয়েরা খেলতে চায়, বেড়াতে যেতে চায়। স্কুলে গেলে তবু বান্ধবীদের সাথে দেখা হত… উঠে দাঁড়িয়ে বার-এর। সামনে চলে এল সে, গ্রাসে খানিকটা কনিয়াক ঢেলে ছোট্ট করে চুমুক দিল। টেবিল। পরিষ্কার করছে মেইড, তার বিদায় না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল সে। বাইরে থেকে দরজা বন্ধ হবার পর আবার সে মুখ খুলল, লরা, কিছু কিছু বিষয় আমাদের। ভেবে দেখতে হবে। আমি চাই আলোচনাটা যেন যুক্তির বাইরে না যায়।

চেহারায় বিরূপ কোন ভাব তো নেই-ই, স্বামীর দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি। হাসছে লরা, চোখে কৌতুক মেশানো প্রশ্রয়।

লরার এইভাব লক্ষ্য করে মনে মনে শঙ্কিত হল ভিটো। বুঝল, তর্ক-যুদ্ধে জেতার জন্যে নিশ্চয়ই কোন কৌশল ঠিক করে ফেলেছে লরা। সেটা কি, বুঝতে না পেরে তার অস্বস্তি আরও বেড়ে গেল।

দুটো ব্যাপারে কথা বলতে চাই আমি, গ্লাসে আরেকটা ছোট্ট চুমুক দিয়ে বলল ভিটো। এক, লুবনাকে স্কুলে পাঠাতে হবে। আর দুই, তোমার বাজে খরচ কমাতে হবে।

আমার বাজে খরচ? চোখের কৌতুক লরার সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ল।

এ-মাসেই তুমি নতুন ডিনার সেট আর অ্যান্টিকস কিনে নব্বই লাখ লিরা খরচ করেছ–কোন মানে হয়?

কিন্তু ভিটো, বাজারে ওগুলো এই প্রথম এল; কিনব না? বিস্মিত দেখাল লরাকে।

বিরক্ত হয়ে মাথা নাড়ল ভিটো। তার আগে আমাদের সামর্থ্যের কথা ভেবে। দেখবে। তুমি তো জান ব্যবসা খারাপ যাচ্ছে। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে আমাদের। প্রোডাকশন কস্ট অনেক বেড়ে গেছে, তার ওপর সস্তা বোটে ছেয়ে গেছে ওয়ার্ল্ড মার্কেট। এ-বছর যা প্রোডাকশন দিয়েছি তার সিকি ভাগও বিক্রি করতে পারব না। অনেক মিলিয়ন লিরা লোকসান দিতে হবে। ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে আমি একবারে ডুবে আছি।

কত লোন নিয়েছ?

বারো শো মিলিয়ন লিরা, বলে কাধ ঝাঁকাল ভিটো।

বাবা বলত, একজন মানুষের ওজন বোঝা যায় তার সম্পদ দেখে, নয়ত তার দেনা দেখে। শুধু পরিমাণটাই আসল কথা।

রেগে উঠল ভিটো। তোমার বাবা অন্য এক জগতে বাস করতেন। তোমার ভায়েরা সমস্ত দেনা শোধ করতে পেরেছিল বলে, নয়ত বেচে থাকলে তোমার। বাবাকে দেশের সেরা দেউলিয়া বলে ঘোষণা করা হত।

ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি নিয়ে লরা বলল, বাবার সময়জ্ঞান ছিল টনটনে, মরার সময় সেটা দেখিয়ে গেছে। আমার কি ধারণা জান? যে যত বড়, তার ভার সহ্য করার ক্ষমতাও তত বেশি। তুমি খুব বড় পরিবার থেকে এসেছ, দেশের সেরা ধনী পরিবারের একটা থেকে, মাত্র বারো শো মিলিয়ন লোন করে ঘাবড়ে যাচ্ছ কেন?

নিজেকে সামলে নিল ভিটো। ব্যাপারটা আর হালকা চোখে দেখার পর্যায়ে। নেই, লরা। বাস্তবকে তোমার মেনে নিতে হবে। দুএক মাসের মধ্যে ব্যাঙ্কের সাথে। একটা এগ্রিমেন্ট না হলে সত্যিই আমি খুব বিপদে পড়ব।

স্থির হয়ে সোফায় বসে থাকল লরা। খানিক চিন্তা করে জানতে চাইল, তা কি করবে বলে ঠিক করেছ?

খুব সাবধানে উত্তর দিল ভিটো। সমস্যার দুটো দিক। এক, ছোট বোটের একচেটিয়া বাজার আমরা হারাচ্ছি। প্রতিযোগিতা করতে হলে শৌখিন বড়লোকদের জন্যে দামি ইয়ট তৈরি করতে হবে। একমাত্র উপায় দুষ্প্রাপ্য জিনিস। দিয়ে চড়া দাম আদায় করা, সস্তাদরের বোটের বাজার যার খুশি দখল করুক গে।

মনোযোগ দিয়ে শুনছিল লরা, ভিটো থামতেই জানতে চাইল, বেশ, তাই কর, কে তোমাকে বাধা দিচ্ছে?

ডকইয়ার্ড, বলল ভিটো। লীজের মেয়াদ শেষ হয়ে এসেছে, কাজেই এটা। ছেড়ে দিয়ে নতুন ডকইয়ার্ড ভাড়া নিতে হবে। নতুন কিছু মেশিনপত্রও দরকার হবে আমাদের। সব মিলিয়ে এখনি তিনশো মিলিয়ন লিরা চাই আমার।

কিন্তু ব্যাঙ্ক সাহায্য করতে চাইছে না?

বার-এর দিকে ফিরল ভিটো, গ্লাসে আরও খানিকটা কনিয়াক ঢালল। স্ত্রীর। দিকে ফিরে বলল, এখানেই সমস্যার আরেক দিক। জমি ছাড়া ডকইয়ার্ডের সমস্ত কিছু এরইমধ্যে মর্টগেজ রাখা হয়েছে, এই বাড়ি আর রোমের অ্যাপার্টমেন্ট সহ। নতুন লোন আমাকে নিতেই হবে, অথচ মর্টগেজ রাখার মত আর কিছু নেই আমার। অন্য পথে চেষ্টা করছি, কিন্তু কতদূর কি করতে পারব জানি না।

লোরানের সাথে কথা বলেছ?

না, মুহূর্তের জন্যে একটু অন্যমনস্ক দেখাল ভিটোকে। আগামী হপ্তায় একসাথে লাঞ্চ খাব আমরা, তখন আলোচনা হবে। লরা, আমি চাইছি, আমরা। সমস্যায় পড়েছি এটা শুধু তুমি মনে রাখ।

হাসিটা আবার লুবনার মুখে ফিরে এসেছে, তাতে বিদ্রুপের ছিটেফোঁটাও নেই। ভিটো, প্লীজ, আমাকেও খানিকটা কনিয়াক দাও।

স্ত্রীর জন্যে ড্রিঙ্ক নিয়ে এগিয়ে এল ভিটো, তার পিছনে দাঁড়াল। হাতের গ্লাসটা রাখার জন্যে লরার কাঁধের ওপর দিয়ে টেবিলের দিকে ঝুঁকল সে। একেবারে স্থির বসে থাকল লরা, গ্লাসটা ছেড়ে দিয়ে তার চুলের ভেতর, গলার পিছনে চলে এল। ভিটোর হাত। স্বামীর হাতের ওপর হাত রাখল লরা, তার আঙুলের ওপর চাপ দিল। মাথাটা ভিটোর পেটে ঠেকিয়ে ধীরে ধীরে ওপর-নিচে ঘষতে লাগল সে।

ভুলে গেছে, সমস্যার কথা এখন আর ভাবছে না ভিটো।

দাঁড়াল লরা, চেয়ারটাকে পাশ কাটিয়ে একটু সরে এসে চুমো খেল ভিটোর। চোখে আর গালে। ঠিক চুমো নয়, কোমল ঠোঁটের আলতো স্পর্শ মাত্র। ভিটো জানে, এভাবেই তাকে অস্থির করে তোলে লরা, অস্থির করে তুলে মজা পায়। সে যত ব্যর্থ হয়ে উঠবে, লরা ততই ধীর লয়ে উনাক্ত করবে নিজেকে। এটাই তার। রীতি।

স্বামীর হাত দুটো নিজের হাতে আটকে রেখেছে লরা। ভিটোর গালে ঠোঁট বুলাতে বুলাতে বলল, চিন্তা কোরো না, লোরান একটা উপায় ঠিকই বের করবে।

স্বামীকে জড়িয়ে ধরে বেডরূমে এল লরা। বিছানায় উঠে অনেকক্ষণ একাই ব্যস্ত হয়ে থাকল সে। ভিটো যখন আর নিজেকে স্থির রাখতে পারছে না, শুধু।

তখনই নিজেকে তার হাতে তুলে দিল সে।

বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে থেকে দম নিল ভিটো। কাপড় না পরেই নিচতলায় নেমে গেছে লরা, কনিয়াক আর সিগারেট আনার জন্যে। ক্ষীণ একটু হাসির রেখা। ফুটে আছে ভিটোর ঠোঁটে, স্ত্রীর কথা ভাবছে। প্রেম করার এই রীতি লরার একান্ত নিজস্ব। সে-ই প্রথমে উদ্যোগী হয়, সে-ই গাইড করে, কিন্তু তবু শেষ পর্যন্ত নারী সুলভ আচরণ বিসর্জন দেয় না, একটু দেরিতে হলেও ঠিকই আত্মসমর্পণ করে। মিলন পর্ব সমাধা হলে নিজেকে ভিটোর নির্জীব, নিঃশেষিত বলে মনে না হলেও দুর্বল লাগে তার–যেন একটা ভায়োলিন অতিরিক্ত বাজানো হয়েছে, ফলে চিল হয়ে গেছে তারগুলো।

এক হাতে বেলুন গ্লাসে কনিয়াক, আরেক হাতে সিগারেট নিয়ে ফিরে এল লরা। গ্লাসটা স্বামীর হাতে দিয়ে বিছানার সামনে দাঁড়িয়ে দুটো সিগারেটে আগুন ধরাল সে। নিরাবরণ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে ভিটোর মনে হল, এখনও ও যেন সদ্য ফোঁটা একটা গোলাপ, কিন্তু সবগুলো কাটাসহ। লরার ঘামের গন্ধ ঢুকল তার। নাকে। বাস্তবে ফিরে আসতে মনের ওপর জোর খাটাতে হল ভিটোকে।

লুবনাঃ.., খানিক ইতস্তত করে সরাসরি প্রসঙ্গটা পাড়ল সে, ওকে আবার স্কুলে পাঠানো দরকার। গভর্নেস বুদলালেও বাড়িতে বসে ওর লেখাপড়া হবে না। বারোয় পা দিয়েছে ও, তাই না, কিন্তু পিছিয়ে পড়ছে।

বিছানায় উঠল লরা, স্বামীর হাতে একটা সিগারেট দিল। ভিটোকে অবাক করে দিয়ে বলল সে, শুধু বারোয় পা দেয়নি, দিনে দিনে আমাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, ওকে আর বাড়িতে আটকে রাখা চলে না। কালই তো লোরান আর অলিভার সাথে কথা হচ্ছিল। জান, ওরা আরাসিয়া আর কালডোকে জেনেভায় পাঠাচ্ছে। স্কুলটা নাকি খুব ভাল, লেখাপড়াও শেখানো হয় আমাদের ভাষায়। ইতালীর। অনেক ছেলেমেয়ে পড়ে ওখানে।

বসে পড়ল ভিটো। কিন্তু লরা, এর কোন মানে হয় না। লোরান দেশের একজন নামকরা লইয়ার, আমার মত শিল্পপতিকে দুদশবার কিনতে পারে সে। বিদেশী ব্যাঙ্কে প্রচুর টাকা আছে তার। তাছাড়া, বছরে দুএকবার জেনেভায়। এমনিতেও বেড়াতে যায় ওরা, ওদের ছেলেময়েরা ওখানে পড়তেই পারে। তাই বলে…

শান্ত ভাবে সিগারেটে টান দিল লরা। তাকে বিচলিত হতে না দেখে আবার মনে মনে শঙ্কিত হয়ে উঠল ভিটো। ভিটো, বলল লরা। আমি কি ঠিক করেছি, বলি তোমাকে। রোমের অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি করে দেব আমরা। রোম আমার কাছে একঘেয়ে লাগে। ঠিক এই সময় ভাল দামও পাওয়া যাবে। ওই টাকা দিয়ে জেনেভায় একটা বাড়ি কিনব। মিলান থেকে প্লেনে মাত্র ত্রিশ মিনিটের পথ, কোনমতেই দূর বলতে পার না। মিলান থেকে গাড়িতে করে এখানে পৌঁছুতেও ওই আধ ঘন্টাই লাগে।

দীর্ঘশ্বাস ফেলল ভিটো, কিন্তু লরা থামল না। তাছাড়া, শীতের সময়টা তুমি এত বেশি বাইরে বাইরে থাক যে আমারও এখানে সময় কাটতে চায় না। জেনেভায় আমার সময় কাটানর কোন সমস্যা হবে না। হপ্তা শেষে মিলান থেকে যাবে তুমি, লুবনাকেও আনিয়ে নেব…

লরা, ধৈর্য হারিয়ে বাধা দিল ভিটো, তোমাকে আমি বলেছি রোমের। অ্যাপার্টমেন্ট মর্টগেজ রাখা হয়েছে। ওটা যদি বিক্রি করি, সব টাকা ব্যাঙ্কে জমা দিতে হবে। আর ভুলে যাচ্ছ, রোমের চেয়ে জেনেভায় বাড়ির দাম অনেক বেশি, প্রায় ডাবল।

ব্যাপারটা হজম করতে অনেক সময় নিল লরা। এক সময় শুয়ে পড়ল সে, গায়ে চাদর টানল। ঠিক আছে, ভেবেচিন্তে অন্য কোন উপায় বের করতে হবে। আমার মেয়ের নিরাপত্তার দিকটা সবচেয়ে আগে দেখব আমি। ওকে আমি বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারি না। মন্তে ফ্যাকন-এর ছেলের কি হল দেখলে তো! স্কুলের গেট থেকে তাকে ধরে নিয়ে গেল। তার গলা চড়ল, স্কুলের গেট থেকে, ভর দুপুরবেলা! মিলানের মত শহরে! আশ্চর্য, তুমি কি তোমার নিজের মেয়ের নিরাপত্তার দিকটাও চিন্তা করবে না!

অনেক কষ্টে নিজেকে শান্ত রাখল ভিটো। লরা, এসব নিয়ে আগেও আমরা আলোচনা করেছি। মন্তে ফ্যাকন মিলানের সবচেয়ে ধনী তিনজনের একজন। তোমার লুবনাকে কেউ কিডন্যাপ করতে যাচ্ছে না। এসব কাজ যারা করে তারা। জানে কার আর্থিক অবস্থা কেমন যাচ্ছে। শেষদিকে তার সুরে তিক্ততা প্রকাশ পেল। সে জানে, ব্যবসায়ী মহলে তার আর্থিক দুরবস্থার কথা গোপন নেই।

তর্ক ছাড়ল না লরা। যারা কিডন্যাপ করে তারা অ্যামেচার নয়। কিডন্যাপিং বিশাল এক জটিল ব্যাপার, শুধু প্রফেশনালরাই জড়িত। ইনফরমেশন পাবার বহু উৎস আছে ওদের। দেউলিয়া হতে বসেছে এমন বাপের মেয়েকে কিডন্যাপ করে। ওরা সময় আর এনার্জি নষ্ট করবে না।

তাহলে বল টারকোর মেয়েটাকে কিডন্যাপ করা হল কেন?

বেছে বেছে ঠিক প্রশ্নটাই করেছে লরা। আট বছরের টারকো নোবিলিকে ছমাস আগে কিডন্যাপ করা হয়। টারকো পরিবার নির্মাণ ব্যবসায় আছে, কিন্তু তাদের ব্যবসা মন্দা যাচ্ছিল। মেয়েটাকে দুমাস আটক রাখা হয়, এই দুমাসে কিডন্যাপাররা তাদের প্রথম দাবি এক বিলিয়ন লিরা থেকে নামতে নামতে শেষ পর্যন্ত দুশো মিলিয়ন লিরায় এসে ঠেকে। অনেক কষ্টে টাকাটা জোগাড় করে। মেয়েকে উদ্ধার করে টারকো পরিবার। ওটা একটা আলাদা ব্যাপার ছিল, বলল ভিটো। কিডন্যাপাররা ছিল ফ্রেঞ্চ, মার্সেলেস থেকে এসেছিল। টারকো পরিবার। সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানত না তারা। তাছাড়া, ওরা ঠিক প্রফেশনালও ছিল না। টাকা পাবার দুহপ্তার মধ্যে ধরা পড়ে যায়।

হয়ত তাই, বলল লরা। কিন্তু বাচ্চা মেয়েটার একটা আঙুল কেটে নিয়েছিল ওরা, সেই থেকে বেচারি একটা মেন্টাল কেস হয়ে গেছে। তুমি চাও লুবনার। সেরকম কিছু একটা হোক?

এভাবে তর্ক করা কঠিন, ভিটোর রাগ বাড়তেই থাকল। স্ত্রীর দিকে তাকাল সে। গায়ের চাদরটা গলা থেকে কোমরে নেমে এসেছে, চিত হয়ে শুয়ে থাকলেও লরার স্তনের আকৃতি বদলায়নি, গম্বুজের মত, নিটোল আর নিভাঁজ। স্বামী তার দিকে তাকিয়ে আছে বুঝতে পেরে পাশ ফিরে শুলো সে।

বলল, মিলানের স্কুলে, লুবনাকে আমি পাঠাতে পারি, কিন্তু তার আগে ওর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে।

কি বলছ? ভুরু কুঁচকে উঠল ভিটোর।

বডিগার্ড।

কি? দুহাতে ধরে স্ত্রীকে নিজের দিকে ফেরাল ভিটো।

বডিগার্ড। লরার চেহারা থমথম করছে। এমন একজন লোক, যে লুবনার সাথে সারাক্ষণ থাকবে, বিপদ থেকে রক্ষা করবে ওকে।

স্ত্রীকে ছেড়ে ধপাস করে বালিশে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়ল ভিটো। আলোচনাটা সম্পূর্ণ ভুল পথে এগোচ্ছে। লরা, এটা কোন যুক্তির কথা হল না। একজন বডিগার্ডের বেতন কত জান তুমি? আর বডিগার্ড রাখা মানে লুবনার দিকে কিডন্যাপারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা…

– তুমি কি শুধু খরচার দিকটাই দেখবে? আমার লুবনার নিরাপত্তার চেয়ে। তোমার কাছে টাকাটাই বড় হল?

ভিটো বুঝল, এভাবে হবে না। কিভাবে কি বললে লরা বুঝবে, ভাবছে। লরার আচরণে এমন কিছু একটা লুকিয়ে আছে যার কোন অর্থ খুঁজে পাচ্ছে না সে। শান্ত ভাবে যুক্তির পথে লরাকে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করল এবার। আমার টাকা নেই, এটা তোমাকে মেনে নিতে হবে। এবার তুমিই বল, বডিগার্ড রাখার মত একটা বাজে খরচ কোত্থেকে আমি যোগাব?

স্বামীর দিকে সরাসরি তাকাল লরা। কি ভাষার ছিরি! মেয়ের নিরাপত্তার জন্যে কিছু টাকা খরচ হবে, সেটা তোমার কাছে বাজে খরচ হয়ে গেল? কেন, ক্যাপরোটা পরিবার তাদের মেয়ের জন্যে বডিগার্ড রাখেনি? মোজারেলা, মল্টিনি, পোলেন্তা এরা? এমনকি পভেলোরাও তাদের ছেলের জন্যে বডিগার্ড রেখেছে।

এতক্ষণে ব্যাপারটা উপলব্ধি করল ভিটো লুবনার নিরাপত্তার দিকটাই বড় কথা নয়। ওদের ছেলেমেয়েদের জন্যে বডিগার্ড আছে, কাজেই তার মেয়ের জন্যেও একটা রাখতে হবে, তা না হলে ভাট বজায় থাকে না। শুধু হতাশ হল ভিটো তা নয়, অসহায় বোধ করল সে। জানে, এই জেদ থেকে এক চুল নড়ানো। যাবে না লরাকে।

ক্লান্তবোধ করল সে। বলল, এ নিয়ে পরে কথা বলব আমরা।

এ-ব্যাপারে লোরানের সাথে কথা বলতে পার, বলল লরা।

এ-সব ব্যাপার ভাল বোঝে সে, লোকে তার কাছে পরামর্শ চায়।

চোখ মেলে দ্রুত জানতে চাইল ভিটো, বডিগার্ডের কথা লোরানকে বলেছ তুমি?

না। তবে কাল লাঞ্চে বসে অলিভা বলল, মোজারেলা বডিগার্ড রাখার জন্যে, লোরানের কাছে পরামর্শ নিতে এসেছিল। সবাই জানে, সব ধরনের লোকের সাথে যোগাযোগ আছে লোরানের। ওর ফার্ম ছোট বড় কোন কাজই ফিরিয়ে দেয় না।

ভিটো চুপ করে থাকল, চিন্তা করছে।

কি, রাগ করলে? স্বামীর গায়ের কাছে সরে এল লরা

না।

লোরানের সাথে তাহলে কথা বলবে?

ঠিক আছে।

ভিটোর গলায় গাল ঘষল লরা। বিজয়ের আনন্দে আপন মনে হাসছে। জেনেভার কথা তুলে চমকে দিয়েছিল ভিটোকে, ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। আর তাই দ্বিতীয় দাবিটা আদায় করতে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি নির্জীব সুইসদের মাঝখানে বসবাস করার কোন ইচ্ছেই তার নেই।

.

০৩.
প্রেজো ফিসো বোর্ডিং হাউজ অ্যাণ্ড রেস্টুরেন্ট।

ভোরের আলো মাত্র ফুটতে শুরু করেছে। প্রেজো ফিসোর মালিক, ভিটেল রেমারিক, চোরের মত পা টিপে টিপে বারান্দা ধরে নিজের অফিস ঘরের দিকে এগোল। ত্রিশ বছর বয়স, সুঠাম স্বাস্থ্য, মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া চুল, চোখে বুদ্ধি ঝিলিক। কিন্তু এই মুহূর্তে তার ভুরু কুঁচকে আছে, দৃষ্টিতে বিস্ময় মেশান উদ্বেগ দূর থেকেই দেখা গেল, দরজা হাঁ-হাঁ করছে।

দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়াল সে, সন্তর্পণে উঁকি দিয়ে ঘরের ভেতর তাকাল। ভেতরের অস্পষ্ট আলোয় পরিষ্কার কিছুই দেখা গেল না। চারকোনা একটা কালো। কাঠামো, ওটা নিশ্চয়ই ডেস্ক। লম্বা আরও একটা আকৃতি, ওটা আলমিরা। ডেস্কের সামনে কালো আরও একটা কি যেন রয়েছে চেয়ার। ঘরের ভেতর থেকে ভারি নিঃশ্বাস পতনের আওয়াজ আসছে।

কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণচোখে তাকিয়ে থাকার পর ভিটেলা রেমারিক বুঝল, চেয়ারটা সম্পূর্ণ ঢেকে ফেলে কেউ একজন বসে আছে ওতে। আলো আরও একটু না ফুটতে লোকটাকে পরিষ্কার দেখা যাবে না। তারমানে এখানেই তাকে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে।

পজিটানোয় অসুস্থ মাকে দেখতে গিয়েছিল ভিটেলা রেমারিক। রা, বারোটায় এখান থেকে তাকে ফোন করে ফুরেলা জানায়, একজন এসেছেন, নাম বলছেন ইমরুল হাসান, তার অনুমতি না নিয়েই মালিকের অফিস ঘরে ঢুকে একটা চেয়ার দখল করে বসে আছেন।

ইমরুল হাসান! স্মৃতির পাতা উল্টে এই নামের কাউকে চিনতে পারেনি। ভিটেলা রেমারিক। খানিক চিন্তাভাবনা করার পর হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মত একটা সম্ভাবনা উঁকি দিল তার মনে। আমি একটা বোকা, নিজেকে তিরস্কার করল সে। লোকটা অনুমতির ধার না ধেরে সোজা তার ঘরে ঢুকে পড়েছে, এ থেকেই কি তার পরিচয় বেরিয়ে আসে না?

এরপর অসুস্থ মাকে চুমো খেয়ে বেরিয়ে পড়ে সে।

দিনের আলো একটু একটু করে বাড়ছে, সেই সাথে পরিষ্কার হচ্ছে লোকটার। চেহারা। উঁহু, এ লোক মাসুদ রানা, নয়। মুখ ভরা আধ ইঞ্চি লম্বা কালো দাড়ি, বা। চোখের নিচে আর কপালের ডান দিক ঘেঁষে দুটো কাটা দাগ, মাথাভর্তি এলোমেলো চুল, মুখটা ভরাট, চোখের নিচে পোটলা। ঘর থেকে ভুর ভুর করে হুইস্কির গন্ধ বেরিয়ে আসছে।

আজ পাঁচ বছর। পাঁচ বছরে কি একটা মানুষ এত বদলাতে পারে? নাহ, কোথায় সেই একহারা গড়ন, মেদহীন পেটা শরীর? চেয়ারে বসে ঘুমাচ্ছে ওটা. একটা পাড় মাতাল, কিন্তু ও জানে, মাসুদ রানা মদ স্পর্শ করে না। তাছাড়া, রানার চেয়ে এই লোকের বয়স অনেক বেশি–পঁয়তাল্লিশ, পঞ্চাশও হতে পারে।

দিনের আলো পরিষ্কার হল। চেয়ারের পাশে হুইস্কির একটা খালি বোতলও এখন দেখতে পাচ্ছে ভিটেলা রেমারিক। একটা ভুল ভাঙলো তার, লোকটা ঘুমাচ্ছে না। চোখ জোড়া বড় বড়, ভারি পাতা, জানালা দিয়ে সাগর আর পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে।

এই চোখ জোড়াই ভুল ভেঙে দিল তার। মায়াভরা এই চোখ কি ভোলা যায়। বয়স আর চেহারা মেলে না, তার কারণটাও পরিষ্কার হল। রানা ছদ্মবেশ নিয়ে আছে।

বন্ধুকে চিনতে পেরে হতভম্ব হয়ে গেল ভিটেলা রেমারিক। এক নিমেষে বহু। কিছু বুঝে নিল সে। হতভম্ব ভাবটা দূর হল, তার জায়গায় দেখা দিল সতর্কতা। ঘরে ঢুকল না সে, শুধু দোরগোড়ায় দাঁড়াল।

দিগন্তরেখায় তখন উঁকি দিচ্ছে নতুন সূর্য। সাগরের দিকে তাকিয়ে থাকলেও আগেই টের পেয়েছে রানা, দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে কেউ। এবার সে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েছে বুঝতে পেরে চেয়ারের ওপর সিধে হয়ে বসল ও, বলল, আমি হাসান। কেমন আছ, দোস্ত?

একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল রেমারিক। ধীর পায়ে ঘরে ঢুকল সে। বন্ধুর সামনে দাঁড়াল। জিজ্ঞেস করল, সে তাহলে লুকিয়ে পড়েছে?

চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল রানা। হ্যাঁ।

দুই বন্ধু সামনাসামনি দাঁড়িয়ে পরস্পরকে দেখছে। প্রথমে ক্ষীণ একটু হাসি। দেখা গেল রানার ঠোঁটে। সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ল সেই হাসি। বন্ধু বিপদে পড়েছে, এটুকু বুঝতে পেরেছে রেমাক্সিক, সেজন্যে শরীরের সমস্ত পেশী টান টান। হয়ে আছে তার। মুখে হাসি ফুটতে তাই একটু দেরি হল। পরস্পরকে আলিঙ্গন করল ওরা। বুকে বুক ঠেকিয়ে দুজন্য দুজনকে যেন পিষছে। কোন কারণ নেই, আবার আরেক অর্থে কারণের কোন অভাব নেই, চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এল। রেমারিকের। তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে ছোট্ট একটা শব্দ উচ্চারণ করল সে, কফি।

মাথা ঝাঁকাল রানা। কিন্তু ছেড়ে দেয়ার আগে লম্বা করা হাত দুটো বন্ধুর কাঁধে রেখে খুটিয়ে তাকে দেখল, আরেকবার। তারপর হাত নামিয়ে নিয়ে বসে পড়ল চেয়ারে।

বোর্ডিং, রেস্তোরাঁ আর অফিস, বিল্ডিংটা এই তিন ভাগে ভাগ করা। অফিসের পাশে রেমারিকের জন্যে একটা শোবার ঘর আর খুদে একটা কিচেনও আছে। সেই কিচেনে এসে ঢুকল রেমারিক, ভারি উদ্বিগ্ন। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই রানার, এ. থেকে বোঝা যায় ভয়ানক কিছু একটা ঘটেছে। তার বন্ধু নিজেকে সুস্থ আর সবল রাখার জন্যে সম্ভাব্য সবকিছু করত, অথচ আজ সে মদ খায়, শরীরে মেদ জমেছে। রেমারিক জানে, ইচ্ছে বা দরকার না হলে নিজের বিপদের কথা প্রকাশ করবে না। রানা। ওদের বন্ধুত্বটা এমনই, রানা না বললে সে-ও কিছু জানতে চাইবে না। কয়েক মুহূর্তের জন্যে অতীত রোমন্থন করল রেমারিক। রানার অনেক কিছুই জানে না সে, তার কাছে ও এক রহস্যময় চরিত্র। কিন্তু না জানা ব্যাপারগুলো তাকে কখনও বিরক্ত বা কৌতূহলী করে তোলে না। রানাকে বন্ধু হিসেবে পাওয়া সাতজন্মের ভাগ্য, সেটা পেয়েই কৃতজ্ঞ সে। মনে পড়ল, শেষবার দুজনের দেখা হয়েছিল জেসমিনের মৃত্যুর পর।

তারপর পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে। কি ঘটেছে এই পাঁচ বছরে?

সেবার দুহপ্তা এখানে ছিল রানা, বরাবরের মত শান্ত আর চুপচাপ। কিন্তু রানার নিরুপদ্রব উপস্থিতি প্রয়োজনের সময় বরাবরের মতই শক্তি যুগিয়েছে। তাকে, গিঁট দিয়েছে ছিঁড়ে যাওয়া সুতোয়।

পাহাড়ের পাশে, চূড়োর কাছাকাছি উঠে এসেছে সূর্য। অফিস ঘরে ফিরে এল রেমারিক। বাথরুমের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। জানালা দিয়ে দেখা গেল, নেপলস জেগে উঠছে। বে-তে নোঙর ফেলেছে একটা যুদ্ধ জাহাজ, আরও সামনে। বিশাল একটা লাইনারের পিছন দিকটা দেখা গেল। টেবিলে ট্রে রেখে অপেক্ষা করছে রেমারিক। ২ বাথরূম থেকে বেরিয়ে এসে ডেস্কের পিছনের চেয়ারটায় বসল রানা। পট থেকে কফি ঢেলে দুধ চিনি মেশাল রেমারিক। চুপচাপ বসে কফির কাপে চুমুক দিল দুজন। দুজনেই জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে।

নিস্তব্ধতা ভাঙল রানাই, অসুবিধে করলাম?

স্নান একটু হাসল রেমারিক। মা। তার সেই রহস্যময় অসুস্থতা।

দুএকমাস পর পর হাঁটুতে আর কোমরে ব্যথা, হেঁটে চার্চে যেতে পারে না বলে কান্নাকাটি। হাসছে রানা।

হ্যাঁ।

বাত, বলল রানা। নতুন একটা ওষুধ বেরিয়েছে, জেনেভা থেকে নিয়ে এসেছি আমি। ফেলে চলে এলে কেন?

আজ সকালে মিলান থেকে রিসো আসছে, বলল রেমারিক। বলছু বটে। বাত, কিন্তু আমার সন্দেহ আছে। যখনই মনে হয় তার প্রতি অবহেলা করা হচ্ছে, তখনই এই অসুস্থতা দেখা দেয়। আমার জন্যে তেমন সমস্যা নয়, মাত্র চল্লিশ মিনিটের পথ। কিন্তু রিসোর বারোটা বেজে যায়।

কেমন আছে রিসো?

ভাল। গত বছর ওর কোম্পানি ওকে পার্টনার করে নিয়েছে। আরেকটা বাচ্চা হয়েছে ওর ছেলে।

আবার কয়েক মিনিট চুপচাপ বসে থাকল ওরা। প্রশান্ত নিস্তব্ধতা, শুধুমাত্র দীর্ঘদিনের প্রিয় দুই বন্ধুর উপস্থিতিতেই সম্ভব, যোগাযোগ, অক্ষুণ্ণ রাখার জন্যে মুখ না খুললেও ওদের চলে। লাইনারটা যখন প্রায় দিগন্ত রেখায় পৌঁছে গেছে, আবার কথা বলল রেমারিক। তুমি ক্লান্ত। এস, বিছানাটা দেখিয়ে দিই।

উঠে দাঁড়াল রানা। আর তুমি? তুমিও তো সারারাত ঘুমাওনি।

লাঞ্চের পর ছোট্ট একটা ঘুম দিয়ে নিলেই আমার চলবে। কিছুদিন থাকতে পারবে তো, নাকি?

কাঁধ ঝাঁকাল রানা। আমার কোন প্ল্যান নেই, রেমারিক। হঠাৎ তোমার কথা মনে পড়ল, চলে এলাম।

মাথা ঝাঁকাল রেমারিক। তাহলে তো ভালই। অনেকদিন পর এলে। কোন কাজের মধ্যে আছ?

ছমাস ধরে নেই। কর্সিকা থেকে সরাসরি আসছি আমি।

দরজার দিকে হাঁটছিল ওরা, কথাটা শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল রেমারিক। ঢাকা থেকে নয়? সরাসরি দেশ থেকে আসছ না?

আবার কাঁধ ঝাঁকাল রানা। না। কোন প্রশ্ন কোরো না। শুধু জেন, বন্ধু-বান্ধব কারও সাথে আমার কোন যোগাযোগ নেই। মার্সেলেসে এসে তোমার কথা মনে পড়ল, ঝোঁকের মাথায় চলে এলাম।

রেমারিকের চোখে ঝিক করে উঠল কৌতুক। ঝোঁকের মাথায়? তুমি? হাসতে লাগল সে।

রানার মুখেও ক্লান্ত হাসি দেখা গেল। রাতে কথা হবে। তোমার সেই বিছানাটা কোথায়?

.

কিচেন টেবিলে বসে আছে রেমারিক, বাজার থেকে ফিরে আসবে ফুরেলা, তার জন্যে অপেক্ষা করছে। বোর্ডিং সেকশনে ছয়টা কামরা, সারা বছর একটাও খালি থাকে না। রেস্তোরাঁ এই এলাকায় বেশ নাম করেছে, লাঞ্চ আর ডিনারের জন্যে প্রচুর লোক আসে। চালু করেছিল জেসমিন। সাধারণ খাবার, কিন্তু চমৎকার রান্নার জন্যে তখনই সুনাম হয়ে যায়। রান্নার মানটা আজও বজায় আছে, তার একটা। কারণ সম্ভবত এই যে রান্নার সময় রেমারিক নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তদারক করে। একবার যদি কেউ প্রেজো ফিসোতে খায়, দ্বিতীয়বার তার ফিরে না এসে উপায়। নেই।

একা বসে বন্ধুর কথা ভাবছে রেমারিক। কিছু একটা ঘটেছে ওর। রহস্যময় একটা চরিত্র, ওকে বুঝতে পারা কোনদিনই সহজ ছিল না, কিন্তু তবু অন্যের চেয়ে। সে ওকে ভালভাবে চেনে। যাই ঘটুক, এর সাথে মেয়েমানুষ জড়িত বলে তার মনে। হল না। রানাকে কোনদিন মেয়েদের পিছনে ছুটতে দেখেনি সে, বরং মেয়েরাই, ওর। পিছনে ছোটে। মেয়েদের ব্যাপারে ছলচাতুরির আশ্রয় নেয়াও ওর স্বভাব নয়। এমন অনেক মেয়ে দেখেছে রেমারিক, যারা রানা বলতে অজ্ঞান ছিল, কিন্তু সময়। থাকতে তারা বুঝতে পারে, এ লোককে বাধনে জড়ানো সম্ভব নয়।

একটা মেয়ের কথা স্পষ্ট মনে পড়ে রেমারিকের। এক লেডি ডাক্তার। ব্যাপারটা অনেকটা যেন ভুল চাবি দিয়ে দরজা খোলার চেষ্টা, মেয়েটা একদিন। বলেছিল রেমারিককে। তালায় ঢোকে, কিন্তু ঘোরে না। কথাটা শোনার পর জবাবে রানা শুধু বলেছিল, দোষটা তালার, সন্দেহ নেই।

রেমারিকের নিজের কামরায় এখন ঘুমাচ্ছে রানা। খানিক আগে ওকে দেখে এসেছে রেমারিক। পাশ ফিরে শুয়েছিল রানা, গায়ের চাদরটা কোমরের কাছে জড় করা। চুপি চুপি অনেকক্ষণ ধরে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে থেকেছে সে। রানার গায়ে সত্যি বেশ মেদ জমেছে, শরীরে অনেকগুলো কাটা-কুটির দাগ। বেশিরভাগই পুরানো, রেমারিকের পরিচিত, দুচারটে নতুন। তিন মিনিট দাঁড়িয়ে ছিল। রেমারিক, তার মধ্যে বেশ কয়েকবার পাশ ফিরেছে রানা। ওর মনে শান্তি নেই, বুঝতে পেরেছে রেমারিক, ঘুমের মধ্যেও অস্থিরতায় ভুগছে।

বন্ধু বিপদে পড়েছে, সেটাই রেমারিকের উদ্বেগের কারণ। কিন্তু কোন প্রশ্ন করতে নিষেধ করে দিয়েছে ও। তারমানে কোন সাহায্য চায় না। না চাইলেও, কিভাবে সাহায্য করা যায় তাই নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছে সে। বাধা পড়ল ফুরেলা ফিরে আসায়, তার দুই বগলের নিচে দুটো বাস্কেট। মালিককে দেখে অবাক হয়ে গেল সে। এই সময় মেইন কিচেন রূমে থাকার কথা রেমারিকের।

আপনি এখানে? টেবিলের ওপর বাস্কেট দুটো নামিয়ে রেখে জানতে চাইল। ফুরেলা।

অনেক দিনের পুরানো বন্ধু, বলল রেমারিক। প্রথম দিন ওকে আমি নিজে রান্না করে খাওয়াব। উঠে দাঁড়িয়ে বাস্কেটের ভেতর উঁকি দিল সে।

মালিককে দেখাবার জন্যে বাস্কেট থেকে ফল-পাকড়, তরিতরকারি, মাছ মাংস ইত্যাদি নামাতে শুরু করল ফুরেলা। অসুস্থ মাকে ফেলে চলে এলেন। কি রকম বন্ধু?

সে তুমি বুঝবে না, মুচকি হাসল রেমারিক। ও এখন আমার ঘরে ঘুমাচ্ছে।

.

ফুরেলাকে কৌতূহলে পেয়ে বসল।

আজ চার বছর রেমারিকের কাছে আছে ছেলেটা। রেমারিকের গাড়ি থেকে ভিউ মিরর চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে যায় সে। রেমারিক তাকে প্রথমে বেদম মারধর করে, তারপর একশো একটা প্রশ্নের জবাব চেয়ে বসে। সে নিরাশ্রয় আর এতিম জানার পর রাস্তা থেকে তাকে তুলে নিয়ে এসে বোর্ভিঙে জায়গা দেয়, খেতে দেয় পেট ভরে। বিনিময়ে তাকে কোন কাজ করতে দেয়নি সে। কিন্তু দুদিন পর ফুরেলা নিজেই ছোটখাট কাজে রেমারিককে সাহায্য করার আগ্রহ দেখায়। সেই থেকে রয়ে গেছে ছেলেটা।

তখনও ফুরেলা জানত না, আজও জানে না, সেই প্রথম দিন ফুরেলার মধ্যে নিজের ছেলেবেলা দেখতে পেয়েছিল রেমারিক।

শুরু থেকে আজ পর্যন্ত ফুরেলার সাথে একই আচরণ করে আসছে রেমারিক রূঢ়, কর্কশ, কোন রকম স্নেহ-ভালবাসা প্রকাশ পায় না। আর ফুরেলাও তার স্বভাব বজায় রেখেছে–উদ্ধত, ঘাড়ত্যাড়া, মালিকের প্রতি তাচ্ছিল্য দেখাবার সুযোগ। পেলে ছাড়ে না। দুজনেই জানে স্নেহ আর শ্রদ্ধার অস্তিত্ব আছে, কিন্তু কখনোই সে-সবের প্রকাশ ঘটে না। আশ্চর্য একটা সম্পর্ক, ইটালিয়ানদের মধ্যে সাধারণত দেখা যায় না। সময়ের সাথে সাথে রেমারিকের ডান হাত হয়ে উঠেছে ছেলেটা, সততা আর বিশ্বস্ততার অনেক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উতরে গেছে।

রেমারিকের কাছে এতদিন থেকেও তার অতীত সম্পর্কে কিছুই জানে না। ফুরেলা। বিশেষ কোন উপলক্ষ্যে রেমারিকের মা প্রেজো ফিসোতে আসে বটে, কিন্তু বুড়ি নিজের ছোট ছেলে রিসো, বড় ছেলের নিহত বউ জেসমিনের গল্প করেই থেমে যায়। বড় ছেলে রেমারিকের অতীত সম্পর্কে ভুলেও একটা শব্দ উচ্চারণ করে না। ফুরেলা জানে, রেমারিক অনর্গল আরবী বলতে পারে, আফ্রিকান দুএকটা ভাষাও তার জানা আছে, আর ফ্রেঞ্চ তো জানেই। বোঝা যায়, অনেক ঘাটের পানি খাওয়া লোক। প্রশ্ন করে জেনে নেবে, সে সাহস তার হয়নি কখনও। সম্পর্কটা সেরকম নয়।

সেজন্যেই নতুন লোকের আগমন তাকে বিস্মিত করে তুলেছে। মাঝরাতের। ঠিক আগের মুহূর্তে যখন কলিংবেল বাজল, সে ধরে নিয়েছিল রেমারিক তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছে। দরজা খোলার পর অচেনা লোকটাকে দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল সে।

রেমারিক আছে? লোকটা জানতে চায়। কথায় নিয়াপলিটান টান পরিষ্কার।

কথা না বলে ফুরেলা শুধু মাথা নাড়ে।

কখন ফিরবে সে?

কাঁধ ঝাঁকাল ফুরেলা। লক্ষ্য করল, তার সহযোগিতা না পেয়ে লোকটা অবাক হয়নি।

আমি অপেক্ষা করব, বলে ফুরেলাকে এক রকম, ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে আগন্তুক, রিসেপশনে ঢুকে বোর্ড থেকে চাবি নিয়ে সোজা উঠে যায়। দোতলায়। পিছু পিছু ওপরে উঠে এসে ফুরেলা দেখে অফিস কামরার দরজা খুলে। ভেতরে ঢুকে পড়েছে লোকটা, চেয়ারে বসে পা দুটো লম্বা করে দিয়েছে। রাগ হয়। ফুরেলার, ব্যাখ্যা দাবি করার ইচ্ছে জাগে, কিন্তু লোকটাকে তখন আর তার ভয় করছে না। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে শহরের আলো দেখছিল লোকটা, এই জগতেই যেন নেই। কেন যেন ফুরেলার রাগ পানি হয়ে গেল। মৃদু সুরে সে জানতে চাইল, তার কিছু লাগবে কিনা।

যদি থাকে, বলল লোকটা। এক বোতল স্কচ।

একটা বোতল আর গ্লাস নিয়ে এল ফুরেলা। আরও খানিক চিন্তা-ভাবনা করে আগন্তুকের নাম জানতে চাইল সে।

ইমরুল হাসান, বলল লোকটা। তুমি?

ফুরেলা কালমাট। মালিকের আমি ডান হাত।

বোতল থেকে গ্লাসে হুইস্কি ঢেলে চুমুক দিল লোকটা। তারপর কটমট করে। তাকাল ফুরেলার দিকে। যাও, শুয়ে পড়। আমি কিছু চুরি করব না।

.

লাঞ্চ তৈরি করছিল ওরা, এই সময় ছেলেটাকে অবাক করে দিয়ে হঠাৎ কথাটা। বলল রেমারিক, ও বাংলাদেশী।

কে?

একটা হাত তুলে সিলিঙের দিকে আঙুল তাক করল রেমারিক। আমার বন্ধু। হাসান।

কিন্তু উনি তো খাঁটি ইটালিয়ান বলেন।

মাথা ঝাঁকাল রেমারিক। আমি শিখিয়েছি।

ফুরেলার বিস্ময় বাড়তেই লাগল। মালিকের এই নরম সুর তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। যে লোক ধমক আর হুমকি ছাড়া কথা বলে না, আজ সে তাকে গল্প। শোনাতে বসেছে। কৌতূহলে মরে যাচ্ছিল ফুরেলা, কিন্তু নিজে থেকে কোন প্রশ্ন করেনি সে।

আমরা দুজন যুদ্ধে ছিলাম, আবার বলল রেমারিক। বিয়ে করার পর যুদ্ধ ছেড়ে দিলাম আমি। সে আজ আট বছর আগের কথা।

যুদ্ধে ছিলেন? বড় বড় হয়ে উঠল ফুরেলার চোখ। কোথায়?

হাসছে রেমারিক। লেবাননে যুদ্ধ করেছি আমরা, মুসলিম ফিলিস্তিনীদের কাঁধে কাধ মিলিয়ে। যুদ্ধ করেছি জিম্বাবুই-য়ে।

চোখে অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে থাকল ফুরেলা। কি বলছেন? ফিলিস্তিনীদের পক্ষে যুদ্ধ করেছেন? আপনি? একজন শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টান? তারপর আবার স্মিথ। সরকারের বিরুদ্ধে রোডেশিয়ায়? কালোদের পক্ষে?

কালো কি, গোরা, মুসলিম কি খ্রিস্টান সে সব আমি বিচার করিনি, বলল রেমারিক। আমি বিচার করেছিলাম ন্যায় কি অন্যায়। ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবে নাম। লেখাই আমি। ভাড়াটে যোদ্ধারা ন্যায়-অন্যায় বিচার করে না, যারা টাকা দেয়। তাদের পক্ষেই যুদ্ধ করে। কিন্তু আমার বন্ধু আমার মধ্যে ন্যায়-অন্যায় বোধটা জাগিয়ে দেয়। তারপর থেকে আমি আর অন্যায়ের পথে যেতে পারিনি। একটু থামল রেমারিক। তারপর চুপ হয়ে গেল।

অনেক কথা ভিড় করছে আজ তার মনে।

.

মারা গেছে বাবা। পনেরো বছরের সুন্দরী বোন, লম্পট সমাজপতিরা তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। ছয় বছরের ছোট ভাই, খিদের জ্বালায় সারা দিন ঘ্যান ঘ্যান। করে বেড়ায়। কঙ্কালসার মা, অদৃষ্টে বিশ্বাসী, পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেয় চার্চে, যেন প্রার্থনা করলেই আকাশ থেকে রুটি পড়বে।

বোনটা একদিন পালিয়ে গেল। আর কোনদিন ফেরেনি সে। বহু বছর পর একদিন তার সাথে দেখা হয়েছিল রেমারিকের। কিন্তু দেখা না হলেই ভাল হত।

বোন পালাবার দুদিন পর পেটে তিন দিনের খিদে নিয়ে এগারো বছরের রেমারিকও বাড়ি ছাড়ল। পঞ্চাশ কিলোমিটার হেঁটে নেপলসে চলে এল সে। জানে, নেপলস শহরে ধনী লোকজন আছে, আর তাদের টাকা পয়সা কেড়ে নেয়ার জন্যে আছে গুণ্ডা-বদমাশ, তারও একটা ব্যবস্থা হয়েই যাবে।

বুদ্ধি ছিল রেমারিকের। হাত পাতার সময় চোখে মরিচের গুঁড়ো ঘষে সাগর বইয়ে দিত, দুঃখ-দুর্দশায় ভরা এমন সব গল্প ফাঁদতো মহাকাব্যকেও ছাড়িয়ে যেতে চায়। তবু ভিক্ষা পাওয়া যেত না, আর ভিক্ষা না পেলে চুরি করত রেমারিক।

দেখা গেল চুরি বিদ্যায় হাত আর মাথা আরও বেশি খোলে রেমারিকের। তার মত কয়েক শো ছেলের মধ্যে থেকে ছয়জনকে শিষ্য বানিয়ে একটা পোড়োবাড়িতে আস্তানা গাড়ল সে। নিজে থেকে সে যা শিখেছে, শিষ্যদের। সেগুলো যত্নের সাথে শেখাল। মদের বোতল খালি হলে ধনীর দুলালরা উদার হয়ে পড়ে, ভিক্ষা চাওয়ার সেটাই উপযুক্ত সময়। আর ওরা যখন মেয়েমানুষের কাছে যায়, বিছানা যখন কাঁচ ক্যাচ করতে থাকে, সেটাই চুরি করার আদর্শ সময়। শহরের প্রতিটি গলি উপগলি, বাক আর চৌরাস্তা মুখস্থ করে নিল রেমারিক। এভাবে সে টিকে গেল। সাগর ঘেষা রাস্তা ধরে প্রতি হপ্তায় পজিটানোয় যায় সে, পকেটে থাকে টাকা, হাতে চকলেট আর মাংসের টিন। রিসো আর খিদের জ্বালায় ঘ্যান ঘ্যান করে না। মা অবশ্য আরও ঘন ঘন চার্চে যাওয়া শুরু করেছে, তার ধারণা তার প্রার্থনার জবাবে ওপরওয়ালা মুখ তুলে চেয়েছেন।

যেখানে ক্ষুধা আর অভাব সর্বগ্রাসী, নৈতিকতা সেখানে পরাজিত সৈনিক। যে সমাজ জীবনের মৌল চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারে না তার আইনকে মানুষ বুড়ো আঙুল দেখাবেই। পজিটানোয় বসবাস করার জন্যে আর কখনও ফিরে। যায়নি রেমারিক। নেপলস তার তীর্থস্থান হয়ে উঠল, এখানেই রয়েছে তার গুপ্তধন আর ভবিষ্যৎ। প্রথমে সে শুধু টিকে থাকার ধান্ধা করে বেড়াল। তারপর তাকে সামনের দিকে টেনে নিয়ে চলল বুদ্ধি। পনেরো বছর বয়সে পৌঁছে রেমারিক। দেখল, সমবয়েসী বারোজন শিষ্য রয়েছে তার, সবাই এক একটা পাকা চোর।

দিন বেশ ভালই কাটছিল, কিন্তু তবু মনে শান্তি ছিল না। তার একটা প্রতিজ্ঞা, পালিয়ে যাওয়া বোনকে সে ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু কোথায় সে? মিলানে সে নেই, তাকে খুঁজে বের করতে শহরের প্রতিটি ইট শুধু খুলতে বাকি রেখেছে সে।

.

পচন মাথা থেকেই ধরে। তখনকার সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যে দুর্নীতি, অন্যায় আর জুলুমের আশ্রয় নিল। ভাল মানুষদের ধরে ধরে জেলে ভরা হল, আর বের করে সাদর অভ্যর্থনা জানানো হল চোর-গুণ্ডা-বদমাশদের। সুসংগঠিত অপরাধী চক্র থাকা দরকার, তারা সাহায্য করবে সরকারকে। প্রায় রাতারাতি গোটা সমাজ চলে গেল অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে।

পেটে খিদে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াত বেশ্যারা, তাদেরকে আশ্রয় দিয়ে জমজমাট ব্যবসা শুরু হল। অনেক বছর পর আবার পুরোদমে মাঠে নামল সংঘবদ্ধ মাফিয়া। ছোট বড় সব ধরনের ব্যবসায়ীরা প্রস্তাব পেল, চুটিয়ে ব্যবসা করে যাও, আমরা প্রোটেকশন দেব, বিনিময়ে হপ্তায় হপ্তায় লাভের বখরা, দিতে হবে। যারা। রাজি হল। তালিকায় নাম উঠল তাদের, আর যারা রাজি হল না তাদের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল, লাশ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া গেল না।

এই নতুন ছকের সাথে খাপে খাপে মিলে গেল রেমারিক। সে আর তার কিশোর দল গোটা কাঠামোর একটা অংশ হয়ে উঠল। আঞ্চলিক নেতারা তাকে চিনতে পারল, সম্ভাবনাময় একজন তরুণ হিসেবে গুরুত্ব পেল সে। ডকের পিছনে লাগিয়ে দেয়া হল তাকে, খুদে দোকানদার আর ব্যবসায়ীদের বোঝাতে হবে। প্রোটেকশন না পেলে কেউ, তারা বাঁচবে না। ডকের পিছনে ভাল কাজ দেখাল সে, পুরস্কার হিসেবে এবার গোটা ডকের দায়িত্ব দেয়া হল তাকে। সে আর তার দল শুধু চুরি নয়, আক্ষরিক অর্থেই লুটপাট শুরু করে দিল। বিদেশ থেকে যত, কার্গো আসে, বাক্স খুলে অর্ধেক বের করে নেয় তারা। নিজের লাভের অংশ জমিয়ে একটা। বাড়ি কিনল রেমারিক, সেটাই আজ প্রেজো ফিসো।

বাড়িটা মায়ের নামে কিনল রেমারিক, কারণ তখনও সে নাবালক।

এভাবে কেটে গেল আরও দুটো বছর। সতেরোয় পা দিল রেমারিক। ওপরমহল তার ওপর ভারি খুশি, নতুন আরও একটা সুযোগ এল তার হাতে। এবার মেয়েদের নিয়ে কারবার করতে হবে রেমারিককে। ডক এলাকায় মেয়েদের। চাহিদা আছে, কিন্তু মেয়েদের জন্যে ভাল কোন আশ্রয়ের ব্যবস্থা নেই। ডকের। কাছাকাছি গোটা একটা পাড়া খালি করতে হবে, বাইরে থেকে মেয়ে আমদানী, করে ভরতে হবে ওই পাড়া। মনে মনে হিসেব করে খুশি হল রেমারিক, তিনগুণ বেড়ে যাবে তার রোজগার।

শুরু হল কাজ। শখানেক বাড়ি নিয়ে একটা পাড়া, খালি করা কম ঝামেলার কাজ নয়। কাজটা করতে গিয়ে উভয়পক্ষের কিছু লোক মারা গেল। তবে কাজটা দুমাসের মধ্যেই শেষ করতে পারল রেমারিক। এবার মেয়ে জোগাড়ের পালা। দালালদের ডেকে সে জানিয়ে দিল, সুন্দরী মেয়ে চাই তার। ভক এলাকার লোকেরা মালদার মক্কেল, ভাল জিনিস দিয়ে ভাল পয়সা খসাতে চায় সে। দালালরা। ব্যাপারটা বুঝল। মেয়ে না এনে তাদের ফটো তুলে নিয়ে এল তারা। রেমারিক নিজে বাছাই করুক, পরে যেন তাদের ঘাড়ে দোষ না চাপে।

মেয়েদের কয়েকশো ফটো দেখল, সে, পছন্দও হল অনেককে। কিন্তু হঠাৎ একটা ফটো দেখে মাথা ঘুরে গেল তার।

ফটোটা হাতে নিয়ে আধ ঘন্টা বসে থাকল রেমারিক, এক চুল নড়ার শক্তি পেল না। ফটোর পিছনে মেয়েটার নাম লেখা রয়েছে, এমিলিয়া। ঠিকানাও আছে। তারমানে, ভাবল রেমারিক, বেলালোনা নাম বদলেছে। তার মন ঠিকই গিয়েছিল, বরাবর কাছেপিঠেই ছিল সে। কিন্তু আশ্চর্য, তার চোখে একদিনও পড়ল না!

মনে মনে হিসেব করল রেমারিক। বেলাডোনার বয়স এখন একুশ বছর। কিন্তু ফটোতে দেখে মনে হয় ত্রিশ পেরিয়ে গেছে। সেই ভরাট মুখে হাড় গজিয়েছে। গোলাপের পাপড়ির মত ঠোঁট এখন বিবর্ণ। পটলচেরা চোখ এখন। আধবোজা, ঢুলুঢুলু। ফটোটা ছুঁড়ে মেঝেতে ফেলে দিয়ে টেবিলে মাথা ঠুকতে লাগল রেমারিক। চোখ-মুখ বিকৃত করে অনেকক্ষণ ধরে ফোঁপাল।

পজিটানোয়, মার কাছে যাচ্ছে রেমারিক। অর্ধেক রাস্তা থেকে ফিরে এল সে, এ-কথা কি করে বলবে মাকে? নিজের আস্তানায় নয়, ফটোর পিছনে লেখা ঠিকানা। ধরে নেপলসের সবচেয়ে বড় বেশ্যাপাড়ায় চলে এল সে। নম্বর মিলিয়ে ছোট্ট একটা ঘরের সামনে দাঁড়াল। চোখ দুটো টকটকে লাল, উসকোখুসকো চুল, হাত পা কাঁপছে।

মাত্র সন্ধে, এরই মধ্যে খদ্দেরদের ভিড় জমে উঠেছে গলির ভেতর। দুবার হাত উঠিয়েও নামিয়ে নিল রেমারিক, নক করতে পারল না। এই এলাকায় কেউ তাকে চেনে না, এভাবে আরও কিছুক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে উপদ্রব ভেবে। দালালরা ঘাড় ধরে পাড়া থেকে বের করে দিতে চাইবে। তৃতীয়বারের চেষ্টায় নক করতে পারল রেমারিক। আওয়াজ হল, কিন্তু এত আস্তে যে ভেতরে কেউ থাকলে শুনতে পেয়েছে কিনা সন্দেহ।

খানিক পর দরজা খুলে গেল। টলতে টলতে বেরিয়ে এল প্রৌঢ় এক লোক। রেমারিককে ধাক্কা দিয়ে পাশ কাটাল সে, সস্তা মদের গন্ধ ঢুকল তার নাকে।

কে গো, নতুন মনে হচ্ছে? ঘরের ভেতর থেকে আওয়াজটা এল। সেই অতি। পরিচিত কণ্ঠস্বর, কিন্তু আগের চেয়ে ভোতা আর সুরটা অশ্লীল।

অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দর দর করে ঘামতে লাগল রেমারিক।

টলতে টলতে দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াল মেয়েটা। আলুথালু বেশ, এলোমেলো। চুল, ঠোঁট জোড়া ফুলে আছে, চোখে নগ্ন আহ্বান। এ কে? একে তো রেমারিক। চেনে না। ইচ্ছে হল দৌড়ে পালায়। কিন্তু নড়ার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছে।

বেলাডোনা! বিড়বিড় করে বলল রেমারিক।

সাপ দেখার মত আঁতকে উঠল বেলাডোনা। কে? দ্রুত পিছিয়ে গিয়ে * দরজার কবাট আকড়ে ধরল সে। চোখ জোড়া বিস্ফারিত হয়ে উঠেছে, দৃষ্টিতে রাজ্যের অবিশ্বাস।

ছায়া থেকে আলোয় সরে এল রেমারিক। আরেকবার শিউরে উঠল। বেলাডোনা।– ভাই-বোন পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকল। ভাইয়ের চোখে কান্না, বোনের। চোখে আতঙ্ক।– চল বাড়ি যাবে, অনেকক্ষণ পর কথা বলতে পারল রেমারিক।

বেলাডোনার চোখে পলক নেই, সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। নিঃশব্দে শুধু মাথা নাড়ল সে।

ইতিমধ্যে ওদের দিকে চোখ পড়েছে লোকের। পথ চলতে চলতে থমকে দাঁড়াচ্ছে কেউ কেউ।

ভেতরে আয়, অস্ফুটে বলল বেলাডোনা।

মাথা নাড়ল রেমারিক, ভেতরে যাবে না সে। কিন্তু তারপরই কি মনে করে এগোল। ঘরের মাঝখানে থেমে ঘুরল সে। দরজা বন্ধ করে রেমারিকের দিকে ফিরল বেলাডোনা।

বসবি না? কেমন আছিস তোরা? মা..মা কেমন আছে? রিসো??

গেলেই দেখতে পাবে, বিড়বিড় করে বলল রেমারিক। বোনের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারল না সে, দেয়ালের দিকে তাকাল। নগ্ন, অর্ধনগ্ন মেয়েলোকের। ছবি সাঁটা দেয়াল। চোখ নামিয়ে নিল সে।

তা হয় না, ছোট্ট করে বলল বেলাডোনা।

চমকে উঠে মুখ তুলল রেমারিক। মানে?

আমার আর ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। বিস্ময় আর আতঙ্ক কাটিয়ে উঠেছে। বেলাডোনা। তার চেহারায় একটা পাথুরে ভাব লক্ষ্য করে ঘাবড়ে গেল রেমারিক।

কেন?

সে তুই বুঝবি না, বলল বেলাডোনা। ওরা কেমন আছে বললি, না?

আমি তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি, জেদের সুরে বলল রেমারিক। লক্ষ্য করল, দরজার পাশের দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে আছে বেলাডোনা, দেয়াল থেকে হাতটা একবারও নামায়নি

পাগলামি করিসনে, শান্ত ভাবে বলল বেলাডোনা। এগিয়ে এল সে, একটু খোঁড়াচ্ছে। চেয়ারের পিঠ, খাটের স্ট্যাণ্ড ধরে কয়েক পা হাঁটল, তারপর বসল বিছানায়। তার পা দুটোর দিকে চোখ পড়ল রেমারিকের। জুতো পরে আছে বেলাডোনা।

পাগলামি বলছ কেন? ফিরে যেতে অসুবিধে কি?

রেমারিকের দিকে তাকিয়ে থাকল বেলাডোনা। কোন জবাব দিল না। হঠাৎ একটা হাত ভাইয়ের দিকে বাড়িয়ে দিল সে। আয়, কাছে বস।

নড়ল না রেমারিক। তোমাকে এখুনি আমার সাথে যেতে হবে।

আয় না, বস, আবার কাছে ডাকল বেলাডোনা।

তুমি যাবে কিনা বল।

মা কেমন আছে রে?

ভাল। তুমি না গেলে আমি এখান থেকে যাব না।

রিসো?

পড়াশোনা করছে, বলল রেমারিক। এতদিন কোথায় ছিলে তুমি? কত খুঁজেছি তোমাকে…

জানি। বেলাডোনার ঠোঁটে স্লান হাসি।

জানো? হতভম্ব হয়ে গেল রেমারিক।

রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতাম, তোকে দেখতে পেলেই গা ঢাকা দিতাম। মেয়েদের কাছে শুনতাম, বেলাডোনা নামে একটা মেয়েকে খুঁজছিস তুই।

কেন? গলা বুজে এল রেমারিকের। কেন?

কেন সে তোকে বোঝানো যাবে না, বলল বেলাডোনা। আমাকে পালিয়েই বেড়াতে হবে, রেমারিক। যদি না বসিস, চলে যা, ভাই। আর কখনও এদিকে আসবি না।

না।

হাসতে লাগল বেলাডোনা। তুই সেই আগের মতই জেদি আছিস, নারে?

তুমি না গেলে আমি জোর করে তোমাকে নিয়ে যাব।

রেমারিকের দিকে আবার একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল বেলাডোনা। তোরা আমাকে ভুলতে পারিসনি, নারে?

কি বলবে রেমারিক! তার চোখ থেকে টপ টপ করে পানির ফোঁটা পড়তে লাগল। নিজেকে সামলে নিয়ে শান্ত সুরে বলল সে, তোমার মালিক কে? তাকে ডাক। ক্ষতিপূরণ দিয়ে তোমাকে আমি এখান থেকে বের করে নিয়ে যাব।

আমি যেতে চাই না, রেমারিক।

কেন? চিৎকার করে জানতে চাইল রেমারিক।

কেন? পায়ের জুতো খুলে ফেলল বেলাডোনা। দেখ।

ঘা। বেলাডোনার দুই পায়ের তিনটে করে ছটা আঙুল নেই। ডান পায়ের। পাতাও ক্ষয়ে যেতে শুরু করেছে। কুষ্ঠ, চিনতে পারল রেমারিক। এই রোগ আগেও দেখেছে সে।

চোয়াল দুটো উঁচু হয়ে উঠল রেমারিকের। আমরা তোমার চিকিৎসা করাব।

এ যেন সারে, বলে আবার জুতো পরল বেলাডোনা। এবার তুই যা, রেমারিক।

নড়ল না রেমারিক। কবে থেকে?

তিন বছর পেরিয়ে গেছে।

ওষুধ?

কি লাভ! ঠোঁট উল্টাল বেলাডোনা। সারা গায়ে ছড়িয়ে পড়ছে, কোথায় ওষুধ দেব?

অনেকক্ষণ আর কেউ কথা বলল না। ঠিক আছে, আমি আবার কাল আসব, নিস্তব্ধতা ভেঙে এক সময় বলল রেমারিক। তুমি আমার কাছে থাকবে। একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করব, তুমি আর আমি থাকব সেখানে। কারও সাথে তোমার দেখা হবে না, কেউ কিছু জানবে না। এতে তোমার আপত্তি নেই তো?

এ হয় না, রেমারিক।

কেন হয় না? এই রোগ হয়েছে জানলে লোকে তোমাকে ঘৃণা করবে, এই তো তোমার ভয়? কেউ জানবে না। কারও সাথে তোমার দেখাই হবে না।

চুপ করে থাকল বেলাডোনা।

দরজার দিকে এগোল রেমারিক। দরজার কাছে এসে কি মনে করে ঘাড়। ফেরাল সে। দেখল একটা হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল বেলাডোনা, যেন তাকে ছুঁতে। চেয়েছিল। সে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতে শুরু করতেই হাতটা তাড়াতাড়ি নামিয়ে নিয়েছে।

ধীরে ধীরে ঘুরল রেমারিক। ভাইয়ের চোখে ধরা পড়ে গিয়ে মাথা নিচু করে নিয়েছে বেলাডোনা, ছুটে গিয়ে বোনের গায়ের ওপর আছড়ে পড়ল রেমারিক। বেলাডোনার হাঁটুর ওপর মুখ রেখে ডুকরে উঠল। তার মাথায় একটা হাত রাখল। বেলাডোনা, হাতের উল্টো পিঠে ফোঁটায় ফোঁটায় চোখের পানি পড়ছে।

পরদিন বেলাডোনাকে নয়, তার লাশ নিয়ে এসে কবর দিল রেমারিক। রাতে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে সে।

তিন দিন কাজে বেরুলো না রেমারিক। মা আর ভাইকে বেলাডোনার কথা। কিছুই জানায়নি সে, ঠিক করল কোনদিন জানাবেও না। আরও দুটো সিদ্ধান্ত নিল রেমারিক। এক, নারী-ব্যবসার সাথে নিজেকে সে জড়াবে না, ডক এলাকায় কোন বেশ্যাপাড়াও তৈরি হতে দেবে না। দুই, কুষ্ঠ রোগীদের জন্যে একটা আশ্রম তৈরি করতে হবে তার।

ঘর-বাড়ি থেকে যাদের তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল, তাদেরকে ফিরে আসতে বলল রেমারিক। খবর পেয়ে মাফিয়া নেতা ব্যাখ্যা দাবি করে প্রতিনিধি পাঠাল। তার সাথে দেখাই করল না রেমারিক, লোক মারফত জানিয়ে দিল, ডক এলাকায় বেশ্যাপাড়া হবে না। হৈ চৈ পড়ে গেল আণ্ডারওয়ার্ল্ডে। কার এত সাহস নেতার। আদেশ অমান্য করে? কে এই রেমারিক?

ঠিক এই সময় মাফিয়া নেতাদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। রেমারিকের ওপরওয়ালাদের আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেছে, ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেছে কেউ কেউ, দেমাকে অনেকেরই মাটিতে পা পড়ে না। কে কত শক্তিশালী এটা প্রমাণ করার জন্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। গোটা দেশ জুড়ে মাফিয়াদের একটা কাঠামো থাকলেও দুই যুগ আগের মত শক্ত আর নিরেট হয়নি তখনও। দক্ষিণের প্রবীণ নেতারা তখনও সবখানে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। শিল্পসমৃদ্ধ উত্তরে আর রোমে তারা সফল হলেও, নেপলসে তারা সুবিধে করতে পারছিল না। ইটালীর অবাধ্য শহর বলা হয় নেপলসকে, এখানের ক্রিমিন্যালরাও আর সবার চেয়ে এক কাঠি বাড়া। প্রবীণ মাতব্বররা সবশেষে নজর দিল নেপলসের দিকে।

ক্ষমতার ভাগ নিয়ে দুটো দলের লড়াই শুরু হল নেপলসে। যে-কোন একটা পক্ষ নিতে হবে রেমারিককে, এই পক্ষ নিতে গিয়েই জীবনের প্রথম ভুলটা করে বসল সে। গিড়ি নোচি নামে এক লোকের পক্ষ নিল সে। ডন নোচি নারী-ব্যবসা, পছন্দ করে না, বেশ্যাদের প্রতি চিরকাল সহানুভূতি দেখিয়ে এসেছে সে, তার এই গুণের জন্যেই রেমারিক তার সাথে হাত মেলাল। কিন্তু নোচি বুড়ো, প্রায় অথর্ব, বহু বছর জেল খেটে আত্মবিশ্বাস, কমে গেছে তার। ফলে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারলেও রেমারিক আর তার দলের অপূরণীয় ক্ষতি হতে লাগল। নিচুস্তরের কর্মী। বলে রেমারিকের দলকেই সামনে থেকে লড়তে হল। মাস কাটল না, দলের অর্ধেক সদস্য হয় খুন হল নাহয় দল ছেড়ে পালিয়ে গেল। শটগানের গুলি খেয়ে আহত হল রেমারিক, হাসপাতালে শুয়ে কাতরাতে লাগল ব্যথায়।

ওদিকে, তার আশা-ভরসা আর উদ্ধারকর্তা গিডি নাচি, ক্লান্ত এবং অসতর্ক, ফ্রিটো মিসটো খেতে বসে, এক রেস্তোরাঁয় খুন হয়ে গেল। শোনা কথা, পুলিস। নাকি তার মুখ থেকে ভাজা মাছ বের করে। আততায়ীকে দেখতেই পায়নি নোচি, শটগানের গুলিতে তার গোটা বুক গুড়ো হয়ে যায়।

এই পর্যায়ে ঘুম ভাঙে পুলিসের। দাপট দেখাবার জন্যে রাস্তায় নেমে আসে তারা। খবরের কাগজগুলো আর রাজনীতিকরা এসবের বিহিত দাবি করে বসে। শেষ পর্যন্ত বিজয়ীদের মধ্যে একটা শান্তি আলোচনার ব্যবস্থা হল। মাফিয়াদের তরফ থেকে উদ্যোগী হল ডন আতুনি বেরলিংগার, সরকারের পক্ষে আলোচনায়, বসল পাবলিক প্রসিকিউটর। প্রমাণ আর সাক্ষী জোগাড় হল, নিচুস্তরের কিছু। লোকজনকে ধরে হাজতে ভরল পুলিস। ভিটেলা রেমারিকও থাকল তাদের মধ্যে। বিচারে দুবছরের জেল হয়ে গেল তার।

জেল থেকে ছাড়া পাবার পর দুমাস গা ঢাকা দিয়ে থাকল রেমারিক। আর আমি জেলে যাব না, নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করল সে। ঠিক করল, মাস্তানি ছেড়ে। দিয়ে দেখবে সত্তাবে বেঁচে থাকা যায় কিনা। মার নামে কেনা বাড়িটা খালি পড়ে ছিল, ঠিক করল ওটাকে বোর্ডিং হাউস বানাবে।

গত দুবছরে শহরে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছে আতুনি বেরলিংগার। তার দলে কুখ্যাত সব মস্তানরা ভিড়েছে, পুলিস আর স্থানীয় সরকারের প্রভাবশালী অফিসাররাও এখন তার পকেটে। রেমারিক বুঝল, তাকে আবার নতুন করে শুরু করতে হলে বেরলিংগারের অনুমতি লাগবে। নেপলসে আত্মপ্রকাশ করল সে, বেরলিংগারের সাথে দেখা করার চেষ্টায় থাকল।

বেরলিংগার তখনও যুবক, মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়স। আধুনিক চিন্তা-ভাবনা নিয়ে অল্প যে-কজন নেতা উঠে এসেছিল, সে তাদেরই একজন। রক্তপাত ঘটিয়ে ক্ষমতায় এল বটে, কিন্তু চারদিক একটু গুছিয়ে নিয়েই বাস্তববাদী ব্যবসায়ীর দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করল সে। বুঝল, তার ক্ষমতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে হলে গোটা দেশের সব মাফিয়া নেতাদের সাথে একটা সমঝোতায় আসতে হবে তাকে। সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়ে, সব বড় শহরে প্রতিনিধি পাঠাল সে। পালার্মো থেকে দূত এল তার কাছে, প্রভাব-বলয় আর ক্ষমতার আওতা নির্ধারণের জন্যে মীটিঙে বসার আমন্ত্রণ জানানো হল তাকে।

পোপ নির্বাচনে যে গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়, সে-সব মীটিঙের আলোচনাও তেমনি গোপন রাখা হল। কার কতটুকু ক্ষমতা, প্রভাব-বলয়ের বিস্তৃতি, ইত্যাদি নিয়ে মতবিরোধ আর দ্বন্দ্ব দেখা দিল, কিন্তু নতুন করে কোন রক্তপাত ঘটল না। কালাব্রিয়ার পুরানো ঐতিহ্যের অনুসারীরা গোঁ ধরে বসল, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মিলান আর তুরিনের বস-রা যেন কোনভাবেই অতিরিক্ত ক্ষমতার অধিকারী না হয়। সবেচেয়ে বেশি শোরগোল তুলল নেপলস আর রোমের নেতারা, কারণ গত কয়েক যুগ ধরে তাদেরকে অবহেলা করা হয়েছে। তবে সবাই একমত হল যে গোটা দেশ জুড়ে শক্তিশালী একটা কাঠামো থাকা দরকার, নেতাদের নেতাও একজন থাকতে হবে, যার ক্ষমতা হবে সবার চেয়ে বেশি।

উত্তরের নেতারা কালাব্রিয়ানদের মধ্যে থেকে কাউকে চায় না, কালাব্রিয়ানরা উত্তরের কাউকে মেনে নেবে না। রোমের ডন পেসকাকে নরম বলে রায় দেয়া হল, আর রেলিংগারের বয়স কম।

এ-ধরনের পরিস্থিতিতে যা হয়, একটা আপোসরফায় আসতে হল সবাইকে। মীটিং আহ্বান করা হয়েছিল পালার্মো থেকে। পালার্মোর নেতা ডন বাকালাকে সাময়িকভাবে নেতাদের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে বলা হল। লোকটা মাঝারি আকৃতির, ঝানু একজন কূটনীতিক। কেউ জানত না, তার একটা প্রতিজ্ঞা। ছিল, পালার্মোকে ক্ষমতার উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। লক্ষণগুলো দেখে ঠিক কি ঘটতে যাচ্ছে পরিষ্কার আঁচ করতে পারে সে। উপস্থিত কেউই তার কূটনৈতিক চাল পছন্দ করত না। রাজনীতিকদের সাথে তার অতিরিক্ত মাখামাখিও সন্দেহের। চোখে দেখা হত। কিন্তু কেউই ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি, ডন বাকালা তার কুটনৈতিক চাল চেলেই আগামী আটটা বছর সরার মাথার ওপর ছড়ি ঘোরাবে। সবাই এ-কথা ভেবেই খুশি হল যে বেশ লম্বা একটা সময়ের জন্যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সবার জন্যেই সেটা বিরাট লাভ হয়ে দেখা দেবে।

আতুনি বেরলিংগারের সাদর অভ্যর্থনা পেয়ে মুগ্ধ হল রেমারিক। তার অফিস দেখেও প্রভাবিত হল সে। সম্পূর্ণ ব্যবসায়ীসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করছে লোকটা। দুবছর আগের নিষ্ঠুরতা সত্যি অতীতের একটা কলঙ্ক মাত্র। যা ঘটবার ঘটে গেছে, ভুলে যাওয়াই ভাল, আশ্বাস দিয়ে বলল বেরলিংগার। পরিস্থিতি এখন। বদলে গেছে। আরে না, রেমারিক নতুন করে ব্যবসা শুরু করলে কেউ তাকে বাধা দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তবে রেমারিক যদি বোর্ডিং হাউসে মারিজুয়ানাও বিক্রি করে; নেতার অনুরোধ ফেলা হয়নি দেখে যারপর নাই খুশি হবে বেরলিংগার। মারিজুয়ানা কেনাবেচার জন্যে পুঁজি লাগলে তাও পেয়ে যাবে রেমারিক।

শর্তটা জুড়ে দেয়ায় একটু মনক্ষুণ্ণ হলেও, আত্মবিশ্বাস নিয়েই ফিরে এল রেমারিক। ভাবল, ভাগ্যিস তাকে বেশ্যাপাড়া চালাতে বলেনি।

আসলে ডন বেরলিংগারকে চিনতে পারেনি রেমারিক। বেরলিংগার তাকে ক্ষমা করেনি। বিরোধী পক্ষে রেমারিক আর তার দল ছিল সবচেয়ে বিপজ্জনক, বেশিরভাগ ক্ষয়-ক্ষতি ওদের দ্বারাই ঘটেছিল। সেই রেমারিককে ব্যবসা করে খেয়ে। পরে বাচতে দেবে, বেরলিংগার সে লোকই নয়।

পালার্মো থেকে নির্দেশ ছিল, আঞ্চলিক গোলযোগ একেবারে কমিয়ে ফেলতে হবে। অতীত ঘটনার জের ধরে কোনরকম খুন-খারাবি চলবে না। বেরলিংগারের তখনও এতটা ক্ষমতা বা সাহস হয়নি যে ডন বাকালার নির্দেশ অমান্য করে। সহজ একটা উপায় আবিষ্কার করে সে। শুরু করুক রেমারিক। সময় আর। সুযোগমত প্রোটেকশন প্রত্যাহার করে নেবে সে। যা করার, তার কাছ থেকে। প্ররোচিত হয়ে পুলিসই সব করতে পারবে। বিচার বিভাগের সাথে তার দহরম মহরম আছে, রেমারিককে লম্বা সময়ের জন্যে জেলের ঘানি টানানো কোন সমস্যাই হবে না।

.

একদিন রাত দুপুরে এল একটা টেলিফোন কল। কে ফোন করেছিল, আজও জানা হয়নি রেমারিকের।

গিডি নোচি আর আতুনি বেরলিংগার, দুজনকেই বাকিতে অস্ত্র আর গোলা বারুদ সরবরাহ করেছিল ভিনসেন্ট গগল নামে এক লোক। নোচি নিহত হওয়ায়। পাওনা টাকা মার গেল গগলের। কিন্তু বিজয়ী বেরলিংগারের কাছ থেকেও টাকা পেল না সে। গগলকে সাধারণ একজন স্মাগলার মনে করে টাকাটা না দেয়ার। সিদ্ধান্ত নিল বেরলিংগার। কেউ ঠকালে বা শত্রুতা করলে সরাসরি আঘাত করা গগলের স্বভাব নয়। কারও সাথে প্রকাশ্যে বিরোধে জড়িয়ে পড়াও তার অপছন্দ। বেরলিংগার টাকা দিতে অস্বীকার করায় কোন প্রতিবাদই করল না সে। শুধু ঘটনার ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখল আর অপেক্ষায় থাকল সুযোগের।

অবৈধ অস্ত্রের যোগানদার হিসেবে নোচি আর বেরলিংগার, দুপক্ষের। লোকজনদেরই চিনত গগল। এদের মধ্যে নোচির দলের রেমারিক তার দৃষ্টি কাড়ে। রেমারিক কোত্থেকে কোথায় উঠেছে, তারপর কোথায় নেমে গেল, সব খবরই জানা ছিল তার।

নানা দেশে ব্যবসা আছে গগলের, সবখানে ঘুরে বেড়াতে হয়, তবু হাতে সময় পেলেই ইতালীতে ছুটি কাটাতে আসে সে। আর এলেই সংশ্লিষ্ট সবার খোঁজ খবর নেয়। রেমারিক সম্পর্কে আরও কিছু খবর পেল সে। বেরলিংগারের সাথে। দেখা করেছে রেমারিক, আবার নতুন করে ব্যবসা শুরু করতে যাচ্ছে ছেলেটা।

নিজের ব্যবসা বা ব্যবসা সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে বন্ধু মাসুদ রানার সাথে, কখনও আলোচনা করেনি গগল, তবে রানা কি ধরনের কাহিনী শুনতে পছন্দ করে সেটা তার খুব ভাল জানা আছে। বেরলিংগার টাকা দিতে অস্বীকার করার পর রানার সাথে দেশে-বিদেশে অনেকবারই দেখা হয়েছে গগলের। গল্পচ্ছলে রানাকে সে রেমারিকের কথাও বলেছে।

যাকে নিয়ে এত আলোচনা, সেই রেমারিক কিছুই জানল না, কিন্তু বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের এজেন্ট এবং রানা ইনভেস্টিগেশনের চীফ মাসুদ রানা তার সম্পর্কে যা কিছু জানার প্রায় সবই জেনে ফেলল। বিমুখ পরিস্থিতির সাথে একা লড়ে রেমারিক অনেক ওপরে উঠেছে, এটা রানার ভাল লাগে। মাফিয়া নেতার কাছ থেকে নারী-ব্যবসা করার নির্দেশ পেয়েও সেটা অমান্য করার সাহস দেখিয়েছিল রেমারিক, এই ঘটনা রানার মনে একটা ছাপ ফেলে। কেন যেন রানার। মনে হয়, ওখানে একজন সৎ যুবক সুযোগের অভাবে সৎ পথে আসতে পারছে না। গগলের সাথে দেখা হলে কথা প্রসঙ্গে দুএকবার জানতে চেয়েছে ও, তোমার সেই রেমারিকের খবর কি?

গগল একবার জানাল, বেরলিংগার তাকে ব্যবসা করার অনুমতি দিয়েছে। তবে আমার ধারণা, সুযোগমত ঠিকই ছোবল মারবে সে।

একটু চিন্তা করে রানা বলেছিল, ওর কোন সাহায্য লাগলে আমাকে জানিও। ছেলেটাকে আমার ভাল লেগেছে।

ব্যস, এই পর্যন্তই। এরপর অনেকদিন গগলের সাথে দেখা হয়নি রানার, রেমারিকের কথাও ভুলে গেছে ও।

ব্যবসার কাজে আবার একবার মিলানে এল গগল। বেরলিংগারের দলের ভেতর নিজের লোক আছে তার, তাকে ডেকে ভেতরের সব খবর সংগ্রহ করার সময়ই সে জানতে পারল, রেমারিককে শায়েস্তা করার জন্যে প্রোটেকশন প্রত্যাহার। করে নিচ্ছে বেরলিংগার। আজ রাতেই তার বোর্ডিং হাউসে হানা দেবে পুলিস।

ইনফরমারকে বিদায় করে দিয়ে চিন্তা করতে বসল গগল। রেমারিকের প্রতি সহানুভূতি জাগল তার মনে। ভাবল, রেমারিককে নিরাপদ কোথাও সরিয়ে দিতে পারলে বেরলিংগার একটা চোট খাবে। কিন্তু রেমারিককে কোথায় সরাবে সে?

এই সময় রানার কথা মনে পড়ে গেল গগলের। মিলানে রানা ইনভেস্টিগেশনের শাখা আছে, কিন্তু ফোন করে সেখানে রানাকে পাওয়া গেল না। কোথায় পাওয়া যাবে ওকে, তাও বলতে পারল না শাখাপ্রধান। রিসিভার নামিয়ে রাখবে গগল, এই সময় অপরপ্রান্ত থেকে জানতে চাওয়া হল, মি. রানাকে কি দরকার?

না, মানে রেমারিক নামে এক যুবককে…

আপনি কে বলছেন?

নিজের পরিচয় দিল গগল।

অপরপ্রান্ত থেকে জবাব এল, রেমারিককে আমাদের ঠিকানা দিয়ে পাঠিয়ে দিন। বস তার সম্পর্কে অনেক দিন আগেই আমাদেরকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন। রেমারিক এখানে পৌঁছুতে পারলে তার নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমাদের।

এই প্রথম গগল উপলব্ধি করে, গোটা ইউরোপ জুড়ে রানা ইনভেস্টিগেশন কেন এত নাম করেছে। দায়িত্ব, তা সে যত নগণ্যই হোক, ছোট করে দেখে না ওরা। রানার আচরণও তার মনে শ্রদ্ধার একটা ভাব এনে দিল। রেমারিককে সাহায্য করার প্রস্তাব দিয়ে সেটা ভুলে যায়নি ও, নিজের লোকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশও দিয়ে রেখেছে।

এরপর গগল ফোন করে রেমারিককে। নিজের পরিচয় না দিয়ে তাকে সে জানায়, বেরলিংগার প্রোটেকশন প্রত্যাহার করেছে। এক ঘন্টার মধ্যে রওনা হচ্ছে পুলিস।

রেমারিক জানতে চায়, আপনি কে বলছেন?

একটা ঠিকানা দিচ্ছি। নিজের ব্যবস্থা নিজে যদি না করতে পার, এই ঠিকানায় গেলে ওরা তোমাকে সাহায্য করবে, ঠিকানাটা জানিয়ে কানেকশন কেটে দিল গগল।

এই রকম একটা বিপদের জন্যে তৈরি ছিল না রেমারিক। কয়েক মিনিট পাথর হয়ে বসে থাকল সে। বেরলিংগারের শত্রুর অভাব নেই, সম্ভবত তাদেরই কেউ ফোন করেছিল। কিন্তু যেচে পড়ে সাহায্য করতে চাওয়ায় মনটা খুঁত খুঁত করতে লাগল। ঠিকানাটার ওপর আরেকবার চোখ বুলাল সে। একটা। ইনভেস্টিগেটিং ফার্মের ঠিকানা, প্রতিষ্ঠানটার নাম অনেকের মুখে শুনেছে সে।

বেরলিংগার তাকে ক্ষমা করেনি এটা পরিষ্কার। তার কি করার আছে ভাবল। রেমারিক। গা ঢাকা দিতে পারে, কিন্তু বেশি দিনের জন্যে নয়। হয় বেরলিংগার, নয় পুলিস শেষ পর্যন্ত তাকে ঠিকই খুঁজে বের করবে। লড়তে পারে সে, কিন্তু জেতা সম্ভব নয়। আরেক উপায় দেশ ত্যাগ করা। কিন্তু ডক এলাকায়। বেরলিংগারের লোকজন যারা কাজ করছে তারা সবাই চেনে তাকে। জাহাজে ওঠার আগেই ধরা পড়ে যাবে সে। পাসপোটও নেই।

আবার তাকে জেলে যেতে হবে?

না। তারচেয়ে এই ঠিকানায় গিয়ে দেখবে সে। যদি ফাঁদ হয়, মেনে নেবে কপালের লিখন।

মাকে চিঠি লিখল রেমারিক। সৎ একজন উকিলের ঠিকানা দিল চিঠিতে। লিখল, এই উকিলের মাধ্যমে বোর্ডিং হাউসটা ভাড়া দিতে হবে, ভাড়ার টাকা দিয়ে ভরণপোষণ আর রিসোর লেখাপড়ার খরচ চালাতে হবে। সবশেষে লিখল, আমাকে অনেক দূরে চলে যেতে হচ্ছে, কবে ফিরব ঠিক নেই।

পকেটে কিছু টাকা নিয়ে- একবস্ত্রে বেরিয়ে পড়ল রেমারিক।

ওর মা পরদিন ছেলের চিঠি পেল। চিঠি পড়ে চার্চে গেল সে। সারাটা দিন প্রার্থনার মধ্যে কাটাল।

রানা ইনভেস্টিগেশনের মিলান শাখা তিন দিন লুকিয়ে রাখল রেমারিককে। এই তিনদিনে পাসপোর্ট এবং দরকারি আরও কিছু কাগজপত্র তৈরি হল তার জন্যে। তাকে প্রস্তাব দেয়া হল, পৃথিবীর যে-কোন দেশে যেতে পারে সে, বেছে নিতে পারে যে-কোন ধরনের পেশা। এই ফার্ম তাকে বিনা ফি-তে সম্ভাব্য সব রকম সাহায্য করবে। প্রশ্নটা চেপে রাখতে পারেনি রেমারিক–কিন্তু কেন? আমি। তো তোমাদের কোন উপকার করিনি? আমার জন্যে এত কিছু…? শাখা প্রধান, মুচকি হেসে বলেছে, আমাদের চীফের নির্দেশ, তার বেশি আমি নিজেও কিছু জানি না।

এই উত্তরেই সন্তুষ্ট থাকতে হল রেমারিককে। অনেক ধরনের চাকরির কথা বলা হল তাকে–বডিগার্ড, সিকিউরিটি গার্ড, ইনফরমার, ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের চেকার, সেলসম্যান, মেসেঞ্জার, ভাড়াটে সৈনিক। ভাড়াটে সৈনিক? যুদ্ধ? কোথায়?

রেমারিককে বলা হল, আগে ট্রেনিং নিতে হবে, ট্রেনিং শেষ হলে যেখানে খুশি ভাড়ায় গিয়ে যুদ্ধ করতে পারবে সে। আগ্রহী হয়ে উঠল রেমারিক। সে দুর্বল, ভয় পেয়ে পালাচ্ছে–ট্রেনিং নিয়ে একজন যোদ্ধা হতে পারলে মন্দ হয় না। তাহলে আলজিয়ার্সে যেতে হবে তাকে। ওখানে একটা ট্রেনিং সেন্টার আছে, ট্রেনিং দিয়ে। সৈনিক বানানো হয়। কিন্তু সেই সাথে সাবধান করে দেয়া হল–এ বড় কঠিন। জীবন, প্রতিপদে মৃত্যুর ঝুঁকি আছে। গায়ে মাখল না রেমারিক।

মিলান থেকে নিরাপদেই প্লেনে চড়ে আলজিয়ার্সে চলে এল ও। মিলান এয়ারপোর্টে বেরলিংগারের একাধিক লোককে ঘুর ঘুর করতে দেখল সে, কিন্তু ছদ্মবেশ নিয়ে থাকায় ওকে দেখেও তারা কেউ চিনতে পারল না।

ট্রেনিং সেন্টারটা মরুভূমির মাঝখানে। দেড় মাসের মধ্যে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিল রেমারিক। শুধু যে খাপ খাইয়ে নিল তাই নয়, সে আর তার ইন্সট্রাক্টর। দুজনেই আবিষ্কার করল, যুদ্ধ-কৌশল দ্রুত রপ্ত করার ব্যাপারে সে একটা প্রতিভা। একবার দেখিয়ে দিলেই যে-কোন ড্রিল বা রণ-কৌশল হুবহু অনুকরণ করতে পারে। সে। টার্গেট প্র্যাকটিসে সবাইকে ছাড়িয়ে গেল। তার তৈরি অ্যামবুশে সম্ভাব্য সমস্ত ফ্যাক্টর বিবেচনার মধ্যে রাখা হয়, কোথাও কোন খুঁত থাকে না। তার চিন্তা-ভাবনা অঙ্কের নিয়মে বাধা, ঝুঁকি নেয়া চলে কিনা অঙ্ক কষে বের করে ফেলে।

এই ট্রেনিং সেন্টারে দুজন লোকের সাথে দেখা হল রেমারিকের, দুজনেই তাকে ভালভাবে চেনে, কিন্তু রেমারিক তাদের একজনকেও চিনতে পারল না। একজন ভিনসেন্ট গগল, অপরজন মাসুদ রানা।

ট্রেনিং চলাকালে বেশ কয়েকবারই সেন্টারে এল গগল, প্রতিবার আধুনিক অস্ত্র পাতি আর গোলাবারুদ নিয়ে এল সে। আর রানা এল ট্রেনিং শেষ হয়ে যাবার পর, ওদের বিদায় অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্যে।

অনুষ্ঠানের মাত্র এক ঘন্টা আগে উপস্থিত হল রানা। রেমারিক লক্ষ করল, তাদের ব্যাচের আট দশ জন যুবক এই নতুন আগন্তুককে ঘিরে ধরে প্রবল উৎসাহে কুশলাদি জানতে চাইছে। প্রায় সমবয়েসী, সুদর্শন, চেহারায় এমন অদ্ভুত একটা আকর্ষণ আছে যে দ্বিতীয়বার না তাকিয়ে পারা যায় না। প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে। না, সুযোগ পেলেই একা থাকতে ভালবাসে, কারও দিকে মাত্র একবার তাকিয়েই যেন তার অন্তরের অন্তস্তল পর্যন্ত দেখতে পায়। আগন্তুক সম্পর্কে প্রচণ্ড কৌতূহল। জাগল রেমারিকের মনে। কিন্তু একে তাকে প্রশ্ন করে বিশেষ কিছু জানতে পারল না সে। শুধু জানল, আগন্তুক নয়জন যুবককে নিজের খরচে এখানে ট্রেনিং নিতে পাঠিয়েছিল, ট্রেনিং শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন তাদেরকে নিয়ে যেতে এসেছে।

অনাড়ম্বর বিদায় অনুষ্ঠান শেষ হল। তখনও রেমারিক ঠিক করতে পারেনি। কোথায় যুদ্ধ করতে যাবে-সে। হঠাৎ আগন্তুককে দেখে তার সামনে দাঁড়াল সে, বলল, বলতে পার, যুদ্ধ করতে কোথায় আমার যাওয়া উচিত?

রোডেশিয়ায়, সাথে সাথে জবাব দিল রানা। কিংবা লেবাননে। যদি ন্যায়ের পক্ষে যুদ্ধ করতে চাও। আমার বন্ধুরা এখানে যারা ট্রেনিং শেষ করেছে, দুভাগে। ভাগ হয়ে লেবানন আর রোডেশিয়ায় যাচ্ছে ওরা। তুমি যে-কোন একটা দলের সাথে ভিড়ে যেতে পার।

তোমার নামটা আমার জানা হয়নিঃ..

মাসুদ রানা।

আর কোন আলাপের সুযোগ হল না, রানাকে নিয়ে তার বন্ধুরা রেস্তোরাঁয় গিয়ে ঢুকল।

পরদিন আরও চারজনের সাথে রওনা হল রেমারিক। গন্তব্য রোডেশিয়া। উদ্দেশ্য মুক্তিপাগল কালোদের সাথে স্মিথ সরকারের শ্বেতাঙ্গ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ।

সে যুদ্ধের স্মৃতি চিরকাল স্মরণ থাকবে রেমারিকের। মুক্তিবাহিনীর মধ্যে একমাত্র শ্বেতাঙ্গ ছিল সে, তাতে করে আশ্চর্য সব সুবিধে ভোগ করার সুযোগ এসে যায় তার। বার কয়েক শ্বেতাঙ্গ সৈনিকদের হাতে ধরা পড়েও তাদের ভুল বুঝিয়ে নিজেকে মুক্ত করে আনে সে।

তিনমাস পর মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিল রানা। রেমারিকের কৃতিত্বের খবর শুনে তাকে নিজের ইউনিটে টেনে নিল ও। এখানেই পরস্পরকে চিনতে শুরু করল। ওরা, ধীরে ধীরে দুজনের মধ্যে গড়ে উঠল বন্ধুত্ব।

রোডেশিয়ায় যুদ্ধ করার সময় সবাইকে তাক লাগিয়ে দিল রেমারিক। তার মহত্ত্ব, তার আত্মত্যাগ, তার বুদ্ধি আর সাহস তাকে একটানে তুলে নিয়ে এল রানার পাশে। কিংবদন্তীর নায়কে পরিণত হল সে। এমন কিছু ঘটনা ঘটল, ব্যক্তিগতভাবে রেমারিকের প্রতি চিরঋণী হয়ে থাকল রানা। আক্ষরিক অর্থেই অবধারিত মৃত্যুর হাত থেকে রানাকে ছিনিয়ে আনল রেমারিক। সেই রকম রানাও রেমারিককে নতুন জীবন দান করল, নিজের প্রাণ তুচ্ছ করে শত্রুঘাটি থেকে বন্দী রেমারিককে উদ্ধার করে নিয়ে এল।

পরস্পরকে সাহায্য করতে পেরেছে বলেই বন্ধুত্ব হল, ব্যাপারটা তা-ও ঠিক নয়। চরিত্রগত কিছু মিলও ছিল, মিল ছিল জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিতে, রুচিতে অরুচিতে, আহারে-বিহারে। রানার কোন অহঙ্কার নেই, রেমারিকেরও নেই। শেখার আগ্রহ রেমারিকের জন্মগত, রানারও তাই। দুজনের কেউই অন্যায় সহ্য। করতে পারে না।

ইতিমধ্যে রেমারিকের সব কথা জানা হয়ে গেছে রানার। মা আর ভাই কেমন আছে জানে না রেমারিক, লুকিয়ে লুকিয়ে চোখের পানিতে বালিশ ভেজায়। একদিন বেলাডোনার করুণ পরিণতির কথাও জানল রানা। জানল, আতুনি বেরলিংগার রেমারিকের সবচেয়ে বড় শত্রু। মুখে কিছু বলল না রানা, কিন্তু মনে মনে ঠিক করল, রেমারিককে আবার তার সমাজে ফিরে যেতে সাহায্য করবে ও। তাকে ও সুখী দেখতে চায়।

দেশের কাজে ঢাকায় ফিরে যেতে হল রানাকে। দেশ থেকে আবার বেরুল রানা, চলে এল ইটালীতে, কিন্তু রেমারিক সে খবর জানল না। ইটালীতে এসে মাফিয়া নেতারা কে কোথায় কি অবস্থায় আছে খোঁজ-খবর নিল রানা। আত্বনি বেরলিংগার সম্পর্কে জানল, হাতে আরও টাকা আর ক্ষমতা আসায় নিজের হেডকোয়ার্টার নেপলস থেকে রোমে সরিয়ে নিয়ে গেছে লোকটা। নেপলসের বিধাতা এখন অন্য একজন ডন, যদিও বেরলিংগারেরই লোক সে। উত্তর থেকে এসেছে লোকটা, এখানকার অতীত সম্পর্কে তার বিশেষ কোন আগ্রহ নেই।

মাফিয়া মহলে প্রভাবশালী দুএকজন নেতার সাথে পরিচয় ছিল রানার। তাদের একজনের সাথে দেখা করল ও। দীর্ঘ আলাপের পর রানাকে কথা দেয়া হল, ভিটেলা রেমারিক আবার নেপলসে ফিরে এসে বসবাস শুরু করলে। বেরলিংগার বা আর কেউ তাকে কোন রকম বিরক্ত করবে না।

তখন লেবাননে যুদ্ধ করছে রেমারিক, তাকে নিয়ে আবার নেপলসে ফিরে এল রানা। মার নামে কেনা বাড়িটা অক্ষতই আছে, একটা চার্চকে ভাড়া দেয়া হয়েছে। সেটা। কুমারী মাতারা থাকে সেখানে। পজিটানোয় মা আর ভাইয়ের সাথে দেখা করতে গেল রেমারিক, সাথে রানা। ওরা ভাল আছে, সে-খবর রানার কাছ থেকে আগেই পেয়েছিল রেমারিক।

রিসো, তার ছোট ভাই, রোম ইউনিভার্সিটির শেষ বর্ষের ছাত্র তখন, ইকনমিকস পড়ছে সে। মার বয়স হয়েছে, কিন্তু এখনও খটখটে। ছেলের ফিরে আসা উপলক্ষে চার্চে গেল সে, বারোটা মোমবাতি জ্বালিয়ে দিয়ে এল।

ব্যস, এখানেই রেমারিকের সৈনিক জীবনের ইতি হল। এরপর মাল্টায় গেল ও রানার সাথে, বিয়ে করল। বউ নিয়ে এখানেই ফিরে এসেছিল ও।-মস্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল রেমারিক। কী হতে পারত, আর কী হয়ে গেল! জীবনটা কী!

.

০৪.
ভিটো আভান্তি তার আইনবিদ বন্ধু আলবারগো লোরানকে নিয়ে লাঞ্চ খেতে বসেছে। প্রথমশ্রেণীর রেস্তোরাঁ গিদাস, মিলানে কখনও এলে এখানেই ডিনার খায়। সোফিয়া লোরেন।

ফ্লোরেনটিনার অর্ডার দিল লোরান। ফ্লোরেনটিনা গিদাস-এর স্পেশাল। জিনিসটা গ্রিল্ড স্টেক, ফ্লোরেনটিনা পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়–তেল, রসুন, পার্সলি। শাক, মরিচ আর শূকরের মাংস দিয়ে। এক বোতল স্কচ হুইস্কির জন্যে বলা হল।

আলবারগো লোরান স্থলদেহী, কিন্তু চটপটে। বয়স চল্লিশ এখনও পেরোয়নি। অথচ গোটা দেশে আইন-ব্যবসায়ী হিসেবে তার নাম ছড়িয়ে পড়েছে। দুর্মুখেরা অবশ্য বলে, লোরান মামলায় জেতে ঝানু উকিল বলে নয়, বিচার বিভাগের। হোমরাচোমরাদের সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক আছে বলে। লোরান কিন্তু এ-সব। অভিযোগ স্বীকার বা অস্বীকার কোনটাই করে না। তবে মাফিয়াদের সাথে তার যে ভাল যোগাযোগ আছে তা সে প্রকাশ্যেই বলে বেড়ায়। এরই মধ্যে বেটপ আকৃতির। একটা ভুড়ি বাগিয়েছে সে, মাথার পিছনে উঁকি দিতে শুরু করেছে চকচকে টাক। তার চোখ দুটো অস্থির, সারাক্ষণ যেন সুযোগের খোঁজে আছে। দামি কাপড়চোপড় পরে সে, সুন্দরী মেয়েদের নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, লেটেস্ট মডেলের গাড়ি কেনে প্রতি বছর।

ভিটোর আর্থিক অবস্থা নিয়ে কথা হল। কৌতুকভরা মিটিমিটি হাসি দেখা। গেল লোরানের মুখে। বন্ধুকে বারবার অভয় দিল সে। ব্যবস্থা একটা হয়েই যাবে। ঠিক আছে, ব্যাংক ম্যানেজারদের সাথে নিজে কথা বলবে সে। ভিটোর এতটা ভেঙে পড়া উচিত নয়।

লোরান শুধু ভিটোর আইন উপদেষ্টাই নয়, পারিবারিক বন্ধুও বটে, কাজেই দ্বিতীয় সমস্যা লরার কথাও তুলল সে। লরা অযথা লুবনার নিরাপত্তার ব্যাপারটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করছে।

কুতকুতে চোখে সকৌতুক হাসি নিয়ে ভিটোর কথা শুনল লোরান। বলল, প্রতিটি সমস্যার ভেতর কিছু সুযোগ-সুবিধে থাকে, সেগুলো দেখতে পাওয়া চাই, ভিক্টো। তোমার এই সমস্যাগুলো নিতান্তই সামান্য, কিন্তু এগুলোর ভেতর যে সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে সেগুলো অসামান্য।

কি রকম?

প্লেটে ফর্ক রেখে বাঁ হাত ওপরে তুলল লোরান, আঙুলগুলো ছড়ানো। এক, আঙুলের গিট গুনতে শুরু করল সে, আভান্তি পরিবারের একটা খ্যাতি আছে, কাজেই ব্যাংক তোমার কাছ থেকে যত টাকাই পাওনা হোক, তোমার অবস্থা না। ফেরা পর্যন্ত ওরা তোমাকে সাহায্য করে যাবে।

আভান্তি পরিবারের খ্যাতি মানে আমার বাবার খ্যাতি, প্রতিবাদ করে বলল। ভিটো। কিন্তু তুমি তো জান লরাকে বিয়ে করার পর বাবার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।

লোরান কাধ ঝাঁকাল,। দুই, লেক কোমোতে তোমার অ্যাপার্টমেন্টটা। আট বছর আগে আশি মিলিয়ন লিরা দিয়ে কিনেছ, এখন সেটার দাম আড়াই শো মিলিয়ন। প্রতিদিন আরও বাড়ছে।

বিরক্ত হল ভিটো। লোরানের মাথা আজ মোটেও খুলছে না। তুমি আমার আইন উপদেষ্টা, তোমাকেও কি আমার মনে করিয়ে দিতে হবে যে ওই অ্যাপার্টমেন্টও ব্যাংকের কাছে দুশো মিলিয়ন লিরায় বন্ধক দেয়া হয়েছে?

আবার কাধ ঝাঁকাল লোরান। তিন, কিছু মনে কোরো না, খোলাখুলি বলছি, তোমার বউ অর্থাৎ ভাবী, এ-দেশের সেরা সুন্দরীদের একজন। সুন্দরী বউ, এরচেয়ে বড় সার্টিফিকেট আর কি আছে হে? বলে কর্কশ গলায় হো হো করে। হাসতে লাগল সে।

গম্ভীর হয়ে বসে থাকল ভিটো। লোরান আজ তাকে হতাশ করছে।

ভিটোর মনের অবস্থা বুঝতে পারল লোরান। বন্ধুর গ্রাসে খানিকটা হুইস্কি ঢেলে দিল সে। তারপর বলল, এমিলিটা কিডন্যাপিং-এর পর লুবনার স্কুলে যাওয়া বন্ধ করাটাই তোমার মস্ত ভুল হয়ে গেছে, বুঝলে!

আমি? আমি তো তখন নিউইয়র্কে। এটাও তোমার ভাবীর কীর্তি। ফিরে। এসে দেখলাম গভর্নেস পর্যন্ত রাখা হয়ে গেছে।

হ্যাঁ, এ-কথা সত্যি, কিছু কিছু কাজ ভাবী কেঁকের মাথায় করে বসে। আবার যদি সে লুবনাকে স্কুলে পাঠাতে রাজি হয়, তার মানেই দাঁড়ায় তার ভুল হয়েছিল এটা স্বীকার করা। এবার বল, ভাবী কখনও নিজের ভুল স্বীকার করেছে?

ক্ষীণ একটু হাসি দেখা গেল ভিটোর ঠোঁটে।

কাজেই, বলে চলল লোরান, চীনারা যেমন বলে, তাকে তোমার মুখ রক্ষা। করার সুযোগ দিতে হবে।

কিভাবে তা সম্ভব? জানতে চাইল ভিটো।

একদিকের কাধ ঝাঁকাল লোরান। একজন বডিগার্ড রাখ।

ধেত্তেরি, তোমার আজ হয়েছে কি! ঝাঝের সাথে বলল ভিটো। আধ ঘন্টা। ধরে ব্যাখ্যা করলাম আমার টাকা নেই, অথচ তুমিও লরার মত বাজে খরচ বাড়াতে বলছ! আমি চেয়েছিলাম লরার সাথে কথা বলবে তুমি, তোমার কথা শোনে ও…

বন্ধুর হাত চাপড়ে দিল লোরান। ভাবীকে আমি যাই বলি না কেন, তাতে তার মুখ রক্ষা হবে না। তার সম্মান বাঁচানটাই এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা। তাছাড়া, ঠিক কি ধরনের বডিগার্ডের কথা বলছি আমি, শুনলে বুঝবে

ওয়েটার কফি নিয়ে এল।

কি ধরনের বডিগার্ড? ওয়েটার চলে যেতে জিজ্ঞেস করল ভিটো।

বন্ধুর দিকে হঠাৎ ঝুঁকে পড়ল লোরান, তার গলা একেবারে খাদে নেমে এল, যেন ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছে। ভিটো, এই কিডন্যাপিং-এর অনেকগুলো দিক আর সম্ভাবনা আছে। গোটা ব্যাপারটা ভারি গোছাল, কারণ এর পিছনে রয়েছে অত্যন্ত দক্ষ আর প্রচণ্ড ক্ষমতাশালী একটা মহল। বিশাল একটা ব্যবসা দিচ্ছে এই কিডন্যাপিং–গত বছর লোকের পকেট থেকে বেরিয়ে গেছে আঠারো শো বিলিয়ন। লিরা।

হ্যাঁ, জানি, গম্ভীর সুরে বলল ভিটো। ব্যবসাটা মাফিয়ারা করছে।

চোখ-মুখ কুঁচকে উঠল লোরানের, কেউ যেন তাকে লক্ষ্য করে পচা ডিম ছুঁড়েছে। কি বাজে একটা শব্দ! ওই শব্দটা দিয়ে লোকে বোঝাতে চায় মাফিয়া। মানে চোর-ডাকাত, গুণ্ডা-বদমাশ, মাস্তান আর খুনে। কিন্তু দিনকাল বদলেছে, ভিটো। ওরা এখন ঝানু ব্যবসায়ী। ওয়েটারের দৃষ্টি আকর্ষণ করল সে, কনিয়াক আনতে বলল। পকেট থেকে দুটো হাভানা সিগার বের করে বন্ধুকে দিল একটা। খুদে একটা সোনালি গিলোটিন দিয়ে সিগারের মুণ্ডচ্ছেদ করা হল। গিলোটিনটা ভিটোকে দিল সে। কনিয়াক রেখে বিদায় হল ওয়েটার।

ছেলেমেয়ের কিডন্যাপ হবার ভয় থাকলে মা-বাপ কি করে? কনিয়াকের গ্লাসে আয়েশ করে চুমুক দিল লোরান। বিদেশে পাঠিয়ে দেয়, সাধারণত সুইটজারল্যাণ্ডে। কিংবা কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে, সশস্ত্র গার্ড আছে এ-ধরনের স্কুলে পাঠায়, বুলেটপ্রুফ গাড়ি কেনে। আর, অবশ্যই, বডিগার্ড রাখে।

তাহলে স্বীকার করছ বডিগার্ড রাখা খরচের ব্যাপার?

বছরে প্রায় তিরিশ মিলিয়ন লিরা। সমস্ত খরচ বাবার।

তাহলে?

এ-ধরনের বডিগার্ড স্পেশালাইজড এজেন্সিগুলো যোগান দেয়, দুনিয়ার সক বড় বড় শহরে তাদের শাখা অফিস আছে। ইউরোপে সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দেয়ায়। বডিগার্ডের ভারি অভাব দেখা দিয়েছে। সত্যিকার যোগ্য বডিগার্ড এখন পাওয়াই মুশকিল, তাই দিনে দিনে ওদের দামও বাড়ছে।

এসব আমি জানি, বলল, ভিটো। পার তো আমার সমস্যা নিয়ে একটু মাথা…

ট্রাফিক পুলিসের মত একটা হাত তুলে বিটোকে থামিয়ে দিল লোরান। ধীরে, বৎস, ধীরে। আমি তোমার সমস্যা নিয়েই কথা বলছি।

একটা নিঃশ্বাস ফেলে অসহায় ভঙ্গিতে নিঃশব্দে মাথা নাড়ল ভিটো।

এবার কিডন্যাপিং-এর সম্ভাবনার দিকটা তোমাকে বলি, বলে চলল লোরান। তুমি জান কিডন্যাপারদের টাকার দাবি মেটাবার জন্যে ধনী পরিবারগুলো ইনস্যুরেন্স করে?

মাথা ঝাঁকাল ভিটো।

এ-ধরনের পলিসি ইটালিয়ান বীমা কোম্পানিগুলো বিক্রি করতে পারে না, বলল লোরান। সরকার নিষেধ করে দিয়েছে। সরকারের ধারণা, সেটা ভুলও বলা। চলে না, এতে করে কিডন্যাপারদের উৎসাহ দেয়া হবে। কিন্তু বিদেশী বীমা। কোম্পানির ওপর কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। এ-ব্যাপারে লণ্ডনের লয়েডস সবচেয়ে ভাল ব্যবসা করছে। গত বছর তাদের প্রিমিয়াম আদায় হয়েছে একশো মিলিয়ন পাউণ্ড। ওদের নিজস্ব এজেন্ট আছে, বললে তারা এমনকি কিডন্যাপারদের সাথে। দর কষাকষির দায়িত্ব পর্যন্ত পালন করে। পলিসি কেনার দুটো শর্ত। প্রিমিয়াম। দিতে হবে ইটালির বাইরে। আর প্রকাশ করতে পারবে না যে তুমি বীমা করেছ। কারণটা পরিষ্কার।

একঘেয়ে লাগছে ভিটোর। জ্ঞান কিছুটা বাড়ল, সেজন্যে তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু এ-সবের সাথে আমার সমস্যার কি সম্পর্ক?.

হাতের সিগার ভিটোর দিকে তাক করল লোরান। তোমার ডকইয়ার্ডের সমস্ত মেশিনপত্র বীমা করা আছে?

অবশ্যই, কিন্তু বেনিফিশিয়ারি ব্যাংক।

বেশ, বলল লোরান। প্রিমিয়াম নিয়ে আলোচনার সময় রেট ঠিক করা হয়েছিল সিকিউরিটির জন্যে তুমি কি খরচ করছ তার ওপর নির্ভর করে, ঠিক?

মাথা ঝাঁকাল ভিটো।

নিয়মটা তাহলে তোমার জানা আছে, বলল লোরান। নিরাপত্তার জন্যে তুমি যদি সিকিউরিটি গার্ড, ট্রেনিং পাওয়া কুকুর ইত্যাদির ব্যবস্থা রাখতে চাও, প্রিমিয়াম অনেক কমে যাবে। কিডন্যাপ প্রিমিয়ামের ব্যাপারেও সেই একই নিয়ম। এখানে পলিসি যেহেতু অস্বাভাবিক মোটা অঙ্কের, তাই রেটের সামান্য হেরফের বিরাট সাশ্রয় এনে দিতে পারে।

ভিটোকে কথা বলতে দিল না লোরান, এখনও তার কথা শেষ হয়নি। সাধারণ একটা কেসের কথা ধর। একজন শিল্পপতি এক বিলিয়ন লিরা কিডন্যাপ ইনস্যুরেন্স করলেন। রেট হতে পারে শতকরা পাঁচ ভাগ, অর্থাৎ পঞ্চাশ মিলিয়ন। কিন্তু তিনি যদি একজন ফুলটাইম বডিগার্ড রাখেন তাহলে প্রিমিয়াম নেমে আসতে পারে শতকরা তিন ভাগে অর্থাৎ ত্রিশ মিলিয়ন লিরায়। এভাবে তিনি বিশ মিলিয়ন। বাঁচালেন।

কিন্তু এইমাত্র তুমি বললে একজন বডিগার্ডের বেতন বছরে ত্রিশ মিলিয়ন লিরা। তাহলে সাশ্রয় হল কোথায়?

লোরান হাসল। সে তো সেরা জাতের বডিগার্ডদের বেতন। প্রিমিয়াম। বডিগার্ড-ও পাওয়া যায়, তুমি জান না। প্রিমিয়াম বডিগার্ড কিডন্যাপিং হয়ত ঠেকাতে পারবে না, কিন্তু তাকে দেখিয়ে প্রিমিয়ামের রেট কমিয়ে আনা যাবে। ওরা কম বেতনে কাজ করে। বছরে সাত মিলিয়ন লিরার বেশি নয়।

কিন্তু লারান, বিটো বলল। আমার মেয়েকে কেউ কিডন্যাপ করতে যাচ্ছে না…কথাগুলো বলতে বলতে হঠাৎ করেই তাৎপর্যটা উপলব্ধি করল সে।

বন্ধুর চেহারা বদলে যেতে দেখে হেসে উঠল লোরান। এই তো বুঝেছ! সস্তায় একজন প্রিমিয়াম বডিগার্ড রাখ, দুএক মাস পর ফাঁকিবাজ বা অযোগ্য বলে। বিদায় করে দাও। ইতিমধ্যে লুবনার স্কুলে যাওয়া শুরু হবে, ভাবীরও মুখ রক্ষার ব্যবস্থা হবে।

চুপচাপ বসে কয়েক মিনিট চিন্তা কল ভিটো, তারপর জানতে চাইল, এ ১. ধরনের লোক কোথায় পাব আমি?

লোরানের কুতকুতে চোখে বিজয়ীর হাসি ঝিলিক দিয়ে উঠল। প্রথমে তুমি, দোস্ত, আমাদের লাঞ্চের বিলটা মিটিয়ে দাও। তারপর আমার অফিসে চল, একটা এজেন্সির ঠিকানা পেয়ে যাবে। খোদ মিলানেও ওদের অফিস আছে।

.

নেপলস কোস্ট রোড় ছেড়ে সরু মেঠো পথে নেমে এল রেমারিকের গাড়ি। মাউন্ট ভিসুভিয়াসের নিচের দিকের ঢালে জলপাই বাগান আছে, একেবেকে সেদিকে চলে গেছে পথটা। বাগানের ঠিক নিচেই পাথুরে পাহাড়ের ইতি, পথটা হারিয়ে গেছে সবুজ ঘাস মোড়া একটা ঢালে, ওখান থেকে নেপলস আর একঝলক আলোর মত সাগরের খানিকটা বিস্তৃতি দেখা যায়। গাড়ি থামিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করল রেমারিক, নিস্তব্ধতা জমাট বাধল। সময়টা শেষ বিকেল, রক্ত-লাল সূর্য দিগন্তরেখার দিকে নামছে।

মাকে আবার দেখতে গিয়েছিল রেমারিক। দুই ছেলের উপস্থিতি তাকে সুস্থ করে তুলেছে। দেড় দুমাসের জন্যে আর কোন চিন্তা নেই, এরমধ্যে লক্ষণগুলো ফিরে আসবে না। রানার কথা মার কাছে সম্পূর্ণ চেপে গেছে রেমারিক, শুনলেই দেখার জন্যে কেঁদেকেটে অস্থির হবে।

আড়ালে ডেকে নিয়ে ছোট ভাই রিসোকে রানার কথা বলেছে রেমারিক। শুনেই খুশিতে লাফিয়ে উঠেছিল রিসো। নেপলসে আসার জন্যে তখুনি সে রওনা। হতে চায়, রানার সাথে দেখা করবে। কিন্তু রেমারিক তাকে হতাশ করে। তিন দিন আগে পৌচেছে রানা, ছদ্মবেশ নিয়ে আছে ও, মনের অবস্থা ভাল না। ওর জন্যে একটা কাজ দরকার।

খানিক চিন্তা করে রিসো জানিয়েছে, কাজ একটা জুটিয়ে দেয়া যাবে। কিন্তু দরকারি কাগজপত্র আছে তো? না থাকলে একটু অসুবিধে হবে। রেমারিক তাকে বলেছে, হাসান নামে বাংলাদেশী এক মার্সেনারি ছিল, বহু দেশে যুদ্ধ করার। অভিজ্ঞতা ছিল তার, লোকটা দেশেই একটা অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়, কিন্তু সে খবর খুব কম লোকই জানে। এই হাসানের চেহারা আর কাগজপত্র নিয়ে এসেছে রানা।

শুনে অস্থায়ী একটা কাজের প্রস্তাব দিয়েছে রিসো। সেটা নিয়েই নির্জনে বসে চিন্তা-ভাবনা করতে চায় রেমারিক।

যেদিন পৌঁছুল তার পরদিন রাতেই রানার সাথে আলাপ হয়েছে রেমারিকের। আলাপ মানে ভাল লাগার অনুভূতি নিয়ে ঘন্টা কয়েক চুপচাপ বসে থাকা আর অনেকক্ষণ পর পর দুএকটা শব্দ উচ্চারণ করা। সব মিলিয়ে শুধু এটুকু জানতে পেরেছে রেমারিক, খুন করার জন্যে কয়েকটা দেশের ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে রানাকে। তার মধ্যে একটা আবার সুপার পাওয়ার। সাথে সাথে বুঝে নিয়েছে রেমারিক, রানা তার প্রেজো ফিসোয় অলস সময় কাটালে লোকের মনে সন্দেহ দেখা দেবে। তখনই সে সিদ্ধান্ত নেয়, ওর জন্যে একটা কাজের ব্যবস্থা করতে হবে।

রিসো কাজের যে প্রস্তাবটা দিয়েছে, রানার জন্যে সেটা হাস্যকর, রেমারিক জানে। রানার সম্পূর্ণ পরিচয় সে না জানলেও, ও যে একটা বিখ্যাত ইনভেস্টিগেটিং ফার্মের চীফ, এটুকু তার জানা আছে। এরচেয়ে কত ভাল চাকরি শয়ে শয়ে লোককে দিয়ে বেড়ায় রানা নিজেই, আজ কি এই রকম একটা চাকরি করতে চাইবে ও?

হয়ত চাইবে না, আর সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যেভাবে হোক রানাকে রাজি করাতে হবে। এই মুহূর্তে আর কিছু নয়, ওকে শুধু ওর নিরাপত্তার কথাটা ভাবতে হবে। আপনমনে হাসল রেমারিক, নিজের ওপর তার আস্থা আছে, রানাকে সে রাজি করাতে পারবে।

সিদ্ধান্ত নিতে পেরে মনটা খুশি হয়ে উঠবে, তা না, কেমন যেন বিষণা বোধ করল রেমারিক। গোধূলি লগ্ন, সাগর ছুঁই ছুঁই করছে লাল সূর্য, ঝটপট পাখা ঝাঁপটে বাগানে ফিরছে নিঃসঙ্গ পাখি, সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে সাদা ধবধবে একটা খরগোস ছুটে গেল, তার মনটাও সেই সাথে ফিরে গেল অতীতে।

রানা তাকে মাল্টায় না নিয়ে গেলে জেসমিনের সাথে তার দেখা হত না। পজিটানোয় দুহপ্তা মার কাছে কাটিয়ে রানার সাথে মাল্টায় চলে এল সে। ছুটিতে ছিল রানা, উদ্দেশ্য বেড়ানো, মাল্টা থেকে সহোদরা দ্বীপ গোজোয় চলে এল ওরা। জেলেপাড়ার ছোট্ট একটা হোটেলে ঠাই পাওয়া গেল। চমৎকার আবহাওয়া, আকাশে চাঁদ উঠলে খোলা মাঠে দল বেঁধে খিলখিল করে বেড়ায় কুমারী মেয়েরা, যুবকরা মদ খেয়ে গান জুড়ে দেয়। গেঁয়ো লোকগুলো সবাই দিনভর খাটে আর অর্ধেক রাত পর্যন্ত ফুর্তি করে। সহজ সরল শান্তির জীবন।

ওই হোটেলেরই রিসেপশনিস্ট ছিল জেসমিন। রেমারিক তাকে দেখেই পাগল। হয়ে গেল। এই মেয়েকে তার চাই-ই।

কিন্তু খোঁজ খবর নিতে গিয়ে ঘাবড়ে গেল রেমারিক। জানল, গ্রামে এমন কোন যুবক নেই যে বিয়ে করতে চায়নি জেসমিনকে, কিন্তু মেয়েটা সবাইকে হতাশ করেছে। মেয়েটা যে, অহঙ্কারী তাও নয়, বরং ঠিক উল্টো। গ্রামের সবার সাথে তার ভাব আছে, ছোটবড় সবাই তাকে একটু যেন সমীহ করেই চলে। নিয়মিত চার্চে যায় জেসমিন, আবার বান্ধবীদের সাথে নেচেও বেড়ায়। শুধু কোন যুবক বেশি মাখামাখি করার চেষ্টা করলে কৌশলে সরে যায়, কোনমতে ধরা দেয় না।

রানার কাছে ধরনা দিল রেমারিক। দোস্ত, তোমার সেই কৌশলটা আমাকে শিখিয়ে দাও।

কি কৌশল? রানা অবাক।

কি জাদু জান তুমি যে মেয়েরা তোমার পেছনে ছোটে?

কেন ছোটে সে আমি নিজেও জানি না। তোমার সমস্যাটা বল। জেসমিন?

মারা যাব, সত্যিই মারা যাব, কাতরাতে থাকে রেমারিক।

বুদ্ধি নেবার জন্যে তুমি ভুল লোককে ধরেছ, বলল রানা। ঠোঁটে মুচকি হাসি।কোথাও বেড়াতে যাবার প্রস্তাব দিয়ে দেখ কি হয় কাজ না হলে একটা। বুদ্ধি বাতলে দেব।

প্রস্তাব দিতেই একটু ইতস্তত করে রেমারিকের সাথে বেড়াতে যেতে রাজি হয়ে গেল জেসমিন। কিন্তু সেই সাথে সতর্ক করে দিয়ে বলল, এখনও আমি ভার্জিন, থাকতেও চাই। শুধু বেড়ানো ছাড়া আর কিছু আশা করলে হতাশ হবে। এমন সরাসরি কথা বলতে শুনে একটুও অবাক হয়নি রেমারিক, এই দ্বীপবাসীদের। সবারই এটা বৈশিষ্ট্য।

কিন্তু অস্বস্তিবোধ করেছিল রেমারিক। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে অল্প বয়সেই লায়েক হয়ে গিয়েছিল সে, আর পেশাটাও ছিল এমন যে হাত বাড়ালেই নারীদেহ পাওয়া যেত। সত্যিকার কুমারী কোন মেয়ে দেখেনি সে, এরকম কেউ থাকতে পারে বলে ধারণাও ছিল না তার।

গোজোয় আরও কটা দিন রানাকে থেকে যাবার জন্যে অনুরোধ করল। রেমারিক। মুচকি হেসে রাজি হল রানা, বলল, গাঁথা চাই কিন্তু।

তিন হপ্তা পর বিজয় সম্পূর্ণ হল রেমারিকের, কিন্তু যেভাবে কল্পনা করেছিল সেভাবে নয়। সেদিন বেশ রাত করে বেরিয়েছিল ওরা, রেমারিক আর জেসমিন, দুজনেরই ইচ্ছে রামলা বে-তে সাঁতার কাটবে। সাঁতার কাটার পর লালচে বালিতে বসে নিজের কথা বলতে শুরু করল জেসমিন। অতি সাধারণ এক মেয়ে সে, ওদের পরিবার বহু যুগ ধরে কৃষক। তারপর জেসমিন একসময় থেমেছে, বলতে শুরু করেছে রেমারিক। আপন খেয়ালে বয়ে গেছে সময়। পুবের চাঁদ ঢলে পড়েছে। পশ্চিমে। বেলাডোনার কথা শুনে কুঁপিয়ে উঠেছে জেসমিন, আবার যুদ্ধের বর্ণনা শুনতে শুনতে নিজের অজান্তেই শিউরে উঠেছে। আকাশ আর সাগরের মাঝখানে। সূর্য উঁকি দিচ্ছে, এই সময় থামল ওরা। রেমারিক তিরস্কার করল নিজেকে, রাত কাবার হয়ে গেল অথচ আসল কথাটা বলা হয়নি। জেসমিন বলল, তার বাড়ির সবাই খুব আঘাত পাবে। কোন মেয়ে সারারাত বাইরে কাটালে গোজোর লোকেরা সেটাকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখে।

কিন্তু আমরা তো অন্যায় কিছুই করিনি, বলল রেমারিক। দেখল, হঠাৎ কি এক প্রত্যাশায় ঝিক করে উঠল জেসমিনের চোখ। তার মনে প্রশ্ন জাগল, ব্যাপারটা আসলে কি, আমি ওকে নাকি ও আমাকে পটাচ্ছে?

সৈকতে প্রেম করল ওরা। ভোরের প্রথম আলোয় মুখ তুলে তাকিয়েছিল। জেসমিন, হেসেছিল–লাজুক কিন্তু গর্বমাখা হাসি।

হাত ধরাধরি করে পাহাড় টপকাল ওরা, নাদুর হয়ে চলে এল জেসমিনদের ক্ষেতে- জেসমিনের বাবা আলের উপর দাঁড়িয়ে ওদেরকে দেখল, এক চুল নড়ল না।

ও রেমারিক, বাবাকে বলল জেসমিন। আমরা বিয়ে করতে যাচ্ছি।

মাথা ঝাঁকিয়ে কাজে ফিরে গেল বাবা। মেয়েকে তার চেনা আছে। বাইরে একটা রাত কাটানো মানেই জামাই।

নাদুর-এ, সেন্ট পিটার আর সেন্ট পলে বিয়ে হল ওদের। বিয়ে পড়াল যুবা। বয়সের একজন প্রিস্ট। লোর্কটা যেমন লম্বা তেমনি শক্তিশালী, মেজাজও খুব তিরিক্ষি। কিন্তু নাদুরে লোকজন তাকে খুব পছন্দ করে। গোজোয় সবার একটা করে ডাক নাম আছে, গ্রামের লোকেরা তাকে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বলে ডাকে।

এই বিয়েতে রানার কি প্রতিক্রিয়া হবে ঠিক বুঝতে না পেরে উদ্বেগের মধ্যে। ছিল রেমারিক। এক সাথে অনেকগুলো দিন কাটিয়েছে ওরা, দুজনের বন্ধুত্বে এতদিন বাইরে থেকে কেউ ভাগ বসাতে আসেনি। কিন্তু রানা আসলে খুশিই হয়েছিল। মেয়েটা যে রেমারিককে ভালবাসে সেটা আগেই বুঝতে পারে ও। জেসমিনকে ওর পছন্দ হয়।

বরযাত্রীদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লোক ছিল রানা। চুপচাপ আর গম্ভীর, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মতই।. বিবাহ-উওর উৎসবে রেমারিকের অনুরোধে গোজোর কড়া মদেও ছোট্ট একটা চুমুক দিয়েছিল ও।

কেউ কিছু বলেনি, নিজের বুদ্ধিতেই ওদের বন্ধুত্বের গভীরতা উপলব্ধি করতে পারে জেসমিন। ব্যাপারটাকে সে সহজভাবে মেনে নেয়। যদিও রানাকে অনেক (রের মানুষ বলে মনে হল তার, ফলে স্নেহের চেয়ে শ্রদ্ধা আর সমীহের ভাবই বেশি করে জাগল মনে। সেই সাথে একটু গর্ব, কজনার স্বামী এমন বন্ধু পায়! নেপলসে ফেরার জন্যে রওনা হল ওরা, ওদেরকে এয়ারপোর্টে নিয়ে এল রানা। জেসমিন ওর দুহাত ধরল, ধরে রাখল অনেকক্ষণ, তারপর যখন ছেড়ে দিয়ে সরে যাচ্ছে রানা তার চোখে পানি দেখল।

আমাদের ভুলে যাবেন না, অস্ফুটে বলেছিল জেসমিন। আমরা আপনার জন্যে একটা ঘর খালি রাখব।

মাথা ঝাঁকাল রানা, চেহারা স্থির আর থমথমে, বলল, রাতে ওর যদি নাক ডাকে, শিস দিয়া, থেমে যাবে।

বছরে ছমাসে নেপলসে ওদের কাছে এসেছে রানা। চিঠিও দিত না, ফোনও করত না, উদয় হত হঠাৎ করে। প্রতিবারই জেসমিনের জন্যে কিছু না কিছু একটা নিয়ে আসত। একবার এক জোড়া জামদানী নিয়ে এল, আরেকবার ইন্দোনেশিয়া। থেকে আনল বাটিক পেইন্টিং। বোঝাই যায়, তাড়াহুড়ো করে কেনা নয়, নির্বাচনে সময় ব্যয় করা হয়েছে, যে দেবে আর যাকে দেবে দুজনের রুচি বিবেচনার মধ্যে রাখা হয়েছে। জিনিসগুলোর মূল্য আর সৌন্দর্য যতটুকু আনন্দ দিয়েছে, এটা বুঝতে পেরে তার চেয়ে অনেক বেশি আনন্দ পেয়েছে জেসমিন।

দুই কি তিন দিনের বেশি কখনও থাকত না রানা। আগে থেকে কিছুই বলত না, হঠাৎ রাতে খেতে বসে জানিয়ে দিত, কাল আমি চলে যাচ্ছি। তবে শেষবার প্রায় বিশ দিনের মত ছিল রানা।

ডিনার সেরে শেষ খদ্দেরটা চলে যাবার পর বড় কিচেন টেবিলে বসত ওরা। টেলিভিশন দেখত, বই পড়ত কিংবা টুকটাক কথা বলত। ওদের দুজনের কথা। শুনে হাসত জেসমিন, কেউই পুরো একটা বাক্য উচ্চারণ করত না। রেমারিক হয়ত পুরানো কোন বন্ধুর কথা জানতে চাইল।

শফিক?

কাতাঙ্গা।

প্রেমরোগ?

তুঙ্গে।

কিন্তু এখনও শক্ত?

একটা রড।

স্টেনগানটা?

রডে গাঁথা।

ওদের বেশিরভাগ কথাই বুঝত না জেসমিন, বিশেষ করে ওরা যখন অস্ত্র আর গোলা-বারুদ নিয়ে আলাপ করত। প্রথম দুবার রানা ঘুরে যাবার পর দিন কয়েক অস্থিরতায় ভুগেছে রেমারিক, কিন্তু জেসমিন কিছু বলেনি। পরে ব্যাপারটা ঠিক হয়ে যায়।

তারপর একদিন স্থানীয় ফুটবল টিম শেষ খেলায় জিতে চ্যাম্পিয়ন হল, সমর্থক আর ভক্তরা খেলোয়াড়দের নিয়ে শহরে বিজয় মিছিল বের করল। পনেরো বিশটা ট্রাক, মাইকে গান বাজছে, হনগুলো মুহূর্তের জন্যেও থামছে না, ছেলেদের হাতে পতাকা আর মুখে মদের গন্ধ। সামনের ট্রাকটা চালাচ্ছিল সতেরো বছরের এক ছেলে, তার বড় ভাই দলের সেন্টার ফরওয়ার্ড, তার গোলেই টিম জিতেছে। ছেলেটার এক হাতে স্টিয়ারিং আরেক হাতে মদের বোতল। হঠাৎ করেই গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল সে। একটা দেয়ালের সাথে পিষে দিল জেসমিনকে। মার্কেটিং করতে বেরিয়ে তার আর ফেরা হল না।

রানা পৌঁছুল এক হপ্তা পর, অনেক দূর থেকে এসে ক্লান্ত। কিভাবে জানল রানা, কথাটা জিজ্ঞেস করতে ভুলে গিয়েছিল রেমারিক।

সূর্য অস্ত গেছে, কিন্তু আলো এখনও ফুরোয়নি। স্টার্ট দিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিল রেমারিক। আজই সে কথা বলবে রানার সাথে।

.

হাসানের চরিত্র অনুকরণ করতে গিয়ে মদ ধরতে হয়েছে রানাকে, পরতে হয়েছে গাম্ভীর্যের মুখোশ। মাঝেমধ্যে সিগারেটও খাচ্ছে ও। কিন্তু এ-সবই যে ছদ্মবেশের কারণে তা নয়, ওর মনও ভাল নেই।

রাশিয়া থেকে এয়ারকিং (মিগ-৩১) হাইজ্যাক করে ঢাকায় পৌঁছায় ও, কিন্তু এয়ারপোর্ট থেকেই নিরুদ্দেশের পথে বেরিয়ে পড়তে হয় ওকে। এয়ারকিং চুরি করার প্ল্যানটা ছিল জিওনিস্ট ইন্টেলিজেন্স আর সি. আই. এ.-র, তাদের মুখের গ্রাস কেড়ে আনে ও। আক্ষরিক অর্থেই পাগলা কুকুর হয়ে গিয়েছিল সি. আই. এ., দেখামাত্র রানাকে খুন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল এজেন্টদের। গা ঢাকা না দিয়ে উপায় ছিল না ওর।

অ্যামফিবিয়ান প্লেন নিয়ে ঢাকা ছাড়ে রানা, মাঝ সাগরে বাংলাদেশী একটা জাহাজ থেকে ফুয়েল নিয়ে পৌঁছে যায় শ্রীলংকার উপকূলে। রাতের অন্ধকারে প্লেন ফেলে সৈকতে উঠে আসে, শহরে ঢুকে মিশে যায় জনারণ্যে। প্লেনে প্রচুর কাগজপত্র আর সরঞ্জাম ছিল, চেহারা আর পরিচয় বদল করতে কোন অসুবিধে হয়নি। শ্রীলংকা থেকে লেবানন, লেবানন থেকে সুইটজারল্যাণ্ড।

তিন মাস পর পরিস্থিতি জানার জন্যে জেনেভায় একজন বি. সি. আই. এজেন্টের সাথে গোপনে দেখা করেছিল রানা। হেডকোয়ার্টার থেকে ওর জন্যে নতুন নির্দেশ ছিল, আরও দুমাস গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে ওকে। আরও জানতে পারল ও, একজন রুশ বৈমানিক মিগ-৩১ ফিরিয়ে নিয়ে গেছে রাশিয়ায়। ঢাকার সাথে এখন মস্কোর সম্পর্ক যে-কোন সময়ের চেয়ে ভাল।

দুমাস পর আবার বি. সি. আই.-র সাথে যোগাযোগ করে নতুন নির্দেশ পেয়ে হতাশায় মুষড়ে পড়ে ও। সি. আই. এ. এখনও পাগলা কুকুর হয়ে আছে, আত্মপ্রকাশ করা রানার জন্যে নিরাপদ নয়, অনির্দিষ্ট কালের জন্যে লুকিয়ে থাকতে হবে ওকে।

পরিচিত একটা ক্লিনিকে ভর্তি হয়ে নিজের চেহারা সামান্য বদলে নিল রানা, মুখের কাটা দুটো দাগ তারই ফলশ্রুতি। এরপর ও ফ্রান্স হয়ে সিসিলিতে চলে আসে।

স্বাধীনচেতা পুরুষ, কখনও কারও কাছে মাথা নত করেনি। পালিয়ে বেড়ানো ওর স্বভাব নয়। সঙ্কট যত বড়ই হোক, বুকে সাহস নিয়ে বিপদের সামনে। দাঁড়িয়েছে চিরকাল। তাকেই এখন চোরের মত এখানে সেখানে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। মন সায় দেয় না, সমগ্র অস্তিত্ব বিদ্রোহ করতে চায়।

কিছু বন্ধু থাকে; যারা একসাথে হেঁটে কবর পর্যন্ত যেতেও দ্বিধা করে না। রেমারিক তাদের একজন। রেমারিককে ও ভালবাসে, আর সেজন্যেই নিজের বিপদের মধ্যে তাকে টেনে আনতে চায় না। মনে মনে ঠিক করা আছে, এখানেও বেশিদিন ওর থাকা চলবে না। কিন্তু এরপর কোথায় যাবে জানা নেই।

এই অবস্থায় কার মনই বা ভাল থাকে। মদের বোতলটা টেনে নিল রানা। জানে, মদ খেয়ে শরীরের বারোটা বাজাচ্ছে, কিন্তু নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই ওর, কি করবে!

.

বডিগার্ডের চাকরি, বলল রেমারিক।

শূন্যদৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল রানা।

কিচেনে বসে আছে ওরা। রিসোর প্রস্তাবটা তুলল রেমারিক। তার ভাই রিসো। উন্নতি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে অ্যাকাউনট্যান্ট হিসেবে মিলানের একটা অডিট ফার্মে জয়েন করে সে। ওর মেধা আর যোগ্যতা দেখে মালিক তাকে ফার্মের পার্টনার করে নেয়। রিসো রেমারিককে জানিয়েছে, এই সিকিউরিটি এজেন্সি ওদেরই ফার্মের ক্লায়েন্ট। এজেন্সির কাজ শিল্পপতিদের বডিগার্ড যোগান দেয়া। বডিগার্ডের চাহিদা খুব বেশি, কিন্তু ট্রেনিং পাওয়া লোক আজকাল পাওয়াই মুশকিল। রেমারিক দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিল। শরীরের বারোটা বাজিয়েছে রানা, তাছাড়া ও এখন একটা মাতাল। যারা বডিগার্ড খুঁজছে তারা ওকে পছন্দই করবে। না। এরপর রিসো তাকে প্রিমিয়াম বডিগার্ড-এর ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করে বলে। আগ্রহী হয়ে ওঠে রেমারিক। বেতন খুবই কম, তাতে কিছু আসে যায় না, ছদ্মবেশের সাথে যাতে মানিয়ে যায় এমন একটা কাজ দরকার, টাকার কোন অভাব নেই রানার। অভাব যদি দেখা দেয়, তার সমস্ত সঞ্চয় রানার হাতে তুলে। দেবে রেমারিক।

কি? জিজ্ঞেস করল রেমারিক।

পাগল, জবাব দিল রানা। আমার যা অবস্থা, তাতে একটা লাশকেও পাহারা দিতে পারব না।

প্রিমিয়াম বডিগার্ডের কথা ব্যাখ্যা করল রেমারিক। কিন্তু রানা মাথা নাড়ল।

একটা মাতালকে কেউ রাখবে কেন?

কাধ ঝাঁকাল রেমারিক। প্রিমিয়াম রেট কমাবার জন্যে স্রেফ একটা দুপেয়ে দরকার ওদের, সে মাতাল কি উন্মাদ তা ওরা দেখতে চাইবে না। যাকে তুমি পাহারা দেবে তার কিডন্যাপ হবার কোনই সম্ভাবনা নেই।

একটা নিঃশ্বাস ফেলল রানা।

তোমাকে অবশ্য মদ আরও কম খেতে হবে। রাতে খাও। এখানে তো তাই খাচ্ছ, কই, দিনের বেলা তো তোমাকে দেখে কিছু মনে হয় না।

বলছ সম্ভাবনা নেই, তবু যদি কেউ কিডন্যাপ করতে চেষ্টা করে?

সাধ্যমত ঠেকাবার চেষ্টা করবে। যা বেতন, তুমি জাদু দেখাবে এটা কেউ আশা করবে না।

চিন্তা করল রানা। বিপদ একটা ঘটার আগেই রেমারিকের কাছ থেকে সরে যাওয়ার এটা হয়ত একটা সুযোগ। তাছাড়া, একটা কাজের মধ্যে থাকলে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণও খানিকটা ফিরে আসতে পারে। তবু দ্বিধা যায় না। বলল, বডিগার্ড মানে সব সময় একজনের কাছে থাকা। আমার যা মনের অবস্থা, আমি কাউকে সহ্য করতে পারব বলে মনে হয় না।

মুচকি হাসল রেমারিক। ঠিক আছে, তুমি নাহয় বোবা বডিগার্ড হবে। ওরা হয়ত এটা তোমার একটা বাড়তি গুণ বলে ধরে নেবে।

আরও অনেক সমস্যার কথা ভাবল রানা, কিন্তু নরম ভঙ্গিতে একটু একটু করে চাপ বাড়াতে থাকল রেমারিক। রিসো খুব করে ধরেছে, রানা যেন মিলানে তার বাড়িতে দিন কয়েক কাটিয়ে আসে। যাও না, দুটো দিন থেকে এস ওর কাছে। মন ভাল লাগবে।

খানিক ইতস্তত করে রাজি হয়ে গেল রানা। আর কোন ধরনের কাজ পাওয়া। যায় কিনা রিসোর সাথে আলাপ করা যাবে। এরপর শুতে গেল ও, যাবার আগে। বলল, শেষ পর্যন্ত বডিগার্ড!

কিচেন থেকে রানা বেরিয়ে যেতেই কলম বের করে কাগজের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে রিসোকে চিঠি লিখতে বসল রেমারিক। সে জানে, এজেন্সি থেকে প্রার্থীর। যোগ্যতা জানতে চাওয়া হবে, কিন্তু রানাকে লিখতে বলা হলে বিস্তারিত কিছুই লিখবে না। হাসানের পরিচয়পত্র, সার্টিফিকেট ইত্যাদি আগেই মুখস্থ করে রেখেছে রেমারিক। কোথায় কটা পদক পেয়েছে হাসান, তাও লিখতে ভুলল না সে।

চিঠিটা এনভেলাপে ভরে টেবিলেই রাখল রেমারিক, একটা নোট লিখে ফুরেলাকে নির্দেশ দিল, কাল সকালেই যেন ডাকবাক্সে ফেলা হয় চিঠি। রানা আসার পর আজ এই প্রথম মনে খানিকটা স্বস্তি নিয়ে ঘুমাতে গেল রেমারিক।

.

০৫.
লোরান যেমন আশা দিয়েছিল, বডিগার্ড পাওয়া ভিটোর জন্যে তেমন সহজ হয়নি। লরার পছন্দ হবে এই রকম একজনকে বেছে বের করতে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়েছে তার।

বডিগার্ডের ব্যবস্থা হবে, এই কথা শোনার সাথে সাথে হৈ-চৈ পড়ে গিয়েছিল বাড়িতে, বডিগার্ড যেন নতুন একটা গাড়ি বা এক সেট অলঙ্কার। তখুনি প্ল্যান প্রোগ্রাম করতে বসে যায় লরা। অনেক তর্কাতর্কির পর তার সিদ্ধান্তই বহাল থাকল, বডিগার্ড বাড়ির ওপরতলায় বড় একটা কামরায় থাকবে। লরা আর লুবনা। নিজেরাই ধরাধরি করে কিছু অতিরিক্ত ফার্নিচার নিয়ে গেল সেই ঘরে। দুজনেরই কনুই আর আঙুল ছড়ে গেল। মেহগনি কাঠের বিশাল একটা খাট আগে থেকেই। ছিল ওখানে, এবার জায়গা পেল বড় একটা ইজি চেয়ার, ছোট একটা টেবিল, একটা চেস্ট অভ ড্রয়ার, একটা ওঅরড্রোব। ঠিক হল বডিগার্ড আথিয়া আর লার্দোর সাথে কিচেনে বসে খাবে।

বডিগার্ডের কি কি কাজ হবে তারও একটা তালিকা তৈরি করে ফেলল লরা। লুবনাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া আর বিকেলবেলা ফিরিয়ে নিয়ে আসা, এটাই তার সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ কাজ। এই দুটো কাজের মাঝখানে লরাকে সে মার্কেটে বা লাঞ্চ খেতে নিয়ে যাবে।

লোকটাকে কেমন হতে হবে তারও একটা রূপরেখা তৈরি করে দিল লরা। লোকজনের সামনে তাকে যেন বের করা যায়। আদবকায়দা জানতে হবে তার, হতে হবে দ্র আর বিনয়ী। আর একেবারে গুণ্ডা-পাণ্ডা মার্কা চেহারা হলে চলবে না। আদেশ নয়, স্বামীর হাত ধরে অনুনয়-বিনয় করে বলল সে, একটু যেন। তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা করা হয়। লুবনার নতুন স্কুল টার্ম শুরু হতে যাচ্ছে, তাছাড়া, ভিটোর সাথে এবার সে-ও প্যারিসে যেতে চায়।

এসবই সমস্যা হয়ে দেখা দিল। প্রথম দুজন প্রার্থীকে দেখামাত্র বিদায় করে। দিল ভিটো। দুজনেই রাস্তা থেকে উঠে আসা গুপ্তা, লরা ওদেরকে দরজা দিয়ে ঢুকতেই দেবে না। তৃতীয় লোকটা বুড়ো, চার নাম্বার প্রার্থীর বা চোখ নেই। এজেন্সি অফিসে ফোন করে ভিটো অভিযোগ করল, বেছে বেছে শুধু আজেবাজে লোককে পাঠাবার মানে কি। জবাব এল, বডিগার্ডের এখন খুব অভাব, তাছাড়া, এই বেতনে এর চেয়ে ভাল কোন লোক কাজটা নিতে চাইছে না।

পরদিন এজেন্সি থেকে একটা ফোন পেল ভিটো। আরও একটা লোককে পাঠাচ্ছে ওরা। সে একজন বাংলাদেশী।

তেমন উৎসাহ বোধ করেনি ভিটো। বাড়িতে একজন বিদেশী লোক থাকবে, এর জন্যে সে মানসিকভাবে তৈরি ছিল না। মনে মনে লোকটার একটা ছবি আঁকল সে। কালো মোষের মত চেহারা, চোখ দুটো টকটকে লাল, সারাক্ষণ চুইংগাম চিবাচ্ছে।

তাই লোকটাকে যখন তার অফিসে হাজির করা হল, একাধারে খুশি আর বিস্মিত হল ভিটো। নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোক, মুখে থমথমে গাম্ভীর্য, কিন্তু চোখ দুটোয় মায়া আছে। সবচেয়ে ভাল লাগল লোকটার রুচি। পরনে ঘন নীল সুট, পপলিনের সাদা শার্ট। হাতে একটা বড় এনভেলাপ নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে ভিটোর দিকে তাকিয়ে আছে।

মাথা ঝাঁকিয়ে কাছে ডাকল ভিটো, এগিয়ে এসে একটা চেয়ার টেনে ডেস্কের সামনে বসল রানা। তারপর এনভেলাপটা বাড়িয়ে দিল। এজেন্সি থেকে আপনাকে এটা পাঠিয়েছে।

খুশির মাত্রা আরও একটু বাড়ল ভিটোর। লোকটা বিশুদ্ধ ইটালীয়ান বলে। এনভেলাপটা নিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, কফি? এর আগে যারা এসেছে তাদের সে। কফি খেতে বলেনি।

মাথা নাড়ল রানা।

সীল ভেঙে এনভেলাপ খুলল ভিটো। ভেতরে অনেকগুলো কাগজ। পড়তে শুরু করল সে। ইমরুল হাসানের কোয়ালিফিকেশন আর ইতিহাস। রেমারিকের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যগুলো সাজিয়ে লিখে পাঠিয়েছে এজেন্সি।

পড়া শেষ করে মুখ তুলল ভিটো। রানার দিকে একদৃষ্টে অনেকক্ষণ তাকিয়ে। থাকল সে। রানাও তাকিয়ে আছে, চোখে কোন ভাষা নেই।

অসুবিধেটা কি? জানতে চাইল ভিটো। অসুবিধে যে একটা কিছু আছে, এ ব্যাপারে তার কোন সন্দেহ নেই। ওর যা কোয়ালিফিকেশন, ওকে একটা দুর্গ পাহারা দেয়ার দায়িত্ব দিয়েও নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। অথচ সামান্য বেতনে একটা মেয়েকে পাহারা দেয়ার কাজ করতে চাইছে।

আমি মদ খাই, সোজা-সাপ্টা স্বীকার করল রানা।

ব্যাপারটা হজম করতে একটু সময় নিল ভিটো। আবার সে কাগজগুলোর ওপর চোখ বুলাল। খারাপ দিকটা কি?

চোখ কুঁচকে চিন্তা করল রানা, ভিটো অনুভব করল খাঁটি সত্যি কথাই শুনতে পাবে সে।

হয়ত আমার রিয়্যাকশন টাইম ঠিক থাকবে না। ঝট করে গুলি করতে হতে পারে, আমি হয়ত একটু দেরি করে ফেলব। দূর থেকে মাথায় গুলি করলাম, কিন্তু লাগল হয়ত বুকে। আপনার জায়গায় আমি হলে, আর আমি যদি জানতাম আমার পরিবারের ওপর হামলা হতে পারে, এই রকম একটা লোককে চাকরি দিতাম না।

ভিটো জানতে চাইল, মদ খেয়ে-মানে, লোক হাসান?

মাথা নাড়ল রানা। টেরও পাবেন না। আমি শুধু রাতে খাই। সকালে আমার খারাপ লাগতে পারে, কিন্তু দেখে কিছু বোঝা যাবে না।

আরেকবার কাগজগুলোর ওপর চোখ বুলাল ভিটো। লরা যদি মদ খাওয়ার। কথাটা না জানে, আর তো কোন সমস্যা নেই। বেতন কিন্তু খুব কম।

কাঁধ ঝাঁকাল রানা। আপনার মেয়েকে যদি টপ প্রফেশন্যালরা কিডন্যাপ করার চেষ্টা করে, বেতনের চেয়ে কম সার্ভিস পাবেন না।

কিন্তু যদি অ্যামেচাররা চেষ্টা করে?

ওরা যদি সত্যি অ্যামেচার হয়, স্রেফ ভয় দেখিয়েই ভাগিয়ে দিতে পারব, কিংবা হয়ত খুন হয়ে যাবে। সেরকম কোন ভয় আদৌ আছে নাকি?

মাথা নাড়ল ভিটো। বোধহয় নেই। আসলে, ভয়টা আমার স্ত্রীর। ইদানীং অনেকগুলো ছেলেমেয়ে কিডন্যাপ হল তো, আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। ভাল কথা, ওকে এখানে-সেখানে আনা-নেয়া করাও আপনার ডিউটির মধ্যে পড়বে। ওর নিজের গাড়ি আছে। কাগজগুলোর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে ভাবল সে, ভাড়াটে যোদ্ধা ছিল এই লোক, কয়শো লোককে খুন করেছে কে জানে! আরেকটা কথা, আপনাকে কিন্তু একটু ঘরমুখো হতে হবে। ইঙ্গিতে কাগজগুলো দেখাল সে। এখানে দেখছি আপনি শুধু বাইরে বাইরে ছুটে বেড়িয়েছেন।

ওটা কোন সমস্যা হবে না, বলল রানা। তবে, আমি ঠিক সামাজিক নই। কাজটা করব, যতটা ভালভাবে পারি, তার বেশি আমার কাছ থেকে কিছু আশা করবেন না।

বেশ, বলল ভিটো। তাড়াতাড়ি জয়েন করতে পারবেন তো?হঠাৎ একটা চিন্তা এল। আপনার আর্মস আছে?

মাথা ঝাঁকাল রানা। এজেন্সি থেকে দেবে। ওদেরকে আপনার একটা চিঠি দিতে হবে। পুলিস পারমিটের ব্যবস্থা করবে ওরা। এর জন্যে বিল করবে এজেন্সি, আপনি দেবেন। উঠে দাঁড়াল ও। যে-কোন সময় জয়েন করতে পারি আমি।

রানার সাথে ভিটোও দরজা পর্যন্ত এল। হপ্তার ছুটিতে কাল আমি কোমোয় যাব। জিনিসপত্র নিয়ে দয়া করে কাল ছটায় চলে আসুন এখানে। ভাল কথা, আপনার মদ খাওয়ার কথা কারও জানার দরকার নেই, আমার স্ত্রীরও না।

রানার সাথে করমর্দন করল ভিটো।

ধন্যবাদ।

ভিটো বলল, চাকরির মেয়াদ সম্পর্কে আমি কিছু বলতে পারছি না। পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। তবে এজেন্সির সাথে আমার তিন মাসের কথা, ১ হয়েছে, এই তিনমাসকে ট্রায়াল পিরিয়ড হিসেবে ধরা হবে। তারপর আমরা দুজনেই নতুন করে চিন্তা করব। এমনও তো হতে পারে, চাকরিটা হয়ত আপনার ভাল লাগল না।

লাউঞ্জে রয়েছে লরা, ফ্রেঞ্চ উইণ্ডোর সামনে। সাদামাঠা একটা কালো ড্রেস পরে আছে সে, মুখ কালো চুলের ফ্রেমে বাধানো সাদা একটা চাঁদের আকৃতি। ভেতরে ঢুকল ওরা, ভিটোর পাশে দাঁড়াল রানা। ভিটোর চেয়ে অনেক লম্বা ও।

ধীরে ধীরে ফিরল লরা, স্বামীর দিকে এক সেকেণ্ডের জন্যে তাকাল, তারপর রানার ওপর আটকে গেল দৃষ্টি। রানাকে আপাদ মস্তক দেখছে সে, ভিটো পরিচয় করিয়ে দিল। লরার মনের ভাব চেহারায় ফুটল না, মৃদু গলায় সে জিজ্ঞেস করল,

আপনাকে ড্রিঙ্ক দেব?

ধন্যবাদ–স্কচ, সামান্য পানি।

বারের দিকে এগোল লরা, ওরা দুজন ফ্রেঞ্চ উইণ্ডোর সামনে এসে দাঁড়াল। লেকের দিকে তাকিয়ে রানা ভাবল, লোকটা ঠিক সহজ হতে পারছে না, কারণটা কি? ওর জন্যে স্কচ আর স্বামীর জন্যে মার্টিনি নিয়ে ফিরে এল লরা।

নামটা ভাল করে শুনতে পাইনি।

হাসান।

আপনি ইটালিয়ান নন, বলল লরা। কোন্ দেশের লোক, বুঝতে পারছি না।

বাংলাদেশী।

ভুরু একটু কুঁচকে উঠল লরার, স্বামীর দিকে একবার তাকাল।

কিন্তু উনি খুব ভাল ইটালিয়ান বলতে পারেন, তাড়াতাড়ি বলল ভিটো।

তথ্যটা লরাকে স্পর্শ করল বলে মনে হল না। আগে কখনও এই কাজ করেছেন?

না।

লরার কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠছে দেখে হড়বড় করে ভিটো বলল, উনি একজন যোদ্ধা ছিলেন। এত জায়গায় যুদ্ধ করেছেন, তুমি অবাক হয়ে যাবে।

লোকটাকে রানার আত্মবিশ্বাসী আর নিজের ব্যাপারে নিঃসংশয় বলেই মনে হয়েছিল, কিন্তু এখন তাকে বেশ খানিকটা অসহায় দেখাল। পরাজয়টা হয়ত স্ত্রীর রূপের কাছে, নাকি ব্যক্তিত্বের কাছে?

খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে রানাকে লক্ষ করছে লরা। কাপড়ের কাটছাট বা রঙ চিৎকার। করে কিছু বলছে না, এটা তার ভাল লাগল। গ্লাস ধরা হাতের উল্টোপিঠে একটা। কাটা দাগ। মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝল, অনেক লম্বা। কিন্তু বয়সটা আন্দাজ করতে গিয়ে হোঁচট খেল সে। পয়তাল্লিশ, নাকি আরও বেশি? চোখের পাতা জোড়া ভারি, চোখ দুটো সুন্দর, কিন্তু অদ্ভুত একটা ঠাণ্ডা দৃষ্টি ফুটে আছে, সাপের মত। গা শির শির করে উঠল তার। লোকটা একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলে যে-কেউ ভয় পাবে।

এখানেই একটা ধাক্কা খেল লরা। পুরুষমানুষ দেখে ভয় পাবার মেয়ে নয় সে। দেখামাত্র এই প্রথম কোন পুরুষ ওকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে।

নিস্তব্ধতা ভাঙল ভিটো। লুবনা কোথায়, ডারলিং?

বাস্তবে ফিরে এল লরা। ওপরে। এখুনি নামবে ও।

ভিটো লক্ষ করল, লরার ইতস্তত ভাবটা আর নেই, কিন্তু তার জায়গায় বিমূঢ় একটা ভাব দেখা যাচ্ছে।

ক্ষীণ একটু হাসল লরা, রানাকে বলল, আমার মেয়ে খুব উত্তেজিত হয়ে আছে। বডিগার্ড ওর কাছে একটা খেলনার মত।

আমিই প্রথম? জিজ্ঞেস করল রানা।

হ্যাঁ। আপনি সুন্দর ইটালিয়ান বলেন–নিয়াপলিটানদের মত।

ওদের একজনের কাছ থেকেই শিখেছি।

ওখানে আপনি ছিলেন?

না, আসা-যাওয়া ছিল।

দরজা খোলার আওয়াজ পেয়ে ঘুরল রানা।

মেয়েটা সাদা টি-শার্ট আর জিনস পরে আছে। দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে রানাকে দেখছে সে।

ওর মা বলল, লুবনা, ইনি মি ইমরুল হাসান।

ধীর পায়ে হেঁটে এল সে, কেতাদুরস্ত ভঙ্গিতে বাড়িয়ে দিল হাতটা। তাকে। ছোট মনে করে কেউ যেন হালকা চোখে না দেখে, ভাবটা এই রকম। মেয়েটা রানার বুক পর্যন্ত লম্বা। ছোট্ট হাতটা ওর হাতের ভেতর হারিয়ে গেল, সেটা ধরে। নাড়ার সময় তার চোখে খুশির ঝিলিক আর চাপা উত্তেজনা দেখল রানা।

মি. হাসানকে তার কামরাটা দেখিয়ে দেবে? লরা বলল।

গ্লাসটা খালি করল রানা, ভক্তি মেশানো গাম্ভীর্যের সাথে ওকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল লুবনা।

.

দরজা বন্ধ হবার সাথে সাথে বিস্ফোরণের অপেক্ষায় কান পাতল ভিটো। কিন্তু টু শব্দটিও না করে নিজের গ্লাসে চুমুক দিল লরা।

লোকটা কিন্তু খুব অভিজ্ঞ,বলল ভিটো।

লরা নিরুত্তর।

বিদেশী, এই যা, আবার বলল ভিটো। কিন্তু ভাল ইটালিয়ান বলে, আমাদের কোন অসুবিধে হবে না।

ইটালিতে আগে কখনও কাজ করেছে?লরা জানতে চাইল।

না

ব্রিফকেস খুলে এজেন্সির দেয়া রিপোর্টটা স্ত্রীকে দিল ভিটো। ওর ব্যাকগ্রাউণ্ড।

সোফায় বসে কাগজগুলো দেখল লরা। বারের সামনে গিয়ে দাঁড়াল ভিটো, আরেকটা মার্টিনি বানাল। পড়া শেষ করে কাগজগুলো কফি টেবিলে রাখল লরা। লোকটা আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে।

ঝট করে স্ত্রীর দিকে ফিরল ভিটো। কি বললে?

মৃদু হাসল লরা। বিদেশী হওয়াতে বরং সুবিধে হয়েছে, আমাদের বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্র করার স্বপ্ন দেখবে না। অত সাহসই হবে না ওর।

কিন্তু তোমার ভয় লাগছে কেন?

কি যেন চিন্তা করল লরা। কি জানি। কাগজগুলোর দিকে তাকাল সে। উত্তরটা হয়ত এগুলোর মধ্যে আছে। আসলে, তুমি একটা খুনেকে বাড়িতে নিয়ে এসেছ। কত লোককে খুন করেছে ও…

প্রতিবাদ করে কিছু বলতে গেল ভিটো, কিন্তু আবার মৃদু হাসি দেখা গেল লরার ঠোঁটে।

তবে দেখতে শুনতে ভাল…সুপুরুষ, তাই না? লোকের সামনে বের করতে লজ্জায় পড়তে হবে না।

ভিটো স্বস্তিবোধ করলেও তাকে বিমূঢ় দেখাল। বোঝা যাচ্ছে, হাসানকে বাতিল করা হয়নি।

উঠে দাঁড়িয়ে স্বামীর গালে চুমো খেল লরা। ধন্যবাদ, ডারলিং, এখন আমি খুশি।

.

ডিনারের পর পিস্তলটা পরিষ্কার করতে বসল রানা। দীর্ঘদিনের অভ্যেস, আপনা থেকেই হাত চলছে, মনে সন্ধেবেলার ঘটনা আর লোকজন।

ভিটো আভান্তি অন্যমনস্ক ছিল, তাতে কোন সন্দেহ নেই। হয়ত ব্যবসা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে।

লরার কথা ভাবল রানা। ভাবাবেগকে প্রশ্রয় না দিয়ে ওর ওপর লরার প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করল। মেয়েদের মধ্যে যা যা দেখলে ও খুশি হয় তার অনেকগুলোই লরার মধ্যে রয়েছে। সাদামাঠা সাজ, বাড়াবাড়ি নেই; নাক, চোখ, ভুরু, কপাল, ঠোঁট সব একই কারিগরের হাতে গড়া–ফলে একটার সাথে আরেকটার সামঞ্জস্য আছে; মেকআপের ব্যবহার নেই বললেই চলে। তার চুল স্বাভাবিক ভাবে ঝুলে আছে, হাতের নখ লম্বা, রঙ করা নয়। তার কোন সাহায্যের দরকার হয় না, এমনকি পারফিউমও লাগে না। স্বয়ংসম্পূর্ণ এক নারী। আর তার ব্যক্তিত্ব, আলাদা কিছু নয়, রূপেরই একটা প্রসারিত শাখা মাত্র।

এই জাতের মেয়েরা সাধারণত পুরুষদের নিয়ে খেলতে ভালবাসে, ভেড়া বানিয়ে মজা পায়। নিজেকে সাবধান করে দিল ও, বুঝে শুনে পা ফেল চাঁদ!

পিস্তলটা পরিষ্কার করার পর ট্রিগার মেকানিজম আর ম্যাগাজিন রিলিজ ক্যাচে তেল দিল রানা। আথিয়া আর লার্দোর কথা ভাবল ও। বিশাল কিচেনে বসে ডিনার খাওয়ার সময় তেমন কথাবার্তা বলেনি ওরা, রানাও কোন রকম উৎসাহ দেয়নি। ও যে একটু দূরে দূরে থাকতে পছন্দ করবে সেটা বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে, ওর। উপস্থিতিতে ওরা অভ্যস্ত হয়ে উঠলে আবার নিজেদের আগের আলাপের ঢং ফিরে আসবে।

পঁচিশ কি ছাব্বিশ বছর বয়স হবে আথিয়ার, সদা হাস্যময়ী, দশজনের খাটুনি একাই খাটতে পারে। রানার ব্যাপারে তার কৌতূহল পরিষ্কার বোঝা যায়। লার্দোর। বয়স সত্তর তো হবেই, আশিও হতে পারে। ভিটোর বাপের মালি ছিল সে, পুরানো লোক বলে তাকে বাদ দিয়ে কম বয়সী মালি রাখা হয়নি। তামাটে রঙের চোখা। মুখ, চোখে নিষ্পাপ সরলতা। রানার দিকে বারবার এমনভাবে তাকাচ্ছিল যেন। বলতে চায় এখানে তোমার কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।

এ বাড়ির রান্নাবান্না ভাল। প্রথমে এল ভেজিটেবল সুপ আর গ্রিসিনি (রুটি), তারপর বিসটেকা (বীফ স্টেক), গোরগোনজোলা (ভেড়ীর দুধ থেকে তৈরি হলদেটে সাদা পনির), রিসো (চাল আর সেলফিশ সহযোগে রান্না, বাঙালী রসনার জন্যে ভারি সুস্বাদু), সবশেষে ডোলসি (মিষ্টি আর ফুল)।

ইটালিয়ান খাবার পছন্দ করে রানা, পরিচয়ও অনেক দিনের। চুপ করে থাকলে অন্যায় করা হবে, তাই আথিয়ার একটু প্রশংসা করতে হল, চমৎকার রাধো তুমি।

চেহারা দেখেই বুঝল, আথিয়ার মুখে খই ফুটতে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি লার্দোর দিকে ফিরল ও, বলল, বাড়ির চারদিকটা কাল আমাকে দেখাবে তুমি। লে আউটটা আমার জানা দরকার। এরপর উঠে নিজের ঘরে চলে আসে ও।

পিস্তলের ম্যাগাজিন থেকে নাইন এম এম বুলেট বের করে স্প্রিং চেক করল। রানা। স্পেয়ার দুটোও পরীক্ষা করল। একটা বাক্স খুলে তিনটে ম্যাগাজিনেই গুলি। ভরল। নতুন শোল্ডার হোলস্টারে তেল ঘষল, আরও নরম করার জন্যে।

লুবনা-সে-ই হবে সবচেয়ে বড় সমস্যা। তাকে পাহারা দেয়ার জন্যেই ওকে। রাখা। মন-মেজাজ ভাল থাকলে মেয়েটার সঙ্গ খারাপ লাগত না। কিন্তু এই বয়সের মেয়েরা কি রকম হয় জানা আছে ওর, ভয়টা সেজন্যেই। নিশ্চয়ই খুব ছটফটে মেয়ে, ঠোঁটে এক কোটি প্রশ্ন নিয়ে অপেক্ষা করছে। প্রথম একবার দেখে সব বোঝা যায় না, কিন্তু রানার মনে হয়েছে মেয়েটা মায়ের ঠিক উল্টো স্বভাব। পেয়েছে, অথচ চেহারায় মায়ের আদল অনেকখানিই আছে, তবে মায়ের চেয়েও সুন্দরী।

রানাকে ওপরতলায় নিয়ে এসে ঘর দেখিয়ে দিয়েই চলে যায়নি লুবনা, ভেতরে ঢুকে রানার পিছনে দাঁড়িয়েছিল কিছুক্ষণ। খোলা সুটকেস থেকে। জিনিসপত্র বের করে ওঅরড্রোবে সাজাচ্ছিল রানা, থেমে থেমে এক-আধটা প্রশ্ন। করছিল মেয়েটা। বোঝাই যাচ্ছিল, রানার আগমন ওর জীবনে বিরাট একটা ঘটনা। বাড়িতে ওর বয়েসী আর কেউ নেই, স্কুলে যাওয়া বন্ধ, মা তার নিজের রূপ-যৌবন আর সোসাইটি নিয়ে ব্যস্ত। রানার জানা আছে, এ-ধরনের মায়েরা। নিজের মেয়েকেও প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে করে। ওর ধারণা হল মেয়েটার বোধহয় খুব। একঘেয়ে জীবন। তা যদি হয়, বিচ্ছিরি একটা ঝামেলা হয়ে দেখা দেবে লুবনা। বডিগার্ডকে স্রেফ রক্ষক বলে মনে করবে না, তার কাছ থেকে আরও বেশি কিছু আশা করবে। বন্ধুত্ব চাইবে।

লুবনার প্রথম প্রশ্ন ছিল বাংলাদেশকে নিয়ে। এক কথায় জবাব দিয়েছিল। রানা, অনেকদিন দেশে ফেরেনি ও। কিন্তু তবু তাকে নিরুৎসাহিত করা যায়নি। বাংলাদেশের সীমা কি? ওটা কি ভারতের একটা অঙ্গরাজ্য? বাংলাদেশীরা কি খেতে ভালবাসে? রয়েল বেঙ্গল টাইগার কত বড় হয়? বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তর। এড়িয়ে গেছে রানা, তাতেও কাজ হচ্ছে না দেখে বলেছে, আমি এখন ক্লান্ত। অনেকক্ষণ কোন সাড়া-শব্দ না পেয়ে ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখে চলে গেছে।

হোলস্টারে তেল মাখানো শেষ করে তাতে বেরেটা ভরল রানা। খাটের স্ট্যাণ্ডে ঝুলিয়ে রাখল সেটা, বাটটা বালিশের কাছাকাছি থাকল। টেবিলের কাছে ফিরে এসে একটা রোড ম্যাপ খুলল, মিলান আর কোমোর মাঝখানের রাস্তাটা দেখানো হয়েছে তাতে। কাজের টেকনিক্যাল দিকগুলো জেনে নিতে চায় রানা। গোটা ব্যাপারটাকে সামরিক দৃষ্টিতে দেখতে চেষ্টা করল। একটা সম্পদকে রক্ষা করতে হবে তার। শক্তিশালী এক শত্ৰু এটা দখল করার চেষ্টা করতে পারে। তার সম্পদ ওরা দখল করার জন্যে ঘাঁটিতে হামলা চালাতে পারে, তারমানে বাড়িতে; কিংবা ঘাটির বাইরে, হয় প্রায়ই যাওয়া হয় এমন কোন ঠিকানায় বা আসা-যাওয়ার পথের। মাঝখানে কোথাও, তারমানে স্কুলে অথবা রাস্তায়।

ঠিক হয়েছে সকালে বাড়ির ভেতর-বার সব ঘুরিয়ে দেখানো হবে ওকে। আর লুবনা ওকে স্কুল দেখিয়ে আনবে। স্কুলের সিকিউরিটি অ্যারেঞ্জমেন্ট জানতে হবে। ওকে। তবে, ওর ধারণা, কিডন্যাপ করার চেষ্টা হলে রাস্তাতেই কোথাও হবে, কাজেই কোন ছক না রেখে যখন খুশি ইচ্ছেমত রাস্তা বদল করে আসা-যাওয়া। করাটা জরুরি। ম্যাপ দেখে জানা গেল, স্কুলে যাওয়ার জন্যে কটা রাস্তা ব্যবহার। করা সম্ভব। মার্জিনে কিছু নোট লিখল রানা।

এরপর ওঅরড্রোব থেকে সুটকেসটা নামাল ও। ভেতরে কাগজে মোড়া কয়েকটা বোতল রয়েছে। একটা গ্লাস খুঁজে নিয়ে তাতে খানিকটা হুইস্কি ঢালল।

ইজি চেয়ারে বসে খাচ্ছে রানা। রাত অনেক হল। এক সময় পুরো বোতলটাই খালি করল ও। বিছানায় শুয়ে আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগল। নতুন দায়িত্ব সম্পর্কে সংশয় কোনমতে কাটতে চায় না।

জানো, লোকটাকে লুবনার পছন্দ হয়েছে।

মাথা নাড়ল ভিটো। গভর্নেস থাকবে না, তাতেই ও আত্মহারা। লোকটা যদি কাউন্ট ড্রাকুলা হত তাও তাকে পছন্দ করত ও।

উঁহু, তুমি জান না, বলল লরা। শুতে যাবার আগে লুবনার সাথে আমার কথা হয়েছে। জিজ্ঞেস করলাম, কি রে, তোর বডিগার্ড লোক কেমন? ঠোঁট উল্টে কি বলল জান? বলল ভারি অহঙ্কারী।

তাহলে যে বলছ পছন্দ হয়েছে ওর?

তারপর আমি জিজ্ঞেস করলাম, অহঙ্কারী বলছিস কেন? লুবনা বলল, আমার। দিকে একবার ভাল করে তাকালও না। দুএকটা কথা জিজ্ঞেস করলাম, হুঁ-হ্যাঁ। করে রয়ে গেল। এরপর আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি লুবনাকে, বলল লরা। লুবনা নিজেই বলল, লোকটা আসলে পাক্কা অভিনেতা। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে। এসে জানালার পর্দা একটু সরিয়ে তাকিয়ে থাকলাম। দেখি, খানিক পর ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। আমাকে না দেখে কেমন যেন ম্লান হয়ে গেল চেহারা, চোখে অপরাধ অপরাধ ভাব। গভীর না ছাই, আসলে প্রথম প্রথম তো, একটু ভাট দেখাচ্ছে।

সশব্দে হেসে উঠল ভিটো। তোমার মেয়েও তো দেখছি কম অভিনয় জানে না!

কিন্তু আমি ভাবছি, এত থাকতে বডিগার্ডের চাকরি করতে এল কেন? যেন নিজেকেই জিজ্ঞেস করল লরা। এর মধ্যে নিশ্চয়ই কোন রহস্য আছে।

রহস্য আবার কি থাকবে, বলল ভিটো। আজকাল ভাল একটা চাকরি পাওয়া খুব কঠিন।

ওর কি বিয়ে হয়েছে? কোথাও বাড়িঘর আছে?

কি জানি।

ঘাপলা একটা না থেকেই পারে না, বলল লরা। কি যেন একটা ধরতে পারছি না। আত্মবিশ্বাসী লোক, সন্দেহ নেই, কিন্তু বেশিদিন হয়নি কোথাও একটা। ধাক্কা খেয়েছে বলে মনে হয়। হয়ত কোন মেয়ে ধোকা দিয়েছে।

ভিটো হাসল। মেয়েলি অনুমান এরচেয়ে ভাল আর কি হবে।

না, মাথা নাড়ল লরা। আমারই ভুল। মেয়ে-টেয়ের ব্যাপার নয়। ওর ব্যক্তিত্বের একটা অংশ যেন হারিয়ে গেছে। যাই বল, লোকটা আমাকে কৌতূহলী করে তুলেছে।

ভিটো খুশি আর তৃপ্ত। লরা লোকটার প্রতি আকৃষ্ট হবে, এ আশঙ্কা তার। নেই। স্ত্রীকে সে অনেক দিন থেকে চেনে, অনেক আগেই এ-ধরনের ভয় তাকে ছেড়ে গেছে। জানে, পুরুষমানুষ লরার একটা প্রিয় সাবজেক্ট, স্টাডি করতে পছন্দ, করে। কে কোন্ প্রকৃতির মানুষ, আবিষ্কার করতে ওর মজা লাগে।

কিন্তু তুমি আমাকে বললে ও নাকি তোমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে।

হ্যাঁ। ভয় শব্দটা বোধহয় ভুল। এক অর্থে, সত্যি ও একটা হুমকির মত। বুনো একটা জানোয়ার, কিন্তু পোষ মেনেছে। তবু এদের ব্যাপারে সাবধান থাকতে হয়। আতিনিদের অ্যালসেশিয়ানটার কথা মনে আছে তোমার? পাঁচ বছর থাকার। পর খোদ মালিককেই একদিন কামড়ে দিল।

ও কুকুর নয়, লরা!

আমি শুধু একটা উদারহরণ দিলাম। লোকটার মনে কি যেন একটা আছে। ভেব না আমি বিপদের আশঙ্কা করছি। হয়ত এটাই ওর ভঙ্গি। তবে, ওর সম্পর্কে জানতে হবে আমাকে। ওর অতীত, ওর স্বভাব, অনুভূতি–সব।

.

০৬.
সামনের সিটে রানার পাশে বসেছে লুবনা। কথা বলতে নিষেধ করে দিয়েছে রানা, রাস্তার ওপর নজর রাখতে হবে ওকে। একটু অবাকই হয়েছে লুবনা, কারণ মেইন কোমো-মিলান রোডে রয়েছে ওরা, গাড়ি চালানো খুব সহজ, পথ ভুল হবারও কোন সম্ভাবনা নেই। কিন্তু রানার উদ্দেশ্য, সহজে চোখে পড়ে না অথচ বিপদ আসতে পারে এই রকম জায়গাগুলো আবিষ্কার করা–যেখানে গাড়ির গতি কমাতে হবে বা বাঁক নিতে হবে, অথবা যে-সব জায়গায় কাছেপিঠে বিল্ডিং নেই। বেশ কয়েকটা স্পট আবিষ্কার করল ও, ম্যাপে নোট করল সেগুলো। আধ ঘন্টা পর শেষ বাকটা দেখাল লুবনা, কয়েক মিনিট পর স্কুল গেটের সামনে থামল গাড়ি। লাফ দিয়ে নেমে গিয়ে দেয়ালের সাথে আটকানো একটা পিতলের হাতল ধরে টানল লুবনা। গাড়িতে বসে উঁচু পাঁচিল, পাঁচিলের মাথায় সার সার বর্শা আকৃতির লোহার পাত লক্ষ করল রানা। দেখল ভারি গেটের সামনে কোন রকম আড়াল নেই।

লুবনার চোখ বরাবর গেটের গায়ে একটা শাটার খুলে গেল। ভেতর থেকে কেউ দেখল ওকে। দুএকটা কথা হল। তারপর প্রৌঢ় এক দারোয়ান ধীরে ধীরে। খুলে দিল গেট। হাত কঁকিয়ে ইঙ্গিত করল লুবনা, গেট পেরিয়ে এগোল, গাড়ি নিয়ে তার পিছু নিল রানা। ভেতরে একটাই বিল্ডিং, হলুদ আর সবুজ লতাগাছে ঢাকা। চারপাশে প্রচুর ফাঁকা জায়গা পড়ে আছে। শেডে গাড়ি থামিয়ে লুবনাকে অনুসরণ করল রানা। আঙুল দিয়ে এটা-সেটা দেখাল লুবনা। খেলার মাঠ, মাঠকে ঘিরে থাকা রানিং ট্র্যাক, বিল্ডিংটার বাঁ দিকে ছোট্ট একটা বাগান, বাউণ্ডারি। ওয়ালের কাছ থেকে যথেষ্ট দূরে। সুইমিং পুলও আছে, সেটা পিছন দিকে।

চারদিক একবার ঘুরে দেখে নিয়ে স্কুল-ভবনের সামনে চলে এল ওরা। স্কুলের ভেতরটা মোটামুটি নিরাপদ লাগল। সারা মুখে পবিত্র হাসি নিয়ে বয়স্কা এক মহিলা বেরিয়ে এলেন, সব চুল সাদা। ছুটে গিয়ে তার দুই গালে চুমো খেল লুবনা, হাত ধরে তাকে টেনে নিয়ে এল রানার সামনে। ইনি সিনোরা মিরিয়াম, আমাদের হেডমিসট্রেস, রানাকে বলল সে। তারপর বৃদ্ধার দিকে ফিরল, চেহারায় উথলে ওঠা গর্ব। ও হাসান, আমার বডিগার্ড।

মি. হাসান, শুদ্ধ করে দিলেন হেডমিসট্রেস।

মাথা নাড়ল লুবনা, হাত ঝাপটা দিয়ে কপাল থেকে চুল সরাল। ও আমাকে শুধু হাসান বলতে বলেছে।

করমর্দন করল ওরা, হেডমিসট্রেস ওদেরকে কফি খাওয়ার জন্যে ভেতরে ডাকলেন। একেবারে ওপরতলায় ছোট একটা অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে ভদ্রমহিলার। অনেক আসবাবপত্র, কিন্তু সবই খুব হালকা। মেঝে ছাড়া প্রতিটি সমতল জায়গায় ফ্রেমে বাধানো গ্রুপ ফটোগ্রাফ রয়েছে। ছবিগুলো রানা দেখছে লক্ষ করে হেডমিসট্রেস বললেন, ওরা সবাই আমার ছেলেমেয়ে। কয়েক শো হবে। এখন ওরা বড় হয়ে গেছে, কিন্তু আমার কাছে চিরকাল ওরা খোকা-খুকুই রয়েছে।

পরিবশেটা খুব ভাল লাগল রানার। স্কুল যে এত ঘরোয়া হতে পারে, ভাবা। যায় না। আসতে না পেরে অস্থির হয়ে উঠেছিল লুবনা, কারণটা বোঝা গেল।

মধ্যবয়েসী এক মেয়েলোক রূপালি একটা ট্রে নিয়ে এল। হেড মিসট্রেস। নিজের হাতে পট থেকে কাপে কফি ঢেলে পরিবেশন করলেন। লুবনার সাথে আলাপ করছেন তিনি। তারপর, রানাকে অবহেলা করা হচ্ছে মনে করে, ফিরলেন। ওর দিকে। এ-ধরনের কাজে অনেক দিন ধরে আছেন আপনি, মি. হাসান?

বডিগার্ড কখনও ছিলাম না, বলল রানা। কিন্তু যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আছে।

বৃদ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কি দিনকাল পড়েছে। আমারও দুটো মেয়ে। কিডন্যাপ হয়েছিল। এখান থেকে নয়, ওরা আহতও হয়নি, আবার স্বাভাবিক হতে অনেক সময় লেগেছে ওদের। লুবনার হাটুতে হাত রাখলেন তিনি। আমাদের লুবনাকে আপনি দেখবেন। ও স্কুলে আসবে শুনে আমি খুব খুশি হয়েছি।

আর কদিন বাড়িতে থাকলে দম আটকে মরেই যেতাম, বলল লুবনা। বন্দী। জীবনের বর্ণনা দিল সবিস্তারে। আপন মনে বকবক করে চলেছে লুবনা, হাসিমুখে শুনছেন বৃদ্ধা, একটা দুটো কথা যোগ করছেন তিনিও। গোটা পরিবেশটা চমৎকার লাগল রানার কাছে। কেমন যেন শান্তি রয়েছে মহিলার মধ্যে।

মিনিট কয়েক পর রানার সাথে লুবনার চোখাচোখি হল, দুজন একসাথে উঠে দাঁড়াল ওরা। গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেয়ার জন্যে ওদের সাথে সাথে হেডমিসট্রেসও এলেন। আপনি ইটালিয়ান নন, বললেন তিনি।

ও বাংলাদেশী, দেশটা নয় মাস যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছে, বলে উঠল লুবনা। সে যুদ্ধে হাসানও ছিল।

অবাক হয়ে গেল রানা, এসব লুবনা জানল কিভাবে? দেখল, আড়চোখে ওর দিকে তাকিয়ে ওর প্রতিক্রিয়া উপভোগ করছে লুবনা আর মুচকি মুচকি হাসছে। সাথে সাথে চেহারা গম্ভীর করে ফেলল রানা।

আপনি এত ভাল ইটালিয়ান বলেন! নিশ্চয়ই নেপলসে শিখেছেন?

হ্যাঁ, একজন নিয়াপলিটানের কাছে।

তাই তো বলি! সন্তুষ্ট দেখাল তাঁকে। স্কুল-ভবনের পিছন দিকের একটা দরজা দেখালেন তিনি। ওটা কিচেন। ছেলেমেয়েদের আমরা ঠিক সময়ে পাঠিয়ে দিতে চেষ্টা করি, তবু যদি আপনাকে অপেক্ষা করতে হয়, মেইডকে বললেই কফি পাবেন। বিষণ্ণ হাসি দেখা গেল তার ঠোঁটে। এখন তো বেশ অনেকের সাথেই বডিগার্ড আসছে।

রানা ধন্যবাদ জানাল। লুবনা তার গালে চুমো খেল।

ফেরার সময় অন্য রাস্তা ধরল রানা।

লুবনাকে এবারও কথা বলতে নিষেধ করল ও। কিছুক্ষণ চুপ করেই থাকল সে, কিন্তু স্কুল আর হেডমিসট্রেসকে দেখার পর উত্তেজিত হয়ে আছে, বারবার আড়চোখে তাকাচ্ছে রানার দিকে। এক সময় আর নিজেকে সামলাতে পারল না। জিজ্ঞেস করল, স্কুল তোমার কেমন লাগত, হাসান?

ভাল না।

ওমা, সেকি! বিস্ফারিত চোখে তাকাল লুবনা। কেন? তুমি বুঝি পড়া পারতে না?

রানা চুপ। ভাবল, উত্তর না পেলে হয়ত দমে যাবে।

হাসান, এটা কি তোমার ডাক নাম?

না।

কি সেটা?

নেই।

এবার লুবনা কোন রকম বিস্ময় প্রকাশ করল না। স্কুল তোমার ভাল লাগত –তারমানে তুমি খুব অসুখী ছিলে, না?

বিরক্তি চেপে শব্দ করে নিঃশ্বাস ছাড়ল রানা। সুখী হওয়াটা মনের একটা অবস্থা। ব্যাপারটা আমি কখনও পাত্তাই দিইনি।

স্টিয়ারিং হুইল ধরা রানার হাতের দিকে চোখ আটকে গেল লুবনার। শুকনো কাটা দাগটা ওকে যেন জাদু করেছে। হঠাৎ হাত বাড়িয়ে দাগটা ছুঁলো সে। কি করে হল এটা?

ঝাঁকি খেয়ে সরে গেল রানা, তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, গাড়ি চালাবার সময় আমাকে ছোবে না। কয়েকমুহূর্ত পর সিদ্ধান্তে পৌঁছুল ও, এখুনি ফয়সালা হয়ে যাওয়া দরকার। আর শোনো, সারাক্ষণ বক বক করবে না। আমি গল্প করার জন্যে আসিনি। আমার সব কথা তোমার জানার দরকার নেই। বিপদ হলে তোমাকে আমি রক্ষা করব–ব্যস। সুরটা রুক্ষ, চাবুকের মত আঘাত করল লুবনাকে।

কয়েক সেকেণ্ড রানার দিকে তাকিয়ে থাকল লুবনা। তারপর সরে গিয়ে যতটা সম্ভব জানালা ঘেঁষে বসল।

ঘাড় ফিরিয়ে একবার তাকাল রানা। সরাসরি রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। লুবনা, ঠোঁট দুটো পরস্পরের সাথে শক্তভাবে চেপে আছে, চিবুক কাঁপছে। আর, দয়া করে কাঁদতে শুরু কোরো না! ঝাঁঝের সাথে বলল রানা, কেন কে জানে। নিজের ওপর রেগে গেছে ও।

ও নিস্তব্ধতা অস্বস্তিকর হয়ে উঠলে নিজের ওপর রাগ আরও বাড়ল রানার। আমি একটা দায়িত্ব নিয়েছি, সেদিকে আমার মনোযোগ থাকতে হবে। কেউ যদি সারাক্ষণ কানের কাছে বক বক করে, তাহলে কি করে হয়! স্টিয়ারিং হুইল থেকে একটা হাত তুলে বাইরেটা দেখাল ও। সম্ভব-অসম্ভব সব রকম জগৎ রয়েছে। ওখানে। সব রকম। সুখী আর অসুখী, ওখানে শুধু এই দুদল লোক বাস করছে না। খারাপ মানুষও আছে। খারাপ কিছুও ঘটতে পারে। বড় হও, তখন বুঝবে।

এখন আর আমি ছোট নই। দপ করে জ্বলে উঠল লুবনা। আমিও জানি। খারাপ কিছু ঘটতে পারে। এমন কিছু অন্যায় করিনি যে এত কথা শুনতে হবে আমাকে। আর জেনে রাখ, আমি কাঁদছি না। ওই বয়সটা আমি পেরিয়ে এসেছি।

কিন্তু লুবনার চোখে পানি ছলছল করছে, যদিও রানার দিকে স্থির হয়ে আছে। তার অগ্নিদৃষ্টি।

রাস্তার পাশে গাড়ি সরিয়ে আনল রানা, থামল। চিন্তা করছে ও, নিস্তব্ধতার মাঝখানে শুধু লুবনার নাক টানার আওয়াজ শোনা গেল। শোন, এক সময় বলল রানা। আমি আসলে এই রকমই। দরকার ছাড়া কথা বলি না, কেউ বললে বিরক্ত হই। এটা তোমাকে বুঝতে হবে, আর তা না হলে তোমার বাবাকে বলে আরেকজন লোকের ব্যবস্থা কোরো।

নাক টানার আওয়াজ থেমে গেল। স্থির হয়ে বসে আছে, সরাসরি সামনে। তাকিয়ে। আচমকা দরজা খুলে গাড়ি থেকে নেমে গেল সে, তারপর পিছনের দরজা খুলে ব্যাক সিটে উঠে বসল। আপনি আমাকে এখন বাড়িতে নিয়ে যেতে পারেন, মি, ইমরুল হাসান। মিস্টারের ওপর খুব জোর দিল সে।

ঘাড় ফিরিয়ে তার দিকে তাকাল রানা। ওর দিকে তাকাবে না লুবনা। পিঠ সোজা করে বসে থাকল, রাগে নাকের ফুটো দুটো কাঁপছে।

গাড়ি ছাড়ল রানা। মন একটু খারাপ হয়ে গেছে। মেয়েটাকে আঘাত দিতে চায়নি। কিন্তু ওর খেলার সাথী হবার জন্যে চাকরিটা নেয়নি সে। কথাগুলো এক সময় না একময় বলতেই হত। ওর মা-বাবার বোঝা উচিত,ওর এখন একজন বন্ধু দরকার।

.

রবিবার। ডিনারের পর নিজের õ