Thursday, April 18, 2024
Homeবাণী-কথাসূর্য তুমি সাথী - আহমদ ছফা

সূর্য তুমি সাথী – আহমদ ছফা

সূর্য তুমি সাথী - আহমদ ছফা

১. বৈশাখের শেষ

বৈশাখের শেষ। আধা বছর জুড়ে বিশাল নীলাকাশে সূর্যের রূপোলী আক্রোশ সহস্র শিখায় শ্যামল পৃথিবীতে আগুন ঢেলেছে। অগ্রহায়ণের শেষাশেষি একদিন আসমানের চার কোণে জমাট বাঁধা কালো মেঘ কালো গাইয়ের ওলানের বরণ ধরেছিলো। বজ্রেরা চীৎকার করে ফেটে পড়েছিলো। মেঘের বুক চিরে চিরে বিজুলীর শাণিত ছুরি ঝিকঝিকিয়ে জেগেছিলো। লোকজন আতঙ্কে ফরিয়াদ করেছিলো অগ্রহায়ণ মাস পাকা সোনারঙ ধান ঘরে আসার মৌসুম। এমনি সময়ে যদি বৃষ্টি নামে। কথায় বলেঃ

‘যদি বিষ্টি আগনত
মানুষ যায় মাগনত’
(অগ্রহায়ণে যদি বৃষ্টি হয় মানুষ ভিক্ষে করতে বেরোয়।)

লোকজনের ভাগ্য ভালো। আসমানের আল্লাহর উদ্দেশে শোকর গুজার করেছিলো। অগ্রহায়ণে বিষ্টি হয় নি। পৌষে না। মাঘে না। ফাঙ্গুন-চৈত্র গেলো। বৈশাখও যাই যাই; আর কয়দিনই বা বাকী। এরি মধ্যে আকাশ একবারও করুণায় সজল হয়ে ওঠেনি। গনগনে সুর্যের হতাশনে রবিশস্যের ক্ষেত জ্বলে গেলো। ঢোড়া সাপের মতো তরমুজ লতার লক্লকে প্রসারিত ডগা মিইয়ে এলো। খরায় গাছের পাতারা তামাটে রঙ ধারণ করলো। আসমানের বিশাল ভয়ঙ্কর শুভ্র শিখার কুণ্ড লক্ষ লক্ষ আগুনে রসনার তাপে পলকে পলকে ধরিত্রীর রূপরস শুষে নিচ্ছে; গোলাকার প্রসারিত খোলের তলায় গলানো রূপোর মতো শিখারা ঝিলিমিলি খেলা করে। ডাইনে-বাঁয়ে-সামনে-পিছে যতদূর যায় চোখ–আগুন, আগুনের হলুদ শিখা। মাঠে আগুন, গাছে আগুন ফসলে আগুন, প্রকৃতির শিখাহীন নীরব প্রদাহের মতো মানুষের অন্তরে উদরেও আগুন, আগুনের কণা। সহস্র শ্রাবণের অক্লান্ত বর্ষণের ঝিকিমিকি বহ্নিমান, অনিভন্ত।

আগুনের জোয়ার ফোলা সাগর সাঁতরে যেনো এলো হাসিম। তার বুকে-পেটে, চোখে-মুখে আগুন। ধুকে ধুকে বন্যা পুকুরের বটতলায় এসে কাঁধের লাকড়ির ভারখানা নামালো। বটগাছ যেখানে শীতল ছায়া মেলে দিয়েছে, সেখানেই ছায়ার কোলে আধা সেদ্ধ শরীরখানা এলিয়ে দিলো। মাটির ভাপে শুকিয়ে যাওয়া ঘাসের ওপর বাদবাকী শরীরখানা রেখে চোখ বুজে রইলো। কিছু ভাবতে পারে না হাসিম। ভাবনার সূত্র জ্বলে গেছে। বন পেরিয়ে বিলে নামার পর থেকে এ বটগাছ স্নেহময়ী জননীর মতো ছায়াভরা হাতছানি ডেকে ডেকে পাক্কা চার মাইল পথ গরম তাজা বালুর ওপর দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে এসেছে তাকে। চোখ বুজে থাকতে পারে না। আগুনে পোড়া অর্ধগ্ধ শরীরের চেতনায় কি এক অনুভূতি জেগে উঠতে চায়। সূর্যের ধারালো নখর বুকের ভেতর যেখানে কজে, সেখানে তপ্ত গরম ছ্যাকা দিয়েছে।

লুঙ্গিটা বদলে গামছাখানা কোমরের গিঠ খুলে পরে নিলো। তারপর তালগাছের পিছল ঘাটের ওপর বসে দু’হাত পানিতে ডুবিয়ে আঁজলা ভরে এক আঁজলা পানি তুলে নিলো। ফেলে দিলো। পুকুরের পানিতেও আগুন। এক পা, দুপা করে ধীরে ধীরে গলা পানিতে নেমে এলো। ঝুপ করে একটা ডুব দিলো, আরেকটা ডুব দিলো। ধুলোয় ধুসরিত গা ডলতে ডলতে অনেকগুলো ডুব দিলো। পানির ওপরে কালো মাথা জাগিয়ে খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। হাসিমের দেহের উত্তাপ শীতল পানি শুষে নিচ্ছে। লোমকূপের গোড়ায় কাঁপছে স্নিগ্ধ শীতল অনুভূতি। তার প্রাণ, অনুভূতি ফিরে এলো দেহে। কেমন শান্ত, নিবিড়, মেহঘন ছোঁয়া।

একটা কক্সবাজারের বাস হর্ণ বাজিয়ে দক্ষিণে ছুট দিলো। দু’টো রিক্সা আঁকাবাঁকা রোডের ওপর ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে চলছে। ধীর মন্থর গতি। টুং টাং ঘন্টাধ্বনি বাতাসে ভেসে চলে যায় অনেক দূর। আকাশের বুকে তীক্ষ্ণ তেরছা একটা রেখা টেনে একটা পাখি উড়াল দিলো। সূর্যের আলো বাদামী রঙের পাখনায় চিকচিক করে ঝলসে ওঠে। একটা চিল দিকচক্ৰবালে চক্রাকারে ক্কর খেলছে। পানির সমতলে পড়ছে ছায়া। রোদজ্বালা দুপুরের তপ্ত নির্জনতাকে ফালি ফালি করে কেটে চিহি স্বর বেজে উঠছে। চোখ-জ্বলা রোদে চিলের মর্মন্তুদ চিহি ডাক বুকে আগুন জ্বালিয়ে দেয়… আলোড়নের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

গা ধোয়া সেরে পুকুর থেকে উঠে আসে। গামছা বদলে আবার লুঙ্গি পরে নিলো। চিপে চিপে ঝেড়ে ফেললো সমস্ত পানি। তারপর গামছাখানা মাথায় মেলে গিয়ে বসে বটগাছতলায়। ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে। বাতাসের তোড়ে ছোটো ছোটো প্রশাখাগুলো দুলে উঠে। নির্জনতার ভেতর থেকে শরশর শব্দ আসে। বটগাছ যুগ যুগান্তরের উত্থান-পতনের সাক্ষী। হাতির গুঁড়ের মতো বিরাট বিরাট ঝুড়িগুলো তৃষ্ণার টানে মাটিতে নেমে এসেছে। ডালপালা পত্র-পল্লবে আকাশখানা কিছুদূর অদৃশ্য করে ফেলেছে। মৃত্তিকার অন্তরের সংগোপন রসে পাতাগুলো সবুজ, সরস। হাওয়ার ঘায়ে কেঁপে কেঁপে ওঠা প্রাণময় প্রসারিত ছায়ার মধ্যে মৃত্তিকার সংগোপন মমতাকেই মেলে ধরেছে।

একটু ভালো লাগছে হাসিমের। সারা শরীরে টলছে ঘুম ঘুম ঝিমানি। পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঘোরাফেরা করে চোখ। ওই হোথা মগডালে বাসা বেঁধেছে দুটো কাক। কোকিল একটা ডাকছে কু…কু। পাতার ফাঁকে অস্বাভাবিক জ্যোতির্ময় কালো দু’চোখ দেখা যায়। কতো কালো আর কণ্ঠস্বর কি মধুর! অন্তরের ভেতরটা পর্যন্ত ঠান্ডা করে দেয়। সবচে’ নীচের ডালটার দিকে চোখ পড়তে চমকে ওঠে।

এখনো যেন দাঁড়িয়ে আছে মানুষটা। পরনে শতচ্ছিন্ন হাঁটু ধুতি। গায়ে বুক চেরা ফতুয়া। সারা শরীরখানা গাব রাঙানো জালের উজ্জ্বল তুলিতে ছাপানো। কালীনাগের মতো চকচকে কালো। সাপের ফণার মতো পেশীগুলো। অভ্যন্তরে লুকিয়ে আছে শক্তি যে শক্তি দিয়ে পাহাড় পাথর চুরমার করা যায়। দাঁড়িয়ে আছে স্থির নিস্পন্দ, নিষ্পলক। চোখজোড়া দুরূহ জিজ্ঞাসায় বিষণ্ণ। তেলীপাড়ার তেজেন। চিনতে এতোটুকু কষ্ট হয়নি হাসিমের। দাঁড়িয়ে আছে মাটি থেকে একহাত ওপরে। ঘরের গাইয়ের শক্ত পাকানো নতুন দড়িখানা গলায় কষে লেগেছে। কিছু দূর কেটে গেছে। দড়িতে ক’ফোঁটা রক্ত। হাসিমই তো পয়লা দেখেছিলো। সে যাচ্ছিলো পাহাড়ে। ভোর রাত। মোরগ বাগ দেয়নি। পৌষালী কুয়াশার জমাট আস্তরণের ভেতরেই দেখেছিলো। চিনেছিলো তেলীপাড়ার তেজেনদার না হলে শিশুকাঠের মতো অমন সবল শরীর আর কার? তাই ডাক দিয়েছিলোঃ

“তেজেনদা, এত রাতিয়া কিল্লাই বাইর অইয়স যে”। (তেজেনদা, এতো রাতে কেন বেরিয়েছো?)

তেজেনদা কোনো জবাব দেয়নি বার বার ডাকার পরও। কাছে এসে গায়ে ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো হাসিমঃ

“কি তেজেনদা রাগ অইয়স যে না কথা ন কস ক্যা?” (কি তেজেনদা, রাগ করছো, কথা বলছো না কেন?)

গাছের ডালে ঝুলন্ত শরীর তেজেনের দুলেদুলে জবাব দিয়েছিলো। হা, সে রাগ করেছে, সমগ্র পৃথিবীর ওপর তার রাগ। সমস্ত মানুষের ওপর অভিমান। তাই সে কথা বলবে না; কোনো দিন কথা বলবে না। সকাল হলে পরে হাসিম ঝুলেপড়া জিহা, রক্তের স্বাক্ষর আঁকা রঞ্জু আর তেজেনদার দু’চোখে সে একটি উদ্ধত জিজ্ঞাসাই দেখেছিলো, আরো সকলে দেখেছিলো। কেউ কোন কথা বলে নি। কেবল ছতুর বাপ তসবীহ্ টিপতে টিপতে মন্তব্য করেছিলো।

“আত্নহত্যা মহাপাপ। কাফের এনে তো যাইত দোযখ। একই কথা। ফি নারে জাহান্নামে হালেদিনা।” (কাফের এমনিতেও নরকে যেতো, একই কথা, তার জাহান্নাম নরকে স্থান)

কোনো হিন্দু মরলে তাকে জাহান্নামের আগুনে জ্বালাবার অনুরোধ করাটাই বিধি। অভাব, দুঃখ, নির্যাতন, উপবাস থেকে মুক্তি পাবার আশায় শীতজর্জর পৌষের এক কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে গাছের ডালের সঙ্গে এক মাথা, দড়ির আরেক মাথা নিজের গলায় পরিয়ে ধাক্কা দিয়ে মইটা ফেলে ঝুপ করে ঝুলে ছিলো মুক্তির আশায়। হাসিমের এখনো চোখের সামনে ভাসে তেজেনদার চিরতরে নির্বাক হয়ে যাওয়া চোখের সে প্রশ্নিল দৃষ্টি।

বুকের সমস্ত বেদনা মথির করে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। হায়রে! আল্লাহ, এতো অত্যাচার তোর রাজ্যে। হাতির মতো বলবান তেলীপাড়ার তেজেনদাকেও গলায় দড়ি দিয়ে মুক্তি খুঁজতে হলো। শ্বাস নিতে পারে না হাসিম। বুকের ভেতর তেজেনদার সে জিজ্ঞাসা যেন সূচীমুখ কোনো তীক্ষ্ণতম যন্ত্রণার মতো বাজে। সে নড়েচড়ে বসে।

বেলা পড়ে এসেছে। সূর্য হেলেছে পশ্চিমে। পেটের ক্ষুধাটাও চাড়া দিয়ে উঠেছে। সেই কবে সাত সকালে দু’টো পানি ভাত খেয়ে বেরিয়েছে। আজকাল একভার লাকড়ির জন্যও বাঁশমুরায় (জঙ্গলে) না গিয়ে উপায় নেই। শালার কন্ট্রাকটারেরা ধারে কাছে কিছু রাখেনি। এ পাহাড়, সে পাহাড় কতো পাহাড়ে ঘোরাঘুরি করতে হয়েছে। একেকটাতে উঠতে বুকের লহু গেছে পানি হয়ে। যাওয়া আসায় বারো মাইলের কম পথ তো তাকে হাঁটতে হয়নি। অন্যদিন কলাপাতায় ‘মোচা বেধে ভাত নিয়ে যায়। গতকাল বাজার থেকে চাল, তরকারী কিছু আনতে পারেনি বলে ভাতও নিতে পারেনি। পেটের ক্ষুধাটা যতোই চাড়া দিচ্ছে, ততই তার উঠতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু ঘরের কথা মনে হতেই ওঠবার শক্তি আপনা থেকে হারিয়ে ফেলে। পা দুটো মাটির মতো হয়ে মাটির সঙ্গে লেপ্টে থাকে।

ঝম্‌ ঝম্ শব্দ করে রেলের গাড়িখানি বরগুইনীর লোহার পুলের ওপর দিয়ে চলে গেলো। পড়ন্ত সূর্যের আলোতে চিকচিক্ জ্বলে। হাসিমের মনে চিন্তা… একমুঠো ভাতের চিন্তা। পোড়া চোখ ধায় রূপের দিকে, কিন্তু…।

বিল কোণাকোণি পথে বানা্যা পুকুরের পাড়ে উঠে এলো অধরবাবু। পেছনে ছেলেটা। ছেলেটার হাতে মাছ রাখার ডুলা। অধরবাবুর হাতে জাল। জালের পাক খুলে এদিকে সেদিকে কয়েকটা খেপ দিলো। একটা মাছও আসেনি। তারপর অগ্নিকোণ বরাবর জালটা সড়ত করে আমগাছে নিবিড় ছায়া যেখানে ছড়িয়ে পড়েছে, সেখানেই ছুঁড়ে মারলো। জাল মাটিতে লাগার সঙ্গে সঙ্গেই ওপর দিকে ঠেলে লাফ দিলো চওড়া বালিশের মতো একটা মস্ত রুই। লাল মুখ লাল পাখনা দেখা গেছে পরিষ্কার। সাদা আঁশগুলো রূপোর টাকার মতোন ঝিলমিল করে জ্বলে উঠলো। ছিঁড়ে যেতে পারেনি। রেশম সুতোর জাল, খেপের তলায় যক্ষ পড়লেও বেঁধে রাখে। লুঙ্গিটা মালকোঁচা দিয়ে গলা জলে নেমে এলো অধরবাবু। ডুব দিয়ে জালটাকে মাছের শরীরের সঙ্গে আচ্ছা করে জড়িয়ে কোমর জলে আসে। মাছের হেঁচকা টানে অধরবাবুর লিকলিকে শরীর বার বার বাঁকা হয়ে যাচ্ছে ধনুকের মতো। শেষ পর্যন্ত মাছ জড়ানো জাল একেবারে পারের সমতলে এনে রাখলো। বিরাট রুইটা শুকনো ডাঙার ওপর দাপাদাপি লাফালাফি করছে। পুচ্ছ তাড়না আর বাতাসে খাবি টানছে। অধরবাবুর মুখে বিজয়ীর হাসি। নিজের জালে ধরা মাছ কিনা, দেখতেও সুখ।

হাসিম ধড়ফড়ানো রুইটার কছেল্লা দেখে পায়ে পায়ে একেবারে অগ্নিকোণে চলে এলো। ইঃ বাবা, কতো বড়ো রুই! লেজ পাখনা লাল হয়ে গেছে। কতো বছরের পুরানো কে জানে। বড়ো চালাক মাছ। পানি কমে গেছে, তাই ধরা পড়লো। মাছটার পুচ্ছ তাড়না তার স্মৃতিতে তেজেনদাকে ডেকে আনে। হয়ত তেজেনদাও ঝুলে পড়ে এমনি করে ধড়ফড় করছিলো। হঠাৎ মনে হয় এই মাছটি তেজেনদা, আর তার ভাগ্য যেন একসুত্রে বাঁধা পড়ে গেছে। আরো কতো ভাবনার উদয় হয় মনে। আকারহীন অবয়ভহীন সব ভাবনা।

হাসিমের দিকে চোখ পড়াতে অধরবাবুর হাসি-হাসি মুখখানা গম্ভীর হয়ে যায়। কপালে স্পষ্ট ঘৃণার কুঞ্চিত রেখা জাগে। থু করে একদলা থুথু হাসিমের পানে ছুঁড়ে দেয়। তারপর জালের সংগে মাছটা জড়িয়ে চোখের কোণে তাকে বিদ্ধ করে বিলে নেমে হাঁক দিলোঃ

“আয়, গণেশ্যা চলি আয়।” (আয়, গণেশ চলে আয়।)

এতোক্ষণে হাসিমের চেতনা হয়। ছোটলোকের চাইতেও ছোটলোক সে। অধরবাবু মুখের ওপর থুথু ছুঁড়ে দিলো? একটা চাপা নিঃশ্বাস হাওয়ার শরীরে বিধে গেলো। ভাগ্য বিরূপ না হলে সেও এ পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরতে পারতো। বাপের ওপর তীব্র আক্রোশ জাগে। কি দরকার ছিল মুসলমান হওয়ার। অবশ্য শেষ বয়সে বুড়ো বলতো, ধন সম্পদ কিছুর লোভে নয়, শুধু বেহেস্তের খাতিরে আমি মুসলমান হয়েছি। কিন্তু তার কণ্ঠস্বরটা বড়ো শুষ্ক; বড়ো করুণ শোনাতো। নিজের গলার স্বরে নিজেই চমকে উঠতো। নিজেকে যেমন পরকেও তেমনি লোকটা ফাঁকি দিয়েছে। হৃদয়ের সঙ্গে চিরটা জীবন কেবল মিথ্যা কথাই কয়ে গেলো। কোন বেহেস্তের মায়া! তা কি হাসিমের অজানা? কাজী সাহেবের মেয়েকে কি একটিবার পেয়েছিলো? তামাম জীবন এ পরিবারের দাসীর সঙ্গে ঘর করে মরতে হলো।

বাপের মৃত্যু-পাণ্ডুর বিবর্ণ-শ্লান মুখচ্ছবিটা মনে পরতেই মনটা তার নরম হয়ে এলো। অলিগলি করুণার রসে আর্দ্র হয়ে আসে। বাপের সীমাহীন বেদনা তার চেতনায় সঞ্চারিত হলো। বেলা পড়ে এলো লাকড়ির ভারটা আবার কাঁধে ফেলে বিলের মাঝ দিয়ে পায়ে পায়ে সৃষ্ট দূরের চিকন রেখা পথটা বেয়ে ঝিমে ঝিমে ঘরের দিকে পা বাড়ায়। মাটির তাপ এখনো কমেনি। সূর্য নিঃশেষ হলেও কামানের ভাতির মতো জ্বলতে থাকবে।

উঠোনের কাঁঠাল গাছটার সঙ্গে লাকড়ির ভারটা হেলিয়ে রেখে ঝাঁপ খুলে ঘরের ভেতর ঢোকে। এক ছিলিম তামাক খাওয়ার ইচ্ছা জাগে। কল্কির ঘেঁদাটা খুঁচিয়ে তামাক ভরে। আগুন তোলার হাতলওয়ালা মালাটা নিয়ে চুলোর ধারে গিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে। আগুন নেই। একরাশ মরা ছাই। একটু উত্তাপও নেই। সুফিয়া কি তা হলে আজও রান্না-বান্না করে নি! ফোরম্যানের বউ একভার লাকড়ি নিয়েছিলো। আজ টাকা দেবার কাথা। টাকা দিলে চাল কিনে ভাত রান্না করতো। টাকা দেয়নি, রান্নাও চড়ে নি। তামাকের নেশা আর তার নেই। দু’হাতে মাথা ঢেকে চুলোর ধারে বসে পড়ে। ক্ষুধাটা দ্বিগুণ মালুম হয়। রান্না ঘরের হাঁড়ি-পাতিল তাকে দেখে যেনো বিদ্রূপ করছে।

এমনি সময়ে ঘরে ঢুকলো সুফিয়া। মুখখানা থমথমে, চোখ দুটো রক্তজবার মতো লাল। সে কঠিন মুখমন্ডলে আরো কঠিন ছাপ এঁকেছে উপবাস। হাসির অনুমান না করেও বুঝতে পারে, তার মতো সুফিয়াও সারাদিন কিছু খায় নি। নিজের অস্তিত্ব সুফিয়ার উদ্ধত দৃষ্টির সামনে কেমন সঙ্কুচিত হয়ে আসে। পাহাড়-পাথর কেটে যে মানুষ জীবন চালায়, তেমনি মানুষ হাসিম। তার কাঠিন্য সুফিয়ার দৃষ্টির তাপে কুপূরের মতো উড়ে যায়। এ বোবা অগ্নিফলার মতো দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে কি কথা বলতে হয়, হাসিম জানে না। উপবাস আর অভাবের যন্ত্রণার চইতেও এ এক তীব্র যন্ত্রণাময় হৃদয় খচখচ্‌ করা অনুভুতি। এ বোধ জন্মাবধি তাকে তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে সুফিয়াকেঃ

“ফোরম্যানের বউয়ে টেঁয়া ন দ্যায়?” (ফোরম্যানের বউ কি টাকা দেয় নি?) সুফিয়া জবাব দেয় না। কঠিন মুখ তুলে লাল চেখের দৃষ্টি উচিয়ে ধরে। হাসিম সে চোখকে ডরায়। কেন জানে না। সুফিয়ার এ চোখ দেখলে তার মনে উথাল-পাথাল ঢেউ ভেঙে যায়। আবার জিজ্ঞেস করেঃ

“টেয়া ন দ্যায়?” (টাকা দেয় নি?)।

টাকার নামে সুফিয়া জ্বলে ওঠে। মেজাজে আগুন লেগে যায়। হাসিমের উদ্দেশে যা বলার নয়, তাই বলে ফেলে।

“টেয়ার নামে কাঁইচ কেলা দিব, নিষ্কর্মা মরদ, ভাত দিত ন পাইরলে বিয়া গইরত কনে কইয়ে?” (টাকার নামে কাঁচ কলা দেবে, নিষ্কর্মা মরদ, ভাত দিতে না পারলে কে বলেছে বিয়ে করতে?)

রাগের তোড়ে বাম হাতখানা হাসিমের মুখের কাছে এনে নানারকম ভঙ্গী সহকারে নানা অশ্লীল, অশালীন মন্তব্য করে। ফুটন্ত তেলে ছিটকার মতো এসে হাসিমের স্নায়ুতে আঘাত করে একেকটি কথা। ধারালো কাঁচের কুচির মতো হৃৎপিন্ড কেটে কেটে বসে যায়। ঠাস করে প্রবল হাতের একটা চড় দিয়ে বসে হাসিম সুফিয়ার মুখে। সুফিয়ার রক্তজবার মতো রক্তবর্ণ দু’চোখ ফেটে বেরোলো আগুন নয়, ঝরঝর চোখের পানির ধারা। সুফিয়া চড় খেয়ে ঘুরে পড়লো। উঠে সে আসমানের আল্লাকে ডেকে বললোঃ

“আল্লা, তুই আঁরে নে, এই দুনাই বিষ অই গেইয়ে।“ (আল্লা, তুমি আমাকে নাও, এই পৃথিবী আমার জন্য বিষ হয়ে গেছে।)

গরীবের ঘরে ঝগড়া–কাজিয়া এসব নতুন নয়। ঘরেতে অভাব, তাই ঝগড়া-কাজিয়ার সঙ্গেও করতে হয় ঘর।

হাসিম ঘরের বাইরে চলে আসে। সুফিয়া ঘরের দাওয়ায় পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসে। অন্তরপোড়া দুঃখে অভিসিক্ত সে কান্নার সুর। আকাশ জুড়ে ধীর-মন্থর গতিতে সন্ধ্যা নামছে। আসমানে তারা ফুটছে। হাসিমের ঘর অন্ধকার।

উঠোনে বার হয়ে হাঁটতে থাকে হাসিম। পেটে ক্ষুধা আর হৃদয়ে অনুতাপ। হাঁটতে পারে না। মগজে চিককুত চিককুত ব্যথা। ভাবছিলো বটতলায় গিয়ে এক কাপ চা নবীর দোকান থেকে বাকীতে খেয়ে নেবে। চেনা-জানা দিলদার কেউ সামনে পড়লে এক আধসের চালও ধার চাইবে। অন্যমনস্কভাবে হাঁটতে হাঁটতে সে নবীর দোকানেই চলে এলো। কিন্তু অবস্থা দেখে মুখটা তার শুকিয়ে এলো। শ্যামল বিশাল মুখমন্ডলে সন্ধ্যার চেয়েও গাঢ় হয়ে একটা কৃষ্ণছায়া নামে। আজ বাকী চাওয়া যাবে না। পয়সার জন্য জইল্যা চোরার সঙ্গে ঝগড়া করছে নবী।

“অ জলিল ভাই, তুই আজুয়া কিছু ন দিলে চইল কিনিত পাইত্যাম নয়, পোয়া মাইয়াম উয়াস থাইবো। দুয় টেঁয়া দ্য, বাকী টেঁয়া পরে দিয়।” (জলিল ভাই, তুমি আজ যদি কিছু না দাও চাল কিনতে পারবো না, ছেলেমেয়েরা উপোস থাকবে। আজ দুটি টাকা দাও, বাকী টাকা পরে দিও ।)

“আরে অজিয়া কন পরকারে সামালি ল, অমাবস্যার যো আইয়ুক… বেবাক টেয়া শোধ গরি দিয়ম।” (আজ কোনরকমে সামলে নাও, অমাবস্যার সময় আসুক সব টাকা এক সঙ্গে শোধ করে দেবো।)

কথাগুলো বলে তিন ব্যাটারী টর্চটা হাতে নিয়ে কাঁধে মাফলার জড়াতে জড়াতে বেরিয়ে যায় জইল্যা চোরা। জোয়ান সদ্য বিধবা মতির মার ঘরের কাছে গিয়ে ‘বন্ধু… রে’ বলে গানে টান দেয়। দাঁতে দাঁত চেপে উচ্চারণ করলো নবী, ‘আলা ডাহাইত’ কিন্তু চোখদুটো তার ছল ছল করে।

হাসিম দোকানে ঢুকে সুপারী গাছের ফালিতে তৈরি বেঞ্চির মতো আসনে চুপচাপ বসে থাকে। অনেকক্ষণ! মাগরেবের আজান শেষ হয়ে গেছে। নামাজও শেষ প্রায়। একজন দু’জন করে দোকানে মানুষ জমতে থাকে। ছতুর বাপ তসবীদানা টিপে টিপে দোকানে ঢুকে বেঞ্চিটা ঝেড়ে বসলো। তার মুখ দিয়ে দোয়া দরুদ ঝরছে। এক সময় তসবীহর ছড়া লম্বা কোতার পকেটে রেখে তার দিকে দৃষ্টি ফেরায়। সে দৃষ্টিতে এমন কিছু আছে যা রহস্যময়, ভয়ঙ্কর, দুর্বোধ্য তাকে ভয় ধরিয়ে দেয়। দৃষ্টির শরে বিদ্ধ হয়ে বুকটা তার দুরু দুরু করে। রহস্যময় দুটো চোখের শিখা হাসিমের চোখের ওপর রেখে হিমশীতল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে সে শীতলতার স্পর্শে বুকের রক্ত জমে যায়ঃ

“বান্যিয়ারপুত, তুই এডে ক্য? নমাজ-কালাম কিছু নাই, শুক্কুরবারেও জুমাত ন আইয়স ক্যা?” (বেনের ছেলে, তুমি এখানে কেন? নামাজ কালাম কিছু নেই, শুক্রবারেও মসজিদে এসো না কেন?)

হাসিম জবাব দেয় না। জবাব না পেয়ে ছতুর বাপের শান্ত শীতল কণ্ঠস্বরে একটু উত্তাপ জাগে। অধিকতররা দৃঢ়কণ্ঠে বললোঃ

“কাইলখুন মসজিদ ন দেখিলে পাড়াত থাকিত ন পারিবি। সময় থাকতে কই দিলাম। মুসলমানের পাড়া।” (কাল থেকে মসজিদে না দেখলে পাড়ায় থাকতে পারবে না, আগে থাকতে বলে দিলাম, মুসলমানের পাড়া।) সাদা দাড়িতে হাত বুলিয়ে আবার রহস্যময় দৃষ্টিরেখায় হাসিমকে বিদ্ধ করে লাঠি ঠক ঠক করতে করতে চলে যায়।

ছতুর বাপ চলে যাওয়ার পর কথা বললো, নাজিমঃ

“বেড়ার পুতে দুনিয়ার হক্কল কুকাম করে হেই খেয়াল নাই। পরের খুঁতা পাইলে তাঁই কাজী, তাই মাঝি। আর মাইয়ারে যা একখানা বানাইয়ে।” (তার ছেলে পৃথিবীর সকল কুকর্ম করে বেড়ায়, সেদিকে কোনো খেয়াল নেই, পরের খুঁত পেলেই তিনিই কাজী, তিনিই মাঝি বনে যান। আর মেয়েটিকে যা বানিয়েছে না।)

পাশের একজন নাজিমের মুখে তাড়াতাড়ি হাত চাপা দিলো। নাজিম চমকে উঠে। ছতুর বাপের বড় ছেলে সুলতান দোকানে ঢুকছে। নাজিম তার মুখের দিকে তাকায়। মন্তব্য শুনতে পেয়েছে কিনা মুখের প্রকাশিত ভাবের মধ্যে সন্ধান করে দেখে। নিশ্চিত হয় সে। সুলতানের থমথমে কালো মুখমন্ডলে বসন্তের অনেকগুলো বড়ো বড়ো গর্ত। চার পাঁচটা ব্রণ পেকে পুঁজের রসে পুষ্ঠ হয়েছে। ঢেঙা মতো নাকটা। কথা বলার সময় তার সারা মুখে লোলুপতা প্রকট হয়ে উঠে। বাঁ পাশের বিশ্রী দাগটা দেখা যায়। দোকানে একথা সেকথা নানা কথা হয়। বেশির ভাগ অভাব, দুঃখময় দৈনন্দিন জীবনের সমস্যার কথা ঘরে চাল না থাকার কথা, বউয়ের পিঠে কাপড় না থাকার কথা, বৃষ্টির অভাবে অকর্ষিত মাঠের কথা। আউশ ধান ছড়ানো হয় নি। অনাবৃষ্টিতে মাঠ ফুটি-ফাটা হয়ে আছে। লাঙলের হল ফোঁটায় তেমন সাধ্য কোন বাপের বেটার নেই।

“নারে নারে নাটুয়ার দিঘির পারে, সুন্দরীরে দেখতে দেখতে বাড়াইল মেলা মারে!”

গাইতে গাইতে আরেকজন দোকানে পা দিয়ে হাসিমকে দেখামাত্রই কলকন্ঠে চীকার করে উঠললাঃ

“এই যে সুলতান, চিন্তার কারণ নাই আর, বান্যিয়ার পুতরে পাইলাম। যামিনী ন আইলে ন আইয়ুক। বানিয়ার পুতে গাইত ন পারিব? কি কস?” (এই যে সুলতান, চিন্তার কারণ নেই। বেনের ছেলেকে পেয়ে গেলাম। যামিনী না আসলে না আসুক, বেনের ছেলে গাইতে পারবে না, কি বলিস?)

“মন্দ কি!”

জবাব দিলো সুলতান।

ঘাড়ের তেল মুছে তর্জনী নেড়ে নেড়ে বলতে থাকে আগত লোকটিঃ

“হুন বানিয়ার পুত, সাতবাড়িয়ার, ছিদ্দিক আর ধলঘাটের যামিনীর পাল্টা গান অইবার কথা আছিল জাহেদ সাবির বাড়ীত। যামিনী খবর দিয়ে আইত পাইরত নয়। হেই কথার লাই তোর গান গাহনের লাই থাহন পড়িব।” (শোন বেনের ছেলে, সাত বাড়িয়ার সিদ্দিক আর ধলঘাটের যামিনীর পাল্টা গান হওয়ার কথা ছিলো জাহেদ সাহেবের বাড়ীতে। যামিনী খবর দিয়েছে আসতে পারবে না। সেজন্য তোমাকে গান গাইতে থাকতে হবে।)

মানিব্যগ খুলে দু’খানা একটাকার কাগজের নোট তার হাতে গুঁজে দিয়ে বলেঃ

“এই দুই টেয়া দিলাম বাকী দুই টেয়া পরে পাবি।” (এই দুই টাকা দিলাম। বাকী দু’টাকা পরে দেবো।

হাসিমের হাতে টাকা দুটো শুয়ে থাকে। ওরা দু’জন পরস্পরের দিকে চেয়ে অর্থপূর্ণ হাসি হাসে। কেন হাসে হাসিম জানে। সিদ্দিকের সঙ্গে গান গাইতে হলে তিরিশ টাকার কম কেউ রাজি হবেনা। তাকে চার টাকাতে রাজী করালো। সুলতান দোকান থেকে বেরিয়ে হাঁক দিলোঃ

“আয় গণ্যা আয়”। (আয় গণি আয়।)

গণি মাথার টেরছা টেরী ঠিক করতে করতে বললোঃ

“যা বানিয়ার পুত, সারিন্দাখানা লই আগই। খানাপিনা হেডে হইব।” (যাও বেনের ছেলে সারিন্দাখানা নিয়ে এসো। খাওয়া দাওয়া ওখানে হবে।)

ওরা চলে গেলো। দোকানে চাপা গুঞ্জন উঠলো। কে একজন মিনমিনে গলায় বলেলোঃ

“দেশের মানুষ ভাতে মরের, জাহেদ বকসুর মনে খুসির অন্ত নাই।” (দেশের মানুষ ভাতে মারা যাচ্ছে, জাহেদ বকসুর মনে খুশির অন্ত নাই। “ন ক্যা অইতো খুশি সুদের টেয়া, টেয়ায় টেঁয়া বিয়ায়।” (খুশি হবে না কেন, সুদের টাকা তো, টাকায় টাকা বাড়ায়।)

কথা আর বাড়ে না। কেন বাড়ে না হাসিম জানে। লণ্ঠনের আলোতে যে সকল মুখ দেখছে, তাদের অনেকেই সুদে জাহেদ বকসুর টাকা ধারে। দোকানের মানুষগুলোর চোখমুখে হাসিম তেলীপাড়ার তেজেনের সে উচিয়ে ধরা প্রশ্নটিকেই দেখলো। আশ্চর্য, একটা মাত্র প্রশ্নের ভারে সকলে কেমন পশুর মতো বোবা হয়ে গেছে। তেজেনদা নিজের গলায় ফাঁসি লাগিয়ে হৃদয়ের রক্তে জীবনের জীবিকায় লীন সে প্রশ্নটিকে দিনের নিলাজ আলোতে তুলে ধরেছিলো। তেজেনদাকে এ সকল মানুষের তুলনায় অনেক সাহসী মনে হয় হাসিমের।

দোকান থেকে বেরিয়ে রসিদ আহমদের মুদী দোকানে গিয়ে দু’টাকার চাল-ডাল কিনে ঘরে চলে গেলো। এখনো সুফিয়া ঘরের দাওয়ায় বসে আছে। সাঁঝবাতিও জ্বালে নি। হাসিম জ্বালবে কিনা ভাবলো। যদি কেরোসিন না থাকে তা হলে খিটিমিটি লাগতে পারে। চাল-ডালগুলো সুফিয়ার সামনে রেখে সারিন্দাখানা হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসে। কতোদূর এসে পিছনে ফিরে তাকায়। সমাচ্ছন্ন অন্ধকারে সুফিয়াকে ভূতের মতো লাগে।

জাহেদ বকসুর বাড়ীতে সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। কড়া আলোকের প্যাটোম্যাক্স শোঁ শোঁ শব্দে জ্বলছে। দশ গেরামের মানুষ গান শুনতে ভেঙে পড়ছে। অভাব দুঃখ, অর্থনৈতিক অন্তদাহ… গাঁয়ের মানুষের সবটুকু প্রাণ শুষে নিতে পারে নি। গান দুঃখের রাজ্য থেকে, অভাবের রাজ্য থেকে এক বিচিত্র রাজ্যে নিয়ে যায়। সে এক বিচিত্র অনুভূতির রূপ-রাঙা জগত।

খাওয়া-দাওয়ার পর শুরু হলো গান। উপস্থিত মানুষেরা ঠিক করে দিলো সিদ্দিক গাইবে পুরুষের ভুমিকায়। নারী হবে হাসিম। আসরে প্রথম উঠেই সিদ্দিক হাসিমকে বেপরোয়া ভাবে খোঁচাতে থাকে। সুরটুকু বাদ দিলে যা থাকে, নির্জলা গালাগালি ছাড়া আর কিছু নয়। প্রত্যেক গানের মধ্যে ঘৃণা, অবজ্ঞা, বিদ্রূপ হাসিমের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দিচ্ছে। ছাগল দিয়ে হাল চাষ করতে পারলে মানুষ কেন গরু কেনে? হাসিম ছাগল আর সে গরু। এমন কি তার বাপকেও টেনে এনেছে। তার মা দাসী। বাপ বেনে। জন্মসূত্রে কপালে যে শীলমোহর পড়েছে তার থেকে এ জন্মে আর নিষ্কৃতি নেই। তাকে লোকে ঘৃণা করবে, বিদ্রূপ করবে, অবজ্ঞা করবে। মানুষের মর্যাদা তার ভাগ্যে নেই। কোনোদিন উদার চোখে পড়ার মানুষ তার দিকে চাইবে না। তেমন বিরাট প্রসারিত মন এদের কই? শেষে মিল দিয়ে গানের আকারেই গালিগালাজ করে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে তবলায় তাল ফুটছে। বেহালার করুণ রাগিণী কেঁদে কেঁদে এ অশ্লীতার প্রতিবাদ করছে। আর মানুষ… উঠোন ভর্তি মানুষ বীভৎস উল্লাসে হাত তালি দিচ্ছে। কে একজন উৎসাহের অতিশয্যে বলে উঠলো, “বাঃ বাঃ সিদ্দিক, বানিয়ার জাতরে ধুই ফেলা, বাপের বেড়া।” (বাঃ সিদ্দিক, বেনের জাতকে ধুয়ে ফেলো বাপের বেটা।)

এসব ঠাট্টা-বিদ্রূপ বিছুটি পাতার মতো লাগে এসে হাসিমের শরীরে। জ্বালা করে। চেতনায় সীসার বলের মতো আঘাত করে।

সিদ্দিক বলে পরে কম্পিত কলেবরে হাসিম সারিন্দা হাতে উঠে দাঁড়ায়। সারা শরীর তার কাঁপছে। চোখ ফেটে বার বার কান্না বেরিয়ে আসতে চায়। সিদ্দিকের স্কুল রসিকতায় যাদের মন ভরেছে তারা কি তার বিনম্র আবেদন, অন্তরের স্বগতোক্তি কান ভরে শুনবে। কাঁপা কাঁপা স্বরে গানের কলি উচ্চারণ করে। পয়লা আল্লাহর নাম, রসুলের নাম দেবী সরস্বতীর বন্দনা করে ওস্তাদ গুরুর নাম স্মরণ করলো। সভার দশজনকে সালাম নিবেদন করে শুরু করলোঃ

“দয়া করো প্রভু তুমি দয়ার মহিমা
দীনহীন সন্তানে ডাকে পুরাও বাসনা গো।”

সারিন্দার তারে মৃদু আঘাত করলো। মুহুর্মুহুঃ ঝঙ্কারে নিপুণ হাতের স্পর্শে নাগেশ্বর কাঠের সারিন্দা বেজে উঠলো গুন গুন। নাগেশ্বর কাঠের কুঁদানো সারিন্দায় বুকের ভেতরের দুঃখে দুঃখে, বেদনায় বেদনায় ফোঁটা রক্তপদ্ম কণ্ঠভরা রক্তাক্ত সুষমায় জেগে উঠলো। ফুলের স্তবকের মতো ফুটে উঠতে থাকলো গানের কলি। প্রথমে ধীরে, খুব ধীরে, তারপর উঁচুতে আরো উঁচুতে চড়তে লাগলো গলার স্বর । হৃদয়ের ফেনিল কান্না, উদ্বেল বেদনা বাসনা পুস্পল গানের আকারে ঝেড়ে ফেলতে চায় হাসিম। বারংবার সারিন্দার কম্পমান তারে টুংটাং কেঁদে যাচ্ছে একখানি অভিমানী নারী-হৃদয় যেন। কোন দংশন, কামড় নয়, অশ্লীলতা, অপবাদ নয়; ব্যথা, শুধু ব্যথাই সভাজনের কাছে করুণ মিনতির উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ছে।

লোকগুলো শুনছে কেবল শুনছে। হাততালি দিচ্ছে না কেউ, টিপ্পনী কাটছে না কেউ, অবাক হয়ে মুগ্ধ হয়ে শুনে যাচ্ছে। বুকের সীমান্ত অবধি হাতড়ে দেখে গানের সুরে সুরে। তাদের ঘরের নারীদেরও এমনি স্বপ্ন-কল্পনা অভাবের আগুনে মাঠের ফসলের মতো পুড়ে যাচ্ছে। তাদের রক্তের ঢেউ ফোঁটা আকাঙ্ক্ষার কাহিনী নির্মম বাস্তবতার আঘাতে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। সুর সারিন্দায় মন্দ্রিত ধ্বনিতে, অনর্গল হাসিমের কণ্ঠ দিয়ে বেরিয়ে আসছে। নিস্তব্ধ সভার মধ্যে থেমে থেমে কাঁদছে। সারিন্দার ধ্বনি। সে দরদে অবাক তারার দৃষ্টি মিটি মিটি কাঁপছে।

গান যখন শেষ হলো তখন অনেক রাত। চাঁদের আলো নিভে গেছে। বুকের সূচীমুখো সুতীক্ষ্ণ যন্ত্রণার শিখার মতো আসমানে কম্পিত, শিহরিত অসংখ্য তারা জেগে আছে। সুলতান কিংবা গণি কারো দেখা পেলো না। দু’টো টাকা তার উসুল হলো না।

আর উসুল হবে না। সারিন্দাখানা মরা লাকড়ির মতো কাঁধে ফেলে ঘরে ফিরছে হাসিম। অসম্ভব ক্লান্ত।

কামারের হাঁপরের মতো বুকের ভেতরটা অসম্ভব উত্তপ্ত মনে হয়। নিঃশ্বাসে রক্ত ঝরে যায়। যে সারিন্দা হৃদয়ের প্রিয়তম দোসরের মতো সাড়া দিয়ে কেঁদেছে, এখন বড়ো বেশি বেদরকারী আর বড়ো বেশী ভারী মনে হয়।

মসজিদ ভিটা পেরিয়ে যেতে পাশাপাশি তার বাপ-মার কবর জোড়া চোখে পরে। আপনা আপনি চোখের পানি বেরিয়ে গন্ডদেশ ভিজিয়ে দিয়ে যায়। এর উৎস কোথায় জানে না হাসিম। বরগুইনির পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে এই বরগুনিতে তির তির ধারার একটি প্রবাহ ছিলো। বর্ষার পানি খেপা বাদ্যানীর মতো মাঠে মাঠে খেলা করতো। এখন স্রোতহীন, প্রবাহহীন বরগুইনি অনন্ত তৃষ্ণার একখানি লকলকে জিহ্বার মতো লোকালয়গুলোকে জড়িয়ে পেচিয়ে পড়ে আছে। এখন তার বুকে রেতী বালু চর খচ খচ করে। ধু ধু বালুকাময় বরগুইনির বুকের মতো হাসিমের বুক। ব্যাথা টন টন করে। অনেক রাত হয়ে গেলো। কালকেও পাহাড়ে যেতে হবে।

কবরস্থান ছাড়িয়ে বাঁ দিকে বাঁক ঘুরবার সময় আচমকা থমকে দাঁড়ায়। বড় আমগাছটার ধার ঘেঁষে কে একজন দাঁড়িয়ে আছে। শাড়ির আঁচলের একপ্রান্ত কলার পাতার মতো বাতাসে অল্প অল্প দুলছে। আবছা অন্ধকারে কেমন ছায়ামূর্তির মতো মনে হয়। সারা গা ছমছম করে। ভীত-বিহ্বল হাসিম ধীরে ধীরে পা বাড়িয়ে এগিয়ে যায়। ভয়ে ভয়ে পাশ দিয়ে চলে যাওয়ার সময় ছায়ামূৰ্তি কথা কয়ে উঠেঃ

“হাসিম বাই, তাড়াতাড়ি আইও। আঁর ডর লাগের দে।” (হাসিম ভাই তাড়াতাড়ি এসো, আমার ভয় করছে।)

“জোহরা এতো রাইতে তুই?” হাসিম জিজ্ঞেস করে।

“হ হাসিম বাই, তোঁয়ার গীত হুনিবার লয় আসিলাম দে। গোয়াল ঘরের পিছদি লুকাই হুন্যি। শেষ অইবার আগে চলি আস্যি। যাইতে ডর লাগে দে” (হাঁ হাসিম ভাই, তোমার গান শোনার জন্য এসেছিলাম। গোয়াল ঘরের পিছনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছিলাম। শেষ হবার আগেই চলে এসেছি। এখন যেতে ভয় করছে।)

তারা দুজন পাশাপাশি হাঁটতে থাকে। হাসিমের চেতনার গভীরে একটা খুশি খুশি ভাব জেগে উঠে। সে সঙ্গে ভয়ও। রক্তের সঙ্গে এমন কিছু পদার্থ জড়িয়ে থাকে, কাউকে দেখলে আপনা থেকেই নেচে উঠে। খলু মাতুব্বরের ভাতিঝি জেহরা। রাতের অন্ধকারে পাশাপশি হাঁটছে। কেউ যদি দেখে ফেলে! সুফিয়ার মুখখানা মনে পড়ে। এ মুহূর্তে সে সব কিছু ভুলে থাকতে চায়! আনন্দের অঙ্কুর তার স্নায়ুকেন্দ্রে। হাসিম এ অনুভূতিটুকু শিল্পীমনে সঞ্চয় করে রেখে দিতে চায়।

২. বৈশাখ যায় যায়

বৈশাখ যায় যায়। বৃষ্টি নামে না। বরগুইনির দু’পাড়ের কৃষকদের মনের বাম্প আকাশে কালো মেঘ হয়ে দেখা দিলো না। কালো মেঘের আঁচল চিরে নেমে এলো না সুশীতল বারিধারা।

তারা আল্লাহর আরশের উদ্দেশ্যে করুণ মিনতি জানালো। আসমানের আল্লাহ প্রার্থনায় সারা দিলো না। সারা জাহানের মালিক কৃপণের মতো আরশের সিংহাসনে গাঁট হয়ে বসে রইলেন। তার মনে লেশমাত্র করূণা নেই। আখেরী জমানা দুনিয়াটা দিনে দিনে বুড়া হয়ে যাচ্ছে। মানুষের হায়া শরম আর ঈমান বলতে কিছু অবশিষ্ট নেই। সে জন্য দীন-দুনিয়ায় দো জাহানের মালিক তার সমস্ত মায়া সমস্ত মমতা মাটির খাঁক থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছেন। বুড়োবুড়িরা মন্তব্য করলো কেয়ামতের আর বেশী বাকী নেই। নয়তো বৈশাখের সতেরো তারিখে বিয়ে হয়ে গেছে গাজী কালুর, এখনো নামলো না বৃষ্টি?

তাদের ধারণা–পীর কুলের মধ্যমণি, ফকির কুলের শিরোমণি গাজীকালুর বিয়ে হয় বৈশাখের সতেরো তারিখে। বৌ করে রাজার ঝি চম্পাবতাঁকে ঘরে নিয়ে আসবেন। সতেরো তারিখেই সাঙ্গোপাঙ্গো নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাত্রা করেন। কালো মেঘ ঢোলক বাজায়। বিজলী আলোক জ্বালায়। বিয়ের উৎসবে বঙ্গোপসাগর হতে উঠে আসা কালবৈশাখীর মৌসুমী ঝড় কেশর ফোলা সিংহের প্রমত্ত গর্জনে উড় মাটি চুর করে, এঁটেল মাটি ধুলো করে। সকলে বলে আমাদের গাজী পীর বিয়ে করতে যাচ্ছেন। রাজার দুলালী চম্পাবতীর তাবৎ শরীরে পাঁচটি ফুলের ভার। পঞ্চফুলের ওজন ফুলের মতো রাজকন্যার বিয়ের যোগাড়যন্তর শেষ-সমাপ্ত প্রায়। তখন ভেঙে গেলো বিয়ে। চম্পাবতীর চাঁপা বরণ গায়ের রঙ গাজীর মায়ের মনে ঈর্ষা জাগায়। ভাংচি দেয় মা। ভেঙে যায় বিয়ে। মাতৃভক্ত সন্তান মায়ের কথামতো চলে আসে। আবিয়েতা চম্পাবতী মনের দুঃখে কাঁদতে বসে। মনের জ্বালা আকাশে মেঘ হয়ে জমে… বৃষ্টি হয়ে গলে পড়ে। সারা জীবন কুমারী থাকার অনুক্ত বেদনা বৃষ্টির ধারায় ঝড়ে পড়ে। ফি বছর এমনি হয়। যতোদিন পৃথিবী থাকে এমনিই হবে। তা না হলে সৃষ্টি রক্ষা পাবে না। মানুষ কেমন করে চাষাবাদ করবে? একমাত্র কেয়ামতের দিন গাজী পীর রাজার কন্যা চম্পাবতাঁকে বিয়ে করতে পারবে, তার আগে নয়।

কবে চলে গেছে বৈশাখের সে সতেরো তারিখ। এবার অজন্মার বছর। তাই গাজী পীর আর বিয়ে করতে যান নি। গেলেও চুপি চুপি গেছেন। মাতৃভক্ত সন্তানের পৌনপুনিক কাপুরুষতার কথা সকলকে জানান দিতে হয়তো লজ্জাজনক মনে করেছেন পীর সাহেব। তাই অতো শান-শওকত করেন নি। কেউ একজন মন্তব্য করলো, এ অজন্মার বছরে, গাজী পীর অতো বড়ো পীর হয়েও বেফজুল হিসেব পত্তর করতে সাহস করেন নি।

বুড়ো-বুড়ীরা বৈশাখের শেষের দিকে সূর্যের হলুদ শিখায় কেয়ামতের নমুনা দেখতে পেলো। এবার আর তারা নিশ্চেষ্ট বসে থাকতে পারে না। খোদার দরবারে মোনাজাত করে। আরশের খোদা বান্দার দিকে মুখ তুলে চাও… তুমি না চাইলে তারা যে বাঁচবে না। বরগুইনির পাড়ের আদম সন্তানের কেউ নেই দয়াল প্রভু তুমি ছাড়া, তোমার রহমত ছাড়া তাদের কিছু সম্বল নেই। তারা লেখা পড়া জানে না চাকরী করে না, দূর-বিদেশ চিনে না, ব্যবসা কেমন করে করতে হয় জানে না। তারা আছে বাবা আদমের লাঙল নিয়ে বরগুইনির পলিমাটি আঁকড়ে। তুমি যদি তোমার রহমতের চোখ মেলে তাদের পানে না তাকাও, তারা যে মরে যাবে। ওগো আল্লাহ! অতো নিষ্ঠুর হয়োনা তুমি। দাও, দাও, মাটি ভিজিয়ে দাও। বৃষ্টি দাও। একশো মোল্লা মৌলানা দিয়ে ধূ ধূ করা বিলে খতম পড়ানো হলো। খতম পড়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাছুরকে দুধ খেতে দিলোনা গেরোস্ত। বুকের শিশুকে স্তন্য দিলো না জননী। আগে খতম শেষ হোক, আসমানে মেঘ উঠুক। কালো মেয়ের কালো যৌবনের মতো মেঘ। কিন্তু বিষ্টি হলো না। বিষ্টির আগমনী গান গেয়ে পাড়া পাড়া চাঁদা তুলে বেড়ালো জোয়ান-বুড়োঃ

“কালা মেঘা ধলা মেঘা তারা সোদর ভাই
এক লাচা ঝড় (বৃষ্টি) দে ভিজি পুড়ি যাই।”

শির্ণী-সালাত অনেক করা হলো। কিন্তু বৃষ্টি নামলো না। কেয়ামত–সাক্ষাৎ কেয়ামত। সূর্যের শিখা দিনে দিনে হলুদ হয়ে উঠছে। পৃথিবীতে আগুন উঠবে–আগুন ছুটবে পৃথিবীতে। আকাশের আগুনে বুকের আশা জ্বলে গেলো। এখনো আউশ ধান বোনে নি। সারা বছর পেটের দাবী, আধসের চালের সে মহাজনকে কি করে- যে বুঝ দেবে। সন্তান বউকে কি খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখবো। সমস্যা–মস্ত সমস্যা।

জ্যৈষ্ঠের মাঝামাঝি বৃষ্টি নামলো। কালো জলবাহী মেঘ ভারে নত হয়ে মধুর চাকের মতো ঝুলে পড়লো। শুরু হলো বর্ষণ। রাত নেই, দিন নেই। বর্ষণ সে কি বর্ষণ! সাত-আট দিন ধরে অবিরাম বৃষ্টি। চোখ মেলবার উপায় নেই। চাষীরা লাঙল-জোয়াল কাঁধে ফেলে মাঠের দিকে ছুটলো। বৃষ্টির পানি পেয়ে পলিপড়া মাটি ফকফকে হয়ে আছে। লাঙলের ধারালো ফলার ঘায়ে নরম মাটির বুক চিরে ফেলে। ধান ছড়াবার সময় চলে গেছে। এখন অঙ্কুরিত ধান চাষ জমিতে ফেলে জালা করতে হবে। কচি ধানের চারা। যেগুলোকে তারা বলে জালা একগাছি দু’গাছি করে সারি সারি রোপণ করতে হবে। শত অভাব, দুঃখের মধ্যেও গলা দিয়ে বেরিয়ে আসে

গানঃ

“দেশ মরি গেল দুর্ভিক্ষের আগুনে
তবু দেশের মানুষ জাগিল না কেনে।”

কেন যে দেশের মানুষ জাগে না হাসিমের জানার কথা নয়। কবিয়াল ফনি বড়ুয়া গান বেঁধেছিলেন। কবিয়ালের কথাই সত্য। দেশ দুর্ভিক্ষের আগুনে জ্বলে গেছে, পুড়ে গেছে। তার পরেও দেশের মানুষ জাগছে না কেন? ঝিলিক মেরে চোখের সামনে তেজেনদার চোখ দুটো ভেসে উঠলো। মৃত নিথর চোখের ছুরির ফলার মতো অন্তরের অতলস্পর্শী জিজ্ঞাসাটি হাসিমকে ডাক দিয়ে অনেক দূরে নিয়ে যায়। মাঝে মাঝে এসকল কথা মনে ঘুরে ঘুরে কেন যে পানির ভাষায় বেজে উঠে হাসিম তার হদিশ পায় না। হাত দুটো কাদার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে চুপ করে থাকে। দলা দলা কাদা তুলে নিয়ে আল বাঁধতে ভুলে যায় সে। কিছুই দেখতে পায় না। কেবল দেখে হাতির মতো বলশালী তেলীপাড়ার তেজেনের বাঁকানো দৃষ্টি হাজার হাজার ভগ্নাংশ হয়ে জীবনে জীবনে মিশে গেছে।

“এই বানিয়ার পুত, মাইনসে কয়; ‘হাত-পাঁচ গুণ্যা চাষ নগরে ব্যান্যা।‘ কি গরসদে, তোরে দি চাষের কাম ন অইবো।” (অই বেনের ছেলে কি করছিস, লোকে বলে সাত পাঁচ হিসাব করে বেনেরা চাষ করে না। তোকে দিয়ে চাষের কাজ হবেনা।)

আমজুর চীৎকারে চেতনা ফিরে আসে। হাঁ, সাত পাঁচ ভেবে স্বর্ণ বণিকেরা চাষ করে না। অপরকে দিয়ে করায়। চাষ করার দরকারটা কি? সোনাতে পেতল মিশিয়ে বেচে ডবল ডবল লাভ করে। দশ-বিশ গেরামের বউয়ের নাক-কানের সোনা তাদের লোহার সিন্দুকে আটক থাকে। মাসে মাসে সুদ বাড়ে। সুদ সুদ বিয়ায়। এসব স্বর্ণ বণিকদের লোহার সিন্দুকে চাষী গোরোস্তের প্রাণ-ভভামরা বন্দী হয়ে থাকে। তবু মুসলমান চাষীরা বেনেদের বাবু বলে ডাকে। একখানি জমি এক সন চাষ করার জন্য সারা বছর ভেট বেগাড় বয়ে বেড়ায়। দু’আনা সুদ কম দেবার জন্যে দশবার হাতে-পায়ে ধরে। আসল যারা বেনে বাবু, সে মুসলমান তার বাবা নয়-বাবার বাবা বেনে ছিলো বলে তাকে ‘বানিয়ার পুত’ বলে ডাকে। এ সমাজের মানুষের সংকীর্ণতা, অনুদারতা, মমতাহীনতা তার বুকে কাঁসার ঘন্টার মতো বাজে। না সে আর আল বাঁধবে না। প্যাক মাখা হাত দুখানি বিলের পানিতে ধুয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে আসে। তাকে চলে আসতে দেখে আমজুর ছেলেটি চীৎকার করে বললোঃ

“বা-জান, বানিয়ার পুত যায় গৈ।” (বাপজান, বেনের ছেলে চলে যাচ্ছে।)।

“যউকদে হালা মালাউনের বাইচ্চা, একবারে ধুতা বলদ, কন কামের নয়।” (যায় যাক শালা মালাউনের বাচ্চা। হিন্দুদের সম্বন্ধে ঘৃণাসূচক উক্তি।) একেবারে অলস বলদের মতো। কোন কাজে আসে না জবাব দিলো আমজু।

সেই-যে চলে এসেছে তারপরে হাসিম আর কারো মাঠের কাজে মজুর খাটতে যায় নি। আকাশ ফুটো হয়ে বৃষ্টি ঝরছে। বাইরে বেরোবার উপায় নেই। পাহাড়িয়া পথ-ঘাট পিছল হয়ে আছে ভয়ানক রকম। একবার যদি পাহাড়ের ধার বেয়ে উঠতে গিয়ে পড়ে যায়, এ জীবনে কোনোদিন উঠে বসে খেতে হবে না। তবু হাসিম পাহাড়ে যায় প্রতিদিন। ছড়িতে ঢল নেমেছে। হাঁসের মতো সাঁতার কেটে পেরোতে হয়। পাহাড়ে জীবনের রহস্যের সমাধান খুঁজে পায়। তাকে দেখে পাড়ার মানুষ হেসে ওঠে। মজুর পাওয়া যাচ্ছে না। দিনমজুরী তিন বেলা খেয়ে আড়াই টাকা তিন টাকার নীচে না। হাসিম পাহাড় থেকে বাঁশ এনে দু’টাকার বেশি পায় না। তার বোকামীর জন্য লোকে হাসে। তার নির্বুদ্ধিতায় তারা আমোদ পায়, সে কথা হাসিম জানে। কিন্তু কেন, সে কথা বুঝিয়ে বলতে পারবে না; খুলে বলতে পারবে না। পাহাড় তাকে কষ্ট দেয় বটে, সে কষ্ট কিছুতেই মানসিক নির্যাতনের সমান নয়। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হৃদয়কে রক্তাক্ত করতে জানে না ধানী মৌনী নীলশৃঙ্গবিশিষ্ট পাহাড়।

বৃষ্টি অবিরাম ঝরছে। উপায় নেই চোখ মেলবার। হাসিমের সেদিন বাশ কাটার পাশ ছিলো না। ফরেস্টারের দৃষ্টি ফাঁকি দিয়ে ঘুরতি পথে আসছিলো। থমথমে গুমোট আকাশে বিরাম-বিহীন বিষ্টি। বনের ভেতর শ্বাপদের থাবার মতো সন্ধ্যা নামছিলো। তাড়াতাড়ি হাঁটছিলো হাসিম। চড়াই বেয়ে নামতে গিয়ে হাত দেড়েক লম্বা কাটা বাঁশের চোখা একটি ফালি তার পায়ের তলা দিয়ে সেঁধিয়ে পাতার ওপর দিয়ে বেরিয়ে আসে। উঃ করে বসে পড়ে! কাঁধ থেকে কাঁচা বাঁশের ভারটা সটকে পড়ে। চিরকি দিয়ে ছোটে রক্ত। ফিনকি দিয়ে প্রবাহিত হয়। টকটকে, লাল তাজা রক্ত। জীবনের জীবনী রস। হাসিমের মাথা ঘুরতে থাকে। এ দৃশ্য দেখতে পারে না চোখ দিয়ে। কোমরের গামছা খুললো। দু’হাতে শরীরের সমগ্র শক্তি জড়ো করে হেঁচকা টানে বিধে যাওয়া ফালিটি বের করে নিয়ে আসে। তারপর কিছু লতাপাতার রস চিপে গামছাতে কষে ক্ষতস্থান বেঁধে পাথুরে পথ রক্তে রাঙিয়ে চলে এসেছিলো। কেমন করে চলে এসেছিলো সে কথা হাসিম বলতে পারেনা। ঘরের কাছে এসে দেখে বরগুইনিতে কুলফাটা ঢল। আশ্চর্য জীবনীশক্তি, জীবনতৃষ্ণার তাগিদে সাঁতার কেটে এপাড়ে এসে ঢলে পরছিলো। তার পর আর জানে না। জ্ঞান ফিরেনি তিন দিন।

চার দিনের দিন জ্ঞান ফিরলো। নড়তে চড়তে পারে না। সারা শরীরে ধান দিলে খৈ ফোঁটার মতো বেতাপ জ্বর। জখমী পা-টা ফুলে ঢোল হয়ে আছে। বেলা ভাটির দিকে জ্বর আসে। হাড় কাঁপানো জ্বর। সারারাত দুঃসহ যন্ত্রনায় কঁকায়। দিনের দিকে জ্বর ছেড়ে যায়। সুফিয়া অম্লান বদনে সেবা করে। পায়ের পট্টি বদলায়। গাছ গাছড়ার পাতা, মূল শেকড় পিষে ক্ষতস্থানে প্রলেপ লাগায়। সারাদিন বসে থাকে শয্যার পাশে। পায়ের ফুলাতে টোটকা ওষুধের প্রলেপ দেয়। মানকচু পাতা গরম করে সেঁক দেয়। বিষ্টি থামার নাম গন্ধ নেই। ঘরের শনের পচা চালের ফুটো দিয়ে জল ঝরছে। সমস্তটা আঙ্গিনা থিক থিকে কর্দমাক্ত হয়ে গেছে। ফাঁকা জয়গা কোথাও নেই। দু’চোখ বুজে বুক ভরা বেদনা আর শরীর ভরা ব্যথার গভীর আস্বাদ গ্রহন করে হাসিম। কলজে ধরে টান দেয় বেদনার শৃঙ্খল। এ সেই বেদনা শরীর থেকে আলাদা করে পাথরে ছেড়ে দিলে পাথর ক্ষয় করে ফেলবে। তেমনি গভীর, চোখা সর্বব্যাপ্ত বেদনা। চেতনার প্রতিভাসে আলোকিত হয় কতকিছু।

বাপের কথা মনে হয়। মার কথা। কাছের অতীত… দূরের অতীত আজ হাসিমের চেয়ে বড়ো বেশি দৃশ্যমান। স্মৃতির উৎস গভীর খুবই গভীর। প্রথম যে মানুষ তার জন্মের হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীতে সংগ্রামী চেতনায় জন্ম নিয়েছিলো তার খবরও ধরে রেখেছে স্মৃতি।

হায় রে বাপ! গোকুল ধরের কনিষ্ঠ সন্তান। কোনদিন কী কুক্ষণে কাজী বাড়ির রহমত কাজীর মেয়ে জরিনাকে দেখে মজেছিলো! তার বাপের হিতাহিত, জাত বিচার ভুলিয়ে–দেয়া সুন্দরী নারী জরিনার একটি ছবি মনের ভিতরে খাড়া করতে চেষ্টা করে। জরিনা কি খুব সুন্দর ছিলো? তার চোখ দুটো কেমন ছিলো? সুন্দরী দেখেই কি তার বাপ পতঙ্গের মতো উড়ে এসেছিলো? শুধু কি সৌন্দর্য? নাকি আরো কিছু ছিলো? হয়তো ছিলো কিন্তু হাসিম কোনো দিন জরিনাকে দেখে নি।

বাঁশখালী থানার কালীপুর গ্রামে গোকুল ধরের কনিষ্ঠতম সন্তানের বিয়ে ঠিক হয়েছিলো। বিয়ে করলো না তার বাপ। ছিটকে বেরিয়ে এলো। প্রেমের তাগিদে বেরিয়ে আসা জনকের স্মৃতিতে মনটা তার ফলভারে নত নম্র গাছের মতো নুয়ে আসে। তার বাপ হরিমোহনের সমাজ ছেড়ে বেরিয়ে আসার কাহিনী গ্রামে পল্লবিত হয়ে ছড়িয়ে আছে। সে কথা হাসিমের চেতনায় লজ্জা, দুঃখ, ক্ষোভের সহযোগে স্তরে স্তরে সঞ্চিত আছে।

কাজী রহমতের তখন বড়ো টাকা-পয়সার টানাটানি। ঘুষ-ঘাস খেয়ে, গাঁয়ে মামলা-মোকদ্দমা লাগিয়ে শরাফতির ভড়ং বজায় রেখে কোনো রকমে চালাচ্ছিলো দিন। চরিত্রের বলিষ্ঠতা, প্রতিপত্তির ব্যঞ্জনা মরে গেছে সে কতোকাল আগে। যতো রকমে সম্ভব অন্যায় করেই যাচ্ছিলো রহমত। শাশুড়ীর বিছানায় জামাইকে শুইয়ে যে লোক ঠাট বজায় রাখে সে কাজী সাহেব শুনলো। শুনে জোড়া চোখে দপ্ দপ্ করে জ্বলেছিলো লোভলালসা। আগের দবদবা রবরবা থাকলে কাফেরের সন্তানকে কতল করে ফেলতো। পচা অভিজাত রহমত কাজী শুধু মনে মনে একটা ফন্দি এঁটে চুপচাপ রইলো। কাজী রহমতের ছোট চোখ আরো ছোট হয়ে যে অবর্ননীয় একটি ভাবের সঞ্চার হয়েছিলো, তাই কল্পনায় ভাসে। ধূর্ত শেয়ালের মতো চকচকে চোখবিশিষ্ট কাজী রহমতের ছবি চোখের সামনে জেগে উঠে। ছোটবেলায় কাজী রহমতের সে মুর্তি অনেকবার দেখেছে। শাদা শাদা খোঁচা খোঁচা আমের আটির কেশের মতো দাঁড়িগুলো। দুরভিসন্ধিতে কুটিল-কথা কইবার সময় কাঁপে।

যার এক কথায় মিথ্যা সত্য বনে যায়, সে কাজী রহমত সহচর কানা আফজালকে দিয়ে তার বাপ হরিমোহনকে ডাকিয়ে নিয়েছিলো। এসেছিলো তার বাপ। যদি না আসতো! আহা, যদি সে রাতে কাজী রহমতের বৈঠকখানায় না আসতো! হাসিম কিন্তু বিগত ঘটনার কথা ভাবছে। কাজী রহমত স্নিগ্ধ কণ্ঠে নাকি বলেছিলোঃ

“তয় বাজান মাইনসে নানান কথা কই বেড়ায়। আঁর খান্দানের ইজ্জত আছে। হেই কথা ভাবি চাইও। তারপরেও আঁই বেদীনরে মইয়া দিত পাইরতাম নয়। মুসলমান ত অইবা, বাকী কথা আফজালে কইবা।” [তারপর বাপজান, মানুষে নানা কথা বলে বেড়াচ্ছে। আর আমার বংশেরও তো একটা ইজ্জত আছে। সে কথা ভেবে দেখো। তাছাড়াও কিন্তু আমি বেদীনকে (বিধর্মীকে) মেয়ে দিতে পারবো না। তুমি তো মুসলমান হবে, বাকী কথা আফজল বলবে।]

হরিমোহন প্রতিবাদ করে নি। হাঁ, ঠিক, কাজী সাহেবের বড়ো বংশ, বড়ো খানদান, বড়ো ইজ্জত। মুসলমান হলেও হরিমোহনকে মেয়ে বিয়ে দেবার পথে অনেক বাধা। বাদবাকী কথা কানা আফজল মর্তমান কলার ঝাড়টার কাছে নিয়ে কানে কানে বলেছিলো। সে কথায়ও রাজী হয়েছিলো তার বাপ। হায় রে প্রেম! তারপর একদিন চাঁদনী রাতে কানা আফজলের সাক্ষাতে আধসের পাকা সোনা আর দু’হাজার মহারাণীর ছবি আঁকা রূপোর টাকা মেয়ে জরীনার দাম স্বরূপ কাজী রহমতের হাতে তুলে দিয়েছিলো। গোপনে… অত্যন্ত গোপনে। গোপনও সময়ের পরিশেষে দল-পাপড়ি মেলে। সে কাজী রহমতই নেই, কাজী বাড়ির দবদবা রবরবা এখন ধুলোয় লুণ্ঠিত তাদের ঘাড়ে পা রেখে কানা আফজলেরা মাথা তুলছে। কানা আফজল এখন আলহাজ্ব আফজল আহমদ চৌধুরী। মান্যগণ্য ব্যক্তি, ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। চেহারাতে চেকনাই লেগেছে। পোষাকে রুচি ফিরেছে। কিন্তু স্বভাবটা ঠিক আগের মতো আছে।

তারপরে একদিন বাগিচার হাটের বড়ো মসজিদে গিয়ে ইমাম সৈয়দ সাহেবের হাতে হাত রেখে কলেমা পড়ে মুসলমান হয়েছিলো। দশ গ্রামের মুসলমান তাকে কেন্দ্র করে উৎসবে মেতে উঠেছিলো। বাজী পুড়িয়ে ইসলামের জয়ধ্বনি ঘোষণা করেছিলো। হিন্দু ধর্মের অসারতা নিয়ে জোড় বক্তৃতা দিয়েছিলো। গরু জবাই করে জেয়াফত দিয়েছিলো। ইচ্ছে ছিলো হিন্দুদের মাথা চির জীবনের জন্য হেঁট করে দেবে।

মৌলানা সাহ্বে শাদা ফ্যাড়ফ্যাড়ে দাড়ি নেড়ে নেড়ে হাজেরান মজলিশের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন উর্দু ভাষায়ঃ

“এসলাম জিন্দা হোতা হ্যয় হর কারবালা কি বাদ।” (প্রতি কারবালার পরেই ইসলাম ধর্ম নবজীবন পায়।)।

হরিমোহনের নতুন নামকরণ হলো মুহম্মদ ইসমাইল খান।

টাকা আর সোনা নেয়ার রাতে কাজী রহমত নিজের মেয়েকে তার কাছে বিয়ে দেয়ার একটা তারিখও হরিমোহনকে দিয়েছিলো। নির্দিষ্ট তারিখেই পাশের গ্রামের শিকদার সাহেবের ছেলের সংগে জরীনার বিয়ে দিয়ে দিলো এবং সে দিনেই তার বাপের সংগে তার মা–মানে কাজী বাড়ির বাঁদির বিয়ে পড়িয়ে দিয়েছিলো। কি চেয়েছিলো? আর হয়ে গেলো কি? মুসলমান হলো, মুসলমানি নাম নিলো, তবু কেন হরি ব্যান্যা ডাকতো তার বাপকে। তার মা বাঁদী। আর বাপ বেনে।

তার পরিচয় মুসলমানের কাছে ব্যানার পুত, হিন্দুদের কাছে কি তা জানার অবকাশ হয় নি। কারণ তারাও নৃশংস কম নয়। বাপের প্রতি সমবেদনায় মনটা তার মেদুর হয়ে যায়। লোকটা সারা জীবন ধরে যে মানসিক নির্যাতন সহ্য করেছে তার কি কোনো তুলনা আছে?

ফুলশয্যার রাতে গলায় বেনারসী শাড়ী দিয়ে, দড়ি পাকিয়ে ফাঁসি দিয়ে আত্নহত্যা করেছিলো জরীনা। সে অব্যক্ত বেদনার গুরুভারও তার বাপকে বইতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, কাজী বাড়ীর দাসী বিয়ে করে দাস হিসেবে জিন্দেগী কাটাতে হয়েছে। সন্তান জন্ম দিতে হয়েছে। নির্মম নিষ্ঠুরতার আঘাতে প্রতি পলে ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাওয়া জীবন তার বাপের। বান্যা পুকুরের বটগাছে লটকানো তেজেনদার চোখের জিজ্ঞাসার ছুরি তার বাপের মর্মে আমুল বিঁধে গিয়েছিলো যেনো। একবার আহা করবার সুযোগও পায়নি। অতীতের ছায়ামূর্তিগুলো তার সামনে নির্দিষ্ট গতিপথে নিজের নিজের ভঙ্গীতে প্যারেড করে যেন চলে গেলো। সকলে মিলে তার জীবনের যে গতিপথ নির্দিষ্ট করেছে, সে পথেই তাকে আমরণ হাঁটতে হবে। নির্দিষ্ট গন্ডী ভেদ করে কোনদিন সে উদার আকাশের তলায় এসে দাঁড়াতে পারবে না। নিজের অস্তিত্বের চারপাশে দেয়ালের মতো নিরেট কঠিন বাধা অনুভব করে। হাজার আঘাতেও পথ দেবে না।

মনের গভীরে সঙ্গোপনে ক্ষীণ স্পষ্ট একটি আলোক শিখা জেগে ওঠে। এই চেতনাই তার হাতিয়ার। এরই আলোকে পথ দেখে দেখে অত্যাচার অবিচার সয়ে সয়ে সে এতো বড়ো হয়েছে। হাসিম স্পষ্ট দেখতে পায়, মানুষের নীচতা, ক্ষুদ্রতা আর ভণ্ডামীর সীমা কতদূর। নিজেকে সময় নির্যাতিত মানব জাতির প্রতীক বলে মনে হয়। চেতনার শিখা আরো প্রোজ্জ্বল, সন্ধানী রশ্মি আরো তীক্ষ্ণতর হয়। আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো শৃঙ্খলকে চোখের সামনে তুলে ধরে। নিজের অস্তিত্বের চার পাশের দেয়ালটাকে আরো স্পষ্টভাবে দেখতে পায়। শরীর উত্তেজনায় আন্দোলিত হয়, মাথায় ছলাৎ ছলাৎ রক্ত ওঠে। সে চিৎকার করে ওঠে।

“এই দেয়াল আঁই ভাইঙ্গম”
এই দেয়াল ভাঙবো আমি।

উত্তেজনার মুহূর্তে জখমো পা’টাতে টান লেগে ব্যথিত হয়ে ওঠে সারা শরীর। মা গো! বলে বলে অস্ফুটে চীৎকার করে। পৃথিবীতে কোনো কিছু, কোনো বাদ্যযন্ত্র কোনো সুর সে যাতনাকে ধরতে পারবে না। সুফিয়া ছুটে আসে তাড়াতাড়ি। পায়ের পট্টি বদলায়। বাটা ঔষধের প্রলেপ লাগায়। হাসিম চুপচাপ মরার মতো নিঃশব্দে পড়ে থাকে।

দীর্ঘ আটদিন পরে বিষ্টি থামলো। আকাশে সোনার বরণ রোদ হেসেছে। বিকেল বেলা। উঠানের কাঁঠাল গাছটিতে দুটি চড়ুই পাখি কিচিরমিচির ডাকছে। হাসিম এক পায়ে ভর করে কোনো রকমে দাওয়ায় এসে মাদুরের উপর বসে। সূর্যের গালানো সোনা দু’চোখে পান করে মনের অলিগলি খুশিতে ভরে ওঠে। মনের ভেতর আলোর ঝরনা বয়ে যাচ্ছে… তার ভাষা নেই কোনো। প্রকৃতির সঙ্গে মনের এ সংযোগ কতো সহজ, কতো স্বাভাবিক। মনে মনে এর একটা অর্থ খুঁজতে চেষ্টা করে। এই যে আকাশ, এই যে গাছপালা, এই যে সূর্য কেমন প্রিয় বন্ধুর মতো তার সমগ্র সত্তা নিবিড় মেহের আবরণে পরম মমতায় আচ্ছাদিত করে রেখেছে।

কাঁঠাল গাছের তলা দিয়ে আসছে জোহরা। তার সুগৌর ফর্সা মুখমন্ডলে শেষ বিকেলের ছটা লেগে অপরূপ দেখাচ্ছে। চুল বাঁধেনি। রুক্ষুচুলে এলোলামেলো জোহরার চেহারার মধ্যে বিষণ্ণ সৌন্দর্যের আমেজ। চোখ দুটো টলো টলো। মুখের ওপর থমকে আছে একটা কান্নার আবেগ। হাসিম ডাকে।

“আয় বইন, আয় বয়।” (এসো বোন, এসো, বসো।)

একখানা সিঁড়ি টেনে নিয়ে বসলো জোহরা। তার মুখে কোনো কথা নেই। রোগক্লিষ্ট যন্ত্রণাকাতর হাসিমও অনুভব করে জোহরা বড় দুঃখী। তার জোয়ান খসমটা মারা গেছে বিশ দিন আগে। চা বাগানে সাবের মতো অমন সুন্দর মানুষটা মাত্র এক সপ্তাহের জ্বরে মারা গেলো। মরার সময় নাকি জোহরাকে একবার চোখের দেখা দেখতে চেয়েছিলো। খলু মাতুব্বর ভাতিঝিকে যেতে দেয় নি। বিছানায় শুয়ে শুয়ে হাসিম জোহরার কথা শুনছে। পাড়া-পড়শী তার শয্যার পাশে টুকরো টুকরো আলাপ করছে এ বিষয়ে। স্মরণে জেগে আছে সে সব। রাশি রাশি শারীরিক মানসিক যন্ত্রণার তাপে চাপে হারিয়ে যায় নি। খলু মাতব্বর বলেছে, আইন মতে জোহরা কবীরকে কাজীর অফিসে গিয়ে তালাক দিয়েছে। সুতরং কবীর এখন বেগানা পুরুষ। শরীয়ত মতে বেগানা পুরুষের মরা মুখ দেখাও হারাম। হারামের জন্য জোহরা খসমকে দেখতে যেতে পারে নি।

আগে আরো দু’দুবার বিয়ে হয়েছে জোহরার। মাতব্বর মামলাবাজ, দাঙ্গাবাজ মানুষ। আগের দুখসমের মধ্যে একজনের জমি মামলা করে নিজের চাষে নিয়ে এসেছে এবং অন্য জনের নামে অলংকার ও খোর পোষের নালিশ করে সব কিছু আত্নসাৎ করেছে। তৃতীয়বার সাতবাড়িয়ার কবীরের সংগে জোহরার বিয়ে হয়েছিলো, গেলো ফাল্গুনের আগের ফাল্গুনে। জোহরার শ্বশুরের জমি নিয়ে মামলা মকদ্দমা চলছিলো। জোহরা অশান্তিতে আছে এ অজুহাতে নাইয়র এনে আর শ্বশুরবাড়ীতে যেতে দেয়নি। কাজীর অফিসে গিয়ে জোহরাকে দিয়ে কবীরকে তালাক দিতে বাধ্য করে তিন কানি জমি দখলের ফন্দি করেছে। তালাক দেওয়ার পরেও কবীরের প্রতি জোহরার টানের কথা মাতব্বর বিলক্ষণ জানতো। জমি জোহরার নামে। মেয়েমানুষের গতি কি বোঝা যায়! কথায় বলে বারো হাত কাপড় পরেও ন্যাংটা থাকে। এখন কবির মরেছে। আপদ বিপদ চুকে বুকে গেছে। জমি নিজের চাষে নিয়ে আসার পথ নিষ্কটক। সে আনন্দে খলু মাতব্বর বগল বাজাচ্ছে।

“সুফিয়া বু কড়ে গেইয়েদে?” (সুফিয়া বুবু কেথায় গিয়েছে?) জিজ্ঞেস করে জোহরা।

“কডে জানি গেউয়ে বইন। কড়ে আর যাইব, সের আধসের চইল উধার চাইবার লায় গেইয়েদে আর কি। আঁরে ত আল্লায় নেয়মত দিয়ে” (কোথায় জানি গিয়েছে বোন। সের আধসের চাল ধারটার চাইতে গেছে। আল্লা তো আমাকে অমৃত দিয়েছে।)

জোহরা কথা কয় না। চুপ করে থাকে। চোখের দুটো টলোটলো মণিতে উদগত অশ্রু। হাসিম এলোমেলো বিস্রস্ত সৌন্দর্যের পানে চেয়ে থাকে। লজ্জা পায়। নড়ে বসতে চেষ্টা করে। পা-টা ব্যাথা জানায়।

“আঁরে এক দলা বিষ দিবানি হাসিম বাই?” (আমাকে এক দলা বিষ যোগাড় করে দেবে হাসিম ভাই?)

“বিষ কিয়ার লাই বইন?” (বিষ কিসের জন্য বোন?)।

“হেই কথা বুঝাইতে পাইরতাম নয়, আল্লায় আঁরে হেই মুখ ন দে।” (সে কথা বুঝিয়ে বলতে পারবো না, আল্লায় আমাকে সে মুখ দেয় নি।)।

“বইন, জগত সংসারে হক্কল জিনিস বিষ। হক্কল কিছু সহ্য গরন পড়িব। উতলা অইলে ত চইলতো নয়।” (বোন, জগৎ সংসারে সক্কল জিনিস বিষ। সব কিছু সহ্য করতে হবে। উতলা হলে চলবে না।)

কথাগুলো বলে বেশ আত্মতৃপ্তি অনুভব করে হাসিম।

জোহরার অন্তরের বেদনার ঝড় হাসিমের সহানুভূতির ছোঁয়ায় ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু হয়ে গণ্ডদেশে গড়িয়ে পড়ে। আস্তে আঁচলে মুখ মুছে ফেললো। তার চোখে পানির দীর্ঘায়ত ফোঁটাগুলো বড়ো দুঃখের। হাসিমের চোখে বড় সুন্দর লাগে।

“জোহরা বু আইজো ন আইল” (জোহরা বুবু আজো এলো না।) বলে ধীরে ধীরে পা ফেলে সচল বিষণ্ণ সৌন্দর্যের মূর্তির মতো কাঁঠাল গাছের তলা দিয়ে ঘনায়মান সন্ধার অন্ধকারের দিকে হারিয়ে গেলো।

সুফিয়া গিয়েছিলো খলু মাতব্বরের বাড়িতে আধসের চাল ধার চাইতে। পড়শীদের কারো চাল নেই। এতোদিন পর হাসিম বিছানা থেকে উঠে বসেছে। সেজন্য আল্লাহর কাছে হাজার শোকর। অসুস্থ, অভুক্ত স্বামী যদি কিছু খেতে চায় তা হলে সামনে কি বেড়ে দেবে? আট দিন একলাগা বৃষ্টির পরে পড়শীদের কারও ঘরে চাল থাকার কথা নয়। দু’এক জনের কাছে চাইবার পরে তার অনুমানের সত্যতার প্রমাণ পেয়েছে। সকলে জোহরাদের মতো আঁচলে করে এনে পাতিলে ঢেলে রান্না করে জীবন চালায়।

উপায়ান্তর না দেখে খলু মাতব্বরের বাড়িতে গেলো। মাতব্বর চালাক মানুষ। বিষ্টির পর চালের দাম চড়বে জানে। সে জন্য ধানের কল থেকে চাল ছাঁটিয়ে এনেছে। চার পাঁচ ভার হবে। মাতব্বরের বড় বৌ, ছোট বৌ, দু’ছেলের বৌ সকলে পাটি বিছিয়ে চাল ঝাড়ছে, চালছে।

সুফিয়া বড় বিবির কাছে অত্যন্ত মিনতি করে বললো, “খালা, তোঁয়ারার জামাই ভাত খাইবার লায় সের আধাসের চইল উধারের লায় আস্যিদে। নদিনের পরে আজিয়া মোড়ে উঠি বস্যে, খালা আঁরে এক সের চইল দেও… আঁই ঝাড়ি চালি দিয়ম।” (খালা, তোমাদের জামাইয়ের ভাত খাওয়ার জন্য সের আধসের চাল ধার চাইবার জন্য এসেছি। ন’দিনের পরে আজ মোটে উঠে বসেছে। খালা, আমাকে সের আধসের চাল ধার দাও–আমি ঝেড়ে চেলে দেবো।)

বড়ো বিবির দয়ার শরীর রাজী হয়েছিলো। কিন্তু শুনতে পেলো মাতব্বর। গরু ঠেঙ্গানো লাঠিটা দিয়ে নিজের ছোট বৌ এবং দু’ছেলের বউয়ের সামনে বড়ো বিবিকে ঠেঙ্গিয়ে দিলো।

“মউগের ঝি, এই ভাবে আঁর গিরোস্থি ধ্বংস গরিবি, দরেয়াত ডোবাবি। (মাগের ঝি, তুই আমার গৃহস্থী ধ্বংস করবি, সমুদ্রে ডুবাবি) মাতব্বরের মুখ দিয়ে আরো নানা রকম অশ্লীল কথা বেরিয়ে আসে।

সুফিয়া তাড়াতাড়ি পালিয়ে আসে। তাকে দেখে মাতব্বরের মুখে গালাগালির খৈ ফোটে।

“এই বান্যিয়ার পুতের বউ, আর তোরে ঘরের কাছে পিছে দেহিলে ঝুঁড়া কাডি লইয়ম।” (এই বেনের বউ, আবার তোকে ঘরের কাছে দেখলে খোঁপা কেটে নেবো৷)

ওদের অসম্ভব কিছু নেই। খোঁপাটিতে হাত দিয়ে অন্ধকারের ভেতর পা চালায়। বুকটা ভয়ে চিব ঢিব করে। পুকুর পাড় ছাড়িয়ে মাতব্বরের গরুর গোয়ালের কাছে এসে হাঁপায়। অন্ধকারের ভেতর একজনকে দেখে চমকে উঠে। মাতব্বরের ছোটো ছেলে লড়াই দেয়ার ষাঁড়টাকে বিল থেকে কলাই চুরি করে এনে ধুনে ধুনে খেতে দিচ্ছে। সুফিয়াকে দেখতে পেয়ে সে ফিসফিসিরে ডাকে। এমনি ডাক তাকে তার বাপ মাতব্বরও ডেকেছে অনেকদিন।

“খোদার কহর পড়ক তোর উয়র।” (খোদার অভিশাপ পড়ুক তোর উপর।) চীকার করে বলে।

গর্ভের ভারে হাঁটতে পারে না সুফিয়া। কিছু দূর দৌড়ে ফুঁপিয়ে উঠে। ছেলেটা চীকার করে গালাগাল করে। হঠাৎ অন্ধকারে কোত্থেকে মাতব্বরের আবির্ভাব হলো। উচ্চঃস্বরে বললোঃ

“মউগের ঝিয়ের ঠ্যাং ভাঙ্গি দে রইস্যা। মউগের ঝি চোর।” (মাগের ঝিয়ের ঠ্যাঙ ভেঙ্গে দে রসিদ। মাগের ঝি চোর।)

.

কোনো রকমে সুফিয়া দু বন্য জন্তুর আওতার বাইরে চলে আসে। তার পরনের শাড়ি খুলে গিয়েছে। খুলে যাওয়া শাড়িটা পড়বার জন্যে কাজী রহমতের কবরের কাছে একবার দাঁড়ায়। কাপড় পড়তে ভুলে যায়। স্ফীত উদরের সঙ্গে কাপড়টা চেপে ধরে কাজী রহমতের কবরে তিনটি লাথি মেরে শোধ নিলো নীরবে। শব্দ করে বললোঃ

“আল্লা, জালেমের উয়র তোর গজব পড়ক। জালেমের বংশ নির্বংশ অউক।” (আল্লা, অত্যাচারীর উপর তোমার অভিশাপ পড়ক।)।

হরিমোহন মুসলমান হয়েছিলো। গোকুল পপাদ্দারের সোনায় ভর্তি লোহার আলমারীর ডালা তার জন্যে চিরতরে বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। গোকুল ছেলেকে ক্ষমা করেনি। ক্ষমা করতে পারেনি। এ অপমান হজম করে বেশি দিন বাঁচে নি। রয়ে গেলো গোকুলের বিধবা স্ত্রী, সম্পর্কে হাসিমের দাদী। পদে পদে মেনে চলে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান। কিন্তু এক জায়গায় বুড়ি দুর্বল, বড় অসহায়। তার কনিষ্ঠ সন্তান। হরিমোহন। আঁতের মধ্যে দশমাস দশদিন ছিলো। সে ছেলে বড় হলো, তারপর মুসলমান হয়ে গেলো। এ জন্য স্বামী তাকেও ক্ষমা করে নি। পেটে ধরেছিলো বলে যেন সমস্ত দোষ তারই। কাজী বাড়ির বাদীকে বিয়ে করলো, মারা গেলো। হায় রে সমাজ! হায় রে ধর্ম! মৃত সন্তানের মুখ বুড়ী দেখতে পারেনি। হিন্দু হোক, মুসলমান হোক তারই সন্তান, তারই গর্ভস্থ ভ্রুণ হতে জন্ম, হরিমোহনকে কি ভুলতে পেরেছে? আরো তিন ছেলে এবং এক গণ্ডা নাতি কি হরিমোহনের স্থান পূরণ করতে পেরেছে?

হাসিমের অসুখ-বিসুখ হলে বুড়ী দেখতে আসে। আসে রাতের অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে– যাতে কেউ দেখতে না পায়। হোক না নিজের আঁত পচা ছেলের ছেলে। তবু তো মুসলমান; বিধর্মী। কিন্তু হাসিমের বিপদে আপদে থুখুরী মনখানা আনচান আঁকুপাঁকু করে কেন? কেন করে? স্বামীর গচ্ছিত মরণের সম্বল থেকে রূপোর টাকা দিয়ে যায় দু’চারটা করে। ছেলেরা নাতিরা প্রচণ্ডভাবে শাসিয়েছে। শ্মশানে বয়ে নেবে না বলে ভয় দেখিয়েছে। মরলে গোর দেবে এ কথাও জানিয়ে দিয়েছে। বুড়ী ভয় পায়, শিউরে ওঠে। যদি তাকে শ্মশানে বয়ে নিয়ে না যায়, যদি তাকে কবর দেয়া হয় মুসলমানের মতো? তা হলে? তা হলে? অস্ফুটে উচ্চারণ করে।

“আঁরে ক্ষেমা গইয্য তেত্রিশ কোটি দেওতা। আঁর মনেত মায়া ছাড়া আর কিছু নাই।” (আমাকে ক্ষমা করো তেত্রিশ কোটি দেবতা। আমার মনে মায়া ছাড়া কিছু নেই।) তেত্রিশ কোটি দেবতার উদ্দেশ্যে হাত ঠেকিয়ে সভক্তি প্রণাম করে।

হাসিমের কথা চিন্তা না করার জন্যে সচেতন মনে বারবার সংকল্প করেছে। হাসিম তার কে? তার যে একটি ছেলে ছিলো, তার নাম হরিমোহন সে কথা ভুলে যেতে চেষ্টা করে। কিন্তু, যুক্তি মানে না হৃদয়। রক্ত ধর্মীয় অনুশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে।

হাসিমের পায়ে জখমের সংবাদ শোনা অবধি বুড়ীর মনটা বার বার কোণাকোণি হয়ে যাচ্ছে। কারো কাছে প্রকাশ করতে পারে না। মনের কষ্টিপাথরে বিজলী রেখার মতো মুসলমান নাতির জন্যে বেদনা জ্বলে ওঠে। কতো গভীর সে বেদনা। রাতে ঘুমোতে পারে না। পথে বেরোতে পারে না। একে তো বিষ্টি, তদুপরি পথঘাট পিছল।

বিষ্টি বন্ধ হবার পরের দিনই সের দুই চালের একটা পুঁটুলি বেঁধে, স্বামীর দেওয়া সঞ্চয় থেকে ক’টি রূপোর টাকা থান কাপড়ের আঁচলে নিয়ে পথে নামলো। সন্ধ্যার অন্ধকারে লাঠি ঠক ঠক করে যখন হাসিমের ঘরের কুয়োটির সামনে এলো, দেখতে পেলো শাদা কাপড় পরা কে একজন এদিকে আসছে। তাড়াতাড়ি বুড়ী চালের পুঁটুলিটা পরনের থান কাপড়ের মধ্যে লুকিয়ে কেয়া ঝাড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ে। কাঁটার আঘাত সমস্ত শরীরকে জর্জরিত করে। একটি নিশ্বাসও না ফেলে চুপ করে রইলো। আঁধর হাঁ, অধরই তো চলে গেলো। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে। দেবতাকে ধন্যবাদ দেয়। অধর নিরাপদ দূরত্বে চলে গেলে বুড়ী অনুচ্চকণ্ঠে হাসিমকে ডাকাডাকি করে। চড়াতে পারে না গলার স্বর। এ পাড়ার কেউ শুনলে আরো এক অনর্থ বাধবে। দাঁতহীন মুখ দিয়ে ঠিক মতো স্বর বেরোয় না। অনেক ডাকাডাকির পর সুফিয়া একখানা বাতি নিয়ে কুয়োর পাশে এসে দাঁড়ায়। জিজ্ঞেস করেঃ

“হেইভা কন?” (সেটা কে?)।

“ওডি আগে তোল আঁরে কেঁড়ায় খাই ফেলাইল। উহ্ বাবারে মরি গেলাম রে।” (ওগো, আগে তো আমাকে কাঁটায় খেয়ে ফেললো। উঃ বাবা গো, মারা গেলাম।) ক্লিষ্ট কণ্ঠস্বর বেরিয়ে আসে।

বুড়ীকে পাড়ে টেনে তুলে কাপড়ের কাঁটা বাছতে বাছতে জিজ্ঞেস করে সুফিয়াঃ

“দাদী তুই ঝাড়ত ক্যা পইরলা?” (দাদী, তুমি ঝড়ের মধ্যে পড়ে গেলে কেমন করে?)

“অধর, অধর গেলদে রাস্তাদি।” (অধর, অধর যে গেলো রাস্তা দিয়ে।) বুড়ী বিজ্ঞতার ভান করে মাড়ি দেখিয়ে হাসে।

সুফিয়ার আর বোঝার বাকি থাকে না। বুড়ীকে ধরে ধরে ঘরে নিয়ে আসে। চালের পুঁটুলিটা হাসিমের সামনে রাখে। ঘরের ভেতরে ঢুকে সর্ষের তেলের বোতলটা এনে উপুর করে বুড়ীর ছড়ে যাওয়া কুঁচকানো চামড়ায় লাগায়। যন্ত্রনায় উঁহু হু করে বুড়ী।

স্বল্পালোকিত বাতির স্লান শিখায় হাসিমের রোগা-পাণ্ডুর কষ্টক্লিন্ন মুখ দেখতে পেয়ে নিজের যন্ত্রনার কথা ভুলে যায়। করুণায়, সেহে, দুঃখে অন্তরের গহনতল পর্যন্ত আলোড়িত হয়। পাশে উবু হয়ে বসে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাকে দেখে।

“সোনা কন জাগাত জখম অইয়েদে?” (সোনা, কোন জায়গায় জখম হয়েছে?)

হাসিম জখমী পা দেখায়। বুড়ী সযত্নে ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দেয়। বড়ো বড়ো নিশ্বাস ছাড়ে। এ নিশ্বাসের ভেতর থেকে অনেক অগ্নিগিরির লাভা নিঃসরিত হয় নীরবে। নাতি দাদী দু’জনের কেউ কথা বলে না। দু’জনেই বেদনার নীরব স্রোতে অবগাহন করে। একজনের মুখে অন্যজন সান্তনার ভাষা খুঁজছে। বুড়ী হাসিমের বুকে মুখে কাঁধে সারা শরীরে হাত বুলোয়। বাম চোখে ছানি পড়েছে, ভালো দেখতে পায় না। তবু দৃষ্টির সবটুকু ধার উপুর করে হাসিমের মুখে কি দেখতে চায়। হরিমোহনের মুখের আদল?

আঁচলের গিঁঠটা খুলে গুণে গুণে দশটা রুপোর টাকা, দশখানা পাঁজরের মতো সন্তর্পনে হাসিমের হাতে তুলে দিলো। চেরাগ বাতির আলোকে টাকার বুকের মহারাণীর ছবিটা জ্বলে উঠলো চিক চিক করে। একদৃষ্টিতে হাতের টাকাগুলোর দিকে চেয়ে হাসিমের দু’চোখের কোণে দু’ফোঁটা অশ্রু নির্গত হলো। শিশু যেমন একমুঠো জোছনা চেপে ধরে হাসিমও তেমনি টাকাগুলোকে চেপে ধরলো। এ টাকাতে কিসের স্পর্শ যেন এখনো লেগে আছে।

“নাতি, এহন যাই। অধর ঘরত গেলে গোলমাল লাগাইব।” (নাতি, এখন যাই। ঘরে গেলে আবার অধর একটা গোলমাল বাধিয়ে বসবে।)।

বাকী কথা শেষ না করে বুড়ী উঠে দাঁড়ায়। সুফিয়া হাতে লাঠিটা তুলে দিয়ে কিছু দূর এগিয়ে দিয়ে আসে। খুবই সন্তর্পণে লাঠি ঠক ঠক করে পথ চলে। কেউ যদি দেখে ফেলে? আঁধারের ভেতর নদীর মতো শুশ্রূষার জল, পিপাসার বারি হয়ে আসে বুড়ী আঁধারেই চলে যায়। দিনের আলোতে দেখা নেই। অন্তরেও আঁধার নদী আছে। তারই স্রোতে ভেসে আসে সমাজের অনুশাসন ডিঙিয়ে রাতের বেলা নাতিকে দেখার জন্যে। হৃদয়ের এ লাবণ্যরেখার নদী কোনোদিন কি দিনের আলোর মুখ দেখবে? বুড়ী মনে মনে সে কথাই ভাবে।

৩. সওদা করার জন্যে বাজারে

হাসিম সেদিন কিছু সওদা করার জন্যে বাজারে গিয়েছিলো। কবরস্থানের পাশ দিয়ে দুপুরবেলা ঘরে ফিরছিলো। পাকা ঘাটলার কাছে কাজী বাড়ীর গোলাম কাঁদেরের সঙ্গে দেখা। বহু কালের ক্ষয়ে যাওয়া ঘাটলায় বসে কা’কে সশব্দে গাল দিচ্ছিলো কাজী গোলাম কাদের। গাল দেয়ার সময় গোলাম কাঁদেরের মুখের ভাব পরিবর্তিত হয়। ঘাড়ের ঝুলে পড়া রগের মধ্যে দুটো রগের রং লাল হয়ে যায়। কবুতরের ভাঙা বাসার মতো ভগ্ন শরীরের আবেষ্টনী ছিন্ন করে বৈদ্যুতিক তারের মতো উত্তপ্ত হৃদপিণ্ডটা বেরিয়ে আসতে চায় বুঝি! শ্বেত-শুভ্র বুকের ধার অবধি লুটিয়ে পড়া দাড়ি তরঙ্গায়িত হয়ে কেঁপে ওঠে। চোখের ঘোলাটে দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক একটা জ্বালা ফুটে বেরোয়।

হাসিমকে দেখতে পেয়ে গাল দেয়া বন্ধ করে গোলাম কাদের। এক কানে দড়ি দিয়ে আটকানো চশমার কাঁচ মুছে হাসিমের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলোঃ

“হেইভা কন?” (ওটা কে?)।

“আঁই দাদা।” (আমি দাদা।) হাসিম বাজারের ঠোঙ্গাটা বাম থেকে ডান হাত বদল করতে করতে উত্তর দিলো।

“।কানে ন হুনি, বড় গরি ক।” (কানে শুনতে পাইনে, বড় করে বলো।)

“আঁই দাদা।” ক্ষয়ে যাওয়া ঘাটলার কাছটিতে কাজী গোলাম কাঁদেরের দৃষ্টির তলায় গিয়ে জবাব দেয়।

অবশেষে চিনতে পারায় খুশি হয় বুড়ো। দাঁতহীন মাড়ি দেখিয়ে হাসতে চেষ্টা করে। বিবর্ণ গামছাটা দিয়ে পাশের জায়গাটিতে দুর্বল অশক্ত হাতে কটা বাড়ি দিয়ে বললোঃ

“অ হাসিম মিয়া, বয়।” (ও, হাসিম মিয়া, বসো।)

বাড়িতে হাসিমের অনেক কাজ। তবু বুড়ো কাজী গোলাম কাঁদেরের অনুরোধ ফেলতে পারে না। কাজী বাড়ির গোলাম কাঁদেরের সঙ্গে হাসিমের কোথায় একটা অস্পষ্ট মিল আছে। খুবই অস্পষ্ট, শাদা চোখে ধরা পড়ে না। হাসিমকে বসিয়ে বুড়ো আবার গালাগাল দিতে থাকে।

“হারামজাদা, বেল্লিক বাঁদরের বাইচ্চা, লাথি মারি মাথার ছড় উলডায়া ফেলাইয়াম। বাদীর বাইচ্চা কন ঝাড়ত কন বাঘ আছে কইত না পারে।” (হারামজাদা, বেল্লিক বাঁদরের বাচ্চা, লাথি দিয়া মাথার ছড় উলটে ফেলবো। বাদীর বাচ্চা জানে না কোন জঙ্গলে কোন বাঘ থাকে।)

হাসিমের অসোয়াস্তি লাগে। মাথার ওপরে ঝাঁ ঝাঁ রোদ তদুপরি বুড়ো গালাগালি করার সময় তিনশ বছর আগের ইউসুফ কাজীর রক্ত শিরায় চঞ্চল হয়ে ওঠে। বাইশ গ্রামের জায়গীরদারী স্বভাব মাথা চাড়া দেয়। অথচ লোকটা অসহায় চরম অসহায়। এ অসহায়তাতে আঘাত লাগলেই বুড়ো আভিজাত্যের পুরোনো গর্তের মধ্যে ঢুকে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। হাসিম জানে, ওটা গোলাম কাদের বুড়োর স্বভাব। তবু তার বুকের ভেতর ঝড়ের পূর্বাভাস দেখা দেয়। শরীরের রক্ত চিনচিন করে। তাকে লক্ষ করেই যেনো বুড়ো কথাগুলো বলছে।

কাজী পরিবারের বাদীর গর্ভে সে জন্মলাভ করেছে। এ কথা কেউ যেন তাকে ভুলতে দেবে না। এমন কি, যে গোলাম কাদের বুড়ো তাকে একটু খাতির করে, বানিয়ার পুত বলে না, হাসিম বলে ডাকে– সেও এ ষড়যন্ত্রে যোগ দিয়েছে। কাজী বাড়ির গৌরব, প্রভাব প্রতিপত্তি সবকিছুর বিরুদ্ধে তার মনে ধারালো বিদ্বেষ রেখায়িত হয়। বুড়ো হরদম ঘ্যানর ঘ্যানর করে। হাসিম দেখতে পায়, একটা করুণ বিষাদময় আলেখ্য, যার সঙ্গে তার জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে এবং জড়িয়ে যাবে তার উত্তর-পুরুষের জীবন। বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলো, চোখ মেলে দেখে বুড়োর চোখে পানি। হাসিমের মনটা গলে যায়। একটু আগের বিদ্বেষ করুণার বিগলিত ধারায় বুক ছেয়ে যায়। লজ্জিত হয়ে গোলাম কাঁদেরের দিকে মনোনিবেশ করে।

“হাসিম, তুই ক’ বাই। আঁই কি কনদিন কেউর কেচা আইলত পারা দিই-না পনা (পাকা) ধানেত মই দিই? পুত নাই, পৈতা নাই, মাইনসে আঁরে এত কিল্লাই বেইজ্জত গরে?” (হাসিম ভাই, তুমি বলো দেখি। আমি কারো কাঁচা আলে পা দিয়েছি, না পাকা ধানে মই দিয়েছি? ছেলে-পুলে নেই, তবু মানুষ আমাকে এতো বেইজ্জত কেন করে?)

হাসিম স্তব্ধ হয়ে মুখের দিকে চেয়ে থাকে। বুড়ো একটু একটু করে সবকিছু বর্ণনা করে। আজ দুপুরে চন্দনাইশের একজন লোক ছাগির দড়ি ধরে পাঁঠার খোঁজ করছিলো। খলু নাকি বলেছে গোলাম কাঁদেরের একটা জাতি পাঁঠা আছে। খলুর কথা বিশ্বাস করে গোলাম কাঁদেরের কাছে গিয়ে বলেছে, আপনার কাছে নাকি একটা জাতি পাঠা আছে। আমার ছাগিটা তিনদিন ধরে ডাকছে। দূরে যেতে হলো না, ভাগ্য ভালো। দয়া করে আপনার পাঁঠাটা একটু দেবেন কি? বাচ্চা দিলে আপনাকে দুধ দিয়ে যাবো। কাজী গোলাম কাদের বেদম খেপেছিলোঃ

“আর কাছে পড়া আছে বুলি তোরে কন্ কুত্তার বাইচ্চায় কইয়েদে?” (আমার কাছে পাঠা আছে, এ কথা তোমাকে কোন্ কুত্তার বাচ্চা বলেছে?)

কিন্তু লোকটি নাছোড়বান্দা। খলু বলে দিয়েছে, পাঁঠা চাইলে বুড়ো প্রথমে দা। হাতে কাটতে আসবে। তাতে বেজার হওয়ার কিছু নেই। মুখটা খারাপ হলেও বুড়োর মনটা ভালো। এক সময় হাসি মুখে পাঁঠা দিয়ে তোর কাজ উদ্ধার করে দেবে। বুড়োকে নাজেহাল করার জন্যে খলু মাঝে মাঝে এ ধরনের ইতরামমা করে থাকে। কেউ কিছু কিনতে এলে ক্রেতাকে বুড়োর কাছে পাঠায়। এ করে খলু এক ধরনের আনন্দ পায়। এরকমভাবে লজ্জা দিয়ে কাজী বাড়ীর সাত পুরুষের ঐতিহ্যে আঁচড় কামড় কাটে।

চোখের অনেক পানি ঝরে গেলেও শান্ত হয় না বুড়ো। বুকে আগুন জ্বলছে। শরীরের বল থাকলে খলুকে রসাতল করে ফেলতো। তার অভিশাপে ফল ফলবে না, দম্ভে কোনো কাজ দেবে না, এ কথা বুড়ো জানে– হাড়ে হাড়ে জানে। তারপর হাসিমকে একেবারে কাছে ডেকে গোপন কোনো পরামর্শ করেছে, তেমনি ফিসফিসিয়ে খলুর নতুন কাণ্ড-কাহিনীর কেচ্ছা শোনায় সবিস্তারে। শুনে হাসিম চমকে ওঠে না। গোড়াতেই আঁচ করেছিলো। কেননা জোহরার তালাক দেয়া স্বামী কবীর এখন বেঁচে নেই। তিন কানি ধানি জমি নিজের চাষে নিয়ে আসার পথে মাতব্বরের কোনো বাধা নেই। বুড়ো এবার তার দিকে তাকিয়ে নিষ্প্রভ চোখের দৃষ্টিরেখা বাগিয়ে ধরে। ত্রিকালদর্শী বিচারকের মতো মন্তব্য করলোঃ

“দেখিস হাসিম, এইবার হারামির পুত মরিব। পরের হক নয়, মরণের দারু কানত বাইন্ধ্যে। পরের ধন হরণে গতি নাই মরণে।” (দেখিস হাসিম, এবার হারামির ছেলে মরবে। পরের হক নয়, কানে মরণের ওষুধ বেঁধেছে।)

সৃষ্টির পরম সত্যটির মতো বুড়ো কথা বললো। কথা বলে খুশি হলো।

সেদিন সন্ধ্যায় দোকানে গিয়েও এ আলোচনা শুনতে পেলো। এ জমি মাতব্বরের দখল করা উচিত, সে সম্পর্কে মতও দিলো অনেকে। ছতুর বাপের বড়ো ছেলে সুলতান বললোঃ

“এই জমিনত যেই ধান পাইব, হেই ধানদি মাতব্বরের বিরাট জেয়াফত দিব, তিন বেলা খাবাইব। দুইটা গরু দিব আল্লাহর নামে।” (এই জমিতে যে ধান পাওয়া যাবে, তাই দিয়ে মাতব্বর বিরাট নেমন্তন্নের আয়োজন করবে। তিন বেলা খাওয়াবে। আল্লাহ্র নামে দুটো গরু জবাই করবে।)

জেয়াফত এবং তিন বেলা খাওয়ার নামে অনেক প্রতিবাদী কণ্ঠ নীরব হয়ে গেলো। তবু কয়েকজনের মনে খুঁতখুঁতানি রয়ে গেলো। পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে চিকিৎসা করে যোগী পাড়ার সুধীর। অনেককে সুধীরের কাছে ঠেকতে হয়, অনেক সময় চিকিৎসা করিয়ে পয়সা দিতে পারে না। পয়সা ছাড়াও চিকিৎসা করতে পারে বলে সুধীরের জিহ্বার ধারটা কিঞ্চিত বেশি। হক কথা বলতে বাপকেও ভয় করে না। সুধীর বলেঃ

“গরু জবাই গরিল ভালা কথা, জেয়াফত দিল ভালা কথা, পাড়ার মাইনসরে খাবাইল, আরও ভালা কথা। কিন্তু পরের জমিনের ধান দিয়ে রে ক্যা?” (গরু জবাই করলো ভালো কথা, নিমন্ত্রণ দিলো ভালো কথা। পাড়ার লোককে খাওয়ালো, আরো ভালো কথা, কিন্তু পরের জমির ধান দিয়ে কেন?)

“ন বুঝিলা না, বৈদ্যের পুত নিজের জমিনের ধান বেচি মাইনসে টেঁয়া কামায়। পরের জমিনের ধানদি ছোঁয়াব কামায়।” (বুঝলে না বৈদ্যের পুত, নিজের জমির ধান বেচে টাকা জমায়, পরের জমিনের ধান দিয়ে পূণ্য সঞ্চয় করে।)

সুধীরের কথার জবাব দেয় লেদু। তারপর একটু হেসে ওঠে। মাতব্বরের ছোটো ছেলে সুলতানকে বাপের নাম করে ডেকে নিয়ে যায়। তসবীহ্ টিপতে টিপতে ছতুর বাপ ঘরে ঢুকে নতুন প্রসঙ্গের অবতারণা করে।

তার পরের দিন খলু মাতব্বর তিন ছেলেসহ বরগুইনির দক্ষিণ পাড়ের বিলে হাল জোতে। সূর্য ওঠার অনেক আগেই বাপ-বেটা তিনজনে হাল জুতেছে। সাধারণত এতো রাতে কেউ হাল জোতে না। দিনের আলোতে সাহস করেনি। তাদের দেখে মানুষের চোখে যে জিজ্ঞাসার চিহ্ন জাগবে তার কোনো সঙ্গত জবাব দিতে পারবে না বলেই বোধ হয় রাতের অন্ধকারে পরের জমিতে, পরের অধিকারে হাল চালাতে এসেছে। পূবের আকাশে শুকতারাটি দপদপিয়ে জ্বলছে। মাতব্বরের তিনটি হালের ছ’টা গরু থলো থলো পানির ভেতর পাক খেয়ে হাঁটছে। পানিতে ছলাৎ ছলাৎ জাতীয় আওয়াজ ফেটে পড়ছে। রোশন আলী যাচ্ছিলো শহরে। প্রতিদিন তরকারীর টুকরী মাথায় করে সকাল সাড়ে চারটার গাড়ী ধরে। রাস্তা দিয়ে যাবার সময় পানির আওয়াজ এবং গরু ফেরাবার বোল শুনতে পেয়ে কৌতূহল জাগে রোশনের। তরকারীর টুকরীটাসহ হেঁটে হেঁটে আলের ওপর দিয়ে কবীরের বাপের তিন কানি চরের আলের কাছে এসে থামে। কাঁচা কর্দমাক্ত আলের ওপর মাথার টুকরিটা নামিয়ে রাখে। বাপ-বেটা তিনজনে নিঃশব্দে গরু ফিরিয়ে নিচ্ছে। কারো মুখে রা নেই। আচাবুয়ার মতো দেখায় একেক জনকে। রোশন আলী হাঁ করে চেয়ে থাকে। কবীর মরেছে আজো বিশদিন হয়নি। খলু তামাক পাতার একটা মোটা চুরুট টানছে। সে আগুনে তার শয়তানের মতো মুখখানা দেখা যায়। হাল নিয়ে আলের এদিকে এলে কেউটে সাপের মতো কুতকুতে চোখে রোশন আলীকে দেখে ।

আর শহরে যায় না রোশন আলী। কাঁচা আল থেকে প্যাক মাখা টুকরিটা মাথায় তুলে নিয়ে ঝপ ঝপ করে পানি ভেঙে চলে আসে। কিছুদূর এলে তার কানে খলুর কণ্ঠস্বর আঘাত করেঃ

“মেডি আর বেডি তার, জোর আছে যার।” (মেয়ে মানুষ আর মাটি তার যার জোর আছে।)।

সাতবাড়িয়ায় রোশন আলীর বাড়ী। জমিনের গোড়া থেকে প্রায় আধ মাইল দূর। গ্রামে পৌঁছে লোকজনকে খবরটা জানায়। সদ্য পুত্রশোকে কাতর কবীরের বাপকে কেউ খবরটা দিতে সাহস করে না। তাই বুড়ো সংবাদ পেতে পেতে আকাশে সূর্য ওঠে। পড়ি মরি জ্ঞান না করে ষাট বছরের বুড়ো দুর্বল শরীর নিয়ে লাঠি ভর করে হাঁটতে থাকে। ডানে বামে না চেয়ে এক নাগাড়ে কিসের ওপর দিয়ে হেঁটে এলো সে হুঁশ নেই। তিন কানির চারদিকে পথের মতো বড়ো আলের ওপর এসে বসলো। খলু আর তার ছেলেরা বুড়োর দিকে একবারও ফিরে তাকালো না পর্যন্ত। নির্বিকারভাবে গরু খেদিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অনেক রাতে হাল জুতেছে। প্রায় এক চাষ দেয়া হয়ে গেলো। জোয়ান গরু, জোয়ান মানুষ। চন্দ্রপুলী পিঠের মতো স্তরে স্তরে পলিময় মাটি। ধারালো তিনখানা লাঙলের কতোক্ষণ লাগে।

বুড়োর ছেলে গেছে। ছেলের বউ গেছে, জমিটাও যেতে বসেছে। আলের ওপর বসে অনেক কথাই মনে পড়লো। সে বছর তিলের বেপার করতে শঙ্খ উজান গিয়েছিলো। উজানের উঁচু পাহাড়ে ওঠবার সময় গড়িয়ে নীচে পড়ে যেতে যেতে শিমুল গাছের শেকড় ধরে আত্মরক্ষা করেছিলো। বুকের কাছে চোট লেগেছিলো। পনেরো দিন বিছানা থেকে উঠতে পারে নি। সে বছরই তিল বেপারের লাভের টাকা দিয়ে এ জমি কিনেছিলো হরিদাস মহাজনের ছেলের কাছ থেকে। তারপরে আর কোনোদিন উজানে বেপারে করতে যায়নি। এ জমিতে চাষ করেছে। ফলিয়েছে ফসল। ধান বেচে টাকা জমিয়ে বিয়ে করেছে। তরমুজ বেচে সোনার নাকফুল কিনে দিয়েছে বৗকে। ছেলে হয়েছে। ছেলে বড়ো হয়েছে। গায়ে কাঁচা সোনার মতো রঙ হয়েছে। চাষী গেরোস্তের ঘরে অমন সুন্দর গায়ের রঙ সচরাচর দেখা যায় না। ছেলেকে বিয়ে করিয়েছে। ছেলের বউ এসেছে, বেঁধেবেড়ে খাইয়েছে। অজু করবার পানিভরা বদনা এগিয়ে দিয়েছে। শাশুড়ীকে প্রাণপণ সেবা করেছে। ছেলের মা মারা গেলো। সে সময়ও তরমুজ বেচা পয়সায় কেনা সোনার নাকফুলটা জ্বলজ্বল করছিলো নাকে। তারপর ছেলের বউও গেলো। তারপর… বুকে হাতুড়ি পেটার শব্দ হয়। বুকের ভেতর জলোচ্ছ্বাস জাগে, বুকের তলায় আগুন জ্বলে। ছোটো ছোটো কোটরাগত চোখ দুটোর চার পাশে বিন্দু বিন্দু শিশির জমে… জমতে থাকে। জমাট শিশিরে আকাশ পৃথিবী ছেয়ে যায়। বুড়ো কিছু দেখতে পায় না। স্থাণুর মতো কাঁচা আলের ওপর লেপ্টে বসে আছে। দুঃখ আর বয়সের ভারে পৃথিবী তখন সেঁধিয়ে যাচ্ছে বুঝি মাটির ভেতর।

“চাচা, কি ধান দিবা?” ছতুর বাপের বড়ো ছেলে সুলতান, পেছনে আরো দশ বারোজন লেঠেলসহ এসে জিজ্ঞেস করে। সকলের হাতে লাঠি। সাতবাড়িয়ার মানুষ খলুকে জমি চষতে বাধা দিতে পারে। সে আশঙ্কা করে সুলতান লাঠিসোটা আর সাঙ্গোপাঙ্গো নিয়ে একেবারে তৈরি হয়ে এসেছে। কবীরের বাপ সুলতানের কথায় জ্ঞান ফিরে পায়। কি দেখছে? কি ভাবছে? তেজী গরু সিনা আলগা করে পানির ওপর ঝপঝপিয়ে হাঁটছে। লাঠি হাতে অনেক মানুষ দাঁড়ানো। ওদের চোখে মুখে ক্রুরতা! সকালের শিশু সূর্য লাফিয়ে লাফিয়ে ওপরে ওঠছে।

“ভাইপুত চিন্নাল ধান দিয়ম। কেন অইব?” [ভাতিজা ভাবছি চিন্নাল ধান (এক রকমের ধানের নাম) দেবো। কেমন হবে? জানতে চায় সুলতানের মতামত। সুলতান মাথা নেড়ে জবাব দেয়ঃ

“ছোডো ধান খুব ভালা অইব চাচা।” (হা, সরু ধান খুব ভালো হবে চাচা!)

হঠাৎ কবীরের বাপ গোত্তা খাওয়া বাঘের মতো ফুঁসে ওঠে। চোখের চারপাশ থেকে বিন্দু বিন্দু শিশির অন্তর্হিত হয়ে যায়। গা ঝাড়া দিয়ে দাঁড়ায়। তার নিজের অধিকারের ওপর হাত দিয়েছে। যতোই দুর্বল হোক সে, সহ্য করবে না।

“না, আর জমি মোড়া ধানর। ক্যারে চিয়ন ধানর চাষ গইরতাম দিতাম নয়।” (না, আমার জমিন মোটা ধানের, কাউকে চিকন ধানের চাষ করতে দেবো না।)

চোখের পলকের মধ্যে একেবারে আগের হালের সামনে জলকাদার ওপর শুয়ে পড়লো। আগের হালের পেছনে লাঙলের গুটি ধরে আসছিলো খলু মাতব্বর। ঘটনার আকস্মিকতায় সুলতানসহ সকলে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়ালেন। খলুর এতে ভাবান্তর নেই। পলিমাটির বুক চিরে চিরবিরিয়ে লাঙল টেনে, দুর্ধর্ষ ষাড় জোড়া ঘার বাঁকিয়ে পলটনের ঘোড়ার মতো চলছে। গতির মুখে বুড়োকে শায়িত দেখে কালো গরুটা গলা নীচু করে বুড়োর ঘাড়ের নীচে লম্বা শিং দিয়ে একটা ঘাই দিলো। বুড়ো ‘মা রে বাপরে’ বলে উঠে দাঁড়াতে পিঠের ঝুলে পড়া চামড়ায় তীক্ষ্ণ বাঁকা দীর্ঘ শিং ঢুকিয়ে দিলো। বুড়োর শরীরের শাদাটে মাংস বেরিয়ে পড়লো। কয়েক বিন্দু রক্ত চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঝরতে থাকে। খলু বলে সুলতানকেঃ

“ভাইপুত, এই বেকুবরে পাথারি কোলা গরি রাস্তার উয়র রাখি আয়।” (ভাতিজা, এই বেকুবকে পাঁজাকোলে করে, রাস্তার উপর রেখে এসো।)

সুলতান বুড়োকে পাঁজাকোলো করে রাস্তার ওপর রেখে আসে। বুড়োর পিঠ এবং ঘাড় থেকে সুলতানের হাতে, গেঞ্জিতে ও লুঙ্গিতে রক্ত লাগে। রক্তাক্ত হাতে মুখ মুছে। ছোপ ছোপ রক্ত লাগে মুখে। খুনীর মতো দেখায় সুলতানকে। কবীরের বাপ কঁকায়। কঁকিয়ে আল্লাহর আরশের উদ্দেশ্যে বলেঃ

“আল্লাহ্ আঁর বোবা পুত, আঁর বোবা ছাওয়াল।” (আমার বোবা ছেলে।)

বুড়োর কথা কওয়া ছেলেকে যম নিয়ে গেছে। আরেকটি বোবা ছাওয়াল ছিলো। কথা কয় না। চাহিদা মতো ধান দিতো, মরিচ দিতো। কালো হীরে মাটি তার বোবা ছাওয়াল। বুড়ো হাড়ের সর্বশক্তি দিয়ে বোবা ছাওয়ালকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছে। কিন্তু পারে নি। ঘাড়ের কাছে রক্ত, পিঠে রক্ত, বুকের ক্ষত চুঁইয়েও বুকের ভেতর ঝরছে রক্ত। তবু বুড়ো চীৎকার করেঃ

“আল্লাহ্, আঁর বোবা ছাঁওয়াল।”

এক চাষ দেয়া হয়ে গেলে গরুকে জোয়ালমুক্ত করে হাল লাঙল কাঁধে ফেলে লেঠেলদের নিয়ে চলে গেলো খলু।

কয়েকটা দিন পার হয়ে গেলো। ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটে নি। বরগুইনির পাড়ের পাশাপাশি দুটো গ্রাম কেমন ঝিম্ মেরে আছে। অথচ এ নীরবতার মধ্যে আবর্তিত হচ্ছে কুটিল একটা চক্রান্ত। সাত বাড়িয়ার মানুষ ব্যাপারটাকে সহজভাবে নিতে পারবে না, খলু মাতব্বর আগেই সে আশঙ্কা করেছিলো। তবু পুরোপুরি ওয়াকেবহাল হবার জন্যে খলু মাতব্বর মকবুল মস্তানের ছেলে ফয়েজ মস্তানকে মাগুর মাছের মাথা আর লক্ষীবিলাস চালের গরম ভাত বেঁধে খাইয়ে আসল খবর সংগ্রহ করার জন্যে সাতবাড়িয়া পাঠিয়ে দিলো।

ফয়েজ মস্তান মানুষ। সুতরাং তার পথ অটকায় কে? এককালে অনেকেই তার বাপের মুরীদ ছিলো। পীর মুর্শীদের প্রতি টান উঠে গেলেও অনেকে ফয়েজকে এখনো সমীহ করে। অবশ্য তারা বুড়োবুড়ি। হাল জমানার চ্যাংড়ারা ফয়েজকে পরোয়া করে না।

সন্ধ্যাবেলায় ফয়েজ খবর দিয়ে গেলো। মাগুর মাছের মাথা এবং চিকন চালের ভাতে বেশ কাজ দিয়েছে। ফয়েজ এক্কেবারে পাকা খবর দিয়ে গেছে।

গেলো ফাল্গনের আগের ফাল্গনে গরুর লড়াইয়ে কাদির মিয়ার ছেলের সঙ্গে মাতব্বরের ছেলের মারামারি হয়েছিলো। কাদির মিয়ার গরুর সঙ্গে গরুর লড়াই দিয়েছিলো চৌধুরী পাড়ার খোলায়। মাতব্বরের গরু আঁটতে না পেরে হেঁটে যাচ্ছিলো। আরেকটু হলেই হটে যেতো। নিজের গরুকে পরাজিত হতে দেখে মাতব্বরের ছেলে আবদুল বেপরোয়াভাবে কাদির মিয়ারটাকে কেরেক বেত দিয়ে মারতে থাকে। কাদির মিয়ার ছেলেও রেগে তেড়ে এসে আবদুলকে মেরেছিলো। দু’দলে লাগলো দাঙ্গা। কাদির মিয়ার ছেলেরা সংখ্যায় বেশি ছিলো না। তাই একেবারে ঘেঁচে পানি করে দিয়েছিলো। গরু কেড়ে রেখেছিলো। খলুর ছেলের কাছে তার ছেলে মার খেয়েছে একথা হাকিমের কাছে স্বীকার করতে হবে, সে বড় লজ্জার কথা। সে জন্যে কাদির মিয়া মামলা করেনি। নীরবে নীরবে সুযোগের সন্ধান করছিলো। এতদিন পরে সুযোগ মিলেছে।

খলুকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্যে বিনামার তারিখের আগের স্ট্যাম্প কালোবাজার থেকে যোগাড় করে সদর রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে কবীরের বাপের সে তিনকানি জমি আগের তারিখ দিয়ে কবলা করে নিয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক করে ওঁত পেতে বসে আছে। বাপ বেটাকে পেলে একসঙ্গে কেটে কুচি কুচি করে বরগুইনির পানিতে ভাসিয়ে দেবে।

খবর পেয়ে খলু তড়িঘড়ি কাজীদের বড় পুকুরে মাছ ধরতে জাল নামিয়ে দেয়। খলু পুকুরটা দু’বছর আগে খাসমহাল থেকে পানির দামে নীলামে খরিদ করেছে। দুটো বড় কাতলা মাছ ধরে। ঘর থেকে সরু কমল চিকন চাল, সে অনুপাতে তেল ডাল তরকারী দিয়ে একটা মাছ তহশীলদার সাহেবের বাসায় এবং অন্যটা পাঠিয়ে দেয় কানা আফজলের বাড়ি। এককালের কাজী রহমতের ভাবশিষ্য এবং দুষ্কর্মের সঙ্গী কানা আফজল বর্তমানে আফজল আহমদ চৌধুরী। ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান।

তহশীলদার যদি খাসমহলের কাগজপত্রে সবকিছু ঠিক করে রাখে, কাদিরার বাপের কি সাধ্য তাকে বেদখল করে। তবু আসতে পারে আপদ-বিপদ। সেজন্য বুদ্ধি করে চেয়ারম্যান কানা আফজলের মুখ বন্ধ করে রাখলো। মেম্বার চেয়ারম্যান পক্ষে থাকাটা খুব ভাগ্যের কথা। বিপক্ষে গেলে রক্ষে নেই। ডালি না পেলে, জানা কথা, বিপক্ষে যাবে। শালারা গুখোরের জাত। মার কানের সোনা চুরি করতে কসুর করে না। পাঁঠাপাঠির ভেদ তাদের কমই আছে। গ্রামের মানুষদেরকেও স্ববশ করেছে। ছতুর বাপ মুসুল্লী মানুষ, তার কথা দশজনে শোনে, মান্য করে। দাওয়াত করে গলা পর্যন্ত আছুদা করে খাইয়েছে। এখন পষ্টাপষ্টি বলে ছতুর বাপ। বিনামা নেই শরীয়ত মতে… বিনামা মানেই কবলা। জোহরার কাছে সাফ-কবলা দিয়ে বেচে দিয়েছে কবীরের বাপ। জোহরার হক… সে তিনকানি সম্পত্তি। বর্তমানে মাতব্বর জোহরার গার্জিয়ান…। সুতরাং খলু মাতব্বরের ও জমিতে হাল চষতে শরীয়তের কোন বাধা নেই। কেউ বেদখল করতে চেষ্টা করলে গোটা গাঁয়েরই বেইজ্জতি। মুর্গীর রান খেয়ে ছতুর বাপের মুখ দিয়ে এখন জজবা ছুটছে। আপাতত তসবীহ টেপা বন্ধ রেখে কবীরের জমি যে খলু মাতব্বরের হক যত্র তত্র সে কথা প্রচার করে বেড়াচ্ছে। মকবুল মস্তানের ছেলে ফয়েজ মস্তান। সে তো বলতে গেলে, ঘরের কুত্তা-বিলাইর সামিল। তু তু করে ডাকলে এসে লেজ নাড়বে, হেই বললে চলে যাবে। আগে দু’বেলা আদালতে মিছা সাক্ষী দিয়েও পেটের ভাত যোগার করতে পারতো না। খলু-ই তো একক প্রচেষ্টায় মসজিদের ইমাম মুয়াজ্জিন দুই-ই করেছে। তাকে। এখন যে গায়ে লম্বা কোর্তা ঝুলায়, চেহারায় যে জৌলুস বেড়েছে, দু’দুটো বিয়ে করেছে-এর মূলে কি খলু মাতব্বর নয়? ঠোঁট বেয়ে একটা লতানো হাসি জাগে এক সময়ে। সশব্দে উচ্চারণ করেঃ

“হালার পুত কাদিরা।”–(শালার পুত কাদিরা–)।

কাঁচা ছেলে খলু নয়। লাঠিতে হলে আসো। মামলা-মোকদ্দমা করে ভদ্রলোকের পরিচয় দিতে চাও–সেও আসো। খলু পথের ভিখারী নয়। মাথায় বুদ্ধি, গাঁটে কড়ি–দুই-ই তার আছে। গোলায় এখনো চার বছরের বিন্নি চিকন ধান মজুত আছে। যে ভাবেই যুদ্ধ করতে চাও, আসো। খলু পিছু হঠার মতো মানুষ নয়। কোনো জিনিসে নজর দিয়ে পিছু হটে না খলু কোনোদিন। মরদের মতো জান বাড়িয়ে লড়তে জানে।

“তুমি খড়গ ধারিলে আমি খৰ্গধারী
তুমি যদি পুরুষ হও আমি ই নারী।”

পুঁথির মজলিসে শোনা পদ্মাবতীর কাহিনীর রাজা রত্নসেনের উক্তিটি মনে মনে কয়েকবার আওড়ালো। সবকিছু ঠিকঠাক। বিধাতার অন্তরের গোপন আকাঙ্খার মতো নিখুঁত পরিকল্পনা খলুর। তবু মনের ভেতরে একটা সংশয় দোলা দিয়ে যায়। ভবিষ্যতকে কিসের বিশ্বাস। খলুর মতো অমন ধড়িবাজ মানুষও আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে পায়চারী করে। মাথার তালুতে উত্তাপ জমে।

দু’চারদিন পর দু’গ্রামে ছড়িয়ে পড়লো প্রবল সংক্রামক উত্তেজনা। ডরে এ গ্রামের মানুষ ও গ্রামের ওপর দিয়ে যায় না। মাতব্বরের ভাতিজা রমজু এসবের কিছু জানে না। সে বরকল গ্রামে শ্বশুর বাড়িতে ঘরজামাই থাকে। বাপের ভিটেতে সাতবাড়িয়ার ওপর দিয়ে বেড়াতে আসার সময়, সাতবাড়িয়ার মানুষ মেরে আধমরা করে দিয়েছে। রমজুর সঙ্গে খলুর সদ্ভাব ছিলো না। খলু ভেবেছিলো ভাতিজা নাম মাত্র দামে ভিটেটুকু কবলা করে দেবে চাচাকে। রমজু কিন্তু উচিত দামে জাহেদ বকসুর কাছেই ভিটে বেচে খাল কেটে কুমীর এনে দিলো। অন্য কেউ হলে বেদখল করে দিতে। জাহেদ বকসুরা পাঁচ ভাই আর গ্রামের নতুন ধনী। খলুর জারিজুরি চালাকী তাদের কাছে চলবে না। বাধ্য হয়েই চুপ করে রইলো। কিন্তু আজকে কাদির মিয়ার মানুষের হাতে বেদম মার খাওয়া ভাতিজার জন্য খলুর দরদ উথলে উঠলো। পাড়ার লোকে দূর ভিন গ্রামে চলে গেলেও রমজুকে ভালোবাসে। এ সুযোগেই খলু গ্রামের লোককে এক জায়গায় জড়ো করলো। গ্রামের দশজনকে ডেকে এনে ঘটনাটা সবিস্তারে বর্ণনা করলো। ছতুর বাপ, কানা আফজল, ফয়েজ মস্তান সকলে এসেছে। আর এলো গ্রামের যুবকেরা… যাদের লেঠেল রক্ত ছলকে ছলকে গরম হয়ে যায়। এ কথা সে-কথা… কাদির মিয়াকে খুব এক চোট গালাগাল দেওয়ার পর সকলে মূল কথা আলোচনা করতে লাগলো। কিভাবে এ অন্যায়ের বদলা নেয়া যায়। এ বদলা নিলে গ্রামের ইজ্জত হুরমত বজায় থাকে না। কুয়ত কি শুধু তাদের বাহুতে? হিম্মত কি শুধু তাদের বুকে? গাছবাড়িয়ার যুবকেরা কি মরে গেছে? তাদের লহু কি ঠাণ্ডা হয়ে গেছে? তারা কি শোধ নিতে জানে না? ছতুর বাপ দু’হাতে দাঁড়ি মুঠো করে একাধিক দাঙ্গার কথা বললো। সে সকল দাঙ্গায় সাতবাড়িয়ার মানুষ কি মার খেয়েছিলো, সে কথাও বললো। কানা আফজল আশ্বাস দিলো। ওসব কাজে বুকে হিম্মত আর মাথা ঠিক রেখে ঘাড়ে দায়িত্ব নিতে হয়। সে আশ্বাসে গ্রামের যুবকদের রক্ত চাড়া দিয়ে ওঠে। প্রতিশোধের নেশায় তারা পাগল হয়ে যায়। গ্রামের সব চাইতে শক্তিমান, সেরা দাঙ্গাবাজ যুবক ছদু মন্তব্য করলোঃ।

“আঁরা কাদিরা চোরার নাহান চুরি গরি মাইরতাম নয়। খবর দেও। সামনাসামনি দাঙ্গা গইরগম–তারপর খানকীর পুতের মাথা কাডি লইয়ম।” (আমরা কাদিরা চোরার মতো চুরি করে মারবো না। খবর দাও, সামনাসামনি দাঙ্গা করবো। তারপর খানকীর বাচ্চার মাথা কেটে নেবো।)

স্থির হলো সামনাসামনি দাঙ্গা করার জন্য কাদির মিয়াকে খবর দেওয়া হবে । দু’পক্ষে যথারীতি খবর চালাচালি হয়ে গেলো। আগামী সোমবার দাঙ্গার দিন ধার্য হয়েছে। দু’দিন ধরে সারা গ্রামের কারো চোখে ঘুম নেই। কিরীচ শানাচ্ছে। কামার বাড়িতে পিটিয়ে বর্শার মুখ ছুঁচলো করে আনছে। মেয়েরা রাত জেগে কেঁকিতে পাড় দিয়ে মরিচের মিহি গুঁড়ো তৈরি করছে। বাঁশ ঝাড় থেকে লাঠি কেটে জুতসই করছে। খলুর মেটে দেওয়ালের বৈঠকখানায় দিনে-রাতে মিটিং চলছে। নতুন নতুন পরামর্শ হচ্ছে। কৌশলের কথা চিন্তা করা হচ্ছে। রোববার দিন বিকালবেলা খলুর বড়ো ছেলে হাজারী হাটে গিয়ে একটা গোটা গরুর গোশত্ কিনে নিয়ে এলো। আগামীকাল দাঙ্গা করতে যাবার আগে লেঠেলদেরকে গোশত্ দিয়ে ভাত খাওয়াবে।

রাতে খলুর বৈঠকখানায় চাপা আলোচনা চলছে। মনির আহমদ, হিমাংশু ধর, মান্নান প্রভৃতি চার-পাঁচজন মাতব্বরকে ডাকতে ডাকতে বৈঠকখানায় এলো। এরা কৃষক সমিতির মানুষ। দেখে মাতব্বর স্পষ্টত বিরক্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে তারা সদলবলে এসেছে। এই কৃষক-সমিতিই মাতব্বরের লাভজনক বহু অভিসন্ধিকে ভণ্ডুল করে দিয়েছে। মফিজার মার ভিটাটুকু বলতে গেলে খলু একরকম পানির দামেই কিনে নিয়েছিলো। কিন্তু মনির আহমদই চাঁদা তুলে মফিজার মা’র মেয়েটাকে বিয়ে দিয়ে দেয়। ফলে চৌদ্দশতক অমন ফলন্ত সুপুরির বাগান নিজ দখলে আসি আসি করেও এলো না। মাথা খাঁটিয়ে কিছু লাভের কাজ করতে চাইলে পারে না। এরা কোত্থেকে এসে বাধা দেয়। শহর-বন্দর চেনে। আইন-আদালত বোঝে। পত্রিকার কাগজে কি সব লেখালেখি করে। কিছুদিন আগে ওপরে টিপসই দিয়ে দরখাস্ত পাঠিয়ে খাসমহালের তহশীলদারকে জেলে পাঠিয়েছে। লোকটা একদম বিনামূল্যে চরের দু’পাশের জমি বন্দোবস্ত দিতে চেয়েছিলো। বাতির স্বল্প আলোকে মনির আহমদের মুখের দিকে তাকিয়ে মনের ভাবখানা জেনে নিতে চেষ্টা করে। মনির আহমদ কোনোরকম ভূমিকা না করেই বললোঃ

“হুইনলাম খলু চাচা, তোঁয়ারা দাঙ্গা গরিবার লাই তৈয়ার অইয়ো। আঁরা আস্যিদে মীমাংসার লায়। কি লাভ চাচা মারামারি কাড়াকাডি গরি? তারথুন মীমাংসা বউত ভালা। তারপরে কোর্ট-কাঁচারীতে দৌড়ন লাগিব। তিন কানির লায় দশকানির টেঁয়া খরচ গরন লাগিব।” (শুনলাম খলু চাচা, তোমরা দাঙ্গা করবার জন্য তৈরি হয়েছে। আমরা এসেছি মীমাংসার জন্য। মারামারি কাটাকাটি করে কি লাভ? তার চেয়ে মীমাংসা খুব ভালো। কোর্ট-কাঁচারীতে দৌড়াতে হবে। তিনকানির জন্য দশকানির টাকা খরচ করতে হবে।)

“তেঁরা কন মীমাংসার কথা কইবার? তোরা কি গেরামর মেম্বর-চেয়ারম্যান?” (মীমাংসার কথা বলবার তোমরা কে? তোমরা কি গ্রামের মেম্বার চেয়ারম্যান?)

“আঁরা সমিতির মানুষ চাচা।” (আমরা সমিতির মানুষ চাচা।) জবাব দিলো মনির আহমদ।

“তোরার সমিতি ভরে আঁই মুতি, দুত্তোর সমিতি। মীমাংসার কথা কইলে কইব চেয়ারম্যান সা’ব।” (তোমাদের সমিতিতে আমি প্রস্রাব করি, দুত্তোর সমিতি। মীমাংসার কথা বললে বলবে চেয়ারম্যান সাহেব।)

এরপরে আর কথা বলা যায় না। সকলে সুর সুর করে বেরিয়ে আসে। আকাশে অষ্টমীর চাঁদ জেগে আছে। পৃথিবী সুপ্তিমগ্ন, গভীর প্রশান্তিতে মৌন সমস্ত চরাচর। সমিতির কর্মীরা কানভরে গভীর পৃথিবীর পাঁচালী শুনে যেন। খলু মাতব্বরের বৈঠকখানায় চুপি চুপি নরহত্যার মন্ত্রণা চলছে।

পরের দিন বরগুইনির দু’পাড়ের দু’গ্রামের মানুষ খুব সকালে শয্যাত্যাগ করে। আজকের দিন ভয়ঙ্করের বার্তা নিয়ে এসেছে। গাছবাড়িয়ার জোয়ানেরা সকলে মাথায় লাল পাগড়ী বেঁধে মাতব্বরের উঠোনে সমবেত হয়েছে। একটু পরেই সকলে খেতে বসলো। সপের দু’ধারে সার সার মাটির সানকী। এমন সময় হাসিমের খোঁজ পড়লো। হাসিম আসেনি। এতো বড়ো বুকের পাটা বানিয়ার পুতের? পাড়ায় থাকবে অথচ দশজনের কাজে আসবে না। তড়াক করে লাফিয়ে ওঠে ছদু। গর্বিত পদক্ষেপে হাসিমের উঠোনে এসে হাঁক দেয়ঃ

“বান্যিয়ার পুত, এই বান্যিয়ার পুত।” (বেনের ছেলে, এই বেনের ছেলে।)

বারবার ছদুর অসহিষ্ণু কণ্ঠস্বর বেজে ওঠে। হাসিম কালকের রাখা পান্তাভাত খাচ্ছিলো। ডাক শুনে বাইরে এসে ছদুকে দেখে মুখের কথা মুখে আটকে থাকে। হাতে লাঠি, মাথায় লাল কাপড়ের পাগড়ী। অন্তরটা পর্যন্ত শিউরে ওঠে। কোনো রকমে জিজ্ঞেস করে, কথাগুলো জড়িয়ে যায়ঃ

“কি মামু?” (কি মামা?)

“কুত্তার বাইচ্চা যাতি নয়? (কুত্তার বাচ্চা, তুই কি যাবি না?)

“মামু আঁর শরীর ভাল না।” (মামা আমার শরীর ভালো নয়।)।

সুফিয়া ছদুর উগ্রমূর্তি দেখে ভয় পায়। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে একখানা সিঁড়ি এগিয়ে দেয়।

“মামু বইয়ো।” (মামা বসো।)

ছদু পিঁড়িটাকে লাঠি দিয়ে উলটিয়ে ফেলে। ঠকঠক কাঁপা পা দুটো জোড় করে ছদুর ভয়ঙ্কর মূর্তির সামনে একান্ত বশংবদের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। সুফিয়া দু’হাতে ছদুর পা দুটো জড়িয়ে ধরে।

“মামু, জ্বরতথন উইঠ্যেদে আজিয়া মোডে চারদিন। ঠ্যাংগর ফুলা ন কমে। মামু তুই ন বাঁচাইলে কেউ বাঁচাইত পাইরত নয়।” (মামা, জ্বর থেকে উঠেছে আজ মোটে চারদিন। পায়ের ফোলা কমে নি। তুমি না বাঁচালে কেউ বাঁচাতে পারবে না।)

এ অবস্থার জন্য ছদু তৈরি ছিলো না। হাসিমকে কানে ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যেতে এসেছিলো। পদতলে শায়িতা রোরুদ্যমানা রমণীর আকুতিতে তার ভেতর একটু করুণার সঞ্চার হলো। মনের দৃঢ় সংকল্প কেমন যেন নেতিয়ে পড়লো। ভাবে, মোটাসোটা হলে কি হবে, বান্যার জাত তো। বাপের আমলে মুসলমান হয়েছে। রক্তে হিম্মত না থাকারই কথা। খুন-খারাপীকে জব্বর ডরায়। হাতের লাঠিটা ঘুরিয়ে হাসিমকে একটা বাড়ি দিয়ে বৃথা সময় নষ্ট না করে চলে গেলো।

খলু মাতব্বরের বৈঠকখানা ঘরে আট-দশজন মৌলানা সুর করে কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করে। দাঙ্গা শেষ না হওয়া পর্যন্ত করতে থাকবে। মেয়েরা হাতের খাড় এবং নাকের নাকফুল খুলে ফেলেছে। তারা রাড়ীর বেশ ধারণ করেছে। স্বামী-পুত্র যদি আর ফিরে না আসে। লেঠেলরা কলেমা পাঠ করে। লাল পাগড়ী পরা মানুষগুলো ‘আলী আলী’ রব তুলে লাঠি বর্ষা হাতে বরগুইনির চরে যাত্রা করলো।

ঠিক জোহরের নামাজের পরে তারা রক্তাক্ত কলেবরে ফিরে এলো। অনেকেই আহত। কারো মাথা ফেটে গেছে, হাত ভেঙ্গেছে কারো। মাতব্বরের ছেলে আবদুল চোখ খুলতে পারছে না। তারে চোখের ভেতরে কাদির মিয়ার লোকদের ছড়ানো মরিচের গুঁড়ো ঢুকেছে। স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছে না, অস্থির যন্ত্রণায় নাচানাচি করছে। মাতব্বরের বাহুমূল থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে। সবচেয়ে বেশি চোট লেগেছে ছদুর। বিপক্ষ দলের মানুষেরা তাকে ঠেঙিয়ে সংজ্ঞাহীন করে ফেলেছে। গ্রামের সবচেয়ে সবল যুবা, সবচেয়ে দুঃসাহসী, গ্রামের মান-ইজ্জতের সঙ্গে শিরার শোণিত-কণিকার অচ্ছেদ্য সম্বন্ধ ছিলো যার– সে ছদুকে মারতে মারতে সংজ্ঞাহীন করে ফেলেছে; সে-ই তো প্রথমে বিপক্ষ দলকে পেছনে ঘুরে আক্রমণ করেছিলে। একজনকে বর্শার ঘায়ে উরুর কাছটিতে এফোঁড় ওফোঁড় করে ফেলেছিলো। ছদুর পেছন পেছন গাছবাড়িয়ার ওরা গিয়ে বিপক্ষ দলের ওপর এলোপাতাড়ি মার শুরু করেছিলো। সহ্য করতে না পেরে তারা পালিয়ে আত্মরক্ষা করেছে। ছদু টেকে বাঁকে বর্শা হাতে তাদের পেছন দিক থেকে তাড়া করতে করতে যখন বরগুইনির পানিতে এসে নেমেছে তখনই তারা সুযোগ পেয়ে চলে গেলো। একটু পানি নাকি চেয়েছিলো। কে একজন মুতে তাকে পান করতে দিয়েছে। কে কাকে দেখে, সকলেই আহত। লেগেছে সকলের। মা-বোন স্ত্রী পুত্র লক্ষ্য করেছে। খলু মাতব্বরের উঠোনে চ্যাংদোলা করে এনে রেখেছে ছদুকে। খালের পানির মতো রক্ত ছুটছে বলকে বলকে। হাফেজ ডাক্তার প্রাণপণ চেষ্টা করেও বন্ধ করতে পারছে না।

মাতব্বর বাহুমূলে একটি পট্টি জড়িয়ে সিন্দুক খুলে টাকা নিলো। তারপর ছদুসহ অন্যান্য আহতদের নিয়ে ছুটলো৷ এজাহার করার পর অন্যান্য আহতদের থানা হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলো।

দু’পক্ষ এজাহার করেছে। সন্ধ্যার দিকে গ্রামে পুলিশ এলো। মনে মনে মাতব্বর বেজায় খুশি হয়েছে। তার পক্ষের মানুষেরা জখম হয়েছে বেশি। কারো কারো অবস্থা সঙ্কটজনক। সুতরাং মামলা তার পক্ষে যাবে। এখন চেয়ারম্যান সাবকে খবর দিয়ে বড়ো দারোগাকে সন্তুষ্ট করতে পারলেই হলো। একটু পরেই বাঁকা লাঠিটা হাতে নিয়ে চেয়ারম্যান সাব এলো। ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসে পা নাচাচ্ছে দারোগা। পাশে একখানা টিনের চেয়ার টেনে নিয়ে চেয়ারম্যান কানা আফজল বসলো। দারোগার সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে ফিসফাস আলাপ করলো। খলুকে ডেকেও কানে কি বলে দিলো।

সন্ধ্যা হয়ে এলো। চেয়ারম্যান সা’ব চলে গেলো। খলু জোড়হাতে চেয়ারম্যান সা’বকে, দারোগা-পুলিশদের সঙ্গে দু’মুঠো খেয়ে যেতে অনুরোধ করলো। এর প্রতিক্রিয়া ভালো হবে না সে কথা চেয়ারম্যান সাব খুলুর কাছে ব্যাখ্যা করলো। ঘরের খাসী জবাই করে দারোগা-পুলিশকে আচ্ছা করে খাওয়ালো। রাতের বেলায় আসামী ধরার জন্য পুলিশেরা সাতবাড়িয়া চলে গেলো।

মাতব্বরকে নানা দিক দেখতে হয়। বড়ড়া সঙ্কটের সময় এখন। কামলারাও পালিয়েছে। দারোগা-পুলিশকে খুব ভয় করে কিনা। খলুরও ভয় করে প্রবলভাবে। তবু একবার যখন ফেঁসে গেছে আর রক্ষে নেই। একটু আগে চেয়ারম্যান সা’ব যে কথা বলে গেছে তার তাপে খলুর মতো মানুষের শরীরেও বিন্দু বিন্দু ঘামের কণা নির্গত হয়েছে।

দারোগা-পুলিশকে খাওয়াতে হয়, টাকা দিতে হয়, এতোদিন তা-ই জানতো খলু। রাতের শয্যার সঙ্গীনীও যে তাদেরকে দিতে হয় এ জ্ঞান খলুর ছিলো না। খলু ভাবছে আর চর্বিওয়ালা পাহাড়ের মতো সটান শুয়ে থাকা মানুষটাকে হাওয়া করেছে। ভাবছে, কি করা যায়। শহর-বন্দর নিদেন পক্ষে থানা হলেও বিশেষ অসুবিধে ছিলো না। এ যে নিতান্তই গণ্ডগ্রাম। কোথায় পাবে নষ্টা মেয়েমানুষ? টাকা দিলেও কে আসবে? প্রত্যেকটা মুহূর্ত তার স্নায়ুকেন্দ্রে হাতুড়ির ঘায়ের মতো বেজে উঠছে প্রবলভাবে। খলুর মতো অমন শক্ত-সমর্থ কূট-কৌশলী মানুষও ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। দারোগার মুখোমুখী দাঁড়িয়ে কিরূপে না বলবে– বিশেষ করে এ বিপদের সময়।

দারোগা বোঁজা চোখ দুটো পাকিয়ে প্রকাণ্ড একটা কাতলা মাছের মতোই হাই তুললো। চারদিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে জিজ্ঞেস করলোঃ

“চেয়ারম্যান সা’ব তোমাকে কিছু কন নি?”

“জী হুজুর, কইয়ে।” (হ্যাঁ হুজুর, বলেছে।) কুণ্ঠিতভাবে জবাব দিলো খলু।

“যাও, তোমার পাখা করতে হবে না। অন্য কাউকে ডেকে দাও, পাখা করুক।”

“এ্যাই শোন্।” খলু নতমুখে ঘরে ঢুকলো।

“হুজুর।”

“ডাবকা জোয়ান মাংসল আর পুরুষ্ট বুক দেখে আনবে। যাও তাড়াতাড়ি।”

আর কাউকে না পেয়ে হাসিমকে ঘর থেকে গিয়ে নিয়ে আসে। হাসিম আনমনে পাখা করছে। তালের পাখার নরম হাওয়া ছুটছে। শব্দ উঠছে। বাইরে লুটিয়ে পড়ছে চাঁদের আলো। এ আলোতে কতো কথা মনে পড়ে। দারোগা সা’ব হাতির মতো মোটা ডান পা-খানা প্রসারিত করে দিয়ে বললোঃ

“এ্যাই একটু টিপে দে তো।”

ঘৃণায় কুঞ্চিত হয়ে ওঠে হাসিমের নাক-মুখ। তবু পা টিপতে হয়। না টিপে যে উপায় নেই। বৈঠকখানার জানালা দিয়ে হাসিম দেখতে পেলো মাতব্বর কাকে ধাক্কিয়ে ধাক্কিয়ে এদিকে নিয়ে আসছে। নিয়ে আসছে সেটি মেয়ে। অবাক হয়ে দেখতে লাগলো হাসিম। আপনা থেকেই পা টেপা বন্ধ হয়ে গেলো। চিনতে চেষ্টা করলো। দারোগা ঝাঁজালো গলায় বললোঃ

“এই শালার বেটা থামলি কেন?”

হাসিম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। খলু চোরের মতো ঘরে ঢুকে হাসিমকে বললোঃ

“হাসিম, তুই এহন যা।”

হাসিম বেড়িয়ে আমগাছটার কোলভরা অন্ধকারের ভেতর আত্মগোপন করে রইলো। দেখলো, জোহরাকে জোরে ধাক্কিয়ে ধাক্কিয়ে দরজার কাছ অবধি নিয়ে যাচ্ছে খলু। কাঁদছে জোহরা। কাঁদবার পালাই তো তার এখন। খলু তাকে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে বাইরে থেকে শেকল তুলে দিলো। এমনও হয়? এমন ও হয়? চিন্তা করতে পারে না হাসিম। আপন চাচা নিজের ভাইয়ের মেয়েকে জোরে-জব্বরে দারোগার কাছে ঠেলে দিতে পারে? হাসিম কি দেখছে? পৃথিবীটা কাঁপছে কেন? আকাশ-বাতাস টলছে কেন? বোধশক্তি সে হারিয়ে ফেলেছে। নিশ্চল পাথরের মূর্তির মতো নিশ্চেষ্টভাবে দাঁড়িয়ে থাকলো। তার দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই আধখানা সোনার থালার মতো সুন্দর চাঁদ ডুবে গেলো। চরাচরের জীবন্ত পীচের মতো অন্ধকার। হেঁটে আসছে কে একজন। সেদিকে এগিয়ে গেলো হাসিম। তাকে দেখে হেঁটে আসা মূর্তি থমকে দাঁড়ায়। হাসিম জিজ্ঞেস করে। কিন্তু ফ্যাসফ্যাসে গলার স্বর বেরোয় না।

“হেইভা কন?” (তুমি কে?) ছায়ামূৰ্তি কথা কয় না। এগিয়ে আসে। কেঁপে কেঁপে হাসিমের হাত ধরে। জড়িয়ে ধরে কাঁপতে থাকে। হাসিমও কাঁপে। কেন কাঁপে? জোহরা সংজ্ঞা হারিয়ে হাসিমের গায়ে ঢলে পড়ে। অন্ধকারের নির্মম চক্রান্ত চারদিকে। এ অন্ধকারেই ঢলে পড়লো নির্মমভাবে ধর্ষিতা জোহরা।

৪. অভিজ্ঞতার বাড়া শিক্ষা নেই

অভিজ্ঞতার বাড়া শিক্ষা নেই। দিনে দিনে হাসিমের অভিজ্ঞতার ভাণ্ড সমৃদ্ধতরো হচ্ছে। বিগত পঁচিশ বছরের জীবনখানা অনুজ্জ্বল মিনারের মতো ঠেকে। এতোদিন পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখতে অভ্যস্ত ছিলো না। হঠাৎ অনেকগুলো ঘটনার আকস্মিক আলোকসম্পাতে তার দৃষ্টিশক্তিতে অনেক তীক্ষ্ণতা এসে গেছে। জীবনের একটা অর্থ ধীরে ধীরে রূপময় হয়ে তার চোখে জেগে উঠেছে। সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের আচার-আচরণের অন্তরালে যে মহাসত্য সক্রিয় হাসিমের চেতনায় তা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে দিনে দিনে। হাসিম অহরহ দগ্ধ হয়। বুকের চিন্তার আগ্নেয় রশ্মি মাঝে মাঝে বিদ্যুতের মতো ঝলসে ওঠে। সে আলোকে জগত জীবনের সমস্ত রহস্যকে বিচার করা যায়, বিশ্লেষণ করা যায়। মানুষ তাকে অবজ্ঞা করে কেন? কেন ঘৃণা করে? হাসিমের ধারণা তার কেন্দ্রবিন্দুটিতে হাত দিতে পেরেছে সে। সে এক নিষ্ঠুর সর্বভূক অনল। রাতদিন দগ্ধ হয়, মুখ ফুটে রা করার উপায় নেই। হাসিমের বাপ গ্রামের মধ্যে একমাত্র মানুষ যার কাছে এ মহাসত্য উলঙ্গভাবে উদ্ঘাটিত হয়েছিলো। মুখ ফুটে একবার উঁহু শব্দটিও উচ্চারণ করে নি। নীরবে নীরবে হৃদয়ের সে কি বেদনার্ত রক্তক্ষরণ! অনুমান করতে কষ্ট হয় না হাসিমের, যার বুকে যত বেশি বৎসব বেদনার সে ততো বেশি চিত্তাকর্ষক গল্প-কাহিনী রচনা করতে পারে। সামাজিক সত্যের আগুন পলে পলে দগ্ধ করেছিলো বলে তার বাপ হামেশা বেহেস্তের দোহাই দিতো। কল্পনাকে স্বর্গরাজ্যে তুলে দিয়ে কেমন আত্মপ্রবঞ্চনা করতো। রহমত কাজীর মেয়ে জরীনার আকর্ষণে বাপের ধর্ম ছেড়ে মুসলমান হয়েছিলো। মুসলমান হলেও জরীনাকে পায় নি। সেখানেই তার বাপের সবচেয়ে বেশি দুঃখ, চিত্তক্ষোভ, ব্যর্থতা। নিজের ব্যর্থতা চাপা দেবার জন্যে বুড়ো যখন তখন বেহেস্তের কথা বলতো। ধর্ম কি? এ সকল প্রশ্ন জাগে হাসিমের মনে। তার বাপ ভুল করেছিলো, বিরাট ভুল। জীবনের চাইতে প্রেম বড়ো নয়। প্রেমকে দেখেছিলো, জীবনকে নয়। জানতো না তার বাপ। জীবনের চাইতে প্রেম বড়ো নয়। প্রবল প্রেমের আকর্ষণে পরিচিত সমাজের গণ্ডী পেরিয়ে আরেকটা অনাত্মীয় সমাজের পরিবেশে এসে দেখলো ঘাসের ডগায় সূর্যালোক ঝলমল করা শিশির বিন্দুটি যার নাম প্রেম, কখন শুকিয়ে গেছে। রইলো শুধু আগুনভরা আকাশ। সে আগুনের শিখাহীন নির্দয় দহনে সারাটি জীবন জ্বলে পুড়ে মরলো। হাসিমের চেতনার আকাশে এ সকল প্রশ্ন বিজুলীর ফুলের মতো জেগে ওঠে। উল্কার মতো ভস্ম হয়ে যায়। অন্তরের অন্বিষ্ট চেতনার আলোকে চারপাশের কঠিন বাস্তবকে আরো নিখুঁতভাবে দেখতে পায়। একনিষ্ঠ স্রোতের মতো একমুখী জীবন হাসিমের। বাইরে জগতের কোনো সংঘাত লাগলে এসকল চিন্তা মনের অন্ধকার নিশুতির রাজ্যে নক্ষত্রমালার মতো জ্বলে ওঠে। চিন্তার আলোকে অনেক ডুবো পাহাড়কে দেখে–যে সকল পাহাড়ের সঙ্গে ধাক্কা লেগে সমস্ত জীবন স্থবির নিশ্চল হয়ে যায়।

গেলো অসুখের সময় সুফিয়া কানের ফুল দুটো অধর বাবুর কাছে বন্ধক দিয়ে চিকিৎসা আর ওষুধ-পথ্য যুগিয়েছিলো। ও দুটো সুফিয়ার মা’র। মরবার সময় তাকে দিয়ে গিয়েছিলো। মার হাতের সোনার জিনিস ভয়ঙ্কর মায়া। একাধিকবার আকারে ইঙ্গিতে সে কথা হাসিমকে জানিয়েছে। হাসিম সুফিয়ার কথা বুঝতে পেরেও না বোঝার ভান করেছে। কেন না, খালাস করে আনতে গেলে পয়সার দরকার। সাফ কথা, পয়সা এখন হাসিমের নেই। সুদ-আসল এক সমান হয়ে দাঁড়ালেও হাসিমের কিছু করার নেই। সুফিয়া হাসিমের মনোগত অভিপ্রায় হৃদয়ঙ্গম করে ফেলেছে। তাই গতকাল বৰ্গা পাওয়া গরুর বাচ্চাটাকে যুগীপাড়ার চন্দ্রকান্তকে দিয়ে বাজারে বেচে এক কুড়ি মোল টাকা আট আনা পয়সা যোগাড় করেছে। দাম হয়েছিলো এককুড়ি সতের টাকা। আট আনা গেছে রসিদের খরচ। হাসিম কিছুই বলে নি। তার বলবার কিছু নেই। পরের দিন সকালে চন্দ্রকান্তকে একেবারে ঘরে ডেকে নিয়ে এসেছে। গতকালের রাখা পান্তাভাতগুলো বড়ো বড়ো গেরাসে গিলছিলো পোড়া মরিচ দিয়ে। চন্দ্রকান্তকে তামাক জ্বেলে দিয়ে তেরছা করে কাটা একটি বাঁশের চোঙ্গা বের করে দু’খানা দশ টাকার আর একখানা পাঁচ টাকার নোট বের করে দিয়ে বললো সুফিয়াঃ

“চন্দ্রকান্ত চাচা, কিছু কম দিবার চেষ্টা গরি চাইও।” (চন্দ্রকান্ত চাচা, কিছু কম দেবার চেষ্টা করে দেখবে।)।

হাসিম মাটির সোরাহীটার পানি ঢক ঢক করে গিলে খেয়ে হাথিনায় চন্দ্রকান্তের পাশে একখানা সিঁড়ি টেনে নিয়ে বসলো। চন্দ্রকান্ত অট্টহাস্যে ফেটে পড়ে। হাসবার সময় বাবড়িটা তার দুলে দুলে ওঠে। মুখ দিয়ে গান বেরিয়ে আসে। সুখের সময়, দুঃখের সময় চন্দ্ৰকান্তের গলা দিয়ে গান ঝরেঃ।

“পাগলা মনরে কি করি রাখিমু তোরে ভুলাইয়া
শিশুরে ভুলাইয়া রাখি বুকের তন দিয়া,
যুবারে ভুলাইয়া রাখি বিবাহ করাইয়া।
ও পাগলা মনরে…।”

“ভাতিঝি, অধরবাবুরে ভোলান যাইত নয়। হাতের ফাঁক দি পানি ন গলে যার, তার নাম অধরবাবু। বুঝিলি ভাতিঝি।” (ভাইঝি অধরবাবুকে ভোলানো যাবে না। যার হাতের ফাঁক দিয়ে জল গলে না, তারই নাম অধরবাবু। বুঝলে ভাইঝি।)।

“চেষ্টা গরি চাইও না চাচা, দুই চার আনা পৈসা নি কম দিবার পার।” (তবু চেষ্টা করে দেখবে, দু-চার আনা পয়সা কম দেয়া যায় কিনা।)

“না রে মা, আঁই পারতাম নয়। হাসিমেরে ক’ তার চাচাত ভাই, ভাইয়ের থুন ভাইয়ে পৈসা একেবারে না লইতও পারে।” (না মা, আমি পারবো না। হাসিমকে বলো, তার খুড়তুত ভাই, ভাই থেকে ভাই পয়সা একেবারে নাও নিতে পারে।)

হাসিমের মুখে একটা কালো ছায়া নামে। চন্দ্রকান্ত নিজের অজ্ঞাতে হাসিমের বড়ো দুঃখের বড়ো বেদনার স্থানটিতে আঘাত দিয়ে ফেলেছে। মুখ দেখে সুফিয়া স্পষ্ট বুঝতে পারে, কষ্ট পেয়েছে হাসিম। আবহাওয়াকে তরল করবার জন্যে হঠাৎ কোনো কথা খুঁজে পায় না। তাদের মুখ দেখে থতোমতো খেয়ে যায় চন্দ্রকান্ত। বড় আফশোস হয় তার। সুফিয়া হাসিমের জামাটা নিয়ে অসে। পিঠের কাছটিতে ছিঁড়ে গেছে। সময় মতো সেলাই করে না রাখার জন্যে দুঃখ হয়। সুফিয়া বললোঃ

“ঠিক আছে চাচা, কম ন লইলে ন লউক। টেঁয়া পৈসা মইরলে ত আর লগে যইত নয়। অধর বও রাজত্বি গরুক। তুই আঁর কানফুল দুয়া আনি দেও।” (ঠিক আছে চাচা, কম না নিলে না নেবে। টাকা-পয়সা তো আর কেউ মরবার সময় সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবে না। অধরবাবু রাজত্ব করুক। তুমি আমার নাকফুল দুটো এনে দাও।)।

হাসিমের দিকে চেয়ে সুফিয়া করুণ মিনতি মেখে বললোঃ

“চন্দ্রকান্ত চাচার লগে তুই অ যও না।” (চন্দ্রকান্ত চাচার সঙ্গে তুমিও যাও না।) নিজের বউটির দিকে চেয়ে বড় মায়া হয়। পরনের একটা কাপড় দিতে পারে না, দু’বেলা ভাত দিতে পারে না পেট পুরে। তবু বউটা কেমন জননীর মতো মেহে তাকে সমস্ত বিপদ-আপদ দুর্ভোগ থেকে রক্ষা করে আসছে। টুললাটুলো স্ফীত তলপেটের দিকে চেয়ে করুণার প্রস্রবণ বয়ে যায় মনের ভেতর। সুফিয়ার আপাদ মস্তক দেখতে থাকে। মা হতে চলেছে সুফিয়া। সেদিনের সুফিয়া পাঁচ বছর আগেও ডুরে কাপড় পরে রাস্তায় ধুলো খেলা করে বেড়াতো। তার সারা শরীরে মাতৃত্বের লক্ষণ পরিস্ফুট। হাসিমের কাছে এ বড়ো আনন্দের কথা। যাবে না বললে সুফিয়া ব্যথা পাবে। জামাটা কাঁধে ফেলে চন্দ্রকান্তকে ডেকে বললোঃ

“ল চাচা যাই।” (চল চাচা যাই।)

কাজী পুকুরের ধার ঘেঁষে, বরগুইনির পাড় বেয়ে, ঢেউ খেলানো আউশ ধানের সবুজ মাঠের কিনারা দিয়ে হেঁটে হেঁটে হাসিম আর চন্দ্রকান্ত খাঁর হাটের অধরবাবুর দোকানে এসে পৌঁছলো। দু’জনের মনের ভেতর লুকিয়েছিলো অনেক কথা। কিন্তু কোনো বৈচিত্র্য নেই বলে সাহস করে কেউ কথা বললো না। বরগুইনির পাড়ে মানুষ মহাজন বাড়ি যাওয়ার সময় একে অপরের হৃৎপিণ্ডের আওয়াজ শুনতে পায়।

মানুষে অধরবাবুর ঘর ভরে গেছে। গদীতে বসেছে অধরবাবু। দু’ভাই চোতা লিখছে একযোগে। কৃশ কাঠির মতো শরীরে কেমন একটা মেদ মেদ আভা

বেরিয়েছে অধরবাবুর। নীচে আগুন জ্বালিয়ে কারিগরেরা হাতুরি ঠক ঠক করে সোনার কাজ করছে। সোনাকে এ্যাসিডে গলাচ্ছে। কষ্টি পাথরে ঘষে দেখছে। লোহার আলমারীর ভারী পাল্লা দুটো হাট করে খোলা। কাঁচের আবরণীর ভেতর দিয়ে ঝিলিক দিচ্ছে নানা রকম সোনার অলঙ্কারের প্রতিভাময় রূপ। এ আলমারীর তালা ভেঙে তার বাপ হরিমোহন আধসের পাকা সোনা আর পাঁচ হাজার রূপোর টাকা চুরি করে রাতের অন্ধকারে কানা আফজলের সাক্ষাতে কাজী রহমতের হাতে তুলে দিয়েছিলো। রাতের অন্ধকারে সে আদান-প্রদানের কথা নিজের বিবরে লুকিয়ে রাখতে পারে নি। এখনো বেঁচে আছে মানুষের স্মৃতিতে। তার মনেও আছে তরুণ বেদনার মতো। পুরনো হয় না, পুরনো হতে জানে না।

কানা আফজল, জাহেদ বকসু আরো অনেকে এসেছে দোকানে। জাহেদ বকসুর ছেলেমেয়ে দুজনের বিয়ে এক সঙ্গে। সোনা কিনতে এসেছে। তাদের সঙ্গে খোশগল্প করছে অধরবাবু। আর নীরবে চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিচ্ছে।

জাহেদের সারা মুখে ছড়িয়ে পড়েছে সুতীক্ষ্ণ বিষয়বুদ্ধির ছটা। কানা আফজল কথা বলছে হরদম। কথার ফাঁকে ফাঁকে হেসে উঠছে। ছোটো করে ছাটা দাঁড়িতে এক ধরনের ভাব বিকীরিত হয়ে যাচ্ছে। গ্রামে নতুন ধনী জাহেদ বকসু। ছেলেমেয়ের বিয়েতে অলঙ্কার কেনার জন্য আরো দশজন ভদ্রলোককে নিয়ে এসেছে। পছন্দ করার চাইতে মেয়েকে কতো খরচ করে বিয়ে দিচ্ছে আর ছেলের বৌকে কতো টাকার অলঙ্কার দিয়ে ঘরে এনেছে, সেকথা জানানোই তার মুখ্য উদ্দেশ্য।

অধরবাবু রুমালে সমস্ত আলঙ্কার একটা পুটুলি বেঁধে হাতে নিয়ে আফজলকে ডাকলোঃ

“হাজী সাব… অ হাজী সাব”

কানা আফজল পাশের লোকটির সঙ্গে আসন্ন ইলেকশন সম্বন্ধে আলাপ করছিলো। অধরবাবু আবার ডাকলোঃ

“অ চেয়ারম্যান সাব?”

এবার শুনতে পেলো। তার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলোঃ

“কি অধরবাবু?”

“আল্লাহর নাম লৈ গছি লন অলঙ্কার।” (আল্লাহর নামে অলঙ্কার বুঝে নিন।)

মনে মনে বিড় বিড় করে সশব্দে বললো, “দেও, কই?”

“বিসমিল্লাহির রাহমানির রহীম।” (পরম করুণাময় আল্লাহর নামে আরম্ভ করছি।)।

জাহেদ বকসুর সে দিকে খেয়াল নেই। আড়চোখে অলঙ্কারের পুঁটুলির দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলোঃ

“দাম কতো চেঁয়া অইল?” (মূল্য কতত টাকা হলো?)

“কডে টেঁয়া, অনেরার লায় মুতের ফেনা। মোডে ষোলো শ পঞ্চাশ টেঁয়া।” (কোথায় টাকা, এই টাকা তো আপনাদের জন্য প্রস্রাবের ফেনা। মোটে ষোলশ পঞ্চাশ টাকা।)।

জাহেদ বকসু মানিব্যাগ থেকে দশখানা জিন্নাহ মার্কা একশো টাকার নোট গুণে দিয়ে বললোঃ

“বাকী টেঁয়া পরে দিলে অসুবিধা অইবো?” (বাকী টাকা পরে দিলে কি কোনো অসুবিধা হবে?)।

“আরে, ছি, কি কন, এই টেঁয়াও পরে দিয়ন?” (আরে ছি, কি যে বলেন, এই টাকাও পরে দেবেন?)

“না, জামাই আবার বি. এ. পাশ’ত। ঘড়ি আর খাট-পালং কিনিবার লায় শহরত যন পড়ের। বেশি টেঁয়া ন আনি লগে।” (জামাই আবার বি. এ. পাশ কিনা। ঘড়ি আর খাট-পালং কিনতে শহরে যেতে হচ্ছে, সঙ্গে করে বেশি টাকা আনি নি।)

আরো কিছুক্ষণ বসে চা খায়, গল্প করে। চন্দ্রকান্ত চোতাটা এগিয়ে দেয় অধরবাবুর দিকে। অধরবাবু চশমার ফাঁক দিয়ে হাসিম আর চক্রান্তের দিকে তাকায়। তার কপালে কুঞ্চিত রেখা। সে তীব্র ঘৃণার। অধরবাবু লোহার আলমারীর গভীর থেকে কালো মোটা মহাজনী খাতাটা হাত দিয়ে টেনে বের করে পাতা খুলে হিসেব করে বললোঃ

“বাইশ টেঁয়া আসল আর সুদ দুই চেঁয়া সাড়ে দশ আনা। নয়া পৈসা অইলে পঁষট্টি পৈসা দে।” (বাইশ টাকা আসল আর সুদ দু’টাকা সাড়ে দশ আনা, যদি নয়া পয়সা হয় তাহলে দেবে পঁয়ষট্টি পয়সা।)

“বাবু ভাংতি পৈসাগুন কম দিতাম।” (বাবু, খুচরো পয়সাগুলো কম দেই।) অনুরোধ করে চন্দ্রকান্ত।

“না, না, এক পৈসাও কম অইত নয়, আঁর হক।” (না, না, এক পয়সাও কম হবে না, আমার হক।)

পঁচিশটি টাকা দিয়ে কানের ফুল জোড়া ও বাকী সাড়ে পাঁচ আনা পয়সা ফেরত নেয়।

জাহেদ বকসু, কানা আফজল এবং অন্যান্য সকলে অলঙ্কারের পুঁটুলিসহ বেরিয়ে যাচ্ছিলো। কোণের বেঞ্চিতে হাসিমকে দেখতে পেয়ে সিগারেট টানতে টানতে থেমে বললো জাহেদ বকসুঃ।

“এ্যাই বানিয়ার পুত, সোমবারের বৈরাতির লগে বেয়াই বাড়িতে যাবি। হাত ধোয়ান পড়িব। আইজকাল দাস-গোলামের এতো অভাব দেশত।” (এই বেনের ছেলে, সোমবার বরযাত্রীর সঙ্গে বেয়াই বাড়িতে যাবি। হাত ধোয়ানো লাগবে। আজকাল দেশে দাস-গোলামের এতো অভাব।)

অধরবাবু জাহেদ বকসুর দিকে চেয়ে ম্লান হেসে বললোঃ

“জাহেদ সা’ব গরীবের মিক্যা খেয়াল রাখিবান।” (জাহেদ সাহেব, গরীবের দিকে দৃষ্টি রাখবেন।)

ঘড়েল হাসি হেসে জাহেদ বকসু জবাব দিলোঃ

“আইচ্ছা।”

হাসিম অভিশপ্ত লোহার আলমারীটার দিকে একবার, আরেকবার অধরবাবুর দিকে, আবার অপসৃয়মাণ জাহেদ বকসুর দিকে চেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। সে নিশ্বাসে চন্দ্রকান্ত চকিত হয়ে উঠলো। কতত বেদনাসিক্ত, ব্যথাদীর্ণ এ দীর্ঘশ্বাস। চন্দ্ৰকান্তের বুক ছুঁয়ে গেলো। চঞ্চল হয়ে উঠলো চন্দ্রকান্ত।

“চল চল হাসিম। বেলা অই গেল।” (চল চল হাসিম, বেলা হয়ে গেলো।) তারা দু’জনে পথ দিলো।

আজকের মহাজনের সোনার দোকানে সুফিয়ার কানফুল জোড়া খালাস করতে গিয়ে যে শিক্ষা হাসিমের হয়েছে তার জুড়ি নেই। জাহেদ বকসুর কথাগুলো সুঁচের মতো তার চেতনায় বিধে আছে। কেমন অবলীলাক্রমে উচ্চারণ করে গেলো কথাগুলো। দুপুরে খাওয়ার পর ঘরের দাওয়ায় বসে ভাবছে, সে লোহার আলমারীটার কথা। যে আলমারী থেকে তার বাপ সোনা আর টাকা এনে কাজী রহমতের হাতে দিয়ে চিরতরে দাস হয়ে গেলো। তাকেও দাস করে গেলো। আজ সে আলমারী থেকে জ্বলন্ত সোনা কিনে নিলো জাহেদ বকসু। তারা কাজীদের দাস নাকি ছিলো দুপুরুষ আগে। সে জাহেদ বকসু তাকে দাস করতে চায়। দাস বিয়ে শাদীতে হাত ধুয়ে দিলে টাকা পায়, বাতাসার হাঁড়ি বয়ে নিলে টাকা পায়। সপের একপাশে বসে কুকুর বেড়ালের মতো খেতে পায়। তার বাপ কাজী বাড়ির দাস ছিলো এখন তার বাপ বেঁচে নেই। কাজীদের এখন দাস রাখার ক্ষমতা নেই। এককালের কাজী পরিবারের দাস জাহেদ বকসুর টাকা হয়েছে। জাহেদ বকসু তাকে দাস করতে চায়। কেন সে দাস হতে যাবে?

জাহেদ বকসু কিসের বলে দাসের খাতায় তাকে দিয়ে দাসখত লিখাতে চায়? টাকার বলে? আর ভাবতে পারে না। গলা দিয়ে রক্ত আসতে চায়। অগ্নিময়ী চিন্তা তার বুকের ভেতর।

সুফিয়ার শরীর দিনে দিনে ভারী হয়ে উঠেছে। তার অস্বস্তি বাড়ছে দিন দিন। উদরের দেয়ালের মাংসল আবেষ্টনীতে অন্তরালবর্তী সন্তান আঘাত করছে। হাসিমের রক্ত-মাংস-বীর্যের প্রভাবে সুফিয়ার মধ্যে আরো একটা প্রাণের সঞ্চার হয়েছে।

আরেকটা বাড়তি প্রাণের ভার সুফিয়া কিছুতেই ধরতে পারছে না। অনাগত শিশুর দায় মেটাতে গিয়ে সুফিয়া নড়তে পারছে না, চড়তে পারছে না। সারা শরীর কাঁচা হয়ে উঠেছে। কাঁচা শরীর নিয়ে শুয়ে আছে। স্ফীত উদরের কাছটিতে পরনের বসন খসে পড়েছে। জ্বলজ্বলে মসৃণ তৈলাক্ত তলপেটের দিকে চেয়ে ফলবান সবুজ কোনো শষ্যক্ষেতের কথা চিন্তা করে। একদৃষ্টে চেয়ে থাকে। চেয়ে চেয়ে আশ মেটে না। পিড়ি থেকে উঠে সুফিয়ার বিস্রস্ত বসন ঠিক করে দেয়। এ উথলানো সৌন্দর্য চোখ দিয়ে দেখার অধিকার যেনো অন্য কারো নেই।

এক ছিলিম তামাক কল্কিটাতে ভরে আগুনের জন্য বাইরের মালসাটার খোঁজ করতে গিয়ে দেখলো জোহরা কাঁঠাল গাছের পাশ দিয়ে হাসিমকে দেখে লুকিয়ে লুকিয়ে চলে যাচ্ছে। হাসিম ডাক দিলো। জোহরার মুখখানা বিবর্ণ হয়ে গেলো। সে রাতের পর জোহরা আর কোনোদিন হাসিমের সামনে আসে নি। সুফিয়াকে দেখতে এসেছিলো। অন্যান্য দিন, এ সময়ে হাসিম ঘরে থাকে না। হাসিমকে দেখে তার ডাক শুনে ভয়ে বুকটা চুরচুর করে। যন্ত্রচালিত পুতুলের মতো হাসিমের সামনে এসে দাঁড়ালো। কাঁপছে। বুকের ভেতর বাসা বেঁধেছে কাঁপুনি, জীবনে কোনোদিন থামবে না।

“কি, আইয়্যারে চলি যর ক্যা জোহরা?” (কি জোহরা, এসে চলে যাচ্ছো কেন?)।

হাসিম জিজ্ঞেস করে। জোহরা জবাব দেয় না।

“কি, কথা ন কস ক্যা? (কি, কথা কও না কেন?)

“হাসিম বাই, কি কথা কইতাম?” (হাসিম ভাই, কি কথা বলবো?)

জোহরা জবাব দেয়। জোহরার চোখের কোল বেয়ে জলের ধারা নামে। ফোঁটা ফোঁটা পানি টস টস করে গণ্ডদেশে ঝরে পড়ে। হ্যাঁ জোহরার বলার কোনো কথা নেই। সকল কথা সে রাতে– তার বুকের ফুলের স্তবকের মতো গোপন গভীর সকল কথা, তার চাচা খলু আর দারোগা মিলে থেঁতলে দিয়ে গেছে। হাসিম পৃথিবীতে তার একমাত্র সাক্ষী।

গা ঘোয় নি জোহরা। চুল বাঁধে নি। পরনে কাপড়খানা মলিন। এলোমেলো রুক্ষ চুল বাতাসে উড়ছে। দু’চোখে একটু আগে পানি ঝরেছে। টলটলে চোখের মণি আর ফর্সা সুগৌর মুখোনিতে কী এক থমথমে বিষণ্ণতা। কী অপরিসীম ক্লান্তি। ক্লান্তির ভারে লুটিয়ে পড়েছে জোহরা। পৃথিবীতে কেউ আর তার ভার ধরতে পারবে না। ভারসাম্য চিরদিনের মতো সে হারিয়ে ফেলেছে। পুরোনো কক্ষপথে সে ফিরে আসবে না, আসতে পারবে না। হাসিমের মুখোমুখী দাঁড়াবার কোনো সাহস জোহরার নেই। টলতে টলতে পালিয়ে গেলো। হাসিমের দৃষ্টি থেকে নয়, সমগ্র পৃথিবীর দৃষ্টি থেকে পালিয়ে যেতে পারলে সে যেন বাঁচে।

হাসিম কল্কিটা মেটে হুঁকোর ‘গাপ্টায় বসিয়ে ক’টা মরা টান মারে। ধোঁয়া বেরোয়। আরো ক’টা টান মারে। প্রবৃত্তি হয় না। চিন্তার অতন্দ্র প্রহরীরা তাকে ঘিরে ধরেছে। একপাশে কোটা রেখে দেয়। মাথাটা ঝিম ঝিম করে। বাইরে সূর্যের ঝলমলানো রোদে হাসিম তেলীপাড়ার তেজেনের ছুরির ফলার মতো বাগিয়ে ধরা দু’চোখের দৃষ্টিকে দেখতে পায়। লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি ভগ্নাংশ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

গ্রামে ওলাউঠা নেমেছে। জিনিসপত্রের দাম ভয়ঙ্করভাবে বাড়ছে। হাজেরার ছোটো আট বছরের ছেলেটা বিনা চিকিৎসায় মারা গেলো। মরে গিয়ে বেঁচেছে। কানা আফজল, জাহেদ বকসু, অধরবাবু আর খলু মাতব্বরদের জগতে হাজেরার ছেলেদের বাঁচবার ঠাই কই?

চন্দ্রকান্ত এসে খবর দিয়ে গেছে। লোকটার মায়া-মমতা যদি কোনো মন্ত্রবলে টাকা-পয়সা অথবা ধান-চাল হয়ে যেতো তাহলে বরগুইনির দু’পাড়ের কারো অভাব-দুঃখ থাকতো না। জাহেদ বকসু, কানা আফজল, খলু মাতব্বর সকলে যদি চন্দ্ৰকান্তের মতো হয়ে যেতো, তাহলে? তাহলে কেমন হতো? কিন্তু তা হবে না, কোনও দিন না। জাহেদ বকসু আর খলু, জাহেদ বকসু খলু হয়েই জন্মগ্রহণ করেছে, আর চন্দ্রকান্ত, চন্দ্রকান্ত হয়েই জন্মগ্রহণ করেছে। অভাবে জ্বলবে, কষ্ট পাবে, দুঃখ পাবে, বুক ঠেলে পরের উপকার করতে চাইবে, দোতরা বাজিয়ে রাধা কানুর পীরিতির গান গাইবে। ওরা জোর করবে, জুলুম করবে, লাঠির জোরে পরের জমি দখল করবে, চেয়ারম্যান হবে, মেম্বার হবে। এজন্যেই তারা জন্মগ্রহণ করেছে।

দাম-ঘেরা পুকুরটার পুব পাড় পেরিয়ে আচার্য পাড়ার রাস্তায় উঠে এলো হাসিম। হাজেরার ঘর আর দূরে নয়। চেকন রাস্তার দু’ধারে বেতঝাড় আর মেহেদী কাটার বন। বেত-ঝোঁপের বাঁ দিকে ছোট্ট আধ-ভাঙা ঘরটি থেকে একটি শিশু-কণ্ঠের আওয়াজ তার কানের পর্দায় আঘাত করে। মনোমোহন আচার্যের ছোটো ছেলেটি তার মাকে জিজ্ঞেস করেঃ।

“আইচ্ছা মা, হাজেরা পিসীর পুত আবুল মরি গেইয়ে না, আজিয়া? (আচ্ছা মা, আজ হাজেরা পিসীর ছেলে আবুল মারা গেছে, না?)

“অয় পুত, অয়।” (হাঁ বাবা, মারা গেছে) মনোমোহনের বউ একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দেয়।

“মা, আঁই একবার আবুলরে চাইবাললাই যাইতাম, তুঁই যাইবানি আঁর লগে?” (মা আমি একবার আবুলকে দেখতে যাবো, তুমি আমার সঙ্গে যাবে?)

“না রে পুত, আঁরা যাইতে পাইত্যাম নয়।” (নারে বাবা, আমরা দেখতে পারবো না।) ছেলের মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে জবাব দেয় মনোমোহনের বউ।

“ক্যা মা? (কেন মা?) মনোমোহনের ছেলে শশাভন আশ্চর্য হয়ে গেলো।

“তোর হাজেরা পিসী মুসলমান, মুসলমান মইলে চাই ন পারে, নিষেধ আছে।” (তোর হাজেরা পিসী মুসলমান, মুসলমান মরলে অন্যে দেখতে পারে না, নিষেধ আছে।)

“কার নিষেধ মা?”

“ধর্মের।”

“মুসলমান মইলে চাই ন পারে? (মুসলমান মরলে অন্যে দেখতে পারে না?)

“না।”

“আঁরা মইলেও চাইত ন পারিব হাজেরা পিসীরা?” (আমরা মরলেও হাজেরা পিসীরা দেখত পারবে না?)

“না, পাইরত নয়।” (না, দেখতে পারবে না।)

“আরা কি?” (আমরা কি?)

“আরা হিন্দু।” (আমরা হিন্দু)

“মুসলমান মানুষ নয় মা?”

“মুসলমানও মানুষ, তবে মুসলমান মানুষ–”

“আর আঁরা হিন্দু মানুষ না?” (আমরা হিন্দু মানুষ না মা?)

“অয়।” (হাঁ।)

“সব মানুষ এক মানুষ নয় ক্যা মা? আঁই যে আবদুলের লগে মার্বেল খেইলতাম মা, কিছু দোষ অইব না?” (সব মানুষ এক মানুষ নয় কেন মা? আমি যে আবদুলের সঙ্গে মার্বেল খেলতাম, সেজন্য কিছু দোষ হবে?)

মনোমোহনের বউ জানায় যে, এক সঙ্গে মার্বেল খেলতে কোনো দোষ নেই।

শোভন আবার বলেঃ

“আঁর পরাণ পোড়ের মা, আঁই একবার চাইতাম যাইয়ম।” (মা, আমার প্রাণ পুড়ছে, একবার আমি দেখতে যাবো।)

“না,” দৃঢ় কণ্ঠে বলে এবার মনোমোহনের বউ।

“আইচ্ছা মা, সব মানুষ এক মানুষ নয় ক্যা?” (আচ্ছা মা, সব মানুষ এক নয় কেন?)

“ধর্ম দুই রকম, হিথার লায়।” (ধর্ম দু’রকম, তাই।)

“ধর্ম দু’রকম ক্যা?” (ধর্ম দু’রকম কেন?)

মনোমোহনের বউ সে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। অবোধ শিশুর অবুঝ প্রশ্ন। অধরবাবুর সোনা-রূপোয় ভর্তি আলমারী, জাহেদ বকসুর দ্রোন দ্রোন সম্পত্তি, ফয়েজ মস্তানের কেতাব কবচ, রামাই পণ্ডিতের প্রমাণ-পঞ্জি সংহিতাতে এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর নেই। তেজেনের ঝুলন্ত মৃত্যুতে এ প্রশ্নই ঝলকিত হয়ে উঠেছিলো, চোখের ভাষায়। কিন্তু হাতির মতো বলশালী তেজেনদাও অবোধ শিশুর মতো এমন সরলভাবে প্রশ্নটি তুলে ধরতে পারে নি।

হাজেরার মরা ছেলেকে দাফন করতে পাড়ার কেউ আসেনি। সেই সকালবেলা মরেছে। মরা ছেলের শিয়রে বোবা হয়ে বসে আছে হাজেরা। তার চোখের পানির ধারা শুকিয়ে গেছে। পাতার নীচে চোখের পানির মরা খালটি এখনো জেগে আছে। শোকের চেয়ে আতঙ্কটাই এখন হাজেরার বেশি। ওলাউঠার রোগী যদি কবর দিতে না পারে? খলুর দাঙ্গায় জান দিতে মানুষের অভাব হয় না। জাহেদ বকসুর ছেলের বিয়েতে বেগার খাটতে মানুষের অভাব হয় না। অভাব কেবল হাজেরার ছেলেকে কবর দেওয়ার বেলা। একা কি করতে পারে হাসিম?

কিছুক্ষণ পরে মনির আহমদ এলো, সঙ্গে কৃষক সমিতির ক’জন কর্মী। এসেই মনির আহমদ হাজেরার সামনে হাতজোড় করে বললোঃ

“আগে খবর ন পাই। হেয় কথার লায় দেরী অইয়েদে বইন। কি গইরগম, পাড়ার মানুষ ন আগায় ডরে। যুগী পাড়াত একজনেরে পোড়ন পড়িল। আরেকজনের কবর দিলাম।” (আগে খবর পাইনি তাই দেরী হয়ে গেলো বোন। কি করবো, পাড়ার মানুষ ডরে এগিয়ে আসে না। যুগী পাড়ার একজনকে পুড়তে হলো, আরেক জনকে কবর দিলাম।)

তারা কাজে লেগে গেলো। কবর খুঁড়ে ফেললো দু’জনে। আরেকজন আবুলকে গোসল দিয়ে দিলো। সে নিদারুণ অভাবের দিনে কোথায় পাবে কাফনের শাদা কাপড়। স্বামীহারা হাজেরার একমাত্র সন্তান আবুল ছেঁড়া কাপড়েই কবরে নামলো। জননী ডুকরে কেঁদে ওঠলো। আকাশ-বাতাস ছাপিয়ে প্রতিধ্বনি জাগলো।

সেদিনই মনির আহমদ এবং কৃষক সমিতির অন্যান্য কর্মীদের সঙ্গে হাসিমের পয়লা পরিচয়। মোহিত হয়ে গেলো হাসিম। মানুষের অন্তরে এতো দয়ামায়া থাকতে পারে? কলেরার সময় গা ছেড়ে পালাচ্ছে মানুষ। এক বাড়িতে কারো কলেরা লাগলে বাড়ির মানুষ উধাও। আর এরা সারাটা ইউনিয়ন ঘুরে ঘুরে দেখছে, কোথায় মানুষ মরে আছে, কোথায় মৃতের সকার হচ্ছে না। তারা হিন্দু? তারা মুসলমান? তারা কোন্ জাত? হাসিম অবাক হয়ে মনির আহমদের মুখের দিকে চেয়ে থাকে। বেঁটে-খাটো মানুষটি। রোদের ছ্যাকা লেগে লাল হয়ে উঠেছে গাল। চুলগুলো ফ্যাড়ফ্যাড়ে। এলোমেলো বাতাসে উড়ছে। ক’দিন গোসল করে নি, ক’দিন ঠিকমতো খায় নি তার হিসাব নেই। গায়ে একটা চেক চেক-হাফশার্ট। তাতে বিস্তর ময়লা। তবু কাজে এতোটুকু বিরক্তি নেই। স্বভাবে একটুও অহঙ্কার নেই। পরোপকারে কোনও দ্বিধা নেই। কণ্ঠস্বরটা মোলায়েম ভেজা ভেজা বাঁশির সুরের মতো। হিমাংশু বাবুটাও তেমন। ভালো বললে এদের ছোটো করা হয়। এদের মনোবলকে অনুভব করতে হয়, উপলব্ধি করতে হয় এদের মনোভাব। সকলে দল বেঁধে তেজেনদার বাগিয়ে ধরা সে মৃত্যুকালীন প্রশ্ন আর মনোমোহন আচার্যের অবোধ ছেলের অবুঝ কৌতূহলের জবাব দেবার জন্যে কঠিন শপথ নিয়ে পথে বেরিয়েছে যেন। চেয়ে দেখে হাসিম। তাদের কারো মুখের আদল খলু অধরবাবু কিংবা জাহেদ বকসুর মতো নয়। তাদের অনেক কথা জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হলো; কিন্তু পারলো না; কথা সরলো না জিভ দিয়ে। সে ছেটোলোকের চাইতে ছোটোলোক।

এদের সম্পর্কে ছধর বাপ তসবীহ টিপতে টিপতে নবীর দোকানে বসে কতো খারাপ কথা বলেছে। ফয়েজ মস্তান এদেরকে কাফের বলেছে। রামাই পণ্ডিত কাঁধের পৈতা দুলিয়ে বলেছে, সব ব্যাটা গাঁজাখোঁর পাড় মাতাল। কাফের কাকে বলে হাসিম জানে না। কাফেরদের কেমন চোখ? কেমন মুখ? কেমন নাক? তারা কি মানুষের মতো? কেমন করে জানবে হাসিম। সেতো আবার কোরান কেতাব পড়ে নি অতো। বলতে গেলে সে শুদ্ধভাবে আরবী ভাষায় বিসৃমিল্লাহও উচ্চারণ করতে পারবে না। গান সে গায় বটে, কিন্তু গান তার শিখতে হয় নি। বরগুইনির পাড়ে মানুষদের কারো শিখতে হয় না গান । বরগুইনির পাড়ে গান ভেসে ভেসে বেড়ায়। ইচ্ছে করে গলার ভেতর ধরে রাখলে গলা দিয়ে আপনা-আপনিই বেরিয়ে আসে।

.

মনির আহমদ, হিমাংশু বাবুদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে বুকের অর্ধেক বোঝা নেমে গেলো হাসিমের। এখনও পৃথিবীতে মানুষ আছে। যারা মানুষের বিত্তসম্পদের পানে তাকায় না। মানুষকে মানুষ বলেই গ্রহণ করতে পারে। কোনো রকমের বাধা বিপত্তির তোঁয়াক্কা না করে মানুষের বিপদে বুক পেতে দেবার হিম্মত রাখে। মনির আহমদ তাকে জিজ্ঞেস করলো, বাড়ি কোথায় ভাই?

জবাব দিতে গিয়ে তোতলাতে লাগলো হাসিম। তার কি বাড়ি আছে? তার কি পরিচয় আছে? এখনো কাজী বাড়ির মানুষ কণ্ঠে শ্লেষ মিশিয়ে তাকে বাঁদীর বাইচ্চা আর বান্যার পুত বলে নিন্দা করে। সুতরাং হাসিম কি বলবে? বলবে নাকি, আমি একজন ঘরহারা, সমাজহারা মানুষ। মানুষ আমাকে ঘৃণা করে, অবজ্ঞা করে– আমার জন্মের জন্য।

“খলু মিয়ার বাড়ির কাছে নাকি তোঁয়ার বাড়ি?” (খলু মিয়ার বাড়ির কাছে নাকি তোমার বাড়ি?) জিজ্ঞেস করে মনির আহমদ।

“জ্বী, একটু পুব সাইডে, পইরের উতর পাড়ে।” (হ, একটু পুব পাশে, পুকুরটার উত্তর পাড়ে।)

“কি নাম তোঁয়ার ভাই?” (কি নাম তোমার ভাই?)

“আবুল হাসিম, মাইনসে হাসিম ডাকে।” (আবুল হাসিম, মানুষে ডাকে হাসিম।)।

তা ছাড়া, মানুষ আরো নামে তাকে ডাকে। সে কথা মনির আহমদকে জানাতে বড় সাধ হলো। কিন্তু পারলো না। জিহ্বাটা আটকে রইলো।

“ঠিক আছে, আঁরা তোঁয়ারের হাসিম বুলি ডাইকাম।” (ঠিক আছে, আমরা তোমাকে হাসিম বলে ডাকবো।) বললো হিমাংশু বাবু।

হাসিমের মনে হলো এতোদিনে পৃথিবীতে তার আসল পরিচয় দিতে পেরেছে। সে এখন অনেক সুখী। মনির আহমদের কণ্ঠস্বর তার বুকের অর্ধেক জ্বালা শুষে নিয়েছে। হিমাংশুবাবু তাকে বললোঃ

“হাসিম বাই, তোঁয়ার যদি কাজ কাম কম থাহে আঁরার লগে কদিন আইও না। চৌকেত দেখর কি রকমের কি রকমের বিপদ।” (হাসিম ভাই, তোমার যদি কাজ কর্ম কম থাকে আমাদের সঙ্গে এসো না। দেখতে তো পাচ্ছো চোখে কি ধরনের বিপদ।)

এমনি একটা আমন্ত্রণের জন্য হাসিম যেন সারাজীবন অপেক্ষা করেছিলো। তবু ঝটপট কিছু বলতে পারলো না। সুফিয়ার কথা মনে হলো। সে যদি সমিতির লোকদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়, কি খাবে? কি ভাবে চলবে তার দিন? হাসিম ভাবতে থাকে। ভেবে কোনো কুল-কিনারা করতে পারে না। অধোমুখে দাঁড়িয়ে থাকে।

মনির আহমদ আবার সস্নেহে জিজ্ঞেস করেঃ

“কি ভাবদে?” (কি ভাবছো?)

“জ্বী,” হাসিম পেঁচার মতো চোখ গোল গোল করে চেয়ে থাকে।

“বাড়িতে কন আছে তোঁয়ার হাসিম ভাই?” (বাড়িতে কে আছে তোমার হাসিম ভাই?)।

হাসিম বড় ফাঁপরে পড়লো। কেমন করে বলবে তার একটা বৌ আছে। বৌয়ের পেটে আবার বাচ্চা আছে। তাকে ভাত খেতে হয়। এতো বড়ো লজ্জার কথাটা সে কেমন করে নিজের মুখে উচ্চারণ করবে?

“আগে কি কাম গইরতা হাসিম বাই?” (আগে কি কাজ করতে তুমি হাসিম ভাই?) শুধায় মনির আহমদ।

“জ্বী, পাহাড়ত যাইতাম।” (পাহাড়ে যেতাম।)

“বাড়িঘরের কথা এই কদিন তোঁয়ার ভাবন ন পড়িব, সমিতির থুন চাঁদা গরি চালাইয়াম।” (বাড়িঘরের কথা ক’দিন তোমাকে ভাবতে হবে না। সমিতি থেকে চাঁদা করে চালাবো।)

অবাক হয়ে যায় হাসিম। জগতে এমন মানুষও কি আছে! তার মতো মানুষকেও বুকে টেনে নিতে দ্বিধা করে না! তার বুকে খুশি উপচে পড়তে চায়। হাজেরা চিৎকার করে কাঁদছে। সে কান্না হাসিমের কানে ঢুকছে না। অপরাহ্নের মিঠে মিঠে সোনালী রোদের দিকে চেয়ে একটা বিচিত্র সুর শুনতে পায়। মনির আহমদ বললোঃ

“বড়ো স্কুলের মাডত আগামী রবিবারে আঁয়ারার সমিতির মিটিং অইবো। অনেক নেতা আইব। তুইও আইবা তোঁয়ার চেনা-জানা মইনসরে লই।” (বড় স্কুলের মাঠে আমাদের সমিতির সভা হবে। অনেক নেতা আসবে। তুমিও তোমার চেনা-জানা মানুষদের নিয়ে আসবে।) হাসিম ঘার নেড়ে সায় দিলো।

অনেক নেতা এসেছে। আগে মিটিংও করেছে। বড় স্কুলের মাঠও গরম করেছে। তার মতো ছোটলোকের তো ডাক পরে নি। তৎক্ষণাৎ ঠিক করে ফেললো চন্দ্রকান্ত চাচাকে নিয়ে যাবেই যাবে।

রোববার সকালবেলা হাসিম হাইস্কুলের মাঠে গেলো। যাবার সময় চন্দ্রকান্তকেও সঙ্গে করে নিয়ে গেলো। সমিতির লোকেরা বক্তৃতার প্যাণ্ডেল তৈরি করছে। মাঠের মধ্যে নানারকম প্ল্যাকার্ড পুঁতে রেখেছে। বড় বড় কি যেন লেখা লাল কালিতে। ওখানে নাকি কলেরা মহামারীর প্রতিকারের দাবী, খাবার জিনিসের দাম কমাবার দাবী লেখা আছে। কেউ কারো ওপর খবরদারী করছে না। কেমন নীরবে সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করছে। মনির আহমদের ফুরসত নেই। এমন সকালবেলাতেও ঘেমে নেয়ে উঠেছে। কণা কণা ঘামের ওপর সূর্যালোক চিক চিক করে জ্বলছে। মনির আহমদকে আজ আশ্চর্য তেজোব্যঞ্জক দেখাচ্ছে। বেঁটেখাটো মানুষটা। সারা শরীরে অসাধারণ কিছু নেই। কিন্তু চোখ দুটোর দিকে চাওয়া যায় না। বাজপাখির কথা মনে পড়লো হাসিমের। মুখের দিকে চেয়ে বুকের কথা বলে দিতে পারে। তেমনি অন্তর্ভেদী তীক্ষ্ণ গভীর চাউনি।

চারদিকে নতুন পরিবেশ। দেখেশুনে চন্দ্ৰকান্তের চোখ তো চড়কগাছ। চাড়া দিয়ে ওঠে কৌতুকবোধঃ

“জয় রাধামাধব, কড়ে আনলি ভাইপুত?” (জয় রাধামাধব, কোথায় নিয়ে এলি ভাইপো?) রাধামাধবের উদ্দেশ্যে দু’হাত জোড় করে প্রণাম করে হাসতে থাকে। বিরাট কোদাল কোদাল দাঁতগুলো হাসির তোড়ে বেড়িয়ে পড়ে।

মনির আহমদ নীরবে এসে হাসিমের মাথায় হাত রাখে।

“হাসিম বাই কত্তে আইস্যোদে?” (হাসিম ভাই কখন এসেছো?)

“এককেনা আগে, চন্দ্রকান্ত চাচাও আইস্যে।” (একটু আগে, চন্দ্রকান্ত চাচাও এসেছে।)

“কই?”

“চাচা কাজর তাড়াতাড়ি। বেশি কথা কইত ন পাইরলাম, এহন আইয়ো চিনা পরিচয় গরাই দি।” (চাচা কাজের খুব তাড়াতাড়ি। বেশি কথা বলতে পারছি না, এসো চেনা জানা করিয়ে দিই।)

মনির আহমদ দু’জনকে নিয়ে সকলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলো। দু’জনকে খুব আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করলো সকলে। আন্তরিকতার স্পর্শে অল্পক্ষণের মধ্যে তাদের সঙ্কোচ কেটে যায়। খুবই সহজভাবে সকলের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে থাকে। চন্দ্ৰকান্তের উৎসাহ হাসিমের চেয়ে বেশি। এটা কি, ওটা কি, জেনে নিয়ে প্রত্যেকটা কাজ বেশ আগ্রহ সহকারে করে যাচ্ছে।

এগারোটার গাড়িতে নেতারা এলে অন্যান্যদের সঙ্গে তারাও অভ্যর্থনা করে আনতে গেলো। দশ গ্রামের কৃষক এসে জমায়েত হয়েছে। তাদের সঙ্গে এক মিছিলে দাঁড়িয়ে আওয়াজ তুললো। আওয়াজ তুললো চন্দ্রকান্ত। প্রথমে হাসিমের গলাটা কেঁপে উঠলো। জিহ্বায় কেমন যেন জড়তা, কিসের যেন আওয়াজ একসঙ্গে সমুদ্রের মতো ফেটে পড়েছে। কোত্থেকে হাসিমের বুকেও এলো সাহস। গলা ফাটিয়ে ঘোষণা করলোঃ

জালেম গোষ্ঠী ধ্বংস অউক

চাষী-মজুর ভাই ভাই

অন্ন চাই বস্ত্র চাই

লাঙ্গল যার জমি তার

বাঁচার দাবীকে উর্ধ্বে তুলে ধরার চাইতে রোমাঞ্চকর উত্তেজনা কি কিছু আছে জগতে? নেতারা এলে হাসিম আর চন্দ্রকান্ত চলে আসতে চাইলো। কিন্তু কৃষক সমিতির কর্মীরা আসতে দিলো না। নেতাদেরসহ ডালে-চালে খিচুড়ী পাক করে সকলে একসঙ্গে খেলো। এসব অভিজ্ঞতা হাসিমের নতুন। খাওয়ার ব্যাপারে চন্দ্ৰকান্তের বরাবর একটা খুঁতখুঁতে স্বভাব ছিলো। আশ্চর্য, চন্দ্রকান্ত চাচাও বিন্দুমাত্র আপত্তি করলো না।

সভার নেতারা বক্তৃতা করলেন। মনে হলো না যেন তারা দূরের মানুষ। যেন তাদেরই একান্ত আপনজন– কাছের মানুষ। দুঃখ-দুর্দশাকে সোজা ভাষায় সহজভাবে চোখের সামনে তুলে ধরলো না শুধু, কারণগুলোও বর্ণনা করলো। শ্যামল চেকন তলোয়ারের ফলার মতো আন্দোলিত শরীরের মানুষটার কথাগুলো তার চেতনায় সঙ্গীতের মতো বাজতে থাকলো।

এক সময় নাকি সমাজের সকলে সমান ছিলো। সকলে সমানভাবে স্বাধীন ছিলো। দাস ছিলো না কেউ কারো। সকলে সমানভাবে পরিশ্রম করতো, সমানভাবে ফলভোগ করতো। কেউ বড় কেউ ছোট ছিলো না। মানুষ মানুষের মেহনত চুরি করে মানুষকে দাস বানিয়ে রেখেছে। কৃষক-শ্রমিকের বুকের খুন-ঝরা মেহনত চুরি করে ধনী হয়েছে মানুষ। মেহনতী মানুষের বুকের তাজা রক্ত তাদের বাগানে লাল লাল গোলাপ হয়ে ফোটে। সহস্র রকম পদ্ধতিতে বুকের রক্ত শুষে নিচ্ছে। হাসিম যেন চোখের সামনে শোষণের নলগুলো দেখতে পেলো। সর্বশক্তি প্রয়োগ করে এ শোষণের পথ বন্ধ করতে হবে। সেজন্য দরকার সমিতি। ঘরে ফেরার সময় বক্তৃতার কথাগুলো হাসিমের চেতনায় বারংবার আবর্তিত হয়ে ঘোরে। পৃথিবীর সমস্ত শ্রমিকের শ্রম চুরি করে ধনীরা বালাখানা গড়েছে। হাসিম তো শ্রমিক, তারও শ্রম চুরি করেছে। এতোক্ষণে ধরতে পেরেছে অধরবাবু, কানা আফজল আর খলুদের সঙ্গে তার মতো মানুষদের তফাৎটা কোথায়। বক্তৃতার আলোকে চেনা মানুষদের নতুন করে খুঁটিয়ে দেখে। তাদের শরীর থেকে যেনো লাল লাল তাজা রক্ত ঝরছে। আর অধরবাবুদের মুখে রক্তের ছোপ। প্রবল উত্তেজনায় দু’হাত মুষ্ঠিবদ্ধ হয়ে এলো।

“জয় রাধামাধব,” একেক জনের কথার জোর কি রকম। চন্দ্রকান্ত ফিক করে হেসে ফেললো।

“চাচা, রাখি দাও তোঁয়ার রাধামাধব। বেবাক দুনিয়া ভরা শোষণ, শোষণে রক্ত নাই, হাড্ডিত ঠেহাইয়ে আনি। এতো শোষণ তবুও মাইনষের ঘুম ন ভাঙ্গে ক্যা?” (চাচা রেখে দাও তোমার রাধামাধব। সমস্ত দুনিয়া জুড়ে চলছে শোষণ। রক্ত শুষে এখন হাড়ে এসে ঠেকেছে। এতো শোষণ তবু মানুষের ঘুম ভাঙ্গে না কেন? উত্তেজনার বশে কঠিন মাটিতে দুম করে একটা পদাঘাত করলো।

৫. হাসিম গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ায়

হাসিম গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ায়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে মহামারী। সমিতির মানুষদের কাজ অনেকগুণ বেড়ে গেছে। ফুরসত নেই কারো একদণ্ড। খাবার জিনিসের দামে আগুন লেগেছে। ডাক্তার বদ্যি পাওয়া যাচ্ছে না মোটেও। একেকজন মানবসন্তান নীরবে বিনা চিকিৎসায় বিনা পথ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।

এতোদিন হাসিম নিজের দুঃখকেই বাড়িয়ে দেখেছিলো। আশপাশের মানুষের হাল হকিকত নজর মেলে দেখে নি। তার পক্ষে দেখবার উপায়ও ছিলো না। বাস্তবে কাজ করতে নেমে দেখতে পেলো পৃথিবীতে সে শুধু একমাত্র দুঃখী নয়। আরো মানুষ আছে, যাদের অবস্থাও তার চাইতে কোনোক্রমে ভালো নয়। তার মতো হাজারো হাজারো মানুষের জীবনের চারপাশে ঘিরে রয়েছে কঠিন করুণ বাস্তবতা। আঘাত খেয়ে রক্ত ঝরে, হৃদয় রক্তাক্ত হয়, সামনে এগিয়ে যাবার পথ পায় না জীবনে। মানুষের জীবনের মিছিল সে আলোহীন নিশুতির গাঢ় অন্ধকারে থমকে দাঁড়িয়ে আছে। নতুন পাওয়া চেতনার আলোকে সবকিছুর মর্মমূল পর্যন্ত কেটে চিরে দেখে। এতোদিন সেও আকাশের দিকে মুখ তুলে মানুষের দুঃখ-বেদনার অবসান কামনা করতো। সমিতির কর্মীদের সঙ্গে কাজ করে, আলাপ-আলোচনা করে সে বুঝতে পেরেছে, মানুষ নিজেকেই তার ভবিষ্যৎ রচনার ভার হাতে তুলে নিতে হবে। ওপর থেকে কোনো আসমানী রহমত এসে মানুষের দুঃখ আর অভাব দূর করবে, সে অসম্ভব কথা। হাজার মানুষের দুঃখ-বেদনার সঙ্গে সে যখন তার নিজের দুঃখও মিলিয়ে দেখলো, তখন অনুভূতির আয়নাতে সুন্দর ধারণা ফুটে উঠলো–সেও মানুষ। সমিতির লোকদের সঙ্গে কাজ করে ক্রমশই ধারণা আপনার থেকেই বদ্ধমূল হয়েছে যে, সেও মানুষ। জীবন অমূল্য সম্পদ, অসম্ভবকে সম্ভব, অসুন্দরকে সুন্দর করার নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম করার নামই জীবন। ক্ষয়ে ক্ষয়ে ধুকে ধুকে মরার জন্য মানুষ পৃথিবীতে আসে নি। সমস্ত পরিশ্রম, সমস্ত আকাঙ্খ, সমস্ত স্নেহ ঢেলে দিয়ে জীবনকে মাটির পৃথিবীতে দাঁড় করাতে হবে সুন্দর করে। কেউ কারো চেয়ে পৃথক নয় একই রক্তের নদী ছুটছে সমস্ত মানুষের ধমনীতে। সকলকে বাঁচাতে হলে প্রয়োজন সকলের সমবেত প্রচেষ্টা। একা থাকার মধ্যে তৃপ্তি নেই। কেননা একা থাকলে অতি সহজে নেতিয়ে পড়ে। সংগ্রাম করার অনুপ্রেরণা থাকে না। জীবনের সুখ মানেই তো জীবনের সংগ্রাম। সামনের উজ্জ্বল আশা আর পেছনের উদ্দীপনা না থাকলে মানুষ পারে না সংগ্রাম চালিয়ে যেতে। অবসর সময়ে হাসিম বসে বসে এসব কথা ভাবে। এ ক’দিন সমিতির কর্মীদের সঙ্গে কাজ করে এমন একটা আতস কাঁচ সে পেয়েছে যার ভেতর দিয়ে দেখল জাহেদ বকসু, খলু মাতব্বর, কানা আফজল সকলকেই তাদের আসল চেহারায় দেখা যায়, চেনা যায়। নিরন্ন ভুখা মহামারীর আক্রমণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া মানুষদেরকেও চেনা যায়। রাতে ঘুম আসে না, বিছানায় শুয়ে ছটফট করে।

সমিতির জেলা অফিস থেকে কাজ করবার জন্যে একটা মানুষ এসেছে। সারাদিন তাদের সঙ্গে ঘুরে মরা পোড়ায়, কবরস্থ করে। রোগীর সেবা করে। দুটো পেলে খেয়ে শুয়ে পড়ে যেখানে সেখানে। যেমনি সরল, তেমনি কঠিন মানুষটা। বেশ লেখাপড়া জানে। সকলের কেরামত ভাই। কতো কতো দেশ ঘুরেছে। কেরামত ভাই চাটগেয়ে ভাষায় কথা বলতে পারে না। তবু মর্মার্থ বুঝতে তাদের কারো অসুবিধে হয় না। হাসিমের মনে হয়, স্নেহ, প্রেম আর ভালোবাসার ভাষা দুনিয়ার সবদেশে এক। আরেকটা তেমন ভাষা আছে, তাও এক– সে সংগ্রামের ভাষা।

ঘরে আসতে পারে না বেশি। দলাদলা মানুষ মরছে। মাটি দিতে হচ্ছে, পোড়াতে হচ্ছে। জাত বিচারের সময় নেই। জাত বিচার করলে যে মৃতের সত্যার হয় না। এ পর্যন্ত ছেলে-বুড়ো-জোয়ান সব মিলিয়ে মরেছে একশো পঁচিশজন। মনির আহমদ শহরে গিয়ে ওপরে দরখাস্ত করে ডাক্তার আনিয়েছে, পুকুরের পানিতে ওষুধ ছড়িয়ে দিয়েছে। পানিতে রোগের পোকা বাড়ে। জীবানু মিশেল পানি খেলে রোগ সংক্রামিত হয়। টিকা দেবার ব্যবস্থা করেছে। গ্রামের মানুষ টিকা নিতে চায় না। তাতে নাকি ঈমান চলে যায়। এ কথা শুক্কুরবারের জামাতে ফয়েজ মস্তান মুসুল্লীদেরকে বলে দিয়েছে। কাজী পাড়া এবং ফকির পাড়ার সকলে একযোগে ফয়েজ মস্তান জহির মৌলভীকে নিয়োগ করেছে। ছাগল জবাই করে শিরনি দিয়েছে। কোরআনের আয়াত পড়ে পাড়া বন্ধ করেছে। মাটির সরায় সুরা লিখে গাছে গাছে ঝুলিয়ে দিয়েছে, যাতে করে ওলাউঠা পাড়ার ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে না পারে। দিনেরাতে শোনা যায় আজানের ধ্বনি। জীবনে যারা নামাজ পড়ে নি ওলাউঠার ডরে তাদের মাথায়ও টুপি উঠেছে। রাতের বেলায় ফয়েজ মস্তান আর জহির মৌলভী জেগে থেকে সমস্ত পাড়াময় ঘুরে বেড়ায়। মাইজ ভাণ্ডারের কোন্ কামেল পীর নাকি স্বপ্নে দেখেছে মানুষের গুনাতে দুনিয়া ভরে গেছে। সে জন্য আল্লাহ্ বান্দার ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে কলেরা, হাম, বসন্ত প্রভৃতি সাতবোন পাঠিয়ে গজব নাজেল করছে। ওরা সুন্দরী মেয়েলোকের বেশ ধরে দেশ হতে দেশান্তরে ঘুরে বেড়াবে। যে পাড়ায় আল্লাহর কালামের কোনো নিষেধের গণ্ডী থাকবে না, ভেতর দিয়ে হুড়হুড় করে ঢুকে পড়বে। হেঁটে গেলেই শুরু হবে রোগ। তারপর মৃত্যু… কান্নাকাটি ইত্যাদি। এরই নাম আসমানী মুসিবত। এই আসমানী মুসিবতেরও আসানী আছে আল্লাহর কালামে। একবার জহির মৌলভী নাকি জোয়ারা গ্রামে রাতের অন্ধকারে এক বোনের মাথার লম্বা চুল জারুল গাছের সঙ্গে পেঁচিয়ে বেঁধে খরম দিয়ে হেঁচতে হেঁচতে মুচলেকা আদায় করেছিলো। আল্লাহ্র হুকুম নেই, নয়তো ধরে রেখে দিতো। একথা জহির মৌলভী যত্রতত্র বলে বেড়ায়। আর সেজন্য কলেরার সময় জহির মৌলভীর এতো দাম।

একমাস আগে হাসিম এসবে মোটেও অবিশ্বাস করতো না। কিন্তু আজকে তার কেবল হাসিই আসে। এরকম সুন্দর সুন্দর গল্প বানাতে পারে বলে মোল্লারা খেতে পায়। ওসব কিছু নয়, ভাওতা। মুর্গীর রান খাওয়ার আর মেহনতকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য এসব মোল্লারা বানিয়েছে।

জ্যৈষ্ঠের শেষ। আষাঢ় নেমেছে। আউশ ধানের কচি সবুজ রঙে শ্যামায়িত হয়েছে মাঠ। মাঠে মাঠে গঙ্গাফড়িং ছুটোছুটি করছে। মেদুর মেঘ সরে গিয়ে সুন্দর চড়চড়ে রোদ উঠেছে। রক্তের মতো লাল হয়ে উঠেছে। এখন সমিতির বিশেষ কাজ নেই। বলতে গেলে মড়ক থেমে গেছে। সে জন্যে হাসিমদের পেটের ভাত চোখের ঘুম বিসর্জন দিতে হয়েছে অনেকদিন। পুকুরে পুকুরে ওষুধ ছড়িয়েছে, ঘরে ঘরে ফিনাইল, ব্লিচিং পাউডার বিলিয়েছে। কেরামত ভাই এসে তাদেরকে সুন্দর সুন্দর অনেক কাজ শিখিয়ে দিয়েছে। রোগীর সেবা করা, কৃত্রিম উপায়ে শ্বাস-প্রশ্বাস করানো, মশা-মাছি ধ্বংস করার তেল ছড়ানো-সব কিছু শিখে ফেলেছে হাসিম। কৃষক সমিতিতে যোগ না দিলে এসব শিক্ষা কোথায় পেতো? মানুষের জীবন রক্ষার জন্য কতো প্রয়োজন–এসব কি কম মূল্যবান অভিজ্ঞতা!

আরো অনেক মূল্যবান মণিমুক্তো সঞ্চিত হয়েছে অভিজ্ঞতার ভাণ্ডে। ছোট ছোট টুকরো টুকরো সে সকল অভিজ্ঞতা, হাসিমের মনে হয়েছে তার গুরুত্বি অপরিসীম। অভিজ্ঞতার শুদ্ধ আলোতেই সমাজের ভাঁজে ভাঁজে জমা ক্লেদ পঙ্কিলতা স্পষ্ট দেখতে পায়। কিছুদিন আগে হাসিমেরা লাশ কবর দেওয়ার জন্য রিফুজি পাড়ায় গিয়েছিলো। পাড়াটা বসেছে দু’বছর আগে। বুড়ীর ছোট ছেলেটার ওলাউঠা হয়েছে। খবর পেয়ে মনির আহমদ হাসিম আর কেরামতকে পাঠিয়ে দিলো।

ভাঙা ঝুরঝুরে বেড়ার ঘরে ছেঁড়া মাদুরের ওপর বুড়ীর ছেলেটা নিঃসাড় হয়ে পড়ে আছে। সারা ঘরে ভন ভন উড়ছে বড় বড় মাছি। রোগী পায়খানা, প্রস্রাব করে সবকিছু একাকার করে ফেলেছে। বদবুয়ের জন্য কাছে আগানো যায় না, সে অসহনীয়। বদবুকে অগ্রাহ্য করে বুড়ী মৃত্যুকল্প সন্তানের শিয়রে বসে আছে। চোখে মুখে আতঙ্ক… ক্লান্তি… শোক একসঙ্গে বাসা বেঁধেছে। হাসিমেরা সে ময়লা পরিষ্কার করছিলো। মনির আহমদ ডাক্তার এনে চিকিৎসা করে মৃত্যুকল্প বালককে বাঁচিয়ে তুলেছিলো। তিনদিন হাসিমকে বুড়ীর সঙ্গে সঙ্গে রোগীর বিছানায় বসে কাটাতে হয়েছে। চারদিনের দিন চোখ মেলে তাকিয়ে ছিলো রোগী। সন্তানকে চোখ মেলতে দেখে বুড়ীর দু’চোখে অশ্রুর ধারা নেমেছিলো। অথচ বুড়ীর চোখ এতোদিন ছিলো আশ্চর্য রকমের শুকনো। এ ভাবান্তর দেখে হাসিম আবাক হয়ে গেলো। সন্তান ভালো হয়ে উঠেছে এতে কাঁদবার কি থাকতে পারে? বুড়ীকে জিজ্ঞেস করেছিলো কেন সে কাঁদছে। জবাবে বলেছিলোঃ

“বাপজান, কেন কাঁদছি তোমাকে বোঝাতে পারবো না।”

মানুষ কেন কাঁদে তা কি বোঝাবার? তবু হাসিমের দরদী মন বুঝতে চেয়েছিল। জবাবে বুড়ী বলেছিলো। তার অনেক কথা মনে পড়েছে। ঘর-বাড়ির কথা… আত্নীয়-স্বজনদের কথা… আরো বলতে পারা যায় না এমন অনেক কথা… গভীর কথা মনে পড়েছে। তাই বুড়ী কাঁদছে। একটি মাত্র আশার অঙ্কুর শিশুসন্তানটি, তাও ঝরে যেতে বসেছিলো। বেঁচে উঠেছে হাসিমদের কল্যাণে। জিজ্ঞেস করলোঃ

“পোয়ার বাপ কডে, খালা?” (ছেলের বাপ কোথায়, খালা?)

“আর কোথায় যাবে, সকলে সবশেষে যেখানে যায় সেখানেই গেছে।”

“কি রোগ অইয়েলদে, খালা?” (কি রোগ হয়েছিলো খালা?)

“বাপজান, রোগ-ব্যারাম কিছু নয়। জ্যান্ত মানুষটাকে মেরে ফেললো।”

“কনে?” (কে?)

“আর কে, হিন্দুরা।” উহ্ করে একটু বুকভাঙ্গা নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে।

হাসিম ঠিকমতো ব্যাপারটা বুঝতে পারে না। কেন হিন্দুরা মারবে তার স্বামীকে? বিশদ জানবার জন্য আবার শুধোয়ঃ

“তোঁয়ারার জাগা-জমিন ন আছিল?” (সেখানে তোমার জায়গা জমিন ছিলো?)।

“বাপজান, আট বিঘে ধানের জমি ছিলো, ভিটি ছিলো, বাগান ছিলো, ঘর ছিলো এবং মুখে বলা যায় না এমন অনেক কিছু ছিলো। জল-হাওয়া… আলো।”

কেন এ যাওয়া-আসা? হিন্দুরা পাকিস্তান থেকে হিন্দুস্তানে যায়, হিন্দুস্তান থেকে মুসলমানরাও বা আসে কেন? কেন আসে? কেন যায়?

“জাগা-জমিন ছাড়ি আইলা ক্যা?” (জায়গা-জমি ছেড়ে এলে কেন?)

“ডরে, বাপজান, ডরে।”

“এই দেশত ত ব্যারামে আর অভাবে মরণের দশা অইয়ে।” (এই দেশেও তো রোগে আর অভাবে মরণের অবস্থা হয়েছে।)

“বাপজান, মরণের কি ভয়?”

“ভয় কারে?”

“ভয় ত হিন্দুদের।”

ভয় শুধু হিন্দুকে? হিন্দুরা কি মরণের চাইতেও ভয়ঙ্কর? হিন্দুদের মধ্যে কি ভালো মানুষ নেই? মুসলমানদের মধ্যে কি খারাপ মানুষ নেই? জাহেদ বকসু, খলু মাতব্বর, কানা আফজল এরা কি ভালো মানুষ? হেডমাষ্টার গিরিজাশঙ্করবাবু যিনি মুসলমানের ছেলের প্রাণরক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ দিলেন তিনি কি খারাপ মানুষ? হাসিমের ধারণা কানা আফজল আর অধরবাবুরা একযোগেই তো মৃত্যুর ব্যাপার করে। ওরা হিন্দু নয়, ওরা মুসলমান নয়, ওরা একজাত-অত্যাচারী। এ সত্যটা মানুষ বোঝে না কেন? কেন বোঝে না? ভয়ানক দুঃখ হয়, যে-দুঃখের কোনো রূপ নেই।

আপাততঃ সমিতির কাজ চুকিয়ে বুকিয়ে দিয়েছে। এখন ঘরে ফেরা দরকার। সুফিয়ার কথা চিন্তা করে শঙ্কিত হয়ে ওঠে হাসিম। তার দিন কি রকম করে কাটছে কে জানে। সেদিনই বাড়ির উদ্দেশ্যে পথে বেরিয়ে পড়ে। বাড়াবাড়ির বটতলার নবীর দোকানের পাশ দিয়ে যাবার সময় তাকে দেখে দোকান ভর্তি মানুষ সশব্দে হেসে ওঠে। সম্মিলিত হাসির শব্দে একটু দিশেহারা হয়। অন্যদিন হলে ভয় পেতো। আজকে তার করুণা হলো। কোথায় দাঁড়িয়ে আছে জানে না বলেই হাসছে ওরা। তাদের স্থান কোথায় যদি সঠিকভাবে জানতে পারতো, তাহলে তাদের হৃদয়েও দয়া জাগতো, উথলে উঠতো প্রেম। তাকে টিটকিরি দেয়। গায়ে মাখে না হাসিম। ছতুর বাপ তসবীহ্ রেখে দাড়ি দু’হাতে মুঠি করে শ্লোক উচ্চারণ করলোঃ

“অকুলীন কুলীন অইব কুলীন অইব হীন
অকুলীনে দুঁড়াইব ঘোড়া কুলীনে ধরিব জ্বীন।”

ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে কথাগুলো ওজন করে দেখে হাসিম। কোনো মানুষের ভালো কামনা করার মতো মন এদের নয়। তেমন তীক্ষ্ণ নয় দৃষ্টিরেখা। গভীর নয় অনুসন্ধিৎসা। প্রবল নয় ভালোবাসা। তাই কেউ ভালো কাজ করতে গেলে সম্ভাব্য সকল উপায়ে নাজেহাল করা চাই তাদের। এটা তাদের মনের চরম দুর্বলতার অভিব্যক্তি। যার কিছু করার ক্ষমতা আছে করবে। বেহুদা কথা কয় না সে। তাদেরকে তো চিনেছে হাসিম। তাদের পরিচয় কি অনুদঘাটিত? তাদের প্রাণ আছে বটে শরীরে, তবে সে প্রাণ নিজেদের এখতিয়ারে নয়। জাহেদ বকসুর হুকুমে লাগান অথবা খলু মাতব্বরের দাঙ্গায় বিসর্জন দেবার জন্য তৈরি করে রেখেছে। মানুষের লহুর স্পন্দন তাদের শিরায় কই?

পাড়ায় ঢুকবার মুখে নারী-কান্নার তীক্ষ্ণ শব্দ তার কানে আসে। অভ্যেস অনুসারে স্বরের অনুসরণে ছোটে। তার নিজের পাড়ায়ও কি লাগলো ওলাউঠা, জহির মৌলভী কিছু করতে পারলো না নাকি? কি করতে হবে মনে মনে সে কথা চিন্তা করে। পুকুরের পশ্চিম পাড় ঘেঁষে চেকন ঘাসে ঢাকা কর্দমাক্ত পিচ্ছিল পথটা বেয়ে অতি সন্তর্পণে হাসিম হাঁটতে থাকে। যে-কোনো মুহূর্তে সাপে কাটার আশংকা। তখন সন্ধ্যা চারদিকে। জীবন্ত অন্ধকার পৃথিবীকে গ্রাস করেছে। সে আঁধার সাঁতরে ছদুর মা’র উঠোনে এসে দাঁড়ালো। ছদুর মা গলা ছেড়ে কাঁদছে। এবার তার কাঁদবার ঋতু। বৌটা একগালে একটা হাত দিয়ে স্বামীর মৃত্যুর সংবাদটা যাচাই করছে। কদিন আগেও যোয়ান মানুষটা বেঁচে ছিলো। কাঁচা বউটি, অল্প বয়েস। একটি ছেলেপুলেও জন্মায় নি। কচি পাটের চারার মতো আন্দোলিত শরীর। আজ খবর পেয়েছে, ছদু তিনদিন আগে শহরের হাসপাতালে জননী আর প্রিয়তমার মায়া কাটিয়ে চলে গেছে। এমন স্বাস্থ্যবান সুঠাম সুন্দর সবল শালকাঠের মতো যুবক ছদু–মারা গেলো? আহা রে! আহা রে! রক্তমাখা বিক্ষত চেহারাটা ভেসে ওঠে। সে প্রাণ আর নেই। আলো হয়ে, হাওয়ায় মিশে গেছে। কলজের ভেতর কে যেন সাঁড়াশী দিয়ে টানছে। বউটা পানি ফেলছে দু’চোখের। শ্রাবণের ধারার চাইতেও ঘন। এবং দীর্ঘতরো। মাটা ডানাভাঙ্গা ঘুঘুর মতো কাতরাচ্ছে। উঠোনের কাদায় গড়াগড়ি যাচ্ছে। বুকে কিলের পর কিল মারছে। বিধবার একমাত্র সন্তান ছদু। গ্রামের মান ইজ্জতের সঙ্গে যার ছিলো প্রগাঢ় সম্বন্ধ। শূন্যচারী ঈগলের মতো ছিলো যার দুঃসাহস, সে ছদু আর নেই। ওলাউঠার মৃত্যু দেখেছে। সে এরকম অণুপরমাণু নিঃসার হয়ে, হাত-পা শীতল হয়ে নীরবে নীরবে ঠাণ্ডা হয়ে ঝরে পড়া মৃত্যু। কিন্তু ছদু-তার রক্তাক্ত মৃত্যু বুকে একবুক টনটন জ্বালা দিয়ে যায়। সহজভাবে নিতে পারে না। বুদ্ধি দিয়ে বিচার করতে পারে না। আবেগেরা স্পন্দিত হয়ে কথা কয়। বজ্রাহত মানুষের মতো দাঁড়িয়ে থাকে হাসিম। আরো মানুষ দাঁড়িয়ে আছে–তারাও বজ্রাহত। পরিস্কার মেঘমুক্ত নিথর আকাশ থেকে একটা বজ্র অনেকগুলো কালো মাথায় নেমে এসেছে–ছদু নেই, বেঁচে নেই, সে কথা বরগুইনির দু’পাড়ের বাতাসে আজ বেজে উঠেছে।

তারপরে দেখলো হাসিম। চোখের পানি মুছে ফেললো বউটি। পড়নের কাপড়খানা আঁটসাট করে পড়লো। বাহ্যজ্ঞানরহিত যেন স্বপ্নের মধ্যেই করে যাচ্ছে সব কিছু। কারো মুখে কোনো কথা নেই। সকলে একদৃষ্টে ছদুর বউকে দেখছে। চুলের খোঁপাটা এলো হয়ে পিঠের ওপরে এলিয়ে পড়েছে। এলোচুলে ঘরের ভেতরে ঢুকে সাড়ে তিন হাতি কিরীচখ