Monday, May 20, 2024
Homeলেখক-রচনারচনা সমগ্রসোনার হরিণ নেই – আশুতোষ মুখোপাধ্যায়

সোনার হরিণ নেই – আশুতোষ মুখোপাধ্যায়

Table of contents

সোনার হরিণ নেই – ১

বেশ মজার স্বপ্ন দেখছিল বাপী তরফদার। শহরটা যেন পাঁচ মাসের দেখা কলকাতার শহর নয়। জঙ্গলটাও বানারজুলির চেনা জঙ্গল নয়। কলকাতার মতোই আর একটা শহর। বানারজুলির মতোই আর একটা জঙ্গল। সেই শহর আর জঙ্গল পাশাপাশি নয়। একটার মধ্যে আর একটা। জঙ্গলের মধ্যে শহর, আবার শহরের মধ্যেই জঙ্গল। হাতি বাঘ ভালুক হায়না চিতা হরিণ মানুষ মেয়েমানুষ সব যে-যার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছেও না। কারো প্রতি কারো ভূক্ষেপ নেই।

ঘোরের মধ্যেই ঘুমটা ভেঙেছে। বাপী তরফদার হঠাৎ ঠাওর করে উঠতে পারছিল না কোথায় শুয়ে সে। উদ্ভট স্বপ্নের রেশ মগজে লেগে আছে। সামান্য নড়াচড়ার ফলে দড়ির খাটিয়া ক্যাচ-ক্যাঁচ করে উঠতে সজাগ হল। সবে সকাল। মাথাটা ভার-ভার।

দেড় মাস হল খুপরি ঘরের এই দড়ির খাটিয়ায় শুয়ে রাত কাটছে। তার আগে যেখানে ছিল সেটা ভদ্রলোকের আশ্রয়। সেখানে সুখ ছিল। ভোগ ছিল। মণিদার বউ গৌরী বউদির চোখের তারায় আগুন ছিল। সে আগুনে ব্যভিচারের প্রশ্রয় ছিল। রমণীর অকরুণ ইশারায় মণিদার পুরুষকার বাপী তরফদারের পিঠে চাবুক হয়ে নেমে আসে নি। ভালো মানুষ মণিদা সাদামাটা দু’চার কথায় তাকে বিদায় দিয়েছিল।

তারপর থেকে এই দেড় মাস এখানে।

ভদ্রলোকের সেই সুখের ঘরের আশ্রয় থেকে ঢের ভালো। তবু সকালে ঘুম ভাঙলে মাথাটা রোজই ওই রকম ভার-ভার লাগে। সেটা দড়ির খাটিয়ার দোষ নয়। নিজের দোষ। মাথার দোষ। অমন পাগলের স্বপ্ন ক’টা লোক দেখে? স্বপ্ন দেখুক বা না দেখুক, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সে খাপছাড়া ভাবনাগুলো আর ইচ্ছেগুলো মাথার মধ্যে ঠিকি দিয়ে জমতে থাকে, সেগুলো তরল হবার মতো গাঢ় ঘুমের প্রলেপই বা কতটুকু পড়ে? নইলে এই রকম দড়ির খাটিয়ায় চেপেই তাদের মতো লোকেরা নিমতলা-কেওড়াতলায় চলে যায়। আবার ওতেই শুয়ে ঘুমোয়ও দিব্যি।

টালি-ছাওয়া পঁচিশ ঘর বাসিন্দার মধ্যে ক’টা ঘরেই বা খাট-চৌকি আছে। ভালো ঘুম না হওয়াটা নিজের স্বভাবের দোষ বাপী তরফদারের। তার বুকের তলায় অসহিষ্ণু বাষ্প ছড়ানোর একটা মেসিন বসানো আছে। মুখ দেখলে কিছু বোঝা যায় না, সেটা তার নিজের কৃতিত্ব। কিন্তু ওই মেসিনটার ওপর তার কোনো হাত নেই। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ওটা কাজ করে চলেছে। বাষ্পগুলো ঠেলেঠেলে মাথায় নিয়ে গিয়ে ঠাসছে। ওই নিয়ে ঘুম, ওই নিয়ে জাগা।

গোল চাপ-বাঁধা এই পঁচিশটা টালিঘরের শতেক বাসিন্দাদের একজন ভাবতে চেষ্টা করে নিজেকে। কিন্তু এখানকার বাসিন্দাদের প্রায় কেউই তা ভাবে না। এমন কি, যার আশ্রয়ে ওই আধখানা ঘরে সে আছে, সেই রতন বনিকও ভাবে না। তার বউটার কথা অবশ্য স্বতন্ত্র। কিন্তু বাকি সকলে তাকে ভদ্রলোক ভাবে। ভদ্রলোকের ছেলে ভাবে। ভদ্রলোকের মস্ত পাশ-টাশ করা ছেলে ভাবে। তাদের চোখে এখানে সে রতন বনিকের সমাদরের অতিথি। নেহাৎ বিপাকে পড়ে দিন কতকের জন্য এসে ঠাঁই নিয়েছে। দিন ফিরলেই চলে যাবে। নইলে বিপুলবাবুও ওদের মতো ওই আধখানা টালি-ঘরে পাকা বসবাসের ভাঙা কপাল নিয়ে এসেছে নাকি! রতন বনিক কপাল চেনে। বিপুলবাবুর কপাল এরই মধ্যে সকলকে সে ঢাক পিটিয়ে চিনিয়ে দিয়েছে।

…বিপুল তারই নাম। শুধু বিপুল নয় বিপুলনারায়ণ তরফদার। গরিব বাবা-মা কোন্ বিপুল আশার খুঁটি ধরে এরকম একটা নাম রেখেছিল জানে না। গোটা নামটা মনে হলে নিজেরই হাসি পায়। তবে এই পোশাকি নাম ভালো পোশাকের মতো তোলাই থাকে বেশির ভাগ সময়। বাবা মা আত্মীয় পরিজন বন্ধু-বান্ধব সকলের কাছেই সে বাপী। বাপী তরফদার। জ্ঞান বয়সের আগে থেকে ওই নাম শুনে তার কান পেকেছে। কিন্তু খিদিরপুর ব্রুকলিন গোডাউনের বাবুদের পিয়ারের পিওন ‘আট-কেলাস’ পড়া রতন বনিকের সঙ্গে কার্য-কারণ সুবাদে এখানে তার ওই পোশাকি নামটাই চালু।

অন্য সব দিনের সঙ্গে এই দিনটার সকাল দুপুর বা বিকেলের রঙে তফাৎ ছিল না একটুও। টালি এলাকার সক্কলের আগে রোজ যেমন ঘুম ভাঙে আজও তাই ভেঙেছিল। তফাৎ শুধু উদ্ভট স্বপ্নটা। তার রেশ ছিঁড়তে রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে একবার চোখ তাকিয়ে খুপরি জানলার ফাঁক দিয়ে ভোরের আলোর আভাস দেখেছিল। নড়বড়ে জানলা দুটো বন্ধ করলেও খানিকটা ফাঁক থেকেই যায়। সেই ফাঁক দিয়ে আলো ঢোকে। মাথার ওপরের টালির ছাদের ফাঁক দিয়েও আলোর রেখা হামলা করে। আলোর এরকম বেয়াড়া স্বভাব বরদাস্ত করতে ইচ্ছে করে না বাপী তরফদারের। আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো শতেক ফুটোর কম্বলটা মাথার ওপর টেনে দিয়ে অন্য দিনের মতোই সে আবার অন্ধকারে সেঁধিয়ে গেছল।

উনিশ-শ আটচল্লিশের ফেব্রুয়ারির একেবারে গোড়ার দিক এটা। চার কি পাঁচ তারিখ হবে। সকালের শীতের কামড়ের হাত থেকে বাঁচার তাগিদেও আপাদ—মস্তক কম্বলে ঢাকা দিতে হয়। কিন্তু শেষ রাতে হোক বা প্রথম সকালে হোক, চোখ একবার দু’ ফাক হলে ঘুমের দফা শেষ। কম্বল মুড়ি দিয়ে শুলেও সবার আগে কলতলার কলরব কানে কটকট করে লাগবে। এই শীতের সকালেও জল নিয়ে কাড়াকাড়ি। কম্বলের তলায় ঢুকে বাপী তরফদারের ইচ্ছে করে ওদের সক্কলের মাথায় ঘড়া ঘড়া জল ঢেলে দিয়ে আসতে।

সকালের আলো গরম হতে না হতে একটু আগে পরে গাঁ-গাঁ করে রেডিও বেজে উঠবে দু’ ঘর থেকে। পঁচিশ ঘর বাসিন্দার মধ্যে মাত্র দু’ ঘরেই এই সম্পদ আছে। তারা সক্কলকে জানান দিয়ে বাজায়। প্রথমেই শোকের প্রসঙ্গ শুরু হবে। সমস্ত দেশ জুড়ে শোকের কাল, শোক-পক্ষ চলেছে এখন। আজ ফেব্রুয়ারির চার তারিখ কি পাঁচ তারিখ বাপী তরফদার ঠিক করে উঠতে পারছিল না। যাই হোক, পাঁচ-ছ’দিন আগে নীল আকাশ থেকে আচমকা একটা বাজ পড়ার মতো সেই শোকসংবাদ সমস্ত পৃথিবীর বুকের ওপর ফেটে পড়েছিল। গান্ধীজী দিল্লীর প্রার্থনা সভায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ‘হা-রাম’ বলে চিরকালের মতো মাটিতে লুটিয়েছেন।

খবরটা শুনে পৃথিবীর শত-সহস্র-কোটি মানুষের মতো বাপী তরফদারও প্রথমে সচকিত আর পরে স্তব্ধ হয়েছিল। কলকাতায় এসেছে মাত্র পাঁচ মাস আগে। অর্থাৎ দেশ স্বাধীন হওয়ার এক মাসের মধ্যে। দূরে বসে দাসত্বের শেকল ভাঙার ঝনঝনানি কানে যত মিষ্টি লেগেছিল, এই পাঁচ মাস যাবৎ আবেগশূন্য বাস্তব-ভূমির ওপর বিচরণের ফলে তার রেশ প্রায় মিলিয়েই গেছে। তার চোখে মহাত্মার হত্যা সেই আবেগ-শূন্যতার শেষ নজির। এই নজির দেখে সেদিন সে স্তব্ধ বোবা হয়ে বসেছিল। সকলেরই তাই হবার কথা। কিন্তু তারপর থেকে দেখছে শোকের আনুষ্ঠানিক দিকটাও কম ব্যাপার নয়। যত বড় শোক, ততো বড় অনুষ্ঠান। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রেডিওয় শোকের গান আর শোকের বক্তৃতা, পথে ঘাটে শোকের মিছিল আর শোকের মিটিং। বাপী তরফদারের এক-একসময় মনে হয়েছে দেশটা সত্যি শোকে ডুবে গেল নাকি শোকের উচ্ছ্বাসে। বাইশ বছর বয়সের মধ্যে সে নিজে তো কখনো সরবে শোক করেনি।

…যে মহারানীর ঘুম ভাঙলে বাপী তরফদারের শরীর খানিক চাঙা হতে পারে আর মাথার ভার একটু কমতে পারে, তাঁর সকাল হতে কম করে এখনো ঘণ্টা দুই দেরি। রতন বনিকের বউ কমলা বনিক। আজ দেড়মাস হয়ে গেল ওরাই তার আশ্রয়দাতা এবং আশ্রয়দাত্রী। রতন বনিকের কড়া হাতের ধাক্কা না খেলে রেডিও বাজুক বা কলতলা সরগরম হোক বেলা আটটার আগে সেই দেমাকীর ঘুম ভাঙতে চায় না। ঠেলা মেরে ঘুম ভাঙানোর পরে রতনকে আবার মিষ্টি সোহাগের সুরে দু’চার কথা বলতে হয়। তা না হলে সাত-সকালে বউয়ের বচনের তোড়ে অনেক সময় তাকে ছিটকে এই খুপরি ঘরে চলে আসতে হয়। সপ্তাহে একদিন করে নাইট ডিউটি পড়ে রতন বনিকের। ফেরে পরদিন সকাল দশটায়। সেদিন বেলা আটটা সাড়ে-আটটার আগে কেউ আর বাপী তরফদারের এই খুপরি ঘরের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢোকে না।

গত রাতে রতনের নাইট ডিউটি ছিল না অবশ্য। তাই সোয়া সাতটা থেকে সাড়ে-সাতটার মধ্যে চায়ের আশা আছে। খুপরি ঘরের দরজা আছে কিন্তু হুড়কো নেই। অন্য দিনের মতোই কমলা দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকেছিল। কম্বলের তলা থেকে বাপী তরফদার সেটা টের পেয়েছে। কারণ, ভেজানো দরজা দুটো শব্দ করেই খোলা হয় আর এই কমলার চলনও লঘু নয়। ঘরে ঢুকে রোজ সে আপাদমস্তক কম্বলে মোড়া একই দৃশ্য দেখে, আর বাপী তরফদারও একই সম্ভাষণ শোনে।

—কই গো, বড়বাবুর ঘুম ভেঙেছে—নাকি ফিরে যাব?

এক ডাকে সাড়া না দিলে সত্যি ফিরে যাবে। দ্বিতীয়বার আর ডাকবে না। সাড়া না পেয়ে এরকম ফিরে গেছে দুই-একদিন। কমলার নিজের ঘুমের ওপর মমতা আছে বলেই বেশি হাঁকডাক করে কারো পাকা ঘুম ভাঙাতে চায় না। ডাক শোনা মাত্র বাপীকে কম্বল ফেলে তড়াক করে দড়ির খাটিয়ার শয্যায় উঠে বসতে হয়।

সকালের এই একটা সময় রতন বনিকের বউটাকে ভালোই লাগে। ঘুমের দাগ লাগা ফোলা-ফোলা মুখ। কালো চোখের তারায় ঘুম-ছোঁয়া ঢুলু ঢুলু ভাব একটু। তার এক হাতে শাড়ির আঁচলে জড়ানো গরম চায়ের গেলাস, অন্য হাতে শস্তা দামের খানচারেক বিস্কুট, নয়তো হাতে-গড়া দু’খানা রুটি আর গুড়। বিস্কুট বা রুটি পছন্দ নয়, ওই চায়ের গেলাসটাই লোভনীয়। কিন্তু কমলার শাসনে পড়ে বিস্কুট বা রুটি-গুড়ও নিতে হয়। না নিলে কমলা ধমকে উঠবে, খালি পেটে চা গিললে কারো ‘নিভার’ আস্ত থাকে!

‘আট-কেলাস’ পড়া রতন বনিকের ‘ছ-কেলাস’ পড়া বউয়ের ভুলটা বাপী তরফদার একদিন শোধরাতে চেষ্টা করেছিল। কথাটা নিভার নয়, লিভার।

পলকা ঝাঁঝের মুখঝামটা দিয়ে উঠেছিল কমলা বনিক।—থাক, নিজের বিদ্যে নিজের মাথায় ঠেসে রাখো, আমাকে আর বিদ্যে দান করতে হবে না!

এরপর আর ভুল সংশোধনের চেষ্টা করেনি। কিন্তু রোজ সকালে ওই শামলা মুখের ধমক একটু খেতেই হয়। কারণ, কম্বল ফেলে ধড়মড় করে উঠে বসেই চায়ের গেলাসের জন্য হাত বাড়ায় সে। ফল কি হবে জেনেও। শাড়ির আঁচল তেমনি গেলাসে ধরে রেখেই কমলা চোখ পাকাবে। —মুখ ধোয়া হয়েছে?

এটুকু ভালো লাগে বলেই বাপী তরফদার মিথ্যে বলে না। বিব্রত মুখে মাথা নেড়ে জানান দেয়, ধোয়া হয়নি।

ঘেন্নাও করে না বাসি মুখে কিছু গিলতে—যাও মুখ হাত ধুয়ে এসো!

এই নিয়মিত অধ্যায় চটপট সারা হলে তবে চায়ের গেলাস আর বিস্কুট বা রুটি তার হাতে আসে।

আজও এর খুব ব্যতিক্রম হল না। তবে একটু হল চায়ের গেলাস আর বিস্কুট হাতে নিয়ে বসার পর। গজেন্দ্রগমনে কমলা বনিক দরজার কাছাকাছি এগিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াল। এটুকু অপ্রত্যাশিত। চা দিয়ে চলে যাবার সময় বিপুল তরফদারের দু’চোখ নিজের অগোচরে দরজা পর্যন্ত তাকে অনুসরণ করেই। আজ হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ানোর ফলে চাউনিটা তার মুখের ওপর হোঁচট খেল। আর এটুকুও কমলার চোখে ধরা পড়ল। হাসির ঝিলিক ঢাকা দেবার জন্যেই সে ছোট করে হাই তুলল একটা। —বুড়ো বলছিল বিপুলবাবু দুই-একদিনের মধ্যেই চলে যাবে।… ঠিক? আ হা, ষাট ষাট, জিভে গরম চায়ের ছেঁকা লাগল বুঝি?

চায়ের গেলাস কোলের কাছে নামিয়ে বাপী তরফদার গম্ভীর মুখে জবাব দিল, দেড় মাস হয়ে গেল আর কত অসুবিধে করব তোমাদের…

কমলাও গম্ভীর মুখেই সায় দিল, আমাদেরই বা সকালে এক গেলাস চা আর দু’খানা বিস্কুট দিয়ে কতকাল কেষ্ট ঠাকুরকে ধরে রাখার ক্ষ্যামোতা বলো। …তা এবার কোন্ মহলে ঘর ঠিক হল?

—কোথাও না। দেশেই চলে যাব ভাবছি। এখানে আর কিছু হবে-টবে না— কমলার কালো চোখের তারায় চাপা হাসির ঢেউ খেলে গেল একটু। বলল, কোথায় যে তোমার হবে ভগবানই জানে। বুড়ো অবিশ্যি বলে, হবে যখন দেখে নিস, বিপুলবাবুর ভাগ্যিখানা কালবোশেখীর ঝড়ের মতোই সবদিক তোলপাড় করে নেমে আসবে একদিন—তা দেখো, যেখানে গেলে হবে সেখানেই যাবে, তার আর কথা কি।

হেলেদুলে চলে গেল।

…আর এই সকালেই ইদানীংকালের সেই অস্বাচ্ছন্দ্য বোধটা তার মধ্যে ছড়িয়ে রেখে গেল। বাপী তরফদারের ওই কমলার ওপরেই রাগ হতে থাকল। ভদ্রলোকের সংস্রব এড়িয়ে রাতের এই মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু তার নিশ্চিত আশ্রয় হয়ে উঠতে পারত। রতনের সঙ্গে কথা বলে সামান্য কিছু ভাড়াও ঠিক করে নেওয়া যেত। কিন্তু এখান থেকে যাওয়ার কথা ইদানীং রতনকে বলতে হচ্ছে নিজের ভিতরের অস্বস্তি দিনে দিনে বাড়ছে বলে। যাবার কথা রতনকে কাল রাতেও বলেছে।

অস্বস্তি শুরু হয়েছিল এখানে আসার দিনকতকের মধ্যেই. বয়স্ক রতন বনিকের ওই তরতাজা বউটা ঠারেঠোরে তাকাতে জানে। চোখের কোণে আর ঠোঁটের ফাঁকে হাসির ঝিলিক ফোটাতে জানে। প্রথম কটা দিনই শুধু ধারেকাছে ঘেঁষেনি, আড়াল থেকে লক্ষ্য করেছে। সমস্ত দিন ঘোরাঘুরি করে বাপী তরফদার তখন বিকেলের দিকে ঘরে ফিরত। ঘণ্টা দুই-তিন দড়ির খাটিয়ায় চিৎপাত শুয়ে থেকে আবার বেরুতো। বাইরে রাতের খাওয়া সেরে ঘরে ফিরত।

একদিন সন্ধ্যার ঠিক পরে ব্যস্তসমস্ত মুখে ঘরে ঢুকে রতন বনিক বলেছিল, আজ নাকি সমস্ত দিন খাওয়াই হয়নি আপনার?

বাপী তরফদার সচকিত।—কে বলল?

—বউ বলছিল, আজ সমস্ত দিন উপোস গেছে কেষ্ট ঠাকুরের—

বলে ফেলেই লজ্জা পেয়ে জিভ কামড়েছে সে। তারপর সে বলেছে, কিছু মনে করবেন না বাবু, বউটার লঘু-গুরু জ্ঞান নেই—ওই রকমই কথা। বলে, কেষ্ট ঠাকুরপানা মুখখানা—। আজ ঘরে ফিরতেই বলল, কেষ্ট ঠাকুর সমস্ত দিন উপোস দিয়েছে। এরই মধ্যে ভাত তরকারি রেঁধে ফেলেছে, সকালের একটু মাছও আছে—আপনাকে এক্ষুনি ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য ঠেলে পাঠালো আমাকে। চলুন —

বাপী তরফদার বাধা দিয়েছিল, না না, তোমাদের ব্যস্ত হতে হবে না, আমি একটু বাদেই বাইরে থেকে খেয়ে আসছি—

মাথা নেড়ে রতন বনিক বলেছিল, আজ আর সেটি হচ্ছে না বিপুলবাবু, রাঁধা ভাত-তরকারি সব তাহলে ড্রেনে ঢেলে দেবে, আমাকেও খেতে দেবে না। চলুন শিগগীর—

অগত্যা উঠে আসতে হয়েছে। সকালের চা-রুটির পর সেদিন সত্যিই চার পয়সার মুড়ি আর চার পয়সার চিনেবাদাম ছাড়া আর কিছু পেটে পড়েনি। সেটা যে নিছক অভাবের দরুন তা নয়। তিন মাসের চাকরির কিছু পুঁজি হাতে আছে এখনো। অবশ্য হিসেবের বাইরে একটিও বাড়তি পয়সা খরচ করে না সে। কিন্তু একেবারে না খাওয়াটা পয়সা বাঁচানোর তাগিদে নয়। মেজাজ না থাকলে এক—আধ বেলা ওরকম উপোস দিতে অভ্যস্ত।

খেতে খেতে একটু সহজ হবার জন্যেই রতন বনিকের বউয়ের দিকে একবার মুখ তুলে তাকিয়েছিল। আর তার পরেই কি-রকম ধাক্কা খেয়েছিল একটু। এ—কদিনে দুই-একবার আভাসে দেখলেও মুখখানা চোখে পড়েনি। আধবয়সী রতন বনিকের ঘরে এরকম বউ থাকা সম্ভব সে ভাবেনি। গায়ের রং তারই মতো কালো ঘেঁষা, কিন্তু অল্প বয়েস, সুঠাম স্বাস্থ্য। কালো চোখে সরমের বালাই নেই। উল্টে সে নিজেই রমণীটির চোখে একটি দর্শনীয় বস্তু।

চোখাচোখি হতে বাপী তরফদার হেসেই বলেছিল, সমস্ত দিন সত্যিই আজ ভালো করে খাওয়ার ফুরসত হয়নি, কিন্তু তুমি বুঝলে কি করে?

তক্ষুণি জবাব এলো, মাটির কেষ্ট হলে বোঝা যেতনি, ওই বুড়োর চোখ থাকলে সে-ও বুঝত

বউয়ের কথা শুনে রতন বনিক হেসে উঠেছিল, তোর মতো চোখ আর কার আছে বল্। পরে বলেছিল, তোর স্বভাব জানি, বিপুলবাবুর সামনে কক্ষনো ঠাট্টা-—ঠিসারা করে বসিসনি যেন—আমাদের কত ভাগ্যির জোরে উনি এখানে এয়েছেন—একদিন ওঁর দিন কেমন ফেরে দেখে নিস—

নিরীহ বিস্ময়ে কমলা বলেছিল, দিন ফিরলে আমি দেখে নেব কি করে গো!

তুষ্ট মুখে হার মেনে রতন বলেছিল, সবেতে কেবল ফষ্টিনষ্টি কথা তোর—দিন ফিরলেই বিপুলবাবু কি আমাদের ভুলে যাবেন!

সেই দিন থেকে ভিতরে ভিতরে কেমন অস্বস্তি বোধ করেছিল বিপুল তরফদার। দীর্ঘকাল জঙ্গলে বাসের ফলে বুনো জন্তু-জানোয়ার ছেড়ে মানুষেরও প্রবৃত্তির দিকটা অনেকখানি চেনা তার। সেই সঙ্গে নিজের খোলস-ঢাকা চরিত্রও ভালোই জানা। মনের তলায় সেই রাতেই একটা বিপদের আভাস উঁকিঝুঁকি দিয়ে গেছে।

পরদিন থেকেই সকালে চা-বিস্কুট বা চা-রুটি-গুড় নিয়ে রতন বনিকের বদলে কমলা নিজেই দরজা ঠেলে অনায়াসে ঘরে ঢুকেছে। আর তখন অতিথির অস্বস্তি—টুকুও তার কাছে উপভোগ্য কৌতুকের মতো। তারপরে আবারও এক-আধদিন দুপুরের খাওয়া বাদ পড়লে এই বউটার চোখে ধরা পড়বেই। আর তখন জুলুম করে ধরে নিয়ে গিয়ে খেতে বসাবে তাকে। ঠিসারার সুরে রতনকে বলবে অসময়ে তোমার ভাগ্যিমন্ত অতিথির একটু সেবা-যত্ন করে রাখলে আখেরে কাজ দেবে—কি বলো?

রতন বনিকেরও তুষ্ট মুখ—এখন ঠাট্টা করছিস কর, পরে দেখে নিস।

বাপী তরফদার এরপর বিকেলে ঘরে ফেরাই ছেড়ে দিল। একেবারে রাতের খাওয়া সেরে ঘরে ঢুকত।

কমলা সেই সময় থেকে তাকে বড়বাবু বলে ডাকতে শুরু করেছে। শুনে কান করকর করেছে বাপী তরফদারের। কিন্তু এ নিয়ে তাকে কিছু বলেনি। বলতে গেলেই কমলা দুটো রসের কথা বলে বসবে। সেটা নিজেকে প্রশ্রয় দেওয়ার সামিল হবে বাপী তরফদারের। সব থেকে বেশি ভয় নিজেকে। বনে-জঙ্গলে বাসের কালে বিষাক্ত সাপের আচমকা ছোবলে এক একটা বড় বড় জীবকে ধরাশায়ী হতে দেখেছে। সেই ছেলেবেলা থেকে ওই রকম একটা হিংস্ৰ প্ৰবৃত্তি তার মধ্যেও লুকনো আছে। এই কারণেই নিজেকে সব থেকে বেশি ভয়।

…দেড় মাস আগে প্রবৃত্তির এই দিকটা আচমকা অনাবৃত হয়ে গেল। গৌরী বউদি দেখেছিল। চিনেছিল। গৌরী বউদি কম করে ছ’ বছরের বড় তার থেকে। কিন্তু জানোয়ার বয়েস দেখে না। গৌরী বউদিও চোখের সামনে সেদিন তাজা জ্যান্ত পুরুষ দেখেছিল একটা। তার চোখের আগুনে পতঙ্গ পোড়ে না। পতঙ্গ করুণার পাত্র। মণিদা করুণার পাত্র। গৌরী বউদির চোখের আগুনে ব্যভিচারের প্রশ্রয়।

…কিন্তু জানোয়ারটা ততক্ষণে খোলসে সেঁধিয়েছিল আবার। গৌরী বউদি তাকে ক্ষমা করেনি। তাকে আশ্রয়-ছাড়া করেছে।

…এই কমলার মতোই গায়ের মাজা রং গৌরী বউদির। সুপটু প্রসাধনে আর একটু উজ্জ্বল হয়তো। মাথায়ও কমলার থেকে কিছু লম্বা। কিন্তু গৌরী বউদির মতো নয় কমলা। তার মতো তীক্ষ্ণ নয়। নির্লিপ্ত নয়। অকরুণ নয়। মায়া-মমতা আছে। বুড়ো স্বামীর যত্ন-আত্তি করে। মেজাজ ভালো থাকলে সহজ কৌতুকে আর উচ্ছ্বাসে টইটম্বুর। সে ঠারেঠোরে তাকাতে জানলেও তাকে দেখে গৌরী বউদির মুখ মনে পড়ত না বাপী তরফদারের।

কিন্তু ইদানীং মনে পড়ে। পড়ছে। হঠাৎ-হঠাৎ মনে হয়, সে-রকম পরিস্থিতি—বিপর্যয়ে এই কমলাও গৌরী বউদির মতো হয়ে উঠতে পারে। মণিদার মতো রতন বনিকও হয়তো তখন নিরীহ মুখে ওকে এখান থেকে চলে যেতে বলবে। সেই ভয়েই মাঝে মাঝে এই আশ্রয় ছেড়ে পালানোর কথা ভাবছে সে। যাবার কথা রতন বনিককে বলেছেও।

.

কমলা নিজের স্বামীকেই বলে বুড়ো। রতনের সামনেই বলে। কিন্তু রতন তাতে রাগ করে না। এই বউয়ের পাশে একগাল কাঁচা-পাকা দাড়ির জন্য একটু বেখাপ্পাই দেখায় তাকে। দ্বিতীয় পক্ষের এই বউকে খুশি করার জন্যও রতন বনিক কেন দাড়ির মায়া ছাড়তে পারে না বাপী তরফদার সেটা ভালোই অনুমান করতে পারে।

ব্রুকলিনের বাবু এমন কি বড়বাবুদের কাছেও কোনো কারণে রতনের একটু বিশেষ সমাদর আছে। এই দাড়ির বোঝা সাফ করে ফেললে সেই বিশেষ কদরে ঘাটতি পড়ার আশংকা। কিন্তু দাড়ির কারণে এই স্বামী-সম্ভাষণ কি অন্য কোনো চাপা ক্ষোভের ফলে সেটা একমাত্র কমলাই জানে। রতনের বয়েস এখন উনচল্লিশ আর কমলা খুব বেশি হলে কুড়ি ছাড়িয়েছে। কমলা বাপীর থেকে দেড়-দু’ বছরের ছোট হতে পারে।

সন্ধ্যায় পর মাত্রা রেখে একটু-আধটু নেশা করার অভ্যাস আছে রতন বনিকের। এই খুপরিটা তার নেশার ঘর। বোতল থেকে সাদা জলের মতো খানিকটা দিশি মাল খায় আর সেই সঙ্গে নুন মেশানো কিছু আদার কুচি। আগে হয়তো ওই পর্বের পর এই দড়ির খাটিয়ায় শুয়ে খোয়াব দেখত। এখন মেঝেতে দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে অল্প অল্প দোলে। কেউ সামনে থাকলে মন খুলে গল্প করে তার সঙ্গে। সামনে গোড়ার দিকে বাপী তরফদারই থাকত। রতনের সংকোচ সে-ই কাটিয়ে দিয়েছে। বলেছে, আমি তোমার আশ্রিত, কিন্তু তোমার কোনরকম অসুবিধে হচ্ছে দেখলে আমি সরে পড়ব।

রতনের অসুবিধের ব্যাপারটা প্রথম সন্ধ্যাতেই টের পেয়ে গেছল। অন্য কারো ঘরে গিয়ে নেশা সেরে এসে রতন এই খুপরিতে এসে বসেছিল। মেঝেতে বসে দেয়ালে ঠেস দিয়ে তাকে একটু একটু দুলতে দেখেই সন্দেহ হয়েছিল। তারপর ওর জিভ আলগা হতে সমস্যা বুঝেছে। বউটার বিবেচনার অভাবের কথাই বলছিল রতন। মাতাল তো আর হয় না, সমস্ত দিন খাটা-খাটনির পর সামান্য মৌজের লোভে যা একটু খায়। শরীর মন ভালো থাকে রাতে ভালো ঘুম হয়। এই খুপরি ঘরে অতিথি আছেন জেনেও বোতল সুদ্ধু বউ তাকে নিজের ঘর থেকে বার করে ছাড়ল। বোতল হাতে দেখলে রতনকে সাদরে ডেকে নেবার মতো ঘর এখানে আরো দু-পাঁচটা আছে। কিন্তু যে ডেকে নেবে তাকে ভাগ তো দিতেই হয়। সেদিনই খামোখা একটা ছোট বোতল একেবারে ফাঁক হয়ে গেল। রোজ রোজ লোককে এ-রকম ভাগ দিতে হলে সে যে ফতুর হয়ে যাবে বউয়ের এই সামান্য বিবেচনাও নেই।

বাপী তরফদার তারপর ওই কথা বলে তাকে নিশ্চিন্ত করেছিল। ঢুলু ঢুলু দু’ চোখ টান করে রতন বলেছিল, বিপুলবাবুর মতো এমন দরাজ মনের মানুষ সমস্ত ব্রুকলিনেও আর দুটি নেই, অথচ বরাত এমন যে তারই চাকরিটা সকলের আগে খোয়া গেল। কিন্তু সে নিশ্চিন্ত, বিপুলবাবু ঢের ঢের বড় হবেন বলেই এই ধাক্কাটা খেতে হল।

ওর বড় হওয়ার ভবিতব্যের কথা শুনে কমলা তাকে ঠাট্টা করে বড়বাবু বলা শুরু করেছে।

অতিথির কাছ থেকে রতন বনিক ঘর ভাড়া নেবেই না যখন, অন্যভাবে বাপী তরফদারকে তার দরাজ মনের পরিচয় দিতে হয়েছে। বার দুই নিজে ছোট বোতল কিনে ওর হাতে গুঁজে দিয়েছে। রতন বনিক খুশিতে আটখানা। এ-সময় একটুআধটু চেখে দেখলে বাবুরও মন ভালো হত এ-কথা অনেকবার বলেছে। কিন্তু জঙ্গলের মানুষদের এ জিনিস হামেশাই খেতে দেখেছে বাপী। অনেক বেলেল্লাপনাও দেখেছে। ফলে এই লোভ সে বাতিল করেছে। রতনের কথায় ও বিন্দুমাত্র আগ্রহ হয়নি। উল্টে বউয়ের ওকে ঘরে বসে এ জিনিস খেতে না দেওয়ার তেজটুকু ভালো লেগেছে।

এ-সময় ওই দ্বিতীয় পক্ষটির গল্প রতন বনিকের মুখেই শুনেছিল সে।… কমলা রতনের নিজের শালী। প্রথম পক্ষ দুর্গার থেকে ঢের ছোট অবশ্য। শ্বশুর-শাশুড়ীর বুড়ো বয়সের মেয়ে। …দুর্গার সর্বাঙ্গ মায়ের দয়ায় ছেয়ে গেছল। সেটা জানাজানি হতে সরকারী গাড়ি এসে তাকে তুলে নিয়ে হাসপাতালে রেখে এসেছিল। আর ঘরের মুখ দেখতে পায়নি, সেখানেই সব শেষ। পাঁচ বছর আগের কথা। দুর্গাকে হারিয়ে রতন চোখে-মুখে অন্ধকার দেখেছিল। কমলার তখন বছর পনের কি ষোল বয়েস। মফঃস্বলে বিধবা মায়ের কাছে থাকে। শাশুড়ী তাকে চিঠি লিখত, একটা তো গেছেই, যেটা আছে তার ভয়ে বুকের ভিতরটা সর্বদা হিম হয়ে থাকে। মেয়েটা দিনকে দিন দজ্জাল হয়ে উঠছে।

রতনের তখন শোকের সময়। অতশত কান দেয়নি। বছর ঘুরতে শাশুড়ীর জোর তাগিদ এলো, জামাইয়ের শিগগীর একবার আসা দরকার—এখানকার ঘর বাড়ি বেচে দিয়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার ইচ্ছে তার। ততদিনে রতন বনিকের শোক হালকা হয়েছে। কিন্তু বোতলের অভ্যাসটাও তখন থেকেই।

ছুটি নিয়ে শাশুড়ীর কাছে গিয়ে তার সমস্যা স্পষ্ট করে বুঝল। সমস্যা ছোট মেয়ে। কমলার তখন বছর সতেরো বয়েস। বাড়ন্ত গড়ন। তাকে দেখে চোখে পলক পড়ে না রতনের। অনেক ছোট শালী, কাছে ডেকে আগের মতোই গায়ে পিঠে হাত বোলাবার লোভ ছাড়তে পারেনি। কিন্তু সতের বছরের ওই কমলা পাকা ঝানু মেয়ে তখন। তার হাত একটু বেসামাল হতেই ফোঁস করে উঠেছে। আর তাই দেখে ভিতরে ভিতরে রতন বনিকও পাগল হয়েছে। কিন্তু কাউকে বুঝতে দেয়নি।

গম্ভীর মুখে সামনে বসে শাশুড়ীর নালিশ শুনেছে সে। সমস্যা আর দুর্ভাবনার কথা শুনেছে। এই মেয়েকে আর সামলাতে পারছে না শাশুড়ী। তার ফষ্টিনষ্টি বেড়েই চলেছে। আগে আশপাশের সমান পর্যায়ের ছেলে-ছোকরাগুলো উৎপাত করত। ওই পাজী মেয়েও তাদের আসকারা দিত। যার সঙ্গে খুশি বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়াতো। কোথাও যাত্রা হচ্ছে শুনলে মায়ের শাপমনিতে ভ্রুক্ষেপ না করে চলে যেত। এখন ভদ্দরঘরের ছেলেদের উৎপাত শুরু হয়েছে। দিনেদুপুরে জানলা দিয়ে ঢেলার মতো চিঠির মোড়ক ঘরে এসে পড়ে। শাশুড়ী লেখাপড়া জানে না, আর কমলাও চোখ-কান বুজে মায়ের কাছে মিথ্যে কথা বলে। কিন্তু ফাঁক পেলেই চুপিচুপি বেরিয়ে যায়। একা শহরে গিয়ে সিনেমা দেখে আসে। ওই সব পাজী ছেলেগুলোই নিশ্চয় পয়সা যোগায়। চৌদ্দ-পনের বছর বয়েস পর্যন্ত বাখারিপেটা করে মেয়েকে মাটিতে শুইয়ে ফেলা গেছে, কিন্তু এখন মেয়েটা মায়ের সমস্ত শাসনের বাইরে।

…হ্যাঁ, বুদ্ধির চালে সেই একবার শাশুড়ী আর তার মেয়ে দুজনকেই ঘায়েল করতে পেরেছিল রতন বনিক। ভেবে-চিন্তে শাশুড়ীকে বলেছে, কমলাকে এখান থেকে সরানো দরকার। কলকাতা দেখাবার নাম করে শাশুড়ী আর শালী দুজনকেই তার ওখানে নিয়ে যাবে সে। আর তারপর কমলার মতো মেয়ের ভালো বিয়ে হতে কতক্ষণ? কমলার যে ভালো বিয়ে হবে নিঃসংশয়ে সেই ভবিষ্যৎবাণীও করেছে। জামাইয়ের এই ঘোষণার ওপর শাশুড়ীর ভারী আস্থা। তার ওপর শুনেছে খরচাপত্রের জন্যেও ভাবনা নেই—যা করার জামাই-ই করবে। কলকাতার এই চাকুরে জামাই শাশুড়ীর মস্ত গর্ব।

কমলাও সানন্দে এসেছে। কলকাতা দেখার লোভ, তার ওপর দিনে একটা করে সিনেমা দেখার লোভ। এত লোভের টোপ না গিলে থাকতে পারবে এমন মেয়ে কমলা নয়। সমস্ত ব্যবস্থা পাকা করে বিয়ের আগের দিন মতলবটা শাশুড়ীকে জানিয়েছে রতন বনিক। প্রথম শোনার পর শাশুড়ী ঘণ্টা-কতক গুম হয়ে ছিল অবশ্য। কিন্তু আবার দেশে ফিরিয়ে নিয়ে গেলে মেয়ের হাল কি হতে পারে সেই ভবিষ্যৎবাণী শোনার পর শাশুড়ী আর আপত্তি করেনি। উল্টে ভেবেছে এ বরং ভালোই হল, মেয়েটা তোয়াজে থাকবে।

কমলা জেনেছে একেবারে বিয়ের দিন সকালে। কিন্তু সেদিন আর রতন বনিক এই টালি এলাকা থেকে তার পালাবার মতো কোনো ফাঁক রাখেনি। শেষে মুখ বুজেই বিয়েটা করতে হয়েছে তাকে। তবে ওই দজ্জাল বউকে বাগে আনতে বেশ সময় লেগেছিল রতন বনিকের। কখন কোন্ ফাঁক দিয়ে পালায় সেই ভয়ে আস্ত একটা মাস আপিসে ছুটি নিতে হয়েছিল। আর রোজ একটা করে সিনেমা দেখাতে হয়েছিল।

কথায় কথায় একদিন বউয়ের আর একটা খেদের কথা জেনেছিল রতন বনিক। এখানে কারো ঘরে কোনো শুভ কাজ হলে বউ নাকি অপমান বোধ করে। কুড়ি পার হতেও ছেলেপুলে হল না বলে এখানকার এয়োরা কোনো শুভ কাজে প্রথমে তার মুখ দেখতে চায় না। রতন বনিক অবশ্য ভবিষ্যদ্বাণী করেছে কমলা ছেলের মা হবে, ব্যস্ত হবার কি আছে, সবে তো কুড়ি গড়ালো বয়েস। কিন্তু বউ তক্ষুনি গলা উঁচিয়ে তর্ক করবে, তাহলে দিদির কেন তিরিশ বছরেও ছেলেপুলে হল না! এ-সব কথা শুনলে রতন বিরক্ত হয়। —দিদির বরাতে ছিল না তাই হয়নি—তা নিয়ে তোর এত বড় ভাবনা কেন, তোর হলেই তো হল! কপালের ব্যাপারে এত লোকের এত বিশ্বাস রতন বনিকের ওপর, এতটুকু বিশ্বাস নেই শুধু ঘরের বউয়ের। আর বিশ্বাস না থাকলে কারো কোনোদিন কিছু হয়!

…আপিসের সহকর্মীদের কাছে তো বটেই, বাবুদের আর বড় দরের বাবুদের কাছেও পিওন রতন বনিকের ওই কপাল গোনার গুণেই বাড়তি খাতির। মাস দুই আগে পর্যন্ত বাপী তরফদার নিজেও ওই ব্রুকলিনেরই সাধারণ কেরানীবাবুদের একজন ছিল। রতন বনিক সেই বিভাগেরই পিওন। কিন্তু পিওনের কাজ খুব একটা করতে হয় না তাকে। কারণ, দশটা-পাঁচটা অফিসের মধ্যে নিজের বা অন্য বিভাগের কোনো না কোনো বাবু ডিউটির অর্ধেক সময় তাকে ডেকে নিয়ে পাশে টুল পেতে বসিয়ে ভবিষ্যতের জট ছাড়াতে চায়।

নিজস্ব পদ্ধতিতে ভবিষ্যৎ গণনার সুনাম দিনে দিনে বাড়ছিল রতনের। হাত দেখা বা ঠিকুজি দেখার সঙ্গে এই গণনার কোনো সম্পর্ক নেই। তার কোন্ এক গুরুর আশীর্বাদে এক ভিন্ন পদ্ধতিতে সে ভবিষ্যৎবক্তা আর ভবিষ্যৎ-দ্রষ্টা হয়ে বসেছে। একমাথা চুল, একমুখ কাঁচাপাকা দাড়ি, আর চওড়া কপালে তেমনি মোটা করে মেটে সিঁদুর ঘষা। অনেকেরই বিশ্বাস লোকটার তন্ত্রমন্ত্র জানা আছে কিছু। ছোট বড় বাবুদের কাছ থেকে দু’দশ টাকা রোজগার হয় রতন বনিকের।

সে তার খদ্দেরের মাথার শেপ দেখে, ভুরু কান নাক চোখ দেখে, ঠোটের বক্রাভাস দেখে—আর সব থেকে বেশি মুখ আর কপালের রং। শুধু তার চোখেই যে কোনো লোকের সুসময়ে অথবা দুঃসময়ে কপাল আর মুখের রং—বদল ধরা পড়ে। খুব নিবিষ্ট মনে এইসব দেখে নিয়ে চোখ বুজে সে ভবিষ্যৎ বলা শুরু করে। যা বলে তার কিছু সত্য হতে পারে, বেশির ভাগই হয়তো সত্য হয় না। বাপী তরফদারের তাই ধারণা। একশটা ঢিল ছুঁড়লে দুদশটা লেগে যায়ই। কিন্তু মানুষের মন এমনি দুর্বল, যেটা লাগল সেটারই দাগ থেকে গেল। অনেককে বলতে শুনেছে, ব্যাটা ভাঁওতাবাজ, কিসসু জানে না। কিন্তু বিপাকে পড়লে অথবা কোনো আশার সম্ভাবনা দেখলে তাদেরও ওকে খাতির করে কাছে ডেকে বসাতে দেখেছে।

শাশুড়ীর কাছে চিঠি লিখতে হলে বা টাকা পাঠাতে হলে নতুন বাবু অর্থাৎ বাপী তরফদার তার সেই চিঠি অথবা মানিঅর্ডার ফর্ম লিখে দিত। আর রোজ ওকে দিয়ে চা আনানোর সময় ওকেও চা খাওয়ার পয়সা দিত। সেই কারণে হোক বা সমস্ত বিভাগের মধ্যে এমন কি আপিসের মধ্যে একমাত্র বিপুল তরফদারই ভাগ্য যাচাইয়ের ব্যাপারে কখনো শরণাপন্ন হয়নি বলে হোক— রতন বনিকের তার ওপর একটু বেশি টান ছিল। তার আগ্রহ না থাকলেও নিঃসংশয়ে সে তার সম্পর্কে এমন ভবিষ্যদ্বাণী করেছে যা শুনে সহকর্মীদের চোখ ট্যারা আর বাপী তরফদারের মেজাজ গরম। তার ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী সে গোটা ব্রুকলিন ডিপোর মালিক হয়ে বসলেও অবাক হবার কিছু নেই।

…ভবিতব্যের কথা শুনে অপরের হাসি দেখে সাধারণ েেকরানীবাবু বিপুলনারায়ণ তরফদারের মেজাজ গরম হবার আরো কারণ আছে। খুব ছেলেবেলা থেকে সে আকাশ-ছোঁয়া রকমের বড় হওয়ার স্বপ্নই দেখে এসেছে। সেই স্বপ্ন এত প্রত্যক্ষ যে এর প্রতিকূল কোনো বাস্তব সম্ভাবনার সঙ্গে এতটুকু আপোস নেই। মনের তলায় এক বিশাল সাম্রাজ্যই গড়ে বসে আছে। বড় হওয়ার এই তাড়নাটা বাসা বেঁধে আছে অনেক দিনের এক অসহ্য তাচ্ছিল্যের আঘাত থেকে। আর, নিজের সেদিনের ছোট শরীরটার তাজা রক্তের নোনতা স্বাদ থেকে।

…মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে দুঃসহ অপমানের বিকৃত প্রতিশোধের প্ররোচনায় কোনরকম জ্ঞানবুদ্ধি বিবেচনার অবকাশ ছিল না। তারপর শাসনের চাবুকে অপরিণত বয়সের সেই দেহ ঝাঁঝরা হয়েছে। দুই কশ-ঝরা নিজের সেই তাজা রক্তের স্বাদ বাপী তরফদার এ জীবনে ভুলবে না।

সেই থেকেই বড় হওয়ার একটা অফুরন্ত তাগিদ ধমনীর রক্তে টগবগ করে ফুটত সর্বদা। এখনো ফোটে। কত বড় হলে মন ভরে সে-সম্বন্ধে কোনো ধারণা নেই। কোনো গণ্ডী বা কোনো সীমানার মধ্যে কুলোয় না সেটা।

.

বাপী তরফদারের সমূহ সমস্যা রতন বনিকের বউ কমলাকে নিয়ে। তার হাবভাব রকম-সকম দ্রুত বদলাচ্ছে। ওকে দেখলেই মনের তলায় অঘটনের ছায়া পড়ে। বাপী তরফদার সরোষে ওটা ছিঁড়েখুঁড়ে মন থেকে সরায়

মাত্র দিন পাঁচ-ছয় আগের কথা। বিকেলের আগেই রেডিও মারফৎ খবরটা আগুনের গোলার মতো ছড়িয়ে পড়তে স্তব্ধ বাপী তরফদার আর বাইরে টহল না দিয়ে এই খুপরি ঘরে এসে বসেছিল। ও-পাশ থেকে কমলা দেখতে পেয়ে ছুটে এসেছে। একপিঠ খোলা চুল, ঢিলে-ঢালা বেশ-বাস, উত্তেজনায় দুচোখ কপালে।—তুমিও খবর শুনেছ তাহলে? তোমাদের ভদ্দরলোকদের হল কি গো বড়বাবু, দেশসুদ্ধ মানুষ জানে উনি মানুষ নন্—দেবতা—তাঁকেই গুলি করে মেরে দিলে?

এর কি জবাব দেবে বাপী তরফদার। তার নিজের মাথার মধ্যেই সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল।

আগ্রহে আর উত্তেজনায় কমলা খাটিয়ার সামনেই মেঝের ওপর বসে পড়েছিল। তার শোনার ইচ্ছে, জানার ইচ্ছে, বোঝার ইচ্ছে। এ-রকমও কেন হয়, দেবতার আবার শত্রু থাকে কি করে?

বাপী তরফদার টুকটাক দুই-এক কথায় জবাব দিচ্ছিল। জানতে বুঝতে এসে কমলা নিজেই বেশি কথা বলছিল। গেল বছর বেলেঘাটায় গিয়ে কমলা নিজের চোখে গান্ধীজীকে দেখে এসেছিল। এখানকার আরো অনেকে গেছিল। নিজের কানে তাঁর কথা শুনেছে, নিজের চোখে তাঁর হাসি দেখেছে—জন্ম সার্থক। আর আজ কিনা এই!

বলতে বলতে কমলা থমকে মুখের দিকে তাকিয়েছে। নিজের অগোচরে বাপী তরফদারের দু’চোখ তার মুখে বুকে ওঠা-নামা করেছে হয়তো দুই একবার! কিন্তু আসলে সে নিজের প্রতি বা কারো প্রতি সচেতন ছিল না একটুও।

গা-ঝাড়া দিয়ে কমলা বসা থেকে সোজা উঠে দাঁড়িয়েছিল আর সঙ্গে সঙ্গে খসা আঁচলটা সজোরে বুকের ওপর দিয়ে পিঠের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছিল। তার পর ছদ্ম ঝাঁঝে বলে উঠেছিল, খুব যে পরের বউকে সামনে বসিয়ে চোখের সাধ মেটানো হচ্ছে—অ্যাঁ?

বলতে বলতে ঘর ছেড়ে চলে গেছল সে। বাপী তরফদার কাঠ।

পরের চার-পাঁচ দিনের মধ্যে কমলার হাবভাব আরো অন্যরকম দেখছে। বাইরে গম্ভীর, কিন্তু চোখে চোখ পড়লে অঘটনের অস্বস্তিকর ছায়াটা আরো ঘন হয়ে উঠেছে। বাপী তরফদার বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ স্নান সেরে বেরিয়ে পড়ে। বাইরে দুবেলার খাওয়া সেরে একেবারে রাতে ফেরে। গতকাল বেরুনোর আগে কমলা এই খুপরিতে এসে হাজির। কালো মুখ পলকা-গম্ভীর, চোখের কোণে কৌতুক চিকচিক

—আজকাল তোমার কোন্ পার্কে ডিউটি চলছে গো?

—তার মানে? না বুঝেও বিরক্ত।

—মানে আবার কি, রোজ সাড়ে এগারোটা বারোটায় বেরিয়ে রাত নটা পর্যন্ত হন্যে হয়ে তুমি চাকরি খুঁজে বেড়াও সেটা ওই হাঁদা বুড়ো বিশ্বাস করলেও আমি করি না। চাপা হাসি উছলে উঠতে চাইল কিন্তু উঠতে দিল না।—মরুকগে, এদিকে একটা ভালো ছবি হচ্ছে, এখানকার অনেকে দেখেছে; দুকুরের শোয়ের দু’খানা টিকিট কাটতে পারবে? আমি পয়সা দিচ্ছি—

কমলার চোখ এড়িয়ে মাথা নেড়ে বাপী তরফদার বিড়বিড় করে জবাব দিল, আমার সময় হবে না।

এ জবাবের জন্য প্রস্তুতই ছিল কমলা।—ঠিক আছে, টিকিট আমিই কেটে রাখব না হয়…তোমার দেখার সময় হবে?

এবারে ওর চোখের দিকে তাকালো বাপী তরফদার। কমলা ফিক করে হেসে ফেলল।—তোমার অত ভয় কিসের, কেউ টের পাবে না। ছবি দেখার পর বেরিয়ে এসে আমি তোমাকে চিনতেও পারব না—সোজা ঘরে চলে আসব—কমলার দুচোখের কৌতুক সমস্ত মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল। জবাব না দিয়ে বাপী তরফদার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে।

তারপর কাল রাতেই রতন বনিককে এখান থেকে চলে যাওয়ার কথা বলেছে। আর তাই শুনেই কমলার সকালের এই ঠেস।

.

কিন্তু সন্ধ্যার আগে পর্যন্ত আজকের দিনটায় আর কোনো ব্যতিক্রম ছিল না। অভ্যাসমতো বাপী ঘণ্টাকয়েক আপিসপাড়ায় ঘোরাঘুরি করেছে; সেখানে লালদীঘির মাছ দেখে ঘণ্টা দুই কেটেছে। বিকেলে ময়দানের মাঝখান দিয়ে অন্য দিনের মতোই দক্ষিণে হাঁটা দিয়েছে। ট্রামের সেকেন্ড ক্লাসের পয়সা কটাও বাঁচে আবার লম্বা হাঁটাও হয়। এই হাঁটারও কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই। পা যখন আর চলতে চায় না, ধারেকাছের কোনো একটা পার্ক-টার্ক-এ বেঞ্চিতে নয়তো ঘাসের ওপরে বসে পড়ে। ততক্ষণে শীতের ছোট বেলার শেষ আলোটুকু অন্ধকারের জঠরে চলে যায়।

আজ ক্লান্ত লাগছিল না। বেলা তিনটে নাগাদ ছেলেবেলার বন্ধু নিশীথ সেন—এর আপিসে গেছল। সে ভর-পেট জলখাবার খাইয়ে দিয়েছে। লোকালয়ের ফুটপাথ ধরে চলতে চলতে নিজের বাসের এলাকা ছাড়িয়ে আরো দক্ষিণে চলেছে। হাজরা পার্কের সামনে দাঁড়িয়ে গেল একটু। লাইট জ্বালিয়ে প্যান্ডেল খাটিয়ে এখানেও গান্ধীজীর শোকসভা চলেছে।

এর পাশেই আর এক দৃশ্য দেখে হাসি পেয়ে গেল বাপী তরফদারের। রেলিং—ঘেঁষা ফুটপাথে গজ দশেক দূরে দূরে কুপী জ্বালিয়ে দু’জন শীর্ণকায় গণৎকার বসে। সামনে ফুটপাথের ওপরেই খড়ির ছক-কাটা। তাদের সামনে একজন করে খদ্দের হাত বাড়িয়ে বসে আছে। এখানেও ভাগ্য গণনা চলছে। এক-আধজন আবার পাশে দাঁড়িয়ে দেখছে। বসে পড়বে কি পড়বে না—দোনামনা ভাব।

বাপী তরফদার এগিয়ে চলল। মানুষ কত দূরের ভবিষ্যৎ দেখতে পেলে নিশ্চিন্ত হতে পারে? আসলে এ একটা রোগ। রোগের মতো কিছু। এই রোগে বাপী নিজেও জর্জর। কিন্তু কোনো লোককে সে হাত দেখায় না। ঠিকুজি দেখায় না। সে জানে, দেখালে একটা রূঢ় বাস্তব তাকে হাঁ করে গিলতে আসবে। কল্পনায় যে সাম্রাজ্যের সে অধীশ্বর, সেটা কোনদিন সত্যের ধারেকাছে ঘেঁষবে এমন ভবিষ্যদ্বাণী কোনো গণৎকার করবে না। বিশ্বাস করুক আর না-ই করুক, রতন বনিকের ভবিষ্যৎ-বচন বরং শুনতে ঢের ভালো লাগে তার।

কিন্তু ঠিক এই এক ব্যাপার থেকেই যে এই দিনটা অন্য সবগুলো গতানুগতিক দিন থেকে এত তফাৎ হয়ে যাবে, তখন পর্যন্ত এ-রকম সম্ভাবনা তার কল্পনা মধ্যেও নেই।

…বড় রাস্তা ছেড়ে ভিতরের একটা মাঝারি রাস্তা ধরে আরো আধ মাইলটাক দক্ষিণে হেঁটে এসেছিল। সামনের মোড়ের মাথায় একটা তিনতলা বাড়ির রাস্তাঘেঁষা একতলার ঘরটার দিকে চোখ গেল। বাপী আবারও হেসে উঠল। ওই . ঘরেই একজন জ্যোতিষী বসে সে জানে। এই রাস্তায় আরো এসেছে-গেছে। এই একজন বড়লোকের জ্যোতিষী। বড়লোকের ভাগ্য দেখে, ভাগ্য ফেরায়। ঘরের সামনে দু’টো তিনটে গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে। বাইরে অভিজাত মেয়ে-পুরুষেরা অপেক্ষা করে। ভিতরের খদ্দের বেরিয়ে এলে তবে আর একজনের পালা।

আজও দূর থেকে সেই একই দৃশ্য দেখল। দু’খানা গাড়ি দরজায় দাঁড়িয়ে। বাইরে দু’জন ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা। বাপী তরফদার হাসছে মৃদু মৃদু, এগিয়ে আসছে। সামনের দরজা দিয়ে ফরাস-ঢাকা চৌকিতে বসা জ্যোতিষীকে দেখা গেল। তার সামনে দুটি অভিজাত মহিলা বসে। পিছন থেকে তাদের পিঠ দেখা যাচ্ছে, মুখ দেখা যাচ্ছে না। জ্যোতিষীর মুখে হুঁকো-গড়গড়ার নল। নলের তামাক টানছে আর নিবিষ্ট মনে দেখছে কিছু।

দরজা ছাড়িয়ে এসে পাশের জানলা দিয়ে ভিতরে তাকাতেই বাপী তরফদার স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে হৃৎপিণ্ডটা লাফালাফি করে বুকের খাঁচা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল। এ কাকে দেখছে বাপী তরফদার? কাদের দেখছে? সত্যি দেখছে না স্বপ্ন কিছু।

সত্যি না হলে গত আটটা বছরের এতগুলো দিন থেকে এই দিনটা—এই রাতটা মুহূর্তের মধ্যে এত তফাৎ হয়ে গেল কি করে? সত্যিই এখানে এত বড় একটা চমক তার জন্য অপেক্ষা করে বসে আছে!

জানালার গরাদ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বিস্ফারিত দুই চক্ষু মেলে দেখছে। ওই দু’জনই এত বেশি চেনা তার যে দেখামাত্র সর্বাঙ্গের স্নায়ুগুলো একসঙ্গে টানটান হয়ে গেল। বয়স্কা মহিলার জমকালো বেশবাস, গলায় কানে হাতে ঝকমক এক রাশ গয়না। …মনোরমা নন্দী। জ্যোতিষীর সামনে কচি পদ্মের মতো দু’হাত মেলে বসে আছে তার মেয়ে মিষ্টি…মালবিকা। ছেড়ে আসা এক জায়গায় সে যেমন বিপুল নয়—বাপী, সেখানে এই মেয়েও তেমনি মালবিকা নয়—মিষ্টি। মিষ্টি মিষ্টি! বাপী, অপলক চেয়ে আছে। দশ আর আটে আঠেরো হবে এখন বয়স। দশ বছরের সেই গরবিনী মেয়েটা আঠেরোয় এই হয়েছে!

বাপী তরফদার তাদেরই দেখছে আর তার মা-কে দেখছে এ কি বিশ্বাস করবে?

ভিতরে জোরালো আলো। বাইরেটা সে তুলনায় অন্ধকার। ভিতর থেকে তাকে কেউ দেখতে পাচ্ছে না।

কতক্ষণ কেটেছে জানে না। উঠতে দেখল তাদের। মনোরমা নন্দী হাসছেন। মিষ্টি নন্দীও হাসছে। মনোরমা নন্দী সুন্দর হাতে ব্যাগ খুলে দুটো দশ টাকার নোট জ্যোতিষীর সামনে রাখলেন। ভিতরের কথাবার্তা আসছে না।

নিজের ওপর আর এতটুকু দখল নেই বাপী তরফদারের। তারা বেরিয়ে আসতে সে দু’হাতের মধ্যে এসে দাঁড়াল।

মনোরমা বিরক্তিতে ভুরু কোঁচকালেন। পা-জামা পরা খয়ের রঙের গরম আলোয়ান জড়ানো একটা ছেলে হাঁ করে তাঁর মেয়েকে দেখছে। দেখছে না, দুই চোখ দিয়ে গিলছে।

—স্টুপিড! খুব অস্পষ্ট ঝাঁঝে কথাটা বলে মেয়ের হাত ধরে তিনি গাড়িতে উঠলেন। মেয়েটারও বিরক্তি-মাখা লালচে মুখ।

সাদাটে রঙের গাড়িটা চোখের সামনে দিয়ে আরো দক্ষিণে চলল।

পিছন থেকে গাড়িটার নম্বর চোখে পড়ল বাপী তরফদারের। তখনো স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে সে। গাড়ির রক্তবর্ণ সাইডলাইট দুটোও মিলিয়ে গেল।

হঠাৎ জিভে করে নিজের শুকনো ঠোঁট বার দুই ঘষে নিল বাপী তরফদার। আট বছর আগের সেই অকরুণ আঘাতের চিহ্ন আট দিনেই মিলিয়েছে। কিন্তু নিজের দেহের সেই তাজা রক্তের নোনতা স্বাদ আজও জিভে লেগে আছে।

সোনার হরিণ নেই – ২

…অন্ন দেইখা দিবা ঘি, পাত্র দেইখা দিবা ঝি।

শুধু কথা নয়, এক বুড়োর ফ্যাসফেসে গলার টানা স্বরসুদ্ধু হুবহু মনে পড়ে গেলে বাপী তরফদারের।

ছেলেবেলা থেকে এ-পর্যন্ত একটিমাত্র গুণের ওপর মস্ত নির্ভর তার। প্রখর স্মরণ শক্তি। এই গুণটুকুও না থাকলে হাতের মুঠোয় বি-এস-সি’র ডিগ্রি ধরা দুরে থাক, স্কুলের গণ্ডী পার হতে পারত কিনা সন্দেহ। যা একবার দেখে নেয় তার ছাপ মগজ থেকে আর সরে না। যা একবার শোনে কানে লেগেই থাকে। কিন্তু এই গুণটাকে সে যদি কোনো উপায়ে বিস্মরণের রসানলে ঠেলে দিতে পারত, দিতই। একটুও দ্বিধা করত না। …অনেক দাহ অনেক যন্ত্রণার শেষ হত তাহলে

এক ধাক্কায় নটা বছর হুড়হুড় করে পিছনে সরে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে হাফপ্যান্ট আর মোটা ছিট কাপড়ের ফতুয়া পরা তেরো বছরের এক ছেলে, নাম যার বাপী—সে সেই বনাঞ্চলের সব থেকে শৌখিন রংচঙা কাঠের বাংলোর বাইরের সাজানো ঘরের দরজার পাশে আড়ি পেতে দাঁড়িয়ে। ভিতরের গদিআঁটা ঝকঝকে বেতের সোফায় বসে মুগা রঙের চোগাচাপকান পরা একজন সাদা দাড়িঅলা মুসলমান ফকির। সাদা দাড়ি নেড়ে নেড়ে অন্ন দেখে ঘি আর পাত্র দেখে ঝি দেবার কথা সে-ই বলছিল।

তার হাঁটুর এক হাতের মধ্যে চামড়া-ঢাকা চেকনাই মোড়ার ওপর মেমসাহেব বসে। অদূরের আর একটা সেটিতে সাহেব —যাঁকে সামনে দেখলে ভয়ে আর সম্ভ্রমে বাপীর বাবা আর বন-এলাকার সমস্ত মানুষের মাথা বুকের দিকে নুয়ে পড়ে। সাদা দাড়ি আর মাথায় সাদা ফেজ টুপী দেখেই অপরিচিত মানুষটাকে মনে মনে ফকির আখ্যা দেয়নি বাপী। সে যখন এসে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে উঁকি দিয়েছে, ওই সাদা দাড়ি তখন সবে মেমসাহেবের হাত ছেড়ে তার ন বছরের মেয়ে মিষ্টিকে কাছে টেনে নিয়েছে। সোফার হাতলের পাশে এক হাত দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। মিষ্টির পরনে জেল্লা ঠিকরনো বেগনে রঙের ফ্রক। ওই ফ্রকটাতে এত সুন্দর লাগছে মিষ্টিকে যে এক হাতে ওকে ওইভাবে জড়িয়ে ধরে থাকার জন্য বুড়োর ওপর রাগই হচ্ছিল বাপীর। আরো একটু গলা বাড়িয়েছে সে। ওদের পিছনে একটু দূরে আর একটা সোফায় আবার ভারিক্কি মুখে দীপুদা বসে। ওকে দেখতে পেলেই উঠে এসে মাথায় খট খট করে গাঁট্টা বসাবে। তবু সাবধানে মিষ্টিকে দেখার লোভ সামলে উঠতে পারছিল না বাপী।

…মিষ্টির ডান হাতটা বুড়োর সোফার হাতলে চিৎ করে পাতা। বাঁ হাতটা সামনে মেলে ধরা। ফুটফুটে হাতের ছোট চেটো দুটোতে যেন হালকা গোলাপী রং বোলানো। সেই দুটো হাতের ওপর বুড়ো তার এক হাতের পুরু কাঁচের চাকতিটা ফেলে একমনে দেখা শুরু করতেই বাপী বুঝে নিল লোকটা গণৎকার। ওই কাঁচের জিনিসটা সে চেনে। ম্যাগনিফাইং গ্লাস না কি বলে ওটাকে। গণৎকার যদি মুসলমান হয় তাকে ফকির ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে বাপী জানে না।

হাতের রেখার ওপর চোখ রেখে বুড়ো জিজ্ঞাসা করল, বেটীর নাম কি?

লজ্জা-লজ্জা মুখ করে মিষ্টি বলল, মালবিকা নন্দী। জবাব দিয়ে সকৌতুকে ও একবার বুড়োর মুখের দিকে তাকাচ্ছে আর একবার নিজের হাতের দিকে।

এরপর ভবিষ্যৎ বলা শুরু হল। খাসা মেয়ে। যত বড় হবে আরো খাসা হবে। উদ্‌গ্রীব মুখে তার মা আরো সামনে ঝুঁকল। আর বাবা সিগারেট ধরালো।

—খুব বুদ্ধিমতী মাইয়া। অনেক লেখা-পড়া অইব। বি.এ. এম.এ. পাস করবো। না, কোন রকম বড় অসুখবিসুখ দেখা যায় না, মায়ের কোনো ভাবনা নাই, বেটীর শরীর স্বাস্থ্য ভালো যাইবো।

মেমসাহেবের প্রশ্ন, আর বিয়ে? বিয়ে কেমন হবে দেখুন—

বাইরে থেকে বাপীরও মনে হল মিষ্টির সম্পর্কে এইটেই শুধু জানার মতো কথা, আর সব বাজে।

ওর দুটো হাতের ওপরেই কাচ ফেলে-ফেলে দেখছে বুড়ো। বেশ করে দেখে নিয়ে শেষে শ্লোকের মতো করেই কথা কটা বলল। ‘অন্ন দেইখা দিবা ঘি, পাত্র দেইখা দিবা ঝি’—

বাইরে থেকে স্পষ্টই শুনল বাপী কিন্তু অর্থ বুঝল না। মেয়ের বিয়ের মধ্যে অন্ন ঘি ঝি আবার কি ব্যাপার! মাথাটা আবার একটু বাড়িয়ে দিতে হল। মিষ্টি ও বড় বড় চোখ করে বুড়োর দিকে চেয়ে আছে।

মিষ্টির মা উদ্বিগ্ন একটু।—তার মানে গণ্ডগোল দেখছেন নাকি? প্রশ্নটা করেই কিছু খেয়াল হল। মেয়েকে বলল, এই মিষ্টি তোর হয়েছে, তুই যা এখন।

মিষ্টি মাথা ঝাঁকালো, দাদা থাকলে আমি থাকব না কেন!

ফলে দাদার প্রতিও মায়ের নির্দেশ, দীপু, তুইও বাইরে যা তো একটু—

শোনামাত্র এদিক থেকে বাপীর ছুট লাগানোর কথা। কিন্তু প্রস্তুত হবার আগেই ছেলের প্রতিবাদ কানে এলো, বা রে, আমারটা তো দেখাই হয়নি এখনো,’ আমি তাহলে বাড়ি থেকেই চলে যাচ্ছি—

বাপী জানে, মেমসাহেব ছেলের কাছে নরম মেয়ের কাছে গরম। ওমনি ছেলেকে অনুমতি দিল, আচ্ছা তুই থাক। সুর পাল্টে মেয়েকে বলল, মিষ্টি! কতদিন বলেছি না দাদা তোমার থেকে ঢের বড়–যাও, ও-ঘরে গিয়ে বই নিয়ে বোসো—

বাপী এদের সমস্ত খবর রাখে। বাইরের শাসন সাহেবের আর ভিতরের শাসন মেমসাহেবের। বিরস মুখে মিষ্টি দরজার দিকে পা বাড়ালো। এবারে বিপদ হতে পারে বাপী জানে, তবু দরজার আড়াল থেকে সে নড়ল না।

বাইরে পা দিয়ে ওকে দেখেই মিষ্টি থমকালো এক দফা। পরের মুহূর্তে ঘরের দিকে ঘাড় ফিরিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, মা—বাপী পাজিটা এখানে দরজার পিছনে দাঁড়িয়ে শুনছে সব!

এক লাফে জাহাজ মার্কা কাঠের বাংলো থেকে বাপী মাটিতে এসে পড়ল। খানিকটা নিরাপদ ব্যবধানে ছুটে এসে ঘুরে দাঁড়াল। না, ওর চিৎকার শুনে সাহেব বা মেমসাহেব কেউ বেরিয়ে আসেনি। এসেছে দীপুদা। চোখোচোখি হতে সে হাত তুলে মার দেখালো, তারপর আবার ভিতরে চলে গেল।

বয়সে দীপুদা তিন বছরের বড় হলেও আর সেবারে সে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিলেও ওই ননীর শরীরে জোর কত বাপীর তাতে সন্দেহ আছে। কিন্তু সাহেবের ছেলের জোর যাচাইয়ের প্রশ্ন ওঠে না। তাই হাতের নাগালে পড়লে বাপীকে গুঁতো খেতে হয়। সাহেবের ছেলে না হলে ও উল্টে লড়ে দেখতে পারত। ছুটে দীপুদা তার নাগাল পায় না কখনো, সে-চেষ্টা করলে জিভ বার-করা কুকুরের হাল হয়।

দীপুদা ঘরে ঢুকে যাওয়ার পরেও ফ্রক পরা মিষ্টি সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে আর ওকেই দেখছে। এ-রকম একটা সুযোগ বাপী ছাড়তে পারে না। যতটা সম্ভব দু’পা ফাঁক করে দাঁড়াল। তারপর হাত দুটোও দুপাশে টান করে দিল। শেষে মুখটা বিকৃত-কুৎসিত করে আর ছ’আঙুল জিভ বার করে ভেঙচি কেটে দাঁড়িয়ে রইল।

ফল যেমন আশা করেছিল তেমনি। রাগের মাথায় ও-দিকের কাঠের বারান্দা থেকে মিষ্টিও চোখের পলকে ঠিক ওই রকম পা ফাঁক করে হাত দু’দিকে ছড়িয়ে আর জিভ বার করে ভেঙচি কেটে পাল্টা জবাব দিল। তারপরেই তারস্বরে আবার চিৎকার, ও মা! দেখে যাও বাপী পাজিটা আমাকে কি বিছুছিরি করে ভেঙাচ্ছে।

আর দাঁড়ানো নিরাপদ নয়। মেয়ের ডাকে ওই মেমসাহেব বাইরে এসে আঙুল তুলে ডাকলেই বাপীকে কাচপোকার মতো কাছে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। দাঁড়িয়ে কানমলা বা চড় খেয়ে আসতে হবে। চড় অবশ্য এখন পর্যন্ত খেতে হয়নি, কিন্তু কানে দুই-একবার হাত পড়েছে। আর চড়িয়ে গাল লাল করে দেবার শাসানি শুনতে হয়েছে। এ-সব নির্যাতন ওই সোহাগী মেয়ের নালিশের ফল। নইলে দরকার পড়লে মেমসাহেব ওকে ডেকে ফাইফরমাস তো বেশ করে। আর, একটু সুনজরের আশায় বাপীও তার কোনো কাজ করতে পেলে বর্তে যায়।

সোহাগী মেয়ের চিৎকার শেষ হবার আগেই বাপী রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলে সেঁধিয়েছে। তারপর জঙ্গলের ভিতর দিয়েই হাসতে হাসতে ঘরমুখো হয়েছে।

মাথায় ফকিরের কথাগুলো ঘুর-পাক খেতে লাগল। যা বলল তার অর্থ কি হতে পারে? ঘরে গিয়ে পিসীকে জিজ্ঞেস করতে হবে। পিসীর কথাবার্তার মধ্যে ও বাঙালের টান আছে, বিশেষ করে বাবার সঙ্গে যখন কথা বলে। আর ওই ফকিরের মতো অনেক রকমের ছড়া-পাঁচালি কাটে পিসী।

বাপীর যা-কিছু আদর আব্দার সব পিসীর কাছে। ঘরে মা নেই। মা-কে সে—রকম মনেও পড়ে না। চিন্তা করলে মায়ের একটা কাঠামো শুধু মনে আসে। আরো সাত বছর আগে অর্থাৎ বাপীর ছ’বছর বয়সের সময় এখনকার হাসপাতাল থেকে মা-কে শহরের বড় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে মা আর এই বানারজুলিতে ফিরে আসেনি। পিসী তার আগে থেকে এখানে ছিল। একদিন বিকেলের দিকে তাকে মেঝেতে আছড়ে পড়ে কাঁদতে দেখেছিল। আর বাবাকে মুখ কালি করে ঘরের কোণে বসে থাকতে দেখেছিল। তারপর জেনেছে মা বড় হাসপাতাল থেকেই সগে চলে গেছে। এই তেরো বছরের জীবনে তারপর মায়ের জন্য হাহুতাশ করার সময় খুব একটা মেলেনি।

ঘরে ঢুকে পিসীকে বলল, সাহেব বাংলোয় মস্ত এক ফকির এসেছে কোথা থেকে, সকলের হাত দেখছে—

হাত দেখা ফকিরের কথা শুনে পিসীর জিভে জল গড়ালো।—বলিস কি রে! কে ফকির? কোথাকার ফকির? তুই নিজের হাতটা একবার দেখিয়ে এলি না কেন?

বিরক্তিভরে শেষের প্রশ্নটারই জবাব দিল, কি যে বলো ঠিক নেই, সাহেব মেমসাহেব তাদের ঘরে বসে হাত দেখাচ্ছে সেখানে নিজের হাত বাড়াতে গেলে আস্ত থাকত—দুমড়ে ভেঙে দিত না!

এ-রকম কথা শুনলে পিসীর রাগ হয়ে যায়। কেন, ভেঙে দেবে কেন শুনি? ওদের ভবিষ্যৎ আছে তোর নেই—তুই কি বানের জলে ভেসে এসেছিস নাকি!

পিসী আবার বাবার ঠিক উল্টো। বাবা সাহেব মেমসাহেবের নাম শুনলে কাঁপে। পিসী জ্বলে। পিসীর রাগের কারণও বাপী নিজেই। তার কাছে ও দুধের ছেলে। সাহেবের ছেলে ভাইপোর গায়ে যখন-তখন হাত তোলে, আর মা-ও ভালো ব্যবহার করে না, ধমক-ধামক করে, কানে হাত দেয় পর্যন্ত—এ পিসী বরদাস্ত করতে পারে না। দাঁত কড়মড় করে, বাপীকেই ঠেঙাতে আসে, তুই নোলা বার করে যাস কেন ও-দিকে বেহায়ার মতো—এত হেনস্তার পর লজ্জা করে না ও-মুখো হতে?

বাপীর লজ্জা করে না। দীপুদা তার বাবা-মা, এমন কি ওই মিষ্টিটার ওপরে পর্যন্ত কি-রকম একটা আক্রোশ তারও বুকের তলায় জমাট বেঁধে আছে। তবু যায়। না গিয়ে পারে না। বিকেলে বা ছুটির দিনে একটা অদৃশ্য কিছু তাকে ওই বাংলোর দিকে টেনে নিয়ে যায়। ওই বাংলোটা তার চোখে রূপকথার নিষেধের এলাকার মতো। নিষেধ বলেই ওদিকে হানা দেবার লোভ।

পিসীর সামনে গ্যাঁট হয়ে বসল বাপী।—বাজে কথা ছাড়ো—অন্ন দেইখা দিবা ঘি পাত্র দেইখা দিবা ঝি—মানেটা কি চটপট বলে দাও দেখি?

হঠাৎ এই বচন শুনে পিসী হাঁ প্ৰথম।—কে বলেছে?

—ওই ফকির।

—কাকে বলেছে?

—মিষ্টির হাত দেখে তার মা-কে বলেছে।

পিসী মিষ্টিকে চেনে। মেমসাহেবকে লুকিয়ে ও বাপীর সঙ্গেই দু’দিন এখানে এসেছে। পিসী ওকে আদর করে নারকেলের নাড়ু আর মুড়ির মোয়া খাইয়েছে।

হাসিমুখে পিসী ভাইপোকে ছড়ার অর্থ বুঝিয়ে দিল। শুনে বাপী চিন্তিত হওয়া দুরে থাক উল্টে খুশি হল। ঢাক-ঢোল-শানাই বাজিয়ে মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলেই হল? হোক গণ্ডগোল —গণ্ডগোলটা যত বেশি হয় বাপী ততো খুশি হবে। ওই হাবা মেয়ে কি বোঝেনি। বুঝবে কি করে, তাকে তো ঘর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পিসীর কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য না হলে নিজের মা ওকে ঘর থেকে সরাবে কেন! মিষ্টিটাকে এবার হাতের নাগালে পেলে হয়—

ডাকলে মিষ্টি যে ওর ধারেকাছে আসতে চায় না সেই দোষটা বাপীর নিজেরই। মেয়েটাকে দেখলেই মাথায় দুষ্টুবুদ্ধি চাপে। অবস্থার ফারাকটা ওরা যদি এত বড় করে না দেখত তাহলে বোধ হয় এতটা হত না। মেয়েটাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে একটা অজ্ঞাত লোভ মনের তলায় উঁকিঝুঁকি দেয়। ঝাঁকড়া আধা—কোঁকড়ানো চুলের সামনে ফর্সা টুলটুলে মুখখানা দেখে মনে হয় ছোট্ট মিশকালো একটা ঝোপের মধ্যে সুন্দর একখানা বড়ো ফুল বসানো।

একা পেলেই ডেকে বসত, এই মিষ্টি, শোন্—

মিষ্টি কাছে আসত। — কেন?

—-তোকে আমি খেয়ে ফেলব। তারপর আরাম করে এক গেলাস জল খাব।

এরপর আর রাগ না করে থাকতে পারে কোন্ মেয়ে। কাছে আসুক না আসুক, দেখা পেলেই বাপীর ওই কথা।—মিষ্টি, তোকে আমি খেয়ে নেব-দূরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? কাছে এলে খেয়ে নেব বলে?

মিষ্টি এই নিয়ে তার দাদার কাছে আর মায়ের কাছে নালিশ করেছে। দীপুদা এই অপরাধে ওর মাথায় কম গাঁট্টা মারেনি। আর এই অপরাধেই মেমসাহেবের হাতে কানমলা খেয়েছে। তার ফলে দেখা হলে দূর থেকে আরো বেশি করে এই কথা বলে ছুটে পালিয়েছে। এরপর বাবার কাছে সাহেব বা মেমসাহেব কে তড়পেছে বাপী আজও জানে না। বাবা একদিন আপিস থেকে ঘরে ফিরেই ওকে ধরে বেদম ঠেঙানি। কি দোষে মার খাচ্ছে, পিসীর বা ওর তাও বুঝতে সময় লেগেছে। এই মারের ফলেই পিসীর সঙ্গে বাবার ঝগড়া বেধে গেছে। দোষটা তখন বোঝা গেছে। বাবা বলেছে, সাহেবের মেয়েটাকে দেখলেই মিষ্টি খাবে, মিষ্টি খাবে বলে চেঁচায়—আজ ওকে আমি শেষ মিষ্টি খাওয়াচ্ছি।

বাবার ওপরে রাগ করেই পিসী গুমগুম করে ওর পিঠে আরো কটা কিল বসিয়ে দিয়েছে—সাহেবের গরিব কেরানীর ছেলে হয়ে তোর এত লোভ—পা চাটতে পারিস না?

একরকম বিপাকে পড়ার ফলেই মিষ্টিকে দেখলে বাপী এখন আর গলার আওয়াজে জানান দিয়ে একথা বলে না। কিন্তু মনে মনে ঠিক বলে। আগের থেকে আরো বেশি বলে। আর সেটা ওই মেয়ে ঠিক বুঝতে পারে। কিন্তু কানে না শুনলে নালিশ করতে পারে না বলেই বাপীর ওপর আরো বেশি রাগ তার। দাদাকে বলেওছে ক’দিন, ও মনে মনে ঠিক আমাকে খাবার কথা বলছে, ঠোঁট নড়ছে দেখছ না—ধরে দাও না দু’ঘা!

কিন্তু দীপুদা যখন দেখে তখন আর বাপীর ঠোঁট নড়ে না। বোনের রাগের কথায় সে অতটা অবুঝ হতে পারে না। তবু ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করে নেয়, মনে মনে বলছিস?

যতটা সম্ভব মুখখানা নিরীহ করে তুলে বাপী মাথা নাড়ে। বলছে না।

দুপুরটা কোনরকমে কাটিয়ে জংলা পথ ধরে আবার সোজা বাংলোর সামনে এসে দাঁড়াল। বিকেলে মিষ্টি বাংলো ছেড়ে বেরুবেই জানা কথা। নিজেদের বাগানে ছোটাছুটি করে আবার সামনের পাকা রাস্তা ধরে বেড়ায়ও। ফাঁক পেলে মেয়েটার জঙ্গলে ঢুকে পড়ারও লোভ খুব। কিন্তু একলা ঢুকতে সাহস পায় না। বাপীর তোয়াজ তোষামোদে মেজাজ ভালো থাকলে মা-কে লুকিয়ে তার সঙ্গেই মাঝে মাঝে ঢুকে পড়ে। ইদানীং বাপীরও তোষামোদের মেজাজ নয় বলে সেটা বন্ধ আছে। এমন কি মিষ্টি ওকে দেখলে বাগান ছেড়ে বাইরেই আসতে চায় না।

চুলবুলে মেয়ে ঘরে কতক্ষণ আর থাকবে। একটু বাদেই কাঠের বাংলোর বারান্দায় দেখা গেল ওকে। তারপর থমকেও দাঁড়াল; অর্থাৎ ওরও চোখ এই দিকে।

একবার এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে নিল বাপী। কেউ নেই। গেট-এর সামনে এসে হাত তুলে ইশারায় কাছে ডাকল।

মিষ্টি দাঁড়িয়ে রইল। অপলক চোখ। রাগ-রাগ মুখ। বাপী বুঝে নিল সকালে যেভাবে ওকে ভেংচি কাটা হয়েছে, সহজে আসতে চাইবে না। খুব মোলায়েম গলায় ডাকল, মালবিকা, একটা কথা শুনে যা, খুব মজার কথা

মালবিকা বলে ডাকার মানে ওকে বোঝাতে চায় মনে মনেও সে এখন মিষ্টিকে খেয়ে ফেলার কথা ভাবছে না। কিন্তু মেয়েও ত্যাদড় কম নয়।—ফের তুই-তুকারি করে কথা! মা-কে ডাকব?

বাপীর ইচ্ছে হল দুই চড়ে ফোলা ফোলা লালচে গালে দশ আঙুলের দাগ বসিয়ে দেয়। তার বদলে দু হাত জোড় করে ফেলে বলল, ঠিক আছে আর তুই—তুকারি করব না, কিন্তু একবার এলে খুব মজার কথা বলতাম, সকালের সেই গণৎকারের কথা—পিসীমার কাছে চুপিচুপি জিগগেস করে জেনে নিয়েছি!

বাংলো ছেড়ে বাইরে আসার লোভ একটু একটু হচ্ছে বোঝা যায়। তবু মাথা নাড়ল, মা তোমাদের সঙ্গে মিশতে বারণ করে দিয়েছে।

এ-কথা মিষ্টি আগেও বলেছে। শুনলেই রাগে ভিতরে ভিতরে গজরাতে থাকে বাপী। কিন্তু এত শুনেছে বলেই কানে তোলার মতো নয়। সাদা-মাটা মুখ করে বলল, ঠিক আছে, শুনতে হবে না তাহলে…জঙ্গলের মধ্যে মস্ত একটা মৌচাকও দেখাব ভাবছিলাম। আবু বলছিল, শিগগীরই মওকা বুঝে এক রাত্তিরে ওটা পেড়ে ফেলবে—অনেক মধু হবে। তুই তোর মায়ের আঁচলের তলায় বসে থাকগে যা।

গেট ছেড়ে রাস্তার এ-ধারে চলে এলো বাপী।

লোভ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে মিষ্টির। এই পাজীটার সঙ্গে জঙ্গলে বেড়াতে ওর ভালই লাগে। বাবার সঙ্গে বা বাবার লোকের সঙ্গে ও আর দাদা জঙ্গলে ঘুরেছে। হাতীর পিঠে চেপেও ঘুরেছে। কিন্তু সে আর এক রকমের ঘোরা। বাপীর সঙ্গে ঘুরতে অন্য রকমের মজা। বাপী হাত ধরে টানাটানি করলেও মিষ্টি ঘন জঙ্গলে ঢোকে না অবশ্য। এমনিতেই গা ছমছম করে। দাদাও ভীতু, একলা বেশি দূর যায় না। কিন্তু বাপীর ভয়ডরের লেশমাত্র নেই। যেখানে বাঘ, ভালুক, চিতা থাকে, আবুর সঙ্গে ও নাকি সে-সব জায়গাও চষে বেড়িয়েছে। আর ঢিল নিয়ে বুনো মোরগ খরগোস বেঁজী সজারু তাড়া করতে মিষ্টি নিজের চোখেই দেখেছে। ছমছমানি ভাব কেটে গিয়ে তখন সত্যিকারের মজা।

রাস্তার ওদিকে চলে গেল দেখে মিষ্টির আর বাংলোয় দাঁড়িয়ে থাকা হল না। পায়ে পায়ে নেমে গেট-এর কাছে এসে চোখ বেঁকিয়ে দেখে নিল সত্যি চলে যাচ্ছে কিনা। তারপর অনেকটা নিজের মনেই কথা ছুঁড়ে দিল, হুঁ, মৌচাক দেখতে যাই আর বোলতা এসে কামড়ে দিক্।

বোলতার বদলে বাপীর নিজেরই ওই ফোলা গালে কামড় বসাতে ইচ্ছে করছিল। বলল, বোলতা আর মৌমাছির তফাৎ জানিস না—তোকে দেখতে হবে না। ঢিল না ছুঁড়লে মৌমাছি চাক ছেড়ে নড়ে?

—আবু চাক ভাঙবে কি করে, তখন কামড়াবে না?

—রাতে ধোঁয়া দিয়ে ভাঙবে। জঙ্গল-সাহেবের মেয়ের কত সাহস আবুকে বলে আসিগে যাই।

ওই একজনকে জঙ্গলের দেবতা বা অপদেবতা ভাবে মিষ্টি। আবু রব্বানীকে এ তল্লাটের মানুষ ছেড়ে জঙ্গলের সমস্ত জীব-জন্তুগুলোও চেনে বোধ হয়। জঙ্গলের খবর ওর থেকে বেশি কেউ রাখে কিনা সন্দেহ। এই জন্যে মিষ্টির বাবাও ওকে পছন্দ করে। আবুর বাবা এ জঙ্গলের হেড-বীটম্যান। ওর ছেলে আবুকে বাবা শিগগীরই বীটম্যান করে দেবে শুনেছে মিষ্টি। ওই আবু একসময় দাদার দু ক্লাস ওপরে পড়ত নাকি। বছর-বছর ফেল করার ফলে পাঁচ বছরের ছোট বাপী ওকে ধরেছিল। আর সেই বছরেই আবু ঘেন্নায় ইস্কুল ছেড়েছে। বয়সে দাদার থেকে মাত্র দু’বছরের বড়। বেশি হলে উনিশ। এরই মধ্যে শুধু পাথর ছুঁড়ে আর লাঠি পেটা করে কত রকমের জীব মেরেছে ঠিক নেই। এই সেদিনও পেল্লায় এক বিষধর সাপ মেরে মিষ্টির বাবাকে দেখাতে এনে খুব বকুনি খেয়েছিল। সাপ ইঁদুর খায়। ইঁদুর বনের ক্ষতি করে। তাই বেশি সাপ মারলে বনের ক্ষতি। বাবা বকুক আর যা-ই করুক, ওর বুকের পাটা আছে অস্বীকার করতে পারে নি। কেউ পারে না। জঙ্গলের ব্যাপারে তার আলাদা মর্যাদা।

বাপীকে নিয়ে আবুর সঙ্গেও মিষ্টি চুপি চুপি জঙ্গলে কম বেড়ায়নি। ছুটির দিনের দুপুরে বাবা-মা ঘুমোয়, দাদা শহরে যায়। ফাঁক বুঝে বাপীও এসে মিষ্টিকে ডেকে নিয়ে যায়। বাবা-মা ওকে না দেখতে পেলেও ভাবে কাছাকাছি আছে কোথাও। আবু সঙ্গে থাকলে আর হাতে সময় থাকলে মিষ্টি ওদের সঙ্গে একটু ঘন জঙ্গলে ঢুকতেও ডরায় না। এই আবুর কাছে মিষ্টির ভীরু অপবাদ কাম্য নয়।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও গেট খুলে বাইরে এসে দাঁড়াতে হল। মেয়ে ভাঙবে তবু মচকাবে না। ঠোঁট উল্টে জবাব দিল, আবুকে বললে বয়েই গেল। বাবাকে বলে দেব আবু জঙ্গলের ক্ষতি করছে, ওকে যেন বীটম্যান না করে।

বাপীর ধৈর্য কমছে, তাই রাগ বাড়ছে।—কি? আবুর নামে নালিশ করবি তুই?

—ফের তুই?…তুমিই বা আমার নামে ওকে বলতে যাবে কেন? বোল্লার চাক কত দূর?

একবার শুধরে দেবার পরেও ফের আবার বোলতাই বলল। বাপীর মনে ওকে নিয়ে জঙ্গলে ঢোকার তাড়না।—খুব কাছে।…আচ্ছা, আবুকে কিছু বলব না। মিষ্টি অত সহজে ভোলবার পাত্রী নয়।—মজার কথা কি বলবে বলছিলে? টোপটা আরো একটু রহস্যজনক করে তোলার সুযোগ পেল বাপী। মুখে হাসি টেনে বলল, সকালে গণৎকারের সঙ্গে তোর বিয়ের কথা বলার সময় তোর মা তোকে ঘর থেকে সরিয়ে দিল কেন সে তো বুঝতেও পারিসনি বোকা মেয়ে! আয়, বলছি—

এবারে আর ‘তুই’ বলার জন্য ফোঁস-ফোঁস করে সময় নষ্ট করতে চাইল না মিষ্টি। আসলে মা বলেছিল বলেই, নইলে তুই-তুমির তফাৎ খুব একটা কানে লাগে না। ঘুরে দাঁড়িয়ে বাংলোর দিকটা দেখে নিল একবার। কেউ নেই। রাস্তা পেরিয়ে কাছে এলো।…বিয়ের কথা মানেই মজার কথা আর ভালো কথা, কিন্তু মা হুট্ করে ওকে ঘর থেকে চলে যেতে বলেছিল কেন সত্যিই মাথায় ঢোকে নি।

—বলো।

—আগে এদিকে আয়। কাছে পাওয়া মাত্র ওর একখানা হাতের ওপর দখল নিয়ে জঙ্গলে ঢুকে গেল। তারপরেও হাত ছেড়ে দিল না। মিষ্টির সুন্দর ছোট হাত নিজের হাতে নিয়ে টানা-হেঁচড়া করতে বা চাপাচাপি করতে ভালো লাগে।

—সকালের ওই গণৎকার কোত্থেকে এলো রে?

—বাবা শিলিগুড়ি থেকে আনিয়েছে। অনেক জানে।

—কি নাম?

—পীর বস্।

—তার মানে এক বাক্স পীর!

না বুঝে মিষ্টি বোকার মতো তাকালো তার দিকে।

বাপী বলল, বি-ও-এক্স বক্স মানে বাক্স না?

—তোমার মুণ্ডু, তুমি এই-সব বজ্জাতি করার জন্য আমাকে ডেকে এনেছ! হাত ছাড়াবার চেষ্টা।

—না রে না—তোর বিয়ের কথায় বুড়ো সেই ছড়াখানা কি বলেছিল মনে আছে?

একটা কি বলেছিল মিষ্টির মনে পড়ছে। চেষ্টা সত্ত্বেও কথাগুলো মনে পড়ল না। মাথা নাড়ল, মনে নেই।

‘অন্ন দেইখা দিবা ঘি, পাত্র দেইখা দিবা ঝি’! বাপী হেসে উঠল।

মনে পড়ল। বুড়ো গণৎকার এই কথাগুলোই বলেছিল বটে। বড় বড় চোখ করে মিষ্টি ওর দিকে মাথা বেঁকিয়ে তাকালো। তার মানে কি?

—’অ’ আর ‘নয়-নয়’ অন্ন মানে ভাত তো?

মিষ্টি মাথা নাড়ল। তাই।

—পচা গন্ধ-অলা চালের ভাতে ভালো ঘি ঢাললেও খেতে স্বাদ ভালো হয়? এবারে একটু ভেবে-চিন্তে মাথা নাড়ল মিষ্টি। হয় না বটে।

—আর পাত্র মানে হল ছেলে, যে-ছেলের সঙ্গে বিয়ে হবে। আর ঝি মানে হল মেয়ে—যে মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হবে।

মিষ্টি ফোঁস করে উঠল, ঝি মানে কখনো মেয়ে নয়।

বাপী তেমনি জোর দিয়ে বলল, হ্যাঁ মেয়ে। পিসীর কাছে শুনে আমি ডিকশনারী দেখে নিয়েছি, বিশ্বাস না হয় তুইও দেখে নিস। ঝি মানে ঝিও হয় আবার মেয়েও হয়।

এ-কথা শুনে মিষ্টি দমে গেল একটু। বলল, ঝি মানে মেয়ে হলেই বা মা আমাকে ঘর থেকে যেতে বলবে কেন?

—তোর বিয়ে নিয়ে হ্যাঙ্গামা আছে বলে। বাপী-গম্ভীর!—পচা চালের মতো একটা বাজে ছেলের হাতে পড়বি তুই।

—কখনো না। পীর সাহেব তো বলেছে, আমার অনেক লেখা-পড়া হবে চেহারা আরো ঢের সুন্দর হবে, অসুখ করবে না, শরীর ভালো থাকবে—তাহলে খারাপ ছেলের সঙ্গে বিয়ে হবে কেন?

অনেক-জানার মতো মুখ করে বাপী হাসতে লাগল। বলল, ওই জন্যেই তো এই শোলকটারে! তোর পীরসাহেব বলেছে, যত ভালো মেয়েই হোক, সে-রকম ভালো ছেলের সঙ্গে যদি বিয়ে দিতে না পারো তাহলে পচা চালে ভালো ঘি ঢালার মতো হবে সেটা। বুঝলি?

বুঝেও গোঁ-ভরে মিষ্টি বলল, বাবা ঠিক দেখেশুনে ভালো ছেলের সঙ্গেই বিয়ে দেবে আমার—

বাপীর মুখের হাসি আরও প্রশস্ত হল।—তুই আচ্ছা বোকা, তোর বাবাও কি গণৎকার নাকি যে আগে থেকেই ছেলের সব জেনে ফেলবে। ভয় না থাকলে পীরসাহেবের মতো এত বড় গণৎকার এ-কথা বলবে কেন, আর তোর মা-ই বা তোকে তাড়াতাড়ি ঘর থেকে সরিয়ে দিতে চাইবে কেন! পরিতুষ্ট বাপী ওর হাতে বড়সড় চাপ দিল একটা। অকাট্য যুক্তির মুখে পড়ে মিষ্টি থমকে দাঁড়িয়ে গেল। বেশ রাগ হচ্ছে। একে হাসছে তায় হাতের ওপর হামলা।

—বোলতার চাক কই?

বাপী থতমত খেল একটু। চারদিকে তাকালো একবার।—কোন্ গাছটায় দেখেছিলাম ঠিক মনে পড়ছে না…একটু খুঁজলেই পেয়ে যাব।

এক ঝটকায় মিষ্টি নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল।—মিথ্যেবাদী, মিথ্যেবাদী! সঙ্গে সঙ্গে যে-দিক থেকে এসেছে সেইদিকে ছুট্‌।

মৌচাক জঙ্গলের কোথাও না কোথাও আছেই। একটা ছেড়ে অনেক আছে। কিন্তু একটাও দেখে রাখা হয়নি বলে বাপী মনে মনে পস্তালো একটু। ছুটে গিয়ে আবার ওকে চেপেচুপে ধরার লোভ। কিন্তু ধরতে পারলেও আজ আর ফেরানো যাবে না।…ওর ফুটফুটে নরম-গরম হাতটা এতক্ষণ নিজের হাতের মধ্যে ছিল, বেশ লাগছিল।

হৃষ্ট মুখেই বাপী এবার আর একজনের সন্ধানে চলল। বয়সে ছ বছরের তফাৎ হলেও এখানে প্রাণের দোসর একজনই।

আবু রব্বানী।

ওই রব্বানীর সে একনিষ্ঠ ভক্ত বললেও বেশী বলা হবে না। তার একান্ত কাছে থাকার ফলে বাপীর ইদানীং কত দিকে জ্ঞান বাড়ছে তা নিজেই অনুভব করতে পারে। বাপীর বিবেচনায় আবুর মতো মরদ তামাম বানারজুলিতে আর দুটি নেই। আবুরও ওর ওপর অকৃত্রিম স্নেহ। তার কারণ আছে। বীটম্যান হবার আশায় বানারজুলির এত বড় রিজার্ভ ফরেস্টের স্থানীয় সর্বেসর্বা রেঞ্জ অফিসারের মেমসাহেবটিকে আবু নানানভাবে তোয়াজ তোষামোদ করে চলেছে বটে। ঝুড়ি ভরতি ফিকে পীত রঙা শাল ফুল অথবা টকটকে লাল পলাশ দিয়ে আসে, আম জাম জামরুল পেয়ারা খেজুর নিয়ে যায়, বুনো মুরগী বা খরগোশ মারতে পারলে মেমসাহেবকে ভেট দিতে ছোটে। কিন্তু চাকরিটা একবার হয়ে গেলে ওর সমূহ মনিব কেরানীবাবু অর্থাৎ বাপীর বাবা হরিবাবু। তাই বাপীর সঙ্গে খাতির রাখাটা তার দরকারও বটে। কিন্তু আবুর অকৃত্রিম স্নেহটাই বড় করে দেখে বাপী।

—আরে থো থো—আল্লার খবর মোল্লায় রাখে!

বাপীর মুখে গণৎকার পীর বস্-এর সমাচার শুনে বাঙাল টান দিয়ে ওই মন্তব্য করেছিল আবু রব্বানী। বিশেষ করে মিষ্টির বি-এ এম-এ পাশ করে মস্ত বিদুষী হওয়ার সম্ভাবনাটা এক ফুঁয়ে বাতিল করে দিয়েছিল সে। বলেছে, বি-এ এম-এ দূরে থাক, ওই মেয়েকে ম্যাট্রিকও পাশ করতে হচ্ছে না বলে দিলাম।

আবু নিজে অনেক বছরের চেষ্টায় ক্লাস সিক্স থেকে সেভেনে প্রমোশন না পেয়ে পড়া ছেড়েছে একথা একবারও মনে হয় না বাপীর। সত্যিকারের বিস্ময় নিয়ে শুধিয়েছে, কেন বলো তো—মেয়েটা তো ওদের ক্লাসে ফার্স্ট হয়।

—ফার্স্ট হোক আর লাস্ট হোক, এই পীর যা বলে শুনে রাখ্

শুনে রাখার মতোই কথা বটে। সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করল, কিন্তু বেশি পড়াশুনা কেন হবে না বলো না?

আবুর মুখে সবজান্তা হাসি। তোর কোনো বুদ্ধি যদি থাকত! এই বয়সেই চেহারাখানা দেখছিস না মেয়েটার, ষোল-সতের বছরের ডবকা বয়সে এই মেয়ের চেহারাখানা কি রকম হতে পারে চোখ বুজে ভেবে দেখ দিকি? ভেবেছিস? ভালো করে ভাব—

বাপী সঠিক ভেবে উঠতে পারল না। তবে একটা সম্ভাব্য আদল চোখে ভাসল বটে। কিন্তু কি বলতে চায় বোঝেনি তখনো। মাথা নাড়ল। ভেবেছে।

আবু এবার ব্যাখ্যা শোনালো। সেই বয়সে কোনো কোনো বড়লোকের ছেলের চোখ পড়বেই ওর ওপর। বিয়ে করে ঘরে এনে পুরবে, তারপর লুটেপুটে শেষ করবে। বি-এ এম-এ পাস করার ফুরসৎ মিলবে কোত্থেকে?

হ্যাঁ করে বাপী আবুর মুখখানাই দেখছিল। মগজে এত বুদ্ধিও ধরে ও! রাস্তার পাশে জ্যোতিষীর জানালা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ওই মা মেয়েকে অপলক চোখেই দেখে নিয়েছিল বাপী তরফদার। তারপর শুধু মেয়েকেই চেয়ে চেয়ে দেখেছে। ওই মা পাশে না থাকলে হঠাৎ দেখে চিনতে পারত কিনা সন্দেহ। জ্যোতিষীর সামনে মিষ্টি টান হয়ে বসে ছিল। ডান পা-টা পিছনে মোড়া। জ্যোতিষীর দিকেই চেয়ে ছিল সে।

জানালা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে স্থানকাল ভুলে বাপী তরফদার ওকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত খুঁটিয়ে দেখেছে। মাথা…কপাল…নাক কান চোখ মুখ…গলা… কাঁধ বুক।

এক পা পিছনে মুড়ে বসার ভঙ্গী…বুক থেকে কোমরের নীচে পর্যন্ত ঈষৎ স্থির যৌবনরেখা…একটু নড়লে-চড়লে সেই রেখাগুলোও নড়া-চড়া করেছে।

নিজের অগোচরে মনে মনে একটা হিসেব সেরে নিয়েছে বাপী তরফদার। আবু রব্বানীর সেই ভবিষ্যদ্বাণী এখন পর্যন্ত ঠিক হয়নি। ঠিক ন’ বছর আগের কথা …মিষ্টির বয়েস এখন আঠারো। কিন্তু এখন পর্যন্ত কপালে বা সিঁথিতে সিঁদুরের আঁচড় নেই।

গাল দুটো আগের মতো ফোলা-ফোলা নয়। মেদ-ঝরা টানা মুখ। আগের তুলনায় আরো আয়ত চোখ। গায়ের রঙও আগের থেকে ঢের বদলেছে, অনেক কম ফর্সা মনে হয়। কিন্তু এই রঙের মধ্যে আদুরে ভাব থেকে তাজা ভাব বেশি।

নির্নিমেষে দেখছিল বাপী তরফদার। তার এই দেখাটা বাইরের প্রতীক্ষারত অন্য মেয়ে-পুরুষদের চোখে বিসদৃশ লাগছিল সে হুঁশ নেই। মা-মেয়ে যখন উঠেছে, বাপী তরফদার আত্মস্থ নয় তখনো। অনাবৃত অপলক দু চোখ মিষ্টির সর্বাঙ্গে ওটা-নামা করেছে। তারা বেরিয়ে আসতে বাপী তাদের দু’হাতের মধ্যে এসে মাকে ছেড়ে মেয়েকেই দেখেছে। দেখেনি, দুই চোখের বাঁধনে তাকে আটকে রাখতে চেয়েছে। চিনতে পারার কথা নয়, দুজনের কেউই চিনতে পারেনি। অস্ফুট ঝাঁজে ‘স্টুপিড’ বলে মেয়ের হাত ধরে মা গাড়িতে উঠেছে। মেয়েরও বিরক্তিমাখা লালচে মুখ। মৃদু শব্দ তুলে সাদাটে গাড়িটা চোখের সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেছে। পিছনের লাল আলোয় গাড়ির নম্বরের ওপর চোখ আটকেছে বাপী তরফদারের।

সেই দিকে চেয়ে ন’ বছর নয়, নিজের অগোচরে আটটা বছর পিছনে পাড়ি দিয়েছে বাপী তরফদার।…ওর বয়েস যখন চৌদ্দ। …মিষ্টির দশ।

হঠাৎ জিভে করে নিজের শুকনো দুই ঠোঁট ঘষে নিল বাপী তরফদার। আট বছর আগের সেই আঘাতের চিহ্ন নেই—কিন্তু জিভে নিজের দেহের সেই তাজা রক্তের নোনতা স্বাদ!…এক মেয়েকে কেন্দ্র করে আট বছর আগে অপরিণত বয়সের ছেলের সেই প্রবৃত্তির আগুন বাইশ বছরের এই দেহের শিরায় শিরায় হঠাৎ দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল আবার

আবছা অন্ধকার শূন্য পথের দিকে চেয়ে দু চোখ ধক্‌ধক্ করছে প্রবৃত্তির ক্রূর আদিম অভিলাষ।

সোনার হরিণ নেই – ৩

শীতের রাত বাড়ছে। পথে লোক চলাচল নেই বললেই চলে। বাপী ঠায় দাঁড়িয়ে গায়ে শার্টের ওপর শুধু একটা আলোয়ান। কাঁপুনি ধরার কথা। কিন্তু ভিতর থেকে একটা উষ্ণ তাপের ওঠা-নামা চলেছে তখনো। একেবারে বুকের পাতাল থেকে। বাইরের ঠাণ্ডা চামড়ায় বিধলেও টের পাচ্ছে না। বাইরের জানালা দিয়ে দু চোখের এক-একটা উষ্ণ ঝাপটায় জ্যোতিষীর সামনে বসা শেষ লোকটাকে তুলে দিতে চাইছে।

জ্যোতিষীর অপেক্ষায় বাইরে তখন একমাত্র বাপী তরফদার ছাড়া আর কেউ দাঁড়িয়ে নেই। হাতের কবজিতে পুরনো আমলের ঘড়ি বাঁধা আছে একটা। সেটা চলছে। রাত দশটা বেজে দশ।

ভবিতব্য জানার আশ মিটিয়ে শেষ লোকটা উঠল। বাপী তরফদারের স্নায়ুগুলো টান-টান আবার। লোকটা বেরিয়ে আসতে সে ঢোকার জন্য প্রস্তুত। দেখতে না পেলেও নিজের চোখ-মুখের খরখরে ভাবটা অনুমান করতে পারছে। ভিতরে ঢোকার আগে সেটা মোলায়েম করে নেবার তাগিদ।

ঘর ফাঁকা হবার সঙ্গে সঙ্গে জ্যোতিষী ভদ্রলোক নিজের ভাগ্য যাচাইয়ে মনোনিবেশ করেছে। সামনের এক-হাত প্রমাণ কাঠের বাক্সটা খুলে ভিতর থেকে এক মুঠো নোট বার করে ওটার ওপর রাখতে যাচ্ছিল। মুখ তুলে তাকাল এবং সঙ্গে সঙ্গে নোটগুলো আবার কাঠের বাকসের ভিতরে চালান করল। একই সঙ্গে পাশের গোল পকেট ঘড়িতে সময় দেখে নিয়ে জিজ্ঞাসা করল, অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা ছিল?

বাপী তরফদার মাথা নাড়ল। ছিল না। আর কিছু বলার আগে ভদ্রলোকও মাথা নাড়ল।—অনেক রাত হয়ে গেছে, আজ আর হবে না।

প্ল্যানমাফিক বাপী তরফদার সবিনয়ে বলল, আমি শুধু একজনের ঠিকানা জেনে নেবার জন্য অসময়ে আপনাকে বিরক্ত করছি…মিসেস মনোরমা নন্দী, আজ তাঁর এখানে আসার কথা ছিল…আমার আসতে একটু দেরি হয়ে গেল, জানা থাকলে ঠিকানাটা দয়া করে যদি বলেন….

ভদ্রলোকের গোল দুচোখ তার মুখের ওপর আটকে থাকল খানিক। তারপর আপাদ-মস্তক ওঠা-নামা করল।—তাঁদের এখানে আসার কথা ছিল আপনি জানলেন কি করে?

সন্দেহ এড়ানোর জন্যেই শুধু মনোরমা নন্দীর নামটা করেছিল। মালবিকা বা মিষ্টির নাম করে নি। তবু ভদ্রলোকের চাউনি সন্দিগ্ধ হয়ে উঠেছে সেটা অনুভব করা গেল। আমতা-আমতা করে জবাব দিল, বিকেলে ফোনে কথা হয়েছিল…তখন বলেছিলেন—

—ফোন নম্বর জানা আছে, বাড়ির ঠিকানা জানা নেই?

বাপী তরফদার মাথা নাড়ল। জানা নেই।

মুখের ওপর সন্দিগ্ধ চাউনিটা কঠিন হয়ে উঠতে লাগল।—কি মতলব?

—আজ্ঞে…..?

—আমি দু ঘণ্টা আগেও তোমাকে ওই জানলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। ভদ্রমহিলার ঠিকানা চাই কেন? কি মতলব?

ভিতরের উত্তেজনার ফলে এ-রকম বিপাকে পড়ার কোন সম্ভাবনা অন্তত মাথায় আসে নি। এখন ছুটে পালাতে চাইলেও চেঁচামেচি করে লোক ডাকবে কিনা কে জানে। এই তিনতলা বাড়ীর একতলায় বসে জ্যোতিষী করে। ডাকলে ভিতর থেকে কতজন ছুটে আসবে ঠিক নেই। কোণঠাসা হয়ে জবাবদিহি করল, ভদ্রমহিলাকে হঠাৎ এখানে দেখে তাঁর স্বামীর কাছে একটা চাকরির তদ্বিরের জন্য ঠিকানা খোঁজ করছিলাম…অনেক কাল আগে উত্তরবঙ্গে থাকতে ওঁরা আমাকে চিনতেন….

আরো রূঢ় স্বরে জ্যোতিষী জিজ্ঞাসা করল, ওঁর স্বামীর নাম কি?

—সন্দীপ নন্দী…উত্তরবঙ্গে বানারজুলি রিজার্ভ ফরেস্টের রেঞ্জ অফিসার ছিলেন এক সময়…বড় দুঃসময় চলছে তাই একটু চেষ্টা করার ইচ্ছা ছিল—

এবারে বিশ্বাসযোগ্য হল বোধ হয়। শীতের রাতের এই বেশবাস বিশ্বাসের অনুকূল। ভদ্রলোকের ঠোটের ফাঁকে হাসির আভাস দেখা গেল। ভাঁওতাবাজী ধরে ফেলার মতই পাকা জ্যোতিষী। বলল, কোন মহিলার ঠিকানা জানার জন্য এভাবে আর কখনো কোথাও ঢুকে পড়ো না—ওঁর স্বামী কলকাতায় থাকেন না। যাও।

বেরিয়ে এল। এর পরেও উত্তেজনার উপশম হল না একটুও। মনে মনে জ্যোতিষীর মুন্ডুপাত করতে করতে ঘরের দিকে পা বাড়াল। ওই মেয়েকে আবারও দেখার তাড়না ভিতরে একটা যন্ত্রণার মত ধিকি ধিকি জ্বলতে থাকল। সেই যন্ত্রণার তাপ বুকের পাঁজর থেকে মাথার দিকে উঠছে। জ্যোতিষীর জানলা দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে দেখেছে মিষ্টিকে, আর বাইরে বেরুনোর পর সামনে দাঁড়িয়েও দেখেছে। এই দেখার বিশ্লেষণে ফাঁক ছিল না বড়। আগের সঙ্গে মেলে না। মাথায় লম্বা হয়েছে বেশ। স্বাস্থ্যও লোভনীয় রকমের নিটোল ছাঁদ নিয়েছে। ফোলা গাল ভেঙে অন্য ধাঁচের পরিণত আকার নিয়েছে। গায়ের রঙে তাজা তামাটে প্রলেপ পড়েছে। সব মিলিয়ে মিষ্টিকে তীক্ষ্ণ মনে হয় এখন। রূপ নয়, এর থেকে ঢের রূপসী কলকাতায় এ ক’মাসে সে অনেক দেখেছে। সন্ধ্যার দিকে যে কোন অভিজাত বার-রেস্তারাঁর সামনে দাঁড়ালে দু-চারটি অন্তত রূপসী মেয়ে চোখে পড়েই। বড় গোছের যে-কোন সোস্যাল ফাংশান ভাঙলেও চোখে পড়ে। ভিতরের সুপ্ত বাসনা অনেক সময়েই তাকে ওসব জায়গায় টেনে নিয়ে যায়। পকেটে পয়সার টান। হিসেবী মন বাজে খরচের ঝোঁকে বিক্ষিপ্ত হয় না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক-একদিন শুধু বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকে। দেখে। এই গোপন অশালীন দেখার খবর একমাত্র সে নিজে ছাড়া আর কেউ জানে না। সে-তুলনায় এই রূপ এমন কিছু নয়। কিন্তু এই রূপের মধ্যে এমন কিছু আছে যা পুরুষের বিশ্লেষণের বস্তু, আবিষ্কারের বস্তু। এই বিশ্লেষণ অথবা আবিষ্কার দীর্ঘকালের জমাট-বাঁধা লোভ আর যন্ত্রণার ফল কিনা জানে না। জানতে চায়ও না। অপ্রত্যাশিতভাবে যার দেখা পেল আজ, তার সমস্ত খুঁটিনাটি দু চোখের তারায় আগলে নিয়ে পথ চলেছে।

মগজে সাদাটে গাড়ির নম্বরটা ঘুরপাক খাচ্ছে।

রাত প্রায় এগারোটা। টালি-এলাকায় শীতের নিঝুম রাত। রাস্তার ধারে লাইটপোস্টের ঝিমুনো আলোয় ভিতরে ঢোকার সরু গলি-পথ দেখা যাচ্ছে। বাপী তরফদার নিঃশব্দে ভিতরে সেঁধিয়ে গেল। অন্ধকার সত্ত্বেও আন্দাজে ঠিক নিজের খুপরির দরজা ঠেলে অন্দরে ঢুকে যেতে পারবে। কিন্তু ভেতরটাও খুব অন্ধকার নয়। ওপর থেকে খানিকটা জ্যোৎস্না এক ধারের টালি বেয়ে উঠোনে লুটোপুটি খাচ্ছে।

কোন দিকে না তাকিয়েই বাপী তরফদার তার খুপরি ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। তার পরেই বিষম চমক। পাশের ঘরের দরজা দুটো খোলা। দরজার ওধারে মূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছে রতন বনিকের ঘুমকাতুরে বউ কমলা। মুখ—চোখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। তাহলেও সাদা চাদর জড়ানো ওই মূর্তি ভুল হবার নয়।

চোখের পলকে বাপী তরফদার নিজের খুপরির দরজা ঠেলে ভিতরে চলে এলো। ক্যাঁচ করে শব্দ হল একটু। আবার বন্ধ করার সময়েও সেই শব্দ। জোরে না হলেও ওই শব্দ রাতের এই নিঝুম স্তব্ধতা ভেঙে দেওয়ার মতো বিরক্তিকর। দরজা বন্ধ করে ঘরের নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে মিনিট খানেক দাঁড়িয়ে রইল বাপী। এতক্ষণে শীতটা ছেঁকে ধরেছে তাকে। একটা ঠাণ্ডা অনুভূতি পা বেয়ে বুকের হাড়ের দিকে এগোচ্ছে। মিনিট খানেক বাদে পাশের ঘরের দরজা বন্ধ করার আর হুড়কো লাগানোর মৃদু শব্দ কানে এলো।

এবারে ঠাণ্ডার ভাবটা কমতির দিকে। অবসন্ন শরীরটা দেয়াল-ঘেঁষা দড়ির খাটিয়ার কাছে টেনে নিয়ে এলো। বসল। গায়ের আলোয়ান খুলে পায়ের দিকে ছুঁড়ে ফেলে দিল। তারপর জামাসুদ্ধই কম্বলের নিচে ঢুকে গেল।

বিকেল থেকে এই রাত পর্যন্ত আজ অনেক মাইল হাঁটা হয়েছে। স্নায়ুর ওপর প্রচণ্ড ধকল গেছে। রাতে কিছু খেয়ে নেবার কথা মনেও পড়ে নি। কম্বলের তলায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে মনে হল দু চোখে ঘুম জড়িয়ে আসছে।

বাপী তরফদার জানে এই সন্ধেটা আর এই রাতটা অনেকগুলো বছরের অনেকগুলো সন্ধ্যা থেকে আর রাত থেকে এত তফাৎ হয়ে গেছে যে খানিকক্ষণের মধ্যেই অবসন্ন স্নায়ুগুলো আবার টান-টান হয়ে উঠবে। কিন্তু মনে-প্রাণে এখন সে ঘুমের অতলে ডুবে যেতে চায়। মড়ার মতো নিঃসাড়ে ঘুমিয়ে পড়তে চায়।

দরজার পরিচিত শব্দটা কানে এলো যখন, অন্য দিনের মতোই বাপী তরফদারের আপাদমস্তক কম্বলের নিচে। কিন্তু আজ সে রাত থাকতে উঠে মুখহাত ধুয়ে আবার শয্যায় আশ্রয় নিয়েছে।

—বড়বাবু ঘুমিয়ে না জেগে?

কম্বলের তলা থেকে গলার স্বরটা ভারী-ভারী ঠেকল কানে। কম্বল বুকের নিচে নামিয়ে বাপী সোজা কমলার মুখের দিকে তাকালো। ঘুম-ভাঙা ফোলাফোলা মুখ আঁচলের ঘোমটায় কান মাথা গলা বেড়িয়ে আধখানা ঢাকা। ভিতরেও আজ পাতলা ব্লাউস নয়, একটা গরম জামা পরেছে। তার ওপর দিয়ে আঁট করে শাড়ি জড়ানোর ফলে শরীরটাও ফোলা ফোলা লাগছে।

বাপী আস্তে আস্তে উঠে বসল। নির্লিপ্ত গলায় জিজ্ঞসা করল, ঠাণ্ডা লাগালে কি করে?

অনেকটা সেই রকমই নির্লিপ্ত ঢংয়ে কমলা ফিরে জিজ্ঞাসা করল, ঠাণ্ডা লেগেছে তুমি বুঝলে কি করে?

—গলার আওয়াজ শুনে, তাছাড়া ঢাকাঢুকি দিয়ে এসেছ—

তার চোখের ওপর কমলার দু চোখ আকারে বড় হতে থাকল। তারপর রাগত সুরে বলল, দেখো, সাতসকালে গোপাল ঠাকুরের রঙ্গও ভাল লাগে না বলে দিলাম…ঢাকাঢুকি না দিয়ে কবে তোমার সামনে এসেছি?

সকালের ঠাণ্ডা সত্ত্বেও ঝাঁ করে দু কান গরম হয়ে উঠল বাপী তরফদারের। তাড়াতাড়ি ওকে বিদায় করার জন্যেই চায়ের গেলাসের দিকে হাত বাড়ালো।

—মুখ ধোয়া হয়েছে?

—হয়েছে।

সত্যি-মিথ্যে যাচাইয়ের চোখে একবার দেখে নিল।—কখন হল?

—কারো ওঠার আগেই হয়েছে, দাও।

গেলাস আর নুন-মাখানো গরম রুটি দুটো সামনে এগিয়ে দিয়ে ঠেসের সুরে কমলা বলে উঠল, দরজায় আওয়াজ শুনেও তাহলে কম্বলের তলায় ঢুকে ছিলে কেন?

বাপী তরফদার জবাব দিল না বা তার দিকে তাকালো না। রাতের নির্জলা উপোসের পর গরম চা আর নুন-ছড়ানো গরম রুটি অমৃতের মতো লাগছে। সকালে চায়ের সঙ্গে রুটি হলে সে চিনি-গুড়ের থেকে নুন পছন্দ করে।

কমলা এস্তে ঘর ছেড়ে চলে গেল। কারণ না বুঝলেও বাপী তরফদার স্বস্তি বোধ করল একটু। কিন্তু দু মিনিটের মধ্যেই দ্বিগুণ বিরক্ত। শাড়ির আঁচলে নিজের চায়ের গরম গেলাস ধরে আবার এ-ঘরে হাজির। চোখের কোণে কৌতুকের ছোঁয়ায় শ্যামবর্ণ মুখ সরস দেখাচ্ছে।

দু চুমুক তল করে বলল, বুড়োটা ঘুমোচ্ছে এখনো, ঠাণ্ডার চোটে উঠে পড়ে আজ এক ঘণ্টা আগে চা বানিয়েছি। তুমি চায়ের পিত্যেশে বসে আছ জানলে আরো আগেই করে দিতে পারতাম। বলতে বলতে একটা হাত পিছন দিকে নিয়ে দরজার একটা পাট বন্ধ করে দিল। তারপর সেদিকের দেয়ালে আড়াল নিয়ে ফিক করে হাসল একটু–তোমার ঘরে এসে গল্প করতে করতে চা খেতে দেখলে কার চোখে আবার কাঁটা বেঁধে ঠিক কি।

কাল রাতে নিজের ঘরের দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকাটা ভুলতে পারেনি। আজ এই দিনমানেও ওকে দেখে অস্বস্তি। চাপা বিরক্তির সুরে বাপী বলল, আমার ঘরে এসে চা খাওয়ার দরকারটা কি!

চায়ের গেলাস মুখে তুলেছিল। সেটা ঠোঁটে ঠেকিয়ে রেখেই হাসি আড়াল করল। —গোপাল ঠাকুরের মনে এক মুখে এক—হুঃ। বড় বড় তিন চার ঢোঁক চা গিলে নিল। তারপর টেনে টেনে বলল, বড়বাবুর কি সাঁঝের টাইমে কোনো ডিউটি-টিউটি জুটেছে নাকি?

—না। নিজের গেলাস খাটিয়ার সামনে মেঝেতে নামিয়ে রাখল।

—তবে কাল রাতে ফিরতে এত দেরি হল?

এবার সত্যি সত্যি ধমকে উঠল বাপী তরফদার। —দেরি হল তো হল—কেন দেরি হল সে জবাবদিহি তোমার কাছে করতে হবে?

গেলাসের চা শেষ করে মুখখানা আর একবার ভালো করে দেখে নেওয়া দরকার বোধ করল কমলা। ঝাঁজালো ব্যঙ্গ ঝরল তার গলাতেও।— সাধে বড়বাবু বলি! নুন রুটি দিয়ে দিন শুরু তবু মেজাজ কতো! রাত-দুকুর পর্যন্ত হাট-করা খোলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে ঠাণ্ডা লাগালাম, সকালে তাই নিয়ে উঠে চা করে খাওয়ালাম—লজ্জাও করে না মুখ নেড়ে কথা বলতে!

বলতে বলতে এক-পাট খোলা দরজা ভুলে যেভাবে কাছে এগিয়ে এলো, মুহূর্তে দিশেহারা অবস্থা বাপী তরফদারের। কিন্তু না, টুপ করে উপুড় হয়ে তার খাওয়া গেলাসটা মাটি থেকে তুলে নিয়ে দু চোখে এক ঝলক মেকি আগুন ছড়িয়ে প্রস্থান করল।

বাপী তরফদার পঙ্গুর মতো বসে রইল। তারপর আত্মস্থ হল।…হ্যাঁ, মুখ নেড়ে কথা বলতে লজ্জা করে। আগেও করেছে, এখনো করে। তাই কথা বেশি বলে না, বলতে চায় না। কিন্তু এখন অন্যায় থেকে বেশি করে ভয়। ভয় কমলাকে। তার থেকে ঢের বেশি নিজেকে।

…বানারজুলিতে সোমত্ত বয়সের দু-ঘর সাপুড়ে মেয়ে ছিল। ননদ-ভাজ সম্পর্ক। একজনের মরদ দিন-রাত নেশা করে পড়ে থাকত। আর একজনের মরদের দুটো চোখই বসন্তের গুটিতে খেয়ে দিয়েছে। সেই ননদ-ভাজ একসঙ্গে দু’তিনটে ঝাঁপিতে সাপ পুরে নিয়ে গ্রামে শহরে সাপের খেলা দেখিয়ে বেড়াতো। গাল ফুলিয়ে পেটমোটা সাপুড়ের বাঁশি বাজিয়ে যেত ঘাগরা-পরা মেয়ে দুটো। কিছু পয়সা মেলার মতো ভিড় দেখলেই সাপের ঝাঁপি খুলে বসত তারা। হরেক রকমের সাপ বের করত। বাঁশি বাজাতো আর সাপের খেলা দেখাতো। কিন্তু অবাক চোখে বাপী ওই মেয়ে দুটোকেই বেশি দেখতো। হাঁটু গেড়ে বা হাঁটু মুড়ে বসে বসে ফণা তোলা সাপের মতোই সামনে পিছনে ডাইনে বাঁয়ে কোমর-বুক-মাথা দোলাতো তারা। ওই করে সাপকে উত্তেজিত করতে চাইত। শুধু তাই নয়, সাপের ছোবল খাবার জন্য অঙ্গ যেন চিড়-চিড় করত তাদের। ফণা-তোলা সাপের সামনে ভুঁয়ের ওপর হাত পেতে দিত। ছোবল পড়ার আগেই চোখের পলকে হাত সরিয়ে নিত, মাটির উপর ছোবল পড়ত। এই করে যতবার ওরা সাপকে ঠকাতে পারতো ততো ওদেরও উত্তেজনা বাড়ত। কিন্তু ক্রুদ্ধ সাপের ছোবল একবার না একবার হাতের উল্টো পিঠে বা আঙুলের মাথায় পড়তই। সঙ্গে সঙ্গে দরদর করে রক্ত বেরুতো। ওরা তখন থলে থেকে কি পাতা বার করে দাঁতে চিবিয়ে সে-পাতা ক্ষতর ওপর লাগিয়ে দিত। ছোবল খাবার পরে উত্তেজনার শেষ।

…কমলাও অনেকটা সেই সাপুড়ে মেয়ে দুটোর মতোই। সাপকে দখলে রেখে উত্তেজনা বাড়িয়ে ছোবল খাওয়ার লোভ। কিন্তু সাপুড়ে মেয়েদের সাপের মতো নিজেকে নির্বিষ ভাবে না বাপী তরফদার। তাই কমলার থেকেও নিজেকে বেশি ভয়।

কিন্তু গত সন্ধ্যা থেকে তার ভিতরে ভিতরে সাপের মতোই এক বিষ-বাষ্প কুণ্ডলি পাকাচ্ছে, গজরাচ্ছে, ফুঁসে উঠে ছোবল বসাতে চাইছে। এই অকরুণ অব্যর্থ সন্ধানী লক্ষ আর এক মেয়ে। নাম মিষ্টি। মালবিকা…।

বানারজুলির সবজান্তা আবু রব্বানী ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, ষোল-সতের বছর বয়সে মিষ্টির চেহারাখানা যা হবে, কোনো না কোনো বড়লোকের ছেলের চোখ পড়বেই ওর ওপর—বিয়ে করে ওকে ঘরে এনে পুরবে, তারপর লুটেপুটে শেষ করবে—বি.এ., এম.এ., পাস করার ফুরসৎ মিলবে কোত্থেকে?

হিসেবে ভুল হবার নয় বাপী তরফদারের। নিজের বয়েস চৌদ্দ আর আটে বাইশ। মাস দেড়-দুই বেশি হতে পারে। ওই মেয়ের দশ আর আটে আঠের। সেই চৌদ্দ আর সেই দশ থেকে আটটি বছর সামনে পা ফেলেছে তারা। কিন্তু বাপীর একটা সত্তা চৌদ্দর সেই অবুঝ দুরন্ত রক্তাক্ত গণ্ডীর মধ্যে আটকে আছে এখনো। আর এই মেয়ের সবটাই সেই দশের গণ্ডী টপকে ভরভরতি আঠেরোয় পা ফেলে জাঁকিয়ে বসেছে। অতীতের ছিটে-ফোঁটাও তার গায়ে লেগে নেই। আবু রব্বানীর ভবিষ্যদ্বাণী ঠিক হয়নি। ভরাট সময়ে যে রূপ রব্বানীর কল্পনায় ছিল সেটা এ-চেহারার সঙ্গে আদৌ মিলবে না এ বাপী হলফ করে বলতে পারে। তার থেকে ঢের ভালো কি ঢের খারাপ জানে না। মোট কথা মেলেনি, মিলবে না। কোনো বড়লোকের ছেলের চোখ পড়েছে কিনা জানে না, কিন্তু কেউ ঘরে এনে পুরতে পারেনি এখন পর্যন্ত। সাদা সিঁথিই তার প্রমাণ। বাপী তরফদার আরো হিসেব করেছে। এম. এ. পড়ার বয়স এখনো হয়নি, কিন্তু এযাবৎ ফেলটেল যদি না করে থাকে তো এতদিনে বি.এ., পড়া শুরু করা উচিত।

একটা অসহিষ্ণু তাড়নায় বেলা এগারোটার মধ্যে স্নান-টান সেরে বেরিয়ে পড়ল। শুধু মোটর গাড়ির নম্বরটা সম্বল। শহর কলকাতার শত সহস্র গাড়ির মধ্যে সেই নম্বরের সাদাটে গাড়িটাকে খুঁজে বার করার চিন্তাও হাস্যকর পাগলামি। কিন্তু আট বছর পরের এই হঠাৎ-দেখাটা হঠাৎই শেষ একেবারে, এরকম চিন্তা বাপী বরদাস্ত করতেও রাজী নয়।

এক জায়গায় বেশ করে খেয়ে নিল। অনেক দিন বাদে নিজেকে সুস্থ আর তাজা রাখার তাগিদ। খেয়েদেয়ে মাথা ঠাণ্ডা করে একটা বড় কিছুর মুখোমুখি দাঁড়ানোর প্রস্তুতি। আজ আর পা দুটো কোনো আপিসপাড়ার দিকে এগোতে রাজি নয়। গত সন্ধ্যার পথ ধরে হাঁটা শুরু করল। জ্যোতিষীর একতলা ঘরের বাইরের দরজা বন্ধ। খোলা থাকলেও সেখানে ওই বাঞ্ছিত মুখ আজও চোখে পড়বে এমন আশা বাতুলে করে।

জ্যোতিষীর ঘর ছাড়িয়ে এগিয়ে চলল বাপী তরফদার। অপ্রত্যাশিত হদিস মিলবে এরকম আশা করছে না বটে, কিন্তু রাস্তার দুদিকের একটা বাড়িও তার শ্যেন দৃষ্টি থেকে অব্যাহতি পাচ্ছে না। হাঁটতে হাঁটতে রাস্তাটা ফুরিয়ে গেল একসময়। বেঁকে গিয়ে ট্রাম লাইনের বড় রাস্তায় এসে মিশেছে। সামনে ব্রীজ। একটা রাস্তা গেছে তার তলা দিয়ে। আর একটা রাস্তা ট্রাম লাইন পেরিয়ে লেক-এর দিকে।

গলা দিয়ে অস্ফুট একটা গালাগাল বেরিয়ে এলো। বড় রাস্তার বাস স্টপের ‘ কাছে চুপচাপ খানিক দাঁড়িয়ে রইল বাপী তরফদার। মাঝখানের ট্রাম লাইন ধরে ট্রাম আসছে যাচ্ছে। এক-একটা করে মানুষ বোঝাই বাস এসে দাঁড়াচ্ছে আবার চলে যাচ্ছে। মোটর ছুটেছে অবিরাম। সাদাটে রঙের গাড়ি দেখলে দু চোখ সেটার গায়ে আটকাচ্ছে। সব-কিছুই দেখছে বটে, কিন্তু আসলে সে ভেবে চলেছে।

হঠাৎই মাথায় এলো কিছু। চেষ্টার নাম পুরুষকার। দেখা যাক। সামনে যে বাস পেল তাতেই উঠে পড়ল। সব বাসই ডালহৌসি যায় এ-সময়। গাড়ির নম্বর থেকে বাড়ির হদিশ মেলা সম্ভব কিনা বন্ধু নিশীথ সেন সেটা বলতে পারে। নিশীথের বাবা মধ্য কলকাতার মাঝারি নাম-ডাকের কবিরাজ। নিজের আয়ুর্বেদ ফার্মেসি আছে। তাঁর ঝরঝরে গাড়ি আছে একটা। সেই গাড়িরও নম্বর আছে।

কলকাতায় বাপীর মোটামুটি দরদী বন্ধু বলতে ওই একজনই—নিশীথ সেন। ছেলেবেলা থেকে একসঙ্গে স্কুলে পড়েছে, একসঙ্গে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছে। বানারহাটে নিশীথ তার দাদুর কাছে থেকে স্কুলে পড়াশুনা করত। জলপাইগুড়ি থেকে আই-এসসি পরীক্ষার পর ছাড়াছাড়ি। নিশীথ আই-এসসির পর কলকাতায় বি-এ পাস করেছে। ছেলেকে মেডিক্যাল কলেজে পড়ানোর ইচ্ছে ছিল বাপের। কিন্তু আই-এসসি’র ফল দুই দাঁড়ির নিচের দিকে ঠেকতে সেটা সম্ভব হয় নি। বি—এ পাস করার সঙ্গে সঙ্গে ও একটা যুদ্ধের আপিসের চাকরিতে ঢুকে পড়েছিল। এখনো সে চাকরিতে টিকে আছে, কিন্তু মাথার ওপর ছাঁটাইয়ের খড়্গা ঝুলছে। দুদিন আগে হোক পরে হোক ওটা নেমে আসবেই। তা বলে বাপীর মতো বেকার হবে না সে। বি-এ পড়ার সময় থেকে বাপের কাছে কবিরাজি চিকিৎসার তালিম নিচ্ছে। বাবার সঙ্গে বসে নানারকম কবিরাজি ওষুধ তৈরির কাজে হাত পাকাচ্ছে। রোজ সন্ধ্যার পরে আয়ুর্বেদ ফার্মেসিতে বাবার পাশের কাঠের চেয়ার দখল করে গম্ভীর মুখে ছোট কবিরাজ হয়ে বসতে দেখা যায় তাকে। ছুটির দিনে সকাল—বিকেল দু বেলাই বসে সেখানে। বাপের অনুপস্থিতিতে সে এখন দিব্বি ঠেকা দিতে শিখেছে। চাকরিটা নেহাৎ আছে বলেই ছাড়তে পারছে না। চাকরি গেলে আয়ুর্বেদের দুই-একটা দিশী টাইটেল জুড়ে পাকাপোক্ত কবিরাজ হয়ে বসবে।

নিশীথ সেন আপিসেই আসেনি আজ। আবার একটা গালাগাল বেরিয়ে এলো বাপীর ভিতর থেকে। এটা ছেলেবেলার অভ্যাস। অনেক রকমের কুৎসিত গালাগালও নিঃশব্দে ঠেলে বেরিয়ে আসে।

আবার কলেজ স্ট্রীটের বাস ধরল। কপালে আজ কিছু পয়সা গচ্চা লেখা আছে।

কলেজ স্ট্রীট ছাড়িয়ে আরো একটু উত্তরে এগোলে নিশীথের বাড়ি। বাড়ির কাছেই ওদের আয়ুর্বেদ ফার্মেসি। আগে সেখানে হানা দিল। দরজা বন্ধ, কিন্তু বাইরে তালা ঝুলছে না। অর্থাৎ ভিতরে কেউ আছে। বাপ আর ছেলে ভিন্ন আর কেউ এ দপ্তর খোলে না। এই বেলা দেড়টায় বাপের এখানে দরজা বন্ধ করে বসে থাকার সম্ভাবনা কম।

বাইরে থেকে দরজায় ধাক্কা দিল। সাড়া না পেয়ে দরজার গায়ে জোরে দু’চারটে চড়চাপড় বসালো। ভিতর থেকে দরজা খোলা হল।

কাঁচা ঘুম-ভাঙা মুখখানা বিরস দেখালো নিশীথের। হাই তুলে বলল, তুই মরতে এখানে এসে জুটলি—

—আপিস কামাই করে এখানে ঘুমুচ্ছিস?

—বাড়িতে থাকলেই বাবা কোনো পাচন বা সালসা বানাবার কাজে বসিয়ে দিত, এখানেও তুই দিলি ঘুমের বারোটা বাজিয়ে। বোস, খাবি কিছু?

এই বেঁটেখাটো ছেলেটার বুকের তলায় একটু নরম জায়গা আছে। এমনিতে বাস্তববুদ্ধি প্রখর। কিন্তু বেকার বন্ধুর প্রতি সদয়। চাকরির প্রথম কটা দিন ওর বাড়িতেই ছিল বাপী তরফদার। কিন্তু বন্ধুর প্রীতি বেশি, কি অনুকম্পা —জানে না।

বিরক্ত মুখ করে জবাব দিল, তুই ভাবিস আমি খালি খেতেই আসি তোর কাছে। এখন অন্য দরকারে এসেছি মন দিয়ে শোন, তোদের তো একটা গাড়ি আছে?

হঠাৎ গাড়ির খোঁজ কেন ভেবে না পেয়ে নিশীথ সেন শুরু থেকেই সতর্ক।—আছে একটা, কিন্তু তার ওপর বাবা ছাড়া আর কারো দখল নেই।

—আরে বাবা আমি তোদের গাড়ি চাইছি না; কোনো গাড়ির নম্বর যদি তোকে দিই তুই তার মালিকের ঠিকানা বার করে দিতে পারিস?

নিশীথ সেন অপ্রস্তুত একটু। —সে আবার কি—!

—আমার খুব দরকার। কাল হঠাৎ ভদ্রলোকের গাড়িটা দেখলাম, চোখের সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেল, নম্বরটা মনে আছে, বাড়ির ঠিকানা বার করতে পারলে একটা চাকরি-বাকরি হতে পারে—

নিশীথ সেন জ্যোতিষী নয়, তাছাড়া পরিস্থিতিও সন্দিগ্ধ হবার মতো নয়। একটু ভেবে জিজ্ঞাসা করল, ভদ্রলোকের কোন্ আপিস বা কি চাকরি জানিস না?

জেরা পছন্দ নয়।—সে জানলে আর তোর কাছে আসব কেন, বড় চাকরিই করে নিশ্চয়, এককালে খুব চেনাজানা ছিল, ধরতে পারলে একটা সুরাহা হতে পারে।

—ভদ্রলোকের নাম কি? ফোন-গাইড দেখেছিস?

ভদ্রলোক বাপী তরফদারের চিন্তার মধ্যেও নেই বলেই তল্লাসীর এই প্রাথমিক রাস্তাটা মনে পড়ে নি। —সন্দীপ নন্দী…ফোন-গাইড আছে এখানে?

জবাব না দিয়ে নিশীথ সেন ঢাউস টেলিফোন গাইডটা টেনে নিল। সাগ্রহে খোঁজাখুঁজি চলল খানিকক্ষণ। দুজন সন্দীপ নন্দীর নাম পাওয়া গেল, কিন্তু বাড়ির ঠিকানা দক্ষিণ কলকাতার নয়। তাছাড়া তাদের একজন ডাক্তার আর একজন অ্যাডভোকেট। নন্দী এস-এর মধ্যে একগাদা নম্বর। ফোন-গাইড বন্ধ করে নিশীথ জিজ্ঞাসা করল, গাড়ির নম্বর ঠিক মনে আছে?

বাপী তরফদার গড়গড় করে নম্বর বলে দিতে সে একটু ভেবে মন্তব্য করল, মোটর ভেহিলিস্-এ গেলে বাড়ির ঠিকানা বার করা যায়, অনেক দূর—

—সেটা কি? সেটা কোথায়?

—তোদের ও-দিকেই। সেখানে কলকাতার সমস্ত গাড়ির ঠিকানাপত্তর থাকে। কাল একবার খোঁজ করে দেখ না —

—কাল নয়, আজই। বাপী তরফদার সাগ্রহে উঠে দাঁড়াল।—আমার দ্বারা হবে না, চল আমি তোকে বাস ভাড়া দিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, আবার পৌঁছেও দেব—

তাগিদ বোঝাবার জন্যেই এরকম করে বলা।

মোটর ভেহিকিলস্-এর অপরিচিত চত্বরে পা ফেলতেই জনা-তিনেক হা-ঘরে মূর্তি হেঁকে ধরল। কি চাই? নতুন লাইসেন্স না রিন্যুয়াল? লার্নার্স লাইসেন্স? ট্র্যান্সফার?

এখানে একলা এলে বাপী তরফদার কোনো কিছুর হদিস পেত কিনা সন্দেহ। কিন্তু নিশীথ সেন-এর জানা আছে। দালালদের মধ্য থেকে সব থেকে দুঃস্থ মার্কা লোকটাকে বেছে নিল সে। তারপর বক্তব্য জানালো। গাড়ির নম্বর থেকে বাড়ির ঠিকানা বার করে দিতে হবে।

এরকম ফরমাস পেতে অভ্যস্ত নয় এরা। দুরূহ দায়িত্ব নেবার মতো মুখ করে দালাল পাঁচ টাকা দর হাঁকল। বাপী তরফদার তক্ষুনি পাঁচ টাকাই বার করতে রাজি। কিন্তু নিশীথ সেন আট আনা থেকে শুরু করে এক টাকায় রফা করে ফেলল।

দশ মিনিটেই মধ্যে কাজ হাসিল। কিন্তু ঠিকানা হাতে নিয়ে নিশীথ সেন হাঁ… না সন্দীপ না নন্দী। সেই নম্বরের গাড়ির মালিকের নাম অনিমেষ ঘোষ!

বিব্রত মুখে বাপী তরফদার তার হাত থেকে কাগজটা নিল। কিন্তু বাড়ির ঠিকানা দেখে আশান্বিত একটু। সেই জ্যোতিষীর ডেরার রাস্তায় বাড়ির নম্বর। একটা টাকা দিয়ে দালাল বিদায় করে বন্ধুকে বলল, কোনো আত্মীয়ের গাড়ি হবে হয়তো ওটা—

নিশীথ সেন প্রস্তাব করল, এতটাই যখন করা গেল ওটুকু আর বাকি থাকে কেন—চল্, ওই ঠিকানাতেই খোঁজ কর দেখি তোর চেনা লোকের হদিস মেলে কিনা।

—না, না, আজ আর ভালো লাগছে না। বাপী তরফদার ব্যস্ত হয়ে উঠল।— মেজাজ খিঁচড়ে গেছে, নাম মিলছে না, চলতি গাড়িতে কাকে দেখতে কাকে দেখলাম কে জানে। ইয়ে, আমি এ-দিকে একটু কাজ সেরে যেতাম…তোকে পৌঁছে দিতে হবে?

তাকে অব্যাহতি দিয়ে নিশীথ সেন নিজের বাস ধরল। তারপর…। তারপর অপচয় করার মতো হাতে আর এক মুহূর্তও সময় নেই বাপী তরফদারের।

…সেই রাস্তা।

মিথ্যেই অনেকটা আগে থেকে রাস্তার ডান দিকের বাড়িগুলোর দিকে চোখ রেখে দ্রুত হেঁটে চলেছে বাপী তরফদার। রাস্তার বাঁয়ের বাড়িগুলোর জোড় নম্বর। তার বে-জোড় নম্বর চাই। নিজের ওপরেই বিরক্ত। বোকার মতো বেশি হাঁটছে। ওই নম্বরের বাড়ি রাস্তার শেষ মাথায় হবে। বাসে চেপে এসে শেষ দিক থেকে খুঁজতে খুঁজতে এলে সময়ের সাশ্রয় হত। শীতের বেলা পড়ে আসছে, তার হাঁটার গতি বাড়ছে।

কম করে দেড় মাইল লম্বা এই রাস্তা। জ্যোতিষীর বাড়ি সিকি মাইলের মধ্যে। লোকটা বিকেলেই দপ্তর খুলে বসেছে, আর আশ্চর্য, খদ্দেরও জুটেছে! জানলা দিয়ে একটা অসহিষ্ণু দৃষ্টি ছুঁড়ে বাপী তরফদার হনহন করে এগিয়ে চলল।

বাড়ির নম্বর যতো বাড়ছে, উত্তেজনাও বাড়ছে ততো। একটা বাড়ির সামনে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে গেল শেষে।…নম্বর মিলেছে। সামনে কোলাপসিবল গেট লাগানো শূন্য গ্যারাজ। তার কোণের দিকে দেয়ালের গায়ে বাড়ির নম্বর-প্লেট। ছোটর ওপর ছিমছাম বাড়ি।

বুকের ভিতরটা ধপ-ধপ করছে বাপী তরফদারের। …ওই গাড়িটা হয়তো এই বাড়িরই, কিন্তু মিষ্টি মালবিকা নন্দী নামে কোনো মেয়ে কি সত্যিই এখানে থাকে? পনের বিশ গজ এগিয়ে গিয়ে রাস্তা টপকে উল্টো দিকের ফুটপাথ-এ এসে দাঁড়াল। দোতলার বারান্দাটা ফাঁকা। তার ও-ধারে পর পর তিনটে ঘরে লোক চলাচলের আভাস পাচ্ছে। কিন্তু স্পষ্ট কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

নির্নিমেষে ওই দোতলার দিকেই চেয়ে আছে বাপী তরফদার। হঠাৎ তন্ময়তায় ছেদ পড়ল কেন জানে না। উল্টো দিকের বাড়িটার একতলায় বাঁধানো দাওয়ায় তারই বয়সী জনা-তিনেক ছেলে বসে সিগারেট টানছে। তারা ওকে দেখেই হাসাহাসি করছে বোধ হয়। আবার ঘন ঘন সামনের বাড়িটার দোতলার দিকে তাকাচ্ছে।…এদিকের একটা বাড়ির দোতলায় রেলিংএর সামনে সোনালি ফ্রেমের চশমা-পরা ছাব্বিশ-সাতাশ বছরের একজন সুশ্রী লোক দাঁড়িয়ে। তারও দৃষ্টি ওই বাড়িটার দোতলার বারান্দার দিকে। বাপী তরফদারের হঠাৎ কেমন মনে হল সিগারেট-মুখে ওই ছেলেগুলো বা দোতলার ওই লোকটাও তারই মতো কারো দেখা পাওয়ার অপেক্ষায় আছে। বাপী তরফদারের আশা বাড়ছে।

হঠাৎ নিঃশ্বাস রুদ্ধ হবার দাখিল তার। ঘর থেকে ওই দোতলার বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে একজন। খোলা চুল ফোলা-ফোলা মুখ। মনোরমা নন্দী! মিষ্টির মা।

সন্তর্পণে বড় নিঃশ্বাস ফেলল বাপী তরফদার। একটা প্রকাণ্ড অনিশ্চয়তার অবসান। অনিমেষ ঘোষ যে-ই হোক, মিষ্টি এ বাড়িতেই থাকে।

ভুরু কুঁচকে মহিলা রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নিচের দাওয়ার ছেলে তিনটিকে দেখলেন একবার। সামনের বাড়ির দোতলার সোনালি ফ্রেমের চশমা-পরা লোকটাকেও দেখলেন। তারপর বাপীর দিকে চোখ গেল তাঁর। রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে তিনি বারান্দা ছেড়ে ঘরে ঢুকলেন আবার।

বাপী তরফদারের মনে হল শেষের বিরক্তিটুকু এক বাড়তি উপদ্রব দেখার দরুন। অর্থাৎ তাকে দেখেই।

এর তিন-চার মিনিটের মধ্যে দাওয়ার ছেলে কটা সচকিত। তিনজনেরই ঘাড় রাস্তার উল্টো দিকে ফিরেছে। …হ্যাঁ, ও-দিক থেকে সাদাটে গাড়ি আসছে একটা। সঙ্গে সঙ্গে তারও ধমনীর রক্তে দাপাদাপি

গাড়িটা এই সাতাশি বাড়ির গায়ে এসে দাঁড়িয়ে গেল। বিকেলের আলোয় টান ধরেছে। তবু সবই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সেই সাদাটে গাড়ি। এঞ্জিনের সামনে সেই নম্বরের প্লেট।

গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গে হর্নও বেজেছে। মনোরমা নন্দী আবার দোতলার বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন। ভিতর থেকে একটা অল্পবয়সী চাকর ছুটে এসে গ্যারাজের তালাবন্ধ কোলাপসিবল গেট খুলতে গেল।

বাপী তরফদারের একাগ্র দু চোখ গাড়িটার গায়ে আটকে আছে। পিছনের দরজা খুলে প্রথমে মিষ্টি নামল। বুকের সঙ্গে একপাঁজা বই ধরা। পরনে হালকা সবুজ শাড়ি, সবুজ ব্লাউস। নেমে দাঁড়াল একটু। পিছনে আর একজন প্যান্ট-কোট পরা বৃদ্ধ লোক নামছেন। তাঁর জন্য কয়েক পলকের প্রতীক্ষার ছলে দাঁড়িয়ে তিন দিকে তিন ঝলক দৃষ্টি নিক্ষেপ করল মিষ্টি নন্দী : প্রথমে দাওয়ার ছেলে তিনটের দিকে— তাদের কারো মুখে সিগারেট নেই এখন। তারপর সামনের বাড়ির দোতলার সোনালি ফ্রেমের চশমা-আঁটা সুশ্রী গম্ভীর মূর্তির দিকে।

তারপর বাপী তরফদারের দিকে। তাকে দেখাটা নতুন পতঙ্গ দেখার মতো। পলকা ঝটকায় ঘুরে বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেল।

সোনার হরিণ নেই – ৪

আবু রব্বানী বলেছিল, যদি মরদ হোস তো একদিন শোধ নিবি। একটা চোখ ছোট করে অন্য চোখ সটান তাকিয়ে শুধিয়েছিল, কি রকম শোধ বুঝলি?

চৌদ্দ বছরের বাপী মাথা নেড়েছিল, বুঝেছে। আবুর কল্যাণে এর ঢের আগে থেকেই না-বোঝার মতো কত কি জল-ভাত তার কাছে। তাছাড়া না বুঝলে নিজের কপাল নাক মুখ তো অক্ষতই থাকত। শোধ নেওয়ার কোনো কথাই উঠত না। তবু আবু রব্বানীর কথাগুলো নতুন করে মনে পড়েছে বাপীর।

পরের দুদিনও একটা অবুঝ অস্থিরতা সকালে-বিকেলে গলায় শেকল পরিয়ে এ পর্যন্ত টেনে এনেছে তাকে। এই সাতাশি নম্বর বাড়িটার দরজা পর্যন্ত। শুধু অস্থিরতা নয়, এক ধরনের অব্যক্ত উপোসী যন্ত্রণাও। শুকনো দুই ঠোঁট বার বার জিভে ঘষেছে। নিজের একদিনের সেই থ্যাতলানো মুখের রক্তের নোনতা স্বাদ লেগেই আছে। সেই ফয়সালা বাকি। ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লক্ষ লক্ষ টাকার স্বপ্ন দেখতে অসুবিধে হয়নি। কল্পনার জগতের সোনার সিংহাসনেও চেপে বসা গেছে। তারপর এক মেয়ের সঙ্গে চরম কিছু ফয়সালার মুখোমুখি এসে থেমে গেছে। সেটার ছক কোনো সময় মনের মতো হয়নি।

সেটা আজও বাকি। সেই মেয়ের দেখা মেলার সঙ্গে সঙ্গে নিভৃতের একটা অস্বাভাবিক বিশ্বাস মগজে দাগ কেটে বসেছে। ফয়সালা হবে বলেই এত বড় দুনিয়ায় এত বছর বাদে আবার দেখা তার সঙ্গে।

ভিতরে ভিতরে এমন একটা নাড়াচাড়া না পড়ে গেলে বাপী তরফদার হয়তো আর একটু মাথা খাটিয়ে বাস্তবের মাটিতে পা ফেলে চলত। গত পরশু আর কাল শুক্রবার আর শনিবার গেছে। এ দুদিনের হাজিরায় কোনরকম ব্যাঘাত ঘটেনি। সকাল সাড়ে নটার আগে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। দেয়ালের নেম-প্লেটের নামটা মুখস্থ হয়ে গেছে। অনিমেষ ঘোষ, অ্যাডভোকেট। মালবিকার মায়ের বাবা হবে হয়তো। মুখ দেখে আর বয়েস আন্দাজ করে সেইরকমই মনে হয়েছে।

…পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়নি। প্রথমে বই বুকে করে বেণী দুলিয়ে ওই মেয়েকে সুতৎপর গাম্ভীর্যে গাড়িতে উঠে বসতে দেখেছে। তিন দিনে তিন রকমের শাড়ি পরতে দেখল। যেদিন যেটা পরেছে সেটাই যেন সব থেকে ভালো মানিয়েছে। গাড়িতে ওঠার ফাঁকে বাপীর দিকে চোখ গেছে। উল্টো দিকের রকে আর দোতলার বারান্দায়ও। দোতলার বারান্দায় সোনালি ফ্রেমের চশমা। রকে দুটো তিনটে বা চারটে ছেলে। বাপীকেও এদের মতোই নতুন একজন ধরে নেওয়া হয়েছে, সন্দেহ নেই। চিনতে না পারাটা বাপীর ক্ষতর ওপর নুন ছড়ানোর মতো লেগেছে।

এক আধ মিনিটের মধ্যে বয়স্ক ভদ্রলোক গাড়িতে এসে ওঠেন। দোতলার বারান্দায় তখন মালবিকার মা মনোরমা নন্দীর অপ্রসন্ন মুখখানাও দেখা যায়। গাড়িটা সকলের নাকের ডগা দিয়ে বেরিয়ে গেলে তিনি ভিতরে পা বাড়ান বিকেলেও একই ব্যাপার। পাঁচটা পনের থেকে কুড়ি মিনিটের মধ্যে সাদা গাড়ি সাতাশি নম্বরের দরজায় এসে দাঁড়ায়। ওই মেয়ে আগে নেমে ভিতরে চলে যায়। পিছনে বয়স্ক ভদ্রলোক। তাঁর কোনদিকে বা কারো দিকে চোখ নেই। আত্মতৃপ্ত সুখী মানুষ মনে হয়। রকে সেই দুটো তিনটে বা চারটে ছেলে। সামনের দোতলার ।বারান্দায় সেই সোনালি ফ্রেমের চশমা। আর সাতাশি নম্বরের দোতলার বারান্দায় মনোরমা নন্দীর অপ্রসন্ন মুখ।

…গত বিকেলেও বাড়িতে ঢুকে পড়ার ঝোঁক অনেক চেষ্টায় সামলেছে বাপী তরফদার। আজ রবিবার। কলেজ বন্ধ। সকাল সাড়ে আটটা না বাজতে ভিতরের দুর্জয় তাড়না তাকে এখানে ঠেলে নিয়ে এসেছে। এমনিতে দেখা পাওয়ার আশা কম। আজ বাপী ভিতরে ঢুকেই পড়বে। তারপর যা হয় হবে। এরকম ঝোঁকের ফলেই অন্য কোনো বাস্তব সম্ভাবনা তার হিসেবের মধ্যে ছিল না।

খাবার লোভে বা সঙ্গিনীর লোভে কোনো বেপাড়ার কুকুর সীমানা লঙ্ঘন করে ঢুকে পড়লে পাড়ার সগোত্র-দল সেটা যেমন বরদাস্ত করে না, ঘেউ ঘেউ রব তুলে চারদিক থেকে ছেঁকে ধরে আঁচড়ে কামড়ে ওটাকে পাড়া-ছাড়া করতে চায়—হঠাৎ সেই গোছের দাঁড়াল অবস্থাখানা। রোববারের রকের মজলিশে জন পাঁচেক বসে। পর পর কদিন সকাল-বিকেলে দুবেলা একটা উটকো লোককে ওই সাতাশি নম্বর বাড়ির সামনে টহল দিতে দেখেছে তারা। সামনের দোতলা বাড়ির সোনালি ফ্রেমের চশমা পরা সুশ্রী লোকটাও দেখেছে। সকলেরই একসঙ্গে ধৈর্যচ্যুতি ঘটল।

আগেও এদের হাব-ভাব সদয় মনে হয়নি বাপী তরফদারের। তা বলে এরকম অতর্কিত হামলার জন্য প্রস্তুত ছিল না। সাতাশি নম্বরের সামনে এসে দাঁড়াতে না দাঁড়াতে রকের ছেলেগুলো উঠে এসে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল। ওদের এক মুরুব্বির হাত সোজা তার কাঁধের ওপর উঠে এলো।

—কি মতলব ব্রাদার?

বাপী তরফদার জবাব হাতড়ে পেল না। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল।

পাশ থেকে একজন সোল্লাসে ফোড়ন কাটল, অসুবিধে দেখে ব্রাদার বোবা হয়ে গেছে, দু’ঘা না বসালে কথা বেরুবে না।

এসব মজার ব্যাপারের চট করে গন্ধ পায় লোকে। অবশ্য একটু চেঁচামেচিও শুরু হয়ে গেছে। এদিক ওদিক থেকে বাচ্চা-কাচ্চারা স-কলরবে দৌড়ে আসছে। রাস্তার দুদিকেরই দোতলার বারান্দায় লোক দেখা যাচ্ছে। ভেবাচাকা খাওয়া মুখ তুলে বাপী তরফদার তাদেরও দেখল একবার। এদিকে মালবিকা… মিষ্টি… রেলিংএ ঝুঁকে দাঁড়িয়েছে। পাশে তার মা। ওদিকে সেই সোনালি ফ্রেমের চশমা। পাশে আরো দুই-একজন। পরিস্থিতি জমে উঠতে যারা তাকে ছেঁকে ধরেছে তাদেরও উল্লাস বেড়েছে। এদিক ওদিক থেকে ধাক্কা মেরে কথা বার করতে চেষ্টা করছে। মুরুব্বিটি কাঁধে একটা বড় ঝাঁকুনি দিয়ে তর্জন করে উঠল, জিভ টেনে ছিঁড়ব বলে দিলাম। কি মতলবে রোজ দুবেলা এখানে এসে ছোঁক ছোঁক করা হচ্ছে?

নিরুপায় বাপী তরফদার এবারে সাতাশি নম্বরের বাড়িটাই দেখিয়ে দিল। ওখানে ঢোকার জন্যে।

ছেলেগুলো থমকে গেল একটু। সকলেই বাড়িটার দিকে তাকালো। দলের

মুরুব্বি এবারে যথাসম্ভব গলা মিষ্টি করে চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করল, মাসিমা কদিন ধরে এই লোকটা আপনাদের বাড়িতে ঢোকার জন্যে ঘুরঘুর করছে বলছে— একে চেনেন নাকি?

সরোষে মাথা নেড়ে মনোরমা নন্দী ভিতরে চলে গেলেন। মেয়ে দাঁড়িয়েই থাকল।

কাঁধ ছেড়ে মুরুব্বি এবার মুঠো করে বুকের জামা টেনে ধরল তার।—শালা মেরে একেবারে তক্তা বানিয়ে দেব—পাড়ায় ঢুকে এত সাহস তোমার?

সঙ্গে সঙ্গে এদিক-ওদিক থেকে জামা ধরে টানাটানি চলল। জামাটা ফ্যাস—ফ্যাস করে ছিঁড়তে থাকল। কাঁধে কোমরে দুই-একটা গুঁতোও পড়ল। একজন চুলের মুঠি চেপে ধরেছে।

সামনের বাড়ির দোতলা থেকে সোনালি, ফ্রেমের সুশ্রী তরুণ গম্ভীর নির্দেশের সুরে বলল, ঘাড় ধরে পাড়ার বার করে দিয়ে এসো, আর যেন না ঢোকে!

এই নির্দেশ মতোই কাজ করল ছেলেগুলো। মারধরের দিকে না গিয়ে রাস্তা পার করে দেবার জন্যেই সামনের মোড় পর্যন্ত ঠেলে নিয়ে চলল তাকে। যে লোভে নিজেরা সকাল-বিকেল রকে বসে থাকে সেই লোভেই আর একজন একটু বেশি এগিয়ে এসেছে বলে কত আর হেনস্থা করা চলে। আশা তো কারোরই নেই, চোখে দেখাই সার। মোড়ের এধারে ছেড়ে দিয়ে শুধু শাসালো, আর এদিকে রস করতে এসো না ব্রাদার, ওই অসিতদা না বললে আজ তোমার মিষ্টি মুখখানা একেবারে থেঁতো হয়ে যেত।

তার ওপর দিয়ে বিস্ময়ের পলকা রঙ চড়ালো আর একজন। —কি ব্যাপার বল্ তো মাইরি, ওই অসিতদার সব থেকে বেশি কলজেয় জ্বালা ধরার কথা, আর সে-ই আগেভাগে ক্ষমা করে ফেলল।

মুরুব্বি গম্ভীর মন্তব্য করল, রোমান্টিক গ্রেটনেস। থাম্ এখন—

বাপীকে বলল, যাও বাছা, ঘরের ছেলে ঘরে চলে যাও —

ওরা ফিরে চলল। বাপী তরফদার সেদিকে চেয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। সামনের বাড়ির দোতলার সোনালি ফ্রেমের চশমা-পরা পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের ফর্সা লোকটাই অসিতদা হবে। একটা মেয়ের জন্য তারও কলজে পুড়ছে আগেই বুঝেছিল। এখন আরো ভালো বোঝা গেল।

হনহন করে হেঁটে চলল বাপী তরফদার। কারো দিকে তাকাচ্ছে না। মনে হচ্ছে সকলেই আস্ত ট্রাউজারের ওপর লণ্ডভণ্ড ছেঁড়া জামাটা দেখছে। আক্রোশের একটা জ্বলন্ত পিণ্ড গলার কাছে দলা পাকিয়ে আছে। সেখান থেকে একটা অসহ্য তাপ চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়ছে।

এত বড় হামলাটা যারা করল, রাগ এই মুহূর্তে তাদের ওপর নয়। গুষ্টির পিণ্ডি ওই অসিতদা না কে, তার ওপরেও নয়। আক্রোশ নিজের ওপর। আরো বেশি দোতলার রেলিং-এ ঝুঁকে দাঁড়ানো ওই মেয়ের ওপর। যার নাম মালবিকা। মিষ্টি তাকে ঘিরে সেই মেয়ে একপাল পথের কুকুরের খেয়োখেয়ির মজা দেখছিল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।…আবু রব্বানী বলেছিল, মরদ হোস তো শোধ নিবি। সেই চরম শোধের নিষ্ঠুর অভিলাষ শিরায় শিরায় জ্বলছে এখন।

উঠোনে পা দিতেই রতন বনিকের বউ কমলার সঙ্গে চোখাচোখি। এটাই সব থেকে অবাঞ্ছিত বাপী তরফদারের। উঠোনের একধারের বাঁধানো কলতলায় শুধু কমলা ছাড়া আর কেউ নেই। বেলা দশটার ওধারে এখন কারোরই থাকার কথা নয়। ছুটির দিনে পুরুষেরা ভালো-মন্দ বাজার করে আনে, তারপর ঘরে বসে বা বাইরে কোথাও আড্ডায় মশগুল হয়। মেয়েরা রান্নায় ব্যস্ত থাকে। টিউব—ওয়েলের হাতল চালিয়ে কমলাকে ওখান থেকে জল নিতে কমই দেখা যায়। তার ঘরের জল এমন কি স্নানের জলও রতনই তুলে দেয়। তাদের রান্নাঘরের পিছনে ছোট ঘেরানো স্নানের জায়গা আছে। আব্রু যাদের তাদের অনেক ঘরেই এরকম ব্যবস্থা।

আজ হয়তো কোনো কারণে জল ফুরিয়েছে। রবিবারে বেলা দুটো আড়াইটের আগে রতনের টিকির দেখা মেলে না। বাজার ফেলে দিয়েই সে বেরিয়ে পড়ে। ছুটির দিন মানেই তার কিছু বাড়তি রোজগারের দিন। বেশ খানিকটা আদর-কদর মেলার দিন। অনেক ক্লায়েন্ট জোটে। কোনো কোনো রবিবারে আবার আপিসের বাবুদের বাড়িতেও ভবিষ্যৎ-বচন শোনাতে যেতে হয়।

অন্য দিন হলে টিউবওয়েলের হাতল চালিয়ে কমলার ঘড়ায় জল ভরার দৃশ্যটা দেখতে মন্দ লাগত না বাপীর। আজ ভিতরটা ডবল চিড়চিড় করে উঠল। শুধু ওর হেনস্থা দেখার জন্যেই যেন বউটা এ সময় ওখানে দাঁড়িয়ে।

কমলার এদিকে অর্থাৎ সামনের দিকে মুখ। উঠোনে পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে চোখাচোখি। টিউবওয়েলের হাতল হাতেই থেকে গেল। নামছে উঠছে না। কমলার দু’চোখ কপালে।

ওই দৃষ্টি থেকে সরোষে নিজেকে ছিঁড়ে নিয়ে বাপী তরফদার ঘরে ঢুকেই ঠাস করে দরজা দুটো বন্ধ করে দিল। নড়বড়ে দরজায় ছিটকিনি নেই, ছেড়ে দিতেই চার ছ’ আঙুল ফাঁক আবার।

পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যে ক্যাঁচ করে একটা মৃদু শব্দ কানে আসতেই বাপীর ঝাঁজালো দৃষ্টি দরজার দিকে। এক পাট খুলে কমলা ঘরে ঢুকল। শাড়ির আঁচলে ভিজে হাত মুছতে মুছতে দু পা এগিয়ে এলো। বাপী তার খাটিয়ায় বসে। ছেঁড়া—খোঁড়া জামাটাও গা থেকে খোলার ফুরসৎ পেল না। দু চোখের উগ্র ঝাপটায় ওকে আবার ঘর থেকে বার করে দিতে চায়।

চোখের বিস্ময় মুখে নেমে এলো কমলার। ব্যাপার কি গো বড়বাবু মারামারি-টারামারি করে এলে নাকি কোথাও থেকে?

এই অবস্থা দেখে ঢুকেছে যখন এমনিতে ঘর ছেড়ে যাবার মেয়ে নয় কমলা। বাপী কি করবে এখন? জবাবে উঠে এসে ধাক্কা মেরে বার করে দেবে?

কমলা খুঁটিয়ে দেখছে ওকে। উসকোখুসকো চুল, ক্রুদ্ধ বিবর্ণ মুখ, ছেঁড়া—খোঁড়া ঝলঝলে জামা। চকিতে কাছে এগিয়ে এলো সে। বাপীর হাঁটুর লাগালাগি প্রায়। তারপর ঝুঁকে ছেঁড়া জামার ভিতর দিয়ে গা দেখতে চেষ্টা করল। আঘাতের দাগ চোখে পড়ে কিনা সভয়ে তাই দেখছে।

বাপীর গলার কাছে একটা গরম নিঃশ্বাসের ছেঁকা লাগল। পরের মুহূর্তে মাথায় ঝলকে ঝলকে রক্ত উঠে গেল। দুটো চোখের শলাকা কমলার ঝুঁকে পড়া মুখ থেকে নেমে বুকের ওপর বিদ্ধ হল।…বহুদিনের উপোসী ক্রুদ্ধ জানোয়ারটাকে এই মুহূর্তে খোলস ছিঁড়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেবে? স্থান ভুলে কাল ভুলে রসাতলে ডুবে যেতে দেবে? আজকের অত বড় অপমানের জ্বালা জুড়োবে তাহলে?

আবার সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কমলা বিষম থতমত খেল এক প্রস্থ। দু’পা পিছনে সরে গেল। এরকম চাউনির একটাই অব্যর্থ অর্থ হতে পারে বুঝি। কৈফিয়তের সুরে বলল, কোথাও লাগল-টাগল কিনা দেখছিলাম….

ফাঁড়া কাটলো। নিজের কি সামনে যে দাঁড়িয়ে তার, বাপী জানে না। মাত্র কটা মুহূর্তের মধ্যে নিজের সঙ্গে অনেক যুঝে অশান্ত ক্রুদ্ধ জানোয়ারটাকে আবার খোলসের ভিতরে ঠেলে দিতে পেরেছে। কিন্তু তার ধকল চোখেমুখে এখনো এত স্পষ্ট যে কমলাও পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে মনে হল। বাপী তার মুখের ওপর রূঢ় ঝাপটা মেরে বসল একটা।—কেন দেখছিলে? কেন তোমরা এভাবে জ্বালাতন করো আমাকে?

—আমরা! কমলার বিস্ময়-ঝরা দু’চোখ তার মুখের ওপর নড়েচড়ে স্থির হল।…অন্য কোনো মেয়ের জ্বালাতনে আজ এই হাল নাকি তোমার?

ধৈর্যের বাঁধ ভেঙেই চলেছে।—তুমি যাবে এখন এখান থেকে?

কমলা মোলায়েম করে বলল, কি হয়েছে শুনি আগে—উঠোনে পা দিতেই ওই মূর্তি দেখে আমি আঁতকে উঠেছিলাম—

খাটিয়া ছেড়ে বাপী প্রায় তেড়েই এলো, তুমি এক্ষুণি যাবে কি যাবে না আমি জানতে চাই?

কমলা চেয়ে আছে। রাগ ছাড়া কিছু দেখার আছে যেন। এক পাট খোলা দরজা পর্যন্ত গিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াল। গম্ভীর। শামলা মুখ একটু মচকে বলল, আমার বাড়ি আমার ঘর, তুমি তাড়াবার কে?

—ও। ঠিক আছে, আমিই যাচ্ছি।

অসহিষ্ণু হাতের টানে ছেঁড়া জামাটা ছিঁড়েই গা থেকে খুলে খাটিয়ার ওপর আছড়ে ফেলল। দড়ি থেকে আর একটা আস্ত জামা টেনে নিয়ে সরোষে দরজার দিকে এগিয়েই থমকে দাঁড়াল। এক পাট খোলা দরজা আগলে কমলা তেমনি দাঁড়িয়ে।

দুজনে সোজা তাকালো দুজনের দিকে। বাপীর লাল চোখ। কমলা প্রায় তেমনি গম্ভীর।

—কি হল, যাও?

বাপী ফুঁসে উঠল, সরো বলছি!

পিছনে ঘাড় ফিরিয়ে একবার বাইরেটা দেখে নিল কমলা। কেউ নেই। থাকলেও এই দিনমানে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গল্প করতে দেখলে খুব কিছু মনে করবে না কেউ। বুড়োর গণনা আর বোলচালের ফলে বড়বাবুকে এখনো মস্ত বাবুই ভাবে সকলে।

আবার সোজা তাকিয়ে পলকা ঝাঁজে কমলা বলল, এক বস্ত্রে চলে যাচ্ছ— তোমার ওই রাজ-শয্যা, বাড়তি জামাটামা আর ওই ভাঙা টিনের সুটকেস কার জন্যে রেখে যাচ্ছ?

বয়েস মাত্র বাইশ, কিন্তু নিজের ভিতরের বয়েস কতো এগিয়ে আছে বাপীই শুধু জানে। রমণীর এই তেজ আর এই উক্তির বিপরীত রসের আঁচটুকু ভালোই অনুভব করতে পারে। সভয়ে এদিকটাই এড়িয়ে চলেছে এতকাল। কিন্তু আজ হাতে-নাতে ধরা পড়েছে। এই মেয়ে ভিতর দেখেছে তার। সেই জোরেই এভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এমন কথা বলছে।…এক মেয়ের চোখের ওপর অপমানের সেই চাবুকের জ্বালা আষ্টেপৃষ্টে লেগে আছে। এখন সামনে এক হাতের মধ্যে যেভাবে আর একজন দাঁড়িয়ে, তাকে দেখে জ্বালা জুড়োবার সেই ক্রুর লোভ নিজের দুটো চোখের তারায় আবারও চিকিয়ে উঠছে।

এবারে কমলার গলার স্বর মোলায়েম-এ।—ঠাণ্ডা হয়ে বোসোগে যাও। তার পর ইচ্ছে হয় বলবে, ইচ্ছে না হয় বলবে না। আমি কি তোমাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেছি!

ভিতরের অসহিষ্ণু তাড়না মাড়িয়ে বাপী খাটিয়ায় এসে বসল।

কমলা অনড় তার পরেও। দেখছে। ———এক গেলাস চা করে এনে দেব?

—না!

—বাবা রে বাবা, বাইরে কোথায় কি কাণ্ড করে এসে এখন ঘরের ভালো মানুষদের কাছে যত দাপট আর হম্বি-তম্বি…রান্নাটা সেরে ফেলিগে যাই, তুমিও চানটান করে মাথা ঠাণ্ডা করো।

যেতে যেতে চোখের কোণ দিয়ে খাটিয়ায় বসা মুখখানা আর একবার দেখে নিল।

বাপী সটান শুয়ে পড়ল। স্নায়ুর ওপর দিয়ে আবার এক প্রস্থ ঝড় বয়ে গেছে। অসাড়ের মতো পড়ে থাকল খানিক। নিজের বুকের তলার টিপটিপ শব্দ কানে আসছে। হঠাৎ নিজের ওপরেই আবার ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতে লাগল সে। এই পৃথিবীর মুখ একেবারে না দেখলে কি হত? না জন্মালে কি হত? মানুষের খোলসে ঢাকা ভিতরের এই হিংস্র অবুঝ জানোয়ারটাকে আর কতকাল ধরে পুষবে? মাত্র কটা মুহূর্তের জন্য হলেও খোলস ছিঁড়ে নিঃশব্দ হুংকারে ওটা বেরিয়েই এসেছিল। থাবা উঁচিয়েছিল। কমলা দেখেছে। চিনেছে। অথচ সত্যিই তার দোষ নেই। যে মূর্তিতে ঘরে ফিরতে দেখেছে, আঁতকে ওঠারই কথা। ছুটে আসারই কথা।

চোখের সামনে আর একখানা মুখ ভেসে উঠল। সে-ও রমণীর মুখ। অকরুণ মুখ। কিন্তু সেদিন সেই সময়ে খুব অকরুণ ছিল না। মণিদার বউ গৌরী। বাপীর থেকে ছ’ বছরের বড় গৌরী বউদি। রসভঙ্গের এক মূর্তিমান কৌতূকের মতো বাপী তরফদার অসময়ে বাড়ি ফিরেছিল সেদিন। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে দেরি তখনো। সেই প্রকাশ্য নির্জনে পাশের লাগোয়া ফ্ল্যাট থেকে কোনো পুরুষের বেপরোয়া অভিলাষের আবেদন এবং এ ফ্ল্যাট থেকে সেটা নাকচের নিঃশব্দ প্রহসন চলছিল। বাপী তরফদার স্বচক্ষে দেখেছে। দোতলার বারান্দা থেকে ওকে দেখে পাশের ফ্ল্যাটের দিকে একটা লঘু ভ্রুকুটি নিক্ষেপ করেছিল গৌরী বউদি। রস-ভঙ্গের ব্যাপারখানা উপভোগ্য ব্যতিক্রমের মতো।

…সেদিনও মাথায় আগুন জ্বলছিল বাপী তরফদারের। অপমান আর হতাশার যন্ত্রণা ভিতরটা কুরে খাচ্ছিল। সেই মূর্তি দেখে কমলার মতো আঁতকে উঠে গৌরী বউদি বসার ঘরের দরজা খুলে ছুটে না আসুক, কাছেই এসে দাঁড়িয়েছিল।

—কি ব্যাপার? এ সময়ে যে?

জবাব না পেয়ে আর একটু এগিয়ে এসে গৌরী বউদি আরো ভালো করে দেখে নিয়েছিল।—এই মূর্তি কেন? কে তাড়া করল?

…সেদিনও বাপী তরফদার স্থানকাল ভুলেছিল। পুরুষের রোষে বাসনা ঝলসে উঠেছিল। মনে হয়েছিল অপমান আর হতাশার আক্রোশ উজাড় করে জাহান্নমে ডুবিয়ে দেবার মতো এক রমণীয় আধার নাগালের মধ্যে দাঁড়িয়ে।

…আর, চোখের সামনে হঠাৎ একটা দুর্বিনীত তাজা পুরুষ দেখেছিল গৌরী বউদি।

কি মনে হতে বাপী তরফদার খাটিয়ায় উঠে বসল। তারপর জামাটা টেনে নিয়ে গায়ে পরল। তাকে চান করে মাথা ঠাণ্ডা করতে বলে কমলা রান্না সারতে গেছে। রান্না শেষ হলেই আবার আসবে। ওকে ঠেলে স্নানে পাঠাবে। তারপর জোর করে ঘরে ধরে নিয়ে গিয়ে খেতে বসাবে। নয়তো এ-ঘরে ওর খাবারটা নিয়ে আসবে। পরে কি হবে বলা যায় না, কমলা গৌরী বউদির মতো নয় এখনো। তার মতো অকরুণ নয়। মায়া দয়া আছে। আছে বলেই ওই উদ্‌ভ্রান্ত মূর্তি দেখে ছুটে এসেছিল। আর অত ছলা-কলা জানে না বলেই অমন কাছে এসে ছেঁড়া জামার ভিতর দিয়ে ব্যাকুল চোখে গায়ে আঘাতের চিহ্ন খুঁজেছিল। আজ অন্তত কমলা ওকে বাইরে খেতে যেতে দেবে না। বাপী তরফদারের এটা নির্ভুল অনুমান।

আবার একটা অসহিষ্ণুতা ঘরের বাইরে ঠেলে নিয়ে এলো ওকে। তারপর উঠোনে নামিয়ে দিল।

—ও কি! না খেয়ে এ-সময় আবার চললে কোথায়? বড়বাবু শোনো—শোনো বলছি? উঠোনের চারদিকে ঘর, কত আর গলা উঁচিয়ে ডাকতে পারে কমলা?

বাপী তরফদার ফিরেও তাকালো না। হনহন করে বেরিয়ে গেল।

নিরুদ্দিষ্টের মতো হেঁটে চলল অনেকক্ষণ। অনেক পথ। এই করে নিজেকে ক্ষয় করার তাগিদ। কিন্তু ক্ষয় সত্যিই করা যায় না। ক্লান্তি সার। সামনে পার্ক। বকুল গাছের ছায়ায় একটা খালি বেঞ্চিতে গা ছেড়ে বসল। শীতকাল হলেও এই অবেলায় দ্বিতীয় লোক নেই পার্কে।

ক্ষুধা তৃষ্ণা কিছু টের পাচ্ছে না। বুকের দিক থেকে একটা চিনচিন যন্ত্রণা শুধু পেটের দিকে নামছে। সেটা সাতাশি নম্বর বাড়ির সামনের সেই অপমানের যন্ত্রণা হতে পারে। নিজের ভিতরের গ্লানির দরুনও হতে পারে। গ্লানি স্বাভাবিক। ওপরঅলার অভিশাপের মতোই প্রবৃত্তির অবুঝপনা হঠাৎ-হঠাৎ দখল দিয়ে বসে তার ওপর। নইলে বরাবর একটাই লক্ষ্য তার। একজনই লক্ষ্য। আট বছর ধরে ভিতরে বাইরে একজনকেই সে আঁতিপাঁতি করে খুঁজেছে। আট বছর বাদে তার দেখা মিলেছে।

সব ভুলে বাপী তরফদার দুটো মেয়েকে দেখছে এখন চোখের সামনে। একজনের বয়েস দশ। নাম মিষ্টি। ফুটফুটে রং। ফোলা-ফোলা গাল। মাথায় ঝাঁকড়া কোঁকড়া চুল। বাপী নামে একটা দুরন্ত ছেলে মিষ্টি খেয়ে জল খেতে চায় শুনে সে রাগে ফুঁসছে, জিভ ভেঙাচ্ছে।

…আর একজনের বয়েস আঠের। নাম মালবিকা। গাল দুটো ফোলা নয় একটুও। মেদ-ঝরা সুঠাম দেহ, টানা মুখ। আয়ত চোখ। অনেক কম ফর্সা কিন্তু ঢের বেশি তাজা।…বাপী তরফদারের একটা বয়েস চৌদ্দয় আটকে আছে, আর একটা বয়েস বাইশ ছাড়িয়ে কোথায় গিয়ে ঠেকেছে কেউ কল্পনা করতে পারে না। ওই মেয়েও না। ওই মেয়ে চেনেও না তাকে। চেনার আগ্রহও নেই। বাড়ির দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে হৃষ্টচিত্তে একটা অপমানের প্রহসন দেখেছে শুধু। নিগ্রহ দেখেছে।

বাপী তরফদার সোজা হয়ে বসল। স্নায়ুগুলো সব টান হয়ে উঠল। নিঃশ্বাসে এক ঝলক তপ্ত বাষ্প ঠেলে বেরুলো। চৌদ্দ বছরের একটা ছেলের ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত মুখ দেখছে। সেটা যদি শেষ কথা না হয়ে থাকে, আজকের এই অপমান আর নিগ্রহও শেষ কথা নয়। বাপী তরফদার তা হতে দেবে না।

বছরগুলো পিছনে সরে যাচ্ছে। আট বছর…ন’ বছর…দশ বছর। চোখের সামনে শান্ত গম্ভীর রহস্যে ছাওয়া বানারজুলি এগিয়ে আসছে।

সোনার হরিণ নেই – ৫

দুপুরেও আকাশ সেদিন মেঘলা ছিল। পিছনের দিকে তাকালে বুক পর্যন্ত কালচে মেঘে ঢাকা পাহাড়ের সারির মাথাগুলো শুধু দেখা যাচ্ছিল।

বাপী বৃষ্টি ভালবাসে না। কিন্তু মেঘলা আকাশ ভারী পছন্দ। আর ওই মেঘে পেট-ঠাসা হিমালয়ও। ঝমঝম বৃষ্টি এসব জায়গায় লেগেই আছে। তখন ঘরে থাকলে বেরুনো দায়। পিসী চোখে আগলায়। কাঠের ঘরে বসে তখন জানলা দিয়ে বৃষ্টি দেখলেও পিসী থেকে থেকে এসে শাসিয়ে যায়, জল মাথায় করে কেউ এখন বাইরে বেরুলে আর রক্ষা নেই—বাবাকে বলে ঠ্যাং ভাঙার ব্যবস্থা না করে ছাড়বে না।

বাপী পিসীর তম্বির পরোয়া করে না। বারো বছর বয়সে এটুকু অন্তত বুঝেছে পিসী আর যা-ই করুক, বাবার কাছে ওর নামে নালিশ করবে না। আসলে জলে বেরুতে বাপীর নিজেরই ভালো লাগে না। জংলা রাস্তাগুলো সব পিছল আর প্যাচপ্যাচে হয়ে যায়। গাছে পাখি কলকল করে না। বাঁদরগুলো সব মৌনী হয়ে বসে থাকে। খরগোশ আর বনমোরগগুলোর টিকির দেখা মেলে না। যদি বা দুই একটা চোখে পড়ে, পিছল রাস্তায় তাড়া করা যায় না।

তার থেকে মেঘলা আকাশ ভালো। বানারজুলির পেল্লায় জঙ্গলখানার তখন আর এক চেহারা। শাল শিশু অর্জুন জারুল দেবদারু ইউক্যালিপটাস—এই-সব বড় বড় গাছগুলো তখন বেজায় গম্ভীর। আর তাই দেখে ছোট গাছগুলোও যেন ঘাবড়ে গিয়ে চুপ মেরে থাকে। আকাশে সূয্যি ঠাকুর যতই জ্বলুক, এমনিতেই জঙ্গলের মধ্যে ছায়া-ছায়া ভাব। উনি মেঘে ঢাকা পড়লেই সেই ছায়া-ভাবটা ঘন থমথমে হয়ে ওঠে। আর তখনই জঙ্গলটাকে বাপীর সব থেকে ভালো লাগে। ওটা তখন অদৃশ্য একটা হাত বাড়িয়ে ওকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে আসতে চায়। এমন কি পাঁচ মাইল দূরের স্কুলের ক্লাসে বসেও বাইরে মেঘলা আকাশ দেখলে ভিতরটা পাখা মেলে বানারজুলির ওই জঙ্গলে এসে সেঁধোয়, তারপর ইচ্ছাসুখে হুটোপুটি করতে থাকে। এক-একদিন তো এমন হয়, স্থান-কাল মনে থাকে না। মাস্টারমশাই উঠে এসে কান টেনে ধরে। অন্য ছেলেরা হাসাহাসি করে।

আর, তখন ঘরে থাকলে তো কথাই নেই। ছুটির দিনের দুপুর হলে সোনায় সোহাগা। পিসীর চোখে ধুলো দিয়ে ছোট্ট মজবুত লাঠিখানা হাতে করে ছুটে বেরুবেই। ওই ছোট্ট জুতসই লাঠিটা ওকে দিয়েছিল আবু রব্বানী। তেল খাইয়ে—খাইয়ে ওই লাঠি বাপী এখন প্রাণের জিনিস করে তুলেছে। জঙ্গলে ঢোকার আগে আরো কিছু অস্ত্র সংগ্রহ করে নিতে হয়। শার্টের দু পকেট আর প্যান্টের দু-পকেট বাছাই নুড়ি-পাথরে বোঝাই করে নেয়। ফুরোলে ওই অস্ত্র জঙ্গলেও মেলে। জল পড়লে ওপরের মাটি কাদা হয় বটে, কিন্তু আসলে তো পাথুরে জঙ্গল।

পাথর হাতে নিলেই বাপীর আবুকে মনে পড়ে। টিপ বটে হাতের। টিপের কমপিটিশন বা প্রাইজ থাকলে আবুকে দুনিয়ার কেউ হারাতে পারত না বোধ হয়। ওর মতো টিপ করার জন্য বাপীরও চেষ্টা বা নিষ্ঠায় ফাঁক নেই। ফারাক ঠিক করে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে গাছের মোটা-সরু ডাল লক্ষ্য করে প্রায়ই টিপের মহড়া দিতে হয়। এই করে করে তারও হাতের টিপ মন্দ নয় এখন। কিন্তু আবু রব্বানীর ধারে কাছে নয় তা বলে।

বাপী কোনো সময়ই বৃষ্টি পছন্দ করে না এমন নয়। লোকে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলে তারপর দুটো কাঁটাই ফেলে দেয়। বাপীরও তেমনি স্কুলে রওনা হবার আগেভাগে বৃষ্টি এলে স্কুল কামাই করার তাড়না। তারপর বৃষ্টি আর স্কুল দুইই চুলোয় যাক। যেমন আজকের এই দিনটায় এই রকমই হবে আশা করেছিল। পড়ার বই সামনে রেখে সকাল থেকে নটা পর্যন্ত জানলা দিয়ে ঘন ঘন আকাশ দেখেছে। সকাল ছটা থেকে আটটা পর্যন্ত ওই আকাশ মেঘে কালি। কালো কালো মেঘের চাঙড়ে হিমালয়ের পেট-বুক ঢাকা। গলা উঁচিয়ে না পড়লে বাবা আর পিসী ভাবে পড়ায় ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। মেঘের সাজ দেখে আনন্দে বাপীর গলা আপনি চড়ছিল। ওই মেঘ হুড়মুড় করে আজ গোটা বানারজুলির ওপর ভেঙে পড়বেই।

কিন্তু বেলা সাড়ে নটার আগে ভাঙুক এটা চায় না। চান-খাওয়া সেরে ঘড়ি ধরে রোজ পৌনে দশটায় একগাদা বই-খাতার ঝোলা কাঁধে ফেলে স্কুলে রওনা দিতে হয়। স্কুল বসে বেলা এগারোটায়। পাঁচ মাইল দূরে সেই বানারহাটে স্কুল। অত পথ হাঁটার ধকল কিছু নয়, রাস্তায় একে একে আরো অনেক ছেলে জোটে। হৈ-হৈ করে চলে যাওয়া যায়। কিন্তু আসলে স্কুলটুল ভালো লাগে না। ক্লাসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকার চিন্তাতে গায়ে জ্বর আসে। সকালে ঘুম ভাঙলেই স্কুলে না যাওয়ার নানা ফন্দি মাথায় জট পাকাতে থাকে। সকালের জলখাবার খেতে খেতে পিসীকে প্রায়ই শুনিয়ে রাখে, এই এই কারণে আজ স্কুলে যাবে কি যাবে না ঠিক নেই। কিন্তু হাসতে মানা বাবাটি সামনে এসে দাঁড়ালেই সব ফন্দি—ফিকির মাথা থেকে উধাও হয়ে যায়।

কিন্তু আজকের আকাশ আর পাহাড় দেখে স্কুল ফাঁকির চিন্তা থেকে মাথাটাকে বিশ্রাম দেওয়া গেছে। আজকের দিনের ব্যবস্থা যা হবার ওখান থেকেই হচ্ছে। অল্প বৃষ্টিতে বাবা যদি ছাতা নিয়ে স্কুলে যেতে বলে, পিসী সে হুকুমও বরবাদ করে দেয়। বৃষ্টিকে বড় ভয় পিসীর। এখানকার ভাষায় ‘মালোরি’ জ্বর ঘরে ঘরে লেগে আছে। তার ওপর ব্ল্যাকওয়াটার ফিভার না কি এক ঘোড়ার ডিমের ব্যামোয় জঙ্গলের আর আশপাশের চা-বাগানের কতগুলি লোক ধপাধপ মরল। পিসীর ধারণা জলে ভেজার থেকেই যত রাজ্যের ব্যামোর উৎপাত।

কিন্তু ঘড়িতে যখন নটা, বারো বছরের বাপীর মেজাজের তখন বারোটা। ওই আকাশ তার সঙ্গে একটা বড় রকমের বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। মেঘ এখনো গোটা আকাশ জুড়ে আছে বটে, কিন্তু এখন আর তেমন ঘন গভীর নয়। পাহাড়ের বড় গাছগুলোও একটু একটু দেখা যাচ্ছে। মেঘ-বিশারদ না হলেও অনেক লক্ষ্য করার ফলে বাপী মোটামুটি ওদের হালচাল জানে। হলপ করে বলতে পারে ঘণ্টাকতকের মধ্যে এই মেঘ আর বর্ষাবে না।

মেজাজটাই খিঁচড়ে গেল। হাতের বই চটাস করে টেবিলে ফেলে উঠে দাঁড়ানোর ঝাঁজে বসার বেতের চেয়ারটা পিছনে ওলটালো। ওটার ওপর আর একটা লাথি ঝেড়ে গটগট করে সোজা হেঁসেলে পিসীর কাছে।—আমি আজ স্কুলে যাচ্ছি না—কক্ষনো যাচ্ছি না।

এরকম শুনে পিসীর দু কান অভ্যস্ত। মুখ না ফিরিয়ে বললেন, আজ আবার কি হল, আজ তো আরো কষ্ট কম হবে, ঠাণ্ডায় ঠাণ্ডায় চলে যাবি

রাগের চোটে ভেংচে উঠল বাপী। —ঠাণ্ডায় ঠাণ্ডায় চলে যাবি—ঠাণ্ডার জন্যে পাঁচ মাইল রাস্তা কমে দু মাইল হয়ে যাবে? হাঁটতে হাঁটতে পায়ের সুতো ছিঁড়ে যায়, ফেরার সময় জিভ বেরিয়ে পড়ে—তবু একটা সাইকেল কিনে দেবে না—আর ছ’ মাস ধরে ভোলানো হচ্ছে সাইকেল হবে! আজ আমি যাব না, যাবই না! বাবাকে বলে দাও আমার পা দুটো আজ সকাল থেকে টনটন করছে।

এতটুকু ছেলের পাঁচ-পাঁচ দশ মাইল হেঁটে যাওয়া আসা পিসীর চোখেও অত্যাচারের সামিল। চা-বাগানের অনেক বাবুর বাড়িতেই সাইকেল আছে। তাদের ছেলেরা বেশির ভাগ সাইকেলে স্কুলে যাতায়াত করে। আবার অনেক সমবয়সী তাদের ক্যারিয়ারে বসে যায়। বাপী ছোট বলে তাদের কাছে খুব একটা পাত্তা পায় না। তাছাড়া ওর নিজেরও দয়া চাইতে ইচ্ছে করে না। সাইকেল চড়া শেখার আন্তরিক অভিলাষ একমাত্র আবুর কাছে ব্যক্ত করেছিল। আবু বলেছিল, শিখে কি হবে, তোর বাবা কিনে দেবে?

বাপী বলেছে, পিসীর পিছনে লেগে থাকব, তার তাগিদে বাবা একদিন না একদিন কিনে দেবেই।

এরপর আবু চা-বাগানের কোন্ এক পিওনের কাছ থেকে একটা ঝর্ঝরে সাইকেল জোগাড় করে এনেছিল। চালাতে শেখা এক দিনেই হয়ে গেছল। তারপর কিছু দিন ওই নেশায় পেয়ে বসেছিল তাকে। ছুটির দিনে ঘণ্টা কতকের জন্য একটা সাইকেল তার চাই-ই। পিসীর কাছ থেকে চার আনা আট আনা আদায় করে আবুর হাতে দিত। আবু কখনো পিওন কখনো আরদালিকে ঘুষ দিয়ে সাইকেল যোগাড় করত। কারো কাছে ভালো সাইকেল দেখলে লোভে দু চোখ চকচক করে ওঠে বাপীর। চুরি করে পার পেলে আপত্তি হত না বোধ হয়। বড় সাধ, ওরও একদিন ঝকঝকে একটা সাইকেল হবে।

কিন্তু এক বছরে আশা অনেক ফিকে হয়ে এসেছে। পিসীর কথা বাবা কানে তোলে না। পিসীর দরদ আছে। দুধের ছেলের অত পথ হাঁটাটা তার বুকে লাগে। নিজের উদ্যোগে ভাইপোর সাইকেল চড়াটা শেখা হয়ে গেছে যখন, সাইকেল একটা ওকে কিনে দেওয়াই উচিত। এই উচিত কথাটা বাবাকে অনেকবার শুনিয়েছে পিসী। গোড়ায় গোড়ায় বাবা কোনো জবাবই দেয়নি। আড়াল থেকে বাপী কখনো তাকে ভুরু কোঁচকাতে দেখেছে, কখনো না শোনার মতো করে পাশ কাটাতে দেখেছে। কিন্তু পিসীর তাগিদে কামাই নেই। কারণ পিসীর ওপর বাপীর না-ছোড় জুলুম। শেষে বাবা একদিন মহা বিরক্ত। তেতে উঠে পিসীকে বলল, প্রথম যেদিন বলেছ সেদিনই তোমার কথা আমার কানে গেছে। আমার কি মাটির তলায় টাকা পোঁতা আছে যে ভাবছ ইচ্ছে করে দিচ্ছি না? শুনে রেখেছি সুযোগ—সুবিধে যদি হয় কখনো— দেব। রোজ তোমার এই এক বায়না নিয়ে আসার দরকার নেই।

বাস, সেই থেকে পিসীরও আর তাগিদ দেওয়ার সাহস নেই।

ডালের কড়া নামিয়ে সুধারাণী ভাইপোর মুখখানা দেখলেন একবার।—সকাল থেকেই বুঝি স্কুলে না যাবার ফন্দি আঁটছিস—তোর বাবা সাইকেল কিনে না দিলে আমি কি করব—আমার টাকা আছে?

বাপীর চোখে পিসীর টাকা না থাকাটাও অপরাধ।—টাকা নেই তো স্কুলে পাঠানোর এত গরজ কেন? আমার কষ্ট হয় না? আজ আমি স্কুলে যাব না—যাবই না।

পিছনে বাবার চটির আওয়াজ কানে আসতে সচকিত। তাঁরও চানে যাবার সময় এটা। খেয়েদেয়ে দশটার মধ্যে হরিনারায়ায়ণবাবু দপ্তরে গিয়ে বসেন। অধস্তনদের কাছে তিনি কেরানীবাবু। অন্যদের কাছে শুধু হরিবাবু। সকালের কাজ সেরে দিদিকে কাঠের আলমারির চাবি দিতে এসেছেন। ওই আলমারিতে দরকারী কাগজপত্র থাকে।

ছেলের কথা কানে যায়নি, চড়া গলা শুনেছেন। মুখ দেখেই কিছু একটা বকাবকির আঁচ পেলেন।—কি হয়েছে?

বাপী পালাবার পথ খুঁজছে। কিন্তু বাবা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। সুধারাণী সামাল দিতে চেষ্টা করলেন, ওর আজ পা কনকন করছে, অত পথ হেঁটে স্কুলে যেতে চাইছে না—

বাপীর মনে হল চোখ দুটো দিয়েই বাবা ওর কান টেনে ধরল। কথাগুলো ঠাস ঠাস করে দু-গালে দুটো চড় পড়ার মতো।—দশ মিনিটের মধ্যে চান সেরে খেতে বোস্—

বাপী পাশ কাটালো। বাবার ওপরেই সব থেকে বীতশ্রদ্ধ। আড়াল থেকে পিসীর গলা কানে আসতে সাগ্রহে কান পাতল।

—তোর সবেতে বেশি বেশি, ওইটুকু ছেলের রোজ অত পথ হাঁটতে কষ্ট তো হয়ই—একটা সাইকেল কিনে দিবি-দিবি করেও তো দিলি না।

বাবার চাঁছাছোলা জবাব।—ওর থেকে ঢের বেশি কষ্ট আমরা করেছি—এখনো করছি। অত বেশি আসকারা দিও না, গরিবের ছেলে গরিবের মতো বাড়তে দাও। একটা সাইকেল কিনতে অনেক টাকা লাগে, বুঝলে?

ঠক করে কাঠের মেজেতে চাবি ছুঁড়ে দেওয়ার শব্দ। তা সত্ত্বেও পিসীর গলা কানে এলো আবার, তুই তো কেবল আসকারা দিতেই দেখিস—কবে পাঁচ-পাঁচ দশ মাইল রাস্তা ঠেঙিয়ে স্কুলে গেছিস এসেছিস—বাড়ির দোরগাড়ায় স্কুল ছিল। নতুন না পারিস, দেখে-শুনে একটা পুরনো কিনে দে না—

আড়ালে বাপীর উৎফুল্ল মুখ। পিসীর সাহস আছে বলতে হবে। বাবার ফটফট চটির আওয়াজেই মেজাজ বোঝা যায়। বাপী আড়াল থেকে হাওয়া।

.

খেয়েদেয়ে সময়মতো কাঁধে বইয়ের থলে ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল। এই মেঘলা দিনে স্কুলে যেতে হচ্ছে। মুখ ভার। কিন্তু পিসীর ওপর আর রাগ করা সাজে না। বাইরে বেরিয়ে সরোষে আকাশের দিকে তাকাতে মেজাজ আরো বিগড়লো। নীল আকাশের বুক-জোড়া মস্ত একখানা কালচে অথচ হালকা মেঘের চাদর বিছানো। গা-পোড়ানো রোদের ছিটে-ফোঁটা নেই। ঠাণ্ডা, মিষ্টি বাতাস। বাঁধানো রাস্তার পাশ ঘেঁষে জঙ্গল। অদূরের লম্বা-লম্বা গাছগুলো এখন থেকেই গম্ভীর। বাপীকে স্কুলে যেতে হচ্ছে বলে ওরাও যেন মনমরা। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল বাবা বলে কোনো মানুষ যদি দুনিয়ায় না থাকত।

—কি রে, স্কুল চললি? পিছন থেকে কাঁধের কাছে মাঝারি জোরের চাপড় একখানা। আবু রব্বানী। ওর হাতে নিজের মাথার থেকেও এক হাত লম্বা সেই পাকা পোক্ত লাঠি—যেটা দেখলে বাপীর দু চোখ জুড়িয়ে যায়। আবুরও সব থেকে পিয়ারের জিনিস ওইটি। লাঠির এক-দিকে রূপোর মতো ঝকঝকে বড়—সড় একটা ইস্পাতের ফালা গোঁজা। ওটা দিয়ে সাপ-খোপ ছেড়ে মাঝারি সাইজের জন্তু-জানোয়ারকে অনায়াসে ঘায়েল করা যায়। ঘায়েল করার দৃশ্য বাপী নিজের চোখেই কম দেখেনি। কিন্তু বাইরে থেকে ইস্পাতের ধারালো ফালা দেখা যায় না। লোহার প্যাচঅলা ক্যাপে ঢাকা। যেন একদিকে লোহা বাঁধানো পাকাপোক্ত লাঠিই একটা। আবুর হাতে ওই লাঠি দেখেই বাপী বুঝে নিল ও এখন জঙ্গল ছুঁড়তে যাচ্ছে।

—পড় পড়, ভালো করে লেখা-পড়া না শিখলে মানুষ হবি কি করে? লেখা—পড়া শিখে বাবু হবি, এই আবুই তখন আবার তোকেও সেলাম ঠুকবে—

পর পর অনেক বার ফেল করে আবু এ বছরই স্কুল ছেড়েছে। নইলে এবারে বাপীর সঙ্গে এক ক্লাসে পড়তে হত। মুখে বিকার নেই, কথাগুলোও গম্ভীর। বাপীর তবু মনে হল ঠাট্টাই করছে। এই দিনেও স্কুলে যেতে হচ্ছে ঠাট্টা করবে না তো কি। লাঠি হাতে আবুকে দেখেই স্কুলের বিতৃষ্ণা আরো বুক ঠেলে বেরিয়ে আসছে। জিজ্ঞাসা করল, তুমি জঙ্গলে যাচ্ছ বুঝি?

—তা ছাড়া কোন চুলোয় আর যাব। বাপের হুকুম সকাল-বিকেল এখন জাঙল ঠেঙাতে হবে। মতলবখানা বুঝলি না, এরপর তোর বাপকে ধরা-করা করে বীটম্যানের খাতায় আমার নামটা ঢোকাতে চেষ্টা করবে।

বাপীর বিবেচনায় সেটা মস্ত ভাগ্যের কথা। বাবার মতো কেরানীবাবু হওয়ার থেকে বীটম্যান হওয়া ঢের ভালো। একটা বড় নিঃশ্বাস ঠেলে বার করে সখেদে বলল, আমার আজ একটুও স্কুলে যেতে ইচ্ছে কচ্ছিল না—বাবার গুঁতোয় যাচ্ছি।

আবুর সঙ্গে আবুর মতো করেই কথাবার্তা বলতে চেষ্টা করে বাপী। ঢিমেতালে চলতে চলতে তাচ্ছিল্যভরে আবু জবাব দিল, ইচ্ছে না করলে কোন বাপ আবার ঠেলে পাঠাতে পারে—মন না চায় যাবি না।

লোভ বাড়ছে। আবার ভয়ও।—–বাবা টের পেয়ে গেলে?

—ভোঁতা মাথা হলে টের পাবে আর গায়ের ছাল ছাড়াবে। সময়ে স্কুলে রওনা হয়েছিস, আবার সময়ে লক্ষ্মী ছেলের মতো ঘরে ফিরবি—টের পাবে কেমন করে?

চাপা উত্তেজনায় বাপীর বুক দুরুদুরু। তার পরেই আবার হতাশা।—অ্যাবসেন্ট হলে কাল যে আবার দরখাস্ত দিতে হবে স্কুলে, তখন টের পাবেই।

দাঁড়িয়ে গিয়ে আবু ঘাড় বেঁকিয়ে ওর বুদ্ধির বহর দেখে নিল। তারপর হাল—ছাড়া গলায় বলল, তুই বরং স্কুলেই চলে যা। কি করে যে পাসটাসগুলো করিস বুঝি না—এক বাবা ছাড়া পিরথীবিতে আর গার্জেন নেই? পাঁচ দিন সাত দিনের জন্য বাপ অন্য জঙ্গলের কাজে গেছে বললে মাস্টাররা কি যাচাই করে দেখতে আসবে নাকি? বাপ না থাকলে তখন পিসী সই করলে চলবে না? পিসীর স‍ই করা মানে বাঁকা-চোরা করে তোর সই করা—

বুকের ভিতরে আবার দুরু দুরু বাপীর।

—শোন্, তোকে ধরার তালেই ইদিক দিয়ে এলাম। আমি সামনে এগিয়ে গিয়ে জঙ্গলে ঢুকে পড়ছি—ইচ্ছে থাকে তো তুইও ফাঁক বুঝে ঢুকে পড়। মেঘলা দিনে আবার জন্তু-জানোয়ারগুলোর প্রেম বেশি চনমন করে ওঠে—

লোভের শেষ আস্ত রাজভোগখানা ছুঁড়ে দিয়ে আবু হনহন করে খানিক পথ ভেঙে জঙ্গলে ঢুকে গেল। বাপী সেখানে মিনিট খানেক ঠায় দাঁড়িয়ে। এই লোভ সামলানোর সাধ্যি আর নেই। পিছনের জঙ্গলের মধ্যেই আবুদের মেটে-ঘর। ওকে ধরার জন্যেই এই পথ ধরে এসেছে। ওইটুকু সব বাধা আর সব নিষেধ তুচ্ছ করার মতো যথেষ্ট। তার ওপর মেঘলা দিনে জন্তু-জানোয়ারগুলোর প্রেম চনমন করে ওঠার কথা।

পিছনে ঘুরে দেখে নিল। কেউ আসছে না। চোখের পলকে সে-ও ওখান থেকেই জঙ্গলের আড়ালে।

প্রেম বলতে বাপী এতকাল পিসীর মুখে রাজপুত্র রাজকন্যার প্রেমের কথাই শুনে এসেছে। রূপকথার রাজপুত্র মেঘ-বরণ চুল রাজকন্যার খোঁজে পক্ষীরাজ ঘোড়ার চেপে জঙ্গল পাহাড় টপকে সাগর পেরিয়ে রাক্ষসের দেশ থেকে ঘুমন্ত রাজকন্যাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসছে। পাশা খেলে ডাইনী পাশাবতীর দফা রফা করে, নয়তো একডুবে কাজলদীঘির তলা থেকে সোনার কৌটা তুলে তলোয়ারের ঘায়ে ভোমরা-ভোমরি দুখানা করে এক-একটি রাজপুত্র এক-একটি সোনার বরণ রাজকন্যাকে ঘরে এনে ধুমধাম করে বিয়ে করেছে। পিসীর মুখে ওইসব গল্প শুনেও বুকের রক্ত টগবগ করে ফোটে, উত্তেজনায় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়। খানিকক্ষণের মধ্যে বাপী নিজেই সেই সব রাজপুত্র বনে যায়।

কিন্তু জঙ্গলের জীবগুলোর প্রেম একেবারে অন্য ব্যাপার। কোটা ওদের ভালবাসা-বাসি আর কোন্টা মারামারি খেয়োখেয়ি এখনো ভালো বুঝতে পারে না। এই ব্যাপারে আবু ইদানীং ওকে একটু-আধটু পাঠ দিচ্ছে। একটু একটু করে ভারী মজাদার নিষেধের জগতের পর্দা সরাচ্ছে। নইলে আগে চোখে দেখতে পেলেও বাপী কি কিছু বুঝতে পারত! এখনো পারে না, আবু বলে দিলে ঠকে শেখে। ভালবাসা-বাসি করতে হলে জীবগুলোরও একটা মেয়ে, আর একটা পুরুষ দরকার হয়, তা-ই জানত না।

এই পাঠ শুরু মাস দুই আগে। দূরে একটা বন-মোরগকে ছুটে আর একটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখে বাপী হাতের পাথর তুলেছিল। দুটোকেই একসঙ্গে শেষ করবে। আবু থামালে।—দাঁড়া, প্রেম করছে দেখছিস না, এ সময় মারতে হয়!

বাপী হাঁ। —মারামারি করছে না?

আবু হেসে সারা। তারপর এযাবৎ আশপাশের অনেক জানোয়ারেরই প্রেম করাটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে ওকে। এমন কি খরগোশ বা কাঠবেড়ালীর প্রেমও বাপী এখন একটু-আধটু আঁচ করতে পারে। তবু গেল রোববারেই তো এক তাজ্জব ব্যাপার দেখে ঠকেছে।

সেদিন জঙ্গলে পাশাপাশি চলতে চলতে আবু কি দেখে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেছল। তারপরেই সেই অদ্ভুত দৃশ্যটা বাপীও দেখেছে। দুটো সাপ একটা আর একটাকে জড়িয়ে পাকিয়ে লেজে ভর করে একেবারে ছুঁয়ে পোঁতা লাঠির মতো দাঁড়িয়ে . আছে। দুটোর ফণাও মুখোমুখি, লাগালাগি।

আবুর সঙ্গে আড়ালে সরে গিয়ে তাজ্জব দৃশ্যটা অনেকক্ষণ ধরে দেখেছে। আবু ফিস্ ফিস্ করে বলেছে, প্রেমে বাগড়া দিলে ক্ষেপে গিয়ে দুটোই একসঙ্গে তাড়া করবে। সাবধান, জোরে নিঃশ্বাসও ফেলবি না!

হাঁ করে বাপী দেখেছে আর বুঝেছে, এ-ও প্রেম। সেই দিনই পরে আবুর মুখে বাঘের প্রেমের গল্প শুনে বাপীর গায়ে কাঁটা! প্রেম করার সময় হলে বাঘিনী নাকি ডেকে ডেকে কাছাকাছির বা দূরের বাঘকে জানান দেয়। সেই প্রেমের ডাক আবু নিজের কানে শুনেছে। ওই ডাক শুনে কখনো আবার একটার বেশি পুরুষ বাঘ এসে হাজির হয়। বাঘিনীকে পাবার জন্য দুই বাঘের মধ্যে তখন যাকে বলে একেবারে খতমের লড়াই। যে জিতবে বাঘিনী তার। আর, বাঘিনীর প্রেমের ডাকে সাড়া দিয়ে যদি একটাই বাঘ আসে তো সে ব্যাটাও নিজের বীরত্ব দেখিয়ে বাঘিনীর মন পাবার জন্য একগাদা পশু মারবে—যা খাবে না তার থেকেও ঢের বেশি।

কদিন ওই প্রেমের পাঠ শুনে আর নিজের চোখেও অনেক দেখার পর বারো বছরের বাপীর ধারণা, জঙ্গলের জন্তু-জানোয়ারের ভালোবাসা-বাসিটা রূপকথার রাজপুত্র রাজকন্যার মতো। ঝাঁপাঝাঁপি ঝকাঝকি জড়াজড়ির ব্যাপার। তার চোখে দেখা বানারজুলির মানুষ বা মেয়েমানুষেরা রূপকথার ছেলে—মেয়ের মতো নয়। আবার জঙ্গলের জীবজন্তুর মতোও নয়। অথচ আবু বলে, মেয়ে-পুরুষের ভালো-বাসা-বাসি না হলে কেউ জন্মাতোই না—বাপী না, আবু না, পৃথিবীর কেউ না। অবাক কথা। বাপী যেটুকু বোঝে তার থেকে বেশি অস্পষ্ট থাকে। কেউ বলে দেয়নি, নিজের ভিতর থেকেই কেমন করে জেনেছে এসব দেখাশোনা বা বোঝাটা ভয়ানক গোপনীয় ব্যাপার। আবার এত গোপনীয় বলেই জানার ভীষণ লোভ।

আজকের মতো এমন দিন হয় না। বাবার ভয়-ডর উবে গেছে। এমন ছুটির স্বাদ আলাদা। কেবল একটু আফসোস হাতে নিজের লাঠিটা নেই। জঙ্গল থেকে সরু একটা গাছের ডাল ভেঙে নিয়ে মনের আনন্দে ছোট গাছ আর ঝোপঝাড় পেটাতে পেটাতে আবুর পাশাপাশি চলেছে। কাঁধের বই-খাতার থলের বোঝাটা একজন বীটম্যানের কুঁড়েতে জিম্মা রেখে নিশ্চিন্ত। ঘরে ফেরার সময় তুলে নিয়ে যাবে।

মেঘলা আকাশের ঠাণ্ডা অথচ ঝিমুনো ছোঁয়াটা জঙ্গলে সেঁধিয়েছে। এ রকম হয় বলেই বাপীর ভালো লাগে। আজ অনেক দূরে চলে যাবার ইচ্ছে। একেবারে পাহাড়-ঘেঁষা বাঘ বা চিতার ডেরার দিকে না হোক, এক-আধটা ভালুক-টালুকের মুখোমুখি হওয়ার ইচ্ছে। বিপাকে না পড়লে এখানকার ভালুক মানুষ তাড়া করে না, উল্টে পালায়। আবু অনেক দেখেছে। ও নাকি ভালুকের ভালোবাসা-বাসিও দেখেছে।

কিন্তু কিছুটা যেতে যে জিনিসটা চোখে পড়ল সে অন্য ব্যাপারে। খুব সুন্দরও একটা বড় ময়ূর রং-বেরঙের বিশাল পেখম মেলে দাঁড়িয়ে আছে। আর ঘুরেফিরে এক-একবার ঢং করে নাচছে। ওটার সামনে আর একটা পেখমছাড়া ময়ূর পোকামাকড় খুঁটে খাচ্ছে আর মাঝে মাঝে মুখ তুলে পেখমমেলা বড় ময়ূরটাকে দেখছে।

আবু মন্তব্য করল, কেমন প্রেম করছে দ্যাখ—

বাপী দাঁড়িয়ে গেল। মেঘলা দিনে পেখম ছড়ানো ময়ূর অনেক দেখেছে। নাচতেও দেখেছে। কিন্তু প্রেমের ব্যাপারটা মাথায় আসেনি।

—সামনের ওই কুচ্ছিতটা মেয়ে ময়ূর?

—না তো কি। নেচে নেচে রূপের বাহার দেখিয়ে ওকে ভোলাচ্ছে।

বাপীর আরো খানিক দাঁড়িয়ে দেখার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আবু তাড়া দিল, এসব তো দুধের খোকারা দেখবে—আয়।

ঘণ্টা দুই আড়াই জঙ্গলখানা মন্দ চষা হল না। এরকম তো কতদিন কতবার করেছে, কিন্তু আনন্দটা সব সময় আনকোরা নতুন। বাপীর একটু খেদ বড় জানোয়ার একটাও চোখে পড়েনি। বাপী আর এক দিকের গভীরে খানিক এগোতে চেয়েছিল। আবু বাধা দিয়েছে, ওদিকে নয়, বুনো শুয়োর বেরোতে পারে।

দাঁতাল বুনো শুয়োর কি ভয়ংকর জীব বাপীর শোনা আছে। ভালুকের মতো নয়, দেখলে সোজা তেড়ে আসে। এ জায়গাও নিরাপদ খুব নয়, এসে হাজির হলেই হল। তখন চটপট কোনো গাছে উঠে পড়লে বাঁচোয়া। এদিকে সেরকম গাছের অভাব নেই।

আবু আর ঘুরতে রাজি নয়। তার খিদে পেয়েছে, ঘরে যাবে। বাপীকেও আসতে বলল। যা আছে ভাগ করে খাওয়া যাবে। তারপর ফের জঙ্গলে এসে আড্ডা দাও বা যত খুশি ঘোরো।

কিন্তু দু কদম না এগোতেই ঝমঝম চেনা শব্দ। তারপর যে কাণ্ড দুজনারই খিদে-টিদে সিকেয়। দিব্বি বড়সড় সজারু একটা। ওদের দেখেই পালাচ্ছে। ওটাকে দেখামাত্র চাপা উত্তেজনায় আবুর অন্য মুখ। ফলে বাপীরও। চোখের পলকে ছিটকে গিয়ে আবু ওটার পিঠে ডান্ডার গোটাকতক পেল্লায় ঘা বসিয়ে দিল লোহামোড়া দিকটা দিয়ে। সারা গায়ের এক বিঘৎ মোটা মোটা কাঁটাগুলো মেলে দিয়ে সজারুটা দাঁড়িয়ে লড়ছে, আবার গর্তের দিকে ছুটছে। ওর গর্ত সামনের ওই চারা গাছগুলোর বেড-এর দিকে।

আবু ছুটে গিয়ে সেই গর্তটা বার করে তার মুখ আগলালো। ওকে চেঁচিয়ে হুকুম করল, হাতে পাথর তুলে নে, ওদিকে দিয়ে না পালায় তুই দ্যাখ—একটা সজারু মারার সাধ অনেক দিনের—এ শালাকে আজ মারবই। বলতে বলতে লাঠি থেকে লোহার খাপ খুলে ইস্পাতের ঝকঝকে ধারালো ফলাটা বার করে লাঠি বাগিয়ে ধরল।

কিন্তু অত বড় সজারু মারা সহজ নয়। ওই বড় বড় কাঁটার আড়ালে আসল জীবটিকে পাওয়া ভার। না চলে লাঠি, না পাথর। ওটার যেমন প্রাণপণ বাঁচার লড়াই এদের তেমনি মারার। ইস্পাতের ফলার খোঁচায় কাঁটাগুলো রক্তাক্ত। লাঠি আর পাথরের ঘায়ে ভেঙেছেও অনেকগুলো। শেষে ওটা ঝিমিয়ে পড়তে আবু অনেক কাছে গিয়ে ধারালো ফলার দিকটা মোক্ষমভাবে বসাতে পারল। ওরকম বার কয়েকের চেষ্টায় ওটার ভবলীলা সাঙ্গ।

এই উত্তেজনায় ফাঁকে কম করে ঘণ্টা-সোয়াঘণ্টা পার। বাপীর হাঁপ ধরে গেছে। ধুলোমাখা রক্তাক্ত জীবটাকে দেখে গাও ঘুলোচ্ছে। কিন্তু আবু ফুর্তিতে টইটম্বুর। পকেটে ধারালো ছোরা একটা থাকেই। গাছ থেকে দড়ির মতো একটা লম্বা ঝুরি কেটে এনে তার এক মাথা দিয়ে ওটার গলার দিকটা শক্ত করে বাঁধল। তারপর টেনে নিয়ে চলল। আবুর কথা শুনে বাপীরও গা-ঘুলনো ভাবটা গেছে। অত বড় সজারুটা মারার জন্য আবু নাকি জঙ্গল আপিস থেকে এক টাকা বা দু টাকা প্রাইজ পাবে। সজারু চারাগাছের বেড-এর নরম মাটির তলা দিয়ে লম্বা গর্ত করে চারাগাছের বারোটা বাজিয়ে দেয়। তাই সজারু মারলে পুরস্কার। তাছাড়া সজারুর মাংস খেতে চমৎকার। কম করে সাত-আট সের মাংস হবে ওটার। আবুর বাড়িতে আজ ভোজ লাগবে। বাপীর নেমন্তন্ন তো বটেই। আর বড় সজারুর কাঁটাও ফেলনা নয়। ড্রইং করার কলম হয় ওই দিয়ে। আবু হেসে উঠল।—আচ্ছা ওরা প্রেম করে কি করে বল তো, নড়লে চড়লেই তো বড় বড় কাঁটা!

মাথা ঘামিয়ে বাপীও ভেবে পেল না।

আধ ঘণ্টা ধরে পালা করে ওটাকে হিঁচড়ে টেনে জঙ্গলের বাইরে পাকা রাস্তার এনে ফেলল। টানতে সুবিধে, কেরামতিটাও লোক দেখবে। আনন্দে বাপী স্কুল পালানোর বিপদও ভুলেছে। কারণ এত বড় একটা বাহাদুরির পিছনে সেও আছে। রাস্তার লোকেরা জীবটাকে দেখছে আর ওদেরও দেখছে। কেউ কেউ আবার দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসা করছে—কোথায় পেল, বা কি করে মারল।

লম্বা রাস্তাটা বাঁক নিতে সামনের দিকে চেয়ে দুজনেই অবাক। খোদ বড় সাহেবের ছবির মতো সুন্দর বাংলোর সামনে মালবোঝাই ট্রাক একটা। তার পিছনে জিপ।

সেখানে ছোট সাহেব অর্থাৎ ফরেস্টার, ফরেস্ট গার্ড, কেরানীবাবু অর্থাৎ বাপীর বাবা, আবুর বাবা হেড বীটম্যান কালু, তার সঙ্গে আরো কয়েকজন বীটম্যান পিওন—সকলেই ব্যস্তসমস্ত। নীচের কর্মচারীরা ট্রাকের দড়ি খুলে মাল নামানোর তোড়জোড় করছে।

বানারজুলি জঙ্গলের সর্বময় কর্তা রেঞ্জ অফিসারের বাংলো ওটা। বড় সাহেবের বাংলো। অবাঙালী বড়সাহেব বদলি হবার ফলে প্রায় তিন সপ্তাহ বাংলোটা খালি পড়ে ছিল।

আবু বলল, নতুন বড়সাহেব এলো বোধ হয়। শিগগীর আয়—

বাঁধা সজারুটাকে টানতে টানতে প্রায় ছুট লাগালো আবু। সেখানে আব্বা আছে, কেরানীবাবু আছে, ছোটসাহেব আর বীটম্যানরা আছে—সকলের সামনে খোদ বড়সাহেবকে কেরামতিটা দেখাবার এমন মওকা আর পাবে কোথায়?

পায়ে পায়ে বাপীও এগিয়ে এসেছে। স্কুল পালানোটা আর মনেই নেই। জিপটার দিকে চোখ। ফরেস্টার সাহেব আর বাবা যাকে তোয়াজ করছে ওই ছিপছিপে সুন্দরপানা সাহেবটিই নিশ্চয় নতুন রেঞ্জ অফিসার। তার দু হাত দূরে ঝকমকে শাড়ি পরা মেমসাহেব। বেশ সুন্দর দেখতে। মেমসাহেবের সামনেই একটা ছেলে আর একটা মেয়ে। ছেলেটা বড়। পরনে ধপধপে সাদা হাফপ্যান্ট আর হাফশার্ট। আর চকচকে রঙিন ফ্রক পরা মেয়েটার ঝাঁকড়া কোঁকড়া চুল, ফুটফুটে ফর্সা রং ফোলা ফোলা লালচে গাল…পুতুল পুতুল মুখ।

বাপী হাঁ করে মেয়েটাকেই দেখছে।

আবুর বরাত খারাপ। লতার দড়ি-বাঁধা ওই পেল্লায় মরা সজারু এনে ফেলতে সকলে যখন সচকিত, খোদ বড়সাহেবের বিরক্ত মুখ। মেমসাহেব আঁতকে ওঠার দরুন হতে পারে। আরদালি পিওন ফরেস্ট গার্ড বীটম্যানরা দুচার মিনিটের জন্য অমনোযোগী হল বলেও হতে পারে। এতে হয়ত দণ্ডমুণ্ডের মালিকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার গুরুত্বে ঘা পড়ল। তার ওপর মেমসাহেবের নাক-মুখ কোঁচকানো বিরক্তি।—মাগো, কি বিচ্ছিরি—সরিয়ে নিতে বলো!

আবুর ভেবাচাকা মুখ। ছেলের কেরামতি দেখে ওর বাবা কালুর দু চোখ আনন্দে চকচক করে উঠেছিল। বড়সাহেবের বাহবা আশা করেছিল। মেমসাহেবের কথা শুনে আর বড়সাহেবের মুখ দেখে রক্ত জল। আগুন চোখে ছেলের দিকে ফিরে তাকানোর আগেই ত্রস্ত আবু তার সজারু সমেত রাস্তার ওধারে জঙ্গলে নেমে গেল। সব থেকে বেশি ঘাবড়েছে ও-ই

ফুটফুটে মেয়েটা সভয়ে মায়ের তিন পা পিছনে চলে গেছল। দেখার জন্য এবারে রাস্তার এধারে এগিয়ে এলো। তার দাদাকে রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলের দিকে খানিকটা নেমে দাঁড়াতে দেখে এগিয়েছে। তবু সাহস দেখে বাপীর হাসি পাচ্ছে। মেয়েটা বলছে, এই দাদা, আর নামিস না—

জঙ্গল থেকে রাস্তা অনেকটা উঁচু। মরা সজারুটাকে টেনেহিঁচড়ে আবু ততক্ষণে ঝোপঝাড়ের আড়ালে। বাপীর বরাত ভাল, তার ব্যস্তসমস্ত বাবা তখন মাল রাখার তদারকির কাছে বাংলোর ভিতরে। এই অপ্রিয় ব্যাপারটা দেখলে বা জানলে দুর্ভোগ হত। ঘর্মাক্ত কলেবরে এবারে বাইরে আসতে ছেলের দিকে চোখ গেল। বাপী জঙ্গলের দিকে মুখ করে সাহেবের মেয়ের পিছনে দাঁড়িয়ে।

কাঁধের নীচে বাবার হাতের হ্যাঁচকা টান পড়তে মুহূর্তের জন্য মুখ আমসি। পরের মুহূর্তে অবাক। ঘাম-ঝরা হাসিমাখা মুখ বাবার। স্কুল-ফুল ভুলে গেছে। ওকে বড়সাহেবের সামনে টেনে বলল, প্রণাম কর্—

সাহেবের ধুলোমাখা বুটে প্রণাম ঠুকে ওঠার ফাঁকে আবার বাবার চিনিগলা কথাই কানে এলো।—মা-মরা এই একটাই ছেলে আমার স্যার, আশীর্বাদ করুন—

বড়সাহেব সামান্য মাথা নাড়লেন। বাবার হুকুমে মেমসাহেবকেও স্যান্ডালপরা পা ছুঁয়ে প্রণাম সারতে হল। তাদের মেয়ে এদিকে ঘাড় বেঁকিয়ে ওকে দেখছে। বাবার ভাবনা গেছে। হাল্কা পায়ে বাপী আবার মেয়েটার কাছে এসে দাঁড়াল। আগের আধ-বুড়ো খোট্টা বড়সাহেবের ছেলেমেয়ে ছিল না। মেয়েটার সঙ্গে কথা বলার লোভ খুব। চেষ্টার দরকার হল না, ও-ই কথা বলø