Thursday, April 18, 2024
Homeবাণী-কথারূপ দর্শন - অন্নদাশঙ্কর রায়

রূপ দর্শন – অন্নদাশঙ্কর রায়

অন্নদাশঙ্কর রায় শ্রেষ্ঠ গল্প

সেদিন নয়নমোহনের সঙ্গে বহুকাল পরে দেখা। এসেছিলেন এক বিয়েবাড়িতে বরযাত্রী হয়ে। আমি ছিলুম কন্যাপক্ষের নিমন্ত্রিত। দেখা হতেই দু-হাত ধরে বললেন, ‘মনে পড়ে?’

আমি তাঁর দুই হাতে ঝাঁকানি দিয়ে বললুম, ‘না, মনে পড়বে কেন? মনে পড়ার তো কারণ নেই। মনে পড়ার তো কথা নয়।’

তিনি দুঃখ প্রকাশ করলেন। ইচ্ছা ছিল তোমার ওখানে উঠতে। কিন্তু জানই তো বরযাত্রীরা স্বাধীন নয়। এসেছি একটা দলের সঙ্গে দলচর হয়ে। সেইজন্যে—’

‘সেইজন্যে একখানা চিঠি লিখেও জানাতে নেই যে আসবার কথা আছে ময়মনসিংহে। না নয়নদা, তোমাকে আমার মনে পড়ে না। মনে পড়বে যদি তুমি এখনও আমার ওখানে ওঠো।’

‘না ভাই, এ যাত্রা নয়। এরপরে আবার যদি কোনোদিন আসা হয় তো নিশ্চয়। এবার আমাকে মাফ করতে হবে। বুঝলে?’

তাঁর কন্ঠস্বরের কারুণ্য আমাকে স্পর্শ করেছিল। আমি তাঁকে পীড়াপীড়ি করলুম না, শুধু একবার চা খেতে ডাকলুম। তিনি রাজি হলেন। পরের দিন চা খেতে এসে শুধালেন, ‘তুমি আমাকে একবার কী বলেছিলে মনে আছে?’

বিশ বছর পরে দেখা। কী করে আমার মনে থাকবে কী বলেছিলুম কবে? আমি মাথা নেড়ে জানালুম, না, মনে নেই।

‘বলেছিলে, রূপ ভগবান সবাইকে দিয়েছেন, দেখবার চোখ দেননি সবাইকে। যাদের দিয়েছেন তারাই শিল্পী, তারা সকলের রূপমুগ্ধ।’

‘তাই নাকি? কই, আমার তো মনে নেই।’

‘তোমার মনে থাকার কারণ নেই, আমার মনে থাকার কারণ আছে। তাই সেদিন ভাবছিলুম, তোমার কথাই অবশেষে সত্য হল কবি।’ তিনি আমাকে কবি বলে ডাকতেন।

‘কিন্তু সত্য না হলেই ভালো হত।’ তিনি সেই নিশ্বাসে বললেন। ‘এ যা হল তা আরও মর্মান্তিক।’

আনি জানতুম নয়নদার বিয়ের গল্প। জানতুম না তার পরিণতি। নয়নদার বিয়েতে আমি বরযাত্রী হয়েছিলুম, কবিতা লিখে ছাপিয়েছিলুম। বোধহয় বউদির রূপ দর্শন করে সান্ত্বনাচ্ছলে বলেছিলুম, রূপ ভগবান সবাইকে দিয়েছেন, দেখবার চোখ দেননি সবাইকে। তার মানে, রূপ ভগবান সবাইকে দেননি, যাকে দেননি সেও রূপবতী কবির চোখে।

আমি তো রিয়্যালিস্ট নই, হলে সাফ কথা শুনিয়ে দিতুম নিষ্ঠুরভাবে। কিন্তু যাঁর বিয়ে তিনি ছিলেন বাস্তববাদী। রূঢ় বাস্তব তাঁকে কাঁদিয়ে ছাড়ল। বিয়ের পরে তিনি আমাদের কারো কারো কাছে চোখের জল ফেলে বলেছিলেন, ‘ভাই, এ যে পোড়াকাঠ।’ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিলেন, ‘দাঁত বার করা, নাক চাপা, এ যে করালী।’

নয়নমোহনের নিজের মত ছিল না, তিনি শাসিয়ে রেখেছিলেন আত্মঘাতী হবেন। কিন্তু তাঁর দাদারা তাঁর মাকে বুঝিয়েছিলেন যে, ডিক্রিদারের হাত থেকে সম্পত্তি রক্ষা করতে হলে ডিক্রিদারের দুহিতাকে বধূ করতে হবে। মা বললেন, ‘সম্পত্তি যদি যায় তো কে তোকে সুন্দর মেয়ে দেবে? কী দেখে? তখন তো সেই কালো মেয়েই বিয়ে করতে হবে। দেখিস আমার কথা ফলে কি না ফলে।’

এর উত্তরে নয়নদা বলেছিলেন, ‘তা কেন হবে! আমি যদি বিয়ে না করি।’

‘শোনো কথা! যদি বিয়ে না করি। তা কি কখনো হয়! বিয়ে না করলে তোকে রেঁধে খাওয়াবে কে?’

নয়নদার ঠাকুমা তখনও বেঁচে। তিনিই নাতির নাম রেখেছিলেন নয়নমণি। নয়নমণি থেকে বিবর্তনসূত্রে নয়নমোহন। বুড়ি বললেন, ‘তোর বাপও বলত বিয়ে করব না, সন্ন্যেসি হব। কী বলে ওকে, কী আনন্দ? বেবাক আনন্দ। বাপ বিয়ে না করলে তুই হতিস কী করে? বল আমাকে, বল।’

বউদিরা বললেন, ‘দেখছ তো আমাদের দশা। রূপ থেকেও নেই, কেননা রুপো নেই। গয়না পর্যন্ত বন্ধক। আসল জিনিস হল টাকা। তোমার শ্বশুরের তা আছে। এমন পাত্রী হাতছাড়া করতে নেই। করলে তোমায় বলব লক্ষ্মীছাড়া।’

নয়নমোহন বাড়ির অবস্থা জানতেন না। বউদিদের কথায় হুঁশ হল। তিনি ছিলেন রিয়্যালিস্ট, তাই শেষপর্যন্ত মত দিলেন। কিন্তু অন্তর থেকে তো দেননি। অন্তর কেন তা মানবে? সেইজন্যে বিয়ের পরের দিন তাঁর কাঁদুনি। এবং সেই উপলক্ষ্যে আমার সান্ত্বনাবাণী।

আমরা যাঁরা তাঁর অন্তরঙ্গ ছিলুম তাঁরা জানতুম এ বিবাহে তিনি সুখী হবেন না। হতে পারেন না। কারণ আর সব বিষয়ে বাস্তববাদী হলেও বিবাহ সম্বন্ধে তিনি ছিলেন আদর্শবাদী। তাঁর পরম কাম্য ছিল তন্বী-শ্যামা-শিখরিদশনা-পক্ব বিম্বাধরোষ্ঠী। কখনো কাউকে ভালোবেসেছিলেন কি না বলতে পারব না, কিন্তু যাকে তিনি ভালোবাসবেন সে কেমন হবে তা তিনি তাঁর অন্তরঙ্গদের মাঝে মাঝে শোনাতেন।

বিয়ের পরে রসিকতা করে কে একজন তাঁকে বলেছিল, ‘তুমিই জিতলে। যা চেয়েছিলে অবিকল তাই পেলে। তন্বী মানে রোগা, শ্যামা মানে কালো, শিখরিদশনা মানে পাহাড়ের মতো দাঁত, আর পক্ব বিম্বাধরোষ্ঠী মানে ফাটা তেলাকুচার মতো ঠোঁট দুটির মাঝখানে অনেকটা ফাঁক।’

নয়নদা বেচারার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়েছিল ও-কথা শুনে। তাঁর সবচেয়ে মনে লেগেছিল আরেকজনের বক্রোক্তি, ‘নয়ন, তুমি চোখে অন্ধকার দেখছ।’

আমরা তাঁর বন্ধুরা তাঁকে নানাভাবে সান্ত্বনা দিয়ে প্রকৃতিস্থ করি, নইলে তিনি হয়তো বিকৃতিবশত কিছু একটা করে বসতেন। আমি যে ঠিক কী কথা বলেছিলুম আমার মনে ছিল না। তাঁর মনে ছিল দেখছি।

‘তোমার কথাই অবশেষে সত্য হল, কবি,’ তিনি বললেন, ‘কিন্তু সত্য না হলেই ভালো হত। এ যা হল তা আরও মর্মান্তিক।’

আমি উৎকন্ঠিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলুম, ‘কী হয়েছে নয়নদা? খারাপ কিছু নয় তো?’

‘না, খারাপ কিছু নয়। সমূহ কুশল।’

আমি নিশ্চিন্ত হলুম, কিন্তু নিরস্ত হলুম না। জানতে চাইলুম, ‘তাহলে আরও মর্মান্তিক কেন?’

তিনি বললেন, ‘শোনো তাহলে।’

সত্যেন দত্তের একটি জাপানি কবিতা থেকে অনুবাদ মনে পড়ে।

অতি বড় অভাগা যে আমি একটা

আমি কিনা পেয়ে গেলুম মনিব্যাগটা।

বিয়ের পরে আমার মনোভাব ধীরে ধীরে দাঁড়াল ওই জাপানিটির মতো। আর কিছু না পাই টাকার থলি তো পেয়েছি। এই-বা কজন পায়! জীবিকার জন্যে আমাকে পরের চাকরি করতে হবে না, স্বাধীন ব্যাবসাতে মূলধনের অভাব হবে না, ব্যাবসা ফেল মারলেও সংসার অচল হবে না, লক্ষ্মী হবেন অচলা। এ কি কম কথা! এত যে দুশ্চিন্তা ছিল এমএ পাস করে তার পরে কী করব, কোথায় স্থিতি পাব, সব দুশ্চিন্তা জল হয়ে গেল। সমবয়সিদের কেউ কেউ এখনও স্থিতি পায়নি, খবর রাখো বোধহয়। বিশ বছর পরেও তাদের জীবনযাত্রা অস্থির। আর আমি সবদিক থেকে গুছিয়ে নিয়েছি। স্বাস্থ্য আমার এত ভালো যে একদিনও অনিদ্রা হয় না। আর তোমার তো শুনি কোনোদিন সুনিদ্রা হয় না। তুমি কৃপার পাত্র। কালো মেয়ে বিয়ে করলে ভালো থাকতে।

জান তো আমাদের কেমন খানদানি বংশ। আগেকার দিনে সুন্দর মেয়ে আমরা লুট করে বিয়ে করতুম। তারপরে কৌলীন্যপ্রথার সুযোগ নিয়ে সুন্দর মেয়ে ঘরে আনি। বর্ণকৌলীন্য যখন উঠে গেল তখন কাঞ্চনকৌলীন্য আমাদের ওই কাজে লাগল। আমরা পণ নিতুম না, যৌতুক নামমাত্র নিতুম, কিন্তু বউ আনতুম সুন্দরী দেখে। এর ব্যতিক্রম যে হত না তা নয়। এমন কোন নিয়ম আছে যার নিপাতন নেই? কিন্তু তা বলে আমার নিজের বেলা ব্যতিক্রম হবে এ আমি কল্পনা করিনি। আমার দাদারা সুন্দরী বিয়ে করেছেন। আমার ধারণা ছিল আমারও জন্মস্বত্ব সুন্দরী ভার্যা। বাবা যদি হঠাৎ মারা না যেতেন, সম্পত্তি যদি মর্টগেজ রেখে না যেতেন, তাহলে এ অঘটন ঘটত না। বংশের ব্যতিক্রম হয়ে নাম হাসাতুম না।

তোমাকে আমি হিংসা করি। তোমার মতো ভাগ্যবান বন্ধুদের সবাইকে হিংসা করি। যেদিন তোমার বিয়ের খবর পড়ি সেদিন যেন বুকে শেল বাজল। বিশ বছর দেখা হয়নি বলে আশ্চর্য হচ্ছ। এ জীবনে দেখা হল এইটেই আশ্চর্য। তুমি জিতেছ, আমি হেরেছি। তোমার সঙ্গে কোন মুখে দেখা করতুম! আমারই মতো যারা দুর্ভাগা তাদের সঙ্গে দেখা হয় বছরে দু-বছরে একবার। কেউ কেউ আবার এমন হতভাগা যে সেই জাপানি বেচারার মতো মানিব্যাগটা তুলে নিয়ে দেখে—‘ট্রামগাড়ি চাপাপড়া ব্যাং চ্যাপটা।’

গোপেনকে মনে আছে তোমার? আবগারি সুপারিন্টেণ্ডেন্ট হয়েছে এখন। গোপেন আমাকে রামপ্রসাদি গান গেয়ে শোনাত। বলত, কালো ভুবন আলো। তেমন তার সাজা পেতে হল নিজের। বিয়ে হল কালো মেয়ের সঙ্গে। আশা করেছিল শ্বশুর তাকে অর্ধেক রাজত্ব দিয়ে যাবেন, কিন্তু দ্বিতীয় পক্ষ বিয়ে করে দিয়ে গেলেন আরও কয়েকটি কৃষ্ণকলির অভিভাবকত্ব। গোপেন কিন্তু আমাকে বাঁচবার প্রেরণা দিয়েছিল। তাকে বলতুম, আচ্ছা, কালো নাহয় আলো, কিন্তু খাঁদা কী করে টিকোলো হবে? সে বলত, চীন দেশে খাঁদা নাকের ওপর তিন হাজার বছর ধরে কবিতা লেখা হয়ে আসছে, ও-দেশের রামপ্রসাদি গান কালীভক্তির নয়, খাঁদি ভক্তির। তা যেন হল, কিন্তু দাঁত বার করা কি সহ্য হয়? যেন খেতে আসছে। গোপেন বলত, এর উত্তর দিয়ে গেছেন জয়দেব কবি। বদসি যদি কিঞ্চিদপি দন্তরুচি কৌমুদী। খেতে আসছেন না, বলতে আসছেন যে তুমি আমার প্রিয়, আমি তোমার প্রিয়া। বচনের উল্লাসে জ্যোৎস্নার মতো ফুটে উঠছে দশন।

মানুষের বাইরেটা কিছু নয়, ভিতরটা আসল। রূপ কিছু নয়, গুণই আসল। একথা আমি কত লোকের মুখে শুনেছি, বিশ্বাস করেছি, মুখ ফুটে বলেওছি কিন্তু সান্ত্বনা পাইনি। রূপের স্বাদ কি গুণে মেটে? রূপ ক্ষণকালের, গুণ চিরকালের। তা বলে কি ক্ষণপ্রভার মূল্য কিছু কম? যখন শুনতুম বউটি বড়ো গুণের তখন খুশি হতুম খুবই, কিন্তু তার চেয়েও খুশি হতুম যদি শুনতুম চোখ দুটি তো বেশ। গুণের প্রশংসা যত শুনতুম রূপের সুখ্যাতি তার সিকির সিকিও নয়। রাগ ধরত যখন ওরা বলত বউমানুষের রূপের প্রয়োজন নেই। রূপের প্রয়োজন নাকি রূপোপজীবিনীর! তবে বউদিদিদের আনা হয়েছিল কী দেখে? তাঁদের রূপবন্দনায় পঞ্চমুখ যারা তারাই আবার রূপের অসারতা ঘোষণা করত আমাদের শুনিয়ে শুনিয়ে।

মাঝে মাঝে মনে পড়ত তোমার উক্তি। রূপ ভগবান সবাইকে দিয়েছেন। সবাইকে দিয়েছেন তো কৃষ্ণাকেও দিয়েছেন। তাহলে আমার চোখে পড়ে না কেন? লোকের চোখে পড়ে না কেন? এর উত্তর, দেখবার চোখ তিনি সবাইকে দেননি; আমাকে দেননি, লোকেদেরকে দেননি। কৃষ্ণার রূপ আছে, আমাদের চোখ নেই। এ কি সত্য? অনেক ভেবেছি, কিন্তু সত্য বলে মেনে নিতে পারিনি। ধরে নিয়েছি এটা একটা স্তোকবাক্য। এ বলে তুমি আমাকে সান্ত্বনা জানিয়েছ। ওটা তোমার বন্ধুকৃত্য কিন্তু বন্ধুতানিরপেক্ষ ধ্রুবসত্য নয়। তোমার বিয়ের পরে মনে হয়েছিল তুমি আমাকে পরিহাস করে ও কথা বলেছিলে, ওটা তোমার শ্লেষ। কিছুকাল তোমার ওপর বিরূপ হয়েছিলুম। তোমাকে আক্রমণ করে একটা প্রবন্ধ লিখে মাসিকপত্রে পাঠিয়েছিলুম। তারা ছাপল না। ভাগ্যিস ছাপেনি।

ক্রমে আমার প্রতীতি হল যে, রূপবোধ একটা সংস্কার। জনম অবধি আমি রূপ নিরীক্ষণ করেছি, সেইজন্যে কৃষ্ণাকে মনে হচ্ছে কুরূপ। ধরো, যদি শিশুকাল থেকে কুরূপ নিরীক্ষণ করতুম তাহলে কি কৃষ্ণাকে মনে হত কুরূপ। না, তাহলে তাকে মনে হত আর সকলের অনুরূপ। এই প্রতীতির পর আমি একান্নবর্তী পরিবার থেকে পৃথক হতে চাইলুম। কেন, সে কথা খুলে বললুম না। বউদিদিদের মুখ দর্শন করে তারপরে কৃষ্ণার মুখ দর্শন করলে কৃষ্ণাকে কুরূপ দেখাবেই। এর একমাত্র প্রতিকার বউদিদিদের মুখ দর্শন না করা। যে-বাড়িতে কেবল কৃষ্ণাই একমাত্র নারী সে-বাড়িতে সুরূপ-কুরূপের বৈষম্য নেই। দেখলুম কৃষ্ণাকে আমার তত খারাপ লাগছে না। তার চোখ দুটি সত্যি সুন্দর। তার প্রোফাইলের ফোটো নিয়ে দেখা গেল মন্দ মানায় না। রূপ বলতে আমরা শুধু গায়ের রং আর মুখের সৌষ্ঠব বুঝি। এতে কিন্তু অনেকের প্রতি অবিচার করা হয়। কৃষ্ণা ক্ষীণমধ্যা, এখানে তার জিত। সে সুকেশী, এখানে তার জিত। তার তনুরেখা বঙ্কিম ও সুমিত, এখানে তার জিত। তার গড়ন মাংসল নয়, দিঘল, এখানে তার জিত। হাতের আঙুল, পায়ের পাতা অপূর্ব ব্যঞ্জনাময়, এখানে তার জিত। এভাবে বিশ্লেষণ করলে কৃষ্ণার জিত অনেক বিষয়ে। কিন্তু সৌন্দর্য তো বিশ্লেষণ করবার বস্তু নয়। আর আমিও নই সম্পূর্ণ নিরাসক্ত সমালোচক। ও যদি আমার না হয়ে পরের হত আমি ওকে রূপের পরীক্ষায় পাস মার্ক দিতুম। কিন্তু ও আমার হয়েই ফেল করেছে। এইটেই মর্মান্তিক।

একটি ছেলে একটি মেয়ে হবার পর আমি বাইরের বারান্দায় পৃথক শয্যা পাতলুম। কৃষ্ণা ভেবেছিল দু-দিনের বৈরাগ্য। একটু হেসেছিলও। কিন্তু মাসের পর মাস কাটে, আমার সংকল্পের পরিবর্তন হয় না। আমার মনে কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না, আমি মনস্থির করে ফেলেছিলুম। ওদিকে কৃষ্ণার মনে দোটানা। সে একা শুয়ে শান্তি পায় না, অথচ আমার কাছে এসে বাইরে শুতে সাহস পায় না। একদিন শেষরাত্রে সে এল আমার কাছে। এসে লুটিয়ে পড়ল। তার কন্ঠে দুর্জয় ক্রন্দন। ধরা গলায় বলল, ‘তুমি কি আর আমার সঙ্গে শোবে না?’

তাকে অনেক বোঝালুম, কিন্তু বৃথা চেষ্টা। শেষে রাগ করে বললুম, ‘আমি কোথাও চলে যাব, হিমাচলে কি পন্ডিচেরিতে।’ তা শুনে সে কেঁদে আকুল। পরের দিন জেদ ধরল, ‘আমাকে আমার বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দাও। এবাড়িতে যে-ই আসে সে-ই জানতে চায় আলাদা বিছানা কেন? লজ্জায় মারা যাই।’ বাপের বাড়ি থেকে কয়েক মাস পরে আপনি ফিরে এল। বাপের বাড়িতেও সকলে জানতে চায় আলাদা থাকার কারণ কী। লজ্জায় মারা যায়। ফিরে এসে আবার সেই একই সমস্যা। লজ্জায় বাঁচে না। একদিন আমাকে মিনতি করে বলল, ‘অন্তত এক বিছানায় শোও। মাঝখানে ছেলে-মেয়ে। লোকলজ্জা থেকে বাঁচাও।’

তাই হল। কিন্তু ইতিমধ্যে দুজনের মধ্যে সেই যে বিচ্ছেদ ঘটেছিল সে আর বুজল না। এ যেন নেহাত একটা লোক-দেখানো সেতুবন্ধ। সকলে জানল যে আমরা একটি সুখী ও সম্ভ্রান্ত দম্পতি। আমরা জানলুম যে আমাদের মাঝখানে দুস্তর ব্যবধান। অশ্রুজলের সাগর।

ভগবানকে ডেকে কত বার বলেছি, ‘প্রভু, ওকে একটি দিনের জন্যে রূপবতী করো, দিনের আলোর মতো রূপ দাও। চিত্রাঙ্গদাকে দিয়েছিলে একটি বছরের জন্যে, কৃষ্ণাকে দাও একটি দিনের জন্যে।’

হঠাৎ ঘড়ির দিকে নজর পড়ায় নয়নমোহন চমকে উঠলেন।

‘তোমার ওটা কি ঘড়ি না ঘোড়া হে?’

আমি বললুম, ‘ও-ঘড়ি ফাস্ট চলেছে।’

‘কিন্তু আমার আর বেশিক্ষণ থাকা চলবে না। মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। আমরা আজ রাত্রের ট্রেনে যাচ্ছি, যেটা দশটায় ছাড়ে।’

‘আর একটা দিন’, আমি অনুরোধ করলুম, ‘এখানে থেকে গেলে পারতে। তোমার তো চাকরি নেই।’

‘চাকরি নেই, কিন্তু যা আছে তা চাকরির বাড়া। মজদুররা ধর্মঘটের নোটিশ দিয়েছে, এখন গিয়ে তাদের মানভঞ্জন করতে হবে।’

এরপরে তিনি তাঁর কাহিনির খেই ধরলেন।

কৃষ্ণা জানত যে তার রূপের অভাব আমাকে প্রতিনিয়ত পীড়া দিচ্ছে, সেইজন্যে সে প্রাণপণে চেষ্টা করত রূপের অভাব গুণ দিয়ে পূরণ করতে। অন্য কেউ হলে স্নো পাউডার মেখে সং সাজত, নানা রঙের শাড়ি ব্লাউজ পরে প্রজাপতি সাজত। কিন্তু সাজপোশাকের ওপর আমার শ্রদ্ধা ছিল না বলে তারও লক্ষ ছিল না। তার লক্ষ ছিল গুণের ওপর। সে তার লক্ষ্যভেদ করেছিল। তবু আমার মন পায়নি।

এর কারণ রূপের অভাব গুণ দিয়ে পূরণ করা যায় না। রূপের অভাব রূপ দিয়েই পূরণ করতে হয়। তা যে পেরেছে সে অসাধ্যসাধন করেছে। এই অসাধ্যসাধন কৃষ্ণার সাধনা ছিল না। অন্য কোনো সাধনা এর স্থান নিতে পারে না। তাই তার গুণের সাধনা আমাকে জয় করেনি। উমার তপস্যা শিবের মতো বিরূপাক্ষের জন্যে। আমার মতো সুরূপাক্ষের জন্যে নয়। আমার নয়ন যদি সায় না দেয় তো মন সায় দেয় না। মন যদি সায় না দেয় তো দেহ সায় দিতে চায় না। গুণ দিয়ে কি বিকার দূর করা যায়?

আমি যে বিকারবোধ করি একথা তাকে মুখ ফুটে বলিনি। সে বুদ্ধিমতী, নিজেই বুঝে নিয়েছিল; তাই একদিন আমাকে বলেছিল, ‘তুমি আর একটি বিয়ে করো বা যেখানে ইচ্ছা যাও। এমন করে ক-দিন চালাবে।’ এর উত্তরে আমি বলেছিলুম, ‘পরিবারে অশান্তি ডেকে আনতে চাইনে। যেমন চলছে চলুক।’

বস্তুত আমার একদন্ড ফুরসত ছিল না, দিনরাত কাজ আর কাজ। হোসিয়ারির কারখানা খুলেছিলুম, দেখাশোনা করতে হত আমাকেই, শ্লিপিং পার্টনার আমার তিন সম্বন্ধী, ওয়ার্কিং পার্টনার আমি। কখন খাই কখন শুই কিছুই ঠিক নেই। শুধু এই ঠিক যে বছরের শেষে লাভ দেখাতে হবে। লাভ যদি না দেখাতে পারি তো সম্বন্ধীরা টাকা তুলে নেবেন। তখন আমি মূলধন পাব কোথায়?

কৃষ্ণা যখন উপলব্ধি করল যে তার গুণেও সাধনা ব্যর্থ হয়েছে, রূপের সাধনাও সুদূরপরাহত, তখন আমাকে একা রেখে ছেলে-মেয়েসমেত দার্জিলিং চলে গেল। সেখানেই তারা লেখাপড়া শিখবে ও মানুষ হবে। আমি দুঃখিত হলুম, কিন্তু বাধা দিলুম না। ওর একটা পরিবর্তন দরকার। কে জানে হয়তো শীতের দেশে বাস করে রংটা এক পোঁচ ফর্সা হতে পারে।

অকস্মাৎ স্বাধীনতা পেয়ে আমার অবস্থাটা হল বৈপ্লবিক, যেমন হতে যাচ্ছে ভারতবর্ষের। কী যে করি স্বাধীনতা নিয়ে, বহুকালের সঞ্চিত ক্ষুধা নিয়ে, বঞ্চিত জ্বালা নিয়ে—কী যে করি! কী যে করি!

তুমি শুনে অবাক হবে যে কিছুই করলুম না। তার কারণ যা-ই করতে যাই তা-ই মনে হয় তুচ্ছ। মনে হয় এমন কিছু করা উচিত যা কেউ কোনোদিন করেনি, যা উচ্চাদপি উচ্চ। তেমন কিছুর নাগাল পেলে হয়। কাব্যের নায়িকারা হোসিয়ারির কল পরিদর্শন করতে এলে হয়! ট্রয়ের হেলেন, বৃন্দাবনের রাধা, ইরানের লায়লা, চিতোরের পদ্মিনী—কোথায় দেখা পাই এঁদের! কেউ কি এঁরা পথ ভুলে বক্তিয়ারপুর আসবেন না!

তোমার মনে আছে কি না জানিনে, কলেজে আমার প্রিয় কবি ছিলেন টেনিসন আর প্রিয় কবিতা ছিল ‘সুন্দরী নারীদের স্বপ্ন।’ অবশ্য আরও প্রিয় ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ও কালিদাস, কিন্তু টেনিসন একটু বিশেষ অর্থে প্রিয়—ওই ‘সুন্দরী নারীদের’ জন্যেই। হায়! এত যে তাঁদের নাম জপ করলুম, রূপ ধ্যান করলুম, তবু তো তাঁদের কারও করুণা হল না। মেন লাইনে ট্রেন দাঁড়ালেই আমার মনে হত এই ট্রেনেই তিনি এসেছেন, এসে আমাকে খুঁজছেন। সব কাজ ফেলে স্টেশনে ছুটে যেতুম, গিয়ে নিরাশ হতুম। লোকে বলাবলি করত, ‘ফি ট্রেনেই এঁর জানানা আসছেন। বাউরা হয়েছেন।’ আমি কিন্তু ওসব গায়ে মাখতুম না, নিরাশ হলেও যেতুম।

একদিন স্টেশনে গিয়ে দেখি ট্রেন থেকে নামছেন ট্রয় দেশের হেলেন নয়, বৃন্দাবনের রাধা নয়, দার্জিলিঙের কৃষ্ণা। ছেলে-মেয়েদের দার্জিলিঙের বোর্ডিং স্কুলে রেখে এসেছেন, সেখানে তারা সুখে আছে। আমার না-জানি কত অসুবিধা হচ্ছে একথা ভেবে তাঁর অস্বস্তি বোধ হল, তাই চলে এলেন। যাক, আমাকে বাঁচালেন। লোকে স্বীকার করল, না বাউরা নয়। আর আমিও স্বীকার করলুম যে স্বাধীনতার ঝক্কি পোষায় না। তার চেয়ে স্ত্রীর হাতের মোচার ঘণ্ট মিষ্টি।

কিন্তু মোচার ঘণ্ট এবার মিষ্টি লাগল না। দেখা গেল কৃষ্ণা কেবল চিঠি লিখছে বসে। ধরে নিলুম ছেলেমেয়ের জন্যে বড্ড মন কেমন করছে, চিঠি লিখে মনের ভার হালকা করছে। কিন্তু প্রতিদিন ওর নামে একই মানুষের লেখা খামে-বন্ধ চিঠি আসতে দেখে সন্দেহ জাগল কার হাতের লেখা এসব! মেয়েলি হাতের কি না। কয়েক বার ইতস্তত করে ঢোক গিলে জিজ্ঞাসা করলুম তাকে। সে বিনা বাক্যে উত্তর দিল চিঠিগুলো আমার সামনে রেখে।

বিস্ময়! বিস্ময়ের পর বিস্ময়! উর্দু ভাষার একজন উদীয়মান কবি দার্জিলিঙে বসে গজল লিখছেন। সাকি বলে যাকে সম্বোধন করছেন সে আমার কৃষ্ণা। সাকির কাছে নিত্যনূতন গজল আসছে স্বাক্ষরিত হয়ে। প্রেরণাও ফুরোয় না, গজলও ফুরোয় না। বলা বাহুল্য, উর্দু আমরা দুজনেই জানতুম। আমিই শিখিয়েছিলুম কৃষ্ণাকে। স্বয়ং শিখেছিলুম মুসলমান বন্ধুদের কাছে। সে-বিদ্যা যে এভাবে কাজে লাগবে কল্পনা করিনি। হতভম্ব হলুম। কবির নাম হাফিজ দিয়ে আরম্ভ। তাঁকে তাই হাফিজ বলে উল্লেখ করব।

হাফিজ নাকি পতঙ্গের মতো রওশনের রূপমুগ্ধ। রূপের বর্ণনা যা দিয়েছেন তা আমার পক্ষে আবিষ্কার। এত রূপ যে আমার অগোচর ছিল তা বিশ্বাস করা শক্ত। কিন্তু বিশ্বাস না করেও পারিনে। কারণ কবি যা লিখেছেন তা পরিহাসের সুরে নয়। তবে কি একথা সত্য যে আমার চোখে যে রূপহীনা অন্যের চোখে সে রূপসি। এ কি কখনো সত্য যে কুরূপা বলে কেউ নেই, ওটা দৃষ্টিবিভ্রম! বা চোখের ধাঁধা।

তখন আমার মনে পড়ল তোমার উক্তি। ভগবান রূপ সবাইকে দিয়েছেন, দেখবার চোখ দেননি সবাইকে। যাদের দিয়েছেন তারাই শিল্পী, তারা সকলের রূপমুগ্ধ। এই উর্দু কবি একজন শিল্পী। ইনি তাই কৃষ্ণার রূপ দেখে রওশনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। হায়, আমিও যদি শিল্পী হতে পারতুম…! আমার শিল্পরচনার দৌড় বক্তিয়ারপুরের গণেশ মার্কা গেঞ্জি ও হনুমান মার্কা মোজা। ওই চোখে ভগবানের দেওয়া রূপ প্রত্যক্ষ করা যায় না। চোখ দুটোকে বদলে নেওয়া চাই। ভাবলুম, কিছুদিন হনুমান ও গণেশের ধ্যান ছেড়ে গৌরীশংকর ও কাঞ্চনজঙ্ঘা অবলোকন করব। স্ত্রীকে বললুম, ‘চলো আমরা দার্জিলিং যাই। দেখে আসি টুবলুকে টুটুকে।’

আঃ! কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে দু-চোখ জুড়িয়ে গেল। কী করে তার বর্ণনা দেব? আমি তো কবি নই। কিন্তু এও আমি বুঝতে পারিনে যে কাঞ্চনজঙ্ঘার মতো নারী থাকতে কৃষ্ণার মতো নারী কী করে বন্দনা পায়। কবিদের কি সত্যিকারের সৌন্দর্যবোধ আছে? আমার তো মনে হয় না।

হাফিজকে নিমন্ত্রণ করেছিলুম। জরিদার শেরওয়ানি ও চুড়িদার পায়জামা পরে তিনি এলেন, শুনলুম তিনি নবাব ঘরানা। মুর্শিদাবাদে বাড়ি। পরের মুখে নিজের স্ত্রীর রূপবর্ণনা তো শোননি, তুমি কী করে বুঝবে আমার ব্যথা। আমার যা লাগছিল আমিই জানি। শুধালুম, ‘আচ্ছা, এ কি তবে সবই সত্য হে আমার স্ত্রীর ভক্ত…’ মনে আছে তো রবীন্দ্রনাথের সেই কৌতুকের কবিতাটি? ‘চির ভক্ত’কে ‘স্ত্রীর ভক্ত’ করেছি।

কবি বললেন, ‘কাব্যের সত্য জীবনের সত্য এক নয়। যেমন চিত্রের সত্য ফোটোগ্রাফের সত্য এক নয়। এও সত্য, আবার সেও সত্য।’

কৃষ্ণা সেখানে ছিল না, থাকলে হয়তো আঘাত পেত। ইতিমধ্যে তার ধারণা জন্মেছিল সে যথার্থই সুন্দরী। দুই অর্থে। কাব্যে ও জীবনে।

ঘড়ির দিকে চেয়ে নয়নদা চঞ্চল হয়ে উঠলেন। আমি তাঁকে অভয় দিলুম যে ট্রেন ধরিয়ে দেবার দায়িত্ব আমার। তখন তিনি পূর্বানুবৃত্তি করলেন।

দার্জিলিঙে আমার চোখ খুলে গেল। দেখলুম কৃষ্ণার গায়ের রং এক পোঁচ ফর্সা হয়নি বটে, কিন্তু রং ধরেছে ভিতরে। সে যেন এতদিন পরে আপনাকে আবিষ্কার করেছে। আবিষ্কার করেছে সে সুন্দরী। সাতাশ কি আটাশ বছর বয়সে যদি কোনো মেয়ে প্রথম আবিষ্কার করে সে সুন্দরী তাহলে তার সেই আবিষ্কার তাকে বিপ্লবের আস্বাদন দেয়। এ যেন একটা আগস্ট বিপ্লব। হিংসার ক্ষমতা নেই বলে দীর্ঘকাল অহিংসা অনুশীলন করার পর অকস্মাৎ আবিষ্কার করা গেল আমরা হিংসার ক্ষমতা রাখি। দেখছ তো দেশ কেমন রক্তপিপাসায় অধীর হয়ে উঠেছে। যতক্ষণ-না একটা আণবিক বোমা কলকাতায় কী বম্বেতে পড়ছে ততক্ষণ এ পিপাসার নিবৃত্তি নেই।

কৃষ্ণাকে নিয়ে আমার দশা হল মহাত্মার মতো। কী করে তাকে বোঝাই যে তার আবিষ্কারটা কাব্যের সত্য, জীবনের সত্য নয়। যে একথা বোঝাতে পারত সে হাফিজ। হাফিজ ক্রমে দুর্লভ হল, তার চিঠিও একসময় বন্ধ হল। কিন্তু ক্ষতি যা করে গেল তার জের চলতে থাকল। কৃষ্ণা বিশ্বাস করল হাফিজের জবানবন্দি সাচ্চা, আমার জবানবন্দি ঝুটা। আমি তাকে এগারো বছর ধরে ঠকিয়ে এসেছি। আমি প্রবঞ্চক। সে আমার মুখের দিকে ভালো করে তাকায় না, আমিও কেমন যেন অপরাধী বোধ করি নিজেকে। একে তো আমাদের দৈহিক সম্বন্ধ ছিল না, মানসিক সম্বন্ধেও ভাঙন ধরল।

দার্জিলিং থেকে একসাথেই ফিরি। আমি প্রস্তাব করেছিলুম, সে যদি দার্জিলিঙে একা থাকতে চায় তো পারে থাকতে। সে নাকচ করল, বোধহয় লোকনিন্দার ভয়ে। বক্তিয়ারপুরে ফিরে আমি আমার কাজকর্মে ডুব মারলুম। আর সে চলল উজান বেয়ে। বয়স তার দিন দিন কমতে লাগল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কাটায় আয়নার সামনে। চুল বাঁধে, চুল খোলে, আবার বাঁধে। শাড়ি পরে, শাড়ি ছাড়ে, আবার পরে। সাজপোশাকের বাহার ছিল না, শুরু হল। স্নো পাউডার মেখে জুতো পালিশের মতো চেহারা হল। তা হোক, তাতে আমার আপত্তি নেই, যার টাকা আছে সে যদি দু-হাতে ওড়ায় তো আমার কী? কিন্তু মাঝখানে ছেলে-মেয়ে না শোওয়ায় সে একেবারে আমার কোলে এসে শোয়। আশা করে আমি তার রূপ দেখে ভুলব। ক্ষণকালের জন্যে ভুলিনি যে তা নয়, কিন্তু সেটা আমার নিজের দুর্বলতা, তার মাদকতা নয়। সে কিন্তু ধরে নেয় যে তার মধ্যে অপূর্ব মোহিনীশক্তির সঞ্চার হয়েছে। অমনি মোহিনীশক্তির অনুশীলনে রত হয়। এদিকে আমি বিকারবোধে অস্থির। কী করে পরিহার করব ভেবে পাইনে।

আর একটি সন্তান হল, এটি ছেলে। খুব খুশি হলুম দুজনে। আমি বললুম, ‘আর কেন? এখন থেকে পূর্বব্যবস্থা বহাল হোক।’ সে কিছু বলে না, মুচকি হাসে। ছেলের জন্যে ছোট্ট একটা বেবি কট কেনা হল। ছেলেটি সেইখানে শোয়। আর আমি প্রতি রাত্রে রবীন্দ্রনাথের সেই শোচনীয় পঙক্তিগুলি আবৃত্তি করি—

রে মোহিনী রে নিষ্ঠুরা ওরে রক্তলোভাতুরা

কঠোর স্বামিনী

দিন মোর দিনু তোরে শেষে নিতে চাস হরে

আমার যামিনী।

অগত্যা পন্ডিচেরির কথা বলাবলি করতে হল। হিমালয়ে মহাপ্রস্থান করতে পারি আভাসে ইঙ্গিতে জানালুম। কিন্তু কে বিশ্বাস করবে ও-কথা! আমার হোসিয়ারি ফাঁপতে ফাঁপতে টেক্সটাইলের আকার ধারণ করেছিল। কটন মিলের উদ্যোগ আয়োজনে জীবনটা মধুর হয়েছিল। রূপ নাহয় পাইনি, কিন্তু রুপো তো পেয়েছি অজস্র অঢেল। রূপের মায়া আমাকে ধরে রাখতে পারবে না, কিন্তু রুপোর মায়া? দেখা গেল কামিনীর চেয়ে কাঞ্চনের আকর্ষণ কম নয়। থেকে গেলুম কাঞ্চনের টানে। কৃষ্ণা কিন্তু ঠাওরাল কামিনীর টানে। তার মুখে হাসি আর ধরে না। মোহিনীশক্তির জয়।

সেই হাড়িকাঠ থেকে উদ্ধারের উপায় নেই দেখে গুরু ডেকে এনে মন্ত্র নিলুম গার্হস্থ্য সন্ন্যাসের। কৃষ্ণাকে সাধলুম, ‘তুমিও নাও।’ তার চোখ দিয়ে আগুন ছুটল। কী যে হল তার জানিনে, যখন খুশি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় একা, পাড়ায় পাড়ায় গল্প করে বেড়ায় আহার নিদ্রা ভুলে। রাত্রে খুঁজেপেতে ধরে নিয়ে আসি, বন্ধ করে রাখি। চিকিৎসকের পরামর্শে গুরুর অনুমতি নিয়ে স্বামী-স্ত্রী সম্বন্ধ আবার পাতাতে যাই। ফল হয় উলটো। কাতর সুরে বলে, তুমি আমার বাপের বয়সি, তুমি মাননীয় বৃদ্ধ, তোমার কি শোভা পায় এ অধর্ম! আমি নাকি তার বাপের বয়সি! হে হরি! আমি নাকি মাননীয় বৃদ্ধ! হে ঈশ্বর!….

নয়নদা বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন। কাঁদো কাঁদো সুরে বললেন, ‘পাড়ার ঘরে ঘরে গিয়ে আমার নামে রটায় আমি নাকি তাকে সুন্দরী পেয়ে তার উপর বলপ্রয়োগ করি। বুড়ো বয়সে আমার নাকি ভীমরতি ধরেছে। ….ও হো হো। …আমার আর বাঁচতে ইচ্ছা করে না ভায়া। বেলডাঙায় আমাদের দু-নম্বর মিলটা তৈরি হয়ে গেলেই আমি চোখ বুজব।…সবাই বলছে ওকে পাগলাগারদে পাঠাতে। কিন্তু সেটা হবে যথার্থ অধর্ম। না, সে আমি পারব না। কিন্তু এও আমার অসহনীয়, আমার মান গেল, আমি হেয় হয়ে গেলুম লোকচক্ষে।’

আমি তাঁর চোখ মুছিয়ে দিলুম সেকালের মতো। এক হস্টেলে একঘরে বাস করতুম আমরা। রাত কেটে যেত সুন্দরী নারীদের স্বপ্নে। নয়নদার নিশ্চিত প্রত্যয় ছিল সুন্দরী নারী তাঁর ভাগ্যে অবধারিত। সেটা তাঁর জন্মস্বত্ব। জন্মস্বত্বের খন্ডন হল দেখে তিনি কেঁদে আকুল হয়েছিলেন বিশ বছর আগে। চোখ মুছিয়েছিলুম আমরা কয়েক জন বয়স্য।

সান্ত্বনাচ্ছলে সে-বার বলেছিলুম, রূপ ভগবান সবাইকে দিয়েছেন, দেখবার চোখ দেননি সবাইকে। এবার কী বলব? বলার আছে কী?

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments