পরোপকারের বিপদ – শিবরাম চক্রবর্তী

পরোপকারের বিপদ - শিবরাম চক্রবর্তী

আমার বন্ধু নিরঞ্জন ছোটবেলা থেকেই বিশ্বহিতৈষী–ইংরেজীতে যাবে বলে ফিলানথ্রপিস্ট। এক সঙ্গে ইস্কুলে পড়তে ওর ফিলানথ্রিপিজমের অনেক ধাক্কা আমাদের সইতে হয়েছে। নানা সুযোগে দুর্য্যোগে আমাদের হিত করবেই, একেবারে বদ্ধপরিকর–আমরাও কিছুতেই দেব না ওকে হিত করতে। অবশেষে অনেক ধব্বস্তাধ্বস্তি করে, অনেক কষ্টে, হয়ত ওর হিতৈষিতার হাত থেকে আত্মরক্ষা করতে পেরেছি।

হয়ত ফুটবল ম্যাচ জিতেছি, সামনে এক ঝুড়ি লেমনেড, দারুন তেষ্টাও এদিকে–ও কিন্তু কিছুতেই দেবে না জল খেতে, বলেছে, এত পরিশ্রমের পর জল খেলে হার্টফেল করবে।

আমরা বলেছি, করে করুক, তোমার তাতে কি?

জল না খেলেও যে মারা যাব, দেখছ না?

সে গম্ভীর মুখে উত্তর দিয়েছে–সেই ভাল।

তখন ইচ্ছে হয়েছে আরেকবার ম্যাচ খেলা শুরু করি–নিরঞ্জনকেই ফুটবল বানিয়ে। কিম্বা ওকে ক্রিকেটের বল ভেবে নিয়ে লেমনেডের বোতলগুলোকে ব্যাটের মত ব্যবহার করা যাক।

পরের উপকার করবার বাতিকে নিজের উপকার করার সময় পেত না ও। নিজের উপকারের দিকটা দেখতেই পেত বা বুঝি। এক দারুণ গ্রীষ্মের শনিবারের হাফ-স্কুলের পর মাঠের ধায় দিয়ে বাড়ি ফিরছি, নিরঞ্জন বলে উঠল–দেখছ হিরণ্যাক্ষ দেখতে পাচ্ছ?

কী আবার দেখব? সামনে ধূ ধূ করছে মাঠ, একটা রাখাল গরু চরাচ্ছে, দু-একটা কাকা-চিল এদিকে ওদিকে উড়ছে হয়ত এ ছাড়া আর কোনো দ্রষ্টব্য পৃথিবীতে দেখতে পেলাম না। ভাল করে আকাশটা লক্ষ্য করে নিয়ে বললাম–হ্যাঁ দেখেছি, এক ফোঁটা ও মেঘ নেই কোথাও। শিগগির যে বৃষ্টি নামবে সে ভরসা করি না।

ধুত্তোর মেঘ! আমি কি মেঘ দেখতে বলেছি তোমায়? ঐ যে রাখালটা গরু চরাচ্ছে দেখছ না!

নিশ্চয়ই! এই দুপুর রোদে ঘুরলে বেচারাদের মাথা ধরবে না? গরু বলে মাথাই নয় ওদের। মানুষ নয় ওরা? বাড়ি নিয়ে যাক বলে আসি রাখালটাকে সকাল-বিকেলে এক-আধটু হাওয়া খাওয়ালে কি হয় না? সেই হলো গে বেড়ানোর সময়–এই কাটফাটা রোদ্দুরে এখন এ কি?

কিন্তু রাখাল বাড়ি ফিরতে রাজি হয় না–গরুদের অপকার করতে সে বদ্ধপরিকর।

নিরঞ্জন হতাশ হয়ে ফিরে হা-হুঁতাশ করে–দেখছ হিরণ্যাক্ষ, ব্যাটা নিজেও হয়ত মারা যাবে এই গরমে, কিন্তু দুনিয়ার লোকগুলোই এই রকম! পরের অপকারের সুযোগ পেলে আর কিছু চায় না, পরের অপকারের জন্যে নিজের প্রাণষ দিতেও প্রস্তুত!

যখন শুনলাম সেই নিরঞ্জন বড়লোকের মেয়ে বিয়ে করে শুশুরের টাকায় ব্যারিস্টারী পড়তে বিলেতে যাচ্ছে, তখন আমি রীতিমত অবাক হয়ে গেলাম। যাক, এতদিনে তাহলে ও নিজেকে পর বিবেচনা করতে পেরেছে, তা না হলে নিজেকে ব্যারিস্টরী পড়তে পাঠাচ্ছে কি করে? নিজেকে পর না ভাবতে পারলে নিজের প্রতি এতখানি পরোপকার করা কি নিরঞ্জনের পক্ষে সম্ভব?

অকস্মাৎ একদিন নিরঞ্জন আমার বাড়ি এসে হাজির। বোধ হয় বিলেত যাবার আগে বন্ধুদের কাছে বিদায় নিতেই বেরিয়েছিল। অভিমানভরে বললাম- চুপি-চুপি বিয়েটা সারলে হে, একবার খবরও দিলে না বন্ধুদেব? জানি, আমাদের ভালর জন্যই খবর দাওনি, অনেক কিছু ভালমন্দ খেয়ে পাছে কলেরা ধরে, সেই কারণেই কাউকে জানাওনি, কিন্তু না হয় না-ই খেতাম আমরা, কেবল বিয়েটাই দেখতাম। বউ দেখলে কানা হয়ে যেতাম না ত!

কি যে বলো তুমি! বিয়েই হলো না ত বিয়ের নেমন্তন্ন! নিজের উপকার করব তুমি তাই ভেবেছ। আমাকে? পাগল! ভাবছি তোতলাদের জন্যে একটা ইস্কুল খুলব। মুক-বধিরদের বিদ্যালয় আছে, কিন্তু তোতলাদের নেই। অথচ কি পসিবিলিটিই না আছে তোতলাদের!

কি রকম?–আমি অবাক হবার চেষ্টা করি।

জানো? প্রসিদ্ধ বাগ্মী ডিমস্থিনিস আসলে কি ছিলেন? একজন তোতলা মাত্র। মুখে মার্বেলের গুলি রাখার প্র্যাকটিস করে তোতলামি সারিয়ে ফেললেন। অবশেষে, এত বড় বক্তা হলেন যে অমন বক্তা পৃথিবীতে আর কখনো হয়নি। সেটা মার্বেলের গুলির কল্যাণে কিম্বা তোতলা ছিলেন বলেই হলো, তা অবশ্য বলতে পারিনা।

বোধহয় ওই দুটোর জন্যই–আমি যোগ দিলাম।

নিরঞ্জন খুব উৎসাহিত হয়ে উঠল–আমারো তাই মনে হয়। আমিও স্থির করেছি বাংলাদেশের তোতলাদের সব ডিমস্থিনিস তৈরি করব। তোতলা তো তারা আছেই, এখন দরকার শুধু মার্বেলের গুলির। তাহলেই ডিমস্থিনিস হবার আর বাকি কি রইল?

আমি সভয়ে বললাম–কিন্তু ডিমস্থিনিসের কি খুব প্রয়োজন আছে এদেশে?

সে যেন জ্বলে উঠল–নেই আবার! বক্তার অভাবেই দেশের এত দুর্গতি, লোককে কাজে প্রেরণা জাগে না। কেন, বক্তৃতা ভাল লাগে না তোমার?

থামলে ভারি ভাল লেগে যায় হঠাৎ, কিন্তু যখন চলতে থাকে তখন মনে হয় কালারাই পৃথিবীতে সুখী।

আমার কথায় কান না দিয়া নিরঞ্জন বলে চলল–তাহলেই দ্যখো, দেশের জন্যে চাই বক্তা, আর বক্তার জন্যে চাই তোতলা। কেননা ডিমস্থিনিসের মতো বক্তা কেবল তোতলাদের পক্ষেই হওয়া সম্ভব, যেহেতু ডিমস্থিনিস নিজে তোতলা ছিলেন। অতএব ভেবে দয়াখো, তোতলারাই হলো আমাদের ভাবী আশাভরসা, আমাদের দেশের ভবিষয়ৎ।

যেমন করে ও আমার আস্তিন চেপে ধরল, তাতে বাধ্য হয়ে জামা বাঁচাতে আমাকে সায় দিতে হলো।

তোতলাদের একটা ইস্কুল খুলব, সবই ঠিক, তোতলাকে রাজিও করিয়েছি, কেবল একটা পছন্দসই নামের অভাবে ইস্কুলটা খুলতে পারছি না। একটা নামকরণ করে দাও না তুমি। সেইজন্যেই এলাম।

কেন, নাম তো পড়েই আছে–নিঃস্বভারতী,–চমৎকার!–মানে, বাক্য, যাদের নিঃস্ব–কিনা, থেকেও নেই, তারাই হলো গিয়ে নিঃস্বভারতী।

উঁহু ও নাম দেওয়া চলবে না। কারণ রবিঠাকুর ভাববেন বিশ্বভারতী থেকেই নামটা চুরি করেছি।

তবে একটা ইংরিজি নাম দাও–Sanatorium for faltering Tongues (স্যানাটোরিয়াম ফর ফলটারিং টাংস) বেশ হবে।

কিন্তু বড় লম্বা হলো যে।

তাতো হলোই। সেদিন দেখবে, তোমার ছাত্ররা তাদের ইস্কুলের পুরো নামটা সটান উচ্চারণ করতে পারছে, কোথাও আটকাচ্ছে না, সেদিনই বুঝবে তারা পাশ হয়ে গেছে। তখন তারা সেলাম ইকে নিতে পারে। নাম-কে নাম, কোশ্চেন পেপার-কে কোশ্চেন পেপার।

হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। এই নামটাই থাকল।–বলে নিরঞ্জন আর দ্বিতীয় বাক্যব্যয় না করে সবেগে বেরিয়ে পড়ল, সম্ভবত সেই মুহূর্তেই তার ইস্কুল খোলার সু-মতলবে।

মহাসমারোহে এবং মহা সোরগোল করে নিরঞ্জনের ইস্কুল চলছে। অনেকদিন এবং অনেক ধার থেকেই খবরটা কানে আসছিল। মাঝে মাঝে অদম্য ইচ্ছেও হতো একবার দেখে আসি ওর ইস্কুলটা, কিন্তু সময় পাচ্ছিলাম না মোটেই। অবশেষে গত গুড়ফ্রাইডের ছুটিটা সামনে পেতেই ভাবলাম–নাঃ এবার দেখতেই হবে ওর ইস্কুলটা। এ সুযোগ আর হাতছাড়া নয়। নিরঞ্জন ওদিকে দেশের এবং দশের উপকার করে মরছে, আর আমি ওর কাছে গিয়ে একে একটু উৎসাহ দেব, এইটুকু সময়ও হবে না আমার! ধিক আমাকে!

মার্বেলের গুলির কল্যাণে নিশ্চয়ই অনেকের তোতলামি সেরেছে এতদিন। তাছাড়া আনুষঙ্গিকভাবে আরো অনেক উপকার যেমন দাঁত শক্ত, মুখের হাঁ বড়, ক্ষুধাবৃদ্ধি–এসবও হয়েছে। এবং ডিমস্থিনিস হবার পথেও অনেকটা এগিয়েছে ছাত্ররা–অন্ততঃ ডিম পর্যন্ত তো এগিয়েছেই, এবং যেরকম কষে তা দিচ্ছে নিরঞ্জন, তাতে স্থিনিসেরও বেশি দেরি নেই হয়ে এল বলে।

ঠিকানার কাছাকাছি পৌঁছাতেই বিপর্যয় রকমের কলরব কানে এসে আঘাত করল; সেই কোলাহল অনুসরণ করে স্যানাটোরিয়াম ফর ফলটারিং টাস খুঁজে বের করা কঠিন হলো না। বিচিত্র স্বরসাধনার দ্বারা ইস্কুলটা প্রতিমুহূর্তের যেন প্রমাণ করতে উদ্যত যে, ওটা মুক-বধিরদের বিদ্যালয় নয়–কিন্তু আমার মনে হলো, তাই হলেই ভাল ছিল বরং–ওদের কষ্ট লাঘব এবং আমাদের কানের আত্মরক্ষার পক্ষে।

আমাকে দেখেই কয়েকটি ছেলে ছুটে এল–কা-কা-কা-কা-কা-কা-কা-কে চান?

দ্বিতীয়টি তাকে বাধা দিয়ে বলতে গেল–মা-মা-মা-মা–কিন্তু মা-মার বেশি আর কিছুই তার মুখ দিয়ে বরোলে না।

তখন প্রথম ছাত্রটি দ্বিতীয়ের বাক্যকে সম্পূর্ণ করল–মাস্টার বাবা-বা- বা-আমি বললাম কাকাকে, মামাকে কি বাবাকে কাউকে আমি চাই না। নিরঞ্জন আছে?

ছেলেরা পরস্পরের মুখ চাওয়া-চায়ি করতে লাগল। সে কি, নিরঞ্জনকে এরা চেনে না? এদের প্রতিষ্ঠাতা নিরঞ্জন, তাকেই চেনে না! কিম্বা যার যার নাম উচ্চারণ–সীমার বাইরে, তাকে না চেনাই এরা নিরাপদ মনে করেছে?

একজন আধ্যবয়সী ভদ্রলোক যাচ্ছিলেন ঐখান দিয়ে, মনে হলো এই ইস্কুলের ক্লার্ক, তাঁকে ডেকে নিরঞ্জনের খবর জিজ্ঞাসা করতে তিনি বললেন–ও মাস্টারবাবু? এই পর্যন্ত তিনি বললেন, বাকিটা হাতের ইশারা দিয়ে জানালেন যে তিনি ওপরে আছেন। এই জ্বলোকও ভোলা নাকি?

আমাকে দেখেই নিরঞ্জন চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠল–এই যে অ- অনেকদিন পরে! খ-খবর ভাল?

অ্যাঁ? নিরঞ্জনও তেতলা হয়ে গেল নাকি? না ঠাট্টা করছে আমার সঙ্গে? বললাম–তা মন্দ কি! কিন্তু তোমার খবর তো ভাল মনে হচ্ছে না? তোতলামি অ্যাকটিস করছ কবে থেকে?

প্যা-প্যা-পর্যাক-এ্যাকটিস করব কে-কেন? তো-তো-তোতলামি আবার কে-কেউ প্রকটিস করে?

তবে তোতলামিতে প্রমোশন পেয়েছ বলো!

ভাই হি-হি-হিরান্না-ন্না-ন্না-ন্না-ন্না বলতে বলতে নিরঞ্জনের দম আটকে যাবার যোগাড় হলো। অমি তাড়াতাড়ি বললাম–হিরণ্যাক্ষ বলতে যদি তোমার কষ্ট হয়, না হয় তুমি আমাকে হিরণ্যকশিপুই বোলো। কশিপুর মধ্যে দ্বিতীয় ভাগ নেই।

স্বাস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিরঞ্জন বলল–ভাই-হি-হিরণ্যকশিপু, আমার এই স্যাটো টো-টো টো-টো।

এবার ওর চোখ কপালে উঠল দেখে আমি ভয় খেয়ে গেলাম। ইস্কুলের লম্বা নামটা সংক্ষিপ্ত ও সহজ করার অভিপ্রায়ে বললাম–হ্যাঁ, বুঝেছি, তোমার এই স্যানাটোজেন, তারপর?

নিরঞ্জন রীতিমত চটে গেল–স্যানাটোজেন? আমার ইস্কুল হো-হো- হলো গিয়ে স্যা স্যানাটোজেন? স্যানটোজেন তো এ-একটা ও-ও-ওষুধ!

আহা ধরেই নাও না কেন! তোমার ইস্কুলও তো একটা ওষুধ বিশেষ! তোতলামি সারানোর একটা ওষুধ নয় কি?

অতঃপর নিরঞ্জন খুশি হয়ে একটু হাসল। ভরসা পেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম–তা, তোমার ছাত্ররা কদ্দুর ডিমস্থিনিস হলো?

ডি-ডিম হলো!

অর্ধেক যখন হয়েছে, তখন পুরো হতে আর বাকি কি! আমি ওকে উৎসাহ দিলাম।

নিরঞ্জন বিষণ্ণভাবে ঘাড় নাড়ে অ-আর হবে না! মা-মা-মার্বেলেই মুখে রাখতে পা-পারে না তো কি-কি-কি-করে হবে?

মুখে রাখতে পারে না? কেন?

স-স-সব গি-গিলে ফ্যালে!

গিলে ফ্যালে? তাহলে আর তোতলামি সারবে কি করে, সত্যিই ত! তা, তুমি নিজেরটা সারিয়ে ফেল, বুঝলে? রোগের গোড়াতেই চিকিৎসা হওয়া দরকার, দেরি করা ভাল না!

হতাশভাবে মাথা নেড়ে নিরঞ্জন জবাব দেয়-আ-আমার যে ডি-ডি-ডি- ডিসপেসিয়া আছে! হ হ-হজম কোরতে পা-পারবো কেন?

ও, ডিসপেপসিয়া থাকলে তোতলামি সারে না বুঝি?

তা-তা কেন? অ-আমিও গি-গিলে ফেলি!–আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম; নিরঞ্জন বলল, আ আমার কি আর পা-পাথর হ-হজম করবার ব-ব-বয়েস আছে?

তাইত! ভারি মুশকিল ত! তোমার চলছে কি করে? ছেলেরা বেতন দেয় ত নিয়ম মত?

উহুঁ–সব-ফি-ফি-ফ্রি যে! অ-অনেক সা-সাধাসাধি করে আনতে হয়েছে!

তবে তোমার চলছে কি করে?

কে-কেন? মা মা-মা-মার্বেল বেচে? এক একজন দ-দ-দশটা-বারোটা করে খায় রোজ! ওগুলো মু-মুখে রাখা ভা-ভা-ভারি শক্ত।

বটে বিস্ময়ে অনেকক্ষণ আমি হতবাক হয়ে রইলাম, তারপর আমার মুখ দিয়ে কেবল বেরোলো–ব-ব-বল কি!

যেমনি না নিজের কণ্ঠস্বর কানে যাওয়া, অমনি আমার আত্মপুরুষ চমকে উঠল! তাঁ, আমিও তোতলা হয়ে গেলাম নাকি! নাঃ, আর একমুহূর্তও এই মারাত্মক জায়গায় নয়! তিন লাফে সিঁড়ি টপকে ঊর্ধ্বশ্বাসে বেরিয়ে পড়লাম সদর রাস্তায়।

Facebook Comment

You May Also Like