Tuesday, April 23, 2024
Homeথ্রিলার গল্পঅভিশপ্ত দ্বীপে ফ্রান্সিস - অনিল ভৌমিক

অভিশপ্ত দ্বীপে ফ্রান্সিস – অনিল ভৌমিক

ইবু সলোমানের রত্নভাণ্ডার - অনিল ভৌমিক

অতিকায় হাঙরের কামড়ে গুরুতর আহত ফ্রান্সিসের দিন কাটতে লাগল বিছানায় শুয়ে। ফ্রান্সিসের ডান হাঁটুর কাছেমাংস খুবলে নিয়েছিল সেই বড় হাঙরটা। ফ্রান্সিসের দুশ্চিন্তা বেড়েছে। ক্ষত সম্পূর্ণ না সারা পর্যন্ত বিছানায় পড়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই। বয়স্ক বৈদ্য ভেন চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছে। ক্ষত শুকোবার সব রকম ওষুধই ভেন ব্যবহার করছে। তবু ভয় যাচ্ছে না ওর মন থেকে। যদি ক্ষত বিষিয়ে ওঠে? ভেন তিনবেলা ওষুধ দিয়ে যাচ্ছে আর মনে মনে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছে যেন ক্ষত বিষিয়ে না ওঠে। এই আশঙ্কার কথা, এই ভয়ের কথা ভেন কাউকে বলছে না।

ওদিকে ফ্রান্সিসও মনে মনে ওর এই অসহায় অবস্থাটা মেনে নিতে পারছে না। ওর মতো দুঃসাহসী দৃপ্ত যুবক এই ভাবে বিছানায় পড়ে আছে এটা মারিয়াও মেনে নিতে পারছে না। কিন্তু উপায় তো নেই। মারিয়া দিনরাত সেবাশুশ্রূষা করে চলেছে। পাছে মারিয়ার মন দুর্বল হয়ে পড়ে তাই ফ্রান্সিস মুখ বুজে সব জ্বালা-যন্ত্রণা সহ্য করে যাচ্ছে। বন্ধুদের মুখে হাসি নেই। রাতে আর জাহাজের ডেকে নাচ-গানের আসর বসে না। ওরা মাঝে মাঝেই এসে ফ্রান্সিসকে দেখে যায়। নীরবে নিজেদের কাজ করে যায়। ভেনের চিকিৎসার ওপর ওদের গভীর বিশ্বাস। ফ্রান্সিস নিশ্চয়ই সুষ্ঠু হবে। আবার আগের মতোইতরোয়ালের লড়াই চালাতে পারবে।

দিন সাতেকের মধ্যে ফ্রান্সিস খুবই দুর্বল হয়ে পড়ল। ও যদিও সেটা কাউকে বুঝতে দিচ্ছিল না। কিন্তু মনের দুশ্চিন্তা কাটতে চায় না। যদি সত্যিই ও এভাবে মারা যায় তাহলে মারিয়ার কী হবে? বন্ধুরাই বা কী করবে?

আস্তে আস্তে ফ্রান্সিস কিছুটা সুস্থ হল। ভেনের ওষুধ আর মারিয়ার শুশ্রূষায় ফ্রান্সিস দিন পনেরোর মধ্যে হৃতশক্তি অনেকটাই ফিরে পেল। মারিয়া ও ফ্রান্সিসের বন্ধুরা নিশ্চিন্ত হল।

এক সকালে ফ্রান্সিস হ্যারিকে ডেকে বলল, হ্যারি, আমি এখন অনেকটা সুস্থ। আর এখানে পড়ে থেকে কী হবে? জাহাজ ছাড়তে বলল। উত্তরমুখো। দেশের দিকে। হ্যারি শাঙ্কোদের ডেকে বলল সে কথা। সবাই আনন্দে হৈ হৈ করে উঠল। পাল খাটাল। জাহাজ ছেড়ে দিল। কয়েকজন চলে গেল দাঁড়ঘরে। দ্রুত দাঁড় বাইতে লাগল। জাহাজ পূর্ণগতিতে চলল। পালগুলো জোরালো বাতাসে ফুলে উঠল। জাহাজ সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে দ্রুত ছুটল।

ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে হাঁটতে পারছে এখন।

রাত হলে সিঁড়ি বেয়ে আস্তে আস্তে ডেকে উঠে আসে ও। ধীরে ধীরে ডেকে পায়চারি করে। মাস্তুলের ওপর বসে থাকা নজরদার পেড্রোকে ডেকে বলে, পেড্রো, ঘুমিয়ে পড়ো না। নজর রাখো। পেড্রোও গলা চড়িয়ে বলে, তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। রাত জেগে না। তোমার বিশ্রামের, ঘুমোবার খুব দরকার। এ সময় হ্যারিও ডেকে উঠে আসে। দুজনের কথা হয়। জাহাজঠিক দিকে যাচ্ছে কিনা, কবে নাগাদ দেশে পৌঁছোনো যাবে এসব নিয়ে আলোচনা চলে।

দিন পনেরো কুড়ি নির্বিঘ্নেই কাটল। ঝড়-বৃষ্টির মুখে পড়তে হয়নি। কিন্তু ডাঙার দেখা নেই। পেড্রো দিনরাতমাস্তুলের ওপর থেকে চারদিকে নজর রাখছে। কিন্তু চারদিকেই জল। ডাঙার কোনো চিহ্নই দেখতে পাচ্ছেনা।

ফ্রান্সিস এখন একটু খুঁড়িয়ে হলেও মোটামুটি হাঁটাচলা করতে পারছে। মাঝে মাঝে শাঙ্কো বিনেলোর সঙ্গে তরোয়ালের খেলা খেলে। আগের মতো তড়িৎগতিতে অবশ্য চলাফেরা করতে পারছে না। বাঁ পায়ের জোর বেশ কমে গেছে।

জাহাজ চলছে। কিন্তু কোথায় ডাঙা? ফ্রান্সিস, হ্যারি বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ল। ওদিকে জাহাজে পানীয় জল, খাদ্য ফুরিয়ে আসছে। ডাঙায় পৌঁছোতেই হবে। বন্ধুরা পাল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দাঁড় টেনে জাহাজের গতি বাড়াতে লাগল। জাহাজের গতি বাড়ল। কিন্তু ডাঙা চোখে পড়ছে না।

ভাইকিংরা সমুদ্রকে ভালোভাবেই চেনে। আবাল্য দেখে এসেছে এই সমুদ্রকে। ভোরের আবছা কুয়াশায় ঢাকা সমুদ্র তারপর সূর্যোদয়ের সেই অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য। আকাশে সমুদ্রের ঢেউয়ের মাথায় উজ্জ্বল রোদের ঝিকিমিকি পূর্বের আকাশে রক্তিমাভা ছাড়াছাড়া মেঘের গায়ে কত বিচিত্র রঙের খেলা। তার মধ্যে দিয়ে সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য। মাঝিরা তো এসময় ডেক-এ উঠে রেলিং ধরে দাঁড়াবেই। বড় ভালোবেসে এই সূযাস্তের দৃশ্য দেখতে। সন্ধ্যার মুখে দুটো একটা করে তারা ফুটতে থাকে। তারপরে রাত্রির আকাশের বিপুল শূন্যতায় লক্ষ তারারভিড়। ক্ষীণ চাঁদদিনে দিনে পূর্ণতা পায়। পূর্ণিমায় মস্তবড় চাঁদ। আদিগন্ত সমুদ্রের ঢেউয়ের মাথায় জ্যোত্সারঝলকানি। সমুদ্রের হাওয়ায় ভাইকিংরা অনেকেই ডেক-এ এসে শুয়ে বসে থাকে। সারাদিনের কাজ শেষ। আবার কখনও কখনও সমুদ্রের ভয়ঙ্কর রূপও দেখে। ঘন কলো মেঘে আকাশ ঢেকে যায়। আঁকা বাঁকা বিদ্যুৎ মাথার ওপর ঝলসে ওঠে। প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টিঝাঁপিয়ে পড়ে ওদের জাহাজেরওপর। শুরু হয় ঝড়ের তাণ্ডবের সঙ্গে লড়াই। ভাইকিংদের জাহাজের জীবন তো এটাই। এই জীবনই ওদের প্রিয় একান্ত আপন।

এখন কিন্তু ভাইকিংরা বড় চিন্তায় পড়েছে। অনেকদিন হয়ে গেল জাহাজ চলেছে তে চলেছেই। মাটির দেখা নেই। অবশ্য এই অভিজ্ঞতা ওদের কাছে নতুন কিছু নয়। তবু এই সময় ওরা বেশ বিমর্ষ হয়ে পড়ে। কখনও দল বেঁধে, কখনও একা একা জাহাজের রেলিং ধরে। চারপাশে গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে যদি পাহাড়ের মাথায় সবুজ গাছগাছালি দেখা যায়। নজরদার পেদ্যে অবশ্য মস্তুলের ওপর ওর বসার জায়গায় চারদিকে নজর রেখে চলেছে। তবু ভাইকিংদের মন মানে না। সময় পেলেই ডেক-এ এসে রেলিং-এর কাছে দাঁড়িয়ে থাকে। জাহাজে এখন আর নাচ-গানের আসর বসে না। সকলেরই মন খারাপ। শুধু ফ্রান্সিস আর হ্যারি নিরুদ্বেগ। দুজনে কখনও কখনও ডেক-এ উঠে আসে। বন্ধুরা বেশ চিন্তিত মুখে দুজনের কাছে আসে ফ্রান্সিস হেসে ওদের আশ্বস্ত করে। বলে–সমুদ্রে ঘুরে বেড়ানো তোমাদের কাছে নতুন কিছু তোনয়। সাহস হারিও না। এখনও খাদ্য আর পানীয় জলে তেমন টান পড়েনি। নাচগানের আসর বসাচ্ছো না কেন? সিনাত্রার দিকে তাকিয়ে বলে–সিনাত্রা–নতুন নতুন গান বাঁধো। গান গাও। মনে কোন দুর্ভাবনাকে কোনরকম প্রশ্রয় দিও না। ফ্রান্সিসের কথায় বন্ধুরা কিছুটা আশ্বস্ত হয়। সিনাত্রা উৎসাহিত হয়ে বলে ওঠে–ভাই সব–নতুন নতুন গান বেঁধেছি। রাতে শোনাবো। বন্ধুদের মধ্যে একটু উৎসাহের সঞ্চার হয়। কেউ কেউ বলে ওঠে –ঠিক আছে। বসাও নাচগানের আসর।

দিন কাটে। বিকেল হয়। পশ্চিম আকাশে রঙের আলোর বন্যা বইয়ে সূর্য অস্ত যায়। সেই সূর্যাস্ত আর কেউ না দেখুক মারিয়া রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে দেখবেই। সেই সূর্যাস্তের দৃশ্য মারিয়ার কাছে প্রতিদিনই নতুন বলে মনে হয়। দেশ থেকে বাবা-মার কাছ থেকে কত দূরে ক্ষুধা তৃষ্ণায় দুর্বল শরীর তবু মারিয়া সূর্যাস্ত দেখতে আসে। এতে মারিয়া যেন মনে খুব শান্তি পায়। ভুলে থাকতে পারে ক্ষুধাতৃষ্ণার কষ্ট। শরীরের দুর্বলতা।

রাতের খাবার খেয়ে অনেক বন্ধু ডেক-এ উঠে আসে। ডাঙার দেখা নেই। কাজেই ফুরিয়ে আসা-খাদ্য জল খাওয়া সবাই কমিয়ে দিয়েছে। ডাঙায় না পৌঁছানোনা পর্যন্ত — খাদ্য জল না পাওয়া পর্যন্ত বেঁচে তো থাকতে হবে। এটা জানতে পেরে ফ্রান্সিস হ্যারিও খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। কাউকে না জানিয়ে মারিয়াও খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে।

সেদিন পূর্ণিমার কাছাকাছি সময়। নক্ষত্র ছাওয়া কালো আকাশে উজ্জ্বল প্রায় গোল চাঁদ জ্যোৎস্না ছাড়িয়েছে ডেউয়ের মাথায় অনেক দূর পর্যন্ত। হাওয়া ছুটেছে শন্ শন্। জাহাজের ডেকে এসে দাঁড়াল সিনাত্রা। জ্যোৎস্না ধোয়া সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ওর ক্ষুধা তৃষ্ণাকাতর শরীর যেন রোমাঞ্চিত হল। ও চিৎকার করে বলে উঠল –হে পৃথিবী তুমি কী সুন্দর। দুজন চারজন করে অনেকেই ডেক-এ উঠে এল। কিছুক্ষণের মধ্যে ফ্রান্সিসও হ্যারি আর মারিয়াকে নিয়ে ডেক-এ উঠে এল। শাঙ্কো নিয়ে এসেছে একটা খালি পীপে। গান নাচের সঙ্গে তাল দেবে বলে। দাঁড়িয়ে থাকা সিনাত্রার চারপাশে গোল হয়ে বসল সবাই। সিনাত্রা ওর সুরেলা কণ্ঠে গান ধরল–

স্বদেশ তুমি স্বদেশেই থাকো।
আমি তো সারা বিশ্বের।
এই সাগরই আমার ঘরবাড়ি।
এই সাগরই আমার মা
এই মায়ের কোলই আমার শেষ শয্যা।

নাচের গান নয়–টানা বড় সুন্দর সুরের গান। সিনাত্রার সুরেলা কণ্ঠের গান চলল। শাঙ্কো পীপে হাত ঠুকে বাজাতে ভুলে গেল। মারিয়ার চোখে তো জল এসে গেল। হ্যারিও মুখ নিচু করে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। ঘিরে বসা বন্ধুদেরও মন বিষণ্ণ হল। ফ্রান্সিস একবার চারদিকে তাকিয়ে নিল। বুঝল সিনাত্রার কণ্ঠের জাদুতে গানটা বড় সুন্দর। কিন্তু এই বিষাদের গান সুর মনকে দুর্বল করে দেয়। ফ্রান্সিস বলে উঠল-সিনাত্রা আনন্দের গান গাও, সুখের গান গাও। জানো তো –দেশের পাহাড়ি এলাকায় যখন বরফ গলে গিয়ে প্রথম কচিকচি সবুজ ঘাস গজিয়ে ওঠে–মেষ পালকেরানবজীবনের গান গাইতে গাইতে ভেড়ার পাল নিয়ে যায়, সেই আনন্দ উল্লাসের গান গাও! সিনাত্রা হেসে বলল, বেশ। আবার সিনাত্রা গান ধরল

কিন্তু রাজকুমারী নই। তোমাদের মতই একজন। মারিয়া একটু অভিমানের সুরে বলল।

–এটা ভালো করেই জানি। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল

মারিয়া–এরকম কথা তোমাকে আগে কোনদিন বলিনি। আজ কেন বললাম জানোবাবা-মার জন্যে দেশের কথা ভেবে ভেবে এতদিন পরে তোমার মন অনেক দুর্বল হয়ে গেছে। তাই তোমার মনে সাহস জোগা। ক্ষুধাতে তৃষ্ণার সঙ্গে লড়াই করতে যাতে মনকে শক্ত রাখতে পারো তাই এসব কথা বলা। রাজকুমারী বলে তোমাকে এসব কথা বলিনি। মারিয়া কিছুক্ষণ ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল –তুমি আগে থেকে অনেককিছু ভেবে রাখো।

নইলে আমাদের আর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী বলা হয় কেন। যাক গে–শোন– আমাদের এখন সাবধান হবার সময় হয়েছে। তুমি হ্যারিকে এখানে আসতে বলল। আমি এখন সিঁড়ি দিয়ে বেশি ওঠানামা করতে চাই না। পা দুটোকে যথাসাধ্য বিশ্রাম দিচ্ছি। মারিয়া উঠে হ্যারিকে খবর দিতে চলল।

অল্পক্ষণের মধ্যেই হ্যারি এল। বলল কী হয়েছে ফ্রান্সিস? তোমাকে বেশ চিন্তিত মনে হচ্ছে।

–স্বাভাবিক। জাহাজে খাদ্যাভাব, জলের অভা চলছে। কিছুদিনের মত খুব ভেবে চিন্তে আমাদের চলতে হবে।

–এসব তো নতুন কিছু নয়। এই সমস্যা তো এর আগে হয়েছে। হ্যারি বলল।

–হ্যাঁ। ডাঙায় পৌঁছেতেই হবে। খাদ্য চাই, জল চাই।

–কিন্তু কী করবে? ফ্লেজার তো অভিজ্ঞ হাতেই জাহাজ চালাচ্ছে। পেড্রো মাস্তুলের ওপর থেকে দিনরাত নজর রেখে চলেছে। ও না অসুস্থ হয়ে পড়ে।

–আমরাও অসুস্থ হয়ে পড়তে পারি। এখন আমরা যাতে আরো কিছুদিন সুস্থ থেকে, চি, ডাঙার সন্ধান করতে পারি তার ব্যবস্থা করতে হবে। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল– রাতের খাবার খেয়ে সবাইকে ডেক-এ আসতে বলে। আমার কিছু বলার আছে।

বেশ বলছি। হ্যারি চলে গেল।

রাতের খাওয়া শেষ হল। ভেন বাদে আর সব ভাইকিং বন্ধুরা জাহাজের ডেক-এ উঠে এল।

মেঘমুক্ত আকাশে অনেক তারার ভিড়। সারাদিন গুমোটের পর জোর হাওয়া ছুটেছে। আধভাঙা চাঁদের আলো পড়েছে সমুদ্রের জলের ঢেউয়ের মাথায়। সবাই জড়ো হতে ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে ডেক-এ উঠে এল। পেছনে মারিয়াও এল।

ফ্রান্সিস বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে গলা চড়িয়ে বলতে লাগল।–ভাই সব। আমরা খাদ্য ও পানীয় জলের সমস্যার মুখোমুখি পড়েছি। এরকম সমস্যায় এর আগেও পড়েছি। তখন দেখা গেছে জল কষ্ট সহ্য করতে না পেরে বুদ্ধি হারিয়ে দু-একজন সমুদ্রের নোনা জল খেয়েছে। তারপরেই যা হওয়ার হয়েছে। বমি করেছে, মাথা ঘুরে পড়ে গেছে। কষ্ট বেড়েছে আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। আমি প্রথমেই সাবধান করে দিচ্ছি-দাঁত চেপে জল তেষ্টা সহ্য করবে। সমুদ্রের নোনা জল খাবে না। এতে খুব কষ্ট হবে। কিন্তু ক্ষুধার সঙ্গে জল তেষ্টার সঙ্গে লড়াই করার বাড়তি শক্তি শরীরে থাকবে। ফ্রান্সিস থামল।

সবাই নিশ্চুপ। শুধু দুরন্ত বাতাসের শন শন শব্দ শোনা যাচ্ছে। সব বন্ধুরা মনেযোগ দিয়ে ফ্রান্সিসের কথা শুনতে লাগল ফ্রান্সিসের ওপর ওদের অগাধ বিশ্বাস। ওরা জানে বিপদের মুখে ফ্রান্সিস কক্ষণো বিচলিত হয় না। বরং আরো বেশি ধীর স্থির হয়। অবশ্য তরোয়ালের লড়াই চালাবার সময় কিন্তু ফ্রান্সিসের অন্য রূপ। দৃঢ় মুখ। চোখে শ্যোন দৃষ্টি। টান টান শরীর। ফ্রান্সিস বলতে লাগল ভাইসব — জাহাজে অল্প দিনের মধ্যেই ভীষণ খাদ্যাভাব জলের অভাব দেখা দেবে যদি না এর মধ্যে আমরা ডাঙায় পৌঁছে খাদ্য ও পানীয় জলের ব্যবস্থা করতে পারি। তাই বলছি কাল থেকে যতট পারো কম খাবার খাবে আর কম জল খাবে। অন্তত ডাঙার সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত। নজরদার পেড্রো রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে নজর রেখে চলেছে। ডাঙার দেখা আমরা পাবোই। আমরা বীরের জাতি। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় অসহায়ভাবে মৃত্যু আমরা মেনে নেবনা। আমার যা বলার বললাম। আমার বিশ্বাস আমরা আমাদের সঙ্কল্পে অটল থাকতে পারবো। ফ্রান্সিস থামল। উৎসাহিত বন্ধুরা ওদের সংকল্পের ধ্বনি তুলল ও-হো-হো… মৃদুস্বরে কথা বলতে বলতে সবাই সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসতে লাগল। শুধুশাঙ্কো বিনেলো আর অন্য দুএকজনকে নিয়ে ডেক-এর ওপর শুয়ে পড়ল। বৃষ্টি না হলে শাঙ্কো বরাবর ডেক-এ শুয়ে ঘুমোয়। তবে ঘুমের মধ্যেও ও সজাগ থাকে। বলা যায় না– পেড্রোর নজর এড়িয়ে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে ওঠা কোন জলদস্যুদের ক্যারাভেন একেবারে কাছে চলে আসতে পারে। বিদেশি লোকরাও নৌকোয় চড়ে এসে ওদের আক্রমণ করতে পারে। সে সময় শাঙ্কোরা চিৎকার করে বন্ধুদের ঘুম। ভাঙিয়ে সেই অতর্কিত আক্রমণের মোকাবিলা করতে পারবে।

ফ্রান্সিস হ্যারিক সঙ্গে নিয়ে জাহাজ চালক ফ্লেজারের কাছে এল। বলল–ফ্লেজার। দিকঠিক রেখেই চালাচ্ছে তো!

-হ্যাঁ হ্যাঁ। ফ্লেজার মাথা কাত করে বলল।

জাহাজের গতি কেমন? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।

দিনের বেলা বাতাস পড়ে গিয়েছিল। সন্ধ্যের পরই বাতাসের জোর বেড়েছে। এখন গতিবেগ ভালোই।

জাহাজ উত্তর পশ্চিম দিকে চালাচ্ছো তো? ফ্রান্সিস বলল।

–হ্যাঁ। আমাদের দেশ তো ঐদিকেই। ফ্লেজার বলল।

–কিন্তু ফ্লেজার আমরা পথ হারাই নি তো?

—খুব জোর দিয়ে বলতে পারছি না। কারণ কোন দ্বীপে বা দেশের অংশেনা পৌঁছাতে পারলে কিছুই বুঝতে পারছি না। একটু দ্বিধার সঙ্গে ফ্লেজার বলল?

-কিন্তু আমি বন্ধুদের কী বললাম শুনেছো তো?

–হ্যাঁ। শুনেছি। ফ্লেজার বলল।

জাহাজে খাদ্য ও জলের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। কাজেই যে করে তোক ডাঙায় আমাদের পৌঁছাতে হবে। সে কোন জঙ্গলেই তোক বা পাহাড়ি এলাকায়ই হোক। জঙ্গলে পৌঁছলে খাবার মত ফলটল পাবো। পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছলে ঝর্ণার জল পাবো। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল–উত্তর পূর্ব নয়–সোজা পূর্ব দিকে জাহাজ চালাও। দেশের দিকে নয়। জাহাজের মুখ ঘোরাও। আগে তো প্রাণে বাঁচি দেশে পৌঁছতে না হয় কিছুদিন দেরিই হোক।

–বেশ। জাহাজের মুখ ঘোরাচ্ছি। ফ্লেজার বলল।

জাহাজ চলল। সব ভাইকিং বন্ধুরা, ফ্রান্সিস মারিয়াও কম খাবার কম জল খেতে লাগল।

দিন যায়। রাত যায়। নজরদার পেড্রোর চোখে ঘুম নেই। বিশ্রাম নেই ওর। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি খুঁজছে গাছপালার আভাস। মাটি পাহাড়। কিন্তু সে সবের দেখা নেই। এক বেলা খাওয়া আর সামান্য জল খাওয়া চলল। সবাই বেশ দুর্বল হয়ে পড়ল। মারিয়া তো খাওয়া প্রায় ছেড়েই দিল।

–হ্যাঁ হ্যাঁ। এইমাত্র খিয়ে এলাম। ফ্রান্সিস আর কিছু বলে না।

সেদিন সূর্যাস্ত দেখবে বলে মারিয়া জাহাজের ডেক-এ উঠে এল। সূর্য পশ্চিম দিগন্তে অনেকটা নেমে এসেছে। দক্ষিণ দিকে তাকাতেই মারিয়ার বুক কেঁপে উঠল। দক্ষিণ দিগন্ত থেকে ঘন কালো মেঘ এসেছে। বেশ দ্রুতই উঠে আসছে মাঝ আকাশের দিকে। বাতাস পড়ে গেছে। রোদের তেজ অনেক কমে গেছে। শাঙ্কোর উচ্চস্বর শোনা গেল–ভাই সব, ঝড় আসছে? তৈরি হও। ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকি শুরু হল। কিন্তু সকলেরই শরীর আধপেটা খেয়ে সামান্য জল খেয়ে খেয়ে বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই দুর্বল শরীর নিয়েই ঝড় বৃষ্টির সঙ্গে লড়তে হবে। অনেকেই বেশ চিন্তায় পড়ল।

দক্ষিণ আকাশ থেকে ঘন কালো মেঘ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মাঝ-আকাশে উঠে আসতে লাগল। সূর্য ঢাকা পড়ে গেল। অন্ধকার হয়ে এল আকাশ সমুদ্র। অন্ধকার আকাশ চিরে শুরু হল আঁকাবাঁকা বিদ্যুতের ঝলকানি। ভাইকিংরা দ্রুত পাল নামিয়ে ফেলল। দাঁড় বাওয়া আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সবাই ডেক-এ এসে জড়ো হল। প্রচণ্ড ঝড়ের সঙ্গে ওরা লড়তে অভ্যস্ত। ঝড়ের প্রথম ধাক্কাটা সামলাবার জন্যে সবাই মাস্তুলের পালের কাঠের দড়িদড়া ধরে তৈরি হল। কিন্তু আধপেটা খেয়ে তৃষ্ণায় দুর্বল সবাই। ওদের নির্ভীক মনে একটু সন্দেহের অনুভূতিও জাগল। এই দুর্বল শরীরে কতক্ষণ লড়তে পারবে ঝড়ের সঙ্গে। হ্যারি ছুটে এল শাঙ্কোদের কাছে। চিৎকার করে বলল শাঙ্কো শিগগির নিচে যাও কয়েকজন। তিনটে জলের পীপেই নিয়ে এসো। ডেক-এ রাখো। যতটা সম্ভব বৃষ্টির জল ধরে রাখে। এই সুযোগ কাজে লাগাও। পানীয় জলের সমস্যাটা কিছু দিনের জন্যে মেটানো যাবে। শাঙ্কোরা তিন চারজন ছুটল সিঁড়ির দিকে খালি জলের পীপে আনতে।

দেখতে দেখতে প্রচণ্ড জোরে ঝড় ঝাঁপিয়ে পড়ল। জাহাজের ওপর। ঝড়ের প্রথম ধাক্কায় জাহাজটা কাত হয়ে গেল। পরক্ষণেই সোজা হল। শুরু হল বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি। বিদ্যুতের ঝলকানি আর বাজ পড়ার মুহুর্মুহু গম্ভীর ধ্বনি আর মুষলধারে বৃষ্টি। দুর্বল শরীর নিয়েও ভাইকিংরা ঝড়বৃষ্টির সঙ্গে লড়াই চালাল। দু’চারজনের দড়িধরা হাতের মুঠি ঝড়ের ঝাপটায় আলগা হয়ে গেল। ছিটকে ডেক-এর ওপর পড়ে গেল। হাঁপাতে হাঁপাতে পরক্ষণেই উঠে এসে দড়ি চেপে ধরতে লাগল। ঝড়ের তাণ্ডব চলল।

ভাইকিংদের সৌভাগ্য বলতে হবে ঝড়বৃষ্টি বেশিক্ষণ চলল না। বৃষ্টি আস্তে আস্তে কমে গেল। ঝড়ের ঝাপটার তীব্রতাও কমল। বিদ্যুৎ ঝলকানি আর বজ্রনাদ অবশ্য চলল কিছুক্ষণ।

আস্তে আস্তে মেঘ কেটে গেল। বিদ্যুতের ঝলকানি বন্ধ হল। বন্ধ হল বজ্রধ্বনি। আকাশ পরিষ্কার হল। পশ্চিম আকাশে ডুবে গেছে সূর্য। কমলা রঙের আভা তখনও লেগে আছে পশ্চিম দিগন্তের কাছে। একটা দুটো করে তারা ফুটতে লাগল।

দুর্বল শরীর নিয়ে অসহ্য ক্লান্তিতে বেশ কয়েকজন ভাইকিং ডেক-এর ওপর শুয়ে রইল। বৃষ্টিতে ভেজা সসপে পোশাক গায়ে। শাঙ্কোরা কয়েকজন পীপের কাছে ছুটে এল। দেখল–বেশ বৃষ্টির জল জমেছে পীপে তিনটেতে। ওদের মুখে হাসি ফুটল। হ্যারি এসে পীপের জল দেখে বলে উঠল সাবাস শাঙ্কো। শাঙ্কোরা কয়েকজন পীপে তিনটে কাঁধে নিয়ে সিঁড়ির দিকে চলল। যাক কিছুদিনের জন্যে খাবার জলের সমস্যা মিটল।

জাহাজ চলল। কিন্তু সেই এক ঘেয়েমি সীমাহীন জলরাশি চারদিকে। ডাঙার দেখা নেই। পেড্রো মাস্তুলের মাথায় নিজের জায়গায় বসে চারদিকে নজর রাখছে। কিন্তু কোথায় ডাঙা? কোথায় মাটি পাহাড় সবুজের ছোঁয়া। পেড্রোকে দুপুরে খাওয়ার সময় এক ডাকা হয়। রাতে তো খাওয়া বন্ধ। পেড্রো তাড়াতাড়ি নেমে আসে। খেয়ে নিয়েই আবার নিজের জায়গায় গিয়ে বসে। তৃষ্ণায় জল পাচ্ছে ঠিকই। কিন্তু খাওয়া তো সামান্য। দুর্বল শরীরেও বড় ক্লান্তি নেমে আসে। দিনের বেলা খেয়ে এসে নিজের ছোট্ট গোল ঘরের জায়গায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেয়। তারপরেই শুরু হয় সারারাত জেগে তীক্ষ্ণ নজরদারি। কিন্তু ডাঙা কোথায়? ডাঙার দেখা নেই।

এদিকে ভাইকিংদের প্রায় না খেয়ে দিন কাটছে। খিদে অসহ্য হয়ে উঠলে ওরা পেট ভরে জল খাচ্ছে। এতে খিদেটা কমছে। ফ্রান্সিস থেকে শুরু করে সবারই এই অবস্থা। কিন্তু ফ্রান্সিস মারিয়াকেসতর্ককরে দিয়েছেএই বলে তোমাকে পেটপুরে খেতেইহবে। উপোষকরে থাকা তোমার চলবে না। উপোস করে থাকার অভ্যেস তোমার নেই। তাহলে তুমি অসুস্থ হয়ে পড়বে। আমাদের বিপদ সমস্যা আরো বেড়ে যাবে। মারিয়া অবশ্য হেসে বলেছেনা না। আমি দুবেলাই পেট পুরে খাচ্ছি। তুমি আমার জন্য ভেবো না। কিন্তু মারিয়া আধ পেটা তো খাচ্ছেই না। মাঝে মাঝে না খেয়েও দু’তিন দিন কাটিয়ে দিচ্ছে। দুপুরে রাতে খাওয়ার সময় কেবিন ঘর থেকে বেরিয়ে ডেক-এ উঠে আসে। সময় কাটায়। তারপর কেবিন ঘরে এসে ঢোকে। ফ্রান্সিস একই দুর্বলস্বরে জিজ্ঞেস করে খেয়ে এসেছো তো?

হ্যাঁ হ্যাঁ। এই তো খেয়ে এলাম। হ্যারি কিন্তু মারিয়ার এই ফাঁকি একদিন ধরে ফেলল। যেটুকু খাবার জুটেছে তা খাবার সময় খাবার ঘরে ও মারিয়াকে দেখতে পাচ্ছিল না। দুদিন আগে হ্যারি তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে নিঃশব্দে ডেক-এ উঠে এসেছিল। দেখল মারিয়া রেলিং ধরে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। হ্যারি কোন কথা না বলে নিঃশব্দে নেমে এল। পরিষ্কার বুঝতে পারল রাজকুমারী মাঝে মাঝে উপোষ করে থাকছে। এটা ফ্রান্সিসকে বুঝতেও দিচ্ছে না। কারণ তাহলে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ফ্রান্সিসের উদ্বেগ বাড়বে। ফ্রান্সিসের। ক্ষতি হবে।

সেদিন দুপুরে মারিয়া কেবিন ঘরে ঢুকতে ফ্রান্সিস যে সামান্য খাবার খাচ্ছিল তাই খেতে খেতে বলল–

-কী খেয়ে এলে?

–হ্যাঁ। মারিয়া মাথা কাত করে বলল।

–ভালো করে খেয়েছে তো? ফ্রান্সিস তবু বলল।

–হ্যাঁ হ্যাঁ। মারিয়া মৃদু হেসে বলল।

এবার শুয়ে পড়ো। বিশ্রাম করো। ঘুমোও। মারিয়া শুয়ে পড়ল। না খেয়ে থাকতে থাকতে খিদের বোধটাই যেন নেই আর। কোনদিন তো খিদে কাকে বলে ও জানতো না। ক্ষুধার্ত মানুষের ঘুম আসতে চায় না। এই সত্যটা মারিয়া এবার জানতে পারল। সত্যি। ক্ষুধার্ত মানুষেরা ঘুমিয়ে একটুশান্তি পাবে তারও উপায় নেই। ফ্রান্সিস চোখ বুজে চুপ করে শুয়েছিল। একই কারণে ওরও ঘুম আসছিল না। কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে মারিয়া উঠে পড়ল। বলল–বড্ড গরম লাগছে। একটু ডেক-এ হাওয়া খেয়ে আসি। মারিয়া ডেক-এ উঠে এল। ফ্রান্সিস অবশ্য সিঁড়ি দিয়ে বেশি ওঠানাম করে না। শুয়ে থাকে।

ডেক-এ উঠে এসে মারিয়া দেখল আকাশ মেঘ শূন্য। শেষ বিকেলে সূর্য পশ্চিম দিগন্তে অনেকটা নেমে এসেছে। অস্ত যেতে খুব বেশি দেরি নেই। আকাশে রোদ উজ্জ্বল। চারপাশে সমুদ্রের জলের মাথায় রোদের ঝিকিমিকি। তখনই কানে এল মাস্তুলের ওপর থেকে নজরদার পেড্রোর চিৎকার ভাই সব ডাঙা ডাঙা দেখা যাচ্ছে। বাঁদিকে। ক্ষুধার্ত ভাইকিংদের কারো চোখে ঘুম নেই। কেবিনঘরে ডেক-এর ওপরে শুয়ে ছিল সবাই। ফ্লেজার নিঃশব্দে জাহাজের হুইল ধরে ছিল। পেড্রোর চিৎকার করে বলা কথা অনেকের কানেই গেল। ডেক-এ শুয়ে থাকা মাস্তুলের গায়ে ঠেস দিয়ে বসে থাকা শাঙ্কোরা কেবিন ঘর থেকে অন্য বন্ধুরা ছুটে এসে ডেক-এ জড়ো হল। রেলিং ধরে দাঁড়াল। বিকেলের আলোয় মারিয়া আর অন্য বন্ধুরা দেখল ডানদিকে–তীর ভূমি। একটা কালো রঙের টিলা মাথা উঁচিয়ে আছে। তার নিচে বিস্তৃত সবুজ বনভূমি। উঁচু উঁচু গাছ ঝোঁপ ঝাড়। ফ্লেজার জাহাজের তীরভূমির দিকে চালাতে লাগল। হ্যারি শাঙ্কোকে ডেকে বলল–যাও ফ্রান্সিসকে খবর দাও। উপবাস ক্লিষ্ট মানুষগুলোর মধ্যে যেন নবজীবনের সঞ্চার হল। যাক খাদ্য জল তো পাওয়া যাবে।

জঙ্গলা জায়গাটার পরেই দেখা গেল বিস্তীর্ণ বালিয়াড়ি ঢালু হয়ে সমুদ্রের তীরে নেমে এসেছে। একটা ছোট বন্দর মত। একটা ছোট জাহাজ নোঙর করা আছে। বালিয়াড়ির পরেই দুধারে পাথরের কাঠের শুকনো ঘাসপাতার ছাউনি নিয়ে সারি দিয়ে কিছু বাড়ি ঘর। ফেরি জাহাজ চালাতে চালাতে ফ্লেজার সমুদ্রের জলের গভীরতা আন্দাজ করে বুঝল এখানে তীর ভূমিতে জাহাজ ভেড়ানো যাবে। কিন্তু ফ্রান্সিস আজও ডেক-এ উঠে আসে নি। ফ্রান্সিস আসুক। ফ্লেজার আস্তে আস্তে জাহাজ থামাল।

তখন ফ্রান্সিস সাবধানে সিঁড়ি দিয়ে উঠে এসেছে। রেলিং ধরে দাঁড়ানো মারিয়া হ্যারিদের ভিড়ের কাছে এল ও। ফ্রান্সিসকে দেখে হ্যারি তাড়াতাড়ি ওর কাছে ছুটে এল। বলল কী করবে?

দাঁড়াও। আগে সব দেখি টেখি। ফ্লেজারের কাছে চলো। দুজনে ফ্লেজারের কাছে এল।

–ফ্লেজার কী মনে হয়? এখানে জাহাজ ভেড়ানো যাবে? ফ্রান্সিস বলল।

মনে হয় যাবে। একটা জাহাজও নোঙর বাঁধা দেখছি। তার মানে এখানে জাহাজ ভেড়ানো হয়। একটা ছোট খাটো বন্দরই বলা যায়। ফ্লেজার বলল।

–ঠিক আছে। এখনই ভিড়িও না। ভালো করে আগে সব দেখি। দুজনে রেলিং এর কাছে এল। রেলিং ধরে দাঁড়াল। শেষ বিকেলের আলোয় দেখা গেল বেশ কয়েকটা দেশীয় নৌকাও বাঁধা আছে ঘাটে। তীরে ওখান থেকেই বালি ভরা পথ মত চলে গেছে বাড়ি ঘরগুলোর মাঝখান দিয়ে পশ্চিম মুখো। কিছু লোকজন দেখা গেল–কিছু দূরে বালি ভরা রাস্তায় তাদের হাতে কোন অস্ত্রশস্ত্র নেই। বোঝা গেল সাধারণ মানুষ যোদ্ধা নয়।

–এখন নামবে? হ্যারি ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল।

না। জাহাজ ঘাটের চেয়ে একটু দূরেই থাকুক। সন্ধ্যে হতে বেশি দেরি নেই। আমরা তৈরি হয়ে নামতে নামতে সন্ধ্যা হয়ে যাব। অন্ধকার নেমে আসবে। অজানা অচেনা জায়গা। কোন দ্বীপনা দেশের অংশ তাও জানি না। কী ধরনের লোক এরা জানি না। সকালে নেমে গিয়ে কথা বলা যাবে। তখন জানা যাবে এটা কোন দ্বীপ বা কোন দেশের অংশ কিনা। কোন যোদ্ধাটোদ্ধা তো দেখা গেল না। তবু সাবধান থাকা ভালো। একটা জায়গা যখন তখন নিশ্চয়ই রাজাটাজা নয় তো কোন উপজাতির সর্দার গোছের কেউ আছে।

–তাহলে কাল সকালে নামবে। হ্যারি জিজ্ঞাসা করল।

–হ্যাঁ। ফ্রান্সিস মাথা ওঠানামা করল।

–কিন্তু ফ্রান্সিস–বলছিলাম–ক্ষুধা তৃষ্ণা নিয়ে কত দিন কাটছে আমাদের তার তো হিসেব নেই। আমাদের কথা ছেড়ে দাও। রাজকুমারীও যে কতদিন না খেয়ে আছেন তুমি তা জানো না। হ্যারির কথা শেষ হতেই মারিয়া চমকে উঠে বলল–হ্যারি।

একবার ভালো করে রাজকুমারীর শুকনো রোগাৰ্ত মুখের দিকে চেয়ে দেখ। হ্যারি মৃদুস্বরে বলল।

–হ্যারি কী বলছো সব? ফ্রান্সিস অবাক হয়ে গেল।

ফ্রান্সিস এবার মারিয়ার মুখের দিকে তাকাল। সত্যিই রাজকুমারীর মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে। চোখের নিচে বেশ কালচে ভাব। ফ্রান্সিস একটু ক্ষুব্ধস্বরে বলল–তাহলে তুমি আমাকে মিথ্যে কথা বলেছো। হ্যারি বিব্রত হল। বলে উঠল–

–ফ্রান্সিস মাননীয়া রাজকুমারী কক্ষণো মিথ্যে কথা বলেন না। কিন্তু তুমি যাতে উদ্বিগ্ন না হও তুমি যাতে তাঁর স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিশ্চিন্ত থাকো তাই তিনি তোমাকে মিথ্যে বলতে বাধ্য হয়েছেন। রাজকুমারীর কোন দোষ নেই।

ফ্রান্সিস আর কোন কথা বলল না। হ্যারি বলল–তাই বলছিলাম যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের অন্তত কয়েকদিনের মত খাদ্য জল সংগ্রহ করতে হবে। বলা যায় না এখন আমরা যদিহঠাৎ আক্রান্ত হই এত দুর্বল শরীর নিয়ে আমার সর্বশক্তি দিয়ে তরোয়াল চালাতে পারবো না।

–ঠিক আছে। বলো কী করতে চাও। ফ্রান্সিস শান্তভাবে বলল। যতখানি খাদ্য জল সংগ্রহ করা সম্ভব আজকে সন্ধ্যের মধ্যেই তা এখান থেকে জোগাড় করতে হবে। হরি বলল।

–হ্যাঁ। তবে দু’তিনজন নয়। শাঙ্কো একা যাবে। আমাদের নৌকায় চড়ে। যতটা পারে খাদ্য নিয়ে আসবে। জল যা আছে আরো কয়েকদিন চলে যাবে। হ্যারি বলল। ফ্রান্সিস শাঙ্কোর দিকে তাকাল।

আমি একাই যাবো। কাজ সেরে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পালিয়ে আসবো। শাঙ্কো বলল।

-তোমার উপর সেই বিশ্বাস আছে আমার শাঙ্কোর। ফ্রান্সিস বলল।

ভিড় ভেঙে গেল সবাই চলে এল। দু’একজনের সঙ্গে শাঙ্কো রেলিং ধরে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে দূরের লোকজন দেখতে লাগল। দেখল ঐ লোকজনদের মাথার চুল লম্বা। উঁচু করে চুড়ো বাঁধা। কয়েকজনকে দেখল খালি গা। গলায় ঝুলছে লাল সূতোর মোটা মালা মত। পরনে মোটা কাপড়ে নানারঙের সূতো দিয়ে ফুল পাতা ভোলা। প্রায় ঐ রকম লম্বা চুল উঁচু করে চুডোর মত বাঁধা। শাঙ্কো মাথা নিচু করে ছক ভেবে নিল। তারপর দ্রুতপায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে ফ্রান্সিসের কেবিন ঘরে নেমে এল। ফ্রান্সিস বিছানায় বসে ছিল। মারিয়া মাথার চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে ফ্রান্সিসের সঙ্গে কথা বলছিল। দুজনেই শাঙ্কোর দিকে তাকাল।

শাঙ্কো বলল রাজকুমারী আপনার ফুলপাতা আঁকা একটা গাউন আছে না? মারিয়া অবাক। বলল- তো। ওটা কোমরের কাছেকাটুন আর নিচেরনীল কাপড়ের ঝালরটা কেটে ফেলুন। মারিয়ার বিস্ময় আরো বাড়ল। কিন্তু মারিয়া কিছু বলার আগেই শাঙ্কো বলল পরে সব বলবো। আমি আসছি।

-কিন্তু আমি তো এখন সূর্যাস্ত দেখতে যাবো। মারিয়া বলল।

–আজকে না হয় নাই গেলেন। কাজটা সেরে রাখুন। তাড়াতাড়ি সারতে হবে সব। শাঙ্কো দ্রুতপায়ে বেরিয়ে গেল।

কিছু পরে শাঙ্কো দু’টো বস্তা নিয়ে ফিরে এল।

দেখল রাজকুমারী সেই গাউনটা বের করে কাঁচি দিয়ে কাটছে। ফ্রান্সিস বলল– উঁহু। শাঙ্কো একটা বস্তা নিয়ে যাও। দুটো বস্তা কাঁধে নিয়ে দ্রুত ছুটতে পারবে না। আর বিপদ আঁচ করলেই সব ফেলে পালিয়ে আসবে।

–কিন্তু আটা চিনি তো আনতে হবে। শাঙ্কো বলল।

না আনতে পারলেও আর কয়েক দিন না খেলে মরে যাবো না। কিন্তু তোমার জীবনের মূল্য আমার কাছে অনেক। একটা বস্তাই নিয়ে যাও। চিনি পেলে যতটা পারো আটার সঙ্গেই মিশিয়ে নিয়ে আসবে।

-বেশ। তোমার কথার অবাধ্য হবো কী করে। ততক্ষণে মারিয়ার পোশাক কাটা হয়ে গেছে। টানা কাটায় মারিয়ার অভিজ্ঞ হাত। সেই বিচিত্র পোশাকটা নিয়ে শাঙ্কো চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে খালি পায়ে ঐবিচিত্র পোশাকটা পরেশাঙ্কো এল। মারিয়া তাই দেখে না হেসে পারলে না। এবার শাঙ্কো বলল রাজকুমারী–এবার আমার মাথার চুল। চুড়ো করে বেঁধে দিন। শাঙ্কোর চুল বেশ বড় বড়। জাহাজের জীবন। নিয়মিত তো চুল দাড়ি কাটা হয় না। মারিয়া আজও কিছু বুঝে উঠতে পারল না। হাসি মুখে শাঙ্কোকে বসিয়ে মাথার চুল আঁচড়ে চুড়ো করে বেঁধে দিল। শাঙ্কো উঠে দাঁড়াতে ঐ চুড়ো করে : বাঁধা চুল আর ঐ বিচিত্র পোশাক খালি গা দেখে মারিয়া মুখে হাত চাপা দিয়ে খিলখিল শ করে হেসে উঠল। ফ্রান্সিসও হাসি না চাপতে পেরে হেসে উঠল।

এবার আপনার মাথার চুল বাধার মোটা লাল ফিতে থাকলে দিন। মারিয়া হাসতে হাসতে ওর চামড়ার ঝোলা থেকে একটা লাল রঙের ফিতে বের করে দিল। শাঙ্কো গিট দিয়ে ওটা গলায় ঝোলালো। মারিয়া আবার হেসে উঠল। মারিয়াকে হাসতে দেখে ফ্রান্সিসের খুব ভালো লাগল। মারিয়া খুব খুশি হলে ঐ রকম খিখি করে হেসে ওঠে। ফ্রান্সিস বলল–মারিয়া শাঙ্কোর এরকম অদ্ভুত সাজে সাজার কারণ আছে। শাঙ্কো খুব বুদ্ধিমান। শাঙ্কো হেসে বলল-রাজকুমারী তীরে কয়েকজন মানুষকে এরকম পোশাক পরে চলাফেরা করতে দেখেছি। এই পোশাকে তাদের সঙ্গে মিশে গেলে অনেক সহজে কার্যোদ্ধার করতে পারবো চলি।

শাঙ্কো ডেক-এর উঠে এল। ওর বন্ধুরা ওকে এই পোশাকে মাথায় চুড়ো করে বাঁধা চুল দেখে হেসে গড়াগড়ি। শাঙ্কো গম্ভীর মুখে দড়ির মই বেয়ে ওদের বাঁধা নৌকোটায় নেমে এল। দড়ির বাঁধন খুলে দাঁড় তুলে নিল। নৌকো চালাল তীর-ভূমির দিকে তখন সূর্য অস্ত গেছে। তবে অন্ধকার খুব গাঢ় হয়নি। নৌকো তীরে ভিড়ল। শাঙ্কো নৌকোটা টেনে তীরের বালির ওপর তুলে রাখল জোয়ার এলেও ভেসে যাবার আশঙ্কা রইল না।

তারপর আবছা অন্ধকারে বালির ওপর দিয়ে আস্তে হেঁটে চলল ঘরবাড়িগুলোর দিকে। কাঁধে নিল বস্তাটা। বস্তা মত কিছুকয়েকজনের কাঁধে দেখেছিল। কয়েকটা দোকান মত পেল। মোটা সূতোয় বোনা কাপড়-টাপড়ের দোকান। মাটির দুচার রকম পাত্রের দোকান। এ সব পার হয়ে দেখল একটা বড় মোটা হলুদ সূতোয় তৈরি বস্তা রাখা একটা দোকান। সব দোকানের সামনেই ততক্ষণে ছোট মশাল মত জ্বালা হয়েছে। কিছু দোকান। বন্ধও দেখল। সেই বস্তা রাখা দোকানে গিয়েশাঙ্কো দেখল বস্তায় আটা ময়দা আর ছোট ছোট দানামত কিছু রাখা। ওসব সেদ্ধ করে খাওয়া হয়। শাঙ্কোকে কারো বিদেশী বলে মনেই হল না। ওর মুখ আবছা অন্ধকারে ভালো দেখা যাচ্ছে না। শাঙ্কো গাঁট থেকে দুটো সোনার চাকতি চুল চুড়ো করে বাঁধা দোকানিকে দেখাল। তারপর সোনার চাকতি দেখে দোকানি খুব খুশী। হাত বাড়িয়ে সোনার চাকতিটা নিল। তারপর একটা কাঠের পাত্র দিয়ে মেপেমেপে শাঙ্কো মেলে ধরা বস্তায় আটা চিনি ঢেলে নিল। এবার শাঙ্কো আঙ্গুল দিয়ে দানা মত জিনিসটার বস্তা দেখাল। দোকানি হেসে সে সব এক পাত্র দিল। শাঙ্কো সব নিয়ে বস্তাটা কাঁধে তুলতেই একজন ওদেশীয় লোক অদ্ভুত ভাষায় শাঙ্কোকে কিছু জিজ্ঞেস করল। শাঙ্কো হেসে মুখের সামনে আঙুল ছোঁয়ালো। অর্থাৎ ও বোবা। শাঙ্কো আর দাঁড়ালে না। বালি ভরা রাস্তায় নেমে এল। ওপাশে তাকাতেই দেখল একটা বুড়ো পাঁচ ছটা বড় বড় বুনো মুরগী নিয়ে বসে আছে। কতদিন পেট পুরে মাংস খাওয়া হয় না। শাঙ্কো বুড়োটার কাছে গেল। মুরগী গুলোর পায়ে দঁড়ি বাঁধা। শাঙ্কো বুঝল। সব কটা মুরগী নেওয়া যাবে না। ও আবার গাঁট থেকে একটা ছোট সোনার চাকতি বের করে বুড়োকে দিল। বুড়োঝুঁকে পড়ে ঐ চাকতি সোনার বুঝতে পেরে মুখ তুলে ফোকলা মুখে হাসল। শাঙ্কো বস্তা নামিয়ে চারটে মুরগীর পাগুলো দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধল। তারপর বস্তা কাঁধে তুলে নিয়ে দড়ি বাধা মুরগীগুলো ঝুলিয়ে সমুদ্রের দিকে চলল। শুরু হল মুরগীগুলোর কোকরকে ডাক। শাঙ্কো নির্বিঘ্নেতে সমুদ্র তীরে পৌঁছল। আবছা অন্ধকারে দেখল নোঙর করা জাহাজটা জনশূন্য। ঢেউয়ের ধাক্কায় দুলছে। নৌকো টেনে জলে নামিয়ে বস্তা মুরগীগুলো রাখল। তারপরদাঁড় তুলে নিয়ে নৌকো চালাল। কয়েকজন ডেক-এ ছিল তারা মুরগীর ডাক শুনল। তাড়াতাড়ি সেই কজন ছুটে এল। নৌকো বেঁধে শাঙ্কো দড়ির সিঁড়ি বেয়ে ডেক-এর কাছে উঠে এল। বন্ধুরা ধরাধরি করে বস্তাটা নামল। মুরগীগুলো নিয়ে ছুটল সিঁড়ির দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভাইকিংদের মধ্যে সাড়া পড়ে গেল। শাঙ্কো খাবার দাবার তো এনেছেই সঙ্গে বড় বড় চারটে বুনো মুরগীও এনেছে।

রাতে পেট ভরে খেল সবাই। আটা চিনি আর ঐ দানাগুলো মিশিয়ে যে খাবার রাঁধুনি বন্ধু তৈরি করল তার স্বাদই হল আলাদা। রাঁধুনি বন্ধুটির খুব প্রশংসা করল সবাই। কতদিন পরে পেট ভরে খেল সবাই।

রাতে রান্না করা খাবার কাঠের থালায় করে রাধুনি ফ্রান্সিসের কেবিন ঘরে এল। ফ্রান্সিস বলল-রাজকুমারীর খাবারও এখানে দিয়ে যাও। ওকে আমার সামনে খেতে হবে। রাঁধুনি মারিয়ার খাবারও দিয়ে গেল। মাংস অবশ্য দুটুকরোর বেশি কেউ পেল না। তবু সুস্বাদু রান্না। খাওয়া শেষ করে মারিয়া বলল–যাই আরো দুটো মোটা রুটি নিয়ে আসি।

যদি বাড়তি থাকে তবেই এনো। ফ্রান্সিস বলল।

রুটি দুটো খাওয়া হলে মারিয়া বলল-রাঁধুনি বন্ধুর রান্নার হাত এত ভালো যে এই অদ্ভুত রান্নাও কী সুস্বাদু হয়েছে।

–তা ঠিক। তবে খিদের মুখে রান্না করা সব কিছুরই স্বাদ বেড়ে যায়। ফ্রান্সিস মৃদু হেসে বলল। তখনই হ্যারি এল। ফ্রান্সিস বলল হ্যারি পেট ভরে খেয়েছো তো?

–হ্যাঁ হ্যাঁ। শাঙ্কো সত্যিই বুদ্ধিমান। হ্যারি হেসে বলল।

–আমি সেটা ভালো করে জানি। ফ্রান্সিস বলল।

–এই পাঁচ মিশেলি রান্না আমার তো কেকেএর মত খেতে লাগল। মারিয়া বলল। ফ্রান্সিসআর হ্যারি দুজনেই হেসে উঠল। মারিয়া একটু মনক্ষুণ্ণ হয়ে বলল–যা প্রশংসার আমি নির্দ্বিধায় তার প্রশংসা করে থাকি।

মাননীয় রাজকুমারী আমাদের মাপ করবেন। হ্যারি বলল।

যাক গে– ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি এই সম্বন্ধে আমাদের কোন ধারণাই নেই। এখানকার অধিবাসী কারো সঙ্গে আমাদের একটা কথাও হয়নি কাজেই রাতের অন্ধকারে ওরা যদি দল বেঁধে আমাদের জাহাজে আক্রমণ করে আমরা বিপদে পড়বো। কাজে নজরদার পেড্রোকে বলো গে–ও যেন সজাগ থাকে।

পেড্রোর ওপর ভরসা রাখো। হ্যারি হেসে বলল।

-ভরসা তো রাখতেই চাই। কিন্তু আগে দু-তিনবার ও আমাদের সাংঘাতিকবিপদে ফেলেছিল।

–তা ঠিক। যা হোক অনেকদিন পরে পেট ভরে খেয়ে সত্যিই আজ শরীরটা অনেক স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। ফ্রান্সিস বলল হ্যারি–দেখবে আজ রাতে ঘুমও ভালো হবে। ক্ষুধার্ত মানুষের ঘুম আসতে চায় না। তন্দ্রামত আসে। ক্ষুধা মানুষকে কী অস্থির করে তোলে কী দুর্বল করে শরীরে যেন সাড় থাকেনা, –এটা যার অভিজ্ঞতা নেই সে কিছুবুঝবেনা। আমার তো মনে হয়–মানুষের ক্ষুধার অভিজ্ঞতা থাকা উচিত। কয়েকদিন হলেও। তাহলেই সে ক্ষুধার্ত মানুষকে ঠিক বুঝতে পারবে। তখন আমরা সবাই কাছাকাছি আসতে পারবো। পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল হবো। সব মানুষকে ভালোবাসতে পারবো। উপলব্ধি করতে পারবো সবার দুঃখ বেদনা। ফ্রান্সিস তুমি এসব ভাবো? একটু অবাক হয়ে হ্যারি বলল।

ভাবি বৈ কি। কত দেশ দ্বীপ তো ঘুরলাম, কত রাজা সুলতানকে তো দেখলাম। আবার দুঃখী অজ্ঞানী মানুষও দেখেছি। ক্ষুধার্ত মানুষও দেখেছি। মনের মধ্যে কোথাও তাদের কথা ঠাই নিয়েছিল। তাই মানুষের ক্ষুধার কথা উঠতেই সেই সব অভিজ্ঞতা ভিড় করে এল। ফ্রান্সিস মৃদু হেসে বলল।

–কিন্তু সত্যিই তোক্ষুধার্তমানুষের ক্ষুধা দূরকরার সাধ্য আমাদেরকতটুকু? হ্যারিবলল।

–যতটা পারি। নইলে আমরা আর মানুষ কীসে। ফ্রান্সিস বলল। একটু চুপ করে থেকে বলল–ফ্রান্সিস তুমি শুধু দুঃসাহসী অভিযাত্রীই নও অনেক কিছু ভাবো তুমি। যাকগে রাত বাড়ছে। চলি। হ্যারি চলে গেল। মারিয়া এতক্ষণ ফ্রান্সিসের কথাগুলো খুব। মন দিয়ে শুনছিল। হ্যারি চলে গেলে বলল–ফ্রান্সিস তুমি অনেককিছু ভাবো। ফ্রান্সিস হেসে বলল-ঘুমিয়ে পড়ো। দেখবে আজ রাতে কী নিটোল ঘুম হয়। সকালে নিজেকে মনে হবে যেন অন্য মানুষ। পরিতৃপ্ত সুখী–কোন ক্লান্তি নেই শরীরে।

কতদিন পরে ভাইকিংরা পেট ভরে খেতে পেল। সারারাত গভীর ঘুমে কাটল। শুধু নজরদার পেড্রোর চোখে ঘুম নেই। তীরভূমির দিকে তো বটেই সমুদ্রের দিকেও আধভাঙা চাঁদের ম্লান আলোর মধ্যে দিয়ে তাকিয়ে থেকে রাত কাটল পেড্রোর। নির্বিঘ্নেই কাটল রাতটা। এখানকার অধিবাসীরাও জাহাজে আক্রমণ চালাল না। ওদিকে সমুদ্রের দিক থেকেও কোন আক্রমণ হল না।

ভোর হল। ঘুম ভেঙে ফ্রান্সিসের প্রথম চিন্তাই হল তীরে নামতে হবে। জানতে হবে কোথায় এলাম। এখানকার লোকেরাই বা কেমন। সবচেয়ে বড় কাজ যথেষ্ট খাদ্য ও পানীয় জল সংগ্রহ করা। সকালের জলখাবার খেয়েই ও শাঙ্কো আর বিনেলোকে ডেকে পাঠাল মারিয়াকে দিয়ে। শাঙ্কো আর বিনেলো এল। ফ্রান্সিস বলল–তোমরা তৈরী হয়ে এসো। তীরে নামবো। সব খোঁজ খবর নিতে হবে।

–তরোয়াল নিয়ে যাবো? শাঙ্কো বলল।

না। আমরা তো লড়াই করতে যাচ্ছি না। খোঁজ খবর করতে যাচ্ছি। ফ্রান্সিস বলল।

–কিন্তু আমি তো বেশি খাদ্য আনতে পারিনি। জল তো ফুরিয়ে এসেছে। শাঙ্কো বলল।

–হ্যাঁ জানি। কিন্তু এখনই আমরা বস্তা পীপে নিয়ে যাবো না। এখনও তো জানি না কাদের মধ্যে কী অবস্থায় গিয়ে আমরা পড়বো। বিপদের আশঙ্কা নেই বুঝলে তখন খাদ্য জলের জন্যে যাবো। যাও। ফ্রান্সিস বলল। শাঙ্কোরা চলে গেল।

অল্পক্ষণের মধ্যে তৈরি হয়ে ফ্রান্সিস ডেক-এ উঠে এল। দেখল আকাশ পরিষ্কার। চারদিক উজ্জ্বল রোদে ভেসে যাচ্ছে। শাঙ্কো আর বিনেলো তৈরী হয়ে ওর জন্যে অপেক্ষা করছে। হ্যারি এগিয়ে এল। বলল। আমি যাবো?

–না হ্যারি। তিনজনই ভালো। বিপদে পড়লে সুযোগ বুঝে পালাতে সুবিধে হবে। তরোয়াল তো নিয়ে যাচ্ছিনা। লড়াই-টড়াইয়ে কোন ভাবে জড়াবো না। ফ্রান্সিস বলল।

–কিন্তু ফ্রান্সিস –জীবন বিপন্ন হলে? হ্যারি আশঙ্কা প্রকাশ করল।

–তখন আত্মরক্ষার জন্যে লড়াই করতে হবে। কিন্তু এখন অস্ত্রশস্ত্র না নিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ফ্রান্সিস বলল।

ফ্রান্সিস জাহাজ চালক ফ্লেজারের কাছে এল।

ফ্লেজার হুইলের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।

– ফ্লেজার জাহাজ তীরে ভেড়াও। আমরা নামবো। ফ্লেজার গিয়ে হুইল ধরল। আস্তে আস্তে জাহাজটা চালিয়ে তীরে ভেড়াল। শাঙ্কো আর বিনেলো ধরে ধরে কাঠের লম্বা পাটাতনটা তীরের বালিভরা মাটিতে নামাল। পাটাতন দিয়ে তিনজনে তীরে নামল।

সামনেই বালিয়াড়ি এলাকা। তিনজনে বালির ওপর দিয়ে হেঁটে চলল। বালিতে পা বসে যায়। আস্তে আস্তে হাঁটতে হচ্ছিল। রোদের তাপ তখনও বাড়েনি। হাওয়ার তোড়ে কিছু ধুলো বালি উড়ছিল। কিছুদূর যেতে দেখল বাড়ি ঘরদোর শুরু হয়েছে। দু পাশে মাঝখান দিয়ে বালি ভর্তি বাস্তু মৃত চলে গেছে পশ্চিমমুখো। এখানে স্থানীয় লোকজনের ভিড়। দোকানে দোকানে কেনাকাটা চলছে। বোঝা গেল এইটা বাজার এলাকা। স্থানীয় লোকজনের মাথায় লম্বা লম্বা চুল। চুড়ো করে বাঁধা। ঢোলা হাতা নানা রঙের সূতো দিয়ে ফুলপাতা তোলা ঢোলা হাতা পোশাক। কিছু লোকের গায়ে কিছু নেই। গলায় মোটা সূতোর মালার মত। এখন শাঙ্কোর গায়ে জাহাজী পোশাক বাজারের লোকজন অনেকেই বেশ অবাক চোখে বিদেশি পোশাক পরা ফ্রান্সিসদের দেখতে লাগল। বুঝল না এরা কোথা থেকে এসেছে। কেনই বা এসেছে।

-শাঙ্কো– আটা চিনির দোকান কোথায়? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।

–চলো দেখাচ্ছি। আটা চিনির দোকানের সামনে এল ওরা।

–ঠিক আছে। এবার জল কোথায় পাওয়া যায় দেখি চলো। বিছুটা এগোতে দেখল, একটা লোক দুটো ভেড়া খুঁটিতে বেঁধে রাস্তার পাশে বসে আছে। ফ্রান্সিস এগিয়ে লোকটার কাছে গেল। কিনতে হবে ভেড়া দুটো। শাঙ্কোকে বলল–ছোট্ট চাকতি আছে তো?

হ্যাঁ হ্যাঁ। শাঙ্কো কোমরের গাঁট থেকে দেখে দেখে একটা ছোট সোনার চাকতি বের করল। লোকটা সোনার চাকতি দেখে খুব খুশি। বিদেশি লোকগুলো ভাল দাম দেবে। তখনই শাঙ্কো চাপাস্বরে বলে উঠল ফ্রান্সিস ডানদিকে দেখ। ফ্রান্সিস আড়চোখে তাকিয়ে দেখল তিনজন যোদ্ধা ঘোড়ায় চেপে এদিকেই আসছে। বোধ হয় টহল দিতে বেরিয়েছে। যোদ্ধাদের গায়ে আটোসাঁটো সবুজ রঙের মোটা কাপড়ের পোশাক। বেশ ভারিকির ভঙ্গি। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বল–ওদের দিকে তাকিও না। ফ্রান্সিস ভেড়াওয়ালার সঙ্গে সোনার চাকতি দেখিয়ে ইঙ্গিত করতে লাগল। ফ্রান্সিস ঝুঁকে পড়ে দামের ইঙ্গিত করছিল। কিন্তু ওদের গয়ে বিদেশি পোশাক। যোদ্ধাদের সজাগ দৃষ্টি ওরা এড়াতে পারল না। এগিয়ে এসে ওদের দলপতি গোছের দাঁড়িগোঁফওয়ালা যোদ্ধাটি ঘোড়ায় বসেই ঐ দেশী ভাষায় কিজিজ্ঞেস করল ফ্রান্সিসরা কথাটা কানেই তুলল না। শাঙ্কো কথাটা আন্দাজে বুঝে নিয়ে বলল–আমরা ভাইকিংদের দেশ থেকে এসেছি। শাঙ্কো স্থানিয় ভাষায় কথাটা বলল। দলনেতা এবার ভাঙা ভাঙা স্পেনীয় ভাষায় বলল তোরা কেন এসেছিস? ফ্রান্সিস মুখ ঘুরিয়ে বলল–বেড়াতে। তারপর বেশ তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে একটা ভেড়ার গলায় বাধা দড়ি খুলতে লাগল। এই উপেক্ষাটা দলপতির সহ্য হল না। ওকে সকলে সমীহ করে ভয় করে আর এই বিদেশি ভূতটা ওর দিকে তাকাচ্ছেইনা? হেঁকে বলল–অ্যাই আমার দিকে তাকিয়ে বল। ফ্রান্সিস তাকাল না। ক্ষেপে গিয়ে যোদ্ধাটা কোমরের খাপ থেকে দ্রুত তরোয়ালটা খুলল। তরোয়ালের ডগাটা ফ্রান্সিসের কাঁধের কাছে চেপে এক টান। দিল। পোশাক কেটে গেল। একটু কেটে রক্ত বেরিয়ে এল। রক্ত দেখে ফ্রান্সিসের মাথায় রাগ চড়ে গেল। শাঙ্কো ফ্রান্সিস বুঝল সেটা। বাধা দেবার আগেই লাফিয়ে ফ্রান্সিস উঠে, দলপতির তরোয়াল ধরা হাতে জোর করে কামড়ে ধরল। এরকম হতে পারে দলপতি বোধ হয় স্বপ্নেও ভাবে নি। সঙ্গের যোদ্ধা দুজনও অবাক। ওরা এই কাণ্ড দেখে কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। শাঙ্কো চাপাস্বরে ডাকল –ফ্রান্সিস। ফান্সিস কামড় ছেড়ে দিল। কামড়ে দলপতির হাত থেকে রক্ত বেরিয়ে এল। হাত থেকে তরোয়াল খসে নিচের বালিতে পড়ল। দলপতি ব্যথায় চোখমুখ কুঁচকে ক্ষতস্থান চেপে ধরল। ফ্রান্সিস দ্রুত হাতে নিচু হয়ে তরোয়ালটা তুলে নিল। তারপর মাথা নিচু করে ঘোড়াটার পেটে জড়িয়ে বাধা আসনের মোটা দড়িটায় তরোয়াল চালাল। দড়িটা কেটে গেল। ঘোড়াটার পেটটাও বেশ কিছুটা কেটে গেল। রক্ত পড়তে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে চিহি চিহি ডেকে উঠে ঘোড়াটা লাফিয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে আসনসুদ্ধদলপতি নিচে বালির ওপর গড়িয়ে পড়ল। চোখের নিমেষে এত ঘটনা ঘটে গেল। আহত ঘোড়া ছুট লাগাল। সঙ্গী যোদ্ধা দুজন হতবাক হয়ে দেখছিল এসব। ওরা এবার তৎপর হল। ঘোড়া থেকে লাফ দিয়ে নেমে এসেই খাপ থেকে তরোয়াল খুলল। ফ্রান্সিসের দিকে ছুটে গেল। ওদের আক্রমণ করার আগেই ফ্রান্সিস তরোয়াল উঁচিয়ে ওদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। শুরু হল দুজনের সঙ্গে একজনের লড়াই। ফ্রান্সিস এগিয়ে পিছিয়ে নিপুণ হাতে তরোয়াল চালাতে লাগল। দুই যোদ্ধাই ফ্রান্সিসের তরোয়ালের আচমকা মার ঠেকাতে ঠেকাতে বুঝল এ বড় কঠিন ঠাই। ফ্রান্সিসের সঙ্গে তরোয়ালের লড়াই করা দুঃসাধ্য। ওদিকে দলপতি আহত হাত কোমরের কাপড়ের ফেট্টি খুলে বাঁধতে বাঁধতে এই লড়াই দেখতে লাগল। এবার শাঙ্কো লক্ষ্য করল ফ্রান্সিস সেই আগের মত বিদ্যুৎগতিতে এদিক ওদিক সরে গিয়ে লড়াই চালাতে পারছে না। কারণটা বোঝাই যাচ্ছে। ফ্রান্সিসের বাঁ পায়ের দুর্বলতা, শাঙ্কো বিনোলার দিকে তাকিয়ে সখেদে বলল ঈস্ত বোয়ালটা আনতে হত। ও উদ্বিগ্ন স্বরে গলা চড়িয়ে বলল– ফ্রান্সিস আমাকে তরোয়ালটা দাও। দুটোকেই নিকেশ করবো। না তাহলে আরো বিপদে পড়বো। ফ্রান্সিস হাত থেকে তরোয়াল ফেলে দিয়ে দুহাত তুলে চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল–লড়াই নয়। শাঙ্কো অবাক হয়ে ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ফ্রান্সিস–যে কোনদিন তরোয়ালের লড়াইয়ে কারো কাছে হার স্বীকার করেনি যার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে কত ধুরন্দর লড়াইয়ে হয় মারা গেছে নয় তো মাথা নিচু করে হার স্বীকার করেছে। সেই আশ্চর্য ক্ষমতার অধিকারী। ফ্রান্সিস আজ হার স্বীকার করল। দঃখে বেদনায় শাঙ্কোর দু’চোখ জল ভিজে গেল। যোদ্ধা দুজন তরোয়াল নামিয়ে তখন হাঁপাচ্ছিল। ফ্রান্সিস শাঙ্কোর দিকে তাকিয়ে শাঙ্কোর মনের অবস্থা বুঝতে পারল। অল্প হাঁপাতে হাঁপাতে মৃদুস্বরে ফ্রান্সিস বলল শাঙ্কো আমি এখনও সম্পূর্ণ সুস্থ নই। অনর্থক ঝুঁকি নেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

ওদিকে দলপতি তখন এগিয়ে এল। ফ্রানিসের ফেলে দেওয়া তরোয়ালটা তুলে নিয়ে খাপে ভরতে ভরতে দাঁত চেপে বলল–তোকে কয়েদখানায় ঢোকাবার ব্যবস্থা করছি। চ। ফ্রান্সিসরা কেউ কোন কথা বলল না। দলপতি যোদ্ধাদের দিকে তাকিয়ে বলল, নিয়ে চল সব কটাকে। ফ্রান্সিসের তরোয়ালের ঘা খাওয়া ঘোড়াটার লাগাম ধরে নিয়ে এল। কেউ ঘোড়ায় উঠল না। দলপতি ধমকের সুরে বলল–চ বিদেশি ভূতের দল। মজা দেখাচ্ছি।

সামনে ফ্রান্সিসরা পেছনে ঘোড়ার লাগাম ধরে সবাই পশ্চিমমুখো চলল। হাঁটতে হাঁটতে শাঙ্কো মৃদুস্বরে বল ফ্রান্সিস-বড্ড রেগে গিয়েছিলে।

তুই তুই করছিল। মেজাজ ঠিক থাকে? ফ্রান্সিসও মৃদু স্বরে বলল দুধারে ছাড়া ছাড়া বাড়ি ঘর। পাথর কাঠের। ঘাসপাতার ছাউনি। এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে মেয়ে পুরুষ বাচ্চা-কাচ্চা অনেকেই অপরিচিত পোশাকপরা ফ্রান্সিসদের দেখতে লাগল। এটা বুঝল যে এই বিদেশিরা নিশ্চয়ই কোন অপরাধ করেছে। দলপতি এদের তাই রাজা জোস্তাকের রাজদরবারে বিচারের জন্য নিয়ে যাচ্ছে। সবাই যেন কিছুটা ভীত। রাজা জোস্তাকের পাল্লায় যখন পড়েছে তখন এদের কপালে দুঃখ আছে। ওদের মুখের ভাব লক্ষ্য করে ফ্রান্সিসও বুঝল বেশ বিপদেই পড়তে হল।

রাস্তায় বালিভরা রাস্তা শেষ হয়ে মাটির রাস্তা শুরু হল। রোদের তেজ বাড়ল। গা শর ঘেমে উঠছে। তবে দূরের সমুদ্র থেকে হাওয়া আসছিল অবাধেই। তাই হাঁটতে হাঁটতে বিনোলা ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল–তাহলে আমরা বিপদে পড়লাম।

–বিপদ তো যে কোন সময় আসতে পারে। দেখা যাক এরা আমাদের কোথায় নিয়ে যায়। তবে আমাদের আদর করে অতিথি আবাসে রাখবে না এটা ঠিক। ফ্রান্সিস মৃদু স্বরে বলল। ওরা হেঁটে চলল। ঘোড়ার লাগাম ধরে ধরে দলপতি আর যোদ্ধা দুজনও চলেছে। ওরা কোন কথাই বলছে না।

কিছু দূরে দেখা গেল বেশ কিছু বাড়িঘর তারপরেই একটা লম্বাটে বড় বাড়ি। পাথরের চাঙড় গেঁথে তৈরি। বাড়িটার মূল ফটকের সামনে এল ওরা। দু’জন প্রহরী। বেশ জমকালো পোশাক গায়ে। মূলপ্রবেশ পথের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে খোলা তরোয়াল হাত পাহারা দিচ্ছে। ফ্রান্সিসরা বুঝল এটাই রাজবাড়ি। প্রহরীদের সামনে ওরা আসতেই প্রহরীরা দলপতির দিকে তাকিয়ে একটু মাথা নুইয়ে সদর দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়াল। শুধু দলপতির পেছনে পেছনে ওরা রাজবাড়ির মধ্যে ঢুকল। একটু চাতাল পার হয়েই রাজসভাকক্ষ। পাথর গেঁথে তৈরি লম্বাটে ঘর। দুটো মাত্র পাথরের জানালা। সভাকক্ষ একটুঅন্ধকার অন্ধকার। প্রজাদের বেশ ভিড়! রাজা জোস্তাক কাঠ আর পাথরের তৈরি সিংহাসনে বসে আছে। সিংহাসন ফুল লতা তোলা মোটা কাপড় ঢাকা। দু’দিকের পাথরের দেয়ালের খাঁজেদু’টো বড়মশাল জ্বলছে। সেই আলোয় ফ্রান্সিস দেখল রাজা জোস্তাক বয়স্ক মানুষ। মুখে অল্প পাকা দাড়ি গোঁফ। গায়ে পাতলা হলুদ রঙের পোশাক। আলখালা মত। পাশের আসনে বৃদ্ধ মন্ত্রীও বলশালী চেহারার সেনাপতি বসে আছে। রাজসভায় তখন বিচার টিচার চলছিল বোধহয়। সে সব নিয়ে ব্যস্ত রাজা। এক নজর ফ্রান্সিসদের দেখে নিল। বিদেশি। দলপতি ফ্রান্সিসদের নিয়ে সামনে এগিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে রইল। এখানে দেখার মত কিছু নেই। তাইফ্রান্সিস এদিক ওদিক তাকিয়ে তাকিয়ে সময় কাটাতে লাগল। রাজা বেশ কয়েকবার ভারি গলায় বিচারের রায় শোনাল। তারপর ডান হাত তুলল। আজকের মত বিচার শেষ। সবাই নিম্নস্বরে কথা বলতে বলতে চলে গেল।

এবার রাজা আঙ্গুল নেড়ে ইঙ্গিতে দলপতিকে কাছে আসতে বলল। দলপতি রাজার কাছে গিয়ে মাথা একটু নামিয়ে সম্মান জানিয়ে দেশীয় ভাষায় বলে গেল। বোধহয় কোথায় ফ্রান্সিসদের দেখা পেয়েছে সেসব। ফ্রান্সিস শুধু ভাইকিং কথাটা বুঝতে পারল। দলপতি রাজাকে হাতের তোড়ে বাঁধা কামড়ের ক্ষত দেখাল। মুখ দিয়ে কামড়াবার ভঙ্গীও করল। রাজা এবার ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে কী বলল ফ্রান্সিস স্পেনীয় ভাষায় বলল আপনি কী বলছেন বুঝতে পারছি না। রাজা থেমে থেমে স্পনীয় ভাষায় বলল–নেতা কে?

–আমি? ফ্রান্সিস কথাটা বলে এগিয়ে গেল।

–বিদেশী ভাইকিং –সাহস দলপতি কামড়েছো। রাজা ভাঙা ভাঙা স্পেনীয় ভাষায় বলল।

–আমাকে তুই তুই বলে ডেকে কথা বলছিল। অপমান সহ্য হয় নি। ফ্রান্সিস বেশ . দৃঢ়স্বরে বলল।

–শাস্তি পাবে। আমার রাজত্বে এসেছো কেনো? রাজা বলল।

–কোন উদ্দেশ্যে নিয়ে আসিনি। ফ্রান্সিস বলল।

–আশ্চর্য! বিনা কারণে? রাজা বলল।

–আমরা দ্বীপ দেশ ঘুরে বেড়াই। নতুন নতুন দেশ কত বিচিত্র মানুষ তাদের ভাষা জীবনযাত্রা ভালো লাগে এসব। সকলের মঙ্গল করার চেষ্টা করি। ফ্রান্সিস বলল।

–শুধু এই? রাজা বেশ অবাক হয়ে বলল।

–এইটুকুকি কম হল? তবে আর একটা কাজও আমরা করি। ফ্রান্সিস বলল।

কী? রাজা জানতে চাইল।

–কোন গুপ্ত ধনভাণ্ডারের খোঁজ পেলে সে সব বুদ্ধি খাটিয়ে কোন না কোন সূত্র ধরে উদ্ধার করি। কখনও জীবনের ঝুঁকিও নিয়ে থাকি। ফ্রান্সিস বলল।

রাজা খুকখুক করে হেসে উঠল। বলল এইবার আসল কথা –গুপ্তধন নিয়ে পলায়ন–পেশা তোমাদের।

–আমাদের ভুল বুঝবেন না। অনেক গুপ্তধন ভাণ্ডার আমরা উদ্ধার করেছি। সাংকেতিক চিহ্ন নকশা মানচিত্র দেখে। কিন্তু একটি স্বর্ণমুদ্রাও আমরা নিইনি। আসল মালিককে দিয়ে দিয়েছি।

–আদর্শবাদী আঁ? আবার রাজা খুক খুক করে হেসে উঠল।

-হ্যাঁ। খুব কম রাজা বা দলপতি আমাদের বিশ্বাস করেছেন। বাকিরা অবিশ্বাস করেছে। আপনিও অবিশ্বাস করছেন। অনুরোধ–আমাদের অবিশ্বাস করবেন না। ফ্রান্সিস বলল।

উঁহু কয়েদঘরই তোমাদের আসল জায়গা। আগেও একটা বিদেশী স্পেন থেকে এসেছিল। আমরা স্পেন ভাষা শিখেছিলাম। প্রজাদের বলে বেড়াত যীশু না কে–শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ। ব্বাঃ আমি রাজা জোস্তাক– কেউ না? ফুটো নৌকোয় চড়িয়ে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়েছিলাম। তোমরা ভাগ্যবান–বেঁচে তো থাকবে। ফ্রান্সিস এবার রাজা জোস্তাকের মুখের দিকে তাকাল। পাতলা দাড়ি গোঁফের ফাঁকে ক্রুর হাসি। কুড়কুড়ে চোখে বদ মতলব এর কাছে সুবিচার পাওয়া অসম্ভব।

-ঠিক আছে। আমাদের কতদিন কয়েদ হবে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।

—যতদিন না স্বীকার করছে তোমরা ঠগ–প্রবঞ্চক লুঠেরা। রাজা বলল। ফ্রান্সিস ভালো করেই বুঝল এই রাজার হাত থেকে নিস্তার নেই। পালাবার ছক কষতে হবে। তারপর দ্রুত ভাবতে লাগল। –পালাতে কদিন লাগবে কে জানে। সেটা কয়েদঘরে না ঢুকলে পাহারার ব্যবস্থা না দেখলে ঠিক বোঝা যাবে না। জাহাজে যা খাদ্য জল আছে কদিন আর যাবে তাতে? তারপর তো মারিয়া হ্যারিদের উপোশ করে থাকতে হবে। এ বিস্কো নেই। ভেন বয়স্ক। অন্য বন্ধুরা সাহসী ঠিকই কিন্তু তাদের চালনা করবে কে? সিনাত্রা গান গায় ভালো। কিন্তু ভীতু। হ্যারিশরীরের দিক থেকে দুর্বল। কিন্তু খুব বুদ্ধিমান সন্দেহ নেই। তবে আমি কাছে না থাকলে ও মনের দিক থেকেও দুর্বল হয়ে পড়ে। কাজেই চটানো চলবে না। ফ্রান্সিস খুব বিনয়ের সঙ্গে বলল মহামান্য রাজা আপনার দেওয়া শাস্তি আমরা মাথা পেতে নিলাম। যত দোষ আমাদের এই তিনজনের। আপনার দলপতির হাত কামড়ে দিয়েছি। শাস্তি আমাদের অবশ্যই প্রাপ্য। কিন্তু মহামান্য রাজা আমাদের বেশ কিছু বন্ধু আমাদের জাহাজে রয়েছে। তাদের খাদ্য জল ফুরিয়ে গেছে। কাউকে পাঠিয়ে যদি তাদের খাদ্য জল সংগ্রহ করতে সাহায্য করেন। তাহলে আপনি যে যীশুর চেয়েও মহানুভব সেটা ভালোভাবে প্রমাণিত হবে। ফ্রান্সিস দেখলকাজ হয়েছে। রাজা জোস্তাক খুশিতে মিটিমিটি হাসছে। মাথা দুলিয়ে রাজা বলল–এ আর বেশি কথা কি। আমার লোক গিয়ে খাদ্য জল দিয়ে আসবে।

সত্যিই আপনি মহারাজা। ফ্রান্সিস সজোরে বলে উঠল। কিন্তু ভবি ভোলবার না। কয়েদ ঘরে বন্দী থাকার আদেশের নড়চড় হল না। সেনাপতি আসন থেকে নেমে এল। ফ্রান্সিসদের কছে এসে বলল চলো। ফ্রান্সিস মাথা অনেকনুইয়ে রাজাকে সম্মান জানাল। আগে সেনাপতি। পেছনে ফ্রান্সিসরা চলল। রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে সেনাপতি উত্তরমুখো চলল। রাজবাড়ি এলাকা শেষ হল। তারপর বাদিকে একটা পাথরের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসরাও দাঁড়িয়ে পড়ল। পাথর আর কাঠ দিয়ে বেশ শক্ত গাঁথুনির ঘরটা বোঝা গেল এটা কয়েদঘর। সেনাপতিকে দেখে কোথা থেকে দুজন প্রহরী খোলা তরোয়াল হাতে ছুটে এল। ঘরটার দরজার সামনে এস দাঁড়িয়ে পড়ল। বোঝা গেল এই দুজনই কয়েদঘর পাহারা দেবে। সেনাপতিকে একটু মাথা নুইয়ে সম্মান জানাল দু’জনে। একজন কোমরের ফেট্টিতে ঝোলানো একটা বড় লোহার রিংমত খুলে নিয়ে বন্ধ দরজার সামনে গেল। দরজার বড় কড়ায় ঝুলছিল একটা বেশ বড় গোল তালা। প্রহরীটি রিং থেকে লম্বা একটা চাবি বের করে দরজাটা খুললে। লোহার দরজাটা বেশ জোরে ঠেলে খুলল। ঢ্যাং ধাতব শব্দ হল। অন্য প্রহরীটি ফ্রান্সিসদের একে একে এগিয়ে আসতে ইঙ্গিত করল। ওরা যখন এক এক করে ঢুকছে তখন প্রহরীটি প্রত্যেককে জোরে ঠেলা দিয়ে ঢুকিয়ে দিল। ফ্রান্সিসের আবার মেজাজ চড়ে গেল। কিন্তু ও চোখ কুঁচকে নিজেকে সহমত করল। এই অপমানজনক ব্যবহার মুখ বুজে সহ্য করল। নিরুপায় এখন।

এই ভর দুপুরেও ঘরটা কেমন অন্ধকার অন্ধকার। চারপাশে নিরেট পাথুরে দেয়াল। দুজন প্রহরীই ঘরে ঢুকল। ফ্রান্সিসদের দুহাত দড়ি দিয়ে বেঁধে দিল। কিন্তু পা বাঁধলো না। ফ্রান্সিস স্বস্তির হাঁপ ছাড়ল। দেখা গেল দু’পাশের দেয়ালে দুটো লোহার কড়া গাঁথা। একটা কড়ায় লম্বা একটা মোটা দড়ি ঝুলছিল। একজন প্রহরী সেই দড়ির একটা মাথা এনে ফ্রান্সিসদের দড়ি বাঁধা হাতের মধ্যে দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়ে টেনে ওপাশের কড়ায় শক্ত, করে বেঁধে দিল দ’হাত তো বাঁধাই। তার মধ্যে দিয়ে লম্বা দড়ি ঢুকিয়ে ফ্রান্সিসদের নড়াচড়াই শুনে প্রায় বন্ধ করে দিল। ঘরে ঘুরে বেড়ানো যাবে না। ফ্রান্সিস একটু হেসে এক প্রহরীকে বলল–সত্যিই ভাই তোমাদের রাজা শুধু মহানই নন-বুদ্ধিমান ধুরন্ধর। প্রহরীরা ফ্রান্সিসের কথা কিছুই বুঝল না। বেরিয়ে গেল। ঢঢং। দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

ঘরের মেঝেয় শুকনো খড় ঘাসপাতা ছড়ানো। হাত বাঁধা অবস্থায় ফ্রান্সিস ঐ মেঝের মধ্যেই শুয়ে পড়ল। বাঁধা হাত বুকের ওপর রেখে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঘরটা দেখতে লাগল। শাঙ্কো আর বিনোলা বসে পড়ল। ফ্রান্সিস দেখল ঘরটার উত্তর দিকে বেশ কিছু ওপরে একটা জানালা মত। জানালা না বলে ওটাকে খোদলই বলা যায়। এবড়ো-খেবড়ো করে ভাঙা। ওটাই একমাত্র আলো আর হাওয়া চলাচলের পথ। আর কোন ফোকর নেই। হঠাৎ হাওয়ার ধাক্কায় একটা ডাল এসে ফোকরটায় ঝাপটা মারল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াও। বলল শাঙ্কো তোমরা উঠে দাঁড়াও। আমি দড়িটা টেনে নিয়ে ঐ দেয়ালের কাছে যাবো। শাঙ্কো বিনোলা উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস ফোকরের দেয়ালের দিকে ঠিক পায়ে পায়ে এগোল। হাতে টানা দড়ি বাঁধা। কাজেই শাঙ্কোদের সেই সঙ্গে এগোতে হল। ফ্রান্সিস মাথা তুলে ফোকরের মধ্যে দিয়ে তাকাল। ফোকরের হাত কয়েক দূরেই একটা মোটামুটি মোটা ডাল বাইরের আলোয় দেখল। আস্তে আস্তে ফিরে এল। শাঙ্কোরাও ফিরে এসে বসে পড়ল। ফ্রান্সিস আবার শুয়ে পড়ল।

–ফ্রান্সিস–কী দেখছিলে? শাঙ্কো জানতে চাইল।

মুক্তির পথের ইঙ্গিত। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল।

–অসম্ভব। যা শক্ত দেয়াল। ছাউনিও উঁচুতে। কী করে মুক্তির কথা ভাবছো? বিনোলা একটু অসহায় ভঙ্গীতে বলল।

ছক কষছি বিনোলা। শাঙ্কো কিছু বলল না। ও ফ্রান্সিসকে ভালো করেই চেনে। ফ্রান্সিস নিশ্চয়ই কিছু গভীরভাবে ভাবছে। ঠিক একটা উপায় বের করবেই।

এবার শাঙ্কোও বুকে দুহাত রেখে শুয়ে পড়ল। দেখাদেখি বিনোলাও কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস চোখ বুজে চুপ করে শুয়ে রইল। ভাবছিল রাজা কথা দিয়েছে। নিশ্চয়ই ওদের জাহাজে খাদ্য ও জল পাঠিয়েছে। মারিয়া আর বন্ধুরা আজ থেকেই পেট ভরে খেতে পাবে। পর্যাপ্ত পানীয় জলও পাবে। একটু তন্দ্রা এল ফ্রান্সিসদের। হঠাৎ ঢং শব্দে ফ্রান্সিসের তন্দ্রা ভেঙে গেল। দরজা খুলে গেল। বগলে লম্বাটে শুকনো বড় পাতা আর হাতে একটা মাটির হাঁড়ি নিয়ে একজন প্রহরী ঢুকল। অন্যজনের হাতে আর একটা মাটির হাঁড়ি। সে সব মেঝেয় রেখে একজন এসে ফ্রান্সিসদের হাত বাঁধা দড়ি খুলে দিল। ওদের সামনে পাতা পেতে দেওয়া হল। পাতে দেওয়া হল সেদ্ধ দানার খাবার। কিছুটা খেয়ে শাঙ্কো বলল–এই দানা গুলো আমি এনেছিলাম। কালকের সেই বিচিত্র রান্নার রুটিতে দেওয়া হয়েছিল। খেয়ে দেখো ভাল লাগবে। এবার একটা বড় টুকরোর মাছ আর ঝোলমত দেওয়া হল। মাছটা এক কামড় খেয়ে ফ্রান্সিস বলে উঠলকী সুন্দর স্বাদ। , সামুদ্রিক মাছ খেয়ে খেয়ে পেটে চড়া পড়ে গেছে। ফ্রান্সিস এক প্রহরীকে জিজ্ঞেস করতে গিয়ে চুপ করে গেল। ও কিছুই বুঝবে না। সেনাপতি এলে জানতে হবে। খেতে খেতে ফ্রান্সিস বরাবরের মতই বলল–আজ খুব সুস্বাদু খাবার। বেশি করে খাও। শরীর তৈরী রাখো।

খাওয়া শেষ। একজন প্রহরী বড় মাটির হাঁড়ি ভর্তি জল নিয়ে ঢুকল। কাঠের গ্লাসও দিল। ওরা হাতমুখ ধুয়ে জল খেয়ে নিল। ওদের হাত বেঁধে প্রহরীরা চলে গেল। আরো খেতে চাইলে মাথা এপাশ ওপাশ করেছিল। আর নেই। তবু খাওয়া ভালোই হল। কারণ তিনজনই ছিল ক্ষুধার্ত। দড়ি দিয়ে হাত বেঁধে ওরা চলে গেল। ঘটাং –দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ওরা শুয়ে পড়ল।

বিকেলে সেনাপতি এল। ঘরে ঢুকে একটু হেসে বলল–ভাল?

–ভালো আছি। দুপুরে পেট পুরে খেয়েছি। আচ্ছা মাছটা খুব সুস্বাদু লাগল। সমুদ্রের মাছ, ফ্রান্সিস জানতে চাইল।

–তাল্লি মাছ। খাড়িতে আসে। ডিম পাড়ে অসংখ্য–বড় জলায় একটু দূরে।

–ও। যাক গে–রাজা কাউকে খাদ্য জল নিয়ে আমাদের জাহাজে পাঠিয়েছিলেন? ফ্রান্সিস বলল।

–ন্নাঃ। কেউ — ন্না। সেনাপতি মাথা এপাশ-ওপাশ করল। ফ্রান্সিস সবিস্ময়ে বলে উঠল–রাজা যে বললেন। কথা দিলেন। ফ্রান্সিস দ্রুত উঠে বসল।

–রাজা–কত কাজ–মনে নেই- বড় চিন্তা– রাজা মিরান্দার লুকোনো রাজৈশ্বর্য–রাজা পাগল– খুঁজছে। সেনাপতি বলল।

ফ্রান্সিস বেশ আগ্রহ বোধ করল। বলল ব্যাপারটা বলুন তো?

–অনেক কথা ইতিহাস সময় নেই চলি। ফ্রান্সিস তাকে থামাবার সময়ও পেল না। তার আগেই সেনাপতি চলে গেল।

–ফ্রান্সিস–গুপ্তধনের ব্যাপার। শাঙ্কো বলল।

-হ্যাঁ। কিন্তু আমার চিন্তা বন্ধুদের জন্য। আর কিছু ভাবতে পারছি না। লোকটা এত নীচ এত হীনমনা।

–কী আর করবে? ফ্রান্সিস চিন্তিত স্বরে বলল।

–শাঙ্কো–ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল- দ্রুত ছক কষতে হবে। আজ রাতেই পালাতে হবে। রাজা সেনাপতি বা প্রহরীরা জানে না আমার নাম ফ্রান্সিস কোন বাধাই আমার কাছে বাধা নয়। আজ রাতে পালাতে হবে।

–এই ঘর থেকে প্রহরীদের ধোঁকা দিয়ে?

ফ্রান্সিস কোন কথা না বলে চোখ বুজে শুয়ে পড়ল।

সন্ধ্যে হল। একজন প্রহরী জ্বলন্ত মশাল নিয়ে ঢুকল। ফোকরের দিককার পাথুরে দেয়ালের খাঁজে বসিয়ে দিয়ে চলে গেল।

রাত হল। চোখ বুজেই ফ্রান্সিস ডাকল–শাঙ্কো? শাঙ্কো মুখে শব্দ করল।

-যদি আমরা পরস্পরের কাঁধে উঠি –ঐ খোদলটার কাছে তুমি পৌঁছতে পারবে না? শাঙ্কো খোদলটার উচ্চতা মনে মনে মেপে নিয়ে বলল

–মনে হয়– পৌঁছোনো যাবে।

–অন্তত তুমি হাতের নাগালে পাবে। ফ্রান্সিস বলল।

হ্যাঁ, হ্যাঁ। তবে ঐ হাত চারেক খোদল। পার হবো কী করে? শাঙ্কো একটু অসহায় ভঙ্গীতে বলল।

–তাহলে তুমি আর নিজেকে দুঃসাহসী ভাইকিং বলে পরিচয় দিও না। ফ্রান্সিস বলল।

-না মানে–শাঙ্কো কথাটা শেষ করতে পারল না। ফ্রান্সিস বলে উঠল আমরা ভাইকিং সব কষ্ট যন্ত্রণা সহ্য করতে পারি। এমন কি কষ্টদায়ক মৃত্যু পর্যন্ত। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসল।

বলল–পারবো। কিন্তু সবার নিচে কে থাকবে?

–আমি। ফ্রান্সিস বেশ দৃঢ় স্বরে বলল। –তুমি? বাঁ পা–এখনো সম্পূর্ণ সুস্থ নও তুমি। শাঙ্কো বলল।

–পারবো–পারতেই হবে। ফ্রান্সিসের কণ্ঠস্বরে দৃঢ়তা।

–তবে আমিও পারবো। কিন্তু তারপর? শাঙ্কো জিজ্ঞেস করল।

–বাইরে ঐ বুনো গাছটার একটা মোটা ডাল আছে। হাত বাড়িয়ে না পেলেও ঝাঁপিয়ে পড়ে ধরা যাবে। চোখ বুজেই ফ্রান্সিস কথাগুলো বলে গেল। শাঙ্কো কিছুটা উঠে ভালো করে খোদলটা দিয়ে চেয়ে রইল। ম্লান জ্যোৎস্নায় দেখল সত্যি একটা ডালের আভাস। মশালের অস্পষ্ট আলোতে আরো স্পিষ্ট দেখল।

রাতে খাওয়া শেষে সব বলবো। এখন হাত পা ছেড়ে স্রেফ বিশ্রাম। কী ভাবে কী করবে ভারো। অন্য কোন চিন্তা নয়। শাঙ্কো শুয়ে পড়ল। কী ভাবে খোঁদলে উঠবে কী ভাবে বাইরে বেরোবে ডাল ধরবে এ সব ভাবতে লাগল।

ঢং ঢং– রাতের খাবার দিতে এল প্রহরীরা। সেই দানাসেদ্ধ তাল্লি মাছ। বোঝাই যাচ্ছে তাল্লি মাছ অজস্র পাওয়া যায়। খাওয়া শেষ। প্রহরীরা চলে গেল।

রাত বাড়তে লাগল। ফ্রান্সিস চোখ বুজেই মৃদুস্বরে বলতে লাগল। শাঙ্কো তোমার ছোরা–দড়ি কাটা–বড় মোটা দড়িটা খুলে কোমরে জড়াবে আমি বসবো কাঁধে উঠবে বিনোলা তার কাঁধে তুমি– খোদল ধরবে–শরীর যতটা পারো গুটিয়ে বাইরে বেরোবে– যে ভাবেই পারো মোটা ডালটা ধরবে। দড়ির মাথাটা শক্ত করে ডালে বাঁধবে–শাঙ্কো চাপা স্বরে বলে উঠল–

সাবাস ফ্রান্সিস।

–আস্তে। এখন একটু ঘুমিয়ে নাও। গায়ে জোর পাবে। ভালো দড়ি বেঁধে সংকেত দেবে। ফ্রান্সিস চোখ বুজে থেকেই বলল।

–মোরগের ডাক? শাঙ্কো বলল।

–পাগল। মোরগরা রাতে ডাকে না। ভোর হলে ডাকে। অন্য যে কোন পাখির : ডাক। ফ্রান্সিস বলল।

–ঠিক আছে। শাঙ্কো বলল।

–ঘুমোও। ফ্রান্সিস বলল।

রাত গভীর হল। তন্দ্রা ভেঙে ফ্রান্সিস উঠে বসল। ফিস্ ফিস্ করে ডাকল শাঙ্কো বিনোলা। দু’জনেরই ঘুম ভেঙে গেল। দুজনেই তাড়াতাড়ি উঠে বসল। শাঙ্কো ফ্রান্সিসের খুব কাছে এসে নিচু হল। ফ্রান্সিস দড়ি বাঁধা হাতদুটো শাঙ্কো বুকের কাছ দিয়ে জামার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে শাঙ্কোর ছোরাটা বের করে আনল। তারপর ছোরাটা ধরে শাঙ্কোর হাত বাঁধা দড়ির মাঝখানে ঘষতে লাগলো। অনেকটা কেটে গেল। শাঙ্কো এক হ্যাঁচকা টানে দড়িটা ছিঁড়ে ফেলল। তারপর একইভাবে ফ্রান্সিস ও বিনোলার হাতে বাঁধা দড়ি কেটে ফেলল। ফ্রান্সিস–মোটা লম্বা দড়িটা খুলে পাথুরে দেয়ালে গাঁথা কড়ার কাছে গেল। কড়ায় বাঁধা দড়ির দুটো মাথাই কাটল। দড়ির একটা মাথা শাঙ্কো কোমরে বেঁধে নিল। এবার ফ্রান্সিস ঐ খোদলটার দিকে নিচে মেঝেয় উঁচু হয়ে বসল। বিনোলে কাঁধের দু’পাশে পা ঝুলিয়ে বসল। শাঙ্কো এবার দেয়ালে দু হাতে ভর দিয়ে বিনোলার কাঁধের ওপর আস্তে আস্তে উঠেদাঁড়াল। কিন্তু খোঁদলটা তখনও হাতখানেক দূরে। এবার ফ্রান্সিস দেয়ালে দু’হাতে ভর রেখে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। এবার শাঙ্কো খোদলটা দু’হাতে ধরে ফেলল। তারপর শরীরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে খোদলটায় বুক চেপে ঝুলে পড়ল। এই ঝাঁকুনিতে ফ্রান্সিস একটু টাল খেয়েও সামলে নিল। বাঁ পাটা টন টন করছে। কিন্তু ফ্রান্সিস মুখ থেকে কোন কাতর শব্দ করল ন। দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রইল। শাঙ্কোর শরীরের ভার কমে যেতে ফ্রান্সিসের একটু স্বস্তি হল। শাঙ্কো বাইরে মুখ বাড়িয়ে অনুজ্জ্বল জ্যোৎস্নায় মোটা ডালটা অনেকটা স্পষ্ট দেখতে পেল। প্রায় চৌকোনো খোদলটায় ভর দিয়ে ও আস্তে আস্তে শরীরটা ঘোরাল। তারপর হাত বাড়িয়ে মোটা ডালের গায়ের একটা ছোট ডাল ধরে ভর নিল। তারপর খোঁদলের মধ্যে দিয়ে জোরে শরীরটা টেনে নিয়ে মোটা ডালটা প্রথমে একহাত পরে দুহাতে ধরে ফেলল। তখনও একটু হাঁপাচ্ছে। একটু দম নিয়ে খোদল থেকে দু পা সরিয়ে নিয়ে ডালটায় ঝুলে পড়ল। পরক্ষণেই পাক খেয়ে ডালটার ওপর বসে পড়ল। দেরি করা চলবে না। তাড়াতাড়ি কাজ সারতে হবে। কোমর থেকে দড়ির মাথাটা খুলে খুব কষে ডালটায় বেঁধে ফেলল। শাঙ্কো মৃদু হাসল। ফ্রান্সিসের নিখুঁত ছক। ও এবার দুহাতের তালু মুখে চেপেকুউ কু ঔ পাখির ডাক ডাকল। ঘরে নিশ্চিন্ত ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল–বিনোলা দড়ি ধরে ওঠো। বিনোলা দড়ি টেনে ধরে আস্তে আস্তে খোদলটায় বুক দিয়ে ঝুলে পড়ল। শাঙ্কোর মতই শরীর ঘুরিয়ে দড়ি টেনে ধরে ডালটায় উঠে এল। ফ্রান্সিস দেয়ালে হাত চেপে হাঁপাতে লাগল। একটু দম নিল। তারপর দড়ি ধরে উঠতে লাগল। জাহাজের দড়ি ধরে নামা ওঠা ওদের কাছে জল ভাত। একটু উঠে বাঁ হাত দিয়ে জ্বলন্ত মশালটা তুলে নিল। তারপর ডান হাত দিয়ে উরু দিয়ে দড়ি জড়িয়ে খোঁদলের গায়ে ঝুলে পড়ল। ডান হাতে টেনে দড়ির ঝোলানো মাথাটা শুনে তুলে নিল। জ্বলন্ত মশালটা মেঝেয় ছুঁড়ে ফেলেই শরীরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে দড়ির সাহায্যে ডালটা ধরে ফেলল। বিনোলা একটু সরে বসল। ফ্রান্সিস ডালের ওপর বসে, পড়ল। ওদিকে ঘরের মেঝের খড়ঘাসপাতায় আগুন জ্বলে উঠেছে। খোদল দিয়ে ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে।

জলদি–নেমে পড়। দড়ি ধরে ঝুলে পড়াশাঙ্কো চাপা স্বরে বলল–ঘরের পেছনে কোন প্রহরী নেই। শাঙ্কোর দড়ির শেষে নেমে এসে নিচে তাকিয়ে দেখল তখনও দুহাত নিচে শুকনো পাতার স্তূপ। আর ফ্রান্সিসকে একই ভাবে নামতে হল। শুকনো পাতার স্তূপে শব্দ হল। খসস ওদিকে আগুন সারা কয়েদ ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। দরজার কাছে। প্রহরীরা হৈ হৈ ডাকাডাকি শুরু করেছে। চাপাস্বরে ছোটে জাহাজ ঘাটের দিকে। বলেই ফ্রান্সিস এক ছুটে শুকনো ঝরাপাতা ঘাস মাড়িয়ে সামনের ঝোঁপ জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ল। তিনজনেই ঝোঁপঝাড় ঠেলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছুটে চলল।

ওদিকে আরো যোদ্ধা এসে জড়ো হয়েছে সেই জ্বলন্ত কয়েদঘরের কাছে। একটু কাছে জলা থেকে পীপে জলে ভর্তি করে আগুন নেভাতে লাগল।

সৈন্যাবস থেকে আরো সৈন্য ছুটে এল। ততক্ষণে আগুন লেগে গেছে কয়েদঘরের ছাউনিতে।

দুজন প্রহরী ছুটল সেনাপতিকে খবর দিতে। শয়নকক্ষে তখন সেনাপতির ঘুম ভেঙে গেছে। বুঝে উঠতে পারল না। বাইরে এত চাচামেচি কীসের জন্যে। আগুন আগুন’ চিৎকারটা শুনছিল। সেনাপতি সবে বিছানা থেকে নেমেছে তার বাড়ির প্রহরী ছুটে এল।

–কী ব্যাপার? বাইরে এত গোলমাল কীসের? সেনাপতি জিজ্ঞেস করল।

আজ্ঞে কয়েদঘরে আগুন লেগেছে। প্রহরী হাঁপধরা গলায় বলল।

–সে কী? কী করে আগুন লাগল? সেনাপতির প্রশ্ন।

আজ্ঞে –তা তো বলতে পারবো না। প্রহরীটি মাথা নেড়ে বলল।

-তুই যা। রাজা মশাইকে খবর দে। কয়েদ ঘরে আগুন লেগেছে। উনি যেন আসেন। সেনাপতি বলল। প্রহরী ছুটে বেরিয়ে গেল।

ওদিকে ফ্রান্সিস দেখল-ঝোঁপ জঙ্গল এলাকা শেষ। ডানদিকে কিছু দূর দিয়ে সদর রাস্তা। টানা চলে গেছে জাহাজ ঘাটের দিকে।

ফ্রান্সিস রাস্তার ধারে এসে একঝলক পেছনটা দেখে নিল? জ্যোত্সার নিষ্প্রভ আলোয় দেখা গেল রাস্তা জনশূন্য। যাক নিশ্চিন্ত। তখনই দেখল কয়েদঘরের ছাউনিতে আগুন লেগে গেছে। আগুনের লেলিহান শিখা আর কালো ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠেছে। আকাশের দিকে। ওরা প্রাণপণে ছুটতে শুরু করল। ঝোঁপ-জঙ্গলের বাধা নেই। উন্মুক্ত রাস্তায় ওদের চলার গতি বেড়ে গেল। সমুদ্রের দিক থেকে জোর হাওয়া ছুটে আসছে। ধূলো বালি উড়ছে। চোখ কুঁচকে ওরা ছুটল প্রাণপণে।

সেনাপতি দ্রুত কয়েদঘরের দিকে চলল। জ্বলন্ত কয়েদ ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। সেনাপতি প্রহরীদের জিজ্ঞেস করল–ঘরে তিনজন বিদেশি ছিল। তারা কোথায়?

–বোধহয় পুড়ে মরে গেছে। একজন প্রহরী বলল।

কী করে বুঝলি? ওদের চিৎকার কান্নাকাটি শুনতে পেয়েছিলি? সেনাপতিজিজ্ঞেস করল।

–আজ্ঞে না। প্রহরীটি মাথা এপাশ ওপাশ করল।

–আগুনে পুড়তে থাকলে নিশ্চয়ই চীৎকার চ্যাঁচামেচি করতো। কথাটা বলে সেনাপতি এগিয়ে পোড়া ঘরের দিকে তাকাল। তখন কয়েদ ঘরের দরজা ভেঙে পড়ে গেছে। ওপরের জ্বলন্ত ছাউনি থেকে কাঠ পাথর ভেঙে পড়ছে। আগুনের আভায় ঘরের ভেতরে ভালো করে দেখল সেনাপতি। না কোন পোড়া শরীর পড়ে নেই। সঙ্গে সঙ্গে বুঝল বন্দীরা পালিয়েছে। পালাবার আগে আগুন লাগিয়ে গেছে। কিন্তু কীভাবে পালাল? সেনাপতি পোড়া কয়েদ ঘরের ওপাশে গেল। আগুনের আভায় সবই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দেখল পেছনের উঁচু গাছটার একটা মোটা ডাল থেকেকয়েদঘরের মোটা দড়িটা ঝুলছে। তার মানে যে করেই হোক খোদল দিয়ে দড়ি ধরে নেমে পালিয়েছে। একটু দূরে দাড়ি গোঁফওয়ালা দলপতি জল ছিটানোর তদারিক করছিল। সেনাপতি ইশায় তাকে ডাকল। জাহাজঘাটায় নোঙর করা আছে–তাই না?

–আজ্ঞে হ্যাঁ। দলপতি মাথা ওঠানামা করল।

-বন্দীরা পালিয়েছে। নিশ্চয়ই জাহাজঘাটায় যাবে। তুমি সাতজন ঘোড়সওয়ার সৈন্য নিয়ে এক্ষুনি এসো। জলদি। জাহাজে ওঠার আগেই ওদের বন্দী করতে হবে। বালির ওপর দিয়ে ওঁরা জোরে ছুটতে পারবে না। ধরা পড়বেই। সেনাপতি বলল।

দলপতি দ্রুত ছুটল সৈন্যবাসের দিকে।

তখনই রাজা জোস্তাক সেখানে এল। দেখল খোলা কয়েদঘরে কাঠামো। ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে। সেনাপতি রাজার কাছে এল। যে যা ভেবেছে যা করেছে সে সব মৃদুস্বরে বলল। সেই সময় সাতজন ঘোড়সওয়ার সৈন্যশূন্যে ভোলা তরোয়াল ঘোরাতে ঘোরাতে তাদের কাছে এল। সেনাপতি গলা চড়িয়ে বলল–বিদ্যুৎগতিতে জাহাজঘাটের দিকে ঘোড়া ছোটাও। বন্দীরা ঐ জাহাজ ঘাটের দিকেই পালাচ্ছে। বন্দীদের পাকড়াও করো। সাতজন ঘোড়সওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া ছোটাল। এবার সেনাপতি বাকি সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে বলল- তোমরাও যাও। ঘোড়সওয়ার সৈন্যদের সাহায্য করবে। বন্দীদের ধরা চাই। কিন্তু ওদের দলকে ধরতে জাহাজে উঠবেনা। পরে এক ফোঁটা রক্ত না ঝরিয়ে কবজা করবে। কাজেই ওদের সঙ্গে এখন লড়াই নয়।

সৈন্যরা দলপতির নেতৃত্বে চিৎকার করতে করতে জাহাজঘাটের দিকে ছুটল।

ওদিকে ফ্রান্সিসদের ছোটার গতি কমে এল। কারণ বালির রাস্তায় এসে পড়েছে তখন। বালিতে পা হড়কে যাচ্ছে। পা চেপে বসছে না। ফ্রান্সিস আবার বাঁ পায়ে তেমন জোর করে পাচ্ছিল না। মাঝে মাঝেই একটু পিছিয়ে পড়ছিল। শাঙ্কো বিনোলা একটু থেমে ফ্রান্সিসের কাছে আসছিল। আবার তিনজন একসঙ্গে ছুটছিল। তিনজনেই তখন ভীষণ হাঁপাচ্ছে। ফ্রান্সিস হাঁ করে শ্বাস নিচ্ছিল। ওরই কষ্ট হচ্ছিল বেশি। ফ্রান্সিস দ্রুতএকবার পেছন দিকে তাকিয়ে দেখল–ধূলোবালি উড়িয়ে একদল ঘোড়সওয়ার সৈন্য ছুটে আসছে। সামনে তাকিয়ে ওদের জাহাজটা দেখল। কিন্তু বেশ দূরে জাহাজঘাট। ফ্রান্সিস হাঁপানো গলায় বলল–জোরে ছোটো। ছুটতে ছুটতে তখন ওরা জাহাজ ঘাটের অনেক কাছে চলে এসেছে। ও আবার পেছন দিকে তাকাল? অশ্বারোহী সৈন্যদল দুরন্ত গতিতে অনেক কাছে চলে এসেছে। বুঝল–শেষ রক্ষা হবে না। জাহাজঘাট পর্যন্ত দূরত্ব আর বেশি বাড়ানো যাবো না। তবু ছুটল। প্রাণপণে। জাহাজঘাটের কাছাকাছি আসতেই পেছন থেকে অশ্বারোহী সৈন্যরা চীৎকার করতে করতে প্রায় ওদের ঘাড়ের ওপর এসে পড়ল। অশ্বারোহী সৈন্যরা ওদের ধরে ফেলল। জাহাজঘাটতখন হাত কুড়ি দূরে। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর বালির ওপর বসে পড়ল। মুখ হাঁ করে হাঁপাতে হাঁপাতে যথাসাধ্য গলা চড়িয়ে বলে উঠল–শাঙ্কো বিনোলা–দাঁড়াও ছোটার চেষ্টা করো না। ওরা তরোয়াল চালাবে। বসে পড়ো। সত্যি-সৈন্যরা নিরস্ত্র ওদের তরোয়োল চালিয়ে হত্যা করতে পিছু পা হবে না। দুজনেই বালির ওপর বসে পড়ল। হাঁপাতে লাগল। তখন পূর্ব আকাশে লাল রং ধরেছে। সূর্য উঠতে বেশি দেরি নেই। সৈন্যদের চিৎকারের শব্দে জাহাজে তখন ফ্রান্সিস সব বন্ধুদের অনেকেরই ঘুম ভেঙে গেছে। হ্যারির ঘুম ভেঙে গেল। ও বাইরে সৈন্যদের চিৎকার হৈ হল্লা শুনতে পেল। বুঝল– নিশ্চয়ই ফ্রান্সিসরা কোন বিপদে পড়েছে। হ্যারি সঙ্গে সঙ্গে সিঁড়ির দিকে ছুটল। চিৎকার করে বলতে লাগল ভাইসব তরোয়াল নাও। ডেকএ চলো। ফ্রান্সিসরা বিপদে পড়েছে। সিঁড়ি দিয়ে দ্রুতপায়ে উঠতে গিয়ে হ্যারি সিঁড়ির ধাপে পা আটকে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। পেছনে থেকে এক বন্ধু ওকে ধরে ফেলল। ভাইকিংরা ছুটে গেল অস্ত্রঘরের দিকে। তরোয়াল নিয়ে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে ডেক এ উঠে এল। হ্যারি রেলিঙের কাছে ছুটে গেল। তখন সূর্য উঠছে। ভোরের আবছা আলোয় দেখল তীরের কাছে বালিয়াড়িতে কয়েকটা ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে। একদল সৈন্য গোল হয়ে দাঁড়িয়ে। গোলের মাঝখানে তিনজন বসে আছে। তখনই সূর্য উঠছে। এবার দেখল সেই তিনজন ফ্রান্সিস শাঙ্কো আর বিনোলা। ফ্রান্সিস মাথা নিচু করে হাত পা ছড়িয়ে বসে আছে। শাঙ্কো আর বিনোলা সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে আছে। সূর্য উঠল। সমুদ্রে জাহাজে তীর ভূমিতে আলো ছড়াল। হ্যারি বুঝে উঠতে পারল না কী করবে। তখনই একজন বন্ধু তরোয়াল হাতে হ্যারির কাছে ছুটে এল। গলা চড়িয়ে বলল–হ্যারি পাটাতন ফেলাই আছে। ফ্রান্সিসদের ওরা বন্দী করেছে। নেমে লড়াই করে ফ্রান্সিসদের মুক্ত করতে হবে। চলো আর এক মুহূর্ত দেরি নয়।

–একটু দাঁড়াও। ফ্রান্সিস এত কাছে। ও নিশ্চয়ই আমাদের ডেকে কিছু বলবে। , তখনই ফ্রান্সিস মুখ তুলে জাহাজের দিকে তাকাল। বন্ধুদের হাতে তোয়াল দেখেই ও বুঝল বন্ধুরা লড়াইয়ের জন্যে তৈরি। ভোরের নরম আলোয় হ্যারি এবার ফ্রান্সিসদের মুখ চোখ স্পষ্ট দেখতে পেল। বুঝল ওরা ভীষণ ক্লান্ত অশ্বারোহী সৈন্যরা ওদের অনেক দূর তাড়া করে এসে ধরেছে। ফ্রান্সিস তখন বুঝতে পেরেছে। বন্ধুরা যে কোন মুহূতে নেমে আসতে পারে। ফ্রান্সিস রাস্তার দিকে তাকাল। দেখল সৈন্যদল আসছে। সবার সামনে দাঁড়িয়ে গোঁফওয়ালা দলপতি। ভীষণ বিপদ সামনে। ও দ্রুত উঠে দাঁড়াল। যথাসাধ্য গলা চড়িয়ে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল–ভাইসব আমার কথা শোন। কেউ জাহাজ থেকে নামবে না। লড়াই নয়। আমরা ধরা দিয়েছি। যে করেই হোক আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। এখন লড়াইয়ে নামলে আমরা কেউ বাঁচবো না।

হ্যারিও দু’হাত তুলে বলে উঠল, ভাই সব, ফ্রান্সিসের কথা মেনে চলো। বন্ধুরা সব তরোয়াল হাতে দাঁড়িয়ে রইল।

ততক্ষণে খোলা তরোয়াল হাতে দলে দলে সৈন্যরা এসে জাহাজঘাটে জড়ো হলো। ফ্রান্সিসের বন্ধুরা এবার বুঝতে পারল ফ্রান্সিস সঠিক কথাই বলেছে। এত সৈন্যের সঙ্গে লড়াই করতে যাওয়া বোকামি ছাড়া কিছু নয়।

ওদিকে বেশ কয়েকজন খোলা তরোয়াল হাতে ফ্রান্সিসদের ঘিরে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসদের পিঠে তরোয়ালের খোঁচা দিয়ে রাজধানীর দিকে হাঁটতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিসরা হাঁটতে শুরু করল। ওরা এই ভেবে নিশ্চন্ত হল যে একটা অবধারিত লড়াই এড়ানো গেছে।

হাঁটতে হাঁটতে বিনেলো ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল, খুব বুদ্ধি করে পালিয়েছিলাম কিন্তু ধরা পড়তে হল। এবার কোথায় আমাদের বন্দী করে দেখি।

নিশ্চয়ই মজবুত কোনো ঘরে আটকাবে। পাহারার কড়াকড়িও বাড়াবে। ওর মধ্যেই পালাবার ছক কষতে হবে।

পারবে? বিনেলো একটু হতাশার সঙ্গেই বলল।

সব দেখিটেখি। উপায় একটা বের করতেই হবে। ফ্রান্সিস বলল।

— ফ্রান্সিসদের রাজবাড়ির সামনে নিয়ে আসা হল। রাজবাড়ির সদর দেউড়িতে সেনাপতি ফ্রান্সিসদের দেখে সেনাপতি দুজন প্রহরীকে কী বলল। প্রহরী দুজন এগিয়ে এসে ফ্রান্সিসদের নিয়ে চলল। রাজবাড়ির পুব কোনায় একটা তালাবন্ধ ঘরের সামনে এসে প্রহরী দুজন দাঁড়াল। একজন প্রহরী কোমরে ঝোলানো চাবির গোল গোছা থেকে চাবি নিয়ে দরজা খুলল। সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমরা কয়েকজন এসো। অস্ত্রশস্ত্র বার করতে হবে। বোঝা গেল এটা অস্ত্রঘর। অস্ত্রশস্ত্র সরিয়ে ফেলে এই ঘরেই ফ্রান্সিসদের বন্দী করে রাখা হবে। প্রহরী আর সৈন্যরা মিলে ঢাল তরোয়াল বর্শা ঘর থেকে বের করে এনে ঘরের সামনে পাকার করল। সৈন্যরাও তাদের অস্ত্রশস্ত্র রাখল সেখানে।

ফাঁকা ঘরে ফ্রান্সিসদের ঢোকানো হল। দমবন্ধ করা ঘর। লোহা আর কাঠ দিয়ে তৈরি দরজা। ফঁকফোকর বলে কিছু নেই। এই দিনের বেলায়ও ঘর অন্ধকার। ঘরের ভেতরে বেশ গরম। পাথরের মেঝেয় ঘাসপাতা বিছানো নেই। কঠিন পাথরের মেঝেয় ফ্রান্সিস বসে পড়ল। পাশেশাঙ্কো-বিনোলা বসল।

এই ঘরে তো দমবন্ধ হয়ে মরে যাব। শাঙ্কো বলল মৃদুস্বরে।

হুঁ। এখানে কীভাবে পাহারা দেয়, কীভাবে খেতে দেয় এসব দেখি। তারপর পালাবার ছক কষব। তবে পালানো খুব সহজে হবে না! লড়াইও করতে হতে পারে। দেখা যাক। তখনই ওরা দেখল চারজন প্রহরী এসে দরজার সামনে দাঁড়াল। হাতে খোলা তরোয়াল। দরজা বন্ধ করে দেওয়া হল।

দুপুরে দরজা খোলা হল। দুজন প্রহরী দরজায় দাঁড়াল। বাকি দুজন বাইরে রইল। দুজন রাঁধুনি খাবার দিয়ে গেল। রুটি, মাছ আর আনাজের ঝোল। ফ্রান্সিসরা খাবার– চেয়ে নিয়ে পেট ভরে খেল। সন্ধ্যা হল। প্রহরী একটা মশাল জ্বেলে দিয়ে গেল।

রাতে অসহ্য গুমোট গরমে ফ্রান্সিসদের প্রায় ঘুমই হল না।

ভোর হতে শাঙ্কো বলল, ফ্রান্সিস, আমরা তো গরমে সেধ হয়ে যাব।

দেখছি। সেনাপতির সঙ্গে কথা বলতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।

সকালে সেনাপতি এলে দরজা খোলা হল।

সেনাপতি দরজায় এসে দাঁড়াল। একটু হেসে বলল, কয়েদঘরে আগুন লাগিয়ে পার পাবে ভেবেছিলে। এবার এই অস্ত্রঘরে মর।

এখনই মরবার ইচ্ছে নেই। শাঙ্কো বলল।

মরতে হবেই, সেনাপতি বলল।

একটা কথা বলছিলাম, ফ্রান্সিস বলল।

বলো। সেনাপতি ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল।

ঘোড়ার আস্তাবলেও জানালা থাকে। এই ঘরে তাও নেই। ফ্রান্সিস বলল।

অস্ত্রঘরে কেউ জানালা রাখে না।

কিন্তু আমরা তো অস্ত্র নেই। মানুষ। আমাদের তো শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে হয়।

তাহলে কি দেয়াল ভেঙে জানালা করে দিতে হবে? সেনাপতি একটু কড়া গলায় বলল।

তাহলে তো খুবই ভালো হয়। শাঙ্কো অমায়িক হেসে বলল।

আবদার! রাজাকে একবার বলে দেখ না। উল্টে তোমাদের হাত-পা বেঁধে রাখার হুকুম দেবে।

ঠিক আছে। এখন তো রাজা রাজসভায় আসবেন। আমাদের নিয়ে চলুন। ফ্রান্সিস বলল।

কোনো লাভ নেই। সেনাপতি মাথা এপাশ-ওপাশ করে বলল।

তবু। আমাদের সমস্যার কথাটা একবার বলে দেখি।

তাহলে সত্যি কথাটাই বলি। সেনাপতি একটু থেমে বলল, আজ রাতেই তোমাদের জাহাজের সঙ্গীদের বন্দী করা হবে। সবাইকে এই ঘরে বন্দী করে রাখা হবে।

ফ্রান্সিস চমকে উঠল। তাহলে সেনাপতি অনেকদূর ভেবে রেখেছে।

বন্ধুদের আর সাবধান করার উপায় নেই। ওদের বন্দীদশা মেনে নিতেই হবে। ফ্রান্সিস। বলল, আমাদের বন্দী করার অর্থ কি? আমরা তো রাজা জোস্তাকের কোনো ক্ষতি করিনি।

সে সব বুঝি না। রাজার হুকুম। সেনাপতি কথাটা বলে চলে যেতে উদ্যত হল।

ফ্রান্সিস বলল, আমরা রাজার সঙ্গে দেখা করব।

বললাম তো, রাজার সঙ্গে দেখা হবে না।

আমাদের অনুরোধ–রাজাকে একবার বলে দেখুন। ফ্রান্সিস বলল।

বেশ। বলছি। সেনাপতি চলে গেল।

শাঙ্কো বলল, ফ্রান্সিস, এরকম অনুরোধ আর করো না।

উপায় নেই শাঙ্কো, এরা আমাদের জাহাজ আক্রমণ করবে। বন্ধুদের বন্দী করবে। বন্ধুরা অস্ত্র হাতে নেবার সময়ও পাবেনা। বন্ধুদের বাঁচাতে রাজার সঙ্গে দেখা করতেই হবে।

কিছুক্ষণ পরে সেনাপতি অস্ত্রঘরের দরজার সামনে এসে বলল, তোমাদের কপাল ভালো। রাজা দেখা করবেন। রাজসভায় চলো।

প্রহরীদের পাহারায় ফ্রান্সিসরা রাজবাড়ির দিকে চলল। রাজসভায় যখন পৌঁছল তখন সেখানে বিচারপ্রার্থী বেশি নেই। ফ্রান্সিসরা অপেক্ষা করতে লাগল।

বিচার পর্ব শেষ হলে সেনাপতি তার আসন থেকে উঠে রাজার কাছে গেল। কিছু বলল। তারপর ফ্রান্সিসদের রাজার সিংহাসনের দিকে এগিয়ে আসতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিসরা এগিয়ে গেল।

বল, তোমাদের কী বলবার আছে। রাজা বেশ গম্ভীর গলায় জানতে চাইল।

মান্যবর রাজা, শুনলাম আমাদের জাহাজের বন্ধুদের বন্দী করার হুকুম দিয়েছেন।

হ্যাঁ, আজ রাতেই সবাইকে বন্দী করে আনা হবে। রাজা বলল।

কিন্তু কেন? আমাদের অপরাধ? ফ্রান্সিস বলল।

কৈফিয়ৎ চাইছ? তোমাদের সাহস তো কম নয়।

আমরা বন্দী। আপনার দয়ায় বেঁচেআছি। আপনার কাছে কৈফিয়ৎ চাওয়ার ধৃষ্টতা আমাদের নেই। শুধু এই অনুরোধ জানাই-বন্ধুদের বন্দী করবেন না।

আমরা পালিয়েছিলাম, কয়েদ ঘরে আগুন লাগিয়েছিলাম। এই অপরাধের জন্যে আমাদের তিনজনকে যে শাস্তি দেবেন মেনে নেব। দয়া করে বন্ধুদের বন্দী করবেন না। ফ্রান্সিস বলল।

না, না। কাউকে রেহাই দেব না। রাজা বলল।

ফ্রান্সিস বুঝল রাজা মনস্থির করে ফেলেছে। কোনোভাবেই বোঝানো যাবেনা। রাজা ওদের জাহাজ আক্রমণ করবেই। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে ফ্রান্সিস বলল, ঠিক আছে। একটা অনুরোধ রাখুন। অস্ত্রঘরে একটাও জানালা নেই। দরজা বন্ধ থাকে। দারুণ গরমে বদ্ধ ঘরটায় আমরা আর কিছুদিন থাকলে অসুস্থ হয়ে পড়ব।

উপায় কি। অস্ত্রঘর তো শোবার ঘর নয়। রাজা বলল।

বলছিলাম, আমাদের হাত-পা বেঁধে রাখুন। কিন্তু দরজাটা খুলে রাখতে বলুন। প্রহরীর। সংখ্যা বাড়ান। আমরা পালাব না।

তোমাদের বিশ্বাস কী? দরজা দিন রাত বন্ধ থাকবে। শুধু খাবার দেবার সময় খোলা হবে। রাজা মাথা এপাশ ওপাশ করল।

ফ্রান্সিস ভালো করেই বুঝল এই রাজাকে কোনো অনুরোধেই রাজি করানো যাবে না। উপায় নেই। পালাবার ছক কষতে হবে।

ফ্রান্সিসরা অস্ত্রঘরে ফিরে এলো। প্রহরীরা দরজা বন্ধ করে দিল। শাঙ্কো মেঝেয় বসতে বসতে বলল, তাহলে বন্ধুদের বন্দী করে এই ঘরেই রাখা হবে।

হুঁ। ফ্রান্সিস মুখে শব্দ করল। তারপর বলল, আবার পালাতে হবে। কিন্তু যা বুঝছি সেনাপতি খুব ধুরন্ধর মানুষ। ও বন্ধুদের সাবধান হবার সময় দেবেনা। মনে হচ্ছে আজ রাতেই আক্রমণ করবে। ওদের আগে থেকে জানাতে পারলে তবু একটা লড়াই হত। কিন্তু সেনাপতি সেই সুযোগ দেবে না।

খাবার দেবার সময় প্রহরীদের কজা করা যাবে না? শাঙ্কো জিগ্যেস করল।

সম্ভব নয়। ওরা চার-পাঁচ জন অস্ত্র হাতে পাহারা দেবে। নিরস্ত্র আমরা এই ঘর থেকে বেরোতে পারব হয়তো। কিন্তু পালাতে পারব না। ধরা পড়ে যাব। আহত হব। আমাদের মেরে ফেলতেও কসুর করবে না। ফ্রান্সিস বলল।

শাঙ্কো আর কোনো কথা বলল না। বুঝল ভীষণ বিপদে পড়েছে ওরা।

ওদিকে একটু রাত বাড়তেই সেনাপতি সৈন্যদের লম্বাটে ঘরের বারান্দায় এল। সঙ্গে সেই দাড়ি গোঁফওয়ালা সৈন্যটি। সেনাপতি তাকে বলল, যাও, সবাইকেঘুম থেকে ওঠাও। নতুন অস্ত্রঘর থেকে অস্ত্র নিয়ে এসে বারান্দায় দাঁড়াতে বলল। দেখবে, বেশি গোলমাল হৈচৈ যেন না হয়।

দাড়ি-গোঁফওয়ালা দলপতি আরও কয়েকজন সৈন্য নিয়ে সৈন্যদের ঘরে ঢুকে সবার ঘুম ভাঙল। সেনাপতির আদেশের কথা বলল। সৈন্যরা নতুন অস্ত্রঘর থেকে তরোয়াল, বর্শা নিয়ে এসে সৈন্যাবাসের বারান্দায় দাঁড়াল। ঘোড়সওয়ার সৈন্যদেরও খরব দেওয়া হল। একটু পরে ঘোড়সওয়ার সৈন্যরাও ঘোড়া ছুটিয়ে এল। সেনাপতি সবাইকে বলল, জাহাজঘাটে বিদেশিদের একটা জাহাজ নোঙর করে আছে। সেই জাহাজ আক্রমণ করে ওখানে যারা আছে তাদের বন্দী করতে হবে। সাবধান, কোনোরকম শব্দ যেন না হয়। নিঃশব্দে কাজ সারতে হবে। চলো সব।

প্রথম ঘোড়সওয়ার, পেছনে অন্য সৈন্যরা খোলা তরোয়াল হাতে জাহাজঘাটের দিকে চলল। সেনাপতি একটা সাদা ঘোড়ায় উঠে সৈন্যদের পেছনে পেছনে চলল।

সৈন্যরা একেবারে নিঃশব্দে কাজ সারতে পারল না। এতে সৈন্যের চলাচলে মৃদু কি কথাবার্তায় শব্দ হল। ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেল। ও অসহ্য গরমে প্রায় জেগেই ছিল। বুঝল সৈন্যরা ওদের জাহাজ আক্রমণ করতে যাচ্ছে। ও মৃদুস্বরে ডাল, শাঙ্কো?

জেগে আছি। সেনাপতি তার পরিকল্পনা মতো চলেছে। শাঙ্কো মৃদুস্বরে বলল। তারপর উঠে বসে বলল। বন্ধুদের সাবধান করতে পারলাম না। ঘুমের মধ্যে হঠাৎ আক্রমণ বন্ধুদের হার স্বীকার করতেই হবে।

সবই মেনে নিতে হবে। শুধু ভাবছি-বন্ধুদের এনে এই ঘরে বন্দী করবে। মারিয়া, বয়স্ক ভেনকেও রেহাই দেবে না। এই অসহ্য কষ্ট ওরা দুজন সহ্য করবে কী করে! তাছাড়া সবাইকে নিয়ে পালানোও প্রায় অসম্ভব।

শাঙ্কো মেঝেয় শুয়ে পড়ল। কোনো কথা বলল না। বিনেলোও ততক্ষণে জেগে গেছে। বলল, ফ্রান্সিস, কিছু একটা উপায় বের করো। এইভাবে সবাই এই ছোট ঘরটায় বন্দী হয়ে থাকা

উপায় নেই বিনেলো। আমার সব চিন্তাভাবনা কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। স্থির হয়ে কিছু ভাবতে পারছি না। বড় অসহায় অবস্থা আমাদের।

ফ্রান্সিস, তুমি ভেঙে পড়োনা। তুমিই আমাদের একমাত্র ভরসা। শাঙ্কো বলল। ফ্রান্সিস কোনো কথা বলল না।

ওদিকে সেনাপতি সৈন্যদের নিয়ে জাহাজঘাটে এসে উপস্থিত হল। ম্লান জোৎস্নায় ফ্রান্সিসদের জাহাজটা ভালো করে দেখল। জাহাজের কোথাও আলো জ্বলছেনা। বোঝাই যাচ্ছে বিদেশিরা নিশ্চিন্ত ঘুমে।

সেনাপতি দাড়ি-গোঁফওয়ালা দলপতিকে ডাকল। গলা নামিয়ে বলল, দুজন জলে নামো। ডুব সাঁতার দিয়ে জাহাজটার হালের কাছে ওঠো। কোনো শব্দ না হয় যৈন। হাল বেয়ে জাহাজের ডেকে উঠবে। কেউ কেউ ডেকেও শুয়ে থাকতে পারে। ওদের দৃষ্টি এড়িয়ে কাঠের পাটাতনটা আস্তে আস্তে পেতে দেবে। পাটাতন দিয়ে উঠে সৈন্যরা আক্রমণ করবে। যাও। জলদি।

দাড়ি গোঁফওয়ালা দলপতিসঙ্গী জোগাড় করে সমুদ্রের ধারে এল। জলে কোনো শব্দ না তুলে নামল। ডুব দিল দুজনে। হালের কাছে গিয়ে ভেসে উঠল। হালে পা রেখে রেখে ঝুলন্ত দড়িদড়া ধরে ডেকে উঠে এল। অনুজ্জ্বল চাঁদের আলোয় দেখল চার-পাঁচজন বিদেশি ডেকে শুয়ে ঘুমুচ্ছে।

দুজনে পা টিপে টিপে সিঁড়িঘরের কাছে এল। পাটাতনটা পড়ে আছে দেখল। দুজনে মিলে পাটাতনটা নিয়ে জাহাজের মাথার কাছে এল। আস্তে আস্তে পাটাতনটা তীরের বালিমাটিতে ঠেকিয়ে পেতে দিল। সমুদ্রের বাতাস জোরে বইছে। সিনেত্রা ও অন্যেরা আরামে নাক ডেকে ঘুমুচ্ছে। তাদের মধ্যে নজরদার পেড্রো, জাহাজচালক ফ্লেজারও রয়েছে। হ্যারি কেবিনঘরে ঘুমিয়ে আছে।

অল্পক্ষণের মধ্যে সৈন্যরা একে একে দ্রুত জাহাজের ডেকে উঠে এল। ঘুমন্ত সিনোদের ঘিরে দাঁড়াল ওরা। দাড়ি গোঁফওয়ালা এগিয়ে এল। খোলা তরোয়ালের ডগা দিয়ে সিনেত্রাকে এক খোঁচা দিল। বার তিনেক খোঁচা দিতে সিনেত্রা ধড়মড় করে উঠে বসল। খোলা তরোয়াল হাতে চারদিকে দাঁড়ানো সৈন্যদের দেখে ও তো হতবাক। দাড়ি গোঁফওয়ালা ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে চাপাস্বরে বলল, চুপ, কোনো শব্দ নয়। সিনেত্রার মুখ দিয়ে আর কোনো শব্দ বেরুলনা। সৈন্যরা এবারতবোয়ালের খোঁচা দিয়ে যে ছ-সাত জন ভাইকিং ডেকেঘুমোচ্ছিল তাদেরজাগাল। সবাইউঠেবসল। তখনও ওদেরঘুমেরভাবকাটেনি। সবাইবুঝললড়াইয়ের কোনো সুযোগ নেই। ওরা স্বপ্নেও ভাবেনি এভাবে বন্দীদশা মেনে নিতে হবে। দাড়ি গোঁফওয়ালার নির্দেশে এবার সৈন্যরা সিঁড়িঘরের দিকে গেল। সিঁড়িতে কোনোরকম শব্দ না তুলে ওরা কেবিনঘরগুলোতে ঢুকতে লাগল। ঘুমন্ত ভাইকিংদের ঘুম ভাঙিয়ে ওপরে। ডেকে নিয়ে আসতে লাগল। মারিয়া, ভেনও বাদ গেল না। মারিয়াকে দেখে সৈন্যরা অবশ্য একটু অবাকই হল। কিন্তু তাকেও রেহাই দিল না। সবাইকে ডেকে এনে সারি দিয়ে বসান হল। সৈন্যরা খোলা তরোয়াল হাতে ঘুরে ঘুরে পাহারা দিতে লাগল।

রাত শেষ হয়ে এল। কালো আকাশে সাদা রং ধরল। একটু পরেই পূবে সূর্য উঠল। সকালের নিস্তেজ বোদ ছড়াল আকাশে সমুদ্রে জাহাজে।

দাড়ি-গোঁফওয়ালা গলা চড়িয়ে বলল, রাজা জোস্তাকের হুকুমে তোমরা সব বন্দী হলে। জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বা ছুটে পালাতে গেলে মরবে। চলো সবাই।

সৈন্যদের প্রহরায় ভাইকিংরা একে একে জাহাজ থেকে নেমে এলো। সৈন্যরা ওদের ঘিরে নিয়ে চলল রাজধানীর দিকে। সমুদ্রের দিক থেকে দমকা হাওয়া ছুটে আসছে। বালি উড়ছে। তোদও চড়েছে। তার মধ্যে দিয়ে ভাইকিংরা চলল।

হাঁটতে হাঁটতে সিনেত্রা হ্যারিকে বলল, ফ্রান্সিসরাও বন্দী। আমরাও বন্দী হলাম। মুক্তির কোনো উপায়ই তো দেখছি না।

ফ্রান্সিসের ওপর ভরসা রাখো। ও নিশ্চয়ই একটা উপায় বের করবে। হ্যারি বলল। তারপর মারিয়ার দিকে তাকাল। দেখেই বুঝল–এই রোদের মধ্যে গরম বালির ওপর দিয়ে হাঁটতে রাজকুমারীর বেশ কষ্ট হচ্ছে। ও ভাবল দাড়ি-গোঁফওয়ালাকে রাজকুমারীর এই কষ্টের কথা বলবে। দেখা যাক সৈন্যটি কী বলে?

ও দাড়ি-গোঁফওয়ালার কাছে এল। বলল, একটা কথা বলছিলাম।

কী কথা? সৈন্যটি বেশ গম্ভীর গলায় বলল।

সেনাপতি কি চলে গেছেন? হ্যারি জানতে চাইল।

হ্যাঁ। তাকে কীসের দরকার।

বলছিলাম, ঐ মেয়েটি আমাদের দেশের রাজকুমারী। উনি এই বন্দীদশা, এত কষ্ট সহ্য করতে পারছেন না।

সহ্য করতে হবে। রাজা জোস্তাকের হুকুম সবাইকে বন্দী করে নিয়ে যেতে হবে। কারো রেহাই নেই।

রাজকুমারীকে আর বয়স্ক ভেনকে জাহাজে রাখলে ভালো হত। ওঁরা তো আর জলে ঝাঁপ দিয়ে পালাতে পারবেন না।

কোনো কথা নয়। সবাইকে অস্ত্রঘরে বন্দী থাকতে হবে। তোমার বন্ধুরা আমাদের ফাঁকি দিয়ে একবার পালিয়েছে। বারবার পারবে না। দাড়ি-গোঁফওয়ালা বলল।

হ্যারি আর কোন কথা বলল না। মারিয়ার কাছে এল। বলল, রাজকুমারী, বুঝতে পারছি আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে। ওদের বললাম সে কথা। কিন্তু আমার কথা কানেই তুলল না।

না না, মারিয়া মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ওদের কোনো অনুরোধ করতে যেও না। তোমরা কষ্ট সহ্য করছ আর আমি পারব না?

ঠিক আছে। এ ব্যাপারে ফ্রান্সিস কী করে দেখি। হ্যারি বলল।

দু’পাশে রাজধানীর বাড়ি-ঘর-দোর দেখা গেল। লোকজন সাগ্রহে ফ্লেজারদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। বিশেষ করে মারিয়াকে দেখেই ওরা উৎসুক হল বেশি। এই বিদেশিরা কোত্থেকে এল? এদের বন্দীই বা করা হল কেন? ওরা রাজা জোস্তাককে ভালো করে চেনে। যা বদরাগী রাজা এরা সহজে রেহাই পাবে না।

ফ্রান্সিস অস্ত্রঘরের মেঝেয় শুয়েছিল। বাইরে ঘোড়ার পায়ের শব্দ, সৈনদের চলার শব্দ ওর কানে গেল। ও উঠে বসল। মৃদুস্বরে বলল, শাঙ্কো, বোধহয় বন্ধুদের বন্দী করে আনা হল।

তখনই অস্ত্রঘরের দরজা খুলে গেল। হ্যারিরা একে একে ঢুকতে লাগল। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল, হ্যারি, লড়াই তো হয়নি?

আমরা তখন গভীর ঘুমে। কথাটা বলতে বলতে হ্যারি এসে ফ্রান্সিসের পাশে বসল।

একটা বিরাট ভুল হয়েছে আমার। তোমাদের সময়মতো সাবধান করতে পারিনি। পেড্রোকে যদি নজরদারির জন্যে রাখা হত তবে তোমরা এত সহজে বন্দী হতে না। ফ্রান্সিস বলল।

হ্যাঁ। ভুলের সে মাসুল দিতেই হবে। তারপর ঘরের চারিদিকে তাকিয়ে বলল, এ কেমন কয়েদঘর? দরজা চেপে বন্ধ করা। একটা জানালাও নেই।

এটা অস্ত্র রাখার ঘর ছিল।

তাই এরকম দম বন্ধ করা পরিবেশ। হ্যারি বলল।

হ্যাঁ। এখানেই থাকতে হবে। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল।

মারিয়া এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। ফ্রান্সিস বলল, মারিয়া, দাঁড়িয়ে থেকো না। বসো। বিশ্রাম করো। মারিয়া ফ্রান্সিসের পাশে এসে বসল। মৃদুস্বরে বলল, এ তো অন্ধকূপ হত্যা।

বন্দীদশা এরকমই হয়। বলে মারিয়ার শ্রান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করল, তোমার শরীর ভালো আছে তো?

হ্যাঁ, হ্যাঁ। তুমি আমার জন্যে ভেবো না। মারিয়া ম্লান হাসল।

হ্যারি বলল, জান, রাজকুমারী আর ভেনকে জাহাজেই রাখার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু গোঁফ ওয়ালা লোকটা আমার কথা কানেই তুলল না।

ওকে বলে কিছু হবে না। রাজা জোস্তাককে বলতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।

রাজা জোস্তাক আবার কেমন মানুষ কে জানে। হ্যারি বলল।

দেখা যাক। ফন্সিস উত্তর দিল।

বন্ধুদের মধ্যে তখন গুঞ্জন শুরু হয়েছে। ছোট ঘরে বেশ গাদাগাদি করে বসতে হয়েছে সবাইকে। নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা চলছে। তখনই ফ্লেজার বলল, ফ্রান্সিস, এই। ঘরে থাকলে আমরা বোধহয় বাঁচব না। যা হোক করে মুক্তির উপায় ভাবো।

ভাবছি। পাহারার ব্যবস্থাটা ভালো করে লক্ষ্য করতে হবে। তারপর পালানোর ছক কষতেহবে।

সন্ধ্যেবেলা সেনাপতি এল। দরজার একটা পাল্লা খুলে গলা বাড়িয়ে হেসে বলল, শুনেছি তোমরা নাকি খুব কষ্ট সহিষ্ণু, বীর জাতি। এই অস্ত্রঘরে থাকতে খুব কষ্ট হচ্ছে। কি?

খুব ভালো আছি আমরা। এখনও দম বন্ধ হয়ে মরে যায়নি। হ্যারি গলা নামিয়ে বলল।

সেনাপতি কথাটা ঠিক বুঝল না। বলল, কী বললে?

ফ্রান্সিস বলে উঠল, কিছু না। একটা দরকারি কথা বলছিলাম।

কী বলবে বলো।

বলছিলাম রাজা জোস্তাকের সঙ্গে একবার কথা বলতে চাই। ফ্রান্সিস বলল।

আগেই বলেছি কোন লাভ নেই। রাজা জোস্তাক এককথার মানুষ। তোমাদের মুক্তি দেবে না। সেনাপতি বলল।

ঠিক আছে। অন্তত একবার বলে দেখুন। আমরা মুক্তি চাই না। এভাবে দমবন্ধ হয়ে মরতে চাই না। বলবেন দরকারি কয়েকটা কথা বলব। ফ্রান্সিস বলল।

অত করে বলছ। ঠিক আছে, রাজাকে বলব। সেনাপতি চলে গেল, দরজার পাল্লা বন্ধ হয়ে গেল।

রাতের খাওয়াটা ভালোই হল। পাখির মাংস, রুটি আর আনাজের ঝোল। ক্ষুধার্ত ভাইকিংরা পেট পুরে খেল। কিন্তু রাতটা কাটল বেশ কষ্টে। কারো প্রায় ঘুমই হল না। ফ্রান্সিস খুবই চিন্তায় পড়ল। বিশেষ করে মারিয়ার জন্যে। এভাবে কতদিন চলবে? হ্যারিরও সহ্যক্ষমতা কম।

সবে সকালের খাবার খাওয়া হয়েছে সেনাপতি এল। বলল, রাজা জোস্তাক খুবই দয়ালু। তোমার কথা শুনতে রাজি হয়েছেন। তবে আগেই বলেছি আজে বাজে কথা শত একদম বলবে না। রাজা চটে গেলে কিন্ত তোমাকে ফাঁসিতে লটকে দেবে। ফ্রান্সিস কোনো কথা বলল না।

চলে এসো। রাজসভার কাজ শুরু হয়ে গেছে। সেনাপতি বলল।

ফ্রান্সিস হ্যারিকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে এল। চারজন সৈন্য এগিয়ে এল। ফ্রান্সিসদের পাহারা দিয়ে নিয়ে চলল।

ওরা সৈন্যদের পাহারায় সভাকক্ষে ঢুকল। তখন কোনো বিচার চলছিল না। দুদিকে পাথরের জানালা থাকা সত্ত্বেও সভাকক্ষ বেশ অন্ধকার। পাথরের সিংহাসনে রাজা বসে আছে। দু’পাশের আসনে সেনাপতি ও মন্ত্রী। সভাকক্ষে প্রজাদের বেশ ভিড়। সিংহাসনে বসেই রাজা একনাগাড়ে বলে চলেছে, কাজেই আমাদের সাবধান হবার সময় এসেছে। দক্ষিণের রাজ্যের জংলীদের সর্দার যে কোনোদিন আমার রাজত্ব আক্রমণ করতে পারে। ঐ দলপতি রাজা মিলিন্দার গোপন ধনৈশ্বর্যের সংবাদ জানে। ওদের লক্ষ্য সেই ধনৈশ্বর্য উদ্ধার করা। এই জন্যেই ওরা আমার রাজত্ব দখল করতে চায়। তখন লড়াই হবে। আমার সৈন্যবাহিনী রয়েছে। কিন্তু তোমাদেরও লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে। রাজা থামল। উপস্থিতপ্রজারা ধ্বনি তুলল, রাজা জোস্তাকের জয় হোক।

রাজা জোস্তাকের কথা শুনে ফ্রান্সিস চমকে উঠল। এই রাজত্বের কোথাও গুপ্ত ধনৈশ্বর্য আছে এটা ও প্রথম শুনল না। সেনাপতিও বলেছিল। রাজা জোস্তাক আর কিছু বলল না। গুপ্ত ঐশ্বর্য সম্বন্ধে ফ্রান্সিস আর কিছু জানতে পারল না। দরবারকক্ষ থেকে প্রজারা বেরিয়ে যেতে লাগল। অল্পক্ষণের মধ্যেই দরবার কক্ষ প্রায় শূন্য হয়ে পড়ল।

রাজা ফ্রান্সিসদের দেখল। সেনাপতি আসন থেকে উঠে রাজার কাছে এল। কিছু বলল। তারপর নিজের আসনে ফিরে গেল। রাজা বলল, তোমরা বিদেশি ভাইকিং।

হ্যাঁ। এ তো আগেই বলেছি। ফ্রান্সিস একটু এগিয়ে গিয়ে বলল।

কী বলতে চাও তোমরা? রাজা জানতে চাইল।

কয়েদঘর নয় অস্ত্রঘরে আমাদের বন্দী করে রাখা হয়েছে। ঘরে একটা জানালাও নেই। কোনো ফোকরও নেই। দরজা সবসময় বন্ধ করে রাখা হয়। আমরা এতজন একসঙ্গে আছি। দম বন্ধ হয়ে আসে।

কয়েদঘর তোমরাই আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছ। এবার তার ফল ভোগ কর। রাজা বলল।

একটা আর্জি। ফ্রান্সিস বলল।

হুঁ। বলো।

আমাদের সঙ্গে রয়েছে আমাদের দেশের রাজকুমারী আর একজন বয়স্ক বৈদ্য। তারা দুজন এত কষ্ট সহ্য করতে পারবেনা। তাদের অন্য কোথাও বন্দী করে রাখা হোক।

না, সবাইকে ঐ অস্ত্রঘরে থাকতে হবে। তোমাদের এভাবে আমার রাজত্বে আসা সন্দেহজনক। নিশ্চয়ই তোমাদের কোন উদ্দেশ্য আছে রাজা বলল।

কোন উদ্দেশ্য নেই। আগেও বলেছি এখনও বলছি জাহাজ চালাতে চালাতে এসে পড়েছি। আমরা এরকমই কোন উদ্দেশ্য না নিয়েই দ্বীপে দ্বীপে দেশে দেশে ঘুরে বেড়াই। আপনাকে আগেই বলেছি আরো একটা কাজ আমরা করি। গুপ্তধন ভাণ্ডারের খোঁজ পেলে কোন সূত্র ধরে চিন্তা আর বুদ্ধি খাটিয়ে আমি আর বীর বন্ধুরা সেসব উদ্ধার করি।

–আর সে সব নিয়ে জাহাজে চড়ে পালাও। রাজা গম্ভীর হয়ে বলল।

–না। আগেও বলেছি যথার্থ মালিককে সব দিয়ে দি। দু-একবার পোশাক খাদ্য। কেনার জন্য তার সম্মতি নিয়ে কিছুস্বর্ণমুদ্র নিয়েছি। বাঁচতে হবে তো। নইলে কিছুই নিই। নি। ফ্রান্সিস বেশ দৃঢ় স্বরে বলল। রাজা ফ্রান্সিসের এই আত্মপ্রত্যয় দেখে খুব খুশি হল। দেখা যাক এদের দিয়ে কার্যোদ্ধার হয় কিনা। বেশ ভাবান্তর ঘটল রাজার। সাগ্রহে বলল এই রাজত্বের কোথাও গোপনে রাখা আছেঅতীতের এক রাজা মিরান্দার ঐশ্বর্য ভাণ্ডার। পারবে উদ্ধার করতে। ফ্রান্সিস একটু চমকে রাজার মুখের দিকে তাকাল। মনে পড়ল সেনাপতিও এই গুপ্তধনের কথা কথাপ্রসঙ্গে বলেছিল। কিন্তু ফ্রান্সিস বিশেষ আগ্রহ দেখল না। রাজাকে বিশ্বাস নেই। বলল–চেষ্টা করতে পারি।

–উঁহু। তোমরা কাল থেকেই লেগে পড়ো। রাজার লোভর্তি চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝল রাজা সত্যিই গুপ্তধনের জন্যে মরীয়া হয়ে উঠেছে। আবার ভাবল– অস্ত্রঘরের নরকযন্ত্রণা থেকে রেহাই পেতে গেলে যত শিগগির সম্ভব গুপ্তধন খুঁজে বের করতে হবে। বলল-দেখুন গুপ্ত ঐশ্বর্য সন্ধান করে উদ্ধার করতে পারবো এরকম কথা দিতে পারবো না। তবে রাজ্যের চারদিকে দেখে শুনে চিন্তা ভাবনা করে তবেই উদ্ধার করতে পারবো। তারপর বলল–যদি অনুমতি দেন তবে কাল থেকেই লাগতে পারি।

-খুব ভালো কথা। রাজা হেসে বলে উঠলেন।

–কিন্তু তার আগে কয়েকটা কথা। ফ্রান্সিস বলল।

বলো বলো সাগ্রহে রাজা বলল।

–শুধু আমরা তিনজন থাকবো। বাকি সব বন্ধুদের মুক্তি দিয়ে জাহাজে চলে যেতে দিতে হবে।

–উঁহু। তা হবে। গুপ্ত ঐশ্বর্য উদ্ধার করলে তবেই তোমরা মুক্তি পাবে। ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকাল। হ্যারিও চাপাস্বরে বলল–এ সুযোগ হাতছাড়া করো না। কাজ হয়ে যাবে।

–বেশ–ফ্রান্সিস বলল–আমাদের তিনজনকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। খোঁজখবর নিতে যে কোন জায়গায় আমাদের যেতে দিতে হবে। কোন শর্ত চাপানো চলবে না।

–আপত্তি নেই। খোঁজ খবর সেরে ঐ অস্ত্রঘরেই ফিরে আসতে হবে। একটা কথা, তোমাদের সঙ্গে সব সময় থাকবে–এক বিশ্বস্ত যোদ্ধা রাজা বলল।

-কেন?

–তোমরা পালিয়ে যেতে পারে। রাজা বলল।

–রাজকুমারীকে, বন্ধুদের বন্দী রেখে আমরা পালিয়ে যাবো? এটা আপনিও ভাবতে পারেন–আমরা কল্পনাও করতে পারি না। ফ্রান্সিস বলল।

–ঠিক আছে। ঠিক আছে। কাল থেকে কাজে লেগে পেড়ো। তবে ঐ গুপ্ত ঐশ্বর্য পারবে না উদ্ধার করতে। রাজা মিলিন্দার পরে যারা রাজা হয়েছিল তারা অনেকদিন চেষ্টা করেও পারেনি। তাদের তো লোকবল কিছু কম ছিল না।

–দেখা যাক। ফ্রান্সিস মাথা উঠানামা করে বলল।

ফ্রান্সিসরা সৈন্যদের পাহারায় অস্ত্র ঘরে ফিরে এল। ওদের দুজনকে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। মারিয়ার বন্ধুরা গভীর আগ্রহেফ্রান্সিসদের জন্য অপেক্ষা করছিল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি বলল। শাঙ্কো এগিয়ে এল। বলল কিছু সুরাহা হল? হ্যারি মাথা নাড়ল। তারপর রাজার সঙ্গে যা যা কথা হয়েছে গুপ্ত ধনভাণ্ডার রাজার শর্ত সব বলল। সকলেই শুনল সে সবকথা। বুঝল–এই দমবন্ধ করা বন্দী দশা থেকে আপাতত মুক্তি নেই। হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই গুপ্তধনভাণ্ডার উদ্ধার করতে হবে।

–সে আর বলতে। তবে এরকম পরিস্থিতিতে আগে কখনও পড়িনি। খোঁজ খবর চালাতে হবে। দ্রুত। বিশ্রাম টিশ্রাম কপালে নেই। যত তাড়াতাড়ি ঐ ধনভাণ্ডার উদ্ধার করতে পারবো তত তাড়তাড়ি মুক্তি পাবো। ফ্রান্সিস বলল। একটু থেমে বলল কিন্তু হ্যারি ঐ ধনভাণ্ডার সম্বন্ধে তেমন কোন তথ্যই এখানো জোগাড় করতে পারেনি। যা হোক–দুপুরের খাবার খেয়েই কাজে নামতে হবে।

–প্রথম কী ভাবে খোঁজ খবর শুরু করবে? হ্যারি জানতে চাইল।

–প্রথম রাজবাড়ির ভেতরটা দেখবো। তন্ন তন্ন করে খুঁজবো। দেখি কোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাই কিনা।

–না পেলে? হ্যারি প্রশ্ন করল।

রাজা জোস্তাকের সঙ্গে কথা বলতে হবে। গুপ্তধন সম্পর্কে সে কতটা জানে তা জানতে হবে। সেই গুপ্তধন কোথায় থাকতে পারে বলে তার ধারণা। রাজাও তো এই ব্যাপারে অনেক খোঁজখবর করেছে, ভেবেছে। দেখা যাক সে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কোন তথ্য পাই কিনা। ফ্রান্সিস বলল।

হবে। রাজার কী অনুমান সেটা জানতে হবে।

তাহলে তো কালকে রাজসভায় যেতে হবে। হ্যারি বলল।

দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে ফ্রান্সিস হ্যারি আর শাঙ্কোকে বলল, রাজবাড়িতে চল।

মারিয়া বলে উঠল, আমিও যাব।

বেশ চলো। ফ্রান্সিস বলল।

শাঙ্কো উঠে গিয়ে দরজায় জোরে ধাক্কা মারল। দরজার একটা পাল্লা খুলে গেল। প্রহরী মুখ বাড়িয়ে বলল, দরজা ধাকাচ্ছ কেন?

সেনাপতিকে ডেকে দাও। কথা আছে। শাঙ্কো বলল।

হুঁ। প্রহরী পাল্লা বন্ধ করে চলে গেল।

কিছু পরে সেনাপতি এল। দরজার দুটো পাল্লা খুলে বলল, কী ব্যাপার?

ফ্রান্সিস এগিয়ে এসে বলল, রাজা জোস্তাকের সঙ্গে আমার কী কী কথাবার্তা হয়েছে। তা আপনি শুনেছেন।

হ্যাঁ হ্যাঁ। সেনাপতি মাথা কাত করল।

আমরা রাজবাড়িতে খোঁজটোজ করতে যাব।

বেশ, সেনাপতি বলল। তারপর পেছন ফিরে দাঁড়ি গোঁফওয়ালা সেই সৈন্যটিকে বলল, এরা তিনজন রাজবাড়িতে খোঁজাখুঁজি করতে যাবে। এদের কড়া পাহারায় রাখতে হবে। যেন পালাতে না পারে।

কে কে আসবে এস। দাড়ি গোঁফওয়ালা বলল।

মারিয়া, হ্যারি আর শাঙ্কোকে নিয়ে ফ্রান্সিস অস্ত্রঘর থেকে বেরিয়ে এল। তারপর দাড়ি-গোঁফওয়ালার পাহারায় রাজবাড়ির দিকে চলল। যেতে যেতে ফ্রান্সিস বলল, আমরা খোঁজটোজ করব। আর তুমি আমাদের পাহারায় থাকবে। কাজেই তোমার নামটা তো জানা দরকার।

সৈন্যটি দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে বলল, আমার নাম লার্দো।

বাঃ সুন্দর নাম, হ্যারি হাসি চেপে বলল। লার্দো দাড়ি-গোঁফের ফাঁকে হাসল। বলল, লার্দো মানে হল মোটা।

নামটা কে দিয়েছিল? শাঙ্কো জিগ্যেস করল।

দিদিমা। ছোটবেলায় খুম মোটা ছিলাম তো, লার্দো বলল।

এখনও কিছু কম যাও না। হ্যারি মুখ টিপে বলল। এত দুশ্চিন্তার মধ্যেও ফ্রান্সিস হো হো করে হেসে উঠল।

চোপ! কোনো বাজে কথা না। লার্দো বলল, বেশ ধমকের সুরে।

তরোয়ালটা খাপে ভরে ফেললো। শাঙ্কো নিরীহ ভঙ্গিতে বলল।

না-না। সেনাপতির হুকুম, কোনো রকম বেচাল দেখলে তরোয়াল চালাবে, লার্দো বলল।

ফ্রান্সিসরা আর কিছু বলল না। সবাই সদর দেউড়ি পার হয়ে রাজ বাড়িতে ঢুকল। অন্দরমহলের দরজায় দুজন প্রহরী বর্শাহাতে পাহারা দিচ্ছে। লার্দো এগিয়ে গিয়ে বলল, এই বিদেশিদের রাজা অনুমতি দিয়েছেন। এরা অন্দরমহল ঘুরে দেখবে। মাননীয়া রানিকে বলো গে। একজন প্রহরী চলে গেল। কিছু পরে ফিরে এল। বলল, যাও,। তবে মাননীয়া রানি হুকুম দিয়েছেন তোমরা বেশিক্ষণ থাকবে না।

ঠিক আছে। ফ্রান্সিস বলল।

সবাই অন্দরমহলে ঢুকল। পাথরের ঘর-দোর খুব সুসজ্জিত। দামি কাঠের আসবাবপত্র। বিছানায় দামি কাপড়ের সজ্জা। ফ্রান্সিস অবশ্য সে সব দেখছিল না। দেখছিল পাথরের দেয়াল, ছাদ। দেয়ালে রঙিন ছবি আঁকা। পাথরের দেয়াল নিরেট। দেয়ালের মধ্যে কোন গোপন কুঠুরি থাকার সম্ভাবনা নেই।

ফ্রান্সিসরা ঘুরে ঘুরে সব ঘর দেখল। কোথাও কোন সাংকেতিক চিহ্ন পেল না। ঘরগুলো, দেয়ালগুলো খুব পরিচ্ছন্ন। ফ্রান্সিসের কেমন মনে হল রাজবাড়িটা খুব বেশিদিন তৈরি হয়নি। তবুলার্দোকে জিজ্ঞেস করল, এই রাজবাড়িতে কোনো পুরোন পরিত্যক্ত ঘর বা পাথরের মেঝের নীচে ঘর আছে?

না, এই রাজবাড়ি বেশিদিনের নয়। রাজা জোস্তাকের পিতার আমলের তৈরি। লার্দো বলল।

এটা আমারও মনে হয়েছে। আচ্ছা রাজা মিলিন্দার আমলে রাজবাড়ি কোথায় ছিল, ফ্রান্সিস জিগ্যেস করল।

–সে তো উত্তর দিকের টিলার নিচে। এখন ধ্বংসাব শেষ। লার্দো বলল। ফ্রান্সিস বলে উঠল–ওটাই দেখবো। চলো।

রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে ওরা উত্তরমুখো চলল। দূর থেকেই একটা ঝোঁপ জঙ্গল ঢাকা টিলা দেখল। কাছাকাছি আসতে দেখল টিলার নিচেই পুরনো রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ। ওরা পাথরের ভাঙা পাটা ছড়ানো জায়গাটায় এল। এখন আর ঐ ধ্বংসাবশেষ দেখে বোঝার উপায় নেই কোথায় ছিল সদর দেউড়ি কোথায় ছিল রাজসভা অন্দরমহল বা বারান্দা জানালা দরজা। স্থূপাকার পাথরের পাটা দেখে কিছুই। বোঝার উপায় নেই। কিছুক্ষণ সেই ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে থেকে ফ্রান্সিস বলল– সব কিছু ভালোভাবে দেখতে হবে। চলো ধ্বংসস্তূপের ওপরে ওঠা যাক।

–এখানে দেখার কী আছে? সবই তো ভেঙে শেষ। লার্দো বলল।

রাজসভা দরজা অন্দরমহল দেখে দেখে এসব বুঝে নিতে হবে। তুমি বরং নিচে থাকো। তুমি তো একটু মোটা মানুষ। তুমি পারবে না।

-না-না। রাজার হুকুম। তোমাদের চোখে চোখে রাখতে হবে। লার্দো মাথা নেড়ে বলল।

তাহলে এসো। শাঙ্কো বলল।

সবাই সাবধানে ভাঙা পাথরের ওপর পা রেখে ধ্বংসস্তূপের একেবারে ওপরে উঠে এল। ভাঙা পাথরের মধ্যে বুনো গাছগাছালি গজিয়েছে। অনেক জায়গায় জংলা ঝোঁপঝাড়। পাথরে শ্যাওলার মোটা ছোপ। ফার্ণ গাছ।

এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করতে করতে একটা ধ্বসে যাওয়া অংশের কাছে এল। ধ্বসের পাশেই একটা গহ্বর মত। ফ্রান্সিস গহুরটার মাথায় হাঁটু গেড়ে বসল। তারপর মুখ নিচু করে তাকাল। গহ্বরের উত্তর দিকে ধ্বসে গেছে বলে গহ্বরটায় রোদ পড়েছে। , তবু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। আবছা দেখল একটা ভাঙা ঘরের অংশ। ওর মনে প্রশ্ন– এই অংশটাতেই কি রাজবাড়ির অন্দর মহল ছিল। এই ভাঙা অংশ দিয়ে নেমে দেখতে হবে। এমনি ধ্বসে যাওয়া আরো ঘর হয়তো পাওয়া যাবে। ঠিক তখনই ভাঙা পাথরে পিছনে হ্যারি পড়ে যেতে যেতে একটা বুনো ঝোপে আটকে গেল। ফ্রান্সিস ভাঙা পাথরে ভারসাম্য রেখে যতটা দ্রুত সম্ভব হ্যারির কাছে। হ্যারিকে টেনে তুলে দাঁড় করালো। তেমন কিছু আঘাত নয়। হ্যারি হেসে বলল–আমি ঠিক আছি। তোমরা যা দেখার দেখ। হ্যারির হাঁটু কনুই ছেড়ে গেছে। অল্প রক্ত বেরিয়ে এসেছে।

–আজ বেলা হয়ে গেছে। খিদেও পেয়েছে। চলো ফিরি। কালকে আসবো ফ্রান্সিস বলল।

চার জনে ভারসাম্য রেখে আস্তে আস্তে পাথরের স্তূপ থেকে নেমে এল।

পরদিন সকালের খাবার খেয়ে ফন্সিস বলল হ্যারি চলো আগে রাজার সঙ্গে কথা বলে নি। তারপর পুরনো রাজবাড়ির দিকে যাবো।

ওরা যখন রাজসভায় এল তখন দেখল রাজা মন্ত্রীমশাইয়ের সঙ্গে কথা বলছে। রাজসভায় আজ ভিড় কম। কথাবার্তা শেষ করে রাজা ফ্রান্সিসদের দিকে তাকাল। বললকী? কিছু হদিশ করতে পারলে?

–সবে তো খোঁজ শুরু করেছি। এতদিন আগে গোপন রাখা ধনসম্পদ–কিছু দিন তো সময় লাগবে। এই ব্যাপারে আপনার সঙ্গে কিছু কথা বলতে এসেছি। এই গুপ্তধন কোথায় থাকতে পারে বলে আপনার মনে হয়? ফ্রান্সিস বলল।

–সেটা কী করে বলি। রাজা বলল।

–তবু-আপনার অনুমান? ফ্রান্সিস বলল।

–রাজবাড়ির কোথাও। রাজা বলল।

না। রাজবাড়ি আমি তন্নতন্ন করে দেখেছি। ফ্রান্সিস বলল

–তাহলে এই রাজত্বেরই কোথাও। রাজা বলল।

–আচ্ছা–প্রাচীন রাজবাড়িতে? ফ্রান্সিস বলল।

–ও তো ধ্বংসস্তূপ! রাজা বলল।

–কিন্ত রাজা মিলিন্দা তোঐ রাজবাড়িতেই থাকতেন। ফ্রান্সিস বলল

–হ্যাঁ শেষ জীবনে ঐ বাড়িতে ছিলেন। রাজা বলল।

–উনি কী ভাবে মারা গিয়েছিলেন। ফ্রান্সিস জানতে চাইল।

–হঠাৎ হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে। রাজা বলল।

–এমনও তো হতে পারে উনি মৃত্যুর আগে কাউকে বলে গেছেন। ফ্রান্সিস বলল।

-রানি আগেই মারা গিয়েছিলেন। রানি ছাড়া আর কাকে বলে যাবেন। রাজা বলল।

–ছেলেমেয়ের কাউকে। ফ্রান্সিস বলল।

–তাহলে তো গোপনীয় কিছুই থাকতো না। রাজা বলল।

–যা হোক–যা বুঝতে পারছি প্রাচীন ভাঙা রাজবাড়িতেই কিছু হদিশ পাওয়া যেতে পারে। ফ্রান্সিস বলল।

-দেখ চেষ্টা করে। রাজা একটু বিরক্তির সঙ্গেই বলল।

লার্দোর পাহারায় ওরা প্রাচীন ভাঙা প্রাসাদের কাছে এল। ফ্রান্সিস ঘুরে টিলার দিকে গেল। ওপর থেকে যে গহুরটা দেখেছিল তার পাশে এল। একটা আধভাঙা দেয়ালের ওপাশেই গহ্বরটা। ও পাথরের পাটার খাঁজে খাঁজে পা রেখে রেখে দেয়ালে উঠল। তরপর দেয়ালের ওপাশে একই ভাবে নামল। গহুরের ভাঙা অংশে রোদ। পড়েছে। অস্পষ্ট হলেও ভিতরটা দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে নেমে এল। দেখল ভাঙা পাথরের পাটায় ঢাকা একটা মেঝে মত। চারপাশে তাকিয়ে আন্দাজ করে বুঝল এখানে একটা বড় ঘর ছিল। খুব সম্ভব অন্দরমহলের ঘর। মেঝের ওপর জমে থাকা পাথরের ভাঙা পাটাতন সরাতে পারলে ঘরটা দেখা যাবে। ও মুখ উঁচু করে ডাকল–শাঙ্কো শাঙ্কো।

–বলো। শাঙ্কোর গলা শুনল। ও বলল–আমার মত দেয়াল ধরে ধরে এখানে নেমে এসো। লার্দোকেও সঙ্গে নিয়ে এসো। হ্যারি পারবে না। হ্যারি থাক্।

কিছু পরে শাঙ্কো আর লার্দো নেমে এল। ফ্রান্সিস বলল–হাত লাগাও। সব ভাঙা পাথরের পাটা সরাতে হবে।

তিনজন মিলে পাথরের ভাঙা পাটা তুলে তুলে একপাশে জড়ো করতে লাগল। গহুরে শব্দ হতে লাগল। খট খট খটাৎ।

কিছুক্ষণের মধ্যেই পাথরের মেঝেটা দেখা গেল। সেই স্বল্পালোকে ফ্রান্সিস মেঝেটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। কিন্তু কোন বিশেষ চিহ্ন কিছু দেখল না। দক্ষিণ কোণায় গিয়ে দেখল এদিকটায় ধ্বস নেমেছে। সেখানে একটা কিছুর কোনা বেরিয়ে আছে। ফ্রান্সিস ডাকল শাঙ্কো। শাঙ্কো এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস বলল–ঐ দেখ। একটা চৌকোনো ফোকর। ওখানকার পাথর সরাও। তিনজনে ওখানকার পাথর সরাতে লাগল। জায়গাটা পরিষ্কার হল। দেখা গেল একটা চৌকোনো গর্ত মত। গর্তের গা মসৃণ পাথরের। বোঝাই যাচ্ছে এই চৌকোনো গর্তে কছু রাখা ছিল। ফ্রান্সিস গর্তটার চারপাশ ভালো করে দেখতে দেখতেবলল–শাঙ্কো এইখানে রাজকোষ ছিল। নিশ্চয়ই কোন কাঠের অথবা লোহার বাক্স এখানে ছিল। রাজা মিলিন্দার আমলে।

–তাহলে কোথায় গেল সেই বাক্স? শাঙ্কো বলল।

–সেটাই প্রশ্ন মনে হয় রাজা মিলিন্দা সেই রাজকোষ অন্য কোথাও গোপনে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। ফ্রান্সিস বলল।

–কিন্তু ফ্রান্সিস–এও তো হতে পারে যে পরের কোন রাজা সেটা পেয়েছিলেন। শাঙ্কো বলল।

–উঁহু। তাহলে সেটা গোপন থাকতো না। সবাই জানতো। সন্দেহ নেই–এখান থেকে রাজকোষ অন্যত্র কোথাও সরানো হয়েছিল-কাজেই এখানে আর দেখার কিছু নেই। এখানে সব ভেঙেচুরে গেছে এই অংশটুকুই যা মোটামুটি আস্ত আছে। এবার অন্য জায়গাগুলো দেখতে হবে। চলো টিলাটা ভালো করে দেখি।

তিনজনে ভাঙা দেয়ালে পা রেখে রেখে উঠে এল। হ্যারি বলল–কিছু হদিশ পেলে? ফ্রান্সিস সব বলল। হ্যারি বলল–বোঝাই যাচ্ছে রাজা মিলিন্দার রাজকোষ অন্য কোন নিরাপদ জায়গায় রেখেছেন।

চারজন ঝোঁপঝাড় জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে টিলার ওপরে উঠল। টিলার মাথাটা নিরেট পাথরের। টিলার মাথা থেকে ফ্রান্সিস চারদিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। কিন্তু লুকিয়ে রাখার মত কোন গুহা বা গর্ত দেখতে পেল না।

এখানে কালকে আবার আসবো ফান্সিস বলল। জঙ্গল এলাকাটা দেখতে হবে। বেলা হয়েছে। ফিরে চলো এখন।

চারজন ফিরে এল।

পরদিন সকালে ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি চলো রাজার কাছে যাবো। প্রাচীন রাজাবাড়ির ধ্বংসস্তূপ যা দেখলাম সে সব নিয়ে কথা বলবো। তখন বন্ধুরা কয়েকজন এগিয়ে এসে বলল–ফ্রান্সিস এভাবে বন্ধ ঘরে অসহ্য গরমে রাতদিন তুমি রাজাকে বলো এভাবে থাকলে আমরা বাঁচবো না। ফ্রান্সিস বলল–আমার চিন্তা মারিয়া আর হ্যারিকে নিয়ে। তোমরা তবু সহ্য করতে পারবে অন্তত কিছুদিন। কিন্তু মারিয়া আর হ্যারি কতদিন পারবে সেটাই চিন্তার। কাল থেকে দিন রাত ধরে সারা রাজ্য ঘুরে বেড়াবো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গুপ্তধন ভাণ্ডার উদ্ধার করবো। তাহলেই আমাদের মুক্তি। অনুরোধ –ধৈর্য হারিও না। আমার ওপর বিশ্বাস রাখো। বন্ধুরা আর কিছু বলল না।

তখনই লার্দো এসে হাজির। বন্ধ দরজার একটা পাল্লা খুলে ও মুখ বাড়াল। বলল কী? তোমরা বেরোবে নাকি?

–হ্যাঁ। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। শাঙ্কো আর হ্যারি তৈরিই ছিল।

লার্দোর পাহারায় ওরা রাজবাড়ি চলল।

রাজসভায় আজ বিচার চলছিল। ফ্রান্সিসরা অপেক্ষা করতে লাগল।

একসময় বিচার শেষ হল। রাজা ডান হাত তুলে অপরাধীকে দেখিয়ে বলে উঠল –একে অভিশপ্ত দ্বীপে রেখে আয়। বিচারের শাস্তির কথা শুনে অপরাধী লোকটি হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। মাথা নেড়ে নেড়ে বলতে লাগল

–আমাকে এই শাস্তি দেবেন না মহামান্য রাজা। আমাকে অন্য শাস্তি দিন। অপরাধী বার বার বলতে লাগল।

–না। অভিশপ্ত দ্বীপে নির্বাসন যা। রাজা মাথা নেড়ে বলল। দুজন সৈন্য এগিয়ে এসে অপরাধীকে টেনে ধরে নিয়ে চলল। অপরাধী চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে মেঝেয় শুয়ে পড়ল। সৈন দুজন ওকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলল। লোকটা তখনও তারস্বরে কেঁদে চলেছে।

ফ্রান্সিস এই প্রথম অভিশপ্ত দ্বীপের কথাটা বলল। ও বুঝল না এরকম নাম, একটা দ্বীপের? কেন? ফ্রান্সিস কথাটা ভাবছে তখনই সেনাপতি বলল তোমরা এগিয়ে এসো। কী বলতে চাও বলো। ফ্রান্সিস কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে ধ্বংপ্রাপ্ত পুরনো রাজাপ্রাসাদে কী ঘটল সব বলল। সবশেষে বলল–যতদূর বুঝতে পারছি রাজা মিলিন্দার রাজকোষ ঐ প্রাসাদেই ছিল। উনি পরে মন পরিবর্তন করে অন্য কোন গোপন স্থানে রেখেছেন।

–হ্যাঁ তা এখন কী করতে চাও? রাজা জোস্তাক বলল।

–অন্য জায়গায় খুঁজতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।

–দেখ খুঁজে। রাজা বলল।

একটা কথা বলছিলাম। ফ্রান্সিস বলল।

–বলো। রাজা বলল।

–অভিশপ্ত দ্বীপ কি একটা দ্বীপ? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।

–হ্যাঁ ছোট দ্বীপ একটা। রাজা বলল।

অভিশপ্ত বলা হচ্ছে কেন? ফ্রান্সিস প্রশ্ন করল।

–ঐ দ্বীপে নামলে কেউ জীবিত ফিরে আসতে পারে না। রাজা বলল

–কেন? ফ্রান্সিস বেশ আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল।

–ঐ দ্বীপে তর্নার নামে এক রকমের বিষাক্ত গাছ আছে। সেই গাছের পাতার রং সবসময়ই হলদু। বসন্তকালে সেই গাছে টকটকে লাল রঙের ফুল হয়। গাছ-ফুল সবই বিষাক্ত। ঐ দ্বীপে নামলেই অবধারিত মৃত্যু। ঐ অভিশপ্ত দীপের ধারে কাছেও কেউ যায় না। প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত অপরাধীকে ঐ দ্বীপে নামিয়ে দেওয়া হয়। দু’হাত-পা বেঁধে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। কারণ ঐ দ্বীপের মাটিও বিষাক্ত।

ফ্রান্সিস একটুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, আমরা ঐ দ্বীপ দেখতে যাব।

ঐ দ্বীপের ধারেকাছেও যেও না। মরবে। রাজা বলল।

দূর থেকেই দেখব। একটা নৌকো দেবেন? ফ্রান্সিস বলল।

বেশ। একটা ভোঙা নৌকো পাবে। রাজা বলল।

আর একটা কথা–গুপ্তধন উদ্ধার করতে পারলে আমাদের সবাইকে মুক্তি দিতে হবে।

এমনভাবে বলছ যেন গুপ্তধন উদ্ধার করে ফেলেছ। রাজা বাঁকা হাসি হাসল।

আমি ওভাবেই কথা বলি। ফ্রান্সিস বলল। ঠিক আছে। তোমাদের তারপরে মুক্তি দেওয়া হবে।

আর খাবার জল আর খাদ্য দিতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।

দেখা যাক, আগে উদ্ধারকাজ সারো।

সেনাপতি আসন থেকে উঠে এগিয়ে এল। বলল, চলো।

সেনাপতির সঙ্গে ওরা রাজবাড়ির বাইরে এল। পেছনে লার্দো।

কখন যাবে? সেনাপতি জানতে চাইল।

এক্ষুনি যাব। ফ্রান্সিস বলল।

অত তাড়া কীসের? সেনাপতি বলল।

আপনি বুঝবেন না।

সেনাপতি লার্দোকে বলল, যাও, ওদের একটা ডোঙা নৌকা, দাঁড় দাও। জেলেপাড়ায় পাবে। সেনাপতি চলে গেল।

লার্দোর সঙ্গে ওরা দক্ষিণমুখো চলল। কিছু পরে একটা খাঁড়ির কাছে এল। খাঁড়ির তীরে কিছু বাড়িঘর। বোঝা গেল জেলেপাড়া। তীরভূমির কাছে কিছু গাছের গুঁড়ি কেটে তৈরি নৌকো ভাসছে। লার্দো একটা ডোঙা নৌকো নিয়ে এল। দূরে অভিশপ্ত দ্বীপটা দেখাল সে। তীরভূমি থেকে খুব একটা দূরে নয়।

ফ্রান্সিস ডোঙা নৌকো দেখে বলল, হ্যারি, তুমি থাকো। ড্ডাঙা নৌকো বেশি লোক নিয়ে যেতে পারবে না। লার্দো তো পাহারা দিয়ে নিয়ে যাবে।

শাঙ্কো আর লার্দোকে নিয়ে ফ্রান্সিস ডোঙা নৌকোয় উঠল। দাঁড় তুলে নিয়ে নৌকো চালাল অভিশপ্ত দ্বীপের দিকে।

খাঁড়ির জল শান্ত। নৌকো বেশ জোরেই চলল। দ্বীপের কাছাকাছি এসে লার্দো বলে উঠল, বেশি কাছে যাওয়া বিপজ্জনক। নৌকো এখানেই থামাও। ফ্রান্সিস নৌকো থামাল। দুপুরের উজ্জ্বল রোদে স্পষ্ট দেখা গেল অভিশপ্ত দ্বীপ। পাঁচ-ছ’সাত উঁচু তার গাছ। হলুদ লম্বা লম্বা পাতা। লাল টকটকে ফুল ফুটে আছে। সমুদ্রের হাওয়ায় গাছগুলো মাথা দোলাচ্ছে। এত সুন্দর গাছগুলো অথচ বিষাক্ত।

কিছুটা এগোতেই দ্বীপের দিক থেকে হাওয়া ছুটে এল। ওদের গা জ্বালা করে উঠল। তাহলে গাছ-ছোঁয়া হাওয়াও বিষাক্ত। শাঙ্কো বলল, ফ্রান্সিস, গা যেন পুড়ে যাচ্ছে। ফিরে চলল।

তার গাছগুলোর জন্যে দ্বীপের মাটি ভালো দেখা যাচ্ছেনা। ভালো ভাবে দেখতে গেলে অন্য উপায় নিতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।

কী সেটা? শাঙ্কো বলল।

আমার ছক কষা হয়ে গেছে। আজ ফিরে চলল। কাল দুপুরে তৈরি হয়ে আসব।

আবার কালকে আসবে? লার্দো অবাক হয়ে ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল।

হ্যাঁ, ভালোভাবে সব দেখতে হবে। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল।

ফ্রান্সিস নৌকোর মুখ ঘোরাল। চলল তীরভূমির দিকে।

তীরে ভিড়ল নৌকো। ফ্রান্সিসরা নেমে এল। একটা বড় গাছের তলায় হ্যারি বসেছিল। ফ্রান্সিসের দেখে বলল, ফ্রান্সিস, একটা জিনিস দেখলাম।

কী দেখলে?

ঐ দেখ খাঁড়ির তীরে দুটো বড় পাথরের ধাপ।

ফ্রান্সিস দেখল সেটা। একটু চমকাল। কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বলল, নৌকোয় ওঠার ব্যবস্থা, আগে লক্ষ করিনি। তার মানে এখান দিয়ে অভিশপ্ত দ্বীপের দিকে যাওয়া হয় তাহলে জীবন বিপন্ন না করেও ঐ দ্বীপের মাটিতে ওঠা যায়। কথা শেষে দ্বীপের কী কী দেখেছে সব বলল হ্যারিকে।

জেলেপাড়ায় ডোঙা নৌকো ফিরিয়ে দিয়ে ওরা অস্ত্রঘরে ফিরে এল। ঘরে ঢোকার আগে ফ্রান্সিস বলল, লার্দো, আজকে আমরা আর টিলার নীচের জঙ্গলে যাব না। কাজেই আমাদের পাহারা দেবার জন্যে তোমাকে আর আসতে হবে না। কিন্তু একটা কাজ করতে হবে।

কী কাজ? লার্দো জানতে চাইল।

কাল সকালে ভালো করে তেলে-ভেজানো দুটো মশাল আনতে হবে।

মশাল? দিনের বেলা? লার্দো তো অবাক।

হ্যাঁ। তুমি নিয়ে আসবে। ফ্রান্সিস বলল।

ঘরে ঢুকতে মারিয়া, বন্ধুরা এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস কোনো কথা না বলে শুয়ে পড়ল। শাঙ্কো তখন অভিশপ্ত দ্বীপের কথা, তার গাছের কথা, গা জ্বলুনির কথা সব বলতে লাগল। ওরা শুনে অবাক হয়ে গেল। মারিয়া বলে উঠল, ফ্রান্সিস, ঐ সাংঘাতিক দ্বীপে আবার যাবে নাকি?

হ্যাঁ, ঐ অভিশপ্ত দ্বীপ হচ্ছে ধনরত্ন লুকিয়ে রাখার উপযুক্ত জায়গা।

কী বলছ তুমি? সমস্ত দীপটাই তো বিষাক্ত? মারিয়া বলল।

দেখি, দ্বীপের বিষ এড়ানো যায় কিনা। ফ্রান্সিস বলল।

মারিয়া জানে কৃতসংকল্প ফ্রান্সিসকে নিরস্ত করা যাবে না। কাজেই ও আর কোনো কথা বলল না।

রাতে ফ্রান্সিসের ঘুম হল না। একে অসহ্য গরমে গাদাগাদি করে থাকা, তার ওপর যে ছক করেছে তা কতটা ফলপ্রসূ হবে সে নিয়েও চিন্তা। ছটফট করতে করতে ভোর হয়ে গেল।

বেলা বাড়তে রাঁধুনিরা সকালের খাবার নিয়ে এল। প্রহরীরা পাহারায় রইল। খাবার খেতে খেতে ফ্রান্সিস বলল, হ্যারি, শাঙ্কো, চেয়ে নিয়ে পেট পুরে খাও। ওখানে কতক্ষণ থাকতে হয় কে জানে! তিনজনেই চেয়ে চেয়ে খাবার খেল।

খাওয়া শেষ। ফ্রান্সিস বলল, শাঙ্কো, সিনাত্রার কাছ থেকে চকমকি পাথর আর লোহার টুকরো নাও। শাঙ্কো সিনাত্রার কাছ থেকে সেসব নিল। তারপর কোমরে গুঁজল।

কিছু পরে লার্দো দুটো মশাল নিয়ে এল। সবাইকে নিয়ে ফ্রান্সিস চলল খাঁড়ির দিকে। লার্দো ডোঙা নৌকো নিয়ে এল। খাটের মতো পাতা পাথরের ওপর দিয়েই তিনজন নৌকোয় উঠল। হ্যারি গিয়ে গাছের নীচে বসল।

নৌকোয় ওঠার আগে ফ্রান্সিস একমুঠো বালি নিয়ে শূন্যে ওড়াল। বুঝল হাওয়ার গতি উত্তরমুখো। বলল, আমাদের দ্বীপের দক্ষিণ দিকে মানে ওপাশে যেতে হবে। হাওয়ার গতির উল্টেদিকে যাব আমরা।

ফ্রান্সিস দাঁড় হাতে নিয়ে নৌকো ছাড়ল। প্রায় শান্ত সমুদ্রের খাঁড়ি দিয়ে নৌকো চলল। অভিশপ্ত দ্বীপের কাছাকাছি পৌঁছে দ্বীপঘুরে দক্ষিণ দিকে এল। দ্বীপের কাছাকাছি নিয়ে এল নৌকোটা। নৌকো থামাল। হাওয়া উল্টোদিকে বইছে। কাজেই গা জ্বালা করল না। ফ্রান্সিস বলল, শাঙ্কো, মশাল জ্বালো। শাঙ্কো চকমকি পাথরে লোহা ঠুকে ঠুকে দুটো মশালই জ্বালাল। ফ্রান্সিস বলল, উঠে দাঁড়াও। দুজনে নৌকোয় উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস বলল, যত জোরে পারো মশাল ছোঁড়ো ঐ তার গাছগুলোর মধ্যে। কথাটা বলে ফ্রান্সিস জ্বলন্ত মশালটা কয়েক পাক ঘুরিয়ে তার গাছের ওপর ছুঁড়ে দিল। শাঙ্কোও জ্বলন্ত মশাল ছুঁড়ে দিয়ে বলে উঠল, সাবাস ফ্রান্সিস।

মুহূর্তে তার গাছের জঙ্গলে আগুন লেগে গেল। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। ফ্রান্সিস দ্রুত বসে পড়তে পড়তে বলল, এই তল্লাট ছেড়ে সরে যেতে হবে। ধোঁয়া উঠবে। যদিও বাতাস আমাদের উল্টোদিকে বইছে তবু সাবধানের মার নেই। ধোঁয়াও বিষাক্ত। জ্বলন্ত তার গাছ থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলি উঠল। ধোঁয়া উড়ে যেতে লাগল উত্তর দিকে। উল্টোদিকে ফ্রান্সিস দ্রুত নৌকো চালিয়ে বেশ কিছু দূরে চলে এল।

আগুন জ্বলতে লাগল। কালো ধোঁয়াও উঠতে লাগল ওপরের দিকে। ফ্রান্সিসরা অপেক্ষা করতে লাগল।

বেশ কিছুক্ষণ পরে আগুন নিভে এল। ধোঁয়া ওঠাও বন্ধ হয়ে গেল। এখন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে দ্বীপের কালো কুচকুচে মাটি।

কী করবে এখন? শাঙ্কো জানতে চাইল।

দ্বীপে নামব। ফ্রান্সিস বলল।

শাঙ্কো ভীষণবাবে চমকে উঠল। বলল, মাথা খারাপ! বিষাক্ত গাছ না হয় নেই। কিন্তু ওখানকার ঐ কালচে মাটিও তো বিষাক্ত।

ফ্রান্সিস একটু চুপ করে থেকে বলল, শাঙ্কো, খাঁড়ির তীরে দুটো বড় পাথর পোঁতা আছে দেখে এসেছ?

হ্যাঁ, নৌকোয় ওঠার জন্যে। শাঙ্কো বলল।

যদি আমার অনুমান সত্যি হয় তাহলে ঐ দ্বীপেও এরকম পাথরে ধাপ আছে। যদি পাথরের ধাপ থাকে তাহলে রাজা মিলিন্দার গুপ্ত ধনভাণ্ডার পোঁতা আছে ওখানেই। যে বা যারা ওখানে গুপ্তধন রেখে এসেছে, সে বা তারা ঐ ধাপের ওপর দিয়েই হেঁটে গিয়েছিল। বিষাক্ত মাটি স্পর্শও করেনি।

শাঙ্কো কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, আবার সাবাস, ফ্রান্সিস। কিন্তু তোমার অনুমান সত্যি হবে যদি

ওকে থামিয়ে দিয়ে ফ্রান্সিস বলে উঠল, হা, যদি ওখানে পাথরের ধাপ পাওয়া যায়। সেটাই দেখতে যেতে হবে।

ফ্রান্সিস আর কোনো কথা বলল না। নৌকো চালাল অভিশপ্ত দ্বীপের দিকে।

আস্তে আস্তে নৌকো তীরের একেবারে কাছে আসতে দেখা গেল সত্যিই কালো মাটির ওপরে পর পর কয়েকটা পাথরের ধাপ গাঁথা, যেমন আছে খাঁড়ির তীরের ভূমিতেও।

দুপুরের চড়া রোদ পড়েছে দ্বীপে। সবই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্সিস দাঁড় রেখে দিল। তীরের পাথরে পা রেখে সাবধানে নামল। কিছুআগে আগুন জ্বলেছিল। কাজেই পাথরটা বেশ গরম। তারপর শরীরের ভারসাম্য রেখে পরের পাথরে পা রাখল। মাটিতে পা রাখার উপায় নেই। পাথরে পা না পড়ে তাও হিসেবে রাখতে হচ্ছে। গুনে গুনে আটটা পাথরের ধাপ পার হতেই উজ্জ্বল রোদে দেখল একটা হাতলওয়ালা কালো কাঠের বাক্স একটা বড় পাথরের ওপর রাখা। ফ্রান্সিস শরীরের ভারসাম্য রেখে আস্তে আস্তে বাক্সটার হাতল ধরল। খুব সাবধানে বাক্সটা তুলে নিল। ওটা বেশ ভারী। ও বাক্স খোলার ঝুঁকি নিল না। আস্তে ঘুরে দাঁড়াল। একটা ভারী জিনিস নিয়ে শরীরের ভারসাম্য রাখতে হচ্ছে। কাজেই খুব সাবধানে পাথরে পা রেখে রেখে নৌকোর কাছে ফিরে এল। বাক্সের ভারে শরীরের ভারসাম্য রাখতে কষ্ট হচ্ছে। ও তখন বেশ হাঁপাচ্ছে। হাঁপাতে হাঁপাতেই বাক্সটা এগিয়ে ধরে বলল, শাঙ্কো, এটা নৌকোয় রাখো। দুজনেই ধরো।

লার্দো হতবাক–এই সাংঘাতিক দ্বীপে বাক্স রেখে গেছে কে? সে কি মানুষ না দৈত্য?

দুজনে ধরাধরি করে বাক্সটা নিয়ে নৌকোয় রাখল। ফ্রান্সিস সাবধানে নৌকোয় উঠে এল। তারপর দাঁড় তুলে নিল। নৌকো চালাল তীরেরভূমির দিকে।

এই বাক্সেই কি আছে রাজা মিলিন্দার গুপ্তধন? শাঙ্কোর মনে তখনও সংশয়।

খুলে দেখো। ফ্রান্সিস দাঁড় বাইতে বাইতে বলল।

শাঙ্কো বাক্সের গায়ে হাতড়ে তালার গর্তে হাত দিয়ে দেখল একটা ছোট্ট চাবি আটকানো। ও চাবিটা ডানদিকে মোচড় দিল। কট করে একটা শব্দ হল। ও হাতল ধরে টানল। বাক্সের ওপরের ডালা খুলে গেল। বাক্সভর্তি সোনার অলঙ্কার, হীরে-মুক্তো, মণিমাণিক্য। উজ্জ্বল রোদে সব ঝকঝক করতে লাগল। লার্দো এসব দেখে চিৎকার করে উঠল, ওঁওঁওঁ। এরকম দৃশ্য ফ্রান্সিস, শাঙ্কো অতীতেও দেখেছে। তবু…শাঙ্কো চেঁচিয়ে উঠল, ও হো হো। তীরে গাছের তলায় বসে-থাকা হ্যারি লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। তাহলে ফ্রান্সিস গুপ্তধন উদ্ধার করতে পেরেছে। হ্যারিও ধ্বনি তুলল, ও হো হো।

ফ্রান্সিস মৃদু হাসল। তারপর আস্তে আস্তে নৌকো তীরে ভেড়াল। শাঙ্কো বাক্সটা কাঁধে তুলে নিল। তিনজনে চলল নগরের দিকে।

হাঁটতে হাঁটতে শাঙ্কো বলল, আচ্ছা ফ্রান্সিস, এই গুপ্তধনের বাক্স তো কারো না কারো নজরে পড়তে পারত।

না, পারত না। প্রথম ঐ অভিশপ্ত দ্বীপের ধারেকাছে কেউ যেত না। তার গাছের আড়ালে ছিল ঐ বাক্স।

রাজা মিলিন্দা কীভাবে ওখানে বাক্সটা রেখেছিলেন? শাঙ্কো জানতে চাইল।

রাজা মিলিন্দা একজন বা দুজন মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত অপরাধীকে সকলের অগোচরে ওখানে নৌকোয় করে বাক্স সহ পাঠিয়েছিলেন। রাজার নির্দেশ ছিল সাত আটটা পাথরের ধাপও নিয়ে যাবার। কয়েক দফায় ওরা নৌকোয় করে পাথরের ধাপগুলো নিয়ে গিয়েছিল। দ্বীপের মাটিতে সেগুলো গেঁথে ধাপের ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে বাক্স রেখেছিল। কিন্তু তার গাছের ছোঁয়া ওরা এড়াতে পারেনি। ওখানেই বিষাক্ত মাটিতে মিশে গেছে ওদের দেহ।

তাহলে রাজা মিলিন্দা কি পরে গুপ্তধনের বাক্সটা আনবেন ভেবেছিলেন? শাঙ্কো বলল।

হ্যাঁ। কিন্তু তার আগেই তার মৃত্যু হয়।

তাহলে জীবিত অবস্থায় কীভাবে আনতেন?

যে ভাবে আমি এনেছি, ফ্রান্সিস বলল, বিষাক্ত তার গাছ পুড়িয়ে ফেলে। খাঁড়ির তীরে দুটো বড় পাথর দেখেই আমার কাছে সব রহস্য পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। ঐ দুটো পাথর ছিল ঠিক দ্বীপের পাথরের উল্টেদিকে। তাই দিক ঠিক রাখতে পেরেছিলাম।

রাজবাড়ির সামনে এসে পৌঁছল ওরা। ফ্রান্সিস লার্দোকে বলল, যাও, রাজার সঙ্গে আমাদের দেখা করার ব্যবস্থা করে দাও। লার্দোর হতভম্ব ভাব তখনও সবটা কাটেনি। ফ্রান্সিস বলল, বলবে যে গুপ্তধন উদ্ধার হয়েছে। উনি যেন সেটা বুঝে নেন।

লার্দো চলে গেল। একটু পরেই প্রায় ছুটতে ছুটতে এল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, রাজসভায় চলো। ওখানেই রাজা আসবেন।

ফ্রান্সিসরা রাজসভায় এসে অপেক্ষা করতে লাগল। কিছু পরে রাজা জোস্তাক এসে সিংহাসনে বসল। শাঙ্কো কাঁধ থেকে বাক্স নামিয়ে রাজার পায়ের কাছে রাখল। তারপর হাতল টেনে ওপরের ডালা খুলল। অত স্বর্ণলঙ্কার হীরে, মণি, মুক্তো দেখে রাজা জোস্তাকের মুখে আর কথা নেই। কিছু পরে অভিভূতের মতো বলল, কী করে উদ্ধার করলে? ফ্রান্সিস সংক্ষেপে সব বলল। তারাপর রাজাকে অনুরোধ করল, এবার আপনার শর্ত রাখুন। ঐ বদ্ধ ঘর থেকে আমাদের মুক্তি দিন। আমরা জাহাজে ফিরে যাব।

বেশ। কিন্তু এত দামি অলঙ্কার, মণি, মুক্তো, তোমরা কিন্তু কিছু দাবি করবে না। রাজা বলল।

আমরা একটা রুপোর টাকাও নেব না। আপনার প্রহরীদের হুকুম দিন। ফ্রান্সিস বলল।

তখনই সেনাপতি এসে হাজির হল। লার্দো শুধু সেনাপতিকেই খবরটা দেয়নি, রাস্তায় যাকে দেখেছে তাকেই এই গুপ্তধন উদ্ধারের কথা বলেছে। দলে দলে লোক ছুটে আসতে শুরু করল রাজবাড়ির দিকে। রাজা সেনাপতিকে হুকুম দিল ওদের ছেড়ে দিতে। সেনাপতি বলল, চলো তোমরা।

অস্ত্রঘরের সামনে এল সবাই। সেনাপতি প্রহরীদের বলল, এদের ছেড়ে দাও। রাজার হুকুম। প্রহরী দরজা খুলে দিল।

হ্যারি গলা চড়িয়ে বলে উঠল, বাইরে বেরিয়ে এসো। ফ্রান্সিস গুপ্তধন উদ্ধার করেছে। এবার জাহাজে চলো। সব ভাইকিং বন্ধুরা ধ্বনি তুলল, ও হো হো। তারা বাইরে বেরিয়ে এল।

শাঙ্কো বলল, বেলা অনেক হয়েছে। এখানে খেয়ে গেলে হত না?

না, ফ্রান্সিস বলল, এই অন্ধকূপে আর এক মূহুর্তও থাকব না। আমাদের জাহাজেই রান্না সেরে খাব। এখন চলল। মারিয়া হাসতে হাসতে এসে ফ্রান্সিসের হাত ধরল। সবাই দল বেঁধে চলল জাহাজঘাটের দিকে।

হাঁটতে হাঁটতে হ্যারি ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল, ফ্রান্সিস, খাবার জল আর খাদ্য নিতে হবে যে।

সে সব কাল সকালে শাঙ্কোরা এসে নিয়ে যাবে। গত কয়েক রাত ঘুমোতেই পারিনি। আজ রাতে মড়ার মতো ঘুমোব। ফ্রান্সিস বলল।

শুধু তোমার নয়, আমাদেরও এক হাল। হ্যারি বলল।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments