কথার কথা – সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

প্রভু ভৃত্যকে বললেন, বাজার থেকে খুব ভালো মাংস কিনে আন। ভৃত্য নিয়ে এল ভেড়ার জিভ। পরের দিন প্রভু বললেন, বাজার থেকে সবচেয়ে খারাপ মাংস কিনে আন। আবার সেই জিভ।

প্রভু ভৃত্যকে জিগ্যেস করলেন, হ্যাঁ রে ব্যাপারটা কী? ভালো মাংস বললুম, এল একটা জিভ। খারাপ মাংস, তখনও সেই জিভ!

ভৃত্যকে বললে, মালিক, মানুষ তার এই জিভের কারণেই কখনও ভীষণ খুশি, কখনও ভীষণ অখুশি। মানুষকে কটু কথা বলে, গালমন্দ করে, ধোলাই খায়, মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়ে, খুন-খারাপিও হয়ে যেতে পারে। আবার যখন ভালো কথা বলে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা বলে, প্রেমের কথা বলে, পৃথিবীর মানুষ ছুটে আসে শ্রদ্ধা জানাতে, সুখী করতে। ভালো আর মন্দ সবই এই জিভে।

প্রভু ভীষণ সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, কেয়া বাত। তাহলে আয়, আমরা এই খতরনক জিভকে সংযত করার জন্যে দুজনেই চেষ্টা করি।

Bridle your tongue. ইংরেজি উপদেশ। লাগাম চড়াও। মা কালী দাঁত দিয়ে জিভ চেপে ধরে ইঙ্গিতে বলতে চাইছেন, সংযত বাক, সংযত রচনা।

অনেক কথার অনেক দোষ।

ভেবে চিন্তে কথা কোস।

A sharp tongue is the only edged tool that grows keener with constant use.আরভিং ওয়াশিংটনের কথা। এরকম ধারালো অস্ত্র অনবরত ব্যবহারে ধার বাড়তেই। থাকে, বাড়তেই থাকে। সেই অস্ত্রের নাম—জিভ। জিভেই অক্ষরের অবস্থান। শব্দ নির্মাণ করে বাইরে প্রক্ষেপ। Ilove you বলা যায়। আবার I hate you-ও বলা যায়। জিভ না থাকলে। মানুষ হত অব্যক্ত প্রাণী। এক ধরনের অর্থহীন শব্দ ছাড়া আর কিছু প্রকাশ পেত না।

কোলাহলমুখর এই ভূমণ্ডল কেবল উল্লাস আর আর্তনাদের ধ্বনিতে ভরপুর হয়ে থাকত। কোথায় সংগীত, কোথায় স্তোত্র। শব্দকারী কিছু জন্তুতে পুথিবী ভরে যেত। নানারকম শব্দ। ঝরনার। প্লবমান শব্দ। সমুদ্রের শাসন। বাতাসের হা-হুতাশ। বিদ্যুতের চিড়িক। পত্র পল্লবের মর্মর আর পারি না, আর পারি না কথার চেয়ে শব্দ বড়। শব্দ হল মাতা। বিশাল বিস্ফোরণ পরমুহূর্তেই শত কণ্ঠের আর্তনাদ। গাড়ির তীব্র ব্রেকের শব্দ। ওই একটি শব্দ থেকে সংবাদপত্রে জন্ম নেবে শত অক্ষরের কাহিনি। প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় ঢুকে যাবে হয়তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা শব্দ। শব্দে ঘটনা। আছে বর্ণনা নেই। শব্দে ভাব আছে, ভাষা নেই। বীভৎস শব্দ। মধুর শব্দ। প্রাণবন্ত শব্দ, প্রাণহীন শব্দ। জীবন্ত মানুষের বুকে কান পাতলে একটানা প্রাণের শব্দ। ডাক্তার শুনবেন একরকম শব্দ, যোগী শুনবেন আর একরকম। অজপা চলছে বিরামহীন হংসঃ। সোহ—আমিই সে। আমিই ঈশ্বর। আমি ব্রহ্ম। ব্রহ্মাচ্ছি।

শ্রীকৃষ্ণের বাঁশিকি বলছে শ্রীমতী জানেন,

বংশী বাজিল ওই বিপিনে
(আমার তো না গেলে নয়) (শ্যাম পথে দাঁড়ায়ে আছে)
তোরা যাবি কিনা যাবি বল গো।
তোদের শ্যাম কথার কথা।
আমার শ্যাম অন্তরের ব্যথা
তোদের বাজে বাঁশি কানের কাছে।
বাঁশি আমার বাজে হৃদয় মাঝে।।

ভাষা, ভাব, অনুভূতি, অর্থ আকর্ষণের বায়বীয় অবস্থা হল সুর। নেশা শব্দের তরল অবস্থা হল সুরা। দুঃখ শব্দের আকৃতিও তরল, চোখের জল। রাগ শব্দের চেহারা আগুন। একটি চুম্বনের। শব্দে কত বছরের প্রেম! রাতে রেলগাড়ির শব্দে দরজা খুলে বেরিয়ে আসার আহ্বান—কত নদী, প্রান্তর! কেউ চলেছেন প্রবাসে—বিচ্ছেদ-বেদনা নিয়ে। কেউ ফিরছেন স্ববাসে আনন্দের বোঝা নিয়ে।

দুপুরে আলমবাজার জুটমিলের বাঁশির শব্দ শুনে দক্ষিণেশ্বরের নহবতের দ্বিতলে শ্রীরামকৃষ্ণের জননী আহারে বসতেন। তিনি ওই বাঁশির শব্দে বৃন্দাবনের শ্রীকৃষ্ণের বাঁশি শুনতেন। ছুটির দিনে, যেদিন মিলের বাঁশি বাজত না সেদিন অনেক সাধ্য-সাধনা করে তাঁকে আহারে বসানো হত।

মা উচ্চকণ্ঠে মেয়েকে উনুন ধরানোর নির্দেশ দিচ্ছেন, ওরে সন্ধে হল, বাসনায় আগুন দে। বিখ্যাত ধনী, প্রখ্যাত লালাবাবু সব ছেড়ে বৃন্দাবনে চলে গেলেন। বাসনা শব্দটি তাঁর কাছে যে অর্থে ভেসে এল, তা হল কামনাবাসনা। প্রেমিকই বলতে পারেন, For gods sake hold your tongue and let me love (John Donne).

Facebook Comment

You May Also Like