Monday, April 15, 2024
Homeবাণী-কথাকেদার রাজা - বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

কেদার রাজা – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

কেদার রাজা - বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

০১. নীলমণি চাটুজ্জে বাড়ি ফেরবার পথে

দুপুর বেলায় নীলমণি চাটুজ্জে বাড়ি ফেরবার পথে গ্রামের মুদির দোকানে জিজ্ঞেস করলেন, হ্যাঁ গো ছিবাস, কেদার রাজাকে দেখেছিলে আজ সারাদিন?

ছিবাস আলকাতরার পিপে থেকে আলকাতরা বার করতে করতে জিজ্ঞেস করলে, কেন চাটুজ্জে মশায়, তেনার খবরে কি দরকার?

নীলমণি বললেন, আরে, খাজনার অংশ নিয়ে গোলমাল বেধেছে বড্ড৷ বাঁটুল নাপিতের দরুন আমার অংশে আমি চার আনা করে বছরশাল খাজনা পাই, তা গাঁয়ের শুদ্দুর ভদ্দর কে না জানে? এ বছরের খাজনা কেদার রাজা দিব্যি আদায় করে নিয়ে বসে আছে৷ দ্যাখো তো কি উৎপাত৷

ছিবাস মুদির মন তখন ছিল আলকাতরার পিপের মুখের ফাঁদলের দিকে৷ সে আপনমনে কি বললে, ভাল বোঝা গেল না৷ নীলমণি ছিবাসের সহানুভূতি না পেয়ে বোকার মত মুখখানা করে বাঁড়ুজ্জে পাড়ার দিকে অগ্রসর হলেন—উদ্দেশ্য, বৃদ্ধ বিশ্বেশ্বর বাঁড়ুজ্জের বাড়ির সান্ধ্য পাশার আড্ডায় গিয়ে একবার খোঁজ নেওয়া৷

পথেই একজন মধ্যবয়স্ক লোকের সঙ্গে দেখা৷

নীলমণি চাটুজ্জে বললেন, আরে এই যে কেদার খুড়ো, তোমাকেই খুঁজছি৷

লোকটি বললে, কেন বলো তো হে?

নীলমণি যতটা জোরের সঙ্গে ছিবাসের দোকানে কথা বলেছিলেন, এখানে কিন্তু তাঁর গলা দিয়ে অত জোরের সুর বের হল না৷

—সেই বাঁটুল নাপিতের ভিটের খাজনা বাবদ কয়েক আনা পয়সা—

—সে পয়সা তুমি কোত্থেকে পাবে খুড়ো?

নীলমণি ভ্রু কুঁচকে বললেন, নেই বললে সাপের বিষ থাকে না তো জানি কোন ছার! তবে সেটেলমেন্টের কাগজপত্রে তাই বলে বটে৷

—ভুল বলে নীলমণি খুড়ো!

—সেটেলমেন্টের পড়চা ভুল বলে?

নীলমণির বড় ছেলে হাজুকে এই সময় সাইকেলে চড়ে সতেজে যেতে দেখা গেল৷

নীলমণি হেঁকে বললেন, ও অজিত—ও অজিত—

ছেলেটি সাইকেল থেকে নেমে বললে, বাবা, তুমি এখানে?

—দরকার আছে, তুই একবার তোর দাদুর সঙ্গে যা দিকি ওর বাড়ি৷ খুড়ো, আমাদের অংশের খাজনা ক’আনা পয়সা অজিতের সঙ্গে দিয়ে দাও গিয়ে—

—কোথা থেকে দেবো এখন? আজ পাঠিও না, যদি কাগজ-পত্র দেখে মনে হয় তোমার জমি ওর মধ্যে আছে—

নীলমণি বাধা দিয়ে বললেন, আলবাত আছে, হাজার বার আছে, ওর বাবা আছে—

লোকটা বললে, চটো কেন নীলু খুড়ো, থাকে পাবে৷ তবে এখন হাতে টানাটানি—

—টানাটানি তা আমার কি? আমার তো না হলে চলে না৷ ওসব শুনলে আমার কাছারির খাজনা মাপ করবে কি জমিদার?

গ্রামের পথ৷ চেঁচামেচি শুনে দু-চারজন লোক জড়ো হয়ে পড়ল৷

—কি, কি, খুড়ো কি?

—এই দ্যাখো না ক্যাদার খুড়োর কাণ্ডটা—নিজের অংশ আমার অংশ গিলে খেয়ে বসে আছে, এখন উপুড়হাত করবার নামটি নেই৷

লোকে কিন্তু এ ঝগড়ায় উৎসাহের সঙ্গে যোগ দিলে না, দু-একবার ঘাড় নেড়ে সরে পড়ল অনেকে৷ যারা দাঁড়িয়ে রইল, তারাও নীলমণি চাটুজ্জের পক্ষে কথা না বলে বরং এমন সব মতামত প্রকাশ করলে, যা কি না তাঁর বিরুদ্ধেই যায়৷

নীলমণি অগত্যা অন্য দিকে চলে গেলেন৷ দু-একজন লোকে বললে, পথের মধ্যে এ রকম চেঁচামেচি কি ভালো? ছিঃ—সামান্য কয়েক আনা পয়সার জন্যে—আর ওঁর সঙ্গে? কেউ সহানুভূতির সঙ্গে বলেন, ক্যাদার জ্যাঠা আপনি বাড়ি যান চলে—

তিনিও চলে গেলেন৷

নবাগত দু-একজন লোক জিজ্ঞেস করলে জনতাকে—কি হয়েছে, কি?

—ওই নীলু খুড়ো ক্যাদার রাজাকে পথের মধ্যে ধরেছে, আমার খাজনা শোধ করো ভারি তো খাজনা, ক’অনা পয়সা—হুঁঃ—

—ক্যাদার রাজা কি বললে?

—বলবে আর কি, সবাই জানে ওর অবস্থা কি৷ দিতে পারে যে দেবে এখুনি? পয়সা ট্যাঁকে করে এনেছে নাকি?

—কেদার রাজা এসব গোলমালের ভেতর থাকতে চান না, কখনও পছন্দ করেন না৷ নির্বিবাদী লোক৷ নীলু খুড়োর যা লোভ!

জনতা ক্রমে ভেঙে গেল৷

.

যাঁর নাম কেদার রাজা, তিনি নিজের বাড়ি ঢুকলেন যখন, তখন বেলা প্রায় একটা৷ কেদারের স্ত্রী লক্ষ্মীমণি ছিলেন অপূর্ব সুন্দরী, ইদানীং তাঁর সে চোখ-ধাঁধানো রূপের সামান্য কিছু অবশেষ যা ছিল তাতেও অপরিচিত চোখ তাঁর দিকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকত৷ তাঁর মৃত্যু হয়েছে আজ এই বছর দুই৷

বাড়িতে আছে শুধু মেয়ে শরৎসুন্দরী৷ মেয়ে মায়ের অতটা রূপ পায় নি বটে, তবুও এ গ্রামের মধ্যে তার মতো সুন্দরী মেয়ে আর নেই৷

—এত বেলা অবধি কোথা ছিলে?…তোমায় নিয়ে আর পারিনে—তেল মাখো, নেয়ে এসো৷ কেদার রাজা একটু অপ্রতিভ মুখে ঘরে ঢুকলেন৷ মেয়ে ভাত রেঁধে বসে আছে, তিনি আগে খেয়ে না নিলে সে-ও খেতে পারে না—হয়তো তার কষ্টই হচ্ছে৷ মুখ ফুটে তো কিছু বলতে পারে না৷ না, বড় অন্যায় হয়ে গিয়েছে৷

শরৎ বাবাকে তেল দিয়ে গেল৷ বললে, এত বেলায় আর নদীতে যেয়ো না৷ জল তুলে দিচ্ছি, বাড়িতেই নাও৷

এই কষ্টের ওপর আবার শরৎকে জল তুলতে হবে কুয়ো থেকে? কেদার প্রতিবাদ করে বললেন, না, আমি নদীতেই যাই৷ ডুব দিয়ে না নাইলে কি আর নাওয়া হল; চললাম, দে গামছাখানা—

শরৎ পাথরের খোরায় বাবার ভাত বাড়তে গেল৷ কাঁসার জিনিসপত্র ছিল বড় সিন্দুক বোঝাই—সব গিয়েছে একে একে—অভাবের তাড়নায় বিক্রি হয়ে, নয়তো বাঁধা দিয়ে৷ আর উদ্ধার করা যায় নি৷

শরৎ বাবার খাবার জায়গা করে অপেক্ষা করতে লাগল৷ কেউ নেই কেদার রাজার সংসারে—এই বিধবা মেয়ে শরৎ ছাড়া৷ মানে, এখন এই গ্রামের বাড়িতে নেই৷ কেদার রাজার একমাত্র পুত্র বহুদিন যাবৎ নিরুদ্দেশ৷ কোনো সন্ধানই তার পাওয়া যায় নি গত দশ বৎসরের মধ্যে৷

কেদার স্নান সেরে এসে খেতে বসলেন৷ পাথরের খোরায় বুকড়ি কালো আউশ চালের ভাত ও ডাঁটাচচ্চড়ি৷ খোরার পাশে একটা ছোট কাঁসার বাটিতে কাঁচা কলাইয়ের ডাল৷ কেদার নাক সিঁটকে বললেন, কি ছাই-রাই-ই রাঁধিস রোজ, তোর রান্না নিত্যি খাওয়া এক ঝকমারি৷

শরৎ চুপ করে রইল৷

নীরবে কয়েক গ্রাস উদরস্থ করে ক্ষুধার প্রথম দিকের জ্বালার খানিকটা মিটিয়ে কেদার মেয়ের দিকে তিরস্কারসূচক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, আহা, কি ডাল রাঁধবার ছববা! আর এই একঘেয়ে ডাঁটাচচ্চড়ি, এ রোজ রোজ তুই পাস কোথায় বাপু!

—আমার কি দোষ আমি কি বাজারে যাই নাকি? যা পাই হাতের কাছে তাই রাঁধি৷ কে এনে দিচ্ছে বল না—

কেদার মেয়ের দিকে চেয়ে বললেন, তার মানে?

তার মানে কি শরৎ বাবাকে-ভালো ভাবেই বুঝিয়ে বলতে পারত, ঝগড়ায় সে-ও কম যায় না—কিন্তু বাবার মেজাজ সে উত্তমরূপে জানে, এখুনি রাগ করে ভাতের থালা ফেলে উঠে যাবেন এখন৷ সুতরাং চুপ করেই গেল সে৷

কেদার পাতের চারিদিকে ডাল-মাখা ভাত ফেলে ছড়িয়ে ছেলেমানুষের মতো অগোছালো ভাবে আহার সম্পন্ন করে অপ্রসন্ন মুখে উঠে যাবার উদ্যোগ করতে শরৎ বললে—বসো বাবা, উঠো না, কিছু তো খেলে না, একটু তেঁতুল দিয়ে খেয়ে নাও—

কেদার রেগে বললেন, তোর মুণ্ডু দিয়ে খাব অকর্মার ঢেঁকি কোথাকার—অমন ছাই না রাঁধলেই না—

শরৎও প্রত্যুত্তরে বললে, তাই খাও, আমার মুণ্ডু খাও না—আমার হাড় জুড়ুক, আর সহ্যি হয় না—

মাঝে মাঝে পিতাপুত্রীতে এমন দ্বন্দ্ব বাধা এদের সংসারে সাধারণ ব্যাপারের মধ্যে দাঁড়িয়ে গিয়েছে৷ কেদার খারাপ জিনিস খেতে পারেন না, অথচ এদিকে সংসারের সচ্ছলতার যে রূপ, তাতে আউশ চালের ভাত জোটানোই দুষ্কর৷ এক পোয়া সর্ষের তেল কলুবাড়ি থেকে আসে, মাথায় মাখা সমেত সেই তেলে তিন দিন চালাতে হয়—সুতরাং তরকারিতে জল-আছড়া দিয়ে রান্না ছাড়া অন্য উপায় নেই৷ তরকারি মুখরোচক হয় কোথা থেকে?

অথচ শরৎ বাবাকে সে কথা বলতে পারে না৷ বড়ই রূঢ় শোনায় সেটা৷ বাবার অর্থ উপার্জনের অক্ষমতার প্রতি ইঙ্গিত করা হয় তাতে৷ এক যদি তিনি বুঝতেন, তবে সব মিটেই যেত৷ কিন্তু বাবা ছেলেমানুষের মতো অবুঝ, তিনি দেখেও কিছু দেখেন না, বুঝেও বোঝেন না—প্রৌঢ় পিতার এই বালস্বভাবের প্রতি স্নেহ ও করুণাবশতঃই শরৎ কিছু বলতে পারে না তাঁকে৷

তার পর সে বাবার পাতেই খেতে বসে গেল৷

.

দিবানিদ্রায় কেদার রাজার অভ্যাস নেই, দুপুরে খাওয়ার পর তিনি আটদশগাছা ছিপ নানা আকারের, পুঁটি মাছ থেকে রুই কাৎলা ধরা পর্যন্ত, সুতো—বঁড়শি বাঁধা, মাছধরা ভাঁড়, চারকাঠি, মশলা প্রভৃতি মাছ ধরবার সরঞ্জাম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন৷ নিষ্কর্মার কর্ম৷

ওপাড়ার গণেশ মুচি একাজে তাঁর সহকর্মী ও বন্ধু৷ গণেশ এসে বললে, বাবাঠাকুর, তৈরি?

—সব ঠিক আছে, কোথায় যাবি, গড়ের পুকুরে না নদীতে?

—চারকাঠি বেঁধেছ কোথায়?

কেদার রাজা চোখে-মুখে স্বীয় কর্মদক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তার আত্মপ্রসাদসূচক একখানি হাস্য বিস্তার করে বললেন, ওরে বেটা, আজ ত্রিশ বছর বর্শেলগিরি করছি এটুকু আর বুঝিনে? ঘোলার শেষের গাঙ, সেখানে চারকাঠি না বেঁধে বাঁধব কিনা পুকুরে?…হ্যা-হ্যা হ্যা—

গণেশ কেদার রাজার ছিপ ও সরঞ্জাম বয়ে নিয়ে চলল নিজের ছিপগুলোর সঙ্গে৷

গড়ের পুকুরের ধারে বেতস ও কণ্টকগুল্মের দুর্ভেদ্য জঙ্গল৷ গত বর্ষার জলে সে জঙ্গল বেড়ে মধ্যেকার অন্ধকার সুঁড়িপথটাকে প্রায় ঢেকে দিয়েছে—তার মধ্যে দিয়ে দুজনে সন্তর্পণে চলল, পায়ের পাতায় কাঁটা না মাড়িয়ে ফেলে৷

পাড়ের ওপারে যেখানে জঙ্গলটা একটু পাতলা হয়ে এসেচে, সেখানে পৌঁছে গণেশ বললে, আমার কিন্তু বাবাঠাকুর জোড়া দেউলির নীচে চারকাঠি পোঁতা, দেখে যাব না একবারটি?

কেদার বললেন, উঃ ব্যাটা বড় চালাক তো! ওখানে পুঁতেছিস তা আমাকে বলিস নি মোটেই? চল দেখি—

গড়ের দিঘির বাঁ পাড়ে জঙ্গলের মধ্যে থেকে সেকালের ভাঙা প্রকাণ্ড দেউলের চূড়া যেখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে, তারই নীচে দিঘির জলে গণেশ গিয়ে নামল৷

দিঘিটা এত বড় যে এপার থেকে ওপারের গাছপালা যেন মনে হয় ছোট৷ অনেকগুলো দেউল এখানে আছে গড়ের দিঘির গভীর জঙ্গলের মধ্যে—কোনো কোনো মন্দিরের গায়ে কালো স্লেট পাথরের ওপর মন্দির-নির্মাতার নাম ও সন তারিখ লেখা৷ একটার ওপর সন লেখা আছে ১০২৪৷ এ থেকে দেউলগুলির প্রাচীনত্ব অনুমান করা কঠিন হবে না৷

গণেশ বললে, ভালো মাছ লেগেছে বাবাঠাকুর, এখানেই বসবা এসো—

—আরে না না, চল গাঙে—এখানে আবার মাছ—

—আপনি নেমে দ্যাখোই না—আমি কি মস্করা করছি তোমার সঙ্গে?

দুজনে পুকুরের ধারেই মাছ ধরতে বসে গেল৷ কেদার রাজা যা হুকুম করেন, গণেশ মুচি তখনই তা তামিল করে, যদিও কার্যত সে কেদার রাজার ইয়ার৷

—তামাক সাজ গণশা, আর পাতা ভেঙে নিয়ে বসবার জায়গা করে দে দিকি!

গণেশ পাড়ের ওপরকার জঙ্গল থেকে বন-ডুমুরের বড় বড় কচি পাতা ভেঙে এনে বিছিয়ে দিলে৷ গণেশ নিজে কিন্তু সেখানে বসল না—বললে, আমি এই বাঁধাঘাটের সানে গিয়ে বসি বাবাঠাকুর—

একটু দূরে প্রাচীন দিনের প্রকাণ্ড বাঁধাঘাট যেখানে ছিল, এখন সেখানে পুকুরপাড়ে সোপানশ্রেণীর চিহ্ন দেখা যায় মাত্র৷ ঘট ব্যবহার করা চলে না, তবে ভাঙা চাতালে বসে মাছ ধরা চলতে পারে এই পর্যন্ত৷

দিঘির চারধারে বড় বড় বট, শিমুল, ছাতিম গাছের বহুকালের বন৷ ঘাটের ওপরকার বৃদ্ধ বট গাছটা দিঘির ঘাটের বাঁধা সোপানশ্রেণীর ফাটলে শিকড় চালিয়ে যদি তার কয়েকটা ধাপকে না ধরে রাখত, তবে প্রাচীন দিনের ঘাটের একখানা ইটও আজ খুঁজে পাওয়া যেত কি না সন্দেহ৷ এর প্রধান কারণ এই সব ধ্বংসস্তূপের পোড়ো ইট দিয়ে এ গ্রামের বহু গৃহস্থের বাড়ি তৈরি হয়ে আসছে আজ একশো বছর ধরে৷

ঘণ্টা-দুই পরে নিবিড় ছায়া নামল দিঘিটার চার পাশ ঘিরে৷ চারধারেই বন, বেলা তিনটে বাজতে না বাজতে সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসবে এ বিচিত্র কথা কিছু নয়৷ কেদার হেঁকে বললেন, ওরে গণশা শীত শীত করছে, একটু ভালো করে তামাক সাজ, ইদিকে আয় তো—

গণেশের ছিপের ফাৎনা বড় মাছে দু-দুবার নিতলি করে নিয়ে গেছে সবেমাত্র, তার এখন ছিপ ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছে না থাকলেও কেদারের আদেশ সে অমান্য করতে পারল না৷ বিরক্ত মুখে উঠে এসে বললে—কিছু হচ্ছে-টচ্ছে বাবাঠাকুর?

—তোর কি হল?

—অই অমনি—তেমন কিছু নয়৷

বড় মাছের ঘাই মারার কথা গণেশ বললে না, কোনো বর্শেলই বলে না, যদি বাবাঠাকুর এখান থেকে উঠে গিয়ে ওখানে বসে!

সন্ধ্যার কিছু পূর্বে কেদারের ছিপে দৈবক্রমে একটা বড় রুই মাছ টোপ গিলে ফাৎনা ডুবিয়ে একেবারে নিতলি হয়ে গেল৷ বহু ধস্তাধস্তি করে সুতো লম্বা করে ছেড়ে মাছটাকে অনেক খেলিয়ে কেদার সেটা ডাঙায় তুললেন৷

গণেশ ছুটে এসেছিল তাঁকে সাহায্য করতে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত গণেশের সাহায্য তাঁর দরকার হল না৷ কেদার হাঁপিয়ে পড়েছিলেন মাছটার সঙ্গে মল্লযুদ্ধ করে, তিনি বললেন— তোল রে গণশা, ক’সের বলে মনে হয় দ্যাখ তো?

গণেশ কানকো ধরে মাছটাকে তুলে বার-দুই ঝাঁকুনি দিয়ে বললে, তা তিনসের চোদ্দপোয়া হবে বাবাঠাকুর, আপনাদের বরাত—আমার ছিপে ঘাই মেরেই পুকুরের মাছ নিউদ্দিশ হয়ে গেল—

নিরুদ্দেশ হওয়ার তুলনাটি কেদারের ভালো লাগল না, হঠাৎ মনে পড়ে গেল তাঁর পুত্রের কথা৷ আজ দশ বৎসর…হাঁ, প্রায় দশ বৎসর যাবৎ সে-ও নিরুদ্দেশ৷…কোথায় আছে, আদৌ বেঁচে আছে কি না, কে বলবে? সচ্ছল অবস্থার লোক যারা, তারা এ অবস্থায় খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেয়, কত খোঁজখবর করে৷ দরিদ্র কেদারের সে সব করবার সঙ্গতি কই? —নীরবে ও নিশ্চেষ্ট ভাবে সব সয়ে থাকতে হয়েছে৷

কি করবেন উপায় নেই৷

কেদার নিজের অলক্ষিতে একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, নিয়ে চল রে গণেশ, পৌঁছে দে মাছটা বাড়িতে৷ একেবারে কেটে দিয়ে তুইও কিছু নিয়ে যা—চল৷

সন্ধ্যার অন্ধকার গড়ের পুকুরের বনে দিব্যি ঘনিয়েছে—হেমন্তের প্রথম, ছাতিম ফুলের উগ্র গন্ধে ভরা অন্ধকার বনপথ বেয়ে দুজনে বাড়ির দিকে ফিরলে৷

.

শরৎ বাবার সন্ধ্যা-আহ্নিকের জায়গা করে বসে ছিল, কিন্তু কেদার এখনও ফেরেন নি৷ বাইরের দোরের কাছে খুটখাট শব্দ শুনে শরৎ ডেকে বললে, কে? বাবা নাকি?

শব্দ বন্ধ হয়ে গেল৷ শরৎ চেঁচিয়ে বললে, দেখে আসি আবার কে, বাবার এখনও দেখা নেই—কোথায় গিয়ে বসে আছে তার ঠিক কি? হাড় ভাজাভাজা হয়ে গেল আমার—

দরজার কাছে কেউ কোথাও নেই৷ শরৎ মুখ বাড়িয়ে এদিক ওদিক চেয়ে দেখে দরজা বন্ধ করে দিয়ে বাড়ির রোয়াকে এসে বসল৷

খানিকটা পরে আবার বাইরের দরজায় খুটখুট শব্দ৷ এবার যেন বেশ একটু জোরে জোরে৷ শরৎ এবার পা টিপে টিপে উঠে গিয়ে বাইরের দরজার খিলটা খুলে ফেলল৷ বাইরে বেশ অন্ধকার, কিন্তু কোথায় কে?

শরতের ভয়-ভয় করতে লাগল৷ তবুও সে খুব সাহসী মেয়ে—এই জঙ্গলের মধ্যে পোড়ো বাড়ির ধ্বংসস্তূপ চারিদিকে, কত কাণ্ড সেখানে ঘটে—একা শরৎ কত রাত্রি পর্যন্ত বাবার ভাত নিয়ে বসে থাকে৷ ভয় করলে চলে না তার৷ মাঝে মাঝে দু-একটা ঘটনাও ঘটে৷

ঘটনা অন্য বেশি কিছু নয়, খুটখাট শব্দ, একা রান্নাঘরে যখন শরৎ রাঁধছে—বিশেষ করে সন্ধ্যাবেলা, তখন কে কোথায় ফিসফিস করে কি যেন বলে ওঠে—বেশ কি একটা কথা বললে সেটা বোঝা যায়, কিন্তু কথাটা কি, তা বোঝা যায় না৷

এ-সব গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে শরতের৷

শরৎ বাপের বাড়িতেই আছে আজীবন, মধ্যে বিয়ের পর বছর-তিনেক শ্বশুরবাড়ি ছিল৷ শিবনিবাসে ওর শ্বশুরবাড়ি, রানাঘাটের কাছে৷ স্বামী মারা যাওয়ার পর আর সেখানে যায় নি, তার কারণ মায়ের মৃত্যুর পর পিতার সংসারে লোক নেই, কে এই বয়সে তাঁকে দুটি রেঁধে দেয়, কে একটু জল দেয়—এই ভাবনা শরতের সব চেয়ে বড় ভাবনা৷ শরতের শ্বশুরবাড়ির অবস্থা নিতান্ত খারাপ নয়, অন্তত এখানকার চেয়ে অনেক ভালো—কিন্তু দরিদ্র পিতাকে একা ফেলে রেখে সে সেখানে গিয়ে থাকতে পারে কি করে?

তার শ্বশুর বলে পাঠিয়েছিলেন, এখানে যদি না আস বৌমা, তা হলে ভবিষ্যতে তোমার প্রাপ্য অংশ সম্বন্ধে আমি দায়ী থাকব না৷

শরৎ তার উত্তরে বলে দেয়—আপনার সম্পত্তি আপনি যা খুশি করবেন, আমার কি বলার আছে সে সম্বন্ধে? বাবাকে ফেলে আমার স্বর্গে গিয়েও সুখ হবে না৷

আজ বছর দুই আগে মা মারা যান, এই দু-বছরের মধ্যে শ্বশুর সাতবার লোক পাঠিয়েছিলেন৷

শরৎ জানে, বাবার অবর্তমানে এ-গাঁয়ে তার চলা-চলতির মহা অসুবিধে৷ বাবা সামান্য কিছু খাজনা আদায় করেন, দু-তিন বিঘে ধান করেন,—কষ্টেসৃষ্টে একরকম চলে৷ কিন্তু সে একা থাকলে এ দুটি আয়ের পথও বন্ধ৷ গ্রামে লোক নেই, থাকলেও সবাই নিজেরটা নিয়ে ব্যস্ত, শরতের মুখের দিকে চেয়ে কেউ নিজের কাজের ক্ষতি করে শরতের কাজ করে দেবে—তেমন প্রকৃতির লোক এ গাঁয়ে নেই৷

সব জেনেশুনেও শরৎ এখানেই রয়ে গিয়েছে৷ তার অদৃষ্টে যা ঘটে ঘটুক৷

সন্ধ্যার পর দেড় ঘণ্টা উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে৷

কেদারের সঙ্কোচমিশ্রিত কাশির আওয়াজ এই সময় বাইরের উঠানে পাওয়া গেল৷ শরৎ বললে, কে? বাবা?

—হ্যাঁ—ইয়ে—এই যে আমি—

শরৎ ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠল—হ্যাঁ, তুমি যে তা তো বেশ বুঝলাম৷ এত রাত পর্যন্ত এই জঙ্গলের মধ্যে একা মেয়েমানুষ বসে আছি, তা তোমার কি একটু কাণ্ডজ্ঞান নেই—জিজ্ঞেস করি?

কেদার কৈফিয়তের সুরে বলতে গেলেন, তাঁর নিজের কোনো দোষ নেই—তিনি এক ঘণ্টা আগেই আসতেন৷ ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেণ্ট পঞ্চানন বিশ্বাস তাঁকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল একটা গুরুতর বিষয়ের পরামর্শের জন্যে—সেখানেই দেরি হয়ে গেল৷

শরৎ বললে—তোমার সঙ্গে কিসের পরামর্শ? ভারি পরামর্শদাতা তুমি কিনা? তোমার সঙ্গে পরামর্শ না করলে তাদের কাজ আটকে গিয়েছে ভারি—

কেদার নীরবে হাত পা ধুয়ে ঘরে উঠলেন, মেয়ের সঙ্গে বেশি তর্কাতর্কি করে ঝগড়া বাধাতে তিনি এখন ইচ্ছুক নন—নির্বিরোধী লোক কেদার৷

মেয়ে আহ্নিকের জায়গা করে বসে আছে দেখে কেদার একটু বিপদে পড়লেন—সেদিকে চেয়ে বললেন—সন্ধ্যে উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে এখন আবার—

—তোমার যত সব ছুতো—সন্ধ্যে উৎরে গেলে বুঝি আহ্নিক করে না? তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকেছে, পরকালের কাজটা এখন থেকে করো একটু—

কেদার অপ্রসন্ন মুখে আহ্নিক করতে বসলেন৷

বাইরে থেকে কে ডাকল—ও শরৎদি—আলো ধরো, উঠোনে যে জঙ্গল করে রেখেছ—

হাসতে হাসতে একটি ষোল-সতেরো বছরের শ্যামবর্ণ মেয়ে ঘরে ঢুকল৷ কেদারকে দেখে সঙ্কোচের সঙ্গে গলার সুর নীচু করে শরৎকেই বললে, জ্যাঠামশায় ফিরেছেন কখন? আমি ভাবলাম বুঝি একা—

—বাবার কথা আর বলিস নে ভাই—তিনটের সময় বেরিয়েছিলেন, আর এই এখন এসে আহ্নিক করতে বসলেন—

নবাগত মেয়েটি হাসিহাসি মুখে চুপ করে রইল৷

কেদার দায়সারাগোছের অবস্থায় সন্ধ্যাহ্নিক সাঙ্গ করে বললেন, আছে নাকি কিছু?

—হ্যাঁ, বোসো৷ বাতাবি লেবু খাবে? মিষ্টি লেবু, ফকিরচাঁদের মা দিয়ে গেল আজ ওবেলা৷ আর এই নারকোলের নাড়ু দুটোও দিয়ে গেল, জল খেয়ে নাও—

জলযোগান্তে কেদার একটু ইতস্তত করে বললেন, তা হলে রাজলক্ষ্মী তো আছিস মা, আমি ততক্ষণ একটুখানি—বরং—ওই হরি বাঁড়ুজ্জের ওখান থেকে—

—না, যেতে হবে না বাবা৷ বোসো৷ রাজলক্ষ্মী দুপুর রাত পর্যন্ত আমায় আগলে বসে থাকবার জন্যে এসেছে নাকি? ও এখুনি চলে যাবে—

—আমি যাব আর আসব মা—এই আধ ঘণ্টার মধ্যে—

—না, তোমার আধ ঘণ্টা আমি খুব ভালো জানি—যেতে হবে না, বোসো তুমি৷ তার চেয়ে বসে একটা গল্প করো—

রাজলক্ষ্মীও আবদারের সুরে বললে, হ্যাঁ জ্যাঠামশাই, বলুন না একটা গল্প! আপনার মুখে কতকাল গল্প শুনি নি৷ সেই আগে আগে বলতেন—

অগত্যা কেদারকে বসতে হল৷ খাপছাড়া ভাবে একটা গল্পের খানিকটা বলে তিনি কেমন উসখুস করতে লাগলেন৷ মন ঠিক গল্পে নেই তাঁর, এটা বেশ বোঝা যায়৷ শরৎ বললে—কোথায় যাবে বাবা? বিশ্বেসকাকার ওখানে কি বড্ড বেশি দরকার তোমার?

কেদার উৎসাহের সঙ্গে বলে উঠলেন, বিশেষ জরুরি, দুবার লোক পাঠিয়েছে—জমিজমা নিয়ে একটা গোলমাল বেধেছে, তাই আমার সঙ্গে পরামর্শ করতে চায় কিনা, তাই—

শরৎ মুখে কিছু বললে না৷ পঞ্চানন বিশ্বাস ঘুণ বিষয়ী ব্যক্তি, সে লোক তার বাবার মতো ঘোর অবৈষয়িক লোকের সঙ্গে পরামর্শ করবার আগ্রহে দু-দুবার লোক পাঠিয়েছিল, একথা বিশ্বাস করা শক্ত৷ তা নয়, আসলে বাবা বারুইপাড়ার কৃষ্ণযাত্রার দলের আখড়ায় গিয়ে এখন বেহালা বাজাবেন, এই তাঁর বৈষয়িক কাজ৷ যদি কেউ লোক পাঠিয়ে থাকে, সেখান থেকেই পাঠানো সম্ভব৷

রাজলক্ষ্মী বললে, দিদি, উনি যান তো একটু ঘুরে আসুন—

শরৎ বললে, হ্যাঁ, উনি গেলে রাত এগারোটার কম ফিরবেন না, আমি একা কি করে এখানে বসে থাকি বল তো? থাকবি তুই আমার সঙ্গে—বাবা না আসা পর্যন্ত? বলছিস তো খুব যেতে—কেদার বিব্রত ভাবে বলে উঠলেন, আরে না না, ওর থাকার দরকার হবে না, আমি যাব আর আসব, এই ধর গিয়ে ঘণ্টাখানেক, দেরি কিসের? যাই তা হলে—

শরৎ বললে, ন’টার মধ্যে যদি না ফিরে আস, তবে আমি কি রকম রাগ করি দেখো এখন আজ—রাজলক্ষ্মী এখন রইল, তুমি এলে তবে যাবে—

রাজলক্ষ্মী হাসিমুখে বললে, বেশ ভালোই তো জ্যাঠামশাই, যান আপনি—আমি ততক্ষণ দিদির কাছে থাকি৷ আসবেন তো শীগগিরই—

কেদার আর দ্বিরুক্তি না করে বেরিয়ে গেলেন৷ শরৎ ঠিক বুঝতে পারে নি, কৃষ্ণযাত্রার দলে বেহালা বাজাতে তিনি যাচ্ছিলেন না৷

কেদারের বাড়িটার ধারে ধারে অনেক দূর পর্যন্ত ভাঙা ও পুরনো বাড়ি, সবগুলো ভাঙা নয়, তবে পরিত্যক্ত এবং সাপখোপের বাস হয়ে আছে বর্তমানে৷ চার-পাঁচ রশি কি তা ছাড়িয়েও একটা পুরনো আমলের উঁচু সদর দেউড়ির ভগ্নাবশেষ আজও বর্তমান৷ এটা পার হয়ে দুধারে সেকালের আমলের নিচু লম্বা কুঠুরির সারি, কোনো কালে এর নাম ছিল কাছারিবাড়ি, এখনও সেই নাম চলে আসছে৷ এই অর্ধেকখানি এখন মাটির ভেতর বসে গিয়েছে, দেওয়াল সেকালে হয়তো চুনকাম করা ছিল, এখন শেওলা ছাতা ধরে সবুজ রং দাঁড়িয়েছে৷ কোনো একটা ঘরেও ছাদ নেই—মেঝেতে বনজঙ্গল, শালকাঠের বড় বড় কড়ি আর ভাঙা ইঁটের স্তূপের ওপর বড় গাছ—এমন কি দেউড়ির ঠিক পাশেই এক কাছারিবাড়ির একটা অংশে প্রকাণ্ড এক তিন-পুরুষের বটগাছ—যার বয়স কোনোক্রমেই একশ বছরের কম হবে না, বেশিও হতে পারে৷

কাছারিবাড়ি পার হয়ে আর একটা দেউড়ি—এর নাম নহবৎখানা—বর্তমানে কিছুই অবশিষ্ট নেই—দুটি মাত্র উঁচু থাম ও তাদের মাথায় একটা ফাটা খিলান ছাড়া৷ থামের এক-পাশে এক সারি সিঁড়ির খানিকটা ভেঙে পড়ে গিয়েছে—বিচুটি গাছের জঙ্গলে থাম আর সিঁড়ির ধাপগুলো ঢেকে রেখেছে৷ হঠাৎ কোনো নবাগত লোক এসব জায়গায় সন্ধ্যার পর এলে দস্তুরমতো ভয় হওয়ার কথা, কিন্তু কেদার নির্বিকার ভাবে এসব পার হয়ে গিয়ে বড় খালের মধ্যে নামলেন৷

এই খালটাকে এখানে গড়ের খাল বলে, কিন্তু এতে জল নেই, খানিকটা খুব নাবাল জমি মাত্র, পশ্চিম কোণের এক জায়গায়—সদর দেউড়ি থেকে প্রায় এক মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে—এই খালের খানিকটায় জল আছে—কচুরি পানায় ভর্তি৷

পূর্বদিকের বাহু ধরে এলে গড়ের খালের সঙ্গে সমান্তরাল ভাবে অবস্থিত বিরাট ধ্বংসস্তূপ সম্পূর্ণরূপে জঙ্গলাবৃত, দিনমানে বাঘ লুকিয়ে থাকতে পারে৷ এমন ঘন কাঁটা আর বেত বন, বন্যশূকরের ভয়ে সেদিকে বড় কেউ একটা যায় না৷

গড়ের এই দিকটায় বিস্তর বড় বড় ছাতিম গাছ—মানুষের হাতে পোঁতা গাছ নয়, বন্যবৃক্ষের বীজের বিস্তারে উৎপন্ন৷

যেখানে এখনও একটু জল আছে, সেখানকার উঁচু পাড়ে বসে দেখলে এই অংশের দৃশ্য মনে কেমন এক ধরনের ভয়-মিশ্রিত সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে৷ কেদার অবিশ্যি এসবের দিকে নজর না দিয়েই খালের নাবাল জমি পেরিয়ে ওধারে গিয়ে উঠলেন এবং আরও খানিকটা হেঁটে ছিবাস মুদির দোকানে উপস্থিত হলেন৷

ছিবাস মুদির চালাঘরে ঝাঁপ পড়ে গিয়েছে, কারণ এমন গাঁয়ে এই রাতে খরিদ্দার কেউ আসবে না—কিন্তু ঘরের ভেতরে চার-পাঁচজন লোক বসে৷ ছিবাস বললে, আসুন বাবাঠাকুর, আপনার জন্য সব বসে—বলি বলে গেলেন আসচেন, তা দেরি হচ্চে কেন—আসুন বসুন—

এখানে এখন গান-বাজনা হবে—শরৎসুন্দরী ঠিকই আন্দাজ করেছিল, তবে বারুইপাড়ার কৃষ্ণযাত্রার দলে নয়, এই যা তফাৎ৷ সবাই সরে বসে কেদারকে বসবার জায়গা করে দিলে৷ কেদার মহানন্দে বেহালা ধরলেন, তাঁর বেহালা বাজানোর নাম আছে এ গ্রামে৷ অনেকক্ষণ ধরে গান-বাজনা চলল, আরও দু-তিনজন লোক এসে গান-বাজনায় যোগ দিলে—তবে গ্রামের ভদ্রলোক কেউ আসে নি৷

কেদার বেহালায় কসরৎ দেখালেন প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে, তার পর আবার গান শুরু হল৷ রাত আন্দাজ এগারটার সময় কি তারও বেশি যখন, গানের আড্ডা তখন ভাঙল৷

একজন বললে, বাবাঠাকুর, আলো এনেছেন কি, না হয় চলুন আলো ধরে দিয়ে আসি খাল পার করে—

কেদারের হুঁশ হল এতক্ষণ পরে, বাইরে এসে বললেন, তাই তো, চাঁদ অস্ত গেল কখন? বড্ড অন্ধকার দেখছি যে—

পঞ্চমীর চাঁদের অবিশ্যি যতক্ষণ থাকা সাধ্য ততক্ষণ সে বেচারি আকাশে ছিল, তার কোনো কসুর নেই৷ কেদার রাজার জন্যে দুপুররাত পর্যন্ত অপেক্ষা করা তার সাধ্যাতীত৷

দাসু কুমোর বললে—আমার সঙ্গে যদি কেউ আসে আমি বাবাঠাকুরকে খাল পার করে দিয়ে আসি—

দু-তিনজন যেতে রাজি হল—একা রাত্রে কেউ ওদিকে যেতে রাজি হয় না, গড়ের মধ্যে আছে অনেক রকম গোলমাল৷ এ অঞ্চলে সবাই তা জানে৷ কেদার কিন্তু নির্ভীক লোক, তিনি কোনো লোক সঙ্গে নিয়ে যেতে রাজি নন—দরকার নেই কিছু, তিনি এমনিই বেশ যাবেন৷

তবুও জনচারেক লোক পাঁকাটির মশাল জ্বালিয়ে তাঁকে গড়ের খাল পার করে দিয়ে এল৷ এত রাত হয়েছে কেদার সেটা পূর্বে বুঝতে পারেন নি, তা হলে এত দেরি করতেন না, ছিঃ কাজ বড় খারাপ হয়ে গিয়েছে৷

কেদার বাড়ি ঢুকে দেখলেন মেয়ে খিল বন্ধ করে ঘরের মধ্যে শুয়ে৷ মেয়েকে একা এত রাত পর্যন্ত এই বনে ঘেরা নির্জন বাড়িতে ফেলে বাইরে ছিলেন বলে মনে মনে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হলেন, তবে কিনা এ অনুতাপ তাঁর নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারের মধ্যে দাঁড়িয়ে গিয়েছে৷ আর মজা এই যে, প্রতিরাত্রে ফিরবার সময়েই এই অনুতাপ মনের মধ্যে হঠাৎ আবির্ভূত হয়, এর আসা আর যাওয়া দুই-ই অদ্ভুত ধরনের আকস্মিক, ন্যায়শাস্ত্রের ‘বেগবেগা’ জাতীয় পদার্থ, আসবার সময় যত বেগে আসে, ঠিক তত বেগেই নিষ্ক্রান্ত হয়ে যায়—মনে এতটুকু চিহ্নও রেখে যায় না৷

শরৎ উঠে বাবাকে দোর খুলে দিলে, ভাত বেড়ে খেতে দিলে৷ তার মনে রাগ অভিমান কিছুই নেই—সে জানে এতে কোনো ফলও নেই—বাবা যা করবেন তা ঠিকই করবেন৷ ওঁর ঘাড়ে ভূত আছে, সে-ই ওঁকে চরিয়ে নিয়ে বেড়ায়, উনি কি করবেন?

কিন্তু কেদারের ঘাড়ে সত্যিই ভূত চেপে আছে বটে৷ খাওয়াদাওয়ার পরে অত গভীর রাত্রেও বাবাকে বেহালার লাল খেরোর খোল খুলতে দেখে সে আর কথা না বলে থাকতে পারলে না৷ বাবা এখন আবার বেহালা বাজাতে বসলেই হয়েছে!

কেদার ব্যাপারটাকে সহজ করবার চেষ্টা করলেন৷ বেহালা যে তিনি ঠিক বাজাতে চাইছেন এখন তা নয়, তবে একটা সুর মাথার মধ্যে বড় ঘুরছে—সেইটে একবারটি সামান্য একটু ভেঁজে নিতে চান৷

শরৎ বললে, না বাবা, তোমার ঘুম না আসতে পারে, তোমার খিদে নেই, তেষ্টা নেই, শরীরের ক্লান্তি নেই, ঘুম নেই—সব জয় করে বসে না হয় আছ, কিন্তু আমি এই সারাদিন খাটছি, তুমি এখন রাতদুপুরে বেহালা নিয়ে কোঁকর কোঁকর জুড়ে দিলে কানের কাছে আমার চোখে ঘুম আসবে?

কেদার বললেন, আমি—তা—না হয় দেউড়িতে গিয়ে বসি মা—তুই ঘুমো—

—না, তা হবে না৷ আমি মাথা কুটে মরব, এই এত রাত্রে অন্ধকারে সাপখোপের মধ্যে তুমি এখন জঙ্গলের মধ্যে দেউড়িতে বসে বেহালা বাজাবে? রাখ ওসব—

কেদার অগত্যা বেহালা রেখে দিলেন৷ মেয়েমানুষদের নিয়ে মহা মুশকিল৷ এরা না বোঝে সঙ্গীতের কদর, না বোঝে কিছু৷ তাঁর মাথায় সত্যিই একটা চমৎকার সুর খেলছিল, এই নিস্তব্ধ নির্জন দুপুর রাত্রি, সুরটা বেহাগ—রক্তমাংসের শরীরে এ সময় তারের ওপর ছড় চালানোর প্রবল লোভ সামলানো যায়?

মেয়েমানুষ কি বুঝবে?

.

কেদার বিকেলবেলা গেঁয়োখালির হাটে যাবার পথে সাধু সেকরার দোকানে একবারটি ঢুকলেন, উদ্দেশ্য তামাক খাওয়াও বটে, অন্য একটি উদ্দেশ্যও ছিল না যে এমন নয়৷ সাধু সেকরার বয়েস হয়েছে, নিজে সে একটি হরিনামের ঝুলি নিয়ে একটা জলচৌকিতে বসে মালাজপ করে, তার বড় ছেলে নন্দ দোকান চালায়৷ ব্রাহ্মণসজ্জনে সাধুর বড় ভক্তি—কেদারকে দেখে সে হাত জোড় করে বললে—আসুন ঠাকুরমশায়, প্রণাম হই—ওরে টুলটা বার করে দে—ব্রাহ্মণের হুঁকোতে জল ফেরা—

কেদার বললেন—তার পর, ভালো আছ সাধু? তোমার কাছে এসেছিলাম একটা কাজে—আমার কিছু টাকার দরকার—তোমার এ বছরের খাজনাটা এই সময়—

সাধুর অবস্থা ভালোই, কিন্তু মুখে মিষ্ট হলেও পয়সাকড়ি সম্বন্ধে সে বেজায় হুঁশিয়ার৷ কেদারকে যা হয় কিছু বুঝিয়ে দেওয়া কঠিন নয় তা সে বিলক্ষণ জানে—সে বিনীত ভাবে হাত জোড় করে বললে, বড্ড কষ্ট যাচ্ছে ঠাকুরমশায়, ব্যবসার অবস্থা যে কি যাচ্ছে, সোনার দর এই উঠচে এই নামচে, সোনার দর না জোয়ারের জল! আর চলে না ঠাকুরমশাই—এই সময়টা একটু রয়ে বসে নিতে হচ্ছে—আপনি রাজা লোক, আপনার খেয়েই মানুষ—

কেদার চক্ষুলজ্জায় পড়ে আর খাজনা চাইতে পারলেন না৷ হাটে ঢুকে আরও দু-একজনের কাছে প্রাপ্য খাজনা চাইলেন—সকলেই তাদের দুঃখের এমন বিস্তারিত ফর্দ দাখিল করলে যে কেদার তাদের কাছেও জোর করে কিছু বলতেই পারলেন না৷

হাটের জিনিসপত্রও সুতরাং বেশি কিছু কেনা হল না—হাতে পয়সাকড়ি বিশেষ নেই৷

সতীশ কলুর দোকানে ধারে তেল নিয়েছিলেন ওমাসে—এখনও একটি পয়সা শোধ দিতে পারেন নি, অথচ সর্ষের তেল না নিয়ে গেলে রান্না হবার উপায় নেই, মেয়ে বলে দিয়েছে৷

সতীশ বললে, আসুন দাদাঠাকুর, তেল দেব নাকি?

সতীশের দোকানে কোণের দিকে যে ঘাপটি মেরে বৃদ্ধ জগন্নাথ চাটুজ্জে বসেছিলেন, তা প্রথমটা কেদার দেখতে পান নি, এখন মুশকিল বাধল—অথচ না বললেও নয়! জগন্নাথ উঠলে না হয় বলবেন এখন৷ জগন্নাথ চাটুজ্জে হেঁকে বললেন, ওহে কেদার রাজা, এস এস, এদিকে এস ভায়া—তামাক খাও—

কেদার বললেন, জগন্নাথ দাদা যে! ভালো সব?

—ভালো আর কই, আবার শুনেছ তো ওপাড়ার নীলমণি গোসাঁইয়ের বাড়ির ব্যাপার? শোন নি? তা শুনবে আর কোথা থেকে—শুধু মাছ ধরা নিয়ে আছ বই তো নয়— সরে এস ইদিকে বলি—ঘোর কলি হে ভায়া ঘোর কলি, জাতপাত আর রইল না গাঁয়ের বামুনের—

জগন্নাথ চাটুজ্জের কথা শোনবার কোনো আগ্রহ ছিল না কেদারের—পরের বাড়ির কুৎসা ছাড়া তিনি থাকেন না৷ কিন্তু এঁকে এখান থেকে সরাবার উপায় না দেখলে তো তেল নেওয়া হয় না৷ কেদার অগত্যা জগন্নাথের কাছে গেলেন৷ জগন্নাথ গলার সুর নিচু করে বললেন, কাল রাত্তিরে নীলু গোসাঁইয়ের মেয়েটা আফিম খেয়েছিল, জানো না?

কথাটা প্রথম থেকেই কেদারের ভালো লাগল না৷ তবুও তিনি বললেন, আফিম? কেন?

জগন্নাথ চোখ মুখ ঘুরিয়ে হাসি-হাসি মুখে বললেন, আরে, এর আবার কেন কি কেদার রাজা! বিধবা মেয়ে, সোমত্ত মেয়ে, বাপেরবাড়ি পড়ে থাকে—কোনো ঘটনা-টটনা ঘটে থাকবে! কথায় বলে—

কেদারের নিজের বাড়িতেও ওই বয়সের বিধবা মেয়ে, গল্প শুনবেন কি, জগন্নাথ চাটুজ্জের কথার গূঢ় ইঙ্গিত, শ্লেষ ও ব্যঞ্জনা শুনে কেদার ভেতরে ভেতরে ভয়ে ও সঙ্কোচে আড়ষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করলেন৷ তেল কিনতে এসে এমন বিপদে পড়বেন জানলে তিনি না হয় আজ তৈলবিহীন রান্নাই খেতেন!

জগন্নাথ চাটুজ্জে বললেন, আমি শুনলাম কি করে বলি শোনো তবে৷ কাল আমি ক্ষেত্র ডাক্তারের বাড়িতে ডাক্তারের স্ত্রীর ব্রত উদযাপনে নেমন্তন্ন খেতে যাই, তাদের পরিবেশনের লোক হয় না, আমি আমার খাওয়ার পরে নিজে পরিবেশন করতে লাগলুম৷ রাত প্রায় বারোটা হয়ে গেল৷ তখন ক্ষেত্র ডাক্তার বললে, এখানেই আমার বাইরের ঘরে বিছানা পেতে দিক, এখানেই শুয়ে থাকুন—এত রাত্তিরে আর বাড়ি যায় না—

শুয়ে আছি, রাত প্রায় তিনটের সময় নীলু গোসাঁইয়ের বড় ছেলে ধীরেন এসে ডাক্তারকে ডাকলে৷ আমি জেগে আছি, সব শুনছি শুয়ে শুয়ে৷ ধীরেন কাঁদকাঁদ হয়ে বললে, শীগগির যেতে হবে ক্ষেত্রবাবু, মীনা আফিম খেয়েছে—

ডাক্তার বললে, কতক্ষণ খেয়েছে?

ধীরেন বললে, কখন যে খেয়েছিল তা তো জানা যায় না৷ নিজের ঘরে খিল দিয়ে শুয়েছিল, এখন গোঙানি ও কাতরানির শব্দ শুনে সবাই গিয়ে দেখে, এই ব্যাপার৷

সেই রাত্রে ক্ষেত্র ডাক্তার ছুটে যায়৷ কত করে তখন বাঁচায়৷ তা ওরা ভাবে যে কাক-পক্ষীতে বুঝি টের পেলে না, কিন্তু আমি যে ক্ষেত্র ডাক্তারের বাইরের ঘরে শুয়ে তা তো কেউ জানে না৷ সোমত্ত বিধবা মেয়ে মীনা, কি জানি ভেতরের ব্যাপারটা কি—কাল পড়েছে খারাপ কিনা—বলে আগুন আর ঘি—আরে উঠলে যে, বোসো!

বারে বারে বিধবা মেয়ের উল্লেখ কেদারের ভালো লাগছিল না—তা ছাড়া জগন্নাথ চাটুজ্জে কি ভেবে কি কথা বলছে তা কেউ বলতে পারে না৷ লোক সুবিধের নয় আদৌ৷ সর্ষের তেলের মায়া ছেড়ে দিয়েই কেদার উঠে পড়লেন, জগন্নাথ চাটুজ্জের সামনে তিনি ধারের কথা বলতে পারবেন না সতীশকে৷

জগন্নাথ চাটুজ্জে বললেন, তা হ’লে নিতান্তই উঠলে কেদার রাজা, বাড়ি থাকো কখন হে—একবার তোমাদের বাড়িতে যাব যে—ভাবি যাব, কিন্তু গড়ের খাল পার হতে ভয় হয়, আর যে বনজঙ্গল গড়ের দিকটাতে! তা ছাড়া আবার সেই তিনি আছেন—

জগন্নাথ চাটুজ্জে হাত জোড় করে কার উদ্দেশে দু-তিনবার প্রণাম করলেন৷

কেদার বলে উঠলেন, আরে ও কখনো কেউ দেখে নি, এই তো শরৎ রোজ সন্ধের সময় উত্তর দেউলে পিদ্দিম দিতে যায়—একাই তো যায়—কিছু তো কখনো কই—

ঝোঁকের মাথায় কথাটা বলে ফেলেই কেদার বুঝলেন কথাটা বলা তাঁর উচিত হয় নি৷ জগন্নাথ চাটুজ্জের পেটে কোনো কথা থাকে না—এর কথা ওর কাছে বলে বেড়ানোই তাঁর স্বভাব—এ অবস্থায় মেয়ের কথা তোলাই এখানে ভুল হয়েছে—

কিন্তু জগন্নাথ অন্য দিক দিয়ে গেলেন পাশ কাটিয়ে৷ বললেন, তুমি বলছ কেদার রাজা কিছু নেই, আমরা বাপ-দাদাদের মুখ থেকে শুনে আসছি চিরকাল—নেই বলে উড়িয়ে দিলেই—অবিশ্যি তোমার মেয়ে ওই নিবান্দা পুরীর মধ্যে একা থাকে, সাহস বলিহারি যাই—আমাদের বাড়ির এরা এলে দিনমানেই থাকতে পারত না—

এদের কথাবার্তার এই অংশটা সতীশ কলুর কানে গিয়েছিল, সে খদ্দেরকে তেল মেপে দিতে দিতে বললে, এখন অবেলায় ও কথাডা বন্ধ করুন বাবাঠাকুর, দরকার কি ওসব কথায়? চেরকাল শুনে আসছি, বাপ-পিতেমো পজ্জন্ত বলে গিয়েছে—গড়ের বাড়িই পড়ে আছে কতকাল অমনি হয়ে তার ঠিক-ঠিকানা নেই—আমার বয়েস এই তিন কুড়ি চার যাচ্ছে, আমি তো ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি ঠিক অমনি ধারা—কেদার দাদাঠাকুরের বয়েস আমার চেয়ে কত কম—আমি ওনাকে একটুখানি দেখেছি—

জগন্নাথ চাটুজ্জে বললেন, আরে তোমার তো মোটে চৌষট্টি সতীশ, আমার ঠাকুরদা মারা গিয়েছিলেন আমার ছেলেবেলায়, তিনি বলতেন তাঁর ছেলেবেলায় তিনিও গড়বাড়ি অমনিধারা জঙ্গল আর ইটের ঢিবি দেখে আসছেন, তাঁর মুখেও আমি উত্তর দেউলের ওকথা শুনেছি—কেদার রাজা কি জানে? ও কত ছোট আমাদের চেয়ে!

কেদার বলে উঠলেন, ছোট বড় নই দাদা, এই তিপ্পান্ন যাচ্ছে—

জগন্নাথ বললেন,—আর আমার এই খাঁটি ষাট কি একষাট্টি—তা হলে হিসেব করে দেখো কতদিন হল, আমার যখন পনেরো তখন ঠাকুরদা মারা যান, তখন তাঁর বয়েস নব্বুইয়ের কাছাকাছি—এখন হিসেব করে দেখ ঠাকুরদাদার ছেলেবেলা, সে কত দিনের কথা—কত দিনের হিসেব পেলে দেখো—

কেদার তেলের আশা ত্যাগ করে উঠে পড়লেন—কোনো উপায় নেই, কারো সামনে তিনি ধারের কথা বলতে পারবেন না—বিশেষ করে জগন্নাথ চাটুজ্জের সামনে৷

সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়েছে৷ গেঁয়োখালির হাট থেকে ফিরবার পথে গড়ের সদর দেউড়ির দিকে গেলে ঘুর হয় বলে পূর্বদিক দিয়েই ঢুকলেন কেদার—যে দিকটাতে খালে এখনও জল আছে৷ এদিকটাতেই বড় বড় ছাতিম গাছ আর ঘন বন৷ এক জায়গায় মাত্র হাঁটুজল খালে, কার্তিক মাসে কচুরিপানার নীলাভ ফুল ফুটে সমস্ত খালটা ছেয়ে ফেলেছে—এতটুকু ফাঁক নেই কোথাও—অন্ধকার সন্ধ্যাতেও শোভা যেন আরো খুলেছে৷

খাল পেরিয়ে উঠে গড়ের মধ্যে ঢুকেই ছাতিম বনের ওপারে ডান দিকে এক জায়গায় ধ্বংসস্তূপের থেকে একটু দূরে গোলাকৃতি গম্বুজের মতো ছাদওয়ালা ছোটগোছের মন্দির—এরই নাম এ গাঁয়ে উত্তর দেউল৷ কেন এ নাম তা কেউ জানে না, সবাই শুনে আসছে চিরকাল, তাই বলে৷

উত্তর দেউলের পাশ দিয়ে ছোট্ট পায়ে-চলার পথ বাদুড়নখী কাঁটার ঝোপের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে৷ ছাতিম ফুলের গন্ধের সঙ্গে মিশেছে বাঁদুড়নখী ও জংলী বনমরচে ফুলের ঘন সুবাস৷ বন বাঁ-ধারে বেশ ঘন আর অন্ধকার৷ গড়ের এখানকার দৃশ্যটি সত্যিই ভারি সুন্দর৷

কেদার একবার গম্বুজাকৃতি মন্দিরটার দিকে চাইলেন৷ আজ কেন যেন তাঁর গা ছমছম করতে লাগল৷ অন্ধকার ঘরটার মধ্যে সামান্য মৃদু প্রদীপের আলো—শরৎ এই সন্ধ্যার সময় প্রতিদিনের মতো সন্ধ্যাদীপ জ্বালিয়ে দিয়ে গিয়েছে—এটা কেদার রাজার বংশের নিয়ম, আজন্ম দেখে আসছেন তিনি, উত্তর দেউলে বাতি দিয়ে এসেছেন চিরকাল কেদারের মা, ঠাকুরমা এবং সম্ভবত প্রপিতামহী৷ কেদারের আমলেও দেওয়া হয়৷

০২. খাজনা আদায় করতে

শরৎ বাবাকে বললে, তুমি আজও তো কোথাও খাজনা আদায় করতে বেরুলে না—কি করে কি হবে আমি জানি নে৷ ঘরে কাল থেকে চাল বাড়ন্ত, কোনো কাজের কথা বললে, সে তোমার কানে যায় না, আমি বলে-বলে হার মেনে গিয়েছি—

কেদার বললেন, তা যাব তো ভাবছি৷ তুই না বললেও কি আর আমি বাড়ি বসে থাকতাম? একটু বেলা হোক—

শরৎ গৃহকর্মে মন দিলে৷ কেদার মোটা চাদরখানা গায়ে দিয়ে কিছুক্ষণ পরে বেরুবার উদ্যোগ করতেই শরৎ বললে, না খেয়ে বেরিও না বাবা—আহ্নিক করে একটু জল মুখে দিয়ে যাও—

কিছু খেতে অবিশ্যি কেদারের অনিচ্ছা ছিল না, কিন্তু তৎপূর্বে যে আনুষঙ্গিক অনুষ্ঠানটির কথা শরৎ উল্লেখ করলে, তাঁর যত আপত্তি সেখানে৷ এত সকালে তিনি আর ও হাঙ্গামার মধ্যে যেতে রাজি নন৷ সুতরাং তিনি বললেন, আমি এখন আর খাব না, এসে বরং—সবাই বেরিয়ে যাবে কিনা এর পরে—

তাঁদের গ্রামের পাশে রাজীবপুর চাষাদের গাঁ৷ এখানে কেদারের তিন-চারটি প্রজা আছে৷ আজ কয়েক মাস যাবৎ কেদার তাদের কাছে খাজনার তাগাদা করে আসছেন, কিন্তু জোর করে কাউকে কিছু বলতে পারেন না বলে একটি পয়সাও আদায় হয়নি৷

প্রথমেই কেদার গেলেন একঘর মুসলমান প্রজার বাড়ি৷ আরও দিন পনেরো পরে মাঠ থেকে ধান আসবে৷ মুরগি চরছে ধানের মরাইয়ের তলায়৷

বছর দুই আগে এই বাড়ির মালিকের মৃত্যু হয়েছিল৷ ছেলে আর ছেলের বৌ ছিল—গত চৈত্র মাসে ছেলেটির সর্পাঘাতে মৃত্যু ঘটে—এখন শুধু আছে বিধবা পুত্রবধূ আর একটি মাত্র শিশু পৌত্র৷ সামান্য জমার জমির ধান আর রবিশস্য থেকে কোনো রকমে সংসার চলে এদের৷

কেদার উঠোনে গিয়ে দাঁড়িয়ে হেঁকে বললেন, বলি ও আবদুলের মা, কোথায় গেলে? বাড়িতে কেউ ছিল না সম্ভবত৷ দু-একবার ডেকে কারো সাড়া না পেয়ে কেদার ধানের মরাইয়ের ছায়ায় একখানা কাঠ পেতে বসে পড়লেন৷ একটু পরে একটি অল্পবয়সী বৌ কলসিকক্ষে উঠোনে পা দিতেই কেদারকে দেখে জিব কেটে একহাতে ঘোমটা টেনে ক্ষিপ্রপদে উঠোন পার হয়ে ঘরে উঠল৷

একটু পরে বৌটি একখানা পিঁড়ি নিয়ে এসে কেদারের বসবার জায়গা থেকে হাত দশেক দূরে মাটির ওপর রেখে চলে গেল৷ কেদার সেখানা টেনে এনে তাতে বসলেন৷

মেয়েটি আরও প্রায় কুড়ি মিনিট পরে ঘোমটা দিয়ে ঘরের বার হয়ে ছাঁচতলায় নেমে দাঁড়াল৷ কোনো কথা বললে না৷

কেদার বললেন, আর বছরের দরুণ এক টাকা পাঁচ আনা আর এ বছরের সমস্ত খাজনা— মোট সাড়ে চার টাকা তোমার কাছে বাকি, টাকাটা আজ দিয়ে দাও—বুঝলে?

মেয়েটি নম্রসুরে বললে, বাপজী—

কেদার চমকে উঠলেন৷ কখনো বৌটি তাঁর সঙ্গে কথা বলে নি—তা ছাড়া ওর মুখের ডাকটি তাঁর বড় ভালো লাগল৷ শরতের চেয়েও বৌটির বয়স কম৷

কেদার বললেন—কি?

—টাকা তো যোগাড় করতে পারি নি আজও, কলাই বিক্রি না করে টাকা দিতে পারব না৷

কেদার দ্বিরুক্তি না করে সেখান থেকে উঠলেন৷ ওর মুখের ‘বাপজী’ ডাকের পর আর কখনো তাকে কড়া তাগাদা করা চলে?

আর এক বাড়ি গিয়ে দেখলেন, তাদের বাড়িসুদ্ধ সব ম্যালেরিয়া জ্বরে পড়ে৷ শুধু রোগের সম্বন্ধে নানা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে সেখান থেকে তিনি বিদায় নিলেন৷

পথে বেলা বেশি হয়েছে৷ এক দিনের পক্ষে যথেষ্ট বিষয়কর্ম করা হল—বেশি খাটতে তিনি রাজি নন—বাড়ির দিকে ফিরবার জন্যে সড়কে উঠেছেন, এমন সময় একজন বৃদ্ধের সঙ্গে দেখা হল৷

বৃদ্ধ লোকটির পরনে আধময়লা থান, গায়ে চাদর, হাতে একটা বড় ক্যাম্বিসের ব্যাগ৷ তাঁকে দেখে লোকটি জিজ্ঞেস করলে, হ্যাঁ মশাই গড়শিবপুর যাব কি এই পথে?

—গড়শিবপুরে কোথায় যাবেন?

—ওখানকার রাজবাড়ির অতিথিশালা আছে—শুনলাম, সকলে বললে৷ অনেক দূর থেকে আসছি, অতিথিশালায় গিয়ে আজ আর কাল থাকব৷

—গড়শিবপুরের রাজবাড়ি? কে বলে দিয়েছে? আচ্ছা চলুন নিয়ে যাই, আমার সঙ্গে চলুন— কেদারের বাড়ির অতিথিশালা পূর্বপুরুষদের আমল থেকেই আছে—সেই নামডাকেই এখনও গ্রামে অপরিচিত বিদেশী লোক এলে কেদারের বাড়ি অতিথি হতে আসে৷ নিজে খেতে না পেলেও পূর্ব-আভিজাত্যের গৌরব স্মরণ করে কেদার তাদের থাকবার খাবার বন্দোবস্ত করে দিয়ে আসছেন বরাবর৷ কখনও তাদের ফিরিয়ে দেন নি এ-পর্যন্ত৷ থাকবার জায়গার অসুবিধা বলে কেদার কাছারিবাড়ির উঠানে অতিথির জন্যে একখানা ছোট্ট দো-চালা খড়ের ঘর তৈরি করে দিয়েছেন অনেক দিন থেকে৷ খড় পুরনো হয়ে জল পড়তে শুরু করলে কেদার নিজেই চালে উঠে নতুন খড়ের খুঁচি দেন৷ এই ঘরখানার নামই অতিথিশালা৷ কেদারকে বিপন্ন হয়ে পড়তে হয় যখন হঠাৎ অতিথি এসে জোটে অতিথিশালায়, হয়তো নিজের ঘরেই সেদিন চাল বাড়ন্ত—কিন্তু অতিথিকে যোগান দিতেই হবে৷ অনেক সময় গ্রামের লোক দুষ্টুমি করে কেদারের অতিথিশালায় অতিথি পাঠিয়ে দেয়, সকলেই জানে কেদারের অবস্থা—মজা দেখবার লোভ সামলানো যায় না সব সময়৷

সাধারণ অতিথিকে দিতে হয় এক বোঝা কাঠ ও এক সের চাল, সামান্য কিছু নুন আর তেল৷ তরকারি হিসাবে দু-একটা বেগুন৷ এর বেশি কিছু দেবার নিয়ম নেই পূর্বকাল থেকেই—কেদারও তাই দিয়ে আসছেন৷

তবে ভদ্র-অতিথি এলে অন্যরকম ব্যবস্থা৷ নিয়ম আছে দুধ, ঘি, সৈন্ধব লবণ, মিছরিভোগ, আতপ চাল, মুগের ডাল ইত্যাদি তাকে যোগাতে হবে৷ কেদারের বর্তমান অবস্থায় সে-সব কোথায় পাওয়া যাবে—কাজেই নিজের ঘরে রেঁধে তাদের খাওয়াতে হয়—যতই অসুবিধা হোক, উপায় নেই৷ মাসের ভিতর পাঁচদিন শরৎকে অতিথিসেবা করতেই হয়৷ আজ কেদার একটু অসুবিধায় পড়লেন৷

ঘরে এমন কিছু নেই যা অতিথিশালায় পাঠাতে পারেন৷ লোকটি কি শ্রেণীর তা এখনও তিনি বুঝতে পারেন না, সাধারণ শ্রেণীর বলেই মনে হচ্ছে৷ অন্তত আধসের চালও তো দিতে হয়, কি করা যাবে সে-সম্বন্ধে পথ হাঁটতে হাঁটতে কেদার সেই কথাই ভাবতে লাগলেন৷

বৃদ্ধ বললে, কতদূর মশাই গড়শিবপুর?

—এই বেশি নয়, ক্রোশখানেক হবে৷ আপনাদের বাড়ি কোথায়?

—বাড়ি অনেকদূর, মেহেরপুরের কাছে, নদে জেলায়৷

—কোথায় যাবেন?

—দেশ বেড়িয়ে বেড়াচ্ছি৷ যেদিকে যখন ইচ্ছে, তখন সেদিকেই যাব—

—আপনারা?

—ব্রাহ্মণ, কাশ্যপ গোত্র, অভিনন্দ ঠাকুরের সন্তান, খড়দ মেল—আমার নাম শ্রীগোপেশ্বর চট্টোপাধ্যায়৷

কেদারের বয়স হয়েছে, সুতরাং তিনি জানেন ব্রাহ্মণদের পরিচয় দেবার এই প্রথাই ছিল আগের কালে৷ তাঁর ছেলেবেলায় তিনি দেখে এসেছেন বটে৷ এমন লোককে অতিথিশালায় পাঠিয়ে দেওয়া যায় না, নিজের ঘরে রেঁধে খাওয়াতে হয়৷

গ্রামের মধ্যে ঢুকে ব্রাহ্মণ বললে, রাজবাড়ি দেখিয়ে দিয়ে আপনি চলে যান, আমার সঙ্গে অনেকদূর তো এলেন—আর কষ্ট করতে হবে না আপনার—

—চলুন, আমিও সেই বাড়ি যাব, সেই বাড়ির লোক—

—আপনি রাজবাড়ির লোক বুঝি?

—আজ্ঞে হ্যাঁ—আমি—ইয়ে—

গড়ের খাল পেরিয়ে বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ বিস্ময়ের চোখে দু-ধারের জঙ্গলে ভরা ধ্বংসস্তূপগুলির দিকে চেয়ে চেয়ে দেখে বললে—রাজবাড়ি কতদূর?

কেদার কৌতুকের সঙ্গে বললেন, দেখতেই পাবেন, চলুন না—

দেউড়ির ধ্বংসস্তূপ পার হয়ে নিজের চালাঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কেদার বললেন, এই রাজবাড়ি—আসুন—

বৃদ্ধ কেদারের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চাইলে৷

কেদার হাসিমুখে বললেন, আমিই রাজবাড়ির রাজা—আমারই নাম কেদার রাজা—

ইতিমধ্যে শরৎ বার হয়ে বাবাকে কি বলতে এল, সকালে উঠে সে স্নান সেরে নিয়েছে, ভিজে চুলের রাশি পিঠময় ছড়ানো, গায়ের রঙের সুগৌর দীপ্তি রোদে দশগুণ বেড়েছে, বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ অবাক হয়ে এই সুন্দরী মেয়েটির দিকে চেয়ে রইল৷

কেদার বললেন, আমার মেয়ে, ওর নাম শরৎসুন্দরী৷ প্রণাম করো মা, ব্রাহ্মণ অতিথি—

শরৎসুন্দরী বাবাকে আড়ালে ডেকে জিজ্ঞেস করলে, তার পর, নিয়ে তো এলে, এখন উপায়? ঘরে তো এক দানা চাল নেই৷ বেলাও হয়েছে, কি করি বলো?

কেদার বললেন, যা হয় করো মা তুমি৷ আমি কিছু জানি নে—ওবেলা বরং—

শরৎসুন্দরী রাগ করে নিজের গালে চড় মারতে লাগল৷ ফর্সা গাল রাঙা হয়ে গেল৷ মেয়ে এরকম প্রায়ই করে থাকে বেশি রাগ হলে—কেদার অপ্রতিভ মুখে বললেন, ও কি করো মা ছেলেমানুষি! না—ছি—অমন করতে নেই৷

শরৎ জলভরা চোখে রাগের ও ক্ষোভের সুরে বললে, আমার ইচ্ছে করে গলায় দড়ি দিয়ে কি মাথায় ইট ভেঙে মরি, আমার এ যন্ত্রণা আর সহ্যি হয় না বাবা৷ বেলা দুপুরের সময় তুমি এখন নিয়ে এলে ভদ্রলোক অতিথি, নিজেদের নেই খাবার যোগাড়—কি করব—বলো বুঝিয়ে আমায়৷ নিত্যি তোমার এই কাণ্ড—কত বার না তোমায় বলেছি—

কেদার চুপ করে রইলেন, বোবার শক্র নেই৷ শরৎ তাঁর সামনে থেকে চলে গেলে তিনি অতিথির সঙ্গে এসে বসে গল্প করতে লাগলেন, কারণ শরৎ যে একটা যা হয় কিছু ব্যবস্থা করে ফেলবেই এ বিষয়ে তাঁর কোনো সন্দেহ ছিল না৷ শরৎ রাগী তেজি মেয়ে বটে, কিন্তু সব কাজে ওর ওপর বড় নির্ভর করা চলে অনায়াসে৷ খুব স্থিরবুদ্ধি মেয়ে৷

.

শরৎ কোথা থেকে কি করলে তিনি জানেন না, আহারের সময় অতিথির সঙ্গে খেতে বসে দেখলেন, ব্যবস্থা নিতান্ত মন্দ হয় নি৷ এত বেলায় মাছও যোগাড় করে ফেলেছে মেয়ে৷

আহারাদির পর কেদার বললেন, আচ্ছা গোপেশ্বরবাবু, চলুন একটু বিশ্রাম করবেন—

তারপর তিনি অতিথিকে সঙ্গে নিয়ে অতিথিশালার দো-চালা ঘরখানাতে এলেন৷ এখানে একখানা কাঁঠাল কাঠের সেকেলে ভারি তক্তপোশ পাতা আছে অতিথির জন্যে৷ পাতার জন্যে একখানা পুরনো মাদুর ছাড়া অন্য কিছু নেই চৌকিখানার ওপর—দেবার সঙ্গতিও নেই তাঁর৷

বৃদ্ধ বললেন, বসুন আপনিও৷ একটু গল্পগুজব করি আপনার সঙ্গে৷

—আপনার গান-বাজনা আসে?

—সামান্য এক-আধটু৷ সে কিছুই নয়—

কেদার উৎসাহে উঠে পড়লেন চৌকি ছেড়ে৷ গানবাজনা জানে এ ধরণের লোকের সঙ্গ তাঁর অত্যন্ত প্রিয়৷ এরকম লোকের সঙ্গে দেখা হওয়া ভাগ্যের কথা৷

বললেন, কি বাজনা আসে আপনার?

—কিছু না, তবলা বাজাতে পারি এক-আধটু—

—তা হলে আজ ওবেলা আপনাকে যেতে দেব না গোপেশ্বরবাবু—আমাদের আড্ডায় আজ সন্ধ্যাবেলা আপনাকে নিয়ে একটু আমোদ করা যাবে—

—তা আপনি যখন বলছেন, আমায় থাকতে হবে রাজামশায়৷ আপনার অবস্থা এখন যাই হোক, আপনি গড়শিবপুরের রাজবংশের বড় ছেলে, এখানকার রাজা৷ আমি সব শুনেছি আসবার পথে৷ আপনার অনুরোধ না রেখে উপায় কি বলুন! আর আমার কোনো তাড়া নেই, দেশ দেখতেই তো বেরিয়েছি—

—পায়ে হেঁটে?

—পয়সাকড়ি কোথায় পাব বলুন! পায়ে হেঁটে যত দূর হয় দেখছি৷ কখনো দূর দেশে যাই নি, কিছু দেখি নি ছেলেবেলা থেকে, অথচ বেড়াবার শখ ছিল৷ ভাবলুম বয়েস ভাঁটিয়ে গেল, এইবার বেরুনো যাক, হেঁটেই দেশ দেখব৷ পয়সা কোনো দিনই হবে না আমাদের হাতে৷ তা ধরুন ইতিমধ্যে নদীয়া জেলা সেরে ফেলেছি, এবার আপনাদের জেলায়—

—আপনার বয়েস হয়েছে, এরকম হেঁটে পারেন এখনও?

—বয়েস হলেও মনটা তো এখনও কাঁচা৷ কখনও কিছু দেখি নি বলেই যা দেখছি তাই ভালো লাগে৷ ভালো লাগলে হাঁটতে কষ্ট বোধ হয় না৷ কিন্তু আপনাকে দেখে আজ এত অবাক হয়ে গিয়েছি আমি, আর আপনাকে এত ভালো লেগেছে যে কি বলব! সত্যিকার রাজদর্শন ভাগ্যি ছাড়া হয় না, আমার তাই হল আজ৷ আমিও আমুদে লোক রাজামশায়, আমোদ ভালোবাসি বলেই বেরিয়েছি এই বয়সে৷

—বেশ তো, এখানে দু’চারদিন থেকে যান৷ আমোদ করা যাবে এখন৷ আপনার মতো লোক পেলে—

—কি জানেন, অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে কাচ্চাবাচ্চা নিয়ে নেনজার হয়ে পড়তুম রাজামশাই৷ দেশ ভ্রমণের শখ ছিল এস্তক লাগাৎ৷ কিন্তু যেতে পারিনে কোথাও—মনটা মাঝে মাঝে এমন হাঁপাতো! এই আমার বাষট্টি-তেষট্টি বছর বয়েস হয়েছে—আর বছর মেয়ে দুটিকে পাত্রস্থ করার পরে সংসারের ঝঞ্ঝাট অনেকটা মিটল৷ তাই বলি কখনও কোথাও যাই নি—বেরিয়ে আসি একবার৷ এক বছর পথে পথে থাকব—

—লাগছে ভালো এরকম হেঁটে বেড়ানো?

—আহা, বড্ড ভালো লাগছে রাজামশায়৷ নদীর ধার, বটগাছের তলা, মাঠে যবের ক্ষেত, মেয়েদের ক্ষার-কাচা পিঁড়ির ওপরে, হয়তো কোনো পুকুরের পাড়—যা দেখি তাতেই অবাক হয়ে থাকি৷ বড় ভালো লেগেছে আমার৷ যেখানে নদে জেলা শেষ হল সেখানে একটা বড় শিমুল গাছ আছে রাস্তার ধারে৷ জেলার শেষ কখনো দেখি নি—হাঁ করে জায়গাটাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলুম কতক্ষণ৷ বেশ রোদ্দুর তখন মাঠে, আকাশে বড় বড় চিল উড়ছে, কেউ কোনোদিকে নেই৷ আমার এক বন্ধু ছিল, মারা গিয়েছে অনেক কাল, নাম ছিল কেশব—সেও দেশ দেখতে ভালোবাসত বড়৷ তার কথা মনে পড়ল—

কেদার বিস্ময়ে ও কৌতূহলের সঙ্গে বৃদ্ধের গল্প শুনছিলেন৷ তিনিও বেশিদূর কোথাও যান নি, অবস্থার জন্যেও বটে—তাছাড়া সংসার ফেলে নড়তে পারেন না৷ তাঁর বড় ইচ্ছে হল মনে, নদে জেলা যেখানে শেষ হয়েছে, সেই শিমুল গাছের তলাটাতে গিয়ে একবার দাঁড়ান৷ কখনও তিনি দেখেন নি৷ জেলা কি করে শেষ হয়৷ বৃদ্ধের বর্ণনা শুনে মনে মনে অনেক দূরে সেই অদেখা শিমুল গাছের তলায় চলে গিয়েছে তাঁর মন৷

জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা গোপেশ্বরবাবু, সেই যেখানে শিমুল গাছ, তার এপারে ওপারে তো দুই জেলা? একহাত তফাতেই নদীয়া, এধারে আবার যশোর৷ ধরুন আমার যদি একখানা বেগুনের ক্ষেত থাকে সেখানে, একটা বেগুন গাছ থাকবে নদে জেলায়, আর দু হাত তফাতের বেগুন গাছটা হবে যশোর জেলায়! ভারি মজা তো! সেখানে এমন জমি আছে?

বৃদ্ধ হেসে বললে, কেন থাকবে না? ওদিকের জমি হবে কেষ্টনগর সদরের তৌজিভুক্ত, আর এদিকের জমি হবে যশোর বনগাঁ মহকুমায়—

—বাঃ বাঃ চমৎকার!

কেদারের মুখচোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল বিস্ময়ে ও কৌতূহলে৷ তাঁর ইচ্ছে হল জায়গাটা এখান থেকে কতদূর হবে জিজ্ঞেস করে নেন৷ কিন্তু পরক্ষণে মনে পড়ল বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাবার যো নেই তাঁর, শরৎকে একা এই বনের মধ্যে রেখে একদিনও তাঁর নড়বার উপায় আছে কোথাও? ছেলেমানুষ শরৎ…

জেলার সীমা দেখা তাঁর ভাগ্যে নেই৷…

সন্ধ্যার সময় বৃদ্ধকে নিয়ে কেদার ছিবাস মুদির দোকানে গিয়ে হাজির হলেন৷ রাত দশটা পর্যন্ত সেখানে পুরোদমে গান-বাজনা চলল৷ সকলেই বৃদ্ধের হাতে তবলা বাজানোর প্রশংসা করলে৷ খুব দ্রুত এবং খুব মিঠে হাত৷ সেই আড্ডাতেই আবার এসে জুটলো জগন্নাথ চাটুজ্জে৷ কোনো দিন আসে না, আজ কি ভেবে এসে পড়েছে কে জানে!

জগন্নাথ চাটুজ্জে মন দিয়ে খানিকক্ষণ গোপেশ্বরের বাজনা শুনে কেদারের কানে কানে বললে, ওহে কেদার রাজা, এ ভদ্রলোকটি বেশ গুণী দেখছি৷ এঁকে জোটালে কোথা থেকে হে?

কেদার পরিচয় দিলেন৷ জগন্নাথ শুনে খুব খুশি৷ তাঁর ইচ্ছে কেদারের বাড়িতে এসে লোকটির সঙ্গে কাল সকালে আরও আলাপ জমান৷ কেদার বললেন, তা বেশ তো দাদা, আসুন না সকালে—

বাড়ি ফিরতে রাত এগারোটা হয়ে গেল৷ রাত্রের আহারের ব্যবস্থা শরৎ ভালোই করেছে৷ মেয়ের ওপর ভার দিয়ে কেদার নিশ্চিন্ত থাকেন কি সাধে? কোথা থেকে সে কি করে, কেদার কোনোদিন খবর রাখেন নি৷ সে রাগ করুক, সংসারের কাজকর্ম সব ঠিকমতো করে যাবে, সে বিষয়ে তার ত্রুটি ধরবার উপায় নেই৷ ঠিক ওর মায়ের মতো৷

কেদার বোধ হয় একটু দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন কি ভেবে৷

গোপেশ্বর চাটুজ্জে কেদারের সঙ্গে বাড়ির চারদিক বেড়িয়ে বেড়িয়ে দেখলেন৷ গড়ের এপারে ওপারে যে সব প্রাচীন ধ্বংসস্তূপ বনের আড়ালে আত্মগোপন করে রয়েছে, তার সবগুলির ইতিহাস কেদারেরও জানা নেই৷

একটা পাথরের হাত-পা-ভাঙা মূর্তির চারিদিকে নিবিড় বেতবন৷

গোপেশ্বর বললেন, এ কি মূর্তি?

কেদার বলতে পারলেন না৷ বিভিন্ন মূর্তি চিনবার বিদ্যা নেই তাঁর৷ বাপ-পিতামহের আমল থেকে শুনে আসছেন এখানে যে মূর্তি আছে, অনেক দিন আগে মুসলমানদের আক্রমণে তার হাত পা নষ্ট হয়—কেউ বলে কালাপাহাড়ের আক্রমণে;—এ কিছু নয়, আসল কথা কেউ কিছু জানে না৷ বিস্মৃত অতীত কোনো ইতিহাস লিখে রেখে যায় নি গ্রামের মাটির বুকে—সময় যে কি সুদূরপ্রসারী অতীত ও ভবিষ্যৎ রচনা করে মানুষের স্মৃতিতে, সে গহন রহস্য এসব গ্রামের লোকের কল্পনাহীন মনে কখনও তার উদার ছায়াপাত করে নি, পঞ্চাশ বছর আগে কি ঘটেছিল গ্রামে, তাও তারা যখন জানে না—তখন ঐতিহাসিক অতীতের কাহিনী তাদের কাছে শুনবার আশা করা যায় কি করে?

গড়ের বাইরে এসে কেদার একটা প্রাচীন বটগাছ দেখালেন৷ কেদারের বাড়ি থেকে জায়গাটা অনেক দূর৷ গাছটার তলায় প্রাচীন আমলের বড় বড় শিবলিঙ্গ, গৌরীপট্ট, মকরমুখ পয়োনালা ইত্যাদি এখানে ওখানে পড়ে আছে স্মরণাতীত কাল থেকে—গ্রামের কেউ বলতে পারে না সে-সব কোথা থেকে এল৷ বৃদ্ধ গোপেশ্বর চাটুজ্জে এসব দেখে সেই ধরণের আনন্দ পেল, অধিকতর সচ্ছল অবস্থার ভ্রমণকারী দিল্লি আগ্রার মুঘলের কীর্তি দেখে যে আনন্দ পায়৷

কেদারকে বললে, রাজা মশায়, যা দেখলাম আপনার এখানে, জীবনে কখনও দেখি নি৷ দেখবার আশাও করি নি—এসব জিনিস কতকালের, যুধিষ্ঠির ভীম অর্জুনের সময়কার বোধ হয়৷ পাণ্ডবদের রাজ্য ছিল এখানে—না?

.

সেই রাত্রে বৃদ্ধের জ্বর হল৷ পরদিন সকালে কেদার অতিথিশালায় এসে দেখলেন বিছানা থেকে উঠবার ক্ষমতা নেই বৃদ্ধের৷ সারাদিন জ্বর ছাড়ল না—সন্ধ্যার পরে তার ওপর আবার ভীষণ কম্প দিয়ে জ্বর এল৷ কেদার পড়ে গেলেন মুশকিলে৷ তাঁর বাইরে যাওয়া একেবারে বন্ধ হয়ে গেল৷ সর্বদা রোগীর কাছে থাকতে হয়, কখনও তিনি কখনও শরৎ৷

সাতদিন এভাবে কাটল৷ কেদার পাশের গ্রাম থেকে সাতকড়ি ডাক্তারকে এনে দেখালেন, বৃদ্ধের জ্ঞান নেই—তার বাড়ির ঠিকানাটা জেনে নিয়ে একখানা চিঠি দেবেন তার আত্মীয়স্বজনকে, তার সুযোগ পেলেন না কেদার৷ শরৎ যথেষ্ট সেবা করলে এই বিদেশী অতিথির৷ ঠিক সময়ে দুটি বেলা বৃদ্ধের পথ্য প্রস্তুত করে নিজের হাতে তাকে খাইয়ে আসা, বাপের স্নানাহারের সুযোগ দেবার জন্যে নিজে রোগীর পাশে বসে থাকা, নিজের বাবার অসুখ হলেও শরৎ বোধ হয় এর চেয়ে বেশি করতে পারত না৷

ন’দিনের পর বৃদ্ধের জ্বর ছেড়ে গেল৷ পথ্য পেয়ে আরও এক সপ্তাহ বৃদ্ধ রয়ে গেল অতিথিশালায়—কেদার কিছুতেই ছাড়লেন না, এ অবস্থায় তিনি অতিথিকে পথে নামতে দিতে পারেন না৷ বাড়িতে চিঠি দিতে চাইলে বৃদ্ধ ঘোর আপত্তি তুললে৷ বললে, কেন মিছে ব্যস্ত করা তাদের? স্ত্রী নেই, মেয়ে নেই—থাকবার মধ্যে আছে ছেলে দুটি আর ছেলের বৌয়েরা—তাদের অবস্থা ভালোও নয়, তাদের বিব্রত করতে চাই নে৷

পরের সপ্তাহে বৃদ্ধ বিদায় নিয়ে চলে গেল৷ শরৎ পায়ের ধুলো নিয়ে প্রণাম করতে বৃদ্ধের চোখে জল দেখা দিল৷ শরতের মাথায় হাত দিয়ে বললে, এমন সেবা আমার আপনার লোক কখনো করে নি৷ আমার পয়সা নেই, পয়সা থাকলে হয়তো তারা করত৷ তুমি যে বড় বংশের মেয়ে তা তোমার অন্তর দেখেই বোঝা যায়৷ তুমি আমার যা করলে, কখনো তা পাই নি কারো কাছ থেকে৷ তোমায় আর কি বলে আশীর্বাদ করব মা, ভগবান যেন তোমায় দেখেন৷

কেদার বললেন, আপনি কি এখন বাড়ি যাবেন?

—না রাজামশায়—বেরিয়ে পড়েছি যখন, তখন ভালো করে সব দেখে নিই৷ অনেক কিছু দেখলাম, আরও অনেক কিছু দেখব৷ আপনাকে আর মাকে যা দেখলাম এই তো আমার কাছে একেবারে নতুন৷ বাড়ি থেকে না বেরুলে কি আপনাদের মতো মানুষের দর্শন পেতাম? ফেরবার পথে আপনাদের সঙ্গে দেখা না করে যাব না৷

অনেক দিন পরে বাড়ি থেকে বেরুবার অবকাশ পেলেন৷ বৃদ্ধের অসুখ সেরে গেলেও রুগ্ন অতিথিকে একা ফেলে কেদার কোথাও যেতে পারতেন না বড় একটা৷ সর্বদা কাছে বসে কথাবার্তা বলতেন৷ আজ একটা বড় দায়িত্বের বোঝা যেন ঘাড় থেকে নেমে গেল৷

ছিবাস মুদির দোকানের আড্ডায় জগন্নাথ চাটুজ্জে বললে—আরে এই যে কেদার রাজা, এসো এসো—কি হল, অতিথি চলে গেল? যাক, বাঁচা গিয়েছে—আচ্ছা অতিথি জুটিয়েছিলে বটে! বাপরে, একেবারে একটি মাসের মতো জুড়ে বসলো—যাবার নামটি করে না!

কেদার হেসে বললেন, কি করে যায় বলো—বেচারি এসেই পড়ে গেল অসুখে৷ লোক বড় ভালো, তার কোনো ক্রটি নেই৷ তার পর জগন্নাথ-খুড়ো—এখানে কি মনে করে? তোমাকে তো দেখিনে এখানে আসতে?

জগন্নাথ বললে, মাঝে মাঝে আসি আজকাল৷ একা বাড়ি বসে থাকি আর ওই একটু সতীশের দোকান নয় তো পঞ্চানন বিশ্বেসের বাড়ি—কোথায় যাই বলো আর? একটু বেহালা ধরো দিকি হে বাবাজী—তোমার বাজনা শুনি নি অনেক দিন৷…

.

শরৎ সন্ধ্যাবেলায় উত্তর দেউলে প্রতিদিনের মতো প্রদীপ দিতে গেল৷ দিঘির পশ্চিম পাড় ঘুরে সেই বড় ছাতিম গাছতলা দিয়ে প্রায় তিন রশি পথ যেতে হয়—বড্ড বন এখানটাতে৷ বাদুড়নখীর জঙ্গলে শুকনো বাদুরনখী ফল আঁকড়ে ধরে রোজ শরতের পরনের কাপড়৷ রোজ ছাড়াতে হয়৷

যে গম্বুজাকৃতি মন্দিরটার নাম ‘উত্তর দেউল’, সেটা একেবারে এই পায়ে চলা সরু পথের পাশেই, গড়ের খালের ধারের ধ্বংসস্তূপ থেকে একটু দূরে, স্বতন্ত্র ভাবে দণ্ডায়মান৷ বাদুড়নখীর কাঁটাজাল ভেঙে পথটা এসে একেবারে মন্দিরের ভাঙা পৈঠায় উঠেছে৷ মাটি থেকে উঁচু রোয়াক, তার ওপর গোল গম্বুজাকৃতি মন্দির—দুটি কুঠুরি পাশাপাশি৷ কি উঁচু ছাদ—শরতের মনে হয় মন্দিরের মধ্যে ঢুকতেই৷ চামচিকের বাসা—দোর খুলতেই খোলা দরজা দিয়ে একপাল চামচিকে উড়ে পালালো৷ ভেতরের কুঠুরিতে বেশ অন্ধকার৷ গা ছমছম করে সাহসিকার, তবুও তো ওর হাতে মাটির প্রদীপ মিটমিট জ্বলছে, আঁচল দিয়ে আড়াল করে আনতে হয়েছে পাছে বাতাসে নেবে৷ আলো হাতে ভয় কিসের?

হঠাৎ যেন পাশের কুঠুরিতে কার পায়ের শব্দ শোনা গেল অন্ধকারে৷ শরতের বুকের মধ্যে ঢিপ ঢিপ করে উঠল—তবুও সে সাহসে ভর করে কড়া-সুরে হেঁকে বললে—কে ওখানে?

ওর হাত কাঁপছে৷…

কোনো সাড়া না পেয়ে শরৎ সাহসে ভর করে আর একবার ডেকে বলল—কে পাশের ঘরে? সামনে এসো না দেখি?

ওর কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কে যেন পাশের কুঠুরির ওদিকের কবাটবিহীন দোর দিয়ে দ্রুতপদে বেরিয়ে গেল—বাইরের চাতালে তার পায়ের শব্দ বেশ স্পষ্ট শোনা গেল৷

শরৎ মন্দিরের মেঝেতে মাটির পিলসুজে বসানো প্রদীপটা জ্বালাতে জ্বালাতে আপনমনে বকতে লাগল—দোগেছের শ্মাশান তোমাদের ভুলে রয়েছে? মুখপোড়া বাঁদরের দল—বাড়িতে মা-বোন নেই?

ওর আগের ভয়টা একেবারে সম্পূর্ণ কেটেছে৷ ব্যাপারটা অপ্রাকৃতের শ্রেণী থেকে সম্পূর্ণ বাস্তবের গণ্ডির মধ্যে এসে পৌঁচেছে৷ দু-পাঁচ মাস অন্তর, কখনো বা উপরি উপরি দু-তিন মাস ধরে—এক-একদিন এরকম কাণ্ড উত্তর দেউলে সন্ধ্যাবেলা আলো দিতে এসে ঘটেই থাকে৷ গ্রামের বদমাইশ কোনো ছেলে-ছোকরার কাণ্ড৷ এমন কি কার কাণ্ড শরৎ খানিকটা মনে মনে সন্দেহও করতে পারে—তবে সেটা অবিশ্যি সন্দেহ মাত্রই৷

শরৎ এসবে ভয় খায় না, ভয় খেতে গেলে তার চলেও না৷ দরিদ্রের ঘরে সুন্দরী হয়ে যখন জন্মেছে, তখন এ রকম অনেক উপদ্রব সহ্য করতে হবে, সে জানে৷ বাবার তো সে-সব জ্ঞান নেই, সেই যে বেরিয়েছেন কখন তিনি ফিরবেন তার ঠিকানা আছে? একাই এই নিবান্দা পুরীর মধ্যে যখন থাকা, তখন ভয় করে কি হবে? আসুক কার কত সাহস, বঁটি নেই ঘরে? বঁটি দিয়ে নাক যদি কেটে দুখানা না করে দিই তবে আমি গড়শিবপুরের রাজবংশের মেয়ে নই! পাজি, বদমাইশ সব কোথাকার!

প্রদীপ দেখিয়ে যখন সে মন্দিরের বাইরে এসে দাঁড়াল—তখন সন্ধ্যার অন্ধকার বেশ ভালো করে নেমেছে৷ ওই দিঘির পাড়ের ছাতিমবনটা বড্ড অন্ধকার হয়ে পড়ে এ সময়—ওখানটাতে ভয় যে না করে এমন নয়৷ শরৎ যে-প্রদীপটা হাতে করে এনেছিল, সেই প্রদীপটা প্রাণপণে আঁচল দিয়ে বাঁচিয়ে বাদুড়নখীর কাঁটাজঙ্গলের পথ বেয়ে চলে গেল—শুকনো ফলের থোলো নাড়া পেয়ে ঝমঝম করছে—দু-একবার ওর কাপড় পেছন থেকে টেনেও ধরলে বাদুড়নখী ফলের বাঁকা ঠোঁট—দু-একবার ও ছাড়িয়েও নিলে৷

বাড়ি পৌঁছে যদি রাজলক্ষ্মীকে দেখতে পেতো, খুব খুশি হত সে, কিন্তু সে পোড়ারমুখী আসে নি৷ শরৎ রান্নাঘরে ঢুকে উনুন জ্বেলে রান্না চড়িয়ে দিলে৷

গোপেশ্বর চাটুজ্জে ছিল এতদিন, শরতের বেশ লাগত৷ বাপের বয়সী বৃদ্ধকে সেবা করে আনন্দ পেত সে—কেদার সে-রকম নন, তিনি সেবা তেমন কখনও চান না৷ তা ছাড়া নির্জন পুরীতে দু-একজন মানুষের মুখ যদি দেখা যায়, সে ভালোই৷

শরৎ সেবা করতে ভালোবাসে, পছন্দ করে৷ জীবনে যেটা সে চেয়েছিল, তাই তার হল না৷ স্বামীর কথা তার ভালো মনে হয় না, সেদিক থেকে তার মন শূন্য—সে মন্দিরের সোপান- বেদীতে কোনো দেবতা নেই—তাদের গড়ের উত্তর দেউলের মতোই৷

সেজন্যে শরৎ স্বাধীন আছে এখনও—সম্পূর্ণ স্বাধীন৷ মনের দিগন্তে এতটুকু মেঘ নেই কোনোদিকে৷

বেশি রাত এখনও হয় নি, শরৎ ডাল সবে নামিয়েছে—এমন সময় কেদার বাড়ি এলেন৷

শরৎ হাসিমুখে বললে, এত সকালে যে বাড়ি ফিরলে! আবার যাবে বুঝি?

কেদার শান্তভাবে বললেন, না, আর যাব না—তবে—

—না বাবা, আজ আর যেয়ো না—

কেদার একটু অবাক হয়ে মেয়ের মুখের দিকে চাইলেন৷ ওর গলার সুরের মধ্যে বোধ হয় কি পেলেন৷

—কেন বলো তো মা?

—এমনি বলছি—থাকো না বাড়িতে৷ সকাল সকাল খেয়ে নাও—রান্না হয়ে গেল, একটু চা করে দেব নাকি?

কেদার চা খেতে তেমন অভ্যস্ত নন, মেয়েও এত আদর করে তাঁকে চা খেতে বলে না কোনোদিন৷ ইতস্তত করে বললেন, তা কর না হয়—খাওয়া যাক৷ তুইও খা একটু—

—আজ একটা গল্প করো না বসে আমার কাছে? করবে? ভালো কথা, সন্ধে-আহ্নিকটা সেরে নাও দিকি? জায়গা করে দিই?

মেয়ে মুশকিলে ফেললে দেখা যাচ্ছে৷ কেদার একটু বিব্রত হয়ে পড়লেন৷ তিনি আসলে এসেছিলেন খানিকটা রজন সংগ্রহ করতে বেহালার ছড়ে দেবার জন্যে৷ ছিবাস মুদির আড্ডায় রজন ছিল, ফুরিয়ে গিয়েছে কিংবা হারিয়ে গিয়েছে৷ এত রাত্রে এ গ্রামের আর কোথাও ও জিনিস পাওয়া গেলে কেদার কখনই বিপদের মুখে পা দিতেন না৷ করাই বা যায় কি? অগত্যা কেদার সন্ধ্যা-আহ্নিকে বসলেন৷ পাঁচ মিনিটের মধ্যে সাঙ্গও করে ফেললেন৷ তার পর তিনি ভাবছেন এখন কি ভাবে বাইরে যাওয়া যায়, শরৎ আবার আবদারের সুরে বললে—বাবা, বল একটা গল্প—আজ তোমাকে যেতে দেব না—

কেদারের বুকের ভিতরটা কেমন করে উঠল৷ আজ শরৎ যেন ছেলেমানুষের মতো হয়েছে৷ কতদিন শরতের গলায় এমন আবদারের সুর তিনি শোনেন নি৷ এমনি অন্ধকার রাত্রে তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মীমণি বাপের বাড়ি থেকে ফিরে এসেছিল গরুর গাড়ি করে৷ শরৎ তখন ছ-মাসের শিশু৷ কেদার চিরদিনই এক রকম বাইরে বাইরে ফেরেন—বাড়িতে কেদারের আপন বৃদ্ধা জ্যাঠাইমা ছিলেন—তিনি কানে অত্যন্ত কম শুনতেন৷ লক্ষ্মীমণি ও তার বাপের বাড়ির গাড়োয়ান অনেক ডাকাডাকি করেও বৃদ্ধার ঘুম ভাঙাতে পারে নি৷ অগত্যা তাঁর ঘরের দাওয়াতেই বসে ছিল কেদারের আগমনের অপেক্ষায়৷…

রাত এগারটার সময় কেদার গানবাজনার আড্ডা থেকে বাড়ি ফিরে দেখেন এই কাণ্ড৷ কেদারের মনে আছে, লক্ষ্মীমণি অন্ধকারের মধ্যে তাঁর কোলে ছ-মাসের মেয়েকে তুলে দিয়েই কৌতুকে আমোদে খিলখিল করে হেসে উঠেছিল৷

—কেমন, বড্ড যে মেয়েকে ঘেন্না করতে!…মেয়ে যেন হয় না, হলে গড়ের পুকুরে ডুবিয়ে মারব!…ইস, মার না দেখি ডুবিয়ে!

সেই নবযৌবনা রূপবতী স্ত্রীর মুখের হাসি আজও মাঝে মাঝে যেন কানে বাজে…তখন পৃথিবী ছিল তরুণ, তিনি ছিলেন তরুণ, লক্ষ্মীমণি ছিল তরুণী৷ আর একজন এসেছিল তারপর…কিন্তু থাক, তার কথা কেদার এখন ভাববেন না৷

সেই মেয়ে শরৎ—সেই ছোট্ট শিশু৷ কি সুখে তাকে রেখেছেন কেদার?

শরৎ চা করে এনে দিলে৷

—শুধু চা খেও না, দাঁড়াও কি আছে দেখি৷

—দুটো বড়ি ভেজে কেন দ্যাও না, সে বেশ লাগে আমার—

শরৎ একটু আচারনিষ্ঠ মেয়ে, ভাতের শকড়ি কড়াতে সে বড়ি ভেজে এখন চায়ের সঙ্গে দিতে রাজি নয় বাবাকে৷ বাবা নিতান্ত নাস্তিক, তাঁর না আছে ধর্ম—না আছে কর্ম—বাবার ওসব ম্লেচ্ছাচার শরৎ পছন্দ করে না আদৌ৷

—বড়ি আবার এখন কি খাবে, হেঁসেলের জিনিস—দুটি মুড়ি মেখে দিই তার চেয়ে৷

কেদার অগত্যা মুড়ির বাটি নিয়ে বসলেন৷

না, আজ আর আড্ডায় যাওয়া গেল না৷ শরৎ তাঁর মনকে বড় অন্যমনস্ক করে দিয়েছে৷ ভালো রজন নিতে এসেছিলেন তিনি!

—আচ্ছা বাবা, উত্তর দেউলের কথা যে লোকে বলে—তুমি কিছু জানো?

—বলে, শুনে আসছি এই পর্যন্ত, নিজে কিছু দেখিও নি, কিছু শুনিও নি৷ তবে বাবার মুখেও শুনেছি, ঠাকুরদাদাও বলতেন—আমাদের বংশেও প্রবাদ চলে আসছে চিরদিন থেকে—

—বল না বাবা, কি কথা—

—তুমি তো জানো, সবই তো শুনে আসছ আজন্ম৷ থাক ও কথা এখন এই রাত্তির বেলা৷ কেন বল তো মা, উত্তর দেউলের কথা উঠল কেন মনে হঠাৎ?

—কিছু না, এমনি বলছি—

—আজ পিদিম দিয়ে এসেছ তো?

—ওমা, তা আবার দেব না! কবে না দিই? এমনি মনে হল তাই বলছি—

আজকার সন্ধ্যার ব্যাপারটা বাবার কাছে বলা উচিত কি না শরৎ অনেকবার ভেবেছে৷ শেষ পর্যন্ত সে ঠিক করে ফেলেছে বাবাকে কিছু বলবে না৷ বাবা ওই এক ধরনের লোক, বালকের মতো আমোদপ্রিয়, সরল লোক—সংসারের কোনো কিছু গায়ে মাখেন না—মাখা অভ্যেসও নেই৷ তিনি শুনবেন, শুনে ভয় পাবেন, উদ্বিগ্ন হবেন—কিন্তু কোনো প্রতিকার করতে পারবেন না৷ দুদিন পরে আবার সব ভুলে যাবেন৷ তাঁকে বলে কোনো লাভ নেই৷

তা ছাড়া একথা প্রকাশ হলেও এ-সব পাড়াগাঁয়ে অনেক ক্ষতি আছে৷ কে কি ভাবে নেবে তার ঠিক কি? এ থেকে কত কথা হয়তো ওঠাবে লোকে৷ বাবা পেটে কথা রাখতে পারেন না, এখুনি গিয়ে ছিবাস কাকার দোকানে গল্প করবেন এখন৷ দরকার কি সে-সব গোলমালে?

কেদার অবশেষে একটা গল্প বললেন—মেয়ের আবদার রাখার জন্যেই৷ এ গল্প এদেশে অনেকে জানে৷ তাঁর নিজের বংশের ইতিহাসেরই হয়তো—কেদার কিছু খোঁজ রাখেন না৷ কোনো পাঁজি-পুঁথিতে কিছু লেখা নেই৷

গড়ের বড় দিঘিটার নাম কালো পায়রার দিঘি৷ এ বাদে আরও দুটো দিঘি আছে ছাতিমবনের ওপারে—একটার নাম রানীদিঘি—একটার নাম চালধোয়া পুকুর৷ ও দুটো পুকুরেই অনেক পদ্মবন আছে—কালো পায়রার দিঘি অর্থাৎ যেটাতে কেদার প্রায়ই গণেশ মুচির সঙ্গে মাছ ধরে থাকেন—সেটাতে কোনো ফুল নেই পাটা-শেওলার দাম ছাড়া৷

বহুকাল আগে—কতকাল আগে কেদারের কোনো ধারণাই নেই—তাঁর কোনো পূর্বপুরুষের সঙ্গে মুসলমান ফৌজদারের দ্বন্দ্ব বাধে৷ চাকদহের নিকট যশড়া ও হাট জগদলের যে যুদ্ধের প্রবাদ আজও ছড়ার আকারে এই সব গ্রাম-অঞ্চলে প্রচলিত, কেদার শুনেছেন সে ছড়ার মধ্যে উল্লিখিত রাজা দেব রায় ও ভূমিপাল রায় তাঁরই বংশের পূর্বপুরুষ৷

হাট জগদলে পানি প্যালাম না

তীর খেয়ে ভিরমি নেগেচে—

দেবরায়ের সেপাই যে ভাই যমদূতের চ্যালা

ভুঁইপালের তীরন্দাজে দেয় বড় ঠ্যালা—

(ও ভাই) হাট জগদলে পানি প্যালাম না৷

তীর খেয়ে ভিরমি নেগেছে—

বিপদে পড়ে রাজা দেব রায় গৌড়ে যান দরবার করতে, বাড়িতে বলে গিয়েছিলেন যদি মঙ্গলের সংবাদ থাকে তবে সঙ্গের শ্বেত পারাবত উড়িয়ে দেবেন, কিন্তু যদি অশুভ কিছু ঘটে, তবে কৃষ্ণ পারাবত উড়ে আসবে৷ সংবাদ শুভ হলেও কার ভুলক্রমে কৃষ্ণ পারাবত উড়িয়ে দেওয়া হয়৷ মহারানী অন্তঃপুরিকাদের নিয়ে গড়ের মধ্যের বড় দিঘির জলে আত্মবিসর্জন করে বংশের সম্মান রক্ষা করেন৷

রাজা জয়ী হয়ে ফিরে এসে যখন দেখলেন তাঁর অসতর্কতার পরিণাম—তিনি আর রাজকর্ম পরিচালনা করেন নি, ভাইয়ের হাতে রাজ্যভার তুলে দিয়ে উত্তর দেউলে বারাহী দেবীর বেদীমূলে বসে প্রায়োপবেশনে দেহত্যাগ করেন৷

এ অঞ্চলে প্রবাদ, উত্তর দেউলে এক বিশালকান্তি পুরুষকে কখনো কখনো নাকি দেখা গিয়েছে—হাতে তাঁর বেত্রদণ্ড, মুখে তর্জনী স্থাপন করে তিনি চিত্রার্পিতের মতো উত্তর দেউলের দ্বারদেশে দাঁড়িয়ে৷

কিন্তু এসব শোনা-কথা মাত্র৷ কেউ এমন কথা বলতে পারে না যে, সে নিজের চোখে কিছু দেখেছে৷

অথচ গ্রাম্য লোক ভয় পায়, সন্ধ্যার পর উত্তর দেউলের এদিকে কেউ বড় একটা যাতায়াত করে না৷

কেদারও কিছু জানেন না, অপর পাঁচজনে যা জানে, তিনি তার বেশি কিছু জানেন না, জানবার কোনো চেষ্টাও করেন নি৷ আর কে-ই বা বলবে?

শরৎ বললে, বাবা, এসব কত দিনের কথা?

—তা কি করে বলব রে পাগলি? আমি কি দেখেছি?

রানীর নাম কি ছিল বাবা?

—কি করে বলব মা?… ইয়ে তা হলে আমি এখন—

—আচ্ছা বাবা, তিনি আমার সম্পর্কে কেউ নিশ্চয় হতেন—আমাদেরই বংশের তো—

কেদার একটু ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন—এখনও যদি ছিবাস মুদির দোকানে গিয়ে পৌঁছুতে পারেন—রাত বেশি হয় নি এখনও৷

তিনি অধীর ভাবে বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই হবেন বৈকি—তোমার ঠাকুরমা-টাকুরমা হতেন আর কি—

শরৎ হেসে বললে, ঠাকুরমা কি বাবা, সে হল কোন যুগের কথা—তোমার মা-ই তো আমার ঠাকুরমা হতেন৷

কেদারের মন এখন অত কুলজী-নির্ণয়ের দিকে নেই৷ তিনি তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন—আচ্ছা, তুমি ততক্ষণ রান্নাটা নামিয়ে রাখো—আমি আসছি চট করে—

—এত রাত্তিরে তোমায় বাবা আর যেতে হবে না৷ না, থাকো আজ—

—কেন, তোর ভয় করছে নাকি মা?

—হ্যাঁ তাই৷ থাকো আজকে—

কেদার একটু আশ্চর্য হলেন, শরৎ কোনোদিন এমন করে বাধা দেয় না৷ গল্প-টল্প শুনে ভয় পেয়েছে ছেলেমানুষ৷ থাক, আজ আর তিনি যাবেন না৷ রজন আনতে বাড়ি এসে যে ভুল তিনি করে ফেলেছেন, তার আর চারা নেই৷

শরৎ বললে, বাবা, সেই কলসিটার কথা মনে আছে?

—হ্যাঁ খুব আছে৷ কলসিটা কোথায় রে?

—রাজলক্ষ্মীদের বাড়িতে চেয়ে নিয়েছিল দেখবার জন্যে৷ সেখানেই আছে৷

—নিয়ে এসে রেখে দিয়ো, নিজের জিনিস বাড়িতে রাখাই ভালো৷

আজ বছর ছ’সাত আগে মাটির কলসি গড়ের খাতের মধ্যে এক জায়গায় পাওয়া যায়—কলসিটার ওপরে নানারকম ছক কাটা, নক্সা আঁকা—কেদারই কলসিটা প্রথমে দেখতে পান,

টাকাকড়ি পোঁতা আছে হয়তো পূর্বপুরুষের—প্রথমটা ভেবেছিলেন৷ কিন্তু শেষে কলসিটা খুঁড়ে বের করে আধ খুঁচিটাক কড়ি পান তার মধ্যে৷

গ্রামের হীরু ও সাধন কুমোর দেখে বলেছিল—এ পোড়ের কলসি আজকাল আর হয় না, এমন ধরনের আঁকাজোকা কলসির গায়ে—এসব বাবাঠাকুর অনেক কাল আগের জিনিস৷ এ পোড়ই আলাদা—খুব ওস্তাদ কুমোর না হলে এমন পোড় হবে না বাবাঠাকুর৷

গড়ের খালের খুব নিচের দিকে, যেখানে জল প্রায় মজে এসেছে, সেখানে একদিন মাছ ধরতে বসে কেদার কলসিটা পেয়েছিলেন৷ ওঃ, টাকার কলসি পেয়ে গিয়েছেন বলে কি খুশি কেদারের! শরতের মা লক্ষ্মীমণি তখনও বেঁচে৷

লক্ষ্মী ছুটে এল—কি গা কলসিটাতে?

এর আগে কেদার বলে গিয়েছিলেন যে একটা কলসির কানা বেরিয়েছে গড়ের খালের পাড়ে৷ অনেক নিচের দিকে পাড়ের৷

কেদার হাসতে হাসতে বললেন, এক হাঁড়ি মোহর—নেবে এসো—

লক্ষ্মীর বয়স তখন পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশের কম, কিন্তু দেখাতো পঁচিশ বছরের যুবতীর মতো৷ গায়ের রঙের জলুস এই দু-বছর আগেও মরণের দিনটি পর্যন্ত ছিল অম্লান৷ এই মেয়ে হয়েছে ওর মায়ের মতো অবিকল—কিন্তু লক্ষ্মীর মতো অত জলুস নেই গায়ের রঙের—তার কারণ কেদার নিজে তত ফর্সা নন—শ্যামবর্ণ৷

লক্ষ্মী এসে হাসিমুখে কড়িগুলো নিয়ে গেল৷ বললে, জানো না, লক্ষ্মীর কড়ি, পয়মন্ত কড়ি—আমাদের বংশের কেউ হয়তো পুঁতে রেখে থাকবে কতকাল আগে—যত্ন করে তুলে রেখে দিই—

কেদার জিজ্ঞেস করলেন মেয়েকে—ভালো কথা, কলসির সেই কড়িগুলো কোথায় আছে?

—লক্ষ্মীর হাঁড়ির মধ্যে মা-ই তো রেখে গিয়েছিল, সেখানেই আছে৷

কেদারের মনটা আজ হঠাৎ কেমন আর্দ্র হয়ে উঠেছে, আশ্চর্যের ব্যাপার বটে! তিনি একটু ব্যস্ত হয়ে বললেন, দেখে এসো না মা, আছে তো ঠিক—যাও না—

অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে শরৎ মুখের হাসি গোপন করলে, আহা, হাসিও পায়, দুঃখও হয় বাবার জন্যে৷ মা মারা যাবার পরে বাবা মায়ের কোনো জিনিস ফেলতে পারেন না, মায়ের ভাঙা চিরুনিখানা পর্যন্ত৷ তবে সব সময় তো খেয়াল থাকে না, ভোলা মহেশ্বরের মতো বাইরে বাইরে ঘোরে কিন্তু মাঝে মাঝে হয়তো মনে পড়ে যায়৷ শরতের বয়স হল পঁচিশ-ছাব্বিশ—সে সব বোঝে৷

বাবাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যেই বিশেষ করে শরৎ উঠে গেল লক্ষ্মীর হাঁড়ি দেখতে—সে ভালোরকমই জানে—কড়িগুলো আছে ওর মধ্যে৷ কিন্তু বাবার ছেলেমানুষের মতো স্বভাব, যখন যা ধরবেন তাই৷

সে দেখে ফিরে এসে দাঁড়াতে না দাঁড়াতে কেদার জিজ্ঞেস করলেন, রয়েছে দেখলি?

শরৎ আশ্বাস দেওয়ার সুরে বললে, হ্যাঁ বাবা, রয়েছে৷

—আর সেই কলসিটা কালই নিয়ে আয় ওদের বাড়ি থেকে৷ সেখানে এত দিন ফেলে রাখে? তোর জিনিসপত্রের যত্ন নেই৷

—তুমি ভেবো না বাবা, কালই আনব৷

আজ বাবার হঠাৎ খেয়াল চেপেছে তাই, নইলে আজ পাঁচ-ছ বছরের মধ্যে কোনো দিন কলসিটার কথা বাবা তো এক দিনও বলেন নি! আজও তো সে-ই আগে তুলেছিল ওকথা, তাই এখন বাবার বড্ড দরদ কলসির ওপর, কড়ির ওপর৷ কেদার নিশ্চিন্ত হয়ে এক ছিলিম তামাক ধরালেন৷ কলসির কথা ওঠাতে তাঁর মনে পড়ল, বনে-জঙ্গলে ঘোরেন তিনি এই বিশাল গড়ের হাতার মধ্যে, খালের এপারে বা ওপারে জলের মধ্যে আরও দু-একটা জিনিস দেখেছেন, যার অর্থ তিনি করতে পারেন নি৷

যেমন একবার, আজ দশ-পনেরো বছর আগে, গড়ের বাইরে যে বড় মজা দিঘির নাম চালধোয়া পুকুর, তার ধারে কি করতে গিয়ে কেদার একটা বাঁধা-ঘাটের চিহ্ন দেখতে পান৷ কত কাল আগের বাঁধাঘাট কে বলবে? কয়েকটা মাত্র ধাপ তার অবশিষ্ট আছে—বাকিটা হয়তো মাটির মধ্যে পোঁতা৷

একবার তিনি কিছু পুরনো ইট বিক্রি করেন, গড়ের খালের এপারের একটা বড় পাঁচিলের ইট৷ বহুকাল থেকে স্তূপাকার হয়ে পড়ে ছিল—তার ওপরে গজিয়েছিল বনগাছের জঙ্গল৷ ইটের ঢিবি খুঁড়তে খুঁড়তে যখন সব ইটের স্তূপ শেষ হয়ে গেল—তখন সমতল মাটির আরও হাত-তিনেক নিচে আর কতকগুলো ইটের সন্ধান পাওয়া গেল৷ সে জায়গাটা খুঁড়ে দেখা গেল মাটির নিচে একটা মন্দিরের খানিকটা অংশ যেন চাপা পড়ে আছে৷

তখন সে ইটগুলোও খুঁড়ে তোলবার জন্যে বন্দোবস্ত করা হল৷ আরও হাত-দুই খুঁড়ে খুব বড় একটা পাথরের মাথা বেরিয়ে পড়ল৷ আর খোঁড়া হয় নি—এখন সে-সব আবার বনে ঢেকে গিয়েছে৷ কেদারের মনে হয়েছিল, ওখানে একটা মন্দির ছিল বহুকাল আগে—কতকাল আগে তা অবিশ্যি তিনি আন্দাজ করতে পারেন নি৷ অনেকগুলো নক্সাকাটা ইট বেরিয়েছিল ওখান থেকে৷ কিসের মন্দির তাও কেউ জানে না৷

ওই বাড়ির চারিপাশে তাঁদের পূর্বপুরুষদের কত দিঘি, দেউল, ঘরবাড়ি ভেঙেচুরে আত্মগোপন করে আছে আজ কত কাল কত যুগ ধরে, দুর্ভেদ্য বেতবনের আড়ালে, জগডুম্বুর গাছের আঁকাবাঁকা শেকড়ের নীচে; দুশো বছরের সঞ্চিত চামচিকের নাদির মধ্যে থেকে বিরাট শিবলিঙ্গ কোথাও মাথাটি মাত্র জাগিয়ে আছেন—হস্তপদভগ্ন বারাহী দেবীর পাষাণ মূর্তি ছাতিমবনের নিবিড় ছায়ায় অনাদৃত অবস্থায় পড়ে আছে কতকাল৷

শরৎ এসব জানে৷ নিজের চোখেও দেখে আসছে আবাল্য, রাজলক্ষ্মীর ঠাকুরদাদা বৃদ্ধ শ্রীনাথ চাটুজ্জের মুখে সে অনেক কথা শুনেছে, যা তার বাবাও কোনদিন বলেন নি৷ শ্রীনাথ চাটুজ্জে অনেক খবর রাখতেন৷

—ভাত দিই বাবা, রাত হয়ে গিয়েছে অনেক—

—কেমন গল্প শুনলি, হল তো?

—উত্তর দেউলের কথা ভুলে গিয়েছ দিব্যি!

—ভুলব কেন, ওই যে বললাম—

—দেবীমূর্তির কথা বললে না যে—

—সেও তো শোনা কথা৷ কালাপাহাড় না কে…দেবীর মূর্তি ভেঙেচুরে মন্দির থেকে ফেলে দেয় টান মেরে—৷

—ভাদ্র মাসের অমাবস্যেতে দেবীমূর্তি নাকি—

—কে দেখতে গিয়েছে মা? চোখে কেউ দেখেছে? ওসব গুজব৷ পাষাণের অতবড় মূর্তিটা অমনি জাগ্রত হয়ে ঠেলে উঠে চলতে শুরু করে—হ্যাঁঃ—

শরৎ সাহসিকা মেয়ে, তবুও বাবার কথায় যে ছবি তার মনে জাগল—তাতে সে শিউরে উঠল, কারণ সে শুনে এসেছে সে-সময় যে সঞ্চরণশীল জগ্রত পাষাণ মূর্তির সামনে পড়ে, তার সেদিন বড়ই দুর্দিন৷

না, ওসব কথায় তার ভয় হয়; তাড়াতাড়ি সে বাবাকে বললে, থাক থাক বাবা, ওসব কথায় আর দরকার নেই৷ তোমার কি, রাতদুপুর পর্যন্ত ফেলে রেখে যাবে, মরতে আমিই মরি আর কি!

মশা বিনবিন করছে জঙ্গলের মধ্যে৷ খালিগায়ে ঘরের মধ্যে বসা কষ্ট৷ কলাবাদুড় ঝুলছে তালকাঠের আড়া থেকে৷ বাইরের বাতাসে কি বনফুলের সুগন্ধ!

কেদার আহারে বসে অভ্যাসমতো এ-তরকারি ও-তরকারির দোষ খুঁত বার করতে করতে খেতে লাগলেন৷ কাঁচকলা রান্না বড় শক্ত কথা, বেগুনের তরকারিতে অত ঝাল সে কোথা থেকে শিখেছে ইত্যাদি৷ খেয়ে উঠে তামাক সাজতে গিয়ে কেদার দেখলেন তামাক একদম ফুরিয়ে গিয়েছে৷ মেয়ে আজকাল অত্যন্ত অমনোযোগী, কাজকর্মে আর অগের মতো মন নেই—যদি থাকত তবে তামাক ফুরিয়ে যাওয়ার একদিন আগে লক্ষ করে নি কেন? এখন তিনি তামাক কোথায় পান এত রাত্রে?

শরৎ বললে, আচ্ছা বাবা, তোমার তামাক খেতে পেলেই তো হল! কলকেটা দাও—

—কোথায় পাবি তামাক?

—তোমার সে খোঁজে দরকার কি? দেখি কলকেটা—

অসময়ের জন্যে সে প্রতিদিনের তামাক থেকে একটু একটু নিয়ে একটা ঘুলঘুলির মধ্যে লুকিয়ে রাখে৷ বাবার কাণ্ড তার জানতে বাকি নেই, এই রকম রাতদুপুরে তামাক ফুরিয়ে যাবে হঠাৎ৷ বকুনি খেতে হবে সে-সময় তাকেই৷ বকুনির চেয়েও তার দুঃখ হয় যখন বাবার কোনো জিনিসের অভাব ঘটে—কোনো কিছুর জন্যে তিনি কষ্ট পান৷

শরৎ তামাক সেজে এনে দিলে৷ কেদার তামাক পেয়েই সন্তুষ্ট, মেয়েকে আর বিশেষ জেরা করলেন না এ নিয়ে৷ রাত অনেক হয়েছে—আর এখন শয্যা আশ্রয় করলেই তিনি বাঁচেন৷ শরৎ সারাদিন খাটে, রাত্রে বিছানায় একবার শুয়ে পড়লে তার জ্ঞান থাকে না৷ আর এক ছিলিম তামাক চেয়ে রাখলে হত ওর কাছ থেকে, কিন্তু কেদার ভরসা পেলেন না৷

গভীর রাত্রে ঘুমের ঘোরে শরতের মনে হয়, আর সে ভাঙাচোরা গড় নেই, কি সুন্দর রাজবাড়ি, পদ্মদিঘির শ্বেতপদ্ম ফুটে জল আলো করেছে—দেউড়িতে দেউড়িতে পাহারা পড়েছে, ছাদে লাল সাদা নিশান উড়ছে—গড়ের এপারে ওপারে কত বাড়ি, কত অতিথিশালা, কত হাতি-ঘোড়ার আস্তাবল, উত্তর দেউলে প্রকাণ্ড বারাহী মূর্তির পুজো হচ্ছে, ধূপ-ধুনো-গুগগুলের সুবাসে চারিদিক আমোদ করছে, কাড়া-নাকাড়ার বাদ্যিতে কান পাতা যায় না৷

যেন এক রানী এসে তার শিয়রে দাঁড়িয়েছেন, ওঁর সুন্দর মুখে প্রসন্ন হাসি, কপালে চওড়া করে সিঁদুর পরা, রূপের দীপ্তিতে ঘর আলো হয়ে উঠেছে…তিনি সস্নেহ সুরে যেন বলছেন—খুকি, আমার বংশের মেয়ে তুই, বংশের মান বাঁচাবার জন্যে আমি দিঘির জলে ডুবে মরেছিলাম, তুইও বংশের মর্যাদা বজায় রাখিস, পবিত্র রাখিস নিজেকে৷

ঘুমের মধ্যেও শরতের সর্বাঙ্গ যেন শিউরে ওঠে৷

.

কেদার পাশের গ্রাম থেকে খাজনা আদায় করে ফিরছেন, এমন সময় ছিবাস মুদি রাস্তায় তাঁকে ডাকলে—চলুন আমার দোকানে দাদাঠাকুর, একটু তামাক খেয়ে যাবেন—

রাস্তার ধুলোতে কিসের দাগ দেখে কেদার বললে, এ কিসের দাগ হে ছিবাস?

—এ মোটর গাড়ির চাকার দাগ—প্রভাস বাড়ি এসেছে যে মোটরে চড়ে—

—বেশ, বেশ৷ তা গাড়ি তো দেখতে হয় ছিবাস—

—কখনো দেখেন নি বুঝি দাদাঠাকুর? আমি সেবার যোগে গঙ্গাচানে গিয়ে নবদ্বীপে দেখে এইচি—

—দূর, মোটর গাড়ি দেখবো না কেন, সেদিনও তো কেষ্টনগরে সদর খাজনা দাখিল করতে গিয়ে চার-পাঁচখানা দেখে এলাম৷ বড়লোকেরা কেনে, কেষ্টনগরে বড়লোকের অভাব আছে নাকি? তবে আমাদের গাঁয়ে মোটর গাড়ি নতুন কথা কিনা—

—তা হবে না কেন দাদাঠাকুর! আজকাল প্রভাসের বাবার অবস্থা কি! কলকাতায় দুখানা বাড়ি, কারবার চলছে তোড়ে—রমারম টাকা আসছে৷ বলে লক্ষ্মী যখন যারে দ্যান, ছপ্পড় ফুঁড়ে টাকা আসে—ওদেরই তো এখন দিন—এ কি আর আপনি আমি?

—তা ভালোই তো৷ গাঁয়ে সবাই গরিব, দু-একজন যদি বড়লোক হয়, অন্ততঃ গাঁয়ের রাস্তাঘাটগুলো তো ভালো হবে৷ দুদিন মোটরে করে এলেই তখন রাস্তার দিকে নজর পড়বে—

—হ্যাঁ, দুদিন মোটরে এসেই তোমার গাঁয়ের রাস্তা অমনি পাথর দিয়ে বাঁধিয়ে গ্যাংট্যাং রোড করে ফেলছে! তুমিও যেমন পাগল দাদাঠাকুর! ছাড়ান দ্যাও ওসব কথা৷

প্রভাস যে মোটরখানা এনেছে, সাতকড়ি চৌধুরীদের চণ্ডীমণ্ডপের সামনে সেখানা কাঁঠালতলার ছায়ায় দাঁড় করানো৷ চৌধুরীদের চণ্ডীমণ্ডপে আট-দশজন লোকের ভিড়৷

কেদার সামনের রাস্তায় কালো চকচকে গাড়িখানার পাশে দাঁড়িয়ে ভালো করে জিনিসটা দেখতে লাগলেন৷ কেমন একটা গরম গন্ধ, কিসের গন্ধ কেদার ঠিক বুঝতে পারেন না৷ ঝকঝক করছে পেতলের না কিসের ডাণ্ডা, হ্যান্ডেল—আরও কি সব যন্ত্রপাতি৷

বেশ জিনিস৷

এত কাছে দাঁড়িয়ে কেদার কখনও মোটর গাড়ি দেখেন নি৷ রাস্তায় যেতে যেতে গাড়িখানার ওধারে আরও দু-একজন পথচলতি চাষাভুষো লোক দাঁড়িয়ে গেল গাড়ি দেখতে৷

কেদার তাদের দিকে চেয়ে হাসিমুখে বললেন, কালে কালে কত কাণ্ডই দেখা গেল—য়্যাঁ—কি বলো মোড়লের পো? তাই না কি, বলো ঠিক করে? দশ বছর আগে দেখেছিলে কেউ?

একজন চাষীলোক স্টিয়ারিংয়ের চাকা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললে, এখানডাতে চাকা একটা আবার কেন, হ্যাদে ও দা’ঠাউর?

কেদার বিজ্ঞভাবে বললেন, ও হল হ্যাণ্ডেলের চাকা৷ ওটা ঘোরায়৷

লোকটির নিকট সব ব্যাপারটা এক মুহূর্তে পরিষ্কার হয়ে গেল৷ সে হাসিমুখে বললে, দেখুন দিখি দা’ঠাউর, বললেন আপনি, তবে আমি বোঝলাম৷ না বলে দিলে কি আমরা বুঝতি পারি?

সে কি বুঝলে তা অবিশ্যি সে-ই জানে৷

এই সময় কেদারকে দেখতে পেয়ে কে চণ্ডীমণ্ডপ থেকে ডেকে উঠল—ও কেদার রাজা, ওহে ও কেদার রাজা—শোন শোন, এদিকে এস না একবার—

প্রভাসকে ঘিরে গ্রামের অনেকগুলি ভদ্রলোক বসে৷ জগন্নাথ চাটুজ্জেও আছে ওদের মধ্যে, কেদারকে ডাক দিয়েছে সে-ই৷

চণ্ডীমণ্ডপের মালিক সাতকড়ি চৌধুরী বললেন, কেদার-দা যে! আরে এস এস—বসতে দাও হে—কেদার-দা’কে বসাও—

জগন্নাথ বললে, আরে ভায়া কেদার রাজা, এসে পড়েছ ঠিক সময়ে—তোমার কথাই হচ্ছিল৷

কেদার বিস্ময়ের সুরে বললেন—আমার কথা!

তাঁর কথা কোথাও মজলিসে আলোচিত হবার মতো গুণ তাঁর কি আছে? কেদার ভেবে পেলেন না৷ কখনও আলোচিত হয়ও নি৷

জগন্নাথ বললে, তোমার কথা কেন, সকলেরই কথা৷ প্রভাস, চিনতে পেরেছ কেদার ভায়াকে? রাজবাড়ির কেদার-রাজা৷ এ হল প্রভাস—আমাদের গাঁয়ের রাসু বিশ্বেসের নাতি—

কেদার বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি জানি৷ তবে সেই ছেলেবেলায় হয়তো দু-একবার দেখে থাকব, বাবাজি তো আসে না গাঁয়ে বড় একটা—কাজেই এদানীং দেখি নি আর৷

প্রভাসের বয়স ত্রিশ-বত্রিশ, মাথায় কোঁকড়া চুলে টেরি কাটা, গায়ে সাদা আদ্দির পাঞ্জাবি, জরিপাড় ধুতি পরনে৷ সকলেই জানে প্রভাস চরিত্রহীন ও বওয়াটে, কিন্তু বড়লোকের ছেলের কাছে স্বার্থ অনেকের অনেক রকম, মুখে কিছু বলতে সাহস করে না৷

সাতকড়ি চৌধুরী বললেন—প্রভাসকে আমরা ধরেছি, অমাদের পুবপাড়ার ইস্কুলটার সম্বন্ধে কিছু বিবেচনা করুক৷ ওদের হাত ঝাড়লে পব্বোত৷

কেদার এক পাশে গিয়ে বসলেন৷ ব্যাপারটা কিছুক্ষণ পরে বুঝলেন, এ গ্রামের প্রাইমারি ইস্কুলের বাড়িটা পাকা করে দেবার জন্যে সবাই প্রভাসকে ধরেছে, শ-চার-পাঁচ টাকা ব্যয় করলে আপাতত বাড়িটা এক রকম দাঁড়িয়ে যায়৷

প্রভাস বলছিল—তা যখন আপনারা বলছেন, তখন দিয়ে দেব, তবে টাকা আপাতত এখন আনি নি, আপনারা যদি কেউ আমার সঙ্গে কলকাতায় গিয়ে—

—আহা সে-জন্যে ভাবনা কি? তুমি যখন হয় পাঠিয়ে দিয়ো৷ তুমি বললেই আমরা কাজ আরম্ভ করে দিই৷ তোমার ভরসা পেলে আমরা করতে পারিনে এমন কি কাজ আছে? কি বল হে জগন্নাথ খুড়ো?

জগন্নাথ চাটুজ্জে সাতকড়ির কথায় কোনো উত্তর না দিয়ে কেদারের দিকে চেয়ে বললেন, তোমার কথা কি হচ্ছিল বলি, ইস্কুলটার জন্যে তোমার গড়বাড়ির পুরনো ইট কিছু দিতে হবে৷

কেদার দ্বিরুক্তি না করে বললেন—নিয়ো৷

—ঠিক তো?

—নিশ্চয়৷

—তা হলে সব কথা তো মিটে গেল হে সাতু, কেদার রাজার ইট আর প্রভাসের টাকা, ইস্কুল বাড়ি তো পাকা হয়ে রয়েছে৷ এক ছিলিম তামাক খাও—বসো কেদার রাজা৷

প্রভাস উঠতে চাইলে—কিন্তু সাতকড়ি চৌধুরী বাধা দিলেন৷ চা হচ্ছে বাড়ির মধ্যে তার জন্যে, না খেয়ে যাবার যো নেই৷

কেদারের একটু চা খাবার ইচ্ছে ছিল না এমন নয়, সুতরাং তিনিও চেপে বসলেন৷ জগন্নাথ চাটুজ্জে তাঁর সঙ্গে তার নিজের সংসারের ঝঞ্ঝাটের গল্প শুরু করলে৷ মেজ ছেলেটার জ্বর হচ্ছে আজ এক মাস, রোজ বিকেলে জ্বর আসে, কত রকম কি করলেন, কিছুতেই জ্বর যাচ্ছে না৷ ও-পাড়ার যতীশ চক্কত্তির সঙ্গে জমি নিয়ে বিবাদ চলেছে গেঁয়োহাটিতে৷ জগন্নাথ বলে জমি আমার, যতীশ বলে আমার৷ প্রজারা ফলে খাজনা বন্ধ করেছে, দু-পক্ষের কাউকেই খাজনা দেয় না৷

কেদার বললেন, কেন, জমির পড়চা দেখলেই তো মিটে যায়—কার জমি লেখাই তো আছে—

—আরে তা কি দেখা হয় নি ভাবছ কেদার রাজা? পড়চা-দৃষ্টে জমি সনাক্ত করতে হবে না!

—পড়চা দেখে যদি জমি সনাক্ত করতে না পারো, তা হলে আমীন ডেকে মীমাংসা করে নাও৷ সেটেলমেণ্টের ম্যাপ আছে, তাই দেখে আগে মেপে নেবার চেষ্টা কর না কেন?

—তুমি একদিন এসো না ভায়া৷ তুমি ম্যাপ দেখে একটা মীমাংসা দাও না করে? জমিজমার কাজ তুমি তো খুব ভালো বোঝ৷

—কেদার-দা সত্যিই ভালো জানে জমিজমা-সংক্রান্ত কাজ—কিন্তু মন এদিকে দিতে চায় না একেবারেই৷ নিজের অনেক জমি ভিন্ন ভিন্ন গ্রামে বেহাতি হয়ে গেল, দেখেও দেখে না, ওই হয়েছে ওর দোষ৷

একথা বললেন সাতকড়ি চৌধুরী৷ অনেক দিন আগে তাঁর নিজের জমিজমার দলিলসংক্রান্ত কি একটা জটিল ব্যাপারের ভালো মীমাংসা করে দেন কেদার, সেই থেকে কেদারের বৈষয়িক কাজকর্মের প্রতি সাতকড়ি চৌধুরীর যথেষ্ট শ্রদ্ধা৷

এই সময়ে চা এল৷ এখানে আর কেউ চা খায় না বলে বোধ হয় চা এসেছে শুধু প্রভাসের জন্যেই৷ শুধু চা নয়, খানকতক গরম পরোটা আর একটু আলু-চচ্চড়িও এসেছে৷ সকলেই নানা অনুযোগ অনুরোধ করে প্রভাসকে খাওয়াতে লাগল৷ কেদার চা খাবেন কি না এ কথা কেউ জিজ্ঞেস করলে না, সুতরাং চা-পানের ইচ্ছে আপাতত কেদারকে দমন করতে হল৷

প্রভাস চা-পান শেষ করে উঠে পড়ল৷ সকলে গিয়ে তাকে তার মোটরে উঠিয়ে দিলে৷

সাতকড়ি বললেন, এখন যাবে কোথায় প্রভাস?

—এখন একবার রানীনগর যাব কাকা, হারাণ কাপালীর কাছে একখানা তিনশো টাকার হ্যাণ্ডনোট আছে, তামাদির মুখে দাঁড়িয়েছে, বাবা বলে দিয়েছেন একবার গিয়ে তাগাদা দিতে৷

—ওবেলা একবার এসো৷ গড়ের ইট কেদার-দা দিতে চেয়েছেন, তোমায় দেখিয়ে আনব৷ কি বলো জগন্নাথ খুড়ো? তুমি টাকা দেবে, ইটগুলো তুমি দেখে নাও৷ এই, সব সরে যা গাড়ির কাছ থেকে, তোদের এত ভিড় কেন?

প্রভাসের গাড়ির চারিধারে বহু ছেলেমেয়ে এসে জড়ো হয়েছিল৷ সকলকে সরিয়ে সাবধান করে দু-চারবার হর্ন দিয়ে প্রভাস গাড়ি ছেড়ে দিলে৷…

জগন্নাথ চাটুজ্জে পথের বাঁকে দ্রুতবিলীয়মান গাড়িখানার দিকে চেয়ে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন—সব টাকা রে বাপু, টাকা! ওর ঠাকুর-দা এই গাঁয়ের পুবপাড়ার কামারের দোকান করতো, হেঁই-ও হেঁই-ও করে হাতুড়ি পেটাতো, আমরা ছেলেবেলায় দেখেছি৷ সাতু বাবাজি, রাসু বিশ্বেসকে মনে আছে নিশ্চয়ই!

সাতকড়ি চৌধুরীর বয়স আসলে চল্লিশের বেশি নয়৷ তার চেয়ে অন্তত পঁচিশ বছর বেশি বয়সের লোক জগন্নাথ চাটুজ্জে তাঁকে নিজের দলে টানবার চেষ্টা করছে দেখে তিনি ক্ষুণ্ণমুখে বললেন—আমার কি করে মনে থাকবে জগন্নাথ খুড়ো, আমি দেখিই নি…

কেদার বললেন, তোমার যে কাণ্ড জগন্নাথ-দাদা! ও দেখবে কোথা থেকে? আমারই ভালো মনে হয় না৷

জগন্নাথ বললেন—তা সে যাই হোক, মোটের ওপর পয়সা করেছে বটে৷ ব্যবসা না করলে কি আর বড়লোক হওয়া যায়? ওই রাসু কামারের ছেলে—আমরা রাসু কামার বলেই জানতাম ছেলেবেলায়—সেই রাসুর ছেলে হারাণ কলকাতায় গিয়ে ঘোড়ার গাড়ি সারানোর ছোট্ট দোকান খুললে বৌবাজারে৷ ক্রমে দোকানের উন্নতি হতে লাগল—মাথা খুলে গেল, তখন পুরনো গাড়ি কিনে তাই সারিয়ে বেচতে লাগল৷ তার পর দ্যাখো আজকাল ওদের অবস্থা৷ কলকাতায় চারখানা বাড়ি৷

সাতকড়ি চৌধুরী বললেন, আজকাল প্রভাসই কর্তা৷ ও-ই বলছিল ওর বাবা বাতে পঙ্গু, উঠে হেঁটে বেড়াতে পারে না৷ প্রভাসই দেখাশুনো করে৷

একজন কে বললে—তবে প্রভাস নাকি বাপের পয়সা বিস্তর উড়িয়েছে৷

জগন্নাথ চাটুজ্জে বললেন—তা ওড়াবে না কেন? হারাণ বিশ্বেস কম টাকা করে নি তো? ছেলে যদি না ওড়াবে তবে ওড়াবে কে বলো না? ঘোর বওয়াটে আর মাতাল—

সাতকড়ি চারিদিকে চেয়ে বললেন, থাক থাক, ওকথা থাক খুড়ো৷ সে-সব কথায় দরকার কি তোমার আমার? যার ছাগল তার লেজের দিকে সে কাটুক না—বাদ দাও৷ ওরা হল আজকাল বড়লোক, এদিগরে সাত-আটখানা গাঁয়ের মহাজন হল ওরা৷ ওদেরই খাতির৷ টাকার দরকার হলে হারাণ বিশ্বেসের কাছে—কলকাতায় গিয়ে হ্যাণ্ডনোট লিখে কর্জ না করলে যখন উপায় নেই, তখন তার ছেলে কি করে না করে সে-সব কথার আলোচনা রাস্তায় দাঁড়িয়ে না করাই ভালো৷

বেলা বেড়েছে৷ কেদার বাড়ির দিকে রওনা হলেন৷ পথে প্রভাসের গাড়ির সঙ্গে আবার দেখা—বেজায় ধুলো উড়িয়ে আসছে, কেদার এক পাশে দাঁড়ালেন৷ ধুলোর পাহাড় সৃষ্টি করে হর্ন বাজিয়ে মোটরখানা সবেগে পাস কাটিয়ে চলে গেল, পেট্রল ও গ্যাসের গন্ধ ছড়িয়ে৷ কেদার ধুলোর মধ্যে চোখ মিট মিট করতে করতে প্রশংসমান দৃষ্টিতে সেদিকে চেয়ে রইলেন৷

.

সকালে উঠেই সেদিন কেদার খাজনা আদায় করতে যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছেন, এমন সময় জগন্নাথ চাটুজ্জে এসে ডাকলে, ওহে কেদার রাজা, বাড়ি আছ নাকি ভায়া?

কেদার বললেন, এসো জগন্নাথ দাদা, এসো৷ কি মনে করে?

—ওরা সব আসছে, ইট কোথা থেকে নেবে দেখিয়ে দেবে চলো৷

কেদার বললে, ও আর দেখিয়ে দেওয়া কি, তুমি তো জানো—যেখান থেকে হোক—

জগন্নাথ জিভ কেটে বললে, তা কি হয় ভায়া? তোমার জিনিস না বলে দিলে কি আমরা নিতে পারি? চলো তুমি৷ প্রভাস নিজে আসবে এখুনি—আরও সব আসছে৷

—ততক্ষণ বসবে এসো দাদা৷ ওরে শরৎ, তোর জ্যাঠামশায়ের জন্যে বসবার কিছু দে৷

শরৎ একখানা পিঁড়ি পেতে দিয়ে বললে, জ্যাঠামশায় তো এদিকে আসা ছেড়েই দিয়েছেন আজকাল৷ বসুন ভালো হয়ে৷ চা খাবেন?

জগন্নাথ চাটুজ্জে একগাল হেসে বললে, তা মা, দে না হয় করে৷

নিজের বাড়িতে জগন্নাথের চা খাওয়ার পাট নেই কোনো কালে, তবে পরের বাড়িতে হলে কোনো কিছু খাওয়াতেই আপত্তি নেই জগন্নাথের৷

কেদার বললেন, তারপর, তোমাদের ইস্কুলের বাড়ি আরম্ভ হবে কবে?

—জিনিসপত্র যোগাড় হলেই হবে৷ প্রভাস টাকা দিলেই আমরা কাজ আরম্ভ করে দিই৷ একটু তামাক সাজো ভালো করে ভায়া৷ চা-টা তোমার এখানেই খাওয়া যাক৷

কিছুক্ষণ পরে শরৎ এসে দু-পেয়ালা চা সামনে রাখল৷ সে সকালেই স্নান সেরে নিয়েছে, পরনে সরুপাড় ফর্সা ধুতি, একরাশ ভিজে এলো চুল পিঠে ফেলা—গায়ের রং ফুটেছে স্নান করে—লম্বা পাতলা দেহ, সুন্দর ভুরু, বড় বড় চোখ—প্রতিমার মতো সুশ্রী৷

চা নামিয়ে বললে, জ্যাঠামশায়, বসুন, একটা জিনিস খাওয়াব৷ খাবেন তো?

—কি মা?

—সে এখন বলছি নে৷ আনি আগে, তখন দেখবেন!

শরৎ একটা পাথরের খোড়া ভর্তি বাসি পায়েস এনে জগন্নাথের সামনে রাখলে৷ হাসিমুখে বললে, খান৷ বাবা বড় ভালোবাসেন বলে কাল রাত্রে করেছিলুম—তা আজ সকালে অনেকখানি রয়েছে দেখলাম৷ বাবা চেয়েছিলেন খেতে কিন্তু ওঁকে এখন আর দেব না, দুপুরে ভাতের সঙ্গে দেব বলে রাখলাম খানিকটা৷

এমন সময় গ্রামের আরও অনেকের সঙ্গে প্রভাসকে দূরে আসতে দেখে কেদার বললেন, ও শরৎ আরও সবাই আসছে৷ চা আর হবে নাকি?

শরৎ বললে, ক’ পেয়ালা?

—চার-পাঁচ পেয়ালার মতো হোক না হয়৷

—তা হবে না, দুধ নেই৷ কাল রাত্রে একটু দুধ রেখেছিলাম, তাই দিয়ে তোমাদের করে দিলাম৷ এক পেয়ালার মতো একটুখানি পড়ে আছে৷

—তবে প্রভাসের জন্যে শুধু এক পেয়ালা করে দে৷ ও গাঁয়ে কখনো আসে না, ওকে দেওয়া উচিত আগে৷ আর সব তো ঘরের লোক৷

ওরা কিন্তু কেউই বাড়ির কাছে এল না৷ অতিথিশালার কাছে এসে সাতকড়ি চৌধুরী ডাক দিয়ে বললেন,—ও কেদার দাদা, এসো এদিকে, প্রভাস এসেছেন—আর কে বসে ওখানে—জগন্নাথ খুড়ো?

কেদার বললেন, তুমি বসে পায়েস খাও দাদা, আমি যাই দেখি৷

সাতকড়ি বললেন, কোথা থেকে ইট দেবে হে? চলো নিয়ে৷

—চলো, কালো পায়রার দিঘির পাড়ে জঙ্গলে অনেক ইট আছে৷ দুটো মন্দিরের ভাঙা ইটের রাশি৷ তাই নিয়ো—কি বলো?

প্রভাস চারিদিকে চেয়ে চেয়ে দেখছিল বিস্ময়ের দৃষ্টিতে৷ সে এ-গ্রামে ইতিপূর্বে কয়েকবার এলেও কেদারের বাড়ি কখনো আসে নি বা গড়ের মধ্যেও কখনো ঢোকে নি৷ এত বড় বড় ভাঙা ঘরদোর ও মন্দির যে এখানে আছে সে তা জানত না৷ আগে জানলে সে ক্যামেরাটা নিয়ে আসত কলকাতা থেকে৷

কেদার তাকে বললেন, চলো প্রভাস, ওখানে জগন্নাথদা বসে আছেন, তুমিও একটু চা খাবে এসো৷ এসো সাতু ভায়া, তুমিও এসো৷

উপস্থিত ব্যক্তিগণের মধ্যে চা-পান করতে অভ্যস্ত নয় কেউই, সাতকড়িও না৷ সুতরাং প্রভাস ছাড়া আর কেউ চা খেতে গেল না৷

সাতকড়ি বললেন, ঘুরে এসো প্রভাস, দেরি না হয়—আমরা এখানেই আছি৷

প্রভাসকে ঘরের দাওয়ায় পিঁড়ি পেতে বসিয়ে কেদার মেয়েকে চা দিতে বললেন৷ শরৎ এসে চা দিয়ে যাবে, কিন্তু অপরিচিত প্রভাসের সামনে হঠাৎ আসতে সঙ্কোচ বোধ করে পেয়ালা হাতে দোরের কাছে দাঁড়িয়ে আছে দেখে কেদার বললেন, ওকে দেখে লজ্জা করতে হবে না, বুঝলি মা৷ ও আমাদের গাঁয়ের ছেলে—এখনই না হয় থাকে কলকাতায়৷ ও পর নয়৷ দিয়ে যাও চা৷

শরৎ এসে প্রভাসের সামনে চা রাখলে৷ প্রভাস শরৎকে কখনো দেখে নি বলা বাহুল্য—চা দেবার সময় সে মৃদু কৌতূহলের সঙ্গে প্রথমটা একবার শরতের দিকে চাইলে…কিন্তু শরৎকে দেখবার পরক্ষণেই প্রভাসের চোখমুখ যেন অপ্রত্যাশিত বিস্ময়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠল৷ মুখের চেহারা যে বদলে গেল অতি অল্পক্ষণের জন্যে, এ যে-কেউ দেখলেই বলতে পারত৷

প্রভাস আশা করে নি এত সুন্দরী মেয়েকে আজ সকালে এই ভাঙা-ইটের-স্তূপে-ঘেরা জঙ্গলাবৃত ক্ষুদ্র বাড়িতে এ ভাবে দেখতে পাবে৷ এত রূপ আছে, এই সব পাড়াগাঁয়ে!

প্রভাস থতমত খেয়ে চায়ের পেয়ালাটা হাতে তুলে নিলে৷

কেদার বললেন, তোমাদের কলকাতায় কোথায় থাকা হয় বাবাজি?

প্রভাস অন্যমনস্ক হয়ে কি যেন ভাবছিল, কেদারের প্রশ্নে যেন চমকে উঠে বললে, আমায় বলছেন? আপার সারকুলার রোড—

—তোমার বাবার শরীর কেমন?

—আছে ভালো, তবে উঠতে হাঁটতে পারেন না৷ বয়েস তো হল কম নয়৷ সাহেব ডাক্তার দেখছে—তবে এ বয়েসের রোগ—

—তোমার একটি ছোট ভাই আছে শুনছিলাম, সে কি করে?

—সেও দোকানে বেরোয়৷ খুব ছোট নয়, তার বয়েস এই সাতাশ বছর হল৷

জগন্নাথ চাটুজ্জে বললে, বাবাজি বিয়ে করেছ কোথায়?

—কই, আমি বিয়ে তো করি নি এখনও৷

কেদার জানতেন না যে প্রভাস অবিবাহিত৷ প্রভাসের সম্বন্ধে এ কথা তিনি কারো মুখে শোনেন নি৷

তিনি বিস্ময়ের সুরে বললেন, বিয়ে করো নি! তা তো জানতাম না৷

জগন্নাথ চাটুজ্জে বললেন, আমিও জানতাম না৷ বাবাজির বয়েস অবিশ্যি এখনও—বয়েসটা কত হল বাবাজি?

—আজ্ঞে একত্রিশ যাচ্ছে৷

—ওঃ, একত্রিশ! যথেষ্ট সময় আছে৷ তোমাদের এখনো যথেষ্ট—

—সে জন্যে নয় কাকাবাবু, বিয়ে আমার করবার ইচ্ছে নেই৷

—বলো কি বাবাজি! তোমাদের রাজার মতো সম্পত্তি, বাড়িঘর, বিয়ে করবে না কি রকম?

প্রভাস হাসি-হাসি মুখে চুপ করে রইল৷

জগন্নাথ চাটুজ্জে বললে, রাসু-দাদা কিছু বলেন না এ নিয়ে?

—অনেক বড় বড় সম্বন্ধ এনেছেন৷ হুগলী বালিতে একবার পঁচিশ হাজার টাকা দেবে আর হীরে জহরতের জড়োয়া—বাবা কিছুতেই ছাড়বেন না৷ বাবাকে বললাম, অমন সম্বন্ধ এর পরে জোটবার অভাব হবে না, যদি আমি বিয়েই করি৷ বাবা তাদের জানিয়ে দিলেন, কিন্তু তবুও তারা পীড়াপীড়ি করতে লাগল এমন যে আমি ওয়ালটেয়ার পালিয়ে গেলাম—সেখানে আমাদের বাড়ি আছে কিনা! বছর পাঁচ-ছয় হল বাবা হাইকোর্টের সেলে কিনেছিলেন৷

কেদার বললেন, কি জায়গাটা বললে বাবাজি—কোথায় সেটা?

—ওয়ালটেয়ার৷ সমুদ্রের ধারে৷

সমুদ্র কোন দিকে কত দূরে, কেদারের সে সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ধারণার অভাব ছিল, কিন্তু জগন্নাথ চাটুজ্জের জামাই রেলে কাজ করে, সে গত পুজোর সময় সস্ত্রীক পাশ নিয়ে পুরী গিয়েছিল৷ জগন্নাথ চাটুজ্জের জানা আছে মাত্র এইটুকু যে, পুরী নামক প্রসিদ্ধ তীর্থস্থানটি সমুদ্রের ধারে—সে সমুদ্র যত দূরেই হোক বা যে দিকেই হোক৷ সুতরাং সে জিজ্ঞেস করলে—পুরীর কাছে বাবাজি?

—না, পুরী থেকে অনেক নীচে৷

বলা বাহুল্য, পুরীর নীচে বা ওপরে কি ভাবে আর একটা জায়গা থাকতে পারে এ কথা জগন্নাথ বা কেদার কারো কাছেই তেমন পরিস্ফুট হল না৷ সে দিক থেকে বরং সমস্যা জটিলতর হয়ে দাঁড়াতো এদের কাছে, কিন্তু শরৎ দোরের কাছে দাঁড়িয়ে ওদের কথাবার্তা শুনছিল, সে তার বাবার মুখের দিকে চেয়ে বললে—পুরীর আরও দক্ষিণে হল তা হলে—না বাবা?

কেদার বিপণ্ণমুখে বললেন, হাঁ—দক্ষিণে!—তাই—ইয়ে দক্ষিণেই তো তা হলে গিয়ে—

প্রভাস হঠাৎ শরতের মুখের দিকে একটু বিস্ময়-মিশ্রিত প্রশংসার দৃষ্টিতে চেয়েই তখনই আবার চোখ ফিরিয়ে নিয়ে জগন্নাথের দিকে চেয়ে বললে, ঠিক বলেছেন উনি৷ দক্ষিণেই হল৷

এবার সকলে পুকুরের পাড়ের জঙ্গলের মধ্যে ঢুকল ইট দেখবার জন্যে৷ ছাতিম-বনের তলায় এদিক ওদিক ছড়ানো ভাঙা ঘরবাড়ি ও প্রাচীন দেউলগুলির ধ্বংসস্তূপ সকলকেই বিস্ময়াবিষ্ট করে তুলল৷ বেতের দুর্ভেদ্য ঝোপের আড়ালে কতদূর পর্যন্ত ছড়ানো বড় বড় ইটের স্তূপ, পাথরের কড়ি, পাথরের চৌকাঠ, নক্সা করা প্রাচীন ইট, ভাঙা থামের মাথা, সকলেরই মনে বর্তমানের বহুদূর পিছনকার এক লুপ্ত বিস্মৃত অতীতের রহস্যময় বার্তা ক্ষণকালের জন্যে বহন করে নিয়ে এল—যাতে জগন্নাথ চাটুজ্জের মতো কল্পনাশূন্য নিরেট ব্যক্তিকেও বলতে শোনা গেল—বাস্তবিক৷ এসব দেখলে মন কেমন করে—কি বলো সতু বাবাজি?

সাতকড়ি ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে বললেন, তা আর করে না?

কিন্তু সকলের চেয়ে বিস্ময়ান্বিত হয়েছে প্রভাস—তা তার মুখ দেখেই বেশ বোঝা গেল৷

প্রভাস এ-সব কোনোদিন দেখে নি—বা তাদের গ্রামে যে এরকম আছে তা শুনলেও সেটা যে এই ধরনের ব্যাপার তা জানত না৷

সে বিস্ময়ের সুরে বললে, ওঃ, এ তো অনেক কাল আগেকার! এ-সব কীর্তি ছিল কাদের?

সাতকড়ি বললেন, এই আমার কেদার দাদার পূর্বপুরুষের—আবার কার? এঁরাই গড়শিবপুরের রাজবংশ৷ কেন, তুমি জানতে না বাবাজি? যাক দেখে নাও দিকি, ক’গাড়ি ইট হবে বা কোন দিক থেকে খুঁড়বে?

প্রভাস চুপ করে রইল৷ জগন্নাথ চাটুজ্জে বললে, যেখান থেকে হয় হাজার দশেক ইট আপাতত নাও না৷ কেদার ভায়ার কোনো আপত্তি নেই তো?

কেদার নির্বিকার মানুষ—কোনো প্রকার ভাব বা অনুভূতির বালাই নেই তাঁর৷ তিনি বললেন, না আমার আপত্তি কি? ইট তো পড়েই রয়েছে!

সাতকড়ি বললেন, কিন্তু এ ইটের দাম কিছু দিতে পারব না কেদার দাদা, তা আগে থেকেই বলে রাখছি৷

কেদার ক্ষুদ্র মনের পরিচয় কোনোদিন দেন নি—তিনি দিলদরিয়া মেজাজের মানুষ সবাই জানে৷ বললেন, কিছু বলবার দরকার নেই সে-সব৷ নিয়ে যাও না ভায়া—আমি কি তোমায় বলেছি দামদস্তুরের কথা?

ইতিপূর্বেও কেদারের অবৈষয়িকতা ও ঔদার্যের সুযোগ নিয়ে পার্শ্ববর্তী গ্রামের বহু লোক গড়ের ধ্বংসস্তূপ থেকে বিনামূল্যে গাড়ি গাড়ি ইট নিয়ে গিয়েছে ঘরবাড়ি তৈরি বা মেরামতের জন্যে—অর্থকষ্ট যথেষ্ট থাকা সত্বেও কেদার কারো কাছে মূল্য চাইতে পারেন নি বা কাউকে বিমুখও করেন নি কোনোদিন, অথচ যেখানে পুরনো ইটের হাজার-করা দর পাঁচ টাকা করে ধরলেও কেদার ইট বিক্রি করেই অন্তত দেড় হাজার টাকা নিট দাম আদায় করতে পারতেন৷

কিন্তু তা কখনো করবেন না কেদার৷ রাজবংশের ছেলে হয়ে পূর্বপুরুষের ভিটের ইট বিক্রি করে টাকা রোজগার? ছিঃ!…এমনি দেবেন৷ লোকের উপকার হয়, হোক না৷

সাতকড়ি বললেন, তা হলে প্রভাস বাবাজি, কাল থেকে লোক লাগিয়ে দিই—কি বল?

প্রভাস বললে, বেশ, নিয়ে যান—আমি তো বলেছি কাজ আরম্ভ করুন৷

ক্ষণকালের সে ভাবান্তর কেটে গিয়েছে সকলের মন থেকেই৷ এরা অন্য ধাতের মানুষ, প্রত্যক্ষ দৃষ্ট বাস্তব ছাড়া অন্য কোনো জগতের সঙ্গে এদের বিশেষ পরিচয় নেই৷

কেদার দেখিয়ে দিলেন কোন পথে ইটের গাড়ি আসতে পারে, কারণ তিনি ভিন্ন গড়ের জঙ্গলের অন্ধি-সন্ধি বড় কেউ একটা জানে না৷

কাজ মিটে গেল৷ সাতকড়ি বললেন, চলো সবাই জঙ্গলের মধ্যে থেকে বেরিয়ে যাই—মশার কামড়ে মলাম৷

বনের মধ্যে একটু যেন ভিজে ভিজে এখনও গাছপালা—বেলা বেশি হয়েছে বটে, কিন্তু ঘন ছাতিম-বনের আবরণ ভেদ করে সূর্যকিরণ এখনও বনের তলায় পড়ে নি৷ কি একটা বনফুলের সুমিষ্ট গন্ধ ঠাণ্ডা বাতাসে৷

প্রভাস সমস্ত পথ ঘোর অন্যমনস্ক ভাবে চলে এল৷ সে আজ যেন কেমন হয়ে গিয়েছে৷

গড়বাড়ি থেকে বের হয়ে গ্রামে ঢুকবার মুখে সে কেদারকে বললে, আপনি বাড়ি থাকেন, না কোথাও চাকরি করেন?

কেদার বললেন, না বাবাজি, চাকরি-টাকরি কখনো আমাদের বংশে করে নি কেউ৷ বাড়িই থাকি৷

—আসুন না একবার কলকাতায়৷ আমাদের বাড়ি রয়েছে—দয়া করে সেখানে গিয়ে—

—আমার কখনো কোথাও যাওয়া হয় না বাড়ি ফেলে—তা ছাড়া মেয়েটা একলা বাড়িতে—ইয়ে হ্যাঁ, এই সব কারণে যেতে পারি নে কোথাও৷ আর ধরো গিয়ে আমার বাড়ি একেবারে গাঁয়ের বাইরে, মানুষজন নেই—ফেলে যাই কি করে?

এ কথার প্রভাস বিশেষ কোনো জবাব দিলে না৷

কেদার আবার বললেন, তুমি এখন ক-দিন থাকবে?

প্রভাস বললে, না, আমি কালই যাব বোধ হয়৷ কলকাতায় অনেক কাজ রয়েছে পড়ে৷ পরশু তারিখের একটা পোস্ট-ডেটেড চেক রয়েছে মোটা টাকার—আমি না গেলে সেখানা ব্যাঙ্কে প্রেজেন্ট করা হবে না৷

কেদার আদৌ বুঝলেন না জিনিসটা কি৷ ব্যাঙ্ক জিনিসটা তিনি জানেন, শুনেছেন বটে—কিন্তু পোস্ট-ডেটেড চেক কথার অর্থ কি, বা সে কি ব্যাপার—এ সব সম্বন্ধে কোনো জ্ঞান নেই তাঁর৷ তিনি শুধু বিজ্ঞের মতো ঘাড় নেড়ে বললেন, ও! ঠিক ঠিক!

ওরা চলে গেল সবাই৷ কেদার এত বেলায় অন্য কোথাও যাওয়া উচিত না বিবেচনা করে বাড়ির দিকেই ফিরছেন এমন সময় গেঁয়োহাটির ক্ষেত্র কাপালির সঙ্গে দেখা৷ সে গড়ের খাল পার হয়ে তাঁর বাড়ির দিক থেকেই আসছে৷ কেদার বললেন, কি হে ক্ষেত্র, আমার ওখানে গিয়েছিলে নাকি?

—প্রাতপেন্নাম দা-ঠাকুর৷ মোদের গাঁয়ে ওবেলা যাতি হবে, একেবারে ভুলে গিয়ে বসে আছো! দা-ঠাকুর আমাদের একেবারে বোম ভোলানাথ৷ মনে নেই আজ আমাদের যাত্তারার দলের আখড়াই? আপনি গিয়ে বেয়ালা না ধরলি আসর জমবে, না আসরে ঢোলক বাজবে? চলো দা-ঠাকুর—তোমার বাড়ি গিয়েছিলাম, তা মা-ঠাকরুণ বললেন তিনি কোথায় গিয়েছেন বেরিয়ে৷

—ভালোই তো—তা ক্ষেত্র, তুমিও দুটো খেয়ে যাও আমার বাড়ি, চলো না? বেলা হয়ে গিয়েছে, চলো৷

ক্ষেত্র কাপালি রাজি হল না সে চলে গেল, যাবার সময় কেদারকে তাদের গ্রামে যেতে বলে গেল বার বার করে৷

কেদার বাড়ি ফিরে দেখলেন শরৎ রান্না সেরে বসে আছে৷ বললে, বাবা নেয়ে নাও, ভাত হয়ে গিয়েছে কতক্ষণ৷ ওরা সব চলে গেল, ইট নিয়েছে?

—হ্যাঁ, ইট কাল গাড়ি পাঠিয়ে নিয়ে যাবে৷

—গেঁয়োহাটির ক্ষেত্র এসেছিল তোমার খোঁজে৷ দেখা হয়েছে?

—এই তো গেল৷ ওবেলা ওদের আখড়াই বসবে তাই ডাকতে এসেছিল কিনা? খেয়ে একটু ঘুমিয়ে নেব—তার পর যাব ওদের গাঁয়ে৷ তেল দাও৷

.

ঘুমিয়ে উঠে বেলা তিনটের সময় কেদার গেঁয়োহাটি রওনা হবার উদ্যোগ করছেন, এমন সময় ভাঙা দেউড়ির রাস্তায় প্রভাসকে আসতে দেখে হঠাৎ বড় ব্যস্ত হয়ে উঠলেন৷

—আরে এসো এসো বাবাজি এসো! কি মনে করে?…

প্রভাস একা এসেছে৷ ওবেলার সাজ আর এবেলা নেই গায়ে—সাদা সিল্কের একটা শার্ট পরেছে, হাতে ও গলায় সোনার বোতাম, পরনে জরিপাড় ধুতি, পায়ে নতুন ফ্যাশনের খাঁজকাটা জুতো৷ হাতের পাঁচ আঙুলের মধ্যে তিন আঙুলে পাথর-বসানো আংটি রোদ পড়ে চিকচিক করছে৷

—ও শরৎ মা, এদিকে এসো—প্রভাসকে একটা বসার জায়গা দাও৷ চা খাবে তো প্রভাস? হ্যাঁ, খাবে বৈকি, বোসো বোসো৷

প্রভাস বললে, আপনাদের এখানে মোটর আসবার রাস্তা নেই৷ গাড়িখানা গড়ের খালের ওপারে দাঁড় করিয়ে রেখেছি৷

শরৎ একটা আসন বার করে প্রভাসকে বসতে দিয়ে রান্নাঘরের দিকে সম্ভবত চা করতে গেল৷ প্রভাস বসে চারিদিকে তাকিয়ে বললে, আমি এর আগে কখনো গড়বাড়িতে আসি নি, খুব কাণ্ড ছিল তো এক সময়! দেখেশুনে সত্যিই অবাক হয়ে যাবার কথা বটে৷ কি ছিল, তাই ভাবি! মন কেমন যেন হয়ে যায়, না কাকা?

কেদার এ ধরণের কথা অনেক লোকের মুখ থেকে অনেক বার শুনেছেন, শুনে আসছেন তাঁর বাল্যকাল থেকে৷ এই সব ইট-পাথরের টিবি আর জলের মধ্যে লোকে কি যে দেখতে পায়, তিনি ভেবেই পান না৷ পয়সা থাকলেই বোধ হয় মানুষের মনে এ-সব অদ্ভুত ও আজগুবি মনোবৃত্তির সৃষ্টি হয়—কে জানে? কেদারের কৌতুক হয় এ ধরণের কথা শুনলে৷ থাকে সব কলকাতায় বড় বড় বাড়িতে, ইলেকটিরি আলো আর পাখার তলায়, এই সব পাড়াগাঁয়ে এসে যা দেখে তাই ভালো লাগে—আসল কথাটা হল এই৷ একবার অনেক দিন আগে মহকুমার হাকিম এসেছিলেন এই গ্রামে কি একটা মোকদ্দমার তদারক করতে৷ যেমন সকলেই আসে, তিনি এলেন গড়শিবপুরের রাজবাড়ি দেখতে৷ কেদারের ডাক পড়ল৷ কেদার তো সঙ্কোচে জড়সড় হয়ে হাকিমের সামনে হাজির হলেন৷ হাকিম-হুকুমকে বিশ্বাস নেই, কাঁচা-খেকো দেবতা সব!

হাকিম জিজ্ঞেস করলেন, আপনি গড়শিবপুরের রাজবংশের লোক?

—আজ্ঞে, হুজুর৷

—আপনাকে দেখে আমার মনের মধ্যে কি হচ্ছে, জানেন? আপনি কে আর আমি কে! আপনি এ পরগনার রাজা—আর আমি—আপনার একজন কর্মচারীর সমান৷

কেদার সম্ভ্রম দেখিয়ে নীরব রইলেন৷ বড়লোক খেয়াল-খুশিতে অনেক কিছু বলে—সব কথার জবাব দিতে নেই৷

শরৎ তখন মাত্র পনেরো বছরের মেয়ে, উদ্ভিন্ন-যৌবনা, অপূর্ব সুন্দরী৷ হাকিম তাকে কাছে ডেকে আদর করে বললেন, মাকে আমি নিয়ে যেতাম, যদি আজ রাঢ়ী শ্রেণীর ব্রাহ্মণ হতাম, আমার সে সৌভাগ্য নেই৷ আমার ছেলেটি এবার বি-এ পাশ করেছে৷ কিন্তু বারেন্দ্র শ্রেণীর ব্রাহ্মণের সঙ্গে তো আপনি কাজ করবেন না৷ মা আমার রাজবংশের মেয়ে বটে! ওর সেবা পাব, সে ভাগ্য কি আর করেছি?

শরৎ মুখ নিচু করে রইল লজ্জায় ও সঙ্কোচে৷

দশ-এগারো বছর আগেকার কথা৷

শরৎ প্রভাসের সামনে চা এনে দিলে৷ সে খুব সরুপাড় একখানা ধুতি পরেছে, হাতে দু-গাছা সোনার চুড়ি—মায়ের হাতের বালা ভেঙে ক-গাছা চুড়ি হয়েছিল, এই দু-গাছা তার মধ্যে অবশিষ্ট আছে৷ জড়িয়ে এলো-খোঁপা বাঁধা, দেখলে ওকে উনিশ-কুড়ি বছরের বেশি বলে কিছুতেই মনে হয় না, এমনি লাবণ্যভরা মুখশ্রী৷

প্রভাসের দিকে চেয়ে বললে, দেখুন তো, আর চিনি দেব কিনা—

প্রভাস চায়ে চুমুক দিয়ে একটু সঙ্কোচের সুরে বললে, আজ্ঞে না৷ আমি চিনি কম খাই—

কেদার বললেন, তার পর, কি মনে করে বাবাজি?

প্রভাস যেন আমতা আমতা করে উত্তর দিলে—ইয়ে—এই কিছু না—এই দিক দিয়ে যাচ্ছিলাম কি না৷…তাই—

—বেশ বেশ৷ বোসো বাবাজি—

প্রভাস চা-পান করে বসে রইল বটে, তবে একটু উশখুশ করতে লাগল৷ বসে থাকাটা তার পক্ষে যেন বড়ই অস্বাচ্ছন্দ্যকর হয়ে উঠছে৷ অথচ মুখেও কোনো কথা যোগায় না৷ এমন অবস্থায় সে কখনো পড়ে নি৷

কেদার বললেন, তুমি কালই তো কলকাতায় যাবে—না?

—আজ্ঞে হ্যাঁ, কাল দুপুরে রওনা হব খেয়ে-দেয়ে৷

আবার সে একটু উশখুশ করতে লাগল৷

তার এ ভাবটা বুদ্ধিমতী শরতের চোখ এড়ালো না৷ তার মনে হল, প্রভাস কিছু বলবার জন্যে এসেছে—কিন্তু তা বলতে পারছে না৷ সে একটু বিস্ময়মিশ্রিত কৌতূহলের দৃষ্টিতে প্রভাসের দিকে চেয়ে রইল৷

পরক্ষণেই প্রভাস পকেট থেকে একটা ছোট মখমলের বাক্স সসঙ্কোচে বার করে বললে, এইটে এনেছিলাম দিদির জন্যে—

কেদার বিস্ময়ের স্বরে বললেন, কি ওটা?

—এই গিয়ে—একটা আংটি—

—শরতের জন্যে এনেছ?

—হ্যাঁ—ভাবলাম, কখনো আসিনে—যখন আলাপ হয়েই গেল আপনাদের সঙ্গে, তাই—

কেদার হাত বাড়িয়ে মখমলের বাক্স হাতে নিয়ে বললেন, দেখি? বাঃ, বাক্সটি বেশ! আংটিটা—এ যে দেখছি বেশ দামি জিনিস! এ তুমি আনলে কোথা থেকে?

—ওবেলা মোটরে চলে গিয়েছিলাম রানাঘাট৷ সেখান থেকে কিনে এনেছি—আমার জানাশুনা দোকান, এ জিনিস বাইরে শো-কেসে সাজিয়ে রাখে না৷ আমাকে চেনে বলে বার করে দিলে৷

—কত দাম নিয়েছে?

প্রভাস সলজ্জভাবে বললে, সে কথা আর কেন জিজ্ঞেস করছেন কাকাবাবু! দাম আর কি, অতি সামান্য—আপনাদের দেওয়ার মতো কিছু না—

কেদার আংটিটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বললেন, আমার মনে হচ্ছে তুমি বেশ পয়সা খরচ করেছ৷ এ পাথরখানা তো বেশ দামি, হীরে বোধ হয়—না?

প্রভাস একটু উৎসাহের সুরে বললেন, আজ্ঞে হ্যাঁ৷ দেড় রতি ওজন, আসল পাথর৷ তবে দামদস্তুরের কথা এখনও সেকরার সঙ্গে কিছু হয় নি—

কেদার বাক্সটা প্রভাসের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, কেন এত খরচপত্র করতে গেলে অনর্থক? এ তুমি নিয়ে যাও বাবাজি৷ এ দরকার নেই৷

প্রভাসের মুখে যেন কে কালি লেপে দিল৷ সে ভয়ে ভয়ে বললে—এনেছিলাম দিদিকে দেব বলে—খুব আশা করেছিলাম—যদি অপরাধ না নেন—

—না বাবাজি—শরৎ বিধবা মানুষ, ও আংটি-টাংটি পরে না তো! ও বড় গোঁড়া ধরণের মেয়ে৷ এতদিন চুল কেটে ফেলত, শুধু আমার ভয়ে পারে না৷

প্রভাস কিছু কথা খুঁজে না পেয়ে চুপ করে রইল৷ কেদারের মনে কেমন একটু সহানুভূতি জাগল প্রভাসের প্রতি—বেচারি যেন বড়ই লজ্জিত ও অপ্রতিভ হয়ে পড়েছে আংটির বাক্স ফেরত দেওয়ায়৷ নাঃ, এদের সব ছেলেমানুষি কাণ্ড!

মেয়ের দিকে চাইতে গিয়ে কেদার দেখলেন শরৎ কখন সেখান থেকে সরে গিয়েছে৷ ডাকলেন—ও শরৎ, শোনো মা—

শরৎ ঘরের ভেতর থেকে জবাব দিলে—কি বাবা?

—হ্যাঁরে, প্রভাস একটা আংটি দিতে চাচ্ছে তোকে—কি করবি? রাখবি?

শরৎ আড়াল থেকেই বললে—আমি কি জানি? তুমি যা ভালো বোঝো৷…আংটি আমি তো পরি নে—তবে উনি যখন হাতে করে এনেছেন থাক জিনিসটা৷

কথা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে শরৎ ঘর থেকে বেরিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে বললে—দেখি?

প্রভাস জিনিসটা কেদারের হাতে দিলে—তিনি মেয়ের হাতে তুলে দিলেন সেটা৷ প্রভাস শরতের দিকে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে চেয়ে দেখল—কিন্তু শরৎ তখন বাক্সটি খুলে আংটি নেড়েচেড়ে দেখছে—তার চোখ অন্যদিকে ছিল না৷

কেদার হাসিমুখে বললেন—পছন্দ হয়েছে তোর? তা পছন্দ হবার জিনিস বটে৷ আমি শুধু বলছি প্রভাসকে যে এত খরচ করবার কি দরকার ছিল? এখান থেকে সাত ক্রোশ তফাৎ রানাঘাটের বাজার৷ মোটর গাড়ি আছে তাই যেতে পেরেছিলে বাবাজি৷

প্রভাসের মুখ উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল, সে বললে, দিদিকে একটা সামান্য জিনিস দিলাম—এতে খরচপত্রের কি আর—কিছুই না৷ অতি সামান্য জিনিস—

শরৎ বললে, বসুন আপনি৷ আমি খাবার করছি, খেয়ে যাবেন৷ ততক্ষণ বাবা একটু গল্প করো না প্রভাসবাবুর সঙ্গে৷

কেদার আসলে খুব সন্তুষ্ট নন, তিনি একটু বিরক্তই হয়েছেন প্রভাস আসাতে৷ বেলা পড়ে আসছে, এখন তাঁর বেরুবার সময়—গেঁয়োহাটির আখড়াইয়ের আসরে বেহালা না বাজালে আখড়াই জমবে না, ক্ষেত্র কাপালি বলে গিয়েছে ওবেলা৷

আর ঠিক এই সময়ে এসে কিনা জুটলো প্রভাস!

একে তো মেয়ে বাড়ি থেকে বেরুতে দেয় না, তার ওপর যদি প্রতিবেশীরা পর্যন্ত বাদ সাধে, তবে তিনি বাঁচেন কি করে?

শরৎ ঘরের মধ্যে চলে গিয়েছে খাবার করতে—কেদার আর কিছুক্ষণ বসে প্রভাসের সঙ্গে অন্যমনস্কভাবে একথা ওকথা বললেন৷ স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল তাঁর মন নেই কথাবার্তার দিকে—গেঁয়োহাটিতে একটা ছিটের বেড়ার দেওয়াল দেওয়া চালাঘরে এতক্ষণে কত লোক জুটেছে—সবাই তাঁর আগমন-পথের দিকে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে চেয়ে আছে—তিনি না গেলে আখড়াইয়ের আসর একেবারে মাটি৷

বেলা বেশ পড়ে এসেছে৷ এখান থেকে দেড় ক্রোশ রাস্তা গেঁয়োহাটি—অনেক দূর৷

হঠাৎ তিনি উঠে পড়ে বললেন, মা, প্রভাস বাবাজি রইলেন বসে৷ তুমি খাবার করে খাইয়ে দিয়ো৷ আমার বিশেষ দরকার আছে—গেঁয়োহাটিতে খাজনার তাগাদা আছে৷ প্রভাসের দিকে চেয়ে বললেন—বোস তুমি বাবাজি, কিছু মনে কোরো না—

মেয়েকে কোনো রকম প্রতিবাদের সুযোগ না দিয়েই তিনি দাওয়া থেকে নেমে উঠোন পার হয়ে ভাঙা দেউড়ির দিকে হন হন করেই হাঁটতে শুরু করলেন৷ অনেক সময় এ-রকম ক্ষেত্রে মেয়ে ছুটে এসে পথ আটকায়—পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে কেদার এ জানেন কিনা৷

শরৎ রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে বললে, যেয়ো না বাবা—শোনো বাবা—খেয়ে যাও খাবার—শোনো ও বাবা—

সঙ্গে সঙ্গে সে খুন্তি হাতে রান্নাঘর থেকে বার হয়ে এসে নিচু চালের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে চেয়ে দেখলে, কেদার ভাঙা দেউড়ির পথে অদৃশ্য হয়েছেন৷

তার লজ্জা করতে লাগল, প্রায় অপরিচিত প্রভাস যে বসে সামনে—নইলে সে এতক্ষণ দেখিয়ে দিতো বাবা জোরে হেঁটে কতদূর পালান! গড়ের খালে নামবার আগেই সে ছুটে গিয়ে ধরে ফেলত বাবার হাত৷

ছিঃ, কি অন্যায় বাবার!

প্রভাসের দিকে চেয়ে বললে, একটু বসুন, কেমন তো? আমি মোহনভোগ চড়িয়ে এসেছি কড়ায়—আসছি নামিয়ে—

প্রভাস খানিকক্ষণ একা বসে থাকবার পরে শরৎ কাঁসার কানা-উঁচু রেকাবিতে মোহনভোগ এনে ওর সামনে রাখলে, আর এক গেলাস জল৷

—কেমন হয়েছে বলুন তো প্রভাসদা?

শরতের স্বর সম্পূর্ণ নিঃসঙ্কোচ—আত্মীয়তার সহজ হৃদ্যতায় মধুর ও কোমল৷

প্রভাস একটু অবাক হয়ে গেল ওর ‘দাদা’ ডাকে৷

শরতের মুখের দিকে চেয়ে বললে, আপনি কি করে জানলেন আমি আপনার চেয়ে বড়?

শরৎ মৃদু হাসিমুখে জবাব দিলে—আমি জানি৷

—কি করে জানলেন?

—বারে, ভুলে গেলেন? ওবেলা তো জগন্নাথ জেঠাকে বললেন এখানে বসে আপনার বয়সের কথা৷

এইবার প্রভাসের মনে পড়ল৷ ওবেলা এ-কথা উঠেছিল বটে৷ সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললে, বেশ হল, আপনার সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল—

শরৎ সে কথার কোনো উত্তর না দিয়ে বললে, কেমন হয়েছে মোহনভোগ বললেন না যে?

—খু-ব ভালো হয়েছে৷ সত্যি বলছি চমৎকার হয়েছে—

—মা খুব ভালো করতে পারতেন, তেমনটি আমার হাতে হয় না৷

—আমার একটা অনুরোধ রাখুন৷ আংটিটা পরুন আমার সামনে—

শরৎ বাক্সটা খুলে আংটিটা হাতে নিয়ে আঙুলে পরে বললে, বেশ হয়েছে৷ এই দেখুন—

প্রভাস আনন্দে গলে গিয়ে বললে, কি চমৎকার মানিয়েছে আপনার আঙুলে!

শরৎ ছেলেমানুষের মতো খুশিতে নিজের আঙুলের দিকে বার বার চেয়ে দেখতে লাগল৷

প্রভাস বললে, আচ্ছা আপনি একা থাকেন, কাকা বেরিয়ে গেলে ভয় করে না আপনার?

—ভয় করলেই বা করছি কি বলুন—উপায় তো নেই৷ বাবা লুকিয়ে পর্যন্ত পালিয়ে যান, পাছে আমি আটকে রাখি৷ ওঁর ছেলেমানুষি স্বভাব—দেখে আসছি এতটুকু বেলা থেকে৷ মা বেঁচে থাকতেও ঠিক অমনি করতেন—

—আচ্ছা, আপনি কখনো কলকাতা দেখেছেন?

শরৎ ঠোঁট উল্টে হেসে বললে, কলকাতা! উঃ—তা আর জানি নে! কখনো জীবনে গোয়াড়ি কেষ্টনগর কি নবদ্বীপ দেখলাম না, তার কলকাতা! আমি এই গড়ের খালের জঙ্গলে কাটালাম সারা জীবনটা প্রভাসদা—সত্যি বলছি ভালো লাগে না৷

প্রভাস যেন বড় উৎফুল্ল হয়ে উঠল—পরক্ষণেই আবার সে ভাবটা চেপে সহজ তাচ্ছিল্যের সুরে বললে, এ আর কি কঠিন আপনার কলকাতা দেখা! যেদিন মনে করবেন, সেদিনই হতে পারে৷

শরৎ হর্ষদীপ্ত স্বরে বললে, আপনি নিয়ে যাবেন প্রভাসদা?

প্রভাস সোৎসাহে বললে, কেন নিয়ে যাব না? বলুন না আপনি কবে যাবেন? মোটর তো রয়েছে—টানা মোটরে বেড়িয়ে আসবেন কলকাতা৷

—খুব ভালো কথা প্রভাসদা৷ যাব এর মধ্যে একদিন৷ একঘেয়েমি বরদাস্ত হয় না আর৷

প্রভাস একহাত জমি শরতের দিকে এগিয়ে বসল উৎসাহের ঝোঁকে৷ বললে—আপনাকে আজ নতুন দেখছি বটে, কিন্তু মনে হয় যেন আপনার সঙ্গে আমার আলাপ আজকের নয়, অনেক পুরনো৷

কি জানি কেন, এ কথা শরতের কানে ভালো শোনাল না—সে নিজেকে কিছু দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল৷ প্রভাসের কথার কোনো উত্তর সে দিলে না৷

প্রভাস বোধ হয় শরতের এ ভাব লক্ষ করলে৷ সে সুর বদলে বললে—আপনার বাবা বড় ভালো লোক, ওঁকে আমার নিজের বাবার মতো ভাবি৷

বাবার প্রশংসা শুনে শরতের মন আহ্লাদে পূর্ণ হয়ে গেল৷ তার বাবাকে গ্রামের কেউ প্রশংসা করে না, অন্তত সে তো বড়-একটা শোনে নি কখনো কারো মুখে, এক রাজলক্ষ্মী ছাড়া৷ কিন্তু রাজলক্ষ্মী বালিকা মাত্র, তার মতামতের মূল্য কি?

শরৎ বললে, বাবার মতো মানুষ একালে হয় না৷ একেবারে সাদাসিদে, কিছুই বোঝেন না ঘোরপ্যাঁচ, গাঁয়ের লোক কত রকম কি বলে, মজা দেখবার জন্যে ওঁকে নাচিয়ে দিয়ে কত রকম কি করে—সেসব দিকে খেয়াল নেই৷ দেখুন প্রভাসদা, আমাদের অতিথিশালা আছে বলে গাঁয়ের লোক ইচ্ছে করে বাইরের লোক এনে বাবার ঘাড়ে চাপাবে৷ আমাদের অবস্থা অথচ সবাই জানে—কিন্তু বাবাকে জব্দ করা তো চাই৷ আমার এত দুঃখু হয় সময়ে সময়ে!

—আপনি বলেন না কেন কাকাকে বুঝিয়ে?

—আমার কথা উনি শোনেন, না কখনো শুনেছেন? মাকেই বড় গেরাহ্যি করতেন, আর আমি! যা খেয়াল ধরবেন, তাই করবেন৷

—আচ্ছা, আজ উঠি তা হলে৷ আর এক দিন আসব এখন৷ কলকাতা যাওয়ার কথা মনে আছে তো? একদিন নিয়ে যেতে আসব কিন্তু৷

প্রভাস চলে গেলে শরৎ গৃহকর্ম শেষ করে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালল৷ চারিদিকে বন-বাদাড়ে-ঘেরা উঠোন, বেশ একটু শীত পড়েছে—হেমন্তকাল শেষ হতে চলেছে৷

শরৎ উত্তর দেউলে প্রদীপ দিয়ে এসে রান্নাঘরের মধ্যে ঢুকল৷ বাবা কত রাত্রে ফিরবেন ঠিক নেই—সে রান্না শেষ করে বসে থাকবে৷ একলা থেকে থেকে ভালো লাগে না সত্যই এই নিবান্দা পুরীতে, এই বন-বাদাড়ের মধ্যে৷

তার মন চায় একটু মানুষজনের সঙ্গ, কারো সঙ্গে একটু কথাবার্তা কওয়া যায়, কেউ একটা মজার গল্প বলে৷ তবুও কলকাতা থেকে প্রভাসদা এসেছিল, খানিকটা সময় কাটল৷

এই সময় যদি একবার রাজলক্ষ্মী আসত!

রান্না করতে করতে রাজলক্ষ্মীর সঙ্গে গল্প করা যেত তা হলে৷ মুখটি বুজে কি করে মানুষ থাকতে পারে সারাদিন?

রান্না চড়িয়ে শরৎ আপনমনে গুনগুন করে গান গাইতে লাগল—

দাদা, কে বা কার পর কে কার আপন!

কালশয্যাপ’রে

মোহনিদ্রা ঘোরে

দেখি পরস্পরে অসার আশার স্বপন—

এই গ্রামেই বারোয়ারির যাত্রায় শোনা গান৷ শরতের গলার সুর এক সময়ে খুব ভালো ছিল—এখন আর কিশোরীর বীণানিন্দিত সুকণ্ঠ নেই—তবুও সে বেশ ভালোই গায়৷ তবে রাজলক্ষ্মী ছাড়া তার গান আর কেউ শোনে নি কখনও, এই যা দুঃখ! এমন কি কেদারও শোনেন নি৷

একবার সে বাইরে বেরুলো—বেশ জ্যোৎস্না আজ৷ শীতের আমেজ দিয়েছে বাতাসে—বাইরে এলে গা সির-সির করে৷ ছাতিম-বনে আর ছাতিম-ফুলের সুগন্ধ নেই—উত্তর দেউলে প্রদীপ দিতে গিয়ে সে দেখেছে৷

মনে কত সব অস্পষ্ট ইচ্ছা জাগে, কত কি করবার ইচ্ছে হয়, কত কি দেখবার ইচ্ছে হয়, এই বনের মধ্যে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এই অবস্থায় থেকে মন হাঁপিয়ে ওঠে৷ অথচ এও সে জানে, অন্য কোথাও গিয়ে সে বেশি দিন থাকতে পারবে না৷

তাদের গড়ের খালের দু-পাশে বনে ভরা, ঘরবাড়ি ভাঙা ইটের আর কাঠের স্তূপ৷ কিন্তু শরতের সমস্ত অস্তিত্ব এই ভিটেটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে৷ উত্তর দেউলে যখন সে প্রদীপ দেখাতে যায়—তখন বাদুড়নখীর জঙ্গল, ছাতিমগাছের সারি, অন্ধকারে কালো পায়রার দিঘি, ভাঙা মন্দির—এরা যেন তার জীবনে একটা স্থায়ী শান্ত অস্তিত্বের বাণী বহন করে আনে, যে অস্তিত্বটা শরতের কাছে একমাত্র সত্য ও বাস্তব৷

নীল আকাশের তলায় দুপুরের ঝমঝম রোদে কালো পায়রার দিঘিতে সে কতদিন নেমেছে ক্ষার কাচতে, কিংবা কুলের থলে মেলে দিয়েছে উঠানের মাচানের ওপর—বাবা হয়তো ঘরে ঘুমিয়ে, কিংবা হয়তো বাড়ি নেই—সেই সময় কতবার তার মনে হয়েছে নানা অদ্ভুত কথা—বহুদূরের কোনো নাম-না-জানা দেশ থেকে সে জন্মেছে এসে এই গড়বাড়ির রাজবংশে—যে রাজবংশে সে আর তার বাবা চলে গেলে বাতি দিতে আর কেউ থাকবে না৷ সে রাজবংশের মেয়ে—রূপকথার রাজকন্যা, রুক্ষ চুলে তেলের অভাব তখন তার মনে থাকে না, ভাঁড়ারের চালডালের দৈন্য, ছেঁড়া কাপড়ের পুঁটুলি বাঁশের আড়ার ওপর—এসব সে ভুলে যায়৷

সে রাজার মেয়ে—রাজকন্যা৷

ওই নীল আকাশ, ওই ছাতিম-বনের সারি, ঘুঘু-কোকিলের দল, সারা দেশ, সারা পৃথিবী তার অস্তিত্বের দিকে সসম্ভ্রমে চেয়ে আছে কিসের অপেক্ষায়—গভীর রহস্যভরা তার মহিমান্বিত অস্তিত্বের দিকে৷

আবার এক এক সময় ভুল ভেঙে যায়৷

সে তখন বড় ছোট হয়ে পড়ে৷

যখন রাজলক্ষ্মীদের বাড়ি চুপি চুপি কাঠা হাতে চাল ধার করতে যেতে হয়, কলুর তাগাদাকে হজম করতে হয়, পয়সার অভাবে ঘর্মাক্ত মুখে হেঁইও হেঁইও করে সাবানদেওয়া ময়লা কাপড়ের রাশি কাচতে হয় নির্জন দিঘির ঘাটে—তখন সে হয় নিতান্ত গরিবের ঘরের মেয়ে, হয়তো বাগদি কিংবা দুলে—তার কোনো লজ্জা নেই, সঙ্কোচ নেই, অপমান নেই—নিজের জন্যে নয়, নিজের কষ্ট সে কোনোদিন গ্রাহ্য করেও নি, কিন্তু বাবার জন্যে সে করতে পারে না এমন কাজই নেই…বাবার এতটুকু কষ্ট সে দেখতে পারবে না কোনোদিন…

তার নিঃসন্তান মাতৃত্বের সবটুকু স্নেহ গিয়ে পড়েছে বাবার ওপরে৷ বাবা বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন, সব জিনিস হয়তো ঠিকমতো বুঝতে পারেন না—তাঁকে আগলে বেড়ানো উচিত সব সময়৷

মা যখন নেই, তখন তাকেই করতে হবে বাবার সব কাজ৷ তাঁর সব সুখ-সুবিধে তাকেই দেখতে হবে৷ বাবাকে ফেলে তার মরেও সুখ নেই৷

এ অভাবের সংসারে সে যে কত জায়গা থেকে জিনিসপত্র জুটিয়ে আনে, বাবা কি তার কোনো খবর রাখেন?

তিনি দুবেলা ঠিক খাবার সময় এসে বলেন—শরৎ ভাত হয়েছে? ভাত দে মা৷ চাল যে কতদিন বাড়ন্ত থাকে, তেল-নুনের অভাবে রান্না হয় না—বাবা কখনো রেখেছেন সে সন্ধান?

রাজকন্যার গর্ব তখন খসে পড়ে, রাজকন্যা তখন এক গরিব গৃহস্থের ছেঁড়াশাড়ি-পরা মেয়ে হয়ে কাঠা হাতে তেলের বাটি হাতে ছোটে ধর্মদাস কাকাদের বাড়ি, রাজলক্ষ্মীদের বাড়ি…সাজিয়ে বানিয়ে কত মিষ্টি মিষ্টি মিথ্যে কথা সেখানে বলে, মানকে জলে ভাসিয়ে দেয়, চক্ষুলজ্জাকে আমল দিতে চায় না৷

যখন আরও বয়স কম ছিল, মাঝে মাঝে কিন্তু সত্যিকার রাজকন্যা হতে তার ইচ্ছে জাগত মনে৷ গড়বাড়ির পুকুরপাড়, বন, জংলী লতায় ঢাকা ইটের স্তূপ চাঁদের আলোয় ফুটফুট করছে, তার স্বাস্থ্যভরা দেহের প্রতি পদক্ষেপে গর্ব ও আনন্দ, প্রাণে অফুরন্ত গানের ঝঙ্কার, মুকুলিত প্রথম যৌবনের অপরিসীম স্বপ্ন তার চোখের চাউনিতে—তখন একদিন এক দেশের রাজপুত্র এলেন ঘোড়ায় চেপে, তার রূপের খ্যাতি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে যে—না এসে কে থাকতে পারবে?

—বিয়ে তোমায় আমি করব না রাজপুত্তুর—

—ওমা, সে কি সর্বনাশ! তুমি বলো কি রাজকন্যে, আমার ঘোড়ার দিকে চেয়ে দেখ, ঘেমে উঠেছে৷ কদ্দূর থেকে ছুটে আসছি যে তোমার জন্যে—আর তুমি বলো কি না—

—বাজে কথা বলে লাভ কি রাজপুত্তুর! ফিরে যাও—

—কেন বলো না? কি হয়েছে?

—আমরা মস্ত বড় বংশ, তার ওপরে ব্রাহ্মণ—তোমার কোন দেশে ঘর, কি বংশ তার নেই ঠিকানা—আমায় কত হীরেমোতির গহনা দিতে হবে জানো? আমার বাবাকে একগাদা টাকা দিতে হবে জানো?…বাবা দোকান করবেন—

—এই কথা! কত টাকা দিতে হবে তোমার বাবাকে? কিসের দোকান করবেন তিনি?

—দাও দু হাজার পাঁচ হাজার৷ চাল-ডাল-ঘি-তেলের প্রকাণ্ড মুদিখানার দোকান—ছিবাস কাকার দোকানের চেয়ে অনেক, অনেক বড়—বাবার কষ্ট যে দূর করবে, সে আমায় নিয়ে যাবে—

কেদার এসে ডাক দিলেন—ও মা, ওঠ—ও শরৎ—উঠে পড়ো—

আঁচল বিছিয়ে কখন শরৎ উনুনের সামনে রান্নার পিঁড়ির পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে৷ বাবার ডাকে সে ধড়মড় করে উঠে পড়ল৷

—নাঃ, তুই কোন দিন পুড়ে মরবি দেখছি! আচ্ছা, রাঁধতে রাঁধতে অমন করে উনুনের সামনে শোয়? যদি আঁচলখানা উড়ে পড়ত আগুনে? ঘুম ধরলে তোর আর জ্ঞানকাণ্ড থাকে না—

শরৎ একটু অপ্রতিভ হয়ে পড়েছিল, ঘুমজড়িত কণ্ঠে বললে, কি হয়েছে?…আঁচল উড়ে পড়ত তো বেশ ভালোই হত৷ তোমার হাত থেকে উদ্ধার পেয়ে স্বগগে চলে যেতাম—বাবাঃ—রাত্তিরে একটু ঘুমুবারও যো নেই—বেশ যাও—কথা শেষ করেই শরৎ আবার তখুনি মেঝের ওপর শুয়ে পড়ল৷

কেদার জানেন, মেয়ের ঘুমের ঘোর এখনও কাটে নি—এই রকমই হয় প্রায় প্রতিদিন, তিনি দেখে এসেছেন৷ ভারী ঘুমকাতুরে মেয়ে৷

তিনি আবার ডাক দিলেন—ও শরৎ—মা আমার ওঠো—এই যে আমি বাড়ি এইচি—ও মা—ওঠো, লক্ষ্মী-মা আমার—বুঝলি, উঠে চোখে জল দে দিকি? ঘুম কেটে যাবে এখন—

শরৎ এবার সত্যিই উঠল৷

কেদার বললেন, যা চোখে জল দিয়ে আয়—তোর যা ঘুম৷ রাত আর এমন কি হয়েছে? এই তো সবে রাত দশটার গাড়ির শব্দ পাওয়া গেল, যখন গড়ের খাল পার হই৷

শরৎ বাবাকে খাবার ঠাঁই করে দিয়ে ভাত বাড়তে বসল৷

খানিকটা পরে খাওয়াদাওয়া সেরে কেদার তামাক খেতে খেতে বললেন—ভালো কথা, প্রভাস কখন গেল রে? বেশ ছেলেটি৷ ওকে এবার একদিন নেমন্তন্ন করে খাওয়াতে হবে৷ তোরও একটা কিছু দেওয়া উচিত৷

—কি দেব বাবা? আমিও তা ভেবেছি৷

—একটা কিছু বুনে-টুনে দে না৷ আসন-টাসন গোছের৷ শুধু হাতে কারো কাছে কিছু নিতে নেই তো? দিস একটা কিছু করে৷ আংটিটা কই দেখি?

শরৎ মৃদু হাসিমুখে বললে, সে নেই বাবা৷

কেদার অবাক হয়ে মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে বললেন, নেই! কি হল?

শরৎ মুখ নিচু করে হাসি-হাসি মুখেই বললে, সে বাবা আমি দিঘির জলে ফেলে দিয়ে এসেছি৷ রাগ করো নি বাবা?

—সে কি রে? কখন?

—উত্তর দেউলে পিদিম দিতে যাওয়ার সময়৷ কি হবে বাবা বিধবা মানুষের হীরের আংটি পরে?

কেদার মেয়ের সঙ্গে তর্ক করলেন না৷ মেয়েকে চিনতে তাঁর বাকি নেই৷ সুতরাং তিনি চুপ করে রইলেন৷ কেবল তাঁর মনে দুঃখ হচ্ছিল অমন দামি আংটিটা যদি রাখবিই নে বাপু, তবে সে বেচারির কাছ থেকে নেওয়া কেন?

এমন খামখেয়ালি মেয়ে!

.

দুপুরে রাজলক্ষ্মী এল শরতের কাছে৷ কেদার খেয়ে হাট করতে বেরিয়ে গিয়েছেন—আজ গেঁয়োহাটির হাটবার৷

রাজলক্ষ্মী দেখতে বেশ মেয়েটি৷ নিতান্ত পাড়াগেঁয়ে, কখনো শহরের মুখ দেখে নি, তবে শহরের কথা অনেক জানে৷ তার দুই মামাতো ভগ্নীপতি এখানে মাঝে মাঝে আসে৷ কলকাতায় কাজ করে তারা—শহরের অনেক গল্প সে শুনেছে ওদের মুখে৷

রাজলক্ষ্মী বললে, হাঁ শরৎদি, প্রভাসবাবু বুঝি কাল বিকেলে তোমাদের বাড়ি এসেছিল? কি বললে?

—বলবে আর কি, বৈকেলে এসেছিল, সন্দের আগে চলে গেল৷ গল্পগুজব করলে বসে—চা করে দিলাম৷ বেশ লোক প্রভাসদা৷ আমাদের বলেছে এক দিন কলকাতায় নিয়ে যাবে—বাবাকে আর আমাকে৷

—কবে শরৎ দিদি?

—তার কিছু ঠিক আছে? তবে প্রভাসদা বলেছে যেদিন আমি মনে করব সেদিনই নিয়ে যাবে৷

—রেলে?

—না, মোটর গাড়িতে৷ এখান থেকে সমস্ত পথ মোটরে যাবে—কেমন মজা হবে, কি বলিস? তুই চড়েছিস কখনো মোটর গাড়িতে?

রাজলক্ষ্মী উদাস নয়নে অন্য দিকে চেয়েছিল৷ শরৎদিদির কথায় তার মনে কত অদ্ভুত ছবি জেগে উঠেছে৷ আজ বছর দুই আগে পিসেমশাই একটি বিয়ের সম্বন্ধ এনেছিলেন তার জন্য—ছেলেটি কলকাতায় চাকরি করত৷ চল্লিশ টাকা মাইনে৷ বেড়ে নাকি হতে পারে একশো টাকা৷ তাদের পৈতৃক বাড়ি কোন্নগর, চাকরি উপলক্ষে কলকাতায় আছে অনেক দিন৷

সম্বন্ধটা রাজলক্ষ্মীর মনে ধরেছিল৷ ছেলেটিও দেখতে নাকি ভালোই ছিল৷ কি দেনা-পাওনার গণ্ডগোলে সম্বন্ধ ভেঙে গিয়েছে৷

মাস দুই ধরে কথাবার্তা চলবার ফলে রাজলক্ষ্মীর মন অনেকবার নানা রঙিন স্বপ্ন বুনেছিল সেটাকে ঘিরে৷ কখনো যে কলকাতা সে দেখে নি এবং হয়তো দেখবেও না কখনো ভবিষ্যতে—সেই কলকাতা শহরের একটা বাড়ির দোতলার ঘরে খাট টেবিল চেয়ার সাজানো তাদের ঘরকন্না, দালানের এক কোণে ছোট্ট একটি খাঁচায় টিয়া কি ময়না পাখি, মাটি-দেওয়া-টিনের টবে তুলসী গাছ, একটা ঘেরাটোপ-মোড়া সেলাইয়ের কল টেবিলের এক পাশে—নিস্তব্ধ দুপুরে বসে সে হয়তো কিছু একটা বুনছে কি সেলাই করছে—উনি গিয়েছেন আপিসে—বাসায় শ্বশুর-শাশুড়ি বা ও ধরনের কোনো ঝামেলা নেই—সে আছে একাই—নিজেকে কত মনে মনে সেই কল্পনীয় ঘরকন্নাটিতে ডুবিয়ে দিয়েছে সে, সে ঘরের খুঁটিনাটি কত কি পরিচিত হয়ে উঠেছিল তার মনের মধ্যে—দেখলেই যেন চিনে নিতে পারত ঘরটা—কিন্তু কোথায় কি হয়ে গেল, সে ঘরে গিয়ে ওঠা তার আর ঘটে উঠল না৷

শরৎ দিদির কথায় সে অল্পক্ষণের জন্যে অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল, শেষের দিকের প্রশ্নের মানে সে ভালো করে না বুঝে শূন্যদৃষ্টিতে শরতের মুখের দিকে চেয়ে বললে—কি বললে শরৎদি? মজা?…ও, মজা হবে না আবার? খুব হবে৷ সত্যি কথা বলতে কি, এখান থেকে যেখানে বেরুবে সেখানেই ভালো লাগবে৷ একঘেয়ে দিন যেন আর কাটতে চায় না৷ অসহ্য হয়ে উঠছে দিন দিন৷ দুপুরে যে তোমার এখেনে নিশ্চিন্দি হয়ে বসব তার উপায় নেই৷ এতক্ষণ কাকিমা ঘুম থেকে উঠলেন, যদি দেখেন এখনও এঁটো বাসন মাজা হয় নি, রান্নাঘর ধোয়া হয় নি, তবে সন্ধে পর্যন্ত বকুনি চলবে৷

শরৎ হাসিমুখে বললে, তা হলে তুই ঝগড়া করে এসেছিস বাড়ি থেকে, ঠিক বললাম৷ হ্যাঁ কি না বল?

রাজলক্ষ্মী চুপ করে রইল৷

শরৎ বললে, তাই বুঝলাম এতক্ষণ পরে৷ নইলে ঠিক দুপুরবেলা তুমি আসবার মেয়েই আর কি! ভাত খেয়ে এসেছিস না আসিস নি, সত্যি কথা বল—আমার মাথার দিব্যি—আমার মরা মুখ দেখবি—

—না, তা নয়৷ তেমন ঝগড়া নয়৷ ভাত খেয়েছি বৈকি—

—সত্যি বলছিস?

—মিথ্যে কথা বলব না শরৎদি, তুমি যখন অমন দিব্যি দিলে৷ না, সে খাওয়ার কথা নিয়ে নয়—ঝগড়া নিয়েও নয়, সত্যিই এত একঘেয়ে হয়ে উঠেছে এখানে—ইচ্ছে হয় যেদিকে দু-চোখ যায় ছুটে যাই—

—সত্যি, যা বলিস ভাই, আমারও বড় একঘেয়ে লাগে৷ সেই সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত একই হাঁড়ি-হেঁসেল নিয়ে নাড়ছি, আর একই দিঘির ঘাটে সতেরো বার দৌড়ুচ্ছি, তার পর কেবল নেই আর নেই—

কিন্তু তরুণী রাজলক্ষ্মীর মন যা চায়, যে জন্যে ব্যাকুল—শরৎ তা ঠিক বুঝতে পারে নি৷ রাজলক্ষ্মীও ঠিকমতো বোঝাতে পারে না, তাই নিয়েই তো আজ বাড়িতে কাকিমার বকুনি খেতে হল৷ সে সর্বদা নাকি থাকে অন্যমনস্ক, কি তাকে বলা হয় নাকি তার কানে যায় না—ইত্যাদি, তার বিরুদ্ধে বাড়ির লোকের অভিযোগ৷ শরৎ বুঝতে পারে না ওর দুঃখ৷ ঘরকন্না করে করে শরতের মন বসে গিয়েছে এই সংসারেই, যেমন তাদের বংশের পুরনো আমলের পাথরের থাম আর ভাঙা মূর্তিগুলো ক্রমশ মাটির ওপর চেপে বসতে বসতে ভেতরে সেঁধিয়ে যাচ্ছে!

উঠোনের রোদ এইসময় একটু পড়ল৷ রাজলক্ষ্মী বললে—চলো শরৎ-দি, একটু গিয়ে দিঘির ঘাটে বসি, বেশ ছায়া আছে গাছের—বেশ লাগে৷

শরৎ বললে, আমায় তো যেতেই হবে এঁটো বাসন মাজতে৷ চল ওখানে বসে গল্প করিস—আমার কি হয়েছে জানিস—মুখ বুজে থেকে থেকে আরও মারা গেলুম৷ আচ্ছা তুই বল রাজলক্ষ্মী, ভালো লাগে সকাল থেকে রাত দশটা অবধি? কার সঙ্গে দুটো কথা কই যে!—বাবা তো সব সময়েই বাইরে—

—তুমি তো আবার এমন জায়গায় থাকো যে গাঁয়ের কেউ আসতে পারে না৷—এত দূর আর এই বনের মধ্যিখানে৷ জানো শরৎ-দি, গাঁয়ের বৌ-ঝি এদিকে আসতে ভয় পায়, সাধনের বৌ সেদিন বলছিল গড়বাড়িতে নাকি ভূত আছে—

—সাধনের বৌয়ের মুণ্ডু—দূর!

—তোমার নাকি সয়ে গিয়েছে৷ তা ছাড়া সে ভূতে তোমায় কিছু বলবে না৷ তুমি তো এই বংশের মেয়ে—রাজার মেয়ে৷ আমাদের মতো গরিব-গুরবো লোকদেরই বিপদ—হি—হি—

—মরবি কিন্তু মার খেয়ে আমার কাছে—

কালোপায়রা দিঘির সান-বাঁধানো ভাঙা ঘাটের নিচু ধাপে বড় বড় গাছের ছায়া এসে পড়েছে পুকুরের জলে আর ঘাটের রানাতে৷ ঘাটে ছাতিম আর অন্য অন্য গাছের ছায়া৷ বাঁ-দিকে দূরে উত্তর দেউল, যদিও এখান থেকে দেখা যায় না—সামনে সেই ইটের টিবিটা৷ প্রভাস যেখান থেকে ইট নিয়ে গিয়েছে গ্রামের স্কুলের জন্যে৷ সামনে প্রকাণ্ড দিঘিটার নিথর কালো জল—জলের ওপর এখানে-ওখানে পানকলস আর কলমির দাম, কোণের দিকে রাঙা নাললতার পাতা ভাসছে, যদিও এখন ওর ফুল নেই৷

শরৎ এ সময় রোজ বসে একাই বাসন মাজে৷ আজ রাজলক্ষ্মীকে পেয়ে ভারি খুশি হয়েছে সে৷

এই ঘাটে বসে শরৎ কত স্বপ্ন দেখেছে—রোজ এই বাসন মাজবার সময়টি একা বসে বসে৷ নীল আকাশের তলায় ঠিক দুপুরের অলস স্তব্ধতাভরা ছাতিম-বন, ভাঙা ইটের রাশ আর কালো পায়রা দিঘির নিথর কালো জল—হয়তো কখনো কাক ডাকে কা-কা—কিংবা যেমন আজকাল ঘুঘু সারাদুপুর ধরে ডাকের বিরাম বিশ্রাম দেয় না৷ কি ভালোই যে লাগে!

জীবনের যে একঘেয়েমির কথা রাজলক্ষ্মী বললে, শরৎ তা কখনো হয়তো সে ভাবে বোঝে নি৷ এই গ্রামে এই গড়বাড়ির ইটের ভগ্নস্তূপের মধ্যে সে জন্মেছে—এরই বাইরের অন্য কোনো জীবনের সে কল্পনা করতে পারে না৷ অন্তত করতে পারত না এতদিন৷

কিন্তু কি জানি, সম্প্রতি তার মনে কোথা থেকে বাইরের হাওয়া এসে লেগেছে—কালো দিঘির নিস্তরঙ্গ শান্ত বক্ষ চঞ্চল হয়ে উঠেছে৷

প্রথমে এল তাদের অতিথিশালায় সেই বুড়ো বামুন, তার বাবার কাছে যে জেলার সীমানা দেখবার অপূর্ব গল্প করেছিল৷ যা ছিল স্থাণুবৎ অচল, অনড়—সেই নির্বিকার অতি শান্ত অস্তিত্বের মূলে কোথায় যেন সে কি নাড়া দিয়ে গেল৷ তার এবং তার বাবার৷

বামুনজ্যাঠা কত গল্প করতো তার রান্নাঘরে পিঁড়ি পেতে বসে বসে৷ বাইরের ঘরকন্না, কত সংসারের কথা, কত ধরণের সুখ-দুঃখের কাহিনী৷ বড় বড় আম কাঁঠালের বাগান, যা তাদের গড়ের বাগানের চেয়েও অনেক বড়, পঞ্চাশ বিঘের কলমের আমবাগান; কত বড় বাড়ি, তাদের মেয়েদের বৌদের কথা, দিগন্তবিস্তীর্ণ মাঠ, মাঠের মধ্যে বাবলা গাছের সারি, শেওড়াবন, শিরীষের ফল পেকে ফেটে কালো বীচির রাশি ছড়িয়ে আছে; উইয়ের ঢিবির পাশে বনধুতুরার ঝোপ৷ শরৎ তন্ময় হয়ে শুনত৷…

অন্য এক জীবন, অন্য এক অস্তিত্বের বার্তা বহন করে আনতো এ সব গল্প৷ আজ সে মেয়ে হয়ে জন্মেছে—তার হাত-পা বাঁধা, কোথাও যাবার উপায় নেই, কিছু দেখবার উপায় নেই—তার ওপর রয়েছেন বাবা, বৃদ্ধ, সদানন্দ বালকের মতো সরল, নির্বিকার৷

তার পরে এল প্রভাসদা৷

প্রভাসদা এল আর এক জীবনের বার্তা নিয়ে৷ শহরের সহস্র বৈচিত্র্য ও জাঁকজমক আছে সে কাহিনীর মধ্যে৷ মানুষ যেখানে থাকে অত অদ্ভুত আমোদ-প্রমোদের মধ্যে ডুবে—নিত্য নতুন আনন্দের মধ্যে যেখানে দিন কাটে, দেখতে ইচ্ছে হয় শরতের সে দেশ কেমন৷ খুব বড় একটা আশা ও আকাঙ্ক্ষা শরতের মনে জেগেছে প্রভাসের সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার পর থেকে৷

তার পরে এই রাজলক্ষ্মী, ষোল বছরের কিশোরী মেয়ে তো মোটে—এরও নাকি একঘেয়ে লাগছে আজকাল গড়শিবপুরের জীবন৷ ওর বয়সে শরৎ শুধু শিবপুজো করেছে বসে বসে দিঘির ঘাটে বোধনের বেলতলায়, অত সে বুঝতও না, জানতও না৷

কিন্তু আজকালের মেয়েদের মন আলাদা৷ শরৎ যে কালের মেয়ে, সে কাল কি আছে?

রাজলক্ষ্মী শরতের দিকে চেয়ে হঠাৎ বলে উঠল—সত্যি শরৎদি—

শরৎ মুখ নিচু করে বাসন মাজছিল, মুখ তুলে ওর দিকে চেয়ে বিস্ময়ের সুরে বললে, কি রে?

—আচ্ছা, তোমার চেহারা দেখলে কে বলবে তোমার বয়স হয়েছে! তোমাকে দেখে, আমি মেয়েমানুষ, আমারই চোখের পলক পড়ে না শরৎদি—সত্যি-সত্যি বলছি৷ রাজকন্যে মানায় বটে৷

শরৎ সলজ্জ হাসি হেসে বললে, দূর বাঁদরী!

—মিথ্যে বলি নি শরৎদি—এতটুকু বাড়িয়ে বলছি নে—

—কেন নিজের দিকে তাকিয়ে বুঝি কথা বলিস নে?

—আর লজ্জা দিয়ো না দিদি, তোমার পায়ে পড়ি৷ অনেক তাকিয়ে দেখেছি, কাজেই ওকথা মনে সর্বদাই জেগে থাকে৷ ওকথা তুলে আর কেন মন খারাপ করিয়ে দ্যাও?

শরৎ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে একটু ইতস্তত করে বললে—একটা কথা বলব রাজলক্ষ্মী?

—কি শরৎদি?

—আমায় অমন কথা আর বলিস নে৷ কে কোথায় থেকে শুনবে আর কি ভাববে৷ এ গাঁ বড় খারাপ হয়ে উঠেছে ভাই৷

—কেন শরৎদি এ কথা বললে?

—তোকে এতদিন বলি নি, কাউকে বলি নি বুঝলি? কিন্তু যখন কথাটা উঠলই, তখন তোর কাছে বলি৷

—কি কথা বলে ফেল না ঝাঁ করে৷ হাঁ করে তোমার মুখের দিকে কতক্ষণ চেয়ে থাকব—

—এ গাঁয়ের কতকগুলো পোড়ারমুখো ড্যাকরা জুটেছে, তাদের মা বোন জ্ঞান নেই—সেগুলোর জ্বালায় আমার সন্দের সময় উত্তর দেউলে পিদিম দিতে যাবার যদি জো থাকে—সেগুলো কবে ষাঁড়াতলার ঘাটসই হবে তাই ভাবি—

রাজলক্ষ্মী অবাক হয়ে শরতের মুখের দিকে চেয়ে বললে, বলো কি শরৎদি! এ কথা তো কোনো দিন শুনি নি তোমার মুখে! কবে দেখেছ? কি করে তারা?

—কি করে আবার—উত্তর দেউলে অন্ধকারে লুকিয়ে থাকে, ছাতিমবনের মধ্যে ফিসফিস করে৷ রোজ নয়, মাঝে মাঝে প্রায়ই করে৷ এই কালও তো করেছিল৷

—কাল?

—কালই৷ প্রভাসদা উঠে চলে গেল, তখন প্রায় বেলা গড়িয়ে গিয়েছে৷ আমি উত্তর দেউলে গেলাম সন্দে দেখাতে, আর অমনি শুনি মন্দিরের পশ্চিম গায়ে দেওয়ালের ওপাশে কার পায়ের শব্দ অন্ধকারে—

—বলো কি শরৎদি! আমার শুনে যে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছে৷ তোমার ভয় করল না?

—আমার গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে ভাই৷ আর বছর সারা বর্ষাকাল অমনি করে মরেছে পোড়ারমুখোরা—তাদের যমে ভুলে আছে—আবার শুরু করেছে এই ক’দিন—

—তার পর, কি হল?

—কি আর হবে, সাহস নেই এক কড়ার৷ হেই করলে কুকুরের মতো পালিয়ে যায়৷ একবার যদি দেখতে পাই—তবে দেখিয়ে দিই কার সঙ্গে তারা লাগতে এসেছে৷ বঁটি দিয়ে নাক কেটে ছাড়ি—

—জ্যাঠামশায়কে বলো না কেন?

—বাবাকে? পাগল! উনি কিছু করতে পারবেন না, মাঝে পড়ে গাঁয়ে ঢাক বাজিয়ে বেড়াবেন৷ মন্দ লোকে পাঁচ কথা বলবে৷

—বাবাকে কি ধর্মদাসকে বলব তবে?

—না ভাই, কাউকে বলবি নে৷ পাঁচ জনে পাঁচ রকম কথা ওঠাবে৷ গাঁয়ের লোক বড় খারাপ, জানো তো সবই৷ কাকারা করতে যাবেন ভালো ভেবে, হয়ে যাবে উল্টো৷ তা ছাড়া তাঁরা করবেনই বা কি? চোখে তো কাউকে দেখি নি!

—আচ্ছা সন্দেহ হয় কারো ওপরে শরৎদি?

শরৎ চুপ করে নিচু মুখে বাসন মাজতে লাগল৷

রাজলক্ষ্মী বললে, বলো না শরৎদি, কাউকে সন্দেহ কর?

—কার ভাই নাম করব—যখন চোখে দেখি নি৷ তবে সন্দেহ আমার হয় কার ওপর তা বলতে পারি, তুই কিন্তু কারো কাছে কিছু বলতে পারবি নে৷ কীর্তি মুখুজের ভাগ্নে অনাদি ছোঁড়াটার চালচলন অনেক দিন থেকে খারাপ দেখছি৷ রাস্তাঘাটে যখন দেখা হয়—তখন কেমন হাঁ করে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, শিস দেয়—আর ওই বটুক মুখপোড়াটাকেও আমার সন্দেহ হয়৷

—বটুক-মামা? তার তো বয়েস হয়েছে অনেক—তবে—

—বয়েস হয়েছে তাই কি? আমিও তো দাদা বলে ডাকি৷ ও লোক কিন্তু ভালো না৷

—সে আমিও একটু একটু না জানি এমন নয় শরৎ দিদি—একদিন হয়েছে কি শোনো তবে বলি৷ আমি আসছি হারান চক্কত্তিদের বাড়ি থেকে—ঠিক দপুর বেলা, ঘোষেদের কাঁটালবাগানে এসে বটুক মামার সঙ্গে দেখা—

শরৎ বাধা দিয়ে বললে, থাকগে—ওসব কথা আর শুনে কি করব? ওসব শুনলে রাগে আমার সর্বশরীর রি-রি করে জ্বলে৷ তবে ওরা এখনও আমায় চিনতে পারে নি৷ কাউকে কিছু বলবার দরকার নেই আমার৷ শাস্তি যেদিন দেব, সেদিন নিজের হাতে দেব৷ মুখপোড়াদের শিক্ষে সেদিন ভালো করেই হবে৷ তবে একটা কথা বলি—যাদের নাম করলাম, তাদের সন্দেহ করি এই পর্যন্ত৷ ওরা কিনা আমি ঠিক জানি নে—চোখে তো দেখতে পাই নি কাউকে৷ অন্যায় দোষ দিলে ধম্মে সইবে না৷

রাজলক্ষ্মী প্রশংসমান দৃষ্টিতে শরতের সুগঠিত সুন্দর দেহের দিকে চেয়ে চেয়ে বললে—সে যদি কেউ পারে, তবে তুমিই পারবে শরৎদি, তা আমি জানি৷ তোমায় দেখলে আমাদের মনে সাহস আসে৷

শরৎ দুষ্টুমির হাসি হেসে রাজলক্ষ্মীর মুখের দিকে সুন্দর ভঙ্গিতে চেয়ে বলল—ইস! বলিস কি রে! সত্যি? সত্যি নাকি?

রাজলক্ষ্মীও উৎসাহের সুরে হাসিমুখে বললে, বাঃ, কি সুন্দর দেখাচ্ছে তোমায় শরৎ দিদি? কি চমৎকার ভাবে চাইলে? আমারই মন কেমন করে ওঠে, তবুও আমি মেয়েমানুষ৷

শরৎ কৃত্রিম কোপের সঙ্গে বললে, আবার! বারণ করে দিলাম না? ওসব কথা বলবি নে৷ মেয়ের এদিকে নেই ওদিকে আছে! চল বাসনগুলো কিছু নে দিকি হাতে করে—বেলা আর নেই৷ এখন ছিষ্টির কাজ বাকি!

.

বাড়ি ফিরে রাজলক্ষ্মী বললে, চলে যাই শরৎ দিদি—সন্দে হলে যেতে ভয় করবে৷

শরৎ তাকে যেতে দিলে না৷ বললে—ও কি রে! তোকে কিছু খেতে দিলাম না যে? তা হবে না৷ এইবার চা করি, আর কিছু খাবার করি৷

—না শরৎদি, পায়ে পড়ি ছেড়ে দাও আজ৷ আর একদিন এসে খাব এখন৷

শরৎ কিছুতেই শুনলে না—কখনো সে রাজলক্ষ্মীকে কিছু না খাইয়ে ছেড়ে দেয় না, নিজে সে গরিব ঘরের মেয়ে, রাজলক্ষ্মীর দুঃখ ভালো করেই বোঝে৷ বাড়িতে হয়তো বিকেলে খাবার কিছুই জোটে না—আসে এখানে, গল্প করে—ওকে খাওয়াতে পারলে শরতের মনে তৃপ্তি হয় বড়৷ শরৎ চা করে দিলে ওকে, নিজের জন্যে একটা কাঁসার গ্লাসে ঢেলে নিলে৷ হালুয়া করে ওকে কিছু দিয়ে বাকিটা বাবার জন্য রেখে দিলে৷

রাজলক্ষ্মী বললে, ওকি শরৎদি, তুমি নিলে না?

—আমি একবোরে সন্দের পরই তো খাব৷ এখন খেলে আর খিদে পায় না, তুই খা৷

রাজলক্ষ্মী চা ও খাবার পেয়ে একটু খুশিই হল৷ বললে, কি সুন্দর হালুয়া তুমি করো শরৎদি—

—যাঃ, আমার সবই তো তোর ভালো!

—তা ভালো লাগলে বলব না? বা রে—তোমার সবই আমার যদি ভালো লাগে, তবে কি করি বলো না?

—আমারও ভালো লাগে তুই এলে, বুঝলি? এই নিবান্দা পুরীর মধ্যে একা মুখটি বুজে সদাসর্বদা থাকি, কেউ এলে গেলে বড় ভালো লাগে৷ বাবা তো সব সময় বাড়ি থাকেন না—তোর সঙ্গে বেশ একটু গল্পগুজব করে বড় আমোদ পাই৷

—আমারও শরৎদি! গাঁয়ের আর কোনো মেয়ের সঙ্গে মিশে তেমন আমোদ পাই নে, তাই তো তোমার কাছে আসি৷

রাজলক্ষ্মীর বিবাহের বয়স পার হয়েছে—কিন্তু বাপ-মায়ের পয়সার জোর না থাকায় এখনও কিছু ঠিকঠাক হয়নি৷ শরতের মনে এটা সর্বদাই ওঠে, যেন তার নিজেরই কন্যাদায় উপস্থিত৷

কেদারকে দিয়ে শরৎ দু-এক জায়গায় কথাবার্তা তুলেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পয়সাকড়ির জন্যে সে-সব সম্বন্ধ ভেঙে যায়৷ আজ দিন দশ-বারো হল, কেদার আর একটা সম্বন্ধ এনেছিলেন—শরতের শুনে মনে হয়েছে সেখানে হলে ভালোই হয়৷ পূর্বে এ নিয়ে একবার দুই সখীর মধ্যে কথাবার্তা হয়েছে৷

আজও শরৎ বললে—ভালো কথা, রাজলক্ষ্মী—আসল ব্যাপারের কি করবি বল—

রাজলক্ষ্মী না বুঝতে পারার ভান করে বললে—কি ব্যাপার আসল?

—তোকে যে-কথা সেদিন বললাম৷ সাঁতরা পাড়ার সেই সম্বন্ধটা—

রাজলক্ষ্মী মনে মনে খুশি হয়ে উঠল৷ মুখে বললে—যাঃ, আর ও-সবে দরকার নেই৷ বেশ আছি৷ কেন তাড়িয়ে দেবে শরৎদি?

—না, ও-সব চালাকি রাখ দিকি৷ এখন আমায় বল, বাবাকে কি বলব?

যার সঙ্গে বিবাহের প্রস্তাব উঠেছে তার সম্বন্ধে সব কথা রাজলক্ষ্মী ইতিপূর্বে দুবার শুনেছে শরতেরই মুখে—তবুও তার ইচ্ছে হল আর একবার সেকথা শোনে৷

শুনতে লাগে ভালোই৷ তবুও কিছু নূতনত্ব৷

সে তাচ্ছিল্যের সুরে বললে, ভারি তো সম্বন্ধ! ছেলে কি করে বলেছিলে?

শরৎ বললে, নৈহাটিতে পাটের কলে চাকরি করে, শুনেছি মাকে নিয়ে নৈহাটিতেই বাসা করে থাকে৷

রাজলক্ষ্মী ঠোঁট উলটে বললে, পাটের কলে আবার চাকরি৷ তুমিও যেমন!…

রাজলক্ষ্মী কথাটা বললে বটে, কিন্তু তার মনে হল এ সম্বন্ধ খারাপ নয়৷ ছেলেটির বিষয়ে আরও কিছু জানবার তার খুব কৌতূহল হল, কেমন দেখতে, কত টাকা মাইনে পায়, বাড়িতে আর কেউ আছে কিনা৷

শরৎ কিন্তু সে দিক দিয়েও গেল না৷ বললে, তা তো বুঝলাম, তোর খুব উঁচু নজর৷ কিন্তু জজ মেজেস্টার পাত্র এখন পাওয়া যাচ্ছে কোথায় বল? অবস্থা বুঝে তো ব্যবস্থা? কি মত তোর?

রাজলক্ষ্মী চুপ করে থেকে বললে, ভেবে বলব শরৎদি—আচ্ছা কি পাশ বলেছিলে যেন সেদিন?

খানিকক্ষণ এ-সম্বন্ধে কথা চলে যদি, বেশ লাগে৷

শরৎ বলে, ম্যাট্রিক পাশ৷

—মোটে!

—অমন কথা বলিস নে৷ দু-তিনটে পাশ পাত্র কি পাওয়া সহজ? এতগুলো টাকা চাইবে৷

—আচ্ছা, পাটের কল কি রকম শরৎদি?

শরৎ হেসে বললে, আমি তো আর দেখি নি কখনো৷ তোরও পরের মুখে ঝাল খাওয়ার দরকার কি, একেবারে নিজের চোখেই তো দেখবি৷

—যাঃ, শরৎদি যেন কি!

শরৎ হাসতে হাসতে বললে, আচ্ছা শোন, তুই যে বলছিস ম্যাট্রিক পাশ কিছুই না—দু-তিনটে পাশ ছেলের সঙ্গে তোর বিয়ে দিলে তুই কথা বলতে পারবি তার সঙ্গে?

—কেন পারব না, দেখে নিও—

গল্পে দুজনে উন্মত্ত, কখন ইতিমধ্যে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে, বাইরে বেশ অন্ধকার নেমেছে, ওরা খেয়ালই করে নি৷ ছাতিমবনে শেয়াল ডেকে উঠলে ওদের চমক ভাঙল৷

রাজলক্ষ্মী ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, ও শরৎদি, একেবারে অন্ধকার ছেয়ে গেল যে! আমি কি করে যাব?

—বোস না৷ বাবা এলে তোকে বাড়ি দিয়ে আসবেন এখন৷

—না শরৎদি আমি যাই, তুমি গড়ের খাল পার করে দিয়ে এসো আমায়—বাকি পথ ঠিক যাব৷ আমার যত ভয় এই গড়ের মধ্যে৷

—আর আমি একলাটি এখন কতক্ষণ পর্যন্ত বসে থাকব তার ঠিক আছে? বাবা যে কখন ফিরবেন! তুই থাকলে বড্ড ভালো হত৷ থাক না লক্ষ্মীটি—আর একটু চা খাবি?

কিন্তু রাজলক্ষ্মী আর থাকতে চাইল না৷ বেশি রাত পর্যন্ত বাইরে থাকলে মা ভারি বকবে৷ একলাটি অন্ধকারে যেতে ভয়ও করে৷ কেদার-জ্যাঠার আসবার ভরসায় থাকতে গেলে দুপুররাত হয়ে যাবে, বাপ রে!

কেরোসিনের টেমি ধরে শরৎ গড়ের খাল পর্যন্ত রাজলক্ষ্মীকে এগিয়ে দিল৷ রাজলক্ষ্মী খাল পার হয়ে ওপারের রাস্তায় উঠে বলে, তুমি যাও শরৎদি, গোয়ালাদের বাড়ির আলো দেখা যাচ্ছে—আর ভয় নেই৷

যেতে যেতে সে ভাবছিল, নৈহাটি কেমন জায়গা না জানি!

সংসারে বেশি ঝামেলা না থাকাই ভালো৷

ম্যাট্রিক পাশ ছেলে মন্দ নয়৷

ছেলের রংটা কালো না ফর্সা?

০৩. শীত কমে গিয়েছে

শীত কমে গিয়েছে—বসন্তের হাওয়া দিতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে সজনে গাছে থোকা থোকা ফুল দেখা দিয়েছে৷

কেদার নিজের গ্রামেই একটি কৃষ্ণযাত্রার দল খুলেছেন৷ সম্প্রতি এ অঞ্চলে কৃষ্ণযাত্রার একটা হিড়িক এসে পড়েছে—গত পুজোর সময় থেকে এর সূত্রপাত ঘটে, বর্তমানে মহামারীর মতো গ্রামে গ্রামে হুজুক ছড়িয়ে পড়েছে৷ কেদার হটবার পাত্র নন, তাঁর গ্রামকে ছোট হয়ে থাকতে দেবেন কেন—জেলেপাড়া, কামারপাড়া এবং কুমোরপাড়ার লোকজন জুটিয়ে তিনিও এক দল খুলে মহা উৎসাহে মহলা আরম্ভ করেছেন৷ স্নানাহারের সময় নেই তাঁর, ভারি ব্যস্ত৷ সম্প্রতি তাঁর দলের গাওনা হবে চৈত্রমাসে অন্নপূর্ণা পূজার দিন, গ্রামের বারোয়ারি তলায়৷ বেশি দেরি নেই, দেড় মাস মাত্র৷

সীতানাথ জেলের বাড়ির বাইরে বড় ছ-চালা ঘর৷ যাত্রার দলের মহলা এখানেই রোজ বসে৷ অন্য সকলের আসতে একটু রাত হয়, কারণ সবাই কাজের লোক—কাজকর্ম সেরে আসতে একটু দেরিই হয়ে পড়ে৷ কেদারের কিন্তু সন্ধ্যা হতে দেরি সয় না, তিনি সকলের আগে এসে বসে থাকেন৷

সীতানাথ বাড়ি নেই—শীতকালের মাঝামাঝি নৌকো করে এখান থেকে পাঁচ দিনের পথ চূর্ণী নদীতে মাছ ধরতে গিয়েছে—এখনও দেশে ফেরে নি৷

সীতানাথের বড় ছেলে মানিক বাড়িতে থাকে ও গ্রামের নদীতেই মাছ ধরে স্থানীয় হাটে বিক্রি করে সংসার চালায়৷ আজ পুরো মহলা হবে বলে সে সকাল সকাল নদী থেকে ফিরে এসে বাইরের ঘরে বড় বড় খানকতক মাদুর ও চট পেতে আসর করে রেখেছে৷

কেদারকে বললে, বাবাঠাকুর, তামাক কি আর এক বার ইচ্ছে করবেন?

—তা সাজ না হয় একবার৷ হ্যাঁরে মানকে, এরা এখনো সব এল না কেন?

—আসছে বাবাঠাকুর, সবাই কাজ সেরে আসছে তো, একটু দেরি হবে৷

—তুই তামাক সেজে একবার দেখে আয় দিকি বিশু কুমোরের বাড়ি৷ ওর ছেলেটাকে না হয় ডেকে আন৷ সে রাধিকা সাজবে, তার গানগুলো ততক্ষণ বেহালায় রপ্ত করে দিই—

কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে জন দুই অভিনেতা ঘরে ঢুকল—একজন ছিবাস মুদি আর একজন হৃষিকেশ কর্মকার৷

কেদার খুশিতে উৎফুল্ল হয়ে বললেন, আরে ছিবাস যে! এই যে রিষিকেশ, এসো এসো—তোমরা না এলে তো রিয়্যাশাল আরম্ভ হয় না৷ বেশ ভালো করেছ—বসো৷

মানিক ততক্ষণ তামাক সেজে কেদারের হাতে দিয়ে বললে, তামাক ইচ্ছে করুন!

কেদারের মনে অকস্মাৎ তুমুল আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল৷ বাইরের ঝিরঝিরে মিঠে ফাল্গুনের হাওয়ায় আমের বউলের সুঘ্রাণ, একটা আঁকোড় ফুলের গাছে সাদা ফুল ধরেছে—সামনে এখন অর্ধেক রাত পর্যন্ত গানবাজনার গমগমে আসর, কত লোকজন, ছেলে-ছোকরা আসবে, মানুষের জীবনে এত আনন্দও আছে!

তামাক খেতে খেতে কেদার খুশির আতিশয্যে বলে উঠলেন, ওহে রিষিকেশ, এদিক এসো—ততক্ষণ তোমার আয়ান ঘোষের পার্টটা একবার মুখস্ত বলে যাও শুনি—

কেদারের হুকুম অমান্য করবার সাধ্য নেই কারো এ আসরে৷ হৃষিকেশ কর্মকার দু-একবার ঢোঁক গিলে, দু-একবার ঘরের আড়ার দিকে তাকিয়ে বিপন্ন মুখে বলতে শুরু করলে—‘অদ্য পৌর্ণমাসি রজনী, যমুনা পুলিনের কি অদ্ভুত শোভা! কিন্তু অহো! আমার হৃদয়ে সহস্র বৃশ্চিকদংশনের মতো এরূপ মর্মঘাতী জ্বালা অনুভব করিতেছি কেন?—কোকিলের কুহু-ধ্বনি আমার কর্ণকুহরে—’

—আঃ দাঁড়াও দাঁড়াও, অমন নামতা মুখস্ত বলে গেলে হবে না৷ থেমে দমক দিয়ে দিয়ে বলো—কাঠের পুতুলের মতো অমন আড়ষ্ট হয়ে থাকার মানে কি? হাত-পা নড়ে না?

এই সময় কয়েকজন লোক এসে ঢুকল৷ কেদারের ঝোঁক গানবাজনার দিকে, শুধু বক্তৃতার তালিম তাঁর মনে পুরো আনন্দ দিতে পারে নি এতক্ষণ, নবাগতদের মধ্যে বিশ্বেশ্বর পালের ছেলে নন্দকে দেখে তিনি হঠাৎ অতিমাত্রায় খুশি হয়ে উঠলেন৷

—আরে ও নন্দ, এত দেরি করে এলি বাবা, তবেই তুই রাধিকা সেজেছিস! বারোখানা গান তোমার পার্টে, আজই সব তালিম দেওয়া চাই, নইলে আর কবে কি হবে শুনি? বোস