হেক্টর এয়ারপোর্ট (নক্ষত্রের রাত-২) – হুমায়ূন আহমেদ

নক্ষত্রের রাত - হুমায়ূন আহমেদ

হেক্টর এয়ারপোর্টের ওয়েটিং লাউঞ্জটি ছোট। কিন্তু এমন নিখুঁত ভাবে সাজান যে, ছবি মনে হয়। এখানে থাকা মানেই ছবির মধ্যে নিজেকে ঢুকিয়ে দেওয়া। রেবেকা তা করতে পারছে না। তার বারবার মনে হচ্ছে, তাকে এই জায়গায় মোটেই মানাচ্ছে না। সে জড়োসড়ো হয়ে কোণের দিকের একটি চেয়ারে বসে আছে। এবং প্রতি পাঁচ মিনিট পরপর দরজার দিকে তাকাচ্ছে আর ঘড়ি দেখছে।

এ্যান চলে গিয়েছে অনেকক্ষণ হল। বেশ মেয়েটি। হড়বড় করে অনেক কথা বলল। যাবার আগে অবিকল বাংলাদেশী মেয়ের মতো বলল, তোমার গলায় যে মালাটি আছে তা কিনতে তোমার কত টাকা লেগেছে? ডলারে কত হবে?

এক ভরি সোর সাধারণ একটা লকেট। কিন্তু এ্যান মুগ্ধ চোখে দেখছে। টাকাকে ডলারে এমন আগ্রহ নিয়ে কনভার্ট করছে যে, মনে হয় ভোর হওয়ামাত্র সে এরকম একটা লকেট কিনে আনবে। চমৎকার মেয়ে। বিদায় নেবার আগে রেবেকাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল। আশ্চর্য কাণ্ড! অথচ এক বার জিজ্ঞেস করল না,আমেরিকায় তোমার ঠিকানা কী হবে? ঠিকানাটা দিয়ে যাও, পরে যোগাযোগ করব।

এত জায়গা থাকতে এক বুড়ো এসে বসল রেবেকার পাশের চেয়ারে। গায়ে গা লেগে যায়, এমন অবস্থা। বুড়োটি ক্ৰমাগত নাক ঝাড়ছে। নাক ঝাড়বার আগে এবং ২৫৬

পরে বিড়বিড় করে বলছে কোন্ড। ড্যাম কোন্ড। লোকটি অসম্ভব নোংরা এবং এমনভাবে নাক ঝাড়ছে যে গা শিরশির করে। রেবেকা বেশ কয়েক বার ভেবেছে একটু দূরে অন্য একটা চেয়ারে সরে বসে। এটা অভদ্রতা হবে ভেবে সে করছে। না।

লাউঞ্জে লোকজন একেবারেই নেই। দু জন বিশালবপু মহিলা একগাদা বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে অনবরত কথা বলছে। এরা আমেরিকান নয়। কথাবার্তা শালিক পাখির কিচিরমিচিরের মত। বাচ্চাগুলি ভেণ্ডিং মেশিনে পয়সা ফেলে কিছুক্ষণ পরপরই খাবারদাবার নিয়ে ছুটে আসছে। এই আইসক্রীম, এই অরেঞ্জ জুস, এই একটা স্যাণ্ডউইচ। এত রাতে ছেলেগুলির পেটে রাক্ষসের মতো খিদে কেন? একটা পুতুলের মতো বাচ্চা, সবেমাত্র হাঁটতে–শিখেছে সেও একটা-কী কিনে এনে চারিদেকে ছড়াচ্ছে। বাচ্চার মা দেখেও দেখছে না। হাত নেড়ে-নেড়ে বারবার বলছে–উইইএ উইইএ্যা উইইএ মানে কী? কোন দেশী ভাষা।

বুড়োলোকটি থলথলে চোখে কাল রেবেকার দিকে। তার একটি চোখ লাল হয়ে আছে। চোখের কোণে ময়লা।

তুমি কি ভারতীয়?

রেবেকা মাথা নাড়ল। যার মানে যা হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।

যে ডেসটি পরে আছ তার নাম কি সারি?

হ্যাঁ শাড়ি।

ঠাণ্ডা লাগছে না তোমার?

না।

ঠাণ্ডা লাগাবার কথা। খুবই পাতলা কাপড় মনে হচ্ছে, ভেরি থিন।

রেবেকা অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। এখন হয়তো হাত বাড়িয়ে সে শাড়ি পাতলা কি মোটা দেখতে চাইবে।

বুড় প্রচণ্ড শব্দে নাক ঝাড়ল। বিড়বিড় করে বলল, কোল্ড, ড্যাম কোল্ড।

রেবেকার ঠাণ্ডা লাগছে না। তার চেতনা কিছু পরিমাণে অসাড় হয়ে আছে। খিদে লাগার কথা, খিদেও লাগছে না। জীবনের উপর দিয়ে ছোটখাট একটা ঝড় বয়ে গেছে। এত বড় অনিশ্চয়তায় সে কখনো পড়ে নি।

অথচ প্লেনে ওঠার সময় কত বড় বড় কথা একেক জনের। ভয়ের কিছুই নেই। ঢাকা থেকে কুমিল্লা যেতে যে-ঝামেলা তার দশ ভাগের এক ভাগ ঝামেলা ঢাকা থেকে নিউইয়র্ক যেতে। ওঠা আর নামা–ব্যস। এক জন অন্ধকে প্লেনে বসিয়ে দিলে সে যেখানে যাবার ঠিক চলে যাবে।

চাঁদপুরের ঘোটখালু বললেন, তাঁর অফিসের নেজাম সাহেবের এগার বছরের ভাগ্নিকে তারা টিকিট কেটে প্লেনে তুলে দিয়েছেন, সে একা-একা চলে গেছে ভ্যাঙ্কুর। পথে সিয়াটলের এয়ারপোর্ট হোটেলে ট্রানজিট প্যাসেঞ্জার হিসেবে এক রাত থেকেছে।

ছোটখালু খুব হাতটাত নেড়ে বললেন, এগার বছরের মেয়ের যদি অসুবিধা না হয়, তোর হবে কেন? তুই এত ঘাবড়াচ্ছিস কেন বোকার মতো।

জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্টে নামবি। ইমিগ্রেশন পার করবি, তারপর গাঁটগ্যাঁট করে হেঁটে চলে যাবি ডোমস্টিক ফ্লাইট সেকশনে। আবদুল সেখানে থাকবে। সে তোক ফার্গোর প্লেনে তুলে দেবে।

আবদুল চাচা যদি না থাকে?

না থাকলে জিজ্ঞেস করবি ফার্গো যাবার প্লেন কত নম্বর থেকে ছাড়ে। জিজ্ঞেস করবি, ফ্লাইট নাম্বার এন ডাবলিউ টু টু ওয়ান কোত্থেকে ছাড়বে। আর আবদুল থাকবেই। ওর একটা দায়িত্ব নেই?

আবদুল চাচার যতটা দায়িত্ব থাকবে আশা করা গিয়েছিল, ততটা দায়িত্ব তাঁর ছিল না। তিনি আসেন নি এবং রেবেকা পুরোপুরি দিশাহারা হয়ে গিয়েছিল–

এয়ারপোর্টের মত একটা ব্যাপার এত বিশাল হতে পারে।

হাজার হাজার মানুষ। সবাই ব্যস্ত। সবাই ছুটছে। যেন কোথাও কোনো আগুন লেগেছে, এই মুহূর্তে পালিয়ে যেতে হবে। অদৃশ্য কোনো জায়গা থেকে অনবরত ঘঘাষণা দেওয়া হচ্ছে–এ্যাটেনশন প্লীজ। ফ্লাইট নাম্বার টু টু ওয়ান…..

মাথার উপরে সারি সারি টিভি ঝুলছে, তার একটির লেখার সঙ্গে অন্যটির কোন মিল নেই। বুড়োবুড়ির বিরাট একটি দল ক্লান্ত ভঙ্গিতে ভারি ভারি মালপত্র টেনে-টেনে আনছে। এত রঙচঙ তাদের পোশাকে যে চোখ ধাধিয়ে যায়। তারা বারবার একই জায়গায় ঘোরাফেরা করছে।

কয়েক জন তরুণ-তরুণী লোকজনের ভিড় সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে জড়াজড়ি করে চুমু খাচ্ছে। একটি দাড়িওয়ালা ছেলের চুমু খাওয়ার ভঙ্গি এতই অশ্লীল যে রেবেকার গা কাঁপতে লাগল। ছেলেটি তার একটি হাত ঢুকিয়ে দিয়েছে মেয়েটির প্যান্টের ভেতর। কেউ তা দেখেও দেখছে না।

রেবেকার নিশ্চিত ধারণা হল, সে এই জীবনে ফ্লাইট নাম্বার এন ডাবলিউ টু টু ওয়ান খুঁজে বের করতে পারবে না। সে বেশ কয়েক জনকে জিজ্ঞেস করল। সবাই বলল, আমি জানি না। এক জন বলল, তুমি কী বলছ, বুঝতে পারছি না। আবার বল।

রেবেকা আবার বলল। লোকটি মাথা ঝাকাল।

উঁহুঁ। বুঝতে পারছি না, আবার বল। ধীরে ধীরে বল, এত ছটফট করছ কেন?

ছোটখালু বলে দিয়েছিলেন, কোনোই ঝামেলা হবে না, বুঝলি। ঐটা কোনো ঝামেলার দেশই না। তবু খোদা না খাস্তা যদি কিছু হয়, স্ট্রেইট পুলিশের কাছে গিয়ে বলবি–হেল্প মি প্লীজ। দেখবি সব ফয়সালা। ওদের পুলিশ আমাদের পুলিশের মতো নয়। ওরা হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে বড়ো বন্ধু। দি বেস্ট ফ্রেণ্ড।

ছোটখালু এমনভাবে কথা বলেন, যেন বিদেশের সব কিছু তাঁর জানা। যেন অসংখ্য বার ঘুরেটুরে এসেছেন। অথচ তার সবচেয়ে দীর্ঘ ভ্রমণ হচ্ছে চাঁদপুর থেকে লালমনিরহাট। সেই লালমনিরহাট যেতেই কত কাণ্ড। ভুল ট্রেনে উঠে বসে আছেন। ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে, লাফিয়ে নামতে গিয়ে চশমা ভেঙে ফেললেন। হাঁটুতে চোট পেলেন।

এত দুঃখেও ছোটখালুর কথা মনে করে তার হাসি পেল। কত সুখের, কত আনন্দের দেশ ছেড়ে কোথায় এলাম ভেবে পরক্ষণেই তার বুক ব্যথা করতে লাগল।

শেষ পর্যন্ত এক পুলিশকেই জিজ্ঞেস করল। সেই পুলিশের পর্বতের মতো চেহারা। কোমরের দুই দিকে দুটি পিস্তল ঝুলছে। ওয়েস্টার্ন ছবিতে যেরকম দেখা যায় অবিকল সেরকম। সে দীর্ঘ সময় তার দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, এই প্রশ্নটি আমাকে জিজ্ঞেস না করে নর্থ ওয়েস্ট অরিয়েন্টের ইনকোয়েরিকে জিজ্ঞেস করলে ভালো হয়। ওদের জানার কথা, আমার নয়।

তাদের কোথায় পাব?

কি বলছ বুঝতে পারছি না, আবার বল।

তাদের কোথায় পাব?

কাদের কোথায় পাবে? যা বলতে চাও গুছিয়ে বল। তুমি কী জানতে চাও, তা তুমি নিজেও ভালো জান না।

এয়ারপোর্ট থেকে সে কোনো দিন বের হতে পারবে, এই আশা রেবেকা প্রায় ছেড়েই দিল। তার ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছা হচ্ছিল। হয়তো কেঁদেও ফেলত, যদি না এক জন নিগ্রো যুবক এসে বলত, তোমার কী অসুবিধা আমাকে বল। এরকম করছ কেন?

আমি কী করব বুঝতে পারছি না।

যাবে কোথায় তুমি? তোমার জিনিসপত্র আছে? টিকিট আছে? টিকিটটা কোথায় আমার কাছে দাও।

ছোটখালু বারবার বলে দিয়েছেন, ব্ল্যাকদের কাছ থেকে সাবধান থাকবি। দেখবি অনেকে যেচে সাহায্য করতে আসবে। তুই মুখের উপর স্ট্রেইট বলবি–নো, থ্যাংকস। আমেরিকার ক্রাইম ওয়ার্লডটা হচ্ছে ওদের হাতে। ইটালিতে যেমন মাফিয়া, আমেরিকাতে তেমনি ব্ল্যাক। হাড়ে-হাড়ে শয়তান। মহা পাজি।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত জনসন নামের তালগাছের মত লম্বা কালে ছেলেটি তাকে নিয়ে গেল একটি নাম্বার ইলেভেনে। বোর্ডিং কার্ড করিয়ে দিয়ে কোমল স্বরে বলল, এগার নম্বর দেখে দেখে চলে যাও। আর কোন প্রবলেম হবার কথা নয়।

থ্যাংকস দিতে গিয়ে রেবেকার গলা জড়িয়ে গেল। ছেলেটি বলল, টেক কেয়ার অব ইয়োরসেলফ। এই বলেই সে তার বিশাল হাত বাড়িয়ে দিল। হাত বাড়ান হয়েছে হ্যাগুশেকের জন্য, এটা বুঝতে অনেক সময় লাগল রেবেকার।

অনেকক্ষণ রেবেকার হাত ঝাকাল ছেলেটি। কিংবা হয়ত অল্পক্ষণই অসংখ্য বার ঘুরেটুরে এসেছেন। অথচ তাঁর সবচেয়ে দীর্ঘ ভ্রমণ হচ্ছে চাঁদপুর থেকে লালমনিরহাট। সেই লালমনিরহাট যেতেই কত কাণ্ড! ভূল ট্রেনে উঠে বসে আছেন। ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে, লাফিয়ে নামতে গিয়ে চশমা ভেঙে ফেললেন। হাঁটুতে চোট পেলেন।

এত দুঃখেও ছোটখালুর কথা মনে করে তার হাসি পেল। কত সুখের, কত আনন্দের দেশ ছেড়ে কোথায় এলাম ভেবে পরক্ষণেই তার বুক ব্যথা করতে লাগল।

শেষ পর্যন্ত এক পুলিশকেই জিজ্ঞেস করল। সেই পুলিশের পর্বতের মতো চেহারা। কোমরের দুই দিকে দুটি পিস্তল ঝুলছে। ওয়েস্টার্ন ছবিতে যেরকম দেখা যায় অবিকল সে-রকম। সে দীর্ঘ সময় তার দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,

এই প্রশ্নটি আমাকে জিজ্ঞেস না করে নর্থ ওয়েস্ট অরিয়েন্টের ইনকোয়েরিকে জিজ্ঞেস করলে ভালো হয়। ওদের জানার কথা, আমার নয়।

তাদের কোথায় পাব?

কি বলছ বুঝতে পারছি না, আবার বল।

তাদের কোথায় পাব?

কাদের কোথায় পাবে? যা বলতে চাও গুছিয়ে বল। তুমি কী জানতে চাও, তা তুমি নিজেও ভালো জান না।

এয়ারপোর্ট থেকে সে কোন দিন বের হতে পারবে, এই আশা রেবেকা প্রায় ছেড়েই দিল। তার ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছা হচ্ছিল। হয়তো কেঁদেও ফেলত, যদি না এক জন নিগ্রো যুবক এসে বলত, তোমার কী অসুবিধা আমাকে বল। এরকম করছ কেন?

আমি কী করব বুঝতে পারছি না।

যাবে কোথায় তুমি? তোমার জিনিসপত্র আছে? টিকিট আছে? টিকিটটা কোথায় আমার কাছে দাও।

ছোটখালু বারবার বলে দিয়েছেন, ব্ল্যাকদের কাছ থেকে সাবধান থাকবি। দেখবি অনেকে যেচে সাহায্য করতে আসবে। তুই মুখের উপর স্ট্রেইট বলবি–নো, থ্যাংকস। আমেরিকার ক্রাইম ওয়ার্লডটা হচ্ছে ওদের হাতে। ইটালিতে যেমন মাফিয়া, আমেরিকাতে তেমনি ব্ল্যাক। হাড়ে-হাড়ে শয়তান। মহা পাজি।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত জনসন নামের তালগাছের মতো লম্বা কালে ছেলেটি তাকে নিয়ে গেল একটি নাম্বার ইলেভেনে। বোর্ডিং কার্ড করিয়ে দিয়ে কোমল স্বরে বলল, এগার নম্বর দেখে দেখে চলে যাও। আর কোনো প্রবলেম হবার কথা নয়।

থ্যাংকস দিতে গিয়ে রেবেকার গলা জড়িয়ে গেল। ছেলেটি বলল, টেক কেয়ার অব ইয়োরসেলফ। এই বলেই সে তার বিশাল হাত বাড়িয়ে দিল। হাত বাড়ান হয়েছে হ্যাগুশেকের জন্য, এটা বুঝতে অনেক সময় লাগল রেবেকার।

অনেকক্ষণ রেবেকার হাত ঝাকাল ছেলেটি। কিংবা হয়তো অল্পক্ষণই ঝাঁকিয়েছে–রেবেকার মনে হয়েছে অনন্তকাল। কী বিশাল হাত। কিন্তু কেমন মেয়েদের মধ্যে তুলতুলে। ছেলেটি আবার বলল, টেক কেয়ার অব ইয়োরসেলফ।

লম্বা-লম্বা পা ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে ছেলেটি। কোনো দিনই আর তার সঙ্গে দেখা হবে না।

এন ডাবলিউ টুটু ওয়ান আকাশে উড়তে শুরু করেছে। এক নিরুদ্দেশ থেকে অন্য এক নিরুদ্দেশের দিকে যাত্রা। বুকের মধ্যে দলা পাকিয়ে কান্না উঠে আসছে। শুধুই বাড়ির কথা মনে পড়ছে।

এক দঙ্গল মানুষ এসেছিল এয়ারপোর্টে, সবাই এমন কান্নাকাটি শুরু করল, যেন তাদের এই মেয়ে কোনো দিন দেশে ফিরে আসবে না। বাবা বিরক্ত হয়ে বললেন, কী শুরু করলে তোমরা? তিন মাসের জন্য যাচ্ছে, আর সবাই মরাকান্না শুরু করলে? কোনো মানে হয়? বলেই নিজেই চোখ মুছতে শুরু করলেন।

বড় দুলাভাই বললেন, ওকে নাসিমের সঙ্গে একা থাকতে দাও না, তোমরা সবাই একটু এদিকে আস তো নাসিম অনেকটা দূরে একা-একা দাঁড়িয়ে ছিল। বড় দুলাভাই তাকে পাঠিয়ে দিলেন। সে বিয়ের পাঞ্জাবিটা পরে এসেছে। পাঞ্জাবি মাপমতো হয় নি, বেশ খানিকটা লম্বা হয়েছে। সেই লম্বা পাঞ্জাবিতেই এত সুন্দর লাগছে তাকো নাসিম লাজুক ভঙ্গিতে কাছে এসে দাঁড়াল। সবাই তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। এইভাবে কোন কথা বলা যায়? কিন্তু কী প্রচণ্ড ইচ্ছাই না করছিল কথা বলতে। রেবেকা শেষ পর্যন্ত বলল, এই পাঞ্জাবিটা পরতে না করলাম, তার পরও কেন পরলে?

সে কোন কথা বলল না। লাজুক ভঙ্গিতে হাসল। রেবেকা থেমে-থেমে। বলল, আজ রাতেই তুমি কিন্তু আমাকে চিঠি লিখবে।

হ্যাঁ লিখব। আজ রাতেই লিখব।

এত লোকজন তার চার পাশে, তবু সবাইকে ছাড়িয়ে সাত দিন আগের পরিচিত এই মানুষটিই কেন প্রধান হয়ে উঠলঃ সাত দিন আগে তো সে কোন দিন একে দেখে নি। রাতের বেলা যেসমস্ত কল্পনার মানুষদের সঙ্গে সে কথাবার্তা বলত, এদের কারো সঙ্গেই এই লোকটির কোন মিল নেই। তার চেহারা সাধারণ। কথাবার্তা সাধারণ। পোশাকআশাকও সাধারণ। তবু কেন মনে হচ্ছে সুদূর কৈশোরে যাকে সে ভেবেছে– সে-ই, অন্য কেউ নয়, দীর্ঘ দিনের চেনা এক জন?

রেবেকা গাঢ় স্বরে বলল, যাই। নাসিম হাসল।

আশেপাশে কেউ না থাকলে নিশ্চয়ই সে এগিয়ে এসে হাত ধরত। বেচারা বডড লাজুক। কিসের এত লজ্জা মা, বাবা, ভাই, বোন যদি সবার সামনে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে পারে, সে কেন সামান্য হাতটা ধরতে পারবে না? এত জঘন্য কেন আমাদের দেশ?

কাঁদবে-না কাঁদবে-না ভেবেও রেবেকা কেঁদে ফেলল। নাসিম বলল, ছিঃ ছিঃ, কী করছ? দুদিন পর তো এসেই পড়বে।

রেবেকা ধরা গলায় বলল, তোমাকে এত বক্তৃতা দিতে হবে না। চুপ করে থাক।

রেবেকার পাশের সীটের মহিলাটি পাখির মত গলায় বলল, আমেরিকায় এই প্রথম আসছ?

হ্যাঁ।

খুব হোমসিক ফিল করছ, তাই না?

হ্যাঁ।

হোমসিকনেস থাকবে না, কেটে যাবে। এ দেশে এসে কেউ হোমসিক হয়। না।

আত্মতৃপ্তির হাসি আমেরিকানটির মুখে। সে স্বৰ্গরাজ্যের সন্ধান দিচ্ছে।

কিন্তু এই স্বৰ্গরাজ্যে যেতে ইচ্ছে করছে না। এ রকম যদি হত যে এটা একটা স্বপ্ন। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাবে এবং রেবেকা দেখবে যে তার পরিচিত বিছানায় শুয়ে আছে। ঝুমঝুম করে বৃষ্টি পড়ছে টিনের চালে। বৃষ্টির ছাটে তার বিছানা ভিজে গেছে। কিন্তু তা হবে না। এটা স্বপ্ন নয়। এটা সত্যি।

এয়ারহোস্টেস এসে রাতের খাবার দিয়ে গেল। প্রতিটি জিনিসই দেখতে এত সুন্দর, কিন্তু খেতে এত জঘন্য। বমি এসে যায়।

তোমার কি কোনো ডিংক লাগবে?

না।

ভালো শেরী আছে, পর্তুগালের।

না, আমার লাগবে না। আর আমি এসব কিছুই খাব না। নিয়ে যাও।

তুমি কি অসুস্থ?

না। আমি ভালেই আছি।

রেবেকা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। অনেক উঁচুতে প্লেন। নিচের কিছুই দেখা যায় না। ঘঘালাটে একটি চাদরে পৃথিবী ঢাকা।

এত কুৎসিত, এত কুৎসিত।

Facebook Comment

You May Also Like