Friday, February 23, 2024
Homeথ্রিলার গল্পরহস্য গল্পঅদ্ভুত ট্রেন যাত্রা - রহস্য গল্প

অদ্ভুত ট্রেন যাত্রা – রহস্য গল্প

ভৌতিক গল্প: অদ্ভুত ট্রেন যাত্রা

ট্রেনে বসে আছি। বাইরে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। আমার গন্তব্য নোয়াখালী৷ আমি যখনি গ্রামের বাড়ি যাই ট্রেন দিয়েই যাই। খুব ভালো লাগে। অনেকেই বলে ট্রেনে চড়তে ভালো লাগে না, কারণ অনেক সময় ধরে বসে থাকতে হয়।

এর চেয়ে বাসে চড়াই শ্রেয়, তাড়াতাড়ি পৌঁছানো যায়৷ কথা ঠিক। তবে আমি বলবো না বাস থেকে ট্রেন শ্রেয়, সময় একটু বেশি লাগে বটে তবে বেশ ভালোও লাগে৷ বাইরের প্রাকৃতিক দৃশ্য অনেকক্ষণ ধরে উপোভোগ করা যায়৷ তবে আজ আমার একটু বেশিই ভালো লাগছে, কারণ বাইরে ঠান্ডা হাওয়া সাথে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। আমি একাই যাচ্ছি যদি বন্ধুবান্ধব থাকতো তাহলে আরো জমে যেত। যাই হোক কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেন ছেড়ে দেবে৷ দেখতে দেখতে ট্রেন ছেড়েও দিয়েছে৷ বসে বসে বাইরে তাকিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছি।

এখন পর্যন্ত সব ঠিকঠাক আছে৷ হঠাৎ দেখলাম অন্য একটা বগি থেকে একটা মেয়ে এসে বসলো আমার সামনের আসনটায়। ট্রেনের আসনগুলো মুখোমুখি। আমি তেমন কিছু মনে করলাম না।

অনেকক্ষণ হয়ে গেল আমিও চুপচাপ আর মেয়েটাও চুপচাপ বসে আছি। আমার কেমন যেন একটা মনে হলো৷ এভাবে একজন সামনে বসে আছে আর অথচ কথা বলবো না? বিষয়টা মোটেও ভালো দেখায় না। তাই আমিই প্রথমে শুরু করলাম।

“আ … আপনি কোথায় নামবেন?”
“লাকসামে৷”
“ওহ আচ্ছা৷ আমি সোনাপুরে নামবো৷”।।

মেয়েটি আর কোনো কথা বললো না৷ মেয়েটি কেমন যেন চুপচাপ। চোখ কেমন ম্লান৷ মেয়েটি বোধয় চুপচাপ স্বভাবের৷ আচ্ছা আমি যে আগ বাড়িয়ে কথা বললাম মেয়েটি কিছু মনে করলো না তো? না না কি আর মনে করবে, ট্রেনে মুখোমুখি বসে আছি কথা না বললে ভালো দেখায়? মনে মনে অনেক কিছুই চিন্তা করছি৷ হঠাৎ মাথায় এল আরে মেয়েটির নামটাই তো জানা হলো না৷ আমি জিজ্ঞেস করেই বসলাম যে তার নাম কি? সে জানালো তার নাম “তিথি।” আমিও আমার বললাম”রাফি।” একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম মেয়েটা বসেছে ধরে এক দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে আছে৷ আমি তিথির দিকে তাকিয়ে কথাগুলো যখন ভাবছিলাম তখন হঠাৎ করে তিথির আমার দিলে তাকালো৷ আমিও সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নিলাম। ইশ মেয়েটা কি ভাবছে কে জানে?

ট্রেন ছুটছে নিজের গতিতে। কখন যে এক ঘন্টা পেরিয়ে গেছে খেয়ালই করিনি৷ কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো মেয়েটি এখনো চুপ৷ কোনো কথা নেই মুখে৷ একটা মানুষ এতটা চুপ কি করে হতে পারে? আমার এই ভাবনার মধ্যেই হঠাৎ তিথি প্রশ্ন করে বসে, ‘আচ্ছা আপনি কি কখনো কাউকে ট্রেনে কাটা পড়তে দেখেছেন?’ তিথি যে এমন প্রশ্ন করবে আমি ভাবতেও পারিনি৷ এমন উদ্ভট প্রশ্ন কেই বা করে? আমি একটু ইতস্তত হয়েই উত্তর দিলাম যে, না আমি এমন দৃশ্য কখনো দেখিনি৷ তিথি আবারো বললো, আচ্ছা যদি দেখেন তাহলে আপনার কেমন মনে হবে? তিথির এইসব প্রশ্ন শুনে আমার কপালটা আপনাআপনিই কুচকে গেল৷ আমি ওর কথার কোনো উত্তর না দিয়েই উঠে ট্রেনের দরজার সামনে দাঁড়ালাম৷ আমার একটু অস্বস্তি হচ্ছিল৷ উঠে আসার পর আমার চোখে একটা জিনিস পড়লো৷ সেটা হলো ট্রেনে কোনো যাত্রী নেই৷ আমি আর তিথি ছাড়া। একটু আশ্চর্যও হলাম৷ কি হলো! আগে তো কখনো এমন হয়নি! আগে যেখানে মানুষের ভিড়ে আসনে বসা যেত না ঠিক মতো আর আজ সেখানে মানুষই নেই? অদ্ভুত ব্যাপার তো! যাকগে এটা নিয়ে এত ভেবে কি হবে?

ট্রেনে সেই কখন থেকে বসে আছি৷ দেখলাম বাইরের বাতাসটা একটু ঠন্ডা হয়ে এসেছে৷ ভালোই লাগছে৷ সন্ধ্যাও নামছে৷ ভাবলাম দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াই৷ ট্রেনে যাচ্ছি আর ট্রেনের দরজার সামনে দাঁড়াবো না সেটা হয় নাকি? উঠে গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়াতেই মুখ দিয়ে আপনা আপনি বেরিয়ে গেল “আহা!” ঠান্ডা বাতাস, সন্ধ্যা নামছে, আর একটা বৃষ্টি বৃষ্টি ভাব৷ অবশ্য বৃষ্টি অনেক আগেই থেমে গেছে৷ তারপরও বৃষ্টি বৃষ্টি আবহাওয়াটা রয়ে গেছে৷ হঠাৎ আমার অনে হলো পেছনে কেউ আছে৷ কারো গরম নিশ্বাস আমার ঘাড়ে পড়ছে৷ আমি পিছন ফিরতেই দেখলাম তিথি দাঁড়িয়ে আছে৷ আমি একটু ভয় পেয়ে গেলাম৷ খেয়াল করলাম আমি একদম দরজার মুখে দাঁড়িয়ে আছি। আর এক পা পিছিয়ে গেলেই সোজা ট্রেনের নিচে৷ দেখলাম তিথি কিছু বলছে না৷ আমি ওকে পাশ কাটিয়ে চলে এলাম৷ মেয়েটা বড়ই অদ্ভুত৷ কোনো কথা বলে না আবার এখন তো আর একটুর জন্য আমাকে ফেলেই দিত৷

দেখতে দেখতে লাকসাম চলে এল৷ কিন্তু মেয়েটা নামছে না৷ কি ব্যাপার? আমি তিথিকে ডেকে বললাম,
– এই যে আপনার স্টেশন তো চলে এসেছে নামবেন না?

এবারো কোনো কথা নেই৷ ধুর বিরক্তিকর৷ আজব একজন মানুষ একটা কিছু বললে যে তার উত্তর দিতে হয় সেটা কি মেয়েটা জানে না? মেয়েটা তো বোবা নয় যে কথা বলতে পারবে না৷ কথা তো বলতেই পারে তাহলে সমস্যা কোথায়? ধুর সমস্যা থাকুক আমি আর কোনো কথাই বলবো না৷ মেজাজটা প্রচন্ড খারাপ হয়ে গেল৷ অনেক বিরক্ত লাগছে৷ কিন্তু মুখে কিছুই প্রকাশ করতে পারছি না৷

কখন যে চোখটা লেগে এসেছে টেরই পাইনি৷ চোখ মেলে দেখি সোনাপুর স্টেশনে থেমে আছে ট্রেন৷ এটা যেহেতু শেষ স্টেশন তাই ড়েন থেমে আছে৷ নয়তো এতক্ষণে আমায় নিয়েই অন্য কোনো স্টেশনের উদ্দ্যেশ্যে রওনা হয়ে যেত৷ যাই হোক ট্রেন থেকে নামতে হবে৷ সামনে তাকিয়ে দেখি মেয়েটা নেই৷ কোথায় গেল আবার? তাতে আমার কি? যাক যেখানে খুশি৷ আমি নিজের মতো নেমে পড়লাম৷ নেমে দেখি রাত বারোটা বাজে৷ আর সিগনাল দেয়া মানে আরেকটা ট্রেন আসবে৷ পেছন ঘুরে সামনে তাকাতেই আঁতকে উঠলাম৷ একি তিথি ওখানে কি করছে? তিথি দেখি রেল লাইনের উপর দাঁড়িয়ে আছে৷ আরে কেউ ওকে ধরছে না কেন? ট্রেন তো চলে এসেছে৷ কোনো উপায় না দেখে আমিই নিচে নেমে গেলাম৷ আমি তিথিকে ধরতে যাবো এমন সময়ে কিছু লোক এসে আমায় আটকায়৷ আমি দেখলাম ট্রেনটা এসে তিথিকে সজোরে একটা ধাক্কা দিল৷ আমি চিৎকার দয়ে তিথি বলে উঠলাম৷ লোকগুলো ধরে আমায় উপরে নিয়ে আসলো৷

আমি লোকগুলোর উপর চিৎকার করতে লাগলাম,
– আজব মানুষ তো আপনারা। নুজেরা তো একজনকে আত্মহত্যা থেকে বাঁচালেন না বরং আমাকেও বাঁচাতে দিলেন না৷ কেন করলেন এমন? আরেকটু হলেই আমি মেয়েটাকে ধরেই ফেলেছিলাম৷

আমার কথা শুনে লোকগুলো একজন আরেকজনের মুখের দিকে তাকাতে লাগলো৷ কি হলো বুঝলাম না৷ একজন বলে উঠলো,
– এখানে তো কেউই ট্রেনে কাটা পড়েনি। আপনি কার কথা বলছেন?

একে তো আমাকে মেয়েটাকে বাঁচাতে দিল না আর এর উপর এখন তারা সবাই এমন মুখ করে আছে আর কি সব বলছে৷ আমি আর বসে না থেকে উঠে দাঁড়ালাম। এখানে আর এক মুহূর্তও থাকবো না৷ এখানে থাকলে নিশ্চিত কোনো ঝামেলায় ফাঁসবো।

আমি হাঁটছি, ঘড়িতে এখন বাজে ৪’৪৫। ট্রেন পৌঁছাতে এমনিই লেট করেছিল৷ এরপর স্টেশনে ঝামেলা। এখন ফলাফল এতটা দেরি হয়ে গেল। আমার বাড়ি স্টেশন থেকে ২ ঘন্টার পথ। এত রাতে কোনো গাড়ি না পেয়ে পায়ে হেঁটেই রওনা হয়েছি৷ মা যে কতবার ফোন করে জিজ্ঞেস করেছে হিসেব নেই৷ মা বারবার জিজ্ঞেস করছিল আমিন্ঠিকাছি কিনা? জানি না কেন? এর আগেও তো আমি বাড়িতে এসেছি নাকি? যাই হোকি রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। আর কিছুক্ষণ বাকি৷ একটু পরই আমি আমার বাড়ির উঠানে পৌঁছে যাবো৷ হঠাৎ আমার কান দুটো সজাগ হয়ে গেল৷ খেয়াল করে শুনলাম। পাশ থেকে কেমন খস খস আওয়াজ আসছে৷ অন্ধকারে তেমন কিছু বুঝতে পারছি না৷ আমি ফোনটা বের করলাম। ফোনের লাইটটা জ্বালিয়ে পাশে ময়লার স্তুপের দিকে মারলাম৷

ময়লার স্তুপে লাইটটা পড়তেই বুকটা ধক করে উঠলো৷ আমি দেখলাম ময়লার স্তুপে একটা মেয়ে পেছন ফিরে বসে আছে৷ একটু কাছে গিয়ে দেখলাম৷ মেয়েটার জামা কাপড় দেখে তো মনে হচ্ছে আমি এমন জামা কারো গায়ে দেখেছি হয়তো৷ মনে মনে কথাটা কয়েকবার কথাটা নাড়াচাড়া করতেই মনে পড়লো, আরে এটা সেই মেয়ের গায়ে ছিল যে আজকে আমার সাথে ট্রেনে ছিল। মানে তিথির গায়ে৷ কিন্তু ও তো ট্রেনে,,,

যাই হোক আমি ধীর পায়ে মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেলাম৷ আমি মেয়েড়া কাঁধে হাত দিতেই মেয়েটা আমার দিকে ফিরে তাকালো৷ আমি এক হাত দূরে ছিটকে সরে গেলাম। এ আমি কি দেখছি? মেয়েটার মুখে ময়লা আবর্জনা লেগে আছে৷ তার চোখগুলো লাল হয়ে আছে৷ হঠাৎ দেখলাম মেয়েটার ঘাড়টা কেমন নড়ে উঠলো৷ তারপর আস্তে আস্তে ডানে বেঁকে যেতে লাগলো৷ এক পর্যায়ে মাথাটা ঘাড় থেকে আলাদা হয়ে গেল৷ আমার পুরো শরীর অবশ হয়ে যেতে লাগলো৷ এসব আমি কি দেখছি? বুঝতে পারছি আমার সাথে কিছু একটা হতে চলেছে৷ কিন্তু আমি নড়তে পারছি না৷ মনে হচ্ছে কেউ আমায় সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে আটকে রেখেছে৷ আমার ফোনের লাইট এখনো মেয়েটার দিকেই ধরা৷ মেয়েটা একটা বিকট হাসি দিয়ে উঠলো৷ হঠাৎ মেয়েটা তার ঝুলন্ত মাথা নিয়ে আমার দিকে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসতে লাগলো। আমার মুখ দিয়ে কোনো সূরাও বের হচ্ছে না। মেয়েটা প্রায় চলেই এসেছে৷ আমার মাথা ঘুরছে। শরীরে কোনো বলই পাচ্ছি না৷ আমি আজ এখানেই শেষ। মেয়েটা এসে আমার পা ঝাপটে ধরলো৷ তার হাতের ধারালো নখ আমার পা দিয়ে বিঁধে যাচ্ছে৷

হঠাৎ আমার কানে দূরের কোথাও আজানের শব্দ ভেসে আসলো৷ আমার শরীর একটু হালকা হতেই আমি সব শক্তি দিয়ে মেয়েটাকে এক লাথি দিলাম৷ আমি স্পষ্ট দেখেছি আমার লাথিতে তার ঝুলন্ত মাথাটা গিয়ে ময়লার স্তুপে পড়েছে৷ আমি সেখান থেকে শরীরের যত শক্তি আছে সব শক্তি দিয়ে দৌড় লাগালাম৷ দৌড়ানোর সময় একবার পেছনে তাকিয়ে দেখেছিলাম। মেয়েটা তখনো হামাগুড়ি দিয়ে আমার পেছন পেছন আসছে৷ একটা মাথা বিহীন শরীর আমার পিছু করছে৷ এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য! চারপাশ থেকে আজানের শব্দ ভেসে আসছে৷ আমি মনে ও শরীরে আরেকটু শক্তি পেলাম৷ আমি দৌড়ে আমাদের বাড়ির উঠানে গিয়ে মা বলে চিৎকার দিতেই একটা কিছুর সাথে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলাম। আমার হাত পা কাপছে৷ সারা শরীরে কোনো বোধ পাচ্ছি না। ধীরে ধীরে জ্ঞান হারাচ্ছি৷ কয়েকটা চিৎকার আমার কানে ভেসে আসছে৷ আমি আর চোখ মেলে রাখতে পারছি না৷ চোখ দুটো নিজ থেকেই বন্ধ হয়ে এল।

চোখ খুলে দেখি আমি হাসপাতালে৷ পায়ে ব্যান্ডেজ করা। পায়ে অনেক ব্যাথা করছে৷ পাশে তাকাতেই দেখি একজন হুজুর বসে আছে। আর পাশে মা দাঁড়িয়ে আছে৷ হুজুর বলে উঠলো,

– তুমি জোর বাঁচা বেঁচে গেছ৷ পিশাচের খপ্পরে পড়েছিলে। ভাগ্যিস আজান হচ্ছিল তাই তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারেনি৷”

কথাগুলো বলে হুজুর একটা তাবিজ বেঁধে দেন আমার হাতে। আর বললো বেশি রাতে যেন বাইরে না থাকি। সবই বুঝলাম। কিন্তু ট্রেনের ব্যাপারটা এখনো কিছু বুঝতে পারলাম না৷ ট্রেনে ওটা কে ছিল তাহলে? কাউকে এই ব্যাপারে কিছু বললাম না৷ বেঁচে গেছি যেহেতু এটা নিয়ে মাথা না ঘামানোই ভালো৷

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments