Thursday, February 29, 2024
Homeকিশোর গল্পদেয়ালের ওপারে - মাসুদ রহমান

দেয়ালের ওপারে – মাসুদ রহমান

দেয়ালের ওপারে - মাসুদ রহমান

নতুন বাসায় আসার পর থেকেই প্রায় প্রতি রাতে কান্নার শব্দ শোনে নিতু। হাউমাউ কান্না নয়, চাপা কান্না। থেমে থেমে অনেকক্ষণ ধরে চলে। নিতু একদিন ওর মায়ের কাছে বলেছিল কথাটা। মা পাত্তা না দিয়ে উল্টো ঝাড়িই দিয়েছেন, ‘সারা দিন ভূতের বই পড়ে, সিনেমা দেখে তোর মাথাটা গেছে! এত করে বলি, এসব ছাইপাঁশ পড়া বাদ দে! কে শোনে কার কথা।’

কিন্তু কান্নার আওয়াজ থেমে গেল না তাতে। আজও কান্নার আওয়াজ আসছে। কম বয়সী একটা মেয়ে কাঁদছে থেমে থেমে। কেমন ভয় ভয় লাগে নিতুর। ও সবে ক্লাস সেভেনে উঠেছে। একা একা রুমে ঘুমাতে ওর কোনোকালেই ভয় করেনি। কিন্তু ইদানীং এই কান্নার আওয়াজে ওর মনে ভয় ঢুকে গেছে। তাই রাতে কান্নার আওয়াজ কানে এলেই ও মাথার ওপর বালিশ চাপা দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করে। আজ বিছানা ছেড়ে নেমে পড়ল ও। বারান্দার দিকে পা বাড়াতেই খেয়াল করল, কান্নার শব্দ আসছে পাশের ফ্ল্যাট থেকে!

পরদিন মায়ের কাছে আবারও বিষয়টা খুলে বলল নিতু। এবার ওর মা কিছুটা নড়চেড়ে বসলেন, ‘তুই শিওর, পাশের ফ্ল্যাটে কাঁদে?’

: হ্যাঁ, মা। আমি শিওর।

মা কিছুক্ষণ কিছু একটা ভাবলেন, তারপর বললেন, ‘কে কাঁদল না কাঁদল, সেটা নিয়ে আমাদের ভাবার কী আছে? তুই খবরদার ওসবে কান দিবি না।’

সেই রাতে কান্নার আওয়াজ আরও বেশি করে শুনতে পেল নিতু। এবার কান্নার সঙ্গে একটা পুরুষ কণ্ঠের ধমকও ভেসে এল। কিছুক্ষণ পর ধমকের সঙ্গে ঠাস ঠাস জাতীয় শব্দ! পুরুষ লোকটা কি মেয়েটাকে মারছে? অনেকক্ষণ জেগে থাকল নিতু।

২.

স্কুল থেকে ফেরার পথে পরমাকে কথাটা বলল নিতু। পরমা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলল, ‘যে কাঁদে তাঁকে ​গিয়ে জিজ্ঞেস করলেই পারিস, আসলে কী সমস্যা।’

: সেটার তো উপায় নেই। আমরা ওই বাসায় উঠেছি কেবল দুই সপ্তাহ হয়। এখনো পরিচয়ই হয়নি। গিয়ে দুম করে কি আর বলা যায়, আপনি রোজ রাতে কাঁদেন কেন?

: তা ঠিক। আন্টিকে বলেছিস? এসব বড়দের ব্যাপার, তাঁরাই ভালোভাবে হ্যান্ডেল করতে পারবেন।

: বলেছি। আম্মু বলেছে, পাশের বাসায় কী হচ্ছে, সেটা দেখতে গেলে ঝামেলা বরং বাড়বে।

: কথা তো ঠিকই।

নিতু মন খারাপ করে হাঁটতে লাগল। প্রতি রাতে কান্না শুনতে শুনতে ও নিজেই কেমন যন্ত্রণাবোধ করছে। ঠিক তখনই পরমা আবার রাস্তায় থেমে গিয়ে বলল, ‘একটা বুদ্ধি আছে!’

: কী বুদ্ধি?

: তুলি আপাকে তো চিনিস?

: হ্যাঁ, তোর কাজিন। কী হয়েছে?

: তুলি আপারা তো মেয়েদের নিয়েই কাজ করে। মেয়েদের ভালো-মন্দ সবকিছু।

: তো?

: তুলি আপাকে বললে সে নিশ্চয়ই একটা বুদ্ধি বের করে ফেলবে। যাবি নাকি ওর কাছে?

: বুদ্ধিটা খারাপ না। অন্তত যদি বোঝা যায়, কেন কাঁদে, তাতেও আপাতত চলবে।

৩.

তুলি আপাদের অফিসটা অদ্ভুত। একেবারে একটা বাসার মতো। সেখানে গিয়ে তুলি আপার কথা বলতেই নিতু আর পরমার জন্য গরম-গরম চা চলে এল। সেটা মুখে দিতে না দিতেই চলে এলেন তুলি আপা নিজেই। ওদের দেখে তো তিনি অবাক, ‘তোরা, কী মনে করে!’

নিতু সব ঘটনা খুলে বলতেই তুলি আপা গালে হাত দিয়ে কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘দেখ, বিষয়টা হয়তো নারী নির্যাতনের মধ্যেই পড়বে। কিন্তু ঘটনাটা তো আমরা দেখিনি। না দেখে এখানে কী করতে পারি, বল!’

নিতু হতাশ হওয়ার ভঙ্গি করে বলল, ‘তাহলে মেয়েটা প্রতি রাতে এভাবে কাঁদবে?’

: তা তো অবশ্যই না! তুই এক কাজ কর, তোর মাকে বলে কিছু একটা ছুতোয় ওই বাসার মেয়েটার সঙ্গে কথা বল। তারপর আমরা ব্যবস্থা নিতে পারব।

তুলি আপার সঙ্গে কথা বলে নিতু বাসায় চলে ​এল। ওরা থাকে চারতলায়। সিঁড়ি ভেঙে উঠতেই দেখে, পাশের ফ্ল্যাটের দরজা খুলে এক মহিলা বেরিয়ে এলেন। হাতে ময়লার প্যাকেট। নিশ্চয়ই এই ফ্ল্যাটের বুয়া। সুযোগটা কাজে লাগাল নিতু। মহিলাটাকে বলল, ‘আপনি কি এই বাসায় থাকেন?’

: হ, আফা। আপনারা নয়া আইছেন, না?

: হ্যাঁ, নতুন এসেছি। আচ্ছা, আপনাদের বাসায় কি ভূত আছে?

: ইয়া মাবুদ! কী কন আফা এই সব! দুর দুর! ভূত আইব কইত্তন!

: তাহলে প্রতি রাতে কান্নার আওয়াজ আসে কোত্থেকে?

ময়লার ঝুড়িটা রাখতে গিয়ে ক্ষণিকের জন্য থমকে গেলেন মহিলাটা। শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বললেন, ‘মাইনষের মইধ্যেই অনেক ভূত আছে গো আফা!’

: মানে?

: আপনি ছোড মানুষ, এত​ কিছু জাইনা কী করবেন!

: প্রতি রাতে কান্না শুনতে ভালো লাগে না। তাই জানতে চাই।

: এই কান্না থামব বইলা মনে লয় না গো!

: কেন?

: এই বাসার সায়েবে হাড়বজ্জাত। বউডারে প্রতি রাইতে মাইরধর করে।

৪.

তুলি আপা তাঁর অফিসের আরও দুজনকে নিয়ে নিতুদের পাশের ফ্ল্যাটে চলে গেলেন ঠিক সন্ধ্যায়। লোকটা তখন বাসায়। অফিস থেকে এসে টিভি দেখছিলেন। দরজায় তুলি আপাদের দেখে বললেন, ‘আপনারা? কাকে চাই?’

: আমরা এসেছি ‘প্রিয়তী ফাউন্ডেশন’ থেকে। আমরা নারীদের নিয়ে কাজ করি। একটা জরিপে এই এলাকার সব নারীর সঙ্গে কথা বলা দরকার। এই বাসায় নারী কেউ থাকেন?

প্রথম প্রথম গাঁইগুঁই করলেও শেষমেশ লোকটা তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার অনুমতি দিলেন। বসার ঘরে এলেন সেই মহিলা, যিনি প্রতি রাতে কাঁদেন। মহিলা বললে বোধ হয় ভুলই হবে, বয়স খুব বেশি নয়, কেবল এইচএসসি পাস করেছেন এমন বয়সী। তুলি আপারা তাঁকে নানা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে লাগলেন। একপর্যায়ে গিয়ে শুরু হলো তাঁর স্বামীর সম্পর্কে প্রশ্ন। আপনার স্বামী আপনাকে নির্যাতন করেন কি না, করলে কেন, আপনি কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন কি না…এ রকম আরও অনেক প্রশ্ন। কিন্তু এ-জাতীয় কোনো প্রশ্নের উত্তরেই তাঁর ওপর চালানো কোনো নির্যাতনের কথা বলতে পারলেন না তিনি! ভয়ে মুখটা শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে তাঁর। কিছুক্ষণ পরপর স্বামীর দিকে ভয়ার্ত মুখে তাকাচ্ছেন। তাঁর স্বামীর অবস্থাও অবশ্য দেখার মতো। ভয় পেয়ে তাঁর মুখটাও শুকিয়ে গেছে, বোঝাই যাচ্ছে।

উঠে আসার আগে তুলি আপা বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে বলে এলেন, ‘এই নিন আমাদের নম্বর, আপনি যদি কোনো ধরনের সমস্যায় পড়েন, আমাদের জানাবেন। আমরা আছি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আছে, মোটকথা, রাষ্ট্র আপনার পক্ষে আছে। কোনো কিছু মুখ বুজে সহ্য না করে খোলাখুলিভাবে সব জানাবেন।’

পাশ থেকে লোকটা বলে উঠলেন, ‘আরে আপা, এই সব কী বলেন! নির্যাতন হবে মানে! আমি কিছু করছি নাকি!’

: আপনি নির্যাতন করেন, সেটা তো বলিনি। আপাকে শুধু সচেতন করার কাজটুকু করলাম আমরা! আর জানেন তো, নারী নির্যাতনের বিচার হলে নির্যাতনকারীর কঠিন শাস্তি হবেই।

৫.

তুলি আপাদের বুদ্ধিটা কাজে দিয়েছিল। সেদিন রাত থেকে আর কান্নার শব্দ পায়নি নিতু। অনেক রাত পর শান্তিমতো ঘুমাতে পারছে ও। লোকটা হয়তো সত্যিই ভয় পেয়েছে! নিতু ঠিক করল, সকালে গিয়ে ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা বলে আসবে।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments