Friday, July 12, 2024
Homeবাণী-কথাবহুব্রীহি - হুমায়ূন আহমেদ

বহুব্রীহি – হুমায়ূন আহমেদ

Table of contents

০১. বিশাল দোতলা বাড়ি

উঁচু দেয়ালে ঘেরা পুরানো ধরনের বিশাল দোতলা বাড়ি। বাড়ির সামনে এবং পেছনে গাছগাছলিতে জঙ্গলের মত হয়ে আছে। কিছু কিছু গাছের গুড়ি কালো সিমেন্টে বাধানো। বাড়ির নাম নিরিবিলি, শ্বেত পাথরে গেটের উপর নাম লেখা, অবশ্যি র এর ফোঁটা মুছে গেছে। পাড়ার কোন দুষ্ট ছেলে হারিয়ে যাওয়া ফোঁটাটা বসিয়ে দিয়েছে ব এর উপর। এখন বাড়ির নাম নিবিরিলি।

সাধারণত যেসব বাড়ির নাম নিরিবিলি হয়, সেসব বাড়িতে সারাক্ষণই হৈ চৈ হতে থাকে। এই মুহুর্তে এ বাড়িতে অবশ্যি কোন হৈ চৈ হচ্ছে না। বাড়ির প্ৰধান ব্যক্তি সোবাহান সাহেবকে বারান্দার ইজি চেয়ারের পা মেলে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। তাঁর মুখ চিন্তাক্লিষ্ট। চোখে সুস্পষ্ট বিরক্তি।

সোবাহান সাহেব বছর দুই হল ওকালতি থেকে অবসর নিয়েছেন। কর্মহীন জীবনে এখনো অভ্যস্ত হতে পারেন নি। দিনের শুরুতেই তার মনে হয়। সারাটা দিন কিছুই করার নেই। তাঁর মেজাজ সেই কারণ ভোরবেলায় খুবই খারাপ থাকে। আজ অন্য দিনের চেয়েও বেশি খারাপ, কেন তা তিনি বুঝতে পারছেন না। শরৎকালের একটা চমৎকার সকাল। ঝকঝকে রোদ, বাতাসে শিউলি ফুলের গন্ধ। এ রকম একটা সকালে মন খারাপ থাকার প্রশ্নই আসে না।

সোবাহান সাহেবের গায়ে হলুদ রঙের একটা সুতির চাদর। গলায় বেগুনি রঙের মাফলার। আবহাওয়া বেশ গরম, তবু তিনি কেন যে মাফলার জড়িয়ে আছেন তা বোঝা যাচ্ছে না। তার হাতে একটা পেপার ব্যাক, ডিটেকটিভ গল্প। কাল রাতে বত্ৰিশ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়েছিলেন। গত একটা ঘণ্টা ধরে তেত্রিশ নম্বর পৃষ্ঠা পড়তে চেষ্টা করছেন, পারছেন না। বার বার ইচ্ছে করছে বই ছিড়ে কুটি কুটি করে ফেলে হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলতে। তেত্রিশ পৃষ্ঠায় নেইল কাটার দিয়ে খুঁচিয়ে মীথ নামে একটি লোকের বা চোখ তুলে নেবার বিষদ বর্ণনা আছে। সোবাহান সাহেব অবাক হয়ে পড়লেন— চোখ উপড়ে তুলে নেবার সময়ও মিঃ স্মীথ রসিকতা করছে এবং গুন গুন করে গাইছে–লন্ডন ব্রীজ ইজ ফলিং ডাউন।

কোন মানে হয়? যে লেখক এই বইটি লিখেছে সোবাহান সাহেবের ইচ্ছে করছে তার বা চোখটা নেইল কাটার দিয়ে তুলে ফেলতে।

সোবাহান সাহেবের ছোট মেয়ে মিলি চায়ের কাপ নিয়ে বারান্দায় ঢুকল। বাবার সামনের গোল টেবিলে কাপ নামিয়ে রাখতে রাখতে হাসিমুখে বলল, বাবা তোমার চা।

সোবাহান সাহেব থমথমে গলায় বললেন, কিসের চা?

চা পাতায় তৈরি চা, আবার কিসের?

এখন কেন?

তুমি সকাল আটটায় এক কাপ চা খাও এই জন্যে এখন। সকাল আটটা কিছুক্ষণ আগে বাজল?

সোবাহান সাহেব থমথমে গলায় বললেন, পিরিচে চা পড়ে আছে কেন? চা থাকবে চায়ের কাপে!

তাই আছে বাবা, পিরিচে এক ফোঁটা চা নেই। তুমি ভাল করে তাকিয়ে লেখ।

তিনি চায়ের কাপ হাতে নিলেন। মনে মনে ঠিক করলেন চা অতিরিক্ত মিষ্টি হলে বা মিষ্টি কম হলে মেয়েকে প্ৰচণ্ড ধমক দেবেন। কাউকে ধমকাতে ইচ্ছা! করছে। তিনি অত্যন্ত মনমরা হয়ে লক্ষ্য করলেন, চা-য়ে চিনি ঠিকই আছে। চা আনতে আনতে ঠাণ্ডাও হয় নি, যতটুকু গরম থাকার কথা ততটুকুই আছে, বেশিও না কমও না।

মিলি বলল, সব ঠিক আছে। বাবা?

তিনি জবাব দিলেন না। মিলি হালকা গলায় বলল, ভোরবেলা তোমার জন্যে চা আনতে যা ভয় লাগে। একটা না একটা খুঁত ধরে বিশ্ৰী করে বিকা দাও। বাবা, তোমার পাশে খানিকক্ষণ বসব?

সোবাহন সাহেব এই প্রশ্নেরও জবাব দিলেন না। মিলি, গোল-টেবিলের এক কোণায় বসল। তার বয়স একুশ। একুশ বছরের একটা আলাদা সৌন্দৰ্য আছে। সেই সৌন্দর্যে সে ঝলমল করছে। তার পরনে কমলা রঙের শাড়ি। শরৎকালের ভোরের সঙ্গে এই শাড়িটি চমৎকার মানিয়ে গেছে। মিলি হাসিমুখে বলল, এই গরমে গলায় মাফলার জড়িয়ে আছ কেন বাবা? দাও খুলে দেই।

সোবাহান সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, খোলার প্রয়োজন মনে করলে নিজেই খুলতাম। মাফলার খোলা খুব জটিল কোন বিষয় নয় যে দ্বিতীয় ব্যক্তির সাহায্য লাগবে।

মিলি হেসে ফেলল। হেসেই চট করে মুখ ঘুরিয়ে নিল, বাবা তার হাসি দেখতে গেলে রেগে যেতে পারেন। মিলি মুখের হাসি মুছে বাবার দিকে তাকাল। হাসি অবশ্যি পুরোপুরি গেল না— তার চোখে ঝিলমিল করতে লাগল। বাবা, রোজ ভোরে তুমি একটা ঝগড়া বাধাতে চাও কেন বলতো? ভোরবেলা তোমার ভয়ে আমি অস্থির হয়ে থাকি।

এই বলে মিলি আবার হেসে ফেলল। এখন তার হাসি দেখে মনে হল না। বাবার ভয়ে সে অস্থির। সোবাহান সাহেব কিছুই বললেন না। বই খুললেন, তেত্রিশ পৃষ্ঠাটা পড়ার একটা শেষ চেষ্টা করা যাক।

মিলি বলল, তুমি মোর্ডার ইন দা ডার্ক পড়ছ? অসাধারণ একটা বই–তাই না বাবা?

সোবাহান সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, অসাধারণ?

হ্যাঁ অসাধারণ, স্মীথ নামের একটা লোকের বা চোখ নেইল কাটার দিয়ে খুঁচিয়ে তুলে ফেলা হয়…

এটা অসাধারণ? লোকটার সাহস তুমি দেখবে না? লোকটা তখন গান গাইতে থাকেলন্ডন বীজ ইজ ফলিং ডাউন, ফলিং ডাউন….। তারপর কি হয় জান? এই অবস্থায় সে কোক করে একটা লাথি বসায় মাডারারটার পেটে। মার্ডারার এক মুহুর্তের জন্যে অন্যমনস্ক হতেই সে উপড়ে তোলা চোখটা ছিনিয়ে তিনতলার জানোলা দিয়ে নিচে লাফ দেয়। তার চোখ দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ছে। তীব্ৰ ব্যথায় সে দিশাহারা, তবু সে ছুটে যায় একটা হাসপাতালে, ডাক্তারকে হাসি মুখে বলে–ডাক্তার সাহেব। আপনি কি এই চোখটা জায়গামত বসিয়ে দিতে পারেন? যদি পারেন তাহলে আপনাকে আমি লন্ডন শহরের সবচেয়ে বড় গোলাপটি উপহার দেব। সৌভাগ্য ক্রমে সেই হাসপাতালে তখন ছিলেন ইউরোপের সবচেয়ে বড় আই সার্জন ডঃ এসিল নায়ার। তিনি— সোবাহান সাহেব থমথমে গলায় বললেন, সে লোকটার চোখ লাগিয়ে দিল?

হ্যাঁ, অপটিক নার্ভ গুলি জোড়া লাগিয়ে দিল—?

এই কুৎসিত বইটাকে তুই বলছিস অসাধারণ? বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী যে ইকনমিক্সে অনার্স পড়ছে সে এই বইকে বলছে অসাধারণ?

ইকনমিক্সে সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, বইটা আমার সামনে ছিঁড়ে কুটি কুটি কর।

কি বললে বাবা?

বইটা কুটি কুটি করে ছিড়ে ফেল, আমি দেখি।

মিলি আঁৎকে উঠে বলল, এই বই আমার না বাবা। আমার এক বান্ধবীর বই। আমি এক সপ্তার জন্যে ধারা এনেছি।

বই যারই হোক–নষ্ট করা দরকার। সমাজের মঙ্গলের জন্যেই দরকার। আমি এই বিষয়ে দ্বিতীয় কোন কথা শুনতে চাই না। আমি দেখতে চাই যে বইটা কুটি কুটি করে ফেলা হয়েছে।

আমার বইতো না বাবা। আমার বই হলে একটা কথা ছিল।

বললাম তো এই বিষয়ে আমি আর কোন আগুমেন্ট শুনতে চাই না। ডেস্ট্রয়।

মিলি বেশ কিছুক্ষণ। হতভম্ব ভঙ্গিতে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল, কেঁদে ফেলার চেষ্টা করল, কাঁদতে পারল না। কেঁদে ফেলতে পারলে বইটা রক্ষা করা যেত। সোবাহান সাহেব বললেন, কি ব্যাপার বসে আছিস যে? কি বলছি কানে যাচ্ছে না?

মিলি উঠে দাঁড়াল। বাবার কোল থেকে বই নিয়ে ছিড়ে কুচি কুচি করে ফেলল। এই সময় তার চোখে পানি এসে গেল। মিলি জানে চোখের পানি দেখা মাত্র তার বাবার মেজাজ ঠাণ্ডা হয়ে যায়। এখন ঠাণ্ডা হলেই বা লাভ কি? সর্বনাশ যা হবার তাতো হয়েই গেছে। ছেড়া বইতো আর জোড়া লাগবে না। মৌসুমীকে সে কি জবাব দেবে তাই ভেবে মিলির চোখ। আবার জলে ভরে উঠছে। সে ছেড়া বই চারদিকে ছড়িয়ে ছুটে ভেতরে চলে গেল। তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বারান্দায় ঢুকল ফরিদ।

ফরিদ, মিলির মামা। সাত বছর বয়স থেকে এই বাড়িতেই আছে। পাঁচ বছর আগে অঙ্কে অনার্স পাস করেছে। এম. এ. করেনি। কারণ তার ধারণা তাকে পড়াবার মত বিদ্যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নেই। এম. এ. পড়া মানে শুধু শুধু সময় নষ্ট। বর্তমানে তার দিন কাটছে ঘুমিয়ে। অল্প যে কিছু সময় সে জেগে থাকে সেই সময়টায় সে ছবি দেখে। অধিকাংশই আর্ট ফ্রিম। কোন কোন ছবি ছয় সাত বার করেও দেখা হয়। বাকি জীবনটা সে এই ভাবেই কাটিয়ে দিতে চায় কি-না জিজ্ঞেস করলে অত্যন্ত উচ্চ মার্গের একটা হাসি দেয়। সেই হাসি অতি মধুর, তবু কেন জানি সোবাহান সাহেবের গা জুলে যায়। ইদানীং ফরিদকে দেখা মাত্র তাঁর ব্ৰহ্মতালু গরম হয়ে উঠে, ঘাম হয়। আজও হল। তিনি তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। আগেকার আমলে মুনি ঋষিরা হয়ত এই দৃষ্টি দিয়েই দুষ্টদের ভস্ম করে দিতেন। ফরিদ তার দুলাভাইয়ের দৃষ্টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আকাশের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ কণ্ঠে বলল,

What a lovely day.

ফরিদের খালি গা। কাঁধে একটা টাওয়েল। মুখ ভর্তি টুথপেস্টের ফেনা। কথা বলতে গিয়ে ফেনা তার গায়ে পড়ে গেল এতে তার মুগ্ধ বিস্ময়ের হের ফের হল না। সে আনন্দিত স্বরে বলল, দুলাভাই শরৎকালের এই শোভার কোন তুলনা হয় না। অপূর্ব অপূর্ব! আমার মনটা দ্রবীভূত হয়ে যাচ্ছে দুলাভাই। I am dissolving in the nature.

সোবাহান সাহেব মেঘ গর্জন করলেন, ফরিদ এসব কি হচ্ছে আমি জানতে পারি?

নেচারকে এপ্রিসিয়েট করছি দুলাভাই। নেচারকে এপ্রিসিয়েট করায় নিশ্চয়ই কোন বাধা নেই।

টুথপেস্টের ফেনায় সারা গা মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে সেই খেয়াল আছে?

তাতে কিছু যায় আসে না দুলাভাই।

যায় আসে না?

না।

খালি গায়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছ, রাস্তায় লোকজন চলাচল করছে তাতেও তোমার অসুবিধা হচ্ছে না?

জ্বি না। পোশাক হচ্ছে একটা বাহুল্য।

পোশাক একটা বাহুল্য?

জি। আমি যখন খালি গা থাকি তখন প্রকৃতির কাছাকাছি থাকি। কারণ প্রকৃতি যখন আমাদের পাঠান তখন খালি গায়েই পাঠায়। এই যে আপনি জাব্বা জোব্বা পরে বসে আছেন এসব খুলে পুরো দিগম্বর হয়ে যান দেখবেন অন্য রকম ফিলিংস আসবে।

স্তম্ভিত সোবাহান সাহেব বললেন, তুমি আমাকে সব কাপড় খুলে ফেলতে বলছ?

জ্বি বলছি।

সোবাহান সাহেব লক্ষ্য করলেন তাঁর ব্ৰহ্মতালুতে জুলুনি শুরু হয়েছে, গা ঘামছে। এসব হার্ট এ্যাটাকের পূর্ব লক্ষণ কিনা কে জানে। তাঁর মৃত্যু হার্ট এ্যাটাকে হবে একটা তিনি বুঝতে পারছেন, ফরিদের কারণেই হবে। কত অবলীলায় কথাগুলো বলে কেমন হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

ফরিদ বলল, আপনি চোেখ মুখ এমন শক্ত করে বসে আছেন কেন দুলাভাই? আনন্দ করুন।

আনন্দ করব?

হ্যাঁ করবেন। জীবনের মূল জিনিসই হচ্ছে আনন্দ। এমন চমৎকার একটা সকাল। আচ্ছা দুলাভাই রবি ঠাকুরের ঐ গানটার কথাগুলো আপনার মনে আছে–আজি এ শারদ প্ৰভাতে–মনে আছে? প্রথম লাইনটা কি–আজি এ শারদ প্ৰভাতে, না-কি হেরিনু শারদ প্ৰভাতে?

সোবাহান সাহেব বললেন, তুমি দয়া করে আমার সামনে আসবে না।

ফরিদ বিস্মিত হয়ে বলল, কেন?

আবার কথা বলে, যাও বলছি আমার সামনে থেকে। বহিষ্কার, বহিষ্কার।

কি যন্ত্রণা আবার সাধু ভাষা ধরলেন কেন? বহিষ্কার আবার কি? বলুন বেড়িয়ে যাও। মুখের ভাষাকে আমাদের সহজ করতে হবে। দুলাভাই, তৎসম শব্দ যত কম ব্যবহার করা যায় ততাই ভাল।

যাও বলছি আমার সামনে থেকে। যাও বলছি।

যাচ্ছি। যাচ্ছি। বিনা কারণে আপনি এ রকম রেগে যান কেন এই ব্যাপারটাই আমি বুঝি না।

ফরিদ চিন্তিত মুখে ঘরের ভেতর ঢুকল। সোবাহান সাহেবের স্ত্রী তার কিছুক্ষণ পর বারান্দায় এসে বললেন, তুমি কি মিলিকে কিছু বলেছ? ও কাঁদছে কেন?

সোবাহান সাহেবের মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল, একুশ বছর বয়েসী। একটা মেয়ে যদি কথায় কথায় কেঁদে ফেলে তাহলে বুঝতে হবে দেশের নারী সমাজের চরম দুদিন যাচ্ছে।

কথা বলছি না কেন, কিছু বলেছ মিলিকে? মেয়ে বড় হয়েছে এখন যদি রাগারগি কর।

সোবাহান সাহেব শীতল গলায় বললেন, মিনু তোমাকে এখন একটা কঠিন কথা বলব, মন দিয়ে শোন— আমি তোমাদের সংসারে আর থাকব না।

তার মানে, কোথায় যাবে তুমি?

সেটা এখনো ঠিক করিনি। আজ দিনের মধ্যে ঠিক করব।

মিনু দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। সোবাহান সাহেব বললেন, একটা অপ্রিয় ডিসিসান নিলাম। বাধ্য হয়েই নিলাম।

বনে জঙ্গলে গিয়ে সাধু সন্ন্যাসী হবে?

এই বিষয়ে তোমার সঙ্গে কোন কথা বলতে চাই না।

সোবাহান সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। মিনু বললেন, যাচ্ছ কোথায়?

তিনি এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না। অতি দ্রুত গেট খুলে বাইরে গিয়ে দাঁড়ালেন। তার বাড়ির সামনের রাস্তার ওপাশেই এখন একটা মাইক ভাড়ার দোকান হয়েছে। সারাক্ষণ সেখানে থেকে হ্যালো মাইক্রোফোন টেস্টিং ওয়ান-টু–খ্ৰী। হ্যালো মাইক্রোফোন টেস্টিং ওয়ান-টু–গ্ৰী হয়। এখন হচ্ছে না। এখন তারা একটা রেকর্ড বাজাচ্ছে হাওয়া সে উড়তা যারে মেরা লাল দু পাট্টা মলমল। এই লক্ষ কোটি বার শোনা গান শুনে মেজাজ আরো খারাপ হবার কথা, তা হল না। সোবাহান সাহেব লক্ষ্য করলেন–গানটা শুনতে তাঁর ভাল লাগছে। তিনি এর কারণ বুঝতে পারলেন না। তিনি আকাশের দিকে তাকালেন, আকাশ ঘন নীল, নীল আকাশে সাদা মেঘের স্তূপ। আকাশ এবং মেঘ দেখতেও তার ভাল লাগল। তাঁর মনে হল— মানব জীবন বড়ই মধুর। এই জীবনের আনন্দ হেলা ফেলার বিষয় নয়।

০২. মানব জীবন বড়ই মধুর

মানব জীবন বড়ই মধুর এই কথা সবার জন্যে সম্ভবত প্ৰযোজ্য নয়। গ্ৰীন ফার্মেসীর নতুন ডাক্তার মনসুর আহমেদের জন্যে তো অবশ্যই নয়। তার কাছে মনে হচ্ছে–মানব জীবন অর্থহীন যন্ত্রণা ছাড়া আর কিছুই নয়। এই রকম মনে করার আপাত দৃষ্টিতে তেমন কোন কারণ নেই। সে মাত্র ছয়মাস আগেই ইন্টার্নশীপ শেষ করে বের হয়েছে। এর মধ্যেই ভোলা উপজেলায় স্বাস্থ্যু কমপ্লেক্সে একটা চাকরিও পেয়েছে। ঢাকা ছেড়ে যাবার ইচ্ছা নেই বলে ঐ চাকরি সে নেয়নি। আপাতত সে গ্রীন ফার্মেসীতে বসছে। গ্রীন ফার্মেসীর মালিক কুদ্দুস সাহেব তাকে ফার্মেসীর উপরে দুটি ঘর ছেড়ে দিয়েছেন। মনসুর ঐ ঘর দুটিতে সংসার পেতে বসেছে। প্রতিদিন কিছু রুগী টুগীও পাচ্ছে। বড় কিছু নাসর্দি জ্বর, কাশি, ডায়রিয়া। একদিন অল্পবয়সী একটা মেয়েকে নিয়ে মেয়ের মা এসেছিলেন, চেংড়া ডাক্তার দেখে মেয়ের অসুখ প্রসঙ্গে কিছু বললেন না। গম্ভীর গলায় বললেন, না থাক আপনাকে দেখতে হবে না। আমার দরকার একজন বয়স্ক ডাক্তার। আপনি তো নিতান্তই বাচ্চা ছেলে।

কুদ্দুস সাহেব বললেন, ডাক্তারদের কোন বয়স নেই। আপা। ডাক্তার হচ্ছে ডাক্তার। আর এর বয়স কম হলে কি হবে জাত-সাপ।

জাত সাপের প্রতি রুগী বা রুগীনির মা কারোরই কোন আগ্রহ দেখা গেল না। রুগীনি বলল, আমি উনাকে কিছু বলব না মা।

এ রকম দু একটা কেইস বাদ দিলে রুগী যে খুব খারাপ হচ্ছে তাও না। ভিজিটের টাকা চাইতে মনসুরের লজ্জা করে। ঐ দায়িত্ব কুদ্দুস সাহেব খুব ভাল ভাবেই পালন করছেন।

দশ টাকা কি দিচ্ছেন ভাই? উনার ভিজিক কুড়ি টাকা। বয়স কম বলে অশ্রদ্ধা করবেন না–গোল্ড মেডালিস্ট।

মনসুর বিব্রত গলায় বলেছে, কুদ্দুস ভাই, সব সময় গোল্ড মেডেলের কথা বলেন। কোন মেডেল ফেডেল তো আমি পাই নি।

কুদ্দুস সাহেব নির্বিকার ভঙ্গিতে বলেছেন, পাওয়ার দরকার নেই। মানুষের মুখেই জয়। মানুষের মুখেই ক্ষয়। মুখে মুখে মেডেলের কথাটা রটে যাক। সুটকেস খুলে কেউতো আর মেডেল দেখতে আসবে না।

এসব মিথ্যা কথা বলে। লাভ কি?

নাম ফাটবেরে ভাই নাম ফাটবে। তোমার নাম ফাটা মানে ফার্মেসীর উন্নতি। ফার্মেসীর উপর বেঁচে আছি। ফর্মেসীর উন্নতি দেখতে হবে না?

কুদ্দুস সাহেবের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। তিনি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ফার্মেসীতে বসে থাকেন। সারাক্ষণ কথা বলেন। মানুষটাকে মনসুরের বেশ ভাল লাগে। তাঁর বকবকানি এবং উপদেশ শুনতেও মনসুরের খারাপ লাগে না।

তোমার সবই ভাল বুঝলে ডাক্তার, তবে তোমার একটা বড় সমস্যা কি জান? তোমার কোন উচ্চাশা নেই।

সেটা সমস্যা হবে কেন?

এইটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। দু ধরনের মানুষের উচ্চাশা থাকে না, মহাপুরুষদের এবং বেকুবদের। তুমি এই দুদলের কোন দলে সেটা বুঝতে পারছি না। সম্ভবত দ্বিতীয় দলে।

আমাকে নিয়ে ভাবার দরকার নেই।

দরকার থাকবে না কেন, অবশ্যই আছে। এ রকম ইয়াং একজন ছেলেগোল্ড মেডালিস্ট, অথচ তার কোন উচ্চাশা নেই—

কি মুশকিল গোল্ড মেডেলের কথা আবার বলছেন?

ঐ একই হল। পেতেও তো পারতে। আমি যা বলছি তার সারমর্ম হচ্ছেসুযোগ খুঁজতে হবে। বিলেত আমেরিকা যেতে হবে, এফ আর সি এস, এম আর সি পি হয়ে এসে রুগীদের গলা কেটে পয়সা করতে হবে। আলিশান দালান তুলতে হবে—

আমার এত সব দরকার নেই। আমি সুখেই আছি।

সুখে আছ?

হ্যাঁ সুখে।

মনসুর আসলেই সুখে আছে। তার উপর সংসারের দায়-দায়িত্ব কিছু নেই। তার বাবা ময়মনসিংহ শহরে ওকালতি করেন। দেশের বাড়ির অবস্থা মন্দ নয়। ময়মনসিংহের এত বড় বাড়িতে মানুষ বলতে বাবা-মা এবং ছোট বোন নীলিমা। মনসুরকে টাকা রোজগার করে সংসার চালানোর দায়িত্ব নিতে হচ্ছে না। উল্টা প্রতিমাসে মনসুরের বাবা এক হাজার করে টাকা পাঠিয়ে ছোট একটি চিঠি লিখেন। প্রতিটি চিঠির ভাষা এবং বক্তব্য এক।

বাবা মনু,

টাকা পাঠালাম। শরীরের যত্ন নেবে। তুমি ঢাকা শহরে কেন পড়ে আছ তা বুঝতে পারছি না। তোমার নিজের শহরে প্র্যাকটিস করতে অসুবিধা কি? একটা ভাল জায়গায় তোমার জন্য চেম্বার করে দেবার সামর্থ পরম করুণাময় আল্লাহতালা আমাকে দিয়েছেন পত্রপাঠ মন স্থির করে আমাকে জানাবে।

–ইতি তোমার আকবা।

পুনশ্চ ১ : আরো টাকার দরকার হলে লিখবে। এই নিয়ে সংকোচ করবে না। টাকা-পয়সা তোমাদের জন্যেই।

পুনশ্চ ২ : তোমার মার ইচ্ছা তোমার একটা বিবাহ দেন। ব্যাপারটা ভেবে দেখা। তোমার এখন পচিশ চলছে। আমি চব্বিশ বছর বয়সে তোমার মাকে বিবাহ করি। বিবাহের জন্যে এটাই উপযুক্ত বয়সী।

পুনশ্চ ৩ : তোমার নিজের কোন পছন্দ থাকলে আমাদের কোনই আপত্তি নাই, এটা তোমাকে বলে রাখলাম।

বাবার চিঠির সঙ্গে মার চিঠি থাকে। সেই চিঠিতে নানান অবান্তর কথার সঙ্গে একটি মেয়ের কথা থাকে। পুরো চিঠি জুড়ে থাকে সেই মেয়ের রূপ এবং গুণের বর্ণনা এবং সেই রূপবতী এবং গুণবতীর কয়েকটি রঙ্গীন ছবি।

গত সপ্তাহের চিঠিতে যে মেয়ের কথা ছিল তার নাম রূপা।

মনসুরের মা লিখেছেন—

বাবা মনু, এই মেয়েটির দিকে একবার তাকাইলে চোখ ফিরাইতে ইচ্ছা! করে না। বড়ই রূপবতী মেয়ে। আচার ব্যবহারেও চমৎকার। এই সবই হয়েছে বংশের গুণ। মেয়ের মাতুল বংশ খুবই উচ্চ। নান্দাইল রোডের সরদার পরিবার। এক ডাকে সবাই চিনে। মেয়ে মমিনুন্নেসা কলেজে বি এ ফাস্ট ইয়ারে পড়ে। মেট্রিক ফাস্ট ডিভিসন এবং জেনারেল অংকে লেটার পেয়েছিল। অসুখ নিয়ে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেয়ার ফল বেশি ভাল হয় নাই। মেয়ে খুব ভাল গান গায়। কলেজের সব ফাংশনে নজরুল গীতি গায় এবং খুব প্রশংসা পায়। মেয়ের তিনটি ছবি পাঠালাম। তোমার পছন্দ হলে আরো কথাবার্তা বলব।

চিঠির সঙ্গে খুব সেজেগুজে তোলা তিনটা ছবি। একটা ছবিতে সে টেলিফোন তুলে কার সঙ্গে কথা বলছে। একটায় অবাক বিস্ময়ে পৃথিবীর দিকে অর্থাৎ ক্যামেরার লেন্সের দিকে তাকিয়ে আছে। অন্য ছবিটা ফুলের বাগানে তোলা। আউট অব ফোকাস হওয়ায় মেয়েটাকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না, ফুলগুলো বড় সুন্দর এসেছে।

এসব চিঠি এবং চিঠির সঙ্গে ছবি পেতে মনসুরের মন্দ লাগে না। ভালই লাগে। কোন এক লজাবনত তরুণীর সঙ্গে তার বিয়ে হচ্ছে এই কল্পনাও তার কাছে মধুর বলে মনে হয়।

গ্ৰীন ফার্মেসীর জীবন এবং তার সঙ্গে মধুর কিছু কল্পনায় তার সময় ভােলই কাটছিল। একটা মেয়ে হঠাৎ করে এসে সব এলোমেলো করে দিল। ঐ মেয়েটার কারণে কদিন ধরেই মনসুরের মনে হচ্ছে–মানব জীবন একটা যন্ত্রণা বিশেষ। তার রাত্রে ভাল ঘুম হচ্ছে না। হজমের অসুবিধা হচ্ছে। ঘটনাটা এ রকম

গত বুধবারে খুব মেঘলা ছিল। দুপুরে টিপটপ করে বৃষ্টি শুরু হল। কুদ্দুস সাহেব ভাত খেতে গেছেন। দোকানের এক কর্মচারী মজনু বলল, স্যার আপনি একটু বসেন আমি লাস্ত্রী থেকে কাপড় নিয়ে আসি। মনসুর বলল, যাও আমি আছি। মজনু চলে যাবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটি মেয়ে এসে ঢুকল। পরণে সাধারণ নীল রঙের একটা শাড়ি। মাথার চুল খোপা করা। খোপা ভাল করে করা হয়নি–চুল এলোমেলো হয়ে আছে। মেয়েটির দিকে তাকিয়েই মনসুরের কেমন যেন লাগতে লাগল। এমন সুন্দর মানুষ এই পৃথিবীতে আছে? ছেলেবেলার রূপকথার বইয়ে যেসব বন্দিনী রাজকন্যার ছবি থাকে এই মেয়ে তার চেয়েও লক্ষ গুণ সুন্দর। কেমন মায়া মায়া চোখ, সমস্ত চেহারায় কি অদ্ভুত একটা স্নিগ্ধ ভাব। মেয়েটা এত সুন্দর যে তার দিকে তাকাতে পর্যন্ত মনসুরের কষ্ট হচ্ছে।

মেয়েটা নরম স্বরে বলল, আপনাদের কাছে স্যাভলনি বা ডেটল জাতীয় কিছু আছে?

মনসুর কাঁপা গলায় বলল, জ্বি আছে।

মাঝারি সাইজের একটা ফাইল দিন।

এক্ষুণি দিচ্ছি। আপনি বসুন। ঐ চেয়ারটায় বসুন।

মেয়েটি বিস্মিত গলায় বলল, বসতে হবে কেন? জিনিসটা দিন চলে যাই। দাম কত?

মনসুর কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, দাম লাগবে না।

মেয়েটি আরো অবাক হয়ে বলল, দাম লাগবে না কেন?

না মানে কোম্পানি থেকে আমরা অনেক স্যাম্পল ফাইল পাইতো–এটা হচ্ছে একটা স্যাম্পল ফাইল।

মেয়েটি বিরক্ত গলায় বলল, স্যাম্পল ফাইল আমাকে দেবার দরকার নেই। অন্য কাউকে দেবেন। দাম কত বলুন?

দামতো আমি জানি না।

দাম জানেন না মেন?

আমাদের কর্মচারি লন্ড্রীতে গেছে। ও সব জানে। এক্ষুণি এসে পড়বে।

আপনি তাহলে কে?

আমি ডাক্তার। মানে এই ফার্মেসীতে বসি। সকাল বিকাল দুবেলাই থাকি। আপনি ঐ চেয়ারটায় বসুন।

বসতে পারব না। আমার তাড়া আছে। আমার মা বটিতে হাত কেটে ফেলেছেন। হাতে ডেটল দিতে হবে।

মনসুর অসম্ভব ব্যস্ত হয়ে বলল, চলুন যাই ড্রেস করে দিয়ে আসি। কাটা ছেড়া ছোট হলেও একে অবহেলা করা ঠিক না। সেপটিকে হয়ে যেতে পারে।

মেয়েটি খুবই অবাক হল। কেমন যেন অদ্ভুত চোখে তাকাতে লাগল। শান্ত গলায় বলল, মার হাতের কাটা এমন কিছু না।

মজনু এই সময় ফিরে এল। মেয়েটা টাকা দিয়ে স্যাভলনের শিশি হাতে নিয়ে চলে গেল। মনসুরের সারাটা দিন আর কোন কাজে মন বসল না। আশ্চর্যের ব্যাপার সেই রাতে সে ঘুমাতে পারল না। একটা মেয়েকে একবার দেখে কারোর এমন হয়?

দ্বিতীয় দিনে মেয়েটির সঙ্গে আবার দেখা। বই খাতা নিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছিল। ভাগ্যিস ঠিক সেই সময়ে মনসুর বের হয়েছিল সিগারেট কিনতে। মনসুর জীবনে যা কোনদিন করেনি। তাই করল, এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনার মা ভাল আছেন?

মেয়েটি বিস্মিত হয়ে বলল, আমাকে বলছেন?

মনসুর থাতমত খেলে বলল, জি।

আপনাকে তো আমি চিনতে পারছি না।

আমি গ্রীন ফার্মেসীতে বসি। ডাক্তার। আপনি এক বোতল স্যাভলন। কিনে নিয়ে গেলেন। আপনার মার হাত কেটে গিয়েছিল।

ও আচ্ছা মনে পড়েছে। মা ভাল আছেন। আমি এখন যাই, কেমন?

মেয়েটি তাকে চিনতে পারল না। এই দুঃখে দ্বিতীয় রাতেও মনসুরের ঘুম এল না। দুটা সিডাকসিন খেয়েও সে সারা রাত জেগে কাটাল। মেয়েটির সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য সে এখন জানে। তার নাম মিলি। ভাল নাম ইয়াসমীন। ইকনমিক্সে অনার্স পড়ে–সেকেন্ড ইয়ার। যে বাড়িতে থাকে। সে বাড়ির নাম নিরিবিলি। বাড়ির গেটে একটা সাইবোর্ড ঝুলে, সেখানে লেখা–কুকুর হইতে সাবধান। যদিও সে বাড়িতে কুকুর নেই। মেয়েটি বিকেলে বাড়ির ছাদে একা হাঁটাহাঁটি করে। সে ইউনিভার্সিটিতে যায় সকাল আটটায়। রাস্তার মোড় পর্যন্ত হেঁটে যায়। তারপর রিকশা নেয়। রিকশার হুড তুলে না। সব সময় শাড়ি পরে। মেয়েটার নিশ্চয়ই অনেক শাড়ি। এখন পর্যন্ত এক শাড়ি দুবার পরতে মনুসর দেখেনি। মেয়েটি ফ্ল্যাট স্যান্ডেল পরে। অবশ্যি সে বেশ লম্বা, হিল পরবার তার প্রয়োজন নেই।

মেয়েটি তাকে চিনতে পারে কি-না এটা পরীক্ষা করবার জন্যে আজ সকালে সে মেয়েটার ইউনিভার্সিটিতে যাবার সময় সামনাসামনি পরে গেল। মেয়েটি চোখ তুলে তাকে দেখল। মনসুর কাঁপা গলায় বলল, ভাল আছেন?

মেয়েটি অবাক হয়ে বলল, আমাকে বলছেন?

মেয়েটির চোখে অপরিচিতের দৃষ্টি। লজ্জায় এবং দুঃখে মনসুরের চোখে প্রায় পানি এসে গেল। আর তখন মেয়েটি বলল, ও আচ্ছা। আপনি গ্ৰীন ফার্মেসীর ডাক্তার সাহেব। জি আমি ভাল।

মনসুর হড়বড় করে বলল, আপনার মায়ের সেই কাটাটা কি সেরেছে?

মেয়েটি এই প্রশ্নে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। তারপর আর কোন কথা না বলে রিকশায় উঠে গেল। রাগে এবং লজ্জায় মনসুরের ইচ্ছা করল। লাইট পোষ্টে নিজের মাথা সজোরে ঠুকে দেয়। কেন সে বোকার মত তার মার হাত কাটার কথা জিজ্ঞেস করল? মেয়েটি নিশ্চয়ই তার বোকামী নিয়ে মনে মনে হাসছে। কে জানে বাড়িতে গিয়ে তার মাকেও হয়ত বলবে। কি লজ্জা। কি লজ্জা।

কুদ্দুস সাহেব বললেন, তোমার কি হয়েছে মনসুর বল তো।

কিছু হয়নি।

কিছু হয়নি বললে তো আমি বিশ্বাস করব না। কিছু একটা হয়েছে তো বটেই–রাতে ঘুম হয়?

ঘুমের একটু অসুবিধা হচ্ছে?

বদ হজমও হচ্ছে তাই না?

জ্বি।

মনে হচ্ছে পৃথিবীটা খুব খারাপ জায়গা—ঠিক না?

জ্বি।

সবই খুব পরিচিত লক্ষণ। আমি যখন ইন্টারমিডিয়েট পড়ি তখন আমার মধ্যে এসব লক্ষণ প্ৰকাশ পেয়েছিল। এটা একটা জীবাণু ঘটিত অসুখ।

হ্যাঁ জীবাণু ঘটিত। এ সব জীবাণুর উৎপত্তি হয় কেন এক সুন্দরী তরুণীর চোখে। জীবাণুর নাম হচ্ছে প্ৰেম-জীবাণু। ইংরেজিতে বলে Love bug, ঠাট্টা করছি না ভাই, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। জীবাণুর প্রথম আক্রমণে নার্ভাস সিস্টেম উইক হয়ে যায়। তারপর লিভার ক্ষতিগ্ৰস্ত হয়।

কি সে বলেন।

সত্যি কথা বলছি রে ভাই। খুবই সত্যি কথা— এখন বল মেয়েটা কে?

কেউ না।

সোবাহান সাহেবের মেয়ে মিলি নাতো?

মনসুরের চোখ মুখ লাল হয়ে গেল। কুদ্দুস সাহেব বললেন, আগেই সন্দেহ হয়েছিল এখন তোমাকে দেখে পুরোপুরি নিশ্চিত হলাম। তোমার অবস্থাতো দেখি কাহিল।

মনসুর ক্ষীণ স্বরে বলল, আপনি যা ভাবছেন তা না।

আমি কিছুই ভাবছি না। ভাবাভাবির ফাঁক তুমি রাখনি। এখন আমার উপদেশ শোন, সহজ পাচ্য খাবার খাবে। বেশি করে ডাবের পানি খাবে। সকাল বিকাল লাইট একসারসাইজ। প্ৰেম জীবাণুঘটিত অসুখের কোন চিকিৎসা নেই। জীবাণুগুলো ভাইরাস টাইপ, কোন ওষুধেই কাজ করে না। সময়ে রোগ সারে। টাইম ইজ দ্যা বেষ্ট হিলার। সতীনাথের বিরহের গানগুলো শুনতে পোর। এতেও অনেক সময় আরাম হয়— ঐ যে আমি এধারে তুমি ওধারে, মাঝে নদী কুলকুল বয়ে যায়। টাইপ গান।

ঠাট্টা করবেন না কুদ্দুস ভাই। ঠাট্টা তামাশা ভাল লাগে না।

ঠিক বলেছি, এই সময় ঠাট্টাটা অসহ্য লাগে। কেউ ঠাট্টা করলে ইচ্ছা করে টান দিয়ে জিভ ছিড়ে ফেলি। রোগের কঠিন সংক্রমণের সময় এটা হয়। অল্পতেই নাৰ্ভ ইরিটেটেড হয়।

মনসুর ক্ষীণ স্বরে বলল, আমাকে কি করতে বলেন?

কিছুই করতে বলি না। মিলি অল্প বয়েসী মেয়ে হলে চিঠি লিখতে বলতাম—–এর সেই ষ্টেজ পার হয়ে এসেছে। চিঠি লিখলে সবাই সেই চিঠি পড়ে শুনাবে এবং হাসােহাসি করবে। তুমি যদি আগবাড়িয়ে কথা বলতে চাও, তোমাকে ভাববে ভ্যাবলা। এক মনে আল্লাহকে ডাকা ছাড়া তো আমি আর কোন পথ দেখি না। যাকে বলে আধ্যাত্মিক চেষ্টা। মাঝে মাঝে এই চেষ্টায় কাজ হয়। দৈব সহায় হয়। হঠাৎ হাতে দেখবে মেয়েটা রিকসা এ্যাকসিডেন্ট করেছে। ধরাধরি করে তাকে এইখানে আনা হল। তুমি ফাস্ট এইড দিলে। দেখা গেল অবস্থা সুবিধার না। তুমিই তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে। মেয়েটাকে ব্লাড দিতে হবে। ব্লাড গ্রুপ এ পজেটিভ। দেখা গেল তোমারও তাই। তুমি ব্লাড দিলে। মেয়েটি করুণ গলায় বললে, আপনি আমার জন্যে অনেক করলেন। আপনাকে ধন্যবাদ। তুমি গাঢ় গলায় বললে, ধন্যবাদ পরে হবে। আগে সুস্থ হয়ে উঠ।

মনসুর বলল, চুপ করুনতো কুদ্দুস সাহেব, আপনার কথা শুনতে ভাল व्लां96छ না।

কুদ্দুস সাহেব বললেন, সেটা তোমার মুখ দেখেই বুঝতে পারছি। করব কি বল, কথা বলা হয়ে গেছে। অভ্যাস। তোমার অবস্থা দেখে খারাপও লাগছে। আল্লাহর উপর ভরসা রাখা। তাতে যদি কিছু হয়।

কিছু হল না। প্রেমের ক্ষেত্রে দৈব কখনোই সহায় হয় না। গল্পে, সিনেমায় হয়। জীবনটা গল্প সিনেমা নয়। জীবনের নায়িকারা, নায়কদের সঙ্গে রাস্তায় দেখা হলেও চিনতে পারে না। স্যাভলনের শিশি। কিনতে একবারই ফার্মেসীতে আসে। দ্বিতীয়বার আসে না। গল্পে উপন্যাসে নায়িকারা ঘন ঘন অসুখে পড়ে। ডাক্তার নায়ক তখন চিকিৎসা করে তাকে সারিয়ে তুলে। বাস্তবের নায়িকাদের কখনো কোন অসুখ হয় না, আর হলেও অন্য ডাক্তাররা তার চিকিৎসা করেন।

অবশ্যি মনসুরের বেলায় দৈব সহায় হল। শরৎকালের এক সন্ধ্যায় তার ডাক পড়ল নিরিবিলিতে। সোবাহান সাহেবের প্রেসার মাপতে হবে। তাঁর প্রেসার হাই হয়েছে। মাথা ঘুরছে। ব্লাড প্রেসার নামক ব্যাধিটির উপর, কৃতজ্ঞতায় মনসুরের মন ভরে গেল। বারান্দায় মিলি দাঁড়িয়েছিল। এও এক অকল্পনীয় সৌভাগ্য। বারান্দায় সে নাও থাকতে পারত। মিলির সঙ্গে দেখা না হলেও কিছু করার ছিল না। মিলির জন্যে তো আর তাকে ডাকা হয়নি। মিলি বলল, স্লামালিকুম।

ওয়ালাইকুম সালাম।

আপনার জন্যে দাঁড়িয়ে আছি।

মনসুর হতভম্ব। বলে কি এই মেয়ে। এই কথাগুলো কি সত্যি সত্যি বলছে না মনসুর কল্পনা করছে? কল্পনা হওয়াই সম্ভব। নিশ্চয়ই কল্পনা। হেলসিনেশন।

আপনাকে বলেছে বোধ হয়। বাবার ব্লাড প্রেসার মাপার জন্যে আপনাকে খবর দেখা হয়েছে।

জ্বি বলেছে।

আপনার সঙ্গে একটা গোপন ষড়যন্ত্র করার জন্যে আমি দাঁড়িয়ে আছি।

জ্বি বলুন। আপনি যা বলবেন তাই হবে।

যদি দেখেন বাবার প্রেসার খুব হাই না। তবু বলবেন হাই। বাবার রেস্টের দরকার। ভয় না দেখালে তিনি রেস্ট নেবেন না। আপনি মিথ্যা করে বলতে পারবে না?

জ্বি না।

মিলির দৃষ্টি তীব্ৰ হল। মনসুর বলল, আমি মিথ্যা বলতে পারি না।

মিথ্যা বলতে পারেন না?

জ্বি না।

ও আচ্ছা, আমার জানা ছিল না। আপনাকে দেখে আর দশটা সাধারণ মানুষের মতাই মনে হয়েছিল, যারা প্রয়োজনে কিছু মিথ্যা-টিথ্যাও বলতে পারে। আপনি যে অসাধারণ তা বুঝতে পারি নি।

আপনি কি রাগ করলেন?

কথায় কথায় রাগ করা আমার স্বভাব না। আসুন, দোতলায় যেতে হবে। বাবা দোতলায়। সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় ওঠার পর মনসুর নার্ভাস ভঙ্গিতে বলল, একটা ভুল হয়ে গেছে।

কি ভুল?

প্রেসার মাপার যন্ত্র ফেলে এসেছি।

সেকি, প্রেসার মাপার জন্যেইতো আপনাকে ডাকা হয়েছে–সেই জিনিসই আপনি ফেলে এসেছেন? আপনি মানুষ হিসেবে শুধু যে অসাধারণ তাই না, মনে হচ্ছে খুব ভুলো মন।

আমি এক দৌড়ে নিয়ে আসব। যাব। আর আসব।

আপনাকে যেতে হবে না। আমি কাদেরকে পাঠাচ্ছি, ও নিয়ে আসবে।

না না। আমিই যাই। এক মিনিট।

মনসুর অতি দ্রুত সিঁড়ি টপকাচ্ছে। সেই দ্রুত সিঁড়ি ভাঙা দেখে মিলির মনে হল–একটা একসিডেন্ট হতে যাচ্ছে, হবেই হবে। না হয়েই যায় না। আর তখনি হুড়মুড় শব্দ হল। ডাক্তার সাহেব মাঝ সিড়ি থেকে বলের মত গড়িয়ে নিচে নামতে লাগলেন। শব্দ শুনে সোবাহান সাহেব এবং মিনু বেরিয়ে এলেন, ফরিদ বেরিয়ে এল, বাসার কাজের ছেলে কাদের ছুটে এল।

সোবাহান সাহেব বললেন, এ কে?

মিলি বলল, ডাক্তার সাহেব। তোমার প্রেসার মাপতে এসেছেন।

প্রেসার মাপতে এসে মাটিতে শুয়ে থাকার কারণ কি?

পা পিছলে পড়ে গেছেন বাবা।

পা পিছলে পড়েছে টেনে তুলবি না? হা করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?

মিলিকে টেনে তুলতে হল না, মনসুর নিজেই উঠল। সার্টের ধূলা ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, একদম ব্যথা পাইনি। সত্যি বলছি।

তার চারপাশের লোকজন মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগল। সোবাহান সাহেব কি একটা বলতে গিয়েও বললেন না। মনসুর বলল, এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি খাব। সোবাহান সাহেব বললেন, অবশ্যই খাবে। মিলি একে নিয়ে ফ্যানের নিচে বসা। কাদের এগিয়ে এসে বলল, আমারে ধইরা ধইরা হাঁটেন। ডাক্তার সাব। চিন্তার কিছু নাই, উপরে আল্লা নিচে মাটি।

নিচে মাটি এমন কোন লক্ষণ মনসুর পাচ্ছে না। তার কাছে মনে হচ্ছে সে চোরাবালির উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। পা ডেবে ডেবে যাচ্ছে। ঘরটাও মনে হচ্ছে একটু একটু দুলছে। কে যেন বলল, বাবা তুমি এখানে বস।

কে বলল কথাটা? ঐ মহিলা না? ইনি বোধ হয় মিলির মা। তাকে কি সালাম দেয়া হয়েছে? স্নামালিকুম বলা দরকার না? দেরী হয়ে গেছে বোধ হয়। দেরী হলেও বলা দরকার।

নিন পানি নিন।

মনসুর পানি নিল। নিয়েই ক্ষীণ স্বরে বলর, স্নামালিকুম। বলেই বুঝল ভুল হয়ে গেছে। কথা এমন জিনিস একবার বলা হয়ে গেলে ফিরিয়ে নেয়া যায় না। মনসুর লক্ষ্য করল তার চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে। সে নিশ্চয়ই খুব উল্টা পাল্টা কিছু বলেছে। টেনশনের সময় তার মাথা এলোমেলো হয়ে যায়। মনসুর অবস্থা স্বাভাবিক করার জন্যে শব্দ করে হাসল। অবস্থা স্বাভাবিক হল না মনে হল আরো খারাপ হয়ে গেল।

ফরিদ বলল, ছোকরার মনে হয় ব্রেইন ডিফেক্ট হয়ে গেছে। কেমন করে হাসছে দেখুন না দুলাভাই। অবিকল পাগলের হাসি। সোবাহান সাহেব বললেন, একজন ডাক্তারকে খবর দেয়া দরকার।

ফরিদ বলল, ডাক্তার কিছু করতে পারবে বলেতো মনে হচ্ছে না। আমার ধারণা ব্রেইন হেমারেজ। হোয়াট এ পিটি, এ রকম ইয়াং এজ।

০৩. আনিস

আনিস অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করছে ভয়ঙ্কর একটা রাগের ভঙ্গি করতে। যা দেখে তার আট বছরের ছেলে টগর আঁৎকে উঠবে এবং মুখ কাচুমাচু করে বলবে, আর করব না বাবা। টগর যা করেছে তাকে ক্ষমা করার কোন প্রশ্নই উঠে না। সে ফায়ার ব্রিগেড খেলা খেলছিল। আগুন ছাড়া একরম খেলা হয় না, কাজেই অনেক কষ্টে সে বিছানার চাদরে আগুন ধরাল। তাকে সাহায্য করছিল তার ছোট বোন নিশা যার বয়স পাঁচ হলেও এই জাতীয় কাজ খুব ভাল পারে। খেলার দুটি অংশ, প্রথম অংশে বিছানার চাদর এবং জানালার পর্দায় আগুন লেগে যাবে, নিশা তার খেলনা টেলিফোন কানে নিয়ে বলবে, হ্যালো, আমাদের বাসায় আগুন লেগে গেছে। তখন শুরু হবে খেলার দ্বিতীয় অংশ–টগর সাজবে ফায়ার ম্যান। বাথরুম থেকে নল দিয়ে সে পানি এনে চারদিকে ছিটিয়ে আগুন নেভাবে। বেশ মজার খেলা।

খেলার প্রথম অংশ ভালমত শুরু হবার আগেই ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেল। তিন তলার ভাড়াটে ছুটে এলেন। একতলা থেকে বাড়িওয়ালা এলেন এবং ঘন ঘন বলতে লাগলেন, কি সর্বনাশ! কি সর্বনাশ।

আনিস গিয়েছিল বাড়ির খোজে। বাড়িওয়ালা নোটিশ দিয়েছে। গত মাসেই বাড়ি ছাড়ার কথা। এখনো কিছু পাওয়া যায়নি বলে বাড়ি ছাড়া যাচ্ছে না। বাড়িওয়ালার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে এবার তিনি আর মুখের কথা বলে সময় নষ্ট করবেন না। পাড়ার ছেলেপুলে দিয়ে তুলে দেবেন। গত সপ্তাহে খুব ভদ্র ভাষায় এ জাতীয় সংগীত দেয়াও হয়েছে।

সারাদিন বাড়ি খুঁজে ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে বাসায় ফিরে টগর এবং নিশার নতুন কীর্তি শোনার পরে মেজাজ ঠিক থাকার কথা নয়। আনিসের মেজাজ যথেষ্টই খারাপ, কিন্তু তা সে ঠিক প্রকাশ করতে পারছে না। টগরের গালে একটা চড় বসিয়ে দেয়া খুবই প্রয়োজন, হাত উঠছে না। বাচ্চা দুটির মা এক বছর আগে মারা গেছে। মা নেই দুটি শিশুর উপর রাগ করার কিংবা তাদের শাসন করা বেশ কঠিন ব্যাপার। আনিসের বেলায় তা আরো কঠিন কারণ রাগ তার স্বভাবে নেই। সে এক দৃষ্টিতে টগরের দিকে তাকিয়ে আছে। টগর খানিকটা অস্বস্তি বোধ করছে। তবে খুব ঘাবড়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে না।

টগর!

জি বাবা!

টগর যা করে নিশার ঠিক সেই জিনিসটিই করা চাই, কাজেই সেও বলল, জ্বি বাবা।

আনিস বলল, নিশা মা, তুমি এখন কোন কথা বলবে না। টগরের সঙ্গে আমার খুব জরুরি কথা আছে। ওকে আমি যা বলব তা খুব মন দিয়ে শুনবে।

টগর!

ঘরে আগুন লাগিয়েছিলে?

নাতো–বিছানার চাদরে লাগিয়েছিলাম। আর নিশাকে বলেছিলাম জানালার পর্দায় লাগাতে।

কি জন্যে?

আমরা ফায়ার সার্ভিস ফায়ার সার্ভিস খেলছিলাম।

খেলতে আগুন লাগে?

অন্য খেলায় লাগে না। ফায়ার সার্ভিস খেলায় লাগে। আগুন না লাগলে নেভাব কি করে?

আমি খুব রাগ করেছি। টগর। এত রাগ করেছি যে আমার গা কাঁপছে রাগে।

কই বাবা, গা তো কাঁপছে না।

তোমরা দুজন খুবই অবাধ্য হয়েছে। আমার কোন কথা তোমরা শোন না। রোজ অদ্ভুত অদ্ভুত সব খেলা খেল। দুদিন আগে দোতলার ছাদ থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়লে।

দোতলার ছাদ থেকে তো লাফ দেই নি। গ্যারাজের উপর থেকে লাফ দিয়েছি। নিচে বালি ছিল। একটুও ব্যথা পাইনি। বালি না থাকলে লাফ দিতাম না।

তোমাদের কখনো আমি কোন শাস্তি দেই না বলে এই অবস্থা হয়েছে। আজ তোমাদের শাস্তি দেব।

কি শাস্তি?

তুমি নিজেই ঠিক কর কি শাস্তি। আমি কিছু বলব না।

এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকব বাবা?

বেশ দাড়াও।

টগর এবং নিশা দুজনই উঠে এক পায়ে দাঁড়িয়ে গেল। দেখা গেল শাস্তি গ্রহণে দুজনেরই সমান আগ্রহ। এই শাস্তিতে তারা বেশ মজা পাচ্ছে বলেও মনে श्ल। মিটিমিটি হাসছে–

টগর!

জ্বি বাবা!

একটা কথা তোমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে কথাটা হচ্ছে–

আনিস তার দীর্ঘ বাক্য শেষ করতে পারল না, বাড়িওয়ালার ভাগ্নে এসে বলল, আপনাকে মামা ডাকে। আনিস দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ওঠে দাঁড়াল। বাড়িওয়ালার সঙ্গে বকবক করতে তার মোটেই ইচ্ছা করছে না। উপায় নেই, ইচ্ছা না করলেও বকবক করতে হবে।

আনিসের বাড়িওয়ালার নাম মির্জা সুলায়মান। ভাড়াটেদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভাল। শুধু ভাল না, বেশ ভাল। সুলায়মান সাহেবের ব্যবহার অতি মধুর। হাসি হাসি মুখ না করে তিনি কোন কথা বলেন না। ভাড়াটেদের যখন ডেকে পাঠান। তখন বসার ঘরের টেবিলে নানান ধরনের খাবার দাবার তৈরি থাকে।

আনিস বাড়িওয়ালার বসার ঘরে ঢুকে দেখল টেবিলে ঠাণ্ড পেপসির গ্লাস, প্লেটে ফ্ৰট কেক। সুলায়মান সাহেবের বয়স ষাটের কাছাকাছি হলেও তিনি তার সব ভাড়াটেদের ডাকেন— বড় ভাই। কেউ এই নিয়ে কিছু বললে তিনি বলেন, এটা হচ্ছে আমার দস্তুর। আমার পিতাজীর কাছ থেকে শিখেছি। পিতাজী সবাইকেই বড় ভাই ডাকতেন।

সুলায়মান সাহেব তার দস্তুর মত আনিসকে দেখে হাসি হাসি মুখ করে বললেন, বড় ভাই সাহেব আছেন কেমন?

জি ভাল।

আপনার পুত্ৰতো সর্বনাশ করে দিয়েছিল। দোতলায় উঠে দেখি বুন্দা বুন্দা ধোয়া। কোথায় আমাকে দেখে ভয় পাবে তা না উল্টা ছেলে আমাকে বলেআপনি এখন যান, আমরা খেলছি। আপনাকে দেখে মনেই হয় না যে আপনার এমন বিছু ছেলেমেয়ে আছে।

আনিস। গম্ভীর গলায় বলল, আপনি আপনার বাবার মত হয়েছেন, সবাই সে রকম হয় না।

খুবই খাটি কথা। তাছাড়া বড় ভাই সাহেব একটা ব্যাপার কি জানেন? অল্প বয়সে মা মারা গেলে ঘাড়ের একটা রাগ তেড়া হয়ে যায়। ওদের তাই হয়েছে। রাগ হয়ে গেছে তেড়া।

হতে পারে।

এদের সামলাবার জন্যে আপনার একটা বিবাহ করা দরকার। ঘরের শাসন হচ্ছে আসল শাসন। নেন কেক মুখে দেন। ফ্রেঞ্চ বেকারীর কেক। একশ টাকা পাউন্ড।

আনিস কেক মুখে দিল। সুলায়মান সাহেব মধুর গলায় বললেন, অনেক পুরুষ আছে যারা মনে করে সংসারে সৎ মা এলে ছেলেপুলেদের উপর অত্যাচার হবে। কথা ঠিক। অত্যাচার হয়। তবে বুঝে সুঝে বউ আনলে হয় না।

আমি বুঝে সুঝেই আনব।

বুদ্ধি কম এমন মেয়ে বিবাহ করতে হবে। বুদ্ধি কম মেয়ে মুখের একটা মিষ্টি কথাতেই খুশি হয়। এদের খুশি করা খুব সোজা। নিউমার্কেট থেকে আসার পথে এক টাকা দিয়ে একটা ফুলের মালা কিনে নিয়ে গেলেন— এতেই খুশি আর বৌ যদি বুদ্ধিমতী হয় তাহলে কিছুতেই খুশি হবে না। জ্বলিয়ে মারবে। বোকা স্ত্রী সংসার হচ্ছে সুখের সংসার।

আনিস বলল, বোকা মেয়ে পাওয়াইতো মুশকিল। সব মেয়েরই বুদ্ধি বেশি।

বড় ভাই সাহেব, ভুল কথা বললেন, পুরুষের চেয়ে মেয়েদের বুদ্ধি অনেক কম।

তাই-না-কি?

হ্যাঁ। আমার মুখের কথা না, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার। একজন পুরুষ মানুষের ব্ৰেইনের ওজন হচ্ছে ১,৩৭৫ গ্রাম। আর একজন মেয়ে মানুষের ১,২২৫ গ্রাম। একশ পঞ্চাশ গ্ৰাম।

এই তথ্য পেয়েছেন কোথায়?

খোঁজ-খবর রাখি বড় ভাই। একেবারে মুখতো না। কই, এখানে চা দিল না।

পেপসি খেলামতো আবার চা কেন?

পেপসি খেলেন পানির বদলে। চা ছাড়া নাস্তা শেষ হয় না-কি? হয় না।

আনিস নাস্তার শেষে চা-এর জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল। সুলায়মান সাহেব বললেন, বড় ভাই সাহেব, এবার একটু কাজের কথা বলি।

বলুন।

ফ্ল্যাটটা যে বড়ভাই ছেড়ে দিতে হয়।

ছেড়ে দেব। বাড়ি খুঁজছি। বিশ্বাস করুন খুঁজছি। পাওয়া মাত্র ছেড়ে দেব।

বুধবারের মধ্যেই যে ছেড়ে দিতে হয় ভাই সাহেব। আমি একজনকে জবান দিয়ে ফেলেছি, সে বুধবারে বাড়িতে উঠবে। জবান তো বড় ভাই সাহেব রক্ষা করতে হয়।

আমি যদি এর মধ্যে কিছু খুঁজে না পাই— আমি যাব কোথায়?

আমি আমার একটা ঘর ছেড়ে দিব। মেহমান হিসেবে কয়েকদিন থাকবেন।

চা এসে গিয়েছে। আনিস চা-য়ে চুমুক দিল। কি বলবে ভেবে পেল না।

বড় ভাই সাহেব।

জি বলুন।

বলতে শরম লাগছে–না বলেও পারছি না। আপনার কাছে তিন মাসের ভাড়া পাওনা আছে। বলেছিলেন একটা ব্যবস্থা করবেন।

অবশ্যই করব।

তা করবেন জানি। কিন্তু ভাইসাহেব যাওয়ার আগে পরিশোধ করে যাওয়াটা কি ভাল না। একবার চলে গেলে আপনার হয়ত মনে থাকবে না।

আনিস তিক্ত গলায় বলল, এই মুহূর্তে আমার হাত একেবারে খালি তবে স্ত্রীর কিছু গয়না আছে। ঐগুলো বিক্রি করে হলেও আপনার পাওনা মিটিয়ে দেব।

এইটা খুব ভাল কথা বলেছেন। যে পুরুষ ঋণ রেখে এক কদম পা ফেলে না, সে হচ্ছে সাচ্চা পুরুষ। বড় ভাই সাহেব, আমার একটা পরিচিত গয়নার দোকান আছে। আপনি যদি চান আপনাকে নিয়ে যাব।

ঠিক আছে যাব আপনার সঙ্গে।

কাল বিকালে কি আপনার সময় হবে?

হবে। এখন তাহলে উঠি? না-কি আরো কিছু খাওয়াবেন?

সুলায়মান সাহেব হো হো করে অনেকক্ষণ হাসলেন। যেন এরকম মজাদার কথা অনেকদিন শোনেননি। আনিস শীতল গলায় বলল, এরকম শব্দ করে হাসবেন না। সুলায়মান সাহেব। শব্দ করে হাসলে হার্টে প্রেসার পড়ে। আপনার যা বয়স তাতে হার্টে বাড়তি প্রেসার দেয়াটা ঠিক হবে না।

সত্যি বলছেন?

হ্যাঁ সত্যি। হাসাহাসি একেবারেই করবেন না। সব সময় মন খারাপ করে বসে থাকবেন তাহলেই দেখবেন হার্ট ভাল থাকবে, অনেক দিন বাঁচতে পারবেন।

অনেক দিন বাঁচতে ইচ্ছা করে না। যত তাড়াতাড়ি কবরে যেতে পারব ততাই ভাল।

তোড়াতাড়ি কবরে চলে গেলে এই যে টাকা পয়সা রোজগার করছেন সেগুলো ভোগ করবে। কে? ভোগ করবার জন্যেই তো আপনার দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা দরকার।

আপনি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছেন।

হ্যাঁ করছি।

হাসলে হার্টের উপর চাপ পড়ে ঐটাও তাহলে ঠাট্টা?

না। ঐটা ঠাট্টা না। ঐটা সত্যি। যে কারণে হাসি খুশী মানুষদের বেশি দিন বাঁচতে দেখা যায় না। বেঁচে থাকে খিটখিটে গম্ভীর মানুষজন। দেখেন না পৃথিবী ভর্তি বদমেজাজী বুড়ো-বুড়ি।

কথাটাতো ভাইসাহেব খুব ভুল বলেন নাই।

কথা আমি সচরাচর ভুল বলি না। আচ্ছা আজ তাহলে যাই। কাল সন্ধ্যায় দেখা হবে। এক সঙ্গে গয়নার দোকানে যাব।

ইনসাআল্লাহ।

হাসির ব্যাপারটা মনে রাখবেন। হাসি সম্পূর্ণ বন্ধ। দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে হলে রাম গরুর ছানা হতে হবে।

নিজের ঘরে ঢুকে আনিসের মন খারাপ হয়ে গেল। টগর এখনো একপায়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিশা রণে ভঙ্গ দিয়ে ছবি আঁকছে। বাবাকে দেখে নিশা বলল, টগর ভাইয়ার শাস্তি আর কতক্ষণ হবে বাবা?

আনিস বলল, শাস্তি শেষ।

টগর বাবার দিকে তাকিয়ে হাসল। আনিস বলল, পা ব্যথা করছে?

হুঁ করছে।

আর কোনদিন ফায়ার ব্রিগেড খেলা খেলবে না তো?

টগর না সূচক মাথা নাড়ল। আনিস বলর, মাথা নাড়লে হবে না। বল, আর কোনদিন খেলিব না।

আর কোনদিন খেলিব না। ভেরি গুড। তোমরা এখন হাত মুখ ধুয়ে পড়তে বস। আমি রান্না শেষ করি।

নিশা বলল, আমি কি তোমাকে সাহায্য করব বাবা?

না। সাহায্য লাগবে না। আজ তোমাদের কি খেতে ইচ্ছা করছে বল? ডিমের ভাজি না তরকারী?

টগর বলল, আমরা রোজ ডিম খাচ্ছি কেন বাবা?

ডিম রান্না সবচে সহজ এই জন্যে রোজ ডিম খাচ্ছি।

নিশা গম্ভীর গলায় বলল, আমরা পৃথিবীর সব ডিম খেয়ে শেষ করে ফেলছি তাই না বাবা?

হ্যাঁ তাই। এখন বই নিয়ে বস।

বই নিয়ে বসতে ইচ্ছা করছে না।

কি ইচ্ছা করছে?

নিশা অবিকল বড়দের মত গলায় বলল, কি যে ইচ্ছা করছে তাও তো জানি না।

আনিস হেসে ফেলল। তার ছোট মেয়েটি বড় মায়াবতী হয়েছে। কথা বলার কি অদ্ভুত ধরন। কোথেকে পেয়েছে এসব?

টগর বলল, আজ রাতে কি গল্প বলার আসর বসবে বাবা?

এখনো বুঝতে পারছি না। সম্ভাবনা আছে।

গল্প বলার আসর শেষ পর্যন্ত বসল না। নিশা ঘুমিয়ে পড়েছে। একা একা গল্প শুনতে টগরের ভালো লাগে না। অথচ তার ঘুমও আসছে না। আনিস তার পিঠে চুলকে দিল, মাথায় হাত বুলিয়ে দিল, তাতেও কিছু হলো না। টগর চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। একটু পর পর বলছে— ঘুম আসছে না বাবা।

একেবারেই আসছে না?

না।

তাহলে আস নতুন ধরনের একটা খেলা দুজনে মিলে খেলি।

কি খেলা?

এই খেলাটার নাম হচ্ছে সত্যি-মিথ্যা খেলা। আমি তোমাকে প্রশ্ন করব তুমি মিথ্যা জবাব দেবে। দশটা প্রশ্ন করব। প্রতি বারই যদি মিথ্যা জবাব দিতে পার তাহলে তুমি জিতে যাবে। যেমন ধর আমি যদি জিজ্ঞেস করি, তোমার নাম কি? তুমি যদি বল টগর তাহলে তুমি হেরে যাবে। সব জবাব হতে হবে মিথ্যা।

এটাতো খুব সহজ খেলা বাবা।

মোটেই সহজ না। খুব কঠিন খেলা। কারণ মানুষ বেশিক্ষণ মিথ্যা কথা বলতে পারে না। পর পর দশটা মিথ্যা বলা মানুষের জন্যে খুব কঠিন। বেশির ভাগ মানুষই পারে না।

আমি পারব?

না তুমিও পারবে না। এসো শুরু করা যাক। রেডি-ওয়ান টু খ্ৰী— খোকা তোমার নাম কি— টগর?

জ্বি না। আমার নাম টগর না।

তোমার ছোট একটা বোন আছে না?

জ্বি না। আমার একটা ভাই আছে।

তুমি কি ক্লাস থ্রিতে পড়?

জ্বি না। আমি ক্লাস টেনে পড়ি।

তোমার কি তিনটা হাত আছে?

হ্যাঁ আমার তিনটা হাত আছে?

তুমি কি তোমার মা-কে খুব ভালবাস?

হ্যাঁ বাসি।

আনিস হেসে ফেলল। টগর মাথা নিচু করে ফেলেছে। আনিস বলল, দেখলে তো টগর, মাত্র পাঁচটা প্রশ্নেই তুমি সত্যি কথা বলে ফেললে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মিথ্যা কথা বলা খুবই কঠিন।

টগর চাপা গলায় বলল, মিথ্যা কথা বলা কঠিন কেন বাবা?

কঠিন, কারণ মানুষকে মিথ্যা কথা বলার জন্য তৈরি করা হয়নি। তবু আমরা মিথ্যা কথা বলি। যখন বলি তখন আমাদের খুব কষ্ট হয়।

আমার তো কষ্ট হয় না। বাবা।

তুমি কি মিথ্যা কথা বল?

হ্যাঁ বলি। স্কুলে বলি।

আনিস উপদেশমূলক কিছু বলবে কি বলবে না। এই নিয়ে খানিকক্ষণ ভাবলা। শৈশবে নীতিকথার আসলে কি কোন গুরুত্ব আছে? একই পরিবারের চারটি ছেলেমেয়ে শৈশবে একই ধরনের নীতিকথা এবং উপদেশ শোনে কিন্তু বড় হয়ে চারজন চার রকমের হয়। আনিসের ধারণা শিশুরা বইয়ের উপদেশ গ্ৰহণ করে না। একটি শিশু অন্য একটি শিশুর কথা শুনে কিন্তু একজন বয়স্ক মানুষের কথা শুনে না। তাদের জগৎ ভিন্ন, তারা নিজেদের জগৎ থেকে শিক্ষা গ্ৰহণ করে।

টগর।

টগর জবাব দিল না। আনিস দেখল, টগর ঘুমিয়ে পড়েছে। তার নিজের চোেখও ঘুমে জড়িয়ে আসছে কিন্তু সে জানে বিছানায় শোয়া মাত্র ঘুম চলে যাবে। নানান উদ্ভট চিন্তা মাথায় ভর করবে। তারপর আসবে সুখময় কিছু কল্পনা। সেই কল্পনায় চব্বিশ বছর বয়েসী একজন তরুণী এসে ঘরে ঢুকবে। পান খাওয়ায় সেই তরুণীর ঠোঁট লাল হয়ে আছে। তরুণীটির নাকে বিন্দু বিন্দু ঘাম। টলমলে চোখে স্নিগ্ধ ছায়া।

আনিস বিরক্ত হবার মত ভঙ্গি করে বলবে, আবার পান খেয়েছ?

তরুণীটি বলবে, হ্যাঁ খেয়েছি।

দাঁতগুলি নষ্ট করবে।

করলে করব। সারা দিনে একবার পান খাই তাতেই–

আচ্ছা যাও আর কিছু বলব না।

তোমার কি চা লাগবে?

হ্যাঁ।

ঘুমুতে যাবার আগে কেউ চা খায় এই প্রথম দেখলাম।

ঘুমুতে যাব তোমাকে কে বলল?

ঘুমুবে না?

নো ম্যাডাম। সারা রাত জাগব।

লেখালেখি? হ্যাঁ লেখালেখি। নতুন উপন্যাস শুরু করছি।

তুমি না বললে সোমবার থেকে শুরু করবে।

দুদিন আগেই শুরু করছি।

উপন্যাসের নাম কি?

ময়ূরাক্ষী। নামটা কেমন?

সত্যি জানতে চাও।

হ্যাঁ।

বললে রাগ করবে নাতো?

না–এর মধ্যে রাগ করার কি আছে?

নিউ এলিফেন্ট রোডের একটা জুতার দোকানের নাম ময়ূরাক্ষী।

আনিস তাকিয়ে আছে। তরুণী খিলখিল করে হাসছে। হাসতে হাসতে তার চোখে পানি এসে গেল। তবু সে হাসছে। কি অসাধারণ একটি দৃশ্য চমৎকার দৃশ্য তার জীবনে অভিনীত হয়েছে এই কথাটা আজ আর কিছুতেই বিশ্বাস হতে চায় না। আজ মনে হয় রাত্ৰি নামে কোন তরুণীর সঙ্গে তার কোনদিন পরিচয় ছিল না। সবই কল্পনা সবই মায়া।

০৪. সোবাহান সাহেব

সোবাহান সাহেবের সামনে যে যুবকটি দাঁড়িয়ে আছে সোবাহান সাহেব তাকে চিনতে পারলেন না। মাঝারি গড়নের একজন যুবক। গায়ে খন্দরের পাঞ্জাবী, চোখে মোটা কাচের চশমা। মুখ হাসি হাসি। গেট খুলে তরতর করে এগিয়ে

এসেছে। যেন বাড়ি ঘর খুব পরিচিত। অনেকবার এসেছে।

স্লামালিকুম। ওয়ালাইকুম সালাম।

আমার নাম আনিস। আমি কি আপনার সঙ্গে খানিকক্ষণ কথা বলতে পারি?

আমি কি আপনাকে চিনি?

জ্বি না। অচেনা লোকের সঙ্গে কি আপনি কথা বলেন না?

সোবাহান সাহেবের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হল। এই যুবকের মতলব ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। দেশ ভর্তি হয়ে গেছে। মতলববাজ যুবক। এদের কোন রকম প্রশ্ৰয় দেয়া উচিত না।

স্যার, আমি কি বসব?

দীর্ঘ আলাপ থাকলে বসুন। আর সংক্ষিপ্ত কোন কিছু বলার থাকলে বলে চলে যান।

আনিস বসল। তার কাঁধে একটা ভারী হ্যান্ডব্যাগ ঝুলছিল, সেই হ্যান্ডব্যাগ খুলে কোলের উপর রাখল। সোবাহান সাহেব অত্যন্ত সন্দেহজনক দৃষ্টিতে হ্যান্ডব্যাগের দিকে তাকাতে লাগলেন। তার মন বলছে ছোকরার আসার উদ্দেশ্য এই হ্যান্ডব্যাগেই আছে। কিছু একটা গছাতে এসেছে। সম্ভবত ইনসু্যারেন্স কোম্পানির লোক। পটিয়ে পটিয়ে ইনসু্যারেন্স করিয়ে ফেলবে।

সোবাহান সাহেব কঠিন স্বরে বললেন, বলুন কি ব্যাপার। সংক্ষেপে বলবেন। লম্বা কথা শোনার সময় বা ধৈৰ্য কোনটাই আমার নেই।

আপনার বাড়ির দোতালার ছাদে দুটা ঘর আছে। ঐ ঘর দুটা কি আপনি ভাড়া দেবেন?

ছাদের ঘর ভাড়া দেয়া হবে এই রকম কোন বিজ্ঞাপন কি আপনার চোখে পড়েছে?

জ্বি না।

তাহলে?

আমি এই এলাকায় বাড়ি খুঁজছিলাম। তখন একজন বলল, এক সময় তেতলার দুটি ঘর আপনি ভাড়া দিতেন।

এক সময় দিতাম বলে সারা জীবন দিতে হবে?

তা-না। আপনি রাগছেন কেন? জোর করে নিশ্চয়ই আমি আপনার বাড়িতে উঠিব না!

আপনি কি করেন?

কিছু করি না।

কিছু করি না মানে? কিছু না করলে সংসার চলে কি ভাবে?

আমি একজন লেখক। লেখালেখি করি।

কি নাম?

আগে একবার বলেছিলাম।

দ্বিতীয়বার বলতে অসুবিধা আছে?

না নেই–আমার নাম আনিস।

এই নামে কোন লেখক আছে বলে তো জানি না।

আমি ছদ্মনামে লিখি।

ছদ্মনামটা কি?

আপনাকে বলতে চাচ্ছি না। ছদ্মনাম গ্রহণের উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজেকে আড়াল করা। যদি বলেই ফেলি। তাহলে শুধু শুধু আর ছদ্মনাম নিলাম কেন?

তুমি কি লেখা?

আনিস লক্ষ্য করল এই ভদ্রলোক হঠাৎ আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছেন এবং নিজে তা বুঝতে পারছেন না।

এইটি ভাল লক্ষণ। আনিস বলল, গল্প, উপন্যাস। এসব লিখি। একটি প্ৰবন্ধের বই আছে। কেউ সেই বই পড়ে না।

আমার বাড়ি ভাড়া নেওয়ার ইচ্ছা তোমার কেন হল?

শুনেছি আপনি ভাড়া খুব কম নিতেন। এ্যাডভান্সের ঝামেলা ছিল না। তাছাড়া বাড়িটাও আমার পছন্দ হয়েছে।

তুমি কি ব্যাচেলার?

জ্বি না। আমার দুটি বাচ্চা আছে।

দেশের সমস্যা নিয়ে কি তুমি ভাব?

আপনার কথা বুঝতে পারলাম না।

এই যে দেশে অসংখ্য সমস্যা এসব নিয়ে কখনো ভাব?

কোন সমস্যার কথা বলছেন?

সব রকম সমস্যা।

জ্বি-না, ভাবি না।

তুমি একজন লেখক মানুষ, তুমি এসব নিয়ে ভাব না? তুমি কি রকম লেখক?

খুবই বাজে ধরনের লেখক।

তুমি এখন যেতে পার। তোমাকে বাড়ি ভাড়া দেব না।

দেবেন না?

না। তোমাকে আমার পছন্দ হয় নি।

আপনাকেও আমার পছন্দ হয় নি। তবে আপনার বাড়ি পছন্দ হয়েছিল।

আমাকে পছন্দ না হবার কারণ?

আপনি হচ্ছেন এক শ্রেণীর পয়সাওয়ালা অকৰ্মণ্য বৃদ্ধ। যারা দেশের সমস্যা নিয়ে ভাবে এবং মনে করে এই ভাবনার কারণে সে অনেক বড় কাজ করে ফেলছে। এক ধরনের আত্মতৃপ্তি পায়। আসলে আপনার এসব চিন্তা ভাবনা অর্থহীন এবং মূল্যহীন। আপনার যা করা উচিত তা হচ্ছে— রগরগে থ্রীলার পড়া। মাঝে মাঝে দান দক্ষিণ করা যাতে পরকালে সুখে থাকতে পারেন। ইহকাল এবং পরকাল দুটিই ম্যানেজ করা থাকে বলে।

অভদ্র ছোকরা। স্টপ। স্টপ।

আপনি খুব বেশি রেগে যাচ্ছেন। আপনার প্রেসার ট্রেসার নেইতো? প্রেসার থাকলে সমস্যা হয়ে যেতে পারে।

বহিস্কার। বহিস্কার। এই মুহুর্তে বহিস্কার।

সোবাহান সাহেব প্ৰচণ্ড চিৎকার করতে লাগলেন। মিলি বারান্দায় ছুটে এল। চোখ বড় বড় করে বলল, কি হয়েছে?

এই ছোকরাকে ঘাড় ধরে বের করে দে। ফাজিলের ফাজিল, বিদের বদ।

মিলি কড়া গলায় বলল, আপনি বাবাকে কি বলেছেন?

আনিস অবস্থা দেখে পুরোপুরি হকচকিয়ে গেছে। কিছু একটা বলতে গিয়েও সে বলতে পারল না। মিলি বলল, প্লীজ আপনি এখন কথা বলে আর ঝামেলা বাড়াবেন না। চলে যান। আনিস গেট পার হয়ে চলে যাবার পর সোবাহান সাহেব বললেন, কাদের বাসায় আছে?

মিলি বলল, আছে।

কাদেরকে বল ঐ ছোকরাকে ধরে আনতে।

বাদ দাও না বাবা। আর কেন?

যা করতে বলছি কর।

ভদ্রলোক কে?

আমাদের নতুন ভাড়াটে।

তোমার কথা বুঝলাম না বাবা।

তিনতলার ঘর দুটা তার কাছে ভাড়া দিয়েছি। ছোকরাকে আমার পছন্দ হয়েছে। ছোকরার মাথা পরিষ্কার।

কাদের আনিসকে আনতে গেল। সোৱাহান সাহেব নিজেই দোতলার ছাদে উঠলেন ঘর দুটির অবস্থা দেখার জন্যে। অনেক দিন তালাবন্ধ হয়ে আছে।

দুটি ঘর। একটা বাথরুম, রান্নাঘর। ছোট পরিবারের জন্যে খুব ভালই বলতে হবে। ঘর দুটির সামনে বিশাল ছাদ। ছাদে অসংখ্যা টব, টবে ফুলের চাষ হচ্ছে। মিলির শখ।

মিনু ছাদে উঠে এলেন। তার মুখ থমথমে। কিছুক্ষণ আগে মিলির কাছে তিনি বাড়ি ভাড়া দেবার খবর শুনেছেন। রাগে তার গা জুলে যাচ্ছে।

তুমি নাকি ছাদের ঘর দুটি ভাড়া দিচ্ছ?

হ্যাঁ।

কাকে দিলে?

নামটা মনে আসছে না। ফাজিল ধরনের এক ছোকরা।

বাড়ি ভাড়া দেয়া কি খুব দরকার ছিল?

না।

তাহলে, বাড়ি ভাড়া দিলে কেন?

আমার দরকার ছিল না, কিন্তু ঐ ফাজিলের দরকার ছিল।

তুমি হুট করে একেকটা কাজ কর আর সমস্যা হয়।

সোবাহান সাহেবের মেজাজ। চট করে খারাপ হয়ে গেল। তিনি থমথমে গলায় বললেন, আমি সমস্যার সৃষ্টি করি?

মিনু চুপ করে গেলেন। সোবাহান সাহেব চাপা গলায় বললেন, আমার জন্য কারোর কোন সমস্যা হোক তা আমি চাই না।

এই বলেই তিনি নিচে নেমে গেলেন। মিনু গেলেন পেছনে পেছনে।

একতলার বারান্দায় আনিস দাঁড়িয়ে আছে। কাদের তাকে নিয়ে এসেছে। আনিস খানিকটা শংকিত বোধ করছে। বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে আবার ডেকে আনার অর্থ সে ঠিক ধরতে পারছে না। সোবাহান সাহেব তার কাছে এসে দাঁড়ালেন এবং শুকনো গলায় বললেন, এসেছ?

আনিস বলল, জ্বি। আপনি ডেকে পাঠিয়েছিলেন।

সোবাহান সাহেব বললেন, তোমাকে বাড়ি ভাড়া দেয়া হবে না। এটা বলার জন্যে ডেকে পাঠিয়েছি।

সেতো একবার বলেছেন।

আবার বললাম, আবার বলায় তো দোষের কিছু নেই।

জ্বি না নেই। দ্বিতীয়বার বলাটা ভাল হয়েছে। এখন কি আমি যেতে পারি?

হ্যাঁ যাও।

স্লামালিকুম।

আনিস গেটের বাইরে বেরুতেই মিনু বললেন, কাদের যা ভদ্রলোককে ডেকে নিয়ে আয়।

কাদের সোবাহান সাহেবের দিকে তাকাল। তিনি কিছু বললেন না। মিনু বলল, দাঁড়িয়ে আছিস কেন যা। কাদের বিমর্ষ মুখে বের হল। বড় যন্ত্রণায় পড়া গেল।

আনিস বড় রাস্তা পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। কাদের সেখানেই তাকে ধরল, নিষ্প্রাণ গলায় বলল, আপনেরে বুলায়।

আনিস বলল, ঠাট্টা করছি?

জ্বি না। আবার যাইতে বলছে।

আবার যাব?

যাইতে ইচ্ছা না হইলে যাইয়েন না। আমারে খবর দিতে কইছে। খবর দিলাম। যাওন না যাওন আফনের ইচ্ছা।

নাম কি তোমার?

আমার নাম মোহাম্মদ আব্দুল কাদের। সৈয়দ মোহাম্মদ আব্দুল কাদের।

সৈয়দ নাকি।

জ্বি। বোগদাদী সৈয়দ।

বল কি? বোগদাদী সৈয়দ যখন খবর নিয়ে এসেছে তখন তো যেতেই হয়।

আনিস তৃতীয়বারের মত নিরিবিলি বাড়ির বারান্দায় এসে উঠল। সোবাহান সাহেব তার দিকে না তাকিয়েই বললেন, কাদের ভদ্রলোককে তিনতলার ঘর দুটার চাবি এনে দে।

আনিস বলল, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ স্যার। অনেক ধন্যবাদ।

রাত আটটার মত বাজে।

মিলি বিরক্ত মুখে খাতা কলম নিয়ে বসে আছে। তার সামনে চার পাঁচটা বই। আগামীকাল সকাল নটায় তার টিউটোরিয়েল ক্লাস। এ্যাসাইনমেন্টের কিছুই এখনো করা হয়নি। বিষয়টাই মাথায় ঢুকছে না। এর আগের টিউটোরিয়েলে বি মাইনাস পেয়েছে। এবার মনে হচ্ছে সি মাইনাস হবে। খাতায় প্রথম বাক্যটা লিখে শেষ করবার আগেই কাদের ঘরে ঢুকে বলল, আফা আফনেরে ডাকে।

মিলি রাগি গলায় বলল, কে ডাকে?

ডাক্তার সাব। গ্ৰীন ফার্মেসীর চেংড়া ডাক্তার।

আমাকে ডাকছে কি জন্যে? আমার কাছে কি?

আমি ক্যামনে কই আফা? আমি হইলাম গিয়া চাকর মানুষ। আমার সাথে কি আর খাতিরের আলাপ করব?

মিলি কঠিন গলায় বলল, তুই কথা বেশি বলিস, কথা কম বলবি।

অর্ডার দিলে কথাই কমু না। অসুবিধা কি? কথা কওনের মইধ্যেতো আফা আরাম কিছু নাই।

যা আমার সামনে থেকে।

কাদের গম্ভীর মুখে বের হয়ে গেল। পেছনে পেছনে আসছে মিলি, বেআক্কেল ডাক্তারের জন্যে তার মেজাজ খুবই খারাপ হয়েছে, যদিও তাকে দেখে তা বোঝা যাচ্ছে না।

মনসুরের পোশাক-আষাক আজ খুবই পরিপাটি। সার্ট প্যান্ট সবই নতুন কেনা হয়েছে। জুতা জোড়াও নতুন। জুতা জোড়া সাইজে খানিকটা ছোট হয়েছে। কেনার সময় তা ঠিক বোঝা যায়নি। এখন জানান দিচ্ছে। পাটন টন করছে। পায়ের আঙুলে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে কি-না কে জানে। মিলিকে দেখে সে উঠে দাঁড়াল। মিলি বলল, কি ব্যাপার ডাক্তার সাহেব?

না মানে আপনার বাবার প্রেসারটা চেক করতে এসেছিলাম।

আপনাকে কি আসতে বলেছিল কেউ?

জ্বি না। তবে উনার যেহেতু হাই প্রেসারের টেনডেন্সি কাজেই প্রায়ই চেক করা দরকার।

ও আচ্ছা।

আমি আপনাদের বাসার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম, ভাবলাম দেখেই যাই।

ভাল করেছেন। বাবা দোতলায় তার ঘরে। আসুন বাবার কাছে আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি।

চলুন।

মিলি সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বলল, আপনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন কেন?

মনসুর লজ্জিত গলায় বলল, নতুন জুতা। সাইজে হয়েছে ছোট। কেনার সময় বুঝতে পারি নি। মনসুর সিড়ির শেষ মাথা পর্যন্ত উঠল না। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। দিশাহারা গলায় বলল, একটা ভুল করে ফেলেছি।

মিলি বলল, প্রেসার মাপার যন্ত্র ফেলে এসেছেন। তাই না?

জ্বি। তাহলে আজ বরংচ চলে যান। বাবার শরীর যদি খারাপ হয় আপনাকে খবর দেব।

আমি বরং এক দৌড়ে নিয়ে আসি। যাব আর আসব।

তেমন ইমার্জেন্সিতো না। ব্যস্ত হবার কিছুই নেই। আপনি সিঁড়ি ধরে ধরে নামুন। ঐ দিনের মত হওয়াটা ভাল হবে না।

মনসুর মনটা খারাপ হয়ে গেল। মেয়েটা ঐ দিনকার ঘটনাটা ভুলতেই পারছে না। সামান্য দুর্ঘটনার বেশিতো কিছু না। দুর্ঘটনা মানুষের জীবনে ঘটে। না? সব সময়ই তো ঘটছে।

অতিরিক্ত সাবধানতার জন্যেই কি না কে জানে সিঁড়ির মাঝামাঝি এসে মনসুরের নতুন জুতা ক্লিপ কাটল। অতি সহজেই মনসুর নিজেকে সামলাতে পারত। কিন্তু সে কেন জানি মিলির মুখের দিকে তাকাতে গেল আর তখনি রেলিং-এ ধরে রাখা হাত ফসকে গেল। সে গড়িয়ে পড়ে গেল নিচে। আজ ঐ দিনের চেয়েও ভয়াবহ শব্দ হল।

সোবাহান সাহেব, ফরিদ, কাদের এবং রহিমার মা ছুটে এল। সোবাহান সাহেব বললেন, কি ব্যাপার? মিলি বলল, ডাক্তার সাহেব পড়ে গেছেন।

ফরিদ বিস্মিত গলায় বলল, কোন ডাক্তার ঐ দিনকার পাগলা ডাক্তার?

মিলিকে ঐ প্রশ্নের জবাব দিতে হল না। মনসুর উঠে দাঁড়িয়ে বলল, একেবারেই ব্যথা পাইনি।

ফরিদ বলল, আপনি ব্যথা পেয়েছেন কি পাননি এটা আমার জিজ্ঞাসা নয়। আমি জানতে চাচ্ছি। আপনাদের ডাক্তারী শাস্ত্রে আছাড়া, খাওয়া রোগ নামে কোন রোগ আছে কি না? যদি থেকে থাকে তাহলে সেই রোগের চিকিৎসা আছে, না সেটা দুরারোগ্য ব্যধি?

মনসুরের মনে হল ইনি রসিকতা করছেন। অপমানজনক পরিস্থিতিতে রসিকতা খুবই ভাল জিনিস। সবাই মিলে এক সঙ্গে হেসে উঠলে ব্যাপারটা হালকা হয়ে যায়। সবাই হেসে উঠবে এই ভেবে মনসুর উচ্চস্বরে হাসল। আশ্চর্য অন্য কেউ তার সঙ্গে হাসছে না। বরংচ কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। নির্যাৎ তাকে পাগল ভাবছে।

ধারণা ভদ্রলোকের ব্রেইন ফাংশান করছে না। এই যে ভাই ডাক্তার সাহেব, আপনি কাদেরের সঙ্গে যান। সপ্তাহখানেক বেড রেস্টে থাকবেন। বিশ্রামের মত ভাল জিনিস আর কিছু নেই। সব চিকিৎসার সেরা চিকিৎসা হচ্ছে বিশ্রাম।

নিরিবিলি বাড়ির দুজন সদস্য রাতের খাবার খেতে বসেছে। ফরিদ এবং মিলি। মিনু বেশির ভাগ সময় রাতে খান না। আজও খাবেন না। বাকি শুধু সোবাহান সাহেব। ফরিদ এবং মিলি প্লেটে ভাত নিতে নিতে সোবাহান সাহেব এসে পড়লেন। ফরিদ হাসি মুখে বলল, কেমন আছেন দুলাভাই?

সোবাহান সাহেব অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালেন।

কথা বলছেন না কেন দুলাভাই? রাগ করলেন না কি?

চুপচাপ খাওয়া দাওয়া কর। আমাকে বিরক্ত করবে না।

খাওয়ার টেবিল হচ্ছে সামাজিকভাবে মেলামেশার একটা স্থান। নিঃশব্দে খাওয়া দাওয়া করে উঠে যাওয়া খাবার টেবিলের উদ্দেশ্য নয়।

চুপ কর।

এত ভাল যন্ত্রণা হল দেখি–কিছু বললেই চুপ কর। আপনার সমস্যাটা কি?

মিনু লেবু দিতে এসে বললেন, চুপচাপ খেয়ে বিদেয় হ ফরিদ। ভ্যাজর ভ্যাজর করিস না। ফরিদ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। গল্প গুজব করে খাওয়া দাওয়া করতে তার ভাল লাগে। দুলাভাই টেবিলে থাকলে তা সম্ভব হয় না। সোবাহান সাহেব মিনুর দিকে তাকিয়ে বললেন, আজও ইলিশ? পর পর তিন দিন ইলিশ হয়ে গেল না?

কি করব, বাজারে মাছ নেই। কাদেরকে পাঠালে ইলিশ নিয়ে চলে আসে। মাছের খুব আকাল।

সোবাহান সাহেব মিলির দিকে তাকিয়ে আফসোসের স্বরে বললেন, এই দেশ মাছে এক সময় ভর্তি ছিল। মেঘের ডাক শুনে ঝাঁক বেঁধে কৈ মাছ পানি ছেড়ে শুকনায় উঠে পড়ত। মাছের জন্যে আমরা কি করতাম জানিস? নৌকা ড়ুবিয়ে রাখতাম। কয়েকদিন পর পর সেই নৌকা তুলে পানি সেছা হত। আর তখন–

দুলাভাই, কিছু মনে করবেন না। আপনাকে ইন্টারাপ্ট করি। না করে পারছি না। আমাকে চুপ করে থাকতে বলে নিজে সমানে কথা বলে যাচ্ছেন এটা কেমন হল? প্রাচীন একটা আপ্ত বাক্য হচ্ছে–আপনি আচারি ধর্ম পড়কে শেখাও। আপনি তা করছেন না।

সোবাহান সাহেব সরু চোখে ফরিদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ফরিদ সেই দৃষ্টি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করল। মিলি মিনতি মাখা চোখে মামার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখ বলছে–মামা, তোমার পায়ে পড়ছি বাবার সঙ্গে ঝগড়া বঁধিও না। মিলি চোখের ভাষা ফরিদকে কাবু করতে পারল না। সে উৎসাহের সঙ্গে বলে চলল,

আমাদের প্রফেটের সেই বিখ্যাত গল্পটা কি আপনার মনে আছে দুলাভাই? এক লোক তাঁর কাছে গিয়ে কাতর গলায় বলল, হুজুর বড় সমস্যায় পড়েছি, আমার মধ্যম পুত্ৰ শুধু মিষ্টি খেতে চায়—

এই গল্পটি আমার জানা আছে ফরিদ।

আমারও ধারণা আপনার জানা আছে কিন্তু গল্পের মোরাল আপনি হয় ধরতে পারেননি কিংবা নিজের জীবনে প্রয়োগ করতে চাননি।

মিলি বলল, এই প্রসঙ্গটা থাক মামা। তোমার যদি এতাই কথা বলতে ইচ্ছা! করে তাহলে অন্য কিছু নিয়ে কথা বল।

অন্য কি নিয়ে কথা বলব?

ছবি নিয়ে কথা বল। বাবা জান! মামা ছবি বানাবে, শর্ট ফ্রিম। ছবিটা দারুণ একটা কিছু হবে।

সোবাহান সাহেব বললেন, ভাল। বলেই প্লেট সরিয়ে উঠে পড়লেন। মিলি বলল, বাবার খাওয়াটা তুমি নষ্ট করলে মামা।

আমি কারো খাওয়া নষ্ট করিনি। পরিষ্কার যুক্তি দিয়ে দুলাভাইকে পরাস্ত করেছি। অবশ্যি তাঁকে পরাস্ত করা সহজ। তাঁর আই কিউ খুবই নিচের দিকে। আমার মনে হয়। গাছপালার আই কিউ-এর কাছাকাছি।

তোমার আই কিউ বুঝি আইনস্টাইনের মত?

আমি কারো সঙ্গে তুলনায় যেতে চাচ্ছি না। তবে বুদ্ধি বৃত্তির ক্ষেত্রে ১০০র ভেতর আমাকে ৯৩ থেকে ৯৫ দিতে পারিস।

তাই নাকি?

হ্যাঁ। আর তোর বুদ্ধি হচ্ছে ৫৬ থেকে ৬২-র মধ্যে। আর একই স্কেলে দুলাভাইয়ের বুদ্ধি ১৮ থেকে ২২র মধ্যে উঠানামা করে।

তোমার তাই ধারণা?

হ্যাঁ এবং আমি আমার ধারণার কথা বলতে কোন রকম দ্বিধাবোধ করি না। কারণ সত্য হচ্ছে আগুনের মত। আগুন চাপা দেবার কোন উপায় নেই। আমি বুঝতে পারছি দুলাভাইয়ের বুদ্ধি কম বলায় তুই আহত হয়েছিস, কিন্তু উপায় কি যা সত্যি তা বলতেই হবে। আমার মুখ হয়তবা তুই বন্ধ করতে পারবি, কিন্তু পাবলিকের মুখ তুই কি করে বন্ধ করবি? পাবলিক এক সময় সত্যি কথা বলবেই।

বিকবকানি থামাও তো মামা।

থামাচ্ছি। কিন্তু প্ৰসঙ্গটা যখন উঠলই তখন এই বাড়িতে আমার পরই কার আই কিউ বেশি সেটা জানা থাকা বল। আমার পরই কাছে কাদের। অসাধারণ ব্রেইন।

চুপ করতো মামা। অসাধারণ ব্ৰেইন হল কাদেরের!

প্ৰপার এড়ুকেশন পেলে এই ছেলে ফাটাফাটি করে ফেলত।

তুমিতো প্রপার এড়ুকেশন পেয়েছ। তুমি কি করেছ?

করব। সময়তো পার হয়ে যায় নি। দেখবি দেশ জুড়ে একটা হুলুস্থুল পড়ে যাবে। তোদের এই বাড়ি বিখ্যাত হয়ে যাবে। লোকজন এসে বলবে—এটা একটা বিখ্যাত বাড়ি। তোদের বই লিখতে হবে— মামাকে যেমন দেখেছি কিংবা কাছের মানুষ ফরিদ মামা—।

কিছু মনে করো না, আমার ধারণা তোমার আই কিউ খুবই কম।

ফরিদ উচ্চাঙ্গের হাসি হাসল। তার সম্পর্কে অন্যদের ধারণা তাকে খুব মজা দেয়। এটা হচ্ছে পৃথিবীর যাবতীয় প্রতিভাবান ব্যক্তিদের সাধারণ ট্র্যাজেডি। প্রিয়জনরা তাদের বুঝতে পারে না। আড়ালে হয়তবা হাসাহাসিও করে। করুক। তাদের হাসাহাসিতে কিছু যায় আসে না।

কাদের এসে ঢুকল। গম্ভীর মুখে ঘোষণা করল, নতুন ভাড়াটে চলে এসেছে। সে মুখ কুঁচকে বলল, এক মালগাড়িতে বেবাক জিনিস উপস্থিত। ফকির্যা পার্টি।

বলেই সে আবার বারান্দায় চলে গেল। নতুন ভাড়াটের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা দরকার। ফুলের গাছ টাছ না ভেঙে ফেলে। এই বাড়িতে তার অবস্থান সম্পর্কেও জানিয়ে দেয়া দরকার। ভাড়াটে যদি তাকে সামান্য একজন কাজের মানুষ মনে করে তাহলে মুশকিল। প্রথম দর্শনে মনে করে ফেললে সারাজীবনই মনে রাখবে। যখন তখন ডেকে বলবে, এক প্যাকেট সিগারেট এনে দাওতো, চিঠিটা পোস্ট করে দাওতো, এক দৌড়ে খবরের কাগজটা এনে দাও।

আনিস রিক্সা করে এসেছে। টগর এবং নিশা দুজনেই গভীর ঘুমে। মিলিদের বসার ঘরের দরজা খোলা। আনিস বাচ্চা দুটিকে বসার ঘরের সোফায় শুইয়ে আবার বাইরে এসে দাঁড়াল। কাদেরের দিকে তাকিয়ে বলল, কাদের তুমি সুটকেস দুটা উপরে দিয়ে আসতো।

কাদের তৎক্ষণাৎ বলল, কুলীর কাম আমি করি না ভাইজান। সৈয়দ বংশ।

বখশীস পাবে।

এই বংশের লোক বখশীসের লোভে কিছু করে না ভাইজান। আমরা হইলাম আসল। সৈয়দ। বোগদাদী সৈয়দ।

আনিস নিজেই জিনিসপত্র টানাটানি করে তুলতে লাগল। ঠেলাগাড়ির লোক দুটি উপরে কিছু তুলবে না। দোতলার ছাদে তোলা হবে এই কথা তাদের বলা হয়নি। এখন যদি তুলতে হয় পঞ্চাশ টাকা বাড়তি দিতে হবে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে আনিসের হাতে এই মুহুর্তে পঞ্চাশটা টাকাও নেই। এ বাড়িতে সে কপর্দক শূন্য অবস্থাতেই এসে উঠেছে।

মিলি কি করতে জানি বসার ঘরে ঢুকেছিল। সোফাতে দুটি শিশুকে শুয়ে থাকতে দেখে সে এগিয়ে এল। আহ কি মায়া কাড়া চেহারা। দুটি দেবশিশু যেন জড়ােজড়ি করে শুয়ে আছে। মেয়েটির মাথাভর্তি রেশমি চুল। চোখের ভুরুগুলো যেন কোন চৈনিক শিল্পী সুক্ষ তুলি দিয়ে এঁকেছে। কমলার কোয়ার মত পাতলা ঠোট বার বার কেঁপে উঠছে। বাচ্চাটিকে কোলে নেবার এমন ইচ্ছা হচ্ছে যে মিলি রীতিমত লজ্জা লাগছে। মিলি দোতলার ছাদে উঠে গেল। আনিস খাটের ভারী একটা অংশ টেনে টেনে তুলছে।

মিলি বলল, আপনি এত কষ্ট করছেন কেন? আপনার ঠেলাগাড়ির লোকজন কোথায়?

ওরা চলে গেছে।

দাঁড়ান আমি কাদেরকে পাঠাচ্ছি।

না থাক। বেচারা সৈয়দ বংশের মানুষ কুলীর কাজ করবে না। আমার অসুবিধা হচ্ছে না। তুলে ফেলেছি।

তইতো দেখছি। আপনার স্ত্রী কোথায়?

ও আসে নি।

আসে নি মানে? মাকে ছাড়াই বাচ্চা দুটি চলে এসেছে?

হুঁ।

উনাকে কবে আনবেন?

তাকে আনা সম্ভব হবে না। সে আসবে না।

আপনার কথা কিছু বুঝতে পারছি না।

ও মারা গেছে।

বেশ কিছুক্ষণ সময় মিলি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। এত বড় একটা খবর তার হজম করতে সময় লাগল। মিলি বলল, বাচ্চা দুটির মা নেই শুনে আমার খুব খারাপ লাগছে। এটা নিয়ে আপনি রহস্য করবেন তা ভাবিনি। আপনি হয়ত খুব রসিক মানুষ, সব কিছু নিয়ে রসিকতা করা হয়ত আপনার অভ্যাস কিন্তু এটা অন্যায়।

আনিস বলল, ঠিক এই ভাবে কিছু বলিনি। ওর মৃত্যুর কথা সরাসরি বলতে খারাপ লাগে বলেই অন্য পথে বলতে চেষ্টা করি।

আর করবেন না।

আচ্ছা আর করব না।

আনিস মুগ্ধ হয়ে লক্ষ্য করল মিলি নামের এই মেয়েটি তার ঘর গুছিয়ে দিল। মশারি খাটিয়ে দিল, টগর এবং নিশাকে কোলে করে এনে বিছানায় শুইয়ে দিল। মেয়েরা প্রাকৃতিক নিয়মেই মমতাময়ী, কিন্তু এই মেয়েটির মধ্যে মমতার পরিমাণ অনেক অনেক বেশি।

আনিস বলল, আপনাকে অনেক যন্ত্রণার মধ্যে ফেললাম।

তা ঠিক। কাল সকালেই আমার টিউটোরিয়াল। কিছুই করা হয় নি।

আপনি আমার জন্যে অনেক কষ্ট করেছেন কাজেই আমি আপনার ক্ষুদ্র একটা উপকার করতে চাই। এ গুড টার্ন ফর এ গুড টার্ন।

মিলি বিস্মিত হয়ে বলল, কি উপকার করতে চান?

একটা উপদেশ দিতে চাই যা আপনার খুব কাজে আসবে। উপদেশটা হচ্ছে আমার বাচ্চা দুটিকে একেবারেই পাত্তা দেবেন না।

সে কি!

ওদের একজনই আপনাকে পাগল করে দেবার জন্যে যথেষ্ট। দুজন মিলে কি করবে। তার বিন্দু মাত্র ধারণাও আপনার নেই। কাজেই সাবধান।

মিলি হাসল। আনিস বলল, আপনার হাসি দেখেই বুঝতে পারছি আমার কথা আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না। সাবধান করে দেবার দরকার ছিল করে দিয়েছি।

যেতে। রাত জাগা পুরোপুরি বারণ। ডাক্তারের উপদেশ মত কিছুদিন তাই করলেন। দেখা গেল রাত দশটার দিকে ঘুমুতে গেলে ঘুম আসে। দেড়টা দুটায় দিকে অথচ বারটার দিকে ঘুমুতে গেলে দশ পনেরো মিনিটের মধ্যে ঘুম চলে আসে। কিছুদিন হল তিনি তার নিজস্ব নিয়ম চালু করেছেন— রাত বারোটায় ঘুমুতে যান। তবে তিনি জানেন না যে শোবার ঘরের ঘড়ি এক ফাঁকে মিলি একে এক ঘন্টা আগিয়ে রাখে।

শোবার ঘরের ঘড়িতে এখন বারোটা বাজছে। যদিও আসল সময় রাত এগারেটা। মিনু ঘরে ঢুকলেন। হাতে বরফ শীতল এক গ্রাস পানি। বিছানায় যাবার আগে সোবাহান সাহেব ঠান্ডা এক গ্লাস পানি খান। মিনু পানির গ্রাস টেবিলের পাশে রাখতে রাখতে বললেন, ঘুমুবে না?

সোবাহান সাহেব বললেন, একটু দেরী হবে মিনু। তুমি শুয়ে পড়।

দেরী হবে কেন?

একটা বিষয় নিয়ে ভাবছি।

কি নিয়ে ভাবছ?

দেশে মাছের যে ভয়াবহ সমস্যা। ঐটা নিয়ে ভাবছি। কি করা যায়। তাই—

ঐ সব ভাববার লোক আছে। তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না।

এই তো একটা ভুল কথা বললে মিনু। দেশের সমস্যা নিয়ে সবাইকে ভাবতে হবে। সবাই যদি ভাবে তাহলেই সমস্যার কোন একটা সমাধান বের করা যাবে।

বেশতো সকাল বেলা সমাধান বের করবে। বারটা বাজে, এখন শুয়ে পড়। নাও পানিটা খাও।

সোবাহান সাহেব চোখ থেকে চশমা খুলে রেখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে হাসলেন। হাসতে হাসতেই বললেন, ঘড়িতে বারটা বাজে না, বাজে এগারোটা। তোমরা এই ঘরের ঘড়ি এক ঘণ্টা আগিয়ে দাও। যেদিন প্রথম করলে সেদিনই টের পেয়েছি। তোমাদের বুঝতে দেই নি। তোমরা যা করছ, আমার প্রতি মমতাবশতাই করছ, তবু কাজটা ঠিক না। তোমরা ধোঁকা দেবার চেষ্টা করছি। ধোকা দেয়া অন্যায়। যাও শুয়ে পড়।

মিনু কথা বাড়ালেন না, শুয়ে পড়লেন। স্বামীকে তিনি খুব ভাল করে চেনেন। এই মুহুর্তে তাকে ঘাটানো ঠিক হবে না।

মিনু।

বল।

আচ্ছা বলতো তোমরা কি আমাকে খুব অল্প বুদ্ধির মানুষ বলে মনে করা?

তা মনে করব কেন?

এই যে ঘড়ির কাটা এক ঘণ্টা আগিয়ে দিলে, মনটাই একটু খারাপ হল। তোমরা আমাকে নিয়ে এমন একটা ছেলেমানুষী ব্যাপার করছ।

মিলি করেছে। এই সব মিলির বুদ্ধি। দাও এক্ষুণি ঠিক করে দিচ্ছি।

দরকার নেই। আমার ঘরের ঘড়ি এক ঘণ্টা এগিয়েই থাকুক। আমি মানুষটা অবশ্যি অনেকখানি পিছিয়ে আছি। এই দিক দিয়ে ঠিকই আছে। তুমি ঘুমাও মিনু। বয়সতো শুধু আমার একার বাড়ছে না, তোমারও বাড়ছে। আমার যেমন বিশ্রাম দরকার, তোমারও দরকার। সমাজটাই এমন যে পুরুষের প্রয়োজনটাই বড় করে দেখা হয়। মেয়েদেরটা দেখা হয় না। এই সমস্যা নিয়েও ভাবতে হবে।

সোবাহান সাহেব নিজেই উঠে ঘরের বাতি নিভিয়ে টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে দিয়ে চেয়ারে বসলেন। তার সামনে একটা বিশাল খাতা। খাতায় লেখা–মৎস্য সমস্যা। খাতার প্রথম পাতায় এদেশের সব রকম মাছের নাম লেখা আছে। দেশে কত ধরনের মাছ পাওয়া যায়, কোন অঞ্চলে কোন মাছের কি নাম সব আগে লেখা দরকার। সব জাতের মাছের ব্রিডিং টাইম কি এক–না একেক মাছের একেক সময় তাও জানা দরকার। মাছের খাবার কি?

সোবাহান সাহেবের মন খারাপ লাগছে, তিনি মাছের দেশের মানুষ অথচ মাছের ব্যাপারে প্রায় কিছুই জানেন না। শুধু জানেন বৈশাখ জৈষ্ঠ্য মাসে যখন আকাশ গুড় গুড় করে উঠে তখন কৈ মাছের ঝাক পানি ছেড়ে শুকনোয় উঠে আসে। রহস্যময় ব্যাপার। এই পৃথিবী যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি কত অদ্ভুত রহস্য চারদিকে দিয়েছেন। তাকে চিনতে হবে। এইসব রহস্যের মাঝে।

বারান্দায় মিলি হাঁটছে।

হাঁটতে হাঁটতে গুনগুন করে গাইছে। মেয়েটার গানের গলা চমৎকার অথচ ভাল করে গান শিখল না। তার ইচ্ছা করল মেয়েকে ডেকে পাশে বসিয়ে গান শুনেন। তা সম্ভব হবে না। গাইতে বললে মিলি গাইতে পারে না। সে না-কি গান করে নিজের জন্যে, অন্য কারো জন্যে না।

মিলি গাইছে—

বলি গো সজনী যেয়ো না, যেয়ো না
তার কাছে আর যেয়ো না।
সুখের সে রয়েছে, সুখে সে থাকুক,
মোর কথা তারে বোলো না বোলো না।

সুন্দর গানতো। সোবাহান সাহেবের মন আনন্দে পূর্ণ হল। তিনি খাতা বন্ধ করে বারান্দায় এসে দাড়ালেন। মিলি রেলিং-এ হেলান দিয়ে আছে। আকাশ ভরা জোছনা। কি অপরূপ ছবি। এমন সুন্দর পৃথিবী ফেলে রেখে তাঁকে চলে যেতে হবে ভাবতেই কষ্ট হয়। স্বৰ্গ কি এই পৃথিবীর চেয়েও সুন্দর হবে? তাও কি সম্ভব?

মিলি গান বন্ধ করে বাবার দিকে তাকিয়ে করুণ গলায় বলল, আমার মন অসম্ভব খারাপ হয়ে আছে। বাবা।

কেন?

কাল আমার টিউটোরিয়েল, কিছু পড়া হয়নি। পড়তে ভাল লাগে না, কিযে করি!

সোবাহান সাহেব সিস্নেহে মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। মিলি বলল, জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা আমরা পড়ালেখা করে নষ্ট করি। কোন মানে হয় না।

০৫. রহিমার মা

নিরিবিলি বাড়ির সবচে সরব মহিলা–রহিমার মার মুখে আজ সারাদিন কোন কথা নেই। মিনু ব্যাপারটা লক্ষ করলেন, জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে রহিমার মা?

রহিমার মা থমথমে গলায় বলল, কি হয় নাই। গরিবের আবার হওয়া হওয়ি। গরিবের কিছুই হয় না।

মিনু আর তাকে ঘাটালেন না। চুপচাপ আছে ভাল আছে, কথা বলা শুরু করলে মুশকিল।

সন্ধ্যায় চা বানাতে বানাতে রহিমার মা নিজের মনেই বলল, গরিবের দুঃখ কেউ বুঝে না। মাইনষেতো বুঝেই না আল্লায়ও বুঝে না।

খুবই ফিলসফিক কথা। এ জাতীয় কথাবার্তা বলা শুরু করলে বুঝতে হবে ভয়াবহ কিছু ঘটে গেছে।

যা ঘটেছে তাকে ভয়াবহ বলা ঠিক হবে না। ঘটনা ঘটেছে গত রাতে। কাদের এবং রহিমার মা এক ঘরে ঘুমোয়। কাজকর্ম শেষ করে রাত এগারোটায় দিকে রহিমার মা ঘুমুতে এসে দেখে কাদের জেগে বসে আছে। কাদেরের চোখে নতুন চশমা। কাদেরকে কেমন ভদ্রলোক ভদ্রলোক লাগছে। কাদের বলল, কেমন দেহায় খালাজী?

রহিমার মা তৎক্ষণাৎ জবাব দিতে পারল না। বিস্ময় সামলাতে সময় লাগল।

চশমা কই পাইছস?

কিনলাম। একশ দশ টেকা দাম। টেকা পয়সার দিকে চাইলেতো হয় না খালাজী। টেকা পয়সা হইল বাটপাতা। আইজ আছে কাইল নাই। জেবন তো বটপাতা না। জেবনের সাধ আহ্লাদ আছে। কি কন খালাজী?

রহিমার মা জবাব দিল না। কাদের চোখে থেকে চমশা খুলে গম্ভীর ভঙ্গিতে কাচ পরিস্কার করতে করতে বলল, জিনিসটার প্রয়োজনও আছে খালাজী। চেহারা সুন্দরের কথা বাদ দিলেও জিনিসটার বড়ই দরকার। চউক্ষে ধুলাবালি পড়ে না। রইদ কম লাগে। চউক্ষের আরাম হয়।

দাম কত কইলি?

একশ দশ। পাওয়ার দিলে আরো বেশি পড়ত। বিনা পাওয়ারে নিলাম। বুড়াকালে পাওয়ার কিনুম।

রহিমার মা দীর্ঘ নিঃশ্বাস আটকে রাখতে পারল না। এই কাদের ছোকরা বড়ই শৌখিন। বেতনের টাকা পেলেই এটা ওটা কিনে ফেলে। গত মাসে কিনেছে কলম। কলম কিনে এনে গম্ভীর গলায় বলেছে, কলম কিনলাম একটা খালাজী, চাইনিজ।

রহিমার মা অবাক হয়ে বলেছে, কলম দিয়া তুই করবি কি? লেহাপড়া জানছ?

কাদের দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলেছে লেহাপড়া কপালে নাই করমু কি কন? লেহাপড়া না জানলেও কলম এটা থাকা দরকার। পকেটে কলম থাকলে বাইরের একটা লোক ফাঁট কইরা তুমি বইল্যা ডাক দিব না। বলব, ভাইসাব।

রহিমার মারও খুব শখ ছিল একটা কলম কেনার। তবে কাদের যেমন কলম পকেটে নিয়ে ঘুরতে পারে সে তা পারবে না জেনে কেনে নি। এখন আবার চশমা কিনে ফেলেছে। ঈর্ষায় রহিমার মার চোখ জ্বালা করতে লাগল।

কাদের বলল, দেহায় কেমন খালাজী?

রহিমার মা বিরক্ত মুখে বলল, যেমুন চেহারা তেমুন দেহায়। ভ্যান ভ্যান করিস না।

আয়নায় অনেকক্ষণ কাদের নিজেকে দেখল। তারপর বারান্দায় একটু হেঁটে আসল। চমশা পরার পর তার হাঁটার ভঙ্গিও বদলে গেছে।

সেই রাতে মনের কষ্টে রহিমার মার ঘুম হল না। তার মেজাজ খারাপের এই হচ্ছে পূর্ব ইতিহাস। মিনু পূর্ব ইতিহাস জানেন না। কাজেই রহিমার মা যখন এসে তাঁকে বলল, আমার চউক্ষে যেন কি হইছে আম্মা, তখন সঙ্গত কারণেই চিন্তিত হয়ে বললেন, কি হয়েছে?

চাউখ খালি কড় কড় করে।

তাই না-কি?

আবার চিলিক দিয়ে বেদনা হয়।

ডাক্তার দেখাও।

ডাক্তার লাগতো না আম্মা। চশমা দিলে ঠিক হইব। চশমার দাম বেশি নাএকশ দশ। কাদের কিনছে।

কাদের চশমা কিনেছে?

জি আম্মা। জেবনের একটা সাধ আহলাদ আছে না?

মিনু বিরক্ত হয়ে বললেন, কাদের যা করে তোমাকে তাই করতে হবে? তুমি বড় যন্ত্রণা কর রহিমার মা।

কয় দিন আর বাঁচুম আম্মা কন?

আচ্ছা ঠিক আছে যাও চশমা দেয়া হবে।

রহিমার মার চোখে আনন্দে পানি এসে গেল।

চশমা এল তার পরের দিন। রহিমার মা মুগ্ধ। আয়নায় সে নিজেকে চিনতে পারে না। কাদের বলল, ময়লা শাড়িডা বদলাইয়া একটা ভাল দেইখ্যা শাড়ি পরেন। খালা। চশমার একটা ইজজত আছে।

রহিমার মা তৎক্ষণাৎ শাড়ি বদলে গত ঈদে পাওয়া সাদা শাড়ি পরে ফেলল। নতুন শাড়ি এবং চশমার কারণে ছোট খাট একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল।

মনসুর বিকেলে এসেছে। তাকে খবর দেয়া হয় নি, নিজ থেকেই এসেছে। এ বাড়িতে আসবার জন্যে অনেক ভেবেচিন্তে একটা অজুহাতও তৈরি করেছে। অজুহাত খুব যে প্রথম শ্রেণীর তা নয়, তবে মনসুরের কাছে মনে হচ্ছে প্রথম শ্রেণীর। সে ঠিক করে রেখেছে মিলিকে বলবে, আজ আমার জন্মদিন। কাজেই এই বাড়ির মুরুত্বীদের দোয়া নিতে এসেছি। জন্মদিনের কথায় সবাই খানিকটা দুর্বল হয়। মিলিও নিশ্চয়ই হবে। যতক্ষণ কথা বলার প্রয়োজন তার চেয়েও কিছু বেশি কথা বলবে। চা নাশতা দেবে। একটা মানুষতো আর একা একা বসে চা খাবে না। মিলি বসবে তার সামনে। কি ধরনের কথা সে মিলির সঙ্গে বলবে তা মোটামুটি ঠিক করা। কয়েকটা হাসির গল্প বলবে মিলিকে হাসিয়ে দিতে হবে। মেয়েরা রসিক পুরুষ খুব পছন্দ করে। হাসির গল্প সে নিজেও পছন্দ করে কিন্তু তেমন বলতে পারে না।

মনসুর দরজার বেল টিপল। দরজা খুলে দিল রহিমার মা। তার চোখে চশমা, পরনে ইস্ত্রী করা ধবধবে সাদা শাড়ি। মিলি সোফায় বসে কি একটা ম্যাগাজিন পড়ছে।

মনসুর রহিমার মার দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে বলল, আজ আমার জন্মদিন।

রহিমার মা এবং মিলি দুজনই বিস্মিত হয়ে ডাক্তারে দিকে তাকাল। মনসুর মুখের হাসি আরও বিস্তৃত করে বলল, ভাবলাম জন্মদিনে মুরুব্বীদের কাছে থেকে দোয়া নিয়ে যাই। আপনি আমার জন্যে দোয়া করবেন–

এই বলে মনসুর নিচু হয়ে রহিমার মা-র পা ছুঁয়ে সালাম করে ফেলল।

মিলি তার হতভম্ব ভাব সামলে তীক্ষ্ণ গলায় বলল, রহিমার মা যাওতো ডাক্তার সাহেবের জন্যে চা নিয়ে এসো।

রহিমার মা চলে যেতেই মনসুর ক্ষীণ স্বরে বলল, মনে হচ্ছে একটা ভুল হয়ে গেছে।

হ্যাঁ কিছুটা হয়েছে। আপনি মুরুব্বীদের দোয়া নিতে এসেছেন। রহিমার মা বয়সে আপনার অনেক অনেক বড় সেই হিসেবে মুরুব্বী–কাজেই এত আপসেট হচ্ছেন কেন? বসুন। যা হবার হয়ে গেছে।

জ্বি না। বসব না। কাইন্ডলি এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি যদি খাওয়ান। আমি ঠিক বুঝতে পারি নি। কনফিউজড হয়ে গিয়েছিলাম।

আপনি বসুন। পৃথিবী উল্টে যাবার মত কিছু হয়নি। এ রকম ভুল আমরা সব সময় করি।

মিলি ভেতর থেকে ঠাণ্ডা পানি এনে দেখল ডাক্তার নেই। এই প্রথম ডাক্তার ছেলেটির জন্যে সে এক ধরনের মায়া অনুভব করল। তার ইচ্ছা করতে লাগল। কাদেরকে পাঠিয়ে মনসুরকে ডেকে আনায়। চা খেতে খেতে দুজনে খানিকক্ষণ গল্প করে। বেচারা বড় লজ্জা পেয়েছে।

০৬. ফরিদ

দুপুরের খাওয়ার পর ফরিদ টানা ঘুম দেয়। বাংলাদেশের জল হাওয়ার জন্যে এই ঘুম অত্যন্ত প্রয়োজন বলে তার ধারণা। এতে মেজাজের উগ্ৰ ভাবটা কমে যায়–স্বভাব মধু হয়। ফরিদের ধারণা জাতি হিসেবে বাঙালি যে ঝগড়াটে হয়ে যাচ্ছে তার কারণ এই জাতি দুপুরে ঠিক মত ঘুমুতে পারছে না।

তার ঘুম ভাঙল বিকেল চারটায়। চোখ মেলে অবাক হয়ে দেখল। সাত-আট বছরের একটি ফুটফুটে ছেলে এবং চার-পাঁচ বছরের পরীর মত একটি মেয়ে পা তুলে তার খাটে বসে আছে। গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। শিশুদের ফরিদ কখনো পছন্দ করে না। শিশু মানেই যন্ত্রণা। ফরিদের ভুরু কুঞ্চিত। সে গম্ভীর গলায় বলল, তোমরা কে?

ছেলেটি তার চেয়েও গম্ভীর গলায় বলল, আমরা মানুষ।

এখানে কি চাও?

কিছু চাই না।

ছোট মেয়েটি বলল, আপনি আমাদের ধমক দিচ্ছেন কেন? ধমক দিলে আমরা ভয় পাই না।

নাম কি তোমার?

আমার নাম নিশা, ওর নাম টগর। ও আমার ভাই।

আপনার নাম কি?

এতো দেখি বড় যন্ত্রণা হলো।

আমাদের নাম জিজ্ঞেস করেছেন আমরা বললাম, এখন আপনার নাম জিজ্ঞেস করেছি আপনি বলবেন না কেন?

আমার নাম ফরিদ।

আপনাকে কি বলে ডাকব?

কিছু ডাকতে হবে না।

বড়দের কিছু ডাকতে হয়, চাচা, মামা, খালু এইসব।

বললাম তো কিছু ডাকতে হবে না।

নাম ধরে ডাকব?

আরো বড় যন্ত্রণা করছে তো। নামো বিছানা থেকে। নামো।

টগর এবং নিশা গম্ভীর মুখে নামল। ঘর থেকে বের হল কিন্তু পুরোপুরি চলে গেল না, পর্দার ওপাশে দাঁড়িয়ে রইল। মাঝে মাঝে পর্দা সরিয়ে মুখ দেখায় এবং জীব বের করে ভেংচি কাটে আবার মুখ সরিয়ে নেয়। রাগে ফরিদের সর্বাঙ্গ জ্বলে যাচ্ছে। এত সাহস এই দুই বিছুর! এল কোথেকে এইগুলো? খুব সহজে এগুলোর হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না। এরা তার হাড় ভাজা ভাজা করে দেবে। সে অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছে। শিশুদের সঙ্গে তার এক ধরনের বৈরী সম্পর্ক আছে। শিশুরা তাকে নানান ভাবে যন্ত্রণা দেয়।

ফরিদ ডাকল, কাদের কাদের।

অবিকল ফরিদের মতে করে টগর বলল, কাদের-কাদের।

ফরিদ চেঁচিয়ে বলল, এই বিছু দুটাকে ঘাড় ধরে বের করে দে তো কাদের।

ছোট মেয়েটি ফরিদের মত করে বলল, এই বিছু দুটাকে ঘার ধরে বের করে দেতো।

ফরিদ প্ৰচণ্ড ক্ষোভের সঙ্গে বলল, উফ!

সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটি বলল–উফ!

টগর, এবং নিশা এখন যে খেলাটা খেলছে। তার নাম নকল খেলা। এই খেলা হচ্ছে মানুষকে রাগিয়ে দেবার খেলা। যাকে রাগিয়ে দেয়া দরকার তার সঙ্গে এই খেলা খেলতে হয়। সে যা বলে তা বলতে হয়। অবশ্যি বড়দের সঙ্গে এই খেলা খেলতে নেই। তবে টগর এবং নিশা দুজনেরই মনে হচ্ছে এই মানুষটা বড় হলে তার মধ্যে শিশু সুলভ একটা ব্যাপার আছে। তার সঙ্গে এই খেলা অবশ্যই খেলা যায়।

ফরিদ বিছানায় উঠে বসল। চাপা গলায় বলল, শিশুরা শোন, আমি কিন্তু প্ৰচণ্ড রেগে যাচ্ছি।

নিশা বলল, শিশুরা শোন, আমি কিন্তু প্ৰচণ্ড রেগে যাচ্ছি।

ফরিদ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। টগর অবিকল তার মত ভঙ্গিতে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বোনকে নিয়ে চলে গেল। দুই বিছু চলে গেছে দেখেও ফরিদের ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না। তার কেবল মনে হচ্ছে এক্ষুনি এই দুইজন ফিরে আসবে।

রাতে রহিমার মা কাঁদো কাঁদো গলায় মিনুকে বলল, আম্মা বড় বিপদে পড়েছি।

মিনু বললেন, কি বিপদ?

নতুন ভাড়াইট্যার পুলা আর মইয়া দুইটা বড় যন্ত্রণা করে।

কি যন্ত্রণা করে?

আমি যে কথাটা কই হেরাও হেই কথাটা কয়। ভেংগায় আম্মা।

বলতে বলতে রহিমা মা কেঁদে ফেলল। মিনু অসম্ভব বিরক্ত হয়ে বললেন, ছোট দুটা বাচ্চা কি করেছে এতে একেবারে কেঁদে ফেলতে হবে? বাচ্চারা এরকম করেই। সামান্য ব্যাপার নিয়ে আমার কাছে আসবে না।

টগর এবং নিশা যা করছে তাকে ঠিক সামান্য বলে উড়িয়ে দেবার পথ নেই। তারা বারান্দায় রাখা সোবাহান সাহেবের গড়গড়ায় তামাক টেনেছে। গেট বেয়ে দেয়ালের মাথায় চড়ে সেখান থেকে লাফিয়ে নিচে নেমেছে। মিনুর পানের বাটা থেকে জর্দা দিয়ে পান খেয়ে বমি করে ঘর ভাসিয়েছে। খাবার ঘরের সবগুলো চেয়ার একত্র করে রেলগাড়ি রেলগাড়ি খেলা খেলেছে। মিনু ধমক দিতে গিয়েও দিতে পারে নি। বরং মায়ায় তার মন ভরে গেছে। এই বয়সে বাচ্চাদের কোলে নিয়ে বেড়ানো বেশ শক্ত তবু তিনি দীর্ঘসময় নিশাকে কোলে নিয়ে বেড়ালেন। নিশা দুহাতে তাঁর গলা জড়িয়ে ধরে রইল। টগর বলল, তুমি আমাকে কখন কোলে নেবে? আমার ওজন বেশি না, নিশার চেয়ে মাত্ৰ পাঁচ পাউন্ড বেশি।

এরকম বাচ্চাদের উপরে কি কেউ রাগ করতে পারে?

০৭. মাছের সমস্যা

সোবাহান সাহেব তাঁর মাছের সমস্যা নিয়ে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছেন। সম্পর্কে জানার জন্যে তিনি ময়মনসিংহের এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটির ফিসারি ডিপার্টমেন্টে টেলিফোন করেছিলেন। দেখা গেল তারা আমেরিকার মাছ সম্পর্কে প্রচুর জানেন। দেশি মাছ সম্পর্কে তেমন কিছু জানেন না। বইপত্রও নেই। সোবাহান সাহেব বললেন, বিদেশি মাছ সম্পর্কে জেনে কি হবে?

অধ্যাপক ভদ্রলোক রাগী গলায় বললেন, দেশি বিদেশি প্রশ্ন তুলছেন কেন? আমরা মাছ সম্পর্কে জানি, একটা স্পেসিস সম্পর্কে জানি। দেশি মাছ সম্পর্কে একেবারে কিছুই জানি না তাওতো না। বই পত্রে লেখা হচ্ছে, গবেষণা হচ্ছে।

কি গবেষণা হচ্ছে?

কি গবেষণা হচ্ছে তা আপনাকে বলতে হবে না-কি? কেন হবে না? আমি একজন নাগরিক। আমাদের টাকায় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলছে। কাজেই আমাদের জানবার অধিকার আছে।

অধ্যাপক ভদ্রলোক রাগে আগুন হয়ে বললেন, অধিকার ফলাবেন না।

কেন অধিকার ফলাব না? আপনি এত রেগে যাচ্ছেন কেন? এ রকম রেগে গেলে ছাত্র পড়াবেন কিভাবে?

আমার ছাত্র পড়ানো নিয়ে আপনাকে মাথা ঘামাতে হবে না।

কেন হবে না?

অধ্যাপক ভদ্রলোক খট করে টেলিফোন নামিয়ে রাখলেন। সোবাহান সাহেব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগেও চেষ্টা করলেন। সেখানেও এই অবস্থা। অধ্যাপকরা অত্যন্ত সন্দেহজনক ভঙ্গিতে জানতে চান— আপনি কে? মাছ সম্পর্কে জানতে চান কেন?

সোবাহান সাহেব মৎস্য বিভাগের অফিসে গেলেন। সেখানকার অবস্থা ভয়াবহ। বড় দরের সব অফিসাররাই হয় মিটিং-এ নয় সেমিনারে, কয়েকজন দেশের বাইরে। এরচে ছোটপদের অফিসারা হয় টুরে কিংবা ব্যস্ত। একজনকে পাওয়া গেল, তিনি তেমন ব্যস্ত না। চা খেতে খেতে চিত্ৰালী পড়ছেন। সোবাহান সাহেব হুট করে ঢুকে পড়লেন। ভদ্রলোক বিরক্ত মুখে বললেন, কি চান?

মাছ সম্পর্কে আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।

কেন?

কারণ আপনারা মৎস্য বিভাগের লোক।

বলুন কি ব্যাপার।

আপনি পত্রিকাটা আগে পড়ে শেষ করুন তারপর কথা বলব।

ভদ্রলোক পত্রিকা নামিয়ে কঠিন চোখে তাকালেন। ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললেন, বলুন কি বলতে চান?

সোবাহান সাহেব বললেন, দেশে এই যে মাছের তীব্ৰ অভাব তাই নিয়ে কদিন ধরে চিন্তা-ভাবনা করছিলাম।

আপনাকে চিন্তা-ভাবনা করতে বলেছে কে?

সোবাহান সাহেব হতভম্ব হয়ে গেলেন। থমথমে গলায় বললেন, দেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমি কি দেশের সমস্যা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করতে পারব না?

অবশ্যই পারবেন। চিন্তা করে কি পেলেন সেটা যদি অল্প কথায় বলতে পারেন, বলুন। গল্প করলেতো আমাদের চলে না, অফিসের কাজকর্ম আছে।

আমি যা বলতে চাচ্ছি তা হচ্ছে। আমরা যদি এক বছর মাছ না খাই। যদি মাছরা একটা বছর নির্বিঘ্নে বংশ বিস্তার করতে পারে তাহলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

ভাল কথা এটা আমাকে বলছেন কেন?

আপনাকে বলছি কারণ আপনারা যদি জনগণকে বোঝাতে পারেন, মাছ না খাওয়ার একটা ক্যাম্পেইন যদি করেন। তাহলে.

আপনি একটা কথা বলবেন আর ওমি আমরা ঢাক ঢোল নিয়ে সেই কথা প্রচারে লেগে যাব, এটা মনে করলেন কেন?

আমার কথায় যদি যুক্তি থাকে তাহলে আপনারা কেনইবা প্রচার করবেন। না?

আপনার কথায় কোনই যুক্তি নেই।

যুক্তি নেই?

জ্বি না। প্রথমত দেশে মাছের কোন অভাব নেই। সরকার মৎস্য সম্পদ উন্নয়নে যেসব প্রকল্প হাতে নিয়েছেন সেই সব প্রকল্প খুব ভাল কাজ করছে। ফিস প্রোটিনে আমরা এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ।

স্বয়ংসম্পূর্ণ?

অবশ্যই। বিদেশেও আমরা মাছ রপ্তানি করছি। চিংড়ি মাছ এক্সপোর্ট করে কি পরিমাণ ফরেন এক্সচেঞ্জ আমাদের আসে। আপনি জানেন?

জি না।

আপনার জানার দরকারও নেই। আজে বাজে জিনিস নিয়ে মাথা গরম করবেন না এবং আমাদের সময় নষ্ট করবেন না।

সোবাহান সাহেবের মুখ লজ্জায় অপমানে কালো হয়ে গেল। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। মানে বসা ভদ্রলোক সিনেমা পত্রিকাটি মুখের উপর তুলে ধরতে ধরতে নিজের মনে বললেন, পাগল ছাগলে দেশ ভর্তি হয়ে গেছে।

সোবাহান সাহেব হতভম্ব হয়ে বললেন, আপনি আমাকে পাগল বললেন?

আরে না ভাই আপনাকে বলি নাই। দেশে আপনি ছাড়াও তো আরো পাগল আছে? আচ্ছা এখন যান স্নামালিকুম।

সোবাহান সাহেব ঘরে ফিরলেন প্রবল জ্বর নিয়ে। বাড়ির গেটের সামনে মিলি দাঁড়িয়েছিল, সে বাবাকে দেখে চমকে উঠে বলল, তোমার এই অবস্থা কেন বাবা? কি হয়েছে?

সোবাহান সাহেব জড়ালো গলায় বললেন, আমাকে পাগল বলেছে। মুখের উপর পাগল বলেছে।

মিলি বিস্মিত হয়ে বলল, কে তোমাকে পাগল বলেছে?

কে বলেছে সেটাতো ইস্পটেন্ট না। পাগল বলেছে এটাই ইস্পটেন্ট। মোটেই না বাবা। পাগল কোন গালাগালি নয়। পাগল আদরের ডাক। পৃথিবীর সমস্ত প্রতিভাবান লোকদের আদর করে পাগল ডাকা হয়।

মেয়ের কথায় সোবাহান সাহেব খুব যে একটা সান্ত্বনা পেলেন তা নয়। রাতে ভাত খেলেন না। সন্ধ্যার পর পরই ঘর অন্ধকার করে শুয়ে রইলেন। মানুষের কুৎসিত রূপ তাঁকে বড় পীড়া দেয়।

ফরিদ রাতে খাওয়া শেষে দুলাভাইকে দেখতে এল। বিছানার পাশে বসতে বসতে বলল, কে নাকি আপনাকে পাগল বলেছে, আর তাতেই আপনি চুপসে গেলেন।

তোমাকে পাগল বললে কি তুমি খুশী হতে?

আমাকে বললে আমি ঠান্ডা মাথায় ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করতাম। যদি দেখতাম আমাকে পাগল বলার পেছনে যুক্তি আছে, তাহলে সহজভাবে ট্রথকে একসেপ্ট করতাম। এখন আপনি বলুন, কেন সে আপনাকে পাগল বলল? আপনি কি করেছিলেন বা কি বলেছিলেন?

আমি শুধু বলেছিলাম এক বছর যদি আমরা মাছ না খাই তাহলে মাছরা নির্বিঘ্নে বংশ বিস্তার করবে। মাছের অভাব দূর হবে।

এই বলায় সে আমাকে পাগল বলল?

হ্যাঁ।

ঐ ভদ্রলোকের উপর আমার রেসপেক্ট হচ্ছে দুলাভাই। আপনাকে পাগল বলার তার রাইট আছে। এর চেয়ে খারাপ কিছু বললেও কিছু বলার ছিল না। একটা মাছের পেটে কতগুলি ডিম থাকে? মাঝারি সাইজের একটা ইলিশ মাছে ডিম থাকে নয় লক্ষ সাতষট্টি হাজার। মাছের সব ডিম ফুটে যদি বাচ্চা হয়, মাছের কারণে নদী নালা বন্ধ হয়ে যাবে। প্ৰবল বন্যা হবে। মাছ চলে আসবে ক্ষেতে খামারে। ক্ষুধার্থ মাছ সব ফসল খেয়ে শেষ করে ফেলবে। পুরো দেশ চাপা পড়ে যাবে এক ফুট মাছের নিচে। কি ভয়াবহ অবস্থা চিন্তা করে দেখুন দুলাভাই।

সোবাহান সাহেব অত্যন্ত বিরক্ত হলেন। মনে মনে বললেন, গাধার গাধা। ঘর অন্ধকার বলে ফরিদ সোবাহান সাহেবের তীব্র বিরক্তি টের পেল না। সে মহা উৎসাহে বলে চলল, আপনি মনে হয় আমার কথা ঠিক বুঝতে পারছেন না, কিংবা বুঝতে পারলেও বিশ্বাস করছেন না। আমি প্রমাণ করে দিচ্ছি। ধরুন আমাদের দেশে মাছের মোট সংখ্যা একশ কোটি। খুব কম করে ধরলাম মোট ংখ্যা তারচে অনেক বেশি। একশ কোটি মানে টেন টু দি পাওয়ার এইট। টেন বেস লগারিদমে এটা হল আট। এই মাছের অর্ধেক যদি স্ত্রী মাছ হয় তাহলে টেন বেস লগে কি দাঁড়ায়? আচ্ছা এক কাজ করা যাক, টেন বেস না ধরে নেচারেল লগারিদমে নিয়ে আসি। এতে পরে হিসেবে সুবিধা হবে।

সোবাহন সাহেব থমথমে গলায় বললেন, বহিস্কার, এই মুহুর্তে বহিস্কার।

ফরিদ বিস্মিত হয়ে বলল, আমাকে বলছেন?

হ্যাঁ, তোমাকে বলছি। বহিস্কার, বহিস্কার।

আমি খুব দুঃখের সঙ্গে বলতে চাচ্ছি দুলাভাই যে আপনার আচার-আচরণ পরিষ্কার ইংগিত করছে…

আবার কথা বলে, বহিস্কার।

ফরিদ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। তার মনটা খারাপ হয়ে গেছে, বেশ খারাপ। অবশ্যি তার মন খারাপ কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হয় না, আজো হল না–নিজের ঘরে ঢোকা মাত্র মন ভাল হয়ে গেল। রাত কাটানোর খুব ভাল ব্যবস্থা করা আছে। ভিডিও ক্লাব থেকে স্পার্টকার্স ছবিটা আবার আনা হয়েছে, এবারে প্রিন্ট বেশ ভাল। আজ রাতে ছবি দেখা হবে। ছবি দেখার ফাঁকে ফাকে ডিসকাশন হবে কাদেরের সঙ্গে। ছবির খুঁটিনাটি কাদের এত ভাল বোঝায়ে ফরিদ প্রায়ই চমৎকৃত হয়। যেমন স্পটাকার্স ছবির এক অংশ স্পটাকর্সের সঙ্গে নিগ্রো গ্লাডিয়েটরের যুদ্ধ হবে। যুদ্ধের আগের মুহুর্তে দুজন একটা ঘরে অপেক্ষা করছে। উত্তেজনায় স্পার্টাকার্স কেমন যেন করছে। তার অস্থিরতা দেখে নিগ্রো হেসে ফেলল। অসাধারণ অংশ। ফরিদ বলল, দৃশ্যটা কেমন কাদের? কাদের বলল, বড়ই চমৎকার মামা কিন্তুক বিষয় আছে।

কি বিষয়?

হাসিটা কম হইছে। আরেকটু বেশি হওনের দরকার।

উঁহু, বেশি হলে নান্দনিক দিক ক্ষুন্ন হবে।

কিন্তুক মামা, হাসি যেমন হঠাৎ আইছে তেমন হঠাৎ গেলে ভাল হইত। এই হাসি হঠাৎ যায় না, ঠোঁটের মইধ্যে লাইগ্যা থাকে।

ফরিদ সত্যি সত্যি চমৎকৃত হল। এ রকম প্রতিভা, বাজার করে আর ঘর বাট দিয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে ভাবতেই খারাপ লাগে।

মামা কি করছ?

কিছু করছি নারে মিলি। আয়।

মিলি ঘরে ঢুকল। হাসি মুখে বলল, তোমাদের ছবি এখনো শুরু হয় নি?

না।

আজ কি ছবি?

স্পটাকার্স।

স্পটাকার্স না একবার দেখলে।

একবার কেন হবে, এ পর্যন্ত পাঁচবার হল। ভাল জিনিস অনেবার দেখা যায়।

আচছা মামা এই যে তুমি কিছুই কর না, খাও দাও ঘুমাও, ছবি দেখ, তোমার খারাপ লাগে না?

না তো। খারাপ লাগবে কেন? তুই যদি পৃথিবীর ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করিস তালে জানতে পারবি পৃথিবীর জনগষ্ঠির একটা বড় অংশ এভাবে জীবন কাটিয়ে দেয়। জনগষ্ঠির ইকুইলিব্রিয়াম বজায় রাখার জন্যেই এটা দরকার। জনতা এই অকৰ্মক অংশের কাজ হচ্ছে কর্মক অংশগুলোর টেনশন এ্যাবজাৰ্ভ করা। অর্থাৎ শত এ্যাবজাৰ্ভারের মত কাজ করা।

সব ব্যাপারেই তোমার একটা থিওরী আছে, তাই না মামা?

থিওরী বলা ঠিক হবে না, বলতে পারিস হাইপোথিসিস। থিওরী আর হাইপোথিসিস কিন্তু এক না—

চুপ করতো মামা।

তুই দেখি তোর বাবার মত হয়ে যাচ্ছিস। সব কিছুতে চুপ কর, চুপ কর।

মিলি গম্ভীর গলায় বলল, আজ তোমার থিওরী শুনতে আসিনি মামা। আজ এসেছি তোমার সঙ্গে ঝগড়া করতে।

আমি কি করলাম?

তুমি খুব অন্যায় করেছ মামা।

অন্যায় করেছি?

হ্যাঁ করেছ। বাবার স্বভাব চরিত্র তুমি খুব ভাল করেই জান। তুমি জান বাবা কত অল্পতে আপসেট হয়। সব জেনেশুনে তুমি তাকে আপসেট কর। মাছের সমস্যাটা নিয়ে বাবা একদিন ধরে ভাবছে, হতে পারে তার ভাবনাটা ঠিক না। কিন্তু কেউ যেখানে ভাবছে না। বাবাতো সেখানে ভাবছে।

তা ভাবছে।

তাকে আমরা সাহায্য না করতে পারি–ডিসকারেজ করব কেন?

এসব উদ্ভট আইডিয়াকে তুই সাপোর্ট করতে বলছিস?

হাঁ বলছি। এতে বাবা শান্তি পাবে, সে বুঝবে যে সে একা না।

তুই এমন চমৎকার করে কথা বলা কোথেকে শিখলি?

সিনেমা দেখে দেখে শিখিনি —এইটুকু বলতে পারি।

তোর কথা বলার ধরন দেখে অবাকই হচ্ছি–ছোটবেলায় তো হাবলার মত ছিলি।

কি যে তোমার কথা মামা। আমি আবার কবে হাবলার মত ছিলাম?

মিলি উঠে দাঁড়াল। ফরিদ বলল, আচ্ছা যা তোর কথা রাখলাম। স্ট্রং সাপোর্ট দেব।

মিলি বলল, সবকিছুতেই তুমি বাড়াবাড়ি কর মামা, স্ট্রং সাপোর্টের দরকার নেই।

তুই দেখ না কি করি।

মিলি চিন্তায় পড়ে গেল। মামার কাজ কর্মের কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। কি করে বসবে কে জানে। মামাকে কিছু না বলা বোধ হয় ভাল ছিল। মিলি নিজের ঘরে চলে গেল। মনটা কেন জানি খারাপ লাগছে। মন খারাপ লাগার যদিও কোন কারণ নেই। ইদানিং ব্যাপারটা ঘন ঘন ঘটছে। অকারণে মন খারাপ হচ্ছে।

আফা ঘুমাইছেন?

মিলি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল রহিমার মা দাঁড়িয়ে আছে।

কি ব্যাপার রহিমার মা?

একটা সমস্যা হইছে আফা।

কি সমস্যা। চশমা দেওনের পর থাইক্যা সব জিনিস দুইটা করে দেখি।

বল কি?

হ আফা। এই যে আফনে চেয়ারে বইয়া আছেন মনে হইতাছে দুইখান আফা। একজন ডাইনের আফা একজন বায়ের আফা।

মিলি অবাক হয় তাকিয়ে রইল। রহিমার মা বলল, টেবিলের উপরে একখান গেলাস থাকে তখন আমি দেখি দুইখান গেলাস, এই দুই গেলাসের মাঝামাঝি হাত দিলে আসল গেলাস পাওয়া যায়।

কি সর্বনাশের কথা। চশমা পরা বাদ দাও না কেন?

অত দাম দিয়া একখান জিনিস কিনছি বাদ দিমু ক্যান? সমিস্যা একটু হইতাছে, তা কি আর করা কন আফা, সমিস্যা ছাড়া এই দুনিয়ায় কোন জিনিস আছে? সব ভাল জিনিসের মইদ্যে আল্লাহতালা মন্দ জিনিস ঢুকাইয়া দিছে। এইটা হইল আল্লাহতালার খুদরত। যাই আফা।

রহিমার মা চলে যাচ্ছে। পা ফেলছে খুব সাবধানে, কারণ সে শুধু যে প্রতিটি জিনিস দুটা করে দেখছে তাই না ঘরের মেঝেও উঁচুনিচু দেখেছে। তার কাছে মনে হচ্ছে চারদিকে অসংখ্য গর্ত। এসব গর্ত বাঁচিয়ে তাকে সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে। চশমা পড়া খুব সহজ ব্যাপার নয়।

মিলির পড়ায় মন বসছে না। সে বাতি নিভিয়ে বারান্দায় এস। দাঁড়াল। উপর থেকে টগর এবং নিশির খিলখিল হাসি শোনা যাচ্ছে। এত রাতেও বাচ্চা দুটি জেগে আছে। এদের কোন ঠিক ঠিকানা নেই। কোনদিন সন্ধ্যা না মিলতেই ঘুমিয়ে পড়ে আবার কোনোদিন গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকে। আনিস সাহেব বাচ্চা দুটিকে ঠিকমত মানুষ করতে পারছেন না। সারাদিন কোথায় কোথায় নিয়ে ঘুরেন। আগের স্কুল অনেক দূরে কাজেই তারা এখন স্কুলেও যাচ্ছে না।

ভদ্রলোকের উচিত আশেপাশের কোন স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়া। তিনি তাও করছেন না।

বাচ্চাদের হাসির সঙ্গে সঙ্গে একবার তাদের বাবার হাসি শোনা গেল। কি নিয়ে তাদের হাসাহাসি হচ্ছে জানতে ইচ্ছ করছে— নিশ্চয়ই কোন তুচ্ছ ব্যাপার। এমন নির্মল হাসি সাধারণত তুচ্ছ কোন বিষয় নিয়েই হয়।

মিলির ধারণা সত্যি। অতি তুচ্ছ বিষয় নিয়েই হাসােহাসি হচ্ছে। আনিস তার ছেলেবেলার গল্প করছে, তাই শুনে একেকজন হেসে গড়িয়ে পড়ছে। আনিসের ছেলেবেলা সিরিজের প্রতিটি গল্পই এদের শোনা, তবু কোন এক বিচিত্র কারণে গল্পগুলো এদের কাছে পুরানো হচ্ছে না।

নিশা বলল, তুমি খুবই দুষ্ট ছিলে তাই না বাবা?

না দুষ্ট ছিলাম না। আমার বয়েসী ছিলেদের মধ্যে আমি ছিলাম। সবচে শান্ত। তবু কেন জানি সাবই আমাকে খুব দুষ্ট ভাবত।

বাবা আমরা কি দুষ্ট না শান্ত?

তোমার খুবই দুষ্ট কিন্তু তোমাদের সবাই ভাবে শান্ত। অনেক রাত হয়ে পড়েছে এসো শুয়ে পরি।

টগর বলল, আজ ঘুমুতে ইচ্ছা করছে না।

কি করতে ইচ্ছা করছে?

গল্প শুনতে ইচ্ছা করছে। তোমাদের বিয়ের গল্পটা কর না বাবা।

এই গল্পতো আনেকবার শুনেছি, আবার কেন?

আরেকবার শুনতে ইচ্ছা করছে।

এই গল্প শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমুতে যাবে তো?

হ্যাঁ যাব।

তোমার মা ছিল খুব চমৎকার একটি মেয়ে…

নিশা বাবার কথা শেষ হবার আগেই বলল, আর ছিল খুব সুন্দর।

হ্যাঁ খুব সুন্দরও ছিল। তখনো আমি তাকে চিনি না। একদিন নিউমার্কেট বইয়ের দোকানে বই কিনতে গিয়েছি, একই দোকানে তোমার মাও গিয়েছে…

টগর বলল, মার পরণে আসমানী রঙের একটা শাড়ি।

হ্যাঁ তার পরণে আসমানী রঙের শাড়ি ছিল।

নিশা বলল, সে বই কিনতে গিয়েছে কিন্তু বাসা থেকে টাকা নিয়ে যায় নি।

আনিস হেসে ফেলল।

নিশা বলল, হাসছ কেন বাবা?

তোমরা দুজনে মিলেইতো গল্পটা বলে ফেলছি, এই জন্যেই হাসি আসছে। চল আজ শুয়ে পড়া যাক। ঠান্ডা লাগছে।

তারা আপত্তি করল না। বিছানায় নিয়ে শোয়ানো মাত্র ঘুমিয়ে পড়ল। অনেকদিন পর আনিস তার খাতা নিয়ে বসল। উপন্যাসটা যদি শেষ করা যায়। নিতান্তই সহজ সরল ভালবাসাবাসির গল্প। অনেকদূর লেখা হয়ে আছে কিন্তু আর এগুলো যাচ্ছে না। একেই বোধ হয় বলে রাইটার্স ব্লক, লেখক চরিত্র নিয়ে ভাবতে পারেন, মনে মনে কাহিনী অনেক দূর নিয়ে যেতে পারেন কিন্তু লিখতে গেলেই কলম আটকে যায়। যেন অদৃশ্য কেউ এসে হাত চেপে ধরে, কানে কানে বলে–না তুমি লিখতে পারবে না।

আনিস রাত তিনটা পর্যন্ত জেগে দুপৃষ্ঠা লিখল। ঘুমুতে যাবার আগে সেই দুই পৃষ্ঠা ছিড়ে কুচি কুচি করে ফেলল।

০৮. ফরিদের নাশতা সাজানো

সকাল দশটার উপর বাজে।

খাবার টেবিলে ফরিদের নাশতা সাজানো। ফরিদ নাশতা খেতে আসছে না সে বাগানে বসে আছে। তাকে দেখেই মনে হচ্ছে সারারাত ঘুম হয়নি। অঘুমোজনিত ক্লান্তির সঙ্গে এক ধরনের চাপা উত্তেজনাও তার মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মিলিকে খবর পাঠানো হয়েছে। ফরিদ অপেক্ষা করছে মিলির জন্যে। মিলি ইউনিভার্সিটিতে যাবার জন্যে তৈরি হয়েই নিচে নামল। মামার খোজে বাগানে গেল।

একটা ব্যাপার মামা?

সারারাত ঘুম হয়নিরে মিলি।

তাতে তো তোমার খুব অসুবিধা হবার কথা না। প্রচুর ঘুম তোমার একাউন্টে জমা আছে। বছর খানেক না ঘুমালেও কিছু হবে না।

তোর কি খুব তাড়া আছে?

হ্যাঁ আছে। এগারোটায় ক্লাস, এখন বাজে দশটা দশ।

আজকের ক্লাসটা না করলে হয় না?

না হয় না। ব্যাপারটা কি বলে ফেল।

অদ্ভুত একটা আইডিয়া মাথায় চলে এসেছে। অন্ধকারে যেন একটা এক হাজার ওয়াটের বাতি জ্বলে উঠল।

তাই না-কি?

দুলা ভাইয়ের মৎস্য ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছিলাম। কি করে তাকে সাপোর্ট করা যায় এই সব ভাবতে ভাবতে প্রায় ঘুমিয়েই পড়েছি। হঠাৎ মাথার মধ্যে দপ করে হাজার পাওয়ারের বাতি জ্বলে উঠল। আমি ইউরেকা বলে লাফিয়ে উঠলাম।

আইডিয়া পেয়ে গেল?

রাইট। আইডিয়া পেয়ে গেলাম, ছবি বানাব।

ছবি বানাবে মানে?

দেশের মৎস্য সম্পদ নিয়ে একটা শর্ট ফ্রিম। মাছের জীবন কথা বলতে পারিস। মাছদের জীবনে আনন্দ-বেদনার কাব্য। ছবির নামও ঠিক করে ফেললাম। ছবির নাম–হে মাছ।

হে মাছ?

হ্যাঁ–হে মাছ। এই ছবি যখন রিলিজ হবে তখন চারদিকে হৈ চৈ পরে যাবে। মৎস্য সমস্যার এটু জেড পাবলিক জেনে যাবে। দুলাভাই যা চাচ্ছিলেন তাই হবে তবে অনেক তাড়াতাড়ি হবে। এক গুলিতে যুদ্ধ জয় যাকে বলে।

ছবি যে বানাবে টাকা পাবে কোথায়?

কোন মহৎ কাজ কখনো টাকার অভাব আটকে থাকে বল?

মামা যাই, আমার দেরী হয়ে যাচ্ছে।

একদিন ইউনিভার্সিটিতে না গেলে কি হয়?

অনেক কিছু হয়। তুমি তোমার চিন্তা ভাবনা করতে থাক পরে শুনব।

ফরিদ সারা দুপুর দরজা বন্ধ করে বসে রইল। কাদেরের কাজ হল কিছুক্ষণ পর পর চা এনে দেয়া। ফরিদ কোথায় যেন পড়েছিল তামাকের নিকোটিন ক্রিয়েটিভিটিতে সাহায্য করে। কাদেরকে দিয়ে সিগারেট আনানো হল। সিগারেটের ধূয়া মাথা ঘুরা, বমি ভােব এবং কাশি তৈরি ছাড়া অন্যকোনভাবে সাহায্য করল না। দুপুরে ফরিদ কিছু খেল না— শুধু একটা টোস্ট বিসকিট এবং আধা কাপ দুধ। কারণ ফুল স্টমাকে ক্রিয়েটিভ কাজ কিছু হয় না। জগতে বড় বড় ক্রিয়েটিভ কাজ করছে। প্রতিভাবান ক্ষুধার্তা মানুষ। ক্ষুধার সঙ্গে প্রতিভার ঘনিষ্ট যোগাযোগ আছে।

সন্ধ্যা নাগাদ হে মাছ চিত্ৰনাট্যের খসড়া তৈরি হয়ে গেল। প্রথম পাঠক সৈয়দ মোহাম্মদ কাদের। ফরিদ বলল, কেমন বুঝছিস কাদের?

কাদের গাঢ় স্বরে বলল, বোঝাবুঝির কিছু নাই মামা–ফাডাফাডি জিনিস হইছে!

ক্লাইমেক্সগুলো কেমন এসেছে?

কেলাইমেক্সের কথা কইয়া আর কাম কি মামা? ফলে পরিচয়। এই দেহেন শইলের লোম খাড়া হইয়া গেছে। হাত দিয়ে দেহেন।

ফরিদ হাত দিয়ে দেখল— যে কোন কারণেই হোক কাদেরের গায়ের লোম সত্যি সত্যি খাড়া হয়ে আছে।

কাদের!

জ্বি মামা।

এখনো ফাইন্যাল করিনি। তবে মনে হচ্ছে তোকে একটা রোল দেব।

কি কইলেন মামা?

নৌকার হতদরিদ্র মাঝির ভূমিকা তোর পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

কাদের স্তম্ভিত। সে মূর্তির মত বসে রইল। নড়াচড়া করতে পারল না।

সোবাহান সাহেবের শরীর আজ বেশ ভাল। জ্বর নেই। ক্লান্তির ভাব ছাড়া তার কোন শারীরিক অসুবিধাও নেই। তিনি যথারীতি বারান্দায় তার ইজিচেয়ারে বসে আছেন। তার কোলে বিশাল খাতা। যার মলাটে লেখা মৎস্য সমস্যা। আজ আবার মৎস্য সমস্যা নিয়ে বসেছেন। বাংলাদেশের মাছের পূর্ণ তালিকা এখনো তৈরি হয়নি। ছোট প্ৰজাতির মাছগুলোর একেক অঞ্চলে একেক নাম। এও এক যন্ত্রণা।

রহিমার মা সোবাহান সাহেবের সামনে বসে আছে। মাছের নাম বলছে। বেশ কিছু নাম সোবাহান সাহেব তার কাছ থেকে পেয়েছেন।

কি নাম বললে?

দাঁড়কিনি মাছ।

দাঁড়কিনি মাছ? সত্যি সত্যি এই নামে কোন মাছ আছে না বসে বসে বানোচ্ছ? দাঁড়কাকের কথা জানি। দাড়কিনিতো কখনো শুনিনি।

আছে, আফনে লেহেন–পিতল্ল্যা মাছ।

পিতল্ল্যা মাছ?

জ্বি।

সেটা কেমন?

খুব ছোড, লেজ আছে।

ফাজলামি করছ না-কি রহিমার মা? লেজ তো সব মাছেরই আছে। এমন কোন মাছ আছে যার লেজ নেই?

থাকতেও পারে। আল্লাহর কুদরতেরতো কোনো সীমা নাই।

আচ্ছা তুমি এখন যাও।

নামডা লেখছেনতো–পিতল্ল্যা মাছ। পিতলের লাহান রং এই কারণে নাম পিতল্ল্যা মাছ।

সোবাহান সাহেব পিতল্ল্যা মাছ লিখলেন। তবে ব্রাকেটে প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে রাখলেন।

আনিসকে দোতলার সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখা গেল। তার সঙ্গে টগর এবং নিশা। আনিস হাসিমুখে বলল, স্নামালিকুম স্যার।

টগর এবং নিশাও সঙ্গে সঙ্গে বলল, স্নামালিকুম স্যার, স্নামালিকুম স্যার।

যাচ্ছচ কোথায় আনিস?

কোথাও না। ওদের নিয়ে একটু হাঁটতে বের হয়েছি। আপনি কি করছেন?

আমি মাছের নাম লিখছি। তোমাকে বলেছিলাম না মৎস্য সমস্যা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছি। আমাদের দেশ হচ্ছে মাছের দেশ অথচ মাছের কি ভয়াবহ আকাল।

তাতো বটেই।

দুটা মিনিট দাড়াওতে আনিস–আমি নামগুলো তোমাকে পড়ে শুনাচ্ছি। দেখ কোন নাম বাদ পড়েছে কিনা।

সোবাহান সাহেব পড়তে শুরু করলেন— রুই,কাতল, মৃগেল, পাঙ্গাশ, চিতল, বোয়াল, কালি বাউস, নানিদ, চিংড়ি, কৈ, মাগুর, শিং, পুঁটি, শোল, মহাশোল, রিঠা, ভেটকি, টেংরা, খইলসা, কাইক্যা, পাবদা, লাটি, বাতাসী, আইড়, বাইম, তপসে, নলা, ফইল্যা, দাঁড়কিনি, পিতল্ল্যা— কিছু কি বাদ পড়ল আনিস?

আনিস কিছু বলার আগেই নিশা বলল— ইলিশ বাদ পড়েছে স্যার। সোবাহান সাহেব অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। সত্যি সত্যি ইলিশ বাদ পড়েছে। এটা কি করে হল? আসল মাছটাই বাদ পড়ে গেল। সোবাহান সাহেব ক্ষীণ স্বরে বললেন, এটা কেমন করে হল আনিস? এত বড় ভুল কি করে করলাম?

আনিস হাসিমুখে বলল, এটা কোন বড় ভুল না, খুবই সাধারণ ভুল—যা আমরা সব সময় করি। যে জিনিস চোখের সামনে থাকে তাকে আমরা ভুলে যাই। যে ভালবাসা সব সময় আমাদের ঘিরে রাখে। তার কথা আমাদের মনে থাকে না। মনে থাকে হঠাৎ আসা ভালবাসার কথা।

ঠিকই বলেছ আনিস।

স্যার যাই, স্নামালিকুম।

তিনি জবাব দিলেন না। টগর বলল, স্যার যাই স্নামালিকুম। নিশাও বলল, স্যার যাই স্নামালিকুম। সোবাহান সাহেব হেসে ফেললেন। হঠাৎ তার কাছে মনে হল এই পৃথিবী বড়ই আনন্দের স্থান। এই পৃথিবীতে বাস করতে পারার সৌভাগ্যের জন্যে তিনি নিজের প্রতিই খানিক ঈর্ষা অনুভব করতে লাগলেন।

খাবার টেবিলে হে মাছের চিত্ৰনাট্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। খেতে বসেছে মিলি এবং ফরিদ। মিলির চিত্ৰনাট্য বিষয়ক কথাবার্তা শোনার আগ্ৰহ নেই, কিন্তু ফরিদ শোনাবেই। ফরিদ গম্ভীর গলায় বলছে—

সব মিলিয়ে চরিত্র হচ্ছে চারটি। জেলে, জেলের স্ত্রী, খেয়া নৌকার মাঝি এবং একটা চোর।

মিলি বলল, মাছ নিয়ে ছবি এর মধ্যে আবার চোর কেন?

পুরোটা না শুনেই কথা বলিস এটাই হচ্ছে তোর বড় সমস্যা। চোরের প্রয়োজন আছে বলেই চোর আছে। একটা হাই ড্রামা স্টোরী। এখানে. টেনশন বিন্ড আপ করতে চোর লাগবে। জেলের নিজস্ব কোন নৌকা নেই, সে খেয়া নৌকায় করে মাছ মারতে বের হয়েছে। সেই নৌকায় বসে আছে। একজন চোর। ওপেনিং শটে— নৌকা দেখা যাচ্ছে। দিনের অবস্থা ভাল না। ঢেউ উঠেছে। নৌকা টালমাটাল করছে। ফাস্ট ডায়লগা জেলে দিচ্ছে–ক্যামেরা জুম করে জেলের মুখে চলে গেল, মিলি শুনছিসতো কি বলছি?

হ্যাঁ শুনছি।

জেলে বলল, ও মাঝি ভাই, একখান গীত গান। মাঝি বলল, পেডে যদি ভাত না থাহে, গীত আইব ক্যামনে। জেলে বলল, কথা সত্য। নদীত নাই মাছ। তখন হঠাৎ কি মনে করে যেন মাঝি গান ধরল, ও আমার সোনা বন্ধুরে ও আমার রসিয়া বন্ধুরে। এই গানের সঙ্গে সঙ্গে জাল ফেলা হবে। ক্যামেরা মাঝির মুখ থেকে কাট করে চলে যাবে জালে। সেখান থেকে কাট করে পানিতে, কাট করে লং শটে নৌকা। কাট মিড ক্লোজ আপে তোর মুখ।

আমার মুখ মানে?

জেলের স্ত্রীর ভূমিকায় তুই অভিনয় করছিস। দুঃখ, অভাব অনটনে পর্যুদস্ত বাংলার শাশ্বত নারী। হৃদয়ে মমতার সমুদ্র, পেটে ক্ষুধার অগ্নি।

মামা, তোমার এসব ঝামেলায় কিন্তু আমি নেই।

আমি কি বাইরে থেকে আটিষ্ট আনিব না-কি? নিজেদেরই কাজ করতে হবে। আমি পৃথিবীকে দেখিয়ে দেব— অভিনয়ের অ জানে না। এমন মানুষ নিয়েও ছবি হয় এবং এ ক্লাস ছবি হয়। ডায়ালগ মুখস্ত করে ফেলবি, পরশু থেকে রিহার্সেল।

মিলি বিরক্ত গলায় বলল, তোমার এই পাগলামীর কোন মানে হয় মামা? মুখে বললেই ছবি হয়ে যাবে? টাকা-পয়সা লাগবে না?

আমার কি টাকা পয়সার অভাব? দুলাভাইয়ের কাছে আমার কত টাকা জমা আছে তুই জানিস? প্রয়োজন হলে মগবাজারের বাড়ি বিক্রি করে দেব। মরদক বাত, হাতিকা দাঁত। একবার যখন বলে ফেলেছি–

হবে না। শুধু শুধু—

আগেই টের পেয়ে গেছিস শেষ পর্যন্ত কিছু হবে না? জীবন সম্পর্কে এমন পেসিমিস্টক ভিউ রাখবি না। মনটাকে বড় কর।

আর কে কে অভিনয় করছে তোমার ছবিতে?

এখানো ফাইন্যাল হয় নি। ডাক্তার ছোকরাকে বলে দেখব, আর দেখি নতুন ভাড়াটে আনিস রাজি হয় কি-না।

ওরা ছবিতে অভিনয় করবে। কেন?

শিল্পের প্রতি মমত্ববোধ থেকে করবে। মহৎ কাজে শরিক হবার স্পিরিট থেকে করবে। আনিস ছোকরাকে আজ রাতেই ধরব।

মিলি তাকিয়ে আছে মামার দিকে। সে যে খুব উৎসাহ বোধ করছে তা মনে হচ্ছে না।

আনিস আছ না-কি?

আনিস দরজা খুলল। ফরিদকে দেখে অবাক হলেও ভাব ভঙ্গিতে তার কোন প্ৰকাশ হল না। সে হাসি মুখে বলল, স্নামালিকুম।

ওয়ালাইকুম সালাম। তুমি করে বললাম। কিছু মনে করনিতো? আমি মিলির মামা।

জ্বি আমি জানি। আসুন ভেতরে আসুন।

ভেতরে যাব না। কাজের কথা সেরে চলে যাব। খুব ব্যস্ত। ছবির স্ত্রীপ্ট করছি, মাছ নিয়ে শর্ট ফ্রিম বানাচ্ছি। নাম হচ্ছে হে মাছ।

তাই না কি?

হ্যা! তাই। এখন কথা হচ্ছে তুমি কি ছবিতে অভিনয় করবে? এক গাদা কথা বলার দরকার নেই। বল হ্যাঁ কিংবা না।

আনিস হকচকিয়ে গেল। কেউ তাকে অভিনয়ের জন্যে ডাকতে পারে তা তার মাথায় কখনো আসে নি। ফরিদ বলল, আমার ছবিতে একটা চোরের ক্যারেক্টার আছে। এই জন্যেই তোমার কাছে আসা নয়ত আসতাম না। তোমার চেহারায় একটা চোর চোর ভাব আছে।

আনিস হতভম্ব হয়ে বলল, আমার চেহারায় চোর চোর ভাব আছে?

হ্যাঁ আছে।

আনিস বিস্মিত গলায় বলল, নিজের সম্পর্কে আজে বাজে কথা অনেক শুনেছি, কিন্তু আমার চেহারা চোরের মত এটা এই প্রথম শুনলাম।

সত্যি কথা আমি পেটে রাখতে পারি না। বলে ফেলি। তুমি আবার কিছু মনে করনি তো?

জ্বি না, কিছু মনে করিনি।

অভিনয় করবে, না করবে না?

করব। এ জীবনে অনেক কিছুই করেছি। অভিনয়টাই বা বাদ থাকবে কেন?

ফরিদ হৃষ্টচিত্তে নিচে নেমে এল। এখন ডাক্তার ছোকরা রাজি হলেই কাজ শুরু করা যায়। তবে ছোকরার ব্রেইন বলে কিছু নেই। তার কাছ থেকে অভিনয় আদায় করা কষ্ট হবে। ব্যাটা হয়তো রাজিও হতে চাইবে না। ফরিদের ধারণা ডাক্তার এবং ইনজিনিয়ার এই দুই সম্প্রদায়, অভিনয় কলার প্রতি খুব উৎসাহী নয়। আজ রাতেই ব্যাপারটা ফয়সালা করে ফেললে কেমন হয়?

ফরিদ কাদেরকে পাঠাল মনসুরকে ডেকে আনতে। মনসুর সঙ্গে সঙ্গে চলে এল। মনে হল যেন কাপড় পরে এ বাড়িতে আসার জন্যে তৈরি হয়েই ছিল। মনসুরের সঙ্গে ফরিদের নিম্নলিখিত কথোপকথন হল।

ফরিদ : তোমাকে একটি বিশেষ কারণে ডেকেছি। অসুখ বিসুখের সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নেই।

মনসুর : জ্বি বলুন।

ফরিদ : আচ্ছা স্ত্রী হিসাবে মিলি কি তোমার জন্যে মানানসই হবে বলে মনে হয়? মিলি আবার একটু বেঁটে, ভেবে চিন্তে বল।

মনসুর : (তোতলাতে তোতলাতে) জ্বি মামা, অবশ্যই হবে। বেঁটে কি বলছেন? পারফেক্ট হাইট। মানে আমার ধারণা-মানে—

ফরিদ : মিলি স্বামী হিসেবে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে?

মনসুর : অবশ্যই পারব। একশ বার পারব।

ফরিদ : তাহলে কাল থেকে রিহার্সেল শুরু করে দাও।

মনসুর : (বিস্মিত) কিসের রিহার্সেল?

ফরিদ : মিলি করবে জেলে স্ত্রীর ভূমিকা আর তুমি হচ্ছে জেলে।

মনসুর : আমি মামা কিছুই বুঝতে পারছি না।

ফরিদ : ছবি বানাচ্ছি। শর্ট ফ্রিম। সেখানে তোমার ভূমিকা হচ্ছে অভাব অনটনে পর্যুদস্ত জেলে, আর মিলি তোমার স্ত্রী।

মনসুর : ছবির কথা বলছেন? ফরিদ : অফকোর্স ছবির কথা বলছি। তুমি কি ভেবেছিলে?

মনসুর : (শুকনো গলায়) একগ্লাস ঠাণ্ডা পানি খাব। একগ্লাস ঠাণ্ডা পানি খেয়ে মনসুর ক্ষীণ স্বরে বলল, মিস মিলি কি আমার সঙ্গে অভিনয় করতে রাজি হবেন?

সেতো রাজি হয়েই আছে।

তাই নাকি–আরেক গ্রাস পানি খাব।

মনসুর দ্বিতীয় গ্লাস পানি খেয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় জানাল যে, সে অতি আগ্রহের সঙ্গে মিস মিলির অভিনয় করবে।

তুমি আগে অভিনয় করেছ?

জ্বি না। অসুবিধা হবে না–আমি শিখিয়ে দেব। অভিনয় কঠিন কিছু না। জাল ফেলতে জান?

শিখে নেবে।

জ্বি আচ্ছা।

মাথাটা কাল পরশু কামিয়ে ফেল।

ডাক্তার হকচকিয়ে গেল। টোক গিলে ভয়ে ভয়ে বলল, কি বললেন মামা?

মাথাটা কামিয়ে ফেলতে বললাম। জেলেদের মাথায় থাকে কদমছাট চুল। মাথা না কামালে ঐ জিনিস পাব কোথায়? কোন অসুবিধা আছে?

জ্বি না। কোন অসুবিধা নেই। আপনি যা বলবেন তাই করব।

ভেরি গুড।

অভিনয় নিয়ে মিস মিলির সঙ্গে কি একটু কথা বলতে পারি?

ফরিদ বিরক্ত হয়ে বলল, তার সঙ্গে আবার কি কথা? সে অভিনয়ের জানে কি? যা জানতে চাইবে আমাকে প্রশ্ন করলেই জানবে।

ডাক্তার বলল, জি আচ্ছা।

০৯. ফজরের নামায

ফজরের নামায শেষ করে সোবাহান সাহেব তসবি হাতে বাগানে খানিকক্ষণ হাঁটেন। আজও তাই করছেন। হঠাৎ মনে হল কে যেন গেটে টোকা দিচ্ছে। এত ভোরে কে আসবে এ বাড়িতে? তিনি বিস্মিত হয়ে গেট খুললেন–বিলুদাঁড়িয়ে আছে। ব্যাপারটা বিশ্বাসই হল না। বিলুর মেডিকেল কলেজ খোলা। কদিন পরই পরীক্ষা। এই সময় সে ঢাকায় আসবে কেন? আনন্দ ও বিস্ময়ে সোবাহান সাহেব অভিভূত হয়ে গেলেন।

আরে তুই? বিলু, মা, তুই?

বিলু বেবীটেক্সী ভাড়া মেটাতে মেটাতে বাবার দিকে তাকিয়ে হাসল। ভোরবেলার আলোয় হলুদ রঙের শাল জড়ানো বিলুকে অন্সরীর মত লাগছে। তার এই মেয়ে বড় সুন্দর। স্বর্গের সব রূপ নিয়ে এই মেয়ে পৃথিবীতে চলে এসেছে।

ভাড়া মিটিয়ে রাস্তার উপরই বিলু নিচু হয়ে বাবার পা স্পর্শ করল। নরম গলায় বলল, তুমি এতো রোগা হয়েছ কেন বাবা? সোবাহান সাহেবের চোখে পানি এসে গেল। তাঁর বড় মেয়ের সামান্য কথাতেই তার চোখ ভিজে উঠে। তিনি ধরা গলায় বললেন,

কলেজ ছুটি না-কি মা?

ছুটি না— ছাত্ররা মারামারি করে সব বন্ধ-টন্ধ করে দিয়েছে। একমাত্র আমাদের মেডিকেল কলেজটাই খোলা ছিল। ঐটাও বন্ধ হল।

একা এসেছিস?

না। সব মেয়েরা একসঙ্গে এসেছি। সন্ধ্যাবেলা লঞ্চে উঠলাম, ঢাকা পৌঁছলাম রাত তিনটায়। একটু সকাল হতেই চলে এসেছি।

ভাল করেছিস মা। খুব ভাল করেছিস।

সোবাহান সাহেবের ইচ্ছা করছে চেঁচিয়ে বাড়ির সবার ঘুম ভাঙাতে, তিনি তা করলেন না। নিজেই রান্নাঘরে গিয়ে গ্যাসের চুলায় কেতলি বসিয়ে দিলেন। বড় মেয়ের সঙ্গে কিছু সময় একা একা থাকার আনন্দওতো কম নয়।

দুজন চায়ের কাপ নিয়ে বসেছে। বিলু এক হাতে বাবাকে জড়িয়ে রেখেছে আর এত ভাল লাগছে।

বাসার খবর বল বাবা।

কোন খবরটা শুনতে চাস?

মামা নাকি ছবি বানাচ্ছে? মিলি চিঠি লিখেছিল।

সোবাহান সাহেব মুখ বিকৃত করে বললেন, গাধাটা বড় যন্ত্রণা করছে। রিহার্সেল টিহার্সেল কি কি করছে। বিকেলে বাসায় থাকা মুশকিল।

বিলু, আপন মনে হাসল। ফরিদ তার খুবই পছন্দের মানুষ। বিলু হালকা

গলায় বলল, মামার পাগলামী কমেনি?

না বেড়েছে। আমার মনে হয় কিছুদিন পর তালা বন্ধ করে রাখতে হবে।

ধরে বেঁধে মামার একটা বিয়ে দিয়ে দাও।

ঐ সব কথাই মনে আনবি না। একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করার কোন মানে হয়?

বিলুচায়ের কাপ হাতে নিয়ে ঘর থেকে ঘরে ঘুরতে লাগল। মাত্র চার মাস পরে সে ফিরেছে অথচ মনে হচ্ছে যেন কত যুগ পরে ফিরল। সব কেমন যেন অচেনা।

আরো আফা কোন সময়ে আইলেন? কি তাজ্জব!

বিলুপ্ৰথম দেখায় চিনতে পারল না। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। চোখে চশমা, মুখ ভর্তি দাড়ি চেনা ভঙ্গিতে কে যেন হাসছে।

আফা আমি কাদের।

তুমি দাড়ি কবে রাখলে কাদের?

সিনেমায় পাট করতাছি আফা— মামার সিনেমা, আমার হিরোর পাট। খেয়া নৌকার মাঝি।

তাই নাকি? খেয়া নৌকার মাঝির বুঝি, দাড়ি থাকতে হয়?

ডিরেকটর সাব চাইছে।

বিলু হেসে ফেলল, হাসতে হাসতে বলল— তোমরা বেশ সুখে আছ বলে মনে হচ্ছে কাদের।

আর সুখ। সিনেমা করা কি সোজা যন্ত্রণা? চিন্তা-ভাবনা আছে না? এইটা কি পানি-ভাত যে মরিচ দিয়া এক ডলা দিলাম। আর মুখের মইদ্যে ফেললাম?

বিলু অনেক কষ্টে মুখের হাসি আটকাল। তার খুব মজা লাগছে। কাদেরের মুখও আনন্দে উজ্জ্বল। কাদেরের ধারণা এই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মহিলা হচ্ছে বিলু আফা। এ বাড়ির সবাই তাকে তুই করে বলে, একমাত্র বিলু আফা বলে তুমি করে। এক গ্লাস পানির দরকার হলে বিলু আফা জনে জনে হুকুম দেয় না। নিজের পানি নিজে নিয়ে আসে। একবার কাদেরের জ্বর হল। চাকর-বাকরের জ্বর হলে কে আর খোঁজ করে। ঘরের এক কোণায় কথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতে হয়। কাদের তাই করেছে, শুয়ে আছে। জ্বর খুব বেশি। চারপাশের পৃথিবী কেমন হলুদ হলুদ লাগছে। আচ্ছান্নের মত অবস্থা। এমন সময় লক্ষ্য করল কে যেন তার মাথায় পানি ঢালছে। ঠাণ্ডা পানি। বড় আরাম লাগছে। কাদের চোখ মেলে দেখে বিলু। এক মনে পানি ঢালছে এবং রহিমার মাকে কড়া গলায় বলছে, জ্বর এত বেড়েছে, তুমি লক্ষ্য করলে না এটা কেমন কথা রহিমার মা? একশ চার টেম্পারেচার। কত সময় ধরে এক রকম জ্বর কে জানে।

রহিমার মা বলল, আমারে দেন। আফা। আমি পানি ঢালি।

থাক, তোমার আর কষ্ট করতে হবে না। তবে তোমার উপর আজ আমি খুব রাগ করেছি।

সেই প্ৰবল জুরের ঘোরের মধ্যে কাদের ঠিক করে ফেলল বড়। আপার জন্যে যদি কোনদিন প্রয়োজন হয় সে জীবন দিয়ে দিবে। বড়। আপার যদি কোন শক্ৰ থাকে–তাকে খুন করে সে ফাঁসি যাবে।

দুপুর নাগাদ গত তিন মাসে এ বাড়িতে কি কি ঘটেছে বিলু জেনে গেল। কোন কোন ঘটনা তিনবার চারবার করে শুনতে হল। একবার বলল মিলি, একবার মা, একবার কাদের। প্রতিবারেই বিলু ভান করল যে সে ঘটনাটা প্রথম বারের মত শুনছে।

বিলু আসা উপলক্ষে মিলি ইউনিভার্সিটিতে গেল না। সারাক্ষণ বড় আপার পেছনে পেছনে ঘুরতে লাগল এবং অনবরত কথা বলতে লাগল।

টগর আর নিশার সঙ্গে তোমার এখনো দেখা হয়নি— পৃথিবীতে এরকম দুষ্ট ছেলেপুলে আছে, না দেখলে তোমার বিশ্বাস হবে না।

তাই বুঝি?

হ্যাঁ। তবে মুখের দিকে তাকালে তোমার মনে হবে এরা দেবশিশু। ভয়ানক ইন্টেলিজেন্ট। ওদের মা নেই, তোমাকে তো আগেই চিঠি লিখে জানিয়েছি।

বিলু প্ৰসঙ্গ পাল্টে বলল, আচ্ছা তোর ঐ ডাক্তার সাহেবের খবর কি?

মিলি হকচকিয়ে বলল, আমার ডাক্তার সাহেব মানে? আমার ডাক্তার সাহেব বলছি কেন?

এম্‌নি বললাম, তোর চিঠিতে ভদ্রলোকের কথা প্রথম জানলাম তো। তুই লজ্জায় এমন লাল হয়ে যাচ্ছিস ব্যাপার কি? সত্যি করে বলতো–উনাকে কি তোর পছন্দ?

মিলি রেগে গেল। মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, কি যে তুমি বল আপা। ঐ ছাগল–কে আমি পছন্দ করব কেন? আমার তো আর মাথা খারাপ হয় নি।

তুই রেগে মেগে কেমন হয়ে গেছিস। এটাতো সন্দেহজনক।

আমি সত্যি কিন্তু রাগছি আপা।

ভদ্রলোককে খবর দে না, আমার দেখতে ইচ্ছে করছে।

তাকে খবর দেবার কোন দরকার নেই। দিনের মধ্যে তিনবার করে আসছে। রিহার্সেল করছে। মামার সিনেমায় সেও তো আছে।

বাহ ভালতো। তোমরা দুজন আবার নায়ক-নায়িকা না তো?

রাগিয়ে দিওনাতো। আপা। এতদিন পর এসেছ বলে ঝগড়া করলাম না। নয়ত প্ৰচণ্ড ঝগড়া হয়ে যেত। এর মধ্যে আবার নায়ক-নায়িকা কি?

বিলু হাসি মুখে ফরিদের ঘরে ঢুকল। বাড়ির সবার সঙ্গেই কথা হয়েছে শুধু মামার সঙ্গে কথা হয় নি।

ফরিদ মাথা নিচু করে কি যেন লিখছে। বিলুকে এক নজর দেখেও সে লিখেই যেতে লাগল। যেন বিলুকে সে চেনে না।

আসব মামা?

না।

না বললে তো হবে না। এতদিন পর এসেছি তোমার সঙ্গে খানিকক্ষণ কথাও বলব না?

না। কাজ করছি। আগামীকাল হে মাছ ছবির অন দ্যা স্পট রিহার্সেল। নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই। লাস্ট মিনিট চেঞ্জ যা করার এখনি করতে হবে।

তাই বলে তোমাকে আমি সালামও করতে পারব না?

বিলু এগিয়ে এসে ফরিদের পা ছুঁয়ে সালাম করল। ফরিদ বলল, তুই এত ভাল মেয়ে কি করে হলি রে বিলু? ছোটবেলায় তো এত ভাল ছিলি না। যতাই দিন যাচ্ছে ততাই ভাল হচ্ছিস।

শুনে খুশী হলাম মামা।

খুব খুশী হবার কোন কারণ নেই। বুদ্ধি কম মানুষরাই সাধারণত ভাল হয়। আমার ধারণা যত দিন যাচ্ছে তোর বুদ্ধি তত কমে যাচ্ছে।

বিলু খিলখিল করে হেসে উঠল। এমন গাঢ় আনন্দে অনেক দিন সে হাসে নি। এই মানুষটাকে তার বড় ভাল লাগে।

সোবাহান সাহেব তাঁর মনের মত একটা প্ৰবন্ধ পেয়েছেন। প্ৰবন্ধের নাম থাইল্যান্ডে মাগুর মাছের চাষী। এই মাছের চাষে বিশাল পুকুর কাটার দরকার নেই–ট্যাংক বা চৌবাচ্চা জাতীয় জলাধার থাকলেই হল। মাছের খাবারের জন্যেও আলাদা ভাবে কিছু ভাবতে হবে না। সঙ্গে হাঁস-মুরগির চাষ করতে হবে। মাছের খাবার হবে. সোবাহান সাহেব থমকে গেলেন। মাছের খাবার হিসেবে যে সব জিনিসের উল্লেখ করা হয়েছে তা তার পছন্দ হচ্ছে না।

স্লামালিকুম স্যার।

সোবাহান সাহেব পত্রিকা থেকে মুখ তুলে দেখলেন, আনিস দাঁড়িয়ে আছে। বিব্রত মুখ ভঙ্গি।

কিছু বলবে?

জ্বি।

বল।

এই মাসের বাড়ি ভাড়াটা স্যার দিতে পারছি না।

বাড়ি ভাড়া কি তোমার কাছে চাওয়া হয়েছে?

জ্বি না।

তাহলে বিরক্ত করছ, কেন? পড়ার মাঝখানে একবার বাধা পড়লে কনসানট্রেসন কেটে যায়।

সরি স্যার। কি পড়ছেন?

থাইল্যান্ডের মাগুর চাষ।

আপনি তাহলে মাছের ব্যাপারটা নিয়ে সত্যি খুব ভাবছেন।

হ্যাঁ ভাবছি।

আপনি বাংলাদেশ মাছে মাছে ছয়লাপ করে দিতে চান তাই না স্যার?

হ্যাঁ চাই।

এখন আপনি যদি আমাকে অনুমতি দেন তাহলে আমি একটা মজার কথা বলতে চাই— শায়েস্তা খাঁর আমলে বাংলাদেশ খুব সস্তা গন্ডার দেশ ছিল। প্রচুর খাদ্য ছিল, মাছ মাংস ছিল। মূল্য ছিল নাম মাত্র। অথচ তখনো এ দেশের প্রচুর লোক ছিল অনাহারে। নাম মাত্র মূল্যেও খাদ্য কেনার মত অর্থ তাদের ছিল না। যদি আপনিও সত্যি সত্যি এই দেশ একদিন মাছে মাছে ছয়লাপ করে দেন। তাতেও লাভ হবে না। যারা এখন মাছ খেতে পারছে না। তারা তখনো খেতে পারবে না। তাদের টাকা নেই। মূল সমস্যাটা অন্য জায়গায়।

কোথায়?

আরেকদিন আপনাকে বলব। আজ আমার একটু কাজ আছে। হে মাছ ছবির অন লোকেসন রিহার্সেল হবে। আপনি হয়ত জানেন না। ঐ ছবিতে আমার একটা রোল আছে। স্যার যাই স্নামালিকুম।

আনিস চলে গেল। দীর্ঘ সময় সোবাহান সাহেব মূর্তির মত রইলেন। তাঁর মন আনিসের কথায় সায় দিচ্ছে। তিনি আসল সমস্যা ধরতে পারেন নি। নকল সমস্যা নিয়ে মাতামাতি করছেন। দেশের লোক যদি খেতেই না পারে তাহলে কি হবে মাছের চাষ বাড়িয়ে?

হে মাছ ছবির অন লোকেসন রিহার্সেল শুরু হয়েছে। জায়গাটা হচ্ছে বুড়িগঙ্গার পার। বেশ নিরিবিলি। সঙ্গে ক্যামেরা নেই বলে লোকজন জড়ো হয়নি।

ফরিদের মাথায় ক্রিকেট আম্পায়ারদের টুপীর মত সাদা একটা টুপী। সত্যজিৎ রায় না কি এরকম একটা টুপী পরে সুটিং করেন। ফরিদের হাতে কালো একটা চোঙ। এই চোঙের মাধ্যমে নৌকায় বসা ডাক্তার এবং কাদেরের সাথে যোগাযোগ হচ্ছে। ডাঙায় আছে মিলি, বিলু এবং আনিস। আনিসের বাচ্চা দুটিও আছে। এরা মনের আনন্দে ছুটাছুটি করছে।

নৌকায় ডাক্তারকে খুব নার্ভাস দেখাচ্ছে। তার হাতে একটা জাল। গোল করে জাল ফেলার প্র্যাকটিস সে ভালই করছে। জাল এখন সে ফেলতে পারে। তবে নৌকা দুলছে, দুলুনির মধ্যে জাল ঠিক মতো ফেলতে পারবে কিনা। এই নিয়ে সে চিন্তিত। ডাক্তারের পরনে জেলের পোশাক তবে চুল এখনো ছাটা হয়নি। কাদের বৈঠা নিয়ে বসে আছে। তাকে উৎফুল্ল মনে হচ্ছে। ফরিদের নির্দেশে তারা নৌকা ছেড়ে দিল। নৌক মাঝ নদীতে যাবার পর অভিনয় হবে। ডাক্তার ভীত গলায় বলল, কাদের ভয় লাগছে।

কাদের বলল, ভয়ের কি আছে ডাক্তার সাব? উপরে আল্লাহ নিচে মাডি।

মাটি কোথায়? নিচে তো পানি।

একই হইল। আল্লাহর কাছে মাডি যা, পানিও তা। আল্লাহর চোউখ্যে সব সমান।

সাঁতার জানি না যে কাদের। সাঁতার আমিও জানি না ডাক্তার সাব। মরণতো একদিন হইবই। অত চিন্তা করলে চলবে না। পানিতে ড়ুইব্যা মরার মজা আছে।

ডাক্তার বিস্মিত হয়ে বলল, মরার মধ্যে আবার কি মজা?

শহীদের দরজা পাওয়া যায়। হাদিস কোরানের কথা।

শহীদের দরজার আমার দরকার নেই কাদের। নৌকা এত দুলছে কেন?

ডাঙ্গা থেকে চোঙ মারফত ফিরিদের নির্দেশ ভেসে এল–ডাক্তার স্টার্ট করে দাও-রেডি ওয়ান-টু-এ্যাকসান।

এ্যাকসানে যাবার আগেই দৃশ্য কাট হয়ে গেল। ফরিদ বাজখাই গলায় চেঁচিয়ে উঠল— কাট, কাট, এই হারামজাদা কাদের চশমা পরেছিস কেন? খোল চশমা।

কাদের চশমা খুলল। সে খুব শখ করে চশমা পরেছিল।

এ্যাকসান। ডাক্তার তুমি বিষণ্ণ চোখে আকাশের দিকে তাকাও। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেল। আবার তাকাও আকাশের দিকে। গুড। কাদের তুই কানের ফাঁকে রাখা বিড়ি ধরা। গুড। পানিতে থুথু ফেল। পুরো ব্যাপারটা ন্যাচারেল হতে হবে। ডাক্তার তুমি জলকে তিনবার সালাম কর। গুড। ভাল হচ্ছে। এই বার জাল ফেলা।

ডাক্তার জাল ফেলল। আশ্চর্য কাণ্ড পানিতে শুধু জাল পড়ল না,জালের সঙ্গে খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ডাক্তারও পড়ে গেল। জাল এবং ডাক্তার দুই-ই মুহুর্তের মধ্যে অদৃশ্য, ব্যাপারটা ঘটল চোখের পলকে।

কাদের বিড় বিড় করে বলল, বিষয় কিছুই বুঝলাম না।

ফরিদ হতভম্ব।

মিলি বলল, মামা ডাক্তার তো ড়ুবে গেছে।

ফরিদ থমথমে গলায় বলল, তাইতো দেখছি। এই গাধা কি সাঁতারও জানে না? গরু গাধা নিয়ে ছবি করতে এসে দেখি বিপদে পড়লাম।

ডাক্তারের মাথা ভূস করে ভেসে উঠল। কি যেন বলে আবার ড়ুবে গেল। আবার ভাসল, আবার ড়ুবল। ফরিদ বলল, ছেলেটাতো বডড যন্ত্রণা করছে।

আনিস চেঁচিয়ে বলল, ডাক্তার মরে যাচ্ছে। আমি সাঁতার জানি না। সাঁতার জানা কে আছেন? কে আছেন সাঁতার জানা?

কুপকুপ করে দুবার শব্দ হল। বিলু এবং মিলি দুজনই পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে ড়ুবন্ত ডাক্তারের দিকে। ফরিদ চমৎকৃত। এই মেয়ে দুটি সাঁতার শিখল কবে?

আবার ঝুপ ঝুপ শব্দ। টগর এবং নিশাও পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ওদের তুলে আনার জন্যে আনিস এবং ফরিদকেও পানিতে লাফিয়ে পড়তে হল।

ডাক্তারের জ্ঞান ফিরল হলি ফেমিলি হাসপাতালে। সে ক্ষীণ স্বরে বলল, আমি কোথায়?

মিলি বলল, আপনি হাসপাতালে।

কেন?

ফরিদ বিরক্ত গলায় বলল, উজবুকটাকে একটা চড় লাগাতো। আবার জিজ্ঞেস করে কেন? ফাজিল কোথাকার।

ডাক্তার ক্ষীণ গলায় বলল, আমি কি এখনো বেঁচে আছি?

১০. রিকশা এসে থেমেছে

রিকশা এসে থেমেছে নিরিবিলির সামনে। রিকশায় বসে আছে পাকুন্দিয়ার এমদাদ খোন্দকার। সঙ্গে তার নাতনী পুতুল। এমদাদ খোন্দকারের বয়স ষাটের উপরে। অতি ধুরন্ধর ব্যক্তি। মামলা মকদ্দমায় মিথ্যা সাক্ষী দেয়া তাঁর আজীবন পেশা। গ্রামের জমি জমা সংক্রান্ত মামলায় তিনি দুই পক্ষেই শলা পরামর্শ দেন। নিয়ম থাকলে দুপক্ষের হয়ে সাক্ষীও দিতেন, নিয়ম নেই বলে দিতে পারেন না। জাল দলিল তৈরির ব্যাপারেও তার প্রবাদ তুল্য খ্যাতি আছে।

পুতুলের বয়স পনেরো। এবার মেট্রিক পাস করেছে। ফাস্ট ডিভিশন এবং দুটো লেটার। রেজাল্ট বের হবার পর এমদাদ খোন্দকার খুব আফসোস করেছে–নাতনী যদি নকল করতে রাজি হত তাহলে ফাটাফাটি ব্যাপার হত, নকল ছাড়াই এই অবস্থা।

পুতুলকে নিয়ে এমদাদ খোন্দকার নিরিবিলিতে কেন এসেছে তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না। পুতুলও কিছু জানে না। তাকে বলা হয়েছে ঢাকায় কয়েক দিনের জন্যে বেড়াতে যাচ্ছে, উঠবে সোবাহান সাহেবের বাড়ি। সোবাহান সাহেব তাদের কোন আত্মীয় না হলেও অপরিচিত নন। পাকুন্দিয়া গ্রামের কলেজটি তিনি নিজের টাকায় নিজের জমিতে করে দিয়েছেন। মেয়েদের একটি স্কুল দিয়েছে, মসজিদ বানিয়েছেন। সোবাহান সাহেব তাঁর যৌবনের রোজগারের একটি বড় অংশ এই গ্রামে ঢেলে দিয়েছেন, কাজেই গ্রামের মানুষদের কাছে তিনি অপরিচিত নন। পুতুল তাকে চেনে। তাঁর স্কুল থেকেই সে মেট্রিক পাস করেছে।

রিকশা থেকে নামতে নামতে পুতুল বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে বলল, কী বড় বাড়ি দেখছ দাদাজান?

এমদাদ মুখ বিকৃত করে বলল, পয়সার মা-বাপ নাই বাড়ি বড় হইব নাতো কি। চোরা পয়সা।

পুতুল দুঃখিত গলায় বলল, চোরা-পয়সা? কি যে তুমি কও দাদাজান। এমন একটা বালা মানুষ। কত টেকা পয়সা দিছে গোরামে…

টেকা পয়সা দিলেই মানুষ বালা হয়? এদের শইল্যে আছে বদ রক্ত। এরারে আমি চিনি না? হাড়ে গোশতে চিনি।

পুতুল কিছু বলল না। তার দাদাজানের চরিত্র সে জানে, মানুষের ভাল দিক তার চোখে পড়ে না। হয়ত কোনদিন পড়বেও না।

পুতুল।

জ্বি দাদাজান।

এমদাদ গলা নিচু করে বলল, সোবাহান সাহেবের দাদার বাপ ছিল বিখ্যাত চোর। এরা হইল চোর বংশ।

চুপ করতো দাদাজান।

আইচ্ছা চুপ করলাম।

এমদাদ নাতনীকে নিয়ে বাড়িতে ঢুকল। সোবাহান সাহেব বারান্দায় বসে ছিলেন। তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, চিনতে পারলাম নাতো। এমদাদ বিনয়ে গলে গিয়ে বলল, আমি এমদাদ। পাকুন্দিয়ার এমদাদ খোন্দকার।

ও আচ্ছা আচ্ছা–আমি অবশ্যি এখনো চিনতে পারিনি।

চিনবার কথাও না–আমি হইলাম। জুতার ময়লা। আর আপনে হইলেন বটবৃক্ষ।

বটবৃক্ষ।

জ্বি বটবৃক্ষ। বটবৃক্ষে কি হয়— রাজ্যের পাখি আশ্রয় নেয়। আপনে হইলেন। আমাদের আশ্রয়। বিপদে পড়ে আসছি। জনাব।

কি বিপদ?

বলব। সব বলব। আপনেরে বলবনাতো বলব কারে? পুতুল ইনারে সেলাম কর। ইনারা মহাপুরুষ মানুষ। দেখলেই পুণ্য হয়।

পুতুল এগিয়ে এল। সোবাহান সাহেব পুতুলের মাথায় হাত রেখে নরম গলায় বললেন, যাও ভিতরে যাও। হত মুখ ধুয়ে খাওয়া দাওয়া কর। তারপর শুনব কি সমস্যা।

এমদাদ বলল, ভাইসােব আমারে একটু নামাযের জায়গা দিতে হয়। দুই ওক্ত নামায কাজ হয়েছে। নামায কাজ হইলে ভাইসােব আমার মাথা ঠিক থাকে না।

অজুর পানি লাগবে?

অজু লাগবে না, অজু আছে। আমার সব ভাঙ্গে অজু ভাঙ্গে না। হা হা হা।

সোবাহান সাহেব ভেতরে চলে গেলেন। আর তখন ঘরে ঢুকল ফরিদ। এমদাদ বলল, ভাইজান পশ্চিম কোন দিকে?

ফরিদ বিরক্ত গলায় বলল, পশ্চিম কোন দিকে আমি কি জানি? আমি কি কম্পাস না কি?

বাবাজীর পরিচয়?

বাবাজী ডাকবেন না।

রাগ করেন কেন ভাই সাহেব।

আপনি কে?

আমার নাম এমদাদ। এমদাদ খোন্দকার।

ও আচ্ছা।

ভাইসব ভাল আছেন?

ফরিদ বিরক্ত দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে চলে গেল। এমদাদ ধাঁধায় পড়ে গেল। এই মানুষটির চরিত্র সে ঠিক বুঝতে পারছে না। মানুষের চরিত্র পুরোপরি বুঝতে না পাড়া পর্যন্ত তার বড় অশান্তি লাগে।

১১. সুন্দর লাগছে ছাদটা

আনিস বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে ছাদে এসে দাঁড়িয়েছে। সুন্দর লাগছে ছাদটা। টবের ফলগাছগুলোতে চাঁদের আলো এসে পড়েছে। ছাদে আলো-ছায়ার নকশা। হাওয়ায় গাছের পাতা নড়ছে, নকশাগুলোও বদলে যাচ্ছে। আনিস ভারী গলায় বলল,

আলোটুকু তোমায় দিলাম।

ছায়া থাক আমার কাছে।

আনিসের কথা শেষ হল না তার আগেই নারী কণ্ঠের তীক্ষ্ণ আওয়াজ পাওয়া গেলা— কে আপনি? আপনি কে?

আনিস হকচকিয়ে গেল। দেয়ালে ঠেস দিয়ে লম্বামত একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার শরীর চাদর দিয়ে ঢাকা। মুখ দেখা যাচ্ছে না। নারী কণ্ঠ আবারো তীক্ষ্ণ গলায় বললে–আপনি কে?

আমার নাম আনিস। আমি এ বাড়ির ভাড়াটে। আপনি কি ভয় পেয়েছেন?

হ্যাঁ।

ভয়ের কিছু নেই। আমি মানুষ। ভূত কখনো কবিতা বলে না। তাছাড়া ভূতের ছায়া পড়ে না। এই দেখুন। আমার ছায়া পড়েছে।

নারীমূর্তি কিছু বলল না। গায়ের চাদর টেনে দিল। তাতে তার মুখ আরো ঢাকা পড়ে গেল।

আনিস বলল, আপনি কে জানতে পারি কি?

আমার নাম বিলু। আমি এ বাড়ির বড় মেয়ে।

ছাদে কি করছেন?

কিছু করছি না। টবের গাছগুলো দেখতে এসেছিলাম। মাঝখানে আপনি ভয় দেখিয়ে দিলেন।

সত্যি ভয় পেয়েছেন?

হ্যাঁ।

কেন বলুনতো?

বিলু সহজ গলায় বলল, রহিমার মার ধারণা এ বাড়ির ছাদে না-কি ভূত আছে। সে প্রায়ই দেখে। আপনাকে হঠাৎ দেখে… আচ্ছা যাই।

বিলু সিঁড়ির দিকে রওনা হল। আনিস বলল, আপনার টবের গাছ দেখা হয়ে গেল?

হ্যাঁ।

আমার কেন জানি মনে হচ্ছে। আপনার আরো কিছুক্ষণ ছাদে থাকার ইচ্ছা! ছিল, আমার কারণে চলে যাচ্ছেন।

আপনার ধারণা ঠিক না। আমার শীত শীত লাগছে। তাছাড়া অনেকক্ষণ ছাদে ছিলাম।

আনিস সহজ গলায় বলল, আপনাকে ভয় দেখানোর জন্যে দুঃখিত।

বিলু হেসে ফেলল। বেশ শব্দ করে হাসল। আনিস হাসি শুনে হতভম্ব হয়ে গেল। এই হাসি তার পরিচিত। এ জীবনে অনেকবার শুনেছে। রেশমা এম্‌নি করেই হাসত, কিশোরীদের ঝনঝনে গলা, যে গলায় একই সঙ্গে আনন্দ এবং বিষাদ মাখানে।

বিলু বলল, যাই কেমন?

আনিস দ্বিতীয়বার চমকাল। রেশমাও কোথাও যাবার আগে মাথা কাত করে বলত, যাই কেমন? যেন অনুমতি প্রার্থনা করছে। যদি অনুমতি পাওয়া না যায় তাহলে যাবে না। বিলু। তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাচ্ছে। সিঁড়ির মাথায় মূর্তির মত আনিস দাঁড়িয়ে। সে ফিসফিস করে বলল, আলোটুকু তোমায় দিলাম। ছায়া থাক আমার কাছে।

তার ভাল লাগছে না। কোথাও কিছু একটা ঘটে গেছে। অনেক অনেক দূরের দেশ থেকে যেমন হঠাৎ রেশমা উঠে এল। এ কেমন করে হয়? যে চলে গেছে সে আর আসে না। মানুষের কোন বিকল্প হয় না। কি যেন কথাগুলো? এ পৃথিবী একবার পায় তারে কোন দিন পায় নাকো আর, লাইনগুলো কি ঠিক আছে না ভুল-টুল কিছু হল?

১২. এমদাদ এবং তার নাতনী

এমদাদ এবং তার নাতনীকে থাকার জন্যে যে ঘরটা দেয়া হয়েছে সে ঘর এমন্দাদের খুবই পছন্দ হল। সে তিনবার বলল, দক্ষিণ দুয়ারী জানালা লক্ষ্য করে দেখ। ঘুম হবে তোফা। পুতুল শুকনো গলায় বলল, ঘুম ভাল হইলেই ভাল। আরাম কইরা ঘুমাও।

খাটিও দুইটা আছে। একটা তোর একটা আমার। ব্যবস্থা ভালই। কি কস পুতুল?

পুতুল চুপ করে রইল। এমদাদ বলল, ভয়ে ভয়ে ছিলাম বুঝলি। কিছুই বলা যায় না। যদি চাকর বাকরের ঘর দিয়া বসে। দিয়া বসতেও তো পারে। মানী লোকের মানতো সবাই দেখে না। আরে আরো কারবার দেইখ্যা যা। ঘরের লগে পেসাবখানা। এলাহী কারবার।

আনন্দে এমদাদের মুখ ঝলমল করছে। শুধু পুতুল মুখ কাল করে রেখেছে। কিছুতেই তার মন বসছে না। অন্যের বাড়িতে আশ্রিত হবার কষ্ট ও যন্ত্রণা সে তার ক্ষুদ্র জীবনে অনেকবার ভোগ করেছে। এখন আবার শুরু হল। ইচ্ছা মৃত্যুর ক্ষমতা যদি মানুষের থাকতো তাহলে বড় ভাল হত। এই যন্ত্রণা সহ্য করতে হত না।

७ श्रृंङ्गल।

কি দাদাজান?

ঘর ভালই দিছে ঠিক না?

হুঁ।

এখন খেয়াল রাখবি সবের সাথে যেন ভাল ব্যবহার হয়। যে যা কয় শুনবি আর মুখে বলবি— জ্বি কথা ঠিক। এই কথার উপরে কথা নাই। গেরাম দেশে লোক বলে মুখের কথায় চিড়া ভিজে না–মিথ্যা কথা, মুখের কথায় সব ভিজে। তোর মুখ এমন শুকনা দেহায় ক্যানরে পুতুল?

এইখানে কদিন থাকবা?

আসতে না আসতেই কদিন থাকবা? থাকা না থাকা নিয়া তুই চিন্তা করবি না। এইটা আমার উপড়ে ছাইড়া দে। যা হাত মুখ ধুইয়া আয় চাইরডা দানাপানি মুখে দেই। এই বাড়ির খাওয়া খাদ্যও ভাল হওনের কথা।

এমন্দাদের আশঙ্কা ছিল হয়ত চাকর বাকিরদের সঙ্গে মেঝেতে পাটি পেতে খেতে দেবে। যদি দেয় তাহলে বেইজাতির সীমা থাকবে না। দেখা গেল খাবার টেবিলেই খেতে দেয়া হয়েছে। বাড়ির কত্রী স্বয়ং তদারক করছেন। চিকন চালের ভাত, পাবদা মাছ, একটা সজি, মুগের ডাল। খাওয়ার শেষে পায়েস। তোফা ব্যবস্থা। মিনু বললেন, পেট ভরেছে তো এমদাদ সাহেব? ঘরে যা ছিল তাই দিয়েছি। নতুন কিছু করা হয়নি।

কোন অসুবিধা হয় নাই। শুধু একটু দৈ থাকলে ভাল হইত। খাওয়ার পর দৈ থাকলে হজমের সহায়ক হয়। তার উপর আপনার ছোটবেলা থাইক্যা খাইয়া অভ্যাস।

ভবিষ্যতে আপনার জন্য দৈায়ের ব্যবস্থা রাখব।

আলহামদুলিল্লাহ্। এখন মা জননী অবস্থা পইড়া গেছে। একটা সময় ছিল খোন্দকার বাড়ির সামনে দিয়া লোকজন ছাতা মাথায় দিয়া যাইত না। নিয়ম ছিল না। জুতা খুইল্যা হাতে নিতে হইত বুঝলেন মা জননী।

তাই বুঝি!

জি। এবার কি হইল শুনেন মা জননী। খোন্দকার বাড়ির সামনে দিয়ে এক লোক যাইতেছে হঠাৎ খ্যক করে কােশ ফেলল। সাথে সাথে দারোয়ান ঘাড় ধরে নিয়া আসল–বলল হারামজাদা এত বড় সাহস। খোন্দকার বাড়ির সামনে কাশ ফেলস। নাকে খত দে। মাটিতে চাটা দে–তারপরে যা যেখানে যাবি।

পুতুলের এইসব কথা শুনতে অসহ্য লাগে। না শুনেও উপায় নেই। দাদাজান যেখানে যাবে সেইখানেই এইসব বলবে। পুতুলের ধারণা সবই মিথ্যা কথা। সে খাওয়ার মাঝ পথে উঠে পড়ল। এমন্দাদের তাতে সুবিধাই হল। সে জরুরি একটা কথা বাড়ির কত্রীর সঙ্গে বলতে চাচ্ছে।

পুতুল থাকায় বলতে পরছে না। এখন সুযোগ পাওয়া গেল।

মা জননীকে একটা কথা বলতে চাইতেছিলাম।

বলুন।

বলতে শরম লাগছে। আবার না বলেও পারতেছি না। তারপর ভেবে দেখলাম আপনাদের না বললে কাদের বলল? আপনারা হইলেন বটবৃক্ষ।

ব্যাপারটা কি?

ট্রেইন থাইক্যা নামার সময় বুঝলেন মা জননী পাঞ্জাবীর পকেটে হাত দিয়া দেখি পকেট কাটা।

পকেট কাটা মানে?

ব্লেড দিয়ে পকেট সাফা করে দিছে। মানিব্যাগে চাইরশ তেত্ৰিশ টাকা ছিল, সব শেষ। এখন পকেটে একটা কানা পয়সা নাই। কি বেইজ্জতী অবস্থা চিন্তা করেন মা জননী।

আচ্ছা ওর একটা ব্যবস্থা হবে।

হবে তাতো জানিই। বটবৃক্ষতো শুধু শুধু বলি না। চাইলতা গাছও তো বলতে পারতাম। পারতাম না।

আপনাকে কি মিষ্টি দেব? ঘরে মিষ্টি আছে।

দেন। আমার অবশ্য ডায়াবেটিস। মিষ্টি খাওয়া নিষেধ। এত নিষেধ। শুনলে তো আর হয় না। কি বলেন মা জননী? মিষ্টি খাইতে পারব না, ভালমন্দ খানা খাইতে পারব না, সিগ্রেট খাইতে পারব না–তাইলে খামুটা কি? বাতাস খামু?

দীর্ঘদিন পর এমন্দাদের খুব চাপ খাওয়া হয়ে গেল। পেট দম সম হয়ে আছে। খানিকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করা দরকার। এদের বাড়ি ঘর, লোকজন সবার সম্পর্কে একটা ধারণা থাকা দরকার। সে দীর্ঘ পরিকল্পনা নিয়ে এসেছে। নাতনীটাকে এ বাড়িতে গছিয়ে যেতে হবে। কাজেই পরিবারে সদস্যদের নাড়ি নক্ষত্র জানা থাকা প্রয়োজন। তার কাছে অবশ্যি বেশির ভাগ সদস্যকেই বোকা কিসিমেরে বলে মনে হচ্ছে। এটা খুবই ভাল লক্ষণ। যে পরিবারে সদস্যদের মধ্যে অর্ধেক থাকে বোকা সেই পরিবার সাধারণত সুখী হয়।

এমদাদ ফরিদের ঘরে উঁকি দিলে। ফরিদ চিন্তিত মুখে বিছানায় বসে আছে। ছবির পরিকল্পনা ভেঙে যাওয়ায় তার মন খুবই খারাপ। এমদাদ ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলর, বাবাজী কি জেগে আছেন?

ফরিদ কড়া চোখে তাকাল। থমথমে গলায় বলল, আপনি কি এর আগে কাউকে চোখ মেলে বসে বসে ঘুমুতে দেখেছেন যে আমাকে এরকম একটা প্রশ্ন করলেন। দেখেছেন। এইভাবে কাউকে ঘুমুতে?

এমদাদ প্রথমটায় হকচকিয়ে গেলেও অতি দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। সহজ গলায় বলল, জ্বি জনাব দেখেছি। চোখ মেলে দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে ঘুমাতে দেখেছি।

কাকে দেখেছেন?

ঘোড়াকে। ঘোড়া দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে ঘুমায়।

লোকটির স্পধাঁয় ফরিদ হতভম্ব।

আমাকে দেখে আপনার কি ধারণা হয়েছে যে আমি একটা ঘোড়া?

জি না।

আপনি বয়স্ক প্ৰবীণ একজন মানুষ বলেই আমি এই দফায় আপনাকে ক্ষমা করে দিচ্ছি। ভবিষ্যতে আর করা হবে না।

জ্বি আচ্ছা।

আপনি কখনো আমার ঘরে ঢুকবেন না।

জ্বি আচ্ছা।

দাঁড়িয়ে আছেন কেন চলে যান।

একটা সিগারেটের জন্যে দাঁড়িয়ে আছি। বাবাজী কি সিগারেট খান।

খাই কিন্তু আপনাকে সিগারেট দেয়া হবে না। আপনি যেতে পারেন।

জি আচ্ছা। জিনিসটা অবশ্য স্বাস্থ্যের জইন্যেও খারাপ।

এমদাদ বের হয়ে এল। ফরিদের ঘরের ঘটনা তাকে খুব একটা বিচলিত করল না। বরংচ সে খানিকটা মজাই পেল। বড় ধরনের বেকুব সংসারে থাকা ভাল। যে সংসারে বড় ধরনের কোন বেকুব থাকে সেই সংসারে কখনো ভয়াবহ কোন সমস্যা হয় না। বোকাগুলি কোন না কোনভাবে সমস্যা পাতলা করে দেয়। এমদাদ রাস্তায় বের হল। চা খাওয়ার পর তার একটা সিগারেট দরকার।

অপরিচিতি মানুষের কাছে টাকা চাওয়া সমস্যা কিন্তু সিগারেট চাওয়া কোন সমস্যা না। এমদাদ আধা ঘণ্টার মধ্যে ছটা সিগারেট জোগাড় করে ফেলল। তার টেকনিকটা এ রকম–সিগারেট ধরিয়ে কোন ভদ্রলোক হয়ত আসছে–এমদাদ হাসি মুখে এগিয়ে যাবে।

স্লামালিকুম ভাইসাব।

অপরিচিত ভদ্রলোক থমকে দাঁড়িয়ে বিস্মিত গলায় বললেন, আমাকে কিছু

বলছেন?

জ্বি।

বলুন-

আমার হার্টের অসুখ। ডাক্তার সিগারেট বন্ধ করে দিয়েছে। লুকিয়ে চুকিয়ে যে একটা টান দিব সেই উপায় নাই। ঘর থেকে একটা পয়সা দেয় না। ভাই এখন আপনি যদি একটা সিগারেট দেন জীবনটা রক্ষা হয়।

ডাক্তার যখন নিষেধ করেছে তখন তো সিগারেট খাওয়া উচিত হবে না।

কয়দিন আর বাঁচব বলেন? এখন সিগারেট খাওয়া না খাওয়া তো সমান।

এরপর আর কথা চলে না। অপরিচিত ভদ্রলোক পকেটে হাত দিয়ে সিগারেট বের করেন। এমদাদ হাসি মুখে বলে, দুটা দিয়ে দেন ভাই সাহেব। রাতে খাওয়ার পর একটা খাব।

এমদাদ যখন সিগারেটের সঞ্চয় বাড়াতে ব্যস্ত তখন বাড়ির ভেতর ছোট্ট একটা নাটক হল। মিনু তিনশ টাকা হাতে নিয়ে পুতুলকে বললেন, মা এই টাকাটা তোমার দাদাকে দিও। পুতুল বিস্মিত হয়ে বলল, কিসের টাকা?

উনার মানিব্যাগ পকেটমার হয়ে গেল। উনি বলছিলেন।

পুতুল কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, কই দাদাজানের কোন টাকা পকেটমার হয় নাই। ঐতো দাদাজানের মানিব্যাগ।

তবু তুমি টাকাটা রাখা।

না না— আমি টাকা রাখব না।

মিনু বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করলেন— পুতুলের চোখে পানি এসে গেছে। তিনি বেশ অবাক হলেন। মিনু কোমল গলায় বললেন, কি ব্যাপার পুতুল? পুতুল ধরা গলায় বলল— দাদাজান মিথ্যা কথা বললে আমার বড় কষ্ট হয়।

হয়ত মিথ্যা কথা না। হয়ত উনি ভুলে গেছেন।

না। উনি ভুলেন নাই। উনি সহজে কিছু ভুলেন না। পুতুলের কান্নার বেগ ক্রমেই বাড়তে লাগল। মিনু পুরোপুরি হকচকিয়ে গেলেন। এই মেয়েটা মনে হচ্ছে সম্পূর্ণ অন্য রকম। তিনি নিতান্ত অপরিচিত এই মেয়েটির প্রতি এক ধরনের মমতা অনুভব করলেন।

নিরিবিলি বাড়িতে ক্রাইসিস তৈরি হতে বেশি সময় লাগে না। রাত আটটা দশ মিনিটে একটা ক্রাইসিস তৈরি হয়ে গেল। অবশ্যি এটা যে একটা ক্রাইসিস শুরুতে তা বোঝা গেল না। রাতের টেবিলে সবাই খেতে বসেছে। সোবাহান সাহেব হাত ধুয়েছেন। তাঁর প্লেটে বিলু ভাত দিতে যাচ্ছে তিনি বললেন, স্টপ।

বিলু বলল, ভাত দেব না। বাবা?

না।

প্লেট বোধহয় ভাল করে ধোয়া হয়নি। তাই না?

ওসব কিছু না।

সোবাহান সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালেন। মিনু বললেন, শরীর খারাপ লাগছে? সোবাহান সাহেব অস্পষ্ট এক ধরনের শব্দ করলেন। এই শব্দের কোন অর্থ নেই।

রাত সাড়ে নটার দিকে জানা গেল ক্ষুধার প্রকৃত স্বরূপ কি তা জানার জন্যে তিনি খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। আগামী দশদিন তিনি পানি ছাড়া কিছুই খাবেন না।

বিলু বাবাকে বোঝানোর জন্যে তার ঘরে গেল। হাইপারটেনসনের রুগীকে অনিয়ম করলে চলে না। বিলুর সঙ্গে সোবাহান সাহেবের নিম্নলিখিত কথাবার্তা হল।

বিলু : বাবা তুমি ভাত খাবে না।

বিলু : না।

বিলু : ভাত খাবে না। কারণ তোমাকে ক্ষুধার স্বরূপ বুঝতে হবে?

বাবা : হ্যাঁ।

বিলু : কেন বলতো? ক্ষুধার স্বরূপ বুঝে তোমার হবেটা কি? তুমি যদি একজন কবি হতে তাহলে একটা কথা হত। ক্ষুধা সম্পর্কে কবিতা লিখতে। গদ্যকার হলে আমরা ক্ষুধার অসাধারণ বর্ণনা পেতাম। তুমি যদি রাজনীতিবিদ হতে তাহলেও লাভ ছিল, গরিব দুঃখীদের কষ্ট বুঝতে— তুমি বলতে গেলে কিছুই না। তাহলে তুমি কেন কষ্ট করছ?

বাবা : তুই ঘর থেকে যা। তুই বড় বিরক্ত করছিস।

বিলু : তুমি যদি কিছু না খাও তাহলে মা-ও খাবে না।

বাবা : সেটা তার ব্যাপার। আমি মনস্থির করে ফেলেছি।

বিলু : না খেয়ে কতদিন থাকবে?

বাবা : যত দিন পারি।

বিলু : অনশনে যাবার এই বুদ্ধি তোমাকে কে দিয়েছে বাবা? দোতালার আনিস সাহেব?

বাবা : হ্যাঁ।

বিলু : আমিও তাই ভেবেছিলাম।

বিলু দোতলায় উঠে এল। তার মুখ থম থম করছে।

আনিসের দুটি বাচ্চাই শুয়ে আছে। দুজনের চোখই বন্ধ। কোন সাড়াশব্দ করছে না। কারণ আনিস ঘোষণা করেছে। সবচে বেশি সময় যে কথা না বলে থাকতে পারবে সে পাঁচ টাকা পুরস্কার পাবে। পুরস্কারের পাঁচটা টাকা খামে ভর্তি করে টেবিলের উপর রেখে দেয়া আছে। আনিসের ধারণা পুরস্কারের লোভে চুপ করে থাকতে থাকতে দুজনই এক সময় ঘুমিয়ে পড়বে। যদিও লক্ষণ তেমন মনে হচ্ছে না। টগর এবং নিশা মুখে কথা বলছে না ঠিকই কিন্তু ইশারায় কথা বলছে। দুজনই হাত ও ঠোঁট নাড়ছে। এই সব কীর্তিকলাপ বিলুকে ঢুকতে দেখে থেমে গেল। দুজনই চোখ বন্ধ করে মরার মত পড়ে রইল। যেন ঘুমুচ্ছে।

বিলু বলল, আনিস সাহেব, আমি কি আপনার সঙ্গে খানিকক্ষণ কথা বলতে পারি?

আনিস হাসিমুখে উঠে দাঁড়াল। কোমল গলায় বলল, অবশ্যই পারেন।

আপনার সঙ্গে আমার ফরম্যাল পরিচয় হয়নি— আমার নাম….

আনিস বলল, আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। আপনার হয়ত মনে নেই। আপনার নাম বিলু, বরিশাল মেডিক্যাল কলেজে পড়েন। একবার ছাদে আমাকে দেখে ভয় পেয়েছিলেন। আপনি বসুন।

না। আমি বসার জন্য আসিনি।

ঝগড়া করতে এসেছেন?

হ্যাঁ।

আনিস হাসতে হাসতে বলল, এটা অদ্ভুত ব্যাপার যে সবাই আমার সঙ্গে ঝগড়া করতে আসে। এতদিন পর্যন্ত এ বাড়ি আছি। অথচ এখন পর্যন্ত একজন কেউ এসে বলল না, আপনার সঙ্গে গল্প করতে এসেছি।

বিলু আনিসের হালকা কথাবাতাঁর ধার দিয়েও গেল না। কঠিন গলায় বলল, আপনি কি বাবাকে উপোষ দিতে বলেছেন?

আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না।

আপনি কি বাবাকে বুঝিয়েছেন ক্ষুধার স্বরূপ বোঝার জন্য না খেয়ে থাকার প্রয়োজন।

আনিস বিস্মিত হয়ে বলল, উনি কি না খেয়ে আছেন না-কি?

হ্যাঁ।

কি সর্বনাশ। আমি শুধুমাত্ৰ কথা প্রসঙ্গে বলছিলাম যে আমরা যারা সৌখিন সমস্যাবিদ তারা মূল সমস্যা নিয়ে ভাসা ভাসা কথাবার্তা বলি। কারণ মূল সমস্যা আমরা জানি না। ক্ষুধা যে কি ভয়াবহ ব্যাপার তা আমরা অর্থাৎ তথাকথিত মধ্যবিত্ত সমস্যা বিশারদরা জানি না। কারণ আমাদের কখনো ক্ষুধার্তা থাকতে হয় না। রোজার সময় বেশ কিছু সময় ক্ষুধার্ত থাকি সেও খুবই সাময়িক ব্যাপার। তখন আমাদের মনের মধ্যে থাকে সূৰ্যটা ড়ুবার সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর খাদ্য দ্রব্য চলে আসবে। কাজেই ক্ষুধার স্বরূপ…

বিলু আনিসকে থামিয়ে দিয়ে বলল, আপনাকে হাত জোর করে অনুরোধ করছি আপনার এই সব চমৎকার থিওরী দয়া করে নিজের মধ্যেই রাখবেন। বাবাকে এসবের মধ্যে জড়াবেন না। উনি সব কিছুই খুব সিরিয়াসলি নেন। নিজের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করেন, আমাদের জন্যেও সমস্যা সৃষ্টি করেন। আমি কি বলছি আপনি কি বুঝতে পারছেন?

জ্বি পারছি।

সুযোগ যখন পাওয়া গেছে তখন আরো একটা কথা আপনাকে বলতে চাচ্ছি। কথাটা হচ্ছে–আপনি যে আপনার বাচ্চাদের মাধ্যমে আমাকে প্ৰেম নিবেদন করেছেন এতে আমি শুধু অবাক হয়েছি। তাই না-দুঃখিত হয়েছি, রাগ করেছি, বিরক্ত হয়েছি। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে হৈ চৈ করা আমি পছন্দ করি না বলেই এতদিন চুপচাপ ছিলাম। আজ বলে ফেললাম।

আনিসেকে একটি কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বিলু নিচে নেমে গেল। আনিস ডাকল, টগর টগর। টগর জেগে আছে। তবু কথা বলছে না। কথা বললেই বাজিতে হারিতে হয়। আনিস বলল, টগর কথা বল এখন কথা বললে বাজির কোন হেরফের হবে না। টগর।

জি।

বিলু মেয়েটিকে তুমি কি বলেছ?

আমি কিছু বলিনি— নিশা বলেছে।

নিশা, তুমি কি বলেছে?

আমার মনে নেই।

মনে করার চেষ্টা কর। তুমি কি বলেছ?

নিশা কোন শব্দ করল না। টগর বলল, নিশা মনে হচ্ছে ঘুমিয়ে পড়েছে বাবা। আনিস বলল, তোমার কি মনে আছে নিশা কি বলেছে?

মনে আছে।

বলতো শুনি।

নিশা উনাকে বলেছে— আব্বু আপনাকে বিয়ে করবে। তখন আপনি আমাদের সঙ্গে থাকবেন। তখন আমরা আপনাকে আম্মু ডাকব।

আনিস হতভম্ব হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইল। অনেক কষ্টে বলল, ভদ্র মহিলা নিশার কথা শুনে কি বলল? সে তখন বলল, টগর–তোমার বাবা এই সব কথা তোমাদের বলেছেন? আমি বললাম— হুঁ।

তুমি হুঁ বললে?

হ্যাঁ।

কিন্তু আমি তো কখনো এ রকম কথা বলিনি–তুমি হুঁ বললে কেন?

আর বলব না বাবা।

নিশা ক্ষীণ স্বরে বলল, আমিও বলব না। বাবা। এতক্ষণ সে জেগেই ছিল! কোন পর্যায়ে কথাবার্তায় অংশগ্রহণ করবে। এইটাই শুধু বুঝতে পারছিল না।

একটা মানুষ ক্ষুধা কেমন এটা জানার জন্যে না খেয়ে আছে। এই ব্যাপারটা পুতুলকে অভিভূত করে ফেলেছে। সে কয়েকবার দাদাজানের সঙ্গে এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চেষ্টা করলা–এমদাদ কোন পাত্তা দিল না। এমিতেই তার মেজাজ খারাপ, পকেট মারের ব্যাপারটায় উল্টাপাল্টা কথা বলে মেয়েটা তাকে ড়ুবিয়েছে। শুরুতেই বেইজ্জত হতে হল। এটাকে যে কোন ভাবেই হোক সামলাতে হবে। কি ভাবে সামলাবে তাই নিয়ে এমদাদ চিন্তা ভাবনা করছে— এর মধ্যে পুতুল ঘ্যান ঘ্যান করছে। সোবাহান সাহেবের না খাওয়া নিয়ে। এই মেয়েটাকে কড়া একটা ধমক দেয়া দরকার। ধমক দিতেও ইচ্ছা করছে না! ও দাদাজান ঘুমাইলা?

না!

কেমন আশ্চর্য মানুষ দেখলা দাদাজান? ক্ষুধা কেমন জিনিস এইটা জাননের জইন্যে না খাইয়া আছ।

দুনিয়াডা ভর্তি বেকুবে—এইডাও বেকুবির এক নমুনা।

ছিঃ দাদাজান–এমন কথা কইও না।

এই বুড়া বেকুব তো বেকুবই, তুইও বেকুব। তুই আমার সাথে কথা কইস না।

আমি কি দোষ করলাম দাদাজান?

চুপ, কোন কথা না।

বুড়ো বয়সের ব্যধি রাতে ঘুম হয় না। এমদাদ রাত দেড়টায় ঘুমের আশায় জলাঞ্জলি দিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসল। ফুরফুরে বাতাস দিচ্ছে বসে থাকতেও আরাম। মশা না থাকলে পাটি পেতে বারান্দায় ঘুমানোরই ব্যবস্থা করা যেত কিন্তু বডড মশা।

মিনু দরজা বন্ধ করতে এসে দেখেন এমদাদ সাহেব বারান্দার ইজিচেয়ারে আরাম করে বসে আছেন। হাতে সিগারেট। তিনি বিস্মিত গলায় বললেন, কে এমদাদ সাহেব না?

জ্বি মা জননী।

এত রাতে এখানে কি করছেন?

মনটা খুব খারাপ। ঘুম আসে না।

মন খারাপ কেন?

বাড়ির কর্তা না খেয়ে ঘুমিয়ে আছে। এই জন্যেই মনটা খারাপ মা জননী! আমার হইলাম গোরামের মানুষ, ক্ষুধা পেটে কেউ ঘুমাইতে গেছে শুনলে মনটা খারাপ হয়?

ঐসব নিয়ে ভাববেন না। বিলুর বাবার এই রকম পাগলামী আছে। সকালে দেখবেন ঠিকই নাশতা করছে।

শুনে বড় ভাল লাগছে মা জননী।

আসুন ভেতরে চলে আসুন। আমি দরজা বন্ধ করে দেব।

এমদাদ ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, আরেকটা বিষয় আপনেরে বলা হয় নাই মা জননী— মানিব্যাগের বিষয়ে! মানিব্যাগ ছিল পুতুলের কাছে। মাইয়া খুব সাবধানতো— গুছায়ে রাখছে। এদিকে আমার পাঞ্জাবীর পকেটে ছিল রুমাল। পকেটমার সেই রুমাল নিয়ে চলে গেছে। হা হা হা।

মিনু বললেন, টাকা পয়সার প্রয়োজন হলে বলবেন। সংকোচ করবেন না।

আলহামদুলিল্লাহ। কোন সংকোচ করব না— আপনারা হইলেন বটবৃক্ষ।

যান। ঘুমুতে যান।

জ্বি আচ্ছা। ঘুম আসবে না। তবু শুইয়া থাকব। বাড়ির আসল লোক দানাপানি খায় নাই— এরপরেও কি ঘুম আসে কন মা জননী?

এইসব নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। সকাল হলেই দেখবেন খাওয়া দাওয়া শুরু করছে। উদ্দেশ্যে তো আর কিছু না। উদ্দেশ্য হলো আমাকে যন্ত্রণা দেয়া!

&#