Tuesday, April 23, 2024
Homeগোয়েন্দা গল্পভূতের হাসি - রকিব হাসান

ভূতের হাসি – রকিব হাসান

তিন গোয়েন্দা সিরিজ - রকিব হাসান

সাইকেলের লাইট জ্বেলে দিল মুসা আর রবিন। বাড়ি এখনও মাইল দুয়েক। শীতকালে ক্যালিফোর্নিয়ার এই পার্বত্য অঞ্চলে হঠাৎ করেই রাত নামে।

খাইছে! বলে উঠল সহকারী গোয়েন্দা। আরও আগে রওনা দেয়া উচিত ছিল।

হুঁ, অন্ধকারে হাসল রবিন মিলফোর্ড। খাইছে বলা মুদ্রাদোষ হয়ে গেছে তার বন্ধু মুসা আমানের।

পর্বতের ভেতরে পাহাড়ী নদীতে সাঁতার কাটতে গিয়েছিল দুই গোয়েন্দা। চমৎকার কেটেছে দিন, আরও ভাল লাগত যদি কিশোর থাকত সঙ্গে। তাদের আরেক বন্ধু কিশোর পাশা, তিন গোয়েন্দার প্রধান। স্যালভিজ ইয়ার্ডে জরুরী কাজ ছিল, তাই যেতে পারেনি।

ধীরে ধীরে প্যাডাল ঘুরিয়ে চলেছে দুই ক্লান্ত কিশোর। পাহাড়ী পথ। এক পাশে পাথরের দেয়াল শুরু হলো।

রাতের অন্ধকার চিরে দিল তীক্ষ্ণ চিৎকার। সাহায্য চায়!

চমকে ব্রেক চাপল মুসা। দাঁড়িয়ে গেল সাইকেল। সামলাতে না পেরে তার গায়ের ওপর এসে পড়ল রবিন, উফ করে উঠল।

ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল মুসা, শুনেছ?

মুসার সাইডস্ট্যাণ্ডের ভেতর ঢুকে গেছে রবিনের সামনের চাকা, টেনে ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলল, শুনলাম তো। কেউ ব্যথা পেল বুঝি?

কান পেতে রয়েছে দুজনে।

দেয়ালের ওপাশে ঝোপের ভেতর কিসের নড়াচড়া।

আবার শোনা গেল চিৎকার।

হ্যাঁ, সাহায্যের আবেদনই। বিপদে পড়েছে লোকটা।

ওদের ঠিক সামনে ভারি একটা লোহার গেট, পাল্লার ওপর কাটা বসানো। দেয়ালের ওপাশে যাওয়ার পথ।

এক মুহূর্ত দ্বিধা করল না আর মুসা। সাইকেল রেখে দৌড় দিল গেটের দিকে।

পেছনে ছুটল রবিন। হাউফ করে কনুই চেপে ধরে দাঁড়িয়ে পড়ল হঠাৎ। ছোট্ট কি যেন জোরে বাড়ি খেয়ে উড়ে গিয়ে পড়ল মাটিতে।

এই যে, নিচু হয়ে জিনিসটা কুড়িয়ে নিল মুসা।

ইঞ্চি-তিনেক লম্বা ধাতব জিনিস, স্পষ্ট দেখা না গেলেও বুঝতে অসুবিধে হলো, পুতুল। তারার আলোয় মৃদু চকচক করছে।

কে ছুঁড়ল, মুসা?

জানি না। দেখো, গলায় ফাঁস লাগানো। বাধা ছিল কোন কিছুর সঙ্গে।

দেয়ালের ওপাশ থেকে ছুঁড়েছে মনে হলো, রবিন বলল। তোমার… থেমে গেল। দেয়ালের ওপাশে পায়ের শব্দ। ঝোপঝাড় মাড়িয়ে ছুটে আসছে।

কি যেন ছুঁড়ে ফেলেছে। দেখো দেখো, চাপা গলায় বলল কেউ।

দেখছি, বস, বলল দ্বিতীয়জন।

গেটের তালায় ঘষার শব্দ, খোলার চেষ্টা চলছে।

দ্রুত এদিক ওদিক তাকাল দুই গোয়েন্দা। বড় একটা ঝোপ দেখে তাড়াতাড়ি গিয়ে তার মধ্যে সাইকেল ঢোকাল, লুকিয়ে বসে রইল ভেতরে। দেয়ালের কাছাকাছি।

মরচে ধরা কব্জায় কিচকিচ শব্দ তুলে খুলে গেল লোহার ভারি পাল্লা, গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল একটা আবছা মূর্তি, রাস্তার ধার ধরে দৌড় দিল।

ঝোপের ভেতর দম বন্ধ করে রয়েছে ছেলেরা, দুরুদুরু করছে বুক। তাদের পাশ দিয়ে ছুটে চলে গেল লোকটা।

চেহারা দেখেছ? ফিসফিস করল রবিন।

না। বেশি অন্ধকার।

আমিও না। পুতুলটা খুঁজছে বোধহয়। দিয়ে দেয়া উচিত।

চুপ!

ফুট দশেক দূরে এসে দাঁড়িয়েছে আরেকটা ছায়ামূর্তি। লম্বা, চোখা নাক। পাখির মাথার মত খুদে একটা মাথা, পাখির মতই ঝটকা দিয়ে এদিক ওদিক নড়ছে।

দুজনকে চমকে দিয়ে অদ্ভুত কণ্ঠে হেসে উঠল মূর্তিটা। আতঙ্কে অবশ হয়ে এল মুসার শরীর।

তাদের আরও অবাক করে মানুষের কণ্ঠে কথা বলে উঠল আজব পক্ষীমানব, চলে এসো। এখন পাবে না।

হ্যাঁ, বস্। বেশি অন্ধকার, পথের ধার থেকে জবাব দিল দ্বিতীয় মূর্তিটা। কাল সকালে খুঁজে বের করব।

মাথার কাছে সামান্য কুঁজো কিম্ভুত ছায়াটার। অন্য ছায়াটা তার কাছাকাছি হলো। ঝোপ মাড়িয়ে গেটের দিকে এগোল দুটোই। ভেতরে ঢুকল, বিচিত্র শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল পাল্লা। তালা লাগল আবার। ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল পদশব্দ।

দেখেছ? গলা কাঁপছে রবিনের। মাথাটা দেখেছ? একেবারে পাখি! আর হাসিটা কি জঘন্য। পিলে চমকে যায়। কি ওটা?

আল্লা মালুম।

চলো, ইয়ার্ডে যাই। কিশোরকে বলব।

হ্যাঁ, চলো, মুসা একমত হলো।

সাইকেলে চাপল আবার দুই গোয়েন্দা। জোরে প্যাডাল ঘুরিয়ে চলল। যত তাড়াতাড়ি পারে সরে যেতে চায় ভূতুড়ে এলাকা থেকে। লা ক্যাসিটাস ধরে চলেছে ওরা। পেছনে আবার শোনা গেল অট্টহাসি, খান খান করে দিল যেন পাহাড়ী রাতের জমাট নিস্তব্ধতা।

গতি আরও বাড়াল ওরা। গিরিপথ পেরিয়ে এসে সামনে রকি বীচের পরিচিত আলো দেখার আগে কমাল না।


নিরেট, নিখাঁদ স্বর্ণ! বিড়বিড় করল কিশোর।

হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে পুতুলটা।

দামী? জিজ্ঞেস করল রবিন।

সোনার চেয়েও দামী, মাঝে মাঝে কঠিন শব্দ ব্যবহার, কিংবা দুর্বোধ করে কথা বলা কিশোরের স্বভাব।

সোনা আবার সোনার চেয়ে দামী হয় কিভাবে? বুঝতে পারছে না মুসা।

হাসিতে বিকশিত পুতুলটা ঠকাস করে টেবিলে নামিয়ে রাখল কিশোর। ঋষিদের মত আসন পেতে বসল সোনার পুতুল। দেখেছ, কি যত্ন করে খোদাই করেছে? দক্ষ শিল্পীর কাজ। মাথায় দেখো, যেন পালকের মুকুট। শিল্পী রেড ইনডিয়ান। অনেক পুরানো। এ-রকম জিনিস মিউজিয়ামে দেখেছি।

হেডকোয়ার্টারে আলোচনায় বসেছে তিন গোয়েন্দা।

পুরানো একটা মোবাইল হোম, ট্রেলার, বাতিলই কিনে এনেছেন কিশোরের চাচা রাশেদ পাশা। বিক্রি করা যায়নি ওটা। দিয়ে দিয়েছেন ছেলেদেরকে। লোহালক্কড় আর পুরানো জঞ্জালের তলায় চাপা পড়েছে ওটা এখন, বাইরে থেকে চোখে পড়ে না।

জঞ্জালের ভেতর দিয়ে কয়েকটা গোপন পথ বানিয়ে নিয়েছে তিন কিশোর, হেডকোয়ার্টারে ঢোকার পথ। ভাঙা ট্রেলারটাকে ঠিকঠাক করে নিয়েছে ওরা, ভেতরটা আর বোঝাই যায় না, বাতিল হয়ে পড়ে ছিল। চেয়ার-টেবিল আছে, টেলিফোন, টেপরেকর্ডার আর নানা রকম আধুনিক যন্ত্রপাতি আছে, ছোট একটা ল্যাবরেটরি, এমনকি খুদে ডার্করুমও রয়েছে ছবি প্রসেস করার জন্যে।

নিচের ঠোঁটে বার দুই চিমটি কাটল কিশোর; বলল, তাহলে, তোমাদের ধারণা, সাহায্যের জন্যে যে চেঁচিয়েছে সে-ই পুতুলটা ছুঁড়ে দিয়েছে? কিন্তু ধারণা দিয়ে তো কাজ হবে না, প্রমাণ চাই।

কি বলছ, কিশোর? প্রতিবাদ করল মুসা। চিৎকার শুনে বীরের মত এগিয়ে গেলাম সাহায্য করতে। অন্ধকারে পুতুল কুড়িয়ে নিলাম। ঝোপের ভেতরে লুকিয়ে ভূত দেখলাম, হাসি শুনলাম, তা-ও পালালাম না। আর কি করতে পারতাম?

বস্ বস্ করল, বলল রবিন। ডাকাতের দল না-তো?

তাহলে ওই ভূতুড়ে ছায়াটা কি? পাখির মত মাথা, ঠোঁটের মত নাক, কুঁজো। আর কি হাসি। ভূতের বাপ ওটা, ডাকাত না।

অযৌক্তিক কথা বলে লাভ নেই, কিশোর বলল। হাসিটা কেমন?

তীক্ষ্ণ, সঙ্গে সঙ্গে বলল মুসা। বাচ্চা ছেলের চিৎকারের মত।

না, মেয়েমানুষের, শুধরে দিল রবিন।

না, মেয়েমানুষ না। খেপার।

বদ্ধ উন্মাদের। পিলে চমকে দেয়।

বাজে হাসি, খুবই বাজে।

কেমন যেন বিষণ্ণ। বুড়ো মানুষের হাসির মত লাগে।

থামো, থামো, হাত তুলল কিশোর। হাসিটা একই সঙ্গে দুজনে শুনেছ?

নিশ্চই, জোর গলায় বলল মুসা। তবে একই হাসি কিনা বলতে পারব না।

আমি শুনতে পারলে ভাল হত, কেমন হাসি বুঝতে পারতাম। তবে সাহায্যের জন্যে যে চেঁচিয়েছে,এ তে তো কোন দ্বিমত নেই, নাকি?

না, একসঙ্গে বলল দুই সহকারী-গোয়েন্দা।

গভীর ভাবনা থেকে ডুব দিয়ে উঠল কিশোর। তোমাদের কথা শুনে মনে হচ্ছে, জায়গাটা পেদ্রোজ এস্টেট।

আঙুল মটকাল রবিন। নিশ্চই। বুড়ো পেদ্রোর জমিদারি। পাঁচ হাজার একরের বেশি।

হ্যাঁ, বেশির ভাগই বন আর পাহাড়। ফসলের জমি তেমন নেই। শুনেছি, অনেক আগে বুড়োর নাকি গরুর পাল ছিল, গরু পুষত।

এখন নেই? মুসা জিজ্ঞেস করল।

মাথা নাড়ল রবিন। না, লাইব্রেরিতে রেফারেন্স বইপত্র ঘেঁটেছিলাম একদিন। স্পেন থেকে এসেছিল বুড়োর দাদা, খামার করেছিল ওখানে। বুড়ো পেদ্রোর আমলেই গরু শেষ হয়ে যায়। তার একমাত্র মেয়ে মিস ভেরা পেদ্রোর জন্যে কিছু রেখে যেতে পারেননি। মিস ভেরাও বুড়ো হয়েছেন, খুব সাধারণ ভাবে থাকেন। ল্যাণ্ড-পুয়ার বলে একটা কথা আছে না, তাই। এত জায়গা, অথচ কাজে লাগাতে পারছেন না। টাকা নেই, লোকজন রাখতে পারেন না। এক চাকরানী আর একজন মালী, ব্যস। মহিলা নাকি একা থাকতে পছন্দ করেন, কেউ কখনও দেখা করতে যায় না তাঁর সঙ্গে।

বইয়ের পোকা রবিন, তিন গোয়েন্দার সমস্ত কেসের রেকর্ড রাখার দায়িত্ব তার ওপর, ফালতু কথা বলে না। সে যা বলছে, জেনেশুনেই বলছে।

গম্ভীর হয়ে গেল কিশোর। হুঁ। আচ্ছা, পেদ্রোজ এস্টেটে কি করছিল দুজনে? মূর্তিটাই বা ছুঁড়ে ফেলল কে?

দুজন নয়, একজন, শুধরে দিল মুসা। আরেকটা তো ভূত। ভূতের সঙ্গে যোগ দিয়েছে এক ডাকাত।

কি ডাকাতি করতে যাবে ওখানে? মনে করিয়ে দিল রবিন, মিস ভেরা পেদ্রোর টাকা নেই।

পুতুলটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখছে কিশোর। আশা করছে যেন, এখুনি কথা বলে উঠবে, প্রশ্নের জবাব দেবে। হঠাৎ স্থির হয়ে গেল তার হাত।

কি হলো? জিজ্ঞেস করল রবিন।

পুতুলের নিচের দিকে এক জায়গায় নখ দিয়ে খুঁটছে কিশোর। ছোট্ট একটা দরজা খুলে মেঝেতে পড়ল কি যেন।

গোপন খুপরি! চেঁচিয়ে উঠল মুসা।

কাত হয়ে কুড়িয়ে নিল কিশোর, এক টুকরো কাগজ। ভাঁজ খুলে টেবিলে বিছিয়ে হাত দিয়ে ডলে সমান করল। দেখার জন্যে ঝুঁকে এল অন্য দুজন।

মেসেজ? বলল রবিন।

বুঝতে পারছি না, মাথা নাড়ল গোয়েন্দা-প্রধান। লেখাই মনে হচ্ছে। কি ভাষা কে জানে।

ভুরু কুঁচকে চেয়ে আছে মুসা আর রবিন, ওরাও কিছু বুঝতে পারছে না।

এ-ভাষা আর কখনও দেখিনি, বলল কিশোর।

নীরবে খানিকক্ষণ কাগজটার দিকে চেয়ে রইল ওরা।

শোশ-শোনো, তোতলাতে শুরু করল রবিন। লে-লেখার…মানে, কালি দিয়ে লেখা হয়নি…রক্ত।

আলোর কাছে সরিয়ে নিয়ে আরও ভালমত লেখাটা দেখল কিশোর।

অস্বস্তিতে মাথা চুলকাচ্ছে মুসা।

ঠিকই বলছে, রবিন, একমত হলো কিশোর। রক্তেই লেখা। হাতের কাছে কালি-টালি কিছু ছিল না লেখকের।

হয়তো কোন বন্দি, রবিন অনুমান করল।

কিংবা দল-ছুট কেউ, মুসা বলল। ডাকাতের দল থেকে বেরিয়ে…

অনেক কিছুই হতে পারে, বাধা দিয়ে বলল কিশোর। তবে বোঝা যাচ্ছে, তিন গোয়েন্দার উপযুক্ত রহস্য, আরেকটা কেস। এখন প্রথম কাজ, মেসেজের পাঠোদ্ধার করা।

কে করবে?

একজনের কথাই মনে আসছে যিনি সাহায্য করতে পারবেন।

মিস্টার ক্রিস্টোফার?

হ্যাঁ। রাত অনেক হয়েছে, আজ বিরক্ত করা ঠিক হবে না। কাল সকালে ফোন করব।


পরদিন সকালে নাস্তা সেরেই স্যালভিজ ইয়ার্ডে ছুটে এল মুসা আর রবিন। রেন্টআ-রাইড অটো কোম্পানিতে ফোন করেছিল কিশোর, রাজকীয় রোলস-রয়েস নিয়ে হাজির হয়েছে হ্যানসন। পুরানো মডেলের কুচকুচে কালো বিশাল গাড়িটার জায়গায় জায়গায় সোনালি অলঙ্করণ, খুব সুন্দর।

আগে হলিউড যাব, হ্যানসন, বলল কিশোর, মিস্টার ডেভিস ক্রিস্টোফারের অফিসে।

ভেরি গুড, মাস্টার পাশা, বিশীত কণ্ঠে বলল খাঁটি ইংরেজ শোফার।

অফিসেই রয়েছেন বিখ্যাত চিত্রপরিচালক। বিশাল টেবিলের ওপাশ থেকে স্বাগত জানালেন তিন গোয়েন্দাকে, এসো; ইয়াং ফ্রেণ্ডস। এবার কি সে?

খুলে বলল ছেলেরা।

মন দিয়ে শুনলেন মিস্টার ক্রিস্টোফার। পুতুলটা নিয়ে ভালমত দেখে নামিয়ে রাখলেন টেবিলে। পুরানো, অনেক পুরানো। অ্যামিউলেট। ইনডিয়ান কারিগরের কাজ, সন্দেহ নেই। ইনডিয়ান শিল্পের ওপর একটা ডকুমেন্টারি ফিল্ম করেছিলাম টেলিভিশনের জন্যে, অনেক কিছু জেনেছি তখন। অ্যামিউলেটটা দেখেই বোঝা যায়, চাম্যাশ ইনডিয়ানদের কাজ।

অ্যামিউলেট কি, স্যার? জিজ্ঞেস করল মুসা।

মন্ত্রপুত পুতুল। গলায় ফাঁস লাগানো থাকে, এতে নাকি শয়তান কাছে ঘেঁষতে পারে না, মূর্তির মালিকের অশুভ কিছু ঘটে না। সেফ কুসংস্কার। চাম্যাশদের অনেকের কাছেই এ-ধরনের পুতুল আছে।

রকি বীচেও ইনডিয়ান ছিল?

ছিল, জবাব দিল রবিন। আগে রকি বীচে চাম্যাশ ইনডিয়ানরা ছিল উপকূলের ধারে, স্প্যানিশ জমিদারদের গোলামী করেছে অনেকে।

হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ, মাথা দোলালেন পরিচালক। এখন পক্ষীমানবের কথা বলো। লম্বা, কুঁজো, পাখির মত খুদে মাথা, ঝটকা দিয়ে দিয়ে নড়ছিল, অট্টহাসি হেসে উঠেছিল, না?

হ্যাঁ, স্যার।

তুমি আর মুসা ছায়াটার খুব কাছে ছিলে, একই সময়ে হাসি শুনেছ, অথচ ভিন্ন ভিন্ন ভাবে বর্ণনা করছ। তোমার কি মনে হয়, কিশোর?

বুঝতে পারছি না, স্যার।

আমিও না, স্বীকার করলেন পরিচালক। দেখি, মেসেজটা?

কাগজের টুকরোটা বের করে দিল কিশোর।

রক্তেই লেখা, ভাল করে দেখে বললেন মিস্টার ক্রিস্টোফার। আরেকটা ব্যাপার লক্ষ করেছ? খুব বেশি পুরানো নয় কাগজটা, বেশি দিন আগে রাখা হয়নি।

পড়তে পারছেন, স্যার? জিজ্ঞেস করল রবিন।

না। এরকম লেখা আর দেখিনি।

খাইছে! তাহলে? হতাশ কণ্ঠে বলল মুসা। কিশোর বলছিল, আপনি পড়তে পারবেনই।

এখন তাহলে কি করব, স্যার? রবিনও হতাশা ঢাকতে পারল না।

আমি পারিনি বলে যে অন্য কেউ পারবে না, তা-তো বলিনি, মিটিমিটি হাসছেন পরিচালক। আমার এক বন্ধু আছে। ইউনিভারসিটি অভ সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার প্রফেসর, প্রাচীন ভাষার বিশেষজ্ঞ। ফিচার ফিল্মটা করার সময় অনেক সাহায্য করেছে আমাকে। রকি বীচেই থাকে। আমার সেক্রেটারির কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে যাও। কি হয়, জানিও আমাকে।

মিস্টার ক্রিস্টোফারকে ধন্যবাদ জানিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে এল তিন গোয়েন্দা। প্রফেসরের ঠিকানা লিখে নিল সেক্রেটারির কাছ থেকে। পাশা স্যালভিজ ইয়ার্ড থেকে মাত্র কয়েক রক দূরে থাকেন প্রফেসর নরম্যান এইচ. হেনরি।

হ্যানসনকে রকি বীচে ফিরে যেতে বলল কিশোর।

প্রফেসর হেনরির ছোট্ট সাদা বাড়িটা রাস্তা থেকে দূরে। ঘন গাছপালায় ঘেরা। সীমানার চারপাশে সাদা খাটো খুঁটির বেড়া। হ্যানসনকে গাড়ি নিয়ে চলে যেতে বলে, গেটের কাঠের পাল্লা ঠেলে ভেতরে ঢুকল কিশোর। পেছনে মুসা আর রবিন। ইট বিছানো পথ চলে গেছে গাড়িবারান্দায়। এগোল ওরা।

অর্ধেক পথ পেরিয়েছে, এই সময় পাশের ঘন ঝোপ থেকে বেরিয়ে পথরোধ করে দাঁড়াল এক লোক।

এই, বলেই থেমে গেল রবিন।

বেঁটে, চওড়া কাঁধ লোকটার, গাঢ়-বাদামী পালিশ করা পাকা চামড়ার মত গায়ের রঙ। কালো, চঞ্চল চোখের তারা। ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে শক্ত ঝকঝকে দাঁত। মোটা খসখসে সূতী কাপড়ের শার্ট পরনে, একই কাপড়ের পাজামা, কোমরে কাপড়ের চওড়া বেল্ট কষে বেধেছে, মাথায় সাদা বড় হ্যাট। খালি পা।

হাতে বাঁকা, লম্বা ফলাওয়ালা ভয়াল এক ছুরি।

কালো চোখ জ্বলছে লোকটার। সামান্য কুঁজো হয়ে পা পা করে এগোচ্ছে, ছুরিটা সামনে বাড়ানো।

পাথর হয়ে গেছে তিন গোয়েন্দা। আরেক পা এগিয়ে ভীষণ ভঙ্গিতে ছুরি নাড়ল লোকটা। বিচিত্র ভাষায় কি যেন বলে লাফিয়ে এসে পড়ল কাছে। থাবা দিয়ে কিশোরের হাত থেকে সোমার পুতুলটা ছিনিয়ে নিয়েই এক দৌড়ে গিয়ে ঢুকে পড়ল ঝোপে।

ঘটনার আকস্মিকতায় থ হয়ে গেছে ছেলেরা। নড়ার, এমন কি চিৎকার করার ক্ষমতাও যেন নেই।

সবার আগে সামলে নিল মুসা। নিয়ে গেল তো!

বিপদের তোয়াক্কা না করে লোকটার পিছে দৌড় দিল সে, ঝোপে গিয়ে ঢুকল হুড়মুড় করে। পেছনে ছুটল অন্য দুজন।

ঝোপঝাড় ভেঙে বাগানের এক ধারে বেরিয়ে এল ওরা। দেরি হয়ে গেছে। পুরানো রঙ-চটা একটা গাড়িতে উঠছে লোকটা। ড্রাইভিং সীটে বসে আছে। আরেকজন। ছেলেরা বেড়া ডিঙানোর আগেই গর্জে উঠল পুরানো এঞ্জিন, চলতে শুরু করল গাড়ি।

যাহ, গেল অ্যামউলেট! চেঁচিয়ে বলল মুসা।

এই সময় পেছনে কড়া গলায় ধমকে উঠল কেউ।


এই, কি হচ্ছে এখানে? হালকা-পাতলা একজন মানুষ, কাঁধ সামান্য কুঁজো। ধূসর চুল। পুরু কাচের চশমা। ছেলেদের দিকে চেয়ে আছেন।

আমাদের অ্যামিউলেট নিয়ে গেল! নালিশ করল যেন মুসা।

ছুরি দেখিয়ে, রবিন যোগ করল।

তোমাদের অ্যামিউলেট? চোখে বিস্ময় ফুটল মানুষটির। অ তোমাদেরকেই পাঠিয়েছে ক্রিস্টোফার। তিন গোয়েন্দা, না?

আপনিই প্রফেসর হেনরি? পাল্টা প্রশ্ন করল কিশোর।

একটা প্রােমে নিয়ে এসেছ? প্রশ্নের জবাব প্রশ্ন দিয়েই সারলেন প্রফেসর একটা অপরিচিত ভাষা বুঝতে পারছ না।

পোরেম নিয়ে এসেছিলাম, বিষণ্ণ কণ্ঠে রবিন বলল, এখন আর নেই। লোকট, নিয়ে গেছে।

আছে, শুধরে দিল কিশোর। অ্যামিউলেট নিয়ে গেছে, কিন্তু কাগজটা আছে।

পকেট থেকে কাগজটা বের করে হাসিমুখে প্রফেসরের হাতে তুলে দিল গোয়েন্দাপ্রধান।

আশ্চর্য! লেখাটা একনজর দেখেই চেঁচিয়ে উঠলেন প্রফেসর, পুরু লেন্সের ওপাশে চকচক করছে চোখ। এসো এসো, স্টাডিতে গিয়ে বসি।

লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটতে শুরু করলেন প্রফেসর। চোখ কাগজের দিকে। কয়েক কদম গিয়েই প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়লেন একটা গাছের ওপর।

স্টাডিতে ঢুকে হাত নেড়ে ছেলেদের চেয়ার দেখিয়ে দিয়ে নিজে বসলেন ফ্যানটাসটিক!

হ্যাঁ, হ্যাঁ, কোন সন্দেহ নেই। আশ্চর্য! আপনমনে বিড়বিড় করছেন প্রফেসর। ছেলেদের উপস্থিতি ভুলেই গেছেন যেন। রক্তে লেখা। খুব বেশি দিনের নয়! ফ্যানটাসটিক!

কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে নিল কিশোর। পড়তে পারছেন, স্যার?।

আঁ! চোখ তুলে তাকালেন প্রফেসর। হা হা, পারছি। ইয়াকুয়ালি। কোন সন্দেহ নেই। ইয়াকুয়ালি ভাষা। জানোই তো, ইনডিয়ানদের মাত্র কয়েকটা গোত্রের লিখিত ভাষা আছে। স্প্যানিশ অক্ষরের রূপান্তর। মিশনারিদের কাছ থেকে স্প্যানিশ শিখে নিজেরা নতুন একটা ভাষা তৈরি করে নিয়েছিল ইয়াকুয়ালিরা।

চাম্যাশদের মত? প্রশ্ন করল মুসা।

গর্দভ নাকি ছেলেটা? রেগে উঠলেন প্রফেসর। চাম্যাশরা তো আদিম জাত, বুনো। তাদের সঙ্গে ইয়াকুয়ালিদের তুলনা? বলি, ইংরেজি ভাষার সঙ্গে চায়নিজের

তুলনা?

ওরা আমেরিকান ইনডিয়ান তো? ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল রবিন।

নিশ্চয় আমেরিকান, এটা আবার জিজ্ঞেস করতে হয় নাকি? কাগজের লেখার দিকে তাকালেন আবার প্রফেসর। এখানে, এই রকি বীচে, ইয়াকুয়ালিদের হাতের লেখা মেসেজ? নাহ, বিশ্বাসই হচ্ছে না। পর্বতের ওপর থেকে পারতপক্ষে নিচেই নামে না ইয়াকুয়ালিরা, শহরে আসা তো দূরের কথা। সভ্যতাকে ঘৃণা করে ওরা।

ইয়ে, স্যার, কোন্ পর্বত? জিজ্ঞেস করতে কিশোরও ভয় পাচ্ছে। কোথায় বাস করে ইয়াকুয়ালিরা?

কোথায় মানে? মেকসিকো। কোন ক্লাসে পড়ো? কিশোরের দিকে তাকালেন প্রফেসর। এই যেন প্রথম খেয়াল করলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নয়, ওরা কিশোর, মাত্র স্কুলে পড়ে, ইনডিয়ানদের ইতিহাস জানার কথা নয় ওদের। লজ্জিত হেসে বললেন, ফরগিভ মি, বয়েজ। ইয়াকুয়ালিরা কোথায় থাকে, তোমরা জানবে কি করে? গোপনে থাকতে পছন্দ করে ওরা, আধুনিক সভ্যতাকে এড়িয়ে চলে।

কিন্তু স্যার, দ্বিধা করছে কিশোর, বলে না আবার বকা শুনতে হয়। মেকসিকো তো এখান থেকে খুব দূরে না। এক-আধজন ইয়াকুয়ালি যদি কোন ভাবে রকি বীচে এসেই পড়ে, অবাক হওয়ার কি আছে?

অসম্ভব! তিন গোয়েন্দাকে চমকে দিয়ে গর্জে উঠলেন প্রফেসর। এত জোরে চেঁচানো উচিত হয়নি বুঝেই যেন কণ্ঠস্বর নরম করলেন। কারণ, ইয়াং মেন, ওরা তাদের এলাকা ছাড়তে নারাজ। মেকসিকোর মাদ্রে পর্বতের দুর্গম অঞ্চলে বাস। লোকালয় থেকে অনেক দূরে, সাংঘাতিক শুকনো এক জায়গা। ডেভিলস গার্ডেন বলে অনেকে, শয়তানের বাগান। পর্বতের অনেক ওপরে, চুড়ার কাছাকাছি থাকে ইয়াকুয়ালিরা, টিকটিকির মত বেয়ে উঠে যায় খাড়া পাহাড়ে, পাহাড়ী ছাগলও ওদের কাছে কিছু না। তাই তো ওদের বলে ডেভিলস অভ দা ক্লিফস।

ডেভিলস? কেঁপে উঠল মুসার গলা। এতই ভয়ানক?

হ্যাঁ, ভয়ানক বটে। আক্রান্ত হলে শয়তানের চেয়েও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কিন্তু, সাধারণত, ওরা খুব শান্তিপ্রিয় জাত। নিজেদের নিয়ে থাকতে ভালবাসে। আরেকটা কাজ ভালবাসে, পাহাড়ে চড়া। সময় অসময় নেই, ইচ্ছে হলেই উঠে যায় উঁচু পর্বতের চূড়ায়।

এত উঁচু থেকে নিচে নামল কি করে তাহলে মেসেজটা? জিজ্ঞেস করে বসল রবিন।

জোরে জোরে চিবুক ডললেন প্রফেসর। তাই তো, কি করে নামল? কয়েক বছর ধরে অবশ্য মেকসিকান গভারনমেন্ট ওদের পোষ মানানোর চেষ্টা করছে। যত যাই হোক, ইয়াকুয়ালিরাও মানুষ, সভ্যতার লোভ পেয়ে বসতে কতক্ষণ?

তারমানে, ধরে নেয়া যায় অন্তত একজন ইয়াকুয়ালি রকি বীচে এসেছে? বলল কিশোর। কাজ করতে?

কি জানি, নিজেকেই প্রশ্ন করলেন যেন প্রফেসর, জোর নেই গলায়। নিজের এলাকা ছেড়ে কোথাও গিয়েছে ইয়াকুয়ালি, বিশ্বাস করতে পারছি না। তাছাড়া এখানে কি করতে আসবে? মেসেজটা রকি বীচে পেয়েছ, শিওর?

হ্যাঁ, স্যার। একটা অ্যামিউলেটের ভেতরে।

হ্যাঁ, মাথা দোলালেন প্রফেসর। ইয়াকুয়ালিরা অ্যামিউলেট পছন্দ করে।

কিন্তু মিস্টার ক্রিস্টোফার তো বললেন, অ্যামিউলেটটা চাম্যাশদের তৈরি, প্রশ্ন তুলল রবিন। এরকম একটা পুতুল নাকি ফিল্ম তৈরির সময় ব্যবহার করেছেন।

চাম্যাশ? আরও অবাক করলে। মিলছে না, মাথা নাড়লেন প্রফেসর। চাম্যাশদের সঙ্গে ইয়াকুয়ালিদের কোন সম্পর্ক নেই। চাম্যাশ পুতুল ইয়াকুয়ালিদের হাতে যায় কি করে? ওই পুতুলটাই তোমাদের কাছ থেকে ছিনতাই হয়েছে?

হ্যাঁ, স্যার, বলল মুসা।

খাঁটি সোনার তৈরি, জানাল রবিন।

বলো কি? ভুরু কুঁচকে ছেলেদের দিকে তাকালেন প্রফেসর। স্বর্ণ? চাম্যাশ। অ্যামিউলেট? অসম্ভব! … সত্যি বলছি, স্যার, জোর দিয়ে বলল কিশোর। আমি স্বর্ণ চিনি।

মিস্টার ক্রিস্টোফারও তো তাই বললেন, রবিন বলল।

তাজ্জব হয়েছেন প্রফেসর। হাঁ হয়ে যাচ্ছে মুখ, ঝুলে পড়ছে নিচের চোয়াল। শাট করে বন্ধ করলেন হঠাৎ। হাত বোলালেন চোয়ালে। কাছাকাছি হয়ে আসছে চোখের পাতা, চিন্তিত। আস্তে করে সামনে ঝুঁকলেন। তাই যদি হয় মাই ইয়াং ফ্রেণ্ডস, সাবধানে শব্দ বাছাই করলেন প্রফেসর, বক্তব্যের গুরুত্ব বোঝানোর জন্যে, তাহলে কাজের কাজই করেছ। দুশো বছরের পুরানো জটিল এক রহস্যের সূত্র এসে পড়েছে তোমাদের হাতে।

বড় বড় হয়ে গেল কিশোরের চোখ। দুশো বছরের পুরানো রহস্য?

ইয়েস, মাই বয়েজ, চাম্যাশ হোর্ডের রহস্য।


শোনো, বললেন প্রফেসর, চাম্যাশরা স্বর্ণ ব্যবহার করে না। এদিকে সোনার খনি কখনই ছিল না। পুতুলটা সোনার হলে, নিশ্চয় চাম্যাশ বোর্ড থেকে এসেছে।

চ্যামাশ হোর্ড কি জিনিস, স্যার? জিজ্ঞেস করল রবিন।

সতেরোশো নব্বই সাল থেকে আঠারোশো বিশের মধ্যে, বলে চললেন প্রফেসর, ভয়ানক একদল খুনে চাম্যাশ আড্ডা গেড়েছিল এদিকের পর্বতের মধ্যে। ইয়াকুয়ালিদের মত না হলেও পাহাড়ে চড়ায় ওরাও ওস্তাদ ছিল। পাহাড়ের মধ্যে লুকিয়ে পড়লে খুঁজে বের করা খুব মুশকিল হত। দলটাকে কিছুতেই সামলাতে পারছিল না স্প্যানিশরা। শেষে অন্য ফন্দি করল, সোনার লোভ দেখাল, এটা-ওটা নানারকম সোনার জিনিস উপহার দিল। খারাপ করল আরও। সোনার কদর বুঝে গেল ওই চাম্যাশরা, এতদিন শুধু বশ্যতা স্বীকার করেনি, এবার লুটপাট শুরু করে দিল। স্প্যানিশ জমিদারদের খুন করে লুট করতে লাগল তাদের সম্পদ।

আর কোন উপায় না দেখে সেনাবাহিনীর কাছে ধর্না দিল জমিদারেরা। শেষ করে দেয়া হলো দলটাকে। ধরা পড়ল দলের নেতা ম্যাগনাস ভারদি। অনেক অত্যাচারেও মুখ খুলল না। কিছুতেই বলল না, কোথায় লুকিয়ে রেখেছে ধনরত্নের স্তুপ। মৃত্যুর আগে বলে গেল, এমন এক জায়গায় রেখেছে ওগুলো, যা, কেউ কোনদিন খুঁজে পাবে না। সত্যি, খুঁজে পেল না। কত লোক যে কতভাবে খুঁজেছে, কিন্তু পায়নি। বাতাসে হারিয়ে গেল যেন চাম্যাশ হোর্ড। আমার বিশ্বাস ছিল, পানিতে ফেলে দিয়েছে, সাগরে, যাতে কেউ কোন দিন না পায়।

অনেক দূরে চলে গেছে যেন কিশোরের নজর। এত কষ্টে জোগাড় করেছে, পানিতে ফেলে দেয়ার জন্যে? নিশ্চয় সেটা পারেনি ম্যাগনাস, মন সায় দেয়নি।

হয়তো, বললেন প্রফেসর। আর পুতুলটা হোর্ডের হয়ে থাকলে, আশা করা যায়, গুপ্তধনগুলো ধারে-কাছেই কোথাও রয়েছে। দারুণ এক আবিষ্কার হবে সেটা।

মেসেজে নিশ্চয় হোর্ডের কথা বলা আছে, সামনে ঝুঁকল কিশোর।

মেসেজ? চোখ মিটমিট করলেন প্রফেসর। কাগজটার দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠলেন। হায় হায়, ভুলেই গিয়েছিলাম।

মেসেজটা পড়তে পড়তে কুঁচকে গেল প্রফেসরের ভুরু।

আদিম এসব ভাষা অনুবাদ করা কঠিন। আদিম বলছি, তার কারণ, ভাষাটা নতুন হলেও যাদের ভাষা তারা আদিম লোক, প্রাগৈতিহাসিক চিন্তাভাবনা রয়ে গেছে, মনটা কাজ করে সেভাবেই। বলার ভঙ্গিও আদিম। যাই হোক, এটা বলছে। ওয়ারডস স্মােক। সিঙ ডেথ সঙ। ব্রাদার্স হেল্প। ব্যস, এই।

সাহায্যের আবেদন? বলল কিশোর।

মনে হয়, অবাক হয়ে মেসেজটার দিকে চেয়ে আছেন প্রফেসর। কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারছি না, চাম্যাশ অ্যামিউলেটের ভেতরে ইয়াকুয়ালি মেসেজ কেন? গভীর রহস্য।

সমাধান করে ফেলব, স্যার, দৃঢ় আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল কিশোর।

হ্যাঁ, করে ফেলো, হাসলেন প্রফেসর। জানিও আমাকে, প্লীজ। চাম্যাশ হোর্ড দেখার ইচ্ছে আমার অনেক দিনের।

গেটের কাছে ছেলেদেরকে এগিয়ে দিয়ে গেলেন তিনি। রোদে উজ্জ্বল সকাল। বার বার তাকালেন এদিক ওদিক, ভয়, যেকোন সময় ঝোপের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে পারে বাদামী চামড়ার লোকটা।

বাইরে বেরিয়েই কিশোরের দুদিক থেকে চেপে এল রবিন আর মুসা।

কিশোর? প্রায় চেঁচিয়ে বলল রবিন। কি মনে হয় তোমার? চাম্যাশ হোর্ভ পেয়ে গেছে কেউ?

তার কাছ থেকে কেউ ছিনিয়ে নেয়ার তালে আছে? মুসার প্রশ্ন।

হয়তো অ্যামিউলেটটাই সূত্র, আবার বলল রবিন।

কিন্তু ছিনিয়ে নিল যে, কে লোকটা? মুসা বলল। ইনডিয়ান ডাকাতদের আরেকটা দল?।

বাদামী লোকটাকে কিন্তু ইনড়িয়ানের মত লাগল।

পেদ্রোর বাড়িতে সেদিন যে ছায়াটা দেখলাম, নিশ্চয় কোন ইনডিয়ানের প্রেতাত্মা।

গভীর চিন্তায় মগ্ন কিশোর, ঘনঘন চিমটি কাটছে নিচের ঠোঁটে, বিরক্ত হয়ে ঘুরে তাকাল। পাগল হয়ে গেছ নাকি? এভাবে অনুমানে কিছু হবে না। কাজ করতে হবে, কাজ। পেদ্রোজ এস্টেটে গিয়ে খোঁজখবর নিতে হবে।

গোপনে? জিজ্ঞেস করল মুসা। মানে লুকিয়ে ঢুকব?

না, লুকিয়ে ঢুকব। হয়তো কিছু জানাতে পারবেন মহিলা। কিন্তু তাঁর সঙ্গে দেখা করি কিভাবে?

নানারকম প্রস্তাব দিল রবিন আর মুসা। কোনটাই পছন্দ হলো না গোয়েন্দাপ্রধানের। শেষে ঠিক হলো, রবিনের বাবার সাহায্য নেবে। তিনি সাংবাদিক। ক্যালিফোর্নিয়ার পুরানো ইতিহাস জোগাড় করে পত্রিকায় ধারাবাহিক একটা ফিচার করছেন কিছু দিন ধরে। প্রেদ্রোজ এস্টেটে তাঁর পক্ষে সহজে ঢোকা সম্ভব। মহিলার সাক্ষাৎকার নেবেন। তার সঙ্গে ঢুকবে তিন গোয়েন্দা, ফাঁকে ফাঁকে দু-চারটা প্রশ্ন ওরাও হয়তো করতে পারবে।

বাবাকে রাজি করানোর দায়িত্ব নিল রবিন।

হাঁটতে হাঁটতে ইয়ার্ডের কাছে চলে এসেছে ওরা। গেটের দিকে চোখ পড়তেই চেঁচিয়ে উঠল মুসা, আরে, দেখো কে? শুঁটকি! ·

টেঙা, হালকা-পাতলা একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে গেটের পাশে, পেছন ফিরে রয়েছে। হ্যাঁ, টেরিয়ার ডয়েলই, তিন গোয়েন্দার পুরানো শত্রু শুঁটকি টেরি। বড়লোকের বখে যাওয়া ছেলে, রকি বীচে বাড়ি আছে, মাঝে মাঝে ছুটি কাটাতে আসে, জান জ্বালিয়ে ছাড়ে তিন গোয়েন্দার। মুসার দীর্ঘ দিনের ইচ্ছে, সময়সুযোগমত পেলে ওর চোখা বাঁকা নাকটা এক ঘুসিতে ভোঁতা করে দেবে। কিন্তু রকি বীচে একা নয় টেরিয়ার, অনেক বন্ধু আছে, সবগুলো শয়তান, টেরিয়ারের নীল গাড়িতে চড়া আর হোটেল-রেস্তোরাঁয় ভালমন্দ খাবার লোভে তার দলে যোগ দিয়েছে। তিন গোয়েন্দার যদিও তেমন কোন ক্ষতি আজতক করতে পারেনি ওরা, তবে যথেষ্ট ভুগিয়েছে।

এখানে কি করছে ব্যাটা? রবিনের জানার খুব ইচ্ছে।

নিচু গলায় তাগাদা দিল কিশোর। জলদি, লাল কুকুরচার।

ঘুরে, পাশ দিয়ে স্যালভিজ ইয়ার্ডের পেছনে চলে এল ওরা, টেরিয়ারের অলক্ষে। বেড়ার গায়ে ওখানে একটা অগ্নিকাণ্ডের দৃশ্য আঁকা, ১৯০৬ সালে স্যান ফ্রানসিসকোয় আগুন লেগেছিল, তারই একটা দৃশ্য। জ্বলন্ত শিখার কাছ থেকে দূরে বসে আগুনের দিকে চেয়ে আছে একটা লাল কুকুর। কাঠের একটা গিট রয়েছে একটা চোখের জায়গায়, অবিকল চোখের মতই দেখা যায়। নখ দিয়ে খুঁচিয়ে ওটা বের করে আনল কিশোর, ভেতরে আঙুল ঢুকিয়ে গোপন সুইচে চাপ দিতেই তিন দিকে সরে গেল তিনটে হার্ডবোর্ডের পান্না। ভেতরে ঢুকে গেল ছেলেরা, সুইচ টিপে আবার পাল্লা বন্ধ করে দিল কিশোর।

জঞ্জালের তলা দিয়ে চলে গেছে পথ, বুকে হেঁটে ট্রেলারের তলায় এসে পৌঁছল ওরা। ঢাকনা তুলে ঢুকল হেডকোয়ার্টারে।

চেয়ারে বসতে না বসতেই স্পীকারে ভেসে এল জোরাল মহিলা-কণ্ঠ, কিশোর? এই কিশোর?

খাইছে! আঁতকে উঠল মুসা। মেরিচাচী। নিশ্চয় জঞ্জালের বোঝা নিয়ে এনেছেন রাশেদ চাচা। মারা পড়ব এখন।

জবাব দিল না কিশোর।

কিশোর? আবার ডাক শোনা গেল। গেল কই ছেলেগুলো? আরে এই কিশোর, শুনছিস? একটা ছেলে দেখা করতে এসেছে তোর সঙ্গে, টনি পেদ্রো। কিশোর?

একে অন্যের দিকে তাকাল ছেলেরা। জনৈক পেদ্রো এসেছে তাদের সঙ্গে দেখা করতে, যখন ওরা পথ খুঁজে পাচ্ছে না কি করে ঢুকবে পেদ্রো এস্টেটে? একেই বলে মেঘ না চাইতেই জল। কিন্তু কে এই টনি পেদ্রো?

মিস ভেরা তো শুনলাম একা থাকেন? রবিন বলল।

চলো, দেখি, দুই সুড়ঙ্গের মুখের দিকে রওনা হলো কিশোর। জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে।


এই যে, বেরিয়েছে, ছেলেদের দেখেই বলে উঠলেন মেরিচাচী। এই, ছিলি কোথায়? এত ডাকাডাকি করছি। একেক সময় ভাবি, ইয়ার্ডটা বানানোই হয়েছে বুঝি তোদের লুকোচুরি খেলার জন্যে। নে, কথা বল। ছেলেটাকে দেখিয়ে দিয়ে চলে গেলেন তিনি, অফিসে অনেক কাজ।

লম্বা একটা ছেলে, তিন গোয়েন্দার চেয়ে বয়েসে বড়, লম্বা কালো চুল। ধূসর স্যুট পরনে, বিদেশী ছাঁট, আমেরিকান নয়। হেসে হাত বাড়িয়ে দিল সে, আমি টনি পেদ্রো।

বিস্মিত হয়েছে, সে ভাবটা গোপন করে কিশোরও হাত বাড়াল। আমি কিশোর পাশা। ও রবিন মিলফোর্ড, আর ও মুসা আমান।

পরিচিত হয়ে খুশি হলাম, হাসল টনি। তোমাদের এক বন্ধু জানাল, তোমরা নাকি অদ্ভুত ক্যারেকটার।

টেরিয়ার ডয়েল।

অদ্ভুত ক্যারেকটার নয়, বলতে চেয়েছে আসলে আজব চিড়িয়া, বুঝল তিন গোয়েন্দা।

শুঁটকি পাঠিয়েছে তোমাকে? গুঙিয়ে উঠল রবিন।

বলল, তোমাদের মাথায় নাকি ছিট আছে, জবাবটা এড়িয়ে গিয়ে বলল টনি। আছে নাকি? শুনেছি, সব আমেরিকান ছেলের মাথায়ই ছিট কমবেশি থাকে।

ওই শুঁটকি ব্যাটাই খাঁটি আমেরিকান, জোরে হাত নাড়ল মুসা। আমরা কেউ নেই। কিশোর বাঙ্গালী, আমি আফ্রিকান, আর রবিন অর্ধেক আইরিশ। তুমি কি আমেরিকান নাকি?

না না, তাড়াতাড়ি বলল টনি, ইংল্যাণ্ড। ক্যামব্রিজ। মিস ভেরা পেদ্রো আমার দাদী, বাবার ফুফু। ওই যে, পেদ্রোজ এস্টেটের মালিক, নাম নিশ্চয় শুনেছ। কয়েক মাস আগে বাবা মারা যাওয়ার সময় দাদীর কথা বলেছে আমাকে। আগে তো জানতামই না। আমার দাদা, ভেরা-দাদীর ভাই নাকি ফ্রান্সে খুন হয়েছিল, আমার বাবা তখন মায়ের পেটে। কঠিন অসুখে মারা গেছে বাবা। যখন বুঝল বাঁচবে না, দাদীর কাছে চিঠি লিখল। দাদীই আমাকে তার কাছে নিয়ে এসেছে।

সারাক্ষণ হাসি লেগে আছে টনির মুখে, কথা বলার সময়ও। দ্রুত অনেক বেশি কথা বলে, ফলে কথার টান ঠিক বোঝা যায় না। কেউ কিছু বলার আগেই আবার লাগাম ছেড়ে দিল, হ্যাঁ, যে কথা বলতে এসেছি। পুরানো জঞ্জালে বোঝাই হয়ে আছে ভেরাদাদীর ভাড়ার। ওগুলো এবার পরিষ্কার করে ফেলতে চায়। ফেলেই দিতে চেয়েছিল। আমি বুদ্ধি দিলাম, ফেলে কি লাভ? পুরানো বাতিল মাল কেনার পাগলও আছে, তাদের কাছে বেচে দাও। কথাটা খুব মনে ধরল দাদীর, আমাকে খোঁজ নিতে বলল। কাউকে তো চিনি না এদিকে। দাদীর উকিলের কাছে তোমাদের কথা শুনলাম। রকি বীচেই থাকে উকিল সাহেব, তারই বন্ধুর ছেলে টেরিয়ার উয়েল। তাকে জিজ্ঞেস করলাম স্যালভিজ ইয়ার্ডটা কোথায়, দেখিয়ে দিতে পারবে কিনা। দেখিয়ে দিল বটে, কিন্তু ভেতরে আনতে পারলাম না কিছুতেই। বেশ অবাক হয়েছি।

কি যেন কাজে ওয়ার্কশপের বাইরে এসেছিলেন মেরিচাচী, পুরানো জঞ্জালে বোঝাই কথাটা তার কানে গেছে। বেড়ার এপাশে উঁকি দিলেন। কিশোর, কিসের কথা বলছে রে?।

পুরানো মাল, চাচী, বলে আবার টনির দিকে ফিরল কিশোর। হ্যাঁ, টনি, কখন দেখতে যাব?

এখন গেলেই তো ভাল হয়।

এক্ষুণি? বললেন মেরিচাচী। দুপুর তো হয়ে এল। ঠিক আছে, যা। খেয়ে যা। ফিরতে নিশ্চয় বিকেল হবে।

চাচা কই? জিজ্ঞেস করল কিশোর।

কি জানি, রোভারকে নিয়ে কোথায় গেল। বোধহয় মালটাল আনতে।

যাব কিসে? ছোট ট্রাকটা আছে?

আছে।

তাড়াতাড়ি খেয়ে নিল তিন গোয়েন্দা। অফিসে বসে রইল টনি।

ট্রাক বের করল বোরিস। চড়ল তিন কিশোর। টনি যাবে তার নিজের গাড়িতে।

গেটের বাইরে বেরিয়ে টেরিয়ারকে খুঁজল টনি, ধন্যবাদ দেয়ার জন্যে, কিন্তু কোথাও দেখা গেল না তাকে। নীল গাড়িটাও নেই। অবাকই হলো টনি।

মুচকি হাসল তিন গোয়েন্দা। শুঁটকির ব্যাপারটা কি বলো তো? মুসা বলল।

কি আর? জবাব দিল কিশোর। বরাবর যা করে, নাক গলাবে আমাদের কাজে। ওর কথা ভাবছি না, আমি ভাবছি টনির কথা। বেশি কাকতালীয় হয়ে গেল না? তোমরাও পুতুল পেলে, তার পরদিনই এসে হাজির হলো পেদ্রোদের নাতি, আমাদেরকে এস্টেটে নিয়ে যেতে চায়।

তাই তো? পুতুলটা আমাদের কাছে আছে ভাবছে না তো? রবিনের জিজ্ঞাসা।

ইয়াল্লা! বলল মুসা। এক পুতুল কয় দলে খুঁজছে?

ছিনতাই যে হয়েছে, টনি জানে এটা? বলল রবিন।

হয়তো জানে, কিশোর বলল। তাহলে এটাও জানে মেসেজটা আমাদের কাছে আছে। সেটাই হাতাতে চায় এখন।

তাই কি? দেখে কিন্তু খারাপ মনে হয় না।

খামোকাই হয়তো সন্দেহ করছি। তবে সতর্ক থাকতে হবে আমাদের।

একমত হলো রবিন আর মুসা।

রকি বীচ থেকে বেরিয়ে এসেছে ঝরঝরে ট্রাক, টনির স্পোর্টস কারকে অনুসরণ করে উঠে যাচ্ছে পাহাড়ী পথ ধরে।

আঁকাবাঁকা গিরিপথ শেষ করে এসে এস্টেটের পুরানো লোহার দরজার সামনে থামল দুটো গাড়ি।

পাল্লা খুলল টনি।

ভেতরে ঢুকল গাড়ি দুটো। খোয়া বিছানো আধ মাইল পথ পেরিয়ে এসে থামল বিরাট এক বাড়ির সামনে। স্প্যানিশ ধাঁচের বাড়ি, সাদা দেয়াল, লাল টালির ছাত। মস্ত বড় জানালাগুলোতে মোটা লোহার শিক, দোতলার কয়েকটা দরজার সামনে ঝোলা বারান্দা। দেয়ালের সাদা রঙ মলিন, জায়গায় জায়গায় ছাতলা পড়া, চিড়ও ধরেছে কোথাও কোথাও, অযত্ন আর অবহেলার ছাপ।

পথ দেখিয়ে তিন গোয়েন্দাকে বাড়ির পেছনে আরেকটা বাড়িতে নিয়ে এল টনি, ইটের দেয়াল, গোলাঘর। ভেতরে পুরানো জিনিসপত্র ঠাসা। ভাঙা আসবাবপত্র, গৃহস্থালীর সরঞ্জাম, পুরানো আমলের এমন অনেক জিনিস আছে, যেগুলোর নামও জানে না তিন গোয়েন্দা। ধুলোয় মাখামাখি। দেখে মনে হয়, গত পঞ্চাশ বছরে ওগুলোতে হাত দেয়নি কেউ।

দাদী তত সন্ন্যাসী, বলল টনি। এখানে কি আছে না আছে জানেই না হয়তো।

পুরানো মাল ভালই চেনে কিশোর, কোনটা বিক্রি হবে না হবে, তার চাচার চেয়ে ভাল বোঝে। বলল, আরিবা, এত পুরানো। এই যে, একটা চরকা। ওটা কি? ও, জাহাজের টেবিল, লেখার ডেস্ক।

পুরো এক ঘণ্টা জিনিসপত্র দেখল সে, তাকে সাহায্য করল রবিন আর মুসা। এতই মগ্ন, চাম্যাশ অ্যামিউলেটের কথা ভুলে গেছে, মনেই পড়ছে না কারও মাত্র আগের রাতে ভূত দেখা গেছে এ-বাড়ির কাছে।

টনির দিকে ফিরল অবশেষে কিশোর, হুঁ, দেখলাম। ভালই।

ঘরে, এসে বসো তাহলে, আমন্ত্রণ জানাল টনি। কিছু খাও। দাদীর সঙ্গেও কথা বলা যাবে। তার সঙ্গেই দামদর করো।

এটাই চাইছে তিন গোয়েন্দা, মিস ভেরা পেদ্রোর সঙ্গে কথা বলতে।

খুব ভাল হয় তাহলে, সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেল কিশোর। বোরিস, মালগুলোর লিস্ট করে নিন।

হো-কে (ওকে), সায় জানাল বোরিস।

ঠিক আছে, আপনি থাকুন, টনি বলল। বীয়ার পাঠিয়ে দিচ্ছি।

হো-কে। ভেরি গুড।

বিরাট বাড়ির বিশাল ড্রইংরুমে ছেলেদের নিয়ে এল টনি। ঠাণ্ডা ঘর। পুরানো আমলের আসবাবপত্র, গাঢ় রঙ। চাকরানীকে ডেকে লেমোনেড আর বিস্কুট আনার জন্যে বলল সে।

খাবারের ট্রে নিয়ে এল চাকরানী, তার পেছনে এলেন এক বৃদ্ধা। ক্ষীণ-দেহী, ধবধবে সাদা চুল। বয়েসের ভারে ঘোলাটে চোখের তারা, উজ্জ্বল হলো ছেলেদের দেখে।

আমি ভেরা প্রেদ্রো, পরিচয় দিলেন মহিলা। বুঝতে পারছি, টনির সঙ্গে তোমাদের বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। শুনলাম, স্যালভিজ ইয়ার্ড থেকে এসেছ। মাল পছন্দ হয়েছে?

হ্যাঁ, ম্যাডাম, মাথা নোয়াল কিশোর।

সব কিছু ছেড়েই দিয়েছিলাম, বললেন মহিলা। টনি এসে নতুন জীবন দিয়েছে আমাকে। বাঁচার আগ্রহ জাগিয়েছে।

টেবিলে লেমোনেড আর বিস্কুট সাজিয়ে রেখে চলে গেল কাজের মেয়েটা।

ছেলেদের হাতে হাতে খাবার তুলে দিলেন মিস ভেরা, মেহমানদের ভাল লাগছে তার, বোঝা যাচ্ছে। গতরাতে বুঝিয়েছে আমাকে টনি। খামোকা পুরানো মাল ভাঁড়ারে ফেলে রেখে লাভ কি? নষ্ট হচ্ছে। তার চেয়ে বেচে দিলে কিছু পয়সা আসবে।

সতর্ক হয়ে গেল তিন গোয়েন্দা। গত রাতে? বলল কিশোর।

হ্যাঁ, মাথা ঝাকালেন মহিলা। আমাদের নাকের সামনে দিয়ে চুরি হয়ে গেল একটা সোনার পুতুল। দুটো পুতুলের একটা। আমার পাগলা ভাইটার জিনিস, সেই যে বাড়ি থেকে পালাল, আর ফিরল না। ওগুলোই ছিল তার স্মৃতি, তা-ও একটা গেল চুরি হয়ে।

সব দোষ, ভাই, আমার, ছেলেদের শোনাল টনি, কি করে চুরি হয়েছে। বাবা জানত পুতুল দুটোর কথা, আমাকে বলেছে। লাইব্রেরিতে ড্রয়ারে খুঁজে পেয়েছি ওগুলো, নিচের দিকের একটা ড্রয়ারে। লাইব্রেরিতে দরজা খোলা রেখে বেরিয়েছিলাম, আবার ফিরে গিয়ে দেখি একটা পুতুল নেই।

কে নিয়েছে জানো না নিশ্চয়? ঘুরিয়ে প্রশ্ন করল কিশোর।

মিস্টার ডাংম্যান তো বলল একটা ছেলে নিয়েছে। দেখেছে নাকি।

হ্যাঁ, দেখেছি, শোনা গেল ভারি কণ্ঠ।

ফিরে চাইল ছেলেরা।

দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা, চমত্তার স্বাস্থ্য, গায়ে উজ্জ্বল জ্যাকেট, পরনে হাফপ্যান্ট, লম্বা পায়ের শক্ত মাংসপেশী ফুলে রয়েছে। ধূসর চোখজোড়া চঞ্চল। লালচে চুল। রুক্ষ চেহারা, ঠোঁটের এক কোণে গভীর কাটা একটা দাগ, সারাক্ষণ বিকৃত হাসি ফুটিয়ে রেখেছে যেন বেচারার মুখে।

পরিচয় করিয়ে দিল টনি। জানাল, মিস্টার ডাংম্যান তার দাদীর বন্ধু।

ডাকাতির কথা তো শুনলে, ডাংম্যান বলল, বিস্তৃত হলো বিকৃত হাসি। কথার টান টনির টানের সঙ্গে ঠিক মেলে না। বোধহয় খাস লণ্ডন শহরের মানুষ। ছেলেদের কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বলে গেল, একটা ছেলেকে দেখলাম বাড়ির কাছ থেকে ছুটে পালাচ্ছে। তাড়া করলাম। গেটের কাছে গিয়ে হারিয়ে ফেললাম তাকে, আর খুঁজে পেলাম না। ছেলেটার সঙ্গে আরও এক-আধজন ছিল হয়তো। যা-ই হোক, গেল পুতুলটা, আর পাওয়া যাবে না।

আমরা চেষ্টা করে দেখতে পারি, কিশোর বলল। চোরাই মাল খুঁজে বের করার অভিজ্ঞতা আছে আমাদের।

অনেক জটিল রহস্যের সমাধান করেছি, মুসা জানাল।

হেসে উঠল ডাংম্যান। ডিটেকটিভ মনে হচ্ছে?

হ্যাঁ, স্যার, ডিটেকটিভই, বলে পকেট থেকে কার্ড বের করে দিল কিশোর।

পড়ল ডাংম্যান। আবার হাসল। যাক, আশা হচ্ছে। পাওয়া যেতে পারে পুতুল। মুসার দিকে ফিরল। তুমি যেন কি বললে? রহস্যের সমাধান?

অনেক করেছি। বিশ্বাস না হলে পুলিশ চীফ ইয়ান ফ্লেচারকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন।

তাই? আবার কার্ডটার দিকে তাকাল ডাংম্যান।

ঘরের কোণে চেয়ারে বসে আছে টনি, জিজ্ঞেস করল, আশ্চর্যবোধকগুলো কেন? তোমরা অদ্ভুত ছেলে, সেটা বোঝানোর জন্যে?

কড়া জবাব দিতে যাচ্ছিল মুসা, সেটা বুঝে তাড়াতাড়ি বলল কিশোর, ওগুলো আমাদের প্রতীকচিহ্ন। তাছাড়া নানা রকম আজব রহস্য যে সমাধান করি, সেটাও বোঝায় চিহ্নগুলো।

দারুণ, প্রশংসা না ব্যঙ্গ করল টনি, বোঝা গেল না। দাদী, ওদেরকে দাও না একটা সুযোগ?

কিন্তু টনি, দ্বিধা করছেন মহিলা, কোন বিপদে পড়ে যদি ওরা?

হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন, সুর মেলাল ডাংম্যান। বিপদে পড়তে পারে।

সতর্ক থাকব আমরা, ম্যাডাম, বলল কিশোর। তেমন বুঝলে মিস্টার ফ্লেচারকে গিয়ে ধরব সাহায্যের জন্যে। চোর কোন ছেলেছোকরা হয়ে থাকলে, আমাদের জন্যেই কাজটা উপযুক্ত হবে।

ঠিকই বলেছে ও দাদী, টনি বলল। তাছাড়া পুলিশ চীফের সঙ্গে খাতির আছে ওদের…

ঠিক আছে, নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না মিস পেদ্রো। তবে একটা কথা ঠিক, এত ছোটখাট ব্যাপার নিয়ে গিয়ে পুলিশের কাছে পাত্তা পাব না আমরা।

হ্যাঁ, সায় দিয়ে বলল ডাংম্যান, পুলিশের অনেক জরুরী কাজ আছে। তারচে ওরাই খুঁজুক, তেমন বুঝলে গিয়ে পুলিশের কাছে বলবে। তবে সাবধানে থাকবে, কথা দিয়ে যেতে হবে।

তা থাকবে, বলে উঠল টনি। জানের মায়া কার না আছে? দাদী, একটা পুরস্কার ঘোষণা করলে কেমন হয়? বিপদ যেমন, তেমন খাটুনিও আছে কাজটায়?

নাতির দিকে চেয়ে হাসলেন মিস পেদ্রো। হ্যাঁ, তা মন্দ হয় না। ধরো, এই একশো ডলার?

কি বলো রাজি? গোয়েন্দাদের দিকে চেয়ে বলল টনি। এক কাজ করো, কাল লাঞ্চের সময় এখানে চলে এসো। কি ভাবে কি করা যায়, চারজনে বসে প্ল্যান করব?

লাঞ্চের সময় এসে কি করবে? তাড়াতাড়ি বলল ডাংম্যান। আমাদের খাবার কি পছন্দ হবে? আমি আর মিস পেদ্রো তত খাই নিরামিষ। তিন কিশোরের দিকে ফিরল। তোমরা হয়তো জানো না, ভেজিট্যারিয়ান লীগের প্রেসিডেন্ট আমি। রকি বীচে লীগটা আমিই শুরু করেছি, অনেক সাহায্য করছেন মিস পেদ্রো। একটা অনুষ্ঠানে তোমরা হাজির থাকতে পারো, লেকচার শুনবে। উপকার হবে। আজ বিকেলেই একটা আছে।

পারলে খুব খুশি হতাম, স্যার, বিনীত কণ্ঠে বলল, কিশোর। কিন্তু আজ অনেক কাজ। এই তো, মালপত্রগুলো নিয়ে যেতে হবে। দেরি করলে চাচী চিন্তা করবে। ম্যাডাম, জিনিসগুলোর দাম…

ও যা হোক কিছু একটা ধরে দিও তোমরা, দরাদরি করতে মহিলা নারাজ। জানাই তো আছে তোমাদের, কেমন মাল, কত দাম হতে পারে। আমাকে আর

এসবে টেনে না।

ঠিক আছে, যাই তাহলে, উঠল কিশোর। বোরিসকে গিয়ে সাহায্য করি। দুই সহকারীকে বলল, এসো।

মূর্তিটার কথা ভুলো না কিন্তু, বলল টনি।

হ্যাঁ, আর পুরস্কারের কথাটাও, হাসল ডাংম্যান।

বেরিয়ে এল তিন গোয়েন্দা।

গোলাঘরে মাল গোছাচ্ছে বোরিস।

ভেতরে ঢুকে দ্রুত চারপাশে একবার চেয়ে নিল কিশোর, বোরিস ছাড়া আর কেউ নেই। নিচু গলায় দুই বন্ধুকে বলল সে, ব্যাপারটা খেয়াল করেছ?

কী? অবাক হয়ে বলল মুসা।

আশ্চর্যবোধকের কথা জিজ্ঞেস করল টনি।

এতে অবাক হওয়ার কি আছে? অনেকেই তো করে।

অনেকের করা আর টনির করাটা আলাদা। আমাদের কার্ড দিইনি তাকে।

তাই তো! চোখ মিটমিট করল রবিন। কার্ডটা তো ছিল ডাংম্যানের হাতে।

তারমানে আগে থেকেই আমাদের কথা সব জানে টনি? ভুরু কুঁচকে গেছে মুসার।

মাথা ঝাঁকাল কিশোর। জানে। তারমানে, বেশ কিছু মিথ্যে বলেছে আমাদের কাছে। পুরানো মাল বিক্রি তার একটা বাহানা। সেজন্যে আমাদের খোঁজ করবে কেন? সোজা গিয়ে মেরিচাচীর কাছে বললেই চলত।

চুপ করে আছে অন্য দুজন।

হঠাৎ হাসি ফুটল কিশোরের মুখে।

হাসছ যে? জিজ্ঞেস করল মুসা।

লোকে যে কত রকমের নাম রাখে। ডাংম্যান! হাহ্হা! জানো, বাংলা করলে কি দাঁড়ায়?

কি?

গোবরমানব, অর্থটা ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিল কিশোর। দুই সহকারীগোয়েন্দাও হেসে ফেলল।


আমাদের কার্ড তাহলে কোথায় দেখল সে? মুসার প্রশ্ন।

দেখেনি, রবিন বলল। নিশ্চয় শুঁটকি বলেছে।

মনে হয় না, জোর দিয়ে বলল কিশোর। শুঁটকির কাছে যাওয়ার আগেই আমাদের কথা জেনেছে সে, আমি শিওর। আর শুঁটকি আমাদের সুনাম কিছুতেই করবে না, হিসুংক নাম্বার ওয়ান। তাছাড়া ওর কাছে শুনে থাকলে সেকথা বলত টনি।

কিন্তু বলেনি, বুঝতে শুরু করেছে রবিন। আমরা তিন গোয়েন্দা, জেনেও চুপ থেকেছে। আমরা বলার আগে মুখেও আনেনি। তারমানে, মুসা বলল, বলতে চাইছ, আগেই জেনেছে। অথচ জানে যে সেটা জানাতে চায়নি?

কিন্তু কেন? প্রশ্ন করল রবিন। আমাদের কার্ড দেখেও না বলার কি কারণ থাকতে পারে?

একটাই কারণ, ভেবেচিন্তে বলল কিশোর। এমন কোন উপায়ে জেনেছে, যেটা আমাদের বলা উচিত মনে করছে না। আচ্ছা, তোমাদের কার্ডগুলো গুণে দেখো তো? কার পকেটে কটা রেখেছিল?

সঙ্গে কয়েকটা করে কার্ড রাখে তিনজনেই। বের করে গুণে দেখল মুসা আর রবিন।

আমার একটা কম, বলল মুসা। কালও দেখেছি, পাচটা ছিল।

কাল কখন?

সকালে।

রাতে ফেলেছ তাহলে। পেদ্রোজ এস্টেটের গেটের কাছে। পকেট থেকে রুমাল বের করেছিলে পুতুল জড়ানোর জন্যে, তখনই টান লেগে পড়েছে, বলল রবিন।

এবং টনি সেটা পেয়েছে, কিশোর যোগ করল। হয়তো রাতেই গেটের কাছে এসেছিল সে। যেহেতু বলছে না…।

খাইছে। বাধা দিল মুসা। সে-ই পুতুল চুরি করেছিল ভারছ?

অসম্ভব কি?

কিন্তু, কিশোর, রবিন বলল, সে-ই যদি চুরি করবে, আমাদের সাহায্য চাইতে এল কেন? চাপাচাপি করে সে-ই তো তার দাদীকে রাজি করাল, আমাদের সাহায্য নেয়ার জন্যে।

চাপাচাপি খুব বেশি করেছে, বলল কিশোর, সেটাই সন্দেহজনক। ওর হয়তো ধারণা, পুতুলটা আমাদের কাছে আছে। ফেরত চায়। পুরস্কারের লোভ দেখিয়েছে সে-জন্যেই।

তাতে তার কি লাভ? পুতুল পেলে তো আমরা নিয়ে দেব মিস পেদ্রোর কাছে। আমাদের কাছে সরাসরি চাইলেই পারত। পারত না?

নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটল দু-বার কিশোর। এই প্রশ্নটাই খোঁচাচ্ছে আমাকে। দুটো ব্যাপার শিওর। এক, পুতুলটা ফেরত চায় টনি। দুই, দরকার হলে, ওটার যা বাজারদর, তার চেয়ে বেশি দিতে রাজি।

কিন্তু হারিয়ে বসে আছি আমরা, গুঙিয়ে উঠল মুসা ফেরত পাওয়ারও কোন আশা নেই।

হয়তো আছে, সহজে নিরাশ হওয়ার ছেলে নয় কিশোর। চুরি হওয়ার পর থেকেই ভাবছি, কি করে আবার ফেরত আনব। লোকটার যা চেহারা আর পোশাক-আশাক, রকি বীচে বেশিক্ষণ লুকিয়ে থাকতে পারবে না। ভূত-থেকেভূতের সাহায্য নেব আমরা।

ঠিক, তুড়ি বাজাল মুসা।

হ্যাঁ, কটা ছেলেমেয়ের চোখ ফাঁকি দেবে? রবিন বলল।

তাড়াতাড়ি করা দরকার, বলল কিশোর। এসো, মালগুলো গুছিয়ে নিই। বোরিস একা পারছে না।

এক ঘণ্টার মধ্যেই পছন্দসই জিনিসগুলো আলাদা করা হয়ে গেল, প্রতিটির লিস্ট করে নিয়েছে কিশোর। ফিরে চলল ইয়ার্ডে।

লিস্ট দেখে খুব খুশি হলেন মেরিচাচী। কোনটার দাম কত হতে পারে, তাই নিয়ে মাথা ঘামাতে শুরু করলেন। এখানে আর কিছু করার নেই। হেডকোয়ার্টারে চলল তিন গোয়েন্দা।

পুতুল ছিনতাইকারী আর তার সঙ্গীর চেহারার বর্ণনা নিখুঁতভাবে লিখে নিল কিশোর। তারপর এক এক করে ফোন শুরু করল তার পাঁচজন বন্ধুকে। লোকগুলো আর ঝরঝরে গাড়িটার কোন খবর পেলে জানাতে অনুরোধ করে রিসিভার তুলে দিল মুসার হাতে। সে ফোন করল তার পাঁচ বন্ধুকে। তারপর রবিন করল তার পাঁচ বন্ধুকে। ওই পনেরো জন আবার তাদের পাঁচ বন্ধুকে জানাবে, তারা জানাবে তাদের পাচজন করে বন্ধুকে। দেখতে দেখতে সারা রকি বীচের কিশোর মহলে ছড়িয়ে পড়বে খবরটা।

এবার, হেসে বলল কিশোর, শুধু অপেক্ষার পালা।

কিন্তু ছ-টা পর্যন্ত করার পরও কোন খবর এল না। নির্বাক একে অন্যের দিকে তাকাল তিন গোয়েন্দা। ব্যাপারটা কি? রকি বীচের কোন ছেলেমেয়ে দেখেনি নাকি? বাতাসে মিলিয়ে গেল ওরা?

লুকিয়ে পড়েছে, রবিন বলল।

রকি বীচে আছে কিনা, কে জানে, বলল মুসা।

আমি শিওর, আছে, আশা ছাড়তে পারছে না কিশোর। খোঁজ পেতে সময় লাগবে, এই আরকি। খবর পাবই। এখন…।

এখন আমরা বাড়ি যাব, ঘড়ির দিকে চেয়ে বলল মুসা। খিদে লেগেছে।

অসহিষ্ণু ভঙ্গিতে মুখ বকাল কিশোর। মুসার এই খাওয়ার ব্যাপারটায় মাঝে মাঝে বিরক্ত হয় সে। যত জরুরী কাজই থাকুক, তার কাছে খিদেটাই আসল।

ঠিক আছে, বলল কিশোর, যাও। রবিন, ডিনার সেরে লাইব্রেরিতে যাবে একবার। লোকাল হিস্টরির ওপর অনেক বই আছে, সেদিন দেখলাম। ওগুলো ঘাঁটলেই পেয়ে যাবে। আর হ্যাঁ, মিস ভেরা পেদ্রোর ভাইয়ের কথাও কিছু লেখা আছে কিনা, দেখো তো।

আমার কি কাজ? জানতে চাইল মুসা।

তুমি? সোজা এখানে চলে আসবে। আমরা দুজন যাব পেদ্রোজ এস্টেটে। রহস্যময় কিছু ঘটছে ওখানে। কি, সেটা জানা দরকার।

কি জানার আছে? বুঝতে পারছে না মুসা।

হয়তো অনেক কিছুই। প্রথমেই ধরো, সেই ছায়ামূর্তির কথা, অদ্ভুত ছায়া আর হাসি। ওটাকে দেখতে চাই একবার। নিজের চোখে।

আবার! চমকে উঠল মুসা।

খাওয়ার পর সোজা এখানে আসবে, আবার বলল কিশোর। কালো শার্টপ্যান্ট পরে আসবে।

পশ্চিমের উঁচু পাহাড়গুলোর ওপাশে অস্ত যাচ্ছে টকটকে লাল সূর্য। এস্টেটের লোহার গেটের সামনে পৌঁছল কিশোর আর মুসা। ঝোপের ভেতর সাইকেল লুকিয়ে রেখে ক্যারিয়ার থেকে ছোট, পেটফোলা ব্যাগটা খুলে নিল কিশোর। খুব উঁচু দেয়াল, ফিসফিসিয়ে বলল সে, তাই তৈরি হয়ে এসেছি।

ব্যাগ খুলে ঘোট দুটো ওয়াকি-টকি বের করল কিশোর। চার কাঁটাওয়ালা মাঝারি সাইজের একটা হুক আর মোটা দড়ির বাণ্ডিলও বের করে নিল। যদি আমরা কোন কারণে আলাদা হয়ে যাই, সে-জন্যে, ওয়াকিটকি দেখিয়ে বলল সে। হুক আর দড়ি দেয়াল টপকানোর জন্যে।

হুকের ছিদ্র দিয়ে দড়ির এক মাথা ঢুকিয়ে শক্ত করে বাঁধল কিশোর, ছুঁড়ে দিল ওপর দিকে। দেয়ালের ওপরে আটকে গেল হুকের একটা কাটা। দুজনে মিলে দড়ি ধরে টেনে দেখল, খুলে আসছে না।

দড়ি বেয়ে আগে উঠে গেল মুসা। উঁকি দিয়ে দেখল ওপাশে। উঠে বসে ফিরে চেয়ে কিশোরকে ওঠার ইঙ্গিত করল।

উঠে এল কিশোর।

দেয়াল থেকে হুকটা খুলে নিয়ে দড়ি গুটিয়ে আবার ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখল কিশোর। দুজনে লাফিয়ে নামল এস্টেটের সীমানার ভেতরে। ব্যাগটা একটা ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে রাখল।

বাড়িটাতে ঢুকব, বলল কিশোর। খুব সাবধান।

ম্লান হয়ে আসছে সাঁঝের আলো। গাছপালা আর ঝোপঝাড়ের আড়ালে। আড়ালে সাবধানে এগোল ওরা। ছোট একটা টিলায় উঠে থামল, এখান থেকে মূল বাড়ি আর গোলাঘরটা স্পষ্ট দেখা যায়। চোখ রাখা যাবে।

দিনের আলো শেষ, হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসছে যেন অন্ধকার। আলো জ্বলে উঠেছে বাড়িটার ঘরে ঘরে। জানালার শার্সিতে মানুষের ছায়া, কিন্তু কেউ বেরোল না, ঘরের ভেতরেই হাঁটাচলা করছে। চারদিক শান্ত। দূরে রাস্তার দিক থেকে কদাচিত ভেসে আসছে গাড়ির এঞ্জিনের শব্দ।

এক জায়গায় একই ভঙ্গিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে থেকে শরীর ব্যথা হয়ে যাচ্ছে, জমে যাচ্ছে যেন মাংসপেশী। মুসার একটা পা প্রায় অবশ, মৃদু ডলাডলি করে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করে নিল।

কিশোর নড়ল না, পড়ে আছে তো আছেই। স্থির, পাথরের মূর্তি যেন।

সময় যাচ্ছে।

এক সময় বাড়ির নিচতলার আলো নিভে গেল। চাঁদ নেই আকাশে। আরও ঘন হলো অন্ধকার।

হঠাৎ, মুসার বাহুতে হাত রাখল কিশোর।

কি? ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল অবাক মুসা।

ওই যে!

লম্বা, আবছা একটা মূর্তি এগিয়ে যাচ্ছে বাড়িটার দিকে। দাঁড়িয়ে পড়ল, কান পেতে কিছু শোনার চেষ্টা করছে বোধহয়, তারপর আবার চলতে শুরু করল। গোলাঘরের পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে পুবের বনের দিকে।

ও বনে ঢুকলেই আমরা… কথা আর শেষ করতে পারল না কিশোর।

তীক্ষ্ণ, তীব্র, বুনো হাসি ছড়িয়ে পড়ল দিকে দিকে, খান খান করে দিল যেন আঁধার রাতের স্তব্ধ নীরবতা।


চিড়িয়াখানায় অন্ধকারে হায়েনার হাসি শুনেছে কিশোর, হাসিটা অনেকটা সেরকম লাগল তার কাছে।

ওটাই! গলা কেঁপে উঠল মুসার। ভূতের ছায়া। আজ অন্যরকম লাগছে!

মানে?

সেদিনের মত কুঁজো নয়। তবে হাসিটা একরকম।

জলদি করা দরকার। নইলে হারিয়ে ফেলব। চলো।

উঠে, টিলার উল্টো ধার দিয়ে দ্রুত নেমে এল ওরা। বনের দিকে ছুটল। যে পথ ধরে ছায়াটা গেছে, সে-পথ ধরে। যতখানি কাছে থেকে স্তব অনুসরণ করতে চায়।

ফিরে তাকাল না ছায়াটা, লম্বা লম্বা পা ফেলে একভাবে এগিয়ে চলেছে। থেমে গেছে বুনো হাসি।

মাইলখানেক পর ঘন হতে শুরু করল বন। এগিয়েই চলেছে ছায়া। আরও খানিকদ্দূর এগিয়ে মোড় নিল, মূল পথ থেকে সরে গেল একটা গলিপথে।

সরু এই পথটা গিয়ে পড়েছে বাটি-আকৃতির ছোট একটা উপত্যকায়। খোয়া বিছানো কাঁচা পথ চলে গেছে উপত্যকার বুক চিরে, পথের শেষ মাথায় ছোট, পুরানো একটা কাঠের বাড়ি। চারপাশে ঘেরা বারান্দা, খড়খড়ি লাগানো জানালা, পাথরে তৈরি চিমনি।

শিকারীর বাংলো গোছের কিছু, বলল কিশোর। হান্টিং লজ।

দেখো!

আড়াল থেকে বেরিয়ে কালো মস্ত আরেকটা ছায়া এগিয়ে আসছে বাড়ির দিকে। আরও কাছে আসার পর কানে এল এঞ্জিনের শব্দ। ট্রাক, হেডলাইট নিভানো। যেন উড়ে এসে ট্রাকটা থামল ছায়ামূর্তির কাছে, কেবিন থেকে লাফিয়ে নামল বেঁটে, ভারি একটা লোক। দ্রুত, চাপা গলায় কথা হলো কিছু, তারপর ঘুরে ট্রাকের পেছনে গিয়ে টেইল-বোর্ড নামাল লোকটা।

পেছন থেকে নামল চারটে বেঁটে মূর্তি।

ওদেরকে এক সারিতে দাঁড় করাল লোকটা। আগে আগে বাড়িটার দিকে চলল, সে, পেছনে অন্যেরা।

লম্বা ছায়াটা আগেই গিয়ে উঠেছে বারান্দায়। আলো জ্বেলে দিল।

খাইছে! আঁতকে উঠল মুসা। কি ওগুলো?

খুবই বেঁটে চারটে মূর্তি, মাথা নেই।

মাথা! মাথা গেল কই! গলা কাঁপছে মুসার।

আ-আমি জানি না! কিশোর পাশাও কথা হারিয়ে ফেলেছে। ও-ওরা, মনে তো হচ্ছে, মুশূন্য বামন…

অন্ধকারে একে অন্যের মুখের দিকে তাকানোর চেষ্টা করল দুই কিশোর।

হচ্ছে কি এখানে? মুসার জিজ্ঞাস।

জানি না, গলা শুকিয়ে গেছে গোয়েন্দাপ্রধানের। কাছে গেলে বোঝা যাবে। চলো, জানালা দিয়ে উঁকি দিই।

ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করল দুজনে।

হঠাৎ আবার বিস্ফোরিত হলো যেন ভয়াল হাসি, ঠিক তাদের পাশে।

কোনরকম ভাবনা-চিন্তার অবকাশ নেই আর। পাঁই করে ঘুরে দিল দৌড় দুজনে, যে পথে এসেছে, সে-পথে। পেছন ফিরে তাকানোর সাহস হারিয়েছে।

উত্তেজিত হয়ে লাইব্রেরি থেকে বেরোল রবিন। জবর খবর জেনেছে।

দ্রুত হেডকোয়ার্টারে এসে ঢুকল সে। কিন্তু মুসা আর কিশোর ফেরেনি। এলেই যেন বাড়িতে ফোন করে, ওদের জন্যে মেসেজ রেখে বেরিয়ে এল রবিন। বাড়ি চলল।

টেলিভিশনে স্থানীয় সংবাদ শুনছেন মিস্টার মিলফোর্ড। লস অ্যাঞ্জেলেসের একটা বিশিষ্ট পত্রিকায় সাংবাদিকতার কাজ করেন তিনি, কাজেই রেডিওটেলিভিশনের যে কোন খবর শোনা পারতপক্ষে বাদ দেন না। বাড়িতে থাকলে তো নয়ই।

রান্নাঘরে মাকে খুঁজে পেল রবিন।

এক গ্লাস দুধ আর কয়েকটা বিস্কুট এগিয়ে দিলেন মিসেস মিলফোর্ড। লাইব্রেরি থেকে এলি?

হ্যাঁ, বলল রবিন। মা, কিশোর কোন মেসেজ দিয়েছে?

না-তো।

অ। রান্নাঘরের টেবিলে বসে খেতে শুরু করল রবিন।

এই সময় বাবা ঢুকলেন সেখানে। কি যে হচ্ছে আজকাল, অনিশ্চিত কণ্ঠস্বর, কাউকে উদ্দেশ্য করে বলেননি। রকি বীচেই আজ একটা লোককে মারার চেষ্টা হয়েছিল। পাবলিক হলে, লোকজনের সামনে।

রকি বীচে? আঁতকে উঠলেন মিসেস মিলফোর্ড। সাংঘাতিক কাণ্ড ! কে? কাকে?

আর বলো না, কোন চরমপন্থী হবে। যাকে আক্রমণ করা হয়েছিল, সে এক নিরামিষভোজী সঙ্রে প্রেসিডেন্ট, আরেক পাগল। ভক্তদের সামনে বক্তৃতা দিচ্ছিল, এই সময় সাদা, বিচিত্র পোশাক পরা দুই নোক মঞ্চে উঠে আক্রমণ করে বসল। দুজনেরই বাদামী চামড়া।

গলায় দুধ প্রায় আটকে গেল রবিনের। একটু কেশে পরিষ্কার করে নিয়ে বলল, বাদামী চামড়া?

তাই তো বলল।

প্রেসিডেন্ট ব্যথা পেয়েছে? জিজ্ঞেস করলেন মিসেস মিলফোর্ড।

না। লোক দুটোকে ধরা যায়নি। পালিয়েছে।

নাম কি ওর, বাবা? জিজ্ঞেস করল রবিন।

কার নাম?

ওই যে, নিরামিষভোজী প্রেসিডেন্ট।

ডাংম্যান। কি ডাংম্যান যেন।

কোন সন্দেহ থাকল না আর রবিনের, পুতুল ছিনতাইকারীরাই আক্রমণ করেছে। নিরামিষভোজীদের প্রেসিডেন্টকে। দুই ঢোকে বাকি দুধটুকু শেষ করে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল সে। টেলিফোন করবে। একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গেছে, বাদামী। লোকগুলো যে-ই হোক, সাংঘাতিক কোন উদ্দেশ্য রয়েছে তাদের।

রিঙ হয়েই চলেছে হেডকোয়ার্টারে। কিন্তু ধরছে না কেউ। তারমানে ফেরেনি এখনও মুসা আর কিশোর।

হুমড়ি খেয়ে ঝোপের ভেতর পড়ে রয়েছে দুই গোয়েন্দা। হাঁপাচ্ছে জোরে জোরে। কাটা, ভাঙা শুকনো ডালের মাথার খোঁচা আর আঁচড় লেগে ছিলে গেছে গায়ের চামড়া। পাথরে হোঁচট খেয়ে পড়েছে কয়েকবার, দুই হাঁটুর চামড়াও ক্ষতবিক্ষত। তবে অনেক পেছনে ফেলে এসেছে রহস্যময় কাঠের বাংলো।

পাগলা-ভূতটা তাদের সঙ্গে সঙ্গে এসেছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না।

সাবধানে মাথা তুলে পেছনে তাকাল মুসা। কিশোর, কিছু দেখতে পাচ্ছ? .

না। এখানে আমরা নিরাপদ।

আমার তা মনে হচ্ছে না। কি ওগুলো? মুশূন্য বামনগুলো?

সহজ কোন ব্যাখ্যা নিশ্চয় আছে, অস্বস্তিবোধ পুরাপুরি যাচ্ছে না কিশোরের। ভাল মত দেখারই তো সুযোগ পেলাম না। ফিরে গিয়ে আবার যদি…

পারলে তুমি যাও, হাত নাড়ল মুসা। আমি নেই। একে তো পাগলা হাসি, তার ওপর ওই মাথাছাড়া… কেঁপে উঠল সে। আল্লাহগো, বাঁচাও !

জোরে নিঃশ্বাস ফেলল কিশোর। হাসিটা অবশ্য বিকটই, ভয় লাগে।

খালি ভয়? চলো পালাই। আবার এসে পড়লে, ভয়ে ভয়ে পেছনে তাকাল। মুসা।

নীরব হলো কিশোর। গভীর ভাবনায় ডুবে গেছে।

উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছে গোয়েন্দা-সহকারী।

অবশেষে বলল কিশোর, আমার মনে হয়, সব কিছুর মধ্যেই যুক্তি রয়েছে, মুসা। বাদামী চামড়ার সেই মূর্তিচোর লোকটা, এই ভূতের হাসি, মুশূন্য বামন…

কি যুক্তি?

সেটাই জানতে হবে। তবে এখন আমাদের বাড়ি যাওয়াই ভাল।

হ্যাঁ, এইটা হলোগে কাজের কথা।

অন্ধকারে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল মুসা। এই একটা কাজে সে বিশেষ পারদর্শী। একবার কোন পথে গেলে সেটা সহজে ভোলে না, কি করে যেন ঠিক চিনে নেয়। কিশোরের খুব অবাক লাগে মাঝে মাঝে।

চলছে ঠিক পথেই, তবে গতি ধীর।

যেখানে দিয়ে ঢুকেছিল দেয়ালের সেই জায়গাটার কাছে এসে থামল দুজনে।

ঝোপের ভেতর থেকে ব্যাগটা বের করল মুসা।

হুক ছুড়ে মারল কিশোর। একবার, দু-বার, তিনবার, আটকাতে পারছে না, অথচ তখন একবারই কাজ হয়ে গিয়েছিল। তবে তখন আলো ছিল।

দেখি, আমার কাছে দাও, হাত বাড়াল মুসা। প্রথমবারে সে-ও পারল না, কাজ হলো দ্বিতীয়বারে। টেনেটুনে দেখল দড়িটা না, খুলে আসবে না। উঠতে গিয়েই স্থির হয়ে গেল। নীরবতার মাঝে রাইফেলের বোল্ট টানার ক্লিক শব্দটা বড় বেশি করে কানে বেজেছে।

এই সরে এসো! কঠিন আদেশ শোনা গেল।

পথের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে লম্বা একটা মূর্তি, হাতের রাইফেল এদিকে ফেরানো।

কিছু করার নেই। দেয়ালের কাছ থেকে সরে এল দুই কিশোর, পথে উঠল। মূর্তিটার কাছে এসে বলে উঠল কিশোর, টনি, আমি কিশোর, ও মুসা।

রাইফেল সরাল না টনি। সন্দেহ যাচ্ছে না। শীতল কণ্ঠে বলল, এখানে কি করছ?

টনি, অধৈর্য হয়ে বলল মুসা, কি করছি ভালমতই জানো। সোনার পুতুল খুঁজছি।

এই অসময়ে? ধমকের সুরে বলল টনি। অন্ধকারে চোরের মত? কই, আজ আবার আসবে বলোনি তো। সত্যি করে বললো, কেন এসেছ?

কি জ্বালা! বললাম তো পুতুল খুঁজতে, জবাব দিল কিশোর। ভাবলাম, গেটের কাছে হারিয়েছে যখন, অন্ধকারে চোরটা আবার ফিরে আসতে পারে ওখানে। কণ্ঠস্বর পাল্টে গেল। টনি, পুতুল খোঁজার অনুমতি আমাদেরকে দিয়েছেন তোমার দাদী, নাকি?

দ্বিধায় পড়ে গেল টনি। তোমাদের বিশ্বাস করব কিনা ভাবছি।

তোমাকেও তো অবিশ্বাস করতে পারি আমরা! রেগে গেল মুসা। আমরা যে তিন গোয়েন্দা, অনেক আগে থেকেই জানো তুমি। আমাদের কার্ড পেয়েছ।

থামানোর জন্যে মুসার পায়ে লাথি মেরে বসল কিশোর, কিন্তু লাভ হলো না, ধনুক ছেড়ে বেরিয়ে গেছে তীর।

কি করে জানলে?

আর মিথ্যে বলে লাভ নেই, সত্যি কথাই বলল মুসা।

না, নরম হলো টনির গলা, রাইফেল নামাল, তোমরা চালাক ছেলে। হ্যাঁ, তোমাদের কার্ড পেয়েছি, গেটের কাছে। ডাংম্যানকে সেকথা বললাম। যা করার বুঝেশুনে করতে বলল আমাকে। দাদীর উকিলকে জিজ্ঞেস করলাম তোমাদের কথা। সে আমাকে টেরিয়ার ডয়েলের কাছে পাঠাল, সেকথা আগেই বলেছি। হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ, মাল বিক্রির ছুতোয়ই তোমাদেরকে এস্টেটে নিয়ে এসেছিলাম, চাইছিলাম, পুতুল খোঁজার কাজটা দাদী তোমাকে দিক।

তুমি ভেবেছিলে আমরা চুরি করেছি, ঝাঁঝাল মুসার কণ্ঠ।

যা, স্বীকার করল টনি, কিছু মনে করো না। মিস্টার ডাংম্যানকে সে-কথাও বলেছি। সে বলল, তা না-ও হতে পারে। চোর হয়তো তাড়াহুড়োয় পুতুলটা গেটের কাছে ফেলে গেছে, তোমরা কুড়িয়ে পেয়েছ। তাই ঠিক করলাম, পুরস্কার ঘঘাষণা করে পুতুল ফেরত দেয়ার সুযোগ করে দেব তোমাদের।

ওসব ঝামেলা না করে, বলল কিশোর, খোলাখুলি বললেই ভাল করতে।

ওই যে, মিস্টার ডাংম্যান বলল, তোমরা চোর না-ও হতে পারো।

কুড়িয়ে পেয়েছি কিনা, সেটাও তো জিজ্ঞেস করতে পারতে?

সেটাও আলোচনা করেছি আমরা। মিস্টার ডাংম্যান বলল, তোমরা স্বীকার করবে না। ভয় দেখালে কোন দিনই আর দেবে না পুতুলটা।

তাই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে, আনমনে বলল কিশোর। পুরস্কার ঘোষণা করালে। এমন ভাব দেখালে, যেন জানোই না পুতুলটা আমাদের কাছে আছে।

হ্যাঁ। এখন তো সব খোলাখুলি হয়ে গেল। দিয়ে দাও না ওটা। তুমিই তো পেয়েছ?

রবিন আর মুসা পেয়েছিল।

পেয়েছিল?

হ্যাঁ। হারিয়েছি আবার। সকালে বাদামী চামড়ার এক লোক কেড়ে নিয়ে গেছে।

মাথা নাড়ল কিশোর। না, ফেরত পাওয়ার সুযোগ এখনও আছে। লোকটাকে খুঁজে বের করতে পারলেই…

শব্দ করে হাসল টনি। আমার সাহায্য নেবে? তোমাদের সঙ্গে কাজ করতে খুব ভাল লাগবে আমার।

হ্যাঁ, একটা সাহায্যই করতে পারো, বলল কিশোর। চোখ খোলা রাখো, এস্টেটে কারা আসে যায় খেয়াল রাখো।

ঠিক আছে।

এখন আমাদের বাড়ি যাওয়া দরকার। দেরি হয়ে গেছে।

গেট দিয়ে ওদের বের করে দিল টনি।

অন্ধকার গিরিপথ ধরে সাইকেল চালিয়ে চলল দুই গোয়েন্দা।

কিশোর, একসময় জিজ্ঞেস করল মুসা, আমরা যে ভূত দেখেছি, টনিকে বললে না কেন?

ওকে বিশ্বাস করতে পারছি না। আমার ধারণা, কিছু একটা গোপন করছে।


পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নামল রবিন। তাড়াহুড়ো করে কাপড় পরে নিচতলায় নামল। বাবা-মা ওঠেননি। তাদের দরজায় টোকা দিয়ে ডেকে বলল, মা, আমার নাস্তা খেয়ে নিচ্ছি।

মায়ের ঘুমজড়ানো কণ্ঠ শোনা গেল, ঠিক আছে। কোথায় যাবি?

ইয়ার্ডে।

জানালা দিয়ে রোদ ঢুকছে রান্নাঘরে। রুটি, ভাজা ঠাণ্ডা ডিম আর এক গ্লাস কমলার রস দিয়ে নাস্তা শেষ করে এসে মুসাকে ফোন করল রবিন।

মুসার মা জানালেন মুসা বেরিয়ে গেছে।

ঘর থেকে ছুটে বেরোল রবিন।

ইয়ার্ডে ঢুকেই পড়ে গেল মেরিচাচীর সামনে।

এই যে, একটাকে অন্তত পাওয়া গেল, বলে উঠলেন তিনি। অন্য দুটোকে ডাকাডাকি করলাম, জওয়াবই নেই। পালিয়েছে বোধহয় ভোররাতেই। রবিন, কিশোরকে বলো, আজ তার চাচার সঙ্গে এস্টেটে যেতে হবে।

বলব, আন্টি।

মেরিচাচী অফিসে গিয়ে ঢোকার পর পা বাড়াল রবিন, ওয়ার্কশপের দিকে। দুই সুড়ঙ্গ দিয়ে ঢুকল হেডকোয়ার্টারে।

মুসা আর কিশোর দুজনেই আছে।

মেরিচাচী কি বললেন? ভুরু নাচাল মুসা।

জানাল রবিন। গম্ভীর হয়ে থাকা কিশোরকে জিজ্ঞেস করল, ভূত-থেকে-ভূতের কি খবর?

মাথা নাড়ল শুধু কিশোর, মুহূর্তের জন্যে চোখ সরাচ্ছে না টেলিফোনের ওপর থেকে।

কাল রাতে কি জেনেছি, জানো? কথা আর পেটে রাখতে পারছে না রবিন।

আমরা কি দেখেছি, শোনো আগে, মুসার অবস্থাও রবিনের মতই। হড়হড় করে উগড়ে দিতে আরম্ভ করল সে। শুনে চোখ বড় বড় হয়ে গেল রবিনের।

নিশ্চই মাথা আছে ওদের, মুসা বামনদের কথায় আসতেই বলল কিশোর। তবে দেখা যায়নি। মরুকগে ব্যাটারা। আমি ভাবছি, ভূত-থেকে ভূতের কি অবস্থা? খবর-টবর আসে না কেন? ওই বাদামী লোকদুটোই সমস্ত রহস্যের চাবিকাঠি, কিন্তু কোথায় ওরা? হ্যাঁ, রবিন, চাম্যাশ হোর্ডের কথা কি জেনেছ কাল?

এখানকার লোকাল হিস্টরি বইতে ব্যাপারটা নিয়ে বেশ ফোলানো-ফাপানো হয়েছে, জানাল রবিন। ডাকাতের দলটা মারা পড়তেই গুপ্তধন খুঁজতে বেরিয়েছিল লোকে, দলে দলে। অনেক দিন ধরে অনেক ভাবে খুঁজেছে, পায়নি। ডাকাতেরা পুরো পর্বত জুড়ে ছড়িয়ে ছিল, একেক দিন একেক জায়গায় সরে যেত। পেদ্রোজ এস্টেটেও গিয়ে লুকিয়েছিল একবার। গুপ্তধনগুলো কোথায় আছে, আন্দাজই করতে পারেনি কেউ।

অ্যামিউলেট দুটোর খবর কি? জিজ্ঞেস করল মুসা। আর মিস ভেরা পেদ্রোর ভাইয়ের নাম?

মিস পেদ্রোর ভাইয়ের নাম ছিল ফিয়ারতো, খুনী। একটা লোককে খুন করে ফেরারী হয়েছিল। অবাকই লাগে, যে লোকটাকে খুন করেছিল, সে ছিল শিকারী, থাকত এস্টেটের হানটিং লজে। কেউ জানে না, কেন তাকে খুন করেছে ফিয়ারতো। অ্যামিউলেট দুটোর কোন কথাই লেখা নেই বইতে। একবার উল্লেখও করা হয়নি।

নিচের ঠোঁটে কামড়ে ধরল কিশোর। আচ্ছা, ম্যাগনাস ভারদি মরার আগে ঠিক কি বলেছিল, বলো তো।

চারটে বইতে তিন রকম লিখেছে, নোটবই বের করল রবিন। একটাতে লিখেছে, হোয়াট ম্যান ক্যান ফাইণ্ড দা আই অভ দা স্কাই? আরেক লেখক বলছেন, দা স্কাইজ আইজ ফাইণ্ড নো ম্যান। অন্য দুটো বইতে একরকম কথা, ইট ইজ ইন দা আইজ অভ দা স্কাই হোয়্যার নো ম্যান ক্যান ফাইও ইট। চাম্যাশ ভাষা থেকে অনুবাদ করতে গিয়েই গড়বড় করে ফেলেছে মনে হয়।

খুব বেশি গোলমাল করেনি, বলল কিশোর। আই অভ দা স্কাই কথাটা সবাই বলছে।

কিন্তু, কিশোর, মুসা বলল, আই অভ দা স্কাইয়ের মানে কি?

আকাশে কি জিনিস আছে, যা দেখতে চোখের মত? পাল্টা প্রশ্ন করল কিশোর।

অনেক সময় মেঘ ওরকম দেখায়।

আমার মনে হয় সূর্য, রবিন বলল।

মাথা নোয়াল কিশোর। আমারও তাই মনে হয়। চাঁদও হতে পারে। রূপকথার বইতে, ছবিতে চাঁদ আর সূর্যকে মানুষের মুখের মত করে আঁকে অনেকে।

তাহলে কি চাঁদে গিয়ে গুপ্তধন লুকিয়েছে নাকি? প্রশ্ন তুলল মুসা।

না, তা নয়। তবে এমন কোন জায়গা হয়তো বেছে নিয়েছে, যেখানে সব সময় চাঁদ আর সূর্যের আলো পড়ে। প্রাচীন অনেক মন্দির এমনভাবে তৈরি হয়েছে, সব সময় রোদ পড়ে ওগুলোতে।

হ্যাঁ, সায় দিল রবিন। কিছু কিছু মন্দির তো আছে, ওপরের দিক খোলা, সেখান দিয়ে রোদ কিংবা জ্যোৎস্না এসে পড়ে মঞ্চের ওপর।

তাহলে কি ওরকম কোন জায়গা খুঁজতে হবে?

কোথায় খুঁজব? হঠাৎ উজ্জল হলো কিশোরের মুখ। ম্যাগনাস ভারদি অন্য কিছুওঁ বুঝিয়ে থাকতে পারে। কোন গিরিখাত, গিরিপথ বা উপত্যকার কথাও বোঝাতে পারে, যেখান থেকে চাঁদ কিংবা সূর্যকে দেখতে চোখের মত লাগে। কি মুসা, এমন কোন জায়গা চেনো?

কোত্থেকে চিনব? আমার চোখে তো পড়েনি। আর সান্তা মনিকা তো ছোট পর্বত না, সবটাতেই নাকি ঘুরেছিল ভারদির ডাকাতের দল। কোন জায়গা থেকে চাঁদ-সুরুজকে চোখের মত লেগেছে ব্যাটাদের, ওরাই জানে,

হ্যাঁ, মুসার সঙ্গে একমত হলো রবিন। তাছাড়া ভারদি বলেছে, গুপ্তধন কেউ খুঁজে পাবে না, এমন জায়গায়ই রেখেছে।

আমার তা মনে হয় না, বলল কিশোর। নিশ্চয় ব্যাপারটাকে ধাধা বানিয়ে রেখে গেছে ভারদি। বাদামী লোকটা পুতুল দিয়ে কি করবে যদি খালি একথাটা জানতে পারতাম, অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যেত।

ও-মা, কিশোর, ভুলেই গিয়েছি! চেঁচিয়ে উঠল রবিন। মিস্টার ডাংম্যানকে আক্রমণ করেছিল ওরা।

খুলে বলল সব।

লাফিয়ে উঠল কিশোর। এক্ষুণি মিস্টার ডাংম্যানের কাছে যাওয়া দরকার। জরুরী কিছু হয়তো জানতে পারব। না দুজন নয়, একজন এসো আমার সঙ্গে। আরেকজন থাকো ফোনের কাছে। কে থাকবে?

গতরাতে মুসা গেছে, আজ আমি যাব, বলল রবিন। বেকুব হয়ে সারাক্ষণ একা এখানে বসে থাকতে পারব না।

যাও, খুশি হয়েই বলল মুসা, কাঁটায় লেগে ছড়ে যাওয়া একটা জায়গায় হাত বোলাচ্ছে। আমি আছি।

মুসা, কিশোর বলল, ওয়াকি-টকি নিয়ে যাচ্ছি। ভূত-থেকে-ভূতের কোন খবর এলে সঙ্গে সঙ্গে জানাবে।

ফোন করে ভেজিট্যারিয়ান লীগের ঠিকানা জেনে নিয়ে হেডকোয়ার্টার থেকে বেরোল কিশোর আর রবিন। সাইকেল নিয়ে একটা গোপন পথ দিয়ে ওয়ার্কশপ থেকে বেরোল, মেরিচাচীর চোখে যাতে না পড়ে সেজন্যে এই সতর্কতা।

দশ মিনিটেই বাড়িটা খুঁজে বের করে ফেলল ওরা। শহরের এক প্রান্তে লা পামা স্ট্রীটের শেষ মাথায় ব্লকের মস্ত গথিক-স্টাইলে বানানো পুরানো বাড়িটাকে হেডকোয়ার্টার করেছে ভেজিট্যারিয়ান লীগ। শুকনো বাদামী পাহাড়ের ঢাল নেমে এসে মিশেছে পথের সঙ্গে। পর পর কয়েকটা ব্লকের পেছন দিয়ে আরেকটা সরু পথ চলে গেছে, তার কিনারে সব কটা বাড়ির গ্যারেজ।

গথিক-বাড়ির গেটের কাছে সাইকেল রাখল দুই গোয়েন্দা। সদর দরজায় এসে বেল বাজাল। বেটে তাগড়া এক লোক দরজা খুলে দিল।

মিস্টার ডাংম্যান আছেন? জিজ্ঞেস করল কিশোর।

ও, তোমরা? লোকটার পেছন থেকে উঁকি দিল ডাংম্যান। এসো, এসো। ল্যাঙলী, সরো, ওদের আমি চিনি। গোয়েন্দাদের দিকে চেয়ে বলল, এত তাড়াতাড়ি আসবে ভাবিনি কিন্তু? লীগে যোগ দিতে এসেছ তো?

বেঁটে লোকটা গিয়ে কাজে লাগল আবার। আবছা আলোকিত হলঘরে অগোছাল হয়ে রয়েছে কিছু বাক্স, ওগুলোই গোছাচ্ছিল বোধহয়, ঘণ্টা শুনে দরজা খুলতে এসেছে।

বিনীত গলায় বলল কিশোর, না, স্যার, এত তাড়াতাড়ি নিরামিষ ধরার ইচ্ছে নেই। আপনার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি।

কথা? বেশ, অফিসে এসো। সব অগোছাল হয়ে আছে, দেখেশুনে পা ফেলো। তোমরা লীগে যোগ দিলে খুব খুশি হতাম, অনেক সাহায্য করতে পারতে।

বাক্স, বই, ফাইলিং কেবিনেট, গাদা গাদা বিজ্ঞাপন আর পোস্টার ছড়িয়ে রয়েছে সারা ঘরে, ওগুলোর মাঝ দিয়ে সাবধানে পা ফেলছে ওরা।

ওক কাঠের ভারি দরজা খুলে বড় অরেকটা রোদে-উজ্জল ঘরে ছেলেদের নিয়ে এল ডাংম্যান, এটাই অফিস। প্রাচীন একটা ডেস্কে বসে দুটো প্রাগৈতিহাসিক চেয়ার দেখিয়ে মেহমানদের বসতে বলল।

বলো, কি বলতে এসেছ?

শুনলাম, আপনাকে নাকি মারতে চেয়েছিল? বলল কিশোর।

আর বোলো না, পাগল। বদ্ধ উন্মাদ। দুই জন। এমন হঠাৎ করে মঞ্চে লাফিয়ে উঠল। বক্তৃতা দিচ্ছিলাম তখন। কোন মতে নিজেকে বাঁচিয়েছি। ঠেলাঠেলি, হই-চই জুড়ে দিল মেম্বাররা, পুলিশ ডাকতে গেল, অথচ দুজনকে ধরার কথা মনে এল না কারও। পালাল।

আক্রমণ করেছিল কেন, স্যার? জিজ্ঞেস করল রবিন।

জানি না।

কিছু বলেছে? কিশোর প্রশ্ন করল।

বলেছে, তবে ইংরেজি নয়। অনেক চেঁচামেচি, বকবক করেছে, কি বলেছে ওরাই জানে। একটাকে জাপটে ধরেছিলাম, কিন্তু রাখতে পারলাম না, ঝাড়া দিয়ে ছুটে গেল। পুলিশ আসার আগেই পালাল দুব্যাটা। হয়তো ফ্যানাটিক হবে, নিরামিষভোজীদের দেখতে পারে না। ও-রকম অনেকের পাল্লায় পড়েছি আগেও। কত রকম লোক যে আছে দুনিয়ায়। মতের মিল হলো না, ব্যস, ধরে মারো ব্যাটাকে, এমন অনেক আছে।

জানি। তবে ওদের দুজনের কথা যা শুনলাম, ফ্যানটিক মনে হচ্ছে না।

অবাক হলো ডাংম্যান। নয়? তাহলে কেন মারতে এল? তোমরা অন্য কিছু ভাবছ, অন্য কারণ?

হ্যাঁ, স্যার, আমরা ভাবছি… বলতে গিয়ে থেমে গেল রবিন।

মৃদু একটা শব্দ হয়েছে।

ডাংম্যানও শুনছে, চোখ কুঁচকে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে শব্দের উৎস আবিষ্কারের জন্যে।

বীপ-বীপ-বীপ! বীপ-বীপ-বীপ!

ঝটকা দিয়ে উঠে দাঁড়াল কিশোর। মাপ করবেন, স্যার, আমাদের এখুনি বাইরে যেতে হচ্ছে। আসছি। রবিন, এসো।

তাড়াতাড়ি এসো, ডাংম্যান বলল। পেদ্রোজ এস্টেটে যাব। রোজই যাই মিস পেদ্রোর সঙ্গে দেখা করতে। তার সাহায্য না পেলে এখানে কিছুই করতে পারতাম না।

আসছি, স্যার, ঘুরে হাঁটতে শুরু করল কিশোর। পিছু নিল রবিন।

ওয়াকি-টকি সিগন্যাল দিচ্ছে। নিশ্চয় মুসা। আশেপাশে বড় বড় বিল্ডিং। শব্দঠিকমত ধরা যাবে না। খোলা জায়গা খুঁজল কিশোর। বাগানটা চোখে পড়ল, উজ্জ্বল রোদ। একটা ঝোপের ধারে ছায়ায় চলে এল দুজনে।

হুমড়ি খেয়ে বসে পড়ে সুইচ টিপল কিশোর। ফার্স্ট বলছি। সেকেণ্ড, শুনছ? ফাস্ট, শুনছ? ওভার।

শুনছি। বলো। ওভার, জবাব দিল কিশোর।

কিশোর? মুসার দুর্বল কণ্ঠ উত্তেজিত। ভূত-থেকে-ভূতে খবর দিয়েছে। এইমাত্র। একটা ছেলে লোক দুটোকে দেখেছে। ঝরঝরে গাড়িটা লা পামা স্ট্রীটের…।

কিশোর! চেঁচিয়ে উঠল রবিন। ওই যে, আসছে!

লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল কিশোর। রিসিভারের বোতাম থেকে আঙুল সরে গেল, কেটে গেল বেতার যোগাযোেগ। স্তব্ধ হয়ে গেল মুসার কণ্ঠ।

সেকথা ভাবার সময় নেই এখন কিশোর আর রবিনের। ওদের সাইকেলের কাছে দাঁড়িয়ে আছে সেই বাদামী চামড়াদের একজন, পরনে বিচিত্র সাদা পোশাক। আরেকজন দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির সদর দরজা আর ঝোপটার মাঝামাঝি জায়গায়। দুজনের হাতেই দুটো বড় বাঁকা ফলাওয়ালা ছুরি।

ছেলেরা ওদের দেখে ফেলতেই রওনা হলো দুজনে। ভীষণ ভঙ্গিতে ছুরি নেড়ে এগিয়ে আসতে শুরু করল।

গেটের দিকে যাওয়ারও উপায় নেই, বাড়িতে ঢোকার পথও রুদ্ধ।

দৌড় দাও! চেঁচিয়ে বলল কিশোর। সোজা পাহাড়ে!

১০
বাড়ির কোণের দিকে দৌড় দিল ওরা।

দ্বিধায় পড়ে গেল লোক দুজন। ক্ষণিকের জন্যে। চেঁচিয়ে উঠল গলা ফাটিয়ে।

ফিরেও তাকাল না ছেলেরা। বাগানের শেষে নিচু বেড়া লাফ দিয়ে ডিঙিয়ে এসে পড়ল বাদামী পাহাড়ের গোড়ায়, পথে।

পাহাড়ে ওঠো, হাঁপাতে শুরু করল কিশোর। পরিশ্রম একেবারেই সয় না তার।

আগে ছুটছে রবিন, পেছনে কিশোর, শুকনো ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে। শক্ত, ঘন, ধূসর ঝোপের ডাল তাদের কাপড় ছিড়ছে, চামড়া ছিলছে, খেয়ালই করছে না কেউ। কানে আসছে পদশব্দ। তাড়া করে আসছে দুই বাদামী। চেচাচ্ছে।

কি বলে? রবিনও হাঁপিয়ে উঠছে।

ব্যাটাদের মাথা, জোরে জোরে হাঁপাচ্ছে কিশোর। কিচ্ছু বুঝি না।

পালাতে পারব? পারতে হবে।

আরও ওপরে উঠে সরু একটা পথ পাওয়া গেল। ঝোপঝাড় নেই। খাড়াইও অনেক কম। গতি কিছুটা বাড়ল ওদের।

ছুটছে ওরা। সরে যাচ্ছে রকি বীচ থেকে দূরে, গথিক-বাড়ি, তাদের সাইকেল পেছনে পড়ছে, কিন্তু কিছু করার নেই। বাঁচতে চাইলে পালাতে হবে। ভারি হয়ে আসছে পা। পথের ওপর জোরাল হচ্ছে জুতোর আওয়াজ।

ওহ-ন্নো! চেঁচিয়ে উঠে থমকে দাঁড়িয়ে গেল রবিন। তার প্রায় গায়ের ওপর এসে পড়ল কিশোর। আরেকটু হলেই দিয়েছিল ধাক্কা দিয়ে ফেলে।

হঠাৎ শেষ হয়ে গেছে পথ। সামনে নিচে গভীর খাদ। মাঝখানে খানিকটা খালি, তারপরে আবার পাহাড় এবং পথ।

পুল ছিল, বলল রবিন। পাহাড়ী ঢলের সময় ভেঙেছে।

ওপারে যাওয়া যাবে না। পাগলের মত এদিক ওদিক তাকাচ্ছে কিশোর। এক পাশে পাহাড়ের চূড়া দেখিয়ে বলল, চলো।

বিপথে আবার ওপরে উঠতে শুরু করল ওরা। ধুলায় ধূসর চুড়া, রোদে তপ্ত হয়ে আছে। নিচে চিৎকার শোনা গেল। গোয়েন্দাদের দেখে ফেলেছে।

ফিরে তাকাল কিশোর। উঠে আসছে লোক দুজন। পাহাড়ে চড়ার অদ্ভুত ক্ষমতা। ঝোপ, পাথর, খাড়াই কোন কিছুকেই পরোয়া করছে না।

আর পারব না ওদের সঙ্গে, দাঁড়িয়ে গেল রবিন।

থেমো না!

ঘাড়ে যেন চাপড় মারছে কড়া রোদ। গরমে কটকট করছে শুকনো ডাল পাতা। ঘামে ভিজে গেছে ওদের শরীর। শুকনো চোখা ডাল হাত দিয়ে ঠেলে

সরাতে হচ্ছে বার বার, রক্তাক্ত হয়ে গেছে তালু আর আঙুল।

অবশেষে পাহাড়ের কাধে পৌঁছল ওরা। লাল ধুলোমাটির ওপরেই ধপাস করে বসে পড়ল কিশোর, হাঁ করে হাঁপাচ্ছে, আরেকটু হলেই জিভ বেরিয়ে যাবে।

ফিরে তাকাল রবিন! হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, আসছে!

আসুক! গুঙিয়ে উঠল কিশোর, আর পারছি না।

কপালের কাছে হাত তুলে চোখ থেকে বোদ আড়াল করল রবিন। জানের ভয়ে ছুটছি আমরা, তা-ই পারছি না, আর ওদের কাণ্ড দেখো! এক্কেবারে পাহাড়ী ছাগল। এই কিশোর, ইয়াকুয়ালি না তো? দা ভেভিলস অভ দা ক্লিফস!

কৌতূহল কিছুটা শক্তি ফিরিয়ে দিল কিশোরের দেহে। উঠে দাঁড়িয়ে তাকাল সে। হতেও পারে। এজন্যেই কথা বুঝি না। ইয়াকুয়ালি বলেই হয়তো।

এসকিমো ভাষা বলুকগে, আমার কিছু না, আমার এখন পালানো দরকার, চঞ্চল হয়ে উঠল রবিন। যাই কোথায়? আচ্ছা, ডাংম্যানই আমাদের ধরতে পাঠাল না তো?

মনে হয় না, দূরে গথিক-বাড়িটার দিকে তাকাল কিশোর। শান্ত। কাউকে দেখা যাচ্ছে না।

সাইকেলের কাছে যদি খালি ফিরতে পারতাম!

সামনে কোথায় যাব? পাহাড়ের শূন্য কাঁধের দিকে তাকাল রবিন, শুকনো ঝোপ ছাড়া আর কিছু নেই। লুকানোর কোন জায়গায়ই চোখে পড়ছে না। দেখতে দেখতে হঠাৎ উজ্জ্বল হলো তার মুখ। কিশোর, পেয়েছি! এসো।

কাঁধ ধরে ছুটতে শুরু করল রবিন। পেছনে কিশোর।

পাহাড়ের চূড়া ঘিরে রেখেছে কাঁধ। খানিকটা এগোতেই লোকগুলো আড়ালে পড়ে গেল। আরও পঞ্চাশ গজমত পেরিয়ে উল্টো দিকে মোড় নিল ওরা। নেমে যাওয়া পাহাড়ের ঢালে এখানে ওকের জঙ্গল শুরু হয়েছে, ঝোপও খুব ঘন।

যাচ্ছি কোথায়? হাঁপাতে হাঁপাতে বলল কিশোর।

এখানেই।

আচমকা শুরু হয়েছে সবুজ জঙ্গল, যেন একটা সবুজ দেয়াল। তাতে এসে প্রায় ঝাঁপ দিয়ে পড়ল রবিন, ঢুকে গেল বনে।

পেছনে ছুটছে কিশোর। হঠাৎ মাটি সরে গেল পায়ের তলা থেকে, মহাশূন্যে ঝাপ দিয়েছে যেন।

ময়দার বস্তার মত এসে ধাপ্পাস করে পড়ল সরু একটা গিরিখাতের তলায়। চারপাশে ঘন গাছের জঙ্গল। আগের রাতের ছড়ে যাওয়া হাঁটুতে নতুন করে চোট লাগল, ডলতে ডলতে উঠে বসল সে। তাকাল মাতালের মত।

আগেই বলতে পারতে, খসখসে কণ্ঠ, গলার ভেতরটা সিরিশ দিয়ে ঘষা হয়েছে যেন কিশোরের।

সময় পেলাম কই? পাশ থেকে বলল রবিন। তোমার মতই আমিও তো পড়েছি। একটা সাপকে লাঠি নিয়ে তাড়া করেছিলাম। যাক, ব্যাটারা আর খুঁজে পাবে না।

কি জানি, নিশ্চিন্ত হতে পারছে না কিশোর।

শশশ, ঠোঁটে আঙুল রাখল রবিন।

হামাগুড়ি দিয়ে খাদের কিনারে সরে এল দুজনে। ঝোপে ঢুকল।

আস্তে করে ঝোপের ডালপাতা সরিয়ে ওপরে উঁকি দিল রবিন।

বড় জোর পঞ্চাশ ফুট দূরে দাঁড়িয়ে আছে লোকদুটো। কথা বলছে, একেক দিকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছে, উত্তেজিত।

একেবারে শুয়ে পড়ল কিশোর। বুঝে গেছে, আমরা ধারে-কাছেই আছি।

কি করব এখন?

চুপ করে থাকব। আর কি করা?

চুপ করে শুয়ে রইল দুজনে, কান খাড়া। লোকগুলোর কথা আর পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। অনিশ্চিতভাবে হাঁটাহাঁটি করছে ওরা, বোধহয় ঝোপের ভেতরে খুঁজছে। স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে কথা, কিন্তু এক বর্ণও বুঝতে পারছে না ছেলেরা।

ফিসফিসিয়ে বলল কিশোর, দেখে ফেলবেই, লুকিয়ে বাচতে পারব না।

না-ও দেখতে পারে। গিরিখাতটা বাইরে থেকে দেখা যায় না।

তাহলে আমাদের মতই পা ফসকে ভেতরে পড়বে। বেরোনোর পথ আছে? ওদের চোখ এড়িয়ে?

এক মুহূর্ত ভাবল রবিন। বায়ে গভীর আরেকটা খাদ আছে, গথিক-বাড়িটার পেছনে যে আরেকটা পথ আছে, তার কাছে গিয়ে শেষ হয়েছে। এখান থেকে বেরিয়ে পঞ্চাশ ফুট খোলা জায়গা পেরোতে পারলেই খাদটায় গিয়ে নামতে পারব।

পঞ্চাশ ফুট, না? নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটতে শুরু করল কিশোর। দু-চোখের কোণে খাজগুলো গভীর হয়েছে। তাহলে ওদের নজর এড়ানোর অন্য ব্যবস্থা করতে হবে। এমন কিছু, যাতে ওরা এসে এখানে নামে, ওই সময়ে খোলা জায়গা দিয়ে ছুটে যাব আমরা।

তাহলে ভেনট্রিলোকুইস্ট হতে হবে আমাদের, তিক্ত কণ্ঠে বলল রবিন। খোলা জায়গায় গিয়ে এখানে আমাদের কথা ছুঁড়ে পাঠাতে হবে। এছাড়া আর কি করার আছে?

ঠিকই বলেছ! ঝট করে সোজা হলো কিশোর।

মানে? ভেনট্রির ভ্যা-ও জানি না আমরা। কথা ছুঁড়ব কিভাবে?

ইলেকট্রোনিক ভেনট্রিলোকুইস্টের সাহায্যে, পকেট থেকে ওয়াকি-টকিটা বের করল কিশোর। তোমারটা আছে না? গুড। আমারটা ফেলে যাব এখানে। তোমারটা দিয়ে কথা পাঠাব এটাতে।

দারুণ! এতক্ষণে হাসি ফুটল রবিনের মুখে। কথা শুনে এখানে ধরতে আসবে ওরা, ওই সুযোগে আমরা পগার পার। ওঠো, দেরি করছ কেন?

ঝোপ থেকে বেরোল দুজনে।

ওয়াকি-টকিটা মাটিতে রেখে একটা পাথর চাপা দিয়ে রিসিভারের সুইচ অন করে. রাখল কিশোর। রবিনের যন্ত্রটা হাতে নিয়ে নিঃশব্দে হামাগুড়ি দিয়ে এগোল খাদের এক কিনারে, খোলা জায়গাটার দিকে।

ওই যে একটা বড় গাছ দেখছ? হাত তুলে দেখাল রবিন। তারপরেই।

শুরু হোক তাহলে, হাসল কিশোর। ওয়াকি-টকি মুখের কাছে এনে জোরে বলল, রবিন, ওরা আসছে। বলেই রবিনের মুখের কাছে ধরল যন্ত্র।

আসুক। আমাদের দেখতে পাবে না।

কান পেতে রয়েছে কিশোর, দূরের যন্ত্রটায় বেজে উঠেছে কথা, এখান থেকেও শোনা গেল মৃদু।

আরেকবার ওয়াকি-টকিত্বে কথা বলল দুজনে।

ঝোপঝাড় ভাঙার দুপটুপ আওয়াজ হলো।

শুনেছে, ফিসফিস করল রবিন। খুঁজতে যাচ্ছে।

ছোটো, বলেই লাফ দিয়ে উঠে ছুটতে শুরু করল কিশোর।

মাথা নিচু করে এক দৌড়ে বড় গাছটা ছাড়িয়ে এল দুজনে। ফিরে তাকাল একবার। লোকগুলোকে দেখা যাচ্ছে না।

খাদের ধারে চলে এল ওরা। বেশি গভীর নয়। আসলে চওড়া একটা ফাটল, লম্বা, এঁকেবেঁকে চলে গেছে অনেকটা গিরিপথের মত হয়ে।

তাতে লাফিয়ে নামল দুজনে।

ঢাল বেয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে নামল গথিক-বাড়ির পেছনের পথে। লোক দুটোর দেখা নেই।

চলো, গিয়ে ডাংম্যানকে লোকগুলোর কথা জানাই, পরামর্শ দিল কিশোর।

দ্রুত বাড়ির কোণ ঘুরে সামনে সদর দরজার কাছে চলে এল ওরা। বেল বাজাল কিশোর।

অপেক্ষা করেও সাড়া পাওয়া গেল না।

আবার বেল বাজাল।

সাড়া নেই।

দরজার নব মোচড় দিয়ে দেখল, খুলল না, তালা লাগানো।

দরজার পাশে একটা জানালা দিয়ে ভেতরে উঁকি দিল কিশোর। লোক দেখা যাচ্ছে না।

এস্টেটে চলে গেছে হয়তো, রবিন বলল।

তা-ই হবে। চলো, ভাগি।

১১
ওত পেতেই ছিলেন মেরিচাচী, রবিন আর কিশোরকে ঢুকতে দেখেই পাকড়াও করলেন।

ওয়ার্কশপের দেয়ালে সাইকেল হেলান দিয়ে রাখল দুই গোয়েন্দা। গোপন পথ দিয়ে ঢুকেও রেহাই মিলল না।

কিশোর, কই গিয়েছিলি? সেই কখন থেকে বসে আছে তোর চাচা। এস্টেটে যাবি না?

যাব, চাচী। তুমি যাও, আমি এক্ষুণি আসছি।

তাড়াতাড়ি আয়, বলে অফিসের দিকে চলে গেলেন মেরিচাচী।

দুই সুড়ঙ্গ দিয়ে হেডকোয়ার্টারে ঢুকল দুই গোয়েন্দা।

দেখেই হাঁ হাঁ করে উঠল মুসা। কি ব্যাপার, লাইন কাটলে কেন? জরুরী খবর ছিল; দুটো ছেলে লা পামা স্ট্রীটে গাড়িটা দেখেছে। লোক দুটোকেও। খানিক পর

আবার ফোন করে বলল, লোকগুলো নাকি দুই জন কিশোরকে তাড়া করেছে।

জানি, মুখ বাকাল রবিন। আমরাই।

সংক্ষেপে সব বলল কিশোর।

খাইছে! শুনে চেঁচিয়ে উঠল মুসা। বড় বাঁচা বেঁচেছ।

এখন কথা হলো, বলল কিশোর, গথিক-বাড়িটার কাছে ঘোরাঘুরি করেছে কেন ওই দুজন? ডাংম্যানকে আবার আক্রমণ করার সুযোগ খুঁজছে? এস্টেটে গিয়ে হুঁশিয়ার করব।

তোমরা যাওয়ার আগেই যদি আবার অফিসে ফিরে যায়? রবিন বলল।

যেতে পারে। সেজন্যেই তোমাদের গিয়ে ওখানে বসে থাকা দরকার।

আমি এখন পারব না, সাফ মানা করল মুসা। পেটে আগুন জ্বলছে।

আমারও, রবিন বলল।

তাহলে লাঞ্চ সেরেই যাও। লোক দুটো এলে ওদের ওপরও চোখ রাখবে।

কিন্তু কিশোর, এইমাত্র ওদের হাত থেকে বেঁচে ফিরলাম। আবার দেখলে…

আর কোন উপায় নেই, চিন্তিত শোনাল গোয়েন্দাপ্রধানের কণ্ঠ। ওদের ওপর চোখ রাখলে মূল্যবান সূত্র পাওয়ার আশা আছে। খুব সাবধানে। তোমাদের যেন দেখে না ফেলে।

সেটা আর বলে দিতে হবে না, কাজটা বিশেষ পছন্দ হচ্ছে না মুসার।

কি ভাবছ? কিশোরকে জিজ্ঞেস করল রবিন। ওরা সত্যি ইয়াকুয়ালি?

তাই তো মনে হয়। কোনভাবে হয়তো চাম্যাশ হোর্ডের খবর জেনেছে। আমার ধারণা, ম্যাগনাস ভারদির মেসেজের মানে ওরা বুঝতে পারবে।

জিভ দিয়ে বিচিত্র শব্দ করল মুসা। ইস, আমরাও যদি পারতাম।

হ্যাঁ, পারলে ভাল হত, একমত হলো কিশোর। ইন দা আই অভ দা স্কাই হোয়্যার নো ম্যান ক্যান ফাইও ইট, কথাটার মধ্যেই রয়েছে জবাব। দেখি, পরে ভেবে মানে বোঝার চেষ্টা করব।

মেরিচাচীর ডাক শোনা গেল। কিশোর? কি হলো? আবার গিয়ে ঢুকেছিস?

যা বললাম, মনে থাকে যেন, তাড়াতাড়ি বলল কিশোর। ডাংম্যানকে হুঁশিয়ার করবে। লোকগুলো এলে তাদের ওপর চোখ রাখবে, বাড়িটার কাছে ঘুরঘুর করছে কেন, বোঝার চেষ্টা করবে। আমি যাই।

রবিন আর মুসা দুজনেই মাথা নাড়ল।

বেরিয়ে এল কিশোর।

বড় ট্রাকটা বের করা হয়েছে। ড্রাইভিং সিটে বোরিস, তার পাশে রাদেশচাচা।

রকি বীচ থেকে বেরিয়ে এসেছে ট্রাক। আঁকাবাঁকা গিরিপথ ধরে ছুটছে। এস্টেটে পৌঁছতে বেশিক্ষণ লাগল না।

গেট খোলা। ট্রাক নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল বোরিস। ভাড়ারের কাছে এসে থামল।

কেবিন থেকে লাফ দিয়ে নামল কিশোর। তার পরেই রাশেদ পাশা। উত্তেজিত দেখাচ্ছে। পুরানো মাল কিনতে এলে ওরকম হয় তার। জঞ্জালের ভেতর থেকে পছন্দসই জিনিস খুঁজে বের করতে ভাল লাগে।

বড় বাড়িটা থেকে বেরোলেন মিস পেদ্রো। হাসিমুখে এগিয়ে এলেন। আপনিই মিস্টার প্যাশা। খুশি হলাম। আপনার ভাতিজা তো কাল পছন্দ করে গেছে। দেখুন আপনার পছন্দ হয় কিনা। অনেক দিন পড়ে ছিল, অনেক জিনিসই নষ্ট হয়ে গেছে।

কিশোরের পছন্দ হলে আমারও হবে, আশ্বাস দিলেন রাশেদ পাশা। মস্ত গোফে পাক দিলেন। সত্যি বিক্রি করবেন তো? দাম তেমন না পেলেও?

আমি তো ফেলেই দিতে চেয়েছিলাম। টনি বোঝাল, যা পাওয়া যায় তাই লাভ। ভেবে দেখলাম, ঠিকই বলেছে। আজকাল তো একটা সুতোও পয়সা ছাড়া মেলে না। টনি এসে আমার সব ওলট-পালট করে দিচ্ছে। ভাবছি, আবার ঠিকঠাক করে নেব এস্টেটটা।

যাই, মাল দেখি, বললেন রাশেদ পাশা। আপনি আসবেন?

চলুন, হেসে বললেন মিস পেদ্রো।

সবার পেছনে রইল কিশোর। রাশেদচাচাকে নিয়ে মিস পেদ্রো ভাড়ারে। ঢুকলেন, পেছনে গেল বোরিস। ব্যস, চোখের পলকে ঘুরে বাড়ির দিকে ছুটল কিশোর।

দেখা হয়ে গেল টনির সঙ্গে। কিছু তদন্ত করতে এসেছ?

তদন্ত ঠিক নয়, বলল কিশোর। আসলে, মিস্টার ডাংম্যানের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।

লাইব্রেরিতে। কিশোরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে এল টনি।

খবরের কাগজ পড়ছিল ডাংম্যান। কিশোরকে দেখে প্রায় ছুটে এল। কাল রাতে তোমরা এসেছিলে, টনি বলেছে আমাকে। তোমাদের চোর ভেবেছি, কিছু মনে রেখো না। লোভ দেখিয়ে পুতুলটা তোমাদের কাছ থেকে বের করার জন্যেই পুরস্কার ঘোষণা করেছে।

বুঝতে পেরেছি, স্যার, শান্ত কণ্ঠে বলল কিশোর।

গুড। ঠিক করে বলো তো, পুতুলটা কি হয়েছে?

পুতুলটা কি ভাবে পেয়েছে মুসা আর রবিন, সেখান থেকে শুরু করল কিশোর। চুপচাপ শুনছে ডাংম্যান, মাঝে মাঝে ভ্রুকুটি করছে শুধু।

ভূতুড়ে হাসির কথা কিশোর বলতেই চেঁচিয়ে উঠল টনি, একটা ছায়া তো? পাগলের মত হাসে? আমিও শুনেছি কাল রাতে। অদ্ভুত হাসি।

টনির কথায় কান দিল না ডাংম্যান। ঠিক শুনেছ তো, কিশোর? মানে, বাতাসের শব্দ-টক হয়? কিংবা কল্পনা?

না। এই এস্টেটের মধ্যেই রয়েছে কোথাও ভূতটা। কয়েকজনকে বন্দী করে রেখেছে।

বন্দী? কি বলছ! চোখমুখ বিকৃত করে ফেলেছে টনি।

কে কাকে বন্দী করল। কি বলছ, কিছুই তো বুঝছি না। কেন এসব করবে?

চাম্যাশ হোর্ডের জন্যে। আমি শিওর।

কী?

গুপ্তধন। সোনার সুপ! খুলে বলল কিশোর।

আই সী, বিড়বিড় করল ডাংম্যান। বিশ্বাস করা শক্ত। তাহলে তোমার বিশ্বাস, ডাকাতেরা ওই সোনার পিছে লেগেছে? বিপদের কথা। কয়েকটা বাচ্চাকে ঢোকালাম এসবের মধ্যে।

কোডটা আরেকবার বলবে, কিশোর? অনুরোধ করল টনি।

ইন দা আই অভ দা স্কাই হোয়্যার নো ম্যান ক্যান ফাইও ইট।

মানে কি? হাত ওল্টাল টনি। আর এর সঙ্গে পুতুলের কি সম্পর্ক? আর ওই যে বললে, এস্টেটে কাদেরকে নাকি বন্দী করে রাখা হয়েছে?

জবাব দিতে গিয়েও থেমে গেল কিশোর। মিস পেদ্রো ডাকছেন।

টনি? দেখে যা তো। কোথায় গেলি?

সাড়া দিয়ে বেরিয়ে গেল টনি।

হাসি আমিও শুনেছি, স্যার, নিজের কানে, বলল কিশোর। আর পুতুলের সঙ্গে সম্পর্ক হলো, মেসেজ। ভেতরে একটা মেসেজ ছিল। আমি নিজে খুলেছি।

মেসেজ? পুতুলের ভেতর? অবাক মনে হলো ডাংম্যানকে।

বোধহয় সাহায্যের আবেদন। ওই বন্দিদেরই কেউ লিখেছে।

পুলিশকে জানিয়েছ? গভীর হলো ডাংম্যান।

না। গিয়ে কি বলব? পুলিশকে বিশ্বাস করাতে হলে প্রমাণ দরকার।

হুঁ, কিছু ভাবল ডাংম্যান। তুমি কখনও দেখেছ ছায়াটা?

কাল রাতে। টনির সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে, টনির ওপর জোর দিল কিশোর। চারটে বেঁটে লোক দেখেছি, মাথা ছিল না।

পাগল হয়ে গেল নাকি!

ছিল না, মানে দেখা যাচ্ছিল না। বোধহয় চটের বস্তা দিয়ে ঢেকে দিয়েছিল।

কী? চেঁচিয়ে উঠল ডাংম্যান। চারজন বন্দী? এই এস্টেটের মধ্যে? মিস পেদ্রোর এলাকায়? তা কি করে হয়?

হাসল কিশোর। হয়েছে বলেই তো বলছি, স্যার। বন্দীদের রাখা হয়েছে একটা হানটিং লজে। চট করে দরজার দিকে তাকাল একবার সে, স্বর খাদে নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, টনিকে কতদিন ধরে চেনেন?

টনি? বেশি দিন না তো, চোখ মিটমিট করছে ডাংম্যান। কেন? তাকে সন্দেহ করছ?

হ্যাঁ-না কিছুই বলল না কিশোর, শুধু হাসল।

ঘুরল ডাংম্যান। লম্বা পায়ে ডেস্কের কাছে গিয়ে টান দিয়ে ডয়ার খুলল। আবার যখন ফিরল, তার হাতে একটা পিস্তল।

১২
কঠিন হয়ে উঠেছে ডাংম্যানের চেহারা। শক্ত করে ধরে রেখেছে পিস্তল। বুনো পথ ধরে কিশোরের পিছু পিছু প্রায় ছুটে চলেছে শিকারীর বাংলোটার দিকে।

তোমার ধারণা, বলল ডাংম্যান, যারা পুতুল ছিনিয়ে নিয়েছে, তারাই আমাকে আক্রমণ করেছিল? তোমাদেরও তাড়া করেছিল?

কোন সন্দেহ নেই।

তাহলে ওরাই চারজনকে বন্দী করে রেখেছে। হুঁশিয়ার। বোঝা যাচ্ছে, লোক মোটেই সুবিধের না ওরা।

এতক্ষণ ওখানে আছে কিনা কে জানে। বিশেষ করে, ছায়াটা।

গেলেই দেখা যাবে। আমার মনে হয় না দুটো ছেলের ভয়ে পালাবে। কি করছে ওরা আসলে?

জানি না, স্বীকার করল কিশোর। যাদেরকে ধরে এনেছে, তারা হয়তো জানে গুপ্তধন কোথায় আছে। চাপ দিয়ে ওদের মুখ খোলাতে চাইছে হয়তো ভূতুড়ে ছায়ার মালিক।

হ্যাঁ, এটা হতে পারে। দেখি, হাতে-নাতে ধরতে পারি কিনা।

ঘন বনের ভেতর দিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে চলেছে ওরা। বাটি-আকৃতির উপত্যকার কাছে চলে এল। বাংলোর সামনে ট্রাকটা নেই। রাতের মতই দিনেও রহস্যময় দেখাচ্ছে বাড়িটা।

গাছের আড়ালে কিশোরকে চুপ করে বসে থাকার নির্দেশ দিল ডাংম্যান। গাছপালা আড়ালে আড়ালে নেমে যেতে শুরু করল ঢাল বেয়ে।

বাংলোটার দিকে চেয়ে আছে কিশোর। নির্জন, কোন সাড়া-শব্দ নেই। জানালাগুলোর খড়খড়ি খোলা, সামনের দরজাটাও। দেখে তার দৃঢ় ধারণা হলো, ভেতরে কেউ নেই।

কোন রকম ঝুঁকি নিল না ডাংম্যান। মাথা নিচু করে নিঃশব্দে পৌঁছে গেল উপত্যকার খোলা জায়গাটার ধরে। এক মুহূর্ত থেমে বাড়িটা দেখল। ডেকে বলতে চাইল কিশোর, গিয়ে লাভ হবে না। কিন্তু সে মুখ খোলার আগেই মাথা নিচু করে দৌড় দিল ডাংম্যান। হাতে উদ্যত পিস্তল।

জানালায় গিয়ে উঁকি দিল ডাংম্যান। ঘুরে চলে গেল খোলা দরজার কাছে। ভেতরে ঢুকল।

বসে আছে কিশোর। বাংলোর ভেতর থেকে খুটখাট আর নানা রকম শব্দ কানে আসছে। তারপর দরজায় বেরোল ডাংম্যান। হাতের ইশারায় কিশোরকে ডাকল।

উঠে দৌড় দিল কিশোর।

খালি, বলল নিরামিষভোজী। কেউ নেই। তবে ছিল, দেখো।

ছোট একটা পামাজা দেখাল সে, সাদা কাপড়। এ-রকম কাপড়ই পরে ছিল ওই বাদামী-চামড়ার লোক দুটো, যারা পুতুল ছিনিয়ে নিয়েছে, কিশোর আর রবিনকে পাহাড়ে তাড়া করেছে।

ইনডিয়ান পোশাকের মত লাগছে, বলল ডাংম্যান। তোমার বাদামীরা এখানে এসেছিল মনে হচ্ছে। ট্রাকটাও ঠিকই দেখেছ। পথে তেলের দাগ দেখেছি। শুকিয়ে গেছে। তারমানে ট্রাকটা গেছে যে, অনেকক্ষণ।

কোথায় গেছে আন্দাজ করতে পারেন?

কি করে বলি? চলো, আরেকবার দেখি। কিছু বোঝো কিনা দেখো।

বাংলোয় ঢুকল দুজনে।

খুঁটিয়ে দেখছে কিশোর। তাড়াহুড়ো করে পালিয়েছে লোকগুলো। মদের খালি বোতল পড়ে আছে টেবিলে। প্লেটের অবশিষ্ট খাবার শুকিয়ে মড়মড়ে হয়ে গেছে। সব কিছু নোংরা। কিন্তু ওসব দেখে লোকগুলো কোথায় গেছে অনুমান করার উপায় নেই।

নাহ, এখানে কিছু নেই, বলল সে। এস্টেটের অন্য কোথাও গিয়ে লুকিয়েছে হয়তো।

তাহলে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। অনেক বড় এলাকা এটা, পাহাড়-পর্বতের মধ্যে লুকালে কে খুঁজে বের করবে? তবে ওদের প্ল্যান বরবাদ করে দিয়েছ তুমি। ভয় পেয়ে পালিয়েছে।

আমার মনে হয় না, মাথা নাড়ল কিশোর। এত সহজে ভয় পাওয়ার লোক ওরা নয়। আজও আমাকে আর রবিনকে তাড়া করেছিল, আপনার অফিস থেকে বেরোনোর পর।

তাড়া করেছিল? আমার বাড়ির কাছে? বিশ্বাস করতে পারছে না যেন ডাংম্যান। আর কি চায় তোমাদের কাছে?

আমাদের কাছে চায় না, চায় আপনার কাছে।

আমার কাছে? আমার কাছে কি চায়?

হয়তো কিছু আছে। আমাদের কাছ থেকে পুতুলটা ছিনিয়ে নেয়ার পর আপনাকে আক্রমণ করেছিল। তারপর আমরা আপনার বাড়ি থেকে বেরোলে তাড়া করল আমাদেরকে। হয়তো ভেবেছে, জিনিসটা আমাদেরকে দিয়েছেন আপনি।

আ-আমি…কি জিনিস! ও হ্যাঁ হ্যাঁ, চেঁচিয়ে উঠল ডাংম্যান। আছে আরেকটা পুতুল। অফিসে নিয়ে রেখেছি। একটা পুতুল চুরি হওয়ার পর ঘাবড়ে গেলেন মিস পেদ্রো, আরেকটাও চুরি হতে পারে। আমিই পরামর্শ দিয়েছি, আমার কাছে নিয়ে রাখার জন্যে, নিরাপদে থাকবে। কি ভুলো মন আমার, ভুলেই গিয়েছিলাম। ওই পুতুলটাও চায় হয়তো ব্যাটারা।

মাথা ঝাঁকাল কিশোর। দুটো পুতুল এক করলে হয়তো গুপ্তধনের খোঁজ মিলবে, সে-জন্যে চায়।

হ্যাঁ, হতে পারে। কিন্তু জানল কি করে, আরেকটা পুতুল আমার কাছে?

আপনাকে নিতে দেখেছে হয়তো।

অসম্ভব। বাক্সে ভরে পকেটে ঢুকিয়ে তারপর বেরিয়েছি। অফিসে লুকিয়ে রাখার আগেও আশেপাশে ভালমত দেখে নিয়েছি, কেউ ছিল না।

আপনার সহকারীরাও না?

না। আর ওরা দেখলেও কিছু হত না, খুব বিশ্বাসী অনেকদিন ধরে আছে। আমার সঙ্গে, আমাকে গুরু মানে।

নিচের ঠোঁট কামড়ালো কিশোর। মিস পেদ্রো জানেন…।

তাতে কি? বাধা দিল ডাংম্যান। উনি চোরের সঙ্গে হাত মেলাননি। আর গুপ্তধন চাইলে আগেও তো অনেক সুযোগ ছিল, দুটো পুতুলই অনেক বছর ছিল তাঁর কাছে। শুধু মিস পেদ্রো আর টনি…

টনি! ডাংম্যানের কথায়ও বাধা দিল কিশোর। সে-ও তো জানে।

হাঁ হয়ে গেল ডাংম্যানের মুখ, চোয়াল ঝুলে পড়ল, ধীরে ধীরে আবার বন্ধ হলো ফাঁক। কিশোর-মিস পেদ্রো:টনি কোন কিছুতে জড়ালে বেচারী খুবই দুঃখ পাবেন, শেষ হয়ে যাবেন!

রবিন আর মুসা যখন পুতুলটা পায়, টনি তখন গেটের কাছে ছিল। গতরাতেও অন্ধকারে এস্টেটের মধ্যে ঘুরঘুর করছিল। কতদিন থেকে চেনেন ওকে, মিস্টার ডাংম্যান?

খুব বেশি দিন না। ইংল্যাণ্ডে পরিচয় হয়েছে, এখানে আসার জন্যে রওনা হয়েছে তখন সে। আমিও লস অ্যাঞ্জেলেসে আসছিলাম। টনিই বলেছে, তার দাদী নিরামিষভোজী, অনেক আগে থেকেই। তাই প্রথমেই এসে তার সঙ্গে দেখা করলাম, থামল ডাংম্যান। গভীর। চলো, টনির সঙ্গে কথা বলা দরকার। তার দাদীকে পরে জানাব।

বুনো পথ ধরে ফিরে চলল আবার দুজনে। খুব জোরে ছুটতে পারে লোকটা, তাল রাখতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে কিশোর।

ট্রাকে মাল বোঝাই শেষ হয়নি। গলদঘর্ম হয়ে উঠেছেন রাশেদ পাশা আর বোরিস। কোথায় গিয়েছিলি? জিজ্ঞেস করলেন রাশেদ পাশা।

এই, একটু ঘুরে দেখতে, বলে কিশোরও এসে হাত লাগাল। তবে কাজে বিশেষ মন নেই, বার বার তাকাচ্ছে বাড়ির সদর দরজার দিকে। ডাংম্যান গেছে টনির সঙ্গে কথা বলতে, কেউই বেরোচ্ছে না।

অবশেষে বেরোল ডাংম্যান। কাছে এসে বলল, টনি গাড়ি নিয়ে কোথায় যেন গেছে। আমি অফিসে যাচ্ছি।

টনি আপনার অফিসে গেলে চোখে পড়বে, জানাল কিশোর। রবিন আর মুসা আছে ওখানে।

বরফ হয়ে গেল যেন ডাংম্যান। কী?

লোকদুটোর ওপর চোখ রাখতে পাঠিয়েছি ওদের।

কিশোর। চেঁচিয়ে উঠল নিরামিষভোজী, চেহারা ফ্যাকাসে, আমার সেফে আরেকটা পুতুল রয়েছে। ভীষণ বিপদে পড়বে ওরা। এখুনি যাচ্ছি আমি। তোমার চাচার বোধহয় হয়ে গেল। রকি বীচে ফিরেই পুলিশের কাছে যাবে।

গাড়ির দিকে ছুটল ডাংম্যান।

১৩
লাঞ্চ শেষে ইয়ার্ডে ফিরে হেডকোয়ার্টারে ঢুকল আবার রবিন আর মুসা। ফোনধরার যন্ত্রটা দেখল। না, কোন মেসেজ কোড করা নেই, কেউ ফোন করেনি তাদের অবর্তমানে। বেরিয়ে এসে ভেজিট্যারিয়ান লীগ-এ রওনা হলো দুজনে।

খুব সতর্ক রয়েছে ওরা। লোক দুটোকে চোখে পড়ল না। কোন নড়াচড়া, কোন রকম সাড়া নেই গথিক-বাড়িটার ভেতরে বাইরে। ডাংম্যানের গাড়িটা নেই। সদর দরজা তালাবন্ধ।

এস্টেটে গেছে, অনুমান করল মুসা।

তাহলে কিশোরের সঙ্গে দেখা হবে। আমরা এখানেই থাকি। লোকগুলো আসতে পারে।

ভেজিট্যারিয়ান লীগের উল্টোধারে দুটো বাড়ির মাঝে সরু একটা গলি। ওখানে সাইকেল রেখে ঘাপটি মেরে থাকবে ঠিক করল দুই গোয়েন্দা। তা-ই করল। রুক্ষ পাহাড়ের দিকে চোখ। গরম রোদ পাঁউরুটির মত সেঁকছে যেন পাহাড়টাকে, বাতাসে বাস্পের অদ্ভুত ঝিলিমিলি। অনেক ওপরে ডানা মেলে ভাসছে একটা গলাছেলা ধাড়ী শকুন, পাক দিয়ে দিয়ে ঘুরছে।

কুৎসিত পাখিটাকে দেখে অস্বস্তিতে ভরে গেছে মুসা আমানের মন। আমাদের কথা ভাবছে না তো ইবলিস পাখিটা?

গালাগাল করছ কেন? খুব ভাল পাখি ওরা, প্রতিবাদ করল রবিন। পচা-গলা খেয়ে সাফ করে, জায়গা পরিষ্কার রাখে।

সেজন্যেই তো ভয়। আমিও তো পচতে পারি। আমি মরি, সেই দোয়া করছে কিনা এখন কে জানে? শকুনের দোয়ায় গরু মরে না মরে না করেও তো অনেক মরে।

কেমন যেন শুকনো, জমাট নীরবতা। গত এক ঘণ্টায় একটা গাড়িও যায়নি গরম সড়কটা ধরে। চুপ করে বসে থাকা আর সইল না মুসার, হাতের কাছে কয়েকটা ছোট পাথর দেখে ওগুলো নিয়ে খেলতে শুরু করল। আরও খানিক পর পা সোজা করল। ঝি ঝি ধরে গেছে। গুঙিয়ে উঠল, গোয়েন্দাগিরির এই একটা ব্যাপার মোটেই ভাল্লাগে না আমার। বসে থাকা আর থাকা।

কিশোর তো বলে খুব জরুরী কাজের একটা এটা, গোয়েন্দাদের জন্যে। কখনও কখনও এক জায়গায় হপ্তার পর হপ্তা নাকি কাটাতে হয়।

ওরকম বসে থাকার গোয়েন্দা হতে আমি চাই না, থ্যাংকু, হাত নাড়ল মুসা। চোরা-ব্যাটারা আবার এখানে আসবে এ-ধারণা হলো কেন কিশোরের?

মনে হয়, ডাংম্যানের বাড়িতে এমন কিছু আছে, ওরা নিতে চায়। গুপ্তধনের কোন সূত্র-টুত্র হতে পারে।

মারছে! তাই নাকি? আবার গুঙিয়ে উঠল মুসা, দ্রুত তাকাল এদিক ওদিক! তাহলে তো আসবেই।

হ্যাঁ। আর সে-কারণেই চোখ রাখাটা জরুরী।

হঠাৎ, পথের ওপার থেকেই বোধহয়, ভেসে এল চাপা চিৎকার। এ-ভাই, কেউ আছ?

মৃদু কণ্ঠ, কিন্তু তপ্ত দুপুরের এই নীরবতায় স্পষ্ট বোঝা গেল কথা।

এই কেউ আছ? বাঁচাও! আবার এল সাহায্যের আবেদন।

বাড়িটার মধ্যে, ফিসফিস করে বলল মুসা। ওদিকে। ভেজিট্যারিয়ান লীগের পেছনে দিক দেখাল।

ডাংম্যানকে আটকে রাখেনি তো? রবিনের সন্দেহ, চোরেরা?

দ্বিধা করছে দুই গোয়েন্দা। যাবে? চোরেরা কাছেপিঠে নেই তো? তাহলে বেরিয়ে পড়বে মহাবিপদে। কিন্তু অসহায় লোকটাকে সাহায্য করাও দরকার।

কি করি? বুঝতে পারছে না মুসা।

গিয়ে দেখা উচিত। তবে হুশিয়ার থাকতে হবে। বিপদ দেখলেই যাতে পালাতে পারি।

সাবধানে ছুটে নির্জন শূন্য পথটা পেরোল ওরা। সদর দরজা বন্ধ, তাই ওদিকে গেলই না, ঘুরে সোজা চলে এল পেছনে। পেছনের দরজা দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করবে।

নবে মোচড় দিয়েই বলে উঠল মুসা, খোলা। ঠেলে পাল্লা খুলে পা রাখল অন্ধকার চওড়া একটা গলিতে।

রান্নাঘরে এসে ঢুকল ওরা। কেউ নেই। সেখান থেকে বেরিয়ে বাড়ির পেছনের ছোট একটা হলঘরে ঢুকল, জিনিসপত্র সব এলোমেলো। ঠাণ্ডা, আবছা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে কান পাতলো শোনার জন্যে।

কই, কিছুই শুনছি না, ফিসফিসিয়ে বলল রবিন।

কিন্তু এদিক থেকেই শব্দ হয়েছে। চলো তো, অফিসে দেখি।

সাবধানে দোর খুলল মুসা। ভেতরে উঁকি দিল। নীরব, নির্জন।

আলমারীর দরজার মত একটা দরজার দিকে ইশারা করল রবিন। পা টিপে টিপে সেটার কাছে এসে তাতে কান রাখল দুজনে। ওপাশের শব্দ শোনার চেষ্টা করছে।

কিন্তু পুরো এক মিনিট দাঁড়িয়ে থেকেও কিছু শোনা গেল না।

আস্তে করে গিয়ে ডাংম্যানের টেবিল থেকে বড় একটা পেপারওয়েট তুলে নিয়ে এল মুসা। চোখের ইশারায় দরজা খুলতে বললু রবিনকে।

হ্যাঁচকা টানে পাল্লা খুলে ফেলল রবিন। কিন্তু কারও মাথায় পাথরটা বসানোর সুযোগ হলো না মুসার ভেবেছিল ওপাশে ঘর আছে, নেই। আসলেই ওটা আলমারী, দেয়াল আলমারী। শূন্য।

এদিকেই কোথাও থেকে হয়েছে, আবার বলল মুসা।

এমন জায়গায় আছে লোকটা, যেখানে বাতাস ঢোকে না। বেহুশ হয়েযেতে পারে।

তা পারে। তাড়াতাড়ি করা দরকার।

নিচতলার সব কটা ঘর খুঁজল ওরা। নেই। দোতলায় উঠল। তিনটে ছোট ছোট ঘরের পাটিশন সরিয়ে বড় একটা বৈঠক-ঘর করা হয়েছে। এক কিনারে একটা মঞ্চ। ওতে উঠেই ভাষণ দেয় ডাংম্যান, বোঝা গেল, ওখানেই আক্রান্ত হয়েছিল।

তোমরা এসেছ? বাঁচাও! শোনা গেল আবার চিৎকার। মাথার ওপরে।

চেঁচিয়ে উঠল রবিন, তেতলায়।

এসো, সিঁড়ির দিকে দৌড় দিয়েছে মুসা।

তেতলায় আলো খুব সামান্য। জানালার সমস্ত খড়খড়ি নামাল। ধুলোর পুরু আস্তরণ সব কিছুতে। এক ধারে কতগুলো তক্তা পড়ে আছে, তাতেও ধুলো। কয়েকটা দরজা, পাল্লা খোলা, সব কটা থেকে করিডর চলে গেছে দিকে দিকে।

চুপচাপ দাঁড়িয়ে কান পেতে রয়েছে ছেলেরা।

হঠাৎ এলোমেলো করাঘাতের শব্দ হলো একটা করিডরের শেষ মাথায়। বড় একটা তক্তা তুলে নিয়ে দৌড় দিল মুসা, পেছনে রবিন। আরেকটা দরজা, তারপরে আরেকটা ঘর। খালি।

আবার দাঁড়িয়ে পড়ল ওরা। শব্দের আশায় কান পাতল।

দূরের দরজাটা আগে চোখে পড়ল রবিনের, ঘরের উল্টোধারে। মুসা, ওখানে।

মাথা নুইয়ে সায় জানিয়ে এগোল মুসা।

দরজার নব ধরে মোচড় দিল রবিন। তক্তা তুলে তৈরি রয়েছে মুসা।

তালা দেয়া, জানাল রবিন। ভাঙা যাবে?

দড়াম করে তাদের পেছনে দরজার পাল্লা বন্ধ হলো, যেটা দিয়ে ঢুকেছিল। চরকির মত পাক খেয়ে ঘুরল দুজনে, চোখ কোটর থেকে ছিটকে বেরোনোর অবস্থা। তক্তা মাথার ওপর তুলে ফেলেছে মুসা। কিন্তু বাড়ি মারার জন্যে কাউকে পেল না। শুধু, খোলা ছিল দরজাটা, এখন বন্ধ।

কিট করে দরজার বাইরে একটা শব্দ হলো।

মুসা! চেঁচিয়ে উঠল রবিন। তালা লাগিয়ে দিয়েছে।

হা-হা করে হেসে উঠল কেউ ওপাশে। নিজেদেরকে খুব চালাক ভাবো, না মিয়ারা? আবার হাসি। পরিষ্কার চেনা যাচ্ছে এখন গলা। টেরিয়ার ডয়েল।

দরজার কাছে ছুটে গেল দুই গোয়েন্দা। বন্ধ। ধাক্কা দিল মুসা, লাথি মারল, নাড়লও না পাল্লা।

শুঁটকি, জলদি দরজা খোলো! চেঁচাল রবিন।

জলদি, হুমকি দিল মুসা, নইলে বেরিয়ে দেখাব মজা।

বেরোতে তো হবে আগে, ওপাশ থেকে বলল টেরিয়ার। তারপর না মজা দেখানো। আমি যাচ্ছি, বুঝেছ? গরম তো টেরই পাচ্ছ। ঘাম শুকাও। ইস, হোমসের বাচ্চাটাকে পেলাম না, আফসোস, করল সে। ওটাকে শিক্ষা দেয়ার বেশি ইচ্ছা ছিল।

কিশোর তোমার মত গর্দভ নাকি? রেগে গেল রবিন। তোমার মত শুঁটকি?

চুপ! ধমক দিল টেরিয়ার। তার চেয়ে কিশোরের বুদ্ধি বেশি এটা কেউ বললেই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে সে। তোমরা গাধারা যে কি বিপদে পড়েছ, বুঝতে পারছ আশা করি?

বিপদে পড়বি ব্যাটা দুই, রাগে কাঁপছে মুসা। ভেবেছিস কি…

কি ভেবেছি? হাসি হাসি গলায় জবাব দিল টেরিয়ার, বলছি, শোনো। একজন ভদ্রলোকের বাড়ি চোরের হাত থেকে বাঁচিয়েছি। দুটো চোরকেই আটকেছি। এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, বাড়ির ভেতরে শব্দ শুনে সন্দেহ হলো। ঢুকে দেখি দুটো ছিঁচকে চোর।

পাগল! রবিন বলল। শুঁটকি যে শুঁটকিই। কে বিশ্বাস করবে তোমার কথা?

সবাই করবে, খিকখিক করে হাসল টেরিয়ার। সামনের দরজায় তালা। পেছনের দরজা তাহলে কে খুলল? তোমরা। নাহলে ঢুকলে কিভাবে? আবার হাসল সে। টনি পেদ্রো তোমাদের কথা বলার পর থেকেই চোখ রাখছিলাম ময়লার ডিপোটার ওপর। আজ বাচ্চা হোমসকে সঙ্গে নিয়ে বেরোতে দেখলাম ফোচাচাকে। কার মুরগীর মরা চামড়া কিনতে গেছে, কে জানে। তোমাদেরও বেরোতে দেখলাম, ঢুকতে দেখলাম, আবার বেরোতে দেখলাম। ধরেই নিলাম, ইবলিস দেখা করেছে তোমাদের সঙ্গে, কিছু একটা নিয়ে মেতেছ। পিছু নিলাম। হি-হি-হিহ!

নরকে পচে মরবি তুই, শুঁটকির বাচ্চা! গাল দিল মুসা। ইবলিস বলেছে বুঝি? হি-হিহ।

ইবলিস নয়, শুঁটকি, বোঝানোর চেষ্টা করল রবিন, মিস্টার ডাংম্যান। তিনি জানেন আমরা এখানে আছি। মিস পেদ্রোর কাজ করছি।

বোকা বানাতে চেয়ো না। টনি পেদ্রো আমাকে বলেছে, একটা দামী পুতুল খুঁজছে সে। তার ধারণা, তোমরা চুরি করেছ ওটা।

তোমার মুণ্ডু! চেঁচিয়ে উঠল মুসা। টনির সঙ্গে চুক্তি হয়ে গেছে আমাদের। ও-ই আমাদের অনুরোধ করেছে পুতুলটা খুঁজে দেয়ার জন্যে। তোর গিয়ে লটকে থাকা উচিত জেলেদের জালে, তা না করে ব্যাটা এখানে ভদ্রলোকের পাড়ায় আসিস কিশোর পাশার সঙ্গে পাল্লা দিতে। কিশোর তোর মত দূর?

কে ইঁদুর একটু পরেই বুঝবে। খাঁচায় তো সবে আটকেছ, দারুণ মজা পাচ্ছে টেরিয়ার, রাগছে না তাই। এতই যদি বুদ্ধি বাচ্চা হোমসের, কান্নাকাটি করে তাকেই ডাকো না, এসে তালা খুলে দিয়ে যাক। তো, থাকো তোমরা, ধূলো খাও। আমি বাড়ি যাচ্ছি। গুড বাই। করিডরে পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল।

অস্থির চোখে মুসার দিকে তাকাল রবিন, তারপর দরজায় গিয়ে কান ঠেকাল। নিচ তলায় নেমে যাচ্ছে টেরিয়ার। আরও খানিকক্ষণ পর নিচতলার দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো, যেটা দিয়ে ঢুকেছিল ওরা।

হতাশ চোখে একে অন্যের দিকে তাকাল দুই গোয়েন্দা। সরে এল দরজার কাছ থেকে। ভাল বিপদেই পড়েছে।

জানালায়ও শিক লাগানো, বলল মুসা। অন্য দরজাটায়ও তালা।

পুরানো বাড়ি। দেয়ালে কিংবা মেঝেতে নরম জায়গা থাকতে পারে। খোলা তক্তাক্তা।

সঙ্গে সঙ্গে কাজে লেগে গেল মুসা। মেঝেতে দুর্বল জায়গা খুঁজতে শুরু করল। নেই।

রবিন খুঁজল দেয়াল। পাথরের মত শক্ত, বিষণ্ণ কণ্ঠস্বর।

এখন কিশোর কিংবা ডাংম্যান তাড়াতাড়ি এলেই বাঁচি।

সাইকেল দুটো গলিতে আছে। কিশোরের চোখে পড়বে।

হ্যাঁ, বলল মুসা। তাহলে বুঝবে, আশেপাশেই আছি আমরা।

দুজনেই হাসল, কিন্তু প্রাণ নেই তাতে। নিজেদের সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছে, মনকে বোঝাচ্ছে, কিশোর এই এল বলে, ওদের উদ্ধার করবে। সময় যাচ্ছে।

দুর্বল গলায় এক সময় বলল রবিন, কিশোর না এলেও ডাংম্যান তো আসবেই। তার বাড়ি যখন।

ধরো, এল না।

তাহলে বেরোনোর উপায় আমাদেরকেই করতে হবে।

আবার সারাটা ঘর খুঁজল ওরা। নেই। জায়গামতই এনে তাদেরকে আটকেছে টেরিয়ার। _ রবিন! চেঁচিয়ে উঠল মুসা, একটা দরজার দিকে চেয়ে আছে। এটা ভেতরের দিকে খোলে। কজাগুলো দেখে যাও। ভেতরে।

স্ক্রু খোলার কথা ভাবছ

হ্যাঁ। সহজ কাজ।

স্ক্রু-ড্রাইভার থাকলে সহজ।

শক্ত ছুরি দিয়েও ভোলা যাবে, ভারি স্কাউট-নাইফটা বের করল মুসা, বিপদের আশঙ্কা থাকে এ-রকম কোন জায়গায় গেলে সঙ্গে নেয়।

যতটা সহজ মনে করল, কাজটা তত সহজ নয়। কজা আর স্কু পুরানো, জং পড়ে গেছে। ঘষে ঘষে আগে মরচে সাফ করল মুসা, তারপর ক্রু খোলার চেষ্টা চালাল।

১৪
ইয়ার্ডে পৌঁছেই আগে হেডকোয়ার্টারে ঢুকল কিশোর। মুসা আর রবিন ফেরেনি। মেসেজ-রিসিভার যন্ত্রটা দেখল, কোন মেসেজ নেই, ফোন আসেনি। বেরিয়ে এসে তাড়াতাড়ি থানায় ছুটল সে।

অফিসেই পাওয়া গেল পুলিশ চীফ ইয়ান ফ্লেচারকে।

এই যে, ইয়াং ডিটেকটিভ, এসো এসো, হেসে ডাকলেন তিনি। তারপর, কি মনে করে?

একটা কেস, স্যার, বলল কিশোর। আপনার সাহায্য লাগবে।

বসো, চেয়ার দেখালেন তিনি। খুলে বলল, কি হয়েছে?

বাসার সময় নেই, স্যার। ডাংম্যান…

ধীরে, কিশোর। গোড়া থেকে বলো, রিপোর্ট লিখতে হবে তো।

ঠিক আছে, বলল কিশোর। তবে দেরি করা যাবে না, স্যার। পুতুল কুড়িয়ে পাওয়া থেকে শুরু করল, যত তাড়াতাড়ি পারে শেষ করতে চায়।

থামো, থামো, হাত তুললেন চীফ। ভূতের ছায়া? নিশ্চয় ভুল করেছে রবিন আর মুসা। কল্পনা। তোমার কি মনে হয়?

না, স্যার, কাল রাতে আমিও শুনেছি। বিচ্ছিরি হাসি। লম্বা একটা ছায়া, তবে কুঁজো মনে হয়নি আমার। ওরা নাকি লম্বা নাকও দেখেছে, পাখির মাথার মত মাথা, ঝটকা দিয়ে দিয়ে নড়ছিল। কাল রাতে আমি আর মুসা ছায়াটার পিছু নিয়েছিলাম। উপত্যকায় গিয়ে এক জায়গায় একটা ট্রাক এল কোত্থেকে, চারজন মুণ্ডুশূন্য বামনকে নামাল।

কাশলেন চীফ। মুশুন্য বামন?

মাথা দেখা যাচ্ছিল না আরকি। চটের বস্তা দিয়ে ঢেকে রেখেছিল, যাতে কোথায় এসেছে না দেখতে পারে। বন্দী।

ওদেরই কেউ সেরাতে পুতুলটা ছুঁড়ে ফেলেছিল? সাহায্যের জন্যে চেঁচিয়েছিল?

তাই তো মনে হয়, স্যার। বামনদেরই কেউ চুরি করেছে পুতুলটা। তাতে মেসেজ ভরে বাইরে ছুঁড়ে দিয়েছে। আশা, কারও না কারও চোখে পড়বেই, উদ্ধারের ব্যবস্থা হবে।

বেশি আশা করেছে। নির্জন এলাকায় ঝোপের ধারে ফেলেছে ছোট্ট পুতুল, তাতে লুকানো কুঠুরীতে মেসেজ, তা-ও আবার বোঝা যায় না কিছু।

মরিয়া হয়ে উঠেছিল হয়তো। কিংবা, আশেপাশে তার বন্ধুরা ঘোরাঘুরি করছে জানত, তাদেরকেই ডেকেছে, পুতুল তাদের হাতে পড়বে বলেই ছুঁড়ে ফেলেছে। ওরা পায়নি, আমাদের হাতে এসে পড়ল। আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিল দুই বাদামী চামড়ার লোক।

বাদামী চামড়া? খুলে বলল সব কিশোর।

ওরা? স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন এতক্ষণে চীফ। কিশোর আবল-তাবল কথা বলে না, জানেন। তাই ভূতুড়ে ছায়া আর মাথাশূন্য বামনদের কথা শুনে দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলেন। যাক, বাস্তব কিছু পাওয়া গেল। হ্যাঁ, ওদের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেয়া যায়। চলো, ডাংম্যানের ওখানেই যাই আগে।

দুজন পুলিশ সঙ্গে নিলেন চীফ। শহরতলীতে ঢুকল পুলিশের গাড়ি। নির্জন পথ ধরে ছুটছে।

দূর থেকেই গথিক-বাড়িটার গাড়িবারান্দায় ডাংম্যানের গাড়িটা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল কিশোর। বাড়িতেই আছে। ওই যে গাড়ি।

বেল বাজানোর আগেই সদর খুলে গেল। ডাংম্যান। কিশোরকে দেখে উদ্বিগ্ন হলো, ওরা কোথায়? রবিন আর মুসা?।

নেই? আমি তো ভাবছিলাম, এখানেই আছে। টনিকে দেখেছেন?

না। স্যালভিজ ইয়ার্ডের কাছে তার গাড়ি দেখলাম মনে হলো। ছুটে গেলাম, কিন্তু মোড় পেরিয়ে আর দেখলাম না গাড়িটা। ইয়ান ফ্লেচারের দিকে তাকাল, এই প্রথম যেন চোখে পড়ল।

ইনি ইয়ান ফ্লেচার, লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশের চীফ, পরিচয় করিয়ে দিল কিশোর। আপনার কথামতই থানায় গিয়েছিলাম।

আপনি এসেছেন খুব ভাল হয়েছে, চীফ, স্বভাব-বিনীত গলায় বলল ডাংম্যান। সমস্যায় পড়ে গেছি। দুজন লোক মারার চেষ্টা করল আমাকে। আমিষভোজী ফ্যানাটিক হবে-টবে প্রথমে ভেবেছি। কিন্তু কিশোর আমার মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে অদ্ভুত সব কথা বলে।

ভূতুরে ছায়া আর মুণ্ডুশূন্য বামন? বললেন চীফ।

হ্যাঁ। বেশি কল্পনা করে বোধহয় ছেলেটা। তবে, মিস পেদ্রোর সোনার পুতুল চুরি হয়েছে, এটা সত্যি।

চিন্তিত মনে হলো চীফকে। চাম্যাশ হোর্ডের কথা এখানকার অনেকেই শুনেছে, আমিও শুনেছি। থাকলে থাকতেও পারে।

ওসব সোনা-দানার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই আমার, হাত নাড়ল ডাংম্যান। আমি ভাবছি মুসা আর রবিনের কথা। কোথায় গেল?

খোঁজা দরকার, বললেন চীফ।

বাড়ির ভেতরে অনেক জায়গায় খোঁজা হলো। নেই।

দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল কিশোর। গেল কই?

চোরগুলোর পিছু নেয়নি তো? ভুরু কোঁচকালো ডাংম্যান।

নিতেও পারে, চীফ বললেন।

কিন্তু তাহলে আমাকে জানানোর ব্যবস্থা করত, কিশোর মেনে নিতে পারছে না।

সুযোগই পায়নি হয়তো। চোরগুলোর পিছু নিয়ে থাকলে ভাবনার কথা। বিপদ। হতে পারে।

মুখ কালো হয়ে গেছে কিশোরের।

লক্ষ করলেন চীফ। কিছু বললেন না।

ডাংম্যানের অফিসে ঢুকল ওরা। সেফ খুলে ছোট একটা বাক্স বের করে নিয়ে টেবিলের কাছে চলে গেল সে। খাবারের এঁটো আর মোড়কের কাগজ পড়ে আছে।

বেল শুনে উঠে গেলাম, সলজ্জ হাসল ডাংম্যান, ফেলার সময় পাইনি। কাগজ দলেমুচড়ে ঝুড়িতে ফেলল সে, খাবারের টুকরো পরিষ্কার করল। বাক্স খুলে পুতুলটা বের করে বাড়িয়ে দিল। এই যে, এটা নিয়েই গোলমাল। চোরগুলো বার বার আক্রমণ করছে আমাকে।

পুতুলের গোপন কুঠুরি খুলল কিশোর। চীফের দিকে ফিরল, মেসেজ নেই।

থাক না থাক, ওসব জেনে কাজ নেই আমার, বলল ডাংম্যান। জিনিসটা পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি, ব্যস, এবার আমি নিশ্চিন্ত। চুরি আর হবে না।

চোরগুলো কোথায়, হয়তো রবিন আর মুসা বলতে পারবে, বললেন চীফ। কিশোর, এসো, খুঁজি।

হ্যাঁ হ্যাঁ, দেখুন, ডাংম্যান বলল। কিশোর, নতুন কিছু খবর পেলেই আমাকে জানিও ! আমি আছি আজ এখানেই। কাল এস্টেটে যাব, টনির সঙ্গে কথা আছে।

বাড়ির ভেতরে পাওয়া গেল না রবিন আর মুসাকে।

বেরিয়ে পুলিশ দুজনকে নিয়ে গাড়ির দিকে চললেন চীফ। পেছনে আস্তে আস্তে হাঁটছে কিশোর, চারপাশে তাকাচ্ছে, চিহ্ন খুঁজছে। দুটো বাড়ির মাঝের একটা গলির দিকে চোখে পড়ল তার। কপালে হাত রেখে রোদ আড়াল করে ভালমত দেখল।

চীফ! চেঁচিয়ে উঠল সে, দেখুন। টায়ারের দাগ।

গলির দিকে ছুটল কিশোর। পেছনে ফ্লেচার।

এখানে ছিল ওরা, দেখতে দেখতে বলল কিশোর। এই যে, দেখুন, সাইকেলের টায়ারের দাগ। আর এই যে এটা দেখছেন, পাথর দিয়ে বানানো খুদে একটা পিরামিড মত জিনিস দেখাল। মুসার কাজ। চুপচাপ বসে থাকতে পারে না, হাতের কাছে পাথর পেলেই এরকম বানায়।

নিশ্চয় তাহলে কারও পিছু নিয়ে গিয়েছে, বললেন ফ্লেচার।

গলিটার দুই দিকেই তাকাল কিশোর। বুঝতে পারছি না। গেলে তো চিহ্ন রেখে যেত, চকের দাগ। দেয়ালগুলো দেখল ভাল করে। নেই।

হয়তো সময় পায়নি। নাকি অফিসে গিয়ে একটা অল পয়েন্ট বুলেটিন ছাড়ব?

বাড়ি গিয়ে দেখি আগে, ফিরেছে কিনা।

হ্যাঁ, চলো। ভূতুড়ে ছায়াটার কথা ভাবছি। চোরদের কেউ না তো?

না, স্যার। ওরা বেঁটে, ছায়াটা অনেক লম্বা। টনির সমান।

কিন্তু টনির গলা চেনো তোমরা।

চিনি। কিন্তু ইচ্ছে করলে খানিকটা বদলে নেয়া যায়, জানেনই তো। তবে, হাসিটা মানুষের মনে হলো না। মানুষ ওরকম হাসে না।

তো কি? সেটাই তো ভাবছি।

এডগার অ্যালান পোর সেই গল্প মনে পড়ে যাচ্ছে, হাসলেন চীফ। কেউ চিনতে পারছিল না খুনীর গলা, কথা বলে না, শুধু বিচিত্র শব্দ করে। মানুষের কণ্ঠের মত নয়। বানর জাতীয় না, ঝট করে দেয়ালের দিক থেকে চোখ ফেরাল কিশোর। অস্ট্রেলিয়ায় এমন কি জীব আছে স্যার, যেটা হাসে?

মানে?

ঠোঁট কামড়াল কিশোর, চোখ মুখ কুঁচকে গেছে। কি যেন একটা আছে, স্যার, মনে পড়ি পড়ি করেও পড়ছে না। আচ্ছা, টনির কথায় টান আছে। বলেছে ইংল্যাণ্ড থেকে এসেছে, মিছে কথাও হতে পারে। হয়তো অস্ট্রেলিয়ান। আসল টনি নয় সে।

তাহলে ডাংম্যানের কথা বাদ দিচ্ছে কেন? তার কথায়ও তো টান রয়েছে।

উজ্জল হলো কিশোরের চোখ। অস্ট্রেলিয়ান টান? ব্রিটিশ যে নয়, এটা

ঠিক।

বোঝা যায় না। অস্ট্রেলিয়ান পুলিশের সঙ্গে কথা বললেই বুঝতে পারব, লোকটার বদনাম থাকলে জানাবে। চলো যাই।

কিশোরকে স্যালভিজ ইয়ার্ডের গেটে নামিয়ে দিয়ে গেল পুলিশের গাড়ি।

সোজা এসে হেডকোয়ার্টারে ঢুকল সে। রবিন আর মুসা নেই। কোন মেসেজও পাঠায়নি।

দুজনের বাড়িতে ফোন করল কিশোর। জানল, দুপুরে খেয়ে যে বেরিয়েছে, আর ফেরেনি।

আর নিশ্চিন্ত থাকা যায় না। পুলিশ হেডকোয়ার্টারে ফোন করে চীফকে খরবটা জানাল কিশোর। তারপর ফোন করল রেন্ট-আ-রাইড অটো কোম্পানিতে। রোলস-রয়েস গাড়িটা দরকার।

১৫
পনেরো মিনিট পর সবুজ ফটক এক দিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে এল কিশোর। উঠল রাজকীয় রোলস-রয়েসে। চকচকে কালো শরীরে সোনালি অলঙ্করণ, চমত্তার একটা গাড়ি, যদিও মডেলটা পুরানো।

ভেজিট্যারিয়ান লীগ, হ্যানসন। জলদি, ঠিকানা বলল কিশোর।

ছুটতে শুরু করল রোলস-রয়েস। ইঞ্জিনের শব্দ প্রায় নেই বললেই চলে। উড়ে চলল যেন। দেখতে দেখতে এসে পড়ল লা পামা স্ট্রীটে। উৎকণ্ঠায় দুলছে কিশোরের মন, জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে, যেন আশা করছে, যে-কোন

মুহূর্তে বাদামী চোরদেরকে দেখা যাবে।

রোলস রয়েসটা গথিক-বাড়ির রকখানেক দূরে থাকতেই শাঁ করে ছুটে এল ডাংম্যানের গাড়ি। ধুলোর মেঘ উড়িয়ে চলে গেল পাশ দিয়ে। চেঁচিয়ে ডাকল কিশোর, কিন্তু লোকটার কানেই যেন ঢুকল না। তাকালও না রোলস-রয়েসের দিকে। স্টিয়ারিঙের ওপর নুয়ে রয়েছে, গভীর।

চেনেন নাকি? জিজ্ঞেস করল হ্যানসন। পেছনে যাব?

না, দ্রুত দূরে সরে যাওয়া গাড়িটার দিকে চেয়ে আছে কিশোর, চিন্তিত। বলল আজ বেরোবে না, মুসা আর রবিনের খবর শোনার অপেক্ষায় থাকবে। তাহলে? নতুন কিছু ঘটল?

গথিক-বাড়ির সামনে এসে থামল রোলস-রয়েস। ঝটকা দিয়ে দরজা খুলে বুলেটের মত বেরোল কিশোর, ছুটল বাড়ির সদর দরজার দিকে। তার পেছনে এল হ্যানসন। দরজা খোলা। ছুটে ঢুকে পড়ল কিশোর। কান খাড়া।

শুনছেন কিছু? হ্যানসনকে জিজ্ঞেস করল।

না, মাথা নাড়ল ইংরেজ শোফার।

আশ্চর্যবোধক চিহ্ন দেখা যায় কিনা দেখুন।

ওরা কোন বিপদে পড়েছে?

জানি না, বলল কিশোর। পুলিশের ধারণা কারও পিছু নিয়ে গেছে। হয়তো তাই। কিন্তু তাহলেও কোন চিহ্ন রেখে যাবে।

হ্যাঁ, শান্তকণ্ঠে বলল হ্যানসন।

ওপরের সব ঘর খোঁজা হয়েছে। আপনি গিয়ে দেখুন আরেকবার। আমি বাইরে গিয়ে দেখি।

ঠিক আছে।

পুরো রকটা খুঁজে দেখল কিশোর, দেয়াল, বেড়া, পথ, সব। গাছ, কাঁচা রাস্তায়ও সঙ্কেত খুঁজল, নেই। পাশরের পিরামিডটা ছাড়া আর কোন নিশানাই রেখে যায়নি ওরা।

বাড়িতে এসে ঢুকল আবার কিশোর।

সিঁড়ি দিয়ে নামছে হ্যানসন। মাথা নাড়ল, কিচ্ছু নেই।

ঠোঁট কামড়াল কিশোর। ডাংম্যান গেল কোথায়? এত তাড়াহুড়ো করে? আনমনে বলল সে।

হয়তো মিস্টার ফ্লেচার ডেকেছেন। আচ্ছা, গ্রাউণ্ড ফ্লোর কিন্তু দেখলাম না।

আমি তখন দেখেছি ভালমতই।

মিসও তত হতে পারে। অনেকবার দেখলে ক্ষতি কি?

রাজি হলো কিশোর। কয়েকটা ঘরে দেখে গিয়ে ঢুকল ডাংম্যানের অফিসে। দেয়াল, মেঝে, আসবাবপত্র, সব দেখল, কোথাও কোন চিহ্ন নেই।

ডেস্কের ওপর থেকে ময়লা ফেলার ঝুড়ির দিকে চোখ ফেরাল কিশোর। সরে আসতে গিয়েও থমকে গেল। ঝুঁকে ঝুড়ি থেকে তুলে নিল একটা কাগজ। চেঁচিয়ে উঠল হঠাৎ, হ্যানসন, দেখুন।

ছুটে এল শোফার। মোম মাথানো কাগজটা নিল কিশোরের হাত থেকে। স্যাণ্ডউইচের কাগজ। এতে এমন কি দেখার আছে?

দাগগুলো দেখছেন? গন্ধ শুকে দেখুন।

দেখল হ্যানসন। সরিষা, আর মাংসের গন্ধ। তেলের দাগ। স্যাণ্ডউইচে থাকবেই।

কিন্তু হ্যানসন, মিস্টার ডাংম্যান ভেজিট্যারিয়ান। লীগের প্রেসিডেন্ট, নিরামিষভোজীদের সর্দার। বুঝলেন না? শজিভোজীদের যে নেতা মাংস আর সরিষা খায়, সে একটা ভণ্ড।

এগুলো ডাংম্যানই খেয়েছে, আপনি শিওর?

শিওর মানে? ও নিজে বলেছে তখন, পুলিশের সামনে। সে ভণ্ড, তারমানে পুরো লীগটাই একটা ভোগলামী। গল্প শুনিয়েছে, অনেক বড় সংগঠন আছে ডাংম্যানের, অনেক দেশ ঘুরে এবার রকি বীচে এসেছে নিরামিষভোজীর সংখ্যা বাড়াতে, সব শয়তানী, এখন বুঝতে পারছি। কোথাও কোন সংগঠন নেই তার।

এ-তো রীতিমত ক্রাইম, তীক্ষ্ণ হলো হ্যানসনের কণ্ঠ। কি কারণ থাকতে পারে? লোক ঠকিয়ে টাকা আদায়?

না, অন্য কিছু। সে জেনেছে, মিস ভেরা পেদ্রো নিরামিষভোজী, হয়তো ইংল্যাণ্ডে টনিই তাকে জানিয়েছে সেকথা। জেনেছে চাম্যাশ হোর্ডের কথা। টনিকে ব্যবহার করার ইচ্ছেয় যোগাযোগ করেছে মিস, পেদ্রোর সঙ্গে, নিরামিষভোজীদের প্রেসিডেন্ট বলে নিজেকে চালিয়ে দিয়ে খাতির করেছে। পেদ্রোজ এস্টেটে ঢোকার খুব চমৎকার এবং সহজ বুদ্ধি।

টনি কে?

জানাল কিশোর। সোনার পুতুল ছিনতাইয়ের কথাও বলল।

এমনও তো হতে পারে, শুনে বলল হ্যানসন, চাম্যাশ হোর্ডের কথা আগে থেকেই জানে ডাংম্যান। ওগুলো খুঁজে বের করার প্ল্যান করেছে। সেই প্ল্যানমাফিকই যেচে এসে পরিচিত হয়েছে টনির সঙ্গে।

হুঁ, হতে পারে। টনিকে দিয়েও এমন কাজ করিয়েছে, যাতে ওর ওপর চোখ পড়ে আমাদের, সন্দেহ হয়, গুঙিয়ে উঠল কিশোর। ইস, আমি একটা গাধা! সব কথা বলে দিয়েছি ডাংম্যানকে। হায় হায়রে, হুঁশিয়ারও করে দিয়েছি।

বুঝে তো আর বলেননি, সান্তনা দেয়ার জন্যে বলল হ্যানসন। সব্বাইকে বোকা বানিয়েছে ব্যাটা, মহা-ধড়িবাজ।

হ্যাঁ, মাথা কাত করল কিশোর। সব কিছুর মূলেই হয়তো সে। ওই ভূতুড়ে ছায়া, মুণ্ডুশূন্য বন্দি, ঝট করে মুখ তুলল সে। হ্যানসন! জলদি চলুন। পুলিশ হেডকোয়ার্টার।

চলুন। কোন প্ল্যান করেছেন?

না। তবে ডাংম্যান আরেক শয়তানী করেছে। এস্টেট থেকে বেরিয়ে এখানে পৌঁছতে অনেক দেরি হয়েছে তার, সেটা আমাদের জানার কথা নয়। সে-ই জানিয়েছে। তার ভয়, কৈফিয়ত চেয়ে বসব। তাই আমরা জিজ্ঞেস করার আগেই কৈফিয়তও দিয়ে দিয়েছে, স্যালভিজ ইয়ার্ডে নাকি টনিকে খুঁজতে গিয়েছিল, তাই আসতে দেরি হয়েছে। সব মিথ্যে কথা। আমরা আসার অনেক আগেই এখানে এসেছে। তারমানে রবিন আর মুসার নিখোঁজ হওয়ার পেছনে তার হাত রয়েছে।

১৬
মরচে ধরা পুরানো একটা লোহার টেবিলের সামনে বসে আছে ডাংম্যান। চেয়ে রয়েছে রঙচটা কাঠের দেয়ালের ধারে বসা মুসা আর রবিনের দিকে।

সত্যি বলছি, তোমাদের ব্যথা দিতে খুব খারাপ লাগছে আমার, হাসল ডাংম্যান।

জবাব দিল না দুই গোয়েন্দা। কি বলবে? শক্ত করে হাত-পা বাঁধা। কোথায় রয়েছে, জানে না। শুধু জানে, একটা পাহাড়ী অঞ্চলে রয়েছে। চোখ বেঁধে নিয়ে আসা হয়েছে এখানে ওদের। দরজার গুলো সব খুলে ফেলেছিল মুসা, ঠেলা দিতেই বাড়ি কাঁপিয়ে দড়াম করে পড়েছিল পান্না, সেই শব্দ শুনে উঠে এসেছিল ডাংম্যান।

পালাতে পারেনি ওরা। ডাংম্যান আর তার দুই চেলা মিলে ধরে ফেলেছে ওদের, চোখের পলকে হাত-পা-মুখ বেঁধে এনে তুলেছে একটা ট্রাকে। সাইকেল দুটোও তুলে নিয়েছে ট্রাকে। তারপর তাদেরকে নিয়ে আসা হয়েছে এখানে।

অন্যের ব্যাপারে নাক গলানো উচিত হয়নি তোমাদের, বুঝতে পারছ তো? হাসল ডাংম্যান। চুরি করে আমার বাড়িতে ঢুকেছ, কাজটা ভাল করোনি। আইনের চোখে অপরাধু! পুলিশে দিতে পারতাম, কিন্তু তার চেয়ে এখানে নিয়ে আসাটাই আমার জন্যে নিরাপদ হয়েছে। পুলিশ গেছে আমার বাড়িতে, কিশোরও ছিল তাদের সঙ্গে। না না, বেশি আশা করো না, ওরা কিছুই পায়নি। তোমাদের সমস্ত চিহ্ন নষ্ট করে দিয়েছি। কিছুই বুঝতে পারোনি।

থাকো এখানে, আমার মেহমান হয়ে। কদ্দিন? তা, আমি যতদিন না যাচ্ছি। তবে এখানকার কাজ ফুরিয়ে এসেছে আমার, আর বেশি সময় লাগবে না।

ধৈর্যের বাধ ভাঙল রবিনের। তুমি একটা চোর।

চাম্যাশ হোর্ড চুরির তালে আছ, ঝাঁঝাল কণ্ঠে বলল মুসা।

হা-হা করে হেসে উঠল ডাংম্যান। তোমরা চালাক ছেলে। ঠিকই আন্দাজ করেছ। আজ রাতেই বের করে আনব ওগুলো।

ছেলেদেরকে আরেকবার দেঁতো হাসি উপহার দিয়ে ঘুরে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল ডাংম্যান।

নীরবে একে অন্যের দিকে তাকাল দুই গোয়েন্দা। জানালার ময়লা কাচের, ভেতর দিয়ে দেখতে পাচ্ছে, সূর্য ডুবছে। রাতের দেরি নেই, ডাংম্যানকে থামানোর কোন উপায় বের করতে পারছে না ওরা।

পেদ্রোজ এস্টেটের কোথাও রয়েছি, অনুমানে বলল মুসা।

কোন চিহ্নও তো রেখে আসতে পারলাম না। দরজাটা অবশ্য ভাঙা…।

ভাঙা নয়, ভ্রু খুলেছিলাম শুধু, শুধরে দিল মুসা। বলল না, কোন চিহ্ন রাখেনি। আমাদেরকে পাঠিয়ে দেয়ার পর নিশ্চয় আবার দরজা লাগিয়ে ফেলেছে। সাইকেলেদুটোও নিয়ে এসেছে, কেউ কিছু বুঝবে না।

হ্যাঁ। দেয়ালে-টেয়ালে চিহ্নও আঁকতে পারলাম না, সময়ই দিল না ব্যাটারা।

তবু, কিশোর আমাদের খুঁজে বের করবেই, বন্ধুর ওপর অগাধ আস্থা মুসার। বাঁধন খোলা গেলে আমরাও চেষ্টা করতে পারতাম।

দরজায় দেখা দিল ডাংম্যান। হাসতে হাসতে ঢুকল কেবিনে। পরাস্ত হবে না কিছুতেই, আঁ। তোমাদের প্রশংসা না করে পারছি না।

এসব করে পার পাবে না তুমি, কঠিন গলায় বলল মুসা।

হাসি মুছল না ডাংম্যানের মুখ থেকে। খুব পাব। তোমরা আমাকে সুযোগ করে দিয়েছ আরও। কিশোর আর পুলিশ থাকবে তোমাদের খোঁজে, বাদামী চোরদুটোর খোজে, আমাকে সন্দেহ করার সুযোগই পাবে না। দারুণ হয়েছে।

কিশোর পাশাকে চেনো না তুমি, ডাংম্যান, বলল রবিন। তোমার পরিণতি আমি এখনই বলে দিতে পারি। জেল।

নাহ্, তা আর হচ্ছে না, দৃঢ় আত্মবিশ্বাসে বলল ডাংম্যান। অনেক সময় নিয়ে অনেক ভাবনাচিন্তা করে প্ল্যান করেছি, প্ল্যানমাফিক কাজ করেছি, কয়েকটা ছেলে আর ছোট্ট শহরের কয়েকটা পুলিশ আমাকে ঠেকাবে এখন? পারবে না। আমার কথা শুনবে? আমারও সুবিধে, তোমাদেরও।

না, শুনব না, সাফ জবাব দিল মুসা।

হুঁ, সাহস আছে। তবে বোকামি করছ। অবশ্য দুনিয়ায় বোকার সংখ্যাই বেশি, নইলে আমার কপালে চাম্যাশ হোর্ড থাকত না। অনেক আগেই অন্য কেউ তুলে নিয়ে যেত।

এত আশা করছ কেন? রবিন বলল। না-ও তো পেতে পারো।

পাবো, মাই বয়, পাবো। ম্যাগনাস ভারদির ছোট্ট ধাধার সমাধান আমি করে ফেলেছি। আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চাম্যাশ হোর্ড এসে যাবে আমার হাতে। ছেলেদের দিকে চেয়ে ডাংম্যানের চোখের পাতা কাছাকাছি হলো। তখন তোমাদের একটা ব্যবস্থা করা যাবে।

বলে ঘুরল সে। দরজার নবে হাত রেখে ফিরে চাইল। পালানোর চেষ্টা কোরো না, লাভ হবে না। পাহাড়ের ওপরে এই কেবিন, তিন ধারে একশো ফুট গভীর খাদ। এক দিক দিয়ে শুধু সরু একটা পথ, তাতে লোক পাহারা রেখেছি। গলাকাটা এক ডাকাত সে। সারাক্ষণ কেবিনের দরজায় চোখ রাখছে। কাজেই পালাতে পারছ না তোমরা।

জোরে আরেকবার হেসে উঠে বেরিয়ে গেল ডাংম্যান।

বাইরে থেকে তালা লাগানোর ক্লিক শব্দ শোনা গেল।

পিছমোড়া করে হাত বাধা হয়েছে, খোলার চেষ্টা করল মুসা। খানিকক্ষণ টানাটানি করে ব্যর্থ হয়ে বলল, রবিন, আমার পিঠে পিঠ ঠেকাতে পারবে? গড়িয়ে চলে এসো তো।

দুজনেই রুক্ষ মেঝেতে গড়িয়ে গড়িয়ে কাছাকাছি হলো, পিঠে পিঠ ঠেকাতে পারল।

রবিনের কজির বাঁধন খোলার চেষ্টা শুরু করল মুসা। দরদর করে ঘাম ঝরল কপাল থেকে, দাঁতে দাতে চাপল সে। মনে হলো, যুগ যুগ পেরিয়ে গেছে, আঙুল ব্যথা হয়ে গেল, কিন্তু কিছুই করতে পারল না। ক্লান্ত হয়ে হাল ছেড়ে দিল।

নাগালই পাই না, হাঁপাচ্ছে সে।

নাগাল পাওয়ার জন্যে কি আর বেঁধেছে, রবিন বলল।

ছুরিটাও নিয়ে গেছে হারামজাদা। দাতে কামড়ে ধরে…

দাঁত! শুয়ে পড়ো তো। কাত হয়ে।

রবিন শুয়ে দুই মোচড় দিয়ে সরে এল খানিকটা, মুখ নামিয়ে আনল মুসার হাতের কাছে। কজির দড়ি বেশ ভালমতই নাগাল পেল দাঁত দিয়ে। গিঁট কামড়াতে লাগল। লালা লেগে সামান্য নরম হলো দড়ি, প্রথম গিটটা কামড়ে ধরে টানাটানি করতে লাগল, কাঁচা মাংস কামড়ে ধরে কুকুর যেভাবে দু-পাশে মুখ-মাথা নেড়ে টেনে ছেড়ার চেষ্টা করে, সেভাবে।

কিছুক্ষণ টানাটানি করে থামল সে, জিরিয়ে নিয়ে আবার শুরু করল।

তিনবারের মাথায় চিল হতে লাগল গিঁট।

চেঁচিয়ে উঠল মুসা, হচ্ছে! টের পাচ্ছি। আরও জোরে।

প্রথম গিটটা খুলে গেল। দ্বিতীয়টা খোলা আরও সহজ হলো।

বাঁধন মুক্ত হয়ে উঠে বসল মুসা, খুলে ফেলল পায়ের বাঁধন। এরপর রবিনের বাঁধন খোলাটা কোন ব্যাপারই না।

ডলাডলি করে বাধনের জায়গাগুলোতে রক্ত চলাচল সহজ করে নিল দুজনে। তারপর উঠে এসে দাঁড়াল জানালার কাছে। মুসা সামনের জানালায়, রবিন পেছনের।

মুসা বলল, গার্ডটাকে দেখতে পাচ্ছি। অন্ধকারেও ওর চোখ এড়িয়ে যেতে পারব না, এমন জায়গায় রয়েছে।

সব চেয়ে উঁচু চূড়াটার ওপাশে নেমে গেছে সূর্য। এপাশে আলো কমছে। রাত নামল বেশ তাড়াতাড়ি।

এদিক দিয়েও সম্ভব না, রবিন বলল। কয়েক ফুট পরেই খাদ। নাহ, যাওয়ার আশা বাদ।

ঘরের মাঝে রাখা টেবিলের কাছে ফিরে এল দুই গোয়েন্দা।

টেবিলে রাখা লণ্ঠনের কাচে হাত বোলাতে বোলাতে বলল মুসা, কোথায় আছি অনুমান করতে পারছি। পশ্চিমে গিরিপথটা দেখা যায়। পর্বতের মধ্যে কোথাও রয়েছি আমরা, মিস পেদ্রোর বাড়ি থেকে মাইল পাচেক দূরে।

সঙ্কেত পাঠালে কেমন হয়, লণ্ঠনটার দিকে তাকিয়ে আছে রবিন। পাঁচ-ছয় মাইল দূর থেকে দেখা যাবে রাতের বেলা।

প্রথমে কিছু বুঝল না মুসা। কিন্তু রবিনকে লণ্ঠনের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে-ও তাকাল। ঠিক বলেছ। কিন্তু লণ্ঠন জ্বালাতে দেশলাই লাগবে।

লণ্ঠন যখন আছে, নিশ্চয় দেলাইও আছে, টেবিলের ড্রয়ার টান দিয়ে খুলল রবিন। এই যে আছে, বললাম না।

দুজনেরই মুখ উজ্জ্বল হলো। মোর্স কোড জানা আছে, রাতে এস ও এস পাঠাতে পারবে। কারও চোখে পড়ার সম্ভাবনা অবশ্য খুবই ক্ষীণ, তবু বলা তো যায় না। যদি পড়ে গেল?

পেছনের জানালার দিকে চেয়েই চমকে উঠল মুসা।

কি হলো? বলতে বলতেই ফিরল রবিন, দেখে স্থির হয়ে গেল সে-ও।

জানালার বাইরে একটা মুখ। বাদামী চামড়া।

পাল্লা খুলে ফেলে একে একে ভেতরে ঢুকল দুজন লোক। পরনে বিচিত্র সাদা পোশাক। হাতে লম্বা, বাঁকা ফলাওয়ালা ছুরি।

১৭
হুড়মুড় করে অফিসে ঢুকল কিশোর আর হ্যানসন।

ডেস্কের ওপাশে বসে আছেন ইয়ান ফ্লেচার। দুজনকে ওভাবে ঢুকতে দেখে ভুরু কোঁচকালেন।

ডাংম্যান একটা ভণ্ড, স্যার! কণ্ঠস্বর সংযত রাখতে কষ্ট হচ্ছে কিশোরের। হোর্ভ চুরির তালে আছে ব্যাটা। তাড়াহুড়ো করে চলে যেতে দেখলাম ওকে। নিশ্চই পেদ্রোজ এস্টেটে গেছে। আমি শিওর, মুসা আর রবিন ওখানেই আছে। স্যাণ্ডউইচের মোড়কটা ঠেলে দিল সে।

কাগজটা দেখলেন চীফ, নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শুকলেন। হুঁ, খায় আমিষ, করে ভেজিট্যারিয়ান লীগ। মিলে যাচ্ছে।

কী?

আমি যা জেনেছি, কিশোরের কৌতূহল দেখে মিটিমিটি হাসছেন চীফ। দুনিয়ায় তোমরাই একমাত্র ডিটেকটিভ নও। হ্যাঁ, অস্ট্রেলিয়ান পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছি। টনি পেদ্রোর ব্যাপারে ওরা কিছু জানে না, তবে ফগ ডাংম্যানের নাম অবশ্যই জানে।

কি জেনেছেন, স্যার?

উঠে দাঁড়ালেন চীফ। চলো, যেতে যেতে বলব। দেরি করা ঠিক না। বাদামী চোর দুটোকে পাইনি, কিন্তু আমার ধারণা, ডাংম্যানকে ধরতে পারলেই ওদেরও পেয়ে যাব। মিস্টার মিলফোর্ডকে ফোন করে দিয়েছি, পথে তুলে নেব। মুসার বাবাকে পাইনি, বেরিয়ে গেছে।

যাচ্ছি কোথায়? জানতে চাইল কিশোর।

পেদ্রোজ এস্টেট। তোমার ধারণা বোধহয় ঠিক। ওখানেই পাওয়া যাবে শয়তানটাকে।

রোলস-রয়েসটা নিয়ে যাই, প্রস্তাব দিল কিশোর। ডাংম্যান ওটা চেনে না। পুলিশের গাড়ি দেখলেই পালাবে।

মন্দ বলনি। ঠিক আছে, আমি ওতে চড়েই যাব। আমার লোককে বলি, পুলিশ-কার নিয়ে পিছে আসুক।

চারজন পুলিশকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে রোলস-রয়েসে উঠলেন চীফ। কিশোর আগেই উঠেছে। গাড়ি ছেড়ে দিল হ্যানসন। রবিনদের বাড়ি থেকে তার বাবাকে তুলে নেয়া হলো।

উঠেই জিজ্ঞেস করলেন মিস্টার মিলফোর্ড, ওদের খোঁজ পেয়েছেন, চীফ?

না, তবে পাবো।

ব্যাপার কি?

জানালেন ফ্লেচার। শেষে বললেন, ভাল কাজ দেখিয়েছে ছেলেরা। ওদের নিয়ে গর্ব করা উচিত আপনাদের, এমন ছেলের বাপ হয়েছেন। ওরা না থাকলে সাংঘাতিক বিপদে পড়ত টনি আর তার দাদী। আমরা জানতে জানতে দেরি হয়ে যেত। সব্বাইকে বোকা বানিয়েছে ডাংম্যানের বাচ্চা! পুলিশী মেজাজ ঠাণ্ডা রাখলেন জোর করে।

কে লোকটা? অস্বস্তি বোধ করছেন মিস্টার মিলফোর্ড। ইয়ান ফ্লেচার তার বন্ধু, অনেক দিন থেকে চেনেন। সহজে রাগেন না চীফ, রেগেছেন যখন, ব্যাপার গুরুতর।

চোর, ভণ্ড, ওই যে কিশোর যা যা বলেছে, আঁকাবাকা গিরিপথের দিকে চেয়ে বললেন চীফ। দিনের আলো শেষ। সিডনি-পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছি। ডাংম্যানের নামে ওয়ারেন্ট আছে ওখানে। সাংঘাতিক এক ঠগ, ধোকাবাজ, প্রতারক, চোর-উঁচু উঁচু বাড়িতে দড়ি কিংবা পানির পাইপ বেয়ে উঠে চুরি করেছে। মানুষ ধরে নিয়ে গিয়ে আটকে রেখে টাকা আদায় করেছে। এমন কোন কুকর্ম নেই, যা সে করেনি। একেক জায়গায় গিয়ে একেক সংগঠনের দোহাই দিয়ে মানুষকে ঠকিয়েছে। মেকসিকোতেও পুলিশ খুঁজছে তাকে। এমন কি সহজ সরল ইনডিয়ানদেরকেও ফাঁকি দিয়েছে সে।

মেকসিকো? বলল কিশোর। কবের ঘটনা?

একবার তো যায়নি, কয়েকবার। তবে শেষ গিয়েছিল নাকি বছরখানেক আগে। অস্ট্রেলিয়ান পুলিশের ধারণা, তারপর থেকেই আছে ক্যালিফোর্নিয়ায়।

তাহলে বছরখানেক আগেই জেনেছে চাম্যাশ হোর্ড আর মিস পেদ্রোর কথা।

মনে হয়। মহিলার ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পড়েছে হয়তো পত্রিকায়, বললেন চীফ। তখনই ঠিক করেছে, ইংল্যাণ্ডে গিয়ে টনির সঙ্গে দেখা করবে।

পাহাড়ী পথ ধরে উঠে চলেছে রোলস-রয়েস। অনেক পেছনে রয়েছে পুলিশের হ্যানসন গাড়ি। কালো বিশাল গেটটা দেখা গেল, খোলা। গতি না কমিয়েই মোড় নিয়ে ঢুকে পড়ল হ্যানসন। শক্তিশালী এঞ্জিনের কোনরকম বিকার নেই, প্রতিবাদ জানাল শুধু মোটা টায়ার।

স্প্যানিশ-স্টাইল বিরাট বাড়ির সামনে এনে গাড়ি রাখল হ্যানসন। একটা ঘরেও আলো নেই, নির্জন মনে হচ্ছে। প্রাণের সাড়া নেই কোথাও।

রোলস-রয়েস থেকে নামল সবাই।

কেউ নেই নাকি? নিচু গলায় বললেন চীফ।

তাই তো মনে হয়, কিশোর বলল।

ঢুকে দেখা দরকার, বললেন মিস্টার মিলফোর্ড। হয়তো হাত-পা বেঁধে অন্ধকারে ফেলে রেখেছে মুসা আর রবিনকে।

পুলিশের গাড়িটাও এসেছে, থামল বাড়ি থেকে কিছু দূরে। নিঃশব্দে নেমে এল চারজন পুলিশ। ইশারায় ওদেরকে ছড়িয়ে পড়তে বলে কিশোর আর মিস্টার মিলফোর্ডকে নিয়ে সদর দরজার দিকে এগোলেন ফ্লেচার। তাদের পেছনেই রইল হ্যানসন।

নিচতলার প্রতিটি ঘর খুঁজে দেখা হলো। কেউ নেই।

জোরে জোরে নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটছে কিশোর। সবাইকে ধরে নিয়ে গিয়ে আটকে রেখেছে ডাংম্যান? চাম্যাশ হোর্ড নিয়ে পালানোর সময় মুক্তিপণ হিসেবে কাজে লাগানোর জন্যে?

কান খাড়া করল সবাই।

অন্ধকারে মৃদু থ্যাপ থ্যাপ শব্দ শোনা গেল।

ওপরে, বললেন চীফ। বাড়ির পেছন সাইডে।

পিস্তল বের করে হাতে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করলেন ফ্লেচার। পেছনে অন্যেরা। সাবধানে দোতলায় উঠে এল সবাই। করিডর ধরে এগিয়ে চলল পেছনে, যেদিক থেকে শব্দ এসেছে।

আবার শোনা গেল শব্দটা।

ওখানে, টর্চের আলোয় একটা দরজা দেখিয়ে বললেন মিস্টার মিলফোর্ড।

দরজায় তালা লাগানো। সবাইকে পাশে সরতে বলে খানিকটা পিছিয়ে এলেন ফ্লেচার। ছুটে গিয়ে কাঁধ দিয়ে জোরে ধাক্কা লাগালেন দরজায়। ভারি শরীরের প্রচণ্ড আঘাত সইতে পারল না পুরানো পাল্লা, হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল।

উদ্যত পিস্তল হাতে ঢুকলেন চীফ।

ওই যে, দরজার কাছ থেকেই চেঁচিয়ে উঠলেন মিস্টার মিলফোর্ড।

ঘরের কোণে চিত হয়ে আছে যেন একটা মিশরীয় মমি—সারা শরীর দড়ি দিয়ে এমনভাবে পেঁচিয়ে বাঁধা হয়েছে। টনি। মুখেও কাপড় গোঁজা, চেঁচানোর উপায়, নেই। পায়ের নিচের দিক কোনমতে নড়াতে পারছে, সে-ই লাথি মেরেছে দেয়ালে। মুখের কাপড় খুলে ফেলতেই চেঁচিয়ে উঠল টনি, দাদী, ওই যে, ওখানে!

একটা চেয়ারে বসিয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে মহিলাকে, মুখে কাপড়। তার বাঁধন খুলে দিল হ্যানসন।

আমি…আমি…কি হয়েছে? ঘোরের মধ্যে রয়েছেন যেন মিস পেদ্রো ও, মনে হয়েছে। ডাংম্যান। ট্রেতে করে বিকেলের চা নিয়ে এসেছিল, খেয়েছি। তারপর আর মনে নেই। হুঁশ ফিরলে দেখলাম এই অবস্থা। ঈশ্বর, এত ভয় জীবনে পাইনি! টনি, আরে, মেঝেতে কেন?

লাফিয়ে চেয়ার ছাড়তে গিয়ে টলে উঠলেন মহিলা। ধপ করে বসে পড়ে জিরিয়ে নিলেন এক মুহূর্ত। তারপর উঠে এসে বসলেন টনির পাশে। মুখে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। তার দিকে চেয়ে হাসল টনি।

দড়ির বাঁধন কেটে দেয়া হলো। উঠে বসল টনি, বিকৃত করে ফেলেছে মুখ।

কি হয়েছিল? জিজ্ঞেস করল কিশোর।

দাদী ডাকলে পরে তোমাদেরকে লাইব্রেরিতে রেখে গিয়েছিলাম না? ফিরে এসে দেখি, তুমিও নেই, ডাংম্যানও না। শেষ বিকেলে ফিরে এল আবার। বলল, পুতুলটার ব্যাপারে জরুরী খবর আছে, দোতলায় গিয়ে বলবে। একটুও সন্দেহ না করে গেলাম। কি দিয়ে জানি বাড়ি মারল মাথার পেছনে। হুঁশ ফিরলে দেখলাম, মমি বানিয়ে রাখা হয়েছে আমাকে বানিয়ে রাখা হয়েছে আমাকে।

হুঁ, ডাংম্যানের পুরো পরিকল্পনাই পরিষ্কার হয়ে আসছে কিশোরের কাছে। ও আমাদেরকে বলেছে, তোমাকে খুঁজতে গেছে, ইয়ার্ডে নাকি তোমার গাড়িও দেখেছে, তারপর নাকি হঠাৎ করেই গায়েব হয়ে গেছ।

সব শয়তানী, বললেন চীফ। আসলে অনেক আগেই গিয়ে নিজের বাড়িতে বসে ছিল, রবিন আর মুসাকে ধরে আটকেছে। ওরা ওখানে আছে, কিশোরই জানিয়েছিল ব্যাটাকে।

প্লীজ, গুঙিয়ে উঠল কিশোর, আর লজ্জা দেবেন না। সব আমার দোষ, আমিই সব কথা বলেছি তাকে, হুঁশিয়ার করে দিয়েছি।

আজ রাতেই গুপ্তধন খুঁজে বের করবে সে, বলল টনি। আমার দোষ সবচেয়ে বেশি। এখানে ঢোকার সুযোগ আমিই করে দিয়েছি তাকে। তোমরা চোর, পুরস্কার ঘোষণা করে পুতুলটা তোমাদের হাত থেকে ফেরত আনার আইডিয়া, সব তার। ও-ই বুদ্ধি দিয়েছে জঞ্জাল বিক্রির ছুতোয় তোমাদের সঙ্গে পরিচয় করতে। দম দেয়া পুতুলের মত খেলিয়েছে সে আমাকে।

আমার দোষও কম নয়, বলে উঠলেন মিস পেদ্রো। ওর দলে ঢুকিয়েছে আমাকে, তার লীগে বেশ কিছু টাকাও চাঁদা দিয়েছি আমি। আমার চেনা অনেক নিরামিষভোজীর কাছু থেকে চিঠি এনেছে, দেখিয়েছে আমাকে।

সব জাল, আমি শিওর, বললেন ফ্লেচার। ইবলিসটা জানে না, এমন কোন শয়তানী নেই।

যা-ই হোক, ওকে এখন খুঁজে বের করে ধরা দরকার, মনে করিয়ে দিল কিশোর। টনি, বাদামী চামড়ার লোক, কিংবা মুছাড়া বামনদের কথা কিছু বলেছে

ডাংম্যান?

মুণ্ডুছাড়া! না-তো!

ভ্রূকুটি করল কিশোর। ওই বামনরাই এ-রহস্যের চাবিকাঠি মনে হচ্ছে। ওদেরই কেউ পুতুলটা চুরি করে মেসেজ ভরে দেয়ালের ওপর দিয়ে ছুঁড়ে ফেলেছিল। ইয়াকুয়ালী ইনডিয়ান হতে পারে। কিন্তু ওদেরকে আটকেছে কেন ডাংম্যান?

ধৈর্য হারালেন মিস্টার মিলফোর্ড। বামন আর পুতুল নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি কেন? মুসা আর রবিনকে খোঁজা দরকার আগে।

কিন্তু ডাংম্যানকে না পেলে ওদের পাওয়া যাবে না, বললেন চীফ। তাকেই আগে দরকার।

ঠোঁট কামড়াতে কামড়াতে মিস পেদ্রোর দিকে ফিরল কিশোর। ম্যাডাম, আপনার ভাই কখনও চাম্যাশ হোর্ডের কথা বলেছিল?

না। ও তখন পালানোর জন্যে অস্থির, বেশি কথা বলার সময়ই ছিল না।

পুতুল দুটোর কথা কি বলেছিল?

তেমন কিছুই না। চলে যাওয়ার আগে পুতুল দুটো আমার হাতে দিয়ে বলল, ওগুলো আর কোন কাজে লাগবে না। হাঁসটাকে নাকি মেরে ফেলেছে সে। কথাটা অনেক ভেবেছি, কি বলতে চেয়েছে কিছুই বুঝিনি।

চোখ মিটমিট করল কিশোর। বলতে চেয়েছে সোনার-ডিম-পাড়া হাঁসটাকে মেরে ফেলেছে। যে লোকটাকে খুন করেছে, নিশ্চয় চাম্যাশ হোর্ড কোথায় আছে জেনেছিল লোকটা। পুতুলের মধ্যে কোন সূত্রই ছিল না। চাম্যাশ হোর্ড আছে, শুধু একথা প্রমাণ করে ওদুটো।

হোর্ড কোথায় আছে জানত না তাহলে ফিয়ারতো, ফ্লেচার বললেন। কিন্তু ডাংম্যান জানে। কিভাবে জানল?

ম্যাগনাস ভারদির ধাধার সমাধান করে ফেলেছে আরকি। কিংবা বাদামী চামড়ার লোক দুটো করেছে। আমাদেরও করতে হবে এখন।

ইন দা আই অভ দা স্কাই হোয়্যার নো ম্যান ক্যান ফাইও ইট, বিড়বিড় করলেন চীফ। মানে কি?কোথায় খুঁজতে হবে?

জবাব নেই কারও মুখে! একে অন্যের দিকে নীরবে তাকাল শুধু।

বাদামী চামড়ার লোকদুটোকে পাই কোথায়? আনমনে বলল কিশোর।

নীরবতা দিয়ে ঠাট্টা করুল যেন তাকে বিশাল বাড়িটা।

১৮
ছুরি হাতে আবছা অন্ধাকার কেবিনে দাঁড়িয়ে আছে লোক দুজন।

ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে রবিন আর মুসা।

টেবিলের কাছে এসে থামল মুসা, হাত বাড়াল লণ্ঠনটার দিকে, ছুঁড়ে মারবে যে কোন একজনের মুখে।

মুসার উদ্দেশ্য বুঝে মাথা নাড়ল একজন, ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলল, না না, আমরু বন্ধু। সাহায্য করব।

স্থির হয়ে গেল রবিন। ইংরেজি জানো?

সি, অল্প। আমি জ্যাকোয়া। ও আমার ভাই জেরমি।

সাহায্য করতে চাইলে পুতুলটা চুরি করেছিলে কেন?

ভাবলাম ভেতরে আমার ভাইয়ের চিঠি আছে। তোমার পিছু নিলাম, পুতুল কেড়ে নিলাম, চিঠি নেই ভেতরে।

মেসেজটা আমরা রেখে দিয়েছি, মুসা জানাল।

কি লেখা? জিজ্ঞেস করল জ্যাকোয়া।

কি লেখা আছে, বলল রবিন।

উত্তেজিত হয়ে মাথা ঝাঁকাল জ্যাকোয়া, বিচিত্র ভাষায় জেরমিকে কি বলল। তার মুখেও উত্তেজনা ফুটল। ছুরি খাপে ভরে রাখল দুজনে।

এই ভয়ই করছিলাম, ইংরেজিতে বলল জ্যাকোয়া। আমাদের ছোট ভাইয়ের বিপদ। ডাংম্যান মিথ্যুক, খারাপ লোক।

তোমরা ইয়াকুয়ালি ইডডিয়ান, মেকসিকো থেকে এসেছ না? জিজ্ঞেস করল রবিন। তোমাদের ভাইকে বন্দি করে রেখেছে ডাংম্যান?

সেদিন আমাদের তাড়া করেছিলে যখন, ইংরেজি বললে না কেন? অনেক কিছু সহজ হয়ে যেত, বলল রবিন।

তখন উত্তেজিত। ইংরেজি মনে ছিল না, বিষণ্ণ জবাব দিল জ্যাকোয়া। ডাংম্যান তোমার ভাইদের ধরে এনেছে কেন? কি করছে সে?

ভাঙা ইংরেজিতে যা বলল জ্যাকোয়া, তার সংক্ষেপ : মাসখানেক আগে, মেকসিকোর সিয়েরা মাদ্রে পর্বতের গভীরে ইয়াকুয়ালিদের গাঁয়ে গিয়েছিল ডাংম্যান। পাবলিক অ্যামিউজমেন্ট পার্কে দড়াবাজিকরের চাকরি দেয়ার লোভ দেখিয়ে চারটে কিশোরকে নিয়ে আসে আমেরিকায়। অভিভাবকরা রাজি ছিল না, কিন্তু ছেলেদের মন, আমেরিকা আর শহর দেখার লোভ সামলাতে পারল না, বলে-কয়ে রাজি করাল বাপ-মাকে। চার কিশোরের একজনের নাম নিউকা।

তারপর, হপ্তাখানেক আগে একটা চিঠি পৌচেছে গাঁয়ে। রকি বীচ থেকে পাঠিয়েছে নিউকা, সাহায্যের আবেদন। চিঠিটা কিভাবে পোস্ট করেছে, সে-ই জানে।

এখানে এলাম, পুরানো গাড়ি জোগাড় করলাম, বলে গেল জ্যাকোয়া। ডাংম্যানকে পর্বতের ভেতরে এক বাড়িতে দেখলাম। নিউকার চিৎকার শুনলাম মনে হলো। সন্ধ্যায় তোমাদেরকে দেখলাম বড় বাড়িটার সামনে। তোমরা কোথায় থাকো, দেখে এলাম। পরদিন সকালে তোমাদের পিছু নিলাম। বড় স্টুডিওতে যেতে দেখলাম। ভাবলাম, ওটার ভেতরে নিউকার লেখা আছে। ছিনিয়ে নিলাম। লেখা পেলাম না। ডাংম্যানকে খুঁজতে খুঁজতে পেলাম আরেকটা বড় বাড়িতে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ছেলেগুলো কোথায়। ঝগড়া লেগে গেল আমাদের সঙ্গে।

সে-ই তাহলে ঝগড়া শুরু করেছে। তোমরা আক্রমণ করোনি, বলল রবিন।

সি। ভয় দেখাল, পুলিশকে বলে আমাদের জেলে পাঠাবে। ভয়ে পালিয়ে এলাম। চোখ রাখলাম বাড়িটার ওপর। তোমাকে আর আরেকটা ছেলেকে ঢুকতে দেখলাম। বেরিয়ে এলে। কথা বলার জন্যে ডাকলাম, তোমরা দৌড় দিলে। পালালে। আবার বাড়ির ওপর চোখ রাখলাম। তোমাদেরকে আবার ঢুকতে দেখলাম। পরে তোমাদের বেঁধে ট্রাকে তুলতে দেখলাম। পিছু নিয়ে এখানে এসেছি কথা বলতে। ডাংম্যান কোথায় জানো?

জানি না, বলল মুসা।

তোমাদের ছেলেদের দিয়ে কি করাচ্ছে, জানো? জিজ্ঞেস করল রবিন।

নিশ্চয় কোন খারাপ কাজ, বলল জ্যাকোয়া। তারপর মেরে ফেলবে। ওরা জানে, সে কি করছে, তাই মারবে।

নিশ্চয় হোর্ড খোঁজার কাজে লাগিয়েছে, বুঝতে পেরে বলে উঠল মুসা। পাহাড়ে চড়তে ওস্তাদ ওরা। ঠিকই বলেছ, জ্যাকোয়ার কাজ শেষ হলে ওদেরকে মেরে ফেলবে ইবলিসটা।

পুলিশকে জানানো দরকার, রবিন বলল।

বাইরে যেতে চাও? জিজ্ঞেস করল জ্যাকোয়া। এসো।

কি করে? পাহারা আছে। নিশ্চয় বন্দুক আছে তার কাছে, মুসা বলল।

এদিক দিয়ে নামব, খাদের দিকে দেখাল জ্যাকোয়া।

জ্যাকোয়া কি বলছে, আন্দাজে বুঝে মাথা ঝাঁকাল জেরমি। বিচিত্র ভাষায় কিছু বলল। বোধহয় বলেছে, নেমে যাওয়াটা কোন ব্যাপারই নয় ওদের জন্যে।

ওই খাড়া পাড় বেয়ে? আঁতকে উঠল মুসা।

খাড়া কই? বলল জ্যাকোয়া। সহজ।

মুসার দিকে তাকাল রবিন, দৃষ্টি ফেরাল জ্যাকোয়ার দিকে। চলো, যাব। আর কোন পথ যখন নেই।

যাবে? কাঁধ ঝাঁকাল মুসা, হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গিতে।

ঠিক আছে। আগে সঙ্কেত পাঠিয়ে নিই। পড়ে গিয়ে হাড়গোড় ভেঙে তো মরব জানিই, লাশগুলো অন্তত এসে নিয়ে যেতে পারবে।

লণ্ঠন জেলে জানালার কাছে এসে দাঁড়াল মুসা। ঘরের কোণ থেকে খুঁজেপেতে ছোট একটা কাঠের টুকরো এনে দিল রবিন। টুকরোটা লণ্ঠনের সামনে ধরে-সরিয়ে, ধরে-সরিয়ে এস ও এস পাঠাতে শুরু করল মুসা।

তারপর জানালা দিয়ে বেরিয়ে এল চারজনে।

সঙ্গের ঝোলা থেকে চামড়ার তৈরি সরু শক্ত দড়ি আর মোটা দুটো কাঠের গোঁজ বের করল দুই ভাই। পাথরের দুটো গভীর খাঁজে গোজ দুটো ভালমত ঢুকিয়ে দিয়ে দুটো দড়ির এক মাথা বাঁধল। হাতে তৈরি চামড়ার স্ট্রাপ বের করে কাঁধে-পিঠে বেঁধে নিল। স্ট্রাপে চামড়ার আঙটা রয়েছে, ওগুলোর ভেতর দিয়ে ঢুকিয়ে দিল দুটো দড়ির অন্য মাথা। কোন কারণে হাত যদি ছুটেও যায় দড়ি থেকে, ওই আঙটায় আটকে যাবে দড়ি, মারাত্মক পতন ঠেকাবে।

খাদের কিনারে এসে নিচে উঁকি দিল মুসা। অন্ধকার, কিছুই দেখা যায় না। ভালই হলো, বিপদের পরিমাণ চোখে দেখা না গেলে ভয় অনেক কম লাগে।

শক্ত করে ধরে রাখবে গলা আর আঙটা, মুসাকে বলল জ্যাকোয়া। ছাড়বে। আমরা নামতে পারব।

মুসাকে পিঠে নিল জ্যাংকোয়া, জেরমি নিল রবিনেক। তারপর আলগোছে দড়ি ধরে ঝুলে পড়ল।

পাক দিয়ে উঠল মুসার মাথা। ক্ষণিকের জন্যে মনে হলো মহাশূন্যে ভাসছে। জ্যাকোয়ার গলা জড়িয়ে ধরে রেখেছে, আরেক হাতে আঁকড়ে রেখেছে স্ট্র্যাপের পিঠের একটা আঙটা। দাঁতে দাঁত চেপে রেখেছে, ঝাঁকুনির চোটে গোড়া থেকে হাত ছিঁড়ে গেলে যাক, কিন্তু আঙুল ছুটাবে না।

পাহাড়ের দেয়ালে পা ঠেকিয়ে দোল দিতে দিতে নেমে চলেছে দুই ইয়াকুয়ালি। ঠেলে বেরিয়ে থাকা পাথর, খজ, কিছুই রুখতে পারছে না ওদের, গতি কমছে না একটুও।

ধরে থাকতে থাকতে হাত ব্যথা হয়ে গেছে দুই গোয়েন্দার। ওদের মনে হচ্ছে, এ-নামার বুঝি আর শেষ নেই, শেষ হবে না কোনদিন।

হঠাৎ প্রচণ্ড ঝাঁকুনি লাগল, ধরে রাখতে পারল না মুসা, জ্যাকোয়ার গলা থেকে হাত ছুটে গেল তার। আঙটা থেকে খুলে এল আঙুল। চোখ বন্ধ করে ফলল সে। দড়াম করে আছড়ে পড়ল কঠিন পাথরে। পিঠে তীব্র ব্যথা, চোখা গরম এক শিক ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে যেন মেরুদণ্ডের পাশে। গুঙিয়ে উঠল সে।

হাসি শোনা গেল জ্যাকোয়া আর জেরমির।

হাত ধরে মুসাকে টেনে তুলল জ্যাকোয়া।

চোখ মেলল গোয়েন্দা-সহকারী। লজ্জা পেল। জ্যাকোয়ার পা মাটিতে ঠেকায় ঝুঁকুনি লেগেছিল, আর তাতেই ছুটে গেছে তার হাত।

ব্যথা পাচ্ছে পিঠে, কিন্তু সেটা কাউকে বুঝতে দিল না মুসা।

নামলাম তাহলে! রবিনের কণ্ঠে বিস্ময়। বিশ্বাস হচ্ছে না।

আবার হাসল জ্যাকোয়া। সহজ।

কঠিনগুলোর কথা আর বোলো না, সোজা হতে গিয়ে আঁউ করে উঠল মুসা। কোমরের এক পাশে হাত চেপে ধরে দুর্বল কণ্ঠে বলল, তাড়াতাড়ি করা দরকার। তোমাদের গাড়িটা কোথায়?

বাঁয়ে, পথে। পুলিশের কাছে যাব? সাহায্য করবে?

করব, বলল রবিন।

গাড়ির দিকে রওনা হলো ওরা। পথ নেই, কঠিন পাথুরে অঞ্চল, এবড়োখেবড়ো, রুক্ষ। তাড়াতাড়ি হাঁটা যাচ্ছে না।

অবশেষে পথে পার্ক করে রাখা গাড়ির কাছে পৌঁছল ওরা।

ঠিক এই সময় মোড়ের কাছে দুটো হেডলাইট জ্বলে উঠল, চোখ ধাধিয়ে দিল তীব্র আলো। একটা ট্রাক।

আবছা মত দেখা গেল ট্রাকের কেবিন থেকে লাফিয়ে নামল একটা মূর্তি, হাতে রাইফেল। অনেক জ্বালান জ্বালিয়েছ, ডাংম্যানের গলা। আর ছাড়ব না।

কি ভাবে…কথা সরছে না রবিনের, জানলে…আমরা এখানে।

ইয়াল্লা! গুঙিয়ে উঠল মুসা।

হেসে উঠল ডাংম্যান। তার হোঁতকা সঙ্গী ল্যাঙলীও নেমেছে ট্রাক থেকে। তার হাতেও রাইফেল।

বিচিত্র ভাষায় গাল দিয়ে ডাংম্যানের ওপর লাফিয়ে পড়তে গেল জেরমি। সঁ্যাত করে সরে গেল ডাংম্যান, রাইফেলের বাট দিয়ে প্রচণ্ড বাড়ি মারল ইনডিয়ানের মাথায়। মুখ থুবড়ে পড়ল লোকটা, উঠল না। নিথর হয়ে গেছে।

পালাচ্ছে! চেঁচিয়ে উঠল ল্যাঙলী। আরেকটা পালাচ্ছে!

চরকির মত পাক খেয়ে ঘুরল ডাংম্যান, রাইফেল তুলল, কিন্তু তার আগেই অন্ধকারে হারিয়ে গেল জ্যাকোয়া।

যাক, বলল ডাংম্যান। একটু পরেই মাল নিয়ে হাওয়া হয়ে যাব আমরা। ওই ব্যাটার তোয়াক্কা না করলেও চলবে।

অস্বস্তি বোধ করছে ল্যাঙলী। ঠিক তো, বস? সত্যিই পারব?

পারব না মানে? যাও, রিগোকে ডেকে নিয়ে এসো, আর পাহারার দরকার নেই। এই বিচ্ছ দুটো বেশি জ্বালাচ্ছে। ঠাণ্ডা করে দেয়া দরকার।

১৯
কিভাবে? হতাশা ঢাকতে পারলেন না মিস্টার মিলফোর্ড। কোথায় আছি কিছুই জানি না। কোন সূত্র নেই। ধারণা নেই। কি করে খুঁজব?

সবাই বেরিয়ে এসেছে বাড়ির বাইরে। চাঁদের আলোয় প্রতিটি জিনিসকে কেমন রহস্যময়, ভূতুড়ে দেখাচ্ছে। গাড়ি বারান্দায় পায়চারি করতে করতে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল কিশোর।

চীফ, কয়েকটা ব্যাপার আলোচনা করে দেখা যাক, বলল সে। এক, পর্বতের মধ্যেই কোথাও রয়েছে গুপ্তধন। দুই, ডাংম্যানের একটা কার একটা ট্রাক আছে। তিন, আজ রাতেই গুপ্তধন সরানোর মতলব করেছে সে।

তাতে কি? প্রশ্ন করল টনি।

তাতে? একটা ব্যাপার শিওর, কোন একটা পথ ব্যবহার করতে হবে তাকে। আর সেই পথটা রয়েছে এই এস্টেটেরই কোথাও। পর্বতের ভেতরে, এখান থেকে বেশি দূরে নয়। গেট দিয়ে ঢুকেছে যে পথ, সেটা নয়, হান্টিং লজে যেটা গেছে, সেটাও নয়, তৃতীয় আরেকটা পথ আছে কোথাও। মিস পেদ্রো হয়তো বলতে পারবেন।

মাই গড। কিশোর, ঠিকই বলেছ, একমত হলেন ফ্লেচার। মিস পেদ্রোর দিকে ফিরলেন। মিস পেদ্রো, মিস্টার মিলফোর্ড, টনি, হ্যানসন সবাই তাকিয়ে আছে পুবের অন্ধকার পাহাড় শ্রেণীর দিকে। মিস পেদ্রো, আর কোন পথ আছে, জানেন?

ভেবে বললেন মহিলা, খুব বেশি ঘোরাঘুরি করিনি এস্টেটের ভেতরে…

চেঁচিয়ে উঠল টনি, আরে, ওটা কি? আলো! জ্বলছে নিভছে।

ঘুরে আরেক দিকের পাহাড়ের দিকে তাকাল সবাই। দম বন্ধ করে ফেলল। ম্লান আলো ঝিলিক দিয়েই নিভে গেল, আকাশের অনেক নিচে, কাছের গাছগুলোর মাথার ওপর দিয়ে দেখা গেছে আলোটা।

এস ও এস, কিশোর বলল। বাজি রেখে বলতে পারি, মুসা আর রবিন। বন্দি করে রেখেছে ওদেরকে।

চার পাঁচ মাইল হবে, বললেন ফ্লেচার। পর্বতের গোড়ায় কোন টিলার মাথায়।

ওই যে, আবার, বলল হ্যানসন।

জ্বলে উঠেই নিভে গেল আলো।

কি আছে ওদিকে, মিস পেদ্রো? জিজ্ঞেস করল কিশোর।

কি যেন আছে? মাথা চুলকালেন মহিলা, মনে করার চেষ্টা করছেন। অনেক দিন আগের কথা। বাবা বলত…ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে, পুরানো একটা কেবিন। আজকাল আর কেউ যায় না ওদিকে।

কি ভাবে যেতে হয়? জিজ্ঞেস করলেন মিস্টার মিলফোর্ড।

পথ একটা আছে, খুব সরু। একটা ছোট পাহাড়ের ধার দিয়ে গিয়ে ঢুকেছে পর্বতের ভেতরে। পাহাড়টার চূড়া চ্যাপ্টা, টেবিলের মত অনেকটা, ওই মেসা বলে যাকে। মেসার ওপরই তৈরি হয়েছে কেবিন। ওখানে ওঠা খুব কঠিন।

বন্দি রাখার জন্যে ভাল জায়গাই খুঁজে বের করেছে ডাংম্যান, মন্তব্য করল কিশোর।

পূব দিকে তাকিয়ে রয়েছে সবাই। কিন্তু আর দেখা গেল না আলোর সঙ্কেত। কিছু হলো না তো? উদ্বিগ্ন মনে হলো মিস্টার মিলফোর্ডকে।

চলুন, বললেন চীফ, গিয়ে দেখি।

রোলস-রয়েসে উঠল কিশোর, ইয়ান ফ্লেচার, মিস্টার মিলফোর্ড আর টনি। পুলিশের গাড়িতে এখন তিনজন পুলিশ, একজন রয়ে গেল মিস পেদ্রোর পাহারায়। কোন দিক দিয়ে কিভাবে যেতে হবে, বলে দিয়েছেন মিস পেদ্রো। সেভাবেই, হাইওয়ে দিয়ে ঘুরে এসে সরু পথটায় নামল গাড়ি দুটো।

পাহাড়ী পথে নেমেই নিভিয়ে দেয়া হলো গাড়ির আলো। আশপাশে টিলাটক্কর আর পাহাড়, ফলে চাদের আলো ভালমত পড়ছে না পথে, আবছা অন্ধকার।

বিশাল পর্বতের গোড়ায় এসে থামল গাড়ি। সবাই নামল।

মেসার মাথায় কেবিনটা দেখাল কিশোর, ওই যে।

অন্ধকার কেন? ফিসফিস করে কথা বললেন মিস্টার মিলফোর্ড।

সাবধান! হুঁশিয়ার করলেন ফ্লেচার। ফাঁদ হত