Monday, April 15, 2024
Homeবাণী-কথাআয়নাঘর - হুমায়ূন আহমেদ

আয়নাঘর – হুমায়ূন আহমেদ

আয়নাঘর - হুমায়ূন আহমেদ

০১. ইহা খেতে বড় সৌন্দর্য হয়

লিলিয়ান এক টুকরা মাছ ভাজা মুখে দিয়ে হাসিমুখে বলল, ইহা খেতে বড় সৌন্দর্য হয়। তাহের হো-হো করে হেসে ফেলল। লিলিয়ান ইংরেজিতে বলল, আমার ধারণা আমি ভুল বাংলা বলি নি। হাসছ কেন?

তাহের হাসি থামাল না। তার হাসিরোগ আছে। একবার হাসতে শুরু করলে সহজে থামতে পারে না। লিলিয়ান আহত গলায় ইংরেজিতে বলল, আমার বাংলা শেখার বয়স মাত্র। ছমাস। যা শিখেছি নিজের চেষ্টায় শিখেছি। এ ব্যাপারে তুমি আমাকে কোনো সাহায্য করছ না। বরং উল্টোটা করছি। যখনই বাংলা বলার চেষ্টা করছি তুমি হাসছ। এটা কি ঠিক?

তাহের বলল, অবশ্যই ঠিক। একশ ভাগ ঠিক। আমরা বাঙালিরা বিদেশীদের মুখে ভুল বাংলা সহ্য করি না। যতবার তুমি ভুল বাংলা বলবে ততবার আমি হাসব। মাছ ভাজা মুখে দিয়ে বললে, ইহা বড় সৌন্দর্য হয়। মাছ ভাজার মধ্যে আবার সৌন্দৰ্য কী? এটা পিকাসোর ছবি না, আবার রবীন্দ্রনাথের কবিতাও না। মাছ ভাজা হলো মাছ ভাজা। বুঝলে?

না, বুঝলাম না। মাছ ভাজা খেতে ভালো লাগলে আমি কিছুই বলব না?

বলবে–খেতে মজা হয়েছে, কিংবা বলবে–ভালো হয়েছে। খেতে সৌন্দৰ্য হয়েছে আবার কী? সুন্দর আমরা খাই না। চাঁদেব আলো খুব সুন্দর, তাই বলে চাঁদের আলো কি কেউ খায়?

তাহের আবার হেসে উঠল। লিলিয়ান তাহেরের উপর রাগ করার চেষ্টা করছে, পারছে না। কখনো পাবে না। তার মনে হয় না কখনো পারবে। লিলিয়ানের বয়স তেইশ। নেপলস-এর মেয়ে। তাহেরের সঙ্গে তার পরিচয় হয় ইয়েলো ষ্টোন পার্কে। পরিচয়-পর্ব বেশ মজার। লিলিয়ান ত্রিশ ডলারের টিকিট কেটে একটা ট্যুর গ্রুপের সঙ্গে এসেছে। এই প্ৰথম শহর ছেড়ে বাইরে আসা, যা দেখছে তাই তার ভালো লাগছে। সে মুগ্ধ হয়ে একের পর এক ছবি তুলে যাচ্ছে–তখন সে লক্ষ করল, কালো, লম্বামতো ঝাঁকড়া চুলের একটি ছেলে তার দিকে তাকিয়ে হো-হো করে হাসছে। রূপবতী মেয়েদের আশেপাশে যে-সব ছেলেরা থাকে তারা তাদের অজান্তেই অনেক অদ্ভুত আচরণ করে, কিন্তু এরকম অশালীন ভঙ্গিতে দাঁত বের করে কখনো হাসে না। লিলিয়ান ব্যাপারটা অগ্ৰাহ্য করার চেষ্টা করল। কিন্তু অগ্রাহ্য করা যাচ্ছে না। যতবারই সে ছবি তুলছে ততবারই মানুষটা মুখের সব কটা দাঁত বের করে হাসছে। যেন লিলিয়ান তেইশ বছর বয়েসী ঝকঝকে চেহারার তরুণী নয়, যেন সে মহিলা চার্লি চ্যাপলিন। তার প্রতিটি ক্রিয়াকলাপে হাসতে হবে। লিলিয়ান এগিয়ে গেল। বরফ শীতল গলায় বলল, আপনি হাসছেন কেন জানতে পারি?

লিলিয়ানের শীতল গলা শুনে যে-কোনো পুরুষ ঘাবড়ে যেত। এ ঘাবড়াল না। লোকটি হাসিমুখে বলল, অবশ্যই জানতে পারেন। আপনার ছবি তোলা শেষ হোক, তারপর বলব।

এখন বলতে অসুবিধা আছে?

হ্যাঁ অসুবিধা আছে, অবশ্যই অসুবিধা আছে।

আমার ছবি তোলা শেষ হয়েছে, আপনি বলুন কেন হাসছেন?

আপনি আপনার ক্যামেরার মুখ থেকে ক্যাপ সরান নি। মুখে ক্যাপ লাগিয়ে ছবি তুলছিলেন। এই জন্য হাসছিলাম।

না হেসে আপনি যদি আমাকে বলতেন–ক্যামেরাব মুখেব ক্যাপ সরানো হয় নি–সেটাই কি শোভন হতো না?

হ্যাঁ হতো।

বলতে বলতে তাহের আগের চেয়েও শব্দ করে হেসে উঠল। লিলিয়ান সরে এলো। সে জীবনে এত অপদস্ত হয় নি। তার রীতিমতো কান্না পাচ্ছে। ইচ্ছা করছে ক্যামেরাটা ওল্ড ফেইথফুলের পানিতে ছুঁড়ে ফেলতে। সাধারণ শিষ্টতা, সাধারণ ভদ্রতা কি তরুণী মেয়েরা পুরুষদের কাছ থেকে আশা করতে পাবে না? লিলিয়ানের ইচ্ছা করছে খুব কঠিন কঠিন কথা মানুষটাকে শুনাতে। তা সে পারবে না। খুব রেগে গেলে সে গুছিয়ে কোনো কথা বলতে পারে না। সবচে ভালো হয় লিলিয়ান যদি তার হোটেলে ফিরে যেতে পারে। তা সম্ভব হবে না। সে যে গাইডেড ট্র্যারে এসেছে তাদের মাইক্রোবাস ছাড়বে সন্ধ্য মেলাবার পর। ইচ্ছা না করলেও সন্ধ্যা পর্যন্ত তার এখানে থাকতে হবে। ঘুবেফিরে ঐ লোকটির সঙ্গে দেখা হবে। সেও নিশ্চয়ই সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকবে। লিলিয়ানকে দেখামাত্র দাঁত বের করে হাসবে। কত বিচিত্র মানুষই না পৃথিবীতে আছে।

লিলিয়ান লক্ষ করল, লোকটা তার দিকে আসছে। হাসিমুখেই আসছে। লিলিয়ানোব চোখমুখ শক্ত হয়ে গেল। মুখে থুথু জমতে শুরু করল। মানুষটাকে কোনো কঠিন গালি দিতে পারলে মন শান্ত হতো। লিলিয়ান জানে, তা সে পাববে না। সবাই সব কিছু পাবে না। লিলিয়ান কাউকে কড়া কথা বলতে পারে না।

আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবার জন্য এসেছি।

লিলিয়ান স্থির চোখে তাকাল, কিছু বলল না। লোকটা নরম গলায় বলল, আমি যখন প্রথম এ দেশে আসি, তখন একটা সস্তা ধরনের ক্যামেরা কিনে খুব ছবি তুলেছিলাম। যা দেখেছি। মুগ্ধ হয়ে তারই ছবি তুলেছি। মজার ব্যাপার হলো, সব ছবি তুলেছি ক্যামেরার ক্যাপ লাগিয়ে। আপনাকে দেখে পুরনো স্মৃতি মনে পড়ল। আপনি কি আমেরিকায় নতুন এসেছেন?

না।

ও আচ্ছা, তাহলে ক্যামেরা নতুন কিনেছেন। এ ধরনের ক্যামেরায় এই অসুবিধা হবে ই। সুন্দর দৃশ্য দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়বেন। ক্যামেরার ক্যাপ না খুলেই ছবি তুলবেন। আপনার যা করা উচিত তা হচ্ছে–Single Lens Reflex ক্যামেরা কেনা। এরে বলে SLR.

আপনার অযাচিত উপদেশের জন্য ধন্যবাদ। আমাকে দয়া করে একা থাকতে দিন।

আমি কি আপনাকে বিরক্ত করছ?

হ্যাঁ করছেন।

লোকটা চলে গেল, কিন্তু লিলিয়ানের মনে হলো সে আবার আসবে। সহজে তার সঙ্গ ছাড়বে না। এশিয়ান ছেলেগুলি মোটামুটি নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করে। সুন্দরী মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার সামান্যতম সুযোগও এরা ছাড়ে না। এও ছাড়বে না। চেষ্টা চালিয়েই যাবে। লোকটার সঙ্গে কথা বলাই উচিত হয় নি।

লিলিয়ানের অনুমান মিথ্যা হলো না। বিকেলে লিলিয়ানদের দলের সবাই বসে কফি খাচ্ছে। ছেলেটি উপস্থিত। লিলিয়ানের কাছে গিয়ে হাসিমুখে বলল, আমি আপনার জন্য একটা ফিল কিনে এনেছি।

লিলিয়ান কঠিন মুখে বলল, কেন?

আমার কারণে আপনার ফিল্ম নষ্ট হয়েছে। আমি প্রথম থেকেই লক্ষ করেছিলাম। আমার উচিত ছিল আপনাকে সতর্ক করা। তা করি নি, উল্টা মজা পেয়ে হেসেছি। অবশ্যই অপরাধ করেছি, কাজেই অপবাধের প্রায়শ্চিত্ত করছি।

লিলিয়ান কঠিন মুখে বলল, অপরাধ টপরাধ কিছু না। আপনি আমার সঙ্গে গল্প কবার লোভ সামলাতে পারছেন না। সুন্দবি অজুহাত বানিয়ে এগিয়ে এসেছেন।

আপনি ভুল বললেন। নিজেকে খুব রূপবতী ভাবছেন বলে এই সমস্যা হয়েছে। আপনি হয়তো আপনার দেশে, কিংবা খোদ এই আমেরিকাতেই রূপবতী। কিন্তু আমাদের দেশের রূপের বিচারে রূপবতী নন।

আপনাদের দেশে রূপবতী হবাব জন্য কি গায়েী রঙ আপনার মতো কুচকুচে কালো হতে হয়?

তা না। আমাদের দেশে রূপবতী মেয়েদের প্রথম শর্ত হলো–তাদের চোখ সুন্দর হতে হয়।

আমার চোখ সুন্দর না?

না। আপনার চোখের মণি নীল। আমাদের দেশে বাদামি বা নীল চোখের তারার মেয়েদের বলে বিড়াল-চোখা মেয়ে। এদের সহজে বর জুটে না। পুরুষরা এদের বিয়ে করতে চায় না।

কী অদ্ভুত কথা! আপনি কোন দেশের মানুষ?

দেশের নাম আপনাকে বলছি, কিন্তু দয়া করে দেশের নাম শুনে ঠোঁট উল্টে বলবেন না–এই দেশ আবার কোথায়? এ জাতীয় কথা যখন কেউ বলে অসম্ভব রাগ লাগে। আমার দেশের নাম বাংলাদেশ। নাম শুনেছেন?

না।

নাম না শোনার অপরাধ আমি ক্ষমা করলাম, যদিও ক্ষমা করা উচিত হচ্ছে না। যাই হোক, আমি কি আপনার পাশে বসতে পারি?

বিড়াল-চোখা মেয়ের পাশে বসে কী করবেন?

আপনার সঙ্গে এক কাপ কফি খাব, তারপর চলে যাব।

বসুন।

আপনার নাম কি জানতে পারি?

লিলিয়ান গ্রে।

আমার নিজের নামটা কি আপনাকে বলতে পারি?

লিলিয়ান চুপ করে রইল। মানুষটার সাহস দেখে সে বিস্মিত হচ্ছে। লোকটা হাসিমুখে বলল, আমার নাম তাহের। আপনি যেমন লিলিয়ান গ্রে, তেমনি গায়ের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে আমাকে তাহের ব্ল্যাক বলে ডাকা যায়। আমি সম্প্রতি আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক্তারি পাস করেছি। আমার ফিন্ড অব স্পেশালাইজেশন হচ্ছেচোখ। আমি ডাক্তারি পড়ছি, ভবিষ্যতে চোখের ডাক্তার হবো।

ভালো।

চোখের ডাক্তার হিসেবে আপনার নীল চোখ সম্পর্কে আমি আপনাকে মজার একটা তথ্য দিতে পারি। তথ্যটা হচ্ছে–বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আপনার চোখ কিন্তু কালো হতে থাকবে, নীল থাকবে না।

কেন?

চোখের পিগমেন্টগুলি বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বড় হতে থাকে। চোখের বঙ নির্ভর কবে পিগমেন্টের সাইজের ওপর। সাইজ বড় হলে রঙ কালো হয়ে যাবে। এক ধরনের Tyndall effect.

কখন চোখ কালো হবে?

যখন বুড়ো হবেন তখন।

আপনি বলতে চাচ্ছেন বৃদ্ধ বয়সে আমি যদি আপনার দেশে যাই তাহলে আমাকে সবাই রূপবতী বলবে?

তাহের হো-হো করে হাসতে লাগল। এমন হাসি যে লিলিয়ানদের দলের সবাই চোখ ঘুরিয়ে তাকাল। লিলিয়ান নিজেও খানিকটা অপ্ৰস্তুত বোধ করতে লাগল। হাসতে হাসতে তাহেরের চোখে পানি এসে গেল। সে রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল, সরি। আমি একটু বেশি হাসি। আমার হাসি-রোগ আছে। একবার হাসতে শুরু কবলে থামতে পারি না। পুরো এক ঘণ্টা তেইশ মিনিট ক্রমাগত হাসার আমার একটা ব্যক্তিগত রেকর্ড আছে। গিনিস রেকর্ড কত তা অবশ্যি জানি না।

হাসি-রোগ ছাড়া আর কী রোগ আছে?

ঘুম-রোগ আছে।

ঘুম-রোগটা কী?

একবার ঘুমিয়ে পড়লে সহজে আমার ঘুম ভাঙে না।

খুব আনকমন রোগ কিন্তু না। অনেকেরই এই রোগ আছে।

আমারটা আনকমন। উদাহরণ দিলে বুঝতে পারবেন। দুবছর আগে আমি লস এনজেলসে ছিলাম। হোস্টেলে থাকি। একবার ভূমিকম্প হলো। ভূমিকম্পের নিয়ম হচ্ছে প্রথম একটা ছোট দুলুনি হয়–তারপর হয় বড় দুলুনি। প্রথম দুলুনির পর আমার বন্ধুবান্ধবরা আমার ঘুম ভাঙানোর প্রাণপণ চেষ্টা করল। কোনো লাভ হলো না। শেষে ওরা আমাকে চ্যাংদোলা করে বাইরে নিয়ে ফুটপাতে শুইয়ে রাখল। আমার ঘুম ভেঙেছে ভোরে, জেগে দেখি আমি একটা হাইড্রেন্টের পাশে শুয়ে আছি।

লিলিয়ান খিলখিল করে হেসে উঠল। লিলিয়ানের সঙ্গীরা আবারো ফিরে তাকাল। তাহের বলল, আমরা বোধহয় ওদের ডিস্টার্ব করছি, একটু দূরে গেলে কেমন হয়?

ভালো হয় না। আমাদের যাত্রার সময় হয়ে গেছে। আমি এখন উঠব।

আমার সঙ্গে গাড়ি আছে। আমি আপনাকে পৌঁছে দিতে পারি।

ধন্যবাদ। অপরিচিত কারো গাড়িতে আমি চড়ি না।

শুরুতে অপরিচিত ছিলাম। এখন নিশ্চয়ই অপরিচিত না। আপনি আমার নাম জানেন। আমি আপনার নাম জানি।

লিলিয়ান কঠিন মুখে বলল, আপনি শুধু শুধু আমার সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টা করছেন। আপনার গাড়িতে আমি যাব না।

লিলিয়ান তার সঙ্গীদের দিকে রওনা হলো। একবার তার ইচ্ছা করল পেছন ফিরে মানুষটির মুখের বিব্ৰত ভঙ্গিটা দেখে। অনেক কষ্টে এই লোভ সে সামলাল। মনে মনে ভাবল–ভালো শিক্ষা হয়েছে। কাউকে শিক্ষা দেবার এটাই সবচে ভালো টেকনিক। প্রথম কিছুটা প্রশ্ৰয় দিতে হয়, তারপর ছুঁড়ে ফেলতে হয় আঁস্তাকুড়ে। আশ্চর্য স্পর্ধাফিল্ম কিনে নিয়ে এসেছে। আড়াই ডলার দামের একটা উপহাব কিনে মনে মনে ভেবেছে অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

লিলিয়ান ডরমিটরিতে থাকে না। রুমিং হাউজে থাকে। রুমিং হাউজগুলি ইউনিভার্সিটির কোনো ব্যাপার না। ব্যক্তিমালিকানায় চলে। বাড়িওয়ালারা সস্তায় ভাড়া দেয়। রুমিং হাউজে। শুধু থাকার ব্যবস্থা। রান্না করার ব্যবস্থা নেই, কারণ কিচেন নেই। কমন বাথরুম। মাসে চল্লিশ ডলারে এরচে ভালো কিছু আশা করাও অবশ্যি অন্যায়। এরচে বেশি খরচ করে ডরমিটরিতে জায়গা নেয়া লিলিয়ানের সাধ্যের বাইরে। পিকনিক করতে এসে পঞ্চাশ ডলার খরচ হয়ে গেছে। এই মাসটা তার কষ্টে যাবে। কয়েকটা বই কেনা দরকার। এ মাসে কেনা হবে না। ভেবেছিল মার জন্মদিন উপলক্ষে মাকে লংডিসটেন্স কল করবে। তাও সম্ভব হবে না। তিন মিনিট কথা বলতেই লাগে আঠার ডলার। তাছাড়া মার সঙ্গে তিন মিনিট কথা বলাও যাবে না। একবার টেলিফোন হাতে পেলে তিনি ছাড়বেন না। রাজ্যের কথা বলতে থাকবেন। লিলিয়ান যদি বলে–এখন রাখি মা, বিল উঠছে। মা বলবেন–আর একটু, জরুরি কথাটাই বলা হয় নি। তোর পজার চাচা ঐদিন কী করেছে শোন। ঐ লোকটার। আক্কেল বলে এক জিনিস এখনো হলো না। এদিকে তার ডেনটিস্ট বলেছে তার না-কি তিনটা আক্কেল দাত। এমন কথা কি শুনেছিস কখনো—তিনটা আক্কেল দাঁত?

বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে লিলিয়ানের ঘুম এলো শেষ রাতে। ঘুম আসার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল। সে অপরিচিত একটা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিশাল নদী। পানিতে কানায় কানায় ভর্তি। নদী, নদীর ওপাশে বন-সব জোছনায় থৈ-থৈ করছে। হঠাৎ মাঝ নদীতে কালোমতো কী দেখা গেল। স্রোতের প্রবল টানে ভেসে যাচ্ছে। লিলিয়ান দেখতে পারছে না, তবু পরিষ্কার বুঝতে পারছে নদীর স্রোতে যে জিনিসটা ভেসে যাচ্ছে তা একটা মৃতদেহ। মৃতদেহটা লিলিয়ানের চেনা। খুব চেনা। মৃত মানুষ প্রশ্নের জবাব দেয় না। তবু লিলিয়ান চিৎকার কবে উঠল— কে কে কে?

স্বপ্নে সবই সম্ভব। মৃতদেহ কথা বলল। অনেক কষ্টে পানিব উপর উঠে বসল। ক্ষীণ গলায় বলল, লিলিয়ান আমি। ওরা আমাকে মেরে নদীতে ফেলে দিয়েছে। তুমি আমাকে देंbi७।

লিলিয়ান আতঙ্কে অস্থির হয়ে বলল, আমি কী করে তোমাকে বাঁচাব? তুমি তো মরেই গেছ।

বাঁচাও লিলিয়ান, বাঁচাও। প্লিজ প্লিজ।

এই সময় নদীর স্রোত বেড়ে গেল। জলের প্রবল টান উপস্থিত হলো। শো-শো শব্দ হতে লাগল। মৃতদেহটি ভাটির দিকে তীব্ৰ গতিতে ছুটে যাচ্ছে। অনেক অনেক দূর থেকে সে ডাকছে–লিলিয়ান লিলিয়ান।

লিলিয়ান নদীর পাড় ঘেসে ছুটতে শুরু করেছে। খানাখন্দ ঝোপঝাড় ভেঙে সে ছুটিছে। মনে হচ্ছে সে আর দৌড়াতে পারবে না। হুঁমড়ি খেয়ে পড়বে। মৃতদেহ এখনো তাকে ডাকছে। মৃতদেহের কণ্ঠস্বর ক্ষীণ। সেই স্বর বাতাস ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। লিলিয়ানের কান পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না।

এই অবস্থায় লিলিয়ানের ঘুম ভািঙল। তার সমস্ত শরীর ঘামে ভিজে গেছে। জেগে ওঠাব পরেও সে অনেকক্ষণ ভয়ে ঠকঠক করে কপিল। তার ভয়ের অনেকগুলি কারণেব একটি হচ্ছে–যে যুবকের মৃতদেহটি ভেসে যাচ্ছিল সেই যুবক তার চেনা। যুবকের নাম–তাহের। দেখা হয়েছিল ইয়েলো স্টোন পার্কে। তার গায়ে ছিল। হলুদ বঙেব গলারন্ধ স্যুয়েটার। স্বপ্নেও সেই একই স্যুয়েটার ছিল, তবে তার রঙ ছিল ধূসর।

তীব্র ভয় অনেকটা যেমন হঠাৎ আসে তেমনি হঠাৎই চলে যায়। রোদ উঠার সঙ্গে সঙ্গে লিলিয়ানের ভয় কেটে গেল। শুধু যে ভয় কাটল তাই না, হাসিও পেতে লাগল। তার মনে হলো সে এমন কিছু ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখে নি। নদী দেখেছে। নদী কোনো ভয়ঙ্কর জিনিস নয়। নদী দেখার কারণও আছে। আগের দিন পুরো সময়টা কাটিয়েছে ওল্ড ফেইথফুল আহদের তীরে। তাহের নামের ছেলেটিকে জড়িযে স্বপ্ন দেখেছে–সেটাও স্বাভাবিক। তার সঙ্গে দেখা হয়েছে। সাক্ষাৎ-পর্বও খুব সুখকর ছিল না। মস্তিষ্ক এই ব্যাপারগুলিই তার নিজের মতো করে সাজিয়েছে। লিলিয়ানের পরিষ্কার মনে আছেছোটবেলায় সে যার সঙ্গেই ঝগড়া করত রাতে তাকেই স্বপ্নে দেখত। সেই স্বপ্নগুলিও হতো ভয়ঙ্কর।

লিলিয়ান ঠিক করুল আজ ইউনিভার্সিটিতে যাবে না। আজ একটামাত্র ক্লাস। এই ক্লাস এমন জরুরি নয়। না করলে ক্ষতি হবে না। তারচে বরং ক্যান্টিনে যাওয়া যাক। কোনো কাজ পাওয়া যায় কি-না সেই চেষ্টা করা যেতে পারে। চার-পাঁচ ঘণ্টা কাজ করতে পারলে–ইয়েলো স্টোন পার্কের খরচ কিছুটা উঠে আসবে।

ক্যান্টিনে কোনো কাজ পাওয়া গেল না। সে সুইমিং পুলের দিকে গেল। অকারণে যাওয়া। সাঁতার কাটতে হলে টিকিট লাগবে। তার টিকিট কাটার মতো ডলার নেই। কী অদ্ভুত দেশ। এই আমেরিকা! কারো মুখে ডলার ছাড়া অন্য শব্দ নেই।

লিলিয়ান বেশ অনেকক্ষণ সুইমিং পুলে সাঁতার কাটা দেখল। তার কাছে সব সময় মনে হয় পৃথিবীর সবচে সুন্দর দৃশ্যের একটি হচ্ছে–মানুষের সাঁতারের দৃশ্য। মানুষ যদি উড়তে পাবত তাহলে সেই দৃশ্য নিশ্চয়ই খুব সুন্দর হতো।

লিলিয়ান স্যান্ডউইচ কিনে ইউনিভার্সিটি বোটানিক্যাল গার্ডেনের দিকে গেল। লাঞ্চ খাওয়ার জন্য তার এখানে একটি প্ৰিয় জায়গা আছে। মেপল গাছের নিচের বাধানো বেদি। গাছের পাতা হলুদ হতে শুরু করেছে। কী সুন্দর লাগছে গাছটাকে! সে একা একা সন্ধ্যা পর্যন্ত গাছের নিচে বসে রইল। আরো কিছুক্ষণ বসত। শীত শীত করছে। সুয়েটারে শীত মানছে না। তাছাড়া ঘুম ও পাচ্ছে। পড়াশোনা করা দরকার। মনে হচ্ছে আজ পড়া হবে না। সকাল সকাল শুয়ে পড়তে হবে।

আশ্চর্য ব্যাপার, আজ রাতেও লিলিয়ানের ঘুম হলো না। শেষ রাতের দিকে তন্দ্ৰামতো হলো। তন্দ্ৰায় দেখল দুঃস্বপ্ন। আগেব রাতের স্বপ্নটাই অন্যভাবে দেখা। সে এবং তাহের দৌড়াচ্ছে। প্ৰাণপণে ছুটছে। তাদেব তাড়া করছে ভয়ঙ্কর কিছু মানুষ। তাহের বলছে, লিলিয়ান আমার হাত ধৰ্ব্ব। আমি দৌড়াতে পারছি না। প্লিজ, আমার হাত ধব। প্লিজ।

লিলিয়ান চিৎকার কবে জেগে উঠল। নিজেকে শান্ত করতে তার সময় লাগল। হিটিং কয়েল দিয়ে গরম এক কাপ কফি খেয়ে মাকে চিঠি লিখতে বসল।

মা,

আমার কী জানি হয়েছে–দুঃস্বপ্ন দেখছি। ভয়ঙ্কর সব দুঃস্বপ্ন। আমার রাতে ঘুম হচ্ছে না। তুমি চার্চে গিয়ে আমার নামে দুটা বাতি জ্বলিও…

এই পর্যন্ত লিখেই লিলিয়ান চিঠি ছিঁড়ে ফেলল। এ ধরনের চিঠি মাকে দেয়ার কোনো মানে হয় না। তিনি শুধু শুধু দুশ্চিন্তায় পড়বেন। তার হাঁপানির টান উঠে যাবে। সে নতুন একটি চিঠি লিখল। সেখানে খুব সুন্দর করে লেখা হলো-ইয়েলো স্টোন পার্কে বেড়াতে যাবার বর্ণনা। ইউনিভার্সিটি সুইমিং পুলে সাতাবের আনন্দ বিবরণ।

ভোর সাতটায় সে তৈরি হলো ইউনিভার্সিটিতে যাবার জন্য। আয়নায় একবার নিজেকে দেখল। দুরাত ঘুম হয় নি। কিন্তু চেহারায় ক্লান্তির কোনো ছাপ নেই। তার নিজের কাছে মনে হলো আজ তার চোখ অন্যদিনের চেয়েও অনেক উজ্জ্বল।

আজ লাঞ্চ আওয়ারের আগে কোনো ক্লাস নেই। কিন্তু টার্ম পেপার জমা দিতে হবে–লাইব্রেরিতে বইপত্র ঘাটাঘাঁটি করতে হবে। বিরক্তিকর কাজগুলির মধ্যে একটি। যে বইটি তার প্রয়োজন দেখা যাবে সেটি ছাড়া সব বইই আছে।

একেকদিন একেকজনের ভাগ্য খুব ভালো থাকে। আজ লিলিয়ানের ভাগ্য খুবই ভালো। যে বইগুলি তার দরকার ছিল সবই সে পেয়ে গেল–বাড়তি পেল একটি মনোগ্রাফ–তার টার্ম পেপারের সঙ্গে মনোগ্রাফের কোনো বেশিকম নেই। টুকে ফেললেই হয়। দুঘণ্টার মধ্যে টার্ম পেপার লেখা শেষ হলো। লিলিয়ান কফি হাউসে কফি খেতে গেল। ঘুম ঘুম লাগছে। কফি খেয়ে ঘুম তাড়াতে হবে, নয়তো ক্লাস করা যাবে না।

কফি হাউজ ছাত্র-ছাত্রীতে ঠাসা। এখন লাঞ্চ আওয়ার। কফি শাপে এত ভিড় থাকার কথা নয়। আজ এত ভিড় কেন? আজ কি সস্তায় কফি জিচ্ছে? না ফ্রি কফি দিচ্ছে? কফি হাউজ মাঝে মাঝে কিছু কায়দা করে নোটিস দিয়ে দেয়–আজ বোলা নটা থেকে সাড়ে নটা পর্যন্ত ফ্রি কফি। ব্যবসার নতুন কোনো চাল। আজও এরকম কিছু হয়েছে বোধহয়। লিলিয়ান কফির মগ হাতে জায়গা খুঁজছে তখন শুনল হাত উচিয়ে কে তাকে ডাকছে–হ্যালো লিলিয়ান, এদিকে এসো জায়গা আছে।

লিলিয়ান তাকিয়ে দেখে, তাহের।

সে কয়েক মুহুর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল— তারপর এগিয়ে গেল। তাহের হাসি মুখে বলল, এত তাড়াতাড়ি তোমার দেখা পাব ভাবি নি। তুমি কি এই ইউনিভার্সিটির ছাত্রী?

হ্যাঁ।

আমি যাচ্ছিলাম পাশ দিয়ে, কী মনে করে যে ঢুকেছি। তোমার সাবজেক্ট কী? এনথ্রাপলজি।

দাঁড়িয়ে আছ কেন? বসে। বসো।

লিলিয়ান বসবে কি-না বুঝতে পারছে না। তার অস্বস্তি লাগছে। মনে হচ্ছে বসা ঠিক হবে না। এই মানুষটির সঙ্গে যোগাযোগের ফল শুভ হবে না। এর কাছ থেকে যত দূরে থাকা যায় ততই মঙ্গল। তাছাড়া এই লোক তার সঙ্গে এমন আন্তরিক ভঙ্গিতে কথা বলবে কেন? এই অধিকার তাকে কে দিয়েছে?

তুমি কী খাবে? কফি? কফিতে ক্রিম থাকবে–না ব্ল্যাক কফি?

আমি কিছু খাব না।

কাপাচিনো কফি খাবে? প্রচুর ফেনা থাকে, একগাদা মিষ্টি দিয়ে বানানো হয়। দারুণ মজা। তুমি বসে। আমি নিয়ে আসছি।

তাহের কফি নিয়ে ফিরে এসে দেখে লিলিয়ান শান্ত ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে বসে আছে। মেয়েটিকে তার খুব অসহায় মনে হলো। শুধু অসহায় না, ক্লান্ত বিষণু। এই বয়েসী মেয়েরা অনেক হাসিখুশি থাকে।

কফি কেমন লাগছে?

বেশি মিষ্টি।

একেক ধরনের কফির একেক নিয়ম। এই কফি খেতে হয় প্রচুর মিষ্টি দিয়ে। তোমার কি মন খারাপ?

না।

দেখে মনে হচ্ছে খুব মন খারাপ।

লিলিয়ান কিছু বলবে না ভেবেও বলে ফেলল, রাতে আমার ঘুম হয় নি।

তাহের হেসে ফেলল। শব্দময় হাসি। আশেপাশের টেবিল থেকে ছাত্ৰ-ছাত্রীরা তাকাচ্ছে। অনেকের ভুরু কুঁচকে আছে। কোনো বিদেশী তাদের দেশের কফি শাপে বসে সবাইকে অগ্রাহ্য করে এমন হাসি হাসবে তা বোধহয় এদের পছন্দ নয়।

তাহের লিলিয়ানের দিকে ঝুঁকে এসে বলল, শোন লিলিয়ান—মাঝে মাঝে রাতে ঘুম না হওয়াই সুস্থ মানুষের লক্ষণ। শুধুমাত্র পশুদেরই রাতে ঘুমের অসুবিধা হয় না। মানুষের হয়। আমাকে দেখা–আমি বিছানায় শোয়া মাত্র ঘুমিয়ে পড়ি। এ জন্য নিজেকে পশু পশু লাগে। হা হা হা।

আবারো সেই হাসি। আবারো লোকজন চোখ ঘুরিয়ে তাকাচ্ছে। লিলিয়ান বলল, আমি উঠব। কফির জন্য ধন্যবাদ।

আহা, বসো আর খানিকক্ষণ।

না না।

কাল তো ছুটি। এত তাড়া কীসের? এখান থেকে নব্বুই কিলোমিটার দূরে একটা পেট্রোফাইড ফবেস্ট আছে। পুরো জঙ্গল পাথর হয়ে আছে। আমি আগামীকাল যাব বলে ভাবছি। দিনে দিনে ফিরে আসা যাবে। তুমি কি আগ্রহী?

না, আমি আগ্রহী না; আমার বেড়াতে ভালো লাগে না।

ঐদিন ইয়েলো স্টোন পার্কে কিন্তু খুব বেড়াচ্ছিলে।

ঐদিন ভালো লেগেছিল। এখন লাগবে না।

লিলিয়ান বের হচ্ছে। তাহের সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে। তাকে মুখের ওপর না বলা হয়েছে তবু কোনো বিকার নেই। অদ্ভুত নির্লজ্জ ধরনের ছেলে তো। সাধারণত আমেরিকান ছেলেগুলি এরকম হয়–আঠার মতো লেগে থাকে। এ তো বিদেশী এক ছেলে। তার মান-অপমান বোধ আরো খানিকটা থাকা উচিত ছিল না?

লিলিয়ান বলল, আর আসতে হবে না। আমি যাচ্ছি।

তাহের বলল, আবার দেখা হবে। ভালো থাক–রাত জেগে জেগে তুমি যে উচ্চ শ্রেণীর মানব সন্তান তা প্ৰমাণ করতে থাক। হা হা হা। ভালো কথা, তুমি কি আমার টেলিফোন নাম্বার রাখবে? রাতে দুঃস্বপ্ন দেখলে টেলিফোন করতে পার।

আমি অন্যের টেলিফোন নাম্বার রাখি না।

অন্যের টেলিফোন নাম্বারই তো রাখতে হয়। নিজেরটা তো মনেই থাকে। হা হা হা।

আমি যাচ্ছি।

লিলিয়ান দ্রুত করিডোরে চলে এলো। সে এমনিতেই দ্রুত হাঁটে, আজ আরো দ্রুত হাঁটছে। মেমোরিয়েল ইউনিয়নের বাইরে এসে হাঁপ ছাড়ল। পেছনে ফিরে তাকাল। তাহেরকে দেখা যাচ্ছে না। নাছোড়বান্দা হয়ে সে যে পেছনে পেছনে আসে নি–এতেই লিলিয়ান আনন্দিত।

লিলিয়ান তার আপার্টমেন্টে ফিরল না। কাঁধে ব্যাগ বুলিয়ে হাঁটতে বের হলো। আজ সারাদিন সে হাঁটবে। হেঁটে হেঁটে এমন ক্লান্ত হবে যে বিছানায় শোয়ামাত্র ঘুমিয়ে পড়বে। ঘুমুতে যাবার আগে হাট শাওয়ার নেবে। এক গ্লাস আগুন গরম দুধ খাবে। বিছানায় নতুন চাদর বিছিয়ে রাখবে। তার ঘুমের সমস্যা আছে। এক রাত ঘুম না হলে পর পর কয়েক রাত ঘুম হয় না।

বেশিক্ষণ হাঁটতে হলো না। অল্প হেঁটেই লিলিয়ান ক্লান্ত হয়ে পড়ল। হলগুলিতে ঘুরতে এখন আর ভালো লাগছে না। ইচ্ছা করছে আপার্টমেন্টে ফিরে বিছানায় শুয়ে পড়তে। এখন বিছানায় যাওয়াটা হবে বিপদজনক। খানিকক্ষণ ঘুম হবে, কিন্তু রাতটা কাটবে অঘুমো। লিলিয়ান স্যান্ডউইচ কিনল। পার্কে বসে একা একা খেল। একা একা খাওয়া খুব কষ্টের। খাবার সময় একজন কেউ পাশে থাকা দরকার। যে প্রয়োজনেঅপ্ৰয়োজনে কথা বলবে। হাসবে। লিলিয়ানের এমন কেউ নেই। কোনোদিন কি হবে? প্রিয় একজন কি থাকবে পাশে? কে হবে সেই মানুষটি? চার্চের পাদ্রি মাথায় হলি ওয়াটার ছিটিয়ে, বুকে ক্রশ স্পর্শ করে বলবেন–

তোমাদের দুজনকে আমি স্বামী-স্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করলাম। মৃত্যু এসে তোমাদের বিচ্ছিন্ন না করা পর্যন্ত একজন থাকবে অন্যোব পাশে, সুখে দুঃখে, আনন্দে বেদনায়। Till death do you part.

লিলিয়ানের চোখে পানি এসে যাচ্ছে। সে পার্কের অপরূপ দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। মন শান্ত হচ্ছে না। সে একধরনের হাহাকার বোধ করছে–মনে হচ্ছে এই অপরূপ দৃশ্য একা দেখাব নয়। দুজনে মিলে দেখার।

লিলিয়ান আপার্টমেন্টে ফিরুল সন্ধ্যা মিলাবার পর। ক্লাস্তিতে তার শরীর ভেঙে পড়ছে। মনে হচ্ছে এক সেকেন্ডও সে জেগে থাকতে পারবে না। হট শাওয়াব নেয়া, গরম দুধ খাওয়া, বিছানার চাদর বদলানো কিছুই তার পক্ষে সম্ভব নয়। সে দাবজা বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। সে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ল। গাঢ় গভীর ঘুম। যে ঘুমের সময় মানুষ মানুষ থাকে না, পাথরের মতো হয়ে যায়। গভীব ঘুমের স্বপ্নগুলি অন্যরকম হয়। স্বপ্ন আর স্বপ্ন থাকে না। বাস্তবের কাছাকাছি চলে যায়। হালকা ঘুমের স্বপ্নগুলি হয়। হালকা, অস্পষ্ট কিছু লজিক বিহীন এলোমেলো ছবি। গাঢ় ঘুমের স্বপ্নস্পষ্ট, যুক্তিনির্ভর।

আজ লিলিয়ান দেখল গাঢ় ঘুমের স্বপ্ন। স্বপ্নে সে এবং তাহের দুজন পাশাপাশি শুয়ে আছে। তাহের ঘুমুচ্ছে, সে জেগে আছে। ঘুমের মধ্যে তাহের অফুট শব্দ করল। লিলিয়ান হাত রাখল। তাহেরের গায়ে। হাত ভেজা ভেজা লাগছে। সে চোখের সামনে হাত মেলে ধরল। হাত রক্তে লাল। সে চেঁচিয়ে উঠল। লিলিয়ানের ঘুম ভাঙল নিজের চিৎকারে। বাকি রাত সে ঘুমুল না। জেগে বসে রইল। ভোরবেলা টেলিফোন করল মাকে।

কেমন আছ মা?

আমি ভালো আছি। তোর গলা এমন শোনাচ্ছে কেন? তোর কী হয়েছে?

কদিন ধরে আমি খুব দুঃস্বপ্ন দেখছি।

কী দুঃস্বপ্ন?

ভয়ঙ্কর সব দুঃস্বপ্ন। একটা বিদেশী ছেলেকে নিয়ে দুঃস্বপ্ন।

এ ছেলের সঙ্গে কি তোর পরিচয় আছে?

না। দুদিন কথা হয়েছে।

কী রকম কথা?

সাধারণ কথা মা। তেমন কিছু না।

ছেলেটার মধ্যে নিশ্চয়ই এমন কিছু আছে যা দেখে তুই ভয় পেয়েছিস।

তেমন কিছু নেই মা। ভালো ছেলে।

দুদিনের আলাপে কী করে বুঝলি ভালো ছেলে?

লিলিয়ান জবাব দিল না। তার মা কয়েকবার বললেন, হ্যালো হ্যালো–লিলিয়ান নতে পাচ্ছিস? আমি তো কিছুই শুনতে পাচ্ছি না–হ্যালো হ্যালো।

লিলিয়ানের সবচে ছোটবোন রওনি কাঁদছে। রান্নাঘরে মা নিশ্চয়ই কল ছেড়ে রেখেছে–পানি পড়ার শব্দ আসছে।

হ্যালো, লিলিয়ান। হ্যালো… ..টেলিফোনটায় কী হলো কিছু শুনতে পারছি না।

লিলিয়ান বলল, মা রওনি কাঁদছে। তুমি ওকে দেখ–আমি টেলিফোন রাখলাম…

না না। টেলিফোন রাখিস না। তুই আমার কথা শোন মা… ..তুই একজন ভালো ডাক্তার দেখা। টাকা। যা লাগে লাগুক… ..আমি যেভাবেই হোক ডলার পাঠাব। কিছু দিন পর পর তুই এমন দুঃস্বপ্ন দেখিস। এটা তো ভালো কথা না।

টেলিফোন বাখলাম মা।

না না না…।

লিলিয়ান টেলিফোন রাখল না। কানে লাগিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। এখনো রওনির কান্না শোনা যাচ্ছে। বাথরুমের ট্যাপ দিয়ে পানি পড়াবা শব্দ আসছে, কেউ একজন বোধহয় এসেছে তাদের বাড়িতে, কলিঃ বেল টিপছে… ..ক্রমাগত বেল বাজছে। লিলিয়ানের মা কাঁদো কাঁদো গলায় বলে যাচ্ছেন, হ্যালো লিলিয়ান হ্যালো। কী হলো টেলিফোনটায়–কোনো কথা শুনতে পাচ্ছি না। অপারেটর হ্যালো অপারেটর…

লিলিয়ান মার কথা অগ্রাহ্য করল না। কোনো দিন করেও না। সে একজন সাইকিয়াট্রিস্টেব সঙ্গে কথা বলতে গেল। ইউনিভার্সিটিব সাইকিযাট্রিষ্ট। এরা বলে স্টুডেন্ট কাউন্সিলার। ছাত্র-ছাত্রীদের নানান ধরনে? সমস্যা নিয়ে এঁরা কথা বলেন। এক সময় ছাত্ৰ-ছাত্রীদেব সমস্যা ছিল পড়াশোনা কেন্দ্ৰক–কোর্স ভালো লাগছে না, গ্রেড খারাপ হচ্ছে এই জাতীয়। এখনকার সমস্যা বেশির ভাগই মানসিক। যে কারণে স্টুডেন্ট কাউন্সিলারদের মধ্যে অন্তৰ্গত একজন থাকেন সাইকিয়াট্রিষ্ট।

লিলিয়ান যার কাছে গেল তাঁর নাম ভারমান। ডা. এঙ্গেলস ভারমান। ভদ্রলোক ভারিক্কি ধরনের বেঁটেখাট মানুষ। তাঁর মুখ ভর্তি দাড়িগোঁফ। চুল-দাড়ি সবই পাকা। ফর্স গায়ের রঙের সঙ্গে চুলের রঙ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমাটা ঝুলে আছে নাকের উপর। ভদ্রলোক তাকালেন চশমার ফ্রেমের উপর দিয়ে। লিলিয়ানের মনে হলো–ভদ্রলোকের চোখ সুন্দর। তিনি তাকাচ্ছেন মমতা নিয়ে। ডাক্তাররা যখন রোগীর দিকে তাকান তখন রোগটাকে দেখার চেষ্টা করেন, মানুষটাকে নয়। এই ডাক্তার মানুষটাকে দেখার চেষ্টা করছেন।

লিলিয়ান বলল, গুড মর্নিং ডা. এঙ্গেলস ভারমান।

গুড মর্নিং লিটল মিস।

আমার নাম লিলিয়ান।

গুড মর্নিং লিটল মিস লিলিয়ান।

গুড মর্নিং স্যার।

বলো তো লিলিয়ান, তুমি কেমন আছ?

আমি খুব ভালো নেই।

শুনে খুশি হলাম। সারাক্ষণ ভালো থাকা কোনো কাজের কথা না। তোমরা যদি সারাক্ষণ ভালো থাক তাহলে আমরা কী করব? তোমার সমস্যা কী তা এখন বলো। সহজভাবে বলো। খোলাখুলি বলো।

আমার ঘুম হচ্ছে না।

এটা কোনো সমস্যাই না। ঘুম না হলে এক লক্ষ ধরনের ঘুমের ওষুধ আছে। আর কী সমস্যা?

ঘুমুলেই দুঃস্বপ্ন দেখি।

তুমি তো ভালো আছ, ঘুমিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখ। আমি দেখি জেগে জেগে। চাবদিকে যা দেখছি সবই দুঃস্বপ্ন। গতকাল কী হয়েছে শোন–সাবওয়ে দিয়ে আসছি, আমার চোখের সামনে একজন মহিলার ব্যােগ এক কালো ছোকরা ছিনিয়ে নিয়ে দৌড়ে পালাল। এতগুলি লোক আমরা, কেউ কোনো কথা বললাম না। সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম। এটা কি বড় ধরনের দুঃস্বপ্ন না?

আপনিও কিছু বলেন নি?

না। আমি হচ্ছি অবজাবভার, আমি বসে বসে দেখেছি।

লিলিয়ান বলল, অন্যরাও হয়তো আপনার মতো কোনো অজুহাত তৈরি কবে বসে ছিল।

ডা. এঙ্গেলস ভাবমান হাসতে হাসতে বললেন, তুমি বুদ্ধিমতী মেয়ে। তোমার কোনো সমস্যা থাকার কথা না। সমস্যা হয় কম বুদ্ধির মানুষদের। এরা কিছু বুঝতে চায় না। কিন্তু তুমি বুঝবে। যুক্তি দিয়ে বোঝালে বুঝবে। এখন সুন্দর করে তোমার সমস্যা বলো। না-কি বলার আগে কফি খেয়ে নেবে?

কফি খাব।

ঐ টেবিলে কফি মেকার আছে। তোমার জন্য আন এবং আমার জন্য আন। কফির কাঁপে চুমুক দিতে দিতে তোমার সমস্যার কথা বলো। আমার বদঅভ্যাস হচ্ছে, আমি চশমার ফাঁক দিয়ে তাকাই। আশা করি এতে কোনো সমস্যা হবে না। কারণ আমার চোখ খুব সুন্দর। ঠিক বলি নি?

জ্বি, ঠিক বলেছেন।

লিলিয়ান খুব গুছিয়ে তার সমস্যার কথা বলল। ডা. ভারমান কোনো প্রশ্ন করলেন না। চুপচাপ শুনে গেলেন। এক ফাকে উঠে গিয়ে আবার কফির পেয়ালা ভর্তি করে আনলেন। লিলিয়ান কথা শেষ কববার পর ডা. ভারমান মুখ খুললেন। তিনি নরম গলায় বললেন, তোমার পরিবারে লোক সংখ্যা কত?

অনেক। আমাদের যৌথ পরিবার। আমার দুচাচা এবং বাবা… ..এরা তিন ভাই একসঙ্গে থাকেন।

একত্রে রান্না হয়?

হ্যাঁ, এক সঙ্গে রান্না হয়। তবে আমাদের পজার চাচা কিছুদিন পরপর রাগ করে বলেন এখন থেকে তিনি আলাদা রান্নাবান্না করবেন। কারো সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ নেই। দুএকদিন আলাদা রান্না হয়, তাবপর আবার আগের জায়গায় ফিরে আসেন।

তোমাদের চাচাদের মধ্যে কি খুব মিল?

মোটেও মিল নেই। সারাক্ষণ তাঁরা ঝগড়া করছেন, কিন্তু তারপরেও একজন অন্যজনদের ছাড়া থাকতে পাবেন না। আমার মনে হয় ঝগড়া করার জন্যই তাদের একসঙ্গে থাকা প্রয়োজন। ব্যাপারটা বেশ মজার।

তুমিই প্রথম বাইরে পড়তে এসেছ?

জ্বি।

তুমি যখন বিদেশে রওনা হলে তখন তোমার পরিবারের সদস্যরা কী করল? সবাই খুব কাদল। আমার পজার চাচা পুরো একদিন এক রাত না খেয়ে দরজা জানালা বন্ধ করে ঘরে বসে ছিলেন। অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাঁকে খাওয়ানো হয়।

ডা. ভারমান পাইপ ধরাতে ধরাতে বললেন, তোমার সমস্যার মূল কারণ হচ্ছে তোমার পরিবার। তুমি এমন এক ক্লোজ পরিবার থেকে এসেছি যে পরিবারের সদস্যরা ভালোবাসার কঠিন জালে তোমাকে আটকে রেখেছে। তুমি জাল ছিড়তে চাচ্ছ–পারছি না।

আপনি ভুল বললেন–আমি জাল ছিঁড়তে চাচ্ছি না।

তুমি চাচ্ছ কিন্তু তোমার মন তাতে সায় দিচ্ছে না। তোমার মনে একই সঙ্গে দুটি বিপরীত ধারা কাজ করছে। একটি ধারা তোমাকে জাল কেটে বেরিয়ে আসতে বলছে, অন্যটি তা করতে দিচ্ছে না। এতে মনে প্ৰচণ্ড চাপ পড়ছে।

এর সঙ্গে আমার দুঃস্বপ্নের সম্পর্ক কী? আমি দুঃস্বপ্ন দেখছি অন্য একজনকে নিয়ে।

সম্পর্ক আছে… । ঐ ছেলেটিকে দেখেই তোমার জাল কেটে বেরিয়ে আসবার কথা মনে হলো। তোমার মনের একটি অংশ তাতে সায় দিল না। সৃষ্টি হলো প্রচণ্ড চাপের। দুঃস্বপ্নগুলি চাপের ফল, আর কিছুই না। ছেলেটিকে তোমার খুব ভালো লেগে গেছেতুমি তা স্বীকার করতে চাচ্ছি না।

ছেলেটিকে ভালো লাগার কিছু নেই।

আমার ধারণা আছে। তুমি তোমার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কাকে সবচে ভালোবাসো?

পজার চাচাকে।

চরিত্রের কোন কোন মিল আছে?

ভালো করে চিন্তা কর। আমার ধারণা মিল আছে।

পজার চাচা অকারণে হো-হো করে হাসেন। ঐ ছেলেটিও হাসে।

আর?

এইসব নিয়ে ভাবতে আমার ভালো লাগছে না।

আমি যে তোমার সমস্যাটা ধরিয়ে দিয়েছি তা-কি বুঝতে পেরেছ?

লিলিয়ান জবাব দিল না। ডা. ভারমান হাসলেন। লিলিয়ান বলল, আমাকে আপনি কী করতে বলেন?

উপদেশ চাচ্ছি?

হ্যাঁ।

আমি তোমাকে কোনো উপদেশ দেব না। তুমি কী করবে না করবে তা তোমার ব্যাপার। আমি সমস্যা ধরিয়ে দিয়েছি। সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব তোমার। কারণ সমস্যাটা তোমার, আমার নয়।

লিলিয়ান উঠে দাঁড়াল। ফিরে গেল আপার্টমেন্টে। প্রায় এক ঘণ্টার মতো চুপচাপ বিছানায় শুয়ে রইল। তারপর উঠে হাতে মুখে পানি ছিটাল। সে তার সবচে সুন্দর পোশাকটা পরল। অনেক সময় নিয়ে চুল আঁচড়াল। তার সম্বল অল্প কিছু ডলাবেল সব কটা সঙ্গে নিয়ে বেরুল। সে তাহেরকে খুঁজে বের করবে। এই শহরের মেডিকেল স্কুলের একজন বিদেশী ছাত্রের ঠিকানা বের করা কঠিন হবার কথা না। তবে লিলিয়ান প্রথমে গেল। ডাউন টাউনের এক ফুলের দোকানে। দশ ডলার দিয়ে সে পঁচিশটা চমৎকার গোলাপ কিনল। আধ ফোঁটা গোলাপ! আগুনের মতো টকটকে রঙ। চিরকাল ছেলেরাই মেয়েদের জন্য ফুল কিনেছে। মাঝে-মধ্যে নিয়মেব হেরফের হলে কিছু যায় আসে না।

কলিং বেল টেপার সঙ্গে সঙ্গেই দরজা খুলে গেল। তাহের খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, এসো লিলিয়ান। তার কথা বলার ভঙ্গি থেকে মনে হওয়া অস্বাভাবিক না যে সে লিলিয়ানের জন্যই অপেক্ষা করছিল।

লিলিয়ান বলল, আমি যে এখানে আসব তা কি আপনি জানতেন?

তাহের বলল, জানব কী করে–আগে তো বলো নি।

আমাকে দেখে অবাক হন নি?

আমি এত সহজে অবাক হই না। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে রিকশা করে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ করে বাবা রিকশা থেকে পড়ে গেলেন। নেমে গিয়ে দেখি মরে পড়ে আছেন। সেই থেকে অবাক হওয়া ছেড়ে দিয়েছি।

লিলিয়ানের চোখে-মুখে হকচকিত ভাব। তার ফর্সা কপাল ঘামছে। হাতের গোলাপগুলি নিয়েও সে বিব্রত। তাহের বলল, ফুলগুলি কি আমার জন্য?

হুঁ।

দাও আমার হাতে। তুমি বসে।

না।

দাঁড়িয়ে থাকার জন্য এসেছ?

লিলিয়ান কী বলবে বুঝতে পারছে না। সত্যি তো সে কী জন্য এসেছে? কেনই বা এসেছে? সে তাকাল চারদিকে। অবিবাহিত পুরুষের ঘর। একপলকেই বোঝা যায়। টেবিলে বা দেয়ালে কোনো তরুণীর ছবি নেই। এটা একটা বড় ব্যাপার। বিছানার কাছে পিন আপ পত্রিকা নেই। লিলিয়ান ক্ষীণ গলায় বলল, আমি এখন চলে যাব।

চলে যাবে ভালো কথা–চলে যাও। হঠাৎ করে একগাদা ফুল নিয়ে এসে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে চলে যাওয়া ভালো।

আপনাকে বিব্রত করার জন্য আমি দুঃখিত।

আমি মোটেও বিব্রত হই নি। বিস্মিত হচ্ছি। অন্যদের বিস্ময় যেমন চোখে-মুখে ফুটে উঠে আমার বেলায় তা হয় না বলেই তোমার কাছে মনে হচ্ছে। আমি পুরো ব্যাপারটা খুব সহজভাবে নিচ্ছি। আসলে তা না। আমার ঠিকানা কোথায় পেলে?

জোগাড় করেছি।

কেন?

লিলিয়ান চুপ করে রইল। তাহেরের মনে হলো এই মেয়ে আর কোনো প্রশ্নের জবাব দেবে না। মেয়েটিকে সহজ করার কোনো পথও সে খুঁজে পাচ্ছে না। কী বললে সে সহজ হবে?

লিলিয়ান, তুমি কি পেট্রিফায়েড ফরেস্টটা দেখতে চাও? ঐদিন আমি যাই নি। তুমি যেতে চাইলে আজ যেতে পারি। সন্ধ্যায্য সন্ধায় চলে আসতে পাবীব।

আমি আমার আপাটমেন্টে ফিরে যাব।

বেশ তো ফিরে যাবে। আমি তোমাকে পৌঁছে দেব।

আপনাকে পৌঁছে দিতে হবে না।

তুমি লক্ষ কর নি বোধহয়–বাইরে খুব ঠাণ্ডা পড়েছে। এই ঠাণ্ডায তুমি এমন পাতলা কাপড় পরে কী করে এসেছি সেও এক রহস্য। তুমি আমার সঙ্গে যেতে না চাইলে একাই যাবে–আমার একটা ওভারকেট আছে, সেটা গাযে চাপিয়ে চলে যেতে পারবে। না-কি আমার ওভারকেটও গায়ে দেবে না?

লিলিয়ান বসল। সে যে বসেছে তাতে সে নিজেও অবাক হয়েছে। তার কাছে মনে হচ্ছে পুরো ব্যাপারটা স্বপ্নে ঘটছে। সে নিজের ইচ্ছেতে কিছু করছে না। যা তাকে করতে বলা হচ্ছে তাই সে করছে। পুবে ঘটনা অন্য কেউ ঘটাচ্ছে। সে অন্য কেউটা কে?

লিলিয়ান।

হুঁ।

কফি খাবে?

হুঁ।

শুনে খুশি হলাম। আমি কফি তৈরি করছি। তুমি সহজ এবং স্বাভাবিক হতে চেষ্টা কর। তারপর তোমার কাছে কয়েকটা জিনিস জেনে নেব। যা যা জানতে চাই তাও বলে নিচ্ছি–এক, হঠাৎ তুমি একগাদা ফুল নিয়ে আমার কাছে কেন এসেছ? দুই, আজ যে আমার জন্মদিন তা-কি তুমি জানো? যদি জানো তাহলে কীভাবে জানো?

লিলিয়ান বিস্মিত হয়ে বলল, আজ। আপনার জন্মদিন?

তাহের বলল, আমি দ্বিতীয় প্রশ্নটির জবাব পেয়ে গেছি। আজ যে আমার জন্মদিন তা তুমি জানো না। এখন বাকি রইল প্রথম প্রশ্ন। তুমি প্রশ্নটির জবাব নিয়ে ভাবতে থাক। আমি একটু গ্রোসরি শপে যাব। ঘরে কফি, চিনি, ক্রিম কিছুই নেই।

আমি কি আপনার এখান থেকে একটা টেলিফোন করতে পারি?

হ্যাঁ পার।

একটা লং ডিসটেন্স কল করব।

একটা কেন, দশটা কর। তুমি আমার এখানে আসায় আমি নিজে যে কী পরিমাণ খুশি হয়েছি তা কোনোদিন তুমি বুঝবে না। প্রথম দেখাতেই ভালোবাসা–এই জাতীয় কিছু কথা সাহিত্যে প্রচলিত আছে। এই জাতীয় বায়বীয় কথা আমি কখনো বিশ্বাস করতাম না। তোমাকে ওল্ড ফেইথফুল লেকের কাছে দেখে প্রথম মনে হলোসাহিত্যের এই কথাটা মিথ্যা না। মেয়েদের পেছনে ঘোরা আমার স্বভাব নয়। তারপবেও আমি খুঁজে খুঁজে তোমার আপার্টমেন্ট বের করেছি। ঐদিন তোমার সঙ্গে ইউনিভার্সিটিতে দেখা হলো। তোমার বোধহয় ধারণা পুরো ব্যাপারটা কাকতালীয়। আসলে তা না। আমি প্রায়ই তোমাদের মেমোরিয়াল ইউনিয়নে বসে থাকতাম। এই আশায় যে তোমার সঙ্গে দেখা হবে। দেখা হলেই বলব, পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম… । কবে। কোথায় কোন রুমে তোমার ক্লাস তাও আমি জানি–প্ৰমাণ দেব?

লিলিয়ান তাকিয়ে আছে, কিছু বলছে না। তাহের আগের মতোই সহজ স্বাভাবিক ভুঞ্জিলিল, আজ ছিল তোমার টার্স পেপার জমা দেয়ার শেষ দিন। আমি কি ঠিক বলেছি?

লিলিয়ান অন্যদিকে তাকিয়ে হাসল। তাহের বলল, আমি কফি নিয়ে আসতে যাচ্ছি। আমার আসতে খানিকটা দেরি হবে। আমার জন্মদিন উপলক্ষে একটা ভালো হোটেলে আমি তোমাকে নিয়ে খেতে যাব। দুশ্চিন্তাগ্ৰস্ত হবার কোনো কারণ নেই। খাওয়ার শেষে আমি তোমাকে তোমার আপার্টমেন্টে পৌঁছে দেব। তুমি যে এসেছ এতেই আমি খুশি। এর বেশি আমি কিছু আশা করি নি। যা হয়েছে তাই যথেষ্ট। যদিও জানি না–ঘটনা এমন কেন ঘটল। ব্যাখ্যা নিশ্চয়ই আছে। তোমার ইচ্ছা করলে তুমি ব্যাখ্যা করবে। ইচ্ছা না করলে করতে হবে না।

তাহের ঘর ছেড়ে চলে গেল। লিলিয়ান উঠে দরজা বন্ধ করল। টেলিফোন করল তার মাকে। লিলিয়ানের মা আতঙ্ক মেশানো গলায় বললেন, আমি এর মধ্যে তিনবার তোর আপার্টমেন্টে টেলিফোন করেছি। আমরা চিন্তায় চিন্তায় অস্থির।

চিন্তার কিছু নেই মা।

তুই কি গিয়েছিলি কোনো ডাক্তারের কাছে?

হ্যাঁ।

ডাক্তার কী বললেন?

ডাক্তার নতুন কিছু বলে নি। আমি যা জানতাম তাই বলেছেন।

আমি তোর কথা কিছু বুঝতে পারছি না। তুই কী জানতি?

লিলিয়ান হাসল। শব্দ করে হাসল। লিলিয়ানের মা বললেন, কী হলো হাসছিস কেন?

হাসি আসছে তাই হাসছি?

তুই এখন কোথায়?

কেন আমার আপার্টমেন্টে।

না, তুই অন্য কোনো জায়গায়।

কী করে বুঝলে?

আমি জানি। আমার মন বলছে। তুই কি ঐ ছেলেটির কাছে?

হ্যাঁ।

কেন–ঐখানে কেন? কী হচ্ছে লিলিয়ান?

ভয়ের কিছু নেই মা!

অবশ্যই ভয়ের কিছু। তুই কেন ঐ ছেলের কাছে গেলি?

লিলিয়ান খানিকক্ষণ চুপ করে বাইল। ওপাশ থেকে ভদ্রমহিলা বারবার বলতে লাগলেন–হ্যালো হ্যালো।

মা শোন, আমি খুব সম্ভব এই ভদ্রলোককে বিয়ে করব।

কী বলছিস তুই?

আমি এখনো জানি না। ভদ্রলোক এখানে নেই। তিনি কফি কিনতে গিয়েছেন। ফিরে এলেই তাকে বলব।

কী বলবি?

বলব যে আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই। যদি রাজি থাকেন তবেই শুধু আপনার সঙ্গে কফি খাব এবং রাতে ডিনার করতে যাব।

হা ঈশ্বর! মা তুই কী বলছিস? তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে মা। আমি নিশ্চিত তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে।

অস্থির হয়ে না মা। আমার মাথা খারাপ হয় নি। মাথা ঠিক আছে। আর এক্ষুণি তোমাদের চিন্তিত হতে হবে না। হয়তো বিয়েতে ভদ্রলোক রাজি হবেন না। হয়তো বলবেন–তিনি বিবাহিত।

লোকটা বিবাহিত কি-না তাও তুই জানিস না?

না।

হা ঈশ্বর! এসব কী শুনছি।

কথায় কথায় হা ঈশ্বর বলবে না। মা! শুনতে ভালো লাগছে না।

লিলিয়ান লক্ষ্মী মা, তুই দেশে চলে আয়। তোকে পড়াশোনা করতে হবে না।

কাদছ কেন মা? আমি তো ভয়ঙ্কর কিছু করছি না।

তুই তোর পজার চাচার সঙ্গে কথা বল।

আমি এখন কারো সঙ্গে কথা বলব না।

তোর বাবার সঙ্গে কথা বল।

বললাম তো মা, আমি এখন কারো সঙ্গে কথা বলব ন।

হা ঈশ্বর! আমি এ কী শুনছি?

লিলিয়ান শান্ত স্বরে বলল, ঈশ্বরের প্রতি তোমার অবিচল ভক্তি। কাজেই তুমি ধরে নাও–যা হচ্ছে ঈশ্বরের ইচ্ছার আগোচরে হচ্ছে না।

লিলিয়ান মা লিলিয়ান…

টেলিফোন রাখছি মা। তুমি ভালো থেকে।

লিলিয়ানের মা চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন। লিলিয়ান জানালার পাশে দাঁড়াল। বরফ পড়তে শুরু করেছে–বছরের প্রথম বরফ। ইচ্ছে করছে ববফেব ভেতর ছুটে যেতে। সারা গায়ে বরফ মাখতে। লিলিয়ান খানিকক্ষণ বরফ পড়া দেখল। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার জন্যই বোধহয় তার চোখ জ্বালা করছে। সে বাথরুমে ঢুকে চোখে পানি দিয়ে কিছুক্ষণ কাঁদল। ফিসফিস কবে বলল, মা রাগ করো না। আমি কী করছি আমি নিজেও জানি না। এর ফল শুভ হবে, কি শুভ হবে না। তাও জানি না। শুধু একটা জিনিস জানি–আমৃত্যু আমাকে অচেনা-অজানা এই ছেলেটির সঙ্গে থাকতে হবে। এর থেকে আমার মুক্তি নেই। কিংবা কে জানে আমার মুক্তি হয়তো বন্ধনের ভেতরই ঘটবে।

দরজায় কলিং বেল বাজছে। লিলিয়ান দরজা খুলে দিল। তাহের মুগ্ধ গলায় বলল, বাইরে বরফ পড়ছে দেখেছ?

হ্যাঁ।

গায়ে বরফ মাখবে?

হ্যাঁ মাখব!

বাহু চমৎকার। আমাদের দেশে বরফ নেই, তবে বৃষ্টি আছে। বৎসরের প্রথম বৃষ্টি হলে আমরা বৃষ্টিতে ভিাজ, এতে গায়ের ঘামাচি নষ্ট হয়। বরফে কিছু নষ্ট হয় কি-না কে জানে!

তোমাদের দেশের বৃষ্টি কি তুষারপাতের চেয়েও সুন্দর?

লক্ষ গুণ সুন্দর। আমাদের দেশের প্রথম বৃষ্টিতে কী হয় জানো–এক ধরনের মাছ আছে–নাম হলো কৈ মাছ। এরা এত আনন্দিত হয় যে দলবেঁধে পানি ছেড়ে শুকনায় উঠে আসে।

কেন আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছ?

মোটেই ঠাট্টা করছি না। তোমাকে আমি দেশে নিয়ে গিয়ে নিজের চোখে দেখাব তখন তুমি…

তাহের কথা শেষ করল না, থেমে গেল। বিব্ৰত চোখে লিলিয়ানের দিকে তাকাল লিলিয়ানও তাকিয়ে আছে। লিলিয়ানের চোখে চাপা দ্যুতি।

০২. ওদের বিয়ে হতে দশ দিন লাগল

ওদের বিয়ে হতে দশ দিন লাগল। বিয়ের লাইসেন্স বের করা এদেশে অনেক যন্ত্রণা। অনেক টেস্ট-ফেস্ট করতে হয়। ডাক্তাররা আগে নিশ্চিত হয়ে নেন এই দম্পতির সন্তান বংশগত কোনো রোগের শিকার হবে না। তারপরই সার্টিফিকেট দেন। সেই সাটিফিকেট দেখিয়ে লাইসেন্সের জন্য দরখাস্ত করতে হয়।

বিয়ের পরপব লিলিয়ান ডা. ভাবমানের সঙ্গে দেখা করতে গেল। ডা. ভারমান চশমার ফাঁক দিয়ে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, মিস থেকে মিসেস হয়েছ?

হ্যাঁ। কী কবে বুঝলেন? আমার কপালে তো লেখা নেই মিসেস।

অবশ্যই লেখা আছে। সেই লেখা সবাই পড়তে পারে না। আমি পারি। তুমি কি ঐ ছেলেটিকেই বিয়ে করেছ?

হ্যাঁ।

দুঃস্বপ্ন এখন নিশ্চয়ই দেখছি না?

জ্বি-না, দেখছি না।

শুনে খুব খুশি হলাম। মনস্তত্ত্ববিদ্যা একটি বড় বিদ্যা–তা কি বুঝতে পারছ?

পারছি।

ভবিষ্যতে যদি কোনো সমস্যা হয় তাহলে আমার কাছে আসবে। তবে আমার মনে হয়। ভবিষ্যতে কোনো সমস্যা হবে না। যদি হয় তুমি নিজে তার সমাধান করতে পারবে। পাববে না?

হ্যাঁ পারব।

তোমার হাসি-খুশি মুখ দেখে ভালো লাগছে। সত্যিকাব হাসিমুখ অনেক দিন দেখি না। চারদিকে ভেজাল হাসি দেখি।

হাসির ভেজালও আপনি ধরতে পারেন?

অবশ্যই পাবি। আমার নিজের মুখে যে হাসিটি আমি ঝুলিযে রাখি তা হলো ভেজাল হাসি। একশ ভাগ ভেজাল। তুমি তোমার জীবনে ভেজাল হাসিকে আসতে দিও না। মনে কষ্ট পেলে কাদবো। মনের কষ্ট চাপা দেয়ার জন্য হাসির ভান করাধ প্রয়োজন নেই।

আমি আপনার উপদেশ মনে রাখব ডা. ভারমান।

ডা. ভারমানের উপদেশের জন্যই হয়তো দেশ থেকে মার চিঠি পেয়ে লিলিয়ান সারাদিন কাঁদল। চিঠিটি তিনি মেয়ের বিয়ের সংবাদ পাওয়ার পর লিখেছেন। সংক্ষিপ্ত চিঠি। যদিও লিলিয়ানের মার হাতে লেখা। তবু লিলিয়ান জানে–এই চিঠি তার বাবা লিখে দিয়েছেন। মা শুধু দেখে দেখে কপি করেছেন। কপি করতে গিয়েও মার বানান ভুল হয়েছে। বাবা সেইসব বানান শুদ্ধ করেছেন।

লিলিয়ান,

তোমার বিবাহের সংবাদ পাইয়াছি। আনন্দে উল্লসিত হই নাই। তুমি নিশ্চয়ই তা আশাও কর না। তুমি খুব ভালো জানো তুমি আমাদের সবার অতি আদরের ধন ছিলে। তোমাকে নিয়া আমাদের স্বপ্নের অন্ত ছিল না। তুমি সব স্বপ্নের অবসান ঘটাইয়াছ। আমি তোমাকে দোষ দেই না। ঈশ্বরের হুকুম ছাড়া কিছুই হয় না। এই ক্ষেত্রেও তাঁর ইচ্ছারই প্রতিফলন হইয়াছে। আমি তোমার এবং তোমার স্বামীর সুখী সুন্দর জীবন কামনা করি। যে সুখের জন্য তুমি আমাদের পরিবারের সকলের সুখ তুচ্ছ করিয়াছ, ঈশ্বর যেন সেই সুখ তোমাকে দেন ইহাই আমাদের সকলের কামনা।

এখন তোমাকে কিছু কথা বলিব, মন দিয়া শোন। তোমার বাধা পরিবারের সদস্য হিসেবে তোমাকে গ্ৰহণ করিবার ব্যাপারে অনিচ্ছা! প্ৰকাশ করিয়াছেন। আমাদের সকলেরই সেইমতো অভিমত। সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুসারে তোমাকে বর্জন করা হইয়াছে। ইহাতে মনে কষ্ট পাইও না। তুমি সকলকে ত্যাগ করিয়া একজনকে পাইতে চাহিয়াছ। ঈশ্বর তোমার প্রার্থনা পূর্ণ করিয়াছেন।

এক্ষণে বাড়িতে তোমার নাম আর উচ্চারিত হইবে না। তোমার ব্যবহারী জিনিস, তোমার ফটোগ্রাফ সমস্ত নষ্ট করিয়া দেওয়া হইয়াছে। তুমি আমাদের সহিত কোনো রকম যোগাযোগ রাখিবার চেষ্টা করিবে না। যোগাযোগ করিবার চেষ্টার অর্থই হইবে আমাদিগকে কষ্ট দেওয়া এবং নিজে কষ্ট পাওয়া।

ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। ঈশ্বরের নিকট তোমার প্রসঙ্গে ইহাই আমাদের শেষ প্রার্থনা।

তোমার হতভাগিনী মা।

পুনশ্চ: মা, তোমার দুঃস্বপ্ন দেখা কি বন্ধ হয়েছে?

লিলিয়ানের ধারণা চিঠির শেষের পুনশ্চ অংশটি মার লেখা। মা বাবাকে না জানিয়ে এই বাক্যটি লিখেছেন। কেন মায়েরা এত ভালো হয়? কেন হয়? সে নিজে কি কোনো একদিন এমন একজন মা হবে?

লিলিয়ান কাঁদতে কাঁদতে ভাবল আমার প্রথম সন্তানটি যেন মেয়ে হয়। মেয়ে হলেই আমি মার নামে তার নাম রাখতে পারব।

০৩. ভিন দেশের ভিন ধর্মের

ভিন দেশের ভিন ধর্মের একটি ছেলেকে বিয়ে করে ফেলার মতো কোজ সাধারণত প্ৰচণ্ড ঝোঁকের মাথায় করা হয়, এবং ঝোঁক দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বিয়ের এক মাসের মধ্যেই মনে হতে থাকে, কাজটা ঠিক হয় নি। খুব ভুল হয়ে গেছে। এদের বেলায় এটা ঘটল না। বিয়ের এক বছর পর এক গভীর রাতে লিলিয়ানের মনে হলো, আমি নিশ্চয়ই আমার শৈশবে কিংবা আমার যৌবনে বড় ধরনের কোনো পুণ্যকর্ম করেছি। বড় ধরনের কোনো পুণ্যকর্ম ছাড়া এমন একজনকে স্বামী হিসেবে, বন্ধু হিসেবে পাওয়া যায় না। লিলিয়ান একা একা কিছুক্ষণ কাঁদল। তারপর চেষ্টা করল তাহেরের ঘুম ভাঙাতে। পারল না। তাহেরের ঘুম ভাঙানো সত্যি সত্যি অসম্ভব ব্যাপার। লিলিয়ানের খুব ইচ্ছা করছিল তাহেরের ঘুম ভাঙিয়ে তাকে নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে যায়। গভীর রাতে নির্জন রাস্তায় হাত ধরাধরি করে। হাঁটতে হাঁটতে সে তাহেরকে বলে–আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমার জন্য আলাদা করে রাখা এই ভালোবাসা কখনো নষ্ট হবে না। কখনো না।

বিয়ের দেড় বছরের মাথায় তাহের ফিফথ এভিন্নুতে নতুন বাড়ি নিল। বিশাল ড়ুপলেক্স। একতলায় খাবার ঘর, বসার ঘর, লাইব্রেরি। কাম স্টাডি রুম এবং একটা গেস্ট রুম। দোতলায় চারটা শোবার ঘর। এত বড় বাড়ির তাদের কোনোই প্রয়োজন নেই। কিন্তু তাহের ছোট বাড়ি নেবে না। ছোট বাড়িতে তার নাকি দিম বন্ধ হয়ে আসে। ছোট বাড়ি নেবার কথা বলতেই তাহের হাসতে হাসতে বলল, আমার পূর্বপুরুষরা খুব বড় বড় বাড়িতে থাকতেন–বুঝলেন বিদেশিনী; কাজেই আমিও বড় বাড়িতে থাকব। বেতন যা পাই সেখান থেকে টাকা আলাদা করে রাখব। বছর পনের পর সেই টাকায় দশ একর জায়গা নিয়ে এমন বাড়ি বানাব যে তোমার আক্কেলগুড়ুম হয়ে যাবে।

হাসপাতালের জুনিয়র ডাক্তার হিসেবে তাহের যা পায় তা তার জন্য যথেষ্ট–জমানো দূরে থাকুক মাসের শেষে সে শেষ কোয়ার্টারটিও খরচ করে শুকনো মুখে লিলিয়ানকে বলে–লিলি! তোমার কাছে কি গোটা বিশেক ডলাব হবে? তখন তাহেরের শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে লিলিয়ানের চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছা করে–I love you, I love you… সে অবশ্যি চেঁচিয়ে বলে না। মনে মনে বলে যেন তাহের কখনো ধরতে না পাবে। যেমন ধরা যাক, তাহের কফির পেয়ালা হাতে নিয়ে যখন বলে–বাহ তুমি তো একসেলেন্ট কাঁপাচিনো কফি বানাতে শিখে গেছ? এসো আমরা একটি কফি শপ চালু কবি। কফি শপের নাম হবে–লিলিয়ানস কাঁপাচিনো। তখন লিলিয়ান মনে মনে বলে–I love you, I love you, ঈশ্বর মানুষকে প্রচুর ক্ষমতা দিয়েছেন, মনের কথা বুঝবার ক্ষমতা দেন নি। যদি দিতেন তাহলে তাহের বুঝতে পারত কী গাঢ় ভালোবাসায় লিলিয়ান এই মানুষটাকে ঘিরে রেখেছে।

তাহের অনেক রাত জেগে পড়াশোনা কবে। এই সময়টা লিলিয়ান তাকে বিরক্ত করে না। বারান্দায় রকিং চেয়ারে বসে দোল খেতে খেতে ভাবে–ঈশ্বর আমাকে এত সুখী কেন করলেন? এর একশ ভাগের এক ভাগ সুখী হলেও তো আমার জীবনটা সুন্দর চলে যেত।

ভালোবাসা ব্যাপারটা কী লিলিয়ান বুঝতে চেষ্টা করে। বুঝতে পারে না। তার ধারণা ভালোবাসা নামের ব্যাপারটায় শরীরের স্থান খুব অল্প। নেই বললেই হয়। আবার কখনো কখনো সম্পূর্ণ উল্টো কথা মনে হয়। মনে হয় ভালোবাসায় শরীর অনেকখানি। অনেকখানি না হলে কেন তার সারাক্ষণ এই মানুষটাকে ছুয়ে থাকতে ইচ্ছা করবে? মন ছোঁয়া সম্ভব নয় বলেই কি শরীর ছোঁয়ার এই আকুলতা?

আচ্ছা, তার যেমন সারাক্ষণ মানুষটাকে ছুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে ঐ মানুষটারও কি তাই করে? সরাসরি জিজ্ঞেস করতে লজ্জা করে, লিলিয়ান ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করেছেতাহের প্রশ্নটা ধরতে পারে নি। যেমন লিলিয়ান একদিন জিজ্ঞেস করল, শোন তাহের আমরা যখন বাগানে হাঁটি–অর্থাৎ পাশাপাশি আমরা হাঁটছি। তখন তোমার কোন দিকে হাঁটতে ভালো লাগে? অর্থাৎ আমার পাশাপাশি হাঁটতে ভালো লাগে, না আমার আগে আগে, না পেছনে পেছনে?

তাহের গম্ভীর হয়ে বলেছে–মাই ডিয়ার বিদেশিনী! আমার বাগানে হাঁটতেই ভালো লাগে না। আমার ভেতর বাগান-ভীতি আছে। আমাদের গ্রামের বাড়ির চারপাশে বাগান। ঐ বাগানে একবার আমাকে সাপে তাড়া করেছিল। সেই থেকে বাগান-ভীতি।

আচ্ছা ধর, বাগানে না। রাস্তায় হাঁটছি তখন?

মাই ডিয়ার বিদেশিনী! রাস্তায় হঁটিতেও আমার ভালো লাগে না। আমেরিকাব রাস্তাগুলি হাঁটার জন্য নয়, গাড়ি নিয়ে চলার জন্য।

লিলিয়ান দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলেছে, তুমি সব সময় আমাকে বিদেশিনী বলো কেন??

তুমি বিদেশী মেয়ে, এই জন্যই বিদেশিনী বলি।

বিদেশী মেয়ে বলে কি তোমার মনে কোনো ক্ষোভ আছে?

বিন্দুমাত্র ক্ষোভ নেই।

খুব অস্পষ্টভাবে হয়তো আছে। এত অস্পষ্ট যে তুমি নিজেও জানো না।

যদি থাকে তুমি কী করবে?

তোমার সেই ক্ষোভ, সেই হতাশা দূর করার চেষ্টা করব।

কীভাবে করবে?

প্ৰথমে আমি তোমার ভাষা শিখব।

বাংলা ভাষা শিখবে?

হ্যাঁ।

নিতান্তই অসম্ভব ব্যাপার। বাংলা ভাষা হচ্ছে পৃথিবীব কঠিন ভাষাগুলিব চেয়েও কঠিন। হিব্রু বাংলা ভাষার তুলনায় শিশু।

কেন বাজে কথা বলছ?

মোটেও বাজে কথা বলছি না। ইংরেজি s অক্ষরের ধ্বনির কাছাকাছি আমাদের তিনটা অক্ষর আছে শ, স, ধ। আবার z অক্ষরের কাছাকাছি আছে তিনটা অক্ষর–জা, য, ঝ।

এরকম সব ভাষাতেই আছে।

আমাদের আরো অদ্ভুত ব্যাপার-স্যাপার আছে। যেমন ধর–আমার শীত লাগে, এর এক রকম মানে; আবার আমার শীত শীত লাগে–এর অন্য রকম মানে। শীত শব্দ দুবার ব্যবহার করা মাত্র অর্থ বদলে গেল। সে দারুণ কঠিন ব্যাপার।

কঠিন ব্যাপার হলে তুমি আমাকে সাহায্য কর।

পাগল হয়েছ? আমি নিজেই বাংলা জানি না, তোমাকে সাহায্য করব কী? মেট্রিকে বাংলা ফার্স্ট পেপারে ৩৬ পেয়েছিলাম। কানের পাশ দিয়ে গুলি গিয়েছে।

তার মানে তুমি আমাকে সাহায্য করবে না?

না।

নে কেন?

আমি তার প্রয়োজন দেখছি না।

আমি দেখছি। তুমি যে ভাষায় কথা বলো, আমি সেই ভাষা জানব না তা হতেই পারে না। আমি তোমাকে ভালোবাসি, কাজেই আমি তোমার ভাষায় কথা বলতে চাই।

আমিও তোমাকে ভালোবাসি, তার মানে এই না যে রাত জেগে আমাকে তোমার গ্রিক ভাষায় কথা বলতে হবে।

আমার ভাষা কিন্তু গ্রিক না।

সব বিদেশী ভাষাই আমার কাছে গ্রিক ভাষা।

আমি তো তোমাকে আমার ভাষা শিখতে বলছি না। আমি শুধু বলছি তোমার ভাষা শেখার ব্যাপারে তুমি আমাকে সাহায্য কর।

ফাইন, সাহায্য করব! ভাষা শেখা ছাড়া আর কী কী জিনিস শিখতে চাও? একবারে বলে ফেলে।

আমি তোমাদের দেশের রান্না শিখতে চাই।

আর কী?

তোমাদের দেশের রীতি নীতি, আদব-কায়দা। ভাসাভাসা শেখা নয়। খুব ভালোমতো শেখা, যেন তুমি কোনোদিন দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে না বলো–কেন যে বিদেশী একটা মেয়ে বিয়ে করলাম।

তাহের হাসতে হাসতে বলল, তুমি চেষ্টা করছি পুরোপুরি একটি বাঙালি মেয়ে হয়ে যেতে।

হ্যাঁ। খুব কি কঠিন?

ভয়ঙ্কর কঠিন।

মোটেই কঠিন না। আমি ঠিক কবেছি বাংলাটা পুরোপুরি শেখা হয়ে গেলে আমি তোমাকে নিয়ে তোমার দেশে যাব। বাঙালি মেয়ে হবার মূল ট্রেনিং আমি দেশে গিয়ে নেব।

পাগল হয়েছ! দেশে যাবার কথা আমি চিন্তাও করি না।

কেন চিন্তা কর না?

দেশে আমার কেউ নেই।

তোমার বাবা-মা মারা গেছেন তা জানি, তাই বলে আর কেউ থাকবে না, তা কী করে হয়?

আমার বাবা-মা নেই, আমার কোনো ভাই-বোনও নেই। একটাই বোন ছিল। ছোটবেলায় মেনিনজাইটিসে মারা গেছে।

বাড়িঘর তো আছে, না তাও নেই?

একটা বাড়ি আছে তাও গ্রামের দিকে। শহরে কোনো বাড়িঘর নেই।

গ্রামের বাড়িতে কে থাকে?

কেউ থাকে না। তালাবদ্ধ থাকে। দরজা-জানালা কিছু কিছু চুরি করে নিয়ে গেছে, তবে খুব বেশি নিতে পারে নি। বাড়ির সঙ্গে বিরাট আম-কঁঠালের বাগান আছে। আমার এক দূর-সম্পর্কের চাচা সেই বাগান দেখাশোনা করেন। বাগানের আয় তিনিই ভোগ করেন। তাঁকে আমি মাঝে মাঝে কিছু ডলার পাঠাই যাতে তিনি বাড়িটা দেখেশুনে রাখেন।

লিলিয়ান আগ্রহ নিয়ে বলল, খুবই ভালো কথা। মনে হচ্ছে তোমাদের পৈতৃক বাড়ি বাসযোগ্য অবস্থায় আছে। এই সামারে চল দুমাস থেকে আসি।

পাগল হয়েছ? সামারে আমি থাকব ভিয়েনা।

কোনোক্রমেই কি যাওয়া সম্ভব না?

না। তাছাড়া লিলিয়ান সামারে বাংলাদেশ তোমার ভালোও লাগবে না। ট্রপিক্যাল কান্ট্রি। প্ৰচণ্ড গরম। টেম্পারেচার চৌত্ৰিশ ডিগ্রি পয়ত্ৰিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে। হাই হিউমিডিটি। গা থেকে আলকাতরার মতো ঘাম বের হয়।

আমার কোনোই অসুবিধা হবে না।

হবে। আমার পৈতৃক বাড়িতে ইলেকট্রসিটি নেই। হাতপাখা হচ্ছে একমাত্র পাখা। প্রচণ্ড মশা। বাড়ির চারদিকে বাগানটা সুন্দর, কিন্তু সুন্দর হলেও বাগানে হাঁটতে পারবে না। বর্ষায় প্যাচপ্যাঁচে কাদা হয়ে থাকে। সেই সঙ্গে আছে সাপের উপদ্ৰব।

তুমি আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছি।

ভয় দেখানোব চেষ্টা করছি না। সত্যি কথা বলছি। ভয় দেখাতে চাইলে বলতাম, আমাদের বাড়ির চারপাশে ঘন জঙ্গল। সেই জঙ্গলে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, এবং ফুলহাতি ঘুরে বেড়ায়। আমি মশার কথা বলেছি, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের কথা বলি লিলিয়ান দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমার খুব আশা ছিল আমি এই সামারেই তোমার পৈতৃক বাড়ি দেখতে যাব।

তোমার আশা আপাতত পূর্ণ হচ্ছে না। কোনো একদিন নিশ্চয়ই হবে। বাংলাদেশের মশা তোমাকে দেখিয়ে আনব। সব মশা এক্সপোর্ট কোয়ালিটির ইয়া সাইজ। একেক জন এক ছটাক দেড় ছটাক করে রক্ত খায়। রক্ত খেয়ে বমি করে ফেলে দেয়, আবার খায়। হা হা হা।

তাহেরের ভিয়েনায় এক মাসের জন্য যাবার কথা ছিল। সেটা বেড়ে হয়েছে দুমাস। সেমিনারের শেষে একটা শর্টকোর্স শেষ করে সে ফিরবে। তাহের খুব খুশি। লিলিয়ানের খারাপ লাগছে। বেশ খারাপ লাগছে। খারাপ লাগছে। এই ভেবে যে তাহের বুঝতে পারছে না তাহেরকে ছেড়ে একা একা বাস করা তার জন্য কত কষ্টের। সে তো অনায়াসে বলতে পারত-লিলি, তুমিও আমার সঙ্গে চল। ঘরদুয়াব তালাবন্ধ থাকুক। এই কথা একবারও বলছে না।

তাহেরের ফ্লাইট বুধবারে। সে মঙ্গলবার নাশতার টেবিলে কফি খেতে খেতে বলল, লিলি তুমিও চল। আমি সেমিনার করব, কোর্স করব–তুমি শহরে শহরে ঘুরবে। শুধু রাতে আমরা এক সঙ্গে ঘুমুব। এখানে একা একা এত বড় বাড়িতে থাকার তোমার দরকার কী? শেষে ভয়টয় পাবে।

না। আমি ভয় পাব না।

ভয় না পেলে থাক। বাড়ি খালি রেখে যাওয়া ঠিক না।

লিলিয়ানের কান্না পাচ্ছে–কেন সে বলতে গেল না। আমি ভয় পাব না। তাহের বলমাত্র সে বাজি হলো না কেন? এখন কি সে বলবে–আমি একা একা এখানে থাকতে চাচ্ছি না। আমি তোমার সঙ্গে যাব। তুমি আমার জন্যও একটা টিকিট করা। না, তা বলা সম্ভব না। এমন ছেলেমানুষি কিছু সে করতে পারবে না।

লিলিয়ান।

হুঁ।

তুমি স্বীকার না করলেও আমি বুঝতে পারছি দুমাস একা একা থাকা তোমার জন্য কষ্টকর হবে। তোমাকে আমি একটা সাজেশান দেই। তুমি তোমার বাবা-মার কাছ থেকে ঘুরে আস। ওদের রাগ ভাঙিয়ে আস।

ওদের রাগ সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণা নেই বলেই তুমি এমন কথা বললে। এই রাগ ভাঙবার নয়।

আমার ধারণা তাদের সামনে গিয়ে তুমি কান্নাকাটি শুরু করলেই–রাগ গলে জল হয়ে যাবে। চেষ্টা করে দেখ।

চেষ্টা করে লাভ হবে না। আমার পজার চাচা মারা গেছেন, কেউ আমাকে এই খবরটাও দেয় নি। আমি জেনেছি। অন্য একজনের কাছে।

এরা কোনোদিনই তোমাকে গ্ৰহণ করবে না?

তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেলে, কিংবা মারা গেলে হয়তো বা করবে।

তোমাকে ছেড়ে যাবার প্রশ্ন উঠে না। মৃত্যু বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না। যে প্লেনে উঠছি সেই প্লেনটাই ক্র্যাশ করতে পারে। তবে তোমাকে পৈতৃক বাড়ি না দেখিয়ে আমি মরব না। এ বিষয়ে নিশ্চিত থাক।

লিলিয়ানের খুব খারাপ লাগছে। হঠাৎ মৃত্যু প্রসঙ্গ চলে এলো কেন? এই প্রসঙ্গ তো আসার কথা ছিল না।

লিলিয়ান।

হুঁ।

আমি প্রতিদিন একবার টেলিফোন করব।

আচ্ছা।

তোমার ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে একটা খাম রেখে যাচ্ছি। আমি বাসা থেকে বেরুবার পর খাম খুলবে। তার আগে নয়।

কী আছে খামে?

কিছু না। আরেকটা কথা, তুমি যদি একা থাকতে ভয় পাও তাহলে ঘরে তালা দিয়ে পরিচিত কারোর বাড়িতে উঠে পড়বে। কিংবা কোনো হোটেলে।

আমি ভয় পাব না।

তোমার চোখ দেখে মনে হচ্ছে এখনি ভয় পাচ্ছ। আমি চোখের ডাক্তার। চোখ বিশেষজ্ঞ। চোখ দেখে অনেক কিছু বলে দিতে পারি। হা হা হা।

লিলিয়ান তাহেরের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, I love you.

লিলি!

হুঁ।

এই দুমাসে তুমি কি দয়া কবে একটা কাজ করবে, গাড়ি চালানোটা শিখে নেবে? এটা কোনো কঠিন ব্যাপার না। ড্রাইভিং-এর যে-কোনো স্কুলে ভর্তি হলেই হবে। গাড়ি চালানো জানলে তুমি আমাকে এয়ারপোর্টে নামিয়ে দিয়ে আসতে পারতে। দুজন গল্প করতে করতে যেতাম। এখন যাব। ক্যাবে করে। বিশ্ৰী ব্যাপার।

তাহের ঘর থেকে বের হওয়া মাত্র লিলিয়ান ড্রয়ার খুলল। সেখানে একটা চিঠি। চিঠিতে লেখা–প্ৰিয় লিলি, খামের ভেতর একটা ভিয়েনা যাবার ওপেন টিকিট আছে। টিকিটাটা তোমার জন্য। যখন ইচ্ছে করবে তুমি চলে আসবে। আমি জোর করেই তোমাকে নিয়ে যেতাম। যাই নি। কারণ আমি সারাদিন থাকব ব্যস্ত, তুমি একা একা হোটেলে বসে থাকবে। নিজের স্বার্থে তোমাকে কষ্ট দিতে ইচ্ছা করল না। এরচে ওপেন টিকিট ভালো। এখানে একা একা থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়লে চলে আসবে। তখন ভিয়েনার হোটেলে বসে বিরক্ত হলেও আমাকে দোষ দিতে পারবে না। কারণ তুমি এসেছ নিজের আগ্রহে। হা হা হা।

লিলিয়ান সঙ্গে সঙ্গেই ট্রাভেল এজেন্টকে ফোন করল। যদি বুকিং পাওয়া যায়। সম্ভব হলে আজ।

ট্রাভেল এজেন্টের বোবট গলার মেয়েটি বলল, আগামী পনের দিন বুকিং পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। সামারে ইউরোপ যাবার টিকিট কনফার্ম করা কঠিন দলবেঁধে টুরিস্টরা যাচ্ছে। তবে তোমাকে আমি ওয়েটিং লিস্টে রেখে দিচ্ছি। কিছু পাওয়া গেলে জানাব।

অনেকদিন পর লিলিয়ান একা একা ঘুমুতে গেল। এবং আশ্চর্য অনেকদিন পর ভয়ঙ্কর স্বপ্নটা সে আবার দেখল। এবারের স্বপ্ন আরো স্পষ্ট। যেন স্বপ্ন না, পুরো ব্যাপারটা বাস্তবে ঘটে যাচ্ছে। সে দেখল–বিশাল প্ৰাচীন শ্যাওলা পড়া এক অট্টালিকা। সে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। লোহার প্যাচানো সিঁড়ি। সে উঠেই যাচ্ছে। সিঁড়ি শেষ হচ্ছে না। হঠাৎ সিঁড়ি শেষ-নিচে নামতে চেষ্টা করল। কী আশ্চৰ্য, নিচে নামারও ব্যবস্থা নেই। সে এখন কী করবে? তাহেরের কথা শোনা যাচ্ছে। সে অনেক দূর থেকে ডাকছে। তার গলার স্বর ক্ষীণ। প্ৰায় অস্পষ্ট।

লিলিয়ান! লিলিয়ান। তুমি কোথায়?

আমি এখানে।

তুমি আমাকে বাঁচাও। আমি ভয়ঙ্কর বিপদে পড়েছি। ওরা আমাকে মেরে ফেলতে চাইছে। তুমি বাঁচাও আমাকে।

আমি নামতে পারছি না। আমি আটকা পড়ে গেছি।

আমাকে বাঁচাও। লিলিয়ান, আমাকে বাঁচাও।

আমি আটকা পড়ে গেছি।

সিঁড়ি দুলছে। প্রচণ্ড শব্দে দুলছে। দুলুনিতে লোহার রেলিং খুলে আসছে। অনেক দূর থেকে তাহেরের অস্পষ্ট স্বর কানে আসছে। খুব বাতাস দিচ্ছে। বাতাসের কারণে কিছু শোনা যাচ্ছে না।

লিলিয়ান জেগে উঠল। ঘড়িতে একটা দশ বাজে। লিলিয়ান বাকি রাতটা বারান্দায় রকিং চেয়ারে বসে কাটাল।

০৪. ডা. ভারমান চশমার ফাঁক দিয়ে

ডা. ভারমান চশমার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে আছেন। লিলিয়ানের মনে হলো তিনি হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করছেন। যে-কোনো মুহূর্তে হেসে ফেলবেন। হাসবেন তাহেরের মতো শব্দ করে। লিলিয়ান খুব লজ্জায় পড়বে। সে-রকম কিছু হলো না। ডা. ভারমান হাসলেন না। চোখ থেকে চশমা খুলে ফেলে। কচি পরিষ্কার করতে করতে বললেন, তুমি আবার দুঃস্বপ্ন দেখেছি?

হ্যাঁ।

মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্ন দেখা তো খুব স্বাভাবিক লিলিয়ান। আমরা সুন্দর স্বপ্ন যেমন দেখি দুঃস্বপ্নও দেখি।

ডা. ভারমান, আমি তা জানি। কিন্তু আমার স্বপ্ন অন্য রকম।

অন্য রকম বলতে কী বোঝাচ্ছ?

আপনাকে ব্যাখ্যা করতে পারব না। তবে আমার মনে হয় স্বপ্নে কেউ আমাকে কিছু বলার চেষ্টা করছে।

তুমি ঠিকই ধরেছি। স্বপ্নে কেউ তোমাকে কিছু বলার চেষ্টা করছে–এটা ঠিক। অবশ্যই বলার চেষ্টা করছে। সেই কেউটা হচ্ছে–তুমি নিজে। তোমার নিজের সাবকনশাস। মাইন্ড তোমার কনশাস। মাইন্ডকে তথ্য দিতে চাইছে।

ডক্টর! তা কিন্তু না। তাহেরের মহাবিপদ সম্পর্কে আমাকে কেউ একজন সাবধান করছে।

ডা. ভারমান এবার হাসলেন, তবে শব্দ করে না। নিঃশব্দে। শিশুদের প্রবোধ দেয়ার জন্য বড়রা যেমন হাসে তেমন হাসি।

শোন লিলিয়ান, ছেলেটা সম্পর্কে তোমার নিজের মধ্যেই এক ধরনের ভয় আছে। সেই ভয় হচ্ছে ছেলেটিকে হারানোর ভয়। এই ভয়ের উৎপত্তি হলো ভালোবাসায়। কাউকে গভীরভাবে ভালোবাসলেই এই ভয় তৈরি হয়। মনে হয়–এক সময় ভালোবাসার মানুষ আমাকে ছেড়ে চলে যাবে। তখন আমব কী হবে? অবচেতন মনে ধীরে ধীরে ভয় জমা হতে থাকে… তোমার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।

আপনাকে আমি বোঝাতে পারছি না–আমি স্বপ্নে তাহেরদের প্রাচীন বসতবাড়ি স্পষ্ট দেখেছি। আমি সে বাড়ির লোহার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছিলাম।

তুমি তোমার কল্পনার একটি বাড়ির লোহার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছিলে।

ডা. ভারমান, আমি কিন্তু নিশ্চিত জানি একদিন ঐ বাড়িতে আমরা যাব–তাহের ভয়ঙ্কর বিপদে পড়বে।

যদি জানো তাহলে ঐ বাড়িতে যেও না।

আমাদের যেতেই হবে। এটা হচ্ছে নিয়তি। যা ঘটবার তা ঘটবেই।

লিলিয়ান তুমি তোমার নিজের যুক্তিতে আটকা পড়ে যাচ্ছ — যা ঘটবার তা যদি ঘটে তাহলে তোমাকে স্বপ্লে সাবধান করার প্রয়োজন কী?

লিলিয়ান চুপ করে রইল। ডা. ভারমান শান্ত গলায় বললেন, তুচ্ছ জিনিস নিয়ে এত ভেবো না। তুচ্ছ জিনিসকে তুচ্ছ করতে শেখ।

লিলিয়ান উঠে দাঁড়াল। ক্লান্ত গলায় বলল, আমি ওদের বাড়ি স্বপ্নে সত্যি দেখেছি। দেখামাত্ৰ চিনতে পারব। লোহার প্যাচানো সিঁড়ি.

লিলিয়ান আমি তোমাকে ঘুমের ওষুধ দিচ্ছি। রাতে ঘুমুতে যাবার এক ঘণ্টা আগে দুটা ট্যাবলেট খাবে। মনে থাকবে?

থাকবে।

ডক্টর ভারমান নিশ্চয় খুব কড়া ঘুমের ওষুধ দিয়েছেন। ওষুধ খাবার পরপর লিলিয়ানের মনে হলো সে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। কোনো গভীর খাদে পড়ে গেছে–নিচে নেমে যাচ্ছে। অতি দ্রুত নেমে যাচ্ছে। খাদটা অন্ধকার এবং শীতল। লিলিয়ানের ভয় ভয় করতে লাগল। মনে হয়। এই ঘুম তার আর ভাঙবে না। কেউ ভাঙতে পারবে না। সে বিরাট এই বাড়িতে মরে পড়ে থাকবে। কেউ জানবেও না।

ক্রিং ক্রিং ক্রিং!

কীসের শব্দ? টেলিফোন, না কেউ এসে কলিং বেল টিপছে? না-কি গীর্জার ঘণ্টার শব্দ? তাদের বাড়ির কাছেই ক্যাথোলি ক চার্চ। ওরা মাঝে মাঝে ঘণ্টা বাজায়! কেউ মারা গেলে ঘণ্টা বাজায়। কে মারা গেছে? তাহের? তাহেরেব কি কিছু হয়েছে? প্লেন দুর্ঘটনার খবর টিভি খুব ফলাও করে প্রচার করে। ট্রেন বা বাস দুর্ঘটনার খবর কোনো পাত্তা পায় না। এর কারণ কী?

ক্রিং ক্রিং ক্রিং।

লিলিয়ান টেলিফোন তুলে ক্লান্ত গলায় বলল, হ্যালো!

ওপাশ থেকে তাহেরের গলা পাওয়া গেল।

হ্যালো লিলিয়ান–আমি। তুমি কেমন আছ?

ভালো।

গলা শুনে তো ভালো মনে হচ্ছে না। অসুখ-বিসুখ করেছে না-কি?

না, ঘুম পাচ্ছে।

এখনই ঘুম পাচ্ছে কেন? রাত তো বেশি হয় নি। কটা বাজে তোমাদের ওখানে?

দশটা।

দশটা তো তেমন বাত না। তুমি ঘুমে কথা বলতে পারছি না। ব্যাপার কী?

আমি ঘুমের ওষুধ খেয়েছি।

কেন?

কয়েক রাত ধবে আমার ঘুম হচ্ছে না। আমি দুঃস্বপ্ন দেখছি।

ও আচ্ছা।

লিলিয়ান জড়ানো স্বরে বলল, তোমাকে একটা জরুরি কথা জিজ্ঞেস করি। খুব জরুরি। আচ্ছা, তোমাদের গ্রামের বাড়িটা বিশাল না?

হ্যাঁ বিশাল। হঠাৎ এই প্রসঙ্গ কেন?

কারণ আছে। এখন বলে তোমাদের বাড়ির বাইরেব দিকে ছাদ পর্যন্ত লোহার প্যাচানো সিঁড়ি আছে না?

না নেই।

আগে এক সময় ছিল। এখন নেই।

কখনো ছিল না। কোনো কালেও ছিল না। সিড়ির কথা এলো কেন?

এখন কথা বলতে পাবিব না–খুব ঘুম পাচ্ছে।

হ্যালো লিলিয়ান–হ্যালো।

লিলিয়ান টেলিফোন নামিযে রেখে সোফাব ওপর ঘুমিয়ে পড়ল। আবার ঘুম ভাঙল টেলিফোনেব শব্দে। লিলিয়ান জড়ানো গলায় বলল, হ্যালো।

মিসেস লিলিয়ান।

ইয়েস।

ইউনাইটেড ট্রাভেল এজেন্সি থেকে বলছি–আপনি ভিয়েনার বুকিং চেয়েছিলেন। আগামীকাল বুকিং পাওয়া গেছে। লন্ডন ফ্রাংকফোর্ট হয়ে ভিয়েনা। লন্ডনে একরাত থাকতে হবে।

কোথায় থাকব?

এয়ারপোর্ট হোটেল। এয়ারপোর্টের কাছেই।

আচ্ছা, এই হোটেলে কি প্যাচানো লোহার সিঁড়ি আছে?

ম্যাডাম আপনি কী বলছেন বুঝতে পারছি না। লিলিয়ান টেলিফোন রেখে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমের মধ্যে সেই প্যাচানো সিঁড়ি আবার দেখল। সে সিড়ি দিয়ে নামছে। অতি দ্রুত নামছে। সিঁড়ি কাঁপছে–মনে হচ্ছে পড়ে যাবে। লিলিয়ান ঘুমের মধ্যেই ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।

০৫. তাহেরের নার্ভ শক্ত

তাহেরের নার্ভ শক্ত।

শুধু শক্ত না, বেশ শক্ত। চরম বিপদেও তার মাথা ঠাণ্ডা থাকে। ভিয়েনায় সে কোনো বিপদের মধ্যে নেই। সুখেই আছে বলা চলে। সেমিনার চলছে। পেপার পড়া হচ্ছে, তবে আড্ডা হচ্ছে তার চেয়ে বেশি। প্ৰতি সন্ধ্যায় ককটেল পার্টি। হৈচৈ, নাচানাচি। তাহের এই হৈচৈ-এ নিজেকে মেশাতে পারছে না। মনে হচ্ছে তার ইস্পাতের নার্ভে ও মরিচা ধরে গেছে। গত রাতে এক ফোঁটা ঘুম হয় নি। এরকম অদ্ভুত ঘটনা তাহেরের জীবনে খুব বেশি ঘটে নি। বিছানায় যাবার আগেই সে ঘুমিয়ে পড়ে। তার অনিদ্রার কারণ লিলিয়ান। লিলিয়ানের সমস্যাটা সে ঠিক ধরতে পারছে না। টেলিফোনে প্যাচানো সিঁড়ির কথা কেন জিজ্ঞেস করল? তাহেরকে এত আগ্রহ করে সে কেনইবা বিয়ে করল? আমেরিকান মেয়েগুলির কাছে বিয়ে এবং ডিভোর্স দুই-ই ডালভাত। চব্বিশ ঘণ্টার পরিচয়ে তারা বিয়ে করে ফেলে, আবার এক সপ্তাহ পর ছাড়াছাড়ি। দুজন দুদিকে গিয়ে অন্য দুজনকে খুঁজে নেয়। কিন্তু লিলিয়ান এ রকম মেয়ে নয়। সে কেন তাহেরের মতো আধা-বাউণ্ডেল একজনের জন্যে এতটা ভালোবাসা জমিয়ে রাখবো?

লিলিয়ান কোনো একটি ব্যাপারে কষ্ট পাচ্ছে। সেই কষ্টের প্রকৃতি তাহের জানে না। জানার চেষ্টা করা কি উচিত? স্বামী-স্ত্রীর ভেতরও কিছু গোপন ব্যাপার থাকা প্রয়োজন বলে তাহের মনে করে। অবশ্যি ভিয়েনায় পা দেয়ার পর থেকে তাহেরের মনে হচ্ছে, সে ভুল করছে। তার উচিত ছিল লিলিয়ানের গোপন কষ্টের ব্যাপারগুলি জানা।

লিলিয়ানকে টেলিফোনে ধরার সব চেষ্টা বিফল হলো। সারা দিনে তাহের ছবার চেষ্টা করল। রিং হয়, কেউ টেলিফোন ধরে না। লিলিয়ান কি ঘর তালাবন্ধ করে কোথাও গেছে? না-কি ষ্ট্রোক হয়ে ঘরে মারে পড়ে আছে? তাহের খুব অস্থির বোধ করতে লাগল। সেমিনারে একেবারেই মন বসছে না। ইচ্ছা করছে ব্যাগ গুছিয়ে প্লেনে উঠে বসতে। রাতদুপুরে বাড়িতে পৌঁছে আমেরিকানদের মতো চেঁচিয়ে বলতে—Honey I am home.

সেমিনারে Cataract solvent-এর উপর বিরক্তিকর এক বক্তৃতা হচ্ছে। বক্তা মাঝে মাঝে হাসাবার চেষ্টা করছেন, পারছেন না।

বক্তৃতার মাঝখানে তাহেরের কাছে স্নিপ এলো, আমেরিকা থেকে জরুরি কল। তাহের টেলিফোন ধরবার জন্যে প্রায় ছুটে গেল। যিনি পেপার পড়ছিলেন তিনি পড়া বন্ধ করে কড়া চোখে তাকিয়ে রইলেন।

টেলিফোন করেছে লিলিয়ান। তাহের বলল, কেমন আছ লিলিয়ান?

ভালো আছি।

কোনো বিশেষ কারণে টেলিফোন করেছ, না এমনি?

এমনি করেছি। আমি কি তোমাকে বিরক্ত করলাম?

মোটেও বিরক্ত কর নি, বরং খুব আনন্দিত করেছ। আমি তোমাকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা করছিলাম। ঐদিন হঠাৎ টেলিফোন রেখে দিলে…

খুব ঘুম পাচ্ছিল, শরীর ভালো লাগছিল না।

প্যাচানো সিড়ির কথা জিজ্ঞেস করছিলে কেন?

ও কিছু না। বাদ দাও।

লিলিয়ান, এখন তোমার শরীর কেমন?

শরীর ভালো। তুমি আমাকে নিয়ে মোটেও চিন্তা করবে না। তুমি ঠিকমতো তোমার সেমিনার কর। কোর্স ওয়ার্ক কবে থেকে শুরু হচ্ছে?

তাহের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে খুব নরম গলায় বলল, লিলিয়ান, তুমি কি আমার একটা প্রশ্লেব জবাব দেবে?

অবশ্যই দেব?

আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, তুমি এক ধরনেব ক্রাইসিসের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। ক্রাইসিসের কারণটা কি আমি জানতে পারি?

না।

বেশ, জানাতে না চাইলে জানাতে হবে না। এমন কিছু কি আছে যা তুমি আমাকে বলতে চাও?

হ্যাঁ।

তাহলে বলো।

I love you.

অন্য সময় হলে তাহের হো-হো করে হেসে ফেলত। আজ পারল না। তার অসম্ভব মন খারাপ হয়ে গেল। টেলিফোন নামিয়ে রেখে সে দুটা কাজ করল। প্রথম কাজ, কোর্স কো-অর্ডিনেটরকে বলল, আমার একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। আমি আমেরিকা ফিরে যাচ্ছি। দ্বিতীয় কাজ, ট্র্যাভেল এজেন্সিতে টেলিফোন করে বলল, আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে দুমাস ঘুরে বেড়াব। খুব ইন্টারেস্টিং একটা ট্যুর প্ল্যান তুমি তৈরি করে দাও। ট্যুর প্ল্যানে সমুদ্র, পাহাড়, অরণ্য–এই তিনটি জিনিসই থাকতে হবে। আমরা বিয়ের পর একসঙ্গে বাইরে কোথাও যাই নি। এটা হবে আমাদের হানিমুন ট্যুর।

অ্যাডভেঞ্চার চাও, না smooth প্ল্যান চাও?

দুই-ই চাই।

ট্যুর প্ল্যানে হোটেলের ব্যবস্থাও থাকবে?

হ্যাঁ থাকবে।

ইকনমি হোটেল, না এক্সপেনসিভ হোটেল?

এক্সপেনসিভ হোটেল। ইকনমি হোটেলে আমি থাকতে পারি না–দম বন্ধ হয়ে আসে।

কোন মহাদেশ ঘুরতে চাও? ইউরোপ, এশিয়া? ইন্ডিয়া দেখে আস। ইন্ডিয়া এবং নেপাল। পাহাড়, সমুদ্র, অরণ্য–সবই পাবে। তাজমহল আছে–সপ্তম আশ্চর্য…

তাহের হঠাৎ তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, তুমি বরং আমাদের দুজনের জন্যে বাংলাদেশে একটা টুরের ব্যবস্থা কর।

বাংলাদেশ খুব ইন্টারেস্টিং হবে বলে আমার মনে হয় না।

আমার নিজেরও মনে হয় না। তবু কর।।

পুরো ট্যুরটাই হবে বাংলাদেশে?

হ্যাঁ।

কিছু মনে করবে না–বাংলাদেশে হানিমুন টুরে যেতে চাওয়ার কারণ কী জানতে পারি?

হ্যাঁ পার। এটা আমার নিজের দেশ। হো হো হো। হা হা হা।

অনেক দিন পর তাহের প্রাণখুলে হাসল। অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বলল, হ্যালো মিস, আমাকে মন্টানা যাবার একটা টিকিটের ব্যবস্থা করে দাও। এমনভাবে করবে যেন আমি রাতদুপুরে উপস্থিত হতে পারি। আমি আমার স্ত্রীকে চমকে দিতে চাই। হা হা হা।

রাত তিনটায় লিলিয়ান দরজা খুলল।

তাহের দাঁড়িয়ে আছে। বাচ্চাদের খেলনার দোকান থেকে অদ্ভুত একটা মুখোশ কিনে মুখে পরেছে। মুখোশে তাকে ভয়ঙ্কর দেখানোর কথা। কেন জানি তা দেখাচ্ছে না। বরং হাস্যকর লাগছে। লিলিয়ান শিশুদের মতো চেঁচিয়ে উঠে বলল–এ কী। তুমি?

তাহের মুখোশের আড়াল থেকে হাসতে হাসতে বলল, ইয়েস বিদেশিনী, আমি।

চলে এলে যে?

তোমাকে দেখতে এলাম, তুমি কেমন আছ?

লিলিয়ান ঝলমলে গলায় বলল, খুব খারাপ ছিলাম। এখন আর খারাপ নেই। আমি এখন ভালো আছি। খুব ভালো আছি।

ভালো থাকলে চমৎকার করে কাঁপাচিনো কফি বানাও। প্রচুর ফেনা যেন হয়, এবং জিনিসপত্র গোছগাছ করা শুরু কর।

আমরা কোথায় যাচ্ছি?

আমরা যাচ্ছি। বাংলাদেশের একটি জেলা নেত্রকোনায়। নেত্রকোনা থেকে নান্দাইল রোড স্টেশন বলে অখ্যাত একটা রেলস্টেশনে। সেখান থেকেও কুড়ি মাইল দূরের অতি দুৰ্গম এক স্থানে। যেখানে আমার পূর্বপুরুষরা বোকার মতো এক বিশাল অট্টালিকা বানিয়েছিলেন। সেই অট্টালিকার ধ্বংসাবশেষ তোমাকে দেখিয়ে নিয়ে আসব। ঐ অঞ্চলে পৌঁছতে যেসব যানবাহনে আমরা চড়ব সেসব হচ্ছে–প্লেন, রেল, নৌকা, মহিষের গাড়ি, সবশেষে হন্টন।

হান্টন মানে কী?

হন্টন মানে আমি বলব না। বাংলাদেশে যাচ্ছ, কাজেই এখন থেকে কথাবার্তা হবে বাংলায়। তুমি বুঝতে পারলে ভালো কথা, বুঝতে না পারলে নেই।

এত দ্রুত কথা বললে বুঝব কী করে? স্নোলি বলো, আমি সবই বুঝব।

বাংলা এমনই ভাষা যা স্নো বলা যায় না। অতি দ্রুত বলতে হয়। দ্রুত কথা বলা শিখে নাও। আমাদের দেশের লোকজন কাজকর্ম করে টিমাতালে কিন্তু কথা বলে দ্রুত। হা হা হা।

০৬. রেল, নৌকা, মহিষের গাড়ি

রেল, নৌকা, মহিষের গাড়ি এবং হন্টনের কথা বলা হলেও ট্রেন থেকে নেমে সরাসরি নৌকা নিয়ে বাড়ির ঘাটে যাওয়া যায়। ঘাটের নাম ইন্দারঘাট, গ্রাম তিলাতলা। তাহের নৌকা নিয়েছে, ঠাকরাকোনা থেকে ইন্দরঘাট যাবে। দুই মাঝির নৌকা। দুই মাঝির একজনের বয়স দশ-এগার। সে আবার দার্শনিক প্রকৃতির। বেশির ভাগ সময় আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রশ্ন করলে মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়। তার নীরবতা অন্যজন পুষিয়ে দেয়। একটা কথা জিজ্ঞেস করলে দশটা কথা বলে।

তাহের বলল, কতক্ষণ লাগবে? বালক মাঝি উত্তর দিল না, মুখ ঘুরিয়ে নিল। বালক মাঝির বাবা হাসিমুখে বলল, একটানে লইয়া যামু। একটানের মামলা।

টান দিতে পারবেন তো? আপনার নিজের অবস্থা দেখছি কাহিল–ছেলেটাও নিতান্তই শিশু।

বিছনা কইরা দিতাছি। শুইয়। ঘুমান। ইন্দরঘাটে ঘুম থাইক্যা ডাইক্যা তুলব। সাথের মেমসোব আফনের কী লাগে?

আমার স্ত্রী।

গত বছর একজন মেমসাব দেখছিলাম। হাফপেন্ট পরা। নবীনগর হাটবারে মোটর সাইকেল নিয়া আসছে। একটা কুমড়া কিনছে। কুমড়া এরা খুব ভালো পায়। শখ কইরা খায়।

আপনি নৌকা ছাড়ার ব্যবস্থা করুন তো দেখি।

সব ব্যবস্থা হইতেছে। নূর মিয়ার নৌকায় উঠছেন। আর চিন্তার কিছু নাই।

নৌকা ছাড়ার পর মনে হলো চিন্তার অনেক কিছুই আছে। নূর মিয়া নিজে পিচা করছে না, হাল ধবে বসে আছে। বাচ্চা ছেলে একা দাঁড় টেনে নিয়ে যাচ্ছে। দর্শ পথ যেতে দীর্ঘ সময় লাগবে। দিনে দিনে পৌঁছানোর আশা মনে হচ্ছে ছেড়ে

লিলিয়ান খুব আগ্রহ নিয়ে নদী দেখছে। তার কেমন লাগছে বোঝা যাচ্ছে না। কালো চশমায় তার চোখ ঢাকা। তাহের বলল, কেমন লাগছে লিলিয়ান?

খুব ভালো লাগছে–অদ্ভুত লাগছে। আশা করি খুব অল্প সময়ের মধ্যে এই জার্নি শেষ হবে না।

না, এই জানি বলতে গেলে অনন্তকাল ধরে চলবে। তুমি ইচ্ছা করলে ঘুমিয়ে পড়তে পার।

আমি ঘুমুব না।

খিদে পেয়েছে?

না।

স্টেশনে কিছু খেয়ে নেয়া দরকার ছিল। অল্পক্ষণের ভেতর খিদে পাবে। তখন নদীর পানি ছাড়া কিছুই খেতে পারবে না।

নূর মিয়া তাদের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, খাওয়া-দাওয়া নিয়া কোনো চিন্তা কইরেন না। বসিরহাট বাজারে নৌকা ভিরামু। বাজার সদাই কইরা রান্ধা চাপামু, খাওয়া-দাওয়া শেষ কইরা বেলাবেলি চইল্যা যামু ইন্দারঘাট। একটানের মামলা।

তাহের দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল। তার কাছে মনে হচ্ছে নূর মিয়া খুব যন্ত্রণা করবে। তাদের প্রতিটি কথায় অংশগ্রহণ করবে। নিজস্ব মতামত দেবে। রান্নাবান্নায় অনেক সময় নষ্ট করার গরিকল্পনাও নূর মিয়ার আছে বলে মনে হচ্ছে।

স্যার, আপনের পরিবার বাংলা কথা কয়?

হুঁ।

ঐ মটর সাইকেলের মেমসোবও বাংলায় কথা কয়। কুমড়া কিনতে গিয়া পরিষ্কার বলছে–কুমড়ার কত দাম?

ঠিক মতো নৌকা চালান নূর মিয়া। বেশি কথা বলার দরকার নেই।

এইটা স্যার আপনার বলা লাগিব না। বেশি কথার মইদ্যে নূর মিয়া নাই। দেশটা নষ্ট হইতাছে অধিক কথার কারণে।

লিলিয়ান ইংরজিতে বলল, আহা বেচারা কথা বলতে এত পছন্দ করে আর তুমি তাকে কথা বলতেই দিচ্ছ না। বলুক না কথা। কী ক্ষতি তাতে? আমার তো ওর কথা শুনতে ভালো লাগছে।

বুঝতে পারছ?

কিছু কিছু পারছি। যতই কথা শুনব ততই আরো বেশি বুঝব।

তুমি এক কাজ কর–নূর মিয়ার সঙ্গে বসে বসে গল্প কর। আমি ঘুমিয়ে পড়ি।

চারদিকে অসহ্য সুন্দর, এর মাঝখানে তুমি ঘুমিয়ে পড়বে?

কাব্যভাব আমার একেবারেই নেই লিলি। আমি মানুষটা পাথর টাইপ। অনুভূতিশূন্য।

আমি কি এই অনুভূতিশূন্য মানুষটির কাছে একটি আবেদন রাখতে পারি?

হ্যাঁ পার।

আমেরিকায় ফিরে গিয়ে কী হবে? চল, আমরা এখানেই থেকে যাই।

তাহের সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, এই জঙ্গলে থেকে যেতে চাও?

হ্যাঁ চাই।

তোমার মাথা থেকে পোকাগুলি দূর কর লিলিয়ান। তুমি আমার গ্রামের বাড়ি দেখতে চেয়েছিলে বলে তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি। সেখানে আমি থাকব খুব বেশি হলে তিন দিন। তারপর বাংলাদেশের সুন্দর সুন্দর জায়গাগুলি ঘুরে ঘুরে দেখব–কক্সবাজার, মুরুসিলেট। তারপর যাব নেপাল। হিমালয়-কন্যা নেপাল দেখার পর আমেরিকা ফিরে যাব।

লিলিয়ান ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে শান্তগলায় প্রায় ফিসফিস করে বলল, আমার একটা অদ্ভুত কথা মনে হচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে আমাদের দুজনের কেউই এই জায়গা ছেড়ে কোনোদিন অন্য কোথাও যেতে পারব না। বাকি জীবনটা আমাদের থেকে যেতে হবে এইখানে।

তারা ইন্দরঘাটে পৌঁছল সন্ধ্যার পর। কাকতালীয়ভাবেই পূর্ণিমা পড়ে গেছে। চাঁদ উঠেছে, তবে চাঁদের আলো এখনো জোরালো হয় নি। গাছপালায় সব কেমন ভুতুড়ে অন্ধকার। তাহের বলল, হাত ধর লিলিয়ান, বনের ভেতর দিয়ে যেতে হবে। এক সময় এটা ছিল সুন্দর বাগান। এখন পুরোপুরি ফরেস্ট। হালুম শব্দ করে বাঘ বের হয়ে এলেও অবাক হবো না। এখনো বের হচ্ছে না কেন সেও এক রহস্য।

বাড়ি দেখে লিলিয়ান একই সঙ্গে মুগ্ধ ও দুঃখিত হলো। বিশাল অট্টালিকা, কিন্তু অন্তিম দশা। বাড়ির পলেস্তারা খসে খসে পড়ছে। দক্ষিণ দিকের দেয়াল ধসে পড়েছে। পুরো বাড়ি ঘন শ্যাওলায় ঢাকা। দোতলায় উঠার সিঁড়ি ভাঙা, বেলিং ধসে গেছে। একতলার বারান্দায় গোবরের স্তুপ দেখে মনে হয় বৃষ্টির সময় এই জায়গা গরু-ছাগলের আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

তাহের বিরস গলায় বলল, বাড়ি দেখলে লিলিয়ান?

হ্যাঁ দেখলাম।

কোনো কমেন্ট করতে চাও?

চাই।

কবে ফেল।

এই বাড়ি আমার চেনা। আমি এই বাড়ি আগে দেখেছি। তোমাকে আমি লোহার প্যাঁচানো সিঁড়ির কথা বলেছিলাম। তুমি বলেছিলে–এরকম সিঁড়ি নেই। সেই সিঁড়ি কি এখন দেখতে পাচ্ছ? স্বপ্নে আমি অবিকল এই সিঁড়ি, এই বাড়ি দেখেছি।

লোহার সিঁড়ি তাহেরের চোখে পড়ল। বাড়ির যে অংশ ধ্বসে পড়েছে সিঁড়ি সেই দিকে। সিঁড়ির গা ঘেঁসে তেঁতুল পাতার মতো চিকন পাতার একটা গাছ। তাহের বলল, আমি এ বাড়িতে খুব ছোটবেলায় থেকেছি। এই কারণেই সিঁড়ি চোখে পড়ে নি। যাই হোক, তুমি দাবি করছি এই বাড়িই তুমি স্বপ্নে দেখেছ?

হুঁ।

স্বপ্নের সব ভাঙা বাড়ি এক রকম হয়।

লিলিয়ান ক্লান্ত গলায় বলল, হয়তো হয়।

তাহেরের দূর-সম্পর্কের চাচা ইস্কান্দর আলী, তার দুই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। হাতে হারিকেন। এই গরমেও ইস্কান্দর আলীর গায়ে চান্দর। পরনের লুঙ্গিটা সিস্কের, চিকচিক করছে। সঙ্গের ছেলে দুটিব গায়ে গেঞ্জি। দুজনেরই শক্ত-সমর্থ চেহারা। এরা কোনো কথা বলছে না, এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লিলিয়নের দিকে। তাকানোর ভঙ্গি শালীন নয়। তাহের একবার ভাবল ধমক দিয়ে বলে, এভাবে তাকিয়ে আছ কেন? বলল না। নিজেকে সামলে নিল। চাচার দিকে তাকিয়ে বলল, বাড়ির অবস্থা তো শোচনীয়।

ইস্কান্দর আলী কাশতে কাশতে বললেন, পুরানা বাড়ি, এর চেয়ে ভালো আর কী হইব? ভাইঙ্গা যে পড়ে নাই এইটাই আল্লাহর রহমত।

ঠিকঠাক করার জন্যে প্রতি মাসে টাকা পাঠাই।

প্রতিমাসে পাঠাও না। মাঝে-মইদ্যে পাঠাও।

অবস্থা যা তাতে মনে হয় না। এ বাড়িতে থাকা যাবে।

থাকতে পারবা। দুইতলার কয়েকটা ঘর পরিষ্কার করাইয়া থুইছি।

থাকা যাবে?

হ, যাবে। সাথের এই মাইয়া কি তোমার ইসাতিরি?

হ্যাঁ।

খিরিস্তান বিবাহ করছ?

হ্যাঁ।

মেয়ে দেখতে সুন্দর আছে। বিবাহ করছ ভালো করছি। খিরিস্তান বিবাহ করা জায়েজ আছে। নবী করিম নিজেও একটা খিরিস্তান মেয়ে বিবাহ করেছিলেন।

বাবুর্চির ব্যবস্থা করতে লিখেছিলাম। ব্যবস্থা করেছেন?

গোরাম দেশে বাবুর্চি কই পামু? আমার ঘরে রান্ধা হইব। টিফিন বাক্সে কইবা তোমরারে খানা দিয়া যাব। তোমরা থাকবা কয় দিন?

এখনো বলতে পারছি না।

ডাকাইতের খুব উপদ্রব। বেশি দিন না থাকনই ভালো।

আমার সঙ্গে আছে কী যে ডাকাত নেবে?

তোমার ইসাতিরিরে নিয়া যাবে। সুন্দর মেয়েছেলে–হইলদা চামড়া, বিলাতি। ডাকাইতরা খুশি হইয়া তোমার ইসাতিরিরে নিয়া যাবে।

আপনি কি আমাকে ভয় দেখাবার চেষ্টা করছেন?

তোমারে ভয় দেখাইয়া আমার ফয়দা কী? তোমার স্ত্রী মাছ-ভাত খায়, না পাউরুটি খায়?

মাছ-ভাত খায়।

শুয়োরের গোশত খায়?

তাহের ক্ষিপ্ত গলায় বলল, খেলে কী কববেন? শুয়োরের গোশত ব্যবস্থা করবেন?

রাগ হও ক্যান? কথার কথা বললাম। তোমার ইসাতিরি দেখি হাসন্তাছে। সে বাং কথা বুঝে?

তাকেই জিজ্ঞেস করুন।

একলা একলা বাড়িতে ঢুকতেছে, তারে নিয়েধ করা।

নিষেধ করতে হবে না। তার বুদ্ধিাশুদ্ধি আছে।

লিলিয়ান হারিকেন হাতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উঠছে। মনে হচ্ছে এটা তার অনেকদিনের চেনা বাড়ি।

ইস্কান্দর আলী থু করে তাহেরের পায়ের কাছে একদলা থুথু ফেললেন। তাহের চমকে সরে গেল। ইস্কান্দর আলী হাই তুলতে তুলতে বললেন, খাওয়ার জইন্যে কিছু খরচ দিও। জিনিসপত্র অগ্নিমূল্য। মাছ এক জিনিস পাওয়াই যায় না। একটা মুরগির বাচ্চা হেব দামই তোমার চল্লিশ, পঞ্চাশ।

তাহের দুটা পাঁচশ টাকার নোট বের করল। তিনি বিরসমুখে নোট দুটা হাতে নিলেন। তাহের বলল, উত্তর দিকে ভাঙা দেয়াল ঠিক করার জন্যে টাকা চেয়েছিলেন। পাঠিয়েছিলাম। দেয়াল তো ঠিক হয় নি।

বললেই ঠিক হয় না। ইট, সুরকি, সিমেন্ট আনাইতে হয় শহর থাইক্যা। বর্ষা মৌসুমে নৌক দিয়া আনতে হয়। বিরাট যন্ত্রণা।

টাকাটা কী করেছেন?

আছে, টাকা আলাদা করা আছে।

বাড়িটার এ কী অবস্থা! ভূতের বাড়ি বলে মনে হচ্ছে। আলোর কোনো ব্যবস্থা করেছেন?

দুইটা হারিকেন আছে। মোমবাতি আছে।

একটা টর্চের ব্যবস্থা করুন।

আইচ্ছা করব। বললেই তো হয় না। সব আনতে হয়। শহর থাইক্যা। তোমরারে একটা উপদেশ দেই,–দোতলায় থাকবা। একতলায় নামনের প্রয়োজন নাই।

কেন?

সাপের উপদ্রব। গত চইত মাসে সাপের কামড়ে একটা গরু, মারা গেল।

কার্বলিক এসিডেব ব্যবস্থা করতে পারবেন? এখানে কোনো ফার্মেসি আছে?

না। তুমি বললে ছেলে একটারে শহরে পাঠাইতে পারি। এরা কিছুই করে না। বাদাইম্যা হইছে। শহরে যাইতে বললে ফাল দিয়া উঠে।

দিন, কাউকে পাঠিয়ে দিন।

যাওনের খরচ দেও। আন কী আনা লাগব কাগজে লেইখ্যা দেও। সাপের ওষুধ?

ওষুধে কিছু হয় না–কপালে লেখা থাকলে ওষুধের বোতলের ভিতরে বসা থাকলেও সাপে কামরাইব।

আমি কাগজে লিখে দিচ্ছি। দয়া করে আনাবার ব্যবস্থা করুন। একশ টাকা দিচ্ছি। যাওয়ার খরচ। এতে হবে?

আরো কিছু দেও। একশ টেকা আইজ-কাইল কোনো টেকাই না। তুমি থাক বিদেশে। এই জন্যে বুঝতাছ না। আর একটা কথা, তোমার পরিবাররে নিয়া আমরার বাড়িত একদিন যাওয়া লাগে। বাড়ির মেয়েছেলেরা দেখতে চায়। এরা আবার কার কাছ থাইক্যা জানি হুঁনছে–বিলাতের মাইয়াছেলে পিসাব পায়খানার পরে পানি নেয় না। বড় ঘিন্নাকর, কিন্তু কী আর করা! যে দেশে যে নিয়ম! তোমার আমার কারণের কিছু নাই।

তাহের বিরক্তমুখে বলল, ঠিক আছে আপনি এখন যান। রাতে খাবার পাঠিয়ে দেবেন। খাবার পানি পাঠাবেন।

আইচ্ছা। তোমরা নিশ্চিত হইয়া ঘুমাও। ছেলে দুইটারে বইল্যা দিছি। রাইতে পাহারা দিতে। এরা কাজকাম কিছুই করে না। বাদাইম্যা। যে কয়দিন থাকবা এরা পাহারা দিব। কিছু খরচ-বরচ দিও।

তাহের দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল। তার মনটাই খারাপ হয়ে গেল।

লিলিয়ান হারিকেন হাতে দোতলার বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। তাকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। ইক্কান্দর আলী দোতলার জানালার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তোমার ইসাতিরি বড়ই সৌন্দৰ্য। এইটা বিপদের কথা। ডাকাইতে সন্ধান পাইলে বড়ই খুশি হইব। ইস্কান্দর আলীর দুই ছেলেও গভীর আগ্রহ নিয়ে দোতলার বারান্দার দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের চোখে পলক পড়ছে না।

লিলিয়ান বারান্দা থেকে চেঁচিয়ে বলল, উপরে চলে আস। দোতলাটা অসম্ভব সুন্দর। মার্বেল পাথরের মেঝে।

লিলিয়ানের খুব ভালো লাগছে। সে হারিকেন হাতে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাচ্ছে। তার ভাবভঙ্গি কিশোরীর মতো। যে ঘরে আজ রাতে তারা থাকবে সেই ঘর দেখে সে মুগ্ধ। বিশাল দুটা জানালা। জানালার পাশে দাঁড়ালেই দূরের ব্ৰহ্মপুত্র দেখা যায়। নদীতে চর পড়েছে। চারের ধবধবে সাদা বালি চাদের আলোয় চিকচিক করছে। কী হাওয়া! উড়িয়ে নিয়ে যেতে চায়। শোবার ঘরটা কী প্ৰকাণ্ড! যেন ফুটবল খেলাব মাঠ। মাঠেব মাঝখানে খাট পাতা হয়েছে। কালো রঙের একটা খাট, যার চারদিকে রেলিং দেয়া। খাটে সরাসরি উঠার উপায় নেই, এত উঁচু। টুলে পা দিয়ে উঠতে হয়। ঘর ভর্তি ভারী ভারী আলমিরা। লিলিয়ান প্রতিটি আলমিরা খুলে দেখল। সব শূন্য। খাটের মাথার কাছে গোল শ্বেত-পাথরের টেবিল। এ বাড়ির অনেক দরজা-জানালা লোকজন খুলে নিয়ে গেছে। এগুলি নেয় নি কেন?

লিলিয়ান বলল, এই টেবিল, এই খাট যে-কোনো মিউজিয়াম লুফে নেবে। মনে হচ্ছে হাজার বছরের পুরনো।

লিলিয়ানের মুগ্ধতা তাহেরকে স্পর্শ করছে না। সে বেশ ক্লাস্ত। বারান্দায় রাখা বালতির পানিতে হাত-মুখ ধুয়ে সে বিছানায় বিরসমুখে বসে আছে। এ বাড়িতে রাত্রিযাপন ঠিক হবে কি-না তা বুঝতে পারছে না। সাপের ব্যাপারটা তাকে চিন্তিত করছে।

লিলিয়ান বলল, কথা বলছি না কেন?

কী বলব?

তোমাদের এইসব ফার্নিচারের বয়স কত?

তাহের হাই তুলতে তুলতে বলল, এদের বয়স দুশ বছরের মতো। সবই আমার দাদার বাবা বানিয়েছিলেন। খাটটা বাৰ্মা থেকে কেনা। এই যে বাড়ি দেখছ, এই বাড়িও উনার করা।

খুব ধনী মানুষ ছিলেন?

হতদরিদ্র ছিলেন। পরের বাড়িতে কামলা খাটতেন। সুপারির ব্যবসা করে ধনী হন। মাত্ৰ চল্লিশ বছর বয়সে তিনি লাখের বাতি জ্বলিয়েছিলেন।

লাখের বাতিটা কী?

আমাদের অঞ্চলে নিয়ম ছিল–কেউ লাখপতি হলে লাখের বাতি জ্বালাতে হতো। একটা লম্বা বাঁশের মাথায় হারিকেন জ্বলিয়ে ঘরের উঠানে রেখে দিত। এই হলো লাখের বাতি। দূর থেকে দেখে লোকজন বুঝত এই অঞ্চলে একজন লাখপতি আছে।

এই নিয়ম কি এখনো আছে?

পাগল হয়েছ? এই নিয়ম থাকলে উপায় আছে? আজ কোনো বাড়িতে লাখের বাতি জুলালে কালই ডাকাতি হবে। সেই বাড়িতে যদি তোমার মতো রূপবতী কেউ থাকে তাহলে তো কথাই নেই।

আমার মনে হয় এ বাড়িতে এসে তোমার ভালো লাগছে না।

এখন পর্যন্ত ভালো লাগার মতো কোনো কারণ ঘটে নি।

আমার কাছে কিন্তু অসাধারণ লাগছে।

ভাঙা বাড়ি অসাধারণ লাগছে?

পুরনো বাড়ি ভাঙা তো থাকবেই। এই অঞ্চলের জন্যে পুরনো বাড়ি সুন্দর মানিয়ে গেছে। ঝকঝকে নতুন বাড়ি এখানে মানাতো না। আমি এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাচ্ছি। আর গায়ে কাটা দিয়ে উঠছে।

ভয়ে?

না ভয়ে না। মনে হচ্ছে এই ঘরগুলিতে কত না স্মৃতি, কত বহস্য–আমি ঠিক করেছি আজ। সারারাত ঘুমুব না।

হারিকেন হাতে এক ঘর থেকে আবেক ঘরে ঘুরবে?

হ্যাঁ।

খুব ভালো কথা। ঘুরে বেড়াও। দয়া করে আমাকে ঘুমুতে দিও। আমি খুব ক্লান্ত হয়ে আছি। ডিনার শেষ হওয়া মাত্র শুয়ে পড়ব।

লিলিয়ান বলল, তুমি আমাকে ক্ৰমাগত মশার ভয় দেখিয়েছ। মশা কিন্তু নেই।

তাই দেখছি। তবে ঘুমুতে হবে মশারি খাটিয়ে। মশা না থাকুক, পোকামাকড় আছে।

আজ রাতে না ঘুমুলে কেমন হয়?

কী বললে?

চল আমরা বারান্দায় বসে জোছনা দেখি।

আর কোনো পরিকল্পনা আছে?

আমার খুব শাড়ি পরতে ইচ্ছা করছে। সুন্দর একটা শাড়ি জোগাড় করতে পারবে? আমাকে শিখিয়ে দেবে কী করে পরতে হয়?

তোমার কি মনে হয় না লিলিয়ান তুমি বাড়াবাড়ি করছ?

না, আমার মনে হয় না।

আমার কিন্তু মনে হচ্ছে তুমি বাড়াবাড়ি করছি।

লিলিয়ান কিছুক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে থেকে বলল, তোমার এরকম মনে হয়ে থাকলে আমি দুঃখিত। আমার যা মনে হয়েছে। আমি তোমাকে বলেছি। তোমাদের এই বাড়িটা ভাঙা। দরজা-জানালা লোকজন খুলে নিয়েছে। তারপরেও এ বাড়িতে পা দেয়ার পর থেকে আমার ভালো লাগছে। এক ধরনের আনন্দ অনুভব করছি। সেই আনন্দ লুকানোর চেষ্টা করি নি। হয়তো সেটা করাই উচিত ছিল।

লিলিয়ান বারান্দায় চলে গেল। তার খুব খারাপ লাগছে। চোখে পানি এসে যাচ্ছে। এই দৃশ্য দেখলে তাহের হেসে উঠতে পারে। লিলিয়ান চোখের পানি দিয়ে তাহেরকে হাসাতে চায় না। লিলিয়ান একটা ঘর থেকে অন্য ঘরে যেতে লাগল। তার কাছে কেন জানি মনে হচ্ছে, ঘরগুলি তাকে ডেকে ডেকে বলছে, এসো লিলিয়ান, এসো। আমাকে দেখে যাও।

তাহের এসে লিলিয়ানকে আবিষ্কার করল সর্বদক্ষিণের বারান্দায়। এখান থেকেই লোহার সিঁড়ি নিচে নেমে গেছে।

লিলিয়ান!

কী?

তুমি কি আমার উপর রাগ করেছ?

না।

মনে হচ্ছে তুমি রাগ করেছ। আসল ব্যাপার কী জানো, আমার চাচার সঙ্গে কথা বলে মেজাজ হয়েছে খারাপ। কিছুই ভালো লাগছিল না। এই কারণেই তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছি। কিছু মনে করো না।

আমি কিছু মনে করি নি।

খাওয়া-দাওয়াব পর আমরা ছাদে বসে জোছনা দেখব।

ছাদে উঠার সিঁড়ি আছে?

হ্যাঁ, সিড়ি আছে। তালাবন্ধ। চাচার ছেলেটাকে পাঠিয়েছি। চাবি আনতে।

থ্যাংক ইউ।

তোমার খিদে পেয়েছে লিলিয়ান?

এখনো খিদে পায় নি।

একটা বিরাট ভুল হয়েছে। ওদের বলে দেয়া উচিত ছিল মসলা কম দিতে। এরা প্রচুর মসলা দিয়ে রান্না করবে। ঝালের জন্যে কিছু মুখে দিতে পারবে না।

আমার খাওয়া নিয়ে ভেবো না। তুমি যা খেতে পারবে, আমিও পারব।

সব ঘর দেখা হয়েছে?

হ্যাঁ।

আয়নাঘর? আয়নাঘর দেখেছ?

না তো। আয়নাঘর কী?

ওটা একটা ইন্টারেস্টিং ঘর। আমার দাদার বাবা–দি গ্রেট জাঙ্গির মুনশি, এই ঘর বানিয়েছিলেন। তালাবন্ধ কি-না জানি না। তালাবন্ধ থাকার কথা। চল দেখি–খুঁজে বের করতে হবে–কোন দিকে তাও জানি না।

ঘরটা তালাবন্ধ। বেশ বড় তালা ঝুলছে। কয়েকবার ঝাঁকি দিতেই তালা খুলে গেল। অনেকদিন বন্ধ থাকায ঘরে ভ্যাপসা জলজ গন্ধ। ছোট্ট ঘর, কোনো জানালা নেই। ঘরে ঢোকার একটিই দরজা। সেই দরজা ও নিচু। ঘবেব একদিকের পুবো দেয়াল জুড়ে বিশাল আয়না। অন্য পাশে কাবার্ড।

লিলিয়ান বলল, এত বড় আয়না কোথায় পেলেন?

তাহের হাসতে হাসতে বলল, জানি না কোথায় পাওয়া গেছে। দি গ্রেট জাঙ্গির মুনশি জোগাড় করেছিলেন সাহেব বাড়ি থেকে। অর্থাৎ ইংরেজদের কাছ থেকে। এই ঘরটাব নাম হলো আয়নাঘব। জাঙ্গির মুনশির স্ত্রী তিতালী বেগম এই ঘরে সাজগোজ করতেন। সাজের সময় বাইরের কেউ যেন দেখতে না পায় এ জন্যেই এ-ঘরের কোনো জানালা নেই। লক্ষ করেছ?

হ্যাঁ, লক্ষ করেছি।

ঐ মহিলা অসম্ভব রূপবতী ছিলেন। তিনি তার একমাত্র পুত্রের জন্মদিনে মারা যান। মাত্র ষোল বছর বয়সে।

আহা।

আয়নাঘর উনার খুব প্রিয় ছিল। উনি যখন মোটামুটি নিশ্চিত হলেন যে মারা যাচ্ছেন তখন তিনি তার স্বামীকে বলেন তাকে আয়নাঘরে নিয়ে যেতে। তাই করা হলো। তিনি মারা গেলেন আয়নাঘরে। জঙ্গিব মুনশি দ্বিতীয়বার বিয়ে কবেন নি। স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি প্ৰায় চল্লিশ বছর বেঁচে ছিলেন। এই চল্লিশ বছর তিনি আয়নাঘর বন্ধ করে রেখেছিলেন। একদিনের জন্যেও খুলেন নি। উনার মৃত্যুর পর আয়নাঘর প্রথম খোলা হয়। এসো লিলিয়ান, খুব সম্ভব খাবার নিয়ে এসেছে। খেয়ে নেই। খিদে লেগেছে। তাছাড়া আমার বেশিক্ষণ থাকা ঠিকও নয়। আযানাঘরে কোনো পুরুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ।

তুমি যাও। আমি এই ঘরে একটু একা একা থাকি।

কেন বলে তো?

দিচ্ছে–দেখ, দেখ।

তাহের বিস্মিত হয়ে বলল, হ্যাঁ দেখলাম। কারণটা কী?

প্ৰায় দেড়শ বছর আগে এই বাড়ির বউ এক আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখেছিল। আজ আমি নিজেকে দেখছি। আমিও এই বাড়িরই বউ। এই আয়নাটা আমার।

তাহের বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল। লিলিয়ান বলল, আমি যখন অসুস্থ হয়ে পড়ব তখন তুমি আমাকে এই বাড়িতে নিয়ে আসবে। আমি চাই আমার মৃত্যু যেন আয়নাঘরে হয়।

সে তো অনেক দূরের ব্যাপার। আপাতত ভাত খাই চল।

প্লিজ, প্লিজ, আমি খানিকক্ষণ এখানে একা থাকব। খুব অল্প কিছুক্ষণ।

তাহের চিন্তিতমুখে বের হয়ে এলো। লিলিয়ান তাকিয়ে আছে আয়নার দিকে। তাহের লিলিয়ানের কাণ্ডকারখানা কিছুই বুঝতে পারছে না।

রান্নার আয়োজন ভালো। রুই মাছ ভাজা। পোলাও কোরমা। এক বাটি পায়েস। লিলিয়ানের জন্যে একটা কাটা চামচও দেয়া হয়েছে। তবে পোলাও সিদ্ধ হয় নি–চাল চাল রয়ে গেছে। কোরমা রান্না হয়েছে প্রচুর পরিমাণে চিনি দিয়ে। খেতে রসগোল্লার মতো লাগছে। তাহের বিরক্তমুখে বলল, ভাজা মাছ খেয়ো না লিলিয়ান। মাছটা পচা বলে ভেজে ফেলেছে।

খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে পানটাই আরাম করে খাওয়া গেল। মীেবী দিয়ে সুন্দর করে বানানো। লিলিয়ান দুটা পান মুখে দিল। সে বিস্মিত হয়ে বলল, খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে তোমরা ভেজিটেবল খাও কেন তা তো বুঝলাম না।

তাহের বলল, এটা ভেজিটেবল না। এর নাম পান। খাবার পর খেতে হয়। কুৎ করে গিলে ফেললে হবে না। ক্রমাগত চিবিয়ে যাবে। গিলতে পারবে না।

কতক্ষণ চিবাবো?

আধঘণ্টা তো বটেই।

তাতে লাভ কী?

মুখের একটা একসারসাইজ হয়। এইটুকুই লাভ।

ঠাট্টা করছ?

মোটেই ঠাট্টা করছি না। তুমি কি ভেবেছ আমার কাজ শুধু ঠাট্টা করা?

জিনিসটা খেতে আমার ভালো লাগছে।

ভালো লাগলে খাও। আমাদের গ্রামের নতুন বউদের অবশ্য পালনীয় কর্তব্যের একটি হচ্ছে পান খেয়ে ঠোঁট লাল করা।

আমি তো নতুন বউ না।

অবশ্যই নতুন বৌ। ছেলেমেয়ে না হওয়া পর্যন্ত আমাদের দেশের বউদের নতুন বউ ধরা হয়।

কোনো মহিলার দশ বছরেও যদি ছেলেমেয়ে না হয় তাহলে কি তাকে নতুন বউ ধরা হবে?

না। তখন তাকে বলা হবে বাঁজা-মেয়েমানুষ। অমঙ্গলজনক একটি ব্যাপার। সেই মেয়েকে কোনো উৎসবে ডাকা হবে না। সকালবেলা কেউ তার মুখ দেখতে চাইবে না।

তোমাদের নিয়ম-কানুন ভারী অদ্ভুত।

অদ্ভুত তো বটেই। আরো অদ্ভুত কথা শুনবে? আমাদের দেশে স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে পাশাপাশি বসে পূর্ণিমার চাঁদের দিকে তাকাবে না।

তাকালে কী হয়?

তাকালে তাদের যে সন্তান হবে সে হবে চরিত্রহীন।

আবার তুমি তামাশা করছি। কী জন্যে করছ তাও বুঝতে পারছি। তুমি আমার সঙ্গে &জাছনা দেখতে চাচ্ছ না।

জোছনা দেখতে অসুবিধা নেই। চাঁদের দিকে না তাকালেই হলো।

ছাদে সত্যি সত্যি বসবে। আমার সঙ্গে?

হুঁ বসব। তবে ছাদে না। বারান্দায়। তোমার বিখ্যাত চাঁদ বারান্দা থেকেও দেখা যায়। চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমি যদি মুগ্ধ হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি কিছু মনে কবো না। ঘুমিয়ে পড়ার সম্ভাবনা নিরানব্বই দশমিক নয় ভাগ।

ইস্কান্দর আলীর মেজো ছেলে বারান্দা ঝাঁট দিচ্ছে। তাহের তাকে বারান্দায় চাদর পাততে বলেছে। এই ছেলেই খাবার নিয়ে এসেছে। বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনে এনেছে। তার বুদ্ধি কোন পর্যায়ের তাহের এখনো ধরতে পারছে না। সে টর্চ কিনে এনেছে, কিন্তু ব্যাটারি আনে নি।

তোমার নাম কী?

ছালাম।

ছালাম না। সালাম?

ছালাম। ছালাম আলী।

ছালাম তোমাকে টর্চের ব্যাটারি। আনতে যেতে হবে, পারবে না?

হুঁ।

দোকান কি অনেক দূর?

হুঁ।

দূর হলে থাক, সকালে এনে দিও।

ছাইকেল আছে।

সাইকেল থাকলে সাইকেলে করে নিয়ে এসো।

তারা ঘুমুতে গেল রাত দুটায়। তাহের বলল, হারিকেন জ্বালানো থাকুক। লিলিয়ান বলল, হারিকেন জ্বালানো থাকলে ঘরে চাঁদের আলো আসবে না। তাহের বলল, তোমার ভেতর এত কাব্যভাব আছে তা কিন্তু আমার জানা ছিল না।

জানা থাকলে কী করতে, আমাকে বিয়ে করতে না?

তাহের হাসল। হাসতে হাসতে বলল, চা খেতে ইচ্ছা করছে। আমার সমস্যা হচ্ছে ঘুমের প্রথম ধাক্কাটা কেটে গেলে ঘুম আসে না। আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি, বাকি রাতটা তুমি আরাম করে ঘুমুবে, আর আমাকে জেগে থেকে তোমার বিখ্যাত জোছনা দেখতে হবে।

চা সত্যি খেতে চাও? আমার কাছে টি-ব্যাগ আছে, সুগার কিউব আছে। শুধু দুধ নেই।

পানি গরম করবে। কীভাবে?

কাগজ জ্বলিয়ে পানি গরম করব।

কাগজ পাবে কোথায়?

তুমি ডার্টি জোকস-এর যে বইটি এনেছ, সেটা পুড়িয়ে ফেলব। বানাব চা?

মন্দ না। পারলে বানাও।

তুমি চুপচাপ বিছানায় বসে থাক। আমি চা বানিয়ে আনছি।

আমি তোমার পাশে বসি।

লিলিয়ান চায়ের পানি গরম করছে। পাশে বসে আছে তাহের। তার ঘুম কেটে গেছে বলে মনে হচ্ছে না। সে খানিকক্ষণ পরপর হাই তুলছে। লিলিয়ান বলল, তুমি ঐ মহিলা সম্পর্কে আরো কিছু বলে।

কোন মহিলা?

আয়নাঘরে যিনি মারা গিয়েছিলেন।

আমি কিছুই জানি না। খুব রূপবতী ছিলেন, এইটুকু জানি। জাঙ্গির মুনশি বেনারস থেকে একজন আর্টিস্ট এনে তার কিছু ছবি আঁকিয়েছিলেন। সেইসব ছবি দেখলে তার সম্পর্কে আন্দাজ পেতে। তবে ছবিও নেই। উনার মৃত্যুর পর জাঙ্গিব মুনশি তাঁর স্ত্রীর সব ছবি পুড়িয়ে ফেলেন।

লিলিয়ান কোমল গলায় বলল, উনাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে।

তাহের চা খাচ্ছে। কাচের গ্লাসে চা দেয়া হয়েছে। গ্লাস গবাম হয়ে গেছে–চা খাওয়া যাচ্ছে না। তাহের চায়ের গ্লাসে ফুঁ দিতে দিতে বলল, আমার মাব। ধাবণ উনি একবার তিতিলী বেগমকে দেখেছিলেন।

উনি দেখবেন কীভাবে?

মার ধারণা, দেখেছেন। গভীর রাতে আয়নাঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছেন, হঠাৎ শুনেন আয়নাঘরের ভেতর থেকে ঝুনঝুন চুড়ির শব্দ। আয়নাঘর তালাবন্ধ। চুড়ির শব্দ কীভাবে আসবে? মা খুব অবাক হলেন। উনার সাহসের সীমা ছিল না। চাবি নিয়ে আয়নাঘর খুললেন। মোমবাতি হাতে একা একা আয়নাঘরে ঢুকলেন।

তারপর?

তারপরের ব্যাপার পরিষ্কার জানা যায় না। মা কিছু একটা দেখেছিলেন। কী দেখেছিলেন কিছুই ভেঙে বলেন নি। এরপর থেকে তার অভ্যাস হয়ে গেল।–গভীর রাতে আয়নাঘরের দরজা খুলে সেখানে ঢুকতেন। অনেকক্ষণ থাকতেন। আয়নাঘরের মেঝেতে পাটি পেতে দুপুরে ঘুমুতেন। আমার বাবা জানতে পেরে খুব রাগ করেন। বাবার ধারণা, এই বাড়িটা অভিশপ্ত। এ বাড়িতে থাকলে অকল্যাণ ছাড়া কল্যাণ হবে না। তিনি মাকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যান।

কোথায় যান?

প্রথম ময়মনসিংহ শহরে যান। সেখান থেকে যান ঢাকায়। ঢাকায় যাবার পর থেকে মার মাথায় পাগলামি ভর করে। তিনি রাতে একেবারেই ঘুমুতেন না। ছটফট করতেন। আর বলতেন— ঐ বাড়ি ফেলে এসেছি, উনি খুব রাগ করছেন। খুব মন খারাপ করছেন। উনার কত শখ বাড়ি ভর্তি থাকবে ছেলেমেয়েতে। তারা হৈচৈ করবে, চেঁচামেচি করবে।

উনি মানে কে? তিতালী বেগম?

হুঁ। মা খুব কান্নাকাটি শুরু করেন বাড়ি যাবার জন্য। বাবা পাত্তাই দেন নি। বাবা বলতেন–ঐ বাড়িতে থাকার জন্যেই তোমার মাথার দোষ হয়েছে। আমি ওখানে তোমাকে নিয়ে যাব না। বাবা নিয়ে যান নি। মার মৃত্যু হয় ঢাকায়।

তোমার কি মনে হয় না তোমার বাবা ভুল করেছিলেন?

না, মনে হয় না। বাবা যুক্তিবাদী মানুষ ছিলেন। মাব মনের ভ্রান্তিকে তিনি আমল দেন নি। তুমি নিশ্চয়ই মনে কর না আয়নাঘরে একজন মৃত মানুষ বাস করে।

জগৎ বড়ই রহস্যময় তাহের।

জগৎ মোটেই রহস্যময় নয়। জগৎ কঠিন নিয়ম-শৃঙ্খলায় বাঁধা। প্রকৃতি কখনো কোনো নিয়মের ব্যতিক্রম হতে দেয় না। রহস্যের বাস মানুষের মনে। মানুষই রহস্য লালন করে। যেমন তুমি কর। কত আয়োজন করে জোছনা দেখলে। জোছনার যে সৌন্দর্য তার সবটাই তুমি আরোপ কবেছ। জোছনা কী? সূর্যের প্রতিফলিত আলোএকে নিয়ে মাতামাতি করার কিছু নেই। কিন্তু তুমি মাতামাতি কবিছ। তোমার মতো অনেকেই করছে। কবিতা লেখা হচ্ছে। গান লেখা হচ্ছে–আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে… ।

লিলিয়ান বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। ছালাম সব কাজ ফেলে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লিলিয়ানের দিকে। লিলিয়ান বাংলায় বলল, আপনাদের পাঠানো খাবার উত্তম হয়েছে। পান খুবই উত্তম হয়েছে। ছালাম কিছু বলছে না। তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে লিলিয়ানের কোনো কথা তার কান দিয়ে ঢুকছে না। লিলিয়ান বলল, আমি আমাদের এই বাগান প্ৰাতঃকালে পরিচ্ছন্ন করব। আমি কিছু লেবার নিয়োগ করব। দয়া করে আমাকে সাহায্য করবেন। আপনি কি আমার বাংলা ভাষা বুঝতে পারছেন?

ছালাম কিছু বলল না। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল। তাহের বলল, বিদেশী উচ্চারণে তোমার অদ্ভুত বাংলা সে কিছুই বুঝে নি। বোঝাব চেষ্টাও করে নি। আমিই বুঝতে পারি না, আর বুঝবে ছালাম আলী! সে হা করে তাকিয়ে ছিল তোমার দিকে। যাই হোক, এসে বসো এখানে। জোছনা দেখ।

লিলিয়ান বসল। তাহের হাই তুলতে তুলতে বলল, কাঁপাচিনো কফি খেতে পারলে ভালো হতো। যা ঘুম পাচ্ছে বলার না। চাঁদটাকে ঘুমের ট্যাবলেটের মতো লাগছে। যতই দেখছি ততই ঘুম পাচ্ছে। ভালো কথা, জঙ্গল পরিষ্কারের কথা কী বলছ? এইসব মাথা থেকে দূর করা।

না, দূর করব না। আমি বাগান পরিষ্কার করব। বাড়ি ঠিকঠাক করব। আমাদের এত সুন্দর বাড়ি এভাবে পড়ে থাকবে?

সুন্দর দেখলে কোথায়?

আমার কাছে খুব সুন্দর লাগছে।

আচ্ছা ধরে নিলাম সুন্দর। কে থাকবে তোমার এই সুন্দর বাড়িতে?

আমরা দুজন থাকব। আমাদের ছেলেমেয়েরা থাকবে। এরা বাগানে খেলবে। আমি এদের জন্যে দোলনা বানিয়ে দেব। জোছনা রাতে বাচ্চাদের হাত ধরে আমরা নদীর পারে। হাঁটব। আর একটা বড় নৌকা কিনব। নদীর ঘাটে নৌকা বাধা থাকবে।

তাহের হাসতে হাসতে বলল, কী বলছি পাগলের মতো?

আমার মনের ইচ্ছার কথা তোমাকে বলছি।

লোকালয় ছেড়ে আমরা বনে পড়ে থাকব?

হ্যাঁ।

তোমার কী হয়েছে বলো তো লিলিয়ান?

বুঝতে পারছি না।

আমার মনে হয় ঘুমের অভাবে তোমার চিন্তাশক্তি এলোমেলো হয়ে গেছে। ভালো করে ঘুমাও–দেখবে মাথা থেকে ভূত নেমে গেছে। চল শুয়ে পড়ি।

তুমি শুয়ে পড়। আমি খানিকক্ষগ বসি।

আচ্ছা বসো, আমি তাহলে এখানেই শুয়ে থাকি। তোমার যখন জোছনা দেখা শেষ হবে, আমাকে ডেকে দিও।

একটুক্ষণ জেগে থাক না। আমার খুব গল্প করতে ইচ্ছা করছে।

তাহের হাই তুলতে তুলতে বলল, আমি জেগে থাকার চেষ্টা করছি। তুমি গল্প শুরু কর। আমার পক্ষে গল্প করা সম্ভব না। আমার পক্ষে যা সম্ভব তা হচ্ছে হাই তোলা। ঐ কাজটা আমি দায়িত্বের সঙ্গে করে যাচ্ছি।

তাহের দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল। মনে হচ্ছে সে ঘুমিয়ে পড়েছে।

লিলিয়ান গলার স্বর হঠাৎ অনেকখানি নিচে নামিয়ে বলল, আমি তোমাকে কতখানি ভালোবাসি তা কি তুমি জানো?

তাহের চোখ না মেলেই বলল, জানি।

কীভাবে জানো?

বলতে চাচ্ছি না। বললে তুমি লজ্জা পাবে।

আমি লজ্জা পাব না। তুমি বলো। আমার শুনতে ইচ্ছে করছে।

তোমার শুনতে ইচ্ছা করলেও, আমার বলতে ইচ্ছা করছে না। আমার ঘুমুতে ইচ্ছা! করছে। আমি কি তোমার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়তে পারি?

হ্যাঁ পার। আমি সারারাত কিন্তু এখানেই বসে থাকব! তুমি এইভাবেই ঘুমুবে।

তোমার মধ্যে পাগলামির বীজ আছে লিলিয়ান। আমার ধারণা বেশ ভালো মতো আছে।

লিলিয়ান হালকা গলায় বলল, হয়তো আছে। এই মুহুর্তে আমার মনে হচ্ছে কী জানো? আমার মনে হচ্ছে এই যে–তুমি আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছএকজন কেউ তা দেখছে। খুব আনন্দ নিয়ে দেখছে।

সেই একজন কেউটা কে? ভূত-প্ৰেত?

বুঝতে পারছি না, তবে তার উপস্থিতি অনুভব করছি।

এ বাড়িতে তোমাকে বেশিদিন রাখা ঠিক হবে না। তোমার ব্ৰেইন পুরোপুরি নষ্ট হবার আগেই আমাদের চলে যেতে হবে।

ছালাম উঠে এসেছে। তাহের লিলিয়ানোবা কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে দেখেও সে অস্বস্তি বা লজ্জা কোনোটাই বোধ করল না। শুকনো গলায় তাহেরকে বলল, প্যাটারি আনছি।

তাহের তাকিয়ে দেখল। ছালাম দুটি পেনসিল ব্যাটারি নিয়ে এসেছে। তাহেরের কেন জানি মনে হলো সে এটা নিবুদ্ধিতার কারণে করে নি। ইচ্ছা করে করেছে।

আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি যাও।

আর কিছু লাগব?

না, আর কিছু লাগবে না।

লিলিয়ান বলল, আজ হঠাৎ তুমি এত গুছিয়ে কথা বলছ কেন? এত লজিক দিয়ে তুমি কখনো কথা বলো না।

তা বলি না, আজ বলছি। কারণ স্মামাব মনে হচ্ছে তোমার নিজস্ব জগতে লজিকের স্থান খুব কম। তোমার লজিক ভালো থাকলে কখনো আমাকে বিয়ে করতে না। আর কবলেও ভালো মতো খোঁজখবর করতে–আমি কে? আমার বাবা-মা কোথাব্য, কভাই বোন… ? কোনো প্রশ্ন না, কোনো কৌতুহান না–স্বপ্নে পাওয়া মানুষের মতো বলে বসলে–আমি আমার জীবনটা তোমার সঙ্গে কাটাতে চাই।

আমি কি ভুল করেছি?

তুমি ভুল করেছ কি-না তা আমি এই মুহূর্তে বলতে পারব না। তুমি নিজেও বুঝবে না। আজ থেকে দশ বা পনের বছর পর ধরতে পারবে।

কীভাবে ধরব?

আমাকে বিয়ে করার সময়, আমার সম্পর্কে তোমার কিছু প্ৰত্যাশা ছিল। আমি যদি তা মেটাতে পারি তাহলে বুঝতে হবে আমাকে বিয়ে করে তুমি ভুল কর নি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমি নিজে এখনো জানি না কোন প্ৰত্যাশা নিয়ে তুমি আমাকে বিয়ে করেছি। জানলে মেটাবার চেষ্টা করতাম।

তোমার প্রতি আমার কোনো প্ৰত্যাশা নেই। আমাকে তোমার পাশে থাকতে হবেএটা হলো নিয়তি।

তাহের সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, নিয়তি হচ্ছে আরেকটা বাজে কথা। যারা দুর্বল মানুষ, অর্থাৎ যারা দুর্বল লজিকের মানুষ–নিয়তি তাদের একটি প্রিয় শব্দ। এই শব্দ আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত। অভিধান থেকে এই শব্দ তুলে দেওয়া উচিত।

লিলিয়ান কোমল গলায় বলল, পৃথিবীর সব ভাষার অভিধানে কিন্তু এই শব্দটি আছে। নিয়তি বলে কিছু একটা আছে বলেই আছে।

তাহের রাগী গলায় বলল, তুমি একটা হাস্যকর লজিক দিলে লিলিয়ান। অভিধানে দৈত্য শব্দটাও আছে। পরী আছে, ড্রাগন আছে, মৎস্যকন্যা আছে। তুমি কি কখনো দৈত্য, পরী বা ড্রাগন দেখেছ? পৃথিবীর কেউ কি দেখেছে?

না, দেখে নি। এত রেগে যাচ্ছ কেন? চল ঘুমুতে যাই।

তাহের মুখে বলছিল তার ঘুম ছুটে গেছে, বাস্তবে দেখা গেল বিছানায় শোয়ামাত্র তার নাক ডাকতে শুরু করেছে। হারিকেন নিভিয়ে লিলিয়ান এসে পাশে শুয়েছে। তার ঘুম আসছে না। জানালা গলে জোছনা এসে পড়েছে তাদের খাটের এক মাথায়। কী সুন্দর যে লাগছে দেখতে! বাইরের বাগানে পাখি ডাকছে। লিলিয়ান কোন বইয়ে যেন পড়েছিল রাতে কখনো পাখি ডাকে না। বইয়ের তথ্য ঠিক না–অনেক পাখিই ডাকছে। বিবির ডাকের সঙ্গেও বোধহয় পাখিব ডাকের এক ধরনের সম্পর্ক আছে। বিঝিব ডাক যখন থামছে তখনই শুধু পাখি ডাকছে। ঝিঝি এবং পাখি কখনোই এক সঙ্গে ডাকছে না।

শোবার ঘরের দরজায় খুঁট করে শব্দ হলো। কে যেন দরজায় হাত বেখেছে। এ ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করা যায় নি। দরজার ছিটিকিনিতে জং পড়েছে। কিছুতেই নড়ানো যায় না। কেউ যদি সত্যি সত্যি এসে থাকে। সে অল্প ধাক্কা দিয়েই দরজা খুলতে পারবে। আশ্চর্য তো, দরজা খুলে যাচ্ছে। লিলিয়ান তাহেরের গায়ে হাত রাখল। তাহের ঘুমের মধ্যেই বলল, আহ, কী কর!

লিলিয়ান হাত সরিয়ে নিল। সে খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। তার কাছে মনে হচ্ছে দরজার ওপাশে কেউ একজন আছে। সে গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকে দেখছে। লিলিয়ান বলল, কে?

ফিসফিস কবে কেউ কি জবাব দিল? খুব হালকা স্বর যা বাতাসে ভেসে চলে যায়। লিলিয়ান খুব সাবধানে বিছানা থেকে নামল। এগুলো দরজার দিকে। তার মোটেও ভয় করছে না। বরং ভালো লাগছে।

না, দরজার ওপাশে কেউ নেই। ফাঁকা সিঁড়ি। রেলিং গলে জোছনা পড়ে অপূর্ব সব নকশা তৈরি হয়েছে। নকশার ভেতর দিয়ে হাঁটতে কেমন লাগবে? লিলিয়ান হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে সে আয়নাঘরের সামনে চলে এলো। আয়নাঘরের দরজা ভেজানো। তার ইচ্ছা করতে লাগল ভেজানো দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে। ভেতরটা নিশ্চয়ই অন্ধকার। দরজা খুলে দিলে চাঁদের আলো কি ঘরে ঢুকবে?

লিলিয়ান দরজা খুলল। চাঁদের আলো ঘরে ঢুকেছে। আয়নার একটা অংশ আলোকিত হয়ে আছে। কী সুন্দর লাগছে দেখতে! শোবার ঘর থেকে ঘুমের ঘোরে তাহের ডাকল, লিলিয়ান!

শোবার ঘরে যেতে ইচ্ছা করছে না। আয়নাঘরের মেঝেতে পাটি পেতে শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করছে। পাটি ছাড়াও সিমেন্টের মেঝের উপর শুয়ে থাকা যায়। এ ঘরের মেঝে কালো সিমেন্টের। খুব মসৃণ। কেমন ঠাণ্ড ঠাণ্ডা ভাব।

তাহের আবার ডাকল, লিলিয়ান। এবার বোধহয় সে জেগে উঠেছে। লিলিয়ান ক্লান্ত গলায় বলল, কী?

পানি খাব।

আনছি।

পানির গ্লাস নিয়ে লিলিয়ান আবার শোবার ঘরে চলে এলো। তাহেরের গায়ে হাত রেখে মনে মনে বলল, I love you… যদিও মনে মনে বলার প্রয়োজন ছিল না। তাহের ঘুমিয়ে আছে। এই বাক্যটি শব্দ করেও বলা যেত। তবু কিছু কিছু কথা আছে মনে মনে বুলতেই ভালো লাগে।

০৭. খুব ভোরে পাখির কিচকিচি শব্দে

খুব ভোরে পাখির কিচকিচি শব্দে লিলিযানের ঘুম ভেঙেছে। এত পাখিকে সে একসঙ্গে কখনো ডাকতে শুনে নি। তাহেরকে ডেকে তুলে পাখির গান শোনাতে ইচ্ছা করছে। ডেকে লাভ হবে না। এত ভোবে সে উঠবে না। ছুটিব দিনে নটা-দশটার আগে তার ঘুম ভাঙে না। এখন তো প্রতিদিনই ছুটি। লিলিয়ান বিছানা ছেড়ে বাগানে গেল। কাল বাতে যে বাগানটাকে ভয়াবহ জঙ্গল বলে মনে হচ্ছিল এখন তা মনে হচ্ছে না। ঝোপঝাড় ঠিকই আছে, ঝোপঝাড়েবা জন্যেই ভালো লাগছে। বাগানটা বেশ বড়, বেশির ভাগ গাছই তার অচেনা। তাহেরের কাছ থেকে গাছের নামগুলি জেনে নিতে হবে। একটা বড় গাছেব সামনে লিলিয়ান থমকে দাঁড়াল। এ গাছটা চেনা চেনা লাগছে। মনে হচ্ছে ওলিভ গাছ। এ দেশে কি ওলিভ গাছ হয়? একেক দেশে একেক রকম গাছ, সেই হিসেবে মানুষেবাও তো একেক রকম হওযা উচিত। এ বিষয়ে তাহেরের মতামত কী জিজ্ঞেস করতে হবে।

একটা গাছের নিচটা বাঁধানো। এখানে বসে, ব্রেকফার্স্ট খেলে কেমন হয়? তাহেরকে বললে সে হয়তো আবার মুখ বাকিয়ে বলবে–তুমি কিন্তু বাড়াবাড়ি করছি।

লিলিয়ানের ধারণা, সে মোটেই বাড়াবাড়ি করছে না। এই যে বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছে এটা কি বাড়াবাড়ি? নিশ্চয়ই বাড়াবাড়ি না। সে দেখছে মোট কত ধরনের গাছ। এখানে আছে।

ইস্কান্দর আলীর সঙ্গে বাগানেই লিলিয়ানের দেখা হলো। তিনি সকালের নাস্তা নিয়ে এদিকে আসছেন। এক হাতে টিফিন ক্যারিয়ার, অন্য হাতে ফ্লাস্ক। লিলিয়ানকে দেখে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। লিলিয়ান বলল, গুড মর্নিং!

তিনি হাসিমুখে মাথা নাড়লেন। লিলিয়ান বাংলায় থেমে থেমে বলল, আপনি কেমন আছেন?

ইস্কান্দর আলী থতমত খেয়ে বললেন, জ্বে ভালো। এইখানে কী করেন?

আমি বাগান দেখছি।

বাগানে দেখার কিছু নাই। সাপের আড্ডা। প্রতি বছর একটা-দুইটা গরু মরে। সাপ চিনেন তো?

জ্বি, আমি সাপ চিনি।

বড়ই ভয়ঙ্কর জিনিস। চলেন উপরে যাই। নাশতা নিয়া আসছি। খিচুড়ি আর ডিমের তরকারি। গৈ-গোরাম জায়গা। কিছু পাওয়া যায় না। সব জিনিস শহর থাইক্যা আনা লাগে। অনেক খরচ পড়ে।

লিলিয়ান সব কথা বুঝতে না পারলেও আন্দাজ করছে–এই মানুষটি বলছে, শহর থেকে জিনিস আনতে হয় বলে টাকা বেশি লাগে। লিলিয়ান বলল, আপনি তাহেরকে বলবেন, ও টাকা দেবে।

বলতেও শরম লাগে। কত টেকা সে আনছে কিছুই তো জানি না।

ও যথেষ্ট টাকা-পয়সা এনেছে। আমরা বাড়িঘর ঠিক করব, টাকা লাগবে।

বাড়িঘর ঠিক কইরা ফয়দা কী? কে থাকব?

আমলা থাকব। আচ্ছা, আপনি বলুন তো এই গাছটার কী নাম?

জলপাই গাছ।

আমি ঠিক করেছি আমি এবং তাহের এই গাছের নিচে বসে সকালের ব্রেকফার্স্ট করব। কাউকে দিয়ে কি পরিষ্কার করিয়ে দিতে পারবেন?

পারব। কিছু খরচ-বরচ লাগবে। টেকা ছাড়া কাউবে দিয়া কিছু করন যায় না। যে যুগের যে ভাও। দুনিয়া গেছে উল্টাইয়া।

লিলিয়ান ইস্কান্দর আলীকে নিয়ে বাগানে ঘুরছে। গাছের নাম জিজ্ঞেস করছে। অনেকগুলি নাম লিলিয়ান শিখে ফেলল–আমগাছ, তেঁতুলগাছ, বেলগাছ, কাঁঠালগাছ, জলপাইগাছ, গাবগাছ… ।

লিলিয়ানের খুব ভালো লাগছে। তাহেরের ঘুম না ভাঙা পর্যন্ত সে বাগানে বাগানে ঘুরল।

তাহের নাশতা খেয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। দুপুরেব খাবার খেয়েও ঘুমুতে গেল। তার ঘুম ভাঙল বিকেলে। সে হাসিমুখে বলল, ইচ্ছা করে ঘুম স্টক করে নিয়েছি। আজ রাত জাগাব। তোমাকে নিয়ে ছাদে বসে থাকব। কাল ছাদে যাওয়া হয় নি। আজ হবে। ছাদটা সুন্দর। ছাদ থেকে ব্ৰহ্মপুত্র পরিষ্কার দেখা যায়। ব্ৰহ্মপুত্র নদীতে নৌকাভ্রমণ করতে চাও?

চাই।

দেখি খোঁজ করে।

তাহের হাই তুলতে তুলতে বলল, বেশি ঘুমানোর প্রবলেম কী জানো? নেশা লেগে যায়। তখন শুধু ঘুমুতে ইচ্ছা করে।

তুমি কি আবার ঘুমুবে?

না।

বাগানে যাবে? চল বাগানে যাই। বিকেলের চাটা বাগানে বসে খাই।

ওরে সর্বনাশ! বিকেলে বাগানে যাওয়াই যাবে না। বিকেলে সাপরা খুব উত্তেজিত থাকে। বিকেলে দোতলা থেকে নিচে নামাটা হবে চরম বোকামি। বরং চল ছাদে বসে চা খাই।

বেশ চল।

তোমাকে আরেকটা কথা বলা দরকার। আজ রােতই কিন্তু এ বাড়িতে আমাদের শেষ রজনী। কাল ভোরে আমরা চলে যাব। তোমার যা দেখার দেখে নাও। ছবি তুলতে চাইলে ছবি তোল। ক্যামেরাটা বের কর তো?

লিলিয়ানের মন খারাপ হয়ে গেল। আজই শেষ রজনী? লিলিয়ান কিছু বলল না। ছবি তোলার ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহ দেখা গেল না।

বিকেলে ছাদে। চা খাওয়া হলো না। কারণ ছাদের দরজার চাবি নেই। ছালাম চাবি নিয়ে এলো অনেক রাতে। সেই চাবিতে তালা না খোলায় তালা ভাঙতে হলো। ছাদে পাটি পেতে বিছানা করতে করতে রাত দশটার মতো বেজে গেল। লিলিয়ানের খুব শখ ছিল শাড়ি পরবে। শাড়ি জোগাড় হয় নি। সে তার সবচে সুন্দর ড্রেসটি পরে ছাদে বসে আছে। তাহের ছালামকে বিদেয় করে ছাদে আসবে। সে আসতে খুব দেরি করছে। একা একা ছাদে পসে থাকতে লিলিয়ানের খুব খারাপ লাগছে না। বরং ভালোই লাগছে। তবে আজ গত রাতের মতো জোছনা হয় নি। আকাশে মেঘ। মরা জোছনা।

তাহের ছাদে এলো এগারটার দিকে। বিরক্তমুখে বলল, লিলিয়ান, ছাদের প্রোগ্রামটা–আধঘণ্টা পিছিয়ে দিতে হবে। আমার চাচা খবর পঠিয়েছেন। অত্যন্ত জরুরি কী কথা না-কি এই মুহুর্তে আমাকে বলা দরকার। তার হাঁপানীর টান উঠেছে। তিনি আসতে পারছেন না। তুমি শোবার ঘরে গিয়ে বসে। আমি ফিরে এসে তোমাকে নিয়ে ছাদে যাব।

তারা ছাদ থেকে নেমে এলো। লিলিয়ান বুঝতে পারছে তাকে একা ফেলে তাহেরের যেতে ইচ্ছা করছে না। লিলিয়ান বলল, আমিও যাই তোমার সঙ্গে?

তিনি বলে দিয়েছেন আমি যেন একা। যাই। তোমার ভয়ের কিছু নেই। তাঁর বড় ছেলেটা এখানে থাকবে।

আমি মোটেও ভয় পাচ্ছি না। তবে উনার ছেলে এখানে না থাকলে ভালো হয়। ছেলেটাকে আমার পছন্দ না। সারাক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তোকানোর ধরনটা ভালো না।

তাকানোর ধরন ঠিকই আছে। ওরা কখনো বিদেশী মেয়ে দেখে নি। তোমাকে অবাক হয়ে দেখছে। এতে যে তুমি অস্বস্তিবোধ করতে পার সেই জ্ঞান ওদের নেই। তাছাড়া সে থাকবে একতলায়, তুমি দোতলায়–অসুবিধা কী। পারবে না। আধঘণ্টা থাকতে?

পারব।

সিঁড়ির দরজাটা বন্ধ করে দিও।

আচ্ছা।

আমি মোটেও দেরি করব না। কথাটা শুনব আর চলে আসব। তাদের যদি ভালো

কোনো শাড়ি থাকে তোমার জন্যে নিয়ে আসব।

থ্যাংকস।

লিলিয়ান সিড়ির দরজা বন্ধ করে শোবার ঘরে চলে এলো। তার হাতে হারিকেন। তাকে একা এক আধঘণ্টা সময় কাটাতে হবে। আধঘণ্টা সময় কিছুই না। দেখতে দেখতে কেটে যাবে। হিথ্রো এয়াবপোর্ট থেকে তাহের ডাটি জোকস-এর একটা বই কিনেছে। নোংরা রসিকতা পড়তে ভালো লাগে না। তবু সময় কাটানোর জন্যে নিশ্চয়ই পড়া যায়।

লিলিয়ান শ্বেতপাথরের টেবিলে হারিকেন নামিয়ে রাখল। হারিকেনের সম্ভবত কোনো সমস্যা হয়েছে। শিখা দপদপ করছে। নিভে যাবে না তো? লিলিয়ান তাকিয়ে আছে হারিকেনের শিখার দিকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতেই কোনোরকম কারণ ছাড়া আচমকা তীব্ৰ ভয়ে লিলিয়ান আচ্ছন্ন হয়ে গেল। তার মনে হলো— ভয়ঙ্কর কোনো বিপদ ঘটতে যাচ্ছে। তাহের কিছুক্ষণের মধ্যেই ভয়াবহ কোনো বিপদে পড়বে। লিলিয়ান যন্ত্রের মতো পরপর তিনবার বললে, Oh God! Save him Please, Save him… পরম করুণাময় ঈশ্বর। তুমি আমার স্বামীকে রক্ষা কর।

লিলিয়ানের সামনে রাখা হারিকেন নিভে গেল। সে স্পষ্ট শুনল খুব হালকা পায়ে কে যেন আসছে তার ঘরের দিকে। যে আসছে তার পা ছোট ছোট, সে পা ফেলছে খুব সাবধানে। দরজার কাছে এসে সে থমকে দাঁড়িয়েছে, এক হাতে দরজা ধরেছে তা বুঝা যাচ্ছে। দরজায় ক্যাচর্ক্যাচ শব্দ হলো। এর উপস্থিতিই কি লিলিয়ান টের পাচ্ছিল? কে, এ কে? লিলিয়ান আতঙ্কে অস্থির হয়ে কাঁপা গলায় বলল, কে? কে? Who is there?

ছোট্ট করে কে যেন নিঃশ্বাস ফেলল। ছোট নিঃশ্বাস, কিন্তু লিলিয়ান স্পষ্ট শুনল। সে কি তার নিজের নিঃশ্বাসের শব্দই শুনেছে? ভয় পেলে মানুষের মস্তিষ্ক ঠিক কাজ করে না। তারও কি তাই হয়েছে? ডা. ভারমান নিশ্চয়ই এর চমৎকার ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। কিন্তু তার কাছে কোনো ব্যাখ্যা নেই।

তাহের সিগারেট ধরিয়েছে। বর্ষাকাল হলেও কয়েকদিন বৃষ্টি না হওয়ায় রাস্তাঘাট শুকনো। একজন যাচ্ছে সামনে সামনে। তার হাতে টর্চলাইট। সে টর্চের আলো ফেলছে। তাহেরের সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে চারজন যুবক। একজনের নাম তাহের জানেছালাম। চাচার মেজো ছেলে। সে আসছে সবার পেছনে। বাকি তিনজন কে? এরা সঙ্গে যাচ্ছে কেন? কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা হচ্ছে না। ওরাও কিছু বলছে না। চাচার এমন কী জরুরি কথা থাকতে পারে? জমিজমা সম্পর্কিত কিছু? তাহেরের পৈতৃক জমি নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। যা হবার হবে। এগুলি হাতছাড়া হয়ে একদিকে ভালো হয়েছে। বন্ধনমুক্ত হওয়া গেছে। জমির কারণে তার বাবাকে অপঘাতে মরতে হয়েছে। এই অভিশাপ থেকে তাহের মুক্তি চায়। তবে বাড়িটা সে রাখবে। সংস্কার করাবে। লিলিয়ানের যখন এত পছন্দ। তাদের ছেলেমেয়েরা বড় হলে এদের দেখাতে নিয়ে আসবে। কে জানে বৃদ্ধ বয়সে সে নিজেও হয়তো ফিরে আসবে। সে এবং লিলিয়ান জীবনের শেষ সময়টা কাটাবে নদীর ধারের এই বিশাল বাড়িতে। ততদিনে গ্রামে গ্রামে ইলেকট্রিসিটিও নিশ্চয়ই চলে আসবে।

দলটা নদীর পাড়ে এসে থমকে দাঁড়াল। তাহের বলল, এখানে কী? টর্চ হাতের ছেলেটা বলল, নদীর হেই পাড়ে যাওয়া লাগব।

তাহের বিস্মিত হয়ে বলল, নদীর ঐ পাড়ে কেন? ঐ পাড়ে কী? ছালাম তুমি এদিকে এসো। তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি।

ছালাম এলো না। সে দ্রুত সরে গেল। গেল নদীর দিকেই। সেখানে ঝাঁকড়া একটা পাকুর গাছ। পাকুর গাছের ডালের সঙ্গে নৌকা বাধা। চাঁদ উঠে নি। চারদিক অন্ধকার। নক্ষত্রের আলোয় কিছু দেখা যাচ্ছে না। অসংখ্য বিঝি পোকা ডাকছে। Something is very wrong, তাহের দ্রুত ভাবতে চেষ্টা করছে। চারজন যুবক তাকে ঘিরে আছে কেন? এরা নদীর পাড়ে তাকে নিয়ে এসেছে কেন? হত্যা করতে চায়? কোন চায়? টাকা-পয়সার জন্যে? মানুষ খুন করা এত সহজ।

টর্চ হাতের লোকটা বলল, আসেন নৌকায় আসেন।

তাহের কি দৌড়ে পালিয়ে যাবাব চেষ্টা করবে? পারবে পালাতে? এমনও তো হতে পাবে পুবো ব্যাপাধটা কিছুই না। সে ভয। পাচ্ছে বলেই আজেবাজে চিন্তা করছে। হয়তো তার চাচা নদীর ঐ পারে আরেকটা বাড়ি করেছেন। এই ছেলেগুলিকে রাখা হয়েছে বাড়ি পাহারার জন্যে।

খাড়াইযা আছেন ক্যান? আসেন। দেবি কইরা তো কিছু লাভ নাই।

তাহের যন্ত্রের মতো এগুলো। পাকুব গাছের কাছে চাদর গায়ে আর একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। এই গবমে। তার গায়ে চাদর কেন? লোকটা নৌকায় উঠে বসল। তাহের এগুলো যন্ত্রের মতো।

সবাই নৌকায় উঠল না। ছালাম এবং টর্চ হাতে ছেলেটা পাকুর গাছের নিচে দাঁড়িয়ে রইল। দুজন তাহেরের দুহাত ধরে নৌকায় প্রায় টেনে তুলল। চাদর গায়ের লোকটা ছাড়াও নৌকার একজন মাঝি আছে। মাঝি সঙ্গে সঙ্গে নৌকা ছেড়ে দিল। চাদর গায়ের লোকটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আইজ গরম বড় বেশি পড়ছে।

লোকটির গলার স্বরে বোঝা যাচ্ছে সে বৃদ্ধ। তাহেরেব বলার ইচ্ছা করছে— গরম বেশি কিন্তু আপনি চাদর গায়ে দিয়েছেন কেন? তাহের কিছুই বলল না। তাহেরের হাতে সিগারেট, প্যাকেট থেকে বের করে হাতে নিয়েছে। আগুন ধরাতে ভুলে গেছে। যদিও আগুন নেই। তবু তাহের অভ্যাস মতো সিগারেট মুখে দিচ্ছে এবং টানছে।

চাদর গায়ে বুড়ো লোকটি খুকধুক করে কেশে বলল, নৌকা মাঝগাংগে নিয়া চল। লোকটির মাথা থেকে চাদর সরে গেছে। তার মাথার সব চুল সাদা। থুতনির কাছে অল্প কিছু দাড়ি। দাড়ির রঙ কালো। তাহেরের মনে হলো তার বুকের উপর দিয়ে বরফ শীতল পানির একটা স্রোত বয়ে গেল। এরা তাকে খুন করার জন্যে এখানে নিয়ে এসেছে। গ্রামের সব খুনখারাপ হয় নদীর কাছে। নদী হত্যার চিহ্ন ধুয়ে মুছে ফেলে। জলধারার প্রবল স্রোত মৃতদেহ অনেক দূর নিয়ে যায়। জলজ প্রাণী অতি দ্রুত মৃতদেহ নষ্ট করে দেয়। চেনার উপায় থাকে না।

বুড়ো বলল, আপনের সিগারেট নিভা। সিগারেট ধরান। সিগারেট ধরাইয়া আরাম কইরা একটা টান দেন। আহ শালার গরম কী পড়ছে!

তাহেরের বা হাতটা একজন ধরেছিল। সে হাত ছাড়ল। তাহের পকেট থেকে দেয়াশলাই বের করল। তাকাল বুড়োর দিকে। মনে হচ্ছে এই বুড়েই হত্যাকারী। বুড়ো বন্দুক আনে নি। নিশ্চয়ই চাদরের নিচে ছোরা নিয়ে এসেছে। খোলা জায়গায় বন্দুকের আওয়াজ অনেক দূর পর্যন্ত যাবে। সেই তুলনায় ছোরা অনেক নিরাপদ।

বুড়ে বলল, ধরান সিগারেট ধরান।

তাহের সিগারেট ধরানোর চেষ্টা করছে। ধরাতে পারছে না। বাতাসের বেগ প্ৰবল। তাছাড়া তার হাত কাঁপছে। দেয়াশলাইয়ের চারটি কাঠি নষ্ট হবার পর, পঞ্চম কাঠিটি ধরল। তীব্র ঘামের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ঘামের গন্ধে তার বমি এসে যাচ্ছে।

তাহের দেখল। সবাই এক দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। কেউ মুহুর্তের জন্যেও দৃষ্টি ফিরিয়ে নিচ্ছে না। বুড়ো লোকটির মুখ হাসি হাসি। চাঁদের আলোয় হাসিমুখের এই বুড়োকে কী ভয়ঙ্করই না লাগছে।

লিলিয়ানের শোবার ঘর অন্ধকার। হারিকেন নিভে যাওয়ার পর সলতা থেকে বিশ্ৰী ধোঁয়া আসছে। লিলিয়ানের নাক জ্বালা করছে। ঘরে কি কার্বন মনোক্সাইড তৈরি হয়েছে? তার কি ঘর ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত? সিড়ির দরজায় ধাক্কার শব্দ হলো। ভারী গলায় কে বলল–দরজা খুলেন।

লিলিয়ান বলল, কে?

খবর আছে। দরজা খুলেন, Urgent খবর।

লিলিয়ান সিড়ির দরজার কাছে চলে এলো। দরজা খুলল না। তার মন বলছে–দরজার আড়ালে অপেক্ষা করছে ভয়ঙ্কর বিপদ।

খুলেন দরজা। খুলেন।

কে যেন প্ৰচণ্ড শব্দে ধাক্কা দিচ্ছে। লিলিয়ান বলল, Go away.

দরজায় হিংস্র পশুর থাবার মতো থাবা পড়ছে। একজন না, কয়েকজন। লিলিয়ানের মনে হলো–খুব কম করে হলেও তিনজন আছে। লিলিয়ান খিকখিক হাসব শব্দও শুনিল। তিনজনের কোনো-একজন আনন্দে হাসছে। এই আনন্দোবী উৎস কী?

ঐ সাদা চামড়া, দরজা না খুইল্যা কতক্ষণ থাকিবি? আপাসে দরজা খোল।

লিলিয়ান নড়ল না। দাঁড়িয়ে রইল। প্রাচীন ভারী দরজা চট করে ভাঙবে না। ভাঙতে সময় লাগবে। কতক্ষণ সময় লিলিয়ান জানে না। তাহের ফিরে আসা পর্যন্ত কি দরজা তাকে রক্ষা করবে? কিন্তু তাহের? ও কেমন আছে? তারও কি লিলিয়ানের মতোই বিপদ হয় নি? সে কি ফিরে আসতে পারবে? অনেক দিন পর লিলিয়ান তার মাকে ডাকল। ফিসফিস করে বলল, মা, আমি খুব বিপদে পড়েছি।

প্ৰচণ্ড শব্দ হচ্ছে দরজায়। এরা দরজা ভাঙার চেষ্টা করছে। লিলিয়ান কাঁপা গলায় বলল, ঈশ্বর আমাকে রক্ষা কর। দরজার সামনে থেকে তার সরে যাওয়া উচিত। লিলিয়ান সরতে পারছে না। তার পা সিসের মতো ভারী হয়ে আছে–দরজার বাইরের মানুষগুলি পশুর মতো গর্জন করছে।

ভাঙ দরজা। ভাইঙা ধর সাদা চামড়ারে।

দরজা ভেঙে পড়ার কয়েক মিনিট আগে লিলিয়ান সংবিত ফিরে পেল। প্রথম দৌড়ে ঢুকল শোবার ঘরে। সেখান থেকে ছুটে গেল আয়নাঘরে। কোথাও লুকিয়ে থাকতে হবে। আয়নাঘরে লুকানোর জায়গা কোথায়? কাবার্ড কাবার্ড খুলে ভেতরে বসে থাকবে।

লিলিয়ান কাবার্ড খুলে ভেতরে ঢুকল, আর তখনই তিনজনের একটা দল দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে পড়ল। এই দলের একজন নিতান্ত চ্যাংড়া। তার হাতে পাঁচ ব্যাটারির একটা টর্চ। তার বয়স পনের-ষোলর বেশি না। সে খিকখিক করে হাসতে হাসতে বলল–মেম মাগি গেছে কই?

একজন বলল, পালাইছে। হয় খাটের নিচে নয়। আলমিরার ভিতরে।

লিলিয়ান এদের কথা শুনতে পারছে, কিন্তু গ্ৰাম্য টানা টানা কথার অর্থ ধরতে পারছে না। লিলিয়ানের মনে হচ্ছে কাবার্ডে ঢুকে সে বড় ধরনের বোকামি করেছে। এরা প্রথমেই কাবার্ডগুলি খুঁজবে। এক এক করে খুঁজবে। তার উচিত কাবার্ড থেকে বের হয়ে আসা। খোলামেলা জায়গায় থাকা যাতে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করতে পারে। কোণঠাসা হয়ে ধরা পড়ার কোনো মানে হয় না।

ওরা হারিকেন জ্বালিয়েছে। হারিকেন নিয়ে আয়নাঘরেই বোধহয় আসছে। লিলিয়ান কাবার্ড ছেড়ে পালাবার জন্যে কাবার্ডের দরজায় হাত রাখল, আর ঠিক তখন কাবার্ডের ভেতর কী যেন একটা নড়ে উঠল। ঝুনঝুন শব্দ হলো। একজন কেউ কোমল ভঙ্গিতে হাত রাখল তার পিঠে। লিলিয়ান ছোট্ট একটা নিঃশ্বাসের শব্দও যেন শুনল।

কী হচ্ছে লিলিয়ানের? সে কি পাগল হয়ে গেছে? তার কি হেলুসিনেশন হচ্ছে? সে এখন কী করবে? চিৎকার করে উঠবে? তাতে লাভ কী? পিঠে যে হাত রেখেছে সে হাত সরিয়ে নিচ্ছে না। যেন তাকে বলার চেষ্টা করছে–ভয় নেই। কোনো ভয় নেই। আয়নাঘরে তুমি নিশ্চিন্ত মনে অপেক্ষা কব। এরা তোমাকে কিছুতেই খুঁজে পাবে না। লিলিয়ান মনে মনে বলল, আপনি যেই হোন, আমার স্বামীকে রক্ষা করার চেষ্টা করুন। ও বিপদে পড়েছে। ওব বিপদ আমার চেয়েও ভয়ঙ্কর বিপদ। আমি বুঝতে পারছি। আমি খুব পবিষ্কার বুঝতে পারছি।

তাহেরের সিগারেট অনেক ছোট হয়ে এসেছে। সিগারেটের শেষ অংশ এখনই নদীর জলে ফেলে দিতে হবে। এরা সম্ভবত সিগারেট শেষ করার জন্যে অপেক্ষা করছে। তাহের বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি কী চান?

বৃদ্ধ খিকখিক করে খানিকক্ষণ হাসল। সে একাই হাসছে। অন্য কেউ হাসছে না। বৃদ্ধ হাসি থামিয়ে বলল, বিলাত দেশটা কেমন এন্টু কন তো হুনি।

বিলেতের খবর আমি জানি না। আমি থাকি আমেরিকায়।

আমার কাছে আমরিকা বিলাত এক জিনিস।

বৃদ্ধ চাদরের নিচে হাত ঢুকালো। তাহের জ্বলন্ত সিগারেট হাতে লাফিয়ে পড়ল নদীতে। পানির টান প্রবল। তাহেরকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এরা কি তাহেরকে ছেড়ে দেবে? মনে হয় না। নৌকা নিয়ে এরা তাকে খুঁজবে। তন্নতন্ন করে খুঁজবে। তাহের ভাবার চেষ্টা করছে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কতটুকু। খুব বেশি নয়। সম্ভাবনা ক্ষীণ, কারণ তাহের সাঁতার জানে না।

লিলিয়ান আয়নাঘরের কাবার্ডে বসে আছে। কী গাঢ় অন্ধকার! এই অন্ধকার মাতৃগর্ভের অন্ধকার। কোনো মানুষের পক্ষে এই অন্ধকার সহ্য করা সম্ভব নয়।

হঠাৎ করে অন্ধকার কমে গেল। তিনজনের দলটা আয়নাঘরে ঢুকল। কাবার্ডে বসে থাকার অর্থ হয় না। লিলিয়ান ঠিক করল সে দরজা খুলে বের হবে। বলবে, কী চাও তোমরা?

লিলিয়ান দরজা খুলতে পারল না। যে লিলিয়ানের পিঠে হাত রেখেছিল। সে এবাব লিলিয়ানের হাত চেপে ধরল। নরম হাত। হাত ভর্তি চুড়ি। রিনারিন করে চুড়ি বেজে উঠল। এসব কি স্বপ্নে ঘটছে?

টর্চ হাতের ছেলেটি বলল, কুদ্দুস ভাই, আমার মনে হইতেছে মেম সাব এই ঘরে। ছেন্টের গন্ধ পাইতেছি। মেম সাব শইল্যে ছেন্ট দিছে। হি হি হি… ।

লিলিয়ান শক্ত হয়ে আছে। এই বোধহয় কাবার্ডের দরজা খুলল। ঠিক তখন রান্নাঘরে ঝন করে শব্দ হলো। টিনের একটা কিছু মেঝেতে গড়িয়ে যাচ্ছে। দলেব তিনজনই ছুটে গেল রান্নাঘরের দিকে। দৌড়ে যাবার জন্যে হারিকেনটা নিভে গেল।

যে লিলিয়ানের হাত ধরেছে সে-ই তাকে কাবার্ড থেকে বের করল। টেনে নিয়ে যাচ্ছে পাশের ঘরে। চারদিকে জমাটবাধা অন্ধকার। চাঁদের আলো কোথায়? আজ কি চাঁদ উঠে নি? কিছুই দেখা যাচ্ছে না। লিলিয়ান অন্ধের মতো অনুসরণ করছে। তার বোধ লুপ্ত। সে কী করছে নিজেও জানে না। তারা দুজন এখন দাঁড়িয়ে আছে একটা পর্দার আড়ালে। এটা কোন ঘর? লিলিয়ানের সব এলোমেলো হয়ে গেছে। যে তার হাত ধরে আছে সে কে? বা আসলেই কি কেউ তার হাত ধরে আছে?

তিনজনের দলটি এ ঘরে এসেছে। তারা এখন খানিকটা বিভ্রান্ত। একজন বলল, গেল কই? বসির ভাই, গোল কই?

এই ঘর দেখা হইছে?

একবার দেখলাম।

আবার দেখ। পর্দা টান দিয়া ফেলা।

একজন এসে পর্দা ধরল। আর তখন শোবার ঘর থেকে খিলখিল হাসির শব্দ শোনা গেল। কিশোরীর মিষ্টি রিনারিনে গলা। টর্চ হাতের ছেলেটা বলল–হাসে কেডা বসির ভাই, হাসে কেডা?

তিনজন এগুচ্ছে শোবার ঘরের দিকে। এবার আর আগের মতো ছুটে যাচ্ছে না। কিশোরীর হাসির শব্দ আরো বাড়ল। তারপর হঠাৎ করে থেমে গেল। লিলিয়ান মনে মনে বলল, যা ঘটছে সবই আমার কল্পনা। আমার উত্তেজিত মস্তিষ্ক আমাকে এসব দেখাচ্ছে, শোনাচ্ছে। আসলে কেউ আমার হাত ধরে নেই। কেউ আমাকে টেনে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে না। আমি নিজেই জায়গা বদল করছি, এবং কল্পনা কবছি। প্ৰচণ্ড ভয়ের কারণে আমার এ রকম হচ্ছে? ডা. ভারমান আমাকে তাই বলতেন।

তারপরেও লিলিয়ান ফিসফিস করে বলল, আপনি কে?

ছোট্ট নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা গেল। কোনো জবাব পাওয়া গেল না। লিলিয়ান বের হয়ে এলো পর্দার আড়াল থেকে। নিজের ইচ্ছায় নয়–যে তার হাত ধরে ছিল সেই তাকে টেনে বের করল। সে চরকির মতো ঘুরছে–এ-ঘর থেকে ঐ-ঘরে। যেন এক মজার খেলা। এক সময় লিলিয়ান লক্ষ করল সে লোহার প্যাচানো সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে। বাইরের অন্ধকাব্য গাঢ় নয়। অস্পষ্টভাবে সবকিছুই দেখা যাচ্ছে। এখন আর কেউ তার হাত ধরে নেই। এতক্ষণ যা ঘটেছিল সবই কল্পনা। মস্তিষ্ক তার নিজস্ব নিয়মে তৈরি করেছে বিভ্ৰম, এবং তাকে নিয়ে এসেছে। ঘরের বাইরে। অশরীরী বলে কিছু নেই, কিছু থাকতে পারে না।

লিলিয়ান খুব সাবধানে লোহার সিঁড়ি দিয়ে নামছে এতটুকু শব্দও যেন না হয়। তাকে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে হবে। অনেক দূর যেতে হবে, যেন কেউ তার নাগাল না পায়। সিঁড়ি এত দুলছে কেন? মনে হচ্ছে ভেঙে পড়ে যাবে। খুব হাওয়া। উড়িয়ে নিয়ে যাবার মতো হাওয়া। এই ব্যাপারগুলি তো স্বপ্নে ঘটেছিল। এখনো কি সে স্বপ্ন দেখছে? পুরোটাই কি স্বপ্ন? লিলিয়ানের শরীর অবসন্ন, অসম্ভব ক্লান্ত। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে। ইচ্ছা করছে সিঁড়ির রেলিং জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে। মনে হচ্ছে সে জেগে আছে হাজার বছর ধরে।

সে একতলায় নেমে এসেছে। তার সামনেই এ বাড়ির ভাঙা প্রাচীর। ফিসফিস কথা শোনা যাচ্ছে। নিচেও কি কেউ অপেক্ষ ধরছে তার জন্যে? না-কি ওরাই নেমে এসেছে নিচে? দোতলা থেকে টর্চের আলো ফেলল। সিঁড়িতে। আলো এদিক-ওদিক যাচ্ছে। খুঁজে বেড়াচ্ছে লিলিয়ানকে। আর একটু হলেই সে অ্যালো পড়ত লিলিয়ানের মুখে। লিলিয়ান ক্লান্ত গলায় ফিসফিস করে বলল, আমাকে সাহায্য করুন। আমাকে সাহায্য করুন, Please help me.

কার কাছে সে সাহায্য চেয়েছে? উত্তেজিত বিভ্রান্ত মস্তিষ্কের কাছে, না-কি যে অশবীবী নারী তার হাত ধরেছিল তার কাছে। লিলিয়ান জানে না। সে জানতে ও চায় ন। প্রয়োজন হলে সে চোখ বন্ধ করে থাকবে। অশরীরী নারীমূর্তি তার হাত ধরে টেনে নিয়ে যাক। লিলিয়ান আবারও বলল, আপনি কোথায়? আপনি আমাকে সাহায্য করুন।

আর ঠিক তখন সে নারীমূর্তিকে দেখতে পেল। ভাঙা দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্ৰকাণ্ড শিরীষ গাছের আড়ালে সে দাঁড়িয়ে। সে হাত ইশারায় লিলিয়ানকে ডাকল। লিলিয়ান মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগিয়ে গেল।

নারীমূর্তি সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আগে আগে যাচ্ছে। পেছনে পেছনে এগুচ্ছে লিলিয়ান। পাঁচিলের বাইরে এসেই নারীমূর্তি ছুটতে শুরু করল। সে লিলিয়ানকে কিছুই বলে নি। তবু লিলিয়ানের মনে হলো তাকে যেন এই অশরীরী মূর্তি বলছে–ভয় পেও না। তুমি আমার পেছনে পেছনে দৌড়াতে থাক।

আমরাগান ছাড়িয়ে, খোলা মাঠ, আবার খানিক ঝোপঝাড়, চাষা ক্ষেত। নারীমূর্তি দ্রুত ছুটছে। একবারও পেছন ফিরে তাকাচ্ছে না। লিলিয়ান কাতর গলায় বলল, পারছি না। আমি পারছি না–একটু থামুন, Please একটু থামুন। নারীমূর্তি থামছে না। ছুটছে, আরো দ্রুত ছুটছে।

তারা এক সময় চলে এলো নদীর তীরে। আর তখনই মেঘের আড়াল থেকে চাঁদ স্পষ্ট হলো। ঝলমল করে উঠল। নদী ও নদীর ওপাশের বনভূমি। নারীমূর্তি থমকে দাঁড়িয়েছে। হাত ইশারায় নদীর তীরে পড়ে থাকা কী একটা যেন দেখাচ্ছে। লিলিয়ান সেদিকে তাকাচ্ছে না। সে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে নারীমূর্তির দিকে।

কী সুন্দর। মায়াময় একটি মুখ। লম্বা বিনুনী করা চুল। শাড়ির আঁচল হাওয়ায় উড়ছে। লিলিয়ান বলল, আপনি কে? আপনি কি আমার কল্পনা না-কি সত্যি কিছু?

নারীমূর্তি হাসল। কী সুন্দর সে হাসি। লিলিয়ান হাসির শব্দও শুনল।

আপনি কি বলবেন না। আপনি কে?

ছায়ামূর্তি না-সূচক মাথা নাড়ল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকে ছুটতে শুরু করল। লিলিয়ান চেঁচিয়ে বলল, আপনি কোথায় যাচ্ছেন?

ছায়ামূর্তি ছুটতে ছুটতে কী যেন বলল, বাতাসের শব্দে তা শোনা গেল না।

লিলিয়ান এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। চোখ ফিরিয়ে নিতে পারছে না। চোখ ফিরিয়ে নিয়ে আশেপাশে তাকালেই দেখতে পেত নদীর তীরে চিৎ হয়ে যে মানুষটি শুয়ে আছে সে তাহের। এখনো তার দেহে প্ৰাণ আছে, সে বেঁচে যাবে, সে নিশ্চয়ই বেঁচে যাবে।

জ্যোৎস্না প্লাবিত জলরাশি, তার ধার ঘেসে ছুটে যাচ্ছে এক নারীমূর্তি। বাতাসে তার শাড়ির আঁচল উড়ছে। রিনারিন করে বাজছে হাতের চুড়ি।

০৮. পনের বছর পর

পনের বছর পর লিলিয়ান আবার তাহেরকে নিয়ে ইন্দারঘাটে এসেছে। তাদের সঙ্গে দুটি ফুটফুটে মেয়ে। এগার বছরের সারা, সাত বছরের রিয়া। দুজনই হয়েছে মার মতো, শুধু চোখ পেয়েছে বাবার। বড় বড় কালো চোখ। মার নীল চোখ কেউই পায় নি। দুজনই খুব হাসিখুশি মেয়ে, কিন্তু এদের চোখের দিকে তাকালে মনে হয়–চোখ ভর্তি জল। এক্ষুণি বুঝি কাঁদবে।

তাদের আসা উপলক্ষে বাড়িঘর ঠিক করা হয়েছে। বাড়ির চারপাশের বাগান পরিষ্কার করা হয়েছে। মেয়ে দুটি মহানন্দে বাগানে ছোটাছুটি করছে। রিয়া ছুটতে গিয়ে উল্টে পড়ে হাঁটুতে ব্যথা পেয়েছে। হাঁটুর চামড়া ছিলে গেছে। কিন্তু রিয়া হাঁটু চেপে ধরে হাসছে। যেন এই বাগানবাড়িতে ব্যথা পাওয়াও এক আনন্দজনক অভিজ্ঞতা।

তাহের নিজেও বাগানে। সে খুব ব্যস্ত। আমগাছের ডালে দোলনা টানানোর চেষ্টা করছে। ডাল উঁচু। চেয়ারে দাঁড়িয়ে নাগাল পাওয়া যাচ্ছে না। বড় মেয়ে সারা বাবাকে সাহায্য করবার জন্য এগিয়ে এলো। সে গম্ভীর গলায় বলল, বাবা শোন, তুমি যদি দুদিন পর বলো, বেড়ানো শেষ হয়েছে এখন আমেরিকা ফিরে যাব। তাহলে কিন্তু হবে না। আমরা খুব রাগ করব।

তাহলে আমাকে কী করতে হবে?

এখানে থাকতে হবে।

কতদিন?

For eternity.

তাহের হো-হো শব্দে হাসছে। হাসির শব্দে লিলিয়ান এসে দোতলার বারান্দায় দাঁড়াল। তাহের উঁচু গলায় বলল, এই যে বিদেশিনী! দয়া করে মগভর্তি কাঁপাচিনো কফি বানিয়ে নিচে এসে আমাকে সাহায্য কর।

এখন কফি বানানো যাবে না। সরঞ্জাম নেই।

কোনো অজুহাত শুনতে চাই না। কফি বানাতে হবে।

ছোট মেয়ে রিয়া চেঁচিয়ে বলল, বাবার জন্যে কফি বানাতেই হবে।

লিলিয়ান রান্নাঘরের দিকে গেল না। সে ঢুকল আয়নাঘরে। দরজা বন্ধ করে দিল। অন্ধকার হয়ে গেল আয়নাঘন। সে গলার স্বর নামিয়ে প্রায় ফিসফিস কবে বলল, আপনাকে দেখানোর জন্যে আমি আমার বাচ্চা দুটিকে নিয়ে এসেছি। আপনি কি দেখেছেন তাদের?

কেউ জবাব দিল না।

লিলিয়ান বলল, আপনি কি তাদের একটু আদর করে দেবেন না?

নীববতা ভঙ্গ হলো না। আয়নাঘরের স্তব্ধতা ভাঙল না। লিলিয়ানের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। পনের বছর আগে এক ভয়ঙ্কর জটিল সময়ে কেউ একজন তার হাত ধরে বলার চেষ্টা করেছিল–কোনো ভয় নেই। সেই দুঃসময় আজ আর তার নেই। জীবন তার মঙ্গলময় বিশাল বাহু মেলে লিলিয়ানকে জড়িয়ে ধরেছে। আজ আর আশ্বাসের বাণী শোনার তার প্রয়োজন নেই।

লিলিয়ান আবার বারান্দায় এসে দাঁড়াল। নিচে খুব মজা হচ্ছে। দোলনা তৈরি হয়ে গেছে। তাহের দোল খাচ্ছে। মেয়েরা বাবাকে নামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে, পারছে না। লিলিয়ান আপন মনে বলল, আমি কেউ না, অতি তুচ্ছ একজন, তবু ঈশ্বর কেন এত সুখ আমার জন্যে রেখেছেন?

খুট করে শব্দ হলো। আয়নাঘরের দরজা খুলে গেল। লিলিয়ানেব মনে হলো, নুপুর পায়ে কে যেন আসছে তার দিকে। এই তো লিলিয়ান তার পা ফেলার ছোট ছোট শব্দ শুনতে পাচ্ছে। লিলিয়ান বাগানেব দিকে ইশাবা কবে স্পষ্ট স্বরে বলল— ঐ দেখুন, ও হচ্ছে সারা। আমার বড় মেয়ে। আর নীল জামা পরা মেয়েটা রিয়া। দুজনই খুব দুষ্ট।

তাহের দোল খাওয়া বন্ধ করে উঁচু গলায় বলল, মেয়েরা! তোমাদের মাকে দেখ। অকারণে কাঁদছে। ব্যাপারটা কী বলো তো, এই মহিলার অকারণে কাদার রোগ আছে। আগেও কয়েকবার লক্ষ করেছি।

রিয়া বড়দের মতো গম্ভীর গলায় বলল, আমার মনে হয় মার চোখে কোনো প্রবলেম আছে।

লিলিয়ান খুব কাঁদছে। অসম্ভব সুন্দর এই দিনে কেউ কাঁদে না। লিলিয়ান কাঁদছে, কাঁদতে তার বড় ভালো লাগছে।

(সমাপ্ত)

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments