Monday, April 15, 2024
Homeবাণী-কথাআবাদ - অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

আবাদ – অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

সাহিত্যের সেরা গল্প – অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

খরা বড় খরা চলছে হে! মানুষটা বিড়বিড় করে বকছিল।

খরায় মাঠঘাঠ সব শেষ। সুমার মাঠে কোথাও একদানা শস্য ফলে নি। জমির পর জমি তামাটে রঙ ধরে আছে। শুধু খড় আর খড়। একটা ফড়িং পর্যন্ত উড়ছে না। পোকামাকড় সব অদৃশ্য। মাঠ উরাট থাকলে যা হয়—আগাছায় ভর্তি হয়ে আছে—দুটো একটা সাদা ফুল, কোথাও ইতস্তত সাদা বক উড়ে বেড়াচ্ছে।

বুড়ো মানুষটা গাছের গোড়া খুঁটে কী দেখল। মুখ ব্যাজার। শুধু যে ধুলোবালি ওড়ে!–হা কপাল তোমার রস নাই হে। গর্ভে তোমার রস নাই।

আকাশ আদিগন্ত সেই মতো বিস্তৃত। গাছপালা সেই মতো দাঁড়িয়ে। পাকা সড়কে সেই মতো বাস যায়। শুধু মানুষজন সুস্থির নেই। বুড়ো মানুষটা নিজের জমির মধ্যে দাঁড়িয়ে। তার গরুবাছুর গেল। আবাদ গেল। বালির-ঘাটের পাইকার বেচু মণ্ডল কিনে নিল সব। এখন তার জমির খড়ে নজর। শুয়োরটা বলে কি না, গাছ তো সব ন্যাড়া হয়ে গেল ঠাউরদা।

মুখে তার কঠিন হাসি খেলে গেল।—কিছু বুঝি না মনে করে। অরে, কুঞ্জ ঠাকুর সব বোঝে। তোর মতিগতি সব বোঝে। কেবল মরে পড়ে আছে তাই।

না শুকায় নি। ন্যাড়া হয় নি। দেখ না জল হল বলে। জল হলেই ঝাড় খেলবে। আবাদ হবে; ঠিক হবে। তুই চোখ দিস না। তোর চোখ ভাল না। নজর বড় খারাপ। সব ভাগাড় হয়ে যায়।

এ-সব যেন সেই কবেকার কথা!

তরাসে বুক কাঁপে কুঞ্জ ঠাকুরের।—ও পালান লাফাস না। ফড়িং যে কটা আছে থাক। পিছু নিস না ভাই। আবার জল হলে ওরা ওড়াউড়ি করবে।

যেন এইসব কীটপতঙ্গ বেঁচে থাকলে, ডাকাডাকি করলে সামনের বছরটা এমন অজন্মা যাবে না। এরা জমির লক্ষ্মী। প্রকৃতির জীব, তারে হেলাফেলা করতে নেই। বেচুর কামড়ের জ্বালায় মরছে, তার উপর নতুন উপদ্রব দেখা দিলে সব যাবে। চামারের মতো ফাঁক পেলেই বেচু লাল সড়ক থেকে নেমে আসে। হাতে শানানো গোপন অস্ত্র। ফাঁক পেলেই তার ছালচামড়া খুলে নেবে।

অ ঠাউরদা আছেন নি! আমি বেচু—

আমি থাকব না কেনরে! আমি বেচু! তা কি চাস! ঘুরঘুর কেন!

একখান কথা আমার।

কী কথা!

পাঁচ কেজি গম। ভেবে দেখেন, পাঁচ কেজি। মাঠ খড় হয়ে আছে। আর মায়া বাড়িয়ে কি হবে ঠাউরদা। পাঁচ কেজি গম কম কথা না। পরে গরুতেও খাবে না। সব ন্যাড়া হয়ে যাবে।

আমার আবাদ আমি বুঝি না! এই করে কুঞ্জ ঠাকুর ঠেকিয়ে রেখেছিল বেচুকে। কিন্তু কালান্তক যমের মতো দাঁড়িয়ে বেচু। যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই বেচু। হা হা করে হাসে। তিড়িং তিড়িং করে নাচে। কী মজা! অকাল আসছে, কী মজা! জমিতে এখন খড় তারপর ন্যাড়া। গরুতেও মুখ দেবে না। পাঁচ কেজি গমও যাবে। খড়ও যাবে।

কুঞ্জ ঠাকুর ভয় পেলেই ডাকে—ও পালান, দূরে যাস না। রোষে পড়ে যাবি।

—আমি যাইনি দাদু।

—তুই কোথায়?

—এই ত। পালান জমির মাঝখানে ভোঁস করে ভেসে ওঠে।

তা ঠাউরদা আপনে বুড়া মানুষ কী বলব—ঠকাতে পারি না। বামুন মানুষরে ঠকাতে নাই ঠাউরদা। রাজি হয়ে যান। তবে গরুবাছুর জলের দরে দিছেন যখন আর পাঁচ কেজি। বলেই হাঁকার, ও পালানের মা আমি উঠছি। তোমার শ্বউর রাজি না। পালান দ্যাখ তোর মা কোথায়—ডাক।

পালানের মা তো এক পায়ে খাড়া। না ডাকতেই গলা হাওয়ায় ভেসে আসে, অ বেচুদাদা ডাকছ!

হ্যাঁ দেখ না, ঠাউরদা মাথা পাতছে না।

না পাতবে, মরবে। হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেললে মরণ হয় বুড়ো বোঝে না।

বাড়ির আমগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে বেচু এমন কত কথা বলে গেছে। কুঞ্জ ঠাকুর রাজি হয় নি। গোড়ায় তখনও রস ছিল। আশা কুহকিনী। জল একটা পেলেই আবার ঝাড় ছাড়বে। সারা দিনমান চোখ আকাশে। কোথাও গুড়গুড় শব্দ হলে বের হয়ে দেখা, মেঘ উঠছে। হবে হবে। তারপর ছিটে-ফোঁটা হয়ে কোথায় যে মেঘেরা সব উড়ে যায়। চোখ জ্বলে। জল হয় না। গোড়া ভেজে না। আর পালানের মার শাসানি—দশ কেজি গম কম কিসে। কে দেয়! ঘরে গরুবাছুরও নেই যে খাওয়াবে। আকাল আসছে–বোঝ না বুড়ো।

হারামজাদি তোর বাপের জমি, তোর স্বোয়ামীর জমি—জমি আমার। আমি বুঝব। আবাদ ঠিক হবে। জল হবে। এই হবে হবে করে বেচুকে সে ঘোরাচ্ছিল। ঘোরাবার ইচ্ছে ছিল না। সাফ বলে দিতে পারত, হবে না। কিন্তু দিনকাল খারাপ। আকাল আসছে। মানুষ খেতে পাবে না, না খেয়ে মরে যাবে—না হলে বেচুর ইতরামির জবাব সে দিতে পারত। ঘোরাঘুরির ফাঁকে বেচুর আসল টান যে কিসে যেদিন ধরতে পারল—কথা না দিয়ে পারল না। ছল-ছুতো করে আসা—দশ কেজি গমে রাজি হয়ে গেলে ছলছুতো খুঁজে পাবে না। কী জানি, নালে যদি সব যায়। যদি সত্যি বেচু তার বাড়িটাকে ভাগাড় বানিয়ে ফেলে! চামার মানুষ পারে না, হেন কাজ নেই। ধর্ম নাই। কেবল লাল সড়ক থেকে নেমে আসা, ডাকা—অ ঠাউরদা কিছু ঠিক করলেন! দশ কেজি গম কম কথা না। পালান কইরে, তর মারে ডাক। এক গেলাস ঠাণ্ডা জল দিতে ক’ তর মারে। সেই কখন বের হয়েছি।

কালান্তক যমের মতো বেচু নেচেই যাচ্ছে। চারপাশে বেচু। হাত তুলে পা তুলে লাফাচ্ছে। পরনে লুঙ্গি, হাফ শার্ট গায়ে, হাতে লাঠি। পায়ে বুট জুতো। গায়ে শ্বেতী রোগ আছে বলে কালো সাদা ভূতের মতো, যেন দাঁত বের করে নাচছে আর পাচনের খেলা দেখাচ্ছে। পাঁচ আঙুলে পাঁচখান আংটি—সোনা রুপো তামা লোহা মিলে সব ক’খান রোদের ঝিলিকে ঝলসে উঠছে। বেচু লুঙ্গি তুলে—

অ বেচু লুঙ্গিটা শালো নামিয়ে বোস। পালানের মা জল দিতে আসছে।

—পালানরে পালান।

—ডাকছ কেন!

—ওখানে কী করছিস।

এই দ্যাখ, বলে কুঞ্জ ঠাকুরের নাতি পালান একটা মরা ব্যাং তুলে দেখাল।

—ছিঃ ছিঃ পালান। ফেলে দে।

আবার পালান একটা মরা গঙ্গাফড়িং তুলে দেখাল।

কুঞ্জ ঠাকুর ভেবে পায় না, পালান কেন সব মরা কীটপতঙ্গ খুঁজে বেড়াচ্ছে। পালানও কি বোঝে আকাল আসছে!

কোন পাপে কারে খায় কে জানে! গালে কতকালের যেন বাসি দাড়ি, বগলে ছেঁড়া ছাতা আর একখান লাঠি সম্বল করে সে আর দু-খণ্ড ভুঁইয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। শেষ দেখা । আবাদের শেষ দেখা। সত্যি উরাট হয়ে গেছে জমি। শীত আসছে। বড় ঠাণ্ডা। কনকনে ঠাণ্ডায় হাত পা কেমন স্থবির হয়ে যাবে তার। চামারটা আবার কী অজুহাতে আসবে কে জানে!

গন্ধ শুঁকে টের পায় বেচু।

তা বেচু জল ভালই হল। বীজধান চাই। এসব ভাল সময়কার কথা। বাছুরটা বাগি দিলে ফিরে আসত। কিন্তু হাত ফাঁকা। আবাদে কত লাগে বল!

তা ঠাউরদা আবাদ ঠিকঠাক হলে এক গণ্ডা বাছুর কিনে নিতে পাবেন। এই বেচুই আপনেরে দিয়ে যাবে। তবে একখান কথা ঠাউরদা—লালন পালন বলে কথা। কষ্ট হয় বুঝি! বাছুরটা আর পালানটাই আপনের সম্বল। কী করবেন, আবাদ বলে কথা। মা লক্ষ্মীরে আর উপোস রাখা চলে না।

তুমি বড় বুঝদার মানুষ হে! তা কপালখানা যার এ-রকমের তার ভাগাড় তুমি টের পাবে না ত কে পাবে! আর বিশটা টাকা ধরে দাও বেচু!

ও পালান, তর মারে ডাক দিহি। ঠাউরদা বিশ টাকা বেশি চায়। কোথা থেকে দি। আমার ত বেচাকেনা করার কথা। আর কবি য্যান এক গেলাস ঠাণ্ডা জল দেয়।

থাক থাক বেচু। ঠাণ্ডা জলের আর দরকার নাই। তোমার কথাখানাই থাকল। পালান যা ত ভাই বেচুর জন্য ঠাণ্ডা জল আন এক গেলাস।

দাঁত বের করে কী হাসছে দেখ বেচু!

—ও দাদু কার সঙ্গে কথা বলছিস?

—না ত, কথা বলছি না ত!

—কে দাঁত বের করে হাসছে।

—কই, কেউ না তো।

কুঞ্জঠাকুর হাঁটছে। গাছগুলি নুয়ে নুয়ে দেখছে। আর তাকাবে না কোনোদিকে। তাকালেই বেচু! পালানটা পর্যন্ত ধরে ফেলেছে, বেচুর সঙ্গে সে অহরহ কথা কয়। মাড়ির একটা দাঁত বেচুর আলগা। কে করেছিল সে জানে না। কথা বললে গাল তার নড়ানড়ি করে। দাঁতটা ঝুলে পড়েছে। আর একটা দাঁত ঝুলে পড়লেই—হা হা আমি বেচু, আকাল আসছে, কী মজা!

বেচু তোমার দাঁত কে আলগা করে দিল।

পালানের মা ঠাণ্ডা জল।

দাঁত তোমার থাক। টাকাটা।

লপ্তে লপ্তে দিয়ে যাবে।

একসঙ্গে হবে না!

দিলেই ত পেটে। সব খেয়ে ফেলবেন। পালানের মা তোমার শ্বউর সব টাকা এক লগে চায়।

না না—সব না। বেঁচু দাদা ওটার কী হল।

হবে। তবে আগাম চায়।

আগাম! আগাম কিসের বেচু?

কুঞ্জঠাকুরের চোখ উপরে উঠে গেছিল বেচু আর পালানের মার কথা শুনে।

তা বেচু লপ্তে লপ্তেই দিও। বামুন মানুষকে ঠকিও না। পালানের বাপটা বেঁচে থাকলে…। বাকিটুকু বলতে সাহস পায়নি। আসলে বলতে চেয়েছিল কুঞ্জঠাকুর—দাঁত তোমার ভেঙে দিত।

আপনে ঠাউরদা ভাইবেন না। বেচুর কথার দাম আছে! কোন শুয়োরের বাচ্চা আছে বলবে বেচু কথা ঠিক রাখে না। কোন শর্মা আছে লাল সড়কে, বলবে বেচু বেইমান। ঠগবাজ। বাপ জন খাটত। বিবেক ছিল না মানুষটার। বুদ্ধি কম। পুত্র তার পাইকার মানুষ। দারোগাবাবু দেখলে পর্যন্ত হাসে।

দারোগাবাবুর হাসার পর আর কথা নাই। কুঞ্জঠাকুর গোয়ালে ঢুকে বাছুরটা বের করে আনছে। গরুটা আগেই নিয়ে গেছে বেচু। বাছুরটা ঘাড় শক্ত করে রেখেছে। গোয়াল থেকে টেনে বের করা যাচ্ছে না। বেচু লুঙ্গি কোমরে খিচে ছুটে গেল এবং হ্যাঁচকা টান মারতেই হড়হড় করে বাছুরটা বের হয়ে এল। পালান তখন খেপে গিয়ে বেচুকে ঢিল ছুঁড়ে দিয়েছিল। ঘাড় তেড়া করে বলেছিল, শালা!

কী কু-কথা মুখে! কত মানি মানুষ বেচুদা। পালানের মা ছুটে এসেছিল। পালান মাকে দেখেই ছুট। তারে আর পায় কে! ঝোপ জঙ্গলে অদৃশ্য হয়ে গেছিল সে।

—দাদু!

—হুঁ!

হুঁশ ফেরে মানুষটার। সে তার উরাট জমিতে বসে পড়ে। হাঁটুতে বল পায় না। আকাল আসছে শুনেই শরীরটা কেমন তার দুবলা হয়ে গেল। চোখের সামনে বল ভরসা এই ভুঁইটুকু। বছরকার খোরাকি টানাটানি করে হয়ে যায়। খরা দেখা দিতেই সে কেমন একটা তরাসের মধ্যে পড়ে গেল। ভাবনা তার, নাতিটার কী হবে।

সে বসে থাকে। আর উঠতে ইচ্ছে হয় না। গাছগুলি থেকে মরা মরা গন্ধ উঠছে। সে নাক টানলে গন্ধটা পায়। গাছের গুঁড়ি শুঁকে বুঝল, সব শেষ। হাত দিয়ে গাছের গোড়ায় শেষবারের মতো কী খোঁজে। না নেই। ধুলোবালি ওড়ে শুধু তারপর কেমন আবাল মানুষের মতো হাউহাউ করে তার কান্না পায়।—হ্যাঁ আমার সোনার ধানরে!

পালান লাফিয়ে বেড়াচ্ছে জমিতে। পরনে ইজের। খালি গা। রোদ ঝলকাচ্ছে। উত্তুরে হাওয়া পালানকে কাবু করতে পারে না। জমিতে এলেই সে বোঝে, এটা তার দাদুর জমি। বাবা তাকে কাঁধে করে নিয়ে আসত। নিড়ান দেবার সময় সে আগাছা তুলে নিয়ে জমা করত আলে। মাথায় করে নিয়ে আসত এক থালা ভাত। বাপ দাদু নাতি খেত উবু হয়ে। সেই বাবাটার যে কী হল! আর সে বাবাকে দেখে না। কবেকার কথা যেন। বাবা জমি নিয়ে কত কথা বলত। জমি মানুষের বল ভরসা, বলত। বাপ না থাকায় দাদুর যে কী হল, কোথাও গেলেই কেবল ডাকে—হা পালান দূরে যাস না। রোষে পড়ে যাবি। সেই দাদুটা জমিতে বসে হাউহাউ করে কাঁদছে! সে ছুটে গেল দাদুর কাছে। দেখল, দাদু উবু হয়ে জমিতে পড়ে আছে। গাছের গুঁড়ি মুঠো করে ধরা।

সে ডাকল, দাদু, ও দাদু। ওঠ। ওঠ না দাদু!

পালানের ডাকে কুঞ্জঠাকুর স্থির থাকতে পারে না। উঠে বসে। তাকায়।

—পালান। আমাকে ডাকছিস! ভয় পেয়ে গেছিলি নারে!

পালান বড় বড় চোখে দাদুকে শুধু দেখে।

—পাশে বস। পালান দাদুকে জড়িয়ে ধরে পাশে বসল। বলল, তুই কাঁদছিস! আমি বুঝি!

কী বুঝিস?

বাবা নেই বলে তুই কাঁদছিস!

ধুস, তুই আছিস না! একটা বছর বেঁচে থাকতে পারবি না! একটা বছর! তারপর আবার বিড়বিড় করে বকতে থাকে—বেচু তুই আমার বাড়িটায় ঘুঘু চরাতে চাস। ভাগাড় বানাতে চাস। বুঝি। পালানের মাকে বার করে নেবার তালে আছ। সব খালি করে দেবে! আমার পালান আছে না! গাছেরও গাছ থাকে। বীজেরও বীজ! গাছ বড় হয়, বাড়ে। ফুল ফোটে—ফল ধরে।

—কী বলছিস দাদু—বুঝি না।

—তোর মা কখন ফিরবে বলে গেছে রে?

—তোকে বলেনি কিছু?

—না। আমাকে বলবে কেন! আমি ত একটা মরা গাছ।

—ফিরতে রাত হবে।

—রাত করে ফেরাটা ভাল?

পালান বলল, দাদু ওঠ। বাড়ি যাব। খিদা পেয়েছে।

তারপরই মনে হয় বুড়ো মানুষটার; তার মাথা খারাব হয়ে যাবে নাত! পালান এ-সবের কী বোঝে! রাত করে ফিরলে কী হয় সে জানবে কী করে। রেলগাড়ি চড়ে যায় আসে। লেট থাকে গাড়ি—রাত হতেই পারে। বেচু পালানের মাকেও বেচাকেনাতে লাগিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তরাসে পড়ে গেলে যা হয়, সে ভাবে, আসলে কলকাঠি নাড়ে বেচু। আবাদের নাম করে গরুবাছুর গেল, জমির খড় গেল। পালানের মাটা না আবার হাতছাড়া হয়ে যায়! মুখরা মেয়ের সঙ্গে সে পেরে ওঠে না। বললেই, এক কথা—খাবে কী! ইজ্জত ধুয়ে খাবে! সবাই লেগে পড়েছে। কিন্তু বউ তোর শরীর বড় না তোর পালান বড়—আমি যে কিছু বুঝি না!

—ও দাদু বলছি না খিদে পেয়েছে। খাব। চল বাড়ি যাই।

—বাড়ি যাবি। খাবি! তোর মা আর কী বলেছে রে!

—কী বলবে?

—এই না মানে বেচুটা, বেচুটা কোথায় এখন কে জানে—পালানরে….।

পালান কিছুই বোঝে না। দাদুটা তাকে কেন যে কেবল ভয়ের মধ্যে ফেলে দেয়। আর ভয় পেলেই তার এক কথা—আমার মা আছে জান!

—ঐ এক কথা তোর ব্যাটা! গাছের সঙ্গে কথা পাখির সঙ্গে কথা—আমার মা আছে জান! জানব কিরে ব্যাটা। মা আমারও ছিল।

—তোমার মা আছে?

—আছে না! মানুষের মা না থাকলে চলে?

—কই কোথায়? দেখাও।

বুড়ো মানুষটা থাবড়া মারল ভুঁইয়ে।—আমার জননী। তারপরই কেমন পাগলের মতো পালানকে দু-হাত বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে বলল, ব্যাটা আসলে তুই ভয় পেলেই কথাটা বলিস। আমার মা আছে। কেন আমি আছি না। গাছেরও গাছ থাকে–আমি আছি না।

কী যে বকবক করতে পারে দাদু।—এই ওঠ যাব। খিদা লেগেছে। সে হাত ধরে দাদুকে টানতে থাকে।

সে হা হা করে হাসল।—জননীর কোল। বড় শক্তরে তোলা। টান দেখি। মুরদ কত দেখি। পারলি না। বলেই কুঞ্জঠাকুর মরা ধান গাছের ভেতর পা দু-খানি ছড়িয়ে দিল।

পালানের চোখ গেল তখন জমির দিকে। একটা বাছুর নেমে আসছে। জমিতে মুখ দেবে। গাছগুলো মুড়িয়ে খেতে কতক্ষণ। সে জানে বাছুরটা তাদের শত্রুপক্ষ। আবাদ লেগে যেতেই দাদু তাকে জমিটায় পাহারা বসিয়ে দিয়েছিল। সব সময় সতর্ক নজর, গরু ছাগলে সব না খায়। দাদুর কী তরাসও পালান যা, দেখগে জমিতে গরু বাছুর পড়ল কি না। গাছ বড় হচ্ছে, সবার লোভ। মানুষের লোভ। গরু-বাছুরের লোভ। পাখ-পাখালির লোভ। দাদুর হাঁক পেলেই সে ছুটত। হাতে মরা ডাল, সামনে যা কিছু পেত, হাতে নিয়ে ছুটত।

দূর থেকেই ঢিল ছুঁড়তে থাকল পালান। এগিয়ে যাচ্ছে, আর ঢিল ছুঁড়ছে। ভ্রূক্ষেপ নেই। ইজের খুলে গেল ছুটতে গিয়ে। ইজেরটা বগলে নিয়ে আবার ছুটল। বাছুরটার কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। যেন কিছু বোঝে না মতো পালানকে একবার মুখ তুলে দেখল। পালান বুঝল, ব্যাটা বড় ধুরন্ধর। ল্যাজ মুচড়ে না দিলে নড়বে না। পালাবে না। সে প্রথমে হাতে থাবড়া মারল বাছুরটার পিঠে। নড়ছে না। কী বেহায়া রে বাবা, বলছি না, যা। আমাদের জমি। আমাদের ধানগাছ। যা। যাবি না। বলেই সে লেজে মোচড় লাগাল। মোচড় খেয়ে বাছুরটা লেজ তুলে পালাল ঠিক, কিন্তু পালান লাথি খেয়ে পড়ে গেল। লাগে নি। সে উঠে দাঁড়াল। ইজেরটা দিয়ে মুখ মুছে তাকাল জমিটার দিকে। দাদুকে দেখতে পেল না। সে যে কত কাজের দাদুটা দেখল না। সে যে কত সাহসী দাদুটা বুঝল না।—আমি ভয় পাই! দাদুটা না কী! আমি ভয় পাব কেন, আমার মা আছে না। ভয় তোর! তোর মা নেই। গাছের মা নেই। পাখি প্রজাপতির মা নেই। তা সে বলে! একা থাকলে বলে। মা নেই বাড়ি, দাদু গেছে হাটে তখন তার তো গাছ পাখি প্রজাপতি একমাত্র সঙ্গী। এরা তার সঙ্গে কথা বলে। সেও বলে। গাছ একা দাঁড়িয়ে থাকে। তাকে কেউ খাওয়ায় না। পাখি উড়ে বেড়ায়, কেউ তারে খেতে দেয় না। ফড়িং প্রজাপতি উড়ে বেড়ায়—কেউ তারে সঙ্গ দেয় না। তার কষ্ট হয়। সে বলে তোমাদের কেউ নেই না।

গাছের পাতায় সরসর শব্দ হয়। পালান কান পেতে শোনে। গাছে উঠে ডালে বসে থাকলে হাওয়ায় কারা যেন বলাবলি করে।–পালানটা আমাদের ডাল ভেঙে দেয়। পাতা ছিঁড়ে নেয়। ওকে আসকারা দিও না। বড় খারাপ পালান। ওর কান মুচড়ে দাও।—হুঁ কান মুচড়ে দেবে না! জান না, আমার মা আছে। তোমাদের মা আছে! মাকে বলে দেব। কিংবা তার এটাও হয়, কতদিন দেখে একটা গাছ সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। বড় একা!—তোমার মা নেই! এমন প্রশ্ন করে সে। নিজেই আবার কি ভেবে বলে, আমার মা আছে। মা বেথুয়াডহরি গেছে। বেলাবেলিতে ফিরে আসবে। আমার জন্য পানিফল আনে—জান!

বুড়ো মানুষটা দেখতে পায়, তার নাতির চারপাশে সব মরা ধানগাছ হাওয়ায় দুলছে। যেন তারা বেঁচে আছে মতো নাতিটাকে ছলনা করতে চায়। ওরে পালান, এরা আর গাছ না। খড়। পালান বড় বড় চোখে গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে কি যেন খুঁজছে। খড়ের ভিতর উবু হয়ে আছে বলে পালান তাকে দেখতে পাচ্ছে না। পালান বোঝে না, তার পাহারার কাজ শেষ হয়ে গেছে। জমি উরাট হয়ে আছে। হাঁরে পালান সব জ্বলে পুড়ে গেল। সে থুথু ছিটায়। মুখে পোকামাকড় ঢুকে গেলে যেমনটা হয়ে থাকে। সে হাতের পিঠ দিয়ে ঠোঁট থেকে লালা মোছে। থুথুর সঙ্গে ওক উঠে আসে। —ছেনালির ছলনার অন্ত নাই গ! কাকে বলে বোঝা যায় না। বেচু না প্রকৃতিকে বোঝা যায় না। উরাট জমি না পুত্র-বধূকে বোঝা যায় না।—তোর খেতায় আগুন। আমার আবাল নাতিটা কিছু বোঝে না। থু থু। তারপরই ফের থাবড়া মারে ভুঁইয়ে—এই আমার জননী তুই। পেটে থাবড়া মারে।—গর্ভের রস লুকিয়ে রাখতে পারলি না! তুই না জননী! তারপর সে গাছের ফাঁকে মাথা তুলে দেয়। চারপাশটা দেখে। উরাট জমিতে দূরে দূরে ঘোরাফেরা করে মানুষজন। হা-হুতাশ সম্বল সবার। কেউ কারো সঙ্গে কথা বলে না। কনকনে উত্তরে হাওয়া শুধু ক’দিন থেকে প্রবল বেগে বয়ে যাচ্ছে। আকাশ ঘোলা-ঘোলা। ঘূর্ণিঝড় ওঠে। খড়কুটো ভেসে যায়। বৃষ্টি আসে না।

তা বেচু তুমি নিতে পার। গরু বাছুর নিয়েছে, এও নিয়ে যাও। তোমার হক। দশ কেজি গম, তাই দিও। পালানের মা যখন রাজি আমিও রাজি। সেই রাত থাকতে বের হয়ে গেছে গাড়ি ধরতে। বেলাবেলিতে ফিরে আসার কথা। কোনদিন আসে, কোনদিন আসে না। বড় তরাস লাগে। একা না হয়ে যাই বেচু! দূরে বসে সুতো নাড়ানাড়ি চলছে তোমার!

বেচু, তোর ত মাগ ছেলে আছে বাছা। রেগে গেলে তুই তুকারি করার স্বভাব। নাকি মাথাটাই গণ্ডগোল। বয়স হয়ে গেলে স্মৃতিভ্রংশ হয়। এ বয়েসে সে এতটা বুড়ো হয়ে গেল কেন! সংশয়, অভাব, অন্নচিন্তা, না গাছেরও গাছ থাকে, বীজেরও বীজ—আসলে পালানের কথা ভেবে মাথা খারাব হয়ে যাচ্ছে। সে এটা বোঝে। চোখ ড্যাপড্যাপ করে নাতিটার। বড় বড় চোখে নিশিদিন পৃথিবীটাকে দেখছে। সে আকাল বোঝে না। উরাট বোঝে না। খাওয়া ছাড়া আর কিছু প্রত্যাশা করার আছে সে জানে না। সঙ্গে সঙ্গে বুড়ো মানুষটার কেন জানি মনে হয় গরু বাছুরের জীবনের মতো এক জীবন পালানের। পালানকেও না বেচু এক হাটে কিনে অন্য হাটে বিক্রি করতে যায়! বেচু না পারে হেন কাজ নেই। তা বেচু তুমি কেন চোখ দাও বাছা। অভাবের কথা বল, কোন সংসারে না আছে। কোন সংসার না জ্বলছে! পালানের মার সঙ্গে কথা বলার সময় এত অ্যাকটিন কেন বাছা! চাঁদের মেয়ের পালাগান আমার উঠোনে—ঘর ছাড়া করার তালে আছ! জন-মজুরের বেটা তুই, তোর এত বাড়!

বুড়ো মানুষটা বিড়বিড় করে বকে আর গাছ উপড়ায়। যত ক্রোধ এখন এই জমির খড়ে। —বেটারা সব মরে গেলি! কত কষ্ট করে তোদের রুয়েছি। তোরা জমিতে লেগে যাবি কত আশা! তার চোখে জল দেখা দেয়। সে তবু দু হাতে গাছগুলো ওপড়ায়। থামে না। কেবল পাগলের মতো যত পারছে তুলে ফেলছে। বেচুকে দেবার আগে যতটা পারে উপড়ে ফেলে দেবে। না হয় পুড়িয়ে দেবে। দশ কেজি গম! আমার আবাদের দাম নেই। আমার খাটনির দাম নেই। জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় গেল, জল নেই ঝড় নেই। শাবনে জল এল ঝড় এল। মাটি ভিজল। চপর চপর বৃষ্টির ফোঁটায় সেও ভিজল। ত্যানাকানি পরে দিনমান জমির কাদান রোয়া সব। হায় আশা কুহকিনী! পালানের মা তুই ঘরের বার হলি, ফিরবি ত!

সহসা কেমন সব কথা থমকে গেল তার। মাথার উপর দিয়ে একটা শকুন উড়ে গেল! পালানটা কোথায়! না আছে। জমির মধ্যে উবু হয়ে বসে আছে। কোন কীট-পতঙ্গ ধরার তালে আছে। এ-সময়টাতে শকুন আসারই কথা। প্রকৃতির খ্যাপামি টের পেয়ে গেছে। তা অখাদ্য কু-খাদ্য খেয়ে মড়ক লাগতেই পারে। সকালে গম ভাজাভুজি তবু পেটে যাচ্ছে। রাতে এক মুষ্টি অন্ন। এই করে বাঁচা। সামনের মাসগুলিতে কী হবে কে জানে বাপ! খকখক করে কাশল দু বার। দম নিল। টানছে, ওপড়াচ্ছে। দশ কেজি গমে সবটা আবাদ তোর গরু বাছুরে খাবে! খাওয়াচ্ছি। সুতা নাড়ানাড়ি তোমার সব বের করব। আমার পালান আছে না।—ও পালান, পালানরে!

—দাদু আমি এখানে। ডাকছ কেন!

—দূরে যাস না। রোষে পড়ে যাবি।

পালান জানে দাদু তার অহরহ কথা বলে। দাদুর কোন কথাই সে ঠিক বুঝতে পারে না। কেবল বলল, রোষ কী দাদু!

—দেখছিস না, শকুন উড়ছে!

—কোথায়!

বুড়ো মানুষটা মাথা তুলে দেখল শকুনটা নেই। কোথায় উড়ে চলে গেছে।

—কোথায় শকুন দাদু!

—উতো তোর আমার মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল।

পালান বলল, যা মিছে কথা! সে আবার ফড়িংটার পেছনে মনোযোগ দিল। ধরতে পারছে না। উবু হয়ে বসে আছে। যেন টের না পায় কোন মনুষ্যের অপোগণ্ড বসে আছে একটা মরা গাছ হয়ে। গাছ ভেবে বসলেই খপ করে ধরে ফেলবে। তারপর ল্যাজে সুতোটা বেঁধে উড়িয়ে দেবে হাওয়ায়।

খাবলা মেরে ওপড়াচ্ছে আর সেই মতো বকবক করছে।–পুড়িয়ে দেব। তবু শালা বেচুর গরু বাছুরের পেটে যেতে দেব না। কপালে লেখা থাকে। না’লে লায়েক বেটারে কালে খাবে কেন! কপালে লেখা থাকে সব। গরু বাছুর গেছে, আবাদ গেছে। খড় সার। সেও খাবে বেচুর গরু বাছুরে। আর থাকল, পালান আর তার মা। মাকে নিয়ে সুতো নাড়ানাড়ি চলছে। কখন যায়! থাকল সে আর পালান। গাছ আর বীজ।

সে তেমনি পাগলের মতো গাছগুলি উপড়াচ্ছে। কেমন হুঁশ নেই মতো। মাঝে মাঝে, হাঁক শুধু, পালান, পালানরে।

শেষবারের হাঁকে পালানের কোন সাড়া পাওয়া গেল না। সে ফের ডাকল, পালান, পালানরে!

সাড়া দিচ্ছে না।

গাছের ফাঁকে মাথা তুলে দিতেই দেখল, আলে দুটো পাখি কী খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে। পালান পাখি দুটোর খাওয়া দেখতে দেখতে ভারি নিবিষ্ট হয়ে গেছে। তার ডাকে সাড়া দিচ্ছে না। পালান তার ছোট্ট গণেশ ঠাকুর। ইজের কোলে নিয়ে বসে আছে। কোমরে একটা ফুটো তামার পয়সা। হাত পা রোগা, পেটটা সার পালানের। ঘাসের মধ্যে তার দু-খানি পা।

পালানের কী তার বাবার কথা মনে পড়েছে! বাবা মা। এক জোড়া পাখি। বাবা মা ছাড়া আর কী হবে! কী দেখছে এত মগ্ন হয়ে! কেমন নেশাতে পেয়েছে তাকে। গালে হাত। কিংবা কোন তুকতাক করে কেউ বসিয়ে দিয়ে গেছে পালানকে। বাহ্যজ্ঞান শূন্য।

সে ডাকল, এই পালান, কি দেখছিস?

কোন সাড়া নেই।

বুক ধড়াস করে ওঠে। কোন অশুভ প্রভাবে পড়ে যায়নি ত!

—পালান শুনতে পাস না।

পালান ওপরে চোখ তুলে তাকাল। সে তার দাদুকে দেখতে পেল না। দাদুটা কোথায়!

—ও দাদু, দাদু আমাকে ডাকছিস!

—আমি ডাকছি।

পালান ছুটে গেল। দেখল, দাদু খড়ের জঙ্গলের মধ্যে গড়াগড়ি খাচ্ছে।

—কী করছিস দাদু!

—হাত লাগা না ব্যাটা।

সে বুঝতে পারছে না কিছু। দাদু গাছগুলো উপড়ে ফেলছে কেন! বলছে কেন, হাত লাগা না ব্যাটা। খড়ের ডাঁই হয়ে আছে পাশটা। দাদু কথা বলার চেয়ে গাছগুলো উপড়ে ফেলা বেশি দরকারি কাজ মনে করছে।

—ও মা, সব তুই তুলে ফেলছিস। মা বকবে।

—হাত লাগা, হাত লাগা। মা মা করবি না।

—মাকে বলে দেব দেখিস।

হঠাৎ বুড়ো মানুষটা দাঁড়িয়ে গেল। চোখ লাল। কেমন ক্ষেপে গেছে। বলল, চউপ শালা। একদম মার কথা মুখে আনবি না। মুখে আনলেই গলা টিপে ধরব।

—আমি সালা! না তুই সালা! পালান বগলে ইজের নিয়ে তেড়ে গেল।

তারপর দাদুর হাঁটুর সামনে দাঁড়িয়ে মাথা গোঁজ করে বলল, জান আমার মা আছে।

—তোর মা তবে সত্যি আছে! বুড়ো মানুষটা পাশে উবু হয়ে বসল।

—হ্যাঁ আছে ত!

—তোর মা যদি আর না ফেরে?

—ফিরবে না কেন! মা আমার ফিরবে না কেন দাদু?

বুড়ো মানুষটা দেখল, পালানের চোখ ছলছল করছে। জলে ভার হয়ে আসছে। সে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, না এমনি বললাম। আসবে না কেন। ঠিক আসবে। আকাল আসছে, উড়ে যাবে ভয়ে বলছি, না না আসবে। গাছেরও গাছ থাকে, বীজেরও বীজ। গাছ বড় হয়। ফুল ফোটে। ফল ধরে।

পালান দাদুর কথা কিছুই বোঝে না। দাদু যে কী সব অহরহ বলে! সে বোঝে না বলেই তাকিয়ে থাকে। এক হাতের বগলে ইজের, অন্য হাত কোমরে। যেন দাদুটা তার দিন দিন কেমন হয়ে যাচ্ছে। সে এক হাতে দাদুর গলা জড়িয়ে বলল, ডর লাগে দাদু!

—ডর লাগে ক্যান রে?

—তুই আমার কী দেখিস।

—কী দেখব! দেখি তোর চোখ মুখ।

আসলে বুড়ো মানুষটার মনে হয় পালানের বাপও তার দিকে ভয় পেলে এমনিভাবে তাকিয়ে থাকত। মরে হেজে ছিল একজন, তাও শেষে চলে গেল। তার কপালে কিছু সয় না।

বুড়ো মানুষটা বলল, আয় কাঁধে নি। বলে হাত বাড়াল!

—দাদু ওরে রক্ত রে!

—কোথায়!

—তোর হাতে!

গাছ উপড়াতে গিয়ে টানাটানিতে রক্তপাত। তার কোন হুঁশ ছিল না তবে! সে চোখের সামনে হাত দুটো নিয়ে দেখল—জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। কেটে গেছে। কিছুই টের পায়নি! হাত ঠাণ্ডায় অবশ।

বুড়ো মানুষটা বলল, ও কিছু না।

হাত জ্বলছিল না। ঘাসে রক্ত মুছতে পারে—তবে লাগবে। ঘাসের খোঁচা লেগে ক্ষত আরও বড় হবে। হাত বরফের মতো ঠাণ্ডা। সে পালানের দু-গালে হাত দুটো উষ্ণতার জন্য চেপে রাখল কিছুক্ষণ। অসাড় হাত দুটোতে বল সঞ্চার হচ্ছে। সে বলল, আয় এবার তোকে কাঁধে তুলে নিতে পারি কিনা দেখি।

পালান প্রথমে তার ইজেরটা দাদুকে দিল ধরতে। তারপর সে হাঁটুর উপর উঠে দাদুর কাঁধে ঠ্যাং গলিয়ে দিল। ওঠার মুখে বুড়ো মানুষটা বলল, ভাল করে ধরিস, বলে সে তার লাঠি ভর করে উঠে দাঁড়াল। বলল, আকাল আসছে জানিস?

আকাল কী পালান বোঝে না। মার মুখে শুনেছে, আকাল আসছে। দাদু বলছে, আকাল আসছে। আকাল কী রকম দেখতে—রাক্ষস না ডাইনি। ভূত পেত্নী যদি হয়! সে বলল, দাদু আকালে মানুষ খায়।

বুড়ো মানুষটি হেঁটে যাচ্ছে। কাঁধে তার পালান। নিচে তার দু-খণ্ড ভুঁই। সে বলল, হ্যাঁ খায়।

—গরু বাছুর খায়?

—হ্যাঁ খায়।

—বেচু শালাকে খায়?

—না, খায় না।

এ-কেমন কথা? আকালে মানুষ খায়, গরু বাছুর খায়, বেচু শালাকে খায় না। ভারি তাজ্জব হয়ে গেল পালান। বলল, বেচু মানুষ না দাদু?

—বেচু মানুষ না। অপদেবতা।

—অপদেবতা কি দাদু?

—অপদেবতা হল গে, অপদেবতা হ……. ল….. গে….—কিসের সঙ্গে তুলনা করবে বুড়ো মানুষটা ঠিক বুঝতে পারল না।

পালান দু-হাত এক করে বন্দুক ছুঁড়ছে মতো বলল, আমারে একটা বন্দুক দিবা।

—তা দেব নে। কিন্তু ভিতরে অস্বস্তি, নাতিকে ঠিক আকাল কী বুঝাতে পারছে না। আকাল হল অপদেবতা, এই পর্যন্ত ঠিক আছে, কিন্তু অপদেবতাটা কী! শেষে অনেক ভেবে বলল, মনে নেই মলিনের মারে অপদেবতা ভর করল! ছিটালে বসে থাকত। ওঁয়া ওঁয়া করত। ঘরে ঢুকতে চাইত না! তারপরই বলল, ভয় ধরছে না ত শুনে! ভয় থেকে তরাস। তরাসে পড়ে দু-মাসেই সে কেমন জবুথবু হয়ে গেল। তার দাবনা দুবলা হয়ে গেল। হাঁটতে গেলে হাঁটু ভেঙে আসে। মানুষজন দেখলেই এক কথা তার—কি জমি উরাট, না শ্যালো আছে? ডিপ টিউকল আছে কিনা—না আবাদ তার মতো শুখা মাঠে মারা গেল! কেবল শ্যালোর মালিকরাই চুটিয়ে আবাদ করেছে। বেচুই খবর দিয়ে গেছে সব। সে এবারে রাখি করবে। রাখি, হলগে রক্ষণ, যারে কয় সংরক্ষণ। কার্ড মিলে গেছে তার—দারোগাবাবু যারে দেখলে হাসে, তার আর কার্ড মিলতে কতক্ষণ!

আর তখনই পালান সহসা চিৎকার করে উঠল, দাদু ওরে ব্বাস—কী একটা উড়ে আসছে রে দাদু। দ্যাখ দ্যাখ।

কাঁধের উপর আছে পালান। সে জমিতে দাঁড়িয়ে। নাতিকে নিয়ে বের হয়েছিল—ঘরে থাকলেই খাব খাব করে। এই ঘুরে ফিরে ভুলিয়ে ভালিয়ে রাখা। জমিতে নেমে মাথা খারাপ হয়ে গেছিল। নাতিকে কাঁধে নিতেই কোথা থেকে শক্তি সঞ্চার হচ্ছে—আর তখনই কী না কী উড়ে আসছে! বিশাল অতিকায় কিছু ঘাড়ে পালান লাফাচ্ছে—ও দাদু ওটা কি উড়ে আসছে রে। ওরে বাব্বা—

ঘাড়ে পালান। হাতে লাঠি। সে ঠুকে ঠুকে হাঁটছিল। কিছু একটা তবে উড়ে আসছে। বাতাসে সাঁ সাঁ শব্দ হচ্ছিল। কোথায় কোনদিকে—পালান ঘাড়ে বলে উপরের দিকে তাকাতে পারছে না।—কৈ দেখছি না ত!

—ঐ দ্যাখ!

সে পালানকে ঘাড় থেকে নামিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। উত্তরের আকাশ থেকে আর একটা শকুন নেমে আসছে।

সে বিড়বিড় করে বকল, এই হলগে আকালের চেহারা। তেনারা নেমে আসছেন। এতক্ষণ সে কী যে হাবিজাবি কথা বলে পালানকে আকাল বুঝিয়েছে। গাছের মাথায় বসে থাকবে। ঘাড় কাত করে দেখবে কিংবা বাতাসে পাখা মেলে দেবে উচ্ছিষ্টের লোভে। প্রকৃতির যা কিছু উচ্ছিষ্ট ছিঁড়ে-খুঁড়ে খাবে। তারপর আবার বাতাসে পাখা মেলে দেবে।

—ঐ দেখ আর একটা দাদু। কত্ত বড়!

—শকুন। শকুন দেখিস নি! ভয় পেয়ে গেলি। ধুস, ওঠ কাঁধে।

পালান কাঁধে উঠতে চাইল না। বুড়ো মানুষটার দু হাঁটু জড়িয়ে ভয়ে ভয়ে দেখতে থাকল। উত্তরের আকাশ থেকে উড়ে আসছে তারা। এদিকে ভেসে আসছে। পালান দেখছে। বুড়ো মানুষটাও দেখছে। অতিকায় ডানা মেলে ঠিক মাথার উপর ভেসে বেড়াতে থাকল। পালান ভয়ে বুড়ো মানুষটার দু হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে দিল।

শকুনের ওড়াওড়ি দেখে তারও কেমন ভয় ধরে গেল।—তালে কি মরা গন্ধ উঠছে তার শরীর থেকে! সেও কি আর একটা খড়ের জমি! বেচুর গরু বাছুরে খাবে বলে মাথার উপর ভাসছে! সে দ্রুত পা ফেলতে থাকল। নালে মাথার উপর ওগুলো ওড়াউড়ি করছে কেন! সে পালানের হাত ধরে ছুটতে থাকল।—পালান আয়। শিগগির আয়। সব বেচুর কম্ম। ঠিক ছেড়ে দিয়েছে। আবাদ বলে কথা। আয় আয়। আমি না হয় খড়ের জমি—তুই। তোর ঝাড় হবে। তুই বাড়বি। বড় হবি। গাছেরও গাছ থাকে। বীজেরও বীজ । গাছ বড় হয়, ফুল ফোটে। আয়। তাড়াতাড়ি আয়। ফল ধরে—বীজ হয়। আয়। তাড়াতাড়ি করে কররে ব্যাটা। বীজ উড়ে না গেলে গাছ তারে ছাড়ে কী করে! সে পালানকে আড়াল করে পাগলের মতো আকালের কাছ থেকে ছুটে পালাতে থাকল।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments