Thursday, June 20, 2024
Homeবাণী-কথাউত্তরসাধক - বাণী বসু

উত্তরসাধক – বাণী বসু

মেধা ভাটনগর একটা দুর্দান্ত পাটকিলে রঙের শাড়ি পরছিলেন। পাটকিলের সঙ্গে বোধহয় সবুজ সুতো মেলানো আছে। হেলিকপ্‌টার থেকে দেখলে ঋতু পরিবর্তনের কোনও কোনও বিশেষ সময়ে ফসলের খেত বা গুল্ম-জাতীয় গাছের জঙ্গলে এই মিশ্রিত বর্ণ ধর্ম দেখতে পাওয়া যায়। লম্বা দিকে সরু-সরু ডোরা। আঁচলের দিকে যত এগিয়েছে ডোরাগুলো ততই আরও চওড়া আরও অলঙ্কৃত হয়ে গেছে। কালো, মেটে লাল আর গাঢ় সবুজ। কলাক্ষেত্র শাড়ি। শাড়ি বিষয়ে মেধার একটা অদ্ভুত আগ্রহ ও বিস্ময় আছে। তাঁর আলমারিতে হ্যাঙারে ঝুলছে এই রকম বিভিন্ন স্থানের বাছাই করা শাড়ি। সংখ্যায় কুড়ি একুশটার বেশি নয়। কিন্তু প্রত্যেকটি আলাদা করে বিস্ময় জাগাবার মতো। এর মধ্যে যে কোনও শাড়িই তিনি যখন পরে বেরোন, তাঁর নিজের কিরকম একটা প্রচ্ছন্ন গর্ব হয়। তিনি শুধু পোশাক পরেন নি, যেন এক টুকরো ভারতীয় সংস্কৃতি অঙ্গে জড়িয়ে নিয়েছেন। আশ্চর্যের বিষয়, এই কলাক্ষেত্র শাড়ি তাঁকে উপহার দিয়েছে এক মার্কিন ছাত্র। মেধার উৎসাহে যে তার থিসিসের উপকরণ সংগ্রহের জন্য ভারত দর্শনে আসে। মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ভেতর যখন সে পলিথিনের মোড়ক খুলে ভারতীয় শাড়ি-বাক্‌স এবং তার ভেতর থেকে এই অসাধারণ উপহারটি বার করে, তখন মেধা চমৎকৃত, রোমাঞ্চিত হয়েছিলেন। শুধু ছাত্রের দেওয়া উপহার বলে নয়। ভারতীয় ইতিহাসের মেরুদণ্ড যে একাধারে তার গতিশীল গ্রহিষ্ণু ধ্রুপদী শিল্প এবং লোকসংস্কৃতি এই কথাটি টেডকে এবং টেডের মতো অনেককে বোঝাতে পেরেছেন বলে।

মেধা আশা করছেন এখন, ভারতে ফেরবার পর তাঁর শাড়ি কেনার এবং পাওয়ার গতি বেড়ে যাবে, তাঁর সংগ্রহের লাইব্রেরিটা যদি এশিয়াটিক সোসাইটিকে দিয়ে যান, শাড়িগুলো তিনি মিউজিয়ামকে দিতে পারেন, কিন্তু না। তার পরেও এগুলো পরা হবে, তাঁর ছাত্রীদের দিয়ে যাবেন। সযত্নে সংরক্ষিত সুরভিত শাড়িগুলো যাঁরা তাঁকে ভালোবাসে তাদের পরতে নিশ্চয়ই আপত্তি হবে না। এই ভাবে তাঁর সংগৃহীত তথ্য পরবর্তী প্রজন্মের কাজে লাগবে। কারণ ব্যক্তি মানুষ আসে, ব্যক্তিমানুষ যায়, কিন্তু বহু ব্যক্তিমানুষের প্রতিভা ও একাগ্র সাধনার ফল যে সংস্কৃতি তা প্রবাহিত হতে থাকে চিরকাল। সেই প্রবাহ যখন পঙ্কিল, সংকীর্ণ, অগভীর হয়ে ওঠে তখনই দেশ আর দেশ থাকে না ভূখণ্ড হয়ে যায়।

মেধার সব শাড়িই যে উপহার তা নয়, কিন্তু প্রত্যেকটার পেছনে একটা না একটা ইতিহাস আছে। যেমন, গোলাপি-নীলের বমকাই শাড়িটা। এটা তিনি এক ওড়িশি নর্তকীর অঙ্গে দেখেছিলেন। মাছরাঙা উড়ে যাচ্ছে যেন গোলাপি পদ্মবনের ওপর দিয়ে। শাড়িটার সঙ্গে ওড়িশি নৃত্যের সব অসাধারণ ত্রিভঙ্গগুলি মিলে-মিশে আছে। এটা যেদিন পরেন ত্রয়োদশ শতকের নরসিংহদেবের সময়কার কোনও অসামান্য ছন্দোময়ী দেবনর্তকী তাঁর পাশে পাশে ছায়ার মতো ঘোরে। অনেক খুঁজেও যখন কুমকুম সৎপথী নামে ওই নৃত্যশিল্পীটির শাড়ির জোড়া পাওয়া গেল না, মেধা তাকে লেখেন। ফেরৎ ডাকে ভি পি-তে অবিকল ওই শাড়িটি পেয়ে যান। কুমকুম একটা চিরকুটে জানায় এসব শাড়ির জোড়া পাওয়া খুবই মুশকিলের ব্যাপার। সবই অর্ডারি মাল। মেধা আজও জানেন না কুমকুম তাঁর জন্য অত কষ্ট কেন করতে গেল। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কুমকুমকে আনা হয়েছিল। অভ্যর্থনা-সমিতিতে তিনি ছিলেন। তার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করতে গিয়ে যেটুকু আলাপ।

বস্তুত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েই মেধা প্রথম শাড়ির মূল্য বুঝতে পারেন। সেখানে সুবিধের জন্য অনেক সময়েই প্যান্ট পরতে হত। শাড়ি ধোয়া ইস্ত্রি করার অনেক হাঙ্গাম। আইওয়াতে একটা সেমিনার ছিল। ওদেশে যাবার দু চার মাসের মধ্যেই। মেধা পেপার পড়তে উঠলেন, ঘি-ঘি রঙের ওপর বহুবর্ণ বুটির-ফুলিয়া টাঙাইল। লাঞ্চ ব্রেকের সময়ে দুতিন জন ওদেশী মহিলা প্রতিনিধি তাঁকে এসে বললেন—অসাধারণ, অসামান্য, তুলনাহীন। ভেতরে ভেতরে খুবই আনন্দ মেধার, তিনি ধন্যবাদ জানিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছেন মহিলাদের একজন বললেন—‘সত্যি অসাধারণ, তোমার শাড়ি, তোমার এই পোশাক। এ পোশাক তোমাকেও তুলনাহীন, অপূর্ব করেছে। পরার ভঙ্গিটাই বা কি আর্টিস্টিক। দা সুঈপিং এণ্ড, দা গ্রেসফুল প্লীটস ইন দা স্কার্ট।’ অপর দুজন অবশ্য তখন বলতে শুরু করেছেন—‘ইয়োর পেপার টূ-ইজ ফ্যানটাসটিক…’

ওদেশে এখন বহু বাঙালি, ভারতীয়, বাংলাদেশী রয়েছেন। কিন্তু কাজ-কর্মের জায়গায় প্রায় কেউই শাড়ি পরেন না। কোথাও কোথাও নিষিদ্ধ। অন্যত্র অসুবিধাজনক। কিন্তু মেধা তাঁর ক্লাসগুলো নিতেন শাড়ি পরেই। ক্রমশই তিনি এবং তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরা শাড়ি-সৌন্দর্য-সচেতন হয়ে উঠতে থাকেন। একবার একটি ক্লাসে লেকচার আরম্ভ করতে যাচ্ছেন। একটি ফরাসী ছেলে বলে উঠল—‘মাদমোয়াজেল, এক মিনিট অপেক্ষা করুন লক্ষ্মীটি, আমাদের এখনও আপনার শাড়িটা দেখা শেষ হয় নি।’

জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখলেন সন্ধে হয়ে আসছে। আর বেশি দেরি না করাই ভালো। মৈথিলী ভীষণ ক্ষুন্ন হবে। মেধা তাড়াতাড়ি উঠে পড়লেন, ঘরের জানলা বন্ধ করলেন, দরজায় তালা লাগালেন। সম্প্রতি ছোড়দা এসে জোর করে দোতলায় একটা কোল্যাপসিব্‌ল করিয়ে দিয়ে গেছে। সিঁড়ির সৌন্দর্য নষ্ট করে দিচ্ছে বলে কোনও লাভ হয়নি। পরের বারে এসে নাকি বার্গলার অ্যালার্মও লাগাবে। কোল্যাপসিব্‌লটা বন্ধ করতে হবে। তারপর নিচের দরজা, বাইরের গেট। ছোট্ট একটু লন মতো আছে, ধারে ধারে কিছু গুল্ম, কিছু ফুল।

ডাঃ অশোক ভাটনগরের এই বাড়িতে অবশেষে মেধা একলা। তিনি ডাঃ ভাটনগরের তৃতীয় সন্তান। তাঁর বাবার দেশ মীরাট, মায়ের বাংলা। ছেলেমেয়েরা সাধারণতঃ পিতার নাম এবং মাতার সংস্কৃতি গ্রহণ করে। বিশেষত যদি মাতৃভূমিতে থাকে। অশোক ভাটনগর এবং লীলা দত্তের আলাপ-পরিচয়-পরিণয় সব পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রে হলেও তাঁরা যখন কলকাতায় কর্মজীবন শুরু করলেন অশোক আস্তে আস্তে কলকাতার উপান্তে এই বাড়ি করেন। লীলা কি ভেবে তাঁর বাড়ির নাম ‘অলম্‌’ দিয়েছিলেন জানা যায় না। কারণ বাড়ি করলেও অশোক-লীলার জীবনে শেকড় বলতে কিছু ছিল না। অশোক ভুলে গিয়েছিলেন তিনি উত্তর প্রদেশের, লীলাও ভুলে গিয়েছিলেন তিনি বাংলার। যতদিন বেঁচে ছিলেন পৃথিবীর এখানে ওখানে অতিথি-অধ্যাপক, ফেলো ইত্যাদি হয়ে থেকেছেন, ভারতবর্ষের আদ্যন্ত ঘুরে বেড়িয়েছেন কর্ম উপলক্ষ্যে। ছেলে মেয়েরা কলকাতার বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করত। তাদের বলতেন—‘পালা, পালা। কোথাও শেকড় গাড়বি না। আগ্রহ আর সুযোগ তোদের যেখানে টেনে নিয়ে যায়, চলে যাবি।’ জ্যেষ্ঠ কীর্তি ভাটনগর তাই লণ্ডনে ডাক্তারি করেন। ডাক্তারদের পেশা নামেই স্বাধীন। তাদের কোথাও না কোথাও শেকড় গাড়তেই হয়। মেজ মুক্তি সরকারি চাকুরে। সম্রান্ত বুরোক্র্যাট। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোতে ঘোরাফেরা করছেন—চাকরি জীবনের এই পর্বে। তাঁরও এক হিসেবে শেকড় নেই। কিন্তু নিজের তাগিদে তো নয়! সবই কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। ছোট প্রজ্ঞা অবশ্য প্রচণ্ড শেকড় ছিঁড়েছে। গুজরাতি ব্যবসায়ীকে বিয়ে করে তার পার্টনার হিসেবে সে সিঙ্গাপুর, হংকং, টোকিও, ইংল্যাণ্ড করে বেড়াচ্ছে। কখন তাকে কোথায় পাওয়া যাবে জানতে হলে তার কলকাতার সেক্রেটারিকে ফোন করতে হয়, সে হংকং-এর সেক্রেটারিকে ফোন করে জেনে দেয়। একমাত্র মেধাই শেকড় ছিঁড়তে পারলেন না। ভাটনগর নামের শেকড়, ফার্ন প্লেসের বাড়ির শেকড়, কলকাতার শেকড়। স্টেট য়ুনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার প্রশস্ত করিডরে যে লম্বা মেয়েটি ছেলেদের মতো বড় বড় পা ফেলে হেঁটে যেত, তার চেতনার অভ্যন্তরে বসে বসে বিনুনি নিয়ে খেলা করত আশুতোষ বিল্ডিং-এর দোতলার বারান্দা থেকে ঝুঁকে উপচোনো কলেজ স্ট্রিট দেখতে থাকা একটি উনিশ কুড়ির মেয়ের ইতিহাস। বোম ফাটছে, টিয়ার শেল…মেধা সরে আয়…লাঠি চার্জ…অসীমাভ পায়ে গুলি খেয়েছে, মেধা চলে আয়…লেট মী বি…প্যাকিং কেসের ওপর চড়ে রোকেয়া বক্তৃতা দিচ্ছে…বন্দুকের গুলির চেয়েও তীব্র, অগ্নিময়..য়ুনিভার্সিটি লনে ছাত্রসভা…ইনকিলাব জিন্দাবাদ…মেধা ওদিকে নয়…যেদিকে ইচ্ছে যাবো… ইস্‌স্‌ চোখের জলে নাকের জলে করে ছেড়েছে। ছোট কমনরুম, মুখে-চোখে জল দে, জলের ঝাপটা, চোখের মণির ওপর জল আছড়ে পড়ছে, আলো চম্‌কে যাচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে, আলো অমন টুকরো টুকরো কেন? ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইলেকট্রনের কণার মতো। অ্যাটমিক বৃত্ত থেকে ছিটকে যাচ্ছে ইলেকট্রন। অ্যাটম বিশেষিত হবে। হয়ে যাচ্ছে ভেতরের প্রচণ্ড জোরালো তাগিদে। মেধা ভাটনগর এইরকম এক বিশেষ তড়িৎকণা বা মানুষ নামধারী সচেতন মৌলের এক ইতিহাসময় আইসোটোপ।

মেধা পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি লম্বা শক্তপোক্ত কাঠামো। দু দফায় সাত বছর সাত বছর চোদ্দ বছর, বেশিটাই যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরে কাটাবার ফলে এখন ভারতীয়, বিশেষত বাঙালি মানদণ্ডে বেশ ফর্সাই। সোজা ভুরু, বসা লম্বা চোখ, চোখের মণি গাঢ় বাদামি। মেধার ঠোঁটও লম্বাটে, বিবর্ণ গোলাপি। চুল সোজা, চকচকে। মধ্যিখানে সিঁথি করে একটা বেঁটে বিনুনি, কিম্বা ছোট্ট হাত খোঁপা। চিবুকে একটি টোল। মেধা এই টোলটি ভয়ানক অপছন্দ করেন। টোল, কোঁকড়া চুল, তিল বা বিউটি স্পট এইসব বিখ্যাত সৌন্দর্য লক্ষণ তাঁর ঘোর অপছন্দ। তাঁর ধারণা এগুলো মেয়েদের ন্যাকা করে দেবার ষড়যন্ত্র। তাঁর মতে বেশির ভাগ মেয়ে তিন শ্রেণীর হয়ে থাকে, হয় ন্যকা, নয় বোকা, নয় তো দুইই। অ্যাফেকটেশন বা ন্যাকামি এক ধরনের স্ত্রীরোগ, জরায়ুর ব্যাধির মতোই। তাড়াতাড়ি চিকিৎসা এবং ব্যায়াম করে সারানো দরকার। নইলে মনের স্বাস্থ্য বিপন্ন হয়ে পড়বে। এর বাইরেও আরও নারী-প্রজাতি তিনি শনাক্ত করেছেন যাঁরা সচেতনভাবে পুরুষদের নকল করেন। এঁদের থেকেও মেধা শত হস্ত দূরে থাকার পক্ষপাতী। নিজের চিবুকের টোলটি তিনি রীতিমতো ঘৃণা করেন। ছাত্রজীবনে এর দরুণ তাঁর নাম হয়ে যায় ডিম্পল ভাটনগর। সে সময়ে এবং পরবর্তীকালেও অনেকেই তাঁর এই মারাত্মক টোলের প্রেমে পড়েন। শোনা যায় এরকম একটি নাছোড়বান্দা প্রেমিককে তিনি একবার তাঁর টোলটি উপড়ে নিয়ে তাঁকে অব্যাহতি দেবার প্রস্তাব দেন। একবার প্লাস্টিক সার্জনের কাছেও ঘুরে এসেছেন। টোলের সার্জারির প্রস্তাব সম্ভবত ভদ্রলোক জীবনে এই প্রথম পেলেন। বলেন—‘হোয়াটস রং উইথ ইট?

মেধা নিজের মনের কথা ডাক্তারকে বলবেন কেন। তিনি ডাক্তারের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে, নিজের প্রশ্নটাই আবারও করলেন। টোলটার কোনও ব্যবস্থা করা যায় কি না।

মেধার মুখের দিকে তাকিয়ে ডাক্তারের টোলটা বেশ পছন্দ হয়ে যায়। তবে তিনি চালাক লোক। মনের ভাব চেপে গম্ভীরভাবে বলেন—‘ইমপসিব্‌ল। হয়ত স্ক্রেপ করে গ্র্যাফ্‌ট্‌ করে ঠিক করে দিলাম, তারপরেও ইয়োর চিন মে গ্রো অ্যানাদার ডিম্পল।’

এখন মেধা টোলের সঙ্গে সহবাস করতে শিখে গেছেন। ছোটখাটো ব্যাপারে আপস করা যায়। কিন্তু জীবনে আরও অনেক সমস্যা আছে, আরও বৃহৎ, আরও গম্ভীর, গভীর, ব্যাপক, আরও অনেক ভাবে অনিষ্টকর। সমাজের পক্ষে, মানুষের পক্ষে। মেধা সেখানে একেবারে আপসহীন। তবে তিনি আর অসহিষ্ণু নেই। এই সব অনিষ্টের নিরাকরণে তিনি অস্ত্র ধারণ করেন না। কোনও প্রসাধন, প্রহরণ, বাগ-যুদ্ধ, স্নায়ুযুদ্ধ এসব ছাড়াই তিনি কেল্লাফতে করতে চান। তাঁর হৃদয়ের গভীরে আশা তিনি সোজাসুজি ঠিক সড়কটা দিয়ে হেঁটে চলবেন, সমস্যাগুলো আপনা থেকেই কোনও চৌম্বক শক্তিতে হতাহত হয়ে তাঁর পথের দুপাশে লুটিয়ে লুটিয়ে পরবে। মেধা জানেন তিনি কোনও গড়-উওম্যান নন। এরকম ধারণা করা স্বপ্ন দেখার শামিল। তবু কিছু কিছু মানুষের স্বপ্ন মরতে চায় না। মেধার নিজের অমর হবার সাধ নেই। তিনি চান তাঁর স্বপ্নগুলো অমর হোক, সত্য হোক।

দাদা ছিল কীর্তিশরণ, সে কারো, কোনও কিছুর শরণ নিতে চায় না। বড়ই স্বরাট। মেজদা ছিল মুক্তিনাথ, সে নাথ ত্যাগ করেছে। ছোট বোন ছিল প্রজ্ঞাপারমিতা, সে প্রজ্ঞার পারে যেতে ইচ্ছুক নয়। শুধুই প্রজ্ঞা দেশাই। মেধারও আদি নাম ছিল মেধাশ্রী। তিনিও শ্রীটুকু ত্যাগ করতে চাইলেন। শ্রীহীন হবার ইচ্ছেয় নয়। শ্ৰী-এর সঙ্গে যে হতাশা, অত্যাচার, অবিচার এবং আত্মতুষ্টির অনুষঙ্গ এতকাল ধরে চলে এসেছে তার প্রতি তাঁর তীব্র অনীহা। শ্রী থাকুক, কিন্তু কারো দৈন্যের ওপর ভর করে নয়। সৌন্দর্য থাকুক, কিন্তু কখনোই কুশ্রীতাকে আড়াল করবার জন্য নয়।

কাজেই মেধা সুন্দর, অথচ সুন্দর নন। পৃথিবী যদি সত্যিই কোনদিন বিমুক্ত মনের মানুষের বসতি হয়, যেখানে সৌন্দর্য কোনও পরিমাপগত ধারণা নয়, মুখ যেখানে সত্যি-সত্যিই মনের আয়না, সেখানে মেধা ভাটনগর আরও অনেক স্বাধীন-ছন্দ মানুষের ভিড়ে সানন্দে মিশে যাবেন। সবাই রাজা, সবাই সুন্দর, কারণ সবাই ছন্দোময়, শুভময়। সসাগরা ধরিত্রীর আপন সন্তানের মতো। কিন্তু যতদিন তা না হচ্ছে ততদিন মেধা তাঁর অতিরিক্ত শারীরিক ও মানসিক দৈর্ঘ্য নিয়ে ভিড়ের মধ্যে মাথা উঁচিয়ে থাকবেন। অনেকে বলবে—‘কেমন কাঠ-কাঠ’, ‘ফেমিনিন নয়’ কিম্বা ‘বাপ রে, এতো মেয়ে মেয়ে নয়’ আবার কেউ-কেউ আর কোনও বিশেষণ খুঁজে না পেয়ে বলবে—‘কী চমৎকার! কী অনন্য!’ ভিন্নরুচিৰ্হি লোক:।

খুবই কৌতূহল হয় জানতে মেধা বিয়ে করেন নি কেন। তিনি কি নারীমুক্তিতে বিশ্বাসী উগ্ৰক্ষত্রিয়া? কাউকে পতিত্বে বরণ করবেন না পাছে বিন্দুমাত্র দাসীত্ব করতে হয়। না কি তাঁর কোনও যৌন অক্ষমতা আছে? না কি তেমন কেউ তাঁকে কোনদিনও ডাক দেয় নি। মেধার জীবনে একটা গোপন খবর আছে। তিনি সবার অজ্ঞাতে বিয়ে করেছিলেন। এখনকার তুলনায় সে শৈশবকাল। মাত্র উনিশ বছর বয়সে এক বিশ বছরের বড় রাজনৈতিক দাদাকে। ভদ্রলোক যখন পর্যায়ক্রমে অজ্ঞাতবাসে এবং জেলে, তখন তাঁর আরব্ধ কর্মের কিছু কিছু ভার মেধার ওপর পড়েছিল। তখন তিনি ছাত্রী। ছাত্রফ্রন্টে কাজ করার দায় তাঁর। খুব সম্ভব ছাত্রীর স্বভাববশেই প্রচুর প্রশ্ন করতেন। প্রথম প্রথম জবাব পেতেন, তারপর নিরুত্তর কঠিন দেয়াল। জেল থেকে স্বামীর আদেশ এলো পার্টিপতিদের নির্দেশ নির্বিচারে মেনে চলার। বিস্মিত, ব্যথিত পত্নী প্রবল জেহাদ লিখে পাঠালেন, ক্রমশ চিঠির ধারা ক্ষীণ হয়ে এলো। জেলের মধ্যেই বছর দেড়েকের মধ্যে স্বামী যখন মারা গেলেন তখন মেধার সঙ্গে তাঁর আর কোনও সম্পর্ক নেই বললেই চলে। কাজেই মেধা নিজেও ঠিক জানেন না, তিনি বিধবা না বিবাহ-বিচ্ছিন্ন। তিনি বোধহয় যযাতি-কন্যা মাধবীর মতো। বিবাহিত কিন্তু কুমারী।

মা মারা যাবার পর ফার্ণ প্লেসের বাড়িতে বাবা আর মেধা। বাবা বলতেন—‘কি রে মেধা, সেট্‌ল্‌ কর এবার? ত্রিপাঠী বার বার বলছে। ছেলেটা তো ভালোই। মুক্তি খুব সার্টিফিকেট দিচ্ছে।’

মেধার কি খেয়াল চাপল, বললেন—‘ঠিক আছে করব, কিন্তু ওকে এখানে এসে থাকতে হবে। মেয়েরাই বা কেন খালি শ্বশুর-বাড়ি যাবে, বাবা?’

অশোক বললেন—‘যুক্তির দিক দিয়ে তো কথাটা ঠিকই বলেছিস মা। কিন্তু সমাজের কতকগুলো বহুদিনের তৈরি অভ্যাস আছে তো! তাছাড়াও কথাটা কি জানিস? ছেলেরাই শ্বশুরবাড়ি যায়। মেয়েদের মতো ঘটাপটা করে কন্যাবিদায় হয় না বটে, কিন্তু ছেলেরাই যায়। দেখ না, আমিই তো সারাজীবন শ্বশুরবাড়ি পড়ে রইলাম, মীরাট ফিরে গেলাম কি! এখন আমাকে বাঙালি ছাড়া লোকে কি বলবে?

বাবা বাংলা বলেন চমৎকার। শব্দচয়ন, প্রবাদ-প্রবচনের ব্যবহার লক্ষ্য করবার মতো। কিন্তু কথায় একটু হিন্দি টান আছে। মেধা হাসল, বলল—‘মীরাটে যে তুমি ফিরে যাবে, কে আছে সেখানে তোমার?’

—‘কেউ না থাক মেধা মাটি আছে?’

—‘হ্যাঁ যে মাটি থেকে উৎখাত হয়েছ মাত্র পনের বছর বয়সে। তাছাড়া বাবা, মাটিটা দেশ, তোমাদের এই পুরনো ধারণাটা ছাড়ো তো! ছাড়ো। মাটিটা দেশ নয়, মানুষগুলো দেশ। দেশের মাটি বলে মাটিতে মাথা ঠেকাও, বিশ্বমায়ের আঁচল-টাঁচলও পাতা থাকতে দেখো কিন্তু দেশের মানুষগুলোই দেশের রূপটা তৈরি করে।’

—‘আমারও তো তাই ধারণা ছিল রে! যত বুড়ো হচ্ছি মনে হচ্ছে মাটিটাই দেশ। মানুষ বদলে যায়, মাটি বদলায় না। হাওয়া, জল, মাটি এসব বদলায় না কখনও। কখনও মিথ্যে বলে না।’

মেধা দেখল বাবা আবেগপ্রবণ হয়ে যাচ্ছেন। শরিকি বিবাদে উত্যক্ত হয়ে একসময়ে অতি অল্প বয়সে বাবা-মার সঙ্গে তাঁদের কর্মস্থল কলকাতায় চলে আসেন। আর কখনও তেমনভাবে ফিরে যান নি। মীরাটের শুকনো হাওয়া, গরম কালের লু, হাড়ের ভেতর ঢুকে যাওয়া শীতের কামড় এমন কি ভয়ানক দিগ-দিগন্ত অন্ধকার-করা দম-বন্ধ আঁধি পর্যন্ত এখন স্মৃতির আদুরে বেরাল হয়ে গেছে। আবেগপ্রবণ সে নিজেও কম না। সেইসঙ্গে দুঃসাহসী। অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়। নইলে বিশ বছরের বড় মানুষটিকে অমন গোপনে বিয়ে করতে যাবে কেন? বাবা-মাকে বললে কি করতেন? একটু বোঝাবার চেষ্টা করতেন হয়ত—‘দ্যাখ, ম্যাচটা ঠিক হচ্ছে না, একটু ভাব্‌।’ কিন্তু সে জেদী মেয়ে, সেরকমভাবে জেদ করলে আপত্তি করতেন না। বরং তার দুঃখের সময়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন স্তম্ভের মতো। কিন্তু কিরকম একটা রোমাঞ্চকর অভিযানের মতো করে তখন নিয়েছিলেন ব্যাপারটা। ভেলায় করে একা আটলান্টিক পেরোনোর মতো। প্রজ্ঞা ছাড়া কেউ জানত না। এখনও জানে না।

বাবা বললেন—‘ত্রিপাঠী যদি এক কথায় এসে থাকতে রাজী হয়ে যায় তোরই কি ভালো লাগবে? তার চেয়ে বিয়ে হোক। শ্বশুরবাড়ি যা। তারপর তুই তো তোর বাবার কাছে বেশিটা থাকবিই। কান টানলে মাথা আপনি এসে যাবে।’

মেধার এক গোঁ—‘না। ত্রিপাঠীকে শর্ত করতে হবে।’

বাবা বললেন—‘ঠিক আছে। ওকেই বল কথাটা।’

মজার কথা রঘুনন্দনও প্রস্তাব শুনে ওই একই মন্তব্য করেছিল—‘আমি যদি এ শর্তে রাজি হয়ে যাই তুমি কি আমাকে সম্মান করতে পারবে?’

—‘কেন পারবো না?’ বললেও কিন্তু মেধার এই প্রশ্নের-উত্তরে-প্রশ্নে দুর্বলতা ছিল। প্রশ্নটা সে নিজেকেও করছিল—‘কেন পারবো না?’ এবং জবাবে একটা দ্বিধাগ্রস্ত ‘না’ শুনে মরমে মরে যাচ্ছিল। প্রচলিত সংস্কার ভাঙা অত সহজ না। তখনই মেধার ক্ষীণভাবে মনে হয় পুরুষ সম্পর্কে মেয়েদের যেমন একটা সংস্কার আছে, সে স্বনির্ভর, শক্তিমান হবে, কোনও কোনও জিনিস মেনে নেওয়া তার চরিত্রকে দুর্বল করে, মেয়েদের সম্পর্কেও পুরুষদের সংস্কার থাকাটা স্বাভাবিক। মেয়েরা ধীর-স্থির অথবা লোভনীয় ভাবে চঞ্চল হবে, সিরিয়াস বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাবে না, অকারণে হাসবে ইত্যাদি ইত্যাদি। একটা ভাঙবো না। অথচ অন্যটা ভাঙতে বলব—এটা সুবিচার নয়। মেধা অত্যন্ত সৎ মেয়ে। নিজে নিজেই এই আবিষ্কারটা করার পর থেকে তার বিদ্রোহিণী ভাবটাতে একটু চিড় খায়। অস্বস্তি ছিল, ব্যাপারটা সে মেনে নিতে পারছিল না। কিন্তু তখন থেকেই সে তার প্রহরণগুলো একে একে বর্জন করছে। তবু, প্রহরণ বর্জন করলেও মহাবিদ্যা মহাবিদ্যাই থাকে। মেধা ভাটনগর শক্তিরূপা। যে ভুঁড়োপেটা বুড়ো শিবটিকে সে বরণ করেছিল, সে তার শক্তির স্বরূপ বোঝে নি। সে উপলক্ষ্য। তাকে উপলক্ষ্য করেই মেধার মধ্যে শক্তির খেলা আরম্ভ হয়। এখন কোনও উপলক্ষ্যের দরকার আর নেই, সমস্ত পৃথিবী, গোটা সিসটেমটাই তার শিব, তাকে অবলা অনিমন্ত্রিতা বলে দক্ষযজ্ঞে যেতে দিচ্ছে না। মেধাও একটার পর একটা রূপের খোলস মোচন করে নতুন নতুনতর শক্তিরূপ দেখাচ্ছে, দেখিয়ে চলেছে। কিন্তু হায়, একদম একলা-একলা বুঝি সতিই কিছু হয় না।

ত্রিপাঠীর সঙ্গে বিয়েটা হল না। বাবা মারা গেলেন, মেধা ফেলোশিপ নিয়ে বস্টন গেল। সেখানে থাকাকালীন একটি ব্রিলিয়ান্ট ডিভোর্সীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। অলয় মুখার্জি। ছেলেটির কেরিয়ার সোনার জলে লেখা। অ্যাকাডেমিক মহলে সুনামও খুব। মেধা যখন প্রায় ঠিকই করে ফেলেছে তার প্রস্তাবে মত দেবে, সেই সময়ে তার পূর্বর্তন স্ত্রী তনিমা তার সঙ্গে দেখা করতে আসে। সাক্ষাৎকারটা পুরোপুরি অনুধাবন করবার মতো। ডিসেম্বর মাস। জানলার বাইরে তাকালে সব শুধু সাদা দেখাবে। হাওয়া আছে বেশ। বরফের ঝুরোগুলো তাই হিসহিসিয়ে দিক পরিবর্তন করছে ঘন ঘন। এই শব্দ ভীষণ ভালো লাগে বলে টয়লেটের স্কাইলাইটটা মেধা খুলে রেখেছে। বসবার ঘরে জানলার দু’ পাশে পর্দা ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে। কোলের ওপর লাল পাতলা কম্বল। একটা বিখ্যাত রুশ নভেল পড়ছে মেধা। ‘ডেড সোলস।’ প্রথম খণ্ডের শেষ অধ্যায়ে এসে গেছে সে, পেঙ্গুইন এডিশনের ২৫৯ পাতা, এখনও মনে আছে—‘ইজ ইট নট লাইক দ্যাট দ্যাট য়ু টূ রাশিয়া, আর স্পীডিং অ্যালং লাইক আ স্পিরিটেড এয়কা দ্যাট নাথিং ক্যান ওভারটেক?…’ ড্রাইভ ওয়ে দিয়ে একটা ওল্ডসমোবিল ঢুকে এলো, ওয়াইপারের কাঁটাগুলো প্রাণপণে উইণ্ড স্ক্রীন থেকে বরফ সরাচ্ছে। দুদিকে দুটো অ্যাপার্টমেন্ট। ডানদিকেরটা ওর। মাঝখানে ড্রাইভ ওয়ে, ভায়োলেট রঙের মনে হল গাড়িটা, খুব অদ্ভুত রং, গাড়িতে চট করে দেখা যায় না। তবে না-ও হতে পারে। একে ঘন তুষারপাত, তার ওপর আধা-অন্ধকার। ভুল হতে পারে। ভায়োলেট গ্রেটকোট, টুপি নেমে এলো, গাড়ি লক করল। মেধা দেখছে। তার অ্যাপার্টমেন্টে রিং হল। দরজা খুলে দিয়েছে, সামনে ভায়োলেট ঘেরাটোপের মধ্যে থেকে পুতুলের মতো একটি মুখ তার দিকে তাকিয়ে আছে।

—‘আসতে পারি?

—‘নিশ্চয়ই! আপনি!’

—‘আমি তনিমা ভট্টাচার্য। এক্স মিসেস অলয় মুখার্জী।

—‘আসুন।’

মেয়েটিকে বসিয়ে মেধা রান্নাঘরে গেল। দুটো লম্বাটে বিয়ার মগে কফি নিয়ে ফিরে এলো। বলল—‘আমি বড় বড় কাপে বেশি-বেশি কফি খেতে ভালোবাসি। তোমার অসুবিধে হচ্ছে না তো!’

—‘না না। খুব ভালো হয়েছে। তাছাড়া কফি ইজ দি থিং। আমিও প্রচুর কফি খাই।’ কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর তনিমা বললে—‘তোমার ক্র্যাকার্স নেই;

—‘ওহ্ হো, ভুলে গেছি। মনে করো না কিছু। আনি।’

ক্র্যাকার্স-এ কামড় দিয়ে সে বিনা ভূমিকায় বলল—‘তোমাকে সাবধান করে দিতে এলুম। আমার যা অভিজ্ঞতা সেটা তোমাকে না বলা বিশ্বাসঘাতকতা হবে। আফট্রল আমরা দুজনেই ইন্ডিয়ান। শুনে তুমি নিজে ঠিক করো কি করবে।’

আর এক চুমুক কফি পান হল, তনিমা বলল—‘অলয় মুখার্জি ইজ আ ফার্স্ট ক্লাস স্কাউন্ডেল। হ্যাণ্ডসম চেহারা। বিতিকিচ্ছিরি রকমের ভালো কেরিয়ার। সাংঘাতিক ভালো চাকরি। দেখেশুনে আমার বাবা মা আমি স-ব গলে বাটি বাটি জল হয়ে গেলুম। পাত্রপক্ষের চাহিদা কি? কিচ্ছু না, বনেদী ঘরের সুন্দরী গ্র্যাজুয়েট মেয়ে। দেখো আমি তাই কি না।’

তনিমা উঠে দাঁড়িয়ে তার টুপি খুলে সোফায় রাখল, চুল থেকে কি একটা খুলে নিল। কালো প্রপাতের মতো চুলের স্রোত ঝাঁপিয়ে পড়ল, সে চুলের, শুধু চুলেরই কী শোভা! মায়াপ্রপঞ্চময়। টুকটুকে ফর্সা। এরকম গোলাপি ইংরেজরা যাকে মিল্ক অ্যাণ্ড ক্রিম, বাঙালিরা যাকে দুধে-আলতা রঙ বলে এ জিনিস বনেদী আরব্য কি পারস্য ঘরানার মুসলমানী মেয়ে ছাড়া চট করে দেখা যায় না। কুচকুচে কালো চোখ, কালো ভ্রূ। ছোট্ট নাক। চিবুকটা যেন কাট্‌ গ্লাসের, নিখুঁত তার কাটিং, ছোট ছোট ঝিনুকের মতো আভাময় কান।

তনিমা বলল—‘হয়েছে?’

—‘কি হবে?

—‘দেখা হয়েছে আমি সুন্দরী কি না?’

—‘হয়েছে। তুমি পুতুলের মতো সুন্দর।’

—‘এটা কি একটা কমপ্লিমেন্ট হল?’

মেধা সতর্ক হয়ে গেছে, বলল—‘হল না?’

—‘কি জানি! ডল’স হাউজের অলুক্ষুণে অ্যাসোসিয়েশনটা পুতুল-টুতুল বললেই মনে এসে যায়। এনি ওয়ে আই টূ হ্যাভ ব্যাংগ্‌ড্‌ আ ডোর, দো ইট হ্যাজ ফেইলড্‌ টু রিজাউন্ড নাইক নোরা’জ। যাই হোক, এখানে এসে চমৎকার সাজানো সংসার পেয়ে গেলুম। সংসার করতেই আমি ভালোবাসুতুম। বি এটা পাশ করে কোনমতে বা্‌বাঃ বলে নিঃশ্বাস ফেলে বেঁচেছিলুম। ম্যাগাজিন পড়ে পড়ে আর টি ভি দেখে দেখে শিখে নিলুম কত কিছু যা বাগবাজারের চক মিলোনা বাড়িতে কল্পনাও করতে পারতুম না। ফুল পাতা গাছ। পর্ক, বেকন, ক্র্যাব, লবস্টার, কত রকম, কত কিছু। ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছি রূপবান গুণবান বরখানাকে। একবার এক বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছি। অনেকে আসবে। খুব সেজেছি, অলয় গাড়ি চালাচ্ছে আমি পাশে বসে। গাড়ি স্পীড নিয়েছে ভীষণ, আমার মনে হচ্ছে দুজনে মিলে আকাশে উড়ে যাচ্ছি। পেছন থেকে যমদূতের মতো ট্রাফিক সার্জেন্ট এসে ধরল। এ দেখাও, সে দেখাও, ট্রাফিক রুল ভেঙেছ, অমুক কোর্টে তমুক দিন জবাবদিহি করতে হবে। জানোই তো এখানকার ব্যাপার-স্যাপার। যমদূত চলে গেল। হঠাৎ আমার গালে একটা ঠাস করে চড় এসে পড়ল। অবাক হয়ে ফিরে দেখি অলয় লাল চোখে আমার দিকে চেয়ে রয়েছে। বলল—‘পেছনে সার্জেন্ট ধেয়ে আসছে, দেখোনি কেন? আমায় বলে নি কেন?’ চোখ দিয়ে ব্যথায় জল ঝরছে, আমি বললুম—‘এই জন্য তুমি আমায় মারলে?’

অলয় বলল—‘সী হোয়াট আই ডু নেক্সট্‌।’

আরেকটা ঘটনা। রবিবার। আমার শরীরটা কেমন ম্যাজ ম্যাজ করছে। অলয়ও বিছানায় শুয়ে মুখে সিগারেট নিয়ে আয়েস করছে। বলল—‘চা নিয়ে এসো।’ আনতে যাচ্ছি, টেলিফোনটা বেজে উঠল, হঠাৎ পেছন থেকে আমার চুলে হ্যাঁচকা টান। অবাক হয়ে দেখি অলয় ডান পায়ের বুড়ো আঙুল আর মধ্যমা দিয়ে আমার চুলের তলার দিকটা সাঁড়াশির মতো ধরেছে, মুখটা আমার আপনি উল্টে ওদিকে ফিরে গেছে। মুখের সিগারেট দাঁত দিয়ে চেপে বলল—‘টেলিফোনটা না ধরে কোথায় যাচ্ছো মহারাণী! হু ডু য়ু থিংক য়ু আর?’

আরও অনেক আছে। বলবার দরকার নেই। মনে হয় দুটোই যথেষ্ট। দেশেও অ্যাড দিয়েছে—ব্রিলিয়ান্ট ডিভোর্সী আমেরিকান গ্রীন কার্ড-হোল্ডার ওয়ান্ট্‌স্ সুটেব্‌ল্‌ ম্যাচ। রেস, কাস্ট, নো বার। ভালো মন্দ খেতে ভালোবাসে। রান্না বা গৃহস্থলীর কাজ করতে ঘেন্না করে। এখন তুমি ভেবে দেখো।’

তনিমা উঠে দাঁড়াল, চলে যাচ্ছে। মেধা বলল—‘দাঁড়াও দাঁড়াও, এ যে অদ্ভুত উপন্যাস শোনালে। এসব কথা তো গুজব হিসেবেও রটে। কাউকে তো কখনও বলতে শুনিনি।’

—‘কি করে বলবে? চড় মেরে যখন গালে পাঁচ আঙুলের দাগ বসে গেল, গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে বলল—‘আজ আর শেঠীর বাড়ি যাবো না। যদ্দিন না গালের দাগ মেলায় শপিং-এ পর্যন্ত বার হবে না।’ লোকের সামনে ডার্লিং-ডার্লিং করে আদিখ্যেতা করত তো সব সময়ে। ডিভোর্সের সময় অনেককে বলেছি। কেউ বিশ্বাস করে নি। তুমিও করতে না চাও করো না, মরো, আমি আমার কর্তব্য করে গেলুম। দু বছরের কনট্রাক্টে একটা কাজ করছিলুম, এপ্রিলে শেষ হয়ে যাবে। দেশে মা-বাবার কাছে ফিরে যাবো। আবার বিয়ে করবো। তবে আমেরিকায় আর আসছি না। আমার কাছে আমেরিকা ইজ ইকোয়াল টু অলয় মুখার্জি।

আই হেট দিস কানট্রি।’

মেধার আর অলয় মুখার্জিকে বিয়ে করা হল না। বেশ কিছুদিন ঘুরঘুর করেছিল ভদ্রলোক। কিন্তু দেখলেই তার হাতের দিকে চোখ চলে যেত মেধার। ধ্যাবড়া হাতটা। টকটকে লাল। আঙুলগুলো খুব ক্ষিপ্র মনে হয়। তনিমার গলায় কে যেন বলতে থাকত—‘আই হেট দিস কানট্রি, আই হেট দিস ম্যান।’

গ্যারাজ থেকে স্কুটারটা বার করলেন মেধা। মাথায় হেলমেট চাপিয়ে নিলেন। মৈথিলীর অনুষ্ঠান যখন তখন কাঁটায় কাঁটায় ছ’টায় আরম্ভ এখন পাঁচটা বেজে একত্রিশ মিনিট, যেতে হবে মধ্য কলকাতা। সময়মতো পৌঁছতে পারবেন তো?

অধ্যায় : ২
য়ুনিভার্সিটি ইনস্টিট্যুট। লম্বা চওড়া মেরুন রঙের ব্যানার। মেরুনের ওপর সোনালি। রঙগুলো খুঁজে বার করতে মেলা ঝামেলা হয়েছে। গড়পড়তা ডেকোরেটরের কাছে গড়পড়তা রঙই পাওয়া যায়। যেখানে সেখানে সেই একই জিনিস ঝোলে। অথচ বর্ণছায়ের সামান্য এদিক-ওদিক হলেই ফলাফল কত আলাদা! আমরা আলাদা কিছু বলতে চাই। এই সমাজ, এই সংসার, এই-ই জীবনযাপন তবু ঠিক এই নয়। কোথাও একটা আলাদা উদ্দেশ্য, আলাদা বক্তব্য আছে। রঙে সেটা প্রকাশ না হলে চলে? বাজার উজাড় করে ফেলেছে ওরা ঠিক পছন্দসই মেরুনের শেডের জন্য। সঠিক, বিশুদ্ধ সোনালির জন্য। তা সত্ত্বেও গুঞ্জনের পছন্দ হতে চায় না। সে বলে, ‘মেরুন-সোনালি একেবারে প্রিহিসটরিক কম্বিনেশন। তোরা প্লীজ আর কিছু খোঁজ।’ অতঃপর মেরুন-সাদা, নীল-সোনালি প্রস্তাব আসে। যতীনবাবু ডেকোরেটর অনেক দিনের অভিজ্ঞ লোক, তিনি হাত উল্টে বলেন—‘তোমরা চাও আমি করে দিচ্ছি। কিন্তু খুলবে না। দূর থেকে চোখে পড়া চাই তো!’ অতএব মেরুন-সোনালিই বহাল। গুঞ্জনের আপত্তি সত্ত্বেও। গুঞ্জনের গুঁইগাঁই অগ্রাহ্য করে। গুঞ্জন সিং-এর অবশ্য ব্যাপারই আলাদা। ও সন্ধেবেলায় ইনটিরিয়র ডেকোরেশনের কোর্স নিচ্ছে। ক্রোম ইয়লো, সের‍্যুলিয়ান ব্লু, সানসেট অরেঞ্জ এইসব ওর রঙের নাম। উইলিয়ম মরিস, চিপেনডেল এইসব বুকনি সে যখন তখনই ঝাড়ে। আরে বাবা ব্ল্যাক মানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে এমনি তো সব তোর হবু-ক্লায়েন্ট। টাকাটা তাদের খরচ করতে পারলেই ভালো। হাজার হাজার টাকা দিয়ে নটরাজ কিনবে, শঙ্খ কিনবে, গণেশ-টণেশ কিনবে। আর এ হল ছাত্রসঙেঘর ব্যাপার, ছাত্রদের হাতখরচের টাকা দিয়েই যা-কিছু সব। মৈথিলী বার বার বলেছে : ‘ফান্ডের অবস্থা আমাদের ভালোই। কিন্তু বাইরের জাঁকজমক করতে গিয়ে টাকাটা আমরা খরচ করছি না। আসল উদ্দেশ্যটার কথা কেউ এক মিনিটের জন্যেও ভুলিব না। সেখানে কমপ্রোমাইজ নয়।’

‘লোকোৎসব, চ্যারিটি শো, আয়োজক ছাত্রসংঘ।’ মাঝে মাঝেই লাউড স্পীকারে একটা গম্ভীর গলা ভেসে আসছে—‘আমরা সামগ্রিক উন্নয়ন চাই। শিক্ষা যদিও যে কোনও উন্নয়নের প্রাথমিক শর্ত, আমরা জানি আর্থিক উন্নয়ন ছাড়া শিক্ষাও কতদূর ব্যর্থ হতে পারে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থ এই তিনটে আমাদের প্রথম লক্ষ্য। আপাতত আমাদের উদ্দেশ্য একটি অনুন্নত, সহায়হীন গ্রামকে এই তিন স্তরেই সমর্থ করে তোলা। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার কেওড়াখালি গ্রাম….’

ইনস্টিট্যুটের গেটের বাইরে জটলা করছিল পাঁচ ছ’জন ছেলে মেয়ে। শান্তনু বলল—‘কি দিচ্ছে রে উজান! জ্ঞানকুম্ভ উজাড় করে দিলে যে!’

সুমেরু শান্তনুর সাক্ষাৎ সহপাঠিনী এবং খুড়তুতো বোন। সে মন দিয়ে তার আইসক্যান্ডির শেষাংশটুকু চাটছিল। সবুজ জিভ বার করে বলল—‘তুইও তোর কুম্ভ উজাড় করে দে না। দে! কে তোকে বারণ করছে।’

‘মাইকের ধারে কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছে না যে উজোটা! দেখলেই বলছে—‘শান্ত, প্লীজ তফাৎ যা।’

—‘তাই সেই থেকে ঝুট হ্যায় ঝুট হ্যায় স্লোগান দিচ্ছিস?’ পুলকেশ সিগারেটের ছাই টোকা দিয়ে ফেলে বেশ কায়দা করে দাঁড়িয়ে বলল।

সুমেরু মন্তব্য করল ‘ওকেও একটু মাইকটা ছাড়লে পারত। ফাটা কাঁসির আওয়াজও তো একটা বিশিষ্ট আওয়াজ! ফর এ চেঞ্জ ভালো লাগতে পারে।’

শান্তনু বললে- ‘যা যা বাজে বকিস না, আইস-ক্রিম আর কোল্ড ড্রিংক খেয়ে খেয়ে তো নিজের গলাকে ট্রাঙ্কে পুরেছিল। গান করতে বসিস গাধা ছুটে আসে।’

সুমেরু হারবার পাত্রী নয়। সে হেসে বলল- ‘তাই সেদিন যখন মারোয়া সাধছিলুম, তুই ছুটে এলি!’

পুলকেশ বলল—‘ওঁ শান্তি ওঁ শান্তি। তোরা তোদের লাঠালাঠি থামাবি? আসলে কি জানিস শান্তনু, কেউ কেউ নিজের গলা শুনতে বড্ড ভালবাসে।’

শান্তনু বলল—‘ভবিষ্যতে তারাই অব্যর্থ পলিটিক্যাল লীডার এবং ব্যর্থ অভিনেতা হয়। উজোটার নেতা হওয়া কেউ আটকাতে পারবে না।’

—‘সে তো হতেই পারে, বাড়ির ট্রাডিশন ফলো করতেই পারে।’ পুলকেশ বলল।

—‘বাড়ির ট্রাডিশন ফলো করবে উজান আফতাব? তবেই তোরা খুব বুঝেছিস,’ সুমেরু কাঠির সঙ্গে লেগে-থাকা অংশগুলো চেটে পুটে নিতে নিতে বলল।

—‘তবে কি ও রেভেলিউশন করবে?’-পুলকেশ জিজ্ঞেস করল।

—‘ও রেভিলিউশনের এককাঠি বাড়া কিছু করবে।’ সুমেরু বলল, ‘না করে আমার নাক কান কেটে নিস।’

শান্তনু বলল—‘নাক কান দুটোই দিয়ে দিলি? ব্যালান্স রাখবি কি দিয়ে?’

শুভব্রত এই সময়ে হন্তদন্ত হয়ে এসে বলল—‘হ্যাঁরে, ক্লাসে তো সব ভালো ভালো পাত্তর দেখেই টিকিট-বই ধরিয়েছিলি। তো সিনিয়ার কেউ আসছে না কেন বল তো!’

ছাত্র সংঘের সদস্যরা স্থানীয় ও বৃহত্তর কলকাতার কলেজ ও যুনিভার্সিটিতে ছড়িয়ে আছে এটা সত্যি। যে যার শিক্ষায়তনে টিকিট বিক্রি করছে। গোটা গোটা টিকিট-বই বাইরেও বিক্রি হয়েছে। আশা ছিল অনেক অভিভাবক স্থানীয় ব্যক্তিরা টিকিট কিনেছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে গেট দিয়ে যারা দলে দলে ঢুকছে তাদের কেউই বাইশ পেরোয় নি। এরাই ঢুকছে প্রচুর, হই-হল্লা করতে করতে।

শান্তনুদের পাশ দিয়েই চার পাঁচ জন হাত ওপরে ছুড়ে হাসতে হাসতে ঢুকছে। একজন বলল—‘এই, টিকিট বিক্রির সময়ে যে বলল—‘ছাত্রমেলা, এ কেমন ছাত্রমেলা রে! তাহলে তো কলেজর কেলাসগুলোও ছাত্রমেলা!’

আরেকজন বলল—‘আহা হা হা, এটা ওদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, বুঝছিস না? মেয়েলি গলায় জবাব হল—‘সেটা পরিষ্কার করে বললেই তো পারত! মেলা ইজ ফাইন, অল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানস আর বোর্‌স। গোড়ায় স্পীচ, মাঝে স্পীচ, শেষে স্পীচ। মালা ফালা পরানো। বোগাস।’

—‘যা বলেছিস। কিছু লেখা টেকাও তত নেই। ইংরেজিতে একেই বলে চিটিংবাজি।’

—‘জার্মানে কি কয় জানিস?—চীটাগং-।’

আরেক জন সরু গলায় বলল—‘এবং ফ্রেঞ্চে ইহাকেই বলিয়া থাকে সাঁজেলিজে।’

দলটা হাসতে হাসতে ঢুকে গেল।

শান্তনু বলল—‘দিস ইস হিউমিলিয়েটিং। ছাত্রমেলা-ফেলা কি বলছে রে?’

—‘ওসব থ্যাচার সাহেবার ব্রেনওয়েভ’ সুমেরু বলল—‘সারা বছর ধরে ছাত্রমেলা করবে, এই লোকোৎসব দিয়ে শুরু…প্রদর্শনী..সেমিনার..কর্মশালা..অল অন নিরক্ষরতা দূরীকরণ..এই সব সেদিন ক্যানটিনে এসে বলছিল না! ওর সেলসম্যানরা কেউ কেউ নিশ্চয় সে সব বুকনি তুলে নিয়ে ওদিকে নামিয়ে দিয়ে এসেছে।’

কোরা রংএর শাড়ির ওপর নীল গোলাপি ব্যাজ লাগিয়ে গুঞ্জন এদিকে আসছে দেখা গেল। হাতে এক গোছা ব্যাজ।

—‘এই তোমরা এখনও ব্যাজ পরো নি। শো তো শুরু হতে চলল।’

শান্তনু বলল—‘আমরা ভলান্টিয়ার নই। সুমেরু বা পুলকেশ হতে পারে। আমি নই।’

—‘কী তবে তুই? আর কোন কাজে লাগবি?’

—‘কেন? ঘোষক, পরিবেশক, প্রতিবেদক।’

—‘ওরে বাবা রে থামলি কেন? বলে যা.. প্রচারক, প্রসারক, প্রতারক…’ সুমেরু বলল—‘আমাকে একটা দিতে পারিস গুঞ্জন। বেশ স্মার্ট লুকিং রে তোর ব্যাজগুলো।’

গুঞ্জন ব্যাজের গোছাশুদ্ধ হাতটা শট করে সরিয়ে ফেলল—‘ও সব চলবে না। গজল্লা ছাড়ো। আইসক্রিমও ছাড়ো। ছেড়ে ভেতরে যাও, হলের সামনে লোক আছে। টর্চ নিয়ে ভেতরে যাও। নইলে পাচ্ছে না। স্পেশাল ডিজাইন, অর্ডার দিয়ে করিয়েছি ঠিকই। তাবলে এগুলো গয়না নয়।’

হলের ভেতর এই সময়ে আলো নিভতে শুরু করল। নিভন্ত আলোয় বোঝা যায় হল প্রায় ভর্তি। ব্যস্ত-সমস্ত কর্মীরা মাথা নিচু করে স্টেজের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে। হলময় একটা মৃদু গুম গুম ধ্বনি। জমাটি আসরের লক্ষণ। এবং যেহেতু সবাই তরুণ-তরুণী, অনুষ্ঠান দেখা বা শোনার আগ্রহের চেয়ে পরস্পরের সঙ্গে আলাপ ও মত বিনিময়ের ইচ্ছেটা বেশি প্রবল।

সামনের সারিতে মউমিতা তার পাশে-বসা চিত্রলেখাকে বলল—‘এখনও দেখতে পাচ্ছিস না? ওই তো থার্ড রোয়ের ডান দিকের কোণে!’

মউমিতা ও চিত্রলেখা প্রতিবেশী। এক হাইরাইজে থাকে। কিন্তু দুজনের কলেজ, বিষয় সবই আলাদা। মউমিতার চিত্রলেখাকে ছাত্র সংঘের সদস্য করার ইচ্ছে। চিত্রলেখার কৌতূহল খুব। ছাত্র সংঘ গড়েছে কলকাতার কিছু নামকরা ছেলে মেয়ে যাদের অনেককেই ছাত্রমহলে এক ডাকে চেনে।

চিত্রলেখা বলল—‘কোন জন?’

—‘পেছন ফিরে কথা বলছে। ঘাড় ফেরালেই মুখটা পুরো দেখতে পাবি। চেক শার্ট।’

—‘ঢেউ খেলানো চুল মাথায়? শামলা?’

—‘উঃ। ওকে আমি চিনি না। ওর পাশে। বেশ ফর্সা। ঝাঁকড়া চুল। সেকেন্ড ফ্রম রাইট!’

—‘দাঁড়া দাঁড়া বুঝেছি। ও-ই দেবপ্রিয় চৌধুরী?

—‘ও-ই দেবপ্রিয় চৌধুরী। কৌতুহল মিটল তো? এবার নাচটা দেখতে দে।’

—‘আহা কি নাচ। বিহু নাচ, চালি নৃত্য একটা যা হোক বলে দিলেই তো লোকনৃত্য হয়ে যায় না! মেয়েগুলো তাদের এক সাথে পা ফেলাটাও প্র্যাাকটিস করেনি মনে হচ্ছে। স্টেজের এদিকটাই বেশি ইনটারেস্টিং।’

—‘বাবা, এরই মধ্যে এতো? তবু তো এখনও উজানকে দেখিস নি!’

—‘উজান! উজান কে!

—‘উজানকে আমরা টি. ডি. এইচ বলি নিজেদের মধ্যে। টল, ডার্ক, হ্যান্ডসম, মেয়েদের হার্ট থ্রব। তুই উজান আফতাবের নাম শুনিস নি?’

—‘শুনেছি শুনেছি মনে হচ্ছে! ক্রিকেট, না?’

—‘টেনিসও।’

—‘কোনটা রে উজান?’

—‘আগে দেবপ্রিয় চৌধুরীকে গলাধঃকরণ কর। কোন কাল থেকে নাম শুনছিস, আজই তো প্রথম চক্ষু সার্থক করলি?’

—আচ্ছা মউ, সত্যি সত্যি দেবপ্রিয় গাঁয়ের ছেলে!’

—‘সেন্ট পার্সেন্ট সত্যি। রেকর্ড মার্কস পেয়েছিল জানিস তো?’

—‘জানি বলেই তো বলছি, গ্রীন রেভোলিউশন না কি রে?’

—‘বলতে পারিস।’

—‘আলাপ করাবি তো আজ?’

—‘কথা দিতে পারছি না। ওকে ধরা মুশকিল।’

এই সময় রঙ্গশালায় দেবপ্রিয় পাশের ছেলেটিকে কি যেন বলে উঠে দাঁড়াল। পকেটে দু হাত ঢুকিয়ে, মাথা সামনে ঝুঁকিয়ে অন্যমনস্কভাবে সে চলে যাচ্ছে। সামনের চুলগুলো কপালের ওপর এলোমেলোভাবে এসে পড়েছে। যতটা লম্বা তার চেয়েও বেশি দেখায় দেবপ্রিয়কে। কারণ পাগুলো ওর বেশি লম্বা। হাঁটার ধরণটাও কেমন আলগা আলগা। বড় বড় পা ফেলে খুব কম সময়ের মধ্যে সে পার হয়ে গেল অডিটোরিয়ামটা। প্রথমটা স্টেজের আলো ছিটকে পড়েছিল তার মুখে। অল্পস্বল্প দাড়ির ওপর। খয়েরি চেক শার্টটার কাঁধের ওপর। তারপর তার মুখ অন্ধকার থেকে আরও অন্ধকারে চলে গেল।

আসলে দেবপ্রিয়কে নিয়ে ছাত্রমহলে, বিশেষত ছাত্রীদের মধ্যে খুব কৌতূহল। ছেলেটি অতিমাত্রায় চুপচাপ। অহংকারী তো নয়ই। বিনয়ীও নয় আদৌ। কেউ বলে অজ পাড়া-গাঁ থেকে এসেছে। কেউ বলে মফঃস্বল শহর থেকে, কেউ আবার বলে ওর পরিবার ভিন্ন রাজ্যে থাকে, ও বরাবর বোর্ডিঙে মানুষ। এরকম কথাও প্রচলিত আছে যে অভিভাবক বলতে ওর কেউ নেই। দূর সম্পর্কের আত্মীয়-পরিবারে টিউটর হিসেবে থাকে। যেহেতু দেবপ্রিয় মিশুক নয়, কারও কোনরকম কৌতূহলকে তৃপ্ত করবার পাত্রই নয়, তাই কৌতুহল বেড়েই চলে। কিছু মেয়ে চটপট তার জন্য পাগল হতে থাকে। কিন্তু বেশিদিন এ অবস্থা থাকে না। কারণ দেবপ্রিয় না রাম না গঙ্গা। সে যেন নিজের ভেতরে কোথাও ডুব গেলে বসে আছে। আবহমান কাল থেকে সে যেন কোথাও থেকে অন্য কোথাও উদ্দেশ্যহীনভাবে হেঁটে যাচ্ছে। তার চোখ নেই পথের দুপাশে, মাথার ওপর আকাশে, অথবা চারপাশের বাতাবরণে কি ঘটছে দেখার। এই উদাসীনতা তার এক ধরণের আবরণ। এমন এক মোহ-আবরণ যা চট করে ছিন্ন হতে চায় না, কষ্ট দেয়। এই উদ্দেশ্যহীনতা তার আকর্ষণও। কারণ, আপাততঃ জগতে তো বটেই, এমন। কি এই ছাত্র-জগতেও এমন বিশেষ কেউ নেই, যে উদ্দেশ্যহীন, কোনও নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছবার জন্য যে হিসেব-পত্র করে এগোচ্ছে না। এত মন্থর, এতো আনমনা, অথচ এতো আত্মস্থ ঠিক কাউকে চোখে পড়ে না আজকাল। যদিও জানা যায় না দেবপ্রিয় সত্যি সত্যিই উদাসীন, লক্ষ্যহীন, না কি এটা শুধুই তার সম্পর্কে একটা ধারণা। তার চারপাশে সেই অজানারও আবরণ। অজানা মানেই রহস্য, রহস্য মানেই মোহ।

স্টেজের ওপর এখন ঘোষক। ঠিকঠাক বলতে গেলে ঘোষিকা। মাইক হাতে ভাঙা-ভাঙা মিষ্টি গলায় বলল—‘এইবার আরম্ভ হবে আমাদের আজকের আসল অনুষ্ঠান। নাচ সহযোগে বাউলগান। আপনারা শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলায় বা কেঁদুলিতে জয়দেবের মেলায় বাউল গান শুনেছেন। আমাদের বাউল-বন্ধুদের প্রথম বৈশিষ্ট্য এঁরা কেউই কোনদিন মাইক্রোফোনের সামনে, শহর বাজারের পরিবেশে গান করেন নি। এঁদের গানে পাবেন সহজিয়া শ্রেণীর সরলতা ও বিশুদ্ধতা। এঁদের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য…’

মউমিতার সঙ্গিনী চিত্রলেখা বলল—‘কে রে মেয়েটা! জঘন্য দেখতে। মউমিতা একটু বিরক্ত হয়ে বলল—‘শুধু দেখিসনি। শোনও। ইচ্ছে হয় চোখ বুজে শোন। গলা, ডেলিভারি, থ্রো এগুলো শোনবার জিনিস।’

চিত্রলেখা বলল—‘তা অবশ্য। গলাটা সত্যি দারুণ!’

—‘স্বীকার করছিস তাহলে? এ হল মৈথিলী ত্রিপাঠী।’

—‘এ-ইতোদের মৈথিলী?’ চিত্রলেখা উত্তেজনায়, সোজা হয়ে বসল, ‘তোদের বিশ্ববিখ্যাত স্কুলের বিশ্ববিখ্যাত ফার্স্টনন্দিনী? যে এইচ-এস-এ স্ট্যান্ড করবে বলে তোদের হোল স্কুল বাজি ধরে হেরেছিল? এখন কি করছে রে?’

—‘ডাক্তারি পড়ছে। জয়েন্টে ফার্স্ট এসেছিল। জয়েন্টের রেজাল্ট নিয়ে তো আর হই-হই হয় না।’

—‘বাব বাঃ। কি করে পারে রে?’

মউমিতা বলল—‘কপাল!’

—‘সবই কপাল বলছিস?’

—‘কপালের ভেতরেও কিছু আছে ডেফিনিট।’

ঘোষণাটা শেষ হয়ে গেছে। মৈথিলী ত্রিপাঠী মাইক ছেড়ে বাঁ-উইঙ্‌স্‌-এর দিকে ঢুকে গেল। একটু পরেই দেখা গেল পাশের দরজা দিয়ে সে রঙ্গশালায় ঢুকছে। মৈথিলী বেশি লম্বা নয়। বেশ বলিষ্ঠ স্বাস্থ্য, মুখটা চওড়া। নাক একটু চ্যাপটা ধরনের, ফলে চেহারায় মধ্যে একটা চৌকো ভাব এসে গেছে। বেশ কালো রং কিন্তু খুব চকচকে। ঠোঁটদুটি বেশ স্কুল এবং ঢেউ খেলানো। তার চোখের মণি খয়েরি। একটু মোটা সংক্ষিপ্ত ভ্রু। চুল ঈষৎ লালচে। কপালের ওপর কয়েক গুচ্ছ, কানের লতির তলা থেকে ফণার মতো কিছু চুল বেরিয়ে আছে, বাকিটা পিঠের ওপর। মৈথিলী ব্যাগিজ ছাড়া কিছু পরে না।। ওপরের শার্টটা মেটে লাল, তাতে সাদা চক্র চক্র ছাপ। ছোট চাকা, বড় চাকা।

মউমিতা চাপা গলায় ডাকল—‘মৈথিলী, এখানে জায়গা আছে, বসবে?’ তার গলায় সম্ভ্রম, আগ্রহ। সে যে মৈথিলীকে একটা উঁচু বেদীর ওপর বসিয়ে রেখেছে সেটা তার প্রশ্নের ধরনেই স্পষ্ট।

মৈথিলী চট করে মুখ ফিরিয়ে তাকাল, মুখে মৃদু অন্যমনস্ক হাসি। বলল—‘আমি মাঝের রোয়ে একটা জায়গা রাখতে বলেছি লুকুকে। মাঝখান থেকে দেখব, ডোন্ট মাইন্ড।’ বলতে বলতেই সে সামান্য নিচু হয়ে স্টেজের সামনেটা পার হয়ে গেল।

চিত্রলেখা বলল—‘ডাঁটিয়াল? না রে?’

মউমীতা বলল—‘ডাঁটিয়াল? কই না তো। মাঝখান থেকে দেখবে বলল শুনলি না! লোকগীতি নিয়ে মেতেছে এখন ওর কোনদিকে খেয়াল নেই। এই যে বাউল ছেলেগুলো গাইছে ওদের দেখাশোনার পুরো দায়িত্ব ও নিয়েছে। নিজেই খুঁজে বার করেছে ওদের, ট্যাঁকে করে করে ঘুরছে চব্বিশ ঘণ্টা। রাম পাগল একটা।’

—‘তোর সঙ্গে আলাপ কেমন?’

—‘আছে। তবে ওদের গ্রুপ আলাদা, ওরা ছাত্রসংঘের একজিকিউটিভ কমিটির মেম্বার। সমস্ত প্ল্যানিং, পলিসি মেকিং ওরা করে, আমরা সাধারণ সদস্য। চাঁদা দিই। প্ল্যান, পলিসির কথা শুনি। বাইরে থেকে কাজ করি। ওই যে লুকু শুনলি না? লুকু ওর ফাস্ট ফ্রেন্ড, স্কুল ডেজ থেকে। একেবারে ল্যাং বোট, লুকুটা স্লাইট ডাঁটিয়াল। মৈথিলী কিন্তু ভীষণ ভদ্র মেয়ে, প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদা করে আলাপ করে, ডেকে ডেকে, প্রথম যে ছাত্রসংঘের সভ্য হবে তাকে কেন্দ্রীয় কমিটির সবার সঙ্গে বসতে হবে। রীতিমত ইনটারভিউ, কেন সদস্য হচ্ছে, কি আশা করে, দেশ সম্পর্কে ভাবে কি না, রাজনীতি করে কি না।’

‘ছাত্রসংঘের রাজনীতি কি রে? নিশ্চয়ই মার্কসিস্ট।’

‘একেবারেই না। কোনও দলীয় রাজনীতি করে এমন ছাত্র-ছাত্রীকে আমরা সদস্যই করি না। মৈথিলী বলে, যারা রাজনীতি করে তারা একভাবে চেষ্টা করছে, আশা করি দেশের জন্যই করছে। এ নিয়ে বেশি তর্ক-বিতর্কের মধ্যে যেতে চাই না। কিন্তু ছাত্রসংঘ এদের সমান্তরালে চলবে। আমাদের প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ অ-রাজনৈতিক। আমরা কি স্টাডি করি জানিস তো? পশ্চিমবঙ্গ-ভিত্তিক সোস্যাল সায়েন্স বলতে পারিস।’

‘দারুণ পার্সন্যালিটি, না?’

‘ওরে ব্বাবা দারুণ। নইলে এত বড় প্রতিষ্ঠান চালাতে পারে? একে আই এ এস এর মেয়ে তার ওপর লেখাপড়ায় ওইরকম। যতটা করা উচিত ততটা ভালো রেজাল্ট অবশ্য সেই এইচ এস থেকেই করছে না। করবেই বা কি করে? সারাক্ষণই তো কোনও না কোনও কাজ নিয়ে রয়েছে। চিন্তা কর মেডিক্যাল কলেজের সিলেবাস সামলে সারাক্ষণ ছাত্রসংঘ করছে। ওর সঙ্গে কাজ করতে কত বস্তিতে গেছি। সাক্ষরতা-অভিযানে যাবে আমাদের সবাইকে নিয়ে। মাসি, পিসি, চাচা করে এমন গল্প জুড়ে দেবে না! বর্ণ-লীডার রে মেয়েটা। ওই যে ওই দ্যাখ লুকু…’

‘কই?’

‘ওঃ তুই তালকানা আছিস। পেছন থেকে এগিয়ে আসছে, দ্যাখ না!’

—‘সাদা চুড়িদার, পিংক ওড়না?’

—‘হ্যাঁ।’

—‘ফ্যানটাসটিক দেখতে যে রে!’

—“ও তো স্কুল ডেজ থেকে মডলিং করছে টুথ পেস্টের, চা-এর।’

—‘তাই কেমন চেনা-চেনা লাগছিল।’

—‘এখন আর করে না অবশ্য। ওর যা পীয়ার গ্রুপ, তাল রাখতে হলে সীরিয়াস হতেই হবে। ও তো দেখছি মৈথিলীর জায়গা রাখে নি, নিজেই বসতে পাচ্ছে না বোধহয়। গেল কোথায় মৈথিলীটা।’

—‘তুই যে বললি ও মৈথিলীর ল্যাং-বোট!’

—‘শুধু আমি কেন! সবাই বলে।’

—‘বিউটি অ্যান্ড দা বীস্ট যে রে।’

—‘যা বলিস।’ মউমিতা কথা বাড়াতে চাইল না। স্পষ্টই বোঝা যায় যে মৈথিলী ত্রিপাঠীর গুণমুগ্ধ। চিত্রলেখার কথা শুনতে তার একটুও ভালো লাগছে না। মউমিতা ও চিত্রলেখা এবার মঞ্চের বাউল গানে মন দিল। ঘুরে ঘুরে নাচছিল যে ছেলেটি তার মুখটা খুবই কচি-কাঁচা, বয়স এদের থেকে কম বই বেশি হবে না। এখনও গোঁফ ওঠে নি। কোমল চামড়া। মঞ্চের পেছনের অংশে তার সঙ্গে কোনাকুনি দাঁড়িয়ে গাইছে আর একটি ছেলে। সে গানের বিশেষ বিশেষ জায়গায় বিশিষ্ট বাউল ভঙ্গিতে পাক খাচ্ছিল। এ ছেলেটির বয়স সামান্য বেশি। মৈথিলী এর নাম ঘোষণা করে কেষ্টপদ দাস। সামনের ছেলেটি নিরুপাধিক পালান।

মৈথিলী জায়গা পায়নি। লুকুকে সে মোটে দেখতেই পায়নি। মঞ্চের ওপরকার ব্যবস্থা মৈথিলীর, সে তার গ্রামীণ অতিথিদের সাজ পোশাক, স্টেজে তাদের দাঁড়াবার জায়গা, আলোকসম্পাত ইত্যাদি নিয়ে গোড়া থেকেই ব্যস্ত আছে। লুকু খাওয়া-দাওয়ার দিকে। ইনস্টিট্যুটে এসেছিল দুজনে এক সঙ্গে। কিন্তু তারপর থেকে আর সম্পর্ক নেই। ভেবেছিল দুজনে বসে দেখবে এক সঙ্গে। অবশ্য একটা রুমাল ফেলে বা ব্যাগ রেখে ‘জায়গা রাখা’ তাদের কারোই পছন্দ নয়। এক যদি স্বেচ্ছাসেবকদের কাউকে বসিয়ে রাখা যেত। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, লুকু এ ব্যবস্থাটা করতে সমর্থ হয়নি। কিছুক্ষণ জায়গা পাবার আশায় বৃথা ঘুরে, বিরক্ত হয়ে সে মঞ্চের দিকে যাচ্ছিল, উইংস-এর আড়াল থেকে একটা টুল পেতে বসে শুনবে, পালান হয়ত তাকে দেখলে উৎসাহিত হতে পারে। ছেলেটা কখনও এত লোককে গান শোনায়নি। তার ওপর সামনে মাইক যন্ত্র। ভিতু ভিতু চোখে তাকিয়ে বলেছিল, —“বাব্‌রে, কুয়োর মধ্যে এ যে দেখি অনেক নোক গো দিদি, মাইক যন্তরে গলা বসে যায় না তো।

এই সময়ে মৈথিলী রঙ্গশালার বাইরের করিডর দিয়ে প্রোফেসর মেধা ভাটনগরকে ঢুকতে দেখল। মৈথিলী তাড়াতাড়ি এগিয়ে যেতে মিস ভাটনগর বললেন—‘মৈথিলী, আমি কিন্তু অনেকক্ষণ এসেছি। একদম পেছনে বসেছি। তোমাকে খুঁজতেই এদিকে এলাম।

মৈথিলী বলল—‘সে কি আপনি সামনের দিকে জায়গা পান নি? ভলান্টিয়াররা কি করছে?’

—‘শোনো, ওরা বলেছিল, প্রমিত সামনের সারিতে জায়গা করে দিতে চাইছিল। আমি ইচ্ছে করে সামনের দিকে আসিনি। কাউকে উঠিয়ে বসতে আমার একদম ভালো লাগে না। তাছাড়াও, তোমাদের মঞ্চটাই তো সব নয়, প্রেক্ষাগৃহটাও আমার দ্রষ্টব্য ছিল, আই ওয়ান্টেড টু সি দা এনটায়ার প্রজেক্ট ইন ইটস রাইট পার্সপেকটিভ। রূপাদের গ্রুপের নাচটা কিন্তু একদম লোকনৃত্য হয়নি। ওদের অনেক অভ্যেস করে তবে নাবা উচিত ছিল। বাউল গানটা তোমরা একদম খাঁটি জিনিস দিচ্ছো, লোকনৃত্যের বেলায় সিউডো ফোক ডান্স দিচ্ছো এটা ঠিক না। কসটিউম যদিও খুবই ভালো হয়েছে।’

মৈথিলী বলল—কসট্যুম গুঞ্জনের এলাকা। নাচের পরিকল্পনা রূপা নিজেই করেছে। মধুচ্ছন্দাদি তো এখন ট্রুপ নিয়ে উত্তরভারত ট্যুর করতে গেছেন। পরের বারে ওঁকে ধরব।’

—‘রূপা অবশ্য খুব খারাপ করে নি। কিন্তু টিকিট বিক্রি করেছে যখন, এর থেকে ভালো স্ট্যান্ডার্ড লোকে আশা করবে। যাই হোক পালান অসাধারণ। কেষ্ট দাসও ভালো। কিন্তু পালান একটা আবিষ্কার। এমন বাঁশের বাঁশির সুর অথচ এতো জোরালো আমি শুনেছি বলে মনে পড়ছে না। তবে ও বড্ড বাচ্চা। ওর গলা পাল্টাবে।’

মেধা ভাটনগরের কথায় মৈথিলী মনে মনে খুব উদ্বেলিত হয়ে উঠল। তার কিশোর-বন্ধু পালানের গলা সোনালি জরির সুতোর মতো, চকচকে, টানটান, ধারালো। একেক সময়ে যেন তারার সা ছুঁয়ে আসছে। কেষ্টপদ আর পালানের এই দ্বৈত সঙ্গীত তারই পরিকল্পনা। যে পটভূমিতে বাউলগান সবচেয়ে মানানসই, সেই প্রাকৃতিক পরিবেশ এখানে নেই। মৈথিলীর মনে হয়েছিল তার কিছু একটা বিকল্প চাই। তাই এই দ্বৈত সঙ্গীত। পালানের চিকণ গলার সঙ্গে কেষ্টপদর ভারি খসখসে তসরের মতো গলার বুনোট সত্যি একটা অভিনব পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। নাচের পুরো এফেক্টটা সে দেখতে পাচ্ছে না। পালান প্রায় সর্বক্ষণই নেচে নেচে গাইছে, তার হাত পা মুখ সবই খুব কচি। ঠিক একটা সতেজ লাউডগার মতো তার নড়ন-চড়ন, খুব হালকা ফুরফুরে। কেষ্টপদ নাচছে তার সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে, খুব মাঝে মাঝে, এ যদি ডাইনে পাক দেয় তো ও দেয় বাঁদিকে।

মেধা বললেন, ‘আরও হাফ-ডজন বাউল ছেলেকে গানের অন্তরায় সঞ্চারীতে ঢুকিয়ে দিতে পারো এর পর। মুখটা পালান একা আরম্ভ করল, তারপর ধরো ওই ছেলেটি কেষ্টপদ, তারপর একে একে বাকিরা। তাতে তোমার ভিশুয়ালটা আরও জমবে।’

মৈথিলী বলল—‘আর কিন্তু যোগাড় করতে পারি নি, দিদি।’

—‘আহা পারো নি, এর পরে পারবে। পালানদের যদি ভালো পাবলিসিটি দিতে পারো তো ওরাই যোগাড় করে আনবে।’

মৈথিলী একটু দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে বলল, ‘এই অনুষ্ঠানটা কিম্বা বাউলদের পাবলিসিটি দেওয়া কিন্তু আমাদের সঙেঘর আসল উদ্দেশ্য নয় দিদি। আমাদের সব কথা এখনও আপনাকে বোঝানো হয় নি।’

মেধাদি আশ্চর্য হয়ে তাকালেন—‘তোমরা অবশ্য খুব বেশি কথা আমায় বলো নি, মৈথিলী। কিন্তু আমি যতদূর বুঝেছি তোমাদের প্রজেক্ট ঠিকঠাক চালাতে হলে এরকম অনুষ্ঠান আরও করতে হবে। তাছাড়া একটা গ্রামের উন্নয়ন যখন করছ, তখন সেটা করতে গিয়ে অন্যান্য যাদের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে তাদেরও অটোমেটিক্যালি কিছু না কিছু ফললাভ হবেই। উন্নয়নও হবে। কোনও কাজই স্বতন্ত্র, আইসোলেটেড নয়। নদী যখন পাহাড় থেকে নামছে তখন তাঁর লক্ষ্য সমুদ্র, কিন্তু পুরো অববাহিকাটা সে সবুজ করে দিয়ে যাচ্ছে। তোমরা একটা সচেতন, চিন্ময় নদী, তোমাদের অববাহিকা তোমরা কনশাসলি সবুজ, মরুহীন, সমৃদ্ধ করবে। উজান কোথায়?’

—‘উজান বাইরের মাইকটা কনট্রোল করছে, তাছাড়াও আরও অনেক কাজ। কি জানি কোথায়।’

—‘দেবপ্রিয়কে কোনও কাজ দাও নি? মনে হল ও বেরিয়ে গেল।’

—‘জানেন তো মেধাদি, ও পেছন থেকে অনেক কিছু করে দেয়, সামনে কিছুতেই আসবে না।’

মেধা একটু চিন্তিত হয়ে পড়লেন। দেবপ্রিয়র এই কূর্মস্বভাব কিছুতেই কাটানো যাচ্ছে না। বললেন—‘যাক তোমাদের টাকা কেমন উঠেছে?’

—‘আমাদের ফাণ্ডের টাকা সামান্যই খরচ হয়েছে। এই অনুষ্ঠানের জন্য সামান্য যেটুকু হয়েছে ইলেকট্রিসিটি, টিকিট-ছাপানো আর পালানদের দক্ষিণাবাবদ কিছু গিয়ে ব্যালান্স ভালোই আছে। আর শো থেকে মোট কত উঠল সেটা এখনও গোনা গাঁথা হয়নি। ওটা দেব করবে।’

—‘ঠিক আছে। আমি কিন্তু একটু পরেই চলে যাবো। আমার কাজ আছে জরুরি।

—‘গানগুলো পুরো শুনবেন না?’

—‘কিছুটা তো শুনবোই। শেষ অবধি থাকতে পারছি না। তুমি হিসেবপত্র সেরে কাল-পরশুর মধ্যে একবার এসো, তোমরা সকলেই এসো। নিরঞ্জনকেও আমি জানিয়ে রাখবো। ঠিক আছে তো?’

মেধা আর না দাঁড়িয়ে রঙ্গশালার দিকে চলে গেলেন।

লুকু অডিটোরিয়ামে ঢুকেছিল আগে একবার। জায়গা ছিল না, তাকে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল, তাছাড়াও সে বড় অন্যমনস্ক ছিল, যেন কাউকে খুঁজছে, না পেয়ে হতাশ, বিভ্রান্ত বোধ করছে। এই সময়ে সে পেছন দিক থেকে এসে আরেকবার ঢুকল। মেধা তখন নিজের জায়গায় বসছেন। তাঁকে দেখেই লুকু চট করে বেরিয়ে গেল একেবারে বাইরের গেটের কাছে। সেখানে তখন প্রচুর ভলান্টিয়ার জড়ো হয়েছে। অনুষ্ঠান শুরু হবার পর প্রথম আধঘণ্টা পর্যন্ত ভলান্টিয়ারদের খুব ব্যস্ত থাকতে হয়। এখন সে ব্যস্ততা কমে এসেছে। অনেকেই হলের ভেতরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, কেউ-কেউ বা জায়গা পেয়ে বসে গান শুনছে। প্রমিত, বুল্টু, শুভব্রত, শান্তনু সবাই একে একে প্রমিতের লাইটারের সাহায্যে সিগারেট ধরাচ্ছিল গেটের কাছে। লুকুকে আসতে দেখে প্রমিত বলল—‘হয়ে গেল। কে জি বি আ গয়া।’

লুকু আঙুল তুলে চোখ পাকিয়ে বলল—‘দেখো কে জি বিই বলো আর পেন্টাগনই বলো তোমরা তোমাদের অ্যালটেড ডিউটি ঠিক মতো না করলেই হেড কোয়ার্টার্সে রিপোর্ট করতে বাধ্য হবো। প্রমিত, তোমার ওপর খাওয়া-দাওয়ার ভার ছিল না? তুমি এখানে স্মোক করছো!’

প্রমিত বলল—‘একটু রেসপাইট দাও মাদমোয়াজেল। কতগুলো প্যাকেট বাঁধা যে সুপারভাইজ করেছি যদি জানতে! নইলে বাকি ভাণ্ডারাটার ভার না হয় ইয়োর হাইনেসেই নিলেন। শ্রীমান পালান এবং সম্প্রদায় ও বেলা যা টেনেছে, এ বেলায় আমি আর এগোতে সাহস পাচ্ছি না। ওই যে হাঁড়ি বাজায় যে ছেলেটা। উরি ত্তারা!’

বুল্টু বললে—‘খগেন। আচ্ছা এইটুকু একটা ছেলের নাম খগেন্দ্রনাথ। কোনও মানে হয়? এদিকে দেখবি বুড়ো জ্যাঠামশায়ের নাম হয়ত খোকা। পাকা চুল, পাকা গোঁফ, পাকা ব্রেন, খোকাবাবু আসছেন।’

শান্তনু বলল, ‘যা বলেছিস, তবে এ ছেলেটা যেরকম সাঁটাচ্ছে, তাতে খুব কুইক ও খগেন্দ্রনাথ হয়ে উঠতে পারবে। মানিয়ে যাবে নামটা দেখিস।’

—‘কি মেনাস রে এ বেলা! এই লুকু! ওবেলা তো খিচুড়ি আর লাড়া ঢালালি।’ বুল্টু সিগারেটে একটা টান দিয়ে বলল।

প্রমিত বলল—‘লুচি, আলুর দম আর মোহন ভোগ। লুচি ডালদার। মোহনভোগে নাকি রিয়্যাল ঘি আছে। থ্যাচার সাহেবার নিজের করা মেনু। লুকু কি কাউকে খুঁজতে এদিকে এলে? এনিবডি ইন পার্টিকুলার?’

লুকু জবাব দিল না। সে সুমেরুর সঙ্গে গল্প জুড়ে দিয়েছে।

বুল্টু বলল—‘এরকম পিকিউলিয়ার মেনু কোথেকে পায় রে?

প্রমিত বলল—‘মেনুর সম্বন্ধে তুই কি বুঝিস রে? থ্যাচারের বিশেষ হুকুম আছে ওদের সরল, গ্রামীণ জিহ্বা যেন কোনমতেই শহুরে জটিলতায় নষ্ট না হয়, মোহন ভোগ বাড়ি থেকে করিয়ে এনেছে।’

—‘বলিস কি রে? গ্র্যান্ড মা থ্যাচারের নিমন্ত্রিতদের স্টম্যাকের ক্যাপাসিটি সম্পর্কে কনসেপশন আছে তো? আমাদের বোধ হয় আর জুটবে না।’

লুকু বলল—‘ওদের ক্যাপাসিটি সম্পর্কে তুই না-ই ভাবলি বুল্টু। অয়েল ইয়োর ওন মেশিন। তাছাড়া মোহনভোগ তোদের জন্য নয়। এমনিতেই পচ্ছিস না। ওদের স্পেশাল।’

—‘কেন রে, ওরা কি বরযাত্রী নাকি?’

লাউড স্পিকারে উচ্চস্বরে পালানের গান শোনা যাচ্ছিল। একটু আগেই কেষ্টদাস একটা ভাটিয়ালি শেষ করেছে। পালানের এটা দ্বিতীয় গান।

প্রমিত বলল—‘শুনতে দে। শুনতে দে। বড় ভালো গাইছে রে ছেলেটা আহা হা হা।’

অধ্যায় : ৩
কলেজ স্কোয়্যারের দক্ষিণমুখী একটা বেঞ্চে বসেছিল দেবপ্রিয়। বসেছিল এমনভাবে যেন য়ুনিভার্সিটি ইনসটিট্যুটের উচ্চ-কণ্ঠ বাউল-আলাপ তার কানে যাচ্ছে না। বাঁ হাঁটুর ওপর ডান হাঁটুটা তুলে হাত দুটো আলগাভাবে বেঞ্চির পিঠে দুদিকে ছড়িয়ে সে বসেছিল বহু দূরের দিকে চেয়ে।

অনেকেই জানে না দেবপ্রিয় এই কাছেই হুগলি জেলার ছেলে। তার বাবা বলেন আদিতে তাদের পূর্বপুরুষ সপ্তগ্রামে বাণিজ্য করতেন তারপর চতুর্ধুরিণ উপাধি নামে জমিদার হয়ে বসেন। বণিকদের সঙ্গে সদাসর্বদাই কিছু লেঠেল থাকত, তীরধনুক, বর্শা ছোট লাঠি বা পাবড়া সব চালাতেই তারা ওস্তাদ। জমিদার হওয়ার পরও এদের জমি দিয়ে বসত করাতে হয়, মাঝে মধ্যেই নানা ছলে ছুতোয় এদের ব্যবহার করা চলতেই থাকে। চতুর্ধুরিণদের একটি শাখা এতে বিরক্ত হয়ে কিছু দূরে শ্বশুরবাড়ির গ্রাম দায়পুরে বসবাস করতে থাকেন। বৈঁচি স্টেশনে নেমে ভেতর দিকে যেতে হয়। একটাই ত্রুটি গ্রামখানার। কোনও নদী নেই। নদী না থাকলে যেন কোনও জায়গার স্বয়ম্ভরত্ব থাকে না, তার আত্মপরিচয় স্ফুট হয় না। কিন্তু নদীর অভাব গত সাত আট বছর থেকেই পুষিয়ে যাচ্ছে পৃথ্বীন্দ্রনাথ গাঙ্গুলি নামে এক মানুষ নদী আসায়। কোন বিস্মৃত অতীতে পৃথ্বীন্দ্রনাথের ভিটে ছিল দায়পুরে। তাঁর ঠাকুর্দার বাবা ঠাকুর্দা নিশ্চয়ই জমিদার শ্রেণীরই ছিলেন। কিন্তু পুরুষানুক্রমে শহরে বাস করায় গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষীণ হয়ে এসেছিল। বছরে একবার কি দুবার এসে জমির ফসল বিক্রির টাকাকড়ি বুঝে নেওয়া ছাড়া আসা যাওয়া ছিল না। জঙ্গল হয়ে যাওয়া বাগান এবং ভাঙাচোরা বাস্তুর মুখ চলতি নাম ছিল গাঙ্গুলি বাগান। দু তিনখানা বাগান, বিরাট দোতলা কোঠা বাড়ি এবং সংলগ্ন চাষ জমি নিয়ে বিশাল এলাকা। পৃথ্বীন্দ্রনাথ কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়ে একদিন একলা একলা গ্রামে এসে উপস্থিত হলেন। গাঙ্গুলি বাগান সাফ হতে থাকল, দোতলা কোঠার অধিকাংশ ফেলে দিয়ে বাকি সারিয়ে স্কুল হল, তাঁর নিজের জন্য টালি ছাওয়া বাংলো হল। জঙ্গল কেটে ডেয়ারি, পোলট্রি, বিরাট কিচেন গার্ডেন হল। স্কুলটি দিনে ছোটদের, সন্ধ্যায় বয়স্কদের। প্রথমে দায়পুরের লোক প্রবলভাবে প্রতিরোধ করতে চেষ্টা করে এসব, বিশেষত পৃথ্বীন্দ্রনাথের এসে বসাটা। তাঁর তিনটি বাগানের গাছপালা ছিল গ্রামের বহু লোকের রুজির উপায়। কিন্তু তিনি এই সব লোকেদের দিয়েই তাঁর কাজকর্ম করাতে লাগলেন ভালো পারিশ্রমিক দিয়ে। দুটি স্কুলই এখন রমরম করে চলছে। এই পৃথ্বীন্দ্রনাথকেই দেবপ্রিয় গ্রাম সুবাদে মেজজেঠু বলে ডাকে, এবং তিনিই তার যাবতীয় উন্নতির মূলে। দেবপ্রিয়র বাবা গ্রামের বহুদিনের বাসিন্দা। জমিজমাও বেশ কিছু আছে, কিন্তু জ্ঞাতি-গুষ্টি এতো এবং গ্রাম পলিটিক্স এত সাংঘাতিক যে এই জমি জমার পুরো স্বত্ব ভোগ করতে পাওয়া এখন দেখা যাচ্ছে দুরাশা। পুকুরের মাছ রাতারাতি বেপাত্তা হয়ে যায়, ভাগের বাগানের ফলফুলুরি ঠিকঠাক পাওয়া যায় না। বড় বড় গাছ লোপাট হয়ে যায়। বাবার ইচ্ছে দেবপ্রিয় আইন পড়ুক। সদরে প্র্যাকটিস করতেও পারবে, নিজেদের সম্পত্তি উদ্ধারের কাজটাও করবে।

মেজজেঠু সরকারি চাকরি করতেন। ঠিক কি চাকরি দেবপ্রিয় জানে না, খুব বড় চাকরি এই পর্যন্ত সবাই জানে। তবে খুব সিগার খান, এই বয়সেও বুশ শার্ট আর প্যান্ট ছাড়া পরেন না। রাত্রে স্লিপিং স্যুট পরে শোন। মানুষটির হাবেভাবে কিছু সাহেবি ব্যাপার আছে। শৃঙ্খলাবোধটাও হয়তো তারই অন্তর্গত। কিন্তু কথাবার্তায় এবং গ্রামের সবার প্রতি দরদে তিনি খাঁটি এদেশি।

মেজজেঠুই তার দেবব্রত নামটাকে দেবপ্রিয় বানালেন। যত্ন করে পড়ালেন। তার মধ্যে ইংরেজি, ভূগোল, ইতিহাস পড়ালেন যেন তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশিয়ে। জেলা স্কুলে দেবপ্রিয় আগে ভালোই রেজাল্ট করত। সে জানে গ্র্যাজুয়েশনটা করেই তাকে কোর্টে ছুটতে হবে। মেজজেঠু তার মধ্যে অন্য আগ্রহ জাগালেন। সে যখন মাধ্যমিকে ন্যাশনাল স্কলারশিপ পেল মেজজেই তার সম্মানে একটা ছোট্ট ভোজ দিলেন। ভোজে নিমন্ত্রিত মাত্র দুজন—তিনি স্বয়ং আর দেবপ্রিয়। বললেন ‘তুই পাশ করলেই এ ভোজটা হত। এটা শুধু পাশের ভোজ, স্কলারশিপ পাওয়ার ভোজ নয়। এতে প্রমাণ হয় না তুই হৃদয়বান মানুষ কিনা, তোর স্বকীয়তা আছে কি না, তোর নেতৃত্ব গুণ, উদ্ভাবকের মেজাজ আছে কি না, আত্মপ্রত্যয় কতটা, সহনশক্তি, টলারেন্স কতটা, কল্পনা আছে কি না। কিছুই বোঝা যায় না। শুধু বোঝা যায় তোর স্মৃতিশক্তিটা ভালো। হয়ত তোর চেয়ে অনেক খারাপ করেছে এমন একটি ছাত্র বা ছাত্রীর এসব গুণ তোর চেয়ে অনেক বেশি। কিছু বলা যায় না। সুতরাং তুই পাশ করেছিস ভালোভাবে পড়াশোনা করে এটাই যথেষ্ট।

মেজজেঠু খাওয়ালেন তাঁর নিজের ক্ষেতের দুধের সর চালের ভাত, ঢেঁকি-ছাঁটা। হাত রুটি, কয়েকরকম সবজি সেদ্ধ তার ওপর দুরকম সস ঢেলে, নিজের পোলট্রির লেগহর্ন মুরগীর ডিমের ডালনা। নিজের ডেয়ারির ছানা ও দুধ দিয়ে ছানার পায়েস। প্রত্যেকটি নিজের হাতে করা। জেঠিমা মারা যাবার পর থেকেই জেঠু নিজের হাতে রাঁধতে অভ্যস্ত। তাঁর ভেতরে বোধহয় একটা চাপা অভিমানও যে তাঁর একমাত্র ছেলে মার্কিন নাগরিকত্ব নিয়েছে।

খাওয়ার শেষে হাতমুখ ধুয়ে অনেকক্ষণ দাবা খেলা হল। তারপর জেঠু আসল কথাটা বললেন। তাঁর আশা তাঁর এই স্কুল কলেজ হবে, সব থাকবে এক ক্যাম্পাসের ভেতর। কলেজের নিজস্ব ক্ষেত, খামার, বাগান, পোলট্রি, ডেয়ারি থাকবে বলে এই স্কুল-কলেজ অনেকটাই স্ব-নির্ভর হবে। সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভর করতে হবে না বলে নিজেদের পাঠ্য তালিকা ও পরীক্ষা-পদ্ধতি তৈরি করার স্বাধীনতা থাকবে। এই প্রতিষ্ঠানের ভার দেবপ্রিয়কে নিতে হবে। খুব আনন্দের সঙ্গে এ প্রস্তাবে তখনই রাজি হয়েছিল দেবপ্রিয়। মেজজেঠু বলেন— ‘বহুদিন ধরে গ্রাম থেকে শহরের দিকে একটা বর্হিযাত্রা শুরু হয়েছে। ফলে গ্রাম শুধু দরিদ্র নয়, দীন হয়ে পড়ছে, প্রতিভাবাদীন, কল্পনাদীন। এই ব্যবস্থা পাল্টানো দরকার। গ্রামকে করতে হবে এতো শান্তিময়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অপরূপ, অথচ জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় সুযোগসুবিধাসম্পন্ন যে শহরের লোক ক্রমে গ্রামের দিকে মুখ ফেরাবে।’

উচ্চ মাধ্যমিকে প্রথম হয়ে তার হয়ে গেল মহা মুশকিলে। মেজ জেঠু বা তার পরিবারের কেউ তো ভাবেনই নি, সে স্বয়ংও ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি যে জেলাস্কুলের ফার্স্ট বয় উচ্চ মাধ্যমিকে রেকর্ড মার্কস পেয়ে প্রথম হবে। লক্ষ্য বদলে গেল। দেবপ্রিয়র নিজেরই ইচ্ছে হল সে ডাক্তারি পড়বে। পঞ্চায়েত প্রধান হাবু জ্যাঠা এবং গ্রামের অন্য পাঁচজন মাতব্বর ব্যক্তিও তাকে জয়েন্টের ফলাফল অনুযায়ী মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হবার জন্য চাপাচাপি করতে লাগলেন। মেজ জেঠুকে একটু চিন্তিত দেখাল। কিন্তু তিনিও পরে বললেন ‘গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্যসঙ্কট ও শিক্ষাসঙ্কট—কোনটা যে বেশি ভয়াবহ ঠিক করা মুশকিল।’ তাঁর আগের পরিকল্পনাটাকে তিনি সামান্য পাল্টালেন। দায়পুর গ্রামে উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা না থাকলেও চলবে। বরং স্কুলের সঙ্গে একটি বৃত্তিমূলক কলেজ থাক। সেই সঙ্গে থাক স্বাস্থ্যকেন্দ্র যা ক্রমে একটি বড় আধুনিক হাসপাতালে পরিণত হবে। কলকাতা এবং আশপাশের হাসপাতালগুলোয় এই চূড়ান্ত অরাজকতা ও অব্যবস্থার দিনে জেলায় জেলায় উন্নত মানের হাসপাতাল গড়ে ওঠা আশু প্রয়োজন। দেবপ্রিয় নিজেকে এই হাসপাতালের কর্ণধার হিসেবেই তৈরি করুক। মেজ জেঠুর চিন্তাধারার মধ্যে না আছে কোনও গোঁড়ামি, না আছে অহমিকা, তিনি এইভাবে নিজের আশাকে দেবপ্রিয়র আশার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিলেন।

দেবপ্রিয় সেই থেকে কলকাতায় পড়াশোনা করছে। মামার বন্ধুর বাড়িতে থাকে সে পেয়িং গেস্ট হিসেবে। একতলায় তার নিজস্ব একটি ঘর আছে, দালান পার হয়ে বাথরুম। বাকি বাড়ির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক না রাখলেও চলে। গোয়াবাগান অঞ্চলের বহু-শরিকি বাড়ি। এক বৃদ্ধ শরিক তাঁর নিজের অংশের একটি ঘর তাকে ছেড়ে দিয়েছেন। দেবপ্রিয়র উচ্চাশার রকম সকম এখন ক্রমশই পাল্টে যাচ্ছে। তার মা বাবার আশা ছেলে তাঁদের বিষয় রক্ষা করবে, মেজ জেঠুর আশা সে তাঁর সমাজকল্যাণকেন্দ্রের অধ্যক্ষ হবে, তার প্রোফেসররা ইতিমধ্যেই মনে করতে শুরু করেছেন তার বিদেশ চলে যাওয়া ভালো। এদেশে কোনও ভবিষ্যৎ নেই। দেবপ্রিয় অন্ধকারে পথ খুঁজছে। তার নিজের ধরনে। এই অন্ধকার বহু তরুণ-তরুণীর মধ্যে ভয়াবহ কাণ্ডজ্ঞানশূন্য এক প্রতিযোগিতার অন্ধকার। ছাত্রের উচ্চাশার সঙ্গে সমাজের উচ্চাশার প্রচণ্ড ফারাকের অন্ধকার। দেবপ্রিয় এই ঘূর্ণাবর্তের কেন্দ্রে স্থির দাঁড়িয়ে আছে। সে কিছু করবে কিন্তু তা তার শুভাকাঙ্ক্ষীদের আশা পূর্ণ নাও করতে পারে। দেবপ্রিয় এখনও জানে না সে ঠিক কি করবে। ইতিমধ্যে তার ভালো লাগে সহপাঠী সহপাঠিনীদের প্রাণ-চাঞ্চল্য, কলকাতার নানারকম সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকলাপ, ভালো লাগে কলম ছোঁওয়াতেই শ্রেষ্ঠ উত্তরের মর্যাদা পাওয়া, মানবদেহের অন্ধিসন্ধির বিস্ময়, ভালো লাগে কোনও কোনও অধ্যাপকের সস্নেহ মনোযোগ, কারুর প্রতিভার পরিমণ্ডল, মামার বন্ধুর বাড়ির মামা-মামীদের উঁকিঝুঁকি স্নেহ-কৌতূহল। অথচ, এই সমস্ত ভালো লাগার অন্তরালে নির্ভুলভাবে কাজ করে যায় এক নাম না জানা বিষাদ। কেন, কি বৃত্তান্ত তা যেন দেবপ্রিয় জানে অথচ পুরোপুরি জানে না।

লোকগীতির অনুষ্ঠানের শেষে শান্তনু, বুল্টু, প্রমিত সবাই কলেজ স্কোয়্যারের মধ্য দিয়ে শর্ট কাট করছিল। তারা দেবপ্রিয়কে ওই ভাবেই বসে থাকতে দেখে।

—‘কি রে, এখানে?’ শান্তনু বলল।

—‘এমনি!’

—‘এমনি মানে? গান শুনিস নি। থ্যাচারের থাপ্পড় খাবার ইচ্ছে হয়েছে?’

দেবপ্রিয় বলল—‘শুনেছি। অফ অ্যান্ড অন। ঘরের মধ্যে বেশিক্ষণ আমার দমবন্ধ হয়ে আসে। জানোই তো গ্রামের ছেলে।

—‘পালানকে তো তুই-ই যোগাড় করে দিলি। কিরকম পার্ফর্ম্যান্স দ্যায় দেখলি না! দারুণ গেয়েছে কিন্তু। হাঁড়ি বাজানো ছেলেটা কি যেন নাম? খগেন না? দুর্দান্ত।’

—‘জানি। ইনস্টিট্যুটে আর কি শুনলে? খোলামেলায় আরও ভাললা খুলত। আমি তো বলেই ছিলুম প্রেসিডেন্সির মাঠে শুদ্ধু একটা তক্তা পেতে হোক।’

—‘ও, তাই রাগ হয়েছে? রীগনস অবজেকশন ওভাররুল্‌ড্‌ বাই থ্যাচার? চলি। দেবপ্রিয় বাড়ি যাবি না।’

—‘তোমরা যাও। আমার তো এখান থেকে দু পা। আর শোনো, ওসব রাগটাগের কোনও ব্যাপার নেই।’

শান্তনু বলল—‘আহা হা হা, পার্সন্যালিটি থাকলেই পার্সন্যালিটি ক্ল্যাশ হবে। আমাদের নেই তাই হয় না।’

প্রমিত, বুল্টু, পুলকেশ আগেই এগিয়ে গিয়েছিল। শান্তনুও এবার পা বাড়াল। দেবপ্রিয় গলা তুলে জিজ্ঞেস করল—‘উজান যায়নি?’

—‘উজান? উজান এখনও পালান অ্যান্ড কোং-এর সুবন্দোবস্তর কাজে ব্যস্ত।’ ম্যাডামের আদেশ। লুকুও আছে। আরও দু এক জন তোদের নর্থের দিকের রয়েছে।’

দেবপ্রিয় কেন যেন চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। প্রমিতরা চলে যাবার পরও সে একই ভাবে বসে রইল। ঘণ্টাখানেক পরে, অর্থাৎ রাত প্রায় সোয়া নটায় উজান, মৈথিলী এবং লুকু যখন ওই একই জায়গা দিয়ে কলেজ স্ট্রিট যাবার জন্য শর্ট কাট করে তখনও তাকে বসে থাকতে দেখে। উজান বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে চটপটে। একে সে খেলোয়াড়, তার ওপরে আজকাল যোগাসন ধরেছে। স্পোর্টস শার্ট আর জিন্‌স পরে আছে। রঙ কালো। নাক চোখ মুখ খুব কাটা-কাটা, সমস্ত মুখটাই খুব সচল, সপ্রতিভ, তীক্ষ্ণ এবং মিষ্টি। উজান চলে প্রায় সব সময়েই কুইক মার্চের ভঙ্গিতে। সে আগে আগে আসছিল প্রায় লাফাতে লাফাতে, শূন্যে বল ছোঁড়ার ভঙ্গি করতে করতে মাঝে মাঝে। লুকু একবার বলল ‘উজান, কবে রণ্‌জিতে ফোর্টিন্‌থ্‌ সিলেক্টেড হয়েছিলি ভুলতে পারছিস না, না?’

উজান বলল—‘হাত পাগুলো ছাড়িয়ে নিচ্ছি।

মৈথিলী আর লুকু একটু পেছিয়ে পড়েছে। দুজনেই নিজেদের কথায় মগ্ন। মৈথিলী বলছিল ‘তুই প্রবলেমটা ধরতে পেরেছিস? কেষ্ট চায় পাবলিসিটি। ও আমাকে ওর পাবলিসিটি ম্যানেজার বানাতে চাইছে। পালান কিন্তু অতশত বোঝে না।’

লক্ষ্মীশ্রী বলল—‘বোঝে না তুই বুঝলি কি করে?’

—‘বাঃ, সমানে কদিন ওদের সঙ্গে ঘুরছি, এটুকু বুঝব না? পালানটাকে ও আলটিমেটলি ঠকাবে।’

উজান থেমে গিয়েছিল, ওদের শেষ কথাটা কানে যেতে হেসে বলল —‘তুই যে বলছিলি ওরা সহজ সরল। তুই-ই বোধহয় শহরে নিয়ে এসে ওদের মায়ামৃগ দেখালি তাহলে?’

মৈথিলীকে চিন্তিত দেখাল। সে বলল—‘ওরা গান করুক, পয়সা রোজগার করুক এটা আমিও চাই। সেই সঙ্গে ওদের সরলতটাও টিকে থাকুক! এই চাওয়ায় কি খুব অসঙ্গতি আছে?’

—‘আছে বই কি’ উজান বলল, ‘সেটা তুই নিজেই এখন বুঝতে পারছিস।’

—‘আচ্ছা উজান, সরলতা আর বোকামি কি এক? ইজ্‌নট্‌ সিম্পলিসিটি আ ভার্চু?

এই সময়ে দেবপ্রিয়কে ওদের চোখে পরল। উজান বলে উঠল—‘আরে দেব, তুই এখনও রয়েছিস?’

—‘হুঁ।’

‘লুকু বলল— ‘মৈথিল, তোর প্রশ্নের উত্তর কিন্তু সামনে বসে রয়েছে। দেব সরল, কিন্তু দেবকে কি কেউ বোকা বলবে?’

উজান আশ্চর্য হয়ে বলল—‘দেব সরল? লুকু তুই দেবকে সরল বললি কি হিসেবে? মৈথিলী তোর মত কি? দেব কি সরল?’

লুকু বলল—‘ওর চোখ মুখ দেখলেই বোঝা যায় ও কত ইনোসেন্ট।’

মৈথিলী বলল—‘তুই ভুল করছিস লুকু, সরল না হলেও কিন্তু নিস্পাপ হওয়া আটকায় না।’

উজান বলল—‘কি জানি, আই থিংক দেব ইজ আ ভেরি কমপ্লেক্স ক্যারেক্টার। দেব, ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড।’

দেব উঠে দাঁড়াল। অনেকক্ষণ বসে বসে তার কোমর ধরে গেছে। এই সমস্ত কথাবার্তায় যোগ দেবার মেজাজ তার নেই। ভেতরে ভেতরে সে যেন প্রতীক্ষা ক্লান্ত। আড়মোড়া ভাঙ্গার ভঙ্গিতে দু হাত ছড়িয়ে সে শুধু বলল—‘আই ডোন্ট মাইন্ড।’

—‘যাবি না?’ উজান বলল।

—‘যাবো।’

ওদের সঙ্গে লম্বা লম্বা শিথিল পায়ে হাঁটতে লাগল দেবপ্রিয়। ওরা তিনজনে একই বাসে উঠবে, তিনজনেই দক্ষিণে থাকে। দক্ষিণের নানান বিন্দুতে, কিন্তু গড়িয়াহাট যাবার বাস পেয়ে তিনজনেই উঠে পড়ল। উজান দাঁড়িয়ে ছিল। মৈথিলী জানলার পাশে, লুকু খুব সম্ভব উল্টো দিকে জায়গা পেয়েছে। দেবপ্রিয় হাঁটছে। খুব মন্থর গতিতে। গোলদিঘির ঘুরন গেটের কাছে এসে সে থমকে দাঁড়াল যেন ভেতরে যাবে না বাইরে থাকবে স্থির করতে পারছে না। একটি চেনা ফুচকাঅলা তার জিনিসপত্র গুটিয়ে উল্টো দিকে হাঁটতে আরম্ভ করল। বই পাড়া বহুক্ষণ বন্ধ। দেবপ্রিয় খুব সন্তর্পণে এক প্যাকেট সিগারেট বার করল, অনভ্যস্ত শ্লথ কাঁপা কাঁপা আঙুলে সে একটা সিগারেট ধরাল। তারপর যেদিক থেকে এসেছিল সেই বাসস্টপের দিকেই ফিরে গেল। তার সিগারেটের ধোঁয়া এলোমেলোভাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

অধ্যায় : ৪
স্কুটারটাকে গ্যারাজে তুলে গেটের তালা খুলতে খুলতেই মেধা শুনতে পেলেন ভেতরে টেলিফোনটা বাজছে। ইউনিভার্সিটি ইনস্টিট্যুট হয়ে তিনি গিয়েছিলেন সংস্কৃত বিভাগের নন্দিতার বাড়ি। নন্দিতার কাছে কিছু প্রাচীন পুঁথি এসেছে। অনুবাদ করছে ও। মেধাদির কাছে সাহায্য চেয়েছিল। মেধার নিজেরও উপকার। এইসব পুঁথি প্রাচীন ভারতের নানান সময়ের সমাজ-ব্যবস্থা, প্রশাসন, অভিজাতদের জীবন-যাপন, অর্থনীতি, ইত্যাদির ওপর অনেক সময়েই তির্যক আলো ফেলে। গভীর রাত্রে রাত্রির সঙ্গে রঙ-মেলানো বসন পরে অভিসারিকারা পথে বার হত। খুবই পারমিসিভ সোসাইটি সন্দেহ নেই, কিন্তু মেয়েগুলো অক্ষত অবস্থায় বাড়ি ফিরে আসত। মেয়েদের ওপর যখন-তখন অত্যাচার, হালের ভারতবর্ষে যা হচ্ছে, তার বিন্দুমাত্রও যে তখন ছিল না, অভিসারিকা-সিসটেমটা তো তারই প্রমাণ? সেটা কি শাসকের গুণে না সামাজিক শিক্ষার গুণে? এই যে বারাঙ্গনা শ্রেণী যাঁরা চৌষট্টি কলায় শিক্ষিত হতেন, যাঁদের গৃহে নগরের বিদগ্ধ ব্যক্তিরাও এসে আলাপ-আলোচনায় যোগ দিতেন তাঁরা কি জাপানের গেইশাদের সঙ্গে তুলনীয়? না প্যারিসে যাঁরা সালোঁ বসাতেন শিল্পী-সাহিত্যিক এদের খাতির করে তাঁদের মতো? ব্যাপারটা প্রিমিটিভ না অতি-আধুনিক?

সিঁড়ি দিয়ে খানিকটা উঠে মাঝের ল্যান্ডিংটা বড় মাপের। বিরাট পেতলের আধারে একটা রবার গাছ। বাবার জিনিস। তারই কোলে আবলুশ কাঠের ছোট্ট স্ট্যান্ডে টেলিফোনটা বাজছে। ধরতে ধরতেই রিংটা বন্ধ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে রইলেন মেধা। কিন্তু ফোনটা আর বাজল না। অগত্যা ওপরে উঠে কোল্যাপসিব্‌লের তালা খুলে ঘরে ঢুকলেন, আলো জ্বাললেন, ব্যাগটা টেবিলের ওপর নামিয়েছেন এমন সময়ে টেলিফোনটা আবার বাজল। এক রকম দৌড়ে গিয়েই ধরলেন মেধা। বহুদূর থেকে ক্ষীণকণ্ঠ ভেসে আসছে ‘ম্যাডাম। ম্যাডাম আপনার সঙ্গে খুব জরুরি কথা আছে, আমায় একটু সময় দেবেন?’

—‘তুমি কে সেটা আগে বলবে তো!’ মেধা বললেন।

—“আমি…’ ফোনটা আবার কেটে গেল।

মেধা বিরক্ত, হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ইচ্ছে করে কলকাতার প্রত্যেকটি টেলিফোন-যন্ত্রকে গুলি করে মেরে ফেলতে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও আর রিং হল না। লাইন পাওয়া একেই কঠিন। ক্ষীণস্বর শুনেই বোঝা যায় ঠিকমতো কাজও করছে না। ফিরে আসতে আসতে মেধা ভাবতে লাগলেন কে হতে পারে? ম্যাডাম বলে তাঁকে কে কে ডাকে? ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের মধ্যে বলে এম. ভি। প্রয়োজন হলে মেধাদি বলে। ঘরে এসে শাড়ি বদলাতে বদলাতে তাঁর মনে হল এ নিশ্চয়ই ছাত্রসঙেঘর কেউ। ছাত্রসঙ্ঘ ব্যাপারটা মৈথিলীর উদ্ভাবন না মেধার বলা শক্ত। মেধা যখন বস্টন থেকে ফিরে এলেন, তখন শিক্ষাজগতের আবহাওয়ায় একটা লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখলেন। চিত্রটা খুব হতাশাজনক। ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর থেকে সততা ও নীতির চাপটা একেবারে উঠে গেছে। তারা বিশৃঙ্খল, অরাজক। ক্লাসে অসম্ভব হল্লা করে সুবিধে পেলেই। আরও ভয়াবহ চিত্র অধ্যাপক মহলের। তাঁদের বেশির ভাগই কোনও না কোনও দলীয় রাজনীতি করেন। এবং পড়ানোর সময়ে সুকৌশলে সেই রাজনীতি বক্তৃতায় ঢুকিয়ে দ্যান। এর ওপর, তাঁদের ক্লাশে যাওয়াটাই একটা ব্যতিক্রম। অল্পবয়স্করা সব থিসিস, পেপার, এম. ফিল করতে ব্যস্ত। নাহলে তাঁদের ইনক্রিমেন্ট হবে না। কয়েকজন আন্তরিক স্বভাবের মানুষ আছেন। ছাত্রদরদী না হন, যে কাজের জন্য নিযুক্ত আছেন সেটা যথাসাধ্য ভালোভাবে করা দরকার এটা তাঁরা মনে করেন। অধ্যাপকদের মধ্যে এই শৈথিল্য যে আগেও ছিল না, তা নয়। কিন্তু এঁরা ছিলেন মুষ্টিমেয়। এঁদের নাম-ডাক, প্রশাসনিক কাজকর্মের দায়, অন্যান্য বহু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ এঁদের দুর্ভেদ্য করে রাখত। সরকারি কলেজে ছাত্রদরদ জিনিসটা চিরকালই কম। বদলি এবং প্রোমোশন এই দুটো জিনিসই সাধারণত সেখানে বেশি গুরুত্ব পেয়ে থাকে। কিন্তু যান্ত্রিক ভাবে হলেও পঠন পাঠনের কাজটা চলত। এবার এসে মেধা দেখলেন বেশিরভাগ অধ্যাপকই ক্লাসে যাচ্ছেন না, বা গেলেও ফিরে আসছেন। কারণ ক্লাসে ছাত্র নেই। ছাত্রদের মধ্যে নাকি একটা নতুন কথা চালু হয়েছে পাস-কোর্সের ক্লাস গাধারাই করে। হঠাৎ এই প্রজন্মের ছাত্ররা কি করে এতো স্বাবলম্বী হয়ে গেল মেধা ভেবে পেলেন না। পরে দেখলেন তারা আদৌ স্বাবলম্বী নয়, প্রত্যেকটি বিষয়ের জন্য তারা কোচিং ক্লাসে যায়, সেখানে তৈরি নোট পায়, পরীক্ষাটা ছাত্রদের হয় না, হয় অধ্যাপক-টিউটরদের। আরও অনেক জিনিস তাঁর দৃষ্টিগোচর হল, খাতা দেখার সময়ে কলেজ এবং এলাকা ধরে ধরে বাছ-বিচার হয়। এবং কোচিং ক্লাসগুলোর সঙ্গে পরীক্ষার ফলাফলের কোথাও একটা সূক্ষ্ম অসাধু যোগাযোগ আছে। মেধা তাঁর পূর্ব-অভিজ্ঞতা থেকে জানেন সোজাসুজি প্রতিবাদ এবং বিদ্রোহ বিশেষত : তিনি একলা করে কিছু করতে পারবেন না। সৎ এবং আন্তরিক ছাত্রও আছে অধ্যাপকও আছেন, কিন্তু তাদেরও একটা বড় অংশ ভীরু, অনেকে পরিকাঠামোর এই শৈথিল্যের সুযোগ নেন। যদিও নিজেরা সোজাসুজি অসৎ নন। এই অন্যায়ের প্রতিকারের ভাব ছাত্রদের হাতে তুলে দেওয়া যায় না। কারণ সাধারণ ছাত্রসমাজ মুণ্ডহীন ফ্রাঙ্কেনস্টাইন-দানবের মতো। তারা যত সহজে ভাঙতে পারে তত সহজে গড়তে পারে না, বিধ্বংসী তাদের প্রাণশক্তি। এই প্রাণশক্তিকে খুব সাবধানে ব্যবহার করতে হয়। ভারতবর্ষের ইতিহাস বলছে কেউ এদের যথাযথ ব্যবহার করেননি। স্বাধীনতা-পূর্ব দিনগুলি থেকে নকশাল আন্দোলন পর্যন্ত এই বিপুল প্রাণশক্তি আত্মধ্বংসী বন্যার কাজে ব্যবহার হয়েছে, যে বন্যা কোনও পলির প্রলেপ রেখে যায় না, রেখে যায় শুধু ধূ-ধূ বালির উষর চড়া।

মনের অবস্থা যখন ভীষণ অশান্ত, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, মেধা সরকারি কলেজ ত্যাগ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছেন সেই সময়ে একদিন তাঁর মেজদার বন্ধু রঘুনন্দন ত্রিপাঠীর মেয়ে মৈথিলী তাঁর কাছে একটি প্রস্তাব নিয়ে আসে। মৈথিলী মেয়েটি অত্যন্ত গুণী, চৌখস, ইচ্ছে করলেই সে দেশে কিম্বা বিদেশে অনেক উঁচুতে উঠতে পারবে। পরিবারও প্রভাবশালী। কিন্তু মৈথিলী খুব আন্তরিকভাবে তাঁকে জানাল যে ছাত্রদের নিয়ে সে এবং তার কয়েকজন বন্ধু একটা প্রতিষ্ঠান গড়তে চায়। সে স্কুলে, কলেজে, সবরকম প্রতিষ্ঠানে রাজনীতির অনুপ্রবেশ লক্ষ্য করেছে, এতে সে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন, এর মধ্যে ছাত্রদের কোনও মঙ্গল নেই এই তার ধারণা। তাদের প্রতিষ্ঠান হবে সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত, সমাজ-কল্যাণই হবে তাদের প্রধান লক্ষ্য। সব কলেজ, ইউনিভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রীরা এর সদস্য। মৈথিলী মেধাকে উপদেষ্টা হিসেবে চায়। এবং এই প্রসঙ্গেই জানায় যে সমস্ত অধ্যাপকের সৎ, আন্তরিক, কর্মী এবং নির্ভীক বলে সুনাম আছে তাঁদের অনেককেই তারা এই উপদেষ্টা মণ্ডলীতে থাকবার অনুরোধ জানাচ্ছে। মেধা প্রথমে রাজি হননি। কিন্তু মৈথিলী যখন বার বার করে জানালো তাদের রাজনীতির সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই, এবং তারা শুধু অলস সময় কাটানোর উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানটা গড়ছে না, গড়ছে মৈথিলীর ভাষায় ‘উইথ ডেড সীরিয়াসনেস’, তখন মেধা রাজি হয়েছিলেন। এরা ইতিমন্ন্যে বেশ কিছু সাক্ষরতা-অভিযান করেছে, ‘স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন’ এটাও ছিল এদের কয়েকটা অভিযানের মুখ্য উদ্দেশ্য। সংগ্রহ করেছে প্রচুর ছাত্র সদস্য। সাধারণ সদস্যদের সংস্পর্শে খুব বেশি না এলেও কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহক সমিতির সভ্য মেডিক্যাল কলেজের মৈথিলী ত্রিপাঠী ও দেবপ্রিয় চৌধুরী, এঞ্জিনিয়ারিং-এর উজান আফতাব, তাঁর নিজের প্রত্যক্ষ ছাত্রী লক্ষ্মীশ্রী মজুমদার ও গুঞ্জন সিং, এবং সায়েন্স কলেজের প্রমিত গুপ্ত তাঁর সঙ্গে অধিবেশনে মাঝে মাঝেই বসে। এদের মধ্যে প্রথম তিনজন যে অসাধারণ তাদের সংকল্পে, কল্পনাশক্তিতে ও চরিত্রবলে তা তিনি টের পেয়েছেন। উপদেষ্টাদের মধ্যে প্রধানত আছেন নন্দিতা সাহা, ডঃ প্রভাস সোম, সূর্য দাস, মধুচ্ছন্দা দাশগুপ্ত। মুশকিল হচ্ছে এঁরা সকলেই সংসারী মানুষ। নিজের নিজের বৃত্তিতেও আকণ্ঠ নিমজ্জিত। নন্দিতা লেখে, ডঃ সোম রিসার্চ প্রজেক্ট পরিচালনা করেন, সূর্য ভীষণ ভালো ছেলে, কিন্তু বিরাট যৌথ পরিবারের দায় তার কাঁধে, মধুচ্ছন্দার নাচের কেরিয়ার রয়েছে। সংসার-জীবনেও তার নানা গোলমাল। অনেক অধিবেশনেই মেধা দেখেন এদের ‘উপদেশ’ দিতে তিনি একাই এসেছেন। এবং সে ‘উপদেশে’র জন্য ছাত্রসংঘের কেন্দ্রীয় সমিতির আগ্রহ ও শ্রদ্ধা অসীম। যদিও তারা প্রত্যেকটি পরামর্শ নিয়ে আলোচনা করে, সময়ে সময়ে সেটাকে আংশিক বদলায়ও। এদের সঙ্গ মেধার উজ্জীবন, উদ্দীপন।

রাত্রের খাবার তৈরি করতে করতে হঠাৎ একটা নাম মেধার মনে এলো। দেবপ্রিয়। খুব সম্ভব ফোনটা করেছিল দেবপ্রিয়। স্যুপটা গরম করতে বসিয়েছেন, রুটি দুটো হয়ে গেছে মেধার ইচ্ছে হল মোটা মোটা আলুভাজা খাবেন। আলুগুলো কাটতে কাটতে ক্ষীণ টেলিফোন-স্বরটা স্মৃতিতে মৃদু ধাক্কা দিচ্ছিল। গরম তেলের মধ্যে আলুগুলো চড়াৎ করে ছেড়েছেন এমন সময় নামটা মনে এলো। দেবপ্রিয়র গলা চট করে শোনা যায় না। এগজিকিউটিভ কমিটির মীটিং-এ থাকলেও সে বেশির ভাগ কথাই মৈথিলী ও উজানকে বলতে দেয়। মাঝে মাঝে, খুব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সময়ে তার বক্তব্য একবার দুবার শোনা যায়, এবং তখনই বোঝা যায় সে কোনক্রমেই ঘুমন্ত সদস্য নয়। সম্পূর্ণ সজাগ, কাজে আগ্রহী। কিন্তু সবাইকার সঙ্গেই দেবপ্রিয় একটা দূরত্ব রেখে চলে। ছেলেটি গ্রাম থেকে এসেছে। মেয়েদের সঙ্গে খুব সহজ হতে পারে না। এটা অবশ্য একটা অনুমান। কিন্তু উপদেষ্টা কমিটিতে যেসব পুরুষ অধ্যাপক আছেন তাঁদের সঙ্গেও তো সে খুব ঘনিষ্ঠ নয়। মেধার সহজাত বোধ বলে দেবপ্রিয় ছেলেটি আরও একটু সক্রিয় হলে ভালো হত। তার নিজের পক্ষে তো বটেই। ছাত্রসঙেঘর পক্ষেও। কারণ মৈথিলী সমাজ-কল্যাণ বা গ্রাম-কল্যাণ করতে চাইলেও তার সঙ্গে মাটির যোগ খুব কম। দেবপ্রিয় যখন মতামত দেয় বোঝা যায় সে সমস্যার সঙ্গে আরও অনেক প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। লাজুক, মুখচোরা দেবপ্রিয় আজ কেন তাঁকে ফোন করেছিল জানতে মেধা খুব কৌতূহল বোধ করছিলেন। কিন্তু কলকাতার টেলিফোন সিসটেম যদি কোনও ব্যাপারে বাধা দেবে মনে করে তো সে বাধা অতিক্রম করে কার সাধ্য!

খাওয়া শেষ করে মেধা-অন্যমনস্কভাবে মুখ ধুলেন। এখন তিনি অনেকক্ষণ পড়াশোনা করবেন। গবেষণার কাজ মেধা প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন। যে বছরগুলো মার্কিন দেশে ছিলেন ওরা তাঁর মস্তিষ্ক, অন্তরাত্মা নিংড়ে একটার পর একটা পেপার করিয়ে নিয়েছে। স্প্যানিশ ইমিগ্র্যান্টসদের ইতিহাস, ইজরায়েল-মার্কিনি সম্পর্কের প্রথম দশ বছরের তাৎপর্য, বেশির ভাগই আন্তজাতিক সম্পর্কের ওপরে। এসব পেপার লেখার কোন প্রয়োজন তাঁর ছিল না। কোনকালে তিনি নিছক পাণ্ডিত্যের জন্য পড়াশোনা করেননি। এখনও তিনি মনে করেন ইতিহাসে গবেষণার চেয়ে জীবন্ত ইতিহাস গড়ে তোলা আরও অনেক জরুরি, অনেক রোমাঞ্চকর কাজ।

রাতের পোশাক পরে আলোটা নিভিয়ে দিতে যাচ্ছেন এমন সময়ে বাইরের দরজার বেলটা বাজল। ড্রেসিং গাউন পরতে এক মিনিট। বড় বড় পায়ে জানালার কাছে এগিয়ে নিচে টর্চ ফেললেন মেধা—‘কে?’

নিচ থেকে সাড়া এলো—‘আমি দেবপ্রিয়।’

‘এত রাতে?’

—‘কলেজ স্ট্রিট থেকে হাঁটতে হাঁটতে আসছি। অনেকবার ফোন করবার চেষ্টা করলুম! বেশিক্ষণ সময় নেবো না।’

দরজা খুলে দিয়ে মেধা বললেন—‘ওপরে এসো। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা হয় না।’ দোতলার দালানে সোফার ওপর খুব আত্মসচেতন সঙ্কুচিতভাবে বসল দেবপ্রিয়। মেধা বললেন—‘কটা বেজেছে জানো?’

—‘জানি। সাড়ে এগারটা।… আসলে বাড়ি ফিরে যাচ্ছিলুম।… ফিরে এসে ফোন করলুম। লাগল না ঠিকমতো।… বাস পেলুম না…

—‘তার মানে তোমার খাওয়া-দাওয়াও হয় নি?’

—‘ও হ্যাঁ, মানে না… খাওয়া-দাওয়ার কথা আমার মনে ছিল না।

মেধা কথা বলতে বলতেই ফ্রিজ খুলছিলেন। বললেন—‘রাত্রে ভাত খাও?’

দেবপ্রিয় উঠে দাঁড়িয়ে বলল—‘খাওয়া-দাওয়ার সময় আমার নেই ম্যাডাম। আমি শুধু বলতে এলুম পরবর্তী প্রজেক্টগুলোয় আমি থাকতে পারছি না।’

—‘হঠাৎ?’ মেধা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

—‘হয়ত আমি ছাত্রসংঘও ছেড়ে দেবো?’

—‘ছেড়ে দেবে? তো সে কথা ছাত্রসঙ্ঘের সেক্রেটারিকে প্রেসিডেন্টকে জানাও, আমাকে কেন?’

—‘ম্যাডাম, বাইরে থেকে ছাত্রসঙেঘর কাজ-কর্ম আমি সবই করব, শুধু কোনও সম্মেলনে যাবো না। এর কারণটা খুব সিরীয়স, এক্ষুণি জানাবার সময় আসেনি।

কিন্তু কেউ যেন বুঝতে না পারে আমার এই সিদ্ধান্তের কথা। শুধু আপনি জানবেন।’

—‘তুমি যে কী বলছ, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’

‘এখন আপনাকে বোঝাতে পারবো না। বোঝাবার বিপদ আছে। উজান, বা কেউ যেন জানতে না পারে। আমার ওপর বিশ্বাস রাখুন।’ দেবপ্রিয় বলতে বলতে সিঁড়ির দিকে যাচ্ছিল। মেধা পেছন থেকে গিয়ে তার বাহু ধরলেন—‘এতরাতে কোথায় যাবে? খেয়ে নিয়ে এখানেই শুয়ে পড়ো। আমার কোনও অসুবিধে নেই।’

দেবপ্রিয়র চোখে রীতিমতো আতঙ্ক। বলল—‘ম্যাডাম, প্লীজ আমাকে মাপ করুন।’ মেরুন রঙের ড্রেসিংগাউন পরা দীর্ঘাঙ্গী মেধা ভাটনগর রাত সাড়ে এগারটার ভুতুড়ে আলোয় যেন কোনও অতিপ্রাকৃত লোকের অধিবাসী। দেবী না অপদেবী বোঝা যায় না।

—‘তুমি কি হোস্টেলে থাকো?’

—‘না। আমি একটা ফ্যামিলিতে থাকি। রাতে বাড়ি না ফিরলে কালকে আর ঢুকতে পাবো না।’

মেধা হেসে বললেন ‘রাত দুটোয় ফিরেলে ঢুকতে পাবে?’

দেবপ্রিয় হাসল, বলল—‘একটু অশান্তি হবে। কিন্তু পাবো।’

মেধা বললেন—‘তাহলে অন্তত খেয়ে নাও। নিয়ে অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়ে পড়ো। মধ্যরাতের কলকাতার দুঃসাহসিক অভিযান রোমাঞ্চকর হতে পারে, কিন্তু কুকুর, পুলিস, মাতাল, গুণ্ডাদের পাশ কাটিয়ে বেরোতে হলে খালি পেটে পারা সম্ভব নয়।’

দেবপ্রিয় নিতান্ত নাচারের মতো খেলো। রুটি মাখন, দুধ আর কিছুটা স্টু ছিল তাই-ই দিলেন মেধা। ওর খাওয়া দেখতে দেখতে তিনি অনুমান করবার চেষ্টা করতে লাগলেন ছেলেটা কেন ছাত্রসংঘ ছেড়ে দিতে চায়। ছাত্রসংঘের জন্মের পেছনে কোনও নির্দিষ্ট মতবাদ নেই, যেমন তাঁদের সময়ে ছিল। কেউ বিপ্লবে বিশ্বাসী, কেউ শোধনবাদে—এইসব প্রশ্নে চৌষট্টি সালে পার্টি ভাগ হয়েছিল। সাতষট্টির নির্বাচন পর্যন্ত একই নামে দুটি পার্টি চালু রইল। তারপর দুজনেই যখন নির্বাচন নামল, নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে গণ্ডগোল দেখা দিল। এসবের নাড়িনক্ষত্র জানত রোকেয়া, সে-ই তাঁকে ওয়াকিবহাল করে, এত কথা সান্যালদা জানাতে চাইতেন না। কিন্তু এদের মধ্যে তো সে সব প্রশ্ন নেই। এদের কাজের ধরন হল সরাসরি একটা পরিস্থিতিকে বিশ্লেষণ করে অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থা করা। তবে কি কোনও মনোমালিন্য? অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে খেয়োখেয়ি, মন কষাকষি, জিনিসগুলো একেবারে বরদাস্ত করতে পারেন না তিনি। সেটাই যদি কারণ হয় তবে দেবপ্রিয়কে তিনি দ্বিতীয়বার ফিরে ডাকবেন না। অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার আবহাওয়া ধ্বংস হয়ে সহযোগিতার যুগ আরম্ভ হোক এদের মধ্যে এই তাঁর মনের গোপন সংকল্প। কিন্তু দেবপ্রিয় একটা রহস্যময় গোপনতাও রাখতে চাইছে। বলতে চাইছে না যখন নিশ্চয় সঙ্গত কারণ আছে। মেধা জোর করতে চান না। কিন্তু কারণটা তাঁকে জানতেই হবে, নিজের চেষ্টায়।

অধ্যায় : ৫
বহুবার খড়ি দিয়ে লেখা এবং মোছার পর শ্লেটের যেরকম রং হয়, হেমন্তর আকাশ অনেকটা সেইরকম। একটা ময়লাটে আলো যেন নোংরা ন্যাতা হাত বুলিয়ে দিয়েছে শহরটার গায়ে। রঘুনন্দন সাত সকালেই খবর পেলেন অফিসের রাস্তায় বিশাল জ্যাম। গতকাল শেষ রাতে নাকি বড়বাজারে অগ্নিকাণ্ড হয়েছে। তাঁকে যেতে হবে নিউ সেক্রেটারিয়েট। ওদিকে যখন এতো জ্যাম, তখন তিনি মেয়েকে মেডিক্যাল কলেজে নামিয়ে ধীরে সুস্থে যেতে পারেন। দাড়ি কামাচ্ছিলেন বাথরুমের বেসিনে, গালের ওপর দিয়ে রেজারটা টানতে টানতে চেঁচিয়ে বললেন,—‘অরু, মুন্নিকে রেডি হতে বলো। আমার সঙ্গে বেরুবে।’ কোনও উত্তর পেলেন না। চানটান সেরে ঘরে এসে দেখেলেন তাঁর গ্রে রঙের সুট, ব্রাউন টাই সব বিছানার ওপর চিৎপটাং হয়ে আছে। অরুণা ধারে কাছে কোথাও নেই। রান্নাঘরের দিক থেকে অবশ্য ছ্যাঁক ছোঁক শব্দ আসছে। কিন্তু ছ্যাঁক ছোঁক শব্দ তোলবার জন্যে তো বৈজুই রয়েছে। অরুণাকে সেখানে থাকতেই হবে এমন ব্যবস্থা রঘুনন্দনের বাড়ির নয়।

খাবার টেবিলে এসে অবশ্য অরুণাকে পাওয়া গেল। হাতে উল কাঁটা। নীরবে খুব মনোযোগের সঙ্গে দুটো তিনটে রং-এর মিশেলে কিছু একটা বুনে চলেছে। টেবিলের ওপর রঘুনন্দনের খাবার থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে। রান্নাঘরের দিক থেকে কফির খুশবু। রঘুনন্দন টাইয়ের গিটটা ধরে দু-একটা ঝাঁকি দিয়ে তাকে জায়গামতো বসিয়ে দিতে দিতে বললেন—‘মুন্নিকে দিলে না? বললাম যে মুন্নিকে নামিয়ে দিয়ে যাবো।’

অরুণা বুনতে বুনতেই জবাব দিলেন—‘মুন্নি কোথায়, যে তাকে দোব? সে আজ চার পাঁচ দিন বাড়িই ফেরেনি।’

—সে কি?’ রঘুনন্দন পরোটার প্লেট থেকে হাত গুটিয়ে নিলেন।

—‘কালও ফেরেনি?’ রঘুনন্দনের ভ্রু কুঁচকে উঠেছে।

বললেন—‘কোথায় আছে ও? খবর পেয়েছ?’

—‘খবর পেয়েছি,’ অরুণা তাড়াতাড়ি বললেন, ‘লুকুর বাড়িতে খুব সম্ভব।’

—‘ঠিক আছে। লুকুর বাড়ি থেকেই ওকে পিক্‌আপ করব। এতদিন ধরে কলেজ কামাই করছে! ডাক্তারি জিনিসটা ফাঁকি দিয়ে পাস করা যায় না। গেলেও উচিত নয়।’

—‘আমি ঠিক জানি না ও লুকুর বাড়িতেই আছে কি না। আন্দাজে বললুম। ও তো শুধু “ফিরছি না” বলেই ফোন রেখে দিল।’

রঘুনন্দন খুব গম্ভীর মুখে বললেন —‘আই ডোন্ট লাইক ইট অরুণা।’ ভালো করে খেলেন না, মুখ মুছে গরম কফিটা কয়েক চুমুকে শেষ করে উঠে পড়লেন।

অরুণা বুনতে বুনতেই রঘুনন্দনের গাড়ির চলে যাওয়ার শব্দ পেলেন। তারপর নিঃশ্বাস ফেলে বোনার সরঞ্জাম সব থলিতে ভরে বারান্দার চেয়ারে এসে বসলেন। রান্নাঘরের পাশ দিয়ে যাবার সময়ে বলে গেলেন —‘বৈজু আমার কফিটা বারান্দায় দিও।’

খবর পেয়েছেন, মেয়ে ফোন করেছে বললেন বটে, কিন্তু অরুণা কোনও খবর, কোনও ফোনই পান নি। মাত্র দুদিনের কড়ারে কোন গ্রামে মেয়ে সহপাঠীদের সঙ্গে গ্রাম-উদ্ধারের কাজে গেছে। এই জানেন। বেরোবার সময়ে বলে গিয়েছিল —‘সময়মত না ফিরলে ভেবো না। বেশি দেরি হলে ফোন করে দেবো।’ কিন্তু গত পরশু থেকে ফোনের জন্যে হা-পিত্যেশ করে করে তাঁর কপাল ব্যথা হয়ে গেছে। রঘুনন্দন দিল্লি থেকে ফিরেছেন কাল অনেকরাতে। ফিরেই চান করে শুয়ে পড়েছেন। অরুণা সারারাত চোখের পাতা এক করতে পারেননি। মেয়ে তাঁর খুবই ভালো। নিজের দায়িত্ব নিজে নিতে পারে। কিন্তু নিজের কাজ ছাড়া আর সব কাজে যেন ওর মন। কিসের জাল যে বুনে যাচ্ছে। এতো রকম ব্যাপারে ওর মাথা দেবার দরকারটাই বা কি? অরুণার জীবনে স্বামী এবং মেয়ে ছাড়া আর কেউ নেই। শ্বশুরকুল নেই। পিতৃকুল মাতৃকুল কিছু নেই। মুন্নির বাবা চাকরির সুবাদে জেলায় জেলায় ঘুরে বেড়িয়েছেন, দিল্লি-কলকাতা করছেন তাও বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল। মেয়ের পড়াশোনার যাতে অসুবিধে না হয় তাই কলকাতায় এই ছোট বাংলো বানালেন অরুণাকেও ছেড়ে দিলেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল মেয়েও বাপের মতো আই. এ. এস হোক, আর সত্যি তিনি তা চাইতেই পারেন। বৃত্তি পরম্পরাগত হলে মানুষের সামর্থ্য বাড়ে, স্বাভাবিক ভাবেই সে অন্যদের থেকে পিতৃপিতামহের বৃত্তিতে কুশলী হয়ে ওঠে, এই ধারণা রঘুনন্দনের। উপরন্তু মুন্নি ছোট থেকেই খুব ধীর, স্থির, বিচক্ষণ। কিন্তু মুন্নি নিজের পড়াশোনার ব্যাপারে বাবা-মার ইচ্ছেকে আমল দিল না। সে ডাক্তারি পড়তে ঢুকেছে, খুব ভালো কথা, কিন্তু সেটাকেও যেন খুব গুরুত্ব দেয় না। অরুণা বরাবরই তাঁর সময় রঘুনন্দন আর মুন্নির মধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন। যখন কলকাতার বাইরে যান মুন্নি থাকে বৈজুর তত্ত্বাবধানে একা। কদিন বাইরে কাটিয়েই হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে আসেন তিনি। অথচ মজার কথা এই যে তাদের দুজনকে নিয়ে তাঁর এই হাঁসফাসানি তারা দুজনেই অতিমাত্রায় স্বনির্ভর। রঘুনন্দন চিরকাল হোস্টেলে মানুষ। নিজের জামাকাপড় নিজে কাচা, জুতোয় পালিশ লাগানো, ইস্ত্রি করা এসবে চিরকাল অভ্যস্ত। এখন সরকারি আমলা হয়ে এগোতে আর্দালি, পেছোতে আর্দালি, অরুণার কিছু করবার দরকার হয় না। সেখানে যে শক্তিটা খরচ করতে পারতেন সেটাশুদ্ধ অরুণা মেয়ের সেবায় লাগিয়েছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও মুন্নি স্বনির্ভর। ইদানীং দিন সাত আট দিল্লি কাটিয়ে অরুণা যখন ধড়ফড় করতে করতে ফিরে আসেন মুন্নি শান্তমুখে দরজা খুলে দেয়।

—‘ঠিক আছিস তো, মুন্নি?’

মুন্নি হেসে ফেলে। কোনও জবাব দেয় না।

—‘কি করছিলি?’

—‘পড়ছিলুম।’

—‘কি পড়ছিলি?’

—‘হাইডেগার।’

—‘কি ডেগার?’

—হাইডেগার’

—‘খুব অসুবিধে হয়েছিল?

—‘অসুবিধে হবে কেন?’

পরে বৈজুর কাছ থেকে শুনলেন তার নাকি তিনদিন জ্বর ছিল। মুন্নিই তার সেবা যত্ন করেছে, নিজেও বেশ রান্না করে খাওয়া-দাওয়া করেছে। বৈজু বলে দিয়েছে সে বৈজুর জন্য বার্লি তৈরি করে দিয়েছে। বন্ধুরা এসেছে তিন চার দিন। সবাই মিলে বাড়িতে ফীস্ট করেছে। দিদি এক দিনও দেরি করে ফেরেনি। রেণু আসেনি বলে একদিন ঘর ঝাঁটপাটও দিয়েছে। আর নিজের জামাকাপড় তো সে বরাবর নিজেই কাচে।

অরুণা বলেছেন—‘মাকে তাহলে তো তোর কোনোও দরকারই নেই!’

—‘কি যে বলো মা, কত যে অসুবিধে!’

—‘এই যে বললি, কোনও অসুবিধে নেই। তাছাড়া এই তো নিজে নিজে রান্না-টান্না, বৈজুর সেবা-পথ্য সবই তো করতে পেরেছিস!’

—‘করলেই বা।’

—‘এসব ভালোও তো লাগে তোর। কেমন সব বন্ধুবান্ধব মিলে হই-চই করলি। আমি থাকলে তো বাড়িটাকে এমনিভাবে ব্যবহার করতে পারিস না।’

—‘তাই বলে মা না থাকলে অসুবিধে হবে না?’

—‘কি জানি।’

—‘শোনো মা। কে তোমাকে এই ইউটিলিটেরিয়ানিজম্‌ শিখিয়েছে? তুমি না থাকলে আমার বুকের মধ্যে টেনিস বলের মতো একটা ভ্যাকুয়াম থাকে। একদম মধ্যিখানে। কিছুটা হার্ট কিছুটা লাং। এই ভ্যাকুয়ামটা ভরবার জন্যে আমি খুব লম্ফঝম্প করি। যদিও একটা ভাল্‌ভ আমার কিছুতেই কাজ করে না। নিঃশ্বাসে বায়ু থাকে মা, প্রাণ থাকে না।’

—যা যা চুপ কর তো!’

প্রথমটা খুব হাসতে থাকে মুন্নি, তার থাক কাটা কাটা চুল দুলিয়ে। তারপর হাসি থামিয়ে বলে—‘মা বিশ্বাস করো!’ মুন্নি যখন বিশ্বাস করতে বলে, তখন অবিশ্বাস করার থাকা শুধু অরুণা কেন, মুন্নির বাবাও ভাবতে পারেন না।

রাস্তার দিকে চোখ পেতে থাকতে থাকতে অরুণার আধ-কপালে মাথা-ধরাটা আরম্ভ হল। তিনি নিশ্চিন্ত হলেন। একটা চিন্তা নিয়ে থাকতে থাকতে যখন মাথাটা পাগল-পাগল লাগে তখন ভাবনা করার যন্ত্রটা বিকল হয়ে গেলে বড় শান্তি। তিনি নিজের ঘরে এসে ভেনিশিয়ান ব্লাইন্ডটা নামিয়ে দিলেন। কপালে ঘষলেন একটা সবুজ ওষুধ। ও ডি-কলোনের জলে রুমাল ভিজিয়ে নিয়ে চোখে চাপা দিয়ে শুয়ে পড়লেন। মাথার ঠাণ্ডা অনুভূতির ওপর মনটা পড়ে রইল। ঠাণ্ডা, খুব ঠাণ্ডা। আস্তে আস্তে মাথার নানান অলিগলিতে, ফাঁকে ফোকরে ঢুকে পড়ছে ঠাণ্ডাটা।

কেন যে নিজের কেরিয়ারটা ছাড়লেন। রঘুনন্দন মুখে বলেন নি ছাড়তে। কিন্তু তাঁর যখন অন্যত্র পোস্টিং হল অরুণা নিজেই থাকতে পারলেন না। বাপের বাড়ির সবাইকে চটালেন। তাদের সঙ্গে আজ আর কোনও সম্পর্ক নেই। শ্বশুর বাড়ি তো কোনদিনই তাঁকে গ্রহণ করেনি। রঘুনন্দনের তাতে কিছু আসে যায়নি। যতদিন তাঁর মা বেঁচে ছিলেন, মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছেন। কর্তব্য করেছেন, কিন্তু স্ত্রীকে কোনদিন অবহেলা করেননি। প্রথমটা অরুণা বড় সুখী হয়েছিলেন। বাপের বাড়ির পছন্দের কাউকে বিয়ে করলে এভাবে সুখী হতে আর পারতেন না। এখন মনে হয় যৌবন বড় স্বার্থপর। দায়-দায়িত্ব মাথায় নিতেও যতক্ষণ, আত্মসুখের জন্য সব নামিয়ে দিতেও ততক্ষণ। এখন নিজেকে খুব একলাও লাগে। রঘুনন্দন নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। একজন সিনিয়র আমলার নিজস্ব বলতে সময় খুব কমই থাকে। মেয়েও এখন নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত, মগ্ন। তিনজনে একত্রে থাকতে তো পারছেনই না এখন। রঘুনন্দন রিজার্ভ-ব্যাঙ্কের চাকরিটা নিলে এমন হত না। যে যার উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে এক চুলও নড়বে না… ফলে সুখ যা হবার চূড়ান্ত হয়েছে। মান সম্মানও প্রচুর, কিন্তু অরুণার নিজের জীবন ক্রমশ কিরকম অর্থহীন আনন্দহীন হয়ে যাচ্ছে। রঘুনন্দন তাঁর কর্মজীবনের নানান খুঁটিনাটির কথা তাঁর সঙ্গে আলোচনা করা আজকাল একরকম ছেড়ে দিয়েছেন। মুন্নি অবশ্য তার বন্ধু-বান্ধব, পড়াশোনা, সোশ্যাল ওয়ার্কের নানান কথা তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে, মতামতও চায়। কিন্তু কেমন আলগা-আলগা, যেন বুড়ি ধুঁয়ে যাওয়া। নিজের কাজ, নিজের জীবন, নিজের লক্ষ্য কিছু চাই-ই। না হলে এই মাথা-ব্যথা এই প্রতীক্ষার কষ্ট… এই টানাপোড়েন… এ চলবেই।…

মৈথিলী যখন বাড়ি ফিরল, বাড়িটা এই সকালেই নিঝুম। বৈজুদা বলল—‘মায়ের দরদ হচ্ছে মাথায়, দেখো হয়ত এখন ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছেন। বাবা খুব চিন্তা নিয়ে অফিস গেছেন।’

মৈথিলী তার ঝোল্লা ব্যাগটা বসবার ঘরের টেবিলে রেখে, জুতো খুলে পা টিপে টিপে মায়ের ঘরে ঢুকল। অঘোরে ঘুমোচ্ছে মা, চোখ থেকে রুমাল সরে গেছে। ওডিকলোনের মৃদু গন্ধ হাওয়ায়। মায়ের চোখের তলায় কালি। মৈথিলীর মাকে একটা চুমু খাবার ইচ্ছে হল, কিন্তু সে ইচ্ছে সংবরণ করে সে আবার পা টিপে টিপে বসবার ঘরে চলে এলো। ফোনের বোতাম টিপল …‘মিঃ ত্রিপাঠী আছেন? —বাবা আমি মুন্নি কথা বলছি। হ্যাঁ বাবা, অ্যাডাল্ট লিটরেসি প্রোগ্রামে দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ভেতরে যেতে হয়েছিল। অনেক কাজ। ফিরতে পারিনি। না কেউ না। লুকু?… লুকু যায় নি। আমি এসে গেছি, তুমি দুপুরে ভালো করে খেও।… কি করে জানলাম? বৈজুদা দেখালো, তোমার আধধাওয়া প্লেটটা এখনও রেখে দিয়েছে।’

বৈজু রান্নাঘরের দুয়োর থেকে চোখ পাকাচ্ছে—‘ঝুট বলবে না মুন্নি, ফোন রেখে মুন্নি বলল— ‘মিথ্যে কথা! তুমি যেভাবে বর্ণনা দিলে তাতে আমি ওই বিষন্ন, বিদীর্ণ প্লেটটাকে দেখতে পাচ্ছিলাম যে বৈজুদা!’ তার মুখে হাসি।

বৈজু মুন্নির কথাবার্তার ধরনে অভ্যস্ত। সে-ও হাসছে। কিছু না বুঝে। কিন্তু মুন্নি এসে গেছে। আবার ওইভাবে হাত নেড়ে শক্ত শক্ত শব্দ দিয়ে কথা বলছে তার ভারি আনন্দ।

মায়ের ঘর থেকে চাপা আওয়াজ ভেসে এলো—‘মুন্নি এলি!’ মৈথিলী প্রায় এক লাফে মার ঘরে ঢুকে গেল। মায়ের বুকের ওপর ঝুঁকে পড়তেই মা বললেন —‘তোর জামাকাপড়ে কি বিটকেল গন্ধরে!’

—‘গন্ধ হবে না? সারাদিন রোদে রোদে ঘোরা, না জামা-কাপড় বদলানো, না ভালো করে চান, সেই এক ধড়াচুড়ো। এতদিন থাকতে হবে, এত অসুবিধেয় পড়ব, তা কি আগে জানতাম? মা, কোথায় শুয়েছি জানো?’

—‘কোথায়?’

—‘খড়ের বিছানায়।’

——‘সে কি রে?’

—‘সে এক অজ পাড়া গাঁ মা। মাটির ঘর খড়ের চাল, এ ছাড়া কিছু নেই। ওদের এক জনদের একটা বাড়তি ঘর খালি করে দিল, চারচালা ঘর। মেঝেতে আঁটি আঁটি খড় বিছিয়ে দিল, তার ওপর যে যার চাদর পেতে ধড়াচুড়ো পরে শুয়ে পড়লাম।’

—‘কে কে ছিল?’

—‘প্রমিত, শান্তনু, বুল্টু আর উজান।’

—‘সে কি লুকু ছিল না? আর কোন মেয়ে না?’

—‘লুকু শেষ পর্যন্ত যেতে পারল না। ওর বোধহয় মাম্পস হয়েছে মা।’

—‘তুই একা মেয়ে?’

—‘হ্যাঁ। তাতে কি?’

—‘তুই আর ওই চারটে ছেলে এক ঘরে?’

—‘হ্যাঁ! আর কোথায় জায়গা পাবো?

—‘মুন্নি, তুমি এভাবে আর যেও না। এগুলো ঠিক হচ্ছে না। বড়দের মধ্যে কেউ ছিলেন না?’

—‘প্রোফেসর সোম ছিলেন।

—‘তিনিও ওই একই ঘরে?’

—‘বাঃ, তাছাড়া কি?’

—‘তোর অস্বস্তি হল না! আচ্ছা মেয়ে তো!’

—‘অস্বস্তি হলেই বা কি করবো? উজানের অবস্থা যদি দেখতে! আঁট জিন্‌স্‌ পরে শুয়েছে মাঝ রাত্তিরে উঠে বসে বলল—‘আমার কোমর, পা সব হাঙরে কেটে নিয়ে যাচ্ছে।’ গ্রোফেসর সোম বললেন—‘তুমি একটু আলগা করো, আলগা হও, মৈথিলী দেয়ালের দিকে মুখ করুক। তাছাড়া এই লণ্ঠনের আলোয় কাউকেই ভালো করে দেখা যাচ্ছে না,’ গলাটাকে অনুপস্থিত ডঃ সোমের মতো ভারী করে মৈথিলী বলল।

অরুণার রাগ হচ্ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি হেসে ফেলতে বাধ্য হলেন, বললেন —‘তোরা কি রে? লাজ-লজ্জা সব বিসর্জন দিয়েছিস?’

—‘লাজ-লজ্জা আবার কোথায় বিসর্জন দিতে দেখলে মা! কাজ করতে গেলে অতো পুতুপুতু চলে না, অ্যান্ড কাজ ইজ আ হান্ড্রেড টাইমস মোর ইমপর্ট্যান্ট দ্যান অল দ্যাট ন্যাম্বি-প্যাম্বি অ্যাবাউট মডেস্টি।’

অরুণা বললেন—‘যত কাজ কি তোর একারই মুন্নি? আর কেউ নেই?’

—‘কাজ করবার লোক সত্যিই খুব কম, মা। এই দ্যাখো না, লুকুটা অসুখ বাধিয়ে বসল। দেবপ্রিয় টার্ন আপ করল না, গুঞ্জন তো কি সব পরীক্ষা দিচ্ছে। আসলে আমরা সবাই ভাবি ওরা তো আছে ওরা করবে। লোক এমনি করে করে কমে যায়। যাক, তোমার মাথার যন্ত্রণা গেছে তো?’

অরুণা বললেন—‘এক ঘুম তো দিয়ে নিলুম। এরকম ভাবে কি কারো যন্ত্রণা যায় মুন্নি? অন্য সংসারে দেখো কর্ত্রী হাল ধরে থাকে, তার কথামতো, তার সুবিধে মতো সবাই চলে। আমার হয়েছে তোমাদের দুজনের মধ্যে তাঁতের মাকুর মতো ঘোরা। আর ভালো লাগছে না।’

—‘মা, তুমি আজ একদম খাঁটি সত্যি কথাটা বুঝেছ। তোমার নিজস্ব কিছু কাজ দরকার। যদি করতে চাও মা তোমাকে আমি অনেক কাজ দিতে পারি।

—‘রক্ষা করো! অরুণা গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘আমার কাজ আমি খুঁজে নেবো। তোমায় আর আমার কাজ নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না। তবে মনে রেখো মুন্নি, আমার নিজস্ব কাজ হলে আর তোমরা আমায় এরকম এক পায়ে খাড়া পাবে না। আমিও ব্যস্ত হতে, অন্যমনস্ক হতে জানি।’

মৈথিলী বলল—‘মা, তুমি দেখছি সত্যি-সত্যিই খুব রাগ করেছে। রাগ হলেই তুমি ভালো ভালো লাগসই ইডিয়ম ব্যবহার করো। ‘এক পায়ে খাড়া’টা রাগ হলেই তুমি বলো।’

মায়ের কাছে মৈথিলী একটু তরল, বাবার কাছে তরলতর। কিন্তু একই মিশ্রণের গাঢ়তা যেমন তাপের তারতম্যে বাড়ে কমে, তার স্বভাবের ব্যাপারেও তাই। মা বাবার উত্তাপে সে খানিকটা গলে থাকে। বাইরের পৃথিবী যত শীতল, যত নৈর্ব্যক্তিক সে ততই ঘন, ততই ঋজু, সংকল্প কঠিন, ওজনদার ও তার নেতৃত্ব তখন মেনে নেয় সবাই। উজান পর্যন্ত যে উজান শতকরা নব্বই ভাগ পুরুষ, দেব পর্যন্ত জীবন সম্পর্কে যার ধারণা মৈথিলীর চেয়ে অনেক প্রত্যক্ষ।

ছাত্রসঙ্ঘের প্রথম প্রোগ্রাম হয় বয়স্ক শিক্ষা। মেধাদি এবং ডাঃ সোমের সঙ্গে আলোচনা করতে ওঁরা মৈথিলীর ওপরেই সব ভার দিলেন। সূর্যদা বয়স্কশিক্ষার পাঠক্রম ঠিক করে দিলেন। সে সব ঠিকভাবে সাজানো মেধাদি সূর্যদা আর নন্দিতাদির সাহায্য নিয়ে প্রধানত মৈথিলীই করল। সেই পরিকল্পনা মতো তারা শালকিয়ার পিলখানা বস্তিতে, কাঁকুলিয়ার বস্তিতে কাজ করল। কিন্তু মৈথিলীর একেক সময়ে সন্দেহ হয় সে এই ধরনের নেতৃত্বের যোগ্য কি না, সে বড্ড শহুরে, বড্ড বেশি উচ্চবিত্ত। শুভ-সংকল্প আর সমবেদনা ছাড়া এই স্তরের মানুষের সঙ্গে তার কোনও যোগ নেই। যখন তারা শহরের আশপাশের শ্রমিক-বসতিগুলোয় অভিযান চালানোর কথা আলোচনা করছে, পুলকেশ, প্রমিত, উজান সবাই-ই এতে সায় দিচ্ছে, সে সময়ে দেব একদিন বলল মফঃস্বলের লোকেরা যত দরিদ্রই হোক, কিছু-না-কিছু সুযোগ-সুবিধে তারা পায়ই। কিন্তু শহর থেকে বহু দূরে যেসব গণ্ডগ্রাম আছে সেখানকার অবস্থা সত্যিই ভয়াবহ। আগে এরা মহাজনের ওপর নির্ভর করে মার খেতো। এখন খাচ্ছে পঞ্চায়েত আর জেলা-বোর্ডের হাতে। এদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তার সর্বপ্রথম দরকার। উজান তখন দেবদের গ্রামটাকেই কর্মকেন্দ্র করবার প্রস্তাব দেয়। দেব বলে হুগলি জেলায় এমনিতে লিটরেসি লেভেল হাই। তার ওপর ওদের গ্রামে পৃথ্বীন্দ্রনাথ গাঙ্গুলি বলে একজন আছেন, তিনি নিজেই বয়স্ক শিক্ষার প্রোগ্রাম নিয়েছেন। ওদিকে না গেলেও চলবে। অনেক ভাবনা-চিন্তার পর ঠিক হল দক্ষিণ চব্বিশপরগনার এই কেওড়া বা কেওড়াখালি গ্রাম। ওই গ্রামের স্কুলের হেডমাস্টার নিরঞ্জন খাঁড়া মশাইয়ের সঙ্গে এম ভি’র কিভাবে যেন যোগাযোগ হয়। খুব সম্ভব খরার সময়ে নিরঞ্জনবাবু নানান জায়গায় সাহায্য প্রার্থনা করে করে ঘুরতেন। এম ভি-ই প্রথম সূর্যদা আর নন্দিতাদিকে নিয়ে কেওড়াখালি গ্রাম দেখে আসেন। প্রোগ্রাম ছকা হল। মা বাবাকে অ্যাডাল্ট লিটরেসি বলে বুঝিয়ে দিলেও মৈথিলীদের পরিকল্পনা আরও ব্যাপক। তারা এর জন্য চ্যারিটি শো করে করে টাকা তুলেছে, ছাত্রসঙ্ঘের চাঁদার টাকা, এবং কিছু কিছু ডোনেশনও আছে।

স্টেশনের নাম কি অদ্ভুত অদ্ভুত— বহড়ু, তালদী, ধপধপি। অন্য স্টেশনে নেমেও যাওয়া যায়। ওরা ধপধপিতে নেমেছিল। বাসের রাস্তা শেষ হয়ে গেল। তারপর কুলতলির মাঠ। দক্ষিণ-পূর্ব কোণ ধরে এই তেপান্তর পার হতে হয়। ভীষণ গর্ত, জায়গায় জায়গায় কাদার দঁক, বালি। এখানে ওই গ্রামের উৎসাহী হেডমাস্টারমশাই নিরঞ্জন খাঁড়া একটা ভ্যানগাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। সেই ভ্যানগাড়িতে তারা ছজন কিছুটা বসে কিছুটা ঠেলে গ্রামে পৌঁছল। ছেলেরা সবাই কিছুটা করে ঠেলেছে। ডঃ সোম, কিছুতেই ভ্যানগাড়িতে উঠবেন না, হাঁটছেন, আর কপালের ঘাম মুছছেন। সাইকেলের চাকা মাঝে মাঝেই বসে যাচ্ছিল ময়াল সাপের মতো কাদার ফালে। এদিকে বৃষ্টি হয়নি, কিন্তু ওদিকে, শহরের ছেলে মেয়েরা যাবে জেনে তাদের বিপদে ফেলবার জন্যেই যেন বেশ কয়েক দফা হৈমন্তী বৃষ্টি হয়ে গেল। শীতও বাড়ল। রাস্তার কষ্টও। ডঃ সোম বারণ করা সত্ত্বেও মৈথিলীও কিছুটা ঠেলেছে। মেয়ে বলে সে আলাদা সুবিধে নিতে চায় না। যদিও উজান বলেছিল—‘মৈথিল, বাড়াবাড়ি করিসনি। ডাক্তারি পড়ছিস, নিশ্চয় জানিস ছেলে হবো বললেই হওয়া যায় না।’

গ্রামটা এলোমেলো গাছ পালায় ভরা। শীতের গোড়ায় বহু গাছের পাতা ঝরে গেছে। রাস্তাঘাট, বসতবাড়ি, পুকুরঘাট ইত্যাদির শোচনীয় অবস্থা। কুটিরগুলো মোটামুটি পরিষ্কার। কিন্তু এদের পরিচ্ছন্নতার একমাত্র ধারণা গোবর। গ্রামটাতে নদী নেই। কিছু দূরে মাতলা নদী থেকে খালের মতো খানিকটা ঢুকে এসেছে। বাঁয়ে পিয়ালীরও এরকম দু-একটা খাল আছে। এগুলোকে ওরা কানা মজা আর বোজা নাম দিয়েছে। একটিমাত্র পুকুর। তাতেই গ্রামসুদ্ধু লোকের চান, বাসনমাজা, কাপড় কাচা, পানীয় জল সংগ্রহ সব চলে। দেখে শুনে বুল্টু বলল—‘এরা বেঁচে আছে কি করে বল তো? আন্ত্রিক আর কলেরায় এখনও উজাড় হয়ে যায় নি এটাই আশ্চর্য।’

নিরঞ্জন খাঁড়া জানালেন এবছর গরমকালেই প্রচণ্ড আন্ত্রিকের মড়ক লেগেছিল। প্রথমে ওদের দু দিন থাকার কথা ছিল। অবস্থা দেখে ঠিক হল পাঁচদিনের কমে কিছু হবে না। কোন্ কোন্ ব্যাপারে সংস্কার চাই, কোথায় নতুন উদ্যোগ দরকার সেগুলো সরেজমিনে ছকে ফেলা চাই। কুয়ো এবং নলকূপ খোঁড়া হবে। স্পটগুলো উজান ঘুরে ঘুরে ঠিক করল। ওরা থাকতে থাকতেই তো একটা পাতকুয়ো খোঁড়া হয়ে গেল। কিন্তু টিউবওয়েলের জন্যে তো শহরে এসে বিলিব্যবস্থা করতে হবে! খালগুলো থেকে কচুরিপানা পরিষ্কার করাতে হবে। বেশ কিছু জলা জায়গা আছে সেগুলোরও সংস্কার চাই। চারদিনই বিকেলবেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনা করেছে মৈথিলী আর প্রমিত। সাধারণ স্বাস্থ্যের নিয়মপালন, পানীয় জল সম্পর্কে কড়াকড়ি। সাপের কামড়ে এখানে প্রায়ই লোক মরে, সর্পাঘাত, আগুন, জলে ডোবা ইত্যাদির ব্যাপারে ফার্স্ট এইড এবং পরবর্তী করণীয় পরিবার পরিকল্পনা। তালিকায় তো রয়েছে প্রচুর, চার দিনে আর কতটুকু হয়। বয়স্ক শিক্ষার ক্লাসও নিয়েছে বাকিরা, সন্ধেবেলায়। হেড মাস্টার নিরঞ্জনবাবুকেই বয়স্ক-শিক্ষার ট্রেনিং এবং দায়িত্ব দিয়ে এসেছে ওরা। তিনি প্রতি সন্ধেবেলায় তাঁর স্কুলঘরেই বড়দের পড়াবেন। দরকারি বইপত্র, স্লেট পেনসিল, বোর্ড চক প্রভৃতি প্রথম দফায় যা লাগবে তা সবই ওরা দিয়ে এসেছে। স্বাস্থ্য সম্পর্কে ওরা শুধু ক্লাসই নেয়নি। বাড়ি বাড়ি ঘুরে সরেজমিনে দেখে শুনে হাতে কলমে কিছু কিছু আচরণবিধি শিখিয়ে দিয়ে এসেছে।

দেব যে কেন গেল না! শেষ মুহূর্তে টার্ন আপ করল না। ওরও কি লুকুর মতো কিছু অসুধ-বিসুখ করেছে? মনে হয় না। চেহারার ধরণটা একটু পলকা হলেও দেব রীতিমতো ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী। এতদিনের মধ্যে একদিনও তার কোনও শারীরিক গণ্ডগোল হতে দেখা যায়নি। ওদের যাবার আগে, কি কি প্রয়োজন হতে পারে, বইপত্র ইত্যাদি কোথায় পাওয়া যাবে, আন্দাজ কতো নেওয়া হবে এ সবই ব্যবস্থা ও করেছিল। কারণ ওর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে। ও-ই বলেছিল স্বাস্থ্য সম্পর্কে একটা দুটো বক্তৃতায় বা ফার্স্টএইড শিখিয়ে এলেই কাজ হবে না। স্থানীয় দুচার জনকে রীতিমতো ট্রেনিং দিয়ে, প্রাথমিক কিছু ওষুধ পত্র ব্যান্ডেজ, গজ, অ্যানটিসেপটিক ইত্যাদি দিয়ে স্বাস্থ্য কেন্দ্র খুলে দিয়ে আসতে হবে।

নিরঞ্জন খাঁড়া ছাড়া লেখাপড়া বলতে কেউ কিছু জানে না। একদম চাষীগাঁ। কিন্তু নিরঞ্জনবাবু সকালে ছোটদের স্কুল চালান। সন্ধেয় এখন থেকে বড়দের ক্লাস নেবেন, এর পরে যদি স্বাস্থ্যকেন্দ্রও চালাতে হয় তো তাঁর পক্ষে বড্ড বেশি হয়ে যায়। প্রাথমিক কিছু ওষুধপত্র তাঁর কাছেই রেখে এসেছে ওরা। তাঁর স্কুলের সবচেয়ে উজ্জ্বল ছেলেটির নাম নীলমণি, তাকে তৈরি করে দিতে পারবেন আশ্বাস দিচ্ছেন নিরঞ্জনবাবু।

ইতিমধ্যে গ্রামের মেয়েরা পাতকুয়ো এবং টিউবওয়েল খোঁড়া হবে শুনে খুব উৎসাহী। পঞ্চায়েতে বলে বলে ওরা হার মেনে গেছে। এ গ্রাম তো পুরোপুরি গ্রামের মর্যাদাও পায় না, মৌজা মাত্র। গ্রাম সেবকদের এ গ্রামের কথা মনে থাকে না। বড় বড় বর্গাদার আছে পাশের গ্রামে, তাদের গায়ের জোর, গলার জোর, ট্যাঁকের জোর সব বেশি। মনোযোগ সবটুকু তারাই কেড়ে রেখেছে। সেচের তো কথাই নেই, পানীয় জলের জন্যও শুখার দিনে ওদের বহুদূর যেতে হয়, সেই কষ্ট কমবে। বয়স্ক-শিক্ষার ব্যাপারে আবার এদের উৎসাহ কম। দু একজন গিন্নিবান্নি বলল—‘কি হবে গো দিদি! মেয়ে তো তোমার মতো পেন্টুল পরে শহরে বাজারে ঘুরবে না! ষোল পার হলেই বিয়ে দিয়ে দুব। নাউয়ের শাক রাঁধবার জন্যে কি গোবরছড়া দেবার জন্যে নেকাপড়া না শিখলেও চলবে।’

প্রমিত বলল আপনার মেয়ের ছেলেকে লেখাপড়া শেখাবেন তো!

—‘সে শক তো মানুষের থাকেই দাদাবাবু।’

—‘তবে? নাতির বেলায় চাইছেন, মেয়ের বেলায় চাইছেন না কেন? মেয়ে লেখাপড়া শিখলে নাতির তো ঘরে বসেই অক্ষরপরিচয় হয়ে যাবে। ইস্কুলে যাবার আগেই। লেখাপড়া শিখলে কেউ ঠকাতে পারবে না, কাগজ পড়বেন, ইস্তাহার পড়বেন, সই কিসে দিচ্ছেন জানতে পারবেন।’

গিন্নি-মানুষটির মুখ তবু গোঁজ রইল। সন্ধেবেলায় মেয়ে ঘরে পিদিম দেখায় জল ছড়া দেয়, রান্না করে, সে সময়টা তাকে ছাড়তে হলে তার ক্ষেতি।

আসবার সময়ে আবার খাঁড়া মশাই হাত কচলে বললেন ‘এদের একটা ভীষণ অভাব পরনের বস্ত্রের। অনেকেরই একটি বই দুটি নেই। আপনারা যদি আপনাদের পুরনো জামাকাপড় কিছু দ্যান, ছেলেমেয়েগুলো পরে বাঁচে।

শান্তনু, প্রমিত, উজান নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঠিক করল ওরা এবার কলকাতা ফিরে গিয়ে পুরনো জামাকাপড় সংগ্রহ করবে। নিরঞ্জনবাবু কয়েক দফায় নিয়ে আসবেন।

মায়ের সঙ্গে কথাবার্তা হওয়ার পর মৈথিলী ভালো করে চান করল, বেশ করে সাবান মেখে। তাররপর নিজের ঘরে ঢুকে, কিছুক্ষণের মধ্যেই ডায়েরি লেখায় মগ্ন হয়ে গেল। এটা তার নিত্যকর্ম।

অধ্যায় : ৬
গলার ব্যথায় লুকু ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে। লুকুর যে কত ব্যথা! কখনও হাত-পা ব্যথা। কখনও মাথা ব্যথা, কখনও বুকের মধ্যেটা ভারি হয়ে থাকে। এ সব সে কাউকে বলে না। বাবাকে তো নয়ই। বন্ধু-বান্ধবদেরও নয়। তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু মুন্নি, মৈথিলী। কিন্তু ছোটবেলায় তারা যেমন অবিচ্ছেদ্য ছিল, এর পুতুল ওকে দিত, জামাকাপড় বদলি করত, এখন আর তেমন নেই। মৈথিলীর দৈত্যের মতো স্বাস্থ্য, একেক সময়ে তাকে দেখলে মনে হয় সে যেন ব্যাসল্ট কি গ্রানাইট পাথর দিয়ে গড়া। দেশ, সমাজ আর মানুষ নিয়ে সে এখন এমন মেতেছে যে আপনজনদের কথা শোনবার, ভাববার ফুরসৎ পায় না। লুকুর মনে হচ্ছে মৈথিলীর পথ এবার ক্রমশই তার থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। মৈথিলী কাজে মগ্ন, এই বিচ্ছেদ সে বুঝতে পারছে না, লুকু বুঝতে পারছে, বুঝে তার ভেতরের ব্যথা বেড়ে যাচ্ছে আরও। সারাজীবনটা কি শুধু হারাবারই খেলা! কিছুই কি তার প্রপ্তিযোগ নেই! মুন্নিকে একদিনই সে তার স্বাস্থ্যের অবনতির কথা বলেছিল, সে বলল—‘ওই যেগুলো বলছিস লুকু, এগুলো কাদের হয় জানিস?’

‘কাদের?’

—‘একদম অলস, নিষ্কর্মাদের। তুই আরও বেশি কাজ কর লুকু। আর একদম ব্রুড করবি না। ব্রুড করাটা তোর একটা বিলাস হয়ে দাঁড়াচ্ছে।’

লুকু যেখানে সমর্থন পায় না, সেখানে আর মুখ খোলে না। ব্যাস। আর কোনদিন সে এ সব কথা মৈথিলীকে বলেনি।

আপাতত তার যা কষ্ট তা ডাক্তারসিদ্ধ। অর্থাৎ স্বয়ং পাস-করা ডাক্তার এসে দেখে, পরীক্ষা করে বিধান দিয়ে গেছেন, এ কোনও অস্পষ্ট শরীর খারাপ নয়, যে ভোক্তা ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারে না, সাইকোসোম্যাটিক বলে যেগুলোকে উড়িয়ে দেওয়া সহজ। তার বাঁ কানের তলা ফুলেছে। খেতে পারছে না। গলা গলা ভাত তাও গিলতে পারছে না। উপরন্তু গলায় একটা মাফলার জড়িয়ে রাখতে হয়েছে। নভেম্বরের মাঝামাঝি হওয়া সত্ত্বেও শীত এখনও তেমন পড়েনি। গরম লাগছে তাই। নিজেকে দিনে অন্তত দুবার আপাদমস্তক পরিষ্কার না করলে, লক্ষ্মীশ্রীর নিজের শরীরটাকে কেমন ঘেন্না করে। এখন যেন মনে হচ্ছে গায়ে ইদুঁর-পচা গন্ধ। ডিওডোরান্টটা ভালো করে স্প্রে করে একটু ট্যালকম পাউডার হাতে পায়ে ঘষে নিল সে। চুলগুলো ভালো করে ব্রাশ করল। মা বলত হান্ড্রেড স্ট্রোকস আ ডে। এখন সে ক্ষমতা নেই। একটু যেন ফ্রেশ লাগছে এবার। নিজের ঘরে থাকতে ভালো লাগছে না। ঘরটা যেন তার নিঃশ্বাসে নিঃস্বাসে ভর্তি হয়ে গেছে। নিজের ওপর কি রকম রাগ হচ্ছে। গ্ল্যান্ড হবার আর সময় পেল না! ওরা সকলে কি সুন্দর গ্রামে ঘুরে এলো। নিশ্চয়ই অনেক মজা করেছে। চ্যারিটি শো করতে গিয়েই যা মজা!

আচ্ছা…আমার বদলে কি কেউ গিয়েছিল? কে যেতে পারে? মেয়েদের পক্ষে বাড়ি থেকে পারমিশন যোগাড় করা একটু মুশকিল। কলেজ থেকে এক্সকার্শন যাওয়া হচ্ছে সে এক রকম, বন্ধুরা মিলে কোথাও বেড়াতে যাওয়া হচ্ছে সে-ও চলে, কিন্তু কয়েকজন ছেলে-মেয়ে মিলে জনৈক অধ্যাপকের নেতৃত্বে গ্রাম সংস্কার! হরি বলো! কথাগুলো বুল্টুর। সে এইভাবে অভিভাবকদের নকল করে। গুঞ্জনের কি পরীক্ষা আছে। আগেই বলে দিয়েছিল যেতে পারবে না। মউমিতা, সর্বাণী কি বাড়ি থেকে অনুমতি পাবে? তবে কি মৈঘিল একাই গেল? একবার ফোন করে দেখলে হত। কিন্তু গলা খুলতে বড় কষ্ট। তার চেয়ে একটা বই নিয়ে ড্রয়িংরুমে সোফায় গিয়ে বসি। বাবা অফিস থেকে কখন ফিরবে তার ঠিক নেই। ভাইয়ের স্কুল থেকে ফিরতেও বেশ দেরি।

বাড়িটা একদম ফাঁকা। ড্রয়ার থেকে একটা সিগারেটের প্যাকেট বার করি। ধরাই, হ্যাঁ? দিস ইজ ফান, জাস্ট ফান। আচ্ছা তোমরাই বলো ছেলেরা যত খুশি স্মোক করবে, মেয়েরা কেন করবে না? দুজনেরই যদি কাজকর্ম এক হয়, টেনশন এক প্রকৃতির হয়, সব দিক থেকে সমান… শুধু শরীরের গঠন আলাদা! শান্তনু, প্রমিত, উজান সবাই স্মোক করতে পারে। দেব, হ্যাঁ দেবও টানে লুকিয়ে লুকিয়ে। দেব সব ব্যাপারে শহরের ছেলেদের টেক্কা দিতে পারে, খালি চালচলনে পারে না। এ জন্য ওর একটা কমপ্লেক্স আছে। নির্ঘাৎ তাই ও লুকিয়ে লুকিয়ে সিগারেট খায়। যখন কেউ থাকে না, তখন। কোন মামার বাড়িতে থাকে সেখানে পারে না, নিজের দেশের বাড়িতে পারে না। ওর মেজ জেঠু শকড্‌ হবেন, অন্যদের সামনে সেজে থাকে গুডি বয়। কিন্তু আড়ালে আবডালে ও স্মোক করা ভালোমতো অভ্যেস করছে। হঠাৎ একদিন পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে রিং টিং ছেড়ে সব্বাইকে চমকে দেবার ধান্দা। আমার স্মোক করতে দারুণ লাগে। কি রকম একটা অতিরিক্ত ব্যক্তিত্ব আসে। খুব ভালো করে তখন বুঝতে পারি ছেলেরা কেন এতো স্মোক করে। ব্যক্তিত্বের অভাব, শক্তি সামর্থ্যে স্মার্টনেসে ঘাটতি সবই পুষিয়ে যায় ধোঁয়ায়। যে ছেলেকে এমনিতে কেউ পাত্তা দেয় না, সে-ই যখন ঠোঁটে সিগারেট ঝুলিয়ে, চোখ আধরোজা করে একটু একটু করে ধোঁয়া ছাড়ে, তার চেহারায় একটা আলাদা ডাইমেনশন আসে। লোকে বলবে তুমি মেয়ে, তোমার তো পুরুষত্বের দরকার নেই, তুমি কেন স্মোক করবে, বাজে অভ্যাস ধরবে একটা! পুরুষত্ব মানে কি? বায়োলজিক্যাল পুরুষত্ব একটা হাস্যকর প্রত্যঙ্গ। ওটার জন্যে কোনও দুঃখ নেই। কিন্তু আদেশ করবার ক্ষমতা, যে কোনও কাজে একটা অনায়াস সামর্থ্য এইগুলোর জন্য ভেতরে ভেতরে একটা ভীষণ তাগিদ আছে, বুঝতে পারি এগুলো মুন্নির আছে। জীবনে যদি কিছু করতে হয় তো ওটা চাই। মৈথিল, মৌমিতা, আমি, উজান, গুঞ্জন, প্রমিত সব এক স্কুলের ছাত্রছাত্রী। কেউ এক বছর আগে, কেউ পরে। এইচ. এসের পর একেক জন একেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। আমার ইচ্ছে ছিল আর্কিটেকচার পড়ি। কিন্তু জয়েন্টে পারলাম না। বাবা বলল, ‘হিসট্রিতে তো তোমার বরাবর ভালো মার্ক্স। হিসট্রি নিয়ে পড়াশোনা করো। একেবারেই আর সায়েন্স নয়।’ মৈথিলও তাই বলল। কিন্তু আমরা পুরনো স্কুলের বন্ধুরা সবাই ছাত্রসঙ্খে আছি। নিয়মিত দেখাসাক্ষাৎ হয়। নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা আমরা বলাবলি করি।

এমনিতেই আমাকে সুন্দর দেখতে বলে, নরম বলে, অনেকে অনেক সুযোগ নেয়। লোকের হাবভাব দেখে মনে হয় রূপ দেখানো আর রূপ দেখিয়ে পাঁচজনকে এনটারটেইন করা ছাড়া আমার আর কোনও কাজ নেই। মউমিতা খালি বলবে—‘তোর আর কি? তোর যা রূপ, মুণ্ডু ঘুরে যাবে, যেখানেই যাবি।’

—‘আই অবজেক্ট।’ আমি চেঁচাই ‘রূপ আছে আছে, তাই বলে সব কিছুর সাবস্টিট্যুট সেটা নয়।’

—‘তাহলে অত সাজিস কেন?’

—চুলের যত্ন, গাত্রত্বকের যত্ন, ম্যাচ করে ড্রেস করাটা সাজ হল? এ সব সে জন্মে থেকে মায়ের কাছে শিখেছে। তার মা লিপস্টিক, ব্লাশার ছাড়া বেরোত না। মাসে দু বার বিউটি সেলুনে গিয়ে চুল সেট করে আসতো। ছোট্ট লুকু সে সব সময়ে ধৈর্য ধরে মায়ের ভ্যানিটি ব্যাগ ধরে সেলুনের উঁচু চেয়ারে বসে থাকত। যে সময়ের যা, তা ছাড়া অন্য কিছু মাকে পরাও তো! সন্ধের শাড়ি আলাদা, রাত্রের শাড়ি আলাদা, সকালের আলাদা, বিকেলের আলাদা। লুকুকেও মা ডজন ডজন, ফ্রক করিয়ে দিত, একটু বড় হতে কত রকম ড্রেস। মায়ের তুলনায় লুকু তো কিছুই করে না। মায়ের সঙ্গে সঙ্গেই চলে গেছে তার সাজগোজ। আসলে তার গায়ের চামড়াটা শুধু মাখনের মতো নরমই নয়, স্বচ্ছও। ভেতরে সূক্ষ্ম লাল রক্তবহা নালীগুলোর লালিমা যেন দেখা যায়। মনে হয় সে খুব প্রসাধন করেছে। লুকুর চোখের জমি নীল, মণিগুলো গাঢ় নীল, কাচের মতো একটা স্বচ্ছতা সেখানেও। যেন মণির ছিদ্রপথ ধরে বহুদূরে তার শরীর মনের অভ্যন্তরে রোমাঞ্চকর এক যাত্রায় নেমে যাওয়া চলে। শ্যাম্পু করলেই লুকুর চুলে ঢেউয়ের ওঠানামা শুরু হয়। অন্য সময়ে নরম সুগন্ধ, সামান্য সোনালি আভার দ্যুতিময় একঢাল চুল। তার চোখের পাতা মস্ত লম্বা, বাঁকানো। মায়ের একটা কথা লুকুর প্রায়ই মনে পড়ে— ‘লুকু, চেহারাটা তোমার একটা অ্যাসেট। তাকে কোনমতেই নষ্ট করো না। শুধু চেহারার জন্য জীবনে অনেক সুযোগ, অনেক ভক্তি, ভালোবাসা পাবে তুমি, যেগুলো অন্যরা পাবে না।’

কিন্তু শুধু রূপের জোরে কোথাও পৌঁছতে লুকুর ঘৃণা হয়। এমন কোনও দেবপাদপীঠ সে আরোহণ করতে চায় না, যেখানে মানুষের রূপজ-মোহ তাকে অন্ধের মতো তুলে দেবে। গা ঘিনঘিন করে তার যখন বয়স্ক মানুষেরা মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বাসের সীট ছেড়ে দেয়। লেডিজ সীটের কাছে লেপটে থাকে মাঝবয়সীরা। দেখুক না, সৌন্দর্য দেখবারই জিনিস। উজানকেও একবার দেখলে আবার দেখতে ইচ্ছে করে লুকুর। কিন্তু অমন লোভ থাকবে কেন দৃষ্টিতে! সেদিন এসপ্লানেডে নেমেছে, মেট্রোয় বাড়ি ফিরবে। একজন ভদ্রলোক মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বললেন—‘আহা হা হা, মে গড ব্লেস ইউ।’ এই প্রতিক্রিয়াটা ভারি অদ্ভুত, ভারি নতুন লেগেছে লুকুর। সুন্দর চেহারার জন্যে যদি লোকের কাছ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আশীর্বাদ পাওয়া যায় তো মন্দ কি? কিন্তু তারপর? রূপ তো প্রথম দর্শন। তার পরও তো অনেক দর্শন আছে, তখন? তখন নিজের মূল্য প্রতিষ্ঠিত করতে হলে অন্য কিছুও তো চাই। পরীক্ষার মার্ক্সটা পর্যন্ত আশানুরূপ না হলে ওরা বলে ‘তোর আর দরকার কি?’

এ রকম যখন বলে কেউ, তখন রাগে তার শরীরের ভেতরটা কেমন করতে থাকে। কিন্তু ভাবমূর্তি তৈরি করেছে ভদ্র, নরম মেয়ের, চট করে তার থেকে সে বেরিয়ে আসতে পারে না। মৈথিলী যে বুদ্ধিতে, অন্যান্য গুণে তার থেকে শ্রেষ্ঠ সেটা সে মেনে নিয়েছে। যা সূর্যের মতো স্বতঃপ্রকাশ তাকে মেনে না নেওয়ার কোনও মানে হয়? তার সঙ্গে লুকুর প্রতিযোগিতা নেই। ছিল না। কিন্তু গুঞ্জন, মৌমিতা, উজান তাকে ছাড়িয়ে গেলে তার ভীষণ অপমান বোধ হত। উজানের সঙ্গে এক ব্র্যাকেটে থেকে তার স্বস্তি হত। আর উজান তো এখন ভিন্ন পথের যাত্রী হয়ে গেছে।

পুরো সিগারেটটা শেষ করে খানিকটা আরাম পাওয়া গেল। সকাল থেকে মনটা খারাপ হয়ে ছিল। এখন অনেকটা হালকা লাগছে। ফ্রাস্ট্রেশন বড় বিশ্রী জিনিস।…

এক এক সময় ভাবি কি দরকার আমার এই দৌড়বাজির! আমি যা, যতটুকু মেনে নিই না কেন? কিন্তু ভেতর থেকে কিসে যেন আমায় কামড়ায়। আমি না দৌড়ে পারি না। সাধে কি আর আমার বাবা অত স্মোক করে। খুব রিল্যাক্সড লাগে। মনটা এখন কত হালকা লাগছে। নিশ্চয়ই পারবো। এম. ভির মতো আমি উড়ে যাচ্ছি দেশে দেশে। উনি সমস্ত ইয়োরোপ ঘুরেছেন, ইউ. এস. এ. তো বটেই। এখন থেকেই ওঁকে আমার অ্যামবিশনের কথাটা বলা উচিত। যাবো স্টেটস, সেখানে এম. এস করব, পি. এইচ. ডি। তারপর ওখানকার য়ুনিভার্সিটিতে পড়াবো। গ্রেটকোট পরা এম. ভির একটা ছবি আছে মার্কিন ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে…ওই রকম একটা ছবি…ঘরে চলে যাই… ঘুম পাচ্ছে। ভাবল বটে কিন্তু এতো ঘোর আলস্য লাগছিল যে লুকু সোফার ওপরেই ঘুমিয়ে পড়ল। মাথাটা তার বুকের ওপর ঝুঁকে পড়েছে; চুলগুলো গোছা গোছা হয়ে ঝুলছে মাথার দু পাশ থেকে। হাতটা সোফার হাতলেরর ওপর। পাশে চৌকোণা টেবিলে অ্যাশট্রেতে সিগারেটের স্টাব। তার আঙুলে এখনও সিগারেট ধরার ভঙ্গি।

পাখির ডাকে তাদের বাড়ির বেল বাজল। লক্ষ্মীশ্ৰী শুনতে পেল না। তাদের বাড়িতে একটি অল্পবয়সী ছেলে কাজ করে, বুদ্ধিশুদ্ধি কাঁচা, সে সাহেবের নির্দেশমতো ফুটো দিয়ে দেখল লুকুদিদির বন্ধু। দরজা খুলে দিল। দেবপ্রিয়র চোখ দুটো ঈষৎ লাল, চুলটা ভালো করে আঁচড়ায়নি। সে তার স্বভাবের বিপরীত দ্রুত ভঙ্গিতে ঢুকে এলো। ঢুকেই লুকুকে অদ্ভুত একটা ট্যাবলোর মতো ঘুমন্ত দেখতে পেলো। দেবপ্রিয় ছেলেটিকে বলল—চা করতে পারবে? শুধু লিকর হলেই হবে। আমাদের দুজনেরই।

—‘দিদি বেশি দুধ চিনি ছাড়া চা খায় না।’

—‘আচ্ছা আজ খাবে। তুমি নিয়ে তো এসো।’

ছেলেটি রান্নাঘরে চলে গেল। দেবপ্রিয় লম্বা লম্বা পায়ে ঘরটা পার হলো, যেখানে লুকু ঘুমিয়ে পড়েছিল, সেখানে পৌঁছে হাঁটু গেড়ে কার্পেটের ওপর বসে পড়ল, তার ঠিক সামনে। পাশের অ্যাশট্রেটা ভালো করে দেখল। আস্তে করে লুকুর আঙুল দুটো ধরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। নাকের কাছে ধরলো, হঠাৎ কারো দেখলে মনে হতে পারে সুন্দরী লক্ষ্মীশ্রীর আঙুলে সে চুমো খাচ্ছে। তারপর দেবপ্রিয় লুকুর মাথাটা আস্তে আস্তে সোফার পিঠে রেখে দিল। ডাকলো ‘লুকু, লুকু চোখটা খোলো।’

বেশ কিছুক্ষণ ডাকবার পর লুকু সামান্য একটু চোখ খুলল। বেশ লাল।

দেবপ্রিয় বলল—‘লুকু সোজা হয়ে বসো। এতে ঘুমোচ্ছ কেন? ওষুধ খেয়েছে কিছু?’

লুকু সোজা হতে চেষ্টা করছিল, পারছিল না। চা এসে গিয়েছিল। দেবপ্রিয় বলল—‘একটু চা খাও লুকু।’

লুকু এবার কথা বলল—‘চা খাব না।’

—‘হ্যাঁ খাবে। তোমার গ্ল্যান্ড ফুলেছে, গলায় ব্যথা, না? ভালো লাগবে খাও। আমি ধরছি।’ দেবপ্রিয়র হাতে ধরা কাপ থেকে এক চুমুক খেয়ে লুকু মুখ বিকৃত করল।

—‘খাও, আরও একটু খাও।’ একটু একটু করে পুরো দু পেয়ালা চা-ই তাকে ধৈর্য ধরে খাওয়ালো দেবপ্রিয়। তার পরে বলল—‘লুকু, আমার পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা কে সরিয়েছে? তুমি? না?’

লুকু অস্পষ্টভাবে হাসছে—‘কেন দেব, আমার খাবার ইচ্ছে হলে কি আমি এক প্যাকেট কিনে নিতে পারি না?’

—‘পারোই তো! আমারটা নিলে কেন?’

—‘পারি না। সিগারেটের দোকানদারগুলো যা বিশ্রী। তা ছাড়া, তুমি? তুমিই বা কেন খাবে? তোমার কিসের কমপ্লেক্স দেব…’ লুকু জড়িয়ে বলল।

—‘কি আবোল-তাবোল বকছ? আমি খাই না খাই সেটা আমার ব্যাপার। তুমি কেন আমার প্যাকেটটা নিতে গেলে? শোনো, প্যাকেটটা আমাকে দাও।’

লুকু উঠতে পারছিল না, কোনমতে উঠতে গিয়ে একবার ধপাস করে বসে পড়ল। তারপর বলল—‘দেব, আমায় একটু ধরবে?’

দেবপ্রিয় সারাক্ষণ ওকে খুব চিন্তিতভাবে লক্ষ্য করছিল। বলল—‘নিশ্চয়ই ধরবো। কোথায় যেতে চাও?’

—‘বাপীর ঘরে।’

ধরে ধরে লুকুকে তার বাবার ঘরে নিয়ে যাবার পর বাবার টেবিল-ড্রয়ার থেকে ‘লুকু এক প্যাকেট সিগারেট বার করল, দেবপ্রিয়র দিকে ছুঁড়ে দিয়ে আলগা-আলগা গলায় বলল—‘তোমার প্যাকেটটা আমি শেষ করে ফেলেছি দেব, বাপীরটা থেকে তোমাকে গোট্টা একটা দিয়ে দিলাম। আই মে হ্যাভ টু গিভ হিম অ্যান এক্সপ্ল্যানেশন। মাই বাপী ইজ সো পার্টিকুলার। স-ব গোনা গাঁথা। আই নেভার থট ইউ আর সো স্টিঞ্জি। একটা প্যাকেটের জন্যে এ তো!’ বলতে বলতে লুকুর চোখ মুখ কেমন হয়ে যাচ্ছিল। দেবপ্রিয় তাকে প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে বাইরের বেসিনের কাছে নিয়ে গেল। সব বমি করে দিল লুকু। পাতলা সাবুর খিচুড়ি খেয়েছিল, পায়েস, লেবুর রস, কিছুক্ষণ আগেকার চা-স-ব। দেবপ্রিয় বলল—থ্যাংক গড। মুখে-চোখে জল দিয়ে, লুকুকে তার ঘরের বিছানায় শুইয়ে দিয়ে সে পাখাটা চালিয়ে দিল। লুকুর গলাটা ভালো করে ঢেকে দিল, পরে বলল—‘লুকু তোমার বাবার প্যাকেটটা কিন্তু আমার চাই না। আমার প্যাকেটটা চাই।’

—‘হারিয়ে গেছে যে!’ লুকু এখন খানিকটা শান্ত, ‘শেষ করে ফেলেছি তো!’

—‘সবগুলো খেয়ে ফেলেছো? আটটাই?’ আতঙ্কিত গলায় দেবপ্রিয় বলল।

—‘আটটা নয়, সাতটা। উঃ দেব তুমি কী কিপটে? একদম শাইলক একটা! সুদ দিতে হবে না কি আরেকটা প্যাকেট, কিংবা আ পাউণ্ড অফ ফ্লেশ?’

—‘শোনো লুকু, কি ভাবে-খেয়েছে?’

—‘অফ অ্যান্ড অন! একলা হতে পারলেই খেয়েছি।’

—‘ভালো লেগেছে…নিশ্চয়!’

—‘ওহ শিওর!’

—‘তুমি খালি প্যাকেটটাই আমাকে দাও।’

—‘খালি প্যাকেট?’ লুকুর চোখে বিস্ময়।

—‘লুকু, প্লীজ!’

—‘দেখো টেবিলের তলায় গার্বেজ বিন আছে। ওখানে থাকতে পারে।’

দেবপ্রিয় টেবিলের তলা থেকে কাগজের ঝুড়িটা টেনে আনছে, হাঁটকাচ্ছে, লুকু অবাক হয়ে দেখছে। ওটা পেল শেষ পর্যন্ত। সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। বলল—‘লুকু তুমি যতক্ষণ না সুস্থ বোধ করছ, চুপচাপ শুয়ে থাকো, আমি চলি।’

—‘সে কি বসবে না? গল্প করবে না? কেওড়াখালির গল্প!’

—‘কেওড়াখালি আমি যাইনি। ওরা এখনও ফেরেনি যদ্দূর জানি। আমার বড্ড জরুরি কাজ আছে’ আরেক দিন এসে আড্ডা মারা যাবে।’

লুকুর এতো ক্লান্ত লাগছে যে সে তার হতাশাটাকেও ভালো করে প্রকাশ করতে পারছে না। দেবপ্রিয় ঘর থেকে বেরোতে ফিরে তাকাল, বলল—‘লুকু, তুমি আর সিগারেট খেয়ো না।’

—‘হোয়াই? হু আর ইউ টু সে সো?’

—‘আমি ডাক্তার। লুকু, আমি বন্ধুও। তুমি স্মোক করবে না। কেউ খেলাচ্ছলে, গল্পচ্ছলে দিলেও না। কথাটা শুনো।’

দেবপ্রিয় ঘর থেকে বেরিয়ে সামান্য গলা তুলে ডাকল—‘ঝড়ু!’

ঝড়ু রান্নাঘরের পাশের স্টোর রুম থেকে বেরিয়ে এলো। অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাল দেবপ্রিয়র দিকে। তারপর পেছন পেছন গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।

অধ্যায় : ৭
…‘সেদিন আপনাকে বলা হয়নি ছাত্রসংঘ থেকে আমার তফাত থাকার কারণ। সব কথা আজও বলতে পারছি না। সময় আসেনি। শুধু এইটুকু বলছি আমাদের সমস্ত প্রচেষ্টা বানচাল করে দেবার একটা ষড়যন্ত্র কোথাও খুব গোপনে কাজ করে যাচ্ছে। আপনারা সতর্ক থাকবেন। আমি দরকার হলে আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে এই ষড়যন্ত্র আটকাবো। ওখানে কাজ করার লোক এখন অনেক। কিন্তু ডিফেন্স ফ্রন্ট-এ কেউ নেই। চট করে কাউকে বিশ্বাসও করতে পারছি না। ঝড়ু ওঠার আগে প্রকৃতির চেহারা এমনি হয়। আমার দেখা আছে। সে সময়ে মাঝিরা নদী থেকে ডিঙি তুলে ফেলে। আমি এখন ডিঙি তুলে ফেলার পক্ষপাতী…।’

ছেলেটা এতো ভাবুক-প্রকৃতির, কবি-কবি তা তো জানা ছিল না? কথা বলে কম। এখনকার ছেলেমেয়েরা ঠিক এই ভাষা, এই সব তুলনা, চিত্রকল্প ব্যবহার করে না। চিঠিটা আদ্যোপান্ত দুবার পড়লেন মেধা। হঠাৎ মনে হল দেবপ্রিয় ছেলেটি কোনও মানসিক ব্যাধিতে ভুগছে না তো? প্যারানয়েড যাকে বলে! মফস্বল শহরের অপেক্ষাকৃত সরল পরিবেশ থেকে সে অতি জটিল শহুরে সভ্যতার আবর্তে পড়েছে, অনেকেই মানিয়ে নিতে পারে না। কিন্তু ছেলেটি অতি বুদ্ধিমান, উপরন্তু অন্তর্মুখী প্রকৃতির। সে তো সহজে তাঁর এই ব্যাখ্যা মেনে নিতে চাইবে না! ওকে অন্যভাবে সুস্থ করতে হবে। ও খুব অস্পষ্টভাবে ওর ভয়ের একটা ধারণা দিয়েছে। ওকে সাহস দিতে হবে যাতে ও স্পষ্ট করে ওর ধারণার কথা বলতে পারে। বড় বড় কাজের সামনে দাঁড়িয়ে এ রকম ভেঙে পড়তে তিনি অনেক বিপ্লবীকে দেখেছেন। মেধা তাঁর ঠিকানা ও ফোন নম্বরের নোটবইটা উল্টেপাল্টে দেখতে লাগলেন। ফোন নম্বর রয়েছে মৈথিলীর, লুকুর, উজানের, গুঞ্জনের…। দেবপ্রিয়র কিছু নেই। কোনও ঠিকানা সে চিঠিতেও দেয়নি। কি করে ওর সঙ্গে যোগাযোগ করবেন তিনি?

উজানকে ফোন করলেন মেধা। উজানের দাদু ফোন ধরেছেন বোধ হয়। ভাঙা গলা। কথাগুলো ফস্কে ফস্কে যাচ্ছে বোঝা যায়। দাঁত পরেনি বোধ হয়। উজান নাকি সবে ফিরেছে কেওড়াখালি থেকে। একটু যেন অসন্তুষ্ট ভদ্রলোক। মেধা নিজের পরিচয় দিয়ে ফোনটা নামিয়ে রাখলেন।

সারা পৃথিবী একভাবে চলছে। ভারতবর্ষ চলবে অন্যভাবে। এখানে এখনও পণ দিয়ে বিয়ে হচ্ছে আইন করে তা বন্ধ করে দেওয়ার পরেও, এখনও এখানে পণের প্রশ্নে বউ পিটিয়ে হত্যা করা হয়, এখনও বিধবা মেয়ে বিয়ে করার অপরাধে নিজের মা মেয়েকে খুন করে ফেলে। কলকাতার বুকে কোনও ছেলেকে কোনও মেয়ে ফোন করলে অভিভাবকের বিরূপ প্রতিক্রিয়া বোধ হয় এই সামাজিক পরিবেশে ভালোই খাপ খেয়ে যায়। ঢং ঢং করে ন’টা বাজল। হঠাৎ মেধার মনে হল যে সমস্ত ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তিনি ক্রমাগতই জড়িয়ে পড়ছেন, তাদের সঙ্গে মেলামেশাটা যেন বড্ড বেশি তত্ত্বগত স্তরে হচ্ছে, তাদের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে তিনি কিছু জানেনও না, জানার চেষ্টাও করেন না তেমনভাবে। নিজেদের পরিবারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কি, তাদের বাবা মা দাদু এঁরা কে কিভাবে এদের গ্রহণ করেন এগুলো জানা দরকার। কারণ পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু স্বার্থের তো নয়ই, শুধু অন্ধ ভালোবাসারও হওয়া উচিত নয়। বাবা-মার আদর্শ আর ছেলে-মেয়ে কী করতে চায়, এ দুটো জিনিসের মধ্যে একটা সামঞ্জস্য, খানিকটা আপস থাকা দরকার। নইলে পরিবার ভেঙে যেতে থাকবে। পরিবারের কোনও বিকল্প নেই। মুক্ত মানুষের যৌথ সমাজব্যবস্থা, সরকারের হাতে সন্তানের নিশ্চিন্ত ভবিষ্যৎ কোনও কিছুই পারিবারিক সম্পর্কের মাধুর্য ও সৌন্দর্যের জায়গা নিতে পারবে না। গাছপালা, ফুল পাখি, আকাশ, মেঘ, বাতাস মিলিয়ে প্রাকৃতিক পরিপার্শ্ব যেমন সুস্থ সুন্দর জীবনের পক্ষে অপরিহার্য, ঠিক তেমনি অপরিহার্য মায়ের টান, বাবার দায়িত্বশীল স্নেহ, ভাইবোনের পারস্পরিক মমতা। যান্ত্রিক এবং আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ও অগ্রগতি যদি পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে তো সে মূল্যে যন্ত্র সভ্যতা, এমনকি বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিও কেনার কোনও অর্থ হয় না।

কেওড়াখালিতে ওদের সঙ্গে তাঁর যাওয়া উচিত ছিল। আসলে নন্দিতা ও সূর্যর সঙ্গে ঘুরে এসে তিনি একটা খসড়া করে দিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন ছেলেমেয়েদের নিয়ে প্রথম পর্বটায় ডাঃ সোম যান, দ্বিতীয় পর্বে তিনি যাবেন। এখন মনে হচ্ছে তাঁরই যাওয়া উচিত ছিল। ছেলেমেয়েদের একলা ছেড়ে দেওয়া ঠিক হয়নি। এর থেকে সত্যিই অনেক জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে। ডাঃ সোম একেবারে বোমভোলা ধরনের মানুষ। আর মৈথিলী তো একটা কুড়ি-একুশ বছরের বাচ্চা মেয়ে। খুব পরিণত, বিচক্ষণ,। কিন্তু বয়সটা তো অল্পই। তাঁকে যখন উপদেষ্টা হিসেবে চেয়েছে এবং তিনিও রাজি হয়েছেন তখন তাঁকে আরও ভেতরে ঢুকতে হবে, আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। আসলে বহুবছর আমেরিকায় থেকে অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের প্রখর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য দেখে দেখে তাঁর অভ্যাসটা এই রকম হয়ে গেছে। কিন্তু এটা ভারতবর্ষ। এখনও এখানে উপমন্যু-উদ্দালক, এখনও এখানে গার্গী মৈত্রেয়ী খনা লীলাবতী ছেলে-মেয়েদের রক্তে মিশে আছে। ওরা অনেকেই গুরুর আশীর্বচনের ওপর নির্ভর করে, শুধু আচার্য বলেই তাঁর নেতৃত্ব, অনেক অন্যায়ও মেনে নেয়। নিয়ে থাকে। এ তিনি প্রতিনিয়ত দেখছেন।

দরজায় বেল বাজল। নিশ্চয় উজান। বেচারি বোধ হয় চান-টান সারছিল, মিস ভাটনগরের ফোন এসেছিল, তাকে ডেকে দেওয়া হয়নি বলে সঙ্গে সঙ্গে চলে এসেছে। কোনও মানে হয়! দরজা খুলে দিয়ে মেধা দেখলেন রঘুনন্দন।

—‘আরে?’

–‘এলাম। বড়ই প্রাণের দায়ে মেধা…’ রঘুনন্দন ভারি পায়ে ভেতরে ঢুকলেন।

—‘বসো, কফি আনি।’

—‘আনো। আর কিছু না।’

মেধা কফি নিয়ে এসে বসলেন। রঘুনন্দন আপনমনে একটা দেশলাইয়ের কাঠি দিয়ে কানে সুড়সুড়ি দিচ্ছেন। চোখ আরামে বুজে আসছে। মেধা কফিটা নামালেন একটু শব্দ করে। চোখ মেলে রঘুনন্দন বিনা ভূমিকায় বললেন—‘আমার মেয়েটা ভাবালে। রাতে বাড়ি ফিরছে না। কি সব আউল-বাউল ট্যাঁকে করে ঘোরে, হিপি-টিপি হয়ে যাবে না কি বলো তো? জানো কিছু?’

আজকে মেধার অভিজ্ঞতায় এটা দ্বিতীয় অভিভাবকীয় প্রতিক্রিয়া। তিনি বললেন—‘আমি জানি এ কথা কেন মনে হল তোমার?’

রঘুনন্দনের পরনে গ্রে রঙের স্যুট। ব্রাউন টাই। চুলগুলো পরিষ্কার পাট পাট আঁচড়ানো। তা সত্ত্বেও মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। খুব সম্ভব অফিস থেকে এখনও বাড়ি ফেরেননি। তিনি বললেন—‘কি জানি! মেধাদি মেধাদি করে তো ক্ষেপে যাচ্ছে মেয়েটা। তিনি বললেন—তার মা মেয়ের কথা ভেবে ভেবে দিনে দিনে শুকিয়ে যাচ্ছে এদিকে। —‘আমি জানি এই যদি তোমার ধারণা হয়, তবে আমার ওপর ভরসাটাও রাখা উচিত ছিল।’

—‘দেয়ার য়ু আর। তোমাকে যদ্দূর জানি ভয়ঙ্কর উত্তেজক বিস্ফোরক তুমি মেধা, দায়িত্বশীল একেবারে নয়। অন্তত ছিলে না। আজ যে হয়েছে এ ধারণা করার কোনও কারণ দেখি না।’

মেধা ঠিক করে নিয়েছেন রাগ করবেন না, অন্তত দেখাবেন না। তিনি স্মিত মুখেই জিজ্ঞাসা করলেন—‘এ ধারণার কারণ দেখাও। শুধু শুধু কতকগুলো অভিযোগ তুললেই তো হবে না!’

—‘কারণ আমায় বলতে হবে?’ রঘুনন্দন কি ঈষৎ উত্তেজিত? ‘ডাঃ ভাটনগরের মেয়ে হয়ে কীর্তিদা মুক্তির বোন হয়ে ঊনসত্তর সালে তুমি প্রায় জেলে চলে যাচ্ছিলে? যাচ্ছিলে না? তখন তুমি কতটুকু? মুন্নির চেয়েও বোধ হয় ছোট। বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তরের মধ্যে তোমার আরও একবার জেলে যাবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। প্রজ্ঞা সেবার বুদ্ধি করে তোমাকে হংকং-এ আটকে, তারপরে য়ুরোপ বেড়াতে নিয়ে না গেলে তুমি হয়ত ঠিক এই মেধা হয়ে আর জেল থেকে বেরোতে না।’ …রঘুনন্দন আবার দেশলাইয়ের কাঠিটা কানে ঢোকালেন। গাঢ় নীল শাড়ির অন্তরালে মেধা নিজেও যেন নীল, সেই সঙ্গে কঠিন হয়ে উঠছেন, গলার স্বর থেকে রস উবে যাচ্ছে একটু একটু করে, বললেন—‘বলো, বলো রঘুদা, থামলে কেন? এই তোমার অভিযোগ? চুরি ডাকাতি কি হত্যার অপরাধে নিশ্চয়ই জেলে যাচ্ছিলাম না। আর দেশসুদ্ধ বয়স্ক লোক যখন নিজেরা ভাত পেয়েছে এই আত্মপ্রসাদে মগ্ন হয়ে হাই তোলে আর ভাত-ঘুম দেয় তখন ছোটদের ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া উপায় কি? নীলকমল না জাগুক, লালকমলকে তো জাগতেই হয়! সে হয়ত অতটা প্রাজ্ঞ নয়, তাই রাক্ষসের কবলে পড়াও তার ভবিতব্য। যাই হোক, এসব বারবার বলে তো লাভ নেই! সে অধ্যায় পুরনো হয়ে গেছে। সে আমার একার সিদ্ধান্ত নয়। একার সাফারিংও নয়। আমার নিজের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার প্রমাণ তুমি কোথায় পেলে?’

চোখটা আধখোলা করে রঘুনন্দন বললেন, ‘অমিয় সান্যালকে বিয়ে করে তার সঙ্গে শেষ পর্যন্ত কোনও সম্পর্ক রাখলে না।’

—‘তুমি কি করে জানলে?’ মেধা অবাক হয়ে গেছেন।

—‘কেন? তুমি কি নিজের কার্যকলাপ গোপন রাখতে চাও?’

—‘যতটা দরকার তার বেশি কখনোই নয়। তখন প্রয়োজনে চেয়েছিলাম। জেলবন্দী একটা মানুষ যদি ক্রমেই চিঠিপত্র দেওয়া বন্ধ করে দেয় এবং তার ঘনিষ্ঠরা যদি ক্রমশই তোমাকে এড়িয়ে চলতে চায়, কিভাবে তুমি সম্পর্ক কনটিনিউ করবে?’

—‘কাজটা শক্ত, খুবই শক্ত। কিন্তু মেধা তুমি চেষ্টাও করোনি। এটা ঠিক দায়িত্বশীল নারীর বা মানুষের কাজ নয়।’

মেধার মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে, রঘুনন্দন আড়চোখে সেদিকে তাকিয়ে বললেন—‘রাগ করো না মেধা আমার প্রতিও তুমি দায়িত্ব পালন করোনি।’

—‘অন্যায় কথা বলো না রঘুদা’, মেধার স্বর এখন আড়ষ্ট’, ‘আমি তোমায় কখনও কোনভাবে প্রশ্রয় দিইনি।’

—তোমাদের মনে হচ্ছে দাওনি। আমার মনে হচ্ছে দিয়েছ। যাই হোক ওটা না হয় কনট্রোভার্শিয়াল, ছেড়ে দিচ্ছি। কিন্তু এদের মাথায় কী ঢুকিয়েছ বলো তো? মুন্নি বাম রাজনীতি করলে আমার ঘোর বিপদ। বুড়ো বয়সে কি শেষে ডিমোটেড হবো? জানি, তুমি আমার বিপদের কথা ভেবে আমার মেয়েকে সাবধান করবে না, তবু না জানিয়ে পারছি না।’

মেধা বললেন—‘রাজনীতি আমি অনেকদিন ছেড়ে দিয়েছি রঘুদা। কোনদিন করেছি বলেও পুলিশের খাতায় প্রমাণ করতে পারবে না। নইলে সরকারি কলেজে চাকরি নিয়ে ফিরে আসতে পারতাম না। এসব কথা তোমার মতো সরকারী লোকের কেন জানা নেই তা জানি না। আর তোমার মেয়ে যেটা করবে মনে করে সেটা করে তবে ছাড়ে, আমার কাছে মাঝে-মধ্যে শুধু একটু পরামর্শ নেয়। তুমি কি বলছো পরামর্শটাও ওকে দেবো না?’

—‘ওকে একটু হোম-এর দিকে চালিত করো। যদি পারো। “চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম””—এই সোজা কথাটা মেয়েটাকে বোঝাতে পারি না মেধা। ও অনেকটা তোমার মতোই। আমার মেয়ে অথচ তোমার মতো। কী সাংঘাতিক বলো তো?’

রঘুনন্দন উঠে পড়লেন; বললেন—‘মনে রেখো প্লীজ।’

—‘ও বাম ডান কোনও রাজনীতিই করে না।’

—‘করে না?’—অবিশ্বাসের সুরে বললেন রঘুনন্দন।

—‘ও দেশের সচেতন, দায়িত্বশীল নাগরিক। শুধু নিজের কেরিয়ার নিয়ে মত্ত থাকতে তোমার মেয়ের ঘৃণা হয়, অবশ্য ইফ শী ইজ কেপেবল অফ হেট্রেড।’

—‘এগুলো তোমার অ্যানালিসিস?’

—‘আমারই। কিন্তু এগুলো স্বপ্রকাশ। ওকে সিরিয়াসলি নিলেই বোঝ যায়। ও তো খুব জটিল মানুষ নয়!’

—‘বাঁচালে, রঘুনন্দন দরজার ওপারে যেতে যেতে বললেন, ‘আমার ধারণা ছিল ও খুব জটিল, গোপনতাপ্রিয়… আসলে বসা হয় না। যদি বা হয় এতো দীর্ঘ সময় পরে পরে যে এসব প্রসঙ্গ তুলতে ইচ্ছে করে না।’

—‘অথচ এগুলোই আসল। সন্তানকে জানাটা বাবা-মার সবচেয়ে বড় কাজ, বাবা-মা হিসেবে। এনি ওয়ে, আমি তোমার প্রতি দায়িত্বশীল না হওয়ায় তোমার কিন্তু লাভই হয়েছে’, মেধা অপ্রাসঙ্গিকভাবে বললেন।

—‘আর তোমার? তুমি কি লাভ-ক্ষতির ঊর্ধ্বে না কি?’

—‘ঠিক তাই…। এতক্ষণে একটা ঠিক কথা বললে।’

মেধা হাসিমুখে বললেন, যদিও তাঁর ভেতরটা জ্বলছিল। রঘুনন্দন ত্রিপাঠীর গাড়ির আলো বাঁক ফেরবার আগেই তিনি দরজা বন্ধ করে দিলেন।

দোতলায় এসে কোল্যাপসিবলটা টেনে দিলেন অভ্যাসমতো। তালা লাগাবার সময়ে একবার মনে হল উজান যদি আসে। ঘড়ির দিকে তাকালেন, না উজানের আসবার আর কোনও সম্ভাবনাই নেই। ফোনও করল না। ছোড়দারা অনেক দিন আসেনি। হঠাৎ একা-একা লাগল। প্রজ্ঞা যেখানেই থাকুক, দু-তিন মাস অন্তর একবার অন্তত দীর্ঘক্ষণ ধরে ফোন করে। ফোনে কি ওকে বকা যায়? বকার জন্য দু চার দিনের অন্তত অবসর পাওয়া দরকার। তাঁর গোপন কথাটা প্রজ্ঞার ফাঁস করে দেওয়া উচিত হয়নি। বিশেষত, রঘুনন্দন ত্রিপাঠীর কাছে। তিনি বিয়ে করেছিলেন আঠার উনিশ বছর বয়সে সে বয়সটা বীরপূজার, আত্মনিবেদনের, বিদ্রোহের বয়স। বন্ধু রোকেয়া রোদ, জল, ঝড়ু উপেক্ষা করে মিছিল করত, বক্তৃতা করত। এইভাবে একটি সম্পন্ন পরিবারের মেয়ে যার কিছুর অভাব নেই সে মার্কসিজমের জন্য জীবনপাত করে দিচ্ছে, এতে একটা অসামান্য বিস্ময় এবং রোমাঞ্চ ছিল। আত্মগ্লানি হত একেক সময়ে। রোকেয়া কথা বলত অত্যন্ত মধুরভাবে, কখনও তর্কাতর্কির সময়ে মেজাজ খারাপ করত না। উল্টোনো ড্রাম কি প্ল্যাটফর্মের ওপর তার বক্তৃতা ছিল এক রকম—ধারাল, জ্বলন্ত, কিন্তু মুখোমুখি বা পাশাপাশি বসে সে যখন শ্রেণীসংগ্রাম, সামন্ততন্ত্র ধ্বংস করে বুর্জোয়াদের অভ্যুত্থান, প্রোলেতারিয়েতদের আবির্ভাব, উৎপাদন-উৎপাদকের সম্পর্ক, সংঘবদ্ধ প্রোলেতারিয়েতের শাসনযন্ত্র দখল এবং কমিউনিজমের প্রথমাবস্থায় সব কিছুর সরকারি মালিকানার তত্ত্বের কথা বোঝাতো তখন সেটা প্রায় প্রেমালাপের মতো মধুর এবং রোমাঞ্চকর শোনাতো!

মাথার ওপর চিকন সবুজ পাতার মধ্যে দিয়ে হলুদঝুরি ফুল নেমেছে। কেউই তার নাম জানে না। মেধা সেগুলো নিয়ে কবিতা রচনা করত ‘কুমারী লতার ডালে ডালে/কত মৃত আকাঙক্ষার কর্ণভূষা দোলে,/ হায়, ধু ধু অগ্নি জ্বলে।’ রোকেয়া হেসে বলত এই রোমান্টিক কবিতা তোকে কোথায় কতদূরে নিয়ে যেতে পারবে মেধা! আর তোকে যদি ব্যক্তিগতভাবে একটা মূর্খের স্বর্গে নিয়ে যায়ও শত সহস্র লক্ষ কোটি মেহনতি মানুষ বুর্জোয়া শিল্পের যন্ত্রের হাতে যাদের শ্রমের আনন্দ ও মর্যাদাটুকু পর্যন্ত লোপ পেয়েছে, যাদের শুধু শ্রমের প্রয়োজনে অস্তিত্বটুকু টিকিয়ে রাখার জন্য যতটা প্রয়োজন তার চেয়ে এক কড়াও বেশি দেওয়া হয় না, তাদের কোথায় নিয়ে যাবে?

মেধাকে স্বীকার করতেই হত এই সব কাব্যচর্চা তাকে জীবনের গভীরতর স্তর যাকে রোকেয়া মূর্খের স্বর্গ বলছে, সেখানে নিয়ে যেতে হয়ত পারবে। কিন্তু চাষী, চটকলের শ্রমিক এদের সেখানে পৌঁছবার কোনও আশা নেই। এবং যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এই রকম নিরন্ন, নিরক্ষর, নিঃসহায়, সেখানে সমর্থ মানুষের পক্ষে কাব্য-চৰ্চা, এমন কি নিছক বিদ্যা-চর্চাও স্বার্থপরতার শামিল।

—‘হ্যা, তুই ফার্স্ট ক্লাস নিয়ে পাশ করবি, তারপর কোনও কলেজে, কি য়ুনিভার্সিটিতে লেকচারার হয়ে ঢুকবি, লেকচারার, রীডার, প্রোফেসর…। ভালো ভালো শাড়ি পরবি। খুব পদস্থ কাউকে বিয়ে করবি, দুটি তিনটি ব্রিলিয়ান্ট সন্তান, সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটবে, হয়ত বা এ দেশে থাকবিই না। তোর বাড়ির যা ব্যাকগ্রাউন্ড, তাতে সেটাই স্বাভাবিক। যা মেধা, তাই যা। ইন দা মীন টাইম…এই সব ইশাক, রজ্জব, হরিপদ, রামহরি, শিবু, কেষ্টা, রানী খালেদা, লক্ষ্মীমণি, অন্নদা, এরা মুখে রক্ত উঠে মরে যাবে। জেনারেশনের পর জেনারেশন একভাবে মরবে। আল্লার দোয়া চাইবে, দেবমন্দিরে দণ্ডি কাটবে, পীরের দরগায় শিরনি চড়াবে, আর মরে যাবে। আমি রোকেয়া, আমার মতো আরও অনেকে যেমন অমিয়দা, সুন্দরলাল অসীমাভ আমরা যারা প্রতিবাদ করবো, ওদের মুখে ভাষা দিতে চাইবো, ওদের গর্জে উঠতে শেখাবো, তারা জেলে পচব।’

মেধা বলতো—‘কিন্তু উপায়ই বা কি? রোকেয়া আমি যদি আজ আমার জীবনটা স্যাক্রিফাইসও করি, তাতেই কি জেনারেশনের পর জেনারেশন মানুষের মুখে রক্ত উঠে এইভাবে মরা থামবে? থামবে কি? বল তুই?’

রোকেয়ার চোখ জ্বলজ্বল করত—‘যদি বলি থামবে?’

‘আমার একার চেষ্টায়? থামবে? তুই বলছিস কি?’

—‘তুই মনে করছিস তুই একা। কিন্তু আসলে তো তুই একা নয়। তোর মতো আরও অনেক বুদ্ধিজীবী পরিবারের সমর্থ ছেলেমেয়ে আছে যারা শক্তিটা নিজেদের কেরিয়ার গড়বার কাজে পুরোপুরি খরচ করে। তারা যদি বোঝে। বুঝছেও, সারা পৃথিবী জুড়ে বুঝছে। দলে দলে যোগ দিচ্ছে, সেক্ষেত্রে তো তুই একা থাকছিস না।’

—‘ঠিক আছে, দশ, বিশ, ত্রিশ জন আমার মতো যোগ দিল। তাতেই বা এই কোটির দেশে কি হবে?’

—‘কি করলে কিছু হবে তুই-ই বল।’

একটু ভেবে নিয়ে মেধা বলল—‘সরকারকে সচেতন হতে হবে, সরকারি লেভল থেকে যদি কতকগুলো সঠিক নীতি নেওয়া হয়, একমাত্র তবেই…’

—‘বাস, বাস। তুই তাই মনে করিস তো?’ রোকেয়া উৎসাহে টগবগ করছে।

‘সরকারকে সচেতন করাটাই আপাতত আমাদের কাজ। আপাতত।

প্রধানত রোকেয়ার উৎসাহেই অমিয়নাথ সান্যালের ক্লাসে যাওয়া। নকশাল আন্দোলনের শুরুতে যখন চারদিকে গরম হাওয়া বইছে, সেই সময়ে পার্টি অফিসে অমিয়নাথ সান্যাল নামজাদা মার্কসিস্ট নেতার সঙ্গে মেধা ভাটনগরের বিবাহ। সান্যালদা বললেন—‘মেধা তোমার পদবী পাল্টানো না পাল্টানো তোমার ইচ্ছে। বিবাহ মানে আমি বুঝি দুটি স্বাধীনতার সমন্বয়।’ মেধা পদবী পাল্টালো না। ঠিক হয়েছিল আস্তে আস্তে খবরটা ভাঙা হবে বাবা-মার কাছে। সাতদিনের মধ্যে সান্যালদা অজ্ঞাতবাসে চলে গেলেন।

ওঁর কিন্তু আসল ইচ্ছে ছিল রোকেয়াকেই বিয়ে করা। রোকেয়া প্রায় শিশুকাল থেকে মার্ক্সসিস্ট বুলি কপচে মানুষ। অক্লান্ত কর্মী। কতজনকে যে সে দলে নিয়ে এসেছে তার ইয়ত্তা নেই। পার্টির নেতারা তার কাছে কৃতজ্ঞ। তার জ্বলন্ত আত্মপ্রত্যয়ের মূর্তি নিশ্চয় অনেকের মনে আগুন জ্বালাত। অমিয় সান্যালের সঙ্গে পাশাপাশি কাজ করছে সে একেবারে গোড়ার থেকে। এই বালিকার টিউটর ছিলেন অমিয়দা।

ওকেই খুব সম্ভব বিবাহের প্রস্তাবটা প্রথম দিয়েছিলেন সান্যালদা। রোকেয়া কিছুতেই রাজি হয়নি। ব্যাপারটা আন্দাজ করে মেধা তাকে জিজ্ঞেস করেছিল—‘কেন তুই অমিয়দাকে বিয়ে করতে রাজি হচ্ছিস না?’

রোকেয়া বড় অদ্ভুত উত্তর দিয়েছিল, একেবারেই রোকেয়ার মতো নয়, বলেছিল —‘আমাদের পরিবারে আমি একটা প্রচণ্ড প্রবলেম মনে করে সব্বাই। আমাকে, দাদাকে পড়াবার জন্য অমিয়দাকে টিউটর রাখলেন বাবা, পড়ালেখা তো শিখলাম ভালোই, সেই সঙ্গে বাবার উল্টো রাজনীতি। বাবা গোঁড়া কংগ্রেস, এত বছর ধরে এম. পি। দাদা আমি মার্ক্সসিজম করি বলে বাড়িতে ভীষণ অশান্তি। মাকে এর জন্য বাবার কাছে ভীষণ লাঞ্ছনা খেতে হয়। এগুলো আমি যথেষ্ট স্যাক্রিফাইস বলে মনে করি। ফ্যামিলির প্রতি কর্তব্য আমি পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারি না। বাবার আশ্রয়ে আছি, মায়ের স্নেহ ভালোবাসা পাচ্ছি এতো সত্ত্বেও, না হলে কি আমি এতো নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারতাম? কিন্তু বাবাকে আমি ফারদার আঘাত দিতে পারব না। কাউকে বলিসনি, আমি অমিয়দা এবং অন্যান্যদের সবাইকে বলেছি—‘আমি বিয়েতে বিশ্বাস করি না। বিয়ে করবই না।’

—‘বাবাকে খুশি করতে কি তা হলে কংগ্রেসী বিয়ে করবি তুই?’

—‘বাবাকে খুশি করতে আমি বাবার দেখে ঠিক করে দেওয়া পাত্রকে চোখ বুজে বিয়ে করে ফেলব। খুব সম্ভব সে নন-পলিটিক্যাল হবে।’

মেধা রোকেয়াকে বুঝতে পারছিল না। রাজনৈতিক জীবন সে অরাজনৈতিক গার্হস্থ্যের সঙ্গে খাপ খাওয়াবে কি করে? মুখে যার মার্ক্সসিজম-লেনিনিজম ছাড়া অন্য বুলি নেই, সাহিত্য শিল্পকলা সব কিছুকেই সে মার্ক্সের নিরিখে পরীক্ষা করে তবে ছাড়পত্র দেয়, বেশির ভাগ সময়েই দেয় না, কি করে সে বাবার নির্বাচিত বিবাহ করে দিন কাটাবে? কী চায় ও?

অমিয় সান্যাল যখন তারপর তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন তখন তার বিভ্রান্তি আরও গভীর হল। সে সাহস করে বলেছিল—‘কিন্তু আপনি তো রোকেয়াকে ভালোবাসেন, সান্যালদা, আমাকে বিয়ে করতে চাইছেন?’

অমিয় সান্যাল জ্বলজ্বলে চোখে দূরের দিকে চেয়ে বলেছিলেন—‘ভালোবাসা কথাটা তুমি যে অর্থে ব্যবহার করছ, সে-অর্থে সান্যালদা কাউকে ভালোবাসে না। বাসতে পারে না। রোকেয়া শক্তিমতী মেয়ে, ওই শক্তি আমার প্রয়োজন, তুমিও তাই, তুমি আমার পাশে এলে আমার হাত আরও শক্ত হবে।’

—‘বিয়ে না করলেও তো তা করা যায়।’

—‘যায়। অতটা নিশ্চিন্ত থাকা যায় না মেধা। বিবাহের বন্ধনটা দরকার। এখনও।’

—‘আপনি বিবাহ-বন্ধনে বিশ্বাস করেন অমিয়দা? আপনি?’ মেধার বিস্ময় বুঝি আজ আর ফুরোবে না।’

—‘হ্যাঁ করি, পুরোপুরি মুক্তির আগে কিছুদিনের বন্ধন। পুরোপুরি কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার আগে যেমন সরকারি নিয়ন্ত্রণ।’

সান্যালদার চোখ দূরমনস্ক। কিসের একটা দ্যুতি সেখানে। মেধার এতোসব জিজ্ঞাসার দরকার ছিল না। কারণ অমিয় সান্যালকে সে তখন দেবতার সগোত্র মনে করে। অমিয়দা তাঁর আদর্শবাদের প্রয়োজনে বিয়ে করলেও মেধা বিয়ে করল তার নিজের প্রয়োজনে। রেজিস্ট্রি করে, সকলকে মিষ্টি খাইয়ে দুজনে যে যার বাড়ি ফিরে গেল। পর দিন থেকে অমিয় সান্যাল পার্টির অনেক গোপন কথা, অনেক নতুন পথ খোঁজার বিবরণ তাকে দিতে থাকলেন। যার বিন্দু বিসর্গ মেধা আগে জানত না। অমিয় বললেন,—শিগ্গীরই হয়ত আমাকে দার্জিলিঙের ওদিকে গিয়ে থাকতে হবে দীর্ঘ দিন। তোমাকে বেজিং যাবার জন্য তৈরি হতে হবে।’

সাতদিনের মধ্যে বিবাহটা সম্পূর্ণ করার সুযোগ এলো না। তারপর দীর্ঘ অজ্ঞাতবাস পর্ব। দিন দুপুরে যখন জলপাইগুড়ি জেলার নাগরাকাটা থেকে অমিয় সান্যালকে অ্যারেস্ট করল পুলিস, মেধা তখন এম. এর ছাত্রী, বেণী দুলিয়ে য়ুনিভার্সিটিতে ক্লাস লেকচর শুনছে। খবরটা পেতে যেন একবার বুকের মধ্যে সাপে ছোবল দিল। সেই তীক্ষ্ণ কষ্টের স্মৃতি এখনও চেষ্টা করলেই মনে পড়ে। স্মৃতি তার অত্যন্ত শক্তিশালী।

এগুলো ইতিহাসের পাতা। কালের অমোঘ নিয়মে উল্টে যাবেই। মেধা এটা জেনে গেছেন। অমিয় সান্যাল তাকে বুঝতে পারেন নি, তিনি রোকেয়াকেও বুঝতে পারেন নি। আটষট্টি সালের বারোই ফেব্রুয়ারি দুটি ভিন্ন গ্রহের মানুষে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। অমিয়নাথ যে কারণে এই চুক্তি করেন, তা সফল হয়নি। মেধার পরবর্তী কার্যকলাপ, তার সব কিছুর ভেতর ঢাকবার, প্রশ্ন করবার, সংশোধন করবার, পরিকল্পনার চোরা গর্তগুলোর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করবার বাতুল ইচ্ছেগুলোকে দমন করতে করতে অমিয়নাথ নিশ্চয়ই জেলের ভেতর থেকেই বুঝতে পেরে গিয়েছিলেন বন্ধনের সূত্রগুলো কাজ করছে না। প্রথম প্রথম চিঠি চালাচালি হত লোক মারফৎ। অনেক সাবধানতা অবলম্বন করে। জেলে যাবার পর তিনি সোজাসুজিই লিখতে লাগলেন, জেলকর্তৃপক্ষকে উপেক্ষা করে, মেধাও লিখতেন, গোপন নামে। সেই চিঠি পত্রের তর্কাতর্কি ক্রমশ উত্তাল হয়ে উঠল। তারপর বন্যা সরে গেল। মেধার মুক্তি ভেতর থেকেই এসে গেল।

রঘুনন্দন ত্রিপাঠী এই ইতিহাসের আদি-মধ্য-অন্ত কিচ্ছু জানে না, সে দিব্যি জাজমেন্ট সীটে বসে গেল। বাঃ! তিনি অমিয় সান্যালের প্রতি কর্তব্য করেননি, রঘুনন্দন ত্রিপাঠীর প্রতি কর্তব্য করেননি! অধিকার কি তার? এক সময়ে সে মেধার পাণিপ্রার্থী হয়েছিল এবং তাঁর ছোড়দা মুক্তিনাথের প্রাণের বন্ধু ছিল—এই। ভারি চমৎকার। মেধা নিজের মধ্যেকার জ্বলুনি কমাবার জন্যে চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিতে লাগলেন। দিতেই লাগলেন। জ্বলুনি কমছে না। বাবা নেই যে দৌড়ে গিয়ে বলবেন—‘বাবা দেখো না, ওই লোকটা আমাকে কিভাবে অপমান করছে!’ মা নেই যে মায়ের কোলে মুখ গুঁজে চোখের জল ফেলবেন। এটা মেধা খুব মাঝে মাঝে করতেন। মা প্রথমটা জিজ্ঞেস করতেন—‘কি হয়েছে কেন কাঁদচ্ছিস?’ মেধা কোনও সঙ্গত কারণ দেখাতে পারতো না। হয়ত একটি নিম্নবিত্ত বান্ধবীর শুকনো মুখ, হয়ত ফুটপাতের ওপর ভিখারি শিশুর ফোলা পেট নিয়ে চিতপাত হয়ে শুয়ে থাকা, কিম্বা সদ্য গোঁফ ওঠা কোনও কিশোরকে কোনও বয়স্ক পদস্থ ভদ্রলোকের অপমান….এগুলো কি বলা যায়।

—‘কেঁদে নে খুকু, কেঁদে নে। মনটা মাঝে মাঝে বড্ড ভারি হয়ে যায়।’ মা বলতেন।

অনেক দিন পর্যন্ত মনটা বড্ড খচখচ করত। মা চলে গেলেন, বলা হলো না, বাবা চলে গেলেন বলা হল না। বিয়ে করেছেন এতো বড় খবরটা মা-বাবার কাছে চেপে রাখা, এতো সোজা কাজ নয়। এখন মনে হয় খব&#