হতাশা থেকে মুক্তির উপায় কি?

হতাশা থেকে মুক্তির উপায় কি?

টেনশন বা দুশ্চিন্তা মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটি যেন মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। টেনশন ছাড়া মানুষের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া আজকাল কঠিন ব্যাপার!

বিভিন্ন গবেষণার ফলে প্রমাণিত হয়েছে, মানসিক চাপ হৃদযন্ত্রের ক্ষতি সাধন করে। নিউ ইয়র্কের রচেস্টার মেডিকল সেন্টারের ‘সেন্টার ফর মাইন্ড-বিডি রিসার্চ’ এর মনোরোগবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক ড. ক্যাথি হেফনার বলেন, “বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জানা গেছে যে, দুশ্চিন্তা, স্বল্পপুষ্টির খাবার খাওয়া বা ব্যায়াম করার অনীহার ফলে যেসব শারীরিক সমস্যা দেখা যায়, মানসিক চাপের ফলেও সৃষ্ট সমস্যাগুলো সাধারণত আরও ভয়াবহ হয়ে থাকে।”

দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত থাকার কিছু উপায় নিয়ে সাজানো হলো এই লেখাটি; যে উপায়গুলো মানসিক চাপ কমিয়ে হৃদয়ও সুস্থ রাখতে সাহায্য করবে।

জীবন, ছোট্ট একটা শব্দ। কিন্তু এর পরিধি অনেক বড় । আর এই ছোট্ট জীবনের চলার পথটা মসৃণ নয়। পথ চলতে গিয়ে প্রতি পদক্ষেপে এখানে বাধা আসতে পারে। যা আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। আর এই প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে না পেরে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়ে অনেকেই হয়ে পড়েন হতাশ। যা যেকোনো বয়সের বিশেষ করে তরুণদের জন্য অনেক বড় হুমকি।

আমাদের সবারই নিজ নিজ অবস্থান থেকে কিছু করার,কিছু পাওয়ার ইচ্ছা থাকে। অনেকের ক্ষেত্রে হয়ত সেটা ইচ্ছা নয়, জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য কিছু হয়ে থাকে। এর জন্য মানুষ অক্লান্ত পরিশ্রম করে।

অনেকেই দিনরাত এক করে ফেলেন লক্ষ্যে পৌঁছাতে। এই হাড়ভাঙ্গা খাটুনি অনেককেই নিয়ে যায় সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ চূড়ান্ত চেষ্টা করেও সফল হতে পারেন না। অথচ তাদের কাজে কোনো ঘাটতি ছিলো না। আর এই না পারাটাই এক সময় তাদের নিয়ে যায় হতাশায়।

হতাশা এমন একটি রোগ যা একজন মানুষকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দিতে পারে। যা তার ব্যক্তিজীবনের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। হতাশা এমনি এক ব্যাধি যা একজন মানুষকে মৃত্যুর দিকেও নিয়ে যেতে পারে।

এখন প্রশ্ন হল, কিভাবে আসে এই হতাশা ?? কিভাবে এটি শারীরিক ও মানসিকভাবে আমাদের দুর্বল করে দেয় ?? জানা যাক সেই বিষয়েই …..

ডিপ্রেশন বা হতাশা, এর আসলে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। একেকজনের কাছে একেকভাবে প্রভাব ফেলে এটি। সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থান, মানসিক চাপ , কাজের ধরণ ইত্যাদি বিষয়গুলো ব্যক্তিভেদে ভিন্ন।

একজন ছাত্রের কথাই ধরা যাক। সে যখন একের পর এক পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল করতে থাকে বা আশানুরূপ ফল পায় না ,মানসিকভাবে সে ভেঙ্গে পরে। এক ধরণের চাপ সৃষ্টি হয় তার মধ্যে । আবার সে যখন দেখে তার সহপাঠী কিংবা বন্ধুরা সেই একই বিষয়ে খুব ভালো করছে ,এগিয়ে যাচ্ছে তখন তার মধ্যে তৈরী হচ্ছে হীনমন্নতা। সে ভাবতে শুরু করে আমাকে দিয়ে হবে না, আমি পারবো না। আর এই নেগেটিভ ধারণাই একসময় তাকে করে ফেলে প্রচন্ড হতাশ।

এবার আমরা দেখে আসি তরুণদের অবস্থা। প্রতিবছরই বিশাল সংখ্যক গ্রাজুয়েট চাকরির জন্য আবেদন করছে। যোগ্যতা থাকা স্বত্বেও অধিকাংশেরই চাকরি হয় না। কর্মসংস্থানের অভাবই এর অন্যতম কারণ। অথচ এই তরুণদের উপর রয়েছে পরিবারের দায়িত্ব। ভবিষ্যতের ভীত দাঁড় করানোর চিন্তা। কিন্ত যখন তারা চাকরির বাজারে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসছেন তাদের আত্মবিশ্বাস কমতে শুরু করে। একসময় তারা হতাশায় ভুগতে শুরু করেন। আর এই কারণে আত্মহত্যার মত ঘটনাও ঘটে থাকে, যা পত্রিকার পাতায় প্রায় সময়ই দেখা যায়।এছাড়াও পারিবারিক বিভিন্ন কারণ , একাকীত্ব , কাজের অতিরিক্ত চাপ এসব কারণেও কেও কেও হতাশ হয়ে পড়েন। অনেকে আবার সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে থাকেন। এটিও একজন ব্যক্তিকে হতাশ করে ফেলে।

তাহলে আমরা বুঝতে পারছি যে আমাদের জীবনযাত্রার উপর হতাশার অনেক বড় প্রভাব রয়েছে। সুস্থ স্বাভাবিক জীবনকে ব্যাহত করতে এর নুন্যতম প্রভাবই যথেষ্ট। তাহলে আমাদের কি করা উচিৎ ? কিভাবে আমরা এমন পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিবো ? এবার জানি সে সম্পর্কে…

আমাদের প্রথমেই খুঁজে বের করতে হবে যে বিষয়টিতে আমরা বারবার ব্যর্থ হচ্ছি তার কারণ কি। আমাদের দুর্বলতা ঠিক কোথায় তা আমাদের বুঝতে হবে। যদি তা না পারি তবে কারো সাহায্য নিতে হবে।

আপনি নিজে কিসের উপর দক্ষ তার উপর ভরসা রাখতে হবে। অন্যের দক্ষতাকে নিজের ব্যর্থতা ভেবে হতাশ হওয়াটা বোকামীর লক্ষণ।

যখনি হতাশ হবেন তখন একবার নিজের সাফল্যতর মুহূর্তের কথা চিন্তা করুন। আপনার সাফল্যটিই আপনার জন্য সবচেয়ে বড় আত্মবিশ্বাসের জ্বালানী।

যে কাজটি আপনি করবেন ঠিক করেছেন তা আপনি পারবেন বলেই ভাবতে পেরেছেন। আপনাকে লক্ষ্য স্থির রেখে এগিয়ে যেতে হবে। প্রয়োজনে অভিজ্ঞদের পরামর্শ নিবেন। আপনাকে মনে রাখতে হবে ,মানুষ পারে না এমন কোনো কাজ নেই। চেষ্টা করলে সবই সম্ভব। তাই চেষ্টা করুন। থেমে যাবেন না। কারণ থেমে যাওয়ার অর্থ হার মেনে নেয়া।

সবসময় মাথায় রাখতে হবে , যাদের ছায়ায় আপনি বেড়ে উঠেছেন সেই পরিবার আপনার সাথেই আছে। আপনার জন্মের পর থেকেই তারা আপনাকে অনেক যত্ন ও ভালোবাসায় বড় করেছেন। যত কিছুই হোক আপনার পরিবার পাশে থাকবে সর্বক্ষণ। তাই তাদের সাথে শেয়ার করুন আপনার সমস্যাগুলো। এর মাধ্যমে একাকীত্ব থেকে দূরে থাকবেন আপনি।

আবার পরিবারের বাইরে আমাদের অনেক বন্ধুবান্ধব রয়েছে। একেক বন্ধু একেক মনোভাবের। আপনাকে বুঝতে হবে কে প্রকৃতপক্ষে আপনার বন্ধু। যে বন্ধুটি আপনাকে অনুপ্রেরণা দিচ্ছে , আপনাকে সাহস যোগাচ্ছে সামনে এগিয়ে যাবার ,তার সাথে সময় কাটান।

আপনাকে হতে হবে একজন পজিটিভ থিংকার। কোনো একটি বিষয় নিয়ে যখন ভাববেন শুরুতেই তার নেগেটিভ দিকগুলো চিন্তা করবেন না। সবসময় ভালো দিকগুলো চিন্তা করুন।

আপনার কাজের ক্ষেত্রটাকে ভালোবাসুন ,কাজকে ভালোবাসুন। যখনি আপনি অতিরিক্ত চাপ অনুভব করবেন একটু বিরতি নিন। টানা কাজ করবেন না। সপ্তাহ কিংবা মাসের শেষে যখনি সময় পাবেন ঘুরে আসুন পছন্দের কোনো জায়গায়। যদিও এই যান্ত্রিক জীবনে নিজের জন্য একটুখানি সময় বের করে নেয়া অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার ,তবুও যেটুকু সময় পাবেন চেষ্টা করবেন নিজের মত কাটানোর, পরিবারকে নিয়ে কাটানোর।

যখনি আপনি কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন তা কতটুকু সময়পযোগী তা নির্ণয় করার চেষ্টা করবেন। এবং তা যুক্তিযুক্ত কিনা তাও ভেবে দেখবেন। প্রয়োজনে পরিবারের বড়দের ,বন্ধুদের মতামত নেবেন। হয়ত আপনার সামনে অনেক অপশন আছে। আপনি বুঝতে পারছেন না কোনটাকে বেছে নেবেন। এমন অবস্থায় তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলবেন না। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়েই আপনাকে এগিয়ে যেতে হবে। তাই অভিজ্ঞদের পরামর্শ নিন। ঠান্ডা মাথায় নিজে চিন্তা করুন।

যেকোনো বয়সের মানুষ যেকোনো সময়ে হতাশায় ভুগতে পারেন। তবে এই মানসিক পরিবর্তন কিন্তু কেও বুঝতে পারেন না। তাই আমাদের উচিত যখনি আমরা বুঝতে পারবো আমাদের স্বাভাবিক জীবন থেকে আমরা দূরে সরে যাচ্ছি তখনি পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করা। আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা একা নই।

আমরা সবাই হতাশায় ভুগি। এটা স্বীকার করতে কোনো লজ্জা বা ব্যর্থতা নেই। এখান থেকে উঠে আসাটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য ।

You May Also Like