Thursday, April 18, 2024
Homeলেখক-রচনারচনা সমগ্রহারানো পৃথিবী - আর্থার কোনান ডয়েল

হারানো পৃথিবী – আর্থার কোনান ডয়েল

হারানো পৃথিবী - আর্থার কোনান ডয়েল

খ্যাপা বিজ্ঞানী প্রফেসর চ্যালেঞ্জার দাবি করেছেন, আদিম পৃথিবীর বিশালাকার জীবজন্তু— দানবাকৃতি ডাইনোসর, স্টেগোসরাস, ইগুয়ানেডেন, দৈত্যপাখি টেরোডাকটিস নাকি আছে আজও, জ্যান্ত! পাঠক, যাবেন নাকি রোমাঞ্চকর অভিযানে?

০১. মেয়েটির বাবা মিস্টার হাঙ্গারটন

মেয়েটির বাবা মিস্টার হাঙ্গারটন। নিতান্ত ভালমানুষ, তবে তাঁর স্বাভাবিক বুদ্ধির কিছুটা অভাব আছে। নিজের জগৎ আর পছন্দের বিষয়টি ছাড়া আর কিছুই বোঝেন না। গ্ল্যাডিসের কাছ থেকে আমাকে যদি কোনদিন সরে যেতে হয়, তার কারণ হবে মিস্টার হাঙ্গারটনের জামাতা হবার ভয়। তাঁর বদ্ধমূল ধারণা, সপ্তাহে তিনদিন আমি যে চেস্টনাটস যাই সেটা তাঁর সাহচর্যের লোভে; বিশেষ করে সোনা রূপা দ্বৈত ধাতুর মুদ্রা ব্যবস্থা বিষয়ে তার মতামত জানার আগ্রহে।

আজ সন্ধ্যায় একঘণ্টার উপরে একঘেয়ে বক্তৃতা শুনতে হয়েছে আমাকেঃ কেমন করে ময়লা টাকা ভাল টাকাকে বাজার থেকে তাড়িয়ে দেয়; রূপার প্রকৃত প্রতীক মান কি, ভারতবর্ষে টাকার মূল্যমান হ্রাস আর মুদ্রা বিনিময়ের সত্যিকার হার, ইত্যাদি। এসব বিষয়ে উনি একজন বিশেষজ্ঞ।

ধরো পৃথিবীর সব ধার দেনা একসাথে ফেরত চাওয়া হলো, আর কার্যকরও করা হলো—কি ঘটবে তাহলে? প্রশ্ন করলেন মিস্টার হাঙ্গারটন।

তাহলে আমার সর্বনাশ হয়ে যাবে। আমার স্বভাবজাত হালকা ভাবেই বললাম আমি। জবাবটা শুনে লাফ দিয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন মিস্টার হাঙ্গারটন। আমা হেন হালকা স্বভাবের লোকের সাথে কোন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করা যায় না। কামরা থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি, মেসনিক সভায় যাবার জন্যে তৈরি হতে হবে।

এতক্ষণে আমি গ্ল্যাডিসকে একা পেলাম। চরম মুহূর্ত! সারাটা সন্ধ্যা আমার মনের অবস্থা ছিল একজন সৈনিকের মত। বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়ে প্রাণপণ যুদ্ধ করার জন্যে তৈরি। সংশয়ে দুলছে মন জয়, নাকি পরাজয় লেখা আছে ভাগ্যে?

বসে আছে ও-পিছনের লাল পর্দায় তার গর্বিত কোমল মুখের কাঠামোটা ফুটে উঠেছে। সত্যিই সুন্দর ও, কিন্তু যেন অনেক দূরের। বন্ধুত্ব আছে আমাদের বেশ গাঢ় বন্ধুত্ব। কিন্তু কোনদিনই ওর খুব কাছে আসতে পারিনি আমি। গেজেট পত্রিকার সহকর্মীদের সাথে যেমন সহজ সরল কামনাবিহীন সম্পর্ক-গ্ল্যাডিসের সাথেও তাই। মেয়েরা আমার সাথে বেশি দিলখোলা হোক বা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করুক এটা আমার কাম্য নয়। এতে পৌরুষের হানি হয়। যৌন চেতনার শুরুতেই ভীরু-নম্তরা আর অবিশ্বাস মানুষের সঙ্গী। উত্তরাধিকার সূত্রে পুরানো আমলের নৈতিকতাহীন যুগ থেকেই প্রেম আর বলাৎকার পাশাপাশি চলেছে। নত মাথা, চোরা চাউনি, কাঁপা কাঁপা গলা, অস্থিরতা এসবই হলো কামনার লক্ষণ—অসঙ্কোচ চাউনি বা স্পষ্টবাদিতা নয়। বয়স কম হলেও এটুকু জেনেছি আমি এরই মধ্যে। হয়তো এটাই মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি।

নারীসুলভ সব গুণেরই অধিকারী গ্ল্যাডিস। নিন্দুকেরা ওকে একটু কঠিন আর আবেদনবিহীন বলে, কিন্তু সেটা নেহায়েত অন্যায়। প্রাচ্যের উজ্জ্বল তামা রঙের কোমল দেহ, ঘন কালো চুল, বড় বড় মায়াময় চোখ, টসটসে দুটো ঠোঁট। যে-কোন পুরুষের কামনা জাগানোর সব উপাদানই রয়েছে ওর। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ওর মধ্যে কামনা জাগানোর কৌশলটা আজও আমি আয়ত্ত করতে পারিনি। যাহোক, আজ একটা হেস্তনেস্ত করবই-পরিণাম যাই হোক না কেন। না হয় প্রত্যাখ্যান করবে, তার বেশি আর কি? ভাইবোনের সম্পর্ক রাখার থেকে ব্যর্থ প্রেমিক হওয়া ঢের ভাল।

নিজের চিন্তার মাঝেই ডুবে ছিলাম এতক্ষণ! অস্বস্তিকর নীরবতা ভাঙতে যাচ্ছি, এমন সময় বড় বড় চোখ দুটো তুলে সে চাইল আমার দিকে। অহঙ্কারী মাথাটা দুলিয়ে হাসিমুখে আমার দিকে চেয়ে বলল, তুমি মনে হচ্ছে আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে যাচ্ছ, নেড? সেটা না করাই ভাল। এইতো বেশ আছি।

চেয়ারটা একটু কাছে টেনে নিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি করে জানলে আমি বিয়ের প্রস্তাব দিতে যাচ্ছি?

মেয়েরা সব সময়ই টের পায়। পৃথিবীর কোন মেয়েই অপ্রত্যাশিত বিয়ের প্রস্তাব পায়নি। কিন্তু দেখো তো, নেড, আমাদের বন্ধুত্ব কত সুন্দর আর কত মধুর। এটাকে নষ্ট করে দিও না। ভেবে দেখো, দুজন যুবক-যুবতীর এরকম সামনাসামনি বসে গল্প করাটা কত আনন্দের।

জানি না, গ্ল্যাডিস। সে রকম গল্প তো আমি—আমি স্টেশন মাস্টারের সাথে মুখোমুখি বসেও করতে পারি। কেন যে স্টেশন মাস্টারের কথা আমার হঠাৎ মনে এল তা আমি নিজেও জানি না। দুজনে একসাথে হেসে উঠলাম। ওতে আমি মোটেও সন্তুষ্ট নই। আমি চাই তোমাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরতে—তোমার মাথা থাকবে আমার বুকে। ওহ, গ্ল্যাডিস, আমি চাই—

হঠাৎ উঠে দাঁড়াল গ্ল্যাডিস। বুঝেছে সে, হয়তো যা চাই তা আদায়ের চেষ্টা করব।

সব মাটি করে দিলে তুমি, নেড। সব কিছু এত সুন্দর, এত সহজ, স্বাভাবিক ছিল—এর মাঝে ওসব টেনে এনে পরিবেশটাই নষ্ট করে দিলে। নিজেকে সংযত রাখতে পারো না কেন?

এটা আমি আবিষ্কার করিনি, ওকালতির চেষ্টা করলাম। এটা খুব স্বাভাবিক, এটাই প্রেম।

দুপক্ষেরই প্রেম থাকলে হয়তো অন্য রকম হত, কিন্তু আমি তো অমন করে কিছু অনুভব করিনি।

কিন্তু, গ্ল্যাডিস, তোমার এই রূপ, এই কোমল হৃদয়—ভালবাসার জন্যেই তোমার সৃষ্টি! ভাল যে তোমাকে বাসতেই হবে।

অন্তর থেকে ভালবাসা না আসা পর্যন্ত অন্যজনকে অপেক্ষা করতে হয়।

কিন্তু আমাকে কেন ভালবাসতে পারো না তুমি? আমি কি দেখতে এতই খারাপ?

একটু নরম হলো গ্ল্যাডিস। একটা হাত সামনে বাড়াল সে-সামনে ঝুঁকে অত্যন্ত সহৃদয়তার সঙ্গে আমার মাথাটা একটু পিছনে ঠেলে ধরল। আমার মুখটা ভাল করে দেখে সবজান্তার মত একটু হাসল।

না, তা নয়। তুমি আত্মাভিমানী ছেলে নও জানি। তবে বলতে দোষ নেই—কারণটা আরও গভীর।

আমার চরিত্র?

প্রবল ভাবে মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানাল সে।

কি করে শোধরাতে পারি আমি?

বসো, একটু বিশদ ভাবে আলাপ করি ব্যাপারটা। তুমি না বসা পর্যন্ত কোন কথাই বলব না আমি।

আমার দিকে সন্দিগ্ধ চোখে চেয়ে দেখে সসঙ্কোচে বসল সে।

এখন বলো আমার কি দোষ?

আমি আর একজনকে ভালবাসি, জবাব দিল গ্ল্যাডিস।

এবার আমার চমকে উঠবার পালা।

না, নির্দিষ্ট কাউকে নয়, আমার মুখের ভাব দেখে হাসতে হাসতে বলল ও। একটা আদর্শের কথা বলছি আমি। যে মানুষের কথা বলছি, আজও তার দেখা পাইনি।

বলো তো সে কেমন-তোমার সেই মনের মানুষ?

দেখতে সে তোমার মতও হতে পারে।

খুবই খুশি হলাম তোমার কথায়। তাহলে সে ব্যক্তি এমন কি করতে পারে যা আমি পারি না? কি করতে হবে আমাকে বলে দাও, গ্ল্যাডিস। শুধু চা খেয়ে থাকতে হবে, নিরামিষভোজী হতে হবে, বৈমানিক, নাকি সুপারম্যান? জানলে একবার চেষ্টা করে দেখতাম তোমার মনের মানুষ হতে পারি কি না।

পেশার বৈচিত্র্য শুনে হেসে ফেলল গ্ল্যাডিস। প্রথমত, আমার মনে হয় না যে আমার মনের মানুষটি এমন কথা বলবে। সে হবে অনেক শক্ত আর সমর্থ। নিজেকে সে এভাবে একটা মেয়ের ইচ্ছার কাছে সঁপে দেবে না। তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হবে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও বিন্দুমাত্র ভয় পাবে না। বড় বড় অনেক কাজ করতে হবে তাকে—সেই সাথে থাকবে তার নানান অভিজ্ঞতা। কোন ব্যক্তিসত্তাকে আমি ভালবাসব না, ভালবাসব তার গৌরবময় বিজয়কে। রিচার্ড বার্টনের কথাই ধরো, স্ত্রীর লেখা তার জীবনী পড়ে বোঝা যায় কত গভীর ছিল তার ভালবাসা। আর লেডী স্ট্যালী-স্বামীর জীবনী যে লিখেছেন, তার শেষ অধ্যায়টা পড়েছ তুমি? এই ধরনের মানুষকে নারীরা নিজেকে ছোট না করেও ভক্তি করতে পারে। কারণ নারীর প্রেরণাতেই গৌরব অর্জন করে পৃথিবীতে সম্মান পেয়েছে তার প্রেমিক।

উৎসাহের আতিশয্যে ওকে তখন আরও সুন্দর দেখাচ্ছিল। নিজেকে শক্ত করে যুক্তির অবতারণা করলাম আমি, সবাই কি আমরা স্ট্যানলী আর বার্টন হতে পারি? আর তাছাড়া সবাই সমান সুযোগও পায় না—অন্তত আমি তো কোনদিন তা পাইনি। পেলে নিশ্চয়ই তা লুফে নিতাম।

কিন্তু সুযোগ রয়েছে তোমার চারপাশে। এমন মানুষের কথা আমি বলছি, যে নিজের সুযোগ নিজেই করে নিতে জানে; যাকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারে না। এমন লোকের সাথে আজও পরিচয় হয়নি আমার অথচ তাকে কত ভালভাবেই না চিনি আমি। আমাদের চারপাশেই রয়েছে অনেক দুঃসাহসিক কাজের সুযোগ। পুরুষ করবে সে কাজ আর পুরস্কার স্বরূপ নারী নিজেকে সঁপে দেবে সেই বীরের পায়ে। ফরাসী লোকটার কথাই ধরো—এই যে গত সপ্তাহে যে বেলুনে চড়ে আসমানে উঠেছিল। ঝড় বইতে শুরু করল, কিন্তু যেহেতু আগে থেকেই প্রচার করা হয়েছিল, তাই ঝড়ের মধ্যেই জেদ ধরে রওনা হলো। ঝড় চব্বিশ ঘণ্টায় তাকে নিয়ে গেল দেড় হাজার মাইল। রাশিয়ার মাঝখানে গিয়ে নামল সে। তার প্রেমিকার কথা চিন্তা করো—অন্যান্য মেয়েরা নিশ্চয়ই ওর সৌভাগ্যকে হিংসা করে। সেটাই চাই আমি, আর সবার হিংসার পাত্রী হতে চাই।

তোমাকে খুশি করার জন্যে আমিও তা করতে পারতাম, বললাম আমি।

কিন্তু আমার প্রেমিক কেবল আমাকে খুশি করার জন্যেই কাজ করবে না। তার মন অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় বলেই করবে। নিজের অন্তরের তাগিদেই সে বারবার ঝাঁপিয়ে পড়ে বিপদকে বরণ করবে। তুমি তো গতমাসে উইগানের কয়লা খনিতে বিস্ফোরণের বিবরণ দিয়েছিলে। নিচে কার্বনিক অ্যাসিড গ্যাস আছে জেনেও কি তুমি ওদের সাহায্যে নামতে পারতে না?

অবশ্যই, নিচে নেমে সাহায্য করেছি আমি।

কিন্তু তুমি তো আমাকে বলেনি সে কথা।

ওটা বড়াই করে বলার মত কোন ঘটনা বলে মনে করিনি।

আমি জানতাম না, আমার দিকে শ্রদ্ধার চোখে চাইল গ্ল্যাডিস। সাহস আছে তোমার।

আমাকে বাধ্য হয়েই যেতে হয়েছিল। ভাল রিপোর্ট ঘটনাস্থলে না গিয়ে লেখা যায় না।

আশ্চর্য ছন্দপতন! তোমার নিচে যাওয়ার উদ্দেশ্যের পুরো আমেজটাই নষ্ট করে দিলে। যাক তবু তুমি এগিয়ে গিয়েছিলে শুনে খুশি হলাম, বলে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিল সে। ওর ভঙ্গিতে এমন একটা আভিজাত্য ছিল যে আমি সামনে ঝুঁকে কেবল ছোট্ট একটা চুমু খেলাম হাতে।

গ্ল্যাডিস বলল, হয়তো একটা বোকা মেয়ের মতই যৌবনের রঙীন স্বপ্ন দেখছি আমি। কিন্তু তবু আমার কাছে এটা এত বাস্তব, আমার জীবনেরই অংশ যেন। যদি কোনদিন বিয়ে করি আমি বিখ্যাত লোককেই বিয়ে করব।

নিশ্চয়ই। তোমার মত নারীই তো পুরুষকে প্রেরণা যোগায়। সুযোগ দাও, দেখি আমি কিছু করতে পারি কিনা। তাছাড়া, তুমি ঠিকই বলেছ, মানুষকে নিজের সুযোগ নিজেকেই করে নিতে হয়। ক্লাইভের কথাই ভেবে দেখো, সামান্য কেরানী ছিল, ভারতবর্ষ জয় করল। তুমি দেখে নিও-আমি কিছু একটা করবই।

আমার আইরিশ রক্ত ফুটে উঠেছে দেখে হেসে ফেলল গ্ল্যাডিস।

কেন পারবে না? মানুষের যা যা উপকরণ সবই আছে তোমার। যৌবন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, উদ্যম-কোন কিছুরই অভাব নেই। এসব কথা উঠল বলে প্রথমে খারাপ লাগছিল, কিন্তু এখন ভাল লাগছে। সত্যিকার পুরুষ হওয়ার ইচ্ছা তোমার মধ্যে জেগে থাকলেই আমি সুখী হব।

আর যদি সত্যিই…।

কুসুম উষ্ণ ভেলভেটের মত নরম একটা হাত আমার ঠোঁট চেপে ধরল।

আর কথা নয় এখন। সন্ধ্যায় তোমার অফিসে যাবার সময় আধঘণ্টা আগেই পেরিয়ে গেছে। আগে মনে করিয়ে দিতে বাধছিল। যেদিন সত্যিই পৃথিবীতে তুমি সম্মানের স্থান অধিকার করতে পারবে সেদিন আবার আমরা এই সম্পর্কে কথা বলব।

কুয়াশাচ্ছন্ন নভেম্বরের সন্ধ্যায় ক্যামবারওয়েল ট্রামে চেপে উষ্ণ হৃদয়ে ভাবতে ভাবতে চললাম। আর একদিনও নষ্ট হতে দেয়া চলবে না। আমার প্রেমিকার উপযুক্ত বীরত্বের একটা কাজ আমাকে খুঁজে বের করতেই হবে।

০২. বুড়ো ম্যাকারডলকে আমার বেশ ভাল লাগে

বুড়ো ম্যাকারডলকে আমার বেশ ভাল লাগে। আমাদের গেজেট পত্রিকার বার্তা সম্পাদক। মাথায় লাল চুল, সামনের দিকে চুল নেই বললেই চলে; ফলে কপালটা বিরাট দেখায়।

ঘরে ঢুকতেই চশমাটা ঠেলে টাকের উপরে তুলে দিলেন তিনি।

এই যে, মিস্টার ম্যালোন, শুনছি ভাল রিপোর্ট করছেন আপনি? কথায় স্কচ টানের সাথে দরাজ গলায় বললেন তিনি।

আমি তাকে ধন্যবাদ জানালাম।

খনি বিস্ফোরণের খবরটা খুব ভাল হয়েছে। সাদার্কের আগুনের রিপোর্টও চমৎকার। লেখার হাত আছে আপনার। তা আমার কাছে কি মনে করে?

একটা অনুগ্রহ চাইতে এসেছি।

একটু সচকিত হয়ে চোখ নামিয়ে নিলেন মিস্টার ম্যাকারডল।

কি করতে পারি বলুন, পারলে নিশ্চয়ই চেষ্টা করব।

আমাকে কাগজের তরফ থেকে কোন একটা মিশনে পাঠাবেন? প্রাণ দিয়ে কাজ করব আমি, ভাল রিপোর্ট দেব।

কি ধরনের মিশনের কথা বলছেন, মিস্টার ম্যালোন?

যে কোন ধরনের, স্যার-তবে কাজে অ্যাডভেঞ্চার আর বিপদ আপদ থাকতেই হবে। যত বেশি বিপদের ঝুঁকি হবে ততই ভাল।

নিজের জানটা খোয়াবার জন্যে বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েছেন মনে হচ্ছে?

ব্যক্তিগত ব্যাপার, স্যার, আমাকে যোগ্যতা প্রমাণ করতেই হবে।

হুম! কিছুক্ষণ চুপ করে চিন্তা করলেন ম্যাকারডল। তারপর বললেন, একটা কাজ দেয়া যেতে পারে। আধুনিক মাঞ্চুসেন আছেন একজন, তাকে মিথ্যেবাদী প্রমাণ করতে হবে।

যে কোন কাজ, যে কোন জায়গায় যেতে বলুন, আমার আপত্তি নেই।

আরও কিছুক্ষণ ভেবে তিনি বললেন, কিন্তু বন্ধুত্ব তো দূরের কথা তার সাথে কথা বলাই কঠিন। তবে বলা যায় না, মানুষকে সহজেই আপন করে নেয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে আপনার।

কে সেই লোক?

এনমোর পার্কের প্রফেসর চ্যালেঞ্জার।

নাম শুনে একটু চমকে উঠলাম আমি।

চ্যালেঞ্জার! বিখ্যাত প্রাণীতত্ত্ববিদ। এই প্রফেসর চ্যালেঞ্জারই তো ডেইলী টেলিগ্রাফের রানডেলের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলেন?

বার্তা সম্পাদক একটু বাঁকা হাসি হাসলেন।

কি আপত্তি আছে? আপনিই না বললেন যে, যে কাজে বিপদ আপদ থাকে তেমন কাজই আপনার প্রয়োজন?

হ্যাঁ, কাজ কাজই, স্যার, জবাব দিলাম আমি।

ঠিক বলেছেন। সবার সাথেই যে একই ব্যবহার করবেন প্রফেসর তা বলা যায় না। প্রফেসর সম্বন্ধে আমি কিছুই জানি না, কেবল নামটা মনে আছে। ব্লানডেলকে মারার পর কাগজে ফলাও করে লিখেছিল, তাই।

আগে থেকেই চ্যালেঞ্জারের প্রতি নজর আমার। ড্রয়ার হাতড়ে একটা কাগজ বের করলেন ম্যাকারুডল। এতে বেশ কিছু তথ্য আছে, বলে কাগজটা বাড়িয়ে দিলেন তিনি আমার দিকে।

কাগজটাতে লেখাঃ

জর্জ এডওয়ার্ড চ্যালেঞ্জার। জন্মঃ লারগস-১৮৬৩- শিক্ষা লাভঃ লারস একাডেমী। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের সহকারী: ১৮৯২-সহকারী রক্ষী, অ্যানথ্রাপলজি বিভাগ: ১৮৯৩-ওই বছরই তিক্ত পত্রালাপের পর কাজ ছেড়ে দেন। প্রাণীতত্ত্বের উপর গবেষণার জন্যে ক্রেস্টন মেডাল লাভ। আন্তর্জাতিক সদস্য… (বিশ্বের কোন নামই বাদ নেই।)

প্রকাশনা: মঙ্গোলীয় মাথার খুলির উপর মন্তব্য প্রদান; মেরুদন্ডী প্রাণীর ক্রমবিকাশের খসড়া; ইত্যাদি আরও অনেক কিছুর সাথে, ওয়াইম্যানিজমের ভ্রমাত্মক ধারণার উপর তার লেখা প্রবন্ধ ভিয়েনায় জীবতত্ত্ব কংগ্রেসে তুমুল বাকবিতন্ডার সৃষ্টি করেছিল। শখ: হাঁটা, পাহাড়ে চড়া। ঠিকানা: এনমোর পার্ক, কেনাসংটন, পশ্চিম।

কাগজটা নিয়ে যান, আজ আপনার জন্যে বিশেষ কোন কাজ নেই।

পকেটে রেখে দিলাম কাগজটা। কিন্তু, সার, কি জন্যে তার সাক্ষাৎকার নেব তা তো বললেন না? কি করেছেন প্রফেসর?

দুই বছর আগে একক অভিযানে তিনি গিয়েছিলেন দক্ষিণ আমেরিকায়। গত বছর ফিরে ওখানকার কিছু বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন। কেউ একজন তার কথাকে মিথ্যা বানোয়াট বলে অভিহিত করে। এখন একেবারে চুপ মেরে গেছেন। কিছু নষ্ট, ঝাপসা ছবিও ছিল তার কাছে। দক্ষিণ আমেরিকাতে গিয়েছিলেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিছু একটা আশ্চর্য ঘটনা, হয় সত্যি সত্যি দেখে এসেছেন, নয়তো তিনি একজন সেরা মিথ্যুক–পরেরটা ঠিক হবার সম্ভাবনাই বেশি। এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করতে গেলেই খেপে যান। কথা শেষ করলেন ম্যাকারডল।

স্যাভেজ ক্লাবের দিকে এগুলাম আমি। ক্লাবে না ঢুকে অ্যাডেলফি টিরেসের রেলিঙে ভর দিয়ে নদীর বাদামী তেলতেলে পানির দিকে চেয়ে রইলাম। মুক্ত বাতাসে আমার মাথাটা খোলে ভাল। পকেট থেকে কাগজটা বের করে লাইট পোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে পুরোটা আবার পড়লাম। স্পষ্টই বোঝা যায় বিজ্ঞানের বিষয়ে অত্যন্ত উৎসাহী ভদ্রলোক। প্রেসের লোক এই পরিচয়ে যে কোনমতেই প্রফেসরের সাথে দেখা করা সম্ভব নয় তা পরিষ্কার।

ক্লাবে ঢুকলাম। এগারোটা মাত্র বাজে। বড় ঘরটা এরই মধ্যে বেশ ভরে উঠেছে। আগুনের ধারে হাতলওয়ালা চেয়ারে বসা লম্বা, শুকনো, তীক্ষ্ণ চেহারার লোকটার দিকে নজর পড়ল আমার। চেয়ার টেনে পাশে বসতেই ঘুরে তাকাল সে। এই মুহূর্তে ওকেই প্রয়োজন ছিল আমার—টারপ হেনরি, নেচার পত্রিকার লোক। বন্ধু-বান্ধবেরা, সবাই জানে টারপ ভাল মানুষ। আমি টারপের কাছে সরাসরি আমার কথা পাড়লাম।

প্রফেসর চ্যালেঞ্জার সম্বন্ধে কি জানো তুমি?

চ্যালেঞ্জার! অশ্রদ্ধায় ভুরু কুঁচকে গেল তার। এই চ্যালেঞ্জার লোকটাই দক্ষিণ আমেরিকা সম্পর্কে আজগুবী গল্প ফেঁদেছিলেন।

কি রকম?

উঁচু শ্রেণীর অর্থহীন গল্প—অদ্ভুত কি সব জন্তু জানোয়ার নাকি আবিষ্কার করেছেন তিনি ওখানে। একটা সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন রয়টারকে। এমন বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল সেখানে, যে বোঝা গেল কিছুই কাজ হবে না। দুই একজন গুরুত্ব দিতে চাইলেও চ্যালেঞ্জার অচিরেই তাদেরও বিশ্বাসের ভিত্তি নেড়ে দেন।

কিভাবে?

অসহ্য রূঢ় ব্যবহার তার। জীববিজ্ঞানের বৃদ্ধ পন্ডিত ওয়াড়লে ছিলেন ওখানে। তিনি একটা নোট পাঠিয়েছিলেন চ্যালেঞ্জারের কাছে—জীববিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট প্রফেসর চ্যালেঞ্জারকে অকৃত্রিম শুভেচ্ছা পাঠাচ্ছেন। দয়া করে ইনস্টিটিউটের আগামী সভায় উপস্থিত থাকলে প্রেসিডেন্ট ব্যক্তিগতভাবে অনুগৃহীত বোধ করবেন।

এর যা উত্তর দিয়েছিলেন চ্যালেঞ্জার তা উচ্চারণযোগ্য নয়।

তাই নাকি?

হ্যাঁ, কেটেছেটে ভদ্র রূপ দিলে জবাবটা এরকম দাঁড়ায়ঃ প্রফেসর চ্যালেঞ্জার তার পাল্টা শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট শয়তানের শরণাপন্ন হলেই চ্যালেঞ্জার সেটাকে ব্যক্তিগত অনুগ্রহ বলে মনে করবেন।-বোঝো ঠেলা।

ম্পৰ্দ্ধা!

হ্যাঁ, সম্ভবত ওয়াডলেও একই মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর সে কি বিলাপ আমার পঞ্চাশ বছরের অভিজ্ঞতায়— এইভাবে শুরু।

আর কিছু?

ঝগড়াটে স্বভাব লোকটার। ভিয়েনায় গিয়ে ওয়াইসম্যান এবং জীবনের বিকাশ বিষয় নিয়ে ভয়ানক ঝগড়া করেছেন চ্যালেঞ্জার।

বিষয়টা জানা আছে তোমার?

না, নেই, তবে ভিয়েনা আলোচনার একটা ইংরেজি অনুবাদ ফাইল করা আছে আমাদের অফিসে। দেখবে? এখনই দেখাতে পারি।

এমনই কিছু একটা খুঁজছিলাম আমি। তার

সাক্ষাৎকার নিতে হবে আমার। তোমার সময় থাকলে চলো এখনই যাই।

বিরাট মোটা বাঁধানো নথিপত্র নিয়ে বসলাম আমি পত্রিকা অফিসে। ওয়াইসম্যান বনাম ডারউইন শীর্ষক প্রবন্ধটায় চোখ বুলাচ্ছি। বহু চেষ্টা করলাম কিন্তু হাতামাথা কিছুই বুঝলাম না। তবু যেটুকু বুঝলাম তার ভিত্তিতেই একটা চিঠি লিখে ফেললাম, চিঠিটা জোরে জোরে পড়ে শোনালাম টারপকে।

জনাব প্রফেসর চ্যালেঞ্জার,

গাছ-গাছড়া এবং প্রাণী সম্বন্ধে পড়াশুনা করতে গিয়ে আমি সব সময়েই আপনার মতামত অতি আগ্রহের সঙ্গে পড়ে থাকি। ডারউইন আর ওয়াইসম্যানের মতবিরোধ সম্বন্ধে আপনার ভিয়েনার বক্তব্য আমাকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছে।

আপনার বক্তৃতাটা সম্প্রতি আবার পড়লাম। কিন্তু কয়েকটা জায়গা আমার কাছে ঠিক পরিষ্কার হয়নি।

আগামী পরশু আপনার সাথে সাক্ষাৎ করার অনুমতি পেলে বক্তব্যগুলো আরও পরিষ্কার ভাবে বুঝে নিতে পারব এবং নিজেকে ভাগ্যবান মনে করব।

বিনীত ইতি,

আপনার গুণগ্রাহী,

এডওয়ার্ড ডি ম্যালোন।

কেমন হয়েছে? গর্বের সাথে জিজ্ঞেস করলাম আমি।

ভালই–কিন্তু তোমার মতলবটা কি?

কোনক্রমে দেখা করা। একবার তার ঘরে ঢুকতে পারলে একটা উপায় বেরিয়ে যাবেই। এমন কি নিজের ভন্ডামি সরাসরি স্বীকারও করে ফেলতে পারি।

আমার মতে চ্যালেঞ্জার যদি সাক্ষাৎ দিতে রাজি হয়ে চিঠির জবাব দেন, তাহলে তোমার উচিত হবে আমেরিকান ফুটবলের পোশাক পরে তৈরি হয়ে যাওয়া।

বুধবার সকালেই চিঠি এল। চিঠির বক্তব্যঃ

জনাব,

আপনার চিঠিতে জানলাম যে আপনি আমার মত সমর্থন করেন। আপনার জেনে রাখা ভাল যে আপনার বা অন্য কারও সমর্থনে কি অসমর্থনে আমার কিচ্ছু এসে যায় না।

যাই হোক, আপনি লিখেছেন আমার লেকচারের কিছু কিছু অংশ আপনার কাছে পরিষ্কার নয়। কিন্তু তা কি করে সম্ভব? আমার ধারণা একজন সাধারণ মানুষও আমার অকাট্য যুক্তি স্পষ্ট বুঝতে পারবে।

চিঠিটা পড়ে আমার ধারণা হয়েছে যে বুদ্ধি একটু কম হলেও আপনি সত্যিই শিখতে আগ্রহী। তাই বুধবার সকাল এগারোটার সময় আপনাকে আমার সাথে দেখা করার অনুমতি দিলাম। আমার চিঠিটা সাথে এনে গেটে অস্টিনকে দেখাবেন। বাধ্য হয়েই এই ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। সাংবাদিক বলে পরিচয়দানকারী কিছু সংখ্যক অসৎ লোকের হাত থেকে বাঁচার জন্যেই এই সতর্কতা।

জর্জ এডওয়ার্ড চ্যালেঞ্জার।

টারপ্ হেনরিকে চিঠিটা পড়ে শোনালাম। শুনে সে বলল, বাজারে একটা নতুন ওষুধ বেরিয়েছে, কিউটিকুরা না কি যেন নাম—শুনেছি আর্নিকার চেয়ে ভাল কাজ করে। কি বিচিত্র রসবোধ।

সাড়ে দশটায় ট্যাক্সি নিয়ে সময় মতই পৌঁছে গেলাম। বাড়িটার সামনে বারান্দায় বড় বড় থাম। বিরাট বাড়ি-জানালার ভারি পর্দা দেখে সহজেই অনুমান করা যায় বিত্তবান লোক এই প্রফেসর। বেল বাজাতেই দরজা খুলে অতিশয় শুকনো একটা লোক বেরিয়ে এল। বয়স বোঝা কঠিন। পরে জেনেছি সে প্রফেসরেরই ড্রাইভার। বাটলার ঘন ঘন পালিয়ে যায় বলে তাকে বাটলারের কাজও চালিয়ে নিতে হয়। হালকা নীল চোখে আমাকে জরিপ করে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, প্রফেসর কি আপনার সাথে দেখা করবেন বলেছেন?

হ্যা, এগারোটায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট।

চিঠি আছে?

খামটা বের করে দিলাম। ওটা একটু দেখে নিয়ে ফিরিয়ে দিল সে।

ঠিক আছে। মনে হলো নোকটা কম কথা বলে। ওর পিছন পিছন এগুলাম। হঠাৎ একজন ছোটখাট আকারের মহিলার কাছ থেকে বাধা পেলাম। কালো চোখ, উজ্জ্বল প্রাণবন্ত মহিলা-ইংরেজ মেয়ের থেকে ফরাসী মেয়ের সাথেই যেন মিল বেশি।

এক মিনিট, একটু এদিকে আসুন, স্যার, বললেন মহিলা, অস্টিনকে অপেক্ষা করতে বলে, আবার আমার দিকে তাকালেন।

আমার স্বামীর সাথে আগে কখনও দেখা হয়েছে আপনার?

না, ম্যাডাম, সে সৌভাগ্য আমার হয়নি।

তাহলে স্বামীর পক্ষ থেকে আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। খুবই বদরাগী মানুষ, সাবধান!

অনেক ধন্যবাদ, ম্যাডাম।

খেপে উঠতে দেখলেই চট করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসবেন। খবরদার তর্ক করতে যাবেন না। কয়েকজনই তর্ক করতে গিয়ে আহত হয়েছেন। শেষে লোক জানাজানি হয়—অসম্মান। তা কি বিষয়ে আলাপ করবেন, দক্ষিণ আমেরিকা নয় তো?

ভদ্র মহিলার কাছে মিথ্যা বলতে পারলাম না। সর্বনাশ—সবচেয়ে বিপদজনক বিষয় ওটা। একটা কথাও বিশ্বাস করবেন না–আমিও বিশ্বাস করি না। কিন্তু সেটা আবার তাকে বলতে যাবেন না যেন—তাহলেই খেপে যাবেন। তেমন কিছু যদি ঘটেই যায় বেলটা বাজিয়ে আমি না যাওয়া পর্যন্ত কোনমতে ঠেকিয়ে রাখবেন। খুব খেপে গেলেও সাধারণত আমি শান্ত করতে পারি। এই উৎসাহব্যঞ্জক কথাগুলো শুনিয়ে অস্টিনের হাতে আমাকে সঁপে দিলেন তিনি। করিডোরের শেষ মাথা পর্যন্ত এগিয়ে গিয়ে দরজায় টোকা দিল অস্টিন। ভিতর থেকে ষাঁড়ের ডাকের মত একটা আওয়াজ এল। প্রথম বারের মত প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের মুখোমুখি হলাম আমি।

চওড়া টেবিলের পেছনে একটা ঘূর্ণি চেয়ারে বসে আছেন তিনি। টেবিলের উপর বই, ম্যাপ আর নকশা ছড়ানো। আমি ঢুকতেই চেয়ার ঘুরিয়ে আমার দিকে ফিরলেন। তার হাবভাব আর আড়ম্বরে মুখ শুকিয়ে গেল আমার। আশ্চর্য কিছু দেখব বলেই আশা করেছিলাম—কিন্তু তিনি যে এমন পরাক্রান্ত ব্যক্তিত্ব তা মোটেও ধারণা করিনি। তাঁর বিশাল আকৃতিই যে কোন মানুষকে অবাক করার জন্যে যথেষ্ট। মানুষের কাঁধে এত বড় মাথা আর কোনদিন দেখিনি আমি। তার হ্যাটটা যদি আমি পরতে চেষ্টা করি তবে মাথা গলে কাঁধে এসে ঠেকবে। মুখটা বর্ণোজ্জ্বল-কুচকুচে কালো দাড়ি ঢেউ খেলে খেলে বুক পর্যন্ত নেমেছে। বিশাল চওড়া কাঁধ আর বুক দেখা যাচ্ছে টেবিলের উপরে। আর যা দেখা যাচ্ছে তা হলো কালো লোমে ভর্তি তার প্রশস্ত দুটো হাত।

তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে বললেন, বলুন, কি দরকার আপনার?

বুঝলাম, আরও কিছুক্ষণ আমাকে ছদ্ম পরিচয় বজায় রাখতে হবে-নইলে সাক্ষাৎকার এখানেই শেষ।

আপনি আমার সাথে দেখা করতে রাজি হওয়ায় নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি, স্যার। বলে পকেট থেকে খামটা বের করে দেখালাম আমি।

ওহ, তুমিই তাহলে সেই ছোকরা যে সহজ সরল ইংরেজি বুঝতে পারে না? সরাসরি তুমিতে নেমে এলেন প্রফেসর। তবে এটা ঠিক যে, বোঝোনি জিনিসটা স্বীকার করার মত সৎসাহস তোমার আছে। অন্তত ভিয়েনার ওই শুয়োরের দলের ঘোতঘোনির চেয়ে ইংলিশ মেষ শাবক কম অপ্রীতিকর। বলে এমন ভাবে তাকালেন তিনি যেন আমিই সেই ইংলিশ জন্তুটির প্রতিনিধি।

ওরা সত্যিই অত্যন্ত নিন্দনীয় ব্যবহার করেছে আপনার সাথে। বললাম আমি।

আমার যুদ্ধ আমি নিজেই লড়তে জানি, কারও সহানুভূতির প্রয়োজন নেই। এবার কাজের কথায় আসা যাক, কেননা বৃথা নষ্ট করার মত অঢেল সময় আমার নেই। কোন কোন জায়গা স্পষ্ট বোঝোনি তুমি?

এমন পরিষ্কার তাঁর আচার ব্যবহার, যে এড়িয়ে যাওয়া সত্যি মুশকিল। কিন্তু আসল কথা পাড়ার কোন একটা রাস্তা দেখতে পাচ্ছি না আমি। আরও কিছুটা সময় দরকার।

বলো বলো—সময় নষ্ট কোরো না, অসহিষ্ণুভাবে বলে উঠলেন চ্যালেঞ্জার।

আমি একজন ছাত্র মাত্র–শিখতে চাই। ওয়াইসম্যান সম্বন্ধে আপনার বিচারটা কি একটু বেশি কঠিন হয়নি? আজ পর্যন্ত যা সাক্ষ্য আর প্রমাণ পাওয়া গেছে তা কি তার স্বপক্ষেই যায় না?

কিসের সাক্ষ্য প্রমাণ? একটু উষ্ম প্রকাশ পেল তার কণ্ঠে।

অবশ্য এটা ঠিক যে তেমন সঠিক প্রমাণ কিছু পাওয়া যায়নি-আমি আধুনিক চিন্তাধারার সূত্র ধরেই বলেছি কথাটা।

আগ্রহের সাথে সামনে ঝুঁকে এলেন প্রফেসর চ্যালেঞ্জার।

আশা করি তুমি জানো যে ক্রেনিয়াল ইনডেক্স বা মাথার খুলির দৈর্ঘ্যের তুলনায় প্রস্থের শতকরা মাপ একটা ধ্রুব গুণণীয়ক?

অবশ্যই, বললাম আমি।

এটাও নিশ্চয়ই স্বীকার করবে যে বস্তুর মূল কারণের সূত্র এখনও সাবজুডিস?

নিঃসন্দেহে।

আর জীবাণু প্লাসমা যে পার্থেনোজেনেটিক ডিম থেকে ভিন্ন সেটা স্বীকার করবে তো?

নিশ্চয়ই! সোৎসাহে বললাম আমি।

কিন্তু এসব থেকে কি প্রমাণিত হয়? দৃঢ় কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন চ্যালেঞ্জার।

সত্যিই তো, বিড়বিড় করে উচ্চারণ করলাম, কি প্রমাণিত হয় এসব থেকে? পাল্টা প্রশ্ন করলাম আমি।

আমি বলব?

বলুন, আমার জ্ঞান বাড়বে।

এতে প্রমাণিত হয়, হঠাৎ খ্যাপার মত গর্জন করে উঠলেন চ্যালেঞ্জার, যে লন্ডনের একজন সেরা জোচ্চোর তুমি, একজন ঘৃণ্য সাংবাদিক; বিজ্ঞানের কচুও বোঝো না।

বলেই লাফিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠলেন চ্যালেঞ্জার। রাগে তাঁর চোখ থেকে যেন আগুন ঝরছে। সেই সন্ত্রস্ত মুহূর্তেও অবাক হয়ে লক্ষ করলাম যে প্রফেসর চ্যালেঞ্জার আকারে বেশ ছোট। মাত্র আমার কাঁধ সমান হবেন।

অর্থহীন বৈজ্ঞানিক বুলি, চিৎকার করে উঠলেন তিনি। হ্যা, এতক্ষণ তাই আউড়েছি আমি। তুমি কি মনে করেছিলে ওইটুকু মাথা নিয়ে বুদ্ধিতে টেক্কা দেবে আমাকে? আগেই সাবধান করে দিয়েছিলাম আমি, তবু তুমি এসেছ। এবার তৈরি হও! বলেই হুঙ্কার ছাড়লেন।

আস্তে আস্তে পিছিয়ে দরজা খুলতে খুলতে বললাম, দেখুন, স্যার, আপনি আমাকে ভৎসনা করতে পারেন করেছেনও। কিন্তু সবকিছুরই একটা সীমা আছে—মারলে ভাল হবে না।

তাই নাকি? এগিয়ে আসতে আসতে ব্যঙ্গ ভরে বললেন প্রফেসর। তোমার মত ঘৃণ্য লোক কয়েকজনকেই আমি পিটিয়ে বের করেছি এই বাড়ি থেকে। মাথা পিছু গড়ে তিন পাউন্ড পনেরো শিলিং খরচ হয়েছে আমার।

জোর আমার গায়েও কিছু কম নেই। আমিই প্রথম অন্যায় করেছি তা ঠিক, কিন্তু এত কটু কথা আর গালাগালি শুনে আমার রক্তও গরম হতে শুরু করল। বললাম, ভাল হবে না কিন্তু, প্রফেসর গায়ে হাত তুললে আমি সহ্য করব না।

ওহ? তার কালো গোঁফটা উপরে উঠল, দাঁতের একটু সাদা অংশ দেখা গেল, সহ্য করবে না তুমি-না?

বোকামি করবেন না, প্রফেসর, চিৎকার করে বললাম আমি। একশো পাঁচ সের ওজন আমার। প্রত্যেক শনিবারে লন্ডন আইরিশ দলে রাগবি খেলি। সুতরাং বুঝতেই পারছেন…

ঠিক এই সময়ে আমার উপর বিদ্যুৎ বেগে ঝাপিয়ে পড়লেন প্রফেসর চ্যালেঞ্জার। কপাল ভাল, দরজাটা আগেই খুলে রেখেছিলাম—বন্ধ থাকলে দরজা ভেঙে নিয়ে পড়তাম আমরা। প্রফেসরের দাড়ি আমার মুখ চোখ প্রায় সবই ঢেকে ফেলেছে। দুজনেরই হাত-পা শক্ত হয়ে পেঁচিয়ে গেছে। ডিগবাজি খেতে খেতে চললাম দুজন। হলঘর দিয়ে বাইরে বেরুবার পথে হলঘরের একটা চেয়ারও চলল আমাদের সাথে। মনিবকে আগেও অনুরূপ অবস্থায় দেখেছে অস্টিন। আমরা সদর দরজার কাছাকাছি পৌঁছতেই নীরবে দরজাটা খুলে দিল। আর সিঁড়ি দিয়ে চেয়ার সহ উল্টে নিচে পড়লাম আমরা। চেয়ারটা ভেঙে খান খান হয়ে গেল; ছাড়াছাড়ি হয়ে দুজনেই গড়িয়ে গিয়ে পড়লাম ড্রেনে। এক লাফে উঠে দাঁড়ালেন প্রফেসর হাঁপানি রোগীর মত হাঁপাতে হাঁপাতে মুঠো করা হাত নাড়তে লাগলেন। বললেন, শিক্ষা হয়েছে নাকি আরও দেব দুচার ঘা?

বেটা গুন্ডা কোথাকার! বলে আবার মোকাবেলার জন্যে তৈরি হলাম।

মারপিট করার জন্যে প্রফেসর তড়পাচ্ছেন। আর এক দফা লাগার আগেই অপ্রীতিকর অবস্থা থেকে রেহাই পেলাম। একজন পুলিশ এসে দাঁড়ালো আমাদের পাশে–হাতে নোটবই আর পেনসিল।

কি হচ্ছে এখানে? লজ্জা থাকা উচিত আপনাদের, বললো পুলিশ অফিসার। তারপর আমার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো, বলুন, ঘটনা কি? নোট করার জন্যে খাতা পেনসিল তৈরি তার।

আমাকে আক্রমণ করেছিল এই লোকটি, বললাম আমি।

আপনি আক্রমণ করেছিলেন ওঁকে? পুলিশ অফিসার জানতে চাইলো।

জবাব না দিয়ে কেবল জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে লাগলেন প্রফেসর।

এ নিয়ে কবার হল, সজোরে মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন অফিসার। গত মাসে একই কারণে কোর্টে যেতে হয়েছিল আপনাকে। দেখুন তো এই ভদ্রলোকের চোখ কালো করে দিয়েছেন আপনি। অভিযোগ আনছেন তো আপনি? আমাকে জিজ্ঞেস করলো সে।

না, কোন অভিযোগ নেই আমার, আমি নরম হলাম।

তার মানে? চোখ কপালে তুললো পুলিশ অফিসার।

দোষ আমারই—আমিই অনাহুত ভাবে অনধিকার প্রবেশ করেছি। আমাকে উনি আগেই সাবধান করেছিলেন, সত্যি কথাই বললাম আমি।

শব্দ করে নোট বইটা বন্ধ করলো পুলিশ অফিসার। এসব ঘটনা যত কম ঘটে ততই মঙ্গল। যাও, যাও ভিড় কোরো না, যারা জটলা করেছিল তাদের খেদিয়ে নিয়ে গেলো পুলিশ অফিসার। প্রফেসর চাইলেন আমার দিকে, তার চোখে দুষ্টুমির ভাব।

ভিতরে এসো, ধমকে বললেন তিনি। তোমার সাথে বোঝাপড়া এখনও শেষ হয়নি আমার।

প্রফেসরের পিছু পিছু আবার ভিতরে গেলাম। আমরা ঢুকতেই দরজাটা বন্ধ করে দিল অস্টিন।

০৩. দরজা ভাল করে বন্ধ করতে না করতেই

দরজা ভাল করে বন্ধ করতে না করতেই খাবার ঘরের দরজা দিয়ে ছুটে বেরিয়ে এলেন মিসেস চ্যালেঞ্জার। অগ্নিমূর্তি মহিলার। স্বামীর পথ আগলে দাঁড়ালেন উনি-যেন ক্রুদ্ধ মুরগী পথ আগলে দাঁড়িয়েছে বিশাল এক বুলডগের! বোঝা গেল যে আমাকে বেরুতে দেখেছেন প্রফেসর-গিন্নী, কিন্তু আবার ফিরে আসাটা খেয়াল করেননি।

একটা অসভ্য জানোয়ার তুমি, জর্জ, চিৎকার করে বললেন মিসেস চ্যালেঞ্জার, এমন সুন্দর ভদ্র যুবকটিকে মেরেছ।

বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে পিছনের দিকে দেখালেন প্রফেসর। এই যে আমার পিছনে বহাল তবিয়তেই আছে সে।

প্রফেসর-গিন্নীর যেন গুলিয়ে যাচ্ছে সব—সঙ্গত কারণেই। অপ্রস্তুত ভাবে বললেন মহিলা, আপনাকে খেয়াল করিনি আমি।

আমি ঠিকই আছি, ম্যাডাম, তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলাম আমি।

ওহ! মেরে আপনার মুখে দাগ করে দিয়েছে। জর্জ, তুমি একটা আস্ত জানোয়ার। প্রত্যেক সপ্তাহে একই অবস্থা আর সবাই মুখরোচক গল্প করে তোমাকে নিয়ে। আমার ধৈর্যের বাঁধ তুমি ভেঙে দিয়েছ।

বাজে বোকো না।

আমি বাজে বকছি না। আর এটা গোপনীয় কিছু নয়, পাড়ার সবাই জানে। তোমাকে নিয়ে সবাই ঠাট্টা মশকরা করে। মান মর্যাদা নেই তোমার? তোমার মত লোক কোথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সম্মানীয় প্রফেসর হবে, হাজার হাজার ভক্ত ছাত্র-ছাত্রী থাকবে, আর তা না করে গুন্ডামি করে বেড়াচ্ছ—কোথায় তোমার মান সম্মান?

আমার মান আমার কাছে, জবাব দিলেন প্রফেসর।

আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করলে তুমি। তুমি একটা সাধারণ গুন্ডাতে পরিণত হয়েছ।

চুপ করো, জেসি।

কেন চুপ করব, তুমি একটা নিতান্ত নিকৃষ্ট মানুষ।

পরে কিন্তু আমার দোষ দিও না। বলে আমাকে অবাক করে দিয়ে জেসিকে তুলে নিলেন প্রফেসর। একটা উঁচু কালো মার্বেল পাথরের স্তম্ভের উপর বসিয়ে দিলেন। প্রায় সাত ফুট উঁচু হবে, ভাল করে ভারসাম্য রাখতে পারছেন না জেসি, ভয়ে সিটিয়ে গেছেন।

নামিয়ে দাও বলছি! চিৎকার করে উঠলেন তিনি।

প্লীজ বলো, তবে নামাব।

অমানুষ, এই মুহূর্তে নামিয়ে দাও আমাকে।

জেসির কথায় ভ্রক্ষেপ না করে আমাকে বললেন চ্যালেঞ্জার, পড়ার ঘরে এসো, ম্যালোন।

স্যার, মহিলার অবস্থা দেখে বললাম আমি।

এই দেখো ম্যালোনও তোমার জন্যে সুপারিশ করছে। প্লীজ বলো, নামিয়ে দেব।

ওহ, একটা বর্বর তুমি। প্লীজ, প্লীজ।

তাঁকে নামিয়ে দিলেন প্রফেসর।

ভদ্রতা বজায় রেখে চলতে হবে তোমাকে, জেসি। ম্যালোন একজন সাংবাদিক, কি না কি লিখে দেবে, আমাদের পাড়ায় ডজন খানেক বেশি বিক্রি হবে ওই কাগজ।

আপনি সত্যিই একজন বেয়াড়া স্বভাবের মানুষ, স্যার। রাগের সাথে বললাম আমি।

হো হো করে হাসিতে ফেটে পড়লেন প্রফেসর। এখনই আবার মিল হয়ে যাবে আমাদের। বলে বিরাট হাত দুটো জেসির দুই কাঁধে রেখে বললেন, তুমি যা বলো সবই ঠিক। তোমার কথা মেনে চললে আমি অনেক ভাল হতে পারতাম। কিন্তু তাতে আমি ঠিক জর্জ এডওয়ার্ড চ্যালেঞ্জার হতে পারতাম না। পৃথিবীতে ভাল ভাল মানুষ অনেক আছেন কিন্তু জি. ই. সি. আছে একজনই।

মিনিট দশেক আগে যে ঘর থেকে নাটকীয় ভাবে বেরিয়েছিলাম আমরা আবার সেই ঘরেই ফিরলাম।

হাতের ইশারায় একটা চেয়ার দেখিয়ে এক বাক্স চুরুট ঠেলে দিলেন প্রফেসর, আসল স্যান জুয়ান–কলোরাডো।

একটা চুরুট তুলে নিয়ে দাঁতে কামড়ে কাটতে যেতেই হা হা করে উঠলেন প্রফেসর। করো কি! করো কি! ক্লিপ করে কাটতে হবে, তাও খুব সম্ভ্রমের সাথে। এখন আরাম করে হেলান দিয়ে আমার কথা শোনো, তোমার কোন প্রশ্ন থাকলে কথা শেষ হলে পরে জিজ্ঞেস করবে, আমার কথার মাঝখানে কথা বলবে না।

প্রথম কথা হচ্ছে, সঙ্গত কারণে বের করে দেয়ার পরেও আবার কেন তোমাকে বাড়িতে ঢুকতে দিলাম। কারণটা হচ্ছে ওই পুলিশ অফিসারের কাছে তোমার মন্তব্য। তোমার পেশার লোকদের কাউকেই এক টেবিলে বসে কথা বলার যোগ্য মনে করি না আমি। তোমার আজকের আচরণে বুঝলাম যে, সাংবাদিক হলেও তুমি আর সবার চেয়ে উন্নত ধরনের, তুমি ভিন্ন রকম চিন্তাধারা পোষণ করো। ছাইটা তোমার বাম দিকে বাঁশের টেবিলে রাখা ছোট্ট জাপানী অ্যাশট্রেতে ফেলো।

যেন ক্লাশ নিচ্ছেন এমনভাবে একটানা কথাগুলো বলে গেলেন প্রফেসর। টেবিলের উপর ছড়ানো কাগজের স্তুপের মাঝ থেকে একটা জীর্ণপ্রায় স্কেচ খাতা হাতে নিয়ে রিভলভিং চেয়ার ঘুরিয়ে আমার মুখোমুখি হলেন।

এখন তোমাকে আমি দক্ষিণ আমেরিকার কথা বলব। কোন রকম মন্তব্য শুনতে চাই না। আর একটা কথা একবার যা বলব তা আমার অনুমতি ছাড়া পুনরাবৃত্তি করা চলবে না। অনুমতি হয়তো কোনদিনও না-ও দিতে পারি আমি পরিষ্কার?

কঠিন শর্ত আরোপ করলেন আপনি—একটা ছোট্ট রিপোর্ট…

সঙ্গে সঙ্গে নোট বইটা আবার টেবিলে রেখে দিলেন চ্যালেঞ্জার। কথা এখানেই শেষ—আসতে পারো তুমি।

না, না, যে কোন শর্তই আমি মানতে রাজি আছি। বুঝতে পারছি, রাজি না হয়ে উপায় নেই আমার।

না, কোন পথই খোলা নেই তোমার। ঠিক আছে আমি কথা দিচ্ছি।

ভদ্রলোকের কথা তো?

একেবারে মরদ কা বাত হাতী কা দাঁত।

বেশ। তুমি হয়তো শুনেছ, দুবছর আগে আমি দক্ষিণ আমেরিকায় গিয়েছিলাম অনুসন্ধানের কাজে। আমার আবিষ্কার পৃথিবীর বিজ্ঞানের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমার যাওয়ার আসল উদ্দেশ্য ছিল ওয়ারলেস আর বেটসএর কিছু কিছু সিদ্ধান্ত নিজে পরখ করে দেখা। কিন্তু একটা আশ্চর্য ঘটনা আমার অনুসন্ধান আর চিন্তাধারার মোড় ঘুরিয়ে আমাকে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন পথে নিয়ে যায়।

তুমি নিশ্চয়ই জানো কিংবা হয়তো এই আধা-শিক্ষিত বয়সে নাও জানতে পারো-আমাজন নদীর আশেপাশে বিস্তর এলাকা আছে যেখানে এখনও মানুষের পা পড়েনি। অনেক উপনদীই আমাজনে এসে মিশেছে যাদের কোন চিহ্ন পাওয়া যাবে না আধুনিক মানচিত্র বা চার্টে। এরকম একটা উপনদীর সঙ্গমস্থলে কিউকামা ইন্ডিয়ানদের বাস। ওদের কিছু লোকের রোগ আমি ভাল করে দিয়েছিলাম। তাছাড়া আমার ব্যক্তিত্বও ওদের মনে গভীর দাগ কাটে। তাই আবার আমি যখন ওদের মধ্যে ফিরলাম তখন সবাইকে আমার জন্যে অধীর ভাবে অপেক্ষা করতে দেখে অবাক হইনি। ওদের ইশারা ভাষায় বুঝলাম যে কেউ একজন খুব অসুস্থ, আমার চিকিৎসা অতি জরুরী। ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখলাম রোগী একটু আগেই মারা গেছেন। অবাক হয়ে লক্ষ করলাম রোগী রেড ইন্ডিয়ান নন—তার গায়ের রঙ সাদা। পরনে শতছিন্ন জামা, চেহারায় দীর্ঘ দিন ধরে কঠিন অবস্থার সঙ্গে সংগ্রাম করার ছাপ। স্থানীয় লোকেরা কেউ চেনে না ওঁকে—একাকী মরণাপন্ন অবস্থায় বনের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন লোকটি।

পিঠে ঝুলানো ক্যানভাস ব্যাগটা ওঁর পাশেই পড়ে ছিল, সেটা পরীক্ষা করে জানতে পারলাম, তার নাম মেপূল হোয়াইট, আর ঠিকানা: লেক এভিনিউ, ডেট্রয়েট, মিশিগান। ব্যাগের ভিতরে আর যা পাওয়া গেল তা থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় যে লোকটি একজন চিত্র শিল্পী এবং কবি, মনের খোরাক জোগাতে বেরিয়েছিলেন। ব্যাগে আরও পাওয়া গেল কয়েকটা হাতে আঁকা ছবি, একটা রঙের বাক্স, একবাক্স রঙীন চক, কয়েকটা ব্রাশ আর তোমার সামনে ওই কালিদানীর ওপর রাখা হাড়টা। ব্যাক্সটারের লেখা এক কপি মথ এবং প্রজাপতি বইও ছিল ব্যাগে।

চলে আসব এমন সময়ে নজরে পড়ল মেপলের ছিন্ন জ্যাকেটটা থেকে কি যেন বেরিয়ে আছে। এই স্কেচ খাতাটা। তোমাকে দিচ্ছি খাতাটা, এক এক করে পাতা উন্টে দেখো।

একটা সিগার ধরিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার মুখের ভাব লক্ষ করতে লাগলেন প্রফেসর।

আশ্চর্য কিছু বেরিয়ে পড়বে আশা নিয়ে খাতাটা খুললাম আমি, তবে সেটা কি ধরনের চমক হতে পারে তার কোন ধারণাই ছিল না আমার। প্রথম পাতা দেখে নিরাশ হলাম, একটা খুব মোটা মানুষের ছবি আঁকা রয়েছে। নিচে লেখা, সেইল বোটের জিমি কোলভার। পরের কয়েক পাতায় ছোট ছোট স্কেচে দেখানো হয়েছে ইন্ডিয়ানদের কিছু আচার অনুষ্ঠান। আরও কয়েকটা বিভিন্ন বিষয়ের ছবি আর সেগুলোর নামের পর দুই পাতা ভরা বিদঘুটে চেহারার লম্বা নাকওয়ালা টিকটিকি জাতীয় এক জন্তুর স্কেচ। বুঝতে না পেরে আমি প্রফেসরকে জিজ্ঞেস করলাম, এগুলো নিশ্চয়ই কুমীর?

অ্যালিগেটর-দক্ষিণ আমেরিকায় কুমীর নেই। কুমীর আর অ্যালিগেটরের মধ্যে তফাত হচ্ছে…

না, আমি বলছিলাম যে আমি তো এগুলোর মধ্যে আশ্চর্য কিছুই দেখছি না —আপনার কথা থেকে অন্য রকম ধারণা হয়েছিল আমার।

চ্যালেঞ্জার হেসে বললেন, পরের পৃষ্ঠা দেখো।

দেখলাম, কিন্তু সন্তুষ্ট হতে পারলাম না। পুরো পাতা জুড়ে একটা ভূদৃশ্য আঁকা রয়েছে– কিছু কিছু রঙও ব্যবহার করা হয়েছে। মুক্ত আকাশের নিচে যারা ছবি আঁকেন তারাই এ ধরনের খসড়া করেন–পরে খুঁটিনাটি বসিয়ে দেন। দূরে হালকা সবুজ গাছ, প্রান্তরটা ক্রমে উপরের দিকে উঠে গিয়ে একটা খাড়া পাহাড়ের নিচে শেষ হয়েছে। গাঢ় লাল রঙ পাহাড়ের, অনেকটা বেসল্ট পাথরের সারির মত। পাজরের হাড়ের মত যেন দেখাচ্ছে। উঁচু দেয়ালের মত একটানা দুদিকে প্রসারিত হয়েছে পাহাড়টা। এক জায়গায় পিরামিডের মত উচু হয়ে রয়েছে। একটা পাথর। বিরাট একটা গাছ মুকুটের মত শোভা পাচ্ছে পিরামিডের মাথায়। মনে হয় আশে পাশের খাড়া এবড়োখেবড়ো মূল পাহাড়শ্রেণী থেকে একটা ফাটল ওটাকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। পরের পাতায় একই জায়গার আর একটা স্কেচ-তবে অনেক কাছে থেকে আঁকা। এখানে অনেক খুঁটিনাটিই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।

কি বুঝছ? আগ্রহ ভরে জিজ্ঞেস করলেন চ্যালেঞ্জার।

গড়নটা অসামান্য সন্দেহ নেই, বললাম আমি, তবে ভূতত্ত্ববিদ্যায় আমার জ্ঞান সীমিত। মনে সাড়া জাগাবার মত কিছু তো দেখছি না।

কিন্তু উনি বললেন, অপূর্ব, অসামান্য, অবিশ্বাস্য। পৃথিবীর কেউ কোন দিন স্বপ্নেও ভাবেনি যে এমনটি সম্ভব। পরেরটা দেখো!

পাতা উল্টাতে নিজের অজান্তেই বিস্ময়ে একটা শব্দ অস্ফুটে বেরিয়ে এল আমার মুখ থেকে। সমস্ত পাতা জুড়ে আঁকা একটা ছবি, এমন অদ্ভুত জীব আমি জীবনে দেখিনি। মাথাটা মুরগীর মত, দেহ বিরাটকায় গিরগিটির, লেজের উপর সারি সারি গজালের মত কাঁটা। বাঁকা পিঠের উপর ফালি ফালি ঝালর–মনে হয় ডজন খানেক মুরগীর ঝুঁটি যেন সারি বেঁধে পরপর বসানো রয়েছে। জন্তুটার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে মানুষের মত আকৃতির ছোট্ট এক বামন; বিস্ময়ের সাথে চেয়ে দেখছে লোকটা।

কি বুঝছ? বিজয়ের গর্বে হাত দুটো ডলতে ডলতে জিজ্ঞেস করলেন প্রফেসর।

বিরাট, বিশাল একটা দানব।

এমন একটা ছবি কেন আঁকলেন তিনি?

সম্ভবত মদের মাত্রা বেশি হয়ে গিয়েছিল! জবাব দিলাম আমি।

ওহ! এর চেয়ে ভাল কোন কারণ খুঁজে পেলে না তুমি? ক্ষুব্ধ হলেন প্রফেসর।

আপনার ব্যাখ্যা কি, স্যার?

সুস্পষ্ট ভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে ওই জন্তুটা জীবন্ত এবং জীবন্ত অবস্থাতেই ওই ছবিটি এঁকেছেন শিল্পী।

হেসেই ফেলতাম আমি—কিন্তু প্রফেসরের সঙ্গে প্রথম দর্শনের তুমূল কান্ডের কথা মনে করে হাসতে সাহস হলো না।

আমি ব্যঙ্গের সুরে বললাম, সন্দেহ নেই, কোনই সন্দেহ নেই। কিন্তু ওই ছোট্ট মানুষটা আমাকে ধোঁকা লাগিয়ে দিচ্ছে। লোকটা যদি ইন্ডিয়ান হত তাহলে বলা যেত যে সে পিগমী-কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে সানহ্যাট পরা একজন ইউরোপীয়।

নাক দিয়ে খ্যাপা মহিষের মত আওয়াজ করলেন প্রফেসর। বললেন, সত্যি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ তুমি, ঘুণে ধরা মগজ, আর সেই মগজের নিষ্ক্রিয়তা সম্বন্ধে আমার মতামত এবার আরও প্রশস্তির সুযোগ পেল—চমৎকার!

প্রফেসরের কথা এমনই অযৌক্তিক আর হাস্যকর যে রাগতেও পারলাম না আমি। আর চ্যালেঞ্জারের মত লোকের উপর রাগ করতে হলে সব সময়ে কেবল রেগেই থাকতে হবে। ক্লান্ত হাসি হাসলাম আমি, আমার মনে হয় লোকটাকে বেশি ছোট দেখাচ্ছে।

এই যে দেখো, সজোরে বললেন চ্যালেঞ্জার। সামনে ঝুঁকে পড়ে তার মোটা রোমশ আঙ্গুল রাখলেন ছবির ওপর। ওই জন্তুটার পিছনে এই গাছটা দেখেছ? হয়তো ভেবেছিলে ওটা ড্যানডিলাইয়ন বা ব্রাসেলস্প্রাউট, তাই না? জেনে রাখো ওটা একটা আইভরি পাম গাছ। প্রায় পঞ্চাশ ষাট ফুট পর্যন্ত হয় লম্বায়। বুঝছ না কেন যে মানুষের ছবিটা এখানে আঁকার একটা উদ্দেশ্য আছে। তিনি কিছুতেই দানবটার সামনে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহস পেতেন না—প্রাণভয় সকলেরই আছে। নিজেই নিজের স্কেচ করেছেন মাপের মাত্রা বা স্কেল বোঝাবার জন্যে। পাঁচ ফুট মত ছিলেন তিনি লম্বায়, পিছনের গাছগুলো দশগুণ অর্থাৎ পঞ্চাশ ফুট উঁচু।

সর্বনাশ! চেঁচিয়ে উঠলাম আমি, তার মানে, আপনার মতে জন্তুটা—মানে চারিংক্রশ স্টেশনেও ওটার খাচার জায়গা হবে না।

একটু অতিরঞ্জন হয়ে থাকবে কিন্তু জন্তুটা অবশ্যই প্রাপ্ত বয়স্ক।

কিন্তু, একটা স্কেচ দেখে নিশ্চয়ই মানুষের এতদিনের অভিজ্ঞতা সব মিথ্যা বলে বাতিল করে দেয়া যায় না। তাড়াতাড়ি বাকি পাতাগুলো উল্টে দেখলাম, আর কোন ছবি নেই খাতায়। একজন আমেরিকান শিল্পীর একটা ছবি দেখেই আপনার মত বিখ্যাত বিজ্ঞানীর এমন একটা চুড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা কি ঠিক হচ্ছে? কে জানে সে শিল্পী হয়তো হ্যাশিশের প্রভাবে, জ্বরের ঘোরে, কিংবা মনের নিছক উদ্ভট কল্পনার বশে এঁকেছে ছবিটা?

জবাব দেয়ার জন্যে একটা বই হাতে তুলে নিলেন চ্যালেঞ্জার। এই বইটা আমারই এক গুণী বন্ধু রে ল্যাংকেস্টরের লেখা। এখানে একটা ছবি আছে–হ্যাঁ এই যে, ছবির নিচে লেখা-ডাইনোসর স্টিগেসরাসের সম্ভাব্য আকৃতি, পিছনের পা এক একটা দু জন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের সমান, দেখো এই যে ছবি।

খোলা বইটা বাড়িয়ে দিলেন প্রফেসর। ছবিটা দেখে চমকে উঠলাম আমি। অদ্ভুত মিল রয়েছে এই ছবিটার সাথে স্কেচটার।

আশ্চর্য মিল ছবি দুটোর মধ্যে—সত্যিই লক্ষ্যণীয় বিষয়।

কিন্তু তবু তুমি স্বীকার করবে না এটা সত্য?

এটা ঘটনাচক্রে হতে পারে, বা শিল্পী হয়তো এই ছবিটাই কোনদিন দেখেছিলেন। ছবিটা তার মনে গেঁথে গিয়েছিল-পরে ঘোরের বশে আবার এঁকে ফেলেছেন?

ভাল কথা, শান্ত গলাতেই বললেন প্রফেসর, এই প্রসঙ্গ এখানেই থাকুক। এবার আমি এই হাড়টা একটু পরীক্ষা করে দেখতে অনুরোধ করব তোমাকে। বলে আমার হাতে হাড়টা তুলে দিলেন প্রফেসর। ইঞ্চি ছয়েক লম্বা, আমার বুড়ো আঙ্গুলের সমান মোটা। হাড়ে মাংসের কোমল অংশ একদিকে শুকিয়ে আছে, অর্থাৎ বেশি দিনের পুরানো নয়।

এটা কিসের হাড়? প্রফেসর জিজ্ঞেস করলেন।

সতর্কতার সাথে পরীক্ষা করলাম আমি হাড়টা। প্রায় ভুলে যাওয়া স্মৃতি মনে আনার চেষ্টা করলাম।

মানুষের –স্বাস্থ্যবান কোন মানুষের কণ্ঠার হাড় হতে পারে এটা। আমি আন্দাজে বললাম।

মানুষের কণ্ঠার হাড় বাঁকা হয়, একটু বিরক্তির সাথেই হাত নেড়ে আমার কথা উড়িয়ে দিলেন প্রফেসর, এটা সিধে। আর এই খাজটা দেখে বোঝা যায়, একটা মজবুত পেশী ছিল এখানে। কণ্ঠার হাড়ে এরকম খাঁজ থাকে না।

তাহলে আমি স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি যে এটা কি আমি জানি না।

লজ্জার কিছু নেই তোমার—দক্ষিণ কেনসিংটনের সমস্ত লোক ডাকলেও হয়তো তাদের কেউ বলতে পারবে না। ওষুধের বাক্সের ভিতর থেকে একটা ছোট্ট হাড় বের করলেন চ্যালেঞ্জার। মটর দানার চেয়ে সামান্য বড় হবে। আমার হাতে দিয়ে বললেন প্রফেসর, এখন যেটা তোমার হাতে দিলাম সেটাও একই ধরনের হাড়-মানুষের। আর ওই বড় হাড়টা যে ফসিল নয় তা ওই শুকিয়ে যাওয়া অংশ দেখেই বোঝা যায়।

হাতির হাড় এমন…

যাতনায় মুখ বিকৃত হয়ে গেল প্রফেসরের। না, দক্ষিণ আমেরিকায় হাতি আছে এমন কথাও বোলো না…লোকে হাসবে।

হাতি না হোক, দক্ষিণ আমেরিকার কোন বড় জন্তু হতে পারে—টাপির বা অন্য কিছু?

দেখো, আমার যে কাজ তা আমি ভাল বুঝি-ওটা টাপির বা অন্য কোন জন্তুর হাড় নয়। ওটা বিরাট শক্তিশালী আর ভয়ঙ্কর কোন জন্তুর হাড়। জীববিজ্ঞানের রেকর্ডভুক্ত না হলেও এই জন্তু আজও পৃথিবীর বুকেই বেঁচে আছে। কি, বিশ্বাস হচ্ছে না?

পুরোপুরি বিশ্বাস না হলেও ব্যাপারটা অবশ্যই আমার মনোযোগ আকর্ষণ করছে।

তাহলে হতাশ হবার কারণ নেই—তোমার মধ্যে যুক্তি আছে, কাজেই কোন না কোন সময়ে তুমি নিশ্চয়ই বুঝবে। এবার বাকিটা বলছি। এই ঘটনার পরে আমার পক্ষে আরও বিস্তারিত না জেনে ফেরত আসা অসম্ভব হয়ে পড়ল। শিল্পী কোনদিক থেকে এসেছিলেন বনে তার অনেক নিদর্শনই পাই আমি। তবে তার খুব একটা দরকার ছিল না, ভূতুড়ে এক জায়গার কথা প্রচলিত আছে ওখানকার উপজাতীয়দের মধ্যে-কারুপুরির কথা নিশ্চয়ই শুনেছ!

না তো?

কারুপুরি হচ্ছে জঙ্গলের ভূত। ওরা বিশ্বাস করে ওই ভূত খুবই সাঘাতিক, ওর কাছ থেকে যত দূরে থাকা যায় ততই মঙ্গল। কারুপুরির আকৃতি বা প্রকৃতি সম্পর্কে কেউ কিছু বলতে পারে না, কিন্তু আমাজন এলাকার সব লোকই ওকে ডরায়। কারুপুরি কোন দিকে থাকে সেটা তারা সবাই জানে। আমেরিকান শিল্পী এসেছিলেন সেই দিক থেকেই। ভয়াবহ কিছু একটা আছে ওদিকে বুঝলাম কিন্তু সেটা কি তা খুঁজে বের করাই আমার কর্তব্য হয়ে দাঁড়াল।

কি করলেন আপনি? ততক্ষণে আমার অবিশ্বাস দূর হয়ে গেছে,–এই লোকটির সত্যিই আকর্ষণ ক্ষমতা আছে, আপনাআপনিই শ্রদ্ধা এসে যায় তার উপর।

অনেক চেষ্টার পর কিছু স্থানীয় লোককে রাজি করালাম। ওরা তো প্রথমে ওই বিষয়ে কথা বলতেই নারাজ। তোয়াজ, উপহার-শেষ পর্যন্ত এমন কি মারধরের ভয় দেখিয়ে রাজি করাতে হল। দুজন গাইডকে রেখে অনেক বাধা বিঘ্ন পেরিয়ে—সব কিছু বলার দরকার নেই, কোন্‌দিকে গেলাম তা-ও বলব না—আমরা গিয়ে পৌঁছলাম এমন এক জায়গায় যেখানে হতভাগ্য মেপল হোয়াইট ছাড়া কেউ কোনদিন যায়নি। এইটা দেখো।

একটা হাফ প্লেট ছবি আমাকে এগিয়ে দিলেন প্রফেসর।

ছবিটা অপরিষ্কার হওয়ার কারণ ফেরার পথে নৌকা উল্টে ফিল্ম প্লেটের কেসটা ভেঙে গিয়েছিল। প্রায় সব ছবিই নষ্ট হয়ে গেছে। এই একটাই কিছুটা এসেছে। কেউ কেউ বলেছে এটা নাকি জাল ছবি—সে নিয়ে তর্ক করার মত মনের অবস্থা এখন আমার নেই।

ছবিটা সত্যিই ঝাপসা। কোন নির্দয় সমালোচক যদি এই ছবিকে জাল বলে থাকেন তবে খুব একটা দোষ দেয়া যায় না তাকে। অনেকক্ষণ মনোযোগ দিয়ে ছবিটা দেখে বুঝলাম, স্কেচে যে ছবি দেখেছি এটাও সেই একই জায়গার।

মনে হচ্ছে শিল্পীর আঁকা জায়গারই ছবি এটা, বিস্ময়ে অবাক হয়ে বললাম আমি।

ঠিকই ধরেছ তুমি, বললেন প্রফেসর। মেপলের তাঁবুর বেশ কিছু চিহ্ন আমি দেখেছি পথে। এই ছবিটা দেখো এবার।

আর একটা ছবি দিলেন তিনি আমার হাতে। একই ছবি—আরও কাছে থেকে তোলা। পিরামিডের মত পাথরটা আর তার উপরের গাছটা স্পষ্ট চিনতে পারলাম আমি।

উৎসাহের সঙ্গে বললাম, আর কোন সন্দেহ নেই আমার।

যাক, তবু কিছু অগ্রগতি হয়েছে। ছবির উপরের দিকটা দেখো। কিছু দেখতে পাচ্ছ?

একটা বিরাট গাছ।

আর গাছের উপর?

একটা বিশাল পাখি।

একটা লেন্স আমার দিকে এগিয়ে দিলেন প্রফেসর।

হ্যাঁ, একটা বিরাট পাখি বসে আছে ওই ডালে। মস্তবড় ঠোঁট। মনে হয় একটা বড় পেলিকান।

তোমার চোখ খারাপ, ওটা পেলিকানও নয়, কোন পাখিও নয়। গুলি করে মেরেছিলাম আমি ওকে। তার ওই একটি মাত্র প্রমাণই সঙ্গে করে আনতে পেরেছিলাম।

ওটা আছে আপনার কাছে? উৎসাহিত হয়ে জানতে চাইলাম আমি। যাক শেষ পর্যন্ত অন্তত একটা প্রমাণ পাওয়া যাবে।

ছিল, এখন নেই। দুঃখের সাথে বললেন প্রফেসর। ওই যে নৌকাডুবির কথা বলেছি, তাতে ওটাও হারিয়েছি আমি। কেবল পাখার কিছু অংশ রয়ে গেছিল আমার হাতে। এই যে, এটুকুই শুধু প্রমাণ। বলে প্রফেসর ড্রয়ার থেকে পাখার টুকরা অংশটা বের করে আমার সামনে বিছিয়ে দিলেন। প্রায় দুই ফুট লম্বা, বাদুড়ের পাখার মত।

এত্তো বড় বাদুড়! বলে উঠলাম আমি।

বাদুড়ও নয়—কোন পাখিও নয়; কি ওটা? জিজ্ঞেস করলেন প্রফেসর।

আমার বিদ্যার দৌড় শেষ। তাই সহজ ভাবে স্বীকার করলাম, জানি না।

বইটা আবার হাতে তুলে নিলেন তিনি, পাতা উল্টে একটা ছবির দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। এই যে, বলে বিশাল বড় এক বিদঘুটে উড়ন্ত সরীসৃপ দানবের ছবি দেখালেন প্রফেসর। এটা জুরাসিক যুগের ডাইমরফোড়ন বা টেরাড্যাকটিলের একটা চমৎকার ছবি। পরের পাতায় ডানার গড়নের ছবি আছে। নমুনাটা তার সাথে মিলিয়ে দেখো।

মিলিয়ে দেখতে গিয়ে আমার সারা দেহ উত্তেজনায় শির শির করে উঠল। হুবহু মিলে যাচ্ছে সব। না, আর কোন সন্দেহই নেই আমার। আন্তরিকতার সাথেই তা জানালাম আমি প্রফেসর চ্যালেঞ্জারকে। চেয়ারে আরাম করে হেলান দিয়ে স্মিত হাস্যে উপভোগ করলেন তিনি নিজের সাফল্য।

এত বিশাল কোন প্রাণীর কথা আমি কোনদিন শুনিনি। আপনি বিজ্ঞান জগতের কলম্বাস। এক হারানো পৃথিবী খুঁজে বের করেছেন। প্রথমে অবিশ্বাস করেছিলাম বলে ক্ষমা চাইছি। আমি সাংবাদিক মানুষ, সঠিক প্রমাণ দেখলে চিনতে আমার ভুল হয় না, যে কেউ এই প্রমাণে সন্তষ্ট হতে বাধ্য।

তৃপ্তির সাথে আর একটা চুরুট ধরালেন প্রফেসর।

কি করলেন আপনি তারপর?

তখন বর্ষাকাল, আমার রসদ প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। পাহাড়ের কিছু অংশ ঘুরে দেখলাম—কিন্তু উপরে ওঠার কোন পথ খুঁজে পেলাম না।

আর কোন প্রাণী দেখেছিলেন?

না, দেখিনি—তবে মালভূমির উপর থেকে বিভিন্ন রকমের বিকট আওয়াজ শুনেছি।

কিন্তু মেপলের আঁকা ছবিটা? ওটা তিনি কিভাবে আঁকলেন?

মনে হয় উপরে ওঠার কোন পথ খুঁজে পেয়েছিলেন। সেখানে হয়তো ওই বিকট জন্তুর দেখা পান তিনি। ওঠানামা যদি খুব শক্ত কাজ না হত তাহলে ওই জন্তুগুলো নেমে এসে আশে পাশের জায়গা চষে বেড়াত।

ওরা উপরে গেল কিভাবে?

এই প্রশ্নের কেবল একটাই সমাধান হতে পারে। আর সেটা কঠিন কিছু নয়। জানো নিশ্চয়ই, দক্ষিণ আমেরিকাকে গ্র্যানিট মহাদেশ বলা হয়। অনেক আগে কোন এক সময়ে আগ্নেয়গিরির উর্ধ্ব চাপে এর জন্ম। লক্ষ করেছ নিশ্চয়ই পাহাড়ের পাথরগুলো বেসল্ট…অর্থাৎ আগ্নেয় শিলা। পুরো জায়গাটা প্রায় ইংল্যান্ডের সাসেক্সএর সমান একটা চাকা, চাপের মুখে প্রাণী সহ উপরের দিকে উঠে গেছে।

অকাট্য প্রমাণ আছে আপনার হাতে, কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিন, ওরা লুফে নেবে।

সরল মনে আমিও তাই ভেবেছিলাম, তিক্ত কণ্ঠে বললেন প্রফেসর। কিন্তু প্রতি পদে অবিশ্বাস, ঈর্ষা আর নিরেট বুদ্ধির লোকগুলোর কাছ থেকে কেবলই বাধা পেয়েছি আমি; সহযোগিতা পাইনি।

কিন্তু তাই বলে এত বড় একটা আবিষ্কার আপনি গোপনে রাখতে পারেন না!

আমার কথা যারা অবিশ্বাস করে তাদের কাছে নাকিকান্না কাঁদতে যাওয়া আমার স্বভাব বিরুদ্ধ। ওদের ব্যবহারে আমার ঘেন্না ধরে গেছে, তাই এমন অকাট্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও আমি চুপ করে রয়েছি। এই কারণেই সাংবাদিকরা জ্বালাতন করতে এলে আমি নিজেকে ঠিক সামলে রাখতে পারি না।

নীরবে চোখের ওপর হাত বুলালাম আমি। রীতিমত টনটন করছে।

আমার স্ত্রী আমার ব্যবহারে বারবার আপত্তি জানিয়েছেন, কিন্তু আমার বিশ্বাস, আমি যা করেছি, যেকোন আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন মানুষই তাই করতেন।

আপনার মনোভাব আমি বুঝতে পেরেছি। একটা কার্ড বের করে আমার হাতে দিলেন প্রফেসর।

আজ রাতে আমি তোমাকে প্রদর্শনীতে আসার দাওয়াত করছি। মিস্টার পারসিভ্যাল ওয়ান, একজন প্রাণীতত্ত্ববিদ পন্ডিত, রাত সাড়ে আটটায় যুগ এবং কালের ইতিহাস সম্বন্ধে বক্তৃতা দেবেন। সেখানে এই বিষয়ে যাতে আলোচনা হয় তার আপ্রাণ চেষ্টা করব আমি।

আমি অবশ্যই আসব।

তুমি এলে খুশি হব আমি; অন্তত এটুকু সান্ত্বনা থাকবে যে, দর্শকমন্ডলীতে আমার একজন মিত্র আছে। তবে মনে থাকে যেন এই বিষয়ে এক অক্ষরও ছাপানো চলবে না।

কিন্তু আমাদের বার্তা সম্পাদক মিস্টার ম্যাকারডল তো জানতে চাইবেন, কি জানলাম আমি, আমতা আমতা করে বললাম আমি।

তাকে যা খুশি বলতে পারো তুমি। কিন্তু আর কাউকে যদি আমাকে বিরক্ত করতে পাঠায় তবে ঘোড়ার চাবুক নিয়ে হাজির হব তার অফিসে।…তোমাকে যতটুকু সময় বরাদ্দ করেছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি দিয়ে ফেলেছি। আমার সময় পৃথিবীর সবার জন্যে—কারও একার জন্যে নয়। সাড়ে আটটায় দেখা হবে।

হাত মিলিয়ে আমাকে বিদায় দিলেন প্রফেসর চ্যালেঞ্জার।

০৪. চ্যালেঞ্জারের সাথে দেখা করতে এসে

চ্যালেঞ্জারের সাথে দেখা করতে এসে প্রথমে শারিরীক ও পরে মানসিক নির্যাতন আমার সাংবাদিকসুলভ মনের জোর ভেঙে দিয়েছে। মাথা ব্যথা করছে—সেই সাথে একটা চিন্তা ক্রমাগত মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে: প্রফেসরের কাহিনীটা সত্যিই বাস্তব!

একটা ট্যাক্সি নিয়ে সোজা অফিসে গেলাম। দেখি ম্যাকারডল রোজকার মতই তার জায়গায় বসে আছেন।

কি খবর, জিজ্ঞেস করলেন তিনি, চেহারা দেখে মনে হচ্ছে যুদ্ধ করে ফিরলেন; ব্যাটা প্রফেসর মারধোর করেনি তো?

একটু মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল প্রথমে।

লোক বটে একটা! তা আপনি কি করলেন?

পরে ভাল ব্যবহার করেছেন, গল্প করেছি আমরা। কিন্তু ছাপাবার মত কিছুই বের করতে পারিনি আমি।

একেবারে কিছুই পাননি তা বলব না আমি, মেরে তো দেখি চোখে কালশিরা ফেলে দিয়েছে; এটা অবশ্যই ছাপার মত খবর। মিস্টার ম্যালোন, এই ভাবে স্বেচ্ছাচারিতা চলতে দেয়া যায় না। ঘটনার বর্ণনা দিন, আমি এমন হেডিং দেব যে পড়ে প্রফেসরের গায়ে ফোস্কা পড়ে যাবে। প্রফেসর মাক্ষুসেন!-কেমন হয় এই শিরোনাম? স্যার জন ম্যানডোভল-ক্যাগলিওস্ত্রো—সব ঠগ আর রংবাজের ইতিহাস। কলমের বিষে জ্বলবে সে।

দয়া করে লিখবেন না, স্যার।

কেন?

কারণ আমার বিশ্বাস উনি জোচ্চোর নন।

কি! চিৎকার করে উঠলেন ম্যাকারডল, তারমানে আপনি তার সেই বিকট জীবজন্তুর গল্প সব বিশ্বাস করেন?

খুব বেশি কিছু পেয়েছেন বলে দাবি করেননি উনি, তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস নতুন একটা কিছু আবিষ্কার করেছেন প্রফেসর।

তাহলে আর দেরি করছেন কেন, লিখে ফেলুন।

লিখতে পারলে খুশি হতাম কিন্তু আমার কাছে যা বলেছেন প্রফেসর তা আমাকে বিশ্বাস করেই বলেছেন। শর্ত আছে, তার অনুমতি ছাড়া এক লাইনও লেখা চলবে না। আর আজ রাতে একটা অনুষ্ঠানে দাওয়াত করেছেন, ওখানে তিনি বিষয়টি উত্থাপন করবেন।

গভীর অবিশ্বাস ফুটে উঠল ম্যাকারডলের চেহারায়।

ঠিক আছে, মিস্টার ম্যালোন, আজ রাতের অনুষ্ঠান তো গোপনীয় নয়। অন্য কাগজ হয়ত কোন রিপোর্টার পাঠাবে না, কারণ ইতিমধ্যেই ওয়াল্ড্রনের ওপর বেশ কয়েকটা রিপোর্ট হয়েছে। কেউ জানবে না যে চ্যালেঞ্জারও বক্তৃতা দেবেন। কপাল ভাল থাকলে ভাল একটা একচেটিয়া খবর পাওয়া যেতে পারে। রাত বারোটা পর্যন্ত প্রথম পৃষ্ঠায় জায়গা রাখব আমি আপনার জন্যে।

বেশ ব্যস্তভাবেই দিনটা কাটল আমার। একটু সকাল সকালই টারপ হেনরির সাথে রাতের খাবার সেরে নিলাম। সকাল বেলার ঘটনার কিছুটা বর্ণনা দিলাম আমি ওকে। অবিশ্বাসের হাসি হাসতে হাসতে পুরোটা শুনল সে। তারপর হাসির দমকে ফেটে পড়ল, আমি প্রফেসরের কাহিনী বিশ্বাস করেছি বলে এই হাসি।

বন্ধু মেলোন, বাস্তবে এমন ঘটে না। বিরাট কিছু আবিষ্কার করার পর কেউ ওভাবে প্রমাণ হারিয়ে ফেলেন না। ওটা কেবল ঔপন্যাসিকদের পক্ষেই সম্ভব। লোকটা চিড়িয়াখানার বানরের মতই ছল চাতুরীতে ভরা; কাহিনীর পুরোটাই বানোয়াট।

আমেরিকান শিল্পী—সেটাও কি গল্প?

সেটাও গল্প, মেপল হোয়াইট বলে কেউ নেই, কোনদিন ছিল না।

আমি তার স্কেচ বই দেখেছি।

বলো, চ্যালেঞ্জারের স্কেচ বই।

তুমি বলতে চাও চ্যালেঞ্জারই এঁকেছেন ওই ছবি?

অবশ্যই—আর কে আঁকবেন?

আর ফটোগুলো?

তুমি তো নিজেই বলেছ, একটা পাখি ছাড়া ছবিতে আর কিছুই ছিল না।

পাখি নয়, টেরাড্যাকটিল।

ওটা প্রফেসরের কথা—তোমার মাথায় টেরাড্যাকটিল ঢুকিয়ে দিয়েছেন তিনি।

হাড়গুলো সম্বন্ধে কি বলবে তুমি?

প্রথম হাড়টা আইরিশ ঝোল-মাংস থেকে নেয়া; আর দ্বিতীয়টা-যে কোন চালাক লোকের পক্ষেই ছবি আর হাড় দুটো নকল করা সহজ।

মীটিং-এ যাবে তুমি? আমি জিজ্ঞেস করলাম।

চিন্তিত দেখাল টারপকে।

মোটেই জনপ্রিয় লোক নন এই চ্যালেঞ্জার। অনেকেরই রাগ আছে তাঁর উপর। ডাক্তারির ছাত্ররা ওখানে উপস্থিত থাকলে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হবে। এর মধ্যে যেতে চাই না আমি।

অন্তত তাঁর বক্তব্যটুকু বলার সুযোগ প্রফেসরকে দেয়া উচিত।

এমন করে বলছ যখন—ঠিক আছে, সন্ধ্যায় আমিও যাব তোমার সঙ্গে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হলো টারপ।

পৌঁছে দেখলাম যা আশা করেছিলাম তার চেয়ে অনেক বড় একটি হল। ইলেকট্রিক গাড়ি থেকে সাদা দাড়িওয়ালা প্রফেসররা একে একে নামলেন। উপস্থিত ব্যক্তিদের দেখেই বোঝা যায়, তারা সবাই বিজ্ঞানের লোক এবং সবাই ভাল শ্রোতা। বসেই বুঝতে পারলাম গ্যালারি আর হলের পিছন দিকে একদল মেডিক্যাল ছাত্র বসেছে। সম্ভবত বড় বড় সব হাসপাতাল থেকে রীতি অনুযায়ী প্রতিনিধি এসেছে। বেশ হালকা একটা পরিবেশ ছাত্রদের মাঝে। কয়েকজন আবার জনপ্রিয় গান ধরেছে কোরাসে।

বৃদ্ধ ডক্টর মেলড্রাম তার সুপরিচিত ঢেউ খেলানো অপেরা হাট পরে স্টেজে এলেন। অমনি ছেলেদের মধ্যে রব উঠল, চটকদার টুপিখানা পেলেন কোথায়? তক্ষুণি চট করে টুপিটা খুলে চেয়ারের তলায় লুকিয়ে রাখলেন তিনি।

বেতো রোগী প্রফেসর ওয়াডলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এসে নিজের আসন গ্রহণ করতে যাবেন—তক্ষুণি সবাই দরদী স্বরে তার পায়ের অবস্থায় উৎকণ্ঠা প্রকাশ করতে শুরু করল। অপ্রস্তুত হয়ে বসে পড়লেন ওয়াডলে।

সাড়ম্বরে প্রবেশ করলেন আমার সদ্য পরিচিত প্রফেসর চ্যালেঞ্জার। তাঁর কালো দাড়ি দেখার সাথে সাথেই হলের পিছন দিক থেকে ছেলেরা এমন চিৎকার করে সংবর্ধনা জানাল যে টারপ্ যে তাকে লন্ডনের সবচেয়ে অপ্রিয় ব্যক্তি মনে করে ভুল করেনি, সেটা প্রমাণিত হয়ে গেল।

সামনের দিকে নিখুঁত পোশাক পরা কয়েকজন ভদ্রলোকের কাছ থেকে সমবেদনার হাসি শোনা গেল। ছাত্রদের সংবর্ধনা তাদের অপছন্দ হয়নি। হিংস্র পশুর খাঁচায় বালতি করে খাবার দিতে গেলে যেমন হুঙ্কার ওঠে, ছাত্রদের ওই চিকারকে একমাত্র তার সাথেই তুলনা করা যেতে পারে, অর্থাৎ রীতিমত বিকট। চ্যালেঞ্জার বিরক্তির হাসি হেসে দর্শকদের দেখতে দেখতে দাড়িতে হাত বুলাতে লাগলেন। ভাবটা এমন যেন কতগুলো জন্তু জানোয়ার দেখছেন তিনি। হৈ চৈ কমে আসতেই চেয়ারম্যান প্রফেসর রোনাল্ড মারে আর মিস্টার ওয়ার্ল্ডন এগিয়ে গেলেন সামনের দিকে; অনুষ্ঠান শুরু হলো।

চেয়ারম্যানের পরে আরম্ভ করলেন ওয়াল্টন, প্রফেসর মারের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলছি, বেশিরভাগ ইংরেজের যা দোষ তা তার মধ্যেও রয়েছে, অর্থাৎ এত আস্তে কথা বলেন যে শোনাই যায় না। যে সব মানুষের কোন বক্তব্য আছে তারা যে কেন একটু কষ্ট না করে নিজেদের কথা শ্রুতিগোচর হওয়ার প্রতি উদাসীন তা বর্তমান দুনিয়ার এক আশ্চর্য রহস্য।

শক্ত বেতো মানুষ ওয়ান্ড্রন! কণ্ঠ আর স্বভাব দুটোই একটু উগ্র ধরনের। কিন্তু একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে তাঁর। অন্যের কথা থেকে বাছা বাছা অংশগুলো নিয়ে নিজের ভাষায় সুন্দর করে সাজিয়ে বলতে পারেন তিনি। নীরস বিষয়ও উপভোগ্য হয়ে ওঠে কেবল তার বলার ভঙ্গিতে।

তিনি সংক্ষেপে, এমন ভাষায় তাঁর বক্তব্য আমাদের সামনে তুলে ধরলেন যে, চোখের সামনে যেন জীবন্ত ছবি ভেসে উঠল। পৃথিবী কেমন ছিল, ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে কুঁচকে গিয়ে কেমন করে পাহাড় পর্বতের সৃষ্টি হলো, কেমন করে বাস্প পানি হলো। কিন্তু প্রাণীর জন্ম ঠিক কিভাবে হলো তা এড়িয়ে গেলেন কৌশলে। বললেন, যেহেতু সৃষ্টির শুরুর প্রাথমিক পর্যায়ের প্রচন্ড গরমে কোন প্রাণীরই জীবন্ত থাকা সম্ভব ছিল না, অতএব ধরে নেয়া যায় যে তারা পরে এসেছে। তবে কি প্রাণের জন্ম হয়েছে পৃথিবী ঠান্ডা হবার সময়েই-অজৈব পদার্থ থেকে? খুবই সম্ভব। বাইরে থেকে উল্কায় চড়ে প্রাণী পৃথিবীতে এসেছে—এটা অচিন্তনীয়। এটাও আবার ঠিক যে ল্যাবরেটরিতে আজ পর্যন্ত আমরা অজৈব পদার্থ থেকে প্রাণ সঞ্চার করতে পারিনি। তবে তখনকার রসায়ন আর পরিবেশ ভিন্ন ছিল—সেই পরিবেশ আর নেই বলেই হয়তো আমরা এখনও জীবন তৈরি করতে পারিনি।

বলে চললেন বক্তা। কিভাবে জীবনের ক্রম বিকাশ হয়েছে, প্রথমে অতি ক্ষুদ্র প্রাণী ছিল, তারপর আরও এগিয়ে সরীসৃপ, মাছ থেকে ক্যাঙ্গারু, ইঁদুর। এই প্রাণীই প্রথম জীবন্ত সন্তান প্রসব করে, অর্থাৎ সব জীবন্ত প্রসবকারী প্রাণীর আদি। এখান যারা উপস্থিত আছেন তাদেরও আদি পিতামাতা সে-ই।

হলের পিছন থেকে একজন ছাত্র চিৎকার করে উঠল, মানি না! মানি না!

সেদিকে ভাল করে খেয়াল করে বললেন, লাল টাই পরা যে ভদ্রলোক ডিম ফুটে বেরিয়েছেন বলে দাবি করেছেন, তাঁকে বলছি-দয়া করে বক্তৃতা শেষ হবার পর আমার জন্যে একটু অপেক্ষা করলে আমি খুবই বাধিত হব। এমন একটি আশ্চর্য প্রাণী দেখার সুযোগ জীবনে হয়তো আর হবে না আমার। (হেসে উঠল সবাই)। ভাবতে অবাক লাগে যে প্রকৃতির আশ্চর্য ব্যতিক্রমে জন্ম হয়েছে ওই লাল টাই পরা ভদ্রলোকের।

এই ভাবে সবার মুখ টিপে হাসাহাসির মধ্যে দিয়ে সুকৌশলে লাল টাই পরা ছেলেটিকে জব্দ করে নিজের বক্তব্যে ফিরে গেলেন বক্তা। সমুদ্র শুকিয়ে যাওয়া, চর জেগে উঠা, কাদার মধ্যে বাস করা প্রাণী—লেগুনে প্রাণীর প্রাচুর্য, সামুদ্রিক প্রাণীর প্রচুর খাদ্যের লোভে কাদায় উঠে আসা। ফলে সামুদ্রিক প্রাণীগুলোর বৃহদাকার হয়ে ওঠা। কিন্তু আমাদের সৌভাগ্য যে, সেই সব বিরাটকায় প্রাণী—যাদের ফসিল উইলডন বা সোলেনহফেন প্লেটের মধ্যে দেখে এখনও আমাদের কলজে শুকিয়ে যায়—তারা মানুষ জন্ম নেয়ার আগেই পৃথিবীর বুক থেকে বিলীন হয়ে গেছে।

মানি না! মঞ্চ থেকে একটা স্বর হুঙ্কার ছাড়ল।

লাল টাই পরা ছেলেটার বেলাতেই দেখা গেছে যে বাধা পেলে কেমন রূঢ় ভাষায় পর্যুদস্ত করতে পারেন মিস্টার ওয়ার্ল্ডন। কিন্তু এবার এমন অস্বাভাবিক জায়গায় বাধা পেয়েছেন যে হঠাৎ করে বলার কিছুই খুঁজে পেলেন না তিনি। তারপর গলা চড়িয়ে ধীরে ধীরে নিজের কথার পুনরাবৃত্তি করলেন, মানুষ পৃথিবীতে আসার আগেই তারা নিশ্চিহ্ন হয়েছে পৃথিবীর বুক থেকে।

জবাব চাই! আবার সেই কণ্ঠ শোনা গেল মঞ্চ থেকে।

ওয়াল্টন মঞ্চে বসা প্রফেসরগণের উপর চোখ বুলালেন। চ্যালেঞ্জারের উপর দৃষ্টি পড়তেই চোখ আটকে গেল তার। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আধবোজা চোখে মিটিমিটি হাসছেন প্রফেসর। আচ্ছা, বললেন ওয়ার্ল্ডন, তাহলে আমার বন্ধু প্রফেসর চ্যালেঞ্জার! বলে কাঁধ ঝাঁকিয়ে আবার নিজের বক্তব্যে ফিরে গেলেন তিনি। যেন চ্যালেঞ্জারের বাধা দেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এর বেশি কিছু বলার বা গুরুত্ব দেয়ার দরকার নেই।

কিন্তু যতবারই নতুন করে আরম্ভ করেন তিনি প্রতিবারেই হুঙ্কার আসে, জবাব চাই! সেই একই গলা। কয়েকবার চেষ্টা করেও এগুতে পারলেন না বক্তা। এবার ছাত্ররাও যোগ দিল চ্যালেঞ্জারের সাথে। প্রফেসরের দাড়ি একটু নড়ে উঠলেই তার মুখ থেকে কোন শব্দ বের হবার আগেই ছেলেরা গর্জন করে ওঠে, জবাব চাই! এমন কঠিন পরিস্থিতিতে এর আগে আর কোনদিন পড়েননি তিনি।

অর্ডার! শেম! ইত্যাদি চিৎকারের মধ্যে ওয়ার্ল্ডন প্রফেসরের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। এটা সত্যিই অসহ্য। তাঁর চোখের দৃষ্টিতে আগুন ঝরছে। আপনি এমন অজ্ঞ আর অভদ্রের মত বারবার বাধা না দিলে ভাল করবেন।

হলের সব শ্রোতা উত্তেজনা নিয়ে নীরবে বসে আছে। ছাত্রেরা কৌতুকের সাথে স্টেজের ওপর প্রফেসরদের ঝগড়া উপভোগ করছে। প্রফেসর হাতলের উপর ভর দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।

মিস্টার ওয়ার্ল্ডন, আপনার কথার উত্তরে আমি আপনাকে বলব যে আপনিও বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে প্রমাণিত নয় এমন সব কথা না বললেই ভাল করবেন।

ভীষণ হৈ চৈ উঠল চ্যালেঞ্জারের এই মন্তব্যে। শেম! শেম! ওঁকেও বলতে দিন, বের করে দিন ওকে, মঞ্চ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিন, আমরা শুনব ওঁর বক্তব্য, ইত্যাদি নানারকম চিৎকার উঠল শ্রোতাদের মধ্য থেকে।

সভাপতি উত্তেজিতভাবে দুহাত নাড়তে নাড়তে উঠে দাঁড়ালেন। চিৎকার করে বললেন, প্রফেসর চ্যালেঞ্জার, এটা তার নিজস্ব মতামত, পরে আলোচনা হবে।

কুর্নিশ করে চ্যালেঞ্জার নিজের চেয়ারে বসে পড়লেন; বক্তা বক্তৃতার মাঝে মাঝে বারবার রক্ত দৃষ্টিতে চাইতে লাগলেন চ্যালেঞ্জারের দিকে। কিন্তু প্রফেসরের চেহারার কোন পরিবর্তন নেই—একই রকম হাসি মাখা মুখ নিয়ে বসে আছেন নিজের আসনে।

বক্তৃতা শেষ হলো; একটু যেন তাড়াহুড়ো করেই বক্তা হঠাৎ তার বক্তৃতা শেষ করলেন বলে মনে হলো।

সভাপতির অনুরোধে আবার উঠে দাঁড়ালেন প্রফেসর, ভদ্রমহিলা এবং ভদ্র মহোদয়গণ, আরম্ভ করলেন তিনি। পিছন থেকে একটা গুঞ্জন উঠল। মাফ করবেন, ভদ্র মহিলা, ভদ্রমহোদয় এবং তরুণমন্ডলী, আবার ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি— অনিচ্ছাকৃতভাবে দর্শক মন্ডলীর একটা বিরাট অংশের কথা আমি উল্লেখ করতে ভুলে গিয়েছিলাম। শোরগোল আরম্ভ হলো, বিরাট মাথাটা উপরে নিচে ঝাকাতে ঝাকাতে এক হাত তুলে সমঝদারের মত দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি, যেন সবাইকে তার ধৈর্যশীল আর্শীবাদ জানাচ্ছেন।

হট্টগোল থামতেই প্রফেসর আবার আরম্ভ করলেন, সবার তরফ থেকে মিস্টার ওয়াল্ড্রনকে তার সুন্দর বর্ণনামূলক ও কল্পনাপ্রবণ বক্তৃতার জন্যে ধন্যবাদ জানানোর জন্যে আমাকে মনোনীত করা হয়েছে। কোন কোন বিষয়ে আমি তার সাথে একমত নই—সেগুলো আপনাদের সামনে তুলে ধরা আমি পবিত্র দায়িত্ব বলে মনে করি। জনপ্রিয় বক্তৃতা শুনতে ভাল লাগে বটে, কিন্তু মিস্টার ওয়াল্ড্রন, প্রাক্তন বক্তার দিকে মিট মিট করে চেয়ে বললেন, আমি জানি আমার সত্য এবং স্পষ্ট উক্তির জন্যে নিশ্চয়ই আমাকে ক্ষমা করবেন আপনি। এসব বক্তৃতা স্বভাবতই ভাসাভাসা হয়ে থাকে, এবং শ্রোতাদেরকে বিপথে চালিত করে। বিশেষত বক্তৃতাটা যখন একেবারে অজ্ঞ লোকেদের সামনে দেয়া হচ্ছে।

শ্লেষপূর্ণ হর্ষধ্বনি উঠল শ্রোতাদের মাঝ থেকে।

জনপ্রিয় বক্তৃতা প্রকৃতিগত ভাবেই পরনির্ভরশীল হয়। ওয়াল্ড্রনের চোখে মুখে যেন রাগ ফেটে পড়তে লাগল।

জনপ্রিয়তার জন্যে তাঁরা অপরিচিত সহকর্মীদের কৃত কর্মের সুফল ভোগ করে থাকেন। কিন্তু যাক সে কথা, এবার আসল কথায় আসি।

লম্বা ভূমিকা শেষ হয়েছে দেখে অনেকক্ষণ হাততালি পড়ল।

একজন মৌলিক অনুসন্ধিৎসু বৈজ্ঞানিক হিসাবেই আমি প্রতিবাদ করেছি। মিস্টার ওয়াল্ড্রন নিজে কোনদিন প্রাগৈতিহাসিক জীবজন্তু দেখেননি বলেই যে সেসবের অস্তিত্ব থাকবে না এটা ধরে নেয়া তাঁর খুবই ভুল হবে। সন্ধানের মত সন্ধান করলে আজও তাদের দেখা পাওয়া যাবে।

নানারকম চিৎকার উঠল দর্শকদের মাঝে। গাঁজা, প্রমাণ চাই!, আপনি কি করে জানলেন! ইত্যাদি।

আমি কেমন করে জানি? আমি জানি কারণ আমি তাদের গোপন বিচরণ ভূমিতে গিয়ে নিজের চোখে দেখে এসেছি।

হাত তালি আর কোলাহলের মাঝে একটা চড়া গলা শোনা গেল, মিথ্যাবাদী।

মিথ্যাবাদী? কেউ কি আমাকে মিথ্যাবাদী বলেছেন? একবার উঠে দাঁড়াবেন কি তিনি?

ছাত্রদের মাঝে একজন চশমা পরা নিরীহ গোছের ছোটখাট মানুষকে ধস্তাধস্তি করতে দেখা গেল। ছাত্রেরা জোর করেই তাকে দাঁড় করিয়ে দিল, এই লোকই আপনাকে মিথ্যাবাদী বলেছে, স্যার।

ঠিক আছে, মীটিং এর পরে নিষ্পত্তি হবে।

আবার শোনা গেল চিৎকার, মিথ্যাবাদী!

কে? কে বলছে ও কথা? জানতে চাইলেন চ্যালেঞ্জার।

আবারও ছাত্রেরা সেই নিরীহ লোকটাকে তুলে ধরল। ফাজলামি হচ্ছে? আমি যদি নেমে আসি…

আসুন না, ভাই, আসুন। চিৎকার উঠল ওদের মাঝে, বেশ কিছুক্ষণ হট্টগোল চলল। সভাপতি উঠে দাঁড়িয়ে সঙ্গীত পরিচালকের মত দুহাত নেড়ে কোন মতে শান্ত করলেন সবাইকে।

সব বড় আবিষ্কারই প্রথমে প্রচন্ড বাধার সম্মুখীন হয়েছে। খ্যাপার মত বললেন প্রফেসর। অসাধারণ সত্য আপনাদের সামনে তুলে ধরা হলেও সত্য মিথ্যা বিচার করার মত সত্তা আপনাদের নেই। যে মানুষ নিজের জীবন বিপন্ন করে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নতুন আবিষ্কার করলেন, আপনারা কেবল তার দিকে কাদা ছুঁড়তেই জানেন। গ্যালিলিও, ডারউইন, আমি…

এবারে প্রচন্ড হর্ষধ্বনি হেতু থামতে বাধ্য হলেন প্রফেসর। এমনই বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হলো যে কয়েকজন মহিলা বাধ্য হয়ে উঠে চলে গেলেন। বড়রাও যোগ দিল ছাত্রদের সাথে। সাদা দাড়িওয়ালা একজন উঠে দাঁড়িয়ে মুঠি ঝাকালেন প্রফেসরের দিকে, শ্রোতাগণ উত্তেজনায় একেবারে ফুটন্ত পানির মত টগবগ করতে লাগল।

এক পা সামনে এগিয়ে দুহাত তুলে দাঁড়ালেন প্রফেসর। তার ভঙ্গিতে এমন একটা ব্যক্তিত্ব রয়েছে যে গোলমাল কমে এল। প্রফেসরের কোন একটা বিশেষ বক্তব্য আছে বলেই মনে হলো। সেটা কি শোনার জন্যে চুপ করল সবাই।

আপনাদের বেশিক্ষণ আটকে রাখব না আমি। একদল বোকা ছেলে আর বুড়ো যত চিৎকারই করুক না কেন তাতে আমার কিছু আসে যায় না। আমি বিজ্ঞানের একটা নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছি। অথচ আপনারা মানতে রাজি নন—বেশ ঠিক আছে, আপনাদের মধ্য থেকেই একজন বা দুজন লোক দিন, তারা আপনাদের পক্ষ থেকে আমার বিবৃতির সততা নির্ধারণ করে আসবেন?

তুলনামূলক শরীর তত্ত্বের প্রবীণ অধ্যাপক মিস্টার সামারলী দর্শকমন্ডলীর মাঝ থেকে উঠে দাঁড়ালেন। লম্বা, ছিপছিপে, আর কঠিন প্রকৃতির মানুষ।

আপনি কি দুবছর আগে আমাজনের ধারে আপনার আবিষ্কারের পরিপ্রেক্ষিতেই বলছেন একথা? তীক্ষ্ণ কণ্ঠে জানতে চাইলেন সামারলী।

হ্যা। জবাব দিলেন চ্যালেঞ্জার।

তা কেমন করে হয়? তাহলে আপনি বলতে চান যে ওয়ালেস আর বেটস্ এর মত সুবিখ্যাত আর অভিজ্ঞ আবিষ্কারকদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে এত বিশাল একটা জিনিস?

আপনি ভুল করে আমাজনকে টেমস নদী মনে করছেন। আসলে কিন্তু ওই বিশাল এলাকায় যে কোন অভিজ্ঞ আবিষ্কারকেরই বহু কিছু অজানা থেকে যেতে পারে।

ধারালো তিক্ত হাসি হেসে সামারলী বললেন, টেমস্ আর আমাজনের তফাত আমার ভাল করেই জানা আছে। কিন্তু ঠিক কোথায় গেলে এসব প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর দেখা পাওয়া যাবে, সেই অবস্থানটা আমাদের বলবেন কি?

অবস্থান গোপন রাখার যথেষ্ট কারণ আছে আমার। তবে এ বিষয়ে একটা কমিটি গঠন করা হলে সময় মত সেটা জানাতে আমার আপত্তি নেই। আপনি কি সেই কমিটির পক্ষ থেকে আমার বক্তব্যের সততা পরীক্ষা করে দেখতে রাজি আছেন?

সামারলী বললেন, হ্যাঁ, আমি রাজি আছি। সবাই চিৎকার করে উল্লাস প্রকাশ করল।

আমি কথা দিচ্ছি কেমন করে ওখানে পৌছতে হবে তা আপনাকে নিশ্চয়ই জানাব। তবে মিস্টার সামারলী যখন আমার কথার সততা পরীক্ষা করতে যাচ্ছেন তখন আমি তার সাথে আরও একজন সাক্ষী থাকা উচিত বলে মনে করি। দর্শকমন্ডলীর মাঝে এমন কোন স্বেচ্ছাসেবক আছেন কি?

এভাবেই মানুষের জীবনের মহাসঙ্কট ঘনিয়ে আসে। গ্লাডিস না এই রকম একটা কিছুর কথাই বলছিল? সে নিশ্চয়ই চাইতো যে আমি যাই। লাফিয়ে দাঁড়িয়ে উঠলাম। কথা তৈরি নেই তবু বলতে শুরু করলাম। টারপ হেনরি আমার কোটের ঝুল ধরে টানতে লাগল। ফিসফিস করে বলল, বসে পড়ো, ম্যালোন—বোকামি কোরো না।

আমার কয়েক সারি সামনের আরও একজন উঠে দাঁড়ালেন। ছিপছিপে লম্বা গড়ন-লালচে চুল। ওঁকে পাত্তা দিলাম না বলে আমার দিকে রক্ত চোখে চেয়ে রইলেন। আমি চিৎকার করে বললাম, আমি যাব, মাননীয় সভাপতি সাহেব।

দর্শকের মধ্য থেকে রব উঠল, নাম কি?

এডওয়ার্ড ডুন ম্যালোন। আমি দৈনিক গেজেটের লোক, সুতরাং নিঃসন্দেহে আমি নিরপেক্ষ সাক্ষী হব।

আপনার নাম, জনাব? সভাপতি আমার প্রতিদ্বন্দ্বীকে জিজ্ঞেস করলেন।

আমি লর্ড জন রক্সটন। আমাজনে আমার পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে। আর এই বনের অভিযানে আমার দক্ষতাও আছে।

শিকারী, খ্যাতনামা পর্যটক আর খেলোয়াড় বলে আপনার নাম জগৎ বিখ্যাত, বললেন সভাপতি। অন্যদিকে আবার প্রেসের কেউ এই অভিযানে থাকলেও ভালই হয়।

আমি প্রস্তাব দিচ্ছি এঁদের দুজনকেই এই সভার পক্ষ থেকে প্রফেসর সামারলীর সাথে যেতে দেয়া হোক। তারা আমার বক্তব্যের সততা সম্বন্ধে রিপোর্ট পেশ করবেন। সভা শেষ হলো; চ্যালেঞ্জারের প্রস্তাব মেনে নেয়া হলো।

এভাবেই আমাদের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেল। জনতার স্রোতে দরজার দিকে ভেসে চললাম আমি। রিজেন্ট স্ট্রীট ধরে এগিয়ে চললাম—পায়ে হেঁটে। হঠাৎ কনুই-এ কার হাত লাগতে ফিরে তাকালাম। কৌতুকপূর্ণ, সুচতুর দুটো চোখের সাথে চোখাচোখি হলো আমার; একহারা দীর্ঘ ব্যক্তিটি লর্ড জন রক্সটন।

আমরা পরস্পরের সঙ্গী হতে যাচ্ছি, তাই না, মিস্টার ম্যালোন? কাছেই আমার বাসা, আপনার সাথে একটু আলাপ করতে চাই-দয়া করে যদি আধঘণ্টার জন্যে আসেন, বড় খুশি হব।

০৫. লর্ড জন রক্সটন

লর্ড জন রক্সটন আমাকে ভিগো স্ট্রীট দিয়ে নিয়ে গেলেন। একটা অপরিষ্কার প্রবেশ পথ দিয়ে এগিয়ে বিখ্যাত অভিজাত পাড়ায় ঢুকলাম আমরা। মেটে রঙের লম্বা গলির মাথায় একটা দরজা খুলে তিনি বাতি জ্বেলে দিলেন। রঙিন শেডের ভিতর থেকে কয়েকটা বাতি একসাথে জ্বলে উঠল। বিরাট ঘরটা ভরে উঠল গোলাপী ছটায়। অসাধারণ আয়েশ আর মার্জিত রুচির পাশাপাশি ঘরটাতে পৌরুষের ছাপ রয়েছে। রুচিবান, ধনী আর অবিবাহিত যুবকের অগোছালো একটা ভাব সহজেই ধরা পড়ে। দামী নরম পশমী কার্পেট ছাড়াও রামধনু রঙের টুকরো টুকরো কার্পেট ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মেঝেতে সম্ভবত পুবদেশীয় কোন বাজার থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। দেয়ালের ছবিগুলো দেখে আমার আনাড়ি চোখেও ধরা পড়ল যে ওগুলো মূল্যবান, দুর্লভ সংগ্রহ। সারি সারি কাপ, মেডেল আর শীল্ড দেখে বোঝা যায়, খেলাধুলা, দৌড় ঝাপ সবদিকেই দক্ষতা আছে রক্সটনের।

ফায়ার প্লেসের কাছে কারুকাজ করা তাকটার উপরে দেয়ালে ঝুলানো রয়েছে দুটো বৈঠা-গাঢ় নীল একটা বৈঠার উপর আড়াআড়ি ভাবে রাখা আরেকটা গোলাপী রঙের বৈঠা; অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নৌকা বাইচ বিজয়ীর পরিচয় বহন করছে।

দেয়ালে আরও রয়েছে নানা ধরনের বিচিত্র প্রাণীর মাথা, পৃথিবীর কোনো দেশের জীবজন্তুই বাদ নেই; সেগুলোর মধ্যে সাদা গন্ডারের মাথাটাই সবার আগে দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

দুর্লভ পুরনো টেবিলটার সামনে একটা আর্মচেয়ারে আমাকে বসিয়ে দুটো বড় গ্লাসে হুইস্কি আর সোডা ঢেলে একটা গ্লাস আমার সামনে নামিয়ে রেখে নীরবে উল্টোদিকের একটা চেয়ারে বসলেন রক্সটন। একটা সিগার তুলে নিয়ে রূপার চুরুটদানীটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে চকচকে চোখে একদৃষ্টে আমাকে দেখতে লাগলেন। নীল চোখ, অনেকটা বরফগলা সরোবর রঙের।

চুরুটের নীলচে ধোঁয়ার ভিতর দিয়ে ভাল করে দেখলাম তার চেহারা। অবশ্য খবরের কাগজের ছবি থেকে এই মুখ আমার কাছে আগে থেকেই সুপরিচিত। টিয়াপাখির ঠোঁটের মত নাক, বসা গাল, লালচে চুল, পুরুষালী গোঁফ, আর চিবুকের উপর উদ্ধত একগোছা দাড়ি। রোদ আর খোলা বাতাসে গায়ের চামড়া মাটির টবের মত সুন্দর লালচে হয়েছে। শক্ত করে চুরুটটা কামড়ে ধরে অস্বস্তিকর নীরবতার মাঝে তিনি অনেকক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন আমার দিকে। অসহ্য নীরবতা।

শেষ পর্যন্ত নীরবতা ভাঙলেন তিনি। বললেন, আমরা দুজনেই আজ একটা অস্বাভাবিক কাজ হাতে নিলাম, কি বলেন?

অবশ্যই, একটু চিন্তা করে জবাব দিলাম আমি।

আগে থেকে নিশ্চয়ই এমন কোন চিন্তা ছিল না আপনার?

না। হলে যাবার সময়েও ভাবিনি এভাবে জড়িয়ে পড়ব।

আমিও না। কিন্তু কথা হচ্ছে শেষ পর্যন্ত আমরা দুজনেই ফেঁসে গেলাম। মাত্র তিন সপ্তাহ আগে ফিরেছি ইউগান্ডা থেকে, তারপর আবার গিয়েছিলাম স্কটল্যান্ডে একটা চুক্তি সই করতে। বেশ কর্মব্যস্ততা, কি বলেন?

কিন্তু সেটা করেছেন আপনার ব্যবসার খাতিরেই। আমি দৈনিক গেজেটে কাজ করি, এই সবই আমার লাইনের।

অবশ্যই, সেটা আপনি আগেই খুলে বলেছেন। একটা ছোট্ট কাজ আছে আমার, আপনি যদি সাহায্য করেন বাধিত হব।

সাহায্য করতে পারলে অবশ্য আনন্দিতই হব আমি।

ঝুঁকি নিতে রাজি আছেন তো?

কেমন ঝুঁকি?

মানে, আমি ব্যালিঞ্জারের কথা বলছি, ঝুঁকিটা ওঁকে নিয়ে। ব্যালিঞ্জারের কথা। নিশ্চয়ই জানেন আপনি?

না তো?

কোথায় ছিলেন এতদিন? স্যার জন ব্যালিঞ্জারের নাম শোনেননি। উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে ভাল জকি। সমতল মাঠ হলে অবশ্য সব সময়েই তাকে হারাতে পারি আমি, কিন্তু ঘোড়ার হার্ডল রেসে তিনি আমার ওস্তাদ। লুকানো ছাপানোর কিছু নেই, প্রতিযোগিতার সময় ছাড়া রাতদিন তিনি কেবল মদ খান। আর এমনই খাওয়া খান বলেন, গড়পড়তা পুষিয়ে নিচ্ছি! আবোল তাবোল বকতে আরম্ভ করেছেন গত মঙ্গলবার থেকে। ডাক্তার বলেছেন, এই সময়ে কিছু খাবার পেটে না পড়লে বাদবাকি খোদার ইচ্ছা। কিন্তু মুশকিল হয়েছে বিছানায় রিভলভার আছে একটা, সবাইকে সাবধান করে দিয়েছেন, কেউ কাছে যাবার চেষ্টা করা মাত্র গুলি করবেন। খুবই গোঁয়ার লোক, গুলি চালাতে ওস্তাদ। কিন্তু তাই বলে একজন গ্র্যান্ড ন্যাশনাল বিজয়ী জকিকে এভাবে মরতে দেয়া যায় না, কি বলেন?

কি করতে চান আপনি?

ভাবছি আমরা দুজনে যদি একসাথে ছুটে যাই ওঁর দিকে তাহলে আমাদের একজনকে হয়তো গুলি করার সুযোগ পাবেন তিনি, কিন্তু অন্যজন কাবু করতে পারব ওঁকে। তারপর টেলিফোনে পাকস্থলী পাম্পের জন্যে খবর পাঠালে ওরাই বাদবাকি ব্যবস্থা করবে এই ঘরের ঠিক ওপরের ঘরেই আছেন তিনি।

আমি যে খুব একটা সাহসী লোক তা নয়। আমার আইরিশ চিন্তাধারায় অজানা অচেনাকে কতকটা অহেতুক ভাবেই আমি ভয় পাই। কিন্তু পাছে লোকে ভীতু মনে করে সেই ভয়ে, আত্মসম্মান রক্ষার খাতিরে আগুনে ঝাপ দিতেও দ্বিধা করব না আমি। রক্সটনকে বললাম, আমি সাহায্য করতে প্রস্তুত।

লর্ড রক্সটন বিপদের কথা আবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে আরও উস্কে দিলেন আমাকে, কথা বলে সময় নষ্ট করে লাভ নেই, চলুন!

উঠে দাঁড়ালাম আমি। রক্সটনও দাঁড়ালেন।

ঠেলে আমাকে আবার চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে মুচকি হেসে হাত বাড়িয়ে দিলেন রক্সটন। এখন থেকে আমরা বন্ধু-তুমি আমাকে জন বলে ডাকতে পারো।

জ্যাক ব্যালিঞ্জারের কি হবে?

আজ সকালে আমি নিজেই তার ব্যবস্থা করেছি। আমার কিমোনোর নিচের দিকে কেবল একটা ফুটো হয়েছে-মাতাল অবস্থায় হাত কেঁপে তার তাক ঠিক হয়নি। সপ্তাহখানেকের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবেন। যাক, তুমি আমার তরুণ বন্ধু, কিছু মনে করোনি তো? প্রফেসর সামারলী হলেন বুড়ো মানুষ, যত ঝামেলা আমাদের দুজনকেই পোহাতে হবে। অত্যন্ত বিপদসঙ্কুল জায়গা আমাজন। ওখানে নির্ভরযোগ্য বন্ধু দরকার। আচ্ছা বলো তো, তুমিই কি সেই ম্যালোন আয়ারল্যান্ডের জাতীয় দলের পক্ষে যার খেলার সম্ভবনা আছে?

রিজার্ভে হয়তো আমার নাম থেকে থাকবে।

তাই বলো, চেহারাটা চেনা চেনা মনে হচ্ছিল। রিচমন্ডের বিরুদ্ধে যে ট্রাই করেছিলে তুমি, সত্যিই অপূর্ব! এত সুন্দর কাটিয়ে নিয়েছিলে—এই মৌসুমে ওরকম সুন্দর আর কোন টাচ ডাউন দেখেছি বলে মনে পড়ে না। রাগবি ম্যাচ আমি পারতপক্ষে মিস করি না।

ধন্যবাদ।

যাক, আসল কথায় আসা যাক। জাহাজ কবে কবে ছাড়বে তা টাইমস-এর প্রথম পাতায় দিয়েছে। তোমার আর প্রফেসরের যদি কোন অসুবিধা না থাকে তবে আমার মনে হয় সামনের বুধবারে পারা যাচ্ছে যে জাহাজটা ওটা নেয়াই ভাল হবে। তোমার সাজ সরঞ্জামের কতদূর কি?

আমার কাগজ থেকে ওরাই সব ব্যবস্থা করবে।

গুলি ছোড়ায় হাত কেমন তোমার?

টার্গেট বড় হলে প্রায়ই লাগাতে পারি।

হায় আল্লাহ! এই অবস্থা। দক্ষিণ আমেরিকায় গুলি সোজা চালাতে না জানলে বিপদ আছে। কারণ প্রফেসর চ্যালেঞ্জার যদি পাগল বা মিথ্যাবাদী না হয়ে থাকেন তবে আমরা বহু অদ্ভুত জিনিস দেখব ওখানে। অস্ত্র আছে তোমার?

ওক কাঠের তৈরি আলমারিটার সামনে এসে দাঁড়ালেন রক্সট্রন। সেটা খুলতেই আমার চোখে পড়ল সারি সারি ঝকঝকে বন্দুক আর রাইফেলের নল। পাইপ অরগ্যানের মতই দেখাচ্ছে।

দেখি আমার এখান থেকে তোমার জন্যে কোন ব্যবস্থা করতে পারি কিনা। বলে একটা একটা করে বিভিন্ন ধরনের রাইফেল বের করে সশব্দে খুলে আবার বন্ধ করে যথাস্থানে রাখতে লাগলেন। কোনো মা-ও বোধহয় ছেলেমেয়েকে এতটা যত্ন করেন না।

এটা হচ্ছে ব্ল্যান্ডের .৫৭৭ অ্যাক্সাইট এক্সপ্রেস। সাদা গন্ডারটা এটা দিয়েই শিকার করেছিলাম আমি। আর দশগজ এগুতে পারলেই ওর শিকারের খাতায় আমার নামটা লেখাতে হত!

আরেকটা রাইফেল বের করলেন জন। এই যে—আরেকটা প্রয়োজনীয় অস্ত্র। .৪৭০, টেলিসকোপিক সাইট, ডবল নিক্ষেপকারী—সাড়ে তিনশো গজ পর্যন্ত খুব মারাত্মক। তিন বছর আগে এটা ব্যবহার করেছিলাম পেরুর ক্রীতদাস ব্যবসায়ীদের উপর।

মানে? আপনি মানুষ খুন করেছেন ওই রাইফেল দিয়ে!

হ্যাঁ, কেবল একটা নয়—একদল লোক মেরেছি। মানুষের জীবনে এমনও সময় আসে যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে না পারলে সারা জীবন গ্লানি বহন করতে হয়। আমিও তেমনি রুখে দাঁড়িয়েছিলাম অত্যাচার আর অবিচারের বিরুদ্ধে। পেড্রো লোপেজকে খতম করেছিলাম পুটোমায়ো নদীর ফিরাসোতে। সে ছিল ওদের সর্দার।

সুন্দর একটা তামাটে আর রূপালী রঙের রাইফেল বের করলেন রক্সটন।

এতে পাঁচটা গুলি পর পর বেরিয়ে আসে। এটার হাতে জানটা সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারো তুমি। আলমারি বন্ধ করে রাইফেলটা আমার হাতে তুলে দিলেন তিনি। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, প্রফেসর চ্যালেঞ্জার সম্বন্ধে তুমি কি জানো?

গতকাল পর্যন্তও তাঁকে আমি চিনতাম না।

আমিও না। আশ্চর্য, আমরা কেউ তাঁকে চিনি না অথচ তাঁর নির্দেশমত দক্ষিণ আমেরিকাতে যাচ্ছি। অন্যান্য বিজ্ঞানীরা কিন্তু তাকে খুব একটা পছন্দ করেন বলে মন হলো না। তা তুমি এটার মধ্যে জড়ালে কি করে?

সকালবেলার ঘটনার সংক্ষেপে বর্ণনা দিলাম আমি। খুব মনোযোগ দিয়ে সব ঘটনা শুনে দক্ষিণ আমেরিকার একটা ম্যাপ বিছালেন তিনি টেবিলে।

আমার বিশ্বাস তোমাকে যা বলেছেন তার প্রতিটি অক্ষর সত্যি, সরলভাবে বললেন তিনি। দক্ষিণ আমেরিকা যে কেমন জায়গা সে সম্বন্ধে আমার কিছুটা ধারণা আছে। ড্যারিয়েন থেকে ফুয়েগো পর্যন্ত এলাকা সম্ভবত পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর আর চমকপ্রদ। মানুষ এখনও ভাল করে চেনে না এই সব এলাকা। আয়তনে প্রায় ইউরোপের সমান। এই দুর্গম জঙ্গলে কোন কিছু আবিষ্কারেই আমি অবাক হব না।

রক্সটনকে তার ঘরের গোলাপী আভার মধ্যে রেখে বিদায় নিলাম। তিনি তখনও প্রিয় রাইফেলটায় তেল দিতে দিতে মুচকি হাসছিলেন। বুঝলাম, নতুন অভিযানের অজানা ঝুঁকি তার মনে রোমাঞ্চ জাগিয়েছে।

ঘটনাবহুল দিনের শেষে ক্লান্ত দেহে বার্তা-সম্পাদক মিস্টার ম্যাকারডলকে পুরো ব্যাপারটা জানালাম আমি। শুনে পরদিন সকালেই পত্রিকা প্রধানের সাথে কথা বলে সব ঠিকঠাক করে দেবেন বলে জানালেন তিনি। আমার প্রতি নির্দেশ হলো আভিযানের পুরো রিপোর্ট আমি মিস্টার ম্যাকারডলকে পাঠাব। প্রফেসর চ্যালেঞ্জার যদি অনুমতি দেন তাহলে সেগুলো সম্পাদনা করে সাথে সাথেই ছাপা হবে, নইলে প্রফেসরের ইচ্ছানুযায়ী পরে ছাপা হবে।

ফোন করে সাংবাদিক পেশার গোষ্ঠী উদ্ধারকরা বেশ কিছু মন্তব্য শোনার পর প্রফেসরের কাছ থেকে শুনলাম, আমরা কোন্ জাহাজে যাচ্ছি জানালে প্রাথমিক নির্দেশ তিনি জাহাজেই পৌঁছে দেবেন।

ফ্রান্সিসকা জাহাজ। টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে, কুয়াশাও রয়েছে। তিনজন লোক চকচকে বর্ষাকোট পরে এগিয়ে আসছেন ঘাটের দিক থেকে। তাদের আগে আগে আসছে একজন কুলি; ট্রলিতে উঁচু করে বোঝাই করা হয়েছে ট্রাঙ্ক, মোড়ক আর রাইফেলের বাক্স। প্রফেসর সামারলী পা টেনে টেনে মাথা নিচু করে হাঁটছেন। মনে হচ্ছে, এই অভিযানের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে এরই মধ্যে নিজের উপরেই রাগ হচ্ছে তাঁর।

এমন সময় পিছন থেকে একটা গলার আওয়াজ এল–প্রফেসর চ্যালেঞ্জার; কথামত বিদায় জানাতে এসেছেন।

না, আমি আর জাহাজে উঠব না, বললেন প্রফেসর। অল্প কথাই বলার আছে আমার, আর তা সব এই খামের ভিতরেই লেখা আছে। কিন্তু আমাজনের পাড়ে মানাওস শহরে পৌঁছানোর আগে খোলা যাবে না চিঠি। কবে কখন খুলতে হবে তাও লেখা আছে খামের উপর।

আমি কিছু বলতে গেলাম, কিন্তু তার আগেই হাত তুলে আমাকে থামিয়ে দিয়ে চ্যালেঞ্জার বললেন, না, ম্যালোন, তোমার সংবাদ প্রেরণে কোন বিধি নিষেধ প্রয়োগ করব না আমি কিন্তু ঠিক কোথায় যাচ্ছ তা ফাঁস করা চলবে না। আর কোন খবরই তোমরা ফিরে না আসা পর্যন্ত ছাপানো চলবে না।

বিদায় নিয়ে গোড়ালির উপর সাঁই করে ঘুরে ফিরে গেলেন চ্যালেঞ্জার তার ট্রেনের দিকে।

আমাদের যাত্রা শুরু হলো।

০৬. জাহাজে আমরা যে কি রাজার হালে ছিলাম

জাহাজে আমরা যে কি রাজার হালে ছিলাম তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে আপনাদের ভারাক্রান্ত করব না। এক সপ্তাহ আমরা পারাতে ছিলাম। (পেরেইরা ডা পিন্টা কোম্পানী আমাদের যন্ত্রপাতি, রসদ সব একসাথে করতে খুবই সাহায্য করে।) ছোট আরেকটা স্টীমারে করে চওড়া, শান্ত স্রোতের একটা নদী ধরে আমরা ওবিডস হয়ে উজানে গিয়ে মানাওস পৌঁছলাম।

ব্রিটিশ-ব্রাজিলিয়ান ট্রেডিং কোম্পানীর প্রতিনিধি মিস্টার শর্টম্যানের সৌজন্যে আমাদের আর স্থানীয় সরাইখানায় থাকতে হলো না। বেশ ভালই কাটল তাঁর আতিথেয়তায়। যাই হোক, অবশেষে প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের দেয়া চিঠি খোলার নির্ধারিত দিন এল।

আমার সঙ্গী দুজন সম্বন্ধে এখানে কিছু বলা প্রয়োজন। বিজ্ঞানী হিসাবে প্রফেসর সামারলী পরিচয়ের অপেক্ষা রাখেন না। তবে তাকে দেখলে প্রথম দৃষ্টিতে বোঝাই যায় না এই ধরনের কষ্টসাধ্য অভিযানের জন্যে তিনি যে কতখানি উপযুক্ত। লম্বা দড়ির মত শরীরে ক্লান্তি বলে কিছু নেই। ছেষট্টি বছর বয়স কিন্তু আমাদের অভিযানের নানা কষ্ট ক্লেশের মধ্যেও কেউ কখনও তাকে নালিশ করতে শোনেনি। কষ্টসহিষ্ণুতায় আমার চেয়ে কোন অংশেই কম যান না তিনি।

প্রথম থেকেই প্রফেসর সামারলীর বদ্ধমূল ধারণা যে চ্যালেঞ্জার একটা ঠগ। বৃথাই আমাদের কাকের পিছনে দৌড়ানো। দক্ষিণ আমেরিকার জঙ্গলে নানান বিপদ আপদে পড়তে হবে আর শেষ পর্যন্ত কিছু না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসাই সার হবে। জাহাজে চড়ার পর থেকেই এই একই কথা বলছেন সামারলী।

কিন্তু বিজ্ঞানের প্রতি তার অদ্ভুত নিষ্ঠা। প্রজাপতি ধরার জাল আর বন্দুক নিয়ে সারাদিন জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো আর নানান জাতের বিচিত্র সব পোকামাকড় সংগ্রহ করে তার সময় কাটে। সন্ধ্যায় তিনি সারা দিনের শিকার সযত্নে পিন দিয়ে আটকে রাখেন। খুবই অন্যমনস্ক ভাব তার। মুখে সব সময়ে ব্রায়ার কাঠের পাইপ ঝুলছে। ক্যাম্পের জীবন নতুন কিছু নয় তার কাছে।

লর্ড জন রক্সটনের সঙ্গে সামারলীর কিছু কিছু মিল আছে; আবার অনেক গরমিলও আছে তাদের। রক্সটন বয়সে বিশ বছরের ছোট হলেও দুজনের দেহের গড়ন একই ধরনের। সব সময় খুব পরিপাটি আর ছিমছাম থাকতে ভালবাসেন জন। সাদা ড্রিলের স্যুটের সাথে তামাটে রঙের উঁচু বুট পরেন পায়ে। রোজ অন্তত একবার দাড়ি কামাবেনই তিনি।

সারা পৃথিবী সম্বন্ধে বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকা সম্বন্ধে অগাধ জ্ঞান রাখেন জন। ওঁর দৃঢ় বিশ্বাস সামারলী যতই নাক সিটকান না কেন কিছু একটা পাবই আমরা। গলার স্বর মোলায়েম হলেও তাঁর নীল চোখের পিছনে আত্মপ্রত্যয়শীল আর কঠিন একটা মানুষকে খুঁজে পাওয়া যায়।

এখানকার লোকেদের মাঝে সাড়া পড়ে গেছে জনের আগমনে। এদের হিরো হচ্ছেন জন-রেড চীফ। পীরের মত মানে তাঁকে সবাই। ওঁর সম্বন্ধে আশ্চর্য আশ্চর্য অনেক গাঁথা প্রচলিত আছে এখানে, সেগুলোর কিছু কিছু সত্যিই বিস্ময়কর।

কয়েকজন লোক নিলাম আমরা। প্রথম জন এক বিশাল নিগ্রো হারকিউলিস, নাম জাম্বাে। ঘোড়ার মত খাটতে পারে লোকটা, বুদ্ধিও অনুরূপ। ওকে নিয়েছিলাম পারা থেকে, এক জাহাজ কোম্পানীর সুপারিশে। সেই জাহাজেই ভাঙা ভাঙা ইংরেজি শিখেছে সে।

মিশ্র রক্তের গোমেস আর ম্যানুয়েলকেও নেয়া হয়েছে পারা থেকেই। দুজনই দাড়িওয়ালা ভয়ঙ্কর দর্শন লোক। চিতাবাঘের মত কর্মঠ। নদী পথে লাল কাঠের একটা সাপ্লাই নিয়ে এসেছিল ওরা জঙ্গল থেকে। আমরা যেদিকটায় অভিযানে যাব সারাটা জীবন ওরা সেদিককার জঙ্গলেই কাটিয়েছে। ওদের একজন, গোমেস, চমৎকার ইংরেজি বলতে পারে। রান্নাবাড়া, নৌকা চালানো, মোট বওয়া বা যে কোন কাজেই দুজনের কেউ পিছপা নয়।

এরা ছাড়াও আরও তিনজন বলিভিয়ার মোজো ইন্ডিয়ানকে নেয়া হয়েছে। আমাদের সাথে-সবার বেতনই মাসে পনেরো ডলার করে। তিন জনের মধ্যে যে সর্দার তাকে গোত্রের নাম অনুযায়ী মোজো বলে ডাকে সবাই। অন্য দুজনের একজন জোসি আর অন্যজন ফারনান্দো।

দীর্ঘ এক সপ্তাহ পরে চরম সময় উপস্থিত। ফাজেন্দা সান্তা ইগনাসিয়ার ছায়া ঘেরা একটা বৈঠকখানা। মানাওস থেকে দুমাইল ভিতরে। বাইরে সূর্যের ঝলমলে আলো। পামগাছের ছায়াও গাছগুলোর মতই নিকষ কালো। বাতাস স্থির, নানা জাতের পোকা, মৌমাছি আর মশা যেন সারগমের সুর তুলেছে।

বেতের টেবিলের চারপাশে বসেছি আমরা। খামটা টেবিলের উপর রাখা। খামের উপর প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের অসমান অক্ষরে লেখা:

দুপুর ১২টা জুলাই ১৫

লর্ড জন তাঁর ঘড়িটা খুলে টেবিলের উপর রাখলেন। আর মাত্র সাত মিনিট বাকি আছে, বললেন রক্সটন, আমাদের প্রফেসর নিখুঁত কাজে বিশ্বাসী।

একটু কাষ্ঠ হাসি হেসে শুকনো পাতলা হাত দিয়ে খামটা তুলে নিলেন সামারলী। সাত মিনিট পরে আর আগে কি আসে যায়? আমি ভাল করেই জানি এই লোক হাতুড়ে, ভন্ড।

কিন্ত আমাদের তার নিয়ম মেনেই চলতে হবে, বললেন জন, হঠাৎ যদি প্রফেসর চ্যালেঞ্জার এসে হাজির হন এখানে, আর দেখেন আমরা তাঁর নির্দেশ এবং বিশ্বাস ভঙ্গ করেছি, সেটা কি আমাদের ছোট মনেরই পরিচয় দেবে না?

খুব ভাল কথা, তিক্তভাবে মন্তব্য করলেন সামারলী। লন্ডনে থাকতেই এটা আমার কাছে অবাস্তব বলে মনে হয়েছিল, এখন নিজের চোখে এলাকাটা দেখার পর গোটা ব্যাপারটা নেহাতই অসম্ভব মনে হচ্ছে। জানি না খামের মধ্যে কি আছে, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কিছু না থাকলে ফিরতি বলিভিয়া জাহাজেই ফিরে যাব আমি। একটা পাগলকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করার চেয়ে অনেক বেশি জরুরী কাজ পড়ে আছে আমার। সেসব কাজে গোটা পৃথিবী উপকৃত হবে। সাত মিনিট কি এখনও শেষ হয়নি?

হয়েছে-এখন আপনি খুলতে পারেন ওটা।

পকেট থেকে ছোট্ট একটা ছুরি বের করে খামটা কাটলেন মিস্টার সামারলী। একটা ভাঁজ করা কাগজ বেরুল খাম থেকে। সাবধানে ভাঁজ খুলে টেবিলের উপর বিছালেন সেটা। একটা সাদা কাগজ! আমরা সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি, হঠাৎ হাসিতে ফেটে পড়লেন সামারলী।

আর কি প্রমাণ চাও তোমরা? এইটাই তো তার স্বীকারোক্তি। নিজের অযোগ্যতা নিজেই স্বীকার করল। এখন দেশে ফিরে তার মুখোশটা খুলে দেয়া ছাড়া আমাদের আর কিছু করার নেই।

অদৃশ্য কালি! আমি তথ্য যোগান দিলাম।

মনে হচ্ছে না, আলোতে ধরে মন্তব্য করলেন জন। এই কাগজে কোন দিনই কিছু লেখা হয়নি এটা আমি হলপ করে বলতে পারি।

ভিতরে আসতে পারি? বারান্দা থেকে অতি অস্বাভাবিক জোরে কেউ জিজ্ঞেস করলেন।

বেঁটে আকৃতির একজন মানুষ দরজায় দাঁড়িয়ে ঘরের ভিতরে আলোর পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে। সেই স্বর, আর সেই বিরাট কাঁধ! আমরা সবাই চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালাম—প্রফেসর চ্যালেঞ্জার আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন! মাথায় একটা বাচ্চাঁদের রঙীন হ্যাট—তার সাথে আবার লাল ফিতে বাধা। এগিয়ে এসে বললেন তিনি, আমি দুঃখিত যে কয়েক মিনিট দেরি করে ফেলেছি পৌঁছতে। খামটা দেবার সময়ে আমি ভেবেছিলাম যে ওটা খোলার সুযোগ দেব না আপনাদের; ইচ্ছে ছিল আরও ঘণ্টাখানেক আগেই পৌঁছাব আমি। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি আমার পাইলটের একটা ভুলে। প্রফেসর সামারলী আমাকে নিশ্চয়ই শাপশাপান্ত করেছেন?

আমি প্রশ্ন করতে বাধ্য হচ্ছি, কেন আপনি এই পথ বেছে নিলেন? আমাদের অভিযান এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত। প্রতিবাদ করলেন জন।

এ কথার কোন জবাব না দিয়ে জন আর আমার সঙ্গে হাত মিলালেন চ্যালেঞ্জার। কিন্তু সামারলীর সাথে হাত না মিলিয়ে একটু ব্যঙ্গভরে কুর্নিশ করলেন। তারপর একটা বেতের চেয়ার টেনে বসলেন।

যাত্রার জন্যে সব তৈরি তো? জিজ্ঞেস করলেন প্রফেসর।

আগামীকালই আমরা রওনা হতে পারি, বললাম আমি।

তবে আপনারা কালই রওনা হবেন। এখন আর ম্যাপ দেখার দরকার হবে না। আমিও যাব আপনাদের সাথে, আমার সুযোগ্য নির্দেশে আপনারা ঠিক ঠিক জায়গা মত পৌঁছে যাবেন।

জন রক্সটন এসমেরালডা নামে একটি স্টীম লঞ্চ ভাড়া নিয়েছেন আমাদের জন্যে। আমি প্রফেসর চ্যালেঞ্জারকে জানিয়ে দিলাম আমরা পুরোপুরি তৈরি।

খুব ভাল, আজ রাতের মধ্যেই সবাই গোছগাছ যা করার করে রাখবেন। কাল খুব ভোরেই আমরা রওনা হব।

সকালেই রওনা হলাম। অবশ্য এখানকার আবহাওয়া অনুযায়ী যে কোন সময়ে রওনা হলেই চলত। দিনের তাপমাত্রা শীতে বা গ্রীষ্মে পঁচাত্তর থেকে নব্বই ডিগ্রীর মধ্যেই ওঠানামা করে। ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত এখানে বর্ষাকাল, এই সময়ে নদীতে প্রায় চল্লিশ ফুট পানি বাড়ে। নদীর দুই পাড়ই বন্যায় ভেসে যায়। বিরাট এলাকা জুড়ে শুধু পানি থৈ থৈ করে। এখানকার স্থানীয় লোকেরা একে বলে গ্যাপো; পায়ে চলার জন্যে কষ্টসাধ্য, আবার জাহাজ চলার জন্যে অগভীর। জুন মাসে পানি নামতে শুরু করে, অক্টোবর-নভেম্বরের দিকে নদীতে পানি সবচেয়ে কম থাকে। এখন এখানকার বিশাল নদী আর উপনদীর পানি অনেকটা স্বাভাবিক।

নদীর ঢাল মাইলে আট ইঞ্চির বেশি না হওয়ায় স্রোত এখানে খুবই কম, জাহাজ নিয়ে উজানে এগুনো আমাদের পক্ষে অত্যন্ত সহজ হলো। দ্রুত এগিয়ে চললাম। একটানা তিনদিন চললাম উত্তর-পশ্চিমে। মোহনা থেকে প্রায় হাজার মাইল দূরেও নদী এখানে যথেষ্ট চওড়া।

চার দিনের দিন আমরা আমাজনের একটা উপনদীতে ঢুকলাম। মুখের কাছে প্রায় আমাজনের মত চওড়া হলেও কিছুদূর এগুতেই দ্রুত সরু হয়ে এল নদী। আরও দুইদিন চলার পর একটা ইন্ডিয়ান গ্রামে পৌঁছলাম। এখান থেকেই প্রফেসরের নির্দেশে ফেরত পাঠানো হলো জাহাজ। ২ আগস্ট তারিখে ফেরত চলে গেল এসমেরালডা। আর সেই সাথে বাইরের পৃথিবীর সাথে আমাদের সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।

বাঁশের ফালির কাঠামোর উপর চামড়া মুড়ে দুটো বড় আকারের সরু নৌকা তৈরি করতে আমাদের চারদিন কেটে গেল। খুবই হালকা করে বানানো হলো নৌকা যেন জলপ্রপাত বা অন্য কোন বাধা এলে দরকার মত সহজেই বয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।

আরও দুজনকে কাজে নেয়া হলো নাবিক হিসাবে—আটাকা আর ইপেটু। প্রফেসরের গত অভিযানে এরাই ছিল তার সাথে। প্রথমে ওরা ভয়ে যেতে রাজি হয়নি, কিন্তু সর্দারের কথা অমান্য করার উপায় নেই এই সমাজে। উপহার আর টাকা দিয়ে প্রফেসর সর্দারকে রাজি করিয়ে ফেলেছেন, সুতরাং বাধ্য হয়েই রাজি হতে হয়েছে ওদের।

নৌকায় আমাদের সব মালপত্র বোঝাই করা হলো, আগামীকাল রওনা হব অজানার উদ্দেশে।

০৭. পরদিন খুব সকালেই রওনা হলাম

পরদিন খুব সকালেই রওনা হলাম। এক এক নৌকায় ছয়জন করে। দুই প্রফেসরের ঝগড়া এড়াবার জন্যে সামারলীর নৌকায় পাঁচজন হতেই রক্সটন সেটাতে চট করে উঠে পড়লেন। প্রফেসর চ্যালেঞ্জার ওদিকেই এগুচ্ছিলেন, কিন্তু আর জায়গা নেই দেখে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে রক্সটনের দিকে তাকিয়ে ফিরে এসে উঠলেন আমাদের নৌকায়।

কিছুক্ষণের মধ্যেই মেজাজ ভাল হয়ে গেল প্রফেসরের। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে একেবারে ডুবে গেলেন। স্মিত হাস্যে কচি ছেলের মত অবাক বিস্ময়ে প্রতিটি দৃশ্য উপভোগ করতে লাগলেন। তবে কখন যে বিনা মেঘে বজ্রপাত হবে সেটা কারও বলার উপায় নেই। তার মেজাজ মর্জির কিছুটা অভিজ্ঞতা আমার ইতিমধ্যেই হয়েছে। চ্যালেঞ্জারের সঙ্গে থাকলে যেমন কারও পক্ষে স্বস্তিতে থাকা অসম্ভব ঠিক তেমনি আবার তার সান্নিধ্যে কারও পক্ষে বিষণ্ণ থাকাও অসম্ভব।

দুদিন ধরে আমরা প্রায় দুশো গজ চওড়া নদী বেয়ে এগিয়ে চললাম। নদীর পানি একটু কালচে হলেও স্বচ্ছ। তলা পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যায়। আমাজনের উপনদীগুলো অর্ধেকই এই রঙের, বাকি অর্ধেক সাদাটে, অস্বচ্ছ। যে যে এলাকা পেরিয়ে এসেছে তার ওপর নির্ভর করে পানির রঙ। গাছ-গাছড়া পচলে হয় কালো আর কাদামাটি থাকলে হয় অন্য রঙ।

দুবার বাধা পেলাম আমরা, একবার জলপ্রপাতে, আরেকবার একটা খাড়াইয়ে। দুবারই আধ মাইল করে ঘুরে সবকিছু বয়ে নিয়ে যেতে হলো। জঙ্গল বেশি ঘন না হওয়ায় বিশেষ অসুবিধে হলো না আমাদের।

কোনদিন ভুলব না আমি এই জঙ্গলের দৃশ্য। গাছগুলোর যেমন মোটা গুড়ি, লম্বায় তেমনি উঁচু। আমার শহুরে জীবনে আমি চিন্তাও করতে পারিনি যে এও সম্ভব। গাছ সোজা উঠে গেছে উপরের দিকে, অনেক উঁচুতে। আমাদের মাথার বহু উপরে ডালপালা মেলেছে চারদিকে। যেখান থেকে ডাল মেলেছে সে জায়গাটা আবছা ভাবে দেখা যাচ্ছে। ডাল বাঁকা হয়ে উপরের দিকে উঠে গিয়ে যেন একটা পাতার মাদুর তৈরি করেছে। পাতার ফাঁক গলে মাঝে মধ্যে দুএক ফালি সোনালী রোদ সরু লম্বা রেখায় নিচে পড়ছে।

বনের ভিতর দিয়ে শুকনো পাতার কার্পেট মাড়িয়ে চললাম আমরা। কেমন একটা ছমছমে নীরবতা সবার মাঝে। এমন কি যে প্রফেসর চ্যালেঞ্জার আস্তে কথা বলতে জানেন না তার গলা থেকেও এখন ফিসফিস করে শব্দ বেরুচ্ছে।

যদি একা থাকতাম তাহলে সবই অজানা থেকে যেত আমার। কিন্তু আমাদের বৈজ্ঞানিক প্রফেসর দুজন নিচু গলায় চিনিয়ে দিতে লাগলেন বিভিন্ন শ্রেণীর গাছ, শিমুল, লালকাঠ, দেবদারু আরও অন্যান্য সব গাছ। এই সব অসংখ্য গাছের প্রাচুর্যের জন্যেই এই মহাদেশ পৃথিবীর সবথেকে বড় কাঠ সরবরাহকারী। কিন্তু জন্তু-জানোয়ারের দিক থেকে এখানে রয়েছে ঘাটতি।

উজ্জল অর্কিড, বিচিত্র সুন্দর রঙীন লিচেন, বড় বড় গাছের কালো গা বেয়ে ধোঁয়ার মত পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উঠেছে। কোথাও বা এক এক ফালি রোদ এসে পড়েছে সোনালী অ্যালামান্ডা, ট্যাকসোনিয়ার উজ্জ্বল লাল তারা-গুচ্ছে কিংবা কোন গভীর নীল রঙের ইপোমিয়ার উপর। একটা স্বপ্নের দেশের মত দেখাচ্ছে। সূর্যের আলো পাওয়ার জন্যে সব গাছের মধ্যেই যেন একটা নীরব প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। লতা গাছগুলো তো বড় গাছের গা বেয়ে উপরে উঠেছেই, অন্য গাছও, যেমন জেসমিন আর জেসিটারা পাম, ছায়া থেকে বেরিয়ে আসার জন্যে লতানোর কৌশল শিখে ফেলেছে।

নিচে কোন প্রাণী চোখে না পড়লেও উপরের নড়াচড়ায় বুঝলাম সাপ, বানর আর বড় বাদুড় জাতীয় স্লথের একটা রাজ্য আছে আমাদের মাথার উপর। অনেক উপর থেকে অবাক বিস্ময়ে ওরা লক্ষ্য করছে আমাদের।

দেখা না গেলেও আশেপাশেই কোথাও কোনো ফাঁকে যে মানুষ আছে তার নিদর্শন দেখা যাচ্ছিল। তৃতীয় দিনে বাতাসে ভেসে এল গুরু গভীর দ্রুম দ্রুম শব্দ। আমাদের ক্যানো নৌকা দুটো একটা আরেকটাকে খুব কাছাকাছি অনুসরণ করছে। সঙ্গের ইন্ডিয়ান অনুচরেরা সবাই যেন একেবারে পাথর হয়ে গেল, তাদের চোখে মুখে ভয়ের চিহ্ন।

কি হয়েছে? জিজ্ঞেস করলাম আমি।

ড্রাম, অবহেলাভরে জবাব দিলেন জন, আগেও শুনেছি আমি, এগুলো ওদের যুদ্ধ দামামা।

ঠিক বলেছেন, স্যার, বর্ণশংকর গোমেস বলল, মানসো নয়তো ব্রাভো জংলী ইন্ডিয়ান। ওরা আমাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখছে। সুযোগ পেলে সবাইকে মেরে ফেলবে।

কিভাবে নজর রাখছে আমাদের উপর? নিশ্চুপ স্থির বনের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমি। কোন রকম নড়াচড়া চোখে পড়েনি আমার।

কাঁধ ঝাঁকিয়ে গোমেস বলল, তা ওরাই জানে—ইন্ডিয়ানদের নিজস্ব পদ্ধতি আছে। ড্রাম পিটিয়ে পরস্পর কথা বলছে আর আমাদের উপর নজর রাখছে। একটু সুযোগ পেলেই মেরে ফেলবে আমাদের।

আঠারোই আগস্ট–মঙ্গলবার। আজ কম করে হলেও ছয়টা ড্রাম বাজতে লাগল বিভিন্ন জায়গা থেকে। বিকেল হয়ে আসলে কখনও দ্রুত আবার কখনও ধীরে ধীরে বাজছে। স্পষ্টই বোঝা গেল যে সওয়াল জবাব চলছে ওদের মধ্যে। পুব দিকের একটা ড্রাম অত্যন্ত দ্রুততালে বেজে উঠল ডুগডুগির মত। একটু পরেই উত্তরের ড্রাম বাজল গভীর খাদে। অতি ভয়াবহ আর হিংস্র একটা ভাব রয়েছে ওই একটানা ড্রামের শব্দে। মনে হলো যেন এক কথাই বারবার আউড়ে চলেছে, সুযোগ পেলেই মারব তোদের, এইবারেতে মারব তোদের।

নীরব বনের মধ্যে কেউ নড়ছে না। ছায়া ঘেরা বনে সুন্দর স্নিগ্ধ শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে। কিন্তু তারই পিছন থেকে একটানা হুমকি আসছে ভেসে, সুযোগ পেলেই মারব তোদের, সুযোগ পেলেই মারব।

সারাদিন ধরে ড্রামগুলো গুড়গুড় ফিসফিস করল। সেই ভীতিকর শব্দ প্রত্যেকটা স্থানীয় লোকের মুখে সুস্পষ্ট ভয়ের ছাপ একে দিয়েছে। এমন কি ক্ষিপ্র চিতার মত গোমেস, সেও চুপসে গেছে।

বিজ্ঞানী প্রফেসর দুজনকে দেখে অবাক হতে হয়। মানুষখেকোদের ড্রাম আদৌ বিচলিত করতে পারেনি তাদের। সারাদিন তারা লতাপাতা আর পাখি দেখে, আর ঝগড়া করে কাটাচ্ছেন। ড্রামের শব্দ যেন তাদের মনে বিন্দুমাত্র দাগ কাটছে না। এমন একটা ভাব যেন সেন্ট জেমস স্ট্রীটের রয়াল সোসাইটি ক্লাবের বিশ্রাম কক্ষে তারা বসে আছেন!

মাত্র একবারই চ্যালেঞ্জার ওদের বিষয়ে কথা তুললেন। বুড়ো আঙুল দিয়ে পিছনের বনে শব্দের দিকে নির্দেশ করে বললেন, মানুষখেকো মিরানহা বা আমাজুয়াকা।

কোন সন্দেহ নেই, উত্তর দিলেন সামারলী। অন্যান্য উপজাতীয়দের মত মঙ্গোলীয় গোষ্ঠীর নানা ভাষার সংমিশ্রণ এখানেও আছে বলে আমার বিশ্বাস।

বহু সংমিশ্রণ অবশ্যই আছে, বললেন চ্যালেঞ্জার, প্রায় একশো গোত্র সম্বন্ধে আমার বিশেষ নোট নেয়া আছে। কিন্তু মঙ্গোলীয় কিনা সে সম্বন্ধে আমার গভীর সন্দেহ আছে।

আবার লেগে গেলেন দুই প্রফেসর।

তুলনামুলক শরীর বিদ্যাতে যার সামান্য জ্ঞান আছে সে-ও আমার কথার মর্ম বুঝতে পারত, তিক্ত ভাবে বললেন সামারলী।

গর্ব ভরে আকাশের দিকে মুখ তুলতে তুলতে চ্যালেঞ্জারের এমন অবস্থা হলো যে দাড়ি আর টুপির কিনারা ছাড়া মুখের আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কোনই সন্দেহ নেই, জনাব, কেবল মাত্র অল্প বিদ্যান ব্যক্তিই ওকথা বলবে। কিন্তু জ্ঞান যার গভীর তিনি ভিন্ন রকম সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেন।

রক্তচোখে দুজন দুজনের দিকে চেয়ে রইলেন। ওদিকে ড্রাম ফিসফিসিয়ে একটানা বলে চলেছে, অল্প পরেই মারব তোদের, সুযোগ পেলেই মারব।

সেই রাতে আমরা মাঝ নদীতে ভারী পাথরের সাথে নৌকা বাঁধলাম। সেই সাথে যে কোন আক্রমণ প্রতিহত করার সব রকম ব্যবস্থাই নেয়া হলো। কিন্তু কোন আক্রমণ এল না। সকালে আবার রওনা হলাম আমরা, ধীরে ধীরে ড্রামের শব্দ পিছিয়ে পড়তে লাগল। বিকেল তিনটার দিকে প্রায় এক মাইল লম্বা একটা খাড়াই আর প্রবল স্রোতের সম্মুখীন হলাম।

মনটা খুশিতে ভরে উঠল আমার। চ্যালেঞ্জারের গল্পের সাথে হুবহু মিলে যাচ্ছে, এখানেই নৌকা উল্টে টেরাড্যাকটিলটা হারিয়েছিলেন তিনি।

ঘন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে আমাদের নিযুক্ত স্থানীয় ইন্ডিয়ানরা প্রথমে আমাদের নৌকা ও পরে রসদ পার করল।

সন্ধ্যার মধ্যে আরও মাইল দশেক এগিয়ে নৌকা বাঁধলাম। আমি আন্দাজ করলাম উপনদী ধরে অন্তত একশো মাইল ভিতরে ঢুকেছি আমরা।

পরদিন সকালে রওনা হতে হতে দশটা বেজে গেল। রওনা হওয়ার পর থেকেই প্রফেসর চ্যালেঞ্জার অত্যন্ত উল্কণ্ঠার সঙ্গে বার বার দুই পাড়ে কি যেন খুঁজতে লাগলেন। হঠাৎ ঘোঁৎ! করে একটা শব্দে সন্তোষ প্রকাশ করলেন তিনি।

একটা বিরাট পাম গাছ বাঁকা হয়ে নদীর দিকে হেলে রয়েছে। ওদিকে সামারলীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে জিজ্ঞেস করলেন, কি ওটা?

ওটা অতি অবশ্যই একটা আসাই পাম।

ঠিক! এই আসাই পাম গাছটাই আমি পথ নির্দেশের চিহ্ন হিসাবে ব্যবহার করব বলে ঠিক করে রেখেছিলাম। গোপন পথটা ঠিক আধ মাইল সামনে নদীর উল্টো পাড়ে। গাছ গাছড়ার মধ্যে কোন ফাঁক নেই, সেটাই আশ্চর্য রহস্য। সামনে যেখানে হালকা সবুজ নলখাগড়া দেখা যাচ্ছে-ওই যে শিমূল আর গাঢ় সবুজ ঝোপঝাড়ের ঠিক মাঝখানে-ওটাই আমার অজানা দেশে পৌছবার গোপন প্রবেশ পথ। কাছে গেলেই বুঝতে পারবেন।

জায়গাটা সত্যিই সুন্দর! নলখাগড়ার ভিতর দিয়ে লগি ঠেলে কয়েকশো গজ এগিয়ে আমরা বেরিয়ে এলাম একটা ছোট অগভীর স্রোতস্বিনীতে। খুবই খেয়াল করে ঝোপের বদলে যে নলখাগড়া জন্মেছে তা লক্ষ্য না করলে কেউ কোনদিনও এখানে পৌঁছতে পারবে না। এমন স্বচ্ছ একটা স্রোতস্বিনী আর পরীর দেশের মত জায়গা কল্পনাও করা যায় না।

পরীর দেশই এটা। মানুষ এমন সুন্দর জায়গা কেবল স্বপ্নেই দেখতে পায়। স্রোতস্বিনীর দুধারের গাছগুলো মাথার উপর প্রাকৃতিক ছাতা তৈরি করেছে। ফাঁক দিয়ে সোনালী আলো আর দুএক ফালি রোদ এসে পড়েছে স্বচ্ছ পানির উপর। হিমবাহের ধারের মত সবজে, স্ফটিকের মত স্বচ্ছ আর কাচের সরু পাতের মত পরিষ্কার দেখাচ্ছে। পাতার তোরণের নিচে বৈঠার প্রত্যেক টানে শত শত ছোট্ট ঢেউ কাঁপছে পানির উজ্জ্বল উপরিভাগে। অজানা অচেনা অদ্ভুত দেশে পৌঁছার উপযুক্ত পথ বটে।

জংলী ইন্ডিয়ানদের চিহ্নও নেই এখানে। তবে এখন অনেক জীবজন্তু দেখা যাচ্ছে। ওদের নির্ভয় চলা ফেরা দেখেই বোঝা যায় যে শিকারী সম্পর্কে ওরা মোটেও সতর্ক নয়।

ছোট ছোট ব্ল্যাক-ভেলভেট বানরগুলো তাদের তুষার সাদা দাঁতে দাঁতে বাড়ি দিয়ে শব্দ তুলে কৌতূহলী চোখে আমাদের যাওয়া লক্ষ্য করছে। একটা টাপির ঝোপের ভিতর থেকে একবার উঁকি দিয়েই অদৃশ্য হলো। বিরাট একটা চিতা ঝোপের পিছন থেকে বেরিয়ে আমাদের দিকে আক্রোশ ভরা চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে নিজের পথ ধরল।

পাখির প্রাচুর্য বিশেষ করে নজরে পড়ছে। বেশির ভাগই জলচর পাখি। বক, সারস আর ইবিস-নীল, গাঢ় লাল আর সাদা রঙের। নদীর উপরে ঝুঁকে পড়া প্রত্যেকটি ডালেই দেখা গেল অসংখ্য পাখি। আর পানিতে বিভিন্ন আকার ও বিচিত্র রঙের মাছের সমারোহ।

তিনদিন আমরা প্রায় ঝাপসা সবুজ সূর্যের আলোয় স্রোতস্বিনীর সুড়ঙ্গ ধরে এগিয়ে গেলাম। লম্বা পানির ধারাটি যে কোথা থেকে শুরু হয়েছে বোঝা মুশকিল; সামনে বহুদূর পর্যন্ত দেখা গেল শুধু পানি আর পানি। এদিকে মানুষের কোনো অস্তিত্ব মোটেও চোখে পড়ল না।

এদিকে কোন ইন্ডিয়ান নেই। কুরুপুরির ভয়ে এই এলাকায় কেউ আসে না, বলল গোমেস।

কুরুপুরি হচ্ছে জঙ্গলের ভূত বা দৈত্য, ব্যাখ্যা দিলেন জন। যে কোন ভূত, প্রেত, দৈত্য, দানব, জিন, পরী সবার বেলাতেই এই নাম প্রযোজ্য। ওদের ধারণা এদিকে ভীতিজনক কিছু আছে, তাই ভুলেও কেউ এদিকে আসে না।

তৃতীয় দিনে পরিষ্কার বোঝা গেল আমাদের নৌকা যাত্রার পথ এবার ফুরিয়ে এসেছে। স্রোতের ধারাটা দ্রুত অগভীর হয়ে এল, দুঘণ্টায় আমাদের নৌকা দুবার তলায় ঠেকে গেল। শেষ পর্যন্ত দুটো নৌকাই ঝোপের মধ্যে টেনে তুলে রাতের মত ক্যাম্প করলাম।

সন্ধ্যায় তাঁবুর ভিতর আমরা চারজন আলাপ করছি ভবিষ্যৎ কর্মসূচী নিয়ে। দুই প্রফেসর যথারীতি পরস্পরের পিছনে লেগেছেন এবং কথা কাটাকাটি করছেন। বাইরে একটা ধস্তাধস্তির শব্দে আমরা বেরিয়ে আসার আগেই হারকিউলিস জাম্বাে গোমেসকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে নিয়ে তাঁবুতে ঢুকল। জাম্বাের ভাঙা ভাঙা ইংরেজী থেকে বোঝা গেল যে আমাদের তাঁবুর পিছনে সন্দেহজনকভাবে উবু হয়ে বসে ছিল গোমেস।

খাঁটি ইন্ডিয়ান অধিবাসীরা মিশ্র রক্তের মানুষকে একেবারেই দেখতে পারে না, রীতিমত ঘৃণা করে। সুযোগ পেয়ে প্রভুভক্ত কুকুরের মত গোমেসের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে জাম্বাে।

হঠাৎ ছুরি বের করেই কোপ মারল গোমেস। অদ্ভুত ক্ষিপ্রতার সাথে হাতটা কজির কাছে ধরে ফেলল জাম্বাে, তার হাতের পেশীগুলো ফুলে উঠল। এক হাতেই মোচড় দিল সে, ছুরিটা মাটিতে পড়ে গেল। কিন্তু তার পরেও ছাড়ল না জাম্বাে। জন বাধা না দিলে হাতটা হয়তো মুচড়ে ভেঙেই ফেলত সে।

গোমেস খুবই কাজের লোক। কোন কাজেই না নেই তার। কৌতূহল চাপতে না পেরে হয়তো শুনতে চেষ্টা করছিল আমরা কোথায় যাচ্ছি বা আমাদের উদ্দেশ্য কি।

গোমেসকে ভৎসনা করে দুজনের হাত মিলিয়ে দেয়া হলো। আশা করা যায় যে ওদের নিয়ে ভবিষ্যতে আর কোন জটিলতা দেখা দেবে না।

সকালে আমি আর রক্সটন প্রায় দুই মাইল অগ্রসর হলাম, জঙ্গলের ভিতর দিয়ে, স্রোতের ধারার কিনার ঘেঁষে। দেখলাম উপরের দিকে পানি আরও সরু আর অগভীর হয়ে এসেছে। ক্যাম্পে ফিরে জানালাম সবাইকে।

চ্যালেঞ্জার বললেন, হ্যাঁ, আমি তো গতকালই বলেছি এর পরে আর নৌকা নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। এখন থেকে আমাদের পায়ে হেঁটে যেতে হবে বাকি পথ।

নৌকা দুটো ভাল করে ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে রেখে কুড়াল দিয়ে গাছে দাগ কেটে চিহ্ন রাখা হলো যেন ফেরার পথে চিহ্ন খুঁজে পেতে কোন অসুবিধা না হয়। সব মালপত্র আর বোঝা ভাগ করে নিয়ে আমরা যাত্রার সবথেকে কঠিন অংশ পার হতে রওনা হলাম।

কিন্তু শুরুতেই আবার দুই প্রফেসরে বেধে গেল। প্রথম থেকেই প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের নির্দেশে সবাই চলে আসলে কিন্তু সামারলী সেটা ঠিক মেনে নিতে পারেননি। এতদিনের জমা সেই অসন্তোষ অবশেষে প্রকাশ হয়ে পড়ল।

তেমন ভারী কিছু নয়, একটা ব্যারোমিটার বহন করতে দেয়া হয়েছিল তাঁকে। হিসহিসিয়ে ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করলেন সামারলী। জানতে পারি কি, জনাব, কোন অধিকারে আপনি সবাইকে আদেশ নির্দেশ দিয়ে চলেছেন?

কটমট করে তাকালেন চ্যালেঞ্জার সামারলীর দিকে। সোজা হয়ে গেল তাঁর দেহ। প্রফেসর সামারলী, আমি নির্দেশ দিচ্ছি এই অভিযানের নেতা হিসাবে।

কিন্তু আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি যে আপনাকে আমি নেতা হিসাবে মানি না।

তাই নাকি? ব্যঙ্গ ভরে সামারলীকে কুর্নিশ করলেন চ্যালেঞ্জার। তাহলে আপনিই বলে দিন আমার পদ-মর্যাদা কি।

বলছি। আপনার সত্যবাদিতার বিচার চলছে। বিচারকমন্ডলীর সাথে চলেছেন আপনি!

আচ্ছা! বলেই একটা গাছের নিচে বসে পড়লেন চ্যালেঞ্জার। ঠিক আছে, আপনারা তাহলে এগিয়ে যান, আমি আমার সময় মত আপনাদের পিছু পিছু আসব। আপনি নিজে, বা যাকে আপনি নেতা মানেন তিনিই পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন-আমি দায়িত্ব থেকে রেহাই পেলাম।

এত জ্ঞানী মানুষ, এমন মেধা তাদের, যে লোকে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। নিজ নিজ বিষয়ে তারা পৃথিবীর সেরা বৈজ্ঞানিক। অথচ ব্যবহারে দুজন একেবারেই শিশু। কি বিচিত্র এই পৃথিবী।

ভাগ্য ভাল যে দলে দুজন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষও ছিল। নইলে অভিযান অসমাপ্ত রেখে এখান থেকেই ফিরে যেতে হত আমাদের। বহু কাঠ-খড় পুড়িয়ে, অনেক সাধ্যসাধনা করে রাজি করানো গেল তাদের। তবু চ্যালেঞ্জারকে আগে নেয়া গেল না। সামারুলীই আগে থাকলেন, আর পিছন থেকেই নির্দেশ দিয়ে আমাদের এগিয়ে নিয়ে চললেন চ্যালেঞ্জার।

আমরা পরে টের পেয়েছিলাম যে এডিনবারার ডক্টর ইলিংওয়ার্থ সম্পর্কে উভয় প্রফেসরেরই ধারণা খুব খারাপ। কোনো ভাবে ওই বিষয়টিকে ওঠাতে পারলেই উভয়ে একমত হন এবং একটা আপাত মৈত্রী হয়ে যায় তাদের মধ্যে। কখনও বেগতিক দেখলেই আমরা ডক্টর ইলিংওয়ার্থের নাম উচ্চারণ করে তার প্রসঙ্গ তুলতাম।

সার বেঁধে নদীর ধার দিয়ে এগিয়ে চললাম আমরা। স্রোতের ধারা ছোট হতে হতে শেষ পর্যন্ত এক জায়গায় মিলিয়ে গেল শ্যাওলার তলায়। সেখানেই স্রোত পার হলাম আমরা। আমাদের পা শ্যাওলায় হাঁটু পর্যন্ত ডুবে গেল। মেঘের মত মশা উড়ছে চারপাশে। মশার সঙ্গে হাজারো রকমের ছোট ছোট পোকা। পাড়ে উঠে আশ্বস্ত হলাম। তখনও কানে আসছে পোকা আর মশার গুনগুন শব্দ।

নৌকা ছেড়ে আসার দ্বিতীয় দিনে দেখলাম আশেপাশের পরিবেশে পরিবর্তন আসছে। আমরা কেবল উপরের দিকেই উঠছি। যতই উপরে যাচ্ছি গাছপালাও ততই পাতলা হয়ে আসছে। নদীর ধারের বিশাল বিশাল গাছের জায়গায় এদিকে দেখা যাচ্ছে ফিনিক্স আর কোকো পাম, সব বিচ্ছিন্নভাবে গজিয়ে উঠেছে। মাঝে মধ্যে ঝোপঝাড়। কম্পাসের সাহায্যে দিক নির্ণয় করে চললাম আমরা। দুই একবার চ্যালেঞ্জারের সঙ্গে পথ প্রদর্শক ইন্ডিয়ান দুজনের মতবিরোধ দেখা দিল। দলের সবাই ইন্ডিয়ানদের নির্দেশই মেনে চলার সিদ্ধান্ত নিলাম। রাগে, দুঃখে চ্যালেঞ্জার মন্তব্য করলেন, বিজ্ঞানসম্মত কম্পাসের চেয়ে দুজন অসভ্য ইন্ডিয়ানের ধারণাকেই বেশি বিশ্বাস করলেন আপনারা? ছোঃ!

আমরা যে ভুল করিনি তা প্রমাণিত হলো তৃতীয় দিনে যখন চ্যালেঞ্জার নিজেই স্বীকার করলেন যে কিছু কিছু জায়গা তিনি চিনতে পারছেন। আরও নিশ্চিত হওয়া গেল যখন আগুনে জ্বলে কালো হওয়া চারটে পাথর দেখতে পেলাম।

আমাদের পথ এখনও উঁচুতেই উঠছে। পাথরে ভরা জায়গাটা পার হতে আমাদের দুদিন সময় লাগল। গাছপালার চেহারা আবারও বদল হয়েছে। আইভরি পাম ছাড়া আর কোন বড় গাছ নেই এই এলাকায়। আর আছে নানা জাতীয় অর্কিড। এখানেই আমি দুর্লভ নাট্টোনিয়া ভেক্সিল্লারিয়া, গোলাপী ও গাঢ় লাল রঙের ক্যাটলিয়া আর অডটোগ্লসাস চিনতে শিখলাম। একটি দুটি ছোট ঝর্না, ছোট্ট ছোট্ট পাথরের নুড়ির উপর দিয়ে পাহাড়ের খাঁজ বেয়ে নেমে গেছে। দুধারে শ্যাওলা।

প্রতি সন্ধ্যায়ই আমরা কোন একটি ঝর্নার ধারে ক্যাম্প করি। ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ ঘুরছে ঝর্নাগুলোতে—পিঠের রঙ নীল। প্রায় ইংলিশ ট্রাউটের সমানই বড়। আকৃতিও একই রকমের। (আমাদের দেশের শোল মাছের মত-অনুবাদক) রাতের বেলা এই মাছ দিয়ে চমৎকার সুস্বাদু খাবার রান্না হয়।

নৌকা ছেড়ে আসার নয় দিনের দিন থেকে গাছপালা ক্রমে ছোট হতে হতে শেষে গুল্মলতায় পরিণত হলো। এখন গাছ আর নেই, শুধু বেত ঝাড়। এতই ঘন যে কুড়াল আর বড় ছুরি দিয়ে না কেটে ভিতরে ঢোকাই যায় না। সকাল সাতটা থেকে আরম্ভ করে সারাদিন গিয়ে রাত আটটা বেজে গেল আমাদের বেতবন পার হতে। মাঝে দুবার এক ঘন্টা করে মাত্র বিশ্রাম নিয়েছি। এমন একঘেয়ে ক্লান্তিকর পথ যে চিন্তাই করা যায় না। সবচেয়ে খোলা জায়গাতেও দশ বারো গজের বেশি নজর যায় না। বেশির ভাগ সময়েই আমি কেবল লর্ড জনের জ্যাকেট পর্যন্ত দেখতে পেয়েছি, তার দুপাশে ঝোপঝাড় হলদে দেয়ালের মত দাঁড়ানো। এমন জঙ্গলে কিসের বাস জানি না তবে কয়েকবারই আমাদের খুব কাছ থেকে কোন ভারি জন্তু ছুটে পালিয়ে গেল। জন ধারণা করলেন যে ওগুলো বুনো ষাঁড়।

রাত হতে ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে আমরা তাঁবু ফেললাম। সবাই ক্লান্ত।

পরদিন সকালেই আবার রওনা হলাম। আমাদের সামনের দৃশ্য আবার পাল্টাচ্ছে এখন। খোলা প্রান্তর ক্রমে উপরের দিকে উঠে গেছে, অসংখ্য ফার্ণ গাছে ভরা। প্রান্তরটা তিমি মাছের পিঠের মত বাঁকা হয়ে ওপাশে অদৃশ্য হয়ে গেছে।

দুপুর নাগাদ আমরা বাঁকের মাথায় পৌঁছলাম। ওপাশে ছোট অগভীর উপত্যকা; তার পরে আবার উপরে উঠেছে মাঠ।

দুজন ইন্ডিয়ানের সাথে প্রফেসর চ্যালেঞ্জার সবার আগে আগে চলছিলেন। হঠাৎ থেমে উত্তেজিত ভাবে ডান দিকে দেখালেন তিনি। তাকিয়ে দেখলাম প্রায় মাইল খানেক দূরে বিরাট বড় একটা সাদা রঙের পাখি ডানা ঝাপটে ধীরে ধীরে মাটি থেকে উপরে উঠল। খুব নিচু দিয়ে সোজা উড়ে আড়ালে চলে গেল পাখিটা।

দেখেছেন! উল্লাসে চিৎকার করে উঠলেন চ্যালেঞ্জার, সামারলী, দেখেছেন তো?

পাখিটা যেখানে অদৃশ্য হয়েছে সেদিকে নীরবে তাকিয়ে আছেন সামারলী। ওটা কি বলে দাবি করছেন আপনি? তিনি ব্যঙ্গ ভরে জিজ্ঞেস করলেন।

আমার যতদূর বিশ্বাস ওটা একটা টেরাড্যাকটিল, গম্ভীরভাবে বললেন প্রফেসর চ্যালেঞ্জার।

হো হো করে হেসে উঠলেন সামারলী। একটা বড় সারস ছাড়া আর কিছুই নয় ওটা।

রাগের চোটে কথা ফুটল না চ্যালেঞ্জারের মুখে, ঝট করে ঘুরেই হাঁটা আরম্ভ করলেন তিনি।

জন এগিয়ে এলেন আমার পাশে। ওঁর মুখ অস্বাভাবিক রকম গম্ভীর। হাতে জাইস বাইনোকুলার। পাখিটা অদৃশ্য হবার আগে ফোকাস করেছিলাম আমি। কি যে ওটা বলতে পারব না আমি, তবে জোর দিয়ে বলতে পারি যে জীবনে বহু পাখি দেখেছি, শিকারও করেছি, কিন্তু এরকম পাখি কোনদিন চোখে পড়েনি।

সামনে এগিয়ে চললাম আমরা। দ্বিতীয় টিলাটা পার হতেই সামনে খোলা জায়গা পড়ল। এখানে পাম গাছ বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে আছে। শেষ মাথায় লাল পাথরের খাঁড়া উঁচু একটা পাহাড়-স্কেচে দেখা এই পাহাড়টা চিনতে দেরি হলো না আমার। কোন সন্দেহই রইল না যে আমরা আমাদের গন্তব্যস্থলে এসে পৌঁছেছি। আমাদের ক্যাম্প থেকে এই পাহাড়টা এখন প্রায় সাত মাইল দূরে। গর্বিত ভাবে আকাশের দিকে চেয়ে হাঁটাচলা করছেন প্রফেসর চ্যালেঞ্জার। সামারলী চুপ করে থাকলেও সন্দিগ্ধ। আর মাত্র একদিন পরেই সব সন্দেহের অবসান হবে।

০৮. পাহাড়ের কাছে পৌঁছে দেখলাম

পাহাড়ের কাছে পৌঁছে দেখলাম কোন কোন জায়গা হাজার ফুটেরও বেশি উঁচু। এডিনবারার সেলসবারি ক্রাগের মতই গড়ন। চুড়ার দিকে নানা রকম গাছ দেখা যাচ্ছে, তবে অন্য কোন প্রাণীর লক্ষণ এখনও আমাদের চোখে পড়েনি।

পাহাড়ের ধার কেবল যে খাড়া উঠে গেছে তাই নয়, উপরের দিকে আবার হেলে বেরিয়ে এসেছে কিছুটা। সুতরাং বেয়ে ওঠার প্রশ্নই ওঠে না। পিরামিডের মত পাথরটার ঠিক উপরেই দেখা যাচ্ছে ছবির সেই বিশাল গাছটা। কিন্তু মাঝখানে বিরাট ফাঁক। প্রায় ছশো ফুট উঁচু হবে পাথরটা, পাহাড়ও এখানে বেশ নিচু; উচ্চতায় দুটো প্রায় সমানই হবে।

এই গাছের ওপরেই বসেছিল টেরাড্যাকটিলটা, গাছটা দেখিয়ে বললেন চ্যালেঞ্জার। আমি অর্ধেক বেয়ে উঠে গুলি করেছিলাম। আমার মত দক্ষ পাহাড়েচড়া লোকের পক্ষেও ওপর পর্যন্ত ওঠা সম্ভব হয়নি।

টেরোড্যাকটিলের কথা উঠতে আড় চোখে সামারলীর দিকে তাকালাম আমি। তার ঠোঁটের কোণ থেকে বিদ্রুপের হাসি উবে গেছে। কিছুটা যেন অনুতপ্তই মনে হচ্ছিল তাকে; দুই চোখে উত্তেজনা আর বিস্ময়। চ্যালেঞ্জারও সেটা লক্ষ্য করে তৃপ্তি বোধ করলেন।

সামারলীর পিছনে লাগলেন প্রফেসর, মিস্টার সামারলী অবশ্যই বুঝবেন যে, আমি টেরোড্যাকটিল বললে সেটা সারসকেই বোঝায়। এমন সারস, যেটার পালক নেই, আছে ছাল চামড়ার মত ঝিল্লীর পাখা আর চোয়ালে দাঁত, চোখ মিটমিট করতে করতে দাঁত বের করে হেসে কুর্নিশ করে দাঁড়িয়ে রইলেন চ্যালেঞ্জার। কোন কথা না বলে ঘুরে অন্যদিকে চলে গেলেন সামারলী।

সকালে সামান্য কিছু নাস্তা খেলাম। সঞ্চিত খাবারের দিকে খেয়াল রাখতে হচ্ছে আমাদের। কি করে উপরে ওঠা যায় সে বিষয়ে পরামর্শ করতে মীটিঙে বসলাম আমরা।

চ্যালেঞ্জার এমন ভঙ্গিতে বসে সভাপতিত্ব করছেন, মনে হচ্ছে তিনি স্বয়ং লর্ড চীফ জাস্টিস। একটা পাথরের উপর বসে, ছেলেমানুষী হ্যাটটা মাথার পিছন দিকে ঠেলে দিয়েছেন। তার গর্বিত চোখ আধ বোজা পাতার নিচ থেকে আমাদের উপর আধিপত্য করছে, আর তাঁর বিখ্যাত কালো দাড়ি কথা, তালে তালে নড়ছে উপরে আর নিচে। আমাদের বর্তমান অবস্থা আর পরবর্তী করণীয় কর্তব্য সম্বন্ধে ধীরে ধীরে জ্ঞান দান করলেন চ্যালেঞ্জার।

শ্রোতা আমরা সবাই। আমি, মুক্ত আলো বাতাসে এতদূর আসার পর রোদে পোড়া এক তরুণ যুবক। সামারলী চুপচাপ, কিন্তু এখনও নিঃসন্দেহ নন, পাইপটা লেগেই আছে তার মুখে; আর ক্ষুরের মত তীক্ষ্ণ ধার লর্ড জন তার নমনীয় সতর্ক দেহটা রাইফেলে ভর দিয়ে রয়েছেন কিন্তু ঈগল চক্ষু একাগ্রতার সাথে বক্তার উপর নিবদ্ধ। আমাদের পিছনে গোমেস, ম্যানুয়েল আর অন্যান্য সবাই।

বলাই বাহুল্য যে পাহাড়ে ওঠায় দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও গতবারে আমি সরঞ্জামের অভাবে পুরো উঠতে পারিনি। কিন্তু এবার তৈরি হয়ে এসেছি। আমি হলপ করে বলতে পারি যে ওই পিরামিডের মত পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে এখন আমার কোন অসুবিধা হবার কথা নয়। কিন্তু মূল মালভূমির সাথে যোগাযোগ না থাকলে এই পথে উপরে পৌঁছা অহেতুক। পুব দিকে ছয় মাইল পর্যন্ত আমি ঘুরে দেখেছি, উপরে ওঠার কোন পথ নেই। এখন করণীয় কি?

সেক্ষেত্রে আমাদের সামনে একটাই যুক্তিসঙ্গত পথ খোলা আছে, বললেন সামারলী। আগেরবার আপনি যখন পুব দিকে দেখেছেন এবার আমাদের পশ্চিম দিকে খোঁজ করে দেখা উচিত।

ঠিক, বলে উঠলেন জন। এই মালভূমিটা খুব বড় না হবারই সম্ভাবনা। আমরা এর চারপাশে একটা চক্কর দিয়ে দেখতে পারি। কোন সহজ পথ না পেলেও ক্ষতি নেই, যেখান থেকে রওনা হব আবার সেখানেই ফেরত আসব আমরা।

এই ছেলেকে আমি আগেই বুঝিয়ে বলেছি, বললেন চ্যালেঞ্জার। আমাকে বছর দশেকের স্কুলের ছাত্র হিসাবে গণ্য করা যেন তার একটা অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে। সহজ রাস্তা থাকা একেবারেই অসম্ভব, ওঠার সহজ রাস্তা থাকলে সেই পথে ওরাও সহজেই নেমে আসতে পারত।

তবে এটা ঠিক যে দক্ষ পর্বতারোহীর পক্ষে হয়তো কোন কোন জায়গায় উপরে চড়া সম্ভব হতে পারে। এমন জায়গা অন্তত একটা আছে নিশ্চয়ই। বিশাল ভারী কোন জন্তুর পক্ষে হয়তো সেই পথ দিয়ে নিচে নামা অসম্ভব।

কথাটা কি প্রমাণ ছাড়া আন্দাজে বলা হলো না? সামারলী কঠোর প্রতিবাদ করলেন। আপনার পাহাড়ের মত উঁচু জমি আমি স্বীকার করে নিতে রাজি আছি, কেননা আমি তা নিজে দেখেছি। কিন্তু তার উপরে প্রাণীর অস্তিত্ব আছে এটা আমি মানতে রাজি নই।

আপনি মানেন কি মানেন না সেটা নিতান্তই অবান্তর বিষয়। তবে লাল পাহাড়টা যে আপনার মগজে একটু স্থান করে নিতে পেরেছে তা জেনে খুশি হলাম। বলে উপরের দিকে চেয়ে পাহাড়টা দেখলেন চ্যালেঞ্জার। হঠাৎ সবাইকে অবাক করে দিয়ে তড়াক করে লাফিয়ে পাথর থেকে নেমে তিনি সামারলীর ঘাড়ে ধরে চিবুকটা ঠেলে উপরের দিকে চাইতে বাধ্য করলেন। এবার, স্যার! চিৎকার করে বললেন চ্যালেঞ্জার, এবার তো বিশ্বাস করবেন যে উপরে জীবজন্তু আছে?

উপরের সবুজ লতাপাতার ভিতর থেকে একটা কালো চকচকে বস্তু বেরিয়ে এল। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বাইরে ঝুলে রইল কিছুক্ষণ। দেখলাম একটা বিরাট সাপ, মাথাটা কোদালের মত চ্যাপ্টা। মিনিট খানেক একে বেঁকে মাথার উপর নড়াচড়া করল, সকালের রোদে ঝিলিক দিয়ে উঠল সাপটার মসৃণ তেলতেলে দেহ, একটু পরেই পিছু হটে অদৃশ্য হয়ে গেল ওটা।

সামারলী এতই বিস্মিত আর অভিভূত হয়ে দেখলেন দৃশ্যটা যে চ্যালেঞ্জারের অশোভন আচরণের প্রতিবাদ করতেও ভুলে গেলেন তিনি। সাপটা অদৃশ্য হতেই নিজেকে ছাড়িয়ে কাপড় জামা একটু ঠিকঠাক করে নিয়ে স্ব-সত্তায় ফিরে এলেন তিনি।

প্রফেসর চ্যালেঞ্জার, আপনার কিছু বক্তব্য থাকলে সেটা শুধু মুখে বললেই আমি খুশি হব। একটা পাথুরে পাইথনের আবির্ভাবেই এভাবে আমার থুতনি ঠেসে ধরার কোন অধিকার আপনার নেই।

কিন্তু এখন তো স্বীকার করবেন যে উপরে জীবজন্তু বাস করে? বিজয়ী কণ্ঠে বললেন চ্যালেঞ্জার। আমার মতে এই প্রদর্শনীর পর আর সময় নষ্ট না করে ওপরে ওঠার পথের খোঁজে এক্ষুণি আমাদের পশ্চিম দিকে রওনা হয়ে যাওয়া উচিত।

খাড়ির নিচে জমি পাথরে ভর্তি আর ভাঙাচোরা, তাই আমাদের অগ্রগতি খুবই ধীর আর কঠিন হলো। হঠাৎ আরেকটা জিনিস আবিষ্কারে আমাদের মন খুশিতে ভরে উঠল। এখানে আমাদের আগেও কেউ ক্যাম্প করেছিল। কয়েকটা খালি মাংসের টিন পড়ে রয়েছে, টিনগুলো শিকাগোতে তৈরি। একটা খালি বোতল-লেবেলে লেখা, ব্র্যান্ডি একটা ভাঙা টিন খোলার যন্ত্র ইত্যাদি আরও অনেক কিছুর সাথে আমরা পেলাম একটা দুমড়ানো খবরের কাগজ। নামটা পড়তে পারলাম শিকাগো ডেমোক্র্যাট, কিন্তু তারিখ পড়া গেল না।

এদিকে আমি আসিনি, বললেন চ্যালেঞ্জার, এগুলো নিশ্চয়ই মেপল হোয়াইটের পরিত্যক্ত জিনিস হবে।

লর্ড জন আগ্রহ ভরে একটা গাছের দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে থেকে বললেন, ম্যালোন, দেখ তো এটা বোধ হয় কোন চিহ্ন।

একটা কাঠের টুকরো পেরেক দিয়ে গাছের গায়ে লাগানো রয়েছে, পশ্চিম দিকে নির্দেশ করে।

অবশ্যই এটা পথ নির্দেশের চিহ্ন, বলে উঠলেন চ্যালেঞ্জার। সে চেয়েছিল যে আর কেউ যদি কোনদিন এই পথে আসে তবে যেন জানতে পারে কোন্ পথে গিয়েছিল মেপল। আমার মনে হয় সামনে আমরা আরও চিহ্ন দেখতে পাব।

সত্যিই তাই। কিন্তু বিষয়টা খুবই অপ্রত্যাশিত আর মর্মান্তিক। এখানেও বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে বেত গাছ জন্মেছে। আমরা যে বেত বন পার হয়ে এসেছি সেই রকমই কিন্তু আরও হালকা। গাছগুলোর ডগা বেশ চোখা আর প্রায় বিশ ফুট লম্বা-শক্তও। এক একটা বর্শার মত দাঁড়িয়ে আছে। পাশ দিয়ে যাবার সময়ে সাদা কি যেন একটা চোখে পড়ল আমার। কাছে গিয়ে বেতের ফাঁক দিয়ে মাথা গলিয়ে দেখলাম সামনে পড়ে রয়েছে চামড়া-মাংসহীন একটা মানুষের মাথার খুলি। অদূরেই বাকি কঙ্কালটাও পড়ে আছে, মাথাটা কেমন করে দেহ থেকে আলাদা হয়ে ঝোপের ধারে চলে এসেছে।

ইন্ডিয়ানদের বড় বড় ছুরি দিয়ে কয়েক কোপ দিতেই পরিষ্কার হয়ে গেল জায়গাটা। জীর্ণ কয়েক টুকরো কাপড় এখনও চেনা যায়, বুট জোড়া রয়েছে পায়ের হাড়ের উপর। স্পষ্ট বোঝা যায় মৃত লোকটি সাদা চামড়াধারী ছিল। নিউ ইয়র্কের হাডসন কোম্পানীর তৈরি একটা সোনার ঘড়ি আর চেনের সাথে আটকানো একটা কলম পড়ে রয়েছে পাশেই। একটা রূপার সিগারেট কেসও পাওয়া গেল, কেসের গায়ে এ. ই. এস. থেকে জে. সি, এই কথা কটা খোদাই করা। রূপার কেসের অবস্থা দেখে মনে হলো গত কয়েক বছরের মধ্যে ঘটে থাকবে এই দুর্ঘটনা।

লোকটা কে হতে পারে? জিজ্ঞেস করলেন জন। বেচারার শরীরের প্রায় প্রত্যেকটা হাড়ই ভাঙা।

ভাঙা পাঁজরের ভিতর দিয়ে বেত গাছ জন্মেছে, মন্তব্য করলেন সামারলী। যদিও বেত গাছ খুব তাড়াতাড়ি বাড়ে, তবু যতদিন দেহটা এখানে আছে ততদিনে বিশ ফুট বেড়েছে, এটা অবিশ্বাস্য।

লোকটার পরিচয় সম্পর্কে আমার কোনো সন্দেহ নেই। পারাতে যদিও কেউ মেপল হোয়াইট সম্বন্ধে কিছু বলতে পারেনি, রোজারিওতে আমি খবর পেয়েছিলাম যে মেপলের সাথে একজন আমেরিকানও ছিলেন। নাম জেমস কোলভার। মেপলের স্কেচ বইটাতেও একটা ছবি আছে ওঁর। জেমস কোলভারেরই দেহাবশিষ্ট খুঁজে পেয়েছি আমরা, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

কিভাবে মৃত্যু বরণ করেছেন তাও সুস্পষ্ট, বললেন জন, নিশ্চয়ই উপর থেকে তাকে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিল বা তিনি পড়ে গিয়েছিলেন। এত উপর থেকে না পড়লে তার হাড়ও ভাঙত না আর বেতের ঝোপে শূলবিদ্ধও হতেন না।

ভাঙা হাড়গুলোর সামনে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলাম। জনের কথাটা যে কত সত্যি তা উপলব্ধি করলাম সবাই। সন্দেহ নেই তিনি উপর থেকেই পড়েছিলেন, কিন্তু কথা হচ্ছে সেটা হঠাৎ দুর্ঘটনা বশত পা ফস্কে নাকি তাকে…? নানা অশুভ চিন্তা এসে মাথায় ভিড় করল অচেনা অজানা জায়গাটাকে ঘিরে।

কোন কথা না বলে চুপচাপ পাহাড়ের গা ঘেঁষে এগিয়ে গেলাম আমরা। সবখানেই একই রকম খাড়া ভাবে উঠে গেছে পাহাড়। দক্ষিণ মেরুর বিশাল হিমবাহের মতই যেন সোজা উপরে উঠেছে।

পাঁচ মাইল ঘোরার পরেও কোন ফাটল চোখে পড়ল না। হঠাৎ নতুন আশার সঞ্চার হলো আমাদের মনে। বৃষ্টিতে ভেজে না এমন এক জায়গায় পাহাড়ের গায়ে খড়িমাটি দিয়ে একটা তীর চিহ্ন আঁকা রয়েছে, তীরের মাথা পশ্চিম দিকে।

মেপল হোয়াইটের নির্দেশ, বলে উঠলেন চ্যালেঞ্জার। সাদা চক ব্যবহার করেছিল বলেই ওর বাক্সের রঙিন চকগুলো আস্ত ছিল। কিন্তু সাদাটা ছিল ক্ষয়ে যাওয়া, ছোট্ট।

ঘটনাক্রমে প্রমাণ হচ্ছে যে তিনি এই পথেই এগিয়েছিলেন, বললেন সামারলী। আমাদেরও এই পথই অনুসরণ করে পশ্চিমে যাওয়া উচিত হবে।

আমরা আরও প্রায় পাঁচ মাইল এগিয়ে গেলাম। আরও একটা তীর চিহ্ন দখতে পেলাম। নির্দেশ অনুযায়ী লক্ষ্য করতে করতে পাহাড়ের গায়ে এই প্রথম একটা ফাটল নজরে পড়ল। ফাটলের কাছে গিয়ে ভিতরে ঢুকতেই দেখলাম আরও একটা চিহ্ন। এবারের সঙ্কেতটা বেঁকে কিছুটা উপরে উঠে গেছে, মনে হয় যেন মাটি কে একটু উপরে কোন একটা জায়গা নির্দেশ করছে।

নিচ থেকে সরু একফালি নীল আকাশ দেখা যাচ্ছে, সামান্য আলো কোন রকমে ঢুকছে; আধো আলো আধো ছায়া, দুপাশে বিশাল পাথরের দেয়াল।

গত কয়েক ঘণ্টা ধরে আমাদের পেটে কিছুই পড়েনি। কিন্তু সবাই এমন উত্তেজনা বোধ করছি যে এই মুহূর্তে আর আমাদের পক্ষে ক্ষান্ত দেয়া সম্ভব নয়।

ইন্ডিয়ানদের ক্যাম্প খাটানোর কাজে লাগিয়ে দিয়ে আমরা চার জন ভিতরে ঢুকলাম, জোসেফ আর ম্যানুয়েলও এল আমাদের পিছু পিছু।

সরু পথ ধরে এগুচ্ছি। মুখের কাছে প্রায় চল্লিশ ফুট চওড়া হলেও দ্রুত সরু হয়ে এল পথটা। ছোট হতে হতে একটা সূক্ষ্ম কোণে মিলে শেষ হলো। পাথর এত মসৃণ আর এমন খাড়া ভাবে ওপরে উঠেছে যে কোন মানুষের পক্ষেই সেখান দিয়ে বেয়ে ওঠা সম্ভভ নয়। ফিরে চললাম আমরা। গিরিখাতটা মাত্র সিকি মাইল মত ভেতরে ঢুকেছে। আমরা যা খুঁজছিলাম তা হঠাৎ লর্ড জনের চোখে পড়ল। আমাদের মাথার বেশ উপরে আধো আলো আধো ছায়ায় দেখা গেল অপেক্ষাকৃত অন্ধকার গোল মত একটা জায়গা। হয়তো কোন গুহার মুখ।

ওইখানে পাহাড়ের গোঁড়ায় অনেক আলগা পাথর পড়ে রয়েছে। সেগুলো জড়ো করে হাত পা দুই-ই চালিয়ে উপরে ওঠা খুব কঠিন হলো না। সেখানে পৌঁছে আমাদের সব সন্দেহ দূর হয়ে গেল। সত্যিই একটা গুহা, আর যেটা বড় কথা, খড়িমাটির দাগ রয়েছে গুহার গায়ে। এখান দিয়েই তাহলে উপরে উঠেছিলেন তারা।

একটা প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষ না করে এখন আর ক্যাম্পে ফেরা যায় না। রক্সটনের পিঠে ক্যানভাস ব্যাগের মধ্যে একটা টর্চ ছিল, সেটাই আমাদের একমাত্র আলো। টর্চের ছোট গোল আলোয় পথ দেখে এগিয়ে চললেন জন, আর আমরা সবাই সার বেঁধে চলেছি তার পিছনে।

পানিতে ক্ষয়ে তৈরি হয়েছে গুহাটা। দুই পাশের পাথর খুবই মসৃণ, মেঝেটা গোল গোল পাথরে, ভর্তি। গুহা যথেষ্ট বড়, একটু ঝুঁকে দাঁড়ালেই একজন মানুষ স্বচ্ছন্দে এটে যায়। চল্লিশ ফুট সোজা ভিতরে যাবার পর দেখলাম গুহাটা পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রী হয়ে উপরে উঠে গেছে। কিছুদূর গিয়ে আরও খাঁড়া উঠেছে, আমরা হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে চললাম। মেঝের আলগা পাথর মাঝে মাঝে গড়িয়ে পড়ছে নিচে।

হঠাৎ রক্সটনের উত্তেজিত গলা শোনা গেল, পথ বন্ধ।

সবাই তার পিছনে জড়ো হয়ে টর্চের আলোয় দেখলাম ভাঙ্গা বেল্ট পাথরে গুহার মুখটা বন্ধ হয়ে গেছে।

ছাদ ধসে পড়েছে।

বৃথাই চেষ্টা করলাম আমরা, কয়েকটা পাথর সরাতেই আরও বড় বড় পাথর গড়িয়ে পড়তে লাগল। আরও বড় আকারের পাথর যদি গড়িয়ে পড়ে তাহলে আমাদের পিষে ফেলবে। বোঝা গেল, এই পথ পরিষ্কার করে ওপরে ওঠার কোন আশা নেই। মেপল হোয়াইট যে পথ ধরে উঠেছিল সে পথ আর আমরা ব্যবহার করতে পারব না।

হতাশ মনে ফিরে চললাম। ছোট দলে জড়ো হলাম আমরা। যখন ফাটলের মুখ থেকে প্রায় চল্লিশ ফুট ভিতরে, হঠাৎ একটা বড় পাথর ভীষণ বেগে ছুটে গেল আমাদের পাশ দিয়ে। অল্পের জন্যে বেঁচে গেলাম আমরা। পাথরটা কোন দিক থেকে এল ঠিক ঠাহর করতে পারলাম না। জোসেফ আর ম্যানুয়েল তখনও গুহার মুখে, ওরা এসে জানাল যে পাথরটা ওদের পাশ দিয়ে এসেছে। তাহলে নিশ্চয়ই পাহাড়ের চূড়া থেকে পড়েছে ওটা।

উপরে তাকালাম, কোন নড়াচড়া নজরে পড়ল না আমাদের। সবুজ লতাপাতা গাছ সবই স্থির। এতে কোন সন্দেহ নেই যে পাথরটা আমাদের লক্ষ্য করেই ছোড়া হয়েছিল, ঘটনাটা মানুষের উপস্থিতিরই প্রমাণ দেয়। তবে কি হিংসাপরায়ণ জংলী মানুষের বাস আছে মালভূমির উপরে?

দ্রুত ফাটল থেকে বেরিয়ে এলাম আমরা। সবার মাথায় একই চিন্তা। এই নতুন পরিস্থিতি আমাদের অভিযানে কতখানি বাধার সৃষ্টি করবে? এখানে পাহাড়ের উচ্চতা কিছুটা কম। আর মালভূমির ধারটাও উত্তর দিকে বাঁক নিতে আরম্ভ করেছে। এটাকে যদি আমরা গোল বলে ধরে নেই তবে পরিসীমা খুব বেশি বড় হবে না। উপরে ওঠার সুবিধা না পেলেও কয়েক দিন পরেই আমরা যেখান থেকে শুরু করেছিলাম আবার সেখানে ফিরতে পারব।

একটা চিন্তা সবার মনেই খচ খচ করছে এমনিতেই প্রাকৃতিক বাধাহেতু উপরে ওঠা শক্ত কাজ, তার উপর আবার যদি আমাদের মানুষের বাধার সম্মুখীন হতে হয় তবে কাজটা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়বে। কিন্তু উপরের সুন্দর তাজা সবুজ ঝালরের দিকে চেয়ে, সবকিছু ভাল করে খতিয়ে না দেখে লন্ডনে ফেরার কথা আমরা কেউই ভাবতে পারলাম না।

প্রায় বাইশ মাইল হাঁটলাম সেদিন, কিন্তু ভাগ্য প্রসন্ন হলো না। নৌকা ছাড়ার পর থেকে হেঁটে ক্রমাগত উপরেই উঠেছি আমরা। ব্যারোমিটারে দেখা যাচ্ছে সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে তিন হাজার ফুট উঁচুতে উঠেছি। উচ্চতার কারণে তাপমাত্রা আর গাছ পালা, দুটোতেই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। পোকার দৌরাত্ম এখন অনেক কম। গ্রীষ্মমন্ডলের যে কোন দেশ ভ্রমণে পোকাই সাধারণত বড় বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

কিছু পাম আর অনেক ফার্ণ গাছ এখনও দেখা যাচ্ছে। আমাজন উপকূলের গাছ পিছনে ফেলে এসেছি আমরা। কনভলভিউলাস, কামনা ফুল আর বেগোনিয়া ফুলগুলো দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। বিদেশ বিভুইয়ে চেনা ফুল দেখলে দেশের জন্য মন কেমন করে। একটা লাল বেগোনিয়া আরও বেশি করে মনে করিয়ে দেয় স্ট্রাদামের একটা ভিলার কথা। জানালার উপর ঠিক এই রঙেরই ফুল রাখা আছে একটা ফুলদানীতে। ভাবপ্রবণ হয়ে পড়ছি আমি।

সেই সন্ধ্যায় লর্ড জন একটা অজুটি শিকার করলেন। জন্তুটা অনেকটা শুয়োরের মত দেখতে। অর্ধেক ইন্ডিয়ানদের দিয়ে বাকি অর্ধেক আমরা রোস্ট করলাম আমাদের খোলা আগুনের ওপর। বেশ একটু শীত শীত ভাব, তাই আমরা সবাই আগুন ঘিরে বসেছি। রাত হয়ে এল, আকাশে চাঁদ নেই, কিন্তু তারার আলোয় আর আমাদের আগুনের আলোতে কিছু কিছু এখনও দেখতে পাচ্ছি।

হঠাৎ রাতের আঁধারের ভিতর থেকে কি যেন বেরিয়ে এল। উড়োজাহাজের মত শোঁ শোঁ শব্দ তুলে নেমে এল ওটা। মুহূর্তের জন্যে দলের আমরা সবাই চামড়ার পাখার বিশাল চাদোয়ার নিচে ঢাকা পড়লাম। ক্ষণিকের জন্যে চোখে পড়ল একটা সাপের মত লম্বা গলা, ভীষণ ভয়ঙ্কর রক্তিম লোভাতুর চোখ। বিরাট ঠোঁট হাঁ করে কামড় দেয়ার সময়ে দেখলাম ভিতরে দুই সারি ধারাল দাঁত।

পরমুহূর্তেই দূরে চলে গেল ওটা, দেখলাম সেই সাথে আমাদের খাবারও অদৃশ্য হয়েছে। একটা বিরাট কালো ছায়া অন্তত বিশ ফুট চওড়া, ডানা ঝাপটে উপরে উঠে গেল; তারপর মালভূমির ওপর দিয়ে দৃষ্টির বাইরে চলে গেল। আমরা হতবুদ্ধি হয়ে বসে রইলাম।

সামারলীই প্রথম স্তব্ধতা ভাঙলেন, প্রফেসর চ্যালেঞ্জার, ভাবাবেগে কাঁপছে তার গলা, ক্ষমা চেয়ে আপনাকে ছোট করতে চাই না, আমার ভুল ভেঙেছে। অতীতে যা বলেছি দয়া করে নিজ গুণে ক্ষমা করবেন।

সামারলী খুব সুন্দরভাবেই নিজেকে ব্যক্ত করলেন। সমগ্র অভিযানে এই প্রথমবারের মত দুই প্রফেসর হাত মেলালেন। টেরাড্যাকটিলকে চাক্ষুষ দেখে আমাদের একটা লাভ হলো। রাতের খাবার যে চুরি হয়ে গেল সেই শোক আমরা ভুলে গেলাম দুই প্রফেসরের এই মধুর মিলনে।

সত্যিই অদ্ভুত একটা অভিজ্ঞতা হলো আমার। মনে সামান্য যা একটু সন্দেহ ছিল তা এবার সম্পূর্ণ মুছে গেল। দৈনিক গেজেট সম্ভবত এই প্রথম ফলপ্রসূ কোন কাজে প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। তবে আরও ভাল করে অনুসন্ধান করে সব দেখেশুনে প্রমাণ সহ যদি লন্ডনে ফিরতে পারি, আর প্রফেসর চ্যালেঞ্জার যদি অনুমতি দেন, তবেই এটা কাগজে ছাপা সম্ভব হবে। প্রমাণ ছাড়া এমন কিছু লিখলে লোকে আমাকে নির্ঘাৎ সাংবাদিক মাঞ্চুসেন বলে ডাকবে।

কিন্তু প্রাগৈতিহাসিক জীবজন্তু মালভূমির উপর থাকলেও তারা সংখ্যায় খুব বেশি হবে না, কারণ পরবর্তী তিন দিনে আমরা আর কোন টেরাড্যাকটিল বা অন্য কোন প্রাণীর দেখা পাইনি। এই তিন দিনে আমরা কেবল বিরক্তিজনক অনুর্বর জমি পার হলাম কখনও পাথুরে শুকনো জমি কখনও বা বন মুরগীতে পরিপূর্ণ নোংরা জায়গা। উত্তর আর পুবদিক পার হতে গিয়ে এমন এক বাধা পড়ল যে পাহাড়ের নিচের বাইরে বেরিয়ে থাকা শক্ত ধারটা না থাকলে আমাদের ফিরেই আসতে হত। কয়েকবারই কোমর পর্যন্ত চর্বির মত এঁটেল কাদা দিয়ে চলতে হলো। তার ওপর আরেক বিপদ, দেখা গেল জায়গাটা জারাকাকা সাপের বংশবৃদ্ধির অতি প্রিয় স্থান। দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে বিষধর আর আক্রমণাত্মক সাপ হচ্ছে এই জারাকাকা। নলখাগড়ার ভিতর থেকে একেবেঁকে বেরিয়ে এসে সাপগুলো বারবার আক্রমণ করতে লাগল। সর্বক্ষণ বন্দুক নিয়ে তৈরি থেকে নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষা করলাম আমরা।

একটা ছোট ডোবা পড়ল পথে। এক ধরনের সবজ শৈবালে ভর্তি, সেটার পানির রঙও সবুজ হয়ে রয়েছে। এখানকার ঘটনা আমার চিরদিন দুঃস্বপ্নের মত মনে থাকবে। এই ডোবাটা ওই সাপের বিশেষ প্রিয় জায়গা হবে হয়তো; আমাদের দেখার সঙ্গে সঙ্গে ডোবার ঢালগুলো জীবন্ত হয়ে উঠল, হাজার হাজার সাপ কিলবিল করে ছুটে আসছে আমাদের দিকে। জারাকাকা সাপের স্বভাবই হচ্ছে যে দেখা মাত্র ওরা আক্রমণ করবে। আর এতগুলোকে গুলি করে মারাও অসম্ভব।

ঝেড়ে দৌড় দিলাম। অনেক দূর গিয়ে ক্ষণিকের জন্যে পিছনে তাকিয়ে দেখলাম নলখাগড়ার ভিতর থেকে সাপগুলো একবার মাথা তুলছে আবার নামিয়ে নিচ্ছে। যতক্ষণ দমে কুলাল উর্ধ্বশ্বাসে ছুটলাম আমরা।

এদিককার পাহাড়ে এখন সেই লালচে রঙের বদলে তামাটে চকোলেটের মত রঙ ধরেছে। গাছও এদিকে কম আর বেশ দূরে দূরে। তবে এক একটা গাছ প্রায় তিন চারশো ফুট উঁচু। কিন্তু এত ঘুরেও কোথাও উপরে ওঠার পথ খুঁজে পেলাম না। বরং আমরা প্রথম যেখান থেকে রওনা হয়েছিলাম সেদিকের চেয়ে এদিকে উপরে ওঠা আরও বেশি কঠিন।

আলোচনার মাঝে আমি বলে উঠলাম, বৃষ্টির পানি নিশ্চয়ই কোন না কোন পথে নিচে নামে। পাথরের মধ্যে অবশ্যই কোথাও সুরঙ্গ আছে।

সস্নেহে আমার পিঠ চাপড়ে দিয়ে চ্যালেঞ্জার বললেন, মাঝে মধ্যে ছেলেটার মাথা খুলে যায়।

বৃষ্টির পানি সরতেই হবে কোথাও, নিজের যুক্তিতে অটল রইলাম আমি।

কঠিন বাস্তববাদী এই ম্যালোন, কিন্তু নিজেই তো ঘুরে দেখে প্রমাণ পেলে যে পানি বের হওয়ার কোন পথ নেই পাথরের ভিতরে, তাই না?

তাহলে পানি যায় কোথায়?

আমি মনে করি আমরা যুক্তিসঙ্গত ভাবেই ধরে নিতে পারি যে পানি যখন বাইরে আসছে না তখন ভিতরের দিকেই কোথাও যায়।

তাহলে মাঝখানে কোন হ্রদ আছে? প্রশ্ন করলাম আমি।

সম্ভবত, জবাব দিলেন প্রফেসর।

সামারলী বললেন, পুরানো কোন আগ্নেয়গিরির গর্তই হয়তো এখন হ্রদে পরিণত হয়েছে। তারপর নিভে যাওয়া পাইপটা আবার ধরিয়ে নিয়ে বললেন, পুরো মালভূমিটাই আগ্নেয়শিলায় তৈরি। যে কোন কারণেই হোক জায়গাটা ভিতরের দিকে ঢালু আর মাঝখানে বিরাট একটা হ্রদ আছে বলে আমার ধারণা। হয়তো সেখান থেকেই মাটির তলা দিয়ে কোন যোগাযোগ আছে জারাকাকা আর অন্যান্য জলাভূমিগুলোর সাথে।

অথবা পানি বাষ্পীভূত হয়ে সমতা রক্ষা করছে, বললেন চ্যালেঞ্জার।

দুই প্রফেসর এমন সব গভীর বৈজ্ঞানিক যুক্তি তর্কের মধ্যে চলে গেলেন যে সেগুলোতে আমাদের পক্ষে দাঁত বসানো সম্ভব নয়।

ছয় দিনের দিন মালভূমি প্রদক্ষিণ শেষ হলো। আমরা আমাদের প্রথম ক্যাম্পে ফিরে এলাম। সেই বিচ্ছিন্ন পিরামিডের চুড়ার মত পাহাড়টার নিচেই আবার ক্যাম্প করলাম আমরা। নৈরাশ্য সবাইকে গ্রাস করেছে। অনুসন্ধানে কোন খুঁত নেই আমাদের। কিন্তু কোথাও এমন একটা জায়গা খুঁজে পাইনি যেখান দিয়ে কোন মানুষ উপরে ওঠার কথা আদৌ ভাবতে পারে।

শিকার করার কারণে আমাদের অনেক খাবার বেঁচেছে, কিন্তু তাতে অনির্দিষ্ট কাল চলবে না। আরও খাবারের প্রয়োজন একদিন হবেই। দুমাস পরে বৃষ্টি আরম্ভ হবে, তখন পানির তোড়ে ক্যাম্প ভেসে যাবে। পাহাড়টা মার্বেল পাথরের মত শক্ত, পাথর কেটে যে পথ তৈরি করব তাও অসম্ভব। বিষণ্ণ মনে আমরা কম্বলের উপর গা এলিয়ে দিলাম, কথা বলার মত মনের অবস্থা কারোই নেই ঘুমানোর আগে চ্যালেঞ্জারকে শুভরাত্রি জানিয়ে কোন সাড়া পেলাম না, একটা পাথরের ওপর বসে গভীর চিন্তায় মগ্ন তিনি।

কিন্তু সকালে চ্যালেঞ্জারের সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ দেখলাম। তৃপ্তি আর আত্মপ্রশংসার ভাব তার সারা মুখে। হাত দুটো সামনে জ্যাকেটের উপর রেখে তিনি। ভঙ্গি দেখে মনে হয় অবসর সময়ে তিনি ট্রাফালগার স্কোয়ারের মূর্তিটার জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে থাকেন।

পেয়েছি! বললেন চ্যালেঞ্জার। তাঁর কুচকুচে কালো দাড়ির ভিতর দিয়ে ঝকঝকে সাদা দাঁতগুলো হেসে উঠল। আপনারা আমাকে অভিনন্দন জানাতে পারেন, আমরা সবাই সবাইকে অভিনন্দন জানাতে পারি; সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে।

তাহলে আপনি উপরে ওঠার পথ খুঁজে পেয়েছেন? সোৎসাহে জিজ্ঞেস করলেন জন।

আমার তো তাই মনে হয়, তিনি জবাব দিলেন।

কোন পথে? আমি জানতে চাইলাম।

জবাবে পিরামিডের মত বিচ্ছিন্ন পাহাড়টার দিকে আঙ্গুল তুলে নির্দেশ করলেন চ্যালেঞ্জার।

অন্যদের কথা জানি না, ভাল করে ওটার দিকে তাকিয়ে আমি নিরাশ হলাম। প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের কথা মত আমরা ওটার উপরে উঠতে সক্ষম হলেও মালভূমির সাথে তার যে ব্যবধান সেটা পার হব কি ভাবে?

আমরা কিছুতেই পার হতে পারব না, মনের কথা বলেই ফেললাম আমি।

ঠিক আছে, অন্তত ওই পর্যন্ত তো পৌঁছাই, তারপরে প্রমাণ করা যাবে যে মানুষের মস্তিষ্ক অনেক কিছুই উদ্ভাবন করার ক্ষমতা রাখে।

নাস্তা খেয়ে আমরা প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের আনা পাহাড়ে চড়ার সরঞ্জামের বাক্স খুললাম। ওটা থেকে বের হলো দেড়শো ফুট নাইলনের দড়ি, গজাল, খিল আরও অনেক কিছু।

জন পাহাড়ে চড়ায় অভিজ্ঞ ব্যক্তি। সামারলীও কম বেশি অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তাঁর বিগত জীবনে। আর চ্যালেঞ্জারের তো কথাই নেই। একমাত্র আমিই অনভিজ্ঞ। আমাকে সম্পূর্ণ দৈহিক শক্তি আর প্রাণ-প্রাচুর্যের উপর নির্ভর করতে হবে।

যত কঠিন মনে করেছিলাম ঠিক ততটা কঠিন হলো না উপরে চড়া। যদিও কোন কোন মুহূর্তে ভয়ে আমার মাথার চুল দাঁড়িয়ে গিয়েছিল তবু প্রথম অর্ধেক বেশ সহজেই উঠলাম আমরা। কিন্তু পরের অর্ধেক পাহাড় আরও খাঁড়া হতে হতে একেবারে সোজা ওপরে উঠেছে। আমরা কোন মতে হাত পায়ের আঙ্গুল পাথরের খাঁজে ঢুকিয়ে লটকে রইলাম। আমার আর সামারলীর পক্ষে উপর পর্যন্ত পৌঁছানো একেবারেই অসম্ভব হত কিন্তু চ্যালেঞ্জার উপরে পৌঁছে একটা গাছের গুড়ির সাথে শক্ত করে দড়ি বেঁধে নিচে ফেললেন। আমাদের পক্ষে দড়ি বেয়ে ওঠা অনেকটা সহজ হয়ে গেল। উপরে উঠে দেখলাম পঁচিশ ফুট লম্বা, পঁচিশ ফুট চওড়া এক সমতল চুড়ার ওপর দাঁড়িয়ে আছি।

দম নিয়ে ফিরে তাকাতেই দেখলাম আশ্চর্য সুন্দর দৃশ্য। ব্রাজিলের বিশাল বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি বিছিয়ে রয়েছে আমার চোখের সামনে। প্রথমে লম্বা ফার্ণ গাছ আর পাথরে পূর্ণ মাঝামাঝি জায়গায় ঘোড়ার পিঠের মত পাহাড়ের ঢিবি, ওপাশে বেতের সবুজ হলুদ রঙ, তারপর থেকে গাছপালা ঘন হয়েছে। যতদূর চোখ যায় কেবল সবুজ আর সবুজ। আকাশের সাথে গিয়ে মিশেছে অনেক অনেক দূরে।

প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের একটা বলিষ্ঠ হাত যখন আমার কাঁধে পড়ল আমি। তখনও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সুধা পান করছি। এই পথে, থোকা, বললেন তিনি, পিছু দেখতে নেই, সব সময়ে সামনের গৌরবময় ভবিষ্যৎ লক্ষ্যের দিকে চাইতে হবে আমাদের।

ঘুরেই লক্ষ্য করলাম মালভূমির উচ্চতা ঠিক, এই পাহাড়টারই সমান। সবুজ ঝোপঝাড় আর লম্বা উঁচু গাছগুলো এত কাছে যে মাত্র এই সামান্য দূরত্বটুকুই পার হওয়া যে কত অসম্ভব তা চট করে উপলব্ধি করা যায় না। ফাঁকটা আন্দাজ চল্লিশ ফুট হবে। তবে চল্লিশ ফুট না হয়ে চল্লিশ মাইল হলেও কথা একই হত; পার হবার কোন উপায় নেই। এক হাতে একটা গাছের গোড়া ধরে ঝুঁকে নিচের দিকে চাইলাম; দেখলাম অনেক নিচে ছোট ছোট আকৃতির ইন্ডিয়ানরা সব উপরের দিকে চেয়ে রয়েছে।

আশ্চর্য! সামারলীর স্বর শোনা গেল। ঘুরে দেখলাম খুব মনোযোগ দিয়ে সেই বড় গাছটা পরীক্ষা করছেন তিনি।

মসৃণ বাকল, পাঁজরের মত শিরাওয়ালা ছোট ছোট পাতা, আমার খুবই পরিচিত। আরে, এটা তো একটা বীচ গাছ, চেঁচিয়ে বললাম আমি।

ঠিক তাই, বললেন সামারলী, বিদেশ বিভঁুই-এ দেশী গাছ!

মহামান্য জনাব, শুধু দেশীই নয়, নাটকীয় ভঙ্গিতে আরম্ভ করলেন চ্যালেঞ্জার, অকৃত্রিম বন্ধুও বটে। এটাই আমাদের পথের নির্দেশ দেবে।

পুল! একটা পুল! উত্তেজিত ভাবে বলে উঠলেন জন।

ঠিক বন্ধুগণ—একটা পুল। গতরাতে আমাদের এই সমস্যা নিয়ে পুরো একঘণ্টা চিন্তা করেছি আমি। আমার চেষ্টা বিফলে যায়নি। বলে দাড়িতে একটু হাত বুলিয়ে নিলেন চ্যালেঞ্জার। এই তরুণ সঙ্গীকে আমি আগেই বলেছি যে নিরুপায় অবস্থায় পড়লেই জি. ই. সি-র মাথা খোলে ভাল।

সত্যিই এক চমৎকার উপায় বের করেছেন চ্যালেঞ্জার। গাছটা প্রায় ষাট ফুট উঁচু। পড়ার সময় কেবল ঠিক দিকে পড়লেই হয়। চ্যালেঞ্জার পাহাড়ে ওঠার সময়ে কুঠারটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়েছিলেন, এবার সেটা আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন তিনি। বললেন, এই ছেলের পেশী আর শক্তি দুইই আছে। এই কাজের জন্যে ম্যালোনই সবচেয়ে উপযুক্ত। তবে একটা অনুরোধ, নিজের ভাবনা চিন্তা মতামত বাদ দিয়ে অক্ষরে অক্ষরে আমার নির্দেশ মত কাজ করতে হবে তোমাকে।

তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী গাছটা এমন ভাবে কাটলাম যেন ঠিক জায়গা মত পড়ে। স্বাভাবিক ভাবেই ওদিকে একটু ঝুঁকে ছিল গাছটা, জন আর আমি পালা করে কেটে একঘন্টা কঠোর পরিশ্রম করে, মট মট শব্দে গাছটা ফেললাম। ওটা সশব্দে পড়ল গিয়ে মালভূমির ঝোপগুলোর উপর। ঝাঁকির চোটে কাটা গুড়ির দিকটা খাদের একেবারে কিনারায় চলে এল। মুহূর্তের জন্যে সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলাম, কিন্তু কিনারার কয়েক ইঞ্চির মধ্যে এসে স্থির হয়ে থেমে গেল গাছটা। অজানাকে জানার জন্যে আমাদের সেতু তৈরি হলো।

কারও মুখে রা নেই, একে একে সবাই প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের সাথে নীরবে হাত মেলালাম আমরা। প্রফেসর তাঁর খড়ের হ্যাটটা একটু পিছন দিকে ঠেলে দিয়ে কুর্নিশের কায়দায় ঝুকে প্রত্যেককে সম্মান দেখালেন।

আমিই প্রথম পার হয়ে অজানা রাজ্যে পা রাখব, বললেন চ্যালেঞ্জার। এটা আমার ন্যায্য দাবি।

তিনি পুলের দিকে এগিয়ে যেতেই জন তার কোটের উপর হাত রেখে বাধা দিলেন, বললেন, আমি দুঃখিত, প্রফেসর, আমি এতে অনুমতি দিতে পারছি না।

অনুমতি? মাথাটা পিছন দিকে আর দাড়ি সামনের দিকে এগিয়ে এল তার উদ্ধত ভঙ্গিতে।

বিজ্ঞানের ব্যাপারে আমি সবসময়ে আপনার নেতৃত্ব নির্দ্বিধায় মেনে এসে