সোনার বালা – সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

সোনার বালা - সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

এব্লেড হ্যাজ ফোর স্লাইডস। তিন দিন মোটে কামিয়েছে। তার মানে একটা দিক এখনও অব্যবহৃত। কিন্তু কোন দিকটা? রোজই মনে রাখার চেষ্টা করে। রোজই ভুলে যায়। সামান্য একটা হিসেব। এক, দুই, তিন, চার। তাও খেয়াল থাকে না! কী যে তোর মাথা বন্ধু। সকাল ন টার সাইরেন অনেকক্ষণ বেজে গেছে। সাত মাইল দূরে অফিস। অনেক বাধা ঠেলে সাড়ে দশটার মধ্যে যেমন করেই হোক পৌঁছোতে হবে। এদিকে চারটে আসল কাজ বাকি। ক্ষৌরী খাজানা নাহানা খানা পরনা। প্রথম কাজটাই আটকে গেছে। ব্লেডের হিসেব গোলমাল করে ফেলেছে।

সকাল থেকেই আজ সব ট্রেন লেটে চলেছে। গতকাল বঙ্কিমের এক সম্বন্ধীর বিয়ে ছিল। বিয়ে। হয়েই ছিল। গতকাল গেছে বউভাত। একপেট আবর্জনা নিয়ে শুতে শুতেই একটা বেজেছে। সারা রাত প্রায় ঘুম নেই। জঠরে বিভিন্ন সুখাদ্যের লাঠালাঠি। পরিপাক যন্ত্রের নির্দেশ কেউই মানতে চাইছে না। আটখণ্ড মাছ জোড়া লেগে বিশাল কালবোশ হয়ে এপাশ থেকে ওপাশ খেলে খেলে বেড়াতে চাইছে। কয়েক টুকরো মাংস বিগত জীবনের শোক ভুলতে পারছে না। মাঝে। মাঝে ব্যা ব্যা করে উঠছে। ফ্রায়েড রাইস সমস্ত স্নেহ বস্তু ত্যাগ করে কুইক পলিউশানের দায়ে এক কোণে আলো চাল মেরে বসে আছে; এই হট্টগোলে দাশ বেচারা পশু চর্বির ভার মুক্ত করে সমস্যা আরও সাংঘাতিক করে তুলেছে। গোটা কতক কমলাভোগ ক্রিকেট বলের মতো কেবলই বোল্ড আউট করার চেষ্টা করছে। পাকযন্ত্র হাল ছেড়ে দিয়ে বসে আছে। আমি হলুম গিয়ে ঝোলভাতের যন্ত্র, তুমি ঠুসেছ মোগলাই খানা। আই হ্যাভ নো রেসপনসিবিলিটি, তোমার মাল তুমি বুঝে নাও। মাঝরাতে বিনিদ্র বঙ্কিম জোয়ানের আরক খেতে খেতে সার বুঝেছে, অনুরোধে হয়তো পেঁকি গেলা যায় কিন্তু হজম করা যায় না। আর একটা জিনিস বুঝেছে, আড়াইশো টাকা। এখনও এই বাজারেও খেয়ে উশুল করা যায় না।

কড়কড়ে টু হান্ড্রেড অ্যান্ড ফিফটি রুপিজ। সামান্য একটি সোনার বালা। নতুন বউয়ের গোল গোল শ্যামলা হাতে মানিয়েছে জবর। ওমা দেখি দেখি বড় জামাই কী দিয়েছে? বাঃ বেশ দিয়েছে। এই বাজারে বেশ দিয়েছে। মেয়েমহলের প্রশংসায় বঙ্কিমের বুক দশ হাত না হলেও বঙ্কিমের স্ত্রী প্রতিমার চলার ঠমক খুলেছে। কোমরে কাপড় জড়িয়ে সে কী দেমাক! জ্যাল-জেলে শাড়ি নয়, অপাঠ্য বই নয়, ডিফেকটিভ টেবিলে ল্যাম্প নয়, প্ল্যাস্টার অফ প্যারিসের বিদঘুটে কোনও মূর্তি নয়, আস্ত একটা সোনার বালা ঝেড়ে সব শালাকে কুপোকাত করে দিয়েছে। অবশ্য এই বালা নিয়ে তার আগে বঙ্কিমের সঙ্গে অনেক চুলাচুলি হয়ে গেছে। তিন রাত দুজনে এক ঘরে ঘুমোয়নি। দুদিন নির্জলা উপবাস। সাতদিন কথা বন্ধ। বঙ্কিম বলার মধ্যে বলেছিল, একটা দুটো শালা-শালি হলে লোকে দামি কিছু দেওয়ার কথা ভাবতে পারে। মা ষষ্ঠীর কৃপায় সংখ্যা তো নেহাত কম নয়। আগের তিন শ্যালক আর এক শ্যালিকাকে সাড়ে তিন পয়সা সোনার কানের ঠিকরে দুল দিয়ে জামাইকৃত্য করেছে, তখন সোনার দাম কম ছিল, নিজের সংসার ছোট ছিল। এখন দুটোই বেড়েছে। অতএব বাড়াবাড়ি করাটা ঠিক হবে না। তা ছাড়া আরও দুজন লাইন দিয়ে আছে। বছর না ঘুরতেই টোপোর পরার জন্যে মুখিয়ে আছে। এদিকে শালাজরা একটি করে আন্ডা পাড়ছেন আর অন্নপ্রাশনের স্টেনলেস স্টিলের থালাবাটি কিনতে কিনতে বঙ্কিম ক্রমশই বোম মেরে যাচ্ছে। কাকে সামলাবে! বড়র মেয়ে হল, তো মেজো একটি ছেলে দিলেন। অমনি বড় কোমর বেঁধে লাগলেন ছেলের জন্যে। মেজো টেক্কা দিয়ে যাবে সহ্য হবে কেন? রেজাল্ট আবার মেয়ে। এদিকে সেজো সকলকে টেক্কা দিয়ে একসঙ্গে দুটি ছাড়লেন। প্রবল প্রতিযোগিতা। ঘরদোর বাড়ি উঠোন নবজাতকে ছয়লাপ। অনবরত চ্যাঁ ভ্যাঁ।

বঙ্কিম বলতে চেয়েছিল, সোনার এখন প্রচণ্ড দাম, একটা ভালো শাড়ি দিয়ে ছেড়ে দাও। তা কী করে হয়? এই ভাই আমার সবচে আদরের ভাই। ট্যাঁকে করে মানুষ করেছি। একটা ভারী কিছু না দিলে প্রেসটিজ থাকে না। আরে ম্যান তুমি এত রোজগার করছ? বিয়ে তো একবারই করে লোকে! এর পরের কাজ তো অনেক পরে। বঙ্কিম খুঁতখুঁত করে বলেছিল, তাহলে সেই পেটেন্ট দুল। তিন পয়সার সোনা। না না দুল নয়, দুল নয়। প্রতিমার ঘোরতর আপত্তি। দুল একঘেয়ে হয়ে গেছে। প্রতি কাজেই দুল গেছে। এবার অন্য কিছু।

অন্য কিছুটা কী? হিরের আংটি! বঙ্কিম খিচিয়ে উঠেছিল।

হিরের আংটি দেওয়ার মুরোদ আছে তোমার? প্রতিমা একটু মোচড় মেরে ছিল।

কেন নেই! তুমি চাইলেই আছে। বাড়িটা বেচে দিয়ে তোমার পেয়ারের ভাইয়ের বউয়ের আঙুলে হিরের আংটি তুলে দিই। বঙ্কিম ইস্যুটাকে আর একটু ঘোরালো করে তুলল; আমার বিয়েতে তোমার বাপের বাড়ি থেকে যা দিয়েছিল সবই তো প্রায় উশুল করে নিয়েছ আর গোটা বত্রিশ টাকা হয়তো পাওনা আছে।

এর পর প্রতিমা আর কথা বাড়ায়নি। মুখ তোলো াঁড়ি করে সংসারের কাজে লেগেছিল। বঙ্কিমও বিশেষ আমল দিতে চায়নি। তোমরা সব বিয়ে করে খাট, বালিশ, বিছানা, ফার্নিচারে বাড়ি ঠেসে ফেললে। মোটা মোটা বউ। মোটা মোটা নগদ। ভালো ভালো তত্ব। টেরিলিন, টেরিকটন, ঝকঝকে জুতো, চকচকে চেহারা। এদিকে বঙ্কিম বেচারার হাঁড়ির হাল। তার বেলায় এক কাঁদুনি, কে করবে? শ্বশুরমশাই গত হয়েছেন। তিনি থাকলে সবই হত। ছেলেরা যে যার সে তার। না। করলে জোর তো করা যায় না। প্রতিমার যুক্তি, তুমি ভিখিরি না কি? তুমি আমার রাজা। পরের ধনে পোদ্দারি করবে কেন? নিজের রোজগারে লড়ে যাও ম্যান।

খুব হিসেব হয়েছে। ব্লেডের যে-কোনও এক দিক ক্ষুরে চাপাও। গালে পড়লেই ধার বোঝা যাবে। বঙ্কিম আর হিসেবের ঝামেলায় যেতে চাইল না। কোন হিসেবটা সে শেষ পর্যন্ত রাখতে পেরেছে! মধ্য মাসেই মাইনের টাকা ফৌত। বাকি ক-টা দিন, এটা ধরে টান, ওটা ধরে টান। তখন সে। খেচর, ভূচর, জলচর। দাড়িতে একটা টান মেরেই বঙ্কিমের মালুম হল ব্লেডের হিসেব মেলেনি। হেঁ হেঁ বাবা, অতই সোজা এক চান্সে মিলে যাবে। জীবনে মেলেনি। আজ মিলবে! ছাত্রজীবনে একদিনের জন্যেও হাজার চেষ্টা করে সরল করর উত্তর শূন্য কিংবা এক হয়নি। সবসময় একটা বিদঘুটে ভগ্নাংশ পূর্ণ-চূর্ণ নিয়ে তলায় এসে থিতোত। দেখলেই চক্ষুস্থির। বঙ্কিমের শিক্ষকরা বলতেন, ছোকরার এলেম আছে। কোথা দিয়ে যে কী করে বসল। উত্তর দেখেছ। এক পূর্ণ দুশো তেত্রিশের নয় হাজার তিন; বলিহারি বাবা। শেষে বঙ্কিমের এক বন্ধু পথ বাতলে দিলে। ট্রাই। ইওর লাক। হয় শূন্য, না হয় এক। এক কাজ করবি। ধর, দুশো বত্রিশের পাঁচশো তেরো হয়েছে। ঘাবড়াও মাত। পাঁচশো তেরোর দুশো বত্রিশ দিয়ে গুণ করে দে। ইজিকোয়ালটু ওয়ান। উত্তর। যদি শূন্য না হয় ফুলমার্ক। আর যদি শূন্য করতে চাওয়া হয়েছে সেই সংখ্যাটাই মাইনাস করে দাও। শূন্য কি এক? এক কি শূন্য? এইটা ঠিক করার মধ্যেই একটু ফাটকাবাজি রয়ে গেল। ওটুকু রিস্ক তোমাকে নিতেই হবে। নো রিস্ক নো গেন।

ব্লেডটাকে আবার উলটে লাগাতে লাগাতে বঙ্কিম ভাবলে রিস্কটাই নিলুম সারা জীবন গেনটা ছাই হল কী! শূন্য আর একের ঘোরপ্যাঁচে পড়ে ফুলমার্ক আর ভাগ্যে জুটল না। গালের সাবান শুকিয়ে খুসকির মতো উড়তে শুরু করেছে। অন্যদিন আটটার মধ্যেই দ্বিতীয় পক্ষের চা এসে যায়। আজ প্রায় সাড়ে নটা বাজতে চলেছে। সম্বন্ধীর বিয়েতে বঙ্কিমের বাড়ির অবস্থা দেখলে মনে হবে মড়ক লেগেছে। সব কিছুই এলোমেলো। দেরিতে সব ঘুম থেকে উঠেছে। ঘরে ঘরে দোমড়ানো চটকানো বিছানা। প্রতিমার নীলাম্বরী আলনায় জড়ভট্টি। ব্লাউজ মাটিতে লুটোচ্ছে। উঁচু গোড়ালির জুতো যথাস্থানে নেই। সকালের শুড়িখানার মতো লন্ডভন্ড অবস্থা। শরীর যখন নিচ্ছে না বিয়েবাড়িতে নাচতে-কুঁদতে যাওয়া কেন? সকালে একবারই প্রতিমাকে খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। বাসী নায়িকার মতো চেহারা। চোখে অস্পষ্ট কাজল। মুখের এখানে-ওখানে প্রাচীন দেয়ালের মতো চটা ওঠা মেকআপ! পরিপাটি খোঁপা যেন থ্যাঁতলানো গোলাপের কুঁড়ি। উৎসবে ভোরের বউকে যে এত অশ্লীল দেখায়, বঙ্কিমের ধারণা ছিল না। ঠোঁটে আবার ফাটা ফাটা পানের রসের ছোপ। লাখ টাকা দিলেও ও ঠোঁট চুম্বনের অযোগ্য।

জুলপির কাছে ব্লেডের কোপ বসিয়ে বঙ্কিম নিজেকেই বললে, চায়ের সেকেন্ড এডিশানের আশা ছাড়ো মানিক। সকাল থেকেই তো দফায় দফায় ইন্টারভিউ। প্রতিবেশীদের, ভায়ের বউভাতের ফিরিস্তি দেবে না, চা তৈরির মতো একটা তুচ্ছ কাজে সময় নষ্ট করবে। ওঃ, খুব করেছে ভাই এই বাজারে! মাছ? এই চাকা চাকা দাগা। যত পারো খাও। এক হাজার কমলাভোগ এখনও ভাঁড়ারে গড়াগড়ি যাচ্ছে। সাত হাঁড়ি দই, হাত পড়েনি। হিসেব নেই তো! সব ভাইয়ের দিলই তো। হাওদাখানা!

তোমার মুখেই শুনলুম হাওদাখানা। বঙ্কুবাবুর বেলাতেই যত কৃপণতা। জামাইষষ্ঠীতে একবারই তোমার কোনও এক দিলদার ভাই একটা দিশী কাপড় কিনেছিল। কেনার সময় মনেই ছিল না বড়জামাই প্রমাণ সাইজের একটা লোক। কিনে নিয়ে এল একটা খোকা কাপড়। বহর বোধহয় আটত্রিশ ইঞ্চি লম্বা আটহাত, বড় জোর ন-হাত। বেহিসেবী ঠিকই। তবে জামাইদের ব্যাপারে অলওয়েজ অন দি মাইনাস সাইড। তবু প্রতিমা ভাইয়েদের ডিফেন্ড করে গেল। খাটো ঝুলই তো ভালো গো। কত কনসিডারেট। পাছে বোন বিধবা হয় সেই ভয়ে ছোট কাপড় দিয়েছে। বাসে-ট্রামে ওঠার সময় অসাবধানে পায়ে জড়িয়ে যাওয়ার নো চান্স! একেই বলে সেফটি ধুতি। বঙ্কিম বলেছিল, রোড সেফটি উইকে পরে বি-বা-দী বাগে সাদা দাগের ওপর দিয়ে হেলেদুলে রাস্তাপার হব, কী বলে?

দাড়িতে ব্লেডেতে যখন কিছুতেই বনিবনা হচ্ছেনা, প্রতিমা তখন দুধের সর ভাসা এক কাপ চা নিয়ে প্রবেশ করল। মেঝেতে থেবড়ে বসে বঙ্কিম দাড়িমুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছিল।

ধরো ধরো।

রাখো না।

নীচু হওয়ার কষ্টটাও মহিলা স্বীকার করতে চায় না। পারলে বঙ্কিমের চাঁদিতেই কাপটা বসিয়ে দিয়ে যায়! এমন কিছু ভুড়ি নেই। বয়সও তত নয় যে কোমরে আথ্রাইটিস হয়েছে বলে বিশ্বাস করতে হবে। হাপরের মতো একটা শব্দ করে প্রতিমা জলভরতি প্লাস্টিকের মগের পাশে চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল। একটু চা চলকে ডিশে পড়ল। বঙ্কিম একবার আড়চোখে তাকাল। চায়ের কাপ, জলের মগ, দাড়ি কামাবার বুরুশ। সেভিং ক্রিমের টিউব, চাকা, কৌটো, সেফটি রেজারের খাপ, ছোট তোয়ালে, ব্লেডের কাগজ, আর ফুটখানেক দূরে প্রতিমার ফুলো ফুলো পা। সায়ার ফ্রিল। পায়ের পাতায় জলের ছিটে। প্রতিমা অবাক হয়ে জিগ্যেস করলে, তুমি বেরোবে নাকি?

হুম।

না-ই বা বেরোলে আজ!

অফিসটা আমার মামার বাড়ি নয়। গলার নীচে থেকে ওপরের দিকে ব্লেড চালাতে চালাতে সংক্ষিপ্ত উত্তরে বঙ্কিম তার মনের ভাব জানিয়ে দিলে।

মামার বাড়ি নয় সে আমিও জানি। এমনি হাজার দিন কামাই করছ। আজকে যেতে হবে না। এই বলছিলে হজম হয়নি, রাতে ঘুম হয়নি। চানটান করে একটু শুয়ে পড়ো।

হজম হয়নি বলে চাকরিটা তো আর হজম করতে পারি না। চাকরি ইজ চাকরি। এর পর একবারেই শুইয়ে দেবে। তখন সংসার সামলাবে কে? তুমি না তোমার ভাইয়েরা?

ভাইয়েরা কোন দুঃখে সামলাবে! তাদের সংসার নেই? তোমার সংসার তুমি সামলাবে।

তবে আমার ব্যাপারে নাক গলাতে এসোনা দয়া করে।

সকাল থেকেই বাবুর মেজাজ একেবারে সপ্তমে। বাপ বললে শালা বলতে আসছে।

হ্যাঁ আসছে। যার ছত্রিশটা শালা তার গলা দিয়ে অষ্টপ্রহর হরিনামের মতো শালা শালাই। বেরোবে। বঙ্কিম উত্তেজনায় সাবান-মাখা বুরুশটা জলের মগের বদলে চায়ের কাপেই ডুবিয়ে দিলে। যাঃ শালা। চা-টাই গেল। সেই ফুলপড়ার মতো টাঙিয়ে থেকে থেকে যদিও এক কাপ ছ্যাকরা চা জুটল, কানের কাছে তোমার বকবকানির চোটে তা-ও গেল।

আমি আর করে দিতে পারব না। খেতে হয় ওই চা-ই খাবে না হয় ফেলে দেবে।:

সে আমি জানি। কাজের সময় কাজি, কাজ ফুরোলেই পাজি। যতদিন বালাটা আদায়ের প্রয়োজন ছিল, ততদিন না চাইতেই চা, না চাইতে জল। কাল সন্ধে থেকেই তোমার অন্যমূর্তি। সব শালাকেই আমার চেনা আছে শালা। চায়ের ভয় দেখিয়ো না। দোকান আছে, পয়সা ফেলব কাপ কাপ চা খাব, মিনিটে মিনিটে খাব। তোমার পরোয়া করি!

কে কার পরোয়া করে। আজকাল কেউ কারুর পরোয়া করে না বুঝলে দোস্ত। দোকানে শুধু চা-ই জুটবে অন্য কিছু জুটবে না?

সব জুটবে, সব জুটবে। পয়সা ফেললে সব জুটবে। মাসে একটা করে সোনার বালা ছাড়লে আরও অনেক কিছু জুটবে, বুঝেছ? মোনোপলির যুগ শেষ হয়ে গেছে।

তাই জোটাও। জুটিয়ে যে রাখোনি তা-ই বা কে জানছে। তোমার প্রাইভেট লাইফের খবর কতটুকু জানি? অফিস অফিস করে কেন এত পাগল? বুঝি না ভাববা? কাজ তো যা করো জানাই আছে! তুমি একদিন না গেলে অফিস একবারে উলটে যাবে না। ওই কাঁধকাটা, পেটকাটা, পিঠ কাটা মেয়েছেলের ধান্দা! সারাদিন বিনা পয়সার ফষ্টিনষ্টি!

হ্যাঁ, অফিসটা তো কুঞ্জবন, সেখানে সব রাধিকারী সেজেগুঁজে এই বুড়ো কেষ্টর জন্যে কমদতলায় বসে আছে। মোস্ট লাইবেলাস রিমার্ক। কোর্টে মানহানির মামলা ঠুকে দেওয়া যায়।

বুড়ো কেষ্টদেরই তো সবচে বেশি ভয়। খাচ্ছ মাল। ডুবে ডুবে জল খাও শিবের বাবাও টের পায় না।

বঙ্কিম সেফটি রেজার থেকে গম্ভীর মুখে ব্লেড খুলতে খুলতে বললে, প্লিজ, প্লিজ, মেছুনীদের মতো তর্ক কোরো না। বলা হয়ে গেছে, এখন আর আমার সঙ্গে নো রিলেশান। আবার অন্নপ্রাশন আসছে। ভয় নেই, তখন সংসারের ডালে বসে আবার তোমার কোকিল কণ্ঠ শোনা যাবে। তোমাকে আমার স্টাডি করা হয়ে গেছে। স্বার্থপরতা ইনকারনেট।

বালা, বালা করে দেখছি পাগল হয়ে যাবে। ঠিক আছে আজই আমি নতুন বউয়ের হাত থেকে বালা খুলে এনে তোমার নাকের ডগায় ছুড়ে ফেলে দেব। কঞ্জুস কাঁহাকা।

মুখ সামলে। ডোন্ট ফরগেট, আই অ্যাম ইওর হাজব্যান্ড। গুরুজন। তুমি হিন্দু নারী। পতি পরম গুরু।

সেরকম পতি হলে গুরু বলে মান্য করা যায়। তোমার মতো পতির পত্নী হয়েছি এই তোমার সাত পুরুষের ভাগ্য।

তাই নাকি? বেশ বুলি ফুটেছে তো! আর যে বাড়ির মেয়ে, কথাবার্তায় এর থেকে ভালো ছিরি অবশ্য এক্সপেক্ট করা যায় না। মোস্ট আনসিভিলাইজড রুট।

আমাকে বলছ বলো, খবরদার বাড়ি তুলবে না। বাড়ি তোলা মানেই বাপ তোলা। জেনেশুনেই তো বিয়ে করেছিলে। কে বলেছিল বিয়ে করতে, না করলেই পারতে।

তাই নাকি? মনে নেই, তোমার মা যখন হাতে ধরে কান্নাকাটি করেছিলেন, বাবা আমার মেয়েটাকে নাও, মেয়েটাকে নাও বড় ভালো মেয়ে, তোমাকে একটু ইয়েও করে।

মা-র বয়ে গেছে তোমার হাতে ধরতে, আমারও বয়ে গেছে তোমাকে ইয়ে করতে। কত ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, ব্যারিস্টার ছিল। আচ্ছা আচ্ছা সব ছেলে ছিল।

হ্যাঁ, হ্যাঁ জানা আছে। হাজার টাকায় ব্যারিস্টার জুটত?

হাজার কেন, দরকার হলে বাবা পঞ্চাশ হাজার খরচ করতেন। টাকার অভাব ছিল না কি?

ও, টাকার অভাব ছিল না? তাহলে আমার বেলায় দায়সারা করলেন কেন চাঁদু?

তোমার মতো বস্তুর জন্যে যে দাম দেওয়া উচিত তাই দিয়েছেন। প্রতিমা শেষ তোপটা দেগে দিয়ে উত্তরের অপেক্ষা না করেই ফরফর করে ঘর ছেড়ে চলে গেল। সাবান গোলা এককাপ চা নিয়ে ক্রেস্টফলন, বঙ্কিম ছড়ানো দাড়ি কামাবার সামগ্রীর মধ্যে কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে রইল। পেটে শ্বশুরবাড়ির বদহজমের মাল। মনে প্রতিমার খোঁচা। চিবুকে অস্পষ্ট দাড়ি খিচখিচ করছে। অন্যদিনের মতো ভেলভেট সফট হয়নি।

আয়নায় নিজের মুখের প্রতিফলন-এর দিকে বঙ্কিম ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। আয়নার মুখ যেন বলছে, হায় বঙ্কিম, কা তব কান্তা, কস্তে পুত্র, সংসারোহমতীব বিচিত্র কস্য ত্বং বা কৃত আয়ত। চোখের কোণে কালি পড়েছে বাপি, দৃষ্টি ক্রমশ সরে আসছে। আর কেন? জয়। শিব শম্ভু, উখার নে মকান লাগা দে তম্বু। চলো বেটা, গঙ্গা যমুনা তীর। আশার ছলনে ভুলি কী। ফল লভিলে মানিক! ছিলে এক, হয়েছ তিন। আর কিছুকাল পরে হবে চার, তারপর হয়তো পাঁচ। নিউমারিক্যালি তুমি বাড়তেই থাকবে। উত্তাপে বীজ তাড়াতাড়ি অঙ্কুরিত হয়। এখনও সময় আছে, বি কেয়ারফুল ম্যান।

কী ভাবে গুরু? আসল বঙ্কিম প্রশ্ন করল প্রতিফলিত বঙ্কিমকে।

তবে শোনো একটা কাহিনি। বরাহ অবতাররূপী নারায়ণ হিরণাক্ষকে বধ করে নিজের স্বরূপ ভুলে গেলেন। কমপ্লিট ওরলিভিয়ান। ছানাপোনা নিয়ে সংসার পেতে বসলেন। এটাকে দুধ খাওয়াচ্ছেন। ওটার গা চেটে দিচ্ছেন। কেলেঙ্কারি কাণ্ড! দেবতাদের মাথা ঘুরে গেল। হায়। নারায়ণ হিরুকে মারতে গিয়ে একী ফ্যাসাদ বাধালে প্রভু। ল্যাজারাস গোবেরাস অবস্থা। তুমি তো রিয়েল বরাহ নও। বরাহ হয়েছিলে ফর এ গ্রেট কজ। এ দেখছি প্লে বিকেম এ টাস্ক। উঠে এসো প্রভু। স্বর্গে তোমার সোনার পালঙ্ক, নারায়ণী সেজেগুঁজে সালংকারা। অপ্সরারা নৃত্যগীত করছে। আতর ছড়াচ্ছে। আর তুমি কি না আস্তাকুঁড়ে ছানাপোনা নিয়ে ঘোঁত ঘোঁত করছ। এ কী সাংঘাতিক আত্মবিস্মৃতি! বুড়ো বুড়ো দেবতাদের দিকে আঙুল তুলে নারায়ণী বললেন, দিস ইজ ফর ইউ। বয়োজ্যেষ্ঠ আপনারা। অনবরত একটানা একটা উপদ্রব তৈরি করে, আজ বরাহ, কাল নৃসিংহ, পরশু কুর্ম করে আমার ঘর-সংসারের বারোটা বাজালেন। এবার সবটার মুখে মুড়ো জ্বেলে, খেংরে বিষ ঝেড়ে দেব। মাতাল, লম্পটের দল।

দেবতাদের মুখ চুন। নারায়ণটার কি বুড়ো বয়েসে ভীমরতি হল। তুই দেবতা জন্ম ভুলে শূকর সেজে শূকরীর সঙ্গে সংসার পাতলি। ইডিয়েট!

শেষকালে দেবতাদের সভায় শেষ রাতে স্থির হল, নারদ কো বোলাও।

নারদ চোখ রগড়াতে রগড়াতে রাগ রাগ মুখে এসে ঢুকল। তার শরীরটা ভালো না।

দেবরাজ বললেন, নাড়ু, নারায়ণকে যে সেভ করতে হবে। বেচারা মর্তে গিয়ে বেহেড হয়ে গেছে।

নারদ বললেন, আমি স্যার এখন মর্তে যেতে পারব না, আমার শরীর খারাপ।

দেবরাজ বললেন, তোমাকে যে একবার বরাহরূপী নারায়ণের কাছে যেতে হচ্ছে।

এই ভয়টাই নারদ করেছিল। কিন্তু কী আর করা, দেবরাজের হুকুম। শেষে নারদ কেঁকিতে করে বরাহ অবতারের কাছে গিয়ে ল্যান্ড করেন।

বললেন, এই যে গুরু, মেমোরিটা একবারে গুলে খেয়ে বসে আছ যে। এটা তো তোমার আসল রূপ নয়।

বরাহ প্রথমে অ্যাটাক করতে এল। নারদ প্রস্তুত ছিল। নারায়ণ নারায়ণ বলে বার কতক খোঁচাখুচি করতেই, শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্মধারী বেরিয়ে এলেন। নারদকে জড়িয়ে ধরে বললেন, দোস্ত মাই সেভিয়ার। কিন্তু মন্দ ছিলুম না হে। আহার, নিদ্রা বেড়ে লাগছিল। বাট পাস্ট ইজ। পাস্ট। চলো কেটে পড়ি। আয়নার বঙ্কিমকে বঙ্কিম বললেন, ধান ভানতে শিবের গীত গাইলেন কেন? হোয়াট ইজ মিনিং? তুমি বলতে চাইছ, পঞ্চভূতের ফাঁদে পড়ে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ কাঁদে তাই তো?

এগজ্যাকটলি?

তা মাঝখানে ওইসব ভ্যানতারা করার কী দরকার ছিল? ছোট্ট দু-লাইনের স্টোরি উইথ এ বোল্ড সারমন। নিজের আসল সত্তাটাকে হারিয়ে ফেলো না। বি এ কর্মযোগী, দ্যাটস অল। জড়িয়ে পোড়োনা। সেই সার কথা পাঁকাল মাছটি হয়ে পিছলে বেড়াও সবসময় ওপর দিকে ওঠার চেষ্টা কর নিজের বোয়েনসিতে।

তাই তো বলতে চেয়েছি, তোমার নিজের প্যাঁচালো, প্রভাবিত মনের রিফ্লেকশানে, সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি। পুরাণ, বর্তমান সব এক করে ফেলেছ। তাই তো সাধক গেয়েছে, তারা কতদিনে কাটবে বল এ দুরন্ত কালের ফাঁসি।

বঙ্কিম তাড়াতাড়ি আয়নাটা উপুড় করে রাখল। দার্শনিক বঙ্কিমকে উলটে চাপা না দিলে আসল বঙ্কিমের অফিস যাওয়া মাথায় উঠবে। প্রায় দশটা বাজল। বারোটা অবধি লেট অ্যাটেনডেন্স চলে। তারপর অফিস যাওয়ার আর কোনও মানেই হয় না। এদিকে পেটের যেরকম গুমোট অবস্থা। দ্বিতীয় কাপ চা-টা পেটে পড়লে হয়তো একটু কাজ হত। প্রতিমাকে খেপিয়ে দিয়েছে, এখন কিছুদিন বঙ্কিম এক ঘরে; ধোপা নাপিত সব বন্ধ। তোমার তালে তাল দিয়ে চলতে হবে, তাইনা। তুমি আমার মানি প্ল্যান্ট দেখেছ, তাই না। নাড়া দিলেই টাকা পড়বে! ওঃ, সোনার বালা! বঙ্কিম মাথাটা এমনভাবে ঝাঁকাল, যেন তার সাজানো বাগান শুকিয়ে গেছে। তার নিজের বিয়ের আংটির সোনাটা তো গেছেই, প্লাস আরও কয়েক পয়সার সোনা, প্লাস মজুরি। বিষ্ণুর দোকানে। আড়াইশো টাকা ধার। যতদিন না দিতে পারছে আসা-যাওয়ার পথে জুলজুল করে তাকিয়ে থাকবে।

ঘরের বাইরে প্রতিমার এলাকায় পা দিয়েই বঙ্কিমের ক্ষোভটা আবার উথলে উঠল। বিয়ে করে। ঘোড়ার ডিম তার লাভটা কী হয়েছে? এর চে ব্যাচেলার থাকলে আরামে থাকত। তাড়াহুড়ো না করলে আর একটু বাজিয়ে, দেখেশুনে বউ আনা যেত। আর একটু চোখা নাক, টানা চোখ, ধারালো মুখ, আর একটু ভালো ফিগার, মৃদুভাষী, নম্র, সমর্পিতা, ছোট নিট পরিবার। এ এক ডাকা হাঁকা ধ্যাদ্ধেড়ে জিনিস। যত পুরোনো হচ্ছে তত আওয়াজ বাড়ছে।

বঙ্কিম যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী, ক্ষতবিক্ষত মানুষ। বাথরুমের দিকে যেতে যেতে বঙ্কিম বেশ জোরে জোরেই বলল, যতসব থার্ড ক্লাস ব্যাপার। প্রেজেনটেশানের লোভে ঝেটিয়ে নিমন্ত্রণ করছে আর যতসব পচা জিনিস গিলিয়ে মানুষ মারার তাল করেছে। দেশের শত্রু মার্ডারার।

মুখ সামলে। প্রতিমা রান্নাঘর থেকে ফোঁস করে উঠল। বঙ্কিম এইটাই চাইছিল। চেঁচামেচি করে অন্তত মনটা খোলসা হোক, মুখ সামলে কী। ফ্যাক্ট ইজ ফ্যাক্ট। এত জায়গায় নেমন্তন্ন খেয়েছি এ রকম পেটের অবস্থা কখনও হয়নি। নেভার।

মাত্রা না রেখে খেলে ওইরকম হবে। আমরাও তো খেয়েছি। আমাদের কিছু হল না; ওনারই সব হয়ে গেল।

তোমার যে বাপের বাড়ি। বাপের বাড়ির সব কিছু অমৃত সমান।

কোনটা পচা ছিল—

প্রথম তেল। ওটা তেল না, ডিজেল। মাছগুলো মর্গ থেকে এনেছে। ওই বোগড়া চালে কোনও শিক্ষিত লোক ফ্রায়েড রাইস করে না। মাংস ধাপা থেকে তোলা। মিষ্টি কাগজের মণ্ড থেকে তৈরি। পেটে ওই মালের ধাক্কা সামলাতেও আরও দুশো যাবে। হাজার টাকার বালাদুশো টাকার ঠেলা! শ্বশুরবাড়ির নিকুচি করেছে। বুরুশ ঝাড়তে ঝাড়তে বেশ জুতসই করে বঙ্কিম আক্রমণ শানিয়ে নিলে।

ও, বালার দামটা মিনিটে মিনিটে বাড়ছে। আড়াইশো থেকে আধ ঘণ্টার মধ্যে হাজারে উঠল।

আজ্ঞে না, ঘর থেকে যে সোনাটা গেল তার দামটা তখন ধরা হয়নি।

সেটার আবার দাম কী? ও সোনা তো ও বাড়িরই। মাছের তেলে মাছ ভাজা।

বাঃ, ভালো যুক্তি! তার মানে তুমি বলতে চাইছ, বিয়ের সময় যা ছিটেফোঁটা দিয়েছিল সব এইভাবেই উশুল করে নেবে?

উশুল করে নেবে কেন? তোমার কেনার ক্ষমতা থাকলে কিনে দাও। নেই বলেই ওই অবস্থা। অন্য কোনও বউ হলে এইভাবে ঘরের সোনা দিত বার করে? নেহাত আমার মতো বউ পেয়েছিলে তাই বর্তে গেলে।

আহা কী উদারতা? আমার কোনও রিলেটিভের বিয়ে হলে দিতে?

রাম, তোমার রিলেটিভরা আমাকে কী দিয়েছে, যে আমি দেব। যারা দেয় তাদেরই গায়ে গায়ে শোধ দিতে হয়। একেই বলে শোধবোধ। কিছু নিলেই কিছু দিতে হয়।

সমান সমান হতে আর কত বাকি?

ওঃ, এখনও অনেক বাকি! সমান সমান হতে সব ভাই ফুরিয়ে যাবে। আর তো মাত্র দুই বাকি।

এখনও এই চার চার আটগাছা চুরি আছে। গলার হার আছে। আমার আংটিটা আছে। আইবুড়োবেলার দুল দুটো আছে। নাকছাবি আছে।

আরও আছে। একটা পালিশ ওঠা খাট আছে, ছেঁড়া তোশক আছে, দাগ লাগা লেপ আছে, আমার বিয়ের পোকায়-ফুটো সিল্কের পাঞ্জাবিটা আছে, জোড়ের কাপড় আছে, একটা জলচৌকি আছে, স্টিলের ট্রাংক আছে, কয়েকটা কাঁসার বাসন আছে, আর আছে তোমার হাতঘড়িটা। ছেলেমেয়ের আধাআধি ভাগ। হাফ আমার, হাফ তোমার। তোমার হাফটা শ্বশুরবাড়িরই প্রাপ্য।

ওদের অতটা ছোটলোক ভেবোনা। তোমার মতো অত চুলচেরা হিসেবে ওরা চলে না।

খুব চলে। তা না হলে তোমার এইরকম স্বভাব হয়! এ বাড়ির আদ্দেক মালই তো ও বাড়িতে পাচার। ওদের হল সেই থিয়োরি—ভূমি যার ফসল তার। আমি হলুম ভাগচাষী, তোমার সয়েলে বারো বছর চাষ করছি। ফসল সব ওই গোলায়। আমার ভাগে বুড়ো আঙুল। একটা হিসেব। কেবল তোমাদের হিসেব থেকে বাদ পড়ে গেছে। আর সেই হিসেবের বেলায় জেনেশুনে অন্ধ। হয়ে থাকাই ভালো।

প্রতিমা ঘেঁস ঘেঁস করে লাউ কাটতে কাটতে বললে, সেটা কী? আমার হিসেবে ওদের এখনও অনেক পাওনা।

বঙ্কিম মাথায় তেল মাখতে মাখতে বলল, এই যে বারোটি বছর তোমাকে ভাত-কাপড়ে পুষছি, তার কস্টটি তো বাছাধন করে দেখোনি। ডেলি এক সের চাল, এক চাকা মাছ, আলু পটল, কপি, মুলো, কচু ঘেচু, গাজর মাজর, চা চিনি ডাল দুধ, শাড়ি জুতো সিনেমা থ্যাটার। এসব দেবোত্তর প্রপার্টি থেকে হচ্ছে, না গৌরী সেনের ফাইনান্সে!

তার বদলে সার্ভিস যা পাচ্ছ চার ডবল।

আরে যাও, মাসে একশো টাকা দিয়ে একটা মেয়েছেলে রাখলে টোয়েন্টি ফোর আওয়ার্স আমার সেবা করত। তাকে হুকুম করা চলত। তটস্থ হয়ে থাকত। তোমার মতো মাথায় চড়ে বসত না। আমার ব্লাডার লিক করে দিত না। যে নৌকোয় চড়ে নদী পার হচ্ছ সেটার তলা ফাঁসাবার জন্যে আকুলিবিকুলি করত না। একে কী বলে জানো, সবোতাজ, অন্তর্ঘাত।

প্রতিমা আধখানা লাউ ধমাস করে আনাজ রাখার চুবড়িতে ফেলে, উঁহু উঁহু করে উঠল। বঙ্কিম আড়চোখে দেখল। আঙুলের মাথা থেকে উঁজিয়ে রক্ত পড়ছে। প্রতিমা উঠে দাঁড়াল। কয়েক ফোঁটা গাঢ় লাল রক্ত মেঝেতে পড়েছে। কুঁচো কুঁচো সাদা নরম লাউ জায়গায় জায়গায় লাল। বঙ্কিম আঙুলটার দিকে ঝুঁকে পড়ে বলল, কেটেছ তো! একেবারে অকর্মণ্য। ওয়ার্থলেস টুঁ দি পাওয়ার ইনফিনিটি।

একেবারে অকর্মণ্য! সকাল থেকে কানের কাছে বক বক করে মাথা খারাপ করে দিলে! কী না একটা বালা।

প্রতিমার চোখে জল।

বঙ্কিম আবার অশ্রুজলে বড়ই কাতর হয়ে পড়ে। রক্তের ঊর্ধ্বচাপ ইতিমধ্যেই নামতে শুরু করেছে। আঙুলটার জন্যে এখুনি কিছু করা দরকার অন্তত মানবিক কারণে। বারো বছরের জীবনসঙ্গিনী। রাগ করে কতক্ষণ কথার চাবুক মারা যায়? বঙ্কিম বললে, দাঁড়াও, ডেটল দিয়ে দিই। আগে সাবান দিয়ে ধুই।

থাক থাক, আমাকে আর দরদ দেখাতে হবে না। আমার জন্যে একেই দেউলে হয়ে গেছ! আমি মরলেই তো তোমার জ্বালা জুড়োয়।

প্রতিমা হনহন করে শোবার ঘরের দিকে চলে গেল। বঙ্কিম মনে মনে বললে, মানুষের মৃত্যু যদি অতই সোজা হত! কত বড় বড় দুর্ঘটনায় ছিন্নভিন্ন মানুষকে জোড়া লাগিয়ে বাঁচিয়ে দিচ্ছে, এ তো সামান্য আঙুলটা একটু উসকে গেছে। সুযোগ পেয়ে গেছে, এইটাকেই এখন মূলধন করে একচোট আপারহ্যান্ড নেবে। তারপর ভাবল, দোষ কী? সে যদি বালা নিয়ে সারা সকাল মাতামাতি করতে পারে, প্রতিমা কাটা আঙুল নিয়ে লড়ে যাবে, এ তো খুব স্বাভাবিক।

বঙ্কিম সাবান দিয়ে তেল-হাত ধুয়ে তাক থেকে ডেটলের শিশি নিয়ে শোবার ঘরে যখন এসে ঢুকল প্রতিমা তখন একখানি ন্যাকড়া দিয়ে বাঁ-হাতের আঙুলটা জড়াবার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। ন্যাকড়াটা ইতিমধ্যে লাল হয়ে গেছে। পাকা কলার মতো ঠোসা ঠোসা আঙুলে কীরকম রক্ত। বঙ্কিম বললে, দাঁড়াও দাঁড়াও, কী-একটা যা-তা ন্যাকড়া ডেটল না দিয়েই আঙুলে জড়াচ্ছে। এখুনি বিষিয়ে উঠবে যে।

ওঠে উঠবে, আমার উঠবে। তোমার তাতে কী?

প্রতিমার কথায় চাবুক খাওয়া লোকের মতো বঙ্কিম টান টান হয়ে গেল। ইশ, বচনের ছিরি দেখো! হারব বললেই হারেগা, খামচে খুমচে মারেগা। বঙ্কিম হু হু করে একটু শীতল হাসির ঢেউ তুলে বললে, আমার কী, তাই না? একটা কিছু হলে তখন কোন সম্বন্ধী দেখবে? কোনও শালা আসবে না। এই শর্মাকেই ডাক্তার-বদ্যি করতে হবে চাঁদু।

তোমাকে আর কিছু করতে হবে না। তোমার পয়সা ব্যাঙ্কে ডিম পাড়ুক। আমার জন্যে অনেক করেছ। আর করতে হবে না। আমার লজ্জা নেই তাই পড়ে পড়ে মার খাচ্ছি। আমার বাবা বেঁচে থাকলে এই হাল হত? জেনেই গেছ আমার তো কোনও যাওয়ার জায়গা নেই, তাই অষ্টপ্রহর ধামসে যাচ্ছ। প্রতিমা বঙ্কিমের দিকে পেছন ফিরে ফুলে ফুলে কাঁদতে লাগল।

বঙ্কিম মনে মনে বলল, কান্না তোমাদের হাত ধরা। সারা জীবনের অশ্রুজল ধরে রাখতে পারলে ভারতবর্ষে সেচ সেবিত এলাকা আরও বেড়ে যেত। না, তা কী করে হয়! চোখের জল তো আবার স্যালাইন। সামুদ্রিক মাছের চাষ হতে পারত। হাঙর কিংবা তিমি লাট খেত। তুলো ডেটলে চুবিয়ে এগিয়ে গেল, অফিসের বারোটা বেজে গেল। আচ্ছা ফাঁপরে পড়েছি।

বঙ্কিম তুলো আর শিশি হাতে প্রতিমার পেছন থেকে সামনে এগিয়ে গেল। উত্তরটা ঠিকই দিল। আঙুল কাটতে পারে, তাবলে যা খুশি তাই বলে পার পেয়ে যাবে তা তো হয় না। বঙ্কিম বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমার বাবা বেঁচে থাকলে সব হত। তিনি এসে লাউ কুটে দিতেন কারণ মেয়ে বঁটি ব্যবহার করতে জানে না। তিনি থাকলে উনুন ধরিয়ে দিতেন কারণ মেয়ে অন্যের মনে ছাড়া আগুন ধরাতে জানে না। তিনি বেঁচে থাকলে স্বর্গে অপ্সরারা নৃত্যগীত করত, দুন্দুভি বাজাত আর আকাশ থেকে তাক করে এই বাড়ির ওপর পুষ্পবৃষ্টি করত। দেখি আঙুল থেকে তোমার ন্যাস্টি ন্যাকড়াটা সরাও।

প্রতিমা বড় দোকানের শোকেসের ঘূর্ণায়মান প্রদর্শনী চাকতির মতো কিংবা আহ্লাদী পুতুলের মতো আবার ঘুরে গেল। তুলো হাতে ভ্যাবাচ্যাকা বঙ্কিম আবার পেছনে সরে গেল। বঙ্কিম ছাড়বে না। অ্যান্টিসেপটিক লোশন লাগিয়ে নিজের হাতে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়ে স্বামীর কর্তব্য সে করবেই। এমন কোনও লুপ হোলস সে রাখবে না যার ফাঁক দিয়ে বিবেক বেরিয়ে এসে বলবে, নির্দয়, হৃদয়হীন, পাষণ্ড। প্রতিমাকেও পরে খোঁচা মারার সুযোগ সে দেবে না। বঙ্কিম চক্রাকারে ঘুরে আবার সামনে গেল। প্রতিমা আবার ঘুরে গেল। তিনশো ষাট ডিগ্রির খেলা চলেছে। ঘড়ির কাঁটাও এদিকে ঘুরছে। শেষে আর কোনও উপায় না দেখে বঙ্কিম খপ করে প্রতিমার হাত চেপে ধরল, চালাকি পেয়েছ, না? বুড়ি বয়সে ইয়ার্কি হচ্ছে? জানো আমার সময়ের দাম আছে, অফিস বেরোতে হবে।

প্রতিমা হাতটা ছাড়াবার চেষ্টা করতে করতে বললে, কে তোমাকে আটকে রেখেছে। যাও না। অফিসে, চলে গেলেই পারো!

চলে গেলেই পারো! বঙ্কিম ভেংচে উঠল, আহ্লাদী পুতুলের মতো কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে না ঘুরে আঙুলে ওষুধটা লাগাতে দিলেই পারো।

প্রতিমা প্রাণপণে হাতটা ছাড়াবার চেষ্টা করতে করতে বলল, দয়া করে আমার হাতে ওষুধটা লাগাবার চেষ্টা করে তোমার মূল্যবান সময় নষ্ট করতে হবে না। আমার চরকায় আমিই তেল দেব।

ইট ইজ মাই চরকা। তেল আমাকেই দিতে হবে। বারো বছরের ইজমেন্ট রাইট। জমির মালিক আমি। ইউ আর মাই জমিদারি। বঙ্কিম ভীষণ খেপে গেছে। ওষুধ লাগাবেই।

প্রতিমা আপ্রাণ চেষ্টা করে খামচাখামচি করেও যখন দেখলে বঙ্কিমের শক্ত মুঠো আলগা হচ্ছে না তখন একেবারেই প্রাকৃতিক কায়দায় খ্যাঁক করে বঙ্কিমের হাতে কামড় বসিয়ে দিলে। খুব জোরে নয়, অনেকটা কুকুরের আদুরে কামড় কিংবা লাভ-বাইট-এর মতো। সুখের সময় এই কামড়ের আলাদা অর্থ হতে পারত। ঝগড়ার সময় এই সামান্য কুটুকুটু কামড়েরও অন্য মানে। বঙ্কিম হাত আলগা তো করলই না, বরং আরও জোরে চেপে ধরে বললে, অতই সোজা না। কামড়াও, যত পারো কামড়াও, তলপেটে ষোলোটা ইনজেকশান নেব, সে ও-ভি আচ্ছা। তবু দেখব কতটা নীচে তুমি নামতে পারো। যেমন কুকুর তেমনি মুগুর। ওই দাঁত আমি হাঁ করিয়ে উকো দিয়ে ঘসে ঘসে ফোকলা করে দেব। কড়মড় করে মাংসের হাড় চিবোনো জন্মের মতো ঘুচিয়ে দেব।

প্রতিমা এতখানি হাঁ করে বঙ্কিমের হাতটা ধরেছিল ঠিকই তবে সেটা যতটা ভয় দেখাবার জন্যে ততটা কামড়াবার জন্যে নয়।

বঙ্কিমের মনে হচ্ছিল ফোকলা দিদিমা যেন তার হাতটা পাগলাচ্ছে। প্রতিমারও হয়েছে। মহাবিপদ। কতক্ষণ কামড়ে বসে থাকবে। সে তো আর কচ্ছপ নয় যে মেঘ ডাকলে তবে ছাড়বে। বঙ্কিম ডেডলক অবস্থাটা কাটাবার জন্যে বললে, যত চাপ পড়বে তত রক্ত বেশি বেরোবে। ছেলেমানুষি করার বয়েস আর আমাদের নেই। মাথা ঠান্ডা করো। যে-কোনও এক পক্ষকে আত্মসমর্পণ করতেই হবে। যেহেতু তুমি আহত সেই হেতু পরাজয় তোমারই। আমি তোমার ভালো করতে এসেছি, ভালোরই জয় হয়। ধর্মে, নাটকে, উপন্যাসে, সর্বত্রই এক বিধান।

প্রতিমা বাধ্য হয়েই পাগলাপাগলি বন্ধ করে মুখ সরিয়ে নিল। মুখের লালায় বঙ্কিমের হাত ভিজে। পরাজিত প্রতিমা খাটের ওপর ধড়াস করে শুয়ে পড়ল। এ ছাড়া কী আর করবে! গোহারান। হেরেছে। বঙ্কিম ওষুধ লাগিয়ে দিল। ইশ, বেশ কেটেছে! কয়েকদিন জবরদস্ত ভুগবে। আলমারি খুলে ফাস্ট-এড বক্স থেকে ব্যান্ডেজ বার করে বঙ্কিম দক্ষহস্তে আঙুলে জড়িয়ে দিল। আমার কাজ শেষ। এ টি এস দিতে হবে নাকি? লম্বা বঁটির কাটায় কি আর অমন হতে পারে? হলে বুঝতে হবে ভাগ্য।

বঙ্কিম বাথরুমে ঢুকে পড়ল। পেটটাকে এখন খোঁচাখুঁচি করতে হবে। সলিড পাথরের মতো হয়ে আছে। নাঃ, বয়েস সত্যিই বাড়ছে! সামান্য খাওয়াও সহ্য হচ্ছে না। তলপেটে গোটাকতক ঘুসি চালাল। প্যাঁক প্যাঁক করে বার কতক টিপল। নাঃ পেটও অভিমান করে বসে আছে। নিজের

পেটই কথা শুনছে না। ডিসওবিডিয়েন্ট। পরের বাড়ির মেয়ে কথা শুনবে? গ্রেট এক্সপেকটেশন, বন্ধু। গুমোট পেট নিয়ে কি আর রাস্তায় বেরোনো যায়? বাড়িতে বসে থাকারও উপায় নেই। আগুন জ্বলছে ধিকিধিকি। যাক, চানটা তো করা যাক।

স্নান সেরে বঙ্কিম ঢকঢক করে কয়েক গেলাস জল খেল। ছচামচ ভাস্কর লবণ। একেই বলে সুখে। থাকতে ভূতে কিলোননা। বাবুরা সব বিয়ে করবেন আর ছাইপাঁশ খাইয়ে মানুষের সুস্থ শরীরকে ব্যস্ত করে তুলবেন। অনেকটা সেই ইললিসিট লিকার খাওয়ার মতো কেস। না খেলে বলবে। বড়লোকি চাল হয়েছে শালার। এইবার আসছে পর পর অন্নপ্রাশন। বড়বাজারের স্টিলের। বাসনের দোকান তো বাঁধাই আছে। আজকাল দোকানে গিয়ে দাঁড়ালেই কাজ হয়ে যায়। মালিক জানে লোকে কী চায়। একটা ছোট থালা, পুঁচকে গেলাস আর বাটি। প্যাক করে দাও। সোনালি রোলেক্স রিবনের বাহার। প্যাকিং চার্জ একট্রা টু রুপিজ বাবু। আবার সেই লুচি, ঘি-ভাত, আঁশটে মাছ, এঁচোড়, টেনে ছেড়া যায় না মাংস, দই, বোঁদে, পাঁপড়, চাটনি, রসগোল্লা! ওয়াক!

খাবার কথা মনে হতেই গা গুলিয়ে উঠেছে। ওয়াক। চার গেলাস জল পেটে ঢেউ খেলিয়ে দিচ্ছে। তার ওপর ভাসমান ভাস্কর লবণ। হিংয়ের ভেঁকুর উঠছে। সংসারেও মিউটিনি। পেটেও মিউটিনি। বড় এক গেলাস লেবুর জল খেতে পারলে হত। কে করে দেবে! বিদ্রোহী প্রতিমার আঙুল ফুলে কলাগাছ। তিনি এখন নতুন চাল চালার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছেন। যত বেলা বাড়ছে বঙ্কিমচন্দ্র ততই কাবু হয়ে পড়ছে। ঘন ঘন ভেঁকুর। ওয়াক ওয়াক করে সব ওয়াক আউট করে পেটের অ্যাসেমব্লি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। বাথরুম ঘর, ঘর বাথরুম,—ঘণ্টাখানেক এই চলল। ওঃ আই। অ্যাম টেরিবলি সিক মাই লর্ড। সকালের মতো টান টান বুক নেই। গলা দিয়ে চি চি শব্দ বেরোচ্ছে। হায় ভগবান! ক্রমশই কুঁজো হয়ে আসছি। অদ্যই শেষ রজনী মাগো।

ফন ফন করে পাখা ঘুরছে। বঙ্কিম খাটে চিৎপাত। ঘণ্টাখানেক হিসেব রাখতে পেরেছিল। তুমি আঙুল কেটে টেক্কা মারতে চেয়েছিলে। আমি মিনি কলেরা দিয়ে স্কোর করে বেরিয়ে গেলুম! একবারে দেহ ছেড়ে বেরিয়ে যেয়ো না মানিক। অন্ত-বঙ্কিমকে বঙ্কিমের রিকোয়েস্ট। দিন ক্রমশ বাদুড়ের ডানার মতো ঝুলে আসছে। প্রতিমা আশেপাশে আছে। কাছাকাছি নেই। দুজনের মাঝখানে সোনার বালার গোল ফোকর। স্বর্ণ ব্যবধান। শেষের সেদিন অতি ভয়ংকর। পা দুটো ঠান্ডা হয়ে আসছে। ও খাট আর বিছানাটা তো শ্বশুরবাড়ির সম্পত্তি। এর ওপর মরাটা তো ঠিক হবে না। প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা থেকে দাম কেটে নেবে। নেমে শুই বাবা।

বঙ্কিম মেঝেতে সতরঞ্চির ওপর নেমে এল। এটা নিজের পয়সায় কেনা। এখানে সে বুক ফুলিয়ে, তাল ঠুকে মরতে পারে। দেহটাও আমার, সতরঞ্চিটাও আমার। কোনও শ্যালকের সম্পত্তি নয়। মেঝেতে শুয়ে তেমন দেহিক আরাম না হলেও বেশ মানসিক আরাম বোধ করল। ভেতর থেকে তার অন্তরাত্মা বলে উঠল, আরে ইয়ার, তলায় শক্ত জমি মাথার ওপর নীল আকাশব্যস, এর চে ভালো কী আছে। সকাল থেকেই তো পবন আহার করে ওহারী। এ যাত্রা যদি বেঁচে যাও এই শুদ্ধ শরীরের ওপরই আগামী বিশুদ্ধ জীবনের ফাউন্ডেশান স্টোন প্যাঁ প্যাঁ প্যাঁপোর পোঁ করে লে কর। জীবনটাকে ওই প্রতিমা, বালা, বিয়ে, ভাত, শ্রাদ্ধে বরবাদ কোরো না। আমাকে বেরোতে দাও, ফাটতে দাও, ফাটতে দাও, গ্রেট, গ্রেটার, গ্রেটেস্ট হতে দাও।

তুমি হঠাৎ নেমে শুলে কেন? প্রায় দশ ঘণ্টা পরে প্রতিমার কণ্ঠে যেন একটু দরদ।

হাউ হু আর কী? আমার আর হবে না দেরি আমি শুনেছি ওই শুনেছি ওই বাজে, বাজে তোমার ভেরি। আমি শুনতে পাচ্ছি, ডাক এসেছে, চলে আয়। বঙ্কিম কুঁই কুঁই করে বললে।

প্রতিমা আকুল ব্যান্ডেজ করা হাত বঙ্কিমের কপালে রাখল। বঙ্কিম তখন বলছে, তাই তো নেমে এলুম। খাট আর বিছানাটাতো আমার নয়। ওতো চলে যাবে। এখান থেকে বের করার সুবিধে। সতরঞ্জিতে রোল করে খাঁটিয়ায় লাদাই করে দাও।

প্রতিমা নাকটানার মতো একটু শব্দ করল। হাতটা মাথার চুলে স্থির। বঙ্কিম আর একটু অ্যাড। করল, বাড়িটা রইল, কিছু টাকাও রইল। অবশ্য তোমার ভোগে লাগবে না। তোমার ভাইয়েরা দখল করে তোমাকে লাথি মারবে। ছেলেটা আর মেয়েটার জন্যেই ভাবনা। মামাদের ছেলে মেয়ে ধরে, ফাইফরমাস খেটে পাতকুড়োনো হয়তো একটু জুটবে। বড় হলে ফুটপাথ গতি। হা হা, হা। ভগবান।

বঙ্কিমের কথা বলতে প্রকৃতই কষ্ট হচ্ছে। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। তা না হলে ভবিষ্যতের ছবি আরও গাঢ় রঙে রেখায় আঁকার ইচ্ছে ছিল। প্রতিমা ইতিমধ্যে বেশ বার কতক ফোঁসফোঁস করেছে। বঙ্কিম উপুড় হয়ে একপাশে ঘাড় কাত করে চোখ বুজিয়ে শুয়ে আছে। খাও, মাঝরাতে ভ্রাতার বউভাতে হাঁড়ি হাঁড়ি দই খাও। সর্দি হবে না? নিউমোনিয়া হবে। এখন আর কী? আহ্লাদের সময়। বাপের বাড়ি, অসুখ, সেবা, ডাক্তার, বদ্যি, শ্বশুরবাড়ি। তখন বঙ্কিম আছে, গামছা আছে, বঙ্কিমের ঘাড় আছে, শাশুড়ি আছে। প্রতিমার সর্দি নয়। আসলে সে অল্প অল্প কাঁদছে। মনে দুঃখ হয়েছে। বঙ্কিম একটু মৃত্যু-দৃত্যুর কথা বলছে। সাদা থান, শাঁখাহীন হাত, সিঁদুরশূন্য সিঁথি, মাছশূন্য দিন। আহা বড় কষ্ট গো! পঙ্গু হয়েও ঘোষবাবুর মতো পড়ে থাকো বেডসোর নিয়ে।

সেবাটেবা আমার ধাতে নেই। সকাল-সন্ধে দুমুঠো গিলিয়ে দেব। তারপর মা-র দেওয়া জর্দা আর দুখিলি পান মুখে ঠুসে সিনেমা, যাত্রা, হ্যাল্লা, ফ্যালা।

প্রতিমা কানের কাছে মুখ এনে জিগ্যেস করল, এইবার একটু ঘোল খাবে?

ঘোল? ঘোল আর মুখে কেন, এতকাল তো মাথাতেই ঢেলে এসেছ।

আঃ, এই অসুস্থ অবস্থায় বাঁকা বাঁকা কথা বলতে নেই। শরীরে আর কিছু নেই। কয়েকদিন একটু শক্তি করে নাও, তারপর আবার হবে।

ভূতের মুখে রাম নাম। এ যাত্রা যদি টিকে যাই, সন্দেহ আছে, তাহলে সাফ বলে রাখছি তোমার বাপের বাড়িতে জল পর্যন্ত খাব না। সব বিষাক্ত। তুমি যাবে, সন্দেশের বক্স আর উপহারের। মোড়কটি নামাবে। থাকতে হয় থাকবে তুমি। আমি আর ওর মধ্যে নেই। তবে একটা সুবিধে, এমনি ওঁরা কখনওই আদর করে ডাকেন না, এই বিয়ে পালা পার্বণেই জামাইয়ের খোঁজ পড়ে। লাটের টাকায় লাটের মালের আদর হয়ে যায়। উড়ো খই গোবিন্দায় নমঃ।

প্রতিমার দাঁত কিড়মিড় করছিল। অন্য সময় হলে লেগে যেত। কোনওরকমে সামলে নিল। সামলে নিয়ে বললে, বালার শোকটা ভোলার চেষ্টা করো। বালার ডবল আমি বাগিয়ে এনেছি। পরে হিসেব করে দেখো। প্রণামীর কাপড়, যেটা আমাকে দিয়েছে, ষাট-সত্তর টাকা হবে। কালকে প্রেজেন্টেশান যা পেয়েছিল তার থেকে দুটো শাড়ি, একটা লেডিজ রিস্টওয়াচ কেঁপে এনেছি। তাহলে ষাট, আর আর ষাট কত হল?

একশো আশি।

হ্যাঁ, একশো আশি আর ঘড়িটা ধরো দুশো, তাহলে তিনশো আশি। তাছাড়া বিয়ের আগে ছোড়দা এমনি দেড়শো দিয়েছিল।

সেটা তো আবার মেজদার ধার শোধে চলে গেল।

ও হ্যাঁ, তাহলে ফোল্ডিং ছাতাটা ধরো, ষাট-সত্তর টাকা হবে। তারপর একটা বড় স্টেনলেস স্টিলের থালা আর বাটি আটকে রেখেছি। ওগুলোও দেব না।

বঙ্কিমের ভেতরে যেন একটু শক্তি আসছে। দুর্বল ভাবটা যেন কেটে যাচ্ছে। মাথাটা মেঝে থেকে অল্প একটু তুলে দেখল, না, তেমন বোঁ করে ঘুরে গেল না।

প্রতিমা বললে, আমাকে কি তুমি এতই ক্যাবলা ভাবো? তুমি কি ভাবো আমি মাল চিনি না। তোমার সব শালাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। একহাতে যেমন দিচ্ছি, আর এক হাতে তেমনি আদায় করে নিচ্ছি। দু-চার টাকা এদিক-ওদিক হতে পারে। তা-ও ঠিক উশুল করে নেব। মার। পঞ্চত্নের আংটিটা বাগাবার তালে আছি। আর এবার থেকে বলে রাখছি, ভাতে স্টেনলেস নয়, স্রেফ ওই অ্যালুমিনিয়াম।

বঙ্কিম উপুড় থেকে চিত হয়ে বললে, কাঁচকলা দিয়ে ন্যাংলা সিঙ্গি মাছের ঝোল আর সরু চালের ভাত খাব।

প্রতিমা বললে, রাত নটার সময় ন্যাংলা আর পাবে কোথায়? এখন চিঁড়ে-দই দিয়ে চটকে খাও। কাল সকালে দাম বুঝে মাছের ব্যবস্থা হবে। তা না হলে স্রেফ গাঁদাল পাতার পাতলা ঝোল।

বঙ্কিম ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলল। মন বললে, এ ওম্যান হ্যাজ মালটিসাইডস।

Facebook Comment

You May Also Like