Sunday, April 21, 2024
Homeলেখক-রচনারচনা সমগ্রশাপমোচন - ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

শাপমোচন – ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

শাপমোচন - ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

১. শারদীয়া পূজা

শারদীয়া পূজা।

বাংলার ঘরে ঘরে আনন্দের ঢেউ। এত মম্বন্তর, মহামারী ছাপিয়ে এ আনন্দের স্রোত বাংলার গ্রামে গ্রামে প্লাবন এনেছে, চিরদিনই আনে। খাদ্যে রেশন; কাগজ কনট্রোল, কর্মে ছাটাই, তবুও বাঙালি মহা পূজার আয়োজনে ব্যস্ত।

মহেন্দ্র কিন্তু কিছুই করতে পারলো না। বাড়িতে অন্ধ দাদা, অসুস্থ বৌদি আর একমাত্র ভ্রাতুষ্পুত্র খোকন, এই তিনটিমাত্র প্রাণীর জীবনে নিতান্ত তুচ্ছ একটা মাটির প্রদীপের আলোও সে জ্বালাতে পারলো না, নিরাশ হয়ে ফিরে এলো, মহেন্দ্র শুধু খোকনের জন্য একটা পাঁচ সিকের সূতীর জামা কিনে।

ওতেই আনন্দ হয়তো উথলে উঠতো বাড়িতে, কিন্তু খোকার শরীর ভালো নেই, ওদের নয়নের জ্যোতিটুকু মলিন হয়ে উঠলো। সপ্তমীর দিন একটু ভালো থাকলে খোকন, অস্টমীর দিন কাকার গলা জড়িয়ে বললো :

কলকাতা যাবে না কাকু? কলকাতা!

কেন রে মানিক?

সেই যে তুমি বলেছিলে, কলকাতায় কে তোমার কাকা আছে তার ঘরে হাতী থাকে।

‘ও হ্যাঁ যাব, কাল যাব।’ বলে কবেকার বলা বিস্মৃত কথাটা একবার মনে করল মহেন্দ্র। যেতে হবে, শেষ চেষ্টা একবার করবে সে।

নবমীর সকালেই রওনা হয়ে গেল মহেন্দ্র কলকাতায়। খোকন ভাল আছে, অতএব চিন্তার কারণ নেই। পূজার আনন্দ তো তার নেই কিছু। রাত্রে পৌঁছাল হাওড়া স্টেশনে, রাতটা কাটিয়ে দিল গঙ্গার উপর, পূলের ফুটপাতে শুয়ে বসে। পুলিশে ধরতে পারতো, কিন্তু কি জানি কেন, ওকে কেউ ধরলো না, এমনকি কেউ কোন প্রশ্ন পর্যন্ত করলো না। গামছা বাধা কাগজের পুটলীটা মাথায় দিয়ে মহেন্দ্র নিরাপদে কাটিয়ে দিল, কিন্তু দশমীর সকাল, সে এখন যায় কোথায়? যেখানে যাবে লক্ষ্য করে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে, সেখানে যেতেও ভয় করে, কে জানে ওকে ওরা চিনবে কিনা? যদি না চেনে, যদি তাড়িয়ে দেয় অপমান করে?

না, যেতে হবে খোকন বলেছে, যাবে কাকু? খোকন তার শিশু দেবতা, খোকন তার তপ–জপ আরাধনা, যাবে মহেন্দ্র শ্যামবাজারে ওর পিতৃবন্ধু উমেশ ভট্টাচার্যের বাড়ি, ওর অনেক আশা রয়েছে সেখানে।

মহেন্দ্র উঠে পড়ে, স্নানাদি করা দরকার, বেশটা যা হয়েছে, যেন পথের হন্যে কুকুর। মহেন্দ্র কাছের ঘাটে নামলো গঙ্গাস্নান করতে। ও হরি স্নান করবে কি করে? ওর আর কাপড় নেই, গামছা আছে আর আছে একখানা লুঙ্গি, অতএব মহেন্দ্র স্নান করে লুঙ্গি পরে কাপড়খানা ওখানেই শুকিয়ে নিল। এখন কিছু খেতে হবে। আনা আষ্টেক পয়সা ওর কাছে এখনো। কিন্তু কলকাতা শহরে কি অত কম পয়সায় খাওয়া হয়? সাহস করে মহেন্দ্র কোন দোকানে ঢুকতে পারছে না, যদি বেশি পয়সা খেয়ে ফেলে? কিন্তু দূরন্ত ক্ষুধা পেয়েছে, আর বেলাও তো হয়েছে অনেকটা! মহেন্দ্র ভাবতে ভাবতে হাঁটে অনেক দূর। একটা পার্কে সার্বজনীন দুর্গোৎসব চলছে, কি বিরাট প্যান্ডেল, কী চমৎকার সাজসজ্জা, কী অপরূপ প্রতীমা, মহেন্দ্র দেখতে লাগলো। কত টাকা খরচ করে এতবড় ব্যাপার করা হয়েছে। দশ হাজার, পনের হাজার, বিশ হাজার? হয়তো আরো বেশি। কত কাঙ্গালি ভোজন হবে, চিড়ে কলা, দুই লাইন করে বসেছে সব, মহেন্দ্রকে একজন কর্তৃপক্ষগোছের লোক ঠেলে বললো, বসে যাও, বসে যাও সব—

বসে গেল মহেন্দ্র লাইনের এক জায়গায়। নিজেকে দেখলো, হ্যাঁ ভিক্ষুকের চেয়ে ভালো চেহারা ওর নয় এখন আর, যদিও ওর চেহারা সত্যি ভালো। একমুখ দাড়ি, চুল রুক্ষ, তারপর গঙ্গার মেটে জলে আলুথালু গায়ের রং খড়ি মাখা হয়ে গেছে, ধুতী অত্যন্ত ময়লা, কামিজের পিঠখানা ছেঁড়া। এ অবস্থায় কে তাকে ভদ্র বলবে? কিন্তু ভদ্রলোক নিজে ঠেলে বসিয়ে না দিলে কিছুতেই ও লাইনে বসতে পারতো না। বসে কিন্তু ভালোই হলো খাবার পয়সা বেঁচে গেল। এ বেশ খেল মহেন্দ্র, পুরো পেট খেল, কাঙালীদের সঙ্গে খেতে খেতে ও ভুলেই গেল যে ও মহেন্দ্র মুখুয্যে, ভদ্র পরিবারের সন্তান আর এখানে এসেছে রোজগারের চেষ্টায়, বরং মনে হচ্ছিল, ও এদেরই সমগোত্রীয়, এই অন্ধ, কুষ্ট ব্যাধিগ্রস্থ অশ্লীলভাষী কথক ভিখারীদের একজন। খাওয়া শেষ হলে কিন্তু মহেন্দ্রের মানসপটে জেগে উঠলো। আত্মগ্লানি, এতোটা দীনতা স্বীকার করার কোন দরকার ছিল না, একবারে ভিকারী হলেও পারতো। ওর গামছার সঙ্গে লুঙ্গিটা আর দু’খানা পুঁথি উপন্যাস নয়, ঠিক দর্শন শাস্ত্র। ওদের প্রাচীন পরিবারের কে কবে টোল খুলেছিলেন, অন্ন এবং বিদ্যাদান একসঙ্গে করতেন।

পুঁথি এখনও জমা আছে। এই দুইখান মহেন্দ্র তার মধ্যে থেকে বেঁছে এনেছে, যদি কেউ কেনে তো বিক্রি করবে। ও শুনেছে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় মিউজিয়াম তৈরি করেছে স্যার আশুতোষের নামে। সেখানে পুঁথি দু’টো বিক্রি করার চেষ্টা করবে মহেন্দ্র, অতএব ও এখনও নিঃস্ব নয়। কিন্তু কে জানে, পুঁথি ওরা কেনে কি না।

কয়েক বছর আগের কথা, গ্রামের স্কুলে ম্যাট্রিক পাস করেছে মহেন্দ্র, দাদা তখনও রোজগার করতেন এবং কিছু জমিজমাও ছিল ওদের। তিনি মহেন্দ্রকে পাঁচক্রোশ দূরের হোতমপুর কলেজে ভর্তি করে দিয়ে এলেন, মহেন্দ্র আই. এ. পড়বে। কিন্তু বিধাতা যদি বিরূপ হন তো, মানুষ কতটুকু কি করতে পারেন। অকস্মাৎ দাদার হলো বসন্ত। সেই অসুখে চোখ দুটি তার নষ্ট হয়ে গেল, এবং তারপরই হলো আরও কি কঠিন ব্যাধি চিকিৎসা করতে যা কিছু ছিল সব বেরিয়ে গেল, রইল যা তা অতি সামান্য। বই কেনা হয় না, কলেজের মাইনে দেওয়া হয় না, বোডিং–এর খরচ জোটে না। নিরুপায় হয়ে মহেন্দ একদিন সন্ধ্যাবেলা কলেজ হোষ্টেল ত্যাগ করে বাড়ি ফিরলো। খোকন তখন মাত্র এক বছরের। তারপর এই ক’বছর ধরে রোজগারের চেষ্টায় ফিরছে মহেন্দ্র, নানা কাজের সন্ধান কিন্তু বিধি প্রতিকুল। মহেন্দ্র কিছুই করে উঠতে পারল না। ওদের পিতৃদেব ক্ষেত্ৰনাথ ছিলেন পশ্চিমের এক রাজসভায় সুর শিল্পী এবং কুমারদের সঙ্গীত শিক্ষক? দেশীয় রাজা এবং রাজার স্নেহ ভাজন ছিলেন বলে রোজগার তিনি ভালোই করতেন এবং পৈতৃক বিষয় আর পূজা উৎসব ভালোই চালাতেন। তারই বন্ধু এই উমেশবাবু কলকাতায়, মহেন্দ্র যাবে বলে বেরিয়েছে, ওর। রাজ্যের বনবিভাগ থেকেই কাঠের কারবার করে উমেশবাবু নাকি একজন মস্ত ধনী, দাদা দেবেন্দ্র তাকে দেখেছেন, মহেন্দ্র কখনো দেখেনি। মহেন্দ্রর ছোট বেলাতেই পিতৃ বিয়োগ হয়, দেবেন্দ্রের বয়স তখন আঠারো তিনিই মহেন্দ্রকে মানুষ করেছেন কিন্তু বাইরে আয় না থাকায় বিষয় সম্পত্তি ক্রমে ক্রমে কমতে কমতে দেবেন্দ্রের অসুখে প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেল।

দাদা দেবেন্দ্র–উমেশবাবুকে চেনেন, কিন্তু তিনি এখন অন্ধ, তাই মহেন্দ্র একদিন বলতে শুনেছে উমেশ কাকা বাবার কাছে অনেক সাহায্য পেয়েছিলেন। এখন তিনি মস্ত ধনী, তাঁর কাছে একবার গেলে হয় না। যদি কোনো চাকরির ব্যবস্থা হয়।

ধনীদের কি অত মনে থাকে মহীন। দাদা বলেছিলেন উত্তরে।

–তবু একবার দেখা উচিত।

–বেশ, যাবি! খুব আগ্রহের সঙ্গে তিনি কথাটা বলেননি।

অতঃপর মহীন বলেছিল খোকনকে, মহীন যেমন তার কাকা, তেমনি তারও এক কাকা আছেন কলকাতায়, সেখানে মহীন যাবে আর সেই উপলক্ষ করেই মহীন বেরিয়েছে। কিন্তু এখন যেন আর উৎসাহ পাচ্ছে না মহীন। বড় লোকের বাড়ি, কে জানে কি বলেন তারা। হয়তো ঢুকতেই পারবে না মহেন্দ্র। কিন্তু খোকনকে যে মানুষ করতেই হবে। না, থামলে চলবে না, মহেন্দ্র যাবেই। উঠে পড়লো। শ্যামবাজারের পথ, ট্রাম চলেছে, কিন্তু অনর্থক পয়সা খরচ করতে ইচ্ছে হচ্ছে না। পূজার–বাজার সাজানো দোকান আর নানান পোষাকের মানুষ দেখতে দেখতে চলেছে মহেন্দ্র। পথে একটা বাচ্চা ছেলে, খোকন নাকি। চমকে উঠেছিল মহেন্দ্র। কিন্তু না খোকন এত পোষাক পাবে কোথায়। মহেন্দ্র ছেলেটাকে আর দেখলো না ভালো করে। ঠনঠনের কালীতলায় প্রণাম করল, চাকরি যেন একটা জোটে। তার খোকনের জুতো, জামা, কাপড় যেন সে আসছে বছর কিনতে পারে। মহেন্দ্র জোরে হাঁটতে লাগলো।

অনেকখানি রাস্তা, অপরাহ্ন বেলা, পথের ভিড় কিন্তু মহেন্দ্র আর কোথাও থামলো না। একেবারে বাগবাজারের মোড়ে এসে দাঁড়ালো, হ্যাঁ এইখানে প্রশ্ন করে জেনে নিতে হবে ২৪ নম্বর কাঁঠালপুর লেনটা কোথায়। এক দোকানীকে জিজ্ঞাসা করলো মহেন্দ্র। “আগে যান” বলে দোকানী নিজের কাজে মন দিল কলকাতার দপ্তর এই রকম, বলবেনা যে, জানি না মশাই। মহেন্দ্র অন্য একজনকে জিজ্ঞাসা করলো। লোকটি ভদ্র–তিনি পরিস্কার বুঝিয়ে দিলেন সোজা গিয়ে বাঁ দিকে মোড় ফিরবেন–তারপর প্রথম গলিটাই কাঁঠালপুর লেন। এই মোড়ের প্রকান্ড বাড়িটাই বোধ হয় চব্বিশ নম্বর। মহেন্দ্র নমস্কার করে চলতে লাগলো।

চেহারাটা যা হয়েছে, চেনা যায় না, কিন্তু কিছুই করবার নাই। না আছে কাপড় বা আয়না চিরুনী। মোটা ধুতিটা হাঁটুর উপর কুঁকড়ে উঠেছে। মহেন্দ্র টেনে নামালো। মাথার চুল যথাসাধ্য বাগিয়ে নিল একটা রাস্তার কলের জল ছিটিয়ে গামছা পুঁটলিটাও একটু চৌকস করে বেঁধে নিল। তবুও ভদ্র বললো না মহেন্দ্র। দুর চাই। চলো যা হয় হবে। মহেন্দ্র অনাসক্তবৎ চলতে লাগলো, যেন দারওয়ান গলাধাক্কা দিলেও সে অপমান বোধ করবে না, নিঃশব্দে ফিরে আসবে।

কাঁঠালপুর লেন মোড়েই মস্ত বাড়িটা চব্বিশ নম্বর। গেটে তিনজন দারওয়ান। তারপর বাগান, তার ওপারে তিনতলা বাড়ি, যেন ছবি একখানা। বাড়ির দক্ষিণ দিকে খোলা লেন–সেখানে জাল খাঁটিয়ে কয়েকজন যুবক যুবতী টেনিস খেলছে। দেখতে পাচ্ছে মহেন্দ্র।

এই বাড়িটাই তো। মহেন্দ্র নিজের মনেই প্রশ্ন করলো, হ্যাঁ নেমপ্লেট রয়েছে ইউ সি, ভট্টাচার্য টিম্বার মার্চেন্ট এন্ড কন্ট্রাক্টর। ঢুকবে না, মহেন্দ্র এক মিনিট ভাবলো। কিন্তু ফিরলে চলবে না। মহেন্দ্র সটান গেটের মধ্যে ঢুকে পড়লো। দারওয়ানরা ওকে আটকাবে না তো? না কেউ কিছু বলবো না–হয়তো বহু লোক এমন যায় আসে বলে কেউ ওকে বাধা দিল না বাগান পার হয়ে মহেন্দ্র বাড়ির বারান্দায় এসে দাঁড়াল। ভেতরে হলঘর দেখা যাচ্ছে, সেখানে চারজন লোক, একজন ইজিচেয়ারে। ইনিই বোধ হয় উমেশবাবু। মহেন্দ্র আন্দাজ করছে বাইরে দাঁড়িয়ে। একটা চাকর ওকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখে গেল। গাড়ি বারান্দায় দাঁড়ানো মোটর থেকে এজন ড্রাইভার উঁকি দিয়ে দেখলো। একটা মস্তবড় কুকুর ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে ওর কাপড় শুকছে, এইবার হয়তো ঘেউ ঘেউ করে তাড়া করবে।

কিন্তু কুকুরটা তাড়া করবার পূর্বেই ইজি চেয়ারস্থ বৃদ্ধের নজর পড়লো দরজার দিকে। মাথাটা তুলে তিনি বললেন–

–কে? কি চান?

–আজ্ঞে, আমি–বলতে বলতে সেই দামী কার্পেট পাতা মেঝেতে ধুলো মলিন পায়ই ঢুকে পড়লো মহেন্দ্র এবং ভুমিষ্ঠ হয়ে তার পদ প্রণাম করলো গিয়ে, তারপর বললো–আমি চন্ডীপুর থেকে আসছি–ক্ষেত্ৰনাথ মুখুর্যের ছেলে আমি।

অ্যাঁ। বলে বৃদ্ধ যেন চমকে চেয়ার ছেড়ে খাড়া হয়ে গেলেন, তারপর মহেন্দ্রের চিবুক ধরে বললেন এসো বাবা, এসো, মা ভাল আছেন।

মা গঙ্গালাভ করেছেন বছর দশেক হলো।

–ওহো–দাদা, দেবেন্দ্র।

–হ্যাঁ দাদা–বসন্ত হয়ে দাদা অন্ধ হয়ে গেছেন।

–অন্ধ। বলে বৃদ্ধ গভীর বেদনার্তভাবে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন মহেন্দ্রের মুখ পানে!

মহেন্দ্র আশা করেনি, এতোটা স্নেহ এই ধনীর প্রাসাদে, একটু পরে বৃদ্ধ আবার বললেন–সবই ভগবানের ইচ্ছা। বাড়িতে আর কে আছে তাহলে?

দাদা, বৌদি–আর একটা খোকন, বছর সাতেকের। বস, বস, এই চেয়ারটায় এইযে এইখানে বলে একবার নিজের ডান দিকে বড় চেয়ারখানা নির্দেশ করে দিলেন তিনি। অন্য বন্ধুগণ এতক্ষণ উদ্ৰবটাকে ঘৃণার চোখে দেখছিলেন, ভেবেছিলেন চাকর বাকর বা বড় জোর চাকুরির উমেদার হবে, কিন্তু এখন বুঝলেন এ ছোঁকরা এখন যাবে না।

কাজেই ওদের একজন গাত্রোত্থান করে বললেন আমার একটু কাজ রয়েছে স্যার আজ তবে উঠি।

–ও উঠবে। আচ্ছা। এই ছেলেটি আমার বাল্যবন্ধু ক্ষেত্রের ছেলে। অনেক বার আমি ক্ষেত্রনাথের কথা আপনাদের বলেছি, সেই ক্ষেত্ৰনাথ।

তিনজন উঠে গেলেন। শেষের লোকটার হয়তো কিছু কথা ছিল, তখনো রইলেন। বাইরে টেনিস লনে যারা খেলা করছিল, তারা অকস্মাৎ হৈ চৈ করে বারান্দায় উঠে এলো মহেন্দ্র দেখলো তাদের। দুটি মেয়ে, চারজন পুরুষ। ওরা এবার বারান্দায় বেতের চেয়াগুলোতে বসে চা খাবে, তার আয়োজন চলছে। আকাশে মেঘ ছিল, বৃষ্টি পড়ছে তাই ওরা বারান্দায় এলো।

যে ভদ্রলোকটি এতক্ষণ বসেছিলেন তিনি এবার ধীরে ধীরে বললেন লাখ খানেক টাকাতেই হয়ে যেতে পারে ওটা। আপনি নিজে বার দেখুন, প্রকাণ্ড বাগান বাড়ি প্রায়। দেড়শ বিঘে জমি তবে একটু দূরে নইলে ওর দাম তিন লাখের কম হতো না।

–আচ্ছা আমি ভেবে দেখবো, আজ আপনি যান, আজ আর সময় হবে না, বলে উমেশবাবু মহেন্দ্রের দিকে চেয়ে বললেন,–হাত মুখ ধোও বাবা, চা খাবে। ওরে কে আছিস, এদিকে আয়।

একটা চাকর এসে দাঁড়ালো। এই চাকরটাই কিছুক্ষণ আগে মহেন্দ্রকে দরজায় দেখে গিয়েছিল? উমেশবাবু বললেন–একে পাশের বাথরুমটা দেখিয়ে দে আর তোয়ালে সাবান এনে দে।

চাকরটা এবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মহেন্দ্রের দিকে চেয়ে চলে গেল। সে চাহনি এমনি অবজ্ঞাসূচক যে মহেন্দ্রের মনে হলো এখনি উঠে যাবে এখান থেকে। কিন্তু বাড়ির মালিকের সেই কোমল দৃষ্টি ওর সর্বাঙ্গে আপতিত রয়েছে। মহেন্দ্র স্থির হলো। ঠিক সেই সময় ঢুকল এক যুবক।

–এই যে অতীন, বৃদ্ধ বললেন–এই আমার বন্ধু ক্ষেত্রের ছোট ছেলে। এই মাত্র এলো দেশ থেকে।

মহেন্দ্র উঠে প্রণাম করতে যাবে, কিন্তু অতীন্দ্র নামধারী যুবকটির দৃষ্টি তার দিকে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মহেন্দ্র বুঝতে পারলো উনি প্রণামটা পছন্দ করবেন না। সে হাত তুললো কিন্তু অতীন তার পানে এক নিমেষ দৃষ্টিপাত করেই বললো, ও আচ্ছা–বাণ কোম্পানীর কাজটা তাহলে ধরছি বাবা। এক লক্ষ বিশ হাজার টাকায় রফা হলো বলেই বগলের ফাঁইলটা বৃদ্ধের সামনে ফেলে এক মিনিট কি একটা কাগজ দেখলো, তারপর সটান গিয়ে ঢুকলো হল ঘরের পাশের একটি ঘরে যার খোলা দরজার ফাঁকে মহেন্দ্র দেখতে পাচ্ছিল এক বব করা মেমসাহেব খটখট টাইপ করে চলেছে। ওটা হয়তো অফিস ঘর। মহেন্দ্র ভাবতে লাগলো। এই নিদারুণ ধনলোভী মানুষগুলোর কাছে সে কেন এসেছে, কি সে এখানে পাবে। আপনার দীন বেশ তাকে ক্রমাগত কুণ্ঠিত করতে করতে প্রায় চেয়ারের সাথে মিলিয়ে এনছে কিন্তু উমেশবাবুর স্নেহদৃষ্টি তেমনি উজ্জ্বল তার সর্বাঙ্গ যেন প্লাবিত করে বয়ে যাচ্ছে।

–যতীন, বৃদ্ধ ডাকলেন জোরে। বারান্দায় চা পানরত একজন সুন্দর বলিষ্ঠকায় যুবক উঠে আসতে বললো–

ডাকছেন বাবা।

হ্যাঁ শোন, এই আমার বন্ধুর ছেলে চন্ডীপুর থেকে এসেছে, এইমাত্র এল। ও হ্যাঁ, যতীন তাকিয়ে দেখলো মহেন্দ্রকে একবার, তারপর আস্তে বললো, বেশ তো, বসুক। কুমার নৃপেন্দ্রনারায়ণ এসেছেন বাবা, আমি তাকে চা টা খাইয়ে নিই। তারপর ওর সঙ্গে আলাপ করবো। নাম কি তোমার? শেষের প্রশ্নটা মহেন্দ্রকে।

–মহেন্দ্র অতি ক্ষীণ কণ্ঠে জবাব দিল মহেন্দ্র।

আচ্ছা বস বলেই যতীন চলে গেল ব্যস্ত ভাবে।

তোয়ালে আর সাবান আনতে গেছে যে চাকরটা সে এখনও ফিরলো না, হয়তো ভুলেই গেছে মহেন্দ্রের কথা। বড় লোকের বাড়ির চাকর, কে আর মহেন্দ্রের মত অতিথিকে পছন্দ করে।

ঘড়িতে সাড়ে পাঁচটা বাজলো ঢং করে। ঠিক সেই সময় সুন্দর টেডি পরিহিত জনৈক যুবক আর তার সঙ্গে দুটি মেয়ে এসে ঢুকলো বারান্দা থেকে ঘরে। যুবক বললো–

শরীর ভালো আছে তো জ্যাঠামশায়? তখন লোক ছিল তাই দেখা করতে পারি নি।

–হ্যাঁ ভালো আছি। রাজবাহাদুর দার্জিলিং থেকে ফিরছেন নাকি?

–না–বাবা নভেম্বরে ফিরবেন আমি তাড়াতাড়ি চলে এলাম।

–বেশ, চা–টা খেলে বাবা? খেলা হলো তোমাদের?

–আজ্ঞে হ্যাঁ এবার যাব। বলে কুমার একচোখে মহেন্দ্রকে দেখলো।

বৃদ্ধ বললেন, ও আমার বন্ধুর ছেলে কাজকর্মের সন্ধানে এসেছে!

ও, তাই নাকি? পড়াশুনা করেছে কিছু? কুমার প্রশ্ন করলো, যেন কাজ সে দিতে পারে এক্ষুনি। বৃদ্ধ তাকালেন মহেন্দ্রের পানে। মহেন্দ্র দুর্বল কণ্ঠে ধীরে ধীরে বললো–

পড়াশুনা বিশেষ কিছু করতে পারিনি, ম্যাট্রিক পাশ করার পরই দাদার অসুখ তারপর দুঃখে দৈন্যে এই কটা বছর কাটছে।

ম্যাট্রিক! বলে কুমার যেন আতকে উঠলো, ওতে কি চাকুরী জুটবে?

আচ্ছা দেখা যাবে, বলে তিনি যেমন কিছুটা বিদ্রূপ মাখা মৃদু হেসে চলে যাচ্ছেন, ঠিক সেই সময় বৃদ্ধের পিছনের ঘরটায় মৃদু গুঞ্জন ধ্বনিত হয়ে উঠল মধুর কণ্ঠে।

কে যেন সন্ধ্যাদ্বীপ জ্বালছে।

এ ঘরের সবকটি প্রাণী নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেছে, কুমার বাহাদুরও দাঁড়িয়ে গেল, বৃদ্ধের যেন যৌবন ফিরে এসেছে অকস্মাৎ সোজা হয়ে ডাকলেন–মাধু মা। যাই বাবা। দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল এক অষ্টাদশী তরুণী, ডান হাতে ধুপদানী, বাঁ হাতে প্রদীপ। গৈরিক বর্ণের তনুদেহ দিয়ে জ্যোতিরেখা যেন উদ্ভাসিত হচ্ছে। দীর্ঘায়িত চোখে অবর্ণনীয় এক কোমলাভ। বৃদ্ধ বললেন, তোর বাবাকে টাইফয়েডের সময় বাঁচিয়ে ছিল যে ক্ষেত্র, তারই ছেলে। দীপ হাতে দাঁড়িয়ে গেল মেয়েটি, আধ মিনিট দেখলো মহেন্দ্রকে, তারপর বলল পায়ে জুতো নেই কেন?

কিনবার পয়সা নেই। মহেন্দ্র মাথা নীচু করে জবাব দিল।

–জামাকাপড় অত নোংরা।

–ওই একই কারণে।

–তা অত হেটমুণ্ড হবার কি হয়েছে। দুনিয়ার সবাই বড়লোক হয় না। উঠুন আসুন আমার সঙ্গে বলে ধুপদানী আর দীপ নিয়ে সে এগুলো।

–যাও বাবা। বললেন বৃদ্ধ, তারপর মেয়েকে বললেন ও পাড়াগাঁয়ের ছেলে মা, দেখিস কেউ যেন কিছু না বলে।

-–তোমার কিছু ভাবনা নাই বাবা–আমি এক্ষুণি ওকে ঘষে মেজে হীরের মতো ধারালো করে দেব, বলে সঞ্চায়িনী লতার মত সে এগিয়ে যাচ্ছে, মহেন্দ্রও উঠলো, পিছনে চললো। মেয়েটিও কেমন যেন বিহ্বল হয়ে গেছে। সে গামছার পুটলীটা পড়ে রইল ওখানেই। ভুলে গেছে নিয়ে যেতে। বৃদ্ধ সেটা সযত্নে তুলে নিজের চেয়ারের মাথায় রাখলেন, বললেন ওরে রামু, এইটা দিয়ে আয় তো–

কুমার নৃপেন্দ্রনারায়ণের চোখ দুটো অকস্মাৎ জ্বলে উঠেছিল, কিন্তু সে মুহূর্তের জন্য পরক্ষণেই শান্ত সহাস্য কন্ঠে বললেন–

একেবারে হীরকের মতো ধারালো হয়ে যাবে ওই পাড়াগাঁয়ের ভুত।

ওর কথা ওই রকম বললো। ওখানে দাঁড়ানো একটি মেয়ে সম্ভবত কুমারের বোন। বৃদ্ধের মেঝ ছেলে যতীন এতক্ষণে বললো, বড়দার অফিসেই একটা কাজে ওকে ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে বাবা, আপনি ভাববেন না।

আমারই তো একটা লোকের দরকার। কুমার বললো, অবিশ্যি কাজটা তেমন ভাল কিছু নয় বাজার সরকার।

বৃদ্ধ মুখ তুলে চাইলেন, বললেন, এসেছে দু’দিন থাক, পরে দেখা যাবে। অন্য কেউ আর কিছু বলবার পূর্বেই বৃদ্ধ বেরিয়ে গেলেন বাগানের দিকে।

মাধুরীর পেছনে সিঁড়ি দিয়ে উঠে এলো মহেন্দ্র। সাদা মার্বেলের মেঝে ওর খালি পা পিছলে যাচ্ছে। চকচক করছে দেয়াল, তাতে উজ্জ্বল ইলেকট্টিক আলো গলে চোখ ধাধিয়ে দেয়–মহেন্দ্রের আয়ত চোখ জলভরা হয়ে গেল ঘরের আত্যুজ্জ্বল আলোধার দিকে তাকিয়ে। কামরা সাজানো, গোছানো যেন ইন্দ্রভবন’ কত আসন, কুশন আসবাব, চেনে না, মহেন্দ্র।

ওইটা বাথরুম ওখানে গিয়ে সাবান দিয়ে গা ধোন তেল মাখুন,

আয়না চিরুণী সব আছে আমি আসছি বলে চলে যাচ্ছে কিন্তু মহেন্দ্র ওই কোনায় মেহগিনি কাঠের একটা চকচকে দরজা ছাড়া আর কিছু দেখতে পেল না কোথায় বাথরুম কেমনে কি করতে হয় সেখানে জানে না। মাধুরী মুখ দেখেই বুঝতে পারলো।

এই আসুন, দেখিয়ে দিই বলে কোণের দরজায় হ্যাঁন্ডেল ঘুরিয়ে টেনে খুললে ভিতরের কামোড ঝাজরী জল খুলবার প্লগ সব এক এক করে দেখিয়ে বুঝিয়ে দিল ওকে, তারপর বললো–

এই দরজাটা আপনি বন্ধ করে স্নান করুন, আমি এসে ডাকলে খুলবেন। স্নানাগারে সে দেখেনি কল্পনাতেও না আর এমন মেয়েও কি দেখেছে? কি পছন্দ সাবলীল অথচ কি সংযত। কিন্তু সংযমটা যেন একটু কম ওর, মহেন্দ্রের পল্লী কন্যা দেখা অভ্যস্ত চোখে কেমন যেন একটু বাড়াবাড়ি মনে হলো। কিন্তু এটা তো পল্লী নয় শহর।

স্নান করছে আর ভাবছে মহেন্দ্র ক’দিন থাকা যাবে। বৃদ্ধ এবং এই মেয়েটি ছাড়া আর কারও ব্যবহার তো প্রসন্ন মনে হলো না। এ বাড়িতে কি মহেন্দ্র কিছু আশা করতে পারে? কিন্তু মহেন্দ্ৰ ভাগ্যবাদী, ভাগ্যকেই সে জীবন নিয়ন্ত্রণের ভার দিয়ে স্নান শেষ করলো।

–হোল আপনার। বাইরে থেকে ডাক দিল মাধুরী।

হ্যাঁ সাদা তোয়ালেটা পরে মহেন্দ্র বেরিয়ে এল। উজ্জ্বল গৌরবর্ণ গায়ের চামড়ায় সদ্যস্নাত গা বেয়ে জলবিন্দুর নিম্ন গতি আলোকোজ্জ্বল কক্ষের মৌনতা সব মিলিয়ে কেমন একটা মোহকারী পরিবেশ, মাধুরী এক নিমেষ দেখলো। মুখে একটু হাসি ফুটলো, তারপর হেট হয়ে এক জোড়া চটি নামিয়ে দিয়ে বললো–

চটিটা পায়ে দিন, তারপর কাপড় ছাড়ুন এই কাপড় আন্ডারওয়াড়, গেঞ্জী আর চাদর।

এত দামী কাপড়। মহেন্দ্র জরী পাড় ধুতীখানা হাতে নিতে নিতে বললো।

হ্যাঁ–এখানকার আসবাব সব দামী হয়–মাধুরীর উত্তর খুব গম্ভীর।

কিন্তু আমি আসবাব নই।

না আপনি একজিবিট। হাসলো না মেয়েটা একটুও–তেমনি গম্ভীর ওর মুখ।

কাপড় নিয়ে মহেন্দ্র আবার বাথরুমে ঢুকে আন্ডাওয়ার, ধুতী আর গেঞ্জী পরে এল, এসে দেখলো মাধুরী নাই। ও যেন কিছুটা স্বস্তিবোধ করছে মাধুরীকে না দেখে, ওকে একজিবিট বলে বিদ্রূপ করলে নাকি মেয়েটা। এ বাড়ির সবাই কি সমান অহঙ্কারী, শুধু বৃদ্ধ ছাড়া। মহেন্দ্র চুল আঁচড়াবার ফাঁকে ভাবতে লাগলো, এই বিরাট বাড়িখানা সত্যি একজিবিশন আর সে সেখানে একজিবিট, জু, বললে আরও ভালো হতো, সেখানে সে একটা জানোয়ার বনে যেত। কিন্তু এবারে সে কি করবে। দীর্ঘ দর্পনে প্রতিবিম্ব দেখে অবাক হয়ে ভাবছে মহেন্দ্র। সে দেখতে তো মন্দ নয়। চেহারাটা ভালোই, একটা একজিবিট হবে ও এখানে কিন্তু বিদ্যা। সেটা যে ওর কিছু মাত্র নেই। বুদ্ধি ওর খুবই ছিল, ক্লাসে প্রথম দ্বিতীয়ই হোত বরাবর, বিধি বাম, নইলে বিশ্ববিদ্যালয় ডিঙ্গিয়ে যাবার যোগ্যতা ওর কম ছিল না।

পড়ার কথা মনে হলো, যাঃ ফেলে এসেছে পুটলীটা নিচের ঘরেই ফেলেছে। এমন ভোলা মন মহেন্দ্রের। নিজের উপর বিরক্ত হয়ে মহেন্দ্র ঘরের বাইরে বারান্দায় এল, শুনতে পেল রেডিওতে গান চলছে মালকোশ।

দাঁড়িয়ে গেল মহেন্দ্র ওখানেই। চমৎকার আলাপ করছেন গায়ক। বহুদিন শোনে নাই, বাজনা শেখার সখ আর মিটল না মহেন্দ্রের অথচ ওদের বাড়িতে গানের বিশেষ চর্চা ছিল। আজও তার সাক্ষীস্বরূপ মৃদংগ, সেতার তানপুরা ভাঙ্গা অবস্থায় একটা ঘরে পড়ে আছে।

খাঁটি রাগ–রাগিনী আজকাল প্রায় শোনা যায় না–ইনি গাইছেন কে ইনি নমস্যা শিল্পী। মহেন্দ্র দাঁড়িয়ে শুনতে লাগলো, যন্ত্রটা কোথায় আছে জানা যাচ্ছে না শুধু সুর ভেসে আসছে, আঃ চমৎকার।

–কি চমৎকার। ঐ আলাপটা?

–হ্যাঁ। মহেন্দ্র জবাব দিল।

–একদম বাজে। আসুন এ দিকে।

–কেন। মহেন্দ্র যেতে যেতে বললো। বাজে কেন? মালকোশ রাগ–

–থাক। ও শুনলে আমার মাথা ধরে–ওটা খাঁটি নয়, নকল রেকর্ড গলা রেকর্ড, তার থেকে রেডিওতে, সেখান থেকে আপনার কানে। তিন নকলে আসল আর থাকে কোথায় মশাই। এই যে এই দিকে মার কাছে চলুন।

–আমার বেশ ভাল লাগলো আলাপটা মহেন্দ্র অতি আস্তে বললো।

আপনার পছন্দটা অত্যন্ত দীন বলতে বলতে ফিরে দাঁড়ালো মাধুরী। বললো, দেখুন, আপনি নিজে দরিদ্র হতে পারেন, আপনার পছন্দকে দরিদ্র করবেন না, চৌরাস্তার মোড়ের গান ওটা, রেকর্ড আর রেডিওর আমি ভালো ওস্তাদ আনিয়ে আপনাকে মালকোশ শুনিয়ে দেব আসুন।

মহেন্দ্র যেন এতটুকু হয়ে গেল, কোথায় নিয়ে যাবে, কি আবার বলবে। কে জানে। ভাল জামা–কাপড় পরায় মহেন্দ্রের কুণ্ঠা কিছুটা কমেছে এখন তবু বিদ্যার স্বল্পতা তাকে যেন আড়ষ্ট করেছিল। তারপর এই তীক্ষ্ণাধী তরুণী যার প্রতি কথায় বিদ্যুতের কণা, মহেন্দ্র। নিরুপায়ের মত চলল। খানিকটা সিঁড়ি নেমে একটা বড় ঘরে তার লাগাও একটা ছোট কুঠরী। আগাগোড়া মার্বেল বাধানো–দেওয়ালে নানা দেবদেবীর ছবি, মেঝেতে সুন্দর আসনের উপর একজন স্থলাঙ্গী বৃদ্ধা তার পাশেই একজন অবগুণ্ঠীতা বধু। বধুটি অত্যন্ত সুন্দরী বয়স ত্রিশের কম। বোধ হয় বড় বৌ। মাধুরীর পিছনে মহেন্দ্র এল।

–মাঃ এই মহীনদা বলে পরিচয়টা সংক্ষেপে সারলো মাধুরী, আর ঐ বড়বৌদি,

-–এসো বাবা, বলে হাত বাড়ালেন বৃদ্ধা। মহেন্দ্র ভুমিষ্ঠ হয়ে প্রমাণ করলো তাঁকে তারপর বড়বৌদি ঘোমটা কমিয়ে দিয়ে বললো। খুব ছেলেমানুষ। আমি ভেবেছিলাম কতই বা না বড় হবে।

–ইনি বড়দা নন মাধুরী বললো বড়দা বাড়িতে আছেন তিনি দাদার থেকে বড় বুঝলে বৌদি? বড়দার নাম দেবেন্দ্রনাথ মা তুমি তো জানো।

–হ্যাঁ মা জানি। এসো মহীন বলে বৃদ্ধা তাকে কাছেই বসালেন, তারপর বধুকে আদেশ করলেন জল খাবার আনতে।

মহীন এই ছোট সুন্দর ঘরখানি আর তার দেওয়ালের ফটো দেখবে কিংবা সম্মুখের মাতৃস্বরূপিণী ঐ মহিলাকে দেখবে বুঝতে পারছে না।

–এতদুঃখ পেলে বাবা, মহীন, আমাদের একটা খবরত দিতে হয়। –ভুল হয়েছিল কাকিমা, কষ্টভোগ মহেন্দ্র বললো।

–না মা, গরীবের অভিজত্যেবোধ–মাধুরী বললো ব্যঙ্গ করে যেন। বড় বৌ খাবার নিয়ে এল।

বসে খাওয়ালেন মহেন্দ্রকে বৃদ্ধা ছেলের মত যত্ন করে। ওর মধ্যেই সংসারের খবর জেনে নিলেন। মাধুরী কোথায় গেছে কে জানে। মহেন্দ্র অনেক স্বস্তিবোধ করছিল ওর অনুপস্থিতিতে, যেন জলন্ত অগ্নিকুণ্ডটা কাছে নাই। তার স্নিগ্ধ উত্তাপটুকু রয়েছে।

তোমার বাবাকে আমি দেখেছি মহীন, তুমি তেমন হয়েছ। চেহারায় এত মিল।

বাবাকে আমার ভালো মনে পড়ে না–মহেন্দ্র বললো।

হ্যাঁ তুমি তখন খুবই ছোঠ। তিনি যে উপকার আমাদের করেছেন বাবা। মুঙ্গেরে ওর টাইফয়েড হলো, তোমার বাবা দিন রাত্রি জেগে ওকে বাঁচালেন। সেই সময় তাকে দেখেছিলাম রুগী যায় যায় হলো, তোমার বাবা বললেন, কেঁদো না বৌমা–যমের সাধ্য নাই যে তোমার সিঁথির সিঁদুর মুছবে। আমার পরমায়ু দিয়ে আমি ওকে বাঁচাব–ঝরঝর করে জল গড়ালো বৃদ্ধার চোখে।

তাই তো তোমার কূল উজ্জ্বল করা সন্তানেরা পায়ে জুতো নাই, আর কাপড় ময়লা দেখে নাক সিটকে পালাল–আর ঐ কুমার না কুমাণ্ডা। মাধুরী অকস্মাৎ অভিভুত হয়ে বললো কথাগুলো! কণ্ঠের দৃঢ়ম্বর ভাষার ঝলকে যে অগ্নিবৃষ্টি ঝরছে বড়দার অন্তত এটা উচিত হয়নি মা। কি বলবি? আমি বলবো বড়দাকে।

বলবো যে, এই অকৃতজ্ঞতা উমেশ ভট্টাচার্জির বড় ছেলের উচিত হয়নি আর মেজদা ঐ কুমারটাকে এনে খারাপ অবস্থা করেছিল, ভাগ্যিস আমি সে সময় গিয়ে পড়েছিলাম। যাকগে মেজদাকে কিছু বলবো না, বড়লোকের জামাই, বিলেতে যাবে, তার কথা বাদ দাও। দেখি ছোট দা এসে কি বলে।

নারে, কেউ কিছু বলবে না ওরা ঠিকমত বুঝতে পারে নি, মহীন কত আপনার। ওর আবার বুঝবার কি আছে মা। ক্ষেত্র জ্যাঠার ছেলে এই–ই যথেষ্ট পরিচয় ওর। আবার কি বুঝবে হাতী ঘোড়া। এতকাল খবর নাও নি তার জন্যে অনুতাপ কর।

কেউ কিছু বললো না। একটু পরে মাধুরীই বলল বড় বৌদি–দক্ষিণ দিকের কোণের ঘরটায় মহীনদার থাকবার ব্যবস্থা করলেন বড়বৌদি, তুমি একবার দেখিয়ে দিয়ে। সব ঠিক আছে কিনা, আমি ওকে নিয়ে প্রতিমা বিসর্জন দেখতে যাচ্ছি। মহীনদা গাড়ি তৈরি?

কোথায় যেতে হবে? মহীন ভয়ে ভয়ে তাকালো।

অত খবরে কাজ কি। যা বলছি চটপট এগোন। মহীন উঠে, চললো ওর পিছনে নামতে নামতে বললো–আমার গামছার পুটলীটা–

যা, আছে তো একখানা ছেঁড়া লুঙ্গি আর খানকতক হিজিবিজি কেতাব কি ওগুলো?

পঁথি সেকেলের হাতে লেখা পুঁথি।

কি হবে ও দিয়ে। পড়াই তো যায় না।

পন্ডিতরা পড়বেন। বিক্রি করার জন্যে এনেছি।

আচ্ছা আমিই কিনে নিবো, দুটোর দাম চার টাকা হয়ে রইলো।

আপনি ও দিয়ে কি করবেন? মহেন্দ্র অকস্মাৎ নির্বোধের মত প্রশ্ন করল।

আমি এই বাড়ির সবার থেকে ছোট, আমাকে আপনি বললে পর হয়ে যাবে, তুমি বলতে হয় বুঝলেন?

তাহলে আমাকেও আপনি বললে তো পর হয়ে যেতে পারি। মহেন্দ্র সাহস করে বলে ফেলল, এবার কিন্তু জবাব এল।

হ্যাঁ আপনি তো পরই, দায়ে পড়ে আত্মীয়তা করতে এসেছেন, ঠেলায় পড়ে অভাবে পড়ে, পর না হলে এমন কেউ করে নাকি?

মহেন্দ্র আর জবাব খুঁজে পাচ্ছে না, অসম্মান বোধ হচ্ছে ওর। অকস্মাৎ হাসির যেন ঝরণা বইছে। সুমিষ্ট হাসিটা থামাতেই চায় না। এক মিনিট পরে বললো মাধুরী–আমি এই বাড়ির কাউকে আপনি বলি না, সবাইকে তুমি বলি সবাই আমার আপনার। তোমাকে এই অপমানজনক কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে তোমায় ভালো করে বুঝিয়ে দিলাম যে, এখানে। তুমি অত্যন্ত আপনার। সবাই তোমাকে তুমি বলবে। এ বাড়ির মালিক তোমার বাবার কাছে। দেনা হয়ে আছেন। নিজেকে এত কুণ্ঠিত ভাববার কারণ নেই, এসো তোমাকে কলকাতায় প্রতিমা বিসর্জন দেখাবো বলে গাড়ির দরজা নিজের হাতে খুলে দিল মাধুরী। মহেন্দ্র জীবনে চড়েচি এত বড় মোটরে।

বুইক গাড়ি নিঃশব্দ সঙ্করণশীল। কখন যে মাধুরী আর মহেন্দ্রকে নিয়ে বাগবাজারে পাঁচ রাস্তার মোড়ে এসে পড়লো। বোঝাই গেল না, দাঁড়ালো গাড়ি। রাজপথ আলোকাকীর্ণ শোভাযাত্রা করে প্রতিমা বিসর্জন করতে চলেছে কলকাতার বারো মারা পুজকেরদল। কী চমৎকার প্রতিমা, কী তার সাজ–সজ্জা। কী অপরূপ ছন্দায়িত যেন দেখার বস্তু সত্যিই। মহেন্দ্র মুগ্ধ বিস্ময়ে এই মহোৎসব দেখছিল অকস্মাৎ মাধুরী বললো—

বিশ্বের মা শ্বশুর বাড়ি চলেছে তুমি আজ এলে, মহীনদা।

হ্যাঁ কেন? মহীন চমকে প্রশ্ন করলো।

আজ দিনটা ভালো কিনা, তাই বলছি। বিজয়াদশমী। হাসলো মাধুরী। মহেন্দ্র কিছু বললো না, মহেন্দ্রের গ্রাম্য মস্তিস্কে মাধুরীর সুক্ষ ব্যঞ্জন কোন রস সৃষ্টি করতে সমর্থ হল না।

ওর তখন খোকনের কথা মনে পড়েছে তাকে এই উৎসব সমারোহ করে দেখাতে পারবে। মহেন্দ্র কবে? এমনি বুইক গাড়িতে বসিয়ে না হোক পায়ে হেঁটে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ও কি সে তার শিশু দেবতাকে এই উৎসব দেখাতে পারবে না? অবশ্য দেখাবে।

কি ভাবছো, মহীনদা?

খোকনটাকে মনে পড়ে গেল—বাড়িতে থাকলে কাঁধে চড়ে প্রতিমা বিসর্জন দেখতে যেত। কে জানে কে এবার তাকে নিয়ে যাবে?

যেই হোক নিয়ে যাবে তার জন্য ভাবনা কি? আসছে বছর খোকনকে এখানে এনে আমিই নিয়ে যাব কোলে চড়িয়ে। খোকন দেখতে কেমন?

আমাদের বংশের চেহারা সব প্রায় এক রকম রং ঢং আকৃতি।

ও বুদ্ধিটাও যেন তোমার মত না হয় বলে মৃদু হাসলো মাধুরী।

না, না ওর বুদ্ধি সত্যি খুব ভালো। যদি পড়াতে পারি—

দিগগজ হয়ে উঠবে, এই তো, বেশ, পড়ানো যাবে। তার জন্যে আজ থেকে ভাবনা কেন?

আমি অভাবের জন্য পড়তে পারলাম না, ওকে পড়াতে হবেই। আমাদের বংশে ছাড়া মুখ কেউ নেই, দাদাও কাব্য ব্যাকরণতীর্থ চোখের অসুখ হলে–

থাক্ থাক্ ওসব আমার জানা হয়ে গেছে মাধুরী বাধা দিল–তোমার বিদ্যাদিগগজ হবে হবেই। আপাতত চল বাড়ুজ্যেদের প্রতিমা দেখবে খুব প্রাচীন চণ্ডীমন্ডপ ভাঙা অবস্থা, তবু দেখতে কত সুন্দর এসো। মাধুরী দরজা খুলে নামলো, মহীনও নামলো দুজনে ঠাকুর বাড়িতে ঢুকল গিয়ে।

নবমীর দিন রওয়ানা হয়েছে মহেন্দ্র বাড়ি থেকে, খোকনই তাকে পাঠিয়েছে বলা চলে, কিন্তু কাকার যাওয়ার পর থেকে ছেলেটা আর কারও সঙ্গে কথা কয়নি রাতটা ঘুমিয়েছিল, বিজয়াদশমীর সকালেই শিউলী ফুল কুড়িয়ে রেখে খিড়কীর পুকুরটা একবার ঘুরে এলো–দু পয়সার বেলুনটা ফুঁ দিয়ে যতদুর সম্ভব ফুলিয়ে ফাটিয়ে দিল, অপরাজিতা ফুলগুলো তুলে দু’হাতে চটকে তাল পাকালো, তারপর আর কীকরা যায়?

অন্ধ বাবার কাছে বড় একটা যায় না সে না ডাকলে প্রায় যায় না! আবার পুকুরঘাটে এসে দেখতে লাগলো। পোনামাছের বাচ্চাগুলো অল্পজলে খেলা করছে এখনি ও দু’চারটে ধরতে পারে কিন্তু ধরে কি হবে? কাকু বাড়িতে নেই, ভাজা মাছের কাটা বেছে কে ওকে খাওয়াবে? থাক্ গে। একটা ঢিল ছুঁড়ে মারলো ঘাটের জলে মাছগুলো ত্বরিতে সরে গেল, ঠিক সেই সময় ডাকে–খোকন। বাবা নয়, মা ডাকছে। উঠে এলো খোকন, মা ওর পানে চেয়ে বললো—-

আয় জামাটা পরিয়ে দিই? পূজা দেখতে যাবি না?

না বলে খোকন সরে পড়তে চায়।

কাকু তো চার পাঁচদিন পরেই আসছে অত মন খারাপ করছিস কেন? তুই তো পাঠালি। যা ঠাকুর দেখে আয়।

না বলে উঠোনের এক কোণে শিউলী গাছটার কাছে দাঁড়ালো গিয়ে। ফুলগুলো সকালেই কুড়িয়ে রেখেছে, তার হলদে বোটাগুলি ছিঁড়তে লাগলো শুকিয়ে রাখবে। সরস্বতী পূজোর সময় বাসন্তিরঙ্গের কাপড় পড়বে। মা জানে খোকনের মনের অবস্থা, আর কিছু বললো না। একটু পরে ডাক দিল আয়, মুড়ি আর নারিকেল কোরা খাবি? না বলে খোকন নিজের কাজ করতে লাগলো। অন্ধ দেবেন্দ্র ও ঘর থেকে বললো ওকে কেন মিথ্যা ডাকাডাকি করছ, যা খুশি করে কাটাক। মহীন না ফেরা পর্যন্ত অমনি তো করবে। ওকে বল যে; কাকু লক্ষ্মী পূজার দিন ফিরবে।

ও জানে। খোকনের মা তাকে আর কিছুই বললো না? অভাবের সংসার। আজ বিজয়াদশমী বাড়িতে বহু ব্যক্তি প্রণাম করতে আসবে। তাদের মিষ্টি মুখ করাতে হয়। অন্য মিষ্টি কিছু জোগাড় করা যাবে না, গুড় আর নারিকেল দিয়ে নাড় তৈরি করছে। আর যৎসামান্য মিঠাই কিনে আনা যাবে। আজকের দিনে বাড়িতে তো খালি মুখে কাউকে ফেরানো যাবে না, নিজে না খেয়েও অতিথির জন্য আয়োজন করে রাখতে হয়, খৈ কিছু ভাজা আছে, তাই দিয়ে মুড়কি তৈরি করবে। অন্য বছর খোকনের কত উৎসাহ থাকে এসব ব্যাপারে। উনুনের কাছ ছাড়া হয় না বকুনী খায় তবু। এবার কিন্তু কাছ দিয়ে ও এল না। আচ্ছা কাকাভক্ত ছেলে যাহোক? মা নিজেই একটু হাসলো?

বাইরের ঘরটায় দেবেন্দ্র বসে থাকেন। চোখ নাই, চোখ নাই তাই পড়াশুনা বন্ধ কিন্তু বিখ্যাত পণ্ডিত ব্যক্তি কাব্য ব্যাকরণ স্মৃতি কণ্ঠ স্বর তাই বহু লোক আসেন তার কাছে বিধান নিতে, ভগবত্ব আলোচনা করতে, সকথা শুনতে। বংশের একটা ছেলে পণ্ডিত হোক, এই ইচ্ছায় ওর বাবা ক্ষেত্ৰনাথ ওকে কাশীতে পড়িয়েছিলেন সংস্কৃত। অভাব ছিল না তাই সখ

হয়েছিল। অন্ধ না হলে অর্থ ভালোই উপার্জন করতে পারতেন দেবেন্দ্র।

ইংরেজীও ভালো জানেন কিন্তু চোখ আর নাই, বিশ্ব তার কাছে অন্ধকার। এখন সম্বল ঈশ্বরের অনুধ্যান তাহার তপস্যা। ইচ্ছে আছে ঈশ্বরীর কথা কিছু লিখবেন। কিন্তু নিজে লিখতে অক্ষম তাই হয়ে ওঠে না? ভগবান শ্রী কৃষ্ণের মতামত শোনাবার একটা লোকও নাই, যারা আসেন বাড়িতে, তাদের কাউকেও ধরে কখনো পড়িয়ে শোনেন।

নিত্যকর্ম শেষ করে উনি বসেছিলেন তক্তপোষে, কেউ আজ আসেনি। সকলেরই তো বিজয়াদশৰ্মী, প্রতি বাড়িতে উৎসব। বড় ইচ্ছে করতে লাগলো। জগ্যমাতার সপ্তশতী স্তোত কিছু শোনেন কিন্তু কে ওকে চণ্ডীমণ্ডপে নিয়ে যাবে অনেকটা দূরে বাবুদের চণ্ডীমণ্ডপ সেখানেই যেতে হবে। বর্ষার গ্রাম্য পথ পঙ্কিল এবং পিচ্ছিল হয়। লাঠি ধরে তিনি একা যেতে পারবেন না কিন্তু আজ একটু চণ্ডীপাঠ শুনতে হয়। বিশেষ করে মহেন্দ্রের কল্যাণ কামনা করবার জন্যে চণ্ডীমণ্ডপে যেতে হবে ওকে। ডাকলেন–

খোকন?

উঁ যাই–

খোকন নিতান্ত নিরুপায় ভাবে খেলা ছেড়ে এসে দাঁড়ালো, বললো—

কি?

জামাটা পরে আয় তো বাবা, আমাকে একবার ঠাকুর দেখিয়ে আনবি।

আচ্ছা বলে খোকন চলে গেল। ঠাকুর দেখিয়ে আনবে, কথাটা উনি যেন বিদ্রূপ করেই বললেন অভিমান করে। অনন্ত জগতে বিধাত্রী যিনি, তাঁরই বিধানে ঐ দশভুজা রূপ দেখবার শক্তি আর নাই দেবেন্দ্রের। অন্তরে চিন্ময় মুর্তির ধ্যান ছাড়া কিছুই তিনি আর করতে পারেন না কথাটা তাই বেরিয়ে গেল মুখ থেকে। খোকন জামাটা গায়ে দিয়ে এসে বললো—

কৈ লাঠিটা কোথায় বলেই কোন থেকে বাঁশের লাঠিগাছ নিয়ে বললো–এসো বাবা।

লাঠি অন্যপ্রান্ত ধরে দেবেন্দ্র উঠলেন? খোকনের অভ্যাস আছে ওকে এভাবে নিয়ে যাওয়া–অতি সাবধানে নিয়ে যায় ঈশ্বরের কৃপার দান খোকন।

বাবুদের চণ্ডীমণ্ডপের বহু ভাগীদার, এই উৎসব তেমন হয় না, শুধু প্রতি অংশীদার সগর্বে প্রচার করতে চায়, সেই যেন মালিক প্রজার। দশ পনের বছর আগে পূজার দিনে গ্রামস্থ সকলকে আহ্ববান করা হতো, কেউ অনাহুত গেলে প্রচুর আদর আপ্যায়ন পেতো। কিন্তু এখন কেউ গেলে মালিকেরা কৃপার দৃষ্টি তাকান যেন ওরা পূজা করেছেন বলেই নিতান্ত হতভাগা গ্রামবাসীরা প্রতিমা দর্শন করতে পারলো। কাছাকাছি দুতিনখানা গ্রামে প্রতিমা পূজা নাই, তাই বিসর্জন দেখবার জন্য চারপাশের গ্রাম থেকে সন্ধ্যাবেলা বহু লোক আসে ছেলে মেয়ে পর্যন্ত। কিন্তু বাবুদের খোশখেয়াল এমনি তারা প্রতিমা বের করতে রাত বারোটা বাজান, নিরাশ হয়ে দূরের লোক ফিরে যায়। গ্রামের ছোট ছেলে মেয়েরা ঘুমিয়ে পড়ে। বাবুরা বিজয় গর্বে বিসর্জন করে এসে খাটে শুয়ে ভাবতে থাকেন ভাগ্যি তাদের বাড়ি পূজা হয়েছিল। তাই এত লোক বিসর্জন দেখলো।

গ্রামে যার দু’পয়সা আছে সে গেলে বাবুরা খাতির করেন ভালোই, কিন্তু দেবেন্দ্রর মত নিঃস্ব ব্যক্তির সেখানে কোন সম্মান নাই, কৃপার দৃষ্টিপাতও কম হয় তার প্রতি কারণ ধন না থাকলেও বিদ্যা তার আছে এবং মাথা তিনি কোথায়ও নিচু করেন না। ছেলের সামনে দেবেন্দ্র। গিয়ে দাঁড়ালেন। চণ্ডীমণ্ডপের বহু লোক প্রায় সকলেই অংশীদারদের পরিবার কেউ কেউ একবার তাকালেন ওর মুখের পানে। কিন্তু দেবেন্দ্র ওদের কাছ থেকে সম্মানলাভের প্রত্যাশায় যান নাই। মন্ডপের দাওয়ায় না উঠেই তিনি খোকনকে বললেন মার মূর্তির সামনেই আমাকে দাঁড় করা? খোকন ঠিক তাই করলো। ভেতরে চণ্ডীপাঠ চলছে। দু’একজন বললেন এখানে আসুন মুখুৰ্য্যেমশাই, আসুন দেবুদা।

থাক ভাই এখান থেকেই শুনছি। পুরোহিত তখন পড়ছিলেন–

প্রশতানাং প্রসীদ তং দেবী বিশ্ববিত্তিহারিণি।
ত্রৈলোক্যধাসিনামীড্যে লোকাং বরদাভব।

দেবেন্দ্র ভুমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলেন। সুন্দর পালঙ্কে পুরু বিছানায় শুয়ে মহেন্দ্র ভাবতে লাগলো স্বপ্ন রূপকথার শোনা ব্যাপারটাই সে স্বপ্নে দেখছে। হাওড়া ব্রীজের উপর রাত যাপন, ভিক্ষুক হয়ে ভোজন স্বর্গ ছাড়া কি আর। তারপর এই বিশাল পালঙ্কে শয়ন এমন আজগুবি স্বপ্ন কম লোকেই দেখে, কিন্তু এটা কি সত্যি স্বপ্ন? নিজের হাতের আঙ্গুল কামড়ে মহেন্দ্র পরীক্ষা করলে ব্যথা বোধ হয়। বেডসুইচটা পিটে আলো জ্বালালো, ঠিক জ্বলছে। উঠে কয়েক পা পায়চারী করলো, হ্যাঁ ঠিক বলা যায় তাহলে স্বপ্ন নয়, সত্যিই সে তার পিতৃবন্ধুর বাড়ীতে রয়েছে কলকাতার প্রাসাদে।

দেওয়াল ঘড়িতে সাড়ে বারো। বাইরের রাস্তায় এখনও বিসর্জনের বাদ্য কোলাহল জানালাপথে আকাশচারী ফানুশ দু’একটি দেখা যাচ্ছে। হাউই ছুটছে, পটকার আওয়াজ আর নীচে বাগান থেকে উঠে আসছে হাসনাহেনা ফুলের মদির গন্দ। অপূর্ব আবেষ্টনী অদ্ভুত পরিবেশ।

মহেন্দ্র আবার শুলো–সুইচ টিপে আলোটা নিভিয়ে দিল, চোখ বুজলো ঘুমুবে এবার। খোকনকে মনে করবার চেষ্টা করতে লাগলো। তার শিশু দেবতার আশ্রয় নিতে চাইল, কিন্তু আশ্চর্য কিছুতেই খোকনের মুখোনা মনে পড়ছে না। হোল কি তার আজ? খোকনকে মনে পড়ে না। এমন অসম্ভব ব্যাপার তার জীবনে আর কোনদিন ঘটেছে কি? না তো। কিন্তু খোকনকে এভাবে মনে করবার চেষ্টা সে করেনি কোনদিন। হয়তো খুব বেশী প্রিয়জনকে ধ্যান করা যায় না, অনেক সময় মহেন্দ্র চিন্তা করতে লাগলো গলা জড়িয়ে বলছে একটা গল্প বল না, কাকু?

শোন এক ছিল–চমকে উঠলো মহেন্দ্র। কান গল্প শোনাচ্ছে সে বালিশকে ছিঃ। খোকনের অকল্যাণ হবে যে। মহেন্দ্র বালিশটা ঠেলে সরিয়ে দিল। পাশ ফিরলো তারপর অকস্মাৎ উঠে পা তলে রাখা ব্যাগখানা তুলে মেঝেতে ফেলল। মহেন্দ্র নিজের মনেই বললো–

খোকনকে ছেড়ে এত ভালো বিছানায় শোয়া যাবে না–

একটা ছোট বালিশ টেনে নিয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়লো, মহেন্দ্র ঘুমিয়ে গেল নিটোল নিবিড় একটি ঘুম স্বপ্নহীন সুষুপ্তি। মহেন্দ্র যেন জীবিত ছিল না, অকস্মাৎ খিলখিল হাসির সোনার কাঠি উজ্জ্বল জলকল্লোল হাসির ঝরণা। বালিশ থেকে মাথা তুলে মহেন্দ্র দেখলো বারান্দার পাশের একটা দরজা ঈষৎ ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছে মাধুরী।

হাসিটা ওরই কিন্তু এতে হাসবার কি হয়েছে? মহেন্দ্র উঠে বসবার পূর্বেই মাধুরী বললো, যোগাভ্যাস চলছে সন্ন্যাসী ঠাকুর?

যোগাভ্যাস? না দাদা ওসব করেন। মহেন্দ্র বোকার মত জবাব দিল উঠতে উঠতে।

তুমিও করবে, দণ্ড কমণ্ডলু আমি কিনে দেব। বলে ভেতরে এল মাধুরী।

ঠাট্টা? বলে মহেন্দ্র এতক্ষণে যেন পিটা অনুধাবন করল।

ঠাট্টা কি? ওসব আমি করি না। যোগাভ্যাস কিছু খারাপ ব্যাপার নয়। আজ থেকে খাট পালং বিছানা তুলে কম্বল পেত দেব নাও উঠে পড়, সকাল অনেকক্ষণ হয়েছে। যোগের লক্ষণ ব্রহ্মমুহূর্তে শয্যা ত্যাগ।

যোগের অনেক কিছু শিখে ফেলেছ দেখছি মহেন্দ্র এতো পরে বললো কথাটা সাহস করে। কাল থেকে এ পর্যন্ত মহেন্দ্র একতরফা শুনছে। আজ সাহস পেলে। হ্যাঁ যেটুকু শিখতে বাকী আছে, তোমার কাছে শিখে নেব। হাতমুখ ধুবে এসো দাদাদের চা হয়ে গেল।

তোমার? মহেন্দ্র যেতে যেতে প্রশ্ন করলো।

তোমার মত মেষ শাবকের ভার আমার ওপর, তখন তোমাকে খোয়াড় মুক্ত না করে আমি খাব কেমন করে? বলেই মাধুরী কম্বলখানা আর বালিশটা তুলে দিল। বাথরুমে ঢুকে মহেন্দ্র ভাবতে লাগলো স্নান হয়ে গেছে মাধুরীর ভিজে চুলগুলো পিঠ জুড়ে রয়েছে। মহেন্দ্র স্নানটা সেরে নেবে নাকি? কাপড় কোথায় আছে, কে জানে? আর থাকলেও এ বাড়ীতে মানাবেনা। কাজেই মুখ ধুয়ে মহেন্দ্র বাহিরে এল নিজেকে যথাসাধ্য ন্দ্র করে নিয়েছে সে এর মধ্যেই। চুলটাও আচড়ে নিয়েছে। বেরিয়ে দেখলো একটা চাকর দাঁড়িয়ে। বললো ছোটদা ডাকছেন স্যার আসুন।

মহেন্দ্র চটি পায়ে, তার পিছনে বেরিয়ে এল? বৃদ্ধ উমেশবাবু গিন্নি আর বড়বৌ বসে আছেন চেয়ারে মাধুরীকে কোথাও দেখতে পেলেন না। বৃদ্ধ বললেন এস বাবা, কাল বেশ ঘুম হয়েছিল তো।

আজ্ঞে হ্যাঁ।

মহেন্দ্র বললো চেয়ারে বসতে বসতে।

কম্বলে না শুলে ওর ভাল ঘুম হয় না বাবা–বলে মাধুরী কোত্থেকে এসে দাঁড়ালো–খাটে না শুয়ে মেঝেতে কম্বল পেতে শুয়েছিল আজ ওকে একটা মৃগচর্ম কিনে দিতে হবে।

সে কিরে মা। বলে বৃদ্ধা বিস্মিত হাসিমুখে তাকালেন মহেন্দ্রের পানে? সলজ্জ মহেন্দ্র বললো–

আজ্ঞে না অত ভালো বিছানায় শোয়া তো, অভ্যাস নেই। অভ্যাস করাটাও ঠিক হবে না তাই–

কৃচ্ছ সাধন করেছিলেন বললো মাধুরী বেশ তো, ঐ অশ্বথ গাছটার তলায় মৃগচর্ম পেতে দেবো।

বসলো মাধুরীও রুটিতে মাখন লাগিয়ে গিন্নী মা প্লেটখানা এগিয়ে দিলেন। বললেন ওসব করো না। বাবা, ব্যাটাছেলে রোজগার করবে, চিরদিন কি কেউ গরীব থাকে। তোমার এই কাকাই তখন সি, পিতে যান সামান্য সম্বল নিয়ে, তখন আমাদের অবস্থাও খুব খাটো। ছিল। তোমার বাবার অবস্থা তখন আমাদের চেয়ে ভালো।

মহেন্দ্র কিছু বললো না, চুপ করে খেতে লাগলো। মাধুরী ওর চা ঠিক করে দিতে দিতে বললো ভালো করে দিনকতক খাও, শরীরটাও অল্প সারুক তারপর কম্বলে না হয় শোবে কোপীন পরবে কচুপেড়া খাবে যা খুশী করবে। মহেন্দ্র এবারেও কথা কইল না, একটু হাসলে মাত্র। উমেশবাবু বললেন কিছু টাকা আজই পাঠিয়ে দাও তোমার দাদার নামে লিখে দাও তুমি এখানেই রয়েছে ওরা যেন না ভাবে।

চাকরী বাকরি একটা কি জুটবে? অতি ক্ষীণ কন্টে বললো মহেন্দ্র।

অত ব্যস্ত কেন, বাবা? এখানে তুমি নিজের বাড়ীতেই আছ মনে করবে। চাকরির কথা এবার আমি ভাববো এতোকাল বন্ধুর ছেলেদের খবর নিইনি এ যে আমার কতবড় অপরাধ, তা আমি বুঝেছি। মাধুমা, টাকাটা তুই নিজেই মানি অর্ডার করিয়ে দিস আর জুতোজামা কাপড় সব কিনে দিবে যা।

শীত আসছে, বাবা গরম কোর্ট শার্ট দরকার।

না, ওসব না। আমার খোকনের সুতার গেঞ্জী রয়েছে।

মহেন্দ্র এমন আকস্মিক আর্তকণ্ঠে কথাটা বলে উঠলো যে উপস্থিত তিন জনেই ওরা করুণ এই আবহাওয়াটাকে শীত পড়তে দেরী রয়েছে, তার আগেই তোমার খোকনের জামা কাপড় তৈরী হয়ে যাবে বাড়ি থেকে বেরিয়ে অবধি কতবার খোকনের কথা ভেবেছ। মহীনদা?

ও ছাড়া কিছুই আর ভাবী না, মাধুরী। অন্ধ দাদা খোকনের মতই বয়স থেকে আমায় মানুষ করেছেন তার কথাও ভাবি না। যোগী পুরুষ অদ্ভুত অসাধারণ মনঃশক্তি–অভাবকে তিনি অবহেলায় অগ্রাহ্য করেন বৌদি তার যোগ্য সহধর্মিণী কিন্তু আমি বড় দুর্বল–

তাই সবল হওয়ার জন্যে কাল কম্বল পেতে ছিলে? বড় বৌ বললো এতক্ষণে।

না বৌদি খোকনকে কখনো ভাল বিছানায় শোয়াতে পারিনি, ফুলের মত ছেলে, ঘুটিং বেরুনো শানে পড়ে থাকে–

ব্যাটাছেলের ঐ রকম ভাবেই মানুষ করতে হয় বললো মাধুরী। নইলে ঐ দেখো না আমার ছোড়দা ললিতা লবঙ্গলতা, একটা পালং এ আটখানা বালিশ দেড় হাত মোটা গদী আর সিল্কের চাদর না হলে ঘুমুতে পারে না।

ঠিক সেই সময় একজন সুন্দর যুবক প্রায় মহীনের সমবয়সী, এসে দাঁড়ালো কবি কবি চেহারা। লম্বা চুল, গায়ে দামী সিল্কের গেঞ্জী তবে স্বাস্থ্য খুব ভাল বলা চলে না। একখানা চেয়ারে বসতে বসতে বললো দে তোর মহীনদার সঙ্গে আলাপ করিয়ে, আর এক কাপ চাও যদি দিস।

চা দিচ্ছি কিন্তু আলাপ করিয়ে দিবে হবে কেন, তুমি কি বিলেতী না আমেরিকান? কি এমন বয়স হয়েছে যে পরের লোকের সঙ্গে ইনট্টোডিউস না করলে কথা বলতে পারবে না? লক্ষ্ণৌ ঠুংরী হয়ে যাচ্ছো ছোড়দা।

তার মানে? লক্ষ্ণৌ ঠুংরী কিরে?

সবাই হেসে উঠলো কথাটা শুনে। মাধুরী একটু গম্ভীর গলায় বললো–

নয় তো কি। তোমার লক্ষ্ণৌ এ বিয়ে বন্ধ করতে হবে, সঙ্গে ইনট্টোডিউস করিয়ে দেব তাকে চা খাওয়াতে হবে। ওস্তাদ গান শোনবার একজন সমঝদার স্রোতা তুমি পেলে ছোড়দা, এর জন্যে।

তোমাকে ধন্যবান দেওয়া উচিত। তোমাকে কেন ধন্যাবদ দেব।

কারণ আমিই আবিস্কার করেছি? এসো ইনট্টোডিউস করিয়ে দিই–মাল–কোশ শোনাতে হবে, তোমাদের খা সাহেবকে আজ ডেকে আনবে।

ছোড়দা অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ এতক্ষণ কথা বলেনি মহেন্দ্রের সঙ্গে, ইংরেজী কায়দায় পরিচয় করিয়ে দেয়নি কেউ বলে নয়। নিতান্ত একজন গ্রাম্য যুবক।

কি কথা বলবে এই ভেবে সময়ক্ষেপন করেছিল। মহেন্দ্র গানের সমঝদার শুনে সাগ্রহে বললো–

গান বাজনার সাধনা করা হয় তাহলে?

আজ্ঞে না সাধন করবার সময় কোথায়? পেটের ধান্দায় ঘুরছি সব আছে সময় সুযোগ পেলে বসি এক আধবার মহেন্দ্র অলকা ক্লাবে।

না! অতি তীক্ত কণ্ঠে বললো মাধুরী। ওখানে ও যাবে না। ওখানে তোমাদের রাজাবাদশার মজলিসে আমাদের গরীবের মানায় না ওকে। আমি নিজেই গান শুনিয়ে আনবো কোথাও, নইলে বাড়ীতেই উস্তাদ ডাকবো।

কেন? ওখানে যেতে আপত্তি কি? আমার সঙ্গে যাবে রতীন শুধালো।

আপত্তি অনেক। ওরা সবে মহীনদাকে কৃপার চক্ষে দেখবে, বলবে পাড়া গাইয়া অশিক্ষিত গরীব। ওসব হতে দেব না আমি। চল মহীনদা, বাজারে যেতে হবে বলে মাধুরী উঠে পড়ল।

ভালো গায়কের সম্মান ওখানে খুব বেশী, জানিস ওকে সবাই লুফে নেবে।

ও তোমাদের মতো ভালো গায়ক নয়, নাকী সুরে প্যানপ্যানে গানও গাইতে পারে না। মাধুরী এগিয়ে বললো এসো দেরী হয়ে যাচ্ছে।

মহেন্দ্র উঠতে উঠতে ভাবতে লাগলো_প্যানপ্যানে নাকি সুরের গান সে যে পছন্দ করে না এ খবর মাধুরী জানলো কেমন করে? আশ্চর্য তো কথাটা কিন্তু খুবই সত্যি। ওদের বংশটা ওস্তাদের বংশ, বাবা ভাল গাইতে পারতেন। সম্ভবতঃ উমেশ কাকার মুখে মাধুরী সে কথা শুনে থাকবে। এখানে এসে মহেন্দ্র তো একবার তাতানা শব্দও করেনি অবশ্য রেডিওর গানটা শুনেছিল কিন্তু এতেই কি মাধুরী তার সংগীত প্রিয়তা সম্বন্ধে এত খবর জানতে পারলো। এই পরমাশ্চার্যের কথাটা চিন্তা করতে সে যাচ্ছে। ছোড়দা রতীন বললো–

আচ্ছা বাজার করে আসুন পরে আলাপ হবে।

হু বলে মহেন্দ্র মাধুরীর সঙ্গে গিয়ে গাড়ীতে উঠলো। বললো—

একটা অনুরোধ রাখবে মাধুরী।

অনুরোধ যখন, তখন শুনে বলা যাবে রাখবো কিনা। আদেশ হলে নিশ্চয়ই রাখতাম।

বেশ, আদেশই বললো মহেন্দ্র। খুব বেশী দামী জামা কাপড় আমার জন্যে কিনো না। আমি তো সত্যি গরীব আর অশিক্ষিতও। ভদ্রভাবে চলতে যতটুকু যা দরকার, তাই আমার জন্যে কিনে দাও। বড় মানুষী করবার আমার সখ নেই লক্ষী।

ও বাড়ীটাকে আবুহোসেনী রাজত্ব বলে মনে হচ্ছে–কেমন? আচ্ছা বোঝা যাবে।

হাসলো মাধুরী নিটোল মধুর হাসি–তারপর বললো গম্ভীর স্বরে–

আমাদের বাড়ীতে তুমি শুধু একটা গায়ে পড়া আত্মীয়ও নও। বাবা এটা সকলকে ভালো। করে বুঝিয়ে দিতে চান আর আমিও চাই। এখানে যেভাবে থাকলে বাবার সম্মান বজায় থাকে, তাই তোমাকে করতে হবে। হা, কিন্তু তার জন্যে কি মানুষ দরকার?

অবশ্য দরকার, কারণ তিনি বড় মানুষ সেলফম্যান এবং ম র‍্যাদায় অভিজাত। কলকাতায় আমাদের চার পুরুষের বসতি বনেদী বংশ আর তুমি সে বাবার পরম বন্ধুর ছেলে। তোমাকে কোনো ছুটকে রাজকুমারের বাড়ীতে বাজার সরকারী করতে বাবা নিশ্চয়ই। পাঠাবেন না। তুমি কেন অত কুণ্ঠিত হোচ্ছ মহীনদা?

না কুণ্ঠ নয় মাধুরী, অনভ্যাস। নিজেকে বড় মানুষ ভাবতে আমার ভয় করে। বড় মানুষ। মানে ধনী মানুষ–

হ্যাঁ, তা বুঝেছি। বেশ অন্যদিকে বড় মানুষ হও–বিদ্যায়, জ্ঞানে মানুষত্বেও সেটাই আমি হতে চাই, বলে মহেন্দ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বললো। আমাকে অতবড় ঘরে পালঙ্কে না রেখে নীচের তলায় একটা ছোট ঘরে তুমি একখানা তক্তপোষে রাখলে আমি খুশিই হই মাধুরী।

না, আমি খুশী হব না। তার থেকে বরং একটা কাজকর্ম যোগাড় করে তুমি এ বাড়ী : থেকে চলে যাবে। যেখানে ইচ্ছে থাকবে গিয়ে, কিন্তু এখানে যতক্ষণ ততক্ষণ বড় লোকের ছেলের মতই থাকতে হবে অন্ততঃ আমাদের সাধারণ ভদ্রলোকের ছেলের মতো। দীনভাব আমি ভালবাসি না।

কিন্তু আমি দীন—

না। মাধুরী তীব্র প্রতিবাদ জানালো–নিজেকে দীন মনে করা অপরাধ। মানুষ অমৃতের পুত্র। দীন কেন হবে?

গাড়ীটা চৌরঙ্গীর একটা বড় দোকানের সামনে দাঁড়ালো, মাধুরী নামলো মহীনকে নিয়ে, দারোয়ানরা সেলাম জানাচ্ছে। উমেশবাবুর তিন ছেলে এক মেয়ে মাত্র যথাক্রমে অতীন যতীন, রতীন আর মাধুরী। মাধুরী সবার ছোট। তাই সকলের আদরের। বাবা মার কথা তো না বলাই ভালো, দাদারাও ওকে অত্যন্ত স্নেহ করে। কেহ কখনো ওকে এতোটুকু কড়া কথা বলে না। বড়দার থেকে ও অনেক চোট তাই বড়দার স্নেহটা আরো বেশী ওর উপর। বৌদিও।

২. বড় বৌদি জমিদার বাড়ীর মেয়ে

বড় বৌদি জমিদার বাড়ীর মেয়ে সুন্দরী সুলক্ষণা এবং সদগুণশালিনী আর এই বধুটি আসার পর থেকে উমেশবাবুর উন্নতি আশাতীত হয়ে উঠেছিল, বড় বধুর সম্মান ও বাড়ীতে বেশী। একমাত্র পুত্রসন্তান সাড়ে তিন বছরের। মেঝ ছেলে উচ্চশিক্ষিত কলকাতায় এক বিখ্যাত ব্যারিষ্টারের কন্যাকে বিয়ে করেছে সন্তানাদি এখনো হয়নি। শীঘ্রই সস্ত্রীক বিলাতে আমেরিকা যাবে বেড়াতে, কিছু বিদ্যা শিক্ষারও ইচ্ছা আছে। খেলাধুলায় ঝোঁক বেশী, ভাল ক্রিকেট খেলতে পারে। ব্যারিষ্টার কন্যাটি বিলেতী ঢঙে মানুষ হয়েছে, বাড়ীর চালচলন তার খুব পছন্দ নয় তবে যতদুর সম্ভব মানিয়ে চলতে চায়। ছোট ছেলে রতীন এম এ পাশ করে সঙ্গীত চর্চা করছে। ওদিকে খুব ঝোঁক ওর। লক্ষ্ণৌ এর একজন বিখ্যাত ব্যবসায়ীর কন্যার সঙ্গে বিয়ের কথা চলছে। আগামী অগ্রহায়ণেই হতে পারে। ছোট মাধুরী, উইমেন্স কলেজে আই, এ পড়ে। গাড়ীতে আসে যায়। এখন পূজার ছুটি তাই অখন্ড অবসর ওর। গিন্নীমা পূজা পার্বন নিয়েই থাকেন। বড় বধুই সাহায্য করেন। আর মাধুরীও করে সাহায্য। বাড়ীতে নিত্য পূজা তো আছেই তাছাড়া ওর নিজের তপজপও যথেষ্ট আছে তাই বাড়ীর মধ্যে আলাদা একটা ঘরই আছে ওঁর জন্যে। অত্যন্ত ভক্তিমতি নিষ্ঠামতী মহিলা। কেউ যদি বলে আপনাকে ভাল কীর্তন শোনাবো, তা তৎক্ষণাৎ তাকে লুচি মিষ্টি খাইয়ে দেবেন আর কীর্তন শোনালে তো কথাই নাই। পোলাও কালিয়া খাওয়ান! নিত্য গঙ্গা স্নান করে আসেন তাই কালীগঞ্জে ওর বাড়ি করা হলো না, গঙ্গা দূর হয়ে যাবে। দক্ষিণেশ্বর প্রতি শনিবার যান শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেবের সাধানপীঠ দর্শন করতে কথামত ওর প্রায় মুখস্থ। কিন্তু নিজে তিনি মোটে লেখাপড়া জানেন না সব পড়িয়ে শোনেন। কেউ যদি গিয়ে বলে আপনাকে কথামৃত পড়ে শোনাবো, তার তখুনি ওখানে নিমন্ত্রন হয়ে গেল খাবার। পাড়ার কত চালাক ছেলে–মেয়ে ওঁর এই দুর্বলতার সুযোগ যে নেয়, তার ইয়ত্তা নাই। এইবার পূজোর আগে পাড়ার ছেলেমেয়ে এসে বললো, জেঠাইমা বা কাকিমা মাসিমা যাহোক সম্বোধন করে মহিষমর্দিনী অভিনয় হবে, মায়ের মহিষাসুর বধ লীলা আপনাকে না শোনালে আমাদের পূজোই মিথ্যে হয়।

মহা খুশী হয়ে তিনি একশো চাঁদা দিলেন এবং নবমীর দিন রাত্রি জাগরণ করে শুনে এলেন গিয়ে যাত্রা। বললেন–

নিজের ছেলেরা করেছে তাই ভালো খুব ভালো হয়েছে!

অবশ্য এ জন্য পাড়াতে ওঁর অত্যন্ত সুনাম আপদে বিপদে ওর কাছেই লোকে ছুটে আসে, সাহায্য তিনি করেন যথেষ্ট। কলকাতার শহরে এরকম গিন্নী আধুনিক যুগে দুর্লভ এ জন্য সকলেই বলে মা বলে ভগবতী।

সংসারটা সুন্দর কোথাও কোনো কলঙ্ক চোখে পড়ে না। বাইরে থেকে শুধু মেজবৌটার চাল চলন ও বাড়ীর পক্ষে একটু বেমানান। কিন্তু সে খবর বাইরের লোকের জানাবার কথা নয়। তার বিস্তর বন্ধু নারী এবং পুরুষ টেনিস একটু না খেললে রাত্রে তার ঘুম হয় না। রাত্রে মোটরে চড়ে ক্লাবে তাকে যেতে হয়, তিনখানা খবরের কাগজ সে সকাল থেকে পড়ে। রান্না বান্নার প্রায় কিছু জানে না। চায়ের লিগার ঠিক করে দিলে কোন রকমে কাপে ঢেলে দুধ চিনি। মিশিয়ে দেয়, এছাড়া মাঝে মাঝে সৌখিন রান্না করে। বন্ধুদের দেওয়া পার্টি পিকনিকে যায় আর ইংরেজী গান শিখে রেকর্ড বাজায়। বিদ্যায় এম, এ। ইংরেজী কথা মুখ ফরফর করে বলতে পারে। বই যা পড়ে সব ইংরেজী, বাংলার কোনো লেখকের নাম বোধ হয় ওর জানা নেই এক রবীন্দ্রনাথ ছাড়া। রবীন্দ্রনাথকে জানে কারণ ছোটবেলায় দিনকতক শান্তি নিকেতনে পড়তে গিয়েছিল। তার পর ওর বাবা ওকে দার্জিলিং–এর মেম স্কুলে পড়ায়। কিন্তু একেবারে বিদেশী করে তোলা কেন? দেশী কর্তব্য কে জানে।

যতীনের সঙ্গে ক্রিকেটের মাঠে ওর আলাপ হয়। পরে বন্ধুত্ব তারপর লাভ ম্যারেজ। নইলে উমেশবাবু ও বাড়ীতে ছেলে বিয়ে দিতেন না। এই বধুটিকে নিয়ে সংসারে যা একটা ভাবনা। ঘর না ভাঙে। নইলে ভাইরা স্নেহ পরায়ণ বড়দার ওপর সবাই নির্ভর, আর বড়দাও অতিশয় ভালোবাসেন ভাই বোনদের। বড় বধূর তো কথাই নাই সাক্ষাৎ লক্ষ্মী। মাধুরীকে নিয়ে একটু গন্ডগোল আছে। সবার ছোট এবং সকলের অদূরে তাই ওর মন মেজাজ বোঝা কঠিন। কিন্তু ছেলেমানুষ দাদারা ওর বক্তব্যের মধ্যেই আনেনা বলে ও আমাদের আরেকটা ভাই। ওর যা খুশী করবে কেউ কিছু বলে না ওকে।

ওর বিয়ের চিন্তা কেউ কখনো করেনি। বয়স প্রায় আঠারো। বিয়ে হলে কিন্তু মন্দ হয়। মেজবৌদির বন্ধু কুমার সাহেবের বেশ একটা লোভ আছে ওর দিকে, কিন্তু মাধুরী গ্রাহ্য করে না তাকে। এমন কি কুমার যেদিন আসে মাধুরী সেদিন এ তল্লাটে থাকে না। ছোটদার এক বন্ধু আছে সুশীল বড় লোকের ছেলে গানবাজনার সখ। না মাধুরী তার দিকে ফিরেও চায়না। আর একজন আছে বড়বৌদির ভাই, নাম বরুণ, সুন্দর চেহারা বলিষ্ঠ, শিক্ষিত, সদালাপী সবাই ভাবে হলে বেশ হতো কিন্তু যার জন্যে এসব চিন্তা তার কোন সাড়া পাওয়া যায় না। ছোট থেকে মানুষ করেছে বড়বৌ ওকে মেয়ের মত স্নেহ করে; মাধুরী সুখী হলেই বড়বৌ সুখী হবে। শোনরে ছোটদি আজ মার সঙ্গে দক্ষিণেশ্বর যেতে পারবি?

আমি তো যাবই তুইও চল না–-ওখানে তোর জন্যে ভাল বরের প্রার্থনা করবো।

আমার জন্যে বর চাই না, অভিশাপ পাও তো কুড়িয়ে এনো, আমি আজ রতনদাকে নিয়ে ঈষা খার গান শুনতে যাবো বলে মাধুরী চলে গেল।

দক্ষিণেশ্বর পৌঁছে ঠাকুর দর্শন শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ দেবের মন্দির ইত্যাদি দেখে জপ সমাপন করে ফিরলো, রাত তখন দশটার উপর। কিন্তু মাধুরী মহেন্দ্র তখনও ফেরেনি। বড়বৌদি বললো–

এখনো ফেরেনি মাধু, বাবা। মেয়ে যা হোক–

তোমার তাতে কি? বড়দা বললো কথাটা শুনে। আমার কিছু না কিন্তু বোনটি বড় হয়েছে, বুঝলে? মেয়েরা অত রাত অব্দি বাইরে থাকবে!

মাধুরী তোমার মতন ছিচকাঁদুনে মেয়ে নয়। যার কাজ তাকেই সাজে।

স্বামী মাধুরীর দোষ দেখবে না, জানা বড়বৌদির। হেসে বললো বিয়েটিয়ে দিতে হবে না বোনের?

না বিয়ে ওর খুশী হয় করবে টিয়ে একটা পেলে দেখতাম।

টিয়ে নিজেই জোগাড় করে নিয়েছে ওই মহেন্দ্রকে। বলে হাসলো বড়বৌদি বেশ তো। কিন্তু খারাপ নয়, বলে বড়দা চলে গেল খাওয়া শেষ করে।

আর সব খেয়েছে, বাকী মাধুরী, মহেন্দ্র আর বড়বৌদি স্বয়ং। কিন্তু শাশুড়ী ওপর থেকে বললেন তুই খেয়ে নে মা, ওরা যখন আসবে খাবে, তুই কচি ছেলের মা রাত জাগলে অসুখ করবে–

নিরুপায় হয়ে বড়বৌ খেয়ে শুতে গেল তখনো মাধুরীর ফেরেনি, আশ্চর্য তো। এমন কি শুনছে ওরা বারোটা বাজে বড়বৌ ঘুমিয়ে গেল।

কে জানে মাধুরী আর মহেন্দ্র কখন ফিরছে?

পাঁচ সাত বিঘে ধানজমি মাত্র দেবেন্দ্রর বছরের ভাতের চালটা কোন রকম হয়, কিন্তু পরনের কাপড় আর নুন, তেল, মসলার জন্য নগদ কিছু দরকার কাজেই নিত্য অভাব লেগেই থাকে। খিড়কীর ডোবাটায় আগে কিছু মাত্র মাছ হতো ধারে কিচু শাক বেগুনও, কিন্তু দীর্ঘকাল সংস্কার না হওয়ার এখন আর বারো মাস জল থাকে না আর শাক বেগুনের চাষ করবার লোকাভাব। অন্ধ দেবেন্দ্ৰ পেরে উঠেন না অতএব তবুও এ বছর কিছু মাছ ছাড়া রয়েছে, আর পুকুরের জলে কলমীলতা বপন করেছে খোকনের মা। লতাটা বেশ বড় হয়ে উঠলো। ওরই শাক প্রায় প্রতিদিন রান্না হয়! ওদিকে পাড়ে একটা আমরা গাছ আছে তার অম্বল হয় রোজই। এই উপাদান দিয়ে কোনরকমে অন্ন উদরস্থ করতে হয় ওদের কিন্তু অভ্যাস হয়ে গেছে।

পুরনো বাড়ী পেছনের অংশটা অব্যবহার্য–ইঁদুর চামচিকের বাসভুমি। সামনের দিকটাই একটু ভাল আছে তারই কয়েকখানা ঘর আর উঠোনটুকু নিয়ে এই পরিবারটি। বাইরের ঘরটায় দেবেন্দ্র প্রায় সারাদিন বসে থাকেন চৌকিতে যে কেউ আসে এই ঘরেই বসে। মাঝে মাঝে সেতার তানপুরা মৃদঙ্গ বাজাতেন দেবেন্দ্র কিন্তু তানপুরাটাই ভেঙ্গে গেছে। সেতারটা প্রায় অব্যবহাৰ্য্য কাজেই তার সেই অবলম্বনটুকু নাই আর এখন খালি গলায় দু’একটা গান মাঝে মাঝে ধরেন।

খোকনের গান বাজনার বড় ঝোঁক। ওইটুকু ছেলে তবলার চাটি শুনলেই দৌড়াবে সেখানে। রাত জেগে গান শুনতে চায় ভাঙা কেনেস্তার বাজিয়ে বোল শেখে। গলাটা অত্যন্ত মিষ্টি এরই মধ্যে দু’একটা শ্যামাবিষয়ক গান শিখে ফেলেছে। কিন্তু ওকে শিক্ষা দিতে যন্ত্রপাতির দরকার তার অভাবে কিছু করা যাচ্ছে না। দেবেন্দ্র অনেক ভেবে চিন্তে আজ সকাল থেকে খোলাটা নিয়ে পড়েছেন, কীর্তন শেখাবেন খোকন বসে বসে দেখছে এবং সাহায্য করছে–অন্ধ বাপের ঐ এখন বন্ধু।

গ্রামের দু’জন লোক এসে দাঁড়ালো–স্বাগতম জানিয়ে দেবেন্দ্র বললেন কি খবর চাকলাদার মশাই?

: পাড়ায় মাহমায়া লতায় আজা একটু গান বাজনা হবে, তাই তোমাকে যেতে হবে, ভাই দেবেন। আমার ছেলে এসে নিয়ে যাবে আর দিয়ে যাবে।

: সে তো আনন্দের কথা তা বাইরের কেউ আসবে নাকি?

: হ্যাঁ ভুরশুশরী ওস্তাদ কালীচরণ আসবে, আমাদের বিপিন আছে আর তুমি রয়েছ। তাহলে এই কথাই রইল কেমন।

: না, তেমন কিছু নয়। ভাল কথা, মহেন্দ্র কোথায়?

: সে কলকাতায় গেছে কিছু একটা চেস্টা চিঠি পাইনি এখনো, ভাবছি।

: ভাবনা কি? চিঠি পাবে। আচ্ছা আসি এখন, বাবুদের বাড়ীর দু’এজনকে বলতে হবে বলে চলে গেলেন ওঁরা।

দেবেন্দ্র খোলটা সারবার চেষ্টা করতে করতে ভাবতে লাগলেন, একদিন এই বাড়িতেই গানের কত আসর বসতো। আর আজ তাকে যেতে হবে ও পাড়ায়। কিন্তু দুঃখের কি আছে। ওরা সব মনে করে ওকে ডেকেছেন, এইতো যথেষ্ট। গরীবকে কে আর মনে রাখে? বহুদিন ভালো গান বাজনা শোনেন নি আজ শুনতে পাবেন ভেবে আনন্দিত হয়ে উঠলেন মনে মনে।

এ গ্রামে সঙ্গীত চর্চা একদিন খুব ছিল এমন প্রায় নাই বললেই হয়। এখন পরচর্চা এবং পরের অনিচিন্ত ছাড়া আড্ডা প্রায়ই জমে না। যাকগে, তানপুরাটা কোনোরকমে সারিয়ে খোকনকে গান শিখাতে হবে। পড়া শুনায় ছেলেটায় বুদ্ধি খুব কিন্তু গান শেখানো দরকার। গ্রামের ফ্রি প্রাইমারী স্কুল পড়ে সে, মাইনে লাগে না ও বিষয়ে কিছু ভাবনার নাই। পড়ার। বইও যোগাড় করা হয়েছে, তা ছাড়া ওর মা, ঘরে পড়ায়, তাই খোকনের খেলায় ধুম খুব বেশী। গান বাজনা হবে শুনেই বললো–

: আমি যাব বাবা।

হ্যাঁ, যাবি, মা যাবে না তো? না।

আয় তোকে স্বর–মাত্রা শেখাবো বলে আরম্ভ করে দিলেন মুখে মুখে। খোকনের আগ্রহ অত্যন্ত বেশী। আর এত সহজে বুঝতে পারে যেন মনে হয় পূর্বজন্মের সংস্কার সা–রে–গা–মা সমানে চালিয়ে যাচ্ছে বাপের সঙ্গে ওর মা ভেতরে থেকে একবার উঁকি দিয়ে দেখলো। ও একনিষ্ঠ সুরসাধকের এখন ঐ শিশুটি সম্বল। অথচ কত ভালো গান উনি গাইতে পারেন। চোখে জল আসছে, সামনে এগিয়ে এসে বললো–

: স্নান করো, বেলা হয়ে গেছে।

: হ্যাঁ, যাই গা মা পা ধা তাল দিয়ে চলেছেন দেবেন্দ্র আর খোকন ঠিক মত অভ্যাস করছে। অপূর্ব কণ্ঠস্বর ভগবদদও। কি মিষ্টি যে লাগছে কচিমুখে। সাধারণ বদরী বেদীতে যেন ওই পিতাপুত্র, ওই গুরু শিষ্য। খোকন গাইছে–

শ্মশান ভালবাসিস বলে, ওরা শ্মশান করেছি হৃদি।
শ্মশান সিনী শ্যামা, নাচবি বলে নিরবধি।
শ্মশান ভালবাসিস বলে–

ঝরঝর জল পড়ছে দেবেন্দ্রের দৃষ্টিহীন চোখ থেকে। জানালাপথে চেপে আছে যেন আকাশ উজ্জ্বল করা জ্যোতির্ময় শ্যামামূর্তি দেখছেন। গাইছেন—

আর কিছু ধন নাই মা চিতে,
চিতার আগুন জ্বলছে চিরে,
চিতাভষ্ম চারিভিতে, রেখেছি মা আসিস যদি,

: থামো। এটুকু ছেলেকে গান কেন শেখাচ্ছে? বললো খোকনের মা। মরণকালে গাইবে গো–আমার আর কদিন। ওর মুখে গান শুনতে শুনতে–

থামো। তোমার পায়ে পড়ি। থামো বলে ছুটে এসে মুখে হাত চাপা দিল। খোকন অবাক হয়ে বড় বড় চোখ দুটো দিয়ে দেখছে বাবা মার এরকম ব্যাপার ও আর দেখেনি। কী এমন হলো যে বাবা কাঁদছে আর মা চুপ করাচ্ছে। সে ভাবলো আজ সকালে জলখাবার জন্য মা কৈ কিছু দিতে পারেনি, তাই কাদাছ বাবা। বলে বসলো–

: আমার খিদে পাইনি মা, দু’টো ডাসা পেয়ারা খেয়েছি রাজুদের বাড়ীতে।

: চুরি করে? দেবেন্দ্র প্রশ্ন করলেন।

: না বাবা, রাজু দিয়েছিল। আর একটা আতা–আতাটা পাকা নয় তাই রেখে দিয়েছি পাকলে খাব। কাল পেকে যাবে।

: সকালে কারও বাড়ী যাসনে খোকন, মা বললো, ওদের ছেলেপেলেরা সব ভাল খাবার খায় তুই কেন ভিখারির মত গিয়ে দাঁড়াস বাবা? যাসনে।

না মা রা জ্বর দুধমুড়ি খাওয়ার পর আমি গিয়েছিলাম। আর যাব না গান শিখতে হবে। ভোরবেলা, বাবা বললো।

হ্যাঁ, ভোরবেলা গলা সাধবে। এসো স্নান করে ভাত খাবে এবার মা ওকে উঠিয়ে নিয়ে গেল। ওইটুকু ছেলে সকাল থেকে বারোটা পর্যন্ত কিছুই খায়নি দু’টো ভাত বেঁধে দিতে পারতো, কিন্তু কাঠ–কয়লা কিছু ছিল না শেষে পিছনের দালানের একটা পুরানো কড়িকাঠ ছড়িয়ে উনুন জ্বালতে হোল, বেলা তখন অনেক হয়ে গেছে। নগদ পয়সা হাতে থাকলে কিছু কিনে দেয়া যেত। কিন্তু যা ছিল, মহেন্দ্রকে দেয়া হয়েছে ট্রেনভাড়া বাবদ। দেবেন্দ্র সবই জানেন, কিছু বলেন না। বলে লাভ তো নেই।

পূজা সেরে খেতে বসলেন মাসকলা–এর ডাল, ভাত আর আমড়ার অম্বল। বাড়ীর শাক অবশ্য পাতের এক কোণে ছিল একটু, ওতেই হোল। কিন্তু খোকনের বড় কষ্ট হয়, কোনো রকমে খায়, যাকে বলে পেটের জ্বালা। দৈন্য মানুষের আসে কিন্তু এদের যেন অতিরিক্ত মাত্রায় এসেছে কিন্তু যেদিন মহেন্দ্র রোজগার করবে সেদিনই তো সংসার সচ্ছল হয়ে উঠবে। দুঃখের দিন শেষ হয়ে আসছে।

আহারের পর একটু বিশ্রাম করার অভ্যাস, দেবেন্দ্র চৌকিতে শুয়ে চোখ বুজছেন, খোকন বাইরে রোয়াকে বসে সা রে গা মা সাধছে। হঠাৎ পিওন তাকে কি যেন বলল, খোকন তিন লাফে ভিতরে এসে বললঃ

বাবা, ও বাবা টেলিগ্রাম নাকি, কাঁপছেন দেবেন্দ্র উদ্বেগে।

আজ্ঞে হ্যাঁ বাবু, টেলিগ্রাম মানি অর্ডার, পঞ্চাশ টাকা, বলতে বলতে গ্রামের পোষ্টম্যান সাগরময় এসে ঢুকলো ভেতরে। ঘাম দিয়ে জ্বর ছুটলে যেন। মানি অর্ডার। টেলিগ্রাম নয়, আহঃ। আনন্দে চোখে জল এসে পড়লো দেবেন্দ্রের। মহীন টাকা পাঠিয়েছে, কোথায় টাকা পেল, কি করে পাঠালো কে জানে। কোন খবর নয় এই যথেষ্ট।

: ফর্ম খানা হাতে দিয়ে দেবেন্দ্র বললেন আমারই নামে আছে তো সগর, কোথায় সই করতে হবে, দেখিয়ে দাও।

: আজ্ঞে, চিঠিও আছে একখানা, বলে সাগর একটা পোষ্টকার্ড দিল।

চিঠিখানা আগে পড়লো খোকনের মা। মহীন ভালো আছে। উমেশবাবু তাকে পুত্রবৎ গ্রহণ করেছেন, এই টাকা তিনি পাঠাচ্ছেন খোকনের জন্যে। চাকরিও তিনি একটা করে দেবেন শীঘ্রই।

পঞ্চাশ টাকা একসঙ্গে অনেকদিন দেখেনি দেবেন্দ্ৰ হাত পেতে নোটখানা নিলেন কিন্তু এটা একজনের দান সাহায্য। মহীনের রোজগারের টাকা নয়। যতটা আনন্দ ওর হওয়া উচিত ছিল, তা হোল না। তবু মহীন ভালো আছে সেখানে। আর উমেশবাবু ধনী হয়েও তাদের ভুলে যায়নি এই সান্ত্বনা, খুশীই হলেন তিনি। মহীন লিখেছে খোকনের যেন রোজ আধাসের দুধের ব্যবস্থা করা হয়, ছেলেটা ঠিকমত বাড়িত পারছে না খাদ্যভাবে? হাসলেন দেবেন্দ্র। দুধ স্বপ্নের ব্যাপার তার বাড়িতে। কিন্তু স্বপ্ন কেন? মহীন রোজগার করবে, দুধ অমন অসম্ভব কথা কি?

টাকাগুলো স্ত্রীর হাতে দিয়ে আবার শুলেন তিনি খাটে, মাথাটা এখনো ধরে রয়েছে। ডাক পিওন বিদায় হয়ে গেছে, মনি অর্ডার আর কুপন আর চিঠিখানা রয়েছে বিছানার একপাশে। খোকন মার সঙ্গে ভেতর বাড়িতে গেছে। একা দেবেন্দ্র শুয়ে। কিন্তু আর ঘুম। আসে না কত চিন্তা কত অতীতের স্মৃতি কত ভবিষ্যতের স্বপ্ন যে ওর মনের আনাচে কানাচে ঘুরতে লাগলো তার সংখ্যা নেই। নিশ্ৰুপ কিছুক্ষণ পড়ে থাকলেন, তারপর উঠে ভেতরে গেলেন দেয়ালে ধরে ধরে। স্ত্রীকে গিয়ে বললেন একটা টাকা সত্য নারায়ণের পূজার জন্য রাখে, বাকীটা খরচ করো। তোমার একখানা কাপড় বড় দরকার, দয়ালকে ডেকে আনতে পাঠিয়ে দাও।

আচ্ছা, তুমি উঠে এলে কেন?

: কিছু না, এমনি মনটা অস্বস্তি লাগছে।

: কে জানে?

: কেন তা জানে অর্পণা। টাকাগুলো নিতে হলো দারিদ্রের তাড়নায়, নিরুপায় হয়ে, নইলে ক্ষেত্রনাথের পুত্র দেবেন্দ্র কারো অর্থ সাহায্য জীবনে গ্রহণ করেনি। আর এই জন্যই তিনি উমেশবাবুকে কোনো খবর পর্যন্ত দেননি, তার দুঃখ দুর্দশার। মহেন্দ্র জেদ করে গেল, নইলে তাকে ওখানে তিনি পাঠাতেই চাননি। অর্পণা বললো, উনি আমাদের লোকই তো টাকা দিয়েছেন তো ক্ষতি কি? মহীন চাকরী পেলেই আর কারও সাহায্য নিচ্ছি না আমরা, নিজের মনে করে তিনি দিয়েছেন, মনে অশান্তি কেন আনছো তুমি?

অশান্তি নয় অপর্ণা অসহায় বোধ করছি। মহীনের রোজগারের পাঁচটা টাকা এলে আমি হয়তো আনন্দে নাচতাম।

–আসবে? পাঁচ টাকা কেন, পাঁচশো আসবে মহীনের। কত কষ্টে মানুষ করা ছেলে আমার মহীন, সে তো বসে থাকার ছেলে নয় কুড়েও নয়।

: হু, যাক কাপড়টা আনিয়ে নাও, বলে তিনি ফিরে যাচ্ছেন। অপর্ণ বললো। তোমার তানপুরার তারও আনতে দেব কি রকম তার চাই বলে দাও

–না, অকস্মাৎ ফিরে দাঁড়ালেন দেবেন্দ্র। না অপর্ণা ওটা মহীনের রোজগারের টাকা এলে কিনবে। এই বংশের গৌরববাহী যন্ত্রে আমি পরের দানের স্পর্শ ঘটাব না। চলে গেলেন।

জানে অপর্ণা স্বামী স্বভাব। ভাঙ্গবে তো নুইবে না কঠোর কঠিন সংযমী পুরুষ, নির্লোভ নিরহঙ্কার কিন্তু কোথাও তার বংশগৌরব ক্ষুণ্ণ হতে তিনি দিতে চান না, একান্ত অসহায়। আজ তিনি অন্ধ, অন্ন বস্ত্রহীন, নইলে হয়তো এ টাকা তিনি ফেরত দিতেন।

দয়ালকে ডাকতে হলো না এমনি সে আসে। পাড়ার পরোপকারী যুবক অকাতরে। অপরের জন্য শরীর ব্যয় করতে প্রস্তুত। এসে বললো–

: কাকীমা, কিছু দরকার আছে?

: হ্যাঁ বাবা একখানা শাড়ী এনে দিতে পারবি?

: হ্যাঁ টাকা দাও, আর রেশন কার্ডটা।

অপর্ণা টাকা দিয়ে বললো খুব মিহি কিনিস না বাবা, মাঝামাঝি দেখে আনিস যেন টেকে। খোকনের জন্য প্যান্ট।

আর কি? দয়াল প্রশ্ন করলো!

–না আর কি? একটা রবারের বল পাস তো আনবি খোকনের জন্য দয়াল হয়তো সন্ধ্যা নাগাদ ফিরবে। কিন্তু তানপুরার তারটা কেনা হলো না। হলে উনি বাজাতে পারতেন সকাল সন্ধ্যায় একটা কাজ পেতেন খোকনের শেখা হতো, উপায় নাই। অপর্ণা নিঃশ্বাস ফেলে গৃহকর্মে মন দিল।

খোকন খিড়কী পুকুরের পাড়ে বাগান করেছে। চাপা দোপাটি আর সন্ধ্যামণি ফুলের গাছ লাগিয়ে। কবরী শুলঙ্ক আর গাদা আগে থেকেই ছিল ওখানে। বাগানের মাঝে গোটাকয়েক ভাঙ্গা ইট জড়ো করে বেদী বেঁধেই তার উপর শাহাজাদা বাদশার মতো বসে গান ধরেছে–

কেষ্টঠাকুর কালো হলো, গোরা হলো, গোরা হলো রাধা।

সন্ধ্যা হয়ে আসছে, হঠাৎ শুনতে পেল বাবাকে ডাকতে এসেছে মহামায়া মন্দিরে গান বাজনার আসর থেকে। একছুটে ভিতরে এসে দাঁড়ালো, ও যাবে ওখানে। অপর্ণা ওর ছেঁড়া প্যান্ট খুলে নতুন প্যান্ট পরিয়ে দিল। আনন্দে খোকন চলে গেল বাপের সঙ্গে গান শুনতে।

আসরটা মন্দ হয়নি ওখানে। অনেক লোক এসেছে। দেবেন্দ্র ওস্তাদ সবাই খাতির করে বসালেন, গান আরম্ভ হলো, খোকন তালে তালে ঘাড় দোলাচ্ছে অবশেষে বাবার গলার সঙ্গে গলা মিলিয়ে গাইতে আরম্ভ করে দিল। সবাই অবাক সঙ্গীতে অসাধারণ প্রতিভা তার, আশ্চর্য তো।

: খুব বড় গায়ক হবে বললো একজন।

: কি করে হবে শেখবার অবস্থা নেই দেবেন্দ্র বললেন।

: আপনি শুধু সা রে গা মা শিখিয়ে দিন, তারপর ও নিজেই শিখে যাবে।

: সঙ্গীত বড় শক্তি বিদ্যা, বললেন দেবেন্দ্র কিন্তু আশায় আনন্দে ওর চোখ জলে ভরে উঠলো। খোকা বড় গায়ক হবে ঈশ্বরের আর্শীবাদ হয়ে দাঁড়াবে তার জীবনে।

জুতো জামা কাপড়ে মহেন্দ্র প্রায় অভিজাত হয়ে উঠেছে, চেহারাটা তো ঈশ্বরদত্ত! কিন্তু আচার ব্যবহার নিতান্ত দীনহীনের মত না হলেও ধনী সন্তানের মত মদগর্ব আসছে না। বহু ব্যাপার আছে এই সমাজে, যা যত্ন করে শিখতে হয়। জন্মবধি যাদের অভ্যাস তারাই এই সব ভাল পারে। মহেন্দ্র নিতান্তই পল্লীবাসী, তাকে কাঁটা চামচেতে খাওয়া শেখাতেই যথেষ্ট সময় লাগবার কথা, কিন্তু মাধুরী অসাধারণ ভাল মাষ্টার। তার পাল্লায় পড়ে মহেন্দ্রকে শিখতে হচ্ছে।

সেদিন গান শুনে বহু রাত্রে ফিরলো মহেন্দ্র মাধুরী। খেয়েই এসেছিল, তাই বাড়ীর খাবারের আর খোঁজ করলো না। মহেন্দ্র তার নির্দিষ্ট ঘরে কম্বল পেতে শুলো, কিন্তু অতি ভোরে মাধুরী নয় বড়বৌদি এসে বললো, তোমার যোগাভ্যাস আপাততঃ তুলে রাখো ঠাকুরপো, ওর দেরী আছে। এজন্মে হবার আশা কম।

: যোগভ্যাস নয় বৌদি। মহেন্দ্র তাড়াতাড়ি শয্যাত্যাগ করতে করতে বললো, বদভ্যাস করতে চাই না।

: ভালো, বিছানায় শোওয়া বুঝি বদ অভ্যাস?

: হ্যাঁ, বৌদি, পুরুষ যেখানে হউক শোবে, যা পাবে তাই খাবে, যে ভাবে হোক থাকবে পৃথিবীতে তাকে কর্মের জন্য পাঠানো হয়েছে।

: ওরে বাপরে! একেবারে পতঞ্জলী ঠাকুর। কিন্তু তোমার শরীর খুব ভালো নয়। ঠাকুরপো। কাল তোমার বড়দা বলেছিলেন তোমার শরীরটা আগে সারা দরকার।

: আমি খুব সুস্থ মানুষ, বৌদি, আপনি ভুল করছেন। বড়দাকে বলবেন দেখতে লম্বা আর রোগা হলেও আমি অসম্ভব খাটতে পারি। উঠলো মহেন্দ্র নিজের হাতে কম্বল–বালিশ গুটিয়ে তুলে রাখলো। মুখে চোখে জল দিল এবার।

: কাল কেমন গান বাজনা হলো, বড়ো বৌদি শুধোল।

: ভালো। তবে দেখলাম খাঁটি রাগ রাগিণীর দিকে প্রায় কেউ এগোল না।

: আজ কালকার মানুষ খাঁটি কিছুই চায় না ঠাকুরপো। নাও উঠে মুখ ধুয়ে এসো, মা বাবা বসে আছেন চা নিয়ে।

: মাধুরী কোথায়? ঘুমুচ্ছে? কথাটা অকস্মাৎ অতর্কিত বেরিয়ে গেল মহীনের মুখ থেকে।

: না। হেসে উঠলো। বড়বৌদি, মাধুরী ভালোই আছে। ভোরে স্নান ওর অভ্যাস, তারপর ঠাকুর ঘরে যায়, এখনো সেখানেই আছে। নাও, মুখ ধোও। মহেন্দ্র আর কিছু না বলে বাথরুমে ঢুকলো। কিন্তু বৌদি কেন হাসলেন? অমন ব্যাকুলভাবে মাধুরীর কথাটা না শুধুলেই ভালো হতো। কে জানে কি ভাববেন। অত্যন্ত বুদ্ধিমতি এই বৌদি। এতবড় সংসার ওর নখাগ্রে রয়েছে, অথচ কিই বা বয়স? বড়বৌদির চোখকে ফাঁকি দেওয়া অতিশয় কঠিন। ফাঁকি দেবার মতো কি এমন দুষ্কর্ম করেছে মহেন্দ্র? না কিছু না। আশ্বস্ত হয়ে মুখ দিয়ে এল। চা খেতে গেল তারপর।

গিন্নী আর উমেশবাবু বসে আছেন। মহেন্দ্রকে দেখেই গিন্নী বললেন, ভালো ঘুম হয়েছিল বাবাচোখ লাল কেন দেখাচ্ছে?

: না ঘুমিয়েছি তো। বলে মহেন্দ্র বসলো। মাধুরী এখানে আনে নি ঠাকুর ঘর থেকে, ওখানে ও কি করে, কে জানে? ওর এখন ঠাকুর ঘরে অত সময় দেবার বয়স নয়, কিন্তু ওদের। মহেন্দ্র ভাবলো জিজ্ঞাসা করবে মাধুরীকে। ইতিমধ্যে ছোটদা রতীন্দ্র এসে বললো, আমাদের অলকা ক্লাবে কাল তুমি গেলে না মহীন? মাধুটাকে এত করে বললাম তোমায় নিয়ে যেতে কোথায় গিয়েছিলে তোমরা?

: চলো সঙ্গীতালয়ে। বহুবাজার।

: আমাদের ওখানে গেলে না কেন? কাল ভাল গাইয়ে ছিল একজন।

: তোমাদের দত্ত সাহেব তো। ওর গান আমাদের শোনা আছে। গলা তো নয় যেন ফাটা হাড়ি। লোকটার গান গাইতে লজ্জা করে না। কথাগুলো বললো মাধুরী।

স্নান করে ঠাকুর ঘর থেকে ফিরছে, অঙ্গে ওর ধুপ সুরভি, হাতের মুঠোয় এক মুষ্টি শেফালী ফুল। টেবিলের উপর সেগুলো নামিয়ে বসলো। রতীন্দ্র বললো, ভাঙ্গা গলা পুরুষের লক্ষণ জানিস। রাগিনী যেন রূপ ধরে উঠে ওর গানে। ওরে বাপ। সে তাহলে রাগিনী নয় বাঘিনি। বলে মাধুরী চা ঢালতে লাগলো। রতীন জানে কথায় ওর সাথে পারা যাবে না, তাই। মহীনকে বললো তুমি একবার দপ্ত গান শুনবে মহীন, বুঝলে? আমার সঙ্গে যেয়ো আজ বিকালে।

না, আজ আমাদের হাওড়া যাবার প্রোগ্রাম আছে, বেলুড় মঠ দেখতে, বলে মাধুরী কথাটা কাটিয়ে দিল। মহেন্দ্র কিছুই বলেনি ধীরে ধীরে চা খাচ্ছে।

: দাদার চিঠি পেয়েছে? শুধালেন উমেশবাবু। ও আজ্ঞে না, দাদা আমার চিঠি হয়তো পেয়েছেন, আজ জবাব দিলে আমি কাল পাব।

: খোকার জন্য মন খারাপ করছ বাবা। শুধোলেন গিন্নী মা।

: না হ্যাঁ ওটার কথাই মনে হয়; মহীন সলজ্জ হেসে জবাব দিল।

: বেলুড়ে কি কাজ তোমাদের? রতীন প্রশ্ন করলো আবার।

: কাজ এমন কিছু না। দেখতে যাব আজ গেলেও হয়, কাল গেলেও হয়, বললো মহেন্দ্র।

: আজ যেতে হবে, আমার প্রোগ্রাম বদলায় না। মাধুরীর গলার স্বর দৃঢ় এবং উত্তেজনাপূর্ণ।

আচ্ছা বাপু যা। বেলুড়ই যা রামকৃষ্ণ, মিশনে যোগ দিলেই তো পারিস, বলে রতীন বিরক্ত হয়ে উঠে গেল। যেতে যেতে আবার বলে গেল, মনে করেছিলাম ক্লাবে টেলাবে নিয়ে একটু দ্র করে দেব, পাঁচজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব তা তো তুমি হতে দেবে না। থাক অমনি জংলী ভূত হয়ে।

শহরে মামদো থেকে জংলী ভূতেরা অনেক ভালো। জবাব দিল মাধুরী।

ওরা পিঠোপিঠি ভাই–বোন, ঝগড়া প্রায়ই লেগে আছে ওদের। কিন্তু সে ঝগড়ায়। স্নেহের অভাব নাই। ছোটদা খুবই ভালোবাসে মাধুরীকে। যেখানে যায় নতুন কিছু ওর জন্য কিনে আনে। সেই লক্ষ্ণৌ থেকে একটা পুতুল কিনে আনলো।

: ও নিয়ে খেলবার বয়স পার হলাম ছোটদা, তোমার খুকীর জন্য রেখে দাও।

: তুই এখনো যথেষ্ট খুকী আছিস, নে, নে বলছি, ছোটদা ওর ঘরে দিয়ে গেল ওটা। খুশি হলো মাধুরী খুবই। কিন্তু মুখে কথা বলতে ছাড়লো না বললো, আমাকে ওরা খুকী বানিয়ে রাখবার চক্রান্ত করেছে, ছোটা সেই চক্রান্ত সভার প্রেসিডেন্ট।

: আমি না, বড়দা বললো ছোড়দা।

: আজ্ঞে তোমার ইচ্ছাই নয় যে আমি বড় হই। শাড়ি তো তুমি কিনে দিতে চাইতে। এখনো তুমি স্বীকার করছো না আমি বড় হয়েছি।

: হোসনি বলে ছোড়দা চলে গেল। ভাই বোনের এই ঝগড়া বেশ লাগে অন্য সকলের ওরা সবার ছোট, সকলের স্নেহভাজন, তাই সবাই উপভোগ করে কথা কাটাকাটি। কিন্তু মহেন্দ্র ব্যাপারটা অন্য চোখে দেখলো। মাধুরীর মত বয়সের মেয়ে তার চোখে ছোট তো। নয়ই বরং যথেষ্ট বড়। ওর বিয়ে এখনো হয়নি মহীনের কাছে প্রথম প্রথম এটা অত্যন্ত বিসদৃশ লেগেছিল। এই কয়দিনে অবশ্য সয়ে গেছে এবং সে বুঝেছে সে আধুনিক যুগে এটাই চলছে কিন্তু রতীন যেভাবে মাধুরীর সঙ্গে ঝগড়া করতে পারে যতখানি সহজে তার বেশি ধরে টান দিয়ে চড়টা–চাপড়টা লাগিয়ে দেয় মহেন্দ্রর পক্ষে তা সম্ভব নয় কিন্তু কেন? রতীন ওর সহোদর আর মহেন্দ্র নিতান্ত অনাত্মীয় না হলেও বন্ধুপুত্র। মাধুরীর পক্ষে সহজ ভ্রাতা–ভগ্নী ভাব কেন মহেন্দ্র আনতে পারছে না। নিজেকে কঠোর প্রশ্ন করেছে মহেন্দ্র দু’তিনদিন থেকে এটা অপরাধ হচ্ছে তার অন্তরাত্মার কাছে। নিজেকে এভাবে নীচু করা মহেন্দ্রের। মাধুরীর তরফটা সে ভেবে দেখলো, সে ঠিক সহোদরার মতো ব্যবহার করে, সহজ সরল সুন্দর। মাধুরী উঠে বললো। চলো, তোমার সেই গল্পটা শুনতে হবে।

: কিসের গল্প রে মা? উমেশবাবু শুধালেন।

খুব ভালো গল্প বাবা, ধানগাছ আর ক্ষেত্রে কাঁকর ধরার গল্প, পানকৌড়ির ডুব সাঁতার, কাঠ ঠোকরার কঠকঠ তার সঙ্গে দোয়েল, পাপিয়া, বৌ কথা কও পাখীর গল্প, ও এতো সুন্দর করে বলে বাবা, যে শুনলে তুমিও শুনতে চাইবে।

: ও, যা, শোনগে।

মহেন্দ্রকে নিয়ে মাধুরী চলে গেল। বড় বউ হেসে বললো, পাড়াগাঁ সম্বন্ধে মাধুরীর একটা স্বপ্ন আছে বাবা, ও কখনো দেখেনি কিনা।

হ্যাঁ, মা কলকাতার বাইরে ও যদি গেছে তো, দার্জিলিং কিংবা দিল্লী। পাড়াগাঁ দেখেনি।

: আমি একবার ওঁকে বলেছিলাম, আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে কুন্তী নদী বয়ে যায়। তা শুনে বললো সে নদী আমি দেখবোই বৌ, কুন্তী, মহাবারতের কুন্তী দেখতেই হবে। বললাম, সেইটা একটা খাল বিশেষ। শুনে ওর চোখ ছলছল করে উঠলো, বললো, কুন্তীর মত গরবিনী মাকে তুমি খাল বলছো? ছি। সেই থেকে আমি খুব সাবধানে ওর সঙ্গে কথা বলি বাবা।

মা বাবা দু’জনেই হাসলেন। মা বললেন ওকে নিয়ে ভারী মুশকিল রে মা। কোথায়। গিয়ে পড়বে, শ্বশুর বাড়ি কেমন হবে, বড় ভাবনা হয় আমার।

: তোমার ছেলেরা তো বলেন ওর বিয়েই দেব না। তুমি ভাবছো কেন মা ওঁরা বলে, মাধুকে নিয়ে আমরা চার ভাই, মাধু আমাদের বাড়িতেই থাকবে বিয়ে ওর দেব না।

তা কি হয় মা? মেয়ে হয়ে জন্মেছে, বিয়ে তো দিতেই হবে। তবে যতটা সম্ভব দেখে শুনে দিতে হবে, তারপর অদৃষ্ট। আর কেউ কিছু বললো না কেমন যেন গুরু গম্ভীর হয়ে উঠলো আসরটা। তারপর উমেশবাবু বললেন, অতীন কি বেরিয়ে গেছে বৌমা?

: হ্যাঁ বাবা, কিসের যেন কন্ট্রাক্ট নিয়েছেন, ভোরেই বেরিয়েছেন। মেজ ঠাকুরপো যাবেন। বোম্বাই ওদের খেলা আছে।

: মেজবৌমা যাবেন নাকি, গিন্নি প্রশ্ন করলেন। হ্যাঁ যাবার যোগাড়ই তো করতে দেখলাম, এয়ারে যাবে শুনেছি।

: এয়ারে। বড্ড আমার ভয় করে মা, এয়ারে কেন? ট্রেনে গেলেই পারতো।

: ভয় করে আর লাভ নাই মা, সবাই এ যুগে এয়ারে চলে, বাকী রইলাম আমি তুমি আর বাবা, বলে হাসলো বড়বৌ। বাবা চলুন আমরা একবার এয়ারে ঘুরে আসি, আমার ভারী ইচ্ছে হয় বাবা।

: তুই যা অতীনের সঙ্গে। আমাদের আর এ বয়সে এয়ারে পোয় না মা, বলেন। উমেশবাবু। তারপরই বললেন, মাধু শুনলেই বায়না নেবে আর আমাকে উড়িয়ে ছাড়বে। ওকে কিছু বলিস না, বুঝলি?

: ওকেই বলতে হবে বাবা তাহলে আপনারা যাবেন আপনাকে একবার এয়ারে নিয়ে যাবার বড় সাধ, হাসলো বড়বৌ।

: কেন মা হেসে শুধালেন উমেশবাবু। আমাকে উড়াবি কেন?

: বাবা, আপনি আমাদের জন্যে এতসব করেছেন, সারাজীবন খেটেছেন অথচ যুগের যে সুখ সুবিধে, তা কিছু আপনি ভোগ করছেন না। সেই ভাতে ভাত খাবেন ফরাসে বসে, গুড়গুটি টানবেন, আর সেই হাত কাটা ফতুয়া গায়ে দিয়ে শীত কাটাবেন আর আমরা সব নবাবী করে বেড়াবো, এ আমার ভালো লাগে না বাবা। বড়বৌ মাথায় হাত দিয়ে বুলাতে বুলাতে বললো।

: অনেকদিন সে এসেছে এ বাড়িতে। কন্যার মত বড় হয়েছে উমেশবাবুর ক্রোড়ে। শুধু বধু নয়। আত্মজা দুহিতার মতো ওর আবদার বড় মিষ্টি লাগে উমেশবাবুর। আর বড়বৌ সত্যি বড় ভালো মেয়ে, এযুগে এরকম বধু দুর্লভ।

: ছেলেমেয়েদের জন্যই মা বাপ যা কিছু করে মা, আমার কি নবাবী করার বয়স আছে। এখন হরিনামের মালা ঘোরাব, শেষ কাজ মাধুরীর বিয়ে, তাপর আর কি, তোরা ভাল থাকলেই আনন্দ রে। আমায় এককাপ কফি দে রে, বলে বৃদ্ধ সস্নেহে বড় বধূর পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন।

বড়বৌ কফি তৈরি করছে শ্বশুরের জন্য, ওদিকে মাধুরীর কল হাসি শোনা গেল। ওদের গল্পে বলছে নিশ্চয় এবং সে গল্প হাসির উপাদান আছে। কফির কাপটা এগিয়ে দিয়ে বড়বৌ একবার ভিতরে গেল দেখতে, মহেন্দ্র আর মাধুরী কিসের গল্প করছে–

: শীত বুড়ি এ গ্রাম উ বাড়ি সে বাড়ি ঘুরলো, ওম্ মা তাকে কে চায়, বেরো–। শীত বুড়ীকে কেহ আশ্রয় দিল না, ঘুরে ঘুরে বুড়ি ক্লান্ত হয়ে পড়লো। পিপাসায় গলা শুকিয়ে গেছে শীতে তো গলা শুকায় জানো

: হু, তারপর? মাধুরী হাসিমুখে বললো।

ও জল খাবার জন্যে বুড়ি গেল নদীতে। নদী ওকে দেখে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল যা বেরো কে তাকে জল দেবে? শীত বুড়ি নিরাশ হয়ে পুকুরের কাছে গেলো। পুকুরও তাকে তাড়িয়ে দিল দূর দূর করে। কেউ জল দিতে চায় না। শীত বুড়ির চোখ ফেটে জল আসছে, পিপাসায়…..

: তারপর?

ঐখানে ছিল একটা পুরানো পাতকুয়া, সে এসে বললো, বুড়ি, কেউতো তোকে জল দিল না, আমি দেব আয়। আমার জল খা। বুড়ি যেন হাতে স্বর্গ পেল। আকণ্ঠ জল পান করে আশীর্বাদ করলো পাতকুয়াকে, শীত কালে আমার রাজত্বে সব জল ঠান্ডা হয়ে যাবে কিন্তু বাছা পাতকুয়ো, তোর জল থাকবে উষ্ণ, সুখসেব্য। হ্যাঁ, সত্যি? পাতকুয়োর জল গরম থাকে শীতকালে? মাধুরী শুধলো, গরম নয়, উষ্ণ থাকে। তাপর শীত বুড়ি বসলো। গাছতলায়। সন্ধ্যা হয়ে আসছে, শীত পড়েছে দারুণ, শীতে বুড়ি কাঁপছে। রাস্তা দিয়ে যে যায়, শীত বুড়ি বলে, বড় জড়ি একটি কম্বল দাও না গো কেউ। কিন্তু কে দেবে? সবাই ভয়ে পালাল। শীত বুড়িকে কম্বল দিয়ে কে আর তোয়াজ করবে বলো?

: হু, তারপর?

: শেষে একটি গাঁয়ের বউ ঘাট থেকে জল নিয়ে ফিরছিল, শীত বুড়ি তাকে বললো জারে বড় কষ্ট পাচ্ছি মা, কিছু দিতে পারো। বউটির দেবার কিছু নাই, বললো, আমি তো আঁচল গায়ে দিয়ে আছি মা, এরই একখানি নাও। বলে সে তার আঁচলের খানিকটা ছিঁড়ে দিল। বুড়ি গায়ে দিয়ে বাচলো, বললো, বৌমা, আমার রাজত্বে যে যতই দামী জামাকাপড় পরুক আমি তাকে শীতে কষ্ট দেবই, কিন্তু খালি গায়ে আঁচল গায়ে দিয়ে কেউ শীত পাবে না, বৌরা আঁচল ঢেকে তাদের খোকাখুকীকে শীত থেকে রক্ষা করতে পারবে। সেই থেকে পাতকুয়োর জল আর শাড়ির আঁচল বাংলার বধূদের সম্বল। এই দারুণ শীতে দামী জামাকাপড় বৌদের দরকার হয় না মাধুরী।

: শুধু আঁচল গায়ে? এতো শীতে? বিস্ময়ে–চোখ কপালে উঠলো।

: হ্যাঁ শুধু আঁচলে, তাও ছেঁড়া, উঠতে হয় ভোর পাঁচটায়, ঘর নিকানো কত কি কাজ ঐ ভোরেই বাংলা পল্লীবধুর এই স্বরূপ, আজও।

: পাতকুয়োর জলে হাত কনকন করে না।

: না, মাধুরী পাতকুয়োর বর রয়েছে জল উষ্ণ, আমার লাগে হাত দিতে।

: ওখানকার সব বাড়িতেই এই রকম?

: হ্যাঁ কারণ সবাই গৃহস্থ প্রায়, কলের জলতো নেই, জামা–কাপড়ও কম।

: এই তোমাদের গল্প, বলে বড়বৌ হেসে ঢুকলো ভেতরে। মাধুরী বলল গল্প খুব সুন্দর বৌদি, গাঁয়ের মেয়েদের সত্যি রূপটি ফুটে উঠেছে গল্পে।

উমেশবাবু একটি বাগান বাড়ি খরিদ করলেন দমদমে। বিরাট বিস্তীর্ণ উদ্যান কৃত্রিম ঝর্ণা। পুকুর এবং তার সঙ্গে একখানি বাড়ি। কে জানে কবে কোন এক সৌখিন ধনী। এই সুন্দর উদ্যান তৈরি করেছিলেন। প্রায় পঞ্চাশ বছরের প্রাচীন এর জীবনে। ইতিহাস, হয়তো সেসময় বাঈজী বিশাল এই সুরম্যকানন অপবিত্র হোত কিন্তু আজ তার কোন চিহ্ন নাই বরং বাড়ির বহু ভগ্ন, বাগান যে মেরামতে কদর্য মূল্যবান প্রস্তর মূর্তির অনেকগুলো স্থান ভ্রষ্ট তথাপি বাগানটা এখনও সুন্দর।

বর্তমানকালে কেউ আর বাগানবাড়ি কিনে না। উমেশবাবুও কিনতেন না, কিন্তু বাগানটার মালিক আর্থিক দূর্দাশায় পড়েছেন, তাই উমেশবাবুকে তিনি ধরে পড়লেন। অন্তঃপর বাগানটা নিয়ে কি করা যায় উমেশবাবু ভাবছিলেন। অকস্মাৎ মেজ ছেলে যতীন বললে, আমরা ঐ বাগানটায় পিকনিক করতে যাবে একদিন।

বেশ তো, যেয়ো। উমেশবাবু আনন্দিত হয়ে উঠলেন। এতগুলো তার ছেলে মেয়ে, বাগান বাড়ি তো দরকারই বাগানটা কিনে ভালো করেছেন। তারপর কলকাতা শহর যেমন বাড়তে আরম্ভ করেছে কে জানে কবে ঐ বাগানে ঠেকবে আর তখন ঐ জমি হাজার টাকায় বিক্রী হবে। একটা সম্পত্তি হয়ে রইল।

মনে মনে এসব হিসাব করছিলেন উমেশবাবু হিসাব করা তার অভ্যাস, হিসেবী না হলে এতবড় সম্পদের মালিক তিনি হতে পারতেন না। বড় ছেলে এসে ঢুকলো। উমেশবাবু তার পানে প্রশ্ন সূচক দৃষ্টিতে তাকালেন।

: মহেন্দ্রকে টাইপ করার কাজটা শিখতে বললাম বাবা।

: বেশ তো, আর শর্ট হ্যাঁন্ডও। উমেশবাবু সানন্দে বললেন।

: না বাবা, ইংরাজী খুব কম জানে, শর্ট হ্যাঁন্ড পড়বে না।

: কে? সেই ছোঁকরাটার কথা বলছেন? বলতে বলতে কুমার এসে দাঁড়ালে। হাতে টেনিস র‍্যাকেট, পরণে খেলোয়াড়ের সাজ, মুখে উপেক্ষার হাসি। বললো, শর্ট হ্যাঁন্ড না শিখলে টাইপ শেখার কোনো মানেই হয় না, ওতে কি হবে। ত্রিশ টাকা।

: হবে ওতেই হয়ে যাবে। টেনিস ক্রিকেট না দেখলে, বিলেতী ঢঙে না চললে ওতেই দুবেলা দুমুঠো হতে পারে। বলে মাধুরী এসে দাঁড়ালো বাপের পিছনে। বাবাকে বললো, আজ আমি একটা ঘরোয়া সাহিত্য আসর বসাব বাবা, তোমাকেও থাকতে হবে।

সাহিত্য আসর! উমেশবাবু বুদ্ধিহারা হয়ে উঠলেন, কাকে কাকে নিমন্ত্রণ করেছিস?

বাংলার খ্যাতনামা কয়েকজন সাহিত্যিক আসবেন, বর্তমান সাহিত্য নিয়ে আলোচনা হবে।

ব্যাপারটা এতই অভিনব আর এ বাড়িতে এমনই আকস্মিক যে উমেশবাবু এবং অতীন ও কুমার বিস্মিত হয়ে গেলো বিশেষ রকম। কিন্তু কুমার কোনো ব্যাপারে নিজেকে ছোট মনে করে না, আধ মিনিট ভেবে বললো, সুন্দর প্রস্তাব। আমাদের খেলাটা আজ না হয় মূলতবী থাক……।

আপনারা নিশ্চিন্তে খেলা করুনগে, ওখানে আপনাদের কোনো কাজ নেই।

তোমাকে তাহলে নিমন্ত্রণ করা হলো বাবা, বলে মৃদু হেসে চলে গেল মাধুরী।

নৃপেন্দ্রনারায়ণ বেশ ক্ষুণ্ণ হলো বোঝা গেল, কিন্তু উপায় নেই। মাধুরীর কথাই ঐ ধরনের। তথাপি ঐ তরুণীর প্রতি আকর্ষণ দুর্বার, দুঃসহ অজয়কে জয় করবার সাধনাই। করেছে সে। মাধুরীর অন্তর তাকে লাভ করতেই হবে কিন্তু আপাততঃ কিছু করবার নেই। ওদিকে লন–এ খেলোয়াড়গণ এসে জুটল। কুমার র‍্যাকেটখানা ঘুরাতে ঘুরাতে বাইরে গেল–অতীন বললো–

: মাধু কুমারকে মোটেই সইতে পারবে না বাবা

: তার আর কি করা যাবে? যাকে সইতে পারবে তাকেই আনবি।

: সে তো নিশ্চয়ই। যতদিন ওর মত না হবে, তত দিন বিয়ের কথা থাক বাবা। ও এখন সাহিত্য, সঙ্গীত এই নিয়ে বেশ আছে।

: থাক, তবে বড় হয়ে উঠলো অতীন।

: না বাবা, এমন কিছু বড় হয়নি, বলে চলে গেল। বৃদ্ধ তারপর কিছুক্ষণ বসে বসে ভাবতে লাগলেন, ছেলে। মাধুরীকে অত্যন্ত স্নেহ করে। তার মৃত্যুর পরেও মাধুরী কোন। অসুবিধা হবার নয়, তথাপি কিছু নগদ টাকা আর দমদমের ঐ বাগানখানা তিনি মাধুরীকে দিয়ে যাবেন। মাধুরীর বিয়ে যদি এর মধ্যে হয় ভাল না হলেও খুব বেশি আটকাবে না। তবে কি হবে, না হবার কারণ কিছু নাই, কুমারকে না চায়, অনেক কুমার মাধুরীর জন্য পাওয়া যেতে পারে।

ওদিকে বড় ঘরটায় সাহিত্য আসর পাতা হচ্ছে। তিন চারটি মেয়ে ওরা সকলেই মাধুরীর বান্ধবী, কলেজে পড়ে পাড়ারও আছে। আর রয়েছে মহীন। গান হবে, তারও আয়োজন করা হচ্ছে। এ ঘর থেকে দেখতে পেলেন উমেশবাবু ব্যাপারটা বেশ ঘোরাল করে। তুলেছে মাধুরী। ওদের আলোচ্য বিষয় বর্তমান সাহিত্য কিন্তু সাহিত্য সম্বন্ধে উমেশবাবু কোন খোঁজ খবর রাখেন না। বাড়িতে একটা ছোট লাইব্রেরী আছে, মাসিক পত্রও আসে কয়েকখানা, কিন্তু সে সব মাধুরীর সম্পত্তি। বড় জোর ছোট ছেলে রতীন মধ্যে মধ্যে যায় সেখানে। বড় বৌমাও বই নিয়ে যায়, কিন্তু মাধুরীদের ওতে নজর খুবই কম। প্রায় সব সময়। ঘরটা তালাবন্ধ থাকে।

চার পাঁচজন অতিথিকে সঙ্গে নিয়ে মাধুরী ঢুকলো এ ঘরটায়, এঁরাও তাহলে সাহিত্যিক হবেন। আর বসে থাকা চলে না, উমেশবাবুকে উঠতে হোল অভ্যর্থনার জন্যে। গিয়ে স্বাগত সম্ভাষণ জানালেন তাদের। গান হোল, মাল্যদান ও হোল, এবার আলোচনাও হবে। উমেশবাবু এক সময় সরে পড়লেন, কিন্তু টেনিস খেলোয়াড়ের দলকে দল এসে ঢুকলো। ওখানে। পাঁচ সাত জন লোক, কুমার নৃপেন্দ্র নারায়ণও।

আসনে বসলেন তারা। জনৈক সাহিত্যিক বক্তা বলতে লাগলেন, বর্তমান বাংলা। সাহিত্যে যে ধারা দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হয় রবীন্দ্রোত্তর সাহিত্য একটা বলিস্ট গতি লাভ করেছে। এই যুগের জন সাহিত্য, মানুষের মনের সঙ্গে এর সংযোগ। নিবিড় মানুষের আবেষ্টনীর সঙ্গে অনুরঞ্জন গভীর এবং গাঢ়। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন–

যে কবির বাণী লাগি কান পেতে আছি,
যে আছে মাটির কাছাকাছি—

মাটির কাছাকাছি থাকা সেই কবিদের আবির্ভাব আজ ঘটছে–

ব্যাপারটা অমনি জটিল অবোধ্য আর অনালোচিত যে কুমারদের দলে বিশেষ সুবিধে পাচ্ছিল না। প্রায় শেষ হয়ে আসছে, আর কেউ কিছু বলবেন কিনা প্রশ্ন করলেন সভাপতি মশাই। অকস্মাৎ কুমার বলে উঠলো, সাহিত্য সম্বন্ধে আমরা মহীন বাবুর কাছ থেকে কিছু শুনবার আশা করি।

মহেন্দ্র একধারে চুপচাপ বসেছিল। তার প্রতি এমন একটা আদেশ আসবে, সে মোটেই আশা করেনি, সভাটা ঘরোয়া, কাজেই রুচি বিরুদ্ধতার কথা উঠে না কিন্তু সভাপতি মশাই মহেন্দ্রর পানে তাকালেন। মহেন্দ্র উঠলো–

অকস্মাৎ আমার উপর এই আদেশ আমি আশা করিনি। বিদ্যা আমার অত্যন্ত কম। সাহিত্য সম্বন্ধে জ্ঞান তার থেকেও কম, তথাপি আমার মত, আমি যথাসাধ্য বলবার চেষ্টা করছিঃ বর্তমান জগযুদ্ধের বিপর্যয়ে ব্যাধিগ্রস্ত জগৎ শুধু বলিষ্ঠ আর বিচিত্র সাহিত্যই চাইছে না, বহির্মুখী চিন্তাকে আজ আবার কেন অন্তমুখী করবার জন্যে একটা অনুপ্রেরণা জেগেছে মানুষের। নির্জন গৃহকোণের শুদ্ধ ধ্যান মোহনতার যে শান্তি, যে সুরভি, যে সুখাবেশ তাকে মানুষ উপেক্ষা করছে বলিষ্ঠ আর বর্যিমুখি বৈচিত্র্য দিয়ে কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবী আজ যেন আবার অন্তরের আত্মচেতনাকে জাগিয়ে তুলতে চায়। মানুষের মনের এই দাবীকে মিটাতে হলে শুধু বলিষ্ঠ আর বিচিত্র সৃষ্টি হলে হবে না। সে সৃষ্টিকে করতে হবে শান্ত এবং সম্মানিত, সে হবে লোক সাহিত্য শুধু নয়, লোকাত্তর সাহিত্যও, তার আবেদন আজকের শুধু নয়, আগামী শতাব্দীরও। তার আনন্দ আধুনিক নয়, অনন্তকালের। আমার মনে হয়, মাটির কাছাকাছি আছেন যে কবিগণ তারা অন্তরকে উদঘাটিত করে অন্তরকে নন্দিত করবেন, আনন্দিত করবেন রস পিপাসুদের।

সুন্দর! হাততালি দিল কয়েকজন। বসে পড়ল মহেন্দ্র, কিন্তু মাধুরীর তীক্ষ্ণ চক্ষু কুমারের এই প্রস্তাব, মাধুরীর বুঝতে মুহূর্ত সময় লাগেনি, কিন্তু ঐ ছোট লোকটা জব্দ হয়ে গেল! শান্ত সুন্দর হাসি ফুটলো মাধুরীর মুখে, অতঃপর সভাপতির অভিভাষণের পর জলযোগার ভুরি পরিমাণ আয়োজন। মহেন্দ্র সঙ্গে আলাপ করলেন তারা এবং বললেন, মহেন্দ্রর সংক্ষিপ্ত ভাষণ সুন্দর হয়েছে। মাধুরী তাকালো কুমারের দিকে কিন্তু কুমার তখন কাটলেটখানা কাটতে ব্যস্ত! পাশে বসা ডেইজীকে অনুচ্চস্বরে কি যেন বলছে। ডেইজী ওর বান্ধবী। টেনিস খেলার সঙ্গিনী এবং ওদের পাড়াতেই বাস করে বছর চব্বিশ বয়স এখনও বিয়ে হয়নি। সাহিত্যিকরা আহারাদি করে চলে গেলেন মহেন্দ্র মাধুরী ওদের এগিয়ে দিল।

তারপর মহেন্দ্র গেল নিজের ঘরে, মাধুরী গেল মার পূজার ঘরে? ওখানে টেনিস খেলোয়াড়দের আলোচনা সভায় ওরা আর ফিরে এলো না। কুমারদের দল আশা করেছিলো ওদের ফেরাবার কিন্তু কৈ, অনেকক্ষণ তো হয়ে গেল। অতএব ওরাও উঠলো।

কুমারের অন্তরটা কেমন যেন বিষাদিত হয়ে উঠেছে। ঐ নগন্য একটা যুবক, বিদ্যাহীন, স্বাস্থ্য, সামাজিকতাহীন একটা তুচ্ছ ব্যক্তি কুমার নৃপেন্দ্রনারায়ণ কি তার কাছে হেরে যাবে? কিন্তু হারালো কোথায় নিজেকে আশ্বস্ত করবার চেষ্টা করতে করতে কুমার গিয়ে গাড়িতে উঠলো, পাশে ডেইজী, গাড়ি চলে যাচ্ছে।

ডেইজী বলল, ছোঁকরাটা কে? ঐ শেষে বক্তৃতা দিল?

ওদের বাড়ির একটা পরগাছা। চাকরির জন্য বসে আছে?

ছেলেটা বেশ বলতে পারে তো।

হ্যাঁ এবার কংগ্রেস নির্বাচনে ওকে কাজে লাগাব—

আপনি দাঁড়াচ্ছেন নাকি?

দাঁড়াব, ওকে প্রোপাগাণ্ডার জন্য নিযুক্ত করতে হবে।

ভালো হবে, ওর বুদ্ধি আর বলবার ক্ষমতা দুটোই আছে।

তৃতীয়টা নেই, বলে মোড় ফেরালেন গাড়িটাকে কুমার।

সেটা কি?

বল। শারীরিক শক্তি, বলে আপনাদের সবার সুপুষ্ট হাত দিয়ে ষ্টিয়ারিং ঘোরাচ্ছেন কুমার সাহেব, গাড়িটাকে অনাবশ্যক জোরে চাপিয়ে দিলেন।

সাহিত্য বাসর শেষ হওয়ার পর মহেন্দ্র নিজের ঘরে এসে বসল, ভাবতে লাগলো সে তো বেশ বলতে পারে। অল্পক্ষণের জন্য হলেও কথাগুলো সে খুব মন্দ বলেনি? নিজেকে এতোখানি অসহায় ভাববার কোনো কারণ নেই, তার ভেতর এমন একটা শক্তি রয়েছে যে তাকে সকল সাহায্য করছে। নিজের এই শক্তিটা সম্বন্ধে সে কোন দিন সচেতন ছিল না, এ যেন তার কাছে একটা আবিষ্কার। কিন্তু উৎফুল্ল হতে পারলো না মহেন্দ্র। তার বক্তৃতা মাধুরী ওকে আক্রমণ করবে, অথবা একান্তভাবে এগিয়ে যাবে ও বিশেষ কোন কথাই তুলবে না। মাধুরীর মনের গঠনটা এতটা অদ্ভুত কেন হোল, বুঝতে পারে না মহেন্দ্র। এ বাড়িতে আরো তো অনেক আছেন, কিন্তু মাধুরী এদের মধ্যে থেকেও যেন স্বতন্ত্র, ওর সঙ্গে এদের কারো মেলে না।

মাধুরীর মনে মহেন্দ্রর বক্তৃতা কি কাজ করেছে, ভেবে আবিষ্কার করা সম্ভব নয় মহেন্দ্রের। পক্ষে। তার সঙ্গে দেখা হলে তখন বোঝা যাবে, তাই মহেন্দ্র কাব্য পাঠ আরম্ভ করে দিল। এখানে আসার পর থেকে ওর পড়াশোনার সুবিধা হয়েছে প্রচুর, সঙ্গীত চর্চার ও সুযোগ মিলেছে, কিন্তু ওর যেটা সারা মনপ্রাণ দিয়ে চাইছে, সেই চাকরি এখনো পায়নি। টাইপ রাইটিংটা শিখছে মহেন্দ্র, তার সঙ্গে বুক কিপিংও। হয়তো চাকরি তার একটা শিঘ্রী হয়ে যাবে, কিন্তু এ বাড়ির কেউই তার চাকরির জন্য বেশি মাথা ঘামায় না, শুধু মাধুরীই বলে মাঝে মাঝে চটপট কাজ শিখে ফেল চাকরি করতে হবে তোমার–

মহেন্দ্র রবীন্দ্রকাব্য পড়ে প্রতিটি পংক্তির ব্যঞ্জনা রসাপুত করে বিস্মিত বিমুগ্ধ করে তোলে, গড় গড় করে তাই সে পড়ে না ধীরে ধীরে রস আস্বাদন করে পড়ে, এটা ওর বরাবরের স্বভাব, কিন্তু অত ধীরে পড়ায় অপর কাউকে শোনানো যায় না তাই মাধুরী বলে–

আবৃত্তি তোমার দ্বারা হবে না মহিনদা

না হোক, আবৃত্তির জন্য কাব্য হয়নি, বলে মহেন্দ্র পড়ে চলে।

কি জন্য তবে লেখা হয়েছে? প্রশ্ন করে মাধুরী।

রসপিপাসুর অন্তরকে পরিতৃপ্তি করতে, কাব্য সকলের জন্য নয় মাধুরীর, বিমুগ্ধ জনই কাব্য সম্ভোগ করতে পারে, দেবীর করুণা, কাব্য ব্যতীত অনুভব হয় না।

যথা? মাধুরী তীক্ষ্ণ কণ্ঠে শুধোয়। যথা, অন্তর হচ্ছে আহরি বচন, আনন্দ লোক কবি বিচরণ কবির এই যে কথাটায় একটি আনন্দলোক রচিত হয়েছে, পৃথিবীর কটা মানুষ সেখানে পৌঁছাতে পারে বল তো?

আমি তো কোন লোকই খুঁজে পাচ্ছি না, না আনন্দ, না নিরানন্দ, তবে ভাষার তুবড়িবাজী দেখা যাচ্ছে, মাধুরী তর্ক করতে চায় মহেন্দ্রকে রাগিয়ে। ঐ জন্যেই তা। অরসিকেষু রহস্য নিবেদন, করতে মানা বলে মহেন্দ্র পাশ কেটে একেবারে চুপ মেরে যায়, কিন্তু মাধুরী তখনো গুঞ্জন করতে থাকে আপন মনে।

অরসিকের মধ্যে রস না আনতে পারলে কবিতা হোলো না, হোলো কচুপোড়া বেগুন ভোজন করার লোক, আর বেলফুল উপভোগ করার মধ্যে তফাৎ আছে মাধুরী।

অর্থাৎ আমি বেগুন বিলাসী আর তুমি বেলফুল বিলাসী, দুটোরই কিন্তু জন্ম এক জায়গায়, মাটিতে, অতএব এখানে আমরা আত্মীয়, কেমন?

হ্যাঁ, যেন অন্নের সঙ্গে সম্পর্ক কদলী পত্রের, সৌন্দয্যের চপট ভরে না, তার উপর ভাতের কাড়ি দরকার। বেলফুলে পেট ভরে না বেগুনও চাই, চাই–ই।

চাকরির চেষ্টা কর, রোজগার কর, তারপর কথা হবে।

এরকম তর্ক হয় ওদের মধ্যে।

আজও সভাভঙ্গের পর মহেন্দ্র নিজের ঘরে এসে পড়তে বসেছে। রবীন্দ্রকাব্য মনটা রক্তাপুত হয়ে উঠেছে, সুতরাং অন্য চিন্তা ভুলে গেছে মহেন্দ্র, বিশ্ব যেন ওর কাছে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, জেগে আছে, এক কবি অন্তরের।

অনাস্বাদিত অনুভূতি আনন্দের জ্যোতিময় রূপায়ন, মহেন্দ্র পড়ছে।

নিঃশব্দ চরণে উষা নিখিলের সুপ্তির দুয়ারে দাঁড়িয়ে একাকী, রক্ত অবগুণ্ঠনের অন্তরালে।

উষা নয় আমি বড়বৌদি, উষার আসতে দেরী আছে। এই রাত মাত্র দশটা।

ওঃ মহেন্দ্র হাসলো এই বিঘ্ন ওর ভাল লাগেনি, কিন্তু কিছু বলার নেই। এ ওদের আশ্রিত, কিন্তু বড়বৌ বুঝলো, হেসে বললো–

খেতে ডাকতে এলাম ঠাকুরপো, চল, কি এমন মশগুল হয়ে পড়ছিলে? বই ওটা? উষা অনিরুদ্ধ?

না বৌদি রবীন্দ্রনাথ বলেছেন থেমে গেল মহেন্দ্র।

কি বলেছেন? প্রশ্ন করলো বড়বৌদি হেসে।

কি অপরূপ কথার ব্যঞ্জন। বৌদি বলেছেন রাত শেষ হয়েছে ভোর হল পূবাকাশে লাল হলে উঠছে আলো এতগুলো বলেছেন তিনি

বেশ তো বলেছেন, তোমার বৌদি এসে ঐ রকম বলবে, খাবে এসো।

শুনুন বৌদি, কি অপরূপ কথার ব্যঞ্জন ওভাবে কথাগুলো তিনি বলেন নি, বলেছেন–

নিঃশব্দ চরণে উষা নিখিলের তৃপ্তির দুয়ারে দাঁড়ায় একাকী। রক্ত অগুণ্ঠনের অন্তরালে।

না, বৌদি অবগুণ্ঠন মানে ঘোমটা, ভোরের আকাশকে তিনি অবগুণ্ঠনের সঙ্গে–কিন্তু মহেন্দ্র দেখতে পেল, দরজার প্রান্তে মাধুরী প্রদীপ্ত চোখে তাকিয়ে রয়েছে কথাটা আর শেষ করতে পারলো না। মহেন্দ্র তাড়াতাড়ি বললো থাক বৌদি, চলুন খেতে দেবেন বলে বইটা রেখে উঠে পড়ল।

মাধুরী নিঃশব্দ পদসঞ্চার কখন চলে গেছে, দেখতে পেল না আর। খেয়ে এসে মহেন্দ্র শোবে। দেখলো বিছানার চাদরখানা ঝেড়ে পেতে দিচ্ছে মাধুরী। নিশূপে দাঁড়িয়ে থাকলো মহেন্দ্র। মাধুরী কাজ শেষ করে বলল।

শোও, যেখানে সেখানে যা তা কথা বলা বন্ধ করো তুমি।

কেন? কি বললাম। ভয়ে ভয়ে মহেন্দ্র তাকালো ওর পানে।

অত ভয় পাবার কিছু নেই, উলুবনে মুক্তো ছড়িও না। বুঝলে তোমার এই কাব্য ব্যঞ্জনা বড়বৌদি কি বুঝবেন? তিনি মা জাতীয় জীব। তাঁর সমস্ত শরীর মন ইন্দ্রিয় আচ্ছন্ন করে জেগে আছে শুধু মাতৃত্ব ওখানে উষার অভিসারের কথা একেবারেই অবান্তর! নিঃশব্দে চরণে উষা আসছে তোমার কাব্য মণিকোঠার দরজা ঠেকতে এ ব্যাপারে ওকে কোনদিন বোঝন যাবে না তোমার পেটের দরজা উনি খুলতে পারে। শোও।

চলে গেল মাধুরী মহেন্দ্র তার পেছনটা দেখলে ওকে তো এখন আর ডাকা যাবে না। ও পতিভক্তিতে সেটা প্রকাশ হচ্ছে কিন্তু মহেন্দ্র কে জিজ্ঞেস করতে তীব্র ইচ্ছা জাগিছিল। উষার এই অভিসারের কথা মাধুরী কতখানি বুঝেছে। কাব্য লিখে আনন্দ পূর্ণ হয় না পড়েও হয় না যদি কোন অনুভূতিশীল শ্রোতার সঙ্গে সে রস বন্টন করে ভোগ করা যায়। মাধুরী কি অপূর্ব রস উপলদ্ধি করতে পারে?

পারে তার কথাতেই সেটা প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু মাধুরীর মনে গভীর জটিলতা অতল বারিধির তলদেশের মতই স্তব্ধ নিথর।

কি ভাবলো নিজের চিন্তাটা নিজেই যেন বুঝতে পারছে না মহেন্দ্র ওর মতে অন্য কেউ যেন চিন্তা করছে ওর সম্বন্ধে সে সর্বশেষ জানে, এবং অনেক বেশি জানে কে সে। মহেন্দ্রর অন্তরাত্মা হয়তো।

ধীরে ধীরে বিছানায় এসে শুলো মহেন্দ্র। ঘুম আসতে হয়তো দেরী হবে, কিন্তু না, অতি অল্প সময়েই মহেন্দ্র ঘুমের মধ্যে কত কি স্বপ্ন দেখে। সে আজ কিন্তু কিছুই দেখলো না কেমন একটা নীবিড় সুশীতল ঘুম, উঠেই দেখল সকাল। সকালেই টাইপ যন্ত্রণা কিছুক্ষণ অভ্যাস করে মহেন্দ্র, তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে খেয়ে নিল তারপর অফিস ঘরে এসে টাইপ করতে বসল। কতক্ষণ কেটেছে কে জানে? অকস্মাৎ মহেন্দ্রের মনে পড়ল, আজ সকাল থেকে এত বেলা অবধি মাধুরীকে একবারও দেখা যায়নি। এমনটি তো হয় না।

প্রতিদিন যার সঙ্গে দেখা হয়, কোনো একদিন তার সঙ্গে দেখা না হলে মনের কোণায় যেমন কাটার মত ব্যাথা বোধ হয়, মহেন্দ্রের তেমনি হচ্ছিল, ঠিক সেই সময় অফিসের মেমসাবটি একবার মহেন্দ্রকে দেখে প্রশ্ন করলো–তুমি কতটা শিখলে বাবু, চোখ বুজে টাইপ করতে পার? ভাষাটা ইংরেজি? না বলে মহেন্দ্র আবার বললো চোখ বুজে টাইপ করতে অনেক দিন লাগবে। নাও, তোমার কাজ কর, বলে মহেন্দ্র যন্ত্রটা ছেড়ে উঠলো। মনের মধ্যে এমন একটা উদাস ভাব জেগে রয়েছে, যেন কিছুই আর করবার নেই। এখানেই খবরের কাগজ রয়েছে, মহেন্দ্রের চোখ দিতেও ইচ্ছা করল না, বুককিপিং শিখবার জন্য কিছু পড়া দরকার, সেদিকেও মন গেল না, করবে কি সে এখন? কেন মনটার অবস্থা এতো করুণ হয়ে উঠলো ভাবতে গিয়ে মহেন্দ্র বুঝতে পারল আজ দুইদিন দাদা বৌদির চিঠি পায়নি, খোকনের কোন খবর পাওয়া যায়নি। এতোগুলো দিন পার হয়ে গেল খোকনের কথা ভাবেনি মহেন্দ্র এর থেকে বিস্ময়কর ব্যাপার ওর জীবনে কিছু হতে পারে না। নিজেই সে আশ্চর্য হয়ে গেল, কি এমন রাজকার্যে ব্যস্ত ছিল যে তার একান্ত স্নেহ–পুত্তলীর কথা সে ভুলে গেছে? আর চিঠিই বা আসলো না কেন!

ভেবে দেখলো এই ক’দিন সকাল বিকাল টাইপ করার অভ্যাস করছে আর সন্ধ্যায় থিয়েটারে, সিনেমা, নাচ, গান শুনে কাটিয়েছে। রাত্রে ফিরে পড়েছে কাব্য না হয় উপন্যাস। গভীর রাত্রে সঙ্গীত সাধনাটাও ক’দিন হয়নি, কারণ ঘুমিয়ে গেছে। এভাবে জীবন কাটলে তো তার চলবে না তাকে খাটতে হবে, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। বড় লোকের বাড়িতে আগাছা পরগাছা হয়ে পরমানন্দে দিনযাপন করতে মহেন্দ্র কলকাতায় আসেনি। নিজের উপর অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে মহেন্দ্র উঠে এসে খবরের কাগজের ওয়ানটেড কলাম দেখতে লাগলো। খুঁজে খুঁজে কয়েকটা চাকরীর জিজ্ঞাপন বের করলো, তারপর গোটা পাঁচেক দরখাস্ত বিভিন্ন জায়গায় পার করে দিল ডাকে, অবশ্য ওই সঙ্গে দাদাকেও একটা চিঠি লিখলো থোকার খবরের জন্য। সব শেষ করে সে যখন স্নান করে এলো, তখন বেলা দেড়টা। বড় বৌদি বলল–ব্যাপার কি ঠাকুরপো, আজ কি এমন দরকার ছিল?

এমন দরকার ছিল–ছিল বৌদি, দরখাস্ত লিখলাম চাকরীর জন্য।

চাকরী–বলে বৌদি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো, খানিক পর বললো তা বেশ তো।

৩. মাসখানেক অতীত হয়ে গেছে

মাসখানেক অতীত হয়ে গেছে, মহেন্দ্র আবার পঞ্চাশ টাকা পাঠিয়েছে কিন্তু এ টাকাও তার রোজগারের টানা না, উমেশবাবুর দান। দেবেন্দ্র নিঃশব্দে সই করে নিয়েছেন টাকাগুলো নিরুপায় হয়ে। কিন্তু দারিদ্রের অসম্মান আহত হয়েছে বার বার। শ্বশুরের ভ্রাতৃপ্রতীম কোন বন্ধু অসময়ে কিঞ্চিৎ অর্থ সাহায্য করেছে, এতে তার মনঃপীড়া হবার কিছু সে খুঁজে পায়না, কিন্তু স্বামীকে সে চেনে দেবেন্দ্র যে এই সাহায্য নিতে চাইছেন না, এটা ভালোই জানা আছে আপনার। তবু নিয়তির কাছে মানুষ এতোই নিরুপায় যে এই সাহায্য হাত পেতে নিতে হচ্ছে, এবং মহেন্দ্রকে চিঠি লিখে জানানো যাচ্ছে না এরকম সাহায্য যেন সে না দেয়, কারণ সে চিঠি উমেশবাবুর হাতে পড়তে পারে। তথাপি দেবেন্দ্র ঠিক করলেন মহেন্দ্রকে তিনি লিখে জানাবেন, চাকুরী যদি সে না পায় তো অবিলম্বে বাড়ি ফিরে আসুক। কিন্তু নিজে লেখা সম্ভব নয়, দয়ালকে দিয়ে, লিখতে হবে। খোকনকে ডেকে বললেন, তোর দয়াল দাদাকে ডেকে আনতো খোকন বেরিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই জন পাঁচ ভদ্রলোক এসে ঢুকলেন বাড়িতে। গ্রামেরই লোক, দেবেন্দ্র স্বাগত আহ্বান জানালেন। এখন আর চিঠি লেখানো হবে না। তাই দয়ালকে ডাকতে নিষেধ করলেন দেবেন্দ্র। খোক বেঁচে গেল। কাকু চার পাঁচদিন পরে আসবে বলে আজও এলোনা। মর্মান্তিক দুঃখ ভুলতে পাচ্ছিল না ছেলেটা। বাবার কাছে থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকে, শুধু গান শিখবার সময় বাবার কাছে যায়, মুখে মুখে গান ভালই শিখেছে সে।

ভদ্রলোক কয়েকজন এসে প্রস্তাব করলেন এই গ্রামে তারা একটা চতুম্পাঠি খুলতে চান। আপাততঃ গ্রামের লোকই চাদা দিয়ে সেটা তারা চালাবে এবং সরকার থেকে বৃত্তি পাবার চেষ্টা করবে। আর চতুম্পাঠি চালাতে হলে যোগ্যতম ব্যক্তি দেবেন্দ্র। পাঁচটি ছাত্র পাওয়া গেছে গ্রামের পাঁচজনের বাড়িতে তারা খাবে এবং দেবেন্দ্রর ভিটার পশ্চিমদিকে যে বড় কুঠুরীটা আছে, ওই খানে থাকবে আর পড়বে। এই ঘরটাতেই এই বংশের মৃদঙ্গ সেতার তানপুরা ভাঙ্গা অবস্থায় পড়ে আছে।

প্রস্তাবটা সুন্দর, উদার এই মানুষটির হৃদয় উচ্চ, এতে কোন সন্দেহ নেই কিন্তু দেবেন্দ্রর মনটা মোচড় দিয়ে উঠলো। এই বাড়িতেই টোল ছিল, ছাত্ররা এই বাড়িতেই অন্ন এবং বিদ্যালাভ করতো, আজ সেটা চালাবে গ্রামের লোক উপরন্তু চাদা করে মাইনেও দেয়া হবে দেবেন্দ্রকে। তাঁর দৃষ্টি হীন চক্ষু থেকে জল বেরুতে চাইছে, কিন্তু সামলে নিলেন, বললেন প্রস্তাবটা খুবই ভাল নরেশ এতো বড় গ্রামের যোগ্য প্রস্তাব কিন্তু কিন্তু কি বলুন? নরেশ শুধাল না।

আমার কি আর অত খাটবার সমর্থ হবে ভাই?

সে কি। আপনি এমন কিছু বুড়ো হয়ে যাননি।

না, না, পারবো কি করে চোখ যার নেই, পড়ানো কি তার পক্ষে সম্ভব?

হ্যাঁ সে কথা আমরা ভেবেছি, কিন্তু আপনাকে সাহয্য করতে মাধুবী থাকবে ও তো ব্যাকরণতীর্থ। আর সন্ধ্যেবেলা ঐ ঘরে সঙ্গীত চর্চা হবে, উচ্চাঙ্গের সঙ্গীত, আমরা আজই ওই তবলা মৃদঙ্গ সেতারগুলো সারিয়ে আনছি, আপনি আপত্তি করবেন না দেবু দা আমরা অনেক আশা নিয়ে এসেছি।

আপত্তি করবার মত মনের জোর খুছে পাচ্ছে না দেবেন্দ্র। আজ যদি খবর পেতেন মহীন ত্রিশ টাকার কোন কাজে ঢুকেছে, মাসে দশটা টাকা দিতে পারবে তাহলে তিনি গ্রামের চাঁদায় নিজের পেট চালাবার কাজে সম্মতি দিতেন না। কিন্তু এখন ওসব ভেবে লাভ নেই, মহীনকে তিনি বাড়ি ফিরতে চিঠি লিখে দেবেন। বড় লোকের বাড়ির রাজভোগ খেয়ে ছেলেটি বয়ে যাচ্ছে হয়তো।

নরেশের দল পাশের ঘরে গিয়ে সেতার তানপুরাগুলো তুলে নিল তারপর হৈ হৈ করে চলে গেল বাজারে। ওদের উৎসাহ বিপুল, উদ্যম অসাধারণ। কিন্তু দেবেন্দ্রর মন ক্ষুণ্ণ হয়েই রইল তার পিতৃপুরুষের পবিত্র বস্তুগুলিতে অপরের সংস্পর্শ তিনি ঘটাতে চাননি তাই কিন্তু ঘটলো। ঘটুক বিধাতার ইচ্ছা। তিনি যেন আত্মসমর্পণ করলেন ভাগ্যের কাছে, ভাবলেন মানুষের শক্তি কত ক্ষুদ্র কত অসহায়তার অধীন। কিন্তু খোকনের আনন্দ ধরছে না। বাড়িতে গানের আসর হবে, নিত্য গান বাজনা চলবে কত কি আলাপ হবে, রাগ রাগিনী শিখতে পারবে। আঃ কাকু যদি বাড়ি থাকতো। কিন্তু ওই সঙ্গে একটা টোলও নাকি হবে। সেটা কি বস্তু, খোকনের জানা নেই। সেখানে নাকি ছাত্ররা পড়তে আসবে, খুব বড় বই পড়ানো হবে নিশ্চয়। ভাবতে ভাবতে খোকন ভেতরে এলো। ওর মা রান্নাঘরে, কিন্তু সেও শুনেছে। বাইরের আলোচনার কথা খোকনকে বললো।

এবার গান শিখবার খুব সুবিধা পাবি, বুঝলি।

হ্যাঁ মা, কিন্তু ওই যে টোল নাকি খুলেছে, ওটা কি?

ওটা পাঠশালা, তোকে ওখানে পড়তে হবে না।

ওটা কি জন্য হবে তাহলে?

সরকারী বৃত্তি পেলে কিছু হবে বাবা।

খোকন অতকিছু বুঝল না নিঃশব্দে চলে গেল পুকুর পাড়ের দিকে। কাকু যে কেন এতো দেরী করছে কে জানে? ওর বটের বেদীটা ভেঙ্গে গেছে, আবার তৈরি করতে আরম্ভ করলো আর একটু বড় করে।

অর্পণা রান্নাঘরেই ছিল স্বামীর কাছে কি একটা দরকারে আসছে কিন্তু দরজার কাছে এসেই দেখলো দেবেন্দ্র দেওয়ালে ঠেস দিয়ে নিঃশব্দে বসে দৃষ্টিহীন চোখ থেকে জলধারা গড়াচ্ছে। অর্পণা বিস্মিত হয়ে থেমে গেল। কি হোল কেন উনি কাঁদছেন।

কে? অর্পণা। দেবেন্দ্র সামান্য সাড়া আন্দাজ করেই বুঝতে পারেন।

হ্যাঁ, কি হলো? কাঁদছো।

না। চোখ মুছছেন দেবেন্দ্র ও কিছু না? একটু থেমে আবার বললেন, এই পরিবারের উপর একটা অভিশাপ রয়েছে অর্পণা।

ও মা কেন? কার অভিশাপ।

সঙ্গীতের ইষ্টদেবীর। এই বংশের রাগসিদ্ধ হয়ে এতো অহংকারী হয়েছিলেন সে এক দরিদ্র সঙ্গীত শিল্পীকে সামান্য ভুলের অপমান করে তাড়িয়ে দেন। চোখের জলে তিনি অভিশাপ দিয়ে যান, ওই সিদ্ধ যন্ত্র কলঙ্কিত হবে। তারপর থেকে এই বংশের অকালমৃত্যু আকস্মিক মৃত্যু অন্ধতা কিছু না কিছু লেগে আছে।

না ছিঃ ওসব রূপকথার গল্প অভিশাপ কেন থাকবে। ওসব কেন যে তুমি ভাবো।

নানা জায়গায় দরখাস্ত করেছে মহেন্দ্র কিন্তু কই কোন জবাব তো এলো না। অবশ্য আসবার সময় পার হয়ে যায় নি। ইতিমধ্যেই টাইপ করাটা আরো ভাল করে রপ্ত করে নিচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে অফিসের অন্যান্য কাজও করছে।

চাকরিতে ঢুকবার আগেই দাদাকে সে টাকা পাঠাতে পারছে, এটা ওর পক্ষে খুবই আনন্দের ব্যাপার হতো, কিন্তু দাদাকে সে চেনে। ওই টাকা কয়টা দান যে গভীর দুঃখের সঙ্গে হাত পেতে নিতে বাধ্য হন, মহেন্দ্রের তা অজানা নয় উপায় কি? ছেলেটা না খেয়ে শুকিয়ে যাচ্ছিল আর এই আশ্বিন কার্তিক মাসে রাজার ভান্ডারও খালি হয়ে যায়, নতুন ধান না উঠা পর্যন্ত ঘরে হাঁড়ি চড়ার কোনো উপায় নাই যদি বাজার থেকে চাল না কেনা হয়। শহরে অবশ্য সর্বত্র রেশন, কিন্তু পল্লীতে চাল কিনতে গেলে মহেন্দ্র অনেক ভেবে উমেশবাবুর এই দান গ্রহণ করেছিল।

প্রায় মাসখানেক ওর কাটলো এ বাড়িতে। কলকাতায় অনেক কিছু শিখে ফেলেছে। মহেন্দ্র। রেষ্টুরেন্টে বসে কাঁটা চামচেতে খাওয়া, সেলুনে গিয়ে চুল ছাটাই করে আসে আর চলতি ট্রামে লাফিয়ে উঠা শিখতে দেরী লাগলো কারণ মন প্রাণ দিয়ে এসব ও পছন্দ করে না।

ঘোড়া দৌড় ক্রিকেট খেলা এবং এ জাতীয় ব্যাপারগুলো দুর্বোধ মহেন্দ্রের কাছে। কিন্তু সে দেখতে পায় এ বাড়িতে সবাই খেলাধুলা নিয়ে খুবই মাতামাতি করে। এমন কি খবরের কাগজের খেলার রিপোর্ট নিয়েও ওদের মধ্যে ঝগড়া লেগে যায়। রেডিও খুলে সবাই বসে থাকে, কোথায় কি খেলা হচ্ছে তার খবর শোনার জন্য।

যুদ্ধ কবে শেষ হয়েছে, এখানে দেশের লোকের হাতে টাকা কিছু রয়েছে–যাকে বলে ইনফ্লমেশন–কিন্তু সে আর কদিন? কিন্তু এতো কথা লোকে ভাবছে না। জিনিষ পত্রের দাম অনেক চড়া কিন্তু বিক্রি কম হয় না, কারণ হাতে পয়সা রয়েছে। মানুষ হন্যে হয়ে খেলার মাঠে টিকেট কেনে, সিনেমায় যায়, মদ খায় এবং আরো কত কি করে টাকার গরম এমনিই। মহেন্দ্র এসব দেখে শুধু লিখে রাখে তার দিনলিপিতে। এই আর্থিক উদ্বায়ী বৃত্তি, এই আধ্যাত্মিক বিপর্যয়ের ব্যধি এই আত্মকেন্দ্রিকতার ভয়াবহ পরিণাম মানুষকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে কে জানে। কিন্তু ওর এসব ভেবে লাভ কি? তবু মহেন্দ্র ভাবে। ওর চিরন্তনশীল মন না ভেবে পারে না। গভীর রাত্রে ওর ভাবনাগুলি লিখে রাখে দিনলিপির পাতায় অত্যন্ত গোপনে সে লিখে এই দিনলিপি, মাধুরীও জানে না এই লেখার কথা। ও আজ লিখছে। কিছুতেই সে ধনী পরিবারের সাথে নিজেকে মেলাইতে পারছে না। ও যেন বাতাসে উড়ে আসা একটা ঘুড়ি, এই বাড়ির ছাদের কার্নিশে তার সুতোটা আটকে গেছে, তাই ও এখানে উড়ছে কিন্তু জানে ঐ ক্ষীণ সূত্রটুকু ছিঁড়ে যাবে আর মহেন্দ্র গিয়ে পড়বে কোন সুদূর আকাশে। সেখান থেকে হয়তো এ বাড়ির চিলে কোঠাটা নজরে পড়বে না কিন্তু সত্যি কি তাই, এ বাড়ির সব স্মৃতিই কি সে ভুলতে পারবে? না দীর্ঘ দিনের দেখা আবছা স্বপ্নের মত মনে থেকে যাবে একথা–এ স্মৃতি এর মায়া। কিন্তু মহেন্দ্র এই মায়ার শৃঙ্খল অবিলম্বে কাটাতে চায়। কেন? জানে না মহেন্দ্র ওর চিত্তে যেন অহরহ তাগিদ দিচ্ছে সারা, সরে যাও মহেন্দ্র এতখানা অসামঞ্জস্যের মধ্যে থাকলে মানুষ্যত্বের মহিমা খর্ব হয়, ক্ষুণ্ণ হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কিন্তু এবাড়িতে মহেন্দ্র কয়েকটা বিশেষ সুবিধে পেয়েছে যা অন্যত্র দুর্লভ। পড়বার জন্য প্রচুর পুস্তক আর গানবাজনা শিখবার জন্য বহু রকমের যন্ত্র এবং অখন্ড অবসর ঘন্টা দুই তিন টাইপ শেখা, আর অফিসের কাজ শেখা ছাড়া তার আর কর্ম নেই। বিকালে মাধুরীর সঙ্গে। বেড়াতে যাওয়া, কিন্তু তাও হয় কোনো সঙ্গীতের আসরে না হয় সাহিত্য আসরে অথবা শিল্পকলা কেন্দ্র বা ঐরকম কিছু একটা দেখতে। অকারণে মাধুরী তাকে কোথায় নিয়ে যায়।

সেদিন ঘরোয়া সাহিত্য আসরে যে কয়েকজন সাহিত্যিকের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল, তাদেরই একজন আজ লেখা চাইলেন মহেন্দ্রর কাছে। মাধুরী সেখানে ছিল না, থাকলে। মহেন্দ্র লজ্জায় মরে যেত কারণ সেদিন সেই আলোচনার পর মাধুরীর সঙ্গে আর কোন কথা। হয়নি এ সম্বন্ধে মতটা মাধুরী কিভাবে নিল আজো জানে না মহেন্দ্র। এই ভদ্রলোক তার। সাপ্তাহিক কাগজের জন্য লেখা চাইলেন অতিশয় সঙ্কোচের সঙ্গে মহেন্দ্র একটা ছোট গল্প এগিয়ে দিল, বলল কে জানে চলবে কিনা। আপনার যদি ভাল না লাগে তো ছাপাবেন না, খারাপ জিনিস আমি ছাপতে চাই না। আচ্ছা আচ্ছা, সে ভার আমার। আপনার লেখা খারাপ হবে আমি বিশ্বাস করি না। না না, আমি নিতান্তই অব্যাপারী, থাক, সেদিন আপনার বানীতেই বুঝেছি কি আপনি, আর কেমন আপনি। আমার কাগজটা সাপ্তাহিক সিনেমার কাগজ কিন্তু তাতেও আমি চাই আপনার মত স্বাস্থ্যকর চিন্তাধারা পরিবেশন করতে। আপনি। আগে পড়ে দেখবেন বলে সলজ্জে মহেন্দ্র নমস্কার জানালো। মাধুরী ব্যাপার কিছু জানলে না, মহেন্দ্র জানাল না তাকে। সে জানে মাধুরী ওসব পছন্দ করবে কিনা। হয়তো চোখ। পাকিয়ে বলবে–রবীন্দ্র, বঙ্কিম, শরতের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে সাহস কম নয় বলবে লোকের কাছে মুখ দেখানো দায় হল কি সব ছাই পাশ লিখতে শুরু করলে মাধুরী ভাল বলবে এ রকম আশা করে মহেন্দ্র হয় খারাপ বলে, না হয় কিছুই বলে না। একেই তো মহেন্দ্র নিতান্ত কুণ্ঠিত হয়ে থাকে এখন। তার ওপর প্রতি কাজে খুৎ ধরলে ও টেকে কি করে? অবশ্য আর কেউ কিছু ওকে বলে না–না ভাল না মন্দ? এমন কি অফিস ঘরে ওর যতক্ষণ ইচ্ছে থাকে, যখন খুশী চলে আসে কোন কৈফিয়ৎ নাই।

মহেন্দ্রের অসহায়তার দিকে মাধুরীর সতর্ক দৃষ্টি অগাধ অপার্থিব করুণ আকর্ষণ করে। দুর্বারভাবে এ যেন তার মাতৃমূর্তি কিন্তু মহেন্দ্রের সামান্য ত্রুটি বিচ্যুতিতে মাধুরীর শাসন যেন রাজদণ্ড। সেখানে মাধুরী ক্ষমাহীন হয়তো হৃদয়হীনও। এই বিচিত্র অতলস্পর্শ শহরে পরে মহেন্দ্র নিজেকে যেন সামলাতে পারছে না।

কিন্তু চাকরীও একটা জুটছে না আর চাকরী জোগাড় করে নেবার জন্যেও কারুর মাথাব্যাথা দেখা যাচ্ছে না বাড়িতে। মহেন্দ্র আছে থাক বাড়ির একটা লোক যে সে? বাইরের কেউ এখন আর ধরতেই পারবে না যে মহেন্দ্র এ বাড়ির কেহ নয়। কিন্তু মহেন্দ্র নিজে সেই সত্যটা অনুক্ষণ অনুভব করে আত্মপরীক্ষা করে আত্ম–বিশ্লেষণ করে আপনাকে কঠোরভাবে তিরস্কার করে বলে তুমি এ বাড়ির কেউ নও মহেন্দ্র তুমি নিতান্ত গরীবের ছেলে তোমার পিত্র প্রতীম দাদা অন্ধ তোমার একমাত্র ভ্রাতুস্পুত্র নাবালক তাকে মানুষ করতে হবে। পরের দানে নয় নিজের রোজগারের টাকায়।

কুমার নৃপেন্দ্রনারায়ণ আরো দু’একদিন এসেছে মহেন্দ্রের সঙ্গে দেখাও হয়েছে–

প্রশ্ন করেছে সে মহেন্দ্রকে কি করবে বা কি করতে চায় সে সম্বন্ধে। কুমার বেশি আসে না কারণ মেজদাই সস্ত্রীকে ওখানে যায়, টেনিস খেলতে বা ক্লাবে বেড়াতে কিন্তু আজ নাকি কুমার বাহাদুর এখানে আসবে তার আয়োজন চলছে।

এ পাড়াটা কলকাতায় বনেদী বাসিন্দাদের পাড়া। টেনিস খেলা বালীগঞ্জী ব্যাপার এখানে টেনিসকোড বসিয়েছে। বাড়ির কারো ওতে সম্মতি নেই, কিন্তু কিছু বললে গাছে ভ্রাতৃবিরোধ ঘটে, তাই সবাই চুপ করে আছে। মাধুরী বলে।

শ্যামবাজার শ্যামসুন্দরে ক্রীড়া ভূমি–এখানে গোচারণ হয় টেনিসে কেন? গরুচরবার জায়গা নষ্ট করে দিলে তুমি মেজদা।

কি করি বল–তোর মেজ বৌদির ঘুম হয় না–মেজদা বলে।

হবে কেন? ও তো আর গোপী নন গোপী গরবিনী রাধা ভাগ্যি কোথায় ওর? ও হোল সেই, মাধুরী থেমে যায়।

কি? কিরে ছোটদি–তাহলে কি? প্রশ্ন করে মেজো বৌ হাসে।

তুমি? মেজবৌদি গোপীনও। গোবরচনা নও। তুমি একেবারে গোবর—

ভালই তো, তোদের বাড়ি পবিত্র হোল ঘর নিকুষি।

হ্যাঁ–সে আর হতে দিলে কই। খুঁটো হয়ে উনুন জলছো যে! বলেই চলে যায় মাধুরী।

কিন্তু এসব তর্ক বিতর্ক, বাকবিতণ্ডায় ওদের অন্তরের স্নেহরস, কিছুমাত্র ক্ষুণ্ণ হয় না। মাধুরী সকলের স্নেহপাত্রী, দাদারা ওর দোষ দেখে না বৌদিরাও দেখে না। ওকে ভালবেসেই যেন আনন্দ। ওর কথায় যেন সুরের ঝঙ্কার পায় ওরা, মেজবৌদি স্বামীকে বলল–

কথায় ওকে যে হারাবে, তার সঙ্গে ওর বিয়ে দেব।

এমন ছেলে আছে নাকি? আমি তো দেখিনি মেজদা বলে।

তাহলে বুদ্ধিতে যে হারাবে।

তেমনই বা কৈ?

কেন কুমার বাহাদুর।

তুমি ভুল করছো গোপী! কুমারের বুদ্ধিটা বৈষয়িক বুদ্ধি মাধুরী তার কাছ দিয়ে যায় না। ওর আদর্শবাদী মন কোথায় বাঁধা পড়বে কে জানে?

কুমার কিন্তু খুব আশা করে ওর সম্বন্ধে।

আমরা এক ফোঁটা করি না আর ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছুই আমরা করবো না।

বিয়ে দেবে না?

ওর ইচ্ছে হয় তো করবে আমরা এতগুলো ভাই ঐ এক ফোঁটা একটা বোন যা ইচ্ছে ওর করবে ও আমাদের বাড়িতে আনন্দ প্রতীমা।

বৌরা জানে দাদাদের এই মত। মা বাপের মত যাই হোক। দাদারা মাধুরীকে কোনদিন। কিছু বলবে না। না হলে মহেন্দ্রের মত কোথাকার এক অশিক্ষিত ছেলেকে নিয়ে মাধুরী এ তো মাতামাতি করছে কারও কি চোখে পড়ে না। আশ্চর্য।

কিন্তু এসব কথা বলতে যাওয়া মোটেই নিরাপদ নয়, মেজবৌ সেই দিন বাড়ির সকলের চক্ষুশূল হয়ে উঠবে। মাধুরীর মনে আঘাত দেবে বাবা বা তার দাদার কল্পনাতীত। দরকার নাই, পাঠা সে লেজ দিয়েই কাটুক, অতএব বৈকালিক অর্ভ্যথনার আয়োজন করতে লাগলো মেজবৌরাণী।

কুমার সাহেব আসবেন এবং আরেকজন কে বিশেষ ব্যক্তি আসবেন তার সঙ্গে অতএব আয়োজনও বিশেষ হওয়া দরকার। চায়ের টেবিলগুলো সাজাচ্ছে মেজবৌ, হঠাৎ মাধুরী অভিভুত হয়ে বললো–

বাঃ। মন্দ নয়। বড়দা বড়বৌদি হবে কাগিন্নী ঘর সামলাচ্ছে তোমরা হলে খেলোয়াড় খেলোয়াড়নী, বাহির সামলাচ্ছ এরপর ছোটবৌদি যদি লক্ষ্ণৌ ঠুংরী হয়ে এসে সংগীতের আসরটা সামলান তো এ বাড়ি আর দেখতে হবে মানবতোক, দানবপোক, দেহলোক সব হয়ে যাবে…।

তুই সাহিত্যের আসরটা সামলাবি তাহলে আরো কিছু হবে মেজবৌ রসিকতা করল। আর কি হবে। আর কিছু হবার নেই ঐ তিন লোকই সব–তিন লোকের তিন উপসর্গ অপবিদ্যা–অপবিদ্যাটা কে?

তুমি মেয়ে হয়ে খোলোয়াড় হচ্ছে এরপর গোঁফ গজাবে।

দুর মুখপুড়ি। মেজবৌ হেসে উঠলো–কিন্তু তুইও তো ভাল খেলতে পারিস ছোটদি। তোর গোঁফ গজাবে তাহলে।

না–আমি শুধু শিখে রেখেছি তোমার মতন বাতিকগ্রস্থ নই আমি যে এক দিন খেলা না হলে ঘুম হবে না। যাক আজ কোন মহাপুরুষ আসছেন? সে কুমাণ্ড তো? কুমাও কি করে? কুমার বাহাদুর আর মাদ্রাজের আদিলিংগমঃ ভারত বিখ্যাত যাক। তিনি পৃথিবী বিখ্যাত হোন, কিছু যায় আসে না, বর্তমান যুগটা উড়োখ্যাতির যুগ।

তার মানে? উড়োখ্যাতি কি?

মানে খ্যাতিটা আকাশে উড়ছে যে পার ধরে না, খেয়ালে খ্যাতি, খাওয়ায় খ্যাতি, স্নানে, সঁতারে খ্যাতি, সৌন্দর্য খ্যাতি তাই সবাই এক এক দিক খ্যাতিমান। শুধু বীরত্বে, মনুষ্যত্বে করে কতটা খ্যাতি তাই জানা গেল না যাক আমারও গানের আসর আছে আজ! পিয়ানোটা একটু বাজিও বুঝলে, তোমাদের খেলা চুকলে আমার আসর।

মহেন্দ্র কোথায়? মহেন্দ্র ঠাকুরপো বলে গেছে, সে গেছে কোন অফিসের চাকুরি খুঁজতে।

ও। বলে মাধুরী আধমিনিট চেয়ে রইল। মেজবৌদির পানে তারপর বললে তোমার জানানোটা বাইরের ঢাকঢোল মেজবৌদি, মন্দিরের ভেতরের মৃদু ঘন্টাধ্বনি নয়, হলে তুমি মহেন্দ্র বলতে না মহীন বলতে। মা যা বলে বড় বৌদি যা বলে আদুরে নাম অধরকে স্নেহরসে সিক্ত করে, যার মধুর সৌরভ লুকানো যায় না, যাকগে। মহীনদা চাকরি পেলেই চলে যাবে তোমাদের আতঙ্কের কোনো কারণ নেই, তোমার কুমার বন্ধুরাই নাচবে এখানে।

চলে গেল মাধুরী। মেজবৌ নিমেশে চেয়ে রইল ওর দিকে অনেকক্ষণ। মহেন্দ্র সম্বন্ধে। অতি অল্পতেই মাধুরী যেন কেমন উত্তেজিত হয়ে যায় কেন?

কি এমন ঐ অজ পাড়াগাঁয়ের অশিক্ষিত ছেলের? রূপে এমন কিছু রাজপুত্র নয় যদিও দেখতে ভালই। বিদ্যা তো একেবারে মাধুরীর থেকেও কম গলাটা ভাল গাইতে পারে। কিন্তু তাইবা কি এমন শিখেছে? স্বাস্থ্য তো নাই–ই। কিন্তু ও আশ্রিত। মাধুরীর স্নেহসজল নারী মন মায়ের মত ওকে ঘিরে আছে সত্যি। তো মাধুরী নায়িকা শ্রেণীর মেয়ে নয়। ওর মাতৃরূপটাই সব সময় জল জল করে। বাড়ির দারোয়ান পর্যন্ত এ সংবাদ জানে। মেজবৌ নিজের কাজে মন দিল।

উর্বশী কাগজের অফিসে গিয়ে মহেন্দ্ৰ শুনলো তার গল্পটা ছাপা হয়েছে অর্ধেকখানা বাকিটুকু এই সপ্তাহে বেরুবে আশাতীত আনন্দের সঙ্গে। আশাতীত সৌভাগ্য মহেন্দ্রের। সম্পাদক ওকে দক্ষিণা বাবৎ পনরটি টাকা দিয়ে বললেন কিছু মনে করবেন না, দুসংখ্যার জন্যই দক্ষিনা আর বেশি পারা যায় না, বাংলাদেশের পত্রিকা চালানো যে কঠিন ব্যাপার

মহেন্দ্রের কিছুই বলবার ছিল না, টাকা পাবার আশায় সে করেনি। অত্যাধিক আনন্দটা কোনো রকমে অন্তরে চাপা দিয়ে মহেন্দ্র ধন্যবাদ জানালো এবং আর বেশি বিলম্ব না করে ঐ সংখ্যার দুখানা কাগজ নিয়ে বেরিয়ে পড়লো সটান পোষ্ট অফিসের দিকে।

এ টাকা ওর নিজের রোজগারের টাকা এই ওর জীবনে প্রথম উপার্জন। স্বােপার্জিত এবং সুদুপায়ে অর্জিত এই অর্থ সে দাদার হাতে দেবে এর একটি পয়সাও মহেন্দ্র নিজে খরচ করবে না।

মহেন্দ্র জানে উমেশবাবুর দয়ার দান দাদা কত কষ্টে গ্রহণ করেন। তিনি বাধ্য হচ্ছেন মনঃপীড়া ভোগ করছেন। কিন্তু মহেন্দ্রের অর্জিত এই অর্থ তো যতই সামান্য হোক তাকে অসীম আনন্দ দেবে।

পোষ্ট অফিসে গিয়ে একখানা কমল চেয়ে মহেন্দ্র চৌদ্দ টাকার মনিঅর্ডার লিখলো বাকি টাকার কয়েক আনা মনিঅর্ডার কমিশন। এই অর্থে সে আর কারো দানের ছোঁয়া লাগাতে চায় না কিন্তু এতটা শূচিব্যয়ুগ্রস্ত মহেন্দ্র না হলেও পারতো। হলো কিন্তু মহেন্দ্র!

টাকাটা পরশু গিয়ে পৌঁছাবে শনিবার দিন। দাদার অন্ধ নয়ন অশ্রুভরা হয়ে উঠবে। টাকাটা পেয়ে। ভাবতে গিয়ে মহেন্দ্রের নিজের চোখ দুটো জল ভরা হয়ে উঠলো। একজন বয়স্ক ভদ্রলাক ওর মুখ পানে চেয়ে বলে উঠলেন কি হলো মশাই কাঁদছেন।

আজ্ঞে না, কিছু না বলেই সলজ্জে চোখ মুছে মহেন্দ্র রাস্তায় নামলো। নিজের মনে বলল মানুষের জীবনে, মর্মান্তিক দুঃখ যেমন আছে মর্মান্তিক সুখও তার চেয়ে কম নেই।

কিন্তু মহেন্দ্র ঘরে ফিরলো না শেষ টাকাটার বাকি কয়গণ্ডা পয়সা ওর পকেটে তাই দিয়ে ও কিছু কিনবে খোকনের জন্য লাটিম না হয় বল না বশি। মহেন্দ্র ফুটপাতের দোকানগুলোয় চোখ বুলিয়ে ফিরতে লাগলো।

আর একটা গল্প লিখতে হবে অনুরোধ করেছে সম্পাদক। কি লিখবে। ভাবতে মহেন্দ্র। ঐ রকম ঘুরতে ঘুরতে বেশ বড় একটা প্লট যদি মাথায় এসে যায় তো না না না। বড় প্লট বড় লোকের জন্য। দুনিয়ায় অধিকাংশ লোকেই গরীব মহেন্দ্র তাদের জন্য ছোট গল্প লিখবে। তার মতন এমনি কত দুর্ভাগ্য পীড়িত বাবা কাকা সোনার শিশুর জন্য দু’পয়সার তালপাতা ভেপু খুঁজে ফিরছে দিনাস্তের মুখের একটু ফোঁটা হাসি দেখবার আশায় হয়তো সেই হতভাগ্য পিতা কোন ধনীর মূল্যবান মোটরের তলায়–

আহ হা। চার পাঁচজন লোক ছুটে এল অন্যমনষ্ক মহেন্দ্র কলার খোসায় পা পিছলে ফুটপাতে পড়ে গেছে। দামী কোটখানায় কাদা লেগে গেল। একজন ধরে তুলে বলল খুব লেগেছে মশাই?

না তেমন কিছু না ধন্যবাদ উঠে দাঁড়ালো। লেগেছে বেশই কিন্তু তার জন্য মহেন্দ্রের তিলমাত্র আফসোস নেই। ওর তীক্ষ্ণ অনুভূতিশীল অন্তর আচ্ছন্ন করে খোকনের মধুর হাসি ভেসে উঠলো। হাত ধরা বরাবরের বলটাও ছাড়েনি, পড়ে গেলেও হয়তো ছাড়বে না। মহেন্দ্র উঠেই চলে গেল।

আঃ এই পরম তৃপ্তির কথা সে পাঠককে জানাবে। তার অতি ক্ষুদ্র জীবনের অতি তুচ্ছ অনুভূতির অপরূপ সুষমা সে কি সঞ্চারিত করতে পারবে না পাঠকের অন্তরে? দরিদ্র কেরানী। পিতা মাসের শেষে মাইনে পেয়ে দু’পয়সার লজেন্স কিনে নিয়ে তার ছোট খুকুটার জন্য সে কি জীবন নয়, তাতে কি মাধুর্য নেই তার কি অমৃতস্বাদ অনুভব করবার মত অন্তর সৃষ্টি করে নেবে মহেন্দ্র শিল্পীর দরদ দিয়ে?

মহেন্দ্র স্টান শ্যামবাজারে ফিরে ঘরে ঢুকলো লিখবে কিন্তু লেখার এটা সময় নয় শীতের বিকাল এক্ষুনি হয়তো ডাক পড়বে চা খেতে কিংবা বেড়াতে যেতে। থাক রাত্রে লেখা যাবে।

মহেন্দ্র মেজদা ওর ঘরে ঢুকে ডাক দিল। এরকম খুব কমই হয়।

আজ্ঞে। মহেন্দ্র জবাব দিয়ে তাকালো ওর পানে। মেজদা বলল–

আজ কুমার আর তার এক বন্ধু আসবেন বাড়িতে থেকে বেরিও না। তিনি একটা কাজ জোগাড় করে দিবেন বলছেন, বুঝলে?

আজ্ঞে হ্যাঁ। বলে মহেন্দ্র কিযে ভাবছে। মেজদা চলে গেল।

মহেন্দ্র ভাবছে তো ভাবছেই। কি যে ভাবছে ঠিক নেই। ওদিকে এক এক করে কয়েকখানা গাড়ি ঢুকলো টেনিস লনে, কুমার ইত্যাদি বলেন, বেতের চেয়ারে। একটা চাকর এসে মহেন্দ্রকে আসতে বললো ওখানে। কাদা মাখা জামাটা খুলে রেখেছে মহেন্দ্র, অন্য একটা পরেছে, এগিয়ে নমস্কার জানালো সকলকে। কুমার ওর পানে দৃষ্টিপাত করে প্রশ্ন করলো টাইপ শেখা হলো তোমার? আজ্ঞে হ্যাঁ এখন চোখ বুজে টাইপ করতে পারি তবে স্পিড কম–আরো দিনকতক অভ্যাস করলে ঠিক হয়ে যাবে।

এবার কাজের মাথায় অভ্যাস করবে–পরশু সোমবার আমার ওখানে যাবে দশটার সময়, সাদার্ণ পার্কে কেমন।

যে আজ্ঞে। বললো মহেন্দ। আনন্দই হচ্ছে ওর একটা কাজ এতদিন পর হোল। কিন্তু এখানেই মাধুরী চা পরিবেশন করছে অতিথিদের হঠাৎ কুমারকে সে প্রশ্ন করলো–

কাপটা কি? টাইপ না কি বাজার সরকারী।

দরকার হলে সবই করতে হবে বললো কুমার গম্ভীর স্বরে।

না ও যাবে না। আপনার জুতো বুরুশ করার মতো শিল্প জ্ঞান নেই ওর। –সে কি। মাধুরী। বুরুশ করবার কথা কি?

–এই তো বললেন সবই করতে হবে তার মধ্যে জুতো বুরুশও পড়ে।

–না না, আমি বলছি, বাড়ির ছেলের মত থাকবে যখন যা দরকার–

–আজ্ঞে না। এ ক্ষেত্র মুখুয্যেরই বাড়ির ছেলে আর কারো বাড়ির ছেলে হয়ে কাজ নেই। মহীনদা তুমি বলে দাও, আমি তোমাকে যেতে দেব না বলেই মাধুরী বাকি চারজনকে চা পরিবেশন করলো, ধীরে ধীরে, তারপর নিঃশব্দে চলে গেল।

ব্যাপারটা এমন দৃষ্টিকটু হয়ে দাঁড়ালো যে কুমার আর বললো না। মেজদা যেন গম্ভীর আর মেজবৌদির চোখে জ্বলন্ত একটা অগ্নি যেন ধিকধিক করছে কিন্তু মহেন্দ্রর অবস্থা আরো শোচনীয়। সে নিরুপায়ভাবে একখানা চেয়ারে বসে।

চল, আরম্ভ করা যাক। কুমারই বললো কথাটা। খেলোয়াড়দের এখন খেলার মধ্যে আত্মসমর্পণ করে ওরা গুমোট ভাবটা কাটাতে চায়, কিন্তু খেলার একজন সঙ্গী কম হচ্ছে। অতিথি যিনি আসার কথা তিনি এখনো আসেননি।

এসো। মহীন ততক্ষণ তোমাকে নিয়েই আরম্ভ করা যাক বলে কুমার অকস্মাৎ মহীনকে হাতে ধরে টেনে দাঁড় করে দিল। মহীন এর আগে দু’একদিন খেলেছে মাধুরীর সঙ্গে কিন্তু শুধু খেলা শিখবার জন্য ওর মোটে অভ্যাস নেই। আমি। আমিতো ভাল খেলতে পারি না।

–খুব পারবে এসো। বলে তাকে টেনে নিয়ে এল, হাতে গুঁজে দিল টেনিস র‍্যাকেটটা। নিরুপায় মহেন্দ্র দাঁড়ালো খেলতে।

পড়ে গিয়ে ওর কোমরে ব্যথা হয়েছে, তারপর খেলার তেমন অভ্যাস নাই। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই মহেন্দ্র কাবু হয়ে পড়লো, অবস্থাটা এমন যে অন্যান্য খেলোয়াড়রা হাসছে। কিন্তু কুমার পরম অভিজাত ব্যক্তি মহেন্দ্রর মত নগন্য ব্যক্তিকে কেন খেলার সাথী করলো। কেউ ভেবে দেখলো না।

অকস্মাৎ মাধুরীর আবির্ভাব ঘটলো, এক মিনিট দাঁড়িয়ে দেখলো অবস্থাটা তারপর মহেন্দ্রের হাত থেকে র‍্যাকেটখানা কেড়ে নিয়ে বললো–আসুন কে কত পারেন দেখা যাক বলেই মহেন্দ্রকে বললো, যাও তুমি আমার গানের আসরটা ঠিক করগে।

অতঃপর মাধুরী খেলতে আরম্ভ করলো যেন, দশভূজা। এত ভালোখেলা ও হয়তো জীবনে খেলেনি কী এক আশ্চর্য উত্তেজনা ওকে যেন আচ্ছন্ন করে রেখেছে। র‍্যাকেটখানায় যাদু লেগেছে যেন। মুগ্ধ হয়ে দেখছে ওকে।

খেলাটা শেষ করে র‍্যাকেটখানা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আঁচলে মুখ মুছলো, বললো, দুর্বলকে জয় করতে যাওয়ার কোনো মহিমা নেই সপ্তরথী ঘিরে অভিমুন্যকে হত্যার কলঙ্ক শুধু মহা ভারতের কলঙ্ক নয় আপনাদেরও।

চলে গেল মাধুরী। কে কি বললো, জানবার জন্য কিছুমাত্র আগ্রহ নেই ওর। ইতিমধ্যে সেই আহুত খোলোয়াড়টি এসে পড়েছে। তিনিও দেখছিলেন খেলা মাধুরী তাকে নমস্কার পর্যন্ত করলে না, ব্যাপারটা খুবই দৃষ্টিকটু, খেলোয়াড়টি সত্যি স্পোর্টম্যান হেসে বললেন–

: চমৎকার খেলেন। উনি তো খুব ভাল খেলোয়াড় হবেন।

: ও কিছু হবে না একটা জলন্ত তল্লা, আগুন জলতে জলতে ও নিজেই পুড়ে যাবে কথাটা বললো যতীন তারপর এসে করমর্দন করলো অতিথির সঙ্গে।

: কেন একথা বলছেন? মেয়েটি কে আপনার? শুধালেন ভদ্রলোক?

আমার বোন, অনেক দুঃখেই কথাটা বলছি, মিঃ আদিলিঙ্গম। ও আমাদের ঘরের প্রদীপ। লেখায়, সঙ্গীতে, শিল্পে ওর বিচিত্র প্রতিভা বিস্ময় জাগায়। কিন্তু ঐ হোমকুণ্ডে আহুতি দেবার মত স্মৃত্বিক আমরা খুঁজে পাচ্ছিনে হয়তো ও ব্যর্থ হয়ে যাবে।

ছিঃ ছিঃ ! এরকম কথা কেন ভাবছেন নিতান্ত ছেলে মানুষ এখনো। বলে মিঃ আদিলিঙ্গম সস্নেহ দৃষ্টি একবার তাকালেন বাড়িটার পানে। যেন মাধুরীকে আর একবার দেখতে চাইছেন। মেজবৌ ব্যাপারটা বুঝে চাকরকে বললো ডাকতো ছোটদিকে।

কিন্তু ডাকতে হলো না, মাধুরী নিজেই এলো এবং সুষ্ঠু ভঙ্গীতে নমস্কার করে বললো শুরুতেই মার্জনা চাইছি; আপনার কাছে অপরাধী হয়ে গেলাম।

–না না, কিছু না ওতে আর কি হয়েছে? আপনার খেলা দেখে খুশী হয়েছে আমি। আপনি ভালো খেলোয়াড় হতে পারবেন।

আপনার আশীর্বাদ মাথা পেতে নিলাম কিন্তু খেলোয়াড় হবার ইচ্ছে নেই।

কেন? মিঃ আদিলিঙ্গম সস্নেহে প্রশ্ন করলেন।

কারণ, খেলার আগ্রহ খেয়াল থেকে জন্মায় বাস্তবের রূঢ়তা ও সইতে পারে না।

তাহলে তো শিল্প সাহিত্য সবই খেয়ালের সৃষ্টি সবই বাদ দিতে হয়।

না, মহীনদা বলেন, শিল্প, সাহিত্য আর সঙ্গীতের মধ্যে আছে অন্য একটা গতি, অন্তর্মুখী গতি যে পথে মানুষ নিজ আত্মাকে খুঁজে পায় আর, অতিমানসকে ধরতে পারে। খেলাটা পুরোপুরি বহির্মুখী। খেলাকে আমি নিন্দে করছি না, ওটা আমার স্বভাবের পরিপন্থী।

মিঃ আদিলিঙ্গম আর কিছু বললেন না, চা খেতে লাগলেন পরে শুধুলেন আপনার মহীনদা বুঝি আপনার গুরু? কে তিনি? কোথায় থাকেন?

গুরু নন, গুরু থাকেন উঁচুতে, মহীনদা আমাদের খুব কাছাকাছি এই মাটিতেই থাকেন। খেলা শেষ হলে আমাদের গানের মজলিসে মহীনদার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব যাবেন তো?

–হ্যাঁ নিশ্চয় যাব বললেন, আদিলিঙ্গম সস্নেহে।

অতঃপর মাধুরী নমস্কার জানিয়ে চলে গেল। ওদের খেলা আরম্ভ হল। মিঃ আদিলিঙ্গম ভালো খেলোয়াড়, এক একটি বলের এমন চমৎকার মার তিনি দিতে লাগলেন যে বিপক্ষ দলের আনন্দ হয়। গেম শেষ হতে দেরী হবে।

ওদিকে মহেন্দ্র গানের আসরটা সাজিয়ে ভাবছে কোথায় মাধুরী? কিন্তু মাধুরী আসবার আগে এলো ছোটদা রতীন্দ্র। বেহালাটা নিয়া সুর বাঁধতে লাগলো এই ফাঁকে প্রশ্ন মহেন্দ্র। বাজাতে পারে কিনা।

না, বললো মহেন্দ্র। রতীন্দ্র অবাক হয়ে তার মুখ পানে চেয়ে জিজ্ঞাসা করলো, তাহলে কোন যন্ত্র বাজাও তুমি। বেহালার মতন সুরের যন্ত্র আর কিছু আছে নাকি;

–কি জানি। ধীর কণ্ঠে বললো মহেন্দ্র আমাদের বাড়িতে বেহালা নেই। আছে মৃদঙ্গ, তানপুরা, তবলা, ভুকি, মাদলা, মন্দিরা।

ব্যাস ওতেই গান বাজনা চলে?

হ্যাঁ এখন আর চলে না, আগে চলতো। মানে আমার বাবার আমলে।

–হারমোনিয়াম নেই?

: না ও আমরা বাজাই না, আমাদের তিন পুরুষের যন্ত্র নষ্ট হয়ে গেছে। ছেলেটাকে যে কি করে শিখাবো। এসো বলে রতীন অভ্যর্থনা জানালো। সংগীতের আসর হল ওদের। কিন্তু কোথায় মাধুরী? আশ্চর্য তো! যার আসর সেই উপস্থিত নেই। খেলা শেষ হলেই মিঃ আদিলঙ্গম কুমার এবং মেজবৌদি ঢুকলো।

মেজবৌদি বললো, এই মহীন ঠাকুরপো, আর ইনি মিঃ আদিলিঙ্গম।

সবিনয়ে নমস্কার জানালো মহীন। ওরা বসার পর একজন একটা রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইলেন অন্যজন একটা ভজন। রতীন বেহালা বাজালো মাধুরী এখনো আসছে না এর পরে কে গাইবে? মেজবৌদি বললো মহীন ঠাকুরপো গান একখানা। মহীন সেতার বাজাচ্ছিল সেটা বাজাতে লাগলো। বাজাচ্ছেই সুর ক্রমশঃ আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে ঘরখানাকে, সারা বাড়িটাকে, ধীরে মধুর রাগিনী একি গুঞ্জন। একি অন্তর্বেদনার নিগঢ় অভিব্যক্তি একি বাষ্পকুল ব্যাথা। বিলাস। দিকে দিকে ক্রন্দসী যেন হেমন্তের শিশির ঝরা আকাশে আবিল করে দিল অশ্রু পঙ্কিল করে তুললো। অন্তত প্রাণের আকুল দেবতা যেন আর্তহাহাকারে মুর্ছিত হয়ে পড়েছে। কোন এক নিষ্ঠুর দেবতার চরণমুলে ‘ওগো যন্ত্ৰী’ অসহনীয় আনন্দ আর ধরতে পারিনি থামাও তোমার মুরলী।

নিস্তব্ধ হয়ে গেছে বাড়িটা। মাধুরী কখন এসে একধারে নীরবে দাঁড়িয়েছে কেউ দেখেনি। শেষ হবার পর প্রায় আধ মিনিট ঘরখানায় যেন রেশ রয়েছে। মিঃ আদিলিঙ্গম রসজ্ঞ শ্রোতা এতক্ষণে তিনি বললেন, উঠতে উঠতে এসো তোমাকে আলিঙ্গন করে ধন্য হই।

মহীনের দুই গণ্ডা অশ্রুপ্লাবিত, মানুষ যে বাজাতে বাজাতে এমন করে কাঁদে এ ওরা এর আগে কখনও দেখেনি। মিঃ আদিলিঙ্গম মহীনকে বুকে জড়িয়ে বললেন এই অন্তর্মুখিনতটা ভারতের নিজস্ব সাধনা এঁকে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে দাও বন্ধু মানুষের আত্মা আবার স্বধর্মে প্রতিষ্ঠিত হোক।

মহেন্দ্র মাথা নুইয়ে এই বয়োঃবৃদ্ধ খেলোয়াড়ের আশীর্বাদ গ্রহণ করলো।

বয়সে তুমি ঢের ছোট, কিন্তু যেখানে তুমি বড় বিরাট, সেখানে আমাদের শ্রদ্ধা অগাধ, অকুণ্ঠ হয়ে রইল।

মহীনের চোখ ছাপিয়ে আবার জল এল–কিছু সে বলতে পারলো না উত্তরে।

বাগান বাড়িটা কেনা হয়েছে, কিন্তু মাধুরী এখনো ওটা দেখেনি, আজ সকালে মহেন্দ্রকে বললো চলতো দমদমার বাগানটা দেখে আসি।

: আমার একটু কাজ ছিল মাধুরী। মহেন্দ্র সভয়ে বলল। জানি। ও গল্প উর্বশীতে’ না পাঠিয়ে। উত্তরায়ণে পাঠাতে ওদের অফিস দশটার পর খোলে। উর্বশী সিনেমার কাগজ। উত্তরায়ণ মাসিক কাগজ ভালো কাগজ।

তুমি কি করে জানলে আমার গল্পের ব্যাপার মাধুরী?

–জানলাম, না জেনে আমার চলে না যে। চৌদ্দ টাকা মনি অর্ডারের কথা জেনেছি রসিদ দেখে।

লজ্জায় মহেন্দ্র হয়তো মাটির সঙ্গে মিশে যেতে চাইতো, কিন্তু মাধুরীই তাকে রক্ষা করলো বলল ভালো করছো, নিজের উপার্জনের টাকা যত কমই হোক, তার মূল্য হিসেবে হয় না এসো, উঠে পড়ো গাড়িতে।

মহেন্দ্র আর কিছু বলবার অবকাশ পেল না, কোটখানা গায়ে চড়াতে চড়াতে গাড়িতে উঠলো গিয়ে। মাধুরী তার আগেই উঠে বসে আছে, বললো গান গাওয়া আমি ছেড়ে দিলাম মহীনদা।

: কেন? মহীন অতি বিস্ময়ে প্রশ্ন করলো।

: এতাকাল আমার ধারণা ছিল যে গান শুধু গলার ব্যাপার। মিষ্টি গলা আর তাকে খেলিয়ে সুর বের করতে পারলেই গান হয় কাল জানলাম, তা নয়।

–কেন? ব্যাপারটা তো মূলতঃ ঐ গলারই কারসাজি। গলার অবশ্য শেষ শ্রুতি পর্যন্ত পৌঁছানো যায় না, তার জন্য দরকার যন্ত্রের, কিন্তু গলার মূল্য কম নয়।

–না’ গলায় কারসাজিকে গলাবাজি বলা যায় তাতে গান হয় সংগীত হয় না, গীত তো নয়ই ওর জন্য দরকার সে দুঃখানুভূতির যেটা গলাতে না মহীনদা; সে থাকে অন্তরে। সেখান থেকে সুর আহরণ করে যে অমৃতময় পরিমণ্ডলের সৃষ্টি হয়, গলা তাকে পরিবেশন করে মাত্র।

–বেশ তো, অন্তর থেকেই সুর আহরণ করো। মহেন্দ্র হেসে বলল কথাটা।

–না আমার ক্ষমতা নাই। অতটা অনতমুখী নই আমি। গান তো আমি ভালোই গাইতে পারি মহীনদা, বিস্তর প্রশংসা পেয়েছি, কিন্তু ওগুলো গান নয়।

–তাহলে? মহেন্দ্র আবার হাসলো। কি তা জানি না তবে গান নয় গীতামৃত ওর থেকে উৎসারিত হয় না কিন্তু যাক ওগুলো মানুষকে চমক লাগানো ফুলঝুরি। না আছে আগুন না হয় আলো ওর দীপ্তি এততাই ক্ষণিকের যে ওর ক্ষীণ আয়ুর জন্য ওর নিজেরই লজ্জা হওয়া উচিত।

মাধুরী কোনদিন মহেন্দ্রর সঙ্গে এতো কথা একসঙ্গে বলে না, এমন দীনভাবে তো নয়ই তার সতেজ সগর্ব বাক্যস্রোত যেন আজ রুদ্ধ হয়ে গেছে, এ যেন অন্য মাধুরী মহেন্দ্র আধ মিনিট ওর দিনে তাকিয়ে বলল, তোমার এই দীনতা আমার ভালো লাগছে না মাধুরী, আমাকেই তুমি একদিন বলেছিলে অমৃতের সন্তান দীন কেন হবে? আজ তুমি কেন এভাবে কথা বলছো?

–আমি মোটেই দীন নই মহীনদা। মাধুরী হেসে উঠলো। দীনতাকে আমি অত্যন্ত ঘৃণা করি, আমি ধনীকন্যা এবং স্বয়ং ধনী কিন্তু ওই সম্পূর্ণ পার্থিব। অপার্থিব ধনকে সম্ভোগ করার সৌভাগ্য আমার কম হয়েছে যে সৌভাগ্যবান তাকে নমস্কার জানাই।

মহেন্দ্র নীরব হয়ে রইল, মাধুরীর এই শ্রদ্ধা জানানোর মধ্যে আরো কি আছে কিনা খুঁজে দেখবার মত অবস্থা ওর নয়, হতদরিদ্র এক গ্রাম্য আরো কি আছে কিনা খুঁজে দেখবার মত অবস্থা ওর নয়, হতদরিদ্র এক গ্রাম্য যুবক রূপে গুণে শিক্ষায় আভিজাত্যে মহেন্দ্র এতোই খাটো যে আপনাকে কোন সময়ই সে বুইক গাড়িতে চড়ে বেড়াবার যোগ্য মনে করে না। প্রশংসা শুনলে লজ্জায় তার মাথা নীচ হয়ে পড়ে নিন্দা শুনলে ভাবে এটাই তার প্রাপ্য। মাধুরীর প্রশংসা ওকে আনন্দিত করলো যা এ পর্যন্ত মাধুরীরর কাছ থেকে পায়নি তা পেল আজ কিন্তু ওতেই তার হোত ওর বেশি সে আশা করে না, ওর থেকে ক, খ পেলেও সে সুখী হতে। না পেলেও কিছুই মনে করতো না।

–আমি ধনী তাই আমার গান পাঁচজনে শোনে, বাহবা দেয়, তুমি নির্ধন তাই তোমার গানের শ্রোতা খুব কম মহীনদা এটা কিন্তু সত্যি।

কেন?

কারণ, সোনা যতক্ষণ খনিতে থাকে, তাকে খুঁজতে যায় কম লোক আবার সে যখন গিনি হয়ে গহনা হয়ে মণিকারের শোকেসে বসে তখন রাস্তার পথচারীও তাকে দেখতে দাঁড়িয়ে যায়–তাতে খনির সোনার দাম কমে না মাধুরী।

–দাম কথাটা আপেক্ষিক মহীনদা মানুষের চাহিদা হিসাবে ওর মূল্য, কুকুরের কাছে হীরের দাম কতটুকু!

তোমার শ্রদ্ধাটা অশ্রদ্ধায় পরিণত হচ্ছে যে মাধুরী বলে মহিন হেসে উঠলো। না মহীনদা মাধুরীরর হাসিতে গাম্ভীর্য শ্রদ্ধার সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই, এটা হচ্ছে জাগতিক পরিবেশের প্রয়োজনীয় পদার্থ জগতে নরম সোনা ইস্পাত না হলে চলে না।

সোনার মূল্যটা কোথায় থাকে? মহেন্দ্র প্রশ্ন করলো। অন্তরের অন্তঃপুরে, ওকে হাটে কিনতে যাওয়া মুখতা ছাড়া কিছু নয় মাধুরী। উত্তরটা দেবার সময় মুখোনি গাড়ির বাইরে নিয়ে গেল মহীন কিছু দেখতে পেলো না।

পীচঢালা পথে গাড়ি চলছে দ্রুত। সরে যাচ্ছে দুপাশের বৃক্ষলতা প্রসাদ কুটির। গাড়িটা বাঁক ফিরলো, একটা ছোট পল্লী, কোণার একটা দোকানে এক জন শীর্ণদেহী নারী, বুকে একটা শিশু–

: দু’পয়সার এরারুট দাও তো?

: দু’পয়সার হয় না যুদ্ধের বাজারে অত সস্তায় এরারুট নেই।

গাড়িটা শ্লথগতি হয়েছে বাক ফেরার জন্য কথাগুলো শুনতে পাওয়া গেল। মহীন গলা বাড়িয়ে দেখলো মেয়েটিকে ওর কোলের কাছে আরেকটি শিশু শীর্ণ দুর্বল। মেয়েটা এরারুট না পেয়ে নিরাশ হয়ে ফিরছে।

: থামো তো বলে মহীন গাড়ি থামতে বললো।

: দু’পয়সার এরারুট পেলে না মা? মহীন প্রশ্ন করলো মেয়েটিকে।

: না বাবা, হাতে আর পয়সা নেই বলে ছলছলে চোখে দাঁড়ালো সে গাড়ির কাছে।

: একে দুটো টাকা দাও মাধুরী।

: কেন? মাধুরী সাহাস্যে প্রশ্ন করলো মহেন্দ্রকে। টাকা কেন দিতে হবে।

: ওকে কিছু দিয়ে তুমি ধন্য হও।

: ধন্য হব। মানিব্যাগটা খালি হয়ে যাবে না।

: হোক অন্তরের ভাণ্ডার পরিপূর্ণ হবে মাধুরী একে দান মনে করো না।

: মনে করো সেবা।

মূর্তিগুলিতে সে রকম কিছু নেই, অধিকাংশ বাঘ, সিংহ বা অন্যান্য জন্তুর মূর্তি মানুষের মূর্তিও আছে। সুন্দর বীরত্বব্যঞ্জক গ্রীক মূর্তি এবং কয়েকজন বিশিষ্ট শিল্পীর ক্ষোদিত নারী মূর্তিও ভাঙা অবস্থাতেও। বাগানটা যথেষ্ট সুন্দর। মহেন্দ্র আর মাধুরী ঘুরে ঘুরে দেখছিল, অকস্মাৎ ঝিলটার নামবার একটা বাঁধা ঘাটে মহেন্দ্র একটা মূর্তির কাছে দাঁড়িয়ে গেল।

: কি দেখছো মহীনদা।

: না বলে মহীন সামনের মূর্তির দিকে তাকিয়ে রইল।

: বাঃ! বেশ তো?

: হ্যাঁ খোকনটাকে নিয়ে বৌদি খিড়কী ঘাটে দাঁড়ালে ঠিক এক রকম দেখতো মাধুরী।

: বৌদির চেহারা বুঝি খুব সুন্দর এমনি সুন্দর। মাধুরীরর প্রশ্নে বিদ্রুপের ব্যঞ্জনা।

: ওর জন্য সুন্দর চেহারা তো দরকার নাই মাধুরী, বিশ্বের যেখানে যত মা আছে, সবারই এই এক রকম যে ছেঁড়া শাড়ি পরা মেয়েটিকে টাকা দিয়ে এলে ওরও?

ব্যঞ্জনার কাছ দিয়ে গেল না মহীন, নির্বাক মাধুরীর অন্তর জুড়ে তখন একটা কথাই গুঞ্জিত হচ্ছে অশিক্ষিত এই পল্লি যুবকের অন্তরটা কতখানি গভীর অতলস্পর্শ মাধুরীকে তা খুঁজে বের করতে হবে। হেসে বললো, এসো ওই ভাঙা নৌকাটায় বসা যাক মাধুরী কথা কাটিয়ে নৌকায় গিয়ে উঠলো।

মহেন্দ্র এলো, বসলো একধারে। নৌকাটা টলমল করছে ওদের ভারে কিন্তু পরে স্থির হলো। কেথায় একটি পাখি বৌ কথা কও’ ডাকছে। মাধুরী বললো তোমার খালি গলার গানও ভাল লাগে মহীনদা গাওনা একটা। গলা কোন সময়ই খালি নয় মাধুরী বিশ্ব জুড়ো অবিরাম যে শব্দ ধ্বনিত হচ্ছে ঋষি তাকে বলছেন ওঙ্কার নাব্রহ্ম। ঐ গাছের পাখি শুধু নয়, এই বাতস এই বনমর্মর এই জলকল্লোল, সবই সেই বিরাট সঙ্গীতের বাদ্যযন্ত্র শোন–

ওম, ও ও ও ও ও ম…।

সুরের গভীর ধ্বনি, যেন রূপ পরিগ্রহ করেছে আকাশে গিয়ে লয় হচ্ছে সেই ওঙ্কার নাদ অপূর্ব আশ্চর্য, কিন্তু অকস্মাৎ মহীন কেমন নীল হয়ে গেল। গানটা থামাতে ওর দেরী হচ্ছে কোন রকমে গান বন্ধ করে শ্বাস নিল।

–কি হল মহীনদা?

: কিছু না, দাদা ছোটবেলা শেখাতেন, অনেকদিন অভ্যাস নাই, বলে মহীন কয়েক আযলা জল তুলে মুখে দিল। সুস্থ হতে যেন সময় লাগছে ওর। মাধুরী বলল তোমার মাতৃত্বের রূপটা এতা প্রকট, মাধুরী আমি অবাক হয়ে যাই অনেক সময়। কি রকম? মাধুরী প্রশ্ন করলো।

–মেয়েরা মূলতঃ দুই জাতের। এক প্রণয়িনী স্বভাবা আর এক মাত্ররূপী, তুমি শেষেরটা?

: মোটেই না, আমি দারুণ প্রণয়িনী স্বভাবা, আমাকে ঘিরে সোসাইটতে অবিশ্রাম জলতরঙ্গ বাজে জানো তো কচু!

ওটা তোমার বাইরের খোলস অন্তরে তুমি মা! চল, ওঠো। মহীন উঠলো।

: হবে।

মাধুরী যেন নিবে গেছে, এতোটুকু প্রতিবাদ করলো না। নেমে লিচু গাছের তলায় মহীনের অঙ্গ ধরে বললো আচ্ছা, দুটোর মধ্যে কোনটা ভালো, মাতৃস্বভাবা নাকি প্রণয়িনী স্বভাবা?

: প্রেম যদি সত্য হয়, তাহলে তার থেকে বড় কিছু নাই মাধুরী সে অন্তরের লীলা। বিলাসের চারণভূমি, সে তোমার ক্ষেত্র কিন্তু সে প্রেম সুদুর্লভ সে প্রেম সুপ্ত সে প্রেম খনির সোনা তাকে হাটে বাজারে পাওয়া যায় না। আর মাতৃরূপ পৃথিবীতে বড় দরকার, যেমন–

: ইস্পাত হেসে ব্যঙ্গ করলো মাধুরী। না ইস্পাত আমি বেলতে চাই না। যেমন আকাশের বৃষ্টি মাটির শস্য মায়ের জন্য।

: তাহলেও বড় কিন্তু প্রেমিকাই তোমার মতে?

হ্যাঁ কিন্তু প্রেম অপার্থিব সে প্রেম অন্তরের সেখানে দেহ বিলাসে কোন প্রশ্ন নাই চল, দেরী হয়ে যাচ্ছে। মাধুরী যেন গম্ভীর হয়ে কত কি ভাবতে লাগলো। মহীনের অন্তরঃস্থল খুঁজবার ব্যথা সে ভেবেছিল একটু আগে, এই চেষ্টা করে কি ফল হবে তার? একি অসীম একটা অনুভূতিময় প্রাণ মাধুরী যেন কুল পাচ্ছে না। এই পর্যন্ত এই ধরণের কথা কারো মুখে শোনেনি কথার ফুলঝুরি খেলে ওর দাদার বন্ধুগণ রাজনীতি, অর্থনীতিতে বিশেষজ্ঞ সুর তরুণ পাশ্চাত্য উপন্যাসের পাত্রপাত্রীদের আইডিয়ায় ভরপুর, অশ্লীল আর অসুন্দর শিল্পের বিকৃত পুজকদের দল আসে।

যার আপনাকে প্রকাশ করার সহস্র ভঙ্গিমায় আবেদন জানায় যেন ভিক্ষুক। আর মহীনদা যেন অটল গম্ভীর হিমাচল, ওর প্রতি বন্দনে ঝঙ্কার ধ্বনি স্পন্দিত হচ্ছে।

–ওর আত্ম প্রকাশের প্রচেস্টা নেই, ও স্বতঃ প্রকাশমান সূর্য।

–এই যে, রাস্তা ভুল করছো? মহেন্দ্র ডাক দিল?

: না মহীনদা, এই ফুলটা তুলোম বোটা ছেঁড়া একটি ফুল মাধুরী এগিয়ে এলো দেখতে কি ফুল। আমি তো চিনি না–

: আমিও না কিন্তু নামের কি দরকার। ও নিজেই ওর পরিচয়।

: তা কি হয়। দেখতে সুন্দর, গন্ধাটাও বেশ মিষ্টি একটি নাম হলে

: নামের মিষ্টিটা ততক্ষণ ওকে চেননি নাম না জানা ফুল আরো বেশী মিষ্টি মধুরী ওর রহস্যতেই ওকে থাকতে দাও

: তাহলে মালীকে শুধোব নামটা।

: নাই বা শুধোলে ওর নাম জবা, কবরী অথবা ডালিয়া, ডায়স্থাস গোছের কিছু একটা হবে সেইটাকে অতবড় করে দেখছো কেন?

: এররূপ রস গন্ধের সঙ্গে নামটিও যোগ করতে চাইনি।

: না ওর রহস্যকে অবগুণ্ঠিত করো না, হাজার ফুলের নাম তো জান ওর নাম নাই বা জানলে।

তাহলে এর নাম রইল নাম না ও শুধু রইল আমাদের আজকের বেড়ানোর সাক্ষী হয়ে আচ্ছা তাই বলে হাসলো মাধুরী।

৪. উমেশবাবু স্বয়ং কোনো কাজ করেন না

উমেশবাবু স্বয়ং কোনো কাজ করেন না, বড় ছেলেই সব দেখে শোনে, তবে ছেলে এমন যে বাবার মত ছাড়া এক পা চলে না। বর্তমান যুগেও পিতা হিসেবে উমেশবাবুর গর্ব করার মতো তার ছেলেরা। গিন্নিও নিজের পূজা পার্বণ নিয়ে থাকেন ওদিকে বড়বৌ সব দেখাশোনা করে কিন্তু মাধুরীর বিয়ের কথাটা উমেশবাবুকে আর গিন্নিকে ভাবতে হয়।

মেয়ে বড় হয়েছে, এবার যোগ্যপাত্রে তাকে সম্প্রদান করা দরকার। কুমার নৃপেন্দ্র নারায়ণ অবশ্য বাড়িতে আসেন পাত্র হিসাবে যতেষ্ট যোগ্যতা তার। কিন্তু মাধুরী তার কাছে ঘেঁষে না অতএব উমেশবাবু ও কথা ভাববেন না। হঠাৎ সেদিন অন্য একটি ছেলে এল ছেলেটি যতীনের বন্ধু নাম সুশীল বড় লোকের ছেলে এম. এ. পাস, ভালো গাইতে পারে। মাঝে মাঝে আসে এখানে গান গায় ব্রিজ খেলে। হঠাৎ এলো সে বিকাল বেলা। কুশলাদি প্রশ্নের পর রতীন তাকে নিয়ে বসলো নিজের গান বাজনার ঘরটায়। মহেন্দ্র বাড়ি নাই, কোথায় গেছে কে জানে, অতএব মেজবৌদি, মেজদা রতীন আর সুশীল ব্রীজ খেলতে বসলো সন্ধ্যার পর গান হবে। খেলা চলছে, অকস্মাৎ মাধুরী এসে ঢুকলো বৈকালিক প্রসাধন সেরে! চা দেবে সকলকে। সুশীল তাকে দেখে নমস্কার জানিয়ে বলল……..

: তাস আর খেলা চলে না, এবার মাধুরী দেবী একটা গান শোনান।

ফরমাস করলেই আমি গাইতে পারি নে, অত সস্তা গলা নেই আমার, চা খাবেন তো আসুন সবাই এই বারান্দায় বলে সে ওদিকে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল চায়ের সরঞ্জাম সমেত চাকরটাকে নিয়ে।

বেশ, চা খেতে খেতে গানের মুড আসবে তো? বলতে বলতে ওরা এলো বারান্দায়।

: আমার গান হুড চাপা আছে ও এখন খুলবে না এখানে হুড মানে হড়পী, যাতে সাপ থাকে ওকে তুবড়ী বাজিয়ে খুলতে হয়, আসুন, চা খান। এখানে আছে গোখরা সাপ বলে চা ঢেলে চলে যাচ্ছে, বড়দা এসে ঢুকলো বললো–

আমায় এক কাপ দে ছোটদি।

: দিই মাধুরী কোমল হয়ে উঠল। বড়দাকে সে অত্যন্ত ভক্তি করে, বললো আজ দমদমার বাগানটা দেখে এলাম বড়দা, ওখানে একটা গোশালা করলে হয় না? আমি না হয় দেখবো?

: গো শালা? কেন রে?

: দেশে বিস্তর গরু, রাখবার জায়গা নেই আমি কতকগুলো রাখতাম।

: বিস্তর গরু কোথায়? গরুরই অভাব বাংলাদেশে।

না বড়দা গরু অনেক আছে, তবে সেগুলো দুধ দেয় না ওদের খোয়াড়ে পুড়ে ভালো করে খাওয়াতে হবে!

চা দিয়ে গেল মাধুরী। ওর কথা কেউ ধর্তেব্যের মধ্যে আনে না তাই রক্ষে নইলে সুশীল হয়তো অপমান বোধ করতো তথাপি সে লাল হয়ে উঠলো মাধুরীর ছেলে মানুষ রসিকতায়। কিন্তু কিছু করবার নেই। মাধুরীর কথা বরাবরই এমনি কাউকে সে খাতির করে না।

মেজবৌদি উঠে গেল ভেতরে, মাধুরীকে ধরলো এসে মাঝ পথে বললো শোন ছোটদি, সুশীলকে গরু বানিয়ে ছাড়লি তুই।

: গরু খুব দামী জানোয়ার ওর অহঙ্কার হওয়া উচিত ওকে তো সম্মান করলাম।

: হ্যাঁ গাধা বলিসনি, এই ঢের।

মেজবৌদির পিছনে মেঝদা মাধুরীর কথাটা শুনতে পেলো কঠিন ভাবে বললো মানুষকে অত হতশ্রদ্ধা কেন করিস মাধুরী।

: ও মা, হতশ্রদ্ধা কই করলুম। গরু আমাদের পূজোর দেবতা, যজ্ঞের বলি, ওর গোবর অবধি মাথায় রাখি।

কথাগুলো এমন গভীর ভাবে বললো মাধুরী মেজদা, মেজবৌদি দুইজনেই হেসে ফেললো। অতঃপর হাসি সামলে মেজদা বললো

: বাড়িতে অতিথি এলে তাকে সম্মান করতে হবে বোনটি, এখন বড় হয়েছিস। উনি অতিথি নাকি? আমি ভেবেছিলাম আপনার লোক। তাহলে মাফ চাইছি গিয়ে বলে সটান ফিরে এসে সুশীলকে বললো।

: শুনুন সুশীলবাবু, আমি আপনার সঙ্গে রসিকতা করছিলাম আপনার লোক মনে করে, কিন্তু মেজদা বললেন, আপনি শুধু অতিথি, তাই ক্ষমা চাইতে এলাম, কিছু মনে করবেন না, বলেই চলে গেল।

: অবস্থাটা কিভাবে এনে কোথায় ঘোরাল, ভালো করে কেউ অনুভব করবার পূর্বেই সুশীল বললো, ওতো ঐ রকমই বলে, আপনি আবার ওকে ধমকাতে গেলেন কেন মেজদা। হাসি ফুটল সুশীলের মুখে, অর্থাৎ মাধুরী তাকে আপনার লোক ভেবে রসিকতা করেছে এটা সে বুঝে আনন্দ পাচ্ছে, বড়দা চা খেতে খেতে শুনলো সব, উঠে গেল ভেতরে। মাধুরী মার ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে।

বড়দা এসে ওর পিঠে হাত দিয়ে বললো—

লক্ষী দিদি সুশীলকে তোর কি রকম লাগে বল তো?

উনি অতিশয় ভাল ছেলে।

: অতিশয় কথাটা কেন বললি?

: মানে রূপে, গুণে, কুলে শীলে, আভিজাত্যে অহঙ্কারে আর—

: আর কি কি?

: আর মাধুরী আমতা আমতা করে আর তোমার এই বোনটিকে ক্যাপটিভিট করবার ক্যাঙালপনায়, বলেই বড়দার কোল ঘেঁষে দাঁড়ালো। তুমি আমাকে একটা অপদার্থ ধনীর ঘরের পুতুল সাজাতে ছাইছ বড়দা, বাপের টাকার সুট পরে ব্রীজ খেলতে এলেই মানুষ মহাপুরুষ হয় না, এম. এ. পাস করলেও চতুর্ভুজ হয় না। ওই তুলতুলে ননীর শরীর দিয়ে কুটোটি কাটবার যার শক্তি নেই, তাকে বিয়ে করে খাঁচায় প&