শ্যামখুড়োর কুটির – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শ্যামখুড়োর কুটির - সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

সেই যারা বাংলা মুল্লুকের পাড়াগাঁয়ে রাতবিরেতের অন্ধকারে নিরিবিলি জায়গায় আলো জ্বেলে কীসব খুঁজে বেড়ায়, এই মার্কিন মুল্লুকেও এসেও তাদের দেখা পেয়ে যাব ভাবতেও পারিনি।

তফাতটা শুধু দেখলুম ভাষার। সেই একইরকম তিনটে আলো নিয়ে তিনটি ছায়ামূর্তি জলার ধারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নাকি স্বরে একজন বলল, এখানেই তো থাকার কথা। গেল কোথায়?

অন্যজন বলল,–ভালো করে খুঁজে দ্যাখ না।

তৃতীয়জন বলল,–কেউ মেরে দেয়নি তো?

ভাষাটা ইংরেজি। এমনিতে বেশির ভাগ মার্কিন একটু নাকি স্বরে কথা বলে। এরা তো ভূত। গলার স্বর বেজায় রকমের খোনা।

আমার সঙ্গী বব তেজি ছোকরা। ভূত বিশ্বাস করে না। সে বলল, একটু অপেক্ষা করো। ওদের ডেকে আনি। মনে হচ্ছে, গাড়িটা ঠেলতে হবে। উনষাট বছর বয়সের এই বুড়োগাড়ির পক্ষে এমনটা হবেই।

উঁচু হাইওয়ের ডান ঘেঁষে আমাদের গাড়িটা দাঁড় করানো। ঘুটঘুঁটে অন্ধকার রাত। কনকনে হাওয়া বইছে। ঠান্ডায় হিম হয়ে গেছি গাড়ি থেকে নেমেই। দূরে বহু দূরে আলোর ফুটকি দেখা যাচ্ছে। হাইওয়েতে কয়েক ফার্লং অন্তর ল্যাম্পপোস্ট যদিও রয়েছে, আমরা থেমেছি দুই ল্যাম্পপোস্টের মাঝামাঝি জায়গায়।

ইচ্ছে করে কি কেউ থামে? একেই বলে, যেখানে ভুতের ভয়, সেখানেই সন্ধে হয়। বব হাইওয়ের পরে ঢালু জমির দিকে পা বাড়াচ্ছে দেখে পিছু ডেকে বললুম, বব! বব! কথা শোনো!

বব থেমে বলল, কী হল?

–যাচ্ছ কোথায় তুমি? একটা কথা বলছি, শোনো।

নিচের দিকে আবছাভাবে একটা জলা দেখা যাচ্ছে। নক্ষত্রের প্রতিবিম্ব পড়েছে। ঝিকমিক করে কাঁপছে। সেখানে তিনটে আলো ঘুরঘুর করে বেড়াচ্ছে। সেদিকে দেখিয়ে বব বলল, ওদের ডেকে আনি। তুমি কি একা ঠেলতে পারবে ভাবছ? তুমি তো বাতাসেই উড়ে যাচ্ছ দেখছি।

বব হাসছিল। বললুম,–বব! ওরা কারা, কী ভাবছ তুমি?

বব সেদিকে তাকিয়ে বলল,-এখানে একটা গরুর খোঁয়াড় আছে দেখেছি। ওরা খোঁয়াড়েরই লোক হবে। না হলে খামার বাড়ির চাষাভুষো।

দুপা এগিয়ে চাপা গলায় বললুম,–ওরা কী বলাবলি করছিল আমার কানে এসেছে বব। শ্যামখুডোর কুটির

এবার বব একটু চমকাল বুঝি। সেও গলা চেপে বলল, আমাদের ওপর ওরা হামলা করবে বলছিল নাকি? দ্যাখো, হাইওয়েতে এমন হামলা প্রায়ই হয়। তবে আমাদের কাছে দামি কিছু তো নেই। তাছাড়া আমার কাছে একটা অটোমেটিক রিভলভার আছে। ভেবো না।

বললুম, না না! আমার ধারণা, ওরা হয়তো মানুষ নয় বব!

বব অবাক হয়ে বলল,–মানুষ নয় মানে? তবে ওরা কী?

–দ্যাখো বব, তাহলে তোমায় অনেক গল্প বলতে হয়। ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে ব্যস্তভাবে বললুম। বরং হাইওয়েতে দাঁড়িয়ে থেকেই আমরা কোনও গাড়ি থামিয়ে সাহায্য চাইব।

বব রাস্তার দুদিকে ঘুরে-ঘুরে দেখে নিয়ে বলল, আশ্চর্য তো! এখন কোনও দিক থেকেই গাড়ি আসছে না! এটা এক আন্ত রাজ্য হাইওয়ে। চব্বিশ ঘণ্টা গাড়ির বিরাম থাকে না। হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল কেন?

–সেজন্যেই তো বলছি, গতিক ভালো নয়। এসো, আপাতত গাড়ির ভেতর ঢুকে সিগারেট টানি। ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে না।

বলে আমি গাড়িতে ঢুকে বসলুম। বব কিন্তু এল না। বলল, এদিকে লোকগুলোও চলে যাচ্ছে যে! হাতেরি, তোমার কথার নিকুচি করেছে। বোসো, এক্ষুনি আসছি।

সে দৌড়ে ঢাল বেয়ে নেমে গেল। নিচে জলার ধারে আলো তিনটে ওদিকে উঁচুতে উঠে এগিয়ে যাচ্ছে কালো টিলার মতো উঁচু জায়গার দিকে। একটু পরে কিন্তু তিনটে আলোই মিলিয়ে গেল। তখন বব ফিরে এসে বলল,-ব্যাটাচ্ছেলেদের অত করে ডাকলুম। শুনতেই পেল না। দ্যাখো দিকি, কী মুশকিলে পড়া গেল! ওহে, একবার বেরিয়ে একটু ঠেলে দাও না, দেখি কী হয়। এসো এসো।

অগত্যা বেরোতে হল। বব একপাশে দাঁড়িয়ে ঠেলতে-ঠেলতে স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা করল, অন্যদিকে আমি কাঁধ লাগালাম। কিন্তু গাড়ি কান্নার মতো শব্দ করতে থাকল শুধু। স্টার্ট নিল না। এই সেকেলে ১৯২১ সালের মডেল ভিনটেজ গাড়িটা তবু মায়াবশে বব ছাড়তে নারাজ।

হতাশ হয়ে বব অন্ধকারে সেই কালো টিলাটার দিকে তাকিয়ে রইল। সেই সময় দেখলুম, এবার তিনটে নয়, মোটে একটা আলো নেমে আসছে জলার দিকে। আলোটা জলাঅব্দি এসে একবার থামল। তারপর আমাদের দিকে উঠতে থাকল। অস্বস্তি হচ্ছিল আমার। কিন্তু বব নেচে উঠল প্রায়। সে জোর গলায় ডেকে বলল, ওহে লোকটা, আরও একটু পা চালিয়ে এসো দিকি! বড় বিপদে পড়েছি আমরা।

আলোটা ঢালু জায়গায় থেমে গেল। তারপর খনখনে গলায় জিগ্যেস করল, কে তোমরা? হয়েছেটা কী?

বব বলল,–গাড়িটা স্টার্ট নিচ্ছে না; ঠেলে দিলে বোধহয় নেবে।

–আমার সময় নেই। কর্তার কুকুরের লেজ হারিয়ে গেছে। খুঁজে বেড়াছি।

–কী হারিয়েছে বললে?

লেজ।–বলে আলোওয়ালা ছায়ামূর্তিটা গাড়ির সামনে দিয়ে রাস্তা পেরুতে থাকল।

বব হাসতে-হাসতে বলল,–তুমি তো ভারি রসিক লোক দেখছি!

আলোওয়ালা বলল,-রসিকতা কী বলছ? প্রাণ নিয়ে টানাটানি! কর্তার যা মেজাজ। জিমের লেজ খুঁজে না আনলে চাকরি চলে যাবে।

আলোওয়ালা রাস্তার ওধারে গিয়ে মাঠে নামল। বব বলল, উঁহু উঁহু। এভাবে রাত কাটানোর মানে হয় না। তুমি অপেক্ষা করো, আমি ওর কর্তার কাছে গিয়ে সাহায্য চাই।

আমি তো ভুক্তভোগী যাকে বলে। বাংলার পাড়াগাঁয়ে একবার ঠিক এমন আলোওয়ালাদের পাল্লায় পড়ে যা ভূগেছিলাম কহতব্য নয়। এটা তো বিদেশবিভূঁই। একা এখানে থাকি, আর যে আলোওয়ালাটা সদ্য ওধারে ঘুরে বেড়াচ্ছে আমাকে বাগে পেয়ে ঘাড় মটকাবে আরকী! তাই বললুম, চলো বব। তোমার সঙ্গে আমিও যাই!

বব খুশি হয়ে বলল, এসো।

মানে একটা ভরসা হচ্ছে দুজন একসঙ্গে থাকলে ওরা সুবিধা করতে পারবে না। তাছাড়া ববের গায়ে অসুরের জোর আছে। পকেটে রিভলভারও আছে, রিভলভারের গুলিতে ওদের ক্ষতি কিছু না হোক, আমরা অন্তত মনে সাহস পাব। রাতবিরেতে ভয় পেলে আওয়াজ একটা মোক্ষম দাওয়াই কিনা। সেজন্যই নিয়ম আছে ভয় পেলে জোরে গান গাইতে হয় কিংবা আপন মনে কথা বলতে হয়। সাহস ছাড়া ভূতপেতকে হারানোর আর কোনও উপায় নেই। ভয় পেয়েছি টের পেলেই ওরা ঘাড়টি মটকে দেবে। কাজেই ভূতের পাল্লায় পড়লেই হাবভাবে দেখাতে হবে তুমি ভীষণ সাহসী। তাহলে উল্টে ভূতই ভয় পেয়ে পালাবে।

জলার ধার দিয়ে গিয়ে নরম ঘাসে ঢাকা টিলায় উঠতে-উঠতে বললুম,– রিভলবারটা তৈরি রেখো কিন্তু। কিছু বলা যায় না।

বব বলল, না না। এরা চাষাভূষা লোক। বড্ড গোবেচারা।

–বব, কুকুরের লেজ খোঁজাখুঁজির ব্যাপারটা নিয়ে তোমার মনে সন্দেহ জাগছে?

–ওটা তো রসিকতা। তুমি মার্কিন চাষাভূষাদের হালচাল জানো না। ওরা ভারি রসিক।

–যে কর্তার কথা বললে, সে রসিক না হতেও পারে।

চলো তো দেখি লোকটা কেমন। বলে বব জগিংয়ের ভঙ্গিতে টিলাটা বেয়ে উঠতে থাকল।

আমার হাঁপ ধরে যাওয়ার দাখিল। তবে শিগগির থামতে হল আমাদের সামনে ঘন গাছপালা। একফালি পথ খুঁজে পেলুম। পথ ধরে একটু এগুলে কুকুরের ডাক শোনা গেল।

কুকুরের ডাকটা সত্যি বলেই মনে হচ্ছিল আমার। ভূতদের কুকুর থাকতে পারে। কিন্তু তারা কখন ডাকে বলে শুনিনি। যতো এগোচ্ছি, কুকুরটার হাঁকডাক তত বেড়ে যাচ্ছে। সামনে আবছা একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু কোনও আলো নেই। এমন তো হওয়ার কথা নয়। এদেশে বিদ্যুৎ ছাড়া চলে না! শুধু আলো নয়, হাজার রকমের দরকারি কাজে বিদ্যুৎ লাগে।

বব বলল, ভারি অদ্ভুত তো। মনে হচ্ছে বাড়ির ভেতর কুকুরটাকে বেঁধে রেখে বাড়ির লোকেরা কোথায় বেরিয়েছে। আলো নেই কেন?

এবার ফিসফিস করে বললুম, বব। সেজন্যেই তো তখন বলছিলুম, এরা মানুষ নয়।

বব আমার কথা শুনে হেসে উঠল। তখন থেকে তুমি মানুষ নয় মানুষ নয় করছ কেন বলো তো?

আসল কথাটা বলতে যাচ্ছিলুম, হঠাৎ বাড়ির সবগুলো আলো একসঙ্গে জ্বলে উঠল। কুকুরের ডাকটাও থেমে গেল। সামনে সুন্দর একটা কাঠের বাড়ি দেখতে পেলুম। ছোট্ট লনে একটা ফুলবাগিচাও দেখলুম। বব দৌড়ে গিয়ে বারান্দায় উঠল এবং দরজায় নক করল। আমি লনে দাঁড়িয়ে আলো-অন্ধকারে চোখ বুলিয়ে বিপজ্জনক কিছু আছে কিনা খুঁজতে থাকলুম।

দরজা ফঁক করে এক বুড়ো ভদ্রলোক উঁকি মেরে বললেন, কী চাই?

বব সবিনয়ে বলল,–দেখুন, আমরা আসছিলাম সিডার র‍্যাপিড এয়ারপোর্ট থেকে। এক বন্ধুকে প্লেনে তুলতে গিয়েছিলুম। ফেরার পথে গাড়িটা বিগড়ে গেছে।

বুড়ো নির্বিকার মুখে বললেন, আমি কী করতে পারি?

–দয়া করে যদি আপনার লোকদের একটু বলেন—

ভদ্রলোক বললেন, আমার লোকেরা সবাই এখন কাজে বেরিয়েছে।

রাগী বব খাপ্পা হয়ে বলল, কুকুরের লেজ খুঁজতে বুঝি?

আশ্চর্য, ভদ্রলোক খিকখিক করে হাসলেন, তাহলে তো জানোই দেখছি। আমার জিমের ওই এক দোষ বুঝলে? বেড়াতে গিয়ে একটা না একটা কিছু ফেলে আসবেই! প্রত্যেক দিন! আজ তো লেজ ফেলে এসেছে। কাল এসেছিল সামনের বাঁ ঠ্যাংটা ফেলে। হতভাগা খোঁড়াতে-খোঁড়াতে বাড়ি ফিরেছিল। শেষে অনেক খোঁজাখুঁজি করে পাওয়া গেল একটা ওক গাছের মাথায়।

বব রাগ চেপে বলল, উড়ে গিয়ে আটকে ছিল বুঝি?

না না।–বুড়ো খুব হাসলেন। দুষ্টু বাজপাখির কাজ। ভাগ্যিস, পরদিন খাবে বলে বাসায় রেখে দিয়েছিল। নইলে জিম খোঁড়া হয়ে থাকত।

বলেই বুড়োর চোখ পড়ল আমার দিকে। বললেন,–ওটা কে?

চটপট বললুম, আমি ভারতের লোক। এদেশে বেড়াতে এসেছি।

দরজাটা পুরো খুলে ভদ্রলোক বেরুলেন। মস্ত আলখাল্লার মতো কালো ওভারকোট গায়ে চাপানো। লম্বাটে চেহারা! নাকটা অসম্ভব খাড়া আর লম্বা। কোটরাগত ছোট্ট দুটো চোখ। ভুরু, চুল, দাড়ি সব সাদা। হাত বাড়িয়ে বললেন, স্বাগত, সুস্বাগত। তুমি ভারতের লোক! এসো এসো। ভেতরে এসো। কী সৌভাগ্য আমার, এতকাল পরে একজন ভারতের লোক পাওয়া গেল। তোমায় আমার বড় দরকার!

বব তো হতভম্ব। কিন্তু বাইরের কনকনে ঠান্ডায় ততক্ষণে রক্ত যেন জমে গেছে। ভূত হোক, আর প্রেতই হোক, ঘরের ভেতর ঢোকাটাই এখন জরুরি।

ভেতরটা সেকেলে আসবাবে ঠাসা! একপাশে ফায়ারপ্লেসও রয়েছে সাবেকি রীতিতে! কানট্রি এলাকায় মার্কিনদের ঘর গরম রাখার ব্যবস্থা সত্ত্বেও শখ করে ওরা সেকালের মতো ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বালে এবং সেখানে বসে গল্পস্বল্প করে।

বব গুম হয়ে বসে রইল। ভদ্রলোক বললেন, আমার নাম শ্যাম বানভিল। এই এলাকায় লোকে আমায় আংকল শ্যাম–শ্যাম খুড়ো বলে ডাকে। হুম! আগে কফি খাও। পরে কথাবার্তা হবে!

দুধ চিনি ছাড়া কালো কফি খেতে আমি ততদিনে অভ্যস্ত। কিন্তু মুখে দিয়েই বুঝেছি, গণ্ডগোল আছে। রুমাল বের করে মুখ মোছার ছলে তরল পদার্থটুকু পাচার করে দিলুম। তারপর আড়-চোখে দেখি বব কাপ থেকে বাঁ হাতের দুই আঙুলে সরু কী একটা টেনে তুলল। তুলে বলল,–এটা কী শ্যামখুড়ো? বাজ পাখিটার আঙুল নাকি?

শ্যামখুড়ো চোখ বুজে দুলতে-দুলতে বললেন, না, না, ঘাসফড়িং।

বব বলল,–চিনে পাখির বাসার ঝোল রান্না করে খায় শুনেছি। ঘাসফড়িং সেদ্ধ করে কফি খাওয়ার কথা জানা ছিল না। আশা করি ডিনারে আপনি ছুঁচোর রোস্ট এবং পাচার পালকের স্যালাড় খেয়েছেন?

শ্যামখুড়ো খিকখিক করে হেসে বললেন,–তোমাদের আমি ডিনার খাওয়াতে পারতুম। তুমি ঠিকই ধরেছ।

বাঁচা গেল। মার্কিনিরা রাতের খাওয়া সূর্য ডোবার সঙ্গে-সঙ্গে খেয়ে নেয়। কাজেই আমি ও বব শ্যামখুড়োর কাছে যদি ওই সময় আসতুম, কী হতো ভেবে শিউরে উঠলুম। বব কফির কাপটা রেখে দিয়েছে ততক্ষণে। খুড়ো আপন খেয়ালে বসে বসে দুলছেন। নইলে নিশ্চয় আপত্তি করতেন এবং গিলতে বাধ্য করতেন। দেখাদেখি আমিও কাপটা রেখে দিলুম।

এই সময় একটা প্রকাণ্ড কালো কুকুর নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে খুড়োর পায়ের কাছে বসল। অবাক হয়ে দেখলাম, তার লেজটা পুরোপুরি বাদ। লেজের জায়গায় একটা গর্ত-মত রয়েছে। কুকুরটার জ্বলজ্বলে চোখ। সেই চোখে আমায় দেখছে দেখে ভীষণ ভড়কে গেলুম। কিন্তু ভড়কালে চলবে না। সাহস চাই, প্রচুর সাহস।

বব কুকুরটাকে দেখে বলল, খুড়ো আশাকরি জিমকে কুকুরের স্বাভাবিক খাদ্য খাওয়ান?

শ্যামখুড়ো জবাব দেবার আগেই জিম করল কী, যেন ববকে দেখাবার জন্য মুখ বাড়িয়ে ফায়ারপ্লেস থেকে একটা জ্বলন্ত কাঠের টুকরো কামড়ে নিল। তারপর মুখ কাত করে হাড় চিবুনোর ভঙ্গিতে চিবুতে শুরু করল। অঙ্গারের কুচি চিড়বিড় করে ছিটকে পড়তে থাকল।

এতক্ষণে বব ভীষণ চমকে উঠল এবং তার চোখদুটো ছানাবড়া হয়ে গেল। সে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। শ্যামখুড়োর চোখে পড়লে ব্যস্তভাবে বলে উঠলেন, আঃ, জিম! খায় না, ছিঃ খায় না! বদহজম হবে। তখন সেদিনকার মতো ঘোড়ার নাদির গুলি গিলতে হবে।

জিম বারণ মানল। হয়তো ঘোড়ার নাদির গুলি গিলতে হবে বলেই।

এবার শ্যামখুড়ো আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, হুম! তোমার সঙ্গে কতাবার্তা শুরু করা যাক। হা হে, তোমরা ভারতীয়রা নাকি অনেক রকম গুপ্তবিদ্যা জানো মানে, অকাল্টের কথাই বলছি। একটু নমুনা দেখাও না আমায়?

–খুড়োমশাই, আমি তো কিছু জানি না। করুণ মুখভঙ্গি করে বললুম। আড়চোখে লক্ষ করলুম, ববের ঠোঁটের কোনায় মুচকি হাসি ফুটেছে। আমার অবস্থা দেখেই হয়তো বা।

শ্যামখুড়ো বললেন, জানিনে বললে ছাড়ছিনে বাপু। বলি, আপত্তিটা কীসের? বিদ্যা তো অপরের কাছে জাহির করার জন্যই! বিদ্যা জেনে কি কেউ ঘরে চুপচাপ মুখ বুজে বসে থাকে? কই, ঝাড়ো একখানা নমুনা। ধরো, শূন্যে মাটি ছাড়া হয় বসা– কিংবা জ্বলন্ত আগুনে পিঠ দিয়ে শুয়ে থাকা। যে-কোনওটা।

বেগতিক দেখে বব বলল, বরং তোমার তাসের ম্যাজিকটা দেখাতে পারো খুড়োকে।

খুড়ো ভুরু কুঁচকে বলল,-ম্যাজিক ম্যাজিক কে দেখতে চেয়েছে ছোকরা?

তেজী বব বলল, সবই তো ম্যাজিক। ওই যে অকাট না ফকাল্ট না গুপ্তবিদ্যার কথা বললেন, তা স্রেফ ম্যাজিক ছাড়া কী? একটু আগে আপনার জিমের আগুন খাওয়াটাও তাই। আপনি আসলে একজন ম্যাজিশিয়ান। তা কি বুঝিনি?

–কী বললে? কী বললে? শ্যামখুড়ো রাগের চোটে সটান উঠে দাঁড়ালেন।

–আপনি ম্যাজিশিয়ান। বব অকুতোভয়ে বলল।

আমি ববের দিকে বারবার চোখ টিপছি। এ বিপদের সময় তর্ক করতে নেই। গোঁয়ার বব আমার দিকে তাকাচ্ছেই না। এদিকে শ্যামখুড়ো দাঁত কিড়মিড় করে তাকিয়ে আছেন। গুলি-গুলি চোখ দুটো থেকে দেখতে পাচ্ছি, স্ফুলিঙ্গ ঠিকরে পড়ছে। তবু হাঁদারাম বব কিছু আঁচ করছে না।

হঠাং লিকলিকে আঙুল তুলে খুড়ো চেরা গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন, বেরিয়ে যাও! বেরিয়ে যাও!

যাচ্ছি।–বলে বব উঠে গটগট করে বেরিয়ে গেল।

আমি উঠতে যাচ্ছি, খুড়ো আমার কাধ চেপে বসিয়ে দিলেন। সারা গা হিম হয়ে গেল। কিন্তু খুডোর মুখে মিঠে হাসি ফুটেছে তক্ষুনি। বুড়ো আঙুল তুলে ববের উদ্দেশে বললেন,–কি জানে না ও ছোকরা। কখনও ওর সঙ্গে আর মিশো না। তুমি আমার কাছে থেকে যাও।

মৃদু আপত্তি করে বললুম,–পরে সময় করে আসব খুড়ো! এখন বরং আমায় যেতে দিন।

এই ঠান্ডায় কোথায় যাবে বাপু?–শ্যামখুড়ো সস্নেহে বললেন,–পাশের ঘরে আরামে ঘুমোতে পারবে। যাকগে, যা নিয়ে কথা হচ্ছিল। কই, শূন্যে বসে থাকাটাই একটু দেখাও।

অগত্যা বললুম,–যখন তখন এ বিদ্যা প্রকাশ করতে নেই খুড়ো। শাস্ত্রে নিষেধ আছে। তিতিনক্ষত্র এসব দেখে তবে না। পাজি দেখে দিনক্ষণ ঠিক করতে হবে।

খুড়ো বললেন,-তাই বুঝি? ঠিক আছে। তাহলে ওই তো আগুন রয়েছে। অন্তত আগুনে পিঠ রেখে শোয়াটা একবার দেখাও। ওঠো, দেরি কোরো না। টম ডিক হ্যারি এক্ষুনি এসে পড়বে। ওরা এলে আমার অন্য সব কাজকর্ম আছে। ফুরসত পাব না। ওঠো, ওঠো।

আগুনটাও এসময় ফায়ারপ্লেসে কেন কে জানে, দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। আঁতকে উঠলুম। শ্যামখুড়ো লিকলিকে আঙুলে আমাকে খোঁচাতে শুরু করেছেন। পাজি তিথি-নক্ষত্রের কথা তুলব কী, ক্রমাগত পাঁজরে ও পেটে খোঁচা খেয়ে কাতুকুতু লাগছে। হি-হি করে হাসি পেয়ে গেল শেষ অব্দি। তখন শ্যামখুড়োও হি-হি করে হাসতে-হাসতে কাতুকুতু বাড়িয়ে দিলেন।

কাতুকুতুর চোটে ফায়ারপ্লেসে গিয়ে ছিটকে পড়ি আর কী, হঠাৎ হইহই করে দরজা দিয়ে তিনটে নোক ঢুকল। তিনজনের হাতেই তিনটে অদ্ভুত লণ্ঠন। হ্যাঁ, এরাই জলার ধারের সেই তারা। শ্যামখুড়ো আমায় ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,–পাওয়া গেল?

টম হ্যারি ডিক তুমুল কোলাহল করে জবাব দিল,–পাওয়া গেছে! পাওয়া গেছে!

শ্যামখুড়ো বেজায় খুশিতে নাচতে নাচতে বললেন,–কোথায় পেলি?

ওরা কোরাস গাওয়ার ভঙ্গিতে বলল,–ভোঁদরের গর্তে।

–কাল ব্যাটাকে দেখব। এখন আয় তোরা, জিমকে ধর। লেজটা পরিয়ে দিই।

চারজনে জিমকে নিয়ে ব্যস্ত হল! আর সেই সুযোগে আমি ফুড়ুত করে কেটে পড়লুম দরজা গলিয়ে। তারপর দৌড়, দৌড়, দৌড়। অন্ধকারে কতবার ঠোক্কর খেলুম। রাস্তায় গড়িয়ে পড়লুম। শিশিরে কাদায় পোশাকের অবস্থা যা হল, বলার নয়।

হাইওয়েতে পৌঁছে ভাগ্যিস গাড়িটা পাওয়া গেল। ভেতরে বব নির্বিকার ঘুমোচ্ছিল। ঘুমজড়ানো গলায় বলল,–শুয়ে পড়ো। সকাল অব্দি উপায় নেই।

হাইওয়েতে পুলিশের টহলদারি আছে। শেষরাতে তাদের ডাকে ঘুম ভেঙেছিল। গাড়ির অবস্থা দেখে তাদের অফিসার ববকে বলেছিল,–এই ভিনটেজ মালটা ভাগাড়ে ফেলে দিয়ে নতুন একটা কেনো। বব তাতে রাজি। তাদের গাড়িতেই আমাদের লিফট দিয়েছিল।

পথে বব হঠাৎ জিগ্যেস করেছিল,–গাড়ি খারাপ হওয়া জায়গাটার ওখানে টিলার ওপর কে থাকে বলুন তো? ভারী অদ্ভুত লোক।

অফিসার চোখ পাকিয়ে বলেছিলেন,-গাঁজা খাও নাকি?

বব খাপ্পা।–সিগারেট খাওয়া নিশ্চয় গাঁজা খাওয়া নয়।

অফিসার একটু হেসে বলেছিলেন,-ও জায়গাটার নাম আংকল স্যামস কেবিন। শ্যামখুডোর কুটির। বিখ্যাত বই আংকল টমস কেবিনের অনুকরণ। ওখানে শ্যাম নামে একটা লোক থাকত। ভাঙা বাড়িটার সামনে তার কবর দেখেছি। ফলকে মৃত্যুসাল লেখা আছে ১৮৭৫।

বব আমার দিকে চোখ টিপে, কেন কে জানে, শুধু মুচকি হেসেছিল। আমি হাসিনি। ফোঁস করে বড় রকমের একটা নিশ্বাস ফেলেছিলুম। কারণ এই নিয়ে দুবার ফঁড়া গেছে। একবার বাংলামুল্লুকে, আর এবার মার্কিনমুল্লুকে। তফাতটা শুধু ভাষার।…

Facebook Comment

You May Also Like