Tuesday, April 23, 2024
Homeবাণী-কথাসমুদ্র-যাত্রা - বাণী বসু

সমুদ্র-যাত্রা – বাণী বসু

সমুদ্র-যাত্রা - বাণী বসু

ঘুমের মধ্যে আমি বাড়ি দেখি। জঙ্গলের মতো জনহীন, দিঘির মতো অথই, দুর্গের মতো নিচ্ছিদ্র, ফাংগাসের মতো ছত্রাকার, আবার ফাঁকা হাতায় লম্বা দেউড়ি নিয়ে ব্যাপক বাড়ি। কোনওটাই ছোটখাটো নয়। এত বিরাট যে তাদের এ মুড়ো থেকে ও মুড়ো, নীচ থেকে ওপরে যেতে অনেক সময় লাগে। অত সময় ঘুম কাউকে দেয় না। তাদের আদি-অন্ত, নীচ-মহল ওপর-মহল আমার অজানাই থেকে যায়। দেউড়ি থেকে শুরু করি, কখনও কোনও রহস্য-চাতালে, কখনও অফুরান বারান্দার মাঝ-মধ্যিখানে শেষ।

দুর্গ-বাড়িটা একটা কালো মাঠের মধ্যে। কালো, খোলা মাঠ। কিন্তু সে খোলা মাঠ আটকে দিয়েছে গম্ভীর পাঁচিল। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকি দিনের পর দিন। ছায়া-শরীরেরা ইশারায় আমায় ডেকে নিয়ে যায়। এ ঘর থেকে ও ঘর, ও ঘর থেকে সে ঘর, সব ঘর থেকে সব ঘরে যাওয়া যায়। কিন্তু একটা দরজা বন্ধ করে দিলেই সব শেষ। ভেতরে-যাওয়া কিংবা বাইরে আসা। কোথাও কোনও জানলা নেই। ভয় পেয়ে ছুটে বেরিয়ে আসি। দরজার পাল্লাগুলো মরচে-ধরা কব্জার ওপর ক্যাঁচ-কোঁচ শব্দে নড়ে। ভয়াল ভ্রূকুটি করে চাপা গর্জন করে দুর্গ। যেন ভীষণ বদমেজাজি রাগী মানুষ একটা, কথার অবাধ্যতা সইতে পারে না। তারপরে দেখি আমার পরনে একটা সুতোও নেই। উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ি। কেন না অনেক দূর দিয়ে ছায়া-মানুষেরা যাচ্ছে। তাদের কেমন চেনা-চেনা মনে হয়। ঘামে ভিজে গেছি দেখি।

ছত্রাকার বাড়িটা আরও অদ্ভুত। তার ঘর উঠোন বারান্দা সব আলাদা আলাদা দাঁড়িয়ে আছে। যেন কেউ বাড়িটাকে একটা বিশাল কৌটোর মধ্যে ঢুকিয়ে প্রচণ্ড রকম ঝাঁকানি দিয়ে দশ-পঁচিশের ঘুঁটির মতো ছড়িয়ে দিয়েছে। সব ঘর বারান্দার ছাত খুলে গেছে। এক ঘর থেকে আরেক ঘরে আমি লাফ দিয়ে চলে যাই। নষ্ট কুয়োর মতো গোল ঘর। শ্যাওলার চৌবাচ্চার মতো চৌকো ঘর। ঘুরে বেড়াই নিশ্চিন্তে। কেন না আমি উড়তে পারি। আগে যে কথাটা জানতুম না সেটা আশ্চর্য মনে হয়। আফসোস হয়, আগে জানা থাকলে কত নতুন দেশে ভেসে যাওয়া যেত। লোকে কি সেভাবেই যায়? দেশভ্রমণে, তীর্থযাত্রায়? অথচ ট্রেন, অথচ বাস, জাহাজ, উড়োজাহাজ! কেন? কেন! তখন বুঝতে পারি অন্য কেউ পারে না, আমি একাই পারি, জলের তলার অদৃশ্য ডাঙায় লগি দিয়ে ঠ্যালা মেরে যেমন নৌকাযাত্রা, সেরকমই। গুপ্ত ক্ষমতা। আমার একার।

আবার অনেক সময়ে প্রশস্ত হাতায় উড়ে বেড়ায় শুকনো শালপাতা, খড়কুটো, বহুদিনের চাপা ধুলো। বড় বড় থামের মাথায় কবুতর কুবকুব করে, দেখে বুঝি। আওয়াজ শুনি না। তিন মানুষ উঁচু সিং দরজা। খোলা হা হা করছে। চলে যাও, কেউ তোমাকে বাধা দেবে না, ঢুকে যাও। রোয়াক দিয়ে ঘেরা চৌকো উঠোন দ্যাখো। ওপর দিকে চেয়ে দ্যাখো আদ্যিকালের সিসে রং আকাশ, যেন কোনও বহুদিনের পুরনো সিন্দুক থেকে বার করে টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। ছ্যাতলা-পড়া সাদা পাথরের ঘর। দরজার মতো বড় বড় জানলা। বাইরে তাকালে পড়ো জমি, চোখ অন্ধ করা ভগ্নস্তৃপ—কোনও ঘর, ছাত, দালান ধসে পড়ে আছে। বাড়ি ঘিরে ভেতর বাড়ির গোলবারান্দা, বাইরেও দোতলা তিনতলা, চারতলা ঘিরে বারান্দা চলেছে এক অন্তহীন পথের মতো। বাড়ির গাঁট থেকে দেওয়াল ফাটিয়ে, ফুঁড়ে উঠেছে ভূতের মতো বট-পাকুড়। তাদের বিস্তৃত শেকড়ের নিশ্বাস আমি শুনতে পাই। ছড়িয়ে যাচ্ছে দেওয়ালময়। ভয়, বিস্ময়, আহ্লাদ তেমন কিছু তো কই হয় না। বাড়িটা তার ঘর, দোর, দালান, উঠোন, বারান্দা, থাম, তার ভগ্নতা ও ভয়াল আগাছা নিয়ে এক ধরনের বাস্তব। ছায়া-বাস্তব। কোথাও ওর কিছুই স্বীকার বা অস্বীকার করা যাবে না। আমি এখানে কেন? আমার সঙ্গে তোমার কী সম্পর্ক? কী খুঁজছি? কিছু খুঁজছি কী? না কি কেউ আমাকে এই বাড়িগুলো পর পর দেখিয়ে যায়, বাড়ির দালালরা যেমন দেখায়। যদি কোনওটা পছন্দ হয়।

সারা জীবন এই স্বপ্নগুলো না-ছোড় ফিসফিস করে। ফিরে ফিরে আসতে ওদের কোনও ক্লান্তি নেই, লজ্জা নেই।

যারা খুব অন্তরঙ্গ একমাত্র তাদেরই আমি এই স্বপ্নের বাড়ির কথা বলেছি। এরকম মানুষ আমার জীবনে খুব কম। যেমন দাদু। দাদুই বোধহয় ছিলেন সবচেয়ে কাছের মানুষ। তাঁর, একমাত্র তাঁরই সারাদিনের কার্যক্রম আমি খুব আগ্রহের সঙ্গে লক্ষ করতুম। একই কাজ করছেন, কিন্তু প্রতিদিন যেন নতুন করে, কেমন একটা ছন্দ আছে, তাতে কোনও একঘেয়েমি নেই। বামুন ঠাকুরের পড়া পাঁচালি নয়, বেশ যত্ন নিয়ে শব্দ বেছে বেছে লেখা এক উপাখ্যান। পুরনো দিনের একটা রাজকীয় স্টুডিবেকারে চড়ে স্যুট-কোট-টাই পরে, হাতির দাঁতের মুণ্ড-অলা ছড়ি নিয়ে তিনি হুস করে অফিস যেতেন। সেটা ছিল তাঁর কর্মজীবনের শেষ দিক। তাঁর চুলগুলো সব ধবধবে সাদা হয়ে গিয়েছিল। তিনি এক কোটি-কোটিপতি ব্যক্তির এস্টেট-ম্যানেজার ছিলেন। কোনও কোনও সংস্থার ডিরেক্টরও ছিলেন। যেমন এক গ্লাস ফ্যাক্টরি। বাব্‌ল উঠে যাওয়া কাচের জিনিস আমাদের বাড়িতে প্রায়ই আসত। বড় বড় রঙিন ফুলদানি, সুন্দর সুন্দর গ্লাস, কিন্তু একেকটা একেক রকম, প্লেট আসত ছাপ ঠিকমতো ওঠেনি, ভাল পালিশ হয়নি। এইসব খুঁতো, বুড়বুড়ি ওঠা জিনিসই ডিরেক্টরদের বাড়ি আসত। কেউ এ নিয়ে কোনও প্রশ্ন তুলত না, খালি মা দুঃখিত গলায় মাঝে মাঝে বলতেন— কখনও কি নিখুঁত জিনিস আপনাকে দেওয়ার কথা মনে হয় না কারও? এত করছেন!

দাদুকে বলতে শুনেছি— মানুষ যেমন নিখুঁত হয় না, জিনিসও তেমন। যা পাচ্ছি, যা পাচ্ছ বউমা, যার হাত দিয়ে যেমনই আসুক সব ঈশ্বরের দান, খুঁতো বলে কি তুমিই ফেলে দিয়েছ? কত যত্ন করে যে সাজিয়ে রেখেছ!

আমার নিজের ঠাকুমা আমার জন্মের আগেই মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু আরও দুই ঠাকুমা ছিলেন—বড়দিদা আর ছোড়দিদা। আর কোনও দাদু বেঁচে ছিলেন না। জ্যাঠামশাই বিয়ে করেননি, কোথায় যে থাকতেন, তখন জানতুম না, কাকা ছিলেন কেন্দ্রীয় সরকারের চাকুরে, খুব বদলি হতেন, আমার যখন জ্ঞান হয়েছে তখন কাকা আমেদাবাদে। পরে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে কানাডা চলে যান, আমি তাঁকে কখনও দেখিনি। আমার বাবা, বলবার মতো বড় কিছু করতেন না, কিন্তু তাঁর দাপট ছিল খুব। নাম রাজকুমার। দাদুকে গরিব-গুর্বো লোকেরা ভালবেসে রাজাবাবু বলত, তারাই বোধহয় মুখে মুখে রাজকুমার নামটা চালু করে। দাদুর দ্বিতীয় সন্তান আমার বাবা ছিলেন রীতিমতো সুপুরুষ। একটা বি. এ ডিগ্রি ছিল। দাদুর দৌলতে বড় বড় পোস্টে চাকরি পেতেই পারতেন। কিন্তু নিতেন না। তাঁর মত ছিল বাবার বন্ধু বলে যাঁরা তাঁকে স্নেহ করেন, খাতির করেন, তাঁদের তিনি ওপরওয়ালা ভাবতে পারবেন না। সাফ কথা। ভাল ছাত্রও ছিলেন, কিন্তু ইউনিভার্সিটির ছায়া মাড়াননি। ডিগ্রি নিয়ে কী হবে? তিনি কি কোনও ডিগ্রিধারীর থেকে কম পড়াশোনা করেন? সুতরাং তিনি থাকতেন তাঁর মর্জি মেজাজ অনুযায়ী রাজকুমারেরই মতো। বাড়িতে তিনটি বুড়ো মানুষ ও নিজের মেজাজি স্বামীকে সামলাতে মা হিমশিম খেতেন। আমরা জ্ঞান হয়ে থেকে তাঁর সঙ্গ তেমন পাইনি। বাবাকে ঘোর ভয় পেতুম এবং অপছন্দও করতুম। আমার একমাত্র আকর্ষণ ছিল দাদু নামে সেই বৃদ্ধ অথচ কর্মঠ, বাস্তববোধসম্পন্ন অথচ স্নেহশীল মানুষটির প্রতি।

সন্ধেবেলা দাদু ফিরে এসে শরবত কি এক গ্লাস হরলিক্স খাবেন, তারপর আমাদের নিয়ে বসবেন। দাদা এত ভাল ছাত্র ছিল যে নিজেই সব বুঝে করে নিতে পারত। খুব মাঝে মাঝে ছাড়া সাহায্য দরকার হত না। ফিনকি আমার বোন সন্ধে হলেই মায়ের আঁচল ধরে ধরে ঘুরবে। বাকি রইলুম আমি। পড়ি, গল্প করি। যত প্রশ্ন যত মনের কথা পাঠ্য এবং পাঠ্যের বাইরে সবই দাদুর কাছে, দাদুর সঙ্গে। পড়ছি, পড়ছি হঠাৎ হয় তো বইটা ঠেলে সরিয়ে রাখলুম।

—কী হল? বুঝতে পারছ না? না ভাল লাগছে না?

—আচ্ছা দাদু, স্বপ্নের কোনও মানে থাকে?

—খারাপ স্বপ্নের মানে থাকে না। ভাল স্বপ্নের মানে থাকে— দাদু হেসে বললেন— কী স্বপ্ন দেখেছ, ভয় পেয়েছ?

—না বাড়ি। খালি বাড়ি…

স্বপ্নগুলো দাদুকে সবিস্তার বলি।

দাদু কখনও আমার কোনও কথা উড়িয়ে দিতেন না। মন দিয়ে শুনতেন, তর্ক-বিতর্কও করতেন যেন আমি তাঁর সমান বয়সি। ভুরু কুঁচকে একটু ভাবলেন। তারপর বললেন—তুমি তো মাৰ্বল প্যালেস দেখেছ?

—হ্যাঁ। তুমিই তো নিয়ে গিয়েছিলে!

সারা শীতকাল দাদুর সঙ্গে মিউজিয়াম, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল, হুগলির ইমামবাড়া, ব্যান্ডেল চার্চ, চন্দননগরের স্ট্র্যান্ড, কিছু না হোক আমাদের গঙ্গার ঘাট, ফোর্ট উইলিয়ামের ঢালু জমির ওপর বেড়াতে বেড়াতে মাঝ গঙ্গায় নোঙর করা বড় জাহাজ দেখা ছিল আমাদের তিন ভাইবোনের কাজ।

—স্বামী বিবেকানন্দর বাড়িটাও দেখেছ!

—হ্যাঁ, উনি কোন ঘরটায় জন্মেছিলেন সেটাও।

—ঘিঞ্জি, পড়োমতো, না?

—হ্যাঁ।

—আর দেবেদের বাড়ি? ও বাড়ির একটি ছেলে তোমার বন্ধু না? গেছ?

—কতবার।

—তা হলে ওই বাড়িগুলোই স্বপ্নে নানারকম ভোল পাল্টে পাল্টে আসে। খুব একটা ইমপ্রেশন পড়েছে তোমার মনে, ভাল লেগেছে, বুঝেছ? নাও এবার এসেটা কী লিখলে দেখি।

—আমার ভাল লাগেনি।

—তা হলে খারাপ লেগেছে?

—তা-ও না। আমি ঠিক বোঝাতে পারছি না। ভাল না খারাপও না। তুমি থাকলে হয়তো ভাল লাগত।

—ঠিক আছে, এবার থেকে তোমার স্বপ্নের মধ্যে আমায় ডেকে নিয়ো।

আমি স্বস্তি পাই না— স্বপ্ন যদি তোমায় ঢুকতে না দেয়?

—ঠিক কথা— দাদু চিন্তিত মুখে বলেন— জোর করে কি আর কারও স্বপ্নে ঢোকা যায়?

যায় না বোধহয়। তাই আমার স্বপ্নগুলো ছিল জনহীন।

আমাদের বাড়ি আর স্কুলের খুব কাছেই গঙ্গা, বাগবাজারের ঘাট। ঘাটে নাও এসে লাগে। বড় বড় খড়বোঝাই। আবার ছোট ছোট দাঁড়ের নৌকো। তার পাটাতনের তলায় কী আছে কে জানে, ছই থাকলে তার ভেতরটা দেখতে পাই না। একটা অন্ধ কোটর মতো। পাটাতনের ওপর কুণ্ডলী করা জাল, কাক ঠুকরোচ্ছে। জালের সুতো ঠোঁটে চেপে ধরে একবার এদিক একবার ওদিক। তারপরে হঠাৎ হয় তো একটু পাখনা ঝেড়ে নিল। গলা অবধি সমস্ত শরীরটা তখন পালক-পালক। কাক আমার ভাল লাগে। খুব কর্কশ ডাক কাকের, এঁটো কাঁটা খায়, মাথায় ঠোক্কর মারে, বাসা বাঁধতে জানে না, চামচ মুখে করে নিয়ে চলে যায় হরদম। কিন্তু কাক যখন হালকা গরমের দুপুরে একলা গাছের মাঝডালে বসে থাকে, চুপচাপ, চোখ বাঁকানো নেই, খাবার খোঁজা নেই, কেমন যেন উদাস, ধ্যানস্থ, তখনই কাকের আসল রূপটা ধরা পড়ে। প্রতিদিনের উঞ্ছতা ছাড়িয়ে কাক তখন একা একা জীবন ভাবে, অদ্ভুত নির্লিপ্ত দেখায় তাকে। কালো গা, মিশকালো নয়, কেমন ছাতারে কালো। যা-ই খাক না কেন, কাকের চেহারা খুব সাফসুতরো, আমি কোনওদিনও কোনও মোটা কাকও দেখিনি। ছিপছিপে, হালকা পলকা।

কাকটা জাল ঠোকরাচ্ছে। মাঝি খুব অলস ভাবে একবার তাড়া দিল হু শ্‌ শ্‌… কাক একটু পিছিয়ে যায়। আবার তুড়ুক তুড়ুক ফিরে আসে। মাঝি আর ফিরে দেখে না। উবু হয়ে বসে গভীর ভাবে বিড়ি টানে। যেন বিড়ি টানাটা একটা ভীষণ জরুরি কাজ। একটা ঝুপসি গাছের তলায় বসে আমি এইসব দেখি। আশেপাশে তাকিয়ে একটা দুটো ঢিল খুঁজি। তারপর একটার পর একটা জলে ছুড়ে দিই। খুব বেশি দূর যায় না। কেন? হাতের জোর নেই আমার? ইচ্ছের জোর? পুলুও তো আমার মতো রোগা, ওর ঢিল তো অনেক দূর যায়। নৌকাটার আশেপাশে যদি পড়ত ঢিলটা! শব্দ হত টু প্‌ প্‌ প্‌। মাঝি মুখ তুলে দেখত। সে যদি একবারও আমাকে লক্ষ করে তো আমি কৃতার্থ হয়ে যাই। সে নৌকা বায়, দূর-দূর দিক-দিগরে যায়, জাল ফেলে মাছ ধরে, মাছের গায়ে রুপো চিক চিক, দুপুরের রোদ চলকে চলকে পড়ছে মাঝির গায়ে, নাওয়ের গলুইয়ে, গঙ্গার ঘোলা জল তখন আর ঘোলা থাকে না, অজস্র চকচকে আঁশ তার জলে চলকায়। এক জীবনে সে কত ঘাট জানল, জলের কত নিবিড় খবর তার কাছে। মাঝি খুব অবাক মানুষ। কেমন একটা সম্ভ্রম হয়, বিশেষ করে যখন দূরে নিজের ডিঙিতে বসে দোল খায়।

পুলু এসে ডাকল— ঠিক জানি তুই এখানে বসে আছিস। কী গরম! রোদের কী ভাপ রে এখানে?

কথা বলি না। মাথার ওপর ঝুপসি গাছের ছাউনিটা দেখিয়ে দিই। পাতা-পাতলির মধ্যে দিয়ে চকরাবকরা রোদ এসে পড়েছে আমার শাদা শার্টের ওপর। কালো কালো ছায়া-পাতার নকশা।

—তাতে কী? ভাপটা তো বেরোচ্ছে মাটি থেকে! গরম হচ্ছে না?

—আমার হচ্ছে না। তোর হলে চলে যা।

তখন গরমের ছুটি। স্কুলে একটা স্পেশ্যাল ক্লাস হয়। হেড সার নিজে পড়াতেন, অঙ্কের জন্যে ছিলেন যতীনবাবু, সব বাঘা বাঘা মাস্টারমশাই। কোচিং ক্লাস সেরে বাকি দুপুরটা বাড়ি যেতে মন চাইত না। নিঝঝুম বাড়ি। দিদারা ঘুমোচ্ছেন। দাদা খুব শান্ত ধরনের, ভীষণ পড়ুয়া ছেলে, তার থাকা না থাকা সমান, ফিনকি গল্পের বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছে, মা খুটুর খুটুর করে আলমারি গোছাচ্ছেন, কী সব সেলাই টেলাই নিয়ে বসেছেন, তারপর একটা বই নিয়ে শুয়ে পড়েছেন ফিনকির পাশে। কেমন স্যাঁতসেঁতে মরা বাড়ি। আমি নিজেও যে খুব হই-চইয়ে দুরন্ত ছেলে, খুব বলিয়ে-কইয়ে তা তো একেবারেই নয়। আমার ভেতরের স্তব্ধতাটা যেন আরও জো পেয়ে যেত এমন দুপুরে। তার চেয়ে গঙ্গার ধারে ঝুপসি বটতলায়…— ভাল। অন্যদিন দুপুরে বেরোলে বলে বেরোতে হত, খালি স্পেশ্যাল কোচিং-এর দিনগুলোয় কোনও জবাবদিহি নেই। দেড় ঘণ্টা, দু ঘণ্টা, আড়াই ঘণ্টা ক্লাস, তারপর স্কুলেই হুটোপাটি। গান, গল্প। যতক্ষণ না দীনবন্ধু দারোয়ান চাবির তোড়া নিয়ে উদয় হত ততক্ষণ দু চারখানা খোলা ঘরে আড্ডা। গলা খাঁকারি, চাবির ঝন ঝন, তার মানেই দীনবন্ধুদা আসছে, উঠে পড়ো এবার।

অন্যান্য দিনে স্কুলে কী রকম একটা গমগমে ভাব। সারেদের পড়ানোর আওয়াজ। ছেলেদের যাওয়া-আসা, একটু-আধটু কথা হাসি সব মিলিয়ে একটা জমজমাট হাওয়া। কিন্তু এই সব গ্রীষ্ম দুপুরের তাতে স্কুলটা যেন একটা অতিকায় কিন্তু খুব নিরীহ জন্তু। তার বিশ্রামের সময়ে কয়েকটি বালখিল্য সামান্য উৎপাত করছে তাতে সে কিছু মনে করত না। সামান্য আওয়াজ করলেই সেটা যেন লাউড-স্পিকার-এ ঘোষণা হয়ে যেত। আমি খুব সন্তর্পণে কান পেতে স্কুল বাড়িটার নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পেতুম। একটা ভারী শরীরের শ্বাসযন্ত্রে যেমন হয়। আড্ডা হয়। কিন্তু আমি যে তাতে যোগ দিই না, শুধু হাসি, অনেক সময়ে হাসির জায়গায়ও হাসি না, কেমন অন্যমনস্ক থাকি এটা একমাত্র পুলুই লক্ষ করত।

—কী ভাবিস রে? এই সমু?

—কই কিছু না তো!

—কিছু হয়েছে?

—কী হবে?

—তা হলে এরকম চুপচাপ…

—কিচ্ছু ভাবি না।

—বলবি না তাই বল।— এক ঝটকায় ইয়ো-ইয়ো ঘোরাতে শুরু করে পুলু।

আমি অপ্রাসঙ্গিক ভাবে বলে উঠি— যা মাঞ্জা বানাব না! এবার গোপালদের সব ঘুড়ি কাটতে হবে।

—কী রং দিবি?

—ম্যাজেন্টা, ঘোর ম্যাজেন্টা, আকাশেও সুতোটা দেখা যাবে!

—আমি হলে অরেঞ্জ দিতুম… অরেঞ্জটাও খুব… টিউটোরিয়্যাল থাকলে খুব মজা না রে তোর?— মাঞ্জার প্রসঙ্গ থেকে ছিটকে টিউটোরিয়ালের প্রসঙ্গে চলে যায় ও। ও আমার কাছ থেকে কথা বার করতে চাইছে। আমার ভেতরে বসে কে যেন ক্রমাগত বলতে থাকে— বলে না এসব বলতে নেই… বলতে নেই….।

বটগাছতলায় বসে গঙ্গার অনর্গল বয়ে যাওয়া দেখছি। ক্লান্ত কাকের ক্বঃ ক্বঃ… মাঝির দোল খাওয়া… পালতোলা নৌকো দূর দিয়ে যাচ্ছে… পুলু বলল—তুই এমন চুপ করে বসে থাকিস কেন রে?

—ভাল লাগে।

—ভাল তো আমারও লাগে। কিন্তু এ রকম চুপচাপ না। দ্যাখ কী রকম এক দফা সাঁতার দিয়ে নিই।

সাঁতার আমিও জানি। দেশবন্ধু পার্কের পুকুরে শিখেছি। ফ্রি-স্টাইল যাকে গোরাদা বলেন আনতাবড়ি, তার পরেও চিৎ সাঁতার ডুব সাঁতার। ডুব সাঁতার দিচ্ছি একদিন, হঠাৎ জলের মধ্যে থেকে কে আমায় ডাকল—সমর্পণ। স ম-র্পণ। আমার নাম সমর্পণ নয়, তবু মনে হল আমাকেই ডাকছে। কোন পাতালঘর থেকে ভুড়ভুড়ি কাটতে কাটতে ডাকটা বেরিয়ে এল। আমার কানের কাছে এসে যেন ফেটে গেল। তাড়াতাড়ি ভেসে উঠি। এইভাবে দ্বিতীয়বার ডাকলে আমাকে ডুবতে হবে আরও গভীরে। সেখান থেকে ভেসে ওঠবার ক্ষমতা আমার হবে কি না আমি জানি না।

এর পরেই একদিন একটা দুর্ঘটনা হল। ঘোষেদের বাড়ির মনু, মনসিজ পুকুরটাতে ডুবে গেল। বাড়িতে মাকে ভাত বাড়তে বলে এক ছুটে চান করতে গিয়েছিল। চান করা মানে একবার অন্তত এপার-ওপার করা। মনু খুব ভাল সাঁতার জানত। সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিল ওর মতো চ্যাম্পিয়ন সাঁতারু কী করে ডুবে যায়! আমি আন্দাজ করতে পারি। ওকে কেউ ডেকেছিল। ডাকটা পুকুরের অতল থেকে পাক খেতে খেতে উঠে এসে মনুর কানের কাছে ফেটে যায়। ও ডাকটার উৎস খুঁজতে গিয়েছিল। আর ওপরে উঠতে পারেনি। সকলে বলত পুকুরের ভেতর একটা কুয়ো আছে, মরণফাঁদ। জানি না কিন্তু আমার মনে হত ওই কুয়োর মধ্যে ঠিকঠাক মতো ডাইভ দিতে পারলে সোজা অন্য কোনও অজানা ভূখণ্ডে পৌঁছনো যায়। সেখান থেকে কারা আমাদের ডাক পাঠায়, বড্ড একা লাগে ওদের। ওরা কেমন? মানুষই হবে, কিন্তু খুব একা, সঙ্গী-খোঁজা ছায়ামানুষ। তাদের খোঁজে যাব কী! পুকুরটা এরপর কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে দেওয়া হল। ট্রেনিং বন্ধ রইল এবং মা দাদুকে বলে আমার পুকুরে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন।

—যাবি না সাঁতারে? পুলু শার্টটা খুলে আমার দিকে ছুড়ে দিল। তারপর ঝাঁপ দিল। কিছুক্ষণ পরে সোঁপাট ভিজে উঠে এল প্যান্ট নিংড়োতে নিংড়োতে।

—গেলি না?

—আমি তো যাব বলিনি!

—ভয় পাস?

—আমার এখন সাঁতারের সময় নয়।

—কীসের সময় এখন তা হলে! পুলু একটা তীব্র দৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে, তারপর শার্টটা ছিনিয়ে নিয়ে প্যান্টের জল নিংড়োতে নিংড়োতে চলে গেল। রাগ হয়েছে।

সত্যিই তো! সাঁতারের সময় নয়তো কিসের সময়? পড়ার সময়, খেলার সময়, শোওয়ার সময়… তেমন কি সাঁতারেরও নির্দিষ্ট সময় থাকে?

গাছের গুঁড়ি বেয়ে কাঠপিঁপড়ে নেমে আসে। ঝুরি বেয়ে কাঠবেড়ালি উঠে যায়। এত সুন্দর প্রাণী, আমার ধারণা ছিল ওদের ডাক পাখির শিসের মতো হবে। ইঁদুর-কিচকিচ শুনে প্রথমটা খুব অভক্তি হয়, এখন সয়ে গেছে। ঘাটে এই পড়তি দুপুরেও চানে নেমেছে জনা দুই লোক। গামছা পরা। গামছার তলা থেকে বেরিয়ে আছে খুব লোমঅলা শুকনো ডালের মতো পা। বুক জলে নেমে ওরা সামনের জল সরিয়ে সরিয়ে ডুব গালছে, কুলকুচি করছে। একজন কুলকুচির জলটা গাল ফুলিয়ে সামনে ফেলে দিল, আর একজন ফোয়ারার মতো উঁচুদিকে মুখ করে ছুড়ছে। …ওরা উঠে আসছে। ভিজে গামছা নিংড়িয়ে পরল। ভেতরে ইজের পরা। একজন কুচকুচে কালো, আরেকজন একটু কম। আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছে।

—কী খোকা ইস্কুল পালিয়েছ?

আমি চমকে উঠি। ওদের গায়ের আঁশ-আঁশ জল-চিকচিক চামড়া, কড়া বুড়ো ঘাসের মতো হাত পায়ের লোম, না কামানো নারকোল-ছোবড়ার মতো মুখ… খুব মন দিয়ে দেখছিলুম, ওরা যে আমাকে লক্ষ করতে পারে ভাবিইনি। কেন না আমি তো নিশ্চিহ্ন হয়েছিলুম। গঙ্গার জলে, ভাসমান নৌকোয়, গুটোনো জালের কুণ্ডলীতে, বটের ঝুরিতে একেবারে ঢুকে গিয়েছিলুম, আমার ফুটকির মতো দেহটার একটা দৃশ্যমান অস্তিত্ব আছে এটা একেবারে ভুলে। তাই থতমত খেয়ে যাই।

বলি— এখন গরমের ছুটি তো!

—কোথায় থাকো? বাড়িতে বকেছে?

—না তো!

ওদের বোধহয় বিশ্বাস হয় না। আমার দিকে মাঝে মাঝে চাইতে চাইতে, নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে ওরা চলে গেল। ওদের পায়ের ছাপ ধুলোবালিতে শুষে নিয়েছে।

একদিন কোচিং ক্লাসের পর পুলুকে বললুম— পুলু আরেকটু থাক তোকে একটা জিনিস শোনাব।

সবাইকার পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেলে, খাতাপত্তর মুড়ে রেখে বললুম —শোন!

—কী শুনব বল!

—বলব না। তুই শোন। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে শোন।

মিনিট দুই তিন হয়ে গেলে ও অধৈর্য হয়ে কনুই দিয়ে ঠ্যালা মারল আমাকে— কী রে, কী শুনব?

—একটা ঝিঁঝির ডাকের মতো আওয়াজ পাচ্ছিস না?

—না, আমি কোনও ঝিঁঝি টিঁঝি শুনতে পাচ্ছি না।

—আশ্চর্য! শুনতে পাচ্ছিস না? অমন পষ্ট!

—না, বেশ, ওটা কী? দিন দুপুরে ঝিঁঝি ডাকে না— না হয় ডাকলই, তো কী?

—ঝিঁঝি নয় ওটা। আমাদের সবাইকার, সারেদের, পিওনদের, ছেলেদের সবাই সারাদিন যত কথা বলে, হইচই করে সব রেকর্ড করা রয়েছে।

—কী করে বুঝলি আমাদেরই। অন্যকিছুরও তত হতে পারে!

—অন্য কিছু?

ধর ভূত!— বলেই পুলু উঠে দাঁড়াল।

—ভূত নয়— আমি জোর দিয়ে বলি, ভূত-টুত নয়— আমি হেডসারের গলা মাঝে মাঝে চিনতে পারি, অবিনাশবাবুর, তমোনাশদার, ফার্স্টক্লাসের বিজয়মুকুলদা আর তথাগতদা ডিবেট করছিল একদিন। আমরা বাড়ি চলে যাই, আমাদের গলা থেকে যায়।

পুলুর চোখে অস্বস্তি, বলল— তুই শুনতে চাস শোন, আমি চললুম।

দোতলায় হচ্ছিল আমাদের ক্লাস। রুম নাম্বার ইলেভেন। পুলু চলে গেল, আমি বসেই রইলুম। কান পেতে শুনছি, বোঝবার চেষ্টা করছি। ক্রমে যেন ধ্বনি পরতের পর পরত খুলে যায়, খুব পাতলা পরতগুলো, একটার সঙ্গে আরেকটা জোড়া, ক্রমেই ভেতরের পরতের দিকে যেতে থাকি। আশ্চর্য হয়ে শুনি মেয়েদের গলার আওয়াজ। ভারী, সরু, মিঠে। সরু গলার চিৎকার, ভারী গলার ধমক। সবই কিন্তু খুব আবছা। কী এগুলো? আমাদের স্কুলে ভোর সাড়ে ছটা থেকে সাড়ে দশটা মেয়েদের ক্লাস হয়। সেই আওয়াজগুলো কি এখনও রয়ে গেছে! তার মানে আজকের, গতকালের, পরশুর, অনেক বছর আগেকার ধ্বনিরাও রয়ে গেছে? রয়ে যায়?

এই সময়ে পুলু হাতে খাতা নিয়ে ফিরে আসে। ভয়-ভয় গলায় বলে— এই সমু। আমি সিঁড়ি দিয়ে নামতে পারছি না। ভয় করছে, চল, আমার সঙ্গে চল, লক্ষ্মীটি।

—ভয়? কেন?

—তুই-ই তো ওইসব ভুতুড়ে কথা বলে ভয় ধরিয়ে দিলি আমার!

এখন সাড়ে তিনটে তো বেজে গেছেই! চারদিকে ঘেরা বারান্দা, মাঝখানে উঠোন। বারান্দা দিয়ে নীচের দিকে চাই। কেমন একটা চৌকো কুয়োর মতো, তার ভেতর জলে পড়ে রয়েছে, ঝরা পাতা, খড়কুটো। যে কোনও সিঁড়িতে পৌঁছতে হলেই আমাদের খানিকটা হাঁটতে হবেই। পুলু প্রায় আমার গা ঘেঁষে চলেছে। ওর ঘামের গন্ধ পাচ্ছি। চটচটে হাত, ঠান্ডা। সিঁড়িতে পা দিয়েই চিৎকার করে ডাকল— ‘দীনবন্ধুদা— আ— আ।’ ডাকটা সঙ্গে সঙ্গে অনেক দূর চলে গিয়ে আবার ফিরে এল। ‘দীনবন্ধুদা —আ —আ—আ— আ— আ।’ শিউরে উঠল পুলু।

আমি বললুম— ও তো প্রতিধ্বনি। ভয় খাচ্ছিস কেন?

আমরা বেরিয়ে যাচ্ছি প্রায়, স্কুলের দোতলার তিনটে ঘর খোলা, সদর ফটক, কোল্যাপসিব্‌ল খোলা। কী করে যাই? পুলুকে বলি— চল, দীনবন্ধুদাকে ডেকে আনি। খুব অনিচ্ছাসত্ত্বেও পুলু আমার সঙ্গে চলে।

পেছন দিকে স্কুলবাড়ি থেকে নেমে প্লে গ্রাউন্ড। তার একদিকে ছোট্ট একটা ঘর দীনবন্ধুদার। ঘরে তালা মারা। কোথায় গেল? জানে না গেটে তালা দিতে হবে? আমরা আবার সামনে আসি। খোলা গেটের সামনের ধাপে বসে থাকি। পশ্চিমে ময়লা কাপড়ের মতো রোদ ঝুলছে বাড়িগুলোর বারান্দা, ছাত থেকে। তাপ নেই তেমন। কিন্তু ঘাম হচ্ছে, আবার যখন গঙ্গার দিক থেকে হাওয়া আসছে ঝলক ঝলক তখন ঘামের ওপর হাওয়া লেগে খুব আরাম।

পুলুর এখন ভয় অনেকটা কেটেছে। সামনে রাস্তা দিয়ে লোকজন যাতায়াত করছে। হেঁটে, সাইকেলে। রিকশা চলে গেল কয়েকটা ঠুনঠুন করতে করতে।

আজকে আর গঙ্গার ধারে যাওয়া হল না। নির্মলদা যাচ্ছিল, সাইকেল থামিয়ে বলল— কী রে। এখানে বসে?

আমরা কৈফিয়ত দেবার আগেই দীনবন্ধুদা এসে গেল। হাতে মাটির ভাঁড়, একটা কাগজের ঠোঙা, ঠোঙাটা তেলে ভিজে উঠেছে।

—কোথায় গিয়েছিলে?

—খাবে? তেলেভাজা?

—দাও— আমি, পুলু, নির্মলদাও হাত বাড়ায়, আমাদের হাতে একটা করে লম্বা লম্বা বেগুনি দেয় দীনবন্ধু। প্রত্যেকটাতে একটা করে কাঁচা লংকা সাঁটা।

—হরি ঘোষের ইষ্ট্রিট থেকে ভাজিয়ে আনলুম। কখন গেছি, তখন তোমরা ক্লাস করছ খোকা। বেজায় ভিড়।

বেগুনি মুখে দিয়েই খিদে পেয়ে গেল। পুলুকে বলি—চ’, আমাদের বাড়ি থেকে খেয়ে খেলতে যাব।

—ধুৎ, আমার খেলার মেজাজ নেই।

—কেন?

—কেমন মন খারাপ লাগছে।

—বাড়ি গিয়ে কী করবি?

—তা-ও তো! চল তোদের বাড়িই যাই। তারপরে দেখা যাক।

লুচি ভাজার গন্ধ আসছে। প্রায় পাঁচটা। এই সময়ে আমি, দাদা, বোন কয়েক মিনিট পর পর ফিরি। বোন এখন ছুটিতে বাড়িতেই আছে। এই সময়ে রোজ লুচি কিংবা পরোটা ভাজা হয়। ডালডায়। প্রতি মাসে এত এত ডালডার টিন আসে আমাদের বাড়িতে। ফুরিয়ে গেলে সেগুলো আমরা দখল করি। যত বড় হচ্ছি, ডালডার খালি টিনগুলো অবান্তর হয়ে যাচ্ছে। মার্বেল ভর্তি, সমুদ্রের ঝিনুক কড়ি ভর্তি, খুচরো পয়সা ভর্তি টিন সব। অনেক সময়ে মা আমার কাছ থেকে খুচরো পয়সা চান— দাও তো তিন টাকা, পরে দিয়ে দেব। মা সেভাবে আর কোনওদিনই ফেরত দেন না। তবে টাকাপয়সা তো আমরা মোটামুটি পাই-ই। জন্মদিনে, পয়লা বৈশাখে, দোল, রথ, সরস্বতী পুজো, দুর্গা পুজো, এ রকম অনেক উপলক্ষ আছে। লুচি ভাজার বোদা জ্বলা-জ্বলা গন্ধটা আমার ভাল লাগে না। কিন্তু খাবার সময় অত গন্ধ পাই না। আলু চচ্চড়ি দিয়ে মুড়ে খেয়ে নিই। আলু মরিচ করলে মা একটু মাখন দ্যান, সেটা খেতে আমি বেশি ভালবাসি।

সদর-দরজাটা আধ-ভেজানো, ভেতরে আমাদের উঠোনের একটা সরু রেখা দেখা যাচ্ছে। খুলি। রোদ ঢুকে যায়, একেবারে পড়তি বেলার ঝিমঝিমে রোদ। উঠোনে ঢুকেই কিছু দূরে একটা পেয়ারা গাছ, এটা আমাদের বাসনমাজার লোক মঙ্গলা পুঁতেছিল। চকচকে মচমচে গাঢ় সবুজ হালকা সবুজ পাতা নিয়ে সুন্দর দাঁড়িয়ে থাকে গাছটা। পেয়ারা গাছের পেছনে লোকজনেদের কলঘর। বেশ বড় একটা চত্বর জুড়ে জায়গাটা। বড় চৌবাচ্চা, ভেতরে কল বাইরেও কল। কাপড় মেলার জায়গা আছে। পায়খানা ডানদিকে। আমি দেখেছি। ওটা রোজ পরিষ্কার করান দাদু। লোকজন যে-ই ব্যবহার করুক, কিন্তু তবু আমার ঘেন্না করে। কী রকম একটা কৌতূহলও হয়, মাঝে মাঝে মুখ বাড়িয়ে দেখি— একটু পুরনো রঙের সাদা প্যান। দুটো ধাপি, পাশেই কল, কলের তলায় একটা এত বড় পেতলের গাড়ু বসানো থাকত আগে। সেটা চুরি হয়ে যাবার পর এখন একটা মরচে-ধরা টিনের মগ থাকে। আমার মনে হয়, এই জায়গাটুকু একটা ভিন্ন দেশ, অচেনা, অজানা, পুকুরের মধ্যেকার কুয়োর উল্টো দিকের দেশের মতো। কখনও কখনও জলভর্তি চৌবাচ্চাটার ধারে দাঁড়াই। ভেতর বাড়ির কলঘরে এত বড় চৌবাচ্চা নেই। দাঁড়ালে জলের মধ্যে আমার ছায়া পড়ে।

—তুমি এখানে থাকো? জলের মধ্যে? —কেমন ঝাপসা চুল, ঝাপসা চোখ মুখ ছেলেটার। টুপটাপ করে পেয়ারা পাতা খসে পড়ে, সামান্য একটু চিড় খায় জল, ছায়া ভেঙে ভেঙে যায়। ও আমার কথার জবাব দেবে না। লুকিয়ে পড়ল। ওকে ধরতাই দিল পেয়ারা গাছ, হাওয়া, হাওয়ার ভেতর মিশে থাকা ধুলো, আলো, ছায়া। জানি ওটা আমারই ছায়া। কিন্তু জলের মধ্যে সে যেন অন্য কেউ। চেনা আবার অচেনা। ছায়া মানুষ। আর এক জীবন, অন্য ধরনের। সে আমাকে কিছুতেই ধরা-ছোঁয়া দেবে না।

লুচি দিয়ে কুমড়োর ছোঁকা খেয়ে আমরা লুডো খেলতে বসি। আমি, পুলু আর বোন, প্রত্যেকবার কী কৌশলে বোন জিতে যায়, বেস্ট অব থ্রি, বেস্ট অব ফাইভ, বেস্ট অব সেভেন…তাতেও। নিজের ঘুঁটি হোমে উঠিয়ে ও বলে—তোরা খেলা শেষ কর। আমি চট করে ঘুরে আসছি। —ঘুরে আসছি মানে ও পুতুলদের কাপড় পাল্টাবে। ছোট বড় কাঠ মাটি কাচ গাদা পুতুল ওর। সেগুলো নিয়ে খেলে। নাইলন ডল সাজিয়ে রেখে দেয়।

ও আমার চেয়ে বেশ ছোট। আমি যেমন শান্ত, চুপচাপ, ও তেমন দস্যি। মুখে খই ফুটছে। বাবার খুব আদুরে ও। একমাত্র ওকেই বাবা কখনও বকেন না। দাদা এখন কলেজে, তবু দাদা মাঝেমধ্যে বাবার খারাপ মেজাজের আঁচ পায়। আমি তো পাই-ই। তবে আমি পারতপক্ষে বাবার ত্রিসীমায় যাই না, বকা-ঝকা খাওয়ার মতো কিছু তো করিও না। তবুও কোনও কারণে মেজাজ খারাপ হলেই বাবা গর্জন করে আমাকে আর মাকে বকেন।

—কী খেতে দাও ছেলেটাকে? এত রোগা? এত কালো? নিজেও যেমন হচ্ছ, এ ছেলেটাকেও তেমন করছ। অ্যাই সমু কোনওদিনও যেন আর না শুনি যে তুমি দুধ খাওনি। ট্যাং ট্যাং করে রাস্তায় ঘুরতে দেখি না যেন।

বাবা কী করে আমায় রাস্তায় ঘুরতে দেখবেন? ফেরেন তো রাত নটার আগে নয়। তখন আমার খেলাধুলো, পড়াশোনা, খাওয়াদাওয়া সব শেষ। তখন আমি কোনও বই বা পত্রিকা পড়ছি। আর দুধ? দুধ যে কবে শেষ খেয়েছি আমি মনে করতেই পারি না। দুধ দেখলে আমার বমি আসে। মা, দিদারা এমনকী দাদু পর্যন্ত এই কঠিন সত্যটা মেনে নিয়েছেন যে আমাকে দুধ বা ছানা খাওয়ানো যাবে না। আর বাবা সে খবরই রাখেন না! বাবাকে আমি খুব এড়িয়ে চলি। যত বড় হচ্ছি তত ভয়বোধটা চলে যাচ্ছে, তার জায়গা নিচ্ছে বিরক্তি। দাদার সঙ্গে তো ক্রমে বাবার কোনও কথাবার্তাই থাকছে না। দাদা, আমি, ফিনকি সবাই একসঙ্গে খেয়ে নিই। তখন বাবা কোথায়? জুতোর মচমচ শব্দ শুনলেই দাদা শেষ গরসটুকু হাপুস-হুপুস করে খেয়ে নিয়ে, বা পাতে ফেলে রেখে উঠে পড়ে, চৌকাঠ পেরিয়ে পগারপার। নিজের থালাটা পর্যন্ত দাদা উঠোনে কলের নীচে নামিয়ে রেখে যায়। আর আমি? মা যদি ‘তোমার বাবা’… দিয়ে কোনও কথা শুরু করেন, আমি বলি—আহ্‌—ছাড়ো তো।

দাদু বাবাকে খোকা বলেন, খুব সমীহ করেন, কিন্তু দাদুর মতামত, আমাদের সঙ্গে ব্যবহার বাবার একেবারে বিপরীত। দাদু আমাদের এগিয়ে দ্যান, সাহস দ্যান, বাবা বাগড়া দ্যান। বয় স্কাউট-এ ভর্তি হব, বাবা বললেন—না। দাদু বললেন—ডিসিপ্লিনের শিক্ষা হবে খোকা ও ভর্তি হোক।

—বাবলুর বেলায় তো বলনি?

—বাবলু চায়নি। যে যেটা ভালবাসে, আপনি করে।

—তবে ও বয় স্কাউটে যাবেই!

—আমি তো সেটাই উচিত মনে করি।

বাবা শব্দ করে চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখেন। ভীষণ জলদ গলায় হাঁকতে হাঁকতে চলে যান ওপরে—আমি আজ সাড়ে আটটায় ভাত খেতে নামব। তরকারি যেন কাঁচা না থাকে।

মা মাথায় আধ-ঘোমটা দিয়ে দাদুর ঘরে ঢোকেন।

—কী হল, বাবা?

—সমু বয় স্কাউট করতে চাইছে।

—পছন্দ নয়?

—না।

—কেন?

—পছন্দ নয়, পছন্দ নয়। খোকার অপছন্দের কি কোনও মাথামুণ্ডু থাকে বউমা! দেখো গতকাল হয়তো আপিসে হিসেব মেলেনি।

মাসের শেষে হিসেব মেলাটা ছিল বাবার প্রতি মাসের ক্রাইসিস। ওই সময়টা বাবা একেবারে অন্যমনস্ক এবং তিরিক্ষি হয়ে থাকতেন। আসল কথা, বিদ্যা, ঝোঁক, মেজাজ সব ধরতে গেলে বাবার হওয়া উচিত ছিল অধ্যাপক। কিন্তু হতে হয়েছিল হেড-আপিসের বড়বাবু। ছোটবাবু থেকে শুরু করে আমাদের যখন ভালমতো জ্ঞান হয়েছে তখন বড়বাবু। ওই কাজ করতে ওঁর ভাল লাগত না। এদিকে নিজের পায়ে কুড়ুলটি তো নিজেই মেরেছেন। তার ওপর ষোলো আনার জায়গায় তাঁর কাজে নিষ্ঠা ছিল ষোলো আনা, ভয় আঠারো আনা। টাকাপয়সা নিয়ে কারবার! কাজেই ক্রাইসিস, মেজাজ খারাপ।

বাবাকে স্বাভাবিক সাবধানতায় এড়িয়ে চলতুম। আর এই সময়টা একেবারে ধারেকাছে থাকতুম না। সেবার হল কি রাত্তিরে ফিরেই বাবা হাঁকডাক শুরু করে দিয়েছেন।

দাদুকে বলছেন—কত বার বলেছি তুমি রাতে আমার জন্যে অপেক্ষা করবে না। বুড়োমানুষ ঠিক সময়ে খাওয়া ঘুম চাই, কিছুতেই কথা শুনবে না?

দাদু—আমি যদি বুড়ো মানুষ হই তো তুই কী! আমার তো মনে হয় তুই-ই বুড়োমানুষ। বাহাত্তুরে ধরলে তখন মানুষ খামোখা এমন অশান্তি করে। কী হল তোর? আবার হিসেব মেলেনি!

—আর বোলো না, কে যে ভুলটা করে বসে আছে এখনও ধরতেই পারিনি।

—মাথা ঠান্ডা করে, টেন্‌স্ না হয়ে দ্যাখ ভাল করে। ঠিক বেরোবে।

-বলছ?

—বলছি। না বেরোবে তো যাবে কোথায়?

—কালই বেরোবে তো? তোমার মনটা কী বলছে?

—কালই বেরোবে।

—দেখি। তোমার কথা তো সচরাচর মিথ্যে হয় না। একটু ঠান্ডা হলেন এইভাবে, তারপরই—বাবলা, বাবলা কোথায়?

বাবলা মানে আমার দাদা।

—তার খোঁজে তোর কী দরকার? দাদু বলে উঠলেন।

—সারাদিনের পর বাড়ি ফিরে নিজের সন্তান-সন্ততির খবর নিতে পারব না! বা বাবা বা!

মা মাথার ঘোমটাটা একবার তোলবার ভঙ্গি করলেন, ধীর গলায় বললেন, বাবলা খেয়েদেয়ে এখন পড়াশোনা করছে।

—এত রাত্তির অব্দি? চোখ-ফোক খারাপ হয়ে গেলে?

দাদু বললেন—এখন মোটে সাড়ে ন’টা, বাড়ি ফেরবার পক্ষে দেরি কিন্তু বি. এসসি-র পড়া করবার পক্ষে দেরি নয়। তুই যা, হাত পা ধুয়ে খেতে বোস গে।

সে সময়ে আমরা মেঝেতে খেতুম। ছোট কিন্তু খুব পরিষ্কার সবুজ মেঝের ঘরখানা। গরমকালে খুব শীতল থাকত। শতরঞ্চির চৌকো চৌকো আসন পাতা থাকত। সোজা উল্টো বোঝবার জন্যে মেজদিদা আসনের এক পিঠে একটা চিহ্ন দিয়ে রাখতেন। সেলাইয়ের ফোঁড় তুলে খানিকটা গিঁট পাকানো। যদি কোনওদিন ভুলক্রমে উল্টো দিকটা ওপরের পিঠে পড়ত তো বাবার বিরক্তি দেখতে হয়! তার ওপরে আবার লুচি ফোলেনি। বেগুনভাজা ভেতরশক্ত, মাংসের ঝোলটা কেন জলের মতো… একটার পর একটা বাবা খুঁত ধরতে থাকতেন। রাঁধুনি কাঠ হয়ে যেত। শেষে দাদু ডাক পাড়তেন ফিনকি! ফিনকি! ফিনকি আমার বোনের নাম। ও তখন ঘুমে ঢুলছে। আমি ওকে বেশ করে নাড়া দিয়ে বলতুম—শুনতে পাচ্ছিস না! দাদু ডাকছেন, একবার নীচে গিয়ে দ্যাখ।

মুঠো দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে কোঁকড়া ঝাঁকড়া চুল দুলিয়ে নোদলগোদল করে নেমে যেত ফিনকি—বাঁব্‌বাঃ, এঁকটুখানি ইতিহাঁস পঁড়ছিলুম। তোমরা আমাকে একটু পঁড়তেও দিলে না। পঁরীক্ষাতে খাঁরাপ হঁলে বলতে পারবে না কিন্তু। খালি কাঁজ আর কাঁজ আর কাঁজ… এইভাবে গজ গজ করতে করতে নেমে যেত ফিনকি। আর তার মিষ্টি গলার পাকা পাকা কথা শুনতে শুনতেই বাবা ক্রমে অট্টহাস্যে ফেটে পড়তেন।

দাদু ফিনকিকে ডেকে দিয়েই ঘটনায় ইতি টেনে দিতে পেরেছেন জেনে এবার শুতে চলে যেতেন। এবার উনি বই পড়বেন। বিছানায় শুয়ে শুয়ে পড়তে পড়তে যে-ই ঘুমে চোখ বুজে আসবে, অমনি বেড সুইচটা টিপে অফ্‌ করে দিয়ে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়বেন। পরদিন ভোর চারটে সাড়ে চারটেয় উঠে ছোটখাটো ব্যায়াম করবেন, চান করবেন। বেলপোড়া আর কাঁঠালিকলা খাবেন। তারপর গীতা কিংবা মহাভারত কিংবা ভাগবত একটা কিছু পড়বেন।

এদিকে ফিনকি খাবার ঘরে ঢুকে বলবে—একটু শান্তি করে পঁড়তেও তুমি আমাকে দেবে না বাঁবা। উঃ! কী চিৎকার, কী চিৎকার, ঠিক যেন বাঁড়িতে ডাঁকাত পড়েছে।

বাবা হাসতে হাসতে বলবেন—তা তুই যে ডাকাতদলনী আছিস! ভয়টা কী! এই নে একটা লুচি খা তো এখন!

—আমরা বিকেলে লুচি খেয়েছি বাবা, আর খাব না। রাত্তিরে মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খাই। আমার পেটটা ঠাসা।

—একটা খা না! ওগো, ফিনিকে একটা লুচি আলুভাজা দিয়ে দাও তো!

—ও পারবে না, অসুখ করবে— মায়ের জবাব।

—অসুখ করবে? না, থাক তবে…

তারপর বাবার প্রবল উৎসাহে গল্প শুরু হয়ে যাবে। একটু পরে ফিনকি ঢুলতে ঢুলতে ওখানেই ঘুমিয়ে পড়বে। বাবা বলবেন জোছনায় ফিনিক ফুটেছে।

আঁচিয়ে টাঁচিয়ে কোলে করে ফিনকিকে নিয়ে ওপরে উঠবেন বাবা, মায়ের বিছানায় শুইয়ে দেবেন আস্তে।

আমি এই পুরো সময়টা, দাদার টেবিলে-চেয়ারে বসে গল্পের বই পড়তুম। রবিনসন ক্রুসো, মাস্টারম্যান রেডি, টোয়েন্টি থাউজ্যান্ড লিগস আন্ডার দা সি। এই সব। আমার চারপাশ ঘিরে জল, অরণ্য কিংবা আকাশ। মাঝে মাঝে নীচ থেকে হাসি, কথার টুকরো ওপরে উঠে আসছে, যেন মহাকাশে একটা স্যাটেলাইট চলে গেল। সমুদ্রে একটা ভেলা, কোথায় ভেসে চলে যাচ্ছে, সমুদ্র যেমন তেমনই। আমার সমুদ্র আকাশ অরণ্যে কখনও চিড় ধরে না। হঠাৎ দাদা বলে ওঠে— কী রে সমু, কখন থেকে ডাকছি শুনতে পাচ্ছিস না?

তবে কি দাদা অনেকক্ষণ ধরেই ডাকছে? আমি শুনতে পাইনি তো!

দাদা বলে— এই ডায়াগ্রামটা আমায় করে দে তো! আমি ততক্ষণ চ্যাপটারটা শেষ করে নিই। লেবেলিং করতে হবে না, আমি করে নেব।

ডায়াগ্রামটা কিছুক্ষণ উল্টেপাল্টে দেখি। তারপরে সেট স্কোয়্যার, কম্পাস, রুলার দিয়ে এঁকে ফেলি।

—বাঃ তুই এগুলো এত চমৎকার আঁকিস, তুই আর্কিটেকচার নিয়ে পড়িস, বুঝলি? এত গল্পের বই পড়িস কেন?

—পড়ব না? পড়লে কী হয়!

—পড়বি না বলিনি। এত পড়াটা ঠিক নয়। মগজটা অলস হয়ে যাবে।

—গেলে?

—গেলে আর কী! ডিফিকাল্ট কিছু ধরতে পারবি না, ধৈর্য চলে যাবে।

আমি বইটা উল্টে রেখে দিই।

সত্যি কথা বলতে কি আমার অসুবিধে হয় না। নানান রকম ভাবনা-চিন্তা বই-টই সত্ত্বেও লেখাপড়ার ব্যাপারটা আমার ভালই আসে। হাতের লেখা ভাল। ছোট্ট করে গুছিয়ে সব লিখে দিতে পারি। অঙ্ক বেশির ভাগই ঠিক হয়। আশি নব্বুই কক্ষনও পাই না। সব সারই বলেন, তুমি বড় কম লেখো সমুদ্র, সুন্দর স্পষ্ট উত্তর, কিন্তু বড্ড ছোট্ট। এ কথার মানে কী আমি বুঝি না। যেটার ব্যাখ্যা চাওয়া হচ্ছে সেটা তো পরিষ্কার বুঝিয়ে দিতে পেরেছি। তবে? এর চেয়ে বেশি বলতে লিখতে আমার ভাল লাগে না। তাতে ফার্স্ট সেকেন্ড না হলুম তো না-ই হলুম।

দাদা বলল— তুই কেন এত নির্জীব রে? ভাল করে খাস না, না কি!

সত্যি কথাই, আমার খাওয়া একটু কম। ঠাকুমারা এ নিয়ে অনেক বকাবকি করেছেন। মা বলেন ওর পেটের খোল যদি ছোট হয় তো ও কী করবে বড়মা?

—খেলাধুলো করো না? —দাদু জিজ্ঞেস করেন।

—খেলি তো!

—কী, কী?

—ফুটবল না। কিন্তু ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন তো প্রায়ই খেলি।

দাদা বলল— একটু এক্সারসাইজ কর দেখি। স্বাস্থ্যটা ভাল হবে। রোজ রোজ এই কালো রোগা স্বাস্থ্য স্বাস্থ্য শুনতে শুনতে বিরক্ত লাগে।

তখন আমি সত্যিই ব্যায়াম করতে আরম্ভ করি। গোরাদাদেরই একটা ক্লাব আছে। সেখানে খালি হাতে ব্যায়াম, যোগাসন, বার্বেল, ডাম্বেল মুগুর এসব নিয়ে সব রকমেরই শেখায়। আমি বললুম— গোরাদা, আমার যাতে চেহারাটা বেশ তাগড়াই হয়, খাওয়া বাড়ে তেমন কিছু শেখান তো!

—যাতে খাওয়া বাড়ে? কে বলেছে? এই মাগ্‌গি গণ্ডার দিনে? গোরাদা হাসতে লাগল।

—সব্বাই, আমিও হেসে বলি।

ভাল করে দেখে শুনে গোরাদা বলল— তুই দু’চারটে ফ্রি হ্যান্ড কর, তারপর তোকে যোগ-ব্যায়াম শেখাব। দেখবি চমৎকার চেহারা হয়ে যাবে।

সত্যিই কিন্তু আমি যখন হায়ার সেকেন্ডারিতে কলেজে ভর্তি হই তখন আমার খুব চমৎকার স্বাস্থ্য! আয়নায় নিজেকে দেখতে নিজেরই গর্ব হয়। ঠিক যাকে বলে পেশিবহুল দেহ তা নয়। কিন্তু দৈর্ঘ্যের অনুপাতে ঠিকঠাক চওড়া, পেশি দিয়ে সুন্দর ভাবে ঢাকা কাঠামোখানা, তার ওপরে মাছি পিছলোনো চকচকে চামড়া। এখন আর কণ্ঠা জেগে নেই। চোখের কোল বসা নয়, আঙুলগুলো খ্যাংরা ঝাঁটার কাঠির মতো নয়। আমার অখণ্ড মনোযোগের ক্ষমতা পরীক্ষার খুব কাজে লেগেছে। বাড়িতে সবাই খুশি। আমাকে নিয়ে আর তেমন সমস্যা নেই।

সমস্যা অবশ্য আগেও ছিল না। কিন্তু আমি অত রোগা-টোগা বলে, খাওয়া-দাওয়া তেমন করে করতুম না বলে, আর লোকের সঙ্গে মিশতে পারতুম না বলে বোধহয় ভাবনা ছিল, মা আর দাদুর মধ্যে এ নিয়ে নিশ্চয় কথা হত। কেন না একদিন দাদুই কথাটা বলেছিলেন— যাক সমুভাই, এখন তোমার স্বাস্থ্যটা আর ভাবাচ্ছে না।

—ভাবাচ্ছিল বুঝি? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি।

—হ্যাঁ তা তো খানিকটা বটেই। স্বাস্থ্য ভাল না হলে মানুষ ঠিকঠাক জীবন উপভোগ করতে পারে না। আর উপভোগ না হলেই মনমরা হয়ে থাকে।

—আমি কি মনমরা থাকতুম, দাদু? কই, আমি জানি না তো!

—জান না? নিজে অনেক সময়ে বুঝতে পারা যায় না।

তখন আমার ইলেভ্‌ন্‌ থেকে টুয়েলভে ওঠার পরীক্ষা এসে গেছে। প্রিপারেশনের ছুটি চলছে। পরীক্ষার জন্যে আমার আলাদা করে পড়ার দরকার হত না। তাই সারা বছরের রুটিনই চলত। কিন্তু তাতে তো সবার মন উঠত না। দাদাই তো ধমক মারত। একগাদা প্রবলেম দিত সল্‌ভ্‌ করতে। বেশির ভাগই পারতুম। কয়েকটা হয়তো পারলুম না। দাদা বলত— দেখছিস তো? প্র্যাকটিস চাই। ভাল রকম অনুশীলন।

বাবা নিজের ভুল হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলেন বলেই থেকে থেকে বলছিলেন পড়াশুনো ঠিকঠাক হচ্ছে তো? দেখো ফাঁকি দিয়ো না, পস্তাবে।

মায়েরও খুব টেনশন হচ্ছে ভেতরে ভেতরে, বোঝা যেত। একটু বেশি করে মাছ দিলেন হয়তো, খেতে আপত্তি করলে বলতেন— মাছ খেলে মগজ পরিষ্কার হয় সমু।

সেই সময়ে একদিন দাদু একটু সকাল-সকাল বাড়ি ফিরলেন। মুখটা গম্ভীর। হাত-মুখ ধুয়ে বাড়ির ঢোলা পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি পরলেন। আমিও তখন সবে বাড়ি ঢুকেছি। দাদু বললেন— সমু ভাই, তোমার একটু সময় হবে?

—হ্যাঁ, কেন হবে না? —আমি বসে পড়ি।

দাদু অনেকক্ষণ ধরে আমাকে দেখতে থাকেন। যেন জরিপ করে নিচ্ছেন কিন্তু একটু অন্যমনে। আমি ধৈর্য ধরে বসে থাকি। হঠাৎ দাদু কথা বলেন।

—সাম হাউ আমার মনে হয়, তুমি একটু আলগা, মানে বাড়ির সঙ্গে তোমার সম্পর্কর কথা বলছি।

আমি চুপ করে থাকি।

—শুধু বাড়ি কেন, সমু, পুরো সংসারটার সঙ্গেই যেন তোমার কোনও ঘনিষ্ঠতা নেই। ঠিক কি না?

এটা সরাসরি প্রশ্ন। জবাব দিতেই হয়।

—কেন এ কথা বলছ? আমি তো আজকাল বাজার পর্যন্ত করি। ফিনকিকে পড়া দেখিয়ে দিই, আমি ভাবতে থাকি তারপর বলি, আর ধরো হঠাৎ ডাক্তার ডাকতে হলে, ওষুধ কিনতে হলে… বাড়িতে কেউ এলে মিষ্টি-টিষ্টি কিনতে হলে…।

দাদু বললেন— সেটাই তো ভাবাচ্ছে। এমন নয় যে তুমি দায়িত্বশীল নও, কিছু করতে বললে সেটা তুমি পালনও কর। আমি জানি, তোমার বয়সে একটু বাইরের টান বেশি হয়। বন্ধু-বান্ধব। কিন্তু এটা আজকের ব্যাপার নয় সমু। ছোট্ট থেকেই তোমাকে এমনই দেখছি। পুলু ছাড়া কোনও বন্ধুকেও তো আসতে দেখি না। বন্ধু হয়নি তোমার? কলেজে, ক্লাবে?

—হ্যাঁ, অনেক তো!

—না, না, আমি জাস্ট পরিচিত সমবয়সিদের কথা বলছি না। বন্ধু, যার সঙ্গে তোমার কোনও বন্ড আছে, যাকে তুমি সব কথা বলতে পার।

আমি চুপ করে থাকি। ভেবে দেখতে গেলে সত্যিই তেমন প্রাণের বন্ধু কেউই নেই আমার। অথচ কতজনের সঙ্গে আলাপ-পরিচয়। ক্লাবে ব্যায়ামের পর খালি গায়ে তোয়ালে কাঁধে যখন বসে থাকি, কত গুলতানি হয়, আমি তো থাকি, মাঝে মধ্যে ফোড়নও দিই।

—অখিলদা আজকাল খুব ডাঁটে থাকে… দেখেছিস? মোটরবাইকটা কেনার পর থেকে… কেউ হয়তো বলল।

—এবার পেছনে কোমর জড়িয়ে বসার কেউ এলে তো আর দেখতে হচ্ছে না, কী বল সমু? বিনুনি উড়বে, আঁচল উড়বে। পথ যদি না শেষ হয়… আরেকজন।

আমি হাসি।

—এবার জুনিয়র সেকশনে বান্ধব-সমিতির একটা ছেলে নিখিল ভারত যোগকুমার হয়েছে… কী নাম রে ছেলেটার? …আমি বলি।

—সঙ্কর্ষণ বোধহয়…

—গোরাদার ক্ষমতা নেই ওরকম একটা বার করে, কী বল সমু? একজন মন্তব্য করে।

—কেন? আমরা তো বেশ ভালই আছি!

—এতদিন শরীর-চর্চা করছি, একটা অ্যাম্বিশন থাকবে না?

—আমার তো এটাই অ্যাম্বিশন ছিল। ভাল স্বাস্থ্য, সত্যিই আজকাল সব সময়ে বেশ ফ্রেশ লাগে। —আমি বলি।

কলেজের আড্ডা আবার অন্য রকম। বেশির ভাগ ছেলেই মেয়েদের নিয়ে আলোচনা করে।

—প্রীতি খুব স্মার্ট, কী রকম গটমট করে যায়, টকাটক উত্তর দেয়!

—মুখটা ভ্যাঁটকা। সুইট হল রীনা…মুখার্জি না মিত্র রে?

—কেন তাতে কী দরকার? পদবি মিলিয়ে প্রেম করবে গুরু? কী বলে সেই? পাল্টি ঘর?

—যাঃ, প্রেম-ফ্রেম কে করতে চাইছে?

—পেটে খিদে, মুখে লাজ, বাবা! আছ হোস্টেলে, চুটিয়ে যা করবার করে নাও এই বেলা।

মেয়েদের বিষয়ে আমার যে খুব একটা শুচিবাই আছে তা কিন্তু নয়। আমিও দেখি—প্রীতিকে। ওর স্মার্টনেস আমার ভাল লাগে। রীনা সত্যি সুন্দর। এত সুন্দর হাসে। এ ছাড়াও আছে রত্নাবলী, নন্দিতা, সুমিতা। সুমিতা খুব ভাল ছাত্রী, চোখে হাই-পাওয়ারের চশমা, ও খুব পড়ুয়া টাইপ। কারও দিকে বড় একটা মন দেয় না। রত্নাবলী ধনী লোকের মেয়ে, গাড়িতে আসে যায়, গা থেকে ভুরভুরে সেন্টের গন্ধ বেরোয়, একেক দিন একেক রকম শাড়ি। নন্দিতা কালো, রোগা, গম্ভীর। মনে হয় ও অম্বলের অসুখে ভুগছে। এ ছাড়াও অনেক আছে— অর্ণব, সুকান্ত, চঞ্চল, আদি, প্রণব… অনেক, অনে-ক।

আমি গ্যালারির সর্বোচ্চ বেঞ্চে বসে ওদের কালো কালো মাথা দেখি, একটা স্থির কালো নদী যেন। বাবরিতে, বিনুনিতে, কদম ছাঁটে, বব-চুলে বয়ে বয়ে চলেছে। ক্লাস শেষে নদীতে ঢেউ ওঠে, ভেঙে ভেঙে যায় সব।

পুলক বলে—কী রে, যাবি না!

যেন ঘুম ভেঙে উঠি—অ্যাঁ? হ্যাঁ! চল।

দাদু আবার বলেন— বন্ধু না থাকাটা একটু…

আমি বলি—বন্ধু নেই, তা নয়, আছে। তবে মনের কথা বলার মতো… তা ছাড়া মনের আবার আলাদা করে কথাই বা কী! কোনও কথা নেই তো!

—তুমি যে সেই বাড়ির স্বপ্নের কথা বলতে! জানলাহীন বাড়ি। বট অশ্বথত্থ গজিয়েছে… দেওয়াল থেকে।

আমি চমকে উঠি। আগের রাতেই দেখেছি। ঘরের পরে ঘর, তারপরে আরও ঘর, ভগ্নস্তূপ। দেওয়াল আঁকড়ে আছে শেকড়-বাকড়। চুন বালি খসা দেওয়াল…

—দেখি, মাঝে মাঝে।

—শোনো, প্রায়ই যখন দ্যাখো ও স্বপ্নের কোনও একটা মানে আছে।

আমার একটু আগ্রহ হয়। আমিও নিশ্চিত স্বপ্নটার কোনও মানে আছে। কিন্তু সেটা কী ধরনের মানে তা আমি বুঝতে পারি না। যেভাবে বলা হয় ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয়। ভবিষ্যতের ছবি দেখা যায়। সাপের স্বপ্ন মানে বংশবৃদ্ধি। এইভাবে কী? আমি জানি না, কিন্তু জানতে চাই। নিজে নিজে বুঝতে পারলেই সবচেয়ে ভাল।

—তুমি কি কবিতা লেখ?— দাদু জিজ্ঞেস করেন।

—না, না, —আমি খুব প্রতিবাদ করে উঠি।

—কেন সমু, কবিতা লেখা তো খারাপ কিছু নয়? তোমাদের বয়সে তোমাদের বাবাও অনেক কবিতা লিখেছে। সে স্টেজটা স্থায়ী হয়নি। যাদের স্থায়ী হয় তারাই কবি হয়।

—আমি কবিতা লিখি না দাদু, কিন্তু আমার প্রতিদিন কত কী মনে হয়!

—শোনো সমু, সেই মনে-হওয়াগুলো অনর্থক মনের মধ্যে না রেখে একটা ডায়েরি-টায়েরিতে লিখে ফেল। তুমি…তুমি বোধহয় তোমার বয়সের তুলনায় বেশি ম্যাচিওর, হয়তো সেই জন্যেই সমবয়সিদের মধ্যে বন্ধু পাও না। যেটুকু কথা বলো সে এই বুড়ো মানুষটার সঙ্গে, কেমন?

দাদুর কথা শুনে আমি হাসি।

—আজকে তোমাকে কয়েকটা দরকারি কথা বলতে ডেকেছি ভাই।

—বলো!

দাদু বললেন— কীভাবে বলব…তুমি কী এসব শোনবার মতো বড় হয়েছ? জানি না। সমু আমাদের আয়টা অনেক কমে যেতে চলেছে। আমি এবার অবসর নেব ভাবছি।

আমি শুনছি চুপচাপ।

দাদু থেমে থেমে বলতে লাগলেন— পালিতসাহেব মারা যাবার আগে একটা উইল করে গেছেন বলে শুনেছিলুম। উনি নিজেই আমাকে নিশ্চিন্ত থাকতে বলেছিলেন। যতদিন চাকরি করব, ততদিন। তো ধরো স্যালারি ড্র করবই, তা ছাড়াও… কিছু পার্কস… ধরো টেলিফোন, ইলেকট্রিসিটি, গাড়ি উইথ শফার, পেট্রল, বাইরে বেড়াতে যাবার খরচ, বাড়িতে কোনও উৎসব-টুৎসব হলেও উনি আমাকে সওগাত পাঠাতেন। …ধরো তোমার বাবা-মা’র বিয়েটা বা তোমাদের অন্নপ্রাশন আমি খুব ঘটা করে দিতে পেরেছিলুম… কেন না অনেকগুলো খাতে খরচ পালিতসাহেবই করেছিলেন। কিন্তু কেউ জানে না তোমায় বলছি সমু, উনি আমাকে আমার যোগ্য মাইনে দিতেন না। জমিদারি যাবার পর ওঁরা টাকাপয়সা লাগান কোলিয়ারিতে। চা-বাগানে। লসে চলছিল। আমি আসার পর ওঁরা ফুলে ফেঁপে ওঠেন, বহু স্থাবর সম্পত্তি, ঘোড়া এ সমস্ত আমার উদ্যোগেই হয়েছে। কুর্গ ভ্যালির চা-বাগান আমারই প্ল্যান। তা ছাড়া রেসহর্স। এই সব সম্পত্তির চার ভাগের তিন ভাগই আমার করা। উনি বলতেন গাড়িটা তুমি অবসর নেওয়ার পরও পাবে। ওটা তোমারই। ম্যান্ডেভিলার বাড়িটা তোমায় দিয়ে যাব, কিছু ভাল শেয়ার, পেনশন তো থাকবেই। পালিতসাহেব তো হঠাৎই মারা গেলেন। উইল পড়ে দেখা যাচ্ছে, ওসব কিছুই উনি আমাকে দ্যাননি। শুধু হাজার টাকা পেনশন……আমার ধারণা জুনিয়র পালিতেরও কিছু কারসাজি আছে এতে। ও কোনওদিন আমাকে তেমন…। আসলে ওর বাবা আমাকে বেশি বিশ্বাস করতেন তো! …এখন কিছুকাল ওর আন্ডারে কাজ করলুম। সুবিধে হচ্ছে না। সংসারের কথা ভেবে… আর বোধহয় চালানো ঠিক হবে না। মানীর মান রাখতে জানে না। কী? ঠিক করছি তো? বয়সও আমার অনেক হল। অন্য চাকরি করলে কবে রিটায়ার করে যেতুম।

—হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। যেখানে মান থাকবে না… দাদু এত বৈষয়িক কথা আমাকে বলছেন! আমাকে!

—এগজ্যাক্টলি। যেখানে আমিই হর্তা-কর্তা ছিলুম সেখানে পদে পদে—বিসাইডস ও ছেলেটা ভাল তৈরি হয়নি, বুঝলে? এ সম্পত্তি ও রাখতে পারবে না। তখন খুব কষ্ট পাব, তিল তিল করে গড়া একটা সাম্রাজ্য তো… তবে তোমার বাবার সঙ্গেও কথা বলেছি… সে-ও একই কথা বলেছে। সে সব ঠিক আছে। আমার কথাটা হল, স্টেটাস, আয় সবই কমে যাবে। তোমরা এখনও কেউ তৈরি হওনি… তোমাদের ওপর এর প্রভাব অনেকটাই.. তোমরা যদি বলো তো আরও কিছুদিন…।

—না, না, দাদু। আমাদের জন্যে… অসম্ভব। তা ছাড়া আমি তো গাড়িও চড়ি না, টেলিফোনও তত ব্যবহার করি না। ছোটবেলায় অবশ্য তোমার সঙ্গে অনেক বেড়িয়েছি।

—জানি। তুমি বললে শুনে ভাল লাগল। তোমার দাদার… কিন্তু মত অন্য রকম।

—অন্য রকম?

—হ্যাঁ, ও খুব ক্ষুব্ধ মনে হল। এম. এসসি ফাইন্যাল ইয়ার ওর, কী করবে না করবে …আমি যেটা বলছিলুম সমু, তুমি যদি হায়ার সেকেন্ডারিটা পাশ করে এঞ্জিনিয়ারিং পড়ো, তা হলে চট করে দাঁড়িয়ে যাবে। আমি জানি তোমার সাহিত্য-দর্শন এ সবের দিকে ঝোঁক। তাই-ই… একটু…

—কে বললে? না তো! সাহিত্য পড়তে আমার ভাল লাগে। ফিলসফিক্যাল থটস নিয়ে পড়তেও ভাল লাগে…। কিন্তু ঠিক আছে আমি চেষ্টা করব এঞ্জিনিয়ারিংই পড়তে।

—থ্যাংকিউ, আমার একটা ভাবনা গেল। তোমার দাদা আমাকে কেস করবার কথা বলছিল।

—কীসের কেস!

—ওই যে উইলটা! আমাকে এক রকম বলেছিলেন, আরেক রকম বার হল! কনটেস্ট করতে বলছিল। এ বিষয়ে তোমার কী মত?

—মুখে বলেছিলেন, সেটা উইলে সত্যিই লিখেছিলেন কিনা… শিওর না হয়ে তো… আমি অবশ্য এ সব ব্যাপারে…।

—সেটাও একটা কথা, তা ছাড়া পালিতসাহেব খুব কৃপণও ছিলেন। একটু মীন মাইন্ডেড যাকে বলে। কাজ করিয়ে নিয়ে পরে হাঁকিয়ে দেওয়া ওর চরিত্রে ছিল। আনপ্রেডিক্টেবল। আমার উচিত ছিল সোঁদা কথায় না ভিজে স্যালারিটা বাড়িয়ে নেওয়া। লোকের জন্য এত বিষয়সম্পত্তি করলুম অথচ নিজের বেলায়… ঠকে… ঠকেই তো গেলুম। ইমপ্র্যাকটিক্যাল!

দাদু মাথা নিচু করে বসে রইলেন। এরকম পরাজিত রূপ তাঁর কখনও দেখিনি। এভাবে নিজের কর্মক্ষেত্র, বিষয়সম্পত্তি, মালিকের সম্পর্কে কথা তাঁকে বলতেও শুনিনি। অদ্ভুত মানুষ, আমাদের কাছেও উনি এক রকম জবাবদিহি করছেন, পরামর্শ চাইছেন।

আমার দাদুর জন্য কেমন কষ্ট হল। কেমন একটা ধূসর কষ্ট। তীক্ষ্ণ নয়। সমস্ত মনটাতে যেন শীতের সন্ধে নামল। ইনি এত সচ্ছল ছিলেন যে এঁর ছেলে রাজকুমার আখ্যা পায়। ইনি গাড়ি চড়ে চলাফেরা করতেন। সাহেব-সুবোর মতো ধরনধারণ। এখন কী অপমানজনক ভাবে ইনি বঞ্চিত হয়েছেন। ঠকে গেছেন। দাদুর সঙ্গে আমার সুখ-দুঃখ যে অনেকটাই গাঁটছড়া বাঁধা ছিল সেদিনই স্পষ্ট বুঝেছিলুম। এবং হয়তো সেই দিন থেকেই আমরা প্রকৃত বন্ধু হলুম। সতেরো আর সাতাত্তর।


রাত আর বেশি নেই। আকাশ ময়লাটে, ঘোলাটে, হঠাৎ কদিন একটু বৃষ্টিবাদলও হচ্ছে। সময়টা বর্ষাই। পাখির ডাকে ঘুম ভাঙল। উঠোনের পেয়ারা গাছ, পাশের বাড়ির মিনারের মতো চিলেকুঠুরির ওপর ফ্ল্যাগ-স্টাফ। দু তিন বাড়ির মাঝখানে লেবু, বেল, নিম গাছ। এই জায়গাগুলো সবই পাখিদের আর প্রজাপতিদের প্রিয়। এখন ওই পাশের বাড়ির ফ্ল্যাগ-স্টাফের ওপর বসে ছোট্ট কালো পাখি শিস দিচ্ছে। দোয়েল বোধহয়। অনেকক্ষণ ধরে শিস দিচ্ছে দোয়েলটা। আমিও শুয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করে শুনছি। আমার প্রিয় পাখি কাক একটা জানলার পাটে বসে ঘাড় বেঁকিয়ে ডাকল ক্বঃ। একদম সকালে ওদের গলা কী রকম আধো আধো থাকে। বাচ্চার মতো। বৃষ্টি-ভেজা হাওয়া ঢুকল এক ঝলক। আমার মনে হল ঠিক এই রকম দোয়েল এবং কাক, এই রকম ভেজা হাওয়া, ঠিক এই রকম ভোরের বিছানা আমার জীবনে আরও আরও অনেক বার এসেছে। ভোরের একটা কী রকম স্পর্শ তো থাকেই, কীরকম একটা গন্ধও। সেই গন্ধটা পাবার জন্য আমি বুক ভরে প্রশ্বাস নিই। ঠিক এই রকম কোথায়? কবে? এবং এই অনুভূতিটাও যে আমার এরকম আগেও হয়েছিল, কোথায়? কবে? ঠিক এই রকম। এ ঠিক গতানুগতিক মনে হওয়া নয়।

আজ থেকে আমি হস্টেলে চলে যাচ্ছি। কাল থেকেই মায়ের মুখ একটু শুকনো হয়ে আছে। ফিনকি কান্নাকাটি করছে। দাদা গত মাসেই অধ্যাপনার চাকরি নিয়ে দিল্লি চলে গেল। দাদু বলছিলেন— দিল্লির খরচ-খরচা বেশি বউমা। আজ ও হস্টেলে জায়গা পেয়েছে। হয়তো চিরকাল পাবে না, তারপর…ধরো চোখের আড়ালে চলে গেল, মানসিকতার পরিবর্তন হবে। তুমি ওর থেকে বেশি কিছু আশা কোরো না।।

মা ম্লানমুখে বললেন—সে যদি বলেন বাবা, আমি আপনি ছাড়া কারও কাছেই কিছু আশা করি না।

ঠিক এই সময়টাতেই আমি ঢুকলুম।

—মা আমি আমার জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়েছি। কালো প্যান্টটা কোথায় বলতে পার?

—ওটা ডাইংক্লিনিংএ দিয়েছি। পরের বার এসে নিয়ে যেয়ো। আর কী কী দরকার মনে করো। শেষে…

দাদু বললেন—একটা লিস্ট করেছ কী? বইপত্তর, জামাকাপড়, মিসেলেনিয়াস?

—করেছি। তবে আমি তো সব জিনিস একসঙ্গে নিয়ে যাব না। যদি দেখি ওখানে কাপড়-জামা কাচতে বেশি খরচ, কি বেশি সময় লাগছে, তো সপ্তাহে সপ্তাহে বাড়িতে দিয়ে যাব।

মা একটু উজ্জ্বল মুখে আমার দিকে চাইলেন। বললেন, প্রতি সপ্তাহে আসতে পারবে তো?

—পারতেই হবে। ফিনকিকে কথা দিয়েছি, রবিবার রবিবার ওকে পড়িয়ে দেব। আর দু’বছর পরেই তো…

আমি ফিনকির কথাটাই বললুম। কিন্তু আসলে আমি পুরো বাড়িটার কথাই ভাবছিলুম। দাদুর কথা, মায়ের কথা। যদিও তার কোনও বহিঃপ্রকাশ ছিল না। আমাদের পরিবারের সবাই-ই খুব শান্ত এবং চাপা, বাবা আর ফিনকি ছাড়া। বাবা অনর্গল কথা বলেন, অনর্গল রাগারাগি করেন, সামান্য কারণেই চেঁচামেচি, পাঁচজনের মুণ্ডপাত। আর ফিনকি সর্বক্ষণ কলকল করে। কোথায় ওর নতুন বন্ধু অদ্ভুত নামের প্রিসিলা। সে নাকি একেবারে মেমসাহেব, একমাত্র মনীষা অর্থাৎ আমাদের ফিনকিকে ছাড়া কাউকে পাত্তা দেয় না। ওদের প্রিন্সিপ্যাল কত রাগী, বাংলার টিচার বানান ভুল করেন। হিস্ট্রির টিচারকে ওরা কত ভালবাসে, পড়ান মোটামুটি কিন্তু চমৎকার চমৎকার শাড়ি পরেন, খুব গ্ল্যামার। গ্ল্যামারই, ঠিক সুন্দর নয়। সে যদি বলো সায়েন্সের বল্লী নায়ার খুব মিষ্টি। কালোর ওপর এত সুন্দর যে…।

এত কথা, প্রতিদিনের খুঁটিনাটি, তা ছাড়া মনের কথা প্রাণের কথা ফিনকি মোটের ওপর সবাইকেই বলে। দাদু থেকে শুরু করে আমি পর্যন্ত। দাদাকে ও একগাদা ফরমাশ করেছে। গালার চুড়িবালা, সালোয়ার কামিজ এবং দিল্লির চটি।

দাদা ভুরু কুঁচকে মিটিমিটি হেসে বলেছিল—মনে হচ্ছে আমার কলেজের পাশেই তোর গালা না ফালার দোকান, চটিগুলো বোধহয় গেটের কাছেই ফুটপাথে বসে।

—ওসব জানি না—মাথা ঝাঁকিয়েছিল ফিনকি—আমি কাগজের ওপর আমার পায়ের মাপ ভাল্লো করে এঁকে দিয়েছি। চটি ভীষণ সস্তা ওখানে, লাল সবুজ সব রকম দেখে এনো ঠিক।

দাদার দিল্লি যাওয়াটা ওর কাছে বেশ একটা আনন্দের ব্যাপার। দিল্লি একটা সব পেয়েছির দেশ— ওর কাছে। সে সব সরবরাহ করবার জন্যেই দাদা যাচ্ছে, চাকরি-টাকরি গৌণ। কিন্তু আমি হস্টেলে যাচ্ছি শুনে ওর ঠোঁট ফুলতে লাগল।

—তুই না দেখলে আমি পাশ করব কী করে?

বাড়িতে একমাত্র ফিনকির সঙ্গেই আমি অনেক সময় কাটাই। সব বিষয়ে পড়াশোনার জন্য ও আমার ওপর নির্ভর করে। ওকে আর মাকে আমিই আত্মীয় বাড়ি, সিনেমা ইত্যাদি নিয়ে যাই।

বলি—এই তো এইখানে শিবপুর, প্রতি সপ্তাহে আসব, ভাবনা কী?

—ঠিক আসবি তো?

—ঠিক। না হলে তুই পাশ করবি কী করে?—দুজনেই হাসি।

এই রকম একটা ভূমিকা তৈরি হয় আমার হস্টেল-যাত্রাকে ঘিরে। বড় একটা স্যুটকেস মা দিয়েছেন। বোধহয় মায়ের বিয়ের সময়কার। ভাল চামড়ার। ভেতরে বিছানার চাদর, বালিশের ওয়াড় থেকে যে বইগুলো আপাতত কিনতে পেরেছি সেগুলো, দাদুর দেওয়া ডায়েরিটা পর্যন্ত সবই আছে। মা গুছিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আমি জানি মায়ের বহু কাজ, সময় বার করা খুব শক্ত। ফিনকি একটু আধটু সাহায্য করেছে। ব্যাস।

কিন্তু মা ও কথাটা বললেন কেন?— তা যদি বলেন বাবা, আমি আপনাকে ছাড়া কারও কাছেই কিছু আশা করি না।

এই প্রথম বাড়ির কারও কথা আমার মনে ঢেউ তুলল। সত্যিই, মায়ের কথা আমরা কে কতটুকু ভাবি? দাদা আর আমি নিজেদের নিয়ে থাকি। বাবাও এক রকমের তাই। আমরা নিঃশব্দ বাবা সশব্দ এইটুকু তফাত। আদুরে বোনটাও মায়ের চেয়ে বাবার কাছেই ঘেঁষে বেশি। বাকি তো থেকে যাচ্ছেন দাদুই। দিদারা দুই বৃদ্ধা, জপতপ, পুজো-অর্চনা নিয়ে থাকেন। তাঁদের প্রয়োজনগুলো মাকেই মেটাতে হয়। মটকার কাপড় পরে পুজোর জোগাড় করে দেওয়া, নিরামিষ রান্না উনুন পেড়ে করে দেওয়া। আমাদের রাঁধুনি মেয়েটি বামুন নয়। তার হাতে ওঁরা খান না। আমাদের এমনিতেই তিন চার রকম রান্না হয়, দিদারা পুরো নিরামিষ, দাদুর হাই ব্লাডপ্রেশার, নুন চলে না, বাবা মশলাদার রান্না ছাড়া খেতে পারেন না, আমরা তিন ভাই বোন মোটামুটি অল্প মশলা পছন্দ করি, কিন্তু কেউ এ ডাল খায় না, কেউ ও ডাল খায় না, কারও কাঠি আলুভাজা চাই, কারও গোল, মায়ের ঠিক কী পছন্দ, শেষ পর্যন্ত মা কী খান, জানি না। জানবার কথা আগে মনেও হয়নি। ইদানীং দাদু নিজের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের কথা আলোচনা করার পর থেকে একটু-আধটু লক্ষ করি। তারপর থেকে আমি রাত্তিরে মাছ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। বাজার আমিই করি। মা মাংস আনতে বললেও একদিনের বেশি আনতুম না। বলতুম—যাঃ ভুলে গেছি। সপ্তাহে অন্তত তিনদিন মাংস না হলে বাবা বড্ড চ্যাঁচামেচি করতেন। বকুনিটা খেতেন মা। সেদিন অমনই চুপচাপ বকুনি খাচ্ছিলেন। আমি নীচে নেমে গেলুম। খাবার ঘরে ঢুকে বললুম— মা আনতে বলেছিলেন, আমিই ভুলে গেছি। একটু চুপ করে বললুম, জিনিসপত্রের দাম খুব। ওই টাকায় কুলোতে পারি না। আমি চাকরি করি, তখন তোমাকে রোজ মাংস খাওয়াবো…।

বাবা আমার ইঙ্গিতগুলো বুঝেছিলেন মনে হয়। চুপ করে গেলেন। বাবা বোধহয় আমাদের অর্থাৎ দাদাকে ও আমাকে কিঞ্চিৎ ভয় করতেও শুরু করেছিলেন। আমরা তাঁকে যতটা, তিনি আমাদের তারও বেশি।

মা ইদানীং খুব রোগা হয়ে যাচ্ছিলেন। আমার কেমন মনে হচ্ছিল আমাদের ঠিক আগের মতো খাওয়াতে গিয়ে মা নিজের খাওয়া-দাওয়া কমাচ্ছেন। এমনিতেও তেমন যত্ন-আত্তি করতেন না। নিজেকে নিজে যত্ন করতে মায়েরা চিরকাল লজ্জা পেয়ে এসেছেন। তখন পরীক্ষা শেষের ছুটি চলছিল, একদিন দুপুরে সন্তর্পণে নীচে নেমে গেলুম, খাবার ঘরের দরজা দিয়ে উঁকি মেরে দেখি মা এক থালা ভাত খাচ্ছেন, সুদ্ধু ভাত, একটু গলা-গলা, দুটো কাঁচা লঙ্কা, দুটো পেঁয়াজ, একটু কাঁচা সর্ষের তেল ঢেলে নিলেন।

আমাকে মা দেখতে পাননি। চুপচাপ ওপরে চলে এলুম। পর দিন খাবার সময়ে বললুম—মা, আমার একটা জিনিস খেতে ইচ্ছে করছে, দেবে? মা একটু সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলেন, মুখটাতে কালি নামছে, ছেলে কী চাইছে, তিনি দিতে পারবেন কি না। আমি বললুম— দুটো কাঁচা লঙ্কা, দুটো কাঁচা পেঁয়াজ যদি থাকে, আর একটু কাঁচা সর্ষের তেল।

মা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলেন। কিন্তু আমাদের মধ্যে এমন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল না যে আমি মাকে খাওয়া-দাওয়া নিয়ে বকাবকি করি বা মা তা নিয়ে আর কিছু বলেন।—যা দিচ্ছি এখন খাও তো! পাকামি করতে হবে না-গোছের। মাছ খাওয়াও আমি ছেড়ে দিলুম। বললুম— ওয়াক ওঠে।

এরপর দাদু একদিন খাওয়ার পরে ডাকলেন— সমু। তুমি আজকাল মাছ খাচ্ছ না। ওয়াক ওঠে তোমার মা বলছিলেন। এ তো মুশকিলের কথা, ডাক্তার দেখাতে হয়, জনডিস-টিস হল না কি? তুমি না কি সর্ষের তেল দিয়ে ভাত মেখে কাঁচা লঙ্কা পেঁয়াজ দিয়ে খাচ্ছ!

আমি বললুম— গরিব লোকেরা তো এ রকমই খায় দাদু।

দাদু বললেন— তুমি অনর্থক আমার অবস্থাটাকে বড্ড বেশি খারাপ মনে করছ ভাই, এতটা দরিদ্র হইনি যে তোমাকে পেঁয়াজ লংকা দিয়ে ভাত খেতে হবে। ওসব কথা তোমাকে বলা বোধহয় আমার ঠিক হয়নি।

আমি বললুম— মা’র রেগুলার এই-ই ডায়েট আজকাল, যতদিন মা খাবেন আমিও ওই-ই খাব। আমার কোনও অসুবিধে নেই।

দাদুর মাথা ঝুলে গেল। কোনও কারণে খুব দুঃখ পেলে, লজ্জা পেলে দাদুর এটাই ছিল ভঙ্গি।

আমি বারবার ফেল করছি— উনি বললেন— তোমার মা সারাদিন শরীর পাত করে আমাদের সেবা করছেন। আমি ওঁর কোনও খোঁজ রাখিনি, ছিঃ! তুমি আমায় মাফ করো সমু।

মাকে উনি কী বলেছিলেন জানি না, পরদিন মা দুপুর দুটোর সময়ে আমাকে ডাকলেন। নীচে নামতে বললেন— কী খাচ্ছি দেখে যাও সমু। এই দ্যাখো আমার ডাল, মাছ, তরকারি। আশা করি কাল থেকে আর আমায় জ্বালাবে না।

—আমি তো রোজ রোজ ইন্‌স্‌পেকশনে আসতে পারব না!

—আচ্ছা, আমি তোমায় কথা দিচ্ছি।

—আশা করি, তোমার মিথ্যে কথা বলার অভ্যেস নেই।

মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, তারপর আমার চোখে চোখ রেখে বললেন— না।

—মা আমি কিন্তু তোমাকে বিশ্বাস করছি।


বাড়ির জীবন নিস্তরঙ্গ নিরাপদ। হস্টেল যে তা হয় না, হতে পারে না সেখানে যে প্রতিপদে বুদ্ধি খাটিয়ে চলতে হবে এ সব কথা আমি ভাবিনি। জানতুমই না। পুলু একবার যেন বলেছিল, আমি খেয়াল করিনি। বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে আসবার পরের দিনই সেকেন্ড ইয়ার থার্ড ইয়ারের কিছু দাদা আমাকে ডেকে পাঠাল। কী নাকি ভীষণ দরকার আছে।

কথাবার্তা হল খুব অদ্ভুত। ওদের প্রশ্ন আর আমার উত্তর। কোনওটার জন্যেই আমি প্রস্তুত ছিলুম না।

—এই তোর ফ্যামিলি স্ট্রাকচার কী রে?

—যেমন হয়। মা-বাবা-ভাই-বোন-দাদু-ঠাকুমা-দাদা-বউদি ভাইপো-ভাইঝি-মেজদা-মেজবউদি-সেজদা-সেজবউদি-জ্যাঠা-জেঠি-কাকা-কাকিমা-জেঠতুতো-ভাই-বোন-দাদা-বউদি-খুড়তুতো।

—মারব এক থাবড়া, ইয়ার্কি হচ্ছে আমাদের সঙ্গে? তোর জ্ঞাতিগুষ্টির কথা কে জানতে চেয়েছে? তুই যে বাড়িতে থাকিস সেইখানে।

আমি অবাক হয়ে বলি— সেই বাড়ির কথাই তো বলছি!

—এত বড় জয়েন্ট ফ্যামিলি তোদের?

—ইয়েস।

—তোরা কটা ভাই কটা বোন?

—বড়দা-মেজদা-সেজদা-ন’দা-ক’নেদা-নতুনদা-রাঙাদা-ফুলদা…

—বাস বাস বুঝতে পেরেছি। এতগুলো কি তোর নিজের মায়ের পেট থেকে বেরিয়েছে?

—কেউ কেউ জেঠিমা কাকিমাদেরও, তবে আমরা এইভাবেই নিজেদের কাউন্ট করি।

—বোন ক’টা, সাফ বলবি?

—এই অচিন্ত্য এক্ষুনি নামতা পড়বে রে। অন্য কোয়েশ্চন কর?

—সবচেয়ে সুন্দর বোন কোনটা!

—আমার নিজের ছোট বোন।

—চিয়ার্স চিয়ার্স হিপ হিপ হুররে। বোনটার সঙ্গে শুতে দিবি? ক’জনের সঙ্গে দিবি সেটাও ঠিক করে নে, রাইট?

—গ্ল্যাডলি। হিসি করবে, কাঁথা পাল্টাতে যতজন থাকে ততই ভাল, একজনের ওপর চাপটা বেশি পড়ে যাবে।

—রাম রাম, কত বয়স তোর বোনটার?

—মাস পাঁচেক হবে।

—বাপ রে, দাদা এঞ্জিনিয়ার হতে এয়েছে। বোন পাঁচ মাস? তোর বাবা-মা তো এখনও দিব্যি চালু রে! বয়স কত তোর মায়ের?

—মা? …আমি চোখ কপালে তুলে একটু ভাবি— ঠিকঠাক বলতে পারছি কিনা জানি না। চৌত্রিশ পঁয়ত্রিশ হবে বোধহয়।

—ইয়ার্কি পেয়েছিস? মাত্র সতেরো বছরের বড় তোর থেকে?

নিস্পাপ মুখ করে আমি বলি— কেন, সতেরো বছরে বুঝি ছেলে হয় না?

অ্যাকশন— আড়াল থেকে কে বলল।

অমনি আমাকে চ্যাংদোলা করে তুলে নিল ক’জন। তারপর কয়েকবার দুলিয়ে ছুড়ে দিল। আর কয়েকজন আমাকে লুফে নিল।

মাথাটা ঝুলে পড়ল। আমি অজ্ঞান হয়ে গেছি। মুখটা অল্প হাঁ, আস্তে আস্তে নিশ্বাস পড়ছে।

পুলুর গলা শুনতে পেলুম—সর্বনাশ। ওর যে হার্টের একটু গোল.. আছে। শিগগির ডাক্তার ডাকুন।

—এই খবর্দার। ঢপ অনেক দেখেছি, হেল্‌থ এগজামিন হয়নি? হার্টের গোল! এই কাতুকুতু দে তো রে!

যে কোনও কারণেই হোক, আমার কাতুকুতু লাগে না। মাথা একদিকে নেতিয়ে গেছে। চার হাত পা ছেতরে মড়ার মতো পড়ে আছি।

—জল ঢাল মাথায় জল ঢাল।

পুলু বলল সাবধানে ঢালবেন। নাকে মুখে ঢুকে গেলে চোক করে যাবে। দাঁড়ান আমি দেখছি—সমুদ্র, এই সমুদ্র। চোখ মেলে দ্যাখ আমি পুলু রে। আর আমাদের সেকেন্ড ইয়ারের দাদারা। —সারা মাথা ভিজে, শার্টের ভেতর দিয়ে জল গলে যাচ্ছে, আমি বেশ পাঁচ মিনিট পরে চোখ একটু খুলি….

—আরেকটু হলে খুনের দায়ে পড়ে যাচ্ছিলেন ইশ্‌শ্‌… পুলু বলল,— আমাকে যা করার কালকে করবেন। আজ ওকে নার্স করতে হবে। একজন কেউ কাইন্ডলি ডাক্তার ডেকে আনুন।

—এত রাতে ডাক্তার কোথায় পাব! মালকে ঘরে নিয়ে যা।

কয়েকজন কাঁধে পিঠে করে আমাকে বয়ে নিয়ে গেল। পুলু জামা-কাপড় পাল্টে দিল, পাজামা সুদ্ধু।

ঘর নিশ্চয় ফাঁকা হয়ে গেছে। কেন না পুলু বলল— এই সমু এবার চোখ খোল। তুই যে এত ভাল অ্যাক্টিং করতে পারিস আমি জানতুম না।

কথাগুলো ক্ষীণভাবে আমার কানে এল। যেমন আরও কিছু-কিছু কথাও আমি শুনতে পেয়েছিলুম। আমি কিন্তু সত্যিই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলুম। একটা ঝাঁকুনি, তারপরে আর কিছু মনে নেই। অন্ধকার। একটা বিশাল পরিত্যক্ত বাড়ি। ঘরদোর হাঁ হাঁ করছে। অন্ধকারের মধ্যে থেকে কয়েকটা দূরবর্তী স্বর, তারপরে জল থাবড়া পড়তে আস্তে আস্তে আবার ঘরটা ভেসে উঠল চোখের সামনে। দূরে জানলা, বাইরে অন্ধকার, গাছপালার মধ্যে দিয়ে একফালি চাঁদের আধখানা। চতুর্দিকে ঝিঁঝি ডাকছে। খুব আর্তস্বরে কে কী বলছে, কারা কী সব বলছে, আর্ত গলা, কড়া গলা, আর্ত, কড়া, কড়া, আর্ত।

—তুই কথা বলতে পারছিস না কেন? কী রে সমু?

—আমি বোধহয় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলুম পুলু— আমি খুব কষ্ট করে বলি।

—বলিস কী রে! কাল সকাল হলেই দাদুকে ফোন করব। কী কাণ্ড!

আমি বলি— সকালের কথা পরে। এখন শোন চুপ করে। কিছুক্ষণ চুপ করে শুনল পুলু। তারপর বলল— কী শুনব, কিছু তো শুনতে পাচ্ছি না!

—অনেক গলা, কাঁদছে, অনুনয় করছে, অন্য পক্ষ ধমক দিচ্ছে, গালাগালি দিচ্ছে, কত কত দিন এই ঘরে কত ছেলেদের ওপর অত্যাচার হয়েছে, ঘরটা সব রেকর্ড করে রেখেছে।

—তুই একটা পাগল!

আমি হাসি। দেখাই যাচ্ছে আমার শোনা সবাই শুনতে পায় না, আমার দেখা সবাই দেখতে পায় না। সুতরাং আমি পাগল। আমি পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ি।

ঘুম ভাঙতে দেখি ঘর রোদে ভেসে যাচ্ছে, সুপার দাঁড়িয়ে, তাঁর পাশে স্টেথো হাতে ডাক্তার। বললেন— নিশ্বাস নাও জোরে জোরে।

পরীক্ষা শেষ হলে বললেন— এর কয়েকটা পরীক্ষা করাতে হবে। আমি লিখে দিচ্ছি। তোমার আগে কখনও এমন হয়েছে?

আমি মাথা নাড়ি। না।

—স্বাস্থ্য তো চমৎকার।

আমি চেয়ে আছি।

উনি বললেন— এর বাড়িতে খবর দিন। ইনভেস্টিগেশনগুলো করিয়ে নিতে হবে।

আমি এবার আস্তে বলি— বাড়িতে খবর দেবেন না। ওঁদের ডিস্টার্ব করার দরকার নেই।

—তার মানে? বিনা চিকিৎসায়…?

—হ্যাঁ। আমার তাতে কোনও অসুবিধে নেই। অচিন্ত্যদা, সুব্রতদাদের জন্যে যখন হয়েছে… হস্টেলের ঘরে, তখন হস্টেলেরই দায়িত্ব…। আমার বাড়ির অবস্থা ভাল নয়। এসব ঝামেলা পোয়াবার ক্ষমতা নেই।

সুপার বললেন— এগুলো তো আমাদের করবার কথা নয়। এমার্জেন্সি হলে আলাদা কথা।

—মানুষ ছোড়াছুড়িটা তা হলে আপনাদের করবার কথা, কিন্তু তার ফলগুলোর দায়িত্ব নেবার কথা নয়। আমি ক্ষীণ গলায়, কোনও রাগ ছাড়া শান্ত ভাবে বলি।

ডাক্তার বললেন— সিচ্যুয়েশন এ রকম হলে আমি আপনাদের হায়ার অথরিটিকে জানাব। তাতেও কাজ না হলে পুলিশ। ইন এনি কেস— এ ছেলেটির যদি কোনও ইনজুরি হয়ে থাকে, তাতেও প্রসিডিওরটা একই থেকে যাচ্ছে। এর বাড়িতে জানালেও…

সুপার বললেন— তোমরা সবাই চাঁদা তুলে ফেলো, দ্যাখা যাক কী হয়। সুব্রত অধিকারীর চোখে ভয়ের ছায়া দেখে আমি আবার চোখ বুজলুম।

নিজের সম্পর্কে এই কথাগুলো আমার জানা ছিল না। সম্মিলিত আক্রমণের বিরুদ্ধে আমার মন যে আপনাআপনি এরকম একটা নীতি ঠিক করে নিতে পারে, শরীর তাতে সাহায্যও করে,—এটা নতুন খবর। খবরটাকে আমি শান্ত ভাবে হজম করি। পুলু অনেকবার বলে তোর বাড়িতে জানাই। আমি না করি। একজন বৃদ্ধ, একজন ভিতু, আর একজন অনুপস্থিত, এই তো আমার বাড়ির সত্যিকার স্ট্রাকচার। নিজেই যতটা পারি নিজেকে দেখব। চিরকালই সম্ভবত এমনটাই করে এসেছি। এখনও না করার কোনও কারণ নেই।

ইনভেস্টিগেশনে অবশ্য তেমন কিছু বার হল না। স্নায়বিক ব্যাপার— ডাক্তার বললেন। নিউরোলজিস্ট দেখাতে বললেন। আমার নিউরোলজিস্ট দেখাবার সময় নেই।

সুব্রতদা বলল— দেখিয়ে নে সমু, আমরা টাকা দিচ্ছি। সত্যি যদি কোনও গণ্ডগোল হয়ে যায় তা হলে বাড়ির লোকেদের জানা দরকার।

আমি রাজি হইনি।

সত্যি কথা বলতে কি সুব্রত অ্যান্ড কোং যখন আমাকে অকথ্য অশ্লীল কথাগুলো বলছিল, আমার কিচ্ছু মনে হয়নি। কথার পিঠে শুধু কথা সাজিয়ে দিয়েছিলুম। মিথ্যার পিঠে মিথ্যা। শারীরিক আক্রমণটা যতটা লেগেছিল মানসিক আক্রমণটা তার দশ শতাংশও না। অথচ এসব কথা আমি কখনও শুনিনি। আর হস্টেলে আসবার আগে কেউ আমাকে সাবধানও করেনি। কিন্তু আমার অসুবিধে হয়নি। কার কথা ওরা বলছে— মা, বাবা, ভাই, বোন… কতগুলো শব্দ শুধু। তার পেছনে যদি অনুভূতি ও আবেগ থাকে তা হলেই শব্দগুলো অর্থপূর্ণ। নাহলে তো নয়। সুব্রতদাদের মুখে ওই শব্দগুলো শুধু শব্দই ছিল। প্রাণহীন অর্থহীন শব্দ। পরে যখন পুলু বলল— ‘সমু তোর রাগ হয়নি? আমাকে ও রকম বললে আমি তো লাফিয়ে পড়ে ওদের আঁচড়ে কামড়ে দিতুম…’ আমি বললুম— না রে কিচ্ছু মনে হল না। যে মুহূর্তে ওরা দল বেঁধে ঘরে ঢুকল আমার মনে হল একদল ছায়া মানুষ ঢুকল, যারা কিছু না কিছু অত্যাচার করে যাবে, আমার লাগবে না, কেন না সবটারই ভিত্তি মিথ্যে। মিথ্যেটাকে মিথ্যে দিয়ে আটকাতে তাই আমার অসুবিধে হয়নি।

কিন্তু মনটা আমার আয়ত্তে হলেও শরীরটা তো নয়। ঘরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে যখন আমাকে ছুড়ে দেওয়া হল তখন একটা প্রচণ্ড ঝাঁকুনি, একটা মারাত্মক স্নায়বিক ভয়। এক্ষুনি মাটির ওপর আছড়ে পড়ব। থেঁতলে যাব। শরীরটা কুঁকড়ে ঠান্ডা হয়ে গেল, কালঘাম ছুটতে লাগল, বেগতিক বুঝে সেই কটা মুহূর্তের জন্যে শরীরটা মরে গেল। ওটা শরীরের নিজস্ব ডিফেন্স মেকানিজ্‌ম্‌।

পুলক বলল— কিন্তু তুই তো পুরো অজ্ঞানও হোসিনি। আমাদের কথাগুলো তো শুনতে পাচ্ছিলি!

—হ্যাঁ, কিন্তু কেমন যেন অনেকে দূর থেকে। খুব হালকা গলা, যেন অনেক কুয়াশা ভেদ করে আসছে দু’চার ছিটে রোদের কণা। তবে সেটা ঠিক কী, কেন ও রকম হল পুলু আমি বলতে পারব না। আমি তো ডাক্তার নই। তা ছাড়া ধর মৃত্যুর সময়ে কী হয়? চারপাশের কান্না, হাহাকার তো এমনই দূর থেকে চেতনায় এসে পৌঁছয়, তাই না?

—মৃত্যুর সময়ে কী হয় আমি কী করে জানব? পুলক অবাক হয়ে বলল, তুই-ই বা কী করে শিওর হচ্ছিস যে ও রকমই হয়?

—জানি না, কেমন মনে হল।

—তুই একটা কিম্ভূত।

পুলু বা পুলক আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। পাড়ার বন্ধু, স্কুলের আবার ক্লাবেরও বন্ধু। একদম ছোট্ট থেকে যেহেতু দু’জনে সর্বত্র একসঙ্গে একই জায়গায় যাওয়া আসা করেছি সেইজন্যেই প্রধানত ওর সঙ্গে আমার অন্তরঙ্গতা। ও যে আমাকে সব সময়ে বোঝে তা না। কিন্তু কখনও আমাকে ঠাট্টা-তামাশা করে না, বিশেষত অন্য কারও সামনে। কেমন একটা টানও ওর আছে আমার ওপর।

বয়-স্কাউটের দলে সেবার আমরা জাম্বোরিতে গেছি গিরিডি। দিন সাতেকের ক্যাম্প। খাণ্ডোলি পাহাড়ের কাছাকাছি ক্যাম্প পড়েছে। একটু দূরে তিরতির করে বইছে উশ্রী নদী। খুব সরু, জল কম। সন্ধেবেলায় ক্যাম্প ফায়ার ঘিরে প্রতিদিনই আমাদের নানা রকম আনন্দ অনুষ্ঠান হত। গান হচ্ছে আবৃত্তি হচ্ছে। সুকুমার ছিল হরবোলা। পশুপাখির ডাক তো নকল করতে পারতই। নানান মানুষের গলা অবিকল তুলে নিতে পারত নিজের গলায়। আমাদের, স্কাউট মাস্টারদের— সবার।

সেদিন ওই রকম অনুষ্ঠান হচ্ছে। কেউ করছে রবীন্দ্রসঙ্গীত, কেউ নজরুল, বেশ গরম গরম কবিতাও আবৃত্তি হচ্ছে। সুকান্ত, নজরুল। হঠাৎ আধো-অন্ধকার থেকে শম্ভুদার গলা এসে আমাকে বিঁধল—সকলেই কিছু না কিছু করছে, তুই কেন চুপ করে বসে আছিস সমুদ্র? কিছু বল! কর!

আমি কিছুই পারি না। অন্যরা যেটা করে আমার ভাল লাগে।

গানের সুরটা জানা থাকলে বা কবিতাটা মুখস্থ থাকলে গলা মেলাবার চেষ্টা করি। কিন্তু নিজে না পারি সে ভাবে গান করতে, কবিতা-টবিতা আওড়াতে, কমিক-টমিক তো আমার একেবারেই আসে না। এ-ও জানি এখানে সবাই কিছু না কিছু করতে বাধ্য। না করলে পুরো মেজাজটাই নষ্ট হয়ে যায়। তা ছাড়াও ‘আমি কিছু জানি না পারব না’ এ সব বলাও আমার কেমন ন্যাকামি মনে হত।

বিনা ভূমিকায় ছাই-পাঁশ যা মনে হল বলে গেলুম অতএব— দেখ স্কাউট ভাইরা, মালদা, বর্ধমান, বাঁকুড়া, শিলিগুড়ি, কলকাতা, হুগলি, নদিয়া আরও কত জায়গা থেকে আমরা এখানে এসে মিলেছি। আমাদের জীবনযাত্রা, পরিবার, ভাল-লাগার জিনিস, আলাদা আলাদা। দক্ষতাও সব বিষয়ে সবাইকার একরকমের নয়। কিন্তু এক জায়গায় আমরা সবাই এক। এই জাম্বোরিতে। একদিকে দেখ ওই ঝিরঝিরে নদী, আর একদিকে পাহাড় দিয়ে আমরা ঘেরা। নদী যদি শুরু হয় তো পাহাড় দাঁড়ি। মাঝের ফাঁকটায় ক্যাম্প পড়েছে আমাদের; আগুন জ্বেলেছি, হাত-পা সেঁকে নিচ্ছি শীতের রাতে, গ্রীষ্মে ওই নদীর জল যত কমই হোক ঝাঁপিয়ে স্নান করব। আমাদের সারা জীবনের যা কিছু জানা বোঝা সব আমরা অন্যদের কাছে উজাড় করে দিচ্ছি। এর পর আগুন নিবে যাবে, জাম্বোরি শেষ। সব গান কবিতা, অভিনয় সব রকমের খেলাধুলো, একসঙ্গে কাজ-কর্মের দিন, বক্তৃতা, নির্দেশ ডুবে যাবে, জেগে থাকবে শুধু পাহাড়। এসো আমরা পাহাড়ের কথা ভাবি।

কিছুক্ষণ সব চুপ। তারপর সুকুমার চেঁচিয়ে উঠল— জল ঢেলে দিলি সমুদ্র। একেবারে বালতি বালতি ঠান্ডা জল ঢেলে দিলি। তোকে কিছু করতে বলাই আমার ভুল হয়েছে। ধুস্‌।

তখন বুঝতে পারলুম শম্ভুদার গলা নকল করে সুকুমারই ফরমাশটা আমাকে করেছিল। শম্ভুদা ওখানে নেই-ই।

কিন্তু আশ্চর্যের কথা অন্য কেউ কোনও শব্দ উচ্চারণ করল না। আমরাই তখন সবচেয়ে সিনিয়র। আমাদের থেকে ছোটও অনেক ছিল। কেউ কিছু বলল না।

শুধু পুলু বলে উঠল— যার যা মনে হয়েছে করেছে, বলেছে, সমুকে বলতে বলেছিলি ও ওর মতো বলেছে। সুকুমার তুই যা করছিস সেটা ক্যাম্পের স্পিরিট নয়। চুপ করে যা।

আমিই ছিলুম শেষ বক্তা। তখনও আগুন জ্বলছে। ছোট ছোট শিখা মাঝে মাঝে হুস করে জ্বলে উঠছে। তলায় কাঠগুলোর ধিকি ধিকি দেখা যাচ্ছে, একটা ঠান্ডা হাওয়া উঠল, শিরশির করছে গা, সেই নিবন্ত আগুন মাঝখানে নিয়ে আমরা বসে আছি সব্বাই সুকুমার সুদ্ধু। যতই রাত বাড়ছে অন্ধকার আকাশের পটে আরও জমাট অন্ধকার হয়ে ফুটে উঠছে ধূম্র পাহাড়। কতক্ষণ বসেছিলুম কে জানে, শম্ভুদা বিপ্লবদারা এসে ডাকলেন। ‘খাবার রেডি। দেখি আজ কে ক’টা রুটি খেতে পারিস।’ আসলে অন্যান্য দিন রান্না ওঁদের সাহায্য নিয়ে আমরাই করতুম। আজকে ওঁরা করেছেন।

আমাদের চুপচাপ দেখে বিপ্লবদা বললেন— ‘কী রে তোরা কি মেডিটেশন করছিস?’ প্রসঙ্গত, ধ্যানও আমাদের ক্যাম্প-জীবনের একটা প্রাত্যহিক করণীয় ছিল। তবে বিপ্লবদা ক্যাম্প-জীবনে বৈচিত্র্য আনতে পুরো রুটিনটাকে একেক দিন ওলোটপালোট করে দিতেন। ধ্যান যে কখন হবে তা কেউ বলতে পারত না। একদিন সকালবেলা আমরা অনেকে মিলে ডিমসেদ্ধ, পাউরুটি টোস্ট করলুম। কয়েকজন মাখন লাগাল, কয়েকজন চা তৈরি করল। কয়েকটা শালপাতার থালায় খাবারগুলো রাখা হল রোজকার মতো, মাটির ভাঁড়ে চা, কয়েকজন মিলে একসঙ্গে গোল হয়ে বসা একটা থালায় দিস্তে দিস্তে টোস্ট, আরেকটাতে ডিম, এরকম অন্তত দশটা দল তো থাকতই।

খাওয়া শেষ? বিপ্লবদা আধঘণ্টা সময় দিয়ে হাঁকলেন— ব্যস হাত মুখ ধুয়ে সমবেত হও বৎসগণ।

আমরা এঁটো শালপাতা মাটির ভাঁড় জড়ো করে ফিরে এলুম। বিপ্লবদা বললেন— মেডিটেশন, গেট সেট গো…।

ব্যস সব্বাইকে যে যেখানে আছে পদ্মাসনে বসে পড়তে হবে। তারপর ধ্যান। চোখ বুজে। বিপ্লবদা স্টপওয়াচ দেখে ঠিক দশ মিনিট পরে মিলিটারি গলায় বলবেন— ওভার।

এইরকম।

সে রাতে কি তারা-জ্বলা, নিচাঁদ আকাশের তলায় পাহাড়ের নিশ্চলতা গাম্ভীর্য, অবশ্যম্ভাবিতা… প্রাকৃতিক বস্তুর এবং মৃত্যুর… আমরা সবাই-ই কিছুক্ষণের জন্যে অনুভব করেছিলুম? তাতে আমার উল্টোপাল্টা কথাগুলোর কি সত্যি কোনও ভূমিকা ছিল?

টেন্টগুলো ছিল ছোট ছোট। বদলে বদলে থাকতে হত আমাদের, যাতে সবাই সবাইকার সঙ্গে থাকার সুযোগ পায়। সে রাতে আমার সঙ্গে ছিল দুটি জুনিয়র ছেলে— হাফিজ আর মাইকেল। এটাও স্কাউটমাস্টারদের প্ল্যানের অন্তর্গত। নানা ধর্মের ছেলেদের পারস্পরিক মেলামেশা, যৌথ জীবন। শুয়ে শুয়ে গল্প করাটাকে খুব একটা উৎসাহ দেওয়া হত না। তবে সারাদিন খেলাধুলো, সাঁতার এবং অত রকম কাজ-কর্ম করে বিছানায় শোওয়ামাত্র আমরা ঘুমিয়েই পড়তুম। দূর থেকে বিপ্লবদার হুইসলের শিস্‌, সঙ্গে সঙ্গে পাশ ফিরে ঘুম।

হয়তো সেদিন রাত্রের রান্নাটা মাস্টারমশাইরা করায় আমাদের ক্লান্তি একটু কম ছিল, হাফিজ বলল,— সমুদা ঘুমোলে?

—না।

—মাইক্‌ল ঘুমিয়েছিস?

—উঁহু।

আমারও ঘুম আসছে না। —তারপরে কেমন কাঁপা-কাঁপা গলায় হাফিজ বলল— আমি চিতাকে ভয় পাই।

—চিতাকে আবার কে না ভয় পায়? বিশ্বের দ্রুততম হিংস্র প্রাণী। তবে এখানে চিতা-টিতা নেই। —আমি আশ্বাস দিই।

—জানোয়ার চিতার কথা বলিনি। ওই মড়া পোড়ানোর কথা বলছি।

—তোরা হঠাৎ চিতা-টিতার কথা ভাবছিস কেন?

—তুমি যে বললে পাহাড়ের কথা ভাব।

আমি চুপ করে যাই। সেই মুহূর্তের একটা নিজস্ব অনুভবের কথাই তো আমি বলেছি, সমস্ত আমোদ-আহ্লাদের মধ্যে প্রকৃতি আমাকে এমন একটা এক্স-ফ্যাক্টরের উপমা দেখিয়েছিল যেটা নাকি সনাতন।

—মৃত্যুর সঙ্গেও চিতা বা কবরের তেমন কোনও সম্পর্ক নেই। মৃত্যু একটা অজানা দিগন্ত, পাহাড় যেমন রহস্যময়, তেমনই। তাই থেকেই তুলনাটা এল। মৃতদেহের তো নানা জনে নানারকম সৎকার করে। মৃত্যু একটা অন্য অভিজ্ঞতা।

—তোমার কথা বুঝতে পারলুম না।

আমি নিজেই কি বুঝি? তাই হেসে বললুম— বুঝতে হবে না। কী করব, বলব ভেবে না পেয়ে ওই সব উল্টোপাল্টা বকেছি।

দূর থেকে হুইসল বেজে উঠল। বিপ্লবদা বোধহয় কোনও কোনও টেন্টে কথাবার্তার আওয়াজ শুনতে পেয়েছেন। তাই দ্বিতীয়বার হুইসল।

—ঘুমিয়ে পড়। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে।

পরদিন দুপুরবেলা। তখন আমরা বাসন মাজছি। বড় ছেলেরা কড়া হাঁড়ি ডেকচি এইসব নিয়ে বসেছি। ছোটরা জল ঢেলে দিচ্ছে। কেউ কেউ দূরে শালপাতা মাটির খুরি গেলাস ফেলে আসছে, সুকুমার চাপা রাগত গলায় বলল—তোকে আমি দেখে নেব সমুদ্র। বাড়ি ফিরি। তোকে আমি ছাড়ব না।

আমি অবাক।

—আমার ওপর রাগ করে আছিস এখনও? শুধু কালকের ওই কথাগুলোর জন্যে?

—আমার বাবা-মা ক’দিনের মধ্যে মারা গেছে, আমি মামার বাড়িতে থাকি তুই জানিস না? সবে ভুলতে শুরু করেছি, ক’দিন একটু আনন্দ করছি, মজায় আছি, তোর সেটা সইছে না, কেমন? মীন। মীন একটা…

—আমি সত্যি জানতুম না সুকুমার। কী করে জানব, বল।

—কোথাও থেকে জেনেছিস। বেস্ট স্কাউটের দৌড়ে আমি এগিয়ে আছি। জেনে বুঝে তুই আমাকে দমিয়ে দিতে চেষ্টা করছিস, তোর ওই চামচা পুলকটা সেকেন্ড প্লেস পাচ্ছে বলে!

এত অবাক হয়ে গেছি যে মুখ দিয়ে কথা সরছে না আমার।

বলি— আমায় বিশ্বাস কর, আমি কিছু জানতুম না। এভাবে কাউকে দমিয়ে দেওয়া যায়, তা-ও আমার ধারণায় নেই। ওটা একটা কী বলব…যে মুহূর্তে বললুম সেই মুহূর্তের ভাবনা। আমার তো তোদের মতো কোনও গুণ নেই। যা মনে হল তাই বলে ফেলেছি। তুই ওসব আজে-বাজে কথা ভাবিসনি।

সুকুমার অতবড় শক্তপোক্ত ছেলেটা হঠাৎ মুখ ঢেকে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগল।

কিছুক্ষণ কাঁদবার পর যখন একটু শান্ত হয়েছে তখন সাহস করে ওর কাঁধে একটা হাত রাখি। —সুকুমার, আমি বুঝতে পারছি। তোর কষ্টটা ঠিকঠাক বুঝতে পারছি। ভুলে যা। কালকের কথা ভুলে যা। আজ খুব দারুণ কিছু একটা করবি। আজ শেষ।

—আমি আর কিছুই করতে পারব না, সমুদ্র। আমার বাবা মা ওই পাহাড় থেকে আমায় ডাকছে। কী জোর সেই ডাকের তুই বুঝবি না। কান্না ভেজা ফুলো লাল চোখমুখ নিয়ে সুকুমার বেরিয়ে গেল।

পুলুকে জিজ্ঞেস করি—কী করব? এই ব্যাপার।

—অদ্ভুত তো! —পুলু অবাক, এরকম হয়?

আমরা দুজন পরামর্শ করে সেদিন টেন্টগুলোর পেছনে একেবারে তিরতিরে নদীটার ধারে বন ফায়ার জ্বালালুম। সারেরা বললেন— কী একটা স্পট বাছলে?

—রোজ রোজ এক জায়গায় ভাল লাগে না সার।

পাহাড়ের দিকে মুখ জায়গাটা পুরো ভর্তি। সুকুমারকে বসতে হল নদীর দিকে মুখ করে।

ক্রমশ ক্রমশ জমে উঠতে লাগল আমাদের জাম্বোরির শেষ রাত। হই-হল্লা। এক সারের বাকসো থেকে বেরোল একটা লজঝড়ে স্প্যানিশ গিটার। একজন বার করল মাউথ অরগ্যান। স্টিলের থালা আর লম্বা হাতা নিয়ে রেডি আরও একজন। নাচবে বলে কয়েকজন দাঁড়িয়ে উঠল, মুখে মুখে গান তৈরি, হাতে হাতে বাজনা… একেবারে যাকে বলে আবোল-তাবোল। বিপ্লবদা ধরলেন— হেই হেই আশিয়ানা ট্যাংগো

পুলু পরের লাইন— যত পারো করে নাও ব্যঙ্গ

সমীরদার লিডে সবাই— কেউ থামাবে না গান, কেউ থামাবে না নাচ

কেউ দিচ্ছে না রণে ভঙ্গ, ভ্যাংগো—ও-ও।

হাফিজ— হো হো আমাদের ট্যাংগো

তপন— আমাদের দেশিয়ানা ম্যাঙ্গো

সবাই— চেখে দ্যাখো সয়ে যাবে, না চাখলে বয়ে যাবে

এর নাম রঙ্গ, র‍্যাংগো…


সেই থেকে আমি সতর্ক হয়ে যাই। যে সব কথা আমার মনে হয়, তা আমারই কথা। আর কাউকে বলার নয়। বললে তার অদ্ভুত অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া হতে পারে। এমনিতেই চুপচাপ। আমি আরও চুপ হয়ে যাই। ক্লাস করি, ওয়ার্কশপ করি, ল্যাবের সময়ে ল্যাব, রাত্তির অবধি পড়ি। বটানিকসে গিয়ে গঙ্গার ধারে বেড়াই, যখন দলের সঙ্গে তখন দলের মতো। যখন একলা তখন নিজের মতো। বটানিক্যাল গার্ডেনটাই আমার ঘরবাড়ি হয়ে ওঠে এক এক সময়ে। নদী সামনে নিয়ে বসতে আমার কেমন একটা স্বস্তি হয় আসলে। হস্টেলের ঘর বড় ছোট মনে হয়। নিজেকে ছড়াতে পারি না। ফার্স্ট ইয়ারে পুরনো বাড়িতে থাকতুম। সেগুলো অনেক উঁচু ছিল। এক এক সময়ে মনে হয়, এত ছাত কেন? এত দেয়াল কেন? ওপর থেকে একটা বোমা-টোমা পড়ে যদি ছাতটা ভেঙে যায় তো বেশ হয়। ঠিক একটা পুরনো অব্যবহৃত কুয়োর মতো ছন্ন দেখতে হবে ঘরখানা! নিজের ভাবনায় নিজেই এক এক সময়ে বিরক্ত হই। এরকম ধ্বংসাত্মক ভাবনা-চিন্তা কেন আমার? এদিকে তো আমি গড়তে শিখছি। তবে এ কেমন বিপ্রতীপ আচরণ মনের?

সকলে প্রতি সপ্তাহে বাড়ি যায় না। এগুলো ওদের নানা রকম মজার সময়। কী মজা আমি জানতে চাই না। ঠারে-ঠোরে যেটুকু শুনি। বাড়ি চলে যাই, সবাই খুব স্বস্তি পান, দাদুর মুখটা আলো হয়ে যায়। আর ফিনকির তো কথাই নেই। সারা সপ্তাহ কী কী কৌতুকজনক ঘটনা ঘটল, বাবা কতবার শুধু শুধু চেঁচালেন, দাদা চিঠিতে কী লিখেছে সব তার বলা চাই। সবচেয়ে কম সময়টা সে দেয় পড়াশোনাতে যার জন্য না কি প্রতি সপ্তাহে আমার আসাটা বাধ্যতামূলক।

—কী রে ফিনকি? তোর জোমেট্রি আজ? রাইডারগুলো পেরেছিস? —শোন না— ফিনকি এক পাক নেচে নিল, —দাদা না প্রেম করছে।

—কী?

—হ্যাঁরে! বউদিটার নাম সন্তোষ, হি হি মেয়েদের এ রকম নাম শুনেছিস?

—সন্তোষ?

—তুই কী করে জানলি প্রেম?

দাদু মাকে বলছিলেন— বউমা, সাগর প্রতি চিঠিতেই এই পঞ্জাবি মেয়েটির কথা লিখছে। মনে হচ্ছে হি ইজ ইন লাভ।

—মা কী বললেন?

—কিছু বলল না। কিন্তু মা কাঁদছিল।

—কাঁদছিলেন? কেন? তুই কী করে বুঝলি?

—মা দাদুর ঘরের বাইরে এসে চোখ মুছছিল।

খবরটা নতুন। মায়ের কোনও আলাদা সুখ-দুঃখ আছে বলে আমি জানতুম না। মা যেন এক কর্তব্যপুতলি। কারও কোনও ব্যবহারেই মায়ের কোনও বিকার দেখিনি। কথা দরকারের বেশি বলতেন না। নানা জনের সেবা করতে করতে, ফরমাশ খাটতে খাটতে নিজের ছেলেমেয়েদের দেখাশোনাই মা করে উঠতে পারেননি। মায়ের অভাব আমরা তেমন করে বুঝিওনি। দুই ঠাকুমারই তখন আর একটু কম বয়স ছিল। ভাত মেখে, গল্প বলতে বলতে খাইয়ে দিচ্ছেন এরকম একটা দৃশ্য আবছা মনে পড়ে। তারপর একটু বড় হতেই তো দাদুর আওতায়। দাদার এ নিয়ে বোধহয় একটু ক্ষোভ থেকে থাকবে। মাঝে মাঝে বলত— সবাইমিলে মাকে কেটেকুটে ভাগ করে নিয়েছে। আমাদের ভাঁড়ে মা ভবানী।

যখন কোনও জিনিস খুঁজে পেত না, বিশেষ কিছু খেতে ইচ্ছে করত, কিংবা অসুখবিসুখ করত, তখন এই ক্ষোভগুলো ওর চেগে উঠত। সেবার জল-বসন্ত হল। খুব গুটি বেরিয়েছে। দাদা মশারির মধ্যে শুয়ে থাকত একা। আমাকে দাদুর ঘরে শুতে দেওয়া হত তখন। দাদার ঘরের পাশেই অবশ্য মায়ের ঘর। মাঝখানের দরজা মা রাতে খুলে রাখতেন। কিন্তু একদিন শেষ রাত্তিরে কেমন হাউমাউ করে দাদা মশারি ছিঁড়ে, ঘর থেকে দালানে এসে রাগ আর কান্না মিশিয়ে চিৎকার করতে লাগল।

—বেশ, বেশ, বাঃ, বাঃ একটা রুগ্‌ণ ছেলেকে একা ফেলে নিজেরা নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। কেমন মা, কেমন বাবা? এরা কেমন?

মা ঘুম চোখে বেরিয়ে এলেন— কী হয়েছে বাবলা?

—হ্যাঁ এখন বাবলা!— দাদা ভ্যাঙাল— চুলকোনিতে সারারাত বলে ঘুম নেই!

—আমি যে চন্দন লাগিয়ে দিলুম, নিমের পাতাসুদ্ধু ডাল দিলুম? চুলকোলেই বুলোতে হবে বলে দিলুম যে!

—ঘুমোব? না নিম বুলোব? জলপটিটাও নিজে দিয়ে নেব! থার্মোমিটারটাও নিজে নিজেই লাগিয়ে টেম্পারেচার দেখব! এবার এ ঘরে একটা স্টোভও রেখে যেয়ো, নিজের হরলিক্স-টিকসগুলো নিজেই করে নেব। চমৎকার।

বাবাও বেরিয়ে এসেছিলেন চেঁচামেচিতে!

—কী হল? জ্বর বেড়েছে, না কী?

—তোমাকে আর ওস্তাদি করতে হবে না। যাও যাও লুচি মাংস খেয়ে আড্ডা দিগে যাও। —দাদা চেঁচিয়ে উঠল।

—কী? আমাকে এত বড় কথা, এত্ত বড়! রুচি কাল থেকে আমাকে আর লুচি-মাংস দেবে না…কাল থেকে আমাকে…

দাদু উঠে এসেছেন নীচ থেকে।

—খোকা কী হচ্ছে? ছেলেটা অসুস্থ।

দাদা আবার হাইমাই করে উঠল— আমার মাথার কাছে রোজ পেতনি দাঁড়িয়ে থাকে জানো? আজকে গলা টিপে ধরবে বলে হাত বাড়িয়েছিল।

মা বললেন— ঠিক আছে, আজ থেকে আমি তোমার ঘরে থাকব, ব্যস আর কান্নাকাটি কোরো না।

দাদু বললেন,— এই রোগে এটা একটা খুব কমন হ্যালুসিনেশন বাবুভাই। মাথার কাছে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। যারা জানে না তারা বলে মা শীতলা।

তা যেন হল। কিন্তু আমার যেটা খারাপ লাগল মা সারাদিন ঠিক তেমনই উদয়াস্ত খেটে সারা রাত দাদার পাশে বসে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন, ছটফট করলে জল। সারাদিন তো সবকিছু করছেনই, সাবান, অ্যান্টিসেপটিক কাপড় পাল্টানো। কেউ নেই বলবার যে এটা একটু অতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছে। শেষ কালে আমি বলি— দাদু, আমিই দাদার ঘরে থাকব।

দাদু আকাশ থেকে পড়লেন— তুমি? তুমি সেবার কী জান? এইটুকু ছেলে?

—এত মা কেমন করে পারবেন? সারা দিন…তারপর সারা রাত…

দাদু অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন—তুমি ঠিকই বলেছ। আমরা তোমার মায়ের কাছ থেকে বড্ড বেশি ডিমান্ড করি। আমি, আমিই বরং বাবুর কাছে থাকব।

—তুমি?

—তুমি জানো না সমু। তোমার তিন বছর বয়সে টাইফয়েড হয়েছিল। এই ঘরে রেখে তোমার সেবা আমিই করেছি।

—কিন্তু এখন তোমার…তুমি তো এখন…

—বুড়ো হয়েছি? ঠিক কথা। কিন্তু মানুষ একবার যেটা শেখে সেটা আর ভোলে না। সাঁতারই বল আর সেবাই বল। এ রকম সঙ্কটের সময়েও আমি নিজের রুটিন নিয়ে আছি। আমার শেয়ার করা উচিত ছিল।

—আমি তা বলিনি দাদু। মা তোমাকে করতে দেবেনও না।

আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। রাতে দাদার বিছানায় মশারি ফেলে জল, নিমডাল সব গুছিয়ে রেখে মা যেমনি বেরিয়ে গেছেন অমনি আমি দরজা বন্ধ করে দাদার পাশে নিজের তক্তপোশে শুয়ে পড়লুম।

—তুই শুলি যে? —দাদা অবাক।

—আজ থেকে তোর কাছে আমি থাকব।

—কে বলেছে? দাদু?

—না।

—তবে কে ঠিক করল?

—কেউ না, আমি নিজে।

—কিন্তু তোর তো একবারও হয়নি। ছোঁয়াচ লাগলে?

—লাগবে, কী করা যাবে! তুই ভাবিস না, যেই দরকার হবে ডাক দিবি, আমি ঠিক উঠে পড়ব।

মা আরও রাত্তিরে এসে দরজার কড়া নাড়লে, আমি জানলা দিয়ে বললুম— দাদার কাছে আমি থাকছি। নিজের ঘরে ছাড়া আমার ঘুম হচ্ছে না।

—ওর অসুবিধে হবে সমু।

—হবে না। আমার ঘুম খুব পাতলা। তুমি যাও শুয়ে পড়ো গে।

মা আর কিছুক্ষণ আমার সঙ্গে তর্ক করলেন। কিন্তু মায়ের চিরকালই কথা কম, কাজ বেশি। শেষে রণে ভঙ্গ দিলেন।

আমি দাদাকে জিজ্ঞেস করি— তোর কি মাকেই বিশেষ করে দরকার? বাচ্চারা অসুখ করলে বেশি-বেশি মা-মা করে, সেই রকম?

দাদা বলল— একটা সত্যি কথা বলব?

—বল।

—তুই থাকলেই আমার বেশি সোয়াস্তি হবে। মা সারা রাত জেগে বসে থাকবেন। বললেও কিছুতেই শোবেন না। মাঝে মাঝে ঢুলে পড়ে যাচ্ছেন তার পরেই আবার চমকে জেগে উঠে হাতে পায়ে নিম ডাল বুলোতে থাকছেন। যেন কী রকম নিঃশব্দে স্যাক্রিফাইস করে চলেছেন বাবার জন্যে, দাদুর জন্যে, এবার আমার জন্যে। আই ডোন্ট লাইক ইট। আনইজি লাগে।

রাত ছমছম করছে। খোলা জানলা দিয়ে রাস্তার আলো ঢুকছে ঘরে। আমার মশারি, তার বাইরে খালি স্পেস। তারপরে দাদার মশারি, ভেতরে দাদার বিছানা। দাদার শরীরভরা জলবসন্তের ফোস্কা ফোস্কা গুটি, শরীরের দাদা এক, ভেতরে আর একটা দাদা, অভিমান, রাগ আবার অস্বস্তিতে ভুগছে, ভয়েও। তারও ভেতরে আর একটা দাদা যে পরিষ্কার চিন্তা করতে পারছে। যে হৃদয়ঙ্গম করেছে মায়ের শ্রান্তি। আমার আন্তরিক ইচ্ছার সেবা, সে এখন স্বস্তিতে। শান্তিতে। তারও ভেতরে আছে এই সাময়িক অসুস্থতা ও বিকারের বাইরের অন্য দাদা, যে টেবিলের ওপর কনুই রেখে অনন্য মনে পড়ে যায়, খালি পড়ে যায়, লেখে, অঙ্ক কষে, অন্যমনস্ক হয়ে থাকে, বি বি সি শোনে, কদাচিৎ কদাচিৎ একদম একা একা সিনেমা দেখে আসে, কী সিনেমা জিজ্ঞেস করলে শুধু মিটিমিটি হাসে। আমরা দুজন মানুষ এক ঘরের দুই প্রান্তে। এক বাড়ি এক পরিবার। একই বাবা-মা’র রক্ত, বংশের জিন আমাদের শরীরে, এই তো দাদাকে জল এগিয়ে দিচ্ছি। হরলিক্স দিলুম, ফ্লাস্ক থেকে ঢেলে, টেম্পারেচার দেখলুম, খুব কম, নিরানব্বই মতো… সবই… কিন্তু কোনওদিনই আমাদের চেনাশোনা হবে না। একজন আলাস্কান কিংবা জাপানি আমার কাছে যেমন অচেনা তেমনই থেকে যাবে। অথচ একই মনুষ্য লক্ষণ, রক্ত, একই জৈবনিক ওঠাপড়া। মস্তিষ্কের গঠন, কোষ সমূহ।

—সমু! সমু! দাদা চাপা ভিতু গলায় চিৎকার করছে। হ্যাঁ। চাপা কিন্তু চিৎকারই।

—সমু আমাকে তোর পাশে শুতে দে। সেই সাদা কাপড় মহিলা— যেই ঘুম আসছে অমনি।

আমি বললুম— তুই শুয়ে পড়, আমি যাচ্ছি। তখন রাত পাতলা হয়ে এসেছে। দপদপ করছে শুকতারা একটা স্টেনলেস স্টিলের টিপের মতো। একটু পরেই প্রথম ভোরের আলো ইরেজার দিয়ে ঘষে মুছে দেবে ওকে। দাদার বিছানার পাশে বসে কপালে আলতো হাত রাখি। এখন ওর সারা শরীরের অগুনতি গুটি শুকিয়ে এসেছে। কিন্তু মুখেরগুলো বেশির ভাগই দগদগে।

আধো ঘুমের ঘোরে দাদা বলল— কে হাত রাখল রে মাথায়? ওই সাদা কাপড় নয় তো! দেখিস।

শেষ রাত বড় অদ্ভুত সময়। অপার্থিব। মনে হয় এক মহাজাগতিক অনন্তে আস্তে আস্তে ফুটে উঠছি। আমার অস্তিত্ব এবং অনস্তিত্ব দুটোই সমান সত্য। পৃথিবীতে যেমন একটা সত্যি হলে অন্যটা মিথ্যে হয় তেমন নয়। খুব অদ্ভুত জায়গা, যদি জায়গাই বলা যায় ওটাকে, যেখানে সব বিপ্রতীপ সমান ঔদাসীন্যে অবস্থান করে। খুব বেশিক্ষণ এই অনুভবের মধ্যে থাকলে জীবনের সব কিছু খুঁটিনাটি কী রকম যেন অবান্তর হয়ে যায়। ঠিক ভয় করে না, কিন্তু আস্তে আস্তে আমি ওই মেজাজের বাইরে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করি। খুব বেশি জোর নয়। সামান্য চাপ দিলে যেমন কোনও কোনও বাক্সের ডালা খুলে যাবার একটা ব্যবস্থা থাকে সেই রকম! সামান্য চাপ। ধীরে ধীরে অনন্তর ভেতরের ঢাকনা খুলে যায়, সেই স্বল্প, অভ্যস্ত স্পেসের মধ্যে ঢুকে পড়ি এবং ঘুম এসে যায়। বুঝিওনি যে ঘুমিয়ে পড়েছি। ধীরে ধীরে আমার পাশে এসে দাঁড়ান একজন— সাদা কাপড় পরা, মাথায় ঘোমটা, মুখ দেখা যায় না, শেষ রাতের আবছায়ার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার। তিনি হাত বার করেছিলেন কি না বুঝিনি। কিন্তু স্পষ্টই দেখলুম দাদার মাথার ওপর একটা হাত। সেই হাতটার শীতল শুশ্রূষা আমার মাথাও ছুঁয়ে গেল মৃদু এক ঝলক হাওয়ার মতো।

আমি পুরোটাকেই সত্যি ভেবেছি। ঘুমের মধ্যেই ডেকেছি— মা? মা নাকি? কোনও উত্তর নেই।

ঝলমলে রোদে ঘর ভেসে যাচ্ছে। চোখের ওপর জ্বালা ধরানো সূর্যশলাকা। জেগে উঠে দেখি, বহু বেলা পর্যন্ত দুজনে ঘুমিয়েছি। জানলার কাছ থেকে মা আস্তে ডাকছেন সমু, সমু, এবার ওঠো, দরজাটা খুলে দাও।

দরজাটা খুলে দিতে মা খুব মৃদু গলায় বললেন— দেখেছ তো, রাত জাগার ফল কী! এখন তো স্কুলে যেতে হবে। চান করে নাও। একেবারে ভাত খাবে।

উঁকি মেরে দেখলেন— বাবলা ঘুমোচ্ছে? খুব, না?

—হ্যাঁ, ওর জ্বর একেবারে ছেড়ে গেছে।


সেই দাদা প্রেম করছে? ভিন্ন প্রদেশীয় মেয়ের সঙ্গে? আমার কী রকম অদ্ভুত লাগল। দাদা আমাদের বাড়িতে আলগা। সেভাবে দেখতে গেলে আমিও আলগা। মা-ই কি আলগা নয়? বাবা তো বাড়িটাকে হোটেলের মতোই ব্যবহার করেন। বাড়ির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক একমাত্র দাদু আর ফিনকির। কিন্তু যারা আলগা তারা স্বভাবেও আলগা, একা বলে আমার ধারণা ছিল। দাদা এই বাড়ি ছেড়ে অনেক দূরে তার একাকিত্ব ঘোচাবার চেষ্টা করছে? যে দাদা সিনেমা পর্যন্ত একা-একা যেত, তার প্রথম বন্ধুই একজন মেয়ে, ভিন্ন সংস্কৃতির, ভিন্ন আচার-আচরণের মেয়ে! তা ছাড়া, দাদা যতই যা-ই হোক, যেটুকু ভরসা করে আমাকেই করে, আমাকে ঘুণাক্ষরেও জানাল না! তবে কি যেটুকু বাঁধন ছিল সেটুকুও এবার ছিঁড়ল। আমাকে খুব আশ্চর্য করে আমার বুকের পেশিতে একটা টান ধরল। দাদা চলে যাচ্ছে। দাদা চলে যাচ্ছে। অথচ দাদার কত ডায়াগ্রাম এঁকে দিয়েছি, দাদা আমার কত প্রবলেম দেখে দিয়েছে। এক ঘরে থাকতুম, পাশাপাশি তক্তপোশে শোওয়া, মাঝখানে জানলা ঘেঁষে বড় টেবিল। তার একদিকে আমি আর একদিকে দাদা। জলবসন্তের রাত আমি দাদার পাশে। দুজনের কপালে একই স্পর্শ। ‘তুই থাকলেই আমার বেশি সোয়াস্তি’ দাদা বলছে। অথচ দাদা আমাকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে চলে যাচ্ছে।

যথেষ্ট আলোড়ন ভেতরে। আমি আমার নিশ্চিন্ত রুটিন মানতে পারছি না। এতই উদ্বেগ যে পুলক লক্ষ করেছে।

—কী হয়েছে রে তোর, সমু?

—কিছু না তো!

—ঠিক জানতুম এই কথাই বলবি। থাক, আমাকে কিছু বলতে হবে না তোর।

রাগ করে পুলু চলে যায়।

তখন বুঝতে পারি, হঠাৎ-ই, যে একটা মানুষের আর একটা মানুষের যতখানি কাছে আসা সম্ভব, পুলক আমার কাছে এসেছে। এর কারণ কী আমি জানি না। কেন না আমাদের রুচি, স্বভাব কিছুই এক রকমের নয়। এক স্কুলে পড়েছি, এক ক্লাবে ব্যায়াম করেছি, দুজনেই এঞ্জিনিয়ারিং পড়ছি। যদিও আলাদা আলাদা বিষয়। তো কী? এইগুলোই যদি ঘনিষ্ঠতার কারণ হয়ে থাকে তা হলে তার গভীরতা বেশি নয়। আমি কোনও হিরো নই। তবু পুলক আমার শাগরেদ। আমাকে ও সমর্থন করে, কতবার বাঁচিয়েছে, কেন না সমবয়সিরা আমাকে বড্ড ভুল বোঝে।

—এই পুলু শোন।

চৌকাঠে পা দিয়েছিল, বলল—বল শুনছি, এ ঘরে আবার বহু দূর অতীতের কোনও ক্ষুধিত পাষাণটাষাণ শুনতে পাচ্ছিস, না কী?

—নাহ্‌। চলে যাওয়ার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। কাছ থেকে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে পায়ের শব্দ।

—অনেক পা! না এক জোড়া? এক জোড়া যদি হয় তো সেটা আমার। আর অনেকের যদি হয় তা হলে নতুন ফার্স্ট ইয়ারের। করিডর দিয়ে এক্ষুনি চলে গেল।

—ঠাট্টা নয়, শোন না।

—বল। পুলু উৎসাহিত হয়েছে খুব কিন্তু সেটা দেখাবে না।

—পুলু। দাদা বোধহয় বিয়ে করছে।

—বলিস কী রে? পুলু লম্ফ দিয়ে উঠল— তবে তো ভোজ ভোজ মহাভোজ।

আমার মুখে ফিকে হাসি দেখে ও রেগে উঠল— দাদা কি তোর প্রেমিকা? যে দাদার বিয়ে হচ্ছে বলে কাঁদতে বসেছিস?

—কাঁদলুম আবার কই? কী যে বলিস! দাদা তো দূরেই থাকে, আরও দূরে চলে যাবে। এই!

—দূরে মানে? দিল্লিতে চাকরি, যাবে না? তুই যদি এখন তিরুবনন্তপুরমে চাকরি পাস— যাবি না? আরও দূরে মানে? তোর দাদার শ্বশুর কি জামাইকে বিলেত পাঠাচ্ছে? বিলেত একবার গেলে অবশ্য ফেরা শক্ত। আমাদের যে যেখানে বিলেত-আমেরিকা গেছে আর ফিরে আসেনি, মায়াবিনীর দেশ মাইরি। থাক ডিটেল বল।

—ডিটেল কিছু নেই। অন্তত জানি না।

—কবে, কার সঙ্গে, কী দিচ্ছে থুচ্ছে…

আমি হাসি— কিছুই জানি না।

—এই যে বললি বিলেত যাচ্ছে।

—ওটা তুই বলেছিস পুলু, আমি নই।

—তো আমি যেগুলো বলিনি সেগুলো বল। কবে ডেট ঠিক হল!

—কিছুই হয়নি। দাদার চিঠি পড়ে দাদুর মনে হয়েছে, দাদা বিয়ে-টিয়ে করতে চায়।

—এই, ব্যস? তুই দেখালি একখানা সমু। চাকরি-বাকরি করছে। সোমত্থ ছেলে হাত পুড়িয়ে রান্না করে খেতে হচ্ছে। বিয়ে করতে চাইবে না?

আমি চুপ করে যাই। বীজ থেকে গাছ হল, গাছ থেকে ডালপালা, পাতাপুতি, ফুলফল, বনস্পতি হলে তার আর ফুল নেই শুধু ফল। ফুলন্ত বৃক্ষের শোভা কি কোনওদিন আমার দাদুর বাড়িতে ছিল? দাদুর বড় দুই ভাই ঝরে গেছেন, দুই ঠাকুমা দুটো অর্ধছিন্ন শাখা, দাদুর ছোট ছেলে কতদিন মাদ্রাজ-প্রবাসী। আগে আসতেন, ফিনকিকে জন্ম দিয়ে কাকিমা মারা গেলেন তখন সেই শিশুকে আমার মায়ের কাছে জমা রেখে তিনি ফিরে গেলেন, ওখানকারই একজন মেয়েকে বিয়ে করলেন। আর এলেন না। ফিনকি জানেই না কাকা ওর বাবা। পাছে ওকে নিতে হয়, চেনা দিতে হয় তাই-ই হয়তো কাকা… একপক্ষে ভালই। কিন্তু সেই কাকিমা আর তাঁর ছেলেমেয়েরা যদি এখানে মাঝে মাঝে আসত আমরা যেতুম, ফিনকি যদি ছোট্ট থেকেই জানত যাকে মা বলে ডাকে তিনি ওর জ্যাঠাইমা, তবে কী ক্ষতি হত? এত লুকোছাপা কীসের?

আর জ্যাঠামশাই? খুব রেগে যেতেন, লাল চোখ ঘুরত, যেটুকু মনে আছে, জ্যাঠামশাই আছেন আছেন বেশ আছেন, হঠাৎ প্রচণ্ড হয়ে উঠতেন, জিনিসপত্র ভাঙচুর, সে এক ভীষণ কাণ্ড। এখন শুনতে পাই জ্যাঠামশাইকে কোনও মানসিক হাসপাতালে রাখা হয়েছে। দাদু দেখতে যান খুব মাঝে মাঝে। আর কেউ না, কখনও না। আমার খুব ছোটবেলার স্মৃতিতে ছাড়া জ্যাঠামশাই আর কোথাও নেই। অথচ জ্যাঠামশাই ছিলেন দাদুর ছেলেদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী।

এত কথা তো পুলু জানে না, জানার দরকারই বা কী! কিন্তু আমার সেই ভগ্নশাখা বনস্পতির কথা মনে হয় যার ডালের পর ডাল ভেঙে পড়ছে। সব সময়ে যে কালের প্রকোপে তাও নয়। কোথা থেকে কুঠার চালাচ্ছে কেউ।

অবশেষে একদিন চিঠি পাই। দাদার।

সমু,

কেমন আছ? ভালই করছ শুনছি। আমার পিএইচ. ডি গতকাল পেলুম। থিসিস উচ্চ-প্রশংসিত। প্রকাশ করবার চেষ্টা চলছে। রীডার হয়ে গেছি। এখানে ক্যাম্পাসে আঁতেল স্নবারি খুব। মেলামেশা করতে গেলে লাইফ-স্টাইল মেনটেন করতে হয়। খরচে কুলিয়ে উঠতে পারছি না। তোমার আর এক বছর এটাই ভরসা। আমার গাইড দলজিৎ অরোরা খুব বিবেচক। একলা কিছুই চালিয়ে উঠতে পারছিলুম না। টাকাপয়সা, জিনিসপত্র সব চুরি হয়ে যাচ্ছিল। এখন পেয়িং গেস্ট হয়ে আছি অরোরাজির বাড়িতেই। ওঁর কেউ নেই এক মেয়ে আর স্ত্রী ছাড়া। ভদ্রমহিলা খুব স্নেহময়ী। পঞ্জাবি রুটি খেলে তুমি আর ভুলতে পারবে না। এখানে চলে এসো একবার। ছুটিতে। সিরিয়াসলি বলছি। আমার পি জি অ্যাকমোডেশন ঠিকই, কিন্তু কুল্যে দু’খানা ঘর, একটা টয়লেট, একটু বারান্দা। ভদ্রমহিলা আর তাঁর মেয়ে সবই টিপটপ রাখেন, আমি শুধু মাসান্তে টাকাটা দিয়ে খালাস। দ্বিতীয় ঘরটাতে একজন গেস্ট রাখতেই পারি। কোনও অসুবিধে নেই।

চিঠিটা এইটুকুই। কিন্তু চিঠির লাইনের মাঝে মাঝে আরও অনেক না-বলা কথা উঁকিঝুঁকি মারছে। যেমন, তুমি তাড়াতাড়ি পাশ-টাশ করে সংসারের দায়িত্ব নাও। আমি পেরে উঠছি না। যেমন, আমার লাইফ-স্টাইল অন্য রকম হয়ে যাচ্ছে। তার যা যা ফলাফল তা-ও ক্রমশ প্রকাশ্য। যেমন, বাড়িতে আমি যে স্নেহ-যত্ন পাইনি, এখানে তা পাচ্ছি। এবং সমু একবার এসো, মুখোমুখি তোমার সঙ্গে কিছু দরকারি কথা বলা দরকার, যে কথাগুলো দাদুকে লিখতে পারছি না।

সেই রবিবার আমি বাড়ি গেলুম না। ফোন করে দিলুম। কাজ জমে গেছে বাজে কথা। আমার কাজ কোনওদিনও জমে না। আসলে দাদার চিঠি পাবার পর থেকে একটা ভীষণ মানসিক অস্বাচ্ছন্দ্য শুরু হয়, যার পরিণতি হয় এক প্রবল শরীরী আলোড়নে। ঘুমের মধ্যে নিম্নাঙ্গের এই কঠিনতা এই প্রবল আবেগ যে জানিনি তা তো নয়! কিন্তু এ ক’দিন যা হচ্ছে তা অসহ্য। শরীর গরম। এখুনি কাউকে আক্রমণ করতে না পারলে যেন শান্ত হতে পারব না। হস্টেলের সবচেয়ে তুখোড় ছেলে মৃণাল। ওদের ঘরে গেলাম।

—কী রে ভাল ছেলে? বাড়ি যাসনি?

—নাঃ, তোদের সঙ্গে বেরোব।

—আমাদের সঙ্গে? —ওরা মৃণাল, সুজন, নৃপেশ চোখ চাওয়া-চাওয়ি করল।

—পুলককে ডেকে নে, তোর বডিগার্ড!

—পুলক বাড়ি গেছে।

—ভাল ছেলে ডুডু খাবে।

—বাজে কথা রেখে চল—বেরো।

সুজন বলল মৃণালকে, মদনার ঠেকে যাবি? না গোবরদার!

কার ঠেক নিয়ে বেশ মতবিরোধ হল ওদের।

মদনার ঠেকে মাল্লু ভাল, না গোবরদার, এই নিয়ে বিতণ্ডা হল। নতুন শিক্ষানবিশকে নিয়ে যেতে হবে তো!

—পয়লে তো মদনার ঠেকে চল, আড় ভাঙতে হবে না?

—হ্যাঁ, আড়মোড়া।

আমি বললুম— আমাকে নিয়ে ইয়ার্কি-ফিয়ার্কি মারিসনি। কোথায় যাস চল।

একটা ছোট দোকান। পেছন দিকে লম্বা। অর্থাৎ ঢোকবার দরজাটা ছোট। মাথা নিচু করে ঢুকতে হয়। টিমটিম করে আলো জ্বলছে।

আমরা কয়েকজন গোল হয়ে মেঝেতে বসেছি। কেরোসিনের কুপি জ্বলছে। প্রচণ্ড গন্ধ। তার সঙ্গে চোখ জ্বালা করা ধোঁয়া। ওরা প্রত্যেকে সিগারেট ধরাল। আমাকেও একটা দিল।

মৃণাল বলল— লেসন ওয়ান।

—কী আছে এতে? কী ভরেছিস?

—কী আবার? গঞ্জিকা? সাধু-মহাত্মারা খেয়ে থাকে। আস্তে টান দিবি।

টান দিই আস্তে। মাথাটায় ঝিম ধরে যায়। আস্তে আস্তে ছড়িয়ে যাচ্ছে ঝিমুনিটা। সব ভুলে যাচ্ছি। দাদা, সন্তোষ অরোরা, ফিনকি, দাদু, বাড়ি, বাড়ির পেছনে বাড়ি, আরও বাড়ি, ঘরের শেষ নেই। অফুরন্ত বারান্দা। হঠাৎ খেয়াল করি আমি আসলে ভুলতে ভুলতে ফিরে গেছি সেই বারান্দাতেই। ছাতিম ফুলের গন্ধ বেরোচ্ছে। আমি হাঁটতে পারছি না, গড়িয়ে যাচ্ছি, গোল একটা বেলনের মতো গড়িয়ে গড়িয়ে…।

চোখ লাল, মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। টলতে টলতে উঠে দাঁড়াই। ওরা আমাকে ধরে ধরে হস্টেলে নিয়ে আসে। সারারাত মড়ার মতো ঘুমোই। সকালে ওরা এসে জিজ্ঞেস করে —কেমন আছিস?

—ভাল।

—কেমন লাগল?

—ভাল।

—আজ যাবি?

—যাওয়া যায়।

এইভাবে আস্তে আস্তে আমার প্রোমোশন হয়। দ্রুত শিখে ফেলি। বিশেষ কষ্ট করতে হয় না। সিগারেট প্যাকেটের রাংতার ওপর সাদা সাদা গুঁড়ো। সরু চোঙানল দিয়ে হুস করে টেনে নিই। প্রচণ্ড একটা ধাক্কা, মাথাটা ফেটে যায়। তারপর শূন্যে সাঁতার কাটতে থাকি।

শনি রবি এইভাবেই কেটে যায়। বাড়ি যাওয়া হয় না। খচ খচ করে মনের মধ্যে। দাদু বাইরের দিকে চেয়ে বসে আছেন। ফিনকি ঠোঁট ফোলাচ্ছে। ফোন করে দিই। বড্ড বেশি কাজের চাপ পড়েছে। দু’ তিন সপ্তাহ যেতে পারব না।

পুলু বলল —তোর কী হয়েছে রে?

—কী আবার হবে? তুই তো সব সময়েই আমার কিছু না কিছু হতে দেখছিস।

—হয়েছে বলেই দেখছি। দেখছি বলেই বলছি। চোখ লাল, বিড়বিড় করে বকিস। বাড়ি যাসনি কেন?

—কাজ পড়েছে।

—কাজ তো আমারও। ভাল লাগে উইক-এন্ডে হস্টেলে থাকতে? জঘন্য খাওয়া!

পুলু চলে যায়। আমি মৃণালদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ি। বাসে চড়ে একবার বদল করে চলে আসি। ওরা টেপা হেসে বলে— এ জায়গাটার নাম বাঁধাঘাট। ওদিকে গঙ্গা, ফেরিঘাট, স্টিমার চলছে, কিন্তু বাঁধাঘাটে একবার এলে বাঁধা পড়তে হবে।

কাছেই একটা সিনেমা হলে আমরা ছবি দেখি। মাঝ-সময়ে ওরা আমাকে টেপে, উঠে পড়ি।

সরু গলি, কাদা-কাদা, ভাঙা ভাঙা বাড়ি, দরজায় একজন নথ পরা গিন্নিবান্নি দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দেখে বলে —এসো খোকাবাবুরা—

—এই খবর্দার খোকাবাবু বলবে না।

—আচ্ছা আচ্ছা মরদের বাচ্চা সব, এ বাবুকে নতুন দেখছি!

—আজ ওর হাতেখড়ি। এই সমু যা! মাসির সঙ্গে যা!

একটা নিচু মতো ভাঙা ভাঙা ঘরে মাথা নিচু করে ঢুকি। কড়া দেশি মদ এক গেলাস রাখে মাসি।

—ওব্যেস আছে নিশ্চয়ই। দেখো বাপু, ঘরদোর ভাসিও না। মাসি চলে যায়। আমি গেলাসে একটু চুমুক দিয়ে নামিয়ে রাখি। তার পরেই ভেতরের দরজা খুলে ঘরের মধ্যে এসে দাঁড়ায় নাঙ্গা এক দুঃস্বপ্ন। ডাকিনী যোগিনী ঘিরে আছে কালীমূর্তিকে। গলায় নরমুণ্ডের মালা। আমি কোনওক্রমে বেরিয়ে আসি। টেনে এক চড় মারি মৃণালকে তারপরে ওইভাবেই টলতে টলতে একলা ফিরে আসি হস্টেলে।


কোথা থেকে টাকা জোগাড় করি! দিল্লি যাওয়া-আসার, এবং যদি কোথাও নিজের থাকবার ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হয়, বলা তো যায় না। দাদা যখন দরকারি কথা বলতে চাইছে, তখন কথাটা শোনা দরকার। কয়েকজন বন্ধুর কাছ থেকে কিছু ধার নিলুম। বাড়ি। ফিনকির ছুটে আসা। মায়ের মাথার আঁচল খসে পড়ে যাওয়া। দুই ঠাকুমার নিদন্ত মুখে ছেলেমানুষি হাসি। বাবা পিকনিকে গেছেন। এবার গিয়ে দেখলুম দাদু বুড়ো হয়ে গেছেন। এত দিন একমাথা পাকা চুল সত্ত্বেও, ‘বুড়ো মানুষ বুড়ো মানুষ’ বলা সত্ত্বেও দাদুকে বুড়ো ভাবা যেত না। এখনও, চুল একটু পাতলা হয়ে গেলেও দাদুর দাঁত অটুট, একটুও ঝুঁকে পড়তে দেখলুম না। তবু যেন স্বাস্থ্যের মধ্যে সেই ইস্পাত নেই, কোথাও একটা শীর্ণতা, শুষ্কতা। আমাকে দেখে দাদু তেমন কিছু বললেন না। কেন দু সপ্তাহ আসিনি, জিজ্ঞেসও করলেন না। আমিই ব্যাগটা নামিয়ে রেখে বলি— দাদু কেমন আছ?

দাদু উত্তর দিলেন না। অভিমান হয়েছে না কি? দাদু এত প্র্যাক্টিক্যাল চরিত্রের মানুষ যে মান-অভিমানে তাঁকে খুব বেশি বিচলিত হতে দেখিনি।

—দাদা আমাকে একটা চিঠি লিখেছে, যেতে বলছে খুব করে।

—যাও। থাকবে কোথায়?

—দাদা ব্যবস্থা করবে বলছে।

—তা হলে শুধু গাড়ি-ভাড়া আর কিছু হাত-খরচ?

—হ্যাঁ, সেটা আমি জোগাড় করে নিয়েছি।

—ধার?

—হ্যাঁ।

—বেশ।

—দাদার পিএইচ. ডি হয়ে গেল, রীডার হয়ে গেছে, তোমায় লিখেছে নিশ্চয়।

—এখনও না। লিখবে… হয়তো।

—নিশ্চয়। এতদিন তো আমাকে একটা চিঠিও লেখেনি। এই প্রথম। বোধহয় মনে করে একজনকে খবরটা দিলেই সবাই পেয়ে যাবে।

—হতে পারে। দাদু চুপ করে রইলেন। আমি একই ভাবে বসে থাকি। আমার মনে হল দাদুর আর আমার মাঝখানে একটা ভ্যাকুয়াম। শব্দ পৌঁছয় না, চিন্তাতরঙ্গও না। শুধু আলো কখনও হার মানে না। জানলা দিয়ে বেলা ন’টার ঝকঝকে রোদ এসে পড়েছে দাদুর সাদা চুলে। ফতুয়ার বাঁ কাঁধে। সামনের দিকে একটু ঝুঁকে বসে আছেন, বাহু পেরিয়ে গিঁটবহুল আলগা চামড়ার হাতে পাতার উল্টো পিঠে। সেই একই আলো এক ছিট ছিটকে এসে পড়ে আছে আমার হাঁটুতে।

—আমি জাস্ট যাব আর আসব।

—কেন? জীবনে প্রথমবার দিল্লি যাচ্ছ, ভারতের বহু শতাব্দীর রাজধানী। ইতিহাস দেখে এসো। শুনে এসো। তোমার দাদার কথা বিশেষ কিছু শোনবার নেই।

আমি চমকে দাদুর দিকে চাই, মাথাটা ঝুলে গেছে। দাদুর সেই বহুদিনের পরাজিতের ভঙ্গি।

কেন জানি না আর কোনও প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করল না। কেন ও কথা বললেন, তার কিছুটা তো আন্দাজ করতে পারিই। দাদুর ওই ভঙ্গির মধ্যে এমন একটা দাঁড়ি টেনে দেওয়া সমাপ্তি আছে, যার পর যে কোনও সান্ত্বনাই স্তোক বচনের মতো শোনায়।

—যাও, চান-টান করে ফেলো, একটু থামলেন— তারপর বললেন— তুমি বড় হয়ে গেছ।

এক পক্ষকালের মধ্যে কী এমন বড় হয়ে গেলুম। ভেতর থেকে একটা লজ্জা উঠে আসে। এই দু সপ্তাহের মিথ্যে, অনাচার কি দাদু ধরতে পেরে গেছেন? কী করে? আমার চেহারায়, ব্যবহারে কি কোনও ছাপ পড়েছে? হ্যাঁ, মৃণালের চেহারায় একটা চোয়াড়েমি, চোখের চাউনিতে কেমন একটা অশ্লীলতার ছাপ পড়েছে নিশ্চিত। কিন্তু নৃপেশ নিয়মিত পাতাখোর, ওর চোখে একটা রোম্যান্টিক ভাবালুতা ছাড়া কিছু বোঝা যায় না তো! দু-চার দিন অনিয়ম করেই আমার কী এমন পরিবর্তন হল? চান করি অনেকক্ষণ ধরে, ঘরে আসি। এ ঘরে এখন দাদার ভাগ নেই। আমি সাত দিন গেলে তবে আসি। কখনও কখনও আসিও না। কেমন একটা অব্যবহারের ছাপ পড়েছে ঘরখানায়। যেন ঝাঁট দেওয়া হয়, অথচ মোছা হয় না, একই চাদর, বেড কভার, বালিশের ওয়াড় যেন পরানো অনেকদিন ধরে। অপেক্ষা করছিল, অপেক্ষা করছিল, ঘরের মালিক আসেনি, নিশ্চেতন বস্তুর নিজেকে সাফ-সুতরো রাখার, নতুন করে নিজেকে পাওয়ার কোনও উপায় নেই, সচেতনের সাহায্য ছাড়া। দেয়ালে টাঙানো গোল আয়নাটার ওপরেও কেমন একটা ছ্যাৎলা। আমি আমার মুখ রাখি আয়নায়। একটু দাড়ি উঠেছে। ভিজে চুলগুলো একটু বড়। ঘাড়ের কাছে গুটিয়ে রয়েছে। আয়না বলল —আমি তোমাকে চিনি না।

—আমি সমুদ্র, বিশ্বাস কর আমি সমুদ্রই।

—হতে পারে, কিন্তু সমুদ্র তো একটা নয়। তুমিও অন্য। অন্য সমুদ্র। ও চলে গেছে।

আমিই আমাকে বলছি আমি চলে গেছি! বিশ্বাসও করছি কোথাও একটা সমূহ চলাচল চলছে।

দরজায় ধাক্কা পড়ল। ফিনকি। এক মুখ হাসি। লুটিপুটি চুল। নরম গালগুলো দেখা যায়। ফিনকির উচ্চ-মাধ্যমিক টেস্ট হয়ে গেছে। ওর উত্তরগুলো কষে দেখেছি ঠিকঠাক হয়েছে। ফিনকিকে দেখে আমি প্রাণপণে ফিরে আসার চেষ্টা করি।

—এতক্ষণ কী করছিলি রে?

—এ-ই। চান করে ঘরে এসে দেখি সব কেমন ধুলো পড়া। ভাবছিলুম পরিষ্কার করব কি না। একটা চাদর আর বালিশের ওয়াড় দিতে পারিস?

অবাক হয়ে ফিনকি বলল— কাল রাতেই তো পাল্টে দিলুম। সব ধোপর বাড়ির। ধোপার বাড়ি গিয়ে গিয়ে বোধহয় রংগুলো একটু কটে গেছে।

—তা হলে একটা ঝাড়ন দে। আয়নাটা মুছি।

—ঝাড়নে হবে না। দাঁড়া আমি ঠিক করে দিচ্ছি। —কোথা থেকে খবরের কাগজ আর এক মগ জল নিয়ে এল ফিনকি। কিছুক্ষণের মধ্যেই আয়না পরিষ্কার হয়ে গেল। আমি চোরা চাউনি দিই আয়নাটার দিকে। চাউনিটা রিবাউন্ড করে আমার দিকে ফিরে আসে। আঘাত করে। আয়না আমার প্রতিবিম্ব নেবে না।

ঘরের মেঝেয় সাধারণ ছাইরঙা সিমেন্ট। খানিকটা মসৃণ, কিন্তু জায়গায় জায়গায় কেমন খরখরে হয়ে গেছে।

খেতে বসে দেখি দুই দিদাও এসে ঘুরে গেলেন। মেজদিদার খুব শুচিবাই। উনি এক ধারে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন— দাদুভাই, এক মাত্তর রোববারগুলোয় তোমার দেখা পাই। জানি কাজ পড়েছিল, তবু, বুড়োবুড়িগুলোকে মনে রেখো, হঠাৎ আঁচলের খুঁট দিয়ে চোখ মুছলেন উনি। আস্তে আস্তে চলে গেলেন। বড়দিদা বয়সে বড় কিন্তু শক্ত বেশি, বললেন— আর একটু মাছের তরকারি দাও দাদাভাইকে, ও বউমা। পার্শে মাছ আনিয়েছি দাদা, তুমি ভালবাস। খাও ভাল করে। হস্টেলে কী-ই বা খাও!

হারাই-হারাই ভয় যেন চোখে। এতদিন গেছে কখনও ওঁদের এভাবে আমার খাওয়া-দাওয়া নিয়ে খোঁজ করতে দেখিনি। আমি হাত দিয়ে থালা ঢাকবার আগেই মা আর দুটো পার্শে মাছ আমার পাতে ফেলে দিলেন। ফিনকিকে বললুম— তুই একটা তুলে নে তো। আমি খেতে পারব না।

—দে—ফিনকি থালা বাড়াল।

—তুই তুলে নে।

দিদারা চলে গেলে ফিনকি বলল, মাছটা দিদারা আনিয়েছেন, তোর জন্যে— বলে হাত চাটতে চাটতে নিগূঢ় হাসি হাসতে লাগল।

শেষ বেলায় আমরা তিনজন সিনেমা দেখতে গেলুম। আমি, ফিনকি আর মা। কোনওমতেই মাকে রাজি করানো যায় না। ফিনকি বলল— তা হলে আমিও যাব না। কতদিন থেকে ‘বর্ন-ফ্রি’ দেখব বলে বসে আছি।

আমি এভাবে জোর করতে পারতুম না। ফিনকি যা পারে আমি তা পারি না। শুধু ফিনকি কেন, অনেকেই যা পারে, আমি তা পারি না।


নিউ দিল্লি স্টেশনে দাদার আসার কথা। দেখলুম না। নিজের ব্যাগটা দু পায়ের মধ্যে রেখে পকেট থেকে দাদার ঠিকানা বার করি। গ্রেটার কৈলাস। প্রথমে দাদা ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের মধ্যেই থাকত। এখন গ্রেটার কৈলাস, মানে সেই অরোরাদের বাড়ি। স্টেশন থেকে কতটা দূর কোনও ধারণাই নেই আমার। এখানে শুনেছি ট্যাক্সি, অটো কিছুই মিটারে চলে না। চললেও টুপি পরাবার বন্দোবস্ত করে। একটু ভেবে নিতে হবে, কালীবাড়িটাড়ি গিয়ে আস্তানা নেওয়া ভাল। ওখানে মোটের ওপর সস্তা শুনেছি। তারপর ফোন করব। আমার পিঠে হাত পড়ল। দাদা।

—ভীষণ জ্যামে পড়েছিলুম। তুমি খুব ভাবছিলে?

—হ্যাঁ, ভাবছিলুম কোথায় যাই। কালীবাড়িটাড়ি…

—আরে! আমার একটা দায়িত্ব নেই।

—তুমি পুরো সাড়ে তিন বছর এসেছ দাদা। একবারও বাড়ি যাওনি।

—থিসিস শেষ করতেই তো তিন বছর চলে গেল! তার সঙ্গে চাকরি, খুব টাফ্‌। অ্যাডজাস্ট করতে সময় লাগে। দিজ পিপল আর সো স্মার্ট! আমাদের ঐতিহ্য তো… ভেতো আপ ব্রিঙ্গিং একেবারে!

দাদার পোশাক-আশাক চলন-বলন সত্যিই এখন খুব স্মার্ট। ইংরেজি সিনেমায় যেমন দেখা যায়। চেহারাটাও খুব ভরেছে। পুরো স্যুট পরনে। চকচকে জুতো মোজা। চশমার ফ্রেমটা পাল্টেছে।

বাইরে দেখলুম একটা কালো অ্যাম্বাসাডার দাঁড়িয়ে আছে।

—ওঠো। দাদা আমার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে পেছনের সিটে চালান করে দিল। তারপরে ড্রাইভিং সিটে বসল।

—তুমি গাড়ি কিনেছ?

—তুমিও যেমন! অরোরাজির গাড়ি। আমি ড্রাইভিং শিখে গেছি। ও বাড়ির সবাই-ই জানে। আর একটা ফিয়েটও আছে। যখন যার যেটা দরকার হয়…

দাদাকে দেখে আমার সম্ভ্রম জাগার কথা ছিল, কিন্তু আমার ঈষৎ মজাই লাগছিল। দাদা যেন বিশেষ ভাবে আমাকে অভিভূত করবার চেষ্টা করছিল। এর আগে দাদার সঙ্গে আমার দিনগুলো ছিল খুব চুপচাপ। একটা দুটো কথা, কাজ, দুজনের দুদিকে চলে যাওয়া। এত কম কথা বলত, এত একা-একা থাকতে পারত যে মনে হত দাদার পছন্দের মানদণ্ড এমনই যে হয় দাদার কাউকে পছন্দ হয় না, নয় দাদাকে কেউ পছন্দ করে না, এবং দাদা সেটা জানে। সেই চুপচাপ প্রায় ধ্যানস্থ মানুষটা যদি হঠাৎ খুব হাসি উপছে-পড়া, বাচাল মতো হয়ে যায়, তখন অনেকগুলো সম্ভাবনা মনে আসে। হয় তো বাইরের কর্মজগৎটা এতটাই ওর স্বভাবের বিপরীত এবং সেখান থেকে উদ্ধার পাওয়া ওর এতই অসম্ভব যে সেই জগতের বাইরের পোশাকটা ও পরে ফেলেছে, এক রকম ঝাঁকের কই হবার মরিয়া চেষ্টা এটা। আবার এও হতে পারে, আমার কাছে ধরা পড়ে যাবার একটা শঙ্কা ওর মনে কাজ করে যাচ্ছে। ও কিছু লুকোতে চায়। এমন আমূল বদলে যাওয়া কি সম্ভব?

—মা কেমন আছে? কিছুক্ষণ পর জিজ্ঞেস করল।

—যেমন থাকে।

—বোন?

—অনেক বড় হয়ে গেছে।

—দাদু?

—বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন।

—তুমি কি ভেবেছিলে, দাদু ইয়াং হয়ে যাবেন? দাদা ছোট্ট একটু অপ্রস্তুত হাসি হাসল। আমি কিছু বললুম না। ভেবে দেখতে গেলে দাদুর বুড়ো হয়ে যাওয়ার তথ্য তো আমি দিইনি। দিতে চেয়েছি সম্পর্কের সুতো ধরে একটু টান, দাদার মধ্যে দাদুর লালিত যে বড় নাতি লুকিয়ে আছে তাকে। ভেবে দিইনি। তবে দাদা বুঝতে পেরেছে। না হলে ওই হাসি আর ওই মন্তব্যের আড়াল খুঁজত না।

গ্রেটার কৈলাসের প্রথম দিনটা ছিল নির্মল, স্বচ্ছ, স্ফটিকের একটা দানার মতো। খুব সুন্দর ডিজাইনের একটি বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালুম। বাইরে থেকেই বোঝা যাচ্ছে, প্রচুর লেভেল ব্যবহার করা হয়েছে বাড়িটিতে। যিনিই করে থাকুন অল্প জায়গাকে বেশি করবার মন্ত্র তিনি জানেন। একেবারে ডান দিকের দরজা চাবি দিয়ে খুলল দাদা। ভেতরে একটা দারুণ সাজানো ঘর। মোটা মোটা সোফা, তাতে ঝলমলে কভার। দেওয়াল থেকে নানা রকম জিনিস ঝুলছে। যিনিই সাজিয়ে থাকুন খালি দেওয়ালে তিনি বিশ্বাস করেন না।

—বোসো। দাদা সগর্বে চাবির রিংটা ঘোরাতে লাগল।

—তোমার ঘরে তুমি বাইরে থেকে যখন খুশি ঢুকতে পারো তা হলে?

—না হলে আর স্বাধীনতা কী?

—পুরো স্বাধীনতা নয়, তুমি অন্যের ওপর নির্ভরশীল তো বটেই।

—পার্টলি। বাট আ অ্যাম পেয়িং ফর ইট।

পাশের ঘরটা দাদার শোবার ঘর। এখানে কাজ করবার টেবিল-চেয়ার, পাতলা একটা খাট, দেয়ালের সঙ্গে আটকানো আলমারির পাল্লা। বইপত্রের জন্য তাক।

—তুই আমার খাটটায় শুবি, বুঝলি। আমি এই ঘরে ডিভানটা পেতে নেব। নিশ্চয় চান করবি। চলে যা। শোবার ঘরের সঙ্গে টয়লেট, শাওয়ার অ্যান্ড এভরিথিং পাবি।

অনেকক্ষণ পরে দাদা আমাকে তুই বলল। অর্থাৎ আড়ষ্টতাটা একটু কেটেছে।

—কী খেতে চাস? ভাত না রুটি!

আমার মনে পড়ল দাদার চিঠির কথা। বললুম—রুটি। দাদার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল আয়।

একতলা থেকে একটা মেজানিনের মতো ঘরে গেলুম। এটা খাবার ঘর। দাদা হিটারে কিছু একটা গরম করল। একটা কৌটো রাখল টেবিলে।

—মাংস আর রুটি, এখানে নানান রকম চাটনি আছে। ক্ষীরা খাবি তো?

—ক্ষীরা?

—শসা, শসা।

আমি জানাই হ্যাঁ। তখন দাদা ফ্রিজ থেকে কাটা আধখানা করা তিন-চারটে শসার প্লেট মাঝখানে রাখল।

—অসুবিধে হবে?

—একেবারেই না।

আমি বয়-স্কাউটে ছিলুম বলে ঘর গোছানো, রান্না করা, বাসন মাজা, বিছানা করা সবই শিখে গেছি। কিন্তু দাদা ছিল মার্কামারা বাঙালি বাড়ির ছেলে। এক গ্লাস জল গড়িয়ে খেতেও আপত্তি। মা ওর টেবিলে একটা ঘটিতে জল রেখে চাপা দিয়ে পাশে একটা গ্লাস উপুড় করে রেখে দিতেন। এখন দূর বিদেশে একলা চাকরি করতে এসে দাদাও দেখা যাচ্ছে কিছু কিছু শিখে গেছে।

—ভাল না?

—ভাল, তবে একটু বেশি ঝাল। ঠিকই আছে।

—রুটিটা?

—খুব ভাল।

এই ‘ভাল’, ‘খুব ভাল’গুলোও যেন দাদার যথেষ্ট বলে মনে হল না। মুখ দেখে একটু হতাশ মনে হল।

—এ বাড়ির লোকেরা কোথায়?

—অরোরাজি তো ইউনিভার্সিটিতে। মাম্মি সোশ্যাল সার্ভিস করেন, একটা সংস্থা আছে। এই ধর, গরিবের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখানো, দুঃস্থ মেয়েদের স্বাবলম্বী হতে শেখানো। শি ইজ এ প্যারাগন অব ভার্চু। সবাইকার কাছেই একেবারে মায়ের মতো।

—আর?

দাদার মুখ একটু লাল হল, বলল— সোনু, মানে ওঁদের মেয়ে এয়ার লাইনস-এ কাজ করে। তাই…আমি তো ছুটি নিয়েছি।

আমি বললুম আমি কিন্তু কালই ফিরতি ট্রেনে চাপব দাদা।

—বলিস কী রে! দিল্লি দেখবি না?

—পরে, এখন না। দিল্লি দেখা পালিয়ে যাবে না।

—কলেজ?

—হ্যাঁ, —আমার অন্য কারণও ছিল, সেগুলো বলি না।

বসবার ঘরে— অলস ভাবে বসে দাদা একটা সিগারেট ধরাল। বলল —কী ওয়র্মথ আর কী লাইফ তুই কল্পনা করতে পারবি না।

কার আমি জিজ্ঞেস করি না।

—এরা জানে কীভাবে লাইফ এনজয় করতে হয়। বুঝলি? খোলামেলা, দরাজ হাসি। যেমন রোজগার করে তেমন খরচ করে। ফ্যান্টাস্টিক।

আমি চেয়ে থাকি।

—তুই চিন্তা করে দেখ, এরা কিন্তু লাহোরের উদ্বাস্তু। এরই মধ্যে পুরো দিল্লি শহর এদের দখলে। মানে, ডমিনেটেড বাই পঞ্জাবিজ। ড্যাশিং পিপল, অনেক কিছু শেখার আছে…

এতক্ষণে আমি বলি— এঁরা কেন্দ্রীয় সরকারের ঢালাও সাহায্য পেয়েছিলেন দাদা। দিল্লির আশেপাশের অঞ্চল, প্রপার দিল্লিসুদ্ধু কলকাতার মতো ক্রাউডেডও ছিল না তখন।

—ইয়া, দে স্টার্টেড উইথ অ্যান অ্যাডভান্টেজ। রাইট।

একটু চুপ। তারপর সিগারেটে দুটো টান দিয়ে বলল— সমু, আমি কলকাতা ফিরে যাবার কথা ভাবতে পারি না। প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড।

আমি হেসে বলি— কে বলেছে ফিরে যেতে? যেখানে তোমার কর্মক্ষেত্র সেখানে তো থাকতেই হবে। আজ যদি তুমি ভারতের বাইরে ভাল সুযোগ পাও, যাবে না?

—ব্যাপারটা তা নয়, বুঝলি? এঁরা আমাকে জামাই করতে চাইছেন। সোনু মানে মেয়েটি, ডিভোর্সি। এখন এই পরিস্থিতিতে আমাদের রক্ষণশীল বাড়ি চাইবে না বিয়েটা, তাই না?

—আমার তা মনে হয় না।

—হয় না? সোনুর একটি বাচ্চাও আছে, ছেলে, স্কুলে যায়। পাবলিক স্কুল। ভেরি ব্রাইট। বুঝতে পারছিস সিচুয়েশনটা একটু অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে।

আমি একটু ভাবিত হয়ে পড়েছিলুম ঠিকই। কিন্তু দাদাকে সেটা জানতে দেওয়া ঠিক মনে করলুম না।

দাদা বলল এই যে বাড়ি, ব্যাঙ্ক ব্যালান্স ওর বাবার, কিন্তু ওর ব্যবসায়ী স্বামীর কাছ থেকেও ও অ্যালিমনি বাবদ এককালীন থোক টাকা নিয়ে নিয়েছে বুদ্ধি করে। ইনভেস্ট করেছে। ভাল ভাল শেয়ার। শী ইজ কোয়াইট রিচ।

আমি চেয়ে আছি।

দাদা খুবই অস্বস্তিতে পড়ল। প্রশ্নের উত্তরে কথা বলা যত সহজ, প্রশ্নহীনতার মুখোমুখি ততটা নয়।

বলল— তুই কি রাগ করছিস?

—না তো! তুমি বলছ আমি শুনছি।

—আসলে ওদের একটা শর্ত আছে। ওরা চায় বিয়েটা কোয়ায়েটলি এখানেই হয়ে যাক। এবং এই বাড়িতেই আমাকে থাকতে হবে। কিন্তু বাড়ি বা সম্পত্তির ওপর সোনুরই অধিকার। আমি যেন না ভাবি এই বাড়িতে আমার আত্মীয়স্বজনকে… মানে…রাখতে-টাখতে পারব।

—বিয়ের সময়েও আমরা কেউ উপস্থিত থাকতে পারব না? — আমি একটু বিরক্ত হয়ে বলি, —এ কেমন শর্ত!

—না না, বিয়েতে অবশ্যই যে যে পারবে উপস্থিত থাকবে। যার যার সুবিধে হবে। ধর দাদু তো পারবেন না। মা-বাবা এঁদের পক্ষেও তো সম্ভব নয়। ধর তুই, ফিনকি। তোরা…

আমি দাদার সিগারেটের ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে থাকি। খোলামেলা কথা কোনওদিন দাদার সঙ্গে বলিনি। বাড়িতে টাকা-পয়সা পাঠাবে কি না, এটাও জিজ্ঞেস করতে পারলুম না।।

—রাতে ঘুম হয়নি। আমি একটু ঘুমোতে চাই দাদা। এইখানে ডিভানেই আমার হয়ে যাবে।

—শিওর, একটু ঘুমিয়ে নে, তারপর বিকেলবেলা তোকে দিল্লি দেখিয়ে আনব। কালকেও একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

—কিন্তু ওঁরা তো এটা চান না!

—কী?

—এই যে তোমার পরিবারের কেউ এখানে আসুক!

—ননসেন্স। এই স্পেসটার জন্যে আমি খরচ করছি। তা ছাড়া তোর কথা আলাদা।

—কেন?

—তুই একটা বাডিং এঞ্জিনিয়ার…

আমি একদম চুপ করে যাই।

—ওরা এমনিতে কিন্তু খুবই অতিথিবৎসল। সে সব না। একটা দুর্ঘটনা হয়ে গেছে তো। তাই একটু সাবধান।

দাদা আমাকে কুতুবমিনার চত্বর হয়ে লাল কিল্লার সাউন্ড অ্যান্ড লাইট শো দেখাল। ইন্ডিয়া গেট যেতে আসতেই দেখা যায়। শহরের কেন্দ্রে পার্লামেন্ট হাউজ, রাষ্ট্রপতি ভবন হয়ে চাণক্যপুরী দেখে দাদা গ্রেটার কৈলাসের পথ ধরতে আমি বলি— দাদা, রাতের খাওয়াটা কোনও একটা ধাবা-টাবায় খেয়ে নিলে হত না? দিল্লির পরোটাগলির খুব নাম শুনেছি!

—সে তো অনেক পেছনে ফেলে এসেছি। পুরনো দিল্লিতে। বলবি তো আগে? কিন্তু আজ ডিনারে ওঁরা তোর জন্যে অপেক্ষা করবেন, আলাপ করবেন।

—সো কাইন্ড অব দেম। কিন্তু আমি আর ওখানে ফিরতে চাইছি না। এখানে কোথাও একটা থেকে নিতে পারব। তুমি যে এই আমাকে গাড়িতে এত ঘোরালে পেট্রলের দামটাও…

—কী বলছিস? পেট্রল আমি দিই! দে নো যে তুই আসছিস। আমাদের বাড়ির প্রতিনিধি। ওঁরা কথা বলবেন তোর সঙ্গে।

এত ক্রুদ্ধ যে আমি হতে পারি আমার জানা ছিল না। বললুম— আমি আমার বাড়ির প্রতিনিধি নই দাদা, হতে পারি না। আমি এসেছিলুম শুধু তোমার ভাই হিসেবে। তোমার কী সব বলবার কথা আছে…শুনতে। শোনা হয়ে গেছে। এবার ওখান থেকে ব্যাগটা নিয়ে আমি চলে যাব।

—সমু, তুই এত রাগ করবি— আমি বুঝতে পারিনি। প্লিজ বি রিজনেবল। আমার কথা থেকে যতটা তোর মনে হয়েছে ওঁরা অতটা ওরকম নন। তুই চলে গেলে ভীষণ ইনসাল্টেড ফিল করবেন!

—আমরা যে কতটা ইনসাল্টেড হচ্ছি সেটা তা হলে তুমি বুঝতে পারছ না! তাতে তোমার কিছু যায় আসে না!

—শোন শোন, তোকে যা-যা বললুম, মানে বাড়ির লোক আসা-যাওয়ার কথা, সে সব ওঁরা ইন সো মেনি ওয়র্ডস বলেননি কখনও। এগুলো আমি জাস্ট বুঝে নিয়েছি।

এত জোর করতে লাগল যে আমি যেতে বাধ্য হলুম। বেশি না না করা আমার কোনওদিনই আসে না।

দাদার ঘরে ঢুকে চান করে একটা পাজামা-পাঞ্জাবি পরলুম। ভিজে চুল আঁচড়ালুম। বসার ঘরে ঢুকে দেখি এক বিশাল বপু সালোয়ার কামিজ পরা মহিলা খুব জমজমে গলায় কথা বলছেন, তাঁর পাশে একটি বছর আট-দশের ছেলে।

আমি নমস্কার করে দাঁড়িয়ে থাকি।

—বৈঠিয়ে বৈঠিয়ে। আপ তো মেরি বেটা জৈসা। সোনু সোনু! উনি গলা তোলেন, এবং একটি লম্বা-চওড়া লালচে ফর্সা মেয়ে ঘরে ঢোকে।

—নমস্তে।

আমি নমস্কার করি।

মেয়েটির কোনও জড়তা নেই। অভিজ্ঞতার ছাপ মুখটাতে, ব্যক্তিত্ব। এ আমার মেরুদণ্ডহীন দাদাকে চালিয়ে নিতে পারবে। আমার দাদা যোগ্য হাতে পড়ছে দেখে আমি নিশ্চিন্ত হই।

বিনা বাক্যব্যয়ে ডিনার সারতে যাই। দলজিৎজি স্ত্রীর মতো অতটা বেঢপ নন। দিল্লি ইউনিভার্সিটির সায়েন্স ফ্যাকাল্টির ডিন, একটু অহঙ্কার আছে বোধহয়। সরসোঁ কি শাক, দু তিন রকমের আচার, তরকা, শুকনো মাংস, ঘন ডাল। এত রকম পদ। আমার কথা ভেবে ওঁরা ভাতও রেখেছিলেন।

—আপ তো সাগর সে ভি হ্যান্ডসাম হ্যাঁয়— সোনু বলল।

—রাইট — তার বাবা একমত হলেন।

দাদা জানাল আমি কীভাবে যোগ-ব্যায়াম করে আমার শরীর তৈরি করেছি।

ওঁরা জানতে চাইলেন— ওঁদের মেয়েকে আমার কেমন লেগেছে।

আমি জানাই খুব ভাল। ওঁদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। জিজ্ঞেস করেন বিবাহ-প্রস্তাবে আমার সায় আছে কি না। আমি জানাই আমাদের নিয়ম বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠতম অর্থাৎ আমার গ্র্যান্ডফাদারকে ওঁদের লিখতে হবে। মনে হয় না কেউ আপত্তি করবেন। ওঁরা স্বস্তি পান।

তখন প্রায় ট্রেনের সময় হয়ে এসেছে। দাদা একটু কঠিন স্বরে বলল— তা যদি বলিস, আমরা কী পেয়েছি ওই বাড়ি থেকে? রাজকুমারকে কেন্দ্র করে ঘুরছে ওখানে জীবন। মায়ের মতো নির্লিপ্ত, ছেলেদের ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন মা আমি আর দেখিনি। পাগল জ্যাঠামশাইয়ের খরচ কেন আমাদেরই বইতে হবে? কাকার মেয়ের ভারই বা কেন আমাদের? দুই বুড়ি তো চিরটাকাল দাদুকে আর মাকে এক্সপ্লয়েট করে গেল। এখন আমাকেও করছে। দাদুকে বলিস টাকাপয়সার জন্যে কাকাকে ওঁর লেখা উচিত। কোনওক্রমে রান্না, একটা মুখে দেবার মতো জিনিস নেই, ওটা একটা হানাবাড়ি। তুই যা-ই-ই মনে করিস আমি ওখানে আর ফিরছি না। তুই-ও যত তাড়াতাড়ি পারিস কেটে পড়। রাজকুমার বুঝুক।

সারারাত ঝমাঝ ঝম করে গাড়ি চলে। বাইরে ভেতরে। একটু ঘুম আসে, আবার চলতি স্টেশনের আলো চোখে পড়ে, ভেঙে যায় ঘুম। তারপর শেষ রাতে ঘোর নিদ্রা আমায় অধিকার করে। ভাবনা, চিন্তা, রাগ, দুঃখ সমস্ত লয় পেয়ে যায়, এক সমৃদ্ধ প্রশান্তির মধ্যে আমি জেগে উঠি এবং মাটিতে পায়ের সামান্য ধাক্কা দিয়ে শূন্যে উঠে যাই। পাখা নেই, তবু মহানন্দে উড়তে থাকি। নীচে বাড়িঘর, ট্রেন, ট্রাম, বাস, মানুষের ভিড়, পুকুর, হ্রদ এবং সমুদ্র। আমার পায়ের সামান্য তলায় গজরাচ্ছে সমুদ্র। যেমনটা বয়স্কাউটের দলের সঙ্গে পুরী গিয়ে দেখেছি। ফুঁসে উঠছে ঢেউয়ের সাদা পাগড়ি। এক্ষুনি বুঝি ছুঁয়ে ফেলল। কিন্তু আমি শূন্যেই পায়ের একটা ধাক্কা মারি। গিয়ার বদলে উঠে যাই আর একটু ওপরে। চন্দ্ৰতারকাহীন মহাকাশ এবং অকূল সাগর। কোথা থেকে একটা আলো আসছে। মৃদু। এ কি আমাদের ঘরের রাত-আলো? জানলার বাইরে থেকে ঢুকে পড়া রাস্তার আলো? সূর্য গ্রহণের সময়ে একটা না-আলো না-আঁধার নেমে আসে চরাচরে। এ কি সেই? আকাশ এবং সাগর নিয়ে আমার কোনও প্রশ্ন নেই। তাদের অবস্থান এবং দুইয়ের মাঝখানে আমার ওড়া যেন একরকম স্বতঃসিদ্ধ। কিন্তু আলোটার উৎস এবং প্রকৃতি নিয়ে আমি ভেবে চলেছি। উড়তে উড়তে ভেবে চলেছি। এমন একটা রহস্য এটা যা আমায় ভেদ করতে হবে।

বাড়ি পৌঁছনো পর্যন্ত এই ঘোর আমার ছিল।


বাড়িটা তিন রাস্তার মোড়ে অর্থাৎ কোণে। দুটো রাস্তা থেকে সোজা আমাদের কোনাচে বাইরের ঘরের অন্দর দেখা যায়। একজন বৃদ্ধ, সাদা ফতুয়া, সাদা লুঙ্গি পরে বসে রয়েছেন। বহুদূর পারাপার পার হয়ে একটা মহাজাগতিক ছবি এসে পৌঁছচ্ছে আমার কাছে অনেক আলোকবর্ষ পরে। কিন্তু ফুরিয়ে যাওয়া, লয় পেয়ে যাওয়া ছবি নয়। এ ছবি স্থির হয়ে আছে অনেক দূরে। বার বার কাছে পৌঁছচ্ছি আবার হারিয়ে ফেলছি। দাদু কি আমার জন্যে অপেক্ষা করছেন? সোজা গিয়ে ঘরে উঠি।

—দাদু!

দাদু আমার দিকে তাকান। দৃষ্টিতে কোনও উৎসাহ নেই। আমি ব্যাগটা রেখে মুখোমুখি চেয়ারে বসি।

—সমু!

—বলো। তোমার কী হয়েছে?

—কী হয়েছে সেটাই বুঝতে পারছি না।

—শরীর খারাপ?

—না।

—মন? দাদু, দাদার জন্যে মন খারাপ?

—না। কোনও রকম মন খারাপ নেই; সেটাই অদ্ভুত। … আমার বিরাশি কমপ্লিট হয়ে গেল সমু। যে রকম জোরের সঙ্গে সবকিছু মুঠোয় করে রেখেছিলুম, সেই … মুঠোটা আলগা হয়ে যাচ্ছে। তুমি দিল্লি থেকে যে খবর এনেছ, যা-ই এনে থাকো, আমায় না বললেও চলে। কিছু এসে যাবে না।

কী গভীর অভিমান থেকে দাদু কথাগুলো বলছেন অনুভব করি। প্রসঙ্গ ঘোরাই।

—বেশ ভাল লাগলো ওঁদের। ওই অরোরাদের … যাঁদের মেয়ের কথা দাদা তোমাদের আগেই জানিয়েছে। ওঁরা তোমাকে চিঠি লিখবেন। রেজিষ্ট্রি ম্যারেজ করতে চায় দাদা, ওখানেই।

দাদু কেন জিজ্ঞেস করলেন না। আমার মনে হল এখানে বিয়ে হওয়ার মূল অসুবিধেটা ওঁকে জানিয়ে দেওয়া ভাল।

—আসলে দাদু, মেয়েটি ডিভোর্সি। ওঁরা চান না এ নিয়ে কোনও কথা উঠুক।—ঘটা পটা আনুষ্ঠানিক বিয়ে ইত্যাদি ওঁরা কিছুই তাই চান না।

—বেশ।

মা এসে ঢুকলেন — ও তুমি এসে গেছ? কী হল?

আমি শুধু কথাগুলো আবার বলি।

কিছুক্ষণ পরে মা বললেন— আজকে একটা প্রচণ্ড চ্যাঁচামেচি হবে বাবা।

—হোক। কিছুতে কিছু এসে যাবে না। সমু একটা কাজ করবে?

—বলো!

—আমাকে দুটো জিনিস খাওয়াবে?

অবাক হয়ে বললুম— কী?

—ফুচকা আর আইসক্রিম। দিদিভাই খুব ফুচকা খায়, কী এমন জিনিস, একটু চেখে দেখব। আর আইসক্রিম। বহুদিন বহু অভ্যাসে সংযত খাওয়া-দাওয়া করেছি। হঠাৎ হঠাৎ আইসক্রিমের গন্ধ পাই। ওইখানটা একটু বাকি আছে।

শেষ কথাটার মানে বুঝলুম না। মা খুব চিন্তিত চোখে চাইলেন, একবার আমার দিকে, একবার দাদুর দিকে।

মায়ের দিকে চাইলেন দাদু। —আমার ইচ্ছে হয়েছে বললুম। তোমাদের ইচ্ছে না হয়— দিয়ো না।

যখন আনলুম আইসক্রিম দু-তিন চামচ খেয়ে বললেন কোনও বিশেষ স্বাদ তো টের পাচ্ছি না। সমু, আমাদের অল্প বয়সে আইসক্রিমের খুব ভাল স্বাদ-গন্ধ ছিল। ম্যাগনোলিয়া, ম্যাগনোলিয়া বোধহয়। তা ছাড়া মালাই-বরফের খুব চল ছিল। সিদ্ধি দেওয়া, হালকা সবুজ, বুঝলে? কে জানে তারই গন্ধ পেলুম কি না। তফাত করতে পারছি না।

ফুচকা খেয়েও দাদু কিছু তফাত করতে পারলেন না। বললেন— তোমার খই দুধের সঙ্গে এই দিদিভাইয়ের ফুচকার কিছু তফাত বুঝছি না। আমাদের যৌবন বয়সে, বুঝলে সমু, হাতে ছোট বালতির উনুন ঝুলিয়ে পকৌড়িঅলা যেত, আর তোমার বাবাদের সময়ে পাওয়া যেত লড়াইয়ের চপ। সেসব খেলে দিদিভাই আর এসব আনতাবড়ি জিনিস খেতে চাইত না।

দাদু নীচের ঘরে একলা থাকেন। পাশের ঘরে দুই দিদা। আমি মাকে বলি ক্যাম্পখাটটা আমি দাদুর ঘরে পেতে নিচ্ছি। আজ এখানেই শোব।

গভীর রাতে দাদু বললেন— সমু ঘুমোলে?

—না দাদু।

—তোমায় কটা কথা বলি।

—বলো।

—যতদূর মনে পড়ছে বলি। আমি খুব সম্ভব খুব স্ট্রাগল্‌ করে আমার জায়গায় পৌঁছেছিলুম। আমার দাদারা হঠাৎ পরপর মারা গেলেন। তোমার জ্যাঠা খুব বড় স্কলার ছিলেন। উনি কাউকে ভালবেসেছিলেন, মেয়েটি ওঁকে ঠকায়, সেই থেকে মাথার গোলমাল হতে হতে একেবারে উন্মাদ। কিন্তু এখন উনি একরকম ভাল হয়ে গেছেন। ভায়োলেন্স আর নেই। খুব নিরীহ। ওঁকে আমাদের নিয়ে আসাই উচিত। তোমার কাকা এখন কানাডায়, তার দ্বিতীয় স্ত্রী মারা গেছেন। একটি ছেলেও। অন্যটি দিদিভাইয়ের থেকে বছর চারের ছোট। তাকে নিয়ে তোমার কাকা খুব মুশকিলে পড়েছে। এখন চাইছে দিদিভাই ওখানে গিয়ে থাক। আমার মনে হয় ও মরিয়া হয়ে দিদিভাইকেও এরপর লিখবে। তোমাকে খুব সম্ভব একটা সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। দিদিভাই এখনও এত বড় হয়নি যে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারবে। তুমি ওকে সঠিক পরামর্শ দিয়ো। একটা ইমোশন্যাল আপহিভ্যাল হবে। আমার বয়সে পৌঁছলে বুঝবে তার কোনও সত্যি মূল্য নেই। তোমরা, আমার দুই ছেলে, বউমা, দুই নাতি, কাউকে ভালবাসনি। বড্ড আলগা। তোমার দাদা ভালবাসবার লোক খুঁজে পেয়েছে বলে আমি নিশ্চিন্ত। বড় ছেলেটি ভালবেসে কষ্ট পেল, আর বাকি সবাই না ভালবেসে। ফিনকিই একমাত্র আশা তোমাদের।

দাদু চুপ করে গেলেন।

পরদিন হস্টেলে চলে গেলুম। আমার ফাইন্যাল সেমিস্টারের পরীক্ষার দিনে রাত এগারোটা নাগাদ ফোন এল দাদু চলে গেছেন। খুব ভোরে, নিঃশব্দে, আমার পরীক্ষা ছিল বলে আমাকে খবর দেওয়া হয়নি।


তা হলে এই! দাদুর শেষ উপলব্ধি যদি ঠিক হয় তা হলে একদিকে স্বার্থপরতা আরেক দিকে শুকনো কর্তব্যপরায়ণতার উত্তরাধিকার আমাদের। কাকা চলে গেছেন, দাদা চলে গেল, বাবা থেকেও নেই। কিন্তু কর্তব্য, শুধু শুকনো কর্তব্য? এ সব কথা সম্পূর্ণ মেনে নেওয়া শক্ত। মা? দাদাও মাকে উদাসীন বলেছিল। আমি দেখেছি মায়ের সুখদুঃখের অনুভূতি দৃশ্যত কম। ভেতরটায় কী? স্বল্পবাক মানুষের ভেতরটা জানা কঠিন।

কাকার চিঠি। গোটা চারেক। দাদুর ক্যাশবাকসো থেকে নিয়ে পড়ি। একই কথা। ছেলে এখন হাইস্কুল। তাঁর চাকরি খুব কম সময় দেয় তাঁকে। ফিনকি এলে সব দিক রক্ষা হয়। আমরাও বাড়ন্ত একটি মেয়ের দায় থেকে বাঁচি, কাকারও সুবিধে হয়।

জ্যাঠার অ্যাসাইলাম থেকে চিঠি। তাঁদের ফিজ বাড়ছে, তা ছাড়া দেবকুমারবাবু ভাল আছেন। ওঁকে আমরা নিয়ে আসতে পারি।

এ চিঠিটা দেখাই বাবাকে।

—এত ফিজ তো আর দেওয়া সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে সরকারি গারদে রাখবার কথা চিন্তা করা যেতে পারে।

—কিন্তু দাদু বলেছেন ওঁকে নিয়ে আসতে।

—বাবার ভীমরতি ধরেছিল। এসব ঝামেলা বাড়িতে ঢোকাতে নেই।

—তুমি একবার না হয় দেখে এসো— আমি বলি।

—আমি খুব নার্ভাস হয়ে যাই এসব ব্যাপারে সমু। দেখতে হয় তুমি দেখে এসো।

—মা, কী করব!

—তোমার দাদু যা বলে গেছেন তাই করা উচিত। ভাসুরঠাকুরের ওপর আমাদের কিছু কর্তব্যও তো আছে!

সুতরাং দক্ষিণ শহরতলি প্রান্তে সেই অ্যাসাইলামে আমি যাই। চতুর্দিকে কোল্যাপসিবল গেট। দারোয়ান। আমাকে ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করতে বলা হয়। ঘরটা বেশ বড়, উঁচু সিলিং-এর। টেবিল চেয়ার নিয়ে একদিকে গম্ভীর মুখ এক ভদ্রলোক ফাইল খুলে বসে আছেন। এত শক্ত মুখ কেন ওঁর? পাগল সামলাতে কী কী লাগে? গায়ের জোর, দৃঢ়তা দরকার, বুঝি। কিন্তু দরদ? একটু সমবেদন নরম মুখ, শান্ত আশ্রয়শীল ব্যবহার লাগে না এসব? সাতপুরনো জাবদা খাতার মতো এমন মুখ?

চারদিকে পিঠ তোলা কাঠের বেঞ্চি পাতা। ব্যবহারে ব্যবহারে তেলতেলে হয়ে আছে।

আমার সামনেই দু’তিনটে ‘কেস’ ঢুকে গেল। রীতিমতো জবরদস্তি করে নিয়ে গেল দু’ তিন জন লোক। সবাই উর্দিপরা। চোখ লাল, বিড়বিড় করছে মানুষটি। আমার চেয়ে হয়তো সামান্য বড় হবে। ও কি বুঝেছে? এই পৃথিবী এই সব মানুষ খুব অন্যরকম? ওর সঙ্গে মিলছে না? কে জানে হয়তো ও-ই ঠিক। ওর ভাষা কেউ বুঝছে না, তাই…। না, দেবকুমারকেও নিশ্চয়ই এমনি ভাবেই নিয়ে আসা হয়েছিল। তিনি বিশ্বাস হারিয়েছিলেন মানুষের ওপর। গ্রহান্তরের কোনও ব্যাপার—ছিল না তো!

অন্য দুজন নিশ্চুপ। কোনও প্রতিরোধ নেই। নিজেদের অন্যদের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। যা হয় হোক। তবে যা হয় হোক। এক ব্যাখ্যাতীত হতাশা সমস্ত শরীরে। হাতে পায়ে স্বাভাবিক অথচ আচরণে আলাদা মানুষগুলিকে দেখতে দেখতে মনে হল ওরা কিছু একটা মেলাতে পারেনি। কোনও অঙ্ক। ওদের দুয়ে দুয়ে চার হয়নি। প্রাণপণে হাতড়েছে, হাতড়েছে। এখন হতভম্ব হয়ে গেছে—তা হলে এ প্রশ্নের উত্তর কী? উত্তর যদি না-ই থাকবে তবে প্রশ্ন কেন?

শীর্ণ এক ভদ্রলোককে নিয়ে আসে গার্ড। পাজামা আর ফতুয়া পরা। এক মাথা পাকা চুল। চোখে খুব ভীত দৃষ্টি। দাদুর সঙ্গে, আমার বাবার সঙ্গে, এমনকী আমার সঙ্গেও মিল স্পষ্ট। আমি এঁকে জীবনে সেভাবে দেখিনি। আমার পুরো জ্ঞান হবার আগেই ইনি স্থানান্তরিত হয়েছেন। দাদা দেখেছে, দাদার এঁর সম্পর্কে স্মৃতি খুব তিক্ত।

—বাবা কই? বাবা? ভদ্রলোক দিশেহারা ভাবে বললেন। তারপর আমার দিকে চোখ পড়ল।

—রাজ, তুমি এসেছ? —এগিয়ে এসে খুব আদরে উনি আমায় জড়িয়ে ধরলেন। একটা অস্বস্তিকর গন্ধ। আমি শক্ত থাকবার চেষ্টা করি। তার মানে বাবার চেহারা ওঁর মনে আছে।

—এখানে এরা আমাকে রোজ চারাপোনা খেতে দেয় রাজ, আমাকে দিয়ে জামাকাপড় কাচায়, একটা লোককে সারাক্ষণ হাত-পা টিপে দিতে হয় আমায়। জানো ভাই, আমার ঘরে একটা লোক গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। ভয়ে মরি। পুলিশ-টুলিশ! যত বলছি আমি কিছু করিনি বিশ্বাস করছে না। —উনি কাঁপতে থাকেন। আমি ওঁকে আস্তে আস্তে চেয়ারে বসিয়ে দিই। বলি— আপনি বাড়ি যাবেন?

—বাড়ি? উনি অবাক হয়ে তাকান — আমার বাড়ি আছে?

—আছে।

—তা হলে এদের এই অত্যাচার থেকে আমায় বাঁচাও ভাই। নিয়ে চলো। বাবার কাছে।

একটু অপেক্ষা করি, তারপর বলি— আমি কিন্তু আপনার ভাই রাজকুমার নই। আমি আপনার ভাইপো। আমার নাম সমুদ্র।

উনি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকান। —আমার ভাই কি বেঁচে নেই?

—না না, উনি আছেন।

—বাবা? বাবা আসেনি কেন?

একটু চিন্তা করতে হয় আমাকে। খবরটা এখানে দেব, না বাড়িতে গিয়ে দেওয়া ভাল? বাড়িতে গিয়ে যদি প্রতিক্রিয়া খারাপ হয়, তো আমরা কি সামলাতে পারব? এখানে যদি বলি— ওঁর রাতটা খুব যন্ত্রণায় কাটবে। কিন্তু এখানে অন্ততপক্ষে সামলাবার লোক আছে। আমি আস্তে আস্তে বলি— দাদুর তো অনেক বয়স হয়ে গেছে। একাশি-বিরাশি পার।

—বাবার বয়স? একাশি? বিরাশি? তাতে কী হয়েছে! বাবাই তো আমার দেখাশোনা করেন!

তখন আমি বলি— এখন আপনি ভাল হয়ে গেছেন। আর আপনাকে দেখাশোনা করতে হবে না। আপনি নিজেই পারবেন। পারবেন না?

উনি ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে চান।

আমি বলি— এত বয়সে কি আর কেউ বেঁচে থাকে জেঠু! দাদু কিন্তু মারা গেছেন।

—অ্যাঁ? আঁক করে উঠলেন। তারপরে চুপ করে গেলেন, একেবারে চুপ। মুখের কালি গাঢ়তর। চোখে যন্ত্রণার ছাপ।

—আমার জন্যেই। আমি বাবাকে কষ্ট দিয়েছি। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন।

একসময়ে ওঁর কান্না থেমে গেল। জামার হাতা দিয়ে চোখ মুছলেন উনি। আমি বললুম— জেঠু আপনি এখন আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়। দাদু বলে গেছেন— এবার থেকে আপনিই আমাদের দেখবেন। আপনিই অভিভাবক।

—তোমরা জানো না আমার মাথা খারাপ?

—মানুষের কত রকমের অসুখ হয়, আবার সেরেও তো যায়! এঁরা খবর দিয়েছেন আপনি একেবারে সেরে গেছেন। ওষুধপত্র খেতে হবে অবশ্য। নিয়ম করে …

—চলো তা হলে যাই — উনি উঠে দাঁড়ালেন।

—আমি কালকে আপনাকে নিয়ে যাব। আপনার ঘর-টর ঠিক করতে হবে তো?

—ঠিক নিয়ে যাবে তো? —করুণ সুরে উনি বললেন।

—ঠিক — আমি ওঁর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করি।

বাবা সেদিন রাতে খেলেন না। সিঁড়ির ওপর পায়ের শব্দ হতে লাগল ধম ধম ধম ধম। মায়ের দিকে তাকিয়ে খুব খারাপ লাগল। এঁর ভার দুর্বহ। সারা জীবন ধরে বইছেন, আমি আরও ভার চাপাতে চাইছি। আমার উপায়ই বা কী!

ফিনকির সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলি।

—তোর কি ভয় করছে?

—কামড়ে দেবেন না তো!

—না, সেরকম কিছু নয়।

—জেঠুর কথা কখনও শুনিনি কেন রে ছোড়দা?

—কী জানি, আনপ্লেজেন্ট বলে তোকে কেউ বলেনি হয়তো!

—ঠিক করেনি। আমার কিন্তু সত্যিই খুব ভয় করছে। ওঁকে হাসপাতালেই রাখলে ভাল হত না?

—ফিনকি, এখন আর হাসপাতালের খরচ চালাবার সাধ্য আমাদের নেই। আর ওঁর দিকটাও ভেবে দ্যাখ, উনি ভাল হয়ে গেছেন। এখন অ্যাবনর্ম্যাল লোকেদের সঙ্গে থাকা কি খুব ভয়ানক নয়?

—আমাকে যত শিগগির সম্ভব পাশ-টাশ করে একটা চাকরি করতে হবে। বুঝলি ছোড়দা!

—যত শিগগিরই হোক, যা সময় লাগার তা তো লাগবেই — আমি হেসে বলি, তারপর ওর চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে বলি— তোর অবশ্য একটা বিকল্প আছে।

—বিকল্প? মানে?

—মানে, কাকা তোকে কানাডা নিয়ে যেতে চাইছেন। ওখানে তুই অনেক ভাল ভাল সুযোগ পাবি। ধর তোর জীবনটাই বদলে যাবে।

—হঠাৎ? ওর ভুরু কুঁচকে গেছে।

—হঠাৎ-ই। আসলে কাকিমা আর ওঁর ছোট ছেলে মোটর দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। বাড়িতে উনি আর ওঁর বড় ছেলে। তাই …

—তাই বলো! —ঠোঁট বেঁকে গেল ওর — স্বার্থ। কিছুদিন পরে দাদার যখন অসুবিধে হবে, ধর বাচ্চাকে কার কাছে রেখে যাবে, দুজনেই চাকরি করে, তখনও আমি এরকম একটা অফার পেতে পারি। তাই না?—আমি হাসি।

—তোকে ছেড়ে, মা-বাবাকে ছেড়ে, দিদুদের ছেড়ে আমি কোথাও যাব না।

—বিয়ে হয়ে গেলে?

—সে যখন হবে তখন দেখা যাবে। আপাতত আমি এখান থেকে নড়ছি না।

পরদিন ফিনকিকে সঙ্গে নিয়ে জেঠুকে আনতে গেলুম।

দাদুর ঠিক ওপরের ঘরে ওঁর থাকবার ব্যবস্থা হয়েছে। চারিদিকে দাদুর ছবি, ওঁর যৌবনের ছবি, বাবা উনি আর কাকা একসঙ্গে, স্কুল বয়, পাশ করে সবে চাকরিতে ঢুকেছেন, উজ্জ্বল চেহারা, যত পারি দেয়ালে দেয়ালে টাঙিয়েছি, টেবিলের কাচের তলায় কিছু। ভেবেচিন্তে। চেনা মানুষদের চেনা চেহারা তো আর জীবনে দেখতে পাবেন না। অচেনা ফাঁকগুলোর মধ্যে চেনাগুলো যদি ফিট করে দেওয়া যায় তা হলে হয়তো একটু সহনীয় হবে নতুন জীবন।

সবই অবশ্য করেছে ফিনকি। আমি বলেছি, ও করেছে। ছবি সাজাতে সাজাতে বলল— মাঝখান থেকে পঁচিশ ছাব্বিশ বছর হারিয়ে গেছে, ছোড়দা, কী ভয়ংকর না?

খুব সংকুচিত হয়ে ট্যাক্সির এক ধারে বসে উনি বাড়ি এলেন। ঘরের মধ্যে যে ঢুকে গেলেন, বাস। দিদারা কান্নাকাটি করে জড়িয়ে ধরলেন, মা প্রণাম করলেন, পা কুঁকড়ে দাঁড়িয়ে রইলেন উনি। তারপর ঘরে ঢুকে নিশ্চিন্ত।

আর ঠিক তিনদিন পরে আমাকে অফিস জয়েন করতে হবে। বেশির ভাগই পেয়েছিলুম কলকাতার বাইরে। কিন্তু সেগুলো নেওয়ার পরিস্থিতি নেই।

এই যে কতকগুলো সিদ্ধান্ত নিলুম, এগুলো কি আমার? না কি দাদুর? দাদার কথা শুনতে দিল্লি যাওয়া, জেঠুকে নিয়ে আসা, ফিনকির কাছে কানাডা যাবার প্রস্তাব রাখা, এবং এই দূরে চাকরি না নেওয়া! দাদুকে অনুসরণ করেছি, ঠিকই। কিন্তু আমি তো মানতে না-ও পারতুম। বাবা তো আমার সঙ্গে কথাই বলছেন না। দিদারা সিঁটিয়ে আছেন। অশান্তি কে চায়? মা যন্ত্রের মতো তাঁর কর্তব্যের রুটিন পালন করে যাচ্ছেন। দাদুর জায়গা নিয়েছেন জেঠু। সেই বারবার খাবার দিয়ে আসা, বসা, নিয়ে আসা, প্রতিদিনের জামাকাপড় গুছিয়ে রেখে আসা, ছাড়া কাপড় কাচতে দেওয়া। দাদুর সঙ্গে মায়ের কথোপকথনের মধ্যে যে উদ্দীপক অংশটুকু ছিল সেটা শুধু আর নেই। জেঠু সসঙ্কোচে চুপ করে থাকেন।

প্রথম রবিবারে আমি নিজের খাবার থালা নিয়ে জেঠুর ঘরে যাই। টেবিলের কাচের ওপর দুটো থালা রাখি খবরের কাগজ বিছিয়ে। সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছেন উনি। আমি লক্ষ করি না।

বলি— জেঠু আমাদের রান্না আপনার ভাল লাগছে?

অনেকখানি ঘাড় নাড়েন উনি।

—কী কী ভালবাসেন?

—সব। তোমার মা যা দ্যান …। উনি চারাপোনা দ্যান না। খেসারির ডাল দ্যান না।

এগুলো হাসপাতালে দিত বুঝতে পারি। সম্ভবত রোজ।

—আমি কিছু করি না।

—খান। এই দেখুন আপনার সঙ্গে খাব বলে আমার থালা নিয়ে এসেছি।

—রাজ আসে না। ও বেঁচে আছে?

—হ্যাঁ। আসলে বাবার অফিসে ভীষণ কাজ পড়েছে।

—আমরা দুজনে সিনেমা দেখতে যেতুম। মহল, কবি, গ্যাসলাইট, জোন অব আর্ক, আমরা একই ক্লাবে খেলতুম।

—কী খেলতেন জেঠু? কী নাম আপনাদের ক্লাবের?

—বন্ধুদল। সব রকম খেলা। টেনিস ছাড়া সব। রাজ ইনডোর ভালবাসত। ক্যারম। ওপরে আলো টাঙিয়ে— জেঠু ওপরে হাত দ্যাখান। —এখন খেলে? ক্যারম? চেস?

—কী জানি! আপনি জিজ্ঞেস করবেন।

—না, না, আমি সে পারব না। তুমি জিজ্ঞেস করো। তুমি সাগর, না?

—আমি সমুদ্র, জেঠু। সাগর দিল্লিতে থাকে।

—মেয়েটি কে?

—আমার বোন, ফিনকি।

—ভাল মেয়ে?

—খুব ভাল।

আমি অফিস যাই। ফিনকি কলেজ যায়। বাবা অফিস যান। বাড়িতে দুই বৃদ্ধা এক মানসিক রোগগ্রস্ত বৃদ্ধের দায়িত্ব একলা মায়ের ওপর। প্রতিদিন যাই অপরাধবোধ নিয়ে, প্রতিদিন ফিরি অপরাধবোধ নিয়ে। দেখতে পাই ফিনকি আস্তে আস্তে জেঠুকে ওষুধ খাওয়ানো, তাঁকে একটু-আধটু সঙ্গ দেওয়ার কাজটা নিজের হাতে তুলে নিয়েছে। রাত্তিরে ঠিক ন’টার সময়ে খাওয়া-দাওয়া হলে ওঁকে ঘুমোতে দেওয়া হয়। বাবা ফিরলে বাবা আর ফিনকি খেতে বসে, আমি মায়ের সঙ্গে বসি। বাবার খাওয়ার সময়টা আমি অনেক সময়েই দিদাদের ঘরে একটুখানি বসি। খুব নিপাট পরিষ্কার চন্দনের গন্ধ বেরোয়। একদিকে দেয়ালে গাঁথা ছোট্ট একটু তাক মতো। তার ওপর বালগোপালের রুপোর সিংহাসন। দুটো খাটে দুটো কম্বলের আসন পাতা। ওখানে বসে ওঁরা জপতপ করেন। দুজনেই নিঃসন্তান, আমাদের ছোটবেলা কেটেছে মোটামুটি ওঁদেরই তত্ত্বাবধানে। কিন্তু বড় তাড়াতাড়ি ওঁরা নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন। আমার নিজের ঠাকুমা হলে কি পারতেন? কেন এমন হল? ওঁরা যেন এ পরিবারের কেউ নয়। আমি যদ্দূর জানি দুজনেই উইডো পেনশন পান। তাতে দাদু কোনওদিনই হাত দেননি। মাঝেমধ্যে নিজেদের ইচ্ছেয় সংসারের জন্য কিছু খরচ করেন, উপহার দেন। মাকে পুজোয় একটা শাড়ি, আমাদের পাশ করবার পর একটা কলম। দাদাকে হাতঘড়ি দিয়েছিলেন। ফিনকিকে ছোটবেলায় ফ্রক কিনে দিতেন। এখন কি দ্যান? আমি জানি না। এসব কথা আমার মাথায় আসেনি এতদিন। দাদার কথা, দাদুর কথা, মায়ের ভাবনা এইসব থেকে ইদানীং আসছে। ভাসমান দুটি দ্বীপ। অনেক দিন দেখেছি বাবার খাওয়ার সময়ে দুজনের একজন গিয়ে বসেছেন। কিন্তু বাবার নিত্যদিনের চেঁচামেচি বোধহয় সহ্য হত না, আস্তে আস্তে বন্ধ করে দিয়েছেন। আমি এই জলধির নির্জন দ্বীপগুলির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করবার চেষ্টা করে যাই। দুই দিদা, জেঠু, এমনকী মা …। আমরা সবাই কি এক জায়গায় বাস করি? বোধ হয় না। এক বাড়ি, কিন্তু আলাদা ঘর, প্রত্যেক ঘরে ঢুকতে হাওয়া নিজেকে একটু পাল্টে নেয়। এ যেন পান্থনিবাস। একসঙ্গে অথচ আলাদা আলাদা আমরা কোথায় চলেছি?

হঠাৎ শুনি— খাবার ঘরে যেন একটু জোর গলা শোনা যাচ্ছে। দুই বৃদ্ধা চকিত হয়ে উঠলেন। গলাটা কিন্তু বাবার নয়। একটু শুনে বুঝতে পারি ফিনকির।

—এর কোনও মানেও হয় না, ক্ষমাও হয় না —ফিনকি বলছে। ওর কানের রিং দুলছে। গাল চকচক করছে। এক হাত দিয়ে ওড়নাটা পিঠে ফেলল। ও বাবাকে একটুও ভয় বা সমীহ করে না।

—আমার যদি ইচ্ছে না হয় … বাবার গলার স্বর এমনিতেই গম্ভীর। এখনও গম্ভীর শোনাল। কিন্তু তার ভেতরে কোথাও একটা দুর্বলতা আছে। ফিনকির ক্রুদ্ধ মূর্তির সামনে বাবা নিরস্ত্র।

—আমারও যদি ইচ্ছে না হয় তোমার সঙ্গে এরকম গল্প করি, মায়ের যদি ইচ্ছে না হয় প্রতিদিন তোমার ফরমাশ খাটতে, ছোড়দার যদি ইচ্ছে হয় দাদার মতো বিদেশে চাকরি নিতে …

—মানে? সমু কি অন্য জায়গায় …

—ছোড়দা জামশেদপুর কি বম্বে গেলে অনেক বেশি মাইনে পেত। যায়নি। কেন সেটা তোমার বোঝা উচিত। সবাইকার কথা ভেবে কিছু কিছু জিনিস অনিচ্ছাসত্ত্বেও করতে হয়। জেঠু আজও তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিলেন। উনি ভাবছেন উনি কাজকর্ম করেন না বলে তুমি রাগ করেছ। আমি তোমাকে বলে দিচ্ছি বাবা, রোজ তোমার ওই একঘেয়ে গল্প শুনতে আমার ভাল লাগে না, লাগে না, লাগে না। শুধু তোমার ভাল লাগবে বলে শুনি।

মায়ের গলা শুনি— আঃ, ফিনকি!

—কাল থেকে আর শুনব না। আসব না। আমার কী দরকার! তা ছাড়া ইচ্ছে হলেই তো আমি কানাডায় চলে যেতে পারি।

—অ্যাঁ? বাবা একটা ফ্যাঁসফেঁসে চিৎকার করলেন।

—হ্যাঁ, কাকা আমাকে অফার দিচ্ছেন, আমি যেতেই পারি, আমার জীবনটাই অন্যরকম হয়ে যাবে।

হাতে গরস বাবা, লুচির ঝুড়ি হাতে মা স্থাণু হয়ে বসে এবং দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আমি সেই সময়ে ঢুকি। ফিনকিতে এসে বাবার পথ মায়ের পথ মিলে গেছে। ফিনকিই আমাদের একমাত্র ভরসা।

—আমার ভয় করে। সে সময়ে দাদার বাই চাপলে আমাকে মেরে পাট করে দিত। পাঁজরে চিড় খেয়েছিল একবার। সমু তুমিই বলো আমার ভয় করাটা কি অন্যায্য?

—কীসের ভয়? —কীসের কথা হচ্ছে, মা?

বাবা বললেন— তোমাদের জেঠুর কথা হচ্ছে। তোমরা তো নিয়ে এসে খালাস। এখন আমাকে জোর করছ কাছে যেতে। আই ডিটেস্ট হিম।

—একবার গেলে হয়তো আর অতটা …. থাকবে না, তুমি গিয়েই দেখ না। আজ জেঠু ঘুমিয়ে পড়েছেন। কাল একবার যেয়ো। ফিনকিকে সঙ্গে করেই না হয় যেয়ো। —আমি খুব হালকা চালে বলি।

—তোমরা আমাকে … বাবা রাগে আবেগে থরথর করতে করতে উঠে গেলেন। আমি ফিনকিকে বললুম— তুই বাবার খাবার সময়ে কথাটা তুললি কেন?

—আর কখন পাই? এক খাওয়ার পরে ওপরে বাবার ঘরে গিয়ে বলতে হয়। কাছেই জেঠুর ঘর, জেঠুর কানে গেলে কী হবে বল তো! বাবা তো আস্তে কথা বলবে না!

বলে ফিনকি ফিক করে হেসে ফেলল—বাবার খাওয়া প্রায় হয়েই এসেছিল, দ্যাখ একটা মাত্র লুচি পড়ে আছে, বাটিতে একটাই আলুর দম। মা, এবার তোমার পাখির আহার নিয়ে এসো, ছোড়দাও এসে গেছে।

—আমার একটু পড়া আছে মা, উঠি? একটু পরেই ফিনকি উঠে গেল। তখন মা, একটু ইতস্তত করে বললেন— সমু, কানাডার কথা ও কী বলছিল!

—দাদুর বাক্সে কাকার চিঠি পেয়েছি কতকগুলো। উনি ওকে নিয়ে যেতে চাইছেন।

—ও কি জানে?

—না। আমার মনে হয়েছিল অফারটার কথা ওকে জানানো দরকার। ওটা ওর প্রাপ্য মা।

—ঠিকই বলেছ। ওটা ওর প্রাপ্য — কথাগুলো কেমন মন্ত্রের মতো আউড়ে গেলেন মা। মা’র মুখ সাদা হয়ে গেছে। থালার ওপর একটা হাত, থেমে গেছে।

—ও অফারটা নিতে চায়নি মা। ওর ধারণা, হয়তো ঠিক ধারণাই। যে কাকা এখন একটু বিপাকে পড়েছেন, তাই-ই নিয়ে যেতে চাইছেন।

—তা হলে বলল কেন?

—হয়তো বাবাকে ভয় দেখাতে।।

—কিন্তু ও যদি জানতে পারে আসল কথাটা ও তো রাগ করতে পারে আমাদের ওপর। তখন? তা ছাড়া নবকুমারের অধিকারটা তো বেশি বটেই।

—মা, সেই আসল কথাটাই এখন নকল হয়ে গেছে। অবান্তর। ওগুলো বলার ভাবার কোনও প্রয়োজন নেই। আর অধিকারের কথা যদি বলো— ফিনকির আঠারো বছর বয়স হয়ে গেছে। এখন ডিসিশন ওর। একটু খেয়ে বলি— যেমন চলছে চলতে দাও। ভেবো না।

—না, ভাবব আর কী! আমার ভাবনার কী-ই বা মানে?

১০
দাদু মারা যাবার পর আমার ঘাড়ে অতিরিক্ত বোঝা চেপেছে, তবু আমার কী রকম হালকা লাগে। কেন আমি বুঝি না। দাদুই ছিলেন আমার একমাত্র বন্ধু। দাদুকে যা বলতে পারতুম, অন্য কাউকেই তা পারতুম না। ঘোর বন্ধন একটা। হস্টেল থেকে বাড়ি আসতুম শুধু ফিনকির জন্যে নয়, দাদুর জন্যেও। দাদুকে বুঝতে দিতুম না। আমার প্রকাশ চিরকালই কম। তবু দাদু হয়তো বুঝতেন, তাঁর প্রকাশ বেশি, কিন্তু তিনিও আমাকে কোনওদিন বুঝতে দ্যাননি যে তিনি আমার টান বুঝেছেন। আর যেহেতু দাদু পুরো পরিবারটার ভাল-মন্দের সঙ্গে অমন নিবিড় ভাবে যুক্ত, তাই দাদুর আগ্রহগুলোতে অংশ না নিয়ে আমি পারতুম না। আর এমনই অন্তর্দৃষ্টি ছিল ওঁর আমাদের বিষয়ে! কী যেন বলেছিলেন দাদার বিষয়ে— ওর কাছ থেকে বিশেষ কিছু আশা কোরো না! কী যেন বলেছিলেন আমাকে — হেরোইন খেয়ে, খারাপ পাড়ায় যাবার পর! —তুমি বড় হয়ে গেছ। আর ফিনকি? ফিনকিই একমাত্র আশা তোমাদের। আমাকেও কি উনি ডিসমিস্ করে গিয়েছিলেন? তা হলে শেষ কথাগুলো কেন আমাকে বললেন? আর কেউ বলবার ছিল না, অথচ কথাগুলো বলা দরকার ছিল বলে?

এখন কথাগুলো, দাদুর সে সময়কার আচরণ মনে মনে তোলা পাড়া করি, মেট্রো রেলের কাজ হচ্ছে। সাইটে আছি। ক্রেন, থিয়োডোলাইট, মিক্সার, স্তূপীকৃত স্টোন চিপস্ ও অজস্র শ্রমিকের মাঝখানে খোঁড়া গর্তের পাশে দাঁড়িয়ে আছি। একটানা আওয়াজ, আমি হঠাৎ বুঝতে পারি ঘটনাটা। দাদু জীবন সম্পর্কে সমস্ত আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। এটা কোনও মান-অভিমানের প্রশ্ন নয়। বাড়ির সকলের উদাসীনতা আত্মপরতার শূন্যতা দাদু নিজের প্রবল আসক্তি দিয়ে সারাজীবন পূর্ণ করে গেছেন। ওঁর মনে হত উনি ছাড়া আর কোনও কাণ্ডারী নেই। ওঁর দাদারা মৃত, দুই বিধবার বিপুল ভার, বড় ছেলে উন্মাদ, তার সমস্ত দেখাশোনা ও আর্থিক দায়িত্ব আর কেউই তো নিতে চায়নি। ভালবাসার সঙ্গে আসে কর্তব্যবোধ। তিনি করেছিলেন, মেজ ছেলের কোনও দায়িত্ববোধ ছিল না। অথচ পরিবার বলতে যা বোঝায় তা তো তাঁরই। ছোট ছেলে স্রেফ চুপচাপ পালিয়ে গেল। পরের প্রজন্মে দাদা অবিকল কাকার পথ অনুসরণ করল। এদের সবাইকার প্রেমহীনতার উল্টো দিকে তাঁর প্রবল ভালবাসা, নিঃশব্দ, নির্বিচার, কিন্তু সবসময়ে সক্রিয়। এই আসক্তিই জীবন।