স্বামীরা – লীলা মজুমদার

স্বামীরা - লীলা মজুমদার

স্বামীদের কথা বলতে হলে আমার শ্রদ্ধাভাজন মাস্টারমশাই জয়গোপাল বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়েই শুরু করি। অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল তাঁর। ইংরেজি কাব্যসাহিত্য যাকে বলে তাঁর নখাগ্রে থাকত। কিন্তু আমি যখন তাঁকে প্রথম দেখি, তখন অতটা টের পাইনি। আমার বয়স হয়তো সাত কি আট। গরমের ছুটিতে ওঁরা পাহাড়ে এলেন। আমাদের পাশের বাড়ির ওপাশের বাড়িতে উঠলেন।

দুপুরে মাস্টারমশাই বোধহয় পড়াশুনো করতেন। ওঁর স্ত্রী সেই সময়ে আমার মা’র সঙ্গে গল্প করতে আসতেন। আমার স্পষ্ট মনে আছে, একদিন তিনি মাকে বলছিলেন, “আমার স্বামীকে লোকে ভারী ভালমানুষ বলে, কিন্তু ওঁর সঙ্গে ঘর করা যে কী কঠিন ব্যাপার তা জানলে কেউ বলত না। এই ধরুন ভাই, পাহাড়ে আসবার আগে বাক্স গুছোচ্ছি তা উনি এসে বললেন, ‘তোমাদের জিনিসপত্র যেমন খুশি গুছোতে পার, কিন্তু আমার বাক্সে আমার সব জিনিসপত্র যেন একেবারে ওপরে থাকে।’ আমি বললাম, ‘বেশি দরকারি জিনিস তো আমি সর্বদা ওপরেই রাখি। যাতে বাক্স খুললেই পাও।’

তাতে বললেন, ‘দরকারির আবার কম বেশি কী? না, না, আমার সমস্ত জিনিস ওপরে রেখো, যাতে বাক্সের ডালা খুললেই সব একসঙ্গে দেখতে পাই।’ শুনেছেন কখনও এমন কথা?”

মা তো অবাক!

আমার মা একাধারে শান্তিপ্রিয় আর বুদ্ধিমতী ছিলেন বলে কক্ষনও নিজের মতটা পেশ করতেন না। আমাদের বাড়িতে বাবা যখন যা বলতেন তাই হত। মায়ের যে অন্যরকম মত হতে পারে একথা আমাদের স্বপ্নেও কখনও মনে হয়নি। একবার মনে আছে শিবপুরে আমার মাসির বাড়ির ওপরতলায় স্যার কে জি গুপ্তর এক ছেলে থাকতেন। তাঁর মেম-স্ত্রী আর মেয়েরা গল্প করতে নীচে আসত।

সুগৃহিণী বলে মেমের ভারী সুনাম ছিল। ওঁদের বাড়ি থেকে কখনও টুঁ শব্দটি শোনা যেত না। সব মেশিনের মতো চলত। আমার মাসিতে-মেসোতে খুব মতভেদ তর্কাতর্কি হত।

একদিন মেম মাসিকে বললেন, ‘দেখুন, সুখে সংসার করতে হলে, কখনও তর্কাতর্কি করবেন না।’ মাসি আকাশ থেকে পড়লেন, ‘বলেন কী! তর্ক না করলে চলে কখনও? সংসার সম্বন্ধে পুরুষদের কোনও ধারণা আছে? যত সব উদ্ভট মতামত! সবাই তো আপনার কর্তার মতো নয়।’

মেম হাসলেন, ‘সব পুরুষমানুষই এক রকম। কিচ্ছু জানে না, খালি ঝুড়িঝুড়ি মতামত। তা আমি কখনও তর্ক করি না। উনি যা বলেন শুনে যাই। তারপর কাজের বেলা, সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছামতো করি। উনি কিচ্ছু টেরও পান না। পুরুষমানুষ সাধে বলে!’

তর্কের কথাই যখন উঠল, আমার স্বামীও কিছু কম যান না। আরে তর্ক করবি তো আমাদের মতো সোজাসুজি নিজের মতটা প্রকাশ করে যা বলবার বল! তা নয়। একরাশি তথ্য, প্রমাণ পরিসংখ্যান, শতকরা হেনাতেনা, অমুক রিপোর্টে বেরিয়েছে বলে এমনি বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড করবেন যে তর্ক করবার সব সুখ চলে যাবে!

শুধু তাই নয়। ধরুন আমি কোথাও যাবার কিংবা কিছু করবার প্রস্তাব দিলাম, অমনি উনি উঠে পড়ে লেগে গেলেন, আমার প্রস্তাবে কোথায় খুঁত আছে তা দেখিয়ে দিতে। আবার কখনও আমি কিছু বললাম তো চুপ করে শুনে গেলেন। যে কোনও শ্রোতার মনে হতে পারে আগের প্রস্তাবে ওঁর আপত্তি এবং পরেরটাতে সমর্থন আছে। আসলে ঠিক তার উল্টো।

আগেরটা করবার ইচ্ছে আছে, তবে খানিকটা রদবদল করে নিজের পছন্দসই করবার পর। পরেরটা উনি কোনও মতেই করবেন না, এমনকী তাই নিয়ে বৃথা নিশ্বাস খরচ পর্যন্ত করবেন না।

স্বামীদের বিষয়ে বাস্তবিক একটা এনসাইক্লোপিডিয়া লেখা যায়। কী যে ওঁদের পছন্দ আর কী যে নয়, তাই বোঝা দায়। সুন্দরের কথাই ধরি। আমরা যাদের সুন্দরী বলি, তাদের দেখে নাক সেঁটকাবেন। অথচ ওঁদের বন্ধুবান্ধবদের হতকুচ্ছিৎ ন্যাকা বউদের রূপের প্রশংসায় পঞ্চমুখ!

গিয়ে হয়তো দেখা যাবে রোগা, হটকা, উটকপালী, এ কান থেকে ও কান হাঁ— যাক গে বলে লাভ নেই!

এর ওপর আরও আছে, অন্যদের বাড়ির রান্না আর সেখানকার গিন্নিদের ঘরকন্নার প্রশংসা কোন স্বামী না করেন? বাড়িতে যা দেখলে পিত্তি জ্বলে যায়, অন্যদের বাড়িতে ঠিক তাই দেখে ভাল লাগে! এর ওপর কোনও কথা হয়!

ইউরোপে ভ্রমণ করে এসে আমার নতুন দিদি একটা মজার গল্প বলেছিলেন। একটা বিখ্যাত পাহাড়ে শহর। ছোট্ট শহর। সেখানকার এক বিখ্যাত হোটেল। ভারী রোমাঞ্চময় ব্যাপার; চারদিকে চোখভোলানো বরফের পাহাড়; অনেক নীচে নীল হ্রদ; চাঁদের আলোয় একটা লোক গীটার বাজাচ্ছে।

সাদা পোশাক পরা বেজায় মোটা হোটেলওয়ালা নতুনদিদিদের সঙ্গে এসে ভাব করল। বলল, ‘ম্যাডাম, আমাদের বেজায় রোমাঞ্চময় দেশ। আমার গালে এই যে কাটার দাগ দেখছেন, এর পেছনেও একটা প্রেমের ইতিহাস আছে। একটা লোকের সঙ্গে ডুয়েল লড়ার চিহ্ন এটা। বলাবাহুল্য ছয় মাস হাসপাতালে কাটিয়ে, সে ব্যাটা বিদেশে পালিয়েছে। শুনেছি কালকুতা বলে একটা জায়গায় তার মস্ত ব্যাবসা আছে।

আমার তাতে কোনও আপত্তি নেই। আমি সেই অতুলনীয়াকে বিয়ে করে, পরম সুখে হোটেল চালাচ্ছি।’

গল্প শুনে উৎসাহিত হয়ে, নতুনদিদি বললেন, ‘এই বিদেশিনীকে কি একবার দেখতে পাব না? দেশে ফিরে গল্প করব।’

আহ্লাদে গলে গিয়ে হোটেলওয়ালা বলল, ‘নিশ্চয়, নিশ্চয়, ওই তো বড় ট্রে নিয়ে সে এদিকেই আসছে।’

নতুনদিদি ফিরে দেখলেন যত না লম্বা তার চেয়ে চওড়া, মাথায় কয়েক গাছা চুল ঝুঁটি করে বাঁধা, জুতোর বোতামের মতো পিটপিটে চোখ, ঢিবলি নাক, হাঁড়ি মুখ।

অবাক হয়ে হোটেলওয়ালার দিকে তাকাতেই, সে বলল, ‘আশ্চর্য হলেন নাকি? আহা! ওর রান্না তো এখনও খাননি! ওর জন্য একবার কেন, আমি একশোবার যুদ্ধক্ষেত্রে নামতে রাজি আছি!’

বুঝুন একবার স্বামীদের কী পছন্দ!

Facebook Comment

You May Also Like