বাংলায় বই বা লেখকের নাম লিখে সার্চ করুন :

রাজবাড়ির চিত্ররহস্য – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

রাজবাড়ির চিত্ররহস্য - সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

প্রাইভেট ডিকেটিভ কে. কে. হালদার–আমাদের প্রিয় হালদারমশাই খবরের কাগজ পড়ছিলেন। হঠাৎ তিনি বলে উঠলেন,–খাইসে!

জিগ্যেস করলুন,কী হল হালদারমশাই?

হালদারমশাই একটিপ নস্যি নাকে খুঁজে নোংরা রুমালে নাক মুছলেন। তারপর বললেন, জয়ন্তবাবুরে একখান কথা জিগাই।

-বলুন হালদারমশাই।

গোয়েন্দাপ্রবর বাঁকা হেসে বললেন,–আপনাগো কাগজে আইজ দুইখান মার্ডারের খবর লিখসে।

–তাতে কী হয়েছে? কোথাও মার্ডার হয়েছে, তাই খবর লেখা হয়েছে।

গোয়েন্দাপ্রবর বললেন,–একখান মার্ডার তেমন কিসু না। ভিটিম চায়ের দোকানে বইসা চা। খাইত্যাছিল, কারা তারে বোম মারসে। কিন্তু আর একখান মার্ডার হইসে এক্কেরে ঘরের মধ্যে। ভিকটিমের মাথায় গুলি করসে খুনি। ভিকটিম তখন দরজার কাছাকাছি মেঝের উপর হুমড়ি খাইয়া পড়সে। কিন্তু তার ডাইন হাতের মুঠায় একগোছা কঁচাপাকা চুল।

এবার একটু কৌতূহলি হয়ে বললুম-তা হলে বোঝা যাচ্ছে ভিকটিম খুনির মাথার চুল উপড়ে নিয়েছে।

হালদারমশাই উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। বললেন,–প্রথম কথা, দরজা বন্ধ ছিল। পুলিশ দরজা ভাইঙা ওই অবস্থায় ভিকটিমরে দেখসে। কিন্তু এমন একখান হেভি মিস্ত্রির খবর আপনাগো কাগজে এইটুকখান কইরা ছাপসে। ওদিক প্রথমে যে মার্ডারের কথা কইলাম, সেইখবর ছাপসে বড় কইরা প্রথম পাতায়। ক্যান?

আমি আমাদের কাগজ মন দিয়ে পড়ি না। তা ছাড়া কাল শনিবার আমি দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার অফিসেও যাইনি। হালদারমশাইয়ের প্রশ্নের উত্তরে বললাম,–এমন হতে পারে প্রথম পাতার ভিকটিম একজন ভি.আই.পি। আর দ্বিতীয় খবরটা হয়তো দেরিতে পাওয়া গিয়েছিল। তখন কাগজে যেটুকু জায়গা ছিল, খবরটা কাটছাঁট করে কোনওরকমে ঢুকিয়ে দিয়েছেন নাইট এডিটর।

হালদারমশাই তেমনই উত্তেজিতভাবে বললেন,–নাইট এডিটর ঠিক করেন নাই। অমন হেভি মিস্ত্রি! ভিকটিমের হাতের মুঠোয় খুনির চুল! তারপর আরও হেভি মিস্ত্রি, দরজা যখন বন্ধ ছিল তখন খুনি পলাইল কোন পথে?

কর্নেল তার টাইপরাইটারে সম্ভবত প্রজাপতি, অর্কিড বা দুষ্প্রাপ্য প্রজাতির পাখি নিয়ে প্রবন্ধ লিখছিলেন। এতক্ষণে তার কাজ শেষ হল। তারপর টাইপ করা কাগজগুলো গুছিয়ে ভাঁজ করে টেবিলের ড্রয়ারে রাখলেন। এবং বললেন,–হালদারমশাই, খবরটা ছোট করে লেখা হলেও আপনি কয়েকটা পয়েন্ট মিস করেছেন।

-মিস করসি? কী মিস করসি কন তো কর্নেল স্যার।

কর্নেল টাইপরাইটারের কাছ থেকে উঠে এসে আমাদের কাছাকাছি তার ইজিচেয়ারে বসলেন। তারপর চুরুট ধরিয়ে বললেন,–একটা লাইন আপনার চোখ এড়িয়ে গেছে। দরজার ল্যাচ-কি ছিল। তার মানে কেউ ঘরের ভেতর থেকে ল্যাচ-কি তে চাপ দিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে যেতে পারে, কিন্তু সে বেরিয়ে যাওয়ার পর দরজা বন্ধ হয়ে গেলে বাইরে থেকে আর খোলা যায় না। আমার অ্যাপার্টমেন্টে ঢোকার দরজা কী আপনি লক্ষ করেননি? হা

লদারমশাই বলে উঠলেন,–হঃ! আপনি ঠিক কইসেন।

বলে তিনি আবার সেই অংশটা পড়ার জন্য কাগজটা তুলে নিলেন। তারপর যথারীতি বিড়বিড় করে পড়তে শুরু করলেন। পড়া শেষ হলে তিনি বললেন,–আর কী মিস করসি বুঝলাম না।

কর্নেল বললেন,–ভিকটিমের মুঠোয় ধরা পঁচাপাকা চুলের গোছা উল্লেখ করে খবরে লেখা হয়েছে, চুলগুলো পুলিশ সহজেই টেনে বের করে ফরেনসিক ল্যাবে পাঠিয়ে দিয়েছে।

হালদারমশাই বললেন,–ওই লাইনটা আমি মিস করি নাই কর্নেল স্যার! ওই চুল তো ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানোই লাগবো।

কর্নেল হাসলেন,–হালদারমশাই কোনও মৃত মানুষের হাতের মুঠিতে আটকে থাকা কোনও জিনিস সহজে খুলে নেওয়া যায় না। আপনি তো এসময় পুলিশের চাকরি করেছেন, ওই সহজ কথাটা আপনার চোখ এড়িয়ে গেল কী করে?

অমনি হালদারমশাই নড়ে সিধে হয়ে বসলেন। তারপর কাঁচুমাচু হেসে বললেন,–হঃ, আমারই ভুল।

এবার আমি জিগ্যেস করলুম,–কর্নেল, আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে যেন খুনিই ওই চুলগুলো ইচ্ছে করে পুলিশকে মিস গাইড করার জন্য হাতে গুঁজে দিয়েছিল। তাই কি?

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন,–এজন্যই তোমাকে বলি জয়ন্ত, তুমি বোঝে সবই, তবে দেরিতে।

এবার আমি খবরটা পড়ার জন্য হালদারমশাইয়ের কাছ থেকে কাগজটা নিলুম। হেডিংটা ছোট্ট ‘কেষ্ট মিস্ত্রি লেনে রহস্যময় খুন’। খবরটা এক লাইন পড়েই বুঝতে পারলুম, ওটা আমাদের নতুন ক্রাইম রিপোর্টার দীপকেরই লেখা।

সবে দুটো লাইন পড়েছি, এমনসময় ডোরবেল বাজল। কর্নেল অভ্যাসমতো হাঁক দিলেন,–ষষ্ঠী!

হালদারমশাই চাপাস্বরে বললেন,–এবার দ্যাখেন কে আসে!

কথাটা শুনে বুঝতে পারলুম বরাবর যেমন হয়, কর্নেলের এই জাদুঘরসদৃশ ড্রইংরুমে যখনই আমরা কোনও রহস্যময় ঘটনা নিয়ে আলোচনা করি, তখনই সে ঘটনার সঙ্গে জড়িত কেউ-না-কেউ এসে পড়েন।

কিন্তু আমাদের নিরাশ করে ঘরে ঢুকলেন বেঁটে বলিষ্ঠ গড়নের এক ভদ্রলোক। তার পরনে সাদা-সিধে ধুতি-পাঞ্জাবি। হাতে একটা বাদামি রঙের ব্রিফকেস। তিনি ঘরে ঢুকে কর্নেলকে নমস্কার করে বললেন,–কর্নেলসাহেব কি আমাকে চিনতে পারছেন?

কর্নেল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাঁকে দেখছিলেন। বললেন, আমি যদি ভুল না করি তাহলে আপনি যদুগড়ের মধুরবাবু।

ভদ্রলোক সোফায় বসে হাসবার চেষ্টা করে বললেন, আপনার স্মৃতিশক্তির ওপর আমার বিশ্বাস এখনও আছে। আপনি আমাকে ঠিক চিনেছেন। আমি যদুগড়ের রাজবাড়ির কেয়ারটেকার হতভাগ্য মধুরকৃষ্ণ মুখুজ্যেই বটে।

লক্ষ করলুম কর্নেলের চোখে যেন বিস্ময় ফুটে উঠেছে। তিনি বললেন, আমি আপনাকে চিনেছি বটে, কিন্তু মাত্র তিন বছরের মধ্যে আপনার চেহারায় কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ করছি। যদুগড়ের কুমারবাহাদুর রুদ্রনারায়ণ রায় আপনাকে ‘বাবুর বাবু’ বলে পরিহাস করতেন, কারণ

আমিও দেখেছি আপনার পোশাক-পরিচ্ছদে বেশ বিলাসিতা ছিল। আপনার চেহারাতেও প্রাণবন্ত। ভাব ছিল। কিন্তু এখন আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি যেন দীর্ঘকাল রোগে ভুগেছেন।

মধুরবাবু জোরে শ্বাস ছেড়ে বললেন, আমার জীবনে এই তিনবছরে অনেক কিছুই ঘটে গেছে। আমি যদুগড় ছেড়ে এসেছি তিন বছর আগে। কলকাতায় এক বিধবা দিদির কাছে বাস করছি। দিদির একটি মাত্র ছেলে। সে থাকে বোম্বেতে। যাই হোক, যেজন্যে আজ হঠাৎ আপনার কাছে এসে হাজির হয়েছি, তা বলি।

বলে তিনি আমাদের দিকে তাকালেন। কর্নেল বললেন,–আলাপ করিয়ে দিই, জয়ন্ত চৌধুরি, দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার বিখ্যাত সাংবাদিক, আর উনি প্রাইভেট ডেটেকটিভ মিস্টার কে. কে. হালদার। তবে আমরা ওঁকে হালদারমশাই বলি।

মধুরবাবু এবং আমাদের মধ্যে নমস্কার বিনিময় হল। তারপর তিনি একটু ইতস্তত করে বললেন,–আমার কথাগুলো গোপনীয়।

কর্নেল একটু হেসে বললেন,–যত গোপনীয়ই হোক, আপনি এদের সামনে স্বচ্ছন্দে খুলে বলতে পারেন। কারণ এরা দুজনেই আমার ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তবে আগে কফি খান। কফি নার্ভকে চাঙ্গা করে। বলে কর্নেল হাঁক দিলেন,ষষ্ঠী, কফি কোথায়?

ঠিক সেই মুহূর্তেই কফির-ট্রে হাতে নিয়ে ষষ্ঠী ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। তারপর ট্রে সেন্টার-টেবিলে রেখে নিঃশব্দে চলে গেল। আমি জানি কর্নেলের ঘরে নতুন কেউ এলেই ষষ্ঠী দ্রুত কফি তৈরি করে ফেলে।

মধুরবাবুকে কর্নেল এক পেয়ালা কফি তুলে দিলেন। তারপর নিজে এক পেয়ালা কফি তুলে নিয়ে বললেন,–মধুরবাবু, কুমারবাহাদুরের কোনও খবর রাখেন?

মধুরবাবু মাথা নেড়ে বললেন,–না। তবে কুমারবাহাদুরের মেয়ে বল্লরীকে আমি আমার দুঃখ জানিয়ে একটা চিঠি লিখেছিলুম। বল্লরীকে আমি কোলে পিঠে করে মানুষ করেছিলুম। সে আমাকে আগের মতোই আপনজন ভেবে চিঠির উত্তর দিয়েছিল। তার বাবা নাকি এখন নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন। তাই প্রায়ই আমার কথা বলেন। বল্লরী রাগ করে বাবাকে আমার ঠিকানা দেয়নি। লিখেছিল,–কাকাবাবু আপনি এখানে ফিরে আসুন।

কফি শেষ করে মধুরবাবু বললেন,–এবার তা হলে ব্যাপারটা বলি।

কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজিয়ে বললেন,–হাঁ বলুন।

মধুরবাবু আবার একটা শ্বাস ছেড়ে বললেন,–ঘটনাটা ভারি অদ্ভুত। গত পরশু, শুক্রবার বিকেলে অভ্যাস মতো আমি গঙ্গার ধারে বেড়াতে গিয়েছিলুম। গঙ্গাদর্শনে আমার মন শান্ত হয়। তো আউটরাম ঘাটের দিকে একটা খালি বেঞ্চে বসে গঙ্গাদর্শন করছিলুম। রবিবার ছাড়া অন্যদিন গঙ্গার ধারে লোকজন কমই থাকে। কিছুক্ষণ পরে প্যান্টশার্ট পরা এক ভদ্রলোক বেঞ্চের অন্য কোণে এসে বসলেন। তাকে একবার দেখেই মুখ ঘুরিয়ে নিলুম। এর কোনও কারণ ছিল তা নয়। বেড়াতে গিয়ে আমার কথা বলতে ইচ্ছে করে না। যদি দৈবাৎ ভদ্রলোক যেচে পড়ে কথা শুরু করেন সেই ভয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলাম। ভদ্রলোকের মুখে একরাশ কাঁচাপাকা দাড়িগোঁফ, মাথায় তেমনই এলোমেলো একরাশ কাঁচাপাক চুল। প্যান্ট-শার্ট-জুতো অবশ্য বেশ পরিচ্ছন্ন। একটু পরে চোখের কোনা দিয়ে দেখলুম তিনি ব্রিফকেসের ওপর একটা কাগজ রেখে কিছু লিখছেন। লেখা শেষ হলে কাগজটা তিনি ভাঁজ করলেন। তারপর গঙ্গার দিকে আপন মনে তাকিয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পরে সূর্য লাল হয়ে যখন অস্ত যাচ্ছে তখন লক্ষ করলুম তিনি ডানদিকে ঘুরে কী যেন দেখলেন। তারপর আমাকে ভীষণ অবাক করে বললেন,–কিছু যদি মনে করেন একটা অনুরোধ করব। আমি বললুম,–অনুরোধের কী আছে, বলুন। তিনি বললেন,–প্লিজ, আমার এই ব্রিফকেসটা আপনার কাছে রাখুন। আর এই চিঠিটা পড়ে দেখুন। কথাটা বলেই তিনি ব্রিফকেসটা একরকম জোর করেই আমার দুই উরুর ওপর রেখে সেই ভাঁজকরা কাগজটা আমার বুক পকেটে গুঁজে দিলেন। তারপর সবেগে পিছনের রেললাইন ডিঙিয়ে তিনি গাছপালার আড়ালে উধাও হয়ে গেলেন। আমি তো ভীষণ হতবাক হয়ে গেছি। তারপর পকেট থেকে সেই ভাঁজ করা কাগজটা খুলে পড়তে-পড়তে আমার বোধবুদ্ধি গুলিয়ে গেল। কাগজটা আপনাকে দেখাচ্ছি।

কর্নেল বললেন, আপনার হাতে যে ব্রিফকেসটা দেখছি, ওটা নিশ্চয়ই সেই ভদ্রলোকের ব্রিফকেস।

-ঠিক ধরেছেন। এটা আমার হাতে মানায় না। বেশ দামি ব্রিফকেস। বলে তিনি বুক পকেট থেকে ভাঁজ করা একটা কাগজ কর্নেলকে দিলেন।

কর্নেল ভাঁজ খুলতে-খুলতে জিগ্যেস করলেন,–একটা কথা। ওই ব্রিফকেসটা কি আপনি খুলেছিলেন, বা খোলার চেষ্টা করেছিলেন?

মধুরবাবু বললেন,–আজ্ঞে না কর্নেলসাহেব। আপনি তো আমাকে ভালোই জানেন। আমি কী প্রকৃতির মানুষ। হ্যাঁ, বলতে পারেন, মানুষের স্বভাব বদলায়, কিন্তু আমি বদলাইনি। তা ছাড়া আমার একটা ভয়ই পিছু ছাড়ছে না। যদি ব্রিফকেসটা খুলতে গেলেই কোনও সাংঘাতিক বিস্ফোরণ ঘটে যায়। আপনি তো জানেন আজকাল সন্ত্রাসবাদী বা জঙ্গিরা এভাবে বিস্ফোরণ ঘটায়।

হালদারমশাই কান খাড়া করে কথা শুনছিলেন। তিনি বলে উঠলেন,–হঃ, ঠিক কইসেন। ওটার মধ্যে সাংঘাতিক এক্সপ্লোসিভ কিছু থাকতেও পারে। আর একটা কথা কই আমি। চৌত্রিশ বৎসর পুলিশে চাকরি করসি। তাই আমার সন্দেহ হইত্যাসে সেই ভদ্রলোক আপনার কোনও শত্রুর চর হইতেও পারে। কী কন কর্নেল স্যার!

কর্নেল কাগজটা খুঁটিয়ে পড়ে মধুরবাবুর দিকে তাকালেন, এটা একটা চিঠি। দেখা যাচ্ছে সেই ভদ্রলোক অর্থাৎ ‘বারিন’ বলে যিনি স্বাক্ষর করেছেন, তাকে কি আপনি একটুও চিনতে পারেননি?

–নাঃ এটাই আমার দুর্ভাগ্য। বারিনের সঙ্গে আমার শেষ দেখা বছর দশেক আগে। সে যদুগড়ে তার ব্যবসার ব্যাপারে একজনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। দৈবাৎ রাস্তায় তার সঙ্গে দেখা হয়। তখন তার মুখে দাড়ি ছিল না। তাছাড়া গায়ের রং ছিল খুব ফরসা। দশ বছর পরে সে মুখে একরাশ গোঁফদাড়ি নিয়ে আমার পাশে বসলে আমার পক্ষে তাকে চেনা কোনওভাবেই সম্ভব নয়।

কর্নেল বললেন,–দ্যাখা যাচ্ছে সে আপনাকে চিনতে পেরেই আপনার কাছে এসে বসেছিল। বরং আমার অনুমান, তার কোনও শত্রু ওই সময়েই গঙ্গার ধারে তাকে ফলো করে আসছিল। তা ছাড়া চিঠি পড়ে এটুকু বোঝা যাচ্ছে, সেই শত্রুর লক্ষ ছিল তাকে খুন করে ব্রিফকেসটা হাতানো। যাই হোক, চিঠির কথা পরে। এবার আপনি বলুন, তার অনুরোধমতো আপনি কী কাল সকালে তার ঠিকানায় ব্রিফকেসটা পৌঁছে দিতে গিয়েছিলেন।

–আজ্ঞে হ্যাঁ। কিন্তু সেখানে গিয়ে যা দেখলুম আর শুনলুম—

কর্নেল তার কথার ওপর বললেন,–বারিনবাবু তার ঘরে খুন হয়েছেন, তাই না? ..

মধুরবাবু দু-হাতে মুখ ঢাকলেন। আত্মসম্বরণ করার পর তিনি ধরা গলায় বললেন, আপনি ঠিকই ধরেছেন। আমি কেষ্ট মিস্ত্রি লেনে গিয়ে দেখি, একটা দোতলা বাড়ির সামনে পুলিশের কয়েকটা গাড়ি আর বাড়ির ভেতরে-বাইরে পুলিশ গিজগিজ করছে। আমি সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি অনেকদিন আগেই, কিন্তু কী ঘটেছে তা জানার জন্য একজন পান-সিগারেট বিক্রেতার কাছে একটা সিগারেট কিনলুম। তারপর তাকে জিগ্যেস করলুম, এখানে এত পুলিশ কেন দাদা? লোকটা বলল, ওই বাড়ির দোতলায় এক ভদ্রলোক থাকতেন। তাকে কে বা কারা গতরাত্তিরে কখন খুন করে গেছে। সকালে একটা হোটেল থেকে ওর জন্যে ব্রেকফাস্ট নিয়ে গিয়েছিল একটা লোক। সে দরজা বন্ধ দেখে ডাকাডাকি করে। কিন্তু সাড়া পায়নি। তারপর হঠাৎ তার চোখে পড়ে দরজার বাইরে চাপ-চাপ খানিকটা রক্তের ছোপ। অমনি সে হোটেলে খবর দেয়। তারপর পাড়ার লোকেরা জড়ো হয়, পুলিশ ডাকে।

মধুরবাবু দম নিয়ে বললেন,–কথাগুলি শোনামাত্র আমি সেখান থেকে পালিয়ে এসেছিলুম। তারপর আমার দিদি নিরুপমাকে সব কথা খুলে বলেছিলুম। সে খুব বুদ্ধিমতী মেয়ে। আমাকে পুলিশের কাছে যেতে বারণ করেছিল। তার মতে পুলিশ আমার কথা বিশ্বাস করবে না, উলটে আমাকেই হয়তো খুনি সাব্যস্ত করবে। তার চেয়েও বড় কথা, ব্রিফকেসে যদি চোরাই মাল থাকে? দিদির কথা শুনে আমি আর থানায় যাইনি। তারপর গত রাতে নানাকথা ভাবতে-ভাবতে হঠাৎ আমার মনে পড়ে যায় আপনার কথা। আপনার নেমকার্ডটা আমি খুঁজে পাইনি। তাছাড়া দিদির বাড়িতে টেলিফোনও নেই। তাই সকাল হলে সোজা আপনার বাড়ি চলে এলুম। আপনার এ-বাড়িতে আমি একবার কুমারবাহাদুরের চিঠি নিয়ে এসেছিলুম, আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে?

কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। তবে আপাতত একটা কাজ জরুরি বলে মনে হচ্ছে। কাজটা হল এই ব্রিফকেসটা খুলে ফেলা। চিন্তার কারণ নেই আমার কাছে মেটাল বা এক্সপ্লোসিভ ডিটেকটর যন্ত্র আছে।

বলে কর্নেল উঠে গেলেন। আমরা হতবাক হয়ে বসে রইলুম।

.

দুই

লক্ষ করছিলুম হালদারমশাইয়ের চোখদুটি যথারীতি গুলি-গুলি হয়ে উঠেছে এবং গোঁফের দুই সুচাল ডগা তিরতির করে কাঁপছে। তিনি আমার কানের কাছে মুখ এনে বললেন, আমার বিশ্বাস ব্রিফকেসটার ভেতরে টাকাকড়ি কিংবা সোনাদানা আছে।

আমি কিছু বলার আগেই কর্নেল এসে ব্রিফকেসটার ওপর একটা ছোট্ট ডিটেকটর ছোঁয়ালেন। কোনও শব্দ শোনা গেল না। মধুরবাবুকেও উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। তিনি বললেন,–মেসিনটা দিয়ে কী বুঝলেন কর্নেলসাহেব?

কর্নেল দ্বিতীয় ডিটেকটরটা ব্রিফকেসের ওপর ছোঁয়াতে-ছোঁয়াতে হাসিমুখে বললেন, –আমাদের নিরাশ করল ব্রিফকেসটা। এতে বিস্ফোরকও নেই, আবার কোনো অস্ত্রশস্ত্রও নেই।

গোয়েন্দপ্রবর বলে উঠলেন, তা হলে আমি যা কইসিলাম জয়ন্তবাবুরে, তাই-ই সইত্য।

বললুম,–হ্যাঁ, টাকাকড়ি সোনাদানা থাকতেও পারে। তবে সে সব থাকলে বারিনবাবু কি তার পুরোনো বন্ধুর হাতে বিশ্বাস করে রেখে যেতে পারতেন কি না, সেটা মধুরবাবুই বলতে পারবেন।

মধুরবাবু বললেন,–বারিন চিঠিতে লিখেছে ইচ্ছে হলে আমি তালা ভেঙে ব্রিফকেস খুলে দেখতে পারি কী আছে। কারণ সে জানে আমি তার কোনও জিনিস হাত দেব না, বা তালাও ভাঙব না।

কর্নেল বললেন, তা হলে কী করা যায় আপনিই বলুন মধুরবাবু?

–আজ্ঞে? আমি কী বলব? আপনি যদি ওটার তালা ভেঙে ভেতরে কী আছে দেখতে চান, আমার তাতে আপত্তি নেই। বরং জয়ন্তবাবু আর হালদারমশাই দুজন সাক্ষী থাকবেন।

কর্নেল হালদারমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে বললেন,–হালদারমশাই, আপনি কী বলেন?

হালদারমশাই এবার গম্ভীরমুখে বললেন,–আমি কী আর কমু, ব্রিফকেসের মালিক তো খুন হইয়া গেসেন। কাজেই এটা একটা মার্ডার কেস। তাই আমার মতে ওটা না ভাইঙা ও.সি. হোমিসাইডেরে খবর দিলে ভালো হয়।

মধুরবাবু হাত তুলে মাথা নেড়ে আপত্তি জানিয়ে বললেন,–না-না, ওকাজ করলে আমি মারা পড়ে যাব। পুলিশ আমাকে ছাড়বে না।

কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট ধরিয়ে বললেন,–তা ঠিক। কিন্তু আপনাকে একটা কথা জিগ্যেস করি। আপনি তো আমার কাছে এসেছেন। পুলিশের কাছে গেলে ঝামেলা হবে বলেই এসেছেন–তাই না?

মধুরবাবু ব্যস্তভাবে বললেন,–হা, কর্নেলসাহেব।

–তা হলে এটার ভেতর কী আছে তা জানতে আমাদের যেমন আগ্রহ, আপনারও তাই। মধুরবাবু বললেন,–হা। বারিনের কাজকর্মের খবর বহুকাল আমি জানি না। আমার ধারণা ব্রিফকেসটার মধ্যে এমন কিছু আছে যা সে শত্রুপক্ষের হাত থেকে বাঁচাতে চেয়েই আমাকে দিয়ে কেটে পড়েছিল। কাজেই আপনি যদি তালা ভেঙে ভেতরের জিনিস দেখে নেন, তাহলে বারিনকে খুনের উদ্দেশ্য বোঝা যাবে।

এবার কথাটা হালদারমশাইয়ের মনঃপুত হল। তিনি বললেন,–হঃ, এটা একটা পয়েন্ট বটে। পুলিশ খুনের মোটিভ বুঝে পাওয়ার আগেই আপনি তা পাইয়া যাবেন।

কর্নেল হাত বাড়িয়ে পাশের টেবিলের ড্রয়ার থেকে কয়েকটা ছোট বড় ভ্রু-ড্রাইভার এবং একটা ছোট্ট হাতুড়ি বের করলেন। তারপর ব্রিফকেসটা কোলে রেখে একটা ভ্রু-ড্রাইভারের মাথায় আস্তে হাতুড়ির ঘা দিতে থাকলেন। দুমিনিটের মধ্যেই একটা লক খুলে গেল। দ্বিতীয় লকটা খুলতে তার চেয়ে কম সময় লাগল। তারপর ব্রিফকেসটা তিনি টেবিলে রেখে ডালা খুললেন।

আমরা খুব উত্তেজিত হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। দেখলুম ব্রিফকেসের ভেতর একটা টার্কিস তোয়ালে ভরা আছে। কর্নেল সেটা তুলে নিতেই দেখা গেল খবরের কাগজে মোড়া একটা প্যাকেট। প্যাকেটটা প্রায় ব্রিফকেসের তলার সাইজের। কাগজের মোড়ক খোলার পর দেখলুম তিনটে একই সাইজের ফ্রেমে বাঁধানো ছবি।

কর্নেল একটা-একটা করে ছবি আমাদের দেখালেন। তিনটে ছবিই পোর্ট্রেট। ফটোগ্রাফ নয়, অয়েল পেন্টিং। একটা ছবি নানা অলঙ্কারে সেজে থাকা এক মহিলার। বাকি দুটো দুজন পুরুষের। একজন যুবক, অন্যজন বয়স্ক। তিনটি ছবি দেখেই বোঝা যায় এই মানুগুলি অভিজাত পরিবারের। কর্নেল আতস কাঁচের সাহায্যে পরীক্ষা করে দেখে বললেন,–তিনটি ছবির চিত্রকর একজন সাহেব বলে মনে হচ্ছে। জড়ানো ইংরেজি হরফে লেখা আছে “আর মার্লিন’ বা মার্টিন। আমি বিখ্যাত চিত্রকরদের অনেকের নামই জানি না। তবে আমার কাছে বিদেশি চিত্রকরদের একটা এনসাইক্লোপিডিয়া আছে। সঠিক নামটা পেতেও পারি, কারণ দেখে তো মনে হচ্ছে এরা রাজা মহারাজা পরিবারের লোক। আর ছবিগুলোও আঁকা বহুবছর আগে।

মধুরবাবু বললেন,–এবার ছবির তলায় কিছু আছে নাকি দেখুন তো।

কর্নেল ছবি তিনটে টেবিলে রাখলেন তারপর ব্রিফকেসটা উপুড় করে ঝাড়বার ভঙ্গি করলেন। বললেন,–নাঃ, আর কিছু নেই।

আমি বললুম,–ওপরের ডালার ভেতরে একটা চেন দেখতে পাচ্ছি।

আমি আর কিছু বলার আগেই কর্নেল চেন টেনে ভেতর থেকে কতকগুলো নেমকার্ড বের করলেন। তারপর বললেন,–নানা জায়গার নানা লোকের নেমকার্ড। এদের কেউ-কেউ কোনও কোম্পানির লোক।

মধুরবাবুকে হতাশ দেখাচ্ছিল। তিনি বিস্ময়ের সুরে আস্তে বললেন,–এই তিনটে ছবির জন্য। বারিন অমন করে ভয় পেয়ে পালালই বা কেন? সে কি এই ছবিগুলোর জন্যই খুন হয়ে গেল? কর্নেলসাহেব আমার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে আপনিই এই অদ্ভুত ঘটনার পিছনে কী আছে তা জানতে পারবেন, কারণ আপনার পরিচয় আমি ভালোই জানি।

কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন,–ঘটনাটা রহস্যজনক তাতে কোনও সন্দেহ নেই, কিন্তু সেই রহস্য ফাঁস করতে হলে আপনার সাহায্য দরকার। একটা কথা আপনাকে খুলেই বলি, আপনি যদি আমার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেন তবেই আমার পক্ষে ঠিকভাবে হাঁটা সম্ভব হবে।

মধুরবাবু বললেন, আমি আপনার সব প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রস্তুত। অবশ্য যদি এমন কোনও প্রশ্ন করেন যে বিষয়ে আমার জানা নেই তাহলে আমি ঠিক উত্তর দিতে পারব না।

এবার কে জানে কেন গোয়েন্দাপ্রবরের মুখে খি-খি হাসি শোনা গেল। তিনি বললেন,–এটা যে আদালতের ব্যাপার হইয়া গেল। যাহা বলিব সইত্য বলিব, মিথ্যা বলিব না।

কর্নেল হেসে উঠলেন। বললেন,–ঠিক ধরেছেন। যাইহোক, মধুরবাবু প্রথমে আপনি আমার এই প্রশ্নটার উত্তর দিন। বারিনবাবুর পুরো নাম কী? আর তার সঙ্গে কবে কোথায় কোন সূত্রে আপনার পরিচয় হয়েছিল?

মধুরবাবু বললেন,–বারিনের পুরো নাম, বারীন্দ্রনাথ সিনহা। ওর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ যদুগড় রাজ হাইস্কুলে। ওর বাবা ছিলেন রেলের অফিসার। যদুগড়ে বদলি হয়ে আসার পর বারিনকে তিনি ক্লাস সিক্সে ভরতি করে দেন। বারিন ছিল খুব আলাপি ছেলে। আমার সঙ্গে ওর হৃদ্যতা ছিল সবচেয়ে বেশি। তখন আমার বাবা ছিলেন যদুগড় রাজপরিবারের ম্যানেজার। যাইহোক, আমরা দুজনে ওখান থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে পাটনার কলেজে পড়েছিলুম। বি.এ. পাশ করে বারিন কোথায় চলে গিয়েছিল জানি না। ওর বাবা রিটায়ার করে যদুগড়েই বাড়ি করেছিলেন। তার কাছে বারিনের কথা জানতে চাইলে তিনি রাগ করে বলতেন, ওই হতভাগার কথা তুমি জিগ্যেস কোরো না আমাকে। আমি জানি না সে কোথায় কী করছে।

কর্নেল বললেন, তারপর বারিনের সঙ্গে আপনার আবার কবে দেখা হয়েছিল?

–আগেই বলেছি বছর দশেক আগে। সে যদুগড়ে কোনও কোম্পানির ব্যবসার কাজে এসেছিল।

–বারিনবাবুর বাবা কি তখন বেঁচে ছিলেন?

–না, তিনি মারা যাওয়ার পর বারিনের মা তার একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন ভাগলপুরে। তারপর তিনি যদুগড়ের বাড়িটা বিক্রি করে দিয়ে জামাইয়ের কাছে গিয়ে থাকতেন।

–বারিন আপনার কাছে এসব কিছু জানতে চায়নি? নাকি সে তার মায়ের এবং বোনের খবর জানত?

মধুরবাবু একটু চুপ করে থাকার পর বললেন,–বারিন এ কথা জানত। সে বলেছিল, সে তখন বম্বেতে বড় একটা কোম্পানিতে কাজ করে। সেই কাজের সূত্রেই তাকে যদুগড়ে আসতে হয়েছে। আমি তাকে রাজবাড়িতে আমাদের কোয়ার্টারে থাকার জন্য অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু সে বলেছিল তার হাতে আর সময় নেই। এখুনি তাকে পাটনায় চলে যেতে হবে।

-–আচ্ছা মধুরবাবু একটু স্মরণ করার চেষ্টা করুন তো, যদুগড়ে কোন ব্যবসায়ীর কাছে। বারিনবাবু এসেছিলেন? তা কি তিনি আপনাকে বলেছিলেন?

মধুরবাবু চোখ বুজে কিছুক্ষণ আঙুল খুঁটলেন। তারপর চোখ খুলে বললেন,–হা, বারিন আমাকে বলেনি, কিন্তু আমি তাকে হরদয়াল ট্রেডিং এজেন্সির অফিস থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেছিলুম।

কর্নেল বললেন,–ওই অফিসটা যে ব্যবসা সংক্রান্ত তা বোঝা যাচ্ছে। আপনি নিশ্চয়ই জানেন বা জানতেন ওরা কীসের ব্যবসা করত।

মধুরবাবু এবার বিকৃত মুখে বললেন,–হরদয়াল ইলেকট্রনিক জিনিসপত্রের ব্যবসা করত। কিন্তু যদুগড়ে ওর বদনাম ছিল স্মাগলার বলে। একবার ওকে পুলিশ গ্রেফতারও করেছিল। হংকং থেকে নেপাল থেকে যেসব ইলেক্ট্রনিক জিনিস চোরাচালান হয়, সেই চক্রের সঙ্গে হরদয়ালের যোগাযোগ ছিল।

–এখন কি ওই ট্রেডিং এজেন্সিটা আছে?

–তিন বছর আগে আমি যদুগড় থেকে চলে এসেছি। তখন ওটা ছিল, তা দেখেছি। হরদয়াল মারা গেলে তার ছেলে রামদয়াল ব্যবসা চালাত। এই তিন বছরে সেটা উঠে গেছে কি না জানি না।

কর্নেল বললেন, আপাতত আমার আর কোনও প্রশ্ন নেই। এবার আপনি আপনার কলকাতার ঠিকানা দিন।

বলে কর্নেল একটা কাগজের প্যাড আর কলম এগিয়ে দিলেন। মধুরবাবু তাতে নিজের নাম, বাড়ির ঠিকানা লিখে দিলেন।

কর্নেল সেটা হাতে নিয়ে টেবিলের ড্রয়ারে রেখে ব্রিফকেসের ছবিগুলো আগের মতো কাগজের মোড়কে ভরে রেখে দিলেন। তারপর তোয়ালেটা হঠাৎ কী খেয়ালে খুলে পায়ের কাছে ঝাড়লেন। তখনই দেখলুম তোয়ালের ভেতর থেকে একটা লম্বা-চওড়া খাম মেঝেয় ছিটকে পড়ল। মধুরবাবু বলে উঠলেন,–আরে ওটা আবার কী?

কর্নেল খাম খুলে একটা ভাঁজ করা খুব পুরোনো কাগজ বের করলেন। কাগজের ভাঁজগুলো কোথাও-কোথাও একটু আধটু ছিঁড়ে গেছে। সাবধানে ভাঁজখুলে অভ্যাসমতো তিনি আতস কাঁচের সাহায্যে দেখতে-দেখতে বললেন,–মধুরবাবু, রহস্য আরও ঘনীভূত হল মনে হচ্ছে।

মধুরবাবু সোফা থেকে একটু উঁচু হয়ে কাগজটা দেখতে-দেখতে বললেন, এটা একটা ম্যাপ মনে হচ্ছে! ম্যাপটাতে শুধু আঁকিবুকি ছাড়া স্পষ্ট করে কিছু লেখা নেই।

কর্নেল বললেন,–আছে, তবে সেগুলোতে ইংরেজি এ বি সি ডি ইত্যাদি অক্ষর লেখা আছে। ম্যাপের দাগগুলো মোটা কিন্তু অক্ষরগুলো ছোট তাই সহজে চোখে পড়ে না।

মধুরবাবু জিগ্যেস করলেন,–এটা কীসের ম্যাপ বলে মনে হচ্ছে আপনার?

কর্নেল একটু থেমে বললেন,–এটা কোনও জায়গার ম্যাপ হতে পারে, তবে ও ম্যাপ আঁকার উদ্দেশ্য কী এখন অনুমান করাও আমার পক্ষে অসম্ভব।

হালদারমশাই উত্তেজিত হয়ে বললেন,–কর্নেলস্যার, কোথাও কোনও দামি জিনিস লুকোনো আছে-এটা তারই ম্যাপ হইতে পারে না? জয়ন্তবাবু কী কন?

সায় দিয়ে বললুম,–ঠিক বলেছেন হালদারমশাই। এটা যাকে বলে লুকিয়ে রাখা গুপ্তধনের ম্যাপ।

মধুরবাবু শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বলে উঠলেন,–গুপ্তধন? বারিন কি কোনও গুপ্তধনের খোঁজ পেয়েছিল? তা না হলে এ ম্যাপ সে এঁকে লুকিয়ে রাখল কেন? কর্নেলসাহেব এখন আমার মনে হচ্ছে ছবিগুলোর জন্য নয়, এই লুকিয়ে রাখা ম্যাপটার জন্যই বারিনকে কেউ অনুসরণ করেছিল। আর এটা না পেয়েই রাগের চোটে সে বারিনকে খুন করে চলে গেছে।

কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন,–মধুরবাবু আপনি কি ব্রিফকেসটা আপনার কাছে রাখতে চান?

মধুরবাবু হাত এবং মাথা জোরে নেড়ে বললেন,–না-না কর্নেলসাহেব, ওই সর্বনেশে জিনিস আমার কাছে রেখে আমি কি স্বেচ্ছায় কারও হাড়িকাঠে গলা গলিয়ে দেব? ওসব সাংঘাতিক জিনিস আপনিই রাখুন। আর আমার একটা অনুরোধ, বারিন আমার এক সময়কার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। তার এই শোচনীয় পরিণতির জন্য আমার মনে খুব আঘাত লেগেছে। আপনি দয়া করে বারিনের খুনিকে পুলিশের হাতে তুলে দিন। আর সেইসঙ্গে সেই ম্যাপের রহস্য ফাঁস করুন। আমাকে আপনি সবসময়েই পাবেন।

কর্নেল ম্যাপটা খামে ভরে ভোয়ালের ভাঁজে রেখে ব্রিফকেসে ঢোকালেন। তারপর টেবিলের ড্রয়ার থেকে তার একটা নেমকার্ড বের করে মধুরবাবুকে দিলেন। বললেন,–দরকার হলে আপনি আমাকে ফোন করবেন। আর যদি প্রয়োজন মনে করেন, আপনার দিদিকেও আমার কথা খুলে বলবেন। কারণ তাঁর সাহায্যও যে আমার লাগবে না এমন কথা বলা যায় না।

মধুরবাবু চলে যাওয়ার সময় আমাকে ও হালদারমশাইকেও নমস্কার করে গেলেন।

কর্নেল ব্রিফকেসটা নিয়ে ভেতরের ঘরে চলে গেলেন। বুঝতে পারলুম তিনি এই কেসটাতে খুব গুরুত্ব দিচ্ছেন। গুরুত্ব দেওয়ারই কথা, কারণ এই ব্রিফকে কেন্দ্র করে যা ঘটেছে তা প্রচণ্ড রহস্যময়।

হালদারমশাই চাপা স্বরে বললেন,–আচ্ছা জয়ন্তবাবু, মধুরবাবুরে দেইখ্যা আপনার কী ধারণা হইল কন শুনি।

বললুম,–আপাত দৃষ্টিতে সাধাসিধে লোক বলেই মনে হল। একসময় খুব বিলাসিতায় জীবন কাটাতেন তা তো শুনলুম, কিন্তু এখন হয়তো তার তেমন কিছু রোজগার নেই। বিধবা দিদির বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। ইচ্ছে করলে তিনি তো ব্রিফকেসটার তালা ভেঙে টাকাকড়ি সোনাদানা আছে কি না দেখতে পারতেন। অন্য লোকে অন্ততত আগ্রহের জনও তেমনটি করে। কিন্তু উনি তা করেননি।

গোয়েন্দাপ্রবর একটিপ নস্যি নিয়ে নোংরা রুমালে নাক মুছে বললেন,–কিছু কওন যায় না। মাইনসের চেহারা দেইখ্যা বা কথা শুইন্যা কিছু বোঝা যায় না। জয়ন্তবাবু, চৌত্রিশ বৎসর চাকরি করসি–

এই সময়েই কর্নেল ফিরে এসে বললেন,–হালদারমশাই আপনার চৌত্রিশ বছরের পুলিশি অভিজ্ঞতা দিয়ে আপাতত একটা কাজ করে ফেলুন।

হালদারমশাই ব্যগ্রভাবে বললেন,–কন কর্নেলস্যার।

কর্নেল বললেন,–আপনাকে আমি নিহত বারিনবাবুর ঠিকানা লিখে দিচ্ছি। আপনি আজ সন্ধ্যার মধ্যেই একটা খবর এনে দিন। ও বাড়িতে বারিনবাবু কি একা থাকতেন, নাকি তার সঙ্গে আরও কেউ থাকত?

কথাটা শোনামাত্র গোয়েন্দাপ্রবর কোনও কথা বলে সবেগে বেরিয়ে গেলেন।

.

তিন

এমনিতেই রবিবারের দিনটা আমি কর্নেলের বাড়িতে কাটাই। কিন্তু কোনও রহস্যজনক ঘটনার পিছনে দৌড়াতে হলে কর্নেলের হাত থেকে আমার রেহাই মেলে না। তাছাড়া আমার স্বার্থও থাকে। কারণ সেই ঘটনার ভিত্তিতে পাতার পর পাতা রিপোর্টিং লিখে দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকায় প্রকাশের সুযোগ পাই এবং তাতে পত্রিকার কর্তৃপক্ষের কাছে সুনাম কুড়োই।

দুপুরে খাওয়ার পর অভ্যাসমতো ডিভানে চিত হয়ে ছিলুম। সেই সময় লক্ষ করলুম কর্নেল ঘরের ভেতর থেকে সেই ব্রিফকেসটা নিয়ে এলেন। তারপর সেটার ভেতর থেকে সেই ম্যাপটা বের করলেন। আমার চোখে ঘুমের টান এসেছিল, সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল কর্নেল ম্যাপটা খুঁটিয়ে দেখে তা থেকে কোনও সূত্র বের করবেন।

তারপর কখন ঘুমিয়ে গেছি জানি না। ঘুম ভাঙল ষষ্ঠীচরণের ডাকে। তার হাতে যথারীতি চায়ের কাপ-প্লেট। এটা বহুদিনের রীতি। ষষ্ঠী জানে ঘুমের পর আমি চা খেতেই ভালোবাসি। ডিভানে বসে দেওয়ালে হেলান দিয়ে জিগ্যেস করলুম,–ষষ্ঠী তোমার বাবামশাই কি সাধের বাগান পরিচর্যা করতে গেছেন?

ষষ্ঠী ফিক করে হেসে বললে,–আজ্ঞে দাদাবাবু, উনি আমাকে বলে গেছেন, তোর দাদাবাবুকে বলবি তার গাড়িটা আমি চুরি করে নিয়ে যাচ্ছি।

এমন ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু বরাবরই এতে আমার রীতিমতো অভিমান হয়। কেন, আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেলে ওঁর কোনও অসুবিধা হয়? বললুম,–তোমার বাবামশাই কখন ফিরবেন তা কি বলে গেছেন?

ষষ্ঠী বলল,–আজ্ঞে না। বলেই সে চমকে ওঠার ভঙ্গি করল–এই রে! সাড়ে-চারটে বাজতে চলল। ছাদের বাগানের কথা ভুলেই বসে আছি।

সে দ্রুত চিলেকোঠার সিঁড়ির দিকে ছুটে গেল। চা খাওয়ার পর কাপ প্লেটটা নিয়ে সোফার কাছে গেলুম এবং সেটা সেন্টার টেবিলে রেখে দিলুম। ঠিক এই সময়ই টেলিফোন বাজল। রিসিভার তুলে সাড়া দিতেই হালদারমশাইয়ের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল,কর্নেল স্যার, আমি হালদার কইত্যাদি।

কর্নেলের কণ্ঠস্বর নকল করার চেষ্টা করে বললুম-বলুন হালদারমশাই।

কিন্তু গোয়েন্দপ্রবরকে যতই অবহেলা করি, তার কান প্রাক্তন পুলিশের কান। তিনি বললেন, –জয়ন্তবাবু, এখন জোক করার মুডে আমি নাই।

অগত্যা হাসতে-হাসতে বললুম,–আপনি কি ছদ্মবেশে আছেন, নাকি কেউ আপনাকে অ্যাটাক করেছিল?

হালদারমশাই বললেন,–বুসছি, কর্নেল স্যার ছাদের বাগানে আছেন। থাকলে প্লিজ শিগগির ডেকে দ্যান।

বললুম,–হালদারমশাই আপনার কর্নেল স্যার আমার গাড়ি চুরি করে নিয়ে পালিয়েছেন।

–কী কাণ্ড! ষষ্ঠীরে কইয়া জাননি কিছু?

–ওই তো বললুম, ষষ্ঠীকে ঠিক ওই কথাটাই তিনি বলে গেছেন–জয়ন্তর গাড়ি চুরি করে নিয়ে যাচ্ছি!

–আপনি তখন কী করত্যাসিলেন?

–ঘুমোচ্ছিলুম। আপনি তো ভালোই জানেন দুপুরে আমার ভাত-ঘুমের অভ্যাস আছে।

–তা হইলে তো একটু গণ্ডগোল হইয়া গেল।

–কীসের গণ্ডগোল?

–কর্নেল স্যার থাকলে তেনার লগে কনসাল্ট করতাম।

–আপনি আমার সঙ্গে কনসাল্ট করতে পারেন।

হঠাৎ ফোনের লাইন কেটে গেল। আমি কয়েকবার হ্যালো-হ্যালো করার পর রিসিভার নামিয়ে রাখলুম। তারপর কেন যেন মনে হল কেউ কি হালদারমশাইয়ের হাত থেকে ফোন কেড়ে নিল? একটু উদ্বেগ বোধ করলুম। এই প্রাইভেট ডিটেকটিভদ্রলোক মাঝে মাঝে ভুলে যান তিনি এখন পুলিশ ইন্সপেক্টর নন, তাছাড়া জেদের বসে অনেক সময়েই এমন হঠকারি কাজ করে বসেন যে কর্নেলকে সেজন্য অনেক ছোটাছুটি করতে হয়।

এইসব ভাবতে-ভাবতে দৃষ্টি গেল সোফার নিচে। যেখানে মধুরবাবু বসে ছিলেন সেখানে সোফার তলায়ে কী একটা ছোট্ট চাকতির মতো জিনিস পড়ে আছে। তখনই হাত বাড়িয়ে সেটা তুলে নিলুম। ততক্ষণে ঘরের আলো কমে এসেছে। আগে কর্নেলের টেবিল ল্যাম্পটা জ্বেলে দিয়ে জিনিসটার দিকে তাকালাম। একটা তামার চাকতি বলেই মনে হল। চাকতিটার সাইজ এক টাকার কয়েনের মতো। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় দেখতে-দেখতে আবিষ্কার করলুম চাকতির গায়ে অজানা ভাষার হরফে কীসব লেখা আছে। উলটো পিঠে একটা মূর্তি আঁকা। মূর্তিটা দেখতে ভয়ঙ্কর।

খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলুম। কর্নেলের ড্রইং রুমে দেশ বিদেশের বিস্ময়কর বহু জিনিস আছে বটে, কিন্তু সেগুলো সবই কাঁচের আলমারির ভেতর সাজানো আছে। এটা নিশ্চয়ই কর্নেলের নয়। তাহলে কি এটা মধুরবাবুর পকেট থেকে দৈবাৎ তার অজান্তে পড়ে গিয়েছিল? মনে পড়ল মাঝে-মাঝে তিনি রুমাল বের করে মুখ মুছছিলেন।

মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে কলকাতায় শীতের আর পাত্তা নেই বরং বাইরে বেরুলে গরম লাগে। কিন্তু কর্নেলের ড্রইং রুমের ফ্যানের হাওয়া সত্ত্বেও উত্তেজনা মানুষকে ঘামিয়ে তুলতে পারে।

আরও একটু চিন্তার পর আমার বিশ্বাস দৃঢ় হল, এটা কোনও দেশের প্রাচীন মুদ্রাও হতে পারে। কিন্তু মধুরবাবু এটা পাঞ্জাবির ডান পকেটে না রেখে বাঁ-পকেটে রেখেছিলেন কেন, যে পকেটে কি না রুমাল ভরা আছে।

ইতিমধ্যে ষষ্ঠী ছাদ থেকে নেমে এসে ঘরের সব আলো জ্বেলে দিল। তারপর মুচকি হেসে বলল,–দাদাবাবু টিকটিকিবাবু আসছেন।

ষষ্ঠী হালদারমশাইকে টিকটিকিবাবু বলে। মিনিট দুই-তিন পরে ডোরবেল বাজল। ষষ্ঠী পিছনের করিডোর দিয়ে গিয়ে বাইরের লোকেদের জন্য দরজা খোলে। কিন্তু তাকে দরজা খুলতে নিষেধ করে আমি নিজেই ড্রইংরুমের সংলগ্ন ছোট ওয়েটিং রুমটা দিয়ে এগিয়ে গেলুম। তারপর দরজা খুললুম।

হালদারমশাইকে দেখে অবাক হয়ে বললুম,–কার সঙ্গে মারামারি করে এলেন? আপনার কপালে ছোট একটা ব্যান্ডেজ দেখছি। ডান হাতের বুড়ো আঙুলেও পট্টি বাঁধা।

হালদারমশাই বাঁকা হেসে বললেন,–ও কিছু না। কর্নেল স্যার ফেরেন নাই?

বললুম,–না।

ড্রইংরুমে এসে হালদারমশাই ধপাস করে সোফায় বসে বললেন,–এক গ্লাস জল খামু। ষষ্ঠীরে ডাকেন।

আমি হাঁক দিলুম,–ষষ্ঠী, শিগগির এক গ্লাস জল নিয়ে এসো।

ষষ্ঠী তখনই জল এনে দিল। তারপর তার টিকটিকিবাবুর ক্ষতচিহ্নের দিকে তাকিয়ে কিছু জিগ্যেস করতে ঠোঁট ফাঁক করল। কিন্তু আমি তাকে চোখ টিপে নিষেধ করে ইশারায় চলে যেতে বলুলম। কারণ, হালদারমশাই এখন অন্য মেজাজে আছেন। ষষ্ঠীকে ধমক দিতেও পারেন।

ষষ্ঠী চলে যাওয়ার পর জিগ্যেস করলুম,–মনে হচ্ছে আপনার ওপর কেউ হামলা করেছিল। হালদারমশাই জলের গ্লাস রেখে এক টিপ নস্যি নিলেন, তারপর প্যান্টের পকেট থেকে সেই নোংরা রুমাল বের করে নাক মুছে বললেন,–আইজ একটু ভুল করসিলাম। সঙ্গে আমার লাইসেন্সড রিভলভারটা ছিল না। আর্মস ছাড়া আমি কখনও কোনও স্পটে যাই না। আসলে কর্নেল স্যারের কথা শুইন্যাই সোজা স্পটে চলে গিসলাম।

–তা আপনার ওপর হামলা করল কে?

গোয়েন্দাপ্রবর ক্ষোভের সঙ্গে বললেন,–আমি তখন আপনার লগে ফোনে কথা কইতেসিলাম। সেই ফোনটা পাইসিলাম একটা ফামের্সিতে। আইজ রবিবার, কিন্তু ফার্মেসিটা খোলা ছিল। আপনার লগে কথা কইত্যাসি, এমনসময়ই এক হালায় হঠাৎ আমার পিছন থিক্যা ফোনটা কাড়বার চেষ্টা করল। ফার্মেসির মালিক কর্মচারী সবাই মনে হল লোকটারে ভয় পায়। তারা চুপচাপ দাঁড়াইয়া থাকল। এদিকে আমি এমন কাণ্ড দেইখ্যা একটুখন অবাক হইসিলাম। ফোনটা কাড়িয়া লইয়া লোকটা কইল,–এক্ষুনি এখান থেইক্যা কাইট্যা পড়ো। নইলে এই দেখসো আমার কী আসে!

জিগ্যেস করলুম,–ছোরা ছুরি নাকি ফায়ার আর্মস?

হালদারমশাই জোরে শ্বাস ছেড়ে বললেন,–ছয়-সাত ইঞ্চি লম্বা একখান ছোরা।

জিগ্যেস করলুম,–আপনাকে কি সে ওটা দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করেছিল?

গোয়েন্দাপ্রবর বাঁকা হেসে বললেন, নাঃ, আমিই হালার হাত থেইক্যা ড্যাগারখান কাইড়া লইছি। কাড়াকাড়ির সময় আমার কপালে আর ডান হাতের বুড়ো আঙুলে ড্যাগারের ডগা একটুখানি লাগসে।

–তারপর কী হল?

–হালার প্যাটে হাঁটুর গোঁত্তা এমন জোরে মারসি, সে তখনই টেলিফোন শুঙ্কু নিচে গড়াইয়া পড়সিল। তারপর আর সাড়াশব্দ নাই।

–তার মানে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল?

–হঃ! তো আমি ফার্মাসিতে কইলাম আমারে দুইখান ব্যান্ডেজ লাগাইয়া দিন।

দোকানের একজন কর্মচারী আমার হুকুম পালন করল। আমি তারে কইলাম,–আমি কে আপনারা জানেন? লালবাজারের ডিকেটটিভ ডিপার্টমেন্টের লোক। অমনি দ্যাখলাম যেটুকু ভিড় জমসিল, তখনই সাফ হইয়া গেল। আমি বুক ফুলাইয়া রাস্তায় নাইম্যা একটা ট্যাক্সি ডাকলাম।

–আর লোকটা ওখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইল?

এবার গোয়েন্দ্ৰপ্ৰবর খোলা মনে হেসে বললেন, আমি আর পিছু ফিরি নাই।

–লোকটা কে তা চিনতে পেরেছিলেন?

–না। তবে এইটুকু বুঝঝি হালা আমারে জগদীশবাবুর বাড়ি থিক্যা ফলো কইরা আইছিল।

–জগদীশবাবু কে?

–কমু। কর্নেল স্যারেরে আইতে দিন, তারপর ডিটেলস সব জানতে পারবেন।

কর্নেল এলেন প্রায় আধঘণ্টা পরে। তখন প্রায় ছ’টা বাজে। তিনি এসেই হালদারমশাইকে দেখে বলে উঠলেন,–যা ভেবেছিলাম, তাই ঘটেছে দেখছি। তখন আপনি আমার কথা শুনেই বেরিয়ে গেলেন, আমি সুযোগ পেলুম না যে আপনাকে একটু সাবধান করে দেব।

হালদারমশাই বললেন,–ও কিসু না। তারপর পকেট থেকে ভাঁজ করা একটা ড্যাগার বের করে বললেন,–কর্নেলস্যার, আপনি তো জানেন আমার মাথা আফটার অল–।

কর্নেল সহাস্যে বললেন, পুলিশের মাথা–এই তো? যাই হোক, বসুন আমি পোশাক বদলে আসি। আর জয়ন্ত, তোমার গাড়ি চুরি করে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেজন্য এই বৃদ্ধের প্রতি মনে-মনে খুব রেগে আছ। কিন্তু ভেবে দ্যাখো, তোমার কেমন চমৎকার একটা ভাত-ঘুম হয়ে গেল। বলবে, তুমি সঙ্গে গেলে কি আমার কোনও অসুবিধে হতো? হ্যাঁ, হতো।

বলে তিনি ভেতরে গিয়ে ঢুকলেন। কিছুক্ষণ পরে আমি হালদারমশাইয়ের হাত থেকে ভাঁজ করা ড্যাগারটা খুলে ফেললুম। ছ’ইঞ্চির বেশি লম্বা শান দিয়ে ধারাল করা অস্ত্র। হালদারমশাই ছোরাটা আমার হাত থেকে নিয়ে চাপা স্বরে বললেন,–মনে হইত্যাসে ষষ্ঠীচরণ এখনই কফি লইয়া আইবে। সে ফায়ার আর্মর্স দেইখ্যা ভয় পায় না, কিন্তু ড্যাগার দেইখ্যা খুব ভয় পায়।

একটু পরে কর্নেল ফিরে এসে ইজিচেয়ারে বসলেন। তার পেছনে ষষ্ঠীচরণও কফি আর দু-প্লেট স্ন্যাকস নিয়ে এসে গেল। এবং সেন্টার টেবিলে ট্রে-টা রেখে চুপচাপ চলে গেল।

এরপর কিছুক্ষণ আমরা কফি পানে মন দিলুম। কফি শেষ করে কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, –এবার হালদারমশাইয়ের রিপোর্ট শোনা যাক।

হালদারমশাই ইনিয়ে-বিনিয়ে যে ঘটনা শোনালেন, তা সংক্ষেপে এই :

কর্নেলের কথা অনুসারে হালদারমশাই বারিনবাবুর বাড়িতে গিয়েছিলেন। বাড়িটার মালিক একজন অবাঙালি ভদ্রলোক। তার নাম, জগদীশ প্রসাদ রাও। বাড়িটা দোতলা, এবং নতুন। ওই গলির মধ্যে বাড়িটা চোখে পড়ার মতো। সামনের একটা গেট আছে, ভেতরে ছোট্ট একটা লন। সামনের অংশটা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। এবং পাঁচিলে কাঁটাতারের বেড়া আছে। হালদারমশাই গেটের কাছে গিয়ে দারোয়ানকে ডাকেন। তারপর দারোয়ানের হাতে তার নেমকার্ড দিয়ে বলেন, বাড়ির মালিকের সঙ্গে তার দেখা করা জরুরি। দারোয়ান বলে তার সাহেব এখন বিশ্রাম করেছেন। দেখা করতে হলে চারটের পর আসতে হবে।

হালদারমশাই একটু গলা চড়িয়ে ইংরেজিতে বলেন, তিনি একজন ডিটেকটিভ। এবং এই বাড়িতে আজ যে ভদ্রলোক খুন হয়েছেন তার আত্মীয় তাকে এই খুনের তদন্তের ভার দিয়েছেন। এতে কাজ হয়। ডান দিকে দোতলার একটা ঘরের দরজা খুলে ব্যালকনিতে এক ফরসা রঙের ভদ্রলোক বেরিয়ে আসেন। তিনি কথাটা শুনতে পেরেছিলেন। তাই দারোয়ানকে বলেন, হালদারমশাইকে যেন নিচের বসার ঘরে নিয়ে আসে।

এরপর জগদীশবাবুর সঙ্গে হালদারমশাইয়ের কথাবার্তার আর বাধা ছিল না। জগদীশবাবু বলেন, নিহত বারিনবাবু ছিলেন তার একজন বন্ধুমাত্র, তার বেশি কিছু নয়। গত মাসে বারিনবাবুকে তার বাড়িতে থাকার জন্য অনুরোধ জানান। জগদীশবাবুর ফ্যামিলি মাসখানেকের জন্য দেশে গেছে। তার দেশের বাড়ি হরিয়ানায়। কাজেই দোতলার যে ঘরটা আত্মীয়স্বজন বা ঘনিষ্ঠ কারো জন্য খালি রাখা হয়, অর্থাৎ তার গেস্টরুম, সেখান তিনি বারিনবাবুকে অস্থায়ী ভাবে থাকতে দিয়েছিলেন। বারিনবাবুর কাছে এযাবৎ কোনও লোক দেখা করতে আসেননি। ওঘরে একটা বাড়তি টেলিফোন আছে, সেটা তিনি বারিনবাবুকে ব্যবহার করতে অনুমতি দিয়েছিলেন।

এসব কথা হালদারমশাই তাঁকে প্রশ্ন করেই জানতে পেরেছেন। এরপর হালদারমশাইয়ের প্রশ্নের উত্তরে জগদীশবাবু বলেন, গতরাত্রে কখন এমন একটা শোচনীয় কাণ্ড ঘটেছে তিনি টের পাননি। দারোয়ানও এতটুকু জানতে পারেনি। বারিনবাবু পাড়ার একটা হোটেলের সঙ্গে নিজের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করে নিয়েছিলেন। কারণ, উনি কখন খাবেন তার কোনও সময়ের ঠিক ছিল না।

এরপর হালদারমশাইকে নিয়ে তিনি দোতলায় বারিনবাবুর ঘরে যান। পুলিশ যা তদন্ত করার করে নিয়ে চলে গেছে। তাই ঘরের চাবি জগদীশবাবুর কাছে আছে। ঘরে ঢুকে হালদারমশাই যথাসাধ্য খুঁটিয়ে দেখে কোনও সূত্র পাওয়ার চেষ্টা করেন। ঘরের রক্ত ততক্ষণে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করা হয়েছে। জগদীশবাবু তাকে বলেন, তার ধারণা কোনও চেনা লোক বারিনবাবুর কাছে এসেছিল। কিন্তু সে তা হলে নিশ্চয়ই পাঁচিলের কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে ঢুকে ছিল। এমনকী জগদীশবাবুর ধারণা, তাকে বারিনবাবুই গভীর রাতে কোনও এক সময় পাঁচিল ডিঙিয়ে আসতে বলেছিল। পুলিশ দেখেছে দারোয়ানের ঘরের পাশে একটা বকুলগাছ আছে। সেই বকুলগাছে খুনির আসার চিহ্ন পুলিশ খুঁজে পেয়েছে। এখন জগদীশবাবুর আক্ষেপ, তিনি বারিনবাবুর ওপর কেন যে এত আস্থা রেখেছিলেন বুঝতে পারছেন না।

এসব কথা বলার পর হালদারমশাই একটু দম নিয়ে বললেন,–ঘরে বারিনবাবুর যেসব জিনিস ছিল, তা পুলিশ সিজ কইরা লইয়া গ্যাসে, কিন্তু আমার মনে একখান ধন্ধ ঢুকসে।

কর্নেল জিগ্যেস করলেন,–কী ধন্ধ? গোয়েন্দপ্রবর খুব চাপা স্বরে বললেন,–কর্নেলস্যার, আমার সন্দেহ, বারিনবাবুরে ওই জগদীশবাবুই খুন করসেন।

কর্নেল বললেন,–সেটা অসম্ভব কিছু নয়।

এই সময় টেলিফোন বেজে উঠল। কর্নেল রিসিভার তুলে সাড়া দিলেন। তারপর বললেন, –বলুন মধুরবাবু…বলেন কী? আপনার লেটার বক্সে হুমকি দেওয়া চিঠি? ঠিক আছে, কাল দিনের বেলায়-ধরুন, সকাল নটার মধ্যে আপনি চলে আসুন।

.

চার

সেই সন্ধ্যায় কর্নেল হালদারমশাইকে জগদীশবাবুর কাজ কারবারের খোঁজ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছিলেন। হালদারমশাই চলে যাওয়ার পর আমি সোফার নিচে কুড়িয়ে পাওয়া সেই চাকতিটা কর্নেলকে দেখিয়েছিলুম। চাকতিটা যে মধুরবাবুর পকেট থেকেই পড়েছে, আমার এই ধারণার কথাও বলেছিলুম। কিন্তু কর্নেলের মতে ওই চাকতিটা তোয়ালের ভঁজের ভেতরেই সম্ভবত রাখা ছিল। সোফার নিচে কার্পেটের ওপর ভোয়ালেটা লম্বা করে ঝেড়ে ফেলার সময় অবশ্য কোনও শব্দই শোনা যায়নি। তারপর কর্নেল আমাকে অবাক করে বলেছিলেন, তুমি এটাকে তামার চাকতি ভাবছ, কিন্তু এটা আসলে একটা ব্রোঞ্জের সিল।

আতস কাঁচের সাহায্যে টেবিল ল্যাম্পের আলোয় সিলটা পরীক্ষা করে দেখার পর কর্নেল বলেছিলেন,–প্রাচীন লিপি বিষয়ে আমার যতটুকু জ্ঞান, তাতে মনে হচ্ছে, এই লিপিগুলি ব্রাহ্মি। আর উলটো পিঠে যে মূর্তিটা দেখছ, সেটা বৌদ্ধ ধর্মের এক অপদেবতার। তার নাম ‘মার।

রহস্যটা ক্রমেই এত জটিল হয়ে উঠল দেখে সে রাতে আমার ভালো ঘুমই হয়নি। সকালে বেড-টি খাওয়ার পর বাথরুমে গিয়েছিলুম, তারপর প্যান্টশার্ট পরে সাধের বাগানে যাব। ভাবছিলুম। কারণ কর্নেলের এখন ছাদেই থাকার কথা। কিন্তু চিলেকোঠার সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে গিয়ে ড্রইং রুমের ভেতর থেকে কর্নেলের ডাক শুনতে পেলুন। ড্রইংরুমে গিয়ে দেখি মধুরকৃষ্ণ মুখুজ্যে বিরক্ত মুখে সোফায় বসে আছেন। মনে হল ভদ্রলোক আমার মতোই বিনিদ্র রাত কাটিয়েছেন। সবে আটটা বাজে, তাই বোঝা যায় উনি ঘুম থেকে উঠেই এখানে চলে এসেছেন।

আমাকে দেখে তিনি নমস্কার করলেন। আমি একটু তফাতে বসে জিগ্যেস করলুম,–হাতের লেখা দেখে মধুরবাবু কি কাউকে চিনতে পেরেছেন?

কর্নেল হেসে উঠলেন,–জয়ন্ত, মাঝে-মাঝে এমন ছেলেমানুষের মতো প্রশ্ন করো আমার অবাক লাগে।

বললুম,–বাঃ, অবাক লাগার কী আছে? মধুরবাবু এতবছর দিদির বাড়িতে বাস করেছেন, কতরকম লোকের সঙ্গে তাঁর মেলামেশা থাকা তো স্বাভাবিক। তাদের হাতের লেখা দেখতে পাওয়াও অসম্ভব কিছু নয়।

মধুরবাবু বিষণ্ণমুখে বললেন,–হাতের লেখা দেখে আমার মনে হয়েছে কেউ কোনও কমবয়সি ছেলে বা মেয়েকে দিয়ে চিঠিটা লিখিয়েছে। কর্নেল সাহেবও আমার কথা স্বীকার করেছেন।

কর্নেল বললেন,–হাঁ, এটা যে-কোনও কমবয়েসি এবং বানান ভালো না জানা ছেলে বা মেয়েকে দিয়ে লেখানো হয়েছে, এতে আমি নিঃসন্দেহ। তুমি নিজেই পুরো চিঠিটা পড়ে দ্যাখো।

চিঠিটা নিয়ে দেখলুম, একটা একসারসাইজ খাতার পাতা ছিঁড়ে আঁকাবাঁকা হরফে এবং ভুল বানানে লেখা আছে, মধুরকেষ্ট মালটা তুমি যে হাতিয়েছ তা জানি। আজ থেকে তিন দিনের মধ্যে ওটা তুমি আউটরাম ঘাটে গঙ্গার ধারে সেই বেঞ্চিতে যদি রেখে না আসো, তা তোমার মুণ্ডতেও একটা গুলি ঢুকে যাবে। ইতি–

চিঠিটা পড়ার পর বললুম,–একটা জিনিস স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, বারিনবাবুকে যে শুক্রবার গঙ্গার ধারে ফলো করে গিয়েছিল, সে সম্ভবত দূর থেকে মধুরবাবুর হাতে ব্রিফকেসটা দেখেছিল।

কিন্তু প্রশ্ন হল মধুরবাবুর মতো নিরীহ মানুষের কাছ থেকে সে তত শুক্রবার রাত্রেই সোজা ওঁর দিদির বাড়িতে ঢুকে ওটা কেড়ে নিয়ে আসতে পারত। বিশেষ করে তার কাছে যখন পিস্তল বা রিভলভার আছে।

মধুরবাবু বললেন, আমার দিদিকে আপনি দেখেননি। সে পাড়ায় খুব জনপ্রিয়। তার ডাকে পড়াশুদ্ধ এসে হাজির হবে। এই চিঠি যে লিখেছে সে নিশ্চয়ই একথাটা জানে।

কর্নেল বললেন,–লোকটা যে আপনার অলক্ষ্যে আপনাকে কাল সকালে বা আজ সকালে ফলো করে আসেনি, কে বলতে পারে? আমার ধারণা ব্রিফকেসটা ফেরত নেওয়ার জন্য সে তিন দিনের সময় দিয়েছে, তার কারণ সে জানে ওটা আপনার কাছে নেই।

আমি বললুম,–তা হলে খালি ব্রিফকেসটা মধুরবাবুর হাতে দিয়ে পুলিশের সাহায্যে একটা ফঁদ পাতলেই তো হয়। যেই লোকটা মধুরবাবুর হাত থেকে ব্রিফকেস নেবে অমনি তাকে পুলিশ এবং আমরা পাকড়াও করে ফেলব।

কর্নেল হাসলেন,জয়ন্ত, লোকটা যেই হোক, সে অত বোকা নয়।

মধুরবাবু কাতর মুখে বললেন, আমার কলকাতায় থাকতে এখন খুবই আতঙ্ক হচ্ছে। তিনদিন পেরিয়ে যাওয়ার পরও যদি সে কথামতো, ব্রিফকেসটা না পায়, তাহলে প্রচণ্ড ক্রোধে আমাকে হয়তো মেরে ফেলবে। দিদিও বলছিল কর্নেলসাহেবরা যা করার করবেন, আমি যেন চুপি-চুপি যদুগড়েই ফিরে যাই। কুমারবাহাদুরের রাগ এতদিনে পড়ে গেছে, তাছাড়া ওঁর মেয়ে আমাকে অনুরোধ করে চিঠি লিখেছে, কাজেই যদুগড়ে ওঁদের আশ্রয়ে থাকলে আমি নিরাপদে থাকতে পারব।

কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে কিছু ভাবছিলেন। তিনি চোখ না খুলেই বললেন, –এই প্ল্যানটা মন্দ নয়। আপনি বরং আজই যদুগড়ে চলে যান। যাতে সেই লোকটা আপনাকে ফলো করার সুযোগ না পায় সেইজন্য আপনি একটা ট্যাক্সি করে অলিগলি ঘুরতে-ঘুরতে হাওড়া স্টেশনে চলে যাবেন। ট্যাক্সিওলা জিগ্যেস করলে বলবেন, আমার ইচ্ছে মতো আমি যাব। তোমার তো মিটারের অঙ্ক বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে।

মধুরবাবু হাসবার চেষ্টা করে বললেন,–এই অবস্থায় তাই করতে হবে।

টাকাকড়ি আমার হাতে তত নেই। দিদির কাছে ধার চাইলে অবশ্য পেয়ে যাব। দিদি জামাইবাবুর প্রভিডেন্ট ফান্ড আর গ্র্যাচুইটির টাকা ছাড়াও মাসে-মাসে পেনসেন পাচ্ছে। তাছাড়া নিজের বাড়ি। একতলায় ভাড়াতে আছে।

কর্নেল বললেন,–বাঃ, তাহলে তো কোনও অসুবিধেই নেই। আপনি আজই সুযোগমতো কলকাতা থেকে কেটে পড়ুন। প্রয়োজনে আমি কুমারবাহাদুরের সঙ্গে যোগাযোগ করে আপনার খবর নেব।

মধুরবাবু করজোড়ে বললেন,–কিন্তু কর্নেলসাহেবকে একটু অনুরোধ, এইসব ঘটনার কথা যেন কুমারবাহাদুরের কানে না যায়।

–না, না, সে নিয়ে আপনি ভাববেন না। আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় যদুগড়ের রাজবাড়িতে–তাই না! তাই আপনার খবর নিতে আমার কোনও অসুবিধে নেই।

মধুরবাবু আমাদের দুজনকে নমস্কার করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

দেখলুম কর্নেলের একদফা কফি খাওয়া হয়ে গেছে। তাই বললুম,–এমন জমজমাট রহস্যের গোলকধাঁধায় পড়ে আমার নার্ভ অসাড় হয়ে গেছে। রাত্রে ভালো ঘুমও হয়নি।

কর্নেল এবার তার বিখ্যাত অট্টহাসি হাসলেন এবং যথারীতি ষষ্ঠীকে দেখলুম পরদার ফাঁক দিয়ে মুখ বাড়িয়ে আছে। কর্নেল হাঁক দিয়ে বললেন,–ষষ্ঠী, পাঁচ মিনিটের মধ্যে কফি না আনলে তোর গর্দান যাবে।

ষষ্ঠীর মুখ পরদার আড়ালে হারিয়ে গেল। বললুম,–কর্নেল, গত রাতে আমি লক্ষ করেছি আপনি আপনার বেডরুমে টেবিল ল্যাম্পের আলোয় কী যেন করছিলেন।

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন,–হা, তুমি ঠিকই ধরেছ। আমি বৌদ্ধযুগের ওই ব্রোঞ্জের সিলটা একটা সিল সংক্রান্ত পুরোনো বইয়ের পাতায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিলুম।

–খুঁজে পেয়েছেন তো?

–হ্যাঁ, রাত একটা নাগাদ ওই সিলটার ছবি খুঁজে পেয়েছি। ওটা থেরবাদী, অর্থাৎ বৌদ্ধ স্থবির সম্প্রদায়ের একটা সিল। ঐতিহাসিক ডক্টর ফাগুসন লিখেছেন এই সিল-এ পালি ভাষায় এবং ব্রাহ্মি লিপিতে যা লেখা আছে, তাতে প্রাচীন মগধ অর্থাৎ আধুনিক বিহারের একটা মঠে লুকিয়ে রাখা গুপ্তধনের আভাস পাওয়া যায়।

চমকে উঠে বললুম,–তা হলে ঘুরে-ফিরে গুপ্তধনের কথাই ফিরে আসছে।

-হ্যাঁ। আসছে বটে। এবার শুনলে তুমি আরও অবাক হবে সিল-এর যে পিঠে অপদেবতা মার-এর মূর্তি খোদাই করা আছে, তার নিচের দিকে কয়েকটা আঁকাবাঁকা রেখা আতস কাঁচে লক্ষ করে আমি একটা কাগজে তা নকল করেছি। তারপর তোয়ালের ভেতর লুকিয়ে রাখা পুরনো ছেঁড়াখোঁড়া কাগজটার সঙ্গে মিলিয়ে দেখে অবাক হয়েছি। সিল-এর আঁকাবাঁকা রেখাগুলো আসলে একটা ম্যাপ। যে ম্যাপ বড় আকারে পুরোনো কাগজে আমরা দেখেছি।

এই সময়েই ষষ্ঠীচরণ ট্রেতে কফি এবং স্ন্যাকস রেখে গেল। কফি খেতে-খেতে বলুলম, –আমার নার্ভ চাঙ্গা হতে শুরু করেছে। আমার চোখে এখন কী ভাসছে জানেন?

কর্নেল বললেন,–প্রাচীন মগধ। অর্থাৎ আধুনিক বিহার।

আমি উত্তেজিত ভাবে বললুন,কর্নেল, এমনকী হতে পারে না, বিহারের কোথাও সেই মঠের ধ্বংসাবশেষ বারিনবাবু আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু গুপ্তধন নিশ্চয়ই খুঁজে পাননি। আপনি কী বলেন?

–ঠিক বলেছ ডার্লিং।

হাসতে-হাসতে বললুম,যাক, অনেকদিন পরে আবার আপনার মুখ থেকে ডার্লিং শব্দটা বেরোল। তার মানে আপনার অঙ্ক ঠিক পথেই এগোচ্ছে।

–নিছক অঙ্ক নয়, মনে হচ্ছে সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক। অর্থাৎ ভগ্নাংশের অঙ্ক। তাই বড় জটিল।

একটু পরে বললুম,–আপনি যদুগড়ে হয়তো অনেকবার গেছেন। কারণ, সেখানকার রাজবংশের কুমারবাহাদুর আপনার বন্ধু। যদুগড় অঞ্চলে নিশ্চয়ই অনেক ঘোরাঘুরি করেছেন। ওখানে কি কোথাও বৌদ্ধমঠের ধ্বংসাবশেষ লক্ষ করেননি?

কর্নেল হাসলেন,–ভগ্নাংশটা তুমি নিমেষে সমাধান করে ফেললে?

–এমনকী হতে পারে না? বিহারে তো বহু জায়গায় বৌদ্ধদের কীর্তিকলাপের নিদর্শন ছড়িয়ে আছে।

কর্নেল কী বলতে যাচ্ছিলেন, এমনসময় ডোরবেল বাজল। তিনি অভ্যাসমতো হাঁকলেন,–ষষ্ঠী–

একটু পরে সবেগে প্রবেশ করলেন প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে. কে. হালদার। তিনি সোফায় বসে বললেন,–মর্নিং কর্নেলস্যার। মর্নিং জয়ন্তবাবু।

কর্নেল বললেন,–কোনও সুখবর এনেছেন মনে হচ্ছে হালদারমশাই!

হালদারমশাই মুচকি হেসে বললেন,–খবর একখান আনসি, তা সু কিংবা কু এখনও জানি না। তবে আগে ষষ্ঠীর হাতের কফি খামু, নার্ভ চাঙ্গা করুম, তারপর সব কমু।

ষষ্ঠী হালদারমশাইকে দরজা খুলে দিয়েই তার জন্য স্পেশাল কফি তৈরি করতে গিয়েছিল। শিগগির সে সেই কফি নিয়ে এল।

হালদারমশাই কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন,–আঃ!

ষষ্ঠী দাঁড়িয়ে আছে দেখে কর্নেল বললেন,–ওঃ, বুঝেছি। তুই বাজার যাবি।

ষষ্ঠী বলল,–আধঘণ্টা লেট হয়ে গেল। টাটকা মাছ আর পাব কিনা কে জানে?

কর্নেল উঠে গেলেন। বুঝলুম ষষ্ঠীকে বাজারের টাকা দিতে যাচ্ছেন। সেই সুযোগে আমি চুপি-চুপি জিগ্যেস করলুম,–কী খবর এনেছেন, তার একটু আভাস দিন না হালদারমশাই।

হালদারমশাই চাপা স্বরে বললেন,–জগদীশবাবুর কাজ কামের হদিশ পাইসি।

কী হদিশ শোনার সুযোগ পেলাম না। কর্নেল এসে গেলেন। ইজিচেয়ারে বসে তিনি চুরুট ধরালেন। তারপর বললেন,–এবার আপনার খবরটা বলে ফেলুন হালদারমশাই।

হালদারমশাই তেমনই চাপাস্বরে বললেন,–জগদীশবাবুর ব্র্যাবোর্ন রোডে ব্যবসার অফিস আছে।

-কীসের ব্যবসা?

কর্নেলের প্রশ্নের উত্তরে হালদারমশাই আরও চাপা গলায় বললেন,–নীলামের ব্যবসা। আইজ সকাল সাতটায় ওনার বাড়িতে আবার গিসলাম। একটুখান মেক-আপ করসিলাম। মাথায় পরচুলা আর গোঁফ-দাড়ি ছিল। পরনে ধুতি পাঞ্জাবি। জগদীশবাবুর গাড়ি বার হইয়া গেল, তারপর দেখলাম জয়ন্তবাবুর বয়েসি একজন ইয়াং ম্যান ওনার বাড়ি ঢুকত্যাসে। অমনি তারে গিয়া কইলাম, জগদীশবাবুর লগে আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। লোকটি কইল, তিনি তো কিছুক্ষণ আগে বেরিয়ে গেছেন। আপনি কে? কইলাম আমি ভবানীপুরের এক জমিদার বাড়ির থিক্যা আসত্যাসি। আমার নাম রাখালচন্দ্র বিশ্বাস। আমার কর্তামশাইয়ের টাকার অভাব। তাই উনি আমারে এখানে আইতে কইলেন। জগদীশবাবু নাকি পুরোনো মাল বেচাকেনার কারবার করেন। যুবকটি কইল, তাহলে আপনি দুপুর একটা নাগাদ স্যারের অফিসে দেখা করবেন। আমি কইলাম, ঠিকানা? সে তার পকেট থেইক্যা এই কার্ডখান বার কইরা আমাদের দিল।

বলে গোয়েন্দাপ্রবর কর্নেলকে একটা কার্ড দিলেন।

কর্নেল সেটা পড়তে-পড়তে বললেন, হ্যাঁ, ভদ্রলোক দেখছি পুরোনো আসবাব পত্রের বেচাকেনা করেন। মহাবলী অকসন হাউস। অবশ্য এই নিলামের কারবারিরা সুযোগ পেলে গোপনে প্রত্নদ্রব্যের ব্যবসা করেন। যাইহোক, আপনি একটা কাজের মতো কাজ করেছেন। যুবকটিকে তার নাম জিগ্যেস করেননি?

–করসিলাম। কইল, স্যারেরে কইবেন চঞ্চল সাহা আপনারে এই কার্ড দিছেন। সে আরও কইল, আমি ওনার একজন এজেন্ট।

আমি বললুম,–কর্নেল, ভগ্নাংশটা আর তো তবে জটিল মনে হচ্ছে না।

কর্নেল আমার কথার জবাব দিলেন না। হালদারমশাই বললেন, আমার সন্দেহ বারিনবাবু এই ব্যবসার লগে যুক্ত ছিল। আমি এখনও কইতাসি জগদীশবাবুই বারিনবাবুরে খুন করসেন।

কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন,–হালদারমশাই, আপনি এক কাজ করুন। এখনই মধুরবাবুর বাড়ি চলে যান। গিয়ে তাকে বলুন তার সঙ্গে আপনিও যদুগড়ে যাবেন। আপনার পরিচয় তো মধুরবাবু পেয়েছেন। আপনি এবার ওঁর দিদি নিরুপমার সঙ্গে দেখা করে আপনার আইডেনটিটি কার্ড দেখিয়ে বলবেন, কর্নেল নীলাদ্রি সরকার আপনাকে মধুরবাবুর বিপদে সাহায্যের জন্য পাঠিয়েছেন। নিরুপমাদেবী যেন আমাকে ফোন করে কথাটা যাচাই করে নেন। আর একটা কথা। সামান্য কিছু টাকা অ্যাডভান্স নিয়ে আপনার এজেন্সির কনট্র্যাক্ট পেপারে ওঁদের সই করিয়ে নিন। বলবেন আইনের স্বার্থে এটা করা দরকার।

–হ বুসসি। কনট্র্যাক্ট পেপারে সই করলে মধুরবাবু আমার ক্লায়েন্ট হইয়া যাবেন। কোনও ঝামেলা বাধলে ওই কনট্র্যাক্ট পেপার আমার কাজে লাগবো।

কথাটা বলেই তিনি যথারীতি বেরিয়ে গেলেন। আমি বললুম,–তা হলে হালদারমশাই আর মধুরবাবু যদুগড়ে চলে যাচ্ছেন?

কর্নেল একটু হেসে বললেন,–অপেক্ষা করো, আমরাও যদুগড়ে যাব। তার আগে শুধু ব্যাকগ্রাউন্ডটা স্পষ্টভাবে গড়ে নিতে হবে।

আমি জিগ্যেস করলুম,–আচ্ছা কর্নেল, ওই তিনটে ছবি সম্পর্কে কি কোনও চিন্তা-ভাবনা করেছেন?

–ও নিয়ে এখন চিন্তা-ভাবনা করে লাভ নেই। ছবি তিনটে দেখেই বোঝা যাচ্ছে কোনও রাজপরিবারের ছবি।

বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন,–প্রায় সাড়ে ন’টা বাজে। আমরা ব্রেকফাস্ট করে নিয়েই বেরিয়ে পড়ব।

–কোথায় যাবেন?

–এখন কোনও প্রশ্ন নয়। যথাসময়ে তুমি নিজেই তা জানতে পারবে।

.

পাঁচ

গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে বললুম,–কাল বিকেলে আপনি একা এই গাড়ি নিয়ে কোথায় গিয়েছিলেন জিগ্যেস করতে ভুলে গিয়েছি।

কর্নেল বললেন,–পুরাতত্ত্ববিদ ডক্টর সুবিমল চক্রবর্তীর কাছে। তোমাকে সঙ্গে না নেওয়ার কারণ ছিল। ডক্টর চক্রবর্তীকে তুমি নিশ্চয়ই চেনো। সেবার একটা দুপাঠ্য প্রাচীন লিপির অর্থোদ্ধারে–

কথাটা মনে পড়ায় বললুম,–ও সেই রাগি ভদ্রলোক? যিনি চেঁচিয়ে কথা বললে ভাবেন তাকে ঠাট্টা করা হচ্ছে, আবার আস্তে কথা বললেও ভাবেন তাকে ব্যঙ্গ করে করা হচ্ছে?

কর্নেল হেসে উঠলেন,–কাজেই বুঝতেই পারছ, তোমাকে আবার দেখলে উনি খাপ্পা হয়ে আমাকেও ভাগিয়ে দিতেন। তোমাকে বলেছিলুম মনে পড়ছে, যারা কানে কম শোনেন, তারা খুব সহজেই রেগে যান।

-ওঃ সে এক সাংঘাতিক অভিজ্ঞতা। আপনি না থাকলে ভদ্রলোক আমাকে বিনা দোষে লাঠিপেটা করে ঘর থেকে বের করে দিতেন। তো কালকে আপনি ওই বৌদ্ধ সিলটা ওঁর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন?

-ঠিক ধরেছ, ডক্টর চক্রবর্তীর মতে ওই সিলটা তৃতীয় থেকে চতুর্থ শতাব্দির মাঝামাঝি সময় তৈরি হয়েছিল। তা ছাড়া ওঁকে ম্যাপটাও দেখিয়েছিলুম। ওঁর মতে ম্যাপে যে ইংরেজি অক্ষরগুলো লেখা হয়েছে, তা কোনও শব্দের প্রথম অক্ষর। যাই হোক, গাড়ি চালাতে-চালাতে কথা বললে অ্যাকসিডেন্ট করে ফেলবে। দেখছ না এখন পিক আওয়ার শেষ হয়নি।

কর্নেলের নির্দেশে আমি পার্ক স্ট্রিট দিয়ে ধর্মতলার মোড়ে যখন পৌঁছুলাম, তখন প্রচণ্ড জ্যাম। একটু বিরক্ত হয়ে বললুম,–আমরা যাচ্ছিটা কোথায় বললে কি আপনার মহাভারত অশুদ্ধ হবে!

কর্নেল চুরুটের একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে সহস্যে বললেন, না। তবে তোমাকে একটা চমক দেওয়ার ইচ্ছে আছে। কাজেই তুমি চুপ করে থাকো।

এরপর সেন্ট্রাল এভিনিউ দিয়ে সোজা বিডন স্ট্রিটের মোড়ে পৌঁছুলাম। কর্নেল ডাইনে বিডন স্ট্রিটে গাড়ি ঢোকাতে ইঙ্গিত দিলেন। কয়েকটা বাড়ির পর বাঁদিকের একটা গলির মুখে উনি গাড়ি দাঁড় করাতে বললেন। তারপর গাড়ি থেকে নেমে বললেন, এখানে পার্ক করে রাখো, কোনও

দাউ গাড়ি ঢোকাতে ইভিনিউ দিয়ে করে থাকে অসুবিধৌত বললেন। তা দিলেন। কয়েবিডন স্ট্রিটের সে

গাড়ি লক করে কর্নেলকে অনুসরণ করলুম। গলির ভেতর কিছুটা এগিয়েই দেখি ডানদিকে প্রাচীন আমলের একটা বিরাট দেউড়ি। তার ভেতরে তেমনি প্রাচীন একটা দোতলা বাড়ি। বাড়ির গড়নে ইতালীয় ভাস্কর্যের ছাপ স্পষ্ট। একতলা এবং দোতলায় মোটা-মোটা থাম। লনের দুপাশে ফুলের সমারোহ। গেটে কর্নেলকে দেখামাত্র একজন পেল্লাই চেহারার গুফো লোক সেলাম দিয়ে বলল,–আসেন, আসেন, কর্নেলসাহাব। হামার মালিক থোড়া আগে আমাকে খবর ভেজেছেন, কী কর্নেলসাহাব আসবেন। তা আপনার গাড়ি কুথায়?

কর্নেল বললেন,–বেশিক্ষণ থাকব না বলে গাড়ি গলির মোড়ে রেখে এসেছি। তা তুমি কেমন আছ রামলাল?

রামলাল গেট খুলে দিয়ে বলল,–আপকা কৃপা, হামি খুব ভালো আছি।

এইসময়েই ধুতি-পাঞ্জাবি পরা এক ভদ্রলোক গাড়িবারান্দার তলা থেকে বেরিয়ে আমাদের দিকে হন্তদন্ত এগিয়ে এলেন। নমস্কার করে বললেন,রাজবাহাদুর আপনার আসার কথা আমাকে বলেছেন।

এতক্ষণে সত্যি চমকে উঠলুম। কারণ এই ভদ্রলোকের নাম অচিন্ত্যবাবু। ইনি কর্নেলের বাড়ি কয়েকবার গিয়েছিলেন। তারপরই মনে পড়ল ভানুগড় রাজবাড়ি থেকে চুরি যাওয়া অমূল্য কিছু জুয়েলস কর্নেল উদ্ধার করে দিয়েছিলেন। সেই রহস্যময় কেসের সময় আমাকে আমার কাগজের কর্তৃপক্ষ ব্যাঙ্গালোরে পাঠিয়েছিলেন।

অচিন্ত্যবাবুও আমাকে চিনতে পেরেছিলেন। তিনি বললেন,–নমস্কার, নমস্কার, জয়ন্তবাবু। তা আপনারা কি ট্যাক্সিতে এসেছেন?

কর্নেল বললেন,–না, আপনি তো জানেন আমার ছ্যাকড়া লালরঙের ল্যান্ডরোভার গাড়িটা বেচে দেওয়ার পর জয়ন্তর উৎকৃষ্ট ফিয়াটেই আমি চাপতে অভ্যস্ত। জয়ন্তর ঘাড়ে চেপেই ঘুরি।

অচিন্ত্যবাবু বললেন,–কী আশ্চর্য! গাড়ি কি বাইরে কোথাও রেখে আসছেন?

কর্নেল বললেন,–হা, কারণ রাজাসাহেবের সঙ্গে মাত্র কয়েকটা কথা বলেই আমরা অন্য জায়গায় যাব। গাড়ি ওখানেই থাক।

অচিন্ত্যবাবু আমাদের গাড়িবারান্দার তলা দিয়ে একটা প্রশস্ত হলঘরে নিয়ে গেলেন। বনেদী রাজা-জমিদারের বাড়ির এইসব হলঘর কর্নেলের সাহচর্যে অনেক দেখেছি। এটা তার ব্যতিক্রম নয়। দেয়ালে বড়-বড় তৈলচিত্র। গোলাকার বিশাল শ্বেতপাথরের টেবিল ঘিরে সারবদ্ধ গদিআঁটা চেয়ার, ইতস্তত প্রকাণ্ড চীনা ফ্লাওয়ার ভাস এবং বিবিধ ভাস্কর্য সাজানো। একপাশে আরামদায়ক সোফায় আমাদের বসতে বলে অচিন্ত্যবাবু কারপেট বিছানো কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছিলেন, সেই সময়ই কুকুরের হাঁকডাক কানে এল। আতঙ্কে দেখলুম দুটো প্রকান্ড বিদেশি কুকুরের গলায় চেন হাতে নিয়ে সিঁড়ির মাথায় ধপধপে সাদা ফতুয়া আর ধুতি পরে এক ভদ্রলোক আবির্ভূত হলেন। তার চেহারায় আভিজাত্য স্পষ্ট। গলার কাছে পৈতে দেখা যাচ্ছিল। বুঝলুম তিনি ব্রাহ্মণ এবং এও বুঝলুম তিনিই রাজাসাহেব। তার কণ্ঠস্বরও বেশ গম্ভীর। তিনি বললেন,–অচিন্ত্য এই বেয়াদপ দুটোকে বেঁধে রেখে এসো। নইলে ওরা আমাদের কথাবার্তায় বলেন বাধাবে।

অচিন্ত্যবাবু কুকুর দুটোকে নিয়ে চলে গেলেন। তারপর রাজাসাহেব রেলিং ধরে নামতে-নামতে সহাস্যে বললেন,–ডনি আর জনিকে সঙ্গে নিয়ে আসছিলুম কেন জানেন, কর্নেলসাহেব? আপনাকে যেন ওরা একটু বকে দেয়। কথাটা বলেই তিনি হো-হো করে হেসে উঠলেন।

কর্নেল বললেন,–গতরাত্রে আপনি তো আমাকে নিজেই বকে দিয়েছেন। কারণ, আমি নাকি আপনাকে মন থেকে মুছে ফেলেছি।

রাজাসাহেব সোফায় আমাদের মুখোমুখি বসে বললেন,–তা বকেছি, কারণ আমার প্রিয় বন্ধু কর্নেল নীলাদ্রি সরকারকে যে দুষ্প্রাপ্য প্রজাতির ক্যাকটাসটা পাঠিয়েছিলুম, তার প্রাপ্তিস্বীকার করেননি।

কর্নেল কপালে একটা মৃদু থাপ্পড় মেরে বললেন,–মাই গুডনেস! তাইতো! কিন্তু দোষটা আপনারই। সঙ্গে কোনও চিরকুট ছিল না। তাছাড়া আমিও তখন বাড়িতে ছিলুম না তাই পরে ওটার কথা ভুলে গিয়েছিলুম। কিন্তু রাজাসাহেব, আপনার তো উচিত ছিল একটা ফোন করে আমাকে জানানো।

রাজাসাহেব বললেন,–আলবত ফোন করেছিলুম।

–আমি নিশ্চয়ই ফোন ধরিনি, কারণ আমি তখন বাড়িতে ছিলুম না। নিশ্চয়ই আমার পরিচারক ষষ্ঠীচরণ ফোন ধরেছিল। যাগ্যে, আপনার পাঠানো ক্যাকটাস বাড়ছে। চমৎকার ফুল ফুটিয়েছে। এবার কাজের কথায় আসা যাক। কারণ হাতে সময় কম।

রাজাসাহেব আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,–আপনি না বললেও আমি বুঝতে পেরেছি। এই ভদ্রলোক আপনার তরুণ সাংবাদিক বন্ধু জয়ন্ত চৌধুরি।

সায় দিয়ে আমি নমস্কার করতেই তিনি আবার হো-হো করে হেসে উঠলেন,–আপনার আমি ভক্ত। সত্যি বলতে কী, কর্নেলসাহেবকে আমি আপনার চোখেই দেখি।

কর্নেল বললেন,–রাজাসাহেব, আর নয়, এখনই উঠব। কাজের কথাটা—

বাধা দিয়ে রাজাসাহেব বললেন,–কফি আসছে, আপনিই তো বলেন, কফি নার্ভ চাঙ্গা করে। তা ছাড়া কতদিন পর আপনার সঙ্গে বসে আমি কফি খাব–এও আমার জীবনের একটা আনন্দ।

একটু পরেই অচিন্ত্যবাবুর সঙ্গে একজন পরিচারিকা কফির ট্রে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল। তারপর সে কর্নেল ও আমাকে করজোড়ে প্রণাম জানিয়ে আবার দোতলায় উঠে গেল। রাজাবাহাদুর বললেন, অচিন্ত্য তুমি নিজের কাজে যাও।

অচিন্ত্যবাবু দোতলায় উঠে গেলেন। তারপর কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন,–কাল রাত্রে আপনাকে ফোনে যদুগড়ের রাজবাড়ির কেয়ারটেকার মধুরকৃষ্ণ মুখার্জির কথা বলেছি। যদুগড়ের কুমারবাহাদুর তো আপনার বেয়াই। মধুরবাবুকে আপনি অনেক বছর ধরেই চিনতেন। বিশেষ করে আপনি যখন ভানুগড়ে থাকতেন তখন শুনেছি আপনি প্রায়ই বেয়াই বাড়ি যেতেন। আমার প্রশ্ন, মধুরবাবু সম্পর্কে আপনার নিশ্চয়ই একটা ধারণা হয়েছিল। অর্থাৎ সে কী প্রকৃতির লোক, আপনি নিশ্চয়ই টের পেয়েছিলেন।

রাজাসাহেব বললেন,–আরে সে তো এক বাবুর বাবু। সবসময়ই খুব সেজে-গুঁজে থাকত, সেন্ট মাখত। কিন্তু তাকে তো আমার খারাপ বলে মনে হয়নি।

–আপনার বেয়াইমশাই কেন ওকে বছর তিনেক আগে চাকরি থেকে ছাড়িয়ে দিয়েছিলেন, আপনি কি তা জানেন?

রাজাসাহেব এবার একটু গম্ভীর হয়ে বললেন,–রুদ্রনারায়ণ, অর্থাৎ আমার বেয়াইমশাই গতবার কলকাতায় এসে আমার বাড়িতেই উঠেছিলেন। তার কাছে তত বেশি কিছু শুনিনি। তবে উনি বলেছিলেন, মধুর রাজবাড়ি থেকে একটা অমূল্য প্রাচীন জিনিস হাতিয়েছে বলে তার সন্দেহ।

–জিনিসটা কী তা আপনাকে উনি বলেননি? রাজাসাহেব চাপাস্বরে বললেন,–আমার বেয়াইমশাই বাবার বাতিক ছিল পুরাদ্রব্য সংগ্রহ করে ব্যক্তিগত জাদুঘর বানানোর।

-জানি। পাতালের সেই গোপন জাদুঘর আমি দেখে এসেছি। কিন্তু জিনিসটা কী?

আমাকে অবাক করে রাজাসাহেব বললেন,–একটা খুব প্রাচীন বৌদ্ধ সিল। তবে মধুরবাবুকে উনি হাতেনাতে ধরেননি, শুধু সন্দেহ হয়েছিল। তা ছাড়া মধুরবাবু নাকি স্থানীয় একজন ব্যবসায়ীর কাছে প্রায়ই যাতায়াত করতেন বলে খবর পেয়েছিলেন।

কর্নেল কফি শেষ করে চুরুট ধরিয়ে বললেন,–অসংখ্য ধন্যবাদ রাজাসাহেব। আমি শুধু এই গোপন খবরটুকুই আপনার কাছে জানতে চেয়েছিলুম।

রাজাসাহেব ব্যগ্রভাবে বললেন,–বাই এনি চান্স আমার বেয়াইমশাই কি আপনাকে সেই হারানো সিল-এর সন্ধানে অনুরোধ করেছেন?

কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, না। আমি অন্য কেস-এর সূত্রে সেই হারানো সিল-এর কথা জানতে পেরেছি। যাইহোক, আপনাকে একটা অনুরোধ, আপনি যেন এ বিষয়ে আপনার বেয়াইমশাইকে কোনও কথা জানাবেন না। যথা সময়ে আপনি এবং আপনার বেয়াইমশাই সবই জানতে পারবেন। কিন্তু এখন যদি আপনি তাকে কিছু জানান, তা হলে, আমার সব চেষ্টা একেবারে ব্যর্থ হয়ে যাবে। আমি এবার আসি।

রাজাবাহাদুর গম্ভীরমুখে দরজা অবধি আমাদের এগিয়ে দিলেন। তারপর আমরা গেটের দিকে চললুম।

কিছুক্ষণ পরে দুজনে গাড়িতে চেপে গাড়ি স্টার্ট দিলুম। কর্নেল বললেন,–জয়ন্ত, আমার সঙ্গে আজ বেরিয়ে যা জানতে পেরেছ, তা যেন ঘুণাক্ষরে অন্য কারও কানে না ওঠে।

বললুম–কখনও কি আমি তেমন কিছু করেছি?

–করোনি, কিন্তু তোমাকে সতর্ক করা দরকার আছে।

–এবার কোথায় যাবেন? কর্নেল চুরুটের একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ব্র্যাবোর্ন রোডে। চলো, আমি শর্টকাটে যাওয়ার রাস্তা দেখিয়ে দিচ্ছি।

বললুম,–আমার ধারণা আপনি জগদীশপ্রসাদ রাওয়ের মহাবলী অকসন হাউসে যাচ্ছেন।

–তুমি বুদ্ধিমান।

তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে। অলিগলি রাস্তা ঘুরে আমরা ব্র্যাবোর্ন রোডে পৌঁছুলাম। তারপর কর্নেলের নির্দেশে একটা পার্কিং-এর জায়গা খুঁজে নিয়ে সেখানেই গাড়ি দাঁড় করালুম।

কর্নেল বললেন,–গাড়ি লক করে চলে এসো।

রাস্তার ওপারে গিয়ে একটা গলির ভেতর কর্নেল ঢুকলেন। তারপর বললেন,–এই বাড়িটাই মনে হচ্ছে।

বাড়িটা ছ’তলা। দোতলায় সাইনবোর্ড–মহাবলী অকসন হাউস।

দোতলায় গিয়ে বারান্দায় কয়েক’পা হেঁটে হলঘরের মতো একটা বিরাট ঘর চোখে পড়ল। ভেতরে অবশ্য মোটা-মোটা থাম দেখা যাচ্ছিল। আর দেখা যাচ্ছিল নানা ধরনের সেকেলে আসবাবপত্র। হলঘরটার প্রথম দরজায় কোলাবসিবল গেট এবং সেটা তালাবন্ধ। কয়েক-পা এগিয়ে আর একটা কোলাবসিবল গেট। কিন্তু সেটা খোলা। গেটের পাশে টুলে একজন বন্দুকধারী এবং উর্দি পরা লোক বসে আছে। বুঝলুম সে নিরাপত্তারক্ষী। ভেতরে কোনও লোক দেখলুম না। কর্নেলকে দেখে সম্ভবত বিদেশি ভেবেই রক্ষী উঠে দাঁড়িয়ে একটা সেলাম দিল। কর্নেল তাকে হিন্দিতে বললেন,–জগদীশপ্রসাদ রাও-এর সঙ্গে দেখা করতে চাই।

সাহেবকে হিন্দি বলতে দেখে রক্ষী একটু অবাক হয়েছে মনে হচ্ছে। সে ইশারায় পাশে একটা ঘর দেখিয়ে দিল।

সেই ঘরের দরজায় অবশ্য কোনও লোক নেই। ভেতরে ঢুকে দেখি একটা করিডোর। আর সার-সার কয়েকটা কেবিন। একটা কেবিন থেকে বেয়ারা গোছের একজন তোক বেরিয়ে এসে কর্নেলকে দেখে থমকে দাঁড়াল। কর্নেল হিন্দিতে বললেন,–মিস্টার রাওয়ের সঙ্গে দেখা করতে চাই।

বলে তিনি তার হাতে নিজের নেমকার্ড খুঁজে দিলেন।

লোকটা তখনই যে কেবিন থেকে বেরিয়েছিল, সেই কেবিনে ঢুকে গেল। তারপর প্রায় মিনিট পাঁচেক পরে সেলাম দিয়ে বলল,–আপলোগ আইয়ে।

কর্নেলের সঙ্গে কেবিনে ঢুকে দেখলুম প্রকাণ্ড অর্ধবৃত্তাকার সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ওধারে একজন তাগড়াই চেহারার টাই-স্যুট পরা প্রৌঢ় ভদ্রলোক বসে আছেন। কর্নেল বাংলায় বললেন,–আপনি কি মিস্টার জগদীশপ্রসাদ রাও?

মিস্টার রাও খাঁটি বাঙালির মতোই বললেন,–আগে বসুন, তারপর কী বলতে চান বলুন।

আমরা দুজনেই পাশাপাশি বসলুম। তারপর কর্নেল বললেন, আপনার এই অকশন হাউসের নামডাক শুনেছি। তবে আমি সেজন্য আসিনি। এসেছি অন্য একটা কারণে। আমার এক আত্নীয় বারিন দত্ত আপনার বাড়িতে ছিল।

মুহূর্তে মিস্টার রাওয়ের চোখদুটো জ্বলে উঠল। আস্তে বললেন, তাকে কেউ গত শুক্রবার রাতে মার্ডার করেছে। আপনি কি পুলিশের কাছে সেই খবর শুনে আমাকে কিছু জিগ্যেস করতে এসেছেন?

কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। বারিন আপনার বাড়িতে খুন হয়েছে তা জানি। আমি শুধু আপনার কাছে জানতে এসেছি, তাকে কেউ খুন করার পিছনে কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে আপনার ধারণা?

মিস্টার রাও সেইরকম জ্বলন্ত চোখ পাকিয়ে বললেন, আমি জানতুম না সে একজন চোর। সে আমাকে বলেছিল পুরোনো জিনিস কেনাবেচার ব্যাপারে তার অভিজ্ঞতা আছে। আমি যদি তাকে থাকবার জায়গা দিই তাহলে সে আমাকে আমার কাজে সাহায্য করতে পারবে। কিন্তু সে আমার অফিস থেকে তিনটে দামি পোর্ট্রেট চুরি করেছিল। সেটা তার মৃত্যুর পর জানতে পেরেছি। কাজেই ওর সম্পর্কে আমি কোনও কথা বলব না। আপনারা আসতে পারেন।

.

ছয়

কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে পা বাড়াতে গিয়ে হঠাৎ জগদীশবাবুর দিকে ঘুরে বললেন,–একটা জরুরি কথা জিগ্যেস করতে ভুলে গেছি। আশা করি আপনি সঠিক জবাব দেবেন।

জগদীশবাবু নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে বললেন,–জবাব দেওয়ার মতো হলে তবেই দেব।

কর্নেল বললেন, আপনি কখনও আপনার ব্যবসার কাজে কি যদুগড়ে গিয়েছিলেন?

–যদুগড়? কোন যদুগড়?

–বিহারের যদুগড়।

জগদীশবাবু একটু চমকে উঠলেন মনে হল। তিনি বললেন,–কেন?

–সেখানকার রাজবাড়িতে অনেক মূল্যবান জিনিস আছে।

–তা সব রাজবাড়িতেই থাকতে পারে।

এবার কর্নেল একটু গম্ভীর কণ্ঠস্বর বললেন, আপনি যদুগড় রাজবাড়ির কেয়ারটেকার মধুরকৃষ্ণবাবুকে কি চেনেন?

আবার লক্ষ করলুম জগদীশবাবু কেমন যেন বিব্রত বোধ করছেন। তিনি আস্তে বললেন, –তাকে আমি চিনি না।

কর্নেল তেমনই গম্ভীর কণ্ঠস্বরে বললেন, আমার কাছে খবর আছে আপনি তাকে চিনতেন, এবং এখনও চেনেন। কারণ গত তিনবছর ধরে মধুরবাবু কলকাতাতেই আছেন এবং তিনি বারিনবাবুর ছেলেবেলার বন্ধু। তাই প্রায়ই আপনার বাড়িতে, অর্থাৎ বারিনবাবুর কাছে যাতায়াত করতেন।

জগদীশবাবু এবার যেন নিস্তেজ হয়ে পড়লেন। তাঁর হাবভাব একেবারে বদলে গেল। তিনি বললেন, আপনি কে? আপনার প্রকৃত পরিচয় কী?

কর্নেল আগের মতো মেজাজে বললেন, আপনার কাছে একজন প্রাইভেট ডিকেটিভ মিস্টার কে. কে. হালদার গিয়েছিলেন। তাই না?

–হ্যাঁ। কিন্তু কী ব্যাপার আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

–মিস্টার হালদারের পিছনে আপনি কেন একজন খুনি দুবৃত্তকে লেলিয়ে দিয়েছিলেন? না, আপনি কিছু গোপন করার চেষ্টা করবেন না। আমি সবই জানি।

–আপনি কি সি. বি. আই. অফিসার?

–আপনি আগে আমার প্রশ্নের জবাব দিন। মধুরবাবু সম্পর্কে আমি যা বলেছি, তা ঠিক কি না?

জগদীশবাবু একটু ইতস্তত করার পর বললেন,–মধুরবাবু কি না জানি না, একজন বেঁটে বলিষ্ঠ গড়নের প্রৌঢ় ভদ্রলোক বারিনবাবুর সঙ্গে মাঝে-মাঝে দেখা করতে আসতেন। পোশাক-আশাকে তাকে সাধারণ লোক বলেই মনে হতো।

–গত শুক্রবার বিকেলে আপনি কি বাড়িতে ছিলেন?

–না! ব্যবসার কাজে বেরিয়েছিলুম।

–কখন বাড়ি ফিরেছিলেন?

–রাত দশটার পরে।

–বারিনবাবুর ঘরে তখন কি আলো জ্বলছিল?

–অত লক্ষ করিনি। তা ছাড়া রাতে বারিনবাবু মাতাল অবস্থায় থাকতেন। তাই তাকে এড়িয়ে থাকতুম।

কর্নেল তাকে বললেন, আপনি আমাকে যেসব কথা বললেন, পুলিশ আপনাকে জেরা করলে যেন ঠিক তাই বলবেন।

বলে কর্নেল শার্টের বুক পকেট থেকে একটা খুদে টেপ রেকর্ডার বের করে তাকে দেখালেন এবং বললেন, আপনি উলটো কথা বললে বিপদে পড়বেন, কারণ এই যন্ত্রে আপনার সবকথা রেকর্ড করা হয়ে গেছে। আরও শুনুন, আপনি যদি মিস্টার হালদারের মতো আমাদের পিছনেও গুন্ডা লেলিয়ে দেন, তার পরিণতি হবে ভয়ঙ্কর।

আমাকে অবাক করে কর্নেল তার প্যান্টের পকেট থেকে তার রিভলভারটি দেখিয়ে বেরিয়ে এলেন। আমি তাকে অনুসরণে দেরি করলুম না।

এরপর রাস্তা পেরিয়ে আমার গাড়িতে ওঠার পর কর্নেল হেসে উঠলেন। বললুম,–হাসছেন কেন? ব্যাপারটা তো খুব সিরিয়াস বলে মনে হচ্ছে। আপনি কী করে জানলেন যে মধুরবাবুর ও বাড়িতে যাতায়াত ছিল?

কর্নেল বললেন,–আন্দাজে বহুবার ঢিল ছুঁড়ে লক্ষভেদ করতে পেরেছি। এবারও পারলুম। সেজন্যই হাসছি। তা ছাড়া সঠিক জায়গায় ঢিলটি লাগলে অন্যপক্ষের কী অবস্থা হয়, তা তো নিজের চোখেই দেখলে।

গাড়ি স্টার্ট দিয়ে যেতে-যেতে বললুম–এবার নিশ্চয়ই বাড়ি?

কর্নেল বললেন,–অবশ্যই।

যেতে-যেতে বলুলুম,–এ তো ভারি আশ্চর্য ব্যাপার। মধুরবাবু বারিনবাবুর কাছে প্রায়ই যাতায়াত করতেন, আপনি এমনটা কী করে অনুমান করলেন? সব অনুমানের মোটামুটি এক অস্পষ্ট ভিত্তি তো থাকেই!

কর্নেল বললেন,–ওটা আমার নিছক একটা অঙ্ক।

–তা হলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এই যে মধুরবাবু যে ঘটনার কথা বলে ব্রিফকেসটা নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই ঘটনা একেবারে মধুরবাবুর বানানো।

কর্নেল বললেন, এখন এসব কথা নয়। বাড়ি ফিরে স্নানাহার করার পর বিশ্রাম দরকার।

-কেন? রহস্যের জটিল জট তো প্রায় আপনাআপনি খুলেই পড়েছে।

কর্নেল টুপি খুলে মাথার টাকে হাত বুলিয়ে বললেন,–জয়ন্ত, তোমাকে বহুবার যুক্তিশাস্ত্রে অবভাস তত্ত্বের কথা বলেছি। যা যেমনটি দেখছ তা সবময়ই সর্বক্ষেত্রে তেমন নাও হতে পারে। রেললাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তুমি দেখবে দুটো লাইন যেন ক্রমশ কাছাকাছি হতে-হতে একত্রে মিশে গেছে। কিন্তু ওটা তোমার দেখার ভুল।

এরপর আর কথা বলা চলে না। বাড়ি পৌঁছুতে প্রায় পৌনে একটা বেজে গিয়েছিল। স্নানাহারের পর খেয়ে নিয়ে কর্নেল ড্রইংরুমে তার ইজিচেয়ারে বসেছিলেন এবং চুরুট টানছিলেন। আমি যথারীতি ডিভানে চিৎপাত হয়ে ভাতঘুমের চেষ্টা করছিলুম। একটু পরে লক্ষ করলুম, কর্নেল টেলিফোনের রিসিভার তুলে ডায়েল করছেন। তাপপর তিনি মৃদু স্বরে কার সঙ্গে কথাবার্তা বলছিলেন বোঝা যাচ্ছিল না।

এই অবস্থায় ভাতঘুমের হাত থেকে আমার রেহাই ছিল না। সেই ভাতঘুম ভেঙেছিল ষষ্ঠীর ডাকে,–সাহেব!

চায়ের কাপ হাতে নিয়ে তাকে জিগ্যেস করেছিলুম,–আজ তোমার বাবামশাই আমার গাড়ি চুরি করেননি তো?

ষষ্ঠী সহাস্যে বলল,–আজ্ঞে দাদাবাবু, বাবামশাই আপনার গাড়ি চুরি করেননি। লালবাজারের সেই পুলিশবাবু, কী যেন নাম তার–

বললুম,–নরেশবাবু?

–আজ্ঞে হ্যাঁ। লালবাজারের নরেশবাবুই বটে। ওই যাঃ, ছাদের বাগানে কাকের বড় উৎপাত।

বলে সে হন্তদন্ত হয়ে চলে গেল। ততক্ষণে বুঝতে পেরেছি লালবাজারে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের সাব-ইনসপেক্টর নরেশ ভদ্র এসে কর্নেলকে তুলে নিয়ে গেছে। তাহলে দেখছি রহস্যটা আবার অন্যদিকে মোড় নিল।

কিছুক্ষণ পরে টেলিফোন বেজে উঠল। উঠে গিয়ে রিসিভার তুলে সাড়া দিলুম। হালদারমশাইয়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এল। দুষ্টুমি না করে বললুম-আপনি কোথা থেকে বলছেন।

–জয়ন্তবাবু নাকি? কর্নেল স্যার নেই?

–না বেরিয়েছেন।

–আমি যদুগড় থিক্যা কইত্যাসি। আমি উঠসি সরকারি ডাকবাংলোতে। আর মধুরবাবু আছেন রাজবাড়িতে। একটু আগে মধুরবাবু টেলিফোনে আমারে কইলেন, কুমারবাহাদুর তার ফিরে যাওয়াতে খুশি হয়েছেন। কিন্তু কুমারবাহাদুরের জামাই তাকে যেন থাকতে দিতে চান না। তাই তিনি এক বাল্যবন্ধুর বাড়িতে গিয়া থাকবেন ভাবসেন। আমি তারে কইলাম, অপমান সহ্য কইরা অন্তত আরও একটা দিন থাকেন। আমি কর্নেলস্যারেরে ফোন করত্যাসি, যাতে তিনি শিগগির আইসা পড়েন।

বললুম,–কর্নেল এলেই কথাটা বলছি। আর কোনও জরুরি কথা আছে? যদুগড়ের পশ্চিমে নদীর ধারে আদিবাসিরা বুনো আলুর খোঁজে মাটি খুঁড়ত্যাছিল। সেখানে তারা একটা পাথরের মূর্তি দেখসে। সেই মূর্তি দেখার জন্য সেখানে সারাদিন খুব ভিড়।

–আপনি যাননি দেখতে?

–না। কর্নেল স্যার আইলে ওনারে শিগগির আইতে কইবেন। হালদারমশাই লাইন কেটে দিলেন। আর প্রায় মিনিট পনেরো পরে কর্নেল ফিরে এলেন। তখন তাকে হালদারমশাইয়ের টেলিফোনের কথাটা বললুম। তিনি বললেন,–আজ রাতের ট্রেনেই আমরা যদুগড় যাচ্ছি।

একটু পরে ষষ্ঠী কফি আর স্ন্যাকস দিয়ে গেল ঘরের আলো জ্বেলে দিল। কফি খেতে-খেতে বললুম,–লালবাজারে নরেশবাবু আপনাকে নাকি উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল?

কর্নেল একটু হেসে বললেন,–শ্রীমান ষষ্ঠীচরণের শ্রীমুখের খবর তা বুঝতে পারছি। ব্যাপারটা বুঝতে পারছ, জয়ন্ত, ষষ্ঠীও ক্রমশ গোয়েন্দা হয়ে উঠছে।

বললুম,–তা হতেই পারে। আপনি বলুন না ব্যাপারটা কী।

কর্নেল বললেন,–ধূর্ত জগদীশ রাও লালবাজারের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে ফোন করে আমার চেহারার বর্ণনা দিয়েছিল। এবং সবকথা জানিয়েছিল। ভাগ্যিস ফোনটা ধরেছিলেন নরেশবাবু! তিনি ওকে আরও ভয় দেখিয়ে বলেছেন, আমি সত্যিই সি.বি.আই. অফিসার। নিহত বারিনবাবু। সম্পর্কে এখনও কোনও গোপন তথ্য থাকলে যেন পুলিশকে জানিয়ে দেয়।

–কিন্তু আপনাকে কোথায় নিয়ে গিয়েছিলেন নরেশবাবু?

–জগদীশবাবুর কথায় নরেশবাবু জেনে গিয়েছিলেন বারিনের হত্যাকাণ্ডের রহস্যে আমি নাক গলিয়েছি। তাই নরেশবাবু আমার কাছে জানতে এসেছিলেন কথাটা সত্যি কি না। যাইহোক সেই সুযোগে আমি ওঁর কাছে বারিনবাবুর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এবং ফরেনসিক তদন্তের ফলাফল জানতে চেয়েছিলুম। নরেশবাবু সঙ্গে কেস ফাইল আনেননি। তাই ওঁর সঙ্গে লালবাজারে গিয়ে সেই রিপোর্ট দেখে এলুম।

–রিপোর্টে কী দেখলেন, বলতে আপত্তি আছে?

–না। গুলি করা হয়েছিল বারিনবাবুর কপালে আগ্নেয়াস্ত্রের নল ঠেকিয়ে। গুলিটা পয়েন্ট বত্রিশ ক্যালিবারের রিভলভার থেকে ছোঁড়া। ফরেনসিক রিপোর্টে বারিনবাবুর হাতের মুঠোর কাঁচাপাকা চুলের গোছা পরচুলা নয়। তিনি আততায়ীর মাথার চুল খামচে ধরেছিলেন। খুনির মাথার চুলগুলো ছিল লম্বা। আর একটা ব্যাপার, নরেশবাবুর নিজের মনে হয়েছে খুনির রিভলভারে সাইলেন্সর লাগানো ছিল, তাই কেউ গুলির শব্দ শুনতে পায়নি। যাই হোক, লালবাজারে বসেই তোমার জন্য ট্রেনের ফার্স্টক্লাসের একটা স্লিপার বুক করতে বলেছি। তুমি তো জানো, ইস্টার্ন রেলের সব অফিসারই আমাকে খানিকটা পাত্তা দেন।

এবার কর্নেল কফিতে মন দিলেন। আমি জানি রিটায়ার্ড মিলিটারি অফিসার হিসেবে কোথাও ট্রেনে বা প্লেনে যেতে কর্নেলের পয়সা খরচ হয় না। তা ছাড়া কেন্দ্রীয় সরকারের চোখেও উনি একজন ভি.ভি.আই.পি.।

রাত দশটায় ডিনার সেরে নিয়ে কর্নেলের নির্দেশে তৈরি হয়ে নিলুম। মাঝে-মাঝে কর্নেলের ডেরায় আমাকে কাটাতে হয় বলে আমার কয়েক প্রস্থ পোশাক-আশাক এখানেই থাকে। আর যেহেতু আমি কর্নেলের কনিষ্ঠ সহযোগী এবং তার রহস্যভেদের কাহিনি ফলাও করে দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকায় লিখি, সেইহেতু কর্নেলের কথামতো বাইরে বেরুলেই আমাকে পকেটে লাইসেন্সড রিভলভার এবং কিছু বুলেট রাখতে হয়।

কর্নেল বলেছিলেন, হাওড়া স্টেশন থেকে আমাদের ট্রেন ছাড়বে রাত সাড়ে এগারোটায়। তাই সাড়ে দশটাতেই আমরা বেরিয়ে পড়েছিলুম। ছ’নম্বর প্ল্যাটফর্মের কাছে যেতেই একজন রেলওয়ে অফিসার কর্নেলকে নমস্কার করে তার হাতে যেটা গুঁজে দিলেন, সেটা আমারই টিকিট। কর্নেল পার্স বের করে টাকা মিটিয়ে দিলেন। তারপর বললেন,–থ্যাঙ্কস রজত। তুমি জয়ন্তকে দেখতে চেয়েছিলে তো, এই সেই জয়ন্ত।

ভদ্রলোক আমাকে নমস্কার করলেন। প্রতি নমস্কার করে আমি কর্নেলকে অনুসরণ করলুম। কারণ অবাক হয়ে দেখলুম কথাটা বলেই তিনি হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।

কাছে গিয়ে বললুম,–এখনও তো গাড়ি ছাড়ার সময় হয়নি। আপনি হঠাৎ ঘোড়দৌড় শুরু করলেন কেন?

কর্নেল চাপাস্বরে বললেন,–মহাবলী অকশন হাউসের মালিক সেই জগদীশবাবুকে দূর থেকে লক্ষ করেছি। তিনি আমাদের দেখতে পেয়েছেন কি না জানি না। হুইলার বুকস্টলের ওপাশে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে একটা ব্রিফকেস।

বললুম,–গিয়ে জিগ্যেস করলেই হয়, তিনি যদুগড় যাচ্ছেন কি না।

কর্নেল ঠোঁটে আঙুল রেখে বললেন,–এই থামের আড়ালে আমরা দাঁড়াই। দেখা যাক উনি আমাদের দেখতে পেয়েছেন কি না।

প্ল্যাটফর্মে একটা ট্রেন দাঁড়িয়ে ছিল। আমি জিগ্যেস করলুম,–এই ট্রেনেই কি আমরা যাব?

–হ্যাঁ। তা ছাড়া তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না, আমরা ফার্স্ট ক্লাস কম্পার্টমেন্টের সামনেই দাঁড়িয়ে আছি। এই কামরাতেই আমরা যাব।

–তা হলে উঠেপড়া যাক।

–এক কাজ করো। তুমি উঠে গিয়ে বারো নম্বর কুপের একটা লোয়ার সিটে বসে পড়ো, আমি একটু পরে যাচ্ছি।

–তার মানে জগদীশবাবু এই ট্রেনেই চাপছেন কি না তা দেখতে চান। কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বললেন,–যা বললুম করো। তুমি ডান দিকে কাত হয়ে সবেগে পা ফেলে দরজায় উঠবে।

তাঁর কথামতো আমি কামরায় উঠে গেলুম। তারপর বারো নম্বর কুপ খুঁজে নিয়ে বাঁ-দিকে নিচের বার্থে জানালার কাছে বসলুম। আমার একটা সুটকেস আর ব্যাগ সিটের তলায় ঢুকিয়ে রাখলুম। তারপর জানলা দিয়ে কর্নেলকে খুঁজলুম। তার পিঠের কিটব্যাগটি যথারীতি আঁটা আছে এবং চেনের ফাঁক দিয়ে প্রজাপতি ধরার জালের লাঠির কিছু অংশ মাথা উঁচিয়ে আছে। ডান হাতে একটা গাবদাগোবদা ব্যাগ। তিনি হুইলার স্টলের দিকেই তাকিয়ে আছেন। মিনিট পাঁচেক পরে তিনি ট্রেনে উঠলেন। তারপর বারো নম্বর কুপে ঢুকে ডান দিকে লোয়ার বার্থে বসলেন। জিগ্যেস করলুম,জগদীশবাবুকে কি এই ট্রেনে উঠতে দেখলেন?

কর্নেল একটু হেসে বললেন,–ভদ্রলোক কোটিপতি। বাড়িতে এবং অফিসে এয়ারকন্ডিশনড ঘরে থাকেন। কাজেই এই ট্রেনেও তিনি এ.সি. কম্পার্টমেন্টে চেপে যাবেন তাতে অস্বাভাবিক কিছু নেই।

–আচ্ছা কর্নেল, এমন তো হতে পারে উনি এই ট্রেনে দিল্লি যাচ্ছেন।

-হ্যাঁ, তাও যেতে পারেন। তবে যদুগড় স্টেশনে নেমে তুমিও একটু সতর্ক থেকো এবং চোখ খোলা রেখো।

তার মানে আমাদের যেন তিনি দেখতে না পান–এই তো?

কর্নেল আমার প্রশ্নের জবাব দিলেন না। মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছিল ট্রেন ছাড়ার খবর। তারপরই হুইসেল দিয়ে ট্রেনটা চলতে শুরু করল। সেই সময়েই কি একটা অস্বস্তি এবং আতঙ্ক আমাকে পেয়ে বসল। জগদীশবাবু এই ট্রেনে যাচ্ছেন!

.

সাত

যদুগড় স্টেশনে ট্রেনটা যখন থেমেছিল, তখন ভোর পৌনে ছ’টা বাজে। কর্নেলের পিছনে সাবধানে নেমে বললুম,–জগদীশবাবুকে কি দেখতে পাচ্ছেন?

কর্নেল ঠোঁটে আঙুল রেখে আমাকে চুপচাপ থাকতে বললেন। মাঝারি স্টেশন কিন্তু ট্রেনটা দিল্লি যাবে বলেই বড্ড ভিড়। প্রায় আধঘণ্টা সামনে টি-স্টলের কাছে দাঁড়িয়ে দুজনে চা খেলুম। চা খেয়ে কর্নেল চুরুট ধরালেন। সেই চুরুট শেষ হওয়ার পর তবে তিনি পা বাড়ালেন। জগদীশবাবুর কথা আর তাকে জিগ্যেস করলুম না।

গেটে গিয়ে দেখলুম কয়েকটা বাস আর অজস্র রিকশা নিচের চত্বর থেকে সামনের রাস্তায় পৌঁছুনোর জন্য যেন যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমার অবাক লাগল ঘন কুয়াশা দেখে। কুয়াশায় সবকিছু ঢেকে আছে। আর শীতের কথা বলার নয়।

জিগ্যেস করলুম,–আমরা কোন বাহনে চেপে যাব? একে-একে সবগুলোই তো চলে গেল।

কর্নেল হাসলেন,–ওই দ্যাখো, একটা জিপ এগিয়ে আসছে।

অবাক হয়ে বললুম,–ওটা তো পুলিশের জিপ মনে হচ্ছে।

কর্নেল কিছু বলার আগেই জিপটা এসে আমাদের কাছাকাছি থেমে গেল। তারপর একজন পুলিশ অফিসার জিপ থেকে নেমে কর্নেলকে সেলাম ঠুকে বললেন,–একটু দেরি হয়ে গেল স্যার।

কর্নেল সহাস্যে বললেন,–মোটেও দেরি হয়নি।

কর্নেল জিপের সামনে উঠলেন এবং পিছনের সিটে ওঠার জন্য আমাকে অনেক কসরত করতে হল। পুলিশ অফিসার জিপে স্টার্ট দিয়ে বললেন, আমি কখনও আপনাকে স্বচক্ষে দেখিনি। আমার সৌভাগ্য যে আপনার সেবা করতে পারছি।

কর্নেল জিগ্যেস করলেন, আপনার পরিচয়ই তো এখনও দিলেন না।

-স্যার আমার নাম শাহেদ খান। আমার বাংলা বলা শুনে আপনি অবাক হতে পারেন। আসলে আমার বাবা ইউ.পি.-র লোক। আর মা কলকাতার বাঙালি মেয়ে, আমি কলকাতাতেই মানুষ হয়েছিলুম।

কুয়াশায় চারদিক ঢাকা থাকলেও আবছা দেখা যাচ্ছিল উঁচু-নিচু নানা আকারের টিলা-পাহাড়। চড়াই-উতরাই হয়ে কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর আমরা একটা নদীর ব্রিজ পেরিয়ে গেলুম। নদীতে তত জল নেই। বালির চড়া আর কালো-কালো পাথর দেখা যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পরে জিপ বাঁয়ে একটা আঁকাবাঁকা রাস্তায় এগিয়ে গেল।

মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই আমরা একটা বাংলোর সামনে পৌঁছুলাম। মিস্টার খান বললেন,–এটা যদুগড়ের এক ব্যবসায়ী ভদ্রলোকের গেস্টহাউস বলতে পারেন। এস.পি. সাহেবের মেসেজ। পেয়েই ও.সি. মিস্টার জয়রাম পাণ্ডে এই বাংলোটাই আপনার জন্য ঠিক করেছেন। শুনেছি আপনি প্রকৃতির মধ্যে ঘুরতে ভালোবাসেন। তাই আমার ধারণা আপনার এখানে থাকতে ভালোই লাগবে।

একটা টিলার গায়ে এই একতলা বাংলোতে ঢুকে আমার ভালোই লাগল। বাংলোর চৌকিদার আমাদের জিনিসপত্র সব গুছিয়ে একটা ঘরে ঢোকাল। কর্নেল তখনও লনে দাঁড়িয়ে মিস্টার খানের সঙ্গে কথাবর্তা বলছিলেন।

তারপর মিস্টার খান জিপ নিয়ে চলে গেলেন এবং কর্নেল এসে বাংলোয় ঢুকলেন। বললুম-কখনও দেখিনি আপনি রহস্যের সমাধানে পুলিশের অতিথি হয়েছেন, আমার মাথায় একটা ধাঁধা ঢুকে গেছে।

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, তুমি কি দ্যাখোনি, বরাবরই রহস্যের শেষ দৃশ্যে আমাকে পুলিশের সাহায্য নিতে হয়।

চমকে উঠে বললুম,–বলেন কী? আপনি বারিনবাবুর হত্যা রহস্যের শেষ দৃশ্যে পৌঁছে গেছেন, অথচ আমি আপনার পাশে থেকেও কিছু টের পেলুম না?

কর্নেল পিঠের কিটব্যাগ এবং গলায় ঝোলানো ক্যামেরা ও বাইনোকুলার খুলে টেবিলে রাখলেন। তারপর মাথার টুপি খুলে রেখে বললেন,–তীক্ষ দৃষ্টিশক্তি এবং একটু বুদ্ধি থাকলেই চারপাশে কী হচ্ছে টের পাওয়া যায়। না ডার্লিং, তোমার বুদ্ধিশুদ্ধি নেই মোটেই বলছি না, দৃষ্টিশক্তি এবং বুদ্ধি তোমার যথেষ্টই আছে। তবে তুমি তা খরচ করতে বড্ড আলসেমি করো–এই যা।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বাংলোর চৌকিদার ট্রেতে কফি আর স্ন্যাকস নিয়ে এল। কর্নেল তাকে হিন্দিতে জিগ্যেস করলেন, তোমার নাম কী?

সে সেলাম দিয়ে বলল,–সাব, হামার নাম গয়ানাথ।

–তোমার বাড়ি যদুগড়ে?

–হাঁ সাব।

–তুমি যদুগড়ের রাজবাড়ি কেয়ারটেকার মধুরবাবুকে চেনো?

–জি সাব, ওই বাবুকে হামি চিনতুম। তিনবছর আগে রাজবাড়ি থেকে তাকে কুমারবাহাদুর তাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

বলে সে একটু হেসে উঠল,–তাজ্জব বাত সাব, কাল বিকেলে সেই মধুরবাবুকে আবার দেখতে পেলুম। বাজারে এক ব্যবসায়ী আছে। তার টি.ভি., ক্যামেরা, এইসব জিনিসের কারবার। মধুরবাবু তার টেবিলের সামনে বসে চা খাচ্ছিলেন।

–তা হলে মধুরবাবু আবার যদুগড়ে ফিরেছেন?

–আপনি কি তাকে চেনেন সাব?

–হ্যাঁ, চিনি।

–মধুরবাবুর নামে এখানে বদনাম আছে। কেউ তাকে বিশ্বাস করে না।

কথাটা বলেই গয়ানাথ চলে গেল।

কফি খাওয়ার পর কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, আমি বাথরুম থেকে আসছি ইতিমধ্যে যদি টেলিফোন বাজে তুমি ধরবে এবং একটু অপেক্ষা করতে বলবে।

বলে তিনি বাথরুমে গিয়ে ঢুকলেন। মিনিট দশেক পরে পোশাক বদলে তিনি ফিরে এলেন। বললুম,–কেউ আপনাকে ফোন করেনি।

কর্নেল বললেন,–তা হলে আমি হালদারমশাইয়ের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করব।

নোটবই খুলে নম্বর দেখে তিনি ডায়াল করলেন। সাড়া পেয়ে বললেন,–আমি মিস্টার কে, কে. হালদারের সঙ্গে কথা বলতে চাই।…কী হালদারমশাই, কেমন বুঝছেন?…হ্যাঁ আমরা এসে গেছি।…ধরমচাঁদ লাখোটিয়ার বাংলোতে উঠেছি। আপনি চলে আসুন।

ততক্ষণে কুয়াশা সরে রোদ ফুটছে। বাংলোর নিচে কিছুটা দূরে এই নদীটা দেখা যাচ্ছে। নদীর ওপারে আগাছার জঙ্গলের ভেতর বড়-বড় কালো পাথর হাতির মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার ওধারে ঘন শালবন।

মিনিট কুড়ি পরে সাইকেল রিকশায় চেপে গোয়েন্দা প্রবর আবির্ভূত হলেন। কর্নেল বারান্দায় গিয়ে তাঁকে সম্ভাষণ করে ঘরে নিয়ে এলেন। ঘরে ঢুকে একটা চেয়ারে বসে হালদারমশাই চাপাস্বরে বললেন,–একখান আশ্চর্য খবর লইয়া আইসি। আমি বাংলোর বারান্দায় বইয়া চা খাইত্যাসি, সেই সময়ই দেখলাম, কলকাতার সেই জগদীশবাবু একটা গাড়ি থিক্যা নামলেন, তারপর তিনি একটা বাড়ির বারান্দায় উঠলেন। গাড়িখান বাড়িটার পাশের গ্যারেজ ঘরে ঢুকল। কিন্তু আমার চোখ ছিল জগদীশবাবুর দিকে একটু পরে দরজা খুইল্যা এক ভদ্রলোক বারাইলেন। তারপর জগদীশবাবুরে ঘরের ভেতর লইয়া গেলেন। সেই সময়ই বাংলোর চৌকিদার কইল আমার টেলিফোন আছে।

যাইহোক ফোনে আপনার কথা শুইন্যা এখানে আসবার সময়ই বাড়িটা লক্ষ করসি। গেটে ইংরিজিতে লেখা আছে মাতাজি ধাম’। তার নিচে লেখা আছে হরদয়াল অগ্রবাল।

আমি বলে উঠলুম,–সেই হরদয়ালবাবুর বাড়ি? যিনি স্মাগলিং করে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলেন? কিন্তু এখন তো তিনি বেঁচে নেই, কাজেই হালদারমশাই যাঁকে দেখেছেন, তিনি তার ছেলে রামদয়াল।

কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বললেন,–আঃ জয়ন্ত, হালদারমশাইকে কথা বলতে দাও।

বকুনি খেয়ে চুপ করে গেলুম। হালদারমশাই বললেন,–এবার মধুরবাবুর কথা শোনেন, কাইল সন্ধ্যায় উনি আমার কাছে আইসিলেন। তিনি কইলেন, কুমারবাহাদুর জামাই রাজবাড়িতে তার থাকা পছন্দ করসে না। তাই তিনি তার এক বন্ধুর বাড়িতে থাকবেন। তারপর আপনারা এলে তিনি কলকাতায় ফিরে যাবেন। হ্যাঁ, আর একটা কথা। কাইল দুপুরে আদিবাসিরা বুনো আলুর লতা খুঁজতে গিয়ে কী একটা দেবতার মূর্তি উদ্ধার করসে। সেই মূর্তি এখন।

কর্নেল তার কথার ওপরে বললেন,–পুলিশের জিম্মায়।

হালদারমশাই হতভম্ব হয়ে বললেন, আপনি ক্যামনে জানলেন?

কর্নেল বললেন,–পুলিশ সূত্রে জেনেছি। যাইহোক, এবার আপনাকে একটু গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব দিচ্ছি। আপনি আপনার বাংলো থেকে ‘মাতাজি ধাম’ বাড়িটার দিকে লক্ষ রাখবেন। দৈবাৎ যদি মধুরবাবুকে ওই বাড়িটার কাছে দেখতে পান, অমনি আমাকে টেলিফোনে খবর দেবেন। এক মিনিট, বরং আপনি এখনই রাজবাড়িতে গিয়ে আগে খবর নিন মধুরবাবু নামে কেউ ওখানে আছেন কি না। জিগ্যেস করলে বলবেন, মধুরবাবুর সঙ্গে আপনার চেনাজানা আছে।

হালদারমশাই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–যাই গিয়া। তবে একটা কথা কর্নেলস্যার। রাজবাড়িতে যদি মধুরবাবু না থাকেন আমি কি মাতাজি ধামে এসে কারুকে জিগাইমু?

কর্নেল বললেন,–ওঃ না। আপনি শুধু লক্ষ রাখবেন বাড়িটার দিকে।

হালদারমশাই যথারীতি সবেগে বেরিয়ে গেলেন।

কর্নেল চৌকিদারকে সাড়ে আটটার মধ্যে ব্রেকফাস্ট তৈরি করতে বলেছিলেন। ব্রেকফাস্টের পর কর্নেল টেলিফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করলেন। সাড়া পেয়ে বললেন,–মর্নিং! কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি।…নমস্কার মিস্টার পাণ্ডে…না-না, একেবারে রাজার হালে আছি। এবার শুনুন, আমি কিছুক্ষণ পরে রাজবাড়িতে কুমারবাহাদুরের সঙ্গে দেখা করতে যাব। একটা জরুরি কাজের কথা তাই বলে নিই। আমি যেখানে থেকেই হোক আপনাকের রিং করলে আপনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফোর্স নিয়ে পৌঁছোনোর জন্য যেন তৈরি থাকবেন।….হ্যাঁ, মিস্টার খানের কাছে শুনেছি, লালবাজার পার্টি দুপুরের ট্রেনে এসে যাবেন।….হা, ঠিকই বলেছেন। এই কেসটা কলকাতা এবং যদুগড় দুটো জায়গারই কেস। তবে ধড়টা এখানকার, লেজটা কলকাতার। বলে কর্নেল হেসে উঠলেন। তারপর রিসিভার নামিয়ে রাখলেন।

জিগ্যেস করলুম,–এখনই কি বেরুচ্ছেন?

-হ্যাঁ, রেডি হয়ে নাও। আমরা পায়ে হেঁটেই যাব। রাজবাড়ি শর্টকাটে যাওয়া যায়। বলে তিনি তার সেই পেটমোটা ব্যাগ খুলে যা বের করলেন তা দেখে আমার অবাক হওয়ার কারণ ছিল না। বারিনবাবুর ব্রিফকেসে পাওয়া সেই তিনটে ছবি তিনি সেই তোয়ালেতেই জড়িয়ে বাঁধলেন। তারপর সেটা বগলদাবা করে বললেন,–চলো, বেরুনো যাক, হালদারমশাইয়ের ফোন যখন পেলুম না, তখন বোঝা যাচ্ছে তিনি মাতাজি ধামের কাছে মধুরবাবুকে দেখতে পাননি। এমনও হতে পারে রাজবাড়িতে গিয়েই আমরা হালদারমশাইয়ের দর্শন পাব।

বাংলোর পাশ কাটিয়ে একটা সংকীর্ণ পায়ে চলা পথে কর্নেল হাঁটছিলেন। পথের দু-ধারে ঘন ঝোঁপ। আমরা যাচ্ছি উত্তর দিকে। বাঁ-দিকে একটু দূরে ঘর-বাড়ি চোখে পড়ো। তারপর পথের দু-ধারের ঘন গাছপালা আর কিছু দেখতে দিল না।

মিনিট দশেক হাঁটার পর কর্নেল থমকে দাঁড়ালেন। আস্তে বললেন, আমরা রাজবাড়ির কাছে এসে পড়েছি। এবার তোমাকে কষ্ট করে ঝোঁপঝাড়ের ভেতর দিয়ে আমার সঙ্গে আসতে হবে।

একটু পরে চোখে পড়ল উঁচু একটা বাউন্ডারি ওয়াল। জায়গায়-জায়গায় ফাটল ধরেছে, ইটও বেরিয়ে আছে। সেই পাঁচিলের সমান্তরালে পশ্চিম দিকে কিছুটা চলার পর খোলামেলা একটা জায়গায় পৌঁছলুম। কর্নেল একটু হেসে বললেন,–কুমারবাহাদুরকে চমকে দেওয়ার ইচ্ছা আছে। তাছাড়া সদর রাস্তায় বগলে এই বোঁচকাটা রাখা নিরাপদ মনে করিনি। চমকে উঠে জিগ্যেস করলুম,–নিরাপদ মনে করেননি? কেন?

–ভুলে যেও না, জয়ন্ত, এই ভোয়ালেটা এবং তার ভেতরের জিনিস এখানে কারও চেনা হতেই পারে।

আরও অবাক হয়ে বললুম,–এটা মধুরবাবু ছাড়া আর কে চিনবেন?

কর্নেল আমার কথার জবাব না দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে হাঁটতে থাকলেন। আবার উত্তরে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে বাউন্ডারি ওয়ালের শেষে একটা গেটের সামনে পৌঁছুলাম। গেটের কাছে গাঁট্টাগোট্টা চেহারার হাফপ্যান্ট আর শার্ট পরা একটা লোক দাঁড়িয়েছিল। কর্নেলকে দেখা মাত্র সে সেলাম ঠুকে বলে উঠল,–কর্নেলসাব! আপনি যে আসবেন তার খবর তো দেননি? খবর দিলে আপনাকে কষ্ট করে পায়ে হেঁটে আসতে হতো না।

কর্নেল বললেন,–কুমারবাহাদুর আছেন?

–হ্যাঁ, কর্নেলসাব। আপনারা আসুন, আমি ওনাকে খবর দিচ্ছি।’ বিহার অঞ্চলে রাজা-জমিদারদের রাজবাড়ি কর্নেলের সঙ্গগুণে অনেক দেখেছি। তবে এই রাজবাড়ি বেশ পরিচ্ছন্ন এবং দেশি-বিদেশি ফুল এবং গুল্মে সাজানো। আমরা এগিয়ে কিছুটা গেছি, এমনসময় কর্নেলের মতোই বৃদ্ধ এবং প্রকাণ্ড চেহারার পাজামা-পাঞ্জাবি পরা এক ভদ্রলোক গাড়ি বারান্দার ছাদে আবির্ভূত হলেন। তিনি বললেন,–কী আশ্চর্য, আমি কি স্বপ্ন দেখছি?

কর্নেল বললেন,–না, হঠাৎ-ই আমাকে চলে আসতে হল। হাতে সময় কম, আপনার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলেই বেরুতে হবে।

গেটে দেখা সেই লোকটি আমাদের হলঘরের ভেতর দিয়ে দোতলায় নিয়ে গেল। চওড়া বারান্দায় কয়েকটা বেতের চেয়ার এবং টেবিল ছিল। সেখানে আমরা বসলুম। কুমারবাহাদুর বললেন, আপনার সঙ্গী এই যুবকটিকে দেখে আমার ধারণা ইনিই সেই সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরি।

এরপর কর্নেল বগলদাবার তোয়ালে জড়ানো ছবিগুলো টেবিলে রেখে বললেন, দেখুন তো, এগুলো চিনতে পারেন কিনা?

তোয়ালে খুলে ছবিগুলো দেখামাত্র কুমারবাহাদুর কর্নেলের হাত চেপে ধরে শিশুর মতো কেঁদে উঠলেন। আমি তো হতবাক।

কর্নেল বললেন,–কুমারবাহাদুর, আমার হাতে সময় কম। এই ছবিগুলো আমি কীভাবে উদ্ধার করেছি যথাসময়ে জানতে পারবেন। এবার আর দুটো হারানো জিনিস আপনাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি।

বলে উনি জ্যাকেটের ভেতর পকেট থেকে সেই প্রাচীন বৌদ্ধ সিলটা এবং ভাজকরা ম্যাপটা তার হাতে তুলে দিলেন। কুমারবাহাদুর সিল এবং ম্যাপটা দু-হাতে নিয়ে কপালে ঠেকিয়ে বললেন,–সত্যিই আমি স্বপ্ন দেখছি।

–স্বপ্ন নয়। আপনাদের জাদুঘর থেকে এই ছবি এবং সিল হারানোর কথা আপনার কলকাতার বেয়াইমশাইয়ের কাছে শুনেছি। কিন্তু তার আগেই দৈবাৎ এগুলো আমার হস্তগত হয়েছিল। তাই দেরি না করে আপনার হারানো জিনিস আমি ফেরত দিতে এসেছি।

কুমারবাহাদুর চোখ মুছে বললেন, আমার মেয়ে-জামাই আজ পাটনা গেছে। ওরা ফিরবে কয়েকদিন পরে। ওরা থাকলে খুবই আনন্দ পেত।

কর্নেল চাপাস্বরে বললেন,–মধুরবাবু ফিরে এসেছেন শুনলুম, কোথায় তিনি?

–কাল পাটনা যাওয়ার আগে জামাই মধুরকে দেখে খুব চটে গিয়েছিল। সে বলে গেছে ওই লোকটাকে যেন আমি আর আশ্রয় না দিই। কিন্তু কী করব বলুন। মধুর এসে আমার হাতে-পায়ে ধরে ক্ষমা চাইল। তারপর বলল,–জাদুঘরের হারানো জিনিস আমি নাকি শিগগির ফিরে পাব। তাই তো পেলাম দেখছি। আমার অবাক লাগছে।

.

আট

কর্নেল বললেন,–এবার একটা গুরুত্বপুর্ণ গোপন কথা আছে। কিন্তু এখানে নয়, সেটা আপনার ঘরে বলতে চাই।

কুমারবাহাদুর তখনই বারান্দা ধরে এগিয়ে গেলেন, আমরা তাকে অনুসরণ করলুম। লক্ষ করলুম তার হাতে একটা চাবির গোছা আছে। একটা ঘরের পরদা সরিয়ে তালা খুললেন। তারপর বললেন,–আসুন।

ঘরে ঢুকে কর্নেল বললেন,–দরজাটা বন্ধ করে দিচ্ছি।

তারপর কুমারবাহাদুর এবং আমরা একটা টেবিল ঘিরে বসলুম। কুমারবাহাদুর ছবিগুলো, ব্রোঞ্জের সিল এবং ম্যাপটা টেবিলে রাখলেন। কর্নেল চাপাস্বরে বললেন, আপনি কি ছবিগুলোর ফ্রেম এবং পিছন দিকটা লক্ষ করেছেন?

কুমারবাহাদুর একটা ছবি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে বললেন,–ফ্রেম তো তেমনি আছে।

–কিন্তু পিছনের দিকটা দেখে কি আপনার খটকা লাগছে না?

এবার কুমারবাহাদুর বলে উঠলেন,–কী আশ্চর্য! পিছনের দিকটাই নতুন করে কাগজ সাঁটা হয়েছে। ছবিগুলো কি কেউ খুলেছিল?

কর্নেল বললেন,–আমিই খুলেছিলাম। কারণ বহু বছর আগের বাঁধানো ছবির পিছন দিকটা দেখে সন্দেহ হয়েছিল, পিছনগুলো কেউ খুলেছে।

এবার কুমারবাহাদুর উত্তেজিতভাবে বললেন,–ছবি ভোলার কারণ কী?

–কারণ ছবিচোর জানত এই তিনটে ছবির ভেতরই বহুমূল্য রত্ন লুকনো আছে। আমি দেখাচ্ছি। ভেতরে এই দেখুন দুটো করে পুরোনো পিসবোর্ড আছে। আতস কাঁচে দেখেছি দুটো পিসবোর্ডের মধ্যে আবছা নকশা কাটা কোনও জিনিসের ছাপ পড়েছে।

কুমারবাহাদুর চমকে উঠে বললেন,–তা হলে এর ভেতর মূল্যবান রত্ন লুকোনো ছিল।

–ছিল। সেগুলো ছবিচোর হাতিয়ে নিয়ে নতুন করে পিছনে কাগজ এঁটে রেখেছিল। ব্রোঞ্জ, সিল আর নকশা নিয়ে তার মাথাব্যথা থাকার কথা নয়। তিনখানা বহুমূল্য নকশাদার হালকা পাতের অলঙ্কার পেয়েই সে খুশি হয়েছিল। যাইহোক, আর কোনও কথা নয়, আমি একবার টেলিফোন করব।

কুমারবাহাদুর টেলিফোন দেখিয়ে দিতেই কর্নেল রিসিভার তুলে ডায়াল করলেন, তারপর বললেন,–হালদারমশাই কী খবর বলুন।… কতক্ষণ আগে?…এইমাত্র? ঠিক আছে। আপনি এসে বাড়িটার কাছাকাছি কোনও জায়গায় দাঁড়ান। যেখান থেকে ও বাড়ির কেউ আপনাকে দেখতে পাবে না।

কর্নেল আবার ডায়াল করলেন, তারপর বললেন,–মিস্টার পাণ্ডে, আপনারা তৈরি আছেন তো?…তা হলে এখনই বেরিয়ে পড়ুন এবং রামদয়াল অগ্রবালের বাড়ি ‘মাতাজি ধাম’ চারদিক থেকে ঘিরে ফেলুন। আমি এখনই বেরুচ্ছি।

কুমারবাহাদুর কান ভরে শুনছিলেন। তিনি জিগ্যেস করলেন, কর্নেলসাহেব, কী ব্যাপার বলতে আপত্তি আছে?

কর্নেল হেসে বললেন, আপাতত আছে। কারণ আমার এই অভিযান সার্থক হবে কি না নিশ্চিত নই। আপনি অপেক্ষা করুন, যথাসময়ে এসে আপনাকে সব বলব।

কর্নেল ঘরের দরজা খুলে বেরুলেন, আমি তাকে অনুসরণ করলুম। সিঁড়ির মাথায় গিয়ে একবার ঘুরে দেখলুম কুমারবাহাদুর দরজার বাইরে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

আমরা গেটের কাছাকাছি পৌঁছেছি এমনসময় পাশের একতলা ঘর থেকে সেই হাফপ্যান্ট পরা লোকটি সেলাম ঠুকে বলল,–এখনই চলে যাচ্ছেন কর্নেলসাব?

কর্নেল বললেন,–মগনলাল, আবার আমরা আসব।

সেই সময়ই নিচের রাস্তায় দুটো পুলিশের জিপ এবং একটা কালো রঙের প্রিজন ভ্যান ঝড়ের বেগে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে গেল। কর্নেল বললেন,–চলো জয়ন্ত, আমরা এবার শর্টকাটে না গিয়ে সদর রাস্তা দিয়েই হেঁটে যাই।

রাস্তাটা চড়াইয়ের দিকে উঠেছে। মিনিট দশেক হাঁটার পর সমতল রাস্তায় পৌঁছে দেখলুম বাঁ-দিকে মাতাজি ধাম-এর সামনে পুলিশের তিনটে গাড়িই দাঁড়িয়ে আছে। এবং রাইফেল হাতে নিয়ে পুলিশবাহিনী বাড়িটা ঘিরে রেখেছে। একটু তফাতে হালদার মশাই দাঁড়িয়ে আছেন। আমাদের দেখেই হন্তদন্ত এগিয়ে এলেন। তারপর চাপাস্বরে কর্নেলকে বললেন, এখনই জাল ফ্যালাইয়া তো দিলেন। কোন মাছটারে ধরবেন বুঝতে পারতাসি না।

কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, আপনার কথা শুনেই জাল ফেলেছি। আসুন দেখি কী অবস্থা।

হালদারমশাই কী বলতে গিয়ে চুপ করে গেলেন। একদিকে আমি তো একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছি। কিছু বোঝার শক্তি যেন হারিয়ে গেছে। আমাদের দেখে সেই এস. আই. মিস্টার শাহেদ খান চাপা হেসে বললেন,–কর্নেলসাহেবের অলৌকিক ক্ষমতা দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি।

কর্নেল বারান্দায় উঠে শুধু বললেন,–অর্থাৎ আমার টাইমিং সেন্স কাজে লেগে গেছে।

প্রথম ঘরটা বসবার ঘর। সেই ঘরে দুজন সশস্ত্র কনস্টেবল ছাড়া আর কেউ নেই। শাহেদ খান ভেতরের ঘরের দরজায় পরদা তুলে বললেন, স্যার কর্নেলসাহেবরা এসে গেছেন।

ভেতর থেকে গম্ভীর কণ্ঠস্বর কেউ ডাকলেন,–আসুন কর্নেল সাহেব। কর্নেল তার পিছনে আমি এবং হালদারমশাই ঢুকে দেখি এটা যেন একটা গোডাউন। ঘরের এখানে-ওখানে স্তূপাকৃতি প্রকাণ্ড সব প্যাকেট সাজানো এবং এককোণে জানালার ধারে ছোট্ট সোফাসেটে বসে আছেন জগদীশ প্রসাদ। একজন ভুড়িওয়ালা ধুতি-পাঞ্জাবি পরা ভদ্রলোক এবং আমাদের সুপরিচিত সেই মধুরকৃষ্ণ মুখুজ্যেমশাই। সেন্টার টেবিলে খবরের কাগজ ছড়িয়ে রেখে তার ওপর সূক্ষ্ম নকশাকাটা অর্ধবৃত্তাকার মুকুটের মতো গড়নের তিনটে জিনিস। প্রত্যেকটিতে নানারঙের রত্নখচিত আছে। তার ওপর আলো পড়ে আমার চোখ যেন ঝলসে যাচ্ছিল। আরও একটা জিনিস দেখতে পেলুম। টেবিলের একপাশে একটা ব্রিফকেস খুলে রাখা হয়েছে। সেটা নোটে ভর্তি। হালদারমশাই আমার কানে-কানে বললেন,–কী কারবার দ্যাখসেন?

কর্নেল সোফার কাছে গিয়ে বললেন, মিস্টার পাণ্ডে, একেবারে ঠিক সময়েই এসে পড়েছিলেন দেখছি।

দৈত্যাকৃতি মিস্টার পাণ্ডের ডান হাতে রিভলভার ছিল। উনি সেটা বাঁ-হাতে নিয়ে কর্নেলের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলেন। তারপর বললেন,–দরজা ভেঙে ঢুকতে হয়নি। কারণ এই তিন ঘুঘু বেটাচ্ছেলে ভেবেছিল বাইরের ঘরের দরজা খোলা রাখলে সন্দেহ হবে না যে ভেতরে ঘরে কিছু হচ্ছে।

মিস্টার পাণ্ডে ছাড়া ঘরে সশস্ত্র দুজন পুলিশ অফিসার হাতে রিভলভার নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। কয়েকজন সাদা পোশাকের পুলিশও দেখতে পেলুম। বুঝলুম তারা স্পেশাল ব্রাঞ্চের লোক। তারপরই দেখলুম মধুরবাবু হাউ-মাউ করে কেঁদে উঠেছেন। তিনি কাঁদতে-কাঁদতে বললেন,–আমি কিছু জানি না কর্নেলসাহেব। রাজবাড়িতে আমার জায়গা হবে না দেখে আমি রামদয়ালজির কাছে একটা চাকরির আশায় এসেছিলুম।

কর্নেল একটু হেসে বললেন, আপনার মতো ধূর্ত মানুষ আমি এ যাবৎ কাল দেখিনি। আমাকে একটা অদ্ভুত গল্প বলে আপনি যে নাটকের সূত্রপাত করেছিলেন, তা কোথায় পৌঁছুবে আমি জানতে পেরেছিলুম বারিনবাবুর হাতে মুঠোয় কঁচাপাকা একগোছা চুল থাকার কথা শুনে।

হালদারমশাই বলে উঠলেন,–অ্যাঁ, কী কইলেন? কঁচাপাকা চুল?

–হ্যাঁ, হালদারমশাই। মধুরবাবুর মাথা লক্ষ করে দেখুন। উনি যেদিন আমার কাছে যান, সেদিন আমার চোখ পড়েছিল, ওঁর মাথার সদ্য ছাঁটা ছোট-ছোট চুলে। আপনারা জানেন মধুরবাবু খুব সৌখিন মানুষ ছিলেন। তাঁকে কুমারবাহাদুর ঠাট্টা করে বাবুর বাবু’ বলতেন। তাছাড়া আমিও ওঁকে যখন প্রথম দেখেছিলুম, তখন ওঁর মাথায় ছিল, টেরিকাটা ঝাঁকড়া চুল।

মিস্টার পাণ্ডে বললেন,–কলকাতার এই জগদীশবাবুর ব্রিফকেস থেকে আমরা একটা রিভলভার উদ্ধার করেছি। মনে হচ্ছে সেটাই মার্ডার উইপন। লালবাজার থেকে আমাকে বারিন সিনহা নামে এক ভদ্রলোকের শোচনীয় হত্যাকাণ্ডের কেস হিস্ট্রি রেডিও মেসেজে পাঠানো হয়েছে।

কর্নেল বললেন,–লালবাজারের ডিটেকটিভরা সদলবলে দুপুরের মধ্যেই এসে পড়বেন। তাদের হাতে এই তিনজনকেই আপনারা হয়তো তুলে দেবেন।

–দেব। কিন্তু এই কয়েক লাখ টাকার তিনটে রত্নখচিত সোনার মুকুট কোথায় এবং কে দেখতে পেয়ে চুরি করেছিল?

–আপাতত সংক্ষেপে বলি। এই মধুর মুখুজ্যে ছিল এখানকার রাজবাড়ির কেয়ারটেকার। তার বাবাও ছিলেন রাজ এসটেটের ম্যানেজার। পুরুষানুক্রমে এ বাড়িতে থাকার দরুন মধুরবাবু জানতে পেরেছিল কুমারবাহাদুরের পূর্বপুরুষদের তিনটি বাঁধানো ছবির পিছন দিকে সাবধানে এই তিনটি রত্নখচিত মুকুট লুকোনো ছিল। মধুরকৃষ্ণ রাজবাড়ি থেকে সেগুলো হাতিয়ে এই জিনিসগুলো সরিয়ে ফেলেছিল এবং ছবির পেছনে নতুন করে কাগজ এঁটে দিয়েছিল। তাই প্রথম দিনই ওর কাটা চুল এবং এই নতুন করে আঁটা কাগজ আমার মনে সন্দেহ জাগিয়েছিল। এরপর মধুরকৃষ্ণ প্রথমে বারিনের সঙ্গে তারপর জগদীশপ্রসাদের সঙ্গে এগুলো নিয়ে দরাদরি শুরু করে। এ অবশ্য আমার অনুমান।

তারপর জগদীশ আর মধুরকৃষ্ণ দুজনে কেন বারিন সিনহাকে খুন করল তাও আমার কাছে স্পষ্ট। এই মুকুটগুলোর দাম বাজার দরে এত বেশি টাকা, যে বারিনের পক্ষে তা কেনা সম্ভব ছিল না। তার চেয়ে বড় কথা বারিন বেঁচে থাকলে তাকেও সমান বখরা দিতে হবে। অতএব তাকে শেষ করে ফেলাই উচিত।

এরপর মধুরকৃষ্ণ খুব ভয় পেয়েছিল। কারণ জগদীশপ্রসাদ এরপর তাকেও হয়তো মেরে ফেলবে। তাই নিজের প্রাণ রক্ষার জন্যে সে একটা ব্রিফকেসে শুধু ছবিগুলো আর দু-একটা জিনিস ভরে আমার কাছে নিয়ে গিয়ে একটা গপ্পো ফেঁদে আসলে আমার কাছে আশ্রয়ই চেয়েছিল। সে জানে আমি তার গল্পটা শোনার পর তাকে আশ্রয় দেব। যাইহোক, সে রত্নগুলো নিজের কাছে লুকিয়ে রেখে আমার কথা মতো প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিস্টার হালদারের সঙ্গে যদুগড়ে এসেছিল। এটা কিন্তু আমারই একটা চাল। শেষ পর্যন্ত সে এখানে এসে সাধু সেজে রাজবাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে নিশ্চয়ই কোটিপতি স্মাগলার এই রামদয়ালের কাছে রত্ন বেচতে চাইবে। এটা আমি অনুমান করেছিলুম।

মিস্টার পাণ্ডে জগদীশ প্রসাদকে দেখিয়ে বললেন,–কিন্তু এই ভদ্রলোক কীভাবে জানলেন যে মধুরবাবু এখানে এসে রামদয়ালের দ্বারস্থ হবে?

কর্নেল বললেন, আমার অনুমান জগদীশ প্রসাদের হাত থেকে বাঁচতে মধুরকৃষ্ণ অনেক ভেবে তাকেও বখরা দিতে চেয়েছিল। দেখা যাচ্ছে, এদের তিনজনের মধ্যেই একটা যোগাযোগ হয়ে যায়, এবং ঠিক সময়ে জগদীশ তার বখরা নিতে এখানে এসে পড়ে। আজকাল টেলিফোনের উন্নতির যুগে পরস্পর যে যেখানেই থাকুক যোগাযোগ করা কঠিন কিছু নয়।

মিস্টার পাণ্ডে বললেন,–সবকথা আমি এই তিন বেটাচ্ছেলের মুখ থেকে বের করে নেব। আমার নাম জয়রাম পাণ্ডে! আমি যে কী, তা অন্তত এই রামদয়াল অগ্রবাল ইতিমধ্যেই ভালোই জেনে গেছে।

কর্নেল বললেন,–তা হলে আপনার বমাল আসামিদের নিয়ে থানায় চলে যান। লালবাজারের লোকেরা এসে পড়লেই আইনত যে ব্যবস্থা করা উচিত তা করবেন।

এই বলে কর্নেল সবে ঘুরেছেন, হালদারমশাই হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে কয়েক পা বাড়িয়ে মধুরবাবুর মাথায় একটা জায়গায় চুল সরিয়ে দেখালেন। তারপর বললেন,–দ্যাখসেন! বাঁ-কানের পাশে একটুখানি জায়গা লাল হইয়া আসে। এই জায়গাটা কাইল দুপুরে হঠাৎ আমার চোখে পড়সিল। জিগাইলাম ফেঁড়া হইসে নাকি মধুরবাবু? মধুরবাবু সেইখানে হাত বুলাইয়া কইলেন, কী একটা হইসিল। আমি চুলকাইয়া দিসিলাম। কে জানে সেপটিক না হয়!

বলে হালদারমশাই খি-খি করে হাসতে-হাসতে কর্নেলকে অনুসরণ করলেন।


আমরা তিনজনে ‘মাতাজি ধাম’ থেকে বেরিয়ে যে বাংলোয় কর্নেল এবং আমি উঠেছি, সেখানে গেলুন। কর্নেল চৌকিদারকে বললেন,–একজন গেস্ট আছে। কোনও অসুবিধে হবে না তো?

চৌকিদার বলল,–কোনও অসুবিধে হবে না স্যার, শুধু হুকুম করুন, কখন আপনারা লাঞ্চ খাবেন।

কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন,–ঠিক একটায় আমরা খেয়ে নেব। তবে আপাতত তুমি আমাদের তিন পেয়ালা কফি এনে দাও।

কিছুক্ষণ পরে চৌকিদার কফি দিয়ে গেল। কফি খেতে-খেতে গোয়েন্দাপ্রবর বললেন,–একটা কথা বুঝতে পারতাসি না কর্নেলস্যার।… হঃ, আপনি কথাটা তখন মিস্টার পাণ্ডেরে কইসিলেন বটে, কিন্তু আমি বুঝি নাই।

কর্নেল জিগ্যেস করলেন,–বলুন হালদারমশাই।

–মধুরবাবু মিথ্যা একখান গল্প কইয়া আপনার কাছে গিসল ক্যান? সে তত ওই রত্নগুলি হাতাইয়া বাকি সব জিনিস নষ্ট কইরা ফেলতে পারত। কিন্তু তা না কইরা সে আপনার কাছে গেল ক্যান?

কর্নেল একটু হেসে বললেন,–জগদীশপ্রসাদের ভয়ে।

–এবার কন যখন সে বারিনবাবুর কাছে গিয়াসিল তখনই কি জগদীশবাবু বারিনবাবুকে খুন করেন?

–হ্যাঁ।

–তা হলে বারিনবাবু জগদীশবাবুর চুল না ধইরা মধুরবাবুর চুল ধরলেন ক্যান?

–দৃশ্যটা আমি মনে-মনে সাজিয়েছি। শুক্রবার রাত্রে তিন স্যাঙাতে মিলে মধুরবাবুর চুরি করা রত্ন নিয়ে আলোচনা করছিল। ধরা যাক, তিনজনেই ঠিক করে রত্নগুলো যদুগড়ে গিয়ে রামদয়ালের কাছে বিক্রির প্রস্তাব করা হবে। কারণ, তিনজনই রামদয়ালকে চেনে। জগদীশবাবুও যে চিনত, তা তো আমরা এখন জানি। এখানে এসে তার বাড়িতেই জগদীশবাবু ঢুকেছিল।

যাইহোক, এবার সেই দৃশ্যের কথায় আসি, কথাবার্তা শেষ হওয়ার পর মধুরবাবু উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে পা বাড়িয়েছেন, এমন সময়েই জগদীশবাবু মধুরবাবুর চক্রান্ত অনুসারে আচমকা এগিয়ে এসে বারিন সিনহার কপালে রিভলভার ঠেকিয়ে গুলি করেন। আচমকা আক্রান্ত হওয়ার মুখে মানুষ সহজাত বোধে যা করে, বারিনবাবু ঠিক তাই করেছিল। হাত বাড়িয়ে জগদীশবাবুর চুল ধরতে গিয়ে মধুরবাবুর মাথাটা হাতের কাছে পেয়েছিল। তাই সে মধুরবাবুরই একগোছা চুল ছিঁড়ে নেয়।

আমি জিগ্যেস করলুম,–আপনি তা হলে একেবারে প্রথম থেকেই মধুরবাবুকে সন্দেহ করেছিলেন।

–সে তো আগেই বলেছি। মধুরবাবুর মাথার চুলছাঁটা দেখে আমার অবাক লেগেছিল। যখন অবাক লেগেছিল। তখন অবশ্য তার প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝতে পারিনি। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে মধুরবাবু যখন বলল,–বারিন নামে তার এক বন্ধু খুন হয়েছে, সে নাকি ব্রিফকেস দিয়েছিল–তার হাতের মুঠোয় একগোছ কাঁচাপাকা চুল আছে। জয়ন্ত, খুনি যত ধূর্তই হোক এইভাবেই একটা বেঁফাস কথা বলে ফেলে কিংবা তার ধরা পড়ার কোনও সূত্র নিজের অজান্তে রেখে যায়। একটু চিন্তা করো জয়ন্ত, ভিকটিমের হাতের মুঠোয় কাঁচাপাকা চুল থাকার কথাটা বলে মধুকৃষ্ণ কি বোকামি করেনি? আসলে সে বারিনবাবুর হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বলতে গিয়ে মুখ ফসকে কথাটা বলে ফেলেছিল।

হালদারমশাই ততক্ষণে কফি শেষ করেছেন। একটিপ নস্যি নিয়ে বললেন,–আমরা কি আইজ যদুগড়ে থাকব? কর্নেল সহাস্যে বললেন,–নিশ্চয়ই থাকব। আর এই সুযোগে আপনাকে আর জয়ন্তকে রাজবাড়ির বিস্ময়কর পাতাল-জাদুঘর দেখাব।

Facebook Comment

You May Also Like