Sunday, April 21, 2024
Homeথ্রিলার গল্পরহস্য গল্পপোকা - হুমায়ূন আহমেদ

পোকা – হুমায়ূন আহমেদ

পোকা - হুমায়ূন আহমেদ

১. নামের শেষে অক্ষর

আলতাফ হোসেনের নামের শেষে অনেকগুলি অক্ষর।

আলতাফ হোসেন বি. এ. (অনার্স), এম, এ, বি, টি, এল, এল, বি.।

প্রতিটি অক্ষরের পেছনে কিছু ইতিহাস আছে। যেহেতু পোকার নায়ক আলতাফ হোসেন সেহেতু তার ইতিহাস জানা থাকলে পোকার বিষয়বস্তু বুঝতে সুবিধা হবে। অনার্স থেকে শুরু করা যাক। আলতাফের ইচ্ছা ছিল পাস কোর্সে পড়া। তার দূর সম্পর্কের মামা এ.জি, অফিসের সিনিয়র এসিসটেন্ট বজলুর রহমান বললেন, অনার্স পড়। শুনতে ভাল লাগে। আলতাফ হোসেন ক্ষীণ গলায় বলল, ইন্টারমিডিয়েটের রেজাল্ট খারাপ, অনার্সে ভর্তি হতে পারব না, মামা। বজলুর রহমান বললেন, চেষ্টা করে দেখ। কত আজে-বাজে সাবজেক্ট আছে–পল সায়েন্স, ফল সায়েন্স। আলতাফ অনেক খুঁজে পেতে জগন্নাথ কলেজে অনার্সে ভর্তি হয়ে গেল। বজলুর রহমান বললেন, খাটাখাটনি করে পড়। খাটাখাটনি কখনো বৃথা যায় না। কথায় আছে–খাটে মানুষ টে না।

আলতাফ প্রচণ্ড খাটাখাটনি করল। অনার্স পরীক্ষার রেজাল্ট বের হবার পর সে তার মামার পা ছুঁয়ে সালাম করল। ক্ষীণ গলায় বলল, রেজাল্ট হয়েছে মামা। বজলুর রহমান বিছানায় শুয়ে ছিলেন। তিনি উঠে বসলেন। উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কি রেজাল্ট?

থার্ড ক্লাস পেয়েছি, মামা।

বলজুর রহমান সাহেবের উৎসাহ মরে গেল। তিনি হতাশ গলায় বললেন, এত পড়াশোনা করে শেষে থার্ড ক্লাস?

জি মামা।

থার্ড ক্লাস ডিগ্রী নিয়ে চাকরি-বাকরি তো কিছুই পাবি না। এখন করবি কি?

আপনি বলে দিন, মামা।

এম, এ, দিয়ে দে। এম, এ, পাশ থাকলে থার্ড ক্লাসের দোষ কাটা যায়। ভালমত পড়াশুনা করে এম. এ. দে। খাটাখাটনি কর। কথায় আছে–খাটে মানুষ ঘাঁটে না।

আলতাফ হোসেন খুব ভালমত পড়াশুনা করে এম, এ, দিল। রেজাল্ট বের হবার পর যথারীতি পা ছুঁয়ে মামাকে সালাম করল। বজলুর রহমান শংকিত গলায় বললেন, কি রে, এবারো থার্ড ক্লাস?

জ্বি মামা।

থার্ড ক্লাসের তুই তো দোকান দিয়ে ফেলেছিস রে গাধা।

আলতাফ হোসেন ক্ষীণ স্বরে কি যেন বলল, পরিষ্কার বোঝা গেল না। তার বেশিরভাগ কথাই পরিষ্কার বোঝা যায় না। তবে আর চোখ ভিজে উঠল। বজলুর রহমান বললেন, যা হবার হয়ে গেছে। এখন চাকরি-বাকরি খোঁজ। রোজগারপাতির চেষ্টা তো দেখা দরকার। আমার ঘাড়ে বসে কতদিন খাবি? আর থার্ড ক্লাস নিয়ে মন খারাপ করিস না। ডিগ্রীটাই সবাই দেখবে, ক্লাস কে দেখবে? এত সময় কার আছে? তাছাড়া থার্ড ক্লাস পাওয়াও সহজ না। এক চান্সে পেয়েছিস, এটা কম কথা না।

মামার উপদেশমত আলতাফ হোসেন চাকরির খোঁজে লেগে গেল। দু’বছর অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে চাকরি খুঁজল। কিছু হল না। বলজুর রহমান বললেন, বি, টি, দিয়ে ফেল। বি, টি, থাকলে স্কুলের চাকরি পেয়ে যাবি। স্কুলের চাকরিতেই আজকাল মজা। প্রাইভেট টিউশানি করবি, দুই হাতে টাকা কামাবি। স্কুল মাস্টারি আজকাল কেউ করতে চায় না, ঐ লাইনে চাকরি খালি আছে।

আলতাফ হোসেন বি. টি, পাশ করল। স্কুলের কোন চাকরি জোগাড় করা গেল না। স্কুলে সায়েন্স গ্রেজুয়েট চায়, এম, এ, বি, টি, চায় না। আরো দু বছর গেল। বজলুর রহমান বললেন, এল. এল. বি.টা দিয়ে দিবি নাকি? আইনের একটা ডিগ্রী থাকলে সুবিধা হবে। আলতাফ হোসেন এল, এল, বি, ডিগ্রী নিয়ে নিল। চাকরির কোন সুবিধা হল না।

বজলুর রহমান হতাশ হয়ে একদিন বললেন, বিয়ে করবি? অনেক সময় বিয়ে করলে ভাগ্য ফেরে। কথায় আছে–স্ত্রী ভাগ্যে ধন। দেখবি বিয়ে করে?

আলতাফ হোসেন অস্পষ্ট গলায় বলল, জ্বি আচ্ছা।

চাকরি পাওয়া না গেলেও বিয়ের মেয়ে পেতে অসুবিধা হল না। আট-দশটি মেয়ের সন্ধান পাওয়া গেল। এই মেয়েগুলির অভিভাবকদের কথা শুনলে মনে হতে পারে এরা বেকার ছেলেই খুঁজছিল। একজন তো বলেই ফেলল, পাত্র হিসেবে বেকার ছেলের তুলনা নেই। এরা খুব স্ত্রীভক্ত হয়ে থাকে। চাকরি বাকরি নেই তো, তাই স্ত্রীকে খুব মানে। আরে ভাই, চাকরি তো একসময় হবেই। রিজিক আল্লার হাতে। মানুষের হাতে থাকলে চিন্তার বিষয় ছিল।

বজলুর রহমান মেয়ে দেখে বেড়াতে লাগলেন। আষাঢ় মাসের ন’ অরিখে বিয়ের কথা পাকা করে এক কেজি বাসি সন্দেশহাতে বাসায় ফিরলেন। মেয়ের নাম হোসনে আরা। লালমাটিয়া কলেজে বি, এ, পড়ে। গায়ের রঙ ময়লা হলেও মাথাভর্তি চুল।

বজলুর রহমান রাতে খেতে বসে খুব আগ্রহের সাথে হোসনে আরার লম্বা চুলের গল্প করতে গিয়ে লক্ষ্য করলেন, তার স্ত্রী মনোয়ারা কোন রকম আগ্রহ দেখাচ্ছে না। শুধু তার মেয়ে দুলারী চোখ বড় বড় করে শুনছে। বজলুর রহমান তৃপ্ত গলায় বললেন, মেয়ের চুল ১.২২ মিটার লম্বা।

কেউ তেমন বিস্মিত হল না, শুধু দুলারী বলল, তুমি কি গজফিতা দিয়ে মেপেছ?

আমি মাপব কেন? ওরা নিয়মিত মাপে।

তাহলে তো আমাদেরও মাপতে হবে। তুমি একটা গজফিতা কিনে এনো তো বাবা।

তিনি বিরক্ত গলায় বললেন, তুই এমন বাঁকা কথা বলছিস কেন? কি হলো?

দুলারী বলল, এক মিটার সমান কত ফুট তুমি কি জান, বাবা?

না, জানি না।

তোমার উচিত ছিল ওদের জিজ্ঞেস করা। মিটারের হিসাব তো সবাই জানে না, গজ-ফুটের হিসাব জানে।

বজলুর রহমান চিন্তিতমুখে মেয়ের দিকে তাকালেন। মেয়েটা কেন যেন কাটা কাটা কথা বলছে। ধমক দেবেন কিনা বুঝতে পারছেন না। দুলারী তাঁর বড়ই আদরের মেয়ে। তাকে ধমক দেয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব না। তাছাড়া দুদিন পর মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। বাপের বাড়িতে যে কটা দিন থাকবে আদরে থাকুক।

দুলারী বড়ই খেয়ালি ধরনের মেয়ে। ইন্টারমিডিয়েটে পড়তে পড়তে পড়া ছেড়ে দিল। বই নিয়ে বসলেই তার নাকি মাথা ধরে। বজলুর রহমান মেয়ের বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলেন। সে বিয়েও করবে না।

মূর্খ অবস্থায় বিয়ে করব না-কি? শ্বশুরবাড়িতে রোজ কথা শুনতে হবে। আগে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করি, তারপর বিয়ে।

বজলুর রহমান বিস্মিত হয়ে বললেন, তুই তো পড়াশোনাই ছেড়ে দিয়েছিস, পাশ করবি কি ভাবে?

মাথাধরা রোগটা কমলেই পড়াশোনা শুরু করব।

চার বছর ঘরে বসে থাকার পর দুলারী আবার কলেজে ভর্তি হয়েছে। নিয়মিত কলেজে যাচ্ছে। রাত জেগে পড়াশোনা করছে। এমন খেয়ালি মেয়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলা মুশকিল। বজলুর রহমান তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা বাদ দিয়েছেন। মেয়ের সঙ্গে কথা যা বলার তা তিনি মেয়ের মার মাধ্যমে বলার চেষ্টা করেন। এই যে মেয়ে এখন ক্যাট ক্যাট করে কথা বলছে, তাকে একটা ধমক দেয়া উচিত, তা দিতে পারছেন না। দুলারীকে ধমক দেয়ার সমস্যা আছে। ধমক দিলে সে কিছুই বলবে না, নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেবে। তার দরজা বন্ধ মানে ভয়াবহ ব্যাপার। একবার কাঠমিস্ত্রী এনে দরজা কাটাতে হয়েছিল। করাত ফরাত এনে কেলেঙ্কারি কাণ্ড।

দুলারী বলল, বাবা, তুমি কি হোসনে আরা বেগমের লম্বা চুলের কোন সেম্পল এনেছ?

না।

ভুল করেছ। সেম্পল আনা দরকার ছিল।

বজলুর রহমান নিজেকে সামলাতে পারলেন না। স্ত্রীকে বললেন, তোমার মেয়েকে এখান থেকে যেতে বল তো।

দুলারী উঠে চলে গেল। বজলুর রহমান বললেন, ওর কি হয়েছে?

মনোয়ারা চাপা গলায় বললেন, সর্বনাশ হয়েছে।

সর্বনাশ হয়েছে মানে?

খাওয়া শেষ করো, অরপর বলব।

বজলুর রহমান তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করতে গিয়ে গলায় কৈ মাছের কাঁটা লাগিয়ে ফেললেন। কৈ মাছের কাঁটা কৈ মাছের মতই জীবন্ত হয়ে থাকে, যতই সময় যায় কাঁটা ততই ভেতরের দিকে ঢুকতে থাকে। বজলুর রহমান ব্যথায় অস্থির হলেন। একটু পর পর বলেন, এর চেয়ে মরণ ভাল ছিল। এই সময়ে স্বামীকে দুঃসংবাদ দেয়া ঠিক হবে কিনা মনোয়ারা বুঝতে পারেন না। বজুলুর রহমান যখন বললেন, কি ঘটনা বল। তখন তাঁকে ঘটনা বলতে হল। ঘটনা শুনে বজলুর রহমানের চোখ কপালে উঠে গেল, তিনি কৈ মাছের কাঁটার ব্যথা ভুলে গেলেন। থমথমে গলায় বললেন, হারামজাদা আলতাফ কোথায়? হারামজাদার চামড়া ছিলে লবণ মাখিয়ে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে দেব। ডাক হারামজাদাকে।

মনোয়ারী বললেন, ও বাসায় নেই।

দুলারীকে ডাক।

ওকে ডাকা যাবে না।

ঘটনা আসলেই ভয়াবহ। দুলারী আজ সকাল দশটায় কলেজে যাবার জন্যে তৈরি হয়ে মার কাছে রিকশা ভাড়া চাইতে এসে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলেছে, মা, আমি এখন একটা কথা বলব, শুনেই হৈ-চৈ শুরু করবে না। কথাটা হল, আমি আলতাফ ভাইকে বিয়ে করব। হোসনে আরা ফোসনে আরার কথা ভুলে যাও।

মনোয়ারা হতভম্ব গলায় বললেন, কি বললি?

দুলারী বলল, কি বলেছি তা তো শুনেছ। ভাল করেই শুনেছ। আবার জিজ্ঞেস করছ কেন? রিকশা ভাড়া দাও, মা। দশ টাকা দেবে। ছেঁড়া নোট দিও না আবার। একদিন ছেঁড়া নোট নিয়ে যা যন্ত্রণায় পড়েছিলাম।

মনোয়ারা রিকশা ভাড়া এনে দিলেন এবং ভাবলেন দুলারী ঠাট্টা করছে। ঠাট্টা তো বটেই। ঠাট্টা ছাড়া আর কি?

তিনি রোজ দুপুরে শরৎচন্দ্রের দেবদাস উপন্যাসের শেষ দশ পাতা পড়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমুতে যান। আজ ঘুমুতে পারলেন না। জোহরের নামাজ পড়লেন এবং মেয়ের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলেন।

দুলারী কলেজ থেকে ফিরে সহজ গলায় বলল, পানি দাও তো মা, পিপাসা হয়েছে।

মনোয়ারার বুক থেকে পাষাণ নেমে গেল। যাক, কোন সমস্যা তাহলে নেই। তিনি পানি এনে দিলেন। হাসিমুখে বললেন, আজ কলেজে কি হল রে? দুলারী বলল, কিছু হয়নি। তুমি কি বাবাকে বলেছ?

কি বলব?

কলেজে যাবার আগে তোমাকে যে বলে গেলাম?

কি বলে গেলি?

তুমি ভালই জান কি বলে গেছি। তুমি বাবাকে বলে রাজি করাবে। না হলে…

না হলে কি?

তোমরা রাজি না হওয়া পর্যন্ত আমি দরজা বন্ধ করে বসে থাকব। দরজা খুলব না, ভাত খাব না।

তুই কি পাগল হয়ে গেছিস?

হ্যাঁ।

তোর বাবা তোকে খুন করে ফেলবে।

খুন করলে খুন করবে।

দুলারী সত্যি সত্যি তার ঘরের দরজা বন্ধ করে ফেলল। অবশ্যি মনোয়ারা দরজায় ধাক্কা দিতেই দরজা খুলল। তবে ঠাণ্ডা গলায় বলল, তোমাদের চব্বিশ ঘন্টা সময় দিলাম, মা। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কিছু না করলে আমি র‍্যাটম খাব। এই হল ঘটনা।

বজলুর রহমান বললেন, র‍্যাটম কি?

র‍্যাটম হল ইঁদুর-মারা বিষ। ধরে এক ফাইল ছিল, সেটা এখন দুলারীর কাছে।

বজলুর রহমান দীর্ঘ সময় ঝিম ধরে বসে রইলেন। গলায় বিঁধে থাকা মাছের কাঁটার কথা তাঁর মনে রইল না। মনোয়ারা বললেন, এখন কি করবে?

বজলুর রহমান থমথমে গলায় বললেন, হারামজাদাকে আমি খুন করব। হারামজাদা কোথায়?

রোজ তো এই সময় বাসাতেই থাকে, আজ কোথায় যেন গেছে।

মাছ কাটার বটিটা আমার কাছে দাও, তারপর দেখ কি করি। শুওর কা কাচ্চা।

আমার মনে হয় আলতাফ কিছু জানে না। তোমার মেয়েটা শয়তানের ঘোড়া, হাড়-বজ্জাত। বটি দিয়ে কাটতে হয় ওকে কাট।

পালের গোদা আগে শেষ করি। তারপর তোমার মেয়েকে ধরব। আমি এখন কবি নজরুল। আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোন ভেদাভেদ নাই। বটি কই? বটি আন।

বটি আনার আগেই আলতাফ হোসেন উপস্থিত হল। বজলুর রহমান বললেন, কোথায় গিয়েছিলি?

রাস্তায় হাঁটতে গিয়েছিলাম, মামা। মাথা জাম হয়েছিল, ভাবলাম একটু হাঁটি।

মাথা জাম হয়েছিল?’

জি মামা।

এখন জাম দূর হয়েছে?

জি না। এখনো আছে।

সারা জীবনের জন্যে জাম দূর করার ব্যবস্থা করছি। এই জীবনে আর জাম লাগবে না।

জ্বি আচ্ছা।

আলতাফ ভেতরের দিকে রওনা হল। বজলুর রহমান হুংকার দিলেন, যাস কোথায়?

ভাত খেতে যাই, মামা।

ক্ষুধার্ত মানুষের সঙ্গে রাগারাগি করা যায় না। বজলুর রহমান অনেক কষ্টে নিজেকে সামলালেন, গম্ভীর গলায় বললেন, যা, ভাত খা! ভাত খেয়ে বিছানা বালিশ নিয়ে বিদায় হয়ে যাবি। এই জীবনে তোর মুখদর্শন করতে চাই না।

আলতাফ অবাক হয়ে বলল, কোথায় যাব?

কোথায় যাবি আমি কি জানি? যেখানে ইচ্ছা যা। মনোয়ারা, হারামজাদাটাকে ভাত দাও।

আলতাফ ভয়ে ভয়ে বলল, কি হয়েছে মামা?

ভাত খেয়ে আয়, তারপর বুঝবি কত ধানে কত চাল।

আলতাফ বলল, ভাত দিন মামী।

মনোয়ারা বললেন, ভাত টেবিলে বাড়া আছে, নিজে নিয়ে খাও।

আলতাফ ভাত খেল। মামার কথামত সুটকেস গুছাল। মামা তাকে যেতে বলেছেন, কাজেই যেতে হবে। মামার সঙ্গে তর্ক করা বা তার অবাধ্য হওয়া তার পক্ষে সম্ভব না। বজলুর রহমান বললেন, কোথায় যাবি কিছু ভেবেছিস?

জি না, মামা।

রেল স্টেশনে চলে যা। খবরের কাগজ বিছিয়ে প্লাটফরমে শুয়ে থাকবি?

জ্বি আচ্ছা।

আলতাফ নিচু হয়ে মামাকে সালাম করল। বজলুর রহমানের ইচ্ছা করছিল লাথি দিয়ে শুয়রের বাচ্চাকে চিৎ করে ফেলে দেন, অনেক কষ্টে নিজেকে সামলালেন। আলতাফ চলে গেল। সারা রাত বজলুর রহমানের ঘুম হল না। কৈ মাছের কাঁটার যন্ত্রণাতেই ঘুম হল না। ভোররাতে ঠিক করলেন, মেডিকেল কলেজে যাবেন। এই যন্ত্রণা পোষার কোন মানে হয় না। মেডিকেল কলেজে একা যাওয়া যায় না, কাউকে সঙ্গে নিতে হয়। তিনি আলতাফের খোঁজে কমলাপুর রেল স্টেশনে গেলেন। সে সত্যি সত্যি একটা ইত্তেফাক বিছিয়ে তার উপর গম্ভীর হয়ে বসে আছে। মামাকে দেখেই সে বলল, কাঁটা এখনো আছে মামা?

হ্যাঁ। কাঁটা তুলতে যাচ্ছি। তুই চল আমার সঙ্গে।

সুটকেস নিয়ে যাব?

নিয়ে যাবি না তো কার কাছে রেখে যাবি?

বজলুর রহমান কাঁটা তুললেন। আলতাফকে নিয়ে বাসায় ফিরলেন। আলতাফের এক হাতে স্যুটকেস, অন্য হাতে কাগজে মোড়া মাছের কাঁটা। মামার গলার কাঁটা সে ফেলে আসতে রাজি হয়নি। কাগজে মুড়ে নিয়ে এসেছে। বাসায় ফিরে বজলুর রহমান স্ত্রীকে ডেকে বললেন, গাধাটার সঙ্গে তোমার মেয়ের বিয়ে দিতে আপত্তি আছে? আপত্তি না থাকলে ঝামেলা চুকিয়ে দাও। মনোয়ারা বললেন, দেখ, তুমি যা ভাল বোঝ। তবে বিয়ে দেয়াই ভাল। তোমার মেয়ে হয়েছে কচ্ছপের মত। কামড় দিয়ে যেটা ধরবে সেটা আর ছাড়বে না। বিয়ে না দিলে শেষমেষ কি করে বসে কে জানে। র‍্যাটম নিয়ে বসে আছে।

ওর কপালে আছে র‍্যাটম। জীবন্ত র‍্যাটম। তোমার মেয়েকে বল, র‍্যাটমের সঙ্গে বিয়ের ব্যবস্থা হচ্ছে। তবে একটা কথা শুনে রাখ–এই মেয়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শেষ। বিয়ের পর এদের আমি ঘাড় ধরে বের করে দেব। এই বাড়ির দরজা চিরকালের জন্য বন্ধ।

ওরা যাবে কোথায়? খাবে কি?

সেটা ওদের ব্যাপার।

বিয়ে কবে দিচ্ছ?

গাধাটাকে জিজ্ঞেস করে একটা তারিখ ঠিক কর।

আলতাফকে জিজ্ঞেস করা হল, সে মাথা নিচু করে বলল, বিয়ে করব না।

বজলুর রহমান কঠিন গলায় বললেন, ফাজলামির জায়গা পাস না! বিয়ে করবি না মানে? তোর ঘাড় বিয়ে করবে।

চাকরিবাকরি নাই।

কোন অজুহাত শুনতে চাই না আগামী রোববার তোর বিয়ে।

জ্বি আচ্ছা, মামা।

হাতে মাছের কাঁটা নিয়ে ঘুছিস কেন? ফেল মাছের কাঁটা।

আলতাফ মাছের কাঁটা ফেলে দিল।

ঘরের ভেতর ফেললি কি মনে করে? যা, রাস্তায় ফেলে দিয়ে আয়।

আলতাফ কাঁটা হাতে বের হয়ে গেল। বজলুর রহমান মনোয়ারাকে বললেন, দুলারীকে গিয়ে বল, রোববারে বিয়ের তারিখ হয়েছে।

মনোয়ারা বললেন, আর একটু চিন্তা-ভাবনা করলে হত না?

একবার যখন বলেছি রোববার, তখন রোববারই হবে। মানুষের জবানের দাম আছে।

কিছু সময় তো লাগবেই। বিয়ের কেনাকাটা করব না?

গাধার সঙ্গে বিয়ের আবার কেনাকাটা কি? কেনাকাটার নামও মুখে আনবে না।

আমাদের একটাই মেয়ে।

একটাই হোক আর দশটাই হোক কেনাকাটা হবে না। এটা আমার ফাইন্যাল কখা। তোমার পছন্দ হলে ভাল, পছন্দ না হলেও ভাল।

আলতাফ ফিরে এসেছে। ভীত চোখে তাকাচ্ছে মামার দিকে। বজলুর রহমান বললেন, কিছু বলবি?

কাঁটা রাস্তায় ফেলে দিয়ে এসেছি, মামা।

আহ! বিরটি কাজ করেছিস। আয় কোলে এসে বোস, আদর করি।

বলেই তার মনে হল, আলতাফ সত্যি সত্যি তার কোলে বসার জন্যে এগিয়ে আসতে পারে। প্রথম শ্রেণীর গাধারা করতে পারে না হেন কাজ নেই।

আলতাফ অবশ্যি মামার কোলে বসার চেষ্টা করল মা। ঘরের সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে মাথা চুলকাতে লাগল। তাকে দেখে মনে হতে পারে, ফ্যান কেন ঘুরে এই রহস্য নিয়ে সে এখন চিন্তিত।

বজলুর রহমান হুংকার দিয়ে বললেন, ঐ গাধা, ফ্যানের দিকে হা করে তাকিয়ে আছিস কেন? সিলিং ফ্যান আগে কখনো দেখিসনি? চোখ নামা।

আলতাফ চোখ নামাল।

যা আমার সামনে থেকে।

আলতাফ ঘর থেকে বের হয়ে এল। আসন্ন বিয়ের আনন্দে তাকে খুব উল্লসিত বলে মনে হল না। বজলুর রহমান শুকনো মুখে বসে রইলেন। তাঁর মনোকক্টের যথেষ্ট কারণ আছে। দুলারীর বিয়ে বলতে গেলে ঠিকই হয়ে আছে। ছেলের ফুপা ফুপু এসে মেয়ে দেখে হাতে আঙটি পরিয়ে গেছেন। অতি সস্তা ধরনের আঙটি। রঙ দেখে মনে হয় পেতলের। আঙটি সাইজেও ছোট। যাতায়াতি করে ঢুকাতে গিয়ে দুলারীর আঙুলের চামড়া উঠে গেল। হুলস্থূল ধরনের বড়লোকরা উপহারের ব্যাপারে হাড়-কেপ্পন হয়। ওরা হুলস্থূল ধরনের বড়লোক। ছেলের চেহারা ভাল। মাথায় অবশ্যি চুল নেই। এই বয়সে টাক পড়ে গেছে। এটা তেমন গুরুতর কোন সমস্যা না। ছেলেরা মাথার চুল দিয়ে কি করবে? এদের তো আর মাখায় বেণী করতে হবে না? তাছাড়া পয়সাওয়ালা লোকদেরই মাথায় টাক পড়ে। আজ পর্যন্ত তিনি মাথায় টাকওয়ালা কোন ভিক্ষুক দেখেননি। যারা ভিক্ষা করে বেড়ায় তাদের মাথাভর্তি ঘন চুল থাকে।

আলতাফ হারামজাদাটারও মাথাভর্তি ঘন চুল। একসময় সেও ভিক্ষুক-টিক্ষুক কিছু হবে। একে দয়া দেখানো ভুল হয়েছে। বিরাট ভুল হয়েছে। মিসটেক অব দি সেঞ্চুরি।

বজলুর রহমানের ধারণা তিনি ভুল করেন না! এই ভুল এখন ভেঙে গেছে। দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পুষেছেন। কালসাপকে বাড়ির ত্রিসীমানায় আসতে দেয়া উচিত ছিল না। তিনি শুধু যে আসতে দিয়েছেন তাই না, বলতে গেলে আদর করে ঘরে স্থান দিয়েছেন। তাও দিতেন না। গ্রহের ফেরে এই কাজটা করতে হয়েছে। ঘটনাটা এ রকম–বজলুর রহমানের ছোটবোন মিনুর ছেলে হল আলতাফ।

বজলুর রহমান মিনুকে পছন্দ করেন না। মিনুর স্বামী মোবারক হোসেনকে দু চোখে দেখতে পারেন না। মোবারক হোসেনের একটা ডিসপেনসারি আছে। সেই ডিসপেনসারিতে আয়-উন্নতি বলে কিছু নেই। কারণ ডিসপেনসারি খোলা এবং বন্ধ করার কোন নিয়ম-কানুন নেই। যখন ইচ্ছা হল মোবারক ডিসপেনসারি খুলে বসে আছে। যখন ইচ্ছা ডিসপেনসারি বন্ধ করে বাসায় চলে আসছে। ডিসপেনসারির বেশির ভাগ অষুধ নিজেই খেয়ে ফেলছে। এই হল অবস্থা। মিনু যখন অসুস্থ হল সে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল না। নিজেই চিকিৎসা করে। অষুধ যে বেচে সে নাকি ভাক্তারের বাবা।

ডাবল এ্যাকশান এন্টিবায়োটিক প্লাস উপবাস চিকিৎসাপদ্ধতি নামে তার নিজস্ব চিকিৎসাপদ্ধতি চলল। এই চিকিৎসাপদ্ধতিতে নিরম্বু উপবাসে থেকে এন্টিবায়োটিক খেতে হয়। এতে অষুধের অ্যাকশান না-কি ডাবল হয়ে যায়। শরীরে পুষ্টি না থাকলে–শরীরের জীবাণুদেরও পুষ্টি থাকে না। এরা আধমরা অবস্থায় থাকে–তখন কড়া এন্টিবায়োটিক পড়লে আর দেখতে হবে না।

মোবারক হোসেনের চিকিৎসাপদ্ধতির কারণেই মিনু আঠারোদিন জ্বরভোগের পর মারা গেল। মোবারক হোসেন আলতাফকে কোলে নিয়ে মৃত্যুসংবাদ দিতে এল।

বজলুর রহমান গম্ভীর মুখে মৃত্যুসংবাদ শুনলেন। দীর্ঘ সময় চুপচাপ থেকে বললেন, ডাক্তার শেষ পর্যন্ত দেখাওনি?

মোবারক হোসেন বললেন, ডাক্তার আর কি দেখব? ডাক্তাররা কি জানে?

ডাক্তাররা কিছু জানে না। তুমি সব জান?

আপনাদের দোয়ায় অষুধ নিয়ে ঘাটাঘাটি করে যা শিখেছি, ভালই শিখেছি।

এখন এই দুধের শিশু কে পালবে?

আলতাফের কথা বলছেন? তাকে নিয়ে মোটেই চিন্তা করবেন না। আমিই পালব। তা ছাড়া তাকে দুধের শিশু বলা ঠিক না। দুবছর হয়ে গেছে। কথা প্রায় সবই বুঝে। বলতে পারে না। পিরিচে ভাত মাছ দিলে কপ কপ করে খায়।

ও আচ্ছা।

মোবারক হোসেন অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে বলল, আলতাফ, ইনি তোমার মামা হন। বড় মামা। বল তো–মামা।

আলতাফ বলল, উ ঊ।

মোবারক হৃষ্টচিত্তে বলল, ও এইভাবেই কথা বলে। মামা বলতে বলেছি তো, কাজেই সে দুবার বলেছে উ-উ। কারণ মামা শব্দটায় দুটা অক্ষর। মা বলতে বললে একবার উ বলবে। কারণ মা হল এক অক্ষরের শব্দ।

বাবু বল তো মা।

আলতাফ বলল, ঊ।

মোবারক হোসেন আনন্দিত স্বরে বলল, দেখলেন ছেলের বুদ্ধি।

বজলুর রহমান থমথমে গলায় বললেন, গতকাল তোমার স্ত্রী মারা গেছে। আজ তুমি দাঁত বের করে হাসছ!

অন্য প্রসঙ্গে হাসছি। ছেলের বুদ্ধি দেখে হাসছি। সব বাবারাই ছেলেমেয়ের বুদ্ধির পৱিচয় পেলে খুশি হয়ে হাসে।

তোমার বুদ্ধিমান ছেলেকে নিয়ে তুমি বিদায় হয়ে যাও। আর কোনদিন যেন তোমাকে এ বাড়িতে না দেখি।

জ্বি আচ্ছা। কিছু খরচ-বরচ কি দিবেন?

কি খরচ?

হাত একেবারে খালি। গোর দিতে অনেক খরচপাতি–কাফনের কাপড়ই আপনার দশ গজ। মার্কিন লংক্লথ সস্তাটা হল নিন আপনের পঁচিশ, ..

দূর হও বললাম। দূর হও। ভকভক করে মুখ থেকে কিসের গন্ধ বেরুচ্ছে। মদ্য পান করেছ?

জ্বি না। মদ খাই না। একটু কাশির মত হয়েছিল দুবোতল কফ সিরাপ এক সাথে খেয়ে ফেলেছি। কফ সিরাপে কিছু এলকোহল থাকে। তবে খুব সামান্য।

বজলুর রহমান কঠিন গলায় বললেন, বিদায় হও। বিদায়।

মোবারক হোসেন বিদেয় হল।

বজুর রহমানের রাগ বেশিক্ষণ থাকে না। সেদিন সন্ধ্যাবেলাতেই মনে হল কাজটা ঠিক হয় নি কিছু পয়সা দিয়ে দেয়া উচিত ছিল। বড় ভাই হিসেবে তারও একটা দায়িত্ব আছে। অপ্রিয় হলেও দায়িত্ব পালন করতে হয়। সঙ্গে সঙ্গে এও মনে হল–এ জাতীয় লোকদের কোন সাহায্য করতে নেই। এদের সাহায্য করার অর্থই হচ্ছে এদের প্রশ্রয় দেয়া। টাকার অভাবে একজন মৃত মানুষের কবর হবে না এটাও বিশ্বাস্য নয়।

বজলুর রহমান রাত এগারোটার দিকে ঠিক করলেন–খোঁজ নিতে যাবেন। যাওয়া হল না। প্রচণ্ড ঝড় বৃষ্টি শুরু হল। বাসার সামনে একহাঁটু পানি জমে গেল। তিনি গেলেন পরদিন।

মোবারকের বাড়ির দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। অনেকক্ষণ ধাক্কাধাক্কি করার পর মোবারক দরজা খুলল। পুরোপুরি খুলল না, সামান্য ফাঁক করে ভীত গলায় বলল, কে?

বজলুর রহমান বললেন, আমি। দরজা খোল।

মোবারক দরজা খুলল। তার মুখ শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে কোন কারণে ভয় পেয়েছে। চোখ রক্তবর্ণ। ঠোঁটের পাশ দিয়ে কষ গড়াচ্ছে। তারচেয়ে বড় কথা হাত পা কাঁপছে। মৃত বাড়িতে অনেক লোকজন থাকার কথা। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী। একটা মানুষ নেই। তবে ভেতর থেকে বিজ-বিজ শব্দ আসছে।

বজলুর রহমান বললেন, শব্দ কিসের?

মোবারক হোসেন নিচু গলায় কি বলল এক বিন্দু বোঝা গেল না।

বজলুর রহমান বললেন, এ রকম করছ কেন?

ভেতরে এসে দেখেন।

কি দেখব?

বিরাট বিপদে পড়েছি।

বজলুর রহমান মোবারকের সঙ্গেই তার শোবার ঘরে ঢুকলেন। তাঁর হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। ঘরভর্তি তেলাপোকা। হাজার হাজার বললেও কম বলা হবে–লক্ষ লক্ষ পোকা। তাদের হাঁটা, পাখায়-পাখায় ঘসাঘসি থেকেই বিজবিজ শব্দ আসছে। পোকাদের মাঝখানে শান্তমুখে বসে আছে আলতাফ। তার চোখে ভয় বা বিস্ময় কিছুই নেই। সে বজলুর রহমানকে দেখে দুবার বলল, উ উ।

বজলুর রহমান বললেন, ব্যাপারটা কি?

মোবারক ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, তেলাপোকা।

তেলাপোকা সে তো দেখতেই পাচ্ছি। কোত্থেকে এল এত তেলাপোকা?

জানি না।

অন্য ঘরেও আছে, না শুধু এই ঘরে?

এই ঘরে। মিনুর ডেডবডি এই ঘরে ছিল। তেলাপোকায় খেয়ে ফেলেছে।

তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?

জ্বি না মাথা খারাপ হয় নাই। সত্যি কথা বলতেছি। আপনার কাছে টাকার জন্য গিয়েছিলাম। না পেয়ে মনটা খুব খারাপ হল।

বাবুকে ঘরে রেখে আবার বের হলাম টাকার সন্ধানে।

তাকে তুমি খালি বাড়িতে রেখে গেলে?

জ্বি। ভেবেছিলাম তাড়াতাড়ি ফিরে আসব। ঝড়-বৃষ্টিতে আটকা পড়ে গেলাম। ফিরে দেখি এই অবস্থা।

তুমি একটা দুধের শিশুকে খালি বাড়িতে একটা ডেডবডির পাশে বসিয়ে চলে গেলে!

জি। না গিয়ে তো উপায় ছিল না। হাতে নাই একটা পয়সা।

একটা মানুষ মারা গেছে–কোন লোকজন নাই। এইটাই বা কেমন কথা?

কাউকে বলি নাই তো।

বল নাই কেন?

কি দরকার। বললেই লোকজন এসে গিজগিজ করবে। হেন কথা তেন কথা বলবে। দরকার কি?

তোমার মাথা পুরোপুরি খারাপ।

জি না ভাই সাহেব। মাথা ঠিক আছে।

আমি এই ছেলেকে সাথে নিয়ে যাচ্ছি। কয়েকদিন থাক আমার এখানে। তুমি অবস্থা ঠিকঠাক করে তারপর নিয়ে যাবে।

জ্বি আচ্ছা।

আর এই নাও এক হাজার টাকা।

আপনাকে এক সপ্তাহের মধ্যে ফিরত দিয়ে দিব।

ফিরত দিতে হবে না।

আমি ফিরত দিয়ে দিব। এক সপ্তাহের মধ্যে ফিরত দিব।

মোবারক হোসেন এক সপ্তাহের মধ্যে টাকা ফিরত দিতে এল না। বরং আরো টাকা ধার করতে এল। সে ন-কি ভয়াবহ ঝামেলায় পড়েছে। পুলিশের ধারণা, সে তার স্ত্রীকে খুন করেছে। তারপর রটিয়েছে তেলাপোকা খেয়ে ফেলেছে।

মোবারক কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, পুলিশ বড় যন্ত্রণা করতেছে ভাইসব। শুধু টাকা চায়।

খুন করেন না কি?

জ্বি না, আমি খুন করব কেন?

তোমার চোখ-মুখ দেখে তো মনে হয় করেছ?

জ্বি-না। তবে পুলিশের ধারণা, করেছি। ৩০২ ধারায় কেইস দিবে বলে মনে হয়। আপনি একটু আমার হয়ে সাক্ষ্য দিবেন।

বজলুর রহমান আঁৎকে উঠে বললেন, আমি আবার কি সাক্ষ্য দিব?

তেলাপোকা যে খেয়ে ফেলেছে এইটা একটু বলবেন। আপনি তো নিজের চোখে তেলাপোকা দেখেছেন।

আমি কিছুই দেখি নাই। টাকা দিতেছি, টাকা নিয়ে যাও। আমি যেন কোন ঝামেলায় না পড়ি।

জ্বি আচ্ছা।

আর শোন, তোমার ছেলে নিয়ে যাও।

জি, নিয়ে যাব। আজকেই নিয়ে যেতাম, আজ আবার এখান থেকে রমনা থানায় যাব। টাকা আপনার কাছ থেকে যা পাব সবটা পুলিশকে দিয়ে দিব। কাল পরশু এসে নিয়ে যাব।

মোবারক আর ফিরে আসেনি। পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে। মামলা চলাকালিন সময়ে সে মারা গেছে জেল হাজতে। আলতাফ থেকে গেছে এই বাড়িতে। তার আত্মীয়স্বজন কেউ তাকে নিতে আসেনি। মনে হয় সবাই হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে।

.

০২.

বারই চৈত্র রোববার আজিমপুর কম্যুনিটি সেন্টারে বিয়ে হয়ে গেল।

আলতাফ আগে থাকতো রান্নাঘরের পাশে খুপড়ি মত জানালাবিহীন একটা ঘরে। বিয়ের পর সে উঠে গেল দোতলায় দুলারীর ঘরে! তার জীবনযাত্রায় পরিবর্তন বলতে এইটুকুই। তবে স্ত্রীর ভাগ্যের কারণেই হোক কিংবা অন্য যে কোন কারণেই হোক সে একটি চাকরি পেয়ে গেল। ভাল চাকরি, সিটি ব্যাঙ্কের অ্যাসিসটেন্ট কেশিয়ার। বেতন তিন হাজার টাকা, মেডিকেল আছে, যাতায়াতের এলাউন্স আছে।

বজলুর রহমান বললেন, এই গাধাকে যে চাকরি দিয়েছে সে আরো বড় গাধা, রামগাধা। তাকে ঘাড় ধরে দেশ থেকে বের করে দেয়া উচিত।

মনোয়ারা বললেন, এত ঘন ঘন গাধা বলো না তো। দুলারী মনে কষ্ট পাবে!

কষ্ট পেলে পাবে, গাধাকে গাধা বলব না তো কি বলব? ক্যাঙ্গারু বলব?

কিছুই বলতে হবে না, মেয়ের জামাই চাকরি পেয়েছে–এ তো ভাল কথা। বেচারা নিজের চেষ্টায় জোগাড় করেছে। মন্ত্রী-মিনিস্টার ধরাধরি করতে হয়নি। কত আনন্দের ব্যাপার।

আনন্দ দুদিন পর টের পাবে। টাকাপয়সার গণ্ডগোলের জন্যে বাবাজীকে যখন জেলে নিয়ে ঢুকাবে তখন বুঝবে আনন্দ কাহাকে বলে। কয়েকটা দিন সবুর কর, এক সপ্তাহ, এর মধ্যেই রেজাল্ট আউট হয়ে যাবে। এক সপ্তার বেশি যদি গাধাটাকে কেউ চাকরিতে রাখে, আমি নিজের কান কেটে কুত্তার লেজে সূতা দিয়ে বেঁধে দেব।

মাসখানিক কেটে গেল, চাকরি যাওয়ার কোন লক্ষণ দেখা গেল না। সকাল আটটায় টিফিন বক্সে টিফিন নিয়ে আলতাফ রওনা হয়। আলতাফের সঙ্গে যায় দূলারী। সে তাকে বাসস্টপ পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসে। দুলারীর হাতে থাকে একটা চটের ব্যাগ। সেই ব্যাগে থাকে একটা পানির বোতল, ছোট্ট ফ্লাস্কে এক কাপ গরম দূধ এবং এক কৌটা পানের মশলা।

দুলারীর কাণ্ড কারখানায় বজলুর রহমান বড়ই বিরক্ত। মনোয়ারাকে একদিন ডেকে বলে দিলেন, দুলারী সঙ্গে যায় কেন? গাধাটা কি বাসস্টপ চেনে না? দুলারীকে নিষেধ করে দেবে। বাড়াবাড়ি আমি পছন্দ করি না। ঢং বেশি হয়ে যাচ্ছে।

মনোয়ার নিষেধ করেছেন। আদুরে গলায় বললেন, কি দরকার রোজ রোজ সাথে যাওয়ার? তোর বাবা রাগ করে।

দুলারী হাই তুলতে তুলতে বলেছে, করুক রাগ।

বাড়াবাড়ি বেশি হচ্ছে।

মোটেই বেশি হচ্ছে না। তুমি তা ভাল করেই জান।

বাড়াবাড়ি বেশি হচ্ছে না এটা অবশ্যি সত্যি। স্বামীকে নিয়ে ঢলাঢলি, ছাদে হাঁটাহাটি, অকারণ হাসাহাসি এইসব কিছুই হচ্ছে না। সন্ধ্যা না হতেই দরজা বন্ধ করে এরা গুজগুজ করে গল্পও করে না। খুব অন্যায় জেনেও তিনি কয়েকবার আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে দেখেছেন। আলতাফ চেয়ারে ঝিম ধরে বসে থাকে। দুলারী নিজের কাজ করে। যেন কেউ কাউকে চেনে না। বজলুর রহমান সব শুনে বলেছেন, ঝিম ধরে বসে থাকে না, ঘুমায়। চতুষ্পদ জন্তুরা ঘুমায় দাঁড়িয়ে। ও ঘুমায় বসে। এইটুকুই যা তফাৎ। আর কোন তফাৎ নেই। মনোয়ারা একদিন কথায় কথায় দুলারীকে জিজ্ঞেসও করে ফেললেন, আলতাফ কি চেয়ারে বসে বসে ঘুমায় নাকি রে?

দুলারী বিরক্ত হয়ে বলেছে, চেয়ারে বসে ঘুমুবে কেন? এইসব কি আজেবাজে কথা বল?

প্রায়ই দেখি চোখ বন্ধ করে চেয়ারে বসে থাকে।

তাতে অসুবিধা কি?

না, অসুবিধা আর কি। দেখতে খারাপ লাগে।

তোমাকে দেখতে বলেছে কে?

তুই এমন ক্যাট ক্যাট করছিস কেন? আমি একটা কথার কথা বললাম।

ওকে নিয়ে তোমরা সারাক্ষণ সমালোচনা কর আমার ভাল লাগে না। বেচারা কারো সাতে নেই পাঁচে নেই, চুপচাপ থাকে, আর তোমরা …

কি যন্ত্রণা! কেঁদে ফেলছিস কেন? আমরা কি এমন বললাম?

বাবা তো তাকে সারাক্ষণই গাধা বলছে। চুপচাপ থাকলেই মানুষ গাধা হয়ে যায়? চুপচাপ থাকাটা কি অপরাধ?

অপরাধ হবে কেন? একেবারে ঝিম ধরে থাকে তো, তাই…

মোটেই ঝিম ধরে থাকে না, বসে বসে ভাবে।

কি ভাবে?

নানান কিছু নিয়ে ভাবে, তোমরা বুঝবে না। ও পোকাদের নিয়ে ভাবে।

পোকাদের নিয়ে ভাবে!

হ্যাঁ। পোকা-মাকড় এইসব নিয়ে ভাবে।

মনোয়ারা শুকনো গলায় বললেন, পোকা-মাকড়দের নিয়ে ভাবা তো ভাল কথা। শুনে খুব আনন্দ হচ্ছে।

তুমি আবার বাবাকে এসব বলতে যেও না। বাবা কি বুঝতে কি বুঝবে। বাবা তো আবার সবকিছু বেশি বুঝে।

আরে না, তোর বাবাকে সব কথা বলার দরকার কি? পুরুষ মানুষকে সব কথা বলতে নেই, এতে সংসারের শান্তি নষ্ট হয়। তা ইয়ে, আলতাফ কি দিনরাত পোকাদের নিয়েই ভাবে?

দুলারী বিরক্ত গলায় বলল, দিনরাত পোকাদের নিয়ে ভাববে কেন? ওর কি আর কাজকর্ম নেই? মাঝেমধ্যে ভাবে। তুমি আবার বাবাকে কিছু বলতে যেও না।

পাগল হয়েছিস, তাঁকে বলার দরকার কি?

মনোয়ারা সেই রাতেই স্বামীকে ফিসফিস করে পোকার ব্যাপারটা বললেন।

বজলুর রহমান বললেন, আরে, গাধাটার তো ব্রেইন ডিফেক্ট হয়ে গেছে। পোকা নিয়ে ভাবে মানে? পোকা নিয়ে ভাবার কি আছে? গাধাটাকে ডাক।

থাক, ভাকতে হবে না।

অবশ্যই ডাকতে হবে। অবহেলা করার ব্যাপার এটা না।

পরে একসময় ওকে আলাদা করে ডেকে … মানে দুলারী যাতে কিছু বুঝতে পারে।

বজলুর রহমান বিরক্ত গলায় বললেন, কোন রকম আর্গুমেন্টে যাবে না। আই হেট আর্গুমেন্ট। তুমি গাধাটাকে ডেকে আন। আজই এর ফয়সালা হওয়া উচিত। পোকাদের নিয়ে ভাবে, পোকাদের রবীন্দ্রনাথ হয়েছে। হারামজাদা!

মনোয়ারা ডাকতে গেলেন। দুলারী বলল, এই রাতদুপুরে বাবা ডাকছে কেন?

মনোয়ারা ক্ষীণ গলায় বললেন, ঐ অফিসে কাজকর্ম কেমন হচ্ছে তাই জিজ্ঞেস করবে।

তুমি পোকার ব্যাপার বাবাকে কিছু বলনি তো?

না।

আলতাফ মামার ঘরে ঢুকে ভয়ে ভয়ে বলল, মামা ডেকেছেন?

বজলুর রহমান বললেন, বোস। মামা ভাকবি না, খবর্দার।

কি ডাকব?

কিছুই ডাকতে হবে না। ডাকাডাকির পালা শেষ।

আলতাফ বসল। বজলুর রহমান গলা খাকাড়ি দিয়ে বললেন, তুই নাকি পোকাদের নিয়ে ভাবিস?

জ্বি মামা?

কি ভাবিস?

তেমন কিছু না, মামা। ওদের সঙ্গে কথা টথা বলি, ওরা যখন চুপ করে থাকে তখন ভাবি।

বজলুর রহমান হতভম্ব হয়ে বললেন, ওদের সঙ্গে কথা বলিস?

জ্বি মামা।

কবে থেকে কথা বলাবলি শুরু হয়েছে?

যখন আপনার এখানে আসলাম তখন থেকে।

আমার এখানে এসেছিস দুবছর বয়সে, তখন থেকে পোকাদের সঙ্গে তোর দোস্তি?

দোস্তি না মামা। ওরা যে আমাকে ঠিক পছন্দ করে তা না। সবাই আমাকে ভয় পায়। ভয়ের কারণে কিছু কিছু কথা শুনে।

পোকারা তাহলে তোর ভয়ে কম্পমান?

আলতাফ হা-সূচক মাথা নাড়ল। বজলুর রহমান মনে মনে বললেন, গাধাটার তো আসলেই ব্রেইন ডিফেক্ট হয়ে গেছে। ব্রেইনে ইলেকট্রিক শক দিতে হবে। তিনি স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ঘটনা শুনছ তো? পোকারা আমাদের আলতাফকে হেড মাস্টার সাহেবের মত ভয় পায়। আলতাফের ভয়ে তারা থরথরি কম্পমান।

আপনি যত বলছেন ওরা তত ভয় পায় না মামা। কিছুটা ভয় পায়।

ভয়ের চোটে ওরা কি করে? তোকে দেখলেই স্লামালিকুম দেয়?

তা না, তবে ডাকলে আসে।

বজলুর রহমান স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, শুনলে তো, আলতাফ ডাকলেই পোকারা যে যেখানে থাকে ছুটে আসে। মনোয়ারা অস্বস্তির সঙ্গে বললেন, আরেকদিন এইসব নিয়ে কথা হবে। আজ রাত অনেক হয়েছে। তিনি হাই তোলার ভঙ্গি করলেন।

বজলুর রহমান বললেন, রাত যতই হোক ব্যাপারটার ফয়সালা হওয়া দরকার। আলতাফ, দেখি তুই তোর এক পোকা ডেকে আন।

একটা তেলাপোকা ডেকে আনব মামা?

ডাক, তেলাপোকাই ডাক। তেলাপোকাই বা খারাপ কি?

আলতাফ চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উড়তে উড়তে ঘরে একটা তেলাপোকা ঢুকল। বসল সিলিং ফ্যানের পাখায়।

আলতাফ বলল, এই, নিচে নাম।

পোকা নিচে নামল। বসল মেঝেতে। আলতাফ বলল, শুঁড় দুটা নাড় তো।

তেলাপোকা শুঁড় নাড়াতে লাগল। বজলুর রহমান নিজের অজান্তেই আয়াতুল কুরসি সুরাটা মনে মনে পড়ে ফেললেন।

আলতাফ বলল, মামা, একে কি চলে যেতে বলব?

বল।

আলতাফ বলল, চলে যা।

পোকা গেল না। শুঁড় নাড়তে লাগল। একবার পাখা তুলে উড়ার ভঙ্গি করল। আবার পাখা নামিয়ে ফেলল।

মনোয়ারা বললেন, কই, যাচ্ছে না তো।

যেতে চাচ্ছে না মামী। এরা সবসময় কথা শুনে না।

তেলাপোকা চক্রাকারে ঘুরছে। আলতাফ বলল, এই, ঘোরা বন্ধ কর।

ঘোরা থেমে গেল।

যা, চলে যা।

পোকা নড়ল না। স্থির হয়ে গেল।

বজলুর রহমান গম্ভীর গলায় বললেন, যেতে না চাইলে কি আর করা! আলতাফ বলল, মামা, আমি যাই? ঘুম পাচ্ছে।

বজলুর রহমান গম্ভীর গলায় বললেন, যা।

আলতাফ উঠে চলে গেল। বজলুর রহমান এবং মনোয়ারা দুজনের কেউই অনেকক্ষণ কোন কথা বললেন না। চুপচাপ বসে রইলেন। মনোয়ারা প্রথম নীরবতা ভংগ করলেন। ফিসফিস করে বললেন, এটা কি হল?

বজলুর রহমান রাগী গলায় বললেন, কিসের কথা বলছ?

পোকা তো সত্যি সত্যি ওর কথা শুনে।

কোন কথাটা শুনেছে?

ওর কথা শুনে পোকা ঘরে এসেছে।

তোমারও কি মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি? পোকা কথা শুনবে মানে? কাকতালীয়ভাবে একটা তেলাপোকা ঘরে এসেছে। এই হল ব্যাপার। ঝড়ে বক মরে গেছে, আর ফকির সাহেব বললেন, দেখলি, দোয়া কুনুত পড়ে ফুঁ দিলাম আর বক মরে পড়ে গেল। ব্যাপার এর বেশি কিছু না।

শুঁড় মাড়িতে বলল, শুঁড় নাড়ল।

কি যন্ত্রণা! পোকা শুঁড় নাড়ে না? কুকুর যেমন লেজ নাড়ে পোকা নাড়ে শুঁড়। ওদের কাজই হল শুঁড় নাড়া।

আমার ভয়-ভয় লাগছে।

ফালতু কথা বলবে না। ভয়ের এর মধ্যে কি আছে?

বজলুর রহমান ঘুমুতে গেলেন। তাঁর ভাল ঘুম হল না। রাতে কয়েকবার উঠলেন। পানি খেলেন, বাথরুমে গেলেন। যতবারই বাথরুমে গেলেন ততবারই লক্ষ্য করলেন–তেলাপোকাটা যায়নি। মেঝেতে ঘুরঘুর করছে। অবশ্যি এটা আগের পোকা নাও হতে পারে। হয়তো অন্য একটা। চায়নিজদের মত সব তেলাপোকাও দেখতে একরকম। একটার সঙ্গে অন্য একটা আলাদা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব না। তাঁর মনে হল পোকাটী তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। শুধু যে তাকিয়ে আছে তাই না, ঘাড় ঘুরিয়ে তাঁকে দেখার চেষ্টা করছে। তিনি পোকাটার গায়ে থু করে থুথু ছিটিয়ে দিলেন, তারপরেও সেটা নড়ল না বরং তাঁর দিকে খানিকটা এগিয়ে এল। এ কি যন্ত্রণা! তিনি বললেন, যা হারামজাদা।

পোকাটা থমকে গেল। এখন আবার শুড় নাড়ছে।

শুঁড় নাড়া বন্ধ কর হারামীর বাচ্চা।

পোকাটা শুঁড় নাড়া বন্ধ করল। বজলুর রহমান এক দৃষ্টিতে পোকাটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

.

০৩.

আজ অসহ্য গরম। বিকেলে এক পশলা বৃষ্টি হয়েছিল, এতে গরম আরো বেড়েছে। এই গরমেও আলতাফের ঘরের দুটি জানালাই বন্ধ। শুধু যে বন্ধ তাই না, পর্দাও টেনে দেয়া। জানালা খোলা রেখে আলতাফ ঘুমুতে পারে না। ঘরে আলো থাকলেও সে ঘুমুতে পারে না। আলতাফের অভ্যাসে দুলারী অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে, এখন আর তার খারাপ লাগে না। এই ঘরের সঙ্গে এটাচড বাথরুম আছে। বাথরুমও অন্ধকার। চল্লিশ পাওয়ারের একটা বাস্তু ছিল, আলতাফ সেই বাল্ব খুলে রেখেছে। অন্ধকারে আলতাফের অসুবিধা হয় না, তবে দূলারীর হয়। সে একটা টর্চলাইট নিয়ে বাথরুমে মায়।

আজকের অন্ধকার অন্য রাতের চেয়েও বেশি, কারণ বাসার সামনে স্ট্রীট ল্যাম্পের বাল্ব আবার চুরি হয়েছে। অন্ধকার বাথরুমে আলতাফ হাত-মুখ ধুচ্ছে। দূলারী খাটের উপর মশারি খাটাচ্ছে। আন্দাজের উপর খাটাচ্ছে, কিছুই দেখা যাচ্ছে না। দুলারী বলল, আজ খুব গরম।

আলতাফ বলল, হুঁ।

একটা জানালা খুলে দেই?

না।

মশারীর ভেতর ফ্যানের বাতাস ঢুকে না। গরম লাগে।

মশারি খাটিও না।

মশারি না খাটালে উপায় আছে? মশা খেয়ে ফেলবে না?

মশা খাবে না, ওদের না করে দেব।

আলতাফের কথায় অন্য কেউ চমকে উঠতো, দুলারী চমকাল না, এরকম কথা সে প্রায়ই শুনে। দুলারী মশারি খুলে ফেলল। আলতাফ তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বাথরুম থেকে বেরুল। দুলারী বলল, বাবা তোমাকে কেন ডেকেছিলেন?

পোকাদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন।

তুমি বলেছ?

হুঁ।

কেন বলেছ?

মামা জানতে চাইলেন তাই বললাম। না বলার কি আছে?

বাবা কি তোমার কথা বিশ্বাস করেছেন?

বিশ্বাস করবেন না কেন?

আমার মনে হয় না বাবা তোমার কথা বিশ্বাস করেছেন। তোমাকে নিয়ে এখন নিশ্চয়ই মার সঙ্গে হাসাহাসি করছেন। সাধারণ কিছু বললেই বাবা হাসাহাসি করেন, আর এখন বলছ অদ্ভুত কথা।

মামা আমাকে স্নেহ করেন। তা ছাড়া অদ্ভুত কথা তো কিছু বলি নাই।

বাবা তোমাকে মোটেই স্নেহ করেন না। সারাক্ষণ গাধা ডাকেন।

আলতাফ হাই তুলতে তুলতে বলল, ঘুম পাচ্ছে, চল শুয়ে পড়ি।

দুলারী বলল, তুমি আমার একটা কথা শোন। এইসব কথা তুমি কাউকে বলবে না। কাউকে কিছু বলার দরকার নেই।

আলতাফ বিছানায় উঠতে উঠতে বলল, আমি নিজ থেকে বলি না, মামা জিজ্ঞেস করলেন,..

জিজ্ঞেস করলেও কিছু বলবে না। তোমাকে নিয়ে কেউ হাসাহাসি করলে আমার ভাল লাগে না। রাগ লাগে, কান্না পায়।

আলতাফ পাশ ফিরতে ফিরতে সহজ গলায় বলল, পোকাগুলি তো সারাক্ষণ হাসাহাসি করে।

করুক। ওদের হাসি তো আর কেউ বুঝতে পারছে না।

আলতাফ কিছু বলল না। ঘর নিচ্ছিদ্র অন্ধকার। দুলারী বলল, ঘুমিয়ে পড়েছ?

আলতাফ জবাব দিল না। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এসেছে। হাত-পা লম্বালম্বি ছড়ানো। মনে হচ্ছে তালগাছের একটা লম্বা গুঁড়ি। এই এক ঘুমেই সে রাত কাবার করে দেবে। সকালে দূলারী জেগে ওঠে দেখবে–আলতাফ একই ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। দুলারী ছোট করে নিঃশ্বাস ফেলল। তার আরো কিছুক্ষণ গল্প করার ইচ্ছা ছিল।

মাথার উপর ফ্যান ঘুরছে, তবু গরম কমছে না, গরমে মাথা ধরে যাচ্ছে। মশা কামড়াচ্ছে। মশারা এখন আর আলতাফের কথা শুনছে না। দুলারী মনে মনে হাসল। মানুষটা কি অদ্ভুত বিশ্বাস নিয়েই-না আছে–পোকারা তার কথা শুনে। অবশ্যি এরকম বিশ্বাস থাকা দোষের কিছু না। তার এই বিশ্বাসে তো কারো কোন ক্ষতি হচ্ছে না। আলতাফের চেয়েও কত ভয়ংকর সব বিশ্বাস নিয়ে পৃথিবীতে লোকজন বাস করে। নিজের প্রস্রাব নিজেই গ্লাসে করে খেলে ফেলছে–এতে নাকি শরীর রোগহীন হয়। আরেকবার দুলারী পত্রিকায় পড়েছে, শিকাগোতে এক লোক আট বছর বয়েসী একটা মেয়েকে খুন করে তার জরায়ু বের করে খেয়ে ফেলেছে। এতে নাকি যৌবন অক্ষয় হয়। এদের তুলনায় আলতাফের বিশ্বাস তো খুব সাধারণ। তাছাড়া কে জানে আলতাফ হয়তো পোকাদের কথা বুঝতেও পারে। অসম্ভব কিছু না। সোলায়মান পয়গম্বর পৃথিবীর সব পশু-পাখিদের কথা বুঝতেন।

দুলারী পাশ ফিরলো। মশা খুব কামড়াচ্ছে। টেবিলের উপর একটিন মর্টিন আছে। স্প্রে করে ঘরে ছড়িয়ে না দিলে মশারা তাকে ঘুমুতে দেবে না। দুলারী সাবধানে বিছানা থেকে নামল। টেবিলটা কোন দিকে দুলারী বুঝতে পারছে না। অন্ধকার হলেই মানুষ দিকহারা হয়ে পড়ে। পশ্চিমকে মনে হয় উত্তর, উত্তরকে মনে হয় দক্ষিণ।

দুলারী অষুধ স্প্রে করে দিল। ঘরে এখন হাসপাতাল হাসপাতাল গন্ধ। নাক জ্বালা করছে। মশার কামড়ের চেয়ে নাক জ্বালা বরং ভাল। দুলারী বিছানায় ফিরে এলো। আলতাফ অস্ফুট শব্দ করল। বিড়বিড় বিড়বিড় করে কি যেন বলে যাচ্ছে। দুলারী বলল, কি বলছ? আলতাফ লল, হুঁ।

ঘুমুচ্ছ?

হুঁ।

মশার অষুধ দিয়েছি। তোমার খারাপ লাগছে না তো?

হুঁ।

আজ একেবারে গায়ে ফোসকা পড়ে যাবার মত গরম পড়েছে।

হুঁ।

ইচ্ছে করছে গায়ের সব কাপড় খুলে ফেলতে।

হুঁ।

দুলারী জানে এই হুঁ অর্থহীন। যাই জিজ্ঞেস করা হোক আলতাফ বলবে–হুঁ। ঘুমের মধ্যেই বলে যাবে। দুলারীর ঘুম আসছে না। একা জেগে থাকা বেশ কষ্টের। জেগে থাকলেই কথা বলতে ইচ্ছা করে। ঘুমন্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলার কোন মানে হয় না, তবে আলতাফ ঘুমের মধ্যেই হুঁ হুঁ করে, এও মন্দ না।

এই শোন।

হুঁ।

অফিসে তোমার কাজকর্ম কেমন হচ্ছে?

হুঁ।

কেউ আবার ভাবছে না তো তুমি পাগল কিংবা বোকা?

হুঁ।

আমি একদিন তোমাদের অফিসে যাব। তোমাকে জানিয়ে যাব না, না জানিয়ে যাব। চুপি চুপি যাব। বোরকা পরে যাব যাতে তুমি চিনতে না পার। নিজের চোখে দেখে আসব তুমি কি কর।

হুঁ।

তোমাদের অফিসে ক্যানটিন আছে? থাকলে ক্যানটিনে চা খাব।

গরম যেন আরো বাড়ছে। গা বেয়ে ঘাম ঝরছে। দুলারীর মনে হল, গায়ের কাপড় খুলে ফেললে কেমন হয়? অন্ধকারে কে আর দেখতে আসছে? আলতাফ যে জেগে উঠবে তাও না। আর জাগলেও বাতি জ্বালবে না। দূলারী তার গায়ের সব কাপড় খুলে ফেলল। এখন একটু আরাম লাগছে। গায়ে বাতাস লাগছে। আবার নিজেকে কেমন জানি পোকাপোকা লাগছে। পোকাদের গায়ে কোন কাপড় থাকে না। আলতাফ বিড়বিড় করেই যাচ্ছে। কি বলছে সে? দুলারী শোনার চেষ্টা করছে। অর্থহীন সব শব্দ–কিছু খিচ ঝিঝ ঝিঝ। পোকারা কি এমন শব্দ করে? দুলারী আলতাফের গায়ে হাত রাখল। কি ঠাণ্ডা শরীর।

এই শুনছ? শুনছ?

হুঁ।

পানি খাবে?

খাব।

তোমার ঘুম ভেঙেছে?

ভেঙেছে।

আলতাফ উঠে বসল। বিস্মিত গলায় বলল, তুমি নেংটো হয়ে শুয়ে আছ

ঘর অন্ধকার, আলোর সামান্যতম ইশারাও নেই। এর মধ্যে মানুষটা বুঝলো কি করে তার গায়ে কাপড় নেই? দুলারী অস্বস্তির সঙ্গে বলল, বড় গরম!

আলতাফ বলল, ও আচ্ছা। দুলারী অন্ধকারেই হাতড়ে হাতড়ে পানির বোতল এবং গ্লাস নিয়ে এল। আলতাফ এক চুমুকে পানি শেষ করেই আবার শুয়ে পড়ল, এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেল। সে তলিয়ে গেল গভীর ঘুমে।

দুলারীর শরীর জ্বালা করছে। বুক ধক ধ্বক করছে। সে আবারো ডাকল, এই, এই। আলতাফ বলল, কি?

ঘুমিয়ে পড়েছিলে নাকি?

হুঁ।

এখনো কি ঘুমুচ্ছ? তুমি তো আবার ঘুমের মধ্যেও হুঁ হুঁ কর।

না ঘুমাচ্ছি না।

দুলারী ক্ষীণ স্বরে বলল, তোমার সঙ্গে গল্প করতে ইচ্ছা করছে।

গল্প কর।

তুমি একটা গল্প বল। আমি শুনি।

আলতাফ বলল, আমি তো গল্প জানি না।

সত্যি জান না?

না।

তাহলে কথা বল। যা ইচ্ছা বল। তোমার কথা শুনতে ভাল লাগে।

আলতাফ পাশ ফিরতে ফিরতে বলল, আমার কথা বলতে ভাল লাগে না। তুমি বল আমি শুনি।

দূলারী আলতাফের গায়ে হাত রাখতে রাখতে বলল, আমাকে বিয়ে করে তুমি কি খুশি হয়েছ?

খুশি-অখুশির কি আছে?

তুমি আমাকে ভালবাস না?

আলতাফ ক্লান্ত গলায় বলল, ভালবাসাবাসির এখানে কি আছে? পোকারা ব্যবস্থা করে দিয়েছে বলে তুমি আমাকে বিয়ে করেছ।

পোকারা ব্যবস্থা করে দিয়েছে?

হ্যাঁ। ওরা তোমার মাথাটা গণ্ডগোল করে রেখেছে বলেই তুমি সারাক্ষণ আমার জন্য পাগল হয়ে থাক।

এইসব তুমি কি বলছ?

আলতাফ হাই তুলতে তুলতে বলল, এতদিন আমি তোমাদের এখানে আছি, কখনো তো আমার জন্য তোমার টান ছিল না। হঠাৎ বিয়ের জন্যে পাগল হয়ে গেলে। পোকারা তোমাকে পাগল বানিয়ে দিল। এরা এইসব পারে।

দুলারী রাগী গলায় বলল, পোকারা এটা করল কেন?

পোকারা করল কারণ ওরা আমাকে খুব পছন্দ করে। ওরা বোধহয় ভেবে বের করেছে–তোমাকে বিয়ে করলেই আমার ভাল হবে। ওরা আমার ভাল দেখেছে।

তোমার পোকা মাকড়ের ব্যাপার আমি মোটেই বিশ্বাস করি না।

আচ্ছা।

এ ধরনের গাঁজাখুরি গল্প আমার সঙ্গে কখনো করবে না।

আচ্ছা।

তুমি ঘুমাতে চাইলে ঘুমাও, আর কথা বলতে ইচ্ছা করছে না।

আচ্ছা।

আলতাফ পাশ ফিরল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ল। বাকি রাতটা দুলারী কাটালো নির্ঘুম। নানান অদ্ভুত চিন্তাভাবনা তার মাথায় আসতে লাগল। যেন সে একটা পোকা হয়ে গেছে। খুব সুন্দর একটা পোকা। অনেকেই তাকে দেখতে আসছে। আলতাফও এল! সে মুগ্ধ গলায় কলল, বাহ কি সুন্দর! কি সুন্দর! এই, তোমরা একটা ক্যামেরা নিয়ে আস। আমি দুলারীর একটা ছবি তুলে রাখি।

আলতাফ ছবি তুলছে। কি অদ্ভুত কাণ্ড–আলতাফও একটা পোকা হয়ে গেছে! দুলারী বলল, এই, শোন শোন। আলতাফ পোকাদের ভাষায় বলল, খিছ খিছ খিছ। দুলারী এর মানে বুঝতে পারল। এর মানে হল–দুলারী, হাসিমুখে তাকাও। আমি ছবি তুলছি। ছবি তোলার সময় কেউ এমন গম্ভীর হয়ে থাকে?

পোকাদের ভাষার এই হল মজা। মাত্র তিনটা শব্দ—খিছ খিছ খিছ। অথচ কত কিছু বোঝা যাচ্ছে।

.

০৪.

বজলুর রহমান সাধারণত ফজর ওয়াক্তে জেগে উঠেন। নামাজ পড়ে মর্নিং ওয়াকে যান। ঘণ্টাখানিক হাঁটাহাটি করে নাশতা খান। এই রুটিনের নড়চড় খুব একটা হয় না। আজ হল। গত রাতে বলতে গেলে ঘুম একেবারেই হয়নি। শেষ রাতের দিকে চোখ একটু ধরে এসেছিল, ওম্নি বিশ্রী বিশ্রী স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন। স্বপ্নে একটা ধবধবে সাদা রঙের তেলাপোকা এসে তাঁকে ইংরেজিতে বলল, How are you Mr, B, Rahumari? তিনি বাংলায় বললেন, যা, ভাগ। তেলাপোকা বিস্মিত হয়ে বলল (এবার হিন্দীতে), কিয়া তুম আংরেজি নেহি জানতে?

আতঙ্কেই বজলুর রহমানের ঘুম ভেঙে গেল। রাতটা বিছানায় বসে বসেই কাটিয়ে দিলেন।

এখন সকাল ন’টা। তিনি নাশতা খেতে খাবার ঘরে এসেছেন। তাঁর মাথা ভার ভার হয়ে আছে। চোখ জ্বালা করছে। তিনি লক্ষ করলেন, রুটি গলা দিয়ে নামছে না। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। এক টুকরা রুটি মুখে নিয়ে অনেকক্ষণ চিবানোর পর পানি দিয়ে গিলে ফেলতে হচ্ছে। একরাত ঘুম না হওয়ার এত সমস্যা? তিনি বিরক্তমুখে ডাকলেন, মনোয়ারা।

কি?

যদি খুব কষ্ট না হয় তাহলে কাছে এসে একটু শুনে যাও?

মনোয়ারা দ্রুত উঠে এলেন। কুণ্ঠিত গলায় বললেন, কাঁচা আমের আচার বানাচ্ছি। দুলারী কদিন থেকে বলছে। কি জন্যে ডেকেছ?

বজলুর রহমান স্ত্রীকে কি জন্যে ডেকেছেন মনে করতে পারলেন না, তবে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হলেন। কারণ তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে তার রাতের ঘুমের কোন অসুবিধা হয়নি। গত রাতে কি ঘটেছে না ঘটেছে তাও বোধহয় মনে নেই।

রাতে ঘুম হয়েছিল?

যা গরম! ঘুম কি আসে?

দেখে তো মনে হয় মরার মত ঘুমিয়েছ।

মনোয়ারা হকচকিয়ে গেলেন। মনে হচ্ছে মরার মত ঘুমিয়ে তিনি অপরাধ করেছেন। বজলুর রহমান বললেন, আলতাফকে ডাক, ওর সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।

ও তো অফিসে চলে গেছে।

অফিস দশটায়, এখন বাজে ন’টা।

বাস পায় না, ভিড় হয়, এইজন্যে আগে আগে যায়।

দুলারীকে ডাক।

ও তো আলতাফের সঙ্গে গেছে। আলতাফকে বাসে উঠিয়ে কলেজে চলে যাবে।

তিনি থমথমে গলায় বললেন, আলতাফকে কি কোলে করে বাসে তুলে দিতে হয়? মনোয়ারা বললেন, তুমি চট করে রেগে যাচ্ছ। তোমার শরীর মনে হয় খারাপ। দেখি, জ্বর আছে কি-না। ও আল্লা, জ্বর আছে তো। বেশ জ্বর। যাও, বিছানায় গিয়ে শুয়ে থাক। বজলুর রহমান শোবার ঘরে চলে গেলেন। ঘরে ঢুকেই তাঁর ভ্রু কুঞ্চিত হল। তেলাপোকাটা এখনো ঘুরঘুর করছে। বজলুর রহমানকে দেখে পরিচিত ভঙ্গিতে কাছে এগিয়ে এল। এটা কাল রাতের তেলাপোকা কি না তা বোঝা যাচ্ছে না। অন্য একটাও হতে পারে। ঘরে তেলাপোকার উপদ্রব হয়েছে পোকা মারার অষুধ কিনতে হবে। আজই কিনতে হবে। এখন কিনে আনলেই হয়। পরে মনে থাকবে না।

বজলুর রহমান জ্বর নিয়েই পোকা মারার অষুধ কিনতে বের হলেন। বাজারে অনেক ধরনের অষুধ আছে–Kill Them, Finish, Rouche Killer, vanish. তিনি কিনলেন দুফাইল কিল দেম। নামটা সুন্দর! কিল দেম। তাদের মার, শুধু মার, মেরে শেষ করে দাও। শুওরের বাচ্চা। এদের শুওরের বাচ্চা কলা ঠিক না। এরা তারচেয়েও খারাপ। কিল দেম বোতলের গায়ে লেখা–এটি বিষাক্ত অষুধ। স্প্রে করার সময় হাতে গ্লাভস পরে নেবেন। রাতের বেলায় ঘরের কোণায়, কমোডে, বেসিনে, ভাড়ার ঘরে ছড়িয়ে দেবেন। পরপর তিনবাত অষুধ দেবেন। পনেরো দিন বিরতির পর আবার অষুধ দেবেন।

অষুধের তেজ কেমন পরীক্ষা করার জন্যে বজলুর রহমান দিনের বেলাতেই অষুধ স্প্রে করলেন। গ্লাভস ছাড়াই করলেন, তিনি গ্লাভ কিনতে ভুলে গিয়েছিলেন।

Kili Them অষুধ হিসেবে মন্দ না। পোকাটার গায়ে স্প্রে করার সঙ্গে সঙ্গে কাজ হল। পোকাটা একবার উড়ার চেষ্টা করেই চিৎ হয়ে পড়ে গেল। কয়েকবার শুড় নেড়েই স্থির হয়ে গেল। বজলুর রহমান হৃষ্টচিত্তে বললেন, শুয়র কা বাচ্চা। বলেই মরা পোকটির গায়ে আরো কয়েকবার কিল দেম স্প্রে করে দিলেন। তার মনে হিংস্র এক ধরনের আনন্দ হল। অনেক দিন এধরনের আনন্দ পাননি। প্রচণ্ড আনন্দের জন্যেই ঘাম দিয়ে তার জ্বর চলে গেল। ক্ষুধা বোধ হল।

.

দুলারী কলেজ থেকে ফিরতেই মনোয়ারা তাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, তোর বাবার সঙ্গে কিন্তু খুব সাবধানে কথা বলবি। খুব সাবধান!

দুলারী ভীত গলায় বলল, বাবার কি হয়েছে?

বুঝতে পারছি না। মনে হয় রাতে গরমের জন্যে ভাল ঘুম হয়নি। সকাল থেকে ছটফট করছে। কি যেন দোকান থেকে কিনে এনেছে। ঘরে ঘরে দিচ্ছে। বোটকা গন্ধ।

জিনিসটা কি?

জানি না। জিজ্ঞেস করিনি। যা মেজাজ করে রেখেছে জিজ্ঞেস করতেও ভয় লাগে। তুই তোর বাবার সঙ্গে সাবধানে কথা বলিস। না ডাকলে কাছে যাবি না।

আচ্ছা।

বজলুর রহমান মেয়েকে ডাকলেন না। দুলারী নিজ থেকেই কৌতূহলী হয়ে বাবার ঘরে ঢুকল। ক্ষীণ গলায় বলল, কেমন আছ বাবা?

বজলুর রহমান জবাব দিলেন মা। মেয়ের দিকে তাকালেনও না। দুলারী বলল, তোমার কি শরীর খারাপ?

না। জ্বর ছিল, এখন নেই।

দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে শরীর খারাপ। মা বলছিল তোমার রাতে ঘুম হয়নি। ঘুম না হওয়ারই কথা। যা গরম! আমারও রাতে ঘুম হয়নি।

আলতাফ! আলতাফের ঘুম হয়েছে?

ঘুম নিয়ে তো ওর কোন সমস্যা নেই বাবা। ভরদুপুরে ওকে যদি একটা কম্বল দিয়ে ছেড়ে দাও ও আরাম করে নাক ডাকিয়ে ঘুমাবে।

বজলুর রহমান মেয়ের কথায় তেমন মজা পেলেন না। তাঁর মুখ আরো কঠিন হয়ে গেল। তিনি শুকনো গলায় বললেন, ওর মাথাটা কি খারাপ?

দুলারী হকচকিয়ে গিয়ে বলল, মাথা খারাপ হবে কেন?

কাল রাতে আমাকে বলল, ও পোকাদের কথা শুনতে পায়। পোকারাও ওর কথা শুনে। এইসব হাবিজাবি।

বাবা, এটা হল ওর একটা খেয়াল।

খেয়াল?

হ্যাঁ, খেয়াল। ও অবশ্যি বিশ্বাস করে।

তুই বিশ্বাস করিস?

ফিফটি ফিফটি করি বাবা।

ফিফটি ফিফটি মানে?

কিছুটা করি কিছুটা করি না। মানুষ পোকার কথা কি করে শুনবে এটা যখন মনে হয় তখন বিশ্বাস করি না। আবার যখন দেখি ও মশাদের কামড়াতে নিষেধ করল, ওমনি মশার কামড়ানো বন্ধ করল, তখন কিছুটা বিশ্বাস হয়।

বজলুর রহমান থমথমে গলায় বললেন, মশারা ওর কথায় কামড়ানো বন্ধ করে দেয়? সব গান্ধিবাদী মশা?

দুলারী বলল, সবসময় যে কামড়ানো বন্ধ করে তা না, মাঝে মাঝে করে।

বজলুর রহমান বালিশের নিচ থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করতে করতে বললেন, আলতাফের স্থান হওয়া উচিত পাগলাগারদে। শুধু ওর একার না–তোরও। মিয়া বিবি দুজনেরই। কোন মানুষ যদি একনাগাড়ে অনেক দিন পাঁঠার সঙ্গে থাকে তাহলে তার গা থেকে পাঁঠার মত গন্ধ বের হয়। এই-ই নিয়ম। তোর গা থেকেও পাঁঠার মত গন্ধ বেরুচ্ছে।

এরকম করে কথা বলছ কেন বাবা?

তোদের চাবকানো উচিত। তা না করে ভদ্র ভাষায় কথা বলছি। যা আমার সামনে থেকে।

দুলারী কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল, আমি জানি তুমি ওকে দেখতে পার না। আমাকেও না। আমরা তোমার সঙ্গে থাকব না। আলাদা বাসা নেব।

যা ইচ্ছা কর। এখন আমার সামনে থেকে যা।

দুলারী প্রায় ছুটে বের হয়ে গেল।

.

০৫.

আলতাফ মাথা নিচু করে লেজার বই-এ লিখে যাচ্ছে। একটা দশ বাজে, টিফিন টাইম। অফিসের মূল হলঘর প্রায় ফাঁকা। সবাই ভিড় করেছে ক্যানটিনে।

গনি সাহেব আলতাফের পাশের টেবিলে বসেন। তিনি পান মুখে দিতে দিতে বললেন, করছেন কি আলতাফ সাহেব?

আলতাফ হাসল। গনি সাহেব বললেন, একটা থেকে দুটা হচ্ছে রেস্ট পেরিয়ড। রেস্ট পেরিয়ডে কাজ করলে আয়ু কমে যায়। রেস্ট পেরিয়ডে অফিসের কোন কাজ করবেন না। যত জরুরি কাজই থাকুক হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন। পান খাবেন। সিগারেট খাবেন। পা নাড়বেন। খবরের কাগজ পড়বেন। কিন্তু ভুলেও কাজ করবেন না।

জ্বি আচ্ছা।

খাওয়া-দাওয়া করেছেন?

জ্বি।

চা খাবেন না কি? চলুন চা খেয়ে আসি।

আমি দুপুরে চা খাই না।

চায়ের কোন সকাল দুপুর নেই। আসুন তো আমার সঙ্গে।

আলতাফ মাথা নিচু করে বলল, এখন কোথাও যাব না।

গনি সাহেব বিস্মিত হলেন। তাঁর মুখের উপর কেউ কখনো না বলে না। এই অফিসে তিনি অতি জনপ্রিয় একজন মানুষ। পরপর কয়েক বছর ধরেই অফিসার্স ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট। তিনি যে নিজ থেকে চায়ের দাওয়াত দিলেন, এটা কম কথা না। কিন্তু মানুষটা বোধহয় এর গুরুত্ব ধরতে পারছে না। মনে হচ্ছে নির্বোধ ধরনের মানুষ। কেউ না বললে তা হজম করা গনি সাহেবের স্বভাব নয়। তিনি আলতাফের সামনের চেয়ার টেনে বসলেন। হাসিমুখে বললেন, অফিসের কাজকর্ম কেমন হচ্ছে?

জ্বি, ভাল হচ্ছে।

অসুবিধা হলে বলবেন।

জ্বি আচ্ছা।

বড় কর্তাদের সাথে ঝামেলা হলেও বলবেন। আগের দিন এখন নেই, বুঝতে পারছেন?

আলতাফ চুপ করে রইল। গনি সাহেবের যথেষ্ট বিরক্ত হলেন। একটা বোকা বোকা ধরনের লোককে কাছে টানা যাচ্ছে না, এ কেমন কথা? লোকটা কি তার গুরুত্ব বুঝতে পারছে না? বিপদে না পড়লে বুঝতে পারবে না। বিপদে শিগগিরই পড়বে। তখন ছুটে আসতে হবে তাঁর কাছেই। দাঁত থাকতে মানুষ দাঁতের মর্যাদা বুঝে না, এ তো অতি পুরাতন কথা।

যাই আলতাফ সাহেব।

আচ্ছা।

আলতাফ পাঁচটা পর্যন্ত চেয়ারে বসে রইল। পাঁচটার ঘণ্টা পড়ার পর ফাইল গুছাতে শুরু করল, ঠিক তখন বড় সাহেবের পিয়ন এসে বলল, স্যার আফনেরে বুলায়। যে কোন বুদ্ধিমান মানুষ পিয়নের ডাকের ধরণ থেকে বুঝে ফেলবে বড় সাহেবের মেজাজ ঠিক না। আলতাফ কিছু বুঝতে পারল না।

বড় সাহেবের নাম মনসুর আলী। ছোটখাট ধরনের মানুষ। তিনি প্রচণ্ড গরমেও স্যুট পরে থাকেন। তাঁকে দেখে মনে হয় তিনি কারোর সাতে পাঁচে থাকেন না। কিন্তু তারপরও তার ছায়া দেখলেই অফিসের সবাই চমকে উঠে। তিনি সচরাচর নিচের স্তরের কর্মচারিদের ডাকেন না। তাঁর নীতি হল–দূরত্ব বজায় রেখে চলার নীতি। আলতাফের মত একজন জুনিয়র কর্মচারি যে মাত্র সেদিন কাজে যোগ দিয়েছে তাকে খাস কামরায় ডাকার কারণ কি? গনি সাহেব চিন্তিত মুখে অপেক্ষা করতে লাগলেন। ঘটনা না জেনে যাওয়া যায় না।

.

বড় সাহেবের ঘরটা প্রকাণ্ড। ওয়াল টু ওয়াল কার্পেট। এয়ারকুলারের কাঁটা এত নিচে নামানো যে ঘরে ঢুকলেই শীতের কারণে শরীরে কাঁপন ধরে যায়। ঘরের আলোও কম। সবকিছু পরিষ্কার দেখা যায় না। এত কম আলোতেও বড় সাহেব চোখে সানগ্লাস পরে থাকেন। এই অফিসের অতি পুরাতন কর্মচারি সগীর মিয়াও কোনদিন সানগ্লাস ছাড়া বড় সাহেবকে দেখেনি। অফিসের সবার ধারণা, বড় সাহেবের একটা চোখ নষ্ট বলেই তিনি কালো চশমায় চোখ ঢেকে রাখেন।

আলতাফ ঘরে ঢুকে ক্ষীণ গলায় কলল, স্যার ডেকেছেন?

বড় সাহেব বললেন, আপনার নাম আলতাফ হোসেন?

জি স্যার।

কাজে যোগ দিয়েছেন কবে?

দুমাস হয়েছে স্যার।

বসুন।

আলতাফ বসল। বড় সাহেব খানিকটা ঝুঁকে এসে বললেন, এই ফাইলটা আপনার তৈরি করা না? জুন মাসের এক্সপেনডিচার ফাইল।

ছি স্যার, আমার করা।

ফাইল ঘাঁটতে গিয়ে একটা কাগজ পেলাম, মনে হচ্ছে আপনারই হাতের লেখা। দেখুন তো এটা আপনার হাতের লেখা কি-না।

বড় সাহেব পুরো ফাইলটাই এগিয়ে দিলেন। আলতাফ কাগজটার দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, এটা আমারই লেখা।

কি লিখেছেন এখানে?

আলতাফ চুপ করে রইল। বড় সাহেব বললেন, আমি এই লেখার পাঠোদ্ধার করার চেষ্টা করেছি। আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি।

আলতাফ বলল, এই পাতাটা স্যার ভুল করে ফাইলে দিয়ে দিয়েছি।

আমারো তাই ধারণা।

বড় সাহেব ফাইলটা আবার নিজের কাছে নিলেন। ভ্রু কুঁচকে লেখাটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। গুটি গুটি করে বিচিত্র কিছু জিনিস লেখা–

[III({||||||UILT}}}fb/T||||J0-1[ [TVIE DDDDDIDDDDD DDDDDD DDD DD][][[[ ]। JILIULUILO TUDIJU I MITJO. I MNO OLJO ||||||||||au[0]]]]] ]]]] [] [B]][][][000000 Tit]| || ||| |||}{VT|||]Jn-1 [ TV||||||g||||||L [ If [[[[[0000000[] [][0 D] [[ ৯][][] D IIUI|||||1|||||14pUTIIIU-IIIJITIJJ-IIITIVIL ||||ELF [1] DDDDDDDDDDD DDDD6D[D DDDDDDDD

TUITIEUTU||||IU-TIfITTRI)-| |||[[] [[ [ ] [][]]]]]]]]]]] [[[[n][D DDDDDDDDJT IUID] [EUTIIIU-IIf If}}TIOJn-[ IT}|||||| nakfTn BDn[[ [[[[ [[[[[[[[[]] [[]BD

বড় সাহেব অস্বস্তির সঙ্গে বললেন, জিনিসটা কি?

কিছু না স্যার।

যা লিখেছেন তা কি অর্থহীন, না কোন অর্থ আছে?

অর্থ আছে স্যার। পোকাদের নিয়ে একটা লেখা লিখেছি স্যার।

কাদের নিয়ে লিখেছেন?

পোকাদের নিয়ে। যেমন তেলাপোকা, মাকড়সা, শুয়োপোকা, ..

সাংকেতিক ভাষায় লিখেছেন?

জি স্যার।

সাংকেতিক ভাষা আপনি জানেন, না নিজে তৈরি করেছেন?

আলতাফ হোসেন ইতস্ততঃ করে বলল, আমি তৈরি করেছি স্যার। তবে পোকারা আমাকে সাহায্য করেছে।

পোকারা আপনাকে সাহায্য করেছে?

জ্বি স্যার। এখানে দুধরনের সাংকেতিক ভাষা আছে। প্রথমটা তেলাপোকাদের কাছ থেকে নেয়া। দ্বিতীয়টা পেয়েছি ঘুনপোকাদের কাছ থেকে।

ঘুনপোকা?

জি স্যার, ঘুনপোকা। আমি যে টেবিলে কাজ করি সেই টেবিলে অনেক ঘুনপোকা থাকে। ওরা আমাকে লিখতে সাহায্য করেছে। স্যার, আমি এখন উঠি?

বসুন, আরো কিছুক্ষণ বসুন। তাড়া আছে?

জি না স্যার, তাড়া নেই।

আসুন, চা খাওয়া যাক। আপনি চা খান তো?

দিনে দুকাপ চা খাই স্যার। সকালে এক কাপ আর বিকালে এক কাপ।

এখন তে বিকাল, এখন খাওয়া যেতে পারে।

বড় সাহেব বেল টিপলেন। বেয়ারাকে চা দিতে বললেন। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললেন, এখানে কি লিখেছেন একটু পড়ুন তো শুনি।

পোকাদের সাহায্য ছাড়া তো স্যার পড়া যাবে না।

তার মানে কি এই যে এ লেখা আপনি কখনো পড়তে পারবেন না?

পড়তে পারব। পোকা থাকলেই পড়তে পারব। আপনার ঘরে কোন তেলাপোকা বা ঘুনপোকা নেই। আমি কি স্যার আমার টেবিলে গিয়ে পড়ে নিয়ে আসব?

থাক, আরেক দিন দেখা যাবে।

বড় সাহেব উঠে দাঁড়াতে দীড়াতে বললেন, আপনি কি এইসব ব্যাপার নিয়ে অফিসের কারো সঙ্গে আলাপ আলোচনা করেন?

না স্যার।

না করাই ভাল। অফিস হল অফিসের কাজকর্মের জন্যে, পোকাদের সাংকেতিক ভাষা লেখার জন্যে না। ঠিক বলেছি না?

জ্বি স্যার।

আলতাফ বড় সাহেবের ঘর থেকে বের হয়ে দেখল, গনি সাহেব অস্থির হয়ে অপেক্ষা করছেন।

আলতাফ সাহেব, ব্যাপারটা কি?

কিছু না।

বড় সাহেবের ঘরে এতক্ষণ কী করলেন?

চা খেয়েছি।

গনি সাহেবের মুখ কঠিন হয়ে গেল। তিনি এই অফিসের যথেষ্ট ক্ষমতাবান ব্যক্তি। অফিসার্স ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট, অথচ তাঁকে এখনো বড় সাহেব তাঁর অফিসে চা খেতে বলেননি। চা খাওয়া দূরে থাক, রুমে কখনো ডাকেননি। এর মানেটা কি?

শুধু চা-ই খেলেন, না আরো কিছু আলাপ-টালাপ হল?

পোকাদের নিয়ে কথা বলেছি।

বুঝতে পারলাম না, কাদের নিয়ে কথা বলেছেন?

তেলাপোকা, ঘুনপোকা, মাকড়সা–এদের নিয়ে।

গনি সাহেব হাসিমুখে বললেন, আচ্ছা, আচ্ছা। মনে মনে বললেন, গভীর জলের মাছ, Deep water fish. পোকাদের নিয়ে কথা বলা হচ্ছিল। আমার সঙ্গে মামদোবাজি, পোকার চাটনি বানিয়ে খাইয়ে দেব। তখন বুঝবে পোকা কি জিনিস।

আলতাফ সাহেব!

জ্বি।

চলুন আপনাকে রিকশায় তুলে দিয়ে আসি।

আমি বাসে করে যাই।

চলুন তাহলে বাসস্টপ পর্যন্ত যাই।

গনি সাহেব ভেবেছিলেন, যেতে যেতে আরো কিছু কথা বের করা যাবে। লাভ হল না। আলতাফ হ্যাঁ হুঁ ছাড়া কিছুই বলল না। ব্যাটা আসলেই গভীর জলের মাছ। তার আগেই টের পাওয়া উচিত ছিল। টের পাননি। এখন থেকে ব্যাটাকে চোখে চোখে রাখতে হবে। খাতির জমাতে হবে। সবচে ভাল হয় বাসা চিনে এলে। ছুটির দিনে বাসায় চলে যেতে হবে।

আলতাফ সাহেব।

জ্বি।

আপনার বাসা কোথায়?

মগবাজারে।

মগবাজারে কোথায়?

রেল ক্রসিং-এর কাছে।

বলেন কি! আমার এক রিলেটিভ থাকে, আমি আসি প্রায়ই। দেখি একবার যাব আপনার বাসায়। ঠিকানাটা কি?

আলতাফ ঠিকানা বলল। গনি সাহেব নোটবই বের করে ঠিকানা লিখে রাখলেন। মনে মনে ভাবলেন, কাল ছুটির দিন আছে, সন্ধ্যাবেলার দিকে চলে যাবেন। ব্যাটা ভুল ঠিকানা দিয়েছে কিনা কে জানে। গভীর জলের মাছ! ভুল ঠিকানা দিতেও পারে।

২. গায়ে জ্বর নেই

০৬.

রাতে বজলুর রহমান কিছু খেলেন না। তাঁর গায়ে জ্বর নেই। কিন্তু শরীর খারাপ লাগছে। মাথা ঘুরছে। প্রেসারটা একবার দেখানো উচিৎ, মনে হচ্ছে সমস্যটি প্রেসার-ঘটিত। গত রাতে ঘুম হয়নি। প্রেসার রোগিদের একরাত ঘুম না হলে অনেক সমস্যা হয়। বজলুর রহমান রাত নটা বাজার আগেই হিপনল নামের একটা ঘুমের অষুধ এবং আধকাপ দুধ খেয়ে বিছানায় চলে গেলেন। বাতি নিভিয়ে দিলেন। মনোয়ারাকে বলে দিলেন–কেউ যেন হৈ-চৈ না করে। হৈ চৈ করলে কারবালা হয়ে যাবে।

বজলুর রহমানের আশংকা ছিল আজও ঘুম আসতে চাইবে না। আয়োজন করে ঘুমুতে গেলে ঘুম আসে না–এটাই নিয়ম। ঘুমের অষুধ আরো সমস্যা করে। তিনি যে কবার ঘুমের অষুধ খেয়েছেন, সে কবারই সারারাত জেগে কাটিয়েছেন। এক ফোঁটা ঘুম হয়নি।

আজ রাতে সে রকম হল না। দেখতে দেখতে ঘুমে চোখ জুড়িয়ে এল। তৃপ্তির ঘুম। এমন আরাম করে তিনি বহুকাল ঘুমাননি। তাঁর ঘুম ভাঙল গভীর রাতে। দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙল। তিনি দেখলেন–মেঝে ছেয়ে গেছে তেলাপোকায়। তারা এগুচ্ছে তাঁর খাটের দিকে। কুড়ি-পঁচিশটা না, হাজারে হাজারে পোকা। সবাই একসঙ্গে শুঁড় নাড়ছে। পা ফেলছে তালে তালে। অনেকটা সৈন্যদের মার্চের ভঙ্গিতে। তিনি ঘুমের মধ্যেই বললেন, এই, স্টপ, স্টপ।

পোকাদের বাহিনী থমকে গেল। তারপর আবার এগুতে শুরু করল। তিনি ঘুম ভেঙে বিছনায় উঠে বসলেন। কাঁপা গলায় ডাকলেন, মনোয়ারা! মনোয়ারা!

মনোয়ারা উঠে বসলেন।

বাতি জ্বাল।

মনোয়ারা বাতি জ্বাললেন। বজলুর রহমান ভীত গলায় বললেন, দেখ তো মেঝেতে কিছু আছে না কি।

কিছু নেই।

না দেখে কথা বলবে না। কষ্ট করে বিছানা থেকে নাম। তারপর বল। তোমার কোমরে তো বাত হয়নি যে বিছানা থেকে নামা যাবে না।

মনোয়ারা বিছানা থেকে নামলেন।

কিছু দেখছি না তো।

খাটের নিচটা দেখ।

খাটের নিচেও কিছু দেখা গেল না। বজলুর রহমান বললেন, ঠাণ্ডা পানি দাও। পানি খাব।

মনোয়ারা চিন্তিতমুখে পানি আনতে গেলেন। লোকটার হয়েছে কি? স্বপ্ন দেখেছে এটা বোঝা যাচ্ছে। এই বয়সে স্বপ্ন দেখে কেউ এমন বিকট চিৎকার দেয়?

বজলুর রহমান শান্তমুখে পানি খেলেন। মনোয়ারা বললেন, খিদে হয়েছে? কিছু খাবে?

না।

কি স্বপ্ন দেখেছ?

বজলুর রহমান কিছু বললেন না। স্ত্রীর সব প্রশ্নের জবাব তিনি দেন না। খামাখা সময় নষ্ট। মনোয়ারা জবাবের জন্য খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে বাথরুমে গেলেন অজু করতে। রাত শেষ হয়ে আসছে। ফজরের নামাজের অজু করে রাখা যায়। মনোয়ারা বাথরুমের বাতি জ্বালিয়ে বিকট চিৎকার করলেন।

বজলুর রহমান বললেন, কি হয়েছে?

কিছু না।

কিছু না, তাহলে চিৎকার করছ কেন?

পোকা।

কি বললে?

হাজারে বিজারে তেলাপোকা। ওয়াক থু। কি ঘেন্না!

মনোয়ারা ধড়াম করে বাথরুমের দরজা বন্ধ করে দিলেন। তাঁর গা গুলাচ্ছে। তিনি তাঁর বাহান্ন বছর জীবনে একসঙ্গে এত তেলাপোকা দেখেননি। বজলুর রহমান বললেন, গাধাটাকে ডাক।

কাকে ডাকব?

আলতাফকে ডাক।

ওকে ডাকব কেন?

যা করতে বলছি কর।

মনোয়ারা আলতাফকে ডাকতে গেলেন।

আলতাফ মরার মত ঘূমায়। ঘুম ভাঙানো দুঃসাধ্য ব্যাপার। সঙ্গদোষে মানুষ নষ্ট। দুলারীর ঘুমও এখন ভাঙে না। মনোয়ারা প্রাণপণে দুজা ধাক্কাচ্ছেন। কারো কোন সাড়া নেই। অনেকক্ষণ পর দুলারী জড়ানো গলায় বলল, কে?

আমি।

কি হয়েছে মা?

আলতাফকে তোর বাবা ডাকছে।

কেন?

বাথরুম ভর্তি তেলাপোকা।

তেলাপোকা তো বাথরুমেই থাকবে। এর জন্যে শুধু শুধু বেচারার ঘুম ভাঙাব? সারাদিন অফিস করে আসে।

ডেকে তোল না মা। তোর বাবা রাগ করবে।

করুক রাগ। আমি ডাকতে পারব না। আর ডাকলেও লাভ হবে না। ওর ঘুম ভাঙবে না।

মনোয়ারা ফিরে এসে দেখেন, বজলুর রহমান বাথরুমে কিল দেম স্প্রে করছেন। তাঁর চোখে-মুখে হিংস্র আনন্দ। তিন হৃষ্ট গলায় বললেন, মেরে সাফ করে দিয়েছি। গুষ্টি নাশ করে দিয়েছি। সান অব এ বিচ। ঘুঘু দেখেছ, ফাঁদ দেখনি।

মনোয়ার বাথরুমে উঁকি দিয়ে চমকে উঠলেন। সত্যি সত্যি সব পোকা মরে পড়ে আছে। বাথরুমের মেঝেটাকে মনে হচ্ছে মেরুন কার্পেটে ঢাকা। বজলুর রহমান বললেন, দেয়াশলাই নিয়ে আসি, আগুন জ্বালিয়ে দেব। বোন ফায়ার হবে।

মরেই তো গেছে, আগুন জ্বালানোর দরকার কি?

দরকার আছে, তুমি বুঝবে না। তোমাকে যা করতে বলছি কর। কেরোসিন আর আগুন নিয়ে আস। কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বেলে দেব।

শেষে ঘরে আগুন-টাঙ্গুন লেগে একটা কাণ্ড হবে।

তোমাকে যা করতে বলেছি কর। ফালতু তর্ক যথেষ্ট করেছ। Enough is enough.

মনোয়ারা কেরোসিন আর দেয়াশলাই আনতে গেলেন। আগুন লাগানোর উত্তেজনায় বজলুর রহমান আলতাফের কথা ভুলে গেছেন এটা একটা বড় ব্যাপার। নয়তো আরো যন্ত্রণা হত। ঘরে এখন কেরোসিন আছে কিনা কে জানে। বোতলের ভেতর খানিকটা থাকার কথা, না থাকলে ভয়াবহ কাণ্ড হবে।

কেরোসিন ছিল। মনোয়ারা কেরেসিনের বোতল এবং দেয়াশলাই নিয়ে বাথরুমে ঢুকে দেখেন, সব তেলাপোকা একত্র করে বেসিনে রাখা হয়েছে। বেসিন প্রায় আধাআধি ভরা। বজলুর রহমান আনন্দিত গলায় বললেন, ক’টা পোকা আছে বল তো?

মনোয়ারা বললেন, ছয় হাজার।

তোমার আন্দাজ বলে কিছু নেই। এখানে পোকা আছে মোট ২১৩টা।

তুমি বসে বসে গুনেছ?

না গুনলে জানব কি করে?

বজলুর রহমান কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিলেন। পট পট শব্দ হতে থাকল। উৎকট গন্ধে ঘর ভরে গেল। মনোয়ারা বললেন, শব্দ হচ্ছে কিসের?

পেট ফেটে যাচ্ছে তার শব্দ। পেট ফেটে সাদা সাদা কি যেন বের হচ্ছে।

মনোয়ারা বললেন, ওয়াক থু!

তাঁর নাড়িভুড়ি উল্টে বমি আসছে। ঘরময় উৎকট গন্ধ। মনোয়ারা অনেক কষ্টে বমি আটকে রাখছেন। বমি করলে বজলুর রহমান রেগে যেতে পারেন।

ফরিদা।

হুঁ।

আগুন হল পোকার একমাত্র অষুধ। Only Medicine.

হুঁ।

বজলুর রহমান হাসিমুখে বললেন, সব পোকা মেরে ফেলা ঠিক হয়নি। দু একটা রেখে দেয়া উচিত ছিল। মিসটেক হয়ে গেছে। বিগ মিসটেক।

দু-একটা রেখে দিলে কি হত?

ওরা গিয়ে অন্যদের খবর দিত। অন্যদের আক্কেল গুড়ুম হয়ে যেত। হা হা হা।

বজলুর রহমান বেসিনে আরো কেরোসিন ঢেলে দিলেন। গন্ধ আরো বিকট হল। ফরিদা বললেন, ওয়াক থু! বজলুর রহমান বিরক্ত গলায় বললেন, কথায় কথায় ওয়াক থু বলবে না। ওয়াক থু র কি আছে?

গন্ধে টিকতে পারছি না।

টিকতে না পারলে চলে যাও। দাঁড়িয়ে থাকতে বলেছে কে?

ফরিদা মেয়ের ঘরে চলে গেলেন। মেয়েকে সব জানানো দরকার। তাঁর কিছুই ভাল লাগছে না। মানুষটা এরকম করছে কেন? দুলারী জেগেই ছিল। ফরিদা একবার ডাকতেই উঠে এল। বিরক্ত গলায় বলল, কি হয়েছে?

তোর বাবার কাণ্ডকারখানা আমার ভাল লাগছে না।

কি করছে বাবা?

পোকা পুড়াচ্ছে।

সেটা আবার কি?

তুই নিজের চোখে না দেখলে বুঝবি না।

দুলারী নিচে নেমে এল। বজলুর রহমান মেয়েকে দেখে হাসিমুখে বললেন, একটা কলম আর ফুলস্কেপ কাগজ অন তো।

পোকা মারার পাকা হিসাব থাকা দরকার। মোট ২১৪টা খতম। দিনের বেলা মারলাম একটা, রাতে মেরেছি দুইশ তের। সব মিলিয়ে টু হানড্রেড এন্ড ফর্টিন।

আচ্ছা।

মেরে সব সাফ করে দেব। রোজ রাতে বোন-ফায়ার হবে। জ্বালো জ্বালো, আগুন জ্বালো।

দুলারী বাবার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আনন্দে বজলুর রহমানের চোখ ঝলমল করছে? দুলারী বলল, তোমার কি হয়েছে বাবা?

কি হবে আবার?

কেমন যেন অদ্ভুত করে তাকাচ্ছ!

তোকে খাতা-কলম আনতে বলছি, আন।

দুলারী কাগজ কলম আনতে গেল। যাবার সময় শুনল–তার বাবা গুনগুন করে গানের সুর ভাজছেন। হিন্দি গানের সুর–লালা লা লালা লা। হচ্ছেটা কি? বাবা কি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছেন?

.

০৭.

দুপুরে লাঞ্চ ব্রেকের সময় মনসুর আলী তাঁর বেয়ারাকে বললেন, আলতাফ সাহেবকে আসতে বল। বেয়ারা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেল। আলতাফের কাছে গিয়ে অন্যদিনের মত তাচ্ছিল্যের ভঙ্গি করল না। চোখ বড় বড় করে বলল, বড় সাব আপনেরে ডাকে। এক্ষণ চলেন। এক্ষণ।

আলতাফ টিফিন বক্স খুলেছে। দুটা আটার রুটি, একটা ডিম, একটা কলা। এক কোণায় সামান্য আচার। সে কখনো আচার খায় না। তারপরও দুলারী প্রতিদিন টিফিন বক্সের এক কোণায় খানিকটা আচার দিয়ে দেয়। আলতাফ কলাটি বের করল। ফল সবার শেষে খাওয়া উচিত। সে সবার আগে খায়। ধীরে ধীরে কলার খোসা ছাড়াতে তার ভাল লাগে।

আলতাফ কলার খোসা ছাড়াচ্ছে, বেয়ারা বিরক্ত হয়ে বলল, বড় সাহেব ডাকছেন তো। আলতাফ সহজ গলায় বলল, এখন যেতে পারব না। খাচ্ছি।

বেয়ারা এমন চোখে তাকাচ্ছে যেন তার জীবনের সবচে আশ্চর্যজনক ঘটনাটি সে এই মুহূর্তে ঘটতে দেখছে। গনি সাহেব উঠে এসে বললেন, কি হয়েছে?

বড় সাহেব খবর দিলেন, উনি যাবে না।

যাবেন না কেন আলতাফ সাহেব?

খাচ্ছি তো।

আপনার মাথাটা খারাপ কিনা সেটাই তো বুঝতে পারছি না। পরে খাবেন। খাওয়া পালিয়ে যাবে না। যান শুনে আসুন।

আলতাফ অনিচ্ছার সঙ্গে ওঠে দাঁড়াল। গনি সাহেব কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন, ভয় পাবেন না, আমরা পেছনে আছি। We are behind you আলতাফ বিস্মিত হয়ে বলল, ভয় পাব কেন? গনি সাহেব গলা আরো নামিয়ে দিয়ে বললেন, বড় সাহেবরা কেরানীদের সঙ্গে প্রেমালাপ করার জন্যে ডাকে না। এটা শুধু খেয়াল রাখবেন, তাহলেই বুঝবেন ভয় পাবার কিছু আছে কি না।

.

বড় সাহেব বললেন, কি খবর আলতাফ সাহেব?

আলতাফ অস্বস্তির সঙ্গে বলল, খবর ভাল স্যার।

বসুন। করছিলেন কি?

টিফিন খেতে যাচ্ছিলাম স্যার।

খেয়ে ফেলেননি তো?

জ্বি না।

গুড। আমার সঙ্গে খাবেন। খেতে খেতে আপনার কথা শুনি। ঐদিন ঠিকমত শোনা হয়নি।

মনসুর আলী সাহেব নিজেই প্লেট এগিয়ে দিলেন। বড়লোকের খাবার খুব সাধারণ হয়। স্যান্ডউইচ এবং চা। আলতাফের পেটের একটা কোণা শুধু ভরল। সে দুপুরে চা খায় না। চা খাওয়ার জন্যে কেমন জানি লাগছে। পেটে ভুটভট শব্দ হচ্ছে।

আলতাফ সাহেব।

জি স্যার।

ঐ দিন পোকাদের ব্যাপারে কি যেন বলছিলেন, আবার বলুন।

কি বলেছিলাম মনে নেই স্যার।

পোকারা আপনাকে লেখার ব্যাপারে সাহায্য করে–এইসব।

তা স্যার করে।

একটু বুঝিয়ে বলুন। বলতে কোন বাধা নেই তো?

জি না। তবে কাউকে বলি না।

বলেন না কেন?

দুলারী পছন্দ করে না। দুলারীর ধারণা, এই সব শুনলে লোকে আমাকে পাগল ভাববে।

দুলারীটা কে?

আমার মামাতো বোন। লালমাটিয়া কলেজে বি এ, পড়ে।

পোকার ব্যাপারটা শুধু সেই জানে?

আমার মামা-মামীও জানেন। তাঁ

রা কি আপনাকে পাগল ভাবেন?

জি না, ভাবেন না। তাঁরা আমাকে খুব স্নেহ করেন।

এবার বলুন আপনার পোকার কথা।

বলার মত কিছু নাই স্যার। পোকাদের আমরা খুব তুচ্ছ করি। ওদের তুচ্ছ করা ঠিক না। এরকম তুচ্ছ করলে এরা রেগে যেতে পারে। এরা সহজে রাগে না। একবার রেগে গেলে মুশকিল।

ও আচ্ছা।

মানুষের চেয়ে ওদের বুদ্ধি অনেক অনেক বেশি।

ও আচ্ছা। আপনার কি ধারণা ওদের স্কুল-কলেজ আছে?

ওদের ব্যাপারটা ঠিক আমাদের মত না। ওরা সবাই একসঙ্গে চিন্তা করে, একসঙ্গে ভাবে। এইভাবে তারা শেখে। যেমন স্যার, মনে করুন, একটি তেলাপোকা আপনার রান্নাঘরে আছে, আরেকটা আছে আমাদের অফিসে। রান্নাঘরের পোকাটা কি ভাবছে তা আমাদের পোকাটা জানে।

আপনি এইসব থিওরি ভেবে ভেবে বের করেছেন?

ওরা আমাকে বলেছে।

ও আচ্ছা। কি ভাবে বলল? ডেকে বলল?

মাঝে মাঝে ওরা আমাকে স্বপ্ন দেখায়।

সবই তাহলে স্বপ্নে পাওয়া?

স্বপ্ন ছাড়াও ওরা আমাকে বলে।

মনসুর আলী সরু চোখে তাকিয়ে রইলেন। আলোচনা তিনি চালিয়ে যাবেন কি না বুঝতে পারছেন না। কোন প্রয়োজন অবশ্য নেই। তবে কথা শুনতে মজা লাগছে। পৃথিবীতে বিচিত্র ধরনের মানুষ আছে। সেই বিচিত্র মানুষদের একজন এই মুহূর্তে তাঁর সামনে বসে আছে, যাকে পোকারা অনেক কিছু বলে।

আপনি কি সিগারেট খান আলতাফ সাহেব?

জ্বি না, স্যার।

সিগারেট খাওয়ার ব্যাপারে কি পোকাদের কোন বিধি-নিষেধ আছে?

জি না, স্যার।

কথাটা বলেই মনসুর আলীর একটু খারাপ লাগল। কারণ তিনি এই মানুষটাকে নিয়ে মজা করছেন। বিচিত্র মানুষদের নিয়ে সবাই মজা করে। এটা এদের স্বাভাবিক পরিণতি। কিছুদিনের মধ্যেই হয়তো দেখা যাবে অফিসের সবাই একে ডাকছে–পোকাবাবু। তিনি আলতাফ সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিয়েছেন। নির্বিরোধি লোক। অফিসের কাজে অতিদক্ষ। কাজকর্ম ফেলে রেখেই এই লোকটি যদি পোকা পোকা করতো তাহলে ভিন্ন কথা ছিল। তা তো করছে না। পোকা হল লোকটার পাষ্ট টাইম।

আলতাফ সাহেব।

জ্বি স্যার।

আপনার এই পোকার ব্যাপারটা কতদিনের? অর্থাৎ কতদিন থেকে আপনি পোকাদের ব্যাপারগুলি বুঝতে পারছেন?

অনেক দিনের ব্যাপার স্যার। খুব ছোটবেলার।

বলুন তো শুনি।

আমি স্যার বলতে পারব না।

বলতে কি কোন নিষেধ আছে?

নিষেধ নেই কিন্তু বলতে ইচ্ছা করে না। এটা স্যার আমি দুলারীকেও বলি নাই।

দুলারী নামের আপনার মামাতো বোনকে আপনি সবকিছুই বলেন?

জি স্যার, বলি। হঠাৎ হঠাৎ গভীর রাত্রে আমার ঘুম ভেঙে যায়। তখন বলতে ইচ্ছা করে। শেষ পর্যন্ত বলা হয় না। আমার মনে হয় পোকারাই বাধা দেয়। ওরা তো আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা বুঝতে পারি না।

পোকারা আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে?

জ্বি স্যার করে। এই যে আপনি এত ক্যান্ডিডেট থাকতে আমাকে চাকরি দিয়েছেন। পোকাদের কারণে দিয়েছেন। পোকারা আপনাকে বাধ্য করেছে। বোর্ডের মেম্বাররা আমাকে চাকরি দিতে চায়নি। আপনি জোর করে দিয়েছেন।

আপনার তাই ধারণা?

ধারণা না স্যার, এটাই সত্যি। এই যে আপনি কালো চশমা পরে থাকেন, পোকারা সেটা করেছে।

বুঝতে পারছি না।

আপনার ঘরভর্তি ছোট ছোট পোকা। আপনি যাতে এদের দেখতে না পারেন এই জন্যে পোকারা আপনাকে কালো চশমা পরিয়ে রাখে। আপনি মনে করছেন, আপনি নিজের ইচ্ছায় কালো চশমা পরছেন। আসলে তা না।

এইগুলি পোকারা আপনাকে বলেছে?

জ্বি না স্যার, এইগুলি আমার অনুমান।

মনসুর আলী গম্ভীর গলায় বললেন, আচ্ছা যান। কাজ করুন, অনেক গল্প করা হল। আলতাফ নিজের চেয়ারে ফিরে আসামাত্র গনি সাহেব ছুটে এলেন। গলার স্বর নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বললেন, সমস্যাটা কি?

কোন সমস্যা নেই।

স্যার কি নিয়ে আলাপ করলেন?

পোকা নিয়ে।

গনি সাহেব মনে মনে বললেন, হারামজাদা, আমার সঙ্গে রসিকতা! আমি তোর পাছা দিয়ে পোকা ঢুকায়ে দেব। বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা। এমিতে অবশ্যি সহজ গলায় বললেন, আচ্ছা, আচ্ছা। পোকা নিয়ে কথা বলা খুব ভালো। বলুন, কথা বলুন।

মনসুর আলী বেলা তিনটার দিকে চোখ থেকে কালো চশমা খুললেন। তাঁর চোখ জ্বালা করতে লাগল। আলো তাঁর একেবারেই সহ্য হয় না। বেয়ারাকে বললেন জানালার পর্দা সরিয়ে দিতে। পর্দা সরোনোর পরেও ঘরে তেমন আলো হল না। কারণ জানালা বন্ধ এবং জানালার কাঁচে নীল রঙ করা। জানালা খুলতে হলে এয়ারকুলার বন্ধ করতে হয়। মনসুর আলী এয়ারকুলার বন্ধ করে জানালা খুলতে বললেন। জানালা খোলা খুব সহজ ব্যাপার হল না। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় সব জং ধরে গেছে। মিস্ত্রী ডাকিয়ে জানালা খুলতে হল। মনসুর আলী তার রিভলভিং চেয়ারে বসে দেখলেন, সারি সারি পোকা তাঁর টেবিলের পা বেয়ে উপরের দিকে উঠছে। তার প্রথমে মন হল পিপড়া। এরা বর্ষার সময় ডিম নিয়ে শুকনো আশ্রয়ের খোঁজে যায়। ভাল করে লক্ষ করে দেখলেন, পিপড়া না, অন্য কোন পোকা। লালচে রঙ। দশটা করে পা। শুধু যে টেবিলেই পোকা তা না। মেঝেতে পোকা। দেয়ালে পোকা। দেয়ালের পোকাগুলির রঙ সাদা। দেয়ালের রঙের সঙ্গে মিশে আছে, খুব ভাল করে লক্ষ না করলে বোঝাই যায় না! মেঝেতেও পোকা। এদের রঙ আবার নীলচে। মেঝের কার্পেটের সঙ্গে সেই রঙের কিছু মিল আছে। তাঁর মাথা ধরে গেল। প্রচণ্ড মাথা ধরল। মাথাধরার অবশি যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে। অনেকদিন পর চোখে কড়া আলো এসে লেগেছে। নিয়মের ব্যতিক্রম করে মনসুর আলী আজ অফিস ছুটি হওয়ার এক ঘণ্টা আগেই বাড়ি চলে গেলেন।

.

০৮.

আলতাফ বাড়ি ফিরে দেখে দুলারী শুকনো মুখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে। আলতাফ বলল, কি হয়েছে? দুলারী কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, কিছু হয়নি। আলতাফ বলল, তুমি আজ কলেজে যাও নাই?

কলেজে কি করে যাব? বাসায় কত কাণ্ড হচ্ছে।

কি কাণ্ড?

বাবার মাখা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে।

ও আচ্ছা।

আলতাফ এমনভাবে ও আচ্ছা বলল যেন মাথা পুরোপুরি খারাপ হয়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। রোজই হয়। দুলারী বলল, তুমি তাড়াতাড়ি একজন ডাক্তারের কাছে যাও।

আচ্ছা।

আমিও যাব, বাবার কি হয়েছে ডাক্তারকে বুঝিয়ে বলব। তুমি বলতে পারবে না। বাবাকে সঙ্গে নেয়া যাবে না।

আচ্ছা।

কোন্ ডাক্তারের কাছে যাওয়া যায় বল জে?

বিধুবাবু পাড়ার হোমিওপ্যাথি। ভাল ডাক্তার। রোগির ভিড় লেগেই আছে। আগে তাঁর ফী ছিল পাঁচ টাকা। সম্প্রতি দশ টাকা করেছেন। তবে পুরানো রোগিদের বেলায় এখনো পাঁচ টাকা।

.

বিধুবাবু দুলারীকে দেখেই বললেন, তোর বাবার গলার কাটা দূর হয়েছে তো? গলার কাটার একটাই অষুধ। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাশাস্ত্রে গলার কাটার আর কোন অষুধ নেই।

বিধুবাবুর এই এক সমস্যা–একবার কোন অষুধ দিলে বছরের পর বছর মনে থাকে। চার-পাঁচ বছর পরেও বিধুবাবুর সঙ্গে যদি দুলারীর দেখা হয় তিনি হাসিমুখে বলবেন, তোর বাবার গলার কাঁটাটার অবস্থা কি?

তাঁর অষুধে কাঁটা দূর হয়নি এটা বললে ঘণ্টাখানিক বক্তৃতা শুনতে হবে। দুলারী সে কারণেই প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলল। করুণ গলায় বলল, চাচা, বাবাকে একটা অষুধ দিন।

হয়েছে কি?

মাথা গরম হয়েছে। বাবা চারদিকে শুধু তেলাপোকা দেখতে পাচ্ছেন।

ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম না।

দুপুরবেলা ঘুমুতে গিয়েছেন, চাদর গায়ে দিয়েই চিৎকার শুরু করলেন, পোকা! পোকা। আমরা ছুটে গেলাম। দেখি, বাবা থরথর করে কাঁপছেন। অথচ একটা পোকাও নেই। কিন্তু বাবা চারদিকে পোকা দেখছেন।

ও আচ্ছা।

বাথরুমে যখন যান তখন সেখানেও পোকা দেখেন। বেসিনে পোকা, মেঝেতে পোকা, কমোডে পোকা, কিন্তু আমরা দেখি না।

হুঁ।

ঘুমের মধ্যেও তেলাপোকা দেখেন। বিকেলে মাথায় হাত বুলিয়ে অনেক কষ্টে ঘুম পাড়িয়েছি, হঠাৎ জেগে উঠে বললেন, আমার সারা শরীরে পোকা উঠে গেছে। দেখতে পাচ্ছিস না?

বিধুবাবু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, ও কিছু না, বিকার হয়েছে। পেট গরমের জন্যে হয়েছে। হজমের গণ্ডগোল হলে হয়। পিত্ত নষ্ট হয়ে যায়। সেখান থেকেই বিকার। আর্নিকা টু হানড্রেড একফোঁটা খাইয়ে দে, আর দেখতে হবে না। আর্নিকা হল বিকারের বাবা।

এক ফোঁটাতেই কাজ হবে?

আধা ফোঁটাতেও হবে। আধা ফোঁটা করা যায় না বলেই এক ফোঁটা। হোমিওপ্যাথির মজা এইখানেই। তাহলে এক গল্প শোন। নাইনটিন ফিফটি থ্রি-র ঘটনা …

গল্পটা আরেক দিন শুনব চাচা।

আরে শুনে যা, পরে মনে থাকবে না। আমার কাছে একবার এক রোগি এসেছেন। আমি অনেক বিচার-বিবেচনা করে তাঁকে দিলাম কেলিফস ফোর হানড্রেড। আমি তাকে বললাম, অষুধ নিয়ে যান, খেতে হবে না। দৈনিক একবার শুকবেন। এতেই রোগ আরোগ্য হবে।

হয়েছিল?

হবে না মানে? কি বলিস তুই? এটা কি এলোপ্যাথি পেয়েছিস যে ইনজেকশন দিয়ে দিয়ে শরীর মোরব্বা বানিয়ে ফেলব, তারপরেও রোগ সারবে না? তোর বাবাকে যে অষুধ দিলাম নিয়ে যা, দুটা ডোজ পড়ুক, তারপর দেখবি হানিম্যানের মাহাত্ম।

.

বিধুবাবুর অষুধ বজলুর রহমান খেতে রাজি হলেন না। রাগী গলায় বললেন, আমার কি হয়েছে? অষুধ দিচ্ছিস কেন?

দূলারী ক্ষীণ গলায় বলল, তুমি চারদিকে পোকা দেখছ এইজন্যে অষুধ।

আমাকে অষুধ দিচ্ছিস কোন বিবেচনায়? পোকাদের অষুধ দে যেন ওরা আমার সামনে না আসে।

বাবা, তুমি চোখে ভুল দেখছ।

আমি চোখে ভুল দেখছি। আর তোরা সব শুদ্ধ দেখছিস? ফাজলামির একটা সীমা থাকা দরকার। যা আমার সামনে থেকে।

দুলারী পালিয়ে গেল। বজলুর রহমান সন্ধ্যাবেলা পোকা মারার আরো সব অষুধ কিনে আনলেন। বিষাক্ত সব অষুধ। খালি হাতে স্প্রে করা যায় না। গ্লাভস পরে নিতে হয়। তিনি গ্লাভসও কিনে আনলেন। রাতে খেতে বসে ভাতের নলা মুখের কাছে নিয়ে নামিয়ে রাখলেন, মনোয়ারা বললেন, কি হয়েছে?

ভাতে তেলাপোকার গন্ধ। মুখে নেয়া যাচ্ছে না।

নতুন চালের ভাত গন্ধ হবে কেন?

সেটা আমাকে জিজ্ঞেস করছ কেন? ভাতকে জিজ্ঞেস কর।

ঘরে পোলাওয়ের চাল আছে। দেই তোমাকে চারটা ফুটিয়ে?

দাও।

বজলুর রহমান সেই চালের ভাতও খেতে পারলেন না। মুখের কাছে নিয়ে ফেলে দিলেন। ক্ষিপ্ত গলায় বললেন, এখন তো আরো বেশি গন্ধ। মনে হচ্ছে তেলাপোকা সিদ্ধ করে নিয়ে এসেছ।

রাতে কিছু না খেয়েই তিনি বিছানায় গেলেন। বালিশে মাথা রেখেই লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বলেন। মনোয়ার ভয়ে ভয়ে বললেন, কি হয়েছে?

বজলুর রহমান থমথমে গলায় বললেন, বিছানা-বালিশ ধুতে মনে থাকে না? কর কি সারাদিন? পোকার গন্ধে ঘরে থাকা যায় না।

ধোয়া একটা চাদর দেই?

কিছু দিতে হবে না।

দুলারী ভয়ে ভয়ে বলল, বাবা, তুমি বুঝতে পারছ না তোমার শরীর খারাপ করেছে। বিধু চাচার অষুধটা খেয়ে নাও। তোমার পায়ে পড়ি বাবা।

বজলুর রহমান বললেন, নিয়ে আয় তোর অষুধ!

বর্জলুর রহমান বাকি রাতটা বারান্দার চেয়ারে বসে কাটালেন। তাঁর সঙ্গে জেগে রইলেন মনোয়ারা এবং দুলারী। শুধু আলতাফ যথাসময়ে ঘুমুতে গেল। দুলারী কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, বাবার এতবড় অসুখ, তুমি দিব্যি ঘুমুতে যাচ্ছ! তোমার কি মায়া দয়া নেই?

আলতাফ হাই তুলতে তুলতে বলল, পোকাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। ওরা মামার উপর রাগ করেছিল। আমি বুঝিয়ে বলেছি! সকালবেলা ঠিক হয়ে যাবে।

দুলারী রাগ চাপতে চাপতে বলল, পোক বিষয়ে তুমি আর কোন কথা আমাকে বলবে না।

আচ্ছা।

একজন মানুষ পোকার ভয়ে মারা যেতে বসেছে আর তুমি আরাম করে ঘুমুতে যাচ্ছ।

পোকাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ওরা মানুষের ক্ষতি করে না।

কে বলল তোমাকে?

ওরাই বলেছে। ওরা জানে মানুষ খুব অসহায়, এই জন্যেই ওরা মানুষকে রক্ষা করে চলে। পোকারা যদি ঠিক করে তাহলে তারা একদিনে পৃথিবীর সব মানুষ শেষ করে দিতে পরে?

আজেবাজে কথা বলবে না তো। তোমার ঘুম দরকার, তুমি ঘুমাও।

আলতাফ ঘুমিয়ে পড়ল।

.

বিধুবাবুর আর্নিকা টু হানড্রেড অষুধের জন্যেই হোক কিংবা আলতাফের কারণেই হোক ভোরবেলায় বজলুর রহমান নিতান্তই সাধারণ মানুষ। আগ্রহ করে সকালের নাশতা খেলেন। মনোয়ার ভয়ে ভয়ে বললেন, রুটিতে তেলাপোকার গন্ধ পাচ্ছ না তো?

বজলুর রহমান ক্ষিপ্ত গলায় বললেন, সব সময় উদ্ভট কথা। রুটিতে তেলাপোকার গন্ধ হবে কেন? রুটি কি তেলাপোকার পাউডার দিয়ে বানায়?

মনোয়ারা তৃপ্তির হাসি হাসলেন।

.

০৯.

বেলা এগারোটা।

মনসুর সাহেব আলতাফকে নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে গেছেন। তাদের দুজনের সামনেই কফির মগ। আলতাফ কফিতে একটা চুমুক দিয়েই মগ নামিয়ে রেখেছে। সে কিছুতেই ভেবে পাচ্ছে না এমন কুৎসিত জিনিস মানুষ কি করে খায়।

মনসুর সাহেবের ঘর অন্ধকার। চোখে কালো চশমা। গতকাল কিছু সময় চশমা ছাড়া ছিলেন। এতেই মাথা যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। এখনো তার রেশ আছে। অফিসের কাজে মন বসছে না বলেই আলতাফকে ডেকে এনেছেন। লোকটিকে তার যথেষ্ট ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। কথা বলে আরাম পাওয়া যায়। লোকটি এতে প্রশ্রয় পেয়ে যাচ্ছে কি না কে জানে! এদের প্রশ্রয় দেয়া ঠিক না। প্রশ্রয় পেলেই মানুষ ঘাড়ে উঠে যেতে চেষ্টা করে। মনসুর সাহেব ঠিক করে রেখেছেন, আজই শেষ দিন। আর কোন গল্পগুজব হবে না।

আলতাফ সাহেব!

জি স্যার।

কফি খাচ্ছেন না যে?

ভাল লাগছে না স্যার।

অভ্যাস না থাকলে ভাল না লাগারই কথা। আপনি কি ধূমপান করেন?

জি না।

ধূমপানও অভ্যাসের ব্যাপার। অভ্যাস না থাকলে সিগারেটের ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসবে। আবার যারা অভ্যস্ত তারা পাগল হয়ে থাকে এই ধোয়াটার জন্য।

জি-স্যার।

মনসুর সাহেব সিগারেট ধরিয়ে তার রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিলেন। খানিকটা ইতস্তত করে বললেন–পোকাদের ভাষায় যে কাগজে কিছু লেখা লিখেছিলেন সেটার বিষয়বস্তু সম্পর্কে বলুন।

মনসুর সাহেব ড্রয়ার থেকে কাগজটা বের করলেন। আলতাফ কাগজটা হাতে নিল। নিচু গলায় বলল, স্যার, আমি তো ওদের সাহায্য ছাড়া পারব না।

ওদের সাহায্য নিয়েই করুন।

তাহলে আমার নিজের টেবিলে চলে যাই?

যান। লাঞ্চ টাইমে আসবেন। তখন দেখব।

আলতাফ উঠে দাঁড়াল। মনসুর সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, পোকা প্রসঙ্গে এটাই হবে আপনার সঙ্গে আমার শেষ বৈঠক।

জি আচ্ছা, স্যার।

আপনার টেবিলে একটা ফাইল পাঠিয়েছি সকালবেলায়। পেয়েছেন?

পেয়েছি স্যার।

ফাইলটা খুব জরুরি। আপনি কাজকর্ম সাবধানে করেন বলে আপনাকে পাঠানো হল। ফাইলে নোট দেয়া আছে। সেই নোট দেখে কাজ শেষ করবেন। আজ বাসায় যাওয়ার সময় ফাইলটা নিয়ে যাব।

জ্বি আচ্ছা।

মনসুর সাহেব বিরক্ত বোধ করছেন। বিরক্তিটা নিজের উপর। সামান্য বিষয় নিয়ে তিনি মাথা ঘামাচ্ছেন। সামান্য বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানো তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নয়। তিনি চোখ থেকে কালো চশমা খুললেন। চোখ জ্বালা করতে লাগল। টেবিলের পায়ে সারি সারি পোকা দেখা যাচ্ছে। অথচ কাল বেয়ারাকে বলে দিয়েছেন সারা ঘরে যেন খুব ভাল করে এরোসল স্প্রে করে দেয়। এরোসল কিনে আনার টাকাও দিয়েছেন।

আসলে এই ঘরটাই স্যাঁতস্যাঁতে। ট্রপিকেল দেশের একটা ভেজা ঘরে পোকা থাকবেই। ঘরের কার্পেট রোদে দেয়া দরকার। আজ দেয়া যেত। আকাশ মেঘলা হয়ে আছে, বৃষ্টি নামতে পারে। তাকে অপেক্ষা করতে হবে রোদের জন্যে। কড়া রোদের জন্যে। কড়া রোদ উঠলেই এই ঘরের যাবতীয় আসবাব তিনি ছাদে নিয়ে যাবেন। শুধু অফিসের আসবাব না–নিজের বাড়ির আসবাবও। বাড়িতেও একই অবস্থা। গতকালই প্রথম লক্ষ করলেন।

তিনি আলো সহ্য করতে পারেন না। কাজেই বাড়িও অন্ধকার করে রাখেন। চোখের সমস্যাটা দীর্ঘদিন ধরে বিব্রত করছে। দেশের এবং বিদেশের অনেক ডাক্তারই দেখিয়েছেন। সর্বশেষ যিনি দেখেছেন তার নাম প্রফেসর জেনিংস। আমেরিকান ডাক্তার। তিনি এক পর্যায়ে বললেন, তোমার চোখে কোন ত্রুটি নেই। সমস্যাটা মানসিক। তুমি একজন মানসিক রোগের ডাক্তারের সঙ্গে কথা বল। মনসুর সাহেব ডাক্তারের কথায় রেগে গিয়েছিলেন। আমেরিকান ডাক্তারদের এই সমস্যা। যখন কিছু ধরতে পারে না তখন বলে বসে–সমস্যাটা মানসিক।

সেই মানসিক রোগের ডাক্তার তিনি দেখিয়েছিলেন। তিনিও কিছু ধরতে পারেননি। ধরতে পারার কথা নয়। তার জীবনে বড় কোন দুর্ঘটনা কিংবা বড় কোন আঘাতের ঘটনা ঘটেনি। প্রথম যৌবনে স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে। সে তো অনেকেরই হয়। তিনি আর বিয়ে করেননি। চোখের সমস্যা তখনি দেখা দিতে শুরু করে।

মনসুর সাহেবের চোখ জ্বালা করছে। অনেকক্ষণ হল তার চোখে চশমা নেই। চোখ জ্বালা করারই কথা। তিনি চশমা চোখে দিয়ে ডাকলেন–মকবুল।

তাঁর ব্যক্তিগত বেয়ারা মকবুল ছুটে এল।

কাল ঘরে এরোসল দিয়েছিলে?

একটা পুরা বোতল দিছি স্যার।

কাছে আস তো।

মকবুল ভয়ে ভয়ে কাছে এগিয়ে এল। মনসুর সাহেব সহজ গলায় বললেন, টেবিলের গায়ে এই যে পোকা, এদের দেখতে পাচ্ছ?

পাচ্ছি স্যার।

কি পোকা এগুলি জান?

জানি না স্যার।

একটা পরিষ্কার বোতল জোগাড় কর। বোতলে কয়েকটা পোকা ভর।

জি আচ্ছা স্যার।

মকবুল বোতল আনতে ছুটে গেল। মনসুর সাহেব টেলিফোন হাতে তুলে নিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে টেলিফোন করবেন। ভঃ ওসমান সেখানে আছেন। বিলেতে তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। ভাল পরিচয়। বিদেশের অন্তরঙ্গতা দেশে এলে থাকে না। তাদের রয়ে গেছে। মাঝে মাঝে তাদের কথা হয়। মনসুর সাহেব ঠিক করলেন ওসমানকে জিজ্ঞেস করবেন–এই পোকাগুলির নাম কি? এতে লাভ কি হবে? আপাতত তিনি কোন লাভ দেখতে পাচ্ছেন না। জানার জন্যেই জানা। মকবুল খালি বোতল নিয়ে এসেছে। বোতলে পোকা ভরার চেষ্টা করছে। ফাঁকে ফাঁকে বড় সাহেবের দিকে তাকাচ্ছে। মনসুর সাহেব খুব বিরক্তি বোধ করছেন।

.

গনি সাহেব লক্ষ্য করলেন আলতাফ চোখ বন্ধ করে আছে। দীর্ঘ সময় চোখ বন্ধ করে থাকে, তারপর চোখ খুলে–কাগজে কি-সব যেন লিখে–আবার চোখ বন্ধ করে ফেলে। গনি সাহেব এগিয়ে গেলেন।

কি করছেন আলতাফ সাহেব?

আলতাফ চোখ মেলে শান্ত গলায় বলল, এখন যান।

করছেনটা কি?

একটা জরুরি কাজ করছি।

আমি তো দেখছি চোখ বন্ধ করে আছেন, মাঝে মাঝে বিড় বিড় করছেন।

প্লীজ, এখন বিরক্ত করবেন না।

এমন কি কাজ যে চোখ বন্ধ করে থাকতে হয়। চোখ বন্ধ করে একটা কাজই ভাল করে করা যায়। তার নাম ঘুম।

গনি সাহেব, দয়া করে আমাকে বিরক্ত করবেন না।

আচ্ছা ভাই, আচ্ছা। আর বিরক্ত করব না। আপনি বড় সাহেবের পেয়ারের লোক। বিরক্ত করে শেষে কোন ঝামেলায় পড়ি! শেষে দেখা যাবে চাকবিই খতম। নো জব। ছেলেমেয়ে নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।

আলতাফ কিছু বলল না। চোখ বন্ধ করে ফেলল। তাকে পোকাদের সাহায্য নিয়ে লেখাটা শেষ করতে হচ্ছে। তারা তেমন সাহায্য করে না। একটা শব্দ বলে আবার সেটা দিয়ে অন্য শব্দ বলে। আলতাফ লিখেছে–

হে মানব সম্প্রদায়। তোমাদের জন্যে আছে অন্ধকার ভবিষ্যৎ। কারণ তোমরা অন্ধকারের জীব। তোমাদের সৃষ্টি হয়েছিল অন্ধকারের জন্যে। তোমরা সেখানেই ফিরে যাবে। ফিরে যেতে হবে শুরুতে।

একই লেখা আবার অন্যভাবে লিখতে হয়েছে। কারণ পোকারা কিছু কিছু শব্দ বদলে দিয়েছে। আলতাফ আবার লিখল–

অভিবাদন মানব সম্প্রদায়! তোমাদের জন্য আছে মঙ্গলময় অন্ধকার। কারণ তোমাদের মঙ্গল অন্ধকারে। মঙ্গলের জন্য তোমাদের সৃষ্টি। তোমরা সৃষ্টিতে ফিরে যাবে। এক বিন্দুতেই আদি ও অন্ত।

এ নিয়ে মোট চারটা অনুবাদ তৈরী হল। আলতাফ এই চারটার মধ্যে কোনটা রাখবে বুঝতে পারছে না। পোকারা বলছে–কোনটা ফেলা যাবে না। প্রতিটিই সত্য। সত্য এক ও অভিন্ন নয়। সত্যের অনেক ছবি। প্রতিটি ছবি আলাদা আলাদা সত্য।

.

১০.

ডঃ ওসমান বোতলে ভর্তি পোকাগুলির দিকে তাকিয়ে আছেন। মনসুর বললেন, এদের নাম কি?

ডঃ ওসমান হাসিমুখে বললেন, এদের নাম হল পোকা। ইনসেক্ট।

কি পোকা?

বৈজ্ঞানিক নাম চাও, না সাধারণ নাম হলেই চলবে?

সাধারণ নাম জানলেই হবে।

এরা এক ধরনের উইপোকা। উইপোকার অনেক ভ্যারাইটি আছে। এটা হল বিশেষ এক ভ্যারাইটি। এরা সাধারণত মৃত জীবজন্তুর গায়ে ঘুরে বেড়ায়। দেখতে পিঁপড়ার মত হলেও পিপড়াদের সঙ্গে তাদের খানিকটা প্রভেদ আছে। পিপড়ার মৃত জীবজন্তু খেয়ে ফেলে। এরা খায় না। শুধু ঘুরে বেড়ায়।

কেন?

কেন তা জানি না। ওদের জিজ্ঞেস করা হয়নি।

ডঃ ওসমান শরীর দুলিয়ে হাসতে লাগলেন। মনসুর সাহেব বন্ধুর হাসিতে যোগ দিতে পারলেন না। রসিকতা কখনোই তাঁকে আকর্ষণ করে না। হাসি থামিয়ে ওসমান সাহেব বললেন, মুনসুর!

হু।

হঠাৎ পোকা নিয়ে মেতেছ কেন? পোকা তোমার বিষয় না।

মানুষের বিষয় তো বদলায়। তোমার কি বদলেছে?

বুঝতে পারছি না। আচ্ছা, আরেকটা কথা–পোকাদের কি বোধশক্তি আছে? মানে চিন্তা বা কল্পনা করার ক্ষমতা আছে?

বোধ চিন্তা কল্পনা এইসব উচ্চমার্গের বিষয়ের জন্যে দরকার মস্তিষ্ক, ঘিলু। তা পোকাদের নেই বললেই হয়। ওরা বেঁচে থাকে instinct-এর উপর। ওদের চালিকাশক্তি instinct, মস্তিষ্ক নয়।

ঘিলুর পরিমাণ বেশি থাকলেই বোধ চিন্তা এবং কল্পনা এইসব বেশি থাকবে?

অবশ্যই।

গরু এবং গাধার মাথায় তো অনেকখানি মগজ থাকে। অন্তত মুরগির চেয়ে বেশি থাকে। কিন্তু গরুর বোধ বা বুদ্ধি কোনটাই মুরগির চেয়ে বেশি না।

ডঃ ওসমান কিছুক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে থেকে বললেন, তোমার মূল সমস্যাটা বল। তারপর যুক্তিতর্কে যাওয়া যাবে।

সমস্যা কিছু না।

কিছু না বললে তো হবে না। কিছু-একটা তো আছেই। What is that?

মনসুর সাহেব সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, আমাদের অফিসের একজন কর্মচারি–তার ধারণা, সে পোকাদের সঙ্গে কমুনিকেট করতে পারে। পোকার তার সঙ্গে কথা বলে।

ওসমানি সাহেব মোটেই চমকালেন না। স্বাভাবিক গলায় বললেন, পৃথিবীতে অনেক লোক আছে যারা জ্বীন, পরী বিশ্বাস করে। এদের সঙ্গে তারা কথা বলে। অনেকে আছে যারা প্রেতাত্মার সঙ্গে কথা বলে। তাতে কি যায় আসে। পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ। তাদের অতি ক্ষুদ্র এক ভগ্নাংশ কি বলছে না বলছে তা মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাদের স্থান হওয়া উচিত পাগলাগারদে।

পাগলাগারদে?

অবশ্যি পাগলাগারদে।

শুধু শুধু একটা লোক কেন বলবে–সে পোকাদের কথা বুঝতে পারে?

অন্যদের বোকা বানানোর জন্যে বলবে। তোমার অফিসের ঐ কর্মচারি তোমাকে এই কথা বলেছে, কারণ, সে তোমাকে বোকা বানাতে চেয়েছে। তার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। তুমি বোকা বনেছ। কারণ তুমি খানিকটা হলেও ব্যাপারটা বিশ্বাস করেছ।

আমার অফিসের ঐ কর্মচারিটা বোকা ধরনের। আমার মনে হয় না সে আমাকে বোকা বানাতে চায়।

তাহলে ধরে নিতে হবে–তোমার ঐ কর্মচারিটির মাথা খারাপ। কায়দা করে তাকে দু-একটা প্রশ্ন করলেই পুরো ব্যাপার বের হয়ে যাবে। তুমি কি তাকে জেরা করেছ?

না।

জেরা কর। সহজ জেরা না। ঘাঘু উকিলের জের। দেখবে সব বের হয়ে আসবে। তারপর তাকে গলাধাক্কা দিয়ে অফিস থেকে বের করে দাও। এ জাতীয় লোক প্রতিষ্ঠানের জন্যে ক্ষতিকর।

মনসুর সাহেব চুপ করে রইলেন। ওসমান সাহেব বললেন, তোমার হয়ে আমি তাকে প্রশ্ন করতে পারি। করব?

বেশ তো কর। এখনি চল আমার সঙ্গে। যাবে?

ওসমান সাহেব বললেন, যাওয়া যেতে পারে।

.

তাঁরা অফিসে পৌঁছলেন পাঁচটার কিছু পরে। আলতাফকে পাওয়া গেল না। সে ঠিক পাঁচটায় অফিস থেকে বের হয়ে গেছে।

ওসমান সাহেব বললেন, লোকটার বাসায় যাওয়া যায়। সেটাই ভাল হবে। বাসার ঠিকানা জানা আছে?

মনসুর সাহেব বললেন, ঠিকানা বের করা কোন সমস্যা না। তুমি কি সত্যি যাবে?

হ্যাঁ যাব।

চল যাই। যদিও আমার এখন মনে হচ্ছে আমরা খানিকটা বাড়াবাড়ি করছি।

ওসমান সাহেব কিছু বললেন না। তার মুখের বিরক্ত ভাব আরো স্পষ্ট হল। তিনি কোন রকম আগ্রহ বোধ করলেন না। তবে তা মনসুর সাহেবকে জানাতে চান না। ক্ষমতাবান বন্ধুদের সামান্য আগ্রহকেও বড় করে দেখতে হয়। এটাই নিয়ম। একটা লোক পোকার সঙ্গে কথা বলে–ব্যাপারটাই হাস্যকর। হাস্যকর জেনেও তিনি প্রশ্রয় দিচ্ছেন, কারণ মনসুরকে প্রশ্রয় দিতে হয়। সবাই দেবে। সমাজ এটা ঠিক করে দিয়েছে।

৩. দরজার কড়া নড়ছে

১১.

অনেকক্ষণ ধরে দরজার কড়া নড়ছে। সন্ধ্যাবেলা কেউ এলে বজলুর রহমান অত্যন্ত বিরক্ত হন। বেকুব লোকজন বেছে বেছে সন্ধ্যাবেলা মানুষের বাসায় যায়। এদের কানে ধরে ঠাশ করে মাথায় একটা বাড়ি দেয়া উচিত। সভ্য সমাজে বাস করে এই কাজ করা সম্ভব না। বজলুর রহমান দরজা খুললেন। দূজন লোক দাঁড়িয়ে। একজনের চোখে আবার সন্ধ্যাবেলাতেই কাল চশমা।

এটা কি আলতাফ সাহেবের বাসা?

বজলুর রহমান বিরক্ত গলায় বললেন, এটা আলতাফের বাসা হবে কেন? এটা আমার বাসা। বাসাও না, এটা হল বাড়ি। আমার নিজের বাড়ি।

আলতাফ সাহেব কি ভাড়াটে?

হ্যাঁ, ভাড়াটে বলা যায়। তবে ওর কাছ থেকে ভাড়া নেই না। আমি ওর মামা। আপনারা কে?

আমরা উনার অফিসেই আছি।

কলিগ?

জ্বি, কলিগ। আলতাফ সাহেব কি বাসায় আছেন?

না, নেই। কাঁচা বাজারে পাঠিয়েছি। ঘরে দুদিন ধরে বাজার নেই। আপনারা বসুন, এসে পড়বে।

আসতে কি দেরি হবে?

দেরি হবার কথা না। তবে গাধা টাইপের ছেলে তো–হতেও পারে। কিছুই বলা যায় না।

আমরা না হয় কিছুক্ষণ বসি?

বসুন।

বজলুর রহমান বসার ঘর খুলে দিলেন। ঘর অন্ধকার। বজলুর রহমান বিরক্ত গলায় বললেন, অন্ধকারে বসে থাকতে হবে। ইলেকট্রিক লাইনে গণ্ডগোল হয়েছে। বাতি জ্বলে না। গাধাটাকে বলেছি একটা মিস্ত্রি ডেকে আনতে। সেটা মনে থাকে না। আপনারা বসুন, দেখি ঘরে মোম-টোম কিছু আছে কিনা।

মনসুর সাহেব বললেন, আপনাকে ব্যস্ত হতে হবে না।

ব্যস্ত হচ্ছি না। ঘরে মোমবাতি আছে কি না সেটা খোঁজা কোন ব্যস্ততা না। আপনারা চা খাবেন?

ওসমান সাহেব বললেন, অসুবিধা না হলে খেতে পারি।

অসুবিধা তো হবেই। সন্ধ্যাবেলা হল কাজকর্মের সময়, নামাজের সময়। তার উপর ঘরে নেই কাজের লোক। অসুবিধা হবে না তো কি?

তাহলে থাক।

থাকবে কেন? চা খেতে চেয়েছেন, খাবেন। অসুবিধা হলেও ব্যবস্থা হবে।

বজলুর রহমান ঘর ছেড়ে বের হয়ে গেলেন। ওসমান সাহেব নিছু গলায় বললেন, ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার। এই পরিবারের একজন সদস্য পোকার সঙ্গে কথা বলবে, এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। এটাই স্বাভাবিক।

মোমদানে মোমবাতি নিয়ে ঘরে ঢুকল দুলারী। মনসুর সাহেব এবং ড: ওসমান দুজনই চমকে উঠলেন। অসম্ভব রূপবতী একজন তরুণী। মোমবাতি হাতে ধরে ঢুকতেই ঘরের চেহারা পাল্টে গেল। দুলারী বলল, ও এসে পড়বে। আপনারা একটু বসুন। আমি চা দিচ্ছি। বাবা নামাজ পড়ছেন। আপনাদের কিছুক্ষণ একা একা বসতে হবে।

মনসুর সাহেব বললেন, কোন অসুবিধা নেই।

দুলারী বলল, আপনারা কি ওর অফিস থেকে এসেছেন?

জ্বি।

অফিসে কি কোন ঝামেলা হয়েছে?

না, কোন ঝামেলা হয়নি। আপনার পরিচয় কি জানতে পারি?

দুলারী লজ্জিত গলায় বলল, আমি ওর স্ত্রী।

তারা দুজন আবারো একটা ধাক্কা খেলেন। বড় ধরনের ধাক্কা। আলতাফ টাইপের লোকদের যেন এ রকম স্ত্রী মানায় না। এরকম স্ত্রী থাকা উচিতও নয়। এদের স্ত্রীরা হবে হাবাগোবা ধরনের। কালো, রোগ মুখে মেছেতার দাগ। ঘরের কাজ সারতে সারতে যাদের নাভিশ্বাস উঠবে। যাদের কোলে সব সময় রোগভোগা একটা শিশু থাকবে। যার একমাত্র লক্ষ্য থাকবে মায়ের বুকের দুধের দিকে।

.

দুলারী চা নিয়ে ঢুকল। শুধু চা। মনসুর সাহেব লক্ষ করলেন, কাপ পরিস্কার, পিরিচে চা জমে নেই। তারচেয়েও বড় কথা–তিনটা কাপ। মেয়েটিও বোধহয় তাঁদের সঙ্গে চা খাবে। এইসব পরিবারে এ ধরনের ভদ্রতা ঠিক আশা করা যায় না। এরা সচরাচর সর-ভাসা ঠাণ্ডা চা কাজের লোক দিয়ে পাঠিয়ে দেয়। একটা পিরিচে থাকে মিয়ানো টক স্বাদের কিছু বাসি চানাচুর।

মনসুর সাহেব বললেন, সরি, আপনাকে কষ্ট দিলাম।

দুলারী বলল, কষ্ট কিসের? কোন কষ্ট না। বলেই খানিকটা অস্বস্তির সঙ্গে বলল, ওর অফিসে কোন ঝামেলা হয়নি তো?

মনসুর সাহেব বললেন, না, কোন ঝামেলা হয়নি। আপনি কোন দুশ্চিন্তা করবেন না।

দুলারী বলল, ওকে নিয়ে আমি খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে খাকি।

ওসমান সাহেব কৌতূহলী গলায় বললেন, দুশ্চিন্তা কেন?

এম্নি দুশ্চিন্তা।

ওসমান সাহেব খানিকটা ঝুঁকে এসে বললেন, উনার পোকার ব্যাপারটা কি আপনি জানেন?

দুলারী হকচকিয়ে গেল। নিজেকে সে চট করে সামলে নিয়ে বলল, ঐসব কিছু না।

আপনার সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা হয় না?

মাঝে মধ্যে বলে।

কি বলে?

দুলারী শংকিত গলায় বলল, পোকা নিয়ে কি অফিসে কোন সমস্যা হয়েছে?

মনসুর সাহেব বললেন, না, কোন সমস্যা হয়নি। উনি বলছিলেন, পোকাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ আছে। শুনে আমি কৌতূহল বোধ করছি। এরকম তো সাধারণত শোনা যায় না। ব্যাপারটা কি সত্যি?

জানি না।

আপনার সঙ্গে এ নিয়ে কোন আলাপ হয় না?

ও কথাটথা বিশেষ বলে না।

আপনাদের বিয়ে হয়েছে কতদিন হল?

অল্পদিন।

আচ্ছা, আলতাফ সাহেবের এক মামাতো বোন আছে–দুলারী। সে কি এ বাড়িতে আছে?

দুলারী চমকে উঠে বলল, আমার নামই দুলারী।

মনসুর সাহেব অস্বস্তির সঙ্গে বললেন, আচ্ছা আচ্ছা। আলতাফ সাহেব তার মামাতো বোনের কথা আমাকে বলেছিলেন, কিন্তু তাকেই বিয়ে করেছেন তা বলেননি।

ও নিজ থেকে কিছু বলবে না। জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেবে। জিজ্ঞেস না করলে চুপ করে থাকবে।

আপনি পোকাদের ব্যাপারে তাঁকে কিছু জিজ্ঞেস করেননি?

করেছি।

উনি কি বলেন–আসলেই পোকারা তাঁর সঙ্গে কী বলে?

হুঁ।

আপনি তাঁর কথা বিশ্বেস করেন?

হুঁ।

কেন বিশ্বেস করেন? আপনি কি কোন প্রমাণ পেয়েছেন?

না।

তাহলে বিশ্বেস করেন কেন?

ও তো কখনো মিথ্যা কথা বলে না।

আলতাফ এই পর্যায়ে বাজারের ব্যাগ হাতে ঘরে ঢুকল। মনসুর সাহেবেকে দেখে সে মোটেই অবাক হল না। যেন এটাই স্বাভাবিক। অফিসের বড় সাহেবকে সন্ধ্যাবেলা ঘরে বসে থাকতে দেখা যেন খুবই সাধারণ ঘটনা। মনসুর সাহেবই আগ বাড়িয়ে কথা বললেন, আলতাফ সাহেব, ভাল আছেন?

জ্বি স্যার।

বাজার করে ফিরলেন?

জি স্যার।

আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্যে এসেছি। আমার বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি। উনি ডঃ ওসমান। মাস্টারি করেন। আপনি বরং হাত-মুখ ধুয়ে আসুন।

জ্বি আচ্ছা, স্যার।

আমরা অসময়ে এসে আপনার অসুবিধা করলাম না তো?

জ্বি না।

মনসুর সাহেব কৈফিয়ত দেবার মত ভঙ্গিতে বললেন, পোকা-মাকড় হচ্ছে আমার বন্ধুর বিষয়। সে এই বিষয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়। তার আগ্রহেই আপনার কাছে আসা।

জ্বি আচ্ছা, স্যার।

যান, আপনি হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আসুন।

আলতাফ চলে গেল। আলতাফের সঙ্গে দুলারীও বের হয়ে গেল। তার অনেক কাজ। রান্না চড়াতে হবে। ঘরে মসলা নেই। মসলা পিষতে হবে। বাজারের গুঁড়া মসলা বজলুর রহমান খান না। ঘরে কাজের লোক নেই।

ডঃ ওসমান মনসুর সাহেবের দিকে ঝুঁকে এসে বললেন, বেকুব ধরনের মানুষ বলে মনে হচ্ছে।

মনসুর কিছু বললেন না। ডঃ ওসমান বললেন, এদের পেছনে সময় নষ্ট করার কোন মানে হয় না।

চলে যেতে চাও?

এসেছি যখন বসি।

আলতাফ এসে সামনে বসল। তার বসার ভঙ্গিতে কোন রকম দ্বিধা বা সংকোচ দেখা গেল না। ডঃ ওসমান হাসিমুখে বললেন, আলতাফ সাহেব, আপনার পোকাদের বিষয়ে কিছু বলুন।

কি বলব?

যা বলতে চান বলুন।

কিছু বলতে চাই না, স্যার।

বলায় সমস্যা আছে?

জ্বি না। ইচ্ছ! করে না।

ওসমান সাহেবের ভ্রু কুঁচকে উঠল। লোকটা যে নির্বোধ এ বিষয়ে তিনি পুরোপুরি নিঃসন্দেহ হলেন। একমাত্র নির্বোধরাই অফিসের বড় সাহেবের সামনে এমন ভঙ্গিতে কথা বলার সাহস পায়। ওসমান সাহেব কঠিন গলায় বললেন, আমি শুনেছি পোকাদের সঙ্গে আপনার ভাবের আদান-প্রদান হয়।

আলতাফ চুপ করে রইল। ওসমান সাহেব অসহিষ্ণু স্বরে বললেন, জবাব দিচ্ছেন না কেন? ওদের চিন্তা-ভাবনা আপনি নাকি বুঝতে পারেন?

সবসময় পারি না। ওরা যখন ইচ্ছা করে তখনই শুধু বুঝি। ওরা ইচ্ছা না করলে পারি না।

ওদের কথা বুঝতে হলে তো ওদের বুদ্ধিবৃত্তি আপনার স্তরে আসতে হবে।

ওদের অনেক বুদ্ধি, স্যার।

তাই নাকি?

জি।

ওদের বুদ্ধির একটা প্রমাণ দিতে পারেন?

আলতাফ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আমার বাসায় যে তেলাপোকা আছে সে যে কোন সময় আমেরিকার একটা তেলাপোকার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। মানুষ তা পারে না।

ডঃ ওসমান হেসে ফেলতে যাচ্ছিলেন। অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বললেন, তাহলে তো ইচ্ছা করলে আপনি যে কোন মুহূর্তে একটা খবর তেলাপোকার মাধ্যমে আমেরিকায় পাঠিয়ে দিতে পারেন। আপনি একটা কাজ করুন তো …

কি কাজ?

আমার এক ভাই থাকে ক্যালিফোর্নিয়ার পেনসিলভেনিয়ায়। তার ঠিকানা দিচ্ছি। আপনি তেলাপোকার মাধ্যমে খবর এনে দিন ওদের ছেলেমেয়ে কটি। তাহলে বুঝব আপনার তেলাপোকার ক্ষমতা আছে। পারবেন না?

জি না, স্যার।

পারবেন না কেন?

আমরা যেমন ঠিকানা বলি–এত নং বাড়ি, এই রাস্তার নাম–সেটা তেলাপোকাদের অজানা। আমি আমেরিকা বললেও কিছু বুঝবে না। তারা জায়গা চিনে গন্ধ দিয়ে। ওদের কাছে এক এক জায়গার এক এক রকম গন্ধ।

ও আচ্ছা, একেক জায়গার একেক রকম গন্ধ।

জ্বি স্যার।

ভাল। নতুন জিনিস জানা গেল।

এরা মানুষের চিন্তা-ভাবনা কাজ-কর্ম নিয়ন্ত্রণ করে।

এটাও নতুন তত্ত্ব। আপনি বলতে চাচ্ছেন যে, আমরা কি করব না করব তা ঠিক করে দেবে পোকারা?

জ্বি স্যার। এরা খুব সূক্ষভাবে করে। চট করে ধরা যাবে না।

আপনার মত দুই-একজন লোক শুধু ধরতে পারে, তাই না?

জ্বি।

মনসুর সাহেব এতক্ষণ চুপ করেছিলেন। তিনি চুপ করে থাকবেন বলেই ভেবেছিলেন, এখন আর কথা না বলে পারলেন না। বিরক্ত গলায় বললেন, তাহলেতো আলতাফ সাহেব, আমাদের ধরে নিতে হয় যে পোকাদের প্রচণ্ড ক্ষমতা।

ঠিক বলেছেন, স্যার। অসম্ভব ক্ষমতা। একবার পৃথিবী জুড়ে প্লেগ মহামারি হল। কোটির উপর মানুষ মারা গেছে। পোকারাই এটা করেছে।

আমি যতদূর জানি প্লেগ ছড়িয়েছিল ইঁদুর।

প্লেগের জীবাণু এনে দিয়েছিল তেলাপোকারা। তারা ইঁদুর দিয়ে ছড়িয়ে দিয়েছে। পোকার মানুষদের যেমন নিয়ন্ত্রণ করে, অন্য জীব-জন্তুদেরও নিয়ন্ত্রণ করে।

ওসমান সাহেব হাসি চাপার জন্য কয়েকবার কাশলেন। আলতাফ বলল, স্যার, এই পৃথিবীটা পোকাদের। ওরা আমাদের থাকতে দিচ্ছে বলেই থাকতে পারছি। অর্থাৎ আমরা ওদের করুণায় বেঁচে আছি।

ওসমান সাহেব বললেন, আপনার কথা শুনে আনন্দিত হলাম। মজা পাওয়া গেল। শেষ প্রশ্ন–পোকারা এইসব কথা বলার জন্যে আপনাকে খুঁজে বের করল? আরো তো লোক ছিল–না-কি তাদের মতে আপনিই একমাত্র জ্ঞানী ব্যক্তি? আপনাকে ওদের পছন্দ করার কারণ কি?

ওদের জিজ্ঞেস করিনি।

সময় পেলে জিজ্ঞেস করবেন। আজ উঠি?

জ্বি আচ্ছা, স্যার।

উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ওসমান সাহেব বললেন, পোকাদের একটা ডেমনস্ট্রেশন হলে মন্দ হত না। আলতাফ সাহেব পোকাদের সঙ্গে কথা বলছেন। আমরা শুনছি এরকম একটা কিছু। পারবেন আলতাফ সাহেব?

আলতাফ বলল, জ্বি না স্যার।

কিছু মনে করবেন না আলতাফ সাহেব। আমার ধারণা, আপনি অন্যদের বোকা বানিয়ে আনন্দ পান। এই কাজটি করবেন না।

আলতাফ কিছু বলল না। ওসমান সাহেব বললেন, আপনার উচিত কোন সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে কথা বলা। মানুষকে ভাওতা দিয়ে বেড়ানো এক ধরনের অসুস্ততা। বুঝতে পারছেন?

পারছি স্যার। কিন্তু আমি সত্যি কথাই বলছি।

সত্যি কথা বললে তো ভালই।

ঠিক তখন উড়তে উড়তে ঘরে একটা তেলাপোকা ঢুকল। পোকাটা বসল ওসমান সাহেবের পায়ের কাছে।

আলতাফ চমকে উঠে বলল, ওকে স্যার মারবেন না।

ওসমান সাহেব পোকাটাকে মারতেন না। পোকা মেরে আনন্দ পাবার বয়স তার নেই। কিন্তু আলতাফের কথা শুনেই সম্ভবত–জুতো দিয়ে পিষে ফেললেন।

পথে নেমেই ওসমান সাহেব বললেন, মনসুর, তোমার প্রথম কাজ হচ্ছে–এই মহা বেকুবকে তুমি অফিস থেকে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে। তোমার দ্বিতীয় কাজ হচ্ছে–আমার সময় নষ্ট করার জন্য জরিমানা দেবে। বড় ধরনের জরিমানা।

.

১২.

কড় সাহেব জরুরি একটা ফাইল দিয়েছিলেন। সেই ফাইল আলতাফ ড্রয়ারে তালাবন্ধ করে রেখেছিল। আশ্চর্যের ব্যাপার, ফাইলটা নেই! ড্রয়ার ঠিকই তালাবন্ধ। ড্রয়ারের চাবি আলতাফের কাছে।

গনি সাহেব পান চিবুতে চিবুতে কাছে এসে বললেন, সমস্যাটা কি?

আলতাফ বলল, ফাইল পাচ্ছি না।

তালাবন্ধ ছিল?

হুঁ।

তাহলে তো রিবাট সমস্যা। চিন্তার বিষয়। ভাল করে চিন্তা করে দেখুন–বাসায় নিয়ে যাননি তো?

না।

এ অফিসে তো এরকম কখনো হয়নি। বদরুল সাহেবকে ইনফর্ম করুন।

তাকে ইনফর্ম করব কেন?

গনি সাহেব বিরক্তমুখে বললেন, আপনি তো ভাই বড় প্যাঁচালের লোক। তাকে ইনফর্ম করবেন না কেন? তিনি হচ্ছেন আপনার সেকশনের চার্জে। যে কোন সমস্যা হলে আগে তাকে বলতে হবে। না-কি আপনি ঘোড়া ডিঙ্গিয়ে ঘাস খাবেন? সরাসরি চলে যাবেন বড় সাহেবের কাছে? আপনার নৌকা তো আবার বড় খুঁটিতে বাঁধা।

আলতাফ ব্যাপার কিছুই বুঝতে পারছে না। কেউ কি ড্রয়ার খুলে ফাইল নিয়ে গেছে? কেন নেবে? স্টোর ইন-চার্জের কাছে বার ড্রয়ারেরই চাবি থাকে। তিনি কি কোন কারণে খুলেছেন? অসম্ভব কিছু না। বড় সাহেব হয়ত ফাইল চেয়েছেন। স্টোর-ইন-চার্জ খুলে দিয়েছেন। এ ছাড়া আর কি হতে পারে?

আলতাফ স্টোর-ইন-চার্জ খায়রুল কবিরকে খুঁজে বের করল। খায়রুল কবির আকাশ থেকে পড়লেন।

কি বলছেন আপনি! আমি কেন আপনার ড্রয়ার খুলব? এ ধরনের এলিগেশন সাবধানে দেবেন।

আমি এলিগেশন দিচ্ছি না। জানতে চাচ্ছি।

ব্যাপার একই। বড় সাহেবের সঙ্গে দহরম-মহরম বলে ধরাকে সরা দেখছেন? পেয়েছেন কি আপনি? কী ভাবেন আমাকে?

আপনি শুধু-শুধু রাগ করছেন।

আপনার সঙ্গে কোন কথা বলতে চাচ্ছি না। দয়া করে বিদেয় হোন। আপনার সাহস দেখে অবাক হচ্ছি। আমাকে সরাসরি চোর বললেন–

চোর তো বলিনি –।

অবশ্যই বলেছেন। ভেবেছেন কি আপনি?

আলতাফ হতভম্ব হয়ে গেল। এই লোকটা এমন করছে কেন? কেন শুধু শুধু রেগে যাচ্ছে? সে নিজের জায়গায় ফিরে এল। কি করবে বুঝতে পারছে না। বড় সাহেবকে জানানো উচিত। সাহসে কুলুচ্ছে না। ভয়-ভয় লাগছে। আলতাফ ড্রয়ার বন্ধ করে ক্যান্টিনের দিকে রওনা হল। ক্যান্টিনে সে কখনো আসে না। এই প্রথম আসা। কোণার দিকে একটা খালি টেবিলে একা একা বসে রইল। ক্যান্টিনের বেয়ারা এক কাপ চা না চাইতেই দিয়ে গেল। অসময়ে চা খাওয়া তার অভ্যাস নেই। তবু সে চায়ে চুমুক দিচ্ছে। কিছুতেই ভেবে পাচ্ছে না অফিসের মানুষগুলি তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছে কেন। সে তো কারো সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে না।

এই যে আলতাফ সাহেব। কি করছেন একা একা?

গনি সাহেব চা নিয়ে এগিয়ে এলেন।

আলতাফ সাহেব! বসব আপনার সঙ্গে?

বসুন।

আপনি তো দেখি বিরাট ভেজাল লাগিয়ে ফেলেছেন।

কি ভেজাল লাগিয়েছি?

স্টোর-ইন-চার্জ খায়রুল কবির সাহেবকে আপনি নকি চোর বলেছেন? উনি তো দারুণ রেগেছেন। আমি ঠাণ্ডা করার চেষ্টা করেছি। লাভ হয়নি। উনি বোধহয় বড় সাহেবের কাছে কমপ্লেইন করতে যাবেন। আমার সে রকম মনে হল।

আলতাফ কিছু বলল না। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। গনি সাহেব বললেন, আপনার তো চিন্তার কিছু নেই। বড় সাহেব হলেন আপনার খাতিরের লোক। সিগারেট খাবেন নাকি আলতাফ সাহেব?

আমি সিগারেট খাই না।

খেয়ে দেখুন। টেনশানের সময় কাজে লাগে। ব্রেইন পরিষ্কার হয়। এই সময় ব্রেইনটা পরিষ্কার থাকা দরকার। বড় সাহেবকে ফাইলের ব্যাপারে কি বলবেন ভেবে রাখুন। উনি দারুণ রেগেছেন। আপনাকে এক্ষুণি ডেকে পাঠাবেন।

গনি সাহেব সিগারেট ধরিয়ে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তৃপ্তি ষোলআনা হচ্ছে না। আলতাফ তেমন ভয় পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। আশ্চর্য মানুষ! ভয়ে অস্থির হয়ে যদি তাকে ধরে পড়ত, কান্নাকাটি করত, সে সামাল দিতে চেষ্টা করত। হারানো ফাইলও তো মাঝে মাঝে পাওয়া যায়। আলতাফ পাথরের মত মুখ করে বসে আছে। ভয়-ভীতির কোন লক্ষণ নেই। চাকরি এখনো কনফার্ম হয়নি। এক কথায় চাকরি চলে যাবে–সেই চিন্তাও মাধ্যায় নেই।

নিন, সিগারেট নিন আলতাফ সাহেব।

আমি সিগারেট খাই না।

আহ, একটা খেলে কিছু হবে না।

জ্বি-না।

আচ্ছা থাক। খেতে হবে না। আর শুনুন, এত চিন্তা করবেন না। চিন্তা করে লাভ ত কিছু নেই। যা হবার হবেই।

আলতাফ ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। গনি সাহেব বললেন, যাচ্ছেন কোথায়? বড় সাহেবের কাছে? নিজ থেকে যাওয়া ঠিক হবে না। বড় সাহেব ডাকুক, তারপর যাবেন। এর মধ্যে ভেবে ভেবে একটা প্ল্যান অব একশান বের করুন।

বড় সাহেবের খাস বেয়ারা মকবুল এসে ঢুকল। গনি সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, স্যার আপনেরে ডাকে।

গনি সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, আমাকে কেন? তুমি বোধহয় ভুল করছ। উনি আলতাফ সাহেবকে ডাকেন।

জে না। আপনেরে ডাকেন। স্পষ্ট কইরা বলছেন–গনি।

.

গনি সাহেব দরজার বাইরে থেকে বললেন, স্যার আসব?

বড় সাহেব বললেন, ইয়েস! কাম ইন প্লীজ।

তিনি ঘরে ঢুকে হাসিমুখে বললেন, কেমন আছেন স্যার?

বড় সাহেব তার উত্তর না দিয়ে বললেন, বসুন।

তিনি বসলেন। বসতে বসতে তাঁর মনে হল–কিছু একটা হয়েছে। দুয়ে দুয়ে চার মিলছে না। ব্যাপারটা কি?

মনসুর সাহেব ফাইলে চোখ বুলাচ্ছিলেন। ফাইল বন্ধ করে তাকালেন। তাঁর চোখ কালো চশমার আড়ালে বলে গনি সাহেব বড় সাহেবের চোখের ভাব ধরতে পারলেন না। তার অস্বস্তি আরো বাড়ল।

গনি সাহেব?

জ্বি স্যার।

ব্যাপারটা কি বলুন তো?

কি ব্যাপার স্যার? আমি তো কিছু জানি না।

আমি আলতাফ সাহেবকে একটা জরুরি ফাইল দিয়েছিলাম, সেটা জানেন?

জি-না স্যার। আমি তো কিছুই জানি না। কি ফাইল?

মনসুর আলি জবাব দিলেন না। স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন। গনি সাহেব সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেলেন, তিনি একটা বড় বোকামি করেছেন। ফাইল সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না তা বলা ঠিক হয়নি। কারণ এর মধ্যে স্টোর-ইন-চার্জ খায়রুল কবির নিশ্চয়ই বড় সাহেবের সঙ্গে কথা বলেছে। কথা প্রসঙ্গে তার কথা আসতে পারে। আসাটাই স্বাভাবিক।

গনি সাহেব!

জ্বি স্যার।

ফাইল সম্পর্কে আপনি কিছুই জানেন না দেখে অবাক হচ্ছি। একটু আগে খায়রুল কবির এসেছিলেন। তিনি বললেন, আপনি এই ফাইল হারানোর ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তিত।

ও আচ্ছা। আমি স্যার কিছুক্ষণ আগেই জেনেছি। আগে কিছুই জানতাম না। আমি ভেবেছি, আপনি জানতে চাচ্ছেন আগে কিছু জানতাম কি না।

মনসুর সাহেব ড্রয়ার খুলে সিগারেটের কেইস থেকে সিগারেট বের করলেন। গনি সাহেব বললেন, আমি স্যার খুব চিন্তা করছি–এটা হল কি করে? ড্রয়ারে তালাবন্ধ করা ফাইল হাওয়ায় তো উড়ে যেতে পারে না।

আপনার কি মনে হয়? কোথায় গেছে?

বুঝতে পারছি না। তবে আলতাফ সাহেব বাসায় নিয়ে যেতে পারেন। মাঝে মাঝে তিনি বাসায় ফাইল নিয়ে যান।

তাই নাকি?

জ্বি।

ও আচ্ছা।

স্যার, আমি কি চলে যাব?

একটু বসুন।

মনসুর আলি সিগারেট টানতে লাগলেন। গনি সাহেব এই ঠাণ্ডা ঘরে বসেও ঘামতে লাগলেন।

গনি সাহেব!

জ্বি স্যার।

ফাইলটা খুব জরুরি। আজ সন্ধ্যার মধ্যে আপনি এটা বের করে দেবেন।

আমি কোত্থেকে বের করব?

আপনি খুব কর্মঠ মানুষ। আপনার বুদ্ধিশুদ্ধিও পরিষ্কার। আপনি কিভাবে বের করবেন তা আপনি জানেন।

স্যার, আপনার কথায় আমি মর্মাহত।

মর্মাহত হবার কিছু নেই। এখন যান–ফাইলের ব্যাপারে ব্যবস্থা করুন।

গনি সাহেব বের হয়ে এলেন। তাঁর কান ঝা ঝা করছে। বড় সাহেব লোকটি ক্ষমার অযোগ্য একটা কাজ করেছে। সরাসরি চোর বলেছে। এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। কত বড় সাহস! এত সাহস সে পেল কোথায়? খায়রুল কবির কিছু বলেছে নাকি? বলে ফেলতে পারে। বোকা টাইপের লোক। মনে হচ্ছে, বড় সাহেব তাকে প্যাঁচে ফেলে দু-একটা প্রশ্ন করেছেন, আর সে ভর ভর করে পেটের সব কথা বলে ফেলেছে।

গনি সাহেব অতি দ্রুত চিন্তা করছেন। যে ভাবেই হোক বড় সাহেবকে একটা শিক্ষা দিতে হবে। চোর বলার জন্যে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইতে হবে। শুধু হাতজোড় করে ক্ষমা চাইলেই হবে না, কাগজে-পত্রেও থাকতে হবে। ইউনিয়ন কি জিনিস এটা বড় সাহেবকে টের পাইয়ে দিতে হবে। কিছু জরুরি টেলিফোন করা দরকার। বড় সাহেবকে ঘেরাও করতে হলে শুধু অফিসের লোক দিয়ে হবে না। বাইরের কিছু লোকজনও দরকার। বড় ধরনের কিছু করতে হলে কয়েকটা জর্দার কৌটা লাগবে। কত ধানে কত চাল তা জানার সময় হয়ে গেছে। গনি সাহেব আলতাফের টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন। আলতাফ শুকনো মুখে বসে আছে। একে একটা শিক্ষা দিতে হবে। শালা স্পাই! স্পাইগিরি বের করে দিতে হবে। হাত পা ভেঙে হাসপাতালে দাখিল হয়ে গেলে আর স্পাইগিরি করবে না।

.

আলতাফ সাহেব!

জ্বি।

বড় সাহেবের কাছ থেকে আসছি।

ও আচ্ছা।

বড় সাহেবের ধারণা, আপনার ফাইল আমরা চুরি করেছি।

আলতাফ চুপ করে রইল। গনি সাহেব বললেন, আপনি স্যারকে এই কথা বলেছেন। তাই না?

আমি কিছু বলিনি।

স্পাইগিরি করছেন? পেয়েছেনটা কি?

আলতাফ তাকিয়ে রইল। গনি সাহেব ক্যান্টিনের দিকে রওনা হলেন। মাথা গরম করলে চলবে না। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। বড় ঝামেলার সময় মানুষ মাথা ঠিক রাখতে পারে না বলেই ঝামেলা সামাল দিতে পারে না। তিনি পর পর দুকাপ চা খেয়ে সিগারেট ধরালেন। মাথা এখন খানিকটা শান্ত হয়েছে–ঘেরাও করার পরিকল্পনা এখন আর সুন্দর পরিকল্পনা বলে মনে হচ্ছে না। অন্য চাল চালতে হবে। মারাত্মক কোন চাল। বড় সাহেব সে চাল ধরতে পারবেন না। কি চাল দেয়া যায়? হারানো ফাইল ফেরত দেয়া যায়। বড় সাহেবকে যদি বলা হয় ফাইল পাওয়া গেছে আলতাফের বাসায়–তাহলেই হল। খুব বিনয়ের সঙ্গে বলতে হবে। এতে বড় সাহেবের গালে একটা চড় দেয়া হবে। মোলায়েম চড়।

ফাইল গনি সাহেবের কাছেই আছে। তাঁর ড্রয়ারে তালাবন্ধ অবস্থায় আছে। যা করতে হবে তা হল–ফাইলটা লুকিয়ে নিয়ে চলে যেতে হবে আলতাফের বাসায়। আলতাফকে বলতে হবে–ভাই, আপনার বাসার কাগজপত্রগুলি একটু খুঁজে দেখুন। এমনও তো হতে পারে যে আপনি মনের ভুলে ফাইল নিয়ে বাসায় চলে এসেছেন। হতে পারে না? একটু খুঁজে দেখুন। আমিও আপনার সঙ্গে খুঁজি। দুজন খুঁজতে থাকবে–তখন গনি সাহেব চেঁচিয়ে বলবেন–পাওয়া গেছে, পাওয়া গেছে। এই তো পাওয়া গেছে। আপনার খাটের নিচেই ছিল। যাক, বাঁচা গেল! সবচে ভাল হয়–ফাইলটা যদি আলতাফ সাহেবকে দিয়েই ফেরত পাঠানো হয়।

গনি সাহেব আরেকটা সিগারেট ধরালেন। পুরো পরিকল্পনাটা আরো ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখতে হবে কোন ভুল-ত্রুটি থেকে গেল কি-না। সামান্য ভুল থাকাও ঠিক হবে না।

ফাইলটা যে এঁর ড্রয়ারে আছে এই খবর অফিসের আর একজনমাত্র মানুষ জানে–স্টোর-ইন-চার্জ খায়রুল কবির। তাঁর নিজের লোক। তা ছাড়া তিনিই চাবি দিয়ে ড্রয়ার খুলেছেন। কাজেই এই খবর বাইরে ছড়াবে না। খায়রুল কবির সাহেব অবশ্যি মাথা গরম লোক। ফট করে মাথা গরম হয়ে যায়। এই জাতীয় লোক মাথা গরম অবস্থায় বেফাস কথা বলে ফেলতে পারে। তাকে সাবধান করে দিতে হবে।

গনি সাহেব উঠলেন। আলতাফের টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন।

আলতাফ সাহেব।

আপনার বাসায় আজ সন্ধ্যায় একটু যাব।

জ্বি আচ্ছা। বিবাহ করেছেন তো–তাই না?

জ্বি।

ভাবীর হাতে এক কাপ চা খেয়ে আসব।

জ্বি আচ্ছা।

অধিকাংশ অফিসেই দেখি কর্মচারিদের যুধ্যে কোন সদ্ভাব নেই। এটা ঠিক না। অফিসের বাইরেও আমাদের একটা জীবন আছে। তাই না?

জ্বি।

গনি সাহেব খায়রুল কবির সাহেবের খোঁজে গেলেন। তাকে এখন বেশ হাসি খুশি দেখাচ্ছে। টেনশান অনেকখানি কমে গেছে। তার মাথায় একটাই চিন্তা। ফাইলটা কী করে আলতাফের বাসায় নিয়ে যাবেন। শীতকাল হলে সমস্যা ছিল না ––কোটের ভেতর নিয়ে যেতে পারতেন। গরম কাল হওয়ায় ঝামেলা হয়ে গেছে। বাজারের ব্যাগে করে নিয়ে যাওয়া যায়। তাঁর সঙ্গে বাজারের ব্যাগ আছে। অফিস ফেরত হাতিরপুল কাঁচাবাজার থেকে কিছু শব্জি নিয়ে যাবার কথা। আজ আর নেয়া হবে না।

.

অফিস ছুটি হবার ঠিক আগে আগে মনসুর সাহেবের টেলিফোন বেজে উঠল। টেলিফোন করেছেন ডঃ ওসমান। কিন্তু তাঁর গলার স্বর অন্যরকম। মনসুর সাহেব গলা চিনতে পারছেন না। মনে হচ্ছে, অনেক দূর থেকে পাতলা গলায় কে যেন কথা বলছে–মনসুর সাহেব বললেন, হ্যালো, কে? কে কথা বলছেন?

আমি বলছি। আমি!

কিছু মনে করবেন না। আমিটা কে?

ওসমান।

ও আচ্ছা। তোমার ঠাণ্ডা লেগেছে না-কি? গলার স্বর চিনতে পারছি না।

তোমাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমি নিজেও আমার গলার স্বর চিনতে পারছি না।

হয়েছে কি?

ভয়াবহ কিছু হয়নি, তবে যা হয়েছে তাকে ঠিক অগ্রাহ্য করাও ঠিক না।

কি হয়েছে?

তুমি বাসায় আস, তারপর বলব।

আসছি। এখনি আসছি।

বাই দ্যা ওয়ে, তোমাদের অফিসের কর্মচারি–কি যেন নাম–আলতাফ না? ও কি আছে?

থাকার কথা না–এখন বাজছে পাঁচটা। সে কাটায় কাঁটায় পাঁচটা বাজলে বিদেয় হয়ে যায়। তবু খোঁজ নিচ্ছি। কেন বল তো?

ওকে আমার দরকার। তাকে নিয়ে আসতে পারবে?

দরকার হলে অবশ্যই নিয়ে আসব।

মনসুর সাহেব আলতাফের খোঁজে লোক পাঠালেন। তাকে পাওয়া গেল না। সে ঠিক পাঁচটার সময়ই বের হয়ে গেছে।

আলতাফ অফিস থেকে সরাসরি বাসায় ফেরে। ফেরার সময় বাসে প্রচণ্ড ভিড় হয়। ভিড় কমার জন্যে সে ইদানিং অফিসের পাশে একটা মিউনিসিপ্যালটি পার্কে অপেক্ষা করে। পার্কটি মিউনিসিপ্যালটির কর্মকর্তারা শিশুদের মনোরঞ্জনের জন্য তৈরি করলেও এটি এখন ভিক্ষুক এবং নেশারুদের দখলে। নেশারুরা আলে সন্ধ্যার পরে। তাদের সঙ্গে আলতাফের দেখা এখনো হয়নি। তবে পার্কের স্থায়ী ভিক্ষুকরা আলতাফকে চেনে। তারা এই লোকটির স্বভাব-চরিত্রও জানে। তারা জানে, এই সাহেব পার্কে ঢোকার মুখে দুটাকার বাদাম কিনবে। পার্কের সবচে উত্তরের বেঞ্চির এক কোণায় চুপচাপ বসে বাদাম খাবে। খাবে খুব ধীরে ধীরে। দুটাকার বাদাম শেষ করতে করতে তার সময় লাগবে এক ঘণ্টার উপর। তখন সে উঠে দাঁড়াবে–যাবে বাসস্ট্যান্ডের দিকে। এই লোকের কাছে ভিক্ষা চেয়ে কোন লাভ হবে না জানে বলেই ভিক্ষুকরা কেউ এখন আর অকে বিরক্ত করে না।

আলতাফ বসে আছে বেঞ্চিতে। তার হাতে বাদামের ঠোঙা এবং খানিকটা ঝাল লবণ। আলতাফ বাদাম ভেঙে মুখে দিচ্ছে। দুটাকার ঠোঙায় বাদাম থাকে ১৮ থেকে ২৫টা। আজ বাদাম বেশি দিয়েছে–আজ বাদাম আছে ত্রিশটা। শেষ করতে অন্য দিনের চেয়ে বেশি সময় লাগবে। লাগুক। তেমন তাড়া নেই। তবে আকাশের অবস্থা ভাল না। মেঘ ডাকছে। বৃষ্টি হবে। ভাল বৃষ্টি হবে। বৃষ্টি শুরু হলে ভিজতে হবে। ভিজতে তার খারাপ লাগে না। একটাই শুধু সমস্যা হয়। ভেজা কাপড়ে বাসে উঠতে দেয় না। ভিজে গেলে হেঁটে হেঁটে ফিরতে হবে। আলতাফ ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলল। আজ তার মনটা খারাপ। শুধু যে খারাপ তা না–বেশ খারাপ।

সে বুঝতে পারছে না সবাই মিলে তার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলছে কেন? সে তো সবই বুঝতে পারছে। গনি সাহেবের কাছে ফাইলটা বর্তমানে আছে। তিনি এই ফাইল নিয়ে আজ রাতে এক সময় তার বাসায় যাবেন এবং বলবেন, আলতাফ সাহেব, আপনার বাসাটা একটু পরীক্ষা করে দেখব। এমন তো হতে পারে, মনের ভুলে ফাইলটা ফেলে গেছেন।

আলতাফ জানে গনি সাহেবের বাজারের ব্যাগে বর্তমানে ফাইলটা আছে। ফাইলটা নিয়ে তাঁর অনেক কাজকর্ম আছে বলে তিনি আজ বাজারে যেতে পারবেন না। গনি সাহেবের স্ত্রী বলে দিয়েছেন, ঘরে কোন সবজি নেই। সবজি লাগবে। আজও সবজি কেনা হবে না। অথচ এই মহিলা মাছ-মাংস কিছু খেতে পারেন না।

সব তথ্য পোকারা আলতাফকে জানাচ্ছে। কেন জানাচ্ছে সে জানে না। কিভাবে জানাচ্ছে তাও বুঝতে পারে না। জানতে না পারলেই বোধহয় ভাল হত। মনের কষ্ট কম হত। এরা তাকে দেখতে পারছে না কেন? সে কি কোন অন্যায় করেছে?

বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করেছে। আলতাফ উঠে দাঁড়াল। হালকা ফোঁটা পড়ছে। বাসস্ট্যান্ডে লোকজন নেই। ইচ্ছা করলে বাসে উঠা যায়। কিন্তু উঠতে ইচ্ছা করছে না।

হেঁটে হেঁটে যাওয়া যাক। পৌঁছতে সন্ধ্যা পার হয়ে যাবে। তাড়া নেই কিছু। আর বাসায় ফিরতে দেরি হলেই ভাল। ইতিমধ্যে নিশ্চয়ই গনি সাহেব চলে যাবেন। তার সঙ্গে দেখা হোক তা আলতাফ চাচ্ছে না। বৃষ্টির বেগ বাড়ছে। আলতাফ নির্বিকার ভঙ্গিতে বৃষ্টির ভেতর দিয়ে এগুচ্ছে। লোকজন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকে দেখছে। বৃষ্টিতে ভিজে অনেকেই রাস্তায় হাঁটে, তবে তাদের মধ্যে এক ধরনের তাড়া থাকে। কেউ এমন নির্বিকার ভঙ্গিতে হাঁটে না।

.

১৩.

বজলুর রহমান বললেন, কাকে চান?

গনি সাহেব বললেন, আমি আলতাফ সাহেবের খোঁজে এসেছি।

ও তো এখনো বাসায় ফিরে নাই।

সে কি! পাঁচটার সময় উনি অফিস থেকে বের হলেন।

বজলুর রহমান বিরক্তমুখে বললেন, এই গাধার কি কিছু ঠিক আছে? কিছু ঠিক নাই। অফিসে কি করে তাই আমি বুঝি না। আসুন, ভেতরে এসে বসুন।

গনি সাহেব অন্ধকার বসার ঘরে ঢুকলেন। বজলুর রহমান বললেন, আপনাকে অন্ধকার ঘরে বসে থাকতে হবে। গাধাটাকে বুলেছিলাম চল্লিশ পাওয়ারের একটা বাল্ব এনে লাগাতে। লাগিয়েছে ঠিকই কিন্তু বা্ল্ব জ্বলছে না। সমস্যাটা কোথায় সে দেখবে না?

গনি সাহেব বললেন, স্যার, আপনি কাইন্ডলি একটা হারিকেন আনুন। আমি দেখে দিচ্ছি। মনে হয় কোথাও লুজ কানেকশন আছে।

না না, আপনি কি দেখবেন?

কোন অসুবিধা নেই, স্যার। আলতাফ সাহেব আমার কলিগ। খুবই বন্ধু মানুষ।

বজলুর রহমান খুশি হলেন। হারিকেন জ্বালিয়ে নিয়ে এলেন। গনি সাহেব কি করলেন কে জানে–বাতি জ্বলে উঠল। বজলুর রহমান হৃষ্টচিত্তে বললেন, বাবা, তুমি আরাম করে বস, চা খাও। ঘরে কিছু আছে কিনা কে জানে? মনে হয় শুধু চা খেতে হবে।

কোন অসুবিধা নেই, স্যার। চা না পেলেও হবে। আমার চায়ের তেমন অভ্যাস নেই। আলতাফ সাহেব কখন ফিরেন?

কোন ঠিক-ঠিকানা নেই। আগে সকাল সকাল ফিরত। এখন শুনেছি অফিস ছুটির পর কোন এক পার্কে গিয়ে বসে থাকে।

কেন?

কে বলবে কেন? ওর কি মাথার ঠিক আছে? ব্রেইন ডিফেক্ট।

চাচাজী, এসব কি বলছেন?

তোমাদের কলিগ, তোমরা জান না? কি করে অফিস চালায় সেটাই তো আমি বুঝি না। কাজকর্ম কিছু পারে?

উনি তো চাচাজী কাজকর্মে খুব ভাল। তবে…

তবে কি?

রিসেন্টলি একটা সমস্যা হয়েছে।

বজলুর রহমান আগ্রহ নিয়ে বললেন, কি সমস্যা?

থাক স্যার, বলতে চাচ্ছি না।

না না, তুমি বল। কোন অসুবিধা নাই।

অফিসের একটা জরুরি ফাইল হারিয়ে ফেলেছেন। আমাদের বড় সাহেব আবার খুবই রাগী। তিনি ভয়ংকর রেগেছেন। অথচ আলতাফ সাহেবের কোন মাথাব্যথা নেই।

ওর মাথাব্যথা থাকবে কেন? ওর কি মাথা বলে কিছু আছে?

বড় সাহেবের সঙ্গে দেখা করে দু-একটা কথা বললে হত, তাও বলবেন না। এই বাজারে যদি চাকরি চলে যায়, তাহলে অবস্থাটা, চাচাজী, একটু চিন্তা করুন।

চাকরি তো যাবেই। আরো আগেই যাওয়া উচিত ছিল। এখনো কেন যায়নি তাই তো আমি ভেবে পাই না।

বজলুর রহমান অত্যন্ত আনন্দিত বোধ করছেন। তাঁর কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলে যাচ্ছে। এটাই তাঁর আনন্দের বিষয়। গনি সাহেব গলা নিচু করে বললেন, আমার ধারণা, উনি ফাইলটা বাসায় নিয়ে এসেছিলেন, তারপর অফিসে নিতে ভুলে গেছেন। আমি এসেছি একটু খুঁজে দেখতে। উনার তো মাথাব্যথা নেই।

বজলুর রহমান দরাজ গলায় বললেন, যাক, গাধাটার চাকরি চলে যাক। তুমি এই নিয়ে চিন্তা করবে না।

তবু স্যার, আমি ভাবছি একটু যদি খুঁজে দেখি, উনি তো খুঁজবেন না।

ও কিছুই করবে না। ও শুধু দরজা বন্ধ করে ঝিম ধরে বসে থাকবে। আর পোকা নিয়ে ভাববে।

গনি সাহেব ইতস্ততঃ করে বললেন, উনি কখন আসেন কে জানে। আমরা কি এই ফাঁকে একটু খুঁজে দেখব?

দেখতে চাও, দেখ। আমি দুলারীকে বলছি, ও তোমাকে তাদের ঘরে নিয়ে যাবে।

দশ মিনিটের মাথায় গনি সাহেব ফাইল হাতে দোতলা থেকে নেমে এলেন। বজলুর রহমানকে দেখে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, পাওয়া গেছে চাচাজী। খাটের নিচে খবরের কাগজের সঙ্গে ছিল।

বজলুর রহমান বললেন, পাওয়া গেছে বলে এত আনন্দিত হয়ো না। আবার হারাবে। কে জানে কাল অফিসে যাওয়ার সময় হয়ত বসে ফেলে রেখে যাবে।

গনি সাহেব বললেন, আপনাকে কি চাচাজী একটা ছোট্ট রিকোয়েস্ট করব? যদি কিছু মনে না করেন।

মনে করাকরির কি আছে? বল কি রিকোয়েস্ট?

ফাইলটা আলতাফ সাহেবের হাতে না দিয়ে আপনি নিজে যদি নিয়ে যান। বড় সাহেবকে একটু বুঝিয়ে বলেন। স্যার তো খুব রেগে আছেন।

কোন অসুবিধা নেই। আমিই বলব।

আমি যে এসেছিলাম এটা যদি না বলেন তাহলে খুব ভাল হয়। বড় সাহেব আমাকে আবার ঠিক পছন্দ করেন না। উনি যদি শুনেন একজন ফাইল হারিয়েছে আর আমি ছোটাছুটি করছি তাহলে আরো রেগে যাবেন।

না না, তুমি নিশ্চিন্ত থাক। তোমার কখা কিছুই বলব না।

গনি চা খেলেন। মুড়ি খেলেন। দুলারীর সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করলেন। দুলারীর কাজের মেয়ে নেই শুনে দুঃখিত হলেন। যাবার সময় বলে গেলেন, কাল সকালের মধ্যে কাজের মেয়ের ব্যবস্থা করবেন।

এই কাজটা তিনি অবশ্যি ভালই পারেন। কাজের মেয়ের সাপ্লাই চ্যানেল তাঁর খুব ভাল। অফিসের অনেকেরই তিনি এই উপকার করেছেন। দুলারীর জন্যেও একটা ব্যবস্থা করতে হবে। তাঁর নিজের বাসায় এই মুহূর্তে দুজন আছে। তাদের একজনকে দিয়ে যেতে হবে।

.

আলতাফ বাসায় ফিরল রাত নটার কিছু আগে। সে ভিজে চুপসে গেছে। চোখ লাল। দুলারী বলল, আবার বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে এসেছ? কতক্ষণ ভিজেছ বৃষ্টিতে?

অনেকক্ষণ।

হাত-পা একদম নীল হয়ে গেছে। চোখ লাল। আজ নির্ঘাৎ তোমার জ্বর আসবে।

হুঁ।

তোমাদের অফিসের একজন কলিগ আজ বাসায় এসেছিলেন। নাম হল গনি সাহেব। কি যেন খোঁজাখুঁজি করলেন।

হুঁ।

খুবই ভাল লোক। আমার কোন কাজের লোক নেই শুনে খুব দুঃখ করলেন। বলেছেন, কাল সকাল দশটার মধ্যে একজনকে দিয়ে যাবেন।

হুঁ।

তুমি তো ঘুমুচ্ছ না, তাহলে এমন হুঁ হুঁ করছ কেন? যাও, বাথরুমে গিয়ে কাপড় ছাড়। ভাত দিয়ে দি। আজ আবার মার শরীরটাও খারাপ। মা শুয়ে আছেন।

হুঁ।

দুলারী টেবিলে ভাত বেড়ে আলতাফকে নিতে এসে দেখে আলতাফ ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছে। তার গা গরম। আলতাফ বলল, আমার ভাল লাগছে না। আমি কিছু খাব না।

দুধ এনে দেই এককাপ। দুধ খাও?

না। তুমি বাতি নিভিয়ে দাও।

দুলারী বাতি নিভিয়ে দিল। তার খানিকটা মন খারাপ হল। বৃষ্টি হচ্ছে দেখে সে আজ তেহারী রান্না করেছে। এই জিনিসটা আলতাফ খুব পছন্দ করে খায়।

দুলারী!

কি?

আমার মাকে যে পোকা খেয়ে ফেলেছিল তা কি তুমি জান?

এসব কি ধরনের কথা?

তুমি জান কি-না বল।

জানি, বাবা বলেছিলেন।

আমার চোখের সামনে তারা মাকে খেয়ে ফেলল।

চুপ কর তো।

আচ্ছা চুপ করলাম। দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘর অন্ধকার করে দাও।

.

১৪.

ওসমান সাহেব থাকেন ধানমণ্ডি আট নম্বরে। চার ইউনিটের নতুন ফ্ল্যাট বাড়িগুলির তিনতলায়। ফ্ল্যাটটি কিনেছেন ওসমান সাহেবের স্ত্রী রেবেকা। ভদ্রমহিলা ডাক্তার এবং পসারওয়ালা বড় ডাক্তার। এদের কোন ছেলেপুলে নেই। স্বামী-স্ত্রী দুজনে বিশাল বাড়িতে বাস করেন। কুকুর, বেড়াল এবং পাখি পুষেন।

মনসুর সাহেব ওসমানদের ফ্ল্যাট বাড়িতে কলিংবেল টিপলেন রাত দশটায়। কলিংবেলে শব্দ হল না। কড়া নাড়তে হল। শব্দ করেই নাড়তে হল। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। ইলেকট্রিসিটি নেই। তবে ঘরে আলো আছে। চার্জলাইট জ্বলছে। ওসমান সাহেব দরজা খুলে বললেন, এত দেরি! আমি সন্ধ্যা থেকে অপেক্ষা করছি।

বৃষ্টি দেখে ভাবছিলাম বৃষ্টি কমলে আসব। মনে হচ্ছে কমবে না, তাই বৃষ্টির মধ্যেই এসেছি।

খেয়ে আসনি তো?

না।

গুড। আমি পূর্বাণী থেকে খাবার আনিয়েছি। আজ রাতে থেকে গেলে অসুবিধা হবে? রেবেকা বাসায় নেই। একা আছি। তুমি থাকলে দুজন মিলে বেচেলারদের মত সারারাত গল্প করব।

বেচেলাররা সারারাত গল্প করে না। এটা নব্য স্বামী-স্ত্রীদের ব্যাপার। রেবেকা কোথায়?

ওর সঙ্গে ভয়াবহ ধরনের ঝগড়া হয়েছে। প্রায় ছাড়াছাড়ি পর্যায়ের ঝগড়া। ও তার বাবার বাসায় চলে গেছে। মনে হচ্ছে আর ফিরবে না।

মনসুর সাহেব কিছু বললেন না। তেমন গুরুত্ব দিলেন না। রেবেকা প্রায়ই প্রচণ্ড রকমের ঝগড়া করে তার বাবার বাসায় চলে যায়, আবার ফিরে আসে। এবারও আসবে। এদের একের অন্যকে ছাড়া গতি নেই।

ওসমান সাহেব বললেন, এসো খেতে বসে যাই। প্যাকেট করা খাবার ঠাণ্ডা হয়ে গেলে মুসকিল।

টেবিলভর্তি খাবার। শিভাস রিগেলের পেটমোটা বোতল। এই ব্যাপারটিও পুরানো। ওসমান সাহেব মদ্যপান করেন শুধু যখন রেবেকার সঙ্গে তাঁর ঝগড়া হয় তখন। মনসুর হাসতে হাসতে বললেন, ঝগড়া মনে হয় গুরুতর পর্যায়ের হয়েছে?

হ্যাঁ।

কি নিয়ে ঝগড়া?

সেটা বলার জন্যেই ডেকেছি।

আলতাফকেও আনতে বলেছিলে–তাকেও বলতে চাচ্ছিলে?

হ্যাঁ, তাকেও বলতে চাচ্ছিলাম। ঝগড়ার সূত্রপাত তাকে নিয়েই। তুমি খেতে শুরু কর, আমি বলি। খানিকটা হুইস্কি দেই? হুইস্কি থাকলে গল্প শুনে আরাম পাবে।

মনসুর কৌতূহলী হয়ে তাকালেন।

তোমার মনে আছে বোধহয়, আলতাফের বাসায় আমি একটা তেলাপোকা মেরেছিলাম। আলতাফ তাতে দুঃখিত হয়েছিল।

আলতাফ দুঃখিত হয়েছিল কিনা জানি না, তুমি তেলাপোকা মেরেছিলে তা মনে আছে।

বাসায় ফিরলাম, শরীর কেমন ঘিন ঘিন করতে লাগল। সারাক্ষণ মনে হতে লাগল জুতার নিচে তেলাপোকার রক্ত-মাংস লেগে আছে। প্রথমেই কাজের ছেলেটিকে দিয়ে জুতা ধুয়ালাম। আমার মনে হল, সে ঠিকমত ধোয়নি। সাবান দিয়ে নিজে ধুলাম। মনে হল, সর্বনাশ হয়েছে। আমার হাতে রক্ত লেগে গেছে। গোসল করলাম। ভাবটা দূর হল না। শরীর ঘিন ঘিন করতে লাগল।

রাতে ভাত খেতে পারলাম না। রেবেকা ফিরল রাত দশটায়। ততক্ষণে আমার প্রায় মাথা-খারাপের মত হয়ে গেছে। আমার ধারণা হয়ে গেছে, তেলাপোকার রক্ত মাংস সারা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়েছে। দুজন কাজের লোককেই ঘর মুছতে লাগিয়ে দিয়েছি। বালতি ভর্তি পানিতে ডেটল গুলে ওরা মেঝে ন্যাকড়া দিয়ে মুছছে এবং অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছে। রেবেকা ঘরে ঢুকে বলল, কি হয়েছে?

আমি ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করলাম। ব্যাখ্যা করার সময় বুঝলাম, আমি নিতান্ত বোকার মত কথা বলছি। না, বোকা না, পাগলের মত কথা বলছি।

রেবেকা বলল, তুমি নিওরোটিক পেশেন্টের মত আচরণ করছ।

আমি বললাম, আমি মোটেই নিওরোটিক পেশেন্টের মত আচরণ করছি না। আমি যা অনুভব করছি তা বলছি।

রেবেকা কাজের লোক দুটিকে ধোয়াধুয়ি বন্ধ করতে বলল। ঝগড়া শুরু হল এই পর্যায়ে। কুৎসিত ঝগড়া। আমি একেবারে তুই-তোকারির পর্যায়ে চলে গেলাম। চিৎকার করে বলতে লাগলাম–তোর সঙ্গে বাস করে আমি নিওরোটিক পেশেন্ট হয়েছি। বুঝেছিস? তোর ধবধবে শাদা গায়ের রঙের জন্যে তো তোর খুব অহংকার। এই শাদা রঙের জন্যে তোকে দেখায় শাদা তেলাপোকার মত। শাদা তেলাপোকা কখনো দেখেছিস? এরা থাকে কমোডের ভেতরে। তোর গায়েও তেলাপোকার মতই গন্ধ। তার পরেও কিছু বলি না। সহ্য করি।

রেবেকা আমার কথাবার্তা শুনে হতভম্ব হয়ে গেল। এক পর্যায়ে বলল–তোমার ঘুমানো দরকার। আমি পেথিড্রিন ইনজেকশনের একটা এম্পুল রেখে যাচ্ছি। ইসমাইলকে বললেই সে তোমার শরীরে পুশ করে দেবে। আমি চলে যাচ্ছি।

এর উত্তরে আমি আরো সব কুৎসিত কথা বলতে লাগলাম। এমন সব কুৎসিত কথা যে, তুমি শুনলে তিনতলা থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে যাবে। উদাহরণ দেব? শুনতে চাও?

না, শুনতে চাই না।

শুনতে না চাওয়াই ভাল।

মনসুর বললেন, তুমি মদ্যপানটা মনে হয় বেশি করছ?

তা ঠিক, বেশিই করছি। আমার অবস্থায় পড়লে তুমি বাথটাবে মদ ভর্তি করে তার ভেতরে শুয়ে থাকতে। আসল স্টোরিটা শোন। আসল স্টোরিতে এখনো আসিনি।

বল আসল স্টোরি।

রেবেকা রাতেই চলে গেল। আমি কাজের লোক দুটিকে বললাম, তোমরা ননস্টপ ঘর মুছে যাও। আমি না বলা পর্যন্ত থামবে না। তারপর হুইস্কির একটা বোতল নিয়ে বসলাম। তুমি ভাল করেই জান আমি প্রফেশনাল মাতাল নই। বিদেশে পড়াশোনার জন্যে যখন গিয়েছিলাম তখন মাঝে-মধ্যে খেতাম। দেশে এসে ছেড়ে দিয়েছিলাম। ইদানিং কখনো কখনো খাওয়া হয়। তা-ও যখন বন্ধু বান্ধব আসে, তখন। যাই হোক, রাত একটার ভেতর ২৫০ মিলিলিটারের স্কচ হুইস্কির একটা পুরো বোতল শেষ করে ফেললাম। মাতাল হলাম না। শুধু অনুভব করলাম, মাথাটা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। আমি নিজেও সাবানের বড় একটা ফেনা হয়ে গেছি। বাতাসে ভাসতে শুরু করেছি। হার্ড লিকার চার পেগের বেশি আমি খেতে পারি না। আমার বমি ভাব হয়। পুরো বোতল খেয়েও আমার কিছু হল না। শুধু বাথরুম পেতে লাগল। আমার তখন বাথরুমে যেতেও ইচ্ছা করছে না। মনে হচ্ছে চেয়ারে বসেই কাজ সেরে ফেলি। মেঝে তো ধোয়া হচ্ছেই। যাই হোক, বাথরুমে গেলাম। এই অংশটা মন দিয়ে শোন। খুব মন দিয়ে শুনবে।

আমি তোমার সব অংশই মন দিয়ে শুনছি।

এই অংশটা অনেক বেশি এটেনশন দিয়ে শুনতে হবে। বাথরুমে ঢুকেছি। বাতি জ্বালিয়ে দরজা বন্ধ করতেই এক ধরনের হামিং সাউন্ড হতে লাগল। যেন লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষ খুব নিচু গলায় কথা বলছে। লো ফ্রিকোয়েন্সি সাউড আসছে কমোডের ভেতর থেকে। আমি অবাক হয়ে কমোডের কাছে গিয়ে নিচু হয়ে তাকাতেই গায়ের সমস্ত রক্ত জমে গেল। দেখি, কমোডভর্তি তেলাপোকা। তারপর দেখি শুধু কমোড নয়, বাথরুমের মেঝে থিকথিক করছে পোকায়। অথচ ঘরে ঢোকার সময় ছিল না। কখন এল? কোত্থেকে এল? হঠাৎ দেখি পোকারা আমার গা বেয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। অন্য যে-কেউ হলে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যেত। আমি বুঝলাম–অতিরিক্ত মদ্যপানের জন্যে আমার হেলুসিনেশন হচ্ছে। আসলে কোন পোকা নেই কিন্তু আমার মস্তিষ্ক পোকা দেখছে। বাথরুমের দেয়ালগুলি একটু আগেই শাদা দেখেছি–এখন দেখি ব্রাউন রঙ। তেলাপোকায় দেয়াল ডেকে গেছে। আমি তখন এদের কথাও শুনতে পেলাম। পরিস্কার শুনলাম–এরা বলছে …

কি বলছে?

কি বলছে, তা তোমাকে বলতে চাচ্ছি না। কারণ ওরা তো আসলে কিছু বলছে না। যা বলার আমার মস্তিষ্কই আমাকে বলছে। যাই হোক, আমি কি করলাম শোন। বাথরুম থেকে বের হয়ে এলাম। আমার গা ভর্তি তেলাপোকা। এদের নিয়েই বের হয়েছি। কাজের লোক দুটি তখনও মেঝে ঘসে যাচ্ছে। আমি তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বললাম–তোমরা কি আমার গায়ে তেলাপোকা দেখতে পাচ্ছ? ওরা ভয়ে ভয়ে বলল, জি না স্যার। আমি বললাম, তাহলে যাও, ইসমাইলকে ডেকে আন। আমাকে পেথিড্রিন ইনজেকশন নিতে হবে। ইসমাইল এসে আমাকে পেথিড্রিন ইনজেকশন দিল। আমার ঘুম ভাঙল পরদিন দুপুর দুটায়। আমি তখন পুরোপুরি সুস্থ। তেলাপোকা ব্যাপারটা আর মাথায় নেই।

এই তোমার গল্প?

হ্যাঁ।

আলতাফকে এই গল্প শুনাতে চাচ্ছিলে কেন?

ওর কারণে এই ব্যাপারটা আমার মাথায় ঢুকে গেছে বলেই ওকে শুনাতে চাচ্ছিলাম। আমার ইচ্ছা ছিল–ওকে বলব যেন পোকা নিয়ে সে আর কখনো কারো সঙ্গে কোন কথা না বলে। এই হাস্যকর ব্যাপারটা যেন সে আর কারো মাথায় ঢুকিয়ে না দেয়।

মনসুর বললেন, ব্যাপারটা তোমার মাথা থেকে পুরোপুরি দূর হয়েছে?

হঁ, হয়েছে। তবে আমি পোকা নিয়ে খুব ভাবতে শুরু করেছি। অন্য এক দৃষ্টিভঙ্গিতে এদের দেখার চেষ্টা করছি।

অন্য দৃষ্টিভঙ্গি মানে?

ওদের প্রতি একটা সিমপেথিটিক এটিচুড তৈরি হয়েছে।

মনসুর গম্ভীর হয়ে বললেন, সিমপেথিটিক এটিচুডের ব্যাপারটা বুঝলাম না।

ওসমান গলা নিচু করে বললেন, আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আলতাফের কথা সত্যি হতেও পারে। পোকাদের কিছু স্ট্রেজ ব্যাপার আছে, যা থেকে ধারণা করা অস্বাভাবিক না যে এদের বুদ্ধি আছে, ভালভাবেই আছে। যেমন ধর, যখন কোন বিশেষ জায়গায় আণবিক বোমার টেস্টিং হয় তখন যে জায়গায় এই টেস্টিং করা হয় তার এক মাইলের ভেতর কোন পোকা-মাকড় বিশেষ করে তেলাপোকা থাকে না। এরা মনে হয় কোন এক অদ্ভুতভাবে খবর পেয়ে যায় যে এখানে নিউক্লিয়ার বোমা টেস্টিং হবে। খবর পেয়ে সরে পড়ে। ইন্টারেস্টিং না?

সত্যি হয়ে থাকলে ইন্টারেস্টিং।

হিরোশিমা এবং নাগাশাকিতে আণবিক বোমা ফাটার পর এর আশেপাশের অঞ্চলগুলি তেলাপোকায় ছেয়ে গিয়েছিল। আমার ধারণা, এরা এসেছে হিরোশিমা ও নাগাশাকি থেকে। এরা বুঝে গিয়েছিল এখানে বোমা ফাটবে, কাজেই সরে গিয়েছিল।

এই খবর পেলে কোথায়?

কোথায় যেন পড়েছিলাম।

সত্যি?

সত্যি তো বটেই। সমুদ্রগামী জাহাজ থেকে হঠাৎ দেখা যায় ইঁদুর আর তেলাপোকা নেমে পড়ছে। তখন বুঝতে হবে জাহাজটা পানিতে ডুবে যাবে বা এই জাতীয় কিছু একটা হবে। এরা খবরটা পায় কিভাবে?

মনসুর বললেন তুমি বলতে ঢাচ্ছ পোকাদের বুদ্ধি আছে। তারা ইন্টেলিজেন্ট।

নিশ্চিত করে কিছু বলছি না, তবে সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছি না।

একসময় তুমিই কিন্তু বলেছ ওদের মস্তিষ্ক নেই। কাজেই বুদ্ধি থাকবে না। এখন অন্য কথা বলছ।

তা বলছি। এখন কালেকটিভ ইন্টেলিজেন্সের কথা মাথায় আসছে। অর্থাৎ আলাদা-আলাদাভাবে এক একটা পোকা বুদ্ধিমান নয়–কিন্তু তাদের সবাইকে একত্র করলে তারা বুদ্ধিমান। প্রচণ্ড বুদ্ধিমান। এত বুদ্ধিমান যে এরা মানুষকে ব্যবহার করছে। মানুষ তা-ই বুঝতে পারছে না। মানুষ এদের হাতে খুবই অসহায়।

পোকাদের হাতে মানুষ অসহায়?

হ্যাঁ অসহায়। পঙ্গপালের কথা ভেবে দেখ। পঙ্গপালের আক্রমণ ঠেকানোর কোন বুদ্ধি কি মানুষের আছে? মেশিনগান দিয়ে ঠেকাবে? পৃথিবীতে বিউবোনিক প্লেগ ছড়িয়েছিল ইঁদুর। ১৩৪৭ থেকে ১৩৫১–এই পাঁচ বছরে প্লেগে সারা পৃথিবীতে মানুষ মারা গেছে ৭৫ মিলিয়ন। ঊনবিংশ শতাব্দীতেও বিউবোনিক প্লেগ হল–মানুষ মারা গেল ২০ মিলিয়ন। যেমন হঠাৎ করে অসুখটা এসেছিল তেমনি হঠাৎ করে চলে গিয়েছে। আমার এখন মনে হচ্ছে, এইগুলি পোকাদের সাবধানবাণী। পোকারা মানুষদের সাবধান করে দিচ্ছে। তারা বলছে–হে মানব সম্প্রদায়, সাবধান। আমরা কিন্তু ইচ্ছা করলেই তোমাদের শেষ করে দিতে পারি। তোমাদের অতি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান কোন কাজেই লাগবে না।

মনসুর সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, এদের ক্ষমতা থাকলে মানুষকে এরা শেষ করে দিচ্ছে না কেন? মানুষ তো নানানভাবে এদের বিরক্ত করছে। ইনসেকটিসাইড ছড়াচ্ছে–পোকা-মাকড় মারার কত কায়দা-কৌশল বের করছে। পোকাদের যদি এতই বুদ্ধি তাহলে ওরা চুপ কেন?

ওসমান গলার স্বর নিচু করে বললেন, এই বিষয়েও আমার একটা হাইপোথিসিস আছে। মানুষকে এরা শেষ করছে না, কারণ মানুষকে তাদের প্রয়োজন। মানুষের টেকনোলজি প্রয়োজন। শুধুমাত্র মানুষেরই ক্ষমতা আছে মহাশূন্য জয় করার। মানুষ একদিন সৌরজগতের বাইরেও পা বাড়াবে, কিন্তু পোকাদের এই ক্ষমতা নেই। তারা যদি পৃথিবীর বাইরে ছড়িয়ে পড়তে চায় তাহলে মানুষের সাহায্য তাদের নিতেই হবে।

পৃথিবীর বাইরে ছড়িয়ে পড়ার তাদের দরকার কি?

দরকার আছে। বুদ্ধিমান প্রাণির লক্ষণ হল, সে চেষ্টা করবে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে নিজেকে ছড়িয়ে দিতে–পোকারা তাই করছে। মানুষ যখন মঙ্গলগ্রহ থেকে যাবে বৃহস্পতির উপগ্রহে, এরাও যাবে মানুষের সঙ্গে। বুঝতে পারছ?

পারছি, কিন্তু তুমি কি এই হাইপোথিসিস বিশ্বাস কর?

বিশ্বাস করি না–আবার অবিশ্বাসও করি না। আলতাফ নামের তোমার ঐ লোকটির সঙ্গে আমার কথা বলতে হবে।

মনসুর গম্ভীর গলায় বললেন, আলতাফের সঙ্গে তোমার কথা বলতে হবে না। কথা বলার পরিণাম তো দেখতেই পাচ্ছি। তোমার উচিত বিশ্রাম নেয়া এবং মাথা থেকে পোকা-মাকড় পুরোপুরি দূর করা। যেভাবে হুইস্কি খাচ্ছ, মনে হয় একটা কেলেংকারি করবে। যাও, ঘুমুতে যাও।

রাত খুব একটা বেশি হয়নি। দুটা বাজে। দুটা অনেক রাত।

মনসুর উঠে দাঁড়ালেন। এখনো ইলেকট্রিসিটি আসেনি। মনে হয় আজ রাতে আর আসবে না। বৃষ্টি থামেনি। মাঝখানে কিছুটা কমেছিল, এখন আবার মুষলধারে শুরু হয়েছে।

বাথরুম থেকে অদ্ভুত একটা শব্দ আসছে। কিসের শব্দ? মনসুর কৌতূহলী হয়ে উঁকি দিলেন। অন্ধকার বাথরুম। চার্জলাইটের আলো বাথরুম পর্যন্ত পৌঁছেনি। তিনি পকেট থেকে দেয়াশলাই বের করলেন। দেয়াশলাই জ্বালাবার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সারা শরীর কেঁপে উঠল–এসব কি? হাজার হাজার কোটি কোটি পোকা তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। শুঁড় নাড়ছে। এটা কি এক ধরনের হেলুসিনেশন? অবশ্যই তাই। ওসমানের কথা শুনে তিনি প্রভাবিত হয়েছেন। আলতাফ প্রভাবিত করেছিল ওসমানকে। তাকে দিয়ে অন্য আরেকজন প্রভাবিত হবে। এক সময় দেখা দেবে মাস হিস্টিরিয়া। দেয়াশলাইয়ের কাঠি নিভে গেছে। তিনি এখন আর কিছুই দেখছেন না, শোঁ শোঁ শব্দ শুনছেন।

শব্দটা কমোডের ভেতর থেকে আসছে। দেয়াশলাইয়ের আরেকটা কাঠি কি জ্বলাবেন? তাঁর সাহস হল না।

.

১৩.

দুলারী অলঅফের মাথার কাছে বসে আছে। জ্বরে মানুষটার গা পুড়ে যাচ্ছে। থার্মোমিটার থাকলে জ্বর দেখা যেত। থার্মোমিটার নেই। জ্বর কমানোর জন্যে কিছু একটা করা দরকার। কি করবে দুলারী বুঝতে পারছে না। দুটা প্যারাসিটামল খাওয়ানো উচিত। ঘরে কোন প্যারাসিটামল নেই। মাথায় পানি ঢালা উচিত। দোতলায় এক ফোঁটা পানি নেই। পানি ঢালতে হলে বালতিতে করে একতলা থেকে নিয়ে আসতে হবে। দুলারী তাও করতো কিন্তু মানুষটা তাকে ছাড়ছে না। তার হাত ধরে বসে আছে। এত শক্ত করে হাত চেপে ধরে আছে যে হাত ব্যথা করছে।

আলতাফ ক্ষীণ স্বরে ডাকল, দুলারী!

দুলারী বলল, কি?

খুব খারাপ লাগছে।

মাকে ডেকে আনব?

না। এখন কটা বাজে দুলারী?

রাত দুটা।

আলতাফ অনেক কষ্টে পাশ ফিরল। দুলারী বলল, বাবাকে ডেকে তুলি। বাবা তোমার জন্যে ডাক্তার নিয়ে আসুক।

তুমি আমার হাতটা ছাড়, আমি তোমার জন্যে পানি নিয়ে আসি। মাথায় পানি ঢালতে হবে।

না।

আচ্ছা, ঠিক আছে, আমি তোমার জন্যে পানি আনতে যাচ্ছি না। তুমি এত শক্ত করে আমার হাত চেপে ধরবে না। আমার হাত ব্যথা করছে। আচ্ছা, আমার হাতটা একটু ছাড় তো, বাতি জ্বালাই। অন্ধকারে বসে থাকতে আমার ভয় ভয় লাগছে।

আলতাফ দুলারীর হাত ছাড়ল না। বরং আরো শক্ত করে হাত চেপে ধরল। দুলারীর ভয়-ভয় করছে। তার হঠাৎ করে মনে হচ্ছে, তাদের খাটের নিচটা তেলাপোকায় ভর্তি হয়ে গেছে। পোকার আলতাফকে দেখতে আসছে, আরো আসবে। ঘর ভর্তি হয়ে যাবে পোকায়। কেন তার এরকম মনে হচ্ছে সে জানে না। আলতাফকে জিজ্ঞেস করলে কি কোন লাভ হবে? আলতাফ কি কিছু বলবে?

দুলারী বলল, এই শোন, শোন!

উঁ।

ভয় লাগছে। আমার ভয় লাগছে।

উঁ।

আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, খাটের নিচটা পোকায় ভর্তি হয়ে গেছে। আমার প্রচণ্ড ভয় লাগছে।

উঁ।

এই দেখ শোঁ শোঁ শব্দ হচ্ছে। পোকারা কি এরকম শব্দ করে?

উঁ।

এরকম উঁ উঁ করবে না। শুনতে বিশ্রী লাগছে। হাতটা ছাড়, আমি বাতি জ্বালাব।

না।

দুলারী প্রায় জোর করে আলতাফের হাত ছাড়িয়ে দিল। বাতি জ্বাললো। উঁকি দিল খাটের নিচে। সারি সারি তেলাপোকা চুপচাপ অপেক্ষা করছে। একটিও নড়ছে না। দুলারী বলল, যা! যা! এতেও কিছু হল না। আলতাফ ক্লান্ত গলায় বলল, এরা যাবে না। এরা থাকবে। তুমি এদের কিছু বলো না। বাতি নিভিয়ে দাও।

দুলারী বাতি নেভাল। তার কান্না পাচ্ছে। সে কি করবে বুঝতে পারছে না। এত রাতে বাবা-মাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতে ইচ্ছা করছে না।

.

১৪.

ভোরবেলাতেই বজলুর রহমান হোমিওপ্যাথ ডাক্তার বিধু বাবুর দরজার কড়া নাড়তে লাগলেন। দুলারীর কাছ থেকে খবর পেয়েছেন আলতাফের জ্বর। সারারাতই না-কি জ্বর গেছে। এখন খুব বাড়ছে। ডাক্তার না ডাকলেই নয়।

অনেকক্ষণ কড়া নাড়ার পর বিধু বাবু দরজা খুলে হাসিমুখে বললেন, তোমার মাছের কাঁটার অবস্থা কি?

বজলুর রহমান হতভম্ব হয়ে বললেন, কি বলছ তুমি! সে তো বৃটিশ আমলের কথা। আমার গলা থেকে তো কবেই কাটা গেছে, এখন তোমার মাথায় বিঁধে আছে। কাটা বিঁধা মাথা নিয়ে ডাক্তারি কর কিভাবে? যাই হোক, তুমি আস আমার সঙ্গে। আলতাফকে দেখবে।

ওর কি হয়েছে? গলায় কাটা?

গলায় কাঁটার ব্যাপারটা মাথা থেকে দূর কর। ওর জ্বর।

চল দেখি।

.

বিধু বাবু আলতাফের কপালে হাত দিয়েই প্রায় লাফিয়ে উঠার জোগাড় করলেন–সর্বনাশ! এ তো অনেক জ্বর! রাগে বজলুর রহমানের গা জ্বলে গেল। অনেক জ্বর বলেই তো ডাক্তার ডেকে আনা। কুসুম-কুসুম জ্বর হলে কে আনতো?

বিধু বাবু রোগিকে দেখে টেখে শুকনো গলায় বললেন–অবস্থা তো কেমন কেমন মনে হচ্ছে–ইয়ে। বজলুর রহমান বললেন, ইয়েটা কি?

না মানে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াই ভাল। জ্বর খুব বেশি।

বজলুর রহমানের ইচ্ছা হল, বিধু বাবুকে ধরে একটা আছাড় দেন। এম্নি মুখে বড় বড় কথা–ক্যানসার সারাই, হাঁপানি সারাই, এইডস রোগ সারাই। আর সামান্য একটু জ্বর দেখে মুখ শুকিয়ে আমশি! ধাক্কা দিয়ে দোতলার বারান্দা থেকে নিচে ফেলা দেয়া উচিত।

তিনি তা করলেন না। নিজেকে সামলালেন। অনেক কাজ আছে। কব্জিগুলি আগে শেষ করা দরকার। যেমন আলতাফের অফিসে ফাইলটা দিয়ে আসতে হবে। প্রতিমাসে ঠিক সময় ইলেকট্রিসিটি বিল দেয়ার পরেও তার ঘরে ইলেকট্রিসিটির লাইন কেন কেটে দিল সেই খোঁজটাও নেয়া দরকার। আলতাফকে হাসপাতালে নিতেই যদি হয়, সন্ধ্যার দিকে নিলেই হবে।

বজলুর রহমান আলতাফের অফিসের ফাইল বগলে নিয়ে প্রথমে আলতাফের কাছে গেলেন। অফিসের ঠিকানাটা দরকার। আলতাফ ঠিকানা বলল, বেশ ভালভাবেই বলল। অফিসটা কোন জায়গায় বুঝিয়ে দিল।

এটা একটা ভাল লক্ষণ। জ্বরে আলতাফের মাথা খারাপ হয়ে যায়নি। বেশি জ্বর উঠলে মাথা খারাপের মত হয়ে যায়।

আলতাফ!

জ্বি।

তোর ফাইলটা দিয়ে আসি।

আচ্ছা।

তোর বড় সাহেবকে বুঝিয়ে বলব যে, বাই মিসটেক তুই ফাইলটা নিয়ে চলে এসেছিলি।

আচ্ছা।

উনাকে রিকোয়েস্ট করব যাতে ভুলটা বড় করে না দেখেন। মানুষমাত্রই ভুল করে। ভুল করাই মানবধর্ম।

জ্বি আচ্ছা।

তুই চিন্তা করিস না। শুয়ে থাক। দুলারী তোর মাথায় পানি ঢালুক।

জ্বি আচ্ছা।

হাসপাতালে যদি নিতেই হয়, সন্ধ্যার দিকে নিয়ে যাব।

জ্বি আচ্ছা।

তুই কি কিছু বলবি?

আলতাফ বিড় বিড় করে বলল, সবাই আসতে শুরু করেছে, মামা।

কি বললি?

পোকারা আসতে শুরু করেছে।

বুঝতে পারছি না–পরিষ্কার করে বল কে আসছে?

পোকারা আসছে।

আসুক না, অসুবিধা কি?

ওরা আমাকে খেয়ে ফেলার জন্যে আসছে মামা।

তোকে খাবে কেন? ওদের কি খাওয়ার অভাব পড়েছে?

আমাকে ওরা পছন্দ করে তো মামা, এই জন্যেই খেয়ে ফেলবে।

পছন্দ করলেই খেয়ে ফেলতে হবে? আমি তোকে পছন্দ না করলেও তুই তো আমাকে পছন্দ করিস। তাই বলে কি তুই আমাকে খেয়ে ফেলেছিস, না খাওয়ার কথা চিন্তা করছিস?

পোকাদের চিন্তাভাবনা তো মানুষের মতো না মামা। ওরা অন্যভাবে চিন্তা

করুক অন্যভাবে চিন্তা। তুই ভাবিস না।

আমার ভয় লাগছে মামা। দূর দূর খেকে পোকার আসতে শুরু করেছে।

বজলুর রহমান সান্ত্বনার স্বরে বললেন, তুই কোন চিন্তা করিস না। তোকে খেয়ে ফেলবে বললেই হল? আমরা আছি কি জন্যে? দরকার হলে ঘরের চারকোণায় DDT পাউডার দেব। DDT পাউডার মারাত্মক জিনিস–পোকার বাবাও আসতে পারবে না। তুই চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকু–মোটেও চিন্তা করবি না।

জ্বি আচ্ছা।

বজলুর রহমান ব্যাপারটাতে তেমন গুরুত্ব দিলেন না। জ্বর বেশি বাড়লে লোকজন অসংলগ্ন কথা বলে। আলতাফ তাই করছে। বজলুর রহমান ফাইল হাতে অফিসের দিকে রওনা হলেন।

.

১৫.

আমার নাম বজলুর রহমান। আমি আলতাফ হোসেনের মামা।

ও আচ্ছা। বসুন।

আমি স্যার ফাইলটা নিয়ে এসেছি।

মনসুর সাহেব অবাক হয়ে বললেন, কি ফাইল?

একটা জরুরি ফাইল যে আপনি আলতাফকে দিয়েছিলেন, ফাইলটা হারিয়ে গিয়েছিল–ঐ ফাইল।

মনসুর সাহেব অবাক হয়ে বললেন, সেই ফাইল আপনি কোথায় পেলেন?

গাধাটা বাসায় নিয়ে গিয়েছিল। তারপর ভুলে গেছে। এ রকম যে হবে জান&#