পিছু ডাক – শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

পিছু ডাক - শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

বাংলাদেশের কোনও একটি বড় রেলওয়ে জংশনে প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণীর মেয়েদের ওয়েটিং রুম। ঘরটি টেবিল চেয়ার গদি-আঁটা চওড়া বেঞ্চি প্রভৃতি যথোচিত আসবাবে সজ্জিত। মেঝে পরিষ্কার মোজেইক করা। ঘরের প্রবেশ দ্বারে সতরঞ্চির মতো পর্দা ঝুলিতেছে, পাশে আর একটি দরজার মাথার উপর লেখাল্যাভেটারি। রাত্রি কাল; মাথার উপর তীব্রশক্তির দুটা ইলেকট্রিক ল্যাম্প জ্বলিতেছে।

প্রবেশ দ্বারের দিকে পিছন করিয়া ঘরের এক পাশে একটি স্ত্রীলোক মেঝেয় সতরঞ্চির উপর বসিয়া পান সাজিতেছে ও মৃদুগুঞ্জনে হিন্দী ঠুংরী ভাঁজিতেছে। সাজপোশাক ধনী শ্রেণীর বাঙালী কুলকন্যার মতো, সম্মুখে রূপার পানের বাটা। পিছনে কিছু দূরে কয়েকটা সুটকেস হোন্ডল বেতের ঝাঁপি প্রভৃতি ও একটা রূপার গড়গড়া রহিয়াছে; এগুলি এই স্ত্রীলোকেরই লটবহর, কারণ ঘরে অন্য কোনও যাত্রী নাই।

স্ত্রীলোকের বয়স অনুমান আটাশ বৎসর—তবু রূপের বুঝি অবধি নাই। যৌবন অপরাহের দিকে গড়াইয়া পড়িয়াছে, কিন্তু সহসা তাহা ধরা যায় না। কী মুখের পরিণত সৌকুমার্যে, কী শরীরের নিটোল বাঁধুনিতে, যৌবন যেন এত রূপ ছাড়িয়া যাইতে পারিতেছে না। চোখের দৃষ্টি স্বভাবতই গর্বিত ও প্রভুত্ব-জ্ঞাপক; লক্ষ্মৌয়ের প্রসিদ্ধ গায়িকা কেশর বা যে মুগ্ধা-নায়িকা নয়, বরং অত্যন্ত সচেতনভাবে স্বাধীনভর্তৃকা তাহা তাহার রানীর মতো চেহারার দিকে দৃষ্টিপাত করিলে আর সন্দেহ থাকে না।

পান সাজা প্রায় শেষ হইয়াছে এমন সময় দরজার সতরঞ্চি রঙের পর্দা সরাইয়া ওয়েটিং-রুমের দাসী প্রবেশ করিল। রোগা ঘাঘা পরা স্ত্রীলোক; হাড় বাহির করা গালের ভিতর হইতে পান দোক্তার ডেলা ঠেলিয়া আছে। বাঈজীকে সে প্রথম দেখিবামাত্র চিনিতে পারিয়াছিল। সে অতি নিম্ন শ্রেণীর ও নিম্ন চরিত্রের স্ত্রীলোক; ওয়েটিং-রুমের দাসীত্ব করাই তাহার একমাত্র উপজীবিকা নয়। তাই সমধর্মী আর এক নারীর গৌরব গরিমায় সে নিজেও যেন একটা মর্যাদা অনুভব করিতেছিল।

বিগলিত মুখের ভাব লইয়া সে কেশর বাঈয়ের পিছনে আসিয়া দাঁড়াইল।

দাসী : বাঈ সাহেবা, আপনি নিজে পান সাজছেন! দিন, আমি সেজে দিই।

বাঈজী তাচ্ছিল্যভরে একবার চোখ তুলিল।

কেশর : দরকার নেই। পরের হাতের সাজা পান আমি মুখে দিতে পারি না।

দাসী মুখ কাঁচুমাচু করিল।

দাসী : তাহলে—তামাক সেজে আনি?

পানের খিলি মুখের কাছে ধরিয়া কেশর ক্ষণেক ইতস্তত করিল।

কেশর : না থাক।

পান মুখে দিয়া কেশর বাকি পানগুলি ডিবায় ভরিতে ভরিতে একটা কোনও জিনিস এদিকে ওদিকে খুঁজিতে লাগিল। ওদিকে দাসী যাইতে চায় না, বাঈজীর জন্য একটা কিছু করিতে পারিলে সে কৃতার্থ হয়।

দাসী : বাঈ সাহেবার রাত্রের খানা-পিনাও তো এখনও হয়নি। গাড়ি আসবে সেই পৌনে দশটায়–এখনও অনেক দেরি। যদি হুকুম হয় তো কেনারে ফরমাস দিয়ে আসি—

কেশর : খাবার পাট আমি চুকিয়ে নিয়েছি। ম্যানেজার সাহেব বাইরে আছেন। তুই একবার তাঁকে ডেকে দে।

দাসী : এই যে বিবি সাহেবা, এক্ষুনি দিচ্ছি। তিনি প্ল্যাটফর্মে পায়চারি করছেন।

দাসী ব্যস্তভাবে বাহির হইয়া গেল। কেশর দুটি পান হাতে লইয়া নাড়াচাড়া করিতে লাগিল। পানের সহিত যে বিশেষ মশলাটিতে সে অভ্যস্ত ঠিক মৌতাতের সময় তাহা হাতের কাছে না পাইয়া বাঈজী একটু অধীর হইয়া উঠিয়াছে।

পর্দা ঠেলিয়া যে লোকটি ঘরে প্রবেশ করিল তাহার নাম বিজয়। সে যে এককালে বিত্তবান ও ভদ্ৰশ্রেণীর লোক ছিল তাহার চেহারা দেখিয়া এখনও অনুমান করা যায়; ধানের শীষ পাটে আছড়াইলে শস্য ঝরিয়া গিয়া কেবল খড়ের গোছাটা যেমন দেখিতে হয়, অনেকটা সেইরূপ। শীর্ণ লম্বা লোক, বয়স চল্লিশের কাছাকাছি; মাথার সম্মুখস্থ টাকের নগ্নতা ঢাকা দিবার জন্য পাশের লম্বা চুল টানিয়া আনিয়া টাকের লজ্জা নিবারণ করা হইয়াছে। এই লোকটির চেহারা হাসি কথাবার্তা সব কিছুর মধ্যেই একটু শুষ্কতা আছে। গত দশ বৎসরে নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টুকু ও পূর্বপুরুষ সঞ্চিত সমস্ত অর্থ নিঃশেষে কেশর বাঈজীর পায়ে ঢালিয়া দিয়া এখন নিজেকেও সে বাঈজীর পদমূলে নিক্ষেপ করিয়াছে। নামে সে বাঈজীর বিজনেস ম্যানেজার; আসলে গলগ্রহ। বাঈজীর মনে বোধ হয় দয়া-মায়া আছে, তাই সে বিজয়কে তাড়াইয়া না দিয়া অন্নদাস করিয়া রাখিয়াছে। বিজয় সে কথা বোঝে; তাই তাহার নিরুদ্ধ অভিমান নিজের চারিপাশে শুষ্কতা ও নীরস ব্যঙ্গ বিদ্রূপের একটা আবরণ ফেলিয়া রাখিয়াছে।

কেশরের দিকে আসিতে আসিতে বিজয়ের অধরের একপ্রান্ত গোপন ব্যঙ্গভরে নত হইয়া পড়িল।

বিজয় : কি বাঈজী, খুঁজি খুঁজি নারি? অমূল্য নিধি খুঁজে পাচ্ছ না?

কেশর ঈষৎ বিরক্তিভরে চোখ তুলিল।

কেশর : তুমিই পানের বাটা থেকে কখন সরিয়েছ। দাও কৌটো।

বিজয় কাত করা একটা সুটকেসের প্রান্তে বসিল।

বিজয় : নেশা নেশা নেশা। দুনিয়ার এমন লোক দেখলুম না যার একটা নেশা নেই; সবাই। নেশার ঝোঁকে চলেছে। মৌতাতের সময় নেশার জিনিসটি না পেলে বড় কষ্ট হয়, না কেশর বাঈ?

কেশর : হয়। এখন কৌটো দাও।

বিজয় ধীরে-সুস্থে পকেট হইতে একটি দেশলাই বাক্সের আকৃতির রূপার কৌটা বাহির করিল; সেটা নাড়াচাড়া করিতে করিতে কতকটা যেন নিজমনেই বলিতে লাগিল—

বিজয় : নেশা ভাল—তাতে মৌজ আছে। কিন্তু নেশা যখন ভূতের মতন ঘাড়ে চেপে বসে তখনই বিপদ। দেখো বাঈজী, নেশার পাল্লায় যেন আমার মতন সর্বস্বান্ত হয়ো না। আমার দৃষ্টান্ত দেখে সামলে যাও।

কেশর ভ্রূ তুলিয়া চাহিল।

কেশর : তুমি কি নেশার পাল্লায় পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছ?

বিজয় : তা ছাড়া আর কি? ফল দাঁড়িয়েছে এই যে, নেশা রয়ে গেছে, কিন্তু মৌতাত আর পাওয়া যাচ্ছে না।

কেশর : তোমার মৌতাত তো মদ।

বিজয় : মদ? উঁহু। মদ খাই বটে-না খেলে চলেও না—কিন্তু ওটা আমার আসল নেশা নয়। আমার আসল নেশা

বিজয় অর্থপূর্ণভাবে কেশরের মুখের মানে চাহিয়া হাসিল; তারপর যেন কথা পাল্টাইয়া বলিল—

বিজয় : মদের পয়সা না থাকলে মানুষ যেমন তাড়ি খায়, আমার মদ খাওয়া তেমনি

ইঙ্গিতটা বুঝিতে কেশরের বাকি রহিল না কিন্তু সে অবহেলাভরে মুখ ফিরাইয়া লইয়া বলিল— কেশর : আবোল-তাবোল বোকো না; কোরে ঢুকেছিলে বুঝি?

বিজয় : (হাসিয়া) আরে, সেখানে ঢোকবার কি জো আছে ট্যাঁক্ যে একেবারে ফাঁক! তাই ভাবছিলুম তুমি যদি—আজ শীতটাও পড়েছে চেপে

কেশর : (দৃঢ়স্বরে) না। এখনও ট্রেনে অনেকখানি যেতে হবে। ঘরে মদ খেয়ে যা কর তা কর, বে-এক্তিয়ার হয়ে পড়ে থাক, আমি কিছু বলিনে। কিন্তু রাস্তায় ওসব চলবে না। যাও এখন, এটা মেয়েদের ওয়েটিং রুম, এখানে বেশীক্ষণ থাকলে হয়তো স্টেশন-মাস্টার হাঙ্গামা করবে। বাইরে গিয়ে বসো গে—

বিজয় : (উঠিয়া) তথাস্তু। আজ নিরামিষই চলুক তাহলে। কিন্তু সাদা চোখে এই স্টেশনে একলা বসে ধণা দেওয়া বড়ই একঘেয়ে ঠেকবে বাঈজী—

বিজয় বাহিরে যাইবার জন্য পা বাড়াইল।

কেশর : কৌটোটা দিয়ে যাও।

বিজয় হাসিয়া ফিরিয়া চাহিল।

বিজয় : সেটা কি ভাল দেখাবে বাঈজী? ব্রত-উপবাস যদি করতেই হয় তবে দুজনে মিলেই করা যাক। তুমি কালিয়া পোলাও খাবে আর আমি দাঁত চিরকুটে পড়ে থাকব, সেটা কি উচিত? তুমিই ভেবে দ্যাখো!

কেশর কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে বিজয়ের পানে চাহিয়া রহিল, তারপর নিঃশব্দে একটা পাঁচ টাকার নোট বাহির করিয়া তাহার হাতে দিল।

বিজয় : ধন্যবাদ। দয়ার শরীর তোমার বাঈজী। এই নাও কৌটো।

দ্রুত হস্তে কৌটা লইয়া কেশর প্রথমে দুটা পান মুখে পুরিল, তারপর কৌটা হইতে এক চিমটি মশলা লইয়া গালে ফেলিল। বিজয় দাঁড়াইয়া দেখিতে দেখিতে বলিল—

বিজয় : কেশর বাঈ, তুমি লক্ষ্মৌয়ের নামজাদা বাঈজী, রূপে-গুণে, টাকায় বুদ্ধিতে, ঠাটে-ঠমকে তোমার জোড়া নেই—তোমাকে উপদেশ দিতে যাওয়া আমার সাজে না। কিন্তু তবু বলছি, ও জিনিসটা একটু সাবধানে খেও। বিশ্রী জিনিস। একবার একটু মাত্রা বেশী হয়ে গেলে—এমন যে ভুবনমোহিনী তুমি, তোমাকেও আর বাঁচিয়ে রাখা যাবে না।

প্রথম চিমটি মুখে দিবার সঙ্গে সঙ্গে কেশরের ঔষধ ধরিতে আরম্ভ করিয়াছিল, চোখে মুখে একটা উত্তেজনা-দীপ্ত প্রফুল্লতা দেখা দিয়াছিল; সে আর এক টিপ মশলা মুখে দিতে দিতে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলিল—

কেশর : আমার মাত্রা বেশী হবে না। তুমি এখন এস গিয়ে।

বিজয়ের মুখে কিন্তু চকিত উদ্বেগের ছায়া পড়িয়াছিল, সে এক-পা কাছে আসিয়া বলিয়া উঠিল—

বিজয় : মণি! আর খেও না! সত্যি বলছি, ওটা বড় সাংঘাতিক জিনিস! মণি!

নিজের পুরাতন নামে সহসা আহূত হইয়া কেশরের নেশা-জনিত প্রসন্নতা মুখ হইতে মুছিয়া গেল; চমকিয়া সে বিজয়ের পানে বিস্ফারিত চক্ষু ফিরাইল।

কেশর : চুপ! ও নাম আবার কেন?

কেশর কটু করিয়া মশলার কৌটা বন্ধ করিল। বিজয় হাসিল : তাহার কণ্ঠের স্বাভাবিক ব্যঙ্গ-ধ্বনি আবার ফিরিয়া আসিল।

বিজয় : মাফ কর বাঈজী, বে-টক্করে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। দশ বছররের অভ্যাস, যাবে কোথায়? প্রথম যখন ঘর ছেড়ে আমার সঙ্গে বেরিয়েছিলে, তখন মণিই ছিলে; আরও কবছর—যদ্দিন আমার টাকা ছিল—ঐ নামই জারি রইল। তারপর হঠাৎ একদিন তুমি মনমোহিনী কেশর বাঈ হয়ে উঠলে। ছিলাম তোমার মালিক, হয়ে পড়লাম—ম্যানেজার। কিন্তু মনের মধ্যে সেই পুরানো নামটি গাঁথা রয়ে গেছে। মণি মণি মণি! কি মিষ্টি কথাটি বল দেখি? সহজে কি ভোলা যায়?

শুনিতে শুনিতে কেশরের মুখ কঠিন হইয়া উঠিতেছিল, সে রুক্ষস্বরে বলিল—

কেশর : আমার ভাল লাগে না। যা চুকেবুকে গেছে তার জন্য আমার মায়াও নেই, দরদও নেই। ওসব আগের জন্মের কথা। আমি কেশর বাঈ—এ ছাড়া আমার অন্য পরিচয় নেই। আর কখনও ওনামে আমাকে ডেকো না।

বিজয় মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিল, তারপর অলস পদে দ্বারের দিকে যাইতে যাইতে মুখ ফিরাইয়া বলিল–

বিজয় : এখনও তোমার ঘা শুকোয়নি বাঈজী।

বিজয় বাহির হইয়া গেল। কেশর কিছুক্ষণ স্তব্ধ হইয়া রহিল; তারপর কতক নিজমনেই বলিল—

কেশর : ঘা শুকোয়নি! না মিছে কথা। আমার কোনও আপশোষ নেই। কিন্তু কিন্তু যখনই। ঐ নামটা শুনি মনে হয় কে যেন পিছন থেকে ডাকছে। পিছু ডাক!

কেশর মাথা নাড়িয়া চিন্তাটাকে যেন দূরে সরাইয়া দিল, তারপর অন্যমনস্কভাবে কৌটা খুলিয়া এক টিপ্ মশলা মুখে দিবার উপক্রম করিল।

মুখে দিতে গিয়া তাহার চমক ভাঙিল। সে মশলার দিকে কিছুক্ষণ চাহিয়া আবার উহা কৌটায় রাখিয়া দিল। তারপর কৌটাটা পানের বাটার মধ্যে রাখিয়া দৃঢ়ভাবে বাটা বন্ধ করিল।

কেশর : উহু, আর না। বেশী হয়ে যাবে।

.

ওয়েটিং রুমের বাহিরে প্ল্যাটফর্মে ঘণ্টা বাজিয়া উঠিল, পরক্ষণেই একটা ট্রেন আসিয়া দাঁড়াইল। ইঞ্জিনের চোঁ চোঁ হড়হড় শব্দ, যাত্রীদের ওঠা-নামার হুড়াহুড়ি,—কুলিকুলি—চা—গরম—হিন্দু পানিকাবাব রোটি ইত্যাদি।

গোটা দুই কুলি কয়েকটা লটবহর লইয়া ওয়েটিং রুমে প্রবেশ করিল এবং মোটগুলি ঘরের অন্য পাশে রাখিয়া নিষ্ক্রান্ত হইল। ইত্যবসরে নবাগত মেল ট্রেনটিও বংশীধ্বনি করিয়া হু হু শব্দে বাহির হইয়া পড়িল।

এই সময় একটি পুরুষ গলা বাড়াইয়া ওয়েটিংরুমে উঁকি মারিলেন। গায়ে ওভারকোট, মাথা ও মুখ বেড়িয়া পাঁশুটে রঙের একটি কটর—সম্ভবত সর্দি হইয়াছে। তিনি ঘরের ভিতরটা একনজর দেখিয়া লইয়া, বাহিরের দিকে মুখ ফিরাইয়া সর্দি-চাপা গলায় ডাকিলেন—

পুরুষ : ওগো! এই যে—এদিকে—

বাইশ-তেইশ বছরের একটি সুশ্রী যুবতী বছর-দুয়েকের ছেলে কোলে লইয়া প্রবেশ করিলেন; দ্বারের নিকটে দাঁড়াইয়া ছেলেকে কোল হইতে নামাইয়া দিতেই সে হাঁটিয়া ভিতরের দিকে চলিল। কেশর দ্বারের দিকে পিছন ফিরিয়া ছিল; দ্বারের নিকট গলার আওয়াজ পাইয়া সে কেবল মাথার উপর আঁচলটা টানিয়া দিল।

পুরুষ : তুমি তাহলে খোকাকে নিয়ে এখানেই থাক, আধ ঘণ্টার মধ্যেই ট্রেন এসে পড়বে। কাগজ-টাগজ কিছু কিনে এনে দেব? এখনও স্টল খোলা আছে।

যুবতী : দরকার নেই। তোমার ছেলে সামলাতেই আমার আধ ঘণ্টা কেটে যাবে। এত রাত্তির হল, এখনও ওর চক্ষে ঘুম নেই।

পুরুষ : তাহলে না হয় একে আমিই নিয়ে যাই—আমার কাছে খেলা করবে।

যুবতী : না না, আমার কাছে থাক। খায়নি এখনও। তুমি যাও, আর ঠাণ্ডায় দাঁড়িয়ে থেকো

পুরুষ : আমি ভাবছিলুম এইখানেতেই দোরের বাইরে চেয়ার নিয়ে বসে থাকি। যদি তোমার কিছু দরকার-টরকার হয়—

যুবতী : কিছু দরকার হবে না আমার। সর্দিতে মুখ তন্তম্ করছে, বাইরে ঠাণ্ডায় বসে থাকবে! যাও, ওয়েটিং রুমে দোর বন্ধ করে বোসস গে। (পুরুষ যাইবার উপক্রম করিলেন) আর শোনো!আমি বলি কি, কোর থেকে একটু ব্রাণ্ডি আর কুইনিনের দুটো গুলি আনিয়ে নিয়ে খেও; এই সর্দির ওপর ট্রেনের ঠাণ্ডা কি জানি বাপু আমার ভয় করছে—যদি আবার জ্বর-টর–

পুরুষ একটু ঠাট্টা করিলেন।

পুরুষ : ডাক্তারের বোন কিনা, এটু ছুতো পেলেই ডাক্তারি করা চাই। আচ্ছা, দেখি চেষ্টা করে। কুইনিন গেলা শক্ত হবে না বাঙালীর ছেলে অভ্যেস আছে কিন্তু রমা, অন্য জিনিসটা যে গলা দিয়ে নামে না।

রমা : নামবে। লক্ষ্মীটি খেও; ওষুধ বৈ তো নয়, ঢক করে গিলে ফেলবে। যাও, আর দাঁড়িয়ে থেকো না

পুরুষ : বেশ। এর পরে কিন্তু মাতাল বলতে পাবে না, তা বলে দিলুম—

রমা : হয়েছে, আর রসিকতা করতে হবে না। যত বুড়ো হচ্ছেন (কপট সূকুটি করিল)

পুরুষ : ঘৃতভাণ্ড!—আচ্ছা—ট্রেনের সিগনাল দিলেই আমি আসব।

পুরুষ হাসি এবং কাশি একসঙ্গে চাপিতে চাপিতে প্রস্থান করিলেন। রমা ঘরের দিকে ফিরিয়া এক পা আসিয়াই থমকিয়া দাঁড়াইয়া পড়িল। খোকা ইতিমধ্যে ঘরের এদিক ওদিক ঘুরিয়া হঠাৎ কেশরের পিঠের উপর ঝাঁপাইয়া পড়িয়া দুই ক্ষুদ্র হস্তে তাহার গলা জড়াইয়া ধরিয়া খখ হাস্য করিতেছে।

রমা : ওমা! ওরে ও দস্যি!

রমা তাড়াতাড়ি ছেলেকে কেশরের পৃষ্ঠ হইতে মুক্ত করিয়া লইল।

রমা : কিছু মনে করবেন না, ভারী দুরন্ত ছেলে—

কেশর সহাস্যে মাথার কাপড় সরাইয়া রমার পানে চাহিল। তাহার রূপ দেখিয়া রমার চোখ যেন ঝলসিয়া গেল; সে মুগ্ধনেত্রে চাহিয়া রহিল।

কেশর : তাতে কী হয়েছে! এস খোকাবাবু, আমার কোলে এস।

থোকা তিলমাত্র দ্বিধা না করিয়া বুটসুদ্ধ কেশরের কোলে উঠিয়া বসিল। রমা বিপন্ন হইয়া পড়িল।

রমা : ঐ দেখুন! আপনার কাপড় নষ্ট করে দেবে!

কেশর : না না, কিছু করবে না। ভারী সপ্রতিভ ছেলে তো! আর, মুখখানি কি সুন্দর, যেন গোলাপ ফুল ফুটে আছে। তোমার নাম কি খোকাবাবু?

খোকা মাতার প্রতি একবার কটাক্ষপাত করিল।

খোকা : মা বলে—দচ্চি। কেশর হাসিয়া উঠিল।

কেশর : ওমা-দস্যি বলে! ভারি দুষ্টু তো তোমার মা! আচ্ছা, এবার সত্যিকার ভাল নাম কি তোমার বল তো বাবা?

খোকা একটি তর্জনী তুলিয়া সমুচিত গাম্ভীর্যের সহিত বলিল—

খোকা : পিটিং কুঃ!

কেশর স্মিত সপ্রশ্ন নেত্রে রমার পানে চাহিল; রমা হাসিল।

রমা : ওর নাম প্রীতিকুমার—প্রীতিকুমার গুহ। ভাল করে বলতে পারে না—ঐ কথা বলে।

ক্ষণেকের জন্য কেশর একটু বিমনা হইল।

কেশর : প্রীতিকুমার গুহ! (সামলাইয়া লইয়া) বা খাসা নাম—যেমন মিষ্টি খোকা তেমনি মিষ্টি নাম—আপনি দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, বসুন না। এই সতরঞ্চিতেই বসুন। আসুন—

কেশর সতরঞ্চির উপর নড়িয়া বসিল। রমা একবার একটু ইতস্তত করিল।

রমা : এই যে বসি। খোকা এখনও খায়নি, ওর খাবার নিয়ে বসি।

একটা বেতের বাক্স হইতে দুধের বোতল ও কয়েকখানা বিস্কুট লইয়া রমা কেশরের কাছে আসিয়া বসিল।

রমা : আয় খোকা, দুধ খাবি—

খোকা দ্বিধাভরে মাথা নাড়িল।

খোকা : ড়ুড়ু কাব না—বিক্কু কাব।

রমা : আগে দুধ খাবি, তবে বিস্কুট দেব। আয়।

খোকাকে নিজের কোলে শোয়াইয়া বোতলের স্তনবৃন্ত তাহার মুখে দিতেই খোকা আর আপত্তি না। করিয়া দুধ খাইতে লাগিল।

এই দুধ খাওয়ানোর ব্যাপার দেখিতে দেখিতে কেশরের মুখখানা যেন কেমন একরকম হইয়া গেল; প্রবল আকাঙক্ষার সহিত ঈষার মতো একটা জ্বালা মিশিয়া তাহার বুকের ভিতরটা আনচান করিতে লাগিল। খোকা পরম আরামে দুধ টানিতেছে; রমা স্মিতমুখ তুলিয়া কেশরের পানে চাহিল। কেশর চকিতে মুখে একটা হাসি টানিয়া আনিয়া সহৃদয়তার সহিত কথাবার্তা আরম্ভ করিল।

কেশর : আপনারা কোন দিকে যাচ্ছেন?

রমা : আমরা দেবীপুরে যাচ্ছি। ব্রাঞ্চ লাইনে যেতে হয়, রাত্রি একটার সময় পৌঁছুব। আর আপনি?

কেশর একটু থতমত হইয়া গেল।

কেশর : আমি—আমিও দেবীপুর যাচ্ছি।

রমা : (সাগ্রহে) দেবীপুরে! কাদের বাড়ি যাচ্ছেন? আপনি কি ওখানেই থাকেন?

কেশরের মুখ হঠাৎ লাল হইয়া উঠিল।

কেশর : না, আমি একটা কাজে যাচ্ছি।

রমা : ও—তাই। দেবীপুরে আপনার মতো এত সুন্দর কেউ থাকলে আমি জানতে পারতুম। আমি দেবীপুরেরই মেয়ে। অবশ্য সকলকে চিনি না, শহর তো ছোট নয়; কিন্তু হাসিয়া) আপনি থাকলে নিশ্চয় চিনতুম।

রূপের প্রশংসায় কেশরের কোনও দিন অরুচি হয় নাই কিন্তু আজ সে তাড়াতাড়ি কথা পাল্টাইয়া ফেলিল।

কেশর : আপনি বাপের বাড়ি যাচ্ছেন?

রমা : হ্যাঁ। সেও কাজে পড়েই যাওয়া। দাদার প্রথম কাজ—মেয়ের বিয়ে। খুব ঘটা করেই মেয়ের বিয়ে দিচ্ছেন : খবর পেয়েছি লক্ষ্মৌ থেকে বাইউলি আসবে। আমার দাদা দেবীপুরের খুব বড় ডাক্তার।

হঠাৎ কেশর পানের বাটার উপর ঝুঁকিয়া পান বাহির করিতে লাগিল। এই মেয়েটি যে বাড়িতে যাইতেছে ভ্রাতার নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে, সেই বাড়িতেই কেশর যাইতেছে নাচ গানের যোগান দিতে। এতক্ষণ সে রমার সহিত কথা কহিতেছিল সমকক্ষের মতে, এমন কি মনের মধ্যে একটু সদয় মুরুব্বিয়ানার ভাবও ছিল; কিন্তু এখন তাহার মনে হইল সে এই মেয়েটার কাছে একেবারে ছোট হইয়া গিয়াছে। কেশর জোর করিয়া মুখ তুলিল, জোর করিয়াই নিজের সহজ গর্বকে উদ্ৰিক্ত করিবার। চেষ্টা করিল। কয়েকটা পান হাতে লইয়া সে অনুগ্রহের কণ্ঠে বলিল—

কেশর : পান খাবেন?—এই নি।

যে অনুগ্রহ পাইয়া রাজা-রাজড়া, নবাব-তালুকদার কৃতার্থ হইয়া যায় রমা তাহাতে বিন্দুমাত্র। বিচলিত হইল না, হাসিয়া মাথা নাড়িল।

রমা : আমি পান খাই না—মানত আছে।

ইতিমধ্যে খোকা দুগ্ধপান শেষ করিয়া উঠিয়া বসিয়াছিল; তাহার হাতে বিস্কুট দিতেই সে দুহাতে দুটি বিস্কুট লইয়া ঘরময় ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল। কেশর রমাকে আর দ্বিতীয়বার পান খাইবার অনুরোধ করিল না, ভ্রূ তুলিয়া মুখের একটু বিকৃত ভঙ্গি করিয়া নিজে পান মুখে দিল। তাহার মন যে ভিতরে ভিতরে রমার প্রতি অকারণেই বিরূপ হইয়া উঠিয়াছে তাহা বুঝিতে পারিলেও সে তাহা দমন করিবার চেষ্টা করিল না।

কেশর : যিনি দোর গোড়ায় তোমার সঙ্গে কথা কইছিলেন উনি বুঝি তোমার কর্তা?

রমা হাসিয়া মাথা নীচু করিল।

কেশর : ঠিক আন্দাজ করেছি তাহলে। কথা শুনেই বোঝা যায় কী দরদ, কী আত্তি! কতদিন বিয়ে হয়েছে ভাই?

রমা : এই—পাঁচ বছর।

কেশর : পাঁচ বছর! বল কি? এখনও এত! পুরুষের আদর তো অ্যাদ্দিন থাকে না—তবে বুঝি তুমি দ্বিতীয় পক্ষ ভাই? শুনেছি দ্বিতীয় পক্ষের আদর ট্যাঁক্-সই হয়। কেমন, ধরেছি কিনা?

রমার মুখ একটু গম্ভীর হইল; সে খানিক চুপ করিয়া থাকিয়া বলি

রমা : হ্যাঁ—ঠিক ধরেছেন।

কেশর : (হাসিয়া) তা—দুঃখু কি ভাই। করকরে নতুন টাকা কি সবাই পায়? হাজার হাত ঘুরে এলেও টাকার দাম ষোল আনা। সতীন কাঁটা আছে নাকি?

রমা : না।

কেশর : ভাল ভাল। কাঁটা নেই, কেবল ফুল—এমন দ্বিতীয় পক্ষ হয়ে সুখ আছে। যাই বল।

কেশরের কথার মধ্যে যে ইচ্ছাকৃত খোঁচা আছে তাহা বুঝিতে না পারিলেও রমা মনে মনে একটু বিরক্ত হইয়াছিল; কিন্তু হাসিমুখেই বলিল—

রমা : আমার সব খবরই তো নিলেন; আমি কিন্তু আপনার কোনও পরিচয় পেলুম না—

কেশর : আমার পরিচয়?

কেশরের চোখের দৃষ্টি কড়া হইয়া উঠিল। ক্ষণেকের জন্য মিথ্যা পরিচয় দিবার কথাও তাহার মনে আসিল। কিন্তু সে সগর্বে তাহা মন হইতে সরাইয়া দিয়া ব্যঙ্গভরে হাসিয়া উঠিল।

কেশর : আমার পরিচয় শুনবে? দেখো ভাই, শিউরে উঠবে না তো? তুমি আবার কুলের কুলবধূ

রমা অবাক হইয়া রহিল। কেশর আর একটা পান মুখে দিয়া চিবাইতে চিবাইতে সম্মুখে উধ্বদিকে তাকাইল; তারপর তাচ্ছিল্যভরেই বলিল—

কেশর : কেশর বাঈরের নাম শুনেছ? লক্ষ্মৌয়ের কেশর বাঈ?

রমা ক্ষণেক স্তম্ভিত হইয়া রহিল।

রমা : (ক্ষীণ কণ্ঠে) কেশর বাঈজী! আপনিই!

কেশর : আমিই– বিশ্বাস হচ্ছে না?

রমা একবার বিহ্বল-নেত্রে চারিদিকে তাকাইল; রূপার গড়গড়াটা চোখে পড়িল। তারপর সে অনুভব করিল, সে বাঈজীর সহিত একাসনে বসিয়া আছে; তাহার সমস্ত শরীর সঙ্কুচিত হইয়া। উঠিল। কিন্তু সে হঠাৎ উঠিয়া যাইতেও পারিল না; তাহার বসার ভঙ্গিটা আড়ষ্ট হইয়া উঠিল মাত্র।

রমা : তাহলে আপনি-দাদার বাড়িতে

কেশর রমার ভাব লক্ষ্য করিতেছিল, তীক্ষ্ণ হাসিয়া বলিল—

কেশর : হ্যাঁ। গান গাইতে যাচ্ছি। ভারী লজ্জার কথা– না?

রমা : না না, তা বলিনি—

রমা এতক্ষণ লক্ষ্য করে নাই, খোকা বিস্কুট খাইতে খাইতে বিস্কুটের অধিকাংশই দুই গালে মাখিয়া ফেলিয়াছিল, এই ছুতা পাইয়া রমা তাড়াতাড়ি উঠিয়া পড়িল।

রমা : ওরে দস্যি ছেলে, ও কি করেছিস মুখময় বিস্কুট মেখে বসে আছিস। পারিনে আমি। চল, গোসলখানায় মুখ ধুইয়ে দিইগে

সে খোকার নড়া ধরিয়া গোসলখানার দিকে লইয়া চলিল। কিন্তু তাহার এই চাতুরী কেশরের কাছে গোপন রহিল না; কেশর বিদ্রূপ-ভরা সুরে হাসিয়া উঠিয়া বলিল—

কেশর : বলেছিলুম, শিউরে উঠবে। ঘরের বৌ—সতীলক্ষ্মী—শিউরে ওঠাই তো চাই, নইলে লোকে বলবে কি? আর, একজন বাঈজীর সঙ্গে এক সতরঞ্চিতে বসা—সে যে মহাপাতক। কি। দুঃখু যে কাছেই গঙ্গা নেই, নইলে স্নান করে শুদ্ধ হতে পারতে!

রমা : আমি—সেজন্য নয়, খোকাকে

কেশর : (কঠিন স্বরে) বলতে হবে না আমি বুঝতে পেরেছি, শাক দিয়ে কি মাছ ঢাকা যায়! কিন্তু তুমি মনে কোরো না যে তোমার মর্যাদা আমার চেয়ে একচুল বেশীবরং ঢের কম। কে তোমাকে চেনে? তোমার মতো বৌ বাংলা দেশের ঘরে ঘরে আছে কিন্তু খুঁজে বার কর দেখি আর একটা কেশর বাঈ! তুমি যাচ্ছ বড়মানুষ ভায়ের বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে, আর তোমার ভাই এক দিনের জন্য। এক হাজার টাকা দিয়ে খোসামোদ করে আমাকে নিয়ে যাচ্ছেন। কার মর্যাদা বেশী!

এই গায়ে-পড়া বচসায় রমা ঈষৎ ড়ু তুলিয়া কেশরকে লক্ষ্য করিতেছিল, শান্তস্বরে বলিল—

রমা : আপনার মর্যাদা যদি বেশীই হয়—তা বেশ তো, মান-মর্যাদার কথা তো আমি তুলিনি।

কেশর : মুখে তোলনি কিন্তু ঠোরে ঠারে তাই তো বলছ! কিসের এত দেমাক তোমাদের? ঘরের কোণে স্বামীর লাথি ঝাটা খেয়ে তো জীবন কাটাও। তোমাদের আবার মান-মর্যাদা! হ্যাঁ, সে কথা আমি বলতে পারি, মান-মর্যাদা খাতির সম্মান নিজের জোরে আদায় করেছি। কারুর দাসীবৃত্তি করি না—পুরুষ আমাকে মাথায় করে রেখেছে। এত খাতির এত সম্ভ্রম কখনও চোখে দেখেছ তোমরা?

কথা কহিলেই হয়তো ঝগড়ায় দাঁড়াইবে, তাই রমা আর কথা না বলিয়া ছেলেকে কোলে তুলিয়া লইয়া গোসলখানায় প্রবেশ করিয়া দরজা ভেজাইয়া দিল।

উত্তেজনায় কেশর ফুলিতেছিল, রমা চলিয়া যাইবার পর সে ক্রমশ একটু শান্ত হইল, তারপর কৌটা হইতে খানিকটা মশলা লইয়া মুখে দিল।

এই সময় একটি মাতাল দরজার পদার ভিতর মুণ্ড প্রবেশ করাইয়া কেশরকে দেখিয়া মহা আহ্লাদে হাসিতে হাসিতে ঘরে ঢুকিয়া পড়িল। লোকটির মাথায় বয়স আন্দাজ পঁয়ত্রিশ; গৌরবর্ণ দোহারা, মুখে একজোড়া পুরুষ্টু গোঁফ ও মাথায় চুনকরা সাদা টুপি। বড় বড় চক্ষু দুটি অরুণাভ।

মাতাল : বন্দেগি বিবি সাহেবা। এক হাজার কুর্ণিশ! (নত হইয়া কুর্ণিশ করিল ও সেই সঙ্গে কেশরের মুখখানা ভাল করিয়া দেখিয়া লইল) নাঃ—যা রটে তা বটে! রূপ তো নয়, যেন গগনে আগুন। অ্যাদ্দিন কানে শুনেই মজে ছিলুম, এখন চোখে দেখে বুক ঠাণ্ডা হল।

কেশর; (রুক্ষস্বরে) কে আপনি?

মাতাল : আমি, কুলুজি গাইতে গেলে পুঁথি বেড়ে যাবে বিবিজান, তার দরকার নেই। তবে কেও-কেটা মনে কোরো না। এখানকারই একজন জমিদার। অবস্থা আগের মতো আর নেই বটে, কিন্তু শরীফ আদমি। রাম-তেলক সিংকে এদিকের জজ-ম্যাজিস্টর সবাই চেনে। একটু গান বাজনা আমোদ-আহ্লাদের সখ আছে; কতবার ভেবেছি তোমাকে আনিয়ে দু রাত্তির মুজরো শুনি। কিন্তু যা তোমার খাঁই, পেরে উঠিনি গুদন। আজ কোরে দু পেগ টাতে এসেছিলুম, শুনলুম এই আঁস্তাকুড়ে তোমার পায়ের ধুলো পড়েছে। ব্যস্, চলে এলুম; আর কিছু না হোক, দেবী দর্শনটা তো হয়ে যাক।

কেশর : আপনি যান; এটা মেয়েদের ওয়েটিং রুম।

মাতাল : এমনি করেই কি বুকে ছুরি মারতে হয় বাঈজী! এই এলুম এই চলে যাব? (মেঝেয় উপবেশন করিল) বিশ্বাস হচ্ছে না যে আমি ভদ্রলোক? ভাবছ, ফোতো কাপ্তেন—দুদণ্ড এয়ার্কি মেরে কেটে পড়ব! (পকেট হইতে কয়েকটা নোট বাহির করিল) এক—দুই-তিন-চার-পাঁচ। এই দ্যাখো এখনও পঞ্চাশ টাকা পকেটে আছে। একটি ছোট্ট গজল শুনিয়ে দাও, বুলবুল বাঈ, পঞ্চাশটি টাকা পেন্নামি দিয়ে তর হয়ে বাড়ি চলে যাই।

কেশর : আপনি যদি এই দণ্ডে বেরিয়ে না গান, আমি স্টেশন মাস্টারকে ডেকে পাঠাব।

মাতালের মুখের গদগদ ভাব মুহূর্তে অন্তর্হিত হইল, সে কর্কশ কণ্ঠে বলিয়া উঠিল—

মাতাল : স্টেশন-মাস্টারের বাবারও ক্ষমতা নেই আমার মুখের ওপর কথা বলে, জুতিয়ে খাল খিচে নেব। রাম-তেলক সিংকে এদিকের সবাই চেনে; যতক্ষণ ভদ্দর লোক আছি ততক্ষণ ভদ্দর লোক, কিন্তু বিগড়ে গেলে বাপের কুপুত্ত্বর। (রক্তনেত্রে চাহিয়া) নাও, আর দেরি কোরো না, ঝাঁ করে একটা গেয়ে ফ্যালো—

কেশর : আমি গাইব না। আপনি যান।

মাতাল : (নিজের ঊরুতে চাপড় মারিয়া) গাইবে না কি, আলবৎ গাইবে! পয়সা দিচ্ছি—গাইবে! ব্যবসাদার মেয়েমানুষ তুমি, যখন হুকুম করেছি, গাইতে হবে।

অসহায় ক্রোধে ও আশঙ্কায় কেশরের মুখ বিবর্ণ হইয়া গেল। সে কি করিবে ভাবিয়া না পাইয়া চারিদিকে তাকাইতে লাগিল। এই সময় গোসলখানার দরজা খুলিয়া থোকা কোলে রমা বাহির হইয়া আসিল।

একজন পুরুষকে ঘরের মধ্যে কেশরের অতি নিকটে বসিয়া থাকিতে দেখিয়া রমা থমকিয়া দাঁড়াইয়া পড়িল, আঁচলটা মাথার উপর টানিয়া দিয়া তীক্ষ্ণ অনুচ্চ কণ্ঠে বলিল—

রমা : এ কি! এ ঘরে পুরুষমানুষ কেন?

মাতাল রমাকে দেখিয়া ক্ষণকাল বিস্ফারিতনেত্রে চাহিয়া রহিল, তারপর ধড়মড় করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল।

মাতাল : অ্যাঁ! এ যে—এ যে—! (হাতজোড় করিয়া) মাফ করবেন মা লক্ষ্মী—আমি জানতুম—ভেবেছিলুম কেবল বাঈজীই ঘরে আছে। মাফ করবেন, আমি যাচ্ছি। (যাইতে যাইতে ঘুরিয়া) আমি ভদ্দর লোকের ছেলে, ঘরে ভদ্রমহিলা আছেন জানলে এ বেয়াদবি আমার দ্বারা হত না। আমি যাচ্ছি।

লজ্জিত মাতাল চলিয়া গেল। রমা খোকাকে ছাড়িয়া দিয়া একটা চেয়ারে বসিল। মর্যাদায় কে বড়, একটা মাতাল এই প্রশ্নের চূড়ান্ত মীমাংসা করিয়া দিয়া গিয়াছে; কেশর আর মুখ তুলিয়া রমার পানে চাহিতে পারিল না। রমার মুখ দেখিয়াও তাহার মনের ভাব বোঝা গেল না, কিন্তু কেশরের অহঙ্কার যে ধিক্কার ও অপমানে মাটির সহিত মিশিয়া গিয়াছে তাহাতে আর সন্দেহ রহিল না।

ইহাদের মধ্যে আবার আলাপ আরম্ভ হইবার আর কোনও সূত্রই ছিল না। দুইজন বিভিন্ন জগতের অধিবাসীর মধ্যে ক্ষণিকের সংস্পর্শ ঘটিয়াছে। রমা গায়ে পড়িয়া এই পতিতার সহিত আবার আলাপ আরম্ভ করিবে তাহার এমন প্রবৃত্তি নাই। কেশরের বলিবার কিছু নাই। সুতরাং বাকি সময়টা হয়তো ইহাদের নীরবেই কাটিয়া যাইত; কিন্তু যিনি লজ্জা ধিক্কার শুচিতা অশুচিতার অতীত, সেই শিশু ভোলানাথ গোল বাধাইলেন। খোকা স্বাধিকার-প্রতিষ্ঠ নির্বিকার চিত্তে কেশরের কোলে গিয়া বসিল।

খোকার এই অবাচীনতায় রমা সচকিতে চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া চাহিল। কেশরের বুকের মধ্যে রোদনের মতো একটা বাষ্পেচ্ছ্বাস গুমরিয়া উঠিল; তাহার ইচ্ছা হইল, পরম নিষ্পাপ, নবনীতের মতো কোমল এই শিশুটিকে সজোরে বুকে চাপিয়া ধরে। কিন্তু সে খোকাকে দুই হাতে কোল হইতে তুলিয়া দাঁড় করাইয়া ভারী গলায় বলিল—

কেশর : না বাবা, তুমি আমার কোলে এস না; তোমার মা হয়তো এখুনি তোমায় নাইয়ে দেবেন—-

ইহা তেজের কথা নয়, অভিমানের কথা। মুহূর্তে রমার মন গলিয়া গেল।

রমা : না না, থাক না আপনার কাছে কী হয়েছে? আমার ওসব কুসংস্কার নেই।

কেশর তিক্ত অসিল কিন্তু খোকাকে আবার কোলে বসাইল।

কেশর : ওটা কথার কথা। কিন্তু সে থাক, তোমার ভাল-মন্দ তোমার কাছে আমার ভাল-মন্দ আমার কাছে—কেউ তো কারুর ভাগ নিতে পারবে না। তবে আমি তোমার চেয়ে বয়সে বড়, দুনিয়াও ঢের বেশী দেখেছি। মানুষ যা বলে তা সত্যি নয়, মানুষ যাকে যে চোখে দ্যাখে তাও সব সময় সত্যি দ্যাখা নয়।

রমা : কি বলছেন আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।

কেশর কিয়ৎকাল চুপ করিয়া রহিল, খোকার মাথায় একবার হাত বুলাইল, তারপর ধীরে ধীরে। বলিতে আরম্ভ করিল।

কেশর : তোমার জীবন আমার অজানা নয়। আমিও একদিন তোমার মতো ঘরের বৌ ছিলুম–স্বামীর ঘর করেছি। কিন্তু ভগবান ঘরের বৌ করে আমাকে সৃষ্টি করেননি। ভগবান আমাকে অসামান্য রূপ অসামান্য গুণ দিয়ে সংসারে পাঠিয়েছিলেন, নিজের মুখে বললেও একথা সত্যি। যৌবনের আরম্ভে যখন নিজের কথা নিজে ভাবতে শিখলুম, তখন দেখলুম—এ আমি কোথায় কোন্ অন্ধকার কুয়োর মধ্যে পড়ে আছি! এর চেয়ে ঢের বড় জায়গা, ভোলা জায়গা আমায় ডাকছে। এখানে আমার স্থান নয়, আমার স্থান অন্য আসরে।—লোকে আমাকে কুলটা বলতে পারে, ঘৃণাও করতে পারে, কিন্তু কী আসে যায় তাতে? কাঁটা কোথায় নেই? তোমার পথেও কাঁটা আছে, আমার পথেও কাঁটা আছে। আমার সান্ত্বনা এই যে, নিজের স্থান আমি বেছে নিয়েছি, নিজের আসন আমি অধিকার করেছি।

রমা গালে হাত দিয়া শুনিতেছিল; তেমনি চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। খোকা ইত্যবসরে কেশরের কোলে শুইয়া ঘুমাইবার উপক্রম করিতেছিল। কিছুক্ষণ নীরবে কাটিয়া গেল। তারপর রমা হাত হইতে মুখ তুলিয়া প্রশ্ন করিল—

রমা : আপনি সুখী হয়েছেন?

কেশর : সুখী? হয়েছি বৈকি। অন্তত ঘরের কুলবধূ হয়ে থাকলে এর চেয়ে বেশী সুখী হতাম না। একথা জোর করে বলতে পারি।

রমা : আমি বিশ্বাস করি না; আপনি সুখী হননি। আপনি যার লোভে এ পথে পা দিয়েছিলেন তা পাননি, আপনার জাতও গেছে পেটও ভরেনি।

কেশর ক্ষণেক অবাক হইয়া চাহিয়া রহিল; এতটা স্পষ্টবাদিতা সে নরম-স্বভাব রমার কাছে প্রত্যাশা করে নাই। তাহার মন আবার যুদ্ধোদ্যত হইয়া উঠিল।

কেশর : এটা তোমার কুসংস্কার, বুদ্ধি-বিবেচনার কথা নয়।

রমা : (দৃঢ়স্বরে) না, বুদ্ধি-বিবেচনারই কথা। সংসার করতে হলে শুধু কুসংস্কারের ওপর ভর দিয়ে বসে থাকলে চলে না, একটু-আধটু ভাবতেও হয়। আমি আপনার চেয়ে বয়সে অভিজ্ঞতায় ছোট হতে পারি, কিন্তু আমাকেও অনেক কথা ভাবতে হয়েছে। আপনি স্বাধীনতা চেয়েছিলেন, মান যশ মর্যাদা চেয়েছিলেন, মেনে নিলুম। স্বাধীনতা খুব বড় জিনিস, মান-মর্যাদাও তুচ্ছ নয়; কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই বুঝতে পারবেন, মানুষের স্নেহ-ভালবাসা শ্রদ্ধা-মমতা তার চেয়ে ঢের বড় জিনিস। স্বাধীনতা মান-মর্যাদা ও-সব তো উপলক্ষ। আপনার রূপ-যৌবন আছে জানি; গুণও নিশ্চয় আছে—শুনেছি আপনি খুব ভাল নাচতে গাইতে পারেন কিন্তু এ-সব তো চিরদিনের নয়; আজ আছে কাল শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু জীবন সেই সঙ্গে শেষ হবে না। তখন? (একটু চুপ করিয়া) দেখুন, কেবল যৌবনের কথা ভেবে সারা জীবনের ব্যবস্থা করা তো বুদ্ধি-বিবেচনার কাজ নয়। এর পর শুধু শুকনো স্বাধীনতায় আপনার মন ভরবে কি? ভরবে না। কারণ আপনিও চান মানুষের স্নেহ-ভালবাসা শ্রদ্ধা-মমতা। আর তা পাননি বলেই আপনার জীবন ব্যর্থ হয়ে গেছে।

কেশর : কে বলে আমার জীবন ব্যর্থ হয়ে গেছে! মিথ্যে কথা! আমি মানি না।

রমা : (শান্তস্বরে) না মানুন। কিন্তু আপনি মনে জানেন, যা পেয়েছেন তা তুচ্ছ; আর যা হারিয়েছেন তার জন্যে আপনার বুকে অসীম বেদনা লুকিয়ে আছে—আমি দেখতে পাচ্ছি। (নিশ্বাস ফেলিয়া) খোকা কি ঘুমিয়ে পড়েছে?

কেশর কোলে খোকার পানে চাহিল; সহসা তাহার দেহ-মন যেন কোন দুরন্ত নিপীড়নে ভাঙিয়া পড়িবার উপক্রম করিল। সে বাম্পবিকৃতকণ্ঠে বলিল—

কেশর : হ্যাঁ। তুমি নেবে?

রমা : না, থাক আপনারই কোলে। এখন তুলতে গেলে হয়তো জেগে উঠবে।

কেশর একদৃষ্টে খোকার ঘুমন্ত মুখের পানে চাহিয়া রহিল; সে যখন চোখ তুলিল তখন তাহার দুই চক্ষু জলে ভরিয়া উঠিয়াছে।

কেশর : (রুদ্ধস্বরে) আর কিছু না, যদি এমনি একটি শিশুকে পৃথিবীতে আনবার অধিকার আমার থাকত—!

রমা তাহার পাশে নতজানু হইয়া বসিল, আর্দ্রকণ্ঠে কহিল

রমা : আমি বুঝতে পেরেছি। আপনি বড় অভিমানী; লজ্জার মধ্যে অপমানের মধ্যে আপনি একটি নিষ্পাপ শিশুকে টেনে আনতে পারবেন না। (উচ্ছ্বসিত নিশ্বাস ফেলিয়া) বড় নিষ্ঠুর সংসার! কত লোক কত ভুল করে, সব শুধরে যায়; কিন্তু মেয়েমানুষের এ ভুলের যে ক্ষমা নেই দিদি।

কেশর : (চোখ মুছিতে মুছিতে) বোলো না—দিদি বলে ডেকো না—ও নামে আমার অধিকার নেই। আমি কেশর বাঈজী—কেন আমাকে পিছু-ডাক ডাকছ।

রমা : পিছু ডাক কি সবাই শুনতে পায়? আপনিও শুনতে পেতেন না যদি না আপনার পিছু টান থাকত। আপনি আগে যা ছিলেন মনের মধ্যে এখনও তাই আছেন।

কেশর : তাই আছি—সত্যি তাই আছি? তবে কেন সকলে আমাকে শাস্তি দেবে? আমি জানতে চাই—সব ভুলের ক্ষমা আছে, এর ক্ষমা নেই কেন?

রমা : তা আমি জানি না। (একটু চুপ করিয়া) আপনি নিজেও তো নিজেকে ক্ষমা করতে পারেননি—অপরাধের গ্লানি তো আপনার মনেও আছে!

কেশর : (থতমত) গ্লানি! কিন্তু সে তো আমার মনের গ্লানি নয়। সমাজ গ্লানির বোঝা আমার মাথায় চাপিয়ে দিয়েছে—

.

বাহিরে ট্রেন আসিবার ঘন্টা বাজিয়া উঠিল; সঙ্গে সঙ্গে রমার স্বামী হন্তদন্ত হইয়া ঘরে প্রবেশ করিলেন। গলায় গলবন্ধ নাই, এবার তাঁহার মুখাবয়ব ভাল করিয়া দেখা গেল। পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ বছর বয়সের একটি অতি সাধারণ মানুষ।

রমার স্বামী : ট্রেন এসে পড়েছে, রমা, ট্রেন এসে পড়েছে। খোকা কৈ?

বলিতে বলিতে তিনি রমা ও কেশরের সম্মুখে গিয়া দাঁড়াইলেন।

ক্ষণকাল কেশর ও রমার স্বামী পরস্পরের পানে স্তম্ভিত দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিলেন; তারপর রমার স্বামী এক-পা পিছাইয়া আসিলেন–

রমার স্বামী : মণি!

বিদ্যুদাহতের মতো কেশর দুহাতে মুখ ঢাকিল। রমা চমকিয়া স্বামীর পানে চাহিল।

রমা : কি! কে ইনি! তুমি এঁকে চেনোনা? ইনি কে?

ক্ষণিকের মূঢ়তা ভাঙিয়া রমার স্বামী ক্ষিপ্রহস্তে ঘুমন্ত ছেলেকে কেশরের কোল হইতে ছিনাইয়া লইলেন; তারপর রমার হাত ধরিয়া টানিয়া তুলিয়া কঠোর স্বরে বলিলেন—

রমার স্বামী : চলে এস রমা

রমা : (ব্যাকুলস্বরে) কিন্তু কে ইনি?

রমার স্বামী : কেউ না—কেউ না—তুমি চলে এস।

রমাকে একরকম টানিতে টানিতেই তিনি ঘর হইতে বাহির হইয়া গেলেন।

ইতিমধ্যে ট্রেন আসিয়া পড়িয়াছিল। দুইটা কুলি দৌড়িতে দৌড়িতে আসিয়া রমাদের বাক্স-বিছানা তুলিয়া লইয়া চলিয়া গেল। কেশর এতক্ষণ মুখ ঢাকিয়া বসিয়া ছিল, এখন মুখ খুলিয়া হঠাৎ হাসিতে আরম্ভ করিল। হিস্টিরিয়ার হাসি, কিছুতেই থামিতে চায় না। অবশেষে হঠাৎ হাসি থামাইয়া সে উঠিয়া দাঁড়াইল; চোখের দৃষ্টি অস্বাভাবিক উজ্জ্বল, মুখে একটা ব্যঙ্গ-বিকৃত ভঙ্গি। কেশর মশলার কৌটা উজাড় করিয়া হাতের উপর ঢালিল।

এই অবসরে বিজয় চোখ মুছিতে মুছিতে ঘরে প্রবেশ করিয়াছিল, কেশর সমস্ত মশলা মুখে দিবার উপক্রম করিতেছে দেখিয়া সে ছুটিয়া আসিয়া কেশরের হাতে চাপড় মারিয়া মশলা ফেলিয়া দিল।

বিজয়; এ কি! পাগল হয়ে গেলে নাকি?

কেশর : পাগল! না পাগল হইনি। ওরা চলে গেছে?

বিজয় : ওরা কারা?

কেশর : না না, কেউ নয়। ওরা তো এই গাড়িতেই যাবে।

বিজয় : আমরাও তো এই গাড়িতেই যাব। দেরি কিসের? এখনি গাড়ি ছেড়ে যাবে—

কেশর : যাক ছেড়ে! বিজয়, আমি দেবীপুরে যাব না।

বিজয় : দেবীপুরে যাবে না!

কেশর : না—ফিরে যাব।

বাহিরে হুইসল দিয়া গাড়ি ছাড়িয়া দিল। কেশর উৎকর্ণ হইয়া গাড়ির আওয়াজ শুনিতে লাগিল। বিজয় হতভম্ব হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল।

গাড়ির আওয়াজ দূরে মিলাইয়া গেলে বিজয় সুটকেসের কোণের উপর বসিল।

বিজয় : কেলনারে একলা বসে বসে একটু চোখ লেগে গিয়েছিল। ইতিমধ্যে কি ঘটেছে কিছুই জানি না। ব্যাপারটা খুলে বল দেখি বাঈজী।

কেশর : (সম্মুখে স্থির দৃষ্টিতে তাকাইয়া) ব্যাপার! কিচ্ছু না। কয়েকজন চেনা লোকের সঙ্গে দেখা হল।

বিজয় : চেনা লোক? কেশর : হ্যাঁ—চেনা লোক—স্বামী, সতীন—সতীনের ছেলে—

কেশর একটু একটু হাসিতে আরম্ভ করিল; ক্রমে তাহার হাসি বাড়িতে লাগিল—উচ্চ হইতে উচ্চতর সপ্তকে।

হিস্টিরিয়ার হাসি।

২৪ অগ্রহায়ণ ১৩৪৯

Facebook Comment

You May Also Like