Monday, June 24, 2024
Homeবাণী-কথাঅস্পষ্ট মুখ - মঈনুল আহসান সাবের

অস্পষ্ট মুখ – মঈনুল আহসান সাবের

একটা অবৈধ স্বপ্ন দেখে শেষরাতে তার ঘুম ভেঙে গেল। ঘুমের মধ্যে এক জনের সঙ্গে ওটা তার হয়ে গেছে।

সে কিছুক্ষণ নিথর পড়ে থাকল বিছানায়। শরীরে কিছুটা অবসাদ, হয়ে যাওয়ার পর এমন হয়। সে ওটুকু অবসাদকে গুরুত্ব দিতে চাইল না। তার মাথার ভিতর তখন অন্য চিন্তা। কিছুটা আশ্চৰ্য্যও সে বোধ করছে। আচ্ছা, লোকটা কে? শামীমা একটু হাসল। সে ওই চিন্তা বাদ দিয়ে ঘুমোতে চাইল। কিছুক্ষণ সে চেষ্টা করল। তার ঘুম এলো না। শেষে সে উঠে বসল বিছানায়। কিছুক্ষণ বসে থাকল। তারপর এভাবে বসে থাকারও কোন মানে হয় না, এই ভেবে সে আবার শুয়ে পড়ল। কিন্তু এই শুয়ে থাকাটা তার অসহ্য লাগল। কী তাহলে সে করবে! শুয়ে থাকাটা অসহ্য, উঠে বসলেও কিছু করার নেই। সে একবার ভাবল বিছানা ছেড়ে নেমে টেলিভিশনটা অন করবে। তাদের টেলিভিশনে প্রায় ৩০/৩৫ টা চ্যানেল আসে। আসে, তবে কটা আর। দ্যাখা হয়। ৩/৪টা চ্যানেল মোটামুটি দ্যাখা হয়, বাকিগুলো হচ্ছে সময় কাটানোর জন্য তাকিয়ে থাকা। যখন হাতে কোনই কাজ থাকে না, যে ৩/৪ টি চ্যানেল মোটামুটি দ্যাখা হয়, সেগুলোতেও যখন দ্যাখার থাকে না কিছু, সে তখন শুয়ে বসে রিমোটের বোতাম টিপে চ্যানেল বদলায় শুধু। তবে কোন চ্যানেলই ২/৩ মিনিটের বেশি দ্যাখে না। আকর্ষণ বোধ করলে কোনটা হয়ত পাঁচ মিনিট। এভাবে অনেক সময় পার হয়ে যায়।

এখন এই ভোররাতে, যখন সে বুঝতে পারছে আর তার ঘুম আসবে না, তখন ওই কাজটি করা যায়—রিমোটের বাটন টিপেটিপে চ্যানেল বদলানো। কিন্তু এখন সম্ভবত ওই কাজটিও ভালো লাগবে না। ভিতরে ভিতরে সে অসম্ভব অস্থির বোধ করছে। আচ্ছা, লোকটা কে? ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার পর থেকে এই প্রশ্নটা ক্রমশই তার ভিতর তীব্র হয়ে উঠছে। হ্যাঁ সেই লোকটা। যে লোকটার সঙ্গে ব্যাপারটা ঘটে গেল, সে কে? শামীমা আবার একটু হাসল। লোকটা কে—এই প্রশ্নটা তীব্র হয়ে ওঠার কোন কারণ নেই। তবে সে আশ্চর্য হচ্ছে। হঠাৎ করে এতদিন পর কোন কারণ ছাড়া ওই মুখ!

তার অস্থির ওঠাবসায় রকিবের ঘুম হালকা হয়ে গেল। সে জড়ানো গলায় বলল, শামীমা? সে প্রথমবার জবাব দিল না কোন। সে ভাবল ঘুমের মধ্যে কথা বলেছে রকিব। সুতরাং সাড়া না দিলেও চলবে।

রকিব হাত তুলে একটা, চোখ খুলে তার দিকে তাকাল—ঘুম ভেঙে গেছে?

হুঁ। ছোট করে বলল শামীমা। সে একটা হাত রাখল রকিবের চুলে।

হ্যাঁ, মাথায় একটু হাত দিয়ে দাও তো….কখন ঘুম ভাঙল?

শামীমা রকিবের চুলে হাত বুলাতে আরম্ভ করল—এই তো একটু আগে আমারও সারা রাত ভাল ঘুম হয়নি। এপাশ-ওপাশ করলাম।

কাল সারা দিন জার্নি করে এসেছ। ঘুম তো ভাল হওয়া উচিত ছিল।

না। তুমি তো জানোই বেশি ধকল গেলে আমার ঘুমটা ভাল হয় না। আসলে রাতে একটা ঘুমের ওষুধ খাওয়া উচিত ছিল।

ঘুমোও, আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।

শামীমা রকিবের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল এবং রকিব সত্যিই এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল। তখন হাত সরিয়ে নিল শামীমা। মৃদু ভঙ্গিতে সে বিছানা ছেড়ে নামল। বাথরুমে গেল, বেরিয়ে রান্নাঘরে। চা বানাল এক কাপ। তারপর বারান্দায় এসে বসল। তাদের বাসার সামনে বেশ কিছুটা ভোলা জায়গা। এটা যে একটা কত বড় সুবিধা। সময়ে-অসময়ে তার যখন ভাল লাগে না, সে এই বারান্দায় এসে বসে। তাকিয়ে থাকে বহু দূরে। সে খেয়াল করে দেখেছে তখন তার মন ভাল হয়ে যায়। অবশ্য তার মন তেমন করে খারাপই বা হয় কখন! না, সে মনে করতে পারে না এমন কোন দিনের কথা যেদিন তার মন খুব খারাপ হয়েছিল। তার যেটুকু হয়, সেটুকুকে বলা যায়—মন ভারি হওয়া। সে তেমন কিছু নয়, অল্পতেই ঝেড়ে ফেলা যায়। আর মন আবার খারাপই বা হবে কেন, সে চায়ে ছোট একটা চুমুক দিয়ে দূরে তাকাল, মন খারাপ হওয়ার মতো কিছু তো ঘটে না। আচ্ছা, থাক ওসব মন খারাপ কিংবা ভাল হওয়ার কথা কথা হচ্ছে এতদিন পর ওই মুখ কেন?

২.

একবার খুব মজা হয়েছিল। রকিবদের অফিসে বিদেশ থেকে এক প্রতিনিধি এসেছিল, অ্যালেক্সি। অ্যালেক্সি খুব ফুর্তিবাজ, তাদের বাসায় এসে হইচই করে একাকার। প্রায় রাত দুটো পর্যন্ত জমিয়ে আড্ডা। পরদিন অ্যালেক্সি চলে গেল ঢাকার বাইরে, রকিবও গেল। রকিবকে তো যেতেই হবে, অফিসের কাজে সে মাসের মধ্যে অনেক দিন ঢাকার বাইরে কাটায়। আর, শামীমা থাকে একা, একদম একা। থাক, এ প্রসঙ্গে সে এখন কিছু বলবে না। এখন অ্যালেক্সিকে নিয়ে কী মজাটা হয়েছিল, সেটা সে বলবে।

দিন ৪/৫ বাইরে কাটিয়ে অ্যালেক্সি আর রকিব ফিরে এল। আর একটা রাত তুমুল আড্ডা। এক সময় পরিশ্রান্ত তাদের আড্ডা ভেঙে গেল। অ্যালেক্সি বিদায় নিল আর তারাও প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঘুমোতে গেল। সে রাতে শামীমার স্বপ্নের মধ্যে ব্যাপারটা অ্যালেক্সির সঙ্গে ঘটে গেল। এটা সে লুকালো না। কারণ রকিবকে সে চেনে, এটা রকিবের কাছে লুকানোর কিছু নয়। সে নাস্তার টেবিলে বসে বলল, একটা মজার ব্যাপার হয়েছে জানো?

রকিব এক পলক তার দিকে তাকিয়ে খবরের কাগজে চোখ ফেরাল কী করে জানব, তুমি কি বলেছ?

আমার মনে হচ্ছে গত রাতে ও ওই কাজটা আমার অ্যালেক্সির সঙ্গে হয়েছে।

হুঁ। রকিব বলল। তারপর যেন খেয়াল হল তার, সে খবরের কাগজ সরাল–মানে!

মানে পরিষ্কার। মনে তো হলো—অ্যালেক্সিই।

রকিব হো হো করে হাসতে আরম্ভ করল-মনে হচ্ছে অ্যালেক্সিকে খুব পছন্দ হয়ে গেছে তোমার।

ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত না? কীভাবে যে একেকটা মুখ চলে আসে।

রকিব হাসি থামাল না—এখন কথা ঘুরাচ্ছ?

অ্যাই বাজে কথা বলো না। এমনিতেই আমি খুব লজ্জা পেয়েছি।

রকিবের মুখে সামান্য হাসি থেকে গেল ব্যাপারটা আসলেও অদ্ভুত।

তুমি দ্যাখো, তুমি জানোই—অ্যালেক্সির কথা আমি একবারও ভাবিনি।

উঁহু কথাটা ঠিক না। অ্যালেক্সির কথা তুমি ভেবেছ।

শামীমা বলল, কখনও না।

ভেবেছ। কিন্তু যে স্বপ্ন দেখেছ রেকম কিছু ভাবোনি। কিন্তু হয়েছে কী—স্বপ্নের মধ্যে ওই ব্যাপারটা যখন ঘটে তখন একটা না একটা পরিচিত মুখ এসে যায়। অ্যালেক্সি এতক্ষণ ছিল আমাদের সঙ্গে—ওর মুখটা চলে এসেছে।

তুমি কাল রাতে ভোস করে না ঘুমিয়ে, ঘুমানোর আগে ওটা সারলেও তো পারতে। অ্যালেক্সি তাহলে স্বপ্নের মধ্যে তোক আর যেভাবে হোক, ওই কাজে আসার সুযোগ পেত না। আসলেও লজ্জা লাগে বাপু।

রকিব আড়মোড়া ভাঙল কীভাবে হবে ওটা! ৩/৪ দিনের এক্সটেনসিভ টুর, ফিরে অত রাত পর্যন্ত আড্ডা। তারপর কি শরীরে আর কোন ইচ্ছা থাকে।

ইচ্ছা না থাকলেও হতে হবে। কী লজ্জা স্বামী পাশে থাকতে।

লজ্জার কিছু নেই। গত মাসে আমার কী হয়েছিল সেটা শোনো। ওই যে টানা পাঁচ দিন বাইরে থাকলাম না?

এ আর ফলাও করে বলার কী! তুমি তো বাইরেই থাকো।

আহ্, শোননই না। ঢাকা ফেরার আগের রাতে স্বপ্ন আমাকে নিস্তেজ করে দিল। কিন্তু মেয়েটাকে আমি আর চিনতে পারি না। পারি না….।

একদম অচেনা?

ও রকমই। শেষে বুঝতে পারলাম—বিকালে যখন হোটেলে ফিরছি তখন রিসেপশনে মেয়েটাকে এক পলক দেখেছিলাম। বোর্ডার। স্বামীর সঙ্গে রিসেপশন

থেকে রুমের চাবি ফেরত নিচ্ছিল।

শামীমা আন্তরিক গলায় বলল, ওই একবার দেখেই মেয়েটাকে বুঝি তোমার খুব পছন্দ হয়ে গিয়েছিল?

রকিবও খুব সহজ ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল হ্যাঁ, ততটা অবশ্যই, যতটা তোমার অ্যালেক্সিকে পছন্দ হয়েছিল।

তারপর তারা দুজন মিলে খুব হাসল।

রকিব বলল, ওই মেয়েটা আমাকে খুব ভুগিয়েছিল।

শামীমা বুঝতে পারল না। সে জিজ্ঞেশ করল–কোন্ মেয়েটা?

ওই যে, বললাম না, ঢাকা ফেরার আগের রাতে হোটেলে…। ওই মেয়েটাকে আমি চিনতেই পারছিলাম না। কখন পারলাম, জানো?

শামীমা মুচকি হাসল—ফিরে এসে আমার সঙ্গে হওয়ার পর?

রকিব অবাক চোখে তাকাল—তুমি বুঝলে কী করে?

শামীমাও অবাক হয়ে গেল—ওমা, সত্যি নাকি! আমি তো এমনি বললাম।

না, সত্যি। সে রাতে আমাদের হওয়ার পর সিগারেট ধরালাম না? দুটো টান দিতেই মনে পড়ে গেল-আরে, এটা তো ওই মেয়ে!

শামীমা গম্ভীর মুখে জানতে চাইল নিজেকে তখন তোমার আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল মনে হলো কিংবা মার্কোনি?

অ্যালেক্সি কিংবা ওই মেয়েটার এক ধরনের অস্তিত্ব থেকে গেছে তাদের মধ্যে। ট্যুরে রওনা দেওয়ার আগে রকিব গম্ভীর মুখে বলে, তোমার জন্য অ্যালেক্সিকে রেখে যাচ্ছি।

শামীমাও হাসতে হাসতে জানায় হ্যাঁ, আর তোমার জন্য ওই মেয়েটা তো থাকছেই।

কিংবা টুর থেকে ফিরে এসে রবি জিজ্ঞেস করে—অ্যালেক্সি এসেছিল?

শামীমা জানতে চায়—ওই মেয়েটাকে কোথায় রেখে এলে!

রকিব হাসিমুখে বলে, লুঙ্গির সঙ্গে।

৩.

চা শেষ করে কাপটা পায়ের কাছে নামিয়ে রাখল শামীমা। শরীরে ক্লান্তি নেই কোন, সে লু আড়মোড়া ভাঙল। সে দেখেছে—এটা একটা চমৎকার ব্যাপার, এই আড়মোড়া ভাঙা, এ অভ্যাসটা রকিবেরও আছে। প্রায়ই সে বিকট শব্দ করতে করতে আড়মোড়া ভাঙে।

কখনও টানটান করে দ্যায় শরীর, বলে—ধরো শামীমা, এই যে টানটান করে দিলাম শরীর, শরীর টানটানই থাকল, আর স্বাভাবিক হলো না, তখন? শামীমা বলে, মন্দ কী! অমন জবুথবু স্বাভাবিক হওয়ার চেয়ে টানটান হয়ে থাকাই ভাল। সে কথা মনে হলে শামীমা নিজে নিজে একটু হাসল। আরও একটা আড়মোড়া ভাঙল সে। তারপর উঠে দাঁড়াল। রকিবকে ওঠাতে হবে। সে কাল রাতে শোয়ার আগে বলে রেখেছে তাকে একটু সকাল সকাল উঠিয়ে দেয়ার জন্য। অফিরে কিছু কাজ সে গত রাতে বাসায় নিয়ে এসেছে। রাতে শেষ করতে পারেনি। বাকিটুকু সকালে অফিসে রনা হওয়ার আগে শেষ করতেই হবে। কারণ কাল এগারোটায় তার রিপোর্ট নিয়েই অফিসে জরুরী মিটিং।

দুবার ডাকতেই রকিব উঠে পড়ল। ঘুমটা তার গভীর ছিল না। সে বিছানায় উঠে বসলে শামীমা চলে গেল রান্নাঘরে। এখন এক কাপ চা লাগবে রকিবের। চা খেয়ে সে বাথরুমে যাবে, তারপর কাজ করতে বসবে। কাজ যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য হয় তবে তাকে আরও এক কাপ চা দিতে হবে। রকিবের এই অভ্যাসটা খুব বাজে। চায়ের নেশা তার অতিরিক্ত। এর কিছু ছোঁয়া শামীমারও লেগেছে। বিয়ের আগে সে। চা খেত দিনে দুকাপ, কদাচিৎ সেটা তিন কাপ হয়েছে। এখন দিনে ৫/৬ কাপ হয়ে যাওয়াটা কোন ব্যাপার নয়। এর বেশিও হয়। তবে এতে দেখুন অসুবিধা হয় না। আগে যেমন বিকালের পর চা খেলে সে জানত রাতের গুমটা নির্ঘাত হারাম। এখন। রাতে যদি নি কাপ চাও সে খায়, ঘুমের সমস্যা হয় না। রাতে চা খাওয়ার অভ্যাস অবশ্য একা থাকতে থাকতে। মাসের মধ্যে অনেক দিন রকিব ঢাকার বাইরেই থাকে। ওই দিনগুলোতে, দিনগুলোতে মানে রাতে, শামীমার কিছুই করার নেই। তার শ্বশুর থাকে তাদের সঙ্গে। খুব নিরিবিলি নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ একা থাকতেই পছন্দ করেন। শ্বশুরের বইপত্রর অনেক, তার ব্যস্ততা ও বইপত্রের সঙ্গেই। শামীমা মাঝে মাঝে তার সঙ্গে গিয়ে গল্প করে। বিশেষ করে রকিব ঢাকায় না থাকলে, সন্ধ্যায় কিংবা তার কিছু পর পর শামীমার খুব একা একা লাগে। সে তখন শ্বশুরের সঙ্গে গল্প করে কিছু সময় পার করতে চায়। কিন্তু ওর খুব কম কথা বলেন, খুবই ভাল মানুষ তিনি, শামীমাকে তিনি পছন্দও করেন খুব, কিন্তু বেশি কথা বলায় তিনি অভ্যস্ত নন। শামীমাও একা একা কত আর চালিয়ে যায়, সে এক সময় উঠে আসে। তারপর সময় অবশ্য কোন না কোনভাবে কেটেই যাবে। সে এটা-ওটা করে, বারান্দায় বসে থাকে, টেলিফোনে এর-ওর সঙ্গে কথা বলে, রান্নার লোক আছে, কাল ন’টার দিকে এসে বিকাল পাঁচটায় যায়, সুতরাং খাওয়ার সময় একটু গরম করে নেয়া ছাড়া ওই দায়িত্বও পালন করতে হয় না। রান্না করতে হলে সময় পার করায় কিছু সুবিধাই হতো বইকী, সে যাক, নানাভাবে সময় কেটেই যায়। বিয়ের পর থেকেই এ রকম, সে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আর একেবারেই কিছু করার না থাকলে সে ছোট ছোট চুমুক দিয়ে অনেক সময় নিয়ে চা খায়, চা খায় আর টেলিভিশনের চ্যানেল বদলায়। ঘুমের সমস্যা তার হয় বইকী। মাঝে মাঝে হয়, সে এক বিছানায় ছটফট করে। তবে সেটা বেশি বেশি চা খাওয়ার জন্য নয়, সেটা অন্য কারণে।

ঘণ্টা দুয়েক পর কাজ শেষ করে উঠল রকিব। বিকট একটা শব্দ করল। কতক্ষণ হাত-পা ছুড়ল, তারপর বলল, নাস্তা দাও।

নাস্তা রেডিই আছে, রান্নার মেয়েটাকে বললে সে টেবিলে নাস্তা এনে দিল পাঁচ মিনিটের মধ্যে। এখন তারা দু’জনই বসবে। শ্বশুর খেয়ে নেন বেশ আগেই। তারপর বেরিয়ে পড়েন, শামীমা জিজ্ঞেস করে জেনেছে তিনি একেক দিন একেক বন্ধুর বাসায় বা অফিসে যান। শামীমা একদিন জিজ্ঞেস করেছিল বাবা, বন্ধুর বাসায় গিয়ে আপনি কী করেন?

শশুর প্রথমে বুঝতে পারেননি কী করি মানে?

সেটাই আমি জানতে চাচ্ছি কী করেন?

কেন, গল্প করি!

আপনি গল্প করেন! আমার মনে হয় না।

শ্বশুর শামীমার কথার অর্থ বুঝতে পেরে হাসতে আরম্ভ করেছিলেন।

কাজের মেয়েটির টেবিলে নাস্তা সাজানো শেষ হলে শামীমা ডাকল রকিবকে—এসো।

রকিব এসে বসল, একবার তাকাল শামীমার দিকে মুচকি হাসল—তোমাকে এই সকালবেলা বেশ সেক্সি দ্যাখাচ্ছে!

শুনে খুশিতে আটখানা হয়ে গেলাম।…আবার কবে যাচ্ছ ট্যুরে?

কবে যাচ্ছি মানে? এই তো মাত্র ফিরলাম।

সে জন্যই তো জানতে চাচ্ছি। আগে থেকে এবার তবে একটা মানসিক প্রস্তুতি থাকবে। রকিব হাসতে আরম্ভ করল।

হাসবে না। শামীমা গম্ভীর গলায় বলল। তোমার এ ধরনের হাসি দেখলে আমার মেজাজ গরম হয়ে যায়।

তাও ভালো শরীর গরম হয় না।

তা বটে, রকিব মাথা ঝাঁকাল। এটা আমি স্বীকার করছি। কিন্তু কী করব বলো? আমার চাকরিটাই যে এ ধরনের। আমার নিজেরও কি খারাপ লাগে না, অসুবিধা হয় না!

কে জানে তোমার কি হয়।…আমার মাঝে মাঝে অসহ্য লাগে।

কী রকম অসহ্য বলো তো? রকিব নিপাট ভদ্রলোকের মতো জানতে চাইল।

শামীমা মুখে কিছু বলল না, সে ভাবলকী রকিব অসহ্য তুমি কি সেটা জানো রকিব? তুমি যতই ইয়ার্কির ঢঙে কথা বলো না কেন, কী রকম অসহ্য সেটা তুমি জানো। আর বিয়ের দু’বছরের অধিকাংশ দিন যার একা কেটেছে, তার মাঝে মাঝে অসহ্য লাগবে না তো কী লাগবে! এ কথা অবশ্য তোমার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এ রকম ভাবতে ভাবতে শামীমা রকিবের দিকে তাকাল।

রকিব বলল, তোমার তাকানোটা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। তোমার দু’চোখে রাগ না ভালবাসা?

দূরে থাকতে থাকতে তোমার এমনই অবস্থা, আমার দুচোখে রাগ না ভালবাসা, এটাও তুমি আর বুঝতে পার না।

আচ্ছা আচ্ছা, তোমার দু’চোখে তা হলে রাগ কিংবা ভালোবাসা কিছুই নেই। তুমি বোধ হয় কিছু বলবে আমাকে। কী বলবে?

শামীমার একবার ইচ্ছা হলো, হত রাতের স্বপ্নের কথা বলবে সে। বলবে কাল রাতে স্বপ্নের ভিতর ওটা হয়ে গেছে। শুনে রকিব হয়তো অবাক হবে না, কিন্তু সে

অবাক হওয়ার ভান করবে—আবার?

শামীমা ভাবল, রকিব অবাক হলে সে তখন বলবে—অবাক হচ্ছে কেন! তুমিই তো বলেছ—এটা খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার।

তা বটে। খুব স্বাভাবিক।…কিন্তু তুমি মনে হচ্ছে একটু লজ্জা পাচ্ছ।

পাচ্ছি না। তুমি বলেছ এতে লজ্জা পাওয়ারও কিছু নেই।

রকিব সত্যিই এ রকম বলেছে। বেশ আগে একদিন কথা প্রসঙ্গে রকিব বলল, এটা খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। খুব সাধারণ একটা জৈবিক প্রক্রিয়া। নারী কিংবা পুরুষই, যার শরীরই ভারি হোক, একা অবস্থায় আপনা-আপনি ওভাবেই হালকা হবে—এটাই নিয়ম।

হোক নিয়ম। আমার ভীষণ লজ্জা লাগে। কি একটা ব্যাপার বলো তো, ছিঃ।

উঁহু, লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই।

আমার পা ঘিন ঘিন করে।

সেটা করাও অনুচিত।

বিশ্বাস করো, আমি এত বিব্রত হই, আমার এত অস্বস্তি লাগে। এভাবে আমি কখনও চাই না।

উপায় নেই।

রকিরে মুখে উপায় নেই শুনতে শুনতে ব্যাপারটা বেশ কিছুটাই সহজ তার কাছে হয়ে এসেছে বইকী। সুরাং রকিব যখন তাকে জিজ্ঞেস করল—কি বলবে—সে বলতে পারত গত রাতের স্বপ্নের কথা। তারপর কিছু হাসি-ঠাট্টা নিশ্চয় তাদের হতো। কিন্তু শামীমা বলল না। তার মনে হলো হাসি-ঠাট্টা হয়ত হবে ঠিকই, কিন্তু তার আগে সে আটকে যেতে পারে, যদি হাসতে হাসতেই রকিব জিজ্ঞেস করে—তা কার সঙ্গে ব্যাপারটা ঘটল? এ প্রশ্ন যদি করে রকিব, শামীমার মনে হলো, উত্তর দিতে তার সঙ্কোচ ও দ্বিধা হবে।

নাস্তা খেয়ে উঠে রকিব বলল, আসো, এক রাউন্ড ব্যায়াম করি। তারপর নিজেই সে মাথা নাড়লনা, ভরপেটে ব্যায়াম স্বাস্থ্যসম্মত নয়। ফিরে এসে। বলে সে কতক্ষণ টেলিভিশন দেখল। পোষাক পাল্টে কতক্ষণ নিজেকে দেখল আয়নায়, জিজ্ঞেস করল—কেমন দ্যাখাচ্ছে আমাকে বলো তো? বড় অফিসার বড় অফিসার মনে হচ্ছে? শামীমা বলল, মাসের উনত্রিশ দিন যাকে অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে বাইরে থাকতে হয়, সে আবার কিসের বড় অফিসার?

রকিব একটা ভেংচি কাটল, তারপর অফিসে রওনা দিল।

বারান্দা থেকে রকিবের বেরিয়ে যাওয়া যতদূর সম্ভব দেখে নিয়ে শামীমা যখন ঘুরে দাঁড়াল, সে দেখল, তার আর কিছু করার নেই। সে শেষ রাতের স্বপ্নটা ভাবতে বসল। ওটা সজলের মুখ ছিল। কিন্তু এত বছর পর সজল কেন এল ওভাবে! সজলের সঙ্গে বেশ আগে, সে তখন ভার্সিটির প্রথম দিকে, তার একটা সম্পর্ক ছিল। সে সম্পর্ক প্রেমের, এমন নয়, আবার নিছক বন্ধুত্বের কিংবা সজল কেবলই বড় ভাইয়ের বন্ধু, এমনও নয়। সজলের সঙ্গে তার গভীর প্রেম হতে পারত, সেটা গড়াতে পারত। বিয়ে পর্যন্ত, কিন্ত ওসব ছিল হতে পারা কথা, হয়নি। হয়নি বলে সে দুঃখ পায়নি এ নিয়ে তার কোন ক্ষোভ নেই, কষ্ট নেই, হাহাকার নেই। তাছাড়া সজলের কথা তার মনেও পড়ে না।

কিন্তু, মনেও পড়ে না যখন, সজল ওরকম এক স্বপ্নে কেন এল? শামীমা কিছুটা বিরক্ত, কিছুটা হাসিমুখে তাকিয়ে থাকল একদিকে।

অফিস থেকে যে সময় ফেরে রকিব, তার ঘন্টা দেড়েক আগে সে ফিরে এলে। বিটকেলে একটা হাসি দিল শামীমার সামনে দাঁড়িয়ে একা একা কার কথা ভাবছিলে?

শামীমা গম্ভীর গলায় বলল, তোমার কথা যে নয়, এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পার।…তুমি ও সময়ে ফিরলে যে, চাকরি চলে গেছে?

প্রায়। আমি বসকে বললাম এভাবে ঘন ঘন আমাকে বাইরে পাঠালে আমার সংসার টিকবে না। শুনে বস কি বলল জানো?

না।

বস বলল, সংসার গুলি মারেন, চাকরিই সব।…আমি অবশ্য বসকে বলিনি আমাদের ওই কাজটাও নিয়মিত হয় না। অথচ বিয়ের মাত্র দু’বছর।

বললে না কেন! বললেই পারতে।

কি দরকার। বাসায়ই তো চলে এসেছি। এখন ওটা আমরা করব। রেডি হও।

শামীমা হাসতে আরম্ভ করল—ফাজিল কোথাকার।

আমি কিন্তু রেডি হয়ে এসেছি। পরে কিন্তু আমাকে দোষ দিতে পারবে না।

শামীমার হাসি বেড়ে গেল—আমি তেমন করে দোষ দেই তোমাকে?

রকিব একটু গম্ভীর, একটু আনমনা হয়ে গেল, তা দাও না….শামীমা, তুমি আসলে খুব ভালো।

শামীমা তার ছড়িয়ে যাওয়া হাসি স্থির করল, রকিবের দিকে নরম চোখে তাকাল, বলল—বোঝো তাহলে?

রকিবের মুখে এবার হাসি ছড়াল—আমি যদি না বুঝি, কে বুঝবে বলো?

মৃদু মাথা কঁকাল শামীমা। সে খুব বুঝদারের ভঙ্গিতে বলল, তা-ও ঠিক, তা-ও ঠিক।

৪.

তারপর দিন পার হতে হতে রকিবের ঢাকার বাইরে যাওয়ার সময় হয়ে গেল। এবার পাঁচ দিন তার থাকতে হবে বাইরে। সন্ধ্যার সময় তার বাস। সে বলল, যাচ্ছি তাহলে।

যাও। ভালোভাবে যাবে। আর ভালোভাবে ফিরে এসে চাকরিটা বদলানোর চেষ্টা করবে।

অবশ্যই। রকিব গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা দোলাল। সে আর বলতে। ফিরে এসেই।…ফিরে এসেই। ফোন করব।

হুঁ। ফোনটা অন্তত নিয়মিত করো।

গেলাম।… অ্যালেক্সি থাকল।

শামীমা কতক্ষণ তাকিয়ে থাকল রকিবের দিকে। বলল, ওই মেয়েটাকেও, ওই যে হোটেলে দেখেছিলে এক পলক, ওই মেয়েটাও তো তোমার সঙ্গে যাচ্ছে, তাই না?

তারা দু’জন হাসতে আরম্ভ করল। হাসি থামিয়ে রকিব বলল, হ্যাঁ, আমি ওই মেয়েটাকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি আর অ্যালেক্সি থাকছে তোমার কাছে।

শামীমা বলল, একটা ব্যাপার খেয়াল করেছ? তোমার যাওয়ার সময় আমরা শুধু এ ধরনের ইয়ার্কি মারি। কিন্তু শুধু কি এটাই সমস্যা, বলো? দুজন দুজনকে ছেড়ে থাকি বলে আমাদের কি মন খারাপ হয়ে থাকে না?

থাকে। রকিব শামীমার কাঁধে একটা হাত রাখল। খুব মন খারাপ হয়ে থাকে তোমার আর আমার। কিন্তু মন খারাপের কথা বলে যাত্রা সময়টা স্যাঁতসেঁতে করার কী দরকার আছে!….আর, ইয়ার্কি যদি মারতেই হয়, একটু রসালো ইয়ার্কি মারাই ভাল, কি বলল?

তা বটে। শামীমার এ রকম মনে হলো, তা বটে, ইয়ার্কিটা রসালো হলেই জমে ভাল আর বিদায়ের সময় মন খারাপের কথা বলে মন খারাপ করাটাও যুক্তিসঙ্গত নয়। বেশ, মেনে তো নিচ্ছেই সে, কিন্তু মেনে নিয়ে সে এখন কি করবে? চা খাবে আর টেলিভিশনের চ্যানেল বদলাবে? তারপর, তারপর, তারপর?

শামীমা ভেবে দেখল তার কিছুই করার নেই। এ অবশ্য ভেবে দ্যাখার কিছু নয়। এ তো জানা কথা। তবু, রকিব ঢাকার বাইরে রওনা দিলে প্রতিবার সে এরকম ভেবে দ্যাখার ভান করে। পায় না কিছু, এবারও পেল না। অথচ সামনে পাঁচ-পাঁচটা রাত, পাঁচ-পাঁচটা দিন। রাতগুলো পার করতে হবে তার, দিনগুলোও। কি করে এতাট সময় পার করবে সে, ঠেলে ঠেলে? দু’হাতে ঠেলবে প্রাণপণ? আর মুখে বলবে—যা, যা, সর সর’?

শামীমা রান্নাঘরে গেল। চা বানাল। চায়ের কাপ হাতে বেডরুমে ফিরে সে টেলিভিশন ছাড়ল। মন খারাপ তার, হ্যাঁ মনই খারাপ তার। রকিব যতদিন থাকে না, ততদিন মন তার ভীষণ খারাপ হয়ে থাকে। রকিব না ফেরা পর্যন্ত তার মন ভাল হবে না। এটাও সে মেনে নিয়েছেনা হয় মন খারাপই থাকল তার, তবে তার শুধু একটাই কথা—এই দিন আর রাতগুলো পার করে দেয়ার কোন ব্যবস্থা যদি থাকত। কিন্তু এ রকম হবে না কখনও, কোন ব্যবস্থাই সে পাবে না। এটাও জানা আছে তার। সুতরাং একঘেয়ে এক নীরস সময় পার করতে করতে তাকে অপেক্ষা করতে হবে রকিবের ফেরার।

মন খারাপ থাকবে তার, পাশাপাশি—সে অস্বীকার করে না—শরীর, হ্যাঁ, এটাও একটা ব্যাপার বইকী। সে জানে রকিব ফিরে এসে জিজ্ঞেস করবে—এবার তোমার স্বপ্নে কে এল?

পাঁচ রাত থাকবে না রকিব, এর মধ্যে ও রকম এটা স্বপ্ন সে দেখবেই। এটা কেউ বলতে পারে না। নাও সে দেখতে পারে ওরকম কোন স্বপ্ন। একবার আরও অনেকদিন বাইরে ছিল রকিব, তখন কোন স্বপ্নই তাকে বিব্রত করেনি। হ্যাঁ, বিব্রতই বলবে সে। রেকম কোন স্বপ্ন সে সত্যিই দেখতে চায় না। নোংরা লাগে তার, সে অস্বস্তি বোধ করে এবং এ কথা শুনলে রকিব হয়ত হাসবে, কিন্তু এ কথা ঠিক এর রকম স্বপ্ন দ্যাখার পর তার ক্ষীণভাবে হলেও মনে হয় রকিবকে সে ফাঁকি দিয়েছে। তবে ওটা এড়ানোর উপায় তার জানা নেই। বরং এভাবে ব্যাপারটা মেনে নেয়া উচিত—ওটা নিছকই একটা শারীরিক প্রক্রিয়া, ওটা হবেই।

টেলিভিশনের চ্যানেল বদলাতে বদলাতে শামীমা একটু হাসল—এবারও কি হবে? খুব হেলাফেলায় কাঁধ ঝাঁকাল সে, সে চায় না থোক, তবে হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে। যদি হয়, কার সঙ্গে হবে? মাঝে মাঝে শামীমার খুবই অবাক লাগে। কী যে একটা ব্যাপার—সে কত কেউই না চলে আসে ওরকম স্বপ্নে। অবাক হতে হয়—আরে এ কেন! এ কোত্থেকে ঢুকে পড়ল! কিন্তু ঢুকে পড়ে, ওই যে, যে সজলের কথ সে আর ভাবে না, সে সজল কী সহজেই চলে এল।

এবারও কি সজল আসবে? সজলের ব্যাপারটা, তার খুব লজ্জা লাগছে ভাবতে, তার ভিতর সেদিন এক অন্য রকম অনুভূতি তৈরি করেছিল। তবে না, সে চায় না সজল আসুক। ওরকম একটা স্বপ্ন আসবে কি না, তা-ই অবশ্য জানা নেই। তবে যদি আসেই ওরকম কোন স্বপ্ন, তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে, শামীমার মনে হলো,—তাহলে এমন কেউ আসুক স্বপ্নে, যাকে সে চেনে না। হ্যাঁ, যাকে সে চেনে না, এমন কেউ—যাকে সে কখনও কোথাও দ্যাখেনি। ঘুম ভাঙার পর তাহলে সে খুব অবাক হয়ে যাবে। প্রচণ্ড এক অস্থিরতা তাহলে তাকে গ্রাস করে নেবে—কে, কে, কে! কিন্তু তাকে সে শনাক্তই করতে পারবে না।

আর এইভাবে, আশ্চর্য, কে এসেছিল, কে ছিল ওটা—এরকম ভাবতে ভাবতে অস্থির সে রকিবের না থাকা সময়টুকু পার করে দিতে পারবে না?

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments