Thursday, February 22, 2024
Homeবাণী-কথামশা - শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

মশা – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

মশা - শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

রক্ত খেয়ে মশাটা টুপটুপে হয়ে আছে। ধামা পেটটা নিয়ে মশারির দেওয়ালে বসে আছে ওই। এইবেলা টিপে দিলে ফাঁক করে খানিক কাঁচা রক্ত ছিটকে গলে যাবে শালা।

নফরচন্দ্র জীবনে মশা মেরেছে অনেক, আর মানুষ মেরেছে একটা। মানুষটার কথা এখন আর মনে পড়ে না। অল্প বয়স ছিল তখন। সময়ের তফাতে ভুল পড়ে গেছে। তবে মশাদের কথা যদি কেউ শুনতে চায়, তবে ঢের কথা শোনাতে পারে নফরচন্দ্র। একটা জীবন মশা মেরেই তো গেল। তার বউ চারু পর্যন্ত মরবার আগে তার কোনও গুণের কথা না বলুক এটা জোর গলায় বলে গেছে—পারোও বাপু তুমি মশা মারতে।

তা পারে নফরচন্দ্র। যত মশা তত মারার আনন্দ।

লোমের মতো সরু হাত-পা ওলা মশাটা কী পরিমাণ রক্ত টেনেছে দেখ! পেটটা একটা ধানের মতো বড় দেখাচ্ছে। ওই হাতে পায়ে আর ফিনফিনে পাখনায় এত বড় পেটটা নিয়ে ওড়াউড়ি করবে কেমন করে? বড় তাজ্জব লাগে নফরচন্দ্রের। শালারা নিজেদের শরীরের চেয়ে ঢের বেশি ওজনের রক্ত খায়। আখেরের খাওয়া। দু-হাতের পাতা দু-দিকে চড়ের মতো তুলে নফরচন্দ্র আস্তে করে মশাটার দিকে এগোয়। ভরাপেটে মশার চালাকি খাটে না। টলতে-টলতে একটু আধটু নড়েচড়ে ঠিকই, কিন্তু বেশিদূরের দৌড় নয়। নফর জানে।

ঘরের আলোটা কিছু কমজোরি। নাকি বয়সে চোখের দৃষ্টিতেই ভাঁটা পড়েছে? কিছু একটা হবে। চোখের সামনে বিন্দু-বিন্দু কী সব ভেসে বেড়ায় আজকাল নোংরার মতো। সেই বিন্দুগুলোকেও প্রথম-প্রথম মশা বলে ভুল করত সে।

দু-হাতে ফটাস করে তালি বাজাল। কিন্তু রক্ত ছিটকালো না। মশাটা সটকেছে।

নফরচন্দ্র নিজের হাতের দিকে চায়। আঙুলের জোড়ে-জোড়ে গিট পড়ার মতো ভাব। বুড়ো চামড়ায় কুঁচি পড়েছে। বিনা কারণে আঙুলগুলো ত্যাড়াবাঁকা হয়ে যাচ্ছে ইদানীং। এসবই কি হওয়ার কথা ছিল?

বিছানায় হাঁটু গেড়ে বসে নফর ময়লা মশারির চারদিকে তাকিয়ে রক্তচোষাটাকে খোঁজে। আছে খুব কাছেপিঠেই, বেশি ওড়াউড়ি করার মতো ক্ষমতা নেই। এক্ষুনি বসবে কোথাও। কিন্তু চড়টা ফসকাল—সেটাই ভাবনার কথা। এতকাল মশা মারতে কদাচিৎ ফসকেছেনফর।

বাড়ি নিঝুম হয়ে গেছে খানিক আগে। নফর টের পেয়েছে, তার ছেলে গণেশ আজ খেয়ে উঠে আঁচাতে অনেক সময় নিল। একবার যেন বউয়ের কাছে খড়কেও চেয়েছিল। কিন্তু খড়কে দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করার মতো খাওয়া-দাওয়া তো ছিল না আজ! নফরকে সন্ধের মুখে গণেশের বউ মুলো দিয়ে রান্না মটরের ডাল, বাসি বাঁধাকপির ঘন্ট, আর ট্যাংরার চচ্চড়ি খাইয়ে দিয়েছে। সে খাওয়ায় খড়কে লাগে না। নফরের আজকাল সন্দেহ হয়, তাকে ফাঁকি দিয়ে গণেশ আর গণেশের বউ গোপনে দু-চারটে বাড়তি পদ খায়। নফরচন্দ্র খেয়ে আসার পর বেশ খানিক বাদে। একটা মাংস রান্নার বাস খুব মাত করেছিল পাড়া। নফর ভেবেছিল রায়েদের বাড়ি রান্না হচ্ছে। তা নয় তবে।

গণেশের বউ চন্দ্রিমা বেশ মোটাসোটা আহ্লাদী চেহারার মেয়ে। রকমসকম খানিকটা পোষা বেড়ালের মতো। দাঁত নখ লুকিয়ে রেখে চোখ বুজে ন্যাকা-ন্যাকা ভাব করে বটে, তবে দরকারের সময় কোনো অস্ত্র বের করে আনে।

তা মোটা গিন্নি খায় ভালো। সারাদিনই খাচ্ছে। কচর-মচর খানিক চানাচুর চিবোলো, টাউ টাউ করে বাটিভর তেঁতুল-পান্তা মারল, দুধের সরটা আঙুলে আলতো তুলে মুখে ফেলে দিল, এক কোষ আচার চাটল হয়তো। তার ওপর হোটেল রেস্টুরেন্টে গিয়ে গণেশের ট্যাঁক ফাঁক করা তো আছেই। আজকাল নফরকে ফাঁকি দিয়ে বাড়তি পদ খাওয়া শুরু হয়েছে।

নফরচন্দ্র মশাটা আর খুঁজে পেল না। ভরাভরতি পেট নিয়ে শালা যাবে আর কোথায়! কিন্তু নফরের তেমন ইচ্ছেও করল না বেশি খুঁজতে। সেই কোন সন্ধেবেলা চাট্টি লেইভাত খেয়েছিল, এখন খিদের চোটে পেটের মধ্যে হাঁড়ি-কলসি ভাঙছে। রায়বাড়ির মুরগি রাত-বিরেতে বেলা ভুল করে ডেকে ওঠে। আজও ডাকছে ওই।

নফরচন্দ্রের ঘুম আসে না। ঘুম এলেই আজকাল একটা ফালতু লোক এসে বড় ঝামেলা করে। সেই কবে কোন ছোকরা বয়সে রাগের মাথায় কী করে ফেলেছিল তারই জের টানতে মেলা ঝামেলা বাধায় এসে লোকটা।

নফরের তেমন দোষ ছিল না। তখন দেশের গাঁ কালীগঞ্জে থাকত। অকালের বছর। চারদিকে চোর ছ্যাঁচড়ার বড় উৎপাত। লক্ষ্মীঠাকুরুণের মতো এক মা ছিল নফরের, রোগাভোগা খিদে পাওয়া মানুষ দোরগোড়ায় এলে প্রায় সময়েই পাত পেড়ে খাওয়াতো। এক দুপুরে তেমনি পেট টান করে খেয়ে একটা মাঝবয়েসি লোক যাওয়ার সময় একটা কাঁসার বাটি আর দুটো ধুতি মেরে চলে গেল। ঘটনার হপ্তাখানেক বাদে কালীগঞ্জের খাল ধরে নৌকো বেয়ে নফর যখন মাছ ধরতে বড় গাঙের দিকে যাচ্ছিল তখনই শ্মশানের ঘাটে লোকটাকে বসে থাকতে দেখে। পাশে পুঁটুলি। চোরটাকে দেখে নফর বেদিশা হয়ে নৌকো ভিড়িয়ে লগির একখানা ঘা লাগিয়েছিল জোর। লোকটা হাত তুলল না, চেঁচাল না, ঘা খেয়ে যেন বড় ঘুম পেয়েছে এমন ভাব করে শুয়ে পড়ল। কেউ সাক্ষী ছিল না। নফর নৌকোয় কেটে পড়ল তৎক্ষণাৎ। পরদিন হাটে-বাজারে কিছু কথাবার্তা শুনল লোকের মুখে। শ্মশানের ঘাটে একটা লোক মরে পড়ে আছে। তা কে আর একটা মড়া নিয়ে মাথা ঘামায়। তখন কত মরছে চারদিকে!

ভেবে দেখলে, খুনের জন্যে তো মারতে যায়নি নফর। চোরের সাজা দিতে গিয়েছিল। কত মাথা ফাটাফাটি করেও লোকে বেঁচে থাকে। কিন্তু সেই কমজোরি লোকটার যে ফুলের ঘায়ে মূৰ্ছা। যাওয়ার অবস্থা তা কে জানত! নফরের মন-মেজাজ কয়েকদিন বিগড়ে রইল ঠিকই, কিন্তু নিজেকে তেমন দোষ দিতে পারল না।

বহুকাল হয়ে গেছে। চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর আগেকার বৃত্তান্ত। লোকটাকে ভালো মনেও নেই তার। মাথাটা ন্যাড়া ছিল, সেটা বেশ মনে পড়ে। গলায় একটা রুদ্রাক্ষের মালা ছিল মনে হয়। খালি গা ছিল, পরনে একটা হাকুচ ময়লা কাপড়। একদম ফালতু লোক। দুনিয়াতে ওরকম দু চারটে লোক না থাকলে কেউ টেরও পাবে না। পায়ওনি। লোকটার জন্য থানা পুলিশ হয়নি, কান্নাকাটি হয়নি।

কিন্তু মুশকিল হল এখন মাঝে-মাঝে লোকটা এসে নফরচন্দ্রকে ঘুম থেকে তুলে বলে– ন্যাড়া মাথা বলেই বড্ড লেগেছিল হে।

নফর বিরক্ত হয়ে বলে—তাহলে পাগড়ি পরে থাকলেই পারতে।

লোকটা বলে—হুঁঃ তখন জামা জোটে না তো পাগড়ি। তা তুমি লগি চালাবে জানলে পাগড়িই পরতাম। ন্যাড়া মাথাটায় বড্ড লেগেছিল হে।

–ন্যাড়া হয়েছিলে কেন মরতে?

—সে আর এক কেচ্ছা। মজিলপুরে এক মুদির দোকান থেকে এক থাবা বাতাসা চুরি করেছিলাম বলে তারা মাথা কামিয়ে দিলে, ঘোলের বড় দাম বলে ঘোল ঢালেনি। কিন্তু কোমরে দড়ি বেঁধে গাঁয়ে ঘুরিয়েছিল।

নফরচন্দ্র বলে—তাহলে তোমারই দোষ বলো।

—তা ছাড়া আর কার? আমার মাথায় খুব ঝুপসি চুল ছিল তখন। মাথাটা একটা বোঝার মতো দ্যাখাত। তার ওপর লগির ঘা পড়লে বোধহয় তেমন লাগত না। ন্যাড়া মাথা বলে লেগেছিল। না খেয়ে-খেয়ে তখন শরীরটা তো মরেই আসছিল। ব্যথাটা সইল না।

—আমার তবে দোষ কী বলো।

–দূর ছাই, তোমার দোষ কে দিচ্ছে? এতকাল পরে সেসব তুচ্ছ কথা ঘাঁটাঘাঁটি করতে আসি বলে ভাবো না কি? তুমি না মারলেও মরণ আমার লেখাই ছিল। আমি তা বুঝতে পেরে কাজ এগিয়ে রাখতে শ্মশানের ধারে গিয়ে বসে থাকতাম।

—তাহলে আমাকে দোষী করছ না তো! ঠিক করে বলো বাপু ন্যায্য কথা।

—আরে না। তবে বলি বাপু, তোমার কাছে আমার কিছু পাওনা হয়। সেই যে মেরেছিলে তারও তো একটা দেনা আছে।

—দেনা! বলে আঁতকে ওঠে নফর। বলে—এর মধ্যে আবার দেনা-পাওনার কথা ওঠে কোত্থেকে?

—ওঠে। যখনই আমাকে মারলে তুমি তখনই তোমার সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক হল তো।

—সে আবার কীরকম?

লোকটি মিটিমিটি হেসে বলে—হয়। সে এমন সম্পর্ক যে এক জন্মে আর কাটান-ছাড়ান নেই। সেই সম্পর্কের জোরেই তোমার কাছে আমার কিছু পাওনা হয়।

—পাওনা হলেই বা দিই কোত্থেকে। সংসারের অবস্থা তো দেখছ। ওই গণেশটা আমার একমাত্র অন্ধের নড়ি। কোথায় যেন যন্ত্র চালায়। আয় ভালোই, কিন্তু বুড়ো বাপকে দেয় কী? সব ওই মোটা গিন্নির শরীরের আহ্লাদে খরচ হচ্ছে। তার ওপর মাগি আবার বাঁজা। একটা নাতকুড় হলেও আমার একটা সুখ ছিল। সেও হল না। সংসারের সব আদর মোটা গিন্নি নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে।

লোকটা বলে—সে আমি শুনব কেন বলো! আমার পাওনা আমাকে মিটিয়ে দেবে, তবে অন্য কথা।

বলে লোকটা চলে যায়।

জেগে গিয়ে নফরচন্দ্র মশার পুন-ন-ন শুনতে পেয়ে উঠে বসে। কোথা দিয়ে যে মশারির মধ্যে ঢোকে শালারা। মশা মারবার জন্য বাতি জ্বালতে গিয়ে নফরের ভুল ভাঙে। ও হরি! এ যে বেহান হয়ে গেল! কাক ডাকতে লেগেছে।

ছেলের সঙ্গে এই ভোররাতেই একবার চোখের দেখা হয়। গণেশ বারান্দায় ঘুরে-ঘুরে দাঁতন করে এ সময়টায়। চোখাচোখি হলেও কোনও কথা হয় না। কথার আছেটা কী? গণেশ তার সব কথা বরাবর মাকে বলে এসেছে। এখন বউকে বলে বোধহয়। বাপের সঙ্গে কোনওদিনই তেমন বাক্যালাপ করে না। আজও ভোর রাতে বারান্দায় দেখা হল। কলঘর থেকে ঘুরে এসে নফর বলল– আমার মশারিটা বড্ড ছিঁড়ে গেছে। একটা কিনে দিবি?

—দেব’খন। এ মাসটা জোড়াতাড়া দিয়ে চালিয়ে নাও।

গণেশ ছেলে খারাপ না। বউটা খচ্চড়।

না কি বউটাও খারাপ না, সে নিজেই খচ্চড়! কোনটা যে কী তা বলা মুশকিল। গণেশের মা চারু বরাবর বলে এসেছে, নফরচন্দ্রের মতো এমন শয়তান নাকি দুটো হয় না। কথাটা উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। ভেবে দেখবার মতো কথা।

আহ্লাদী বউ যখন উঠে হালুয়ার কড়াই বসিয়েছে তখন গণেশের স্নান সারা। ভাজা সুজিতে জল পড়ল ছ্যাঁকাৎ করে। রায়বাড়ির মুরগি ডাকছে। চড়াই পাখির ডানার শব্দ কানের পাশ দিয়ে সড়াৎ করে চলে যায়। গণেশ রামপ্রসাদি গাইতে-গাইতে খেতে চাইল। মোটা গিন্নি বলল— দিচ্ছি।

নফরকেও দেবে। তবে সে একটুখানি। বাসি রুটি গণেশ ছ’খানা খায়, মোটা গিন্নি ক’খানা তা নফর জানে না। তবে তার ভাগ্যে দুখানা। চাইলে বলে—আর তো নেই!

ডাক্তারেরও নাকি বারণ আছে। কিন্তু নফর তার শরীরের গতিক কিছু বোঝে না। বেশ আছে। তবে কাল রাতে একটা পেটমোটা মশা তার হাত ফসকে পালিয়েছে, সেটা ভাববার কথা।

বউ মরে বড় জ্বালাতন হয়েছে। চারু মুখ করত বটে, কিন্তু সে কাছে থাকতে নফরের হাতে মশা ফসকাত না। আর ন্যাড়ামাথার সেই পাওনাদারটাও কাছে ঘেঁষেনি কোনওদিন।

সূর্যটা তার ন্যাড়ামাথা নিয়ে ভুস করে উঠে পড়ল ওই। গণেশ বেরিয়ে গেলে মোটা গিন্নি আবার গিয়ে বিছানা নেবে। ঝি আসে অনেক বেলায়। বড় ফাঁকা লাগে নফরের। গণেশের যদি একটা ছানা হত।

মশারি চালি করে বিছানা গুটিয়ে বসে থাকে নফর। দুটো রুটি গরম হালুয়ার সঙ্গে পেটের মধ্যে বেড়াতে গেছে। গণেশ কাজে বেরোল। মোটা গিন্নি একটা মস্ত হাই তুলে বিছানা নিল পাশের ঘরে।

পুবের জানালা দিয়ে একটা বেঁটে দেয়াল দেখা যায়। দেয়ালের ওপর তারকাঁটার তিনটে লাইন। তার ফাঁকে একটা ন্যাড়ামাথার মতো সূয্যি ঠাকুর। পাখি ডাকে।

চারু খুব জপ করত এসময়। জপের মালা রেলগাড়ির চাকার মতো বনবন করে ঘুরে যেত। সংসারের কাজকর্ম শুরু করবার আগে বরাদ্দ জপ এগিয়ে রাখত যতটা পারে। নফরের সে-সবও নেই। খামোখা বসে অং বং জপের চেয়ে অন্য কথা ভাবলে কাজ হয়।

এক সময় চাষবাষ করত, পরের দিকে একটা দোকানে আধাআধি বখরায় ব্যাবসা করত। সে খোঁড়া ব্যাবসাতে রোজ দু-পাঁচ টাকা আয় হত। অধৈর্য হয়ে একদিন দোকানের কিছু মাল সরিয়ে কেটে পড়ল। আবার হয়তো অন্য কারবারে হাত দিল একদিন। জীবনটা ফেরেববাজিতে গেছে। গণেশ কম বয়সে যেই চাকরিতে ঢুকল অমনি নফরচন্দ্র হাত ধুয়ে ঘরে থিতু হল। আর কাজ কারবারে যায়নি। গেলে আজ দুটো পয়সা নাড়াচাড়া করতে পারত। তার বদলে নফরের অন্য সব ব্যাপারে মাথা খুলতে লাগল বেশি। চমৎকার মশা মারত, বাগান করত, কয়লা ভাঙত, পান। সাজত। বসে থাকলে কত বাতিক হয় মানুষের।

মোটা গিন্নি ঘুমোলে নফর চুপিচুপি উঠে রান্নাঘরে আসে। ঝি এখনও আসেনি। গত রাতের এটোকাঁটা পড়ে আছে। উঁকিঝুঁকি দিয়ে নফর দেখে মাংসের হাড়টাড় পড়ে আছে ডাঁই হয়ে। কম গেলেনি দুজনে। হাড়গোড়ের পরিমাণ দেখলে তাজ্জব মানতে হয়। একটা লুচির টুকরোও দেখা যাচ্ছে। তবে কাল রাতে লুচিও ভেজেছিল।

শ্বাস ফেলে নফর ঘরে আসে, ঘর পেরিয়ে একদম সদরের বাইরে গিয়ে দাঁড়ায়। উদোম। পৃথিবী চারদিকে ছড়ানো। একবার ইচ্ছে হয়, যায় চলে যেদিকে দু-চোখ যায়। লুচি-মাংসের ব্যাপারটা আজ বড় দাগা দিয়েছে তাকে। কিছুদূর খামোখা ঘোরঘুরি করে ফিরে আসে নফর। বিবাগি হয়ে যেতে এ বয়সে বড় ভয় করে। কাল রাতে একটা মশা ফসকে গেল। ন্যাড়ামাথার লোকটা রোজ আসছে আজকাল।

ঘরে ফিরে এসে নফর মোটা গিন্নির বকুনি খেল একচোট। আহ্লাদী বউ বলল–কী আক্কেল আপনার বলুন তো, সদর দরজা হাট-খোলা রেখে বেড়াতে বেরিয়েছেন, কে না কে ঢুকে যে সব ফরসা করে নিয়ে যেত। এক ডাঁই কাঁসার বাসন পড়ে আছে, আরও কত দামি জিনিস। এই তো সেদিন চুরি গেল এক কাঁড়ি।

বড় দুঃখ হল নফরের। সে নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেই বুঝি ভালো ছিল।

চারু মরে যাওয়ার পর পরই নফর একটা বিয়ের প্রস্তাব পেয়েছিল। খড়কাটা কলের মালিক হরেকৃষ্ণ পালের একটা হাবাগোবা বোন আছে। তার বয়স অনেক। হাঁ করে চেয়ে থাকে, মুখ থেকে অবিরল নাল ঝরে। ওরিয়েন্ট সেলুনের নরহরি নফরের চুল ছাঁটতে-ছাঁটতে একদিন বলেছিল—নফরবাবু শ’পাঁচেক টাকা জোগাড় করতে পারেন তো বিয়েটা লাগিয়ে দিতে পারি।

হাবাগোবা যাই হোক একটা বউ তো হত। টাকাটাই বখেরা বাধালে। তা-ও চেষ্টা করেছিল। ঘরের কিছু জিনিসপত্র হাতছিল্প করে বাজারে বিক্রি করে কিছু পয়সা পেল। মোটা গিন্নির সোনার জিনিস কিছু হাতাতে পারলে হত। কিন্তু সে আর হয়নি, ঘরের জিনিস কিছু খোয়া যাওয়াতে চন্দ্রিমা এমন হই-হুল্লোড় বাধালে যে নফর আর কিছু সরাতে সাহস করল না। তার ওপর কানাঘুষোয় তার বিয়ের ব্যাপারটাও গণেশের কানে এসে পৌঁছেছিল। কী লজ্জা! আজকাল পাড়ার ছেলেরা তাকে রাস্তায় দেখলে উলু দেয়।

তবে সেই চুরি করে বিক্রির কিছু টাকা এখনো নফরের তোষকের তলায় লুকোনো আছে। সবসুদ্ধ গোটা ত্রিশ। মাঝে-মাঝে লুকিয়ে টাকাগুলো ছুঁয়ে আরাম পায় নফর। পৃথিবীতে মানুষ আপন না টাকা আপন তা এখনও সে স্থির করতে পারে না।

আজও সন্ধে পার করেই মোটা গিন্নি তাকে বসিয়ে দিল। এটা আদর নয়, এ হচ্ছে সাবধান হওয়া। নফর খেয়ে বিছানা নিলেই ভালোমন্দ রাঁধবে। খাবে দুজনে।

নফর কিছু বলল না। সেই ভাত আজ আর মুখে রুচছিল না তেমন। প্রাণটা লুচি-লুচি করে, মাংস-মাংস করে। তবু ভাতের দলা কোঁৎ-কোঁৎ করে চালান দিয়ে ঘরে এসে জাগতে বসে নফর। আজ জেগে থেকে কাণ্ডটা দেখবে।

দেখল। পাড়া মাত করে আজ সরষে ইলিশ রান্না হচ্ছে। গণেশ একটা চ্যাঙাড়ি হাতে ঘরে ফিরল আজ। পেটের ভিতরটায় খিদের সেঁতলান দিয়ে মুখে জল এসে গেলে নফরের। একটু রাত করে ওরা বসেছে। ভারী হাসি-ঠাট্টা হচ্ছে দুজনে। নফরের মশারির মধ্যে পনপন করে মশা ঢুকছে।

ওরা শুতে চলে গেল। নফর শুয়ে জেগে রইল একা। মশা কামড়াচ্ছে। কামড়াক। ন্যাড়া। মাথার লোকটাও মশারির মধ্যে সেঁধিয়ে এসে বলে—এলাম বুঝলে! দেনা-পাওনার কথাটা মিটিয়ে নিই।

তোষকের যে ধারে টাকাটা আছে সে ধারাটায় একটু চেপে শুয়ে নফর বলে রোজ তোমার এক কথা।

–বড় অনাদর করেছিলে যে। মেরে ফেললে।

—সে অত ধরলে হয় না।

—ধরছে কে? ধরলে তোমার ফাঁসি হয়।

—তবে?

–বলছি কী, যে জায়গায় মেরেছিলে সে জায়গায় একটু হাত বুলিয়ে দাও। এখনও জায়গাটা ব্যথা করে বড়।

-সত্যি?

—মাইরি। সে শরীরের ব্যথা নয়, অনাদরের ব্যথা। দেবে নাকি একটু হাত বুলিয়ে?

নফরের চোখে জল আসে। উঠে বসে বলে—দেখি।

মাথাটা এগিয়ে লোকটা দেখিয়ে দেয়—এইখানে।

—দেখেছি। ফুলে আছে। বড্ড লেগেছিল, না?

—তা লেগেছিল। তবে তোমার আর দোষ কী?

—দাঁড়াও, হাত বুলিয়ে দিই। বলে নফর হাত বোলাতে থাকে ফোলা জায়গাটায়। নাঃ, এভাবে মারা ঠিক হয়নি।

—আঃ। ব্যথাটা সেরে যাচ্ছে হেনফর। লোকটা বলে।

নফর তার কানে-কানে বলল–লুকোনো ত্রিশটা টাকা আছে আমার। কাল চলো দুজনে দোকানে বসে খুব লুচি মাংস খাই। খাবে?

—খুব খাব। লোকটা বলে।

শুনে নফরচন্দ্র অনেকদিন বাদে পাশ ফিরে আজ নিশ্চিন্তে ঘুমোল।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments