মিস থাম্পি (অশরীরী আতঙ্ক -৩) – মানবেন্দ্র পাল

মিস থাম্পি (অশরীরী আতঙ্ক) - মানবেন্দ্র পাল

 সাতাশে নভেম্বর।

 মিস থাম্পি এসেছেন। রীণাও এসেছে। রীণাকে মান্তুই নিজে গিয়ে নিয়ে এসেছে। একদিন থাকবে।

আসল উদ্দেশ্য মিস থাম্পির মতো মানুষ যখন আসছেন তখন রীণাকে একবার দেখিয়ে নেওয়া। মিস থাম্পি তো সারাজীবন প্রেতচর্চাই করছেন। রীণাকে দেখলে, তার মুখ থেকে সব শুনলে হয়তো মিস থাম্পি বলতে পারবেন মানসিক ব্যাধি না অন্য কিছু। মান্তুর উদ্দেশ্যটা রীণাও জানতো না। এখানে এসেই শুধু এক পেয়ালা কফি খেয়ে বেরোবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন মিস থাম্পি। রীণার সঙ্গে আলাপ করার আগ্রহ দেখালেন না। মান্তু তবু এক নিশ্বাসে পরিচয়টুকু মাত্র দিতে পারল। তাও তিনি ভালো করে শুনলেন। বলে মনে হল না।

–চলুন মিস্টার চৌধুরী, আগে পার্ক স্ট্রীটের সিমেট্রিটা দেখে আসি।

 বলে তখনই ললিতবাবুকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।

পার্ক স্ট্রীটের সেই দেড়শো বছরেরও বেশি পুরনো কবরখানাটা মিস থাম্পি অনেকক্ষণ ঘুরে ঘুরে দেখলেন। বড়ো বড়ো গাছের ছায়ায় জায়গাটা বেশ ঠাণ্ডা। মিস থাম্পির খুব ভালো লাগল।

কয়েক জায়গায় কয়েকটা কবর পরীক্ষা করলেন। ব্যাগ থেকে একটা শিশি বের করে খানিকটা কবরের মাটি পুরে নিলেন। একটা পুরনো কবরের পাশে উপুড় হয়ে শুয়ে কান পেতে কী যেন শুনলেন। এমনি করে সারা সকাল কাটালেন।

মিস থাম্পি বেরিয়ে গেলে মান্তু দুপেয়ালা কফি নিয়ে রীণার কাছে এসে বসল।

কী রে! মুখ অমন ভার কেন? মন কেমন করছে বুঝি?

 রীণা ম্লান হাসল। বলল, মন বলে বোধহয় আর কিছু নেই। তাঁরে, আমায় কি রাত্তিরে থাকতেই হবে?

মান্তু হেসে বলল, বরকে ছেড়ে বুঝি একটা রাত্তিরও থাকতে ইচ্ছে করে না?

রীণার ফ্যাকাশে মুখে লালচে আভা ফুটে উঠল।–তা নয়। ঐ বাড়িতে একা থাকা–

দূর! তুই একটা পাগল! বলে মা রান্নাঘরের দিকে উঠে গেল।

রাত্তিরে সঞ্জয় বাড়িতে একা থাকবে এ দুর্ভাবনা তো রীণার ছিলই, তাছাড়া এখানেও তার ভালো লাগছে না। সে এসেছিল নিরিবিলিতে বন্ধুর সঙ্গে গল্প করতে। কিন্তু এদিনই একজন ভি. আই. পি. এসে হাজির। এই মহিলাটিকে রীণার মোটেই ভালো লাগছিল না। যেন কেমন ধারা! একে তো অবাঙালী, চালচলন আলাদা। কথাও কম বলেন। তাছাড়া কিসব প্রেতচর্চা করেন। নিজের ঘরেই নিত্য ভূতের আতঙ্ক তারপর এখানে এসেও

চিন্তায় বাধা পড়ল। একজন মহিলাকে নিয়ে মান্তু ঘরে ঢুকল। রীণার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল।

ভদ্রমহিলা মান্তুদের প্রতিবেশিনী। মিসেস লাহিড়ি। ছোটোখাটো হাসিখুশি মানুষটি। ফর্সা রঙ। গোল মুখ। কপালে বড়ো একটা টিপ।

মিসেস লাহিড়ি আলাপ করতে আসেননি। এসেছিলেন অন্য উদ্দেশ্যে। তাই রীণার সঙ্গে আলাপটা হল দায়সারা গোছের।

তারপরেই মান্তুকে বলল, তাহলে বিকেলে ওঁকে নিয়ে যাবেন।

 রীণা ভেবেছিল বুঝি তাকেই নিয়ে যাবার কথা বলছেন। না, তা নয়। নেমন্তন্নটা ঐ মাদ্রাজী মহিলাকে।

মান্তু বলল, হ্যাঁ, নিয়ে যাব। উনি ফিরে এলে বলব আপনি নেমন্তন্ন করতে এসেছিলেন।

.

বেলা দুটো নাগাদ মিস থাম্পিকে নিয়ে ললিতবাবু ফিরলেন। খাওয়া-দাওয়া সেরে মিস থাম্পি বসলেন লিখতে।

বিকেল সাড়ে তিনটের সময় এক কাপ কফি খেলেন। তখন মান্তু খুব বিনীতভাবে মিসেস লাহিড়ির কথা বলল।

আপনার কখন সুবিধে হবে?

মিস থাম্পি প্রথমে একটু অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। এর ওর বাড়ি যাবার ইচ্ছে তার ছিল না। শেষে মান্তুর বিশেষ অনুরোধে রাজি হলেন। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নিয়ে বললেন–

–সাড়ে চারটেয়।

ইতিমধ্যে মিস থাম্পির সঙ্গে রীণার অনেকবারই দেখা হল, কিন্তু তিনি কোন কথা বলেননি। কোনো আগ্রহই যেন নেই।

মিস থাম্পির এই ব্যবহারে মান্তু বেশ অস্বস্তিতেই পড়ল। ওঁর কাছে ধীরে সুস্থে বসে রীণা কথা বলবে এইজন্যেই তো রীণাকে আনা। কিন্তু সবই যেন ভেস্তে যাচ্ছে। যাই হোক ঠিক সাড়ে চারটের সময়ে মিস থাম্পিকে নিয়ে মান্তু মিসেস লাহিড়ির বাড়ি চলল। রীণা যেতে চায়নি। মান্তু জোর করেই নিয়ে গেল।

মান্তুদের দুখানা বাড়ির পরেই মিসেস লাহিড়ির বাড়ি। বাড়ির সামনে উঁচু বোয়াক। দুপাশে খুবই সাধারণ ফুলের বাগান।

মিস থাম্পি এখানে নতুন অতিথি, তবু তিনি লম্বা লম্বা পা ফেলে আগে আগে হাঁটছিলেন। যেন নিজের পরিচিত জায়গাতে যাচ্ছেন। নিজেই গেট খুলে খোশ মেজাজে বাগান দেখতে দেখতে ভেতরে ঢুকলেন।

রোয়াকে দাঁড়িয়েছিলেন কর্তা-গিন্নি অতিথিকে অভ্যর্থনা করার জন্যে। পাশে ওঁদের ছেলে, বছর তেরো বয়েস।

মিস থাম্পি বোয়াকে উঠে একটু দাঁড়িয়ে পড়লেন। কপালে যেন একটু ভাঁজ পড়ল। কিন্তু তা কয়েক মুহূর্তের জন্যে।

মিসেস লাহিড়িই অভ্যর্থনা করলেন, আসুন। ইনি আমার হাজব্যান্ড

 ভদ্রলোক নিজেই বাকি পরিচয়টুকু দিলেন।

নির্মল লাহিড়ি।

মিস থাম্পি গভীর আন্তরিকতায় হ্যান্ডসেক করলেন।

–আমার ছেলে দেবল। ক্লাস এইটে পড়ছে।

মিস থাম্পি হেসে তার চুলের ওপর একটু আদর করে দিলেন।

নির্মলবাবু সবাইকে নিয়ে ভেতরের ঘরে বসালেন। মিসেস লাহিড়ি অস্বস্তিতে পড়লেন কোন কথা দিয়ে কিভাবে আলাপ শুরু করবেন। বাংলায় বলতে পারলে সুবিধে হতো।

নির্মলবাবুই কথা শুরু করলেন। তার ইচ্ছে ছিল প্রেততত্ত্ব নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করেন। কিন্তু আমল পেলেন না। তিনি একবারই শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন, সত্যি কি আপনি অশরীরী কিছুতে বিশ্বাসী?

মিস থাম্পি একটু হেসেছিলেন। উত্তর দেননি। এতে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ভারি লজ্জিত হয়েছিলেন।

এরপর খাওয়া। কফি আর কেক। সঙ্গে পোটাটো চিপস। মিস থাম্পি বেশ তৃপ্তি করেই খেলেন। খেতে খেতেই মিস থাম্পি জিজ্ঞেস করলেন, লোডশেডিং হয় কিনা, হলে কি করেন? তারপর হঠাৎই মান্তুকে ইশারায় বললেন, ছেলেটিকে বাইরে পাঠিয়ে দিতে।

মান্তু হতভম্ব।

মিসেস লাহিড়িও প্রথমে ঠিক বুঝতে পারলেন না তার ছেলেকে ঘর থেকে চলে যেতে হবে কেন? ও তো চুপচাপ একপাশে বসে আছে। কোনোরকম অভদ্রতা করেনি। কিন্তু মিস থাম্পি আবার চোখের ইশারা করতেই দেবলকে উনি বাইরে পাঠিয়ে দিলেন। একটা অজানা আশঙ্কায় স্বামী-স্ত্রীর বুক কাঁপতে লাগল। মিস থাম্পি গৃহকর্তাকে লক্ষ্য করে হেসে বললেন, মিস্টার লাহিড়ি, আপনি কিন্তু আপনার ফ্যামিলির সকলের কথা বলেননি।

লাহিড়িবাবু মুখ কাঁচুমাচু করে বললেন, আমি তো সকলের সঙ্গেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছি। সকলে বলতে–আমার মিসেস আর ঐ ছেলে।

মিসেস লাহিড়ি যোগ করলেন, শুধু মেয়েটা এখানে নেই। মামার বাড়ি গেছে।

 মিস থাম্পিও হেসে বললেন, কিন্তু আপনাদের সঙ্গেই আছেন এমন একজনকে আপনারা বাদ দিয়েছেন।

স্বামী-স্ত্রী দুজনেই অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে মিস থাম্পির দিকে তাকালেন।

মিস থাম্পি বললেন, আমি কিন্তু আপনাদের বাড়ি ঢুকেই তাঁকে দেখতে পেয়েছি। বলে হাসতে লাগলেন।

অবাক নির্মল লাহিড়ি বললেন, আরও একজনকে দেখেছেন?

–হ্যাঁ, আপনারা যখন আমায় রিসিভ করছিলেন, তিনিও পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই ছুটে ঘরের মধ্যে চলে গেলেন। আমি ঘরে ঢুকেই তাকে খুঁজেছিলাম। কিন্তু তখন আর দেখতে পেলাম না। দেখলাম পরে খাবার সময়ে। টেবিলের অল্প দূরে দাঁড়িয়েছিলেন। ভারি shy type-এর soft ভদ্রমহিলা।

মিস থাম্পি থামলেন।

সারা ঘর জুড়ে কেমন একটা অস্বস্তি। কেউ সেই মুহূর্তে কোনো কথা বলতে পারল না।

–এখন বলুন ইনি কে?

 স্বামী-স্ত্রী একেবারে বোবা হয়ে গেলেন। নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন। নির্মলবাবু একটু সামলে নিয়ে বললেন, আর তো কেউ নেই মিস থাম্পি।

–নেই, কিন্তু এক সময়ে ছিলেন। একজন মহিলা। বয়েস বছর কুড়ি-বাইশ। পাতলা গড়ন। শ্যামবর্ণা। লম্বা চুল–একটু যেন কুঁজো হয়ে হাঁটেন

শুনতে শুনতে লাহিড়িবাবুর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

বলুন মিস্টার লাহিড়ি, এইরকম কেউ কি কখনো ছিলেন এ বাড়িতে? মিস থাম্পির গলার স্বরটা কেমন যেন অস্বাভাবিক শোনাল।

কয়েক মিনিট নিরেট স্তব্ধতা। তারপর নির্মল লাহিড়ি অস্ফুটস্বরে বললেন, আপনি যে রকম বর্ণনা দিচ্ছেন তাতে মনে হচ্ছে আপনি আমার ফাস্ট ওয়াইফের কথা বলছেন। কিন্তু সে তো অনেকদিন হল–

কথা শেষ হল না। হঠাৎ মিসেস লাহিড়ি কাঁপতে কাঁপতে চেয়ারে বসে পড়লেন। তারপরই অচৈতন্য।

বিমূঢ় নির্মল লাহিড়ি দু হাতে মিসেস লাহিড়ির দেহটা ধরে রইলেন।

Dont worry! মিস থাম্পি বললেন।একটু পরেই উনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। ওঁকে বলবেন–nothing to fear. এই মহিলা যখন জীবিত ছিলেন তখন আপনাকে খুব ভালবাসতেন। এখনো ভালবাসেন। আর জেনে রাখুন যে spirit ভালবাসতে পারে সে কারো ক্ষতি করে না।

বলে দুহাত তুলে নমস্কার করে বেরিয়ে এলেন।

বাড়ি ফিরে মান্তু ললিতবাবুকে সব ব্যাপারটা বলল। ললিতবাবু স্তম্ভিত হয়ে শুনলেন। মিস থাম্পি হঠাৎই যেন এদের কাছে সাধারণ সম্মানীয় অতিথি থেকে ভয়-বিস্ময়-শ্রদ্ধার পাত্রী হয়ে উঠলেন। এও একরকম অস্বস্তি। এই-সব মানুষের কোথায় কিসে তুষ্টি কিসে বিপত্তি বোঝা দায়। তাছাড়া অন্য অস্বস্তিও রয়েছে মান্তুর। যে জন্যে রীণাকে আনা তা আর কিছুতেই হচ্ছে না। ওকে নিয়ে যে নিরিবিলিতে মিস থাম্পির কাছে বসবে, মিস থাম্পি তার ফুরসতটুকুও দিচ্ছেন না। মিসেস লাহিড়ির বাড়ি থেকে ফিরে এসে আবার খাতাপত্র নিয়ে বসেছেন উনি। হয় তো আরো দুএকদিন থাকবেন। কিন্তু রীণা আর কিছুতেই থাকবে না। ওকে কাল সকালেই পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে।

রীণার ওপরই মান্তুর রাগ হল। ও যদি নিজে মিস থাম্পির কাছে গিয়ে সোজাসুজি ওর বিপদের কথা বলত, তাহলে হাঙ্গামা চুকে যেত। কিন্তু ও তো ত্রিসীমানায় ঘেঁষছেই না।

রাত নটা বাজল। মিস থাম্পি তার খাতা নোটবই ব্যাগে পুরে বেরিয়ে এলেন।

–আপনার খাবার ব্যবস্থা করি? মান্তু বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করল।

করুন। আজ তাড়াতাড়ি শোব। খুব টায়ার্ড। খাওয়াদাওয়া চুকে গেল খুব তাড়াতাড়ি আর নিঃশব্দে। যা সচরাচর হয় না। কারণ যাঁর সঙ্গে ওরা গল্প করবে ভেবেছিলেন, তিনিই তো অতিশয় গম্ভীর।

মান্তু দেখল আর সময় নেই। খাওয়ার পরই মিস থাম্পি শুয়ে পড়বেন। আর রীণাও কাল সকালে চলে যাবে। কাজেই খাওয়ার পরই রীণাকে নিয়ে ওঁর ঘরে ঢুকতে হবে।

মান্তুকে দুর্ভাবনার হাত থেকে বাঁচালেন মিস থাম্পিই।

খাওয়া শেষ করে রীণা থালায় আঙুল দিয়ে আঁক কাটছিল। হঠাৎ মিস থাম্পি জিজ্ঞেস করলেন-Why you look so pale? রাত্রে ভালো ঘুম হয় না?

রীণা চমকে মিস থাম্পির দিকে তাকাল।

-Are you a victim of any nightmare? রাত্রে কোন দুঃস্বপ্ন দ্যাখ?

রীণা প্রথমে কি উত্তর দেবে ভেবে পেল না। তার পরই সংকোচ কাটিয়ে বলল, Not dream madam! Something else.

মিস থাম্পি ভুরু কুঁচকে চোখ ছোটো করে তাকালেন।

রীণা বলল, Not only at night-constantly haunted by a feeling of an unknown fear.

মান্তু এই সুযোগে বন্ধুর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল, শুধু রাত্তিরেই নয়, দিনেও খুব ভয় পায়।

-What is that fear?

–That I do not know myself ভয়টা কি ম্যাডাম, আমি নিজেও তো জানি না।

মিস থাম্পি কিছুক্ষণ কী ভাবলেন। তারপর বললেন, আজ আমি খুব টায়ার্ড। কাল সকালে আপনার সঙ্গে কথা বলব। ঠিক সকাল ছটায়।

.

১২.

ডাক্তার রুদ্র

 বাড়িতে রীণা নেই, কাজেই ফেরার তাড়া নেই। রীণাকে ছেড়ে দিতে খুব একটা ইচ্ছে ছিল না ওর। তার কারণ, রীণা যেন ক্রমশ মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে উঠছে। এ বিষয়ে সঞ্জয়ের বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এ অবস্থায় রীণাকে চোখের আড়াল করার এতটুকু ইচ্ছে ছিল না সঞ্জয়ের। অবশ্য মান্তু কথা দিয়েছে সে যেমন নিজে রীণাকে নিয়ে যাচ্ছে রাত পোহালেই তেমনি নিজেই পৌঁছে দিয়ে যাবে। মান্তু আড়ালে ওকে মিস থাম্পির কথাও বলেছে। অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন মহিলা, প্রেতচর্চাই তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত। মান্তুর ইচ্ছে রীণাকে একবার তাঁর সঙ্গে কথা বলিয়ে দেয়। এসব হাস্যকর কথা। মহিলাটি কি ঝাড়ফুঁক করে রীণাকে সুস্থ করে তুলবেন? তবু সঞ্জয় বাধা দেয়নি। ভেবেছে মান্তুর বাড়িতে এক রাত্তির থাকলে রীণার হয়তো ভালোই লাগবে। মান্তুও তাকে বোঝাতে পারবে।

সারাদিন হাসপাতালে কাজের মধ্যে কেটে গেল। রীণা যে বাড়ি নেই এ কথা একবারও মনে হল না। মনে পড়ল বিকেলে হাসপাতাল থেকে বেরোবার পর। ভাবল এখনই গিয়ে কি করবে? বাড়ি তো খালি।

সঞ্জয়ের অবশ্য হুটহাট যাওয়ার মতো জায়গা একটা আছে। সেটা ডাক্তার রুদ্রর বাড়ি। সঞ্জয় ঠিক করল ওখানেই যাবে। রীণার ব্যাপারে একটু কথা বলা দরকার।

ডাঃ অবিনাশ রুদ্রের বাড়ি বেলগাছিয়ায়। গেটের ভেতর মোরাম বিছানো পথ। দক্ষিণ দিকে গ্যারেজ। নিচের ঘরে চেম্বার। সকালে রুগী দেখেন। সন্ধেবেলায় বসেন না। ঐ সময়টা মিটিং নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। মিটিং না থাকলে বই পড়েন।

ডাঃ রুদ্রের এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে লন্ডনে ডাক্তারি পড়ছে। বাড়িতে শুধু স্ত্রী। নির্ঞ্ঝাট সংসার।

সঞ্জয় কলকাতায় এসেই ভেবেছিল রীণাকে নিয়ে ডাঃ রুদ্রের বাড়িতে বেড়াতে আসবে। কিন্তু তখন রীণাকে নিয়ে সিনেমা থিয়েটার দেখাতেই দিন কেটে গেল। তারপরই রীণা ভয় পেতে আরম্ভ করল। আর বেরোন হল না। শেষ পর্যন্ত ডাঃ রুদ্রকেই আসতে হল রীণাকে দেখতে। রীণার সঙ্গে সেই তাঁর প্রথম পরিচয়। যাবার সময়ে তিনি বার বার করে বলেছিলেন–সঞ্জয় যেন রীণাকে একদিন নিয়ে যায় তার বাড়িতে। কাকীমা দেখবে।

সঞ্জয় একদিন নিয়ে গিয়েছিল রীণাকে। রীণার মনে অস্বস্তি ছিল ডাঃ রুদ্র হয়তো কাকীমার সামনেই তাকে ঠাট্টা করবেন। কিন্তু ডাঃ রুদ্র ওসব কোনো কথাই তোলেননি। রীণার খুব ভালো লেগেছিল।

মুখে চুরুট, সোফায় গা এলিয়ে ডাঃ রুদ্র বই পড়ছিলেন। সঞ্জয়কে আসতে দেখে বই মুড়ে রেখে সহাস্য অভ্যর্থনা করলেন, এসো এসো।

সঞ্জয় সামনের কোচে বসল।

–কি খবর বলো। রীণা কেমন আছে? বলেই ভেতরের দরজার পর্দা সরিয়ে হাঁকলেন, ওগো, সঞ্জয় এসেছে।

একটু পরেই ডাঃ রুদ্রের স্ত্রী হাসিমুখে এসে দাঁড়ালেন। রীণাকে নিয়ে এলে না কেন?

সঞ্জয় ইতস্তত করে বলল, আজ আমি হাসপাতাল থেকে আসছি। ছুটির দিনে নিয়ে আসব।

বোসো। আমি আসছি। বলে তিনি ভেতরে চলে গেলেন।

 সঞ্জয় তখন রীণার কথা বলল। প্রথম দিনের ঘটনা ডাঃ রুদ্রের জানা ছিল। সঞ্জয় পরের দিকের সব ঘটনা খুলে বলল। গেলাস ভাঙা, ছবি চুরি থেকে আরম্ভ করে মান্তুর বাড়ি একা বেড়াতে যাওয়া পর্যন্ত সব। বলল না শুধু মান্তুর সঙ্গে আজকে যাওয়ার কথাটা। লুকোবার তেমন কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু মিস থাম্পির কথায় উনি হয়তো রাগ করবেন, কিংবা হাসবেন।

সব শুনে ডাক্তার রুদ্র গম্ভীর হয়ে রইলেন।

 সঞ্জয় জিজ্ঞেস করল, কেসটা আপনার কিরকম মনে হয়? মানসিক ব্যাধিই?

ডাঃ রুদ্র বললেন, ওর সঙ্গে ভালো করে কথা না বললে বুঝতে পারব না।

সঞ্জয় বলল, মানসিক ব্যাধি ছাড়া আর কি হতে পারে? আপনি কি মনে করেন ও সত্যিই কোনো অশরীরী আত্মাকে দেখে?

ডাঃ রুদ্র কিছুক্ষণ কি ভাবলেন। তার পর বললেন, দ্যাখো, এ সম্বন্ধে চটু করে কিছু বলা ঠিক নয়, আমি অলৌকিক ব্যাপার নিজে দেখিনি। তবে রুগী দেখেছি।

–তারা কেউ সেরেছে?

–হ্যাঁ, সবাই। সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবন চালাচ্ছে।

–নিশ্চয় ঝাড়-ফুঁক করে নয়?

 ডাক্তার রুদ্র বললেন, না। চিকিৎসা করেই। তবে সে চিকিৎসা ওষুধ-ইনজেকশান দিয়ে নয়, পেশেন্টের মনস্তত্ত্ব স্টাডি করে কিংবা জায়গা বদল করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্য উপায়ও নিতে হয়েছে।

ডাঃ রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, আমার মনে হচ্ছে তোমার ধারণাই ঠিক। রীণা সাইকোপ্যাথিক পেশেন্ট হয়ে পড়েছে।

সঞ্জয় এতেও সন্তুষ্ট হল না। জিজ্ঞেস করল, হঠাৎ সাইকোপ্যাথিক পেশেন্ট হয়ে পড়ল কেন? তারও তো কারণ থাকবে।

-হ্যাঁ, কারণ তো থাকবেই।

–কিন্তু আমি তো কোনো কারণ দেখছি না।

 ডাঃ রুদ্র একটু হাসলেন। বললেন, তুমি আর কত দিন ওকে দেখছ? তিন বছর? চার বছর? তার আগেও তো কোনো ঘটনা ঘটতে পারে যা তুমি জান না। এমনকি ওর মা-বাবাও জানে না। এমনও হতে পারে ব্যাপারটা ওর নিজেরও মনে নেই!

সঞ্জয় অবাক হয়ে বলল, সে আবার কী?

–হ্যাঁ, ঠিকই বলছি। খুব অল্প বয়েসে হয়তো কোনো কিছুতে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিল। সেই ভয়ের কারণ বা স্বরূপ আজ আর মনে নেই। কিন্তু ভয়ের। তীব্র অনুভূতিটা থেকে গিয়েছে সাব-কনসাস মাইন্ডে।

ডাঃ রুদ্র একটু থামলেন। তারপর সোজা হয়ে বসে বললেন, ছোটোবেলায় একবার নররাক্ষসের জ্যান্ত মুর্গি খাওয়া দেখে ভয় পেয়েছিল, সেদিন তুমি বলছিলে না?

—হ্যা। এবারও মহাজাতি সদনে ম্যাজিক দেখতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল সে কথাও আপনাকে বলেছি। কিন্তু তার সঙ্গে এখনকার মানসিক

এই পর্যন্ত বলে সঞ্জয় একটু থামল। ডাক্তার রুদ্রের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, একটা কারণ খুঁজে পেয়েছি কাকাবাবু। রীণা যাকে দেখে তার পরনে কালো কোটপ্যান্ট। রীণা ছোটোবেলায় যে নররাক্ষসকে দেখেছিল সেও আসলে ম্যাজিসিয়ান। আমার বিশ্বাস সেও কালো পোশাক পরত।

ডাঃ রুদ্রের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বললেন, ভালো কথা বলেছ। রীণাকে একবার জিজ্ঞেস করে দেখো দিকি, সেই ম্যাজিসিয়ানের পোশাকটা মনে আছে কিনা।

করব।

এই সময়ে ডাঃ রুদ্রের স্ত্রী দুজনের জন্য চা, টোস্ট আর ওমলেট নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। প্লেট নামিয়ে কাজ সারতে মিসেস রুদ্র ভেতরে চলে গেলেন।

ডাঃ রুদ্র সোফায় আধ-শোওয়া হয়ে খেতে খেতে বললেন, তবে আমার মনে হয় ওটা ঠিক কারণ নয়। ধরো, সেই ম্যাজিসিয়ানের কালো পোশাকটাই যদি ভয়ের কারণ হয় তাহলে তো যে কোনো কালো কোট-প্যান্ট পরা লোক দেখলেই ভয় হবে। মহাজাতি সদনে ম্যাজিক দেখার আগে কি কখনো কালো পোশাক পরা লোক দেখেনি?

সঞ্জয় চুপ করে গেল। নিঃশব্দে দুচুমুক চা খেয়ে বলল, ধরেই নিলাম না হয় ছোটোবেলার স্মৃতি থেকেই মহাজাতি সদনে ম্যাজিক দেখতে গিয়ে কিংবা ম্যাজিসিয়ানকে দেখে ভয় পেয়েছিল। তার সঙ্গে বাড়িতে ভয় পাবার কারণ কি? আর কলকাতায় এসেই বা এতদিন পর ভয় পেতে লাগল কেন? সব যেন কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে কাকাবাবু।

ডাঃ রুদ্র চা শেষ করে একটা চুরুট ধরালেন। বললেন, গোলমাল কিছুই নয়। ব্যাপার একটাই–ভয় পাওয়া। সেই সঙ্গে একটা-কিছু দেখা।

সঞ্জয় একটু উত্তেজিত হয়ে বলল, আপনিও বিশ্বাস করেন ও কিছু দেখে?

-আমি তো আগেই বলেছি, ও বিষয়ে চট করে কিছু বলা যাবে না। রোগের বিকারে মানুষ নিজে থেকেই বকে। কিন্তু যা বকে তা ভুল বকা। মানসিক রোগে লোকে নানা কারণে ভয় পায়-কখনো কোনো শব্দ শুনে, কখনো কোনো বিশেষ গন্ধ পেয়ে, কখনো বা কিছু দেখে। অথচ সেই শব্দ, গন্ধ বা বস্তু হয়তো আদপেই কিছু নেই।

–তাহলে আপনি সেই আমার কথাতেই আসছেন রীণা সাইকোপ্যাথির পেশেন্ট?

 –হ্যাঁ, তাই।

সঞ্জয় নিজেই কত বার রীণাকেই বলেছে, তুমি মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে পড়েছ। আর আজ ডাঃ রুদ্রের মুখে ঐ একই কথা শুনে তার মুখটা শুকিয়ে গেল। ম্লান মুখে জিজ্ঞাসা করল, তাহলে ট্রিটমেন্ট?

–আমিই করব। অবশ্য যদি বুঝি সত্যিই ওর মানসিক রোগ হয়েছে।

এই বলে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। সঞ্জয়ের পিঠ চাপড়ে বললেন, শুনে অবাক হবে, আমি এখন মেমেরিজম নিয়ে কিছু পড়াশোনা করছি। বলতে বলতে সামনের র‍্যাক থেকে কতকগুলো ফাইল বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন। বললেন, একসময়ে ওদেশের ডাক্তার ফিসার (Dr Fisher), রিচার (Richer), বিনেট (Binet), ফেরি (Fere), বিখ্যাত ফরাসী বিজ্ঞানবিদ ডাক্তার লুই আর স্বয়ং মেসমার যিনি মেসমেরিজমের আবিষ্কর্তা এঁরা সকলেই মেমেরিজমের সাহায্যে কঠিন কঠিন রোগ সারাতে পারতেন। সেই সব খবরের কাটিং এই ফাইলে আছে। কৌতূহল থাকলে একটা ছুটির দিনে এসে পড়ে দেখতে পার। একটু থেমে বললেন এখনও এদেশে বহু জটিল রোগ মেমেরিজমের সাহায্যে সারানো যায়। আমাদের দেশে ঝাড়-ফুঁক করে রোগ সারানো হতো। এখনও পল্লীগ্রামে ঝাড়-ফুঁকের ব্যবস্থা চলে। এই ঝাড়-ফুঁকও এক ধরনের মেসূমেরিজ। তুমি কখনো দেখেছ কি না জানি না ওঝারা রুগীর কাছে বসে রুগীকে না ছুঁয়ে কিংবা তার দেহের ওপর দিয়ে খুব আগ্মভাবে হাত চালায়। একে বলে পাস দেওয়া। মাথা থেকে পা পর্যন্ত এইরকম কয়েকবার পাস দিলেই রুগী ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম ভাঙলে দেখা যায় সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছে। অনেক মহাপুরুষই তো রোগীর গায়ে হাত বুলিয়ে তাদের রোগমুক্ত করতেন। এটা অস্বাভাবিক বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আসলে তারা প্রচণ্ড মানসিক শক্তির অধিকারী। ঐ শক্তির বলেই তারা রোগীকে রোগমুক্ত করতে পারতেন। আর মেমেরিজমের গোড়ার কথাই হচ্ছে প্রচণ্ড মানসিক শক্তি। বুঝতেই পারছ মানসিক রোগের ক্ষেত্রে এই মেসমেরিজম্ কত শক্তিশালী চিকিৎসা।

সঞ্জয় বলল, তাহলে কি আপনি রীণাকে হিপনোটাইজ করে সারাবেন?

ডাঃ রুদ্র হেসে বললেন, তাহলে তো খুব ভালোই হতো। কিন্তু হিপনোটাইজ করি সে শক্তি আমার কই? আজকের দিনে কজনারই বা সে শক্তি আছে? তবে এবিষয়ে আমার ইন্টারেস্ট আছে বলেই তোমাকে এত কথা বললাম।

সঞ্জয় একটু অধৈর্য হয়ে বলল, তাহলে আপনি কিভাবে সারাবেন?

সঞ্জয় না হয়ে অন্য কেউ এ কথা জিজ্ঞেস করলে ডাঃ রুদ্র হয়তো বিরক্ত হতেন। কিন্তু এক্ষেত্রে তিনি শুধু একটু হাসলেন। বললেন, প্রথমে রোগের সঠিক কারণ খুঁজে বের করতে হবে। দেখতে হবে চাপা কোনো ভয়ের স্মৃতি আছে কিনা? কোনো মানসিক আঘাত পেয়েছে কিনা। অনেক মানসিক আঘাত নিঃশব্দে সহ্য করতে হয়, তার প্রভাবই সবচেয়ে বেশি। এছাড়া অতৃপ্ত যৌন-কামনারও একটা প্রভাব আছে। বিশেষ করে যারা উগ্রবিকৃত যৌন-কামনায় কাতর তাদের মানসিক বিকার জন্মাতেই পারে। বিকৃত যৌন-কামনায় কাতর এমন একটি পেশেন্ট আমিই পেয়েছিলাম।

সঞ্জয় অধৈর্য হয়ে বলল, রীণার ক্ষেত্রে এসবের কোনো প্রভাবই নেই। কলকাতায় আসার আগে পর্যন্ত সে সবদিক দিয়েই সুখী ছিল। এখনও তার কোনো কিছুরই অভাব নেই।

ডাঃ রুদ্র স্নিগ্ধ হেসে বললেন, তা হয়তো ঠিক। তবু তুমি নিজে ডাক্তার। এই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ঘটনা জেনে রাখা ভালো। সেই পেশেন্টটির কথা শোনোনা।

ডাঃ রুদ্র একটু থামলেন। তারপর বলতে শুরু করলেন, স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন। দুটি সন্তানও হয়েছে। স্বামীটি সুদর্শন, ভদ্র, মার্জিতরুচি, সলজ্জ প্রকৃতির। স্ত্রীটি মোটামুটি সুন্দরী। পাতলা গড়ন। গাল দুটি একটু বসা। কিন্তু ঝকঝকে চোখ। মোটেই মুখরা নয়, বরঞ্চ স্বল্পভাষী। তাকে দেখেই মনে হয়েছিল তার জীবনের অনেক সুখ-দুঃখের কথা সে যেন ঠোঁটে কুলুপ এঁটে আছে। দশ বছর শান্ত দাম্পত্য জীবন কাটাবার পর স্ত্রীটি হঠাৎ কিরকম অস্বাভাবিক হয়ে উঠল। কোনো কিছুতেই আনন্দ নেই, উৎসাহ নেই, কারো সঙ্গেই কথা বলতে ভালো লাগে না, এমনকি–এমনকি রাত্রে স্বামীর পাশে শুয়েও পাশ ফিরে থাকত। স্বামীর মনে হতো যেন একতাল বরফ তার পাশে পড়ে আছে। অগত্যা স্বামী তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করল। প্রথমে স্ত্রী চিকিৎসা করাতে রাজি হয়নি। বিরক্ত হয়ে বলত–আমার কি হয়েছে যে চিকিৎসা করাব?

শেষে অবশ্য রাজি হয়েছিল। গোপন সাক্ষাৎকারের সময় হিতৈষী ডাক্তারের কাছে সে যা বলেছিল তা এই–প্রথম কৈশোর কালেই সে একটা ছেলের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। ছেলেটি শুধু যে উপভোগ করত তা নয়, উপভোগের সময়ে নানা রকম খারাপ কথা বলত, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করত। তাতে মেয়েটি রাগ তো করতই না, বরঞ্চ তার ভালো লাগত। পরবর্তী জীবনে স্বামীর কাছ থেকেও ঐ রকম আচরণ আশা করত। কিন্তু স্বামীর কাছ থেকে সেরকম ব্যবহার পেত না। শেষ পর্যন্ত–মানে দশ বছর পর তার হঠাৎ এমন অবস্থা হল যে, পাগলের মতো সেই ছেলেটার খোঁজ করতে লাগল। ছেলেটি এই পরিবারের এতই পরিচিত ছিল যে তাকে কেউ সন্দেহ করত না। মেয়েটি এই ব্যাধিরই শিকার।

এই পর্যন্ত বলে ডাঃ রুদ্র একটু থামলেন।

সঞ্জয় জিজ্ঞেস করল–মহিলাটির শেষ পর্যন্ত কি হল?

–চিকিৎসা শুরু হল। চিকিৎসা কি জান? চিকিৎসা আর কিছুই নয়, মাস ছয়েকের জন্যে তাকে তাদেরই অতি সাধারণ এক গৃহস্থ যৌথ পরিবারে পাঠিয়ে দেওয়া হল। তার স্বামীকে বলা হল–এই ছমাসের মধ্যে সে যেন স্ত্রীর কাছে না যায়। শুধু তখনই যাবে যখন তার স্ত্রী তাকে চিঠি লিখে আসতে বলবে। সেই যৌথ পরিবারে গিয়ে বধূটি প্রথম সুস্থ স্বাভাবিক ব্যস্তসমস্ত জীবনের আস্বাদ পেল। তারপর থেকেই তার পরিবর্তন। এখন সে সম্পূর্ণ সুস্থ স্বাভাবিক।

সঞ্জয় কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, রীণার ট্রিটমেন্ট তাহলে কিভাবে করবেন?

ডাঃ রুদ্র হেসে বললেন, রীণার ক্ষেত্রে কোন ধরনের ট্রিটমেন্ট করব তার সঙ্গে কথা বলার পর ঠিক করব। অবশ্য রীণা যদি সত্যিই সাইকোপ্যাথিক পেশেন্ট হয়।

বড়ো ঘড়িটায় ঢং ঢং করে নটা বাজল। সঞ্জয় উঠে পড়ল। এখন তাকে হোটেলে ছুটতে হবে।

.

রাত সাড়ে দশটা শহর কলকাতায় এমন কিছু নয়। কিন্তু যশোর রোডের ধারে এই অঞ্চলটা এরই মধ্যে নিঝুম হয়ে গেছে। বিশেষ করে এই বাড়ির একতলা দোতলার ভাড়াটেরা দশটার আগেই খাওয়া সেরে শুয়ে পড়ে। একমাত্র গরমকালে লোড শেডিং হলে অনেক রাত পর্যন্ত বাইরে এসে বসে।

সঞ্জয় ওপরে উঠে এল। প্যাসেজটা অন্ধকার। বাড়িতে কে আছে যে আলো জ্বেলে রাখবে?

অন্ধকারেই সঞ্জয় তালা খুলে ঘরে ঢুকল। ঢুকতেই গা-টা কেমন ছমছম করে উঠল। এর আগেও একদিন এরকম হয়েছিল, যেদিন রীণা একা মান্তুদের বাড়ি যাবার জন্যে বেরিয়েছিল। তবে সেদিনের অস্বস্তিটা অন্য কারণে। রীণার জন্যে দুর্ভাবনায়। দুর্ভাবনা আর গা ছমছ করা এক নয়।

কিন্তু আজই বা গা ছমছম করল কেন?

সঞ্জয় তাড়াতাড়ি আলো জ্বালল। আলোয় ঘর ভরে গেল। সঙ্গে সঙ্গে গা-ছমছমানি থেমে গেল। নিজেকে ধমক দিল–ডাক্তার মানুষের অন্ধকারে ভয়? তাও তেতলার নিজের ঘরে ঢুকতে?

দরজাটা ভালো করে বন্ধ করে সঞ্জয় বিছানায় এসে বসল। হোটেলে খেয়ে এসেছে। কাজেই শোওয়া ছাড়া এখন আর অন্য কাজ নেই। কিন্তু শুতে ইচ্ছে করল না। শুলেও ঘুম আসবে না। অগত্যা একটা সিগারেট ধরালো।

ডাঃ রুদ্রের কথাগুলো তার মনে পড়ছিল। আচ্ছা, রীণার প্রসঙ্গে হঠাৎ উনি ঐ মহিলাটির কথা টানলেন কেন? তিনি কি রীণার ক্ষেত্রেও সেরকম কিছু সন্দেহ করেন? মান্তুর দাদার সঙ্গেও ওর খুব ভাবছিল নাকি কী জানি বাবা! পরক্ষণেই অবশ্য সঞ্জয় সে কথা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে পাশ ফিরে শুল। কিন্তু কিছুতেই ঘুম এল না।

তার কেবলই সেইসব রাতগুলোর কথা মনে হতে লাগল যেসব রাতে রীণা ভয় পেয়েছিল। ঐ তো বসার ঘরে টেবিলটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ঐ টেবিলের কাছেই রীণা কী যেন দেখেছিল। ঐ টেবিল থেকেই গেলাস পড়ে ভেঙেছিল। আচ্ছা–সেই ছবিটার কি হল? সত্যিই কি কেউ নিয়ে গেছে? কিন্তু কে নেবে? এঘরে তো বাইরের কেউ আসে না।

ভাবতে ভাবতে সঞ্জয়ের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। সে জোর করে অন্য দিকে মন সরাবার চেষ্টা করল। কিন্তু মনটা সেই অশরীরী আত্মার মতো টেবিলটার চারদিকেই ঘুরতে লাগল।

কী মুশকিল! ভয় পাচ্ছে নাকি? সঞ্জয় জোর করে নিজেকে সচেতন করার চেষ্টা করল।

কই? অন্য দিন তো ভয় পায় না। ঘরে সঙ্গী তো শুধু রীণা। তাও সে তো নিজেই ভয়ের শিকার!

আশ্চর্য! আজ সেই একটা ভীতু মানুষই কাছে না থাকাতে সঞ্জয়ের মতো ডাক্তারও কেমন ভয় পাচ্ছে।

সঞ্জয় উঠে পায়চারি করতে লাগল। হঠাৎ ও চমকে উঠল। ঘরে কি আর কেউ আছে? তার পিছনে!

নাঃ, ওটা ওর নিজেরই ছায়া।

 আশ্চর্য! মেঝেতে নিজের ছায়া দেখেই বুকের মধ্যে কিরকম করে উঠেছিল। বুঝতে পারল, এই জন্যেই মানুষ বোধহয় জায়গা-বিশেষে একা থাকতে পারে না। সঙ্গী চায়। ঘরে একটা কুকুর থাকলেও যেন অনেক নিশ্চিন্ত।

নাঃ, ঘুমনো যাক। সঞ্জয় মশারি টাঙিয়ে নিল। বিছানায় ঢুকে বেডসুইচ টিপে আলো নিভোতে যাচ্ছিল, কি মনে হল, আবার উঠে দরজাটা দেখে নিল ঠিক মতো বন্ধ হয়েছে কি না। সিঁড়ির দিকের জানলাটা অন্য দিন খোলা থাকে। আজ বন্ধ করে দিল।

বিছানার কাছে আসছিল–ফিরে গিয়ে একবার বাথরুমটা দেখে নিল। তারপর খাটের তলা।

নাঃ, কেউ কোথাও নেই। নিশ্চিন্ত। মনকে বোঝাল–অন্য কিছুর জন্যে নয়, চোর-ডাকাতের জন্যেই এত সাবধানতা!

বিছানায় শুয়ে বেডসুইচ অফ করে দিল।

তবু ঘুম আসছে না। তখন সঞ্জয় ডাঃ রুদ্রের সঙ্গে যে কথা হল তাই নিয়ে আবার ভাবতে লাগল। ডাঃ রুদ্র যে কী বলতে চাইলেন সঞ্জয়ের কাছে তা মোটেই পরিষ্কার নয়। উনি কি এই বয়েসে এখন মেসমেরিজ শিখে চিকিৎসা করবেন? পাগল নাকি!

উনি রীণার সঙ্গে ভালো করে কথা বলবেন। তা তিনি হাজার বার বলুন। কিন্তু রীণাকে কোথাও চিকিৎসার জন্যে পাঠানো যাবে না। ও কিছুতেই রাজি হবে না।

তাছাড়া ডাঃ রুদ্র যদিও বলছেন মানসিক রোগ, তবু প্রতিবারই বলেছেন, যদি সত্যিই মানসিক রোগ হয়।

উনি কি তবে মানসিক রোগ ছাড়া অন্য কিছু আশঙ্কা করছেন? ডাঃ রুদ্রের মতো একজন বিখ্যাত সাইকিয়াট্রিস্টও কি অলৌকিক কিছুতে বিশ্বাসী?

এক ঘুমেই রাত শেষ।

 ঘুম ভাঙার পরই সঞ্জয়ের মনে পড়ল রীণা নেই। কাজেই চা নিয়ে কেউ আজ মুখের সামনে ধরবে না।

বিছানা থেকে উঠে পড়ল ও। মনটা খুশি খুশি, কাল রাতে কিছু হয়নি। সত্যি কিছু থাকলে তো হবে।

চা খেয়ে, শেভিং-এর কাজ সেরে স্নানের ঘরে যখন ঢুকল তখন বেলা আটটা। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই রীণা এসে পড়বে, তবু আজ আর বাড়ির ভাত জুটবে না। ক্যান্টিনেই খেয়ে নিতে হবে। তার আগে সকালে পেটে কিছু পড়া দরকার। সঞ্জয় একটা ডিম সেদ্ধ করে নিল। তারপর কোথায় নুন, কোথায় গোলমরিচ খুঁজতে খুঁজতে হাঁপিয়ে উঠল।

বেলা সাড়ে আটটা। হাসপাতালে যাবার জন্যে সঞ্জয় তৈরি। কিন্তু রীণার পাত্তা নেই। অথচ সকালেই ওর আসার কথা। মান্তুই পৌঁছে দিয়ে যাবে। কই?

পৌনে নটা হতে চলল।

নাঃ, আর দেরি করা যায় না। সঞ্জয় ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তালা লাগালো। এমনি সময়ে সিঁড়ির মুখে বন্দনা এসে দাঁড়ালো।

-আপনার ফোন।

–ফোন! সঞ্জয় চমকে উঠল। কার ফোন হতে পারে? সেদিন রাতে ফোন এসেছিল থানা থেকে। আজ? আজ নিশ্চয়ই মান্তু

বন্দনাদের বসার ঘরে ঢুকে সঞ্জয় রিসিভারটা তুলে নিল।

–হ্যালো!

–কি মশাই! কাল রাত্তিরে ভালো ঘুম হয়েছিল তো?

 মহিলা কণ্ঠস্বর। কিন্তু কেমন অস্পষ্ট।

-কে বলছেন?

–ও বাবা! এত মিষ্টি করে বললাম, তবু চিনতে পারলেন না? ডাক্তাররা এমনি ভোতাই হয়।

সঞ্জয় এবার হেসে উঠল।

-ওঃ শ্ৰীমতী মান্তু! বলুন কি খবর? বেরোবার মুখে এমন একটি মধুর স্বর উপহার পাব ভাবতে পারিনি।

-চুপ করুন মশাই! বেশি গলে যাবেন না। পাশেই আপনার অর্ধাঙ্গিনী আছেন। শুনতে পাবেন।

সঞ্জয় জোরে হেসে উঠল।

–হাসিটা এখন তুলে রাখুন। শুনুন–এবেলা যাচ্ছি না। ওবেলা। দুজন নয়, তিন জন। পুপুকে যদি ধরেন তা হলে সাড়ে তিন জন।

–তিন, জন?

না না এখন কিছু বলব না। ভয় নেই, পুরুষ নন। মহিলাই। একটু তাড়াতাড়ি ফিরতে চেষ্টা করবেন। জমিয়ে আড্ডা দেব। ছাড়বেন না। রীণা কথা বলবে।

সঞ্জয় রিসিভারটা কান বদল করে নিল।

–হ্যালো! আমি রীণা। কাল ভয়টয় পাওনি তো?

–ভয়? কিসের ভয়? ধুৎ?

তাড়াতাড়ি ফিরছ তো?

-দেখি। বলে রিসিভারটা রেখে বন্দনার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে তাড়াতাড়ি নেমে গেল। বড্ড দেরি হয়ে গেছে।

.

১৩.

মিস থাম্পির অভিজ্ঞতা

 সন্ধেবেলা বাসায় ফিরে সঞ্জয় দেখল বাড়ি সরগরম। হাসি-গল্পে ভরপুর। একে মান্তু এসেছে সেই সঙ্গে এসেছেন সেই ম্যাড্রাসি মহিলা। তিনিও যে আসকেন, মান্তু ফোনে না বললেও, সঞ্জয় অনুমান করেছিল। রীণা তো এই মহীয়সী অতিথিটির আপ্যায়নে মহা ব্যস্ত।

আজ ওকে দেখলে কে বলবে এই রীণাই এই বাড়িতে এত দিন ভূতের ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে ছিল। এমনকি ওঁর মুখের ওপর যে ফ্যাকাশে ভাবটা ছিল সেটাও যেন আজ আর নেই। রীণা ঠিক আগের মতোই প্রাণচঞ্চল, উচ্ছল হয়ে উঠেছে।

দেখে সঞ্জয়ের ভালো লাগল। কিন্তু দূর থেকে ঐ মহিলাটিকে দেখে মোটেই ভালো লাগল না। বরঞ্চ তাঁর মুখখানা দেখে কেমন অস্বস্তি হতে লাগল।

সঞ্জয়কে সিঁড়ির মুখে প্রথম দেখল মান্তু। হাসতে হাসতে এগিয়ে এল সে।

–খুব তাড়াতাড়ি তো এসেছেন মশাই! এদিকে আমরা হোস্টের অপেক্ষায় বসে আছি। আসুন এঘরে। বলে সঞ্জয়কে একরকম টানতে টানতে ভেতরে নিয়ে গেল।

মিস থাম্পির সঙ্গে আলাপের পর্বটা মাই সেরে দিল।

 মিস থাম্পি হ্যান্ডশেক করে হেসে বললেন, আপনি ছিলেন না, আপনার বাছিত সম্ভবত আমার অনধিকার-প্রবেশ হয়ে গেছে।

সঞ্জয় সসংকোচে বলল, সে কী কথা! আমি না থাকলেও আমার স্ত্রীকে তো আপনার হাতেই দিয়ে গেছি। আপনি অনুগ্রহ করে এদের সঙ্গে এসেছেন এ আমার সৌভাগ্য।

মিস থাম্পি বললেন, আজ সকালে আপনার মিসেসের মুখে সব ব্যাপারটা শুনলাম। শুনে খুব কৌতূহল হল। ভাবলাম জায়গাটা একবার দেখেই আসি।

–ভালোই করেছেন। রীণা, চা-টা দিয়েছ তো?

 রীণা ভ্রূভঙ্গি করে বলল, তুমি কি মনে করেছ, তুমি ছিলে না বলে হোস্টের কর্তব্য করতে পারব না?

মিস থাম্পি উত্তরটা শুনে খুব হাসলেন।

মান্তু, রীণা দুজনেই লক্ষ্য করল এবাড়িতে এসে মিস থাম্পি যেন অন্য মানুষ হয়ে গেছেন। এমন করে প্রাণখোলা হাসতে দেখা যায়নি। ভালোই লাগল।

–নিন মশাই, গরম চা। খেয়ে দেখুন আমার হাতে কিরকম লাগে। আর এটা কি বলুন তো?

–পাঁউরুটি তো দেখতেই পাচ্ছি। তাছাড়া নিশ্চয় ঘুগনি।

–আশ্চর্য! এতও বোঝেন!

–তা আর এত দিনে বুঝব না? আপনার বান্ধবীটি তো ঘুগনি-স্পেশালিস্ট। সারা জীবনে ঐ একটিই জলখাবার শিখে রেখেছেন।

উঃ কী মিথ্যুক! রীণা যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল–সেদিন অমন নিজে হাতে কেক করলাম! কী বেইমান!

সঞ্জয় ততক্ষণে চামচে করে মুখে দিয়েছে। না, ঘুগনি নয়–মাংসের কিমা। সঞ্জয় আর কোনো মন্তব্য না করে চুপচাপ খেয়ে গেল।

মিস থাম্পি একটা শাল ভালো করে জড়িয়ে উঠে দাঁড়ালেন।

–আপনারা গল্প করুন। আমি একটু ঘুরে আসি।

মান্তু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল-সন্ধে হয়ে গেছে। এখন কোথায় যাবেন এই ঠাণ্ডায়?

মিস থাম্পি টটা নিয়ে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, নিচটা একবার দেখে আসি।

রীণা বলল, একাই যাবেন? ওঁকে বলব?

মিস থাম্পি তাড়াতাড়ি বললেন, না না, কাউকে লাগবে না। আমি এই কম্পাউন্ডের মধ্যেই আছি।

আধ ঘন্টার মধ্যেই মিস থাম্পি ফিরে এলেন। সঞ্জয় হেসে বললে, কিছু পেলেন?

মিস থাম্পি দাঁতের ফাঁকে একটু হাসলেন। ছেলেমানুষের মতো বললেন, বলব কেন?

কিন্তু সবাই লক্ষ্য করল ওঁর হাতে একটু শুকনো মাটি।

.

খেতে বসতে একটু রাত হল। একসঙ্গেই সবাই বসল। খেতে খেতে গল্প হচ্ছিল। রীণা মান্তুকে বলল, মিসেস লাহিড়ির বাড়ির ঘটনাটা একবার ওকে ব। বলে সঞ্জয়কে দেখিয়ে দিল।

সঞ্জয় মুর্গির হাড় চিবুতে চিবুতে নিস্পৃহ সুরে বলল, কি বলবেন? গল্প? তা বলুন শুনি।

–গল্প নয়, ঘটনা মশাই। আমরা দুজনেই তা স্বচক্ষে দেখলাম। বলে ঘটনাটা রুদ্ধ নিশ্বাসে বলে গেল।

সঞ্জয় শুনে যে কোনো মন্তব্য করল না, মিস থাম্পি তা লক্ষ্য করলেন। হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, আপনার এই ঘরে শুনলাম মাঝে মাঝে কারো আবির্ভাব হয়। আপনি ভয়টয় পান না তো?

সঞ্জয় হেসে বলল, না ম্যাডাম, ভয়টা আমার এমনিতেই কম। ভূত-প্রেতের ভয় তো জীবনে কোনোদিন করিনি। ওসব আমি মানিও না।

একটু থেমে বলল, তাছাড়া আমি ডাক্তার। বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়া–

–বিজ্ঞানই কি শেষ কথা? বিজ্ঞানের এক্তিয়ারের বাইরে কি কিছু থাকতে পারে না?

–থাকতে পারে। তবে তা নিয়ে অকারণে মাথা ঘামাবার মতো যথেষ্ট সময় আমার নেই।

মিস থাম্পি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি কি মনে করেন এ বাড়িতে ও-সব কিছু নেই? সবটাই আপনার ওয়াইফের মনের ভুল?

সঞ্জয় সেই দৃষ্টির সামনে তাকাতে পারল না। চোখ নিচু করে উত্তরটা এড়িয়ে গিয়ে বলল, এই তত গতকালই সারারাত এঘরে আমি একা ছিলাম। দিব্যি ছিলাম। কোনো কিছুই দেখিনি, কোনো শব্দও না।

মিস থাম্পি বললেন, আপনার সঙ্গে তো তার ব্যাপার নয়। কাজেই আপনাকে শুধু শুধু দেখা দেবে কেন?

সঞ্জয় হেসে অবিশ্বাসের সুরে বলল, তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন আমার স্ত্রীর সঙ্গেই শুধু তার কিছু ব্যাপার আছে। তাই সে তাকে ভয় দেখায়।

–হয়তো তাই।

—কিন্তু আমি তা বিশ্বাস করব কি করে? বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ কই?

 মিস থাম্পি একটু যেন কঠোর সুরে বললেন, এসব জিনিস জনসমক্ষে প্রমাণ করা সম্ভব নয়।

রীণা ইশারায় সঞ্জয়কে চুপ করতে বলল। সঞ্জয় চুপ করে গেল।

মিস থাম্পি তার কথার জের ধরে বললেন, প্রমাণ দিতে আমিও পারব না, হয়তো প্রতিকারও আমার পক্ষে সম্ভব নয়, তবে আজ রাত্রে একবার পরীক্ষা করে দেখব বলেই এলাম।

সঞ্জয় বলল, ভালো কথা। আপনি নিজে থেকে দেখুন কোনো পাওয়া যায় কিনা।

তারপর রীণার দিকে তাকিয়ে বলল, তাহলে আজই আঁ কিংবা না হয়ে যাচ্ছে। কি বল?

রীণ কোনো উত্তর দিল না।

সঞ্জয় কথাটা বলল বটে কিন্তু বিশ্বাস না করেই। মিস থাম্পি যদি পরদিন সকালে কফি খেতে খেতে গল্প দেন যে তিনিও সেই কালো-সুট-পরা লোকটিকে স্বচক্ষে দেখেছেন তা হলেও সে বিশ্বাস করবে না। কেননা তা বিশ্বাস করা যায় না।

.

খাওয়া অনেকক্ষণ হয়ে গিয়েছিল। শীতের রাতও গম্ভীর হয়ে উঠছিল।

হঠাৎই মিস থাম্পি রীণাকে জিজ্ঞেস করলেন–আচ্ছা, সিঁড়িটা সম্বন্ধে আপনার অভিজ্ঞতা কিরকম? তার মানে আমি বলতে চাইছি সিঁড়ি দিয়ে যখন আপনি ওঠা-নামা করেন তখন কি কিছু ফিল করেন?

রীণা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল, না তো!

সঞ্জয় হেসে বলল, রীণার মনে নেই-ওর একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল। প্রথম দিনই বেচারি উঠতে গিয়ে আচমকা গড়িয়ে পড়ে গিয়েছিল।

মিস থাম্পি এক মুহূর্ত যেন থমকে গেলেন। কিন্তু কিছু বললেন না।

.

রাত সাড়ে দশটা বাজল। তবু কেউ শোবার নাম করছে না। মিস থাম্পিও না। তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কলকাতার হালচাল জিজ্ঞাসা করছিলেন।

একসময়ে মান্তু বলল, মিস থাম্পি, আপনি যদি আপনার অভিজ্ঞতা থেকে দুএকটা গল্প শোনান তাহলে শীতের রাতে বেশ জমবে।

একথায় মিস থাম্পি গম্ভীর হয়ে গেলেন। একটু যেন বিরক্ত হয়ে বললেন, দেখুন আপনারা যাকে গল্প বলেন, আমি দুঃখিত, সেরকম কিছু আমার জানা নেই। আমি সারাজীবন দেশ-বিদেশ ঘুরে যেসব তথ্য সংগ্রহ করেছি তা গল্প নয়। তা নিয়েই আমার সাধনা। সেসব আমার নিজস্ব সম্পদ!

মান্তুর মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে গেল। বলল, excuse me! আমি দুঃখিত।

মিস থাম্পি আর কিছু বললেন না। কিন্তু পরিবেশটা ভারী হয়ে গেল।

কিছুক্ষণ কাটল। তার পর নীরবতা ভাঙলেন মিস থাম্পি নিজেই। হাসতে হাসতে বললেন, আমার কথায় আপনারা ক্ষুণ্ণ হলেন বুঝতে পারছি। আচ্ছা, একটা সত্য ঘটনা বলছি শুনুন, যার মীমাংসা এখনো হয়নি।

মিস থাম্পি একটু থামলেন। সকলেই নড়েচড়ে বসলেন। কেবল সঞ্জয়ের মধ্যে তেমন কোনো চাঞ্চল্য দেখা গেল না।

কলকাতা থেকে কাল আমার ভুটান যাবার কথা। ওখানে একটা ঘটনা ঘটেছে বলে খবর পেয়েছি। বলে মিস থাম্পি থামলেন। সঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ডাঃ গুপ্ত, ঘটনাটা আপনার বিশ্বাসযোগ্য না হলেও এঁদের শোনাচ্ছি। অলৌকিক শব্দটা আমরা প্রায়শই শুনে থাকি এবং নানা প্রসঙ্গে ব্যবহারও করে থাকি। অলৌকিক অর্থাৎ এমন-কিছু যা বাস্তবজীবনে সচরাচর ঘটে না বা যা বিজ্ঞানসম্মত নয়। কিন্তু আমাদের দেশের অনেক সাধকই তাঁদের কঠোর সাধনালব্ধ বিভূতি বা অলৌকিক ক্ষমতার পরিচয় দিয়ে গেছেন। তন্ত্রমন্ত্রের কথা আপনারা সবাই শুনেছেন। আমাদের দেশের বৌদ্ধ আর হিন্দু তান্ত্রিকেরা নির্জনে এমন অনেক কিছু করতেন যা সাধারণ মানুষের জ্ঞানের বাইরে।

মিস থাম্পি একটু থামলেন। তারপর বলতে লাগলেন, অনেকের বিশ্বাস বৌদ্ধরাই আদি তান্ত্রিক।

এ নিয়ে মতভেদ থাকলেও একটা কথা মনে রাখবেন–এই তন্ত্রশাস্ত্রের উৎপত্তি হিমালয় অঞ্চলে। অর্থাৎ কৈলাস, চীন, নেপাল, তিব্বত প্রভৃতি জায়গায়।

আমার এইসব কথা বলার উদ্দেশ্য অলৌকিকতত্ত্বে বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা বোধহয় নেপাল, তিব্বত, ভুটানেই বেশি। এই অলৌকিকতত্ত্বের মধ্যে প্রেততত্ত্বও জড়িয়ে আছে।

দুঃখের বিষয় অলৌকিকতত্ত্ব ও প্রেততত্ত্ব এখন ভয়-পাওয়ানো গাঁজাখুরি গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারও একটা কারণ বোধহয় এই যে, মানুষ ভয় পেতেও চায়। অশরীরী আত্মা আর তথাকথিত ভূত-প্রেত এক কথা নয়। কিন্তু সেকথা সাধারণ মানুষকে বোঝান যায় না। অশরীরী আত্মার অস্তিত্ব আছে। অনেকেই তা প্রত্যক্ষ করেছে। এমনকি তাদের কথা বলতেও শুনেছে। আশ্চর্য নয় কি? দ্বন্দ্ব এখানেই, আমি বলব আত্মা শরীর ধারণ করতে পারে–যে শরীর দেখা যাবে কিন্তু স্পর্শ করা যাবে না–যে শরীর কোনো চিহ্ন রেখে যেতে পারে না। ডাঃ গুপ্ত বলবেন, অসম্ভব। কিন্তু মিসেস গুপ্ত যাঁকে প্রায়ই দেখেন তিনিও যে ঐরকম কোনো শরীরী আত্মা তা আমি বিশ্বাস করি। কেননা ঐ ধরনের শরীরী আত্মার আমি প্রত্যক্ষদর্শী।

একটু থেমে বললেন, শরীর ধারণ ছাড়াও এই আত্মার আবার অন্যরকম প্রক্রিয়াও আছে। জানেন কি যোগীরা তাঁদের অসাধারণ ক্ষমতায় নিজেদের দেহ থেকে আত্মাকে কিছুকালের জন্যে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে পারতেন? সেও এক অলৌকিক ব্যাপার বিজ্ঞান যার ব্যাখ্যা করতে পারেনি।

মিস থাম্পি রীণার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ঘুম পাচ্ছে?

রীণা তাড়াতাড়ি সোজা হয়ে বসে বলল, না। আপনার কথা শুনতে বেশ ভালোই লাগছে।

মিস থাম্পি হেসেই বললেন, ধন্যবাদ।

বেশ, তাহলে প্রথমে যোগীদের দেহ থেকে আত্মাকে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন করার একটা গল্প বলি। বলে সঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন।

সঞ্জয় চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে বললে, চালিয়ে যান।

–অনেক দিন আগের কথা। এক ইংরেজ দম্পতি ভারতে কার্যরত থাকাকালীন বায়ুপরিবর্তনের জন্যে সিমলা পাহাড়ে গিয়েছিলেন। ইংরেজ ভদ্রলোক ছিলেন বৃটিশ-ভারতের একজন উচ্চপদস্থ অফিসার। দেশ তার ইংলন্ডে।

সিমলায় আসবার আগেই মেমসাহেবের শরীর খারাপ হয়েছিল। অল্প অল্প জ্বর হতো। সেটা খুব খারাপ লক্ষণ। সিমলাতে চেঞ্জে এসেও শরীর ঠিকমতো সারল না।

এই সময়েই আবার এক দুঃসংবাদ এল, সাহেবের বাবা লন্ডনে মারা গেছেন। সেই খবর পেয়েই সাহেব চলে গেলেন। মেমসাহেব শরীর খারাপের জন্যে যেতে পারলেন না।

লন্ডনে পৌঁছে সাহেব নিয়মিত চিঠি দিয়ে স্ত্রীর খবর নিতেন। প্রতি চিঠিতেই আশ্বাস শীগগিরই যাচ্ছি।

মেমসাহেব পথ চেয়ে থাকেন। কিন্তু বেশ কিছুকাল হয়ে গেল–স্বামী আর ফেরেন না। চিঠিপত্রও পান না। তার মন খুব খারাপ।

একদিন ভোর রাত্রে মেমসাহেব ঘুমের মধ্যে কেঁদে উঠলেন। ঘরে তাঁর যে খাস-পরিচারিকা ছিল সে ইংরেজ রমণী। তাড়াতাড়ি মেমসাহেবের ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, কি হয়েছে?

মেমসাহেব পরিচারিকার সামনে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করে ফেলার জন্যে লজ্জিত হলেন। বললেন, স্বপ্ন দেখছিলাম সাহেব কঠিন রোগে মৃত্যুশয্যায়। তাই তিনি আসতে পারছেন না।

মেমসাহেব খাঁটি ইংরেজ মহিলা। তাই স্বপ্নকে স্বপ্ন বলেই মেনে নিলেন। গুরুত্ব দিলেন না।

কিন্তু গুরুত্ব না দিলেও তার মনটা অত্যন্ত ভার হয়ে রইল।

মেমসাহেবের অন্য যে দাসী, সে ছিল তিব্বতীয়। মনিবের মন খারাপ তারও দৃষ্টি এড়ায়নি। রোজই দেখে–আর ভাবে মেমসাহেবকে জিজ্ঞেস করবে কি হয়েছে। কিন্তু জিজ্ঞেস করতে সাহস পায় না। শেষে খাস পরিচারিকাকে জিজ্ঞেস করে কারণটা জানতে পারল। তখন সে সসংকোচে তাকে বলল, মেমসাহেব যদি চান তাহলে সাহেবের খবর আজকের মধ্যেই আনিয়ে দিতে পারি।

খাস-পরিচারিকা অবাক হয়ে বলল, কি করে?

 তিব্বতী দাসী তখন তাকে তার উপায়ের কথা জানাল।

ইংরেজ দাসী তা পুরোপুরি বিশ্বাস না করলেও এ দেশের অনেক ভোজবাজির কথা ছোটোবেলা থেকে শুনেছে। তাই তিব্বতীর কথা একেবারে উড়িয়ে না দিয়ে মেমসাহেবকে বলল। মেমসাহেব তখনই তিব্বতী দাসীকে ডেকে পাঠালেন। দাসী এলে তাকে বললেন, তুমি যে লোকটির কথা বলছ সে কি করে? কোথায় থাকে?

দাসী বিনীতভাবে জানালো যে, যাঁর কথা সে বলছে তিনি একসময়ে লামা সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন। কি কারণে যেন তিনি সেই পদ ছেড়ে দিয়ে এখন লোকচক্ষুর অন্তরালে একটা পাহাড়ের নিচে আত্মগোপন করে থাকেন।

মেমসাহেব সকৌতূহলে জিজ্ঞেস করলেন, আত্মগোপন করে কেন?

 দাসী বললে, তিনি এক বিশেষ সাধনায় সিদ্ধ বলে ঈর্ষাকাতর অন্য দল তাকে মেরে ফেলতে চায়।

শুনে মেমসাহেব স্তম্ভিত হয়ে গেলেন।

—সত্যিই তিনি এত গুণী লোক?

— মেমসাহেব, আমি নিজে চোখে তার সেই গুণ দেখেছি।

–কিন্তু তুমি যা বলছ তাতে তো মনে হচ্ছে তাকে খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। আর–পেলেও হয়তো আসতে চাইবেন না।

দাসী অন্যমনস্কভাবে বলল, আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি। যদি পাওয়া যায় তাহলে আজই উনি সাহেবের খবর এনে দেবেন।

মেমসাহেব জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় কত দূরে–কোন পাহাড়ের নিচে উনি থাকেন?

দাসী বলল, এখান থেকে ক্রোশ তিন দূরে–ঐ যে ধোঁওয়ার মতো তিনচূড়ো পাহাড়টা দেখা যাচ্ছে ওরই কাছে উনি থাকেন।

মেমসাহেব বললেন, উনি যদি তোমার কথায় আসতে না চান–আমি কি গিয়ে request করব?

দাসী বলল, তার দরকার হবে না। তাছাড়া পথ দুর্গম। গাড়ি চলবে না। আপনার পক্ষে হেঁটে যাওয়াও সম্ভব নয়।

মেমসাহেব চুপ করে রইলেন। দাসী বলল, আর তার কাছে যেতে হলে যেতে হবে গোপনে। কেননা তার শত্রুরা তাঁকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।

শুনে মেমসাহেব হতাশ হয়ে পড়লেন। তখন দাসী বলল, আপনি অনুমতি করলে আমি নিজে গিয়ে একবার চেষ্টা করতে পারি।

মেমসাহেব সানন্দে অনুমতি দিলেন।

পরের দিন ভোরবেলায় তিব্বতীয় দাসীটি লামার খোঁজে বেরিয়ে গেল। আর সন্ধেবেলা ফিরল লামাকে নিয়ে।

লামা এসেছে শুনে মেমসাহেব খুশি মনে দোতলা থেকে নেমে এলেন। কিন্তু লামার চেহারা দেখে তার ভক্তি হল না। যেমন আমাকে দেখে আপনাদের হয়েছে। বলে মিস থাম্পি একটু হাসলেন।

–যাক, যে কথা বলছিলাম। মেমসাহেব দেখলেন লোকটি বৃদ্ধ। মাথায় দীর্ঘ পাকা চুল, পাতলা পাকা গোঁফ দাড়ি। হাত, পা শীর্ণ। দেহ তো নয়, যেন একখানা কংকাল। দুই চোখ কোটরাগত। চোখের নিচে কালি পড়েছে। তার সারা মুখের চামড়া কুঁচকানো। গলায় নীল পাথরের একটা মালা। অমন গাঢ় নীল পাথর মেমসাহেব কখনো দেখেননি।

লোকটি এমন ক্ষীণ স্বরে জড়িয়ে জড়িয়ে কথা বলছিল যে মেমসাহেব তার একবর্ণও বুঝতে পারছিলেন না। যাই হোক সেই তিব্বতী দাসীর সাহায্যে কথাবার্তাটা এইরকম হল

মেমসাহেব বললেন, শুনেছি আপনার নাকি এমন ক্ষমতা আছে যে আপনি এখানে বসেই বহুদুরের খবর এনে দিতে পারেন। তাই যদি হয় তাহলে আপনি দয়া করে আমার স্বামীর খবর জানান। তিনি এখন লন্ডনে আছেন। বেশ কিছু দিন খবর পাচ্ছি না। স্বপ্নে দেখলাম তিনি নাকি শয্যাশায়ী। আমি খুবই দুশ্চিন্তায় আছি।

লামা পথশ্রমে ক্লান্ত বলে সেদিনটা বিশ্রাম করে পরের দিন খবর এনে দেবার প্রতিশ্রুতি দিলেন।

কিন্তু মেমসাহেব আর এক দণ্ডও অপেক্ষা করতে চাইলেন না। অগত্যা বৃদ্ধ লামাকে সম্মত হতে হল। তখন শ্রাবণ মাসের বেলা প্রায় শেষ। লামা প্রথমে আনুষঙ্গিক কতকগুলি কাজ শেষ করে নিয়ে সাহেবের ঠিকানা জেনে নিলেন। আর তার একটা ছবি দেখে নিলেন। তারপর খালি গায়ে মাটিতে শুয়ে পড়ে বললেন, আমি আপনার স্বামীর খবর আনতে চললাম। আমার দেহ এখানে পড়ে রইল। যদি বাধা-বিঘ্ন না ঘটে তাহলে এক ঘণ্টার মধ্যেই ফিরে আসব। তবে একটা অনুরোধ–আমার জীবন-মরণের সব দায়িত্ব আপনাকে নিতে হবে।

মেমসাহেব চমকে উঠলেন।-কেমন করে?

 লামা বললেন, আমার দেহ যেন কেউ স্পর্শ না করে, এইটুকু দেখবেন।

–নিশ্চয় দেখব। মেমসাহেব প্রতিশ্রুতি দিলেন।

–আরও একটি কথা–আমি যখন এখানে আসছিলাম, বুঝতে পারছিলাম আমার শত্রুরা আমায় অনুসরণ করছে। তারা হয়তো একটু পরেই এখানে এসে হানা দেবে। আমার দেহটা কেড়ে নিয়ে যেতে চাইবে। আপনি দয়া করে বাধা দেবেন। কথা দিন–পারবেন তো?

মেমসাহেব ইংরেজরমণী। অসুস্থ হলেও তাঁর মনের জোর ছিল অসাধারণ। সব দিক ভেবে নিয়ে বললেন, ঠিক আছে। দায়িত্ব নিলাম। আপনি নিরুদ্বেগে গিয়ে আমার স্বামীর খবর নিয়ে আসুন।

এই অঙ্গীকার পেয়ে লামা যোগনিদ্রায় সমাহিত হলেন। সকলেই দেখলেন লামার অসাড় দেহটা মাটিতে পড়ে আছে যেন বহুকালের পুরনো শুকনো একটা মৃতদেহ।

এই সময়ে তিব্বতী দাসীর খেয়াল হল নিচের দরজাটা বোধহয় ভোলাই থেকে গিয়েছে। সে নিজেই দেখতে যাবে ভাবছিল কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক লামার দেহ ছেড়ে নিচে যেতে মন চাইল না। তখন সে দরজা বন্ধ করার কথা ইংরেজ পরিচারিকাটিকে নিচু গলায় বলল।

ইংরেজ পরিচারিকা যাচ্ছি বলেও সকৌতূহলে লামার নিঃসাড় দেহের দিকে তাকিয়ে রইল। যাবার কথা ভুলে গেল।

আধঘণ্টাও হয়েছে কি না সন্দেহ হঠাৎ নিচে একটা গোলমাল শোনা গেল। কারা যেন দারোয়ান-বেয়ারা-বাবুর্চিদের ঠেলে জোর করে ওপরে উঠে আসতে চাইছে।

মেমসাহেব বিচলিত হলেন। কিসের এত গোলমাল? তিনি ইংরেজ দাসীকে ব্যাপারটা কি জেনে আসবার জন্যে পাঠালেন। ইংরেজ দাসী ব্ৰস্তপদে নিচে নেমে গেল। কিন্তু পাঁচ মিনিট যেতে-না-যেতেই ছুটতে ছুটতে এসে জানালো একদল জংলী জোর করে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়েছে। তারা লামাকে চায়।

-কেন? মেমসাহেবের ভুরুতে ক্রোধের প্রকাশ ফুটে উঠল।

 ইংরেজ দাসী উত্তর দেবার আগেই মেমসাহেব দেখলেন কয়েকজন তিব্বতী জংলী দোতলায় উঠে হৈ হৈ করে ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে।

মেমসাহেব রাগে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠলেন–Who are you? What makes you to come here?

তারা মেমসাহেবের কথা বুঝল না। বুঝতে চাইলও না। তাদের সকলের দৃষ্টি তখন লামার দেহের ওপর। বাড়িতে তেমন লোকজন নেই যে সেই উন্মত্ত লোকগুলোকে বাধা দেয়। জংলী লোকগুলো বোধহয় তা বুঝতে পেরেছিল। তাই তারা নির্ভয়ে ঘরের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।

ইংরেজ দাসী তখন ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। সে পুলিশ ডাকার জন্যে জানলার দিকে ছুটে যাচ্ছিল, মেমসাহেব তাকে আটকালেন। কঠিন স্বরে বললেন, চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকো।

তারপর এক মিনিটের মধ্যে ছুটে গিয়ে ড্রয়ার থেকে গুলিভরা রিভলভারটা এনে দুবার ফায়ার করলেন। সঙ্গে সঙ্গে লোকগুলো যে যেদিকে পারল পালালো।

-যাও! দরজা লাগিয়ে এসো। বলে মেমসাহেব ইজিচেয়ারে বসে হাঁপাতে লাগলেন। তার শরীর একেই দুর্বল, তার ওপর এই উত্তেজনা। রিভলভারটা কিন্তু তখনো তার হাতের মুঠোয়।

তিব্বতী দাসী তখনও লামার দেহের ওপর–তাকে স্পর্শ না করে দুহাত দিয়ে আগলে বসে ছিল।

এবার সে উঠে নিজের জায়গায় গিয়ে বসল।

আরো আধঘণ্টা পরে লামার দেহটা একটু নড়ল। তারপর ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালেন।

মেমসাহেব আনন্দে লামার ওপরে ঝুঁকে পড়লেন। লামা ইশারায় একটু জল খেতে চাইলেন। মেমসাহেব তিব্বতী দাসীকে জল দিতে বললেন।

জল খেয়ে সেই লামা যোগী আস্তে আস্তে উঠে বসলেন। তারপর তার সেই ক্ষীণ স্বরে বললেন, আপনার স্বামী ভালোই আছেন। দেখলাম জিনিসপত্র গোছগাছ করছেন। বোধহয় আজ-কালের মধ্যেই এখানে আসার জন্যে রওনা হবেন।

শুনে মেমসাহেব আনন্দে কিছুক্ষণ চোখ বুজিয়ে রইলেন।

তারপর লামা ধীরে ধীরে তাঁর ঘরের বর্ণনা দিলেন। শুনতে শুনতে মেমসাহেব তো অবাক। শেষে লামা বললেন, তবে আপনার বাড়ির দক্ষিণদিকে যে সুন্দর বাগানটা ছিল সেটা সম্প্রতি ঝড়ে তছনছ হয়ে গেছে।

বাগানটাও যোগীর চোখে পড়েছে তা হলে! মেমসাহেব মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।

লামা সেই রাত্তিরেই চলে যেতে চাইলেন। কিন্তু মেমসাহেব যেতে দিলেন না। পরের দিন অতি প্রত্যূষে যাবার সময়ে লামা মেমসাহেবের দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। মেমসাহেবও চোখ নামাতে পারেননি।

মিনিট দুয়েক পরে লামা বললেন, আপনি এখন রোগমুক্ত। বলে দরজার দিকে পা বাড়ালেন। মেমসাহেব তাঁকে পুরস্কৃত করতে চাইলেন। কিন্তু তিনি কিছুই নিলেন না।

মেমসাহেব নিজের মনেই শুধু বললেন- am grateful to you Indian yogi–I am grateful.

পরের দিনই সাহেবের চিঠি এল। লিখছেন–একটা মিথ্যে মামলায় জড়িয়ে পড়েছিলাম। যাই হোক ঈশ্বরের কৃপায় এখন আমি বিপন্মুক্ত। রওনা হচ্ছি।

পুনশ্চ দিয়ে লিখেছেন-খুব আশ্চর্য ব্যাপার হঠাৎ কাল আমার ঘরের সামনে একজন ইন্ডিয়ান যোগীকে দেখলাম। তারপরেই অদৃশ্য। সম্ভবত আমার চোখেরই ভুল।

মিস থাম্পি তার কথা শেষ করে একটু থামলেন। তার পর জল খেয়ে রুমালে মুখ মুছলেন।

–এ কাহিনী আপনাদের শোনাবার উদ্দেশ্য এটাই বোঝানো যে, এও এক ধরনের অলৌকিক ক্রিয়া। কিন্তু এটা ম্যাজিক বা যাদু নয়। এ যোগসাধনা। এই যোগের দ্বারাই আপনি এই মুহূর্তে কী ভাবছেন তা বলে দেওয়া যায়। এই যোগের দ্বারাই আগামী চাব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আপনার জীবনে উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা ঘটবে কি না জানানো যায়। কঠিন ব্যাধির কারণ ও উৎপত্তিস্থল ধরা যায়।

এই যোগ যাঁর আয়ত্ত তিনি তেমন-তেমন বাড়িতে ঢুকেই বলতে পারেন সেখানে কোনো অশরীরী আত্মার আবির্ভাব ঘটে কিনা। বিজ্ঞানে কিন্তু এর ব্যাখ্যা মেলে না।

অশরীরী আত্মার টের পাওয়া যায়–মিস থাম্পির এই কথায় সকলেই যেন একটু বিচলিত হল।

একটু থেমে মিস থাম্পি বললেন, এরকম অনেক তথ্য রবার্ট ডাল আওয়েল-এর Foot falls on the Boundary of Another World বইটিতে পাওয়া যায়। পুরনো কোনো বড়ো লাইব্রেরিতে খোঁজ করে দেখতে পারেন–of course should you be so interested.

মিস থাম্পি থামলেন। ঘড়ির দিকে তাকালেন। সাড়ে বারোটা।

গল্পে গল্পে অনেক রাত হয়ে গেছে। মিস থাম্পি বললেন, তাহলে এবার শুতে যাওয়া যাক?

মান্তু বলল, কিন্তু আপনি ভুটানে কেন যাচ্ছেন বললেন না তো?

–শুনতে চান?

 –নিশ্চয়ই। মান্তু আর রীণা দুজনেই উৎসাহে বলে উঠল।

 –আপনি? মিস থাম্পি সহাস্যে সঞ্জয়ের দিকে তাকালেন।

 সঞ্জয় সলজ্জভাবে বলল, আমার বড় ঘুম পাচ্ছে। কাল সকালেই তো আবার ছুটতে হবে।

রীণা বলল, তুমি তবে ওঘরে গিয়ে শোও গে।

 সঞ্জয় অবশ্য গেল না। আপাদমস্তক চাদর মুড়ি দিয়ে চোখ বুজে বসে রইল।

 মিস থাম্পি বললেন, বিস্তৃত করে বলতে গেলে রাত শেষ হয়ে যাবে। সংক্ষেপে বলি।ভুটানে যাচ্ছি সেখানকার একটি মেয়েকে স্টাডি করতে। ডাঃ কুমার আমার খুব পরিচিত। তিনি সম্প্রতি সাদার্ন ভুটানের ডিস্ট্রিক্ট টাউন সারভং-এ গিয়েছেন সেখানকার হাসপাতালের এম. ও. হয়ে। ওখান থেকে তিনি আমায় কয়েকখানা চিঠি লিখেছেন।

ডাঃ কুমার ওখানে কোয়ার্টারে একা থাকেন। রাঁধা-বাড়া করার জন্যে উনি একটি লোক খুঁজছিলেন। অনেক কষ্টে একটি মেয়ে পান। মেয়েটির নাম সুখমতী। বয়েস উনিশ-কুড়ি। মেয়েটি কথা বলে না। কিন্তু সে বোবা নয়। কেননা সে শুনতে পায়। মেয়েটির কোনো অভিব্যক্তি নেই। শুধু যন্ত্রের মতো কাজ করে যায়। সে সারাদিন কোয়ার্টারে থাকে। কিন্তু ঠিক রাত নটা বাজলেই সে বাড়ি চলে যায়। ব্যতিক্রম হয় না।

ডাঃ কুমার হুঁশিয়ার লোক। তিনি যখনই কোনো কাজের লোক লাগান তখনই তার ঠিকানা নিয়ে রাখেন। সুখমতীরও ঠিকানা নিয়েছিলেন।

এদিকে সুখমতী কাজে লাগার দু দিন আগে পাহাড়তলীতে একটা জিপ অ্যাকসিডেন্ট হয়। সেটাও নাকি অদ্ভুত ঘটনা। যাই হোক, জিপে যে-সব লোক ছিল তারা সবাই ঘেঁৎলে মরে যায়। ওদের মধ্যে একটি যুবতী মেয়ে ছিল। তার লাশ কিন্তু পাওয়া যায়নি। অথচ সেই নিদারুণ অ্যাকসিডেন্ট থেকে কেউ যে বেঁচে পালাবে তাও নাকি অসম্ভব।

যাই হোক, সেদিনের মতো লাশ তিনটে হাসপাতালের ল্যাবরেটরি-ঘরের কাছে রাখা হয়।

একদিন হাসপাতালের দারোয়ান দীন বাহাদুর ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ডাঃ কুমারকে বলল, সাব, বক্সী!

–ওদেশে ভূতকে বক্সী বলে।

ডাঃ কুমার অবাক হয়ে বললেন, বক্সী! কোথায়?

দীন বাহাদুর বলল, ল্যাবরেটরির পাশে যে ঘরে লাশ ছিল সেখানে।

তার বক্তব্য–রাত্রে পাহারা দিতে দিতে ও একটা শব্দ শুনে লাশ-ঘরের দিকে যায়। সেখানে একটা গোঙানি শুনতে পায়। কৌতূহলী হয়ে জানলার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে যেখানে তিনটে লাশ ছিল সেখানে একটা মেয়ে শোবার জায়গা করে নিতে চাইছে। কিন্তু যেন কিছুতেই জায়গা পাচ্ছে না। মেয়েটার গায়ে জামা-কাপড় কিছুই ছিল না।

তারপর যে কথাটা দীন বাহাদুর নাকি এতটুকু ইতস্তত না করেই বলে ফেললে তা এই যে–সে মেয়েটি সুখমতী ছাড়া আর কেউ নয়।

ডাক্তার কুমার তো চমকে উঠলেন। তিনি অবিশ্বাস করলেন। দীন বাহাদুর হলপ করে বলল, সে খুব ভালো করে নজর করে দেখেছে সে সুখমতীই।

ডাক্তার কুমার তবু যখন বিশ্বাস করতে চাইলেন না তখন দীন বাহাদুর বলল, ঠিক আছে আজই দেখা যাক, সুখমতী রাত্তিরে কি করে।

সেদিনও সুখমতী ঠিক রাত নটায় কাজ সেরে চলে গেল। দীন বাহাদুর তখন ডাক্তার কুমারের কোয়ার্টারে। সুখমতী যখন চলে যাচ্ছে দীন বাহাদুর তখন ফি ফিস্ করে বলল, সাব, দেখুন ওর হাঁটাটা কি রকম।

ডাঃ কুমার এতদিন লক্ষ্য করেননি। আজ দেখলেন–হ্যাঁ, হাঁটাটা একটু অস্বাভাবিক। কেমন যেন লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছে। আর সেই সঙ্গে তার লম্বা হাত দুটো যেন বড্ড বেশি দুলছিল।

রাত দুটোয় ডাক্তারকে নিয়ে দীন বাহাদুর সুখমতীর ঠিকানা খোঁজ করতে বেরোল। বেরোবার আগে একটুকরো ন্যাকড়া ডাক্তারের হাতে দিয়ে বলল, এটা সঙ্গে রাখুন সাব। অনিষ্ট করতে পারবে না।

অনেক খোঁজাখুঁজির পর যে ঠিকানাটা ওরা খুঁজে পেল সেটা একটা ভাঙা ঘর, একেবারে লোকালয়ের বাইরে।

সুখমতী–সুখমতী করে ডাক্তার ডাকাডাকি করলেন। কিন্তু কারো সাড়া পেলেন না। তখন দুজনে দুটো টর্চ জ্বেলে ভেতরে ঢুকলেন। কেউ কোত্থাও নেই। শুধু সুখমতীর ছাড়া কাপড়টা পড়ে আছে।….

এই পর্যন্ত বলে মিস থাম্পি থামলেন।

–খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার। এ বিষয়ে আপনার কি মনে হয়? মান্তু জিজ্ঞেস করল।

–আগে ভুটানে গিয়ে সুখমতাঁকে দেখি। নিজে না দেখে, না কথা বলে আমি কোনো কমেন্ট করব না। তবে আমার শুধু একটাই জানার আছে–সুখমতী কেন চাকরি নিল? কেন ডাক্তার কুমারের কাছেই? কিন্তু আর নয়। এবার সবাই শুয়ে পড়ুন।

.

শীতের রাত। গোটা শহর যেন কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছে। সামনে যশোর রোড যেন দেহ প্রসারিত করে একটু বিশ্রাম নিচ্ছে। ওদিকে সঞ্জয় বসে বসেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছে। মাথাটা হেলে পড়েছে চেয়ারে। শুধু এরা তিন জনই জেগেছিল এতক্ষণ।

এই সময়ে হঠাৎ পুপু কেঁদে উঠল। সেই মর্মান্তিক যন্ত্রণায় কেঁদে ওঠা। রীণা চমকে উঠে ছুটে গিয়ে পুপুকে বুকে তুলে নিল। ঘুম ভেঙে গেল সঞ্জয়ের। লাফিয়ে ছুটে গেল পুপুর বিছানায়। এ কান্না যে তাদের চেনা।

মান্তু কি হল? কি হল? বলে রীণার কাছে গিয়ে বসল। শুধু মিস থাম্পি স্থির হয়ে বসে পুপুর দিকে তাকিয়ে রইলেন।

কান্না থামে না। দেখতে দেখতে পুপুর সমস্ত মুখটা যেন কি রকম হয়ে গেল। রীণা আর্তস্বরে বলে উঠল কী হবে? কান্না থামছে না যে?

রীণা জানে, এ কান্না থামাবার সাধ্য ডাক্তারের নেই।

মিস থাম্পি উঠে দাঁড়ালেন। একবার ভুরু কুঁচকে খোলা দরজা দিয়ে সিঁড়ির দিকে তাকালেন। তারপর গায়ের চাদরটা ফেলে দিয়ে পুপুর কাছে এগিয়ে গেলেন। পুপু তখন কাঁদতে কাঁদতে ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছে। রীণা পাগলের মতো মিস থাম্পির হাত দুটো চেপে ধরে কেঁদে উঠল। কী হবে? এমন করে তো ও কখনো কাঁদে না।

সেই অশরীরীর আবির্ভাব হলেই যে পুপু কেঁদে ওঠে, মিস থাম্পি আগে তা শুনেছিলেন। তিনি একদৃষ্টে কিছুক্ষণ পুপুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার পর আস্তে আস্তে একবার তার গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন। রীণাকে বললেন, তুমি এবার ওকে বুকে তুলে নাও।

–ও ঘুমোত পারবে না। দেখছেন না–

–আমি বলছি, ঘুমোবে। তুমি বুকে নাও। আদেশের সুরে বললেন মিস থাম্পি।

রীণা পুপুকে বুকের কাছে টেনে নিতেই পুপুর কান্না আস্তে আস্তে থেমে গেল। তারপর পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ল।

এবার মিস থাম্পি উঠে দাঁড়ালেন। স্থির গম্ভীর স্বরে বললেন, সে বোধহয় এসেছে। আপনারা তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ুন।

সঞ্জয়ও কেমন যেন চঞ্চল হয়ে উঠল। কিন্তু সে যে আজ কোথায় শোবে ভেবে পেল না।

মিস থাম্পি বললেন, শোবার ব্যবস্থা আমিই করে দিচ্ছি।

-বাইরের ঘরে এই ডিভানে মিসেস গুপ্ত যেমন বাচ্চাকে নিয়ে শুয়েছেন শোন। আপনি শোন মেঝেতে এইখানে। বলে মান্তুকেও জায়গা নির্দেশ করে দিলেন।

–ডাঃ গুপ্ত, আপনি প্লিজ চলে যান ভেতরের ঘরে। নিশ্চিন্তে ঘুমোন গিয়ে।

–আপনি?

মিস থাম্পি একটু হাসলেন।–আমি শোব না। বসে থাকব সিঁড়ির মুখে। আজকের রাতের মতো আমার কথা অনুগ্রহ করে শুনবেন। বলে নিজেই একটা চেয়ার টেনে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

অনেকক্ষণ পর্যন্ত কেউই ঘুমোত পারল না। কিসের যেন দুঃসহ প্রতীক্ষা। তারপর একসময়ে সকলেই ঘুমিয়ে পড়ল।

.

সবার আগে ঘুম ভাঙল মান্তুর। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রীণার। দুজনেই একবার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। রাত্তিরটা তাহলে নিরাপদেই কেটেছে।

সঞ্জয় তখনো ঘুমোচ্ছ। কিন্তু মিস থাম্পি? তিনি কি এখনও বাইরে বসে আছেন?

তাড়াতাড়ি এরা দুজনে বাইরে বেরিয়ে এল। দেখল মিস থাম্পি নেই। শূন্য চেয়ারটা শুধু পড়ে রয়েছে।

দুজনের মুখ শুকিয়ে গেল।

–উনি কোথায় গেলেন? মান্তুর গলার স্বর ভয়ে কাঁপছে।

–তাই তো। বলেই রীণা সঞ্জয়কে ঘুম থেকে তুলে সব কথা বলল। সঞ্জয় ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে এল।

তখনো ভোর হয়নি। শীতের কুয়াশায় চারিদিক পর্দাটাকা। বাড়ির অন্যান্য ভাড়াটেরা তখনো সুখনিদ্রায় নিশ্চিন্ত।

সঞ্জয় কি করবে ভাবছে। এমনি সময়ে সিঁড়িতে হালকা চটির শব্দ। মিস থাম্পি ওপরে উঠে আসছেন।

বাবাঃ! এই কুয়াশায় কোথায় গিয়েছিলেন?

 মিস থাম্পি হেসে বললেন, প্রাতঃভ্রমণে। কম্পাউন্ডের মধ্যেই ঘুরছিলাম। বেশ পুরনো আমলের বাড়ি। ফোয়ারার সামনে যে স্ট্যাচুটা–সেটা কোনো অবস্থাপন্নরই কীর্তি। তাঁর রুচিটা পবিত্র ছিল না। চলুন ভেতরে গিয়ে বসি। একটু গরম কফি খাব।

কফি খেতে খেতে সকলেই উদগ্রীব হয়ে মিস থাম্পির দিকে তাকিয়ে রইল কিছু শোনার অপেক্ষায়। কিন্তু মিস থাম্পি একটি কথাও বললেন না।

কফি খাওয়া শেষ হলে মাকে বললেন, এবার আমাদের যেতে হবে।

সঞ্জয় আর থাকতে পারল না। বলল, কিন্তু কাল রাত্তিরের experience তো কিছু বলছেন না।

বললে কি আপনি বিশ্বাস করবেন?

মিস থাম্পি একটু হাসবার চেষ্টা করলেন।

–শুনতে দোষ কি?

–তবে শুনুন। একটা প্রতিহিংসাপরায়ণ হিংস্র আত্মা এ বাড়িতে আছেই। সে ক্ষতি না করে যাবে না। এর চেয়ে বেশি কিছু জানতে চাইবেন না। প্রমাণ দিতে পারব না।

–তাহলে, আপনি বলছেন রীণা যা দেখে তা ঠিক?

–হ্যাঁ। অবশ্যই।

—প্রকিার?

–আমার মনে হয় বাড়িটা ছেড়ে দেওয়াই ভালো।

 সঞ্জয় মাথা নেড়ে বলল, কিন্তু সে কি করে সম্ভব? আমি নিজে ডাক্তার। বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়া অশরীরী আত্মার অস্তিত্ব মানতে পারি না।

মিস থাম্পি তার বিশেষ হাসিটি একটু হাসলেন। কিছু বললেন না।

আধ ঘণ্টার মধ্যেই মান্তু আর মিস থাম্পি প্রস্তুত হয়ে নিল। যাবার সময়ে মিস থাম্পি বললেন, ডাঃ গুপ্ত, আপনার সংস্কারমুক্ত মন আর সাহসের প্রশংসা করি। কিন্তু আমার একটা কথা মনে রাখবেন–যদি দেখেন আপনার ছেলেটি ক্রমশই অসুস্থ হয়ে পড়ছে তা হলে তদ্দণ্ডেই বাড়ি ছেড়ে দেবেন। লে হাতে ব্যাগটা তুলে নিয়ে নিচে নামতে লাগলেন।

রীণা বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

.

১৪.

সঞ্জয়ের চ্যালেঞ্জ

কদিন হল মিস থাম্পি চলে গিয়েছেন। মান্তুর সঙ্গেও যোগাযোগ নেই। রীণার মনটা তাই একটু খারাপ ছিল। দুঃসময়ে নিজের লোক ছাড়াও প্রকৃত বন্ধুর সান্নিধ্য যে কত দরকার হয় মান্তুকে পেয়ে রীণা তা বুঝতে পেরেছে।

বেলা তখন চারটে। পুপুটা কদিন ধরে ঘ্যানঘ্যান করছে। শীতটাও বেশ জোরে পড়েছে। বিকেলবেলায় কখনো কখনো পুপুকে নিয়ে রীণা নিচে কম্পাউন্ডে নেমে আসে। কম্পাউন্ডে বেশি ভিড় থাকলে নিচে নামে না। সংকোচ হয়। তার যেন মনে হয় সবাই তাকে একরকমভাবে দেখছে। তাই নিজেকে মনে হয় যেন তাদের কাছে অতিপ্রাকৃত জগতের কেউ। তাই সে অনেক সময়ে পুপুকে নিয়ে তিনতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকে।

এদিনও দাঁড়িয়ে ছিল। মিনিট দশেক হল লোডশেডিং শুরু হয়েছে। এই এক অসহ্য ব্যাপার। রীণার কাছে আবার শুধুই অসহ্য ব্যাপার নয়, ভীতির কারণ।

নিচে ছেলেরা খেলা করছে, বৃদ্ধরা বেঞ্চিতে বসে নিশ্চিন্ত মনে সম্ভবত সাংসারিক বিষয় নিয়ে গল্প করছে। বন্দনার মা কোথায় বেরিয়েছিলেন, কিছু জিনিস কিনে রিকশা থেকে নামলেন।

আচ্ছা, মিস থাম্পি যে এসে এক রাত এখানে কাটিয়ে গেলেন বন্দনা বা বন্দনার মা কি তা জানেন?

জানলেও এঁদের সেরকম গায়ে-পড়া কৌতূহল নেই। এটা অবশ্য ভালোই।

বড়ো অদ্ভুত মহিলা মিস থাম্পি। প্রথম যেদিন রীণা ওঁকে দেখে সেদিন ভালো লাগেনি। কিন্তু এ বাড়িতে তাঁকে খুবই ভালো লাগল।

মিস থাম্পি এ বাড়ি সম্বন্ধে কি যেন বললেন? ছেড়ে দেওয়াটাই উচিত। একদিক দিয়ে সে খুশি। আর যাই হোক তার মানসিক রোগ হয়নি। এত দিন তাহলে যা দেখেছে, যা বলেছে সব সত্যি। সঞ্জয় কি এবার তা বুঝতে পেরেছে? তাহলে কি আর একদিনও এ বাড়িতে থাকা উচিত? মিস থাম্পির কথায়–evil spint আছে যে দুরাত্মা হিংস্রকুটিল। শাসিয়ে যায়।

রীণার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। ঠিক তখনই হঠাৎ পুপু কেঁদে উঠল আবার।

রীণা ভোলাতে লাগল, না না, কান্না কেন বাবুসোনা? ওই দ্যাখো ছেলেরা কেমন বল খেলছে। তুমিও বড়ো হয়ে বল খেলবে। তোমার বাপী তোমায় বল কিনে দেবে–সুন্দর লাল বল–

পুপুর কান্না তবু থামল না। দ্বিগুণ জোরে কাঁদতে লাগল।

রীণা মনে মনে সঞ্জয়ের জন্যে ব্যস্ত হচ্ছিল। সন্ধ্যের সময়ে লোডশেডিং হলে কিছুতেই একলা থাকতে ভালো লাগে না।

কিন্তু পুপু ডুকরে ডুকরে কাঁদছে কেন? বেঁকে বেঁকে যাচ্ছে। এ কান্নাটা যেন…।

রীণার বুক কাঁপতে শুরু করল। তাহলে কি এই সন্ধেবেলাতেই….

তখনই রীণার মনে হল ঘরের মধ্যে যেন কিসের চাপা শব্দ! তারপরই হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ায় ঘরের জানলাগুলো সশব্দে খুলে গেল।

ঘরের দিকে তাকাতেই রীণার মেরুদণ্ডের মধ্যে দিয়ে একটা হিমস্রোত বয়ে গেল। দেখল ঘরের মধ্যে একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলি মেঝে থেকে ক্রমাগত ওপরে উঠছে! মনে হচ্ছে নিচের তলায় যেন আগুন লেগেছে। মেঝে খুঁড়ে তারই ধোঁয়া সমস্ত ঘরটাকে গ্রাস করে ফেলছে। ধোঁয়াটা কিসের বুঝতে বুঝতেই ধোঁয়ার মধ্যে থেকে ফুটে বেরোল একটা মূর্তি। সে মূর্তি ওর চেনা। সেই কালো প্যান্ট, কোট আর টুপি। টুপিটা নেমে এসেছে আধখানা কপাল পর্যন্ত। তারপরেই মূর্তিটা দুরন্ত গতিতে ঘুরপাক খেতে লাগল।

রীণা ভয়ে কাঠ হয়ে সেই দিকে তাকিয়ে রইল।

ক্রমে মূর্তির চোখে মুখে একটা হিংস্রভাব ফুটে উঠল। রীণা স্পষ্ট বুঝতে পারল মূর্তিটা দাঁতে দাঁত চেপে কি যেন বলছে!

রীণার শুনতে ইচ্ছে করছিল না। তার এত ভয় করছিল যে সে থরথর করে কাঁপছিল। তবু ইচ্ছার বিরুদ্ধেই শোনার জন্যে কান পাততে হল। কেউ যেন হুকুম করছে–আমি যা বলি শোনো!

একটা চাপা হিসহিস্ শব্দের ভেতর দিয়ে ছেঁড়া ছেঁড়া কয়েকটা কথা বেরিয়ে এল–আগামী শনিবার…রাত দুটো…আমি আসব। তুমি যাবে…নইলে…বলেই মূর্তিটার মর্চে-ধরা লোহার শাবলের মতো দুখানা অদ্ভুত সরু সরু হাত এগিয়ে আসতে লাগল পুপুর দিকে!

পুপু তখন নেতিয়ে পড়েছে রীণার কাঁধে। মুখ দিয়ে লালা ঝরছে। কদবার শক্তিও বুঝি আর নেই।

পালাবার উপায় নেই। সামনেই মূর্তিটা দাঁড়িয়ে। রীণা ব্যালকনির ওপর ঝুঁকে পড়ল। দেখল নিচে ছেলেরা তখনো খেলা করছে, বয়স্করা গল্প করছে।

রীণা চিৎকার করে ডাকতে চাইল, কিন্তু গলা থেকে স্বর বেরোল না।

এদিকে অন্ধকার ঘরের মধ্যে থেকে সেই অদ্ভুত বিকৃত দুখানা হাত ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। হাতের চেটো দুটো অস্বাভাবিক হোট!

ঠিক সেই সময়ে একটা ট্যাক্সি এসে ঢুকল কম্পাউন্ডের মধ্যে। সঞ্জয় নামল ট্যাক্সি থেকে। ভাড়া চুকিয়ে ওপর দিকে তাকালো। লোডশেডিং। তিনতলাটা অস্পষ্ট। তবুও যা দেখতে পেল তাতেই সঞ্জয় চমকে উঠল। পুপুকে কোলে নিয়ে রীণা যেন ব্যালকনি থেকে ঝাঁপ দেবার চেষ্টা করছে! আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠল সঞ্জয়। রীণা! পড়ে যাবে–পড়ে যাবে

রীণা বুঝি মুহূর্তের জন্যে থমকে গেল। নিচে যারা ছিল সঞ্জয়ের চিৎকারে তারাও ওপর দিকে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গে সকলেই চেঁচিয়ে উঠল–গেল–গেল–গেল!

সঞ্জয় ছুটল সিঁড়ির দিকে। তিনতলায় উঠতে তিন মিনিটও লাগল না। সিঁড়ির মুখে এসে থমকে দাঁড়াল। ঘরের দরজা খোলা কেন? এমন তো কোনোদিন থাকে না।

কিন্তু সেদিকে মন দেবার সময় নেই। দৌড়ে গেল ব্যালকনির দিকে। জাপটে ধরল রীণাকে–এ কি করছিলে?

পুপুকে বুকের মধ্যে দু হাতে আঁকড়ে ধরে সেখানেই বসে পড়ল রীণা। কোনোরকমে বলল, এসেছ?

–হ্যাঁ, লোডশেডিং-এ ভয় পাবে বলে ট্যাক্সি নিয়ে চলে এলাম।

–সেটা কোথায় গেল?

 –কে? কার কথা বলছ?

রীণা আর কথা বলতে পারল না। তার অচৈতন্য দেহটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। চেঁচামেচি শুনে বন্দনার মাও উঠে এসেছিলেন। তিনি তাড়াতাড়ি পুপুকে কোলে তুলে নিলেন।

আর চাপাচাপি রইল না কিছুই। সঞ্জয়ের পিছু পিছু সকলেই ওপরে উঠে এসেছে। ঘরভর্তি লোক। অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে আছে রীণা। সঞ্জয় ওর জ্ঞান ফেরাবার চেষ্টা করছে। সকলের মুখেই চাপা প্রশ্ন–কি হল? সুইসাইড করতে যাচ্ছিলেন নাকি? কিন্তু খামোক আত্মহত্যা করতেই-বা যাবে কেন? দুটি মানুষের সংসার। অশান্তি তো কিছু নেই।

প্রায় পনেরো মিনিট পরে রীণা ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো। কিন্তু সে দৃষ্টি বড়ো স্তিমিত।

-কেমন আছ? সঞ্জয় ঝুঁকে পড়ল রীণার মুখের ওপরে। কি হয়েছিল?

ঘরসুদ্ধ সবাই রীণার দিকে তাকিয়ে।

রীণ কোনো উত্তর দিতে পারল না। কেমন একরকম শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

সঞ্জয় কিছুক্ষণ রীণাকে লক্ষ্য করল। তারপর পাল্স দেখতে লাগল। এক বার-দুবার-তিন বার। শেযে ঘড়ির কাটার সঙ্গে পা-বিট মেলাতে লাগল। ওর মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল।

একজন জিজ্ঞেস করলেন, কেমন দেখলেন?

–ভালো না। বলেই সঞ্জয় উঠে পড়ল।

 বন্দনার মা দূরে দাঁড়িয়ে পুপুকে ভোলাচ্ছিলেন। সঞ্জয় বলল, বৌদি, আপনি এখানে একটু থাকুন। আমি আপনার ঘর থেকে একটা ফোন করে আসি।

সঞ্জয়ের উদ্বেগ দেখে এবার ভিড় কমতে লাগল। সঞ্জয় নিচে নামতেই দেখল বন্দনা মুখ শুকনো করে দাঁড়িয়ে।

-কাকীমা?

–ভালো নয়। এখুনি আমায় একটা ফোন করতে হবে।

 ভাগ্য ভালো। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই লাইন পাওয়া গেল। শুধু লাইন নয়, ডাক্তার রুদ্রকেও।

সংক্ষেপে সব ব্যাপার জানিয়ে সঞ্জয় বলল, কাকাবাবু, আপনি এখুনি চলে আসুন। আমি একা ভরসা পাচ্ছি না।

.

আধ ঘণ্টার মধ্যেই ডাঃ রুদ্র এসে পড়লেন। রীণা তখনো মাটিতে চোখ বুজে পড়ে আছে।

ডাক্তার রুদ্র নাড়ী দেখলেন, প্রেসার চেক করলেন। চোখের পাতা ফাঁক করে টর্চ ফেললেন। তারপর সঞ্জয়কে জিজ্ঞেস করলেন ব্রান্ডি আছে?

সঞ্জয় মাথা নাড়ল।

–গরম দুধ?

 বন্দনার মা বললেন, আমি এনে দিচ্ছি। বলে তিনি পুপুকে নিয়ে দোতলায় চলে গেলেন।

ডাঃ রুদ্র ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালেন।

–তুমি বলছ রীণা এখান থেকে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছিল?

–হ্যাঁ। তখন লোডশেডিং–আবছা অন্ধকার, তবু আমি স্পষ্ট দেখেছি।

–কি দেখেছ?

–রীণা পুপুকে এক হাতে বুকে চেপে ধরে রেলিং-এর ওপর উঠছে।

 –তুমি ঠিক জান ঝাঁপ দিতেই যাচ্ছিল? ঝুঁকে কিছু দেখছিল না?

–হ্যাঁ, ঠিক জানি। শুধু আমি কেন নিচে যাঁরা বসেছিলেন তারা সবাই গেল গেল বলে চেঁচিয়ে উঠেছিল।

–তারপর?

তারপর আমি তাড়াতাড়ি ওপরে উঠে এলাম।

–ঘরে ঢুকলে?

 –হ্যাঁ।

দরজা বন্ধ ছিল না?

না। এটাই আশ্চর্য লাগল।

–কেন?

রীণা কখনো দরজা খুলে রাখে না।

–হুঁ, তারপর?

–আমি ছুটে ব্যালকনিতে গেলাম।

 –কি অবস্থায় দেখলে?

–ও তখন রেলিং ধরে কাঁপছিল। আমি ওকে ধরলাম।

 ডাঃ রুদ্র আরও কয়েক মিনিট ব্যালকনিতে রইলেন। তারপর বললেন, ঘরে এসো।

এরই মধ্যে বন্দনার মা গরম দুধ নিয়ে এসেছেন। সঞ্জয় বাটিটা হাতে করে রীণার কাছে গিয়ে বসল।

–দেখি, দুধটা খেয়ে নাও।

ডাঃ রুদ্র বললেন, উঠে বোসো।

রীণা মাথা নাড়ল।

 ডাঃ রুদ্র বললেন, ঠিক পারবে। উঠে বোসো।

 রীণা দুহাতে ভর দিয়ে কোনোরকমে উঠে বসল।

 ডাঃ রুদ্র বললেন, তুমি নিজে হাতে বাটিটা ধরো।

রীণার হাত কাঁপছিল তবু কোনোরকমে বাটিটা ধরল।

–খাও।

 বীণা বলল, খেতে ইচ্ছে করছে না।

–তবুও খেতে হবে।

 রীণা ধীরে ধীরে বাটিতে চুমুক দিল।

খাওয়া হলে বাটিটা মাটিতে রাখল।

 ডাক্তার রুদ্র বললেন, এবার উঠে দাঁড়াতে হবে।

 রীণা করুণ চোখে সঞ্জয়ের দিকে তাকাল।

একটু চেঁচিয়ে ডাঃ রুদ্র বললেন, ওঘরে গিয়ে বিছানার শুতে হবে তো।

রীণা বলল, পড়ে যাব।

পড়ে যাব সামান্য দুটি কথা। কিন্তু ঐ কথা দুটিতেই ডাঃ রুদ্রের দু চোখ ঝকঝক করে উঠল। যেন সঞ্জয়কে লক্ষ্য করেই নিচুগলায় বললেন–তাহলে দ্যাখো, পেশেন্ট পড়ে যেতে ভয় পায়। তারপর রীণাকে বললেন, না, পড়বে না। চেষ্টা করো। ওঠো বলছি।

–সঞ্জয়, help her বলে ডাঃ রুদ্র নিজেই রীণার পিছনে এসে দাঁড়ালেন। সঞ্জয়ের কাঁধে ভর দিয়ে রীণা গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল।

দশ মিনিট পর ডাক্তার রুদ্র সঞ্জয়কে একটা ইনজেকশান দিতে বললেন। ইনজেকশান ডাক্তার রুদ্রর কাছেই ছিল। সঞ্জয় ইনজেকশান দিল।

ডাঃ রুদ্র বললেন, এসো। বাইরের ঘরে ঘণ্টাখানেক বসা যাক। ও এখন ঘুমোক।

দুজনে বাইরের ঘরে এসে বসলেন।

–কি রকম বুঝলেন?

না, সিরিয়স কিছু নয়। হঠাৎ ভয় পেয়েছে। ইনজেকশান দেওয়া হল, ঠিক হয়ে যাবে।

সঞ্জয়ের মুখে তবু হাসি ফুটল না।

–কেন যে বার বার এমন হচ্ছে বুঝতে পারছি না।

–তোমার স্ত্রী তো আগে এমন ভয় পেত না?

 –কোনোদিন তো শুনিনি।

ডাক্তার রুদ্র চুপ করে রইলেন। একটু পরে বললেন, বাড়িটা না হয় ছেড়েই দাও।

সঞ্জয়ের ভুরুতে অসহিষ্ণুতার চিহ্ন ফুটে উঠল–আপনিও একথা বলছেন। শেষে ভূতের ভয়ে বাড়ি ছাড়ব!

ডাঃ রুদ্র একটু হাসলেন। বললেন, তোমার কথা আমি বুঝতে পারছি। ভূত না অলৌকিক কিছু, নাকি মানসিক ব্যাধি, এসব তর্কে আজ আর যেতে চাই না। এখানে থাকলে যদি ওঁর ক্ষতি হয় তাহলে এখান থেকে যাওয়াটাই যুক্তিসঙ্গত নয় কি?

কিন্তু সেদিন তো আপনিও বললেন, ও সাইকোপ্যাথিক পেশেন্ট?

 ডাঃ রুদ্র একটা চুরুট ধরালেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, এসব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত বলে কিছু নেই। আজ লক্ষণ শুনে যা মনে হবে, কাল রুগীকে দেখে অন্যরকম মনে হতে পারে।

সঞ্জয় অসহিষ্ণু ভাবে বলল, তাহলে কি মানতে হবে এ বাড়িতে আসার পরই কোনো একটি অশরীরী আত্মা কেবলমাত্র রীণার ক্ষতি করতে চাইছে। সে রীণাকে তার সঙ্গে যেতে বাধ্য করবে। But how is it possible and why? একটা অশরীরী আত্মা একটা জীবন্ত মানুষকে….

বাধা দিয়ে ডাঃ রুদ্র বললেন, না, জীবন্ত মানুষকে সে চায় না।

তার মানে ওকে মেরে ফেলবে?

–হয় তো তাই। তার সূচনাও তো আজ কিছুক্ষণ আগে দেখতে পেলে।

সঞ্জয় চুপ করে কি যেন ভাবতে লাগল।

ডাঃ রুদ্র বললেন, তুমি কি মনে কর রীণা আত্মহত্যাই করতে যাচ্ছিল?

না, কখনোই না।

ডাঃ রুদ্র একটু ভেবে বললেন, আমারও তাই মনে হয়। ওর মতো সুখী মেয়ে সুইসাইড করতে যাবে কেন?

সঞ্জয় বলল, তবে ফ্রাস্টেশানে ভুগতে ভুগতে নিজেকে অসহায় বলে মনে হলে মানুষ বাধ্য হয়ে আত্মহত্যা করে শাস্তি পেতে চায়।

ফ্রাস্টেশান বলছ কেন?

–ঐ যে ওর কথা আমরা কেউ বিশ্বাস করছি না। তাছাড়া পুপুকে নিয়ে রেলিং থেকে ঝুঁকে পড়াটা আত্মহত্যার চেষ্টাই বোঝায়।

ডাঃ রুদ্র মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপর অল্প হেসে বললেন, কিন্তু আমি প্রমাণ পেয়েছি ও আত্মহত্যা করতে যায়নি।

অবাক চোখে সঞ্জয় ডাক্তার রুদ্রর দিকে তাকালো।

–হুঁ, অকাট্য প্রমাণ পেয়েছি। মনে আছে, রীণাকে যখন উঠে দাঁড়াতে বলেছিলাম তখন ও ভয় পেয়ে বলেছিল পড়ে যাব। যে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে যাবার ভয় পায় সে কি দেড়ঘন্টা আগে স্বেচ্ছায় তিন তলা থেকে ঝাঁপ দেবার চেষ্টা করতে পারে?

সঞ্জয় থমথমে মুখে ডাঃ রুদ্রের দিকে তাকিয়েই রইল। কোনো উত্তর দিতে পারল না।

ডাঃ রুদ্র বলতে লাগলেন–এই থেকেই প্রমাণ হয় রীণা যা বলেছে তা সত্যি। ভয়ংকর কিছু দেখেছিল যার জন্যে বারান্দার শেষ প্রান্তে গিয়ে অমন সাংঘাতিকভাবে ঝুঁকে পড়ে তার হাত থেকে নিজেকে সরিয়ে নেবার এমন শেষ চেষ্টা করছিল।

সঞ্জয় একটু ভেবে বলল, আচ্ছা, রীণা কি হিস্টিরিয়ায় ভুগছে? হিস্টিরিয়ার রুগীকে লোকে ভূতে-পাওয়া বলে। এইসব রুগীদের শক্তি নাকি এতদূর হয় যে জলভর্তি ঘড়া দাঁতে করে তুলে উঠোনের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। কাজেই হিস্টিরিয়াগ্রস্ত হলে…

ডাঃ রুদ্র বাধা দিয়ে বললেন, তুমি বলতে চাইছ রীণা হিস্টিরিয়ার পেশেন্ট। আচ্ছা, তোমার স্ত্রী তো সারাদিন দরজা বন্ধ করেই থাকে, তাই না? তাহলে আজ হিস্টিরিয়ার প্রকোপ যখন তার বাড়ল, তখন বুঝি সে তোমার আসার জন্যে দরজা খুলে রেখে ঝাঁপ দিতে গেল?

সঞ্জয় চুপ করে রইল।

দরজাটা তা হলে খুলল কে?

সঞ্জয় তখনও নিরুত্তর।

 নিভে-যাওয়া চুরুটটা আবার দুটো কাঠি ধ্বংস করে ধরালেন ডাঃ রুদ্র। বললেন, উত্তরটা আমিই দিচ্ছি। দরজা খুলেছিল সে, যে একদিন রাত্রে ঐ টেবিলের কাছে ঘুরতে ঘুরতে কাচের গ্লাসটা ভেঙেছিল, যে কুলুঙ্গি থেকে শিবানন্দ ভট্টাচার্যের ছবিখানা চুরি করেছিল। সে-ই রীণাকে ওয়ার্নিং দিয়ে দরজা খুলে রেখে গেল।

একটু থেমে বললেন, অবশ্য তুমি জিজ্ঞেস করতে পার–অশরীরী আত্মাকেও কি দরজা খুলে যেতে-আসতে হয়? তাহলে অবশ্যই আমি চুপ করেই থাকব। কেননা তার উত্তর জ্ঞানের বাইরে।

সঞ্জয় মন দিয়ে সব শুনল। কোনো উত্তর দিল না।

কয়েক মিনিট দুজনেই চুপচাপ বসে রইলেন। পাশের ঘরে রীণা নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছ। বাইরের দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলেন বন্দনার মা ট্রেতে দুকাপ চা আর কিছু নোনতা বিস্কুট নিয়ে।

সঞ্জয় একটা কাপ এগিয়ে দিল ডাঃ রুদ্রর দিকে। নিজে নিল অন্যটা। বিস্কুটে কামড় দিয়ে সঞ্জয় বলল, কিন্তু শিবানন্দের ছবি চুরি করার উদ্দেশ্য?

আত্মাটির ক্রিয়াকলাপ দেখে মনে হচ্ছে তোমার এই প্রশ্নের উত্তর সোজা। তুমি বলেছিলে ছবির পিছনে ঠিকানা লেখা ছিল। স্পিরিট চায় না শিবানন্দর সঙ্গে তোমার যোগাযোগ হয়। তাই সে ছবিটা সরিয়ে ফেলেছে।

সঞ্জয় চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে বলল, তবে তো শিবানন্দর কাছে আমায় যেতেই হবে। অশরীরী আত্মাটি অনেক কিছুই জানেন, জানেন না যে, ছবি নিয়ে গেলেও ঠিকানাটি আমার মুখস্থ হয়ে আছে।

ডাঃ রুদ্র পেয়ালা নামিয়ে রেখে বললেন, তবে আর কি? একদিন চলে যাও ওঁর কাছে। তবে তার আগে কিন্তু বাড়িটা ছাড়বে।

–এত তাড়াতাড়ি বাড়ি পাব কোথায়?

–এখনি বাড়ি না পাও আমার ওখানে উঠবে। মোট কথা সামনের শনিবারের আগেই তোমরা এ বাড়ি ছাড়বে।

সঞ্জয় ছেলেমানুষের মতো জেদ ধরে বলল, শনিবার পর্যন্ত তো আমি থাকবই।

ডাঃ রুদ্রের মুখটা কঠিন হয়ে উঠল। তিনি বললেন, তুমি থাকতে চাও থাকো। আমি ওদের নিয়ে যাব।

সঞ্জয় বলল, না। তা হয় না কাকাবাবু। রীণা না থাকলে তিনি তো আসবেন। ঐ শনিবার আমি সারা দিন রীণাকে পাহারা দেব। দেখব কি করে ওর ক্ষতি করে?

–তাহলে যা ভালো বোঝ করো। এরপর আমার আর কিছু বলার নেই।

তিনি উঠে রীণাকে পরীক্ষা করতে গেলেন। মিনিট পাঁচেক পরে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।–ভালোই আছে। ওর যদি ঘুম ভাঙে তাহলে রাতের খাবার খাবে। ঘুম যেন ভাঙিও না।

বলে বেরোতে যাচ্ছেন এমনি সময়ে বন্দনার মা পুপুকে কোলে নিয়ে চিন্তিত মুখে ঢুকলেন।–পুপুর জ্বর হয়েছে দেখছি।

–জ্বর! সঞ্জয় চমকে উঠে পুপুর কপালে হাত দিল।বেশ জ্বর। বলে ডাঃ রুদ্রের দিকে তাকালো। ডাঃ রুদ্র পালস্ দেখলেন। কিছু বললেন না।

সঞ্জয় চিন্তিতভাবে তাকালো, কি করব?

ডাঃ রুদ্র হাসলেন, তুমি নিজে ডাক্তার। ছেলের একটু জ্বর হয়েছে। তাতেই ঘাবড়ে যাচ্ছ? বলে সঞ্জয়ের কাঁধে হাত রাখলেন।

–আজকের রাতটা দ্যাখো। কাল জ্বর না ছাড়লে ভাবা যাবে।

ডাঃ রুদ্র ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। সঞ্জয় বন্দনার মাকে বলল, আপনি একটু থাকুন। আমি এঁকে এগিয়ে দিয়ে আসছি।

বন্দনার মা বললেন, আমি থাকছি। আপনি একটু বন্দনাকেও পাঠিয়ে দেবেন।

ডাঃ রুদ্র গাড়িতে উঠে ইঞ্জিনের চাবি ঘোরালেন।কাল সকালেই তাহলে একটা খবর দেবে। কী এত ভাবছ?

–হ্যাঁ, নিশ্চয় খবর দেব। ভাবছিলাম–আপনিও বাড়ি ছাড়ার কথা বললেন, আর একজনও বলছিলেন।

–কে তিনি?

সঞ্জয় ইতস্তত করে বলল, আপনাকে বলা হয়নি গত সপ্তাহে মিস থাম্পি নামে একজন ম্যাড্রাসি মহিলা আমার এখানে এসেছিলেন রীণার এক বান্ধবীর সঙ্গে। রীণার কথা সব শুনলেন। তিনিও বলছিলেন–

ডাঃ রুদ্র গাড়ির চাবি বন্ধ করে বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, ব্যাঙ্গালোরের বিখ্যাত স্পিরিচুয়ালিস্ট মিস থাম্পি নাকি?

–হ্যাঁ। আপনি চেনেন?

ডাঃ রুদ্র চাবি ঘুরিয়ে ফের ইঞ্জিন চালু করে বললেন, ওঁর সঙ্গে দেখা হলে খুশি হতাম। নেক্সট ডে যখন আসব ওঁর কথা বলব। গুড নাইট।

১১. মিস থাম্পি

 সাতাশে নভেম্বর।

 মিস থাম্পি এসেছেন। রীণাও এসেছে। রীণাকে মান্তুই নিজে গিয়ে নিয়ে এসেছে। একদিন থাকবে।

আসল উদ্দেশ্য মিস থাম্পির মতো মানুষ যখন আসছেন তখন রীণাকে একবার দেখিয়ে নেওয়া। মিস থাম্পি তো সারাজীবন প্রেতচর্চাই করছেন। রীণাকে দেখলে, তার মুখ থেকে সব শুনলে হয়তো মিস থাম্পি বলতে পারবেন মানসিক ব্যাধি না অন্য কিছু। মান্তুর উদ্দেশ্যটা রীণাও জানতো না। এখানে এসেই শুধু এক পেয়ালা কফি খেয়ে বেরোবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন মিস থাম্পি। রীণার সঙ্গে আলাপ করার আগ্রহ দেখালেন না। মান্তু তবু এক নিশ্বাসে পরিচয়টুকু মাত্র দিতে পারল। তাও তিনি ভালো করে শুনলেন। বলে মনে হল না।

–চলুন মিস্টার চৌধুরী, আগে পার্ক স্ট্রীটের সিমেট্রিটা দেখে আসি।

 বলে তখনই ললিতবাবুকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।

পার্ক স্ট্রীটের সেই দেড়শো বছরেরও বেশি পুরনো কবরখানাটা মিস থাম্পি অনেকক্ষণ ঘুরে ঘুরে দেখলেন। বড়ো বড়ো গাছের ছায়ায় জায়গাটা বেশ ঠাণ্ডা। মিস থাম্পির খুব ভালো লাগল।

কয়েক জায়গায় কয়েকটা কবর পরীক্ষা করলেন। ব্যাগ থেকে একটা শিশি বের করে খানিকটা কবরের মাটি পুরে নিলেন। একটা পুরনো কবরের পাশে উপুড় হয়ে শুয়ে কান পেতে কী যেন শুনলেন। এমনি করে সারা সকাল কাটালেন।

মিস থাম্পি বেরিয়ে গেলে মান্তু দুপেয়ালা কফি নিয়ে রীণার কাছে এসে বসল।

কী রে! মুখ অমন ভার কেন? মন কেমন করছে বুঝি?

 রীণা ম্লান হাসল। বলল, মন বলে বোধহয় আর কিছু নেই। তাঁরে, আমায় কি রাত্তিরে থাকতেই হবে?

মান্তু হেসে বলল, বরকে ছেড়ে বুঝি একটা রাত্তিরও থাকতে ইচ্ছে করে না?

রীণার ফ্যাকাশে মুখে লালচে আভা ফুটে উঠল।–তা নয়। ঐ বাড়িতে একা থাকা–

দূর! তুই একটা পাগল! বলে মা রান্নাঘরের দিকে উঠে গেল।

রাত্তিরে সঞ্জয় বাড়িতে একা থাকবে এ দুর্ভাবনা তো রীণার ছিলই, তাছাড়া এখানেও তার ভালো লাগছে না। সে এসেছিল নিরিবিলিতে বন্ধুর সঙ্গে গল্প করতে। কিন্তু এদিনই একজন ভি. আই. পি. এসে হাজির। এই মহিলাটিকে রীণার মোটেই ভালো লাগছিল না। যেন কেমন ধারা! একে তো অবাঙালী, চালচলন আলাদা। কথাও কম বলেন। তাছাড়া কিসব প্রেতচর্চা করেন। নিজের ঘরেই নিত্য ভূতের আতঙ্ক তারপর এখানে এসেও

চিন্তায় বাধা পড়ল। একজন মহিলাকে নিয়ে মান্তু ঘরে ঢুকল। রীণার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল।

ভদ্রমহিলা মান্তুদের প্রতিবেশিনী। মিসেস লাহিড়ি। ছোটোখাটো হাসিখুশি মানুষটি। ফর্সা রঙ। গোল মুখ। কপালে বড়ো একটা টিপ।

মিসেস লাহিড়ি আলাপ করতে আসেননি। এসেছিলেন অন্য উদ্দেশ্যে। তাই রীণার সঙ্গে আলাপটা হল দায়সারা গোছের।

তারপরেই মান্তুকে বলল, তাহলে বিকেলে ওঁকে নিয়ে যাবেন।

 রীণা ভেবেছিল বুঝি তাকেই নিয়ে যাবার কথা বলছেন। না, তা নয়। নেমন্তন্নটা ঐ মাদ্রাজী মহিলাকে।

মান্তু বলল, হ্যাঁ, নিয়ে যাব। উনি ফিরে এলে বলব আপনি নেমন্তন্ন করতে এসেছিলেন।

.

বেলা দুটো নাগাদ মিস থাম্পিকে নিয়ে ললিতবাবু ফিরলেন। খাওয়া-দাওয়া সেরে মিস থাম্পি বসলেন লিখতে।

বিকেল সাড়ে তিনটের সময় এক কাপ কফি খেলেন। তখন মান্তু খুব বিনীতভাবে মিসেস লাহিড়ির কথা বলল।

আপনার কখন সুবিধে হবে?

মিস থাম্পি প্রথমে একটু অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। এর ওর বাড়ি যাবার ইচ্ছে তার ছিল না। শেষে মান্তুর বিশেষ অনুরোধে রাজি হলেন। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নিয়ে বললেন–

–সাড়ে চারটেয়।

ইতিমধ্যে মিস থাম্পির সঙ্গে রীণার অনেকবারই দেখা হল, কিন্তু তিনি কোন কথা বলেননি। কোনো আগ্রহই যেন নেই।

মিস থাম্পির এই ব্যবহারে মান্তু বেশ অস্বস্তিতেই পড়ল। ওঁর কাছে ধীরে সুস্থে বসে রীণা কথা বলবে এইজন্যেই তো রীণাকে আনা। কিন্তু সবই যেন ভেস্তে যাচ্ছে। যাই হোক ঠিক সাড়ে চারটের সময়ে মিস থাম্পিকে নিয়ে মান্তু মিসেস লাহিড়ির বাড়ি চলল। রীণা যেতে চায়নি। মান্তু জোর করেই নিয়ে গেল।

মান্তুদের দুখানা বাড়ির পরেই মিসেস লাহিড়ির বাড়ি। বাড়ির সামনে উঁচু বোয়াক। দুপাশে খুবই সাধারণ ফুলের বাগান।

মিস থাম্পি এখানে নতুন অতিথি, তবু তিনি লম্বা লম্বা পা ফেলে আগে আগে হাঁটছিলেন। যেন নিজের পরিচিত জায়গাতে যাচ্ছেন। নিজেই গেট খুলে খোশ মেজাজে বাগান দেখতে দেখতে ভেতরে ঢুকলেন।

রোয়াকে দাঁড়িয়েছিলেন কর্তা-গিন্নি অতিথিকে অভ্যর্থনা করার জন্যে। পাশে ওঁদের ছেলে, বছর তেরো বয়েস।

মিস থাম্পি বোয়াকে উঠে একটু দাঁড়িয়ে পড়লেন। কপালে যেন একটু ভাঁজ পড়ল। কিন্তু তা কয়েক মুহূর্তের জন্যে।

মিসেস লাহিড়িই অভ্যর্থনা করলেন, আসুন। ইনি আমার হাজব্যান্ড

 ভদ্রলোক নিজেই বাকি পরিচয়টুকু দিলেন।

নির্মল লাহিড়ি।

মিস থাম্পি গভীর আন্তরিকতায় হ্যান্ডসেক করলেন।

–আমার ছেলে দেবল। ক্লাস এইটে পড়ছে।

মিস থাম্পি হেসে তার চুলের ওপর একটু আদর করে দিলেন।

নির্মলবাবু সবাইকে নিয়ে ভেতরের ঘরে বসালেন। মিসেস লাহিড়ি অস্বস্তিতে পড়লেন কোন কথা দিয়ে কিভাবে আলাপ শুরু করবেন। বাংলায় বলতে পারলে সুবিধে হতো।

নির্মলবাবুই কথা শুরু করলেন। তার ইচ্ছে ছিল প্রেততত্ত্ব নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করেন। কিন্তু আমল পেলেন না। তিনি একবারই শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন, সত্যি কি আপনি অশরীরী কিছুতে বিশ্বাসী?

মিস থাম্পি একটু হেসেছিলেন। উত্তর দেননি। এতে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ভারি লজ্জিত হয়েছিলেন।

এরপর খাওয়া। কফি আর কেক। সঙ্গে পোটাটো চিপস। মিস থাম্পি বেশ তৃপ্তি করেই খেলেন। খেতে খেতেই মিস থাম্পি জিজ্ঞেস করলেন, লোডশেডিং হয় কিনা, হলে কি করেন? তারপর হঠাৎই মান্তুকে ইশারায় বললেন, ছেলেটিকে বাইরে পাঠিয়ে দিতে।

মান্তু হতভম্ব।

মিসেস লাহিড়িও প্রথমে ঠিক বুঝতে পারলেন না তার ছেলেকে ঘর থেকে চলে যেতে হবে কেন? ও তো চুপচাপ একপাশে বসে আছে। কোনোরকম অভদ্রতা করেনি। কিন্তু মিস থাম্পি আবার চোখের ইশারা করতেই দেবলকে উনি বাইরে পাঠিয়ে দিলেন। একটা অজানা আশঙ্কায় স্বামী-স্ত্রীর বুক কাঁপতে লাগল। মিস থাম্পি গৃহকর্তাকে লক্ষ্য করে হেসে বললেন, মিস্টার লাহিড়ি, আপনি কিন্তু আপনার ফ্যামিলির সকলের কথা বলেননি।

লাহিড়িবাবু মুখ কাঁচুমাচু করে বললেন, আমি তো সকলের সঙ্গেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছি। সকলে বলতে–আমার মিসেস আর ঐ ছেলে।

মিসেস লাহিড়ি যোগ করলেন, শুধু মেয়েটা এখানে নেই। মামার বাড়ি গেছে।

 মিস থাম্পিও হেসে বললেন, কিন্তু আপনাদের সঙ্গেই আছেন এমন একজনকে আপনারা বাদ দিয়েছেন।

স্বামী-স্ত্রী দুজনেই অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে মিস থাম্পির দিকে তাকালেন।

মিস থাম্পি বললেন, আমি কিন্তু আপনাদের বাড়ি ঢুকেই তাঁকে দেখতে পেয়েছি। বলে হাসতে লাগলেন।

অবাক নির্মল লাহিড়ি বললেন, আরও একজনকে দেখেছেন?

–হ্যাঁ, আপনারা যখন আমায় রিসিভ করছিলেন, তিনিও পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই ছুটে ঘরের মধ্যে চলে গেলেন। আমি ঘরে ঢুকেই তাকে খুঁজেছিলাম। কিন্তু তখন আর দেখতে পেলাম না। দেখলাম পরে খাবার সময়ে। টেবিলের অল্প দূরে দাঁড়িয়েছিলেন। ভারি shy type-এর soft ভদ্রমহিলা।

মিস থাম্পি থামলেন।

সারা ঘর জুড়ে কেমন একটা অস্বস্তি। কেউ সেই মুহূর্তে কোনো কথা বলতে পারল না।

–এখন বলুন ইনি কে?

 স্বামী-স্ত্রী একেবারে বোবা হয়ে গেলেন। নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন। নির্মলবাবু একটু সামলে নিয়ে বললেন, আর তো কেউ নেই মিস থাম্পি।

–নেই, কিন্তু এক সময়ে ছিলেন। একজন মহিলা। বয়েস বছর কুড়ি-বাইশ। পাতলা গড়ন। শ্যামবর্ণা। লম্বা চুল–একটু যেন কুঁজো হয়ে হাঁটেন

শুনতে শুনতে লাহিড়িবাবুর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

বলুন মিস্টার লাহিড়ি, এইরকম কেউ কি কখনো ছিলেন এ বাড়িতে? মিস থাম্পির গলার স্বরটা কেমন যেন অস্বাভাবিক শোনাল।

কয়েক মিনিট নিরেট স্তব্ধতা। তারপর নির্মল লাহিড়ি অস্ফুটস্বরে বললেন, আপনি যে রকম বর্ণনা দিচ্ছেন তাতে মনে হচ্ছে আপনি আমার ফাস্ট ওয়াইফের কথা বলছেন। কিন্তু সে তো অনেকদিন হল–

কথা শেষ হল না। হঠাৎ মিসেস লাহিড়ি কাঁপতে কাঁপতে চেয়ারে বসে পড়লেন। তারপরই অচৈতন্য।

বিমূঢ় নির্মল লাহিড়ি দু হাতে মিসেস লাহিড়ির দেহটা ধরে রইলেন।

Dont worry! মিস থাম্পি বললেন।একটু পরেই উনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। ওঁকে বলবেন–nothing to fear. এই মহিলা যখন জীবিত ছিলেন তখন আপনাকে খুব ভালবাসতেন। এখনো ভালবাসেন। আর জেনে রাখুন যে spirit ভালবাসতে পারে সে কারো ক্ষতি করে না।

বলে দুহাত তুলে নমস্কার করে বেরিয়ে এলেন।

বাড়ি ফিরে মান্তু ললিতবাবুকে সব ব্যাপারটা বলল। ললিতবাবু স্তম্ভিত হয়ে শুনলেন। মিস থাম্পি হঠাৎই যেন এদের কাছে সাধারণ সম্মানীয় অতিথি থেকে ভয়-বিস্ময়-শ্রদ্ধার পাত্রী হয়ে উঠলেন। এও একরকম অস্বস্তি। এই-সব মানুষের কোথায় কিসে তুষ্টি কিসে বিপত্তি বোঝা দায়। তাছাড়া অন্য অস্বস্তিও রয়েছে মান্তুর। যে জন্যে রীণাকে আনা তা আর কিছুতেই হচ্ছে না। ওকে নিয়ে যে নিরিবিলিতে মিস থাম্পির কাছে বসবে, মিস থাম্পি তার ফুরসতটুকুও দিচ্ছেন না। মিসেস লাহিড়ির বাড়ি থেকে ফিরে এসে আবার খাতাপত্র নিয়ে বসেছেন উনি। হয় তো আরো দুএকদিন থাকবেন। কিন্তু রীণা আর কিছুতেই থাকবে না। ওকে কাল সকালেই পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে।

রীণার ওপরই মান্তুর রাগ হল। ও যদি নিজে মিস থাম্পির কাছে গিয়ে সোজাসুজি ওর বিপদের কথা বলত, তাহলে হাঙ্গামা চুকে যেত। কিন্তু ও তো ত্রিসীমানায় ঘেঁষছেই না।

রাত নটা বাজল। মিস থাম্পি তার খাতা নোটবই ব্যাগে পুরে বেরিয়ে এলেন।

–আপনার খাবার ব্যবস্থা করি? মান্তু বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করল।

করুন। আজ তাড়াতাড়ি শোব। খুব টায়ার্ড। খাওয়াদাওয়া চুকে গেল খুব তাড়াতাড়ি আর নিঃশব্দে। যা সচরাচর হয় না। কারণ যাঁর সঙ্গে ওরা গল্প করবে ভেবেছিলেন, তিনিই তো অতিশয় গম্ভীর।

মান্তু দেখল আর সময় নেই। খাওয়ার পরই মিস থাম্পি শুয়ে পড়বেন। আর রীণাও কাল সকালে চলে যাবে। কাজেই খাওয়ার পরই রীণাকে নিয়ে ওঁর ঘরে ঢুকতে হবে।

মান্তুকে দুর্ভাবনার হাত থেকে বাঁচালেন মিস থাম্পিই।

খাওয়া শেষ করে রীণা থালায় আঙুল দিয়ে আঁক কাটছিল। হঠাৎ মিস থাম্পি জিজ্ঞেস করলেন-Why you look so pale? রাত্রে ভালো ঘুম হয় না?

রীণা চমকে মিস থাম্পির দিকে তাকাল।

-Are you a victim of any nightmare? রাত্রে কোন দুঃস্বপ্ন দ্যাখ?

রীণা প্রথমে কি উত্তর দেবে ভেবে পেল না। তার পরই সংকোচ কাটিয়ে বলল, Not dream madam! Something else.

মিস থাম্পি ভুরু কুঁচকে চোখ ছোটো করে তাকালেন।

রীণা বলল, Not only at night-constantly haunted by a feeling of an unknown fear.

মান্তু এই সুযোগে বন্ধুর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল, শুধু রাত্তিরেই নয়, দিনেও খুব ভয় পায়।

-What is that fear?

–That I do not know myself ভয়টা কি ম্যাডাম, আমি নিজেও তো জানি না।

মিস থাম্পি কিছুক্ষণ কী ভাবলেন। তারপর বললেন, আজ আমি খুব টায়ার্ড। কাল সকালে আপনার সঙ্গে কথা বলব। ঠিক সকাল ছটায়।

.

১২.

ডাক্তার রুদ্র

 বাড়িতে রীণা নেই, কাজেই ফেরার তাড়া নেই। রীণাকে ছেড়ে দিতে খুব একটা ইচ্ছে ছিল না ওর। তার কারণ, রীণা যেন ক্রমশ মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে উঠছে। এ বিষয়ে সঞ্জয়ের বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এ অবস্থায় রীণাকে চোখের আড়াল করার এতটুকু ইচ্ছে ছিল না সঞ্জয়ের। অবশ্য মান্তু কথা দিয়েছে সে যেমন নিজে রীণাকে নিয়ে যাচ্ছে রাত পোহালেই তেমনি নিজেই পৌঁছে দিয়ে যাবে। মান্তু আড়ালে ওকে মিস থাম্পির কথাও বলেছে। অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন মহিলা, প্রেতচর্চাই তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত। মান্তুর ইচ্ছে রীণাকে একবার তাঁর সঙ্গে কথা বলিয়ে দেয়। এসব হাস্যকর কথা। মহিলাটি কি ঝাড়ফুঁক করে রীণাকে সুস্থ করে তুলবেন? তবু সঞ্জয় বাধা দেয়নি। ভেবেছে মান্তুর বাড়িতে এক রাত্তির থাকলে রীণার হয়তো ভালোই লাগবে। মান্তুও তাকে বোঝাতে পারবে।

সারাদিন হাসপাতালে কাজের মধ্যে কেটে গেল। রীণা যে বাড়ি নেই এ কথা একবারও মনে হল না। মনে পড়ল বিকেলে হাসপাতাল থেকে বেরোবার পর। ভাবল এখনই গিয়ে কি করবে? বাড়ি তো খালি।

সঞ্জয়ের অবশ্য হুটহাট যাওয়ার মতো জায়গা একটা আছে। সেটা ডাক্তার রুদ্রর বাড়ি। সঞ্জয় ঠিক করল ওখানেই যাবে। রীণার ব্যাপারে একটু কথা বলা দরকার।

ডাঃ অবিনাশ রুদ্রের বাড়ি বেলগাছিয়ায়। গেটের ভেতর মোরাম বিছানো পথ। দক্ষিণ দিকে গ্যারেজ। নিচের ঘরে চেম্বার। সকালে রুগী দেখেন। সন্ধেবেলায় বসেন না। ঐ সময়টা মিটিং নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। মিটিং না থাকলে বই পড়েন।

ডাঃ রুদ্রের এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে লন্ডনে ডাক্তারি পড়ছে। বাড়িতে শুধু স্ত্রী। নির্ঞ্ঝাট সংসার।

সঞ্জয় কলকাতায় এসেই ভেবেছিল রীণাকে নিয়ে ডাঃ রুদ্রের বাড়িতে বেড়াতে আসবে। কিন্তু তখন রীণাকে নিয়ে সিনেমা থিয়েটার দেখাতেই দিন কেটে গেল। তারপরই রীণা ভয় পেতে আরম্ভ করল। আর বেরোন হল না। শেষ পর্যন্ত ডাঃ রুদ্রকেই আসতে হল রীণাকে দেখতে। রীণার সঙ্গে সেই তাঁর প্রথম পরিচয়। যাবার সময়ে তিনি বার বার করে বলেছিলেন–সঞ্জয় যেন রীণাকে একদিন নিয়ে যায় তার বাড়িতে। কাকীমা দেখবে।

সঞ্জয় একদিন নিয়ে গিয়েছিল রীণাকে। রীণার মনে অস্বস্তি ছিল ডাঃ রুদ্র হয়তো কাকীমার সামনেই তাকে ঠাট্টা করবেন। কিন্তু ডাঃ রুদ্র ওসব কোনো কথাই তোলেননি। রীণার খুব ভালো লেগেছিল।

মুখে চুরুট, সোফায় গা এলিয়ে ডাঃ রুদ্র বই পড়ছিলেন। সঞ্জয়কে আসতে দেখে বই মুড়ে রেখে সহাস্য অভ্যর্থনা করলেন, এসো এসো।

সঞ্জয় সামনের কোচে বসল।

–কি খবর বলো। রীণা কেমন আছে? বলেই ভেতরের দরজার পর্দা সরিয়ে হাঁকলেন, ওগো, সঞ্জয় এসেছে।

একটু পরেই ডাঃ রুদ্রের স্ত্রী হাসিমুখে এসে দাঁড়ালেন। রীণাকে নিয়ে এলে না কেন?

সঞ্জয় ইতস্তত করে বলল, আজ আমি হাসপাতাল থেকে আসছি। ছুটির দিনে নিয়ে আসব।

বোসো। আমি আসছি। বলে তিনি ভেতরে চলে গেলেন।

 সঞ্জয় তখন রীণার কথা বলল। প্রথম দিনের ঘটনা ডাঃ রুদ্রের জানা ছিল। সঞ্জয় পরের দিকের সব ঘটনা খুলে বলল। গেলাস ভাঙা, ছবি চুরি থেকে আরম্ভ করে মান্তুর বাড়ি একা বেড়াতে যাওয়া পর্যন্ত সব। বলল না শুধু মান্তুর সঙ্গে আজকে যাওয়ার কথাটা। লুকোবার তেমন কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু মিস থাম্পির কথায় উনি হয়তো রাগ করবেন, কিংবা হাসবেন।

সব শুনে ডাক্তার রুদ্র গম্ভীর হয়ে রইলেন।

 সঞ্জয় জিজ্ঞেস করল, কেসটা আপনার কিরকম মনে হয়? মানসিক ব্যাধিই?

ডাঃ রুদ্র বললেন, ওর সঙ্গে ভালো করে কথা না বললে বুঝতে পারব না।

সঞ্জয় বলল, মানসিক ব্যাধি ছাড়া আর কি হতে পারে? আপনি কি মনে করেন ও সত্যিই কোনো অশরীরী আত্মাকে দেখে?

ডাঃ রুদ্র কিছুক্ষণ কি ভাবলেন। তার পর বললেন, দ্যাখো, এ সম্বন্ধে চটু করে কিছু বলা ঠিক নয়, আমি অলৌকিক ব্যাপার নিজে দেখিনি। তবে রুগী দেখেছি।

–তারা কেউ সেরেছে?

–হ্যাঁ, সবাই। সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবন চালাচ্ছে।

–নিশ্চয় ঝাড়-ফুঁক করে নয়?

 ডাক্তার রুদ্র বললেন, না। চিকিৎসা করেই। তবে সে চিকিৎসা ওষুধ-ইনজেকশান দিয়ে নয়, পেশেন্টের মনস্তত্ত্ব স্টাডি করে কিংবা জায়গা বদল করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্য উপায়ও নিতে হয়েছে।

ডাঃ রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, আমার মনে হচ্ছে তোমার ধারণাই ঠিক। রীণা সাইকোপ্যাথিক পেশেন্ট হয়ে পড়েছে।

সঞ্জয় এতেও সন্তুষ্ট হল না। জিজ্ঞেস করল, হঠাৎ সাইকোপ্যাথিক পেশেন্ট হয়ে পড়ল কেন? তারও তো কারণ থাকবে।

-হ্যাঁ, কারণ তো থাকবেই।

–কিন্তু আমি তো কোনো কারণ দেখছি না।

 ডাঃ রুদ্র একটু হাসলেন। বললেন, তুমি আর কত দিন ওকে দেখছ? তিন বছর? চার বছর? তার আগেও তো কোনো ঘটনা ঘটতে পারে যা তুমি জান না। এমনকি ওর মা-বাবাও জানে না। এমনও হতে পারে ব্যাপারটা ওর নিজেরও মনে নেই!

সঞ্জয় অবাক হয়ে বলল, সে আবার কী?

–হ্যাঁ, ঠিকই বলছি। খুব অল্প বয়েসে হয়তো কোনো কিছুতে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিল। সেই ভয়ের কারণ বা স্বরূপ আজ আর মনে নেই। কিন্তু ভয়ের। তীব্র অনুভূতিটা থেকে গিয়েছে সাব-কনসাস মাইন্ডে।

ডাঃ রুদ্র একটু থামলেন। তারপর সোজা হয়ে বসে বললেন, ছোটোবেলায় একবার নররাক্ষসের জ্যান্ত মুর্গি খাওয়া দেখে ভয় পেয়েছিল, সেদিন তুমি বলছিলে না?

—হ্যা। এবারও মহাজাতি সদনে ম্যাজিক দেখতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল সে কথাও আপনাকে বলেছি। কিন্তু তার সঙ্গে এখনকার মানসিক

এই পর্যন্ত বলে সঞ্জয় একটু থামল। ডাক্তার রুদ্রের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, একটা কারণ খুঁজে পেয়েছি কাকাবাবু। রীণা যাকে দেখে তার পরনে কালো কোটপ্যান্ট। রীণা ছোটোবেলায় যে নররাক্ষসকে দেখেছিল সেও আসলে ম্যাজিসিয়ান। আমার বিশ্বাস সেও কালো পোশাক পরত।

ডাঃ রুদ্রের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বললেন, ভালো কথা বলেছ। রীণাকে একবার জিজ্ঞেস করে দেখো দিকি, সেই ম্যাজিসিয়ানের পোশাকটা মনে আছে কিনা।

করব।

এই সময়ে ডাঃ রুদ্রের স্ত্রী দুজনের জন্য চা, টোস্ট আর ওমলেট নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। প্লেট নামিয়ে কাজ সারতে মিসেস রুদ্র ভেতরে চলে গেলেন।

ডাঃ রুদ্র সোফায় আধ-শোওয়া হয়ে খেতে খেতে বললেন, তবে আমার মনে হয় ওটা ঠিক কারণ নয়। ধরো, সেই ম্যাজিসিয়ানের কালো পোশাকটাই যদি ভয়ের কারণ হয় তাহলে তো যে কোনো কালো কোট-প্যান্ট পরা লোক দেখলেই ভয় হবে। মহাজাতি সদনে ম্যাজিক দেখার আগে কি কখনো কালো পোশাক পরা লোক দেখেনি?

সঞ্জয় চুপ করে গেল। নিঃশব্দে দুচুমুক চা খেয়ে বলল, ধরেই নিলাম না হয় ছোটোবেলার স্মৃতি থেকেই মহাজাতি সদনে ম্যাজিক দেখতে গিয়ে কিংবা ম্যাজিসিয়ানকে দেখে ভয় পেয়েছিল। তার সঙ্গে বাড়িতে ভয় পাবার কারণ কি? আর কলকাতায় এসেই বা এতদিন পর ভয় পেতে লাগল কেন? সব যেন কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে কাকাবাবু।

ডাঃ রুদ্র চা শেষ করে একটা চুরুট ধরালেন। বললেন, গোলমাল কিছুই নয়। ব্যাপার একটাই–ভয় পাওয়া। সেই সঙ্গে একটা-কিছু দেখা।

সঞ্জয় একটু উত্তেজিত হয়ে বলল, আপনিও বিশ্বাস করেন ও কিছু দেখে?

-আমি তো আগেই বলেছি, ও বিষয়ে চট করে কিছু বলা যাবে না। রোগের বিকারে মানুষ নিজে থেকেই বকে। কিন্তু যা বকে তা ভুল বকা। মানসিক রোগে লোকে নানা কারণে ভয় পায়-কখনো কোনো শব্দ শুনে, কখনো কোনো বিশেষ গন্ধ পেয়ে, কখনো বা কিছু দেখে। অথচ সেই শব্দ, গন্ধ বা বস্তু হয়তো আদপেই কিছু নেই।

–তাহলে আপনি সেই আমার কথাতেই আসছেন রীণা সাইকোপ্যাথির পেশেন্ট?

 –হ্যাঁ, তাই।

সঞ্জয় নিজেই কত বার রীণাকেই বলেছে, তুমি মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে পড়েছ। আর আজ ডাঃ রুদ্রের মুখে ঐ একই কথা শুনে তার মুখটা শুকিয়ে গেল। ম্লান মুখে জিজ্ঞাসা করল, তাহলে ট্রিটমেন্ট?

–আমিই করব। অবশ্য যদি বুঝি সত্যিই ওর মানসিক রোগ হয়েছে।

এই বলে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। সঞ্জয়ের পিঠ চাপড়ে বললেন, শুনে অবাক হবে, আমি এখন মেমেরিজম নিয়ে কিছু পড়াশোনা করছি। বলতে বলতে সামনের র‍্যাক থেকে কতকগুলো ফাইল বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন। বললেন, একসময়ে ওদেশের ডাক্তার ফিসার (Dr Fisher), রিচার (Richer), বিনেট (Binet), ফেরি (Fere), বিখ্যাত ফরাসী বিজ্ঞানবিদ ডাক্তার লুই আর স্বয়ং মেসমার যিনি মেসমেরিজমের আবিষ্কর্তা এঁরা সকলেই মেমেরিজমের সাহায্যে কঠিন কঠিন রোগ সারাতে পারতেন। সেই সব খবরের কাটিং এই ফাইলে আছে। কৌতূহল থাকলে একটা ছুটির দিনে এসে পড়ে দেখতে পার। একটু থেমে বললেন এখনও এদেশে বহু জটিল রোগ মেমেরিজমের সাহায্যে সারানো যায়। আমাদের দেশে ঝাড়-ফুঁক করে রোগ সারানো হতো। এখনও পল্লীগ্রামে ঝাড়-ফুঁকের ব্যবস্থা চলে। এই ঝাড়-ফুঁকও এক ধরনের মেসূমেরিজ। তুমি কখনো দেখেছ কি না জানি না ওঝারা রুগীর কাছে বসে রুগীকে না ছুঁয়ে কিংবা তার দেহের ওপর দিয়ে খুব আগ্মভাবে হাত চালায়। একে বলে পাস দেওয়া। মাথা থেকে পা পর্যন্ত এইরকম কয়েকবার পাস দিলেই রুগী ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম ভাঙলে দেখা যায় সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছে। অনেক মহাপুরুষই তো রোগীর গায়ে হাত বুলিয়ে তাদের রোগমুক্ত করতেন। এটা অস্বাভাবিক বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আসলে তারা প্রচণ্ড মানসিক শক্তির অধিকারী। ঐ শক্তির বলেই তারা রোগীকে রোগমুক্ত করতে পারতেন। আর মেমেরিজমের গোড়ার কথাই হচ্ছে প্রচণ্ড মানসিক শক্তি। বুঝতেই পারছ মানসিক রোগের ক্ষেত্রে এই মেসমেরিজম্ কত শক্তিশালী চিকিৎসা।

সঞ্জয় বলল, তাহলে কি আপনি রীণাকে হিপনোটাইজ করে সারাবেন?

ডাঃ রুদ্র হেসে বললেন, তাহলে তো খুব ভালোই হতো। কিন্তু হিপনোটাইজ করি সে শক্তি আমার কই? আজকের দিনে কজনারই বা সে শক্তি আছে? তবে এবিষয়ে আমার ইন্টারেস্ট আছে বলেই তোমাকে এত কথা বললাম।

সঞ্জয় একটু অধৈর্য হয়ে বলল, তাহলে আপনি কিভাবে সারাবেন?

সঞ্জয় না হয়ে অন্য কেউ এ কথা জিজ্ঞেস করলে ডাঃ রুদ্র হয়তো বিরক্ত হতেন। কিন্তু এক্ষেত্রে তিনি শুধু একটু হাসলেন। বললেন, প্রথমে রোগের সঠিক কারণ খুঁজে বের করতে হবে। দেখতে হবে চাপা কোনো ভয়ের স্মৃতি আছে কিনা? কোনো মানসিক আঘাত পেয়েছে কিনা। অনেক মানসিক আঘাত নিঃশব্দে সহ্য করতে হয়, তার প্রভাবই সবচেয়ে বেশি। এছাড়া অতৃপ্ত যৌন-কামনারও একটা প্রভাব আছে। বিশেষ করে যারা উগ্রবিকৃত যৌন-কামনায় কাতর তাদের মানসিক বিকার জন্মাতেই পারে। বিকৃত যৌন-কামনায় কাতর এমন একটি পেশেন্ট আমিই পেয়েছিলাম।

সঞ্জয় অধৈর্য হয়ে বলল, রীণার ক্ষেত্রে এসবের কোনো প্রভাবই নেই। কলকাতায় আসার আগে পর্যন্ত সে সবদিক দিয়েই সুখী ছিল। এখনও তার কোনো কিছুরই অভাব নেই।

ডাঃ রুদ্র স্নিগ্ধ হেসে বললেন, তা হয়তো ঠিক। তবু তুমি নিজে ডাক্তার। এই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ঘটনা জেনে রাখা ভালো। সেই পেশেন্টটির কথা শোনোনা।

ডাঃ রুদ্র একটু থামলেন। তারপর বলতে শুরু করলেন, স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন। দুটি সন্তানও হয়েছে। স্বামীটি সুদর্শন, ভদ্র, মার্জিতরুচি, সলজ্জ প্রকৃতির। স্ত্রীটি মোটামুটি সুন্দরী। পাতলা গড়ন। গাল দুটি একটু বসা। কিন্তু ঝকঝকে চোখ। মোটেই মুখরা নয়, বরঞ্চ স্বল্পভাষী। তাকে দেখেই মনে হয়েছিল তার জীবনের অনেক সুখ-দুঃখের কথা সে যেন ঠোঁটে কুলুপ এঁটে আছে। দশ বছর শান্ত দাম্পত্য জীবন কাটাবার পর স্ত্রীটি হঠাৎ কিরকম অস্বাভাবিক হয়ে উঠল। কোনো কিছুতেই আনন্দ নেই, উৎসাহ নেই, কারো সঙ্গেই কথা বলতে ভালো লাগে না, এমনকি–এমনকি রাত্রে স্বামীর পাশে শুয়েও পাশ ফিরে থাকত। স্বামীর মনে হতো যেন একতাল বরফ তার পাশে পড়ে আছে। অগত্যা স্বামী তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করল। প্রথমে স্ত্রী চিকিৎসা করাতে রাজি হয়নি। বিরক্ত হয়ে বলত–আমার কি হয়েছে যে চিকিৎসা করাব?

শেষে অবশ্য রাজি হয়েছিল। গোপন সাক্ষাৎকারের সময় হিতৈষী ডাক্তারের কাছে সে যা বলেছিল তা এই–প্রথম কৈশোর কালেই সে একটা ছেলের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। ছেলেটি শুধু যে উপভোগ করত তা নয়, উপভোগের সময়ে নানা রকম খারাপ কথা বলত, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করত। তাতে মেয়েটি রাগ তো করতই না, বরঞ্চ তার ভালো লাগত। পরবর্তী জীবনে স্বামীর কাছ থেকেও ঐ রকম আচরণ আশা করত। কিন্তু স্বামীর কাছ থেকে সেরকম ব্যবহার পেত না। শেষ পর্যন্ত–মানে দশ বছর পর তার হঠাৎ এমন অবস্থা হল যে, পাগলের মতো সেই ছেলেটার খোঁজ করতে লাগল। ছেলেটি এই পরিবারের এতই পরিচিত ছিল যে তাকে কেউ সন্দেহ করত না। মেয়েটি এই ব্যাধিরই শিকার।

এই পর্যন্ত বলে ডাঃ রুদ্র একটু থামলেন।

সঞ্জয় জিজ্ঞেস করল–মহিলাটির শেষ পর্যন্ত কি হল?

–চিকিৎসা শুরু হল। চিকিৎসা কি জান? চিকিৎসা আর কিছুই নয়, মাস ছয়েকের জন্যে তাকে তাদেরই অতি সাধারণ এক গৃহস্থ যৌথ পরিবারে পাঠিয়ে দেওয়া হল। তার স্বামীকে বলা হল–এই ছমাসের মধ্যে সে যেন স্ত্রীর কাছে না যায়। শুধু তখনই যাবে যখন তার স্ত্রী তাকে চিঠি লিখে আসতে বলবে। সেই যৌথ পরিবারে গিয়ে বধূটি প্রথম সুস্থ স্বাভাবিক ব্যস্তসমস্ত জীবনের আস্বাদ পেল। তারপর থেকেই তার পরিবর্তন। এখন সে সম্পূর্ণ সুস্থ স্বাভাবিক।

সঞ্জয় কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, রীণার ট্রিটমেন্ট তাহলে কিভাবে করবেন?

ডাঃ রুদ্র হেসে বললেন, রীণার ক্ষেত্রে কোন ধরনের ট্রিটমেন্ট করব তার সঙ্গে কথা বলার পর ঠিক করব। অবশ্য রীণা যদি সত্যিই সাইকোপ্যাথিক পেশেন্ট হয়।

বড়ো ঘড়িটায় ঢং ঢং করে নটা বাজল। সঞ্জয় উঠে পড়ল। এখন তাকে হোটেলে ছুটতে হবে।

.

রাত সাড়ে দশটা শহর কলকাতায় এমন কিছু নয়। কিন্তু যশোর রোডের ধারে এই অঞ্চলটা এরই মধ্যে নিঝুম হয়ে গেছে। বিশেষ করে এই বাড়ির একতলা দোতলার ভাড়াটেরা দশটার আগেই খাওয়া সেরে শুয়ে পড়ে। একমাত্র গরমকালে লোড শেডিং হলে অনেক রাত পর্যন্ত বাইরে এসে বসে।

সঞ্জয় ওপরে উঠে এল। প্যাসেজটা অন্ধকার। বাড়িতে কে আছে যে আলো জ্বেলে রাখবে?

অন্ধকারেই সঞ্জয় তালা খুলে ঘরে ঢুকল। ঢুকতেই গা-টা কেমন ছমছম করে উঠল। এর আগেও একদিন এরকম হয়েছিল, যেদিন রীণা একা মান্তুদের বাড়ি যাবার জন্যে বেরিয়েছিল। তবে সেদিনের অস্বস্তিটা অন্য কারণে। রীণার জন্যে দুর্ভাবনায়। দুর্ভাবনা আর গা ছমছ করা এক নয়।

কিন্তু আজই বা গা ছমছম করল কেন?

সঞ্জয় তাড়াতাড়ি আলো জ্বালল। আলোয় ঘর ভরে গেল। সঙ্গে সঙ্গে গা-ছমছমানি থেমে গেল। নিজেকে ধমক দিল–ডাক্তার মানুষের অন্ধকারে ভয়? তাও তেতলার নিজের ঘরে ঢুকতে?

দরজাটা ভালো করে বন্ধ করে সঞ্জয় বিছানায় এসে বসল। হোটেলে খেয়ে এসেছে। কাজেই শোওয়া ছাড়া এখন আর অন্য কাজ নেই। কিন্তু শুতে ইচ্ছে করল না। শুলেও ঘুম আসবে না। অগত্যা একটা সিগারেট ধরালো।

ডাঃ রুদ্রের কথাগুলো তার মনে পড়ছিল। আচ্ছা, রীণার প্রসঙ্গে হঠাৎ উনি ঐ মহিলাটির কথা টানলেন কেন? তিনি কি রীণার ক্ষেত্রেও সেরকম কিছু সন্দেহ করেন? মান্তুর দাদার সঙ্গেও ওর খুব ভাবছিল নাকি কী জানি বাবা! পরক্ষণেই অবশ্য সঞ্জয় সে কথা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে পাশ ফিরে শুল। কিন্তু কিছুতেই ঘুম এল না।

তার কেবলই সেইসব রাতগুলোর কথা মনে হতে লাগল যেসব রাতে রীণা ভয় পেয়েছিল। ঐ তো বসার ঘরে টেবিলটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ঐ টেবিলের কাছেই রীণা কী যেন দেখেছিল। ঐ টেবিল থেকেই গেলাস পড়ে ভেঙেছিল। আচ্ছা–সেই ছবিটার কি হল? সত্যিই কি কেউ নিয়ে গেছে? কিন্তু কে নেবে? এঘরে তো বাইরের কেউ আসে না।

ভাবতে ভাবতে সঞ্জয়ের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। সে জোর করে অন্য দিকে মন সরাবার চেষ্টা করল। কিন্তু মনটা সেই অশরীরী আত্মার মতো টেবিলটার চারদিকেই ঘুরতে লাগল।

কী মুশকিল! ভয় পাচ্ছে নাকি? সঞ্জয় জোর করে নিজেকে সচেতন করার চেষ্টা করল।

কই? অন্য দিন তো ভয় পায় না। ঘরে সঙ্গী তো শুধু রীণা। তাও সে তো নিজেই ভয়ের শিকার!

আশ্চর্য! আজ সেই একটা ভীতু মানুষই কাছে না থাকাতে সঞ্জয়ের মতো ডাক্তারও কেমন ভয় পাচ্ছে।

সঞ্জয় উঠে পায়চারি করতে লাগল। হঠাৎ ও চমকে উঠল। ঘরে কি আর কেউ আছে? তার পিছনে!

নাঃ, ওটা ওর নিজেরই ছায়া।

 আশ্চর্য! মেঝেতে নিজের ছায়া দেখেই বুকের মধ্যে কিরকম করে উঠেছিল। বুঝতে পারল, এই জন্যেই মানুষ বোধহয় জায়গা-বিশেষে একা থাকতে পারে না। সঙ্গী চায়। ঘরে একটা কুকুর থাকলেও যেন অনেক নিশ্চিন্ত।

নাঃ, ঘুমনো যাক। সঞ্জয় মশারি টাঙিয়ে নিল। বিছানায় ঢুকে বেডসুইচ টিপে আলো নিভোতে যাচ্ছিল, কি মনে হল, আবার উঠে দরজাটা দেখে নিল ঠিক মতো বন্ধ হয়েছে কি না। সিঁড়ির দিকের জানলাটা অন্য দিন খোলা থাকে। আজ বন্ধ করে দিল।

বিছানার কাছে আসছিল–ফিরে গিয়ে একবার বাথরুমটা দেখে নিল। তারপর খাটের তলা।

নাঃ, কেউ কোথাও নেই। নিশ্চিন্ত। মনকে বোঝাল–অন্য কিছুর জন্যে নয়, চোর-ডাকাতের জন্যেই এত সাবধানতা!

বিছানায় শুয়ে বেডসুইচ অফ করে দিল।

তবু ঘুম আসছে না। তখন সঞ্জয় ডাঃ রুদ্রের সঙ্গে যে কথা হল তাই নিয়ে আবার ভাবতে লাগল। ডাঃ রুদ্র যে কী বলতে চাইলেন সঞ্জয়ের কাছে তা মোটেই পরিষ্কার নয়। উনি কি এই বয়েসে এখন মেসমেরিজ শিখে চিকিৎসা করবেন? পাগল নাকি!

উনি রীণার সঙ্গে ভালো করে কথা বলবেন। তা তিনি হাজার বার বলুন। কিন্তু রীণাকে কোথাও চিকিৎসার জন্যে পাঠানো যাবে না। ও কিছুতেই রাজি হবে না।

তাছাড়া ডাঃ রুদ্র যদিও বলছেন মানসিক রোগ, তবু প্রতিবারই বলেছেন, যদি সত্যিই মানসিক রোগ হয়।

উনি কি তবে মানসিক রোগ ছাড়া অন্য কিছু আশঙ্কা করছেন? ডাঃ রুদ্রের মতো একজন বিখ্যাত সাইকিয়াট্রিস্টও কি অলৌকিক কিছুতে বিশ্বাসী?

এক ঘুমেই রাত শেষ।

 ঘুম ভাঙার পরই সঞ্জয়ের মনে পড়ল রীণা নেই। কাজেই চা নিয়ে কেউ আজ মুখের সামনে ধরবে না।

বিছানা থেকে উঠে পড়ল ও। মনটা খুশি খুশি, কাল রাতে কিছু হয়নি। সত্যি কিছু থাকলে তো হবে।

চা খেয়ে, শেভিং-এর কাজ সেরে স্নানের ঘরে যখন ঢুকল তখন বেলা আটটা। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই রীণা এসে পড়বে, তবু আজ আর বাড়ির ভাত জুটবে না। ক্যান্টিনেই খেয়ে নিতে হবে। তার আগে সকালে পেটে কিছু পড়া দরকার। সঞ্জয় একটা ডিম সেদ্ধ করে নিল। তারপর কোথায় নুন, কোথায় গোলমরিচ খুঁজতে খুঁজতে হাঁপিয়ে উঠল।

বেলা সাড়ে আটটা। হাসপাতালে যাবার জন্যে সঞ্জয় তৈরি। কিন্তু রীণার পাত্তা নেই। অথচ সকালেই ওর আসার কথা। মান্তুই পৌঁছে দিয়ে যাবে। কই?

পৌনে নটা হতে চলল।

নাঃ, আর দেরি করা যায় না। সঞ্জয় ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তালা লাগালো। এমনি সময়ে সিঁড়ির মুখে বন্দনা এসে দাঁড়ালো।

-আপনার ফোন।

–ফোন! সঞ্জয় চমকে উঠল। কার ফোন হতে পারে? সেদিন রাতে ফোন এসেছিল থানা থেকে। আজ? আজ নিশ্চয়ই মান্তু

বন্দনাদের বসার ঘরে ঢুকে সঞ্জয় রিসিভারটা তুলে নিল।

–হ্যালো!

–কি মশাই! কাল রাত্তিরে ভালো ঘুম হয়েছিল তো?

 মহিলা কণ্ঠস্বর। কিন্তু কেমন অস্পষ্ট।

-কে বলছেন?

–ও বাবা! এত মিষ্টি করে বললাম, তবু চিনতে পারলেন না? ডাক্তাররা এমনি ভোতাই হয়।

সঞ্জয় এবার হেসে উঠল।

-ওঃ শ্ৰীমতী মান্তু! বলুন কি খবর? বেরোবার মুখে এমন একটি মধুর স্বর উপহার পাব ভাবতে পারিনি।

-চুপ করুন মশাই! বেশি গলে যাবেন না। পাশেই আপনার অর্ধাঙ্গিনী আছেন। শুনতে পাবেন।

সঞ্জয় জোরে হেসে উঠল।

–হাসিটা এখন তুলে রাখুন। শুনুন–এবেলা যাচ্ছি না। ওবেলা। দুজন নয়, তিন জন। পুপুকে যদি ধরেন তা হলে সাড়ে তিন জন।

–তিন, জন?

না না এখন কিছু বলব না। ভয় নেই, পুরুষ নন। মহিলাই। একটু তাড়াতাড়ি ফিরতে চেষ্টা করবেন। জমিয়ে আড্ডা দেব। ছাড়বেন না। রীণা কথা বলবে।

সঞ্জয় রিসিভারটা কান বদল করে নিল।

–হ্যালো! আমি রীণা। কাল ভয়টয় পাওনি তো?

–ভয়? কিসের ভয়? ধুৎ?

তাড়াতাড়ি ফিরছ তো?

-দেখি। বলে রিসিভারটা রেখে বন্দনার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে তাড়াতাড়ি নেমে গেল। বড্ড দেরি হয়ে গেছে।

.

১৩.

মিস থাম্পির অভিজ্ঞতা

 সন্ধেবেলা বাসায় ফিরে সঞ্জয় দেখল বাড়ি সরগরম। হাসি-গল্পে ভরপুর। একে মান্তু এসেছে সেই সঙ্গে এসেছেন সেই ম্যাড্রাসি মহিলা। তিনিও যে আসকেন, মান্তু ফোনে না বললেও, সঞ্জয় অনুমান করেছিল। রীণা তো এই মহীয়সী অতিথিটির আপ্যায়নে মহা ব্যস্ত।

আজ ওকে দেখলে কে বলবে এই রীণাই এই বাড়িতে এত দিন ভূতের ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে ছিল। এমনকি ওঁর মুখের ওপর যে ফ্যাকাশে ভাবটা ছিল সেটাও যেন আজ আর নেই। রীণা ঠিক আগের মতোই প্রাণচঞ্চল, উচ্ছল হয়ে উঠেছে।

দেখে সঞ্জয়ের ভালো লাগল। কিন্তু দূর থেকে ঐ মহিলাটিকে দেখে মোটেই ভালো লাগল না। বরঞ্চ তাঁর মুখখানা দেখে কেমন অস্বস্তি হতে লাগল।

সঞ্জয়কে সিঁড়ির মুখে প্রথম দেখল মান্তু। হাসতে হাসতে এগিয়ে এল সে।

–খুব তাড়াতাড়ি তো এসেছেন মশাই! এদিকে আমরা হোস্টের অপেক্ষায় বসে আছি। আসুন এঘরে। বলে সঞ্জয়কে একরকম টানতে টানতে ভেতরে নিয়ে গেল।

মিস থাম্পির সঙ্গে আলাপের পর্বটা মাই সেরে দিল।

 মিস থাম্পি হ্যান্ডশেক করে হেসে বললেন, আপনি ছিলেন না, আপনার বাছিত সম্ভবত আমার অনধিকার-প্রবেশ হয়ে গেছে।

সঞ্জয় সসংকোচে বলল, সে কী কথা! আমি না থাকলেও আমার স্ত্রীকে তো আপনার হাতেই দিয়ে গেছি। আপনি অনুগ্রহ করে এদের সঙ্গে এসেছেন এ আমার সৌভাগ্য।

মিস থাম্পি বললেন, আজ সকালে আপনার মিসেসের মুখে সব ব্যাপারটা শুনলাম। শুনে খুব কৌতূহল হল। ভাবলাম জায়গাটা একবার দেখেই আসি।

–ভালোই করেছেন। রীণা, চা-টা দিয়েছ তো?

 রীণা ভ্রূভঙ্গি করে বলল, তুমি কি মনে করেছ, তুমি ছিলে না বলে হোস্টের কর্তব্য করতে পারব না?

মিস থাম্পি উত্তরটা শুনে খুব হাসলেন।

মান্তু, রীণা দুজনেই লক্ষ্য করল এবাড়িতে এসে মিস থাম্পি যেন অন্য মানুষ হয়ে গেছেন। এমন করে প্রাণখোলা হাসতে দেখা যায়নি। ভালোই লাগল।

–নিন মশাই, গরম চা। খেয়ে দেখুন আমার হাতে কিরকম লাগে। আর এটা কি বলুন তো?

–পাঁউরুটি তো দেখতেই পাচ্ছি। তাছাড়া নিশ্চয় ঘুগনি।

–আশ্চর্য! এতও বোঝেন!

–তা আর এত দিনে বুঝব না? আপনার বান্ধবীটি তো ঘুগনি-স্পেশালিস্ট। সারা জীবনে ঐ একটিই জলখাবার শিখে রেখেছেন।

উঃ কী মিথ্যুক! রীণা যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল–সেদিন অমন নিজে হাতে কেক করলাম! কী বেইমান!

সঞ্জয় ততক্ষণে চামচে করে মুখে দিয়েছে। না, ঘুগনি নয়–মাংসের কিমা। সঞ্জয় আর কোনো মন্তব্য না করে চুপচাপ খেয়ে গেল।

মিস থাম্পি একটা শাল ভালো করে জড়িয়ে উঠে দাঁড়ালেন।

–আপনারা গল্প করুন। আমি একটু ঘুরে আসি।

মান্তু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল-সন্ধে হয়ে গেছে। এখন কোথায় যাবেন এই ঠাণ্ডায়?

মিস থাম্পি টটা নিয়ে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, নিচটা একবার দেখে আসি।

রীণা বলল, একাই যাবেন? ওঁকে বলব?

মিস থাম্পি তাড়াতাড়ি বললেন, না না, কাউকে লাগবে না। আমি এই কম্পাউন্ডের মধ্যেই আছি।

আধ ঘন্টার মধ্যেই মিস থাম্পি ফিরে এলেন। সঞ্জয় হেসে বললে, কিছু পেলেন?

মিস থাম্পি দাঁতের ফাঁকে একটু হাসলেন। ছেলেমানুষের মতো বললেন, বলব কেন?

কিন্তু সবাই লক্ষ্য করল ওঁর হাতে একটু শুকনো মাটি।

.

খেতে বসতে একটু রাত হল। একসঙ্গেই সবাই বসল। খেতে খেতে গল্প হচ্ছিল। রীণা মান্তুকে বলল, মিসেস লাহিড়ির বাড়ির ঘটনাটা একবার ওকে ব। বলে সঞ্জয়কে দেখিয়ে দিল।

সঞ্জয় মুর্গির হাড় চিবুতে চিবুতে নিস্পৃহ সুরে বলল, কি বলবেন? গল্প? তা বলুন শুনি।

–গল্প নয়, ঘটনা মশাই। আমরা দুজনেই তা স্বচক্ষে দেখলাম। বলে ঘটনাটা রুদ্ধ নিশ্বাসে বলে গেল।

সঞ্জয় শুনে যে কোনো মন্তব্য করল না, মিস থাম্পি তা লক্ষ্য করলেন। হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, আপনার এই ঘরে শুনলাম মাঝে মাঝে কারো আবির্ভাব হয়। আপনি ভয়টয় পান না তো?

সঞ্জয় হেসে বলল, না ম্যাডাম, ভয়টা আমার এমনিতেই কম। ভূত-প্রেতের ভয় তো জীবনে কোনোদিন করিনি। ওসব আমি মানিও না।

একটু থেমে বলল, তাছাড়া আমি ডাক্তার। বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়া–

–বিজ্ঞানই কি শেষ কথা? বিজ্ঞানের এক্তিয়ারের বাইরে কি কিছু থাকতে পারে না?

–থাকতে পারে। তবে তা নিয়ে অকারণে মাথা ঘামাবার মতো যথেষ্ট সময় আমার নেই।

মিস থাম্পি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি কি মনে করেন এ বাড়িতে ও-সব কিছু নেই? সবটাই আপনার ওয়াইফের মনের ভুল?

সঞ্জয় সেই দৃষ্টির সামনে তাকাতে পারল না। চোখ নিচু করে উত্তরটা এড়িয়ে গিয়ে বলল, এই তত গতকালই সারারাত এঘরে আমি একা ছিলাম। দিব্যি ছিলাম। কোনো কিছুই দেখিনি, কোনো শব্দও না।

মিস থাম্পি বললেন, আপনার সঙ্গে তো তার ব্যাপার নয়। কাজেই আপনাকে শুধু শুধু দেখা দেবে কেন?

সঞ্জয় হেসে অবিশ্বাসের সুরে বলল, তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন আমার স্ত্রীর সঙ্গেই শুধু তার কিছু ব্যাপার আছে। তাই সে তাকে ভয় দেখায়।

–হয়তো তাই।

—কিন্তু আমি তা বিশ্বাস করব কি করে? বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ কই?

 মিস থাম্পি একটু যেন কঠোর সুরে বললেন, এসব জিনিস জনসমক্ষে প্রমাণ করা সম্ভব নয়।

রীণা ইশারায় সঞ্জয়কে চুপ করতে বলল। সঞ্জয় চুপ করে গেল।

মিস থাম্পি তার কথার জের ধরে বললেন, প্রমাণ দিতে আমিও পারব না, হয়তো প্রতিকারও আমার পক্ষে সম্ভব নয়, তবে আজ রাত্রে একবার পরীক্ষা করে দেখব বলেই এলাম।

সঞ্জয় বলল, ভালো কথা। আপনি নিজে থেকে দেখুন কোনো পাওয়া যায় কিনা।

তারপর রীণার দিকে তাকিয়ে বলল, তাহলে আজই আঁ কিংবা না হয়ে যাচ্ছে। কি বল?

রীণ কোনো উত্তর দিল না।

সঞ্জয় কথাটা বলল বটে কিন্তু বিশ্বাস না করেই। মিস থাম্পি যদি পরদিন সকালে কফি খেতে খেতে গল্প দেন যে তিনিও সেই কালো-সুট-পরা লোকটিকে স্বচক্ষে দেখেছেন তা হলেও সে বিশ্বাস করবে না। কেননা তা বিশ্বাস করা যায় না।

.

খাওয়া অনেকক্ষণ হয়ে গিয়েছিল। শীতের রাতও গম্ভীর হয়ে উঠছিল।

হঠাৎই মিস থাম্পি রীণাকে জিজ্ঞেস করলেন–আচ্ছা, সিঁড়িটা সম্বন্ধে আপনার অভিজ্ঞতা কিরকম? তার মানে আমি বলতে চাইছি সিঁড়ি দিয়ে যখন আপনি ওঠা-নামা করেন তখন কি কিছু ফিল করেন?

রীণা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল, না তো!

সঞ্জয় হেসে বলল, রীণার মনে নেই-ওর একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল। প্রথম দিনই বেচারি উঠতে গিয়ে আচমকা গড়িয়ে পড়ে গিয়েছিল।

মিস থাম্পি এক মুহূর্ত যেন থমকে গেলেন। কিন্তু কিছু বললেন না।

.

রাত সাড়ে দশটা বাজল। তবু কেউ শোবার নাম করছে না। মিস থাম্পিও না। তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কলকাতার হালচাল জিজ্ঞাসা করছিলেন।

একসময়ে মান্তু বলল, মিস থাম্পি, আপনি যদি আপনার অভিজ্ঞতা থেকে দুএকটা গল্প শোনান তাহলে শীতের রাতে বেশ জমবে।

একথায় মিস থাম্পি গম্ভীর হয়ে গেলেন। একটু যেন বিরক্ত হয়ে বললেন, দেখুন আপনারা যাকে গল্প বলেন, আমি দুঃখিত, সেরকম কিছু আমার জানা নেই। আমি সারাজীবন দেশ-বিদেশ ঘুরে যেসব তথ্য সংগ্রহ করেছি তা গল্প নয়। তা নিয়েই আমার সাধনা। সেসব আমার নিজস্ব সম্পদ!

মান্তুর মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে গেল। বলল, excuse me! আমি দুঃখিত।

মিস থাম্পি আর কিছু বললেন না। কিন্তু পরিবেশটা ভারী হয়ে গেল।

কিছুক্ষণ কাটল। তার পর নীরবতা ভাঙলেন মিস থাম্পি নিজেই। হাসতে হাসতে বললেন, আমার কথায় আপনারা ক্ষুণ্ণ হলেন বুঝতে পারছি। আচ্ছা, একটা সত্য ঘটনা বলছি শুনুন, যার মীমাংসা এখনো হয়নি।

মিস থাম্পি একটু থামলেন। সকলেই নড়েচড়ে বসলেন। কেবল সঞ্জয়ের মধ্যে তেমন কোনো চাঞ্চল্য দেখা গেল না।

কলকাতা থেকে কাল আমার ভুটান যাবার কথা। ওখানে একটা ঘটনা ঘটেছে বলে খবর পেয়েছি। বলে মিস থাম্পি থামলেন। সঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ডাঃ গুপ্ত, ঘটনাটা আপনার বিশ্বাসযোগ্য না হলেও এঁদের শোনাচ্ছি। অলৌকিক শব্দটা আমরা প্রায়শই শুনে থাকি এবং নানা প্রসঙ্গে ব্যবহারও করে থাকি। অলৌকিক অর্থাৎ এমন-কিছু যা বাস্তবজীবনে সচরাচর ঘটে না বা যা বিজ্ঞানসম্মত নয়। কিন্তু আমাদের দেশের অনেক সাধকই তাঁদের কঠোর সাধনালব্ধ বিভূতি বা অলৌকিক ক্ষমতার পরিচয় দিয়ে গেছেন। তন্ত্রমন্ত্রের কথা আপনারা সবাই শুনেছেন। আমাদের দেশের বৌদ্ধ আর হিন্দু তান্ত্রিকেরা নির্জনে এমন অনেক কিছু করতেন যা সাধারণ মানুষের জ্ঞানের বাইরে।

মিস থাম্পি একটু থামলেন। তারপর বলতে লাগলেন, অনেকের বিশ্বাস বৌদ্ধরাই আদি তান্ত্রিক।

এ নিয়ে মতভেদ থাকলেও একটা কথা মনে রাখবেন–এই তন্ত্রশাস্ত্রের উৎপত্তি হিমালয় অঞ্চলে। অর্থাৎ কৈলাস, চীন, নেপাল, তিব্বত প্রভৃতি জায়গায়।

আমার এইসব কথা বলার উদ্দেশ্য অলৌকিকতত্ত্বে বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা বোধহয় নেপাল, তিব্বত, ভুটানেই বেশি। এই অলৌকিকতত্ত্বের মধ্যে প্রেততত্ত্বও জড়িয়ে আছে।

দুঃখের বিষয় অলৌকিকতত্ত্ব ও প্রেততত্ত্ব এখন ভয়-পাওয়ানো গাঁজাখুরি গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারও একটা কারণ বোধহয় এই যে, মানুষ ভয় পেতেও চায়। অশরীরী আত্মা আর তথাকথিত ভূত-প্রেত এক কথা নয়। কিন্তু সেকথা সাধারণ মানুষকে বোঝান যায় না। অশরীরী আত্মার অস্তিত্ব আছে। অনেকেই তা প্রত্যক্ষ করেছে। এমনকি তাদের কথা বলতেও শুনেছে। আশ্চর্য নয় কি? দ্বন্দ্ব এখানেই, আমি বলব আত্মা শরীর ধারণ করতে পারে–যে শরীর দেখা যাবে কিন্তু স্পর্শ করা যাবে না–যে শরীর কোনো চিহ্ন রেখে যেতে পারে না। ডাঃ গুপ্ত বলবেন, অসম্ভব। কিন্তু মিসেস গুপ্ত যাঁকে প্রায়ই দেখেন তিনিও যে ঐরকম কোনো শরীরী আত্মা তা আমি বিশ্বাস করি। কেননা ঐ ধরনের শরীরী আত্মার আমি প্রত্যক্ষদর্শী।

একটু থেমে বললেন, শরীর ধারণ ছাড়াও এই আত্মার আবার অন্যরকম প্রক্রিয়াও আছে। জানেন কি যোগীরা তাঁদের অসাধারণ ক্ষমতায় নিজেদের দেহ থেকে আত্মাকে কিছুকালের জন্যে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে পারতেন? সেও এক অলৌকিক ব্যাপার বিজ্ঞান যার ব্যাখ্যা করতে পারেনি।

মিস থাম্পি রীণার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ঘুম পাচ্ছে?

রীণা তাড়াতাড়ি সোজা হয়ে বসে বলল, না। আপনার কথা শুনতে বেশ ভালোই লাগছে।

মিস থাম্পি হেসেই বললেন, ধন্যবাদ।

বেশ, তাহলে প্রথমে যোগীদের দেহ থেকে আত্মাকে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন করার একটা গল্প বলি। বলে সঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন।

সঞ্জয় চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে বললে, চালিয়ে যান।

–অনেক দিন আগের কথা। এক ইংরেজ দম্পতি ভারতে কার্যরত থাকাকালীন বায়ুপরিবর্তনের জন্যে সিমলা পাহাড়ে গিয়েছিলেন। ইংরেজ ভদ্রলোক ছিলেন বৃটিশ-ভারতের একজন উচ্চপদস্থ অফিসার। দেশ তার ইংলন্ডে।

সিমলায় আসবার আগেই মেমসাহেবের শরীর খারাপ হয়েছিল। অল্প অল্প জ্বর হতো। সেটা খুব খারাপ লক্ষণ। সিমলাতে চেঞ্জে এসেও শরীর ঠিকমতো সারল না।

এই সময়েই আবার এক দুঃসংবাদ এল, সাহেবের বাবা লন্ডনে মারা গেছেন। সেই খবর পেয়েই সাহেব চলে গেলেন। মেমসাহেব শরীর খারাপের জন্যে যেতে পারলেন না।

লন্ডনে পৌঁছে সাহেব নিয়মিত চিঠি দিয়ে স্ত্রীর খবর নিতেন। প্রতি চিঠিতেই আশ্বাস শীগগিরই যাচ্ছি।

মেমসাহেব পথ চেয়ে থাকেন। কিন্তু বেশ কিছুকাল হয়ে গেল–স্বামী আর ফেরেন না। চিঠিপত্রও পান না। তার মন খুব খারাপ।

একদিন ভোর রাত্রে মেমসাহেব ঘুমের মধ্যে কেঁদে উঠলেন। ঘরে তাঁর যে খাস-পরিচারিকা ছিল সে ইংরেজ রমণী। তাড়াতাড়ি মেমসাহেবের ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, কি হয়েছে?

মেমসাহেব পরিচারিকার সামনে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করে ফেলার জন্যে লজ্জিত হলেন। বললেন, স্বপ্ন দেখছিলাম সাহেব কঠিন রোগে মৃত্যুশয্যায়। তাই তিনি আসতে পারছেন না।

মেমসাহেব খাঁটি ইংরেজ মহিলা। তাই স্বপ্নকে স্বপ্ন বলেই মেনে নিলেন। গুরুত্ব দিলেন না।

কিন্তু গুরুত্ব না দিলেও তার মনটা অত্যন্ত ভার হয়ে রইল।

মেমসাহেবের অন্য যে দাসী, সে ছিল তিব্বতীয়। মনিবের মন খারাপ তারও দৃষ্টি এড়ায়নি। রোজই দেখে–আর ভাবে মেমসাহেবকে জিজ্ঞেস করবে কি হয়েছে। কিন্তু জিজ্ঞেস করতে সাহস পায় না। শেষে খাস পরিচারিকাকে জিজ্ঞেস করে কারণটা জানতে পারল। তখন সে সসংকোচে তাকে বলল, মেমসাহেব যদি চান তাহলে সাহেবের খবর আজকের মধ্যেই আনিয়ে দিতে পারি।

খাস-পরিচারিকা অবাক হয়ে বলল, কি করে?

 তিব্বতী দাসী তখন তাকে তার উপায়ের কথা জানাল।

ইংরেজ দাসী তা পুরোপুরি বিশ্বাস না করলেও এ দেশের অনেক ভোজবাজির কথা ছোটোবেলা থেকে শুনেছে। তাই তিব্বতীর কথা একেবারে উড়িয়ে না দিয়ে মেমসাহেবকে বলল। মেমসাহেব তখনই তিব্বতী দাসীকে ডেকে পাঠালেন। দাসী এলে তাকে বললেন, তুমি যে লোকটির কথা বলছ সে কি করে? কোথায় থাকে?

দাসী বিনীতভাবে জানালো যে, যাঁর কথা সে বলছে তিনি একসময়ে লামা সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন। কি কারণে যেন তিনি সেই পদ ছেড়ে দিয়ে এখন লোকচক্ষুর অন্তরালে একটা পাহাড়ের নিচে আত্মগোপন করে থাকেন।

মেমসাহেব সকৌতূহলে জিজ্ঞেস করলেন, আত্মগোপন করে কেন?

 দাসী বললে, তিনি এক বিশেষ সাধনায় সিদ্ধ বলে ঈর্ষাকাতর অন্য দল তাকে মেরে ফেলতে চায়।

শুনে মেমসাহেব স্তম্ভিত হয়ে গেলেন।

—সত্যিই তিনি এত গুণী লোক?

— মেমসাহেব, আমি নিজে চোখে তার সেই গুণ দেখেছি।

–কিন্তু তুমি যা বলছ তাতে তো মনে হচ্ছে তাকে খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। আর–পেলেও হয়তো আসতে চাইবেন না।

দাসী অন্যমনস্কভাবে বলল, আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি। যদি পাওয়া যায় তাহলে আজই উনি সাহেবের খবর এনে দেবেন।

মেমসাহেব জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় কত দূরে–কোন পাহাড়ের নিচে উনি থাকেন?

দাসী বলল, এখান থেকে ক্রোশ তিন দূরে–ঐ যে ধোঁওয়ার মতো তিনচূড়ো পাহাড়টা দেখা যাচ্ছে ওরই কাছে উনি থাকেন।

মেমসাহেব বললেন, উনি যদি তোমার কথায় আসতে না চান–আমি কি গিয়ে request করব?

দাসী বলল, তার দরকার হবে না। তাছাড়া পথ দুর্গম। গাড়ি চলবে না। আপনার পক্ষে হেঁটে যাওয়াও সম্ভব নয়।

মেমসাহেব চুপ করে রইলেন। দাসী বলল, আর তার কাছে যেতে হলে যেতে হবে গোপনে। কেননা তার শত্রুরা তাঁকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।

শুনে মেমসাহেব হতাশ হয়ে পড়লেন। তখন দাসী বলল, আপনি অনুমতি করলে আমি নিজে গিয়ে একবার চেষ্টা করতে পারি।

মেমসাহেব সানন্দে অনুমতি দিলেন।

পরের দিন ভোরবেলায় তিব্বতীয় দাসীটি লামার খোঁজে বেরিয়ে গেল। আর সন্ধেবেলা ফিরল লামাকে নিয়ে।

লামা এসেছে শুনে মেমসাহেব খুশি মনে দোতলা থেকে নেমে এলেন। কিন্তু লামার চেহারা দেখে তার ভক্তি হল না। যেমন আমাকে দেখে আপনাদের হয়েছে। বলে মিস থাম্পি একটু হাসলেন।

–যাক, যে কথা বলছিলাম। মেমসাহেব দেখলেন লোকটি বৃদ্ধ। মাথায় দীর্ঘ পাকা চুল, পাতলা পাকা গোঁফ দাড়ি। হাত, পা শীর্ণ। দেহ তো নয়, যেন একখানা কংকাল। দুই চোখ কোটরাগত। চোখের নিচে কালি পড়েছে। তার সারা মুখের চামড়া কুঁচকানো। গলায় নীল পাথরের একটা মালা। অমন গাঢ় নীল পাথর মেমসাহেব কখনো দেখেননি।

লোকটি এমন ক্ষীণ স্বরে জড়িয়ে জড়িয়ে কথা বলছিল যে মেমসাহেব তার একবর্ণও বুঝতে পারছিলেন না। যাই হোক সেই তিব্বতী দাসীর সাহায্যে কথাবার্তাটা এইরকম হল

মেমসাহেব বললেন, শুনেছি আপনার নাকি এমন ক্ষমতা আছে যে আপনি এখানে বসেই বহুদুরের খবর এনে দিতে পারেন। তাই যদি হয় তাহলে আপনি দয়া করে আমার স্বামীর খবর জানান। তিনি এখন লন্ডনে আছেন। বেশ কিছু দিন খবর পাচ্ছি না। স্বপ্নে দেখলাম তিনি নাকি শয্যাশায়ী। আমি খুবই দুশ্চিন্তায় আছি।

লামা পথশ্রমে ক্লান্ত বলে সেদিনটা বিশ্রাম করে পরের দিন খবর এনে দেবার প্রতিশ্রুতি দিলেন।

কিন্তু মেমসাহেব আর এক দণ্ডও অপেক্ষা করতে চাইলেন না। অগত্যা বৃদ্ধ লামাকে সম্মত হতে হল। তখন শ্রাবণ মাসের বেলা প্রায় শেষ। লামা প্রথমে আনুষঙ্গিক কতকগুলি কাজ শেষ করে নিয়ে সাহেবের ঠিকানা জেনে নিলেন। আর তার একটা ছবি দেখে নিলেন। তারপর খালি গায়ে মাটিতে শুয়ে পড়ে বললেন, আমি আপনার স্বামীর খবর আনতে চললাম। আমার দেহ এখানে পড়ে রইল। যদি বাধা-বিঘ্ন না ঘটে তাহলে এক ঘণ্টার মধ্যেই ফিরে আসব। তবে একটা অনুরোধ–আমার জীবন-মরণের সব দায়িত্ব আপনাকে নিতে হবে।

মেমসাহেব চমকে উঠলেন।-কেমন করে?

 লামা বললেন, আমার দেহ যেন কেউ স্পর্শ না করে, এইটুকু দেখবেন।

–নিশ্চয় দেখব। মেমসাহেব প্রতিশ্রুতি দিলেন।

–আরও একটি কথা–আমি যখন এখানে আসছিলাম, বুঝতে পারছিলাম আমার শত্রুরা আমায় অনুসরণ করছে। তারা হয়তো একটু পরেই এখানে এসে হানা দেবে। আমার দেহটা কেড়ে নিয়ে যেতে চাইবে। আপনি দয়া করে বাধা দেবেন। কথা দিন–পারবেন তো?

মেমসাহেব ইংরেজরমণী। অসুস্থ হলেও তাঁর মনের জোর ছিল অসাধারণ। সব দিক ভেবে নিয়ে বললেন, ঠিক আছে। দায়িত্ব নিলাম। আপনি নিরুদ্বেগে গিয়ে আমার স্বামীর খবর নিয়ে আসুন।

এই অঙ্গীকার পেয়ে লামা যোগনিদ্রায় সমাহিত হলেন। সকলেই দেখলেন লামার অসাড় দেহটা মাটিতে পড়ে আছে যেন বহুকালের পুরনো শুকনো একটা মৃতদেহ।

এই সময়ে তিব্বতী দাসীর খেয়াল হল নিচের দরজাটা বোধহয় ভোলাই থেকে গিয়েছে। সে নিজেই দেখতে যাবে ভাবছিল কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক লামার দেহ ছেড়ে নিচে যেতে মন চাইল না। তখন সে দরজা বন্ধ করার কথা ইংরেজ পরিচারিকাটিকে নিচু গলায় বলল।

ইংরেজ পরিচারিকা যাচ্ছি বলেও সকৌতূহলে লামার নিঃসাড় দেহের দিকে তাকিয়ে রইল। যাবার কথা ভুলে গেল।

আধঘণ্টাও হয়েছে কি না সন্দেহ হঠাৎ নিচে একটা গোলমাল শোনা গেল। কারা যেন দারোয়ান-বেয়ারা-বাবুর্চিদের ঠেলে জোর করে ওপরে উঠে আসতে চাইছে।

মেমসাহেব বিচলিত হলেন। কিসের এত গোলমাল? তিনি ইংরেজ দাসীকে ব্যাপারটা কি জেনে আসবার জন্যে পাঠালেন। ইংরেজ দাসী ব্ৰস্তপদে নিচে নেমে গেল। কিন্তু পাঁচ মিনিট যেতে-না-যেতেই ছুটতে ছুটতে এসে জানালো একদল জংলী জোর করে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়েছে। তারা লামাকে চায়।

-কেন? মেমসাহেবের ভুরুতে ক্রোধের প্রকাশ ফুটে উঠল।

 ইংরেজ দাসী উত্তর দেবার আগেই মেমসাহেব দেখলেন কয়েকজন তিব্বতী জংলী দোতলায় উঠে হৈ হৈ করে ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে।

মেমসাহেব রাগে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠলেন–Who are you? What makes you to come here?

তারা মেমসাহেবের কথা বুঝল না। বুঝতে চাইলও না। তাদের সকলের দৃষ্টি তখন লামার দেহের ওপর। বাড়িতে তেমন লোকজন নেই যে সেই উন্মত্ত লোকগুলোকে বাধা দেয়। জংলী লোকগুলো বোধহয় তা বুঝতে পেরেছিল। তাই তারা নির্ভয়ে ঘরের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।

ইংরেজ দাসী তখন ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। সে পুলিশ ডাকার জন্যে জানলার দিকে ছুটে যাচ্ছিল, মেমসাহেব তাকে আটকালেন। কঠিন স্বরে বললেন, চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকো।

তারপর এক মিনিটের মধ্যে ছুটে গিয়ে ড্রয়ার থেকে গুলিভরা রিভলভারটা এনে দুবার ফায়ার করলেন। সঙ্গে সঙ্গে লোকগুলো যে যেদিকে পারল পালালো।

-যাও! দরজা লাগিয়ে এসো। বলে মেমসাহেব ইজিচেয়ারে বসে হাঁপাতে লাগলেন। তার শরীর একেই দুর্বল, তার ওপর এই উত্তেজনা। রিভলভারটা কিন্তু তখনো তার হাতের মুঠোয়।

তিব্বতী দাসী তখনও লামার দেহের ওপর–তাকে স্পর্শ না করে দুহাত দিয়ে আগলে বসে ছিল।

এবার সে উঠে নিজের জায়গায় গিয়ে বসল।

আরো আধঘণ্টা পরে লামার দেহটা একটু নড়ল। তারপর ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালেন।

মেমসাহেব আনন্দে লামার ওপরে ঝুঁকে পড়লেন। লামা ইশারায় একটু জল খেতে চাইলেন। মেমসাহেব তিব্বতী দাসীকে জল দিতে বললেন।

জল খেয়ে সেই লামা যোগী আস্তে আস্তে উঠে বসলেন। তারপর তার সেই ক্ষীণ স্বরে বললেন, আপনার স্বামী ভালোই আছেন। দেখলাম জিনিসপত্র গোছগাছ করছেন। বোধহয় আজ-কালের মধ্যেই এখানে আসার জন্যে রওনা হবেন।

শুনে মেমসাহেব আনন্দে কিছুক্ষণ চোখ বুজিয়ে রইলেন।

তারপর লামা ধীরে ধীরে তাঁর ঘরের বর্ণনা দিলেন। শুনতে শুনতে মেমসাহেব তো অবাক। শেষে লামা বললেন, তবে আপনার বাড়ির দক্ষিণদিকে যে সুন্দর বাগানটা ছিল সেটা সম্প্রতি ঝড়ে তছনছ হয়ে গেছে।

বাগানটাও যোগীর চোখে পড়েছে তা হলে! মেমসাহেব মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।

লামা সেই রাত্তিরেই চলে যেতে চাইলেন। কিন্তু মেমসাহেব যেতে দিলেন না। পরের দিন অতি প্রত্যূষে যাবার সময়ে লামা মেমসাহেবের দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। মেমসাহেবও চোখ নামাতে পারেননি।

মিনিট দুয়েক পরে লামা বললেন, আপনি এখন রোগমুক্ত। বলে দরজার দিকে পা বাড়ালেন। মেমসাহেব তাঁকে পুরস্কৃত করতে চাইলেন। কিন্তু তিনি কিছুই নিলেন না।

মেমসাহেব নিজের মনেই শুধু বললেন- am grateful to you Indian yogi–I am grateful.

পরের দিনই সাহেবের চিঠি এল। লিখছেন–একটা মিথ্যে মামলায় জড়িয়ে পড়েছিলাম। যাই হোক ঈশ্বরের কৃপায় এখন আমি বিপন্মুক্ত। রওনা হচ্ছি।

পুনশ্চ দিয়ে লিখেছেন-খুব আশ্চর্য ব্যাপার হঠাৎ কাল আমার ঘরের সামনে একজন ইন্ডিয়ান যোগীকে দেখলাম। তারপরেই অদৃশ্য। সম্ভবত আমার চোখেরই ভুল।

মিস থাম্পি তার কথা শেষ করে একটু থামলেন। তার পর জল খেয়ে রুমালে মুখ মুছলেন।

–এ কাহিনী আপনাদের শোনাবার উদ্দেশ্য এটাই বোঝানো যে, এও এক ধরনের অলৌকিক ক্রিয়া। কিন্তু এটা ম্যাজিক বা যাদু নয়। এ যোগসাধনা। এই যোগের দ্বারাই আপনি এই মুহূর্তে কী ভাবছেন তা বলে দেওয়া যায়। এই যোগের দ্বারাই আগামী চাব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আপনার জীবনে উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা ঘটবে কি না জানানো যায়। কঠিন ব্যাধির কারণ ও উৎপত্তিস্থল ধরা যায়।

এই যোগ যাঁর আয়ত্ত তিনি তেমন-তেমন বাড়িতে ঢুকেই বলতে পারেন সেখানে কোনো অশরীরী আত্মার আবির্ভাব ঘটে কিনা। বিজ্ঞানে কিন্তু এর ব্যাখ্যা মেলে না।

অশরীরী আত্মার টের পাওয়া যায়–মিস থাম্পির এই কথায় সকলেই যেন একটু বিচলিত হল।

একটু থেমে মিস থাম্পি বললেন, এরকম অনেক তথ্য রবার্ট ডাল আওয়েল-এর Foot falls on the Boundary of Another World বইটিতে পাওয়া যায়। পুরনো কোনো বড়ো লাইব্রেরিতে খোঁজ করে দেখতে পারেন–of course should you be so interested.

মিস থাম্পি থামলেন। ঘড়ির দিকে তাকালেন। সাড়ে বারোটা।

গল্পে গল্পে অনেক রাত হয়ে গেছে। মিস থাম্পি বললেন, তাহলে এবার শুতে যাওয়া যাক?

মান্তু বলল, কিন্তু আপনি ভুটানে কেন যাচ্ছেন বললেন না তো?

–শুনতে চান?

 –নিশ্চয়ই। মান্তু আর রীণা দুজনেই উৎসাহে বলে উঠল।

 –আপনি? মিস থাম্পি সহাস্যে সঞ্জয়ের দিকে তাকালেন।

 সঞ্জয় সলজ্জভাবে বলল, আমার বড় ঘুম পাচ্ছে। কাল সকালেই তো আবার ছুটতে হবে।

রীণা বলল, তুমি তবে ওঘরে গিয়ে শোও গে।

 সঞ্জয় অবশ্য গেল না। আপাদমস্তক চাদর মুড়ি দিয়ে চোখ বুজে বসে রইল।

 মিস থাম্পি বললেন, বিস্তৃত করে বলতে গেলে রাত শেষ হয়ে যাবে। সংক্ষেপে বলি।ভুটানে যাচ্ছি সেখানকার একটি মেয়েকে স্টাডি করতে। ডাঃ কুমার আমার খুব পরিচিত। তিনি সম্প্রতি সাদার্ন ভুটানের ডিস্ট্রিক্ট টাউন সারভং-এ গিয়েছেন সেখানকার হাসপাতালের এম. ও. হয়ে। ওখান থেকে তিনি আমায় কয়েকখানা চিঠি লিখেছেন।

ডাঃ কুমার ওখানে কোয়ার্টারে একা থাকেন। রাঁধা-বাড়া করার জন্যে উনি একটি লোক খুঁজছিলেন। অনেক কষ্টে একটি মেয়ে পান। মেয়েটির নাম সুখমতী। বয়েস উনিশ-কুড়ি। মেয়েটি কথা বলে না। কিন্তু সে বোবা নয়। কেননা সে শুনতে পায়। মেয়েটির কোনো অভিব্যক্তি নেই। শুধু যন্ত্রের মতো কাজ করে যায়। সে সারাদিন কোয়ার্টারে থাকে। কিন্তু ঠিক রাত নটা বাজলেই সে বাড়ি চলে যায়। ব্যতিক্রম হয় না।

ডাঃ কুমার হুঁশিয়ার লোক। তিনি যখনই কোনো কাজের লোক লাগান তখনই তার ঠিকানা নিয়ে রাখেন। সুখমতীরও ঠিকানা নিয়েছিলেন।

এদিকে সুখমতী কাজে লাগার দু দিন আগে পাহাড়তলীতে একটা জিপ অ্যাকসিডেন্ট হয়। সেটাও নাকি অদ্ভুত ঘটনা। যাই হোক, জিপে যে-সব লোক ছিল তারা সবাই ঘেঁৎলে মরে যায়। ওদের মধ্যে একটি যুবতী মেয়ে ছিল। তার লাশ কিন্তু পাওয়া যায়নি। অথচ সেই নিদারুণ অ্যাকসিডেন্ট থেকে কেউ যে বেঁচে পালাবে তাও নাকি অসম্ভব।

যাই হোক, সেদিনের মতো লাশ তিনটে হাসপাতালের ল্যাবরেটরি-ঘরের কাছে রাখা হয়।

একদিন হাসপাতালের দারোয়ান দীন বাহাদুর ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ডাঃ কুমারকে বলল, সাব, বক্সী!

–ওদেশে ভূতকে বক্সী বলে।

ডাঃ কুমার অবাক হয়ে বললেন, বক্সী! কোথায়?

দীন বাহাদুর বলল, ল্যাবরেটরির পাশে যে ঘরে লাশ ছিল সেখানে।

তার বক্তব্য–রাত্রে পাহারা দিতে দিতে ও একটা শব্দ শুনে লাশ-ঘরের দিকে যায়। সেখানে একটা গোঙানি শুনতে পায়। কৌতূহলী হয়ে জানলার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে যেখানে তিনটে লাশ ছিল সেখানে একটা মেয়ে শোবার জায়গা করে নিতে চাইছে। কিন্তু যেন কিছুতেই জায়গা পাচ্ছে না। মেয়েটার গায়ে জামা-কাপড় কিছুই ছিল না।

তারপর যে কথাটা দীন বাহাদুর নাকি এতটুকু ইতস্তত না করেই বলে ফেললে তা এই যে–সে মেয়েটি সুখমতী ছাড়া আর কেউ নয়।

ডাক্তার কুমার তো চমকে উঠলেন। তিনি অবিশ্বাস করলেন। দীন বাহাদুর হলপ করে বলল, সে খুব ভালো করে নজর করে দেখেছে সে সুখমতীই।

ডাক্তার কুমার তবু যখন বিশ্বাস করতে চাইলেন না তখন দীন বাহাদুর বলল, ঠিক আছে আজই দেখা যাক, সুখমতী রাত্তিরে কি করে।

সেদিনও সুখমতী ঠিক রাত নটায় কাজ সেরে চলে গেল। দীন বাহাদুর তখন ডাক্তার কুমারের কোয়ার্টারে। সুখমতী যখন চলে যাচ্ছে দীন বাহাদুর তখন ফি ফিস্ করে বলল, সাব, দেখুন ওর হাঁটাটা কি রকম।

ডাঃ কুমার এতদিন লক্ষ্য করেননি। আজ দেখলেন–হ্যাঁ, হাঁটাটা একটু অস্বাভাবিক। কেমন যেন লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছে। আর সেই সঙ্গে তার লম্বা হাত দুটো যেন বড্ড বেশি দুলছিল।

রাত দুটোয় ডাক্তারকে নিয়ে দীন বাহাদুর সুখমতীর ঠিকানা খোঁজ করতে বেরোল। বেরোবার আগে একটুকরো ন্যাকড়া ডাক্তারের হাতে দিয়ে বলল, এটা সঙ্গে রাখুন সাব। অনিষ্ট করতে পারবে না।

অনেক খোঁজাখুঁজির পর যে ঠিকানাটা ওরা খুঁজে পেল সেটা একটা ভাঙা ঘর, একেবারে লোকালয়ের বাইরে।

সুখমতী–সুখমতী করে ডাক্তার ডাকাডাকি করলেন। কিন্তু কারো সাড়া পেলেন না। তখন দুজনে দুটো টর্চ জ্বেলে ভেতরে ঢুকলেন। কেউ কোত্থাও নেই। শুধু সুখমতীর ছাড়া কাপড়টা পড়ে আছে।….

এই পর্যন্ত বলে মিস থাম্পি থামলেন।

–খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার। এ বিষয়ে আপনার কি মনে হয়? মান্তু জিজ্ঞেস করল।

–আগে ভুটানে গিয়ে সুখমতাঁকে দেখি। নিজে না দেখে, না কথা বলে আমি কোনো কমেন্ট করব না। তবে আমার শুধু একটাই জানার আছে–সুখমতী কেন চাকরি নিল? কেন ডাক্তার কুমারের কাছেই? কিন্তু আর নয়। এবার সবাই শুয়ে পড়ুন।

.

শীতের রাত। গোটা শহর যেন কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছে। সামনে যশোর রোড যেন দেহ প্রসারিত করে একটু বিশ্রাম নিচ্ছে। ওদিকে সঞ্জয় বসে বসেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছে। মাথাটা হেলে পড়েছে চেয়ারে। শুধু এরা তিন জনই জেগেছিল এতক্ষণ।

এই সময়ে হঠাৎ পুপু কেঁদে উঠল। সেই মর্মান্তিক যন্ত্রণায় কেঁদে ওঠা। রীণা চমকে উঠে ছুটে গিয়ে পুপুকে বুকে তুলে নিল। ঘুম ভেঙে গেল সঞ্জয়ের। লাফিয়ে ছুটে গেল পুপুর বিছানায়। এ কান্না যে তাদের চেনা।

মান্তু কি হল? কি হল? বলে রীণার কাছে গিয়ে বসল। শুধু মিস থাম্পি স্থির হয়ে বসে পুপুর দিকে তাকিয়ে রইলেন।

কান্না থামে না। দেখতে দেখতে পুপুর সমস্ত মুখটা যেন কি রকম হয়ে গেল। রীণা আর্তস্বরে বলে উঠল কী হবে? কান্না থামছে না যে?

রীণা জানে, এ কান্না থামাবার সাধ্য ডাক্তারের নেই।

মিস থাম্পি উঠে দাঁড়ালেন। একবার ভুরু কুঁচকে খোলা দরজা দিয়ে সিঁড়ির দিকে তাকালেন। তারপর গায়ের চাদরটা ফেলে দিয়ে পুপুর কাছে এগিয়ে গেলেন। পুপু তখন কাঁদতে কাঁদতে ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছে। রীণা পাগলের মতো মিস থাম্পির হাত দুটো চেপে ধরে কেঁদে উঠল। কী হবে? এমন করে তো ও কখনো কাঁদে না।

সেই অশরীরীর আবির্ভাব হলেই যে পুপু কেঁদে ওঠে, মিস থাম্পি আগে তা শুনেছিলেন। তিনি একদৃষ্টে কিছুক্ষণ পুপুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার পর আস্তে আস্তে একবার তার গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন। রীণাকে বললেন, তুমি এবার ওকে বুকে তুলে নাও।

–ও ঘুমোত পারবে না। দেখছেন না–

–আমি বলছি, ঘুমোবে। তুমি বুকে নাও। আদেশের সুরে বললেন মিস থাম্পি।

রীণা পুপুকে বুকের কাছে টেনে নিতেই পুপুর কান্না আস্তে আস্তে থেমে গেল। তারপর পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ল।

এবার মিস থাম্পি উঠে দাঁড়ালেন। স্থির গম্ভীর স্বরে বললেন, সে বোধহয় এসেছে। আপনারা তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ুন।

সঞ্জয়ও কেমন যেন চঞ্চল হয়ে উঠল। কিন্তু সে যে আজ কোথায় শোবে ভেবে পেল না।

মিস থাম্পি বললেন, শোবার ব্যবস্থা আমিই করে দিচ্ছি।

-বাইরের ঘরে এই ডিভানে মিসেস গুপ্ত যেমন বাচ্চাকে নিয়ে শুয়েছেন শোন। আপনি শোন মেঝেতে এইখানে। বলে মান্তুকেও জায়গা নির্দেশ করে দিলেন।

–ডাঃ গুপ্ত, আপনি প্লিজ চলে যান ভেতরের ঘরে। নিশ্চিন্তে ঘুমোন গিয়ে।

–আপনি?

মিস থাম্পি একটু হাসলেন।–আমি শোব না। বসে থাকব সিঁড়ির মুখে। আজকের রাতের মতো আমার কথা অনুগ্রহ করে শুনবেন। বলে নিজেই একটা চেয়ার টেনে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

অনেকক্ষণ পর্যন্ত কেউই ঘুমোত পারল না। কিসের যেন দুঃসহ প্রতীক্ষা। তারপর একসময়ে সকলেই ঘুমিয়ে পড়ল।

.

সবার আগে ঘুম ভাঙল মান্তুর। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রীণার। দুজনেই একবার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। রাত্তিরটা তাহলে নিরাপদেই কেটেছে।

সঞ্জয় তখনো ঘুমোচ্ছ। কিন্তু মিস থাম্পি? তিনি কি এখনও বাইরে বসে আছেন?

তাড়াতাড়ি এরা দুজনে বাইরে বেরিয়ে এল। দেখল মিস থাম্পি নেই। শূন্য চেয়ারটা শুধু পড়ে রয়েছে।

দুজনের মুখ শুকিয়ে গেল।

–উনি কোথায় গেলেন? মান্তুর গলার স্বর ভয়ে কাঁপছে।

–তাই তো। বলেই রীণা সঞ্জয়কে ঘুম থেকে তুলে সব কথা বলল। সঞ্জয় ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে এল।

তখনো ভোর হয়নি। শীতের কুয়াশায় চারিদিক পর্দাটাকা। বাড়ির অন্যান্য ভাড়াটেরা তখনো সুখনিদ্রায় নিশ্চিন্ত।

সঞ্জয় কি করবে ভাবছে। এমনি সময়ে সিঁড়িতে হালকা চটির শব্দ। মিস থাম্পি ওপরে উঠে আসছেন।

বাবাঃ! এই কুয়াশায় কোথায় গিয়েছিলেন?

 মিস থাম্পি হেসে বললেন, প্রাতঃভ্রমণে। কম্পাউন্ডের মধ্যেই ঘুরছিলাম। বেশ পুরনো আমলের বাড়ি। ফোয়ারার সামনে যে স্ট্যাচুটা–সেটা কোনো অবস্থাপন্নরই কীর্তি। তাঁর রুচিটা পবিত্র ছিল না। চলুন ভেতরে গিয়ে বসি। একটু গরম কফি খাব।

কফি খেতে খেতে সকলেই উদগ্রীব হয়ে মিস থাম্পির দিকে তাকিয়ে রইল কিছু শোনার অপেক্ষায়। কিন্তু মিস থাম্পি একটি কথাও বললেন না।

কফি খাওয়া শেষ হলে মাকে বললেন, এবার আমাদের যেতে হবে।

সঞ্জয় আর থাকতে পারল না। বলল, কিন্তু কাল রাত্তিরের experience তো কিছু বলছেন না।

বললে কি আপনি বিশ্বাস করবেন?

মিস থাম্পি একটু হাসবার চেষ্টা করলেন।

–শুনতে দোষ কি?

–তবে শুনুন। একটা প্রতিহিংসাপরায়ণ হিংস্র আত্মা এ বাড়িতে আছেই। সে ক্ষতি না করে যাবে না। এর চেয়ে বেশি কিছু জানতে চাইবেন না। প্রমাণ দিতে পারব না।

–তাহলে, আপনি বলছেন রীণা যা দেখে তা ঠিক?

–হ্যাঁ। অবশ্যই।

—প্রকিার?

–আমার মনে হয় বাড়িটা ছেড়ে দেওয়াই ভালো।

 সঞ্জয় মাথা নেড়ে বলল, কিন্তু সে কি করে সম্ভব? আমি নিজে ডাক্তার। বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়া অশরীরী আত্মার অস্তিত্ব মানতে পারি না।

মিস থাম্পি তার বিশেষ হাসিটি একটু হাসলেন। কিছু বললেন না।

আধ ঘণ্টার মধ্যেই মান্তু আর মিস থাম্পি প্রস্তুত হয়ে নিল। যাবার সময়ে মিস থাম্পি বললেন, ডাঃ গুপ্ত, আপনার সংস্কারমুক্ত মন আর সাহসের প্রশংসা করি। কিন্তু আমার একটা কথা মনে রাখবেন–যদি দেখেন আপনার ছেলেটি ক্রমশই অসুস্থ হয়ে পড়ছে তা হলে তদ্দণ্ডেই বাড়ি ছেড়ে দেবেন। লে হাতে ব্যাগটা তুলে নিয়ে নিচে নামতে লাগলেন।

রীণা বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

.

১৪.

সঞ্জয়ের চ্যালেঞ্জ

কদিন হল মিস থাম্পি চলে গিয়েছেন। মান্তুর সঙ্গেও যোগাযোগ নেই। রীণার মনটা তাই একটু খারাপ ছিল। দুঃসময়ে নিজের লোক ছাড়াও প্রকৃত বন্ধুর সান্নিধ্য যে কত দরকার হয় মান্তুকে পেয়ে রীণা তা বুঝতে পেরেছে।

বেলা তখন চারটে। পুপুটা কদিন ধরে ঘ্যানঘ্যান করছে। শীতটাও বেশ জোরে পড়েছে। বিকেলবেলায় কখনো কখনো পুপুকে নিয়ে রীণা নিচে কম্পাউন্ডে নেমে আসে। কম্পাউন্ডে বেশি ভিড় থাকলে নিচে নামে না। সংকোচ হয়। তার যেন মনে হয় সবাই তাকে একরকমভাবে দেখছে। তাই নিজেকে মনে হয় যেন তাদের কাছে অতিপ্রাকৃত জগতের কেউ। তাই সে অনেক সময়ে পুপুকে নিয়ে তিনতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকে।

এদিনও দাঁড়িয়ে ছিল। মিনিট দশেক হল লোডশেডিং শুরু হয়েছে। এই এক অসহ্য ব্যাপার। রীণার কাছে আবার শুধুই অসহ্য ব্যাপার নয়, ভীতির কারণ।

নিচে ছেলেরা খেলা করছে, বৃদ্ধরা বেঞ্চিতে বসে নিশ্চিন্ত মনে সম্ভবত সাংসারিক বিষয় নিয়ে গল্প করছে। বন্দনার মা কোথায় বেরিয়েছিলেন, কিছু জিনিস কিনে রিকশা থেকে নামলেন।

আচ্ছা, মিস থাম্পি যে এসে এক রাত এখানে কাটিয়ে গেলেন বন্দনা বা বন্দনার মা কি তা জানেন?

জানলেও এঁদের সেরকম গায়ে-পড়া কৌতূহল নেই। এটা অবশ্য ভালোই।

বড়ো অদ্ভুত মহিলা মিস থাম্পি। প্রথম যেদিন রীণা ওঁকে দেখে সেদিন ভালো লাগেনি। কিন্তু এ বাড়িতে তাঁকে খুবই ভালো লাগল।

মিস থাম্পি এ বাড়ি সম্বন্ধে কি যেন বললেন? ছেড়ে দেওয়াটাই উচিত। একদিক দিয়ে সে খুশি। আর যাই হোক তার মানসিক রোগ হয়নি। এত দিন তাহলে যা দেখেছে, যা বলেছে সব সত্যি। সঞ্জয় কি এবার তা বুঝতে পেরেছে? তাহলে কি আর একদিনও এ বাড়িতে থাকা উচিত? মিস থাম্পির কথায়–evil spint আছে যে দুরাত্মা হিংস্রকুটিল। শাসিয়ে যায়।

রীণার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। ঠিক তখনই হঠাৎ পুপু কেঁদে উঠল আবার।

রীণা ভোলাতে লাগল, না না, কান্না কেন বাবুসোনা? ওই দ্যাখো ছেলেরা কেমন বল খেলছে। তুমিও বড়ো হয়ে বল খেলবে। তোমার বাপী তোমায় বল কিনে দেবে–সুন্দর লাল বল–

পুপুর কান্না তবু থামল না। দ্বিগুণ জোরে কাঁদতে লাগল।

রীণা মনে মনে সঞ্জয়ের জন্যে ব্যস্ত হচ্ছিল। সন্ধ্যের সময়ে লোডশেডিং হলে কিছুতেই একলা থাকতে ভালো লাগে না।

কিন্তু পুপু ডুকরে ডুকরে কাঁদছে কেন? বেঁকে বেঁকে যাচ্ছে। এ কান্নাটা যেন…।

রীণার বুক কাঁপতে শুরু করল। তাহলে কি এই সন্ধেবেলাতেই….

তখনই রীণার মনে হল ঘরের মধ্যে যেন কিসের চাপা শব্দ! তারপরই হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ায় ঘরের জানলাগুলো সশব্দে খুলে গেল।

ঘরের দিকে তাকাতেই রীণার মেরুদণ্ডের মধ্যে দিয়ে একটা হিমস্রোত বয়ে গেল। দেখল ঘরের মধ্যে একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলি মেঝে থেকে ক্রমাগত ওপরে উঠছে! মনে হচ্ছে নিচের তলায় যেন আগুন লেগেছে। মেঝে খুঁড়ে তারই ধোঁয়া সমস্ত ঘরটাকে গ্রাস করে ফেলছে। ধোঁয়াটা কিসের বুঝতে বুঝতেই ধোঁয়ার মধ্যে থেকে ফুটে বেরোল একটা মূর্তি। সে মূর্তি ওর চেনা। সেই কালো প্যান্ট, কোট আর টুপি। টুপিটা নেমে এসেছে আধখানা কপাল পর্যন্ত। তারপরেই মূর্তিটা দুরন্ত গতিতে ঘুরপাক খেতে লাগল।

রীণা ভয়ে কাঠ হয়ে সেই দিকে তাকিয়ে রইল।

ক্রমে মূর্তির চোখে মুখে একটা হিংস্রভাব ফুটে উঠল। রীণা স্পষ্ট বুঝতে পারল মূর্তিটা দাঁতে দাঁত চেপে কি যেন বলছে!

রীণার শুনতে ইচ্ছে করছিল না। তার এত ভয় করছিল যে সে থরথর করে কাঁপছিল। তবু ইচ্ছার বিরুদ্ধেই শোনার জন্যে কান পাততে হল। কেউ যেন হুকুম করছে–আমি যা বলি শোনো!

একটা চাপা হিসহিস্ শব্দের ভেতর দিয়ে ছেঁড়া ছেঁড়া কয়েকটা কথা বেরিয়ে এল–আগামী শনিবার…রাত দুটো…আমি আসব। তুমি যাবে…নইলে…বলেই মূর্তিটার মর্চে-ধরা লোহার শাবলের মতো দুখানা অদ্ভুত সরু সরু হাত এগিয়ে আসতে লাগল পুপুর দিকে!

পুপু তখন নেতিয়ে পড়েছে রীণার কাঁধে। মুখ দিয়ে লালা ঝরছে। কদবার শক্তিও বুঝি আর নেই।

পালাবার উপায় নেই। সামনেই মূর্তিটা দাঁড়িয়ে। রীণা ব্যালকনির ওপর ঝুঁকে পড়ল। দেখল নিচে ছেলেরা তখনো খেলা করছে, বয়স্করা গল্প করছে।

রীণা চিৎকার করে ডাকতে চাইল, কিন্তু গলা থেকে স্বর বেরোল না।

এদিকে অন্ধকার ঘরের মধ্যে থেকে সেই অদ্ভুত বিকৃত দুখানা হাত ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। হাতের চেটো দুটো অস্বাভাবিক হোট!

ঠিক সেই সময়ে একটা ট্যাক্সি এসে ঢুকল কম্পাউন্ডের মধ্যে। সঞ্জয় নামল ট্যাক্সি থেকে। ভাড়া চুকিয়ে ওপর দিকে তাকালো। লোডশেডিং। তিনতলাটা অস্পষ্ট। তবুও যা দেখতে পেল তাতেই সঞ্জয় চমকে উঠল। পুপুকে কোলে নিয়ে রীণা যেন ব্যালকনি থেকে ঝাঁপ দেবার চেষ্টা করছে! আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠল সঞ্জয়। রীণা! পড়ে যাবে–পড়ে যাবে

রীণা বুঝি মুহূর্তের জন্যে থমকে গেল। নিচে যারা ছিল সঞ্জয়ের চিৎকারে তারাও ওপর দিকে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গে সকলেই চেঁচিয়ে উঠল–গেল–গেল–গেল!

সঞ্জয় ছুটল সিঁড়ির দিকে। তিনতলায় উঠতে তিন মিনিটও লাগল না। সিঁড়ির মুখে এসে থমকে দাঁড়াল। ঘরের দরজা খোলা কেন? এমন তো কোনোদিন থাকে না।

কিন্তু সেদিকে মন দেবার সময় নেই। দৌড়ে গেল ব্যালকনির দিকে। জাপটে ধরল রীণাকে–এ কি করছিলে?

পুপুকে বুকের মধ্যে দু হাতে আঁকড়ে ধরে সেখানেই বসে পড়ল রীণা। কোনোরকমে বলল, এসেছ?

–হ্যাঁ, লোডশেডিং-এ ভয় পাবে বলে ট্যাক্সি নিয়ে চলে এলাম।

–সেটা কোথায় গেল?

 –কে? কার কথা বলছ?

রীণা আর কথা বলতে পারল না। তার অচৈতন্য দেহটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। চেঁচামেচি শুনে বন্দনার মাও উঠে এসেছিলেন। তিনি তাড়াতাড়ি পুপুকে কোলে তুলে নিলেন।

আর চাপাচাপি রইল না কিছুই। সঞ্জয়ের পিছু পিছু সকলেই ওপরে উঠে এসেছে। ঘরভর্তি লোক। অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে আছে রীণা। সঞ্জয় ওর জ্ঞান ফেরাবার চেষ্টা করছে। সকলের মুখেই চাপা প্রশ্ন–কি হল? সুইসাইড করতে যাচ্ছিলেন নাকি? কিন্তু খামোক আত্মহত্যা করতেই-বা যাবে কেন? দুটি মানুষের সংসার। অশান্তি তো কিছু নেই।

প্রায় পনেরো মিনিট পরে রীণা ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো। কিন্তু সে দৃষ্টি বড়ো স্তিমিত।

-কেমন আছ? সঞ্জয় ঝুঁকে পড়ল রীণার মুখের ওপরে। কি হয়েছিল?

ঘরসুদ্ধ সবাই রীণার দিকে তাকিয়ে।

রীণ কোনো উত্তর দিতে পারল না। কেমন একরকম শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

সঞ্জয় কিছুক্ষণ রীণাকে লক্ষ্য করল। তারপর পাল্স দেখতে লাগল। এক বার-দুবার-তিন বার। শেযে ঘড়ির কাটার সঙ্গে পা-বিট মেলাতে লাগল। ওর মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল।

একজন জিজ্ঞেস করলেন, কেমন দেখলেন?

–ভালো না। বলেই সঞ্জয় উঠে পড়ল।

 বন্দনার মা দূরে দাঁড়িয়ে পুপুকে ভোলাচ্ছিলেন। সঞ্জয় বলল, বৌদি, আপনি এখানে একটু থাকুন। আমি আপনার ঘর থেকে একটা ফোন করে আসি।

সঞ্জয়ের উদ্বেগ দেখে এবার ভিড় কমতে লাগল। সঞ্জয় নিচে নামতেই দেখল বন্দনা মুখ শুকনো করে দাঁড়িয়ে।

-কাকীমা?

–ভালো নয়। এখুনি আমায় একটা ফোন করতে হবে।

 ভাগ্য ভালো। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই লাইন পাওয়া গেল। শুধু লাইন নয়, ডাক্তার রুদ্রকেও।

সংক্ষেপে সব ব্যাপার জানিয়ে সঞ্জয় বলল, কাকাবাবু, আপনি এখুনি চলে আসুন। আমি একা ভরসা পাচ্ছি না।

.

আধ ঘণ্টার মধ্যেই ডাঃ রুদ্র এসে পড়লেন। রীণা তখনো মাটিতে চোখ বুজে পড়ে আছে।

ডাক্তার রুদ্র নাড়ী দেখলেন, প্রেসার চেক করলেন। চোখের পাতা ফাঁক করে টর্চ ফেললেন। তারপর সঞ্জয়কে জিজ্ঞেস করলেন ব্রান্ডি আছে?

সঞ্জয় মাথা নাড়ল।

–গরম দুধ?

 বন্দনার মা বললেন, আমি এনে দিচ্ছি। বলে তিনি পুপুকে নিয়ে দোতলায় চলে গেলেন।

ডাঃ রুদ্র ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালেন।

–তুমি বলছ রীণা এখান থেকে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছিল?

–হ্যাঁ। তখন লোডশেডিং–আবছা অন্ধকার, তবু আমি স্পষ্ট দেখেছি।

–কি দেখেছ?

–রীণা পুপুকে এক হাতে বুকে চেপে ধরে রেলিং-এর ওপর উঠছে।

 –তুমি ঠিক জান ঝাঁপ দিতেই যাচ্ছিল? ঝুঁকে কিছু দেখছিল না?

–হ্যাঁ, ঠিক জানি। শুধু আমি কেন নিচে যাঁরা বসেছিলেন তারা সবাই গেল গেল বলে চেঁচিয়ে উঠেছিল।

–তারপর?

তারপর আমি তাড়াতাড়ি ওপরে উঠে এলাম।

–ঘরে ঢুকলে?

 –হ্যাঁ।

দরজা বন্ধ ছিল না?

না। এটাই আশ্চর্য লাগল।

–কেন?

রীণা কখনো দরজা খুলে রাখে না।

–হুঁ, তারপর?

–আমি ছুটে ব্যালকনিতে গেলাম।

 –কি অবস্থায় দেখলে?

–ও তখন রেলিং ধরে কাঁপছিল। আমি ওকে ধরলাম।

 ডাঃ রুদ্র আরও কয়েক মিনিট ব্যালকনিতে রইলেন। তারপর বললেন, ঘরে এসো।

এরই মধ্যে বন্দনার মা গরম দুধ নিয়ে এসেছেন। সঞ্জয় বাটিটা হাতে করে রীণার কাছে গিয়ে বসল।

–দেখি, দুধটা খেয়ে নাও।

ডাঃ রুদ্র বললেন, উঠে বোসো।

রীণা মাথা নাড়ল।

 ডাঃ রুদ্র বললেন, ঠিক পারবে। উঠে বোসো।

 রীণা দুহাতে ভর দিয়ে কোনোরকমে উঠে বসল।

 ডাঃ রুদ্র বললেন, তুমি নিজে হাতে বাটিটা ধরো।

রীণার হাত কাঁপছিল তবু কোনোরকমে বাটিটা ধরল।

–খাও।

 বীণা বলল, খেতে ইচ্ছে করছে না।

–তবুও খেতে হবে।

 রীণা ধীরে ধীরে বাটিতে চুমুক দিল।

খাওয়া হলে বাটিটা মাটিতে রাখল।

 ডাক্তার রুদ্র বললেন, এবার উঠে দাঁড়াতে হবে।

 রীণা করুণ চোখে সঞ্জয়ের দিকে তাকাল।

একটু চেঁচিয়ে ডাঃ রুদ্র বললেন, ওঘরে গিয়ে বিছানার শুতে হবে তো।

রীণা বলল, পড়ে যাব।

পড়ে যাব সামান্য দুটি কথা। কিন্তু ঐ কথা দুটিতেই ডাঃ রুদ্রের দু চোখ ঝকঝক করে উঠল। যেন সঞ্জয়কে লক্ষ্য করেই নিচুগলায় বললেন–তাহলে দ্যাখো, পেশেন্ট পড়ে যেতে ভয় পায়। তারপর রীণাকে বললেন, না, পড়বে না। চেষ্টা করো। ওঠো বলছি।

–সঞ্জয়, help her বলে ডাঃ রুদ্র নিজেই রীণার পিছনে এসে দাঁড়ালেন। সঞ্জয়ের কাঁধে ভর দিয়ে রীণা গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল।

দশ মিনিট পর ডাক্তার রুদ্র সঞ্জয়কে একটা ইনজেকশান দিতে বললেন। ইনজেকশান ডাক্তার রুদ্রর কাছেই ছিল। সঞ্জয় ইনজেকশান দিল।

ডাঃ রুদ্র বললেন, এসো। বাইরের ঘরে ঘণ্টাখানেক বসা যাক। ও এখন ঘুমোক।

দুজনে বাইরের ঘরে এসে বসলেন।

–কি রকম বুঝলেন?

না, সিরিয়স কিছু নয়। হঠাৎ ভয় পেয়েছে। ইনজেকশান দেওয়া হল, ঠিক হয়ে যাবে।

সঞ্জয়ের মুখে তবু হাসি ফুটল না।

–কেন যে বার বার এমন হচ্ছে বুঝতে পারছি না।

–তোমার স্ত্রী তো আগে এমন ভয় পেত না?

 –কোনোদিন তো শুনিনি।

ডাক্তার রুদ্র চুপ করে রইলেন। একটু পরে বললেন, বাড়িটা না হয় ছেড়েই দাও।

সঞ্জয়ের ভুরুতে অসহিষ্ণুতার চিহ্ন ফুটে উঠল–আপনিও একথা বলছেন। শেষে ভূতের ভয়ে বাড়ি ছাড়ব!

ডাঃ রুদ্র একটু হাসলেন। বললেন, তোমার কথা আমি বুঝতে পারছি। ভূত না অলৌকিক কিছু, নাকি মানসিক ব্যাধি, এসব তর্কে আজ আর যেতে চাই না। এখানে থাকলে যদি ওঁর ক্ষতি হয় তাহলে এখান থেকে যাওয়াটাই যুক্তিসঙ্গত নয় কি?

কিন্তু সেদিন তো আপনিও বললেন, ও সাইকোপ্যাথিক পেশেন্ট?

 ডাঃ রুদ্র একটা চুরুট ধরালেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, এসব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত বলে কিছু নেই। আজ লক্ষণ শুনে যা মনে হবে, কাল রুগীকে দেখে অন্যরকম মনে হতে পারে।

সঞ্জয় অসহিষ্ণু ভাবে বলল, তাহলে কি মানতে হবে এ বাড়িতে আসার পরই কোনো একটি অশরীরী আত্মা কেবলমাত্র রীণার ক্ষতি করতে চাইছে। সে রীণাকে তার সঙ্গে যেতে বাধ্য করবে। But how is it possible and why? একটা অশরীরী আত্মা একটা জীবন্ত মানুষকে….

বাধা দিয়ে ডাঃ রুদ্র বললেন, না, জীবন্ত মানুষকে সে চায় না।

তার মানে ওকে মেরে ফেলবে?

–হয় তো তাই। তার সূচনাও তো আজ কিছুক্ষণ আগে দেখতে পেলে।

সঞ্জয় চুপ করে কি যেন ভাবতে লাগল।

ডাঃ রুদ্র বললেন, তুমি কি মনে কর রীণা আত্মহত্যাই করতে যাচ্ছিল?

না, কখনোই না।

ডাঃ রুদ্র একটু ভেবে বললেন, আমারও তাই মনে হয়। ওর মতো সুখী মেয়ে সুইসাইড করতে যাবে কেন?

সঞ্জয় বলল, তবে ফ্রাস্টেশানে ভুগতে ভুগতে নিজেকে অসহায় বলে মনে হলে মানুষ বাধ্য হয়ে আত্মহত্যা করে শাস্তি পেতে চায়।

ফ্রাস্টেশান বলছ কেন?

–ঐ যে ওর কথা আমরা কেউ বিশ্বাস করছি না। তাছাড়া পুপুকে নিয়ে রেলিং থেকে ঝুঁকে পড়াটা আত্মহত্যার চেষ্টাই বোঝায়।

ডাঃ রুদ্র মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপর অল্প হেসে বললেন, কিন্তু আমি প্রমাণ পেয়েছি ও আত্মহত্যা করতে যায়নি।

অবাক চোখে সঞ্জয় ডাক্তার রুদ্রর দিকে তাকালো।

–হুঁ, অকাট্য প্রমাণ পেয়েছি। মনে আছে, রীণাকে যখন উঠে দাঁড়াতে বলেছিলাম তখন ও ভয় পেয়ে বলেছিল পড়ে যাব। যে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে যাবার ভয় পায় সে কি দেড়ঘন্টা আগে স্বেচ্ছায় তিন তলা থেকে ঝাঁপ দেবার চেষ্টা করতে পারে?

সঞ্জয় থমথমে মুখে ডাঃ রুদ্রের দিকে তাকিয়েই রইল। কোনো উত্তর দিতে পারল না।

ডাঃ রুদ্র বলতে লাগলেন–এই থেকেই প্রমাণ হয় রীণা যা বলেছে তা সত্যি। ভয়ংকর কিছু দেখেছিল যার জন্যে বারান্দার শেষ প্রান্তে গিয়ে অমন সাংঘাতিকভাবে ঝুঁকে পড়ে তার হাত থেকে নিজেকে সরিয়ে নেবার এমন শেষ চেষ্টা করছিল।

সঞ্জয় একটু ভেবে বলল, আচ্ছা, রীণা কি হিস্টিরিয়ায় ভুগছে? হিস্টিরিয়ার রুগীকে লোকে ভূতে-পাওয়া বলে। এইসব রুগীদের শক্তি নাকি এতদূর হয় যে জলভর্তি ঘড়া দাঁতে করে তুলে উঠোনের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। কাজেই হিস্টিরিয়াগ্রস্ত হলে…

ডাঃ রুদ্র বাধা দিয়ে বললেন, তুমি বলতে চাইছ রীণা হিস্টিরিয়ার পেশেন্ট। আচ্ছা, তোমার স্ত্রী তো সারাদিন দরজা বন্ধ করেই থাকে, তাই না? তাহলে আজ হিস্টিরিয়ার প্রকোপ যখন তার বাড়ল, তখন বুঝি সে তোমার আসার জন্যে দরজা খুলে রেখে ঝাঁপ দিতে গেল?

সঞ্জয় চুপ করে রইল।

দরজাটা তা হলে খুলল কে?

সঞ্জয় তখনও নিরুত্তর।

 নিভে-যাওয়া চুরুটটা আবার দুটো কাঠি ধ্বংস করে ধরালেন ডাঃ রুদ্র। বললেন, উত্তরটা আমিই দিচ্ছি। দরজা খুলেছিল সে, যে একদিন রাত্রে ঐ টেবিলের কাছে ঘুরতে ঘুরতে কাচের গ্লাসটা ভেঙেছিল, যে কুলুঙ্গি থেকে শিবানন্দ ভট্টাচার্যের ছবিখানা চুরি করেছিল। সে-ই রীণাকে ওয়ার্নিং দিয়ে দরজা খুলে রেখে গেল।

একটু থেমে বললেন, অবশ্য তুমি জিজ্ঞেস করতে পার–অশরীরী আত্মাকেও কি দরজা খুলে যেতে-আসতে হয়? তাহলে অবশ্যই আমি চুপ করেই থাকব। কেননা তার উত্তর জ্ঞানের বাইরে।

সঞ্জয় মন দিয়ে সব শুনল। কোনো উত্তর দিল না।

কয়েক মিনিট দুজনেই চুপচাপ বসে রইলেন। পাশের ঘরে রীণা নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছ। বাইরের দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলেন বন্দনার মা ট্রেতে দুকাপ চা আর কিছু নোনতা বিস্কুট নিয়ে।

সঞ্জয় একটা কাপ এগিয়ে দিল ডাঃ রুদ্রর দিকে। নিজে নিল অন্যটা। বিস্কুটে কামড় দিয়ে সঞ্জয় বলল, কিন্তু শিবানন্দের ছবি চুরি করার উদ্দেশ্য?

আত্মাটির ক্রিয়াকলাপ দেখে মনে হচ্ছে তোমার এই প্রশ্নের উত্তর সোজা। তুমি বলেছিলে ছবির পিছনে ঠিকানা লেখা ছিল। স্পিরিট চায় না শিবানন্দর সঙ্গে তোমার যোগাযোগ হয়। তাই সে ছবিটা সরিয়ে ফেলেছে।

সঞ্জয় চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে বলল, তবে তো শিবানন্দর কাছে আমায় যেতেই হবে। অশরীরী আত্মাটি অনেক কিছুই জানেন, জানেন না যে, ছবি নিয়ে গেলেও ঠিকানাটি আমার মুখস্থ হয়ে আছে।

ডাঃ রুদ্র পেয়ালা নামিয়ে রেখে বললেন, তবে আর কি? একদিন চলে যাও ওঁর কাছে। তবে তার আগে কিন্তু বাড়িটা ছাড়বে।

–এত তাড়াতাড়ি বাড়ি পাব কোথায়?

–এখনি বাড়ি না পাও আমার ওখানে উঠবে। মোট কথা সামনের শনিবারের আগেই তোমরা এ বাড়ি ছাড়বে।

সঞ্জয় ছেলেমানুষের মতো জেদ ধরে বলল, শনিবার পর্যন্ত তো আমি থাকবই।

ডাঃ রুদ্রের মুখটা কঠিন হয়ে উঠল। তিনি বললেন, তুমি থাকতে চাও থাকো। আমি ওদের নিয়ে যাব।

সঞ্জয় বলল, না। তা হয় না কাকাবাবু। রীণা না থাকলে তিনি তো আসবেন। ঐ শনিবার আমি সারা দিন রীণাকে পাহারা দেব। দেখব কি করে ওর ক্ষতি করে?

–তাহলে যা ভালো বোঝ করো। এরপর আমার আর কিছু বলার নেই।

তিনি উঠে রীণাকে পরীক্ষা করতে গেলেন। মিনিট পাঁচেক পরে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।–ভালোই আছে। ওর যদি ঘুম ভাঙে তাহলে রাতের খাবার খাবে। ঘুম যেন ভাঙিও না।

বলে বেরোতে যাচ্ছেন এমনি সময়ে বন্দনার মা পুপুকে কোলে নিয়ে চিন্তিত মুখে ঢুকলেন।–পুপুর জ্বর হয়েছে দেখছি।

–জ্বর! সঞ্জয় চমকে উঠে পুপুর কপালে হাত দিল।বেশ জ্বর। বলে ডাঃ রুদ্রের দিকে তাকালো। ডাঃ রুদ্র পালস্ দেখলেন। কিছু বললেন না।

সঞ্জয় চিন্তিতভাবে তাকালো, কি করব?

ডাঃ রুদ্র হাসলেন, তুমি নিজে ডাক্তার। ছেলের একটু জ্বর হয়েছে। তাতেই ঘাবড়ে যাচ্ছ? বলে সঞ্জয়ের কাঁধে হাত রাখলেন।

–আজকের রাতটা দ্যাখো। কাল জ্বর না ছাড়লে ভাবা যাবে।

ডাঃ রুদ্র ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। সঞ্জয় বন্দনার মাকে বলল, আপনি একটু থাকুন। আমি এঁকে এগিয়ে দিয়ে আসছি।

বন্দনার মা বললেন, আমি থাকছি। আপনি একটু বন্দনাকেও পাঠিয়ে দেবেন।

ডাঃ রুদ্র গাড়িতে উঠে ইঞ্জিনের চাবি ঘোরালেন।কাল সকালেই তাহলে একটা খবর দেবে। কী এত ভাবছ?

–হ্যাঁ, নিশ্চয় খবর দেব। ভাবছিলাম–আপনিও বাড়ি ছাড়ার কথা বললেন, আর একজনও বলছিলেন।

–কে তিনি?

সঞ্জয় ইতস্তত করে বলল, আপনাকে বলা হয়নি গত সপ্তাহে মিস থাম্পি নামে একজন ম্যাড্রাসি মহিলা আমার এখানে এসেছিলেন রীণার এক বান্ধবীর সঙ্গে। রীণার কথা সব শুনলেন। তিনিও বলছিলেন–

ডাঃ রুদ্র গাড়ির চাবি বন্ধ করে বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, ব্যাঙ্গালোরের বিখ্যাত স্পিরিচুয়ালিস্ট মিস থাম্পি নাকি?

–হ্যাঁ। আপনি চেনেন?

ডাঃ রুদ্র চাবি ঘুরিয়ে ফের ইঞ্জিন চালু করে বললেন, ওঁর সঙ্গে দেখা হলে খুশি হতাম। নেক্সট ডে যখন আসব ওঁর কথা বলব। গুড নাইট।

Facebook Comment

You May Also Like