Saturday, April 20, 2024
Homeবাণী-কথামীন রহস্য - অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

মীন রহস্য – অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

মীন রহস্য - অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

নিরাময়দাকে কিছুতেই রাজি করাতে পারছিলাম না। তাঁর এক কথা, না। তোমাদের সঙ্গে নিয়ে মরি। ছোটো কর্তার মেজাজ খারাপ। সকাল থেকে শুরু হয়ে গেছে। খবরদার নিরাময় ওদের নিবি না। জ্বর জ্বালা হলে কে দেখবে। জায়গাটাও ভালো না। তোর যে কী মতিভ্রম হয় বুঝি না। ঋতুটাই বিশ্বাসঘাতক।

হেমন্তের মাঝামাঝি সময়। শীত পড়ে গেছে। রাতে কুয়াশা পড়ে। তিনুডাঙার মাঠে এখন ঝানু মাছ শিকারীরা ঘুরে বেড়ায়। আসলে মাঠ না বলে বিল বলাই ভালো। নদীর পাড়ে পঞ্চবটীর শ্মশান। বিল থেকে খাল নেমে গেছে শীতলক্ষ্যায়। এ-সময়টায় বর্ষার জল নেবে যেতে থাকে। মাঠ ঘাট শুকনো হয়ে ওঠে। বিলে যতদূর দেখা যায় শুধু ধানের জমি। ধানগাছের পোকামাকড় খেতে বর্ষার নদী থেকে উঠে আসে নানা কিসিমের মাছ। ধানগাছ যত বড়ো হয়, জল যত বাড়ে তত তারাও বাড়ে। বর্ষার মাছ শিকার, কচ্ছপ শিকার এক নেশা। শরতেই জলে টান ধরে। গ্রাম মাঠ থেকে জল নেমে যেতে থাকে। নালা খাল বিলের জল নেমে যায় নদীতে। ছোটো কর্তা রাজি না।

তা ছোটো কর্তারও দোষ দেওয়া যায় না তার না হয় তন্ত্র মন্ত্র ভরসা, এদের কী ভারসা! ছোটো কর্তা রাজি হবেন না। তা ছাড়া গত সালে হরি বিশ্বাস মাছ শিকার করতে গিয়ে গায়েব হয়ে গেল। ভূত প্রেতের কাণ্ড। সুযোগ বুঝে এত বড়ো ওঝারও হয়তো ঘাড় মটকে দিয়েছে। কিন্তু আমরা সকাল থেকেই বায়না করছি, নিরাময়দা তুমি একা যাবে কেন, আমরাও যাব। আমাদের বুঝি ইচ্ছে হয়—আমরা দুষ্টুমি করব না। যা বলবে শুনব। ‘ওই তো মুসকিল! হরি বিশ্বাস গায়েব হয়ে গেল। ‘জানের মায়া নেই তোদের। ‘বারে তুমি থাকলে আমাদের ভয় করবে কেন। তুমিতো কত কিছু জান। ভূত উড়ানি মন্তর জান, গন্ধ শুঁকে টের পাও সাপখোপের উপদ্রব আছে কি না, তুমি পার। তুমি বললে কাকা রাজি হবে। গেল বারে যে বললে, এবারে নিয়ে যাবে। বললে কেন বল! বড়দা ক্ষেপে আছে জান। তার এক কথা, আমাদের না নিয়ে গেলে, নিরাময়দাকেও যেতে দেব না। কি করে যায় দেখব।

বড়দাকে নিরাময়দা সামলাতে পারে না। হেন আকাম কুকাম নেই বড়দা করতে পারে না। যাবে, যাও। দেখবে ফিরে, কি হয়!

কি আর হবে! বড়দা গোয়ালের গোরুবাছুর ছেড়ে দেবে। তখন নিরাময়দার মাথায় হাত। লেজ তুলে গোরু বাছুর ছুটবে। বাড়ি, ঘর, উঠোন পার হয়ে একেবারে মাঠে। কোন মাঠে, কার খেতে মুখ দেবে—তারপর এই নিয়ে কথা কাটাকাটি। কে করেছে! কেউ জবাব দেবে না। নিরাময়দা ফাঁপরে পড়ে যায়। তার জামা নেই, লুঙ্গি নেই। মাদুর হাপিজ। তার ঘরে কে ঢুকল! কিছু নেই।

আমরা সবাই চুপ।

নিরাময়দা জানে, বড়দার কাজ। বড়দা তখন কি ভালোমানুষ। তোমার ঘরে আমরা ঢুকিই না। তোমার গামছা লুঙ্গি কোথায় আমরা কি জানি? তা ছাড়া কথা দিলে কেন। এ-সালে নিয়ে যাবে বললে কেন! কথা দিলে কথা রাখতে হয়।

অগত্যা নিরাময়দা ছোটো কাকার কাছে আরজি জানাল—যেতে চাইছে। যখন….. নিরাময়দার দাপট আছে। বিশ্বাসী মানুষ। এ-ছাড়া আমাদের দ্বিতীয় মনিব। নানা আকাম কুকাম ঠিক নিরাময়দা ধরে ফেলে। কান ধরে হিড়হিড় করে টেনে আনে বাড়িতে।

কাকা বললেন, বলছিস তুই।

তা ওদেরও তো ইচ্ছে হয়। ভয় ডর না কাটলে বড়ো হবে কি করে!

কাকা বললেন, তা অবশ্য ঠিক।

নিরাময়দা বলল, ঠিক আছে যাবে। হাত লাগাও।

হাত লাগাও বলতে, মাছ শিকারের নানাবিধ কৌশলের কথা বললেন।

এই নাও বানা। পাট করে বেঁধে ফেল। নিরাময়দার সহকারী সুধন্য এবারে যেতে পারছে না। ম্যালেরিয়ায় ভুগছে। ঠিক ছিল সতীশ কর সঙ্গে যাবে। তারও যাবার সখ অনেকদিন থেকে। চন্দ্রকিরণ চাই—অর্থাৎ পুর্ণিমা না হলে ‘জো’ হয় না। রুপালি মাছেরা চন্দ্রকিরণে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। হাতেই ধরা যায়। রোজ এসে খবর নিয়ে গেছে সতীশ কর—কি কবে যাবে ঠিক করলে! ‘জো’ শুরু কবে?

আমরা যাচ্ছি যখন সতীশ করের দরকার নেই। সকাল বেলাতে আমাদের উঠোনে সতীশ কর আসতেই নিরাময়দা বলল, যাওয়া হবে না। আকাশ মেঘলা দেখছেন না! এবারে বোধ হয় ‘জো পড়বে না। শিকারে গেলেই মাছ পাওয়া যাবে কথা নেই। ভাগ্য প্রসন্ন না থাকলে খালি হাতেও ফিরতে হতে পারে। তবে ওস্তাদ মাছ শিকারিরা জানে, কবে কখন, যেমন নিরাময়দার কাছ থেকেই আমরা জেনেছি, শনি মঙ্গলবারে গলদা চিংড়ির জ্বর আসে। কথাটা যে বেঠিক না, জলা দেশে বড়ো না হয়ে উঠলে জানতে পারতাম না। জ্যৈষ্ঠের বৃষ্টি মাঠ ঘাট ভেসে যায়। নদী নালা ভেসে যায়। আষাঢ়ে বাড়ির ঘাটে জল। আমগাছ জামগাছের গোড়ায় জল। কচুর বনে জল। এ-বাড়ি ও-বাড়ি যেতে জল। ঠিক ভাদ্রে জল নামতে শুরু হয়। আর নিরাময়দার কেরামতিও শুরু তখন থেকে।

দেতো ভুলাখানা।

আমরা যাব।

কি করবে গিয়ে। এক ধমক।

নিরাময়দা বাড়ি থেকে বের হলে আমরাও তার পেছনে। পরনে গামছা। খালি হাতে কাঠাখানেক গলদা চিংড়ি তুলতে যাচ্ছেন। কী করে যে বোঝে! ঠিক রাজবাড়ির পেছনে জলে জঙ্গলে হেঁটে বেড়ান। খালের পাড়ে পাড়ে হেঁটে বেড়ান। সন্তর্পণে বকের মতো পা ফেলেন। আমরাও বকের মতো পা ফেলি। নিরাময়দা হাতের ইশারায় চলে যেতে বলেন, শুনি না।

দেখি, খপ–। খপ করে জলে ডাঙায় বড়ো গলদা চিংড়ির মাথা চেপে ধরেছেন। নীল রং। কী বাহার তার। কী করে যে বোঝেন। বড়ো বড়ো দাঁড়গুলি নাড়ে। আমরা ছুটে গেলে বিরাশি সিক্কার থাপ্পড়। কাছেও যেতে পারি না। অথচ অদম্য কৌতূহল। কী ভাবে নিরাময়দা এবার বেজায় প্রসন্ন হয়ে গেল, বলল চল, কী করে বুঝবি, দ্যাখ। জলে ডাঙায় কী করে মাছ ধরতে হয় শিখে রাখ।

খালের পাড়ে পাড়ে হাঁটছি।

হঠাৎ হাত তুলে দিলেন। আমরা থেমে পড়লাম। তারপর তিনি ইশারায় ডাকলেন। বকের মতো পা ফেলে জল ভাঙতেই বললেন, ওই দ্যাখ।

কিছু দেখতে পাচ্ছি না।

ফিস ফিস করে কথা বললেন, নিরাময়দা।

দেখতে পাচ্ছিস না!

জলে টান ধরেছে। জলে পচা গন্ধ। জলজ ঘাস পচছে, মাছেরা পালাচ্ছে—ওই দ্যাখ। পচা জলে মাছ থাকবে কেন? সত্যি, গোড়ালি জলে একটা নীল রঙের বিশাল চিংড়ি পড়ে আছে। বোঝা যায় না। ঘাসের রং জলের রং মাছের রং এক রকমের। নীল হলুদ সবুজ।

নিরাময়দা মাছের পোকা।

আমরা বলি মাছের রাজা। সবাই বলে, হরি বিশ্বাসের চেলা। ডাঙায় মাছ। লাফিয়ে ওঠে নিরাময়দাকে দেখলে।

সেই শিকারি মানুষ বললেন, ইশারায়, পারবি!

আমি ঘাড় কাত করে বললাম, পারব।

বড়দা আমাকে ঠেলে দিয়ে এগিয়ে গেছিল। আর ধরতে যেই না গেল, ঝপাং করে কোথায় ছিটকে গেল মাছটা। নিরাময়দা ক্ষেপে লাল। ‘হাত প্রমাণ সাইজের মাছটাকে তাড়ালি! তোদের দিয়ে কিছু হবে না। শনিবার মঙ্গলবার চিংড়ি মাছের জ্বর আসে জানিস! জলের কিনারায় এসে পড়ে থাকে। সূর্য উঠলে চিংড়ি মাছেরা জলের গভীরে নেমে যায়। তাদের আর দেখা পাওয়া যায় না। সেই থেকে জানি শনি মঙ্গলবারে মাছের জ্বর আসে। দাদা জানে। গুহ্য কথা বলে দিলে আমরাও জানলাম। আবার কিছুদূর হেঁটে গেল।

রাত থাকতেই বের হতে হয়। অন্তত সূর্যোদয়ের আগে জলার চারপাশটা ঘুরে দেখতে হবে। ভোররাতের অন্ধকারে দাদা টের যে পায় কী করে! গাছ পাতা জলে নড়ানড়ি করলেই নাকি টের পাওয়া যায়, তেনারা উঠে আসছেন। আবার ডাক। কাছে গেলাম।

আমাদের দেখালেন কী করে ধরতে হয়। খুব সন্তর্পণে উবু হয়ে বসলেন। মাথার উপর গাছের ছায়া। দূরে মশার শব্দ। হাতটা ধীরে ধীরে প্রসারিত করে দিচ্ছেন। হাতের থাবায় পাতলা গামছা। এক হাতে গামছার শেষ প্রান্ত ঝুলিয়ে রেখেছেন। হাত ফসকালেও রেহাই নেই। জালি গামছায় বাছাধন আটকা পড়ে যাবে। কিন্তু আশ্চর্য খপ করে মাছের মাথাটি চেপে ঠিক ধরে ফেলেছেন। আমরা সবাই ঝুঁকে পড়েছি।

দেখলি! কত বড়ো দেখলি!

তা ঠিক, মুগুরের মতো মাথা। নিরাময়দাকে দেখলেই প্রতিবেশীরা বকত, নেশা বটে, এত রাতে বানা পেতে বসে আছিস! কিছু পেলি! সাপখোপের ভয় নেই!

হেসে বলেন, না। কারণ তিনি জানতে দেন না, কোথায় কী মাছ মিলতে পারে। বড়ো ডুলায়, বড়ো বড়ো পাবদা মাছ তুলছেন আর ডুলায় করে ফেলছেন টের পেলেই ভিড় জমে যাবে। বানা পেতে তারাও চেষ্টা করবে আরও মাছ ধরার। নিরাময়দা স্বীকারই করে না, মাছ তার বঁড়শি কিংবা বানায় আটকে যাচ্ছে। মাছের ডুলাখানাও আড়ালে রেখে দেন। দেখলে মনে হবে মানুষটা কেবল বসে বসে প্রহর গুনছে মাছের আশায়। কেউ কেউ বলত, বেটা মাছই তোকে খাবে। সেই নিরাময়দা দামোদরদির হাট থেকে ফিরে কাকাকে বলেছিলেন, কর্তা পূর্ণিমার ‘জো’ পড়বে। ধানের জমিতে মাছের আওয়াজ পেলাম। দেখা যাক কী মাছ? মনে হয় বিলে আটকা পড়েছে। নেমে যাবার পথ পাচ্ছে না। কাকা বলেছিলেন, গতবারে তো কিছুই পেলি না, সারা রাত মশার আর জোঁকের কামড় খেলি।

নিরাময়দা বললেন, মাছ হল গে আজব জীব কর্তা। তার সঙ্গে লড়ালড়ি। সে ধরা দেবে কেন সহজে। তবে জল নামছে।

ঘাপটি মেরে থাকবে কোথায়! পোদ্দারদের ঝিলে আর কত ধরতে জলের টানে নেমে আসবেই।

কাকা হাসেন, নিরাময় মাছের চলাফেরার হাল হদিশ একটু বেশিই জানে।

তুই কী বুঝলি! কাকার প্রশ্ন।

মনে হয় মন খানেক ওজনের ঢাইন মাছটাছ হবে। ধানগাছ উথালপাতাল। তা সাঁতার জলে নেমে যেতে সাহস পেলাম না। বিলের জল দু-লগি সমান নৌকা নিয়ে ঘোরাঘুরি করলাম। টের পেলাম না। কোথায় যে তলিয়ে গেল।

তা হেমন্তেও সেই বিশাল বিলে গভীর জল এবং পদ্মপাতায় ভরা। তবে খাল ধরে জল নেমে যেতে থাকলে, নদীর মাছ আর বিলে থাকে কী করে। নতুন বর্ষায় মাছের শরীর তাপে ভাপে জ্বলে না। আহা সেই সুমিষ্ট জলের স্বাদ পেতে আনন্দে তারা দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে লেজ নাড়তে নাড়তে ধানের জমিতে, বিলের জলে, খালের জলে ঢুকে যায়। আর পাখনা নাড়ায়। লেজ ওড়ে। বর্ষায় মাছের এই মজা।

কাকা বললেন, গজার মাছটাছ হবে। তা মনে হয় না। গজার মাছের গন্তব্যস্থল বিলের মধ্যে—এ-মাছ নদীতে নামার জন্য আঁকুপাঁকু করছে। পূর্ণিমা রাতে সে নেমে আসতে পারে। জোনাকি পোকা ধানগাছের মাথায় তখন ওড়াউড়ি করে না। পাতায় পাতায় বসে যায়। পোকামাকড়ের তল্লাসে, মাছেরও কম নেশা থাকে না। আমরা রওনা হবার সময় কাকা বললেন, নিয়ে তো যাচ্ছিস। কার বাপের সাধ্যি আছে এদের সামলাতে পারে।

আসলে নিরাময়দা চায়, তিনি কত বড়ো মাছ শিকারি তারা দেখুক।

যাবার সময় আর এক প্রস্থ হিসেব।

কোচ। পাল। বানা। দড়ি। হ্যারিকেন। বস্তা। চাটাই। দেশলাই।

সারারাত কাবার হয়ে যাবে। মুড়ি পাটালি গুড় সঙ্গে।

দুপুর নাগাদ এই করে গেল। খালে নৌকা। নৌকায় তোলা হল সব। এমনকী মুড়ি পাটালি গুড়ও। দরকারে দামোদরদির বাজার আছে। ঘোষের দোকান আছে। ঠাকুরবাড়ির নামে এক পাতিল দই চাইলেও মিলে যাবে।

আসলে কী মাছ তাই সংশয়।

কত বড়ো মাছ নিরাময় দা!

জলের তলায়, আমি কি মেপে দেখেছি।

কেমন করে দেখলে।

ধানের জমিতে জলের পাক। না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবি না। সব ধানগাছ নুয়ে পড়েছে। জলের তলায় তাণ্ডব—কিন্তু বুঝি কী করে কা মাছ!

কুমির নয় তো!

তোরা কেন যে এলি! কুমির ডাঙায় উঠে বিলে পড়ে থাকবে!

না বলছিলাম, যা বলছ, তাতে হৃৎকম্প না শুরু হয়।

তোদের আসা ঠিক হয়নি। কুমির নদীতে ভেসে আসে! সেই কবে একবার এসেছিলো! বাবুরা কুমিরটাকে মারার কম চেষ্টা করেনি। পালের গোরু নিয়ে চড়ায় টানাটানি শুরু করে দিল শেষে। দোষতো দেওয়া যায় না। বেচারা খাবে কী! মানুষ জলে নামে না, ডাঙায় মানুষ লক্ষ নিয়ে পাহারা দেয়—খাবেটা কী।

তারপর কী হলো!

গুলি।

কে করলো!

বাবুরা। ধর্মনাশ বাবু। অবিনাশ বাবু। গুলি পিঠে। গেল পিছলে। কিন্তু জেদ বটে। গোরুর ঠ্যাং কামড়ে ধরে আছে। জলে নিয়ে নামাবে। নদীতে ডুবিয়ে, কুমিরের আস্তানায় তুলে নিয়ে যাবে। কুমিরও কামড় ছাড়ছে না বাবুরাও গুলি করে যাচ্ছে। ফুটছে। পিঠে গুলি লেগে পিছলে যাচ্ছে। বাবুরা সটাসট গুলি করে হয়রান। তাজ্জব হারাণ মিঞা। বলল, দ্যান দেখি বন্দুকখানা। ঠ্যাং কামড়ে আছে বলে কুমিরের চোখে গুলি করছেন না। ভগবতীর গায়ে না আবার গুলি লাগে। চোখে গুলি না করলে কুমির মরে!

ছোড়দা বলল, কুমিরের খুব শক্ত পিঠ না নিরাময় দা!

শক্ত মানে। কচ্ছপের দশগুণ। গুলি পিঠ ফসকে আগুনের গোলা হয়ে উড়ে যায়। কিন্তু গুলিবিদ্ধ করা যায় না। নৌকার পাল তুলে দেওয়া হয়েছে। পেরাব, পোনাব পার হয়ে মশাবর খাল। খালে খালে বিল। বিল পার হয়ে আবার খাল। খালে কোমর জল। নিরাময়দার হিসাব অনুযায়ী আজকের রাতটাই সেই কামাল করা মীনের শেষ রাত। যদি না নামে, তবে আর, নামা হবে না। বিলের জলে আটকা পড়ে পচবে নয় ধরা পড়বে। কার ভাগ্যে এত বড় শিকার আছে কে জানে!

বুক জলে নেমে বাঁশের বানা পুঁতে দিল নিরাময়দা। আমরা মুগুর এগিয়ে দিলাম। আমাদের নৌকা নদীর চড়ায় তোলা। সামনে তাকালেই নদী। শেষ জোয়ার এটা। খালে জল ঢুকছে। এই জোয়ারে যদি নেমে না যায়, আর এ-সালে খালে নদীর জল ঢুকবে না। বর্ষা না পড়লে নদীনালা ভেসে না গেলে অতিকায় মীনের প্রাণনাশ হবে। মাঠে মারা পড়বে—এটাই নিরাময়দার কষ্ট। নিরাময়দার হিসাবও তাই। জলের সঙ্গে মাছের, মানুষের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। বানা পুঁতে দিল খাল বরাবর। বড়দা বলল, মাছটা বানায় এসে গোত্তা মারবে। ভেঙে ফেলবে নাতো। খুব সোজা! কত শক্ত বাঁশ! দেখেছিস। মুগুরের ঘায়ে টসকাল না। সামান্য একটা মীন, তা দেড় দু-মনও হতে পারে—যাই হোক, আজ এসপার না হয় ওসপার হবে। হয় আমি থাকব নয় মীন থাকবে। মেজদা বলল, বানায় উপর দিয়ে টপকাবে।

তা কথার মতো কথা। দু-পাঁচ হাত উপর দিয়ে লাফ মারতে পারে। টেঁটাটা দেতো দেখি।

‘কী করবে?

টেঁটার তিনটে ফলা। লম্বা বাঁশের মাথার খাপকাটা খাঁজে ঠেসে দেওয়া। সঙ্গে হাত পঞ্চাশের লম্বা দড়ি।

টেঁটার ধার দেখে নিরাময়দা বলল, ঘচাং করে বিঁধে যাবে। লাফ মারলেই হল। টেঁটাখানা কার হাতে বুঝবি না! দূরে পঞ্চবটি শ্মশান। তার চালাঘর। ধোঁয়া উঠছে। আমার গা শির শির করতে থাকল ভয়ে। সবে সূর্যাস্ত হয়েছে। মাছেরাও দিনরাত বোঝে। পূর্ণিমা বোঝে। জোয়ার ভাটা বোঝে দিন দুই আগে বিলের সেই অতিকায় মীন দেখে গেছে নিরাময়দা। তা দুক্রোশের মতো বিলটার হয়ে জোয়ার ধরতে সময় লেগে যাবারই কথা। আর বিলের জল তো। কত মাছ, পাবদা, চাপিলা, পুঁটি, ট্যাংরা, কই, শিং, মাগুর—আহার পর্বটি খোশ মেজাজেই চালাচ্ছে। ঠিক করেছে, শেষ জোয়ারে নদীতে নেবে যাবে। জানবে কী করে একজন মনুষ্য টের পেয়ে গেছে, তার গতিবিধি। টের পেয়ে খালের জলে বানা পুঁতে দিয়েছে। যাবে তো যাও, বানা টপকে যাও। যাবে তো যাও টেঁটার কামড় ফসকে যাও। তা ওস্তাদ শিকারি। টেঁটাখানা এখনো হাতে নিচ্ছেন না। নদীর বুক থেকে ঝপাং করে চাঁদ লাফিয়ে উঠে গেলে, আমরা বস্তা পেতে বসে থাকলাম। বানা থেকে খানিকটা দূরে। ঘাসে কুয়াশা জমছে।

হুঁশিয়ার–কথা বলবে না। নিরাময়দা সর্তক করে দিলেন।

হুঁশিয়ার—নজর রাখবে। নিরাময়দা উঠে দাঁড়ালেন। হাতে টেঁটা।

জলের তোড়ে বানা কাঁপছে। খালের এপাড় ওপাড় বানা পুঁতে দেওয়া। বানায় কাছে ঘোরাঘুরি শুরু করলেই-জলের ঘাস নড়ানড়ি করবে। জলের উপর ঘাসের লম্বা ডগা ভেসে আছে। পূর্ণিমার রাত, বুঝতে কষ্ট হয় না—যে দিকে চোখ যায় নির্জন মাঠ। কিছু হাটুরে মানুষ পাড় ধরে যাবার সময় বলল, নিরাময় না?

আজ্ঞে নিরাময় দাস।

মাছের গন্ধ পেয়েছে!

তা বলতে পারেন।

কী মাছ মনে হয়?

তাতো বলতে পারব না। অগাধ জলের মাছ, মাছ না অজগর। কে জানে। আমরা বললাম, ও নিরাময়দা, অজগর বলছ কেন?

হতেও পারে। কাছে ভাওয়ালের গড় আছে। মুসংয়ের পাহাড় আছে। বন জঙ্গলে কারা ঘুরে বেড়ায় কেউ বলতে পারে।

অজগর সাপ হলে কী করবে?

টেঁটায় গেঁথে ফেলব।

বড়দা বলল, আমি নিরাময়দা নৌকার চলে যাচ্ছি।

মেজদা বলল, না, ওটা কুমির হতে পারে।

আমি বললাম, বড়দা দাঁড়া আমিও যাব।

মেজদা বলল, তুমি সত্যি করে বল নিরাময়দা ওটা কী?

কুমিরও হতে পারে। দেখা যাক না। বলে একখানা বিড়ি ধরালেন জুত করে।

হরি বিশ্বাসকে কুমিরে খেয়েছে তবে! বকর বকর করবি না। কুমিরের কম্ম নয় হরি বিশ্বাসকে গিলে খায়। হরি বিশ্বাসকে খেলে কুমির নিজেই হজম হয়ে যাবে।

তা কে বলেছে, হরি বিশ্বাস! লাস শনাক্ত হয়েছিল।

লাস শনাক্ত করবেটা কে শুনি। ওর আর কে আছে নিয়ে গেল লাস। আমি তো দেখিনি। কে আর দেখতে যায়। চাউর হয়ে গেল হরি বিশ্বাস। আমারও ধারণা, হরি বিশ্বাস। তা মনে করলে, দোষের কী আছে! যার যেমন বিশ্বাস। ভূতের খবরদারি করলে শেষে এই হয়! তুমি বুঝি চাও না, হরি বিশ্বাস বেঁচে থাকুক।

কে চায়। প্রতিপক্ষ বাঁচুক কে চায় রে! বেটার তো হদিশ নাই। হদিশ না পেলে লাস হয়ে যাবে না! লাস হয়ে গেলে শনাক্ত করে কচু হবে!

পঞ্চবটি বনে নতুন সাধুর খবর রাখ! কে বলছে!

বারে দু-সাল ধরে নতুন এক সাধুর আমদানি হয়েছে জান না।

এত বড়ো গুহ্য কথা, সেই তো। বলে নিরাময়দা কেমন ফ্যাকাসে মুখ করে বসে থাকল।

রাত বাড়ছে। জোনাকি পোকা জ্বলছে। বড়দা মেজদা নৌকায় চলে গেছে। আমি নিরাময়দাকে ফেলে যেতে সাহস পাচ্ছি না। হাজার হোক গুনিন সে। তুকতাক জানে। কুমির অজগরের চেয়ে পঞ্চবটি জায়গাটা যে বেশি খারাপ এটা ঠিক মাথায় আছে।

হঠাৎ কে যেন কথা কয়ে উঠল। আরে নিরাময় না! তা খালে এতরাতে লণ্ঠন জেলে আর বসে থাকতে সাহস পাবে। তাই হাঁটা দিলাম। পড়েছে কিছু। নিরাময়দা বলল, আমি তো চিনতে পারছি না।

তা পারবি কি করে! চুলে জটা। মুখে দাড়ি-গায়ে গেরুয়া—বুঝবি কী করে। নদীর পারে শ্মশানে গিয়ে শেষে হাজির। তা পড়ল কিছু!

আশা করছি। শ্মশানে কেন!

নিরাপদ জায়গা। ভয়ে ডরে কেউ আসে না। গাজা ভাং-এর বড় অভাব। মাছ শিকার করে কুলাতে পারছিলাম না। তাই শেষমেশ শ্মশানে।

নিরাময়দা বললেন, বস তবে। বিড়ি খাবা। দে, খাই। বলে বিড়িখানা ঠিক নিল। কিন্তু হারিকেন থেকে আগুন জ্বালার সময় দেখা গেল—সব ফুস ফাস। কেউ নেই। আগুনের কাছে ভূত জব্দ।

নিরাময়দা হঠাৎ লাফিয়ে উঠল। দাঁড়াল। ছুটতে থাকল। কার পেছনে ছুটছে। বুঝতে পারলাম না। ডাকছে, ও হরিদা, পালাচ্ছ কেন! তুমি কি জান ওটা কী মাছ। তুমিতো মাছের রাজা ছিলে!

কোনো সাড়া নেই।

আর তখনই বানা কেঁপে উঠল।

আমার গলা শুকিয়ে গেছে। হাত-পা অবশ। কী করব বুঝে উঠতে পারছি না। কুমির অজগর হলেও এত ভয় পেতাম না। বোধ হয় সংজ্ঞা হারাতাম—তখনই নিরাময়দা বলল, বুঝলি, বাপেরও বাপ আছে। ভয় পাস না। ও টসকে গেল।

আমি ভয় পাই। বেটা কী ধান্দায় আছে বুঝতে পারছি না। দেখি কী হয়!

আর কী হয়! বললাম, আমি নৌকার যাব। দিয়ে এস।

কেন যে আসিস, বলে বিরক্ত মুখে বানার দিকে তাকাতেই দেখলাম, বেশ প্রসন্ন মনে হচ্ছে। ঠোঁটে আঙুল রেখে বললেন, এসে গেছে।

তারপর বানা তোলপাড় করে উঠলে, মারলেন জোরে চেঁটাখানা। আর মনে হল, সেই চাঁদনী রাতে জল রক্তে লাল হয়ে উঠেছে। আমার কেমন মাথা ঘুরতে থাকল। টেঁটাখানা চেপে ধরে আছেন নিরাময়দা। চোখ জ্বলছে। যেন কতকালের প্রতিশোধ নিচ্ছে—অথবা মীনের চলাফেরায় খুঁজে পেয়েছে অন্য এক প্রতিপক্ষকে–একজন পালাল, অন্যজন জলের তলায় বুড়বুড়ি কাটছে।

টেঁটার ডগা আমার হাতে দিয়ে বলল, শক্ত করে ধর। জলে নেমে যাচ্ছি। এত বড়ো ওজনের মাছ সামলাতে পারব না। নিরাময়দা জলে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, আর যা দেখলাম, সেই এক লম্বা শিথিল লেজ তুলে মেঘের রং তার এবং গভীর জলের কোনো অতিকায় জন্তু না অজগর, না কুমির বোঝা গেল না। বানা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। গড়িয়ে গড়িয়ে নেমে যাচ্ছে। কীসে যেন পেঁচিয়ে ধরেছে নিরাময়দাকে। জলের গভীরে লাল রক্তের সঙ্গে নিরাময়দা ভেসে চলে যাচ্ছে। একবারই দেখেছিলাম, তার দুখানা পা জলের উপর ভেসে উঠেছে।

আমি আর পারলাম না। নদীর কাছে নৌকায় এসে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। আমার আর কোনো হুঁস ছিল না। শৈশবকালের অভিজ্ঞতা এটা আমার। এখনো মনে হয়, সব কিছুর মধ্যে কোনো গোলমাল আছে। কাহিনির মাথামুণ্ডু ঠিক যেন নেই। লোকটা কি সত্যি হরি বিশ্বাস। টেঁটায় গেঁথে গেছিল মাছ, না কুমির, না অজগর। জ্যোৎস্নায় চরাচর কেমন এক অলৌকিক রহস্য সৃষ্টি করে ফেলেছিল। বোধ হয় আমার মাথাও ঠিক ছিল না। তবে সপ্তাহখানেক বাদে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় নিরাময়দা ফিরে এসেছিলেন। জলে ডুবে যাননি। ভাসিয়েও নেয়নি। মুখে শুধু রা ছিল না। কার কাজ জানি না।ভাবলে সব ব্যাপারটাই আমার কাছে এখনও ভূতুড়ে মনে হয়।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments