Friday, February 23, 2024
Homeবাণী-কথাকোথাও কেউ নেই - হুমায়ূন আহমেদ

কোথাও কেউ নেই – হুমায়ূন আহমেদ

Table of contents

০১. মুনা ঘড়ি দেখতে চেষ্টা করল

গেটের কাছে এসে মুনা ঘড়ি দেখতে চেষ্টা করল। ডায়ালটা এত ছোট কিছুই দেখা গেল না। আলোতেই দেখা যায় না, আর এখন তো অন্ধকার। রিকশা থেকে নেমেই একবার ঘড়ি দেখেছিল সাড়ে সাত। গলির মোড় থেকে এ পর্যন্ত আসতে খুব বেশি হলে চার মিনিট লেগেছে। কাজেই এখন বাজে সাতটা পঁয়ত্ৰিশ। এমন কিছু রাত হয়নি। তবু মুনার অস্বস্তি লাগছে। কালও ফিরতে রাত হয়েছে। তার মামা শওকত সাহেব একটি কথাও বলেননি। এমন ভাব করেছেন যেন মুনাকে দেখতেই পাননি। আজও সে রকম করবেন।

মুনা গেট খুলে খুব সাবধানে ভেতরে ঢুকল। জায়গাটা প্যাচপ্যাচে কাদা হয়ে আছে। সকালে বাবুকে দুবার বলেছিল ইট বিছিয়ে দিতে। সে দেয়নি। বারান্দায় বাতিও জুলায়নি। পা পিছলে। উল্টে পড়লে শাড়ি নষ্ট হবে। নতুন জামদানী শাড়ি। আজই প্রথম পরা হয়েছে। একবার কাদা লেগে গেলে আর তোলা যাবে না। মুনা পা টিপে টিপে সাবধানে এগুতে লাগল।

মামার গলা পাওয়া যাচ্ছে। বকুলকে ইংরেজি পড়াচ্ছেন। সকাল বেলা রাখাল বালক বাঁশি বাজাইতেছিল, বল ইংরেজি কী হবে? বকুল ফোপাচ্ছে। চড়টির খেয়েছে হয়ত। ইদানীং মামার মেজাজ বেশ খারাপ যাচ্ছে। মুনা মনে মনে ট্রানস্লেশনটা করতে চেষ্টা করল। রাখাল বালকের ইংরেজি কী হবে? ফারমার বয়? না অন্য কিছু? অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে সে দরজার কড়া নাড়ল–একবার, দুবার, তিনবার। দরজা খুলতে কেউ এগিয়ে আসছে না। মুনা নিচু স্বরে ডাকল বকুল, এই বকুল।

বকুল ভয়ে ভয়ে তাকাল বাবার দিকে। শওকত সাহেব ধমকে উঠলেন একটা ট্রানস্লেশন করতে একদিন লাগে? বাঁশি বাজাইতেছিল এই ইংরেজি কী বল? বকুল ভয়ে ভয়ে বলল বাবা, মুনা আপা এসেছে। শওকত সাহেব কড়া গলায় বললেন, তোর পড়া তুই পড়। দরজা খোলার লোক আছে। মন থাকে বাইরে, পড়াটা হবে কিভাবে? মাথাতে তো গোবর ছাড়া কিছু নেই। বকুল মাথা নিচু করে ফেলল। তার চোখে পানি আসছে। বাবা দেখে ফেললে আরো রেগে যাবেন। আজেবাজে কথা বলবেন। তিনি একবার রেগে গেলে এমন সব কথা বলেন যে মরে যেতে ইচ্ছা! করে। পরশু বলছিলেন পাতিলের তলার মত মুখ তবু সাজগোজের তো কোনো কমতি দেখি না। একশ টাকার লাগে শুধু পাউডার।

মুনা আবার কড়া নাড়ল। শওকত সাহেব উঁচু গলায় ডাকলেন বাবু, বাবু। বাবু ফ্যাকাশে মুখে ঘরে ঢুকল। সে পড়ে ক্লাস সেভেনে। রোজ সন্ধ্যায়। তার মাথা ধরে বলেই ঘর অন্ধকার করে শুয়ে থাকে। শওকত সাহেব বাবুকে দেখেই রেগে উঠলেন। কানে শুনতে পাস না? বাবু ভয়ে ভয়ে তাকাল বকুলের দিকে। শওকত সাহেব হুংকার দিয়ে উঠলেন দরজা খুলতে পারিস না গরু কোথাকার।

বাবু দরজা খুলল। শওকত সাহেব মুনার দিকে ফিরেও তাকালেন না। কোনো রকম কারণ ছাড়াই বকুলের গালে ঠাস করে একটা চড় বসালেন। ব্যাপারটা ঘটল আচমকা। বকুলের মুখ টকটকে লাল হয়ে উঠল এক মুহূর্তে। মাথা অনেকখানি ঝাঁকিয়ে সে তার খাতায় কী সব লিখতে চেষ্টা করল। লেখাগুলি সব ঝাপসা। চোখ থেকে পানি উপচে পড়ছে। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। শওকত সাহেব কর্কশ স্বরে বললেন–মাথা তোল, ঢং করিস না। বকুল মাথা তুলল না। তার ছোট্ট হালকা শরীর কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। মুনা শান্ত স্বরে বলল মামা, এত বড় মেয়ের গায়ে হাত তোলা ঠিক না। শওকত সাহেব কিছু বললেন না।

মুনা আরো কিছু বলবে ভেবেছিল, বলল না। নিজেকে সামলে নিয়ে তার শোবার ঘরে ঢুকল। এ বাড়িতে দু’টি মাত্র শোবার ঘর। একটিতে মামা এবং মামি থাকেন, অন্যটিতে থাকে মুনা, বকুল এবং বাবু। মুনার রুমটি অসম্ভব ছোট। তবু সেখানে দু’টি চৌকি ঢোকানো হয়েছে। এক কোণায় একটা আলনা। আলনার পাশে বকুলের পড়ার টেবিল। টেবিলের উল্টোদিকের ফাঁকা জায়গাটা একটা বিশাল কালো রঙের ট্রাঙ্ক। তার উপরে প্যাকিং বক্সের ভেতর শীতের লেপ-কাঁথা। এখানে ঢুকলেই দাম আটকে আসে। পুব দিকের একটা বড় জানালায় আলো-হাওয়া খেলত। শওকত সাহেব পেরেক মেরে সেই জানালা বন্ধ করে দিয়েছেন। তার ধারণা খোলা জানালায় গুণ্ডা ছেলেরা এসিড-ফ্যাসিড ছুড়বে। অসহ্য গরমের দিনেও সে জানালা আজ আর খোলার উপায় নেই।

মুনা শোবার ঘরে বাতি জ্বালাল। বাবু বাতির দিকে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে আছে। মুনা বলল, আজও মাথাব্যথা?

হুঁ।

বেশি?

বাবু জবাব দিল না। মুনা বলল, বাবু তুই একটু বাইরে দাঁড়া তো, আমি কাপড় ছাড়ব। বাবু বারান্দায় এসে দাঁড়াল। এক চিলতে বারান্দা। সেখানে একটা ক্যাম্পখাট পাতা আছে। গ্রামের বাড়ি থেকে কেউ এলে এখানে ঘুমুতে দেয়া হয়। বাবু নিঃশব্দে বসিল ক্যাম্পখাটে। মাথাব্যথাটা এখন একটু কমের দিকে। বমি বমি ভাবাটাও কেটে যেতে শুরু করেছে। বাবু লক্ষ্য করেছে মুনা আপা বাসায় এলেই তার মাথাব্যথা কমতে শুরু করে।

মুনা কাপড় বদলে বারান্দায় এসে হাতে-মুখে পানি ঢালল। বাবু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে কিছু বলবে। তবে নিজ থেকে সে কখনো কিছু বলে না। জিজ্ঞেস করতে হয়। মুনা বলল, বাবু কিছু বলবি?

হুঁ।

বলে ফেল।

বাকের ভাই আজ দুপুরে জিজ্ঞেস করছিল।

কী জিজ্ঞেস করছিল?

তোমার কথা।

পরিষ্কার করে বল। অর্ধেক কথা পেটে রেখে দিলে বুঝব কিভাবে?

বাবু ইতস্তত করতে লাগল। মুনা তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, বল কী বলল?

বলল, কী রে তোর আপামণি নাকি বিয়ে করছে?

তুই কী বললি?

আমি কিছু বলিনি।

কিছুই বলিসনি?

বাবু ইতস্তত করে বলল, বলেছি, আমি কিছুই জানি না। মুনা বিরক্ত স্বরে বলল, মিথ্যা বললি কেন? সত্যি কথাটা বলতে অসুবিধা কী? সত্যি কথা বললে সে কী তোকে মারত? আবার যদি কোনোদিন জিজ্ঞেস করে, তুই বলবি, হ্যাঁ বিয়ে করবে। বাবু মুখ ফিরিয়ে নিল, যেন সত্যি কথাটা সে স্বীকার করতে চায় না। এই ব্যাপারটার জন্যে সে যেন লজিত। মুনা কড়া গলায় বলল, অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে আছিস কেন? তাক আমার দিকে। বাবু তাকাল। মুনা হালকা স্বরে বলল, তোরা সবাই এ রকম ভাব করিাস যেন আমি মস্ত একটা অন্যায় করে ফেলেছি। একটা মেয়ে যদি একটা ছেলেকে পছন্দ করে এবং বিয়ে করে তাহলে তার মধ্যে লজ্জার কিছুই নেই; তুই যখন বড় হবি তখন তুইও এ রকম পছন্দ করে একটা মেয়েকে বিয়ে করবি।

যাও।

তুই দেখি লজ্জায় একেবারে মরে যাচ্ছিস।

মুনা। আপা ভাল হবে না কিন্তু।

তুই মুনা আপা মুনা আপা করিস কেন? শুধু আপা ডাকবি। কিংবা বড় আপা। সঙ্গে আবার মুনা কী জন্যে?

আচ্ছা। আপা, তোমাদের বিয়ে কবে?

সামনের মাসে।

বাবু আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। সে মনে হল বেশ লজ্জা পাচ্ছে। মুনা ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, তোরা কেউ আমাকে সহ্য করতে পারিস না। বাবু লজ্জিত স্বরে বলল, কী যে তুমি বল।

ঠিকই বলি। ইট বিছিয়ে রাখতে বলেছিলাম, বিছিয়েছিস? সন্ধ্যার পর বারান্দায় বাতি জ্বালিয়ে রাখতে বলেছিলাম তাও তো রাখিসনি।

বাবু কী যেন বলতে চাইল, মুনা তা শোনার জন্যে অপেক্ষা করল না। মামা-মামির শোবার ঘরে ঢুকল। এই ঘরটিতে কিছু জায়গা আছে। একটা আলমারি, ছোট একটা ড্রেসিং টেবিল; তার পাশে বিয়েতে পাওয়া পুরনো আমলের ভারী খাট, একটা কালো রঙের আলনা। তবুও কিছু ফাঁকা জায়গা আছে।

মুনা ঘরে ঢুকতেই তার মামি লতিফা হাত ইশারা করে তাকে কাছে ডাকলেন। তার হাত ইশারা করে ডাকার ভঙ্গি ও তাকানোর ধরন-ধারণ দেখেই টের পাওয়া যায় কিছু একটা ঘটেছে। মুনা বিছানার পাশেই বসল।

মামি শরীর কেমন?

ভালোই।

জ্বর আসেনি তো?

উঁহু।

মুখে উঁহু বললেও বোঝা যাচ্ছে গায়ে জ্বর আছে। চোখ লালচে। কপালের চামড়া শুকিয়ে খড়খড় করছে। চারদিকে অসুস্থ অসুস্থ গন্ধ। লতিফা তার রোগা হাতে মুনার হাত চেপে ধরলেন। গলার স্বর অনেক খানি নিচে নামিয়ে বললেন, তোর মামা যায় নাই।

কেন, যায়নি কেন?

আমি কী করে বলব?

আংটি দেখিয়েছিলো?

হুঁ! আংটি দেখে আরো রাগ করেছে। বাবু সামনে পড়ে গেল তখন। রাগের চোটে ওকে ধাক্কা মেরে ফেলেছে খাটে। জিব কেটে গেছে বোধ হয়। রক্ত পড়ছিল।

বল কী?

হুঁ।

লতিফা কান্নার মত শব্দ করতে লাগলেন। মুনা একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস গোপন করল। আজ দুপুরে লতিফার বড় ভাই মোজাম্মেল হোসেন সাহেবের ছোট মেয়ের আকিকা। সেই উপলক্ষে এ বাড়ির সবার দাওয়াত ছিল। শওকত সাহেব যেতে রাজি হলেন না। দাওয়াত প্রসঙ্গে অত্যন্ত তেতো ধরনের কিছু কথা বললেন, ফকির খাওয়ানোর বদলে আমাদের খাইয়ে দিচ্ছে। তু বলে ডাকলেই যাব নাকি? পেয়েছি কী আমাকে? আমি ভিখিৱি নাকি? আমি তো যাই না। এ বাড়ির কেউ যদি যায় ঠ্যাং ভেঙে দেব।

লতিফা এই জাতীয় কথায় বিশেষ কান দেননি। তাঁর বড় ভাই তাকে করুণার চোখে দেখে বলেই হয়ত গোপন সঞ্চয় ভেঙে মুনাকে দিয়ে একটা আংটি কিনিয়ে এনেছিলেন। তার আশা ছিল রাগটোগ ভাঙিয়ে দুপুরের দিকে পাঠাতে পারবেন। কিন্তু পারেননি।

মুনা উঠে দাঁড়াল। শান্ত স্বরে বলল, তুমি খাওয়া-দাওয়া কিছু করেছ? লতিফা জবাব দিলেন না। মুনা বলল, কাল অফিসে যাবার সময় আংটি দিয়ে আসব আর বলব তোমার অসুখের জন্যে কেউ আসতে পারেনি। কথাটা তো মিথ্যাও না। লতিফা কী যেন বললেন। মুনা শোনার অপেক্ষা না করে রান্নাঘরে চলে গেল। ভাত চড়াতে হবে। কাজের ছেলেটি চলে যাওয়ায় খুব ঝামেলা হচ্ছে। সারাদিন অফিস করে চুলার পাশে এসে বসতে ইচ্ছা করে না। বড় খারাপ লাগে।

মুনা আপা, বাবা ডাকে।

মুনা দেখল বাবুর মুখ রক্তশূন্য। যেন বড় রকমের কোনো বিপদ আশংকা করছে সে। মুনা স্বাভাবিক ভাবেই বলল, এখন যেতে পারব না। ভাত চড়াচিছে, দেরি হবে।

না, তুমি এখন চল।

কী ব্যাপার?

বাবু কিছু বলল না। তার চোখ-মুখ ফ্যাকাশে, রক্তশূন্য চেহারা। সে বেশ ভয় পেয়েছে।

শওকত সাহেব চেয়ারে পা তুলে শক্ত হয়ে বসে আছেন। ছোটখাটো মানুষ। মাস তিনেক আগেও স্বাস্থ্য ভাল ছিল। এখন অসম্ভব রোগা হয়ে গেছেন। গালটাল ভেঙে একাকার। চুল উঠতে শুরু করেছে। মাথা ভর্তি চকচকে টাকের আভাস। মেজাজও হয়েছে খারাপ। কথায় কথায় রেগে ওঠেন। গতকাল প্ৰায় বিনা কারণে কাজের ছেলেটিকে ছাড়িয়ে দিয়েছেন।

শওকত সাহেবের চোখে চশমা। এটি একটি বিশেষ ঘটনা। কারণ চশমা তিনি পরেন না। তাঁর ধারণা চশমা পরলেই চোখ খারাপ হতে থাকবে এবং বুড়ো বয়সে পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যেতে হবে। আজ হঠাৎ চশমা চোখে দেয়ার কারণ স্পষ্ট নয়। খুব সম্ভব পরিবেশ বদলাতে চাচ্ছেন।

মুনা ঢোকা মাত্র তিনি ইশারায় তাকে বসতে বললেন। মুনা বসল না। শওকত সাহেব কঠিন স্বরে বললেন, তুই আমার ছেলেমেয়েগুলিকে নষ্ট করছিস।

কীভাবে?

তোর কাছ থেকে সাহস পেয়ে এরা এ রকম করে। সামান্য একটা চড় দিয়েছি, এতেই মেয়ে উঠে গিয়ে বাথরুমে দরজা বন্ধ করে বসে আছে। এত বড় সাহস।

সাহস না মামা, লজ্জা।

লজ্জা? লজ্জার কী আছে। এর মধ্যে?

তুমি বুঝবে না মামা।

বুঝবে না কেন?

মুনা চেয়ার টেনে মামার মুখোমুখি বসল। শওকত সাহেব নড়েচড়ে বসলেন। মুনাকে কেন জানি তিনি একটু ভয় করেন। মুনা শান্ত স্বরে বলল, এতবড় মেয়ের গাযে হাত তোলা ঠিক না। মামা।

এত বড় মেয়ে কোথায় দেখলি তুই?

মেট্রিক দিচ্ছে তিন মাস পর। সে ছোট মেয়ে নাকি?

নিজের মেয়েকে শাসনও করতে পারব না?

না।

না মানে?

না মানে না। আর কিছু বলবে?

তুই এ বাড়ি থেকে যাবি কবে?

বিয়ে হোক তারপর তো যাব। বিয়ের আগে যাই কী করে? নাকি তুমি চাও এখনই চলে যাই?

শওকত সাহেব সিগারেট ধরালেন। মুনা সহজ স্বরে বলল মামা, তুমি আমার সঙ্গে এ রকম ব্যবহার করছ কেন?

কী রকম ব্যবহার করছি?

কথাটথা বল না। যেন আমাকে চিনতেই পার না।

রোজ রাতদুপুরে বাসায় ফিরবি আর আমি তোকে কোলে নিয়ে নাচব? এটা ভদ্রলোকের বাসা না? পাড়ার লোকের কাছে আমার ইজ্জত নেই?

কয়েকটা দিন মামা। তারপর তুমি তোমার ইজ্জত নিয়ে থাকতে পারবে।

মুনা উঠে দাঁড়াল।

শওকত সাহেব চুপ করে গেলেন। মুনা বলল, তুমি আর কিছু বলবে? তিনি জবাব দিলেন না। মুনা চলে এল রান্নাঘরে। বাথরুমের দরজা খুলে বকুল বের হয়েছে। তার চোখ-মুখ ভেজা। আচার-আচরণ বেশ স্বাভাবিক। সে আবার তার বাবার কাছে পড়তে গেল। যেন কিছুই হয়নি। শওকত সাহেব শুকনো মুখে মেয়েকে ইংরেজি গ্রামার পড়াতে লাগলেন। বকুল এবার ইংরেজিতে তেইশ পেয়েছে। হেড মিসট্রেস প্রগ্রেস রিপোটো লিখে দিয়েছেন ইংরেজের একজন টিচার রাখার জন্যে।

ভাত চড়াবার আগে মুনা দুকাপ চা বানোল। বাবুকে দিয়ে এক কাপ পাঠাল মামার কাছে। অন্য কাপটি রাখল নিজের জন্যে। বড় ক্লান্ত লাগছে। রান্নার ব্যাপারে কোনো উৎসাহ পাওয়া যাচ্ছে না।

খাওয়া-দাওয়া সারিতে রাত হল। ভাদ্র মাস। বিশ্ৰী গরম। গা ঘামে চটচট করছে। মুনা বকুলকে সঙ্গে নিয়ে বাইরের বারান্দায় মোড়া পেতে বসেছে। কিছু বাতাস পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু শোবার ঘর নরক হয়ে আছে। আজ রাতে ঘুমানো যাবে বলে মনে হয় না। বকুল বলল, আপা তোমরা বাসা পেয়েছে?

না। মালিবাগে একটা ফ্ল্যাট দেখলাম। বেশ ভাল, চার তলায়।. খুব হাওয়া, পনেরশ টাকা চায়।

নিয়ে নাও।

নিয়ে নিলে খাব কী? ও বেতনই পায় পনেরশ।

তুমিও তো পাও।

আমি পাই নয়শ পঁচাত্তর। নয়শ পঁচাত্তরে দুজনের চলবে?

বকুল কিছু বলল না। মুনা হালকা স্বরে বলল, মনে হয় বৃষ্টি হবে। বিজলি চমকাচ্ছে। বৃষ্টি নামলে আজ ভিজব।

তোমার টনসিালের দোষ। টনসিল ফুলে যাবে।

যা ইচ্ছা হোক, আজ ভিজব। সারা রাত যদি বৃষ্টি হয়। সারা রােতই ভিজব। দেখিস তুই।

বকুল অস্পষ্ট স্বরে হাসল। মুনা আপার অনেক পাগলামি আছে। রাতের বেলা বৃষ্টি হলেই সে ভিজে অসুখ বাধায়। যেন অসুখ বাধাবার জন্যেই ভিজে। বকুল নিচু গলায় বলল, বাকের ভাই তোমার ব্যাপারে খোজখবর করছিল জানো?

জানি।

খুব নাকি হাম্বিতম্বি করছিল?

মুনা তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, হাম্বিতম্বি মানে? সে হস্তিম্বি করার কে? তার অনুমতি নিয়ে আমাকে বিয়ে করতে হবে?

বাবুকে নাকি কী সব আজেবাজে কথা বলেছে।

কই বাবু তো আমাকে কিছুই বলেনি। আয় তো যাই জিজ্ঞেস করি।

বকুল উঠল না। তার বসে থাকতে ভালই লাগছে। ঘনঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। হয়ত সত্যি সত্যি বৃষ্টি নামবে। এই বাড়ির ছাদে টিনের হওয়ায় বৃষ্টির শব্দ চমৎকার পাওয়া যায়। মুনা বিরক্ত স্বরে ডাকল এই চল, জিজ্ঞেস করে আসি বাবুকে।

বাবু তো পালিয়ে যাচ্ছে না। আরেকটু বাস। তোমাকে একটা মজার ঘটনা বলব।

বকুল মজার ঘটনা বলতে শুরু করার আগেই ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। ভদ্র মাসের বৃষ্টি বেশিক্ষণ থাকে না। মুনা বকুলকে নিয়ে ভেতরের উঠোনে ভিজতে নামল। বকুল খানিকটা সংকোচ বোধ করছিল কারণ শওকত সাহেব ভেতরের বারান্দায় চশমা পরে বসে আছেন। বকুলের ধারণা তিনি বাজে ধরনের একটা ধমক দেবেন। কিন্তু শওকত সাহেব তেমন কিছুই করলেন না। তার নিজেরও কেন জানি পানিতে নেমে যেতে ইচ্ছা করছিল। এবং এর রকম একটা ইচ্ছার জন্যে লজ্জিত বোধ করছিলেন। মুনা উঁচু গলায় বাবুকে ডাকল, এই বাবু নেমে আয়। বাবু নামল না। ভয়ে ভয়ে তাকাল বাবার দিকে। মুনা বিরক্ত স্বরে বলল এত ঢং করছিস কেন? আয়।

শওকত সাহেব বাবুকে সুযোগ দেবার জন্যেই হয়ত শোবার ঘরে ঢুকে পড়লেন। বাবু বসেছে উঠোনে। বকুল একবার বলল আপা, ঠাণ্ডা লেগে যাবে। মুনা নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল লাগুক।

তোমার টনসিল।

আমার টনসিালের ভাবনা আমি ভাবব। তোর ভিজতে ইচ্ছা না করলে উঠে যা।

তুমি যতক্ষণ থাকবে আমিও ততক্ষণ থাকব।

আমি থাকব। সারারাত।

আমিও।

বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে ঘনঘন। বুপকূপ করে বৃষ্টি পড়ছে। এক সময় ইলেকট্রিসিটি চলে গিয়ে চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। বাবু শীতে কাঁপতে কাঁপতে বলল আমি উঠলাম। আপা! উঠতে গিয়ে সে আবার পিছলে পড়ল। খিলখিল করে হেসে উঠল মুনা। অন্ধকার বৃষ্টির রাতে সেই হাসি এমন চমৎকার শোনাল।

০২. মুনার দেখা নেই

দশটা থেকে এগারটা এই এক ঘণ্টা মামুন মুনার অফিসে বসে রইল। মুনার দেখা নেই। অপরিচিত লোকজনদের মাঝে বসে থাকা একটা বিরক্তিকর ব্যাপার। সবাই যে অপরিচিত তা নয়, পাল বাবু তাকে চিনতে পেরেছেন এবং বাকি সবার সঙ্গে পরিচয়ও করিয়ে দিয়েছেন এই যে ইনি মামুন সাহেব। আমাদের মুনা ম্যাডামের সঙ্গে এনার সামনের মাসে বিয়ে হচ্ছে। কেউ কোনো উৎসাহ দেখায়নি। সম্ভবত মুনার সঙ্গে এদের সম্পর্ক ভাল নয়। পাল বাবু চা এনে দিয়েছেন এক কাপ। চায়ে ঘন সর। তার মধ্যে একটা বেশ তাজা কালো রঙের পিঁপড়া ভাসছে। মামুন আঙুল ডুবিয়ে পিঁপড়া সরাল। চায়ে চুমুক দিতে ইচ্ছে হচ্ছে না। কিন্তু সময় কাটানোর জন্যে একটা কিছু করা দরকার। মামুন পিঁপড়াটার দিকে তাকিয়ে চায়ে চুমুক দিল। চায়ে অন্য কোনো পোকা-মাকড় ডুবে থাকলে কেউ সে চা খায় না। কিন্তু পিঁপড়া ডুবে থাকলে কেউ আপত্তি করে না। এর কারণ কী? মামুন সিগারেট ধরাল। এক ঘণ্টার মধ্যে এটা হচ্ছে চতুর্থ সিগারেট। বা পাশের ভদ্রলোক ভ্রূ কুঁচকে তাকাচ্ছে। তিনি হয়ত সিগারেটের ধোয়া সহ্য করতে পারেন না। মামুন লক্ষ্য করেছে যে কবারই সে সিগারেট ধরিয়েছে এই লোকটি ভ্রূ কুঁচকে বিরক্তি প্রকাশ করেছে। একে নিৰ্ভয়ে সিগারেট অফার করে ভদ্রতা দেখানো যায়। সিগাটে নেবে না, ভদ্রতাও বজায় থাকবে। মামুন হাসিমুখে সিগারেটের প্যাকেটটা বাড়াল। মামুনকে অবাক করে দিয়ে ভদ্রলোক সিগারেট নিলেন এবং আবার নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

এই অফিসে কাজকর্ম একটু বেশি হয় নাকি? সবাই ব্যস্ত। কোণার দিকে একটি মেয়ে একবারও মাথা না তুলে ক্রমাগত টাইপ করে যাচ্ছে। মুনা বলছিল এই অফিসের বিশ্বাস সাহেবের সঙ্গে মেয়েটির কী নাকি একটা বাজে ঝামেলা হয়েছে। বাজে ঝামেলাটা কী সেটা পরিষ্কার করে বলেনি। আগে মেয়েটি বিশ্বাস সাহেবের সঙ্গে বসন্ত, এখন অফিসের সবার সঙ্গে বসে। মামুন আড়াচোখে মেয়েটিকে কয়েকবার দেখল। বাজে ঝামেলাটা কোন পর্যায়ের হতে পারে আন্দাজ করবার চেষ্টা করল। তেমন কোনো আকর্ষণীয় চেহারা নয়। মোটা ঠোঁট, চাপা নাক।

মামুন সাহেব!

মামুন তাকিয়ে দেখল পাল বাবু এক কপি দৈনিক বাংলা নিয়ে ঢুকেছেন।

বড় সাহেবের ঘর থেকে নিয়ে এলাম। বসে বসে পড়ুন। চা খাবেন নাকি আর এক কাপ?

জি না। ও বোধ হয় আজ আর আসবে না।

আসবে। আসবে। মেয়েরা ইন জেনারেল অফিস কামাই করে না। দেরি করে আসে। সাজতেগুজতে দেরি হয়।

পাল বাবু মামুনের পাশের চেয়ারটায় বসলেন। পানের কৌটা বের করলেন। হাসিমুখে বললেন পান খাবেন?

জি না।

খান একটা, ভাল জর্দা আছে।

মামুন পান নিল। বসে থাকার চেয়ে পান চিবানো ভাল। জর্দাটা কড়া। চট করে মাথায় ধরেছে। মুখ ভর্তি হয়ে গেছে পানের পিকে। ফেলার জায়গা নেই, গিলে ফেলতেও সাহস হচ্ছে না। পাল বাবু। তরল গলায় বললেন বাড়ি না, অফিসই মেয়েরা বেশি পছন্দ করে। বাড়িতে শতেক রকমের কাজ। ওই রান্না করবে, এই এক গ্লাস পানি দাওরে, এই চা বানাওরে। অফিসে এসব ঝামেলা নেই। মামুন কিছু বলল না, জর্দার রস ভর্তি পিক গিলে ফেলায় তার সত্যি সত্যি বমি বমি লাগছে। সে বলল, এগারটা বিশ বাজে। আজ আর বোধ হয় আসবে না।

যদি আসে কিছু বলতে হবে?

বলবেন ছুটির পর আমার মেসে যেতে। খুব দরকার।

বলব।

পাল বাবু তাকে অফিসের সিঁড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। এই লোকটি সম্ভবত ফাঁকিবাজ, শুধু সময় নষ্ট করার চেষ্টা করছে। এখন আবার এক আমসত্তওয়ালার সঙ্গে দীরদাম করা শুরু করেছে। দর দামের নমুনা দেখেই মনে হচ্ছে কিনবে না। সময় কাটানোর একটা ব্যাপার।

মামুন হাঁটছে ধীরপায়ে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে চারদিকে। তার মনে ক্ষীণ আশা, হঠাৎ দেখবে মুনা নামছে রিকশা থেকে। কিংবা মাথা নিচু করে দ্রুত হেঁটে আসছে অফিসের দিকে। সে সিগারেট কেনার অজুহাতে পান বিড়ির দোকানটির সামনে মিনিট দশেক দাঁড়াল। মুনার দেখা পাওয়া গেল না।

আজকের দিনটাই মাটি হয়েছে। তিনদিনের ক্যাজুয়েল লিভের আজ হচ্ছে প্রথম দিন। কথা ছিল মুনা অফিসে এসে কোনো একটা অজুহাত দেখিয়ে সাড়ে এগারটার দিকে বেরুবে। তারপর দুজনে মিলে বাড়ি দেখতে যাবে কল্যাণপুরে। সেখানে নাকি নশ টাকায় চমৎকার একটা দুরুমের ফ্ল্যাট আছে। কথা দেয়া আছে একটার সময় বাড়িওয়ালা চাবি নিয়ে থাকবেন। হাতে এখনো সময় আছে। নিউ পল্টন থেকে মুনাকে উঠিয়ে নেয়া যায়। কিন্তু মুনার কঠিন নিষেধ যেন কোনোদিন তার মামার বাড়িতে মামুন না যায়। নিষেধ সব সময় মানতে হবে এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু সে রেগে যাবে। একবার রেগে গেলে তার রাগ ভাঙান মুশকিল। দিনের পর দিন কথা না বলে থাকবে। দশটা কথা জিজ্ঞেস করলে একটা কথার জবাব দেবে। তাও এক অক্ষরের জবাব। হ্যাঁ কিংবা না।

মামুন গুলিস্তান থেকে মীরপুরের বাসে উঠল। জর্দা দিয়ে পান খাবার জন্যেই তার মাথাটা হালকা লাগছে। বমি বমি ভােব কাটেনি। কিন্তু সেই সঙ্গে বেশ ক্ষিধেও লেগেছে। দু’টি সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী ব্যাপার এক সঙ্গে কিভাবে ঘটছে কে জানে। মামুন একটা সিনেমার কাগজ কিনে ফেলল। প্রথম পাতা জুড়ে তিন রঙা বিশালবীক্ষা মেয়ের ছবি। ভালই লাগে দেখতে।

বলা হয়েছিল মেইন রোডের পাশেই দোতলা বাড়ি। আসলে তা নয়, বেশ খানিকটা ভেতরে যেতে হল। বাড়ি দেখে যে কোনো আশাবাদী মানুষেরই আশাভঙ্গ হবে, মামুনেরও হল। অর্ধসমাপ্ত একটি বাড়ি। সামনে চুনসুড়কির পাহাড়। দোতলায় ওঠার সিঁড়ি এমন যে দু’জন মানুষও পাশাপাশি উঠতে পারে না। বাড়িওয়ালা হাজী সাহেবকেও খুব সুবিধার লোক মনে হল না। যেন বাড়ি দেখানোর তার কোনো গরজ নেই। দুপুর একটায় আসতে হওয়ায় তার যে কত বড় ক্ষতি হল সেই কথা তিনি চার-পাঁচ বার বললেন। সিঁড়িতে উঠতে উঠতে বললেন, স্ত্রীকে নিয়ে আসবেন। বলেছিলেন, আনলেন না কেন?

একটা কাজে আটকা পড়ে গেছে। পরে আসবে।

বাববার তো বাড়ি দেখানো যাবে না। নিতে যদি চান আজই বলবেন। নিতে না চাইলেও আজ বলবেন।

দোতলার বারান্দায় উঠেই মামুন বলল, বাড়ি পছন্দ হয়েছে, আমি নেব।

না দেখেই পছন্দ, ভাল করে দেখেন।

মামুন হৃষ্টচিত্তে ঘুরে ঘুরে বাড়ি দেখল। চমৎকার বাড়ি। দু’টি বিশাল ঘর। দু’টি ঘরের সঙ্গেই অ্যাটাচিড বাথরুম। রান্নাঘরের পাশে ছোট্ট একটা স্টোর রুম। চমৎকার একটা বারান্দা। উথালিপাথাল হাওযা খেলছে। হাজী সাহেব বললেন, আপনি আসবেন কবে?

সামনের মাসেব দশ-পনের তারিখেই আসব। কিছু অ্যাডভান্স দিয়ে যাই আপনাকে?

অ্যাডভান্স দেয়ার দরকার নেই। আর আপনি যদি সামনের মাসের আগেই উঠতে চান বা জিনিসপত্র ব্যাখতে চান রাখবেন। তার জন্যে কোনো বাড়তি ভাড়া দিতে হবে না।

আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।

ধন্যবাদের দরকার নেই। বাড়িটার যত্ন করবেন, সাত তারিখের মধ্যে ভাড়া দিবেন ব্যস। দেশ কোথায় আপনার?

ময়মনসিংহ।

ময়মনসিংহের লোক খুব পাজি হয়। আমার বাড়িও ময়মনসিংহ। তবে আপনি প্রফেসর মানুষ। এটাই ভরসার কথা।

মেসে ফিরতে ফিরতে চারটা বেজে গেল। ঘরে ঢুকে দেখে মুনা তার চৌকির ওপর একা একা বসে আছে। তার গলায় নীল রঙের একটা মাফলার। নাক দিয়ে ক্রমাগত পানি করেছে। দেখেই বোঝা যায় গায়ে জুব। মুনা ক্ষুব্ধ স্বরে বলল, সেই কখন থেকে বসে আছি, কোথায় ছিলে? মামুন আজ সারাদিন ভেবেছে মুনার সঙ্গে দেখা হলেই খুব কথা শোনাবে। খুব রাগ করবে। কিন্তু রাগ করা গেল না। মুনার ওপর রাগ করা মুশকিল। মামুন গম্ভীর গলায় বলল, একটার সময় আমাদের এক জায়গায় যাওয়ার কথা ছিল না?

যাব কিভাবে? অফিসেই গিয়েছি। দেড়টার সময। আমার জ্বর, গলা ব্যথা। টনসিল!

আবার টনসিল, বল কী?

বৃষ্টিতে ভিজালাম। আমি ভিজালাম, বকুল ভিজল, বাবু ভিজল। ওদের কারো কিছু হয়নি। আমার অবস্থাই কাহিল।

মুনা অসহায়ের মত মুখ করল। মামুন এগিয়ে এসে হাত রাখল। তার গলায়। মতলব ভাল নয়। মুনা বলল, কী অসভ্যতা করছ, হাত সরাও।

না সরাব না।

মামুনের ঘরের দরজা হাট করে খোলা। কখন কে এসে পড়বে। বারান্দায় লোকজন চলাচল করছে। মামুন তার হাত সরিয়ে নিল না। তার হাসি হাসি মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে রকম কোনো ইচ্ছাও তার নেই। মামুন নরম স্বরে বলল, কাল তোমার কী প্ল্যান?

কোনো প্ল্যান নেই, কেন?

চল কাল তোমাকে কল্যাণপুরের বাড়িটা দেখিয়ে নিয়ে আসি।

মুনা হ্যাঁ-না কিছু বলল না। মামুন বলল–দু’একটা ফার্নিচারও কিনব। তুমি সঙ্গে থাকলে ভাল হয়।

কী ফার্নিচার?

বড় দেখে একটা খাট!

এমন অসভ্যের মত কথা বলা কেন?

মামুন শব্দ করে হাসল। চোখ ছোট করে বলল, খাট কেনার মধ্যে অসভ্যতার কী দেখলে তুমি?

ভদ্র হয়ে বাস।

ঠিক আছে বসছি। ভদ্র হয়ে। কাল কখন আসবে বল।

কাল আসতে পারব না, অনেক কাজ আছে। ঘরে কাজের লোক নেই। মামির অসুখ।

কোনো কথা শুনব না। কাল আসতেই হবে। প্লিজ। মুনা। দুপুরে কোনো রেস্টটুরেন্টে বসে খাব। ফাইন হবে।

রেস্টুরেন্টে বসে খাবার মধ্যে ফাইন কী আছে?

আছে, তুমি বুঝবে না। মুনা, আসবে তো?

দেখি।

দেখাদেখি না। আসতেই হবে। সকাল নটার মধ্যে চলে আসবে, পজিটিভলি।

মুনা হ্যাঁ-না কিছু বলল না। এখান থেকে সে যাবে মামির ভাইয়ের বাড়ি। আংটি দিয়ে আসবে। মামুন বলল … কী আশ্চর্য, এখনি উঠছ কেন?

কাজ আছে আমার।

এত কাজের মেয়ে হয়ে উঠলে কবে থেকে?

মুনা কিছু বলবার আগেই মামুন চট করে তার ঠোঁটে চুমু খেল। মুনা সরে গেল মুহূর্তেই। বিরক্ত স্বরে বলল, কেন সব সময় বিরক্ত কর? দরজা খোলা। লোকজন যাওয়া-আসা করছে।

মামুন হাসিমুখে বলল, ঠিক আছে দরজা বন্ধ করে দিচ্ছি।

থাক। দরজা বন্ধ করতে হবে না।

তুমি আসছ তো?

দেখি।

কাল নটায়। পজিটিভলি।

মামির ভাই বাসায় ছিলেন না। তার স্ত্রী ছিলেন। ভদ্রমহিলা মুনাকে দেখেই তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললেন কাল তোমরা কেউ আসলে না যে, ব্যাপারটা কী?

মামির শরীরটা ভাল না।

তোমাদের শরীর তো ঠিক ছিল, না তোমাদের সবার একসঙ্গে শরীর খারাপ হল?

মুনা কিছু বলল না।

শদেড়েক লোক খেয়েছে। অথচ নিজের আত্মীয়-স্বজন কেউ নেই। বাস তুমি। চা-টা কিছু খাবে?

জি না।

এক বাটি গোসাত তুলে রেখেছিলাম তোমাদের জন্যে, যাওয়ার সময় নিয়ে যেয়ো।

মুনা ক্ষীণ স্বরে বলল, গোসতের বাটি নিয়ে যাব কিভাবে?

বাটি নিয়ে যাবে কেন? টিফিন ক্যারিয়ারে ভরে দেব।

মুনাকে সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকতে হল। এ বাড়িতে অনেক লোকজন থাকে। এদের কাউকেই সে ভাল করে চেনে না। সে যে অনেকক্ষণ ধরে একা একা বাস আছে। এটা কেউ তেমন লক্ষ্যই করছে। না। পাশের কামরায় বেশ কিছু ছেলেমেয়ে ভি সি আর দেখছে। একটি মেয়ে এসে এক ফাঁকে বলে গেল–অমিতাভের ছবি হচ্ছে, দেখবেন? বলেই উত্তরের অপেক্ষা না করে ছুটে চলে গেছে।

মুনা টিফিন বক্সের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল। কাজের ছেলেটি তার সামনে একটা পেপসির বোতল রেখে গেছে। বাড়ির কত্রী টেলিফোন ধরতে গিয়ে আর ফিরছেন না। মুনা ঘড়ি দেখল, সাড়ে ছটা বাজে। আজও বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে।

০৩. মুনার মনে হল তার জ্বর আসছে

মুনার মনে হল তার জ্বর আসছে।

মুখ তেতো, মাথায় ভোঁতা। একটা যন্ত্রণা। সকালে নাশতা খেতে গিয়ে টের পেল গলাব্যথা আরো বেড়েছে। গলা দিয়ে কিছুই নামছে না। মুনা ক্লান্ত স্বরে বলল–বকুল, একটু গরম পানি করে দে, গোসল করব। বকুল সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।

নাশতা শেষ করে যা। বলা মাত্রই দৌড়াতে হবে নাকি?

আমার নাশতা খাওয়া হয়ে গেছে।

বকুল রান্নাঘরে ঢুকে গেল। মুনা বলল, মামা কোথায় রে বাবু?

সকালবেলা কোথায় যেন গেছেন।

নাস্তা খেয়ে গেছেন?

না। বকুল বলেছিল চা খেয়ে যেতে।

মুনা বিরক্ত হয়ে বলল, বকুল বকুল করছিস কেন? কতবার বলেছি আপা বলতে।

আপাই তো বলি।

আবার মিথ্যা কথা? চড় খাবি।

গার্গল করেও লাভ হল না। পানি বেশি গরম ছিল, মাঝখান থেকে জিব পুড়ে গেল; বকুল বলল, তোমার চোখ লাল হয়ে আছে। শুয়ে থাক গিয়ে। মুনা কিছু বলল না। বকুল ইতস্তত করে বলল, ফজলু ভাইদের বাসায় একটু যার আপা? মুনা তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, কেন?

যেতে বলেছিল আমাকে। খুব নাকি দরকার।

কী দরকার?

জানি নাকি, শুধু বলেছেন খুব জরুরি। বোধ হয় ভাবীর সঙ্গে আবার ঝগড়া-টগড়া হয়েছে।

সেটা ওদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার, তুই কেন যাবি?

বকুল আর কিছু বলল না। ফজলুর রহমান সাহেব গলির ওপাশেই থাকেন। মাস ছয়েক হল এসেছেন। খুব সামাজিক ধরনের মানুষ। এসেই আশপাশের সব বাড়িতে গেছেন। বিয়ের সময় নিজে এসে দাওয়াত করে গেছেন। মুনার নিজের ধারণা লোকটি গায়ে-পড়া ধরনের। প্রথম আলাপেই খালা, খালু, আপামণি ডাকাডাকি তার ভাল লাগেনি। বকুলের সঙ্গে ভদ্রলোকের স্ত্রীর খুব খাতির। এটাও মুনার ভাল লাগেনি। অবিবাহিতা মেয়ের সঙ্গে একজন বিবাহিত মহিলার এত ভাব থাকা ঠিক না। বকুল আবার বলল, আপা যাব?

মুনা জবাব দিল না। ব্যাপারটা সে এড়িয়ে যেতে চায়। কিন্তু বকুলের চোখে-মুখে আগ্রহ ঝলমল করছে। মুনা বলল, কী নিয়ে তোদের এত গল্প?

বকুল মাথা নিচু করে হাসতে লাগল। তার গালে লাল আভা। নিশ্চয়ই নিষিদ্ধ গল্পগুজব হয়। নতুন বিয়ে হওয়া মেয়েরা সুযোগ পেলেই অন্য মেয়েদের সঙ্গে বাতের অন্তরঙ্গতার গল্প করতে চায়। মুনা এ ধরনের অনেক গল্প শুনেছে। শুনতে ভালই লেগেছে। বকুলেরও নিশ্চয়ই লাগে।

আপা যাব?

না, রান্নাবান্না করতে হবে না? আজ আমি বাইরে যাব; ফিরতে সন্ধ্যা হবে।

জ্বর নিয়ে কোথায় যাবে?

মুনা জবাব দিল না। বকুল বলল–বেশিক্ষণ থাকব না আপা। যাব আর আসব। যাই?

ঠিক আছে যা।

লতিফা বিছানা ছেড়ে উঠলেন। দশটার দিকে। আজ তাঁর শরীর বেশ ভাল; দশ-বারো দিনের মধ্যে আজ এই প্রথম ঘর ছেড়ে বের হলেন। বাবু ছুটে গিয়ে মাকে বসার জন্যে একটা মোড়া এগিয়ে দিল। তিনি অবশ্যি বসলেন না। দেয়াল ধরে ধরে বসার ঘরে চলে এলেন। বাবু বলল, বেশি হাঁটাহঁটি করবে না মা। লতিফা বললেন, তোর বাবা কোথায়?

জানি না।

বকুল, বকুল কোথায় গেল?

ফজলু ভাইদের বাসায় গেছে। ডেকে নিয়ে আসব?

না ডাকতে হবে না।

তিনি একটি বেতের চেয়ারে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়লেন।

মুনাকে বল তো আমাকে এক কাপ আদা চা দিতে।

মুনা আপার জ্বর, শুয়ে আছে। আমি বানিয়ে দেই?

না থাক। হাতটাত পুড়বি।

না হাত পুড়ব না।

বাবু খুব উৎসাহ নিয়ে চা বানাতে গেল। লতিফা এলেন তার পেছনে পেছনে। বিরক্ত স্বরে বললেন, ইস কী অবস্থা রান্নাঘরের।

তোমাকে একটা চেয়ার এনে দেব মা? বসবে?

না চেয়ার লাগবে না।

লতিফা নোংরা মেঝেতেই পা ছড়িয়ে বসলেন। বাবু বলল, মা দেখ তো লিকার কড়া হয়ে গেছে?

না ঠিকই আছে। মুনার জ্বর কী খুব বেশি?

হুঁ। ঐ দিন বৃষ্টিতে সবাই ভিজলাম তো। কারো কিছু হল না, মুনা আপার টনসিল ফুলে গেল।

চায়ে চুমুক দিয়েই লতিফার বমি বমি ভাব হল। শরীরটা গেছে। তিনি সাবধানে উঠে দাঁড়ালেন। তার পা কাঁপছে।

চা খাবে না?

উঁহু তুই খেয়ে ফেল। শরীরটা খারাপ লাগছে। শুয়ে থাকব। মুনাকে বল তো একটু আসতে।

তিনি নিজের ঘরে ফিরে গেলেন। তার মনে হল আর কোনোদিন এ ঘর থেকে বেরুতে পারবেন না। বাকি জীবনটা এ ঘরেই কাটাতে হবে। আজকাল প্রায়ই তার এ রকম মনে হয়। মুনা এসে দেখল। লতিফা কাঁদছেন। সে না দেখার ভান করে সহজ ভাবেই বলল ডেকেছিলে মামি?

তুই একটু বোস আমার পাশে।

মুনা বসল। লতিফা কী বলবেন মনে করতে পারলেন না। কি একটা যেন বলতে চেয়েছিলেন। বেশ কিছুদিন ধরে এ রকম হচ্ছে। কিছুই মনে থাকছে না।

কি জন্যে ডেকেছিলে মামি?

এমনি এমনি ডাকলাম! শরীরটা বড় খারাপ।

তোমার নিজের জন্যেই তোমার শরীর ঠিক হচ্ছে না মামি। দুপুর একটার আগে কিছু মুখে দাও না। রুগীদের আরো বেশি করে খেতে হয়।

ইচ্ছা করে না, বমি আসে।

আসলে আসুক।

লতিফা ক্লান্ত স্বরে বললেন, বকুলের একটা বিয়ের ব্যবস্থা কর। তোর মামাকে বল। মুনা অবাক হয়ে বলল, কেন? ওর কী বিয়ের বয়স হয়েছে নাকি? কী যে তুমি বল।

বয়স খুব কমও তো না। নভেম্বর মাসে পনেরো হবে।

পনেরো বছর বয়সে কোনো মেয়ের বিয়ে হয় নাকি?

বিয়ে দিলেই বিয়ে হয়। আমার বিয়ে হয়েছিল চৌদ্দ বছর বয়সে।

তুমি বলছি তেত্ৰিশ বছর আগের কথা।

লতিফা ক্ষীণ স্বরে বললেন, আমার শরীর ভাল না। তুইও চলে যাচ্ছিস। আমার সাহস হয় না। তোর মামাকে বল ঐ ছেলেটার সঙ্গে কথা বলতে। তুই বললে শুনবে।

কোন ছেলেটার সঙ্গে?

বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল যে। গ্রিন রোডে ফার্মেসি আছে ছেলেটার। মামা মিডফোর্ডের ডাক্তার।

বাঁটু বাবাজীর কথা বলছি? তিন ফুট বামুন?

লতিফা ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেললেন। মুনা বলল, বকুলের বিয়ে প্রসঙ্গে আমি কারো সঙ্গে কোনো কথাটথা বলতে পারব না। ওর মতো সুন্দরী মেয়ে খুব কম আছে। ওর বিয়ে নিয়ে কোনো ঝামেলা হবে না। তুমি নিশ্চিন্ত থাক।

লতিফা মৃদু স্বরে বললেন, আমি বেশি দিন বাঁচব না।

মুনা বিরক্ত হয়ে বলল, না বাঁচলে, তাই বলে বাচ্চা মেয়েকে ধরে বিয়ে দিতে হবে? এই সব কী?

তুই চলে গেলে ঝামেলা হবে।

কী কামেলা হবে?

ছেলেরা চিঠিফিটি লেখে।

চিঠি তো লিখবেই। সুন্দরী মেয়েদের এইসব সহ্য করতে হয়। এসব কিছু না।

মুনা উঠে চলে এল। বকুল গিয়েছে দেড় ঘণ্টা আগে, এখনো ফেরার নাম নেই। কখন রান্না হবে কে জানে। মামা বাজার নিয়ে ফিরবেন। কিনা তাও বোঝা যাচ্ছে না। মুনা একবার ভাবল ভাতটা চড়িয়ে দেয়। কিন্তু আগুনের কাছে যেতে ইচ্ছে করছে না। মনে হচ্ছে জ্বর চেপে আসছে।

বাবু গম্ভীর হয়ে বসার ঘরে বসে আছে। মুনাকে ঢুকতে দেখে সে কী মনে করে হাসল। মুনা বলল, ছুটির দিনে ঘরে বসে আছিস কেন? বাইরে খেলাধুলা করগে।

বাবু আবার মুখ টিপে হাসল।

হাসছিস কেন?

এমনি।

আমার জ্বর কী-না দেখ তো।

হুঁ তোমার জ্বর।

গায়ে হাত না দিয়েই টের পেয়ে গেলি?

বাবু লজ্জিত মুখে কাছে এগিয়ে এল। তার হাত বেশ ঠাণ্ডা; তার মানে বেশ জ্বর গায়ে। বাসায় কোনো থার্মোমিটার নেই। জ্বর কত বোঝার উপায় নেই।

মুনা। আপা তুমি শুয়ে থাক, আমি মাথার চুল টেনে দেব।

চুল টানতে হবে না, তুই বকুলকে ডেকে নিয়ে আয়। এক্ষুণি যা। এতক্ষণ কেউ অন্যের বাড়িতে থাকে?

বাবু সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। মুনা। আপার কাজ করতে তার এত ভাল লাগে। সারাক্ষণই ইচ্ছা! করে কিছু একটা করে মুনা আপনাকে খুশি করতে।

বকুলই রান্না করল। ভাত ডাল এবং ইলিশ মাছের ঝোল। শওকত সাহেব ভর দুপুরে বাজার নিয়ে এসেছেন। রান্না করতে তাই দুটো বেজে গেল। শওকত সাহেব দুবার এসে খোঁজখবর নিলেন তরকারি নেমেছে কিনা। বকুল তাড়াতাড়ি করতে গিয়ে সব কিছুই কেমন এলোমেলো করে ফেলতে লাগল।

খেতে বসে শওকত সাহেব কঠিন কঠিন কিছু কথা বললেন। এত বড় মেয়ে সামান্য একটা তরকারি রাধতে পারে না কেন এই নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করলেন। গলা টেনে টেনে বললেন, লবণ কী সস্তা হয়েছে? আধাসের লবণ দিয়ে দিয়েছিস তরকারিতে। সবটা তুই একা খেয়ে শেষ করবি।

বকুলের লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করল। শওকত সাহেব প্লেট ঠেলে দিয়ে হাত ধুতে গেলেন। বকুল বাবুকে ফিসফিস করে বলল, লবণ খুব বেশি হয়ে গেছে?

শুধু মাছটা খা। ডালের সঙ্গে মিশিয়ে খা।

তুমি খাবে না?

না।

বকুল সত্যি সত্যি কিছু মুখে দিল না। নিজের জন্যে তার খুব কষ্টও হল না। এটা তার অভ্যেস আছে। প্রায়ই সে রাগ করে না খেয়ে থাকে।

মুনা দু’টা প্যারাসিটামল খেয়েছে। মাথা ধরা। তবু কমেনি। আরো যেন বেড়েই যাচ্ছে। আজ কোথাও বেরুনোর কোনো প্রশ্নই ওঠে না। মামুন অপেক্ষা করে করে মহা বিরক্ত হবে। মুনা ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল। মামুনের সঙ্গে যে কবার কোথাও যাবার প্রোগ্রাম করা হয়েছে সে কবারই এ রকম ঝামেলা।

মুনা আপা।

কী।

কিছু খাবে না?

না। মামিকে খেতে দিয়েছিস?

মা ভাত খাবে না। রুটি বানিয়ে দিতে বলছে।

বানিয়ে দে। আটাটা গরম পানিতে সেদ্ধ করে নিবি। নয় তো রুটি নরম হবে না।

ঘরে আটা নেই।

বাবুকে দোকানে যেতে বল।

বাবু যেন কোথায় গেছে। আমি গিয়ে নিয়ে আসব?

না, তুই কি যাবি। মামাকে গিয়ে বল।

আমি বলতে পারব না। তুমি বল।

ঠিক আছে, আমিই বলব।

শওকত সাহেব কোনো রকম বিরক্তি প্রকাশ না করেই আটা আনতে গেলেন। বকুল বলল আপা, টিনা ভাবীর বাচ্চা হবে। মুনা বলল, এখনই বাচ্চা হবে কি, সেদিনই না বিয়ে হল।

সেদিন না। ছয় মাস এগার দিন হয়েছে।

তোর দেখি একেবারে দিন-তারিখ মুখস্থ। এত খাতির কেন তোর সাথে?

খাতির কোথায় দেখলে? আর খাতির হওয়াট ও কি খারাপ?

বেশি হওয়াটা খারাপ। বেশি কোনোটাই ভাল না।

কেন?

মুনা প্রশ্নের জবাব দিতে পারল না। সে লক্ষ্য করল বকুল আজকাল বেশ কঠিন ভঙ্গিতে কথা বলছে। এটা ভাল লক্ষণ। মেয়েদের এত পুতুপুতু থাকলে চলে না।

বকুল বলল মুনা। আপা, ওরা শুক্রবারে কাবলিওয়ালা দেখতে যাবে। ইন্ডিয়ান অ্যাম্বেসিব অডিটোরিয়ামে। আমাকেও সাথে যেতে বলছে। আমার জন্যেও টিকিট এনেছে।

ওরা স্বামী-স্ত্রী দেখতে যাবে, তাদের মধ্যে তুই যাবি কেন?

আমি তো যেতে চাই না। ওরা জোর করছে। আপা যাব?

শুক্রবার আগে আসুক তারপর দেখা যাবে।

তুমি আগে থেকে বাবাকে বলে রাখবে, নয়ত শেষে রাজি হবে না। তুমি আজ আর কোথাও যাবে না?

না।

বকুল মৃদু হেসে বলল, মামুন ভাই অপেক্ষা করে থাকবে। মুনা কিছু বলল না। বকুল তরল গলায় বলল, আমার কেন যেন মনে হচ্ছে তিনি তোমাকে দেখার জন্যে আজ এখানে চলে আসবেন।

বকুল লক্ষ্য করল। মুনা এই প্রসঙ্গটি পছন্দ করছে না। সে কিছুটা বিব্রত বোধ করল। প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, তোমার চোখ লাল টকটকে হয়ে আছে। শুয়ে থাক না।

সন্ধ্যার দিকে মুনার জ্বর খুবই বাড়ল। শওকত সাহেব একটা থার্মোমিটার কিনে আনলেন। জ্বর একশ তিনের কাছাকাছি। তিনি থমথমে স্বরে বললেন, বৃষ্টির মধ্যে ঝাপঝাঁপি, জ্বর তো হবেই। শরীর বেশি খারাপ লাগছে? মুনা ক্লান্ত স্বরে বলল, কনের কাছে বকবক করলে খারাপ লাগে। তুমি যাও তো ঘর থেকে। শওকত সাহেব নড়লেন না। পাশেই বসে রইলেন।

বাতি নিভিয়ে দাও মামা, চোখে লাগছে।

বাবু বাতি নিভিযে বারান্দায় একা একা বসে রইল। বকুল রাতের রান্না চড়িয়েছে। একা একা রান্নাঘরে তার একটু ভয় লাগছে। সে বেশ কয়েকবার বাবুকে ডেকেছে। বাবু আসেনি। লতিফার পানির তৃষ্ণা হয়েছিল। ক্ষীণ কণ্ঠে কয়েকবার পানির কথা বললেন, কেউ শুনল না। তিনি আবার ঘুমিয়ে পড়লেন। বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারেন না। চোখ জড়িয়ে আসে।

মুনা বলল, মামা তুমি আমার পাশে এ রকম বসে থাকবে না তো! অন্য ঘরে যাও।

তোর কোনো অসুবিধা করছি নাকি?

করছি। ভোস-ভোস করে সিগারেট টানছ। গন্ধে থাকতে পারছি না।

শওকত সাহেব আধাখাওয়া সিগারেটটা ফেলে দিলেন। মৃদু স্বরে বললেন, গ্রিন ফার্মেসিতে বলে এসেছি, ডাক্তার এলেই পাঠিয়ে দেবে।

মুনা পাশ ফিরল।

গায়ের ওপর কথাটা দিয়ে রাখ না। ফেলে দিচ্ছিস কেন?

গরম লাগছে তাই ফেলে দিচ্ছি। ঠাণ্ডা লাগলে আবার দেব। তুমি ও-ঘরে গিয়ে বস না মামা।

শওকত সাহেব উঠলেন না। গলার স্বর অনেকখানি নামিয়ে বললেন, তোর বাবা তোর বিয়ের জন্যে আলাদা করে কিছু টাকা দিয়ে গিয়েছিল আমাকে। নয়। হাজার টাকা। সেই আমলে নয়। হাজার টাকা অনেক টাকা। বুঝলি মুনা, টাকাটা সংসারে খরচ হয়ে গেছে।

খরচ হয়েছে ভাল হয়েছে। এখন চুপ কর।

আমি প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে ছয় হাজার টাকা তুলে রেখেছি। তুই নিয়ে নিস। বাকিটা পরে দেবী! ভাগে ভাগে দেব।

মামা আমাকে কোনো টাকা-পয়সা দেয়ার দরকার নেই! তোমরা না দেখলে আমার যাওয়ার জায়গা ছিল? তুমি আমাকে যে আদর কর তার দশ ভাগের এক ভাগ নিজের ছেলেমেদের কোনোদিন করেছ? আর আজ তুমি টাকার কথা তুললে? ছিঃ ছিঃ!

না মানে…।

মাঝে মাঝে তুমি এমন সব আচরণ করা যে মেজাজ ঠিক থাকে না।

কী করলাম?

এই যে দুপুরে খেতে বসে চেঁচামেচিটা করলে। বেচারী বকুল কেঁদে কেটে অস্থির। ভাত খায়নি দুপুরে।

ননীর পুতুল একেকজন। ধমক দিলে খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। চড় দিয়ে দাঁত ফেলে দিতে হয় এদের।

তুমি যাও তো মামা, ওকে দু’একটা মিষ্টি কথা বল। আমার কানের কাছে বসে ঘ্যান ঘ্যান করবে না;

শওকত সাহেব উঠে পড়লেন। বারান্দায় গিয়ে প্রচণ্ড একটা ধমক দিলেন বাবুকে বই নিয়ে বসার কথাটা বলে দিতে হবে?

বাবু শুকনো মুখে বই আনতে গেল।

অংক বই খাতা নিয়ে আয়। গায়ে তো কারো বাতাস লাগে না? শক্ত মার দিলে হুঁশি হবে। তার আগে হুঁশি হবে না। শয়তানের ঝাড়। দুপুরবেলা হুঁট করে কোথায় গিয়েছিলি?

বাবু কোনো জবাব দিল না। অংক খাতা ও বই নিয়ে বসল। তার মুখ সাদা হয়ে গেছে। বাবাকে সে খুব ভয় পায়। শওকত সাহেব রান্নাঘরে উঁকি দিলেন। বকুল বাবাকে দেখে জড়সড় হয়ে গেল।

রান্নাঘরটাকে একেবারে দেখি পায়খানা বানিয়ে রেখেছিস; গুছিয়ে-টুছিয়ে নিতে পারিস না। কোনোটাই তো দেখি হয় না। পড়াশুনা না কাজকর্মও না। কারবিটা কি? কারো বাড়িতে ঝিগিরিও তো পাবি না। এক কাপ চা বানিয়ে দিয়ে যা।

বকুল ক্ষীণ স্বরে বলল, দুধ চা?

একটা হলেই হল। তোর মা কিছু খেয়েছিল দুপুরে?

রুটি খেয়েছিল।

মুনার জন্যে হালকা করে বার্লি বানা। লেবুর রস দিয়ে লবণ দিয়ে ভাল করে বানা। বার্লি আছে না ঘরে?

আছে।

শওকত সাহেব চলে গেলেন। তখন বকুলের মনে পড়ল ঘরে বার্লি নেই। এই কথাটা এখন বাবাকে বলবে কে? রাগে নিজের হাত কামড়াতে ইচ্ছা হচ্ছে। সে বাবার জন্যে চায়ের পানি চড়াল। ঘরটা একটু গোছাতে চেষ্টা করল। তার আবারও কেন জানি ভয় ভয় করছে। রান্নাঘরে একা থাকলেই একটা ভয়ের গল্প মনে হয়। ঐ যে রান্নাঘরে একটি বউ একা একা মাছ ভাজছিল। হঠাৎ জানালা দিয়ে একটা রোগাকালো হাত বেরিয়ে এল। নাকি সুরে একজন কে বলল, মাছ ভাজা দে। তাছাড়া আজ দুপুরেও ভাবী পাঁচ-ছটা ভূতের গল্প বলেছে। তার কোন খালার নাকি জ্বীনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল। সেই জ্বীন সুন্দর সুন্দর সব জিনিসপত্র এনে দিত। একবার নাকি একটা ফুলের মালা এনে দিয়েছিল যার সবগুলি ফুল কুচকুচে কালো রঙের। দিনের বেলা গল্পগুলি শুনে হাসি এসেছে কিন্তু এখন আবার কেমন ভয় ভয় লাগছে। সবগুলি গল্পই মনে হচ্ছে সত্যি। ভাবী বলছিল–তুমি যা সুন্দর, সাবধানে থাকবে ভাই। ভর দুপুরে আর সন্ধ্যায় এলোচুলে থাকবে না। বকুল অবাক হয়ে বলেছিল, এলোচুলে থাকলে কি হয়?

খারাপ বাতাস লাগে।

খারাপ বাতাস লাগে মানে?

জীন-ভূতের আছর হয়। সুন্দরী মেয়েদের ওপর জ্বীনের আছর হওয়া খুব খারাপ। সারা রাত এরা ঘুমুতে দেয় না। বিরক্ত করে।

কিভাবে বিরক্ত করে?

এখন বুঝবে না। বিয়ে হওয়ার পর বুঝবে।

এই বলে ভাবী মুখ টিপে টিপে হাসল। রহস্যময় হাসি।

কি বকুল শুনতে চাও কিভাবে বিরক্ত করে?

না শুনতে চাই না।

অবশ্যি অনেকে সেটা পছন্দও করে। আমার ঐ খালার কথা বলছিলাম না সেই খালা জ্বীন না এলে কেমন অস্থির হয়ে যেত কাপড়-টাপড় খুলে ফেলে বিশ্ৰী কাণ্ড করত।

এখন তিনি কোথায় থাকেন?

চাঁদপুরে। এখন আর এইসব নেই। খুব ভাল মানুষ। এক ওভারশিয়ারের সাথে বিয়ে হয়েছে। তিন ছেলেমেয়ে। জ্বীন-ভূতের কথা আর কিছুই মনে নেই।

ডাক্তার এল সাড়ে নটার সময়। তার সঙ্গে এল বাকের। বাকেরের গায়ে চকচকে লাল রঙের একটা শার্ট। শার্টের পকেটে ফাইভ ফাইভের প্যাকেট উঁচু হয়ে আছে। তার মুখ অত্যন্ত গম্ভীর। যেন অসুখের ব্যাপারে দারুণ চিন্তিত। বাকেরকে দেখে মুনার বিরক্তির সীমা রইল না। তাকে পরিষ্কার করে বলা হয়েছে–এ বাড়িতে যেন কোনোদিন না আসে। তবু কেমন নির্লিজের মত এসেছে। আর বাবুর কাণ্ড, একেবারে শোবার ঘরে নিয়ে আসতে হবে। সে তো অব ডাক্তার না। মুনা বিরক্ত চোখে তাকিয়ে রইল। বাকের বলল, খুব ফুঁ হচ্ছে চারদিকে। কাহিল অবস্থা। জ্বর বেশি। নাকি তোমার?

মুনা জবাব দিল না। তাকাল ডাক্তারের দিকে। এই ডাক্তার এ পাড়ায় নতুন এসেছে। দেখে মনে হয় নাইন-টেনে পড়ে। স্টেথিসকোপ হাতে নিয়ে এমন ভাবে চারদিক দেখেছে যেন যন্ত্রটি নিয়ে সে কি করবে। মনস্থির করতে পারছে না। কিংবা হয়ত স্টেথিসকোপ বুকে বসাতে সাহস করছে না। মুনা বলল, আমার গলাটা দেখুন। ঢোঁক গিলতে পারি না।

ডাক্তার সাহেব গলায় ছোট্ট একটা টর্চের আলো ফেললেন। বাকের বলল, দেখি আমি টর্চ ধরছি, আপনি দেখুন ভাল করে। ডাক্তারের কিছু বলার আগেই সে টর্চ নিয়ে নিল। মুনা বলল, আপনি বসার ঘর গিয়ে বসুন না। ওঁকে দেখতে দিন।

উনিই তো দেখছেন। আমি দেখছি নাকি? আমি কি ডাক্তার? হা হা হা।

ডাক্তার সাহেব বললেন, কানে ব্যথা আছে?

জি না।

আপনার কি আগেও টনসিালের প্রবলেম ছিল?

জি।

বাকের একগাল হেসে বলল, একেবারে ছেলেবেলা থেকে মুনার এই প্রবলেম। বৃষ্টির একটা ফোঁটা পড়ল, ওমনি তার গলা ফুলে গেল। পিকিউলিয়ার।

ডাক্তার সাহেব নিচু স্বরে বললেন, একটা থ্রোট কালচার করা দরকার।

বাকের বলল, দরকার হলে করবেন। একবার কেন দশবার করবেন। হা হা হা।

মুনা, বলল, আপনারা বসার ঘরে গিয়ে বসুন। আমি চা দিতে বলি।

বাকের বলল, চা-টা কিছু লাগবে না। রোগীর বাসায় কোনো খাওয়া-দাওয়া করা ঠিক না। কি বলেন ডাক্তার সাহেব? ডাক্তার কিছু বললেন না। বকুলের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমাকে একটু পানি দেবেন? হাত ধোব।

এই প্রথম বোধ হয় বয়স্ক একজন কেউ বকুলকে আপনি বলল। বকুলের গাল টকটকে লাল হয়ে গেল মুহুর্তেই। সে অনেকখানি মাথা নিচু করে ফেলল। বাকের বলল, সাবান আর পানি নিয়ে আস বকুল। পরিষ্কার দেখে একটা টাওয়ালও আনবে।

মুনু বলল, বাকের ভাই, আপনি বসার ঘরে চলে যান। মামার সঙ্গে কথা বলুন। এই ঘরটা গরম।

ফ্যানটা ছাড় না।

ফ্যান নষ্ট। কয়েল নষ্ট হয়ে গেছে।

তাই নাকি! আচ্ছা সকাল বেলা লোক পাঠিয়ে দেব খুলে নিয়ে যাবে। মদীনাকে বললেই এক ঘণ্টার মধ্যে ঠিক করে দেবে।

ঝামেলা করতে হবে না।

কোনো ঝামেলা না। মদীনা শালাকে একটা ধমক দিলেই হবে।

বাকের বেশ নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে সিগারেটের প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করল। চকচকে লাইটার বের করে অনেক সময় নিয়ে সিগারেট ধরাল।

ডাক্তার সাহেব বারান্দায় হাত ধুতে গিয়ে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, কী নাম আপনার? উত্তর দিতে বকুলের খুব লজ্জা লাগতে লাগল। তার মনে হল যেন এর উত্তর দেয়াটা ঠিক না। সে অস্পষ্ট স্বরে বলল, বকুল। আমাকে তুমি করে বলবেন। আমি স্কুলে পড়ি।

তাই নাকি! কোন স্কুলে?

মডেল গার্লস স্কুলে?

মেট্রিক দেবে এবার?

জি।

সায়েন্স?

জি না।

সায়েন্স পড়লে ভাল করতে। ডাক্তার হতে পারতে। ডাক্তারের খুব দরকার আমাদের। মেয়ে ডাক্তারের দরকার আরো বেশি।

বকুল কিছু বলল না। জগে করে পানি ঢেলে দিতে লাগল। ডাক্তার সাহেবের হাত পরিষ্কার করতে অনেক সময় লাগল। যাবার সময় তিনি ভিজিট ও নিলেন না। কেন ভিজিট নিচ্ছেন না সেই কারণটিও স্পষ্ট করে বলতে পারলেন না। হড়বড় করে যা বললেন তার মানে হল–সবার কাছ থেকে তিনি ভিজিট নেন না। ডাক্তারি তো কোনো ব্যবসা না। ব্যবসায়ী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এটাকে দেখা ঠিক না…ইত্যাদি।

তারা বেশ কিছু সময় বসার ঘরে বসে রইল। ডাক্তার সাহেব বললেন তিনি চা খান না, তবুও শেষ পর্যন্ত চা খেলেন। বাকের বলল ঘরে কাজের লোক নেই এটা তাকে বললেই একটা ব্যবস্থা করতে পারত। বাবুকে সে ছোটখাটো একটা ধমকও দিল, রোজ দেখা হয়, আমাকে বললেই পারতি।

পরদিন সকালে মদন মিস্ত্রীর লোকজন এসে ফ্যান খুলে নিয়ে গেল। বলে গেল বিকেলের মধ্যে দিয়ে যাবে। তার কিছুক্ষণ পর এলেন ডাক্তার সাহেব। তিনি নাকি পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। রুগী কেমন আছে দেখে যেতে এসেছেন। বকুল তাকে চা বানিয়ে খাওয়াল। চাটা তার কাছে খুব চমৎকার লাগল। কোন দোকান থেকে চায়ের পাতা কেনা হয়েছে তা জানতে চাইলেন। বকুল চোখ-মুখ লাল করে তার সামনে বসে রইল। ডাক্তার সাহেব যাবার আগে বললেন, বকুল যাই। বকুলের কিছু একটা বলা উচিত। কিন্তু সে বলতে পারল না।

০৪. পাল বাবু অবাক হয়ে বললেন

পাল বাবু অবাক হয়ে বললেন, এ কি অবস্থা ম্যাডাম!

মুনা বলল, ক’দিন খুব ভুগলাম। টনসিলাইটিস। আপনার ভাল তো?

ভালই। তিন দিনের জ্বরে কারো এমন অবস্থা হয় জানতাম না। আপনার দিকে তাকানো যাচ্ছে না। গেছো পেত্নীর মত লাগছে। রাগ করলেন নাকি?

মুনা রাগ করল না, তবে বিরক্ত হল। পাল বাবু বড় বিরক্ত করতে পারেন। মেয়েদের টেবিল বেছে বেছে বসবেন, সামান্য জিনিস নিয়ে বকবক করে মাথা ধরিয়ে দেবেন।

আপনার ভাবী স্বামী এসেছিলেন। তারও দেখলাম মুখ শুকনো। সিক লিভের দরখাস্ত করেছেন শুনে মুখ আরো শুকিয়ে গেল। উনি গিয়েছিলেন নাকি আপনাদের ওখানে?

না যায়নি।

সেটাই ভাল, ঘন ঘন শ্বশুর বাড়ি যাওয়া ভাল না। এই আমাকে দেখেন, প্রতি বৃহস্পতিবার শ্বশুরবাড়ি যাই–শুক্র, শনি দু’দিন থাকি। এতে লাভটা কী হয়েছে জানেন? শ্বশুরবাড়িতে প্রেস্টিজ আমার কিছুই নেই।

মুনা শুকনো গলায় বলল, তাই নাকি?

হ্যাঁ। গত সপ্তাহে শ্বশুরমশাই আমাকে বললেন, বাবা রেশনটা একটু তুলে দিতে পারবে? চিন্তা করেন অবস্থা, জামাইকে বলছে রেশন তুলতে।

মুনা সবচেয়ে উপরের ফাইলটা খুলল। দশটা এখনো বাজেনি। অফিস ফাঁকা। ইলিয়াস সাহেব আর আখতারুজ্জামান সাহেব এসেছেন। ওদের টেবিল ঘরের শেষ প্রান্তে। মুনার সঙ্গে তাদের তেমন আলাপ নেই। তবু আখতারুজ্জামান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন–শরীর ঠিক হয়েছে? খুব কাহিল হয়েছে দেখি। মুনা বলল, আপনার ভাল ছিলেন সবাই? বলেই মনে হল কথাটা খুব মেয়েলি হয়ে গেল। তিন দিন পর এসেই আপনার ভাল ছিলেন সবাই জিজ্ঞেস করাটা আদিখ্যেতার মত।

কী হয়েছিল। আপনার, ফু?

মুনা জবাব দেবার আগেই পাল বাবু বললেন ম্যাডামের হয়েছে টনসিলের ব্যারাম, হা হা হা।

কিছু কিছু লোক থাকেন এমন বিশ্ৰী স্বভাবের। পাল বাবুর মত আরেকজন আছে সিদ্দিক সাহেব। সব সময় গলা নিচু করে এমন ভাবে কথা বলবেন যেন মনে হয় ষড়যন্ত্র করছেন। ম্যাচের কাঠি দিয়ে দাঁত খোঁচাবেন এবং কাঠিগুলো টেবিলের ওপর ফেলে রেখে যাবেন। অসহ্য।

বড় সাহেবের বেয়ারা মুনির এসে বলল, আপনারে স্যার ডাকে। পাল বাবু ভ্রূ কুঁচকে বললেন, অফিস তো এখন শুরু হয় নাই, এখনই কিসের ডাকাডাকি? যাও, বল দশ মিনিট পরে আসবে। না না ম্যাডাম, ডাকা মাত্রই ছুটে যাওয়া ঠিক না। বসেন চা খান, তারপর যান। চায়ের কথা বলে এসেছি।

চা তো আমি বেশি খাই না।

আরে খান না। খাওয়ার পর একটা পান খান, মাইল্ড একটা জর্দা আছে। মুর্শিদাবাদ থেকে আমার এক মামা-শ্বশুর পাঠিয়েছেন।

মুনাদের অফিসের বড় সাহেব লোকটি ছোটখাটো। বালক বালক চেহারা কিন্তু লোকটি কাজ জানে এবং কাজ করতেও পারে। কাজ জানা সমস্ত মানুষদের মত সেও অফিসের খুব অপ্রিয়। তার নামে নানান রকম গুজব ও আছে। টিফিন টাইমে সে নাকি মেয়েদের ঘরে ডেকে নিয়ে যায়। এবং কাজের প্রশংসা করবার ছলে পিঠ চাপরায় কিংবা হাত ধরে। একবার নাকি ডিসপ্যাস সেশনের নিনু খানের ব্লাউজ খুলে ফেলেছিল। বিরাট কেলেংকারি। মুনির সেই সময় চা নিয়ে ঢুকেছিল বলে তার চাকরি যায় যায় অবস্থা।

মুনার সঙ্গে এরকম কিছু এখন পর্যন্ত ঘটেনি। তবু যতবারই সে বড় সাহেবের ঘরে ঢোকে ততবারই দারুণ অস্বস্তি ভোগ করে। আজও সে ঢুকাল ভয়ে ভয়ে। ইসরাইল সাহেব তীক্ষ্ণ চোখে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, খুব কাহিল হয়েছে তো?

জি স্যার। টনসিল ফুলে গিয়েছিল।

ভালমত চিকিৎসা করান। কেটে ফেলে দিন। নয়ত রেগুলার অফিস কামাই হবে। গত তিন মাসে আপনি নয় দিন ছিলেন সিক লিভে। ফাইলটা সেদিন দেখলাম।

মুনা কিছু বলল না। ইসরাইল সাহেব গম্ভীর স্বরে বললেন, বসুন দাঁড়িয়ে আছেন কেন? মুনা আড়ষ্ট হয়ে সামনের একটি চেয়ারে বসল। ইসরাইল সাহেব থেমে থেমে বললেন, না দেখে চিঠিতে সই করেন কেন? টাইপিস্টরা ভুল করেই। কাজেই এদের টাইপ করা প্রতিটি শব্দ চেক করতে হয়। বিশেষ করে ফিগারগুলো

মুনা ঠিক বুঝতে পারল না ঝামেলাটা কি। বড় রকমের কিছু হওয়ার কথা না। সে চিঠিপত্র দেখেই সই করে।

এনকো কর্পোরেশনের কাছে লেখা চিঠিতে স্পষ্ট লেখা হয়েছে এগার হাজার নয়শ ছত্ৰিশ। একচুয়েল ফিগার হবে এগার হাজার ছয়শ ছত্রিশ। কমন মিসটেক, ছয় হয়েছে নয়। আমি জাস্ট আউট অব কিউরিওসিটি ফাইলটা আনিয়ে দেখি এই ব্যাপার।

মুনা সাবধানে একটি নিঃশ্বাস ফেলল। ইসরাইল সাহেব বললেন, এর জন্যেই ডেকেছিলাম, যান।

স্নামালিকুম স্যার।

ওয়ালাইকুম সালাম। শুনুন, আপনার শরীর বেশি খারাপ মনে হচ্ছে। আজ দিনটা বরং রেস্ট দিন। ঘণ্টা খানিক থেকে ফাইলপত্র অন্য কাউকে বুঝিয়ে দিয়ে চলে যান।

মুনা থ্যাংক ইউ বলতে গিয়েও বলতে পারল না। এই লোকটির সামনে সে ঠিক সহজ হতে পারে না। মুনা ক্ষীণ স্বরে বলল, স্যার যাই।

ঠিক আছে যান। তারেক সাহেব থাকলে একটু পাঠিয়ে দেবেন।

জি আচ্ছা স্যার।

ঘণ্টা খানিক থেকে চলে যেতে বললেও মুনা লাঞ্চ ব্রেক পর্যন্ত থাকল। জমে থাকা কাজগুলি নিখুঁতভাবে করতে চেষ্টা করল। মাথা হালকা হয়ে আছে। খুব মন দিয়ে কিছু পড়তে গেলেই আপনাতেই চোখ বন্ধ হয়ে আসে। চোখ বন্ধ করে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিতে হয়। তারেক একবার বলেই ফেলল, ঘুমাচ্ছেন নাকি আপা?

নারে ভাই। মাথা ঘুরছে।

বড় সাহেব যেতে বলেছে চলে যান না। জরুরি কাজ যা আছে দিয়ে যান আমার টেবিলে, অবসর পেলে করে দেব।

কাজ তেমন নেই কিছু।

তাহলে শুধু শুধু বসে আছেন কেন? মুনিরকে বলেন একটা রিকশা ডেকে দেবে।

মুনা মুনিরকে ডাকল। অফিসের আশপাশে রিকশা পাওয়া যায় না। মোড় থেকে ডেকে আনতে হয়। এ রকম এক অন্ধগলিতে এত বড় অফিস কোম্পানি কেন বানাল কে জানে। অফিস থাকবে মতিঝিলে।

তারেক, যাই ভাই।

ঠিক আছে আপা যান। কাল কথা হবে। বাসার দিকেই তো যাবেন?

হুঁ।

মুনা অফিসের এই একটিমাত্র ছেলেকে নাম ধরে ডাকে এবং তুমি বলে। যদিও সে নিশ্চিত তারেক বয়সে বড়ই হবে। তুমি ডাকার ব্যাপারটিও কিভাবে শুরু হয়েছে মুনা নিজেও জানে না। প্রায় অবাক হয়েই এক’দিন সে লক্ষ্য করেছে তারেক আপনি বললেও সে নিজে বলছে তুমি। মামুনের সঙ্গে বিয়ের ব্যাপারটা এত পাকাপাকি না থাকলে অফিসে এই নিয়ে একটা আলোচনা হত। পাল বাবু সস্তা ধরনের কিছু রসিকতা করারও চেষ্টা করতেন।

রিকশায় উঠেই মুনার মনে হল বাসায় এই সময় ফিরে কোনো লাভ নেই। দুপুরে ঘুমুলেই সারাটা বিকাল এবং সারাটা সন্ধ্যা তার খুব খারাপ কাটে। রাতের বেলা ঘুম আসে না। রাত দুটো তিনটে পর্যন্ত জেগে থাকতে হয়। মুনা রিকশাওয়ালাকে বলল মগবাজারের দিকে যেতে। এ সময় মামুনের মেসে থাকার কথা নয়। তাকে পাওয়া যাবে না এটা প্রায় একশ ভাগ সত্যি। তবু একবার দেখে গেলে ক্ষতি নেই কোনো। না পাওয়া গেলে কলেজে গিয়ে খোঁজ নেয়া যাবে। কোন বইতে যেন পড়েছিল পুরুষরা সবচে খুশি হয় যখন তারা মেয়েদের কাছ থেকে সিগারেট উপহার পায়। মামুনকে সে আগেও কয়েকবার সিগারেট দিয়েছে, কোনোলারই মনে হয়নি সে খুব খুশি হয়েছে। এমন ভাবে প্যাকেট খুলেছে যেন এটা তার প্রাপ্য। আজও তাই করবে।

মামুন মেসে ছিল না। তার পাশের রুমের আলম সাহেব বললেন, উনি তো টেলিগ্রাম পেয়ে দেশে গেছেন। তার এক বোন মারা গেছে, আপনি কিছু জানেন না?

না।

অনেক দিন ধরে অসুস্থ ছিল। উনার সবচে ছোট বোন।

মুনা একটু বিব্রত বোধ করতে লাগল। এত বড় একটা ব্যাপার মামুন তাকে কোনোদিন বলেনি। তার একটি ছোট বোন আছে তা সে জানত কিন্তু এই বোনের এমন একটা অসুখ তা মামুন কোনোদিন বলেনি।

বসবেন আপনি?

জি না, বসব না। ও দেশে গেছে কবে?

পরশু সকালে। টেলিগ্রাম এসেছে তার আগের রাত্রে। ট্রেন ছিল না, যেতে পারেনি।

কবে আসবে কিছু বলে গেছে?

জি না কিছু বলেনি। আজ-কালের মধ্যে এসে পড়বে। মরবার পর তো আর কিছু করার থাকে না, শুধু শুধু ঘরে বসে থেকে হয়টা কি?

মুনা ক্লান্ত ভঙ্গিতে এসে রিকশায় উঠল। কড়া রোদ এসেছে। চকচক করছে চারদিক। তাকালেই মাথা ধরে যায়। মুনা হ্যান্ড ব্যাগ খুলে সানগ্লাস বের করল। রোদটা খুব চোখে লাগছে।

সানগ্নাস ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত। চোখে পরিবার সঙ্গে সঙ্গে চারদিক কেমন মেঘলা হয়ে যায়। একটু যেন মন খারাপ ও লাগে। মুনা ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেলল। অস্পষ্ট ভাবে তার মনে হতে লাগল–মামুন কখনো তার নিজের ভাই-বোন-মা-বাবার কথা নিয়ে তার সঙ্গে গল্প করেনি। এমন একজন অসুস্থ বোন ছিল তার এটাও পর্যন্ত বলেনি। না বলার পেছনে কোনো যুক্তি নেই। মুনার খুব জানতে ইচ্ছে হল এই বোনটি কি ওর খুব আদরের ছিল? নামই বা কি তার? নাম মামুন বলেছিল, খুবই কমন একটা নাম বলে এখন মনে পড়ছে না। রোকেয়া বা সাবিহা জাতীয়।

মুনার মনে হল একটা চিঠি লিখে রেখে এলে ভাল হত। অল্প কয়েক কথার সুন্দর একটা চিঠি–

হঠাৎ করে তোমার বোনের মৃত্যু সংবাদ শুনলাম।

সে যে অসুস্থ তা তো তুমি কখনো বলনি।…

চিঠিটা ঠিক হচ্ছে না। অভিযোগের ভঙ্গি এসে পড়েছে। কেন অসুস্থতার খবর আগে বলা হয়নি। সেই নিয়ে অভিযোগ। পুরোপুরি মেয়েলি অভিযান। মৃত্যুর মত এত বড় একটা ব্যাপারের পাশে মেয়েলি অভিযোগ একেবারেই মিশ খায় না।

মুনা মনে মনে চিঠিটা অন্যভাবে লিখতে চেষ্টা করল। এবং এক সময় খুবই অবাক হয়ে লক্ষ্য করল। তার চোখ ভিজে উঠেছে। কেন মামুন তাকে আগে বলল না?

বকুলদের স্কুলে কোনোদিনই পুরোপুরি ক্লাস হয় না। প্রায় দিনই সেভেনথ পিরিয়ডে ছুটি হয়ে যায়। আজ সেভেনথ পিরিয়ডে রেহানা। আপার ক্লাস। এই ক্লাসটা হবে না ধরেই নেয়া যায়। কারণ রেহানা আপার অনেক রকম যোগাযোগ আছে। সে সব নিয়ে তাকে ব্যস্ত থাকতে হয়। মেয়েদের টিফিন এবং কোঅপারেটিভদের দোকান তিনিই চালান। গার্লস গাইড এবং সবুজ সেবিকার ব্যাপারগুলিও তাকে দেখতে হয়। নিয়মিত ক্লাস নেবার সময় কোথায় তার! কিন্তু আজ তাকে ক্লাসে আসতে দেখা গেল। তাঁর মুখ গম্ভীর, হাতে প্রকাণ্ড একটা গ্লোব। তিনি ক্লাসে ঢুকেই ব্ল্যাকবোর্ডে বড় বড় করে লিখলেন, জলবায়ু। জলবায়ু তিনি গত সপ্তাহের আগের সপ্তাহে পড়িয়েছেন, কেউ অবশ্যি তাকে সেটা বলল না।

ফরিদা তুই বল জলবায়ু মানে কি?

ফরিদা ফ্যাকাশে মুখে দাঁড়িয়ে রইল। তিনি তাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ছাত্রীদের মোট সংখ্যা গুণতে লাগলেন। সব মিলিয়ে আটত্রিশ জন ছাত্রী উপস্থিত। তিনি মুখ অন্ধকার করে বললেন, আটত্রিশ জন প্রেজেন্ট, কিন্তু টিফিন এনেছিস একচল্লিশটা, কেন?

ক্লাস ক্যাপ্টেন অনিমার মুখ শুকিয়ে গেল।

বল একচল্লিশটা টিফিন কেন?

অনিমা আমতা আমতা করতে লাগল।

চুরি শিখে গেছিস এই বয়সে, বাবা কি করে?

অনিমার মুখে কথা জড়িয়ে গেল। রেহানা আপা আরো গম্ভীর হয়ে বললেন, জলবায়ু কাকে বলে বল দেখি? এটি একটি কাঁচা কাজ হয়ে গেল। কারণ অনিমা খুবই ভাল ছাত্রী। জলবায়ু কি এটি সে তার চেয়েও অনেক গুছিয়ে বলল।

ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের জলবায়ু কী বল?

আপা এটা এখনো পড়ানো হয়নি?

সব কিছু পড়িয়ে দিতে হবে? নিজে নিজে পড়া যায় না? তুই আজ ক্লাস শেষে আমার সঙ্গে দেখা করবি। বসছিস কি জন্যে? বসতে বলেছি? দাঁড়িয়ে থােক। ফরিদা তুইও দাঁড়িয়ে থাক।

তিনি প্ৰায় দশ মিনিট ধরে মেয়েদের মিথ্যা বলার অভ্যাস এবং চুরি করার অভ্যাসের ওপর বক্তৃতা দিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। ক্লাসে টু শব্দও হল না। তিনি কপালের ঘাম মুছে ক্লান্ত স্বরে বললেন, বকুল ক্লাসে এসেছে?

সবচে পেছনের বেঞ্চ থেকে বকুল ভয়ে ভয়ে উঠে দাঁড়াল।

তোকে গতকাল টিফিন পিরিয়ডে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলেছিলাম, করেছিলি?

আপা, আমি গিয়েছিলাম, আপনি হেড আপার সঙ্গে কথা বলছিলেন।

কথা কি আমি সারা জীবন ধরে বলেছিলাম? পাঁচ মিনিট দাঁড়ানো গেল না?

বকুল প্রায় আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু সে কিছু বলল না।

আজ ক্লাস শেষ হবার সাথে সাথে আসবি। বাংলাদেশের জলবায়ু কি রকম বল?

বকুল ঘামতে লাগল।

বইয়ের সঙ্গে কারো কোনো সম্পর্ক নেই? মৌসুমী বায়ু কাকে বলে? কেউ জানো না? কে জানে? হাত তোল।

শুধু অনিতা হাত তুলল। তিনি অনিমাকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। বিমর্ষ মুখে বাংলাদেশের জলবায়ুর কথা বলতে লাগলেন। গত সপ্তাহের আগের সপ্তাহেও একই কথা বলেছিলেন। তার মনে নেই। ক্লাসের মেয়েরা ঘণ্টা পড়ার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল। ঘণ্টা আর পড়ছে না। তাদের মনে হল তারা অনন্তকাল ধরে ক্লাসে বসে আছে।

বকুল টিচার্স কমন রুমে ভয়ে ভয়ে উঁকি দিল। রেহানা আপা হাত নেড়ে নেড়ে অংক আপার সঙ্গে কথা বলছে। তিনি ইশারায় বকুলকে অপেক্ষা করতে বললেন। কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে কে জানে। অন্য ছাত্রীরা সব চলে যাচ্ছে। স্কুল ঘর দ্রুত ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। আজ তার একা একা যেতে হবে। বকুল কিছুক্ষণ পর পর্দা ফাঁকা করে আবার উঁকি দিল। রেহানা আপা এবং অংক আপা দুজনেই খুব হাসছে। অংক আপা কখনো হাসেন না। তার হাসি দেখে বকুল খুবই অবাক হল। ংক আপা বকুলকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হাসি থামিয়ে গম্ভীর হয়ে গেলেন। রেহানা আপার মুখ অবশ্যি এখনো হাসি হাসি। তিনি চটের ব্যাগটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলেন।

বকুল তুই আয়, হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি। রাস্তার মোড় পর্যন্ত এগিয়ে দেব। তারপর রিকশা নিয়ে চলে যাবি। কাল যখন স্কুলে আসবি তখন মনে করে তোর একটা ছবি নিয়ে আসবি।

বকুল অবাক হয়ে তাকাল। রেহানা আপা বললেন, শাড়ি পরা ভাল ছবি আছে?

জি না আপা।

তাহলে এক কাজ কর, আজ বিকেলেই একটা তুলিয়ে ফেল। চুলগুলি সামনে ছড়িয়ে দিবি। যাতে কত লম্বা সেটা টের পাওয়া যায়।

বকুল ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, জি আচ্ছা।

খুব দরকার, ভুলে যাবি না যেন আবার।

বকুল কথা বলল না। রেহানা। আপা বললেন, তুই তো সবার বড়, তাই না?

জি আপা।

ক ভাই-বোন তোরা?

এক ভাই এক বোন।

বাহ ছোট ফ্যামিলি তো। এক’দিন যাব তোদের বাসায়। তোর মাকে বলিস।

জি আচ্ছা।

পড়াশুনা করছিস তো ঠিকমত?

করছি।

লাস্ট বেঞ্চে বসিস কেন সব সময়? ফাস্ট, বেঞ্চে বসবি। মনে থাকবে?

থাকবে।

রেহানা। আপা রাস্তার মোড়ে বকুলের জন্যে একটা রিকশা ঠিক করে, রিকশাওয়ালার হাতে দুটাকা ভাড়া দিয়ে দিলেন।

বকুল হুঁড় তুলে দে। হুঁড না তুলে মেয়েদের রিকশা করে যাওয়া আমার পছন্দ না।

বকুল সারা পথ অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। মেয়েদের কাছে রেহানা। আপার ছবি চাওয়া কোনো নতুন ব্যাপার না। তিনি উপরের ক্লাসের সুন্দরী মেয়েদের কাছে (বেছে বেছে, সবার কাছে না) ছবি চান এবং তার দিন দশেকের মধ্যে সেই সব মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়। আজেবাজে বিয়ে নয়, ভাল বিয়ে।

রেহানা। আপার ধারণা ক্লাস টেনে পড়া মেয়েরা হচ্ছে বিয়েব পাত্রী হিসেবে সর্বশ্রেষ্ঠ। এই সময়টা মেয়েরা ছেলেদের সম্পর্কে প্রথম কৌতূহলী হয় এবং প্রেম করবার জন্যে ছোক ছোক করে। বিয়ের পর হাতের কাছে স্বামীকে পায় বলেই প্রথম প্ৰেম হয়। স্বামীর সঙ্গে। সে প্ৰেম দীর্ঘস্থায়ী হয়। ক্লাস টেনে পড়া মেয়েদের সম্পর্কে তার নানা রকম থিওরি আছে। এই সব থিওরি তিনি অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে প্রচার করে থাকেন।

শওকত সাহেব বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি বকুলকে রিকশা থেকে নামতে দেখে অবাক হলেন। তাকে রিকশা ভাড়া দেয়া হয় না। স্কুল এত দূরে নয় যে, রিকশা করে যাওয়া-আসা করতে হবে। সংসারে কোনো কাঁচা পয়সা নেই। বকুল বোধ হয় মুনার কাছ থেকে নিচ্ছে। মুনা এই সংসারে নানান ভাবে টাকা খরচ করে। এটা তার পছন্দ নয়। কোন বইতে যেন পড়েছিলেন, যে সংসারে মেয়েদের রোজগারের টাকা খরচ হয় সেই সংসারের কোনো আয়উন্নতি হয় না।

বকুল ঘরে ঢুকলা খুব ভয়ে ভয়ে। তার ধারণা ছিল বাবা অকারণেই তাকে একটা ধমক দেবে। দেরি হল কেন? রিকশা করে এসেছিস কেন? কিন্তু শওকত সাহেব তেমন কিছুই করলেন না। মেয়ের দিকে ভালমত তাকালেনও না।

চারদিক ফাঁকা ফাঁকা। মুনা আপা বা বাবু কেউ নেই। সে মার ঘরে উঁকি দিল। লতিফা হাত ইশারায় তাকে আসতে বললেন। তার চোখ জুলজুল করছে, যেন বড় একটা কিছু ঘটেছে। তিনি ফিসফিস করে বললেন, তোর বাবার কি হয়েছে?

কেন? হবে। আবার কি?

মিষ্টি কিনে এনেছে।

কোথায় মিষ্টি?

ঐ দেখা ড্রেসিং টেবিলের উপর।

বকুল অবাক হয়ে দেখল সত্যি সত্যি এক প্যাকেট মিষ্টি। সে বলল, তুমি জিজ্ঞেস করণি কিছু?

না, তুই জিজ্ঞেস করে আয়।

মুনা। আপা আসুক, সে জিজ্ঞেস করবে।

লতিফা নিজের মনে বললেন, আজ তোর বাবা চেঁচামেচি রাগারগি কিছু করেনি। অফিস থেকে এসেছেও সকাল সকাল।

বকুল বলল, আজ তোমার শরীর কেমন?

ভালই। যা তোর বাবাকে চা বানিয়ে দে। ঘরে মুড়ি আছে। পেয়াজ-মরিচ দিয়ে মেখে দে।

বকুল বারান্দায় গেল। বাবা আগের মতই হাঁটাহাঁটি করছেন। কারো জন্যে অপেক্ষা করছেন বোধ হয়। বকুল ক্ষীণ স্বরে ডাকল বাবা।

কি?

চা আনি?

আন।

চায়ের সঙ্গে কিছু খাবে? ঘরে মুড়ি আছে। মেখে দেই।

দে। বেশি করে ঝাল দিবি। আর শোন, মিষ্টি এনেছি। তোর মাকে দে। তুইও খা।

বকুল ভয়ে ভয়ে বলল, মিষ্টি কি জন্যে?

এমনি আনলাম।

শওকত সাহেব সিগারেট ধরিয়ে বিব্রত ভঙ্গিতে কাশতে লাগলেন। মিষ্টি এনে তিনি যেন একটা অপরাধ করে ফেলেছেন।

বকুল ছবির কথা তুলাল রাতের খাবার সময়। অন্য সবার খাওয়া হয়ে গেছে। মুনা এবং সে বসেছে। শেষে। এ-কথা সে-কথার পর বকুল খুব স্বাভাবিক ভাবে রেহানা আপার ছবি-চাওয়ার কথা বলল। মুনা খাওয়া বন্ধ করে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, কেন, ছবি দিয়ে কি হবে?

আমি কি করে জানব। আপা?

তুই কিছু জিজ্ঞেস করিাসনি?

না।

ঠিক কি কি কথা হয়েছে তোর সাথে?

বকুল কথাগুলো গুছিয়ে বলতে চেষ্টা করল। কিন্তু ঠিকমত বলতে পারল না।

মুনা বলল, শাড়ি পরা ছবি চেয়েছে?

হ্যাঁ।

তোকে বিয়ে দিতে চায় নাকি?

বকুল কোনো জবাব দিল না।

কি, কথা বলছিস না কেন?

বোধ হয়। আপা এ রকম মেয়েদের কাছে ছবি চায়। তারপর ওদের বিয়ে হয়ে যায়। শায়লার এ রকম বিয়ে হল। ডাল নাও আপা। ডাল নিয়ে খাও।

খেতে ইচ্ছা করছে না।

মুনা প্লেট ঠেলে উঠে দাঁড়াল।

তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছ। আপা?

তোর ওপর বাগ করব কেন? তুই আয়, তোব সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে।

বাবু বিছানায় শুয়ে বই পড়ছিল। পড়ার ভঙ্গি দেখে মনে হতে পারে গল্পের বই। কিন্তু গল্পের বই না। বাবা যে কোনো সময় ঘরে ঢুকতে পারেন রাত দশটার আগে হাতে গল্পের বই দেখলে সৰ্ব্বনাশ হয়ে যাবে।

মুনা ঘরে ঢুকতেই বাবু হাসিমুখে বলল, ফ্যান দেখেছি আপা? নতুন ফ্যান। বাকের ভাই বলে গেছেন। পুরানটা ঠিক না হওয়া পর্যন্ত এটা থাকবে। মুনা বিরক্ত চোখে ফ্যান দেখল। কিছু বলল না। বাবু বলল, আরাম করে ঘুমানো যাবে, ঠিক না। আপা?

হুঁ। তোর মাথাব্যথা হয়নি?

না!

বিকেলে খেলতে গিয়েছিলি?

হুঁ।

এখন থেকে রোজ যাবি। নিয়মিত খেলাধুলা করলে মাথাব্যথা থাকবে না। ঝড় হোক, বৃষ্টি হোক, যাবি।

আচ্ছা যাব।

যা তো আমার জন্যে একটা পান নিয়ে আয়। কেমন যেন বমি বমি আসছে।

বাবু পান আনতে গিয়ে আর ফিরল না। শওকত সাহেব তাকে আটকে ফেললেন। ইংরেজি বানান ধরতে লাগলেন। মসকুইটো, এমব্রয়ডারি, ইনকুইজিটিভনেস এই জাতীয় বানান। বাবু তালগোল পাকিয়ে ফেলতে লাগল। যেটাতেই সে আটকাচ্ছে সেটাই ডিকশনারি খুঁজে বের করতে হচ্ছে। এবং বিশবার করে সশব্দে বানান করতে হচ্ছে।

রান্নাঘর গুছিয়ে বকুল যখন শোবার ঘরে উঁকি দিল তখন রাত দশটা বাজে। মুনা ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছে। বকুল মৃদু স্বরে ডাকল, আপা।

কি?

ঘুমোচ্ছ নাকি?

না।

কি যেন বলবে বলেছিলে আমাকে?

মুনা একটা লম্বা বক্তৃতা তৈরি করে রেখেছিল। কিন্তু বক্তৃতাটা দেয়া গেল না। সে শুধু বলল, তুই রেহানা আপাকে বলিস, আমার বাবা ছবি দিতে রাজি হলেন না। বকুল বলল, এটা কেমন করে বলব?

অন্য কথাগুলি যেমন করে বলিস ঠিক তেমনি বলবি।

আপা দারুণ রাগ করবে।

রাগ করলে করবে। রাগ কমানোর জন্যে বাচ্চা একটা মেয়ের বিয়ে হয়ে যাবে? তুই কী বুঝিাস বিয়ের?

আপা আস্তে। বাবা শুনবে।

মাস্টারদের দায়িত্ব হচ্ছে পড়ানো। বিয়ে দেয়া না। যখন সময় হবে তখন আপনাতেই বিয়ে হবে। এই নিয়ে তোর এত চিন্তা কিসের?

আমি আবার কখন চিন্তা করলাম?

ছবি দেয়ার ব্যাপারে তোর এত আগ্রহ কেন?

তুমি বুঝতে পারছি না। আপা খুব রাগ করবে।

রাগ করলে করবে। যা আমার জন্যে একটা পান বানিয়ে আন। বাবুকে পাঠিয়েছিলাম, সে আর ফিরবে না। আটকে গেছে।

আপা নতুন ফ্যান দেখেছ?

দেখলাম।

বাকের ভাই নাকি এসে অনেকক্ষণ ছিল। অনেক গল্পটল্প করল।

কার সঙ্গে করল?

বাবার সঙ্গে। বাবা আজ সকাল ফিরেছিলেন। বাকের ভাই এসেই গল্প জুড়ে দিল। কালপরশুর মধ্যে একটা কাজের লোকও এনে দেবে বলেছে।

এনে দিলে তো ভালই। তুই যা, পানটা নিয়ে আয়।

আমার সাহসে কুলাচ্ছে না। বাবার সামনে দিয়ে যেতে হবে। তুমি নিজেই যাও না আপা।

মুনা উঠে বসল। বকুল বলল, মিষ্টি কি জন্যে আনলেন এটাও একটু জিজ্ঞেস করবে। জানতে ইচ্ছা করছে।

জানতে ইচ্ছে হলে তুই নিজেই জিজ্ঞেস কর।

আমার এত সাহস নেই।

বসার ঘর থেকে শওকত সাহেব ডাকলেন, বকুল বকুল। বকুল মুখ অন্ধকার করে উঠে গেল।

শওকত সাহেবের সামনে বাবু কানে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখ লাল। বকুল এসে ঢুকতেই শওকত সাহেব বললেন, পাটিগণিত নিয়ে আয়।

০৫. টেলিগ্রামে লেখা ছিল

টেলিগ্রামে লেখা ছিল–ফরিদা সিরিয়াস, কাম ইমমিডিয়েটলি। মামুন ধরেই নিয়েছিল। সে মারা গেছে। আলম সাহেবকে যাবার বেলায় বলেও গেল, বোনটা মারা গেছে বোধহয়। মৃত্যুর খবরে লোকজন সব সময়ই হকচাকিয়ে যায়, আলম সাহেবও হকচাকিয়ে গেলেন।

কীভাবে মারা গেছে? সে সব কিছু লেখেনি অসুস্থ ছিল। ওর মৃত্যুটা আমাদের সবার জন্যেই রিলিফ। বড় কষ্টে छ्लि।

তাই নাকি? জি। বাড়িতে গেলে ঘুমাতে পারতাম না। চিৎকার করত। সারা রাত। চোখে দেখা যায় না। এমন কষ্ট।

হয়েছে কি? স্নায়ুর মধ্যে কি যেন হয়েছে। চিকিৎসা নেই কোনো। ব্যথা কমানোর ইনজেকশন দিয়েও কিছু হয় না। বাড়ি যাওয়াই ছেড়ে দিয়েছিলাম।

কথা খুবই সত্যি। মামুন গত এক বছরে একবার মাত্র গিয়েছিল এক’দিন থেকে পালিয়ে এসেছে। সারারাত উঠোনে মোড়া পেতে কাটিয়েছে। ভয়ংকর একটা রাত। এখন বাড়িতে গেলে সে রকম কোন ঝামেলা হবে না। ঘুমানো যাবে না।

তাদের গ্রামের বাড়িটি সুন্দর। পাকা দালান। পেছনের পুকুরটি বুজে গেছে। এটা ঠিকঠাক করতে হবে। মুনাকে নিয়ে গ্রামে আসতে হবে। সে কোনোদিন গ্রাম দেখেনি। গ্রাম সম্পর্কে তার ধারণা খুবই খারাপ। ধারণা পাল্টে যাবে।

মামুন বাড়ি পৌঁছল সন্ধ্যার পর। চারদিকে কেমন অস্বাভাবিক নীরবতা। বসার ঘরের বারান্দায় হারিকেন জ্বলিয়ে কয়েকজন মুরব্বি বসে আছেন। মামুনকে দেখে তাঁরা এগিয়ে এলেন। মৃদু স্বরে কি সব যেন বলতে লাগলেন। কিছুই বোঝা গেল না। মামুনের বড় চাচা বললেন, তোমার লাগি অপেক্ষা। তুমি না। আওনে দম বাইর হইতাছে না। যাও ভিতরের বাড়িতে যাও। ভইনের সাথে কথা কও;

ফরিদা বড় খাটটায় পড়ে আছে। ঘরে দুটো হারিকেন। একটা কুপী। অনেক মেয়েদের ভিড়। মামুন ঘরে ঢুকতেই ফরিদার গোঙানি থেমে গেল। সে পরিষ্কার গলায় ডাকল, ভাইজান!

মামুন অসাহায়ের মত তাকাল চারদিকে।

ভাইজান বড় কষ্ট।

হারিকেনেব আলোয় চকচক করছে ফরিদার চোখ। চোখগুলো এখনো এত সুন্দর?

ফরিদার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। টেনে টেনে শ্বাস নিচ্ছে। মামুনের কি উচিত কাছে গিয়ে বসা? হাতে হাত রাখা। কিন্তু জন্তুর মত শব্দ যে করছে সে কি ফরিদা? একজন কে হারিকেন উঁচু করে ধরলেন। ভালমত দেখাতে চান বোধ হয়। কী আছে দেখানোর?

ফরিদা শ্বাস টানার ফাঁকে ফাঁকে বলল, গত বছর আপনি আসছিলেন। কিন্তু আমার সঙ্গে কোনো কথা বললেন না। আমার মনে কষ্ট হয়েছে।

এমন কোনো মনের কষ্ট আছে যা এই তীব্র শারীরিক যন্ত্রণাকে স্পর্শ করতে পারে? মামুন ঘোলাটে চোখে তাকাতে লাগল চারদিকে।

একজন বুড়ো মহিলা বললেন, পশ্চিম দিকে মুখ কইরা দেন। কলমা তৈয়াব পড়েন। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসুলাল্লাহ।

শ্বাসকষ্ট সন্ধ্যা রাত্ৰিতে শুরু হলেও ফরিদা মারা গেল পরদিন সকাল নটায়। একেকবার কষ্টটা কমে যায়, সে চোখ বড় বড় করে তাকায় সবার দিকে। সেই তাকানো দেখেই মনে হয়। সে বুঝতে পারছে সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে এবং তার জন্যে সে খুশি। সে অপেক্ষা করছে আগ্রহ নিয়ে।

মামুন বাড়ি যাবার সময় ঠিক করে রেখেছিল দু’দিন থাকবে। কলেজ থেকে ছুটি নেয়া হয়নি। কাউকে কিছু বলে যাওয়া হয়নি। দুদিনের বেশি থাকার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু সে থাকল এগারো দিন। বারো দিনের মাথায় ঢাকায় ফিরে এল। তার মুখ ভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি। অনিদ্রাজনিত কারণে চোখ লাল। আলম সাহেব তাকে দেখে আঁতকে উঠলেন। মামুন শুকনো হাসি হেসে বলল, সব ভাল তো?

ভাল, সবই ভাল। আপনি কেমন?

ভালই। চিঠিপত্র আছে কিছু?

জিনা, চিঠিপত্র নেই।

মুনা খোঁজ করেছিল?

জি, এসেছিল এক’দিন।

মামুন আর কিছুই জিজ্ঞেস করল না। সারাদিন কাটাল ঘুমিয়ে। সন্ধ্যাবেলা একা একা একটা সিনেমা দেখতে গেল–দি বিস্ট। একজন মানুষ পূর্ণিমা রাতে কেমন করে নেকড়ে হয়ে যায় তার গল্প। প্রথমদিকে গল্পটি কিছুই ধরা যাচ্ছিল না। শেষ দিকে দারুণ জমে গেল। মামুন অবাক হয়ে লক্ষ্য করল সে বেশ উত্তেজনা অনুভব করছে। শেষ দৃশ্যে সুন্দরী একটি তরুণী মেয়ের কৌশলের কাছে জন্তুটির পরাজিত হবার ঘটনাটি তাকে অভিভূত করে ফেলল। চারদিকে হাততালি পড়ছে। সে বহু কষ্টে হাততালি দেবার লোভ সামলাল। প্রথম থেকে ছবিটি মন দিয়ে না দেখার জন্যে তার আফসোসের সীমা রইল না।

মেসে রাতে খাবার ব্যবস্থা আছে। তবুও সে হেঁটে হেঁটে নবাবপুরের এক দোকানে বিরিয়ানী খেতে গেল। ছাত্র থাকাকালীন দল বেঁধে এখানে আসত। অনেক দিন পর আবার আসা। সব কিছু আগের মত আছে। একশ বছর পরেও বোধ হয় দোকানটা এ রকমই থাকবে। তবে বিরিয়ানী আগের মত লাগল না, চাল পুরোপুরি সেদ্ধ হয়নি। লবণও কম হয়েছে। আগে তেঁতুলের টক দিত। এখন বোধ হয় দিচ্ছে না। কাঁচা মরিচে কোনো ঝাল নেই। মিষ্টি মিষ্টি লাগছে খেতে। মামুন প্লেট শেষ না করেই উঠে পড়ল। ঘুম ঘুম লাগছে কিন্তু মেসে ফিরে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে না। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোরও কোনো অর্থ হয় না।

মামুন সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে চলে গেল। অনেককাল আগে দল বেঁধে সবাই আসত। এখানে। একবার নৌকা ভাড়া করেছিল আধা ঘণ্টার জন্যে। বশিরের জন্যে নৌকা ডোবার উপক্রম হয়েছিল। মামুন একটি ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলল। লঞ্চ টার্মিনাল আগের মত নেই। অনেক দিন আসা হয় না। এদিকে। সব বদলে যাচ্ছে।

আলম সাহেব জেগে বসে ছিলেন। মামুনকে আসতে দেখে উঠে এলেন কোথায় ছিলেন এত রাত পর্যন্ত? মামুন অস্পষ্ট ভাবে হাসল। আপনি যাওয়ার পরপরই আপনার বান্ধবী এসেছিল। সন্ধ্যা পর্যন্ত ছিলেন। মামুন কোনো উৎসাহ দেখাল না।

আপনাকে কাল সকালে তাদের বাসায় যেতে বলেছেন।

কাল যাব কিভাবে, কাল কলেজ আছে।

কাল শুক্রবার না। কাল তো ছুটি।

ও হ্যাঁ।

চিঠিও লিখে গেছেন একটা। আপনার টেবিলে রেখে দিয়েছি। আর ভাত-তরকারিও ঢাকা দিয়ে রেখেছি। আপনার শরীর ভাল তো মামুন সাহেব?

জি ভাল।

চোখ লাল হয়ে আছে।

সারাদিন ঘুমিয়েছি তো তাই।

সন্ধ্যাবেলা কোথায় গিয়েছিলেন?

একটা ছবি দেখলাম। নাজ সিনেমায়। দি বিসিট। ভাল ছবি।

আলম সাহেব অবাক হয়ে বললেন, সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন?

জি। মনটা ভাল ছিল না। তাই ভাবলাম যাই দেখে আসি।

ভালই করেছেন।

ছাত্র জীবনে খুব ছবি দেখতাম। রোমান হলিডে ছবিটা মোট এগারো বার দেখেছিলাম। ঐ মেয়েটার প্ৰেমে পড়ে গিয়েছিলাম।

মামুন চিঠিটা পড়ল। দুলাইনের চিঠি। আগামীকাল আমাদের বাসায় দুপুরে ভাত খাধে। সকালে চলে আসবে। ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে না। ওদের এখানে যাওয়ার ব্যাপারে মুনার খুবই আপত্তি। মামা পছন্দ করেন না। একবার গিয়ে তো বেইজাতী অবস্থা। ভদ্রলোক একটা কথাও বললেন না! সালামের জবাব পর্যন্ত দিলেন না। রাগ দেখাবার জন্যে তার সামনেই কাজের মেয়েটাকে বিনা কারণে এমন একটা চড় দিলেন যে মেয়েটা উল্টে চেয়ারের ওপর পড়ে গেল। বিশ্ৰী অবস্থা।

মামুন সাহেব।

জি।

ভাত খান।

না ভাত খাব না। ভাত খেয়ে এসেছি।

চা খাবেন? চলেন মোড়ের দোকান থেকে চা খেয়ে আসি।

মামুন কোনো রকম আপত্তি করল না। চা খেতে গেল। আলম সাহেব হালকা স্বরে বললেন, দুঃখ-কষ্ট সংসারে থাকেই। দুঃখ-কষ্ট নিয়ে বাঁচতে হয়। জন্ম নিলেই মৃত্যু লেখা হয়ে যায়। কি বলেন?

তা তো বটেই।

আপনি এই সব নিয়ে ভাববেন না।

না আমি ভাবি না।

চা খেতে খেতে আলম সাহেব মৃদু স্বরে বললেন, দাড়ি-টাড়িগুলি কেটে ফেলেন। ভাল লাগছে

জি কাটব। কালই কাটব।

মুনা সকাল থেকেই মামুনের জন্যে অপেক্ষা করছিল। এগারোটার দিকে তার কেন যেন মনে হল মামুন আসবে না। এ রকম মনে হবার কারণ নেই। কিন্তু মনে যখন হচ্ছে তখন মুনার মনে হয় মামুনের সঙ্গে দেখা হবে না, তখন হয় না।

শওকত সাহেব ফর্সা একটা পাঞ্জাবি পরে অপেক্ষা করছিল। মুনা গিয়ে বলল, মামা, তোমার কোথাও যাবার থাকলে যাও, ও আসবে না।

আসবে না কেন?

তা আমি কি করে বলি। হয়ত খবর পায়নি।

শওকত সাহেব অত্যন্ত বিরক্ত হলেন। রাগী গলায় বললেন, আসতে বললে আসবে না। এর মানে কি? যখন আসতে বলা হয় না। তখন তো দশবার আসে।

এটা তো মামা ঠিক বললেন না। সে এ বাসায় একবারই এসেছিল। তুমি একটি কথাও বলনি। উল্টো এমন ব্যবহার করেছ লজ্জায় আমার মরে যেতে ইচ্ছা করছে। তোমার বোধ হয় মনে নেই।

শওকত সাহেব বিরক্ত স্বরে বললেন, বাবুকে ঠিকানা দিয়ে পাঠা, ও গিয়ে নিয়ে আসুক।

তুমি হঠাৎ এত ব্যস্ত কেন?

বিয়েটা কবে হবে কি, এইটা ফয়সালা করতে চাই। লোকজন কথা বলাবলি শুরু করেছে।

মুনা তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, কে আবার কী কথা বলল?

নওয়াব সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ভাগীর বিয়ে দিচ্ছেন। কবে? তিনি তোদের দেখেছেন এক রিকশায় যেতে। আমি লজ্জায় বাচি না। বিয়ের আগে কোনো মেয়ে ছেলের সঙ্গে এক রিকশায় যেতে পারে? দেশটা তো বিলাত-আমেরিকা এখনো হয়নি।

মুনা কিছু বলল না। শওকত সাহেব সিগারেট ধরলেন। দামী সিগারেট। আজকের এই বিশেষ উপলক্ষে তিনি পাঁচটি ফাইভ ফাইভ কিনেছেন।

মুনা, যা বাবুকে ঠিকানা দিয়ে পাঠা।

না, ওর যেতে হবে না।

মুনা রান্নাঘরে ঢুকল। বকুল সারা সকাল চুলোর পাশে বসে। তার ফর্সা গাল লাল টুকটুক করছে। মুনাকে ঢুকতে দেখে সে হাসিমুখে বলল, পোলাওটা খুব ভাল হয়েছে আপা।

পোল ও কেন? পোলা ও কে করতে বলেছে?

বাধা।

আমি না বললাম সিম্পল ব্যবস্থা করতে … আমরা যা খাই।

বকুল কিছু বলল না, মুখ টিপে হাসল। মুনা বিরক্ত মুখে বলল, হাসছিস কেন?

তুমি আসলে আপা খুশিই হয়েছ, কিন্তু মুখে বলছ এই কথা, এ জন্যেই হাসছি।

কি সব পাকা পাকা কথা বলছিস। গা জ্বালান কথা। এই বয়সে এত পাকা কথা বলা লাগে না।

বকুল বিব্রত ভঙ্গিতে বলল, রাগছ কেন আপা? ঠাট্টা করছিলাম।

এ রকম ঠাট্টা আমার ভাল লাগে না।

গোসতের লবণ একটু দেখবে আপা।

আমি দেখতে পারব না, তুই দেখ! চুলা খালি থাকলে আমাকে একটু চা করে দে। মাথা ধরেছে। আমি শুয়ে থাকব।

মামুন ভাই এত দেরি করছে কেন আপা? তুমি কখন আসতে বলেছ?

মুনা তার কথার জবাব না দিয়েই চলে গেল। বকুল ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেলল। গত কয়েক দিন থেকেই মুনা আপা তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছে। কেন করছে কে জানে। রেহানা আপা ছবি চাইলে সে কী করতে পারে? সে তো বলতে পারে না না। আপনি ছবি চাইতে পারবেন না। কেন ছবি চাইবেন?

বকুল চায়ের কাঁপে চা ঢালল। আর তখনই বাবু এসে গম্ভীর স্বরে বলল–ডাক্তার সাহেব এসেছে। বকুলের হাত কেঁপে গেল। বাবুর মুখ রাগী রাগী। যেন ডাক্তারের আসা একটা অপরাধ। এবং এর জন্যে বকুল দায়ী। বকুল বলল, ডাক্তার এসেছে তো আমি কি করব? বাবু বলল, কথা বলছে বাবার সঙ্গে।

বলছে বলুক, যা তুই মুনা। আপাকে চা দিয়ে আয়।

বাবু আগের চেয়েও গম্ভীর হয়ে বলল, তুমি ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলে কেন?

বকুল চমকে উঠল। ক্ষীণ স্বরে বলল, কে বলল?

আমি দেখলাম।

ডেকেছিল তাই গিয়েছিলাম।–কী হয়েছে তাতে?

আমি মুনা। আপাকে বলে দেব।

দিস। যা এখন চা নিয়ে যা।

বাবু চা নিয়ে চলে গেল। সে অবশ্যি মুনা আপাকে কিছুই বলবে না। তার স্বভাবের মধ্যে এটা নেই। একজনের কথা অন্যজনকে কখনো বলবে না। তবু বকুলের হাত-পা কাঁপতে লাগল।

ডাক্তারের কাছে যাওয়াটা এমন কিছু নয়। সে স্কুল থেকে ফিরছিল চিশতি মেডিকেল কর্নারের কাছে আসতেই দেখে ডাক্তার সাহেব বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি তার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখেই ডাকলেন, এই যে বকুল, এই! এস দেখি। বকুল নিশ্চয়ই না-শোনার ভান করে চলে যেতে পারে না। সে গিয়েছে। ডাক্তার সাহেব বলেছেন, ইস ঘেমে-টেমে কি অবস্থা। ভেতরে এসে ফ্যানটার নিচে দাঁড়াও তো। ঠাণ্ডা কিছু খাবে? বকুল ক্ষীণ স্বরে বলল, জি না। তিনি শুনলেন না। একটা ছেলেকে পাঠালেন খুব ঠাণ্ডা দেখে এক বোতল পেপসি কিংবা কোক নিয়ে আসতে। বকুল বলতে গেলে কোনো কথাই বলেনি। পেপসি অর্ধেক শেষ করে চলে এসেছে। ভয়ে তার সমস্ত শরীর কঁপিছিল। কেউ যদি দেখে ফেলে। তার ধারণা ছিল কেউ দেখেনি। কিন্তু ধারণা সত্যি নয়। বাবু দেখেছে। বকুলের কান্না পেতে লাগল। তার ভয় হচ্ছিল এক্ষুণি কেউ এসে বলবে, ডাক্তার সাহেব তোমাকে ডাকে। কিন্তু কেউ সে রকম কিছু বলল না। বকুল নিজের মনে রান্না সারতে লাগল। সে ভেবে পেল না। তাকে নিয়ে কেন এত ঝামেলা হচ্ছে।

বাবু এসে বলল, ডাক্তার সাহেবকে এক কাপ চা দাও। বকুল নিঃশব্দে চা বানাতে লাগল। বাবু বলল, ডাক্তার সাহেব মিষ্টি নিয়ে এসেছেন। তার এক বোনের মেয়ে হয়েছে এই জন্যে। বকুল কিছুই বলল না।

কড়া নাড়ার শব্দে মামুনের ঘুম ভাঙল। সে দরজা-জানালা বন্ধ করে শুয়েছিল। চারদিক অন্ধকার। সন্ধ্যা মিলিয়ে গেছে নাকি? মামুন ক্লান্ত স্বরে বলল, কে?

আমি। আমি মুনা।

মামুন তেমন কোনো আবেগ অনুভব করল না। আজ দুপুরে ওদের ওখানে খেতে যাবার কথা। যাওয়া হয়নি। তার জন্যে তেমন অনুশোচনাও হল না।

মুনা বলল, কি হয়েছে তোমার?

কিছু হয়নি।

যাওনি কেন?

ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। শরীরটা ভাল না;

মামুন হাই তুলল। টেনে টেনে বলল, এস ভেতরে এসে বস।

মুনা একবার ভাবল বলবে না বসব না। এবং গভীর মুখ করে চলে যাবে। কিন্তু যেতে পারল না। মুখ ভর্তি দাড়িতে এমন অদ্ভুত লাগছে মামুনকে। মুখের ভাব ধরা যাচ্ছে না। মুখ কেমন রোগা রোগা। সারাদিন ঘুমানোর জন্যে চোখ লাল। মুনা ভেতরে ঢুকাল।

বস, চেয়ারটায় বস। চা খাবে?

হুঁ।

কাউকে পেলে হয়। ছুটির দিন তো। লোকজন থাকে না। এই বলেই মামুন বেশ শব্দ করে হাসতে লাগল, যেন খুব-একটা হাসির কথা। মুনা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকে দেখতে লাগল।

তুমি বসে থাক। আমি হাত-মুখটা ধুয়ে আসি। একা একা বসে থাকতে ভয় লাগবে না তো?

ভয় লাগবে কেন?

মামুন আবার হেসে উঠল। সুস্থ মানুষের হাসি না। ছাড়া ছাড়া হাসি; হাসার সময় কেমন অদ্ভুত ভাবে গা দোলাচ্ছে। r

হাত-মুখ ধুতে মামুনের অনেক সময় লাগল। তার মনেই রইল না ঘরে একজন অপেক্ষা করছে। কাজের ছেলেটি দুকাপ চা দিয়ে গেছে। সেই চা পিরিচ ঢেকে রাখা সত্ত্বেও জুড়িয়ে জল হয়েছে।

মামুন বিস্বাদ ঠাণ্ডা চাতেও চুমুক দিয়ে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মুনা বলল, চা ভাল লাগছে?

হ্যাঁ ভালই তো।

ঠাণ্ডা না?

একটু অবশ্যি ঠাণ্ডা।

আগে তো ঠাণ্ডা চা মুখেই দিতে পারতে না।

মামুন চুপ করে রইল। মুনা বলল, দুপুরে কিছু খেয়েছে?

না!

কেন, খাওনি কেন?

ঘুমিয়ে পড়লাম। দশটার দিকে ঘুমিয়ে পড়লাম। ক্ষিধেও হয়নি।

এখন হয়েছে?

হুঁ।

চল আমার সঙ্গে।

কোথায়?

আমাদের বাসায়। রাতে খাবে।

ঠিক আছে চল।

কাপড় বদলাতে বদলাতে মামুন বলল, তোমার শরীর ভাল মুনা?

হ্যাঁ ভাল।

টনসিালের ঐটা কমেছে, তাই না?

হ্যাঁ। তুমি দাড়ি রেখেছ কেন?

দাড়ি রাখব কেন? কয়েক’দিন কাটা হয়নি সেই জন্যে।

তোমাদের বাড়ির খবর কি বল।

বাড়ির কোনো খবর নেই। ছোট বোনটা মারা গেছে।

ওর কথা তো তুমি আমাকে কখনো কিছু বলনি।

মামুন চুপ করে রইল।

মুনা বলল, তুমি নিজের কথা কখনো কাউকে কিছু বল না। এটা ঠিক না। এতে মনের ওপর চাপ পড়ে।

হুঁ।

তোমার ভাই-বোনদের কথা আমি কিছুই জানি না।

মামুন চাপা স্বরে বলল, ঐ একটি বোন আমার। মরবার সময় খুব কষ্ট পেয়েছে। খুব কষ্টের মৃত্যু।

সব মৃত্যুই কষ্টের, সুখের মৃত্যু তো কিছু নেই।

তাও ঠিক।

মামুন হাসতে চেষ্টা করল। সিগারেট ধরিয়ে খুব উৎসাহের সঙ্গে টানতে শুরু করল। মুনা ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, কষ্টের ব্যাপারগুলি নিয়ে বেশি চিন্তা করা ঠিক না।

না চিন্তা করি না তো। ঐ সব নিয়ে আমি ভাবি না। চল যাই।

মুনা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, দাড়িটা কেটে ফেল। খুব খারাপ দেখাচ্ছে।

খুব খারাপ লাগছে, না?

হুঁ।

কোনো একটা সেলুনে গিয়ে কাটাতে হবে। দাড়ি বেশি বড় হয়ে গেছে, নিজে নিজে কাটা যাবে না। মেসের সামনেই একটা আছে সেখানে কাটাব।

একটি ছেলে শেভ করাচ্ছে। তার পাশেই একটি রূপসী মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে–দৃশ্যটি অদ্ভুত। লোকজন কৌতূহলী হয়ে দেখছে। মামুন খানিকটা অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। বিব্রত স্বরে বলল–তুমি বাইরে যাও না। এখানে দাঁড়িয়ে থাকার দরকার কি? মুনা কিছু বলল না, বাইরেও গেল না। তার কেন জানি পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেই ভাল লাগছে।

দাড়ি কাটার পর মামুনকে আরো রোগা এবং ফর্সা দেখাচ্ছে। তারা একটা রিকশা নিল। রিকশায় উঠলেই মামুন এক হাতে মুনাকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করে। আজ সে রকম কিছু করল না। লাজুক প্রেমিকের মত সংকুচিত ভাবে বসে রইল। মুনা বলল, তোমরা কভাই-বোন? মামুন জবাব দিল না। মুনার মনে হল এই প্রশ্নটি সে আগেও করেছে–মামুন। এড়িয়ে গেছে। মনের ভুলও হতে পারে। হয়ত জবাব দিয়েছে, মুনার মনে নেই। নাকি এই প্রশ্ন সে কোনোদিন করেনি?

মুনা আবার জিজ্ঞেস করল, কভাই-বোন তোমার?

দু’ভাই এক বোন।

অন্য ভাইটি কি করে?

ছোটবেলায় মারা গেছে। পানিতে ডুবে মারা গেছে।

মুনা কিছু বলল না। মামুন বলতে লাগল–আমরা দুভাই পুকুরে গোসল করতে গিয়েছিলাম। আমি সাঁতার জানি না ও জানে। একটা পেতলের কলসী উল্টে তার কানায় ধরে সাঁতার কাটছি, হঠাৎ,…। মুনা বলল থাক বলার দরকার নেই। শুনতে চাই না।

শুনতে চাইবে না কেন? শোন। কলসী হাতছাড়া হয়ে গেল। হঠাৎ। ডুবে যেতে ধরেছি, বড় ভাই সাঁতরে এসে আমাকে ধরল। মরিয়া হয়ে আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম এবং ডুবে গেলাম দুজনেই।

মুনা প্রসঙ্গ পাল্টাবার জন্যে বলল হুঁডটা তুলে দাও না।

মামুন হুঁড তুলল না। গাঢ় স্বরে গল্প শেষ করতে লাগল তারপর কি হয়েছে শোন, দু’জনকে আধমরা অবস্থায় উদ্ধার করা হল। একজন বাঁচল, একজন বাঁচল না।

মুনা ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল। মামুন বলল–আমরা ছিলাম তিনজন। এখন আমি একজন। এবং আমার কি মনে হয় জানো? আমার মনে হয়। আমিও থাকব না।

সে তো কেই থাকবে না।

না তুমি বুঝতে পারছি না। আমি নিজেও বেশিদিন বাঁচব না।

রিকশা থামিয়ে মামুন সিগারেট কিনল। জর্দা দিয়ে পান বানিয়ে রিকশায় উঠে এল। মুনা অবাক হয়ে বলল–পান খাবে নাকি?

হুঁ। কেমন যেন বমি বমি আসছে। আমার শরীরটা বেশি ভাল না। মুনা।

মুনা তার হাত ধরল। তাদের পরিচয় প্রায় তিন বছরের। এই দীর্ঘদিনে আজই প্রথমবারের মত মুনা নিজ থেকে তার হাত বাড়াল এবং এর জন্যে তার কোনো লজ্জা লাগল না। মুনা নরম স্বরে বলল–তোমার গা গরম। মনে হয় জ্বর আছে।

থাকতে পারে। মাথা ধরে আছে।

এই মাথা ধরা নিয়ে সিগারেট টানছ?

অভ্যাস। অভ্যাসের বসে টানছি। টানতে ভাল লাগছে না। তবু টানছি।

ফেলে দাও।

মামুন সিগারেট ফেলে দিয়ে হালকা স্বরে বলল, এখন কেমন জানি একা এক লাগে। এই মাসের মধ্যে একটা বিয়ের তারিখ হলে তোমার আপত্তি আছে? কল্যাণপুরের বাসাটাও তোমাকে দেখিয়ে আনব। কাল সময় হবে?

অফিস ছুটির পর হবে।

আজ তোমার মামার সঙ্গে কথা বলে একটা ডেট করে ফেলি। কি বল?

এত বড় একটা দুঃসংবাদের পর হুঁট করে বিয়ের তারিখ ফেলা কি ঠিক হবে? যাক কয়েকটা দিন।

না। আমার ভাল লাগছে না। আজই সব ঠিকঠাক করব।

বাকি রাস্তা কাটল চুপচাপ। দুজনের কেউই কথা বলল না।

০৬. বাকের ভাই পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছেন

এই বাবু, যাস কোথায়? শুনে যা এদিকে।

বাবু এগিয়ে গেল। বাকের ভাই পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছেন। তার মুখ অস্বাভাবিক গভীর। বাবু ভয়ে ভয়ে বলল, কি?

বাসায়?

কেউ না। লম্বা করে, ফর্সা মত একটা ছেলে ঢুকল, মুনা ছিল সাথে। কে সে? চোখে চশমা।

বাবু তৎক্ষণাৎ কোনো জবাব দিতে পারল না। অসহায় ভাবে এদিক-ওদিক তাকাল। কী বলা উচিত বুঝতে পারছে না।

এই ছেলের সাথেই মুনার বিয়ে হচ্ছে নাকি?

হুঁ।

এটা বলতে এতক্ষণ লাগল কেন? টান দিয়ে বাঁ কান ছিঁড়ে ফেলব। আমার সাথে ফাজলামি। বিয়েটা কবে?

সামনের মাসের তিন তারিখে।

বাকের সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে হঠাৎ উদাস হয়ে গেল। ঠাণ্ডা গলায় বলল যা ভাগ। বাবু তবুও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। লজ্জায় তার চোখে পানি এসে যাচ্ছিল। বহু কষ্টে সে পানি সামলানোর চেষ্টা করছে। বাকের সব সময় তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। সে যখন ক্লাস ফাইভে। পড়ত তখন বাকের একবার একটা চড় বসিয়ে দিয়েছিল। কেন দিয়েছিল বাবু বহু চেষ্টা করেও বের করতে পারেনি। সে ফিরছিল স্কুল থেকে। হঠাৎ বাকেরের সঙ্গে দেখা, সাইকেলে করে কোথায় যেন যাচ্ছে। বাবুকে দেখে সাইকেল থামিয়ে নেমে পড়ল। কড়া গলায় ডাকল এই এদিকে আয়! বাবু এগিয়ে যেতেই কথা নেই বার্তা নেই প্রচণ্ড এক চড়। বাবু কিছু বুঝে উঠবার আগেই বাকের সাইকেলে উঠে চলে গেল। যেন কিছুই হয়নি।

আজকের রাগের কারণটা অবশ্যি স্পষ্ট। বাবু সে কারণ ভালই বুঝতে পারে। তার মনে ক্ষীণ সন্দেহ, এককালে মুনা আপার সঙ্গে বাকের ভাইয়ের কিছুটা ভাব ছিল। কে জানে বিয়ের দিন এসিড-ট্যাসিড ছুড়ে মারবে হয়ত। দারুণ মন খারাপ করে বাবু ঘরে ফিরল। সে বড় ভয় পেয়েছে।

মুনা বাইরে বেরুবার জন্যে তৈরি হচ্ছে। মামুনের সঙ্গে কয়েকটা টুকিটাকি জিনিস কেনার কথা। সংসার তৈরি হবার আগেই সংসারের জন্যে জিনিসপত্র কেনার কথা ভাবতে কেমন লজ্জা লজ্জা লাগে। আবার ভালও লাগে। আজ তারা কিনবে চায়ের কাপ পিরিচ। রান্নার জন্যে বাসন কোসন। গত রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর মুনা একটা লিস্ট করেছে। তার সারাক্ষণই ভয় এই বুঝি বকুল জেগে উঠে চোখ কচলে জিজ্ঞেস করবে, কি করছ আপা? বকুলের ঘুম খুব পাতলা। একটু নড়াচড়া হলেই জেগে উঠে বলে, কি হয়েছে আপা? কি হয়েছে?

মুনা ঘর থেকে বেকবার আগে বলে গেল ফিরতে দেরি হবে। বকুলকে বলল ভাত চড়িযে দিতে। বকুল চাপা হেসে বলল, ভাত কজনের জন্যে রান্না হবে? ঠিক করে বলে যাও।

কজনের জন্যে রান্না হবে মানে?

মামুন ভাইও কি এখানে খাবেন?

মুনা ধমক দিতে গিয়েও দিতে পারল না। মামুন ইদানীং বেশ কয়েকবার এখানে ভাত খেয়েছে। বকুল বলল, মামুন ভাই আজ এখানে খেলে মুশকিল হবে। খাবার কিছু নেই, ডিমও নেই।

মুনা কোনো উত্তর না দিয়ে গম্ভীর হয়ে পড়ল। মামুনের রাতের এখানে খাওয়ার ব্যাপারটা তার নিজেরও পছন্দের নয়। কিন্তু সে আজকাল রাত আটটার দিকে হঠাৎ এসে পড়ে এবং বসার ঘরে চুপচাপ বসে থাকে। মামা তার সঙ্গে কোনো কথা বলেন না। তাতে সে কোনো রকম অস্বস্তি বোধ করে না। বকুল যখন গিয়ে বলে মামুন ভাই, আপনি কী এখানে খাবেন? সে সঙ্গে সঙ্গে বলে, হ্যাঁ। দাও ভাত দাও।

ঘরে খাবার কিন্তু খুব খারাপ।

অসুবিধা নেই।

আসুন তাহলে। ভাত বাড়ছি।

মামুন সঙ্গে সঙ্গে উঠে আসে। যেন ভাতের জন্যেই এতিক্ষণ বসে ছিল। এমন লজ্জা লাগে। মুন্নার। মামুন কেমন যেন অন্য রকম হয়ে যাচ্ছে। কোনো কিছুতেই কোনো উৎসাহ নেই।

বকুল বলল–মুনা আপা, এই শাড়িতে কিন্তু তোমাকে ভাল লাগছে না। বদলে যাও। সবুজ শাড়িটা পর। মুনা গম্ভীর গলায় বলল, শাড়ি-টাড়ি নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। যা পরেছি সেটাই যথেষ্ট। তোর এসব নিয়ে ভাবতে হবে না।

রাগ করছ, কেন?;

পাকামো কথা শুনে রাগ করছি।

বকুল আহত স্বরে বলল, পাকা কথা কি বললাম? শাড়িটাতে তোমাকে মানাচ্ছে না। এর মধ্যে পাকামির কি আছে?

মুনা লক্ষ্য করল বকুল বেশ শীতল স্বরে তর্ক করছে। এই স্বভাব তার আগে ছিল না। আগে সে কোনো কথার জবাব দিত না। আজকাল দিচ্ছে। প্রেমে পড়লে মেয়েদের স্বভাব-চরিত্র পাল্টায়। বকুল কারো প্ৰেমে-ট্রেমে পড়িনি তো? মুনা বলল, চায়ের পাতা শেষ হয়েছে বোধ হয়। বাবুকে দিয়ে আনিয়ে রাখা।

টাকা? টাকা দেবে কে? দোকানে এখন বাকি বন্ধ।

মুনা নিঃশব্দে একটা দশ টাকার নোট বের করল। শওকত সাহেব ঘরে না থাকলে টুকিটাকি কেনা এখন মুশকিল। শওকত সাহেব আগে সংসার খরচের কিছু টাকা লতিফাকে দিতেন। ইদানীং দেন না। আধা সের লবণ কেনার টাকাও এখন তার কাছে চাইতে হয়।

বকুল বলল, তুমি ফিরবে। কখন আপা?

সন্ধ্যার আগেই ফিরব। কেন?

না এমনি জিজ্ঞেস করলাম। শাড়িটা বদলে যাও আপা। প্লিজ। আর যাবার আগে মার সঙ্গে দেখা করে যাও। আজ বেশ কয়েকবার তোমাকে খোঁজ করেছেন। খুব নাকি জরুরি।

কই আগে তো বলিসনি?

আগে মনে ছিল না। এখন মনে পড়ল।

মুনা শাড়ি বদলাল না। বকুলের কথায় শাড়ি বদলানোর কোনো মানে হয় না। তা ছাড়া এটা এমন কোনো খারাপ না। গত সপ্তাহেই বকুল বলেছিল সুন্দর মানিয়েছে। এক সপ্তাহ আগে যে শাড়িতে মানায় এক সপ্তাহ পরে তাতে মানায় না, এ কেমন কথা?

লতিফা আজ বেশ সুস্থ। গত রাতে ভাল ঘুম হয়েছে। সকালে নাশতা খেয়েছেন। দুপুরে ভাত খেয়ে ঘুমিয়েছেন। সারাদিন একবারও জ্বর আসেনি। অনেক দিন পর প্রথমবারের মত র্তার মনে হয়েছে হয়ত শরীর আবার আগের মত হবে। সংসার ফিরে পাওয়া যাবে। তাকে কেউ আর এড়িয়ে চলবে না।

মুনা বলল, তুমি ডেকেছিলে নাকি মামি?

লতিফা উজ্জ্বল চোখে বললেন, বোস তুই। অনেক কথা আছে। আমার পাশে বোস।

তোমার শরীর আজ মনে হয় ভাল?

হুঁ। জ্বর নেই। দেখা গায়ে হাত দিয়ে দেখ।

মুনা তাঁর কপালে হাত লাগাল। গা ঠাণ্ডা। জ্বর সত্যি সত্যি আসেনি। লতিফা আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন–কি, জ্বর আছে?

না। এখন বল কি বলবে। আমার হাতে সময় নেই। এক জায়গায় যাব।

দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়ে আয়।

এমন কি কথা দরজা বন্ধ করতে হবে?

আহ বন্ধ করতে বলছি কর না।

মুনা অবাক হয়েই দরজা বন্ধ করল। লতিফা বিছানায় উঠে বসলেন। গতকাল বকুলের স্কুলের একজন মিসট্রেস বাসায় এসেছিলেন। মুনা তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, কে? রেহানা আপা?

হুঁ। বকুলের জন্যে একটা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন। খুবই ভাল ছেলে। ভাল বংশ। উনার দূর-সম্পর্কের আত্মীয়।

মুনা বিরক্ত স্বরে বলল, এই সব আমি শুনতে চাই না। বাদ দাও তো।

সবটা না শুনেই এ রকম করিস কেন? সবটা আগে শোন। বাবা-মার একমাত্র ছেলে। জাপানে গেছে গত বছর। কম্পিউটার না কিসে যেন ডিগ্রি করেছে। বকুলকে সে দেখেছে। খুব পছন্দ হয়েছে।

দেখল কোথায়?

ছেলে এই মিস্ট্রেসের কাছে গিয়েছিল। তারপর উনি বকুলকে ক্লাস থেকে ডেকে নিয়ে যান। বকুল অবশ্যি কিছু বুঝতে পারেনি।

মুনা বলল বুড়ো ছেলে, বাচ্চা মেয়েকে বিয়ে করতে চায়, ওর মাথা-টাথা কি খারাপ নাকি? এইসব চিন্তা বাদ দাও তো মামি। লতিফা অবাক হয়ে বললেন–এরকম ছেলে পরে তুই পাবি কোথায়? ছেলের ছবি আছে। ছবি দেখ তুই। ছবি দেখার পর…।

আমার ছবি-টবি দেখতে হবে না।

আগেই রাগ করছিস কেন? বকুলের একটা ভাল বিয়ে হোক এটা তুই চাস না?

চাইব না কেন, চাই। কিন্তু ওর বিয়ের বয়স হতে হবে তো? কেন এত ব্যস্ত হয়েছ? মেট্রিকটা অন্তত পাস করতে দাও। ছেলে অপেক্ষা করুক।

না, ছেলে অপেক্ষা করতে পারবে না। তিন মাসের ছুটিতে এসেছে, বিয়ে করে বউ নিয়ে যাবে। তুই অমত করিস না। তোর মামার সঙ্গে কথা বলছিলাম, সে রাজি আছে।

আমাদের রাজি আর অরাজিতে কিছু আসে যায় না। বকুল কিছুতেই রাজি হবে না। কেঁদে বাড়ি মাথায় তুলবে। কেন বুঝতে পারছি না?

লতিফা গম্ভীর স্বরে বললেন, না ও কাঁদবে না।

বুঝলে কি করে কাঁদবে না?

বকুলের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ওর মত আছে। বলেছে আমাকে।

বল কি তুমি!

লতিফা টেনে টেনে বললেন, রাজি কেন হবে না বল? মেয়ে তো বোকা না। যথেষ্ট বুদ্ধি আছে। কোনটাতে ভাল হবে সেটা সে জানে।

জানলে তো ভালই। বিয়ে দিয়ে দাও। আর কি?

মুনা মুখ কালো করে উঠে দাঁড়াল।

যাচ্ছিস কোথায়? কথা শেষ হয়নি আমার।

কথা শোনার আমার তেমন কোনো ইচ্ছা নেই। তোমরা নিজেরা নিজেরাই শোন।

বকুল ভাত চাপিয়েছে। তার মুখ একটু বিষন্ন। মুনা আপা অকারণে তার ওপর এতটা রাগ করবে। সে ধারণাও করেনি। সবাই তার সঙ্গে এমন খারাপ ব্যবহার করে কেন? বকুল দেখল মুনা দরজার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সে অবাক হয়ে বলল, তুমি এখনো যাওনি?

না।

কী করছিলো? এতক্ষণ মার সঙ্গে এমন কি আলাপ?

মুনা কড়া গলায় বলল, গতকাল তোর টিচার এসেছিল। এই কথা তুই আমাকে বললি না কেন?

তুমি রাগ করবে। এজন্যে বলিনি।

শুনলাম জাপানের ঐ ছেলের সঙ্গে বিয়েতে তোর মত আছে। মামিকে নাকি তুই বলেছিস?

বকুল জবাব দিল না। মুনা তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, কথার জবাব দে। চুপ করে আছিস কেন?

বকুল থেমে থেমে বলল মা আমাকে খুব আগ্রহ করে বলছিল। তার মুখের ওপর না বলতে খারাপ লাগল। মা বেশিদিন বাঁচবে না। তাকে কষ্ট দিতে ইচ্ছা করছিল না।

মুনা তাকিয়ে রইল বকুলের দিকে। বকুল সহজ স্বরে বলল তোমার মা যদি এ রকম অসুস্থ হত আর সে যদি তোমার হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বিয়ের কথা বলত তাহলে তুমিও রাজি হতে। হতে না?

এ রকম বাজে তর্ক কার কাছে শিখেছিস?

বকুল জবাব দিল না। মাথা নিচু করে বসে রইল। আজ সে একটা ছাপা শাড়ি পরেছে। এত সুন্দর লাগছে তাকে দেখতে। মুনা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। আরো কড়া কড়া কিছু কথা বলতে গিয়েও বলতে পারল না। প্রতিমার মত একটি কিশোরীকে কোনো কড়া কথা বলা যায় না। মুনা কোমল স্বরে বলল, কাঁদছিস কেন তুই? বকুল চোখ মুছে বলল, তোমরা সবাই আমার সঙ্গে এ রকম করবে। আর আমি কাঁদতে পারব না?

সেকেন্ড পিরিয়ডে রীতা আপার ক্লাস। ইংলিস সেকেন্ড পেপার। রীতা। আপাকে ছাত্রীরা আড়ালে ডাকে রয়েল বেঙ্গল। ভয়ানক রাণী। এবং তিনি বেছে বেছে এমন সব ছাত্রীদের পড়া জিজ্ঞেস করেন যারা সেদিন শিখে আসেনি। সবার ধারণা কপালের মাঝখানে তার একটা তিন নম্বর চোখ আছে, যেই চোখ দিয়ে তিনি দেখে ফেলেন কে পড়া করেছে কে করেনি।

বকুল বসে বসে ঘামছিল। রীতা। আপা ক্লাসে ঢুকে প্রথম প্রশ্নটি জিজ্ঞেস করবেন তাকে। প্রথম দাঁড়াতে বললেন। তারপর শীতল চোখে তাকবেন। ক্লাসের সমস্ত সাড়াশব্দ যখন থেমে যাবে তখন প্রশ্ন করবেন। প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করবেন আলাদা আলাদা ভাবে। এবং এমন প্রশ্ন করবেন যার উত্তর ক্লাসের কেউই জানে না।

আজও তাই হল। রীতা। আপা ক্লাসে ঢুকেই বললেন বকুল দাঁড়া। বকুল দাঁড়াল। আপা তাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, কমন রুমে চলে যা। রেহানা। আপা তোকে ডাকছেন। বই-খাতা নিয়ে যা।

রেহানা আপা দারুণ ব্যস্ত। হাতে একগাদা কাগজপত্র কিন্তু মুখ হাসি হাসি। বকুল তার পাশে দাঁড়াতেই তিনি বললেন, বকুল তুই বাড়ি চলে যা। আজ বিকেল পাঁচটার সময় তোকে দেখতে আসবে, মাকে বলবি। সাজগোজ বেশি দরকার নেই। ছেলের মা আর এক ফুফু আসবে। খবর না দিয়ে হঠাৎ গিয়ে দেখার কথা। সেজেগুজে থাকলে বুঝে ফেলবে। বুঝেছিস?

বকুল মাথা নাড়ল। সে বুঝেছে।

যা একটা রিকশা নিয়ে বাড়ি চলে যা। শাড়ি পাবে থাকবি! কামিজটামিজ না। আর শোন, দুপুরে কাঁচা হলুদ গায়ে দিয়ে গোসল করবি, রঙ খুলবে। আবশ্যি তোর রঙ খারাপ না। চাপা রঙ। এটাই ভাল।

বকুল সরাসরি বাড়ি এল না। গেল টিনা ভাবীদের বাড়ি। অনেক দিন পর আসা। টিনা ভাবী ঘুমুচ্ছিল। সে ঘুম ঘুম চোখে দরজা খুলে দিল।

কেমন আছ ভাবী?

আর কেমন আছি। আমাদের খোজখবর কে করে? তোর ফজলু ভাই দারুণ রেগে আছে, তোকে মজা দেখাবে। কাবলিওয়ালা দেখতে এলি না কেন?

বাসা থেকে আসতে দেয়নি। মুনা। আপা নট বলে দিয়েছিল।

এরকম দারোগা আপা জোগাড় করলি কোথেকে?

বকুল মৃদু হাসল।

তোর এই আপাকে আমার একেবারেই সহ্যই হয় না। কি রকম পুরুষ পুরুষ মেয়ে।

বকুল অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। মুনা। আপার নামে কেউ কিছু বললে তার খারাপ লাগে। টিনা ভাবী বললেও লাগে। যদিও তার প্রায়ই মনে হয় টিনা ভাবীকেই সে সবচে বেশি ভালবাসে।

তোর বিয়ে হচ্ছে। এ রকম একটা গুজব শোনা যাচ্ছে, এটা কি সত্যি?

বলেছে কে তোমাকে?

যেই বলুক, সত্যি কি না বল?

না। সত্যি না।

টিনা ঘাড় কাত করে হাসতে লাগল।

বকুল বলল, হাসছ কেন?

এমনি।

এই কদিনের মথ্যে তোমার পেট অনেকখানি বড় হয়ে গেছে ভাবী।

তা হয়েছে। আমার মনে হয় যমজ। দু’জন আছে। এখানে।

যমজ হলে ভালই হয়।

তোর হোক তখন বুঝবি–ভাল কি মন্দ। রাতে ঘুমুতে পারি না। সবচে অসুবিধা হয় তোর

ভাইয়ের; বেচারা ক’দিন ধরে দারুণ মনোকষ্টে আছে।

কেন? তা বলা যাবে না।

টিনা রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসতে লাগল। বকুল লজ্জা পেয়ে গেল। টিনা বলল, তুই এমন টমেটোর মত লাল হয়ে গেলি কেন? বুঝতে পেরেছিস নাকি কি জন্যে মনোকষ্টে আছে?

না।

আবার মিথ্যা কথা। ঠিকই বুঝেছিস। আজ তুই সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকবি। তোর ফজলু ভাই আসুক, তারপর যাবি। সে অনেক’দিন তোকে না দেখে মন খারাপ করে আছে।

আজ থাকতে পারব না ভাবী, আমার কাজ আছে।

কি কাজ? এত কাজের লোক হলি কবে থেকে? বাস গল্প করব। বিছানায় পা উঠিয়ে বস না।

বকুল বসল। টিনা এসে বসল। তার পাশে। একটা হাত রাখল বকুলের কোলে। মৃদু স্বরে বলল, তুই দিন দিন যা সুন্দর হচ্ছিস। আমারই লোভ, লাগে।

কি যে বল তুমি।

যে তোকে বিয়ে করবে। সে প্রথম তিন মাস এক ফোটাও ঘুমুতে দেবে না। সারা রাত জাগিয়ে রাখবে। যদি না রাখে আমার নাম বদলে ফেলব।

থাক তোমার নাম বদলানোর দরকার নেই।

টিনা মুখ টিপে টিপে হাসতে লাগল। তারপর হঠাৎ হাসি থামিয়ে গম্ভীর হয়ে বলল আমার চেহারা-ছবি তো দেখছিস। এই আমাকেই তোর ভাই এক মাস রাতে ঘুমুতে দেয়নি। সারা রাত জেগে থাকি দিনের বেলায় ফ্যাক পেলেই ঘুমাই। শ্বশুর বাড়িতে সবাই হাসাহাসি করে।

বকুল কিছু বলবে না ভেবেও বলে ফেলল, এখন আর তোমাকে জাগায় না?

না। আগের মত না।

বকুল তিনটা পর্যন্ত থাকল সেখানে। টিনা ভাবীর সঙ্গে কথা বলা একটা নেশার মত। কিছুতেই আসতে ইচ্ছা করে না। পুরুষদের নিয়ে এমন সব মজার মজার গল্প সে জানে শুধু শুনতে ইচ্ছা! করে। আজ সে একটা গল্প বলেছে যে শুনলেই গা বিমঝিম করে।

টিনা ভাবীর এক খালার বিয়ে হয়েছে রাজশাহীতে। টিনা ভাবী তখন মাত্র মেট্ৰিক দিয়েছে। সেও গিয়েছে বিয়েতে। সমবয়সী মেয়েরা শাড়ি পরে ছুটোছুটি করছে। সেও করছে। রাত নটার সময় বর এল। সবাই ছুটে গেল গেট ধরতে। সে গেল ছাদে। সেখান থেকে সমস্ত ব্যাপারটা ভাল করে দেখা যাবে। তখন হঠাৎ ইলেকট্রিসিটি চলে গেল। ছাদে পাঞ্জাবি পরা একজন লোক দাঁড়িয়ে ছিল। সে বলল, খুকী ভয় লাগছে? তারপর…।

গল্প শেষ হবার পর বকুল ক্ষীণ স্বরে বলল, তুমি ফজলু ভাইকে বলেছ। এই ঘটনা?

পাগল হয়েছিস? সবাইকে সব কথা বলা যায়! মেয়েদের অনেক কথা পুরোপুরি গিলে ফেলতে হয়।

ঐ লোকটির সঙ্গে আর দেখা হয়েছিল?

না। আর হলেই কি? তুই দেখি গল্প শুনে ঘামতে শুরু করেছিস। মেয়ে হয়ে জন্মানোর অনেক কষ্ট রে বকুল।

এ সময় বাড়িতে মা ছাড়া অন্য কারো থাকার কথা নয়। কিন্তু বকুল অবাক হয়ে দেখল বাবা খালি পায়ে বারান্দায় ক্যাম্পখাটে বসে আছেন। তারও কি অফিস ছুটি? নাকি তিনি খবর পেয়েছেন রেহানা আপা আসবেন ছেলের মাকে নিয়ে?

শওকত সাহেবের মুখ অত্যন্ত বিমর্ষ। খালি গায়ে থাকার জন্যেই হয়ত তাকে দেখাচ্ছে বুড়ো মানুষের মত। তিনি বকুলের দিকে না তাকিয়েই বলল আজি ক্লাস হয়নি? কি অবস্থা, তিন মাস পর মেট্রিক পরীক্ষা।

বকুল কিছু বলল না। মেট্রিক পরীক্ষার এখনো অনেক দেরি। সেদিন মাত্র ক্লাস টেইনে হাফ ইয়ার্লি হল। কিন্তু বাবার মাথায় কি করে যেন তিন মাস ঢুকে গেছে।

স্কুলে পড়ায় না?

পড়ায়।

আর পড়া। পড়াশোনা কি দেশে আছে? ঠাণ্ডা এক গ্লাস পানি দে।

বকুল পানি নিয়ে এল। শওকত সাহেব তৃষ্ণার্তের মত পানি পান করলেন। তৃষ্ণ মিটাল না।

আয়েক গ্ৰাস পানি দে।

সরবত বানিয়ে দেব? ঘরে কাগজি লেবু আছে।

দে! তোর মার শরীর আজ কেমন?

ভাল।

ভাল? এর নাম ভাল। বিছানা থেকে নামতে পারে না। আর শরীর ভাল। খাওয়া-দাওয়া করেছে?

আমি তো জানি না। সকালে স্কুলে চলে গেলাম।

যা আগে খোঁজ নিয়ে আয়। মা-বাপের দিকে একটু লক্ষ্য রাখিস। এটা আবার বলে দিতে হয়। কেন?

লতিফা জেগেই ছিলেন। বকুলকে ঢুকতে দেখে মাথা উঁচু করে বললেন–তোর বাবা এসেছে নাকি? কথা শোনা যাচ্ছে।

দরজা খুলল। কিভাবে?

দরজা খোলা ছিল বোধ হয়।

না। আমি নিজের হাতে বন্ধ করলাম। তুই জিজ্ঞেস করে আয় দরজা খুলল। কিভাবে?

জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। আমি পারব না।

জিজ্ঞেস করতে অসুবিধা কি? তোকে তো খেয়ে ফেলবে না।

বকুল বিরক্তিতে ভ্রূ কুঁচকাল। অসুস্থ হবার পর লতিফাব এমন হয়েছে। সামান্য ব্যাপারে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েন।

বকুল, তোর বাবা রোজ এমন সকাল সকাল বাড়ি আসছে কেন?

রোজ আসছে নাকি?

কালও তো একটার সময় চলে এসেছে। এর আগের দিন এসেছে দুটার সময।

অফিসে কাজ-টাজ বোধ হয় বেশি নেই।

কাজ থাকবে না কেন? কি যে বলিস! যা তো জিজ্ঞেস করে আন্য রোজ এত সকাল সকাল আসে। কেন?

আমি জিজ্ঞেস করতে পারব না। মা।

তাহলে ডেকে দে, আমি জিজ্ঞেস করছি।

ঠিক আছে দিচ্ছি। তুমি কিছু খেয়েছিলে মা?

দুধ-মুড়ি খেয়েছি। যা তোর বাবাকে আসতে বল।

শওকত সাহেব নিঃশব্দে সরবত খেলেন। গ্রাস শেষ করে বিবক্ত স্বরে বললেন, ছেকে দিতে পারলি না, লেবুর ছোবরায় গ্লাস ভর্তি। কোনো একটা কাজ ঠিকমত করতে পাবিস না, না?

বকুল চুপ করে রইল। শওকত সাহেব বললেন, তোব মা কিছু খেয়েছে?

হ্যাঁ। দুধ-মুড়ি।

রোজ দুধ-মুড়ি। মুড়ির মধ্যে আছেটা কি? এর চাইতে এক বাটি ডাল খেলে পুষ্টি বেশি হয়। যত বেকুবের মত কাজ।

বকুল ক্ষীণ স্বরে বলল, মা তোমাকে ডাকে।

এখন তার ভ্যাজর ভ্যাজার শুনতে পাবিব না। আমার পাঞ্জাবি এনে দে বাইরে যাব।

কখন ফিরবে?

শওকত সাহেব জবাব দিলেন না। ছেলে-মেয়েদেব সব কথার তিনি জবাব দেন না।

রেহানা। আপা আসাব কথা বিকাল পাঁচটায, তিনি চারটিাব মধ্যেই চলে এলেন। তার সঙ্গে অসম্ভব বেঁটে অতিরিক্ত মোটা এক মহিলা। ইনিই সম্ভবত ছেলেবে মা। আবেকজন তার মত বেটে কিন্তু দারুণ রোগা ছেলের ফুফু হবেন। বেহানা আপা বকুলকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলল শাড়ি পরতে বলেছিলাম না? এখনো স্কুলেব ড্রেসই পরে আছিস? মাথায় বুদ্ধি-শুদ্ধি কিছু আছে না সবটাই গোবব?

আপনি বলেছিলেন পাঁচটার সময় আসবেন।

পাঁচটার সময় আসব বলেছি বলেই তুই পাঁচটা বাজার দুমিনিট আগে কাপড় বদলাবি? আব তুই পা ছুয়ে সালাম করলি না কেন?

এখন করব?

এখন কববি কোন অজুহাতে? যাবার সময় করিস। আব্বা মুখ এমন আমসি কবে আছিস কেন? হাসিমুখে থােক। তাই বলে কথায্য কথায় হাসার দবকার নেই।

ছেলের মাকে বকুলের পছন্দ হল। খুব রসিক মহিলা। ছোটখাটো জিনিস নিয়ে মজার মজার রসিকতা করতে লাগলেন। এবং এক ফাঁকে বকুলকে বললেন আমাকে দেখে অনেকেই মনে করে আমার ছেলেমেয়েগুলি বোধ হয়। আমার সাইজের। আসলে তা না, ওরা সবাই ওদেব বাবাব মত লম্বা। তবে আমি নিশ্চিত আমার নাতিগুলি হবে আমার সাইজের। এই বলে তিনি খুব হাসতে লাগলেন। হাসি এমন আন্তরিক যে সবাই তাতে যোগ দিল। বকুলের সঙ্গে তার কথাবার্তা হল খুবই কম। একবার শুধু জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ভাল নাম কি মা? তার উত্তর শোনার জন্যেও অপেক্ষা করলেন না, অন্য প্রশ্ন করলেন। বেশ মহিলা।

যাবার সময় বকুল পা ছুঁয়ে সালাম করতেই তিনি তাকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেলেন। অনেক’দিন বকুলকে এমন ভাবে কেউ আদর করেনি।

০৭. মামুন বলল কি কেমন দেখছ

মামুন বলল কি কেমন দেখছ? বাসা পছন্দ হয়? মুনা এতটা আশা করেনি। সে মুগ্ধ কণ্ঠে বলল, খুবই সুন্দর। তুমি মোটামুটি বলেছিলে কেন? মামুন হাসতে শুরু করল।

এস পেছনের বারান্দাটা দেখি।

পেছনেও বারান্দা আছে নাকি?

থাকবে না। মানে। এখন বল বাসা কেমন?

চমৎকার! সত্যি চমৎকার।

একটু দূর হয়ে গেল। তাই না?

হোক দূর।

বসবার কোনো ব্যবস্থাই নেই। মামুন পা ছড়িয়ে মেঝেতে বসল–জিনিসপত্র কিনে ঘরদুয়ার গোছাও এখন। চল আজ ফেরার পথে বড় দেখে একটা খাট কিনে ফেলি।

তোমার মাথায় শুধু খাট ঘুরছে।

তা ঘুরছে। ফোমের একটা গদি কিনিব বুঝলে মুনা। সাড়ে নশ টাকা দাম।

বাজে খরচ করার পয়সা আমাদের নেই।

ঐটা আমি কিনবাই, তুমি যাই বল না কেন। দাঁড়িয়ে আছ কেন বাস।

মামুন হাত ধরে মুনাকে টেনে পাশে বসোল। কেমন নির্জন চারদিক। একটু যেন গা ছমছম করে। মুনা ক্ষীণ স্বরে বলল হাত সরাও প্লিজ।

এ রকম করছ কেন তুমি? আমার ওপর বিশ্বাস নেই তোমার?

মুনা জবাব দিল না। মামুন তাকে কাছে টানল। গাঢ় স্বরে বলল এমন শক্ত হয়ে আছ কেন? কেউ তো দেখছে না।

চল আজ যাই, সন্ধ্যা হয়ে আসছে।

হোক সন্ধ্যা, তুমি বস তো।

তুমি এ রকম কর, বসতে ভাল লাগে না।

কিচ্ছু করব না তুমি সহজ হয়ে বস।

ওয়ার্ড অব অনার?

হ্যাঁ, ওয়ার্ড অব অনার। শুধু আমার হাত থাকবে তোমার হাতে। নাকি তাতেও আপত্তি?

না তাতে আপত্তি নেই।

মামুন গাঢ় স্বরে বলল চল তাড়াতাড়ি বিয়েটা সেরে ফেলি। আর ভাল্লাগছে না। আগে যে রকম কথা ছিল সে রকমই করি। কাজীর অফিসে গিয়ে ঝামেলা মিটিয়ে দি।

মামা রাজি হবে না। ছোট করে হলেও একটা অনুষ্ঠান করতে হবে। মুনার কথা শেষ হবার আগেই মামুন তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল। মুনা কোন বাধা দিল না। তা্রা সন্ধ্যা না মিলানো পর্যন্ত থাকল সেখানে।

রহস্যময় কিছু সময় কাটল তাদের।

মুনা রোজ ভাবে সকাল সকাল ঘুমুতে যাবে কিন্তু রোজই দেরি হয়। আজও দেরি হল। বারোটার সময় বাতি নেভাতে যেতেই বকুল বলল, একটু পরে আপা। আমার পাঁচ পৃষ্ঠা বাকি আছে। মুনা বিরক্ত স্বরে বলল–মশারির ভেতরে বসে গল্পের বই পড়িস। কেন? চোখ নষ্ট হবে। আর প্রতিদিন একটা করে বই জোগাড় করিস কোথেকে?

ফজলু ভাই এনে দেয়।

আমি বারান্দায় বসছি। বই শেষ হলে ডেকে দিস।

আজ গরম নেই। আশ্বিনের শেষাশেষি। শেষ রাতের দিকে ভাল ঠাণ্ডা পড়ে। মুনা ক্যাম্পখাটে বসে অপেক্ষা করতে লাগল। পাঁচ পৃষ্ঠা বাকি কথাটা মিথ্যা। অনেকখানিই বাকি। মুনাকে ডাকতে কেউ আসে না।

শওকত সাহেবকে বারান্দার দিকে আসতে দেখা গেল। তিনি মুনাকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, অন্ধকারে বসে আছিস কেন? সাড়ে বারোটা বাজে।

এমনি বসে আছি। তুমি নিজেও তো অন্ধকারে হাঁটাহাঁটি করছ। কিছু খুঁজছি নাকি?

দড়ি আছে?

দড়ি দিয়ে কি করবে?

মশারি খাটাব।

মশারি তো খাটানোই আছে। আবার নতুন করে খাটাবে কি?

শওকত সাহেব থেমে থেমে বললেন বসার ঘরে বিছানা করেছি। আজ থেকে আলাদা শোব।

কেন?

প্রত্যেক দিন রুগীর সাথে শুয়ে শুয়ে শরীরটাই আমার খারাপ হয়ে গেছে।

শওকত সাহেব বিরক্তির ভঙ্গি করে বসার ঘরের দিকে গেলেন। সেখানে সত্যি সত্যি একটা বিছানা করা হয়েছে। নোংরা একটা মশারি খাটানোর চেষ্টাও হচ্ছে। মশারির তিন কোণ শিথিলভাবে ঝুলছে। দড়ির অভাবে চার নম্বর কোণাটির গতি হচ্ছে না। মুনা বলল দুপুর রাতে দড়ি পাওয়া যাবে না। তুমি একটা কয়েল জ্বালিয়ে শুয়ে থাক।

কয়েল আছে?

আছে, এনে দিচ্ছি। আচ্ছা মামা, সত্যি করে বল তো তোমার কি হয়েছে?

কি আবার হবে? রুগীর সাথে ঘুমাতে চাই না। এর মধ্যে হওয়া-হওযির কি আছে?

এই কথা না। তুমি নাকি প্রতিদিন দুপুরে অফিস-টফিস বাদ দিয়ে ঘরে এসে বসে থাক?

কে বলেছে, লতিফা?

হ্যাঁ। ব্যাপার কি?

ব্যাপার কিছু না। অফিসে একটা ঝামেলা যাচ্ছে।

ঝামেলা গেলে তো সেখানেই বেশিক্ষণ থাকা উচি৩। কি ঝামেলা বল?

শওকত সাহেব বিরক্ত স্বরে বললেন, ভ্যাজব ভ্যাজব করিস না। কয়েল জুলিখে দি যে যা। আর দেখা হাতপাখা পাওয়া যায় কি না। বিশ্ৰী গরম।

গরম কোথায়? বেশ তো ঠাণ্ডা।

শওকত সাহেব গুম হয়ে বসে রইল। এখন তিনি আর কথা-টথা বলবেন না। মুনা কযেল। আনতে গেল। মামির ঘবের ড্রয়ারে এক প্যাকেট কযেল আছে।

লতিফা জেগে ছিলেন। মুনা ড্রয়ার খুলতেই তিনি ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, তোর মামা আলাদা ঘুমাচ্ছে কেন রে?

এই ঘরে গরম লাগে। বাতাস-টাতাস নেই।

ফ্যান আছে তো।

ফ্যানের বাতাসে তার ঘুম হয় না। একেক জনের একেক স্বভাব।

লতিফা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, এতদিন তো ঘুম হয়েছে। আজ হবে না কেন? বলতে বলতেই তার গলা ভারী হয়ে এল। মুনা এসে বসল বিছানার পাশে। লতিফা বললেন, এক সময় তোেব মামা আমাকে বিয়ে করার জন্যে কত কাণ্ড করেছে।

এই গল্প মুনার জানা। মামির কাছ থেকে অসংখ্যাবার শুনেছে। আজ রাতে আরেকবার হয়ত শুনতে হবে।

মুনা, কি সব পাগলামি কাণ্ড যে সে করেছে। একবার শুনলাম সে বিষ খাবে। এক বোতল র্যাটম না কি যেন জোগাড় করেছে। আমি ভয়ে বাঁচি না। কি কেলেঙ্কারি। কাণ্ড! বাড়িতে সবাই দোয্য দিচ্ছে আমাকে। আমি কি জানি বল? আমার সঙ্গে কোনোদিন তার একটা কথাও হয়নি।

বলতে বলতে শাড়ির আঁচলে লতিফ চোখ মুছলেন। প্রসঙ্গ পাল্টাবার জন্যে মুনা বলল, বকুলের হবু শাশুড়ী নাকি লম্বায় দেড় ফুট? বিয়ের ডেট-ফেট ফেলে দিয়েছ নাকি মামি?

না ডেট হয়নি। বিয়ে নিয়ে কোনো কথাবার্তাই হয়নি।

দুই বেয়ানে কি নিয়ে গল্প করলে?

লতিফা খানিকক্ষণ চুপ করে থাকলেন। সম্ভবত মনে করতে চেষ্টা করছেন। কিছুই মনে করতে পারলেন না। মুনা বলল, শুয়ে থাক মামি। বাতি নিভিয় দেই। লতিফা চাপা স্বরে বললেন, আমি বেশিদিন বাঁচব না রে।

বুঝলে কিভাবে?

কয়েক’দিন আগে স্বপ্নে দেখলাম আমি আর তোর মা দুজনে ভাত খাচ্ছি। স্বপ্নে মরা মানুষদের সঙ্গে খেতে বসা খুব খারাপ। যে দেখে সে আর বাঁচে না।

কি দিয়ে ভাত খাচ্ছিলে?

লতিফা জবাব দিলেন না। চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলেন। মুনা বাতি নিভিয়ে বের হয়ে এল। বকুলের পাঁচ পৃষ্ঠা এখনো শেষ হয়নি। মুনা কোনো কথা না বলে বাতি নিভিয়ে দিল। বকুল বলল, আর একটা পাতা। আপা, প্লিজ।

কোনো কথা না, ঘুমো।

এই পাতাটা শেষ না করলে আমার ঘুম আসবে না।

ঘুম না এলে জেগে থাক। কথা বলিস না। কি বই এটা?

উপন্যাস।

কার লেখা?

সতীনাথ ভাদুড়ির অচিন রাগিনী। ফজলু ভাই এনে দিয়েছে লাইব্রেরি থেকে।

ভাল নাকি খুব?

মোটামুটি।

মোটামুটি? তুই যেভাবে পড়ছিস তাতে তো মনে হয় রসগোল্লা ধরনের উপন্যাস।

বকুল খিলখিল করে হেসে উঠে জড়িয়ে ধরল। মুনাকে। মুনা বিরক্ত স্বরে বলল, হাত উঠিয়ে নে। গরম লাগছে। বকুল হাত সরাল না। আরো কাছে ঘেঁষে এসে বলল, তুমি এত ভাল কেন মুনা আপা?

জানি না কেন। বিরক্ত করিস না।

ধাকুল মৃদু স্বরে বলল, একটা গল্প বল না আপা।

কি মুশকিল, রাত দেড়টার সময় গল্প কিসের?

একটা বল আপা। তোমার পায়ে পড়ি? ভূতের গল্প। সত্যি সত্যি তোমার পায়ে ধরছি কিন্তু।

আহ কেন সুড়সুড়ি দিচ্ছিস?

আপা প্লিজ, প্লিজ।

মুনাকে গল্প শুরু করতে হল। ওপাশের বিছানা থেকে বাবু ক্ষীণ স্বরে বলল, একটু জোরে বল আপা, আমিও শুনছি। মুনা অবাক হয়ে বলল, এখনো জেগে আছিস?

ই। ঘুম আসছে না, কি করব?

বাবু অস্পষ্ট ভাবে কি যেন বলল। পরিষ্কার বোঝা গেল না। মুনা উঁচু গলায় বলল–কি বলছিস ভাল করে বল। বোবা ধরেছিল?

হ্যাঁ।

কাল সকালে মনে করিাস তোকে একজন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।

ঠিক আছে।

গল্প শেষ হতে হতে অনেক রাত হয়ে গেল। বকুল বলল, বাথরুমে যেতে হবে তুমি একটু দাঁড়াও। বাবুর ও বাথরুম পেয়ে গেল। বাবু বলল, আজ না ঘুমিয়ে সারারাত গল্প করলে কেমন হয় আপা? মুনা বিরক্ত স্বরে বলল, ফাজলামি করিস না, বাথরুম শেষ করে ঘুমুতে যা। আর একটি কথাও না।

তারা তিনজন দরজা খুলে বাইরে বেরিয়েই দেখল। শওকত সাহেব উবু হয়ে বারান্দায় বসে আছেন। অন্ধকার বারান্দা। তার হাতে জ্বলন্ত সিগারেট শুধু উঠানামা করছে। মুনা ডাকল মামা! তিনি ফিরে তাকালেন। কোনো উত্তর দিলেন না।

একা একা কি করছ মামা?

কিছু করছি না।

শওকত সাহেব নিঃশব্দে ঘরের ভেতর ঢুকে গেলেন। বকুল চাপা স্বরে বলল, বাবার কি হয়েছে মুনা আপা? মুনা বলল, কিছুই হয়নি। ঘুম আসছে না। তাই বসে ছিল বারান্দায়। কেন জানি বকুলের মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। বাবার বসে থাকার ভঙ্গিটা কেমন দুঃখী দুঃখী। তার মনে হল বাবা লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদছিল। মানুষের কত রকম গোপন দুঃখ থাকে। তার নিজেরও আছে। প্রায়ই সে এ রকম একা একা কাঁদে। তার মত দুঃখ তো বাবা-মাদেরও থাকতে পারে। ভাবতে ভাবতে বকুলের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। অল্পতেই তার কান্না পায়।

০৮. জলিল মিয়ার চায়ের দোকানে

সকাল ন’টার মত বাজে।

বাকের জলিল মিয়ার চায়ের দোকানের সামনে বিমর্ষ মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। কড়া রোদ বাইরে। বাকেরের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। জলিল মিয়া ডাকল–বাকের ভাই, আসেন চা খান। বাকের জবাব দিল না। সব কথার জবাব দেয়া ঠিক না। এতে মানুষের কাছে পাতলা হয়ে যেতে হয়। সে এগিয়ে গিয়ে পান-বিড়ির দোকানটার সামনে দাঁড়াল। বেশ কয়েকজন কাস্টমার দাঁড়িয়ে আছে সেখানে, দোকানদার সবাইকে বাদ দিয়ে হাসি মুখে জিজ্ঞেস করল, কি দিব বাকের ভাই?

সিগ্রেট দে।

ফাইভ ফাইভ?

বাকের এমন ভাবে তাকাল যেন সে দারুণ বিরক্ত হয়েছে। তাকে ক্ষমা করে দেয়ার ভঙ্গিতে বলল, অন্য কোনো সিগ্রেট খাই? দোকানদার জিবে কামড় দিয়ে একটা সিগ্রেট বের করল। বাকের গম্ভীর গলায় বলল, এক প্যাকেট দে। সে একটা চকচকে একশ টাকার নোট ছুড়ে ফেলল।

আজ তার মন নানান কারণে খারাপ হয়ে আছে। গত রাতে খবর পাওয়া গেছে। ইয়াদ চাকরি পেয়েছে। দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা ইয়াদের সঙ্গে ওঠাবসা অথচ এই খবরটা ইয়াদ তাকে দেয়নি। অন্যের কাছে জানতে হল। খবরটা যাচাই করবার জনে সে সাত সকালে গিয়েছিল। ইয়াদের বাড়ি। ইয়াদ হাই তুলে বলল, আর কতদিন এমনি এমনি ঘুরব? আর চাকরিটাও খারাপ না। ঘোরাঘুরি আছে। টি এ ডি এ পাওয়া যায়।

কবে থেকে চাকরি?

সামনের মাসের এক তারিখ থেকে। দেরি আছে। চল যাই চা খেয়ে আসি। নাশতা করেছিস?

চা খেতে খেতেই বাকের একবার বলল, আমবা চারজন মিলে যে স্পেয়ার পার্টস-এর দোকান দেব বলেছিলাম তার কি?

আরে দূর এইসব কি আর হয় নাকি? দুইজন তো ভোগেই গেল, বিয়ে-শাদী করে একেবারে গেরস্ত।

তুই আর আমি দুইজনে মিলে করতে পারতাম।

পয়সা কই?

ইয়াদ খানিকক্ষণ পরই গলা নিচু করে বলতে লাগল, বড় ভাই এদিকে আবার ফ্যাচাং বঁধিয়ে ফেলেছে। আই.এ. পাস এক মেয়ের সাথে সম্বন্ধ করে ফেলেছে। মেয়ে কালো কিন্তু সুইট দেখতে। একটু অবশ্যি রোগা।

বাকের একটি কথাও বলল না। গম্ভীর হয়ে রইল। ইয়াদ নিজের মনেই কথা বলে যেতে লাগল–আমি নিজে তো মেট্রিকটা পাস করতে পারলাম না। এদিকে বউ হল গিয়ে এই–এ। শালা কেলেঙ্কারি অবস্থা। এখন বউ যদি বি.এ. পড়তে চায় তাহলে গেছি। বড় ঝঞ্ঝাটের মধ্যে পড়ে গেলাম। ইয়াদের মুখ দেখে মনে হল না ঝঞাটের জন্যে সে বিরক্ত। বরং মনে হল সে সমস্ত ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করছে।

বাকের চা শেষ না করেই উঠে এল। এটা ঠিক যে পাড়ার সবাই তাকে খাতির করে। কিন্তু দল ভেঙে যাচ্ছে। এ সব লাইনে দল ভেঙে গেলে খাতির থাকে না। দেখতে দেখতে চ্যাংড়ারা উঠে আসবে। গত সপ্তাহেই তার চোখের সামনে মজনু সিগারেট টানতে টানতে রিকশায় উঠল। একটা চড় দিলে দুটো চড়ের জায়গা নেই যার তার এত বড় সাহস।

বাকের জলিল মিয়ার চায়ের স্টলে ঢুকল। জলিল মিয়া নিজেই গলা উঁচিয়ে ডাকল গফফর, গরম পানি দিয়া ভাল কইরা বাকের ভাইরে চা দে। কাপ ধুইয়া দিস। বাকের বসে রইল। উদাস ভঙ্গিতে। এখানে চুপচাপ বসে থাকা ছাড়া এখন আর কোনো কাজ নেই। স্কুলের সময় হয়ে গেছে, পাড়ার মেয়েরা স্কুলে রওনা হয়েছে দল বেঁধে। দেখতে এত ভাল লাগে। বাকের লক্ষ্য করতে লাগল কোনো ছোকরা শিসটিস দেয়। কিনা। টেনে জিব ছিঁড়ে ফেলবে সে। তার পাড়ায় মেয়েছেলের অসম্মান হতে দেবে না।

মুনা ঘর থেকে বেরুল দশটার দিকে। অফিস পৌঁছতে পৌঁছতে নিশ্চয়ই এগারোটা বেজে যাবে। রোজ দেরি হয়। কালও সে ঘর থেকে বের হয়েছে এগারোটায়। বাকের চায়ের সন্টল ছেড়ে বাইরে এসে দাঁড়াল।

এই যে মুনা অফিসে যাচ্ছ নাকি?

হ্যাঁ। সকালবেলা আর কোথায় যাব?

মামাকে বলবে কাজের মেয়ে একটা জোগাড় করেছি।

ঠিক আছে বলব।

বাকের সঙ্গে সঙ্গে আসতে শুরু করল। মুনা কিছু বলল না। বাকের হালকা স্বরে বলল, তোমাদের অফিসে যাব এক’দিন। মেয়েছেলেরা কাজ করছে দেখলে ভাল লাগে।

আপনারী কিছু করবেন না, গায়ে ফুঁ দিয়ে বেড়াবেন। মেয়েরাও যদি তাই করে তাহলে হবে কিভাবে?

তোমাদের জন্যেই তো কিছু করতে পারি না। মেয়েরা সব কাজকর্ম নিয়ে নেয়। বাংলাদেশ একেবারে নারীমহল হয়ে যাচ্ছে। আমরা এখন অন্দরে ঢুকে রান্নাবান্না করব। হা হা হা।

বাকের রাস্তা কাঁপিয়ে হাসতে লাগল। নিজের কথা তার নিজেরই খুব মনে ধরেছে। সে বড় রাস্তার মোড় পর্যন্ত গেল। এ সময় রিকশা পাওয়া মুশকিল, কিন্তু সে ছুটোছুটি করে রিকশা নিয়ে এল। রিকশাওয়ালাকে গম্ভীর গলায় বলল, আপামণিকে তুরন্ত নিয়ে যাবি। মুনার ধন্যবাদ জানিয়ে কিছু-একটা বলা উচিত। কিন্তু সে কিছু বলল না। বাকের বলল মুনা, ভাড়া দিতে হবে না।

কেন? দিতে হবে না কেন?

দিয়ে দিয়েছি।

বাকের উদাস ভঙ্গিতে সিগারেট ধরাল। তার এখন কিছু করার নেই। মোটর পার্টস-এর দোকানে আগে এই সময়টায় আড্ডা দিতে বসন্ত সে আড্ডাটা এখন আর নেই। লোকজন আসে। না। একা একা কতক্ষণ বসে থাকা যায়? সে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে হাঁটতে লাগল। কোনো কিছুই তাকে আকর্ষণ করছে না। রাস্তার পাশে রিকশাওয়ালার সঙ্গে ভাড়া নিয়ে প্যাসেঞ্জারের ঝগড়া বেঁধে গেছে। অন্য সময় হলে প্যাসেঞ্জারের পক্ষ নিয়ে রিকশাওয়ালার গালে প্রচণ্ড একটা চড় বসিয়ে দিত। আজ সে ইচ্ছাও হল না। মুনার সঙ্গে রাস্তাঘাটে দেখার হবার পর তার এ রকম হয়। বেশি কিছু সময় কিছুই ভাল লাগে না।

বাকের গ্রিন ফার্মেসিতে উঁকি দিল। ডাক্তার ছেলেটি এখনো আসেনি। সে এলে তার সঙ্গে কিছুক্ষণ বসা যেত। বাকের গম্ভীর গলায় বলল ডাক্তার কখন আসবে?

দুপুরের পরে।

দেখি টেলিফোনটা দেখি।

ফার্মেসির নীল শার্ট পরা লোক বিরক্ত স্বরে বলল–ফোন তালা দেয়া। চাবি নেই। এই লোকটি নতুন এসেছে, তাকে বোধ হয় ঠিক চেনে না। বাকের ঠাণ্ডা গলায় বলল, চাবি না থাকলে তালা ভাঙার ব্যবস্থা কর। লোকটি তাকিয়ে আছে সরু চোখে। বাকের থমথমে গলায় বলল, ফাজলামি কথাবার্তা আমার সাথে বলবে না। চড় দিয়ে চাপার দাঁত ফেলে দেব। টেলিফোন তালা দেওয়া! তোমার বাবার টেলিফোন?

লোকটি টেলিফোন বের করল। সত্যি বোধ হয় চাবি নেই। সেফটিপিন দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তালা খুলল।

কাকে ফোন করা যায়? মুনাকে করলে কেমন হয়? মাঝে মাঝে সে মুনার সঙ্গে কথা বলে। মুনা ভীষণ বিরক্ত হয়। তবু করে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে টেলিফোনটি বড় সাহেবের ঘরে। মুনাকে ডেকে আনতে হয়। আজও তাই হল। বড় সাহেব তাকে লাইনে থাকতে মুনাকে আনতে খবর পাঠালেন।

হ্যালো, আমি বাকের।

কি ব্যাপার?

রিকশা ভাড়া দাওনি তো? আমি অলরেডি দিয়ে দিয়েছিলাম।

সে তো আপনি আমাকে বলেছিলেন। আবার টেলিফোন কেন? তোমার কাছ থেকে আবার সেকেন্ড টাইম ভাড়া নিল কি না সেটা জানার জন্যে। রিকশাওয়ালারা या হাब्राभि श्श। হা হা হা।

আর কিছু বলবেন?

না। তোমাদের বিয়ের ডেট হয়েছে নাকি?

না। এখনো হয়নি।

হ্যালো মুনা, আমার কানেকশন আছে, আমি হাফ প্রাইসে একটা কমু্যনিটি সেন্টার ভাড়া করে দেব। জাস্ট দশ দিন আগে আমাকে বলতে হবে।

ঠিক আছে বলব। এখন টেলিফোন রাখি?

হ্যালো শোন–তোমাদের ঐ ফ্যানটার কিছু করা গেল না। অসুবিধা নেই, যেটা আছে সেটা ইউজ কর। নো প্রবলেম।

ঠিক আছে, এখন রাখছি। আমার কাজ আছে।

মুনা টেলিফোন নামিয়ে রাখল। বাকের অলস ভঙ্গিতে চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল, একটা খুব ঠাণ্ডা দেখে পেপসি নিয়ে আস তো। বলবে, বাকের ভাই চায়।

নীল শার্ট পরা লোকটি পেপসি আনতে গেল! বাকের রাস্তার দিকে তাকিয়ে বসে রইল।

শওকত সাহেব অফিসে এলেন লাঞ্চের পর। সবাই তখনো লাঞ্চ সেরে ফেরেনি–অফিস ফাঁকা ফাঁকা। শওকত সাহেবের মনে হল সবাই তাকে এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করছে। ডিসপ্যান সেকশনের মল্লিক বাবু তাকে দেখেই যেন হঠাৎ করে ফাইলপত্র নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। শওকত সাহেব বললেন, ভাল আছেন মল্লিক। বাবু? মল্লিক। বাবু অতিরিক্ত ব্যস্ততার সঙ্গে বললেন, জি ভাল। আপনি ভাল তো?

বড় সাহেব আছেন?

আছেন, অফিসেই আছেন। যান না, দেখা করুন গিয়ে।

শওকত সাহেব বড় সাহেবের কাছে গেলেন না। যাবার সাহস সঞ্চয় করতে তার কিছু সময় লাগবে। ছোকড়া মত একটি ছেলেকে দেখা যাচ্ছে ক্যাশ সেকশনে। নতুন অ্যাপয়েন্টেমেন্ট হয়েছে নাকি? মল্লিক। বাবু বললেন, চা খাবেন?

জি না।

ক্যাশ সেকশনের নতুন ছেলেটি আড়চোখে তার দিকে তাকাচ্ছে। তার খবর শুনেছে বোধ হয়।

জসিম সাহেব ঢুকলেন। খুব ফুর্তিবাজ লোক। রসিকতা না করে এক সেকেন্ডও থাকতে পারেন। না। শওকত সাহেবকে দেখে তিনিও কেমন জানি হকচাকিয়ে গেলেন। শুকনো হাসি হেসে বললেন, কি ভাল?

জি ভালই।

দেখা হয়েছে বড় সাহেবের সঙ্গে?

জি না। দেখা করতে বলেছেন?

না কিছু বলেননি। তবে আমার মনে হয় দেখা করা উচিত। ইনকোয়ারি কমিটি রিপোর্ট দিয়েছে।

শওকত সাহেব কাঁপা গলায় বললেন, কি রিপোর্ট?

জসিম সাহেব উত্তর না দিয়ে ড্রয়ার খুলে কি নিয়ে যেন ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

বড় সাহেবের কাছে কি এখনই যাব?

যান। এখুনি যান। দি আরলিয়ার দি বেটার।

শওকত সাহেব ভীত স্বরে বললেন, কিছু শুনেছেন রিপোর্ট সম্বন্ধে?

জি না ভাই। কিছু শুনিনি।

তিনি কথাটা মাটির দিকে তাকিয়ে বললেন। তার মানে এটা মিথ্যা। সরাসরি চোখের দিকে তাকিয়ে কেউ মিথ্যা বলতে পারে না। মিথ্যা বলতে হয় অন্যদিকে তাকিয়ে।

বড় সাহেব মানুষটি ছোটখাটো। হাশিখুশি ধরনের। সহজে রাগ করেন না। কড়া ধরনের কথা বলতে পারেন না। কিন্তু তিনিও গভীর। শওকত সাহেবকে দেখে মুখ অন্ধকার করে বললেন, ইনকোয়ারি কমিটির রিপোর্ট ভাল না। শুনেছেন বোধ হয়?

শওকত সাহেব মূর্তির মত বসে রইলেন।

ইনকোয়ারি কমিটির সুপারিশ হচ্ছে, যে টাকার গরমিল দেখা যাচ্ছে সেটা আপনি দশ দিনের ভেতর যদি ফেরত দেন তাহলে আপনার বিরুদ্ধে কোনো পুলিশ অ্যাকশন নেয়া হবে না। আর তা না হলে কেইস পুলিশ হ্যান্ডওভার করা হবে, বুঝতেই পারছেন একটা কেলেংকারি ব্যাপার হবে। আপনি টাকাটা ফেরত দিয়ে দেন।

টাকা আমি কোথায় পাব স্যার?

বড় সাহেব সরু চোখে তাকিয়ে রইলেন।

আমি স্যার কিছুই জানি না।

এটা তো শওকত সাহেব ঠিক বললেন না। আপনি না জানা মতে এটা হওয়া সম্ভব না। কাজটা করেছেন কাঁচা। আমি নিজেও ইনকোয়ারি কমিটির একজন মেম্বার এটা ভুলে যাচ্ছেন কেন? থানা-পুলিশ হলে একটা বেইজ্জতী ব্যাপার হবে, তার হাত থেকে বাঁচার ব্যবস্থা করুন। শুধু শুধু এখানে বসে থেকে সময় নষ্ট করবেন না। হেড ক্লার্কের কাছে ইনকোয়ারি কমিটির রিপোর্টের কপি আছে। সেটা নিয়ে যান। ভাল করে পড়ুন।

০৯. বকুলের বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছে

বকুলের বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছে এই খবরটি বকুল কাউকে বলেনি। টিন ভাবীকে পর্যন্ত না। অথচ বকুল অবাক হয়ে লক্ষ্য করল ক্লাসের সবাই এটা জানে। সেকেন্ড পিরিয়ডে ইংরেজি। আপা আসেননি। সবাই খুব হৈচৈ করছে। অনিমা গিয়ে এক ফাঁকে বোর্ডে লিখল আজ বকুলের গায়ে হলুদ, কাল বকুলের বিয়ে। দারুণ হাসোহাসি শুরু হল। হাসতে হাসতে একজন অন্যজনের গায়ে গড়িয়ে পড়ছে। বকুল বেঞ্চে মাথা রেখে কেঁদে ভাসাতে লাগল।

ফোর্থ পিরিয়ডে ছুটি নিয়ে চলে গেল টিনা ভাবীদের বাসায়। ভেবেছিল পাঁচটা পর্যন্ত থাকবে–কিন্তু টিনা ভাবীর দেশের বাড়ি থেকে লোকজন এসেছে। বাসা ভর্তি মানুষ। কিছু কিছু দিন এমন খারাপ ভাবে শুরু হয়। বাসায় ফেরার পথে ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।

এই যে বকুল না? এ রকম মাথা নিচু হরে হাঁট কেন? গাড়ির নিচে পড়বে।

বকুল কি বলবে ভেবে পেল না।

এস পেপসি খেয়ে যাও।

জি না, লাগবে না।

লাগবে না কেন। লাগবে। আস তো! চল ফার্মেসিতে বসি, যা গরম।

গরম কোথায়? আজি তো ঠাণ্ড।

এই তো কথা ফুটছে। আমার তো ধারণা ছিল তুমি কথা বলতেই জানো না।

জানব না কেন?

বকুল অবাক হয়ে লক্ষ্য করল, সে বেশ কথার পিঠে কথা বলছে।

কয়েক’দিন আগে কি তুমি শাড়ি পরে কোথাও গিয়েছিলো? নীল শাড়ি?

টিনা ভাবীর বাসায় গিয়েছিলাম।

আমি চিনতে পারিনি। সারাক্ষণ ভাবছিলাম চেনা চেনা লাগছে। অথচ চিনাছি না কেন? আচ্ছা! বকুল বল তো, কাদের পথে দেখলে চেনা চেনা মনে হয়, কিন্তু আসলে ওরা চেনা নয়।

বকুল অনেকক্ষণ ভেবেও কিছু বলতে পারছে না। ডাক্তার ছেলেটি হাসতে হাসতে বলল, টিভি বা সিনেমায় যারা অভিনয় করে ওদের রাস্তায় দেখলে চেনা চেনা মনে হয় ঠিক না?

আমি ওদের কাউকে কখনো রাস্তায় দেখিনি।

আমি অনেক দেখেছি।

সুবৰ্ণাকে দেখেছেন কখনো?

না তাকে দেখিনি।

আমি দেখেছি। আমি আর অনিমা এক’দিন নিউ মার্কেটে গিয়েছিলাম। তখন তাকে দেখলাম কাগজ কিনছে। প্রিন্টের সাদা শাড়ি পরা ছিল।

বকুল প্রায় পাঁচটা পর্যন্ত ফার্মেসিতে একটি টুলের ওপর বসে বসে গল্প করল। এতটা সময় গিয়েছে সে নিজেও বুঝতে পারেনি।

বাসায় ফিরতে ভয় ভয় লাগছিল। তার মনে হল বাবু নিশ্চয়ই আজও দেখেছে এবং হয়ত বলে দেবে মুনা আপাকে। কিংবা কে জানে বাবা নিজেই হয়ত দেখেছেন। তিনি পাঁচটার দিকে মাঝে মাঝে অফিস থেকে ফেরেন। বেছে বেছে হয়ত আজই ফিরেছেন। বকুল ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল।

বাড়িতে কেউ নেই। বাবা, মুনা আপা, বাবু কেউই ফেরেনি। দশ-এগারো বছরের একটা কাজের মেয়েকে দেখা গেল, তার নাম সখী। এ রকম অদ্ভুত নাম থাকে নাকি মানুষের? যতবার তার নাম ধরে ডাকা হয় ততবারই এমন হাসি লাগে। লতিফা এক সময় বিরক্ত হয়ে বললেন, ওকে সখিনা ডাকবি। সখী ডাকছিস কি?

যে নাম ওর বাবা-মা রেখেছে সেটা ডাকবে না?

না ঐ নামে ডাকতে হবে না। সখিনা ডাকবি।

মেয়েটা খুব কাজের। অল্প সময়ের মধ্যেই ঘর-দুয়ার গুছিয়ে ঝকঝকে করে ফেলেছে। বকুলকে জিজ্ঞেস করল, চা খাবে কি না। লতিফা চিন্তিত মুখে বললেন এই মেয়ে বেশিদিন থাকবে না। যারা কাজ জানে তারা এ বাড়িতে বেশিদিন টেকে না।

লতিফার শরীর আজ বেশ ভাল। অনেক দিন পর তিনি আজ রান্নাঘরে ঢুকে হালুয়া বানালেন। সবাই চায়ের সঙ্গে খাবে। গরম পানি দিয়ে ভালমত গোসল করলেন। তার শরীর বেশ ঝরঝরে। লাগছে। বকুল বলল–তুমি গোসল-টোসল সেরে এমন সেজোগুজে বসে আছ কেন?

সাজগোজের কি দেখলি? পরিষ্কার একটা শাড়ি পারলাম শুধু।

তোমাকে বেশ ফ্রেশ লাগছে মা।

লতিফা মনে মনে খুশি হলেন। শরীর যদি সত্যি সত্যি সেরে গিয়ে থাকে তাহলে শক্ত হাতে এবার সংসারের হাল ধরতে হবে। সব জলে ভেসে যাচ্ছে।

বকুল!

কি?

তোর রেহানা। আপা আর আসে না ক্লাসে?

আসবে না কেন, রোজই আসে।

তোর বিয়ের কথা কিছু বলে না?

না।

তুই নিজে কিছু জিজ্ঞেস করিস না?

কি যে তুমি বল মা। আমি গিয়ে জিজ্ঞেস করব। আমার বিয়ের কি করলেন আপা?

লতিফা হেসে ফেললেন। মনে মনে ভাবলেন বড় কথা শিখেছে তো এই মেয়ে। মেয়েরা কত তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যায়। কয়েক’দিন আগেও খালি গায়ে ফ্রক পরে ঘুরে বেড়াত, আজ বিয়ের কথা হচ্ছে। হয়ত সত্যি সত্যি বিয়েও হয়ে যাবে। জাপানে না কোথায় চলে যাবে এইটুকু মেয়ে। এক’দিন তারও ছেলেমেয়ে হবে। ওদেরও বিয়ের বয়স হবে। লতিফার চোখ ভিজে ওঠার উপক্রম হল। বকুল বলল, তুমি শুয়ে থাক তো মা! আবার জ্বর এসে যাবে।

আসবে না। আয় বারান্দায় একটু বসি।

তারা দু’জন বারান্দায় মোড়া পেতে বসল।

তোমার শরীর সতি সত্যি সেরে গেছে নাকি মা?

বোধ হয় সেরেছে। বাবুর স্কুল ছুটি হয়। কখন?

এখন ছুটি হয়ে গেছে। ও খেলতে যায়, সন্ধ্যা হয় আসতে আসতে।

আর মুনা? ও কখন আসে?

একেক দিন একেক সময় আসে।

বলতে বলতেই শওকত সাহেবকে লম্বা পা ফেলে আসতে দেখা গেল। লতিফা বললেন তোর বাবার শরীরটা খুব খারাপ হয়েছে তো।

হুঁ।

যত্ন করার কেউ নেই। কখন খায় কি করে কে জানে।

বকুল বলল, চল ভেতরে যাই মা। বাবা এখানে আমাদের বসে থাকতে দেখলে রাগ করবেন।

শওকত সাহেব কিন্তু রাগ করলেন না। সন্ধ্যাবেলা বই নিয়ে বসবার জন্যেও কাউকে বললেন না। নতুন কাজের মেয়েটা তার চোখের সামনে একটা গ্লাস ভেঙে ফেলল, তিনি শুধু মৃদু স্বরে বললেন–কাজকর্ম সাবধানে করবি। অন্য সময় হলে এর জন্যে চড়-চাপড় মারতেন। চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তুলতেন। রাতের খাবারও খেলেন নিঃশব্দে। মুনা একবার বলল, তোমার শরীর ভাল তো মামা।

হুঁ ভাল।

অফিসে ঝামেলা মিটেছে?

হুঁ মিটেছে।

লতিফা বসেছেন ওদের সঙ্গে। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে এখনো তাঁর জ্বর আসেনি। মাথা একটু হালকা লাগছে। এ ছাড়া শারীরিক আর কোনো অসুবিধা নেই। তিনি নিজেও ব্যাপারটা ঠিক বিশ্বাস করতে পারছেন না। বকুল বসেছে তার পাশে। তিনি একবার বললেন–দেখ তো আমার গা গরম কি না। বকুল বলল না। অসুখটা বোধ হয়। সেরেই গেল। তার চোখ চকমক করতে লাগল। শওকত সাহেব খাওয়া শেষ করে উঠবার সময় বললেন–মুনা, তুই একটু শুনে যা।

অফিসের ঝামেলার ব্যাপারটা মুনা শুনল। শান্ত স্বরে বলল এটা কতদিন আগের ব্যাপার?

এক মাস।

এতদিন তুমি এটা হজম করে রেখেছিলে?

শওকত সাহেব জবাব না দিয়ে সিগারেট টানতে লাগলেন।

এখন ওরা পুলিশ কেইস করবে?

ই। টাকাটা রিকভার না হলে করবে।

তোমাকে তো তাহলে ধরে নিয়ে যাবে হাজতে।

হুঁ।

টাকার ব্যাপারে তুমি কিছু জানো?

না। কিছুই জানি না।

মুনা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তুমি জানো না ঠিক না মামা! তুমি জানো। তবে তুমি একা এটা করনি তা ঠিক। এত সাহস তোমার নেই। সঙ্গে অন্য লোক ছিল। তুমি খানিকটা শেয়ার পেয়েছে? কত পেয়েছে?

শওকত সাহেব চুপ করে রইলেন। মুনা তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, কত পেয়েছ?

দশ হাজার।

আমাকে যে ছ’হাজার দিতে চেয়েছিলে সেটা ওখান থেকেই?

হ্যাঁ।

বাকি চার হাজার কোথায়?

ধার-টার ছিল। শোধ দিয়েছি।

ঐ দিন যে মিষ্টি আনলে সেটা কি এই টাকা থেকে?

শওকত সাহেব জবাব দিলেন না। দ্বিতীয় সিগারেট ধরিয়ে খুক খুক করে কাশতে লাগলেন। মুনা বলল–মামা, তুমি কাল সকালেই অফিসে গিয়ে বলবে, আমি টাকাটা ফেরত দেব, তবে আমাকে দুমাস সময় দিতে হবে।

দু’মাসের মধ্যে কোথায় পাব এত টাকা?

পাবে না। তবে এর মধ্যে আমরা বকুলের বিয়ে দিয়ে দেব। তোমাকে জেলে নিয়ে ঢোকালে ঐ মেয়ের কি আর বিয়ে হবে, না পড়াশোনা হবে? যত সুন্দরীই হোক চোরের মেয়েদের আমাদের সমাজে জায়গা নেই। বুঝলে মামা? তুমি কালই অফিসে যাবে এবং দু’মাস সময় নেবে।

ঠিক আছে নেব।

মুনা উঠে পড়ল। অনেক রাত পর্যন্ত ঘুম এল না তার। সে বুঝতে পারল বকুলও জেগে আছে, কিন্তু সাড়াশব্দ দিচ্ছে না। সে কি কিছু আঁচ করতে পারছে?

বকুল?

কি?

জেগে আছিস তো কথা বলছিস না কেন?

বাবা এতক্ষণ ধরে কি বললেন?

তেমন কিছু না। তোর বিয়ে নিয়ে কথা হল। বুঝলি বকুল, আমি অনেক ভেবে-টেবে দেখলাম অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়া খারাপ না। এর কিছু কিছু ভাল দিকও আছে।

বকুল ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলল।

এই সময়ে মেয়েদের মনে প্রচুর ভালবাসা থাকে। ভালবাসাটা খুবই জরুরি। সব কিছু অভাবই সহ্য করা যায়, কিন্তু ভালবাসার অভাব সহ্য করা যায় না।

বকুল ক্ষীণ স্বরে বলল, তোমাকে একটা কথা বলব মুনা আপা?

বল।

তুমি রাগ করবে না তো?

রাগ করবার মতো কথা না হলে রাগ করব কেন? বল কি বলবি?

বকুল মুনার কাছে সরে এসে আলতো করে একটা হাত রাখল তার গায়ে। প্রায় ফিসফিস করে বলল, ক্লাস টেনের একটা মেয়ে যদি কোনো ছেলেকে পছন্দ করে তাহলে সেটা কি খারাপ আপা?

মুনা তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, ছেলেটা কে?

বকুল জবাব না দিয়ে দুহাতে মুনাকে জড়িয়ে ধরল। মুনা লক্ষ্য করল বকুল থারথার করে কাঁপছে।

ভোরবেলা সূর্য ভালভাবে ওঠার আগেই বাড়িতে পুলিশের ওসি এবং তিনজন কনস্টেবল এল। তাদের সঙ্গে সার্চ ওয়ারেন্ট আছে। জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে তারা টাকা খুঁজল।

লতিফা রক্তশূন্য মুখে দরজা ধরে সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। মাঝে মাঝে কিছু একটা বলতে চেষ্টা করলেন। কেউ তা বুঝতে পারল না। শওকত সাহেব বসে রইলেন বেতের চেয়ারে। তিনি খুব ঘামতে লাগলেন। তার ঠিক সামনেই বসেছেন ওসি সাহেব। এ জাতীয় দৃশ্য তিনি তাঁর জীবনে অনেক দেখেছেন। কাজেই এ দৃশ্য তার মনে কিছুমাত্র রেখাপাত করল না। তবু তিনি একবার লতিফার দিকে তাকিয়ে বললেন, ভয়ের কিছু নেই, আপনি শান্ত হয়ে বসুন।

এই ভোরবেলাতেও বাড়ির সামনে এবং তার লাগোয়া রাস্তায় প্রচুর লোক জমে গেল। এ বাড়িতে একটি মেয়ে খুন হয়েছে। এ রকম একটা গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। রোদ বাড়তে লাগল কিন্তু কৌতূহলী মানুষের ভিড় কমল না।

সার্চ শেষ হতে হতে আটটা বেজে গেল। ওসি সাহেব বললেন, শওকত সাহেব আপনার নামে একটা ওয়ারেন্ট আছে, আপনাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে। ভয়ের কিছু নেই, জামিনের ব্যবস্থা হবে। মুনা বলল, আমি কি যেতে পারি আপনার সঙ্গে?

হ্যাঁ নিশ্চয়ই পারেন। একজন পুরুষ মানুষ হলে ভাল হত। উকিল-টুকিলের ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক ছোটাছুটির ব্যাপার আছে।

মুনা বাবুকে পাঠাল পরিচিত। যদি কাউকে পাওয়া যায়। আশপাশের বাসার অনেকের সঙ্গেই এদের চেনা-জানা। তবু কেউ আসতে রাজি হল না। সাবধানী মানুষ, ইচ্ছা করে কোনো বাজে ঝামেলায় জড়াতে চায় না।

বাকেরকে শুধু পাওয়া গেল। সে ঘুমুচ্ছিল। খবর পেয়েই ছুটে এসেছে। তার মুখ অস্বাভাবিক গম্ভীর। সিগারেট ধরিয়ে দায়িত্বশীল মানুষের মত সে মুনাকে বলল, নো প্রবলেম, এক ঘণ্টার মধ্যে জামিনে ছাড়িয়ে আনব। ছেলেখেলা নাকি। তোমরা সব দরজা বন্ধ করে বসে থাক। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে কোনো উত্তর দেবে না। ঘরে টাকা-পয়সা আছে তো?

বকুল তার ঘরে একা একা বসে ছিল। শওকত সাহেবকে বের করে নিয়ে যাবার সময় সে শুধু বেরিয়ে এল। অত্যন্ত কঠিন স্বরে জিজ্ঞেস করল, আমার বাবাকে আপনারা কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? ওসি সাহেব সে প্রশ্নের জবাব দিতে পারলেন না। শওকত সাহেব অপ্রকৃতিস্থ মানুষের মত চারদিকে তাকাতে লাগলেন। উপদেশ দেবার মত ভঙ্গিতে বললেন, ঠিকমত পড়াশোনা করিস মা। দু’দিন পর মেট্রিক পরীক্ষা।

বাসার সামনে অসম্ভব ভিড়, সেই ভিড় ঠেলে তারা এগুতে লাগল। শওকত সাহেব শিশুদের মত শব্দ করে কাঁদতে লাগলেন। বাকের তাঁর একটা হাত ধরে আছে। সে মৃদু স্বরে বলল, মামা কাঁদবেন না। কিছু হবে না, এক ঘণ্টার মধ্যে জামিন হবে। আমার চেনা লোকজন আছে।

বাসার সামনে লোকের ভিড় বাড়তেই লাগল।

উকিল ভদ্রলোক দেখতে পান-বিড়ির দোকানদারের মত।

রোগা দড়ি পাকানো চেহারা। কথাও ঠিকমত বলতে পারেন না–জড়িয়ে যায়। কিন্তু তিনি নাকি ফৌজদারী মামলায় একজন মহা ওস্তাদ আদমি। তার হাতে মামলা গেলে নাকে তেল দিয়ে ঘুমানো যায়।

কিন্তু মুনা বিশেষ ভরসা পাচ্ছে না। তাকে সামনে বসিয়ে উকিল সাহেব গভীর যত্নে দাঁত খোঁচাচ্ছেন। তাঁর ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে প্রতিটি দাতের গোড়ায় গোসত আটকে আছে এবং এই মুহূর্তেই সেগুলো বের করা দরকার।

মুনার পাশের চেয়ারে বসে আছে বাকের। তার ভাবভঙ্গি খুব বিনীত। বাকেরই তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। বাকেরের ধারণা এই লোক এক নম্বর আসল জিনিস, খাঁটি বাঘের বাচ্চা।

বাঘের বাচ্চারা এত দীর্ঘ সময় নিয়ে দাঁতের পরিচর্যা করে তা মুনার জানা ছিল না। সে অস্বস্তি নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। উকিল সাহেব মাঝে মাঝে দাঁত খোঁচানো বন্ধ রেখে এক দৃষ্টিতে মুনার দিকে তাকাচ্ছেন। তাঁর দৃষ্টি মুনার বুকের কাছে এসে থমকে যাচ্ছে। এমন নির্লজ্জ মানুষও আছে নাকি?

আসামি আপনার কে হয়?

আমার মামা।

আপন মামা? মায়ের ভাই?

জি।

মুনা ভেবে পেল না। আপন মামা না পর মামা, তার সঙ্গে এই মামলার সম্পর্ক কী? নাকি উকিল-মোক্তারদের স্বভাবই হচ্ছে খামোক প্রশ্ন করা।

ভয়ের কিছু নেই, ক্রিমিন্যাল মিস এপ্ৰোপ্রিয়েশন; চারশ তিন ধারা। ম্যাক্সিমাম পেনাল্টি হচ্ছে দুবছরের জেলা। এত নার্ভাস হবার তো কিছু দেখি না। ডোন্ট গেট নাভার্স।

মুনা নড়েচড়ে বসে রুমাল দিয়ে নাক ঘষল। বড় ঘাম হচ্ছে। এ জন্যেই বোধ হয় তাকে নাৰ্ভাস দেখাচ্ছে।

আপনার নাম কী?

মুনা।

মিস নাকি মিসেস?

এই সব কী ধরনের প্রশ্ন? মুনা মৃদু স্বরে বলল, মিস।

মিস মুনা, এখন আপনি বলুন আপনার মামা কী চুরি সত্যি সত্যিই করেছেন?

মুনা কী জবাব দেবে ভেবে পেল না। তাকাল বাকেরের দিকে। বাকের দাঁত বের করে হাসছে। কেন হাসছে কে বলবে। এটা একটা লজ্জায় ফেলার প্রশ্ন, এতে হাসির কিছু নেই।

উকিল সাহেব অ্যাসট্রেতে একগাদা থুথু ফেলে সেদিকে গভীর মনোযোগের সঙ্গে তাকিয়ে রইলেন। যেন এই মুহূর্তে থুথুটায় বিরাট একটা কিছু ঘটবে। সেই ঘটনা তিনি প্রত্যক্ষ করতে চান। এক সময় তার দেখা শেষ হল। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন–চুরি যদি না করে থাকেন। তাহলে খালাস করে আনা মুশকিল। আর যদি সত্যি চুরি করে থাকেন। সহজেই খালাস হয়ে যাবে।

মুনা অবাক হয়ে বলল, তার মানে?

অপরাধীদের খালাস করা অতি সহজ। এরা যখন অপরাধ করে কিছুটা সাবধান হয়েই করে। কোর্টে অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন হয়। আর যারা অপরাধী না, ভাল মানুষ–তারা পড়ে যায় প্যাঁচকলে। হা হা হা।

মুনা অবিশ্বাসী চোখে তাকিয়ে রইল। ভদ্রলোক গম্ভীর হয়ে বললেন, অপরাধীদের খালাস করে আনার মধ্যে একটা আনন্দ আছে। আইনের পশ্চাৎদেশে লাথি বসানোর আনন্দ। আমি এটা খুব এনজয় করি।

বাকের শব্দ করে হাসতে লাগল। সে মুগ্ধ। মুনা কিছু বলল না। উকিল সাহেব জড়ানো স্বরে বললেন। এই জাতীয় ছোটখাটো মামলা আমি নিই না। তবে আপনারটা নেব।

মুনা একবার ভাবল বলে আমারটা কেন নেবেন? কিন্তু সে কিছু বলল না। উকিল সাহেবের চোখ তার বুকের ওপর স্থির হয়ে আছে। শাড়ির আঁচল টেনে দেয়া উচিত। সেটা অভদ্রতা হবে। এতটা অভদ্র হওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। মুনা বলল, আমরা কী তাহলে উঠব?

হ্যাঁ উঠবেন। যাবতীয় কাগজপত্র এবং আসামিকে সঙ্গে নিয়ে আসবেন। কবে আসবেন সেটা আমার মুহুরির কাছ থেকে জেনে যান।

মুহুরি কোথায়?

পাশের ঘরে। আর শুনুন–আমার ফিস কিন্তু বেশি। এবং ফিসের টাকার সবটা আমি অ্যাডভান্স নেই। আজ এক টাকা কাল আট আনা–এই ভাবে নেই না।

আপনার ফিস কত?

সেটা বলব কাগজপত্র দেখে।

বাকের দাঁত বের করে বলল, একটু সার কনসেশন করতে হবে। গরিব মানুষ সার ভেরি নিডি।

কনসেশন কিছু নেই। অনোর বেলায় যা আপনাদের বেলাতেও তা। মাছের বাজার তো না।

মুনা বেরিয়ে এসেই বিরক্ত স্বরে বলল ভেরি নিডি, গরিব মানুষ, এসব বলার দরকার কী?

দরাদাম করতে হবে না? বল কী তুমি? বাড়িতে তো তোমার টাকার গাছ নেই।

লোকটাকেও আমার পছন্দ হয়নি। আস্ত ছোটলোক।

ছোটলোক কী বড়লোক এটা দিয়ে আমাদের দরকার কী? আমরা দেখব। কাকে দিয়ে কাজ উদ্ধার হয়। এই শালাকে দিয়ে হবে। এ হচ্ছে নাম্বার ওয়ান ধনুকর।

ধনুকর মানে?

ধনুকর মানে হচ্ছে যে, ধুনে দেয়। এই শালা ধুনে দেবে। এক ধাক্কায় মামাকে খালাস করে নিয়ে আসবে। এখন যে জিনিসটা লাগবে সেটা হচ্ছে টাকা। মানি। এখন শুরু হবে টাকার খেলা। টাকা-পয়সা কেমন আছে তোমাদের?

মুনা জবাব দিল না। টাকা-পয়সা তেমন কিছু নেই। মামার কাছে ছহাজার টাকা ছিল। তার থেকে এখন কত আছে কে জানে। তার নিজের একাউন্টে পাঁচ হাজার টাকার মত আছে। বেতনের টাকা থেকে জমানো। মামির কিছু গোপন সঞ্চয় আছে। তাঁর ভাই তাকে ঈদ উপলক্ষে টাকা-পয়সা যা দেন তার সবটাই মামি জমিয়ে রাখেন। একটা পাই পয়সাও খরচ করেন না।

বাকের বলল, কোল্ড ড্রিংক-ট্রিংক কিছু খাবে? ফান্টা, পেপসি?

মুনা বিরক্ত স্বরে বলল–ঠাণ্ডার মধ্যে ফান্টা-পেপসি খাব কী জন্যে?

তাহলে গরম কিছু খাও। চা খাবে?

আমি এখন কিছু খাব না। আপনি চলে যান, আমার অন্য কাজ আছে।

কী কাজ?

এক জায়গায় যাব।

চল আমি দিয়ে আসি। আমার এখন কোনো কাজ নেই, ফ্রি আছি।

আপনি তো সব সময়ই ফ্রি।

বাকের শুকনো মুখে বলল, মামুন সাহেবের কাছে যাচ্ছ? তিনি তো আমার মত ফ্রি না। কলেজ-টলেজ আছে। তাকে কী এখন পাবে?

মামুন সত্যি সত্যি ছিল না। গতকাল রাতের ট্রেনে দেশের বাড়িতে চলে গেছে। কেন গিয়েছে তা মেসের কেউ বলতে পারে না। কাউকে জানিয়ে যায়নি। মুনা বড়ই অবাক হল। এমন হুঁট করে চলে যাবে? কিছু বলেও যাবে না। কবে ফিরে আসবে তাও কেউ বলতে পারল না।

বেলা সাড়ে এগারোটা। মুনা বাসায় ফিরে যাবার জন্যে রিকশা নিল, কিন্তু মাঝপথে ঠিক করল। অফিসে যাবে। পর পর দু’দিন কামাই হয়েছে। আজ নিয়ে তিন দিন হবে। এটা ঠিক না। কিন্তু অফিসে যেতে ইচ্ছা করছে না। কিছুতেই মন বসছে না।

আকাশে মেঘ করেছে। বৃষ্টি হবে বোধ হয়। রিকশাওয়ালা প্রচণ্ড গতিতে রিকশা টানছে। একটা অ্যাকসিডেন্ট-ট্যাকসিডেন্ট বাধাবে। মুনা একবার ভাবল বলবে আস্তে চালাও ভাই। কিন্তু কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। কেন যেন শুধু কান্না পাচ্ছে। দুঃসময়ে কাউকে কাছে থাকতে হয়।

১০. শওকত সাহেব

শওকত সাহেব সারাদিন কোথায় কোথায় যেন ঘুরে বেড়ান। বাসার সঙ্গে সম্পর্ক নেই বললেই হয়। নাশতা খেয়েই বেরিয়ে পড়েন, ফেরেন সন্ধ্যা মেলাবার পর। কারো সঙ্গে কোনো কথা বলেন না। হাত-মুখ ধুয়ে বারান্দায় ক্যাম্পখাটে শুয়ে থাকেন। বকুল ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে–চা দেব?

তিনি হ্যাঁ-না কিছুই বলেন না। তবে চা এনে দিলে নিঃশব্দে খান। আগের মত চিনি কম হয়েছে, লিকার পাতলা হয়েছে বলে চেঁচামেটি করেন না। বকুল যদি বলে চায়ের সঙ্গে আর কিছু খাবে? মুড়ি মেখে দেব? তিনি মৃদু স্বরে বলেন না লাগবে না।

রাত বাড়তে থাকে। তিনি বারান্দার বাতি জ্বালান না। অস্পষ্ট আলোতে পত্রিকার একটা পাতা চোখের সামনে ধরে রাখেন। বকুলের বড় মন খারাপ লাগে। খুব ইচ্ছা করে বাবার পাশে এসে বসতে, কিন্তু সাহসে কুলোয় না।

আজও তিনি অন্য দিনের মত ক্যাম্পাখাটে বসে আছেন। খালি গা। ঠাণ্ডা বাতাস দিচ্ছে। এবার শীত পড়ে গেছে আগেভাগে। শীতে একেকবার তিনি কেঁপে কেঁপে উঠছেন, বকুল একটা পাঞ্জাবি তাকে এনে দিল। তিনি যন্ত্রের মত পাঞ্জাবি গায়ে দিলেন। বকুল ভয়ে ভয়ে বলল বাবা তোমার কী শরীর খারাপ? তিনি কিছুক্ষণ থেমে বললেন শরীর ঠিক আছে রে মা; বকুলের চোখ ভিজে গৈল। গলা ব্যথা ব্যথা করতে লাগল। আর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে সে হয়ত কেঁদেই ফেলবে। সে মাথা নিচু করে তার মার ঘরে ঢুকে পড়ল।

লতিফা বললেন তোর বাবা কী করছে?

বসে আছেন।

মুন? মুনা এখনো আসেনি?

এসেছে। শুয়ে আছে। মাথা ধরেছে।

ওকে একটু ডেকে আন।

বললাম না মাথা ধরেছে। এখন ডাকলে যোগ করবে।

লতিফা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। তাঁর অসুখ খুবই বেড়েছে। নতুন একটা উপসর্গ দেখা দিয়েছে। শ্বাস কষ্ট। এত বাতাস চারদিকে অথচ প্রাযই নিঃশ্বাস নেবার মত বাতাসের টান পড়ছে তার। সারারাত এ ঘরের সব ক’টি জানালা খোলা থাকে, ফ্যান চলে ফুল স্পিডে। তবু তিনি বাতাস পান না।

আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে শ্বাস কষ্ট শুরু হলেই শওকত সাহেব তাঁর পাশে এসে বসেন। মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছে, তবু তিনি একটা হাতপাখা নিয়ে বাতাস করেন। লতিফার লজ্জা লাগে। আবার ভালও লাগে।

শওকত সাহেব অনেক’দিন পর এ ঘরে ঘুমুতে এলেন; মিনামিন করে একটা অজুহাত ও দিলেন বিছানায় পিঁপড়া উঠেছে। লাজুক ভঙ্গি। বিয়ের প্রথম ক’দিন এ রকম হয়েছিল। দীর্ঘদিন পর যেন বিয়ের প্রথম দিকের রাত ফ&