খুড়িমার ঘর (জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা-৩) – সত্যজিত রায়

জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা - সত্যজিৎ রায়

দোতলার সিঁড়ি দিয়ে উঠে ল্যান্ডিং পেরিয়েই খুড়িমার ঘর, সেটা আগেই বলেছি। জয়ন্তবাবু সেই ঘরের চৌকাঠের হাত তিনেক এদিকে চিত হয়ে পড়ে আছেন, তাঁর মাথার পিছনের মেঝেতে খানিকটা রক্ত চুঁইয়ে পড়েছে।

ডাক্তার সরকার দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে উঠে সবচেয়ে আগে পৌঁছে জয়ন্তবাবুর নড়ি টিপে ধরলেন। ফেলুদাও প্রায় একই সঙ্গে পৌঁছে জয়ন্তবাবুর পাশে হাঁটু গেড়ে বসেছে। তার মুখ গম্ভীর, কপালে খাঁজ।

কী মনে হচ্ছে? চাপা গলায় প্রশ্ন করলেন শঙ্করবাবু।

পালস সামান্য দ্রুত, বললেন ডাঃ সরকার।

মাথার জখমটা?

মনে হচ্ছে পড়ে গিয়ে হয়েছে। এই সময় খালি মাথায় রোদে ঘোরা ডেনজারাস সেটা অনেকবার বলেছি ওঁকে।

কনকাশন—?

সেটা তা পরীক্ষা না করে বলা সম্ভব না। আজ আবার আমি যন্ত্রপাতি কিছুই আনিনি সঙ্গে। একবার হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারলে ভাল হত।

তই করুন না। গাড়ি তো রয়েছে।

ভদ্রলোক বেশ ভাল ভাবেই অজ্ঞান হয়েছেন, কারণ ফেলুদা সমেত চারজন ধরাধরি করে গাড়িতে তোলার সময়ও তাঁর জ্ঞান হল না। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় অবিশ্যি কালীনাথবাবুর সঙ্গেও দেখা হল। বললেন, আমি জাস্ট ওষুধটা খাবার জন্য ঘরে গেছি—আর তার মধ্যে এই কাণ্ড!

আমি সঙ্গে আসব কি? শঙ্করবাবু ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলেন।

কোনও দরকার নেই, বললেন ডাঃ সরকার, আমি হাসপাতাল থেকে আপনাকে ফোন করব।

গাড়ি চলে গেল। এই দুর্ঘটনার জন্য শঙ্করবাবুর প্ল্যান যে ভেস্তে গেল সেটা বুঝতে পারছি। বেচারি ভদ্রলোকের জন্মতিথিতে এমন একটা ঘটনা ঘটার জন্য আমারও খারাপ লাগছিল।

আমরা সবাই এসে বসবার ঘরে বসেছিলাম, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফেলুদা কেন যে, ‘আমি আসছি’ বলে উঠে গেল তা জানি না। অবিশ্যি মিনিট দুয়েকের মধ্যে আবার ফিরে এল।

শঙ্করবাবু অতিথিদের সামনে যথাসম্ভব স্বাভাবিক হাসিখুশি ব্যবহার করছিলেন। এমনকী তাঁর আশ্চর্য প্রপিতামহ সম্বন্ধে অদ্ভুত সব ঘটনাও বলছিলেন, কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম যে সেটা করতে তাঁর বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।

প্রায় ঘণ্টাখানেক। এইভাবে চলার পর হাসপাতাল থেকে ডাঃ সরকারের ফোন এল। জয়ন্তবাবুর জ্ঞান হয়েছে। তিনি অনেকটা ভাল। মনে হচ্ছে কাল সকালেই আসতে পারবেন।

এই সুখবরের পর অবিশ্যি ঘরের আবহাওয়া খানিকটা হালকা হল, কিন্তু আমি জানি যে শঙ্করবাবুর মোটেই ভাল লাগছে না, কারণ চোরের রহস্য রহস্যই থেকে যাবে।

খাওয়া দাওয়ার পর, ভিডিও-ক্যাসেট ছবি দেখতে চাই কি না জিজ্ঞেস করাতে আমরা সকলেই না বললাম। এ অবস্থায় ফুর্তি চলে না। তাই ম্যাজিকও বাদ পড়ল।

সকলকে গুড নাইট জানিয়ে নিজেদের ঘরে আসতেই আমি যে প্রশ্নটা ফেলুদাকে করব ভাবছিলাম, সেটা লালমোহনবাবু করে ফেললেন।

আপনি তখন ফস করে বেরিয়ে কোথায় গেলেন মশাই?

খুড়িমার ঘরে।

খুড়িমাকে দেখতে গেসলেন? অবিশ্বাসের সুরে প্রশ্নটা করলেন লালমোহনবাবু।

সেই সঙ্গে অবিশ্যি সিন্দুকের হাতল ধরে একটা টানও দিয়ে এলাম।

খোলা নাকি?

বন্ধ। সেটাই স্বাভাবিক। যে ভাবে ঘরের দরজার দিকে পা করে পড়েছিলেন ভদ্রলোক, তাতে মনে হয়। ঘরে ঢোকার আগেই পড়েছেন।

কিন্তু চাবিটা কোথায়, ফেলুদা? আমি জিজ্ঞেস করলাম। প্রশ্নটা কিছুক্ষণ থেকেই আমার মাথায় ঘুরছিল।

ফেলুদা বলল, শঙ্করবাবু হয়তো দুর্ঘটনায় ওটার কথা ভুলেই গিয়েছিলেন।

কথাটা বলতে বলতেই শঙ্করবাবু এসে ঢুকলেন আমাদের ঘরে। দেখুন তো কী বিশ্ৰী ব্যাপার ঘটে গেল! বললেন ভদ্রলোক। জয়ন্তর আর একবার এরকম হয়েছিল। ওর ব্লাড প্ৰেশারটা একটু বেশি নেমে যায় মাঝে মাঝে।

ফোনে আর কী বললেন ডাঃ সরকার?

সেটাই তো বলতে এলাম। তখন লোকজনের সামনে বলিনি। চাবির কথাটা তো গোলমালে ভুলেই গিয়েছিলাম; এখন কী হয়েছে জানেন তো? ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করতে বললেন জয়ন্তর কাছে চাবি ছিল না। হয়তো অজ্ঞান হবার সময় হাত থেকে পড়ে গেছে।

আপনি খুঁজেছেন চাবি?

তন্ন-তন্নকরে। সিঁড়ি, ল্যান্ডিং, সদর দরজার বাইরে, কোথাও বাদ দিইনি। সে চাবি হাওয়া।

যাকগে, ডুপ্লিকেট আছে তো, বলল ফেলুদা।ও নিয়ে ভাববেন না।

তা না হয় ভাবব না, গম্ভীরভাবে বললেন শঙ্করবাবু, কিন্তু রহস্য তো দূর হল না! চার তো অজ্ঞাতেই রয়ে গেল। আর আপনাকে একটা মাথা খেলানোর সুযোগ দেব ভেবেছিলাম, সেটাও হল না।

তাতে কী হল? ফেলুদা বলল। এখানে এসে লাভ হয়েছে বিস্তর। একে এরকম বাড়ি, তার উপর আপনার আতিথেয়তা।

শঙ্করবাবু যাবার আগে বলে গেলেন যে সকালে সাড়ে ছটায় চা দেবে, আর আটটায় ব্রেকফাস্ট।

এটা অ্যাটেমটেড মার্ডার নয়তা মশাই? লালমোহনবাবু ফিস্ ফিস্ করে প্রশ্ন করলেন।

মিঃ কাঞ্জিলাল আর মিঃ ম্যাজিশিয়ান দুজনেই কিন্তু বাড়ির মধ্যে ঢুকেছিলেন।

মাডারের দরকার কী? কার্যসিদ্ধির জন্য তো শুধু অজ্ঞান করলেই চলে।

কার্যসিদ্ধি?

জয়ন্তবাবুকে অজ্ঞান করে তাঁর হাত থেকে চাবিটা নিয়ে সিন্দুক খুলে যা বার করার বার করে আবার হাতে চাবি গুঁজে দিয়ে চলে আসা।

সর্বনাশ! এটা তো খেয়াল হয়নি আমার। আমি বললাম তাই যদি হয়ে থাকে তা হলে তো এখন তিনজনের জায়গায় সাসপেক্ট মাত্র দুজন—কাঞ্জিলাল আর কালীনাথ।

নারে তোপ্‌সে, বলল ফেলুদা ব্যাপারটা অত সহজ নয়। জয়ন্তবাবুর মাথায় কেউ বাড়ি মারলে তো সেটা তিনি জ্ঞান হলে বলতেন; তা তো বলেননি। আর অজ্ঞান করে যে সিন্দুক খুলবে সেটাই বা কী করে সম্ভব-খুড়িমা তো ঘরে থাকতে পারেন। একজন বাইরের লোক সিন্দুক খুলছে দেখলে কি তিনি চুপ করে থাকতেন?

একটা আশার আলো জুলতে না জ্বলতে নিভে গেল। আমি শুয়ে পড়েছিলাম, কিন্তু অত তাড়াতাড়ি আর ঘুমোনো হল না। ফেলুদা এমনিতেও পায়চারি করছিল, বারোটা নাগাদ লালমোহনবাবু হঠাৎ আমাদের ঘরে এসে নিচু গলায় বললেন, বারান্দায় গোসলুম। চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে, মশাই—উপচে পড়ে আলো!

উপ্‌চে নয়, উছলে, বলল ফেলুদা।

সরি, উছ্‌লে। কিন্তু একবার বাইরে এসে দেখুন। এ দৃশ্য দেখবেন না। কখনও।

আপনি এক কাব্যি করবেন, এটা হতে দেওয়া যায় না, বলল ফেলুদা। বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম।

বাইরে গিয়ে মনে হল এ যেন দিনের বেলার দৃশ্যর চেয়েও ঢের বেশি সুন্দর। একটা পাতলা কুয়াশা নদীর ওপারটাকে প্রায় অদৃশ্য করে ফেলেছে। গঙ্গার আবছা গাঢ় জলের উপর ছড়ানো চাঁদির টুকরোগুলো ধীরে ধীরে দুলছে। তারই মধ্যে ঝিঝির ডাক, হাসনুহানার গন্ধ, ফুরফুরে বাতাস, সব মিলিয়ে সত্যিই অমরাবতী।

ফেলুদা ত্ৰয়োদশীর চাঁদটার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, চাঁদের মাটিতে মানুষের পা পড়লেও, এর মজা কোনওদিন নষ্ট করতে পারবে না।

একটা মারাত্মক পোয়েম আছে চাঁদ নিয়ে, বললেন লালমোহনবাবু।

আপনার এথিনিয়াম ইনস্টিটিউশনের সেই বাংলার শিক্ষকের লেখা?

ইয়েস। বৈকুণ্ঠ মল্লিক। এই পোড়া দেশে লোকটা রেকগনিশন পেলে না, কিন্তু আপনি শুনুন কবিতাটা। শোনো, তপেশ।

এতক্ষণ আমরা নিচু গলায় কথা বলছিলাম। কিন্তু আবৃত্তির সময় লালমোহনবাবুর গলা আপনা থেকেই চড়ে গেল।

আহা, দেখ চাঁদের মহিমা
কতু বা সুগোল রৌপ্যথালি
কতু আধা কভু সিকি কভু একফালি
যেন সদ্য কাটা নখ পড়ে আছে নভে—
সেটুকুও নাহি থাকে, যাবে
আসে অমাবস্যা——
সেই রাতে তুমি তাই
অচন্দ্রমপশ্যা!

বুঝতেই পারছি, তপেশ, পদটি একজন লেডিকে অ্যাড্রেস করে লেখা।

একজন লেডিকে তো আপনি আবৃত্তির ঠেলায় ঘর থেকে টেনে বার করেছেন দেখছি।

ফেলুদার দৃষ্টি দোতলার বারান্দার দিকে। এই যে খুড়িমার ঘর। বৃদ্ধ বারান্দার দরজার মুখটাতে এসে দাঁড়িয়েছেন; মিনিটখানেক এদিক ওদিক দেখে আবার ভিতরে ঢুকে গেলেন।

এর পরে আমরা ঘাটের সিঁড়িতে গিয়ে বসেছিলাম আধা ঘণ্টা। মনমেজাজ তাজা, রাতের খাওয়া হজম। তারপর এক সময় ফেলুদা তার হাতঘড়ির রেডিয়াম ডায়াল চোখের সামনে ধরে বলল, পৌনে এক।

আমরা তিনজনেই উঠে পড়লাম, আর তিনজনেই একসঙ্গে শুনলাম শব্দটা।

সেটা যেন আসছে বাড়ির দোতলা থেকেই।

খট্‌ খট্‌ খটু খট্‌ ঠং খট্‌ খট্‌…

আমরা ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে এলাম।

সিঁদ কাটছে নাকি মশাই? লালমোহনবাবু ফিসফিস্ করে জিজ্ঞেস করলেন। আলো জ্বলছে। আওয়াজটা আসছে ওই ঘর থেকে।

খট্‌ খট্‌ খটু খট্‌ ঠং ঠং…

কিন্তু এই ঘর ছাড়াও আরেকটা ঘরে আলো জ্বলছে। দক্ষিণ দিকের ঘরটিা। খোলা জানাল দিয়ে দেখা যাচ্ছে একজন লোক দাঁড়িয়ে হাত পা নেড়ে উত্তেজিত ভাবে কথা বলছে।

এবার লোকটা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

মিঃ কাঞ্জিলাল, বলল ফেলুদা।ওটাই শঙ্করবাবুর ঘর।

এই মাঝরাত্তিরে কী আলোচনা মশাই? লালমোহনবাবু প্রশ্ন করলেন।

জানি না, বলল ফেলুদা। ব্যবসা সংক্রান্ত কিছু হবে।

আপনাদেরও ঘুম আসছে না?

নতুন গলা পেয়ে চমকে উঠে দেখি ম্যাজিশিয়ান কালীনাথবাবু।

ভদ্রলোক সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন। খট্‌ খট্‌ শব্দটা এখনও হয়ে চলেছে। কালীনাথবাবুর ঘাড় ঘুরে গেল সেই দিকে।

কীসের শব্দ বুঝতে পারছেন তো? প্রশ্ন করলেন ভদ্রলোক।

হামানদিস্তা কি? ফেলুদা বলল।

ঠিক বলেছেন। এই মাঝরাত্তিরে বুড়ি পান ছাঁচতে বসেন। এ শব্দ আগেও পেয়েছি।

কথাটা বলে হাতের তেলের আড়ালে দেশলাই জ্বলিয়ে সিগারেট ধরিয়ে ফেলুদার দিকে একটা সেয়ানা দৃষ্টি দিয়ে বললেন, বনোয়ারিলালের জীবনী লেখার জন্য গোয়েন্দার দরকার হল কেন?

আমি তো থ! লালমোহনবাবুর মুখ হাঁ হয়ে গেছে। ফেলুদা একটু হালকা হেসে বলল, যাক্‌, অন্তত একজন আমার আসল পরিচয়টা জানে দেখে ভালই লাগল।

তা জানবে না কেন মিঃ মিত্তির? এ শর্ম অনেক ঘাটের জল খেয়েছে। অনেক কিছু দেখে শুনে চোখ কান দুইই খুলে গেছে।

ফেলুদা একদৃষ্টি চেয়ে আছে ভদ্রলোকের দিকে। তারপর বলল, আপনি কি রহস্যই করবেন, না খুলে বলবেন?

খুলে আর কজনে বলতে পারে মিঃ মিত্তির? স্পষ্টবক্তা আর কজনে হয়? বেশির ভাগই তো মুখচারা। আর দুঃখের বিষয়, আমিও যে সেই দলেই পড়ি। আপনি গোয়েন্দা, খুলে বলার কাজ হল আপনার; তবে আপনাকে আমি একটা কথা বলতে চাই। এখানে এসে আপনার পেশাটাকে কাজে লাগানোর কথা ভুলে যান। অমরাবতীতে এসেছেন, দুদিন ফুর্তি করে গঙ্গার হাওয়া খেয়ে ফিরে যান। নইলে বিপদে পড়তে পারেন।

আপনার উপদেশের জন্য ধন্যবাদ।

কালীনাথবাবু নিজের ঘরে ফিরে গেলেন।

লোকটা অনেক কিছু জানে বলে মনে হচ্ছে? চাপা গলায় বললেন লালমোহনবাবু।

একটা জিনিস তো জানতেই পারে, বলল ফেলুদা।

কী? আমরা দুজনে একসঙ্গে জিজ্ঞেস করলাম।

চুরিটা কে করেছিল। যে করেছিল। সে তে ওঁর পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল।

আমি বললাম, কিন্তু সেটা তো উনি নিজেও করে থাকতে পারেন। উনি তো হাত সাফাই জানেন।

এগজ্যাক্টলি, বলল ফেলুদা।

Facebook Comment

You May Also Like