Monday, May 20, 2024
Homeলেখক-রচনারচনা সমগ্রকাজল – তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

কাজল – তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

[বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ ও ‘অপরাজিত’র পর অপুকে নিয়ে তৃতীয় পর্ব লিখেছিলেন উনার ছেলে তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই তৃতীয় পর্বের প্রথম খণ্ড এই ‘কাজল’; দ্বিতীয় (শেষ) খণ্ড ‘তৃতীয় পুরুষ’।]

ভূমিকা

উপন্যাস লেখার অভিজ্ঞতা আমার এই প্রথম। জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে যিনি আমার পিছনে মাভৈঃ বাণী নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছেন সেই মা আমাকে সর্বক্ষণ উৎসাহ দিয়েছেন, পাণ্ডুলিপি পড়ে প্রয়োজনীয় উপদেশ দিয়েছেন। আমার এবং তঁর পরিশ্রম সমান সমান।

অনেক বিনিদ্র রাত্রির ইতিহাস রয়ে গেল এ বইয়ের পেছনে। লিখতে লিখতে মনে হয়েছে। পাঠকদের কথা, জানি না তারা একে কেমন ভাবে নেবেন। তঁদের জন্যই আমার পরিশ্রম, তারা গ্ৰহণ করলে আমি ধন্য হবো।

তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
আরণ্যক, ব্যারাকপুর

০১. শীত শেষ হইয়া বসন্তের বাতাস

শীত শেষ হইয়া বসন্তের বাতাস বহিতে শুরু করিয়াছে। পুরাতন পাতা ঝরিয়া গিয়া গাছে গাছে নতুন কচি পাতার সমারোহ। এই দিনগুলাতে কাজলের বেশিক্ষণ বাড়িতে মন বসে না-বিশেষত বৈকালের দিকে। সূর্য বাশবনের মাথা ছাড়াইয়া একটু নামিলেই রোদটা কেমন রাঙা আর আরামদায়ক হইয়া আসে। রানুপসিদের গাইটা অলস মধ্যাহ্নে জঙ্গলে ঘুরিয়া ঘুরিয়া ঘাস লতা খায়। কাজল উত্তরের জানালায় বসিয়া লক্ষ করে। কিছুক্ষণ পরে তাহার আর মন টেকে না-বাহিরে যাইবার জন্য ছটফট করিতে থাকে। বন্য লতাপাতার যে বিশেষ ঘ্রাণটা বাতাসে বহিয়া আসেসেটাই যেন তাহাকে আরও চঞ্চল করিয়া তোলে। গন্ধটার সহিত এই বাহিরে যাইবার ইচ্ছার যে কী সম্পর্ক-তোহা সে বুঝিতে পারে না, কেমন যেন রহস্যময় ভাব হয় মনে।

সন্তৰ্পণে দরজার খিল খুলিতে গেলে অসাবধানে আওয়াজ হয়। রানু আসিয়া বলে-ছেলের বুঝি আবার বেবুনো হচ্ছে?

কাজল একটু অপ্রতিভ হয় বটে, কিন্তু ভয় পায় না। খিলটা হাতে ধরিয়াই দুষ্টামিব হাসি হাসিতে থাকে।

বাহির হইতে দিতে রানুর আপত্তি নাই। শুধু সাবধান করিয়া দেয়—খবরদার, নদীতে নামবি নে, নৌকোয় উঠবি নে কিন্তু-বল, উঠিবি নে?

কাজল প্রতিজ্ঞা করিয়া। তবে বাহিরে যাইবার অনুমতি পায়।

অপু বলিয়া গিয়াছিল—দেখো রানুদি, নদীতে যেন একলা না যায়। চান করবার সময় তুমি সঙ্গে নিয়ে যাবে। ছেলেমানুষ, সাঁতার জানে না-ড়ুবে যেতে পারে। কাজলও রানুপিসির কথার অবাধ্য হয় না-ইছামতীর ঘাটে জেলেদের মাছধরা নৌকাগুলি বাধা থাকে। এপাড়ার ওপাড়ার কিছু ছেলে জমা হইয়া তাহার উপর উঠিয়া খেলা করে। কাজলের পাড়ে বসিয়া দেখা ছাড়া গত্যন্তর নাই। পিসি বারণ করিয়াছে যে।

বাড়ি হইতে বাহির হইয়া কাজল বাবার নতুন কেনা আমবাগানের দিকে হাঁটিতে থাকে। বাগানের প্রান্তে কাহাদের একটা বাঁশঝাড়। সতুকাকা সেদিন বলিতেছিল বাঁশগাছ নাকি খুব তাড়াতাড়ি বাড়ে। রাতারাতি নাকি বাঁশের কোঁড় একহাত লম্বা হইতে দেখা গিয়াছে। কথাটা শুনিয়া কাজলের মনে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা জাগিয়া উঠিল। তাই এ জায়গাকেই সে উপযুক্ত স্থান হিসাবে নির্বাচিত করিয়াছে। বাগানের শেষ গাছটার নিচে একখানি বাঁশেব কোঁড় হইয়াছে। হাত দিয়া মাপিয়া আমগাছের গুড়িতে সমান উচ্চতায় কাজল ঝামা ঘষিয়া একটা দাগ দিয়া রাখে প্রত্যেক দিন। পরের দিন গিয়া পরীক্ষা করিয়া দেখে গাছ কতখানি বাড়িল। গাছটার কাছে পৌঁছিয়া কাজল ভালো একটা ঝামা খুঁজিতে লাগিল। কাছাকাছি পাওয়া গেল না। কাজলকে ঢুকিতে হইল বাঁশবনের মধ্যে। বাঁশবনের ভিতরকার আগাছা কেহ কোনদিন পরিষ্কার করে না–মালিকের দায় পড়ে নাই। নির্দিষ্ট সময়ের শেষে কয়েক গাড়ি বাঁশ কাটিয়া চালান দিয়া সিন্দুকে পয়সা তুলিলেই তাহার কাজ শেষ। বাঁশ তো বিনা যত্বেই বাড়ে। তাহার জন্য আবার কে–

কাজল একবার থামিতেই পায়ের নিচের শুকনো বাঁশপাতার মচমচ শব্দও থামিয়া যায়। সঙ্গে সঙ্গে কোথায় লুকানো পাখিটার কুবকুব ডাক স্পষ্ট হইয়া ওঠে। বাঁশপাত হইতে কেমন একটা গন্ধ ওঠে-কাজলের মন-কেমন-করা ভাবটা বাড়িয়া যায়। উপরে-নিচে কোনদিকেই পাখিটাকে দেখা যায় না। রানুপিস ডাকটা চিনাইয়া দিয়া বলিয়াছিল-কুবোপাখি। কাজলের হাসি পাইয়াছিল নামটা শুনিয়া। কেমন নাম দ্যাখো-বলে কিনা। কুবো পাখি–

খোকার মধু-ঝরা হাসি দেখিয়া রানির কী একটা পুরানো কথা মনে পড়ে। এক পলকের জন্য সে অন্যমনস্ক হইয়া যায়। পরমুহূর্তে হাসিয়া বলে-পাগল একটা, এত হাসবার হল কী নাম শুনে?

কাজলের একবার মনে হয় ডাক বাঁদিকের ঝোপ হইতে আসিতেছে। সেদিকেই বনটা বেশি। ঘন। কিছুদিন আগে এই জঙ্গল হইতে কী একটা জন্তু শিকার করিয়া লইয়া গিয়াছে। কাজেই একেবারেই যে গা ছমছম করে না। এমন নহে। কিন্তু পাখিটাকে দেখিবার কৌতূহলও কম নহে। রানুপিসি বলিয়াছে লাল লাল চোখ-সে দেখিবে কেমন লাল চোখ।

কিন্তু বিশেষ সুবিধা করা যায় না। কিছুটা বাঁদিকে হাঁটিলে মনে হয় ডানদিক হইতে আওয়াজ আসিতেছে। ডানদিকে একটু অগ্রসর হইলেই আওয়াজটা পিছনে ঘুরিয়া যায়। আবার খানিকক্ষণ এদিক-ওদিক ঘুরিয়া পরে কাজল হাল ছাড়িয়া দেয়।

ভারি তো পাখি-পরে দেখা যাইবে। আরও একটু সন্ধান করিলে কি দেখা হইত না? নিশ্চয় হইত। নেহাত কাজ আছে বলিয়া তাহাকে অন্যত্র যাইতে হইতেছে।

সন্ধ্যায় সতুকাকার দু-একজন বন্ধুবান্ধব এপাড়া-ওপাড়া হইতে আসিয়া জোটে। মোটা কালোমত একজন লোক-গলায্য কঠি, ঠুকিয়া ঠকিয়া খোলটাকে ঠিক সুরে বাঁধে। পবে সবাই মিলিয়া কীর্তন শুরু করে। একদিন কাজলের খুব মজা লাগিয়াছিল। গানের মাঝামাঝি-যেখানে ‘কোথা যাও প্ৰভু নগর ছাড়িয়া’ পদটা আছে সেখানে সবাই এমন হ্যাঁ করিয়া দীর্ঘ টান দিয়াছিল যে কাজল হাসি চাপিতে পারে নাই। এতগুলি বয়স্ক মানুষকে এক সারিতে হ্যাঁ করিয়া বসিয়া থাকিতে দেখিলে কাহার না হাসি পায়?

কীর্তন তাহার খুব ভালো লাগে নাই। গানের যে স্থানটিতে তাহার আমোদ হয়, সে স্থানটিতেই উহারা পরস্পরের গলা জড়াইয়া ধরিয়া অশ্রুবিসর্জন করিতে থাকে। ব্যাপার দেখিয়া প্রথম দিন। সে অবাক হইয়া গিয়াছিল। রানি তাহকে খাওয়াইয়া বিছানায় শোওযইযা আসার পরেও এক একদিন অনেক রাত্রি পর্যন্ত গান হয়। শুনিতে শুনিতে সে ঘুমাইয়া পড়ে। কখনও কখনও বিনা কারণে মাঝরাত্রে ঘুম ভাঙিয়া যায়-দেখে জানালা দিয়া সুন্দর জ্যোৎস্না আসিয়া বিছানায় পড়িয়াছে। বাহিরের আতাগাছটা-ভূতোবোম্বাই আমগাছটা-উঠানটা অপূর্ব জ্যোৎস্নায ভাসিয়া যাইতেছে। ঘুম-ঘুম চোখে সেদিকে তাকাইয়া থাকিলে বেশ লাগে। মনে হয়, কেহ যেন ওই জঙ্গল হইতে উঠানের জ্যোৎস্নায় আসিয়া দাঁড়াইবে। তাহার গায়ে রূপকথার দেশের পরিচ্ছদ, মৃদু চন্দ্রালোকে সে। একবার কাজলের দিকে তাকাইয়া হাসিবে-পরে ইশাবায় ডাকিয়া আনিবে সঙ্গীদের। একদল পরীর দেশের লোকে উঠান ভরিয়া যাইবে। তাহদের ভাষা বোঝা যায় না-কিন্তু তাহা সংগীতময়। উঠানের ধুলায় চাঁদের আলোয় ছায়া সৃষ্টি করিয়া তাহারা লীলায়িত ভঙ্গিতে নৃত্য করবে। মাঝে মাঝে কাজল নিজে অবাক হইয়া যায় তাহার চিন্তার গতি দেখিয়া।

এই সময় বাবার কথা মনে পড়ে খুব। রানুপিসি পাশে ঘুমাইতেছে। পিসির নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাইতেছে। জানালার বাহিরে উঠানে সেই অপার্থিব চাদের আলোর দেশ। এ সময় বাবা থাকিলে বেশ হইত। মনের যে ভোবই হোক না কেন, বাবাকে বুঝাইয়া বলিবার দরকার পড়েনাবাবা নিজেই কেমন সব বুঝিয়া লয়। বাবা হয়তো বলিতে পারিত কেন সে এমন অদ্ভুত চিন্তা করে। শুধু এ সব কারণেই নহে-অন্য কারণও আছে। হ্যাঁ, সে লুকাইবে না-বাবাকে দেখিতে ইচ্ছা করে, বাবার জন্য তাহার মন কেমন করিতেছে।

পরের দিন দুপুরে ললিতমোহন বাড়জ্যের ছেলে। চনু আসিয়া তাহাকে একা-দোক্কা খেলিতে ডাকে। চড়কতলার মাঠে খেলা জমিয়া ওঠে। অবশ্য কাজল খেলায় খুব পটু নহে। তাহার তাকও প্রশংসার অযোগ্য। তিন নম্বর ঘর টিপ করিয়া ঘুটি খুঁড়িলে সেটা পাঁচ নম্বর ঘরে পড়িবেই। অবশ্য প্রত্যেকবারই কাজল এমন ভান করিয়া থাকে যেন সে ওটা পাঁচ নম্বর ঘরেই ফেলিবার চেষ্টা করিতেছিল। খেলা সমাপ্ত হইলে সন্ধ্যার আরছা আঁধারে বাড়ি ফিরিবার সময় কাজল চনুকে প্রশ্নটা করিয়া ফেলে-তুই জানালার পাশে শুয়ে ঘুমোস?

চনু বাক্যালাপের গতি কোনদিকে বুঝিতে না পারিয়া সংক্ষেপে বলে—

–রাত্তিরে জাগিস নে কখনও? চান্দনি রাত্তিরে?

–কত!

–কিছু দেখিস? মানে, ভাবিস কিছু?

–ভাবিব। আবার কী? দাদা গায়ে পা তুলে দেয় বলেই না ঘুম ভাঙে। পা-টা নামিয়ে দিয়েই আবার ঘুমিয়ে পড়ি। কেন রে?

—মনে হয় না কিছু? এই, কোন অদ্ভুত দেশের কথা, কী গল্পে পড়া কোন লোকের কথা? গল্প বলিতে চনু পড়িয়াছে কথামালার ‘ব্যাঘ্র ও পালিত কুকুর’। তাহা চাঁদনি রাত্রে স্বপ্ন দেখিবার জন্য খুব আদর্শ উপাদান নহে। কাজলটা কি পাগল নাকি? সন্ধ্যাবেলা যত উদ্ভট কথা! না, চন্দ্রালোকিত রাত্রে অগ্রজের তাড়নায় জাগিয়া তাহার বিশেষ কিছু মনে হয় না।

কাজলও যে বিশেষ কিছু দেখিতে পায়, তাহা নহে। কিন্তু একফালি চাঁদের আলো-একটি পাতা খসিয়া পড়া হইতে সে অনেক কিছু কল্পনা করিয়া লইতে পারে। নিজের বৈশিষ্ট্য বুঝিবার বয়স তাহার হয় নাই—তবুও তাহার সঙ্গীদের সহিত একটা চিন্তাগত পার্থক্য সে অনুভব করিতে পারে। যেমন দুৰ্গা পিসির কথা। বাবা ও রানুপিসির কাছে গল্প শুনিয়া সে দুর্গার চেহারা ও স্বভাব কিছুটা কল্পনা করিয়া লইয়াছে, নির্জনে বসিয়া ভাবিতে চেষ্টা করিয়াছে, পিসি সামনে দাঁড়াইয়া কথা বলিতেছে। এই একটা ফল কুড়াইয়া লইল কোন গাছতলা হইতে, এই আধখানা ভাঙিয়া তাহাকে দিল খাইতে। অপু ও রানি দুর্গার শৈশবের গল্পই করিয়াছে—এখন থাকিলে পিসির যে অনেক বয়স হইত, তাহা কাজলের কখনও মনে হয় নাই। শুধু এইটুকু সে বোঝে, পিসি বাঁচিয়া থাকিলে তাঁহাকে খুব ভালোবাসিত।

নিশ্চিন্দিপুরের সহিত কাজলের একটা নিবিড় সম্পর্ক গড়িয়া উঠিয়াছিল। অথচ কোথায় ছিল সে এক বৎসর আগে! দাদামশায়ের ভয়ে জুজু হইয়া থাকিতে হইত। প্রকৃত ভালোবাসার স্বাদ সে দাদামশায়ের কাছ হইতে পায় নাই কখনও—তাড়নাই জুটিত বেশি। কেবল দিদিমার কথা মনে পড়ে। বাবা যে তাহাকে মামাবাড়ি হইতে নিজের বাড়িতে লইয়া আসিল-দিদিমা পাইল না। তাহা দেখিতে। দিদিমাই যা-একটু বাবার গল্প করিত। আর কাহারও জন্য মন খারাপ করে না তত। এখানে সে ভালোই আছে। বাবা নাই বটে-কিন্তু বাবা তো আসিবে। পিসি তাহাকে ভালোবাসে। সবার উপর তাহকে আকর্ষণ করে গ্রামের একটা নীরব ভাষা। কেহ সঙ্গে থাকিলে অনেক সময় ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে যখন সে নিজেদের পুরাতন ভিটায় যায়-অন্তত তখন তো নয়ই। সম্পত্তির স্বত্ববোধ তাহার মধ্যে এখনও জন্মে নাই। কিন্তু নিজের পিতৃপুরুষের ভিটায় বসিয়া চিন্তা করার মধ্যে যে একটা রোমাঞ্চকর অনুভূতি আছে-তোহা মনকে দোলা দেয়। দুপুরে গিয়া জঙ্গল ঠেলিয়া চুপি চুপি সে উঠানে বসিয়া থাকে। চুপি চুপি বসিবার বিশেষ কারণ আছে। এদিকে বিশেষ লোকজন আসে না-আসিবেই বা কী প্রয়োজনে? একমাত্র আকর্ষণ সজিনাগাছটাও কুড়া হইয়া গিয়াছে, ফল ভালো হয় না তত। কাজেই সেজন্য সতর্ক হইবার প্রয়োজন নাই। আসলে এই জায়গায় উচ্ছ্বলতা প্রকাশ করিতে ইচ্ছা করে না একেবারে। অন্য জায়গা হইলে কাজল বটের ঝুরি ধরিয়া বুলিয়া, এখানে ওখানে লাফাইয়া এক তাণ্ডব বাধাইয়া তুলিত। কিন্তু এ ভিটায় আসিয়া বসিলে কে যেন তাহার ছোট্ট মনটাকে শান্ত করষ্পর্শে স্নিগ্ধ করিয়া দেয়। এখানে তাহার ঠাকুমা রান্না করিয়াছেপিসি পুতুল খেলিয়াছে-বাবা রাজা সাজিয়াছে আরশির সামনে-ঠাকুরদা বসিয়া বালি কাগজে পালা লিখিয়াছে। তাঁহাদের পুণ্যস্মৃতিমণ্ডিত স্থানে কি প্ৰগলভ হওয়া যায়? কেহ তাহাকে বলিয়া দেয় নাই। সে আপনি চুপ হইয়া থাকে। দুপুর গড়াইয়া বিকাল হইয়া যায়। কেমন একটা অদ্ভুত ছায়া নামিয়া আসিতে থাকে। কাজলের মনে হয়, এই বুঝি কেহ পিছন হইতে কথা বলিয়া উঠিবে। যেন সে আমলটা শেষ হইয়া যায় নাই। সে মিথ্যা বলিবে না-ভূতপেত্নীতে তাহার একটু ভয় আছে। কিন্তু এই সময় যদি তাহার ঠাকুমা কী পিসি আসিয়া তাহার সহিত কথা বলে, তবে সে একটুও ভয় পাইবে না। সে তো তাহদের একান্তু আপনার, কাহারও নাতি-কাহারও ভাইপো। কত আদর করিত সবাই বাঁচিয়া থাকিলে। একটু আগের রাঙা বাসন্তী রোদটার মতোই তাহারা কোথায় মিলাইয়া গিয়াছে।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরিবার সময় গাছের মাথায় সপ্তর্ষিমণ্ডল জ্বলজ্বল করিতে থাকে। বাবা তাহাকে চিনাইয়া দিয়াছিল সব। কালপুরুষ ঝুঁকিয়া থাকে। পশ্চিম দিগন্তের কাছাকাছি। বাবা একবার বলিয়াছিল কালপুরুষের ছোরাটা যে তিনটি নক্ষত্ৰ দিয়া তৈয়ারি-তাহার মধ্যে একটা দেখিতে নক্ষত্র বলিয়া মনে হইলেও আসলে নীহারিকা। সে একটা দূরবীন পাইলে দেখিবার চেষ্টা করিত। যাহা হউক, আপাতত আমবাগানটা তাড়াতাড়ি পার হইয়া যাওয়া ভালো। সন্ধ্যা হইয়া আসিতেছে।

বাড়ি ঢুকিলে রানি বলে-এতক্ষণ ছিলি কোথায়, হ্যারে-ও খোকন? এই রাতবিরেতে কি বাইরে বেড়াতে আছে বাবা? কোথায় ছিলি?

কাজল আরক্ত মুখে আমতা আমতা করিয়া বলে-এই, একটু ওই পুরানো ভিটেয়—

রানি আর প্রশ্ন করে না। তাহার হঠাৎ সমস্ত ব্যাপারটা কেমন সুন্দর লাগিতে থাকে। খোকন চিনিয়া লইয়াছে আপনার সঠিক স্থান। রক্তের ভিতরকার অমোঘ আকর্ষণ তাহাকে টানিয়া লইয়া গিয়াছে পবিত্র তীর্থে। ঐতিহ্যের ধারার গতি ধীর-কিন্তু অনিবাৰ্য। এ ভিটাকে ছাড়িয়া তাহারা কেহ। কোথাও থাকিতে পারে নাই। অপু গিয়াছিল চলিয়া-সেও কি বেশিদিন পারিল দূরে থাকিতে? বংশের সন্তানের হাত ধরিয়া আবার তো সেই ফিরিয়া আসিতেই হইল। কী যেন টান রহিয়া যায়, তাহা রানি ব্যাখ্যা করিতে পারে না। হয়তো এতদিনে মণিকণিকার ঘাট হইতে হরিহরের দেহাবশেষ বাতাসে ভাসিয়া অন্ধ সংস্কারে ফিরিয়া আসিয়াছে নিশ্চিন্দিপুরে। সর্বজয়ার অদৃশ্য উপস্থিতি হয়তো এখনও ভিটার অণুতে অণুতে। গোবৎস যেমন জন্মগ্রহণ করিয়াই ঠিক মাতৃস্তন্য খুঁজিয়া লয়তাহাকে চিনাইয়া দিতে হয় না, কাজলকেও তেমনি কোন নির্দেশ দিতে হয় না। সমস্ত বিশ্বজগৎটা একটা নিয়মের শৃঙ্খলে বাধা পড়িয়া গিয়াছে। কাহাকেও কিছু বলিতে হয় না-করাইয়া দিতে হয় না। সব ঠিক ঠিক চলে।

মাস দুই পরের কথা। গরম বেশ পড়িয়াছে। আজ আহার করিতে একটু বেলা হইয়াছিল। রানি এখনও কাজলকে বাহির হইতে দেয় নাই, বিশ্রামের জন্য নিজের কাছে শোয়াইয়া রাখিয়াছে। কাজল কান্ত হইয়া শুইয়া পা দুইটা পিসির গায়ে তুলিয়া দিয়া গল্প শুনিতেছিল। রানির হইয়াছে বিপদ-যতই গল্প চলুক, কাজলও ঘুমায় না।–তাহারও ঘুম হয় না। এমন সময় বাহির হইতে কে ডাকিল-শ্ৰীমান অমিতাভ রায়, চিঠি আছে-অমিতাভ রায়! কাজল প্রথমটা বিশ্বাস করে নাইনিশ্চয়ই ভুল শুনিয়াছে। তাহাকে চিঠি লিখিবে কে?

দৌড়াইয়া চিঠিটা নিতে গেল সে। বেশ মোটা কাগজে রঙীন খামের চিঠি। রানিও উঠিয়া আসিয়াছিল কাজলের পিছু পিছু। সে বলিল–খোল তো খোকন, কার চিঠি-।

রানির বুক টিবি টিব করিতেছিল। হয়তো তাহারই ঠিক-কতদিন আর ভুলিয়া থাকিতে পারে!

কাজল খাম খুলিয়া চিঠিটা বাহির করিয়া প্ৰথমে যেন চোখে ধোঁয়া দেখিল। কিছু বুঝিতে পারিল না প্রথমটা। খুব চেনা, খুব পরিচিত হস্তাক্ষর, এ নিশ্চয়ই-। পরীক্ষণেই রানির হৃৎস্পন্দনকে দ্রুতায়িত করিয়া মুখ তুলিয়া সে বলিল–বাবা দিয়েচে-বাবার চিঠি পিসি। এই দ্যাখো, বাবার হাতের লেখা।

উত্তেজনায় সে হাঁপাইতেছিল।

একটু পরেই রানি দেখিল, সে আর কাজল দুজনেই অঝোরধারে কাঁদিতেছে।

অপু রানিকে লিখিয়াছে—

‘ফিজি থেকে আফ্রিকায় এসেছি। কখন কোথায় ঘুরছি কিছু ঠিক নেই। ফিজিতে একটা মিশনারী স্কুলে মাস্টারি করলাম কিছুদিন। অ্যাশবার্টন সাহেবই সব ঠিক করে দিয়েছিল। জীবনটাকে যেমন করে দেখতে চেয়েছিলাম-ঠিক তেমনি করেই দেখছি রানুদি। কোথাও ধাক্কা খেলাম না। আশ্চর্য একটা অসীমত্বের সন্ধান পেয়ে গেছি। মনে হয় যেন সময় অফুরন্ত–তা ফুরিয়ে যাবে না কোনদিন। জীবনও তাই বাঁধনহারা, অসীম। মহাকাল এত বিশাল-তার আঁচলটুকুই এত বড়ো যে সেই বিশালতাকে অনুভব করা বহু দূরের কথা, ধারণাটাকে কল্পনায় আনতেই মানুষের যুগযুগান্ত কেটে যাবে। এই জীবনকে-ত্রিকালকে বুকের পাঁজরে পাঁজরে ব্যথায়-বেদনায়, আনন্দে-উল্লাসে, স্বপ্নে-জাগরণে প্রতিক্ষণে অনুভব করছি। আমার আর ভয় কী রানুদি? এখন মনে হচ্ছে, ভক্তি ভাবটা শুধু মেয়েদেরই একচেট নয়-আমার মনেও একটা ভক্তির ভাব জেগে উঠেছে। এ ঠিক ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি নয়। বর্তমানের ক্ষুদ্র গণ্ডী পেরিয়ে অতীত ও ভবিষ্যতে রহস্যের প্রদোষালোকে আলোকিত পরিসরে বিস্তৃত যে মহাজীবন-তার প্রতি ভক্তি। এ যেন কিছুটা নিজেরই প্রতি ভক্তি। নিজেকে, বিশেষ করে নিজের জীবনকে জানিবার অদম্য স্পৃহায় ঘুরে বেড়াচ্ছি। এখন মনে হচ্ছে যেন তা ছাড়িয়ে আরও বেশি কিছু জেনে ফেলেছি। কিন্তু সে কথা প্ৰকাশ করা যায় না। রানুদি-সে বোধ ভাষার অতীত। সে সকল জানার জানা-এক অনির্বাচনীয় পরম পাওয়া।’

কাজলকে লিখিয়াছে—

তোমার জন্যই হয়তো আমাকে ফিরে আসতে হবে। কতদিন ফিজিতে সমুদ্রের তীরে বসে আশ্চর্য সূর্যস্ত দেখতে দেখতে তোমার কথা ভেবেছি। তুমি আমার প্রাণের অংশ দিয়ে তৈরি স্বপ্ন, বাবা। চেষ্টা করছি তাড়াতাড়ি ফিরে যেতে। তুমি পিসির কথা শুনে চলো তো? বেশি রাতে বেরুবে না। নদীর ধারে বেশি যেয়ে না। আমার যে ফার্স্ট বুকটা আছে–সেটা মনোযোগ দিয়ে পড়বে। এখানে অনেক মজার মজার জিনিস দেখছি।-ফিরে তোমাকে গল্প বলবো। তোমাকে বড়ো দেখতে ইচ্ছে করে। আমার জন্য তোমার মন খারাপ হয় না?’

বাবার জন্য তাহার মন খারাপ হয় কিনা! এমন দিন কবে গিয়াছে যে, সকাল হইতে রাত্রির মধ্যে সে বাবার কথা ভাবে নাই? বরং বাবাই তো তাহাকে ফেলিয়া বেশ থাকিতে পারিতেছে। বাবা ফিরিয়া আসিলে সে বাঁচে।

দুপুরে অপুর রাখিয়া যাওয়া সুটকেস হইতে ডায়েরিখানা বাহির করিয়া সে পড়িতে বসে। ইহা সে মধ্যে মধ্যেই পড়িয়া থাকে। এক বৎসরের ঠাসবুনোট লেখায় ভর্তি ডায়েরি। পাতা উলটাইতে উলটাইতে এক জায়গায় তাহার দৃষ্টি আটকাইয়া গেল। কাশীর কথা লেখা আছে কয়েক পাতা। বাবা তাহাকে রাখিয়া একবার কাশী গিয়াছিল বটে। কাজল পড়িয়া ফেলে পাতা কয়টা। এ কাহার কথা লেখা! লীলা কে? তাহার মেয়ের সহিত বাবা তাহার বিবাহে ইচ্ছা প্ৰকাশ করিয়াছে যে! বিবাহ! এ তো বড়ো মজার কথা হইল। কলিকাতায় থাকিতে গলির ওপারে একটা বাড়িতে সে বিবাহের উৎসব দেখিয়াছিল। বর মোটরগাড়ি করিয়া মালা-চন্দন পরিয়া আসে। পরে গাড়ি হইতে নামিলে একজন মেয়ে কুলোর উপর কী সব সাজাইয়া তাহাকে বরণ করে ও অন্যান্যরা জোরে হাতপাখা নাড়িয়া বাতাস করিয়া থাকে। ওপাড়ার চনুর দিদিরও তো বিবাহের কথা চলিতেছে। চনু বলিতেছিল, দিদি কালো বলিয়া নাকি পত্রিপক্ষ এক হাজার টাকা পণ চাহিয়াছে। বেশ মজা তো! বিবাহ করিলে সেও টাকা পাইবে তাহা হইলে। কিন্তু বাবা তো লিখিতেছে লীলার (এ কে?) মেয়ে ফরসা। ফরসা মেয়েকে বিবাহ করিলে টাকা দিবে তো? টাকা পাইলে সে সব টাকা বাবাকে দিবে। আচ্ছা, কত বৎসর বয়স হইলে বিবাহ হইয়া থাকে?

০২. সেদিন সকাল হইতে মেঘ করিয়াছিল

সেদিন সকাল হইতে মেঘ করিয়াছিল–কিন্তু বৃষ্টি হয় নাই। সুন্দর একটা ছায়াঘন আমেজে গ্রামটা ঝিমাইতেছিল। পাখির ডাক শোনা যাইতেছিল কম। কেবল বহু উঁচুতে প্রায় মেঘের গায়ে গায়ে কয়েকটা চিল উড়িতেছিল। কাদের মিঞার ক্ষেতের পাশে কাজল একবার থামিল। কাদের তাহার শালার সহিত নিড়ান দিতেছে ক্ষেতে। কাজলকে দেখিয়া কাদেরের শালা বলিল–বাড়ি চলে যাও কর্তবাবা-বিষ্টি হতে পারে। কাদের আপত্তি করিয়া বলিল—পানি হবে না মোট-দেখছো না চিল উড়ছে ওপরে। ডানায় পানি পালি নামি আসত। নিচপানে। আরহাওয়াতত্ত্ব সম্বন্ধে তাহদের আলাপ করিতে দিয়া কাজল হাটতে লাগিল মেঠোপথ ধরিয়া। ওই পথটা গিয়াছে আষাঢ়-এই পথটা ঘুরিয়া গিয়াছে নদীর দিকে। একটা বড়ো গাছ রহিয়াছে দুইটা পথের সঙ্গমস্থলে। জায়গাটা কাজলের বড়ো ভালো লাগে। গ্রামের যাবতীয় লোক এই পথ দিয়া আষাঢুব হাটে গিয়া থাকে। অচেনা লোকও যায় কত। ভিন-গাঁ হইতে মালপত্ৰ কাঁধে করিয়া আলের পথ মাঠের পথ ধরিয়া এখানে আসে। এখান হইতে কাঁচা পথ ধরিয়া চলিয়া যায় হাটে। পণ্যাদি কাঁধে হাটমুখী জনস্রোত দেখিতে কাজলের বেশ লাগে।

খানিকক্ষণ সেখানে বসিয়া কাজল একবার নদীর পথে কিছুদূর হাঁটিয়া আসিল। ফিরিয়া আসিতে আসিতে দেখিল একজন লোক আষাড়ুর পথ হইতে নামিয়া গ্রামের দিকে চলিয়া গেল। বুকটা তাহার একবার কেমন করিয়া উঠিল। দৌড়াইয়া আগাইযা গেল সে-এইবার লোকটার পিছনে আসিয়া পড়িয়াছে। বহুদিনের অনভ্যাসের ফলে শব্দটা যেন জিভ দিয়া আর বাহির হইতেছে না। মাথার মধ্যে কেমন করিতেছে। পথের পাশে জঙ্গল হইতে বাতাস অজস্র বন্যপুষ্পের গন্ধ বহিয়া আনিতেছে! একটা ধাক্কা দিয়া কাজল শব্দটা বাহির করিল–বাবা!

অপু বিদ্যুৎস্পষ্টের ন্যায় ফিরিযা তাকাইল। এই ডাকটার জন্য সে ছুটিযা আসিতেছে পৃথিবীর আর এক প্রান্ত হইতে। সমুদ্রের ফেনোচ্ছিল। উর্মিমালা, বিষুব-মণ্ডলীব দেশেব তারকাখচিত তমিত্ৰ বাত্ৰিব আকর্ষণ, উষ্ণ বালুকীয় শুইয়া উপরে নারিকেল পাতায় বাতাসেব মর্মরধ্বনি শুনিবার অদ্ভুত অনুভূতিসব সে ত্যাগ করিয়া আসিয়াছে। এই ডাকটা শুনিবার লোভেই তো। সে থাকিতে পাবে নাই।

অপুর হাত হইতে ব্যাগ আর বাক্স পড়িয়া গেল ধূলায়। পথের মধ্যে হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া সে দুই হাত সামনে বাড়াইয়া দিয়া চোখ বুজিল। পরীক্ষণেই কাজল ঝাপাইয়া পড়িল অপুর বাহুবন্ধনে।

চিলগুলি ঘুরিয়া ঘুরিয়া নামিয়া আসিতেছিল নিচে। এইবার বৃষ্টি নামিবে।

সন্ধ্যান্য রানির রান্নাঘরের দরজায় পিঁড়ি পাতিয়া বসিয়া অপু গল্প করিতেছিল।

-আর পারলাম না থাকতে রানুদি! সে কী টান, তা যদি একবার বুঝতে! যা দেখি যা করি, সবই যেন কেমন ফাঁকা আর অর্থহীন লাগে। সেই বাড়িতে এনে তবে ছাড়ল।

রানি হাসিয়া বলে–আর আমরা বুঝি কেউ নই?

-কে বলেছে একথা রানুদি? তোমরা সবাই মিলে আমার জীবন সার্থক করে তুলেছি। কোথায় যেত আজ কাজল-তুমি না থাকলে? তোমার দান কি ভোলবোর? মায়ের স্নেহ দিয়ে আমাদের দুজনকেই ঘিরে রেখেছি তুমি।

রানির গলার কাছে হঠাৎ একটা কী কুণ্ডলী পাকাইয়া ওঠে! এত সুখের দিনও ভগবান তাহার কপালে লিখিয়াছিলেন। পরে সামলাইয়া বলে-এই নে, এ দুটো পরোটা আগে খা, তারপর গরম গরম ভেজে দিচ্ছি–

রাত্রে ছেলেকে লইয়া শোয় অপু। অনেক রাত্রি পর্যন্ত কাহারও ঘুম আসে না। বৈকালে একবার খুব ঝড় হইয়া বৃষ্টি নামিয়াছিল। তাই গরম নাই তত। জানালার পাশে শুইয়া আকাশে নক্ষত্রগুলি দেখা যায় স্পষ্ট। মধ্যপ্রদেশ হইতে ফিরিয়া একই নক্ষত্র কলিকাতার আকাশে দেখিয়া তাহার কেমন অবাক লাগিয়াছিল। আবার ফিজি ঘুরিয়া আসিয়া এই নক্ষত্রগুলিকে কেমন চেনা-চেনা অথচ অনেক দূরের বলিয়া মনে হইতেছে। বিদেশে ইহারাই ছিল তাহার সঙ্গী-এই নক্ষত্র, মুক্ত উদার আকাশ, প্রান্তরের বুকের উপর দিয়া বহিয়া যাওয়া ভবঘুরে বাতাস। সেও সুন্দর জীবন-সে যে জীবন চাহিয়াছিল, সেই জীবন। কিন্তু এখন কাজলের পাশে শুইয়া তাহার উদ্দাম জীবনের গতিবেগ কিছুটা প্রশমিত করিতে ইচ্ছা করিল। কোথায় ফেলিয়া যাইবে একে? একবার গিয়া তো মর্মে মর্মে অনুভব করিয়াছে নাড়ির টান। শৈশবে বাবা অনেকদিন বাড়ি না। আসিলে তাহার রাগ হইত-অভিমান হইত। বাড়ি ফিরিয়া অনেক চেষ্টা করিয়া হরিহরকে অপুর রাগ ভাঙাইতে হইত। এখন বড়ো মমতা হয়। হরিহরের প্রতি। বাবা কি আর ইচ্ছা করিয়া আসিত না! সংসার চালাইবার দুৰ্বহ প্ৰয়াসে বাবাকে কোথায় না ঘুরিতে হইয়াছে।–কী না করিতে হইয়াছে। বেচারী বাবা-তাহারও কত ইচ্ছা করিত অপুকে দেখিতে। আসিতে পারিত না শুধু কাজের চাপে। বই-খাতা বগলে তালিমারা ছাতা হাতে স্থান হইতে স্থানান্তরে বেড়াইত কাজেব সন্ধ্যানে। আজ অপু লেখক হইয়াছে।-বই বাজারে কাটিতেছে মন্দ নয়, তাহার চাইতে বেশি মিলিতেছে প্ৰশংসা। কত বৎসর পরে তাহদের বাড়ির লোক আজি সচ্ছলতার মুখ দেখিতেছে। কিন্তু বাবাকে দেখানো গেল না। এই সব দিন-বাবা বাঁচিয়া থাকিলে বৃদ্ধ হইয়া যাইত, তাহাকে অপু শিশুর মতো পরিচর্য কবিত। থোক-কাজলের মধ্য দিয়া সে তাহার শৈশবে হারাইয়া যাওয়া পিতাকে খুঁজিয়া পাইয়াছে। তাহাকে মনের মতো করিয়া মানুষ করিতে হইবে।–ঠিক যেমন করিয়া সে চায়, তেমনি করিয়া। ভাবিয়াছিল, গ্রামে না। রাখিয়া কাজলের প্রতি সে অন্যায় করিতেছে। গ্রামে হয়তো কাজলের শিশুমন পূর্ণভাবে বিকশিত হইয়া উঠিবার সুযোগ পাইবে। তাই ছেলেকে কলিকাতার অসুন্দর পরিবেশ হইতে আনিয়া একেবারে প্রকৃতির মধ্যে ছাড়িয়া দিয়াছিল। এখন ভাবিল, এইভাবে রাখিলে উহার পড়াশুনা কিছুই হইবে না। বরং কোন একটা ছোট শহরে লইয়া যাই। মাঝে মাঝে গ্রামে লইয়া আসিবা-মাঝে মাঝে বেড়াইতে লইয়া যাইব দূরে। তাহাতে উহার চোখ ভালো করিয়া ফুটিবে। সব দিক দিয়াই ছেলেকে চৌকস করিয়া তোলা প্রয়োজন।

পরের দিন। সারাবেলা অত্যন্ত গরম ছিল–কোথাও বাহির হওয়া যায় নাই। বিকালের দিকে বোদ একেবারে কমিয়া গেলে অপু ছেলেকে জিজ্ঞাসা করিল–বল দেখি কোথায় বেড়াতে যাওয়া। যায়? পরে নিজেই খানিকক্ষণ ভাবিয়া বলিল–চল, আগে বেরুই তো, তারপর দেখা যাবে। নে, হাতীমুখ ধুয়ে জামাটা পরে নে।

নিজের শার্টটা আনিবার জন্য ঘরে ঢুকিতে গিযা কী মনে করিয়া জেবে ডাকিল-রানুদি!

রানি ভিতরে ছিল, আসিয়া বলিল–কী? আবে, বেবুচিছস বলে মনে হচ্ছে।

–রানুদি, একটা জিনিস খেতে বড়ো ইচ্ছে করচে, খাওয়াবে?

–ও মা? সে আবার কী কথা। খাওয়াবো না কেন। বল না-

–গরম পড়েছে খুব, একটু আমপোড়া-শরবৎ খাওয়াবে?

—আমপোড়া-শরবৎ। সে আবার কী রে! কখনও শুনি নি।

–আমাদের এদিকে খায় না। বাবা পশ্চিম থেকে শিখে এসেছিলেন। পশ্চিমে খুব খায়। বাবা মাঝে মাঝে মাকে করতে বলতেন। তুমি বানাও রানুদি, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।

-করচি। এই সামান্য ব্যাপার, আমি ভুবি কী না কী খেতে চাইবি।

–এটা কিন্তু সামান্য ব্যাপার নয় রানুদি।। কতদিন খাইনি বলো তো? ছোটবেলায় মাঝে মাঝে মা করে দিতেন। আমাদের অবস্থা কী ছিল সে তো তুমি জানেই। নিজেদের বাগান ছিল না, ঘরে সব সময় চিনিও থাকত না–আমপোড়া-শরবৎ তখন একটা বিরাট বিলাসিত। কালেভদ্রে হলে খুব ভালো লাগতো। আজ বানাও তো রানুদি। খেয়ে দেখি, ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে কি না। খোকাকেও একটু দিয়ো–কাঁচা আম আছে তো?

–সে তোকে ভাবতে হবে না। কাল এক ঝুড়ি আম দিয়ে গিয়েছে তুলসীর মা।

কাজল আসিয়া বলিল–বাবা, তোমার হয়েচে? আমার এই বোতামটা লাগিয়ে দাও, আমি পারাচি নে–

অপু হাসিতে হাসিতে বলিল–দেখেচো কাণ্ড বানুদি? উলটো ঘরে বোতাম লাগিয়ে বসে আছে। হ্যাঁরে, তোর বুদ্ধিসুদ্ধি কবে হবে?

একটু পরে বারান্দায় বসিয়া শরবতে প্রথম চুমুক দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ছেলেবেলাটা ফিরিয়া আসিল। অপু চোখ বুজিয়া আমপোড়ার সোদা গন্ধ উপভোগ করিতেছিল। এই গন্ধটা কেমন পুরাতন দিনগুলিকে মনে পড়াইয়া দেয়। সেই দাওয়ায় চাটাই পাতিয়া বসিয়া তালের বড়া খাওয়া, সেই মাটির দোয়াত হাতে প্ৰসন্ন গুরুমশায়ের কাছে পড়িতে যাওয়া। কত কথা মনে পড়ে। রাত্রে প্রদীপের আলোয় বসিয়া পড়িতে পড়িতে কানে আসিত মায়ের খুন্তি নাড়িবার শব্দ। বিদেশ হইতে বাবা আসিলে অপুর অত্যস্ত আনন্দ হইত। রাত্রে বিছানায় শুইয়া অনেক রাত্রি পর্যন্ত শুনিত বারান্দায় বসিয়া বাৰা গান করিতেছে।

আর একজনের কথা মনে পড়ে!

বাংলা দেশ হইতে বহুদূরে তারকাখচিত আকাশেব নিচে সমুদ্রবেলায় শুইয়া থাকিতে থাকিতে হঠাৎ একসময় তাহার। তন্দ্রার ঘোরে। মনে হইয়াছে, সে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। সে বদলায় নাই, বয়স বাড়ে নাই। তাহার চোখের দৃষ্টির পরিবর্তন হয় নাই। তাহার আঁচলে বাধা নাটাফলগুলির সংখ্যা একটিও কমে নাই। সে অপুর সামনে দাঁড়াইয়া হাসিতেছে।

তন্দ্ৰা ছুটিয়া গেলে অপু অবাক হইয়া আকাশের দিকে চাহিত। সমস্ত দুঃখের দিনে উদার আকাশ তাহকে শান্ত করিয়াছে। দেখিত, বাংলার আকাশের সহিত বিদেশের আকাশের কোন প্রভেদ নাই। দেখিত, তাহার দিদির দৃষ্টি যেন ক্ৰমশঃ আনীহারিকাসৌরচরাচরে ব্যাপ্ত হইয়া পড়িতেছে। এইমাত্র এইখানে ছিল—তাহার ঘুম ভাঙিতে দেখিয়া দূরে সরিয়া গিয়াছে।

–বেড়াতে যাবে না। বাবা?

ছেলেকে কাছে টানিয়া লইয়া অপু বলিল–চলো বাবা, যাই।

পথে বাহির হইয়া বলিল–আমরা যদি এখান থেকে চলে গিয়ে অন্য জায়গায় থাকি, তবে তোর মন খারাপ হবে–না রে?

কাজল প্রথমে অবাক হইয়া গেল। চলিয়া যাইবাব কথা উঠিতেছে কেন? অবশ্য বাবা যেখানে আছে, এমন জায়গায় থাকিতে তাহার খারাপ লাগিবে না, কিন্তু পিসিকে ছাড়িয়া থাকা বড়ো কষ্টের।

–কোথায় যাবো বাবা?

কোথায় যাওয়া হইবে তাহা অপুও কিছু ভাবে নাই। গ্রাম ছাড়িয়া বেশিদূর যাওয়া হইবে না, আবার কলিকতাও কাছে হইবে–এমন স্থানের সন্ধান সে মনে মনে করিতেছিল। ছেলের প্রশ্নের জবারে সংক্ষেপে বলিল–আমিও তাই ভাবচি রে।

গ্রাম ছাড়িয়া বেশিদূর যাওয়া ঘটিবে না–সে যাইতে পরিবে না। বার যার তাহাকে ভিক্ষুকের মতো ফিরিয়া আসিতে হইয়াছে নিশ্চিন্দিপুরে। এ গ্রামের প্রকৃতি তাহার কাছে জীবনধারণের জন্য বাতাসের মতো প্রয়োজনীয়। তবুও ছেলের কল্যাণের জন্য যাইতেই হইবে বাইরে। ভালো স্কুলে না। পড়িলে কাজলের চোখ ফুটিবে না। দেওয়ানপুর স্কুলের মিঃ দত্ত-র কাছে সে নিজে ঋণী; বৃহত্তর জীবনে প্রবেশের মুখে তিনি তাহাকে প্রস্তুত করিয়া দিয়াছিলেন। কাজলকে সে নিজে তৈয়ারি করিয়া দিবে।

নদীর ধারে যাইবার পথে আধ্যবয়সী স্থূলবপু এক ভদ্রলোক ডাকিয়া নমস্কার করিলেন–আপনিই তো অপূর্ববাবু?

–আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনাকে তো আগে এ গ্রামে দেখিনি বলেই বোধ হচ্ছে। নতুন এসেছেন বুঝি?

—নতুনই বটে। তাও ধরুন গিয়ে খুব নতুন আর কী! বছর কয়েক তো হয়ে গেল। আমার নাম রাধারমণ চাটুজ্যে। বরাবরের নিবাস ঝাপড়দহর কাছে, গ্রামে, তা সে মশাই এমন ম্যালেরিয়া যে কী বলব। দেখা দেখা করে একেবারে গ্রাম উজাড়–

–ও।

–হ্যাঁ। তারপর আর সে গ্রামে ভরসা করে বাস করা–বুঝলেন না? তাও গিন্নি বলেছিলেন, যেখানে যোচ্ছ সেখানে কি আর জুরজারি নেই? কথাটা অবশ্য মন্দ বলে নি, কী বলেন?

–আজ্ঞে হ্যাঁ। ঠিক কথাই বলেছেন। উনি।

–মশাই শুনলাম দেশ-বিদেশ অনেক ঘুরেছেন, একদিন গল্প শুনতে যাবো। সেজন্যেই মশায়ের সঙ্গে আলাপ করা।

–দেশ-বিদেশ আর কী, সে এমন কিছু নয়। তবে যাবেন নিশ্চয়ই, তার জন্য আর বলার কী আছে?

এই শুরু হইল। রাধারমণ তো আসিলই, সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম হইতে অন্যান্যরাও একে দুয়ে আসিয়া হাজির হইল। ঘরে প্রায়ই নতুন মুখ দেখা যাইতেছে। অনেকেই যাচিয়া আলাপ করিতেছে। অপু যেখানে গিয়াছিল, তাহার ভৌগোলিক অবস্থান সম্বন্ধে জ্ঞান সকলেরই প্ৰায় একপ্রকার। সবাই জানিতে চায় দেশটা কেমন, পৌঁছাইলেই ধরিয়া তাহারা স্লেচ্ছ করিয়া দেয় শোনা গিয়াছে, এ কথা কতদূর সত্য? একদিন সন্ধ্যাবেলা একজন প্রতিবেশী আসিয়া হাজির হইল, সে কাহার কাছে শুনিয়াছে বিলাতে অমাবস্যার রাত্রে রামধনু দেখা যায়। অপু সদ্য বিদেশ হইতে আসিয়াছে–অতএব সত্যমিথ্যা যাচাই করিবার জন্য সে ছাড়া উপযুক্ততর লোক আর কই?

অপু শুনিয়া হাসিয়া বলিল–বিলেত যাকে বলে ঠিক সেখানে তো আমি যাই নি। আর তাছাড়া রাত্তিরে রামধনু, কী করে দেখা সম্ভব? রামধনু তৈরি হয় কী ভাবে? জলকণার ওপর আলো–

একঘণ্টা সময় লাগিল। অনেক পরিশ্রম করিয়া বৈজ্ঞানিক বক্তৃতা দেওয়ার পর শ্রোতার মাথা নাড়ার ভাব দেখিয়া গত একঘণ্টার পরিশ্রমের সার্থকতা সম্বন্ধে অপুর কেমন একটা সন্দেহ জন্মিল। বুকুক আর নাই বুকুক, লোকটা ইহার মিনিট দুই পরে বিদায় লইল।

গ্রাম হইতে বিদায় লইতে হইবে বলিয়া অপু ছেলেকে লইয়া দুইবেলা পথে পথে বেড়ায়। রাস্তায় লোকে তাহার সহিত আলাপ করিয়া তাহার আশ্চর্য ভ্রমণবৃত্তান্ত শুনিতে চায়। অপু কাহাকেও নিরাশ করে না। সে জানে ইহাদের মধ্যে অনেকেই সারাজীবনে বাংলাদেশের বাহিরে পা দেওয়ার সুযোগ পাইবে না। ভাবিয়া তাহার দুঃখ হয়। এই সহজ মমত্ববোধের ফলে সে কয়েকশতবার। কথিত গল্প পুনরায় হাসিমুখে করিতে থাকে।

অপু বলি-বলি করিয়াও কথাটা রানিকে বলিতে পারিতেছিল না। চলিয়া যাইবার কথা শুনিলে রানি যে আদৌ সুখী হইবে না। ইহা অপুর জানা ছিল বলিয়াই কথাটা সে সাহস করিয়া রানির নিকট তুলিতে পারিতেছিল না। যাইবার সময় আচমকা না বলিয়া এখন হইতে আভাস দিয়া রাখা ভালো। অথচ সাহসের অভাব। দুই-চার দিন বলি বলি করিয়া অপু রান্নাঘরের সামনে ঘোরাফেরা করিল, তারপর, একসময় দুর্গানাম করিয়া কথা পাড়িয়া ফেলিল।

-একটা কথা ছিল রামুদি।

রানি তোরঙ্গ গোছাইতেছিল। অপুর গলার স্বরে এবং মুখভাগে বিস্মিত হইয়া তাকাইল।

-কী কথা রে?

অপু একটা ঢোঁক গিলিল–এই মানে-কাজলের পড়াশুনোটা এবার ভালোভাবে শুরু করে দেওয়ার দরকার।

–তাতে কী?

–না, বলছিলাম কী, ওকে এখন থেকে একটু-মানে একটু ভালো স্কুলে তো পড়াতে হবে। তাই রানুদি, ভাবছি কিছুদিনের জন্য শহর এলাকায় বাসাভাড়া করে থাকব। আগামী হণ্ডায় হয়তো রওনা দিতে হবে। বুঝতেই পারছি, ছেলেটার পড়াশুনো তো হওয়া দরকার।

রানি কোনো কথা বলিল না, তেরঙ্গের ডালা খোলাই রাখিয়া বিছানায় আসিয়া বসিল, মুখটা রহিল খোলা জানালার দিকে। তাহার অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গি দেখিয়া মনে হইতে পারিত অপুর কথা তাহার কানো যায় নাই, সে অন্যমনস্কভাবে বাহিরের কাঁঠালগাছটা দেখিতেছে মাত্র।

অপু জিজ্ঞাসা করিল–রাগ করলে রানুদি?

অপু ভাবিয়ছিল রানুদি কাঁদিয়া ভাসাঁইয়া দিবে, রানি মুখ ফিরাইলে দেখিল তাহার চোখে জল নাই।

হাত দিয়া বিছানার চাদরটা মসৃণ করিতে করিতে রানি বলিল–না রে, রাগ করিনি। রাগ করবো কেন? তুই কি পাগল হলি অপু? এতে তো কাজলেরই ভালো হবে, ওর লেখাপড়া কি কিছু হবে এখানে থাকলে?

একটু থামিয়া বলিল–তাছাড়া পরের জিনিস আর কতদিন নিজের কাছে রাখব? মায়া পড়ে গেলে ছাড়তে যে বড়ো কষ্ট হবে। তার চাইতে তুই এখনই নিয়ে যা–

এত সহজে ব্যাপার মিটিয়া যাইবে অপু আশা করে নাই। যাই হউক, রানুদি যে চলিয়া যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা বুঝিতে পারিয়াছে তাহাই যথেষ্ট। অপু বলিল–মাঝে মাঝে এখানে নিয়ে আসবে রানুদি, প্রত্যেক ছুটিতে আসবো। আমারই বা কে আছে বলো তুমি ছাড়া? বরং তখন তুমি বিরক্ত হয়ে উঠবে দেখো–

একটু পরেই হাতপাখা চাহিবার জন্য ঘরে ঢুকিতে গিয়া অপু চৌকাঠেই দাঁড়াইয়া গেল। বিছানার ওপর উপুড় হইয়া রানি ফুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিতেছে।

অনেক ভাবিয়া অপু মালতীনগরে যাওয়া স্থির করিয়াছিল। মালতীনগর জায়গাটা এখনও পুরা শহর হইয়া উঠিতে পারে নাই, তবে শহবের সুবিধা মোটামুটি প্রায় সমস্ত পাওয়া যায়। অনেক বাড়িঘর, মানুষ-জন ও হাট-বাজারের মধ্যে গ্রাম হইতে শহরের স্পৰ্শই বেশি। নিশ্চিন্দিপুর হইতে অবশ্য খুব কাছে হইল না। কিন্তু কী আর করা যায়। সব সুবিধা দেখিতে গেলে চলে না। কিছুদিন আগে অপু মালতীনগর স্কুলে গিয়া হেডমাস্টার মহাশয়ের সঙ্গে কথা বলিয়া আসিয়াছিল। সেখানকার ব্যবস্থা তাহার পছন্দ হইয়াছে। ভর্তি করাইবার যাবতীয় ব্যবস্থা করিয়া ফিরিতে ফিরিতে হঠাৎ একটা কথা ভাবিয়া তাহার খুব অবাক লাগিল। সে আজ ছেলেকে ভর্তি করাইবার জন্য ঘুরিতেছে, ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভাবিতেছে। আশ্চর্য, এই কিছুদিন আগে তাহার কথাই তাহার মা-বাবা চিন্তা করিয়াছে। সত্যই সে অনেক বড়ো হইয়া গিয়াছে। অথচ সন্তানের পিতার যতটা গভীর ও রাশভারী হওয়া উচিত, তাহা সে বিস্তর চেষ্টা করিয়াও হইতে পারিতেছে না। রাশভারী মুখ করিষ্কার চেষ্টা করিল, হইল না। খানিক পরে নিজেরই হাসি পাইল। আসলে সে বৃদ্ধ হয় নাই, তাহার পক্ষে বৃদ্ধ হওয়া সম্ভব নহে।

বিদায় লইবার পালা বেশ কয়েকদিন ধরিয়া চলিল। রানি ভালোমন্দ রান্না করিতে লাগিল, পাড়ার মানুষ এবং গল্প-পিপাসুরা দল বাঁধিয়া আসিয়া বিদায় লইয়া গেল। কড়ার রহিল, অপুকে প্রায়ই আসিতে হইবে। কাজল সকাল-বিকাল একবার করিয়া বন্ধুদের নিকট হইতে বিদায় লইতে লাগিল।

সময়কে যাইতে দিব না বলিলে সময় অধিকতর তাড়াতাড়ি চলিয়া যায়। ক্রমশ যাইবার দিন আসিয়া গেল। অপু মালতীনগরে একখানি বাসা ভাড়া করিয়াছে। সামান্য কিছু প্রয়োজনীয় আসবাব কিনিয়া সেখানে রাখা আছে। একসঙ্গে সমস্ত কেনা গেল না। দৈনন্দিন কাজে প্রয়োজন দেখা দিলে ক্রমশ কেনা হইবে। বহুকাল বাদে অপু সংসার পাতিতেছে-একা। কী কী জিনিস লাগিবে তাহা রানির সহিত পরমার্শ করিয়া কেনা হইয়াছে। অপুর একার উপর ভার থাকিলে হয়তো নূতন বাড়ি গিয়া প্রথম দিন উপবাস করিতে হইত।

যাইবার গোলমাল, বাক্স গোছানো, নানাবিধ উপদেশ এবং উত্তেজনায় কাজল কিছুটা দিশাহারা হইয়া পড়িয়ছিল, নতুবা রওনা হইবার সময় সে নিশ্চয়ই একবার কাঁদিয়া ফেলিত। পরে তাহার মনে হইয়াছিল–পিসি অত কাঁদলে আর আমি দিব্যি চলে এলাম। পিসি হয়তো ভাবলে ছেড়ে আসতে আমার মন খারাপ হয়নি।

মন খারাপ তাহার অবশ্যই হইয়াছে, কিন্তু সেই গোলমালে তাহার কান্না আসে নাই।

অপুর মনটা কেমন ঝিমাইয়া পড়িয়াছিল। রানির কাছে কাজলকে রাখিয়া তাহার যে সহজ নিশ্চিন্ততা ছিল, তাহা সে ফিরিয়া পাইতেছিল না। অনেক প্রতিজ্ঞা, অনেক পত্র লিখিবার প্রতিশ্রুতি, অনেক চোখের জলের মধ্য দিয়া তাহারা মাঝেরপাড়া স্টেশনে পৌঁছিয়া গেল।

ট্রেনে উঠিয়া কাজল বলিল–একটা কথা বলব বাবা?

-কী?

–আমবা মালতীনগরে যাচ্ছি, না?

–হ্যাঁ।

-সেখানে থাকতে কেমন লাগবে বাবা?

কঠিন প্রশ্ন। অপু জানালা দিয়া বাহিরে তাকাইয়া রৌদ্রদগ্ধ প্ৰান্তর দেখিতে দেখিতে উত্তর খুঁজিতে লাগিল।

০৩. মালতীনগর জায়গাটা

মালতীনগর জায়গাটা কাজলের খুব খারাপ লাগিল না। ঘনবসতি সে ভালোবাসে না, মালতীনগরে তাহা নাই। বাবা যে বাসা ভাড়া লইয়াছে সেটা শহরের অপেক্ষাকৃত ফাঁকা জায়গায়। জানালায় দাঁড়াইলে অনেক দূর দেখা যায়, দৃষ্টির কোন প্রতিবন্ধক নাই। একটা জানালা আর মুক্ত আদর্শ কাজলের অত্যন্ত প্রয়োজন। দুপুরের আকাশে চিল ওড়া দেখিয়া সে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটাইয়া দিতে পারে। তাই জানালা একটা অবশ্যই দরকার প্রান্তরের দিকে। সে যে শুধু চিল দেখিবার জন্যই দাঁড়াইয়া থাকে। এমন নহে। আসলে চিলগুলা উঠিতে উঠিতে যখন বিন্দুবৎ হইয়া আসে তখন কাজলের মনটা হঠাৎ বিপুল একটা প্রসারলাভ করে। মনে মনে রোজ ভাবে-বাব্বাঃ, কোথায় উঠে গিয়েছে। চিলগুলো, এই এতোটুকু দেখাচ্চে একেবারে! আচ্ছ, ওখান থেকে না জানি পৃথিবীটা কেমন দেখায়। সুদূরের কল্পনা তাহার শিশুমনে স্বপ্নের রঙ বুলাইয়া দেয়। আরও কী একটা মনের মধ্যে হয়, সেটা সে ঠিক বুঝাইয়া উঠিতে পারে না, সেটা বুঝাইবার উপযুক্ত ভাষা তার আয়ত্তে নাই। দুরের কথা ভাবিলে দুপুরের জানালায় বসিয়া মেঘস্পশী পাখি দেখিলে তাহার বুকের গভীরে কী একটা কথা গুমরাইয়া উঠে, সে তাহা ভাষায় অনুবাদ করিতে পারে না।

একদিন অপু বাহির হইতে আসিয়া কাজলকে জানালায় দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিয়াছিল-কী রে, কী দেখছিস হ্যাঁ করে?

কী দেখিতেছিল তাহা সে বাবাকে মোটেই বুঝাইয়া উঠিতে পারে নাই, প্রকাশের চেষ্টায় তাহার মুখ লাল হইয়া গিয়াছিল। চিলগুলি নহে, অগ্নিবৰ্ষী আকাশটা নহে, মাঠ-প্ৰস্তর নহে, মেঘ নহে, অথচ এই সবগুলি মিলিয়া যে গভীর ঐকতান সাধারণ মানুষের ইন্দ্ৰিয়গ্রাহ্যতার বাহিরে সর্বদাই বাজিতেছে, তাহা সে কেমন করিয়া শুনিয়া ফেলিয়াছে। অপু একেবারে অবাক হইয়া গিয়াছিল। তাহার নিজের শৈশবের চিন্তা হুবহু কাজলের মনে প্রতিফলিত হইয়াছে–হুবহু। ছোটবেলায় সেও রোয়াকে বসিয়া গ্ৰীষ্মের দুপুরে অবাক হইয়া আকাশ দেখিত। প্রকৃতির আশ্চর্য নিয়মগুলির কাছে শ্রদ্ধায় তাহার মাথা নত হইয়া আসে। মানুষের মতামত, ইতিহাসের গতি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করিয়া প্রকৃতি কঠোর হাতে পৃথিবী শাসন করিতেছে। প্রকৃতি স্পষ্ট, জড়তাশূন্য অথচ রহস্যময়। প্রকৃতির রহস্যময়তার প্রতি আকর্ষণ কাজলের রক্তেও সঞ্চারিত। আর মুক্তি নাই। সে মুক্তি পায় নাই, কাজলও পাইবে না।

রান্নাবান্না কোন রকমে হইতেছিল। সৌভাগ্যের কথা এই যে, কাজলের মুখে অপুর রান্না মোটামুটি খারাপ লাগে না।

কিন্তু এইভাবে বেশিদিন চলিবে না, তাহা অপু বুঝিতে পারিয়া একটি বুড়িকে রান্নার জন্য ধরিয়া আনিল। খুব বুড়ি নয়, দুইজনের রান্নার কাজ চালাইয়া লইতে পারে। বুড়িরও কোথাও আশ্রয় মিলিতেছিল না, বলিবামাত্র পোটল হাতে করিয়া আসিয়া পড়িল। তাহার ব্যস্ততা দেখিয়া অপু মনে মনে ভাবিল–আহা, বুড়ি মানুষ, কোথাও কেউই নেই। একে তাড়াব না, রেখে দেব যতদিন থাকে। মুখে বলিল–তোমাকে কী বলে ডাকব বলো দেখি? তোমার ছেলের নাম তো গোপাল? তাহলে গোপালের মা বলে ডাকব, কেমন?

–আর বাবা ছেলে। সে কী আমায় দেখে, না খেতে দেয়? তবুও কী জ্বালা, তার নাম ধবেই লোকে আমায় ডাকবে। যেখানে যাই, শুধু গোপালের মা আর গোপালের মা–

–তবে অন্য একটা কিছু বলো, সেভাবেই ডাকবাখন।

তাহাতেও বুড়ির আপত্তি। দেখা গেল যে ছেলে খাইতে বা পরিতে দেয় না, মুখে আপত্তি করা সত্ত্বেও বুড়ি তাহারই নামে পরিচিত হইতে চায়। অপুর কেমন মায়া পড়িয়া যাওয়ায় গোপালের মা থাকিয়া গেল।

মালতীনগরে আসিবার পরদিন অপু কাজলকে লইয়া বেড়াইতে বাহির হইল। পথটা বাজারেব মধ্য দিয়া গিয়া রেললাইন পার হইয়াছে, সে পথ ধরিয়া দুজনে কিছুক্ষণ হাঁটিল। বাজার ছাড়াইবাব পর বাঁদিকে একটি দোকান হইতে অপু একটা সিগারেট কিনিল। লুঙ্গি পর একজন মানুষ হাত-পা নাড়িয়া বলিতেছে–বেরিয়েছে কি এখন! সেই দুপুরের আগে একবার জাবনা খেয়ে বেরিযেছে। তা কোথাও খুঁজে পাচ্চি নে, কী করি বলো দেখি হরিধান? দুধেলো গাই–কোথাও বেঁধে রেখে দুধ টুধ দুয়ে নিচ্ছে না তো?

হরিধান, দোকানের মালিক, অপুকে পয়সা ফেরত দিতে দিতে বলিল–খুঁজে দেখা পাবে’খন, এখনও তো সন্ধে লাগে নি। তুমি বড়ো বেশি ভাবে কামাল।

কামাল একটা বিড়ি ধরাইয়া বসিল।

বাজার ছাড়াইয়া কাজল বলিল–বাবা, শোনো।

–কী রে!

–আমায় আর একবার কলকাতায় নিয়ে যাবে?

-কেন রে? শহর বুঝি খুব ভালো লাগে? বায়োস্কোপ দেখবি?

–না।

–তবে?

একটু চুপ করিয়া কাজল বলিল–যাদুঘর আবার দেখব।

অপু অবাক হইল, আনন্দিতও হইল।

–নিশ্চয় নিয়ে যাবো। আমারও দু-চার দিনের মধ্যে একবার কলকাতায় যেতে হবে। তোকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবো’খন।

পথটা এখন নির্জন, ফাঁকা। শহরের এদিকে লোকবসতি কম। কাজল চারিদিকে তাকাইতে তাকাইতে চলিয়াছিল। সারাদিন রৌদ্রে পুড়িবার পর সন্ধ্যায় মাটি হইতে কেমন চমৎকার একটা গন্ধ বাহির হয়। গন্ধটার সহিত গরমকালের একটা যোগাযোগ আছে। শীতকালেও তো রৌদ্র ওঠেকিন্তু তখন এমন গন্ধ বাহির হয় না। এক জায়গায় পথের ধারে অনেকগুলি রাধাকুড়া গাছ-হলদে। ফুল ফুটিয়া আছে। অপু ছেলেকে চিনাইয়া দিল-ওই দেখ, ওই হচ্ছে রাধান্ডুড়া ফুল। কালকেই নাম করেছিলাম, মনে আছে?

বেশ শান্ত সুন্দর সন্ধ্যা। এইবার একটি একটি করিয়া নক্ষত্ৰ উঠিবে। অপুর হঠাৎ মনে হইলবেশ হতো, যদি বাড়ি গিয়ে দেখতাম অপর্ণ জলখাবার তৈরি করে বসে আছে। কাজলের হাতমুখ ধুইয়ে খাবার খাইয়ে পড়তে বসাতো। আমায় লুচি আর বেগুনভাজা এনে দিয়ে চা চড়াতে যেতো। মন্দ হয় না। যদি সত্যিই–

অনেক দূর আসা হইয়াছে। সামনেই রেললাইন।

ফিরিবার জন্য অপু ছেলের হাত ধরিয়া টানিবে, এমন সময় কাজল মুখে একটা শব্দ করিয়া দাঁড়াইয়া গেল।

অপু সবিস্ময়ে তাকাইয়া দেখিল কাজল রেললাইনেব ধাবে ঢালু জমিটার দিকে চাহিয়া ভয়ে কাঠ হইয়া দাঁড়াইয়া আছে।

রেললাইনের পাশে একটা গরু পড়িয়া রহিয়াছে—মৃত। ট্রেনের ধাক্কায় নিশ্চয় মাবা গিয়াছে। শিং দুইটা ভাঙিয়া কোথায় গিয়াছে কে জানে, মেরুদণ্ড ভাঙিয়া শরীরটাকে প্রায় একটা মাংসপিণ্ডে পরিণত করিয়াছে। পিঠের কাছে চামড়া ফুটা হইয়া একটুকরা রক্তাক্ত মেরুদণ্ডের হাড় বাহির হইয়া আছে। ঘাড় ভাঙা, মুখের কোণে রক্তমাখা ফেনা।

–বাবা!

কাজল যেন কেমন হইয়া কাঁপিতে কাঁপিতে উবু হইয়া বসিয়া পড়িল, তাহার মুখের ভাব দেখিয়া অপু ভয় পাইয়া গেল।

-কী রে? ভয় কী? ওঠে। বাবা, মানিক আমার। কোন ভয় নেই।

কাজল রক্তশূন্য মুখে বলিল–সেই লোকটার গরু। একেবারে মরে গেছে বাবা? আমার খারাপ লাগছে।

বাড়ি আসিবার পথে কাজল কাঁদিয়া অস্থির। জোরে কাঁদে নাই, ফুঁপাইয়া কাঁদিতেছে। অপু অনুভব করিতেছিল, তাহার হাতের ভিতর কাজলের হাত বরফের মতো ঠাণ্ডা। অপুর নিজেরও খারাপ লাগিতেছিল। বীভৎস দৃশ্যটা। কেন যে ওই পথে গেল তাহারা।

–তুই অত ভয় পেলি কেন? হ্যাঁ রে?

কাজল জবাব দিতে পারিল না। তাহার মনের মধ্যে ঘুরিতেছিল ঈষৎ ফাঁক হওয়া রক্তফেনামাখা মুখ, ভাঙা মেরুদণ্ডের বাহির হইয়া থাকা হাড়টা আর মৃত গরুর পড়িয়া থাকিবার অস্বাভাবিক ভঙ্গি।

অসুন্দর জিনিসের সহিত তাহার পরিচয় কম, সুন্দর সন্ধ্যায় বেড়াইতে বাহির হইয়া এই প্রথম সরাসরি অসুন্দরের সহিত পরিচয় হইয়া গেল।

এ দিনটা কাজল ভুলিতে পারে নাই।

মালতীনগরে যে স্কুলে কাজল ভর্তি হইয়াছে, সেটা অপুর বাসা হইতে খুব একটা দূর নহে। তবু অপু কাজলকে স্কুলে পৌঁছাইয়া দিয়া আসে। আবার ছুটি হইলে লইয়া আসে। বাদবাকি সময় তাহার একবি, নিজস্ব। এই সময় সে একটি নূতন উপন্যাস লিখিয়া থাকে। প্রথম উপন্যাসের সাফল্য তাহাকে সাহসী করিয়াছে। এক উপন্যাসেই তাহার বলিবার কথা শেষ হইয়া যায় নাই। অনেক বাকি বহিয়াছে। এই উপন্যাসে তাহা লিখিবে।

আশেপাশের দুই একজন প্রতিবেশী অপুর কাছে যাতায়াত করিয়া থাকেন। ইঁহারা জানিয়া গিয়াছেন, অপু লেখক। অপুর উপন্যাস এরা পড়েন নাই, কিন্তু লেখকের উপর এঁদের অবিচল ভক্তি। ফলে শহরে সাহিত্যিকের আগমন সংবাদ রটিতে বিশেষ বিলম্ব হইল না। তাহার বাসায় কয়েকটি ছোকরা যাতায়াত শুরু করিল! ইহাদের রচনা অপুকে মনোযোগ দিয়া শুনিতে হইত– দরকার হইলে কলম চালাইয়া ঠিক করিয়া দিতে হইত। অপুর উপন্যাস ইহারা পড়িয়াছে। অপু অবাক হইয়া লক্ষ করিল, তাহার নাম বেশ ছাড়াইয়াছে। এত দ্রুত খ্যাতি আসিবে ইহা তাহার কল্পনার বাহিরে ছিল। একদিক দিয়া ভালেই হইয়াছে। একা থাকিতে হয়, এ ধরনের কিছু তরুণের সহিত আলাপ থাকা ভালো।

কাজলকে প্রতিবেশীব বাড়িতে রাখিয়া মাঝে মাঝে সে একদিনের জন্য কলিকাতায় যায়। বই হইতে আৰ্য হইতেছে মন্দ নহে! পাবলিশারের কাছে গিয়া অপু টাকা লইয়া যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি মালতীনগরে ফেরে। কাজলকে ছাড়িয়া সে বেশিক্ষণ থাকিতে পারে না। আজকাল তাহার এই ভাবিয়া অবাক লাগে যে, কাজলকে ফেলিয়া কীভাবে এতদিন সে বাহিরে পড়িয়া ছিল। হৌক ফিজি সুন্দর স্থান, কাজল সুন্দরতর।

কলিকাতায় একদিন তাহাকে প্রকাশকের দ্বারে দ্বারে পাণ্ডুলিপি লইয়া ফিরিতে হইয়াছে। নূতন লেখকের উপন্যাস কেউ ছাপিতে রাজি হয় নাই। এখন পরিস্থিতি কিছুটা অন্যরকম। প্রকাশক খাতির করিতেছে যত্ন করিতেছে। পূর্বের সে হেনস্থার দিন আর নাই।

একদিন প্রকাশকের দোকানে ঢুকিতেই প্রকাশক হাসিয়া বলিলেন, আসুন অপূর্ববাবু, বহুদিন বঁচবেন। এইমাত্র আপনার কথাই হচ্ছিল; ইনি হচ্ছেন ‘শরবী’ কাগজের সম্পাদক। আপনার একটা উপন্যাস চান, তাই ঠিকানা চাইছিলেন। তা আপনার নাম করতে কবতে আপনি এসে হাজির।

পরে পার্শ্বস্থ স্থূলকায় ব্যক্তিটির দিকে ফিরিয়া বলিলেন—নিন, আর ঠিকানা দিতে হল না, একেবারে লেখক মশাইকে ধবে দিলাম।

কথার্বতা ঠিক হইয়া গেল। আগামী সংখ্যা হইতে অপু লিখিবে। একটা বিজ্ঞাপন দেওয়া হইতেছে। সম্পাদক ভদ্রলোক অপুর লেখার অত্যন্ত প্রশংসা করিলেন।

অগ্রিম টাকা পকেটে লইয়া অপু পুরাতন দিনের মতো খেয়ালে কিছুক্ষণ রাস্তায় বাস্তায় বেড়াইল। এখন সে হোটেলে ঢুকিয়া যাহা ইচ্ছা এবং যত ইচ্ছা খাইতে পারে, ইচ্ছা করিলে নোটগুলি একটা একটা করিয়া হাওয়ায় উড়াইয়া দিতে পারে। আজ হইতে অনেকদিন আগে, অবশ্য খুব বেশিদিন আর কী, তাহাকে অভুক্ত অবস্থায় রাস্তায় বেড়াইতে হইয়াছে শুকনো মুখে। কেহ ভালোবাসিয়া বলে নাই, আহা, তোমার বুঝি খাওয়া হয় নি? এসো, যা হয় দুটো ডাল-ভাত–না, সেরূপ কেহ বলে নাই; ববং তেওয়ারী-বধূ বেশ ভালো ছিল, তাহার স্নেহে খাদ ছিল না। জীবনের পথে তেওয়ারী-বধূর মতো কয়েকজনের নিকট হইতে স্নেহস্পর্শ পাইয়াই তো কষ্টের মধ্যেও মানুষ সম্বন্ধে সে হতাশ হইয়া পড়ে নাই। আজ টাকা কয়টা পকেটে করিয়া সে পরিচিত স্থানগুলিতেঁ একবার করিয়া গেল। মনে মনে ভাবিল, মানুষ যেখানে কষ্ট পায়, ভগবান সেইখানেই আবার তাকে সুখ দেন। আমার সেই পুরোনো মেসের সামনেই পকেটে আজ একগাদা টাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। কথাটা ভাবিয়া তাহার কেমন অদ্ভুত লাগিল। মনে হইল, রাস্তার ওপারের ওই দোকানে বসিয়া থাকা ধূমপানরত মানুষটিকে ডাকিয়া বলে—শুনুন, আমি ওই গলিতে থাকতাম অনেকদিন আগে। খেতে পেতাম না, কলেজের মাইনে দিতে পারতাম না। মা বাড়িতে কষ্ট পেতেন, টাকা পাঠাতে পারতাম না। আর এখন আমার পকেটে এই দেখুন, অনেক টাকা-অনেক। এ দিয়ে আমি কী করি বলুন তো?

কিছুদিনের মধ্যেই অপু আরও একটি পত্রিকায় ধারাবাহিক উপন্যাস লিখিতে শুরু করিল। বাজারে তাহার বেশ নাম। বিশেষ করিয়া তরুণদের কাছে তাহার নূতন দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত আদর পাইতেছে। মালতীনগরের সেই তরুণ বাহিনী রোজ তাহার দুর্গ আক্ৰমণ করে, সে মাঝে মাঝে বিরক্ত হইলেও মুখে কিছু বলিতে পারে না। ছেলেগুলোকে সে পছন্দ করে, কিন্তু বড়ো বেশি বক বক করে তাহারা। অপুর মাথা ধরিয়া যায়।

অপু প্ৰতি মাসে একগাদা পত্রিকা ও বই কিনিয়া থাকে। ছেলের জন্য ভালো শিশুসাহিত্য আনে। এমন বই আনে, যাহা কাজলের মনেব গভীরে ঘুমন্ত ইন্দ্ৰিয়গুলিকে জাগাইয়া তোলে। কূপমণ্ডুক হইয়া বাঁচিয়া থাকিবার কোন অর্থ হয় না, ছেলেকে সে মধ্যবিত্ত মনের অধিকারী করিয়া গড়িবে না। অপু নিজে ওয়াইড ওয়ার্লড ম্যাগাজিন পড়িতে ভালোবাসে। সে পড়ে ও ভালো গল্প পাইলে তৎক্ষণাৎ ছেলেকে ডাকিয়া শোনায়। এইভাবে অপু ছেলের মনে একটা পিপাসা জাগায়।

কাজলের বিশেষ বন্ধু কেহ নাই। স্কুলে নাই, পাড়াতেও নাই। সে সমবয়সীদের মতো দৌড়ঝাপ করিতে পারে না-যেসব খেলায় শারীরিক কসরতের প্রযোজন, সেগুলি কাজল সভয়ে এড়াইয়া চলে। চেষ্টা করিয়া দেখিয়াছে, সে পারে না। এই তো সেদিন বেণু আর শ্ৰীশ আম পাড়িবার জন্য মুখুজ্যেদের বাগানে পাচিল ডিঙাইয়া ঢুকিতেছিল। আম খাইতে কাজলের আপত্তি নাই, কিন্তু মধ্যে প্রাচীররূপী বড়ো একটা বাধা রহিয়াছে। অতি উঁচু পাঁচিল তাহার পার হইবার সাধ্য নাই! বেণু আর শ্ৰীশ অদ্ভুত কৌশলে তর তর করিয়া পাঁচিলের মাথায় উঠিয়া গেল। শ্ৰীশ মিটমিটি হাসিয়া বলিল–কী রে, পাববি নে?

তাহাদের উঠিবার কায়দা দেখিয়া কাজলের মনে হইতেছিল, ভূমিষ্ঠ হইয়া অবধি তাহারা এই কার্যের অনুশীলন করিয়াছে। মনে মনে নিজের অক্ষমতা বুঝিয়া কাজল ম্রিযমাণ হইয়া বলিল–না ভাই, আমার ডান পায়ে ব্যথা। একটা ফেলে দে না ভাই, খাই।

শ্ৰীশ এবং বেণুরা। দয়া করিয়া একটা দুইটা আমি তাহাকে খাইতে দেয়। উপায় কী! নিজ উঠিয়া পাড়িবার সাধা তাহার নাই।

বাহিরের দুনিয়ায় লাফালাফি করিয়া বেড়াইবার সমর্থ্য নাই বলিয়া সে ঘরের মধ্যে অধিকাংশ সময় কাটায়। মাঝে মাঝে কাজল বাবার ওয়াইড ওয়ার্লড ম্যাগাজিনগুলি নাড়িয়া-চাড়িয়া দেখে। গল্পগুলির আকর্ষণ তীব্র। ছবি দেখিয়া তাহার গায়ের লোম কাঁটা দিয়া ওঠে- যে ছবিটায় খুব রহস্যজনক ঘটনার আভাস পাওয়া যায়, বাবাকে বলিয়া গল্পটা কাজল শুনিয়া লয়।

অপু বুঝিতে পারে, কাজলের মানসিক বৃদ্ধি শুরু হইয়াছে। ঠিক এই একই জিনিস সেও করিত দেওয়ানপুরের স্কুলে। কঠিন ইংরাজি বুঝিতে না পারিলে ছবি দেখিয়া কিছুটা আভাস পাইবার চেষ্টা করিত, অনেক সময় রমাপতিদাকে ধরিয়া গল্পটা বুঝিয়া লইত। সেই একই জিনিস আবার ঘটিতেছে। রক্তের ভিতর অদৃশ্য বীজ রহিয়াছে–তাহাই এ সব সম্ভব করিতেছে।

ধারাবাহিক উপন্যাস দুইখানি শুরু করিবার কিছুদিন পরে অপু বিকালে বসিয়া ছেলের সঙ্গে জলখাবার খাইতেছিল। গোপালের মা পরোটা ভাজিয়া দিয়া রাস্তার ও পারের দোকানে দোক্তা আনিতে গিয়াছে। এমন সময় বসিবার ঘরের দরজার মুখে আসিয়া দাঁড়াইল একটি মেয়ে! কিশোরী বলাই অধিক সঙ্গত, মেয়েটির বয়স কোনমতেই পনেরো-ষোলর বেশি নহে। অপু অবশিষ্ট পরোটাসুদ্ধ থালাখানা তাড়াতাড়ি খাটের নিচে লুকাইবার চেষ্টা করিল।

আশ্চর্যের উপর আশ্চর্য! মেয়েটি একা আসে নাই, তাহার পিছনে আরও একটি মেয়ে আসিয়াছে। এ মেয়েটি হয়তো প্রথমটির চেয়ে বৎসর দুই-তিনের বড়ো হইবে।

অপু উঠিয়া কোঁচা দিয়া খাটটা পরিষ্কার করিয়া মেয়ে দুটিকে বসিতে দিল। কাজল অবাক হইয়া ব্যাপারটা দেখিতেছে। অপেক্ষাকৃত কমবয়সী মেয়েটি লজ্জিত সুরে বলিল–আপনিই তো অপূর্বকুমার রায়, লেখক?

অপুর মনে ভারি আনন্দ হইল। সে লেখক বলিয়া মেয়ে দুটি দেখা করিতে আসিয়াছে। এ অভিজ্ঞতার স্বাদ তাহার নিকট একেবারে নূতন। প্রশংসা সে আগেও পাইয়াছে, কিন্তু মেয়েদের নিকট হইতে তাহ পাওয়ার একটা আলাদা আনন্দ রহিয়াছে।

মেয়ে দুটি মালতীনগরেই থাকে। ছোট মেয়েটির নাম হৈমন্তী, বড়টি তাহার দিদি, নাম—সরযূ। হৈমন্তীর সাহিত্যে গভীর অনুরাগ আছে, সে অপুর লেখা পড়িয়া অবাক হইয়াছে তাহার ক্ষমতায়। অপু কি তাহাকে একটা অটোগ্রাফ দিবে?

অপু সত্যই অবাক হইল। মফঃস্বলে মেয়েরা একা বেড়াইতেছে, ইহা বেশ নূতন দৃশ্য। তাহা ব্যতীত কলিকাতায় অটোগ্রাফ চাহিলে ততটা অবাক হইবার কারণ থাকে না, কিন্তু মালতীনগরে অটোগ্রাফা! নাঃ, মেয়ে দুটি দেখা যাইতেছে বেশ আলোকপ্ৰাপ্তা।

অটোগ্রাফ দেওয়ার পর অপু তাহাদের চা খাইতে অনুরোধ করিল। তাহারা লেখকের সহিত কথা বলিতেই আসিয়াছিল, অতএব বিশেষ আপত্তি করিল না।

কথায় কথায় প্রকাশ পাইল হৈমন্তী গল্প লিখিয়া থাকে। অপু বলিল– সেটা আগে বলেন নি কেন? বাঃ, খুব ভালো কথা। একদিন নিয়ে আসুন, পড়া যাক। দিদি কথাটা প্রকাশ করিয়াছিল। হৈমন্তী সরযূর দিকে কটমট করিয়া তাকাইল। অপুর মজা লাগিতেছিল। হৈমন্তীর ছেলেমানুযি তাহার মনের আনন্দকে হঠাৎ জগোইয়া তুলিল। নারীর স্পর্শ না থাকিলে জীবনটা পানসে লাগে, নারীর কল্যাণ-হস্তই জীবনের রূপ পালটাইয়া দেয়।

হৈমন্তী একখানা চাঁপাফুল রঙের শাড়ি পরিয়া আসিয়াছিল, শাড়ির আঁচল হাতে জড়াইতে জড়াইতে লজ্জিত মুখে বলিল–দিদির যেমন কাণ্ড! লেখা-টেখা কিছু নয়, ও এমনি–

সবযু বাধা দিয়া বলিল–না অপূর্ববাবু বিশ্বাস করবেন না। ওর কথা। এই সেদিনও ওর লেখা বেরিয়েছে কাগজে।

সরযূ যে পত্রিকার নাম করিল, সেটা শুনিয়া অপু সত্যিই বিস্মিত হইল। বাংলা দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাসিকপত্রে যদি এই দুগ্ধপোষ্য বালিকার রচনা ছাপা হইয়া থাকে, তবে অবশ্যই একবার পড়িয়া দেখিতে হইতেছে।

অপু বলিল–কোনো আপত্তি শুনছি নে, কবে লেখা আনবেন বলুন। ফাঁকি দিলে চলবে না।

সরযূ বলিল–বাবাও শুনেছেন। আপনি এখানে থাকেন। উনি বলেছিলেন একদিন আপনাকে দুপুরে খাবার কথা বলতে। না, আপনারও কোন আপত্তি শোনা হবে না। কবে যাবেন বলুন।–যেদিন যাবেন, সেইদিন হৈমন্তী আপনাকে লেখা শোনাবে।

অপু বিশেষ আপত্তি করিল না। রবিবারে নিমন্ত্রণ রহিল। কাজলও সঙ্গে যাইবে হৈমন্তী এবং সরযূ দুইজনে কাজলকে অনেক আদর করিয়া বিদায় লইল। ঠিকানাটা অপু রাখিয়া দিল।

মেয়ে দুটি বিদায় লইলে অপু বিছানার কাছে আসিয়া বসিতে যাইবে, চাদরের উপর নজর পড়িল-কয়েকটা বেলফুল। তখনও বেশ তাজা, বেশিক্ষণ তোলা হয় নাই। অপু মনে মনে ভাবিল-এখানটায় হৈমন্তী বসেছিল। ওই নিয়ে এসেছিল ফুলগুলো। ভুলে ফেলে গেছে, আচ্ছা! মেয়ে যাহোক–

অপু ফুলগুলি তুলিয়া একবার গভীর ঘ্রাণ লইল।

রবিবারে ছেলেকে লইয়া অপু নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে গেল। নিজে একটু বিলাসিত করিতে ছাড়ে নাই, একটা শাস্তিপুরী ধুতি পরিয়াছে। কিন্তু সেই তুলনায় জামাটা ভালো হইল না–ময়লা মতো। অথচ এই ধুতিটা পরিয়া নিমন্ত্রণ খাইতে যাইবার তাহার বড়ো শখ। ফলে বিসদৃশ জামাকাপড় পরিহিত অপু নিমন্ত্রণ খাইতে গেল।

বাড়িতে পা দিতেই হৈমন্ঠীর বাবা আসিয়া তাহাকে অভ্যর্থনা করিয়া বসাইলেন। ভদ্রলোক সরকারি কাজ করেন–বদলির চাকরি। তিনি অপুর উপন্যাসটি পড়িয়াছেন। সম্প্রতি যে পত্রিকা দুটিতে অপু উপন্যাস লিখিতেছে, সেগুলিও তাহার বাড়িতে রাখা হয়।

অপু অবাক হইয়া দেখিল, বাড়িময় সাহিত্যের আরহাওয়া। বাবা, ভাই, বোন সবাই বেশ শিক্ষিত ও উদার। বসিবার ঘরে প্রচুর বই রহিয়াছে—অগোছালোভাবে খাটের উপর ও টেবিলের উপর ছড়ানো। অপু নিজের অভিজ্ঞতা হইতে দেখিয়াছে যে বাড়িতে বই সাজানো থাকে, সে বাড়িতে পাঠক কম। পড়ুয়াদের বই কখনও গোছানো থাকিতে পারে না। যাহারা শখের আসবারের মতো বই দিয়া ঘর সাজাইয়া সুরুচির পরিচয় দিতে চায়—তাহদের বই সাজানো থাকিতে পারে। হৈমন্তীদের পরিবার সম্বন্ধে অপুর বেশ একটা শ্রদ্ধা জন্মিল। তাহার মনে বদ্ধমূল ধারণা আছে-যাহারা বই পড়িতে ভালোবাসে তাহারা কখনও খারাপ মানুষ হইতে পাবে না। অনেকদিন পরে এই বাড়িতে আসিয়া অপুর মনে হইল, বেশ সহজ পছন্দসই আবেষ্টনীর মধ্যে আসিয়াছে। কাজল আসিবামাত্রই বই-এর কাছে গিয়া বসিয়াছে, বই পাইলে সে আর কিছু চায় না। অপু কিছুক্ষণ বাদে বলিল–তা, এবার লেখাগুলো পড়লে হতো না?

হৈমন্তী কিছুটা সঙ্কোচের সহিত খান দুই পত্রিকা আনিয়া অপুর হাতে দিল। অপু ব্যগ্রতার সহিত একটি হইতে সূচিপত্র দেখিয়া গল্প খুঁজিয়া পড়িতে শুরু করিল। ভাবিয়াছিল, মেয়েলি প্রেমের মিষ্টি মিষ্টি গল্প হইবে। একটি মেয়েকে একজন ছেলে দূর হইতে ভালোবাসিল, দুই-একটা চিঠি দিল। বাগানে একবার দেখাও হইল–পরে অভিভাবকগণ জানিতে পাবিয়া মেয়েটিকে ঘরে বন্দী করিল। ইহার পর নায়ক দাড়ি কামানো বন্ধ করিল, বোগা হইতে লাগিল এবং স্কুল-মাস্টারিতে ঢুকিয়া বড়ো বড়ো কবিতা লিখিয়া পরে টিবি হইয়া সাধনোচিত ধামে প্রস্থান করিল। ইহা ব্যতীত মেয়েরা আর লিখিবেই বা কী?

একটু তাচ্ছিল্যের সহিত পড়িতে শুরু করিয়াছিল বলিয়াই বোধ হয় ধাক্কাটা জোরে লাগিল। সাধারণ ন্যাকা-ন্যাক ভাষায় লেখা নহে–প্রেমের গল্পও নহে। একটি মেয়ে গল্প লিখিতে ভালোবাসিত। বিবাহ হইয়া পতিগৃহে অজস্র সাংসারিক কাজের ভিড়ে তাহার লেখিকা-সত্তা গেল চাপা পড়িয়া। একদিন বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় মেয়েটি অবসর পাইয়া টিনের তোরঙ্গ খুলিয়া তাহার লেখার খাতা বাহির করিয়াছে। সঙ্গে সঙ্গে ভিজা বাতাসের সহিত তাহার কুমারী জীবনের স্মৃতি যেন হু হু করিয়া ঢুকিয়া পড়িল ঘরের ভিতর। এই গল্প। ভাষার উপর লেখিকার দখলের কথা সহজেই বোঝা যায়। অপু অবাক হইল। গল্প পড়িয়া মামুলি ধরনের কী প্রশংসা করিবে তাহা ঠিক ছিল, এখন গল্পটা সত্য সত্যই ভালো হইয়া পড়ান্য সে কিছু বলিতে পারিল না।

খাইতে বসিয়া অপু বলিল–সত্যিই খুব ভালো লেখা আপনার। এতটা ভালো, মিথ্যে বলবো না, আমি আশা করতে পারি নি।

হৈমন্তী বলিল–আমাকে আর আপনি বলছেন কেন, তুমি বলুন।

–তোমার গল্প সত্যিই ভালো লাগল হৈমন্তী। এত সাধাবণ প্লট নিয়ে এত চমৎকার কবে তা ফুটিয়ে তোলা–না, তোমার মধ্যে শিল্পীমান লুকিয়ে আছে।

হৈমন্তীর বাবা হাসিয়া বলিলেন-অত প্রশংসা করবেন না অপূর্ববাবু, মাথা বিগড়ে যাবে ওর। তবে হ্যাঁ, এ মেয়েটি আমার সত্যিই–পড়াশুনোতেও বড়ো ভালো ছিল। বরাবর ক্লাসে ফার্স্ট হতো। বড়ো অসুখে পড়েছিল বলে বছরখানেক পড়া বন্ধ আছে।

খাওয়া হইলে হৈমন্তী অপুর জন্য মশলা আনিল। মশলা লইতে লইতে অপু জিজ্ঞাসা করিল–আচ্ছা, সেদিন তুমি আমার খাটের ওপরে বেলফুল ফেলে এসেছিলে, না? তুমি যাবার পর দেখি পড়ে আছে। আমার অবশ্য ভালেই হয়েছিল, সারা সন্ধে গন্ধ শুঁকে শুঁকে বেশ কবিত্ব করা গেল।

মাথা নিচু করিয়া হৈমন্তী বলিল–ফেলে আসি নি, আপনার জন্যেই নিয়ে গিয়েছিলাম, রেখে এসেছি। আপনার লেখা পড়ে মনে হয়েছিল ফুল পেলে আপনি খুশি হবেন।

-আমার জন্য নিয়ে গিয়েছ। তো আমাকেই দিলে না কেন?

উত্তরে হৈমন্তী কিছু বলিল না, কিছুক্ষণ চুপ করিয়া পরে মাথা তুলিয়া অপুর দিকে তাকাইয়া একটু সলজ্জ হাসি হাসিল।

-কই বললে না তো দাওনি কেন?

–দিয়েই তো এসেছিলাম। আপনি বুঝতে পারেন নি, সে কি আমার দোষ?

বাড়ি ফিরিতে ফিরিতে কাজল বলিল–বেশ লোক এরা, না বাবা! উত্তর না পাইয়া অভিযোগের সুরে বলিল–হুঁ। বাবা, তুমি সেই থেকে শুনছো না কিছু!

অপু চমক ভাঙিয়া বলিল–অ্যাঁ, ও হ্যাঁ তা ভালো লোক। বেশ ভালো লোক–নাও, এখন তাড়াতাড়ি পা চালাও, বাড়ি গিয়ে তোমার ইংরাজি বানানগুলো—

হৈমন্তী প্রায়ই অপুর বাসায় আসে। অপু সম্প্রতি খ্যাতি পাইতেছে–কিন্তু এই মেয়েটি তাঁহাকে সত্য করিয়া চিনিয়াছে। পুস্তক সমালোচকদেব দায়সারা ভাসা ভাসা আলোচনা নহে, হৈমন্তী তার অন্তরে প্রবেশ করিয়া তার চোখ দিয়া বিচার করিয়াছে। অপুর লেখক এবং ব্যক্তিসত্তাকে এমন করিয়া আর কেহ আদর করে নাই–এক লীলা ছাড়া। হৈমন্তী তাহাকে বুঝিতে পারিয়াছে, চিনিতে পারিয়াছে। অপুর মনে ধীরে ধীরে কেমন একটা বুভুক্ষা জাগিয়া উঠিল। ভালোবাসা পাইবার ক্ষুধা। তার মনে হইল, সারাজীবন এইভাবে ভাসিয়া বেড়ানো সম্ভব নহে, জীবনের মূল মাটির মধ্যে চালাইয়া নিজেকে মৃত্তিকার উপরে প্রতিষ্ঠিত করিবার দিন আসিয়াছে। যতবার সে স্থায়ী হইবাব চেষ্টা করিয়াছে, দুর্ভাগ্যের ঝড়ে তাকে ভাসাইয়া লইয়াছে দূরে। এখন গৃহের শাস্তি পাইতে ইচ্ছা করে। তবে সে স্থাণু হইয়া পড়িতে চায় না, গৃহকে সে পায়ের বেড়ি না ভাবিয়া জীবনানন্দের একটি দিক হিসাবে পাইতে চায়।

একদিন বিকালে হৈমন্তী আসিল। সঙ্গে তাহার ভাই। অপু হাসিয়া বলিল–আরে, এসো, এসো। ভালোই হলো। বিকেলটা মোটে কাটছিল না, এখন বেশ গল্প করা যাবে তোমার সঙ্গে।

–তা তো করবেন। কিন্তু আজ আমার একটা গল্প শুনতে হবে আপনাকে। দেখছেন তো, একদিন প্রশ্ৰয় দিয়ে কী কাণ্ড করেছেন!

–বারে, সে কী কথা! নিশ্চয় শুনব গল্প। তোমার গল্প আমার সত্যিই ভালো লাগে হৈমন্তী, সেদিন তোমায় মিথ্যে বলিনি। মামুলি প্রশংসাও করিনি। সত্যিই তোমার মধ্যে অদ্ভুত গুণ আছে। কোত্থেকে পেলে বলে তো?

-বাড়িয়ে বলা আপনার অভ্যোস। আমার লেখা এমন কিছু নয়—

জোর তর্ক শুরু হইয়া গেল। অপু প্রমাণ করিবেই হৈমন্তী ভালো লিখিয়া থাকে। আধঘণ্টা বাগযুদ্ধের পর হৈমন্তী হার মানিল। অপু বলিল–চলো, উঠোনে মাদুর পেতে বসি, ভেতরে বড্ড গরম।

চারজনে উঠানে বসিল। কাজলের সহিত হৈমন্তীর আশ্চর্য সম্পর্ক গড়িয়া উঠিয়াছে। প্রথম প্রথম কাজল তাহাকে তত পছন্দ করিতে পারে নাই। কিন্তু পরে কী ভাবে যেন কাজলের মতের পরিবর্তন ঘটিয়াছে, এখন সে সর্বদা হৈমন্তীর কাছে কাছে ঘোরে। হৈমন্তী প্ৰথম দিন দেখিয়াই ভালোবাসিয়াছিল। কাজলের উজ্জ্বল বুদ্ধিদীপ্ত চোখ, মুখের গড়ন, সবটাই যেন অপুর ধাঁচে গড়া। দেখিলে আদর না করিয়া থাকা যায় না।

সন্ধ্যা হইয়া আসিতেছিল। কাজল হৈমন্তীর কোলের কাছে ঘোষিয়া বসিয়াছে। প্ৰতাপ (হৈমন্তীর ভাই) হাঁটুর উপরে থুতনি রাখিয়া কী যেন ভাবিতেছে। উঠানের সন্ধ্যামালতীর ঝাড়ে ঝিঁঝির শব্দ। সমস্ত দিনের তাপের পর এখন চারিদিকে কেমন শান্ত স্তব্ধতা।

হঠাৎ একমুহূর্তের জন্য অপুর কেন যেন ফিজির সমুদ্রবেলার কথা মনে পড়িল। এই সময় স্কুল হইতে বাড়ি ফিরিয়া পাউরুটি ও সামুদ্রিক মাছের ঝোল দিয়া জলযোগ করিয়া সে বেলাভূমিতে আসিয়া বসিত। সমুদ্রের ওপরেই একটি ছোট শহরে সে মাস্টারি করিত। কোনদিনই তার তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরা হইত না। সে পা ছাড়াইয়া বসিয়া থাকিত। সামনে অবিশ্রাস্ত গর্জন করিতেছে সমুদ্র। মাঝে মাঝে ঢেউগুলি তাহার কাছ বরাবর আসিয়া পড়িতেছে, চলিয়া যাইবার সময় ফেলিয়া যাইতেছে একটি টানা লম্বা সাদা রেখা আর কয়েকটি ঝিনুক। অপুর অদ্ভুত অনুভূতি হইত-একটা অপার রহস্যের অনুভূতি। সমুদ্রের প্রকাণ্ডত্বের সহিত নিজেকে একাত্ম করিবার মহৎ অনুভূতি। অথচ এই এখন সে মালতীনগরে বসিয়াও তো বেশ আনন্দ পাইতেছে। অত বিশাল দৃশ্যের সম্মুখীন যে হইয়াছে—তাহার এই ক্ষুদ্র স্থানে আরদ্ধ থাকিয়াও কি আনন্দ পাওয়া সম্ভব?

অপু মনে মনে নিজের আনন্দের কারণটা অনুভব করিল। উন্মত্তের মতো উল্কাবেগে পৃথিবীর এ প্রান্ত হইতে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরিয়া মরিলেই সার্থকতা লাভ হয় না। জীবনের আনন্দ রহিয়াছে অনুভূতির গাঢ়ত্বের ভিতর, জীবনকে গভীরভাবে উপলব্ধি করিবার ভিতর। ফিজির সমুদ্রতীরে বসিয়া সে যেমন হইতে পারে–মালতীনগরেও হইতে পারে।

স্তব্ধতা ভাঙিয়া অপু বলিল–তুমি গান গাইতে পারো হৈমন্তী?

একটু চুপ করিয়া থাকিয়া হৈমন্তী বলিল–পারি।

—একখানা গাও না, শুনি।

সামান্য পরেই হৈমন্তী গাহিল—’দিনের শেষে ঘুমের দেশে ঘোমটা পরা ওই ছায়া, ভুলালো রে ভুলালো মোর প্ৰাণ।’

অপু সামনের দিকে ঝুঁকিয়া শুনিতেছিল। হৈমন্তীর গলা ভালো। বিশেষ করিয়া গানেব কথা এবং উদাস সুব অপুর হৃদয় স্পর্শ করিল। পরিবেশের সঙ্গে গানটা যেন কেমন করিয়া মিলিয়া গেল।

‘ঘরেও নহে পারেও নহে
যে জন আছে মাঝখানে
সেই বসেছে ঘাটের কিনারায়-’

গান শেষ হইয়া গেল। অন্ধকার নামিয়াছে। বেশ বাতাস। অপু ওপরে তাকাইল–সব নক্ষত্র এখনও দেখা যাইতেছে না বটে, কিন্তু বৃহস্পতি গ্ৰহ ঝকঝক করিতেছে। অপু বলিল–বৃহস্পতি চেনো? ওই দেখ। ওই যেটা ও-বাড়ির কার্নিসের ডানদিকে জ্বল জ্বল করছ–দেখছো?

–হ্যাঁ।

—ভাবো দেখি, ওটা পৃথিবীর চেয়ে কত বড়। অন্ধকারের বুকে দীর্ঘপথে সূর্যকে পরিক্রমা করছে সৃষ্টির উষাকাল থেকে। ও রকম কত গ্রহ, কত নীহারিকা ধূমকেতু মহাশূন্যের। অকল্পনীয় ব্যাপ্তিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। জীবনটা বড়ো অদ্ভুত, বড়ো সুন্দর, না? তুমি অনুভব করো?

–করি। সেজন্যই তো আপনার লেখা আমার ভালো লাগে।

একটা দমকা বাতাস আসিল। সন্ধ্যামালতীর ঝাড়ে লাগিল দোলা। অনেক শূকনো পাতা খড়খাড় শব্দ করিয়া উঠানের উপর দিয়া সরিয়া গেল। কাজল বলিল–সেই যে বাবা তুমি বলেছিলে, এদের দেবে সেই জিনিস–

অপু হাসিয়া বলিল–ওই দ্যাখো, একদম ভুলে বসে আছি। কলকাতা থেকে অরেঞ্জ ক্রীম দেওয়া বিস্কুট এনেছি। তাই কাজলকে বলেছিলাম, তোমরা এলে দেবার কথা। ভাগ্যিস তুই মনে করিয়ে দিলি খোকা–

অপু উঠিয়া ঘরে বিস্কুট আনিতে গেল।

হৈমন্তীদের বাড়িতে অপু প্রায়ই যাতায়াত করে আজকাল। হৈমন্তীর বাবা-মা তাহাকে পাইলে সত্যই খুশি হন। সে গিয়া গল্পগুজব করিয়া জলখাবার খাইয়া বাড়ি ফেরে। কাজলও সঙ্গে যায়। মাঝে মাঝে গানের আসর বসে, হৈমন্তী আগে হইতে নিমন্ত্ৰণ করিয়া যায়। সাংস্কৃতিক আরহাওয়া অপু পছন্দ করে, ফলে এ বাড়ির সহিত তাহার ঘনিষ্ঠতা গড়িয়া উঠিতে বেশি দেরি হয় নাই।

অপু অনেক ভাবিয়া দেখিয়াছে, এক সারাজীবন কাটানো তাহার পক্ষে সম্ভবপর নহে। অপর্ণর কথা ভাবিয়াই সে অন্তর হইতে সায় পাইতেছিল না। কিন্তু পরে চিন্তা করিয়া দেখিল, অপর্ণার স্মৃতি তাহার মনের যে গোপন কন্দরে স্থায়ী রঙে আঁকা হইয়া গিয়াছে—সেখানে আর কাহারও স্থান নাই। কিন্তু হৈমন্তীকে সে অস্বীকার করিতে পারিবে না। সে যদি বলে-আমি হৈমন্তীকে ভালবাসি না, তবে তাহা মিথ্যা কথা বলিবে।

অপর্ণার স্মৃতিকে শ্রদ্ধার আলোয় বাঁচাইয়া রাখিয়াই সে বর্তমান সত্যকে মর্যাদা দিবে। একমাত্র ভয় ছিল কাজলকে লইয়া। কিন্তু কাজল ও হৈমন্তী পরস্পরকে নিকটবন্ধনে বাঁধিয়াছে। সেদিক দিয়া চিন্তার আর কারণ নাই।

একদিন অপু কথাটা হৈমন্তীর বাবার কাছে পাড়িল। ভদ্রলোক আপত্তি করিলেন না। অপু সজ্জন, সুপুরুষ, বাজারে নামডাক হইয়াছে। সম্প্রতি বই লিখিয়া ভালো উপার্জন করিতেছে। এমন পাত্রের সহিত বিবাহ না দিবার কোনো কারণ নাই। তিনি নিজেও বুদ্ধিমান এবং সাহিত্যরসিক। অপুর ব্যক্তিত্ব এবং রচনা-ক্ষমতা তাহাকে মুগ্ধ করিয়াছিল। তিনি মত দিলেন।

দিনস্থির করিবার জন্য ভিতর বাড়ি হইতে পঞ্জিকা আনানো হইল।

০৪. বিবাহের পর মাস তিনেক কাটিয়াছে

বিবাহের পর মাস তিনেক কাটিয়াছে। বৃষ্টি তেমন হইতেছে না। আকাশের রঙ কটা, তামার মতো। গরমে দেশসুদ্ধ লোক হাঁপাইয়া উঠিয়াছে। মাটিতে বড়ো বড়ো ফাটল, বৃষ্টির জন্য আকাশের দিকে মুখব্যাদান করিয়া রহিয়াছে। গরমে কাকদের স্বরভঙ্গ হইয়াছে, ডাকিলে তীব্র কা-কা শব্দের বদলে একটা ফ্যাসফ্যাস শব্দ বাহির হইতেছে মাত্র। লোকে প্রতি দণ্ডে একবার আকাশের দিকে তাকাইয়া মেঘ আসিল কিনা দেখিতেছে।

অপু স্ত্রী-পুত্ৰকে মালতীনগরে রাখিয়া নিশ্চিন্দিপুরে গেল। হৈমন্তীকে সে দেশের বাড়িতে রাখিবে। মালতীনগর ভালো জায়গা হইতে পারে, কিন্তু মালতীনগরের সহিত তাহার আত্মিক যোগাযোগ নাই। যদি গৃহী হইতে হয়, নিশ্চিন্দিপুরে সে গৃহী হইবে!

রাধারমণ চাটুজ্যের কাছে খোঁজ করিতে বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেল। তাহদের পুরানো ভিটার কাছেই ছোট পাকাবাড়ি, মন্দ নহে। দামও অপুর কাছে সস্তা বলিয়া বোধ হইল। নিজেদের ভিটায় নূতন করিয়া বাড়ি তুলিতে গেলে যা খরচ পড়ে, তাহা এখন অপুর পক্ষে জোগাড় করা মুশকিল। বাড়ি একেবারে ভাঙিয়া পড়িয়াছে–তাহার উপর বাড়ি তোলা অনেক ঝামেলার কাজ। ফলে অপু এই বাড়ি কেনাই মনস্থ করিল।

রাধারমণ হাসিয়া বলিলেন–আমাদের বাড়ির কাছে হল। আমরা দু’ভাই ও বাড়ির একেবারেই পাশেই থাকি কিনা। বেশ গল্প-টল্প করা যাবে। আপনার মতো পড়শী পাওয়া, বুঝলেন কিনা, রীতিমত ভাগ্যের ব্যাপার।

অপু প্ৰথমে রাধারমণের গায়েপড়া ভাবটা পছন্দ করে নাই, কিন্তু পরে লোকটাকে ভালো লাগিয়া গেল। একটু বেশি কথা বলিলেও চাটুজ্যে লোক মন্দ নহে।

মালতীনগরে ফিরিবার আগে অপু একবার জঙ্গলাবৃত পুরানো ভিটার সামনে গিয়া দাঁড়াইল। মনে মনে বলল–বৌ নিয়ে আবার আসছি তোমাদের কাছে ফিরে। দেখলে তো, কোথাও থাকতে পারলুম না। তোমরা আশীৰ্বাদ করো, কাজল যেন মানুষ হয়। যেন ওর জীবনে পূর্ণতা আসে।

হৈমন্তীকে লইয়া নিশ্চিন্দিপুরে আসিলে বেশ বড়ো রকমের হৈ-চৈ হইল। রানি আগে হইতেই অপুর কেনা বাড়িতে আসিয়া প্রস্তুত হইয়াছিল। আরও অনেকে আসিয়া ভিড় জমাইয়াছিল উঠানে। অপুরা আসিতেই রানি সবার আগে আসিয়া অভ্যর্থনা করিল, হৈমন্তীর পিঠে হাত দিয়া তাহাকে ঘরের ভিতর লইয়া গেল।

গোলমাল মিটিলে অপু বলিল–বৌ কেমন লাগল রানুদি?

–সুন্দর হয়েচে। চমৎকার বৌ হয়েচে। তুই যে বিয়েথাওয়া করে আবার এসে গ্রামে উঠেছিস, তাতে যে কী খুশি হয়েচি, তা আর–এবার মন দিয়ে সংসারধর্ম কর। বড্ড বাউণ্ডুলে হয়ে গিয়েছিলি তুই।

সর্বাপেক্ষা খুশি হইয়াছে কাজল। এই কদিন তাহাকে স্কুলে যাইতে হইতেছে না, পড়া মুখস্থ করিতে হইতেছে না। বাবা বলিয়াছে, গ্রামের কাছেই স্কুলে ভর্তি করিবে। তাহাতে যে দু’একদিন লাগিবে, তাহা বেশ মজায় কাটিয়া যাইবে।

নিশ্চিন্দিপুরে ফিরিবার সময় অপু ছেলের কথা ভাবিয়াছিল। শেষে ভাবিল–কী আর হবে, গ্রামের স্কুলেই ভর্তি করিয়ে দিই। বাদবাকি পড়া আমি নিজে দেখব’খন। আমি নিজেও তো একসময় গ্ৰাম্য স্কুলে পড়েচি, আমার কি পড়াশুনো কিছুই হয়নি?

প্রতিবেশীরা ফিরিয়া গিয়াছে। কাজল রানির সহিত তাহদের বাড়ি গিয়াছে। দুপুরে অপু ঘরে ঢুকিয়া বলিল–প্রথম দিন আর বেশি কিছু রান্না করতে হবে না। যাহোক একটা ছেচকি-টেচকি কিছু নামিয়ে ফেলো। এমনিতেই আসার কষ্ট গেছে–রানুদি ডাল আর তরকারি পাঠিয়ে দেবে বলেছে। বলেছে, নতুন বৌ এল, তাকে খাটালে গায়ের নিন্দে হবে যে।

হৈমন্তী মুখ তুলিয়া নতুন ঘরকন্না করিবার আনন্দে হাসিল। সঙ্গে সঙ্গে অপুর মনে একটা আনন্দেব রেশ ছড়াইয়া পড়িল। সে সংসাব করিতেছে স্ত্রী-পুত্ৰ লইয়া। সবাই খুশি। চারিদিক বেশ কেমন ভরিয়া উঠিয়াছে।

সে হৈমন্তীকে জিজ্ঞাসা করিল–তুমি অনেক বড়ো বড়ো জায়গায় ঘুরেচো বাবার সঙ্গে। এই অজ পাড়াগাঁয়ে থাকতে পারবে তো?

–পাববো মশাই, পারবো। আমি সে রকম মেয়ে নই, তা হলে তোমাকে বিয়ে করতাম না। ববং শহরই আমার ভালো লাগে না।

–বিকেলে তোমাকে নিয়ে নদীতে যাবো গা ধুতে। এই পেছন দিয়েই পথ, বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে। দেখো, খুব ভালো লাগবে।

–তুমি তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। বেলা পড়ে এলো যে, কাজল কই?

–সে রানুন্দির ওখানে খাবে। না, না, শুধু আমাকে নয়, তোমারটাও বাড়ো–একসঙ্গে নিয়ে বসে যাই।

–তুমি খেয়ে ওঠে তো আগে, তারপর আমি বসবো।

বিকাল হইয়া আসিতেই অপু, হৈমন্তীকে লইয়া পুরানো ভিটার কাছে গেল।

—এই আমার পৈতৃক ভিটে হৈমন্তী। এখানে আমার জন্ম। ওই যে আকন্দগাছ দেখছ–ওখানে একটা ঘর ছিল, সেই ঘরে। আমার বাবা-মার পুণ্যস্মৃতিমণ্ডিত মাটি এখানকার।

হৈমন্তী ভিটার দিকে মুখ করিয়া গলায় আঁচল দিয়া মাটিতে উপুড় হইয়া প্ৰণাম করিল। বলিল–তাদের তো দেখলাম না। কপাল করে আসি নি শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে ঘর করবো। তঁদের আশীৰ্বাদ যেন পাই। কাজলকে যেন মানুষ করে তুলতে পারি।

ব্যাপারটা আদৌ নাটকীয় হইল না। বরং হৈমন্তীর সাষ্টাঙ্গে প্ৰণাম করিবার মধ্যে অপু অনেক কিছু দেখিতে পাইল। সকাল হইতেই নানা মিশ্র অনুভূতিতে তাহার বুক ভরিয়া উঠিতেছিল। বৌ লইয়া জঙ্গলাকীর্ণ ভিটার সামনে দাঁড়াইয়া তাহার মনে হইল মায়ের স্নেহ, বাবার আশীৰ্বাদ যেন তাহাদের দুইজনকে ঘিরিয়া ধরিয়াছে। এতদিন বাদে অতীতের দিনগুলির সহিত যেন একটা যোগাযোগ স্থাপিত হইল।

রানুপিসি নানা কাজে ব্যস্ত ছিল, তাহাকে বলিয়া কাজল বেড়াইতে বাহির হইল। রানি বলিয়া দিল–বেশি দেরি করিস নে, দূরে যাস নে।

গ্রামের প্রান্তে যে মাঠ আছে তাহার আল ধরিয়া পড়ন্ত বেলায় হাঁটিতে কাজলের খুব ভালো লাগে। মাঠের মধ্যে দূরে দূরে লোক থাকে, অধিকাংশ সময়েই মাঠ ফাঁকা। ওয়াইড ওয়ার্লড ম্যাগাজিন হইতে শোনা গল্পগুলির পটভূমি হিসাবে এই ফাঁকা মাঠ ও বন্য ঝোপ তাহার মনে আধিপত্য বিস্তার করে। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রচণ্ড গরমে মরুভূমির ভিতর হীরকসন্ধ্যানী দুইটি দলের মধ্যে যে ভীষণ সংঘর্ষ হইয়াছিল, এই মাঠে সে তাহা প্রত্যক্ষ করিতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকার গরমের সহিত সংগতি রাখিবার জন্য সে হাতের উলটা পিঠ দিয়া শক্ত আলোর উপরকার উত্তাপ অনুভব করে। মনে মনে ভাবে, আফ্রিকার মরুভূমির বালিও এমনি গরম। বাবার কাছে গল্প শুনিয়া সে লক্ষ করিয়াছে, যাবতীয় রোমাঞ্চকর ঘটনা আফ্রিকাতেই ঘটিয়া থাকে। আফ্রিকা তাহার কাছে বহস্যোব দেশ। বড়ো হইলে সে আফ্রিকায় যাইবে, বাওবাব গাছ (বাবার কাছে নাম শুনিয়াছে) দেখিবে।

সূর্য দিগন্তরেখা স্পর্শ করিয়াছে। কাজল তাকাইয়া দেখিল মস্ত লাল সূৰ্যটা আস্তে আস্তে দিগন্তের নিচে নামিয়া পড়িতেছে। ততক্ষণে একটু ঠাণ্ডা বাতাস ছাড়িয়াছে। আলেব পাশে ছোট ছোট ঝোপের মধ্য দিয়া হালকা শব্দ তুলিয়া হাওয়া বহিতেছে। কেহ কোথাও নাই। যত দূর দৃষ্টি যায়, উদার বিশাল মাঠ পড়িয়া আছে। বিকালে কেমন একটা ছায়া ছায়া ভাব নামিতেছে। বাতাসেব অদ্ভুত শব্দ। এর মধ্যে একলা দাঁড়াইয়া থাকিবার যে একটা ভয়মিশ্রিত আনন্দ আছে, তাহা কাজলকে অভিভূত করে। ঠিক ভয় নহে, একটা অচেনা অনুভূতি। এই সময়, দিন ও বাত্রিব সন্ধিক্ষণে বাড়ি হইতে দূরে মাঠের ভিতর পৃথিবীটাকে যেন অচেনা বোধ হয়।

ফিরিবে বলিয়া ঘুরিয়া দাঁড়াইতেই কাজলের সেই লোকটার সহিত দেখা হইয়া গেল। মানুষটার হাতে খঞ্জনী, পরনে আটহাত খাটো মোটা ধুতি। নাকে বসকলি, বগলে ছাতা–তাপ্পি মারা, কাঁধে ঝুলি। আপন মনে আসিতেছিল, সামনে কাজলকে দেখিয়া খঞ্জনীটা দ্রুত লয়ে একবার বাজাইয়া দিল। কাজল প্ৰথমে ভয় পাইয়াছিল। পরে লোকটার চোখের দিকে তাকাইয়া বুঝিল, এ চোখ যাহার, তাহাকে ভয় পাইবার কোন কারণ নাই।

লোকটা হাসিয়া বলিল— বেড়াচ্ছেন বুঝি বাবাজি? ভালো, বেড়ানো ভালো। বেড়ালে মানুষের চোখ ফোটে–তাঁর দুনিয়াটার রূপ দেখতে পায় মানুষ–

-কার দুনিয়া?

লোকটা আর একবার দ্রুত খঞ্জনী বাজাইয়া ওপরে আকাশের দিকে দেখাইয়া বলিল–ওই ওখানে যিনি থাকেন, তার। সবই তো তার বাবাজি।

সম্পূর্ণটা না পারিলেও, কাজল লোকটার কথার খানিকটা অর্থ ধরিতে পারিল। বেশ কথা বলে মানুষটি। কাজল বলিল–তুমি বুঝি অনেক বেড়িয়েচ?

লোকটা মৃদু হাসিল।

–বেড়ানো আর হল কোথায়? অকাজেই বড্ড বেলা হয়ে গেল। হ্যাঁ, কিছু কিছু ঘুরেছি বাবাজি। বেশির ভাগটাই না-দেখা রইল।

খঞ্জনী বাজাইয়া লোকটা ভাঙা বেসুরো গলায় দুকলি গান গাহিল–

ও মন তুই পোড়া সুখে রাইলি ভুলে
যখন তোর মনের পদ্ম উঠল দুলে
প্রভুর পদপরশনে–

কাজল লোকটাকে ভালোবাসিয়া ফেলিল। সুন্দর মানুষ। গান গাহিতে পারে–গল্প করিতে পারে, আর কী চাই? বলিল–তোমার কী তাড়াতাড়ি আছে? এইখানটায় বসে আমার সঙ্গে একটু গল্প করে যাও না।

লোকটা ছাতাটা আলোর গায়ে হেলান দিয়া রাখিয়া বসিল।

–তুমি যদি থাকতে বলো, তবে আমার কোন তাড়া নেই।

অনেক গল্প হইল লোকটার সহিত। লোকটা সুন্দর গল্প করিতে জানে। সাধারণ ঘটনাও তাহার বলিবার গুণে চিত্তাকর্ষক হইয়া ওঠে। একটি মেয়ের বাপের বাড়ির গাঁয়ে সে ভিক্ষা করিতে যাইত প্রায়ই। মেয়েটির কবে বিবাহ হইয়া গিয়াছে, সে খবর পায় নাই। একদিন না জানিয়াই তাহার শ্বশুরবাড়িতে ভিক্ষা চাহিয়া দাঁড়াইতে বাপের বাড়ির চেনা বলিয়া মেয়েটি তাহাকে অনেক কথা লুকাইয়া বলিয়াছে। ইহাতে লোকটা খুব খুশি।

—জগতে কেউ কারুর নয় বাবাজি। আপন মনে করলেই আপন, পর ভাবলেই পর।

গল্প শেষ হইলে সে ঝুলির ভিতর হইতে একটি পাকা আম বাহির করিল।

–তুমি এটা নাও খোকন। বাড়ি গিয়ে খেয়ো।

–না, তোমার জিনিস। আমি কেন নেবো?

–আমার আর কই? এটা তোমারই, আমি তোমাকে দিচ্ছি।

–নিশ্চিন্দিপুর এই তো কাছেই। একদিন যেয়ে না। আমাদের বাড়ি।

–যাব, নিশ্চয় যাব।

খঞ্জনীতে আওয়াজ তুলিয়া গুনগুন করিতে করিতে সে বিদায় লইল। দুই পা হাঁটিয়াই কাজল তাহাকে ডাকিল- তোমার নাম তো বলে গেলে না?

সে ফিরিয়া বলিল–আমার নাম রামদাস বোষ্টম।

স্বল্প আলাপেই রামদাস কাজলের মনে গভীর ছাপ রাখিয়া গেল। কেমন সুন্দর জীবন, একা এক বেড়ায় মাঠে-ঘাটে, ঘরবাড়ির ঠিক নাই। কোন বন্ধন নাই–আবার পিছুটান নাই বলিয়া দুঃখও নাই। খোলা আকাশের নিচে একা খঞ্জনী বাজাইয়া ফেরে।

সন্ধ্যার আরছা অন্ধকারে কাজল বাড়ির পথ ধরিল।

বিকালে নদীতে স্নান করিতে যাইবার কথা ছিল।

অপু আর হৈমন্তী গল্প করিতে করিতে অনেক দেরি করিয়া ফেলিল।

হঠাৎ খেয়াল হইতে অপু ধড়মড় করিয়া মাদুরের উপর উঠিয়া বসিল-ওই যাঃ, এ যে প্রায় অন্ধকার হয়ে এলো, চল চল, আর কথা নয়। দু’খানা গামছা, তোমার শাড়ি, আমার ধুতি, আর শিশিতে একটু তেল নাও-ওবেলা তেল মাথায় দিতে ভুলে গেছি। একেবারে ঘাটে মেখে নেব।

তাড়াতাড়ি গোছগাছ করিয়া বাহির হইতে আরও পনেরো মিনিট দেরি হইল। হৈমন্তী জিজ্ঞাসা করিল–কাজল এলো না যে?

–রানুদির ওখানে আছে, সন্ধে উতরে গেলে রানুদিই দিয়ে যাবে’খন।

অন্ধকার নামিতেছে। নদীর পথে ঝোপে-ঝাড়ে বেশ অন্ধকার ঘনাইয়াছে। বাগান দিয়া যাইবার সময় একটা কী জন্তু ঝরাপাতার উপর দিয়া খড় খড় শব্দ করিয়া দূরে সরিয়া গেল। হৈমন্তী বলিল–ও কী গো?

–ভয় পেয়েছে? কিছু না, শেয়াল-টয়াল হবে হয়তো কিংবা বেজি!

—সুন্দর লাগছে কিন্তু, না? শহরে এ সময় গোলমাল, গাড়ির ভেঁপু, মানুষের ভিড়। তার চেয়ে এই ভালো। মনের শান্তির চেয়ে বড়ো জিনিস নেই।

–তুমি যে একেবারে নাটুকে কথাবার্তা বলতে শুরু করলে।

–না গো, এই আমার মনের কথা। আমি এই চেয়েছিলাম। শহর আমার ভালো লাগে না। যখনই তোমার লেখা প্ৰথম পড়েছি, মনে হয়েছে–

–কী মনে হয়েছে?

হৈমন্তী অপুর দিকে তাকাইল।–না, সে আমার বলতে লজ্জা করে।

–আহা, বলেই না। আন্দোকটা যখন বললে

–প্রথম তোমার লেখা পড়েই মনে হয়েছিল–এ মানুষটার সঙ্গে আমার খুব মিল খাবে। প্রকৃতি যে এত ভালোবাসে–

দুইজনে কিছুক্ষণ চুপ করিয়া হাঁটিল। বেশ কেমন সন্ধ্যায় নদীতে স্নান করিতে যাওয়া বনপথ বাহিয়া এইসব শাস্তি ছাড়িয়া সে কীসের অন্বেষণে ঘুরিতেছিল সমুদ্রপারে?

বাঁশবাগানের মধ্যে হৈমন্তী হঠাৎ থামিয়া গেল। চারিদিকে তাকাইয়া বলিল–শোনো।

–কী?

–একটা মজার ব্যাপার হয়েছে।

–তোমার তো দেখি দুপুর থেকে খালি মজার ব্যাপারই ঘটছে। কী ব্যাপার?

–মালতীনগর থেকে আসবার আগে পত্রিকায় একটা গল্প দিয়ে এসেছি না? সেই গল্পে একটা বাঁশবাগানের বর্ণনা আছে। মনে মনে একটা বাঁশঝাড়ের কল্পনা করে লিখেছিলাম। হঠাৎ এখানটায় দাঁড়িয়ে চারিদিক দেখে মনে হচ্ছে অবিকল যেন আমার কল্পনাব সেই বাগানটা। কেমন আশ্চর্য, না?

অপুর বেশ ভালো লাগিল ঘটনাটা। হৈমন্তী এ গ্রামের বউ হইয়া আসিবে, ইহা যেন ভগবানই স্থির করিয়া রাখিয়াছেন। নিজের অতীত জীবনটা এই আনন্দের মুহূর্তে গোটানো মানচিত্রের মতো চোখের সামনে খুলিয়া গেল। বহু কষ্ট গিয়াছে, জীবনযুদ্ধে বহু রণক্ষেত্রের সে সৈনিক। এখন পুরস্কারের দিন-সার্থকতার দিন।

অন্ধকার ঝোপে ঝোপে কীটপতঙ্গের ঐকতান শুরু হইয়াছে। বাতাসে দিনশেষের আমেজ আর একটা বন্য গন্ধ।

অপু বলিল–নাও, তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে চল। সন্ধে উতরে গেল—

এক-একদিন রাত্রিতে চাঁদ থাকিলে মাদুর পাতিয়া তারা বারান্দায় শোয়। বাবার পাশে মাদুরে শুইয়া কাজল চাঁদ নক্ষত্র আকাশ পৃথিবী সম্বন্ধীয় অজস্র বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন করিতে থাকে। অপুকে তাহার উত্তর দিতে হয়। অপু মাঝে মাঝে কাজলকে বিশ্বসাহিত্যের গল্প শোনায-কাজল মনোযোগ দিয়া শোনে। বেশি রাত হইলে অপু ভাবে কাজল ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। সে গল্প থামাইয়া বলে-কী রে, ঘুম পেয়েছে?

অমনি কাজল বলে, বাবা আমার ঘুম পায়নি। থামলে কেন? বলো–

অপুকে গল্প চালাইতে হয়। এইভাবে কিছুদিনের মধ্যেই কাজল বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কয়েকটি গ্ৰন্থ শুনিয়া ফেলিল।

একদিন অপু কাজলকে ডাকিয়া বলিল–নে, চল। কাল আমার সঙ্গে কলকাতা চল। যাদুঘর যাবি বলছিলি, কাল যাদুঘর দেখাব’খন। আমারও এমনি কাজ আছে কয়েকটা-সেই সঙ্গে সেরে ফেলব।

পরদিন সকালে অপু ছেলেকে লইয়া কলিকাতা রওনা দিল। কাজল একটা ঘিয়ে. রঙের হাফপ্যান্ট আর সাদা শার্ট পরিয়াছে। হৈমন্তী চুল আঁচড়াইয়া দিয়াছে পরিপাট করিয়া। যাইবার সময় অপুকে বলিয়া দিয়াছে–ওকে ভালো করে দেখেশুনে নিয়ে যাবে। যা দুষ্টু–

কাজল অনেকদিন বাদে কলিকাতা আসিল। আবার সেই বড়ো বড়ো বাড়ি, লোকজন, হৈ-চৈ, রাস্তায় গাড়ির ভেঁপু, ট্রামের ঘণ্টা। সব মিলিয়া জিনিসটা মন্দ লাগে না। বাবা তাহাকে বলিয়াছে বড়ো হইলে তাহাকে কলিকাতার কলেজে পড়াইবে। কলিকাতার বড়ো বড়ো কলেজের গল্প বাবা তাহার নিকট করিয়াছে, সেখানে লাইব্রেরিতে কত বই আছে–তাহা নাকি গণিয়া শেষ করা যায় না। ওই সমস্ত বই সে পড়িবে।

অপুর কাজ ছিল বিকালে। খুব সকালে রওনা হওয়ায় তাহারা বেশি বেলা হইবার আগেই কলিকাতা পৌঁছিয়াছিল। ট্রামে করিয়া অপু এসপ্ল্যানেড আসিয়া নামিয়া বলিল–এইটুকু চল হেঁটে যাই। কেমন দেখতে দেখতে যাওয়া যাবে।

যাদুঘরে ঢুকিতেই কাজলের সেই অদ্ভুত ভাবটা হইল–যাহা সে কিছুতেই কাহাকেও বুঝাইয়া উঠিতে পারে না। মাথার মধ্যে কেমন একটা ঝিম-ঝিম ভাব। যাদুঘরের একটা নিজস্ব গন্ধ আছে, তাহা কাজলকে পুরানো দিনের কথা মনে করাইয়া দেয়। নিজের জীবনের কথা নহে, বাবার কাছে শোনা ইতিহাসের কথা-মানবসৃষ্টির আগেকার পৃথিবীর কথা। সমস্ত আবেদনটা সে ঠিক ধরিতে পারে না। কিন্তু তাহার মনে হয়, এই জীবনের বাহিরে আর একটা বৃহত্তর জীবন তাহাকে হাতছানি দিয়া ডাকিতেছে।

সারাদিন ভারি আনন্দে কাটিল। প্রাচীন স্তূপ হইতে গুহামানবের মাথার খুলি পর্যন্ত সবকিছুই কাজলের কাছে সমান আকর্ষণীয়। প্রাচীন জীবজন্তুর কঙ্কালগুলি যে ঘরে আছে, সে ঘর ছাড়িয়া কাজল আর নড়িতে চায় না। উল্কাপিণ্ডটার সামনে দাঁড়াইয়া উত্তেজনায় তাহার চোখ কোটর হইতে বাহির হইয়া পড়ে আর কী! ফসিলের ঘরে সে অপুকে জিজ্ঞাসা করে–তুমি যে বলেছিলে পলিমাটিতে তারামাছের ফসিল আছে, সে কই বাবা?

এ সমস্ত অত্যন্ত পক্কতার লক্ষণ সন্দেহ নাই–কিন্তু অপু কাজলকে এইভাবেই মানুষ করিয়াছিল। এই বয়সে অন্যরা যাদুঘরে গিয়া মুগ্ধ বিস্ময়ে চতুর্দিক একবার দেখিয়া আসে মাত্র। কক্ষ হইতে কক্ষান্তরে ঘুরিয়া পা ব্যথা করিয়া বেতের ঝুড়িতে আনা জলখাবার খাইয়া মা-বাবার সহিত বাড়ি ফিরিয়া যায়। কিন্তু কাজল বুঝিতে চায়, কাজল অনুভব করে।

বিকালে যাদুঘর বন্ধ হইবার সময় অপু বলিল–চল, এবার আমার কাজটা সেরে আসি। বইএর দোকানের দিকে যেতে হবে।

পাবলিশারের কাছে কিছু টাকা পাওনা ছিল। দোকানে ঢুকিতেই মালিক হাসিয়া বলিল–আসুন অপূর্ববাবু, বসুন। এবার তো অনেকদিন বাদে এলেন। আপনার ও বইটার স্টক প্রায় শেষ। নতুন এডিশন সম্বন্ধে একটু কথাবার্তা বলে নিতে হয়। এটি কে? বাঃ বেশ বেশ।

অপুর এসব আজ ভালো লাগিতেছিল না। সকালে খুব আনন্দ করিয়া বাহির হইয়াছিল বটে, কিন্তু দুপুরের পর হইতেই শরীরটা ভালো বোধ হইতেছিল না। বুকের কাছটায় কেমন একটা ব্যথাব্যথা ভাব। এখন আবার নতুন এডিশন সম্বন্ধে বাক্যালাপের ঝামেলা আসিয়া জুটিল।

সমস্ত কথা মিটিতে প্ৰায় ঘণ্টাখানেক সময় লাগিল। অপুর মাথা ঘুরিতেছিল। বুকের যন্ত্রণাটাও বেশ বাড়িয়াছে। কেন যে হঠাৎ এমন হইল, বোঝা যাইতেছে না। শরীর লইয়া পূর্বে সে কখনও চিন্তায় পড়ে নাই। দোকান হইতে বাহির হইয়া সে কাজলের হাত ধরিয়া রাস্তা পার হইবার জন্য ফুটপাথ হইতে পিচের রাস্তায় নামিতে গেল। সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীটা যেন তাহার পায়ের নিচু হইতে সরিয়া যাইতে লাগিল হু-হু করিয়া। সে যতই পা নামাইতেছে, পা আর রাস্তায় ঠেকিতেছে না। ফুটপাথ হইতে রাস্তা এত নিচু?

পরীক্ষণেই বুকের বেদনটা বাড়িয়া উঠিল। মাটিতে পড়িতে পড়িতে সে হাত বাড়াইয়া কাজলকে ধরিতে গেল। কাজল যেন অনেক দূরে সরিয়া গিয়াছে, তাহাকে আর ধরা যাইতেছে না। সব দূরে সরিয়া গিয়াছে। সে একটা অন্ধকার অতল গহ্বরের মধ্যে পড়িতেছে।

প্রকাশক ভদ্রলোক দোকান হইতে ছুটিয়া আসিলেন, রাস্তায় লোক জমা হইয়া গেল। কাজলের হাত-পা কেমন ঝিমঝিম করিতেছিল। ঘটনার আকস্মিকতায় সে হতবুদ্ধি হইয়া সাহায্যকারীদের মুখের দিকে কয়েকবার তাকাইয়া দেখিল মাত্র। বাবা পড়িয়া গিয়াছে। ব্যাপারটা তাহার বিশ্বাস হইতেছিল না। তাহার কাছে বাবা সর্বশক্তিমান, বাবার ক্ষমতা অপ্রতিরোধ্য। বাবাকে মাটিতে পড়িতে দেখিয়া কাজলের সমস্ত হৃদয় আতঙ্কে সংকুচিত হইয়া আসিল। অপুকে উহারা ধরাধরি করিয়া দোকানের ভিতর তুলিয়া আনিল। কাজলকে কেহ ডাকিল না। সে নিজেই আস্তে আস্তে হাঁটিয়া সবার পিছন পিছন দোকানে ঢুকিয়া দেখিল, তাহার বাবাকে একটা বেঞ্চির উপর শোওয়াইয়া জলের ছিটা দিয়া বাতাস করা হইতেছে। কাঠের একটা টেবিলে হেলান দিয়া সে ভাবিবার চেষ্টা করিল, বাবার কিছুই হয় নাই-ঘটনাটা একটা দুঃস্বপ্ন। স্বপ্ন ভাঙিয়া গিয়া এখনই দেখিবে সে বাবার পাশে শুইয়া আছে, গল্প শুনিতে শুনিতে ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল।

মিনিট কুড়ি বাদে অপু তাকাইল। সে চিৎ হইয়া শুইয়া আছে, ওপরে যেন কালো কড়িকাঠ, চারপাশে লোকের কণ্ঠস্বর। বুকে কাহারা একটা ওজন চাপাইয়া দিয়াছে যেন। এটা কোন জায়গা? সে এখানে শুইয়া কেন? একটু বাদেই সমস্ত কিছু মনে পড়িতে সে আচ্ছন্নের মতো হাত বাড়াইয়া বলিল–খোকা কোথায় গেল? খোকা?

কলিকাতার সেদিনকার সেই ঘটনার পর হইতেই অপুর শরীর খুব ভালো যাইতেছে না। কলিকাতার ভালো স্পেশালিস্ট দেখাইয়াছে। ডাক্তার বলিয়াছে, ব্লাডপ্রেসার আছে, কিডনিও ভালো কাজ করিতেছে না। খাওয়ার ব্যাপারে নজর রাখিতে হইবে। লবণ কম খাইতে বলিয়াছে। অপু হাসিয়া বলিয়াছিল–এই বয়সে প্রেসার হয়? বলিয়াই তাহার মনে হইয়াছিল, খুব একটা কম বয়স তাহার নয়, দেখিতে দেখিতে বয়স বেশ বাড়িয়াছে।

ডাক্তার বলিলেন–সাধারণত এই বয়সে প্রেসার হয় না। আমার মনে হয়, কিডনির জন্যে এরকম হচ্ছে। কতকগুলো ওষুধ দিলাম, খেয়ে দেখুন কেমন থাকেন।

ওষুধ খাইয়া অপু বিশেষ উপকারবোধ করিল না। মাঝে মাঝে শরীর খারাপ লাগে, সে আমল দেয় না। হৈমন্তীর কড়া পাহারার জন্য নিয়মের হেরফের হইতে পারে না, খাওয়া শোওযা ইত্যাদি বাঁধা সময়ে করিতে হয়। অপুর স্বাস্থ্যের জন্য হৈমন্তী বড়ো উদ্বিগ্ন–সে কোথাও বাহির হইলে না ফেরা পর্যন্ত হৈমন্তী ঘর-বাহির করে। দেরি হইলে কাজলকে বলে-দেখা তো খোকা একটু এগিয়ে কাঁঠালতলার কাছে, তোর বাবা এলো নাকি–

অপু বেশিক্ষণ ঘরে থাকিতে পাবে না। তাহার ছেলেবেলা যেন আবার ফিরিয়া আসিয়াছে। বৈকালে রৌদ্র পড়িতে না পড়িতে ছেলেকে লইয়া বাহির হইয়া পড়ে। মাঠে ঘাটে ঘুরিতে ঘুরিতে সন্ধ্যা উতরাইয়া যায়। কোনদিন একই বেড়াইতে যায়। বিকালগুলি তাহার একান্ত নিজস্ব, ব্যক্তিগত। কোন কারণেই একটা বিকাল সে কাহাকেও দিয়া দিতে পারে না। অসুস্থ হইবার পর হইতেই অপুর কেমন একটা ভাব হইয়াছে। প্রায়ই সে বিষণ্ণ মুখে কী যেন ভাবে। প্রকাশকদের নিকট পাওনা টাকার আগে সে হিসাব রাখিত না, এখন বড় একটা খাতা বানাইয়াছে। তাহাতে টাকাকড়ির কথা লিখিয়া রাখে। নিশ্চিন্দিপুরে হৈমন্তীর নামে কিছু জমি কিনিয়াছে, নূতন উপন্যাসখানির টাকা দিয়া হৈমন্তীকে গহনা গড়াইয়া দিয়াছে। হৈমন্তী একদিন চটিয়া বলিল–এ সব শুরু করলে কী! নবাব-বাদশা হয়েছ নাকি? রাজ্যের জমি-জমা, গয়না-পত্তর–এসব তোমার কাছে আমি কবে চেয়েছিলাম?

–তুমি চাও নি হৈমন্তী, আমি দিচ্ছি।

হৈমন্তীর ঠোঁট কাঁপিয়া উঠিল–কেন দিচ্ছ? আমি এ সব চাই না।

–এ সবে তোমার প্রয়োজন নেই, আমি জানি। কিন্তু কাজলের তো ভবিষ্যৎ আছে। প্রথম জীবনটা যেন ওকে কষ্ট করতে না হয়। তারপর চাকরি-বাকরি করলে ওই তোমার ভার নেবে। অন্তত ততদিন–

হৈমন্তীর চোখে কিসের একটা ঝলক খেলিয়া গেল। সে অপুর কাছে সরিয়া আসিয়া বলিল–আমার ভার! শুধু আমার ভার। কেন, তুমি–তোমার ভার নেবে না? বলো?

অপু কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিল। তাহার পর আস্তে বলিল–হ্যাঁ, আমার ভরও নেবে বইকি। তাবপরই সে হাসিয়া ব্যাপারটা লঘু করিতে গেল বটে, কিন্তু নিজেই বুঝিল হাসিবার জনা তাহাকে চেষ্টা করিতে হইতেছে।

গম্ভীর হইয়া থাকে সে। মন তা বলিয়া খুব খারাপ নহে। কেমন একটা আনন্দে সে বুঁদ হইয়া অস্তিত্বকে উপভোগ করে। শত কোটি নক্ষত্র এবং নীহারিকার ভিতর নিজের অস্তিত্বকে উপলব্ধি করিবার তীব্র আনন্দ অন্য সমস্ত কিছু তুচ্ছ করিতে শিখাইয়াছে। মৃত্যুকে সে ভয় করে না। কারণ মৃত্যুর আগেই সে জানিতে পারিয়াছে জীবন কাহাকে বলে। জীবনকে যে জানিতে পারিয়াছে, মৃত্যুকে তাহার ভয় কী?

আকাশটা দুপুরে ধকধক করিয়া জুলে, বিকালের দিকে স্নিগ্ধ হইয়া আসে। সন্ধ্যায় বাতাসে দিনশেষের সুর বাজে। অন্ধকার ঘন হইলে অপু নদীর ধাবে ঘাসে ছাওয়া ঢালু জমিতে শুইয়া দেখে আকাশে তারা ফুটিয়া উঠিতেছে। তাহার ছোটবেলায্য যেমন উঠিত। এ সময়টা সে নৌকায় কবিঘা নদীর উপর বেড়াইত। ছোটবেলাটা কত দূরে চলিয়া গিয়াছে।

মনে কোন দুঃখ নাই, কেমন উদার আনন্দ। পাড়ের নিচে নদীর বহিয়া যাইবার সহজ ভঙ্গির মতো আনন্দ। নদীর ওপারে দিগন্তের উপর উল্কাপাত হইল। বুপালী আগুনের তীব্র শিখা সন্ধ্যা আকাশে একটা উজ্জ্বল সরলরেখা টানিয়া দিয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে অপুর মনে সুদূরের চিন্তা জাগিয়া উঠিল। উল্কাটি এক বিশাল বিশ্বের দূত–মহাজগতের সংবাদবাহক। তাহার মনটা হঠাৎ বড়ো হইয়া, ব্যাপ্ত হইয়া দেখিতে দেখিতে যেন সমস্ত আকাশে ছড়াইয়া গেল।

০৫. অপু ডাক্তার দেখাইতে গিয়াছিল

অপু ডাক্তার দেখাইতে গিয়াছিল। ডাক্তারবাবু চশমাটা নাকের উপর ঠিকভাবে আঁটিয়া লইয়া বলিলেন—আসল কথা এই, বাংলাদেশের হিউমিড আরহাওয়া আপনার স্যুট করছে না। আপনি কিছুদিন বাংলার বাইরে থেকে দেখুন তো, মনে হয় সুস্থ হবেন।

কথাটা অপুর মনে ধরিল। মধ্যপ্রদেশে সে যে কয়েক বৎসর কাটাইয়াছে, সে সময়। তাহার অসুখবিসুখ কিছু হয় নাই। প্রচণ্ড উল্লাসে হৈ হৈ করিয়া প্রায় একটা বন্য জীবন যাপন করিয়াছে। বিহারের দিকে কোথাও গিয়া থাকিলে মন্দ হয় না।

রাত্রে শুইয়া একদিন সে হৈমন্তীর সঙ্গে পবামর্শ করিল। হৈমন্তী কিছুটা অবাক হইয়া বলিল– নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে চলে যাবে? অন্য কোথাও ভালো লাগবে তোমার?

—একেবারে যাবো না হৈমন্তী। আমাদের গা ছেড়ে পৃথিবীতে কোথাও গিয়ে শাস্তি পাব না। এ বাড়িও রইল, ইচ্ছে হলেই চলে আসব।

আসল কথা, অপুর বক্তে ভবঘুরেমি আবার জাগিয়া উঠিতেছে! স্থবিরতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিতেছে। অসুখের জন্যই সে যাইতেছে, এ কথা সম্পূর্ণ সত্য নহে! এক সমস্ত জীবন কাটানো তাহার পক্ষে অসম্ভব। এ তাহার পূর্বপুরুষদেব নিকট হইতে প্রাপ্ত। তাহাদের ভবঘুরে রক্ত তাহাকেও স্থির থাকিতে দিতেছে না। সে যাইবে, আমৃত্যু সে পৃথিবীর ধূলিতে পা ডুবাইয়া হাঁটিবে।

সামান্য সময়ের ভিতরেই অপু কিছু টাকা জোগাড় করিয়া ফেলিল। সবাই তাহাকে আগাম টাকা দেয়, তাহার বই পাইবার জন্য হাঁটাহাঁটি করে। সকালে দুপুরে বিকালে প্রচু্র চিঠি আসে। পাঠকেরা মুগ্ধ হইয়া লিখিতেছে। অপু সবার চিঠির উত্তর দেয়, সামান্য এক লাইনে চিঠি দেয়। প্রত্যেককে দীর্ঘ চিঠি দেওয়া সম্ভব নহে।

জীবন কানায় কানায় পূর্ণ হইয়া উঠিতেছে। আর কী প্রত্যাশা করিবার আছে? টাকা পাইতেছে এবং নাম করিয়াছে এটাই বড়ো কথা নহে–সে দুই চোখ ভরিয়া প্ৰাণ ভরিয়া জগৎটা দেখিয়া লইয়াছে। আরও দেখিবে। থামিবে না। গাৰ্হস্থ্য তাহার কপালে লেখা নাই।

টাকা আনিতে পাবলিশারের কাছে গিয়া একদিন জিজ্ঞাসা করিল–আপনার সন্ধ্যানে কোন ভালো জায়গা আছে বিহারের দিকে? ভাবছি কিছুদিন ওদিকে থাকবো।–

প্রকাশক হাসিয়া বলিল–আপনার ঘোরা বাতিকটা আর গেল না। হ্যাঁ, জায়গার খোঁজ দিতে পারি। অল্প কয়েকদিন থাকবেন, না–

–ভাবছি। একটা ছোটমতো বাড়ি পেলে কিনে নিতাম।

অপুকে তিনি একটা জায়গার কথা বলিলেন, কলিকাতা হইতে খুব দূর নহে, জামসেদপুরের কাছাকাছি। হাওড়া হইতে ট্রেনে মাত্ৰ ঘণ্টা পাঁচেক লাগে। পাহাড়ি এলাকা-অপুর ভালো লাগিবে, তিনি বার বার বলিতে লাগিলেন।

–জঙ্গল আছে? প্রাকৃতিক দৃশ্য কেমন?

—খুব ভালো। সে আপনি নিজের চোখে দেখবেন। আপনাকে তো চিনি। ভালো না হলে আমি আপনার কাছে ও জায়গার নাম করি। কখনও!

অপু আরও দু’পাঁচজনকে জিজ্ঞাসা করিল। অনেকে বিশেষ কোন খবর দিতে পারিল না। কেবল দুইজন লোক, যাদের কথার অপু মূল্য দেয়, জায়গাটার সম্বন্ধে প্রশংসা করিল।

প্রকাশকই খোঁজ করিয়া একটা বাড়ি বাহির করিলেন এবং অপু বিশেষ দেরি না করিয়া বাড়িটা কিনিয়া ফেলিল। কিনিবার জন্য সে নিজে যায় নাই, বাড়ির ছবি দেখিয়াছিল মাত্র। টালির ছাদওয়ালা ছোট সুন্দর বাড়ি। পাশে দুইটা ইউক্যালিপটাস গাছ পাশাপাশি যমজ ভাইয়ের মতো উঠিয়াছে। বহু পিছনে একটা পাহাড় দেখা যায়। ছবিতে বেশ একটা রহস্যের ভাব ফুটিয়াছিল। বিশেষত পিছনের পাহাড়টা অপুকে আকর্ষণ করিল। ছবিটা প্রকাশককে ফেরত দিয়া সে বলিল–আমি আর দেখতে যাবো না। আপনার ওপর ভরসা করে কিনছি। আপনি লোক পাঠিয়ে দিন টাকা সঙ্গে দিয়ে। দলিলপত্রে আমি একেবারে গিয়ে সই কবব।

রাত্রে শুইয়া শুইয়া অপু বলিল–খোকা, তুই তো পাহাড় দেখিস নি? এবার দেখবি’খন। কাজল পাহাড় দেখে নাই। বাবার কাছে শুনিয়া সে মনে মনে জিনিসটা সম্বন্ধে একটা ধারণা করিবার চেষ্টা করে। চড়কতলার ডাইনে যে মাটির উঁচু ঢিবিটা আছে, অনেকটা সেইরূপ কি?

–সেখানে নদী নেই বাবা?

–আছে। কী নাম জনিস?

–কী বাবা?

–সুবর্ণরেখা। নামটা তাহার পছন্দ হয়। সুবর্ণরেখা। এক নিঃশ্বাসে বলিবার মতো নাম। সাঁই করিয়া একবার তলোয়ার ঘুরাইবার মতো। কত নূতন জিনিস সে দেখিবে–পাহাড়, শালবন, সুবৰ্ণরেখা। সুবর্ণরেখা মিষ্টি নাম, সুন্দর নাম।

সুবৰ্ণরেখা। সু-ব-র্ণ-রেখা–নামটা কাজলকে ঘুম পাড়াইয়া ফেলে।

কাজল ঘুমাইলে অপু বলিল–ঠিক বুঝতে পারছিনে হৈমন্তী, কাজটা ভালো হল বিকা। সবে এসে নিশ্চিন্দিপুরে বসতে না বসতেই আবার রওনা দেওয়া-অবশ্য ডাক্তার বলল যেতে, তবু—

হৈমন্তী একটু ভাবিয়া বলিল–না, চলো কিছুদিন থেকেই দেখি তোমার শরীরটা সারে কিনা। এই ভালো, এক জায়গায় না থেকে বেশ ঘুরে ঘুরে বেড়ানো। ও রকম শেকড় গেড়ে সংসায় করতে আমিও ভালোবাসিনে।

–আচ্ছা, তোমার পাহাড়ি দেশ ভালো লাগে, না আমাদের এই পাড়াগাঁ ভালো লাগে?

–দুই-ই। এক এক দেশের এক এক রকম সৌন্দৰ্য–

একটু চুপ করিয়া থাকিয়া অপু বলিল–তুমি তো সমুদ্র দেখনি, না?

–না। কী করে দেখবো বল? বরাবর তো বাবার সঙ্গেই ঘুরেছি, সমুদ্রের কাছাকাছি বাবা কখনও বদলি হননি।

–যাবে?

হৈমন্তী উৎসাহে বিছানায় উঠিয়া বসিল।

–সত্যি বলছো? কবে নিয়ে যাবে? চলো দু’এক দিনেব মধ্যেই যাই।

– কোথায় যাবে?

হৈমন্তী চিন্তা করিয়া বলিল–তুমি বলো।

-পুরী যাবে?

পুরী যাওয়াই ঠিক হইল। কাজলের কিছুদিন বাদেই পরীক্ষা। সে রানির কাছে থাকিবে। অপুরা কাজলের পরীক্ষার আগেই ফিরিবে। রানির কাছে থাকিতে কাজলের কোন অসুবিধা নাই। কাজল সঙ্গে যাইবে বলিয়া অবশ্য হাত-পা ছুঁড়িয়ছিল এবং অপু রাজিও হইয়াছিল। কিন্তু রানি আসিয়া বলিল–তোরা যাচ্ছিস যা। এ ছেলেটার সামনে পরীক্ষা। এটাকে আবার দলে টনছিস কেন? ও আমার কাছে থাকুক, দুবেলা পড়াতে বসাব এখন। তোরা একা যা

কাজল রানির কাছে থাকিয়া গেল। অবশ্য অপুকে বাববার প্রতিশ্রুতি দিতে হইল যে, পরীক্ষার পরেই কাজলকে লইয়া সে পুবী যাইবে।

অপু হাসিয়া হৈমন্তীকে বলিতেছিল–আমাকে কোথাও একদণ্ড তিষ্ঠোতে দিচ্চে না, বুঝলে? দুই জায়গায় তো সংসার পেতে ফেললাম, তাতেও দেখচি খালি ঘুরে ঘুরে বেড়াতে ইচ্ছা কবীচে। বেশিক্ষণ ঘরের মধ্যে থাকলে মন কেমন হ্যাঁপিয়ে ওঠে, জানো!

—তোমার তো ওইরকমই। খালি বেড়ানো, খালি ঘুরে বেড়ানো! এখন তোমার যাযাবববৃত্তি একটু বন্ধ ব্যাখতে হবে, নইলে ছেলেটার পড়াশুনো আব্ব কিছু হবে ভেবেছ?

–হবে হবে। সে কি আমি ভাবিনি মনে করচো? কাজল এতে ভালো কবে মানুষ হয়ে উঠেচে। পড়াশুনায় ওর ঝোঁক বড়ো বেশি, সব সময় বই মুখে করে বসে আছে। নতুন বাড়িতে গিয়েই ওকে আবার সেখানকার ইস্কুলে ভর্তি করে দেব।

হৈমন্তী বলিল–আচ্ছা, সমুদ্রে স্নান করা যাবে তো? নাকি ভাসিয়ে নিয়ে যাবে ঢেউয়েব টানে?

–তা কেন, কত লোক স্নান কবচে দেখবে। সবাইকে কি জলে ভাসিযে নিয়ে যাচ্ছে? তা ছাড়া নুলিয়া আছে–

–নুলিয়ারা কখনও ডোবে না, না?

অপু হাসিয়া বলিল–তুমি বড়ো ছেলেমানুষ হৈমন্তী। একেবারে বাচ্চাদের মতো প্রশ্ন করছে। এই জন্যেই তোমাকে এত ভালো লাগে।

–আর তুমি খুব বুড়ো হয়ে গেছ, না?

-হয়েছিই তো।

–উঃ, একেবারে তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে–

কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া অপু বলিল–কাপড়চোপড় গুছিয়ে নাও। শীগগিরই রওনা দেবো।

অপু আর হৈমন্তী পুরী যাইবার দিন চারেক পর নিশ্চিন্দিপুরে একদিন বৃষ্টি নামিল। রাস্তার ধূলা নিমেষের মধ্যে কাদায় রূপান্তরিত হইয়া গেল। গ্রামের ভিতরের সমস্ত রাস্তা কাদায় ভর্তি, বালকের দল সেখানে আছাড় খাইতে লাগিল। বড়ো বড়ো আম কাঁঠাল গাছ হইতে টুপটাপ করিয়া অবিশ্রান্ত জল পড়িতেছে নিচের কচুবনের উপর। বৃষ্টি এক-একবার ধরিয়া আসে, কিন্তু উঁচু গাছ হইতে জল পড়া থামে না।

মেঘাচ্ছন্ন দিনে কাজলের বড়ো মন কেমন করে। কেন করে, তা সে বোঝে না। ঘন মেঘে। আকাশ কালো, গুম গুম করিয়া মেঘ ডাকিতেছে, ঝপ ঝুপ করিয়া অবিরাম বৃষ্টির শব্দ। কেমন একটা মনখারাপ-করা চাপা আলো চারিদিকে– এই আলোটা কাজলকে উদাস করিয়া দেয়।

রানুপিসির উত্তরের জানালায় বসিয়া সে দেখে, বাহিরের অন্ধকার ক্রমশ ঘন হইতেছে, দুপুরটা সন্ধ্যাবেলার মতো দেখাইতেছে। রানি বৃষ্টিতে তাহাকে বাহির হইতে দেয় নাই। জানালায় বসিয়া সে দেখিল, চণু একটা পুঁটিমাছধরা ছিপ আর একটা চটের থলে হাতে কোথায় যাইতেছে।

কাজল তাহাকে ডাকিয়া বলিল–কোথায় যাচ্ছিস রে?

–মাছ ধরতে।

— কোথায়? নদীতে?

—দূর! নদীর পথে বেজায় কাদা। বামুনপুকুরে যাবো। যাবি?

কাজল মাথা নাড়িল।

— যাবি না?

–না।

— কেন রে, জ্বর হযেছে?

–না।

–তবে?

—ইচ্ছে করছে না যেতে। তুই ধরগে যা মাছ।

ইচ্ছা খুবই করিতেছে। কিন্তু পিসি ঘরে বন্দী করিয়া রাখিয়াছে—এ কথা বলিলে চনুর কাছে দর কমিয়া যায়। চনুব মা-বাবা কেমন ছাড়িয়া দিয়াছে, তাহার বেলা সবার যত কড়াকড়ি।

একটু পরে রানি ঘরে ঢুকিলে সে বলিল–চানু কেমন মাছ ধরতে গেল এই একটু আগে! ওকে তো বেশ ছেড়ে দিয়েছে, আমাকে তুমি একটু বেরুতে দাও না কোথাও–

–দিই না তো বেশ করি। ও সব হাভাতে ছোঁড়ারা তো ঘুরবেই–

অনুমতি মিলিল না। অতঃপর জানালায় বসিয়া শিকে গাল রাখিয়া নির্মিমেষ দৃষ্টিতে বাহিরে তাকাইয়া থাকা ছাড়া উপায় নাই।

বাহিরে জল জমিয়াছে। একটা চড়ুই পাখি হঠাৎ কোথা হইতে উড়িয়া আসিয়া রাস্তার ধারের জমা জলে স্নান করিতে লাগিল। মাথা ড়ুবাইয়া জল তুলিয়া গায়ে দেয়, কখনও সমস্ত শরীরটা ড়ুবাইয়া দেয় জলে। বৃষ্টি হওয়ায় মহাস্মৃতি–এদিকে ওদিকে অনেক পাখি ঝোপঝাড়ে কিচমিচ করিতেছে। ভয়ানক গরম পড়িয়াছিল, তাহা হইতে মুক্তি পাইয়া সবাই খুশি! একটা শেয়াল সামনের বাগানটা পার হইয়া গিয়া একবারে রানুপিসিদের উঠানে আসিয়া পড়িল। কাজল দিনের বেলা এত কাছ হইতে কখনও শেযাল দেখে নাই, উৎসাহে সে উঠিয়া দাঁড়াইল। শেয়াল বড়ো চালাক, দিনমানে মনুষ্যবসতির নিকটে ঘোরাফেরা করিতে বড়ো দেখা যায় না। কাজলের চোখ বিস্ময়ে কোটার হইতে বাহির হইয়া আসিতেছিল। শেয়ালটা মিনিটখানেক স্থাণুবৎ দাঁড়াইয়া হঠাৎ তীরবেগে পাশের কচুবনে ঢুকিয়া পড়িল।

বিকালের দিকে কাজলের মনটা খারাপ লাগিতেছিল। বাবা বাড়ি নাই। এ সময়টা সে সাধারণত বাবার সঙ্গে কাটায়। পড়ন্ত বেলার চাপা আলো তাহার মনে বেদনার একটা সুর ছড়াইয়া দিল। শুধুই কি বাবার জন্য মন খারাপ? কাজল অবাক হইয়া আবিষ্কার করিল, মায়ের জন্যও তাহার মন কেমন করিতেছে। কদিনই বা হইল মা তাহাদের দুইজনের সংসারে আসিয়াছে—তাহার জন্য মন খারাপ হয় তবুও।

জানালা দিয়া বাহিরে তাকাইয়া ভেজা গাছপালা দেখিতে দেখিতে কাজলের মনে হইল, মাকে সে সত্যই খুব ভালোবাসিয়া ফেলিয়াছে।

পুরী হৈমন্তীর ভালো লাগিতেছিল। জীবনের প্রথম সমুদ্রদর্শনে তাহার মন অকস্মাৎ আকাশের মতো খোলামেলা হইয়া গেল।

সারাদিন বেশ গরম থাকে। বিকালে দুইজনে সমুদ্রের ধারে যায়। পায়ে পায়ে হাঁটিয়া হঠাৎ আবিষ্কার করে শহর অনেকটা পেছনে ফেলিয়া আসিয়াছে। বাঁ-পাশে উঁচু বালির ডিাঙা, এদিকে বিস্তৃত একখানি নীল আয়নার মতো সমুদ্র। প্রথম দিন রেল স্টেশন হইতে আসিবাব সময় পথের বাঁক ফিরিয়াই হঠাৎ সামনে সমুদ্র দেখিয়া হৈমন্তী অবাক হইয়া গিয়াছিল। সমুদ্র সম্বন্ধে তাহার মনে যে ধারণাটা ছিল সেটাকে চুরমার করিয়া আসল সমুদ্র চোখের সামনে একটা অগাধ বিস্তুতি খুলিয়া দিল।

সেদিন তাহারা বেড়াইতে বেড়াইতে অনেক দূর গিয়াছিল। অপু বলিল–কেমন লাগছে?

–ভালো।

–শুধু ভালো? আর কিছু না?

—বিরাট ভালোর বর্ণনা কী করে দিই বলে তো? মোটামুটি ভালো লাগলে বেশ বড়ো করে বলা যায়। খুব বেশি ভালো লাগলে তখন আর প্রগল্‌ভ হওয়া যায় না।

অপু বলিল–ভালো করে অনুভব করে দেখো, সমুদ্রের সঙ্গে মানুষেব জীবণের একটা আশ্চর্য সাদৃশ্য পাবে। জীবনও সমুদ্রের মতো বড়। জীবনেও সমুদ্রের মতো ঝড় ওঠে। সমুদ্র যেমন সৃষ্টির আদি থেকে অবিশ্রাম তীরে এসে আঘাত করছে, বাধা পেয়ে আবার ফিরে যাচ্ছে– আবার নতুন করে আসছে, তেমনি জীবনও একটা লোহার পর্দায় বাব বার আঘাত করছে যেন। কিছুতেই ভাঙতে পারছে না। কী একটা যেন জানবার কথা আছে–কিছুতেই জানা যাচ্ছে না–

অপু থামিতেই হৈমন্তীর কানে সমুদ্রের শো শো শব্দটা খুব স্পষ্ট হইয়া উঠিল।

সন্ধ্যা নামিয়াছে। দিগন্ত পর্যন্ত অন্ধকার।–কেবল এখানে ওখানে সাদা ফেনা অন্ধকারেও দেখা যাইতেছে।

হৈমন্তী চুপি চুপি প্রশ্ন করিল–কী জানবার আছে মানুষের?

অপু ঘাড় ফিরাইয়া চোখ তীক্ষ্ণ করিয়া দূরে তাকাইয়া ছিল। অনেকক্ষণ বাদে ধীরে ধীরে বলিল–প্রশ্নটা জানা আছে, উত্তরটা কেউ জানি না।

ফিরিবার সময় হৈমন্তীর হাতটা নিজের হাতের মধ্যে লইয়া অপু বলিল– কেন চিন্তা করতে শিখলাম বল তো? জীবনটা তো এমনিতেই বেশ কাটিয়ে দেওয়া যেতো।

পরের দিন সকালে অপু বলিল–সব ঠিক করে ফেললাম। চল, কাল কোনারক থেকে ঘুরে আসি। পুরী এসে কোনারক না দেখে ফেরা যায় না।

হৈমন্তীর আপত্তির কোন কারণ ছিল না। আরও একটি পরিবাব কোনারক দেখিতে যাইতেছে-অপুও তাঁহাদের সহিত যাইবে ঠিক করিয়াছে, কথাবার্তা সব ঠিক।

সারাদিন একটু একটু করিয়া কোনারকের ইতিহাসটা হৈমন্তী অপুর নিকট হইতে শুনিয়া লইল। ইতিহাস জানিবার পর কোনারক দেখিবার ইচ্ছা আরও বাড়িল। পরদিন সূর্যমন্দিরের চূড়াটা উঁচু গাছের পাতার ফাঁক দিয়া একটু একটু করিয়া স্পষ্ট হইয়া উঠিতেই আনন্দে হৈমন্তীর গলার কাছে কী একটা পাকাইয়া উঠিল।

বিরাট মন্দির। প্রশস্ত উঠানের অপর প্রান্তে বিশাল প্রধান দ্বার। মন্দিরের ভিত্তিতে রথচক্রের অনুকরণে বড়ো বড়ো পাথরের চক্ৰ খোদাই করা। হু হু করিয়া বাতাস বহিতেছে। মন্দিরের ওপাশের উঁচু গাছে হাওয়া লাগিয়া একটা মাতামাতি কাণ্ড হইতেছে। চারিদিক একেবারে স্তব্ধ। এত স্তব্ধ যে, হৈমন্তী নিজের শান্তিপুরী শাড়ির খস-খাস শব্দ শুনিতে পাইতেছে স্পষ্ট।

সহযাত্রী পরিবারটি খাওয়ার ব্যবস্থায় লাগিল। তাহারা সঙ্গে লুচি-তরকারি ও মিষ্টি আনিয়াছে। শতরঞ্চি বিছাইয়া সেগুলিকে পাত্র হইতে বাহির করিয়া পাতায় সাজাইতে আরম্ভ করিল। কর্তাটি অপুকে ডাকিয়া বলিলেন-অপূর্ববাবু, খাবেন তো এখন? আমার মশাই, সত্যি বলতে কি, ভীষণ খিদে পেয়েছে–

—আপনারা শুরু করুন, আমরা একটু ঘুরে আসি। আমাদেরটা রেখে দিন ববং।

অপু হৈমন্তীকে লইয়া মন্দিরটা ঘুরিয়া দেখিতে লাগিল। বিরাট প্রাঙ্গণের মধ্যে ধূসর পাথরের মন্দিরটা কেমন উদাস ভাবে দাঁড়াইয়া আছে। মাটি হইতে ক্ৰমশ চুড়ার দিকে উঠিবার কয়েকটি সংকীর্ণ পথ আছে। তাহারই একটা দিয়া অপু, হৈমন্তীকে লইয়া উঠিতেছিল। একদিকে মন্দিরের পাথর–অপবদিকে অনেক নিচে মাটি। হঠাৎ তাকাইলে মাথা ঘোরে। হৈমন্তী অপুকে ধরিয়া উঠিতেছিল।

অপু বলিল–ভালো করে ধরে থেকে। হাওয়া দিচ্ছে বেশ, বেসামাল হলে ঝুপ করে পড়ে যাবে।

অদ্ভুত! অদ্ভুত! শতাব্দীর ইতিহাসবাহী মৌন প্রান্তর, দূরে গাছের সারি, সুন্দর বাতাস। আকাশের রঙ তাহদেরই মনোলোকের স্বপ্নের মতো নীল। ধীরে ধীরে হৈমন্তীর মনের ভিতর কেমন একটা ঘুম ঘুম ভাব ছড়াইয়া পড়িতেছিল। বহু-তারবিশিষ্ট যন্ত্রের ঝিমঝিম বাজনার মতো আবেশ।

কিন্তু এত সব ভালো লাগিবার মধ্যে একটা কী চিন্তা যেন হৈমন্তীকে খোঁচা দিতেছে। অনেক আনন্দের মধ্যে একটু কী অতৃপ্তির আভাস। কযেকদিন হইতেই হৈমন্তী নিজের অতৃপ্তির কারণ অনুসন্ধান করিতে করিতে আজ এই সূর্যমন্দিরের ভগ্নসোপানে দাঁড়াইয়া উত্তরটা পাইল। সে অনুচ্চকণ্ঠে বলিল—শুনিছো?

-এবার চলো বাড়ি ফিরে যাই।

-সে কী? এই তো সবে এলে। ভালো কবে সব দেখাও তো হল না। তোমার জন্যেই তো আসা।

–তা হোক। আর ভালো লাগছে না।

–কেন?

একটু স্তব্ধ থাকিয়া হৈমন্তী বলিল–খোকাকে ছেড়ে থাকতে পারছি নে।

ফেরা হইল।

কাজলের ষান্মাসিক পরীক্ষা শেষ হইয়া গিয়াছে। অপু ঠিক করিয়াছে এখন বিহারের নতুন বাড়িতে যাইবে না, কাজলের বাৎসরিক পরীক্ষা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করিবে। নতুন জায়গায় একেবারে নতুন শ্রেণীতে ছেলেকে ভর্তি করিলে। এখন গেলে কাজলের একটা বৎসর নষ্ট হয়।

পরীক্ষার পর কাজল বেশ মজায় আছে। পড়ার চাপ কমিয়াছে। সারাদিন সে ঘুরিয়া কাটাইতেছে। বনজঙ্গল ভাঙিয়া মাঝে মাঝে চলিয়া যায় পাশের গ্রামে।

একদিন কাজল বেড়াইতে বেড়াইতে একটা বাড়ির উঠানে গিয়া হাজির হইল। বেশি সুন্দর ঝকঝকে বাড়ি, উঠানে ধানের গোলা, সিঁদুর দিয়া তাহাতে মঙ্গলচিহ্ন আঁকা। কয়েকটা ছেলে ছোটাছুটি করিতেছে। গোয়ালের একটা গরু বাছুরের গা চাটিতেছে। উঠানে ক্ৰীড়ারত চারটি কুকুরছনা। সে মুগ্ধ নয়নে হৃষ্টপুষ্ট বাচ্চাগুলির খেলা দেখিতেছিল। এমন সময় একটি ছেলে আসিয়া তাহার সামনে দাঁড়াইল।

-কী দেখছ?

তাই সে আমতা আমতা করিয়া বলিল–না, এই–মানে–ওই বাচ্চাগুলো বেশ সুন্দর কিনা, তাই–

–তুমি নেবে একটা?

অপ্রত্যাশিত সৌভাগ্যের সম্মুখীন হইয়া কাজল প্রথমটা কিছু বলিতে পারিল না। পরে বলিল–একেবারে দিয়ে দেবে? তোমার বাড়ির লোক কিছু বলবে না?

—দুর! আরও তো তিনটে রইল।–তুমি একটা নাও।

প্রথমে কাজল ধরিতে ভয় পাইতেছিল। পরে গায়ে হাত বুলাইয়া বুলি তাহারা নিতান্তই নিরীহ।

একটা বাচ্চা বগলদাবা করিয়া দ্রুত সে স্থানত্যাগ করিল। প্রতি মুহূর্তে ভয় হইতেছিল, পেছন হইতে ছেলেটি ডাকিয়া বলিবে–না ভাই, বাচ্চা দেবো না। তুমি রেখে যাও।

দ্রুত বড়ো মাঠটা পার হইয়া কাজল নিশ্চিন্দিপুরে ঢুকিল।

হৈমন্তী রাগ করিয়া বলিল–এঃ, এটা আবার কোত্থেকে জুটিয়ে আনলি, নেড়ির বাচ্চা—

হাত-পা নাড়িয়া কাজল দুর্বল জীবটির পক্ষে অনেক ওকালতি করিল। অবশেষে অনুমতি মিলিল। এবারে বাচ্চাকে তো কিছু খাওয়ানো প্রয়োজন। কুকুরের বাচ্চা কী খায়, এ সম্বন্ধে ধারণা না থাকায় হৈমন্তীর কাছে আবার গিয়া দাঁড়াইতে হইল।

–মা।

–কী রে?

–ওটাকে কী খেতে দিই এখন?

রাগ করিতে গিয়া হৈমন্তী হাসিয়া ফেলিল। ছেলেকে কাছে টানিষা লইয়া বলিল–বড্ড বাচ্চা যে, দুধ ছাড়া কি অন্য কিছু খেতে পারবে? বরং রান্নাঘরের কড়া থেকে খানিকটা দুধ নারকোলের মালায় নিয়ে খাওয়াগে।

খাদ্যের প্রতি বাচ্চাটার একটা দার্শনিকসুলভ নিস্পৃহতা দেখা গেল। কাজল জোর করিয়া দুধের মধ্যে মুখ ড়ুবাইয়া দিলে নাকের মধ্যে দুধ ঢুকিয়া হ্যাঁচিয়া সে অস্থির হইল। এক মালা দুধ খাওয়াইতে বেলা গড়াইয়া অন্ধকার নামিল।

দুই-তিনদিনের মধ্যে কুকুরছানা নূতন জায়গায় অভ্যস্ত হইয়া আসিল! কাজল বাবাকে বলিয়াছে, কলিকাতা হইতে কুকুরের গলার চেন আনিয়া দিতে। চেন গলায় দিয়া সকাল বিকাল কাজল তাহাকে লইয়া গ্রাম পরিক্ৰমা করিবে। ওয়াইড ওয়ার্লড ম্যাগাজিনে কুকুরের বীরত্ব সম্বন্ধে ভালো ভালো গল্প ছাপা হয়–বাবার কাছে কাজল তেমন অনেক গল্প শুনিয়াছে। সেও ইহাকে সুশিক্ষিত করিয়া বীরত্বপূর্ণ অভিযানের সঙ্গী করবে।

কুকুরের নাম রাখা হইল–কালু। সাতদিনের মধ্যেই কালু কাজলের পরম ভক্ত হইয়া উঠিল। কাজল নিজে আসিয়া খাইতে না দিলে খায় না, সর্বদা কাজলের পেছনে পেছনে ঘোরে। বেশ ভালো চলিতেছিল, কিন্তু মাসখানেক বাদে হঠাৎ কালুর কী অসুখ করিল। সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঝিমায়, খাওয়াদাওয়া একদম ছাড়িয়া দিয়াছে। প্রথমে কাজল আমল দেয় নাই, পরে দেখিল কালুর উঠিবার ক্ষমতা লুপ্ত হইয়াছে। তিনদিন আগেও লাফালাফি করিয়া বেড়াইয়াছে, ইদানীং সৰ্বক্ষণ শুইয়া থাকে। কাজলের সাড়া পাইলে অতিকষ্টে একবার মাথা তুলিয়া তাকায়। অশক্ত ঘাড়ের উপর মাথাটা কাঁপে, কিছুক্ষণ বাদে আবার চটের উপর পড়িয়া যায়।

অপু দেখিয়া বলিল–আহা রে! কালু বোধ হয় আর বাঁচিবে না।

গোঙানি। কালু মারা যাইতেছে, কালু ভীষণ কষ্ট পাইতেছে, অথচ কাজলের কিছুই করিবার নাই। চাপা গোঙানির শব্দ তাহাকে কিছুতেই ঘুমাইতে দিল না। রাত্রে মায়ের বুকের কাছে শুইয়া তাহার মনে হইল তাহার অসুখ করিলে মা-বাবা ব্যস্ত হইয়া সেবা করে, আর বেচারা কালু অন্ধকারের ভিতর একা একা কষ্ট পাইয়া মরিতেছে।

কাজল ফুঁপাইয়া কাঁদিয়া উঠিল।

হৈমন্তী তাহাকে কাছে টানিয়া বলিল–কাঁদতে নেই মানিক আমার। ছিঃ—

আদরের কথা শুনিয়া কান্নাটা আরও বাড়িল। অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে কাজল বলিল–কালু কত কষ্ট পাচ্ছে, অন্ধকারের মধ্যে রয়েছে–

হৈমন্তী তাহার মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে বলিল–একা কোথায় পাগলা! ওর কাছে ঠিক ভগবান এসে বসে আছেন, জানিস! যারা কষ্ট পেয়ে মারা যায়, তাদের আত্মাকে ভগবান নিজের হাতে স্বৰ্গে নিয়ে যান। ঠিক ওর পাশে ভগবান এসে বসেছেন

কাজলের দুঃখের বেগটা একটু কমিয়া আসিল। এভাবে সে কখনও ভাবিয়া দেখে নাই। একথা যদি সত্য হয়, তবে দুঃখের কিছুই নাই। ভগবান যদি আসিয়া থাকেন—তবে ভালোই তো। কাজল স্পষ্ট দেখিল, কালুর পাশে এক জ্যোতির্ময়দেহ বিশাল পুরুষ–উন্নতললাট, দীপ্তনয়ন। তাঁহার হাতে পৃথিবীর শাসনের স্বর্ণদণ্ড। তিনি আসিয়াছেন ক্লিষ্ট আত্মাকে স্বহস্তে স্বৰ্গে লইয়া যাইবার জন্য।

০৬. সুবৰ্ণরেখা

সুবৰ্ণরেখা।

বালির চর বুকে করিয়া নদীটিা সারাদিন পড়িয়া থাকে। স্বল্প জল এখানে ওখানে বালির মধ্য দিয়া বহিয়া যায়। নদীর মাঝখানে বড়ো বড়ো কালো পাথরের চাই প্রাগৈতিহাসিক জন্তুর মতো পড়িয়া আছে। উপরের প্রখর নীল আকাশ ধূসর দিগন্তের সহিত একটা অদ্ভুত বৈষম্য সৃষ্টি করিয়াছে। মাটির রঙ লাল। জমি সর্বত্র উঁচুনিচু। স্থানটিতে কেমন একটা বৈবাগ্যের ভাব আছে, মাটিব গৈরিক রঙটির মতো।

মৌপাহাড়িতে লোকজন কম। দিনের বেলায় মনে হয় কিসের উপলক্ষে যেন ছুটি হইয়া গিয়াছে–সবাই ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। সন্ধ্যার সময় একটা কালো চাদর ক্রমশ সবকিছু ঢাকিয়া ফেলে। ঝিঁঝি এবং অন্যান্য পতঙ্গের ডাকের মধ্যে দিয়া রাত্রি মৌপাহাড়িকে গ্ৰাস করিয়া লয়। অপু ইহার ভিতরে কী একটা যেন খুঁজিয়া পাইয়াছে। মানুষের সঙ্গ–কেবল কাজল এবং হৈমন্তী ছাড়া–তাহার কাছে আর কাম্য নহে। বইখাতা বগলে দিনের প্রায় সময়টাই সে বাহিরে ঘুরিয়া কাটায়।

নদীর ধারে একখানি বড়ো পাথরের উপর বসিয়া সে লেখে। জীবনকে সে অলসভাবে একদিক হইতে দেখে নাই। তাহার দেখা বিচিত্র জীবনের কথা সে আগামী যুগের জন্য রাখিয়া যাইবে। লিখিতে লিখিতে কখনও মুখ তুলিয়া দেখে সামনে সুবর্ণরেখার বিস্তৃত বক্ষ, ওপারে প্রান্তরের গৈরিক প্রসার। পড়ন্ত সূর্যালোকে নদীর বালির মধ্যে মিশ্ৰিত অভ্রকণা চিক্‌ চিক করিতেছে। আকাশে বাতাসে কীসের একটা অস্পষ্ট ইঙ্গিত অপুকে বিচলিত করে। কী একটা এখনই করিতে হইবে, কী একটা করিবার আছে–কিন্তু কিছুতেই করা হইতেছে না। শরীরের মধ্যে একটা বিচলিত ভাব বাড়িয়া ওঠে। মনে হয়, সবটাই বাকি রহিল, নির্দিষ্ট কাজের ভগ্নাংশও করা হইল না। যাহা জানিবার ছিল, তাহার কণামাত্রের আস্বাদন হইল মাত্র।

শরীর লইয়া অপু খুবই বিব্রত। নিশ্চিন্দিপুর ছাড়িয়া আসার পর মৌপাহাড়িতে তিন-চার বৎসর কাটিল, কিন্তু স্বাস্থ্যের খুব একটা উন্নতি হয় নাই। প্রায়ই বুকে একটা যন্ত্রণা হয়। মাথা ভার ঠেকে, অম্বল হয়। এসব কথা সে কাহাকেও বলে না। অসুখ গা সওয়া হইয়া গিয়াছে। সন্ধ্যা ঘনাইলে লেখা বন্ধ করিয়া নক্ষত্রের আলোয় বাড়ি ফিরিতে ফিরিতে হঠাৎ ছোট টিলেটার গা ঘেঁষিয়া বিশাল বৃহস্পতি গ্রহটাকে উঠিতে দেখিয়া তাহার অসুখের কথা বিস্মরণ হইয়া যায়। সেতারের জলদের মতো জীবনটা কাহার হাতের স্পর্শে যেন বাজিতেছে। কীসের স্পর্শে যেন জীবনের রঙ বদলাইতেছে, সুরের পরিবর্তন ঘটিতেছে।

সুবৰ্ণরেখার ধারে বসিয়া অপু নদীর সঙ্গে নিজের মিল খুঁজিয়া পায়। একা থাকিলেও মনে হয় না সে একা আছে। কাহার উপস্থিতি যেন রহিয়াছে আশেপাশে, অনুভব করা যায় কেহ পেছনে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে, সে চোখ ফিরাইলে সরিয়া যায় দূরে।

একদিন একটা কাণ্ড ঘটিল। অপু বসিয়া লিখিতেছে, একটা প্ৰজাপতি আসিয়া বসিল তাহার খাতার পাতায়। সে হাত বাড়াইয়া ধরিতে গেলে সেটা উড়িয়া একটু দূরে একটা পুটুস গাছের উপর বসিল। অপুর কেমন মনে হইল, সুন্দর প্রজাপতিটাকে ধরিতেই হইবে। এক টুকরা পাথর খাতার উপর চাপা দিয়া সে উঠিল।

প্রজাপতিটা ধরা গেল না। গাঢ় লাল আল বাদামী ডানাওয়ালা পতঙ্গটা তাহাকে দূর হইতে দূরে লইয়া গেল। এক ঝোপ হইতে অন্য ঝোপ করিতে করিতে অপু আচ্ছন্নের মতো দৌড়াইল। বাতাস অপুর চুল অবিন্যস্ত করিয়া দিল, তাহার ধুতিতে চোরাকাঁটা লাগিয়া গেল। পাথরে লাগিয়া পায়ের এক জায়গা কাটিয়াও গেল, কিন্তু প্ৰজাপতির নাগাল পাওয়া গেল না।

মাইলখানেক দৌড়াদৌড়ি করিয়া অপু নিজের বসিবাব জায়গায় ফিরিয়া আসিল। পাথরের উপর রাখা খাতার পাতা বাতাসে অল্প অল্প উড়িতেছে, চাপা আছে বলিয়া একেবারে উড়িয়া যায় নাই।

অপু পাথরটার এক কোণে বসিয়া শূন্যদৃষ্টিতে সুবৰ্ণরেখার দিকে তাকাইয়া রহিল।

বয়স বাড়িবাব সঙ্গে সঙ্গে কাজলের দুষ্টামি কমিয়াছে। আগের মতো লাফালাফি করিতে আর ভালোবাসে না। মৌপাহাড়িতে তাহার সমবয়সী কম। সমবয়সীদের সঙ্গে কখনই তাহার বন্ধুত্ব গড়িয়া ওঠে নাই। বয়সে যাহারা অনেক বড়, তাহদের সঙ্গেই বরং কাজলের জমে ভালো।

একদিন কয়েকটা ছেলে মিলিয়া মাইলতিনেক দূরের একটা পাহাড়ে বেড়াইতে গিয়াছিল। কাজলের মনে হইয়াছিল ছেলেগুলি এক একটি আস্ত বর্বব। ঢিল কুড়াইয়া ভীষণ জোরে ছুঁড়িতেছে, লাফাইতেছে, চিৎকার করিতেছে, নিজেদের মধ্যে তুচ্ছ কারণে মারামারি করিতেছে। অথচ চারিপাশে কেমন সুন্দর পাহাড়ি পরিবেশ। নির্জন স্থানে স্তব্ধতা খা খাঁ করিতেছে। মাঝে মাঝে বাসায় ফেরা কী এক ধরনের পাখি মাথার উপর দিয়া মধুর সুরে ডাকিয়া যাইতেছে। সব মিলাইয়া বেশ ঘনিষ্ঠ আনন্দময় পরিবেশ। ছেলেরা এসব মোটেই বুঝিতেছে না। কাজল ক্রমশ বিরক্ত হইয়া উঠিল। বড়ো গোলমাল করে ইহারা। তাহার মনের সঙ্গে ইহাদের কোন যোগাযোগ নাই। থামাইবার জন্য সে কিছুদিন আগে পড়া একটা গল্প শুরু করিল, কিন্তু সে গল্পে কেহ উৎসাহ পাইল না।

ধীরে ধীরে অল্প বয়সেই কাজলের ভিতর একটা বোধ জাগিয়া উঠিতেছিল, তাহার সহিত অন্যের মনের মিল হয় না–হইবে না।

সে একা থাকে। অপু প্রচুর বই আনি যা দিয়াছে। অনেক বিদেশী সাহিত্যের অনুবাদ সে পড়িয়া শেষ করিয়াছে। অপু তাহাকে নিজে ইংরাজি শিখাইতেছে, যাহাতে কাজল শীঘ্রই বিশ্বসাহিত্যে প্ৰবেশলাভ করিতে পারে, কাজলও অসাধারণ দক্ষতা দেখাইয়া ইংরাজি ভাষা শিক্ষায় অনেক দূর অগ্রসর হইয়াছে। সন্ধ্যায় দুই ঘণ্টা তাহাকে বাবার কাছে বসিয়া পড়িতে হয়।

চোখের সামনে তাহার এ কী জগতের দ্বার খুলিয়া যাইতেছে! এ কী আনন্দ আর আলোর জগৎ। পৃথিবীর সাধারণ অকিঞ্চিৎকর বস্তুও এ আলোর স্পর্শে অসাধারণ হইয়া উঠিতেছে। এমনভাবে যাহারা তাহাকে পৃথিবীটা দেখিতে শিখাইয়াছে, তাহাদের কাছে সে কৃতজ্ঞ থাকিবে।

ফরাসী ছোটগল্পের অনুবাদ পড়িয়া প্রথম তাহার চোখ ফুটিয়াছিল। রোজাকার জীবনে দেখা সামান্য ঘটনা লেখকদের হাতে এক গভীর তাৎপর্য লাভ করিয়াছে। এক জায়গায় একটি বৃষ্টির বর্ণনা এবং অপর জায়গায় একটি জ্যোৎস্নারাত্রির বর্ণনা তাহাকে পাগল করিয়া দিয়াছিল। এখনও বর্ষার দিনে এবং জ্যোৎস্নারাত্ৰিতে গল্প দুটিকে সে মনে করিয়া থাকে।

একটু বয়স হওয়ায় সে বাবাকে চিনিতে পারিতেছে। বাবার কেমন একটা আলাদা অস্তিত্ব আছে, সে বুঝিতে পারে। সেটা বাবার সাংসারিক অস্তিত্ব নহে–অন্য কিছু। সবকিছুর ভিতরে থাকিয়াও বাবা সব কিছু হইতে আলাদা। একদিন বাবাকে বড়ো অদ্ভুত লাগিয়াছিল। বেড়াইতে যাইবে বলিয়া বাহির হইতে গিয়া সে দেখিল বাবা উঠানের প্রান্তে ইউক্যালিপটাস গাছটার নিচে শতরঞ্চি পাতিয়া বসিয়া লিখিতেছে। হয়তো কিছু মনে আসিতেছে না, কোন উপযুক্ত শব্দ খুঁজিয়া পাওয়া যাইতেছে না, তাই বাবা কলমটা হাতে ধরিয়া উদাসভাবে দূরে তাকাইয়া আছে। ডানদিকের কাঁধটা একটু নিচু দেখাইতেছে। ফরসা, ঋজু দেহ বাবার। হঠাৎ বাবার জন্য ভীষণ মায়া হইল, ভীষণ-ভীষণ ইচ্ছা হইল বাবার কোলের কাছে গিয়া মুখ গুজিয়া থাকে। শরীরের ভিতরের প্রতি শিরায় সে পিতার জন্য ভালোবাসার স্রোত অনুভব করিল। বাবার শরীর মোটে ভালো যাইতেছে না–বাবা কাহাকেও বলে না, কিন্তু কাজল জানে।

হৈমন্তীর বাবা সুরপতিবাবু একদিন মৌপাহাড়িতে আসিয়া হাজির হইলেন। কী কাজে জামসেদপুর আসিয়াছিলেন-পথে মৌপাহাড়ি ঘুরিয়া যাইতেছেন। হৈমন্তী দৌড়াইয়া আসিয়া প্ৰণাম করিল। অপু ব্যস্ত হইয়া পড়িল খাওয়াইবার আয়োজনের জন্য। কাজল প্রথমটা একটু থতমত খাইয়াছিল, কিন্তু লজ্জা কাটিয়া গেলে দেখিল দাদু খুব ভালোমানুষ। কাজলকে ডাকিয়া তিনি বলিলেন, আজকে সারাদিন আমি তোমার সঙ্গে গল্প করব দাদু, কেমন?

হৈমন্তী বলিল–তুমি দু’একদিন থাকবে তো বাবা?

–না মা, সময় নেই হাতে একদম। পরের কাজে আসা—

আপত্তি টিকিল না। দুই দিন থাকিয়া যাইতে হইল। সারাদিন কাজল আর দাদুর গল্প চলিত, অপু যোগ দিতে পারিত না। সে একখানি বড়ো উপন্যাস লিখিতেছে। সন্ধ্যান্য উঠানে শতরঞ্চি পাতিয়া বসিয়া অপু শ্বশুর মহাশয়ের সহিত কথাবার্তা বলিত। সুরপতিবাবু জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ লোক। জীবনের তিক্ত এবং মধুর দুই দিকের সহিতই নিবিড় পরিচয় আছে। পরলোকে অত্যন্ত বিশ্বাসী। সন্ধ্যায় পরলোক লইয়া অপুর সহিত কথা হইল।

দুই দিনের বেশি সুবপতিবাবু থাকিতে পারিলেন না। যাইবার সময় অপুকে শরীরের প্রতি বিশেষ যত্ন লাইতে বাব বার বলিয়া গেলেন। হৈমন্তীকে আড়ালে ডাকিয়া বলিলেন–তোর কপাল ভালো হৈম যে এমন স্বামী পেয়েছিস।

জামাই সত্যিই বড়ো ভালো, এমন মানুষ দেখা যায় না। কাজলকে গোপনে দুইটি টাকা দিয়া তিনি ছাত-ব্যাগ সহ রওনা হইলেন। অপু তাঁহাকে ট্রেনে তুলিয়া দিতে গেল।

ট্রেনে তুলিয়া দিয়া ফিরিবার সময় অপুর বুকে কেমন একটা যন্ত্রণা বোধ হইল। বাঁদিকে একটা চিনচিনে ব্যথা, কমিতেছে না। বুকে হাত দিয়া অপু কিছুক্ষণ বসিল, কিছু হইল না। মাথাটা বেশ ঘুরিতেছে, অপু ঠিক করিল। ডাক্তারের কাছে একবার ঘুরিয়া যাইবে।

স্থানীয় ডাক্তার বিশ্বনাথ সোম অপুকে দেখেন, ডিসপেনসারিতে ঢুকিতেই তিনি অপুর মুখ দেখিয়া অবাক হইয়া বলিলেন–কী হয়েছে অপূর্ববাবু? বসুন, ওই চেয়ারটাতে, হ্যাঁ–

যন্ত্রণা বাড়িতেছিল। মাথার মধ্যে যেন বিমঝিম বাজনা। বিশ্বনাথবাবু নাড়ি দেখিয়া কমপাউন্ডারকে ডাকিলেন–সুরেন, মেজার গ্লাসে পনেরো ড্রপ কোরামিন চট করে নিয়ে এসো।

কোরামিন খাইয়া অপু একটু সুস্থ বোধ করিল। বিশ্বনাথবাবু প্রেসার লাইলেন। খুব হাই।

–কিছুদিন বিশ্রাম নিন। এরকম বারবার হওয়াটা তো ভালো নয় রায়মশায়! খাওয়াদাওয়া নিয়মমাফিক, আমাকে প্রতি হগুপ্তায় একবার করে দেখিয়ে যাবেন।

অপু বাহিরে আসিল। রাস্তায় লোক কম। মাথার ভিতরটা এখনও পুরাপুরি পরিষ্কার হয় নাই। একটু হাঁটিলেই মনে হইতেছে আবার মাথা ঘুরিয়া উঠিবে। ডাক্তার বিশ্রাম লইতে বলিয়াছে, এইবার তাহাকে বিশ্রাম লইতে হইবে। একটা উপন্যাস সে লিখিতেছে, শেষ হওয়ার পূর্বে বিশ্রাম নাই। উপন্যাসটা শেষ করিয়া। তবে ছুটি।

ক্লান্ত শরীর-সামনে একটা উপন্যাস লিখিবার পরিশ্রম। হঠাৎ অপুর নিকট ‘ছুটি’ শব্দটা অত্যন্ত তৃপ্তিদায়ক বোধ হইল।

কলিকাতা হইতে প্ৰকাশকের পত্ৰ আসিল, লেখাটা তাহদের শীঘ্র প্রয়োজন। দেরি করিলে আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা।

সকালে জলখাবার খাইয়া অপু লেখা শুরু করে, দুপুরে খাইবার সময় বাদ দিয়া সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত ক্ৰমাগত লেখে। সন্ধ্যায় ক্লান্ত দেহে একটু নদীর দিকে বেড়াইতে যায়। ফিরিয়া আসিয়াই আবার রাত্ৰি বারোটা পর্যন্ত লেখে। শরীরের উপর অত্যন্ত অত্যাচার হইতেছে। উপন্যাসটি অপু হৃদয় উজাড় করিয়া লিখিবে। অপরিণত বয়সের ভাবারেগ আর নাই, এখন জীবন,সত্য উপলব্ধি করিবার সময়।

কোন সময় লিখিতে লিখিতে মাথা একেবারে ফাঁকা হইয়া যায়, হাত-পা অবশ হইয়া আসে। কলামটা টেবিলে নামাইয়া অপু অনুভব করে, শরীর ভাঙিয়া আসিতেছে-আচ্ছন্নের মতো সে কাজ করিয়া যাইতেছে। কিছুটা লোভে লোভেও বটে। কাজটা শেষ হইলে আপাতত ছুটি।

হৈমন্তী আসিয়া বকে–রেখে দাও তো! এরকম খাটলে শরীর দুদিনে ভেঙে পড়বে। শোবে চলো।

অপু চুলের ভিতর হাত চালাইতে চালাইতে বলে–আর একটু, এই চ্যাপ্টারটা শেষ করে ফেলি।

হৈমন্তী বুঝাইয়া পারে না।

একদিন অপু টেবিলেই ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। হাত হইতে কলম খসিয়া পড়িয়াছিল। খাতার উপর মাথা রাখিয়া অপু স্বপ্ন দেখিতেছিল, মধ্যপ্রদেশের সেই বন্যজীবনটা আবার ফিরিয়াছে। সে তেজী ঘোড়ার সওয়ার হইয়া আদিগন্ত হাঁটুসমান জঙ্গলে তীব্ৰবেগে ভ্ৰমণ করিতেছে। কালপুরুষ পশ্চিম দিগন্ত ছুঁই-ছুঁই করিয়াছে। বাতাসে সেই সজীব ভাবটা।

বাধা দিবার কেহ নাই, মহাশূন্যে গাঢ় অন্ধকারে ভীমরেগে ধাবমান উল্কার মতো জীবন আবার ফিরিয়াছে। চিন্তা নাই, দুঃখ নাই, ক্ষোভ নাই-স্বপ্নের মধ্যেই সব পাইবার তৃপ্তি তাহাকে আচ্ছন্ন করিতেছে। খুব জোরে ঘোড়া ছুটাইয়াছে সে। দৌড়-দৌড়-দৌড়। সামনে কালোমত কী একটা আসিতেছে, বিশাল পাহাড়ের মতো। সে ঘোড়ার রাশ টানিল।

ঘুম ভাঙিয়া সে কলমটা আবার তুলিয়া লইল, কিন্তু আর লিখিবার উৎসাহ নাই। স্বপ্ন এখনও মাথার মধ্যে ঘুরিতেছে। অর্থটা বোঝা যাইতেছে না বলিয়া অস্বস্তি হইতেছে। টেবিলের ওপাশে জানালা খোলা, হু-হু বাতাস আসিয়া কাগজ-পত্ৰ এলোমেলো হইতেছে। সবাই ঘুমাইয়া, কেবল বহুদূরের কোন সাঁওতাল বস্তির ক্লান্ত মাদলের শব্দ এখনও শোনা যায়।

চিঠি লিখিবার প্যাডটা টানিয়া লইয়া অপু মনে করিয়া করিয়া বহু পুরাতন বন্ধু আর আত্মীয়দের এক-একখানা চিঠি লিখিল। অনেককে লেখা হইল না, তাহাদের ঠিকানা মনে নাই। লিখিল–ভালো আছো? অনেকদিন খবর নিতে পারিনি, স্বার্থপরের মতো নিজের ভেতরে নিজেকে গুটিয়ে বসে ছিলাম। কিন্তু মানুষ এক বাঁচে না, তোমাদের সবাইকে আমার জীবনে বড়ো দরকার। আমাকে মনে রেখো, একেবারে ভুলে যেয়ো না যেন। মানুষের মধ্যে বেঁচে আছি—এ বোধটা আমার জীবনে যেমন প্রয়োজন, তোমাদের জীবনেও তেমনি।

চিঠিগুলি লিখিতে রাত শেষ হইয়া গেল। পূর্বদিকের টিলোটার পাশের আকাশে লাল রঙ ধরিল। মেঘের লম্বা স্তরগুলিকে দেখাইতেছে যেন আঁকা ছবি। আলো ফু দিয়া নিভাইয়া অপু বারান্দায় আসিয়া দাঁড়াইল।

বিকালে অপু ছেলেকে ডাকিয়া বলিল–খোকা চল, বেরুই কোথাও।

উঁচুনিচু লালমাটির ডাঙা ধরিয়া দুইজনে কিছুক্ষণ হাঁটিল। অনুচ্চ একটি পাহাড়ের কাছে আসিয়া অপু বলিল–আয়, এখানে বসি।

দুইটা ছোট পাথরে দুইজনে বসিল। কাজল বলিল–বাবা, সেই যে গল্পটা। নির্জন দুর্গে একলা রাজকুমারী থাকতো, সেটা আজ শেষ করো।–

সে কথা কানে না লইয়া অপু, ডাকিল-খোকা।

-কী বাবা?

-আমার কাছে উঠে আয় তো একটু।

কাজল বাবাব কোল ঘেঁষিয়া দাঁড়াইল।

–খোকা, তুই আমায় ভালোবাসিস?

উত্তর না দিয়া কাজল বাবাব বুকে মুখ গুজিয়া রহিল। তাহার বয়সী ছেলের পক্ষে ইহা বিসদৃশ হইলেও, বাবা ও মায়ের আদর পাইলে সে এমনি করিয়া থাকে।

অপু ছেলের মাথায় হাত বুলাইতে লাগিল। সূর্যাস্তের রঙে রঞ্জিত প্রান্তরে সে অনেকক্ষণ ছেলের সহিত বসিয়া রহিল। ক্রমে আলো কমিয়া কীটপতঙ্গের গুঞ্জন শুরু হইল। অপু উঠিয়া ছেলের হাত ধরিল।

–চল, বাড়ি চল, তোর মা ভাববে।

বাবার হাত ধরিয়া কাজল হাঁটিতেছিল। বাবা আজ এত গম্ভীব কেন?

কী একটা প্রাণী সুড়ৎ করিয়া রাস্তা পার হইল, অন্ধকারে দেখা গেল না। হয়তো মেঠো ইঁদুর। বাড়ি ফিরিতেই হৈমন্তী বলিল–তোমাকে বলে আর পারা গেল না। এত দেরি করে ফিরিতে হয়। খাবাব এদিকে জুড়িয়ে ঠাণ্ডা হয়ে গেল–

অপু কাজলের হাত ছাড়িয়া দিয়া অদ্ভুত ছেলেমানুষির সুরে বলিল– আর করব না। হৈমন্তী, সত্যি বলছি- আর কখনও না–

রাত্ৰে শুইয়া অপু, হৈমন্তীকে ডাকিল–হৈমন্তী।

–কী গো?

–বাইরে কেমন জ্যোৎস্না উঠেছে দেখেছি?

সুন্দর জ্যোৎস্নায় উঠান ভাসিতেছে। অষ্টমী তিথি, চাঁদ দিগন্তের দিকে ঝুঁকিয়া পড়িয়াছে। বিষণ্ণ অথচ সুন্দর জ্যোৎস্না।

হৈমন্তী বলিল–সুন্দর।

–চল, একটু বাইরে গিয়ে বসি। ঘরে ভালো লাগছে না।

ঘুমন্ত কাজলের চারপাশে মশারি গুজিয়া দিয়া দুইজনে উঠানে গিয়া বসিল। শব্দহীন রাত্রি। চাঁদের আলোয় একটু বসিতেই কেমন একটা আবেশ জড়াইয়া আসে দেহে-মনে।

-হৈমন্তী, কাল আমার উপন্যাস শেষ হয়ে যাবে। বড়ো ভালো লাগছে। যা লিখতে চেয়েছিলাম–ঠিক সেই রকমটি হল না, কিন্তু অনেকখানি পেরেছি বলে মনে হচ্ছে।

কাছেই কোথাও ঝিঁঝি ডাকিতে শুরু করিল।

–ছোটবেলায় দূরে তাকিয়ে ভাবতাম, ওই যেখানে আকাশ আর মাটি মিলেছে, তার ওপারেই আছে রূপকথার ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর দেশ। তেমনি আমার লেখায় একটা দূর দিগন্তের ইঙ্গিত রয়েই গেল। সারাজীবন আমিও এগুলাম, স্বপ্নটাও মরীচিকার মতো পিছিয়ে গেল।

হৈমন্তী অপুর হাঁটুতে হাত রাখিয়া বলিল–তোমার জীবনে কি কোন দুঃখ আছে?

–না, আমি পবিপূর্ণ, আমি তৃপ্ত। কারণ আমি বুঝেছি সন্ধানেই আনন্দ, প্ৰাপ্তিতে পরিসমাপ্তি। আমি পথ চলতে ভালোবাসি হৈমন্তী। আমি পথের শেষ চাই না।

দুইজনে কোন কথা না বলিয়া বসিয়া রহিল। বিবি ডাকোব বিবাম নাই। চাঁদ ইউক্যালিপটাস গাছ দুইটাব মাঝখান দিয়া ধীরে ধীরে নামিয়া পড়িতেছে। তাহাদের ছায়া ক্রমশ দীর্ঘ হইতে দীর্ঘতর হইয়া আসিল। চাঁদের আলো স্নান হইবাব সঙ্গে সঙ্গে নক্ষত্রগুলি উজ্জ্বল হইয়া ফুটিয়া উঠিতেছে। বাতাস একবার গাছের পাতায় হালকা দোলা দিল।

–হৈমন্তী।

–কী?

–না, থাক–

হৈমন্তী অপুর হাত ধরিয়া বলিল–বলো না, কী বলবে।

অপু একবার আকাশের দিকে তাকাইল, তারপর বলিল—বলা যায় না, বলা যায় না। ভাষা জানি নে—

পরের দিন সকালে যদু পিওন আসিল মনি অর্ডার দিতে। কিছুদিন আগে কাগজে হৈমন্তীর গল্প বাহির হইয়াছিল। তাহার পারিশ্রমিক পনেরোটি টাকা আসিয়াছে। যদু পিওন এমনি মনি অর্ডার আগেও কয়েকবার বিলি করিয়াছে। মৌপাহাডির নিরালায় হৈমন্তী বেশ কয়েকটি গল্প লিখিয়াছে।

মনি অর্ডার ফর্মে হৈমন্তী সই করিতেছে, অপু আসিয়া পিছনে দাঁড়াইল।

— বঙ্গবাণীর টাকাটা এলো বুঝি?

হৈমন্তী ফিরিয়া মুখ টিপিয়া হাসিল।

যদু, পিওন বলিল–এই তল্লাটে এমন রোজগেরে বৌ আর দেখিনি বাবু।

হৈমন্তী হাসিয়া বলিল– তোমাকে আর বকবক কবতে হবে না যদুদা। এই টাকাটা নাও, বাচাঁদের মিষ্টি কিনে দিয়ো।

টাকা দুইটি হাত পাতিয়া লইয়া বলিল–দিদির আরও অনেক মনি অর্ডার আসুক।

হাসিতে হাসিতে যদু চিঠির ব্যাগ তুলিয়া রওনা দিল।

সারাদিন অপু টেবিলেই বসিয়া রহিল। লিখিতে লিখিতে কখন যে দিন কাটিয়া গেল কে জানে। উপন্যাসের শেষ অধ্যায়ের শেষ বাক্যটি লেখা হইয়া গেল। স্তূপাকার কাগজগুলির দিকে তাকাইয়া অপুর অবাক লাগিল। শেষ হইয়া গিয়াছে। বিনিদ্র রাত্রির বেদনা-অনুভূতির ফল ওই কাগজগুলি। এইবার প্যাকেটবন্দী হইয়া কলিকাতায় যাইবে, নাকের উপর চশমা নামিয়া আসা বৃদ্ধ কম্পোজিটার বানান করিয়া করিয়া কম্পোজ করিবে।

শরীরে ভীষণ ক্লান্তি। এত পরিশ্রম সে একসঙ্গে কখনও করে নাই। ডান হাত ব্যথায় টনটন করিতেছে, হৈমন্তীকে ডাকিয়া অপু বলিল– একটু গরমজল করে দাও তো, হাতটা বড্ড বাথা করছে, ড়ুবিয়ে রাখব।

কাজ মিটিয়া গেল। সামনে অব বড়ো কোন কাজ নাই। অপু আপনমনে বেড়াইতেছিল। ছেলেবেলাকার অভ্যাসমত হাতে সরু কঞ্চির মতো একটা লাঠি লইয়াছে। অনেকক্ষণ ঘুরিবার পর মনে হইল, সে আজ ভীষণ অন্যমনস্ক। অনেক পুরাতন কথা মনে পড়িতেছে। অনেক পুরাতন মুখ। অপৰ্ণার কথা বড়ো বেশি মনে আসিতেছে। তাহাকে কিছু দেওয়া হয় নাই–তখন অপুর পয়সা ছিল না। অথচ অপর্ণা হাসিমুখে অবস্থার সহিত খাপ খাওয়াইয়া নিয়াছিল–কখনও অভিযোগ করে নাই। বড়ো সিঁদুরের টিপ পরা অপর্ণার সলজ্জ মুখখানি আজ অনেকদিন বাদে মনে পড়িয়া গেল। তাহার চিবুকের টোলটা সে স্পষ্ট দেখিতে পাইতেছে।

কাশীতে যখন বাবা মারা যায়–উঃ কী দিন গিয়াছে। কনকনে শীতের রাত্রে সেই গঙ্গাস্নান করিয়া বাড়ি ফেরা।

সবার হইতে বেশি মনে পড়ে মাকে। কখনও কিছু চায় নাই, আশা করে নাই। অপু সুখে থাকিলেই সুখী হইত। মনসাপোতার বাড়িতে ফিরিয়া তাহার প্রতি ছাত্রীর অভিভাবকদের সদয় ব্যবহারের কথা সে মাকে খুশি করিবার জন্য বানাইয়া বানাইয়া বলিত। মা সরল মনে সব বিশ্বাস করিত। ছিন্নবেশ-পরা মায়ের হাস্যময়ী চেহারা মনে পড়িয়া যায়।

ঘুরিতে ঘুরিতে সুবর্ণরেখার তীরে আসিয়া পড়িয়াছে অপু। বসিলে মন্দ হয় না। যে পাথরটার উপর বসিয়া সে লিখিত, জুতা ছাড়িয়া তাহার উপর অপু বসিল। জনপ্রাণী নাই কোনদিকে। সুবর্ণরেখার শূন্য বুকটা খা-খাঁ করিতেছে। কয়েকটি বক একপায়ে নদীর চরে ধ্যানমগ্নের মতো দাঁড়াইয়া। সূর্য যেন জ্বলিতেছে। অপুর মনে হইল, সবদিকে কেমন একটা নাই-নাই ভাব। আকাশ বিক্ত। এতটুকু মেঘ নাই। নদীর বুক রিক্ত, জল নাই। দিগন্ত পর্যন্ত প্রান্তর রিক্ত, নদীর ওপারে কেবল একটিমাত্র পলাশ গাছ বিপুল একটি প্রাকৃতিক কবিতার যতিচিহ্নের মতো সোজা মাথা তুলিয়া আছে। গাছটার সর্বাঙ্গে যেন আগুন। নিঃস্ব প্রান্তরের পটভূমিতে পুষ্পিত পলাশগাছটাকে সামান্য এতটুকু সত্ত্বনার মতো দেখাইতেছে।

এমনি একটা দিনে কলিকাতা হইতে মায়ের জন্য সামান্য কিছু জিনিস কিনিয়া গ্রামের পথে হাঁটিয়া মনসাপোতায় ফিরিয়াছিল। দরজা খুলিয়া তাহাকে দেখিয়া মা কি খুশিই না হইয়াছিল! মাকে জড়াইয়া আদর করিলে কেমন সুন্দর গন্ধ পাওয়া যাইত মায়ের গায়ে।

মাকে মনে পড়িতেছে। ছোটবেলায় মা তাহাকে পাঠশালায় যাইবার জন্য খুব সকালে ঘুম হইতে তুলিয়া দিত, নিজের হাতে সাজাইয়া হাতে বই দিয়া বলিত–যাও বাবা, পাঠশালায় যাও। তুমি লেখাপড়া শিখে মানুষ হলে বংশে্র নাম উজ্জ্বল হবে।

সে কি মানুষ হইতে পারিয়াছে? অথবা মা কি অন্য কিছু চাহিয়াছিল, যা সে হইতে পারে নাই?

একদিন রাগ করিয়া সে মায়ের দেওয়া তালের বড়া ছুঁড়িয়া উঠানে ফেলিয়া দিয়াছিল। অনেকদিন আগের ঘটনাটা। মায়ের কত কষ্টে জোগাড় করা জিনিসে তৈয়ারি।

এসব মনে করিয়া তাহার চোখে জল আসিতেছে কেন? আশ্চর্য! ইহা কি কাঁদিবার সময় হইল? এমন সুন্দর পরিবেশে? কিছু দূরে নদীর বাঁকের মুখটায় বালির উপর তাপতরঙ্গ থর থর করিয়া কাঁপিতেছে, আকাশে সূর্য, ধূ-ধূ প্ৰান্তর-সব মিলাইয়া স্বরলিপির তীব্র মধ্যমের মতো।

একটা ঢিল তুলিয়া জোরে নদীর দিকে ছুঁড়িল, বেশ জোরে। সঙ্গে সঙ্গে অনুভব করিল বুকের বাঁদিকে যন্ত্রণা শুরু হইয়াছে। সামনে হইতে জোরে ধাক্কা মারিলে যেমন হয়, তেমনি ভাবে বুকে হাত দিয়া কিছুটা ছিটকাইয়া পিছনে সরিয়া আসিলা। মুহূর্তে মাথা কী রকম খালি হইয়া গেল। সূর্যটা যেন একবার কাছে আসিতেছে, সঙ্গে সঙ্গে আবার দূরে সরিয়া যাইতেছে।

অপু অনুভব করিল, পা দুইটা তাহাকে আর দাঁড় করাইয়া রাখিতে পাবিতেছে না। পাথরটার গায়ে হেলান দিয়া সে মাটিতে বসিয়া পড়িল। ব্যথাটা বাড়িতেছে-শ্বাস লাইতে কষ্ট হইতেছে। খুব গভীর ঘুম আসিবার আগে যেমন হয়, শরীরে তেমনি অবসাদের ভাব। দেহে-মনে অবসাদ মাকড়সার জালের মতো জড়াইয়াছে। সে কি এইখানে একটু ঘুমাইবে?

বাবা বাড়ি আসিয়া বলিতেছে–দুৰ্গা কই? তার জন্য শাড়ি কিনে এনেছি যে—

বাবা থলির ভিতর হইতে অনেক জিনিস বাহির করিতেছে। হঠাৎ অপুর মনে হইল–সত্যিই তো, দিদি কই? তাহাকে সবাই কোথায় হারাইয়া ফেলিয়াছে। দিদিকে খুঁজিতে হইবে।

ঘুম-ঘুম-ঘুম-। বুক বাহিয়া চিনচিনে ব্যথাটা উপরে উঠিতেছে। যন্ত্রণা ততটা আর বোধ হইতেছে না, তাহার খুব ঘুম পাইয়াছে। কানের কাছে তীক্ষ্ণস্বরে একটা পাখি ডাকিয়া উঠিল। নিশ্চিন্দিপুরে সেই পাখিটা যেমন ডাকিত। সামনের ওই ব্যাপ্তির ভিতর কোথায় যে বাজনা বাজিতেছে। গম্ভীরনাদ বীণার উদারার তারে আলাপের মতো। তারের উপর এক-একটি আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে সে একটু একটু ঘুমাইয়া পড়িতেছে। হাত-পায়ের সমস্ত শক্তি চলিয়া গিয়াছে। আর সে চলিতে পরিবে না, সমস্ত জীবনে অনেক ঘোরা হইয়াছে–এইবার সে একটু বিশ্রাম করিয়া লইবে। এইখানেই বিশ্রাম করিবে।

আশবার্টন সাহেব বলিতেছে–East opened my eyes, Roy, it really enthralls me, this call of the mysterious-this mystic span of the river–

অ্যাশবার্টনকে দেখিয়া সে উঠিবার চেষ্টা করিল। সে শুইবে না। সে অনড় হইয়া থাকিবে না–কিছুতেই না। কিন্তু শরীর তাহার কথা মান্য করিতেছে না। তাহাকে কেহ উঠাইয়া দিতেছে না। কেন?

ওই বড়ো পাথরটার আড়ালে যে দাঁড়াইয়া ছিল, তাহাকে সে চিনিতে পারে নাই। এইবার সে বাহির হইয়া সামনে আসিয়াছে।

লীলা!

–পোর্তোপ্লাতায় যাবে না অপূর্ব? তুমি যে বলেছিলে সোনা উদ্ধার করে আনবে সমুদ্রের তলা থেকে?

হ্যাঁ, যাইতে হইবে বৈকি! অতল সমুদ্রের নিচে তাহার জন্য যে রত্ন অপেক্ষা করিয়া আছে, তাহাদের সে সূর্যের আলোয় বাহির করিয়া আনিবে।

–খোকা কোথায় গেল, খোকা? খোকা, আমার পাশে আয়–এইখানটায়। কোল ঘেঁষে বোস, উঠে যাসনে কোথাও। আমি তোকে কলকাতা থেকে সেই বইটা এনে দেবো এবার। উঠে যাস নে বাবা আমার–তোকে না দেখে আমি যে মোটে থাকতে পারি না।

তাহার মা বলিতেছে—ঘুমো অপু, ঘুমো। আহা বে, বড় খাটুনি গেছে তোর—

ঘুমাইয়া পড়িবার আগে অপু জোর করিয়া একবার তাকাইল। দেখিল, লাল ফুল ফুটিয়া থাকা পলাশ গাছটার পাশ দিয়া একটা পথ সমস্ত প্ৰান্তরকে দ্বিধাবিভক্ত করিয়া দূরে দিগন্তে মিশিয়া গিয়াছে।

০৭. বুধন সর্দার আর তার ছেলে

বুধন সর্দার আর তার ছেলে সুবর্ণরেখার ধারে কী কাজে আসিয়াছিল। অপুকে বুধন চিনিত, বেড়াইতে বাহির হইয়া অপু বহুদিন তাহার বাড়িতে জল চাহিয়া খাইয়াছে। বুধন দেখিল, ঢালু পাড়ের উপর একখণ্ড পাথরে হেলান দিয়া বাবু ঘুমাইয়া রহিয়াছে। পাশেই চটিজোড়া খোলা রহিয়াছে। পাথরের উপর সরু কঞ্চি।

ছেলেকে দাঁড় করাইয়া বুধনই প্রথম লোক ডাকিয়া আনে।

বাড়িতে শহরের লোক ভাঙিয়া পড়িয়াছে। ডাক্তার বিশ্বনাথ সোমও আসিয়াছেন। তখন আর কিছু করিবার ছিল না। বিশ্বনাথ বিষণ্ণমুখে বলিলেন–রায়মশায়কে এই জন্যই বলেছিলাম পরিশ্রম কম করতে, শুনলেন না সে কথা–

অপুর অনেক ভক্ত আসিয়াছিল। যোগাড় যন্ত্র করিয়া তাহারা দাহ করিবার ব্যবস্থা করিল। অনেক মানুষ, অনেক গোলমাল–তাহার মধ্যে অপু যেন চুপ করিয়া শুইয়া আছে। মুখ দেখিয়া হৈমন্তী স্পষ্ট বুঝিতে পারিল, শেষ সময়ে অপু বেশি কষ্ট পায় নাই। মুখে একটি তৃপ্তির ভাব মাখানো।

পাড়ার লোকেই হৈমন্তীর বাপের বাড়ি টেলিগ্রাম করিয়াছে। ঘটনাগুলি হৈমন্তীর চোখের সামনে ছায়াবাজির মতো ঘটিয়া যাইতেছিল। সে যেন ইহার সঙ্গে জড়িত নয়, সে শুধু দর্শক মাত্র।

দাহ শেষ করিয়া শেষরাত্রে সবাই ফিরিল। খাটের পায়ার কাছে হৈমন্তী একভাবে বসিয়া আছে, একটুও নড়ে নাই। দিন তাহার চোখের সামনেই রাত্রি হইয়াছিল, আবার রাত্রিও ভোর হইতে চলিল।

সবাই অবাক হইল কাজলকে দেখিয়া। শ্মশানে সে মুখাগ্নি করিয়াছে অত্যন্ত শান্তভাবে। ফিরিয়া সেই যে জানালায় দাঁড়াইল, পরের দিন দুপুর পর্যন্ত আর সেখান হইতে নড়িল না। পাশের বাড়ির ওভারসিয়ারবাবুর স্ত্রী আসিয়া সারারাত হৈমন্তীর কাছে বসিয়া ছিলেন। তিনি পর্যন্ত কাজলের নিস্পৃহতা দেখিয়া অবাক হইলেন।

অকস্মাৎ বজ্ৰপাত হইয়া সব যেন বিনষ্ট করিয়া দিয়াছে। উনানে আগুন নাই, ঠাকুরের কাছে প্ৰদীপ জ্বালা হয় নাই, পরের দিন সন্ধ্যা হইয়া গেল, তখনও কেহ ঘরে আলো জ্বলিল না। ওভারসিয়ারবাবুর স্ত্রী সমস্ত রাত জাগিয়া ক্লান্ত ছিলেন, বিশ্রাম করিতে তিনি বাড়ি চলিয়া গিয়াছেন। আবার সকালে আসিবেন বলিয়াছেন। কিছু ফল ও দুধ আনিয়া তিনি বার বার খাইতে বলিয়া রাখিয়া গিয়াছেন। ফলের থালা এবং দুধের ঘটি এখনও জলচৌকিটার উপর পড়িয়া আছে-কেহ তাহাতে হাত দেয় নাই।

দুপুরে কাজল অপুর লেখার ঘরে গিয়া বসিল। সমাপ্ত পাণ্ডুলিপিটা বড়ো খামের ভিতর টেবিলের উপর রাখা। টেবিলের এক কোণে বাবার চুল আঁচড়াইবার যশোরের চিরুনিখানা, তাহাতে বাবার কয়েকটা চুল এখনও জড়াইয়া আছে। ঘাড়ের কাছে ময়লা হইয়া যাওয়া দুইটা জামা দেয়ালের পেরেকে ঝুলিতেছে। এসব দেখিতে দেখিতে কাজল জানালা দিয়া বাহিরে তাকাইল। বেলা পড়িয়া আসিতেছে। সূৰ্যটা কেমন করুণাহীন-কাহারও দুঃখের সমবাহী নহে, সমস্ত দিন কেবল ঘুরিতেছে। একটা মাকড়সাই দুই দেয়ালের কোণে জাল বুনিতেছে অখণ্ড মনোযোগে।

অনেক রাত্রি পর্যন্ত কাজল টেবিলে এবং হৈমন্তী খাটের পায়ের কাছে বসিয়া রহিল। ঝকঝক শব্দ করিয়া রাঁচি এক্সপ্রেস জামসেদপুবের দিকে রওনা হইয়া গেল। সমস্ত দিন গরমের পর একটু ঠাণ্ডা বাতাস দিতেছে। ঘরে আলো নাই, অন্ধকারের ভিতর সমস্ত বাড়ির শূন্যতাটা হৈমন্তীর কাছে বেশি করিয়া ফুটিল। হঠাৎ পায়ের শব্দ। একটা পরিচিত গলার স্বর শোনা গেল। মানুষটি বারান্দায় উঠিল। সঙ্গে সঙ্গে ওভারসিয়ারবাবুর গলা–বাঁচি একসপ্রেসেই এলেন বুঝি?

একটা দেশলাইয়ের কাঠি জ্বলিয়া উঠিল অন্ধকারে। সেই আলোয় কে পথ দেখিয়া আসিতেছে। ঘরের মধ্যে আবার একটা কাঠি জ্বলিতে হৈমন্তী বিরক্তির সহিত মুখ ফিরাইল। কে আসিয়া তাহার মাথায় হাত রাখিয়া বলিল–ভয় নেই মা, আমি এসেছি। বাড়ি অন্ধকার কেন?

সুরপতিবাবু আসিয়াছেন। মালতীনগরে যাইবার আয়োজন হইতে লাগিল। সুরপতিবাবু, হৈমন্তী ও কাজলকে মালতীনগরে লইয়া যাইবেন জিনিসপত্র প্রায় সবই এখানে রাখিয়া যাওয়া হইতেছে, লইয়া যাওয়া খুব কষ্টকর এবং তাহার প্রযোজনও নাই। দুই-চারখানা কাপড় সঙ্গে যাইতেছে মাত্র।

সুরপতিবাবু দিন পাঁচেক মৌপাহাড়ি থাকিলেন। মেয়ে সদ্য শোক পাইয়াছে, একটু সামলাইয়া নিক। বিকালের দিকে শতরঞ্চি পাতিয়া তিনি উঠানে বসেন। অন্যমনস্ক হইয়া চাহিয়া থাকেন কোন একদিকে। কিছুদিন আগে এইখানে বসিয়াই অপুর সহিত গল্প হইয়াছিল। অপু বলিয়াছিল-আত্মার বিনাশ নেই বাবা! আত্মা একটা শক্তি! একটা ভীষণ শক্তি। শক্তির বিনাশ নেই, রূপান্তর আছে মাত্র।

পরলোকে বিশ্বাসী সুরপতিবাবু চারদিকে তাকাইয়া দেখেন। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা হইতেছে। তাঁহার মনে হয় এই মাটি জল বাতাসের ভিতর, ওই দূরের নক্ষত্রটার ভিতর অপুর আত্মা বুপান্তরিত হইয়া মিশিয়া গিয়াছে।

সারাদিন ধরিয়া মৌপাহাড়ি ছাড়িয়া যাওয়ার তোড়জোড়–অথচ সবাই জানে তোড়জোড় করিবার কিছু নাই। সঙ্গে বেশি জিনিসপত্র যাইতেছে না। মৌপাহাড়ির সহিত এতদিনে যে সম্পর্কটা বন্ধু সুখস্মৃতির সঙ্গে জড়িত হইয়া বাড়িয়া উঠিয়াছে, আসল কষ্ট সেটাকে ছিন্ন করা।।

রাত্রি ঝিমঝিম করিতে থাকে। তখনও আলোকবিন্দুহীন অন্ধকারের ভিতর হৈমন্তী কাজলের পাশে শুইয়া চুপ করিয়া তাকাইয়া থাকে। দূরের থানায় ঘণ্টা বাজিয়া যায়। অনেকক্ষণ পরেও হৈমন্তী বুঝিতে পারে, কাজল জাগিয়া আছে।

পর পর কয়েক রাত জাগিয়া চতুর্থদিন শেষরাত্রে হৈমন্তী ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। ঘুমাইয়া সে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখিল। দেখিল সে বড়ো স্টিলের ট্রাঙ্কটা খুলিয়া তার সামনে দাঁড়াইয়া। কোথাও বেড়াইতে যাওয়া হইতেছে। পাশেই বই–এর আলমারি। অপু হাসিয়া বলিতেছে—শুধু জামাকাপড় নিলেই কি চলবে? আমি তো বই ছাড়া মোটে থাকতে পারি নে–

অপু তাহাকে বই আগাইয়া দিতেছে, সে সাজাইয়া লইতেছে ট্রাঙ্কের ভিতর। মন ভরা বেড়াইতে যাইবার আনন্দ। যেন সব ঠিক আছে। যেন কিছুই বদলায় নাই।

পরের দিন ঘুম হইতে উঠিয়া হৈমন্তী সুরপতিবাবুর কাছে গিয়া দাঁড়াইল।

–বাবা!

–কী মা?

–এখান থেকে আর কিছু নয়—শুধু বইগুলো নিয়ে যাবো।

সুরপতি হৈমন্তীর দিকে তাকাইলেন। কোনো প্রশ্ন করিলেন না। কিছুক্ষণ তাকাইয়া মুখ নিচু করিয়া বলিলেন–তাই হবে মা। একটা বইও ফেলে যাবে না।

কয়েকটা প্যাকিং বাক্সে বইগুলি ভর্তি করিয়া সুরপতি মালতীনগরের ঠিকানায় রেলে বুক করিয়া দিলেন।

যাইবার দিন সকালে কাজল একবার সুবর্ণরেখাব ধাবে গেল। বাবা যে পাথরটার উপর বসিয়া লিখিত, সেটা একইভাবে পড়িয়া আছে। কাজলের অবাক লাগিল। যখন কাজলও পৃথিবীতে থাকিবে না, তখনও এটা এইভাবে এখানে পড়িয়া থাকিবে। এই নদী, এই চর, ওই প্রান্তর-সবই একই রকম থাকিবে। আকাশটা নীল থাকিবে। কেবল সে থাকিবে না। যেমন এখন বাবা নাই।

কী-একটা পাখি মাথা সামনে পেছনে নাড়াইতে নাড়াইতে ক্ৰমশ চর বাহিয়া নদীর ভিতরে যাইতেছে। ওপারে বাঁদিকে টিলার মাথায় সূর্যটা যেন আটকা পড়িয়াছে। বাবা এই সমযে অনেকদিন এইখানে বসিয়া লিখিত। সে কতদিন আসিয়া বাবাকে ডাকিয়া লইয়া গিয়াছে। একবার তাহার মনে হইল, পিছন ফিরিয়া তাকাইলে বাবা একটা ঝোপের আড়াল হইতে বাহির হইয়া আসিবে।

–অমন লুকিয়ে ছিলে কেন বাবা?

অপু হাসিয়া বলিবে–দেখছিলুম, আমায় না দেখতে পেয়ে তুই ভয় পাস কি না। এমন কতদিন ঘটিয়াছে। বাবা তাহার সহিত ছেলেমানুষের মতো খেলা করিত। লুকোচুরি খেলা শেষ হইলে খাতপত্র গুটাইয়া তাহারা বাড়ির পথ ধরিত।

এবার বাবা বড়ো কঠিন জায়গায় লুকাইয়াছে। আর কেহ তাহাকে পাইতেছে না। আব্ব তাহাকে কোনদিন কেহ খুঁজিয়া বাহির করিতে পরিবে না।

খেলিতে খেলিতে খেলাটা হঠাৎ যেন ভারী রকমের হইয়া গিয়াছে।

হৈমন্তী জানালা খুলিয়া দিতেই প্রথম নজরে পড়িল ইউক্যালিপটাস গাছ দুইটা। সকালেও বাতাস তাহদেø