Sunday, April 21, 2024
Homeকিশোর গল্পরূপকথার গল্পহ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার গল্প

হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার গল্প

হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার গল্প

শহরটার নাম হামেলন৷ সবাই চেনে হ্যামিলন নামে৷ ছোট্ট, সাজানো, সুন্দর শহর হ্যামিলন৷ সেই শহরের মানুষের খুব দু:খ ৷ সেখানে যেন ইঁদুর বন্যা হয়েছে৷ বলছি ১২৮৪ সালের কথা৷ হাজারে হাজারে ইঁদুর৷ এখানে সেখানে৷

ঘরের মধ্যে যাও সেখানেও ইঁদুর৷ এই ধরো কোন বাচ্চা স্কুলে যাবে, ব্যাগ গোছাচ্ছে, দেখা গেল ঐ ব্যাগের মধ্যে গোটা পাঁচেক ইঁদুর ছানা৷ কিংবা স্কুলের খেলার মাঠে শিশুদের পা খামচে ধরছে ইঁদুর৷ কি যে যাচ্ছেতাই অবস্থা!

রোজই এরকম ঘটতে লাগল। দিনের-পর-দিন, রাতের-পর-রাত।….সকাল হয়েছে এইমাত্র। রাস্তায় দু-একজন লোক দেখা যাচ্ছে। এদিক তড়াক করে লাফিয়ে বিছানা, থেকে নামতে গেল। কিন্তু এ কী! পা পড়ল কিসের উপর? নরম, গোলগাল জ্যান্ত যেন কিছু। ভালো করে দেখতেই ভয়ে ও ঘেন্নায় শিউরে উঠে চেঁচাতে লাগল, মা, মা, শিগগির এসো।

পায়ের নিচে পড়ে থেঁতলে চেপ্টে আছে একটা ইঁদুর। এইটাই হল আসল যন্ত্রণা। ইঁদুরের উৎপাতে আর টেকা যাচ্ছে না। শয়ে শয়ে, লাখে লাখে কোথেকে রাজ্যের ইঁদুর এসে সারা শহর ভরিয়ে ফেলল। এক-পা চলতে যাও, একটা-না-একটা ইঁদুরের সঙ্গে দেখা তোমার হবেই।

আলমারির ভিতরে জামা-কাপড় রাখা আছে, তুমি একটু বের হবে বলে কাপড় বের করতে গেছ যেই, অমনি বাপরে! বলে লাফিয়ে উঠল একটা ধেড়ে ইঁদুর! অথবা ধরো, দিব্যি বাবু সেজে কোট-প্যান্ট পরে রাস্তায় বেরিয়েছ, মাঠের দিকে একটু ঘুরে আসবে, বিকেলে একটু হাওয়া খাবে। রুমাল বের করতে পকেটে যেই হাত দিয়েছ, সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠলে। ইঁদুরে কামড়ে দিয়েছে। কোটের পকেটে দিব্যি আরামে শ্রীমান ঘুমিয়ে ছিল এতক্ষণ।

এরকম হাজার হাজার ঘটনা রোজই ঘটতে লাগল। এতটুকু নিস্তার নেই এই আপদগুলোর হাত থেকে। কী বিপদ যে হয়েছে! ঘরে কিচ্ছুটি রাখবার জো নেই, সব তছনছ করে দিচ্ছে কেটেকুটে। খাবার ঘরে দুধ, মাংস, ডিম—কিছুই হাঁড়িতে, আলমারিতে থাকছে না; দল বেঁধে সব আসছে আর খেয়ে যাচ্ছে। অবিশ্বাস্য ব্যাপার বটে! কিন্তু কী সাংঘাতিক!

একদিন তো তারা একটা কুকুরকেই আক্রমণ করে বসল। এমন কথা শুনেছ কোনোখানে যে, ইঁদুরের দল কুকুরকে তাড়া করে নিয়ে বেড়াচ্ছে! আরেক দিন কী হল বলি। ভাড়ার ঘর থেকে দুধ চুরি করতে গিয়ে দ্যাখে, এক হুলোবেড়াল আগেই ভাগ বসিয়েছে সেই দুধে। আর যায় কোথা! সব ইঁদুর একজোট হয়ে বেচারা বিড়ালটাকে মেরেই ফেলল। শেষকালে, এইসব অঘটন ঘটার ফলে অবস্থাটা এমন দাঁড়াল যে, কুকুর-বিড়ালরা আর ঘর থেকে বের হতে চায় না, ইঁদুরের ভয়ে এককোণে চুপচাপ বসে কেবলই ঝিমুতে লাগল।

সত্যি বলতে কী, কেউ রেহাই পেল না এই দস্যি ইঁদুরগুলোর হাত থেকে। তারা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের হাত থেকে দিব্যি খাবার কেড়ে নিয়ে খাচ্ছে, দরকার হলে এমনকি তাদের আঁচড়ে, কামড়ে দিচ্ছে। ছেলেমেয়েরা যে একটু নিশ্চিন্তে আরাম করে শুয়ে ঘুমুবে তার জো নেই; তাদের দোলনায় শুয়ে ঘুমুতে লাগল ইঁদুরেরা দল বেঁধে।

লোকজনের টুপির মধ্যে মহানন্দে এরা আস্তানা বাঁধে। এদের কিচমিচ চেঁচামেচিতে কান ঝালাপালা বাড়ির লোকদের, দু-দণ্ড বসে কেউ আলাপ করতে পারে না। যত্রতত্র ইঁদুরের উৎপাতে শান্তি নেই কোথাও। টেকা যায় না বাড়িতে এদের জ্বালায়, অফিস-আদালতেও একই অবস্থা; যন্ত্রণা সর্বত্র, এতটুকু শান্তি নেই কোনোখানে।

সারা শহরের লোকের সে কী দুর্দশা! অথচ তাদের শহরের মতো সুন্দর শহর আর কোথা? হ্যামেলিন, কী সুন্দর তুমি! বিশাল দেশ জার্মানি। তারই উত্তর-পশ্চিমে এই শহর। পশ্চিমপ্রান্তে বয়ে যাচ্ছে স্বচ্ছ পানির হেসার নদী। আর দূরে পর্বত। ছবির মতো সুন্দর শহর হামেলিন।

সেদিন সভা বসল শহরে। না-বসে উপায় নেই, অনেক সহ্য করা গেছে, আর পারা যায় না, এবার হেস্তনেস্ত একটা করে ফেলতেই হয়। নগরের পৌরসভার অধিকর্তা মেয়র সভা ডেকেছেন। গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সকলেই এসেছেন। আজ সভাতেই ঠিক হবে, কী করা যায় এই উৎপাতের, ইঁদুরের বংশ নির্বংশ করা যায় কোন উপায়ে।

চেয়ারে বসে আছেন মেয়র। দুশ্চিন্তায় মাথা বোঁ-বোঁ করে ঘুরছে। কীই বা করবেন তিনি? ইঁদুরের বিরুদ্ধে কী করে লড়াই শুরু করবেন ভেবেই পাচ্ছেন না। সভাকক্ষের বাইরে নগরবাসী সব জড়ো হয়েছে। তারা অধৈর্য হয়ে হট্টগোল, চেঁচামেচি করছে। সমাধান একটা খুঁজে বের করতেই হবে, নইলে অপমানের কিছু আর বাকি থাকবে না আজ।

সভা আরম্ভ হল। বেচারা মেয়র। চিন্তায় মাথার ঠিক নেই, গলা কাঁপছে। উঠে দাঁড়ালেন, তারপর ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন, গলা বসে যাচ্ছে, কণ্ঠস্বর কাঁদো-কাঁদো : “বন্ধুগণ, বড়ই দুর্ভাগ্য আমার যে, আজকে আমি এখানে। মনে হচ্ছে, এই শহর থেকে, এই সভা থেকে যদি দূরে থাকতে পারতাম! কী ভালোই না হত তাহলে! এই জ্বালা আর সহ্য হয় না—এই দায়িত্ব আর তারই মধ্যিখানে হঠাৎ করে এই বিপদ। আপনারা তো আমার কেবল দোষই দেখে বেড়ান, আমি নাকি কিছুই করছি না।

আমার মাথা ভাঙবার জন্য সবাই তৈরি হয়ে আছে, আমি জানি। মাথা ভাঙা তো সোজা ব্যাপার। উহ্, আবার দেখছি মাথা ধরল আমার , মাথা ছিড়ে যাচ্ছে যন্ত্রণায়।” এই পর্যন্ত বলে থামলেন মেয়র। দুহাতে কপালের রগদুটো চেপে ধরে রইলেন মিনিট-দুয়েক। তারপর ফের শুরু করলেন—“হ্যা, যা বলছিলাম, মাথা ভাঙা খুব শক্ত ব্যাপার নয়, ইচ্ছে করলেই ভাঙতে পারবেন—মাথাটা তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না, কাধের উপরই আছে।

কিন্তু উপায় কিছু একটা বাৎলান তো দেখি! আপনারাও তো নিশ্চয়ই ভাবনাচিন্তা করছেন এ নিয়ে, কী করা যায় এ সমস্যার। আপনারাই বলুন কিছু। আমি আর ভাবতে পারছি না, মাথা ঘুরছে আমার। উহ, কেবল একটা যাঁতিকল, যাঁতিকল; কত চেষ্টাই যে করলাম একটা উপায় বের করতে, কিন্তু বৃথাই, বৃথাই সব চেষ্টা।

এখন, শুনলে আপনারা বিশ্বাস করবেন না যে, কোনো একটা শব্দ শুনলেই বুকের মধ্যে হাতুড়ি পেটে, মনে হয়—এই বুঝি ইঁদুর আসছে।” এই বলে বসে পড়লেন মেয়র সাহেব। একসঙ্গে এত কথা বলায় ক্লান্ত তিনি; এখন বসে বসে ঝিমুতে লাগলেন। সভাকক্ষ একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে গেল, টু-শব্দ নেই কারো মুখে, সুচ পড়লেও শব্দ শোনা যাবে— এরকম নীরবতা। মাথায় হাত দিয়ে সকলেই ভাবতে লাগলেন। ভাবছেন তো ভাবছেনই, কেবলই ভাবছেন, কিন্তু সমস্যা সমাধানের কোনো হদিশ পাচ্ছেন না।

এমন সময়, হঠাৎ—টুক টুক টুক টুক! কিসের শব্দ? কান খাড়া করে শুনলেন সকলে। মেয়রের ঝিমুনি ছটকে সরে গেল, উত্তেজনায় তিনি খাড়া হয়ে বসলেন। এ্যা, ইঁদুর, ইঁদুর নাকি? না তো। আবার শব্দ : টুক, টুক। ঠিক দরজার বাইরে; দরজার উপরে যেন কেউ টোকা দিচ্ছে।

“কে? এসো, ভিতরে এসো।” সন্দিগ্ধভাবে ভীরু হেঁড়ে গলায় হাঁক দিলেন মেয়র। আর তখনি দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল সে। তার চেহারা আর পোশাক-আশাক দেখে চোখ গোল হয়ে গেল সকলের। আসলেই, দেখতে সে বেশ অদ্ভুতই বটে! রোগা, ঢ্যাঙা। একমাথা উষ্কখুষ্ক চুল, কতদিন-যে তেল পড়েনি, চিরুনির ছোঁয়া পায়নি কে জানে, উড়ছে।

দাড়িগোঁফ কিচ্ছু নেই। গায়ের রং ফরসা নয়, হয়তো কোনোকালে ফরসা ছিল; এখন ময়লা, তামাটে হয়ে গেছে। চোখ কিন্তু তার খুব সুন্দর। কী উজ্জ্বল নীল আর তীক্ষ! পোশাক তো আরো চমৎকার। লম্বা আলখেল্লা ঝুলছে কাঁধ থেকে পা পর্যন্ত; তার রং আবার দু-রকমের—অর্ধেক লাল, অর্ধেক হলুদ। যে-কোনো লোক দেখলেই বুঝতে পারবে যে, এই লোকটি বাউণ্ডুলে, কোনো চালচুলো নেই, আপনজনও নেই কেউ, সমস্ত পৃথিবীতে কী স্বাধীন, মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে সে। অদ্ভুত লোকটির ঠোটে সর্বদা এক মিষ্টি হাসি খেলা করছে যেন। কেমন সুখী, তৃপ্ত, উদাসীন।।

সে এগিয়ে এল আরো। সকলের সম্মুখে, খুব কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর বলতে লাগল : “হুজুর, আপনারা গণ্যমান্য লোক। আমার একটা আর্জি আছে। বাঁশি বাজিয়ে তাদের আমি বশ করতে পারি। বিশেষ করে যেসব প্রাণী লোকের ক্ষতি করে, যেমন ধরুন—ছুঁচো, কুনো ব্যাঙ, কি বিষাক্ত কোনো সরীসৃপ। সবই আমি বশীভূত করতে পারি।

এজন্য সকলে আমাকে বহুরূপী বাঁশিওয়ালা বলে ডাকে।” এতক্ষণ কেউ ঠাহর করে দ্যাখেনি, কিন্তু এ-মুহর্তেই নজরে পড়ল সকলের—তার গলা থেকে ঝুলছে লাল আর হলুদ রঙের একটা উড়ুনি, তারই প্রান্তদেশে বাধা রয়েছে একটা ভেঁপু। মনে হচ্ছে লোকটির হাতের দশ আঙুল যেন চঞ্চল হয়ে উঠল, এখনি হাত দিলেই বেজে উঠবে অলৌকিক মায়াবি ভেঁপু।

কেউ কোনো কথা বলার আগেই বাঁশিওয়ালা আবার বলে উঠল : “এই তো সেদিন—গত জুন মাসে আমি তাতারদের দেশে গিয়েছিলাম, উঁশ-মাছির অত্যাচারে তারা অতিষ্ঠ্য ছিল। তারপরে এই সেদিন এশিয়া মহাদেশের এক অঞ্চলে রক্তচোষা বাদুড়ের উৎপাত দেখা দিয়েছিল। বাঁশি বাজিয়ে এগুলো দূর করলাম। ইঁদুর নিয়ে আপনাদের তো জ্বালা-যন্ত্রণার শেষ নেই, আমি ইঁদুর গুলো তাড়াব, অবশ্য আপনারা যদি চান। তার জন্য খুব বেশি এমন কিছু খরচ হবে

আপনাদের। বেশি না, কেবল এক হাজার গিল্ডার আমাকে যদি দয়া করে আপনারা—” কথা তার শেষও হল না, সভাস্থ সকলে আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল : “কী বলছ? এক হাজার? আমরা তোমাকে পঞ্চাশ হাজার গিল্ডার দেব।” ক্ষীণ হাসির রেখা দেখা দিল বহুরূপী বাঁশিওয়ালার দুই ঠোঁটে।

রাস্তায় নামল তখন মায়াবি বাঁশিওয়ালা। ফু দিল তার বাঁশিতে। তীক্ষ্ণ চোখ তীক্ষ্ণতর হল, স্বপ্নের আভা খেলা করল সেখানে। বাঁশিতে ফু দিচ্ছে সে। কী সুরেলা সে-বাঁশির সুর। এত মধুর বাঁশি কেউ কখনো শোনেনি। আর তার পরেই আশ্চর্য সব কাণ্ড ঘটতে লাগল। হুটপাট-দুদ্দাড় আওয়াজ হচ্ছে। আবার বিস্ময়ে চোখ বিস্ফারিত করে সকলে দেখতে লাগল ইঁদুরের দল।

তারা আসছে, ইদুরের দল, নাচতে নাচতে শহরের সব ঘরবাড়ি থেকে, আনাচ থেকে, কানাচ থেকে সব পথে বেরিয়ে এসেছে। ইঁদুর, ইঁদুর, ইঁদুর ইদুরে চারিদিক ছেয়ে গেল। রাজ্যের যত ইঁদুর এসে জড়ো হচ্ছে রাস্তায়। মোটা, রোগা, লম্বা, বেঁটে, কালো, ধলো, খয়েরি, পাটকিলে, লেজলম্বা, লেজ-ছোট, মোটা-মাথা, পেট-রোগা – হাজার রকমের হাজার বর্ণের লক্ষ লক্ষ ইঁদুর নাচতে নাচতে এগিয়ে আসছে আর জড়ো হচ্ছে রাস্তায়।

তালে তালে বাজছে জাদুকরের ভেঁপু। রাস্তা ধরে ধীরে ধীরে এগুচ্ছে সে, সঙ্গে চলেছে। ঐ ইঁদুরের মিছিল : বাপ-মা, ভাই-বোন, চাচা-চাচি, নানা-নানি, দাদা-দাদি, ছেলে-বুড়ো প্রত্যেকে প্রত্যেকের সাথে গায়ে গা মিলিয়ে গভীর আত্মীয়তায় তালে-তালে হেলেদুলে নেচেনেচে চলেছে রাস্তায়। একটি ইদুরও আর পড়ে নেই কোথাও, সবচেয়ে বাচ্চা ইঁদুরটিও বাদ যায়নি; বুড়ো অথর্ব যে, তার আনন্দও আজ বাধ মানছে না সকলের সাথে সেও চলেছে নেচেনেচে।

একটা রাস্তা ছেড়ে আরেকটা রাস্তায় পা বাড়াচ্ছে, বড় রাজপথ ছেড়ে সরু গলিতে, আবার সেটা বাদ দিয়ে অন্যটায়। একপাশে পড়ে রইল বাজার, অন্যদিকে সরাইখানা, ওদিকটায় দোকানপশারি ইত্যাদি সব পার হয়ে সে যাচ্ছে নেচে-নেচে, তালে-তালে বাশি বাজছে তার, আর সেই তালে হেলেদুলে চলেছে হামেলিন শহরের সমস্ত ইদুরের দল।

হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে একসময় শেষ হল পথ। সামনেই জল টলমল নদী। শান্ত স্বচ্ছ হেসার বয়ে যাচ্ছে ঝিরঝির করে। ছোট ছোট ঢেউ সূর্যকিরণে ঝিকমিক করছে, হাততালি দিয়ে আনন্দে নাচছে যেন তারা। নদীর কাছে এসে গেল বাঁশিওয়ালা, একেবারে নদীর ধারে কিন্তু থামল না তবু। একপাএকপা করে এগিয়ে গেল, পা ডুবল তার নদীর পানিতে, থামল না তবু। বাঁশি বাজানোও থামছে না তার, বাঁশি বাজাতে বাজাতে অতি ধীরে এগুচ্ছে সে পানির মধ্যে; আর পিছনে তার সারা হামেলিনের ইঁদুর। বাঁশিওয়ালার পিছপিছ তারাও নেমেছে পানিতে।

তারা হাবুডুবু খেতে লাগল নদীর পানিতে। আস্তে সব ডুবে গেল—সমস্ত ইঁদুর, হামেলিনের ইঁদুরবাহিনী। না, ভুল বললাম; সব ডোবেনি, কেবল বেঁচে রইল একটা ইঁদুর। ভীষণ মোটা সে, গায়ে প্রচণ্ড শক্তি। সাঁতরাতে সঁতরাতে অতিকষ্টে অবশেষে অন্য পারে গিয়ে উঠতে পেরেছিল সে। হামেলিন শহরের সমস্ত ইঁদুরবংশের ভিতরে আসলে সে-ই শুধু থেকে গেল, পৃথিবীর আর সব ইঁদুরকে এই ঘটনা বলবার জন্য একমাত্র সে-ই বেঁচে রইল।

সে গল্প করত : “বাঁশির তীক্ষ্ণ মধুর আওয়াজ কানে আসতেই আমার মনে হল—পাকা টইটম্বুর অনেক আপেল কেউ আলমারির মধ্যে রাখল, অন্যান্য বহু আলমারির দেরাজ খুলে গেল, সেখান থেকে উঁকি দিচ্ছে নানান রকমের সুখাদ্য, কী মিষ্টি তাদের গন্ধ! অনেক ফ্লাস্কের ছিপি খোলার শব্দ পেলাম, যেটাতে মাখন রাখা হয়, তার ঢাকনি খোলার আওয়াজও কানে এল।

আর এই সমস্ত কিছুই যেন চেঁচিয়ে ডাকতে লাগল আমাদের : “এসো আনন্দ করো তোমরা, আনন্দ করো। এখানে একসঙ্গে বহু খাবার জড়ো করে রেখেছি তোমাদের জন্য, সকাল দুপুর বিকেল রাত—চার বেলাই তোমরা হুটোপুটি করে খেতে পারবে। এসো, চলে এসো এখানে। আমার মনে হল, ঐসব খাবার যেন মাত্র ইঞ্চিখানেক দূরে রয়েছে, আমার চোখের সামনে। তারপরে যে কী হল, মনে নেই; আমি অনুভব করলাম—হেসারের পানির স্রোতে আমি হাবুডুবু খাচ্ছি।”

এদিকে ততক্ষণে মেয়র সাহেব ও অন্যান্য লোকজন চেঁচামেচি শুরু করেছেন, “ওরে সব হাত লাগা, আয় সব। ইঁদুরের গর্তগুলো বন্ধ করে দে, খুব ভালো করে বুজিয়ে দে!” আর ঠিক তখনি মেয়র চোখ তুলে তাকাতেই দেখতে পেলেন, তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে অদ্ভুত পোশাক-পরা সেই বহুরূপী বাঁশিওয়ালা। মায়াবি জাদুকর বলল : “হুজুর, কিছু মনে করবেন না, দয়া করে আমার হাজার গিল্ডার মিটিয়ে দেন যদি এবার—।”

এক হাজার গিল্ডার! মেয়র সাহেবের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল এ-কথা শুনে, তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদেরও তাই। ভীষণ দুশ্চিন্তার হাত থেকে রেহাই পেয়েছেন তারা, সাংঘাতিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। এবার একটা বিরাট খানাপিনার বন্দোবস্ত হবে, দারুণ দামি-দামি খাবার খাবেন সবাই। কিন্তু এই হতভাগাটাকে যদি এক হাজার গিল্ডার দিয়ে দিতে হয়, তাহলে চলবে কেমন করে? ইশ, এইরকম এক জবড়জং ভূত, চাল নেই চুলো নেই, সে কিনা নিয়ে যাবে একটি হাজার গিল্ডার।

“এ আবার এক নতুন ফ্যাসাদ, দেখছি।” মনে মনে বিরক্ত হয়ে ওঠেন মেয়র। কিন্তু লোকটাকে তাড়াবারই বা উপায় কী? উপায় অবশ্য একটা বের হল। মেয়র সাহেব মহাগম্ভীর হয়ে বলতে শুরু করলেন ; “দ্যাখো হে, হেসার নদীতেই তো ব্যাপারটা চুকেবুকে গেছে। আমরা তো স্বচক্ষেই দেখলাম, ইঁদুরগুলো নদীতেই ডুবে মরল, তারা তো আর ফের বেঁচে উঠবে না।

তা খুব খুশি হয়েছি আমরা, বুঝলে—সত্যিই খুব খুশি হয়েছি। চা-টা খাবার জন্য আমরা অবশ্যই তোমাকে সামান্য কিছু দেব বৈকি। এতবড় উপকার করলে—খুশি হয়েই দেব বৈকি, আমাদের সাধ্যমতো দেব। তবে ঐ-যে গিল্ডারের কথা বললে না, আচ্ছা বাপু-ওটা কি একটা কথা হল? আমরা তো কেবল এক করেছিলাম; তাছাড়া অত টাকাই বা আমাদের কোথায় বলো? এ তো দু-দশটা গিল্ডার নয়, একটি হাজার—তার সামর্থ্য কি বাপু আছে আমাদের?” এরপর যেন পুরনো শোকে কেঁদে ফেললেন মেয়র : “ইঁদুর হারামজাদারা সব্বোনাশ করে গেছে, একেবারে ডুবিয়ে গেছে, খাবার-দাবার কাপড়-জামা ছারখার করে একেবারে ভিখিরি করে দিয়েছে আমাদের। তুমি বুঝলে হে, কিছু মনে কোরো না, পঞ্চাশ গিল্ডার নিয়ে যাও। একটু মিষ্টিমুখ কোরো কেমন?”

সে, বহুরূপী বাঁশিওয়ালা, খুব মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনল মেয়রের। প্রথমে যেন কিছুই বুঝতে পারছে না সে এরকম অবাক হল। তারপর ভয়ানক রেগে গেল, একেবারে ক্ষিপ্তপ্রায় হয়ে চেঁচিয়ে উঠল : “তার মানে? না, না, কোনোরকম ধাপ্পাবাজির চেষ্টা করবেন না।

খামোকা সময় নষ্ট করার মতো সময় আমার একেবারেই নেই। আমার হাতে বেজায় কাজ। বিশেষ করে আজ রাত্রেই আমাকে বাগদাদ পৌছুতে হবে। বাগদাদের খলিফার বাবুর্চিখানায় একজাতীয় ভয়ানক কাঁকড়াবিছে বাসা বেঁধেছে, সেগুলো তাড়িয়ে আসতে হবে।

এজন্য আজ রাতের খাবার খলিফার বাবুর্চি বিশেষভাবে রান্না করবে আমার সম্মানে। এ-ব্যাপারে তাদের সাথে আমি কোনো দরাদরি করিনি, আপনাদের সঙ্গেও কোনোরকম দরাদরি করব না। তবে জেনে রাখুন, আমার ভেঁপু অন্য সুরেও বাজতে পারে।”

শেষের এই কথায় আরো খাপ্পা হয়ে গেলেন মেয়র। চেঁচিয়ে উঠলেন রাগে : “কী বলছ হে তুমি? আমাকে কি অপমান করতে চাও, এ্যা? তুমি বাবুর্চির সঙ্গে যে আমার তুলনা দিলে, বলি সাহস তো তোমার কম নয় হে, এ্যা? যাও, যাও, যা-ইচ্ছে করোগে, দেখি কী করতে পারো তুমি। যত জোরে ইচ্ছে বাজাও না তোমার ভেঁপু, বাজাতে বাজাতে ফাটিয়ে ফ্যালো, বুঝলে হে, ফাটিয়ে ফ্যালো। যাও, এখন ভাগো এখান থেকে।

আবার নামল সে পথে, অদ্ভুত খামখেয়ালি ভেঁপুবাজিয়ে। আবার সে ফু দিল তার বাঁশিতে। কী আশ্চর্য স্বর, কী মায়াবি মধুর তার ভেঁপু। গতবারে বেজেছিল যেমন, তারচেয়ে সহস্রগুণ মধুরতর হয়ে বাজল। আর সঙ্গে সঙ্গে হৈচৈ শুরু হয়ে গেল যেন কোথায়, হুটোপুটি-হুল্লোড়ের শব্দ, যেন একরাশ দামাল ছেলে ছুটোছুটি করছে, কথা বলছে কলকল করে।

আরে, আসলেই তো তাই! সারা হামেলিন শহরের ছেলেমেয়েরা যে-যার বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছুটে আসছে রাস্তায়। তাদের কচি-কচি ছোট্ট হাতপা, রেশমের মতো সোনালি চুল তাদের ফুরফুর করে বাতাসে উড়ছে, আনন্দের জ্যোতি চকচক করছে তাদের চোখে। খুশিতে টইটম্বুর হয়ে দৌড়ে আসছে তারা।

থুপথুপ করে হেঁটে-হেঁটে নেচে-নেচে দুলে-দুলে, দুহাতে তালি দিতে-দিতে সমস্ত ছেলেমেয়ে বাঁশিওয়ালার পিছনে ছুটে আসছে। ব্যাপার দেখে-শুনে মেয়রের মুখ হা হয়ে গেছে, সভাসদদের বুকে হাতুড়ি পিটাচ্ছে যেন। কারো চক্ষে পলক পড়ছে না, সবাই স্তম্ভিত হয়ে দাড়িয়ে আছে, দৌড়ে গিয়ে জাদুকরকে-যে বাধা দেবে সে-ক্ষমতাও লোপ পেয়েছে সকলের।

অবাক বিস্ময়ে তারা কেবল দেখছে, দেখছে, দেখছে.. ভেপুবাজিয়ে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে এই দুধের শিশুদের? তবে কি হেসারের পানিতে ওদেরও—? লোকটা যে ক্রমে হেসারের দিকেই এগুচ্ছে! কী করা যায় তাহলে? হামেলিন শহরের সমস্ত মানুষ স্তব্ধ নিশ্বাসে তাকিয়ে রইল নিয়তির দিকে। না-হ্ যাক, বাচা গেল তাহলে।

বাঁশিওয়ালা হেসারের কাছে গিয়েই অন্য রাস্তায় মোড় নিয়েছে। নদীর পাশ দিয়ে বেরিয়ে পাহাড়ের দিকে চলে গেছে রাস্তাটা। কোপেলবের্গ পাহাড় সামনেই। বাঁশি বাজছে তখনো, ভেঁপু বেজে চলেছে দুরন্ত তালে, শিশুরাও নেচে চলেছে সঙ্গে সঙ্গে, বুকে তাদের আনন্দের ফোয়ারা।।

মেয়র, সভাসদ, নগরবাসী—সবাই ততক্ষণে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচল। বলাবলি করছে সবাই নিজেদের মধ্যে : “হুঁ , এতবড় পাহাড় পার হয়ে আর যেতে হবে না! দ্যাখো না, এক্ষুনি থামল বলে আর কী, পাহাড়ের দিকে। শেষকালে একেবারে মুখোমুখি যখন এসে দাঁড়াল পাহাড়ের সামনে, তখনো তারা থামল না।

আর কী আশ্চর্য! ঠিক তখনি পাহাড়ের গায়ে খুলে গেল এক বিরাট দরজা, যেন বিশাল অতিকায় এক গুহামুখ। এখন আর পাহাড় কই? রাস্তা তো! পাহাড়ি সুড়ঙ্গের মতো সেই পথে একে একে ঢুকল তারা, সারা হামেলিন শহরের ছেলেমেয়ে ঐ মায়াবি বাঁশিওয়ালার পিছুপিছু। আর তারপর তেমনি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল সেই চওড়া দরজার বিরাট হাঁ।

বন্ধ হয়ে গেল পাহাড়ের মুখ। মিনিটখানেক পূর্বেও এখানে পাহাড়ের গহ্বরে বিরাট রাস্তা ছিল, হামেলিনের সব আনন্দের টুকরো নিয়ে ভেঁপুবাজিয়ে তার মধ্যে মিলিয়ে গেছে। সারা শহরের সমস্ত লোক স্তব্ধ বিস্ময়ে চেয়ে-চেয়ে দেখল—তাদের সন্তানসন্ততি কাউকেই আর দেখা যাচ্ছে না, পাহাড় গ্রাস করে নিয়েছে সকলকে। সবাই চলে গেছে পাহাড়ের ভীষণ গহ্বরে। না, বাকি রয়ে গেল একজন, ছোট্ট একটি শিশু কেবল। সে তাল মিলিয়ে ওদের সঙ্গে যেতে পারেনি। একপা যে খোড়া ছিল তার তাই।

যতদিন সে বেঁচে ছিল, ঐ দিনের গল্প করেছে সে। তার মুখে কেউ কোনোদিন আর হাসি দেখেনি। সারাজীবনে সে আর কোনোদিন কক্ষনো হাসেনি। সে বলত : “আমার খেলার সঙ্গীরা চলে গেল। হায়রে, আমারই শুধু পোড়াকপাল, আমিই কেবল পড়ে রইলাম। আমিই কেবল রয়ে গেলাম সবাইকে সেই কাহিনী বলবার জন্য।

যা শুনেছিলাম সেদিন, যা দেখেছিলাম, তেমন আর জীবনে কখনো ঘটেনি। আর আসবেও না, তেমন দিন। বেজে উঠল তো ভেঁপু, সে যে কেমন তা বলে বোঝানো যাবে না। সেই আনন্দের ধ্বনি এখনো কানে লেগে আছে আমাদের। কেবল মনে হল যে, ডাক এসেছে আমাদের। কোনো নতুন এক দেশে, যে-দেশে কখনো যাইনি, যে-দেশ কখনো দেখিনি, সেই রূপকথার রাজ্যে নিয়ে যাবে কেউ আমাদের। আর কী চমৎকার সেই নতুন দেশ! চোখের সামনে স্পষ্ট ছবি ভেসে উঠেছিল তার।

যেন কোনো উৎসবের রাজ্যে আমরা পা বাড়িয়েছিলাম। সবই অপরূপ সেখানে। ঝরনার কলতান কানে আসছে, হাজার বর্ণের গাছে কী অপরূপ ফলফুলের মেলা। থোকায়-থোকায় ফল ঝুলছে, থোকায়-থোকায় ফুল। আর সে কী বাহার তাদের! আমাদের হামেলিনে কোথাও তেমন ফলফুল নেই। তাছাড়া সবই কী অদ্ভুত, কেমন নতুন চড়ুই পাখিগুলোর রং এখানকার ময়ূরের রংকেও হার মানায়।

মৌমাছিরা সারাক্ষণই গুনগুন করছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিক-ওদিক, ফুল থেকে ফুলে উড়ে যাচ্ছে, মধু খাচ্ছে; কিন্তু তারা কামড়ায় না কখনো। আর ঘোড়াগুলো তো সবই পক্ষিরাজ, ঈগলের মতো বিশাল ডানা দুপাশে। সে এক অপূর্ব দৃশ্য, অভূতপূরী! তখন আমার মনে হল—ওখানে গেলেই আমার খোঁড়া পা ভালো হয়ে যাবে, আমি আমার সাথীদের সাথে তাদের মতোই ছুটোছুটি করে খেলা করব ফের।

আর তখনি থেমে গেল মায়াবি ভেঁপুর অলৌকিক সুর; চমকে উঠে দেখি, আমি একলা পড়ে আছি পাহাড়ের বাইরে। সব বন্ধুরা চলে গেছে। আমার খেলার সঙ্গীরা চলে গেল সব, শুধু ফেলে রেখে গেল আমাকে। হায়রে, কী দুর্ভাগ্য আমার! খোঁড়া পা আর আমার ভালো হয়ে উঠল না, সেই অপরূপ দেশে নিয়ে যাওয়ার কথাও কেউ আর বলল না আমাকে।”

সবাই ছুটে গেল চতুর্দিকে। মেয়র, সভাসদ, সারা হামেলিনের জনতা। খোজ-খোজ রব পড়ে গেল। মায়েদের কান্নায় ডুবে গেল হামেলিনের আকাশ-বাতাস। উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম কিছুই বাদ গেল না, লোকলস্কর ছুটল হারানো মানিকদের খুঁজে আনতে।

অগ্নি-বায়ু, ঈশান-নৈঋতেও ঘোড়া ছুটিয়ে হেঁকে গেল দূত। না, সবই শূন্য, শূন্য চারদিক। সারা হামেলিন কেঁদে উঠল—যা আছে। আমাদের সবই উজাড় করে দেব, হীরে-মানিক যা আছে সব, কেবল ফিরে আসুক, আমাদের প্রাণের টুকরো ছেলেমেয়েরা। কিন্তু হায়, সবই বৃথা, সবই ব্যর্থ! বৃথা, বৃথা সবকিছু। যারা গেছে। তারা কেউই আর ফিরল না। হামেলিনের আনন্দ নিয়ে আর ফিরবে না কেউ।

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments