Sunday, March 3, 2024
Homeকিশোর গল্পমারমা রূপকথা: হলুদ টিয়া সাদা টিয়া

মারমা রূপকথা: হলুদ টিয়া সাদা টিয়া

মারমা রূপকথা: 'হলুদ টিয়া সাদা টিয়া'

অনেক দিন আগের কথা। এক গ্রামে এক জুমচাষি দম্পতি ছিল। তাদের একটি মেয়ে ছিল। খুবই সুখে দিন কাটছিল তাদের। প্রতিদিন অতি প্রত্যুষে ঘুম থেকে উঠে ওই দম্পত্তি রান্না-বান্না সেরে, খেয়ে, জুমচাষের কাজে বেরিয়ে পড়ত।

মেয়েটিকে ঘরে রেখে যেত। সে ঘর পাহারা দিত আর ঘয়ের খুঁটিনাটি কাজ করত। সন্ধ্যায় মা-বাবা ফিরে আসত। আবার রাতের রান্না সেরে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। এভাবে তাদের দিন অতিবাহিত হতে লাগল। একদিন তারা মেয়েকে ধান শুকাতে বলে গেল। মা-বাবা বেরিয়ে যাবার পর তাদের নির্দেশমতাে উঠানে ধান শুকাতে দিল। পাশে বসে সে পাহারা দিতে লাগল যাতে কোনাে পশুপাখি খেতে না-পারে। ধান প্রায় শুকিয়ে এসেছে। তুলতে যাবে এমন সময় হঠাৎ কোত্থেকে এক ঝাঁক সাদা টিয়া আর হলুদ টিয়া এসে ধানের ওপর বসল। একটা-দুটা করে এক নিমিষে সব ধান খেয়ে শেষ করে ফেলল।

মেয়েটি তাদেরকে অনেক নিষেধ করল। বলল, লক্ষ্মী টিয়ারা, তােমরা ধান খেয়াে না। বাবা-মা ফিরে এসে ধান না-দেখলে আমাকে মেরে ফেলবে।’ টিয়ারা বলল, আমরা একটু খাব, মা-বাবা বকলে, মারলে, আমাদের কাছে চলে এসাে। সন্ধ্যায় মা-বাবা ফিরে এসে ধান না-দেখে মেয়েকে ভীষণ বকুনি দিল। তারা মনে করল সে নিশ্চয় পাহারা দেয়নি।

পরদিন তারা আবার ধান শুকাতে দিয়ে গেল। সেদিনও একই ঘটনা ঘটল। সেদিন মা-বাবা মেয়েকে অলস ভেবে ভীষণ মারধর করল। মেয়েকে সাবধান করে বলল, আবার যদি টিয়াদেরকে ধান খাওয়াস তাহলে তােকে মেরে তাড়িয়ে দেব।’ তার পরদিনও ধান শুকাতে দিয়ে গেল। মেয়েটি শত চেষ্টা করেও টিয়াদেরকে বারণ করে ধান রাখতে পারল না। সে বসে কাঁদতে লাগল। মা-বাবা ফিরে এসে বুঝতে পারল একই ঘটনা। এতে আর কোনাে ভুল নেই। যেই কথা সেই কাজ। মেয়েকে তাড়িয়ে দিল। মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে টিয়াদের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল। অচেনা পথে যেতে যেতে যখন ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে পড়ল, তখন একজন রাখালের দেখা পেল। মেয়েটি রাখালকে জিজ্ঞেস করল, রাখাল ভাই, তুমি কি সাদা টিয়া, হলুদ টিয়ার দেশের সন্ধান দিতে পার?’ রাখাল উত্তর দিল-

লক্ষ্মী মেয়ে বলছি তােমায় শােনাে,
সাদা টিয়ে হলুদ টিয়ের সন্ধান তােমায় দেবাে।
এক মুঠো ভাত, এক আঁজলা পানি খেয়ে একটু জিরিয়ে নাও
তারপরেতে সােজা ওই দক্ষিণপূর্ব দিকে যাও।

মেয়েটি তাই করল। একটু বিশ্রাম করে আবার পথ চলা শুরু করে দিল। যেতে যেতে এবার পৌঁছাল মেষপালকের কাছে। মেয়েটি মেষপালককে জিজ্ঞেস করল, ‘মেষপালক ভাই, তুমি কি সাদা টিয়া হলুদ টিয়ার দেশ কোনদিকে বলতে পার?’ মেষপালক মেয়েটিকে আদর যত্ন করে বসতে দিল। বলল –

লক্ষ্মী মেয়ে শােনাে তােমায় বলি
এক মুঠো ভাত, এক আঁজলা পানি খাও, এই অনুরােধ করি।
সাদা টিয়ে হলুদ টিয়ের দেশে যেতে চাও
তাে দক্ষিণপূর্ব দিকের পথটি ধরে যাও।

মেয়েটি মেষপালকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এগিয়ে চলল। সারাদিন যেতে যেতে সন্ধ্যায় পরিশ্রান্ত হয়ে এক অশরক্ষকের কাছে পৌঁছাল। সে অশ্বরক্ষককে সাদা টিয়া, হলুদ টিয়ার দেশে যাবার রাস্তা দেখিয়ে দিতে বলল। অশ্বরক্ষক বলল-

লক্ষ্মী মেয়ে, এক মুঠো ভাত, এক আঁজলা পানি খাও
শ্রান্ত তুমি, একটু জিরিয়ে নাও।
দক্ষিণপূর্ব দিকে তােমায় যেতে হবে
সাদা টিয়ে, হলুদ টিয়ের দেখা তবে পাবে।

এই বলে কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর অশ্বরক্ষক মেয়েটিকে বিদায় দিল। মেয়েটি সারাদিন যেতে যেতে এবার সন্ধ্যায় হস্তীরক্ষকের কাছে গিয়ে পৌঁছাল। পথ যেন ফুরাতে চায় না। মেয়েটির মনে হলাে সে ক্লান্ত। তারপর হস্তীরক্ষকের কাছে জিজ্ঞাসা করল, সাদা টিয়ে, হলুদ টিয়ের দেশে পৌঁছাতে আর কতদিন লাগবে? হস্তীরক্ষক তাকে সাহস দিয়ে বলল –

লক্ষ্মী মেয়ে এসেছ তুমি সঠিক পথটি ধরে
তবে এক মুঠো ভাত, এক আঁজলা পানি খেয়ে একটু জিরােতে হবে
আর মাত্র এক ক্রোশ পথ যেতে হবে।
সাদা টিয়ে হলুদ টিয়ের তবেই দেখা পাবে।

হস্তীরক্ষকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার পথ চলতে লাগল মেয়েটি। সে বুঝতে পারল সবাই তাকে সত্যি কথা বলছে, সঠিক পথ দেখিয়ে দিয়েছে। সবাই তাকে ফেরার পথে তাদের আতিথ্য গ্রহণ করতে অনুরােধ করেছে। এক ক্রোশ পথ অতিক্রম করার পর মেয়েটি ক্লান্ত অবসন্ন দেহে অবশেষে টিয়াদের দেশে পৌঁছাল।

চারিদিকে তাকাতেই সামনে সে দেখতে পেল এক সুবর্ণ অট্টালিকা। একটু জিজ্ঞেস করতেই, মেয়েটির পরিচয় ও উদ্দেশ্য জানতে পেরে সাদা টিয়া, হলুদ টিয়ারা তাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানাল। সােনার সিঁড়ি, রুপার সিঁড়ি কোনটা বেয়ে ঘরে ওঠার ইচ্ছা তারা জানতে চাইল। মেয়েটি বলল তারা গরিব তাই কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে অভ্যস্ত। মেয়েটিকে তাই করতে দিল। বাড়িতে ঢুকে চারিদিকে ঐশ্বর্যের ছড়াছড়ি দেখে সে অবাক হয়ে গেল। পরিশ্রান্ত মেয়েটিকে স্নান করিয়ে সুন্দর সুন্দর পােশাক পরতে দিল।

তারপর সােনার থালায় রুপার থালায় করে রকমারি খাবার খেতে দিল। মেয়েটি ওইসব থালায় খেতে অভ্যস্ত নয় তাই সে সাধারণ থালায় খেল। জীবনে কোনােদিন খায়নি এমন খাবার! তাই সে খুব তৃপ্তি সহকারে খেল। শােবার ঘরে নিয়ে গেল রাতে। সেখানেও সােনার খাটে রুপার খাটে শুভ্র কোমল বিছানা করা হয়েছে দেখতে পেল । কোনােটাতে ঘুমাবে জানতে চাইলে মেয়েটি বলল, তারা গরিব। জীবনে কোনােদিন ওইসব খাটে শােয়নি। মেঝেতে শুতেই অভ্যস্ত। তারা তাকে মেঝেতেই শুতে দিল। পরদিন সে টিয়াদের তার দুঃখের কথা জানাল। মা-বাবা অলস, অকর্মণ্য ভেবে তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। টিয়ারা তাকে সান্ত্বনা দিল। সুন্দর পােশাক-পরিচ্ছদ, সাত কলস সােনার ও রুপার মােহর আর কয়েকজন রক্ষী দিয়ে মেয়েটিকে মা-বাবার কাছে ফেরত পাঠিয়ে দিল। ফেরার পথে তার শুভাকাঙ্ক্ষী রাখাল, মেষপালক, অশ্বরক্ষক, হীরক্ষক সবার সঙ্গে দেখা করে তাদের সহযােগিতার জন্য অশেষ ধন্যবাদ জানাল। তারাও মেয়েটির ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে প্রাণভরে আশীর্বাদ করল।

অবশেষে মেয়েটি নিজের বাড়িতে এসে পৌঁছাল। মা-বাবা তাদের মেয়ে এবং সঙ্গে সােনারুপার মােহর পেয়ে তাে মহাখুশি। পাড়াপ্রতিবেশীরাও মেয়েটির কাণ্ড দেখে তাজ্জব হয়ে গেল। সবাই কানাঘুষা করতে লাগল, এটা কীভাবে সম্ভব হলাে। অনেকেই হিংসায় জ্বলে গেল। অনেকের লােভ সৃষ্টি হলাে। এভাবে এক লােভী মা-বাবা তাদের মেয়েকে তাড়িয়ে দিল, সােনা-রুপার মােহর খোঁজ করে আনার জন্য। ওই মেয়েটি সবাইকে জিজ্ঞেস করে করে ঠিকই সাদা টিয়া হলুদ টিয়াদের দেশে পৌঁছাল।

লােভী বাপ-মায়ের সন্তানও লােভী ছিল। এই মেয়েটিকেও পূর্বের মেয়েটির অনুরূপ আদর-যত্ন করা হলাে। লােভ সামলাতে না-পেরে সে সােনার সিঁড়ি দিয়ে উঠল। সােনার থালায় খেল। সােনার খাটে ঘুমাল। পরদিন তার এখানে আগমনের কারণটা জানাল। টিয়ারা সব শুনে সাতটি কলস ভালাে করে মুখ এঁটে মেয়েটিকে দিল। বলে দিল বাড়ি পৌছে চট করে যেন কলসের মুখ না-খােলে। একটার ভিতর আরেকটা, এভাবে পরপর সাতটি তাঁবু খাটিয়ে সবচেয়ে ভিতরেরটাতে বংশের সব আত্মীয়-স্বজনকে ডেকে জড়াে করে তারপর যেন কলসের মুখ খােলে। আত্মীয়-স্বজন জড়াে হয়ে যখন কলসের মুখ খুলল তখন সাতটি কলস থেকে বিভিন্ন জাতের বিষধর সর্প বের হয়ে সবাইকে দংশন করে নির্বংশ করল।

(সমাপ্ত)

Anuprerona
Anupreronahttps://www.anuperona.com
Read your favourite literature free forever on our blogging platform.
RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments