ইতর-ভদ্র – শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

ইতর-ভদ্র - শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

রাত্রি প্রায় এগারটার সময় রস রোডে প্রফেসার সরকারের বাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করিয়া সমরেশ বাসায় ফিরিতেছিল। অনেকটা পথ যাইতে হইবে, তাহার বাসা মির্জাপুর স্ট্রীটে, কিন্তু এত রাত্রে ট্রাম ও বাসের যাতায়াত কমিয়া আসিয়াছিল; তবু কোনও একটা বাহন পাইবার আশায় সমরেশ ক্লান্তভাবে চৌরঙ্গীর রাস্তা দিয়া চলিয়াছিল।

পাশ দিয়া দুটা খালি বাস চলিয়া গেল, একটা শূন্য ট্যাক্সির চালক সতৃষ্ণভাবে তাহার দিকে তাকাইতে তাকাইতে ধীরগতিতে বাহির হইয়া গেল। সমরেশ লক্ষ্য করিল না।

এইরূপ অসামান্য অমনোযোগের কারণ, আজ তাহার জীবনে ঘৃণা হইয়া গিয়াছিল। সে অত্যন্ত হতাশভাবে এই কথাটাই তোলাপাড়া করিতে করিতে চলিয়াছিল যে, সে ভদ্রলোক নয় এবং কোনও কালেই ভদ্রলোক হইতে পারিবে না। সুতরাং তাহার পক্ষে বাঁচিয়া থাকা না থাকা দুই সমান।

বাপের পয়সা থাকিলেই যে ভদ্রলোক হওয়া যায় না একথা কে না জানে? প্রকৃত ভদ্রলোক হইতে হইলে আরো কতকগুলি সদগুণের আবশ্যক। বিলাতী মতে জেন্টলম্যান বলিতে কতকগুলা সদাচারের সমষ্টি বুঝায়, আমাদের দেশীশাস্ত্রে ও আচার বিনয় বিদ্যা প্রভৃতি শব্দের দ্বারা শিষ্টতার একটা আদর্শ খাড়া করা হইয়াছে। সমরেশ বিবেচনা করিয়া দেখিল, সেরূপ গুণ তাহার একটিও নাই। বস্তুত সে যে ভদ্রলোক নয়, এ সন্দেহ তাহার বহুপূর্বেই জন্মিয়াছিল কিন্তু আজ তাহা একেবারে বদ্ধমূল হইয়া গিয়াছে।

প্রথমত, সে স্ত্রীলোকের সঙ্গে সহজভাবে কথা কহিতে পারে না কেন? অন্য স্ত্রীলোকের সঙ্গে যদি বা পারে, সুষমাকে দেখিলেই তাহার বারোধ হইবার উপক্রম হয় কেন? তাহার বুদ্ধি আছে, বুদ্ধি না থাকিলে কেহ বি.এ. পরীক্ষায় দর্শনশাস্ত্রে অনার্স লইয়া প্রথম স্থান অধিকার করিতে পারে না। তবু সুষমার সঙ্গে কথা কহিবার একটা দূর সম্ভাবনা উদয় হইবামাত্র তাহার বাহেন্দ্রিয়গুলা এবং সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধিসুদ্ধি অমন জড়ত্ব প্রাপ্ত হয় কেন?

দ্বিতীয় কথা, ভূপেন নামধারী তাহার যে একজন সহপাঠী আছে, যাহার সহিত গত চার বৎসর যাবৎ সে বিদ্যার ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিয়া আসিতেছে, তাহাকে দেখিবামাত্র আজকাল তাহার মাথায় খুন চড়িয়া যায় কেন? ভূপেন অত্যন্ত মিশুক এবং স্ত্রী-পুরুষ-নির্বিশেষে সকলের সঙ্গে স্বচ্ছন্দে কথা কহিতে পারে; কিন্তু তাই বলিয়া তাহাকে মুখ খারাপ করিয়া গালি দিবার প্রবৃত্তি কোন ভদ্রলোকের হইয়া থাকে?

তৃতীয় কথাটা আজ প্রফেসার সরকারের বাড়িতে নিমন্ত্রণ খাইতে গিয়া অত্যন্ত রূঢ় এবং লজ্জাকরভাবে প্রকাশ হইয়া পড়িয়াছে, তাহা এই যে, সমরেশ শিক্ষিত ভদ্রসমাজে বিচরণ করিবার মতো শিষ্টাচার ও আদব-কায়দা কিছুই জানে না। ইহার পর নিজেকে ভদ্রলোক বলিয়া পরের কাছে ঘোষণা করা দূরের কথা, নিজের কাছে স্বীকার করাও সমরেশের পক্ষে অসম্ভব হইয়া পড়িয়াছে।

নিজের সামাজিক চালচলন নিরপেক্ষভাবে অন্যের সহিত তুলনা করিয়া বিচার করিবার উপযুক্ত অন্তদৃষ্টি অনেকেরই থাকে না; সমরেশের সেটা ছিল। তাই সে আজ নিঃসংশয়ে বুঝিতে পারিয়াছে যে, সে ভদ্রলোক নয়। কিন্তু ও কথাটা অনেকবার বলা হইয়া গিয়াছে।

এই সূত্রে কিন্তু একটা কথা আজ সমরেশের কিছুতেই মনে পড়িল না; মনে পড়িলে তাহার মন নিশ্চয় অনেকটা পরিষ্কার হইয়া যাইত। বছর দুয়েক আগে তাহার কলেজের জনৈক সাহেব প্রফেসার অন্যান্য কয়েকটি ভাল ছেলের সঙ্গে তাহাকেও ডিনারে নিমন্ত্রণ করিয়াছিলেন! খাইতে গিয়া সমরেশ দেখিল টেবিলের উপর ডিনার পরিবেষণ হইয়াছে এবং ছুরি কাঁটা দিয়া খাইবার ব্যবস্থা! তাহা দেখিয়া সে বলিয়াছিল, স্যার, ছুরি কাঁটা চালাতে তো জানি না, খাব কেমন করে?

পাদ্রী প্রফেসার হাসিয়া বলিয়াছিলেন, যেমন করে খেয়ে থাকো তেমনি করে খাবে; ভগবান তোমাকে অতগুলো আঙুল দিয়েছেন কি জন্যে?

সমরেশ মাথা নাড়িয়া বলিয়াছিল, না স্যার, তা হতে পারে না, ছুরি কাঁটা দিয়েই খাব। আপনারা কিন্তু হাতে পাবেন না।

সেদিন সমরেশ ছুরি কাঁটা দিয়াই খাইয়াছিল এবং তাহার খাইবার ভঙ্গি দেখিয়া প্রফেসার সাহেব ও অন্যান্য ক্রিশ্চান ছেলেরা খুব হাসিয়াছিল। কিন্তু সমরেশ তিলমাত্র লজ্জা বা ক্ষোভ অনুভব করে নাই বরং নিজেও হাসিয়া বলিয়াছিল, প্রথমবারেই কি হয়। আবার নিমন্ত্রণ করে দেখবেন, স্যার, টেবল-ম্যানার্স সব দুরস্ত হয়ে গেছে।

যাঁহারা এতদূর পর্যন্ত ধৈর্য ধরিয়া পড়িয়াছেন তাঁহারা নিশ্চয় অধীর হইয়া ভাবিতেছেন—কথাটা কি?

কথাটা সেই পুরাতন কথা। পৃথিবীতে যখন ভদ্রলোক বলিয়া কোনও জীবের বাস ছিল না তখন এ কাহিনীর আরম্ভ হইয়াছিল, এবং ঐ জীবটি পৃথিবী হইতে যখন মরিয়া নিঃশেষ হইয়া যাইবে তখনো এ কাহিনীর সমাপ্তি হইবে না।

কিন্তু একেবারে আদিম কাল হইতে না হোক ব্যাপারটা আর একটু আগে হইতে বলা দরকার।

সমরেশ কলিকাতার ছেলে নয়, তাহার বাপ বাঙলা দেশেরই কোনও একটা বড় শহরের একজন বিখ্যাত ডাক্তার! সমরেশ যখন সম্মানের সহিত প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইল তখন তিনি তাহাকে কলিকাতায় একটা বাসা করিয়া দিয়া কলেজে ভর্তি করিয়া দিয়া গেলেন। সমরেশ একাকী বাসায় থাকিয়া গভীর মনঃসংযোগে পড়াশুনা আরম্ভ করিয়া দিল এবং নিয়মিত কলেজ যাইতে লাগিল।

আই.এ. পরীক্ষায় সমরেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় স্থান অধিকার করিল। যে ছেলেটি ফার্স্ট হইল তাহার নাম ভূপেন ঘোষ। ভূপেনকে সমরেশ কখনো চোখে দেখে নাই—ভূপেন অন্য কলেজের ছাত্র—কিন্তু আগামীবার তাহাকে পরাস্ত করিবার জন্য সে শুরু হইতেই উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়া গেল।

বি.এ. পরীক্ষায় সমরেশ ফাস্ট হইল, ভূপেন দ্বিতীয় স্থান পাইল। তারপর এম.এ. পড়িবার সময় দুইজনে একই কলেজে নাম লিখাইল। দুইজনেরই একই বিষয়—এক্সপেরিমেন্টাল সাইকলজি। প্রথম কিছুদিন দুইজনে একটু দূরে দূরে রহিল, তারপর সামান্য একটু আলাপ হইল। ভূপেন অত্যন্ত শৌখীন ও মার্জিত ভাবের ছোকরা কিন্তু সে-ই যাচিয়া আলাপ করিল, আপনার সঙ্গে আলাপ হওয়া সৌভাগ্য বলে মনে করি।

সমরেশ হাসিয়া উত্তর করিল, সেটা উভয়ত। গোড়া থেকে যাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলেছে তাঁকে জানবার ইচ্ছা হওয়া স্বাভাবিক। এ ভালই হল আমাদের দ্বন্দ্বের ক্ষেত্র ক্রমেই সঙ্কীর্ণ হয়ে আসছে। এবার কিন্তু আপনার পালা।

ভূপেন বলিল, এ দ্বন্দ্বে আমার দিক থেকে কোনও গ্লানি নেই, আছে শুধু প্রতিযোগিতার উদ্দীপনা।

সমরেশ বলিল, এ পক্ষেও তাই। হারলে অপমান নেই কিন্তু জিতলে আনন্দ আছে।

পরিচয় কিন্তু ইহার বেশী অগ্রসর হইতে পাইল না। হঠাৎ একদিন মেয়েলি হাতের একটি ক্ষুদ্র কাঁচি ইহাদের মধ্যেকার ক্ষীণ যোগসূত্রটিকে কাটিয়া দ্বিখণ্ড করিয়া দিল।

সুষমা প্রফেসার সরকারের ভাগিনেয়ী–বয়স আঠারো বৎসর। সঞ্চারিণী পল্লবিনী লতার মতো তার চেহারা। সে জুতামোজা পরে, একাকিনী পথ দিয়া সোজা হাঁটিয়া যায় এবং প্রয়োজন হইলেই অন্য দেশী চালে কথাবার্তা বলে। কিন্তু তাহাকে দেখিয়া মনে হয় সে সঞ্চারিণী পল্লবিনী লতা। অন্তত সমরেশ আজ পর্যন্ত তাহার অন্য উপমা খুঁজিয়া পায় নাই। সে কালো কি ফসা, সুন্দরী কি মাঝারি, ব্লন্ড কি ব্রুনেটি এসব কথা ভাবিয়া দেখিবার বেচারা অবসর পায় নাই। এ বিষয়ে বিশ্লেষণ শক্তি প্রস্ফুটিত হইবার পূর্বেই মুকুলে ঝরিয়া গিয়াছিল।

সুষমা আই.এ. পাস করিয়া বেথুন কলেজে থার্ড ইয়ারে পড়িতেছে; সে হপ্তার মধ্যে দুতিন দিন মামার লেকচার শুনিতে আসিত, প্রফেসার সরকার অনুমতি দিয়াছিলেন। মামার ক্লাসে ছাত্রের সংখ্যা খুবই কম, গুটি সাত-আটের বেশী নয়। তাহাদেরই মধ্যে একটু তফাতে বসিয়া সুষমা একাগ্রমনে মামার উপদেশ শুনিত এবং ঘণ্টা বাজিলে কোনওদিকে ভ্রুক্ষেপ না করিয়া সঞ্চারিণী পল্লবিনী লতার মতো উঠিয়া চলিয়া যাইত। দোতলা হইতে সিঁড়ি দিয়া দ্রুত লঘুপদে নামিয়া ফুটপাথের উপর কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকিত, পথে ট্যাক্সি দেখিলে সেই ট্যাক্সিতে চড়িয়া বাড়ি যাইত। তাহার বাড়ি শহরের উত্তর দিকে, বোধ হয় হাতিবাগান অঞ্চলে। ক্লাসের একটি ছাত্র বিশেষ করিয়া তাহা লক্ষ্য করিয়াছিল।

মনস্তত্ত্ব ক্লাসের ছাত্রদের মধ্যে অকস্মাৎ এই মেয়েটির অকুণ্ঠিত আগমনে এমন একটি মনস্তত্ত্বের সৃষ্টি হইল যাহা প্রফেসার সরকারের জ্ঞানগর্ভ লেকচারের বিষয়ীভূত নয়।

ভূপেনের সহিত মেয়েটির বোধ হয় পূর্ব হইতেই পরিচয় ছিল। কারণ, সমরেশ লক্ষ্য করিল, প্রথম দিন সুষমা ক্লাসে পদার্পণ করিতেই ভূপেন তাহার দিকে চাহিয়া একটু ঘাড় নাড়িল। সুষমাও মৃদু হাসিয়া তাহার প্রত্যুত্তর দিল। অপরিচিত যুবকের মুখের দিকে চাহিয়া কোনও ভদ্রমহিলাই হাসে না, সুতরাং সমরেশের অনুমান যে অভ্রান্ত তাহাতে সন্দেহ নাই।

কিন্তু আলাপ যে খুব ঘনীভূত নয় তাহা বুঝিয়া সমরেশ অনেকটা স্বস্তি অনুভব করিল। প্রফেসার ক্লাসে আসিবার পূর্বে কখনো কখনো ভূপেন গায়ে পড়িয়া মেয়েটির সঙ্গে আলাপ করিবার চেষ্টা করিত; কিন্তু আলাপ কেমন আছেন ভাল আছির বেশি কোনদিনই অগ্রসর হইত না, হয় প্রফেসার আসিয়া পড়িতেন নয় সুষমা পাঠ্যপুস্তকে মনোনিবেশ করিত। সমরেশ দূর হইতে তাহাদের কথার মৃদুগুঞ্জন উৎকর্ণ হইয়া শুনিত এবং মনে মনে অত্যন্ত অসহিষ্ণু হইয়া উঠিত।

এইভাবে মাস দুই কাটিবার পর একদিন বেলা তিনটার সময় একটা ব্যাপার ঘটিল। ব্যাপার এমন কিছু গুরুতর নয় কিন্তু স্নায়ুমণ্ডলীর অন্ধ প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধে প্রফেসার সরকার যে বক্তৃতা দিয়াছিলেন, তাহার এমন চমৎকার দৃষ্টান্ত বড় একটা চোখে পড়ে না।

একটা ক্লাস শেষ হইয়া গিয়াছে, দ্বিতীয় ক্লাসের প্রতীক্ষায় সমরেশ দোতলায় সিঁড়ির ঠিক নীচেই অন্যমনস্কভাবে পায়চারি করিতেছিল। সুষমা মামার সহিত কি একটা কথা কহিবার পর অভ্যাসমত দ্রুতপদে সিঁড়ি দিয়া নীচে নামিয়া আসিতেছিল, হঠাৎ সিঁড়ির শেষ ধাপে আসিয়া তাহার পা পিছলাইয়া গেল। সে হুমড়ি খাইয়া পড়িয়া যাইতেছিল, আত্মরক্ষার চিন্তাহীন তাড়নায় সম্মুখস্থ সমরেশের গলা জড়াইয়া ধরিল। হঠাৎ অতর্কিতভাবে আক্রান্ত হইয়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় সমরেশ কাঠের খোঁটার মতো শক্ত হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল এবং একটিও বাঙ্‌নিষ্পত্তি করিতে পারিল না।

দারুণ লজ্জায় সমরেশের গলা ছাড়িয়া দিতেই সুষমা আবার পড়িয়া যাইবার উপক্রম করিল। মাথার মধ্যে বুদ্ধি নামক যে এক পদার্থ আছে তাহা সমরেশের সম্পূর্ণ বিস্মরণ হইয়াছিল, তবু সে না বুঝিয়া সুঝিয়াই সুষমার একখানা হাত টানিয়া ধরিয়া রহিল।

ক্লিষ্ট হাসিয়া সুষমা বলিল, পা মচকে গেছে।

সমরেশ নির্বাক হইয়া রহিল, বিস্ময়ের চিহ্ন ভিন্ন তাহার মুখে আর কিছুই প্রকাশ পাইল না।

এমন সময় ভূপেন কোথা হইতে ছুটিয়া আসিয়া বলিল, এ কি! পড়ে গেছেন নাকি? দেখি দেখি, তাইতো! অ্যাঙ্কল স্পেন হয়েছে দেখছি! এরি মধ্যে ফুলে উঠেছে। নি, আমার কাঁধে ভর। দিয়ে দাঁড়ান, এখন লজ্জা করবার সময় নয়। —মিত্তির, একটা ট্যাক্সি।

মিত্তির, অর্থাৎ সমরেশ বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকিয়া উঠিয়া ট্যাক্সি ডাকিতে ছুটিল।

ট্যাক্সি আসিলে সুষমা খোঁড়াইতে খোঁড়াইতে ভূপেনের স্কন্ধে ভর দিয়া গাড়িতে উঠিয়া বসিল। ভূপেনও তাহার পিছন পিছন গাড়িতে গিয়া উঠিল, চালককে বলিল, চালাও হাতিবাগান, জলদি।

সুষমা আপত্তি করিয়া বলিল, আপনার যাবার দরকার নেই—

ভূপেন বলিল, বিলক্ষণ! আপনি গাড়ি থেকে নামবেন কি করে?

পায়ের যন্ত্রণায় সুষমার মুখ বিবর্ণ হইয়া গিয়াছিল, কথা কাটাকাটি করিবার তাহার শক্তি ছিল না, সে সমরেশের দিকে ফিরিয়া আসিবার একটা চেষ্টা করিয়া বলিল, ধন্যবাদ সমরেশবাবু–বলিয়া দুই করতল একবার যুক্ত করিল।

প্রত্যুত্তরে সমরেশের মুখ দিয়া কেবল বাহির হইল, না না না কিন্তু তখন ট্যাক্সি চলিয়া গিয়াছে।

সমরেশ ফুটপাথে দাঁড়াইয়া রহিল, মিনিটখানেক পরে তাহার স্মরণ হইল যে সুষমার নমস্কারের প্রতিনমস্কার করা হয় নাই।

সেদিন আর ক্লাস করা হইল না। বাড়ি ফিরিবার পথে সমস্ত ব্যাপারটা তন্ন তন্ন করিয়া বিশ্লেষণ করিয়া সমরেশ তাহার মধ্যে নিজের গৌরবসূচক একটা ঘটনাও খুঁজিয়া পাইল না এবং অত্যন্ত মর্মাহত হইয়া মনে মনে সিদ্ধান্ত করিল যে সে এখনো ভদ্রলোক হইতে পারে নাই। কোন্ সময় কি বলা এবং কি করা উচিত ছিল, তাহার একটা জীবন্ত অভিনয় তাহার মনের চিত্রপটের উপর খেলিয়া গেল। কিন্তু তখন আর উপায় নাই। তিথি অনুকূল ছিল বটে কিন্তু শুভলগ্ন অতিক্রান্ত হইয়া গিয়াছে।

রাত্রে বিছানায় শুইয়া সমরেশের কল্পনার রঞ্চমঞ্চে এই ক্ষুদ্র ঘটনাটির বহুবার পুনরভিনয় হইয়া গেল। এবং এই অভিনয়ে সে এমন বাগ্মিতা ও প্রত্যুৎপন্নমতি দেখাইল, সুষমার প্রতি কথার এমন সুন্দর ও সরস উত্তর দিল যে সে নিজেই বিস্মিত হইয়া ভাবিতে লাগিল, এমন চমৎকারভাবে কথা কহিবার বুদ্ধি যখন তাহার আছে তখন কাজের বেলায় শুধু না না না ছাড়া আর কিছুই সে বলিতে পারিল না কেন?

আর একটা কথা, হতভাগা ভূপেনটা ঠিক সেই সময় কোথা হইতে আসিয়া জুটিল! সে অমন অতর্কিতে আসিয়া পড়িয়া নির্লজ্জভাবে বাক্যচ্ছটা বিস্তার না করিলে তো সমরেশ এমন হতবুদ্ধি হইয়া পড়িত না। ভূপেন যেন ইচ্ছা করিয়া তাহাকে অপদস্থ করিবার জন্যই এমনটা করিয়াছে। আর, ট্যাক্সিতে চড়িয়া সুষমার সঙ্গে যাইবার কি দরকার ছিল? গাড়ি হইতে সুষমা নামিতে পারুক না পারুক ভূপেনের কি? অসভ্য বর্বর কোথাকার!

সমরেশ নিজে ভদ্রলোক না হইতে পারে কিন্তু ভূপেনটা যে তাহার চেয়েও ছোটলোক, উপরন্তু নির্লজ্জ এবং বেয়াদব তাহাতে সমরেশের সন্দেহ রহিল না।

তবু এইরূপ আত্মগ্লানি ও বিদ্বেষের মধ্যে দুটি জিনিস তাহার মনে শেষরাত্রির সুখস্বপ্নের মতো জড়াইয়া রহিল। একটি, সুষমা তাহার নাম জানে, নিশ্চয় মামার নিকট তাহার বিষয় শুনিয়াছে। দ্বিতীয়, নিজের কণ্ঠদেশে সুষমার ভয়ব্যাকুল বাহুর নিবিড় বন্ধনের স্পর্শানুভূতি।

ইহার পর এক মাস সুষমা আসিল না। পায়ের জন্যই আসিতে পারিতেছে না তাহাতে সন্দেহ নাই। প্রফেসার সরকারকে স্বচ্ছন্দে সুষমার কুশলপ্রশ্ন করা যাইতে পারিত। কিন্তু তিনি মুখে কিছু না বলুন মনে মনেও তো ভাবিতে পারেন,-সুষমার জন্য তোমার এত দুশ্চিন্তা কেন হে বাপু? এই লজ্জায় সমরেশ তাঁহাকে কিছু জিজ্ঞাসা করিতে পারিল না।

কিন্তু ভূপেন যে সুষমা সম্বন্ধে সংবাদ রাখে তাহা সে বুঝিয়াছিল। কোন অতীন্দ্রিয় শক্তির প্রভাবে বুঝিয়াছিল বলা যায় না; কিন্তু নিঃসংশয়ে বুঝিয়াছিল। সুতরাং ভূপেনকে জিজ্ঞাসা করিলেই সুষমার খবর পাওয়া যাইবে তাহাও একপ্রকার স্বতঃসিদ্ধ। কিন্তু তবু সমরেশ ভূপেনকে প্রশ্ন করিল না, ভূপেনের মারফতে সুষমার কুশল জানিবার হীনতা সে ঘৃণার সহিত বর্জন করিল। উপরন্তু ভূপেনের সহিত পূর্বে যা দুএকটা কথা হইত তাহাও বন্ধ হইয়া গেল।

কিন্তু সর্বদা আত্মবিশ্লেষণ করা যাহার অভ্যাসের মধ্যে দাঁড়াইয়াছে তাহার পক্ষে মনকে চোখ ঠারা চলে না। ভূপেনের প্রতি বিদ্বেষের মুলে যে ভূপেনের কোনও সত্যকার অপরাধ নাই বরঞ্চ নিজের অক্ষমতাই নিহিত আছে, এই নিগুঢ় সত্যটি গোপন কাঁটার মতো নিরন্তর সমরেশের বুকের মধ্যে খ খচ্‌ করিতে লাগিল।

পা ভাল হইবার পর সুষমা যেদিন প্রথম কলেজে আসিল সেদিন সমরেশ দোতলার বারান্দায় দাঁড়াইয়া ছিল, সুষমা সিঁড়ি দিয়া উঠিয়া আসিয়া সম্মুখেই সমরেশকে দেখিয়া সহাস্যমুখে তাহার দিকে অগ্রসর হইয়া গেল। দুটি হাত একত্র করিয়া একটি নমস্কার করিয়া বলিল, এক মাস আসতে পারিনি—আপনারা নিশ্চয় খুব এগিয়ে গেছেন। এখন আপনাদের নাগাল পাওয়া কি আমার পক্ষে সম্ভব হবে সমরেশবাবু?

সমরেশ একেবারেই তৈরি ছিল না, তাহার কান দুটা লাল হইয়া অসম্ভব রকম ঝাঁ ঝাঁ করিতে লাগিল। এবং তালু হইতে কণ্ঠ পর্যন্ত শুকাইয়া কাঠ হইয়া গেল।

সুষমা বলিল, আপনার নোটগুলো আমায় একবার দেখাবেন, যতটা পারি টুকে নেব। মামার তো লেখা নোট নেই—মুখে মুখে যা ডিকটেট করেন।

সমরেশ ঘাড় নাড়িয়া সায় দিল, তারপর একবার কাশিয়া ভগ্নস্বরে কহিল, আপনার পা—আপনার পায়ের–

সুষমা যেন শুনিতে পায় নাই এমনিভাবে বলিল, নোটগুলো দেবেন, কৃপণতা করবেন না যেন। বলিয়া প্রস্থানেনাদ্যতা হইল।

সমরেশ পুনরায় ঘাড় নাড়িয়া বলিল,-এবার গলার স্বর অনেকটা সাফ হইয়াছে,—আপনার পা এখন বেশ— এই পর্যন্ত বলিয়াই হঠাৎ একেবারে মূক হইয়া গেল। সুষমার মুখের উপর লজ্জার যে অরুণাভা ধীরে ধীরে ফুটিয়া উঠিতেছিল তাহার কারণটা সহসা বিদ্যুৎচমকের মতো বিকশিত হইয়া যেন তাহার মস্তিষ্ক পুড়াইয়া দিয়া গেল। পা-মচকানোর সঙ্গে এমন একটা দৈবাকৃত লজ্জাকর ঘটনা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে গ্রথিত হইয়া আছে যাহার ইঙ্গিত পর্যন্ত সুষমার পক্ষে মস্ত সঙ্কোচের কারণ হইতে পারে, তাহা আচম্বিতে স্মরণ করিয়া সমরেশের জিহ্বা একেবারে আড়ষ্ট হইয়া গেল। সুষমা চলিয়া যাইবার পর সে বারম্বার নিজেও মস্তকের উপর অশনিসম্পাত কামনা করিতে করিতে ভাবিতে লাগিল, এত বড় গাধা গরু গবেটের মতো প্রশ্ন সে করিতে গেল কেন? তাছাড়া, স্ত্রীলোকের পায়ের সম্বন্ধে কোনওপ্রকার কৌতূহলই যে ঘোর অশ্লীলতা।

ক্লাস শেষ হইবার পর সুষমার সহিত সমরেশের আবার চোখাচোখি হইল। সুষমা আবার হাসিমুখে বলিল, সমরেশবাবু, ভুলবেন না যেন। কাল তো আমি আসব না, পরশু যেন খাতাগুলো পাই।

সমরেশ অতিমাত্রায় লাল হইয়া উঠিয়া বলিল, আচ্ছা নিশ্চয়! সে আর আপনাকে—তা বেশ তো, কালই আমি—

ভূপেন আসিয়া তাহাদের মধ্যে যোগ দিয়া বলিল, কোন খাতার কথা বলছেন? ও, নোটের খাতা। তা সেজন্যে আপনি ভাববেন না। আপনার জন্যে বিশেষ করে আমি আর এক কপি তৈরি করে রেখেছি, আজই সন্ধ্যাবেলা আপনার বাড়িতে পৌঁছে দেব।

সুষমা কৃতজ্ঞস্বরে বলিল, ধন্যবাদ ভূপেনবাবু। তারপর কুণ্ঠিতভাবে সমরেশের দিকে তাকাইয়া বলিল, কিন্তু সমরেশবাবু—

ভূপেন বাধা দিয়া বলিল, ওঁর ভালই হল। নিজের কপিটা আপনাকে দিলে ওঁর পড়াশুনোর হয়তো ব্যাঘাত হত।–চলুন, আপনার ট্যাক্সি ডেকে দিই।

সেদিন বাসায় ফিরিয়া সমরেশ দেখিল তাহার বাবার নিকট হইতে এক পত্র আসিয়াছে। অন্যান্য কথার পর তিনি লিখিয়াছেন—

তোমার মা তোমার বিবাহের জন্য বড় ব্যস্ত হইয়াছেন। কিন্তু আমি তোমার মতো ও রুচির বিরুদ্ধে কিছু করিতে চাই না। তুমি নিজে পছন্দ করিয়া বিবাহ কর ইহাই আমার ইচ্ছা। নিজের ও আমাদের সুখ সুবিধা বিবেচনা করিয়া কাজ করিবার বয়স ও বুদ্ধি তোমার হইয়াছে। সুতরাং এ বিষয়ে তোমার মতামত জানাইবে।

সমরেশ চিঠি পড়িয়া তৎক্ষণাৎ তাহার উত্তর দিতে বসিল; লিখিল—বাবা, কোনও ভদ্রমহিলাকে বিবাহ করিবার উপযুক্ত সামাজিক শিষ্টতা ও ভদ্রতা আমি এখনো শিখি নাই। যদি কখনো শিখি আপনাকে জানাইব।

এই লিখিয়া তিক্ত অন্তঃকরণে পোস্টকার্ডখানা নিজের হাতে ডাকে দিয়া আসিল।

ইহার পর আরো কয়েকমাস কাটিয়া গিয়াছে। এই মাস কয়েকের মধ্যে অনেকবার সুষমা সমরেশের সহিত কথা কহিয়াছে, সমরেশও কতকটা বুদ্ধিবিশিষ্ট প্রাণীর মতো তাহার জবাব দিতে আরম্ভ করিয়াছে। কিন্তু অন্তর হইতে সঙ্কুচিত জড়তা কিছুতেই দূর করিতে পারিতেছে না। সুষমার কথাগুলির মধ্যে তাহার প্রতি যে একটি নম্র শ্রদ্ধা প্রকাশ পায় তাহা সে বুঝিতে পারে—বেশ উৎসাহিত হয়। কিন্তু কোথা হইতে দুরপনেয় কুণ্ঠা আসিয়া তাহার স্বচ্ছন্দ মেলামেশার পথে অন্তরায় হইয়া দাঁড়ায়। নিজের আচরণ প্রতি পদে পরীক্ষা করিতে করিতে আচরণটা প্রতি পদেই আড়ষ্ট ও অস্বাভাবিক হইয়া উঠে।

যখন একলা থাকে তখন নিজেকে শত ধিক্কার দিয়া ভাবে, সুষমা তাহার অসভ্যের মতো আচরণ দেখিয়া নিশ্চয় মনে মনে হাসে ও উপেক্ষা করে। হয়তো তাহাকে আরো হাস্যাস্পদ করিবার জন্যই অনেক সময় নিজে উপচিকা হইয়া কথা কহিতে আসে।

কিন্তু একথাটা সে কিছুতেই সম্ভব বলিয়া মনে করিতে পারে না যে তাহার লাজুক ও রমণী-ভীরু স্বভাবের বর্ম ভেদ করিয়া কেহ তাহার নিভৃত অন্তরের সন্ধান পাইতে পারে। যাহা বাহিরে প্রকাশ তাহাই তো লোকে দেখিবে—মনের খোঁজ পাইবার অন্য পথই বা কোথায়?

সেদিন ক্লাস শেষ হইবার পর সমরেশ বাড়ি যাইতেছে এমন সময় কলেজের চাপরাসী আসিয়া জানাইল যে প্রফেসার সরকার তাহাকে সেলাম দিয়াছেন। প্রবীণ প্রফেসারের জন্য একটি আলাদা ঘর নির্দিষ্ট ছিল, সমরেশ পর্দা সরাইয়া সেখানে প্রবেশ করিয়া দেখিল প্রফেসারের নিকট ভূপেন ও সুষমা উপস্থিত রহিয়াছে। অজানা আশঙ্কায় তাহার বুকের ভিতর তোলপাড় করিয়া উঠিল।

মেধাবী ছাত্র ও সংযত আত্মসমাহিত প্রকৃতির লোক বলিয়া সমরেশকে প্রফেসার সরকার মনে মনে শ্রদ্ধা করিতেন। তিনি ঈষৎ হাসিয়া একখানা চেয়ার নির্দেশ করিয়া বলিলেন, বসো সমরেশ।

সমরেশ বসিল। প্রফেসার সরকার বলিলেন, কাল আমার জন্মতিথি। একসঙ্গে বসে একটু আহারাদির বন্দোবস্ত করা গেছে। নিজের জন্মতিথিতে উৎসব করা আমার ভাল লাগে না, কিন্তু সুষমা শোনে না–প্রতি বৎসর করতে হয়। এখন ওটা একটা অনুষ্ঠান হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা হোক, তুমি আর ভূপেন কাল রাত্রে আমার বাড়িতেই আহারাদি করবে, নিমন্ত্রণ রইল।

সুষমা হাসিয়া বলিল, মামা, ঐ রকম করে বুঝি নেমন্তন্ন করে? বলতে হয়, মহাশয়, কল্য রাত্রে মদীয় রসা রোডস্থ ভবনে আগমনপূর্বক—তারপর কি বলতে হয় সমরেশবাবু?

সমরেশ একটা ঢোক গিলিয়া ক্ষীণ হাস্যে বলিল, শুভকর্ম সম্পন্ন করাইবেন; পত্র দ্বারা নিমন্ত্রণ করিলাম, নিবেদন ইতি।

সুষমা কলকণ্ঠে হাসিয়া উঠিল। কথাটা বলিয়া সমরেশও একটু খুশি হইয়াছিল, হাসি শুনিয়া তাহার সারা গা রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল। সুষমাকে এমনভাবে প্রাণ খুলিয়া হাসিতে সে আর কখনো শুনে নাই।

প্রফেসার সরকারও হাসিয়া বলিলেন, ঐ হল। সকাল সকাল এসো কিন্তু। আরো অনেকেই আসবেন। সুষমা সকাল থেকেই হাজির থাকবে, ও-ই বলতে গেলে তোমাদের হোস্টেস। ওর মামী তো রুগ্ন শরীর নিয়ে কোনও কাজই করতে পারেন না।

সমরেশ উঠিয়া—যে আজ্ঞে বলিয়া বিদায় লইবার উপক্রম করিল!

ভূপেন বলিল, আমি এইমাত্র প্রফেসার সরকারকে আমার অভিনন্দন জানাচ্ছিলুম—তাঁর জীবনে এই দিনটি যেন বারবার ফিরে আসে।

মুহূর্ত মধ্যে সমরেশের মুখ মলিন হইয়া গেল। অভিনন্দন তাহারো জানানো উচিত ছিল, এবং সে নিশ্চয় জানাইত—এতটা নিরেট নির্বোধ সে নয়। কিন্তু সুষমা উপস্থিত থাকায় তাহার মধ্যে সব ওলট-পালট হইয়া গিয়াছিল। সে কোনমতে আমতা-আমতা করিয়া বলিল, আমিও—আমিও আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি–বলিয়া একরকম ঘর ছাড়িয়া পলাইয়া গেল।

অতঃপর প্রফেসার সরকারের বাড়ি নিমন্ত্রণ রক্ষা। এইখানেই সমরেশের চরম দুর্গতি হইয়া গেল।

তাই সেখান হইতে ফিরিবার পথে ক্লান্ত দেহ ও উদ্ভ্রান্ত মন লইয়া সে ভাবিতেছিল, ভদ্রোচিত কোনও ব্যবহারই যখন তাহার দ্বারা সম্ভব নয় তখন মনুষ্য সমাজে বাঁচিয়া থাকিয়াই বা লাভ কি?

এরূপ মর্মান্তিক ভাবনার যথার্থ কারণ ঘটিয়াছিল কিনা তাহা নিমন্ত্রণ ব্যাপারের আলোচনা করিলেই বুঝিতে পারা যাইবে।

সন্ধ্যা সাতটার পর প্রফেসার সরকারের বাড়িতে উপস্থিত হইয়া সমরেশ দেখিল ড্রয়িং রুমে প্রায় পনের-ষোলো জন পুরুষ ও মহিলা সমবেত হইয়াছেন। সমরেশ একবার চারিদিকে তাকাইয়া দেখিল,—চেনা লোকের মধ্যে কেবল ভূপেন ও প্রফেসার বড়ুয়াকে দেখিতে পাইল। বিখ্যাত আচার্য বড়ুয়াকে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্রই চিনিত; এতবড় বিদ্বান সুরসিক ও অমায়িক প্রফেসার সচরাচর দেখা যায় না। তাঁহার হাস্যবিম্বিত মুখ হইতে জ্ঞান কৌতুক দাক্ষিণ্য ও মদের গন্ধ প্রায় সর্বদাই ক্ষরিত হইতে থাকিত। ছাত্রমহলে এমন অব্যাহত প্রসার বিশ্ববিদ্যালয়ের আর কোনও আচার্যই লাভ করিতে পারেন নাই।

সমরেশ দ্বারের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইতেই সুষমা আসিয়া ঈষদরুণ সহাস্যমুখে তাহার অভ্যর্থনা করিল, আসুন সমরেশবাবু। এত দেরি করলেন যে?

অতিথিকে লৌকিক আপ্যায়িত করা ছাড়াও সুষমার কণ্ঠে যে একটি স্বকীয় আনন্দ আত্মান ধ্বনিত হইয়াছিল তাহা সমরেশের কানে পৌঁছিল না; অপরাধ করিয়া করিয়া সে এতই সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিয়াছে যে অপ্রস্তুতভাবে বলিল, বড্ড দেরি হয়ে গেছেনা? ভারী অন্যায় করেছি।

সুষমা বলিল, নিশ্চয় অন্যায় করেছেন কিন্তু সেজন্য আপনি দুঃখিত হবেন না, লোকসান আমাদেরি। আর একটু আগে এলে বাবার সঙ্গে দেখা হত। তিনি এইমাত্র চলে গেলেন।

সমরেশ অনুতপ্ত বিমর্ষ মুখে চুপ করিয়া রহিল; সুষমা বলিল, ডাক্তার হবার ঐ মুস্কিল। দেখুন, মা কোথায় মামার জন্মতিথিতে একটু আমোদ আহ্লাদ করবেন তা নয় কোথাকার কোন রুগী ফোন করে ধরে নিয়ে গেল।

সমরেশের মুখ হঠাৎ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল, সে ব্যগ্র স্বরে জিজ্ঞাসা করিল, আপনার বাবা বুঝি ডাক্তার?

—হ্যাঁ। কেন বলুন তো?

সমরেশ তৎক্ষণাৎ সঙ্কুচিত হইয়া পড়িল, বলিল, না—অমনি—আমার বাবাও ডাক্তার।

উৎফুল্লনেত্রে চাহিয়া সুষমা বলিয়া উঠিল, তাই নাকি! আপনি তাহলে আমার ব্যথার ব্যথী বলুন। বলিয়াই সুষমা লজ্জিত হইয়া পড়িল, কথাটা চাপা দিবার অভিপ্রায়ে তাড়াতাড়ি বলিল, চলুন, মামীর সঙ্গে আপনার পরিচয় করিয়ে দিই।

প্রফেসার-পত্নী অদূরে একটি কৌচে বসিয়া ছিলেন, সমরেশকে তাঁহার কাছে লইয়া গিয়া সুষমা বলিল, মামী, ইনি সমরেশবাবু, মামার শ্রেষ্ঠ ছাত্র।

প্রফেসার-পত্নী মুখ তুলিয়া সাদরে বলিলেন, এস বাবা, এস।

তাঁহার রুগ্ন অথচ প্রীতিপ্রসন্ন মুখের দিকে চাহিয়া সমরেশের সঙ্কোচের কুয়াশা অর্ধেক কাটিয়া গেল, সে অবনত হইয়া তাঁহার পদধূলি গ্রহণ করিয়া তাঁহার পাশে বসিয়া বলিল, আমি প্রফেসার সরকারের একজন ভক্ত ছাত্র। তাঁর জন্মতিথি উৎসবে যোগ দিতে পারা আমার পক্ষে যে কতবড় সৌভাগ্য তা বলতে পারি না। উনি দীর্ঘ জীবনলাভ করে এই দিনটিকে বারবার ফিরিয়ে আনুন এই আমাদের কামনা।

এমন সহজ আন্তরিকতার সহিত সমরেশকে কথা কহিতে সুষমা পূর্বে কখনো শুনে নাই। তাহার বুকের ভিতরটা দুলিয়া উঠিল, সে আস্তে আস্তে সেখান হইতে সরিয়া গেল।

ঘরের অন্যদিকে প্রফেসার বড়ুয়া নানা জাতীয় চুটকি গল্পে আসর জমাইয়া তুলিয়াছিলেন, মাঝে মাঝে হাসির ঢেউ বহিয়া যাইতেছিল। ভূপেন সেই দলে বসিয়া ছিল কিন্তু তাহার চক্ষু দুটা সতর্কভাবে ঘরময় ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল।

গল্প গুজবে দেড় ঘণ্টা কাটিয়া গেল, সমরেশ এক মুহূর্তের জন্যও প্রফেসার-পত্নীর সঙ্গ ছাড়িল। নয়টা বাজিতেই ভৃত্য আসিয়া জানাইল যে ডিনার প্রস্তুত। সকলেই উঠিয়া পড়িলেন।

ডিনার শুনিয়াই সমরেশ চমকাইয়া উঠিয়াছিল, তাহার মুখ দিয়া বাহির হইল, ডিনার? টেবিলে বসে খাওয়া?

প্রফেসার-পত্নী সমরেশের আতঙ্কের অন্যরূপ অর্থ বুঝিয়া বলিলেন, আমরা সাধারণত টেবিলে বসে খাই না, পাত পেড়েই খাই। কিন্তু আজ অনেক অতিথি এসেছেন যাঁরা মাটিতে বসে খেতে পারেন না—তাই টেবিলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু রান্না সব বামুনে করেছে, তুমি কি বলিয়া উৎকণ্ঠিতভাবে তাহার মুখের দিকে চাহিলেন।

সমরেশ তাড়াতাড়ি বলিল, না না—তা নয়—কিন্তু–

ভোজনকক্ষে প্রবেশ করিবার সময় সুষমাকে তাহার মামী একবার তীক্ষ্ণচক্ষে নিরীক্ষণ করিয়া নিম্নকণ্ঠে বলিলেন, বেশ ছেলেটি সমরেশ, ভারী মিষ্টি স্বভাব। আর কি চমৎকার কথা কয়, যেন কতকালের চেনা।–ওকে মাঝে মাঝে আমার কাছে ধরে নিয়ে আসিস।

সুষমা কোনও উত্তর দিল না, কেবল একটু মুখ টিপিয়া হাসিল।

টেবিলে খাইতে বসিয়া সমরেশের মনে হইল তাহার মতো হতভাগ্য পৃথিবীতে আর নাই। এতগুলা ছুরি কাঁটা লইয়া সে কি করিবে, কোন্টাকে কিভাবে ব্যবহার করিবে, এতগুলা ছোট বড় চামচেরই বা কি প্রয়োজন তাহা কিছুই ধারণা করিতে না পারিয়া সে একেবারে দিশাহারা হইয়া গেল। তাহার একপাশে একটি তরুণী বসিয়াছিলেন, বোধ হয় সুষমার বন্ধু, অন্য পাশে একটি সাহেব বেশধারী ভদ্রলোক। এই দুইজনের মধ্যস্থলে সমরেশ দারুময় জগন্নাথের মতো নিশ্চল হইয়া বসিয়া রহিল।

সুপ চামচ দিয়া খাইতে হয়, তাহার জন্য ছুরি কাঁটার দরকার নাই একথা অতি বড় নির্বোধও বিনা উপদেশে বুঝিতে পারে। সুতরাং সে ফাঁড়াটা সহজেই কাটিয়া গেল। গোল বাধিল মৎস্যের সঙ্গে।

খাওয়া কিছুদূর অগ্রসর হইয়াছে, কথোপকথনের একটা মৃদু গুঞ্জনের মধ্যে সমরেশ নিজেকে অনেকটা নিরাপদ মনে করিতেছে, এমন সময় ভূপেনের সুস্পষ্ট কণ্ঠস্বরে গুঞ্জনধ্বনি চাপা পড়িয়া গেল। ভূপেন টেবিলের অন্যদিকে ছিল, গলা বাড়াইয়া দেখিয়া মুখখানা বেশ গম্ভীর করিয়া বলিল, সমরেশবাবু, একটু ভুল করেছেন। ছুরিটা ডান হাতে ধরতে হয় আর কাঁটা বাঁ হাতে।

সমরেশের ভুলটা যে কেহই লক্ষ্য করে নাই এমন নয় কিন্তু এই খোঁচাটা এতই নিষ্ঠুর এবং অপ্রত্যাশিত যে সকলেই চমকিয়া উঠিলেন। সমরেশের মুখ বিবর্ণ হইয়া গেল, সে মূঢ়ের মতো দুই। হাতে ছুরি কাঁটা ধরিয়া নিজের পাতের দিকে বিহ্বল চক্ষে চাহিয়া রহিল।

শিষ্ট সমাজে কচিৎ এইরূপ দুর্ঘটনা যখন ঘটিয়া যায় তখন, কিছুই ঘটে নাই এমনি ভান করাই একমাত্র ভদ্ররীতি। উপস্থিত সকলে সেই রীতি অবলম্বন করিলেন, যেন শুনিতে পান নাই, এমনিভাবে পুনবার কথাবার্তা আরম্ভ করিলেন। শুধু সুষমার দুই গাল রক্তবর্ণ হইয়া জ্বালা করিতে লাগিল, সে হাত গুটাইয়া স্তব্ধভাবে বসিয়া রহিল।

কিন্তু দুর্নিয়তি তখনো সমরেশকে ত্যাগ করে নাই। আহার প্রায় শেষ হইয়া আসিয়াছে এমন সময় আর একটি ব্যাপার ঘটিল। অসাবধানে হাত নাড়ার জন্যই বোধ হয়, একটা ঝোলের বাটি হঠাৎ সমরেশের সম্মুখ হইতে অদ্ভুতভাবে লাফাইয়া উঠিয়া তাহার কোলের উপর পড়িয়া গেল এবং তরল সস্নেহ ঝোলে তাহার পাঞ্জাবি ও চাদর অভিষিক্ত করিয়া দিল।

পৃথিবী, দ্বিধা হও, আমি তোমার গর্ভে প্রবেশ করি—এই কামনা সীতাদেবীর পর হইতে বোধ করি অনেক নরনারীকেই সময়-অসময়ে করিতে হইয়াছে। সমরেশও কায়মনোবাক্যে সেই কামনাই করিয়াছিল এমন সময় টেবিলের অপর প্রান্তে ঝন্ ঝন্ শব্দে সকলে সচকিত হইয়া দেখিলেন, সুষমার চমৎকার কলাপাতা রঙের সিল্কের শাড়িটি অনুরূপ তরল সস্নেহ ঝোলে রঞ্জিত হইয়া গিয়াছে এবং সে অপ্রতিভভাবে মুখ নত করিয়া আসিতেছে।

এই বৃহত্তর দুর্ঘটনায় সমরেশের দুষ্কৃতি চাপা পড়িয়া গেল বটে কিন্তু তাহার মনের অশান্তি দূর হইল না। উপরন্তু কোন্ এক প্রহেলিকার ইঙ্গিত অনুশোচনার সঙ্গে মিশিয়া তাহাকে আরো পীড়িত করিয়া তুলিল।

আহার শেষ হইলে প্রফেসার বড়ুয়া উঠিয়া একটি সুন্দর বক্তৃতা দিয়া সহকর্মীকে অভিনন্দিত করিলেন। উপসংহারে বলিলেন, আপনারা পাত্র পূর্ণ করুন, প্রফেসার সরকারের স্বাস্থ্য পান করা চাই।

প্রফেসার সরকার মৃদুকণ্ঠে আপত্তি করায় বড় সাহেব বলিলেন, না না, ও কোনও কাজের কথা নয়। কারণবারি না হলে কার্য সুসম্পন্ন হবে না। শ্যাম্পেন আনাও শ্যাম্পেনে মহিলাদেরও আপত্তি হতে পারে না।

প্রফেসার বড়ুয়ার জন্য শ্যাম্পেন আনানো ছিল, অগত্যা তাহাই উপস্থিত করা হইল। সকলের পাত্র পূর্ণ করা হইল। প্রফেসার বড়ুয়া নিজের পাত্রটি ঊর্ধ্বে তুলিয়া বলিলেন, Long life to Professor Sarkar! Drink hearty!

মহিলারা কেহই পান করিলেন না, শুধু পাত্র অধরে ঠেকাইয়া নামাইয়া রাখিলেন। ভূপেন একচুমুকে নিজের পাত্র শেষ করিয়া ফেলিল। সমরেশও একচুমুক খাইল বটে কিন্তু পাত্র শেষ করিতে পারিল না।

অতঃপর মহিলারা ড্রয়িংরুমে ফিরিয়া গেলেন, পুরুষেরাও ইচ্ছামত কেহ কেহ দু-একপাত্র টানিয়া একে একে তাঁহাদের অনুবর্তী হইলেন।

ঝোল-রঞ্জিত কাপড়চোপড় লইয়া ড্রয়িংরুমে ফিরিয়া যাইবার ইচ্ছা সমরেশের ছিল না, সে অলক্ষিতে কাহাকেও কিছু না বলিয়া পলায়ন করিবার সুযোগ খুঁজিতেছিল। ওদিকে প্রফেসার বড়ুয়াকে কেন্দ্র করিয়া দ্রাক্ষারসের আস্বাদন ও নিম্নকণ্ঠে আলাপ চলিতেছিল, সমরেশের দিকে কাহারো লক্ষ্য ছিল না। এই ফাঁকে সে সরিয়া পড়িবার উপক্রম করিতেছে এমন সময় ভূপেন পাশে আসিয়া দাঁড়াইল। তাহার আপাদমস্তক একবার নিরীক্ষণ করিয়া মুখের একটা ভঙ্গি করিয়া বলিল, পাঞ্জাবি দিব্যি রঙিয়ে ফেলেছেন দেখছি। হোরি খেলত বনুয়ারী?—তা এখানে বসে কেন? ড্রয়িংরুমে গেলেই তো পারেন, সেখানে মহিলারা আপনার পাঞ্জাবির বর্ণবৈচিত্র্য দেখে নিশ্চয় খুব। আনন্দ পাবেন। বলিয়া মুচকি হাসিয়া নিম্নকণ্ঠে একটা গানের কলি ভাঁজিতে ভাঁজিতে প্রস্থান করিল।

অপরিসীম আত্মগ্লানির মধ্যেও ক্রোধের শিখ সমরেশের মাথার মধ্যে জ্বলিয়া উঠিল। ভূপেনের পৃষ্ঠের দিকে তাকাইয়া তাকাইয়া মনের মধ্যে যে কথাগুলা বিষের মতো ফেনাইয়া উঠিতে লাগিল, ভাগ্যে সেগুলা মনের মধ্যেই রহিয়া গেল, এই স্থানে মুখ দিয়া বাহির হইয়া পড়িলে যে বিশ্রী ব্যাপার ঘটিত তাহার ফলে বোধ করি সমরেশকে আত্মহত্যা করিতে হইত।

মিনিট কয়েক পরে সমরেশ নিঃশব্দে উঠিয়া বাহিরের বারান্দায় গিয়া দেখিল সেখানে কেহ নাই। সে চুপি চুপি বাহির হইয়া যাইতেছিল, হঠাৎ নজর পড়িল দূরে বারান্দার এক কোণে সুষমা ও ভূপেন দাঁড়াইয়া কথা কহিতেছে। সুষমার আরক্ত মুখ ও তীব্র চোখের দৃষ্টি মুহূর্তের জন্য সমরেশের চোখে পড়িল, সে হেঁটমুখে বারান্দা পার হইয়া যাইবার উপক্রম করিল।

সমরেশকে দেখিবামাত্র সুষমা দ্রুতপদে কাছে আসিয়া বলিল, সমরেশবাবু, আপনি যাচ্ছেন?

সমরেশ থমকিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, হ্যাঁ–রাত হয়েছে,—আমি যাই।

সুষমা তাহার আরো কাছে আসিয়া মিনতিপূর্ণ স্বরে কহিল, একটু দাঁড়াবেন না? আমিও তাহলে আপনার সঙ্গে যেতুম, আপনি আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে পারতেন। আপনার সঙ্গে না গেলে, এই রাত্রে আবার মামাকে যেতে হবে আমায় পৌঁছে দিতে।

ভূপেনের বিষাক্ত শ্লেষ তখনো সমরেশের বুকের মধ্যে জ্বলিতেছিল, সুষমার কথাগুলা তাহার কানে অত্যন্ত নিষ্ঠুর বিদ্রূপের মতো শুনাইল, সে মাথা নাড়িয়া বলিল, না, মাফ করবেন—আমি আর থাকতে পারছিনে—।

সুষমা যেন আহত হইয়া ফিরিয়া আসিল; তাহার মুখ ম্লান হইয়া গেল, তবু সে আর একবার বলিল, মামীর সঙ্গে দেখা করে যাবেন না? আমি না হয় তাঁকে এইখানে ডেকে আনছি—বলিতে বলিতে তাহার দৃষ্টি সমরেশের ঝোলমাখা পাঞ্জাবিটার উপর গিয়া পড়িল।

না—নমস্কার! সমরেশ নিষ্ক্রান্ত হইয়া গেল। ফুটপাথ হইতে শুনিতে পাইল ভূপেন বলিতেছে—আপনি চিন্তিত হচ্ছেন কেন? আমি তো রয়েছি, আপনার মামা না যেতে পারেন—

.

চৌরঙ্গী পার হইয়া সমরেশ ধর্মতলার রাস্তা ধরিল। হাঁটিতে হাঁটিতে ওয়েলিংটন স্ট্রীটের মোড় পর্যন্ত আসিয়া সে চমক ভাঙ্গিয়া দেখিল রাস্তায় লোক চলাচল বন্ধ হইয়া গিয়াছে, শূন্যপথের দুইধারে গ্যাসের বাতিগুলা যতদূর দেখা যায় নির্নিমেষভাবে জ্বলিতেছে। দোকানপাট বন্ধ।

সমরেশ ভাবিল, দূর ছাই, আজ আর গাড়ি পাওয়া যাবে না। গলি দিয়েই যাই।

বাসায় চাকরটা এখনো তাহার জন্য অপেক্ষা করিয়া জাগিয়া আছে স্মরণ করিয়া পার্কের ভিতর দিয়া দ্রুতবেগে চলিতে আরম্ভ করিল। কিন্তু পাশে একখানা খালি বেঞ্চি তাহার পরিশ্রান্ত দেহকে বেশিদূর অগ্রসর হইতে দিল না। মোটবাহী কুলি যেমন ঘাড়ের মোট নামাইয়া ক্ষণকাল বিশ্রাম করে, সেও তেমনি ভারাক্রান্ত দেহটাকে বেঞ্চির উপর নামাইয়া বসিয়া পড়িল।

মিনিট পনের পরে কিন্তু আবার তাহাকে উঠিতে হইল। পার্কে বেঞ্চির উপর রাত কাটাইয়া কোনও লাভ নাই, বাসায় ফিরিয়া কোনক্রমে এই উচ্ছিষ্ট কাপড়চোপড়গুলা ছাড়িয়া শয্যা আশ্রয় করিতে পারিলে সে বাঁচে। পায়ের আঙুল হইতে রগের শিরগুলা পর্যন্ত অপরিসীম অবসাদে ভাঙিয়া পড়িতেছে; কিন্তু বাকী পথটা যে করিয়া হোক অতিক্রম করিতেই হইবে।

গলি দিয়া যাইতে যাইতে সম্মুখে কিছু দূরে সমরেশ দেখিল একখানা ট্যাক্সি দাঁড়াইয়া আছে এবং তাহার বাহিরে দাঁড়াইয়া একটা লোক হুডের ভিতর মাথা ঢুকাইয়া কাহার সহিত কথা কহিতেছে। আরো খানিকটা অগ্রসর হইয়া শুনিতে পাইল গাড়ির ভিতরে বসিয়া যে কথা কহিতেছে সে। স্ত্রীলোক। এই সব পাড়ায় নির্জন রাত্রে অনেক রকম ব্যাপার ঘটিয়া থাকে তাই সমরেশ তাড়াতাড়ি পা চালাইয়া বাহির হইয়া যাইবার চেষ্টা করিল। দণ্ডায়মান ট্যাক্সি ছাড়াইয়া দুপা অগ্রসর হইয়াছে, এমন সময় যে পরিচিত কণ্ঠস্বর তাহার কর্ণে আসিয়া পৌঁছিল তাহাতে সে তীরবিদ্ধের মতো ফিরিয়া দাঁড়াইল।

এ আমাকে কোথায় নিয়ে এলেন? আমি যে বাড়ি যাব।

উত্তেজনা-বিকৃত কণ্ঠে পুরুষটা বলিল, রাস্তার মাঝখানে একটা সী করো না সুমা; কোনও ভয় নেই—এ আমার বাসা। একবারটি নামো, কেউ জানতে পারবে না। তারপর আমি তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেব।

না না, আগে আমায় বাড়ি পৌঁছে দিন।

ভূপেন সুষমার হাত ধরিয়া টানিতে টানিতে বলিল, নেমে এস, নেমে এস। এসব পুরি কি তোমার মতো এড়ুকেটেড গার্লের সাজে! বলিয়া একটা বিশ্রী হাসি হাসিল।

এক লাফে সমরেশ ট্যাক্সির পাশে আসিয়া দাঁড়াইল, কি হয়েছে? সুষমা?

সুষমা আর্তস্বরে প্রায় চিৎকার করিয়া উঠিল, সমরেশবাবু, আমাকে বাঁচান।

ভূপেন বিদ্যুদ্বেগে ফিরিয়া সম্মুখে সমরেশকে দেখিয়া একেবারে হতবুদ্ধি হইয়া গেল। সমরেশও ভুপেনের মুখ দেখিয়া কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হইয়া রহিল—মানুষের মুখ এত অল্প সময়ের মধ্যে এতখানি পরিবর্তিত হইতে পারে তাহা যেন কল্পনার অতীত। যে হিংস্র পশুটাকে ভূপেন এত দিন শিষ্টতার। আড়ালে সযত্নে ঢাকিয়া রাখিয়াছিল, শিকার সান্নিধ্যে পাইয়া সেই পশু যেন মুখ বাহির করিয়া দাঁড়াইয়াছে।

সমরেশের বুকের মধ্যে বহুদিন সঞ্চিত বিদ্বেষ ও ঘৃণা একমুহূর্তে ফাটিয়া পড়িল। তাহার ইচ্ছা হইল ভূপেনের ঐ কদর্য পাশবিক মুখখানাকে লাথি মারিয়া ঘুষি মারিয়া ভাঙিয়া থেঁতো করিয়া একেবারে লুপ্ত করিয়া দেয়। সে এক বজ্রমুষ্টিতে ভূপেনের চুল ধরিয়া অন্য হাতে তাহার গালে একটা বিরাট চপেটাঘাত করিয়া বলিল, হতভাগা ছোটলোক জানোয়ার কোথাকার! ক্যাডাভ্যারাস কুকুরের বাচ্চা! আজ তোকে খুন করব। বলিয়া আর একটি ততোধিক বিরাট চপেটাঘাত করিল।

ভূপেনও রুখিয়া উঠিয়া বলিল, খবরদার বলছি—

সমরেশ সঙ্গে সঙ্গে তাহার পেটে এক প্রচণ্ড লাথি কষাইয়া বলিল, তবে রে—

তারপর তাহার মুখ দিয়া আগ্নেয়গিরির অগ্নদগারের মতো যে সমস্ত শব্দ বাহির হইল, হিন্দি উর্দু ইংরাজী বাংলা মিশ্রিত যে অনুষ্টুপ শ্লোক অবাধে অনর্গলভাবে নির্গত হইতে লাগিল তাহার পুনরুক্তি করিবার সাহস বা শক্তি আমাদের নাই। ভূপেন সেই বাক্যের আগুনে যেন একখণ্ড কাগজের মতো পুড়িয়া কুঁড়াইয়া গেল। গাড়ির মধ্যে সুষমা দুই কানে সজোরে আঙুল পুরিয়া দিয়া, বিস্ফারিত চক্ষে অপূর্ব আলোক ফুটাইয়া নিস্পন্দ বক্ষে বসিয়া রহিল।

প্রিয়তমা নারীর রক্ষাৰ্থ পুরুষ যখন লড়াই করে তখন প্রিয়তমার মনের ভাবটা কিরূপ হয় কে জানে?

ভূপেনের নাকে অন্তিম একটা ঘুষি মারিয়া তাহাকে ফেলিয়া দিয়া সমরেশ বলিল, যা শালা কেঁচোর বাচ্চা, নর্দমায় শুয়ে থাকগে যা! তারপর ট্যাক্সিতে সুষমার পাশে উঠিয়া বসিয়া চালককে বলিল, চালাও—হাতিবাগান।

গাড়ি চলিল। দুইজনে অন্ধকারের মধ্যে চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। এইভাবে মিনিট পাঁচেক কাটিয়া গেল।

শেষে সুষমা মৃদুস্বরে বলিল, কি বলে ঐ সব কথাগুলো মুখ দিয়ে বার করলেন?

সমরেশের শরীরে ক্লান্তির কণামাত্র আর অবশিষ্ট ছিল না, সে হঠাৎ হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিল, তারপর বলিল, ঐ কথাগুলো মুখ দিয়ে বার করা এবং পদাঘাত মুষ্ট্যাঘাত ইত্যাদি চালানোর সঙ্গে সঙ্গে একটা মস্ত কথা বুঝতে পেরেছি যা এতদিন কিছুতেই বুঝতে পারছিলুম না। সেজন্যে দোষ অবশ্য সম্পূর্ণ তোমার, তুমিই আমার মাথা গুলিয়ে দিয়েছিলে?

অন্ধকারের মধ্যে সুষমা হাসিয়া বলিল, কি কথা বুঝতে পেরেছেন শুনি?

সমরেশ হাতড়াইয়া সুষমার একখানা হাত নিজের হাতের মধ্যে লইয়া বলিল, বুঝতে পেরেছি যে আমি একজন খাঁটি ভদ্রলোক। শুধু তাই নয়, আরো অনেক কথা বুঝতে পেরেছি যা চলন্ত ট্যাক্সিতে বসে বলা যায় না।

সুষমা সাড়া দিল না; সমরেশ তখন তাহার মুখের কাছে মুখ লইয়া গিয়া বলিল, সুষমা, কাল বিকেলে তোমাদের বাড়িতে আমার চায়ের নেমন্তন্ন রইল,—ঠিক পাঁচটার সময়বুঝলে? আগে থাকতে খবর দিয়ে রাখলুম-তৈরি হয়ে থেকো।

সুষমা চুপিচুপি বলিল, আমি তো আপনাকে নেমন্তন্ন করিনি সমরেশ বলিল, ওঃ! তাও তো বটে! অনিমন্ত্রিত ভাবে যাওয়া তো কোনমতেই ভদ্রতা হবে। তা, এক কাজ কর, সে ত্রুটি তুমি এখনি সংশোধন করে নাও। বল, মহাশয়, কল্য সায়াহ্নে বেলা পাঁচ ঘটিকার সময় আপনি সবান্ধবে—না না সবান্ধবে নয়, সবান্ধবে নয়—একাকী! কি বল? সুষমা?

সুষমা কিছুই বলিল না; কিন্তু তাহাদের দুজনের বাহু যেখানে আঙুলে আঙুলে জড়াইয়া নিবিড়ভাবে পরস্পরের পরিচয় গ্রহণ করিতেছিল সেইখানে সমরেশ সামান্য একটু চাপ অনুভব করিল।

৩০ মাঘ ১৩৩৮

Facebook Comment

You May Also Like