বড়মামার বোমাবাজি (২) – সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

বড়মামার বোমাবাজি (২) - সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

‘তুই সার্কাস থেকে বড়দার সার্কাসে এলি কীভাবে!’

‘সে মেজদা আর এক স্টোরি! অনেক সময় লাগবে। আপনি কি সাইকেলের কথা শুনতে চান?

‘অবশ্যই চাই।’

‘আমি একটা সাইকেল চেপে গিয়েছিলুম, আমি একটা সাইকেল চেপে ফিরে এলুম। ফিরে এসে সাইকেলটাকে বেড়ার গায়ে রেখেই, বড়দার কাজে লেগে গেলুম। এইবার বলুন তো ব্যাপারটা কী হল?

‘ব্যাপারটা এই হল, তুই জজসায়েবের সাইকেলটা চুরি করলি, আর আমাদের সাইকেলটা চুরি করল অন্য কেউ।’

‘মেজদা, আমার কিঞ্চিৎ আপত্তি আছে।’

‘কিঞ্চিৎ শব্দটা তুই কোথা থেকে শিখলি?’

‘বড়দার কাছ থেকে। রোজ রাতে বড়দা আমাকে সংস্কৃত শেখাচ্ছেন আজকাল। আমার স্লাইট অবজেকশান আছে মেজদা, আমি চুরি করিনি। আমি চেপে চলে এসেছি। না দেখে চেপে চলে এসেছি।’

ঠিক এই সময় বড়মামা হন্তদন্ত হয়ে এসে ঢুকলেন। মুখ-চোখ লালচে দেখাচ্ছে। এতটা পথ রোদে রোদে এসেছেন তো। বড়মামা এসেই বললেন, ‘কী কাণ্ড ভাই রে! ডাক্তারিটা এইবার ছাড়তে হবে। অসম্ভব, অসম্ভব ব্যাপার। এত অসুখ বাড়লে সামলাব কী করে! আটান্নটা ইনজেকশান, একের পর এক। তার মধ্যে একডজন ইন্টাভেনাস। রোগীদের আবার আদিখ্যেতা কত! প্রেশার না দেখলে অভিমান। মুখ অমনি তোনো হাঁড়ি। বুক-পিঠ তো দেখতেই হবে, আবার পাঁজরায় তবলা বাজাতে হবে। ব্লাডপ্রেশার-মাপা চাট্টিখানি কথা! ফ্যাঁস-ফোঁস, ফ্যাঁস-ফোঁস করেই যাও। ইঃ, এতখানি বেলা হল! তোরা সব অনাহারে। শরৎ দেখি বসে বসে লজেন্স খাচ্ছে।’

বড়মামার চোখ পড়ে গেল সাইকেলটার দিকে।

এক পলক দেখেই বললেন, ‘নতুন কিনলি বুঝি। কত নিল?’

মেজোমামা বললেন, ‘এইটাই পার্থর সাইকেল।‘

‘অ্যাঁ, বলিস কী রে! চোর এইখানে ডেলিভারি দিয়ে চলে গেছে?’

‘চোর ডেলিভারি দেয়নি বড়দা। তোমার মুকুন্দই চেপে চলে এসেছে।’

‘আর আমাদের সাইকেলটা?

‘সেইটাই চুরি হয়েছে বড়দা।’

‘তা হলে তো আমাদেরই ডায়েরি করা উচিত। চল, চল। থানায় চল।

‘থানায় তো যাব, এইটার কী হবে? এই সাইকেলটার!’

বড়মামা সাংঘাতিক চিন্তায় পড়ে গেলেন। আর বড়মামার মজা হল, কোনও কিছুর সমাধান খুঁজে পেলে ভীষণ রেগে যান। এখনও তাই হল। ভীষণ রেগে গিয়ে বললেন, ‘এই ভাল্লুকটার জন্যে আমাকে শেষ পর্যন্ত ফাঁসিকাঠে ঝুলতে হবে। যাই, থানায় গিয়ে সারেন্ডার করি। সাইকেল চুরির দায়ে তিন বছর বেশ জম্পেস করে ঘানি ঘুরিয়ে আসি। কুসি ঠিকই বলে, বিমল মিত্রের জীবনে আক্কেল হবে না।’

মুকুন্দ বললে, ‘বড়দা সব ব্যাপারে আপনি ভীষণ ভয় পেয়ে যান। আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে। আমি বেশ বড় মতো এটা গর্ত খুঁড়ে, সাইকেলটাকে সমাধি দিয়ে, তার ওপর নয়নতারা গাছ লাগিয়ে দিই।’

মেজোমামা বললেন, ‘তার চেয়ে ঝপাং করে বড় পুকুরের জলে ফেলে দিলেই হয়।’

মুকুন্দ বললে, ‘চৈত্র মাসে জল কমে এলে, কঙ্কালটা বেরিয়ে পড়বে। এর মধ্যে কেউ যদি জাল ফেলে, উঠে চলে আসবে।’

বড়মামা বললেন,’ পুলিশ যদি কুকুরের সাহায্য নেয় তা হলে কী হবে!’

‘পুলিশ-কুকুর এ-বাড়িতে ঢুকতেই পারবে না। আমাদের আটটা কুকুরের সঙ্গে ফাইট লেগে যাবে।’

শরৎবাবু এসে হাজির। এক মুখ হেসে বললেন, ‘আমি তা হলে আসি। আজ আমার আবার বাগেরহাটে কবিতা পাঠের আসর আছে।’

বড়মামা বললেন, ‘তোমার খাওয়া হয়ে গেছে?’

‘আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলুম তো, তাই ঠিক মনে পড়ছে না। আচ্ছা আমি কি পান খেয়েছিলুম? তোমরা কেউ দেখেছিলে? আমি যদি পান খেয়ে থাকি, তা হলে আমি নিশ্চয় খেয়েছি। আমার ছেলেবেলা থেকেই এই এক রোগস্মৃতিরই ডিফেক্ট। ঘুম থেকে ওঠার পর আমার আর কিছু মনে থাকে না। সব ভুলে যাই, যেন এইমাত্র জন্মালুম।’

মাসিমা এলেন। মাসিমার আগমনটা সব সময়েই বেশ ভয়ের।

মাসিমা বললেন, ‘আমার একটাই প্রশ্ন, তোমরা মেয়েদের মানুষ বলে মনে করো?’ কেউ কিছু বলার আগে শরৎবাবু বললেন, ‘মানুষ’ মেয়েদের আমি দেবী বলে মনে করি। মা দুর্গা, মা সরস্বতী, মা লক্ষ্মী সব একসঙ্গে পেতলে ঢালাই করে…’

‘আপনার কথা হচ্ছে না। কথা হচ্ছে এই দুই মহাপুরুষকে নিয়ে।’

বড়মামা বললেন, ‘কী কাণ্ড হয়েছে রে কুসি! তুই আমার গলায় যা হয় একটা মালা পরিয়ে দে, আমি চলে যাই।’

শরৎবাবু বললেন, ‘তোমাকেও সংবর্ধনা! আমাকেও ওরা আজ সংবর্ধনা দেবে। হাজার টাকা ডোনেশন নিয়েছে ভাই, এমনি নয়।’

মাসিমা বললেন, ‘কেসটা কী!’

বড়মামা বললেন, ‘এই দ্যাখ সাইকেল।

‘তুমি আমাদের বেলা তিনটে অবধি উপোস করিয়ে রেখে এখন সাইকেল দেখাচ্ছ!’

‘শুধু সাইকেল নয় ভাই, এর আগে একটা বিশেষণ আছে। চোরাই সাইকেল। এই সাইকেলের খোঁজেই একটু আগে পুলিশ চড়াও হয়েছিল।’

‘তুমি কি তা হলে ডাক্তারি ছেড়ে সাইকেল চুরির ব্যবসায় নামলে?

‘আমি কেন নামব! এ কাজ মুকুন্দর।’

‘শিবঠাকুরের বদনাম হয়েছিল, তাঁর নন্দী, ভূঙ্গি চেলার জন্যে। তোমারও তাই হবে।’

‘হবে কী! হয়ে গেছে। শিবঠাকুরকে জেলে যেতে হয়নি। আমাকে জেলে যেতে হবে।‘

‘তা, এখনই যাবে, না দয়া করে কিছু মুখে দিয়ে যাবে?’

মেজোমামা যে পাথরটার ওপর বসেছিলেন বড়মামা সেই পাথরটার ওপর ধপাস করে বসে পড়ে বললেন, ‘ছিঃ, ছিঃ, কী অপমান! কী অপমান। আমি পার্থর কাছে মুখ দেখাব কী করে!’

মেজোমামা ঠোঁট থেকে পাইপ নামিয়ে বললেন, ‘ছিঃ ছিঃ কী অপমান। আমি আবার টেলিফোনে গরমাগরম দু-চার কথা শুনিয়ে দিলুম। এখন আমি কোন মুখে গিয়ে বলব, ‘পার্থ, এই তোমার সাইকেল!’ ইশ, আমার এতদিনের উঁচু মাথা একেবারে পাউডার হয়ে গেল।’

মেজোমামা বড়মামার পাশে সেই পাথরটার ওপর বসে পড়লেন।

বড়মামা মেজোমামার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘আয় ভাই, আয়। রাজদ্বারে আর শ্মশানে যে পাশে থাকে সে-ই হল বন্ধু। তুই-ই আমার একমাত্র বন্ধু। আর সেই নাক-কাটা রাজার গল্পটা। মনে পড়ছে। রাজা বানরকে প্রহরী করে তার হাতে তরোয়াল দিয়ে চিত হয়ে ঘুমোচ্ছে। বানর তলোয়াল হাতে বসে আছে পাশে। একটা মাছি এসে ভীষণ উৎপাত করছে।’

মেজোমামা বললেন, ‘পড়েছে পড়েছে, আমারও মনে পড়েছে গল্পটা। মাছি বসল রাজার নাকে, বানর মারল তলোয়ালের এক কোপ। ফিনিশা রাজার নাক খুলে পড়ে গেল।’

‘নীতিবাক্যটা মনে আছে?’

‘শিওর। দুর্জনের সঙ্গে দোস্তি করলে মানুষের বারোটা বেজে যায়। যেমন তোমার বেজেছে।’

মেজোমামার শেষের কথায় বড়মামা একটু বিরক্ত হলেন যেন। ভুরুর কাছটা কুঁচকে গেল। মেজোমামার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বারোটা আমার একা বাজেনি, তোরও বেজেছে। পার্থ তোরই বন্ধু।’

‘তা হতে পারে, তবে যদি জেলে যেতে হয়, তো তোমাকেই যেতে হবে।’

‘কেন? পার্থ তোমার বন্ধু। তুমি যাবে। আমি তোমাকে জামিনে ছাড়িয়ে আনব।’

‘আজ্ঞে না! পার্থ আমার বন্ধু হলেও, তোমার নামই করেছে। পুলিশ তোমাকেই জেরা করতে। এসেছিল। তুমি জেলে যাবে। আমি তোমাকে ছাড়িয়ে আনব জামিনে। উলটোটাই হবে বড়দা। আইনের চোখে তোমার গিয়ে বড়, মেজো নেই। অপরাধীই সাজা পাবে। তা ছাড়া মুকুন্দ তোমার লোক।’

‘মুকুন্দ এখন আমার লোক হয়ে গেল! তোমাদের কেউ নয়?’

‘মুকুন্দকে তুমি এনেছিলে বড়দা।’

বড়মামা অসহায়ের মতো মাসিমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দেখছিস কুসি, দেখছিস, কী সাঙ্ঘাতিক স্বার্থপর।’

‘কে স্বার্থপর নয় বড়দা? তুমি বড় ভাই হয়ে মেজোভাইকে জেলে পাঠাতে চাইছ। জানো, জেলখানায় কী কষ্ট। ছারপোকা-ভরা কম্বলে শুতে দেবে। খেতে দেবে লপসি। সেলে কোনও পাখা থাকবে না। দুপুর-রোদে পাথরের গাদায় বসে খোয়া ভাঙতে হবে। পরনে তোমার থাকবে ডোরাকাটা ইজের আর ফতুয়া। দ্যাখোনি তুমি। আমি একবার একটা হিন্দি সিনেমায় দেখেছিলুম। শিক্ষার জন্যে, জ্ঞানের জন্যে সব কিছু দেখতে হয়।’

বড়মামা আবার মাসিমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘কী যুগ পড়েছে দ্যাখো, পিতৃসম বড়ভাই জেল খাটবে আর মেজোভাই বসে বসে পাইপ টানবেন।’

মাসিমা গালে আঙুল দিয়ে তাঁর পরিচিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন। ভেতরে ভেতরে রাগে ফুটছেন; এইবার ফেটে পড়বেন।

শরৎবাবু বললেন, ‘আমি তা হলে যাই, ভাই। তোমরা তা হলে ক’টা নাগাদ জেলে যাচ্ছ? গাড়িতে যাবে না রিকশায়?

এইবার মাসিমার অ্যাকশন শুরু হল। রক থেকে নেমে হনহন করে এগিয়ে গেলেন গোয়ালের দিকে। হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে এলেন একলট খালি বস্তা। এই বস্তায় আসে গরুর খাবার। কেউ বুঝতে পারছেনা বড়মামার এইবার কী হবে! মাসিমা বড়মামার দিকে না গিয়ে গেলেন। সাইকেলটার দিকে। সাইকেলটাকে বস্তা চাপা দিয়ে দুই মামার সামনে এসে বললেন, ‘গেট আপ। গেট আপ। দুটো হুলোর মতো পাশাপাশি বসে ঝগড়া করলে গায়ে এইবার আমি জল ঢেলে দেব। গেট আপ। গেট আপ। তোমাদের একটা আক্কেল নেই। শরৎদার মতো একজন। মানুষকে নিমন্ত্রণ করে এনে, তোমাদের ছেলেমানুষি হচ্ছে?’

মাসিমার বকুনি খাওয়ার পর বড়মামা আর মেজোমামাকে ফাইন দেখায়। দুজনেই একটু কুঁজো আর ঢিলঢ়িলে মতো হয় যান। সেইভাবেই দুজনে ভেতর বাড়ির দিকে চললেন। পেছনে মাসিমা। মাসিমা শাড়ির আঁচলটাকে কোমরে জড়িয়ে নিয়েছেন। দেখতে তো খুবই সুন্দরী। যেন ঝাঁসির। রানি। মাসিমার পেছনে আমরা। শরৎবাবু আমার পাশে। ধীরে-ধীরে কথা বলেন। ভালোমানুষের মতো। আপনমনেই বলতে লাগলেন, ‘যখন এলুম তখন কী আনন্দের সংসার, একটুখানির মধ্যে সব কেমন বদলে গেল। নিশ্চয় সাঙ্তিক কিছু হয়েছে, তা না হলে এমন কেন করবে! কার্য ছাড়া কি কারণ হয়! না, কথাটা মনে হয় ঠিক হল না।’

শরৎবাবু ঝপ করে থেমে পড়লেন। খপ করে আমার হাত চেপে ধরলেন, ‘তোমার নামটা যেন কী ভাই?’

‘আজ্ঞে, আমার ডাকনাম বুড়ো, আর ভালো নাম হল প্রদ্যুম্ন।’

‘ইশ! সর্বনাশ হয়ে গেল। দুটো নামই পালটানো দরকার। কে রেখেছিলেন জানি না। যিনিই রাখুন, তোমার কেরিয়ারটা যে ড্যামেজ করে দেবে ভাই। বুড়ো হল নেগেটিভ নাম। তোমার স্পিরিটের গানপাউডার ড্যাম্প করে দেবে। আর প্রদ্যুম্ন ভাব তো, ইংরেজিতে লিখতে গেলে তোমার কলম দুমড়ে যাবে। আবার ভাবো তুমি বড় হয়েছ। তোমার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কেউ তোমাকে ডাকছে, প্রদ্যুম্নবাবু বাড়ি আছেন? বাড়ি আছেন প্রদ্যুম্নবাবু? উঃ ভাবা যায় না। একটা নামে এতগুলো যুক্তাক্ষর। তারপর ধরো, এই নামটাকে তো শর্ট করা যাবে না। প্রদ্যুম্নকে তুমি কীভাবে ছোট করবে? প্রদু? দ্যুম্ন? আমি তোমার একটা ভালো নাম রাখব। বেশ কাব্যিক। ইচ্ছেমতো ছোট করা যাবে। বড় করা যাবে। ইংরেজি, বাংলা দুটো ভাষাতেই সহজে লেখা যাবে। সে আমি পরে বইটই দেখে তোমাকে ঠিক করে দেব। না, না, বাজে কথা নয়, আমার কথার। ভীষণ দাম। আমার জীবনই আমার বাণী। নানা, এটাও মনে হয় উলটে গেল। এই কথাটা হবে —আমার বাণীই আমার জীবন। সন্দেহ হচ্ছে, ভীষণ সন্দেহ। এই প্রসঙ্গে এই কোটেশনটা যায় কি? আমার কী জানো, কথায়-কথায় কোটেশন। তোমাকেও বলে রাখি, কথায়-কথায় কোটেশন। দেবে। কেন বলো তো? লোকে তোমাকে জ্ঞানী ভাববে, গুণী ভাববে, পণ্ডিত ভাববে। এই শিক্ষাটা আমাকে কে দিয়েছিলেন বলো তো। জানো না! হা হতোস্মি! মামাদের কাছে আমার জীবনী শোনোনি? আমার সম্পর্কে ঘরে-ঘরে আলোচনা হয়। তোমাদের ঘরে হয় না বুঝি? আরে, সেদিন তো আমাকে নিয়ে কোন এক ইউনিভার্সিটিতে একটা সেমিনার হয়ে গেল। কোথায় যেন। পড়লুম। কোথায় যেন পড়লুম। কোথায় পড়লুম বলো তো! কোথায় ছাপা হয় এইসব সংবাদ।। দৈনিকে? সাপ্তাহিকে? পাক্ষিকে? আচ্ছা, এটাও তোমাকে আমি পরে বলে দেব। কৌতূহলটা ধরে রাখো। বলে না, সেই বলে না, যাঃ, ভুলে গেলুম। কী বলে বলো তো। আ-আ, মনে পড়েছে। সবুরে মেওয়া ফলে। কোটেশনটা ঠিক হয়নি। কথায়-কথায় কোটেশন। কিন্তু ঠিক জায়গায় ঠিক জিনিস লাগল কি না, রামে আর রামছাগলে হয়ে গেল। এইটা ঠিক লেগে গেছে। যাকে বলে। একেবারে ঘাটে-ঘাটে। এটাকে তুমি আর কাটতে পারবে না। আর তুমি কাটার কে? আমার হাঁটুর বয়সি। বলে কি না, আমার কোটেশন কাটবে?’

আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেলুম। ভয়েভয়ে বললুম, ‘কই, আমি তো কিছু বলিনি!’

‘বলিনি মানে? বলবে তো! তোমার এইটুকু ভদ্রতা নেই। তুমি জানো না, কথার পিঠে কথা বলতে হয়। প্রশ্ন করতে হয়। ভালো লাগলে, বাহবা দিতে হয়। তা না হলে, বক্তাকে উপেক্ষা করা হয়। তুমি আমাকে উপেক্ষা করছ। ছিঃ ছিঃ, তুমি না বিমলের ভাগনে। হবেই তো, হবেই তো। তোমরা হলে একালের ছেলে। তোমাদের কাছে মুড়ি-মিছরির এক দর। বলল, এটাও হয়নি। বলে ফেলো, বলে ফেলো।’

‘আজ্ঞে না, আপনার সব কোটেশনই ঠিক।’

‘আজ্ঞে না মানে? এটা তো হবে আজ্ঞে হ্যাঁ।’

‘তা কী করে হবে। হ্যাঁ বললে তো সমর্থন করা হল।‘

‘দাঁড়াও, দাঁড়াও, জিনিসটা আমি তলিয়ে দেখি। অত সহজ নয়। সব কিছুর একটা মেথড আছে। কী প্রসঙ্গে, কী কথা এল!’

আচ্ছা প্যাঁচে পড়ে গেলুম তো! মুকুন্দটা মহা শয়তান। কেমন আমাকে ফেলে রেখে সুট করে পালিয়ে গেল। মামাদের তাড়া করে মাসিমা সেই যে ভেতরে চলে গেলেন, আর দেখা নেই। শরৎবাবু বলতে লাগলেন, ‘আমি বললুম, কী বললুম?’

প্রাণে বাঁচার জন্যে স্মরণ করিয়ে দিলুম। শরৎবাবু মনে-মনে বিড়বিড় করলেন। ঘাড় নাড়লেন। তারপর দু’হাতে তালি মেরে বললেন, ‘হ্যাঁ ঠিক। না-ই হবে। কারণ আমি বলেছিলুম, বলো, এটাও হয়নি। তুমি যদি হ্যাঁ বলতে তা হলে তো হ্যাঁ-ই হত। তাই না! সব কিছু বুঝে নিয়ে নিঃসন্দেহ হওয়াই উচিত, তাতে দু-দণ্ড দেরি হয়, হোক। এ তো আর আমরা ট্রেন ধরতে ছুটছি না! অত তাড়া কীসের! সবসময় জানবে, ওয়ারি, হারি অ্যান্ড কারি—এই তিনটে হল গিয়ে আলসারের কারণ। সবসময়ে ধীরে-ধীরে চিবিয়ে-চিবিয়ে, বসে-বসে খাবে।’

‘আজ্ঞে।’

‘হঠাৎ খাওয়ার কথা এল কেন?’

‘তা তো জানি না। আপনি বললেন, তাই বললেন?’

এইবার আমি বেঁচে গেলুম। মাসিমা দূর থেকে ডাকলেন, ‘তোমাকে আবার কী রোগে ধরল?’

বলতে পারলুম না, শরৎবাবু ধরেছেন।

মাসিমা আবার চিৎকার করলেন, ‘শরৎদা, কী হল আপনার? শরৎবাবু মাসিমাকে উত্তর না দিয়ে আমাকে প্রশ্ন করলেন, ‘আমরা এখানে দাঁড়িয়ে কেন?’

‘ওই যে আপনি নানারকম কথা বলছিলেন।’

‘হ্যাঁ বলছিলুম। কথা তো বলারই জন্যে। তাতে কী এমন অপরাধ হয়েছে যে তুমি আমার নামে কমপ্লেন করছ।’

আমি এতক্ষণে ভদ্রলোককে মোটামুটি বুঝে গেছি। বেশ একটু অপ্রকৃতিস্থ। বড়মামা বলছিলেন, ‘শরৎবাবু বেশ বড় ঘরের ছেলে ছিলেন। তারপর যা হয়। নিজে একজন গ্রন্থকীট। লেখাপড়ায় সাঙ্ঘাতিক ভালো ছিলেন। স্কুলের ফার্স্ট বয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। কলেজে পড়ার সময় মাথার সামান্য গোলমাল হয়। সেই সময় আত্মীয়রা বিষয়সম্পত্তি মেরে পথে বসিয়ে দিয়েছিল। শরৎবাবুর বড় বোন সন্ন্যাসিনী। তিনিই ভাইকে সুস্থ করেন, মানুষ করেন। চাকরি করে দেন। এখন শরৎবাবুর কেউ কোথাও নেই। শরৎবাবুর পিসিমা মারা যাবার আগে ছোট একটা বাড়ি দান করে গেছেন। চাকরিও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।’

‘যাই’ বলে আমি দৌড়োতে শুরু করলুম। এ ছাড়া শরৎবাবুর হাত থেকে বাঁচার রাস্তা ছিল না।

খাবার ঘরে এলাহি আয়োজন। বড়মামা, মেজোমামা বসে পড়েছেন। উলটো দিকে শরৎবাবুর স্থান। তার পাশে আমি। শরৎবাবু মনে হয় হাসছেন। তিনি কখনও কবি। কখনও বোটানিস্ট, অ্যানথ্রোপলজিস্ট। কখন যে কী! তিনি পক্ষীতত্ববিদ হয়ে প্রবেশ করলেন। হাতে একটা বড় পালক। কোথায় খেতে বসবেন, না পালকটা তুলে সকলকে দেখাচ্ছেন আর বলছেন, ‘এই পালকটা কোন পাখির তা আমি বলতে পারব না, তবে অবশ্যই কোনও বড় পাখির। বড় পাখির মধ্যে কী কী আছে—উটপাখি, ধনেশ পাখি।’ মাসিমা ছোঁ মেরে পালকটা হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বললেন, ‘এটা কাকের পালক। যান, হাত ধুয়ে খেতে বসুন।’

শরৎবাবু বেসিনে হাত ধুতে ধুতে বললেন, ‘ঠিক কাক নয়, দাঁড়কাক। জ্যাক ড।’

‘আচ্ছা, দাঁড়কাক, এখন আপনি দয়া করে বসে যান।’

মুকুন্দ পনপন করে লাড়ুর মতো চারপাশে ঘুরছে। এটা ঠিক, মাসিমার হাতের মতো রান্না হয় না। মুকুন্দর মতো পরিবেশন। শরৎবাবু প্রথমে একটুকরো লেবু নুন মাখিয়ে চুষলেন। চুষেই টকটাক-টকটাক বিকট শব্দ। সকলেই চমকে উঠলেন। শরৎবাবুর সেদিকে কোনও খেয়াল নেই। চোখ বড় বড় করে বললেন, ‘বাপস, টক বটে।’

মাসিমা বললেন, ‘শুধু শুধু লেবু খাচ্ছেন কেন?’

‘আপ রুচি খানা, পর রুচি পরনা।’ বলেই আমার দিকে তাকিয়ে চোখ মটকে বললেন, ‘লক্ষ করলে, কোটেশনটা কীরকম কটাস করে লাগিয়ে দিলুম। এইসব লক্ষ করবে। অ্যাপ্রিসিয়েট করবে। ভালো গান শুনতে শুনতে মানুষ যেমন ওয়া ওয়া করে সেইরকম করবে। লেবু কেন। খেলুম বলো তো! অ্যাসিড সাইট্রিক। এই অ্যাসিড দিয়ে পেটে একটা বাতাবরণ তৈরি করলুম। শব্দটা লক্ষ করো, বাতাবরণ। মানে ক্লাইমেট। বাংলা শব্দ কীভাবে ব্যবহার করতে হয় শেখো শেখো। শুধু হনুমানের মতো হাঁউ-হাঁউ করে খেলেই হবে? বাড়ি করতে গেলে সবার আগে যেমন একটা ফাউন্ডেশান করতে হয়, সেইরকম এই লেবু হল খাওয়ার ফাউন্ডেশান। এইবার যা কিছু পেটে ঢুকবে এই অ্যাসিড একেবারে ক্ষুধার্ত বাঘের মতো অ্যাটাক করবে। পেটের ভেতর চালু হয়ে যাবে একটা কেমিকেল ফ্যাকট্রি। সমস্ত খাদ্যকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে একেবারে পালপ করে ফেলবে। এর ইংরেজি নাম হল কাইল।’

শরৎবাবু বড়মামার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ডাক্তার, তুমি এইসব জানো? জানো তো ছেলেটাকে শেখাও না কেন? পৃথিবীটা হল জ্ঞানের পৃথিবী। তোমাদের বাড়িটাকে কীরকম করে রেখেছ জানো, নলেজ, নলেজ, এভরি হোয়্যার নট এ ড্রপ টু ড্রিংক। মেজোবাবু কোটেশনটা কি চেনা-চেনা মনে হল? একটা শব্দ কেবল বদলে দিয়েছি। তুমি সাহিত্যের লোক হয়ে চিনতে পারছ না! আশ্চর্য!’

মেজোমামা বললেন, ‘পারব না কেন? ওয়াটার ওয়াটার এভরি হোয়্যার। ওয়াটারের জায়গায় নলেজ।

‘ওয়া ওয়া! তা কার লেখা?

‘কোলরিজ।’

‘ওয়া ওয়া। এই হল নিয়ম। খাওয়ার টেবিলটাকে জ্ঞানের টেবিল করে তুলতে হয়। দেহের আহার আর মনের আহার অ্যাট এ টাইম। দেহও খাচ্ছে আর মনও খাচ্ছে। কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড, হ্যারো আর ইটনে এই জিনিস হয়। ডিনরা সব ডিনার টেবিলে বসে এইরকম জ্ঞানের আলোচনা করতে করতে কী যে করে ফেলেন না! বড় বড় থিসিসের আইডিয়া বেরিয়ে আসে। এই যেমন ধরো, করলা। এই যে সরষে বাটা দিয়ে করলা হয়েছে। গুড আইটেম। খেলেই খাওয়া। এর। মধ্যে জ্ঞান আর নলেজটা কী আছে? ভীষণ জ্ঞান আছে। করলা কেন তেতো! তিক্ত কেন করলা!’

শরৎবাবু একটা করলার টুকরো মুখে পুরে কৌতূহলী হয়ে সকলের মুখের দিকে তাকাতে লাগলেন।

মেজোমামা বললেন, ‘এটা আপনার গিয়ে কেমিস্ট্রি ঘেঁষা প্রশ্ন। এর উত্তর আমার জানা নেই।’

শরৎবাবু আর একটা করলা মুখে পুরে বললেন, ‘এইটাই হল আমার জীবনের ট্র্যাজেডি। সারাজীবন আমি প্রশ্ন করে গেলুম, একের পর এক। কদাচিৎ একটা-দুটোর উত্তর পেলুম। বাকি সব নিজের উত্তর নিজেকেই খুঁজে বের করতে হয়েছে। তোমরা মোটেই অনুসন্ধিৎসুনও। দিনের পর দিন করলা খাচ্ছ, অথচ একবারও তোমাদের মনে প্রশ্ন এল না! আশ্চর্য! অত্যাশ্চর্য!’

মেজোমামা বললেন, ‘জানা থাকলে, অনুগ্রহ করে বলে দিয়ে পরিস্থিতিটা একটু শান্ত করুন না।’

‘প্রশ্নটা আমার মগজেও আজই এল। সবসময় সব প্রশ্ন তো মাথায় আসে না। প্রশ্ন হল অর্কিডের ফুলের মতো। কোনও কোনও অর্কিডে ষাট বছরে একবারই হয়তো ফুল ফুটল। আমার মনে হয়। উচ্ছে আর করলা হল মাছের পিত্ত, কি মানুষের গলব্লাডারের মতো ফলরূপী পিত্তথলি। এর। ভেতর একটা বিটার প্রিন্সিপল আছে। যেমন আছে হপস গাছে। উত্তরটা ঠিক মনের মতো হল না; তবে একেবারে না হওয়ার চেয়ে তো ভালো।’

মাসিমা শরৎবাবুকে থামাবার জন্যে বললেন, ‘আমাদের শাস্ত্রে আছে খেতে বসে যত কম কথা বলবেন ততই ভালো।’

‘ওটা তোমার বোন, দিশি শাস্ত্র। বিদেশে অচল। বিদেশে লাঞ্চ আর ডিনার হল, খাও, গল্প করো, আলাপ-আলোচনা করো। সেদেশের নিয়ম হল, লিভ টুইট, নট ইট টু লিভ। না দাঁড়াও, গুলিয়ে গেছে। এই ধরনের কোটেশন ভীষণ ডেঞ্জারাস। মানে বাংলাটা হল, বাঁচার জন্যে খাও, খাওয়ার জন্যে বেঁচো না। এইবার ধরে-ধরে ইংরেজিটা করি—ইট টু লিভ, নট লিভ টু ইট। অ্যাাঁ, এইবার হয়েছে। ইংরেজি অনুবাদ হল ইলেকট্রিক্যাল ওয়্যারিং-এর মতো। এক লাইন থেকে আর-এক। লাইনে ধরে-ধরে এগোতে হয়।’

শরৎবাবু কথা বললেও আমরা চুপচাপ খেয়ে চলেছি। মাসিমা আজ মোট ষোলো রকম রান্না করেছেন। আর-একটু সময় পেলে বিশ-তিরিশরকম তো হতই।

বড়মামা বললেন, ‘এত সব খাওয়ার আয়োজন; কিন্তু অপরাধীর মন নিয়ে কি খাওয়া যায়! এ মনে হচ্ছে ডেডবডি ট্রাঙ্কে ভরে রেখে আমরা খেতে বসেছি। এ মনে হচ্ছে, সাইকেলের কবরে বসে খুনির খানাপিনা।’

শরৎবাবু ‘ওয়া ওয়া’ করে বললেন, ‘অসসাধারণ একটা কবিতার লাইন। শুধু সাইকেল শব্দটা হাটাতে হবে। লাইনটা হবে, গতির কবরে বসে খুনিদের খানাপিনা। কলিজার করমচা খুন পল কাটা গেলাসে গেলাসে।/জীবন যদিও এক তিক্ত করলা /বসে আছি মুখোমুখি তড়িৎ প্রবাহ ধরে।’

শরৎবাবু মাছের মুড়ো ফেলে উঠে দাঁড়ালেন।

মাসিমা বললেন, ‘কী হল?’

শরৎবাবু বললেন, ‘আর কী হল! এসে গেল। কবিতার লাইন জগতের ওপার থেকে ভেসে আসে ইথার তরঙ্গে। ওই মহাসিন্ধুর ওপার থেকে কী সঙ্গীত ভেসে আসে।’

‘আসুক না, আপনি খেয়ে নিন।’

‘পাগল হয়েছ! ভেসে বেরিয়ে যাবার আগে আমার রিসিভারে ধরে রাখতে হবে। আমার ডায়েরি, আমার কলম।’

‘আপনি খান, আমি লিখে রাখছি।’

শরৎবাবু শান্ত হয়ে বসলেন। মাসিমা একটা সন্দেশের কৌটোতে ফেল্টপেন দিয়ে লিখতে বসলেন। ফ্রিজের মাথাটা হয়েছে টেবিল।

মাসিমা বললেন, ‘বলুন।’

‘খুনিদের কবরে বসে। না, কীসের যেন কবর বললে?’

আমি বললুম, ‘আমার পুরোটা মনে আছে। বলব? গতির কবরে বসে খুনিদের খানাপিনা। কলিজার করমচা-খুন পল-কাটা গেলাসে গেলাসে। জীবন যদিও এক তিক্ত করলা। বসে আছি। মুখোমুখি তড়িৎ-প্রবাহ ধরে।’

‘ওয়া ওয়া’। শরৎবাবু সব ভুলে, তাঁর ঝালঝোল মাখা ডান হাত দিয়ে আমার পিঠটা বার কয়েক চাপড়ে দিলেন।

মাসিমা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘বুড়ো, যাও, উঠে গিয়ে জামাকাপড় ছেড়ে আগে চান করে এসো।’

৪.

শরৎবাবু এত খেলেন যে, শেষ পর্যন্ত মুকুন্দর সাহায্য নিয়ে তাঁকে খাওয়ার টেবিল থেকে উঠতে হল। তিন-চারটে বিশাল ঢেকুর তুললেন। মাসিমাকে বললেন, ‘তোমার উচিত ছিল আমাকে এক সময় থামিয়ে দেওয়া। তুমি জানো না, দুটো জিনিসে আমার জ্ঞান থাকে না। এক রেগে গেলে, আর খেতে বসলে। এত চাপ খাওয়া আমার উচিত নয়। হার্টের তো আর তেমন জোর নেই। এর মধ্যে দুবার ধাক্কা খেয়েছে। এখন গুড আর ব্যাড, কিছু একটা হয়ে গেলে আমার আর কী, তোমরাই বিপদে পড়ে যাবে।’

আমি আর মুকুন্দ শরৎবাবুকে ধরে ধরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলুম। শুয়ে পড়ে বললেন, ‘আমার আবার অজগরের স্বভাব। পেটে চাপ পড়লেই ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসে। শোনো, তোমার মাসিকে বোলো, ওই যে ওই বিশকোর্মা, ওইটা এক বাটি সরিয়ে রাখতে। যদি মরে না যাই রাতে আবার মুখোমুখি হব। মরতে আমি ভয় পাই না। জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য চিত্ত ভাবনাহীন, শত মাংস, শত মৎস্য আসিবে আসুক।’

ঘাঁড়াক করে একটা শব্দ হল। শরৎবাবুর নাক গর্জন করতে লাগল কামানের মতো।

মুকুন্দ বললে, ‘বেশ মজার মানুষ, তাই না? এইরকম দু-তিনজন বাড়িতে থাকলে ড্রামা একেবারে জমে যাবে।’

‘তোমার আর কী বলল, আমাকে যা ধরেছিলেন না! সেই বাগান থেকে খাবার টেবিল পর্যন্ত। বাব্বা, এ যেন ছেলে ঘুমোল, পাড়া জুড়োল।’

বসবার ঘরে বড়মামা আর মেজোমামা বসে আছেন, দুটো ডেক-চেয়ারে। মাসিমা এইমাত্র এলেন। মুকুন্দ বসে আছে এক পাশে। মুকুন্দ বললে, ‘এটাকে চুরি বলে না বড়দা, একে বলে বদলাবদলি।’

বড়মামা বললেন, ‘চুপ কর। তোর, তোর, তোর…।’

মেজোমামা শেষ করে দিলেন, ‘কথা বলার কোনও অধিকার নেই।’

বড়মামা বললেন, ‘না, না, আমি ও কথা বলতে চাইনি। আমি বলতে চেয়েছিলুম, তোর জন্যে আজ আমার এই অবস্থা। অমন কিশমিশ-টিসমিস দেওয়া ছানার কালিয়া, মনে হল ঘুটের কালিয়া খাচ্ছি।’

মেজোমামার অভিমান হল। বললেন, ‘এবার থেকে নিজের কথা নিজেই শেষ কোরো। আটকে গেলে আমি আর সাহায্য করব না। অধিকার নেই বললে এক কথায় মিটে যায়। অত কথা এই বিপদের সময় বলার দরকার কী?’

মাসিমা বেশ আয়েশ করে বসে বললেন, ‘আচ্ছা, ব্যাপারটা আমাকে খুলে বলো তো। তখন থেকে চলেছে।’

মুকুন্দ এগিয়ে এল, ‘আমি আপনাকে ছবি এঁকে বুঝিয়ে দিচ্ছি।’

মাসিমা বললেন, ‘সে আবার কী, এ তোমার বাড়ির প্ল্যান না জ্যামিতি, যে ছবি আঁকতে হবে।’

মেজোমামা বললেন, ‘ওকে আজ ছবি-ভূতে ধরেছে। আসলে কেসটা হল কীরকম জানিস, বদলাবদলি চুরি। অর্থাৎ পালটিঘরে চুরি। মানে, আমরা পার্থর সাইকেল চুরি করেছি, পার্থ আমাদের সাইকেল চুরি করেছে।’

বড়মামা বললেন, ‘যাঃ, কী যা-তা বলছিস! কোনও একটা জিনিস ভালোভাবে বুঝিয়ে বলতে পারিস না, প্রোফেসর হয়েছিস!’

পাশের টেবিলের ওপর থেকে খপ করে পাইপটা তুলে নিয়ে মেজোমামা উঠে দাঁড়ালেন।

বড়মামা বললেন, ‘কী হল? তোর আবার কী হল!’

‘কথায় কথায় তোমার অপমান আমার আর সহ্য হয় না। তোমার সমস্যা তুমি সামলাও। আমারই ভুল হয়েছে তোমার ব্যাপারে নাক গলাতে যাওয়া।’

বড়মামা বললেন, ‘আমিও লক্ষ করছি, আজকাল আমার কোনও কথাই যেন তোমাদের সহ্য হচ্ছে না। যা বলছি তাইতেই গায়ে সব বড় বড় ফোসকা পড়ে যাচ্ছে। ঠিক আছে, আমিও তা হলে চলে যাই। যা হয় হবে। আমার কী। চিরকাল শুনে এলুম, ডিভাইডেড উই ফল, ইউনাইটেড উই স্ট্যান্ড।’

ইশ, বড়মামার গায়েও শরৎবাবুর বাতাস লেগেছে। কোটেশন উলটে যাচ্ছে।

মাসিমা বললেন, ‘তোমরা দুজনে যদি সাপে-নেউলে হও, তাহলে এইবার কিন্তু আমাকে লাঠিই ধরতে হবে। লাঠিই হল তোমাদের ঠান্ডা রাখার ওষুধ। বয়েস-টয়েস আমি আর মানব না। চুপ করে দুজনে বোসো। সমাধান যদি চাও কেসটা আমাকে খুলে বলো।

মেজোমামা বসলেন। বড়মামা বললেন, ‘পরে তোর প্রেশারটা আমি একবার চেক করব।’

মেজোমামা বললেন, ‘বুঝতে পেরেছি আমার বিবৃতিতে ভুলটা কোথায় হচ্ছিল। আমার প্রেশার নয়, আমার অহঙ্কারটা মাপার দরকার হয়েছে। আমি আবার শুরু থেকে শুরু করি। আমরা পার্থর সাইকেলটা চুরি করেছি আর পার্থ আমাদের সাইকেলটা চুরি হওয়ায় সাহায্য করেছে।’

বড়মামা বললেন, ‘দ্যাটস রাইট। এইবার বিবৃতিটা ঠিক হল।’

মুকুন্দ বললে, ‘আমি একটু বলি, কারণ এটা আমার কেস।’

মাসিমা বললেন, ‘বলো।’

‘এটা চুরি নয়, ভুল। আসলে আমাদের সাইকেলটাই চুরি হয়েছে কিন্তু মনে হচ্ছে চুরি গেছে জজসায়েবের সাইকেল।’

‘সে আবার কী! গোয়ালের পাশে যে সাইকেলটি চট চাপা দিয়ে এলুম, সেটা তা হলে কার সাইকেল?’

‘ওইটাই তো জজসায়েবের সাইকেল।

‘কে এনেছে?

‘আমি এনেছি।’

‘না বলে?’

‘হ্যাঁ, না বলে।’

‘তা হলে! শোনোনি তুমি! না বলিয়া পরের দ্রব্য গ্রহণ করাকে চুরি বলে।

‘আমি তো চুরি করব বলে চুরি করিনি। চুরির মতো দেখাচ্ছে।’

‘উঃ, বাব্বা রে! কী পাল্লায় পড়েছি রে!’

‘আপনি পুরোটা না শুনলে তো বারেবারেই মনে হবে। আমি জজসায়েবের বাড়ির রকে জজসায়েবের সাইকেলের পাশে আমাদের সাইকেলটা রেখে ভেতরে গেলুম। তা হলে বাইরে পাশাপাশি রইল দুটো সাইকেল। কেমন? এইবার কী হল, সার্টিফিকেট নিয়ে আমি বাইরে এলুম। দেখলুম রয়েছে একটা সাইকেল। আমি সাইকেল চেপে চলে এলুম। গোয়ালের বাইরে সাইকেল রেখে লেগে গেলুম কাজে। তা হলে ব্যাপারটা কী হল? চুরি হল কি?’

মাসিমা বললেন, ‘ঘোড়ার ডিম হল। এই নিয়ে এত কান্ড। আসলে কোনও সাইকেলই চুরি হয়নি। বদলাবদলি হয়েছে। গিয়ে দেখে এসো, তোমাদের ঝরঝরে সাইকেল আবার ফিরে এসেছে যথাস্থানে।’

বড়মামা বললেন, ‘তা হলে ওরা থানায় রিপোর্ট করল কেন?

করবে না! ওদের সাইকেলটা তো নেই।’

‘তা অবশ্য ঠিক। এখন তা হলে কী হবে?

‘সোজা ব্যাপার। এই সাইকেলটা চেপে তোমরা কেউ যাও, এটা ফেরত দিয়ে ওইটা চেপে ফিরে

এসো।’

‘কে যাবে, মুকুন্দ?

‘না, তোমরা কেউ যাও।’

মেজোমামা বললেন, ‘আমিই তা হলে যাই?’

‘মেজোমামা আমাকে বললেন, ‘যাবে নাকি?’

আমরা দুজনে বেরিয়ে পড়লুম। বাগান থেকে জানলা দিয়ে দেখতে পেলুম, শরৎবাবু কুম্ভকর্ণের মতো চিত হয়ে শুয়ে আছেন। নাক ডাকছে তুমুল শব্দে।

মেজোমামা বললেন, ‘উঃ, মানুষের কী কষ্ট! কোথায় যেন যাবার কথা ছিল, কী হল?’

‘উনি তো সবই ভুলে যান, তা ছাড়া বলছিলেন খাওয়ার পর অজগর হয়ে যান। ছেড়ে দিন

আপনি।

মেজোমামা সাইকেলে উঠে একটু লগবগ করলেন। তারপর রাস্তার একপাশে কাঁচা নর্দমার ধারে কাত হয়ে গেলেন। ভাগ্য ভালো, লম্বা মানুষ, তাই মাটিতে পা ঠেকিয়ে কোনওরকমে সামলে নিলেন। সেই কাত-অবস্থাতেই বললেন, ‘ম্যাগনেট যেমন লোহাকে টানে, সেইরকম নর্দমা টানে সাইকেলকে। দাঁড়াও আবার একবার গোড়া থেকে শুধু করি।’

মেজোমামা অনেক কায়দায় সাইকেল থেকে নামলেন। নামতে গিয়ে অমন সাধের পাইপটা বুকপকেট থেকে ছিটকে পড়ে গেল নর্দমায়। রাগে মেজোমামার মুখটা লাল হয়ে গেল—উনুনের নিবে-আসা আগুনের মতো। ভড়ভড়ে নর্দমায় রুপোর ঠোঁটওয়ালা পাইপটা ভেসে রইল।।

মেজোমামা বললেন, ‘কত বড় ক্ষতিটা হয়ে গেল একবার দেখলে? এই সাইকেলটা হল অপয়া। সাইকেল। সেই সকাল থেকে জ্বালিয়ে মারছে।’

‘মেজোমামা, আপনার যাওয়াটা মনে হয় ঠিক হবে না। বাধা পড়ে গেছে।’

‘সেটা অবশ্য ঠিকই বলেছ তুমি। তা না হলে আমার মতো পাকা সাইক্লিস্টের এই অবস্থা হবে কেন? চলো, ফিরেই যাই।’

মেজোমামার কথা শেষ হয়েছে কি হয়নি, হুশ করে একটা মোটরগাড়ি এসে গেল। গাড়িটা আমাদের থেকে কিছু দূর গিয়েই ঝপ করে থেমে গেল। গাড়ির পেছনের জানলা দিয়ে একটা মুখ বেরিয়ে এল। জাস্টিস পার্থ ব্যানার্জি। পার্থ ব্যানার্জি বললেন, ‘আরে কী ব্যাপার! চলেছ কোথায়? আমি তো তোমাদের বাড়ি যাচ্ছি বড়দার কাছে ক্ষমা চাইতে। ছিঃ ছিঃ, কী জঘন্য কাণ্ডটাই না ঘটে গেল।’

মেজোমামা বললেন, ‘আরে, আমি তো যাচ্ছি তোমাদের বাড়িতে! কী বিশ্রী কাণ্ড ভাই। আমাদের মুকুন্দ ভুল করে তোমার সাইকেলটা নিয়ে এসেছিল। আমাদের সাইকেল আর তোমাদের সাইকেল পাশাপাশি ছিল। খেয়াল করেনি। বয়েস কম তো আর সবসময় তড়বড় করে।’

‘আমার সাইকেল? আমার সাইকেল তো আমি পেয়ে গেছি।’

‘পেয়ে গেছ মানে? কোথা থেকে পেলে? ওটা তা হলে আমাদের সাইকেল?’

‘তোমাদের সাইকেল কী করে হবে? থানা থেকে উদ্ধার করে দিয়ে গেছে।’

‘এটা তা হলে কার সাইকেল?’

‘তা তো জানি না ভাই।’

মেজোমামা সাইকেলটার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তাজ্জব ব্যাপার। এটা তা হলে সাইকেলের ভূত। তাই বলি, আমার মতো পাকা লোককে নর্দমায় ফেলার তাল করেছিল।’

জজসায়েব মুখটাকে গাড়ির ভেতর টেনে নিতে নিতে বললেন, ‘চলে এসো। আমি বাড়িতে যাচ্ছি।’

মেজোমামা আমাকে বললেন, ‘বুঝলে কিছু। সাইকেল রহস্য। লিখতে জানলে, একটা উপন্যাস লিখে ফেলতুম। যেখানে বড়দা, সেইখানেই যত গোলমাল। বড়দার একটা ব্যাপারও সহজ নয়। তা না হলে কেউ বাজার করতে গিয়ে কীর্তন গাইতে গাইতে ফিরে আসে!’

মেজোমামা পাইপ খুইয়ে, ভৌতিক সাইকেল নিয়ে, আমাকে নিয়ে ফিরে এলেন। জজসায়েবের ঝকঝকে সাদা গাড়ি আমাদের বাড়ির হাতায় গরম হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ড্রাইভারের কী। পোশাক! জজসায়েবের গাড়ির চালক। সাদা পোশাক, সোনালি কলার। মেজোমামা সাইকেলটাকে আবার বেড়ার গায়ে হেলিয়ে রাখলেন। রেখেই একটা লাথি মারলেন। মেজোমামার এই এক দোষ! মারার আগে চিন্তাও করলেন না, কাকে মারছেন! সাইকেল তো আর নরম মানুষ নয়। লোহার তৈরি কঠিন বস্তু। পায়ে লেগেছে। মেজোমামা দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, ‘জানোয়ার! যেমন দেখতে তার সেইরকম ব্যবহার।’

মেজোমামা অল্প একটু খোঁড়াতে খোঁড়াতে বাড়ির ভেতরে ঢুকলেন। ঘর আলো করে বসে। আছেন আমাদের জজসায়েব। উলটো দিকে বড়মামা। আমরা ঢুকতে ঢুকতে শুনলুম বড়মামা বলছেন, ‘থাক, সাইকেলটা তা হলে পেয়ে গেলে! পাবেই তো। তুমি জজসায়েব, তোমার সাইকেল সহজে হজম করা শক্ত। যাক, আমার একটা দুশ্চিন্তা কেটে গেল। তোমরা বলো, পুলিশ চোর ধরতে পারে না, এই তো কেমন ধরে দিলে!’

‘পুলিশ চোর ধরেনি, ধরেছে সাইকেলটা।’

‘তার মানে, সাইকেলটা একা একা ঘুরছিল, আর পেছন দিক থেকে গিয়ে ঘ্যাঁক করে কলার চেপে ধরেছে?’

‘না না, ঠিক নয়। পুলিশ তিরিশ কি চল্লিশটা সাইকেল চোরাই মালের ডিপো থেকে একেবারে লাইন করে নিয়ে এল। বললে বেছে নিন। আমাদের মান্তু একটা বেছে নিল। বাকিগুলো আবার লাইন করে ফিরে গেল।’

‘ফিরে গেল? ইশ, তুমি যদি একবার আমাকে ডাকতে! তা হলে আমার সাইকেলটাও ফিরে পেতুম।’

‘অ, আপনার সাইকেলও গেছে?

‘একটা! তিন-তিনটে সাইকেল আর শ-খানেক ছাতা, পঞ্চাশ জোড়া জুতো, হাজারখানেক রুমাল, একডজন ঘড়ি। সত্তরটা কলম। ছটা সোনার আংটি। দেড়হাজার নস্যির ডিবে। চল্লিশটা থার্মস। ফ্লাক্স। দশ থেকে বারো হাজার নগদ টাকা।’

‘এই লিস্টের মধ্যে বেশিরভাগই হারানো।’

‘আরে আমার হারানো মানেই তো আর-একজনের চুরি।’

‘চুরি নয়, কুড়িয়ে পাওয়া।’

মেজোমামা একপাশে গুম মেরে বসে আছেন। মাঝে-মাঝে পায়ের আঙুল দেখছেন। বেশ। লেগেছে। মুখে সেই বিখ্যাত পাইপ নেই। পাইপ এতক্ষণে নর্দমায় ডুবে গেছে। এর চেয়ে দুঃখের আর কী আছে, পকেটে সদ্য কেনা মোটা এক প্যাকেট টোব্যাকো, অথচ ঠোঁট-কোটাই নেই।

জজসায়েব বললেন, ‘কী হল তোমার? অমন ব্যাজার মুখে বসে আছ?

‘আমার পাইপটা নর্দমায় পড়ে গেছে। আমার দীর্ঘদিনের সঙ্গী। ওই পাইপ তো আর এ-দেশে পাব না!’

‘এই তোমার প্রবলেম। আমি সাবধান করে দিচ্ছি। জজ হবার পর আমার ইচ্ছে হয়েছিল, সিনেমার জজ হব। একটা ড্রেসিংগাউন কিনলুম আর বিদেশ থেকে আনালুম গোটা পঞ্চাশ ভালো-ভালো পাইপ। সবই ডানহিল। তারপর চেয়ারে বসে মাথাটা ঠিক হয়ে গেল। কাহিনিতে আর বাস্তবে অতলান্তিকের ব্যবধান। গাউনটা কেটে ঘরমোছা করা হয়েছে। আর স্ত্রী এসে ধূমপান বন্ধ। আমার সংগ্রহে বহু ভালো ভালো নতুন পাইপ পড়ে আছে। তুমি আমার সঙ্গে চলো, পছন্দ করে নিয়ে আসবে।’

মেজোমামার মুখে হাসি ফুটল। বড়মামা মাঝে-মাঝেই আমাকে বলেন, ‘তোমার পাইপমামার খবর কী! ওর মুখ থেকে পাইপটা খুলে নিলে সব বোলচাল বন্ধ হয়ে যাবে।’

মাসিমা এলেন, পেছনে পেছনে মুকুন্দ। আমাদের জজসায়েবও শরৎবাবুর মতোই ভোজনবিলাসী। একসময় পার্থবাবু আমার মাসিমাকে পড়াতেন। সব বড়-বড় মানুষেরই ছোট ছোট একটা শুরু থাকে। সেই হাফপ্যান্ট পরে স্কুলে যাওয়া। পেটাই হওয়া। নিলডাউন। দু-কান ধরে বেঞ্চের ওপর দাঁড়ানো। অভাব, দুঃখ, কষ্ট, কত কী খেতে ইচ্ছে করে, পয়সা নেই। কত কী পরতে ইচ্ছে করে, পয়সা নেই। তারপর টিউশনি করে পড়ার খরচ তোলা। তারপর মা সরস্বতীর কৃপায় সে-কী পরীক্ষার ফল। ফাস্ট, ফার্স্টক্লাস, গোল্ড মেডেল। ডরু বি সি এস, আই এ এস। জজ, ম্যাজিস্ট্রেট, ব্যারিস্টার। এই জজসায়েব, মেজোমামার মুখে যা শুনেছি, হ্যারিকেনের আলোয় চালাবাড়িতে রাত জেগে লেখাপড়া করেছেন। আর দিনের বেলায় কলেজ করেছেন, ছাত্র পড়িয়েছেন। মাসিমা ছিলেন তাঁর ছাত্রী।

ক্ষীরের লুচি, মালাই চপ, নার্গিসি কোফতা, জল পাকৌড়া—অন্যদিন হলে আমার ভয়ংকর লোভ হত। আজ ভীষণ বেলায় খাওয়া হয়েছে তাই আর রান্নাঘরের দিকে ছুটে যাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে না। জজসায়েবকে মাসিমা কখনও বলছেন মাস্টারমশাই, কখনও বলছেন পার্থদা। জজসায়েব বলে এতটুকু ভয় পাচ্ছেন না। যেমন সবাই বলে, তুমি জজসায়েব কি কমিশনার, সে তুমি তোমার। অফিসে, বাড়িতে তুমি আমাদের ভট্ কী মান্তু, কি পার্থদা!

‘আহা! বেশ হয়েছে, বেশ হয়েছে,’ বলে পার্থবাবু বেশ গপাগপ খেতে লাগলেন। চোখে-মুখে। একটা রেশমকোমল ভাব ফুটে উঠল। আর ঠিক সেই সময় শরৎবাবু এলেন। ঘরের মাঝখানে এসে বিশাল একটা হাই তুলে বললেন, ‘আঃ, যাকে বলে গভীর ঘুম, সেইরকম একটা ঘুমে রুপোর টাকার মতো তলিয়ে ছিলুম। আমার সিস্টেমের একটা মজা আছে, কত পরিশ্রম করলে তবে মানুষের হজম হয়, আর আমার দ্যাখো, এক ঘুম এক হজম। মানে সিরিজটা দ্যাখো, খেলুম, ঘুমোলুম, হজম করলুম। আবার খেলুম।’

চেয়ারে বসতে বসতে প্রশ্ন করলেন, ‘কারও কিছু বলার আছে? আমি জানি আছে। তোমরা প্রশ্ন করবে, তা হলে লেখাপড়াটা কখন হবে? হবে। এরই ফাঁকে ফাঁকে হবে। খাওয়ার পর তোমরা জানো যে, মানুষ ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সেই ক্লান্তি কাটাবার জন্যে নিদ্রা। নিদ্রা থেকে উত্থান এবং আর-একটা আহারের মাঝে যদি সময় থাকে তা হলে একটু লেখা হল, একটু পড়া হল। আসলে আহারের জন্যেই বাঁচা।’

শরৎবাবু একটা হাই তুললেন। সকলের মুখের দিকে এক-একবার তাকালেন একটু বিব্রতভাবে। শেষে প্রশ্ন করলেন, ‘কথাটা কি ঠিক বললুম? আমার আজকাল হয়েছে কী, সব ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে, জানা জিনিসও গুলিয়ে যাচ্ছে। কথাটা কী ভাই, আহারের জন্যে বাঁচা, না বাঁচার জন্যে আহার। সেই যাই হোক, দুটো কথাই এক। এখন আমার প্রশ্ন হল, এই মুহূর্তে কিছু খেতে হবে কি? তা হলে আমি মোটামুটি প্রস্তুত।’

জজসায়েবের খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন শরৎবাবুর দিকে।

বড়মামা পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘ইনি আমার বিদ্যা জীবনের একান্ত সুহৃদ রায়বাহাদুর ঈশ্বর শ্রীজলধর চট্টোপাধ্যায়ের একমাত্র সন্তান লেখক শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।’

শরৎবাবু সঙ্গে-সঙ্গে আপত্তি তুললেন, ‘দুটো কারেকশান। প্রথম নামে। আগে চন্দ্র ছিল, পাছে আর এক বিখ্যাত কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রের সঙ্গে কেউ গুলিয়ে ফেলেন, তাই চন্দ্রটা আমি অফ করে দিয়েছি। এখন সহজ-সরল শ্রীশরৎ চট্টোপাধ্যায়। দ্বিতীয় আমি লেখক নই। আমি কবি। কবি শ্ৰীশরৎ চট্টোপাধ্যায় হল আমার সঠিক পরিচয়। তৃতীয় আমার পরিচয়লিপিতে একটু অসম্পূর্ণতা থেকে গেছে। আমি শুধু কবি নই, আমি শিকারি, আমি পক্ষীতত্ববিদ, আমি নেচারোপ্যাথিস্ট। আরও অনেক পরিচয় আছে আমার। পরে মনে পড়লে বলব। আমি আবার আত্মপ্রচার তেমন পছন্দ করি না, তাই সব কিছু তেমন মনে রাখি না। যেমন এইমাত্র আমার মনে পড়ল দুর্গাপুজো কমিটির আমি পার্মানেন্ট প্রেসিডেন্ট।’

বড়মামা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘এবার আমাকেও স্থানীয় পূজা কমিটির প্রেসিডেন্ট করেছে। আজই চিঠি পেয়েছি সকালে। আচ্ছা, প্রেসিডেন্ট হলে কি নিজের নামে আলাদা করে প্যাড ছাপাতে হবে? তুমি তো শরৎ এইসব ব্যাপারে আমার চেয়েও অভিজ্ঞ।’

‘অভিজ্ঞ তো বটেই। আমাকে ছাড়া কোনও সঙ্, সংগঠন অন্য কাউকে প্রেসিডেন্ট হিসাবে ভাবতেই পারে না। প্যাড তো তোমাকে ছাপাতেই হবে। আমার প্যাডের মাথাটা দেখেছ? তিন থেকে চার ইঞ্চি চওড়া পার্টির মতো পরিচয়-লিপি। চিঠি লেখার মতো সাদা জায়গা খুঁজে বের করতে হয়। উঃ, একটা মানুষের এত পরিচয়ও থাকে। এই দ্যাখোনা, এখন সব মনে পড়ছে একে-একে। জামালপুর হিন্দু সক্কার সমিতির অনারারি প্রেসিডেন্ট। জামালপুর হরিসভার সহ সভাপতি, ঘাস-সংরক্ষণ সমিতির চেয়ারম্যান। বিশ্ববিস্মরণ সংস্থার সদস্য।’

জজসায়েব বললেন, ‘বিস্মরণ সংস্থাটা কী?’

‘সেটা হল গিয়ে বেশ মজার সংস্থা। পৃথিবীতে বহু মানুষ আছে যারা ভুলে যায়। কোনও কিছু মনে রাখতে পারে না। যাকে বলে ফরগেটফুল। এই ছাতা কোথায় রাখছে, এই ব্যাগ কোথায় রাখছে, বাবার নাম ভুলে যাচ্ছে, বাড়ির ঠিকানা ভুলে যাচ্ছে। এমন কত লোক আছে এই বিশাল পৃথিবীতে হারিয়ে বসে আছে, নিজের পরিচয় ভুলে। এদের সাহায্য করাই হল বিশ্ব-বিস্মৃতি সংস্থার কাজ। আমাদের টেলিফোন নম্বর সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়া আছে। আমাদের ফোন করলেই আমরা সঙ্গে সঙ্গে সাহায্য করব। হয়তো ফোন এল, বলতে পারেন, আমার নোট লেখা ডায়েরিটা কোথায় রেখেছি। আমরা বলব, নাম-ঠিকানা বলুন। যে-ই নাম ঠিকানা পেলুম, সঙ্গে সঙ্গে শাঁ-শাঁ করে আমাদের ভলান্টিয়ার পার্টি চলে গেল। তিন মিনিটে বের করে দিয়ে এল। ডায়েরি। একজন বক্তৃতা করছেন। নাম ভুলে গেছেন। থিওরি অব রিলেটিভিটির প্রবক্তার। আমাদের কাছে ফোন এল। আমরা সঙ্গে সঙ্গে বলে দিলুম, বার্ট্রান্ড রাসেল। সঙ্গে সঙ্গে বক্তৃতা চালু হয়ে গেল।’

জজসায়েব বললেন, ‘রাসেল নয়, আইনস্টাইন।’

‘অ, আইনস্টাইন। সে ব্যবস্থাও আমাদের আছে। আমাদের সাহায্যকারীরা যখন কিছু বলে, তখন তার পাশে একজন তার পাশে আর-একজন তার পাশে আরও একজন—পরপর সব লাইন দিয়ে বসে থাকে। এ ভুল করল তো ও সংশোধন করল, ও করল তো সে সংশোধন করল। টু ফরগিভ ইজ হিউম্যান, টু আর ইজ ডিভাইন। না, কথাটা কেমন হল। ঠিক যেন জয়েন্টে জয়েন্টে লাগল না। অ্যাই দেখুন। একে বলে বিস্মরণ। আমাদের সংস্থার কেউ পাশে থাকলে সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে দিত। কোটেশন হল ইলেকট্রিকের লাইন টানার মতো। ঠিক না হলে ধরা যায়। এই। যেমন আমি ধরতে পারছি, ঠিক করতে পারছি না।’

মেজোমামা বললেন, ‘ওটা হবে, টু আর ইজ হিউম্যান, টুফরগিভ ডিভাইন।’

‘অ্যাই, দেখেছ তো, এইবার খাঁজে-খাঁজে মিলে গেল!’

বড়মামা অবাক হয়ে বললেন, ‘এত কথা হল কেন? আমরা কোথা থেকে শুরু করেছিলুম…’

শরৎবাবু বললেন, ‘তা তো জানি না, তবে নিশ্চয় কোনওভাবে শুরু হয়েছিল। কথারও সব রুট থাকে।’

জজসায়েব বললেন, ‘শুরু হয়েছিল প্যাড ছাপা হবে কি না—এই প্রশ্ন নিয়ে।

বড়মামা বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠিক। উত্তরটা কিন্তু পাইনি এখনও।’

শরৎবাবু বললেন, ‘পাবে কী করে? জঙ্গলে যেমন পথ হারিয়ে যায়, কথার জঙ্গলও তো সেই রকম। ওইজন্যে কথা বলার সময় একজন গাইড রাখতে হয়। যে ঠেলে ঠেলে বেলাইন থেকে। লাইনে এনে দেবে। আমার মনে আছে, এক সভায় আমি রবীন্দ্রনাথের ওপর লেকচার দিচ্ছি, রবীন্দ্রনাথের ঋতু, বর্ষার গান, বর্ষাকাল করতে-করতে, আমার ছেলেবেলা, খিচুড়ি শেষে খিচুড়ি কত রকমের আছে, খিচুড়ি কীভাবে রাঁধতে হয়, চাল কতটা, ডাল কতটা, ভুনি খিচুড়ি কাকে বলে। আশ্চর্য, এই, শ্রোতারা যদি একবারও মনে করিয়ে দিত, এটা পঁচিশে বৈশাখ, রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন, রান্নার ক্লাস নয়।’

বড়মামা হেঁকে বললেন,’প্যাড কি ছাপাতে হবে?’

‘কীসের প্যাড?’

‘আমাকে পুজো কমিটির প্রেসিডেন্ট করেছে।’

‘লাইফ প্রেসিডেন্ট?

‘না। এই তো এইবার প্রথম করল।’

‘তা হলে এক কাজ করো, ছাপিয়ে ফ্যালো, পরে পাশে একটা এক্স লিখে দিও। এই বছরটা প্রেসিডেন্ট থাকো, পরের বছর এক্স প্রেসিডেন্ট। ডাক্তারি তো চুটিয়ে করলে এতকাল, এইবার একটু সামাজিক হবার চেষ্টা করো। টাকাপয়সা দিয়েই হোক যেভাবেই হোক, কিছুকিছু সঙ্ঘ। সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে যাও। তোমার তো আটটা কুকুর, আঠারোটা গরু, তিন খাঁচা পাখি, তিরিশটা বেড়াল। এখন ওয়াইল্ড লাইফটা খুব পপুলার হয়েছে। তুমি ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফের সঙ্গে জড়িয়ে যাও। দেখবে, খুব ইজ্জতদার ব্যাপার।’

জজসায়েব উঠে পড়লেন, ‘আমি তা হলে চলি।’

বড়মামা বললেন, ‘চলবে? যাক সাইকেলটা তুমি তা হলে পেয়েই গেলে। ভালোই হল।’

‘আপনার কাছে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। নিজের সাইকেলটা পাঠিয়ে দিয়ে আপনি আমাকে আরও লজ্জিত করতে চাইছিলেন। এ-সবই আমার স্ত্রী-র কীর্তি। জানেন তো, বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়। আমার দেখুন কোনও ডাঁট নেই। আমার স্ত্রী-র সাঙ্ঘাতিক ডাঁট। জজসায়েবের বউ বলে। মাটিতে যেন পা পড়ে না।’

‘ও তুমি ছেড়ে দাও। ও আমার মেয়ের মতো। আর সত্যিই তো, সাইকেলটা তো চুরিই হয়েছিল।

সেই স্বদেশী আমলে এই বাড়িতে একবার ইংরেজ-পুলিশ এসেছিল আর এই একবার দিশি পুলিশ এল। আমাকে তো প্রায় হাতকড়া পরিয়েই ফেলেছিল। ভয়েই মরি। আর সত্যিই তো, সাইকেলটা তো চুরিই হয়েছিল।’

মেজোমামাকে নিয়ে জজসায়েব বেরিয়ে গেলেন।

মুকুন্দ বললে, ‘ব্যাপারটা কী হল?

বড়মামা বললেন, ‘কী আবার হবে, নেহাত খাতির ছিল বলে চুরি করেও রেহাই পেয়ে গেলুম। পুলিশ চাকরি বাঁচাবার জন্যে কার একটা সাইকেল এনে আপনার সাইকেল বলে দিয়ে গেছে। সাইকেল তো আর মানুষ নয়। সব সাইকেলই একরকম দেখতে।’

‘বড়দা, সেই কারণেই তো আমার ভুলটা হল।’

‘যা ব্যাটা খুব বেঁচে গেলি। চোরাইমাল আর বাড়িতে রাখিসনি, রাত হয়ে গেছে, গঙ্গার জলে ফেলে দিয়ে আয়।’

‘হ্যাঁ, ফেলে দিয়ে আসব। ওই তো আপনার জজের বাড়ি। দাওয়া থেকে মাল হাওয়া হয়ে গেল। জজসায়েবও চোরাই সাইকেল চাপবেন, আমরাও চোরাই সাইকেল চাপব। একেই বলে, চোরে চোরে মাসতুতো ভাই।’

শরৎবাবু চটাপট চটাপট হাততালি দিয়ে বললেন, ‘তোফা, তোফা, ঠিক জায়গায় ঠিক কোটেশন। কোটেশন ছাড়া জীবন অচল। আচ্ছা, এখন আমার কথাটা হল, আমি কী করব, আমার তো কোনও কাজ নেই। কেউ কিছু খেতেও দিচ্ছে না। আমি কি তা হলে আবার শুয়ে পড়ব?’

মাসিমা বললেন, ‘আপনার এখনও খাওয়ার সময় হয়নি। হলে, আপনাকে খেতে দেব। শুধু এককাপ চা খাবেন।’

‘তোমরা দেখছি আমাকে না খাইয়ে মারবে। যাক গে, হারমোনিয়াম আছে?’

‘হারমোনিয়াম কী করবেন?’

‘বাঃ, এই সন্ধেবেলা তোমাদের একটু উচ্চাঙ্গ ভজন শোনানো আমার কর্তব্য। শুধু খেলুম দেলুম মরে গেলুম—এটা কোনও জীবন হল না রে ভাই। জীবনকে ক্লাসিক্যাল সংগীতের মতো খেলাতে হয়। ক’টা বাজল এখন?

‘ওই তো আপনার সামনেই দেয়াল-ঘড়ি।’

‘সাড়ে ছয়। তার মানে এখন ইমন চলতে পারে। তারপর বেহাগ। বেহাগের পর খাওয়া। কেমন? ভদ্রলোকের চুক্তি।’

মুকুন্দর ভীষণ গানবাজনার শখ। সঙ্গে সঙ্গে হারমোনিয়াম নিয়ে চলে এল। মুকুন্দ আবার তবলা বাজায়। হারমোনিয়ামটি ডিভানে রেখে বলল, ‘তবলাটা নিয়ে আসি?’

‘তবলা? তুমি তবলা জানো? উত্তম, উত্তম। নিয়ে এসো। তবলা ছাড়া গান হয়?’

‘আমি আবার গানও জানি। দক্ষিণ ভারতীয় মার্গসংগীত।’

‘সর্বনাশ! সে তো আবার খুব গুরুপাক। আমার যখন ম্যালেরিয়া হয়, তখন উত্তর ভারতীয় সব গান দক্ষিণ ভারতীয়ের মতো হয়ে যায়। তুমি ম্যালেরিয়া ছাড়াই ওই গান গাইতে পারো?’

‘আমি শিখেছি যে!’

শরৎবাবু একপাট হারমোনিয়াম বাজিয়েই গাঁক করে গান ধরলেন। বাঘ যেভাবে মানুষ ধরে, ঠিক সেইভাবে গানটা ধরলেন। মরা মানুষও চমকে উঠবে। একলাইন গেয়ে গান থামিয়ে। বললেন, ‘সবসময় গলা ছেড়ে গান গাইবে। গলা একেবারে চাপবে না। আমার গুরু বলতেন, গলা দিয়ে গান গাইবে না, গান গাইবে পেট থেকে।’

কথা শেষ করেই তিনি আরও উঁচু পর্দায় ধরলেন। গলা ফেটে ফুটিফাটা হয়ে গেল। সেদিকে। গ্রাহ্য নেই। যাকে বলে সাঙ্ঘাতিক বেপরোয়া গাইয়ে। মুকুন্দ দড়াম-দড়াম করে তবলা পেটাতে লাগল। গানের লাইনে গান চলেছে, তবলার লাইনে তবলা। কারও সঙ্গে কারও মিল নেই। মুকুন্দ যত না বাজাচ্ছে, তার চেয়ে বেশি মাথা নাড়ছে। বড়মামা উঠে চলে গেছেন। মাসিমা বেরিয়ে গেলেন। পড়ে ছিলুম আমি। আমিও চুপিচুপি বেরিয়ে এলুম এক ফাঁকে। বাইরে থেকে মনে হচ্ছে ঘরের ভেতর গজ-কচ্ছপের লড়াই হচ্ছে যেন। সেই গান শুনে বড়মামার বাঘা-বাঘা। আটটা কুকুর লেজ গুটিয়ে বসে আছে জুজুবুড়ি হয়ে। পরস্পর পরস্পরের মুখের দিকে তাকাচ্ছে।

রাতের পাট চুকে গেল। নীচের তলার আলোটালো সব নিভে গেছে। পুবের ঘরে শরৎবাবুর নাক ডাকছে গাঁক-গাঁক করে। মুকুন্দ রোজ শোয়ার আগে স্নান করে। কুয়োতলায় ছড়ছড় করে জল পড়ার শব্দ হচ্ছে। মাসিমার একটা নিজস্ব ইজিচেয়ার আছে বারান্দায়। বিছানায় যাবার আগে সেই চেয়ারে বসে থাকেন আপনমনে। সেই সময় মাসিমা একেবারে অন্য মানুষ। এই সময় মাসিমার পাশে গিয়ে আমি বসি। মা-মরা ছেলে বলে মাসিমা আমাকে ভীষণ ভালোবাসেন। এই যে আমার মা নেই, আমার বাবা বিলেতে, আমি কিছু বুঝতে পারি না। মাঝে-মাঝে মায়ের কথা মনে পড়লে আমার চোখে জল এসে যায়। আসতেই পারে। সকলেরই কেমন মা আছে, আমার নেই। মা না থাকলে জমে? আমিও স্কুল থেকে ফিরি, আমার বন্ধুরাও ফেরে। তারা কেমন। দরজার বাইরে থেকে ‘মা, মা’ বলে ডাকতে ডাকতে বাড়িতে ঢোকে। আমি আসি গুটিগুটি, চোরের মতো। মামার বাড়ি যতই ভালো হোক, নিজের বাড়ি আর মামার বাড়িতে একটু তফাত হবেই। মাসিমা আমাকে সাঘাতিক ভালোবাসলেও মাসিমাকে আমি ভয় পাই। ভীষণ রাগি মানুষ। অকারণে রাগেন না। কারণ থাকলে রেগে যান। তখন মা দুর্গার মতো চোখ দুটো জ্বলতে থাকে। ফরসা মুখ লাল হয়ে ওঠে। আমাকে ভালোবাসেন বলে আমি কোনও অন্যায় করি না। জানি, অন্যায় করলেও আমার ওপর রাগ করবেন না। আমার হয়েছে মহা সমস্যা। আমার ইচ্ছে করে একটু অন্যায় করি, মায়ের হাতে একটু মার খাই। মারের পর একটু আদর খাই। শুধুই। ভালো ছেলে হয়ে থাকা। একটু দুষ্টুমি যদি এখন না করি, কবে আর করব! বড় হয়ে?

মাসিমার পাশে বসে আছি। মাসিমার একটা হাত আমার মাথায়। আমি দেখেছি, মাসিমা আমার মাথায় হাত রাখলে আমার সব বিপদ কেটে যায়। আমার জ্বর, পেটব্যথা, মাথা ধরা, দাঁত কনকন —সব কমে যায়। স্কুলে পড়া পারি। তাই তো আমি মাসিমার পাশে এসে বসি। আরও বসি, মাসিমা ছেলেবেলার গল্প বলেন। মায়ের গল্প বলেন। মা কেমন সুন্দর গান গাইতেন। ফ্রক পরলে মাকে মেয়েদের মতো দেখাত। মায়ের ভীষণ ভয় ছিল ভূত আর চোর-ডাকাতের। আবার সাপে ভীষণ সাহস ছিল। সবাই যখন ছুটছে, মা দাঁড়িয়ে আছেন। মাকে সবাই ভীষণ ভালোবাসত। মা লেখাপড়ায় একেবারে সেরা ছিলেন। প্রতিটা পরীক্ষায় প্রথম। মায়ের সঙ্গে নাকি কালীমন্দিরে ভোরবেলা -কালীর দেখা হয়েছিল। মা-কালী মায়ের মতোই একটা ছোট মেয়ের রূপ ধরে নাটমন্দিরে এক ঘণ্টা লুকোচুরি খেলেছিলেন। মা সেই লালপাড় শাড়ি-পরা, গাছকোমর বাঁধা মেয়েটিকে যতবার জিগ্যেস করেন, তোমার নাম কী ভাই, ততবারই মেয়েটা হেসে হেসে পালায়। শেষে মা যখন খুব রাগ করে বললেন, যাও, নাম না বললে তোমার সঙ্গে আর খেলব না আমি। সেই থেকে তোমাকে আমি নাম ধরে ডাকতেই পারছি না। মেয়েটা তখন। বললে, আমাকে তুমি এতক্ষণেও চিনতে পারলে না ভাই? আমার নাম জগদম্বা। বলেই মেয়েটা মা-কালীর মূর্তির মধ্যে ঢুকে গেল। সেইনা দেখে আমার মা অজ্ঞান হয়ে গেলেন। মন্দিরের বৃদ্ধ পুরোহিত এসে মায়ের মুখে চরণামৃত দিয়ে জ্ঞান ফেরালেন। সব শুনে বললেন, তুমি মা। ভাগ্যবতী। আমি সারাজীবন পুজো করে আজও দর্শন পেলাম না। পুরোহিত হাউহাউ করে কাঁদতে লাগলেন। মায়ের গল্প সারারাত হলে সারারাত আমি জেগে জেগে শুনতে পারি। মাসিমার কাছে মায়ের অনেক অনেক গল্প আছে। এত গল্পও মা তৈরি করে রেখে গেছেন! আমার জন্যে মায়ের গল্প আছে, মা নেই।

মাসিমা সবে গল্প শুরু করতে যাচ্ছেন, এমন সময় বড়মামা বললেন, ‘তোমরা একবার আমার

ঘরে এসো, সাংঘাতিক একটা আলোচনা আছে।’

মেজোমামা, মাসিমা আর আমি ঘরে ঢুকতেই বড়মামা সাবধানে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আমার কেমন যেন ভয়-ভয় করছে। বড়মামা তো কোনওদিন এমন করেন না। কী হল আজ! বড়মামা। মেঝেতে পুরু গালচেটা পাতলেন। ফিশফিশে গলায় বললেন, ‘তোমরা সব বসে পড়ো।’

মেজোমামাও যেন বেশ ভয় পেয়ে গেছেন। আস্তে আস্তে বললেন, ‘কী ব্যাপার বলো তো!’

বড়মামা আমাদের গা ঘেঁষে বসে, একেবারে ফিশফিশে গলায় বললেন, ‘আমার ভাই সমূহ বিপদ। বিপদ একা আমার নয়, আমাদের সকলের বিপদ।’

মাসিমা বললেন, ‘কী হয়েছে! কাউকে ইনজেকশান দিতে গিয়ে মেরে ফেলেছ! জাল ওষুধের কেস নয় তো?’

‘ওসব নয়, ওসব নয়। অন্য ঘটনা। ভয়ংকর একটা ঘটনা ঘটে গেছে। আমরা শেষ হয়ে গেলুম।’

মেজোমামা বললেন, ‘আর আমাদের টেনশন না বাড়িয়ে দয়া করে বলে ফ্যালো তোমার বিপদটা কী?’

‘খুব কাছে সব সরে এসো। আরও কাছে।’

বড়মামা এপাশে-ওপাশে তাকালেন। জানলার দিকে তাকালেন। আমাকে বললেন, ‘ঝট করে দেখে এসো তো, জানালার বাইরে কেউ আছে কি না!’

ডিটেকটিভ বই আমি খুব পড়েছি। জয়ন্ত, সুন্দরবাবু, ব্যোমকেশ, কিরীটি রায়। পাকা গোয়েন্দার মতো তড়াক করে লাফিয়ে উঠে জানালার কাছে গেলুম। কেউ নেই। অন্ধকার আকাশ। গাছের মাথা দুলছে বাতাসে। দরজাটা টেনে দেখলুম। বন্ধই আছে। ফিরে এসে বসলুম। বড়মামা জোড়হাত হয়ে প্রণাম করলেন দেয়ালে ঝোলানো ঠাকুর রামকৃষ্ণ ও সারদা মায়ের ছবিকে।

মেজোমামা বললেন, ‘উত্তেজনায় আমার বুক ফেটে যাচ্ছে।’

আর ঠিক তখনই বড়মামা বললেন, ‘আমি বিশ লক্ষ টাকা পেয়েছি।’ বলেই ভেউভেউ করে কেঁদে ফেললেন। কাঁদতে-কাঁদতে বললেন, ‘আমার সর্বনাশ হয়ে গেল।’

মেজোমামা বললেন, ‘যাঃ, তা কখনও হয়! বিশ লাখ টাকা কেউ লটারি পায়? তোমার কি সবই অদ্ভুত!’

বড়মামা কান্নাজড়ানো গলায় বললেন, ‘কী করব ভাই, আমার বরাতটা চিরকালই একরকম রয়ে গেল। বিপদের পর বিপদ। বিপদের পর বিপদ। টিকিটটা আমাকে একজন জোর করে গুছিয়ে গিয়েছিল। আমি নেব না কিছুতেই। বলে কিনা…এই করেই আমি সংসার চালাই।’

‘ব্যস, আর কী, তোমার অমনি দয়ার শরীর গলে গেল! নাও, এইবার ঠ্যালা সামলাও। তাও এক আধ লাখ হয়! এ একেবারে বিশ লাখ! একে কী বলে জানো, খাচ্ছিল তাঁতি তাঁত বুনে, কাল হল তাঁতির গরু কিনে।’ আঃ, মেজোমামা কোটেশনটা একেবারে ঘাটে-ঘাটে লাগিয়েছেন। শরৎবাবু থাকলে তালি বাজাতেন।

বড়মামা বললেন, ‘বিপদে পড়েছি ভাই। এখন আর তোরা আমাকে গালি দিসনি।’

‘এই সর্বনাশা লটারিটা কোথাকার?’

‘মেঘমল্লার বাম্পার।’

‘নাও, এখন ডাক্তারি-ফাক্তারি ছেড়ে ব্যবসাদারদের মতো একটা গদি আর ছ’টা টেলিফোন নিয়ে বোসো। আর সারাদিন ভাও কেতনা, ভাও কেতনা করো। থার্ড ক্লাস, ন্যাস্টি, ভার, ব্লোটিং রিকিং মানি। তোমার গা দিয়ে বিশ্রী গন্ধ বেরোবে। তোমার মুখটা কোলাব্যাঙের মতো হয়ে যাবে। তোমার একটা ধামার মতো ভুঁড়ি হবে। তোমার সব চুল উঠে গিয়ে তেপান্তরের মাঠের মতো এতখানি একটা টাক বেরোবে।’

‘পাছে টাকা জমে গিয়ে কালো টাকা হয়ে যায়, সেই ভেবে আমি দু-হাতে উড়িয়ে দিই, উড়নচণ্ডের মতো। এ আমার কী সর্বনাশ হয়ে গেল!’

‘তুমি তো এক্ষুনি দুম করে হার্টফেল করতে পারো। তখন কী হবে? তুমি তো চলে গেলে। তোমার আর কী। আমরা যে অনাথ হয়ে যাব। অনেক ভাগ্য করলে মানুষ এমন বড়দা পায়। তোমার। বুকটা এখন কেমন করছে? ধড়ফড়, ব্যথা! আমি বরং একজন ডাক্তার ডাকি। আজ সারারাত তিনি এ-বাড়িতে থাকুন।’

‘আমার এখনও কিন্তু সেরকম কিছু মনে হচ্ছে না।’

‘এখন ভয় পেয়ে আছ বলে কিছু হচ্ছে না। একটু পরেই তোমার আনন্দ হবে। তখন তোমার লাফ মারতে ইচ্ছে করবে। তারপর তোমার হার্টটা চমকে উঠেই থমকে যাবে।’

মাসিমা বললেন, ‘কত টাকা বললে?’

‘কুড়ি লক্ষ।’

‘কোনও মানে হয়! ছোটলোকের মতো এককাঁড়ি টাকা। তা তুমি টিকিটটা ছিঁড়ে ফেলে দাও না।’

‘সে উপায় নেই। এর আগে তো আমি একটা দেড়লাখ টাকা ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছিলুম।’

‘তার মানে তুমি এর আগে আর একটা লটারি পেয়েছিলে?

‘গত বছরে।‘

‘ছিঃ, ছিঃ, তোমার কী ভিখিরির বরাত!’

‘সে টিকিট তো আমি ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছিলুম। লটারির টাকা আমার পেছন পেছন তাড়া করলে আমি কী করতে পারি! এবারে আমার এজেন্টের কাছেই টিকিটটা ছিল।’

‘সে কী বলছে?’

‘খবরটা দেখে তার ছোট একটা হার্ট অ্যাটাক মতো হয়ে গেছে। বেড রেস্টে ফেলে রেখে এসেছি। শোনো, আমি ওভাবে মরব না। তবে আমি যা শুনেছি, তা আরও ভয়ানক ও ভয়ঙ্কর। ভয়াল ভয়ঙ্কর এক অপরাধ-কাহিনি। খবরটা যখন ছড়াছড়ি হয়ে যাবে, তখন একদল ক্রিমিনাল কী করবে, আমাদের এই ছেলেটাকে তুলে নিয়ে চলে যাবে। নিয়ে গিয়ে রেখে দেবে গুম করে। সেখান থেকে চিঠি ছাড়বে, অমুক দিন অমুক জায়গায় তিরিশ লাখ টাকা নিয়ে হাজির থাকবে, হাতের কবজিতে সবুজ রঙের রুমাল জড়ানো একজন দাঁড়িয়ে থাকবে। তার সামনে দাঁড়ানো মাত্রই বলবে, জয় রাম। টাকা ভর্তি সুটকেসটা তার হাতে দেবে। তখনই কিন্তু ছেলেকে ফেরত পাচ্ছ না। ছেলেকে রাত বারোটার সময় বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে যাবে, আমাদের ডেলিভারি ভ্যান। পুলিশের সাহায্য নেবার চেষ্টা কোরো না; তা হলে গোটা ছেলে আর ফিরবে না। তখন সেপারেট পার্সেলে ডাকযোগে তার পার্টর্স ফিরে আসবে। একবারে আসবে না, অনেকদিন ধরে একটু একটু করে আসবে। তার মানে আমাদের জন্যে ছেলেটার ভোগান্তি আর আমাদের বেনো জল ঢুকে ঘোরো জল বেরিয়ে যাওয়া…’

বড়মামার কথায় আমার ভয় পাওয়াই উচিত ছিল। কিন্তু আমাকে তো কেউ কোনওদিন কিডন্যাপ করেনি, তাই মনে হচ্ছিল রহস্য-রোমাঞ্চ কাহিনিতে যা পড়েছি, একেবারে মিলিয়ে দেখার সুযোগ পেলে বেশ হয়। গভীর জঙ্গলে ছোট্ট একটা গুমটি ঘরে পুরে রাখবে। একপাল হিংস্র ডোবারম্যান কুকুর চারপাশে থাকবে পাহারায়। অনেক উঁচুতে একটা ঘুলঘুলি। সেই পথে অচেনা রোদ। অজানা একটা মেয়ে খাবার আনবে। বাইরে মাঝে মাঝে শোনা যাবে গুলি-গোলার শব্দ। ঘরের ভেতর কাঠের পাটাতন। তার ওপর কুটকুটে কম্বল। একটা লোহার গেলাস। এক কুঁজো জল। বসেই আছি। বসেই আছি। কিছু খেতে চাইব না। দাড়িওয়ালা ভীষণ চেহারার একটা লোক আমাকে মেরেধরে খাওয়াতে চাইবে। আমি তার হাতে কামড়ে দেব। সে আমাকে বলবে, ইবলিশের চ্যালা।।

অনেক রাত অবধি মিটিং হল। বোঝা গেল বিষম বিপদ।

বড়মামা বললেন, ‘আমার ব্যাঙ্কের এজেন্টকে নিয়ে গিয়ে টাকাটা এখানে আমার অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করতে হবে। ভাবছি এজেন্ট ভদ্রলোককে একটা গাড়ি উপহার দোব। লাখখানেক খরচ হল। টাকাটা যেভাবেই হোক খরচ করতে হবে তো। ধরো, বাড়িটাকে ভেঙে চুরমার করে আবার যদি তৈরি করাই তা হলেই তো সব টাকা খতম।’

‘আর তুমিও খতম। পালে-পালে সব আসবে—মেয়ের বিয়ে, ছানি অপারেশন, বারোয়ারি মনসাপুজো, ভোলেবাবা। দিতে না পারলেই বোমা, চাকু। শোনোনা, এ-খবর তুমি কিছুতেই চেপে রাখতে পারবে না। জানাজানি হবেই হবে। এ-ও এক ধরনের স্ক্যান্ডাল। তুমি ছেলেটাকে নিয়ে বেশ কিছুদিনের জন্যে আত্মগোপন করো।’

মাসিমা বললেন, ‘যারা কিডন্যাপ করে, রানসাম আদায় করতে পারে, তাদের আগে থেকেই টাকাটা দিয়ে দিলে কেমন হয়! আমি শুনেছি অনুপার্জিত টাকা ব্যবহার করাটাও তো পাপ।’

‘কে কিডন্যাপ করবে জানব কী করে? একটা দল? অনেক দল।’

‘শোনো, তোমার গোঁফ-দাড়ি বেশ তাড়াতাড়ি বেরোয়। তুমি সাতদিন ছাতের ঘর ছেড়ে কোথাও বেরোবে না। ছেলেটাও তোমার সঙ্গে থাকবে। আমরা অ্যানাউন্স করে দিচ্ছি, তোমার ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। নার্সিংহোমে ইন্টেনসিভ কেয়ারে সাতদিনে তোমার চেহারা হয়ে যাবে ওমর শেখ এর মতো। ছেলেটার তো আর দাড়ি-গোঁফ বেরোবে না, ওর চুল আর ভুরু-টুরু সব আমরা কামিয়ে দেব। কেউ আর চিনতে পারবে না। তারপর রাত যখন গভীর হবে, একটা কালো গাড়ি এসে আমাদের খিড়কিতে দাঁড়াবে। তোমরা উঠবে। ন্যাশনাল হাইওয়ে থার্মি-ফোর ধরে সোজা কালাচিনি ফরেস্টে। সেখানে আমার বন্ধু শৈবাল ফরেস্ট অফিসার। বিশাল বাংলো। থাকে একা। তিনটে মাস গ্যাপ। তার মধ্যে থিতিয়ে যাবে ব্যাপারটা। তখন তুমি ওমর শেখের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসবে আবার তোমার চেম্বারে।

‘এ তো তোর সেই নেতাজির গ্রেট এস্কেপের মতো!’

‘তিনি করেছিলেন মহা কারণে, তুমি করবে হীন কারণে। মহাপুরুষ আর পুরুষে এই তফাত ভাই।’

‘আমি আর আমাদের ভাগনে না হয় অজ্ঞাত বনবাসে গেলুম; কিন্তু তোমাদের কী হবে? ধরো, কুসিকে যদি ধরে নিয়ে যায়!

মাসিমা বললেন, ‘অত সহজ নয়। আমাকে ধরতে এলে তাকে আমি ধরে জালায় ভরে দেব। আমাকে তোমরা চেনোনা।’

মেজোমামা বললেন, ‘আমাকে ধরলে সেই ছেলেবেলার অভ্যাসটা ঝালাই করে নেব। মারামারিতে আমার ভীষণ নাম ছিল।’

বড়মামা বললেন, ‘আমি ভাই একবার লুই পাস্তুর হব বলে গোঁফ-দাড়ি রাখার চেষ্টা করেছিলুম। জিনিসটা বেশ জমেও ছিল। কিন্তু ভাই এমন কুটকুট করে। আমার দাড়িতে আবার ছারপোকা হয়েছিল। তারপর চুমুক দিয়ে তরল কিছু খেতে গেলে গোঁফের বিরক্তি। ঠোঁট ঠেকার আগে গোঁফ ডুবে গেল। তারপর সর্দি হলে নাকঝাড়ার অসুবিধে। আমি বলি কী, বুড়োর মতো আমারও মাথা আর ভুরু কামিয়ে দাও।’

‘ওই ভুলটা কোরো না বড়দা। তোমার চুল পাতলা হয়ে এসেছে। বেরোতে সময় নেবে। বুড়োর চুল সাতদিনেই ঘন হয়ে উঠবে।’

ভোর হয়ে এল। আমরা আলো নিবিয়ে শুয়ে পড়লুম যে-যার জায়গায়। আমি তো বড়মামার ঘরে শুই। এপাশে-ওপাশে খাট।

বড়মামা শুয়ে-শুয়ে বললেন, ‘কী সর্বনাশ হয়ে গেল! এখন প্রাণে বাঁচলে হয়।’

‘আপনি টিকিটটা ছিঁড়ে ফেলে দিন না।

‘আরে, আমি তো মানুষ। লোভও তো আছে। কেবল মনে হচ্ছে, অতগুলো টাকা ছেড়ে দেব। যে কালীবাড়িতে দিদি মায়ের সঙ্গে লুকোচুরি খেলেছিল, সেই মন্দিরটার জীর্ণদশা। খুব ইচ্ছে করে একেবারে ঢেলে সাজিয়ে দিই। আমাদের বাড়িতে যে কাজ করে লক্ষ্মীদি, তার মেয়েটার বিয়ে দেবার পয়সা নেই। মনে হচ্ছে, বিয়েটা বেশ ঘটা করে দিয়ে দিই। কত ছেলেমেয়ে পড়ার খরচ জোগাতে পারছেনা। মনে হচ্ছে, যা হয় একটা কিছু করি। কিছুই করা যাবে না লোক জানাজানি হয়ে যাবার ভয়ে। এমন দেশ আমাদের, বিদেশ থেকে সব বিদেশি পাপ ধার করে আনছে। চুরি ডাকাতি ছিল, কিডন্যাপিংটা ছিল না।’

হঠাৎ ফোন বেজে উঠল।

বড়মামা বললেন, ‘কোনও এমার্জেন্সি কেস। ভদ্রভাবে বলে দাও, বড়মামার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। নার্সিংহোমে আছেন।’

ফোন ধরে বললুম, ‘হ্যালো।’

‘আঁ, কে বুলছেন?

‘আমি বুড়ো। আমার বড়মামার ভাগনে।’

‘আঁ, লেকিন বিমল মিট্টির কুথায়? লেটে আছেন কি, মজেসে। লোটারি মিলিয়েছেন না, আরে ব্বাপ বহত ভারী লোটারি।’ আমি তাড়াতাড়ি ফোন নামিয়ে বড়মামার কাছে ছুটে এলুম। সর্বনাশ করেছে, এ তো গুন্ডার গলা। লোকটা এত জোরে গাঁক-গাঁক করে কথা বলছে, নামিয়ে রাখলেও শোনা যাচ্ছে। ব্যাড় ব্যাড় করছে। হাঃ হাঃ করে হাসছে দৈত্যের মতো। ভয়ে আমার বুক ঢিপঢিপ করছে।

বড়মামার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বললুম, ‘সেই গুন্ডা। খবর পেয়ে গেছে। হাঃ হাঃ করে হাসছে, আর বলছে, ‘বিমল মিট্টির, মাজেসে লেটে আছে কি, বহত ভারি লোটারি মিলিয়েছে।’

বড়মামা টেলিফোনের দিকে গুটিগুটি এগিয়ে চললেন। লোকটা আমার সাড়া না পেয়ে ‘হ্যাল্লো, হ্যাল্লো’ করছে। বড়মামা ট্যাপ করে লাইনটা কেটে দিলেন। হাত কাঁপছে তাঁর। চোখ বড় বড় হয়ে উঠেছে। স্যান্ডো গেঞ্জি পরে আছেন। পিঠের খোলা অংশে আলো পড়েছে। ঘামে চকচক করছে। আমার গলা শুকিয়ে গেছে। এমন বোকা, আমার মনে হচ্ছে, লোকটা টেলিফোনের ভেতর দিয়ে ঘরে চলে আসবে। ট্যাপ করায় লাইনটা কেটে গেল। বড়মামা রিসিভারটাকে টেলিফোন টেবিলেই শুইয়ে রাখলেন, যাতে আর কল না আসে।

আমরা দুজনে ঢকঢক করে জল খেলুম দু-গেলাস। বন্ধ দরজায় টোকা পড়ল। বড়মামা চমকে উঠে বললেন, ‘কে, কে?’

‘দরজা খোলো।’ ভারী গলা।

‘কে তুমি?’ বড়মামা মেজোমামার গলা চিনতে পারছেন না ভয়ে। ‘কে মেজোমামা?’ আমার গলারও জোর গেছে।

‘দরজাটা খোলো।’

মেজোমামা ঘরে ঢুকেই বললেন, ‘আর-এক মুহূর্ত দেরি নয়। প্যারালাল লাইনে আমি সব শুনেছি। তুমি কতজনকে বলে বেড়িয়েছ শুনি। তোমার স্বভাব তো আমি জানি। একটা কথাও পেটে রাখতে পারো না। কতজনকে বলেছ?’

‘বেশি না, মাত্র তিনজন।’

‘ব্যস, ওই তিনজন এখন তিন লক্ষ জন হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে তোমাদের আমি পাচার করে দিতে চাই। আমরাও তোমাদের সঙ্গে যাব। মুকুন্দ আর মদনলাল বাড়ি সামলাবে। প্রয়োজনে ঝড় আসবে। ঝড়ু আর মদনলাল থাকলে ভয় নেই। প্রয়োজনে জান দিয়ে দেবে। গেট রেডি। গেট রেডি।’

মেজোমামা মাসিমাকে ডেকে তুললেন।

মাসিমা সমস্ত শুনে বললেন, ‘নাঃ, যেতেই হবে। থাকলে বিপদে পড়ে যাব। কাল সকাল থেকেই আক্রমণ শুরু হয়ে যাবে। ব্যবসায়ীরা ছুটে আসবে কালো টাকা সাদা করতে। আমি শুনেছি, ওরা ওই রকমই করে। তুমি বড়দা, সর্বনাশ করে ফেলেছ। কেন তুমি তিনজনকে বলেছ। তিনজনের মধ্যে কে-কে আছে?’

‘ওই যে আমাকে মাসাজ করতে আসে, গোপাল হালুই।’

‘তুমি গোপালকে বলেছ! বাঃ, উপযুক্ত লোককেই বলেছ। গোপাল মোটামোটা ব্যবসাদার আর শিল্পপতিকে মাসাজ করে। চুল কাটার সময় আর মাসাজের সময় জানোই তো যত কথা হয়। হয়ে গেছে। নিজের সর্বনাশ তো করলেই, আমাদেরও শেষ করলে। এ-বাড়িতে আর ফিরে আসা যাবে তো! ফিরে এসে কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে তো!’

মাসিমা কথা শেষ করে যাবার জন্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন কি দাঁড়াননি, সদরে গাড়ি থামার শব্দ। অনেকটা বাগান পেরিয়ে সদর। দক্ষিণের বাতাসে হর্নের শব্দ ভেসে এল। কে গেটটাকে ধরে ঝাঁকাচ্ছে। জোরে জোরে। সবাই থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন। আমরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। বারান্দা থেকে অনেক দূরে হলেও, আমরা গেটটা দেখতে পাচ্ছি। বেশ বড় সাদা একটা গাড়ি। পাঞ্জাবি পরা বেশ মোটা মতো এক ভদ্রলোকে দাঁড়িয়ে আছেন।

মেজোমামা বললেন, ‘এই খেয়েছে। বড়দা, বড়দা, শুয়ে পড়ে বুকে হেঁটে ঘরে ঢুকে পড়ো। কুসি, তুই শিগগির যা। বোকা মুকুন্দটা সব গোলমাল করে দেবে। তুই শিগগির যা। গিয়ে বল, মুকুন্দ যেন বলে, ‘বড়বাবুর হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। পাবলো ক্লিনিকে ইনটেনসিভ কেয়ারে আছে। বাড়ির সবাই সেইখানেই আছে।’ কোনওভাবেই যেন অন্য কথা না বলে।’

মাসিমা তরতর করে নীচে নেমে গেলেন। আমরা গেরিলা সৈন্যের মতো বুকে হেঁটে ঘরে ঢুকে পড়লুম।

মেজোমামা বললেন, ‘ড্রেস আপ। ড্রেস আপ। বড়দা, তুমি বেশ ভালো করে সাজো তো। সব চেয়ে ভালো ট্রাউজার আর স্ট্রাইপড শার্ট পরো। সমস্ত চুল সামনে টেনে এনে তোমার চওড়া কপালটা ঢেকে ফ্যালো। কোমরে চওড়া বেল্ট লাগাও। আজ গগলসটা পরো। তোমার সেই ফরেন জিনিসটা।’

নকশাল আমলে বড়মামা আত্মরক্ষার জন্যে রিভলভার রাখার লাইসেন্স পেয়েছিলেন। এই সময় খুব কাজে লেগে গেল যা হোক। আমাদের একটা ইন্টারকম আছে। মাসিমা ইন্টারকমে কথা বলছেন নীচে থেকে। মুকুন্দর কথা ভদ্রলোক বিশ্বাস করেননি। গাড়িতে বসে আছেন। মুকুন্দকে বলেছেন, ‘ব্যবসাদার। আমি বুঝি মানুষ কোন চালে চলে! প্রয়োজন হলে সারাদিন গেট আটকে বসে থাকবেন।’ মুকুন্দ সবক’টা কুকুর বাগানে ছেড়ে দিয়েছে। মাসিমা জিগ্যেস করছেন, ‘শরৎবাবুর কী হবে! তিনি তো এখনও ঘুমোচ্ছেন।’

মেজোমামা বললেন, ‘ঘুমোচ্ছেন, ঘুমোন। উঠে দেখবেন আমরা নেই।’

আমাদের সাজ-পোশাক হয়ে গেল। নীচের স্টোররুমে বসে আমরা এক রাউন্ড চা খেয়ে নিলুম। করিডরের আয়নায় নিজেকে দেখে অবাক। চিনতেই পারছিনা নিজেকে। কেমন যেন বকাটে বকাটে লাগছে। অন্য সময় এমন সাজলে, মেজোমামাই আমাকে বলতেন, ‘যাও, এখানে কেন? সিনেমা হলে গিয়ে ব্ল্যাকে টিকিট বিক্রি করো।’

মুকুন্দকে একপাশে বসিয়ে পাখি-পড়ানোর মতো সব বোঝানো হল। আজই প্রথম শুনলাম, মুকুন্দ খুব ইন্টেলিজেন্ট ছেলে। মেজোমামা বললেন, ‘আর এক মুহূর্ত দেরি নয়। এরপর এমন কেউ এসে পড়বে, যার সঙ্গে দেখা করতেই হবে।’

আমরা আমাদের গাড়িটা কী করে বের করব যখন ভেবেই পাচ্ছি না, তখন মুকুন্দই বুদ্ধিটা বের করল। আমাদের গ্যারাজ থেকে গাড়িটা বের করে খিড়কির গেট দিয়ে পেছনের রাস্তায় পড়া যায়। আর ওই রাস্তায় একবার পড়তে পারলে আমাদের আর পায় কে! কিন্তু গাড়ি স্টার্ট করার শব্দ সামনের গেট পর্যন্ত চলে যাবে।

মুকুন্দ বললে, ‘আপনারা যেমন আছেন, সেইরকমই থাকুন, আমি গ্যারাজ থেকে গাড়িটা বের করে ঠেলে ঠেলে পেছনের রাস্তায় নিয়ে যাচ্ছি। রাস্তায় নামিয়ে আমি পাখির ডাক ডাকব, তখনই আপনারা চলে আসবেন।’

‘কী পাখি?

‘কোকিল।’

মেজোমামা বললেন, ‘এটা বসন্ত কাল নয়। যা বলবে ভেবেচিন্তে বলবে।’

‘তা হলে মুরগি। ওই ডাকটা ছেলেবেলা থেকেই আমি খুব অভ্যাস করেছি।’

‘হ্যাঁ, মুরগি। এই তো আমার বুদ্ধিমান ছেলে!’

মুকুন্দ বেরিয়ে গেল। আমরা বসে আছি উৎকণ্ঠা নিয়ে। কখন সেই মুকুন্দ মুরগি ডাকবে! সবাই ঘড়ি দেখছেন। মাসিমা এত সুন্দর সেজেছেন; ঠিক একেবারে আমার মায়ের মতো দেখতে। হয়েছেন। এইসময় আমার বাবা যদি বিলেত থেকে একবার আসতেন!

কোঁক-কোঁকোর-কোঁ। বিশাল এক রামপাখি তিনবার ডেকে উঠল। আমরা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালুম সৈনিকের মতো। আমাদের তিনজনের হাতে তিনটে ব্যাগ। কৃষ্ণচূড়া, কাঁঠাল, আম আর জামরুল গাছের আড়াল দিয়ে, ম্যাগনোলিয়া আর সবেদা গাছের তলা দিয়ে আমরা পেছনের। কম্পাউন্ড পেরিয়ে রাস্তায়। কালো ঝকঝকে গাড়ির গায়ে চকচকে নিকেলের পাত। এই গাড়ি আমাদের কত দূরে নিয়ে যাবে! গাড়িটা বড়মামা সবে কিনেছেন। মেজোমামা চালকের আসনে। মেজোমামা টেরিফিক চালান। মেজোমামার পাশে বড়মামা। আমরা পেছনে। বড়মামা একটা চামড়ার ব্যাগ মুকুন্দর হাতে দিয়ে বললেন, ‘টেন থাউজেন্ড।’

বড়মামার নতুন মুখে পুরোনো চোখের জল, ‘আমার আটটা কুকুর, আঠারোটা গরু, তিন খাঁচা পাখি, এই বাড়ি, মরিস মাইনার গাড়ি—সব, সব রইল তুই একটু দেখিস। আমাদের সর্বস্ব।’

মেজোমামা বললেন, ‘শক্ত হও, শক্ত হও। এটা ফাঁস ফাঁস করার সময় নয়।’ মুকুন্দকে বললেন, ‘মদন আসবে একটু পরে, মাস্তানকে খবর পাঠা। দুর্গের মতো বাড়িটাকে আগলাবি। এভরিথিং তোর হাতে। লক্ষ্মীদিকে থাকতে বলিস।’

‘জান কবুল করে দেব মেজদা। আচ্ছা, আপনারা কি ওই কারণেই চলে যাচ্ছেন?

‘কী কারণ?

‘বিশ লাখ।’

‘তুই জানলি কী করে?

‘বড়দা যে বললেন, ‘কাউকে বলিসনি মুকুন্দ। আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে।’ আমি কাউকে বলব না। আমার মুখে সেলোটেপ।’

মেজোমামা বললেন, ‘গুড বাই।’

গাড়ি ছেড়ে দিল। তিন বাঁক ঘুরেই বড় রাস্তা। সাত কিলো দূরে এন. এইচ. থার্টি ফোর। আর আমাদের পায় কে! যাচ্ছি আমরা কালাচিনি। একটু পরেই ভুটান। এত আনন্দ আমার কখনও হয়নি। সবাই মিলে একসঙ্গে, যেন টুরিস্ট পার্টি। মেজোমামার ঠোঁটে সোনার ডগাওলা পাইপ। চারপাশে সদ্য-ফোঁটা রোদের আমেজ।

হঠাৎ বড়মামা বললেন, ‘কালাচিনিতে হাতি পাওয়া যাবে?

‘যাবে।’

‘তা হলে, আমার অনেক দিনের ইচ্ছে, ছোট্ট একটা হাতির বাচ্চা কিনব। সারা ঘরে ঘুরে ঘুরে বেড়াবে!’ মাসিমা বললেন, ‘এই তো, বিশ দিনে বিশ লাখ ওড়াবার ঠিক রাস্তাই পেয়ে গেছ।’ আমরা তো চলেছি! অজ্ঞাতবাসে। এদিকে যা হল, শরৎবাবু গেট খুলে বেরিয়ে এলেন হজমি ভ্রমণে। সাদা গাড়ির মোটা চালক, ‘আইয়ে আইয়ে’ বলে খাতির করে তুলে নিলেন গাড়িতে। কবি হিসেবে এই খাতিরটুকুই চেয়ে এসেছেন সারা জীবন। তারপর! কে পাগল হল! একজন? না। একসঙ্গে দুজন! সে আর-এক কাহিনি!

(সমাপ্ত)

Facebook Comment

You May Also Like