Sunday, March 3, 2024
Homeবাণী-কথাবলপয়েন্ট - হুমায়ূন আহমেদ

বলপয়েন্ট – হুমায়ূন আহমেদ

বলপয়েন্ট - হুমায়ূন আহমেদ

বলপয়েন্ট || Ballpoint by Humayun Ahmed

আমার পুত্র নুহাশ

আমার পুত্র নুহাশকে কে যেন জিজ্ঞেস করল, তুমি বড় হয়ে কি বাবার মতো লেখক হতে চাও? নুহাশ বলল, না।

কেন না?

নুহাশ গম্ভীর গলায় বলল, লেখক হলে খুব বেশি হাঁটাহাঁটি করতে হয়। সে সবসময় আমাকে দেখেছে লিখতে শুরু করেছি, কিছুক্ষণের মধ্যেই লেখা বন্ধ করে বারান্দায় হাঁটছি। আবার লিখছি আবার হাঁটছি। সে ধরেই নিয়েছে হাঁটাহাঁটি লেখালেখিরই একটা অংশ। বাংলা একাডেমীর লেখক প্রকল্পের একজন আমাকে আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, আপনার লেখালেখির প্রধান অনুপ্রেরণা কী? আমি গম্ভীর গলায় বললাম, হন্টন।

একবার সাঁতারে চ্যাম্পিয়ন একজনকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি এত ভালো সাঁতার কোথায় শিখেছেন? চ্যাম্পিয়ন বললেন, টিউবওয়েলে শিখেছি।

টিউবওয়েলে সাঁতার শিখলেন কীভাবে?

আমাকে কল চেপে বালতির পর বালতি পানি তুলতে হতো। সেটা করতে গিয়ে হাতের মাসল শক্ত হলো। সেখান থেকে সাঁতার।

আমার বেলাতেও কি তাই? হাঁটতে হাঁটতে পা শক্ত। যে কারণে দীর্ঘ সময় মাটিতে বসে থাকতে পারি। সমস্যা হয় না।

চেয়ার-টেবিলের যুগে আমি লিখি মেঝেতে বসে। তারাশঙ্করের আত্মজীবনীতে পড়েছি, তিনি মেঝেতে বসে টুলবক্সের মতো ছোট্ট জলচৌকিতে লিখতেন। জলচৌকির ডালা খোলা যেত। ডালার ভেতর থাকত কাগজ এবং কলম। আমার অনুপ্রেরণা তারাশঙ্কর না। চেয়ার-টেবিলে বসে লেখার সময় নিজেকে কেমন যেন অফিসের কর্মচারী মনে হয়। মেঝেতে ছোট্ট একটা জলচৌকি অনেক আপন, অনেক ঢিলেঢালা।

তবে কবি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার আপ্রাণ চেষ্টার সময় আমি অফিসার অফিসার ভঙ্গিতে সোফায় বসে লিখেছি। সেবছরই আমাদের নতুন সোফা কেনা হয়েছে। তখনো আমার নিজের লেখার জলচৌকি হয় নি। লেখালেখির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মেঝেতে বসে করার চিন্তাও মাথায় নেই।

দেড় থেকে দু’ঘণ্টা কঠিন পরিশ্রম করে আমি বারো লাইনের একটা কবিতা (না-কি পদ্য) প্রসব করে ফেললাম। ঘটনার সমাপ্তি এখানে হলেই ভালো হতো, তা হলো না। খাম ডাকটিকিট কিনে আনলাম। দৈনিক পাকিস্তান-এর মহিলা পাতার সম্পাদিকাকে একটা চিঠি লিখলাম—

প্রিয় আপা,
সালাম জানবেন। আমার নাম মমতাজ আহমেদ শিখু।
আমি একটি কবিতা পাঠালাম…

মমতাজ আহমেদ আমার ছোটবোনের নাম। সে তখন ক্লাস টেনে পড়ে। আমার ধারণা হয়েছিল, ক্লাস টেনে পড়া একটি কিশোরীর কবিতা হিসাবে আমার কবিতাটা চলতে পারে।

কী সর্বনাশ! পরের সপ্তাহেই কবিতাটা ছাপা হয়ে গেল। আমার যারা পাঠক, তারা কিন্তু জীবনের প্রথম লেখা কবিতাটার দু’টা লাইনের সঙ্গে পরিচিত, কারণ এই দুটা লাইন আমি আমার দ্বিতীয় উপন্যাস শঙ্খনীল কারাগার-এ ব্যবহার করেছি।

দিতে পারো একশ ফানুস এনে
আজন্ম সলজ্জ সাধ একদিন আকাশে কিছু ফানুস উড়াই।

প্রথম কবিতা ছাপা হয়ে যাওয়া কবির জন্যে বিরাট ব্যাপার। আমি সোফায় বসে কাব্যচর্চা করতেই থাকলাম এবং দৈনিক পাকিস্তান এ বেশ কিছু মমতাজ আহমেদ শিখুর কবিতা ছাপা হয়ে গেল। আল্লাহপাকের অসীম করুণা, কবিতা নামক সেইসব আবর্জনার এখন আর কোনো অস্তিত্ব নেই।

লেখায় সামান্য ভুল করলাম। মমতাজ আহমেদ শিখু নামে প্রকাশিত কবিতা আমার প্রথম কবিতা না। স্বনামে স্কুল-ম্যাগাজিনে প্রথম কবিতা ছাপা হয়েছে। ঈশ্বর-বিষয়ক অতি উচ্চশ্রেণীর ভাব-বিষয়ক ইংরেজি কবিতা। কবিতার নাম ‘God’। কবিতাটা ছাপা হয়েছে কবির ছবিসহ। ছবির নিচে লেখা Humayun Ahmed Class X Section B. কবিতার প্রথম কয়েকটি লাইন মনে আছে—

Let the earth move
Let the sun shine
Let them to prove
All are in a line

Move এর সঙ্গে prove এর অন্তর্মিল। Shine এর সঙ্গে line,

মাইকেল মধুসূদন হবার চেষ্টা থেকে যে ইংরেজি কবিতা রচিত হলো, তা কিন্তু না। স্কুল-ম্যাগাজিনের দায়িত্বে যে স্যার ছিলেন, তাঁকে আমি বাংলায় গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী সবই লিখে জমা দিয়েছি। প্রতিটি রচনা পড়েই তিনি বলেছেন, মোটামুটি অখাদ্য। যাই হোক, তোর যখন এত আগ্রহ, তুই বরং ইংরেজিতে যা ইচ্ছা লিখে নিয়ে আয়, ছেপে দেব। ইংরেজি সেকশানে কোনো লেখা জমা পড়ে নি।

স্কুল-ম্যাগাজিন প্রকাশিত হবার কয়েকদিন পরের ঘটনা। আমাদের ক্লাসের ইংরেজির শিক্ষক (স্যারের নাম মনে করতে পারছি না) এক কপি স্কুল-ম্যাগাজিন হাতে ক্লাসে ঢুকলেন, এবং আমাকে মহালজ্জায় ফেলে আমার লেখা কবিতা পড়ে শোনালেন। তিনি তার ছাত্রের ইংরেজি কাব্য প্রতিভায় মুগ্ধ। কবিতা পাঠ শেষ হবার পর তিনি বললেন, হুমায়ূন, তুই ইংরেজি কবিতা লেখার চর্চা ছাড়বি না। আমি দোয়া দিলাম। খাস দিলে দোয়া দিলাম।

আমাদের ইংরেজি স্যার নিশ্চয়ই এখন জান্নাতবাসী। ইংরেজি কাব্য রচনায় স্যারের দোয়া কাজে লাগে নি। কিন্তু পুরোপুরি ব্যর্থ হয় নি। ইংরেজি কবিতা না লিখলেও কিছু গদ্য তো লিখেছি! যদিও একজন গদ্যকার কবির পদধূলিরও নিচে থাকেন। সমারসেট মমের একটি উদ্ধৃতি দেই।

The crown of literature is poetry. It is its end and aim. It is the sublimest activity of the human mind. It is the achivement of beauty and delicacy. The writer of prose step aside when the poet passes.

শেষ লাইনটা ভয়াবহ—’একজন কবি যখন যাবেন তখন একজন গদ্যকার পথ ছেড়ে দিয়ে একপাশে দাঁড়াবেন।’

এত সম্মান কবিদের!

আমার কবিতা (?) রচনা চলতেই থাকল। আমার একজন সহপাঠী বন্ধু (এখনকার বিখ্যাত কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা) চটি একটা কবিতার সংকলন নিজ খরচায় বের করলেন। সেখানেও তিনি আমার একটা কবিতা (নিতান্তই দয়াবশত) ছাপলেন। কয়েকটা লাইন এখনো মনে আছে—

রঙিন সুতার ছিপ ফেলে এক প্রজাপতি ধরতে গিয়ে
উল্টে পড়ে এই উঠোনেই।
মাগো, তোমার খুন হয়েছে বিশ বছরের যুবক ছেলে…

আমার কাব্যরোগ পুরোপুরি কীভাবে সারল সেই গল্প বলি। আমার কাব্যরোগের প্রধান এবং একমাত্র চিকিৎসকের নাম হুমায়ূন কবির (কুসুমিত ইস্পাতের কবি, দেশ স্বাধীন হবার পর আততায়ীর হাতে নিহত)। আমি তার কাছে তিনটা টাটকা কবিতা নিয়ে গেছি। টাটকা, কারণ গত রাতেই লেখা। চব্বিশ ঘণ্টা পার হয় নি। বাসি হবার সময় পায় নি। কবিতা বাসি হতে বাহাত্তর ঘণ্টা লাগে।

অধ্যাপক হুমায়ূন কবির বললেন, কী চাই?

আমি অতি বিনয়ের সঙ্গে বললাম, তিনটা কবিতা নিয়ে এসেছি।

তাঁর কাছে কবিতা নিয়ে যাবার কারণ তখন বাংলা একাডেমী ঠিক করেছে গল্প, প্রবন্ধ এবং কবিতার তিনটি আলাদা সংকলন বের করবে। সংকলনগুলিতে প্রধান লেখকদের লেখা যেমন থাকবে, অপ্রধানদেরও থাকবে। অধ্যাপক হুমায়ূন কবির কবিতা সংকলনটির সঙ্গে যুক্ত। তার কৃপায় যদি বাংলা একাডেমী সংকলনে স্থান পাওয়া যায়। হুমায়ূন কবির বললেন, আপনার কবিতা কি কোথাও ছাপা হয়েছে?

আমি বললাম, জি-না।

ছন্দ সম্পর্কে কোনো জ্ঞান আছে?

জি-না।

অন্যের কবিতা পড়েন?

জি-না।

তিনবার জি-না শোনার পর তিনি ছোট্ট একটি বক্তৃতা দিলেন। বক্তৃতা শুনে মনে খুব কষ্ট পেলেও তার প্রতিটি কথাই ছিল সত্যি। অবশ্যই কবিতা কোনো সস্তা বাজারি বিষয় নয়। কবিতা লিখতে যে মেধা এবং মনন লাগে, তার জন্ম এই ভুবনে না। কবিতার ছন্দ শিখতেই লাগে দশ বছর।

আমি ভগ্নহৃদয়ে তিনটা টাটকা কবিতা নিয়ে মহসিন হলে ফিরলাম। তিনটা কবিতাই বহুখণ্ডে ছেঁড়া হলো। রোগমুক্তির আনন্দ নিয়ে আমি Chemistry-র বই খুলে বসলাম। পড়াশোনা ঠিকমতো করতে হবে, ভালো রেজাল্ট করতে হবে। একসময় সংসারের হাল ধরতে হবে। আমার মতো দরিদ্র পরিবারের একটি ছেলের মহান কাব্যরোগ মানায় না। আমি কবিতা লেখা পুরোপুরি ছেড়ে দিলাম।

‘বলপয়েন্ট’-এর প্রথম কিস্তি এই পর্যন্ত লিখেছি। এইটুকুই ছাপা হবার কথা। পড়তে দিয়েছি শাওনকে। সে বলল, তুমি তো ভুল কথা লিখেছ। তুমি গদ্যলেখক সেটা ঠিক, কিন্তু সারাজীবনই তো প্রচুর কবিতা লিখেছ, গান লিখেছ।

আমি বললাম, এইসব ফালতু ফরমায়েশি জিনিস।

শাওন বলল, আমার সঙ্গে পরিচয়ের সময় প্রায়ই আমাকে চার লাইন, ছয় লাইনের কবিতা লিখে পাঠাতে। সেগুলি তো ফালতু না।

আমি বললাম, সেগুলি তোমাকে উদ্দেশ করে লেখা বলেই তোমার কাছে ফালতু কখনোই মনে হবে না। আসলে ফালতু।

শাওন স্যুটকেস খুলে একটা চিরকুট বের করে বলল, এখানের আTটা লাইন কি ফালতু?

আমি লাইনগুলি হুবহু তুলে দিলাম। পাঠক বিচার করবেন।

আমাকে নিয়ে নানা গল্প আছে
সেই গল্পে আছে একটা ফাঁকি
বিরাট একটা বৃত্ত এঁকে নিয়ে
ভেতরে নাকি আমি বসে থাকি।
কেউ জানে না শাওন, তোমাকে বলি
বৃত্ত আমার মজার একটা খেলা
বৃত্ত-কেন্দ্রে কেউ নেই, কেউ নেই
আমি বাস করি বৃত্তের বাইরেই।

০২.

You can divorce your spouse, you can fire your secretary, abandon your children. But they remain your coauthors forever.
–Ellen Goodman

স্যার, আপনি প্রথম লেখালেখি শুরু করেন কখন?

যখন আমি ক্লাস ওয়ানে পড়ি তখন অ আ লেখা শুরু করি।

এই লেখার কথা বলছি না স্যার। ক্রিয়েটিভ রাইটিং।

ক্রিয়েটিভ রাইটিংও ক্লাস ওয়ানেই শুরু করি। আমি ‘ক’ লিখতাম উল্টো করে। দেখতে অনেকটা ‘ঘ’য়ের মতো। একে নিশ্চয়ই তুমি ক্রিয়েটিভ রাইটিং বলবে!

স্যার, প্রথম যে গল্প লিখেছেন সেটার কথা বলুন।

আমার প্রথম লেখা গল্পটা অন্যের লেখা।

বুঝতে পারছি না। একটু যদি বুঝিয়ে বলেন।

নিজের নামে চিটাগাং কলেজিয়েট স্কুলের ম্যাগাজিনে যে গল্প ছাপা হয়েছিল, সেটা আমার বাবার লেখা।

ওনার লেখা গল্প চুরি করে আপনি স্কুল ম্যাগাজিনে দিয়েছেন!

তোমার প্রশ্নের জবাব আর দিতে ইচ্ছা করছে না। এখন বিদায়!

তাহলে আমি কী লিখব?

তোমার যা ইচ্ছা লেখো।

কথোপকথন হচ্ছে আমার সঙ্গে মাহফুজ আহমেদের। সে তখনো বিখ্যাত নায়ক হয় নি। পূর্ণিমা নামের একটা পত্রিকায় কাজ করত। হঠাৎ তার ইচ্ছা হলো ‘এক হাজার একটি প্রশ্নে হুমায়ুন আহমেদ’ নামে বই লিখবে। আমার শহীদুল্লাহ হলের বাসায় রোজ অসময়ে এসে বসে থাকে। প্রশ্নে প্রশ্নে মহাবিরক্ত করে। শেষের দিকে তাকে আমি বললাম, একটা কাজ কর, নিজেই প্রশ্ন করে নিজেই উত্তরগুলো দিয়ে দাও। আমি কিছুই বলব না। মাহফুজ আহমেদ নিষ্ঠার সঙ্গে এই কাজটা করে বই বের করে ফেলল। বইয়ের কয়েকটা এডিশনও হয়ে গেল।

মাহফুজকে আমার প্রথম লেখা গল্পের ইতিহাস বলা হয় নি।

এখন বলি। পড়ি ক্লাস সেভেনে, স্কুল-ম্যাগাজিনে গল্প দিতে হবে। একটা ভূতের গল্প লিখেছি। বাবা বললেন, দেখি কী লিখেছিস।

আমি বাবার হাতে গল্প দিলাম। তিনি বললেন, অনেক কারেকশন লাগবে। কলম দে।

কলম দিলাম। বাবা গল্প কাটাকাটি করে ছেঁড়াবেড়া করে দিয়ে বললেন, কপি করে আন।

আমি কপি করে তার কাছে দিলাম তিনি আবারো শুরু করলেন কাটাকুটি। তৃতীয় দফায় কাটাকুটির পর যা অবশিষ্ট রইল, সেটা আর যাই হোক আমার গল্প না। আমার গল্পে একজন বুড়ো মানুষের হুঁকা টানার কথা ছিল। সেখানে কলকের বিষয়ে কোনো কথা নেই। বাবা কলকের দীর্ঘ বর্ণনা দিলেন। তার দিয়ে মোড়া, কোণ সামান্য ভাঙা ইত্যাদি। আমি সেই গল্পই জমা দিলাম। গল্প ছাপা হলো। বাবা পুত্র-প্রতিভায় মুগ্ধ হলেন। অফিসে স্কুল-ম্যাগাজিন নিয়ে যান। কলিগদেরকে ছেলের গল্প পড়ে শুনিয়ে নিজেই বলেন–অসাধারণ!

আমার মার গল্প লেখার শখ ছিল। তার কয়েকটি গল্প আল ইসলাহ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। সমস্যা একটাই, সব গল্পই বাবা এমনভাবে কাটাকুটি করেছেন যে, গল্পগুলি মূলত তাঁরই হয়েছে। মার গল্প হয় নি।

কিছুদিন আগে আমার মা’র আত্মজীবনীমূলক একটি রচনা জীবন যেখানে যেমন সময় প্রকাশন প্রকাশ করেছে। বইটির সাতটি মুদ্রণও হয়েছে। বাবা বেঁচে থাকলে কাটাকুটির পর এই বইয়ের কী গতি হতো কে জানে।

সাহিত্য কী হবে, কেমন হবে, এই বিষয়ে বাবার নিজস্ব ধারণা ছিল। তাঁর কাছে সাহিত্য কঠিন সাধনা এবং কঠিন পরিশ্রমের বিষয়। সঙ্গীতশিল্পীকে যেমন রোজ রেয়াজ করতে হয়, যে সাহিত্য করবে তাকেও রোজ রেয়াজ করতে হবে। এই রেয়াজ হচ্ছে, কবিতা মুখস্থ করতে হবে। বাবা গীতাঞ্জলি থেকে বেছে তার পুত্রকন্যাদের কবিতা ঠিক করে দিতেন। এইসব কবিতা মুখস্থ করে তাঁকে শোনাতে হবে। জাফর ইকবালের ভাগে পড়ল ‘প্রশ্ন’ কবিতা। আমার ছোটবোনের ভাগে পড়ল—‘আমি চঞ্চল হে সুদূরের পিয়াসী’। আমি যেহেতু বড় ছেলে, আমার ভাগে পড়ল—-‘এবার ফেরাও মোরে’, ১২৮ লাইনের একটা কবিতা। কবিতাটা বিএ ক্লাসে তাঁর পাঠ্য ছিল। খুবই প্রিয় কবিতা।

আমার দুই ভাইবোনই মেধাবী। তারা দ্রুত কবিতা মুখস্থ করে বাবাকে শুনিয়ে এক আনা করে পুরস্কার পেল। আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল, অতি কঠিন এই কবিতা কিছুতেই মুখস্থ হয় না। আমার বয়স তখন কত? নয় বছর, ক্লাস ফোরে পড়ি।

রবীন্দ্রনাথ আমার জীবনে বিভীষিকার মতো উপস্থিত হলেন। এই বিশেষ কবিতাটি তিনি কেন লিখেছেন? এর অর্থ কী?–কিছুই জানি না। কবিতা মুখস্থ করার চেষ্টা করি। কোনো লাভ হয় না। সব জট পাকিয়ে যায়।

বার্ষিক পরীক্ষার পর স্কুলে অনুষ্ঠান হয়। সেইসব অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া আমাদের ভাইবোনদের জন্যে পিতৃআদেশে বাধ্যতামূলক। আমাকে কবিতা আবৃত্তিতে নাম দিতে হলো। কবিতার নাম ‘এবার ফেরাও মোরে’। কবি শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কী সর্বনাশ!

কবিতা আবৃত্তির সময় উপস্থিত হলো। আমাকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো। দর্শকের সারিতে হাসিমুখে আমার বাবা উপস্থিত। পুত্র-প্রতিভায় মুগ্ধ হবার জন্য তৈরি।

আমি কবিতার নাম এবং কবির নাম বলে মুখ ভোঁতা করে দাঁড়িয়ে আছি। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি। একটি লাইনও মনে পড়ছে না। কেঁদে ফেলা ঠিক হবে কি-না তাও বুঝতে পারছি না। হঠাৎ স্পষ্ট শুনলাম আমার কানের কাছে কে যেন শান্ত গলায় বলল, ‘সংসারে সবাই যবে সারাক্ষণ শতকর্মে রত’।

আরে এটাই তো কবিতার প্রথম লাইন। আমি গড়গড় করে বলে যাচ্ছি। যেখানেই আটকানোর আশঙ্কা সেখানেই কেউ একজন বলে দিচ্ছে।

বালক বয়সে ব্যাপারটা অতি বিস্ময়কর মনে হয়েছিল। এখন জানি এটা মস্তিষ্কের একটা খেলা। পুরো কবিতাটাই অবচেতন মনে জমা করা আছে। অবচেতন মস্তিষ্ক চেতন মস্তিষ্ককে সময়মতো তথ্য পৌঁছে দিচ্ছে। প্রকৃতি রহস্যময় আচরণ করলেও প্রকৃতি রহস্য পছন্দ করে না।

বালকের মুখে অতি দীর্ঘ এই কবিতায় আমাদের হেড স্যার মুগ্ধ হয়ে একটা বিশেষ পুরস্কার ঘোষণা করলেন। আমার হাতে ঢাউস এক বই ধরিয়ে দিলেন। খুলে দেখি এ টি দেবের ইংলিশ টু বেঙ্গলি ডিকশনারি। আমার চোখে পানি আসার উপক্রম হলো। ডিকশনারি দিয়ে আমি কী করব? অন্যরা কত সুন্দর সুন্দর পুরস্কার পেয়েছে—গল্পের বই, থালাবাটি, চায়ের কাপ। আর আমার হাতে কিনা ডিকশনারি?

রবীন্দ্রনাথ আরো একবার আমার ঘাড়ে ভর করলেন। আমি তখন চিটাগাং কলেজিয়েট স্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়ি। স্কুলে বড় করে অনুষ্ঠান হবে। স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন। সাজ সাজ রব। অনুষ্ঠান পরিচালনা করছেন হরলাল রায় স্যার। তিনি আমাকে ডেকে বললেন, তুই রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা আবৃত্তি করবি। আজি হতে শতবর্ষ পরে। কবিতা মুখস্থ করে আয়, কীভাবে আবৃত্তি করতে হবে আমি শিখিয়ে দেব।

কবিতা মুখস্থ হয়ে গেল। স্যার আবৃত্তি শিখিয়ে দিচ্ছেন। শিক্ষামন্ত্রী যেখানে বসে থাকবেন সেদিকে আঙুল তুলে বলবি ‘কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি?’ দুই হাত অঞ্জলির মতো করে বলবি ‘পারিব কি পাঠাইতে তোমাদের করে?’ যে জায়গায় আছে—‘আজিকার কোনো ফুল’ সেখানে আঙুল এরকম করে একটা মুদ্রা করবি। এই মুদ্রার নাম পদ্মমুদ্রা (শাওন বলল, পদ্মমুদ্রা বলে কোনো মুদ্রা নেই। আলাপদ্ম মুদ্রা আছে। আমার ধারণা আলাপদ্মই বাংলায় পদ্ম)।

আমার কাছে আবৃত্তির পুরো বিষয়টাই অস্বাভাবিক লাগল। হরলাল রায় স্যারকে এটা বলার সাহস হলো না।

সৌভাগ্যের বিষয় শিক্ষামন্ত্রী এলেন না। আমাদের আয়োজন জৌলুসহীন হয়ে গেল। অনুষ্ঠানের রাতে স্টেজে উঠে দেখি বাবা এসেছেন। পুত্রের প্রতিভা দেখার জন্যে গভীর আগ্রহ নিয়ে বসে আছেন। শিক্ষামন্ত্রী যেহেতু নেই আমি বাবার দিকে আঙুল তুলে বললাম, ‘কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি?’ বাবা নড়েচড়ে বসলেন।

বাবা বাসায় ফিরে মাকে বললেন, তোমার বড় ছেলে এমন সুন্দর কবিতা আবৃত্তি করেছে, ওকে পুরস্কার হিসাবে দশটা টাকা দিয়ে দাও। সংসার খরচের সব টাকা থাকে মা’র কাছে। টাকা দিতে হলে তাকেই দিতে হবে। দশ টাকা তখন অনেক টাকা। আমি দীর্ঘদিন ঘ্যানঘ্যান করার পর মা’র কাছ থেকে দু’টাকা আদায় করতে পারলাম। সেই টাকায় সঙ্গে সঙ্গে চারটা স্বপন কুমার সিরিজের বই কিনে আনলাম। প্রতিটি বইয়ের দাম আট আনা। এই প্রথম রবীন্দ্রনাথের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা বোধ করলাম।

এক যুগ আগে কী একটা কাজে চিটাগাং গিয়েছি। খোঁজ নিয়ে জানলাম হরলাল রায় স্যার জীবিত। রিটায়ার করেছেন। শরীর দুর্বল। দিনরাত শুয়েই থাকেন।

ঠিকানা জোগাড় করে তাকে দেখতে গেলাম। পা স্পর্শ করে বললাম, স্যার আমি হুমায়ূন। স্যার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তুই হুমায়ূন না রে ব্যাটা। তুই হুমায়ূন আহমেদ। বলেই হৈচৈ শুরু করলেন, কে এসেছে দেখ। কে এসেছে দেখ। সঙ্গে সঙ্গে আমার চোখে পানি এসে গেল। মনে হলো আমার মানবজন্ম সার্থক। (আমি অকৃতী অধম বলেও তো কিছু কম করে মোরে দাও নি। যা দিয়েছ তারই অযোগ্য ভাবিয়া কেড়েও তো কিছু নাও নি। )

পৃথিবীতে কিছু ব্যাধি আছে যার ওষুধ নেই। যেমন ক্যানসার, পাঠব্যাধি। পাঠব্যাধিতে আক্রান্তজনকে কিছু-না-কিছু পড়তেই হবে। পড়ার কিছু না থাকলে মনে হবে, মরে যাই। অতি অল্পবয়সে আমি এমন এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলাম। প্রচণ্ড পড়ার ক্ষুধা। পড়ার বই নেই। বাবার সমস্ত বই তালাবন্ধ। কারণ সবই বড়দের বই। পড়ার বয়স হয় নি।

আমাদের শৈশবে পড়ার বইয়ের বাইরের সব বইয়ের সাধারণ নাম আউটবুক। ছাত্রদের জন্যে আউট বুক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারণ আউট বুক দুটো কাজ করে—

সময় হরণ করে। চরিত্র হরণ করে।

.

আমরা তখন থাকি সিলেটের মীরাবাজারে। আমাদের সঙ্গে এক চাচা এবং এক মামাও থাকেন। তারা সিলেট MC কলেজের ছাত্র। তাদের প্রধান কাজ প্রতি বছর ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেওয়া এবং ফেল করা। মাঝে মাঝে তারা গল্প উপন্যাসের বই নিয়ে আসেন এবং এমন এমন জায়গায় লুকিয়ে রাখেন যে, খুঁজে বের করতে শার্লক হোমস লাগে।

একদিন খুঁজে পেয়ে গেলাম। তারা বই লুকিয়ে রাখেন বালিশের ওয়ারের ভেতর। একদিন সেখান থেকে একটা বই উদ্ধার করলাম। বইয়ের নাম দুটি বৃন্তে একই ফুল। মলাটে গাছের দুই শাখায় নয়নতারা ফুলের মতো ফুল। ফুলের ভেতরে দু’টা মেয়ের মুখ। খাটের নিচে বসে লুকিয়ে বই পড়ে ফেললাম। কাহিনী হচ্ছে, দুই বোন একই সঙ্গে এফ এ ক্লাসে পড়ছে এমন একটি ছেলের প্রেমে পড়েছে। দুটি মেয়ের চোখেই বিজলি জ্বলে। বিজলি একটা ভয়াবহ জিনিস। বিজলির পরপরই বজ্রপাত। এই বিজলি মেয়ে দুটির চোখে কেন জ্বলে কিছুই। বুঝলাম না।

এ ছাড়াও ব্যাপার আছে, মেয়ে দুটির বুকে বুনোফুল প্রস্ফুটিত হবার জন্যে অপেক্ষায়। বুকে ফুল কীভাবে ফুটবে সেটা আরেক রহস্য।

খাটের নিচে বসে আমি নিষিদ্ধ বই পড়ছি, খবরটা প্রকাশিত হয়ে পড়ল। মা তালপাতার পাখা দিয়ে মেরে কঠিন শাস্তি দিলেন। আমার এই গুরুতর অপরাধ উচ্চ আদালতে (বাবার কাছে) পেশ করলেন। বাবা তার পরদিনই আমাকে কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদে নিয়ে গেলেন। লাইব্রেরির সদস্য করে দিলেন। আমি নিশ্চিত ছিলাম সেই বিশাল লাইব্রেরির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। হঠাৎ প্রকাণ্ড একটা জানালা আমার সামনে খুলে গেল। জানালা দিয়ে আসা অলৌকিক আলো আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল।

০৩.

Everyone who works in the domain of fiction is a bit crazy. The problem is to render this craziness interesting.
–Francois Truffaut.

‘সুনীল সাগর’ বাক্যটা সুন্দর। ‘স’-এর অনুপ্রাস আছে। বাক্যের দু’টা শব্দই তিন অক্ষরের বলে প্রচ্ছন্ন ছন্দের দোলা আছে। বাক্যটি সাগরের গুণ প্রকাশ করছে। ‘সুনিলিত সাগরিত’ বাক্যটায় কী বোঝাচ্ছে। সম্পূর্ণ অর্থহীন একটা বাক্য না? বছর ত্রিশ আগে আমরা ঠিক করলাম, একটা পারিবারিক দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করব। দেয়াল পত্রিকার নাম হবে ‘সুনীল সাগর’। আমি সেই নাম পাল্টে নাম দিলাম ‘সুনিলিত সাগরিত’। সম্পূর্ণ অর্থহীন নাম।

আমি প্রধান সম্পাদক। জাফর ইকবাল, আহসান হাবীব ছিল পত্রিকার অঙ্গসজ্জার দায়িত্বে। পনেরো দিন পর পর ঢাউস এক কাগজে সবার লেখা ছাপা হতো। কেউ বাদ যেত না। সুনিলিত সাগরিত পত্রিকাটি আমাদের পারিবারিক ধারাবাহিক ইতিহাস। আমার নিজের লেখালেখির ইতিহাস। আমার দুই ভাইয়ের লেখালেখিরও ইতিহাস। দুই বোন সুফিয়া ও শিখুও ভালো লিখত। তারা কেন জানি এই পারিবারিক পত্রিকার বাইরে নিজেদের প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকল।

দেয়াল পত্রিকার প্রকাশনা অতি সঙ্গত কারণেই ছিল অনিয়মিত। একটা পর্যায়ে প্রকাশনা হয়ে দাঁড়াল পারিবারিক বিশেষ বিশেষ ঘটনানির্ভর। পরিবারের একজন সদস্যের বিয়ে হচ্ছে, সেই উপলক্ষে প্রকাশনা। কেউ প্রথমবারের মতো দেশের বাইরে যাচ্ছে বা কারো প্রথম সন্তানের জন্ম হচ্ছে, সেই উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা। সুনিলিত সাগরিতের সর্বশেষ সংখ্যাটি বের হয় আমার বড় মেয়ে নোভা। আহমেদের বিয়ে উপলক্ষে। পরিবারের বাইরের কারো লেখাই এখানে প্রকাশের নিয়ম নেই। কিন্তু আমার খুব ইচ্ছা ছিল ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নোভাকে আশীবাদ জানিয়ে যে চারটি লাইন লিখেছিলেন তা পত্রিকায় ঢোকানো। তা সম্ভব হয় নি। সংসার ছেড়ে বাইরে চলে আসার কারণে পত্রিকাটির ওপর আমার কোনো। নিয়ন্ত্রণ ছিল না। আমি নিজে যে লেখাটি লিখেছিলাম সেটিও প্রকাশ হবে কিনা তা নিয়েই শঙ্কিত ছিলাম।

আমি আমার বড় মেয়ের বিয়েতে বিশেষ কোনো উপহার দিতে চেয়েছিলাম। শাড়ি, গয়না, ফ্রিজ, টিভির বাইরে কিছু। কী দেয়া যায় কী দেয়া যায়? নোভার অতি প্রিয় লেখকের নাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। নোভার বিয়ের আসরে তার প্রিয় লেখককে উপস্থিত করলে কেমন হয়? এই উপহারটি হয়তো তার পছন্দ হবে।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং তার স্ত্রী স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়কে নিমন্ত্রণ জানালাম। তাদের বললাম, মেয়ের বিয়েতে gift হিসেবে তাদের প্রয়োজন। আমাকে অবাক করে দিয়ে দুজনেই চলে এলেন। এয়ারপোর্টে থেকে সরাসরি বিয়ের আসর বিডিআর-এর দরবার হলে উপস্থিত হলেন। নোভা তার বরকে নিয়ে স্টেজে বসে ছিল। বিয়ের এবং উৎসবের উত্তেজনায় সে খানিকটা দিশেহারা। আমি বললাম, মা, তোমার বিয়ের গিফট দেখে যাও। নোভা তার অতি প্রিয় লেখককে বিয়ের আসরে উপস্থিত দেখে চমকে উঠল।

পাঠক কি ধরতে পেরেছেন মানুষকে চমকে দেয়ার একটা প্রবণতা আমার মধ্যে আছে? সৃষ্টিশীল সমস্ত কর্মকাণ্ডে চমক একটি বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। আমরা কখন চমকাই? সচরাচর ঘটে না তা ঘটতে দেখলে চমকাই।

একজন Fiction writer চমকের ব্যাপারটি কিন্তু তার মাথায় রাখেন, কেউ অবচেতনভাবে এই কাজটি করেন, আবার কেউ সচেতনভাবেই করেন। যেমন জর্জ বার্নাড শ। লেখালেখির সময় সচেতন এবং অবচেতনভাবে অনেক কিছু করতে হয় বলেই এই কর্মটি অতীব জটিল।

Writing is a dog’s life, but the only life worth living.
–Gustave Flauvert.
লেখকের জীবন হলো কুকুরের জীবন, কিন্তু এই একমাত্র

অর্থবহ জীবন। অধ্যাপনা ছেড়ে আমি একসময় কুকুরের জীবন বেছে নেব তা কখনো ভাবি নি। এক দুপুরের কথা। বয়স উনিশ। মন আবেগে পূর্ণ। ইউনিভার্সিটি ছুটি হয়েছে। ছুটি কাটাতে বরিশালের পিরোজপুরে গিয়েছি। একগাদা chemistry বই নিয়ে গেছি। আগামীকাল থেকে পড়তে শুরু করব, এই ভেবে ভেবে সময় কাটাচ্ছি। বইয়ের পাতা খোলা হচ্ছে না। বিকালে কেমন যেন অস্থির লাগে। আমি হাঁটতে বের হই। হুলারহাটের দিকে এগুতে থাকি। প্রথমেই একটা কবরখানা পড়ে। গাছপালায় ঢাকা এমন সুন্দর একটা জায়গা। একদিন কবরখানার ভেতরে ঢুকলাম। অবাক কাণ্ড, কবরখানার ভেতর টলটলে পানির ছোট্ট একটা পুকুর। পুকুরের পাশে শ্যাওলা ধরা এক কামরার মসজিদ ভাঙা ঘাট। ভাঙা ঘাটে অতি বৃদ্ধ একজন (সম্ভবত মসজিদের ইমাম, কবরখানার কেয়ারটেকার) আমাকে দেখে বললেন, কী চান বাবা।

আমি বললাম, কিছু চাই না।

কবরখানায় ঘুরতেছেন কেন?

বেড়াচ্ছি।

বাবা, এইটা কি কোনো বেড়ানোর জায়গা? আছরের ওয়াক্ত হয়েছে, আসেন নামাজ পড়ি।

আমি বললাম, আমার অজু নাই।

পুকুরে পানি আছে। অজু করেন।

বৃদ্ধ কঠিন চোখে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। একবার ইচ্ছা করল দৌড়ে পালিয়ে যাই। কেন জানি সাহসে কুলাল না। বৃদ্ধ অজু করে উঠে দাঁড়িয়েছেন। অপেক্ষা করছেন আমার জন্যে।

অজু কীভাবে করতে হয় জানেন?

জানি।

অজুর দোয়া জানেন?

জি-না।

থাক, দোয়া লাগবে না। অজু করে আসেন। একত্রে নামাজ পড়ি।

আমি অজু করলাম এবং বৃদ্ধকে নিয়ে অন্ধকার মসজিদে ঢুকলাম। আসরের নামাজের দোয়া মনে মনে পড়তে হয়। বৃদ্ধ কিন্তু শব্দ করে পড়ছেন। সূরা ফাতিহার পর তিনি অতি দীর্ঘ একটা সূরা পাঠ করতে শুরু করলেন। ভয়ে আমি অস্থির হয়ে গেলাম। দ্রুত অন্ধকার নামছে। চারদিকে কবর। পুকুরের পানিতে কেউ সাঁতরাচ্ছে এমন শব্দ হচ্ছে। নামাজের শেষে তিনি দীর্ঘ দোয়ায় বসলেন। এই দোয়া কোনোদিন শেষ হবে আমার এরকম মনে হলো না। নামাজে সালাম ফেরানোর একটা ব্যাপার আছে। একবার ডানে একবার বামে সালাম দিতে হয়। এই অতি বৃদ্ধ মাওলানা দোয়ার মধ্যেও কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে দিয়ে সালাম ফেরাচ্ছেন। পাগল না তো?

ঠিক মাগরেবের আগে আগে বৃদ্ধ দোয়া শেষ করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, যান বাড়িত যান।

আমি বললাম, আপনি একা একা এখানে থাকেন?

হুঁ।

একাই নামাজ পড়েন?

বৃদ্ধ বললেন, একাই নামাজ পড়ি। তবে মাগরেব এবং এশার ওয়াক্তে অনেক জিন আমার সঙ্গে নামাজ পড়ে। সূরা পাঠে ভুল করলে তারা লোকমা দেয়।

আমি দ্রুত বের হয়ে এলাম। মাগরেবের ওয়াক্তের বাকি নাই। জিনরা সম্ভবত আসতে শুরু করেছে।

আমার বৈকালিক ভ্রমণে পিরোজপুর গোরস্থান একটি বিশেষ জায়গা দখল করে ফেলল। প্রায়ই সেখানে যাই, কবরের গায়ে লেখা নামগুলি পড়ি। বৃদ্ধ কেয়ারটেকারকে দেখি কবর পরিষ্কার করছেন। ঝোপঝাড় কাটছেন। তিনি আর কখনো আমাকে নামাজ পড়তে ডাকেন নি। তাঁর সঙ্গে আমার কথাবার্তা তেমন হতো না। একদিন শুধু বললেন, আপনার কোনো আত্মীয়স্বজন কি এখানে আছেন।

আমি বললাম, না।

তাহলে রোজ আসেন কেন?

আমি চুপ করে রইলাম। জবাব দিতে পারলাম না। বৃদ্ধ বিড়বিড় করে বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাপাকের কোনো ইশারা আছে বইল্যাই আপনে আসেন।

জানি না কাকতালীয় ব্যাপার কি-না, মিলিটারির হাতে নিহত আমার বাবার কবর হয় এই পিরোজপুরের গোরস্থানেই।

কবরস্থান-বিষয়ক অংশটি বিস্তারিত লেখার একটা কারণ আছে। আমি একদিন কবরস্থান থেকে ফিরেই প্রথম উপন্যাস লেখায় হাত দিই। সন্ধ্যাবেলা আয়োজন করে Chemistry-র বই বের করে পড়তে বসি। খাতায় লেখি—The term ‘macromolecule’ was first suggested by Staudinger.

এইটুকু লিখেই পরের লাইনে লিখলাম বাস থেকে নেমে হকচকিয়ে গেলাম।

Macromolecule-এর সঙ্গে বাসের কোনোই সম্পর্ক নেই। তারপরেও কেন লিখলাম!

বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বাসার সামনে বিশাল পুকুর। পুকুর থেকে ঝুপ ঝুপ বৃষ্টির শব্দ আসছে। পিরোজপুর শহরে বৃষ্টি হওয়া মানেই কারেন্ট চলে যাওয়া। আমি সিরিয়াসলি পড়ছি ভেবেই আমার সামনে হারিকেন দেয়া হয়েছে। আমার মাথার ভেতর একের পর এক লাইন আসছে। এক ধরনের অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে আমি লিখতে শুরু করেছি আমার প্রথম উপন্যাস—শঙ্খনীল কারাগার।

বৃষ্টিতে ভেসে গেছে সব। রাস্তায় পানির ধারা স্রোত। লোকজন চলাচল করছে না, লাইটপোস্টের বাতি নিবে আছে। অথচ দশ মিনিট আগেও যেখানে ছিলাম সেখানে বৃষ্টির নামগন্ধ নেই। শুকনা খটখট করছে চারদিক। কেমন অবাক লাগে ভাবতে, বৃষ্টি এসেছে, ঝুপ ঝুপ করে একটা ছোট্ট জায়গা ভিজিয়ে চলে গেছে। আর এতেই আশৈশব পরিচিত এ অঞ্চল কেমন ভৌতিক লাগছে। হাঁটতে গা ছমছম করে।

শঙ্খনীল কারাগার আমার প্রথম লেখা উপন্যাস, যদিও প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস নন্দিত নরকে। আমার পরম সৌভাগ্য, আমার বাবা শঙখনীল কারাগার উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি পড়ে যেতে পেরেছেন। সেই গল্প আরেকদিন করব।

০৪.

উনিশ বছর বয়সের অনেক তরুণ-তরুণী উপন্যাস লিখেছে। এটা এমন কোনো উল্লেখযোগ্য ব্যাপার না। যেটা উল্লেখ করার মতো সেটা হচ্ছে, আমি লিখেছি খুব দ্রুত। তিন রাতের বেশি সময় লেগেছে বলে আমার মনে হয় না। উপন্যাস শেষ করেছি মধ্যরাতে। শেষ করার পর পর মনে হয়েছে–ইশ, কাউকে যদি পড়াতে পারতাম! এমন সুন্দর একটা গল্প। কেউ জানবে না?

সুন্দর একটা গল্প বলেছি এটা বুঝতে পারছিলাম। লেখার সময় প্রতিটি চরিত্র চোখের সামনে ভাসছিল। রাবেয়া আপা অনেকবার আমার সামনে দিয়ে হেঁটে গেছেন, প্রতিবারই তার কাঁচের চুড়ির শব্দ শুনেছি। কিটকি গায়ে চমৎকার সেন্ট মাখে। যতবার কিটকির কথা লিখেছি, ততবারই সেন্টের গন্ধ পেয়েছি। উপন্যাসের কিছু কিছু জায়গা লেখার সময় টপটপ করে চোখ দিয়ে পানি পড়েছে।

গল্প ভালো লিখেছি বুঝতে পারছি, কিন্তু উপন্যাস কি হয়েছে? উপন্যাস লেখার নিশ্চয়ই অনেক নিয়মকানুন আছে। আমি তো কিছুই জানি না।

উপন্যাস লেখার বিষয়ে সমারসেট মম বলেছেন—There are three rules for writing the novel. Unfortunately no one knows what they are.

তিন মাসের জন্য লেখালেখি শেখার একটা স্কুলে আমি ক্লাস করেছিলাম। আমার আগে সেই স্কুলে পশ্চিমবঙ্গের আরেক ঔপন্যাসিকও ক্লাস করেছেন। তাঁর নাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। স্কুলটা হলো আমেরিকার আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ক্রিয়েটিভ রাইটিং ফ্যাকাল্টি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সেই স্কুল থেকে কিছু শিখতে পেরেছিলেন কি-না আমি জানি না। আমি কিছুই শিখতে পারি নি।

মনে আছে একদিন আমাদের শিক্ষক Idea বিষয়ে এক ঘণ্টার ক্লাস নিলেন। তিনি বললেন, কীভাবে Idea লালন করতে হয়। Idea-র পূর্ণতার জন্য সময় দিতে হয়।

তারপর idea-কে প্রকাশের উপায়গুলো নিয়ে ভাবতে হয়।

আমি মহাবিরক্ত হয়ে উসখুস করছি। শিক্ষকের সেটা চোখ এড়াল না। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ডক্টর আহমেদ (সব ছাত্রের নাম তিনি জানতেন), আইডিয়া বিষয়ে তোমার কি কিছু বলার আছে?

আমি উঠে দাঁড়ালাম এবং পরিষ্কার গলায় বাংলায় বললাম,

শিল্পীর শিরে কিলবিল করে আইডিয়া
উইপোকা বলে, চল ভাই তারে খাই গিয়া।

শিক্ষক বললেন, What does it mean?

আমি ইংরেজিতে অনুবাদ করে তাকে শোনাব, উইপোকার ইংরেজি কিছুতেই মাথায় আসছে না। শেষটায় বললাম

Creative person’s head is full with ideas
Little bugs say, let us eat them.

তিনি হতাশ গলায় বললেন, এখনো বুঝতে পারছি না।

আমি বললাম, আইডিয়া হলো ক্ষুদ্র পোকাদের আহার। এর বেশি কিছু না।

পুরনো কথায় ফিরে যাই। প্রথম উপন্যাস ভূমিষ্ঠ হয়েছে। এখন কী করা যায়? আমি বাবার অফিসের ফাইলের নিচে গোপনে রেখে চলে এলাম। বাবা ফাইল দেখতে দেখতে পাণ্ডুলিপি পেয়ে যাবেন। এবং অবশ্যই আগ্রহ নিয়ে পড়বেন।

বাবার অফিস ছিল আমাদের বাসারই একটা কামরা। ফাইলপত্রে ঠাসা একটা ঘর। বাবার মাথার ওপর বিশাল এক টানা পখি। রশিদ নামের একজন ছিল সরকারি পাংখাপুলার। তার কাজ মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে আধো ঘুম আধো জাগরণ অবস্থায় যন্ত্রের মতো পাখার দড়ি টেনে যাওয়া। অয়োময় নাটক লেখার সময় আমি একটি পাংখাপুলারের চরিত্র এনেছিলাম। বাবার পাংখীপুলার রশিদের প্রচ্ছন্ন ছায়া হয়তো তার মধ্যে ছিল।

আমি রশিদকে গোপনে বলে এলাম, যদি দেখো বাবা ফাইল বাদ দিয়ে নীল রঙের একটা খাতা পড়তে শুরু করেছেন তাহলে আমাকে খুবর দেবে। রশিদ দাঁত বের করে বলল, নিশ্চিন্ত থাকেন।

টেনশান নিয়ে আমি অপেক্ষা করছি। রশিদ কোনো খবর দিচ্ছে না। দুপুরে খাবার সময় বাবাকে ভেতরে এসে খেতে বলা হলো। বাবা বললেন, দেরি হবে। এই সময় রশিদ এসে আমাকে চোখ টিপ দিয়ে বলল, নীল খাতা! আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল।

একসময় বাবা এসে গম্ভীর ভঙ্গিতে দুপুরের খাবার শেষ করলেন। আমার লেখা বিষয়ে কোনো কথা বললেন না। সন্ধ্যাবেলা মাগরেবের নামাজ শেষ করে মা’কে ডেকে বললেন, আল্লাহপাক তোমার বড় ছেলেকে লেখক বানিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। শুকুর আলহামদুলিল্লাহ।

আমার জন্য আরো বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। বাবা রাতে আমার হাতে একতোড়া কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এখানে একটা নাটক আছে। রেডিও নাটক। আমি লিখেছি। নাম—কত তারা আকাশে। ঢাকা বেতারের একজন। প্রডিউসারের বাড়ি পিরোজপুরে। তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন, নাটক ভালো হলে প্রচারের ব্যবস্থা করবেন। তুই নাটকটা পড়ে দেখ। কোনো পরিবর্তন লাগলে করে ফেলবি।

আমি মহানন্দে নাটক কাটাকাটি করতে লাগলাম। একসময় জিনিস যা দাঁড়াল, তাকে আর বাবার লেখা নাটক বলা যায় না। বাবা নাটক পড়ে বললেন, অসাধারণ জিনিস দাঁড় হয়েছে। নাটক জমা দেয়া হলো। প্রডিউসার সাহেব আশ্বাস দিলেন, প্রচার হবে, তবে দেরি হবে।

দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হবার কারণে সব এলোমেলো হয়ে গেল। পিতাপুত্রের যৌথ নাটক প্রচার হলো না।

ছুটি শেষ হয়ে গেল। আমি বাক্সভর্তি কেমিস্ট্রি বই নিয়ে ঢাকায় ফিরলাম। শঙ্খনীল কারাগারের পাণ্ডুলিপি ফেলে এলাম। পাণ্ডুলিপি সঙ্গে রাখার কিছু নেই। বই হিসাবে শঙ্খনীল কারাগার প্রকাশিত হবে, পাঠক পড়বে, কোনো একদিন বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় সেই উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র বানাবে। সেই চলচ্চিত্র দেশে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের সম্মান পাবে, মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে পাবে Honourable mention—এইসব কিছুই ঊনিশ বছরের যুবকটি জানত না।

স্বাধীনতার ত্রিশ বছর পর মা এবং ভাইবোনদের নিয়ে পিরোজপুরে বাবার কবর জিয়ারত করতে গেলাম। মা এবং ভাইবোনরা খুব কান্নাকাটি করল। অদ্ভুত কোনো কারণে আমার চোখে পানি এল না। তাদের বাসায় রেখে সন্ধ্যাবেলা আমি আবার কবরস্থানে গেলাম। আমার সঙ্গে দু’টা বই নন্দিত নরকে, তোমাদের জন্যে ভালোবাসা। নিতান্তই ছেলেমানুষের মতো বই দুটা কবরের ঝোপঝাড়ের ভেতর রেখে অনেকক্ষণ কাঁদলাম। মনে মনে বললাম, নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে রয়েছ নয়নে নয়নে।

বাবার কবরে শ্বেতপাথরে এই দু’টা লাইনই লেখা।

প্রায়ই ভাবি, আমার নিজের কবরে এপিটাফ হিসেবে কী লেখা থাকবে? লেখাটা কি আমিই লিখব? নাকি অন্য কেউ আমার হয়ে লিখে দেবে?

গায়ক আব্বাসউদ্দিনের কবর আজিমপুর গোরস্থানে। সেখানে এপিটাফ হিসাবে তার অতি বিখ্যাত গানের চরণ লেখা

বন্ধু কাজল ভ্রমরা রে
কোন দিন আসিবেন বন্ধু
কয়া কয়া যাও

যে ক’বার দেখেছি মনের ভেতরে গান গুনগুন করে উঠেছে।

এমন সুন্দর কোনো কিছু কেউ কি লিখবে আমার জন্য? কোনো পত্রিকা কি কোনো শোকগাথা প্রচার করবে? তারা কী লিখবে?

William Faulkner বলেছেন, একজন লেখকের obituary হওয়া উচিত এক লাইনের।

He wrote books, then he died.
মানুষটা বই লিখেছে, তারপর মারা গেছে।

বাহ্ চমৎকার। এর চেয়েও সুন্দর একটা কথা লিখি?

আমার প্রিয় লেখক Jorge Luis Borges বলেছেন—When writers die they become books, which is after all, not too bad an incarnation.
মৃত্যুর পর লেখকরা বই হয়ে যান।
এরচেয়ে ভালো আর কী হতে পারে?

পুনশ্চ : আমি যে পিতৃভক্ত ছেলে এই তথ্যটা নিশ্চয়ই ইতোমধ্যে পাঠকরা জেনেছেন। অতি সঙ্গত কারণে প্রশ্ন উঠতে পারে, এমন পিতৃভক্ত একজন ছেলে ত্রিশ বছর পর বাবার কবর দেখতে যায় কীভাবে? ঢাকা থেকে পিরোজপুর যেতে আট ঘণ্টা লাগে।

প্রশ্নটার জবাব আমার কাছে নেই।

সবার ব্যস্ততা। কেউ সময় বের করতে পারে না। কত কিছু। আমরা জটিল আধুনিক এক জগতে বাস করি।

তারপরেও ত্রিশ বছর পর হঠাৎ সবাইকে জড়ো করে কেন কবরস্থানে গেলাম গল্পটা বলা দরকার। এই গল্পে সামান্য Supernatural touch আছে।

বাংলাদেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে সবুজ সাথী নামের প্রেসক্রিপসন নাটক নিয়ে অনুষ্ঠান হচ্ছে। এই সিরিয়ালটির লেখক এবং পরিচালক যেহেতু আমি, আমাকেও প্রতিটি অনুষ্ঠানে থাকতে হচ্ছে। খুলনার অনুষ্ঠান শেষ করে আমরা যাচ্ছি বরিশালে। গাড়ি করে যাচ্ছি। আমার সঙ্গে আছেন আসাদুজ্জামান নূর, জাহিদ হাসান এবং অভিনেত্রী-গায়িকা শাওন। ত্রিশ বছর পর এই অঞ্চলে প্রথম যাত্রা। সবকিছু বদলে গেছে। আমি যাচ্ছি ঘুমুতে ঘুমুতে। হঠাৎ ঘুম ভাঙল। আমি প্রায় চেঁচিয়ে বললাম, ড্রাইভার সাহেব, গাড়ি থামান। গাড়ি থামান।

আসাদুজ্জামান নূর বললেন, সমস্যা কী, শরীর খারাপ লাগছে?

আমি বললাম, শরীর খারাপ না, তবে কেমন জানি লাগছে। মনে হচ্ছে আমি অতিপরিচিত জায়গায় এসেছি।

গাড়ি থামল। আমি ঘোরলাগা অবস্থায় গাড়ি থেকে নামলাম। কিছুই চিনতে পারছি না। খুলনা-বরিশাল হাইওয়ের একটি অংশে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। আমি বিব্রত ভঙ্গিতে বললাম, আমার কেন জানি মনে হচ্ছে খুব কাছে কোথাও আমার বাবার কবর।

জাহিদ বলল, কী বলেন হুমায়ূন ভাই?

শাওন বলল, উনি যখন বলছেন তখন একটু খুঁজে দেখলে হয়।

বেশি খোঁজাখুঁজি করতে হলো না। একজন বলল, সামান্য পেছনে গেলেই পিরোজপুর গোরস্থান। আমি সবাইকে নিয়ে গোরস্থানে ঢুকলাম। আমরা কবর জিয়ারত করলাম। শাওন বলল, আমি আমার জীবনে অতি রহস্যময় একটা ঘটনা দেখলাম। ছেলে পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে দেখে বাবা ছেলেকে ডেকে পাঠালেন।

সব ঘটনার পেছনেই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকে। আমার হঠাৎ ঘুম ভেঙে গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়ার পেছনেও নিশ্চয়ই কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে। থাকলেও আমি তা জানি না।

বরিশালের অনুষ্ঠান শেষ করে ঢাকায় ফিরেই আমি সব ভাইবোন এবং মাকে নিয়ে পিরোজপুর গোরস্থানে এসে উপস্থিত হলাম,

০৫.

When I’m writing I’m always aware that this friend is going to like this, or that another friend is going to like that paragraph or chapter, always thinking of specific people. In the end all books are written for your friends.
–Gabriel Garcia Marquoz

ঢাকা শহরে একজন ‘হন্টন পীর’ আছেন। তাঁর একমাত্র কাজ সারাদিন হাঁটা। একা হাঁটেন না। ভক্তদের নিয়ে হাঁটেন। একজন বাবার মাথায় ছাতা ধরে থাকে। একজনের হাতে থাকে পানির বোতল। অন্য একজনের হাতে কলার কাদি। বাবা খুব সম্ভব কলার ভক্ত। আমি বেশ কয়েকবার দূর থেকে এই হন্টন বাবাকে লক্ষ করেছি। একবার মিনিট পাঁচেক বাবার আশেপাশেই ছিলাম। উদ্দেশ্য বাবার ঘটনাটা কী জানা। বাবার জনৈক ভক্ত আমাকে চিনে ফেলে অবাক হয়ে বলল, আপনি বাবার কাছে কী চান? আমি বললাম, গল্প চাই!

আমি আমার যৌবনে হন্টন পীরের মতো একজনকে পেয়েছিলাম। আমরা দলবেঁধে তার পেছনে হাঁটতাম। তিনি যদি কিছু বলতেন মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। গভীর রাতে নীলক্ষেত এলাকায় তিনি হাঁটতে হাঁটতে আবেগে অধীর হয়ে দুই হাত তুলে চিৎকার করতেন। ‘আমার বাংলাদেশ! আমার বাংলাদেশ!’ আমরা গম্ভীর মুগ্ধতায় তার আবেগ এবং উচ্ছ্বাস দেখতাম। তাঁর নাম আহমদ ছফা। আমাদের সবার ছফা ভাই।

ছফা ভাই ছিলেন আমার Mentor. এই ইংরেজি শব্দটির সঠিক বাংলা নেই। Mentor এমন গুরু যার প্রধান চেষ্টা শিষ্যকে পথ দেখিয়ে উঁচুতে তোলা। ছফা ভাই শুধু যে একা আমার Mentor ছিলেন তা না, অনেকেরই ছিলেন।

দেশ সদ্য স্বাধীন হয়েছে। শিশু রাষ্ট্র জন্মের যন্ত্রণায় তখনো ছটফট করছে। আর ছফা ভাই ছটফট করছেন আবেগে এবং উত্তেজনায়। কত অদ্ভুত অদ্ভুত পরিকল্পনা তার মাথায়। দেশকে শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীতে এভারেস্ট শিখরের কাছাকাছি নিয়ে যেতে হবে। দেশ মেধা এবং মননে পৃথিবীর সব রাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাবে। ইত্যাদি।

ছফা ভাই এমন একজন মানুষ যিনি তার উত্তেজনা নিমিষে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারেন। আমরাও ছফা ভাইয়ের মতোই উত্তেজিত হই। কল্পনায়। ভাসে ভবিষ্যতের অপূর্ব বাংলাদেশ।

ছফা ভাই সাপ্তাহিক একটা পত্রিকা বের করে ফেললেন। নিজেই সম্পাদক, মুদ্রাকর এবং প্রধান লেখক। তিনি আমাকে ডেকে বললেন, গল্প লেখা শুরু করে দাও। রোজ রাতে একটা করে গল্প লিখতে হবে। আমার পত্রিকায় নিয়মিত গল্প ছাপা হবে। ছফা ভাইয়ের কথা মানেই আদেশ। আমি রাত জেগে গল্প লিখে ফেললাম। আজ আর সেই গল্পের নাম মনে নেই। গল্প কী লিখেছিলাম তাও মনে নেই। ছফা ভাইয়ের পত্রিকাটার কথাও মনে নেই। দুই-তিন সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার পর পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়। ছফা ভাই তখন দারুণ অর্থকষ্টে। থাকার জায়গা নেই। ক্ষীণ সম্ভাবনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলে সিট পাবেন। পাচ্ছেন না। একদিন আমি ছফা ভাইকে ভয়ে ভয়ে বললাম, হলে সিট পাওয়া পর্যন্ত আমাদের বাসায় কি থাকবেন?

আমার মা তখন বাবর রোডে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের স্ত্রী হিসাবে একটা বাড়ির দোতলাটা বরাদ্দ পেয়েছেন। সেখানে না আছে পানির ব্যবস্থা, না আছে কিছু। ছফা ভাই আমাদের সঙ্গে থাকতে রাজি হলেন। আমরা তাঁকে সবচেয়ে বড় কামরাটা ছেড়ে দিলাম। মা তার নিজের সন্তানদের যে মমতায় দেখেন, একই। মমতা ছফা ভাইয়ের দিকেও প্রসারিত করলেন।

ছফা ভাই বাইরে-বাইরেই থাকতেন, রাতে এসে শুধু ঘুমাতেন। বেশির ভাগ সময় বাইরে থেকে খেয়ে আসতেন। অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে যাওয়া পরিবারটির ওপর বাড়তি চাপ হয়তো দিতে চান নি।

প্রতিদিন বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ছফা ভাই কিছু সময় মা’র সঙ্গে কাটাতেন। গত রাতে যেসব স্বপ্ন দেখেছেন তা মাকে বলতেন। মার দায়িত্ব স্বপ্ন ব্যাখ্যা করা। আমার ধারণা, ছফা ভাই স্বপ্নগুলি বলতেন বানিয়ে বানিয়ে। স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চেয়ে মাকে খুশি করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। আমার এরকম ধারণা হওয়ার কারণ হলো, ছফা ভাইয়ের স্বপ্নগুলিতে ডিটেলের কাজ খুব বেশি থাকত। স্বপ্নে এত ডিটেল থাকে না। একটা স্বপ্ন বললেই পাঠক বুঝতে পারবেন

কাকিমা, কাল রাতে স্বপ্নে দেখলাম দুটা কাক। একটা বড় একটা ছোট। ছোট কাকটার একটা নখ নেই। তার স্বভাব চড়ুই পাখির মতো। তিড়িং বিড়িং করে সে শুধু লাফায়। বড়টা শান্ত স্বভাবের। সে একটু পর পর হাই তোলার মতো করে। তাদেরকে ধান দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা কেউ ধান খাচ্ছে না। ধানগুলি ঠোঁটে করে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিচ্ছে। এখন কাকিমা, বলুন, স্বপ্নটার অর্থ কী? আমি বিরাট চিন্তায় আছি।

বলতে ভুলে গেছি, আমার প্রথম উপন্যাস নন্দিত নরকে কিন্তু এর মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। ব্যবস্থা করে দিয়েছেন ছফা ভাই। খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানির খান সাহেবকে পাঠিয়ে এই কাজটা করা। তখন তিনি লেখক শিবির নামক সংগঠনের প্রধান। তিনি লেখক শিবির থেকে নন্দিত নরকে উপন্যাসকে বছরের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হিসাবে পুরস্কারও দিয়ে দিয়েছেন। আমি অতি তরুণ ঔপন্যাসিক। আমার ওপর ছফা ভাইয়ের অনেক আশা। তার ধারণী, আমি অনেকদূর যাব। তিনি চেষ্টা করছেন আমার অনেকদূর যাত্রার পথ যেন সুগম হয়।

ছফা ভাই ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলে সিট পেলেন। তিনি উঠে এলেন হোস্টেলে। আমি থাকি মুহসীন হলে। নিয়ম করে আমি এবং আমার বন্ধু আনিস সাবেত প্রতি রাতে তাঁর কাছে যাই। গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা হয়। আড্ডা মানে ছফা ভাই কথা বলেন, আমরা দুজন শুনি। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে কথা। তিনি মহাকবি গ্যাটের রচনার বাংলা অনুবাদে হাত দিয়েছেন। অনুবাদ পড়ে শোনান।

একবার তাঁর ঘরে গিয়ে দেখি, তিনি বিশাল এক বাদ্যযন্ত্র কিনেছেন। সেকেন্ডহ্যান্ড জিনিস। দেখতে নিচু আলমারির মতো। ছফা ভাই জানালেন, প্রতি রাতেই তাঁর মাথায় নানা ধরনের সুর আসছে। সুর ধরে রাখার জন্যই এই বাদ্যযন্ত্র।

আমি বললাম, ছফা ভাই! আপনি বাজাতে পারেন?

ছফা ভাই বললেন, অবশ্যই পারি।

তিনি বাদ্যযন্ত্রটার রিড টিপতে লাগলেন। বিচিত্র শব্দ হচ্ছে। তিনি পায়ে তাল দিচ্ছেন এবং মাথা নাড়ছেন।

এই সময় তিনি গান লিখতে শুরু করলেন। গান লিখে সঙ্গে সঙ্গে সুর দিয়ে দেন। আমি এবং আনিস সাবেত অবাক হয়ে সেই সঙ্গীত শুনি।

হঠাৎ একদিন শুনি ছফা ভাই দেশে নেই। গাদ্দাফির নিমন্ত্রণে লিবিয়া চলে গেছেন। লিবিয়ায় বেশ কিছুদিন কাটিয়ে দেশে ফিরলেন। তাঁর মাথায় রঙিন গোল টুপি। আমাদের জানালেন, গাদ্দাফি নিজের হাতে তার মাথায় এই টুপি পরিয়ে দিয়েছেন। তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে গাদ্দাফির গ্রিন বুক অনুবাদের। ছফা ভাইয়ের অনেক কথাই কল্পনারাজ্যের। তবে এই কথাটা হয়তো ঠিক। ছফা ভাইয়ের হাতে টাকাপয়সার নড়াচাড়া দেখা গেল। তিনি একটা প্রেস কিনে ফেললেন। কিছুদিনের মধ্যেই সেই প্রেস উঠেও গেল। ছফা ভাই কাঁধে একটা টিয়া পাখি নিয়ে ঘুরতে লাগলেন। তিনি নাকি টিয়া পাখির অনেক কথা বুঝতে পারেন।

একটা পর্যায়ে আমার ক্ষীণ সন্দেহ হওয়া শুরু হলো যে, তিনি যে জগতে বাস করেন তা সম্পূর্ণই তাঁর নিজের। বাস্তব জগৎ থেকে অনেকটা দূরের। তাঁর রিয়েলিটি এবং আমাদের রিয়েলিটি এক নয়।

কারো যখন মোহভঙ্গ হয় তখন অতি দ্রুতই হয়। আমি তার বলয় থেকে সরে গেলাম। আনিস সাবেত পিএইচডি করার জন্য আমেরিকা চলে গেলেন। ছফা ভাই তার জন্য নতুন বলয় তৈরি করলেন। তিনি শূন্যস্থান পছন্দ করেন না।

ছফা ভাইকে নিয়ে আমার অসংখ্য স্মৃতি আছে। তার ওপর দুশ’ পাতার একটা বই আমি অবশ্যই লিখতে পারি। এখানে একটি স্মৃতি উল্লেখ করছি। ১৯৮৫ বা ৮৬ সালের কথা। এতদিন লেখালেখির জগতে থেকেও ছফা ভাই বাংলা একাডেমী পুরস্কার পান নি। আমি পেয়েছি অথচ ছফা ভাই পান নি, খুবই লজ্জিত বোধ করি। কীভাবে কীভাবে আমি তখন বাংলা একাডেমীর কাউন্সিলারদের একজন। পুরস্কার কমিটিতে আছি। আমি জোরালোভাবে ছফা ভাইয়ের পুরস্কারের ব্যাপারটা বললাম। যথারীতি তা নাকচও হয়ে গেল। আমি ছফা ভাইয়ের জন্য সুপারিশ করেছি—এই খবর ছফা ভাইয়ের কানে পৌঁছল। তিনি আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি তার বাসায় উপস্থিত হলাম। তিনি বললেন, হুমায়ুন, আপনার এত বড় স্পর্ধা যে আপনি আমার জন্য সুপারিশ করেন!

আমি চেয়ারে বসেছিলাম। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে ক্ষমা প্রার্থনা করলাম।

ছফা ভাই বললেন, আমি বসতে না বলা পর্যন্ত এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকবেন।

আমি বললাম, জি আচ্ছা।

আপনি আর কখনোই আমার বাসায় আসবেন না।

আমি বললাম, জি আচ্ছা।

ছফা ভাইয়ের সঙ্গে এটাই সম্ভবত আমার শেষ দেখা। ভুল বললাম, আনিস সাবেত ক্যান্সারে মারা যাওয়ার সংবাদ দিতে আমি আরো একবার তাঁর কাছে গিয়েছিলাম। তিনি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকার পর ‘আনিসরে’ ‘আনিসরে’ বলে চিৎকার করে কাঁদলেন।

কান্না বন্ধ হবার সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাঁর নিজের ভুবনে ঢুকে গেলেন। চলে গেলেন রিয়েলিটির বাইরে। আনিস সাবেত ট্রাস্টি বোর্ড করতে হবে। সেই ট্রাস্টি দুস্থ লেখকদের বৃত্তি দেবে। দরিদ্র লেখকদের বই প্রকাশনার দায়িত্ব নেবে। ট্রাস্ট ফান্ড একটা আধুনিক স্কুল করবে টোকাইদের জন্য।

তিনি কাগজ-কলম নিয়ে বসে গেলেন ট্রাস্টি বোর্ডের পরিচালক কারা কারা থাকবেন তাদের নাম লেখার জন্য। ট্রাস্টি বোর্ডের নীতিমালাও লিখতে হবে। তাঁকে দারুণ উত্তেজিত মনে হলো। তিনি লিখছেন, আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছি অন্যভুবনের মানুষটিকে।

আমাকে নিয়ে ছফা ভাইয়ের অনেক স্বপ্ন ছিল। আমি তাঁর কোনোটাই পূরণ করতে পারি নি। এত মেধা আমার ছিল না। প্রতিটি মানুষের আলাদা আলাদা বৃত্ত থাকে। কেউ সেই বৃত্তের বাইরে যেতে পারে না। আমিও পারি নি। ছফা ভাই নিজেও পারেন নি। তাকে বন্দি থাকতে হয়েছে নিজের বৃত্তেই।

খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি

Why do people always expect authors to answer questions? I am an author because I want to ask questions. If I had answers I’d be a politician.
—Eugene Lonesco

খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানির মালিক খান সাহেব আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। তাকে যথেষ্ট বিরক্ত মনে হলো। তিনি নন্দিত নরকে উপন্যাসের প্রুফ আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, বই হোট হয়েছে। বড় করতে হবে।

আমি বললাম, আমার গল্পটাই তো এতটুকু।

খান সাহেব বললেন, উপন্যাস ফর্মা হিসেবে লিখতে হয়। ফর্মা বুঝেন তো? ষোল পৃষ্ঠায় এক ফর্মা। আপনি একটা উপন্যাস লিখলেন তিন ফর্মা নয় পৃষ্ঠা। বাকি সাত পৃষ্ঠায় আমি কী করব? কাগজ-কলম নিয়ে বসেন। এখানেই ঠিক করেন।

আমি বললাম, কোন জায়গাটা বড় করব বুঝতে পারছি না!

খান সাহেব বললেন, একটা কোর্ট সিন নিয়ে আসেন। উকিল মন্টুকে জেরা করছে এই রকম। এই, হুমায়ূন সাহেবকে কাগজ আর কলম দে।

আমি খান সাহেবের সামনেই ফর্মা মিলানোর জন্যে উপন্যাস বড় করতে শুরু করলাম। উত্তেজনায় শরীর কাঁপছে তাহলে সত্যি সত্যি আমার বই বের হচ্ছে?

বই বের হলো। দাম তিন টাকা। বইয়ের কভার আমার ছোটভাই জাফর ইকবাল এবং ভাস্কর শামীম শিকদার দুজনে মিলে করল। কয়েকজন মানুষ বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। কভার করার নিয়মকানুন (ব্লক পদ্ধতি) দুজনের কেউ জানে না। অতি অখাদ্য এক কভার হলো। মানুষগুলির একটা মুখেরও ব্লক ডিজাইন ঠিক হয় নি বলে নষ্ট হয়ে গেল।

খান ব্রাদার্স থেকে তখন সুন্দর সুন্দর কবিতার বই বের হচ্ছে। নির্মলেন্দু গুণের প্রেমাংশুর রক্ত চাই। কবি আবুল হাসানের রাজা যায় রাজা আসে। এইসব বইয়ের কভার করেছেন কভার ডিজাইনের গ্র্যান্ড মাস্টার কাইয়ুম চৌধুরী।

নন্দিত নরকে বের হবার ছয় মাস পর খান সাহেব ডেকে পাঠালেন। হতাশ গলায় বললেন, বই তো কিছুই বিক্রি হচ্ছে না। পুশ সেল করেন। বন্ধুবান্ধবের কাছে বেচেন।

আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, বইয়ের কভারটা কি চেঞ্জ করা যায়? কাইয়ুম চৌধুরীকে দিয়ে…।

আমাকে অবাক করে খান সাহেব ড্রয়ার থেকে দুশ’ টাকা বের করে আমার হাতে দিলেন এবং বললেন, টাকাটা কাইয়ুম সাহেবকে দিয়ে বইয়ের কভার নতুন করে করতে বলেন। উনি কভারের জন্য দুশ’ টাকা নেন।

শুরু হলো আমার অন্তহীন ঘোরাঘুরি। কাইয়ুম চৌধুরীর কাছে যাই, তিনি একটা তারিখে আসতে বলেন। সেই তারিখে যাই, তিনি আরেকটা তারিখ দেন। ধৈর্যে আমি রবার্ট ব্রুসকে হার মানালাম। হাঁটাহাঁটি করতে করতে আমার স্বাস্থ্য ভালো হয়ে গেল। কভারের দেখা নেই।

একদিন খান সাহেব বললেন, আমি যাব আপনার সঙ্গে। আমি অন্য এক সূত্রে তাকে চিনি। সেটা উল্লেখ করে যদি কিছু হয়। আপনি পুলাপান মানুষ বলে উনি আপনাকে পাত্তা দিচ্ছেন না। আমি একজন বয়স্ক মানুষ।

গেলাম খান সাহেবকে নিয়ে। ঘণ্টাখানিক বসে রইলাম। কাইয়ুম চৌধুরীর বসার ঘরে না। বসার ঘরের বাইরে ছোট্ট একটা ঘরে। কাইয়ুম চৌধুরী খবর পাঠালেন, তিনি একটা ডিজাইন নিয়ে বিশেষ ব্যস্ত। ডিজাইনটা শেষ হলেই আসবেন। আরো দশ-পনেরো মিনিট লাগবে।

দশ-পনেরো মিনিট পর কাইয়ুম চৌধুরী বের হলেন না। ভয়ালদর্শন এক কুকুর বের হয়ে খান সাহেবের পা কামড়ে ধরল। আমি খান সাহেবকে কুকুরের হাতে ফেলে রেখে দৌড়ে পালিয়ে গেলাম। য পলায়তি স জীবতি।

সেই দিনই খান সাহেবকে তার বাসায় দেখতে গেলাম। তিনি বিছানায় পড়ে আছেন। নাভিতে ইনজেকশন শুরু হয়েছে। সান্ত্বনাসূচক কিছু কথা বলা দরকার। কোনো কথাই মাথায় আসছে না। খান সাহেব বললেন, কাইয়ুম চৌধুরীর হাত থেকে কভারের আশা ছেড়ে দিন। সামান্য কভারের জন্যে কুকুরের হাতে মৃত্যুর। মানে হয় না।

আমি বললাম, জি আচ্ছা।

খান সাহেব বললেন, আমি আপনার জন্যে দোয়া করলাম, আপনার বই কভার ছাড়া বের হলেও মানুষ যেন কিনে পড়ে।

কাইয়ুম চৌধুরী শেষ পর্যন্ত কভার করে দিয়েছিলেন। অপূর্ব কভার। কভার দেখে খান সাহেব কুকুরের কামড়ের দুঃখ ভুলে গেলেন।

কভার ডিজাইন হাতে পাওয়ার দৃশ্যটা বলি। কাইয়ুম চৌধুরী ডিজাইন হাতে বের হয়ে এলেন। আমাকে বুঝিয়ে দিলেন কীভাবে ছাপতে হবে। আমি বিদায় নিয়ে চলে আসছি, কাইয়ুম চৌধুরী বললেন, একটু দাঁড়ান। আমি দাঁড়ালাম।

কাইয়ুম চৌধুরী বললেন, কভারটা করার আগে আপনার উপন্যাসটা আমি পড়েছি। আপনার হবে।

আমি ধন্যবাদসূচক কিছু বলতে যাব তার আগেই তিনি বললেন, সামান্য ভুল বলেছি। আপনার হবে না বলে বলা উচিত আপনার হয়েছে।

এই বাক্যটি আমার লেখালেখি জীবনের প্রথম শোনা প্রশংসাসূচক বাক্য। উনিশ-কুড়ি বছরের একজন তরুণকে এই বাক্যটি কী আনন্দই না সেদিন দিয়েছিল।

আনন্দের কথা যখন এসেছে, তখন নিরানন্দের কিছু কথা আসুক। Ph.D করে ফিরেছি। পুরোদমে লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছি। অনেকগুলি বই বের হয়ে গেছে। পত্রপত্রিকায় ইন্টারভ্যু দিতে খুবই আগ্রহী। কেউ ইন্টারভ্যু নিতে আসে না। হঠাৎ বিচিত্রা পত্রিকা থেকে ডাক পেলাম। তারা আমাকে এবং সৈয়দ শামসুল হককে নিয়ে একটা কভার স্টোরি করতে চাচ্ছে। দেশের প্রধান ঔপন্যাসিক সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে তরুণ ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের কথোপকথন। আমি অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে রাজি হলাম।

বিচিত্রর শাহাদত ভাইয়ের উপস্থিতিতে কথোপকথন শুরু হলো। মডারেটর হচ্ছেন ঔপন্যাসিক মঈনুল আহসান সাবের। সৈয়দ শামসুল হক আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, হুমায়ুন, বলুন তো আপনার লেখাগুলি সবসময় ফর্মা হিসেবে বের হয় কেন? এরচেয়ে বড়ও হয় না, কমও হয় না। এর কারণটা কী?

আমি তাকিয়ে দেখি শাহাদত ভাই মাথা নাড়ছেন। তার মাথা নাড়া থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, তরুণ ঔপন্যাসিক কঠিন পাচে পড়েছে।

আমি হক ভাইকে বললাম, হক ভাই, আপনি তো সনেট লেখেন। সনেটগুলো ১৪ লাইনে শেষ হতে হয়। আপনি যদি আপনার ভাবনা নির্দিষ্ট ১৪ লাইনে শেষ করতে পারেন আমি কেন আমার ভাবনা ফর্মা হিসেবে শেষ করতে পারব না?

হক ভাই খানিকটা হকচকিয়ে গেলেন। এই উত্তর তিনি আমার কাছ থেকে আশা করেন নি। শাহাদত ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি আগের চেয়েও দ্রুত মাথা নাড়ছেন। তাঁর এই মাথা নাড়ার অর্থ হক ভাই প্যাঁচে পড়েছেন।

লেখালেখির দোহাই, আমি হক ভাইকে প্যাঁচে ফেলতে চাই নি। হক ভাই। যে প্যাঁচ তৈরি করেছেন, তার ভেতর থেকে বের হতে চেয়েছি। এই মুহূর্তে আমার হাতে হক ভাইয়ের কিছু উপন্যাস আছে। সবগুলিই ফর্মা হিসেবে এসেছে। কিংবা প্রকাশকরা ফর্মা হিসেবে সাজিয়ে নিয়েছেন।

নন্দিত নরকে উপন্যাসে ফিরে যাই। হঠাৎ করেই বড় বড় মানুষরা (কবি শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান,..) নন্দিত নরকে নিয়ে লেখা শুরু করলেন। তাঁদের অনেকের লেখাই যথেষ্ট হাস্যকর। যেমন শামসুর রাহমান মৈনাক হিসাবে দৈনিক বাংলায় লিখলেন, শুনেছি বইটা ভালো হয়েছে। পড়ে দেখতে হবে।

আমি এতেই খুশি। এই অবস্থায় বন্ধু আনিস সাবেত উত্তেজিত ভঙ্গিতে আমাকে এসে বললেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তোমাকে নিয়ে দেশ পত্রিকায় লিখেছেন।

বলেন কী?

পত্রিকা সঙ্গে আছে, পড়ে দেখ।

উনি আমার বই কোথায় পেলেন?

সেটা তো জানি না। কেউ নিশ্চয়ই তাঁকে দিয়েছে।

পত্রিকা ধরে রাখতে পারছি না, হাত কাঁপছে।

সনাতন পাঠক ছদ্মনামে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কি সত্যিই নন্দিত নরকে বইটি নিয়ে লিখেছেন? কোথাও ভুল হচ্ছে না তো?

এই ঘটনার অনেক অনেক বছর পর নুহাশ পল্লীর সুইমিংপুলে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে দল বেঁধে আমরা নেমেছি। খুব আনন্দ হচ্ছে। হঠাৎ সুনীল বললেন, হুমায়ুন, আপনার প্রথম বইটি নিয়ে অনেক অনেক বছর আগে দেশ পত্রিকায় আমি একটা লেখা লিখেছিলাম। লেখাটি কি আপনার চোখে পড়েছিল?

আমি বললাম, কী লিখেছিলেন সেটা কি আপনার মনে আছে?

সুনীল বললেন, অবশ্যই। ঔপন্যাসিকের স্মৃতিশক্তি ভালো থাকতে হয়।

০৭.

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রধান। তাঁর কাছে কলেজে পড়ুয়া তরুণ এক কবি এসেছে। সেই তরুণ কবি সিরাজ স্যারের সামনে বসতে বসতে বলল, সিরাজ ভাই, আপনার অমুক লেখাটা পড়েছি। ভালো হয়েছে, তবে…

সিরাজ স্যার তার উত্তরে বললেন,..

কী বললেন, সেটা আর উল্লেখ করলাম না। কারণ তা সিরাজ স্যারের চরিত্রের সঙ্গে যায় না। আমার ধারণী গল্পটা বানানো। সমাজের গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের নিয়ে অনেক বানানো গল্প চালু আছে।

পাঠক কি লক্ষ করছেন যে, আমি কৌতূহল জাগ্রত করে দূরে সরে গেছি। সিরাজ স্যার কী বললেন তা জানার আগ্রহ তৈরি করেছি, আগ্রহ মেটানোর ব্যবস্থা করি নি।

আমি একজন Fiction writer. ফিকশন লেখার একটা ছোট্ট টেকনিক ব্যবহার করলাম। প্রথম পৃষ্ঠা থেকে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পাঠকের আগ্রহ যেন থাকে। সে যেন কৌতূহল নিয়ে অপেক্ষা করে। পাঠকের কিছু কৌতূহল মেটানো হবে। কিছু মেটানো হবে না। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়—‘অন্তরে অতৃপ্তি রবে…’ Fiction writing-এ তৃপ্তির চেয়ে অতৃপ্তি গুরুত্বপূর্ণ।

সর্বনাশ! আমি দেখি উপদেশমূলক রচনা শুরু করেছি। ফিকশন রাইটিংয়ের নিয়মকানুন শেখানো আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।

ঔপন্যাসিক হবার আগ্রহ নিয়ে অনেকেই আসে আমার কাছে। গভীর আগ্রহে জানতে চায় লেখালেখির নিয়মকানুন। আমি তাদের তেমন কিছুই বলতে পারি না। ক্রিয়েটিভিটি শেখানোর কলাকৌশল এখনো মানুষের আয়ত্তে আসে নি। আমার ধারণা ক্রিয়েটিভিটি শেখানো যায় না। যদি শেখানো যেত তাহলে রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় লেখকের নাম হতো রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথের ছেলে। বাবার কাছ থেকে লেখালেখির সব কৌশল শিখে নেওয়ার সুযোগ তারই সবচেয়ে বেশি ছিল।

সিরাজুল ইসলাম স্যারকে নিয়ে শুরুতে যে গল্প ফেঁদেছি তার ভেতরে আছে বিশ্বাসযোগ্যতা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রধান ছিলেন এবং হাঁটুর বয়েসি অনেক তরুণ লেখককে আমি নিজে সিরাজ ভাই সিরাজ ভাই করতে শুনেছি।

আসল কথা, ফিকশন রাইটারের ফিকশন বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য একটা ঘটনার এমন বর্ণনা হতে হবে, যেন মনে হয়—এটাই তো হবে।

অবিশ্বাস্য ঘটনার বিশ্বাস্য রূপের প্রথম পরিচয় পেলাম আমি যখন ঢাকা কলেজের ছাত্র তখন। ঘটনাটা বলি। কলেজ ছুটি হয়েছে। আমি কলেজ থেকে যাচ্ছি নানাবাড়িতে—মোহনগঞ্জে (নেত্রকোনা)। গৌরীপুর জংশনে ট্রেন বদল করতে হয়। পাঁচ থেকে ছ’ঘণ্টার যাত্রাবিরতি। সময় কাটানোর জন্য কিছু বই কিনে নিয়ে গেছি। মস্কোর প্রগতি প্রকাশনীর বই। বইগুলো দামে খুব সস্তা। সুন্দর কাগজ, ঝকঝকে ছাপা। একটি গল্প পড়তে শুরু করেছি—গল্পের নাম ‘হৈটি টৈটি’ অদ্ভুত নাম দেখে এই গল্পটি প্রথম পড়ার জন্য বাছলাম। লেখকের নাম খুব সম্ভব আলেকজান্ডার বেলায়েভ (খুব সম্ভব বলছি, কারণ চল্লিশ বছর আগের স্মৃতি। ঝাপসা হয়ে আসছে।) গল্পে একটা মানুষের মাথায় হাতির ব্রেইন ট্রান্সপ্লান্ট করে দেয়া হয়। মানুষটি সম্পূর্ণ বদলে যায়, কারণ তার জগৎ হয়ে যায় হাতির জগৎ। তার স্মৃতি হাতির স্মৃতি।

সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য গল্প। অথচ কী উপস্থাপনা! লেখক যা লিখছেন মনে হচ্ছে সবই সত্যি। কোথাও সামান্য অতিকথন পর্যন্ত নেই। এ ধরনের গল্প তো আগে পড়ি নি। উত্তেজনায় আমার হাত-পা কাঁপা শুরু হলো। গল্প শেষ হবার পর আবার প্রথম থেকে পড়া শুরু করলাম। সায়েন্স ফিকশন নামক নতুন একধরনের রচনা পড়ার সেটাই শুরু। কী অপূর্ব শুরু! গৌরীপুর জংশনের কোলাহল। ট্রেনের আসা যাওয়া। ট্রেন চলে যাবার পর পর হঠাৎ কিছুক্ষণের নীরবতা। তার মধ্যে আমার বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর প্রথম পাঠ।

পড়ার জন্য সায়েন্স ফিকশনের বই খুঁজি। পাই না। এই ধরনের রচনার লেখকের সংখ্যা হাতেগোনা। এসিমভ, লেরি নিভেন, আর্থার সি ক্লার্কের নাম তখনো শুনি নি। একদিন হাতে এল উভচর মানব নামের আরেকটি রচনা। কী অদ্ভুত উপন্যাস!

সায়েন্স ফিকশন ঢুকে গেল আমার রক্তে তার ফলাফল হলো আমার তৃতীয় প্রকাশিত উপন্যাসটি একটি সায়েন্স ফিকশন। নাম তোমাদের জন্যে ভালোবাসা। অঙ্কের গ্রান্ডমাস্টার ফিহাকে নিয়ে কাহিনী। ভূঁইয়া ইকবাল সম্পাদিত বিজ্ঞান সাময়িকী সাপ্তাহিক পত্রিকায় আমার এই উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে আবার ছাপাও হয়েছে। বই আকারে প্রকাশের সময় একটি নির্ঘন্ট যুক্ত করে দিয়েছি। আমার ভয় ছিল পাঠকরা নতুন নতুন শব্দ এবং ধারণা ঠিক বুঝতে পারবে না। যেমন—

নিওরোন : মস্তিষ্কের যেসব কোষে স্মৃতি সজ্জিত থাকে।

দ্বৈত অবস্থানবাদ : একই সময়ে একই স্থানে দুটি বস্তুর উপস্থিতির সম্ভাবনা সম্পর্কীয় সূত্র। (কাল্পনিক)

NGC 1303 : দূরবর্তী কোয়াজার। (কাল্পনিক)

সিলঝিন : ১১৯তম ধাতু সিলঝিনিয়াম ও এক্টিনিয়ামের সংমিশ্রণে তৈরি বিশেষ ঘাতসহ সঙ্কর ধাতু। (কাল্পনিক)

বই প্রকাশের সময় কভার নিয়ে একটা সমস্যা হলো। এ ধরনের বইয়ের কভার কী হবে কেউ বুঝতে পারছে না। শেষে দৈনিক বাংলার শিল্পী কালাম মাহমুদ (এখন প্রয়াত) একটা কভার করেন—কিছু চক্র, কিছু চতুর্ভুজ দিয়ে এক ধরনের খিচুড়ি। যার সঙ্গে বইয়ের কাহিনীর কোনো সম্পর্ক নেই।

তোমাদের জন্যে ভালোবাসা নিয়ে বিতং করে অনেক কিছু লিখলাম। কারণ নানান আলোচনায় দেখছি লেখা হচ্ছে তোমাদের জন্যে ভালোবাসা বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম সায়েন্স ফিকশন। বাংলা ভাষার কথা বলতে পারছি না, তবে বাংলাদেশে এটিই প্রথম প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী। এই বা কম কী?

আমার ছোটভাই মুহম্মদ জাফর ইকবাল এরপর সায়েন্স ফিকশন লেখায় হাত দেয় এবং চমৎকার কিছু লেখা লেখে। তার বেশির ভাগ সায়েন্স ফিকশন হলো হার্ডকোর জেনারের অর্থাৎ বিজ্ঞানের সূত্র যেখানে নিখুঁতভাবে মানা হয়। বাংলাদেশের অনেক পাঠকের মতো আমিও আমার ছোটভাইয়ের হার্ডকোর সায়েন্স ফিকশনের ভক্ত।

যেসব পাঠক আমার লেখা সায়েন্স ফিকশনের সঙ্গে পরিচিত না, তাদের জন্য একটি গল্প দিয়ে দিচ্ছি। গল্পটি পূর্বপ্রকাশিত।

অঁহক

ইন্টার গ্যালাকটিক স্পেসশিপগুলির পরিচালনা নীতিমালায় তিনটি না-সূচক সাবধান বাণী আছে। স্পেসশিপের ক্যাপ্টেনকে এই তিন ‘না’ মেনে চলতে হবে।

১. স্পেসশিপ কখনো নিউট্রন স্টারের কলয়ের ভেতর দিয়ে যাবে না।
২. ব্ল্যাকহোলের বলয়ের ভেতর দিয়ে যাবে না।
৩. অঁহক গোষ্ঠীর সীমানার কাছাকাছি যাবে না। ভুলক্রমে যদি চলে যায়, অতি দ্রুত বের হয়ে আসবে।

সমস্যা হলো নিউট্রন স্টার এবং ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব আগেভাগে টের পাওয়া যায়। সময়মতো ব্যবস্থা নেয়া যায়। কিন্তু অঁহকদের ব্যাপার সম্পূর্ণ ভিন্ন। আগেভাগে তাদের উপস্থিতি জানার কোনো উপায় নেই।

অথচ অঁহকরা মহাশূন্যের বুদ্ধিমান প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে দয়ালু। বিপদগ্রস্ত মহাশূন্যযানের সাহায্যের জন্যে অতি ব্যস্ত। তাদের কর্মক্ষমতাও অসাধারণ। যে-কোনো যন্ত্রাংশ তারা অতি দ্রুত ঠিক করতে পারে। এই অনন্ত মহাবিশ্বের যে-কোনো শ্রেণীর প্রাণীর যে-কোনো ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঠিক করে ফেলতে পারে। তারপরেও এদের কাছে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। এদেরকে ব্ল্যাকহোল কিংবা নিউট্রন স্টারের মতোই বিপদজনক ভাবা হয়।

অঁহকদের সম্পর্কে পরিপূর্ণ কোনো তথ্য কোথাও নেই। গ্যালাকটোপিডিয়াতে লেখা আছে—

অঁহক
অতি উন্নত বুদ্ধিমত্তার প্রাণী। ছোট ছোট দলে এরা অনন্ত মহাশূন্যে ভেসে বেড়ায়। অসংখ্য বাহু বিশিষ্ট প্রাণী। এদের খাদ্যগ্রহণ পদ্ধতি অজ্ঞাত। ধারণা করা হয় এরা খাদ্য গ্রহণ করে না। মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে এরা প্রয়োজনীয় শক্তি সংগ্রহ করে। অন্যসব বুদ্ধিমান প্রাণীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে চায়। তবে বিপদগ্রস্ত প্রাণীদের সাহায্যে অতিদ্রুত ছুটে আসে। ভগ্ন যন্ত্রাংশ ঠিক করা এবং আহত প্রাণীদের চিকিৎসায় এদের ক্ষমতা সীমাহীন।

অন্য বুদ্ধিমান প্রাণীদের কাছাকাছি এলে এরা নিজেদের অদৃশ্য রাখতে পছন্দ করে। এই ক্ষমতা তাদের আছে। তারা টেলিপ্যাথিক মাধ্যমেও বুদ্ধিমান প্রাণীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম। আহত বুদ্ধিমান প্রাণীদের চিকিৎসা দান কালে। তারা এই ক্ষমতা ব্যবহার করে আহতের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেয়। তবে নিজেদের সম্পর্কে কিছুই বলে না।

তাদের যান্ত্রিক কোনো কিছু নেই। কারণ, তাদের যন্ত্রের কোনো প্রয়োজন নেই। মহাকাশের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে তারা ছোটাছুটি করতে পারে।

ধারণা করা হচ্ছে অঁহকরা অতি শান্তিপ্রিয়। সিরাস নক্ষত্রের গ্রহ ‘ভি থ্রি’র অতি উন্নত প্রাণী মায়রাদের একটি দল একবার অঁহকদের লক্ষ করে আণবিক ব্লাস্টার, লেজার-নিও ব্লাস্টার এবং পজিট্রন ব্লাস্টার নিক্ষেপ করে। সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণার মতো অবস্থা তৈরি হয়। এর উত্তরে অঁহকরা তাদের যাত্রাপথ থেকে সরে যায় এবং তাদের কাছে একটি বার্তা পাঠায়। বার্তায় বলা হয়—ধ্বংসে আনন্দ নেই। আনন্দ সৃষ্টিতে।

অঁহকদের মোট সংখ্যা, তাদের জীবনকাল কিংবা বাসস্থান সম্পর্কে কিছুই জানা যায় নি। খুব সম্ভব তাদের নির্দিষ্ট কোনো বাসস্থান নেই। তাদের শরীরবৃত্তিয় প্রক্রিয়া এবং জৈব রসায়ন বিষয়ক কোনো কিছুই জানা যায় নি। স্পেকট্রোগ্রাফিতে প্রাপ্ত সামান্য তথ্যে অনুমান করা হয় তারা মেঘসদৃশ্য প্রাণী। তাদের বলয় থেকে পর্যায়ক্রমিকভাবে গামা রশ্মি এবং এক্স রশির বিকিরণ হয়। এই বিকিরণ অনিয়মিত বলেই তাদের উপস্থিতি আগে থেকে বোঝা যায় না। গ্যালাকটোপিডিয়াতে অঁহকদের সম্পর্কে খারাপ কিছু নেই। মহাবিশ্বের অন্যসব বুদ্ধিমান প্রাণীর সঙ্গেই তাদের যুক্ত করা হয়েছে। তবে তাদের স্থান হয়েছে রেড বুকে। রেড বুকে নাম ওঠার অর্থ এদের কাছে যাওয়া অতি বিপদজনক।

.

স্পেসশিপ ‘লি-২০১’ একটি সাধারণ ফেরিশিপ। এর কাজ সৌরমন্ডলের ভেতরে গ্রহ এবং উপগ্রহ থেকে খনিজ দ্রব্য মঙ্গল গ্রহে নিয়ে যাওয়া। খনিজ দ্রব্য প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতির সব বড় বড় কলকারখানাই মঙ্গল গ্রহে করা হয়েছে।

স্পেসশিপ লি-২০১-এর মাল বহনের ক্ষমতা অসাধারণ। এর ইঞ্জিন ইলেকট্রন এমিশন ইঞ্জিন। পুরনো ধরনের ইঞ্জিন হলেও ভারি ইঞ্জিন এবং কার্যকর ইঞ্জিন। সাধারণত ০.2C [C আলোর গতিবেগ] গতিতে চলে। প্রয়োজনে এই গতিবেগ বাড়িয়ে ০.6C পর্যন্ত যাওয়া যায়।

লি সিরিজের স্পেসশিপ পরিচালনার জন্যে কোনো মহাকাশ নাবিকের। প্রয়োজন হয় না। সাধারণ এনারবিক রোবট কম্পিউটারের সাহায্যে এই কাজ সুন্দরভাবে করতে পারে।

তবে লি সিরিজের দু’শর ওপরের নাম্বার শিপে অবশ্যই একজন মহাকাশ নাবিক লাগে। কারণ, এই সিরিজ তৈরি করা হয়েছিল মিল্কিওয়ে গ্যালিয়াম ভেতরের মাইনিং-এর জন্যে। ইলেকট্রন এমিশন টেকনোলজি ছাড়াও এই জাতীয় মহাকাশযানে হাইপার স্পেস জাম্পের ব্যবস্থা আছে। দু’শ’ সিরিজের এটি দ্বিতীয়। মহাশূন্যযান। প্রথমটি লি-২০০ মহাশূন্যে বিধ্বস্ত হয়েছিল। বিধ্বস্ত হবার কোনো কারণ জানা যায় নি। ধারণা করা হয় কোনো বিচিত্র কারণে মহাশূন্যযানটি হাইপার স্পেস জাম্প দেয়। সেট কো-অর্ডিনেট না থাকায় সেটা চিরদিনের জন্যে হারিয়ে যায়।

এক হাজার টন গ্যালিয়াম ধাতু নিয়ে মহাকাশযান লি-২০১ বৃহস্পতির একটি উপগ্রহ থেকে মঙ্গলের দিকে রওনা হয়েছে। কনট্রোল প্যানেলে যে বসে আছে তার নাম নিম। বয়স মাত্র ২৭। মেয়েটি তিন মাস আগে মহাকাশযান পরিচালনার সার্টিফিকেট পেয়েছে। তবে ট্রেনিং পিরিয়ড এখনো শেষ হয় নি। তাকে এক হাজার ঘন্টার ফ্লাইং টাইম সংগ্রহ করতে হবে। নিম এখন পর্যন্ত সংগ্রহ করেছে দু’শ একুশ ঘণ্টা। আজকের ফ্লাইট শেষ হলে আরো এগারো ঘণ্টা যুক্ত হবে।

নিমের চোখ কনট্রোল প্যানেলের দিকে। তাকিয়ে থাকার কোনো অর্থ হয় না। অটো পাইলট-এ দেয়া আছে। আর মাত্র আটত্রিশ মিনিট এগারো সেকেন্ডে সে পৌঁছে যাবে মঙ্গলের উপগ্রহ ডিমোসের পাশে। ফিক্সড় অরবিট নিয়ে অপেক্ষা করবে মঙ্গলে অবতরণ অনুমতির জন্যে। সেখানেও কিছু করতে হবে না। সবই অটো পদ্ধতিতে হবে। এই কাজের জন্যে মহাকাশ নাবিকের প্রয়োজন নেই। সাধারণ মানের একজন এনারবিক রোবটই যথেষ্ট। নিমের পাশের আসনে যে রোবটটি বসে আছে সে সাধারণ মানের নয়। যে-কোনো মহাকাশযান সে চালাতে পারে। অতি আধুনিক হাইপার ভাইভার চালনার দক্ষতাও তার আছে। এই এনারোবিক রোবটের নাম দৃস। এরা S2 টাইপ রোবট বলেই তাদেরকে মানুষের মতো আলাদা নাম দিয়ে সম্মান দেখানো হয়।

দৃস নিমের দিকে তাকিয়ে বিনীত গলায় বলল, মিস ক্যাপ্টেন, আমি কি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারি?

নিম বলল, নিশ্চয়ই পার।

দৃস বলল, আপনি কি কোনো অস্বাভাবিকতা লক্ষ করছেন?

অস্বাভাবিকতাটা কী ধরনের?

আমাদের এই মহাকাশযানের গতি 0.2C থাকার কথা। প্রোগ্রাম সেরকমই করা হয়েছে। আপনার কি মনে হয় না গতি বাড়ছে?

নিম বিরক্ত গলায় বলল, সেরকম মনে হয় না। পর্দার দিকে তাকিয়ে দেখ গতি দেখানো আছে।

দৃস বলল, আপনি কি দয়া করে ভিউ ফাইন্ডারের দিকে তাকাবেন। যে কোনো দুটি উজ্জ্বল তারার দিকে তাকালেই লক্ষ করবেন আমাদের মহাকাশযানের গতি 0.4C-র কাছাকাছি।

এটা হতেই পারে না।

আপনি ঠিকই বলেছেন, এটা হতে পারে না। কিন্তু ফুয়েল কনজামশান। রেটের দিকে তাকাল আপনি দেখবেন আমি যা বলছি তা ঠিক।

নিম অতিদ্রুত কয়েকটি রিডিং নিল রিডিং থেকে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। ফুয়েল কনজামশান রিডিং ০.4c গতিবেগের কথাই বলে। কিন্তু এই গতিবেগে কনট্রোল প্যানেলে লালবাতি জ্বলবে। হাইপার ভাইভ প্রক্রিয়া কার্যকর হবে।

দৃস বলল, ম্যাডাম, আপনি ভীত হবেন না।

নিম বলল, আমি ভীত তোমাকে কে বলল?

দৃস বলল, মহাকাশযানের গতি এখন 0.5C। ভীত হবার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেই আমি আপনাকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে ভীত না হবার জন্য বলছি।

নিম মঙ্গলের স্পেসশিপ মনিটারিং সেলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করল। যোগাযোগ করা গেল না। দৃস বলল, ম্যাডাম, কোনো মহাকাশযানের গতিবেগ যদি 0.5C-র চেয়ে বেশি হয়ে যায় তখন সমস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়।

এই তথ্য আমি জানি।

আপনি যদি জানেন তাহলে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন কেন?

তুমি আমাকে কী করতে বলছ?

আমি আপনাকে ভীত না হবার জন্যে বলছি।

একটু আগেই তুমি বলেছ ভীত হবার মতো ঘটনা ঘটেছে।

দৃস বলল, আমার ধারণা যে সমস্যা তৈরি হয়েছে সে সমস্যা আপনার ট্রেনিং এর অংশ।

নিম বলল, তার মানে কী?

ট্রেইনী নাবিকদের জন্যে মাঝে মাঝে পরিকল্পিতভাবে সমস্যা তৈরি করা হয়। দেখার জন্যে এরা সমস্যার সমাধান কীভাবে করে।

তোমার এরকম মনে হচ্ছে?

আমি সম্ভাবনার কথা বলছি। নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।

এই সমস্যাটি ট্রেনিং এর অংশ, তার সম্ভাবনা কত?

0.30

বলো কী! এত কম সম্ভাবনা?

ত্রিশ পারসেন্ট সম্ভাবনা কম না, মিস ক্যাপ্টেন।

৭০ পারসেন্ট সম্ভাবনা যে এটা বাস্তব সমস্যা?

আপনি যথার্থ বলেছেন। মহাকাশযানের গতিবেগ বেড়েই চলেছে। ট্রেনিং এর সময়েও গতিবেগ এত বাড়ানো হয় না। তাছাড়া এটা মাল বোঝাই ফেরিশিপ।

এখন করণীয় কী?

আপনি খুব ভালো করেই জানেন এখন করণীয়।

তারপরেও তুমি আমাকে সাহায্য কর।

আপনি যদি কুলকিনারী না পান তাহলে ইমার্জেন্সি ব্লু বাটন টিপবেন। ইমার্জেন্সি বাটন টেপার পর আপনার কিছুই করার থাকবে না। কম্পিউটার সিডিসি আপনার হাত থেকে নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে। ছোট্ট সমস্যা কিন্তু থেকেই যাবে মিস ক্যাপ্টেন।

সমস্যা কী?

যেসব ট্রেইনী নাবিক ব্লু বাটন টেপে তাদের লাইসেন্স বাতিল হয়ে যায়। তারা আর কখনো আকাশে উড়তে পারবে না।

আমার কী করা উচিত?

আপনার ইমার্জেন্সি বাটন টেপা উচিত।

নিম ইমার্জেন্সি বাটনে চাপ দিল। প্যানেলে সবুজ আলো জ্বলে উঠল। কম্পিউটার সিডিসির ধাতব গলা শোনা গেল।

কম্পিউটার সিডিসি বলছি। আমি মহাকাশযানের কম্পিউটারের কাছ থেকে নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছি। আমরা ক্রমবর্ধমান গতিতে এগুচ্ছি। অতি দ্রুত ত্বরণ বন্ধ করা প্রয়োজন। সেটা করা যাচ্ছে না। আয়ন ইঞ্জিনের যে ক্রটি ধরতে পেরেছি সেই ত্রুটি সারানো এই মুহূর্তে সম্ভব নয়।

নিম বলল, ক্রটি কেন দেখা গেল?

এই মুহূর্তে বলা সম্ভব হচ্ছে না। হাতে সময় নেই।

তুমি এখন কী সিদ্ধান্ত নিয়েছ?

কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। খুব অল্পসময়েই এই মহাকাশযান বিধ্বস্ত হবে। কারণ, এটি একটি মাল বোঝাই কার্গো। ০.6c-র গতিবেগ এ নিতে পারবে না।

আমাদের হাতে কত সময় আছে?

তিন মিনিটেরও কম।

আমার কি কিছু করণীয় আছে?

না। আপনি পেন্টাথেল থ্রি ইনজেকশন নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে পারেন। মৃত্যু হবে ঘুমের মধ্যে।

নিম ঠান্ডা গলায় বলল, অতি সুন্দর প্রস্তাবের জন্যে ধন্যবাদ।

নিমের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই বিস্ফোরণ হলো। ভয়াবহ বিস্ফোরণ।

.

অঁহকদের ছোট্ট একটা দল দ্রুত কাজ করছে। তাদের কাজ যিনি তদারক করছেন তাকে তারা মহান শিক্ষক নামে ডাকছে। কাজের প্রতিটি পর্যায়ে তারা মহান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলছে। এমনও হচ্ছে একসঙ্গে সবাই কথা বলছে। মহান শিক্ষক একই সঙ্গে সবার কথার জবাব দিচ্ছেন।

মহান শিক্ষক বললেন, তোমরা কি আনন্দ পাচ্ছ?

একসঙ্গে সবাই বলল, আমরা খুবই আনন্দ পাচ্ছি।

আমরা কেন বেঁচে আছি?

আনন্দের জন্যে বেঁচে আছি।

আমরা কেন বেঁচে থাকব?

আনন্দের জন্যে বেঁচে থাকব।

মৃত্যু কী?

আনন্দের সমাপ্তি।

তোমরা যে মেয়েটির শরীরবৃত্তিয় ক্ষতি ঠিকঠাক করছ সে কোন সম্প্রদায়ের, তা কি জানো?

জানি মহান শিক্ষক। সে মানব সম্প্রদায়ের।

মানব সম্প্রদায়ের বৈশিষ্ট্য কী?

বৈশিষ্ট্যহীন একটি সম্প্রদায়। যাদের শরীরবৃত্তিয় কর্মকাণ্ড অতি দুর্বল।

দুর্বল বলছ কেন?

এরা অক্সিজেননির্ভর একটি প্রাণী। অক্সিজেন একটি ভারি গ্যাস। ভারি গ্যাস নির্ভর প্রাণী দুর্বল হয়। হাইড্রোজেন বা হিলিয়াম-নির্ভর প্রাণীরা সত্যিকার অর্থেই বুদ্ধিমান। যেমন আমরা হাইড্রোজেন-নির্ভর।

এর বাইরে কী আছে?

এরা অতি নিম্নশ্রেণীর বুদ্ধিহীন প্রাণীদের মতোই খাদ্য থেকে শক্তি সংগ্রহ করে। কাজেই তারা চিন্তা বা শিক্ষার সময় পায় না। তারা তাদের সময়ের একটি বড় অংশ ব্যয় করে খাদ্য সংগ্রহ, খাদ্য পরিপাক এবং খাদ্য বর্জনে।

ভালো বলেছ। এদের আর কী ত্রুটি আছে?

এদের সভ্যতা যন্ত্রনির্ভর সভ্যতা। এরা আমাদের মতো যন্ত্রমুক্ত না। মহান শিক্ষক, আপনি বলেছেন যন্ত্রনির্ভর সভ্যতা নিম্নমানের সভ্যতা।

যে-কোনো বস্তুর ওপর নির্ভর সভ্যতাই নিম্নমানের সভ্যতা। এই সত্যটি সব সময় মনে রাখবে।

মহান শিক্ষক, আমরা মনে রাখব।

তোমাদের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে বলো।

মেয়েটি যে যন্ত্রযানে করে এসেছে সেটি সম্পূর্ণ ঠিক করা হয়েছে। যন্ত্রযানের মূল ডিজাইনে একটি ত্রুটি ছিল। আমরা সেই ক্রটিও ঠিক করে দিয়েছি।

কাজটা করে কি আনন্দ পেয়েছ?

মহান শিক্ষক, খুবই আনন্দ পেয়েছি।

মেয়েটির অবস্থা কী?

কিছুক্ষণের মধ্যেই সেও সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবে। মেয়েটির শরীরের যে অংশ অক্সিজেনবাহী তরল পরিশুদ্ধ করে সেই অংশই বিশেষভাবে ক্ষত্যিস্ত হয়েছে বলে সামান্য বেশি সময় আমরা নিয়েছি। তার জন্যে আমরা দুঃখিত মহান শিক্ষক।

কাজটা করে কি তোমরা আনন্দ পেয়েছ?

আমরা অত্যন্ত আনন্দ পেয়েছি। এখন আমরা আপনার নির্দেশের অপেক্ষা করছি।

কী নির্দেশ?

মেয়েটি জ্ঞান ফিরে পাবার পর যেন অত্যন্ত আনন্দ পায় তার জন্যে কিছু কি করব? তার শরীরের কিছু পরিবর্তন? তার জন্যে মঙ্গলময় হয় এমন কিছু পরিবর্তন?

অবশ্যই করবে। আমরা উপকারী সম্প্রদায়। আমাদের কাজ দুর্বল সম্প্রদায়ের উপকার করা। তাদের ত্রুটি দূর করা। অতি দুর্বল বুদ্ধিমত্তার প্রাণীরা নিজেদের ত্রুটি ধরতে পারে না। মেয়েটির কোন কোন ক্রটি সারাবার কথা ভাবছ?

সে মহাকাশযান চালক। মাত্র দুটি হাতে এই জটিল মহাকাশযানের সমস্ত বোতাম এবং চক্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। আমরা তাকে আরো বাড়তি দুটি হাত দিতে চাচ্ছি।

অতি উত্তম প্রস্তাব। দাও।

হাতের আঙুলের সংখ্যা পাঁচটির জায়গায় দশটি করে করতে চাচ্ছি।

এটিও ভালো প্রস্তাব করে দাও।

মানব সম্প্রদায়ের পেছনে কোনো চোখ নেই। পেছনে চোখ না থাকার কারণে সে পেছনে দেখতে পারে না। পেছনে দেখার জন্যে তাকে সমস্ত শরীর ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতে হয়। আমরা ভাবছি তার পেছনে একটি চোখ দিয়ে দেব।

জায়গাটা ঠিক করেছ?

ঘাড়ে দিতে চাচ্ছি।

দাও, ঘাড়েই দাও। তবে ঘাড়ে একটি চোখ না দিয়ে দুটি চোখ দাও। মানব সম্প্রদায় সবসময় দুটি চোখ ব্যবহার করে এসেছে। সেখানে হঠাৎ করে পেছনে একটা চোখ তার পছন্দ নাও হতে পারে।

ঠিক আছে মহান শিক্ষক, আমরা পেছনেও দুটি চোখ দিয়ে দেব।

আর কিছু কি ভাবছ?

আপনার অনুমতি পেলে আরেকটি ছোট্ট পরিবর্তন করা যায়।

বলো কী পরিবর্তন?

মানব সম্প্রদায়ের গায়ের চামড়া সবচেয়ে দুর্বল। আমরা কি একটি ধাতব আবরণ দিয়ে দেব?

না। তার প্রয়োজন দেখি না। চামড়া দুর্বল হলেও সে স্পেস স্যুট পরে। এটি যথেষ্ট মজবুত। গায়ের চামড়া ছাড়া বাকি পরিবর্তনগুলি করে দাও।

মহান শিক্ষক।

বলো।

মেয়েটি যখন তার শরীরের পরিবর্তনগুলি দেখবে তখন সে খুবই আনন্দ পাবে।

অবশ্যই আনন্দ পাবে।

মেয়েটির আনন্দের কথা ভেবেই আমাদের আনন্দ হচ্ছে।

আনন্দ মানেই বেঁচে থাকা। আমরা বেঁচে আছি। তোমাদের সবার কাজে আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট।

ধন্যবাদ মহান শিক্ষক।

.

নিমের মহাকাশযান মঙ্গল গ্রহের দিকে ছুটে যাচ্ছে। তার জ্ঞান ফিরেছে কিছুক্ষণ আগে। সে হতভম্ব হয়ে তার চারটি হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। তাকিয়ে আছে দৃস।

নিম চোখ তুলে ছায়ার দিকে তাকাল।

দৃস বলল, মিস ক্যাপ্টেন, আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা ভয়ঙ্কর অঁহকদের হাতে পড়েছিলাম।

নিমের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। সে এখনো জানে না তার ঘাড়েও দুটি চোখ আছে। সেই চোখ দিয়েও পানি পড়ছে।

দৃস বলল, মিস ক্যাপ্টেন, কাঁদবেন না। আপনার জন্যে একটি ভালো সংবাদ আছে।

নিম ফোপাতে ফোপাতে বলল, ভালো সংবাদটি কী?

দৃস বলল, আপনার ঘাড়ে যে দুটি চোখ আছে, সেই চোখ দুটি আসল চোখের চেয়েও অনেক অনেক সুন্দর।

০৮.

যে-কোনোদিন M.Sc, থিসিস গ্রুপের রেজাল্ট বের হবে। টেনশন নিয়ে অপেক্ষা করছি। ফার্স্টক্লাস যে পাব এই বিষয়ে সন্দেহ নেই। পজিশন কী হবে এই নিয়ে সন্দেহ। পজিশনে যদি নিচে নেমে যাই, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারির সুযোগ নাও পেতে পারি। ভাইভা খুব সুবিধার হয় নি। প্রফেসর আলি নওয়াব Zeta potential বিষয়ে একটা জটিল প্রশ্ন করে আমাকে আটকে দিয়েছিলেন। গভীর গর্তে ঠেলে ফেলে দেওয়ার মতো। একশ’ নাম্বারের ভাইভা। এখানে নাম্বার কমে গেলে দ্রুত পজিশন নামবে।

রেজাল্টের খোঁজে রোজ কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে ঘোরাঘুরি করি। পয়সাওলা বন্ধুবান্ধব খুঁজি যে আমাকে চা-শিঙ্গাড়া খাওয়াবে। অর্থনৈতিকভাবে আমি তখন পরও নিচে। বাবা মরে যাবার কারণে মা ১৮৫ টাকার মাসিক পেনশন পান, এটাই ভরসা। তিনি এবং তার ছোটভাই রুহুল আমিন শেখ (পরবর্তীকালে চেয়ারম্যান, মংলাপোর্ট সফল একজন ভালো মানুষ। অদ্ভুত অদ্ভুত জায়গা থেকে টাকাপয়সা ধার করে আনেন। তাতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সংসার চলে। আমি সারাক্ষণ চোখে অন্ধকার দেখি। একটা চাকরি আমার ভীষণ দরকার। আগে তো রেজাল্ট হবে, তারপর চকিরি।

কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে গেছি, বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করছি। চেয়ারম্যান স্যারের পিয়ন এসে বলল, স্যার আপনারে ডাকে। আমার কলজে শুকিয়ে গেল। খোন্দকার মোকাররম হোসেন কোনো ছাত্রকে ডাকবেন আর তার কলিজা শুকিয়ে শুঁটকি হয়ে যাবে না, তা হয় না। স্যার ভুল করেন নি তো? আমাকে কি তিনি নামে চেনেন? চেনার কথা না।

ভয়ে ভয়ে স্যারের ঘরে ঢুকলাম। স্যার কী যেন লিখছেন। আমি নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ করে আছি। নিঃশ্বাসের শব্দে স্যারের লেখায় যেন বিঘ্ন না ঘটে।

স্যারের লেখা শেষ হলো। তিনি লেখাটা খামে ঢুকালেন। খামের মুখ বন্ধ করলেন। এবং খামটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। আমি খাম হাতে নিলাম।

স্যার বললেন, তুমি ময়মনসিংহ এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটিতে চলে যাও। চেয়ারম্যান কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টকে এই চিঠি দেবে। তুমি লেকচারারের একটা চাকরি পেয়ে যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো পোস্ট খালি নেই। পোস্ট খালি থাকলে এখানেই তোমাকে নিতাম। এখন সামনে থেকে যাও, আমাকে কাজ করতে দাও।

আমি দ্রুত স্যারের ঘর থেকে বের হলাম। তখন মনে হলো, সর্বনাশ! স্যারকে তো ধন্যবাদ দেওয়া হয় নি। আমি আবার ঢুকলাম। স্যার বিরক্ত গলায় বললেন, আবার কী? আমি বললাম, স্যার, আপনাকে সালাম করব।

স্যার রিভলভিং চেয়ারে বসে ছিলেন। তিনি চেয়ার ঘুরালেন। পা থেকে জুতা খুললেন। মোজা খুললেন। সালাম নেবার জন্য অনেক আয়োজন করলেন। আমি পা ছুঁয়ে কদমবুসি করতেই তিনি স্পষ্ট গলায় বললেন, May God be always with you.

আজ আমার বয়স ষাট। অনেকেই নানান কারণে আমাকে পা ছুঁয়ে সালাম করতে আসে। আমি আয়োজন করেই সালাম গ্রহণ করি এবং মোকাররম স্যারের মতো বলি, May God be always with you.

কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান মোকাররম স্যারের চিঠি পড়ে কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনার M.Sc. রেজাল্ট তো হয় নাই।

আমি বললাম, জি-না স্যার।

মোকাররম স্যারের চিঠি আছে। এই চিঠিই যথেষ্ট। সমস্যা একটাই, আপনাকে চাকরি দেব। দুদিন পরে আপনি চলে যাবেন। আবার আমাদের নতুন টিচার খুঁজতে হবে।

চলে যাব ভাবছেন কেন?

চলে যাবেন ভাবছি কারণ আপনার রেজাল্ট ভালো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেলেই আপনি চলে যাবেন। এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটি হচ্ছে আপনার মতো মানুষদের transit point.

আমি হতাশ গলায় বললাম, আমার চাকরি কি স্যার হচ্ছে না?

চেয়ারম্যান সাহেব বললেন, মোকাররম স্যার চিঠি দিয়েছেন। আপনাকে চাকরি না দিয়ে উপায় আছে? আমি সুপারিশ করছি যেন আপনাকে অনেক বেশি বেতন দেওয়া হয়। যাতে বেতনের লোভে হলেও আপনি এখানে থেকে যান।

সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন লেকচারারের বেসিক পে ছিল ৪৫০ টাকা। অনার্স এবং এমএসসিতে ফার্স্ট ক্লাস থাকলে দু’টা ৫০ টাকার ইনক্রিমেন্ট পেয়ে হতো ৫৫০ টাকা। আমাকে চারটা ইনক্রিমেন্ট দেয়া হলো। বেতন হলো ৬৫০ টাকা। সেই সময়ের জন্যে অনেক টাকা।

আমার শিক্ষকতা জীবন শুরু হলো। এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটি, বিশাল ব্যাপার। কিন্তু সেখানের কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট হলো দিঘিতে শিশির বিন্দু। সেখানে কেমিস্ট্রি পড়ানো হয় সাবসিডিয়ারি বিষয় হিসাবে। ল্যাবরেটরির অবস্থা তথৈবচ। কেমিস্ট্রির শিক্ষকরা ক্লাসে যান নিতান্তই অনাগ্রহে। ক্লাস শেষ হওয়া মাত্র শিক্ষকরা (কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের কথা বলছি। যে যার বাড়িতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন কিংবা তাস খেলেন। ছোট্ট একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা পরিষ্কার করি। সকাল দশটায় রসায়ন বিভাগের একজন শিক্ষকের মেটালার্জি (ধাতুবিদ্যা বিষয়ে ক্লাস। ক্লাস শুরু হবার পাঁচ মিনিট আগে ওই শিক্ষক আমাকে বললেন, হুমায়ুন সাহেব, আমার ক্লাসটা নিয়ে আসুন তো। আমার আজ ক্লাস নিতে ইচ্ছা করছে না।

আমি বললাম, ভাই, মেটালার্জি আমার বিষয় না। আমি ভৌত রসায়নের। ওই ক্লাস আমি কীভাবে নেব? আমার তো কোনোরকম প্রিপারেশন নেই।

প্রিপারেশন লাগবে না। ক্লাসে ঢুকে যান। কিছুক্ষণ বকবক করে চলে আসবেন।

আপনি পড়াচ্ছেন কী?

স্টিল। স্টিল কীভাবে তৈরি হয়, এইসব হাবিজাবি।

আমি ক্লাসে ঢুকলাম। মন খারাপ করেই ঢুকলাম। হচ্ছেটা কী?

এখন বলি কীভাবে থাকতাম। কয়েকজন শিক্ষক মিলে ইউনিভার্সিটির কাছেই একটা পাকাবাড়ি ভাড়া করেছিলেন। আমি তাদের সঙ্গে যুক্ত হলাম। আমাকে আলাদা একটা রুম দেওয়া হলো। সকালবেলা একটা কাজের মেয়ে আসে। মেয়েটা অল্পবয়স্ক। বেশির ভাগ শিক্ষকই মেয়েটার সঙ্গে রসিকতা করা দায়িত্ব মনে করেন। এই মেয়ে ঘর ঝাট দেয়। বাজার করে আনে। রান্না করে। দুপুরে সবাইকে খাইয়ে থালাবাসন পরিষ্কার করে চলে যায়। খাবার যা বাচে রাতে তাই খাওয়া হয়। নতুন করে রান্না হয় না। খাবারের আয়োজন থাকে সর্বনিম্ন পর্যায়ের। শিক্ষকরা প্রাণপণ চেষ্টা করেন টাকা বাঁচানোর।

বিনোদনের ব্যবস্থার কথা বলি। দুই প্যাকেট তাস আছে। তাস দিয়ে ব্রিজ খেলা হয়। মাঝে মাঝে লুডু খেলা হয়। সব খেলাই সিরিয়াসলি খেলা হয় না। লুডু খেলায় গুটি খাওয়া নিয়ে কয়েকবার হাতাহাতি পর্যন্ত হয়েছে।

আমি কিছুতেই তাদের সঙ্গে মিশ খাওয়াতে পারি না। শিক্ষকদের মধ্যে একজনকে আমার পুরোপুরি মানসিক রোগী বলে মনে হলো। তিনি রোজ রাতে ঘুমুতে যাবার আগে আমার কাছে এসে বিনীত গলায় বলেন, আমাকে একটা লাথি দেবেন? কষে আমার পাছায় একটা লাথি।

প্রথম রাতে এই কথা শুনে আমি চমকে উঠে বললাম, লাথি দেব কেন?

ভদ্রলোক আগের চেয়েও বিনয়ী গলায় বললেন, আপনি পবিত্র একজন মানুষ। আপনি লাথি দিলে আমার কিছু পাপ কাটা যাবে। আমি ভয়ঙ্কর পাপী একজন মানুষ। কী কী পাপ করেছি শুনবেন?

না।

না বলার পরেও তিনি পাপের কথা বলতে থাকেন। আমার বমি আসার মতো হয়। কাজের মেয়েটির রান্না গলা দিয়ে নামতে চায় না।

গ্লানিময় পরিবেশ থেকে বাঁচার জন্য মাঝে মাঝে আমি ময়মনসিংহ শহরে যাই। শহরের ছোটবাজার নামক জায়গায় আমার মেজোখালা থাকেন। তিনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করেন। কিন্তু তাঁর বাড়িটিও বিচিত্র। তার ছোট ছেলেমেয়েগুলি কোনো কারণ ছাড়াই সারাদিন তারস্বরে কাঁদে। এই কান্না বিরামহীন। খালা এসে মাঝে মাঝে কান্না থামাবার জন্য এদের পিঠে ধুম ধুম কিল দেন। এতে তাদের ব্যাটারি রিচার্জ হয়। তারা নবোদ্যমে কান্না শুরু করে।

বায়োলজিক্যাল ইভোলিউশনের নিয়ম অনুযায়ী বাচ্চাদের কান্না এমন হয়, যা বড়দের মধ্যে চূড়ান্ত বিরক্তি তৈরি করবে। যাতে বড়রা ছুটে এসে কান্নার কারণ অনুসন্ধান করে। বাচ্চাদের কান্না যদি বিরক্তি উৎপাদন না করে, তাহলে কেউ কান্নার কারণ অনুসন্ধানে এগিয়ে আসবে না। শিশু থাকবে একা। ইভোলিউশন বাধাগ্রস্ত হবে।

খালার বাসায় যতক্ষণ থাকি, ততক্ষণ ইভোলিউশনের যন্ত্রণা মর্মে মর্মে অনুভব করি। বেশির ভাগ সময় আমি চলে যাই দোতলার একটা ঘরে। দরজা জানালা বন্ধ করে রাখি, যাতে আওয়াজটা কম আসে।

ছুটির দিনের এক দুপুরের কথা। দোতলার ঘরে দরজা বন্ধ করে শুয়েছি। একটা জানালা শুধু খোলা। বৃষ্টি দেখার জন্য সেই জানালাটা খোলা রেখেছি। ভালো বৃষ্টি হচ্ছে। জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছাট আসছে, ঠান্ডা হাওয়া আসছে। আরামে চোখে ঘুম এসে যাচ্ছে। খালার বাচ্চাগুলোর কান্নাটাও আবহসঙ্গীতের। মতো লাগছে। ঘুম ঘুম অবস্থায় (কিংবা ঘুমের মধ্যে একটা ঘটনা ঘটল। আমি স্পষ্ট দেখলাম জানালার শিক গলে অদ্ভুত এক প্রাণী ঢুকল। পাঁচ ফুটের মতো লম্বা। লোমশ শরীর। মুখমণ্ডল মানুষের মতো। প্রাণীটা ইশারায় কাদের যেন ডাকল। তারা ঘরে ঢুকল। এরা সাইজে খুবই ছোট। মনে হয় বড়টার সন্তান। বড়টা এসে আমার বুকে বসল। দুহাত দিয়ে গলা চেপে ধরল। মেরে ফেলার চেষ্টা। আমি হাত-পা কিছুই নাড়াতে পারছি না। চিৎকার করার চেষ্টা করছি। পারছি না। নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে শুরু করেছি।

পরে শুনলাম এটা একটা অসুখ। অসুখের নাম বোবায় ধরা। ময়মনসিংহের মেজোখালার বাসায় যে অসুখের শুরু সেই অসুখ আমি এখনো লালন করছি। এখনো আমি একা ঘুমাই না। একা ঘুমালেই বড় বোবাটা বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে উপস্থিত হয়। যখন কেউ আমার সঙ্গে থাকে, তখনো উপস্থিত হয়। তবে তখন আমার গোঙানির শব্দে পাশের জনের ঘুম ভাঙে। সে আমাকে ডেকে তোলে। যে দায়িত্ব এখন বর্তেছে শাওনের কাঁধে।

বোবার হাতে আক্রান্ত হবার পর মেজোখালার বাসায় যাওয়া আমি একেবারেই কমিয়ে দিলাম। খালার বাড়িতে যাওয়ার ভৌতিক কারণ ছাড়াও একটা লৌকিক কারণও ছিল। লৌকিক কারণটা ব্যাখ্যা করি।

খালার ধারণা হলো, বিয়ের পাত্র হিসাবে আমি অতি উত্তম। তিনি তার শ্বশুরবাড়ির দিকের মেয়েদের সঙ্গে আমার বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালাতে লাগলেন। তার বাসায় মফস্বলের আধুনিকতায় আধুনিক তরুণীরা আসা-যাওয়া করতে লাগল। মফস্বলের আধুনিকতা হচ্ছে সারা শরীর দুলিয়ে কথা বলা, অকারণে হাসা এবং অকারণে লম্বা গলায় বলা ‘সরি’। তখনো ‘oh Shit’ বলা চালু হয় নি।

খালা এদের বলতেন, আমি রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত। আমার ভাইগ্না একা বসে আছে। যাও তার সঙ্গে গল্প কর।

তাদের গল্পের নমুনা দেই। একজন গল্প করতে এল। অকারণে হেসে ভেঙে পড়তে পড়তে বলল, আপনি নাকি রাইটার?

হুঁ।

আমি কিন্তু বাংলাদেশের কোনো রাইটারের বই পড়ি না। সরি।

সরি হবার কিছু নেই।

আরেকটা কথা আপনাকে বলি—-টিচার আমার দুই চোখের বিষ। আপনি রাগ করলেন নাকি? সরি।

সুপাত্র হিসেবে ইউনিভার্সিটিতে আমার সমস্যা শুরু হলো। কোনো এক ফ্যাকাল্টি ডিন এসে বললেন, আমার মেয়ে দিলরুবা (নকল নাম দিলাম। আপনার ছাত্রী। সে আপনার খুব প্রশংসা করে। আপনি আজ সন্ধ্যায় আমার বাসায় আসবেন। আমাদের সঙ্গে খাবেন। মেস করে থাকেন। কী খান তার নাই ঠিক। আমার স্ত্রী নাটোরের মেয়ে। রান্নার হাত অসাধারণ। বাসা চিনবেন? না-কি দিলরুবাকে পাঠিয়ে দেব আপনাকে নিয়ে যেতে।

বাসা চিনব।

সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে চলে আসবেন। কিছুক্ষণ গল্পগুজব করব। দিলরুবা ভালো গান জানে। গান শুনবেন। গানবাজনার প্রতি কি আগ্রহ আছে? শুধু। লেখাপড়া নিয়ে থাকলে হয় না, জীবনে সুকুমার কলারও প্রয়োজন আছে।

সুকুমার কলার সন্ধানে গেলাম। দিলরুবা হারমোনিয়াম নিয়ে তৈরি। তার গানের টিচার এসেছেন। তিনি তবলা বাজাবেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত দিয়ে শুরু হলো—‘খোল খোল দ্বার রাখিও না আর…’। তারপর নজরুল ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী’।

দিলরুবার বাবা বললেন, হুমায়ূন সাহেব, এইবার আপনার পছন্দের গান হবে। বলুন আপনার কোন গান পছন্দ?

দিলরুবা বলল, আমার কোনো গানই স্যারের পছন্দ হচ্ছে না। আমি লক্ষ করেছি, আমি গান গাওয়ার সময় স্যার অন্যদিকে তাকিয়ে থাকেন। আমি আর গানই করব না। বলতে বলতে দিলরুবার গলা ভারি হয়ে গেল। সে বসার ঘর থেকে ছুটে ভেতরের দিকে চলে গেল। দিলরুবার মা বললেন, আমার মেয়ে বড়ই অভিমানী। এখন বাথরুমে দরজা বন্ধ করে কাদবে। বাবা, তোমার কি খিদে লেগেছে? টেবিলে খাবার লাগাতে বলি।

বলুন।

খাওয়াদাওয়া শেষ হলো। দিলরুবা আমাকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসে বলল, স্যার, একটা আইটেম আমি রান্না করেছি। বলুন তো কোনটা?

আমি বললাম, এটা বলা তো খুব কঠিন।

দিলরুবা বলল, মোটেই কঠিন না। সবচেয়ে পচা হয়েছে যে আইটেমটা সেটা আমি বেঁধেছি।

আমি বললাম, তাহলে তো মনে হয় সবই তোমার রান্না।

দিলরুবা চোখে আঁচল চাপা দিয়ে আবারো ঘরের দিকে ছুটে গেল। মনে হয় বাথরুমে ঢুকে কাঁদবে।

তিন মাস পার করার পর চাকরিতে ইস্তফা দিলাম। চেয়ারম্যান স্যার থমথমে গলায় বললেন, কেন চাকরি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন? এখানে সমস্যা কী হচ্ছে?

আমি বললাম, কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারারের পোস্ট খালি হয়েছে। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করব।

চেয়ারম্যান স্যার হতাশ গলায় বললেন, আমি বলেছিলাম না, এটা হচ্ছে আপনার মতো ছেলেদের ট্রানজিট পয়েন্ট।

জি আপনি বলেছিলেন।

সেকেন্ড থট দিন। আমি চেষ্টা করব যেন অতি দ্রুত আমাদের ইউনিভার্সিটির স্কলারশিপ নিয়ে পিএইচডি করতে যেতে পারেন।

স্যার। আমাকে ছেড়ে দিন। ময়মনসিংহ আমার শহর। কিন্তু আমাকে শহর টানছে না।

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করলাম। ময়মনসিংহ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কোনো অর্জন নেই। সবই বিসর্জন। ছোট্ট একটা অর্জন আছে—এক বর্ষার রাতে ‘সৌরভ’ নামে একটা ছোটগল্প লিখেছিলাম। গল্পটা বিচিত্রায় প্রকাশিত হয়েছিল। সৌরভ আমার লেখা প্রথম ছোটগল্প, যা হারিয়ে যায় নি। ছফা ভাইয়ের পত্রিকায় ছাপা হওয়া গল্পটার এখন কোনো অস্তিত্ব নেই।

কৌতূহলী পাঠকদের জন্য গল্পটা দিয়ে দিলাম। গল্পের পটভূমি ময়মনসিংহ শহর, এটা কি বোঝা যায়?

.

সৌরভ

আজহার খাঁ ঘর থেকে বেরুবেন, শার্ট গায়ে দিয়েছেন, তখনি লিলি বলল, বাবা আজ কিন্তু মনে করে আনবে।

তিনি তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকালেন মেয়ের দিকে। মেয়ে বড় হয়েছে, ইচ্ছে করলেও ধমক দিতে পারেন না। সেই জন্যেই রাগী চোখে তাকিয়ে রইলেন খানিকক্ষণ।

লিলি বলল, রোজ রোজ মনে করিয়ে দেই। আজ আনবে কিন্তু।

সামনের মাসে আনব।

না, আজই আনবে।

রাগে মুখ তেতো হয়ে গেল আজহার খার। প্রতিটি ছেলেমেয়ে এমন উদ্ধত হয়েছে। বাবার প্রতি কিছুমাত্র মমতা নেই। আর নেই বলেই মাসের ছাব্বিশ তারিখে দেয়ালে হেলান দিয়ে দৃঢ় গলায় বলতে পারে, না, আজই আনতে হবে।

তিনি নিঃশব্দে শার্ট গায়ে দিলেন। চুল আঁচড়ালেন। জুতা পরলেন। জুতার ফিতায় কাদা লেগেছিল, ঘষে ঘষে সাফ করলেন। লিলি সারাক্ষণই বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। তিনি বেরুবার জন্যে উঠে দাঁড়াতেই বলল, বাবা, আনবে তো?

মেয়েটার গালে প্রচণ্ড একটি চড় কষিয়ে দেবার ইচ্ছা প্রাণপণে দমন করে তিনি শান্ত গলায় বললেন, টাকা নেই, সামনের মাসে আনব।

লিলি নিঃশব্দে উঠে গেল। তিনি ভেবে পেলেন না সবাই বৈরি হয়ে উঠলে কী করে বেঁচে থাকা যায়। তিনি তো কিছু বলেন নি। শুধু শান্ত গলায় বলেছেন, হাতে টাকা নেই। এটা তাকে বলতে হলো কেন? যে মেয়ে বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে তার অভাব বুঝতে পারে না সে কেমন মেয়ে?

তার মন খারাপ হয়ে গেল। ইদানীং অল্পতেই তার মন খারাপ হয়ে যায়, সামান্য সব কারণে হতাশ বোধ করেন। বেঁচে থাকা অনাবশ্যক বলে মনে হয়।

‘হতাশা গুণনাশিনী। হতাশা মানুষের সমস্ত গুণ নষ্ট করে দেয়। তবুও তো ভালোবাসার মতো মহত্তম সগুণটি আমার এখনো নষ্ট হয় নি। তোমাদের সবাইকে আমি ভালোবাসি। তোমাদের জন্যে সারাক্ষণ আমার বুক টনটন করে, আর লিলি তুমি তোমার বাবার দিকে ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে থাক। মাসের ছাব্বিশ তারিখে তোমার একটি শখের জিনিস আমি কিনে আনতে পারি না। কিন্তু তুমি তো আমারই মেয়ে। তুমি তোমার মায়ের মতো অবুঝ হবে কেন?’

আজহার খাঁর কান্না পেতে লাগল। যদিও সন্ধ্যা হয়ে আসছে, তাঁকে এক্ষুনি বাইরে বেরুতে হবে। তবু তিনি চৌকিতে বসে বাইরের আকাশ দেখতে লাগলেন।

বাবা, এই নাও টাকা।

লিলি তিনটি দশ টাকার নোট টেবিলে বিছিয়ে দিল। তিনি অবাক হয়ে বললেন, টাকা কোথায় পেয়েছিস?

আমার টাকা। আমি জমিয়েছি। আনবে তো বাবা।

আনব।

নাম মনে আছে তোমার?

আছে।

লজ্জা ও হতাশার মিশ্র অনুভূতি নিয়ে তিনি বেরিয়ে এলেন। বাইরে ঝিরঝির করে হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল। সন্ধ্যা এখনো মিলায় নি। এর মধ্যেই চারদিকের তরল অন্ধকার গাঢ় হয়ে এসেছে। পরিচিত পথঘাটও অপরিচিত লাগছে।

দশ বছর ধরে আমি এই শহরে পড়ে আছি। দশ বছর খুব দীর্ঘ সময়। এই দীর্ঘ সময়ে আমি রোজ একই রাস্তায় হাঁটছি। একই ধরনের লোকজনের সঙ্গে কথা বলছি। এই দীর্ঘ সময়ে কোথাও যাই নি। তোমাদের কথা ভেবেই প্রতিটি পয়সা আমাকে সাবধানে খরচ করতে হয়েছে। অফিসে টিফিন আওয়ারে সবাই যখন চায়ের সঙ্গে দুটি করে বিস্কিট খায় আমি সেখানে এক কাপ চা নিয়ে বসি। সেও তোমাদের কথা ভেবেই। তোমরা তার প্রতিদানে কী দিয়েছ আমাকে? আমাকে লজ্জা দেবার জন্যে লিলি, তুমি তোমার দীর্ঘদিনের জমানো টাকা বের করে আন। তোমর মা তার ভাইদের কাছে টাকা চেয়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে চিঠি লেখে।

তাঁর মনে হলো তিনি কুকুরের জীবনযাপন করছেন। সাধ-আহ্লাদহীন বিরক্তিকর জীবন। তিনি একটি নিঃশ্বাস ফেললেন।

বৃষ্টির ছাটে আধভেজা হয়ে আজহার খাঁ বাজারে ঢুকলেন। খারাপ আবহাওয়ার জন্যে বাজার তেমন জমে নি। সন্ধ্যাবেলা যেমন জমজমাট থাকে চারদিক সেরকম নয়। কেমন ফাঁকা ফাঁকা। তিনি বড়সড় দেখে একটি স্টেশনারি দোকানে ঢুকে পড়লেন।

ইভিনিং ইন প্যারিস সেন্টটা আছে আপনাদের?

না, অন্য সেন্ট আছে। দেখবেন?

উঁহু, এইটাই চাই।

তখন ঝমঝম করে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নেমেছে। বৃষ্টি অগ্রাহ্য করে তিনি রাস্তায় নেমে পড়লেন। তিন-চারটি দোকান ঘুরতেই কাদায় পানিতে মাখামাখি। তার গাল বেয়ে পানির স্রোত বইতে লাগল। তাঁর ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল, সেন্টের শিশিটি তাঁর এই মুহূর্তেই প্রয়োজন। বৃষ্টি কখন ধরবে তার জন্যে অপেক্ষা করতে পারছেন না—এমনি তাড়া। পঞ্চম দোকানে সেটি পাওয়া গেল। দোকানি শিশিটি কাগজে মুড়ে বলল, ইশ, একেবারে যে ভিজে গেছেন? রিকশা করে চলে যান।

কত দাম?

ছাব্বিশ টাকা পঞ্চাশ পয়সা।

দরদাম করবার ধৈর্য নেই আর। টাকার জন্যে পকেটে হাত দিয়ে আজহার খাঁ স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। সেখানে দুটি এক টাকার নোট আর একটি আধুলী ছাড়া কিছুই নেই।

দোকানি নীরবে শিশিটি আগের জায়গায় রেখে দিল। তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল এরকম ঘটনা যেন প্রতিদিন ঘটে। কাস্টমার জিনিস কিনে পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেখে পয়সা নেই। এ যেন খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যাপার।

অজিহার খাঁ ভাবলেশহীন মুখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বৃষ্টির ভেতর নেমে গেলেন। হু-হুঁ করে হাওয়া বইছে। ঝড় উঠবে কিনা কে জানে। চশমার কাছে বৃষ্টির ফোঁটা জমে চারদিক ঝাপসা দেখাচ্ছে। আজহার খাঁ নীরবে হেঁটে চলেছেন। দু’একটি রিকশা তার ঘাড়ের ওপর পড়তে পড়তে সামলে উঠছে। দ্রুতগামী। ট্যাক্সির উজ্জ্বল আলো মাঝে মাঝে তার চোখ ঝলকে দিচ্ছে। তিনি আচ্ছনের মতো হাঁটছেন। এই বৃষ্টি, এই শীতল হাওয়া, পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ডুবে যাওয়া ময়লা পানির স্রোত, কিছুই যেন নজরে আসছে না তার।

‘আহা, আমার মেয়ে শখ করে একটা জিনিস চেয়েছে। আশা করে বসে আছে হয়তো। এমন লক্ষ্মী মেয়ে আমার বাবার সংসারে কত কষ্ট পাচ্ছে। তার। নিজের সংসার হোক, সেখানে কোনো দুঃখ-কষ্ট থাকবে না, আমি কসম খেয়ে বলতে পারি।’

এই জাতীয় অসংলগ্ন ভাবনা ভাবতে ভাবতে তিনি নয়াপাড়া ছাড়িয়ে হাইস্কুল ছাড়িয়ে সেইজখালী পর্যন্ত চলে গেলেন। কোথায় যাচ্ছেন, কী জন্য যাচ্ছেন, এসব তাঁর মনে রইল না। একসময় ইটে ধাক্কা খেয়ে পানিতে পড়ে গেলেন। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে বুঝলেন তাঁর পা টলছে; মাথায় অসম্ভব যন্ত্রণা। পাগলের মতো ঘুরছি কী জন্যে? এই ভেবে ফিরে চললেন উল্টো পথে! বাজারের সীমানা ছাড়িয়ে পোস্ট অফিসের কাছে আসতেই সশব্দে বাজ পড়ল কোথাও। রাত কত হয়েছে কে জানে। বাতি-টাতি বিশেষ দেখা যাচ্ছে না। লোকজন শুয়ে পড়েছে। আজহার খাঁর হঠাৎ মনে হলো রফিকের বাসায় গিয়ে বিশটা টাকা নিয়ে এলে হয়। কিন্তু দোকান খোলা থাকবে কতক্ষণ! তিনি ডানদিকের গলিতে ভেজা স্যান্ডেল টানতে টানতে দ্রুত হাঁটতে লাগলেন।

ঘন অন্ধকার রাস্তা, বিজলির আলোয় একআধবার সব ফর্সা হয়ে ওঠে। পরক্ষণে নিকষ কালো।

রফিকের বাসায় কড়া নাড়তে গিয়ে বুঝলেন তাঁর শরীর সুস্থ নয়। প্রবল জ্বর এসেছে। পিপাসায় গলা বুক শুকিয়ে কাঠ। রফিক আঁতকে উঠে বলল, কী হয়েছে আজহার ভাই?

না, কিছু হয় নি। এক গ্লাস পানি খাওয়াও!

বাসার সবাই ভালো আছে তো? ভাবির জ্বর কেমন?

সব ভালোই আছে, এক গ্লাস পানি আন আগে।

আজহার খাঁ উদ্ভ্রান্ত শূন্যদৃষ্টিতে তাকাতে লাগলেন। রফিক তার হাত ধরল, এহ্, তোমার ভীষণ জ্বর। কী হয়েছে বলো?

টাকা আছে তোমার কাছে?

কত টাকা?

গোটা বিশেক।

দিচ্ছি। তুমি একটা শুকনো কাপড় পরো। আমি রিকশা আনিয়ে দিই। আগে একটু পানি দাও।

.

ঘর বন্ধ করে দোকানিরা শুয়ে পড়েছিল। আজহার খা হতভম্ব হয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন। রিকশাওয়ালা বিরক্ত হয়ে বলল, ধাক্কা দেন না স্যার, ভিতরে লোক আছে।

তিনি প্রাণপণে দরজায় ঘা দিলেন। ভেতর থেকে শব্দ এল—কে? তিনি ভাঙা গলায় বললেন, আমি। একটু খুলেন ভাই।

কী ব্যাপার?

টাকা নিয়ে এসেছি। সেন্টের শিশিটা দিন।

খুট করে দরজা খুলে গেল। সন্দেহজনক দৃষ্টিতে দোকানদার তাকিয়ে রইল তার দিকে। তিনি পকেট হাতড়ে টাকা বের করলেন।

দোকানদার বলল, আপনার কী হয়েছে?

কিছু হয় নি।

এত রাতে আসলেন কেন? সকালে আসলেই পারতেন।

রাত কত হয়েছে?

সাড়ে বারো।

.

দ্রুতগতিতে রিকশা চলছে। তিনি শক্ত হাতে হুড চেপে ধরে আছেন। তার সমস্ত শরীর অবসন্ন হয়ে আসছে। তার মনে হলো তিনি যে-কোনো সময় ছিটকে পড়ে যাবেন।

বাড়ির কাছাকাছি সমস্ত অঞ্চলটা অন্ধকারে ডুবে আছে। একটি লাইটপোস্টেও আলো নেই। অল্প ঝড়-বাদলা হলেই এ দিককার সব বাতি নিভে যায়। রিকশা আজহার খাঁর বাড়ি থেকে একটু দূরে টগরদের বাড়ির সামনে থামল। তিনি দেখলেন, হারিকেন জ্বালিয়ে লিলি আর তার মা বারান্দায় বসে আছে। রিকশার বাতি দেখে দু’জনই উঠে দাঁড়িয়েছে। অন্ধকারের জন্যে বুঝতে পারছে না কে এল।

আজহার খাঁ ডাকলেন, লিলি! লিলি?

জমে থাকা পানিতে ছপছপ শব্দ তুলে মা ও মেয়ে দুজনেই দ্রুত আসছিল। তিনি ব্যস্ত হয়ে রিকশা থেকে নামতে গিয়ে উল্টে পড়লেন। যে জায়গাটায় তিনি হুমড়ি খেয়ে পড়লেন, সেখানটায় অদ্ভুত মিষ্টি সুবাস। তিনি ধরা গলায় বললেন, লিলি, তোর শিশিটা ভেঙে গেছে রে।

লিলি ফোঁপাতে ফেঁপাতে বলল, আমার শিশি লাগবে না। তোমার কী হয়েছে বাবা?

গভীর জ্বরে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে আছেন আজহার খাঁ। রঞ্জু অকাতরে ঘুমুচ্ছে। লিলি আর লিলির মা ভয়কাতর চোখে জেগে বসে আছেন। বাইরে বৃষ্টিস্নাত গভীর রাত। ঘরের ভেতরে হারিকেনের রহস্যময় আলো। জানালা গলে ভিজে হিমেল হাওয়া আসছে।

সেই হাওয়া সেন্টের ভাঙা শিশি থেকে কিছু অপরূপ সৌরভ উড়িয়ে আনল।

০৯.

‘টাকশাল থেকে সদ্য বের হওয়া ঝকঝকে কাঁচা রুপার টাকা’। এই উপমা বাংলা সাহিত্যে আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করার পর আমার নিজেকে ঝকঝকে রুপার টাকা মনে হতে লাগল। চেষ্টা করলাম চেহারায় আলগা গাম্ভীর্য নিয়ে আসতে চলনে-বলনে শিক্ষকসুলভ স্থিরতা। হালকা কথাবার্তা বন্ধ। চপলতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শোভা পায় না। একটা প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস, দুটো সাবসিডিয়ারি কেমিস্ট্রি ক্লাস এবং M.Sc. Preliminary-তে কোয়ান্টাম মেকানিক্স। এই হলো আমার দায়িত্ব।

আমি অর্থনৈতিক সমস্যা সত্ত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম দেওয়া। একটা প্যাড় ছাপিয়ে ফেললাম। প্যাডের এক কোনায় লেখা হুমায়ূন আহমেদ, লেকচারার, রসায়ন বিভাগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। যাকে চিঠি লিখব সে যেন। আমার অবস্থানটা বুঝতে পারে। আমাকে এলেবেলে কেউ ভেবে না বসে।

শিক্ষক পরিচয় ছাড়াও আমার লেখক পরিচয়ও আছে। কাজেই লেখকের একটা উদাসী ভাবও চেহারায় আনার চেষ্টা করি। অন্যমনস্ক ভঙ্গি, খেয়ালি দৃষ্টি ইত্যাদি।

যখন ক্লাস থাকে না তখন চলে যাই দৈনিক বাংলা পত্রিকার অফিসে। দৈনিক বাংলার সহ-সম্পাদক সালেহ চৌধুরীর সঙ্গে গল্প করি। তিনি প্রায়ই নিয়ে যান কবি শামসুর রাহমান সাহেবের কামরায়। কবি তখন দৈনিক বাংলার সম্পাদক। তাকে ঘিরে সব সময় ভিড়। দর্শনার্থীদের সঙ্গে কবি নানান ধরনের কথা বলেন। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনি এবং প্রায়ই ভাবি আমি এদের দলেরই মানুষ। আমাদের অবস্থান জাতির আত্মার কাছাকাছি। আমাদের জন্মই হয়েছে জাতিকে পথ দেখানোর জন্যে। বড় ভালো লাগে। নিজের ভেতরে পবিত্র ভাব হয়।

দৈনিক বাংলা অফিসেই বিচিত্রার ঘরবাড়ি। বিচিত্রার সম্পাদক শাহাদত চৌধুরী কোনার দিকের একটা ঘরে বসেন। তিনি তখন কাগজ ছেঁড়া নামক বিচিত্র রোগে ভুগছেন। সবসময় কাগজ ছিঁড়ছেন। ছেঁড়া কাগজের শব্দ না শুনে এক সেকেন্ডও থাকতে পারেন না। গাদা গাদা নিউজপ্রিন্ট তাঁর কাছে রাখা হয় ছেঁড়ার জন্যে।

মাঝে মাঝে শাহাদত ভাইয়ের ঘরে গিয়ে বসি। শাহাদত ভাই কাগজ ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলেন, ভালো?

জি ভালো।

চা খান। এই চা দাও।

চা দেওয়া হয়। আমি চা খাই। শাহাদত ভাই অন্যদিকে তাকিয়ে কাগজ ছিঁড়তে থাকেন।

বিচিত্রা অফিসে অনেকেই তখন কাজ করে। তাদের সবার নাক বেশ উঁচু। নাক উঁচু পত্রিকার কারণে। একটি ক্ষমতাধর পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত সবাই ক্ষমতার আঁচ অনুভব করেন। সেটাই স্বাভাবিক। তারা খুব একটা কথা বলেন না। লেখকশ্রেণীকে পাত্তা দেন না। লেখকরা তাদের তোয়াজ করে চলবে এটাই আশা করেন। আমি তোয়াজটা কীভাবে করব বুঝতে না পেরে কিছুটা কনফিউজড বোধ করি।

বিচিত্রার শাহাদত ভাইয়ের অফিসে একদিন বসে আছি, তিনি যথারীতি কাগজ ছিঁড়ে যাচ্ছেন। হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, পশ্চিমবঙ্গে পূজাসংখ্যা বের হয়। আমাদের দেশে ঈদসংখ্যা বলে কিছু নেই। ঈদ মানেই কোলাকুলি এবং সেমাই। ঠিক করেছি এবার ঈদসংখ্যা বের করব। আপনি একটা উপন্যাস দেবেন।

আমি বললাম, অবশ্যই।

আনন্দে ঝলমল করছি। বিচিত্রা আমার কাছে উপন্যাস চাচ্ছে, আমি তাহলে লেখক হয়েই গেছি। এই প্রথম উপন্যাস লিখছি একজনের ফরমায়েশে। কী লেখা যায়? গ্রামের পটভূমিতে কিছু লিখি নি। গ্রামে গল্পটা শুরু করলে কেমন হয়? গ্রামের স্মৃতি তেমন নেই। ঠিক করলাম দশদিনের ছুটি নিয়ে গ্রামে যাব। দাদার বাড়ি, কিংবা নানার বাড়ি। উপন্যাসটা সেখানেই লিখে শেষ করব।

ইউনিভার্সিটিতে ছুটির দরখাস্ত করতে হয় রেজিস্ট্রারের কাছে। সেই দরখাস্ত রেকমন্ড করবেন বিভাগীয় চেয়ারম্যান।

দরখাস্ত করলাম। অফিসে জমা দিলাম। খন্দকার স্যার বিরক্ত গলায় বললেন, মাত্র সেদিন জয়েন করেছ। এখনি ছুটি? কী জন্য ছুটি চাও?

কী উত্তর দেব বুঝতে পারছি না, লেখালেখির জন্য ছুটি চাচ্ছি শুনলে স্যার সম্ভবত আরো রাগবেন।

আমি মুখ শুকনো করে দাঁড়িয়ে আছি। স্যার বললেন, লিখেছ অতি জরুরি। কারণে ছুটি দরকার। অতি জরুরি কারণটা কী?

স্যার, ছুটি লাগবে না।

গুড। যাও ঠিকমতো ক্লাস নাও।

আমি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে চলে এলাম। গ্রামের পটভূতিতে উপন্যাস লিখতে হবে এটা মাথা থেকে দূর করে দিলাম। ঠিক করলাম শহরকেন্দ্রিক উপন্যাসই লিখব। মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প। বাবা-মা ও দুই বোন। গল্পটা মাথার ভেতর তৈরি হতে থাকল। যতক্ষণ ক্লাসে থাকি ততক্ষণ মাথায় গল্প থাকে না। ক্লাস। থেকে বের হলেই মাথায় গল্প ঘুরঘুর করতে থাকে।

কোয়ান্টাম মেকানিক্স পড়িয়ে তখন খুবই আরাম পেতাম। বিজ্ঞান মানেই যে’শুষ্কং কাষ্ঠং তিষ্টতি অগ্রে’ না।

বিজ্ঞানে অপূর্ব রহস্য আছে। রহস্য জানা এবং না-জানার আনন্দ আছে তা ছাত্রদের বলতে পেরে ভালো লাগত। প্রাণপণ চেষ্টা করতাম অতি জটিল বিষয়। সহজে ব্যাখ্যা করার।

একদিন ক্লাসে বললাম, মনে করো God লুডু খেলছেন। তিনি যখন দান দেবেন তখন ছক্কার গুটিতে কত উঠবে তাকি আগে থেকে বলতে পারবেন?

সবাই একসঙ্গে বলল, অবশ্যই পারবেন।

আমি বললাম, তোমাদের চিন্তার সঙ্গে আইনস্টাইনের চিন্তার মিল আছে। আইনস্টাইনও ভাবতেন, পারবেন। আসলে কিন্তু তা-নী। মানুষের ক্ষেত্রে যে অনিশ্চয়তা, গডের ক্ষেত্রেও তা। একটি বস্তুর গতি এবং অবস্থান যেমন মানুষ একই সঙ্গে বলতে পারবে না, অনিশ্চয়তা থাকবে, গডের ক্ষেত্রেও তা।

আমার অতি সরল ব্যাখ্যা ছাত্রছাত্রীদের খুব যে কাজে এল তা না। পরীক্ষার খাতায় তারা উদ্ভট উদ্ভট উত্তর লিখতে লাগল। একটা প্রশ্ন ছিল, ক্ল্যাসিক্যাল মেকানিক্স এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মূল প্রভেদটা কী?

এক ছাত্র উত্তর লিখল—ক্ল্যাসিক্যাল মেকানিক্সে ঈশ্বর পাশা খেলেন। কোয়ান্টাম মেকানিক্সে তিনি পাশা খেলেন না।

আমি তখনি ঠিক করলাম, ছাত্রদের জন্য কোয়ান্টাম মেকানিক্সের একটা টেক্সট বই লিখব। যেখানে অতি Abstract এই বিষয়টি বোধগম্য ভাষায় লেখা হবে। ছাত্ররা সেই বই ভয় নিয়ে পড়বে না, আনন্দ নিয়ে পড়বে। পিএইচডি করে ফেরার পর সেই বই লিখেছিলাম। নাম কোয়ান্টাম রসায়ন।

বিচিত্রার উপন্যাসে ফিরে যাই।

লেখা শুরু করার পরে দেখি গল্প শুরু হয়েছে গ্রাম্য পটভূমিতে। কিছুতেই পাত্রপাত্রীদের ঢাকা শহরে আনা যাচ্ছে না। সেদিন প্রথম মনে হলো লেখালেখির পুরোটা লেখকের হাতে থাকে না। তার পেছনে অন্যকেউ থাকে। মূল সুতা যার হাতে।

বিচিত্রার প্রথম ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত আমার উপন্যাসটির নাম অচিনপুর।

বিস্ময়কর মনে হলেও সত্যি আমাকে লেখকখ্যাতি এনে দিল এই উপন্যাসটি। কারণ বিচিত্রার কারণে বহু পাঠক এই লেখাটা পড়ল।

উপন্যাসের জন্য আমি তিনশ’ টাকা পেলাম। সেই দিনই খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানির খান সাহেবও আমার হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিলেন নন্দিত নরকে এবং শঙ্খনীল কারাগার উপন্যাসের রয়েলটি বাবদ, যেখানে চারশ’ টাকা আছে। টাকা নিয়ে ফিরছি, স্টুডেন্ট ওয়েজের মালিক ডেকে দোকানে বসালেন। তারা আমার একটা উপন্যাস ছাপতে চান। এই উপলক্ষে দুশ টাকা অ্যাডভান্স দিলেন। জীবনে প্রথম কোনো উপন্যাসের জন্য অ্যাডভান্স টাকা পাওয়া।

বেতনের ডবল টাকা নিয়ে বাসায় ফিরেছি। কেমন যেন অস্থির লাগছে। মনে হচ্ছে এই টাকার ওপর আমার কোনো অধিকার নেই। এই টাকা অন্য কারোর।

অচিনপুর উপন্যাসের কিছুটা পড়লে কেমন হয়?

অচিনপুর

মরবার পর কী হয়?

আট-ন’ বছর বয়সে এর উত্তর জানবার ইচ্ছে হলো। কোনো গূঢ় তত্ত্ব নিয়ে চিন্তার বয়স সেটি ছিল না, কিন্তু সত্যি সত্যি সেই সময়ে আমি মৃত্যুরহস্য নিয়ে ভাবিত হয়ে পড়েছিলাম।

সন্ধ্যাবেলা নবু মামাকে নিয়ে গা ধুতে গিয়েছি পুকুরে। চারদিকে ঝাপসা করে অন্ধকার নামছে। এমন সময় হঠাৎ করেই আমার জানবার ইচ্ছে হলো, মরার পর কী হয়? আমি ফিসফিস করে ডাকলাম, নবু মামা, নবু মামা।

নবু মামা সাঁতরে মাঝপুকুরে চলে গিয়েছিলেন। তিনি আমার কথা শুনতে পেলেন না। আমি আবার ডাকলাম, নবু মামা, রাত হয়ে যাচ্ছে।

আর একটু।

ভয় লাগছে আমার।

একা একা পাড়ে বসে থাকতে সত্যি আমার ভয় লাগছিল। নবু মামা উঠে আসতেই বললাম, মরার পর কী হয় মামা? নবু মামা রেগে গিয়ে বললেন, সন্ধ্যাবেলা কী বাজে কথা বলিস? নবু মামা ভীষণ ভীতু ছিলেন, আমার কথা শুনে তার ভয় ধরে গেল। সে সন্ধ্যায় দুজনে চুপি চুপি ফিরে চলেছি। রইসুদ্দিন চাচার কবরের পাশ দিয়ে আসবার সময় দেখি, সেখানে কে দুটি ধূপকাঠি জ্বালিয়ে রেখে গেছে। দুটি লিকলিকে ধোয়ার শিখা উড়ছে সেখান থেকে। ভয় পেয়ে নবু মামা আমার হাত চেপে ধরলেন।

শৈশবের এই অতি সামান্য ঘটনাটি আমার খুব স্পষ্ট মনে আছে। পরিণত বয়সে এ নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। ছোট একটি ছেলে মৃত্যুর কথা মনে করে একা কষ্ট পাচ্ছে—এ ভাবতেও আমার খারাপ লাগত।

সত্যি তো, সামান্য কোনো ব্যাপার নিয়ে ভাববার মতো মানসিক প্রস্তুতিও যার নেই, সে কেন কবরে ধূপের শিখা দেখে আবেগে টলমল করবে? কেন সে একা একা চলে যাবে সোনাখালি? সোনাখালি খালের বাঁধানো পুলের ওপর বসে থাকতে থাকতে একসময় তার কাঁদতে ইচ্ছে হবে?

আসলে আমি মানুষ হয়েছি অদ্ভুত পরিবেশে। একা একটি বাড়ির অগুনতি রহস্যময় কোঠা। বাড়ির পেছনে জড়াজড়ি করা বাঁশবন। দিনমানেই শেয়াল ডাকছে চারদিকে। সন্ধ্যা হব-হব সময়ে বাঁশবনের এখানে-ওখানে জ্বলে উঠছে ভূতের আগুন। দোতলার বারান্দায় পা ছড়িয়ে বিচিত্র সুরে কোরআন পড়তে শুরু করেছে কানাবিবি। সমস্তই অবিমিশ্র ভয়ের।

আবছা অন্ধকারে কানাবিবির দুলে দুলে কোরআন-পাঠ শুনলেই বুকের ভেতর ধক করে উঠত। নানিজান বলতেন, কানার কাছে এখন কেউ যেও না গো। শুধু কানাবিবির কাছেই নয়, মোহরের মা পা ধোয়াতে এসে বলত, পুলাপান কুয়াতলায় কেউ যেও না। কুয়াতলায় সন্ধ্যাবেলায় কেউ যেতাম না। সেখানে খুব একটা ভয়ের ব্যাপার ছিল। ওখানে সন্ধ্যাবেলায় যেতে নেই।

চারদিকেই ভয়ের আবহাওয়া। নানিজানের মেজাজ ভালো থাকলে গল্প ফঁদতেন। সেও ভূতের গল্প : হাট থেকে শোল মাছ কিনে ফিরছেন তার চাচা। চারদিকে অন্ধকার হয়ে এসেছে। শ্রাবণ মাস, বৃষ্টি পড়ছে টিপটিপ। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সড়ক ছেড়ে বাড়ির পথ ধরেছেন, অমনি পেছন থেকে নাকি সুরে কে চেঁচিয়ে উঠল, মাছটা আমারে দিয়ে যা।

রাতেরবেলা ঘুমিয়ে পড়া ছেলেমেয়েদের জাগিয়ে এনে ভাত খাওয়াত মোহরের মা। লম্বা পাটিতে সারি সারি থালা পড়ত। ঘুম-ঘুম চোখে ভাত মাখাচ্ছি, এমন সময় হয়তো ঝুপ করে শব্দ হলো বাড়ির পেছনে। মোহরের মা খসখসে গলায় চেঁচিয়ে উঠল, পেততুনি নাকি? পেততুনি নাকি রে?

নবু মামা প্রায় আমার গায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে চাপা সুরে বলত, ভয় পাচ্ছি, ও মোহরের মা, আমার ভয় লাগছে।

নানাজানের সেই প্রাচীন বাড়িতে যা ছিল, সমস্তই রক্ত জমাট-করা ভয়ের। কানাবিবি তার একটিমাত্র তীক্ষ্ণ চোখে কেমন করেই না তাকাত আমাদের দিকে। নবু মামা বলত, ঐ বুড়ি আমার দিকে তাকালে কঞ্চি দিয়ে চোখ গেলে দেব। কানাবিবি কিছু না বলে ফ্যালফ্যালিয়ে হাসত। মাঝেমধ্যে বলত, পুলাপান ভরাও কেন? আমি কিতা? পেত্নী? পেত্নী না হলেও সে আমাদের কাছে অনেক বেশি ভয়াবহ ছিল। শুধু আমরা নই, বড়রাও ভাকে সমীহ করে চলতেন। আর সমীহ করবে নাই-বা কেন? বড় নানিজানের নিজের মুখ থেকে শোনা গল্প।

তার বাপের দেশের মেয়ে কানাবিবি। বিয়ের সময় সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন। ফাই-ফরমাস খাটে। হেসে-খেলে বেড়ায়। একদিন দুপুরে সে পেটের ব্যথায় মরোমরো। কিছুতেই কিছু হয় না, এখন যায় তখন যায় অবস্থা। নানাজান লোক পাঠিয়েছেন আশু কবিরাজকে আনতে। আশু কবিরাজ এসে দেখে সব শেষ। বরফের মতো ঠান্ডা শরীর। খাঁটিয়ায় করে বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাঁশ কাটতে লোক গেল। নিজান মড়ার মাথার কাছে বসে কোরআন পড়তে লাগলেন। অদ্ভুত ব্যাপারটা ঘটল ঠিক তখনি। আমার লিজান ভয়ে ফিট হয়ে গেলেন। নানাজান আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠলেন, ইয়া মাবুদ, ইয়া মাবুদ। কারণ কানাবিবি সে সময়ে ভালো মানুষের মতো উঠে বসে পানি খেতে চাচ্ছে। এরপর থেকে স্বভাব-চরিত্রে আমূল পরিবর্তন হলো তার। দিনরাত নামাজ-রোজা। আমরা যখন কিছু কিছু জিনিস বুঝতে শিখেছি তখন থেকে দেখছি, সে পাড়ার মেয়েদের তাবিজ-কবজ দিচ্ছে। সন্ধ্যা হতে-না-হতেই দোতলার বারান্দায় কুপি জ্বালিয়ে বিচিত্র সুরে কোরআন পড়ছে। ভয় তাকে পাবে না কেন?

এ তো গেল রাতের ব্যাপার। দিনেরবেলাও কি নিস্তার আছে? গোল্লাছুট খেলতে গিয়ে যদি ভুলে কখনো পুবের ঘরের কাছাকাছি চলে গিয়েছি, অমনি রহমত মিয়া বাঘের মতো গর্জন করে উঠেছে, খাইয়া ফেলামু। ঐ পোলা, কাঁচা খাইয়া ফেলামু। কচ কচ কচ। ভয়ানক জোয়ান একটা পুরুষ শিকল দিয়ে বাঁধা। ব্যাপারটাই ভয়াবহ! বদ্ধ পাগল ছিল রহমত মিয়া, নানাজানের নৌকার মাঝি। তিনি রহমতকে স্নেহ করতেন খুব, সারিয়ে তুলতে চেষ্টাও করেছিলেন। লাভ হয় নি।

এ সমস্ত মিলিয়ে তৈরি হয়েছে আমার শৈশব। গাঢ় রহস্যের মতো ঘিরে রয়েছে আমার চারদিক। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, অল্পবয়সের ভয়কাতর একটি ছেলে তার নিত্যসঙ্গী নবু মামার হাত ধরে ঘুমোতে যাচ্ছে দোতলার ঘরে। নবু মামা বলছেন, তুই ভেতরের জানালা দুটি বন্ধ করে আয়, আমি দাঁড়াচ্ছি বাইরে। আমি বলছি, আমার ভয় করছে, আপনিও আসেন। মামা মুখ ভেংচে বলছেন, এতেই ভয় ধরে গেল! টেবিলে রাখা হারিকেন থেকে আবছা আলো আসছে। আমি আর নবু মামা কুকুরকুণ্ডলী হয়ে লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছি। নবু মামা শুতে না-শুতেই ঘুম। একা একা ভয়ে আমার কান্না আসছে। এমন সময় বাড়ির ভেতর থেকে হৈচৈ শোনা গেল। শুনলাম, খড়ম পায়ে খটখট করে কে যেন এদিকে আসছে। মোহরের মা মিহি সুরে কাঁদছে। আমি অনেকক্ষণ সেই কান্না শুনে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম। জানতেও পারি নি সে-রাতে আমার মা মারা গিয়েছিলেন।

সে-রাতে আমার ঘুম ভেঙেছিল ফজরের নামাজের সময়। জেগে দেখি বাদশা মামা চুপচাপ বসে আছেন চেয়ারে। আমাকে বললেন, আর ঘুমিয়ে কী করবি, আয় বেড়াতে যাই। আমরা সোনাখালি খাল পর্যন্ত চলে গেলাম। সেখানে পাকা পুলের ওপর দুজনে বসে বসে সূর্যোদয় দেখলাম। প্রচণ্ড শীত পড়েছিল সেবার। কুয়াশার চাঁদরে গাছপালা ঢাকা। সূর্যের আলো পড়ে শিশিরভেজা পাতা চকচক করছে। কেমন অচেনা লাগছে সবকিছু। মামা অন্যমনস্কভাবে বললেন, রঞ্জু, আজ তোর খুব দুঃখের দিন। দুঃখের দিনে কী করতে হয়, জানিস?

না।

হা হা করে হাসতে হয়। হাসলেই আল্লা বলেন, একে দুঃখ দিয়ে কোনো লাভ নেই। একে সুখ দিতে হবে। বুঝেছিস?

বুঝেছি।

বেশ, তাহলে হাসি দে আমার সঙ্গে।

এই বলে তিনি হো হো করে হেসে উঠলেন। বাদশা মামার খুব মোটা গলা ছিল। তার হাসিতে চারদিক গমগম করতে লাগল। আমিও তার সঙ্গে গলা মেলালাম। বাদশা মামা বললেন, আজ আর বাসায় ফিরে কাজ নেই, চল শ্রীপুর। যাই। সেখানে আজ যাত্রা হবে। আমি মহাখুশি হয়ে তার সঙ্গে চলোম।

কত দিনকার কথা, কিন্তু সব যেন চোখের সামনে ভাসছে।

১০.

দীর্ঘদিনের জন্য যারা দেশের বাইরে যায়, তারা সঙ্গে কী নেয়? আমার অনুমান একটা জায়নামাজ (বাবা-মাকে খুশি রাখার জন্য, গানের সিডি, রান্নার বই। যারা নিজেদের ইনটেলেকচুয়েল মনে করেন তারা রবীন্দ্রনাথের এক কপি সঞ্চয়িতা নেন (কখনো সেখান থেকে কিছু পাঠ করা হয় না)।

আমি দীর্ঘদিনের জন্যে আমেরিকা যাচ্ছি। Ph.D নামক ডিগ্রি করে ফিলসফার টাইটেল পাব। আমি সঙ্গে নিচ্ছি একটা বিশাল বই। মরিসন অ্যান্ড বয়েডের লেখা Organic Chemistry. বাজারে আমার নিজের তখন চারটি বই নন্দিত নরকে, শঙনীল কারাগার, তোমাদের জন্য ভালোবাসা, অচিনপুর।

বইগুলোর একটি করে কপি হলেও সঙ্গে নেওয়া উচিত ছিল। কেন নেই নি তা এখন আর মনে নেই। হয়তো নিজের লেখা বইগুলো সঙ্গে নিতে লজ্জা পাচ্ছিলাম।

Organic Chemistry-র বিশাল বই সঙ্গে নেওয়ার একটাই কারণ। এই বিষয়ে আমি অত্যন্ত দুর্বল। শুনেছি ইউনিভার্সিটিতে প্রথম দিনেই তারা একটা পরীক্ষা নেয়। আমি নিশ্চিত পরীক্ষা নিলেই আমি এই বিষয়ে ফেল করব। দীর্ঘদিন ভ্রমণে যতটা পারা যায় ঝালিয়ে নেওয়া।

আমি যাচ্ছি North Dakota State University-তে। তিনটা ইউনির্ভাসিটি আমাকে টিচিং অ্যাসিসটেন্টশিপ অফার করেছে। এর অর্থ আন্ডার গ্রাজুয়েট ছাত্রদের ক্লাস নেব, তার বিনিময়ে Ph.D করার সুযোগ।

North Dakota State University বেছে নেবার পেছনের কারণ কিন্তু সাহিত্য। রসায়ন না। Little house in the Praire-র লেখিকা যে-জীবনের কথা বলেছেন তা North Dakota-র। উনার বই ছোটবেলায় মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়েছি। তার অনেকগুলো বই অনুবাদ করেছিলেন জাহানারা ইমাম। প্রথম বইটির নাম তিনি দিয়েছিলেন ঘাসের বনে ছোট্ট কুটির। লরা ইঙ্গেলসের প্রতিটি বই পড়ে গহীন অরণ্য, বরফের কাল, শিকার, প্রেইরি ল্যান্ডে যাত্রার গল্প পড়ে কতবার ভেবেছি–আহা, তারা কী সুখেই না ছিল?

ইউনিভার্সিটিতে Orientation হচ্ছে। আমাকে জিজ্ঞেস করা হলো, প্রচণ্ড শীতের এই Fargo শহর আমি কেন পছন্দ করলাম? গরম অঞ্চলের ইউনিভার্সিটি বাদ দিয়ে কেন শীতের দেশের ইউনিভার্সিটি?

আমি লরা ইঙ্গেলসের নাম করলাম।

শিক্ষক ভুরু কুঁচকে বললেন, Who is she?

আমি হতভম্ব! (এখন হতভম্ব হই না। এখন আমি জানি পৃথিবীর সব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বিশেষ জ্ঞান জানলেও সাধারণ জ্ঞানে সামান্য ‘Sof’)

মাসে আমার বেতন ৪৫০ ডলার। প্রথম মাসের বেতন পেয়েই মাকে একশ ডলার পাঠালাম। তাকে কপর্দকশূন্য অবস্থায় রেখে এসেছি (পাঠক! কপর্দক মানে কী? সাধারণ জ্ঞানের পরীক্ষা হচ্ছে)। গুলতেকিনের পেটে তখন আমার বড় মেয়ে। তার পৃথিবীতে আসার সময় হয়ে এসেছে, অথচ তার মা’র হাতও শূন্য। কী যে অবস্থা! একশ’ ডলার পাঠিয়ে খুবই স্বস্তি পেলাম।

আমেরিকায় আমার নতুন জীবন শুরু হলো। সেখানে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি অনুপস্থিত। রসায়নময় জীবন। আন্ডার গ্রাজুয়েট ছাত্রদের প্রবলেম ক্লাস নেই। নিজে ক্লাস করি। প্রতি সপ্তাহেই পরীক্ষা। আমি ডাঙার মাছের মতোই খাবি খাচ্ছি।

প্রবলেম ক্লাসেও নানা সমস্যা। ছাত্রদের ইংরেজি বুঝি না। ওরাও আমার ইংরেজি বুঝে না। উদাহরণ দেই। এনট্রফির একটা অংশ আমি বেশ সময় নিয়ে বুঝালাম। তখন এক ছাত্রী উঠে দাঁড়াল। বিনীত গলায় বলল, তুমি যে কথাগুলো বললে তাকি এবার ইংরেজিতে বলবে? সারা ক্লাসে হাসির শব্দ। আমি আবার মতো দাঁড়িয়ে কী করব বুঝতে পারছি না।

প্রবলেম ক্লাস মূলত রসায়নের অঙ্কের ক্লাস। সেখানে ছাত্র-ছাত্রীরা উদ্ভট প্রবলেম নিয়েও উপস্থিত হয়। যেমন এক ছাত্র বলল, সে এক ইন্ডিয়ান মেয়ের সঙ্গে ডেটিং করছে কিন্তু সেই মেয়ে তাকে চুমু খেতে দিচ্ছে না। একজন ইন্ডিয়ান হিসাবে এই প্রবলেমের সমাধান কী বলে তুমি মনে কর?

আমার থাকার জায়গা নিয়েও সমস্যা। প্রথমে এক আমেরিকান বুড়ির বাড়িতে উঠলাম। সে তার বাড়ির দোতলায় কয়েকটা এলোমেলো রুম বানিয়ে রেখেছে। রুমগুলো ইন্ডিয়ান স্টুডেন্টদের ভাড়া দেয় (আমি কালো গাত্রবর্ণের কারণে তার কাছে ইন্ডিয়ান। সে বাংলাদেশের নাম কখনো শোনে নি।) দোতলায় একটা বাথরুম, তার কোনো দরজা নেই। বুড়ির যুক্তি তোমরা ছেলেরা ছেলেরা বাস কর। তোমাদের প্রাইভেসির দরকার কী?

তার বাড়ির দশ গজের ভেতর কোনো সিগারেট খাওয়া যাবে না। আমি সিগারেট খাই শুনে সে আমার বিছানার ওপর একটা স্মোক ডিটেকটর লাগিয়ে দিল।

অদ্ভুত কোনো কারণে আমার প্রতি বুড়ির আচার-আচরণ হঠাৎ বদলে গেল। তার আদর এবং যত্নে আমি অতিষ্ঠ হয়ে গেলাম। এক পর্যায়ে সে বলল, তুমি আমাকে মা ডাক। এ দেশে আমিই তোমার মা। একদিন বলল, তোমার ঘরের স্মোক ডিটেকটরের কানেকশন আমি অফ করে দিলাম। ঠান্ডার মধ্যে সিগারেট খাবার জন্য বাইরে না গিয়ে এখন ঘরেই খাবে। তবে খবরদার অন্য বোর্ডাররা যেন জানতে না পারে। প্রতি রবিবার আরেক যন্ত্রণা। বুড়ি আমাকে চার্চে নিয়ে যাবে। আমি বললাম, আমি মুসলিম। আমি কেন চার্চে যাব?

বুড়ি বলল, গডের চার্চে সব ধর্মের লোক যেতে পারে।

আমি বললাম, আমি যাব না।

বুড়ি মন খারাপ করে চলে যায়। পরের রবিবারে আবার আসে।

পৃথিবীতে অনেক ধরনের অত্যাচার আছে। ভালোবাসার অত্যাচার হচ্ছে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অত্যাচার। কারণ এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে কখনোই কিছু বলা যায় না। সহ্য করে নিতে হয়।

ফার্গো শহরে প্রথম বরফ পড়ল। পুরো এলাকা ঢেকে গেল বরফে। বুড়ি আমার রুমে উপস্থিত। আমার জন্য বরফে হাঁটার জুতা নিয়ে এসেছে। ঘটনার এখানেই ইতি নয়। বুড়ি ঘোষণা করল, সে আমাকে হাত ধরে ধরে ইউনিভার্সিটিতে নিয়ে যাবে। কারণ বরফে হাঁটার বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা নেই। পিছলে পড়ে পা ভাঙতে পারি।

অনেক চেষ্টা করেও আজ আমি ওই মমতাময়ীর নাম মনে করতে পারছি না। নিজের ওপর প্রচণ্ড রাগ লাগছে।

সব নিরানন্দের মধ্যেই নাকি কিছু আনন্দ লুকানো থাকে। বুড়ির অন্ধকার কোঠায় হঠাৎ একদিন আনন্দের সন্ধান পেলাম। একা একা বই পড়ার আনন্দ। ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখি সায়েন্সের বই ছাড়াও গল্প-উপন্যাসের বিশাল কালেকশন। এর আগে লুই হামসুনের একটা মাত্র বই পড়েছি Vagabond। তার অন্য বইগুলো পড়ার খুব শখ ছিল। বাংলাদেশে পাই নি। লাইব্রেরিয়ানকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি কম্পিউটারের বোতাম চেপে বললেন, আমাদের কাছে ভার তিনটি বই আছে। তুমি চাইলে বাকিগুলোও আনিয়ে দেব।

আমি বললাম, কীভাবে?

লাইব্রেরিয়ান বললেন, আমাদের Inter library loan system আছে। যে বই আমাদের নেই, সেই বই আমরা পনেরো দিনের জন্য আমেরিকার যে-কোনো লাইব্রেরি থেকে লোন করে আনতে পারি।

আমি সরল বাংলায় বললাম, খাইছে আমারে।

লাইব্রেরিয়ান চোখ কপালে তুলে বলল, তার মানে?

আমি বললাম, এটা আমাদের বাংলা ভাষার একটা শব্দ। এর মানে হলো—I have been eaten.

কিছুই বুঝতে পারছি না। কে তোমাকে খেয়েছে?

তোমার অপূর্ব System.

লাইব্রেরিয়ানের বয়স চল্লিশ। হিজড়ার মতো দেখতে একজন মহিলা। শুষ্কং কাষ্ঠং। তাকে মানুষ মনে হয় না। মনে হয় ব্যাকরণের বই।

চিড়িয়াখানায় যে লোক জিরাফের দেখাশোনা করে তার গলা খানিকটা লম্বা হয়ে যায়। যে মহিলা লাইব্রেরিতে কাজ করবেন, তিনি বইয়ের মতো হয়ে যাবেন সেটাই স্বাভাবিক।

একটা পর্যায়ে ভদ্রমহিলা আমার বই পড়ার ক্ষমতা দেখে মুগ্ধ হলেন। লাইব্রেরিতে গেলেই তিনি আমাকে ঘরে বানানো কালো কেক খেতে দেন (অতি অখাদ্য), কফি খেতে দেন (কেকের চেয়েও অখাদ্য)।

থ্যাংকস গিভিংয়ে তিনি আমাকে তার বাড়িতে টার্কি খাবার দাওয়াত করলেন। আমেরিকান নিয়ম অনুযায়ী এক বোতল রেড ওয়াইন কিনে (জীবনে প্রথম নিজের পয়সায় মদ কেনা) উপস্থিত হলাম। ভদ্রমহিলা আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন এইভাবে—এর নাম হুমায়ুন। বাংলাদেশ থেকে এসেছে। নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির ইতিহাসে এর মতো পড়ুয়া ছেলে নেই। সে সব বই পড়ে ফেলেছে।

ভদ্রমহিলার স্বামী, মা-বাবা সবাই খুব মাথা দোলাতে লাগল যেন এমন আনন্দের খবর তারা এর আগে শোনে নি। ভদ্রমহিলা আমাকে Robert Frost এর কবিতার বইয়ের একটি রাজকীয় সংস্করণ উপহার দিলেন। বইয়ের ওপর লেখা

To a person who loves book
and books love him.

খাবারের টেবিলে টার্কি নামের বিশাল পক্ষী রোস্ট করা অবস্থায় আছে। তার পেটভর্তিও নানান খাবার। টার্কির মাংসের রঙ একেক জায়গায় একেক রকম। কোনোটা কালো, কোনোটা লাল, কোনোটা সাদা। আমাকে প্রত্যেক জায়গা থেকে খানিকটা করে কেটে দেওয়া হলো। আমি খাবার মুখে দিয়ে শিউরে উঠলাম। বিকট বোটকা গন্ধ। এই দ্রব্য খাওয়া মানে সাক্ষাৎ মৃত্যু। বমি করতে করতেই মারা যাব। এই বিপদ থেকে কী করে উদ্ধার পাওয়া যায়?

আমি মুখ কাচুমাচু করে বললাম, টার্কির মাংস যে খেতে অসাধারণ হয়েছে তা গন্ধ থেকেই টের পেয়েছি, কিন্তু আমি নিরামিশাষি, আমি মাছ-মাংস-ডিম কিছুই খাই না। আমার জন্য ব্যস্ত হতে হবে না। এক প্লেট সালাদ আর আপেল পাই আমার জন্য যথেষ্ট।

.

আমেরিকায় পড়াশোনা করা অবস্থাতেই খবর পাই আমাকে বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। বাজারে আর তখন মাত্র চারটা বই। বয়স ত্রিশ-একত্রিশ। আমি পেয়ে গেছি বাংলা একাডেমী পুরস্কার।

লাইব্রেরিয়ানকে খবরটা দিতে গেলাম। তিনি খুবই অবাক হয়ে বললেন, তুমি যে একজন লেখক এই খবরটা তো আমাকে কোনোদিন বলে নি। আমি বললাম, পড়াশোনার চাপে আমি নিজেই ভুলে গিয়েছিলাম। ভদ্রমহিলা হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, Standing ovation for a fiction writer.

অবাক হয়ে দেখি বিদেশিনীর চোখ ছলছল করছে। এক জীবনে পরম করুণাময় কতভাবেই না আমাকে আনন্দ দিয়েছেন।

আমি যে লেখক না

আমি যে লেখক না–এই বিষয়টি আমেরিকায় যাবার পর স্পষ্ট হয়ে গেল। টানা পাঁচ বছর আমেরিকায় ছিলাম। Ph.D করেছি, পোস্ট ডক করেছি। এই পাঁচ বছরে এক লাইনও লিখি নি। গল্প-উপন্যাসের তো প্রশ্নই ওঠে না।

একজন সত্যিকার লেখক না লিখে থাকতে পারবেন না। তাকে কিছু না কিছু লিখতেই হবে। একজন তবলাবাদক তবলী না পেলে টেবিলে বা চেয়ারে বোল তোলেন। একজন গায়ককে গুনগুন করতেই হয়। সেখানে আমি কীভাবে না লিখে পারছি? আমার সমস্যাটা কী?

প্রচণ্ড পড়াশোনার চাপ। লেখার সময় নেই —এইসব ভুয়া কথা। একজন লেখক প্রচণ্ড কাজের চাপের ভেতর থেকেও লেখার সময় বের করে নেবেন। তাহলে আমি কেন পারছি না? সমস্যাটা কি পরিবেশ? বাংলাদেশের আলো-বাতাস গায়ে লাগছে না বলেই বাংলা ভাষার লেখকের বলপয়েন্ট দিয়ে কালি বের হচ্ছে না? বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ শুনছি না, ব্যাঙের ডাক শুনছি না—এটাই কি সমস্যা?

মা’কে চিঠি লিখলাম তিনি যেন ক্যাসেটে ব্যাঙের ডাক এবং বৃষ্টির শব্দ রেকর্ড করে পাঠান। আমার সর্বকনিষ্ঠ ভ্রাতা আহসান হাবীব ক্যাসেট রেকর্ডার নিয়ে বৃষ্টির দিনে বনবাদাড়ে ঘুরতে লাগল। যথাসময়ে বর্ষা এবং ব্যাঙের ডাকের ক্যাসেট চলে এল।

আমি তখন ইউনিভার্সিটি হাউজিং-এ চমৎকার বাড়ি পেয়েছি। ডুপলেক্স বাড়ি। একতলায় রান্নাঘর, বসার ঘর এবং স্টাডি রুম। দোতলায় দু’টা শোবার ঘর। গুলতেকিন তার কন্যাকে (নোভা) নিয়ে চলে এসেছে। মেয়ের বয়সও দেখতে দেখতে তিন বছর হয়ে গেছে। নিখুঁত বাংলা এবং নিখুঁত ইংরেজিতে। হড়বড় করে কথা বলে। উইকএন্ডে আশেপাশের সব বাঙালি চলে আসে। খিচুড়ি মাংস রান্না হয় এবং ক্যাসেটে বৃষ্টির শব্দ ও ব্যাঙের ডাক বাজে। বাঙালি ছেলেগুলির চোখ ছলছল করতে থাকে।

বাদলা দিনে মনে পড়ে
ছেলেবেলার গান
বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর
নদেয় এল বান।

আমার জীবনচর্যা সম্পর্কে বলি। সামারে দুই মাস কাজের চাপ থাকে না। সবাই ভ্যাকেশনে যায়। আমার ভ্যাকেশনে যাবার ডলার নেই। আমি ইউনিভার্সিটি থেকে কিছু জমি লিজ নিয়ে চাষাবাদ শুরু করে দিলাম। চাষি হুমায়ূন। আমার সঙ্গী মেয়ে নোভা। পিতা-কন্যা দু’জনের হাতেই খুরপা। আমরা মাটি কোপাই! বীজ বুনি। গাছে পানি দেই। এই সময়টায় মেয়ের সঙ্গে নানা গল্প করি। সবই বাংলাদেশের গল্প। বাংলাদেশের বিশাল নদী, বাঁশবাগানে জোছনা, রয়েল বেঙ্গল টাইগার এবং হরিণে ভর্তি সুন্দরবন, বিশাল সমুদ্র, সিলেটের ডিঙ্গিপোতা হাওর যেখানে সমুদ্রের মতো বড় বড় ঢেউ ওঠে।

নোভা চোখ বড় বড় করে শোনে। একদিন সে বলল, আমাদের দেশটা “a piece of paradise”, তাই না বাবা?

আমি বললাম, অবশ্যই তাই। তবে একটু ভুল করেছ। আমি নিশ্চিত Paradiseও এত সুন্দর না।

আমি অতি ভাগ্যবান, আমি আমার জীবন Paradise-এ কাটিয়ে দিতে পারছি। আমার মেয়েটা ভাগ্যবতী না। তার জীবন কাটছে আমেরিকায়। সে এবং তার স্বামী না-কি ঐ দেশের নাগরিকত্বও পেয়েছে। মেয়েটির কি কখনো তার বাবার সঙ্গে কথোপকথন মনে পড়ে? জানি না। আমার সঙ্গে দীর্ঘদিন তার কোনো যোগাযোগ নেই।

.

শুরুতে যে তথ্য দিয়েছি, লেখালেখি কিছুই করি নি, সেখানে সামান্য ভুল আছে। চিঠি লিখতাম। মাকে, ভাইবোনদের। আমি ভালো আছি। তুমি কেমন আছ? এর বাইরে চিঠিতে তেমন কিছু লেখার থাকে না। দেশের সবাই চায় অনেকক্ষণ ধরে চিঠি পড়তে। কাজেই আমি বানিয়ে বানিয়ে অনেক কিছু লিখতাম যা মোটেই সত্যি না। যেমন একবার টর্নেডোর বর্ণনা দিলাম। একবার লিখলাম ব্লিজার্ডে কীভাবে আটকা পড়েছিলাম। Frost bite হয়ে গেছে।

এইসব কি সাহিত্যের আওতায় পড়বে? Vladimir Nabokov (বিখ্যাত রাশিয়ান লেখক এবং সমালোচক-এর মতে এইসবও সাহিত্যের মধ্যে পড়বে। তিনি বলছেন, Neanderthal যুগে একটি বালক গুহা থেকে চিৎকার করতে করতে বের হলো—নেকড়ে বাঘ! নেকড়ে বাঘ! দেখা গেল তার পেছনে পেছনে ছুটে আসছে নেকড়ে বাঘ। তখন কিন্তু সাহিত্যের জন্ম হলো না। সাহিত্যের জন্ম হলো তখনি যখন একটা বালক চিৎকার করতে করতে আসছে—নেকড়ে বাঘ! নেকড়ে বাঘ! অথচ তার আশেপাশে কোনো নেকড়ে বাঘ নেই।

আমেরিকায় শুরুতে বেশ অর্থকষ্টে ছিলাম। নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। একটা উদাহরণ দিয়ে পরিষ্কার করি। বড় মেয়ের প্রথম জন্মদিন। তারিখটা বেকায়দা ধরনের, ২৮ আগস্ট মাসের শেষদিকে। বেতনের চেক পেতে আরো তিনদিন লাগবে। হাতের সব ডলার শেষ। মেয়ের মা’র মেয়ের প্রথম জন্মদিন নিয়ে নানান পরিকল্পনা। আমি উপহার কিনে নিয়ে এলাম দুই কেজি ময়দা। মেয়ে ময়দা ছানতে পছন্দ করে। আমি প্যাকেট খুলে মেয়ের চারপাশে ময়দা বিছিয়ে দিলাম। সে মহানন্দে দুই হাতে ময়দা ছানাছানি করতে লাগল। সে আনন্দে যতই হাসে, তার মা দুঃখে ততই কাঁদে। মেয়ের প্রথম জন্মদিনে দুই কেজি ময়দা!

তার কষ্ট দেখে আমি বলেছিলাম, দোয়া করছি যেন তোমার সব ছেলেমেয়ে থাকে দুধেভাতে। যেন তারা কখনো অর্থকষ্টে না পড়ে। পরম করুণাময় আমার প্রার্থনা শুনেছেন।

গুলতেকিন আমার অর্থকষ্ট লাঘবের জন্যে কাজে নেমে পড়ল। বেবি সিটিং করে। পত্রিকার অ্যাড দেখে কাপড় এনে রিফু করে দেয়। এইসব বিষয় অন্য বইগুলিতে বিস্তারিত লিখেছি বলে এখানে আর লিখলাম না।

এই সময় একটা ঘটনা ঘটল। আমার প্রফেসর একদিন আমাকে ডেকে বললেন, তোমার কর্মকাণ্ডে আমি যথেষ্ট অসুখী (Very unhappy). তোমার টিচিং অ্যাসিসটেন্সশিপ বাতিল করা হলো।

আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। এই লোক বলে কী? আমি খাব কী?

প্রফেসর বললেন, যাও Mail fox চেক কর। আমাকে Blank took দেবে না। Studentদের Blank look আমার একেবারেই পছন্দ না।

আমি মেইল বক্স চেক করতে গেলাম। সবার জন্যে আলাদা আলাদা মেইল বক্স। আমারটা খুলে একটা চিঠি পেলাম, তাতে লেখা তোমার Performance এ আমরা খুশি। তুমি যাতে মনেপ্রাণে Ph.D ডিগ্রির জন্যে কাজ করতে পার তার জন্যে তোমাকে স্কলারশিপ দেয়া হলো। তোমাকে এখন আর টিচিং অ্যাসিসটেন্সশিপ করতে হবে না।

স্কলারশিপের পরিমাণ ৫৫০ ডলার। টিচিং অ্যাসিসটেন্ট হিসেবে আগে পেতাম ৪৫০ ভলার।

আমেরিকানরা মজা করতে পছন্দ করে। আমার প্রফেসর আমার সঙ্গে একটু মজা করলেন। এখানে যার কথা লিখছি তার নাম প্রফেসর Jeno Wicks. তিনি আমার Ph.D Guide ছিলেন না। তিনি ছিলেন বিভাগের চেয়ারম্যান। ফার্গো শহরে তাঁর ছবির মতো সুন্দর একটা বাড়ি ছিল। বাড়ির পেছনে ছিল সুইমিং পুল। তিনি আমেরিকান সব উৎসবে বিদেশী ছাত্রদের তার বাড়িতে দাওয়াত করতেন। প্রচুর আয়োজন থাকত। তার যুক্তি-বিদেশী ছেলেমেয়েগুলি নিজের দেশ ছেড়ে এখানে একা একা বাস করছে। তারা উৎসব উপলক্ষে কিছুক্ষণ আনন্দ করুক।

গত বত্সর প্রফেসর জেনো উইকস মারা গেছেন। নর্থ ডেকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি তাদের বুলেটিনের মাধ্যমে জানিয়েছে, প্রফেসর জেনো উইকস তাঁর সমস্ত বিষয়সম্পত্তি ইউনিভার্সিটিকে দান করে গেছেন।

আমি আমার এক জীবনে অনেক মহাপ্রাণ মানুষের সংস্পর্শে এসেছি। জীবনের এই সঞ্চয় তুচ্ছ করার মতো নয়।

প্রফেসর জেনো উইকস আমার প্রফেসরদের মধ্যে একমাত্র ব্যক্তি, যাকে আমি আমার লেখক পরিচয় দিয়েছিলাম। গুলতেকিন তার সঙ্গে দেশ থেকে আমার প্রতিটি বইয়ের কয়েকটা করে কপি নিয়ে এসেছিল। আমি তাঁকে বইগুলি দেখালাম। তিনি বললেন, কোন ভাষায় লেখা?

আমি বললাম, বাংলা।

তিনি বললেন, তোমাদের অক্ষরগুলি তো চায়নিজদের চেয়েও জটিল। বসো আমার সামনে। আমি বসলাম। তিনি ল্যাবরেটরির সব ছাত্রছাত্রীকে ডেকে পাঠালেন। আমাকে লজ্জায় ফেলে আমার লেখক পরিচয় দিলেন। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন, পড়ে শোনাও।

আমি বললাম, স্যার, কেউ তো কিছু বুঝবে না।

প্রফেসর বললেন, না বুঝলে নাই। তোমাকে পড়তে বলছি তুমি পড়।

আমি শঙ্খনীল কারাগার উপন্যাসের কয়েক পৃষ্ঠা পড়লাম। আমার প্রফেসরের দিকে তাকিয়ে মনে হলো তিনি খুবই আনন্দ পাচ্ছেন। পাঠ শেষ হলে প্রফেসর ছাত্রদের দিকে তাকিয়ে বললেন, কেমন লাগল?

কেউ কিছু বলল না, সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল। শুধু কোরিয়ান ছাত্র ‘হান’ বলল—মনে হচ্ছে মাথার ভেতর কিছু ছোট ছোট পোকা ঢুকে কিলবিল করছিল।

প্রফেসর বললেন, এই লেখক সপরিবারে আজ রাতে আমার বাসায় ডিনার করবে। তোমাদের নিমন্ত্রণ। A special night with a writer.

.

দেশে ফিরে আমি আমার একটা বই উৎসর্গ করলাম প্রফেসর জেনো উইকসকে। সেই বই তাঁকে পাঠাই নি এবং খবরটাও জানাই নি। আমি আমার শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা আমার পাঠক-পাঠিকাদের জানিয়েছি। এটাই যথেষ্ট।

১২.

যারা বিদেশে পড়াশোনা করতে যায়, তারা দেশে ফিরে ডিগ্রি নিয়ে। কেউ M.S কেউ Ph.D. আমি একটা Ph.D এবং সঙ্গে নতুন দুটি মেয়ে নিয়ে দেশে ফিরলাম। শীলা এবং বিপাশা। বিপাশার তখনো জন্ম হয় নি। সে তার মায়ের পেটে। শীলার মা দেশে ফেরাটা নিতে পারছিল না। তার কথা, দেশে আমি যা বেতন পাব তা দিয়ে সবাইকে তিনবেলা খাওয়াবার সামর্থ্যও থাকবে না। আমার একটাই যুক্তি, বিদেশে পড়াশোনা করতে এসেছি। পড়াশোনা শেষ–এখন দেশে ফিরব। অন্যদের মতো বিদেশে স্থায়ী হব না। যে দেশের স্বাধীনতার জন্যে আমার বাবা শহীদ হয়েছেন, সে দেশকে অস্বীকার করে অন্যদেশের নাগরিকত্ব আমি নিতে পারব না।

খুব খারাপ অবস্থায় দেশে ফিরলাম। পকেটে আমেরিকার দীর্ঘ প্রবাস জীবনের সঞ্চয় দুশ ইউএস ডলার। একটা ফ্রিজও কিনেছিলাম। সেই ফ্রিজ জাহাজে করে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হলো। যে সময়ের কথা বলছি তখন বিদেশফেরতরা ফ্রিজ এবং টেলিভিশন আনতেন। টেলিভিশন কেনার টাকা ছিল না বলে শুধুই ফ্রিজ।

দেশে ফিরে আমার বড় মেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হলো। যা দেখে তাতেই মুগ্ধ হয়। শুধু থালা হাতে নিরন্ন মানুষের দল বাড়িতে আসছে ভাতের জন্যে এই দৃশ্য সে নিতে পারল না। তার ক্ষুদ্র জীবনে এই দৃশ্য সে দেখে নি। তার একটাই প্রশ্ন, এদের ফুড নেই কেন?

বাসায় কোনো ভিখিরি এলেই নোভা দৌড়ে যেত রান্নাঘরে। যা পেত একটা থালায় সাজিয়ে ছুটে যেত নিচে। আমাকে যে প্রশ্ন করত এই প্রশ্ন সে ভিখিরিদেরও করত। আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইত, তোমাদের বাসায় ফুড নেই কেন?

বড় মেয়েটির এই কাণ্ড তার দাদি খুব পছন্দ করতেন। তিনি তাকে ডাকতেন মাদার তেরেসা নামে।

আমেরিকা থেকে ফিরে নুরজাহান রোডের একটা বাসায় উঠলাম। একটা ঘরে আমার পরিবার। অন্য ঘরে আমার মা, শাহীন এবং ছোটবোন মনি।

আমার ঘরে একটা খাট পাতার পর আর জায়গা হয় না। সেই খাটে আমার পরিবারের সবার জায়গা হয় না। আমরা ঘুমাই আড়াআড়ি (ময়মনসিংহের ভাষায় ফাত্তাইরা হয়ে)।

বাসায় কোনো টেলিভিশন নেই। নোভা-শীলা টেলিভিশন দেখার জন্যে পাশের ফ্ল্যাটে যায়! টেলিভিশনে বাংলাদেশ প্রোগ্রাম দেখতে তাদের না-কি খুব ভালো লাগে। তখন এত চ্যানেল হয় নি। বিটিভি সবেধন নীলমণি।

এক রাতের কথা। মেয়েরা খুব আগ্রহ করে টিভি দেখতে গিয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যে তারা ফিরে এসে জানালো, ঐ ফ্ল্যাটে মেহমান এসেছে। কাজেই তাদেরকে আজ টিভি দেখতে দেয়া হবে না। বাচ্চারা খুবই মন খারাপ করল। তাদের চেয়েও মন খারাপ করল বাচ্চাদের মা। কেন বাংলাদেশে এসেছি? কী পাচ্ছি বাংলাদেশে? একটা টিভি কেনার সামর্থ্য নেই। ইত্যাদি ইত্যাদি।

রাতে ভাত খাবার সময় বড় মেয়ে বলল, বাবা, তুমি আমাদের একটা টিভি কিনে দেবে?

আমি বললাম, দেব।

রঙিন টিভি?

আমি বললাম, অবশ্যই রঙিন টিভি।

কবে কিনে দেবে?

এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারলাম না। তবে একটা রঙিন টিভি যেভাবেই হোক কিনতে হবে এটা মাথায় ঢুকে গেল।

বিটিভির নওয়াজীশ আলি খান সাহেবের সঙ্গে তখন আমার সামান্য পরিচয় হয়েছে। আমার একটি নাটক তিনি বিটিভিতে প্রচার করেছেন। নাম খুব সম্ভব ‘প্রথম প্রহর’। তিনি আমাকে একটি ধারাবাহিক নাটক লিখতে বলছেন। আমি ধারাবাহিক নাটক লিখতে রাজি হলাম। ঠিক করলাম, একটি রঙিন টিভি কিনতে যত টাকা লাগে তত টাকার ধারাবাহিক নাটক লেখা হবে। যে নাটকটি লিখলাম তার নাম ‘এইসব দিনরাত্রি’। নাটকটির পরিচালক ছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান।

আমার রঙিন টিভি কেনার টাকা হওয়া মাত্র নাটকের একটি চরিত্র টুনির মৃত্যু দিয়ে নাটক শেষ করে দিলাম।

এই নাটকটির প্রতি আমি নানাভাবে ঋণী। নাটকটির কারণে আমি আমার বাচ্চাদের একটা শখ মিটালাম—রঙিন টিভি কিনলাম।

একটিমাত্র ধারাবাহিক নাটকের কারণে দর্শকদের কাছে হুমায়ূন আহমেদ নামটি পরিচিতি পেল। তারা এই নাট্যকারের লেখা গল্প-উপন্যাস হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করা শুরু করল।

এই নাটক প্রসঙ্গে একটা মজার গল্প বলি। মুস্তাফিজুর রহমান সাহেব একদিন টেলিফোনে আমাকে ডেকে পাঠালেন। একটা মজার জিনিস না-কি দেখাবেন। আমি মজার জিনিস দেখতে গেলাম।

মুস্তাফিজ সাহেব বললেন, একতলায় আমাদের একটা বিলবোর্ড আছে। বিলবোর্ডটা দেখে আসুন। আনন্দ পাবেন।

আনন্দ পাবার জন্যে বিলবোর্ড দেখতে গেলাম এবং আনন্দ পেলাম। বিলবোর্ডে কোলকাতা থেকে প্রকাশিত Statesman পত্রিকার একটি খবর সেঁটে দেয়া আছে। সেখানে লেখা আজ রাতে এইসব দিনরাত্রির শেষ পর্ব প্রচার হবে। এরপর আমরা কী দেখব?

বিটিভিতে নাটক লিখে খুব আনন্দ পেয়েছি। একের পর এক ধারাবাহিক নাটক—অয়োময়, বহুব্রীহি, কোথাও কেউ নেই। ঈদের হাসির নাটক। এক ঘণ্টার নাটক। আমি খুব সূক্ষ্মভাবে নাটকের ভাষা বদলানোর একটা চেষ্টা চালালাম। আগে কোলকাতার ভাষা (নদীয়া-শান্তিপুরের ভাষা বলাই ঠিক হবে) ছিল বিটিভি নাটকের ভাষা। যাই নি, খাই নি, জুতো, নৌকো। আমি চেষ্টা করলাম ঢাকার ভাষা বলে আলাদা কিছু দাঁড়া করাতে।

আমার ধারণা পরীক্ষা-নিরীক্ষা পুরোপুরি ব্যর্থ হয় নি। আজকের নাটকের ভাষা নদীয়া-শান্তিপুর মুক্ত।

বিটিভির একটি কর্মকাণ্ডে আহত হয়েছিলাম। বলপয়েন্ট লেখা মানেই আনন্দ অভিজ্ঞতার বয়ান না। মনোকষ্টের বয়ানও তো বটে! বিটিভি তার পঁচিশ বর্ষ পূর্তি উপলক্ষে রজতজয়ন্তির বিশাল অনুষ্ঠান করছে। পনেরোদিন ধরে অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে বিটিভির নানান দিকের সাফল্য তুলে ধরা হচ্ছে। সেই বিপুল উৎসবে একটি নাম অনুচ্চারিত হুমায়ূন আহমেদ। অথচ তখন আমার সব কটি ধারাবাহিক নাটক প্রচারিত। টিভি নাটকে আমি কী করেছি কতটুকু করেছি তা ‘বিটিভি’র কর্তাব্যক্তিরা জানেন।

আমি এক কর্তাব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলাম। বললাম, আমি তো আপনাদের ‘ভাসুর’ না। আমার নাম মুখে নিতে সমস্যা কী ছিল?

তিনি বললেন, আপনি খুব ভালোভাবেই অনুষ্ঠানে ছিলেন। পরে আপনাকে বাদ দেয়া হয়েছে।

আমি বললাম, কেন?

কর্তাব্যক্তি মধুর ভঙ্গিতে হাসলেন। কিছু বললেন না।

বাদ পড়ার অভিজ্ঞতা আমার জীবনে প্রচুর আছে। সাহিত্যের অধ্যাপকদের অনেক গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে, যার বিষয়বস্তু মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালীন সাহিত্য। সেখানে সবাই আছে, আমি নেই। হতেই পারে সাহিত্যের অধ্যাপকরা আমাকে লেখক মনে করেন না। এমন একজন মনে করেন যে লেখালেখি করে অর্থ উপার্জন করেন। তাদের কাছে লেখালেখি করে অর্থ উপার্জন মানে সাহিত্যের মহান বোধের