ব্যাধি – হুমায়ূন আহমেদ

ব্যাধি - হুমায়ূন আহমেদ

ভদ্রলোকের নাম রকিবউদ্দিন ভূঁইয়া। ভূঁইয়া গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক। কোটিপতি কিংবা কোটিপতির উপরে যদি কোন পতি থাকে সেই পতি। ভদ্রলোকের সঙ্গে কোথায় পরিচয় হয়েছিল মনে নেই। কোন পার্টি-টার্টি হবে, এই জাতীয় লোকদের সঙ্গে পার্টি ছাড়া দেখা হয় না। ভদ্রলোক বিনয়ী, কথা বলেন সুন্দর করে, তারপরেও তাকে আমার পছন্দ হয়নি। অসম্ভব বিত্তবান মানুষদের ভেতর চাপা অহংকার থাকে। তাদের বিনয়, ভদ্র ব্যবহার, সুন্দর কথাবার্তাতেও সেই অহংকার ঢাকা পড়ে না। নাটকের আবহ সঙ্গীতের মত, তাদের অহংকার সঙ্গীত সবসময় বাজতে থাকে।

এই জাতীয় লোকদের আমি দ্রুত ভুলে যেতে চেষ্টা করি। রকিবউদ্দিন ভূঁইয়াকে আমি সম্ভবত সেই কারণেই ভুলে গিয়েছিলাম। চিটাগাং নিউমার্কেটের দোতলায় তাঁর সঙ্গে দেখা হল। আমি তাকে চিনতে পারলাম না। তিনি খানিকটা বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, চিনতে পারছেন না? আমি রকিব। রকিবউদ্দিন ভূঁইয়া।

আমি বললাম, ঠিক মনে করতে পারছি না।

হোটেল শেরাটনে দীর্ঘসময় আপনার সঙ্গে কথা বলেছি।

আমি চিনতে পারার মত ভঙ্গি করে বললাম, ও আচ্ছা আচ্ছা।

তিনি আহত গলায় বললেন, এখনো চিনতে পারছেন না?

আমি বললাম, জ্বী না। আমার স্মৃতি শক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মনে হয় আলজেমিয়ার ডিজিজ ফিজিজ হয়েছে। অতি পরিচিত কাউকে দেখলেও চিনতে পারি না।

ভদ্রলোক দুঃখিত গলায় বললেন, ঐ দিন আমি বেগুনী রঙের একটা টাই পরেছিলাম। আপনি বলেছিলেন, টাইটার রঙটাতো খুব সুন্দর।

তখন আমার মনে পড়ল। আমি বললাম, এখন মনে পড়েছে। আপনি ভুইয়া গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক।

ভদ্রলোক হাসলেন। তাঁকে খুব আনন্দিত মনে হল। তাঁকে চিনতে পারছিলাম না এই অপমান তিনি বোধহয় সহ্য করতে পারছিলেন না। ইনি বোধহয় ধরেই নিয়েছিলেন একবার যাদের সঙ্গে তার পরিচয় হবে তারা ইহ জীবনে তাকে ভুলবে না। দেখা হওয়া মাত্র আরে রকিব ভাই বলে ছুটে আসবে।

ভদ্রলোক হাসতে হাসতে বললেন, আমি ঐ বেগুনী টাইটা আলাদা করে রেখেছি। আমার স্ত্রীকে বলেছি, হুমায়ুন ভাই এই টাইটা পছন্দ করেছেন। বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠান ছাড়া আমি এই টাই আর পরব না।

আমি বললাম, ও আচ্ছা। আমার ও আচ্ছাতে খুব যে আনন্দ প্রকাশিত হল, তা না।

আপনার সঙ্গে এই ভাবে দেখা হয়ে যাবে জানলে বেগুনী টাইটা পরতাম।

আমি আবারো বললাম, ও আচ্ছা। এছাড়া আর কি বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না। ভদ্রলোকের হাত থেকে উদ্ধার পাওয়া আমার বিশেষ প্রয়োজন। রাত এগারোটায় তূর্ণা নিশীথায় ঢাকা যাব। এখন বাজছে সাড়ে নটা। রাতের খাওয়া এখনো হয়নি। নিরিবিলি ধরনের কোন হোটেল খুঁজে বের করতে হবে। চিটাগাং-এ হোটেল টোটেলগুলি কোন অঞ্চলে তাও জানি না।

রকিব সাহেব বললেন, চিটাগাং-এ কি কোনো কাজে এসেছিলেন?

আমি বললাম, হ্যাঁ। মনে মনে ভদ্রলোকের কথায় বিরক্ত হলাম। অকাজে নিশ্চয়ই কেউ ঢাকা-চিটাগাং করে না। অকারণ প্রশ্ন করার মানে কি?

ঢাকা কবে ফিরবেন?

আজই ফিরব।

তূর্ণা নিশীথায়?

জ্বী।

আমি কি আপনার কাছে একটা প্রস্তাব রাখতে পারি?

রাখুন।

আমিও আজ ঢাকায় ফিরছি, বাই রোড। রাত এগারোটার দিকে রওনা হব। আমার সঙ্গে চলুন। গল্প করতে করতে যাব।

আমি বেশ কঠিন গলায় বললাম, না।

এখন ঢাকা-চিটাগাং হাইওয়ে এত সুন্দর হয়েছে…

 যত সুন্দরই হোক, আমি ঠিক করেছি ট্রেনে যাব।

নতুন একটা লাক্সারী মাইক্রোবাস কিনেছি, ডাবল এসি, রিভলভিং সীটস, গাড়িতেই ফ্রিজ, টিভি…আপনাকে গাড়িটায় চড়াতে পারলে…

অন্য আরেক সময় আপনার গাড়িতে চড়ব। দয়া করে এই বিষয়ে আর কথা বলবেন না।

রকিব সাহেব শুকনো গলায় বললেন, আচ্ছা। ঠিক আছে।

আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। ভদ্রলোকের স্বভাব চিনেৰ্জোকের মত। যা ধরেন। ছাড়েন না। তাঁর হাত থেকে নিস্তার পেয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। যেভাবে চেপে ধরেছিলেন, তাতে মনে হয়েছিল ছাড়া পাব না। তার সঙ্গেই যেতে হবে। এবং সারা পথ শুনতে হবে জীবনের শুরুতে তিনি কেমন দরিদ্র ছিলেন। পরে কি করে বিত্ত সঞ্চয় করলেন। বিত্তবানরা এ জাতীয় গল্প অন্যদের শুনিয়ে খুব আরাম পায়, যারা ধৈর্য করে শোনে তারা যা পায় তার নাম নির্যাতন। সাধ করে নির্যাতনের ভেতর দিয়ে যাবার কোনো অর্থ হয় না। অন্যের অভাবের গল্প শুনতে যেমন ভাল লাগে না, অন্যের বিত্তের গল্প শুনতেও ভাল লাগে না।

.

রকিবউদ্দিন ভূঁইয়া সাহেবের ক্ষমতা আমি ছোট করে দেখেছিলাম। তিনি যে কি পরিমাণ কলকাঠি নাড়তে পারেন সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না। তিনি কলকাঠি নাড়লেন। ট্রেনে উঠে দেখি ঠিক আমার টিকিটই ডাবল ইস্যু হয়েছে। অচেনা এক লোক আমার সীটে কম্বল গায়ে শুয়ে আছে। কম্পার্টমেন্টের এটেনডেন্টের সঙ্গে কথা বলতে গেলাম সে হাই তুলতে তুলতে বিরস গলায় বলল, স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে কথা। বলেন। আমার কিছু করার নাই, টিকিটতো আর আমি ইস্যু করি নাই।

ট্রেন থেকে নেমে দেখি প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে রকিব সাহেব সিগারেট টানছেন। আমাকে দেখে এগিয়ে এলেন। আমি বললাম, আপনি এখানে? তিনি বললেন, আপনাকে সি অফ করতে এসেছিলাম। সমস্যা কি?

আমি সমস্যার কথা বললাম।

তিনি বললেন, চলুন যাই স্টেশন মাস্টারের কাছে। মগের মুল্লুক নাকি? টিকিট ডাবল ইস্যু হবে? ছেলেখেলা?

স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে দেনদরবার করতে করতে ট্রেন ছেড়ে দিল। বাধ্য হয়ে আমাকে রকিব সাহেবের মাইক্রোবাসে উঠতে হল। মাইক্রোবাস ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে হল ট্রেনের পুরো ব্যাপারটা ভদ্রলোকের সাজানো। ডাবল টিকিট তাঁর কারণেই ইস্যু হয়েছে। তিনি আমাকে তার মাইক্রোবাসে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাই করছেন। আমার মনটাই খারাপ হয়ে গেলো।

রকিব সাহেব।

জ্বী।

ট্রেনের পুরো ব্যাপারটা আপনার সাজানো। তাই না?

জ্বী।

এটা কেন করলেন?

আপনাকে একটা গল্প বলতে চাচ্ছিলাম। সুযোগ পাচ্ছিলাম না। কাজেই সুযোগ তৈরি করে নিয়েছি। আমার ধারণা আপনি আমার উপর খুব রাগ করেছেন। হয়তোবা কিছুটা ঘৃণাও বোধ করছেন। তারপরেও আপনাকে গল্পটা শোনাবো।

কি গল্প? কিভাবে পথের ফকির থেকে কোটিপতি হলেন সেই গল্প?

জ্বি না সেই গল্প আমি কারো সঙ্গেই করি না।

আমাকে যে গল্প করতে যাচ্ছেন সেটা কি সবার সঙ্গেই করেন?

জ্বী না। আমার স্ত্রীকে বলার চেষ্টা করেছিলাম। সে পুরো গল্প মন দিয়ে শোনেনি। গল্পের মাঝখানে চা বানাতে গেছে, তার বান্ধবীকে টেলিফোন করেছে, ড্রাইভারকে পাঠিয়েছে ডিম কিনতে। তারপর থেকে আর কাউকে গল্পটা বলার চেষ্টা করিনি। আমি এমন একজন কাউকে চাচ্ছিলাম যে আমার গল্প মন দিয়ে শুনবে। ধরে নেয়া যেতে পারে আপনি এই গল্পের প্রথম এবং হয়তোবা শেষ শ্রোতা।

শুরু করুন আপনার গল্প।

গাড়ি চলছে প্রায় আশি কিলোমিটার বেগে। রাস্তায় প্রচুর ট্রাফিক। রকিব সাহেব স্টিয়ারিং ধরে বসে আছেন। আমি বসেছি তাঁর পাশে। গাড়িতে তৃতীয় ব্যক্তি নেই।

আমি বললাম, আপনি কি গাড়ি চালাতে চালাতেই গল্প বলবেন?

ভদ্রলোক হাসিমুখে বললেন, হ্যাঁ। আপনার ভয়ের কোনো কারণ নেই। আমি খুব ভাল ড্রাইভার। চোখ বন্ধ করেও গাড়ি চালাতে পারি। তারপরেও সাবধানের মা’র নেই। আপনি সীট বেল্ট বেঁধে নিন।

আমি সীট বেল্ট বাঁধলাম।

আপনার বা পাশে হ্যাংগারে চায়ের ফ্লাস্ক ঝুলছে। আপনি চা পছন্দ করেন। এই জন্যেই নিজে দাঁড়িয়ে থেকে চা বানিয়ে এনেছি।

রকিব সাহেব সিগারেট ধরালেন। তাঁর দুহাত স্টিয়ারিং হুইলে। এর মধ্যেই গল্প শুরু হল। ঠোঁটে সিগারেট নিয়ে গল্প বলতে এই প্রথম কাউকে দেখছি।

.

আমার তখন আট বছর বয়স। নয়ও হতে পারে, ক্লাস থ্রতে পড়ি। স্কুল গরমের ছুটি হয়েছে। আমি বাবার সঙ্গে বেড়াতে যাচ্ছি বরিশাল। আমার বাবা দরিদ্র মানুষ ছিলেন। কিন্তু তাঁর নেশা ছিল ঘুরে বেড়ানো। বাংলাদেশের হেন জায়গা নেই যে তিনি না গিয়েছেন। বাবা একা বেড়াতেই পছন্দ করতেন। মাঝে মাঝে আমি এবং আমার বড় ভাই তাকে এমনভাবে চেপে ধরতাম যে আমাদের সঙ্গে না নিয়ে তার উপায় থাকত না। বাবার সঙ্গে যাবার সুযোগ বেশিরভাগ সময়ই আমার বড় ভাইয়ের ঘটতো। বাবা আমাকে সঙ্গে নিতে চাইতেন না কারণ ছোটবেলায় বেশিরভাগ সময়ই আমি অসুস্থ থাকতাম। বাবার সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া মানে প্রচুর হাঁটা, আমি একেবারেই হাঁটতে পারতাম না। ছেলে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোয় কোনো আনন্দ নেই, কাজেই বাবা নানান অজুহাতে আমাকে বাতিল করে দিতেন।

সেবার কেন জানি নিজ থেকেই তিনি আমাকে সঙ্গে নিতে রাজি হলেন। মা ছাড়তে রাজি হলেন না–আমি মাত্র এক সপ্তাহ জ্বর থেকে উঠেছি, শরীর খুব দুর্বল। এমন রুগ্ন অসুস্থ ছেলেকে মা ছাড়বেন না। কান্নাকাটি করে মা’র অনুমতি আদায় করলাম। এবং এক সন্ধ্যায় হাসিমুখে বাবার হাত ধরে বরিশালে যাবার স্টীমারে উঠলাম। স্টীমারের নাম অসট্রিচ। বিশাল এক স্টীমা’র। যেন পানির উপর ভাসমান ছোটখাট এক শহর। স্টীমারে করে এই প্রথম আমার বাইরে কোথাও যাওয়া। আমি একেবারে অভিভূত হয়ে পড়লাম। স্টীমা’র ছাড়ার পর বাবা আমাকে কোলে নিয়ে ঘুরে ঘুরে সব দেখালেন। ফার্স্টক্লাস কেবিন, ডেক, রেস্টুরেন্ট, পানি ঘর, ইনজিন ঘর। ইনজিন ঘর দেখে আমি হতভম্ব। প্রকান্ড একটা ঘরের এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত হাজার হাজার হাতুড়ির মত কি একটা যন্ত্র তালে তালে উঠছে আর নামছে–ভয়ংকর শব্দ হচ্ছে। আমি ভেবে পাচ্ছি না পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের তালিকায় স্টীমারের ইনজিন ঘরের নাম নেই কেন? এ পৃথিবীতে এরচে আশ্চর্যের আর কি হতে পারে?

স্টীমারের হোটেলে রাতের খাবার খেলাম। ইলিশ মাছ, ভাত, বুটের ডাল। কি যে ভাল রান্না শুধু খেতেই ইচ্ছা করে। ভরপেট খেয়ে ঘুম পেয়ে গেল।

খাওয়ার পর বাবা বললেন, পান খাবি? মিষ্টি পান?

আমি ঠোঁট লাল করে পান খেলাম। বাবা আমাকে কাঠের একটা বেঞ্চে শুইয়ে দিলেন। আমার মাথার নিচে দিলেন তাঁর হ্যান্ডব্যাগ, গায়ে পাতলা একটা চাদর। বাবা বললেন, আরাম করে ঘুম দে। চাঁদপুর এলে ডেকে তুলব। দূর থেকে চাঁদপুর শহর দেখতে অসাধারণ লাগে। হাজার হাজার বাতি জ্বলে। বাতির ছায়া পড়ে পানিতে। দেখলে পাগল হয়ে যাবি। চাঁদপুর আসুক আমি ডেকে তুলব। আমি বললাম, আচ্ছা।

জার্নির সময় আমার ঘুম হয় না। আমি সারাক্ষণ তোর পাশে বসে থাকব না। চা টা খাব, ডেকে ঘুরব, বুঝতে পারছিস?

পারছি।

হঠাৎ ঘুম ভেঙে যদি দেখিস আমি পাশে নেই তাহলে আবার ভয় পাবি নাতো?

না।

আমি একটু পরে পরে এসে তোর খোঁজ নিয়ে যাব।

আচ্ছা।

তোর যদি ঘুম ভেঙে যায়, এখানেই থাকবি। আমার খোঁজে বের হবি না। আমি যেখানেই থাকি তোর কাছে চলে আসব।

আচ্ছা।

বেড়াতে এসে মজা পাচ্ছিস তো বাবা?

পাচ্ছি।

 বেশি মজা পাচ্ছিস, না অল্প মজা?

বেশি মজা।

 বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। আমি প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়লাম। কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম জানি না, ঘুম ভাঙ্গলো হৈ চৈ আর চিকারের শব্দে। জেগে উঠে দেখি স্টীমা’র থেমে আছে। খুব চেঁচামেচি হচ্ছে। আতংকে অস্থির হয়ে বাবাকে খুঁজলাম–দেখি বাবা পাশে নেই। শুধু বাবা না কেউই নেই। যে ঘরে শুয়ে ছিলাম সেই ঘরটা পুরো ফাঁকা। একা একা বসে থাকতে ভয় লাগছিল, বাবার নিষেধের কথা আর মনে রইল না, বের হলাম। স্টীমারের সব লোক ডেকের এক দিকে ভিড় করেছে। মনে হচ্ছে সবাই এক সঙ্গে কথা বলছে। লোকজনের কথাবার্তা থেকে বুঝলাম–একটা বাচ্চা ডেক থেকে পানিতে পড়ে গেছে। তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে। তারপর শুনলাম বাচ্চা না বয়স্ক একজন লোক। লোকটা একবার ডুবে যাচ্ছে, একবার ভাসছে। লোকটার উপর সার্চ লাইটের আলো ফেলা হয়েছে। নদীতে প্রবল স্রোত। স্রোত কেটে লোকটা আসতে পারছে না। তার কাছে মোটা দড়ি ছুঁড়ে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। দড়ি সে পর্যন্ত যাচ্ছে না, বাতাসের ঝাপটায় অন্যদিকে চলে যাচ্ছে।

কখন যে আমি নিজেই লোকটাকে এক নজর দেখার জন্যে রেলিং এর কাছে চলে এসেছি এবং নদীর প্রবল স্রোতের দিকে তাকিয়েছি নিজেই জানি না। কাউকে দেখা যাচ্ছে না। চারদিকে ঘন কালো পানি। শুধু যে জায়গাটায় সার্চ লাইটের আলো পড়েছে সে জায়গাটা দেখা যাচ্ছে। সব লোক এক সঙ্গে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলো–দেখা যায়, দেখা যায়। সার্চ লাইটের আলো সেইদিকে ঘুরে গেলো। আমিও দেখলাম–যে মানুষটা ডুবছে আর ভাসছে সে আর কেউ না, আমার বাবা। তখন আমার কোনো বোধশক্তি ছিল না। সিনেমা’র বড় পর্দার দিকে মানুষ যেভাবে তাকিয়ে থাকে, আমি সেই ভাবেই তাকিয়ে আছি। সিনেমা’র বড় পর্দায় অনেক রোমাঞ্চকর ঘটনা ঘটে। সেইসব ঘটনা দেখে আমরা ভয় পাই, রোমাঞ্চ বোধ করি। কিন্তু সেই ভয়, সেই রোমাঞ্চ কখনই আমাদের গভীরে প্রবেশ করে না। আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সব দেখছি, কিন্তু সেই ভয় আমার ভেতরে ঢুকছে না। বাবা শেষবারের মত পানির উপর মাথা ভাসিয়ে ডুবে গেলেন। ডুবে যাবার আগে আকাশ পাতাল চিৎকার করে ডাকলেন, বাবলু। বাবলু। ও বাবলু।

বাবলু হচ্ছে আমার ডাক নাম।
আর এই হল আমার গল্প।

.

আমি রকিব সাহেবের দিকে তাকালাম। তার কপাল বেয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। তিনি বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলছেন। মাইক্রোবাস চলছে প্রায় একশ কিলোমিটার বেগে। রকিব সাহেব ট্রাক, নাইট কোচ সব একের পর এক ওভারটেক করে যাচ্ছেন। স্পীড আরো বাড়ছে। রকিব সাহেব এক হাত স্টিয়ারিং হুইলে রেখে অন্য হাতে নির্বিকার ভঙ্গিতে সিগারেট ধরাতে ধরাতে শান্ত গলায় বললেন, গল্পটা আপনার কেমন লাগলো?

আমি জবাব দিলাম না। রকিব সাহেব বললেন, আপনি খুব মন দিয়ে গল্পটা শুনেছেন। আপনাকে ধন্যবাদ। গল্পের শেষটা ইন্টারেস্টিং। শেষটা হচ্ছে–আমাকে অসহায় অবস্থায় রেখে বাবা মারা গেলেন, মৃত্যুর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর মাথায় ছিলাম আমি, যে কারণে মৃত্যুর পরেও তিনি আমার সঙ্গে সেঁটে রইলেন। এবং এখনো আছেন।

আপনার কথা বুঝতে পারলাম না।

অবিশ্বাস্য একটা ব্যাপার। বুঝতে না পারারই কথা। বাবা সবসময় আমার আশেপাশে থাকেন। এই যে আমি গাড়ি চালাচ্ছি তিনি কিন্তু পেছনের সীটে বসে আছেন। যতবার আমি স্পীড দিচ্ছি ততবার বলছেন–বাবলু আস্তে চালা। আপনি তা শুনতে পারছেন না। আপনার শুনতে পারার কথাও না।

আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, ব্যাপারটা কি সাইকোলজিকেল, না?

রকিব সাহেব সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললেন, আমি জানি আপনি তাই বলবেন। যে কোনো সেনসিবল মানুষই তাই বলবে। আমি নিজেও কিন্তু সেনসিবল মানুষ। এবং আমি জানি আসল ঘটনাটা কি। একবার কি হল শুনুন–জাপান থেকে যাচ্ছি লসএঞ্জেলেস, থাই এয়ারে। রাতের ডিনার শেষ করে ঘুমুতে যাব হঠাৎ শুনি বাবার গলা। বাবা বলছেন–বাবলু সীট বেল্ট বেঁধে নে। সামনে বিপদ।

সীট বেল্ট বাঁধার তখন কথা না। প্লেনের যাত্রীরা সবাই রিল্যাক্স করছে। বড় পর্দায় ছবি দেখছে। আমি বাবার কথা শুনে সীট বেল্ট বাঁধলাম তার কিছুক্ষণের মধ্যে প্লেন ভয়াবহ এক এয়ার পকেটে পড়ল। কত যাত্রী যে সীট থেকে ছিটকে পড়ল। ভয়ংকর অবস্থা। প্লেন থেকে মে ডে ডিক্লেয়ার করা হয়েছিল।

আপনার বাবা তাহলে বিপদ আপদে আপনাকে সতর্ক করে দেন।

হ্যাঁ করেন।

ভাল তো।

মোটেই ভাল না। উনি আমার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছেন। অতি তুচ্ছ ব্যাপারেও উনি নাক গলান। একবার ব্যাংককে গিয়েছি। ব্যাংককের ম্যাসাজ পার্লারের এত নামডাক। ভাবলাম দেখি ব্যাপারটা কি? দু হাজার বাথ দিয়ে টিকিট করলাম। পার্লারে ঢুকতে যাচ্ছি–হঠাৎ বাবা আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, বাবলু ছিঃ বাবা। এসব কি? ম্যাসাজ না নিয়ে চলে এলাম। দুহাজার বাথ জলে গেল। বাবা ছিলেন স্কুল শিক্ষক, তিনি তার স্কুল শিক্ষকের চিন্তা-ভাবনা নিয়ে আমাকে নিয়ন্ত্রণ করেন। আমি তাঁর কাছ থেকে মুক্তি চাই। স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাই। তাঁকে যে এখন আমি কি পরিমাণে ঘৃণা করি তা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না।

ঘৃণা করেন?

অবশ্যই করি। আপনি হলেও করতেন। বাবার কারণে আমাকে গ্রামে হাই স্কুল দিতে হয়েছে। রাস্তা করে দিতে হয়েছে। এতিমখানা করতে হয়েছে। লোকে ভাবছে আমি বোধহয় ইলেকশন করব। গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করছি। আসল ব্যাপার হল আমার বাবা। সারাক্ষণ কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান–স্কুল করে দে। কলেজ করে দে। এতিমখানা করে দে। অসহ্য। এখন ধরেছেন হাসপাতাল করতে হবে। একশ বেডের হাসপাতাল। একশ বেডের হাসপাতালে কত টাকা লাগে তা উনার কল্পনার মধ্যেও নেই। টাকা গাছে ফলছে না। টাকা কষ্ট করে উপার্জন করতে হচ্ছে।

হাসপাতাল করছেন?

উপায় কি, করতে তো হবেই। সাভারে নব্বই একর জমি নিয়েছি। আরো নিতে হবে।

রকিব সাহেব হঠাৎ গাড়ির গতি কমিয়ে ষাট কিলোমিটারে নিয়ে এলেন। আমার দিকে তাকিয়ে লজ্জিত গলায় বললেন, স্পীড বেশি দেয়ার জন্যে বাবা দারুণ হৈ চৈ শুরু করেছেন।

তারপর তিনি আমার দিকে ঝুঁকে এসে প্রায় ফিস ফিস করে বললেন, যখন বাবার গলা শুনতে ইচ্ছা করে তখন আমি ইচ্ছা করে স্পীড দেই। ডেঞ্জারাস টার্ন নেই। বাবা ধমক দেন। উনার গলা শুনে ভাল লাগে।

আমি কিছু বললাম না। চুপ করে রইলাম। রকিব সাহেব বললেন, আপনি যে বললেন সাইকোলজিকেল–সেটা হতে পারে। বাচ্চা বয়সে একটা ভয়াবহ মৃত্যু দেখেছি, আমার মাথার ভেতর সেটা ঢুকে মাথাকে এলোমেলো করে দিয়েছে। সাইকিয়াট্রিস্ট দিয়ে চিকিৎসা করালে হয়তো সুস্থ হব। আমি কিন্তু চিকিৎসা করাতে চাই। আমি চাই এই ব্যাধি আমার থাকুক। আমৃত্যু থাকুক। এই চাওয়াটা কি অন্যায়?

না অন্যায় না।

ভাই, আপনি আমার হাসপাতালটার জন্যে খুব সুন্দর একটা নাম দেবেন। আমি আমার বাবার নামে হাসপাতাল দিতে চেয়েছিলাম। বাবার তাতে ভয়ংকর আপত্তি। রেগেমেগে এমন ধমকানো আমাকে ধমকিয়েছেন–মনে করলেই হাসি আসে-হা হা হা। হা-হা-হা।

রকিব সাহেব প্রাণ খুলে হাসছেন। ব্যাধিগ্রস্ত কোনো মানুষকে আমি এত সুন্দর করে কখনো হাসতে দেখিনি।

Facebook Comment

You May Also Like