Saturday, April 20, 2024
Homeবাণী-কথাবাদশাহ নামদার – হুমায়ূন আহমেদ

বাদশাহ নামদার – হুমায়ূন আহমেদ

Table of contents

উৎসর্গ

নিনিত হুমায়ূন

আমার কেবলই মনে হচ্ছে পুত্র নিনিত পিতার কোনো স্মৃতি না নিয়েই বড় হবে। সে যেন আমাকে মনে রাখে এইজন্যে নানান কর্মকাণ্ড করছি। আমি ছবি তুলতে পছন্দ করি না। এখন সুযোগ পেলেই নিনিতকে কোলে নিয়ে ছবি তুলি।

এই বইয়ের উৎসর্গপত্রও স্মৃতি মনে রাখা প্রকল্পের অংশ।

রাজ্য হলো এমন এক রূপবতী তরুণী
যার ঠোঁটে চুমু খেতে হলে সুতীক্ষ্ণ
তরবারির প্রয়োজন হয়।

(হুমায়ূনের বিদ্রোহী ভ্রাতা মির্জা কামরানের লেখা কবিতা)

ভূমিকা

কেউ যদি জানতে চান বাদশাহ নামদার’ লেখার ইচ্ছা কেন হলো, আমি তার সরাসরি জবাব দিতে পারব না। কারণ সরাসরি জবাব আমার কাছে নেই।

শৈশবে আমাদের পাঠ্যতালিকায় চিতোর রানীর দিল্লীর সম্রাট হুমায়ূনকে রাখি পাঠানো-বিষয়ক একটা কবিতা ছিল। একটা লাইন এরকম: বাহাদুর শাহ্ আসছে ধেয়ে করতে চিতোর জয়। এই কবিতা শিশুমনে প্রবল ছাপ ফেলে বলেই শেষ বয়সে সম্রাট হুমায়ূনকে নিয়ে উপন্যাস লিখতে বসব এরকম মনে করার কোনো কারণ নেই।

সব ঔপন্যাসিকই বিচিত্র চরিত্র নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসেন। এই অর্থে হুমায়ূন অতি বিচিত্র এক চরিত্র। যেখানে তিনি সাতারই জানেন না সেখানে সারা জীবন তাকে সাতরাতে হয়েছে স্রোতের বিপরীতে। তার সময়টাও ছিল অদ্ভুত। বিচিত্র চরিত্র এবং বিচিত্র সময় ধরার লোভ থেকেও বাদশাহ নামদার লেখা হতে পারে। আমি নিশ্চিত না।

আমার নিজের নাম হুমায়ূন হওয়ায় ক্লাস সিক্স-সেভেনে আমার মধ্যে শুধুমাত্র নামের কারণে এক ধরনের হীনমন্যতা তৈরি হয়। সেই সময়ের পাঠ্যতালিকায় মোঘল ইতিহাস খানিকটা ছিল, তাতে শের শাহ’র হাতে হুমায়ূনের একের পর এক পরাজয়ের কাহিনী। হুমায়ূনের পরাজয়ের দায়ভার খানিকটা আমাকে নিতে হয়েছিল। ক্লাসে আমাকে ডাকা হতো ‘হারু হুমায়ূন’। কারণ আমি শুধু হারি। আমি কার কাছে হারি? মহান সম্রাট শের শাহ’র হাতে—যিনি ঘোড়ার ডাকের প্রচলন করেন, গ্রান্ডট্রাংক রোড বানান। আমি শুধু পালিয়ে বেড়াই। হায়রে শৈশব!

এমন হওয়া অসম্ভব না যে শৈশবের নাম নিয়ে হীনমন্যতাও বাদশাহ নামদার লিখতে খানিকটা ভূমিকা রেখেছে।

আচ্ছা ঠিক আছে বাদশাহ নামদার লেখার কারণ জানা গেল না, তাতে জগতের কোনো ক্ষতি হবে না। আমি লিখে প্ৰবল আনন্দ পেয়েছি—এটাই প্রথম কথা এবং শেষ কথা।

সম্রাট হুমায়ূন বহু বর্ণের মানুষ। তাঁর চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে আলাদা রঙ ব্যবহার করতে হয় নি। আলাদা গল্পও তৈরি করতে হয় নি। নাটকীয় সব ঘটনায় তাঁর জীবন পূর্ণ।

উপন্যাসটি লেখার সময় প্রচুর বইপত্র বাধ্য হয়ে পড়তে হয়েছে। একটি নির্ঘণ্ট দিয়ে নিজেকে গবেষক-লেখক প্রমাণ করার কারণ দেখছি না বলেই নির্ঘণ্ট যুক্ত হলো না।

বাদশাহ নামদারের বিচিত্র ভুবনে সবাইকে স্বাগতম।

হুমায়ূন আহমেদ
দখিন হাওয়া
ধানমণ্ডি

০১. বাঙ্গালমুলুক থেকে কাঁচা আম এসেছে

বাঙ্গালমুলুক থেকে কাঁচা আম এসেছে। কয়লার আগুনে আম পোড়ানো হচ্ছে। শরবত বানানো হবে। সৈন্ধব লবণ, আখের গুড়, আদার রস, কাচা মরিচের রস আলাদা আলাদা পাত্রে রাখা। আমের শরবতে এইসব লাগবে। দু’জন খাদ্যপরীক্ষক প্রতিটি উপাদান চেখে দেখেছেন। তাদের শরীর ঠিক আছে। মুখে কষা ভাব হচ্ছে না, পানির তৃষ্ণাবােধও নেই। এর অর্থ উপাদানে বিষ অনুপস্থিত। সম্রাট বাবর নিশ্চিন্ত মনে খেতে পারবেন। গত বছর শীতের শুরুতে সম্রাট বাবরকে বিষ খাইয়ে মারার চেষ্টা করা হয়েছিল। এরপর থেকেই বাড়তি সতর্কতা।

সম্রাট তখন্তু রওয়ানে (চলমান সিংহাসন) আধশোয়া হয়ে আছেন। তাঁর মাথায় রাজস্থানী বহুবর্ণ ছাতি। তাঁর দু’দিকে দু’জন বড় পাখায় হাওয়া দিচ্ছে। প্রধান উদ্দেশ্য মাছি তাড়ানো। এই অঞ্চলে মাছির বড়ই উৎপাত।

রুপার পাত্রে আমের শরবত নিয়ে খিদমতগার সম্রাটের সামনে নতজানু হয়ে আছে। সম্রাট পাত্ৰ হাতে না নেওয়া পর্যন্ত খিদমতগার মাথা উচু করবে না। সম্রাট পাত্ৰ হাতে নিচ্ছেন না। তাকে চিন্তিত মনে হচ্ছে। যদিও চিন্তিত হওয়ার মতো কারণ ঘটে নি। পানিপথের যুদ্ধে তাঁর প্রধান শত্রু ইব্রাহিম লোদী পরাজিত এবং নিহত হয়েছেন। ইব্রাহিম লোদীর মৃতদেহ তাঁকে দেখানো হয়েছে। তবে বিরক্ত হওয়ার মতো কারণ ঘটেছে। তিনি তাঁর প্রথম পুত্ৰ নাসিরুদ্দিন মুহম্মদ হুমায়ূন মীর্জার উপর বিরক্ত। এই ছেলে অলস এবং আরামপ্রিয়। সে ঘর-দরজা বন্ধ করে একা থাকতে পছন্দ করে। পিতাকে লেখা এক পত্রে সে লিখেছে— আমার মানুষের সঙ্গ ভালো লাগে না। আমি একা থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। একাকিতু রাজপুরুষদের মানায় না। হুমায়ূনকে পাঠানো হয়েছে ইব্রাহিম লোদীর রাজধানী এবং কোষাগার দখল করতে। ইব্রাহিম লোদীর কোষাগার আগ্রা দুর্গে। এই কাজ শেষ করতে এত সময় লাগার কথা না। সে নিশ্চয়ই কোনো ভজঘট করে ফেলেছে। দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকার মতো দায়িত্ববান হুমায়ূন মীর্জা না। সম্রাট নিজেই আগ্রার দিকে রওনা হয়েছেন। কাচা আমের শরবত খাওয়ার জন্যে যাত্রাবিরতি।

সম্রাটের সেনাপতির একজন ফিরোজ সারাঙ্গখানি বললেন, বাদশাহ কি কোনো কারণে অস্থির?

বাবর বললেন, আমি অস্থির, তবে অস্থিরতার কারণ জানি না। গতরাতে দুঃস্বপ্ন দেখেছি। দুঃস্বপ্ন অস্থিরতার কারণ হতে পারে।

ফিরোজ সারাঙ্গখানি দুঃস্বপ্ন কী জানতে চাচ্ছেন। কিন্তু সম্রাটের দুঃস্বপ্ন জানতে চাওয়া যায় না। বড় ধরনের বেয়াদবি।

সম্রাট বললেন, দুঃস্বপ্ন কী জানতে চাও? শোনো। আমি দেখলাম আমার তাঁবুতে একটা ভেড়া ঢুকে পড়েছে। ভেড়াটার একটা পা নেই, সে লাফিয়ে লাফিয়ে চলে। ভেড়াটা লাফ দিয়ে আমার কোলে এসে পড়ল এবং আমার পায়ে মুখ ঘষতে লাগল। তখনই ঘুম ভাঙল।

স্বপ্নের ফলাফল অবশ্যই শুভ।

একটা পঙ্গু ভেড়া লাফ দিয়ে আমার কোলে এসে উঠল। এর ফলাফল শুভ কীভাবে হয়? হুজুর মীর আবুবকার-এর কাছ থেকে স্বপ্নের তফসির জানতে হবে।

কথা বলতে বলতেই বাবর তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন। অনেক দূরে ধুলার ঝড়ের মতো উঠেছে। অশ্বারোহীর দল কি ছুটে আসছে? কোনো বিদ্রোহী বাহিনী? হওয়ার তো কথা না। অশ্বারোহীর দল আগ্রার দিক থেকেই আসছে। এমন কি হতে পারে আগ্রার দুর্গে বন্দি গোয়ালিয়রের রাজা বিক্রমাদিত্যের পরিবারকে উদ্ধার করতে সাহায্যকারী কেউ এসেছে?

বাবর ইশারা করলেন। মুহুর্তের মধ্যে যুদ্ধাবস্থার পরিস্থিতি তৈরি হলো। সিঙ্গা বাজানো হলো। বাদশাহের প্রিয় পিতজুচাক ঘোড়া নিয়ে একজন ছুটে এল। বাদশাহ তখন্তু রওয়ান ছেড়ে ঘোড়ায় উঠলেন। দূরে ধুলার ঝড় ঘন হচ্ছে। সৈন্যসংখ্যা আন্দাজ করা যাচ্ছে নাৰী মাঝে মাঝে রোদে ঘোড়ার আরোহীদের শিরস্ত্ৰাণ ঝলসে ঝলসে উঠছে।

বাবরের সংবাদ সরবরাহ দলের চারজন ঘোড়সওয়ার ছুটে যাচ্ছে। তাদের হাতে আয়না, তারা আয়নার আলো ফেলে বোঝার চেষ্টা করবে কারা এসেছে।

সম্রাট বাবরের চোখমুখ শুক্ত-দৃষ্টি তীক্ষ। হঠাৎ তাঁর দৃষ্টি সহজ হলো। তিনি শরবতের গ্রাসের দিকে হাত বাড়ালেন। সৈন্যবাহিনী নিয়ে কে আসছেন তিনি জানেন আসছে পুত্র হুমায়ূন মীর্জা।

যুদ্ধাবস্থার তাতে পরিবর্তন হলো না। সম্রাটদের পুত্র থাকে না, ভাই থাকে না। তাঁরা সবসময়ই একা। হুমায়ূন যে সসৈন্যে তাকে আক্রমণ করতে আসছে না এর নিশ্চয়তা কোথায়? হুমায়ূন মীর্জার অধীনে বিশাল সৈন্যবাহিনী আছে। আগ্রা দুর্গ দখল করার জন্যে পাঁচশ (অশ্বারোহীর একটি বিশেষ দল সম্প্রতি দেওয়া হয়েছে। বাবর বিড়বিড় করে নিজের রচনা চারপদী কবিতা আবৃত্তি করলেন—

সম্রাটের বন্ধু তার সুতীক্ষ্ণ তরবারি
এবং তার ছুটন্ত ঘোড়া আর তার বলিষ্ঠ দুই বাহু
তার বন্ধু নিজের বিচার
এবং পঞ্জরের অস্থির নিচের কম্পবান হৃদয়

হুমায়ূন মীর্জা ঘোড়া থেকে নেমে এগিয়ে আসছেন। তিনি বাবার সামনে এসে নতজানু হয়ে দাঁড়ালেন। তার হাতে নীল রেশমি রুমালে কী যেন লুকানো। বাঁ হাতে রুমাল রেখে ডান হাতে তিনি নিজের কপাল স্পর্শ করে সেই হাতে ভূমি স্পর্শ করলেন। তিনবার এই কাজটি করে কুর্নিশ পর্ব শেষ করা হলো।

বাবর বললেন, পুত্ৰ, তোমার হাতে কী?

হুমায়ূন বললেন, সামান্য উপহার।

পিতার প্রতি পুত্রের উপহার কখনোই সামান্য না।

হুমায়ূন বললেন, অতি মহাৰ্য উপহারও মহাপুরুষের কাছে সামান্য।

বাবর প্রীত হলেন। কবিতার এই চরণটি তাঁর লেখা। পুত্ৰ মনে করে রেখেছে এবং সময়মতো বলতে পেরেছে। বাবর বললেন, উপহার দেখাও।

হুমায়ূন মীর্জা রেশমি রুমাল খুললেন। তাতে হাতে পায়রার ডিমের চেয়েও বড় একটা হীরা। সূর্যের আলো হীরাতে পড়েছে। মনে হচ্ছে হাতে আগুন লেগে গেছে। বাবর মুগ্ধ গলায় বললেন, বাহ্‌!

হুমায়ূন মীর্জা বললেন, এই হীরার নাম কোহিনূর। এর ওজন আট মিস্‌কাল্‌। বলা হয়ে থাকে এই কোহিনূরের মূল্যে সারা পৃথিবীর সকল মানুষ দু’দিন পানাহার করতে পারবে।

এটা কি সেই কোহিনূর যা সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজি ভারতে এনেছিলেন?

এটি সেই কোহিনূর। আপনি হাতে নিলে আমি খুশি হব।

সম্রাট বাবর হীরকখণ্ড হাতে নিলেন। মুগ্ধ চোখে কিছুক্ষণ দেখলেন। তারপর বললেন, পুত্র তোমার উপহার পেয়ে আমি খুশি হয়েছি। এতই খুশি হয়েছি যে এই কোহিনূর তোমাকেই আমি উপহার হিসেবে দিচ্ছি। পিতার উপহার গ্রহণ করো।

বাবর লক্ষ করলেন হুমায়ূনের চোখ ছলছল করছে। এ-কী! এত অল্পতে তার ছেলের চোখে পানি আসছে কেন? একদিন সে সমস্ত ভারতবর্ষ শাসন করবে। পৃথিবীর নানান প্রান্ত থেকে রাজদূতরা এসে তাকে কুর্নিশ করে বলবে, বাদশাহ নামদার। তাকে হতে হবে ইস্পাতের মতো কঠিন।

সম্রাট বাবরের দ্রু কুঞ্চিত হলো। তিনি উচু গলায় বললেন, পুত্র শোনো। শুধু এই হীরক খণ্ড না, ইব্রাহিম লোদীর রাজকোষের সম্পূর্ণ অর্থ আমি তোমাকে উপহার দিলাম। বলো, মারহাবা।

মারহাবা।

হুমায়ূন মীর্জা এর চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে অদ্ভুত এক কাণ্ড করলেন। সেনাবাহিনী নিয়ে তাঁর পিতার দিল্লীর কোষাগার দখন করে রাজকোষের সব অর্থ নিয়ে পালিয়ে গেলেন বাদাখশানের দিকে। আগস্ট মাস, ১৫২৭ খ্রিষ্টাব্দ। এই কাজ তিনি কেন করলেন তা এখন পর্যন্ত ঐতিহাসিকদের কাছে রহস্যাবৃত।

সম্রাট বাবর তার স্ত্রী মাহিম বেগমের সঙ্গে খেতে বসেছেন। সম্রাট খাচ্ছেন, মাহিম বেগম একটির পর একটি বাটি এগিয়ে দিচ্ছেন। সব খাবারই পরীক্ষা করা, তারপরেও স্বামীর পাত্রে খাবার দেওয়ার আগে নিজে চোখে দিচ্ছেন। বাবর বললেন, তোমার পুত্র যে আমার রাজকোষ লুট করে পালিয়ে গেছে এটা জানো?

জানি।

কাজটা সে কেন করেছে জানো?

জানি না।

তার কি শান্তি হওয়া উচিত?

উচিত। তবে আপনি দয়ালু পিতা। হুমায়ূন মীর্জা আপনার অতি আদরের প্রথম সন্তান।

বাবর বললেন, সম্রাটের কোনো পুত্র থাকে না। স্ত্রী থাকে না। আত্মীয়-পরিজন থাকে না। সম্রাটের থাকে তরবারি।

আপনার থাকে। কারণ আপনি অন্য সম্রাটদের মতো না। আপনি আলাদা।

আমি প্রধান উজির মীর খলিফার সঙ্গে পরামর্শ করেছি। প্রধান উজির হুমায়ূন মীর্জাকে কঠিন শাস্তি দেওয়ার পক্ষে। কঠিন শাস্তি দেওয়া হলে তার ভাইরা সাবধান হবে। অন্য রাজপুরুষরাও সাবধান হবে।

মাহিম বেগম চুপ করে রইলেন। বাবর বললেন, প্রধান উজির হুমায়ূন মীর্জার মৃত্যুদণ্ড শাস্তির পক্ষে। হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট করে মৃত্যু।

মাহিম বেগম বললেন, প্রধান উজির কী বলছেন তা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ না। আপনি কী ভাবছেন তা গুরুত্বপূর্ণ।

বাবর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে হাসলেন। অদ্ভুত এই হাসি দেখে হঠাৎ মাহিম বেগমের গায়ে কাটা দিয়ে উঠল।

হুমায়ূন মীর্জা বাদাখশানের পথে। এখন যাত্রাবিরতি। রাজকীয় তাঁবু ফেলা হয়েছে। তিনি গরমে অতিষ্ঠ। স্নানের বাসনা প্রকাশ করেছেন। স্নানপাত্রে পানি ঢালা হচ্ছে। গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো হচ্ছে। আট ভাগ পানির সঙ্গে এক ভাগ গোলাপের পাপড়ি মেশানো হবে। পানিতে সামান্য কপূরও দেওয়া হবে। কপূর মেশানো পানিতে দৈত্যাকৃতি পাখা দিয়ে হাওয়া দেওয়া হবে। এই হাওয়ায় কপূর উড়ে গিয়ে পানি দ্রুত শীতল হবে।

হুমায়ূন মীর্জার হাতে রঙতুলি এবং চীন দেশ থেকে আনা শক্ত তুলট কাগজ। তিনি আগ্রহ নিয়ে একটা পাখির ছবি আঁকছেন। পাখির পালক ঘন নীল। ঠোঁট এবং পা লাল। পাখিটা মনের আনন্দে তার তাবুর পাশেই ঘুরছে। জনসমাগম দেখে ভয় পাচ্ছে না। কেউ এর নাম-পরিচয় বলতে পারছে না। হুমায়ূন মীর্জার সার্বক্ষণিক সঙ্গী দু’জন চিত্রকর এবং একজন হরবোলা পাখির পরিচয় বের করার চেষ্টায় আছে। চিত্রকরদের একজন হুমায়ূন মীর্জার ভ্ৰাম্যমাণ লাইব্রেরি থেকে পাখি-বিষয়ক বই নিয়ে এসে পাতা ওল্টাচ্ছেন। অন্যজন হুমায়ূন মীর্জার মতোই পাখির ছবি আঁকছেন। যেন পরে ছবি দেখে পাখির পরিচয় পাওয়া যায়। হরবোলা অপেক্ষা করছে। কখন পাখি ডেকে ওঠে। একবার ডাকলেই হরবোলা বাকি জীবন এই ডাক মনে করে রাখবে। পাখি এখনো ডাকছে না।

রাত অনেক হয়েছে।

সম্রাট বাবর ঘুমাবার প্রস্তুতি নিয়ে শোবার ঘরে ঢুকেছেন। ইয়েমেন থেকে আনা হালকা সৌরভের আগরবাতি জ্বলছে। হাবশি খোজারা টানাপাখা টানছে। বড় বড় মাটির পাত্রে পানি রাখা আছে। তাদের গায়ে বাতাস পড়ায় ঘর শীতল। হিন্দুস্থানের অতি গরম আবহাওয়া বাবর এখনো সহ্য করে উঠতে পারেন নি। গরমের রাতগুলিতে প্রায়ই তাকে অয়ুম কাটাতে হয়।

মাহিম বেগম ঘরে ঢুকে সম্রাটকে কুর্নিশ করলেন। সম্রাট স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কিছুই ঘটে না। আল্লাহর ইচ্ছায় আমি তোমাকে একটা সুসংবাদ দিচ্ছি। রাজকোষ লুণ্ঠনের অপরাধে তােমার পুত্রের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলাম। তাকে ধরে আনার জন্যে আমার বিশাল সেনাবাহিনী আগামীকাল প্রত্যুষে যাত্রা করার কথা। কিছুক্ষণ আগে আমি তোমার পুত্রকে ক্ষমা করেছি।

মাহিম বেগম কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, সম্রাট যদি অনুমতি দেন। তাহলে আমি সম্রাটের পায়ে চুম্বন করতে আগ্রহী।

অনুমতি দিলাম।

মাহিম বেগম সম্রাটের পায়ে মুখ ঘষতে লাগলেন। সম্রাট সামান্য চমকালেন। এই দৃশ্যের সঙ্গে কি তাঁর দুঃস্বপ্নের কোনো মিল আছে? স্বপ্নে একটা পঙ্গু ভেড়া এই ভঙ্গিতেই তার পায়ে মুখ ঘষছিল। মাহিম বেগম তার অতি আদরের স্ত্রী। হুমায়ূন মীর্জার মাতা।

মাহিম বেগম বললেন, কাবুলের দুর্গে হুমায়ূন মীর্জার জন্ম হয়। তাকে দেখতে এসে আপনি খুশি হয়ে আমাকে এক শ’ আশরাফি উপহার দেন। তখন আমি আপনাকে কী বলেছিলাম। আপনার কি মনে আছে?

সম্রাট ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, মনে আছে। তুমি বলেছিলে স্বর্ণমুদ্রার আমার প্রয়োজন নাই। আপনি শুধু পুত্রের গায়ে হাত রেখে বলবেন, আপনি তার উপর কখনো রুষ্ট হবেন না। শোনো মাহিম বেগম, আমি সেই প্রতিজ্ঞা কিন্তু করি নাই। যাই হোক অনেকক্ষণ পায়ে মাথা রেখেছ। এখন মাথা তোল।

মাহিম বেগম বললেন, আপনার কিছু বিষয় আমি বুঝি না। আপনার পরম শত্রু ইব্রাহিম লোদী পানিপথের যুদ্ধে পরাজিত এবং নিহত। এই ইব্রাহিম লোদীর মা’কে আপনি রাজ-অন্তঃপুরে স্থান দিয়েছেন। কারণ জানতে পারি?

পার। এই মহিলা কোনো অপরাধ করেন নি। নিহত পুত্রের চেহারা দেখে শোকে অধীর হয়েছেন। আমি তার প্রতি দয়া করব না!

আপনি অবশ্যই করবেন। আপনাকে এই নিয়ে প্রশ্ন করাই আমার অন্যায় হয়েছে।

(ইব্রাহিম লোদীর মা প্রথম সুযোগেই বাবরকে বিষ খাইয়ে মারার চেষ্টা করেন। তাঁর এই অপরাধও ক্ষমা করা হয়।)

৪র্থ জিল্‌কদ্‌ ৯১৩ হিজরির (ইংরেজি ৬ মার্চ, ১৫০৮ খ্রিষ্টাব্দ) মঙ্গলবার রাতে নাসিরুদ্দিন মুহম্মদ হুমায়ূন মীর্জা জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পিতার দিক থেকে তৈমুরের পঞ্চম অধস্তন এবং মায়ের দিক থেকে চেঙ্গিস খানের পঞ্চদশ পুরুষ।

নাসিরুদ্দিন মোহাম্মদ হুমায়ূন মীর্জা নামের আবজাদ (আরবি অক্ষর থেকে নামের সংখ্যা মান বের করা। অনেকটা নিউমারোলজির মতো।)

আমি বাদশাহ নামদার গ্রন্থে ৯১৩ আবজাদ সংখ্যায় সম্রাট হুমায়ূনের বিচিত্ৰ কাহিনী বর্ণনা করব। এই কাহিনীতে ঔপন্যাসিকের রঙ চড়ানোর কিছু নেই। সম্রাট হুমায়ূন অতি বিচিত্র মানুষ। ভাগ্য বিচিত্র মানুষ নিয়ে খেলতে পছন্দ করে। ভাগ্য তাকে নিয়ে অদ্ভুত সব খেলা খেলেছে।

আসুন আমরা বাদশাহ নামদারের জগতে ঢুকে যাই। মোঘল কায়দায় কুর্নিশ করে ঢুকতে হবে কিন্তু।

নকিব বাদশাহর নাম ঘোষণা করছে—

আল সুলতান আল আজম ওয়াল খাকাল আল মুকাররাম, জামিই সুলতানাত-ই-হাকিকি ওয়া মাজাজি, সৈয়দ আল সালাতিন, আবুল মোজাফফর নাসির উদ্দিন মোহাম্মদ হুমায়ূন দশাহ, গাজি জিলুল্লাহ।

০২. এগারো সংখ্যাটি সম্রাট বাবরের প্রিয়

এগারো সংখ্যাটি সম্রাট বাবরের প্রিয়। তিনি যখন শরাব পানের আসরে বসেন, তখন তাঁর সঙ্গী থাকে দশজন। খাবার খেতে যখন বসেন তখনো দশজনকে নিয়েই বসেন। তাকে নিয়ে সবসময় সংখ্যা হয় এগারো। বেজোড় সংখ্যা। আল্লাহপাক বেজোড় সংখ্যা পছন্দ করেন।

প্রভাতী মদ্যপানের আসর বসেছে। এই আসরের নাম সাবহী (প্ৰভাত মদ্য)। যথারীতি দশজন আমীর আছেন। তাদের সামনে রুপার পানপত্র। সম্রাটের সামনে স্বর্ণের পানিপাত্র। তারা ‘দমীহ নামের শরাব খাচ্ছেন। ‘দমীহ এসেছে পারস্য থেকে। এক বিশেষ ধরনের গাছের শিকড় এবং মধু থেকে দমীহ তৈরি হয়। দমীহ কিছুক্ষণের মধ্যে নেশার আবেশ তৈরি করে, তবে সহজে মত্ততা আনে না।

পান শুরু হওয়ামাত্র প্রধান উজির মীর খলিফা ঢুকলেন। সম্রাটের ভুরু কুঞ্চিত হলো। মীর খলিফা ধমীয় অনুশাসন কঠিনভাবে মানেন। শরাব খান না। পানের আসরে এ ধরনের মানুষের উপস্থিতি সম্রাটের अछन की।

মীর খলিফা বললেন, আমি সম্রাটের সঙ্গে একান্তে কিছু কথা বলতে আগ্রহী।

সম্রাট বললেন, উজির, আপনার সময় নির্বাচন ভুল হয়েছে। উজির বললেন, সময়ের ভুল শুদ্ধ নেই। মানুষ ভুল শুদ্ধের অধীনে বাস করে। সময় করে না।

এই মুহুর্তে একান্তে কথা বলা জরুরি?

জরুরি।

যাঁরা আমার সঙ্গে আছেন তারা আমার আপনজন। আমাকে যা বলা যাবে, তাদেরকেও বলা যাবে।

উজির বললেন, আমার যা বলার তা আমি আপনাকেই বলব। আপনার ইচ্ছা হলে পরে আপনি আপনার প্রিয়জনদের সঙ্গে আলাপ করতে পারেন। এখন না।

সম্রাট হাত ইশারা করতেই আমীররা উঠে গেলেন। তাদেরকে বিচলিত মনে হলো।

উজির বললেন, কিছুক্ষণ আগে খবর পেয়েছি হুমায়ূন মীর্জা তাঁর সমস্ত সেনাদল নিয়ে আগ্রার দিকে ছুটে আসছেন।

হুঁ।

বাদাখ্‌শান্‌ অরক্ষিত। হুমায়ূন মীর্জা বাদাখশান সুরক্ষার জন্যে কোনো ব্যবস্থাই করেন নি।

হুঁ।

কামরাম মীর্জার সঙ্গে হুমায়ূনের কাবুলে দেখা হয়েছে। কামরান তাঁর বড়ভাইয়ের হঠাৎ করে আগ্রা রওনা হওয়ার কারণ জানতে চেয়েছিলেন। হুমায়ূন কোনো জবাব দেন নি।

হুঁ।

বাদাখশান্য অরক্ষিত রেখে হুমায়ূন হিন্দুস্তান যাত্রা করেছেন দেখে কামরান যাচ্ছেন বাদাখশানে। তিনি বাদাখশানের দুর্গ রক্ষা করবেন।

হুঁ।

এদিকে অরক্ষিত বাদাখশানের দখল নেওয়ার জন্যে আপনার চিরশত্রু সুলতান সাঈদ খান রওনা হয়ে গেছেন। আমার যা বলার ছিল বলেছি। আপনার প্রভাতী পানাহারের বিঘ্ন করেছি বলে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

বাবর দমীহতে চুমুক দিলেন। তাঁকে তেমন বিচলিত মনে হলো না। তিনি হালকা গলায় বললেন, হুমায়ূন হঠাৎ কেন এদিকে আসছে বলে আপনার ধারণা? সে কি সিংহাসন চায়?

মীর খলিফা বললেন, সিংহাসন চাওয়াটাই স্বাভাবিক। ধরে নিলাম সিংহাসন তার চিন্তায় নেই, তারপরেও আপনাকে কিছু না জানিয়ে বাদাখশান্য অরক্ষিত রেখে তার যাত্রা গৰ্হিত হয়েছে।

সম্রাট বললেন, এমনও তো হতে পারে হঠাৎ এদিকে আসার তার বিশেষ কোনো কারণ ঘটেছে।

উজির শীতল গলায় বললেন, সম্রাটকে মনে করিয়ে দিতে চাই, আপনার এই পুত্ৰ দিল্লীর রাজকোষ লুণ্ঠন করে পালিয়ে গিয়েছিল।

হুঁ।

আপনি তিল তিল করে বিশাল সাম্রাজ্য গড়েছেন। যোগ্য হাতে এই সাম্রাজ্য রক্ষার ভার দিয়ে যাওয়া আপনার কর্তব্য।

আপনার কাছে যোগ্য কে বলে মনে হয়?

অবশ্যই কামরান মীর্জা। হুমায়ূন মীর্জা অলস এবং আরামপ্রিয়।

হুঁ।

সম্রাটকে জানাতে চাই, প্রধান উজির হিসেবে সম্রাটের সেবা এবং সাম্রাজ্যের সেবা ছাড়া আমার কোনো উদ্দেশ্য নাই। অতীতেও ছিল না। ভবিষ্যতেও থাকবে না।

উজির ভক্তিভরে সম্রাটের হাতে চুম্বন করলেন। সম্রাট বললেন, আপনি কখনোই আমাকে কোনো ভুল পরামর্শ দেন নাই। আপনার কর্মে আমি উপকৃত, আমার সাম্রাজ্য উপকৃত।

মীর খলিফা বললেন, আপনাকে এই মুহুর্তে আমি একটি পরামর্শ দিতে চাচ্ছি। আপনি বিচক্ষণ সম্রাট, আমার এই উপদেশ গ্ৰহণ করলে উপকৃত হবেন।

কী পরামর্শ?

রাজকীয় ঘোড়সওয়ার বাহিনী হুমায়ূন মীর্জার গতিরোধ করবে এবং তাঁকে গ্রেফতার করে সম্রাটের সামনে উপস্থিত করবে। আপনি তাঁকে প্রশ্ন করবেন। এই সময়ে বাদাখশান শত্রুর হাতে ফেলে তিনি কেন চলে এসেছেন?

আপনার ধারণা এটি সঠিক সিদ্ধান্ত?

অবশ্যই এটি সঠিক সিদ্ধান্ত।

সম্রাট বাবর বললেন, সঠিক সিদ্ধান্তের ক্ষমতা আছে শুধুই আল্লাহপাকের। মানুষকে মাঝে মাঝে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রমাণ করতে হয় যে সে মানুষ। হুমায়ূন মীর্জা যেন নির্বিঘ্নে দিল্লী আসতে পারে এই ব্যবস্থা করার দায়িত্ব আপনাকে দেওয়া হলো।

উজির কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে হতাশ গলায় বললেন, সম্রাটের আদেশ এই দাসানুদাসের শিরোধার্য।

মীর খলিফা উঠে যাওয়ার পর ভগ্ন পান-উৎসব আবার শুরু হলো। উজবেকিস্তানের এক গায়িকা আসহারির জাদুকরী কণ্ঠের কথা সম্রাট শুনেছেন। তার গান শোনা হয় নি। প্রভাতী পান-উৎসবে গায়কগায়িকাদের কখনো আনা হয় না। সম্রাটের ইচ্ছায় আজ আসহারিকে আনা হলো। সে কিন্নর কণ্ঠে তুকী ভাষায় গান ধরল—

গোলাপকুঁড়ির মতো আমার হৃদয়
তার দলের উপর রক্তের ছাপ,
লক্ষ বসন্তও আমার সে হৃদয়ের ফুল
কুঁড়ি ফোটাতে পারে না।

গান শুনে সম্রাট অভিভূত হলেন। প্রথমত, গায়িকার অলৌকিক কণ্ঠ। দ্বিতীয়ত, এই গানের চরণগুলি তাঁর লেখা। তাঁর চরণেই সুর বসানো হয়েছে।

সম্রাট বললেন, তোমার নাম?

বাঁদির নাম আসহারি।

গানের চরণগুলি কার রচনা তুমি জানো?

জানি জাহাঁপনা।

সুর কে করেছে?

আপনার সামনে উপস্থিত এই বাঁদি করেছে।

আমার কাছ থেকে উপহার হিসাবে কী চাও?

মাঝে মাঝে আপনাকে গান শোনানোর সুযোগ চাই।

সম্রাটের চোখে পানি এসে গেল। তিনি ঘোষণা করলেন এই গায়িকাকে ওজন করে সমওজনের স্বর্ণমুদ্রা যেন তৎক্ষণাৎ দেওয়া হয়। (*গায়িকাকে ওজন করে সমওজনের স্বর্ণমুদ্রা দেওয়া হয় নি। দেওয়া হয়েছিল তাম্রমুদ্রা। আমীররা সবাই খাজাঞ্জিকে বলেছেন, সম্রাট তাম্রমুদ্রা বলতে গিয়ে নেশার ঝোকে স্বর্ণমুদ্রা বলে ফেলছেন।)

হুমায়ূন মীর্জা বাবরের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। দীর্ঘ পথশ্রমে হুমায়ূন ক্লান্ত, কিন্তু তার চোখ চকচক করছে। মুখমণ্ডল উজ্জ্বল। বাবর বললেন, তুমি কার সামনে দাঁড়িয়ে আছ? সম্রাটের সামনে, না একজন পিতার সামনে?

আমি আমার বাবার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।

তাহলে তুমি তোমার বাবাকে জড়িয়ে ধরছ না কেন?

হুমায়ূন সম্রাট বাবরকে জড়িয়ে ধরলেন। পুত্রের সঙ্গে পিতার সাক্ষাৎকারের বর্ণনা সম্রাট বাবর তার বিখ্যাত গ্ৰন্থ বাবরনামা-য় এইভাবে দিয়েছেন—হুমায়ূনের উপস্থিতিতে ফুলের মুকুলের মতো আমার হৃদয় ফুটে উঠল। আমাদের চোখ আনন্দে মশালের মতো জ্বলে উঠল।

আমি একটা ভোজের আয়োজন করলাম। আমরা পরম ঘনিষ্ঠভাবে কিছুকাল একসঙ্গে রইলাম। সত্যি বলতে কী, তার আলাপ-আলোচনা ও কথাবার্তার একটা আশ্চর্য মনোজ্ঞ আকর্ষণ ছিল। একজন পূর্ণ মানুষ বলতে যা বোঝায় সে তখন তা-ই ছিল। (Pavet de Courteiile-র অনুবাদ। বাবরনামা-র বিক্ষিপ্ত অংশ।)

নৈশভোজনের পর পিতার সঙ্গে পুত্রের কিছু কথাবার্তা হলো। সম্রাটের খাসকামরায় গোপন বৈঠক। খাসকামরার দরজা-জানালা বন্ধ। ভারী পর্দা নামানো। খাসকামরার বাইরে ছ’জন খোজা প্রহরী। তারা সবাই বধির। যেন গোপন আলোচনার বিষয় তারা শুনতে না পারে। জন্ম থেকে মূক ও বধিরদের প্রহরী পদ দেওয়া হয় না। সুস্থ-সবল খোজা প্রহরীদের কান নষ্ট করে এই পদ দেওয়া হয়।

সম্রাট পুত্রকে কিছু শক্ত কথা বললেন।

বাবর : তুমি বাদাখশান অরক্ষিত রেখে চলে এলে কেন?

হুমায়ূন : এক রাতে হঠাৎ আপনাকে দেখার প্রবল ইচ্ছা হলো। পরদিনই আমি যাত্রা করলাম।

বাবর : তোমার কি ধারণা কাজটা ঠিক হয়েছে?

হুমায়ূন : হ্যাঁ। পুত্রের কাছে পিতা বড়। সাম্রাজ্য বড় না।

বাবর : মনেপ্ৰাণে এই কথা বিশ্বাস করো?

হুমায়ূন : করি।

বাবর : পিতাকে দেখতে চেয়েছিলে দেখা হয়েছে। এখন বাদাখশানে ফিরে যাও। দুর্গ রক্ষা করো।

হুমায়ূন : না।

বাবর : তুমি কি না বলেছ?

হুমায়ূন : বেয়াদবির জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। সম্রাট আদেশ করলে আমি এই মুহুর্তেই রওনা হব। কিন্তু আমি আমার পিতার আশপাশে থাকতে চাই। আপনার যদি মনে হয় আমার কর্মকাণ্ডের পেছনে আছে সিংহাসনে বসার লোভ তাহলে ভুল হবে। সিংহাসন আমি bांश् नीं।

বাবর : কোন চাও না?

হুমায়ূন : যুদ্ধ, হত্যা, রাজ্যদখল এইসবে আমার আসক্তি নাই। আমি একা থাকতে পছন্দ করি, আমি পড়াশোনা করতে পছন্দ করি।

বাবর : খবর পেয়েছি। তুমি আফিমের নেশা করছি?

হুমায়ূন : হ্যাঁ।

বাবর : এই ভয়ঙ্কর নেশায় আসক্ত হয়েছ কেন?

হুমায়ূন : আফিম খেলে আমি আশপাশের সবকিছু ভুলে থাকতে পারি।

বাবর : আফিম ছেড়ে দাও। এটা সম্রাটের আদেশ না, পিতার আদেশ। আর যেহেতু তুমি আমার আশপাশে থাকতে চাচ্ছি, আমি তোমাকে সম্বর যেতে বলছি। এখান থেকে কাছে। ইচ্ছা করলেই আমার কাছে চলে আসতে পারবে।

হুমায়ূন : আপনার অনুমতি যেদিন পাব সেদিনই রওনা হব। আপনার কাছে আমার একটা আর্জি আছে।

বাবর : বলো।

হুমায়ূন : কোহিনূর হীরা আমি আপনাকে দিতে চাই। আপনি গ্ৰহণ করলে আমার হৃদয় আনন্দে পূর্ণ হবে। হীরাটা আমার সঙ্গেই আছে।

বাবর : তোমার উপহার আমি গ্ৰহণ করলাম।

হুমায়ূন : আপনাকে নিয়ে এই অক্ষম অভাজন একটি কবিতা লিখেছে।

বাবর : পড়ে শোনাও।

হুমায়ূন : আমার ভগ্নি গুলবদন কবিতাটি আপনাকে পড়ে শোনাবে।

বাবর : তুমি শোনাবে না কেন?

হুমায়ূন : আপনার সামনে লজ্জাবোধ করছি।

বাবর : প্রথম চরণটি বলো।

হুমায়ূন : প্রদীপ্ত সূর্য ছিল আমার পিতার কাছে ম্লান।

হুমায়ূন সম্বর ফিরে গেলেন এবং তাঁর স্বভাবমতো ড়ুব মারলেন। যে বাবাকে দেখার জন্যে এত দূরে ছুটে আসা, সেই বাবার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই।

বাবর খবর পেয়েছেন, তার পুত্র বাগানের ভেতর একটা দোতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় থাকেন। একটা জানালার সামনে তাকে ঘন্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে দেখা যায়। প্রচুর পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে ছবি আঁকেন। ছবি আঁকায় একজন হাবশি (খোজা) চিত্রকর তাঁকে সাহায্য করে। (* মোঘল চিত্রকলার শুরু হুমায়ূনকে দিয়ে।)

চার মাস পার হয়ে গেল। এই চার মাসে সম্রাট বাবর পুত্রকে দু’বার আসতে বললেন। হুমায়ূন মীর্জা বেয়াদবির চূড়ান্ত করলেন, চিঠির জবাব দিলেন না।

বাবর সিংহাসনে। দিনের প্রথমার্ধের রাজকাৰ্য শুরু হয়েছে, এই সময় খবর এল পুত্র হুমায়ূন এসেছেন। সম্রাট বললেন, তাকে এক্ষনি এই মুহুর্তে রাজসভায় উপস্থিত হতে বলো।

দূত ভীত গলায় বলল, হুমায়ূন মীর্জার পক্ষে সম্ভব না। তিনি অপারগ।

কেন?

তিনি অচেতন অবস্থায় আছেন। তাঁর জীবনসংশয়।

সম্রাট বাবর রাজসভা ভেঙে দিয়ে ছুটে গেলেন পুত্রকে দেখতে। কোথায় হুমায়ূন মীর্জা? দেখে মনে হচ্ছে একজন মৃত মানুষ পড়ে আছে।

হুমায়ূন মীর্জার ব্যক্তিগত চিকিৎসক বললেন, উনি চিকিৎসার অতীত। শুধুমাত্র আল্লাহুপাক তার গোপন ভাণ্ডার থেকে যদি কিছু দেন। তবেই হুমায়ূন মীর্জার জীবনরক্ষা হবে।

দিল্লীর চিকিৎসকদের সভা বসল। তাঁরাও বললেন, সম্রাটপুত্ৰ আমাদের চিকিৎসার অতীত। তাঁর জন্যে আল্লাহপাকের কাছে আমরা প্রার্থনা করতে পারি, এর বেশি কিছু করতে পারি না।

সুফি সাধক মীর আবুল কাশিম তখন সম্রাটকে বললেন, পুত্রের প্রাণের বিনিময়ে আপনি যদি আপনার অতি প্রিয় কিছু দান করেন। তাহলে হয়তো-বা শাহজাদার জীবন রক্ষা হতে পারে।

বাবর বললেন, আমার কাছে নিজের প্রাণের চেয়ে প্রিয় আর কিছুই নেই। আমি শাহজাদার জন্যে আমার প্রাণ দিতে প্রস্তুত।

হতভম্ব মীর আবুল কাশিম বললেন, সম্রাট আপনি এটা কী বললেন? এই কাজ আপনি করতে পারেন না। আপনি বরং কোহিনূর হীরা দান করে দিন।

বাবর বললেন, আমার পুত্রের জীবনের দাম কি সামান্য একখণ্ড হীরা?

অচেতন হুমায়ূন মীর্জা বিছানায় শুয়ে আছেন। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ। ঘরের ভেতরে তিনটা প্ৰদীপ জ্বলছে। সম্রাট বাবর ছাড়া শাহজাদার সঙ্গে আর কেউ নাই। বাবর পুত্রের মাথার পাশ থেকে ঘুরতে শুরু করলেন। তিনি মনে মনে বলছেন, পুত্রের ব্যাধি আমি আমার শরীরে ধারণ করলাম। পরম করুণাময়, তুমি আমার পুত্রকে সুস্থ করে দাও। সম্রাট তিনবার চক্কর দেওয়ার পর পর অচেতন হুমায়ূন চোখ মেলে বললেন, বাবা। আপনি এখানে কী করছেন?

পুত্রের কালান্তক ব্যাধি শরীরে ধারণ করে পঞ্চাশ বছর বয়সে সম্রাটের মৃত্যু হয়। ৬ জমাদিয়াল আউয়াল ৯৩৭ হিজরি, ইংরেজি ২৬ ডিসেম্বর, ১৫৩০। তার তিন দিন পর হুমায়ূন মীর্জা সিংহাসনে বসেন।

০৩. নীল রঙের বৈদুৰ্যমণি

সম্রাট হুমায়ূনের বাম হাতে একটি অদ্ভুত সুন্দর হালকা নীল রঙের বৈদুৰ্যমণি (Lapis Lazuli)। ডান হাতে একটি চিঠি। চিঠি পাঠিয়েছেন রাজস্থান থেকে রাজপুত রানী কর্ণাবতী। চিঠির সঙ্গে কয়েকগাছি হলুদ সুতা।

সম্রাট চিঠি পড়ছেন না। চিঠি এবং বৈদুৰ্যমণি এক হাত থেকে আরেক হাতে চালাচালি করছেন। যখন চিঠি ডান হাতে তখন বৈদুৰ্যমণি বাম হাতে। দৃশ্যটি সম্রাটের দুই ভগ্নি গুলবদন এবং গুলচেহরা। চিকের আড়াল থেকে দেখে মজা পাচ্ছে। দরবার চলাকালে এই দুই বোন চিকের আড়াল থেকে দরবারের কাজকর্ম দেখে। সম্রাটের অন্তঃপুরের আত্মীয়স্বজন রাজদরবার দেখার জন্যেই চিকের ব্যবস্থা। যারা দেখবে তারা দরবারের লোকজনের কাছে অদৃশ্য।

প্রধান উজির বললেন, সম্রাট কি কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তিত ?

সম্রাট হ্যা-সূচক মাথা নাড়লেন।

চিন্তার বিষয় কি জানতে পারি ?

হ্যাঁ পারেন। জাদুবিদ্যার বইটি এখানো জোগাড় করা গেল না। এই নিয়ে আমি চিন্তিত ।

সম্রাট হিন্দুস্থানের জাদুবিদ্যা নামের একটি বইয়ের সন্ধান পেয়েছেন। বইটি আছে তার ছোটভাই কামরান মীর্জার কাছে। সে সংগ্রহ করেছে কান্দাহারের এক দুর্গ থেকে।

সম্রাট হুমায়ূনের এই বইটি পড়ার খুব ইচ্ছা। বইটি নাকি লেখা হয়েছে প্যাচার রক্ত দিয়ে। দিনের বেলা বইয়ের লেখা অস্পষ্ট থাকে, রাতে স্পষ্ট হয়। সম্রাট তার ভাইয়ের কাছে বইটি চেয়ে পত্র দিয়েছেন। কামরান মীর্জা পত্রের জবাব দেন নি।

উজির বললেন, রানী কর্ণাবতীর পত্রটি কি আপনি পড়বেন? গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।–

সম্রাট চিঠি পড়তে শুরু করলেন

আমি আপনাকে ভাই ডাকলাম। আমাদের নিয়ম অনুযায়ী ভাইকে রাখি পাঠালাম। আমি মহাবিপদে পড়েছি। গুজরাটের বাহাদুর শাহ আমার দুর্গ অবরোধ করেছেন। দুর্গ রক্ষার প্রয়োজনীয় শক্তি আমার নেই। দুর্গে এক হাজার রাজপুত রমণী এবং তিন হাজার শিশু আছে। বাহাদুর শাহ দুর্গে প্রবেশ করলে আমাদের মৃত্যুবরণ করা ছাড়া উপায় নেই।

এখন বোন ভাইকে ডাকছে। ভাই কি বোনকে উদ্ধার করবে?

বোন ভাইয়ের জন্যে একটি বৈদুৰ্যমণি পাঠিয়েছে। কারণ বোন শুনেছে তার ভাই ছবি আঁকেন। বৈদুৰ্যমণি চূর্ণ করে যে নীল রঙ হবে তার দ্যুতি অসাধারণ। বোন কর্ণাবতী আশা করছে তার ভাই এই রঙ ব্যবহার করে একটা ছবি আঁকবে।

ইতি
রানী কর্ণাবতী

সম্রাট চিঠিটি তার প্রধান উজিারের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। প্রধান উজির চিঠি পড়ে বললেন, রত্ন পাঠিয়ে দিন রাজকোষে। চিঠির জবাব দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

ভাই বোনের চিঠির জবাব দেবে না?

রানী কর্ণাবতী বিপদের বোন। বিপদে পড়েছেন বলেই ভাই পাতিয়েছেন। বিপদে না থাকলে এবং তার শক্তি প্ৰবল থাকলে তিনি মোঘল সাম্রাজ্য আক্রমণ করতেও পিছপা হতেন না। তা ছাড়া আপনি নিজেও এখন মহাবিপদে আছেন।

কী রকম?

আপনার ভাই কামরান মীর্জা শক্তি সঞ্চয় করছেন। তিনি পাঞ্জাব দখল করেছেন। তিনি যে-কোনো সময় আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করবেন। একই কথা আপনার আরেক ভাই হিন্দাল মীর্জা সম্পর্কেও সত্যি। এদের চেয়েও অনেক বড় সমস্যা তৈরি করতে যাচ্ছে পাঠান শের খাঁ। সে বাংলা জয় করেছে। আগ্রার দিকে তার যাত্রা শুধু সময়ের ব্যাপার।

হুমায়ূন ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত হতে বলুন। আমি স্বয়ং চিতোরের দিকে রওনা হচ্ছি।

এই সিদ্ধান্ত সমরবিশারদদের সঙ্গে আলোচনার পর নিন।

সমরবিশারদরা আপনার মতোই কথা বলবে। কিন্তু আমি আমার বিপদগ্ৰস্ত বোনের পাশে দাঁড়াতে চাই।

শাহানশাহ, রাজনীতিতে আবেগের স্থান নেই।

হুমায়ূন বললেন, আমার রাজনীতিতে আছে। একজনের চরম বিপদে আমি তার পাশে যখন দাঁড়াব, তখন দেখা যাবে আমার চরম বিপদেও কেউ একজন আমার পাশে এসে দাড়াবে। (* হুমায়ূনের কথা সত্যি হয়েছিল। রাজ্যহারা পথের ফকির হুমায়ূনকে সাহায্য করেছিলেন পারস্য সম্রাট। সেখানেও একটি চিঠির ভূমিকা ছিল।)

প্রধান উজির বিরক্তি চাপার চেষ্টা করছেন। পারছেন না। সম্রাটের কোনো কর্মকাণ্ডই সম্রাটসুলভ না। তিনি বাস করেন সম্পূর্ণ নিজের জগতে। সেই জগৎ নিয়ন্ত্রণ করে সুরা, আফিম এবং কবিতা। তুরস্ক থেকে এক কবি এসেছে, রাজসভায় তাকে উচ্চস্থান দেওয়া হয়েছে। কবির নাম দিদির আলী।

সম্রাট গ্রহ-নক্ষত্র বিচার করাকে এখন রাজকার্যের অংশ ভাবছেন। সারাক্ষণ শুভ-সময় অশুভ-সময় নির্ণয় করে চলেছেন। তিনি পোশাকও পরছেন গ্রহ-নক্ষত্র বিবেচনা করে। রবিবারে পরছেন। হলুদ পোশাক। সেদিন তিনি রাজ্য পরিচালনা-বিষয়ক সভা করেন।

সোমবার পরেন সবুজ পোশাক। ঐদিন তিনি আনন্দে থাকেন। রাজসভায় গীত-বাদ্য হয়।

মঙ্গলবারে লাল, মঙ্গলগ্রহের লাল রঙের পোশাক পরেন। সেদিন যুদ্ধবিগ্রহ নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁর মেজাজ থাকে উগ্র। সামান্য অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেন।

আজ মঙ্গলবার। সম্রাট লাল পোশাক পরেছেন। যুদ্ধযাত্রা ঘোষণা দেওয়ার এইটিই কি কারণ?

প্রধান উজির আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, সম্রাট তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, তীর ধনুক নিয়ে আসুন। একটি তীরের আগায় বাহাদুর শাহর নাম লেখা থাকবে। আরেকটির আগায় আমার নাম। আমি নিজে তীর ছুড়ে দেখব কোনটি আগে যায়। যার তীর আগে যাবে, সে-ই যুদ্ধে জিতবে।

সম্রাটের তীর অনেক আগে গেল।

পরদিন (বুধবার) ফজরের নামাজের পর হুমায়ূন চিতোরের দিকে সসৈন্যে রওনা হলেন। দুপুরে এক হিদের পাড়ে সৈন্যরা দ্বিপ্রহরের খাবারের জন্যে থামল। তখন বাহাদুর শাহ্র বিশেষ দূত সম্রাট হুমায়ূনের কাছে একটি চিঠি দিলেন। চিঠিতে লেখা—

সম্রাট হুমায়ূন,

অতি ভক্তিভরে নিবেদন করছি যে, আমি মোঘল সম্রাটের একজন দীন সেবক মাত্র। আমি বর্তমানে ধৰ্মযুদ্ধে নিজেকে নিয়োজিত করেছি। ওলেমারা রানী কর্ণাবতীর বিরুদ্ধে এই যুদ্ধকে জেহাদ অ্যাখ্যা দিয়েছেন।

সম্ভবত আপনার কাছে তথ্য নাই যে, এই দুর্গে অনেক মুসলমান রমণী বন্দি অবস্থায় আছেন। রাজপুত পুরুষরা তাদের ব্যবহার করে।

নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের নৃত্যগীত এবং আরও অনেক অশ্লীল কুৎসিত কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে হয়।

আমি অনুরোধ করব যে, আপনি এই যুদ্ধযাত্রা স্থগিত করবেন। আমি আপনার সম্মানে এক বাক্স মণিমুক্তা, চারটি আরবি ঘোড়া এবং একটি হাতি পাঠালাম। এই হাতিটা আমার প্রিয়, এর নাম কুশ।

ইতি
আপনার সেবক
বাহাদুর শাহ

হুমায়ূন যুদ্ধযাত্রা স্থগিত করলেন না। জোহরের নামাজের পর সেনাবাহিনী দ্রুত অগ্রসর হতে লাগল। বাহাদুর শাহ খবর পেলেন হুমায়ূন যাত্রা অব্যাহত রেখেছেন। তিনি সঙ্গে করে এনেছেন তাঁর গোলন্দাজ বাহিনী। গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান তিকি খাঁ কামান চালনায় বিশেষ পারদর্শী। হুমায়ূনের বিশেষ কামান ফিরোজাকে দুটা হাতি টেনে নিয়ে আসছে। মাঝারি। কামানগুলি টানছে মাদ্রাজি বলদ। বন্দুকধারীরা কামানের সঙ্গে সঙ্গে আসছে। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে কামান অগ্রসর হবে না, তবে বন্দুকধারীরা অগ্রসর হবে।

সম্রাটের তীরন্দাজ বাহিনীর নেতৃত্বে আছে আফগান তীরন্দাজ প্রধান শাহ জুম্মা। তাঁর সম্পর্কে কথিত আছে, লক্ষ্যবস্তু দেখার পর তিনি চোখ বন্ধ করে তীর ছুড়ে লক্ষ্যভেদ করতে পারেন।

হুমায়ূনের অশ্বারোহী বাহিনীর সংখ্যা ছিল ত্ৰিশ হাজার। তারা অগ্রবর্তী তীরন্দাজ দলের পেছনে পেছনে যাচ্ছিল।

বাহাদুর শাহ সম্রাট হুমায়ূনের দ্রুত এগিয়ে আসার খবর শুনলেন। তিনি পালিয়ে যাওয়ার সব প্রস্তুতি শেষ করে দুর্গ অবরোধকারী সৈন্যদের উল্লাসধ্বনি করতে বললেন। দুর্গের বাইরে বিরাট হৈচৈ হতে লাগল।

রানী কর্ণাবতী বাইরে হঠাৎ হৈচৈ শুরু হয়েছে কেন জানতে বাহিনীর যুদ্ধ হয়েছে। যুদ্ধে হুমায়ূন পরাজিত হয়েছেন। হাতির পায়ের চাপে পিষ্ট হয়ে নিহত হয়েছেন বলেই বাহাদুর শাহর শিবিরে আনন্দ উল্লাস।

জহরব্রত পালনের জন্যে আগুন প্রস্তুত ছিল। রানী কর্ণাবতী সবাইকে নিয়ে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। রানীর আদেশে দুর্গের তিন হাজার শিশুকেও কুয়ায় নিক্ষেপ করা হলো। যেন এরা শত্রুর হাতে পড়ে নিগৃহিত না হয়।

বাহাদুর শাহ দুর্গে প্রবেশ করতে পারলেন না। হুমায়ূনের বাহিনী চলে এসেছে। তিনি পালিয়ে গেলেন।

রানী কর্ণাবতীর মৃত্যু হুমায়ূনকে দুঃখে অভিভূত করল। তিনি তৎক্ষণাৎ বাহাদুর শাহর পেছনে ছুটলেন। রানী কর্ণাবতীর মৃত্যু আরেকজনের মনে গভীর রেখাপাত করল। তিনি বাহাদুর শাহর গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান রুমী খাঁ। তিনি তাঁর দলবল নিয়ে হুমায়ূনের সঙ্গে যুক্ত হলেন।

চিতোরের দুর্গ শ্মশান। দুর্গের বাইরে বাহাদুর শাহের অতি প্রিয় দুই হাতি বিকট চিৎকার করছে এবং ছোটাছুটি করছে। হুমায়ূনের হাতে বাহাদুর শাহর প্রিয় দুই হাতি পড়বে তা তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না বলে নিজের হাতে এদের শুড় কেটে দিয়েছেন। হাতি দুটির নাম শিরজা ও পতাসিকার। বাহাদুর শাহর প্রসিদ্ধ দুই কামান লায়লা এবং মজনু যেন হুমায়ূনের হাতে না পড়ে সেই ব্যবস্থাও হলো। বাহাদুর শাহ নিজে কামান দুটি নষ্ট করলেন। (* সূত্র: ডক্টর হরিশংকর শ্ৰীবাস্তব, মোঘল সম্রাট হুমায়ূন।)

বাহাদুর শাহ পালিয়ে মাণ্ডু দুর্গে আশ্রয় নিলেন।

হুমায়ূন মাণ্ডু পৌঁছালেন ত্ৰিশ হাজার অশ্বারোহী নিয়ে। তিনি মাণ্ডু দুর্গ অবরোধ করলেন। সারা দিন ঘোড়া ছুটিয়ে তিনি ছিলেন ক্লান্ত। এশার নামাজ শেষ করে সেনাপতিদের ডেকে বললেন, আমি জানি মাণ্ডু দুর্গ দখল করা কঠিন। কিন্তু আমি বাহাদুর শাহকে ধরতে চাই। এমন ব্যবস্থা করা হোক যেন রাতের ভেতর দুর্গ দখল হয়।

লম্বা লম্বা মই তৈরি করা হলো। মই দুর্গের গায়ে লাগিয়ে তীরন্দাজরা দুর্গপ্রাচীরে উঠে গেল। একদল তীরন্দাজ দুর্গের প্রধান দরজা খুলে দিল।

বাহাদুর শাহ দড়ি বেয়ে দুর্গ থেকে পালিয়ে গেলেন। দুর্গের ভেতরের মানুষজন কেউ বলল না, বাহাদুর শাহ কীভাবে পালিয়েছেন কোন দিকে যাচ্ছেন। হুমায়ূন তখন এক অদ্ভুত কাণ্ড করলেন, গাঢ় লাল রঙের পোশাক পরলেন। এর অর্থ, সবাইকে হত্যা করো।

ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞ শুরু হলো। মোঘল সৈনিকের তলোয়ারের নিচে হাজার হাজার মানুষকে প্রাণ দিতে হলো। সেদিন মঙ্গলবার হওয়ায় রক্তাম্বর পরে হুমায়ূন উন্মাদ হয়ে গেলেন। তাকে দেখে তার সৈন্যরাও উন্মাদ হয়ে গেল।

মাণ্ডুবাসীদের যে রক্ষা করে, তার কথা এখন বলা যাক। তার নাম বচ্ছু (মতান্তরে মঞ্চ)। এই বচ্ছু বাহাদুর শাহ’র অতি প্রিয় এক গায়ক। বাহাদুর শাহ যেখানে যান। সেখানেই সে যায়।

রক্তাম্বর পরা সম্রাট হুমায়ূনের দিকে বচ্ছু গান গাইতে গাইতে এগিয়ে গেল। গানের কথা—রক্তের রঙের চেয়ে বৃক্ষের সবুজ রঙ কি কম সুন্দর?…

হুমায়ূন গায়কের কণ্ঠ শুনে অভিভূত হলেন। তাঁর কাছে মনে হলো, তিনি তাঁর জীবনে এত মধুর সঙ্গীত শোনেন নি। বচ্ছু সম্রাটের সামনে দাঁড়াল। সম্রাট বললেন, তুমি কি জানো যে তুমি এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গায়ক?

বচ্ছু বলল, জানি। আমি তোমার জাদুকরী ক্ষমতায় মুগ্ধ হয়েছি। বলো কী চাও? আমি চাই আপনি পোশাক বদলে সবুজ পোশাক পরুন। সম্রাট সবুজ বস্ত্র পরলেন। হত্যাযজ্ঞ সঙ্গে সঙ্গে থামল। সম্রাট বললেন, তুমি আর কী চাও?

বচ্ছু বলল, যারা বন্দি আছে তাদের মুক্ত করে দিন। হুমায়ূন বললেন, সবাই মুক্ত। আমি তোমার আরও একটি ইচ্ছা পূর্ণ করব। বলো কী চাও?

আমি আমার গুরু বাহাদুর শাহের কাছে যেতে চাই।

হুমায়ূন দুর্গের প্রধান ফটক খুলে বচ্ছুকে চলে যেতে দিলেন। হুমায়ূনের প্রধান উজির বললেন, আপনি কী করছেন?

সম্রাট বললেন, এই গায়ক যদি আমার রাজ্য প্রার্থনা করত। আমি তাকে দিয়ে দিতাম।

মাণ্ডু থেকে পালিয়ে বাহাদুর শাহ আহমেদাবাদের চম্পানী দুর্গে অবস্থান নিলেন। মোঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেন। বাহাদুর শাহের গোলন্দাজবাহিনী কামান বসানোর আগেই সম্রাট হুমায়ূন চম্পানীর দুর্গ অবরোধ করলেন। বাহাদুর শাহ আবার পালালেন, তিনি আশ্রয় নিলেন কম্ব দুর্গে। হুমায়ূন এক ঘণ্টার মধ্যে কম্ব দুর্গে উপস্থিত হলেন।

কম্ব দুর্গ থেকেও বাহাদুর শাহকে পালাতে হলো। এবার তার সঙ্গে গায়ক বচ্ছু। পালাবার সময় তিনি বলেছিলেন, আমার সঙ্গে বচ্ছু আছে আমার আর কিছুই লাগবে না।

হুমায়ূন দুর্গের ভেতর মাগরেবের নামাজ পড়লেন। নামাজের শেষে তার ইমামকে ডেকে পাঠালেন। ইমামকে বললেন, মাগরেবের নামাজে আপনি সূরা ফিল পাঠ করেছেন?

ইমাম বললেন, জি জনাব।

সূরা ফিলের শানে নজ্বল এবং তর্জমা আমাকে শোনান।

ইমাম বললেন, ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে নবীয়ে করিম (দঃ)-এর জন্মবর্ষের ঘটনার বর্ণনা নিয়ে এই সূরা নাযেল হয়। ইয়েমেনের বাদশাহ আবরাহা হস্তীবাহিনী নিয়ে মক্কা আক্রমণ করেছিলেন, তখন আল্লাহর আদেশে ছোট ছোট আবাবিল পাখি দিয়ে ইয়েমেনের বাদশাহকে পরাস্ত করা হয়েছিল। সূরা ফিলের এই হলো ঘটনা। আল্লাহ্পাক বলেছেন, হে রসুল! তুমি কি দেখো নি তোমার আল্লাহ হাতিওয়ালাদের সাথে কেমন আচরণ করলেন? তাদের সমস্ত আয়োজন কি আল্লাহ ব্যর্থ করে দেন নি?

সম্রাট বললেন, আপনি আমাকে ইয়েমেনের বাদশাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্যে এই সূরা পাঠ করেছেন?

ইমাম বললেন, আমার ভুল হয়েছে। সম্রাট বললেন, আপনি বাহাদুর শাহর অনুরক্ত বলেই এই কাজটি করলেন। কী আশ্চর্য, আমার প্রধান শক্রর প্রতি যে অনুরক্ত, আমি তার পেছনে দিনের পর দিননামাজ পড়েছি!

হুমায়ূন আবার রক্তপোশাক পরলেন। বাহাদুর শাহ তাঁকে যে হাতিটি দিয়েছেন কুশ তিনি সেই হাতি আনতে বললেন। হাতি হাজির করা হলো।

সাম্রাট বললেন, আজ মাগরেবে যে সূরা পাঠ করা হয়েছে তার নাম ফিল অর্থাৎ হাতি ইমাম, আপনার প্রয় বাহাদুর শহর দেওয়া সেই হাতির পায়ের চাপে পিষ্ট করে আমি আপনাকে হত্যার নির্দেশ দিলাম। এই আদেশ এশার নামাজের আগেই যেন কার্যকর হয়। (*ঐতিহাসিক আবুল ফজল লিখেছেন, এই ঘটনার পর হুমায়ূন অত্যন্ত অনুতপ্ত হন। তিনি সারা রাত একফোঁটা ঘুমাতে পারেন নি। সারা রাত শিশুর মতো কেঁদেছেন। পরদিন ফজরের নামাজের আগে তিনি তার রক্তপোশাক পুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। বাকি জীবন তিনি আর এই ভয়ঙ্কর বস্ত্ৰ পরিধান করেন নি।)

নির্দেশ কার্যকর করা হলো।

কম্ব দুর্গ থেকে বাহাদুর শাহ পালিয়ে গেলেও তাঁর ধনরত্ন নিতে পারলেন না। সবই হুমায়ূনের হাতে পড়ল। ধনরত্নের বাইরে পেলেন বাহাদুর শাহের পোষা তোতাপাখি।

এই পাখি নাকি ভবিষ্যৎ বলতে পারে। রুমী খাঁকে সে যতবার দেখে ততবারই বলে, ফট রুমী হারামখোর। ফট রুমী হারামখোর। এর অর্থ হারামখোর রুমীর উপর অভিসম্পাত।

সম্রাটের প্রধান খেলা এখন হলো পাখির সঙ্গে সময় কাটানো। কম্ব বিজয়ের পর সম্রাট তোতাকে জিজ্ঞেস করলেন, কে শ্ৰেষ্ঠ আমি না বাহাদুর শাহ?

তোতা বলল, আল্লাহ আকবর।

পাখির মতে আল্লাহই শ্রেষ্ঠ। সম্রাট সন্তোষ লাভ করলেন। তোতাকে স্বর্গীয় পক্ষী উপাধি দিলেন। তার জন্যে সোনার খাঁচা বানানোর নির্দেশ দিলেন।

সম্রাটকে পানি খাওয়ানোর দায়িত্বে নিযুক্ত জওহরকে এই পক্ষীর সেবক নিয়োগ করলেন। (এই জওহর সম্রাট হুমায়ূনের একটি জীবনী রচনা করেন। সম্রাটভগ্নি গুলবদনের পরেই জওহরের জীবনীকে প্রামাণ্য ধরা হয়।) সম্রাটের নির্দেশে এই তোতাপাখির একটি ছবি আঁকা হয়। ছবিটি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে এখনো সংরক্ষিত আছে।

০৪. লু হাওয়া বইছে

জুন মাস। আগ্রার উপর দিয়ে কয়েকদিন ধরেই লু হাওয়া বইছে। পিঙ্গল আকাশে মেঘের দেখা নেই। লোকজন দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘরে বসা। কিছু মিঠাইয়ের দোকান খোলা। মিঠাইয়ের উপর ভিনভন্ন করছে মাছি। গরম কাল মাছিদের প্রিয় সময়। গরমে তারা দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে।

আগ্রার পথেঘাটে ময়ুরের ঝাঁক। তাদের দৃষ্টি আকাশের দিকে। তারা কুৎসিত শব্দে ডাকে, চক্রাকারে ঘোরে, একে অন্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। গরমে এদেরও মাথা খারাপের মতো হয়ে গেছে। ময়ুর পেখম মেলার জন্যে অস্থির। বৃষ্টির দেখা নেই বলে পেখম মেলতে পারছে না।

আগ্রার অধিবাসীরা আজ খানিকটা উত্তেজিত। প্ৰধান কাজির নির্দেশে তিন অপরাধীর শাস্তি হবে। বিশেষ ধরনের শাস্তি বলেই উত্তেজনা। তিনি অপরাধীর জন্যে তিনটি গাধা হত্যা করা হয়েছে। গাধাগুলির চামড়া ছিলানো হয়েছে। অপরাধীদের গাধার চামড়ার ভেতর ঢুকিয়ে চামড়া সেলাই করে দেওয়া হবে। তারপর তাদের শুইয়ে দেওয়া হবে ঘোড়ার গাড়িতে। এই গাড়ি আগ্রা শহরময় ঘুরবে। প্রচণ্ড গরমে গাধার চামড়া এঁটে বসে যাবে অপরাধীদের গায়ে। তাদের মৃত্যু হবে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে।

তিন অপরাধী গাধার চামড়ায় মোড়া অবস্থায় ঘোড়ার গাড়ির পাটাতনে শুয়ে আছে। ঘোড়ার গাড়ি চলছে। ঘোড়ার গাড়ির চালকের হাতে রুপার ঘণ্টা। সে মাঝে মাঝে ক্লান্ত ভঙ্গিতে ঘণ্টা বাজাচ্ছে। ঘণ্টাধ্বনি শাস্তির ঘোষণা। প্ৰচণ্ড গরমে গাধার চামড়া অপরাধীদের গায়ে ঐটে বসছে। তাদের একজন পানি পানি’ বলে অস্ফুট শব্দ করছে। গাড়ির পেছনে এক দঙ্গল ছেলেপুলে। তাদের উৎসাহের সীমা নেই। তারা মাঝে মাঝে ঢ়িল ছুড়ছে। যখনই কোনো ঢ়িল গাধার চামড়ায় আবৃত অপরাধীদের উপর পড়ছে, তখনই তারা উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠছে।

গরম অসহনীয় বোধ হওয়ায় সম্রাট গোসলখানায় দরবারে খাস’ বসিয়েছেন। তাঁর প্রিয় অমাত্যরা গোসলখানায় জড়ো হয়েছেন। সম্রাট হাম্মামে বুক পর্যন্ত ড়ুবিয়ে বসে আছেন। দুজন খোজা বালক মাঝে মাঝে তার মাথায় পানি ঢালছে। পানিতে গোলাপগন্ধ। অসংখ্য গোলাপ পাপড়ি ছড়িয়ে পানিতে এই গন্ধ আনা হয়েছে। বিশেষ ব্যবস্থায় পানি শীতল করা হয়েছে। শীতলকরণ-পদ্ধতি চালু আছে। সম্রাট যতক্ষণ হাম্মামে থাকবেন ততক্ষণ এই প্রক্রিয়া চলবে।

পানির শীতলকরণ-পদ্ধতি যথেষ্টই বৈজ্ঞানিক। বাষ্পীভবনের সময় পানি কিছু উত্তাপ নিয়ে বাম্পে পরিণত হয়। উত্তাপ নেওয়ার কারণে পানি ঠাণ্ডা হয়। প্ৰকাণ্ড সব মাটির জালার গায়ে পানি ঢেলে বাতাস দেওয়া হচ্ছে। এতে বাষ্পীভবন-প্রক্রিয়া দ্রুত হচ্ছে।

সম্রাটকে ঘিরে আছেন দরবারে খাসের অমাত্যজন। মন্ত্রীসভার সকল সদস্য আছেন। দুজন সেনাপতি আছেন। আজকের দরবারে খাসে আফগান শের খাঁর বিষয়ে আলোচনা হবে। শের খাঁ শক্তি সঞ্চয় করেই যাচ্ছে। তার বিষয়ে কখন কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে তা সম্রাট বলবেন। আলোচনায় অন্যরাও অংশ নিতে পারবে, তবে কে অংশ নেবে। তা সম্রাট আঙুলের ইশারায় ঠিক করবেন। ইচ্ছামতো মতামত জাহির করার সুযোগ নেই। গোপন আলোচনা খোজাদের সামনেই হচ্ছে, তাতে কোনো সমস্যা নেই। গোসলখানায় উপস্থিত সব খোজাই বধির। কানে গলন্ত সীসা ঢেলে তাদের কান নষ্ট করা হয়েছে।

সভা শুরুর আগে আগে সম্রাট একটি শের আবৃত্তি করলেন—

মুরাদই লাখ বুড়া চাহে তো কেয়া হোতা হ্যায় ওই হোতা হ্যায় যো মঞ্জরে খোদা হোতা হ্যায়। (শত্রুরা আমার যতই অনিষ্ট কামনা করুক তাতে কিছুই হবে না। ঈশ্বর যা মঞ্জুর করবেন তা-ই হবে আমার ভাগ্যলিপি।)

দরবারিরা একসঙ্গে বললেন, মারহাবা! মারহাবা! সম্রাট হাসলেন। দ্বিতীয় শের আবৃত্তি করলেন—

হর মুসিবৎকো দিয়া এক তবসুমসে জবাব ইসতরাহ গরদিসে দৌড়োকে রুলায়া হ্যায় ম্যায়নে। (দুর্দিন ভেবেছিল সে আমাকে কাদাবে। উল্টা হাসিমুখে আমি তাকে কাঁদিয়েছি।)

আবারও আওয়াজ উঠল, মারহাবা! মারহাবা!

প্রধান উজির বললেন, গোস্তাকি মাফ হয়। এই অপূর্ব শের কার কলম থেকে বের হয়েছে?

সম্রাট বললেন, এই শের তোমাদের বাদশাহর কলম থেকে এসেছে। সে হিন্দুস্থানের বাদশাহ হলেও অন্তরে একজন অক্ষম দুর্বল কবি।

প্রধান উজির কিছু বলতে চাচ্ছিলেন, সম্রাট ইশারায় তাঁকে থামিয়ে সভা শুরু করলেন। এবং সবাইকে অবাক করে দিয়ে অমাত্যদের মধ্যে গৌণ একজনকে হাম্মামে নামতে বললেন। সম্রাটের সঙ্গে স্নান করা পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার। যাকে হাম্মামে নামতে বলা হলো, তাঁর চেহারা অতি সাধারণ। মধ্যম আকৃতির কৃশকায় একজন মানুষ। তাঁর নাম বৈরাম খাঁ। (মোঘল ইতিহাসের প্রধান পুরুষদের একজন।) গোসলখানায় যখন দরবারে খাস বসে তখন উপস্থিত সবাই পানিতে নামার প্রস্তুতি নিয়ে আসে। যেন সম্রাটের হুকুম পাওয়ামাত্র পানিতে নামতে পারে।

সম্রাট বললেন, এখন একটি পত্র পাঠ করা হবে। পত্রপাঠের পর পত্রের উপর আলোচনা। পত্ৰ পাঠিয়েছেন। আফগান পাঠান—শের খাঁ।

সম্রাটের নির্দেশে প্রধান উজির পত্ৰ পাঠ করলেন।

পত্র

প্রেরক : দাসানুদাস সেবক শের শাহ।

প্রাপক : আল সুলতান আল আজম ওয়াল খাকাল আল মুকাররাম, জামিই সুলতানাত-ই-হাকিকি ওয়া মাজাজি, সৈয়দ সালাতিন, আবুল মোজাফফর নাসির উদ্দিন মোহাম্মদ হুমায়ূন দশাহ, গাজি জিলুল্লাহ।

হে মহান সম্রাট, হিন্দুস্থানের রক্ষাকর্তা ও মালিক। আল্লাহপাকের অনুগ্রহের ফুটন্ত গোলাপী। মহান কবি ও চিত্রকর হুমায়ূন।

হে বাদশাহ, আপনি কি অধম শের খাঁ’র উপর নারাজ হয়েছেন? হিন্দুস্থান হলো গুজবের বাজার। সেই বাজারের বর্তমান দুৰ্গন্ধময় গুজব হলো— আপনি অধম শের খাঁ’র বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

হে সম্রাট! আমি কি এমন কিছু করেছি। যার জন্যে আপনার বিরাগভাজন হয়েছি? চুনারের দুর্গ আমার পুত্র কুতুব খাঁর দখলে, এটা সত্য। সম্রাটের আদেশ পাওয়ামাত্র কুতুব খাঁ দুর্গের চাবি আপনার পবিত্র হাতে তুলে দিয়ে আপনার পদচুম্বন করবে। তবে আপনার কোনো প্রতিনিধির হাতে না। আপনি স্বয়ং উপস্থিত হলে তবেই দুর্গের চাবি আপনার হস্ত মোবারকে দেওয়া হবে। আমি পুত্রকে নিয়ে বঙ্গদেশের ভেতরে চলে যাব। এর অন্যথা কখনো হবে না।

হে পবিত্র সম্রাট, আপনি গুপ্তচর মারফত খবর নিয়ে নিশ্চয়ই জেনেছেন আমি আমার নিজের নামে খুৎবা পাঠ করাই না। মহান মোঘল সম্রাট হুমায়ূনের নামেই জুমার নামাজে খুৎবা পাঠ করা হয়। টাকশাল থেকে আমার নামে কোনো মুদ্রা তৈরি হচ্ছে না।

এই অধম যেখানে সম্রাটের সেবায় নিযুক্ত তখন আপনি তার উপর বিরাগ হচ্ছেন, অথচ আমি যতদূর জানি আপনার ভাই আসকারি মীর্জা এবং কামরান মীর্জা তাদের নামে খুৎবা পাঠ করছেন। টাকশালে তাদের নামে স্বর্ণমুদ্রা তৈরি হচ্ছে। এরকম কিছু মুদ্রা আপনার কাছে পাঠালাম।

মহান সম্রাট, আপনার দুই ভাইয়ের নাম এখানে এনে যদি অপরাধ করে থাকি তাহলে ক্ষমা প্রার্থনা করি। আপনার মহান পিতা বঙ্গদেশের ফল আমি অত্যন্ত পছন্দ করতেন। আমি আম এবং আরও কিছু বঙ্গদেশীয় ফল আপনার সেবার জন্যে পাঠালাম। এই সঙ্গে একটি বিষ্ণুমূর্তি। বিষ্ণুমূর্তিটির ওজন এগারো সের। সম্পূর্ণ স্বর্ণনির্মিত, এর চোখ নীলকান্তমণির। এই বিষ্ণুমূর্তি বিষয়ে প্রচলিত গল্প হলো, ভয়াবহ বিপদের আগে আগে সে অশ্রু বর্ষণ করে। রহস্যময় বিষয়ে আপনার আগ্রহের কথা জানি বলেই বিষ্ণুমূর্তি বিষয়ে প্রচলিত গল্পটি জানালাম।

ইতি
শের খাঁ
আপনার দাসানুদাস সেবক।

রোশন কাকু (আমীর) বললেন, আমি শের খাঁ’র পত্রে সন্তোষ বোধ করছি।

বৈরাম খাঁ বললেন, দুষ্টলোকের ছলনায় ভোলার কোনো কারণ দেখি না।

কাকু বললেন, শের খাঁ তার নামে খুৎবা পাঠ করে না, এটা তো সত্য। তার নামে মুদ্রা বের হয় নি, এটাও সত্য।

বৈরাম খাঁ বললেন, খুৎবা পাঠ করলেই সম্রাটের দৃষ্টি আকৃষ্ট হবে। শের খাঁ বুদ্ধিমান বলেই খুৎবা পাঠ করছে না। শক্তি সঞ্চয় করছে। চুনার দুর্গ যদি শের খাঁ’র দিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা থাকে তাহলে সম্রাটের যে-কোনো প্রতিনিধির কাছে দুর্গ দেবে। স্বয়ং সম্রাটকে কেন উপস্থিত হতে হবে?

উজির তর্দি বেগ খান বললেন, আপনি কি মনে করেন সম্রাটের যুদ্ধযাত্রা করা উচিত?

বৈরাম খাঁ বললেন, অবশ্যই উচিত। এবং এখনই যুদ্ধযাত্রা করা প্রয়োজন।

তৰ্দি বেগ বললেন, এখনই কেন?

বৈরাম খাঁ বললেন, সম্রাটের অনুমতি পেলে আমি ব্যাখ্যা করব কেন কালবিলম্ব না করে যুদ্ধযাত্রা করা উচিত।

সম্রাট বললেন, অনুমতি দেওয়া হলো।

বৈরাম খাঁ বললেন, শের খাঁ হলো ধূর্ত শেয়াল। সুন্দর একটি চিঠি পাঠিয়ে সে সম্রাটকে শান্ত করেছে। সে কল্পনাও করছে না সম্রাট এরকম একটি চিঠি পাওয়ার পরও যুদ্ধযাত্রা করবেন। কাজেই সে নিশ্চিন্ত আছে। রাজকীয় বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করার মতো প্ৰস্তুতি তার নেই। এই সুযোগে মোঘল সৈন্য অতর্কিতে শের খাঁ’র ঘাড়ের উপর পড়লে চিরদিনের মতো আফগান শক্তির পতন হবে।

সম্রাট বললেন, আলোচনা বন্ধ। সবাইকে আমি হামামখানায় আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।

উপস্থিত অমাত্যদের মধ্যে আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। সবাই পানিতে নামল।

সম্রাট শের খাঁ’র পাঠানো ফল এবং বিষ্ণুমূর্তি গোসলখানায় আনার নির্দেশ দিলেন। বিষ্ণুমূর্তি দেখে সম্রাট বিস্মিত হলেন। এত সুন্দর কাজ! সম্রাট বললেন, যে কারিগর এই মূর্তি তৈরি করেছে তার উদ্দেশে মারহাবা।

সবাই বললেন, মারহাবা!

প্রধান উজির বললেন, রাজকোষে হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি থাকা বাঞ্ছনীয় না। মূর্তি গলিয়ে সোনা করে রাজকোষে জমা হোক।

হুমায়ূন বললেন, না। এই মূর্তি যেমন আছে তেমন থাকবে। আমি আজ তার সঙ্গে স্নান করব।

বিষ্ণুমূর্তি হাম্মামে নামিয়ে দেওয়া হলো। বঙ্গদেশের ফলগুলির মধ্যে একটি সম্রাটের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। অত্যন্ত রসালো ফল। মুখে দিলেই জিভের রঙ বদলে কালো হয়ে যাচ্ছে। এই ফলের কী নাম কেউ বলতে পারল না। ফলটি কালো জাম, কিংবা তুঁত।]

হুমায়ূন গোসলখানায় ঘোষণা দিলেন শের খাঁ’র বিষয়ে তাঁর কোনো উদ্বেগ নেই। তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করার কিছু নেই। বাহাদুর শাহ পরাজিত হয়েছে। পর্তুগীজদের হাতে সে নিহত। সে অপুত্ৰক বিধায় তাকে এবং তার বংশধর নিয়ে আর চিন্তার কিছু নেই। সেই উপলক্ষে তেমন কোনো আনন্দ-অনুষ্ঠান হয় নি। দুই মাসব্যাপী আনন্দ উৎসব হবে। এই দুই মাসে প্রতিদিন দশজন করে সাধারণ প্ৰজা আমার সঙ্গে রাজকীয় খানায় অংশগ্রহণ করবে।

মাগরেবের নামাজের পর হুমায়ূনকে জানানো হলো, গাধার চামড়া পরিয়ে যে তিন অপরাধীকে সারা দিন ঘুরানো হয়েছে তাদের দু’জন মারা গেছে। একজন এখনো জীবিত। হুমায়ূনের নির্দেশে চামড়া থেকে মুক্ত করে তাকে সম্রাটের সামনে আনা হলো। তার দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই। তার সমস্ত শরীর ফুলে গেছে। চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। সম্রাট বললেন, তোমার নাম কী?

সে অতি কষ্টে বলল, সম্রাট, আমি একজন মৃত মানুষ। মৃত মানুষের নাম থাকে না।

তুমি কী অপরাধ করেছিলে?

আপনার এক আমীর আমার অতি আদরের কন্যাকে তার হেরেমে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। আমি সেই নির্দেশ পালন করি নাই। এটাই আমার অপরাধ। আমাকে মিথ্যা হত্যা মামলায় জড়ানো হয়েছিল। মহান কাজি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।

আমার সেই আমীরের নাম কী?

সে নাম বলতে পারল না। ততক্ষণে তার হেঁচকি উঠেছে, শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। সে ঠোঁট নাড়ছে কিন্তু মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মৃত্যু হলো। (*আমীরের নাম তর্দি বেগ খান। সম্রাট আকবরের সময় বৈরাম খাঁ তাঁকে হত্যা করেন।)

সম্রাট হুমায়ূন এর পরপর একটি রাজকীয় ফরমান জারি করলেন।

যে-কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে সম্রাটের অনুমতি নিতে হবে।

এ ছাড়াও তিনি যুদ্ধে ব্যবহার হয় এমন একটি দামামার ব্যবস্থা করলেন। কোনো প্ৰজা যদি মনে করে তার উপর বিরাট অবিচার করা হচ্ছে, তাহলে সে দামামায় বাড়ি দিয়ে সম্রাটের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবে।

এই কাজটা করতে হবে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে। এই সময় সম্রাটের শোবার ঘরের জানোলা খুলে যায়। তিনি জানালায় মুখ বের করে প্রজাদের দর্শন দেন। এই দর্শনের নাম ঝড়োয়া কি দর্শন’। প্রজারা সম্রাটকে দেখে আশ্বস্ত হয় যে, সম্রাট বেঁচে আছেন। রাজত্ব ঠিকমতো চলছে।

বাঁশিতে ভৈরবীর সুর বাজছে। সূর্য উঠছে। সম্রাট হুমায়ূন ঝড়োয়া কি দর্শন’ দেবেন। প্রজার দল উপস্থিত।

জানোলা খুলে গেল। সম্রাটের প্রিয় নফর জওহর আবিতাবচি রেশমি পর্দা সরাল। সম্রাটের হাসিহাসি মুখ দেখা গেল। সম্রাটের হাতে একটি ফুটন্ত গোলাপী। তিনি গোলাপের ঘ্রাণ নিয়ে জানালার নিচে সমবেত প্রজাদের দিকে ছুড়ে দিলেন। সম্রাটের ফুল হাতে পাওয়ার জন্য প্রজারা হুমড়ি খেয়ে পড়ল। আর ঠিক তখনই দামামার শব্দ হলো। সম্রাট ভ্রাক্ত কুঞ্চিত করে তাকালেন।

বিচার পেতে ব্যর্থ প্রজারাই শুধু এই দামামায় ঘা দিতে পারে। কে ঘা দিল?

দামামার পাশে সারা শরীর কালো বোরকায় ঢাকা এ জেনানা দেখা যাচ্ছে। সে দামামায় বাড়ি দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

সম্রাট নির্দেশ দিলেন আজ সন্ধ্যায় দরবারে-আম’ বসবে। সেখানে এই জেনানার বক্তব্য প্রথম শোনা হবে। দরবারে আমে প্রবেশের জন্য এই মহিলাকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিতে বলা হলো।

‘ঝড়োয়া কি দর্শন’ শেষ হয়েছে। সম্রাট নিজের ঘরে ফিরে গেছেন। তিনি কিছুক্ষণ কোরান পাঠ করবেন। কোরান পাঠের পর একটি বই পড়বেন। মূল বই হিন্দুস্তানি ভাষায় লেখা (মনে হয় সংস্কৃত কিংবা আদি বাংলা,-লেখক)। সম্রাটের নির্দেশে বইটি ফারসি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। বইয়ের শিরোনাম–

অদৃশ্য হইবার মন্ত্র

বইতে হিন্দু যোগীরা কীভাবে অদৃশ্য হন তার বিষদ বর্ণনা এবং মন্ত্র দেওয়া আছে। যেসব উপকরণের উল্লেখ আছে তা হলো, শ্মশানে ভাঙা কলসির মাথা (কালো রঙ), বজ্রপাতে মৃত ব্যক্তির পাঁজরের হাড়, যে–দড়িতে ফাঁসি হয়েছে সেই দড়ি। প্রথম রজস্বলা কিশোরীর দূষিত রক্ত। ত্ৰিমুখী রুদ্ৰাক্ষ। বেশ্য রমণীর যৌনকেশ… ইত্যাদি।

দরবারে আমে বিচারপ্রার্থী তরুণী উপস্থিত। সম্রাটের নির্দেশে সে মুখের নেকাব খুলেছে। তার মুখ দেখা যাচ্ছে। মেয়েটির রূপ দেখে সম্রাট হতভম্ব। কী সুন্দর বড় বড় চোখ। চোখের দীর্ঘ পল্লব। সম্রাট বললেন, নাম?

তরুণী আভূমি নত হয়ে বলল, বাঁদির নাম আসহারি।

পরিচয়?

সম্রাটকে দেওয়ার মতো কোনো পরিচয় এই বাঁদির নেই। আমি আপনার হেরেমে বাস করি। আপনার মহান পিতা বাদশাহ বাবরকে একবার গান গেয়ে শোনাবার সৌভাগ্য হয়েছিল।

তোমার অভিযোগ কী?

মহান সম্রাট বাদশাহ বাবর আমার গান শুনে খুশি হয়ে আমায় সমওজনের স্বর্ণমুদ্রা দিতে হুকুম করেছিলেন। আমি তা পাই নাই। অবশ্য খাজাঞ্জিখানা থেকে আমাকে সমওজনের তাম্রমুদ্রা দেওয়া হয়। সেটাও কাগজ-কলমে।

তোমার অভিযোগের পক্ষে কোনো সাক্ষী আছে?

আমার হৃদয় একমাত্র সাক্ষী। আর কোনো সাক্ষী নাই।

সম্রাট দাওয়াতদারকে (লিখনিসামগ্ৰীর ব্যবস্থাপক। প্রতিদিনের হিসাবরক্ষক।) বললেন, ঐদিনের ঘটনা কী তা যেন রেকর্ড ঘেঁটে জানানো হয়। প্রতিদিনের ঘোষণার কপি কিতাবাদারের (গ্রন্থাগারিক) কাছেও থাকে। তাকেও রেকর্ডপত্র বের করতে বলা হলো।

আসহারি বলল, সম্রাট আমার আর্জি শুনেছেন, এতেই আমার জীবন ধন্য। পুরাতন রেকর্ড খোঁজার প্রয়োজন নেই।

সম্রাট বললেন, কী প্রয়োজন আর কী প্রয়োজন না, তা তোমার কাছ থেকে জানতে আমি আগ্রহী না। আমি আগ্রহী সেই গানটি শুনতে যা আমার মহান পিতা শুনেছিলেন। তুমি কি গান শোনাতে প্রস্তুত হয়ে এসেছ?

জি জাহাঁপনা। সঙ্গীতের আসর বসল। বাদ্যকররা আসহারির সঙ্গে আলোচনা করে তাদের বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে আসহারির গলার সমন্বয় করল।

আসহারি গান করল। গান শেষ হওয়ামাত্র সম্রাট হুমায়ূন ঘোষণা করলেন, পুরাতন নথিপত্র পরে ঘাটা হবে। এই মুহুর্তে গায়িকার ওজনের সমপরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা তাকে দেওয়া হোক। আমি এই গায়িকাকে আগ্রার বুলবুল সম্মানে সম্মানিত করলাম। আজ থেকে তার নামের আগে আগ্রার বুলবুল ব্যবহৃত হবে।

সভার নিয়ম অনুযায়ী সবাই একসঙ্গে বলল, মারহাবা! মারহাবা!

সম্রাট বললেন, আগ্রার বুলবুল আসহারি, তোমার কি আর কিছু বলার আছে?

আসহারি বলল, আছে। সম্রাটের অভয় পেলেই বলতে পারি।

বলো।

আমি হেরেমবাসী। এতগুলি স্বর্ণমুদ্রা লুকিয়ে রাখা হেরেমে সম্ভব না। আমি আমার এই সম্পদ রাজকোষে জমা দিতে চাই। সম্রাট অনেক জনহিতকর কাজে রাজকোষের সম্পদ ব্যবহার করেন। আমার সামান্য অর্থ সেই কাজে ব্যবহৃত হলেই আমি খুশি হব।

সম্রাট বললেন, তা-ই করা হবে। আমি আগ্রার বুলবুলের কথায় সন্তোষ লাভ করেছি।

দরবারে আম শেষ হওয়ার পর সম্রাট একটা ফরমান জারি করলেন। সেই ফরমানে বলা হলো—এখন থেকে সম্রাট যেখানে যাবেন, প্রমোদভ্রমণ হোক বা যুদ্ধযাত্রা, আগ্রার বুলবুল তাঁর সঙ্গে থাকবে। সে দশজন খোজা প্রহরী থাকবে। মিরনসুর’ পরগনা খেলাত হিসেবে আগ্রার বুলবুলকে দেওয়া হলো। এই পরগনার আয় আগ্রার বুলবুল আসহারি পাবে।

দুই মাসব্যাপী উৎসব শুরু হয়েছে। প্রচণ্ড দাবদাহ। হঠাৎ শীতল হয়ে গেল। আগ্রার উপর ভারী বর্ষণ, এই সঙ্গে শিলাবৃষ্টি। দুই সের ওজনের একটি শিলা এক প্রজা নিয়ে এল বাদশাকে দেখাতে। সম্রাট খুশি হয়ে তাকে একটা আশরাফি দিলেন। এতবড় শিলা তিনি আগে কখনো দেখেন নি। তিনি তাঁর দিনলিপিতে লিখলেন, আল্লাহপাকের রহমত এবং নিদর্শন চারদিকে ছড়ানো। আমরা অন্ধ বলেই তা দেখি না। প্ৰকাণ্ড এক শিলার মাধ্যমে পরম করুণাময় তার নিদর্শন তাঁর দীন সেবককে দেখালেন। সোবাহানাল্লাহ।

শিলাখণ্ড গলিয়ে তার পানি সম্রাট পান করলেন। পানিতে বারুদের গন্ধ তাকে বিস্মিত করল। এটা কি কোনো যুদ্ধের আলামত? তাঁকে কি যুদ্ধযাত্রা করতে বলা হচ্ছে?

০৫. শাহি ফরমান জারি হয়েছে

শাহি ফরমান জারি হয়েছে। সম্রাট হুমায়ূন শের খাঁ’র বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করবেন। শের খাঁকে বন্দি অবস্থায় দিল্লী আনা হবে। সেই উপলক্ষে মাসব্যাপী উৎসব। উৎসবের নাম ঠিক হয়েছে ‘শের খাতেমুন’, যার অর্থ-শেরের শেষ।

শের খাঁকে বন্দি করতে কতদিন লাগবে এটা বোঝা যাচ্ছে না। সে সরাসরি সম্মুখ সমরে আসে না। চোরাগোপ্তা হামলা করে। তার যুদ্ধ কাপুরুষের যুদ্ধ। মোঘল বাহিনী কাপুরুষ যুদ্ধে অভ্যস্ত না বলেই সমস্যা।

সম্রাট বাংলা মুলুক কখনো দেখেন নি। শের খাঁকে পরাস্ত করে তিনি বাংলা মুলুকে কিছুদিন বাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বাংলা মুলুকের বর্ষার অনেক গল্প শুনেছেন। সেই বর্ষা দেখবেন। বর্ষায় সেখানকার সব নদী নাকি সমুদ্রের মতো হয়ে যায়। এক কুল থেকে আরেক কুল দেখা যায় না। তাঁর নদী দেখার শখ আছে। বাংলা মুলুকের হিজড়ারা নাকি নৃত্যগীতে বিশেষ পারদর্শী। তাদের নৃত্যগীত সাধারণ নৃত্যগীতের চেয়ে আলাদা। কতটা আলাদা সেটাও সম্রাটের দেখার ইচ্ছা। (*সম্রাটের ভাই আসকারি মীর্জা বঙ্গ বিজয়ের পর সম্রাটের কাছে উপহার হিসেবে কয়েকজন হিজড়া চেয়েছিলেন।)

মোঘল সম্রাটদের যুদ্ধযাত্রা বিশাল ব্যাপার। চারদিকে সাজ সাজ রব পড়ে গেল। যুদ্ধযাত্রার খরচ হিসেবে আমীররা সঞ্চিত ধনরত্ন জমা দিতে শুরু করলেন। শুধু ধনরত্ন না, তাদেরকে ঘোড়াও দিতে হলো। যে এক হাজারি আমীর সে দেবে এক হাজার ঘোড়া। পাঁচ হাজারি আমীর দেবে পাঁচ হাজার ঘোড়া। করদ রাজ্যের রাজাদের বাধ্যতামূলকভাবে সৈন্য এবং স্বর্ণমুদ্রা পাঠাতে হলো।

যুদ্ধযাত্রার জন্যে একটা বরগা তাঁবু রওনা হয়ে গেছে। বরগী তাঁবুতে একসঙ্গে দশ হাজার মানুষ দাঁড়াতে পারে। এই তাঁবু খাটাতে এক হাজার তাঁবুর কারিগরকে সাত দিন খাটতে হয়।

সম্রাটের জন্যে যাচ্ছে ডুরসানা-মঞ্জেল তাঁবু। এটি দোতলা। উপরের তলায় সম্রাট নামাজ পড়বেন। নিচতলায় বেগমরা থাকবেন।

সম্রাট রাতে ঘুমাবেন চৌবিলরৌতি তাঁবুতে। এই তাঁবুর চালের নিচে খসখসের সিলিং দেওয়া। নিচেও থাকে খসখস। খসখসের উপর কিংখাব ও মলমল। তাঁবু খাটাবার দড়ি রেশমের।

সম্রাট হুমায়ূন আনন্দের সঙ্গে যুদ্ধপ্ৰস্তৃতি লক্ষ করতে লাগলেন। তাঁর আনন্দ কিছু বাধাগ্রস্ত হলো বৈরাম খাঁ’র কারণে। বৈরাম খাঁ বললেন, দিল্লী ত্যাগ করা মোটেই ঠিক হবে না।

সম্রাট বললেন, সমস্যা কী ?

বৈরাম খাঁ বললেন, সমস্যা আপনার তিন ভাই। আপনার অনুপস্থিতিতে তারা দিল্লীর সিংহাসন দখলের চেষ্টা চালাবে।

হুমায়ূন বললেন, আমি আমার ভাইদের নিজের প্রাণের মতোই ভালোবাসি। তারা তিনজনই আমার সঙ্গে যুদ্ধযাত্রা করবে।

তারা আপনার সঙ্গে যুদ্ধযাত্রা করবে না।

তুমি আমার সঙ্গে বাজি রাখতে চাও ?

সম্রাটের সঙ্গে বাজি রাখার স্পর্ধা এই নফরের নেই। আমার এই তিন ভাইয়ের কারণেই কি তুমি যুদ্ধযাত্রা করতে চাচ্ছ না, নাকি আরও কারণ আছে ?

বাংলা মুলুকে বর্ষা এসে যাবে। মোঘল সেনাবাহিনী বর্ষার সঙ্গে পরিচিত না।

এখন পরিচয় হবে। আমিও পরিচিত হব। কলমচিকে খবর দাও, আমি তিনভাইকে পত্ৰ লিখব। এখনই লিখব।

সম্রাট পত্র লিখলেন। তিনজনকে আলাদা আলাদা চিঠি। মীর্জা কামরানকে লেখা চিঠির নমুনা–

আমার প্রাণপ্রিয় ভ্ৰাতা কামরান মীর্জা।
আমার হৃদয়ের পাখি। বাগিচার সৌরভময় গোলাপ।

প্রিয় ভ্রাতা, বাংলা মুলুকের শের খাঁ নামের দুষ্টকে শায়েস্তা করতে বিশাল মোঘল বাহিনী অতি শীঘ্ৰ যাত্রা শুরু করবে। তুমি তোমার সৈন্যবাহিনী নিয়ে লাহোর থেকে চলে এসো। বড়ভাইয়ের দক্ষিণ বাহু হও। আমার তিন ভাই পাশে থাকলে আমি বিশ্ব জয় করতে পারি। যেমন করেছিলেন জুলকারলাইন। (*আলেকজান্ডার দি গ্রেট)

আমার বহরের সঙ্গে তোমার অতি আদরের ভগ্নি গুলবদন থাকবে। সে তোমার সাক্ষাতের জন্যে আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় আছে। প্রিয় ভ্রাতা, তোমার প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন হিসাবে আমি একটি নীলা এবং একটি পোখরাজ পাঠালাম। তুমি রত্ন দু’টিকে প্রতিদিন দুগ্ধমান করাবে। এর অন্যথা হলে রত্নের ঔজ্জ্বল্য নষ্ট হবে। এখন তাৎক্ষণিকভাবে তোমার উদ্দেশে রচিত পঞ্চপদী–

কামরান
চন্দ্ৰ প্ৰস্ফুটিত তার দু’নয়ন।
হৃদয় আর্দ্র আবেগে
যার কেন্দ্ৰে তার ভাই
মীর্জা হুমায়ূন।

কামরান মীর্জা পত্রের জবাব দিলেন না। তার দরবারের এক আমীরকে সম্রাটের কাছে পাঠালেন। আমীর সম্রাট হুমায়ূনকে জানালেন, পাঁচটি কারণে কামরান মীর্জা তাঁর সঙ্গে যেতে পারছেন না।

১. তিনি অসুস্থ। পেটের পীড়ায় ভুগছেন।

২. তাঁর প্রধান গণক গণনা করে পেয়েছে, যুদ্ধযাত্রায় তার প্ৰাণনাশের সম্ভাবনা।

৩. লাহোর অরক্ষিত রেখে রওনা হওয়ার অর্থ শত্রুর হাতে লাহোর তুলে দেওয়া।

৪. স্বপ্লে তিনি তাঁর পিতা সম্রাট বাবরকে দেখেছেন। সম্রাট বাবর তাকে লাহোর ছেড়ে যেতে নিষেধ করেছেন।

৫. তাঁর প্রিয় ঘোড়া লালী মারা গিয়েছে। তিনি ভালো ঘোড়ার সন্ধানে আছেন। শিক্ষিত এবং পরিচিত ঘোড়া ছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হওয়া যায় না।

আমার সঙ্গে না যাওয়ার পাঁচটি কারণ উল্লেখ করেছে। একটি কারণই যথেষ্ট ছিল। পাঁচটি কারণের একটিতে সে আমার মহান পিতাকে টেনে এনেছে। তার প্রয়োজন ছিল না। আপনি আমার ভাইকে বলবেন, যা ঘটবে আল্লাহ্‌পাকের হুকুমেই ঘটবে। আমি কামরান মীর্জার জন্যে একটি শিক্ষিত আরবি ঘোড়া আপনার সঙ্গে দিয়ে দিচ্ছি। পেটের পীড়া একটি নোংরা ব্যাধি। আমি দ্রুত তার আরোগ্য কামনা করছি।

সম্রাটের নির্দেশে আমীরকে একপ্রস্থ পোশাক, একটি রত্নখচিত তরবারি, দশটা আশরাফি দেওয়া হলো। ভাইয়ের পাঠানো দূতের প্রতি সম্মান দেখানো হলো। এই আমীরের নাম মীর হামজা।

মীর হামজা লাহোর ফিরছেন। তার সঙ্গে বিশজন অশ্বারোহীর একটি ক্ষুদ্র দল। রসদ বহনকারী একটা ঘোড়ার গাড়ি। এই গাড়ির সঙ্গেই কামরান মীর্জাকে দেওয়া সম্রাট হুমায়ূনের আরবি ঘোড়া বাধা। ঘোড়ার রঙ সাদা। তার নাম ফাতিন। ফাতিন শব্দের অর্থ সুন্দর।

বিশ ক্রোশ অতিক্রম করার পর মীর হামজাকে থামতে হলো। অশ্বারোহী বিশাল বাহিনী নিয়ে বৈরাম খাঁ দাঁড়িয়ে আছেন। বৈরাম খাঁ বললেন, সম্মানিত আমীর মীর হামজা! আপনার সঙ্গে একান্তে কিছু কথা বলার জন্যে দাঁড়িয়ে আছি।

মীর হামজা বললেন, অশ্বারোহী বিশাল বাহিনী নিয়ে একান্তে কথা?

আমরা দুজন দূরে সরে যাব। একান্ত কথা সেখানেই হবে।

আপনি আপনার বাহিনী নিয়ে এসেছেন কেন?

বৈরাম খাঁ হাসতে হাসতে বললেন, গাধার বেপারি সঙ্গে গাধা নিয়ে চলাফেরা করে। গাধাগুলি হচ্ছে তার শোভা। একজন সেনাপতির শোভা তার সৈন্যবাহিনী।

আমি আপনার সঙ্গে একান্তে কথা বলব না। যা বলতে চান। এখানে বলুন।

আমার সম্রাটের সঙ্গে আপনার কথা হয়েছে। সম্রাটকে আপনার কেমন মনে হয়েছে?

তিনি ভীতুপ্রকৃতির মানুষ।

ভীতু?

হ্যাঁ ভীতু৷ ভীতু বলেই ভাইকে খুশি রাখার চেষ্টা করছেন।

ভ্ৰাতৃস্নেহও তো হতে পারে। সম্রাটদের ভ্রাতৃস্নেহ থাকে না। ভ্রাতৃভীতি থাকে।

সম্রাট হুমায়ূন যুদ্ধযাত্রার পরপর কি কামরান মীর্জা নিজেকে দিল্লীর সম্রাট ঘোষণা করবেন?

সেটা উনিই ভালো বলতে পারবেন। আমি অন্তর্যামী না।

আমি এই তথ্য বিশেষভাবে জানতে চাচ্ছি। সম্রাটের অমঙ্গল আশঙ্কায় আমি অস্থির।

মীর হামজা বললেন, আপনাকে আগেই বলেছি আমি অন্তর্যামী না। কামরান মীর্জার পরিকল্পনা আমি জানি না।

বৈরাম খাঁ বললেন, আমি কামরান মীর্জার পরিকল্পনা আঁচ করতে পারছি। আপনি এই খবর কামরান মীর্জাকে জানাবেন।

অবশ্যই জানানো হবে।

বৈরাম খাঁ বললেন, আপনাকে মুখে কিছু জানাতে হবে না। আমি এমন ব্যবস্থা করব যে আপনি লাহোরে উপস্থিত হওয়ামাত্ৰ কামরান মীর্জা যা বোঝার বুঝে নেবেন।

কী ব্যবস্থা করবেন?

আপনার জন্যে একটি গাধা সংগ্ৰহ করা হয়েছে। আপনি গাধার পিঠে চড়ে লাহোরে যাবেন। নগ্ন অবস্থায় যাবেন।

আপনি উন্মাদের মতো কথা বলছেন।

হতে পারে। আপনার সঙ্গের অশ্বারোহীরা আমার সেনাবাহিনীতে যোগ দিবে। এরা ভাড়াটিয়া সৈন্য। দলত্যাগে তাদের কখনো সমস্যা হয় না।

সম্রাট হুমায়ূনের কানে এই খবর পৌঁছানোর পরিণাম হবে ভয়াবহ।

তার কানে এই খবর আমিই পৌঁছোব। তাকে বলব, মীর হামজা লাহোরের পথে রওনা হওয়ার পর একদল ডাকাতের হাতে পড়েন। ডাকাতরা তাঁর সব লুটে নিয়ে তাকে নগ্ন করে গাধার পিঠে তুলে দেয়। সম্রাট এই খবরে আমোদ পাবেন, তিনি আমোদ পছন্দ করেন।

মীর হামজাকে সত্যি সত্যি নগ্ন করে গাধার পিঠে চড়িয়ে দেওয়া হলো।

ফজরের নামাজের পরপরই সম্রাট হুমায়ূনের বিশাল বাহিনী বঙ্গদেশের দিকে যাত্রা শুরু করল। তারিখ : ২৭ জুলাই ১৫৩৭ খ্রিষ্টাব্দ।

সম্রাট আনন্দিত, কারণ তার দুই ভাই হিন্দাল মীর্জা এবং আসকারি মীর্জা তার সঙ্গে আছেন।

যাত্রার সময় আশ্চর্য এক ঘটনাও ঘটেছে। দু’টি কবুতর সম্রাটের মাথার উপর চক্রাকারে ঘুরেছে। এটি অতি শুভ লক্ষণের একটি।

অগ্রগামী দলে আছে অশ্বারোহী বাহিনী। তার পেছনেই পদাতিক বাহিনী। পদাতিক বাহিনী চলছে হন্তীযুথের সঙ্গে। হাতির সংখ্যা আট শ।

সেনাদল কোথাও না থেমে আসর পর্যন্ত একনাগাড়ে চলবে। আসরের সময় বিশ্রাম এবং আহারের জন্যে থামা হবে। পরদিন আবারও ফজরের নামাজের পর যাত্রা শুরু হবে। যুদ্ধযাত্রার সময় সম্রাট একবেলা আহার করেন।

প্রথম যাত্রাবিরতিতে সম্রাটকে যে খাবার দেওয়া হয়েছিল, তার বর্ণনা দেওয়া যেতে পারে।

পোলাও : পাঁচ ধরনের।

রুটি : সাত প্রকারের।

পাখির মাংস : কিসমিসের রসে ভেজানো পাখি ঘিতে ভেজে দেওয়া।

পাখিদের মধ্যে আছে হরিয়াল, বনমোরগ, বিশেষ শ্রেণীর ময়ূর।

ভেড়ার মাংস : আস্ত ভেড়ার রোষ্ট।

বাছুরের মাংস : কাবাব।

পাহাড়ি ছাগের মাংস : আস্ত রোস্ট (সম্রাটের বিশেষ পছন্দের খাবার)।

ফল, শরবত, মিষ্টান্ন।

সম্রাট হুমায়ূন এবং তাঁর পরিবারের জন্যে যুদ্ধকালীন বাবুর্চির সংখ্যা ছিল এক হাজার। প্রধান বাবুর্চি নকি খান নতুন নতুন খাবার উদ্ভাবন করতেন। তাঁর উদ্ভাবিত একটি খাবার পুরনো ঢাকার কিছু রেস্তোরায় এখনো পাওয়া যায়। খাবারের নাম গ্লাসি।

গ্লাসির রেসিপি (মোঘল আমলের) দেওয়া হলো। পাতলা স্লাইস করে কাটা খাসির মাংস সজারুর কাঁটা (বিকল্প, খেজ্বরের কাটা) দিয়ে কেঁচতে হবে। কেঁচানো মাংসে দিতে হবে কিসমিচের রস, পোস্তদানা বাটা, পেস্তা বাটা, শাহী জিরা বাটা, আদার রস, পেঁয়াজের রস, রসুনের রস, দই, দুধ এবং গম বাটা। পরিমাণমতো লবণ। এতে যুক্ত হবে জয়ত্রি গুড়া, জায়ফল গুড়া, দারুচিনি গুড়া। সব ভালোমতো মেখে মাটির হাঁড়িতে রেখে ঢাকনা লাগিয়ে দিতে হবে। মাটির হাঁড়ি সারা দিন রোদে থাকবে। খাবার পরিবেশনের আগে আগে অল্প আঁচে মাংসের টুকরা মহিষের দুধের ঘিতে (ভৈসা ঘি) ভাজতে হবে।

বঙ্গদেশের দিকে যাত্রার সময় তাঁর রসদখানায় মহিষের দুধের ঘি ছিল দশ মণ এবং গরুর দুধের ঘি ছিল ত্রিশ মণ।

সৈন্যদের খাবার ছিল : এক ঘটি দুধ, যবের রুটি, এক পোয়া ছাতু, মাংস এবং পেঁয়াজ।

যাত্রাবিরতির প্রথম রাত্ৰি।

হুমায়ূন এশার নামাজ শেষ করে তাঁর জন্যে খাটানো চৌবনরৌতি তাঁবুতে গেছেন। গানবাজনা শুনে আফিং খেয়ে ঘুমাবেন।

তাঁর নিজস্ব ভৃত্য জওহর আবিতাবচি তাঁকে জানাল শের খাঁ তাঁর জন্যে কিছু উপহার পাঠিয়েছেন। উপহারের মধ্যে আছে তিনজন অতি রূপবতী বাঙ্গালমুলুকের তরুণী এবং সাতজন হিজড়া। উপহারের সঙ্গে একটি পত্রও আছে।

সম্রাট পত্র পাঠ করলেন। শের খাঁ লিখেছেন—

দিল্লীশ্বর সম্রাট হুমায়ূন,

আপনি অধম তুচ্ছতিতুচ্ছ শের খাঁকে শায়েস্তা করতে যাচ্ছেন। আমি আপনার দাসানুদাস। আমার কারণে এই তীব্ৰ গরমে আপনার কষ্ট হচ্ছে, এটা আমি নিতেই পারছি না।

আপনি দিল্লীতে ফিরে যান।

আপনাকে চুনার দুর্গ আমি দিয়ে দিচ্ছি।

কিছু উপহার পাঠালাম। আমি জানি উপহার আপনার পছন্দ হবে।

ইতি
অধম শের খাঁ (ফরিদ)

চিঠিতে কাজ হলো। সম্রাট নির্দেশ দিলেন, একদিন বিশ্রামের পর মূল সেনাবাহিনী দিল্লী ফেরত যাবে। ডেকে পাঠানো হবে শের খাঁকে। চুনার দুর্গের দখল নেওয়ার জন্যে রুমী খাঁকে পাঠানো হবে। রুমী খাঁর নেতৃত্বে থাকবে বেশ কিছু কামান এবং দুই শ কামানচি। কামানের প্রয়োজন হবে না। তারপরেও থাকল।

ফজরের নামাজের পর দিল্লী যাত্রা শুরু হবে। নামাজের পরপর হুমায়ূন ঘোষণা করলেন চুনার দুর্গ হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় তিনি উপস্থিত থাকতে চান। কাজেই যুদ্ধযাত্রা অব্যাহত থাকবে। সম্রাটের খামখেয়ালির সঙ্গে তার সেনাপতি এবং আমীররা পরিচিত। কেউ অবাক হলেন না।

চুনার দুর্গের অধিনায়ক শের খাঁ’র পুত্র কুতুব খাঁ।

চুনার দুর্গে পৌঁছতে হুমায়ূনের চার মাস সময় লাগল। তিনি নভেম্বরে পৌঁছলেন। আরামদায়ক আবহাওয়ায় হুমায়ূন প্রসন্ন। ভেষজবিদ্যার উপর কিছু দুর্লভ বই তার কাছে এসেছে। বইয়ে বর্ণিত গাছের গুণাগুণ পরীক্ষার বাসনায় তিনি অস্থির। দুর্গ দখলের পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্ব শুরু করবেন।

দুর্গের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার জন্য কুতুব খাঁর কাছে দূত গেল। কুতুব খাঁ বললেন, সম্রাট স্বয়ং উপস্থিত হলেই দুর্গ তার হাতে তুলে দেওয়া হবে।

সম্রাটের দূত বললেন, সামান্য দুর্গ দখলের জন্যে হিন্দুস্থানের অধিপতির আসা শোভা পায় না।

কুতুব খাঁ বললেন, হিন্দুস্থানের অধিপতিকে অনেক তুচ্ছ কাজ কিন্তু করতে হয়। শব্দ করে তিনি বায়ু ত্যাগ করেন। আপনি হয়তো শোনেন নি।

আপনার ঔদ্ধত্যমূলক আচরণের সমুচিত জবাব দেওয়া হবে।

শুনে খুশি হলাম। আফগানরা সমুচিত জবাব ভালোবাসে।

আপনি যে নোংরা কথাগুলি বলেছেন আমি নিজে সম্রাটকে তা জানাব।

সেই সুযোগ আপনি পাবেন না।

এই কথার অর্থ কী?

আপনাকে বাধ্য করা হবে সম্রাটকে একটা পত্ৰ পাঠাতে। সেই পত্রে আপনি বিনয়ের সঙ্গে লিখবেন যে, আপনি স্বেচ্ছায় দলত্যাগ করে আমার সঙ্গে যোগ দিয়েছেন।

জীবন থাকতে এ ধরনের চিঠি আমি লিখব না।

জীবন থাকা অবস্থাতেই আপনি লিখবেন। আমার নির্দেশে আপনাকে খোজা করানো হবে। খোজা করার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ামাত্রই আপনি চিঠি লিখতে রাজি হবেন।

সম্রাট হুমায়ূন তাঁর দূতের কাছ থেকে একটা চিঠি পেলেন। চিঠিতে জানলেন এই আমীর দলত্যাগ করেছে। তাঁর শক্তি ও সামথ্য সে ব্যয় করবে। আফগানদের জন্যে।

হতভম্ব সম্রাট রুমী খাঁ-কে দুর্গ দখলের নির্দেশ দিলেন। রুমী খাঁ কামান দাগতে শুরু করলেন। এর উত্তরে কুতুব খাঁ’র দুর্গের ভেতর থেকে কামানের গোলা বৃষ্টির মতো পড়তে শুরু করল। কুতুব খাঁ’র কামানগুলি ছোট। তবে তাদের নিশানা অব্যৰ্থ। রুমী খাঁ-কে পেছনে হটতে হলো।

মোঘল সৈন্যরা দুর্গ অবরোধ করে পাঁচ মাস বসে রইল। দুর্গ দখল করতে পারল না। এর মধ্যে শুরু হলো বঙ্গের বিখ্যাত বৃষ্টি।

০৬. দোতলা তাঁবু

সম্রাট হুমায়ূন দোতলা তাঁবুর (ডুরসানা মঞ্জেল) বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর দৃষ্টি পশ্চিমের দিগন্তরেখায়। ফজরের নামাজ শেষ হয়েছে। সূর্য এখনো পুরোপুরি ওঠে নি। পশ্চিম আকাশে মেঘের ঘনঘটা। সম্রাট প্রথম সূর্যকিরণ কপালে মাখতে চাচ্ছেন। এই মুহূর্তে হুমায়ূনের সৌভাগ্যের ঘাটতি যাচ্ছে। ছয় মাস পার হয়েছে, চুনার দুর্গ দখল হয় নি। গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান মীর আতশ পুরোপুরি ব্যৰ্থ। সে নৌকায় কামান বসিয়ে কামান দাগার হাস্যকর চেষ্টা করেছিল। কামান দাগামাত্র গোলার প্রবল বিপরীত ধাক্কায় দুটি বড় নৌকা কামান এবং বারুদসহ পানিতে ড়ুবে গেছে। কামানের সঙ্গে তিনজন কামানচিও পানিতে। তারা সাঁতার না জানার কারণে পানির নিচ থেকে উঠে আসতে পারে নি।

পশ্চিম আকাশের মেঘ পরিষ্কার হচ্ছে না, বরং গাঢ় হচ্ছে। ঘন কালো মেঘের যে বিচিত্র সৌন্দর্য আছে তা হুমায়ূন আগে লক্ষ করেন নি। আকাশের এই ছবি এঁকে ফেলতে পারলে ভালো হতো। তার ছবি আঁকার হাত এখনো সেই পর্যায়ে আসে নি। আফসোস!

আলামপনা!

হুমায়ূন পেছনে তাকালেন। জওহর আবাতাবচি (আবতাব শব্দের অর্থ পানি। আবতাবচি—যে পানি সরবরাহ করে। সম্রাটকে পানি খাওয়ানোর দায়িত্ব জওহর আবিতাবচি’র।) সম্রাটের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ হাসি হাসি।

জওহর! সুপ্ৰভাত।

জওহর লজ্জায় মাথা নিচু করল। সে কিছু বলার আগেই সম্রাট তাকে সুপ্ৰভাত জানালেন। কী লজ্জা! কী লজ্জা!

জওহর আমতা আমতা করে বলল, সুপ্ৰভাত মহান সম্রাট। আমি আপনার জন্যে সুসংবাদ নিয়ে এসেছি। কিছুক্ষণ আগে রুমী খাঁ দলবল নিয়ে চুনার দুর্গে প্রবেশ করেছে। শের খাঁ’র ছেলে দুর্গ ছেড়ে পালিয়ে গেছে।

শুকুর আলহামদুলিল্লাহ। আমার হৃদয় এই মুহুর্তে আনন্দে পূর্ণ। আমার কাছে তুমি কী উপহার প্রার্থনা করা?

আপনার স্নেহ। আল্লাহপাক সাক্ষী, আপনার স্নেহ এবং করুণা ছাড়া আমার আর কিছুই চাইবার নেই। আমি আমৃত্যু আপনাকে পানি খাইয়ে যেতে চাই।

তা-ই হবে। আমি দু’টি রাজকীয় ফরমান জারি করব। কলমচিকে আসতে বলো।

রাজকীয় ফরমানের প্রথমটিতে লেখা হলো, জওহর আবিতাবচি আজীবন সম্রাটকে পানি খাওয়ানোর দায়িত্বে থাকবে। তাকে এক হাজারি মসনদদারি দেওয়া হলো।

দ্বিতীয় ফরমানে রুমী খাঁকে মীর আতশ উপাধি দেওয়া হলো। তাকে চুনার দুর্গের আপাতত দায়িত্ব দেওয়া হলো। দুর্গের বন্দিদের যেন প্রাণহানি না হয়। সম্রাট দুর্গের প্রতিটি বন্দির প্রাণের জিম্মাদার।

ফরমানজারির পর হুমায়ূন এক পেয়ালা বেদানার রস খেলেন। অজু করে আল্লাহপাকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্যে সূরা ফাতেহা পাঠ করলেন। জওহর সারাক্ষণই সম্রাটের পাশে বসে রইল।

জওহর।

জি আলামপনা।

আমি ছদ্মবেশে কিছুক্ষণের জন্যে শহর ঘুরতে বের হব। হযরত ওমর রাজিআল্লাহুতালা আনহু এই কাজ করতেন।

উনি রাতে বের হতেন। দিনে না।

রাতের আলোয় কিছুই দেখা যাবে না। আমি দিনের আলোয় বের হব। তুমি আমাকে ঘোড়া ব্যবসায়ীর মতো সাজিয়ে দাও। চাদরে আমার ঠোঁট থাকবে ঢাকা। মানুষের পরিচয় লেখা থাকে ঠোঁটে। ঠোঁট ঢাকা মানুষ হলো পরিচয়হীন মানুষ।

পাশাপাশি দুটি ঘোড়া চলছে। একটিতে সম্রাট হুমায়ূন অন্যটিতে জওহর আবিতাবচি। অনেক দূর থেকে তাদেরকে অনুসরণ করছে সম্রাটের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী বাহিনী। তেমন প্রয়োজনে নিমিষের মধ্যে ছুটে এসে তারা সম্রাটকে ঘিরে ফেলবে। ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ালেও সম্রাটের নিরাপত্তাজনিত কোনো সমস্যা নেই।

শহর শান্ত। দোকানপাট খুলেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য চলছে। চুনার দুর্গ পতনের কোনো প্রভাব শহরে পড়ে নি। শহরের কেন্দ্রে হরিসংকীর্তন হচ্ছে। সেখানে ছেলেবুড়ো ভিড় করেছে। সম্রাট কিছুক্ষণ হরিসংকীর্তন শুনলেন।

একজন নাগা সন্ন্যাসীকে দেখা গেল। গায়ে ভস্ম মেখে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় ঘুরছে। তাকে ঘিরে একদল ছেলেমেয়ে। নাগা সন্ন্যাসী তার সাধনদণ্ডে কাসার একটি ঘণ্টা ঝুলিয়ে দিয়েছে। যখন সে হাঁটছে ঘণ্টায় ঢং ঢেং শব্দ হচ্ছে। সম্রাট নাগা সন্ন্যাসীর সঙ্গে জওহর আবিতাবিচির মাধ্যমে কিছুক্ষণ কথা বললেন। তিনি হিন্দুস্থানি ভাষা জানেন না।

আপনি নগ্ন ঘুরছেন কেন?

আমি নাগা সন্ন্যাসী, সবকিছু বিসর্জন দিয়েছি বলেই নগ্ন।

আপনি তো লজ্জাও বিসর্জন দিয়েছেন। লজ্জা বিসর্জনের জিনিস না।

তোর কাছে না, আমার কাছে লজ্জাও বিসর্জনের।

আপনি গোপন অঙ্গে ঘণ্টা বেঁধেছেন কেন?

সবাইকে সতর্ক করে দেওয়ার জন্যেই ঘণ্টা।

আপনি তো সবই বিসর্জন দিয়েছেন। গোপন অঙ্গও বিসর্জন দিন। এর তো আপনার প্রয়োজন নেই।

আমাকে নিয়ে তুই মাথা ঘামাচ্ছিস কী জন্যে? তুই ঘোড়া বেচাতে এসেছিস, ঘোড়া বিক্রি কর। পুণ্য কামাতে চাইলে আমার সেবা কর।

সম্রাট তাকে দশটা তাম্রমুদ্রা দিয়ে শহরের বাইরে চলে গেলেন। নদীর পাড় ঘেঁসে ঘেঁসে যাচ্ছেন। তার অদ্ভুত লাগছে। মধুর বাতাস। পশ্চিম আকাশের মেঘ এখন ভেলার মতো পুরো আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে। একটা তালগাছ বাঁকা হয়ে নদীর দিকে ঝুঁকে আছে। একদল শিশু তালগাছে উঠে সাবধানে মাথা পর্যন্ত যাচ্ছে, সেখান থেকে ঝাপ দিয়ে নদীতে পড়ছে। তাদের কী আনন্দ! সম্রাট বললেন, দেখো জওহর। ওদের কী আনন্দ!

জওহর কিছু বলল না। হুমায়ূন বললেন, সম্রাটের পুত্র-কন্যারা এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত।

জওহর বলল, তাঁদের জন্য অন্য আনন্দ। মহান আল্লাহ ঠিক করে রেখেছেন কে কী আনন্দ পাবে। সম্রাট বললেন, চলো এগুই। আরও কোনো আনন্দদৃশ্য হয়তো সামনেই আছে।

সম্রাট এগুলেন। প্রায় দু’ক্রোশ এগুবার পর তিনি থমকে দীড়ালেন। সামনে নলখাগড়ায় ঢাকা শ্মশানঘাট। বৃষ্টির সময় আশ্রয় নেওয়ার জন্যে চারদিক খোলা শ্মশানবন্ধু ঘর। ঘর ভর্তি নানান বয়সী। নারী। তারা কলকল করে কথা বলছে।

চারদিক লোকে লোকারণ্য। ঢোল বাজছে, কাঁসার ঘণ্টা বাজছে। কিছুক্ষণ পরপর সবাই মিলে গগনবিদারী চিৎকার দিচ্ছে—সতী মাই কি জয়।

চারজন পুরোহিত আসন করে বসে আছে। মন্ত্রপাঠ চলছে। পুরোহিতদের দক্ষিণ দিকে নদীর কাছাকাছি ডোমরা বসেছে কলসিভর্তি চোলাই মদ নিয়ে। তাদের চোখ রক্তবর্ণ।

সম্রাট বিস্মিত হয়ে বললেন, কী হচ্ছে?

সতীদাহ হবে আলামপনা। মৃত স্বামীর সঙ্গে ভূরী জীবিত স্ত্রীকে চিতায় পোড়ানো হবে।

এই সেই সতীদাহ! আমি সতীদাহের কথা শুনেছি, আগে কখনো দেখি নি।

দেখার জিনিস না। হিন্দুস্থানি বর্বরতা চলুন ফিরে যাই।

যে মেয়েটিকে পুড়িয়ে মারা হবে তাঁর সঙ্গে কি কথা বলা যাবে?

আলামপনা। সে কথা বলার মতো অবস্থায় এখন থাকবে না। সবাই তাকে ঘিরে আছে। তাকে নিশ্চয়ই আরক খাওয়ানো হয়েছে। সে এখন নেশাগ্রস্ত।

একদল মানুষ দেখছি লাঠিসোটা নিয়ে দাঁড়িয়ে। এরা কারা?

সবসময় দেখা গেছে আগুন লাগানোমাত্র সতী দৌড় দিয়ে চিতা থেকে পালাতে চায়। তখন লাঠি দিয়ে পিটিয়ে তাকে চিতায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং আগুনের উপর মেয়েটিকে চেপে ধরে রাখা হয়।

নরকের বর্বরতা।

অবশ্যই।

আমি এই মুহুর্তে ফরমান জারি করে সতীদাহ বন্ধ করতে চাই।

আলামপনা। গুস্তাকি মাফ হয়। আপনার সমস্ত প্ৰজা হিন্দু। আপনি ওদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে বাধা দিলে তারা বৈরী হয়ে উঠবে। আপনার জন্যে শাসনকার্য পরিচালনা দুষ্কর হবে।

আমি মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে চাই।

ঘোড়ার ব্যবসায়ী হিসেবে তারা আপনার সঙ্গে মেয়েটিকে কথা বলতে দেবে না।

তাদেরকে তুমি বলো আমি মোঘল সম্রাট হুমায়ূন এবং আমার রক্ষীবাহিনীকে কাছে এগিয়ে আসতে বলো।

চিতায় ঘিয়ের আগুন জ্বলে উঠেছে। সেখানে প্রায় সত্তর বছর বয়সী। এক চুলপাকা বৃদ্ধের শবদেহ। তার চুলে আগুন ধরতেই নিমিষে সব চুল জ্বলে গেল। আগুন ভালোমতো জ্বলে উঠলে সতী স্বেচ্ছায় হেঁটে হেঁটে চিতায় উঠবে। তাকে ভাং-এর শরবত খাওয়ানো হয়েছে। তার চিন্তাশক্তি কাজ করছে না। ঢোলের বাদ্য আকাশ স্পর্শ করছে। শশানঘরের তরুণীরা একে একে আসছে। সতী মেয়েটির কপালে সিঁদুর দিচ্ছে। সেই সিঁদুর নিজের কপালে ঘষছে এবং উপুড় হয়ে পড়ে মেয়ের পায়ে পড়ে তাকে প্ৰণাম করছে। বাজনাদাররা আধাপাগলের মতো নাচছে। হঠাৎ বাদ্যবাজনা থামল। সম্রাট হুমায়ূন এগিয়ে এলেন।

তাঁর ঘোড়া এসে থামল সতীদাহের মেয়েটির সামনে। বারো-তের বছর বয়সী একটি মেয়ে। পরনে লালপোড়ে শাড়ি। গা-ভর্তি অলংকার। কী সুন্দর সরল মুখ, বড় বড় চোখ! ভয়ে আতঙ্কে সে থরথর করে কাঁপছে। মেয়েটির সঙ্গে কোথায় যেন সম্রাটের কন্যা আকিকা বেগমের মিল আছে।

তোমার নাম কী? বলো, নাম বলো।

অম্বা।

তোমার স্বামী মারা গেছে। সে চিতায় পুড়ে কয়লা হবে। তুমি তো বেঁচে আছ, তুমি কেন মরবে?

অম্বার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। সে ক্ষীণস্বরে বলল, আমি মরতে চাই না। এরা আমাকে মেরে ফেলবে।

সম্রাট ঘোড়া থেকে নামলেন। অম্বার কাছে এগিয়ে গেলেন। গলা নিচু করে বললেন, আমি নিজের হাতে তোমাকে পানি খেতে দেব। তুমি বিসমিল্লাহ বলে সেই পানি খাবে। মনে থাকবে?

অম্বা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। সে খানিকটা হকচকিয়ে গেছে। মেয়েটির আত্মীয়স্বজন এবং জড়ো হওয়া লোকজন এগিয়ে আসতে চাচ্ছে কিন্তু সম্রাটের রক্ষীবাহিনীর কারণে কাছে আসতে পারছে না। তাদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে। হুমায়ূন তাদের দিকে তাকিয়ে গলা উঁচু করে বললেন, অম্বা নামের এই মেয়েটা এইমাত্র আমার হাতে বিসমিল্লাহ বলে পানি খেয়েছে। বিধর্মীর হাতে পানি খাওয়ার কারণে তার জাত গেছে। বিসমিল্লাহ বলায় মেয়েটি মুসলমান হয়ে গেছে। আমার আইনে কোনো মুসলমান মেয়েকে সতী হিসেবে দাহ করা যাবে না।

সম্রাট হুমায়ূন অম্বাকে নিয়ে শিবিরের দিকে রওনা হলেন। মাতাল ডোমের দল লাঠিসোটা নিয়ে পিছন পিছন ছুটল। তাদের সঙ্গে পুরোহিতের দল। বাজনাদারদের দল। মহিলাদের দল। ‘সতী’ কন্যাকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে—এ হতে দেওয়া যায় না।

সম্রাটের নির্দেশে তীরন্দাজরা তীর ছুঁড়ল। অব্যৰ্থ তীরের আঘাতে চারজন পুরোহিতের তিনজনই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। হতভম্ব দল উল্টাদিকে দৌড়াতে শুরু করল।

মাগরেবের নামাজের শেষে সম্রাট দরবার বসিয়েছেন। চুনার দুর্গ দখলে এসেছে। দুর্গের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে সেই বিষয়ে পরামর্শসভা বসেছে। বাংলামুলুক অভিযানে কখন রওনা হতে হবে—সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আজকের সভা গুরুত্বপূর্ণ। আমীররা সবাই উপস্থিত। রুমী খাঁ, (মীর আতশ) উপস্থিত। দরবারে খাসের নিয়ম ভঙ্গ করে চারজন নর্তকী উপস্থিত। এদেরকে আনা হয়েছে চুনার দুর্গ থেকে। গুরুত্বপূর্ণ সভায় নর্তকীরা কখনোই উপস্থিত থাকে না। আজ তারা কেন উপস্থিত বোঝা যাচ্ছে না। নর্তকীরা ভীতসন্তস্ত্ৰ। তারা মাথা নিচু করে আছে। কিছুক্ষণ পরপর একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছে। একজন গোপনে অশ্রুবর্ষণ করছে।

সম্রাট চুনার দুর্গ দখলে আসার কারণে আল্লাহপাকের দরবারে শুকরিয়া আদায় করলেন। সবাই বলল, আমীন।

আমীর বেগ মীরেক-কে চুনার দুর্গের গভর্নরের দায়িত্ব দেওয়া হলো। সবাই বলল, অতি উত্তম সিদ্ধান্ত।

সম্রাট সবাইকে ভোজসভায় আহবান জানালেন। মীর আতশ বললেন, অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং গোপন মিটিংয়ে নর্তকীরা উপস্থিত। এর কারণ বুঝতে পারছি না।

সম্রাট বললেন, এরা আমার কাছে একটা অভিযোগ করেছে। অভিযোগ গুরুতর। আমার ধারণা অভিযোগ মিথ্যা। যদি মিথ্যা প্রমাণিত হয় তাহলে হাতির পায়ের তলায় পিষ্ট করে এদের হত্যা করা হবে।

বৈরাম খাঁ বললেন, অভিযোগ কী?

হুমায়ূন বললেন, অভিযোগ হচ্ছে রুমী খাঁ দুর্গে প্রবেশের পরপর সাড়ে তিন শ মানুষের দুই হাত কেটে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন। সেই নির্দেশ সঙ্গে সঙ্গে পালন করা হয়েছে। রুমী খাঁ, এই বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

রুমী খাঁ বললেন, ঘটনা সত্য। আমি যা করেছি। মহান সম্রাটের নিরাপত্তার জন্য করেছি। যে সাড়ে তিন শ মানুষের দুই হাত কেটে ফেলা হয়েছে, এরা সবাই দুর্ধর্ষ কামানচি। এরা যেন আর কখনো সম্রাটের বাহিনীর উপর কামান চালাতে না পারে সেই ব্যবস্থাই করা হয়েছে। শক্রকে সমূলে বিনাশ করতে হয়।

হুমায়ূন বললেন, আপনাকে সাহসী মানুষ ভেবেছি। আপনি নিতান্তই কাপুরুষের মতো একটি কাজ করেছেন। আমি কাপুরুষ অপছন্দ করি।

যুদ্ধক্ষেত্রে কাপুরুষতা একটি সৎ গুণ। অনেক সময় কাপুরুষতা যুদ্ধজয়ে ভূমিকা রাখে।

সম্রাট বললেন, দুর্গের মানুষজন দুর্গ সমর্পণ করেছেন। কাজেই দুর্গ যুদ্ধক্ষেত্র ছিল না। আপনি যে ভয়াবহ অন্যায় করেছেন, তার শাস্তি আপনারও দুই হাত কেটে নেওয়া।

উপস্থিত আমীরদের একজন বললেন, সম্রাটকে আমি তাঁর আদেশ পুনর্বিবেচনা করার জন্যে অনুরোধ করছি। সম্রাটের কামানবহর পরিচালনার দায়িত্ব রুমী খাঁর উপর। শের খাঁনের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধযাত্রা করব। যুদ্ধের জয়-পরাজয় নির্ভর করবে। কামানের উপর। অর্থাৎ রুমী খাঁর নৈপুণ্যের উপর। যার রণকৌশলে মুগ্ধ হয়ে সম্রাট তাকে মীর আতশ সম্মানে সম্মানিত করেছেন।

হুমায়ূন বললেন, যুদ্ধের জয়-পরাজয় নির্ভর করে মহান আল্লাহপাকের ইচ্ছায়। কাপুরুষ রুমী খাঁর নৈপুণ্যে না। আগামীকাল ফজরের নামাজের পর মীর আতাশের দুই হাত কনুই থেকে কেটে ফেলার নির্দেশ দিচ্ছি।

সম্রাট দরবার ছেড়ে উঠে পড়লেন। মাগরেবের নামাজের সময় হয়েছে। তিনি অজু করার জন্যে উঠে পড়লেন। রুমী খাঁকে গ্রেফতার করে তার তাঁবুতে নিয়ে যাওয়া হলো। রুমী খাঁ সেই রাতেই বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করলেন।

অম্বার জায়গা হয়েছে হুমায়ূনের মেয়ে আকিকা বেগমের তাঁবুতে। অম্বা অতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে গেছে। একদিন আগের ঘটনার স্মৃতি কিছুই তার মনে নেই। অম্বা আকিকা বেগমের তাঁবুর জাকজমক দেখে হতভম্ব। চারজন খোজা প্রহরী সারাক্ষণ তাঁবু পাহারা দিচ্ছে। আকিকা বেগমের সেবায় নিযুক্ত আছে আটজন দাসী। দু’জন দাসীর হাতে ময়ুরের পালকে বানানো বিশাল পাখা। তারা সারাক্ষণই হাওয়া করছে।

আকিকা বেগম অম্বাকে খুবই পছন্দ করেছে। সে তার সঙ্গে পদ্ম ফুল পাতিয়েছে। আকিকা বেগম তার গলার নীলকান্তমণির মালা অম্বার গলায় পরিয়ে দিয়েছে। এখন চলছে। ধাঁধার আসর। ধাধার উত্তর যে দিতে পারবে না, তাকে সঙ্গে সঙ্গে নাকে মাটি ঘষতে হবে। দু’জনের হাতেই মাটির দলা।

আকিকা বলল, দিনে রাজপ্রসাদে থাকে রাতে থাকে জঙ্গলে, ফজরের ওয়াক্তে থাকে মাটির নিচে। এটা কী?

অম্বা বলল, জানি না।

আকিকা বলল, মাটি ঘষো।

অম্বা নাকে মাটি ঘষল।

আকিকা বলল, এখন তোমার পালা।

অম্বা বলল, তার এক শ’ চোখ। কিন্তু সে চোখে দেখে না।

আকিকা : এক শ’ চোখ কিন্তু চোখে দেখে না। আমি জানি না এটা কী।

এর নাম আনারস।

আনারস আবার কী? এক ধরনের ফল। বাঙ্গালমুলুকে পাওয়া যায়।

আকিকা বেগম আনারস ফল বাঙ্গালমুলুক থেকে আনার হুকুম দিল। ফল দেখার পর সে নাকে মাটি ঘষবে। আকিকা বেগমের নির্দেশে দু’জন অশ্বারোহী আনারসের সন্ধানে গেল। অম্বা হতভম্ব। বাচ্চা একটি মেয়ের এত ক্ষমতা!

শের খাঁ গোপন বৈঠকে বসেছেন। চুনার দুর্গ হাতছাড়া হওয়ায় তাকে মোটেই বিচলিত বলে মনে হচ্ছে না। শের খাঁ’র দুই পুত্র এবং তিনজন সেনাপতি বৈঠকে উপস্থিত। শের খাঁ বললেন, আমি নিশ্চিত সম্রাট হুমায়ূনকে আমরা পরাজিত করব। আমার পরিকল্পনা নির্ভুল। চুনার দুর্গ দখলের জন্যে হুমায়ূন ছয় মাস অপেক্ষা করেছেন। এই ছয় মাস আমি শক্তি সঞ্চয় করেছি। সম্রাটের প্রধান স্তম্ভ রুমী খাঁ গত। এটা আমাদের জন্যে পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার।

উপস্থিত সবাই বলল, মারহাবা।

শের খাঁ বললেন, এখানে উপস্থিত সবার প্রতি আমার একটি কঠিন নির্দেশ আছে। সম্রাট হুমায়ূনকে কোনো অবস্থাতেই হত্যা করা যাবে না।

শের খাঁর পুত্র জলাল খাঁ বললেন, কেন না?

শের খাঁ বললেন, হুমায়ূন আমার পরম শত্রু এটা সত্যি, কিন্তু তিনি এমন শক্র যাকে আমি শ্রদ্ধা এবং সম্মান করি। তিনি মহান মানুষদের একজন। এই মানুষটির অন্তর স্বর্ণখণ্ডের মতো উজ্জ্বল। সেখানে কলুষতার কণামাত্ৰও নাই।

শের খাঁ’র উজির বললেন, শক্ৰ সম্পর্কে এমন প্রশংসাসূচক বাক্য দুর্বলতার নামান্তর।

শের খাঁ বললেন, আমি অবশ্যই এই মানুষটির প্রতি দুর্বল। আমি সম্রাটের লেখা একটি কবিতা পাঠ করছি। পাঠ শেষ হওয়ামাত্র আপনারা বলবেন, মারহাবা।

অশ্ব অশ্বারোহীর বন্ধু নয়।
যেমন বন্ধু নয় বায়ু, মেঘমালার।
বন্ধু হবে এমন যাদের সঙ্গে কখনো দেখা হবে না।
দু’জনই থাকবে দু’জনের কাছে অদৃশ্য।
দৃশ্যমান থাকবে তাদের ভালোবাসা।

শের খাঁ’র উজির নিতান্ত অনিচ্ছার সঙ্গে বললেন, মারহাবা।

০৭. হিন্দুস্থানি এক নগ্নগাত্র জাদুকর

হিন্দুস্থানি এক নগ্নগাত্র জাদুকর এসেছে সম্রাটকে ভোজবাজি দেখাতে। তার কোমরের কাছে মালকোঁচা দিয়ে পরা নোংরা ধুতি। মাথায় বিশাল সাদা পাগড়ি। পাগড়ি পরিষ্কার, ঝকঝক করছে। সে কৃশকায়, গাত্রবর্ণ পাতিলের তলার মতো কালো। ভোজওয়ালার সঙ্গে তার কন্যা। বয়স চার-পাচ। সেও নগ্নগাত্র। লাল টুকটুকে প্যান্ট পরেছে। মেয়েটির চোখ মায়াকাড়া। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সম্রাটের দিকে। একবারের জন্যেও দৃষ্টি ফিরিয়ে নিচ্ছে না। তার দৃষ্টিতে ভয় এবং বিস্ময়।

সম্রাট বসেছেন তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। পরিবারের বাইরে আছে অম্বা, কিছু পরিচারিকা এবং একদল খোজা প্রহরী।

সম্রাট বললেন, খেলা দেখাও।

বাজিকর সম্রাটকে কুর্নিশ করল। এতক্ষণ দেখা যাচ্ছিল তার দুই হাতই খালি, এখন তার ডান হাতে একটা আমের আঁটি দেখা গেল। সে আমের আঁটি মাটিতে পুঁতে দিল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মাটি ফুড়ে আমগাছ বের হতে শুরু করল। সম্রাট বললেন, সোবাহানাল্লাহ।

বাজিকর গাছের উপর দিয়ে একবার হাত বুলিয়ে নিতেই দেখা গেল। গাছে তিনটা পাকা আম ঝুলছে। বাজিকর আম তিনটা ছিড়ে সম্রাটের সামনে রেখে আবারও কুর্নিশ করল। সম্রাট বললেন, মারহাবা। বলেই বিস্ময়ে অভিভূত হলেন-যেখানে আমগাছ ছিল সেখানে গাছ নেই। কুণ্ডলী পাকিয়ে বিষধর গোখরো সাপ বসে আছে। সাপ ফণা তুলেছে। ফোঁস ফোঁস শব্দ করছে।

মহিলারা অফুট শব্দ করে নড়েচড়ে বসলেন। জাদুকর মাথার পাগড়ি খুলে সাপ ঢেকে দিল। বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ে ফুঁ দিতেই দেখা গেল পাগড়ির ভেতর কোনো সাপ নেই। সাপের পরম শত্রু লালচোখা বেজি বসে আছে। এবার সবাই একসঙ্গে বলল, মারহাবা।

সম্রাট বললেন, তুমি কি আমার সঙ্গে দিল্লী যাবে? আমি তোমাকে জয়গির দেব। বিশেষ বিশেষ উৎসবে তুমি তোমার খেলা দেখাবে। (সম্রাট কথা বললেন দোভাষীর মাধ্যমে, তিনি হিন্দুস্থানি জানেন না।)

জাদুকর বলল, না।

না কেন?

নদী অতিক্রম করা আমার জন্যে নিষেধ। নিষেধ কে করেছেন?

আমার গুরু।

জাদুকর গুরুর উদ্দেশে আকাশের দিকে তাকিয়ে দুই হাত জোড় করল। সম্রাট বললেন, জাদু দেখানোর সময় তুমি মন্ত্রপাঠ করেছ। মন্ত্র বলে কি কিছু আছে?

আছে।

সবচেয়ে কঠিন মন্ত্র কোনটি?

শূন্যে ভাসা মন্ত্র।

এই মন্ত্র পড়লে শূন্যে ভাসা যায়।

তুমি শূন্যে ভাসতে পার?

আমি পারি না, আমার গুরু পারেন।

জাদুকর আবারও গুরুর উদ্দেশে দুই হাত জোড় করল। তুমি কী পার? আমি পানির উপর হাঁটতে পারি। তবে নদীর পানি না, দিঘির শান্ত পানি। নদীর পানির উপর দিয়ে হাঁটা আমার গুরুর নিষেধ।

তুমি কি পানির উপর দিয়ে হাঁটার জাদু আমাকে দেখাতে পারবে?

পারব।

চিকিৎসক এবং সম্রাট এই দু’জনের কাছে সর্ব অবস্থায় সত্যি কথা বলতে হয়। তুমি সত্যি করে বলো, পানির উপর দিয়ে হাঁটার কি কোনো কৌশল আছে, না শুধুই মন্ত্র?

কৌশল আছে।

তুমি কি এই কৌশল আমাকে শিখাবে?

সম্রাট রাজ্য শাসন করবেন। ভোজবাজি কেন শিখবেন?

তুমি তো বেশ গুছিয়ে কথা বলতে পার। আমি তোমার ভোজবাজি দেখে মুগ্ধ হয়েছি। তুমি আমার কাছে কী চাও বলো।

আমি ভগবান ছাড়া কারও কাছে কিছু চাই না। আপনি আমার খেলা দেখে খুশি হয়েছেন এতেই আমি খুশি। সম্রাটকে খুশি করতে পারা বিরাট সৌভাগ্যের ব্যাপার। আমি ভাগ্যবান।

সম্রাট তার কন্যা আকিকা বেগমকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকলেন। আকিকা ছুটে এল।

ভোজবাজির খেলা কেমন লাগল মা?

খুব ভালো লাগল বাবা।

এই জাদুকর আমাকে খুশি করেছে, আমি তাকে খুশি করতে চাই। কী উপহার পেলে সে খুশি এবং বিস্মিত হবে?

বাবা, আপনি তাকে একটা হাতি উপহার দিন।

হাতি?

হ্যাঁ হাতি। উপহার হিসেবে সে হাতি পাবে এটা কখনো কল্পনা করে নি। আপনার উপহার তার কল্পনাকে ছাড়িয়ে যাবে।

তোমার সঙ্গে যে হিন্দুস্থানি মেয়েটি আছে সে কেমন আছে?

খুব ভালো আছে। আনন্দে আছে।

তার নাম যেন কী?

তার নাম অম্বা।

সে কি তার আত্মীয়স্বজনের কাছে ফেরত যেতে চায়?

না। আত্মীয়স্বজনরা তাকে ফেরত নেবে না। সে বাকি জীবন আমার সঙ্গে থাকবে। বাবা, আপনি কি জানেন আমরা দু’জন এক বিছানায় ঘুমাই?

জানতাম না। এখন জানলাম।

আপনি কি রাগ করেছেন?

আমি আমার আদরের আকিকা বেগমের উপর কখনো রাগ করব না।

আমি যদি কোনো অন্যায় করি তারপরেও না?

তারপরেও না। তুমি কি কোনো অন্যায় করেছ?

করেছি। বড় অন্যায় করেছি।

অন্যায়টা কি বলবো?

না।

আচ্ছা যাও। তোমার বড় অন্যায় ক্ষমা করা হলো।

সম্রাটের নির্দেশে হিন্দুস্থানি জাদুকরকে একটা হাতি উপহার দেওয়া হলো। হতভম্ব জাদুকর এবং তার মেয়েকে হাতির পিঠে চড়িয়ে দেওয়া হলো। বাচ্চা মেয়েটি আতঙ্কে অস্থির হয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে থাকিল। (*হাতির পিঠে হিন্দুস্থানি জাদুকর এবং তার কন্যার মোঘল রীতিতে আঁকা একটি পেইন্টিং ব্রিটিশ জাদুঘরে রক্ষিত আছে।)

শের খাঁ তার সমরবিশারদদের নিয়ে গোপন বৈঠকে বসেছেন। সমরবিশারদদের চারজনের মধ্যে আছে তার দুই পুত্র জালাল খা, সাইফ খাঁ এবং দুই সেনাপতি।

শের খাঁ বললেন, যুদ্ধ শুরুর আগে শত্রুর সবল এবং দুর্বল দিকগুলি খুঁজে বের করতে হয়। সম্রাট হুমায়ূনের সবল এবং দুর্বল দিক কী?

জালাল খা বললেন, সম্রাট হুমায়ূন ভীরু মানুষ, এটাই তার দুর্বল দিক। তার কামানবাহিনী হলো তার সবল দিক।

পুত্র! তুমি ভুল বললে। হুমায়ূন অসম্ভব সাহসী একজন মানুষ। আমোদপ্রিয়, তবে সাহসী। আর তাঁর বিশাল কামানবাহিনী তাঁর সবচেয়ে দুর্বল দিক।

কেন? কামানবহর নিয়ে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়া যায় না। এত কামান কীভাবে দ্রুত টেনে নেবে? কামানবহরকে স্থির হয়ে এক জায়গায় থাকতে হয়। বিশাল কামানবহর নিয়ে আক্রমণ করা যায় না। শক্ৰ প্রতিরোধ করা যায়।

জালাল খাঁ বললেন, আমি এইভাবে ভাবি নি। আপনার কথা সত্য। তবে সম্রাট হুমায়ূন যে কাপুরুষ এই কথাটি সত্য।

তুমি মনে হয় পানিপথের যুদ্ধের কথা ভুলে গেছ। পানিপথে সম্রাট বাবরের ডানবাহুর দায়িত্বে ছিলেন হুমায়ূন। তিনি অসাধারণ বীরত্ব দেখিয়েছেন। বাহাদুর শাহ’র হাত থেকে তিনি চিতোর কীভাবে ছিনিয়ে নিয়েছেন তাও সম্ভবত তোমার মনে নেই। সম্রাট হুমায়ূন সাহসী, কিন্তু খেয়ালি মানুষ। তার চরিত্রের খেয়ালি অংশই হলো তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। আমরা তাঁর এই দুর্বলতাকেই ব্যবহার করব।

কীভাবে?

শের খাঁ শান্ত গলায় বললেন, নানান খেয়ালে তিনি যেন সময় পার করতে পারেন আমরা সেই চেষ্টা করব। জাদুবিদ্যার একটা প্রাচীন বই জোগাড় করেছি। সেই বই তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। বইটি প্রাচীন কোনো অপ্রচলিত ভাষায় লেখা। সম্রাটের সময় যাবে বইটির ভাষা উদ্ধার করতে। আমি ত্রিপুরা রাজ্য থেকে একটা হাতির বাচ্চা জোগাড় করেছি। হাতির বাচ্চার বিশেষত্ব হচ্ছে—প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালে সে দুটা শুঁড় নিয়ে জন্মেছে। সম্রাট দুই ওঁড়ের হাতির বাচ্চা নিয়েও সময় কাটাবেন। আমি কীভাবে শক্তি সংগ্ৰহ করছি তা তার চোখ এড়িয়ে যাবে।

সাইফ খাঁ বললেন, সম্রাট তো একা না। তার পরামর্শদাতারা আছেন। আমীররা আছেন, অতি বিচক্ষণ সেনাপতি বৈরাম খাঁ আছেন। এঁদের সবার চোখ আমরা কীভাবে এড়াব?

শের খাঁ অসহিষ্ণু গলায় বললেন, সম্রাট চোখ বুজলে তাঁর অনুসারীদেরও চোখ বুজতে হয় এটাই নিয়ম। সম্রাট এবং তাঁর অনুসারীদের বিভ্রান্ত করার জন্যে আমি কিছু কূটকৌশলের ব্যবস্থাও করেছি।

কী রকম?

আমি অতি দুর্বল একদল যোদ্ধাকে পাঠাব সম্রাটকে আক্রমণ করার জন্যে। তারা পরাজিত হবে। সম্রাটের ধারণা হবে শের খাঁ’র বাহিনী দুর্বল।

শের খাঁ’র প্রধান সেনাপতি ওসমান বললেন, কৌশলটা ভালো।

সম্রাটের কাছে আমি একটা পত্র পাঠাচ্ছি। এই পত্রেও আমার দুর্বলতা প্ৰকাশ পাবে।

জালাল খাঁ বললেন, কী পত্র পাঠাচ্ছেন আমরা কি শুনতে পারি? হ্যাঁ। পত্র আমি পড়ে শোনাচ্ছি।

হিন্দুস্থানের মালিক,
মহাপরাক্রমশালী সিংহহাদয় জ্ঞানতাপস মহান মোঘল সম্রাট বাদশাহ নামদার হুমায়ূন।

অধীন শের খাঁ’র বিনম সালাম গ্ৰহণ করুন।

আসসালামু আলায়কুম।

নিবেদন এই যে, বাদশাহর সম্মানে আমি দুটি সামান্য উপহার পাঠালাম।

দুই শুড়বিশিষ্ট একটি হস্তীশাবক, নাম হরিমতি। এইসঙ্গে জাদুবিদ্যার একটি প্রাচীন অপ্রচলিত ভাষায় রচিত গ্ৰন্থ। জাদুবিদ্যার প্রতি আপনার আগ্রহের কথা জেনেই এমন ক্ষুদ্র উপহার পাঠানোর সাহস করছি।

এখন আপনার প্রতি আমার সামান্য নিবেদন। অধীনের এই নিবেদন আপনি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন কি না তা আপনার বিবেচনা। মাঝে মাঝে বৃহৎবাপু হন্তীকেও সামান্য মুষিকের কথা শ্রবণ করা জরুরি হয়ে পড়ে।

চুনার দুর্গের পতনের পর আমার দুই বীরপুত্ৰ জালাল খাঁ এবং সাইফ খাঁ মানসিকভাবে বিপর্যন্ত। তারা প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর। যে-কোনোদিন আমার এই দুই পুত্র আপনার সেনাবাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। এর ফলাফল শুভ না হওয়ার কথা। আমার এই দুই পুত্র অসীম সাহসী। প্রতিশোধ গ্রহণের উত্তেজনায় এই সাহস বহুগুণে বর্ধিত হয়েছে।

আমার পুত্রদের কাছে মোঘল বাহিনীর পরাজয় হলে হিন্দুস্থানের মালিক সম্রাট হুমায়ূনের জন্যে তা বিরাট কলঙ্ক। আমি সম্রাটকে এই কলঙ্কের বোঝা নিয়ে দিল্লী প্রস্থানের কথা চিন্তাও করি না। সম্রাটের কলঙ্ক তার দীন সেবক শের খাঁ’র কলঙ্ক।

এখন আমার অনুরোধ (এবং উপদেশ), আপনি অতি দ্রুত দিল্লীর দিকে যাত্রা করুন। আমি আমার ধৃষ্টতার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আপনাকে বিনয়ের সঙ্গে জানাচ্ছি, পুত্রদের উপর আমার তেমন নিয়ন্ত্রণ নেই। আপনি নিজে একজন মহাবীর, আপনি ভালোই জানেন বীররা নিয়ন্ত্রণ পছন্দ করে না।

বিনীত
সম্রাটের পদধূলিসম

শের খাঁ

শের খাঁ পত্র পাঠ শেষ করে দুই পুত্রের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমাদের কিছু বলার আছে?

জালাল খাঁ বললেন, আমরা দুই ভাইয়ের যে-কোনো একজন মোঘলদের সঙ্গে নকল যুদ্ধ করতে যাব এবং ইচ্ছাকৃতভাবে পরাজিত হব?

হ্যাঁ।

স্বেচ্ছা-পরাজয়ের ফলাফল হলো মোঘলদের হাতে বন্দি হওয়া। সে সম্ভাবনা অবশ্যই আছে। মোঘলদের হতে বন্দি হওয়া মানে হাতির পায়ের চাপে পিষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ।

এই কথাও ঠিক। বড় মঙ্গলের স্বার্থে ক্ষুদ্ৰ অমঙ্গল গ্রহণ করতে হয়।

সাইফ খাঁ বললেন, নকল যুদ্ধ করতে কে যাবে?

শের খাঁ বললেন, তুমি যাবে। মূল যুদ্ধে জালাল খাঁকে আমার প্রয়োজন। সে তোমার চেয়ে অনেকগুণ বিচক্ষণ যোদ্ধা।

সাইফ খাঁ বললেন, কবে যুদ্ধে যাব?

সম্রাট যেদিন এই পত্ৰ পাবেন তার সাত দিন পর।

প্রধান সেনাপতি ওসমান বললেন, আপনার দুই পুত্রের কাউকেই পাঠানোর প্রয়োজন নেই। আপনার সেনাপতিদের একজন যাবে।

শের খাঁ বললেন, তাতে আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে না। তবে সাইফ খা’র ভয়ের কোনো কারণ নেই। সে যদি ধরাও পড়ে তার পরিচয় পাওয়ার পর হুমায়ূন তাকে আমার কাছে সসম্মানে ফেরত পাঠাবেন। সম্রাট হুমায়ূনের চরিত্রের সবচেয়ে দুর্বল দিক হচ্ছে তার করুণা এবং ক্ষমা। আমরা তাঁর এই দুর্বলতা ব্যবহার করব।

শের খাঁ’র উপহার পেয়ে সম্রাট হুমায়ূন উত্তেজিত। জাদুর প্রাচীন বইটিকে স্বর্ণখনি বলে মনে হচ্ছে। তিনি ভাষা পড়তে পারছেন না, তবে বইয়ে অনেক ছবি। ছবিগুলি বইটির বিশেষত্ব বলে দিচ্ছে। একটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে একটা মানুষের মুণ্ডু ধড় থেকে আলাদা করা। তার পরের ছবিতে মুণ্ডু শরীরের সঙ্গে লাগানো। একটা ছবিতে মানুষের শরীরের সঙ্গে বিড়ালের মাথা লাগানো।

সম্রাট হিন্দুস্থানের বিভিন্ন ভাষার পণ্ডিতদের জড়ো করার নির্দেশ জারি করেছেন। তাদের কেউ-না-কেউ গ্রন্থের পাঠোদ্ধার করতে পারবে।

দুই ওঁড়ের হস্তীশাবক দেখেও তিনি উত্তেজিত। প্রকৃতির বিশেষ খেয়ালে এরকম একটি হস্তীশাবকের জন্ম হয়েছে, নাকি এটি বিশেষ কোনো প্ৰজাতির? বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান হওয়া প্রয়োজন।

হরিমতি এখন আছে আকিকা বেগমের তত্ত্বাবধানে। আকিকা। বেগম এবং তার বান্ধবী অম্বা হরিমতিকে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা। আকিকা বেগম হন্তীশাবকের হিন্দু নাম বদলে মুসলমান নাম রাখতে চাচ্ছে। অনেকগুলি নাম সে তার কোরানপাঠ শিক্ষক ওস্তাদের সাহায্যে আলাদা করেছে। কোনোটিই পছন্দ হচ্ছে না। যেমন

নাম—অর্থ

শাহানা—রানী

লাবিবা—জ্ঞানী

আনিসা—কুমারী

সাইয়ারা–রাজকুমারী

সাইয়ারা নাম তার কিছুটা পছন্দ হচ্ছে। কিন্তু সে চাচ্ছে তার নামের প্রথম অক্ষরের সঙ্গে মিলিয়ে নাম রাখতে। আনিসা নাম সেই অর্থে ঠিক আছে। ‘আ’ দিয়ে শুরু। কিন্তু নামের অর্থ (কুমারী) পছন্দ হচ্ছে না। হরিমতি নিশ্চয়ই সারা জীবন কুমারী থাকবে না।

হরিমতিকে নিয়ে সম্রাটের অন্য পরিকল্পনা আছে। তিনি এই অদ্ভুত হস্তী শাবক পারস্য-সম্রাট শাহ তামাস্পকে উপহার হিসেবে দিতে চান। পারস্য-সম্রাটের জীবজন্তুর প্রতি প্রবল আগ্রহ। তাঁর চিড়িয়াখানা সারা পৃথিবী থেকে খুঁজে আনা জীবজন্তুতে পরিপূর্ণ। শাহ এই অদ্ভুত উপহার পেয়ে অবশ্যই আনন্দে আত্মহারা হবেন। পারস্যের সঙ্গে তখন সুসম্পর্ক হবে। এর ফলাফল হবে শুভ।

শুক্রবার জুমার নামাজ শেষ করে সম্রাট বিশ্রামে গেছেন। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে তিনি দুপুরের খাবার খাবেন। ঘুমে সম্রাটের চোখ লেগে আসছে, তখনই তাকে ডেকে তোলা হলো। তাঁকে দুঃসংবাদ দেওয়া হলো। শের খাঁ’র পুত্র সাইফ খাঁ প্ৰায় এক হাজার অশ্বারোহী নিয়ে মোঘল শিবির আক্রমণ করেছে। যুদ্ধের জন্যে মোঘলদের প্রস্তুতি ছিল না বলে অল্পকিছু মোঘল সৈন্য নিহত হয়েছে। সাইফ খাঁ সম্পূর্ণ পরাস্ত হয়েছে। তাকে বন্দি করা হয়েছে। সাইফ খাঁ’র সঙ্গের সৈন্যদের প্রায় সবাই নিহত হয়েছে।

সাইফ খা-কে সম্রাটের সামনে আনা হলো। সম্রাট দেখলেন নিতান্তই অল্পবয়সী অতি সুপুরুষ এক যুবক।

মোঘলবাহিনীকে আক্রমণ করেছ। এটা কি তোমার নিবুদ্ধিতা নাকি কোনো কৌশল?

সাইফ খাঁ মাটির দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি বিশাল বাহিনী নিয়েই এসেছিলাম। বেশিরভাগই ছিল ভাড়াটে সৈন্য। যুদ্ধ শুরু হওয়ামাত্র তারা পালিয়ে গেছে।

বন্দি শক্রকে হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট করে মারার রেওয়াজ মোঘলদের আছে, এই তথ্য তুমি জানো?

জানি।

তুমি কি আমার কাছে প্ৰাণভিক্ষা চাও?

সাইফ খা’ বললেন, আপনার করুণা এবং দয়ার কথা আমি জানি। আপনি যে আমার প্রাণ ভিক্ষা দেবেন। সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত।

আমি এখন দুপুরের খাবার খাব। তুমি আমার সঙ্গে খেতে বসে। খাওয়ার পর তোমার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। আচ্ছা তুমি যেন শান্তিমতো খেতে পার আমি সেই ব্যবস্থা করছি। তোমাকে ক্ষমা করা হলো। তুমি শের খাঁ’র কাছে ফিরে যাবে এবং তাকে বলবে তার পাঠানো উপহার আমার পছন্দ হয়েছে।

আমি বাবাকে এই সংবাদ দেব।

সম্রাট বললেন, আমি তোমার পিতার সঙ্গে শান্তিচুক্তি করে দিল্লী ফিরে যাব।

এই খবরও বাবাকে জানাব। তিনি খুশি হবেন।

সম্রাট হুমায়ূন সাইফ খাঁ-কে ডানপাশে বসালেন। অতি সম্মানিতজনকেই এমন সম্মান দেখানো হয়।

০৮. জায়গাটার নাম চৌসা

জায়গাটার নাম চৌসা। গঙ্গা এবং কীৰ্তিনাশা নদীর সঙ্গমস্থলে ছোট একটা গ্রাম। চৌসার দক্ষিণে হুমায়ূনের বিশাল বাহিনী আস্তানা গেড়েছে। নদীর একদিকে মোঘল বাহিনী, অন্যদিকে শের খাঁ’র আফগান বাহিনী। মাঝখানে খরস্রোতা কীর্তিনাশা নদী। আফগান বাহিনী নদী পার হয়ে মোঘল বাহিনীকে আক্রমণ করবে সেই সম্ভাবনা শূন্য। নদীতে নড়বড়ে কাঠের পুল আছে। সেই পুলে বিশাল বাহিনী পার হতে পারবে না। পুলের উপর কামান গাড়ি তোলার প্রশ্নই আসে না।

হুমায়ূনের গুপ্তচর খবর এনেছে শের খাঁ পর্যুদস্ত অবস্থায় আছেন। ঝাড়খণ্ডের চেরুহ। দলপতি শের খাঁকে আক্রমণ করবে। এই নিয়েই শের খাঁ ব্যস্ত। কিছুদিন পরপর নিশাকালে শের খাঁ’র প্রধান সেনাপতি খাওয়াস খাঁ চেরুহ। দলপতির বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্ৰা করেন। তার দেখা না পেয়ে ফিরে আসেন। শের খাঁ যে সমস্যার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন তাতে বিশাল মোঘল বাহিনীর উপর আক্রমণ চালানোর প্রশ্নই ওঠে না। শের খাঁ চাইবেন যে-কোনো মূল্যে মোঘলদের সঙ্গে সন্ধি।

মোঘল সম্রাট নিশ্চিন্ত মনে সময় কাটাচ্ছেন। জাদুবিদ্যার বইটির পাঠোদ্ধারের ব্যবস্থা হয়েছে। বইটি প্রাচীন সংস্কৃত ভাষায় লেখা। সেই ভাষার একজন পণ্ডিত বইটি ফার্সি ভাষায় অনুবাদ শুরু করে দিয়েছেন। পণ্ডিত হিন্দু ব্ৰাহ্মণ, নাম আচার্য হরিশঙ্কর বিদ্যাবাচস্পতি। তিনি প্রতি পৃষ্ঠা অনুবাদ করার জন্যে পাচ্ছেন একটি করে রৌপ্যমুদ্রা।

সম্রাট নতুন এক খেয়ালেও কিছু সময় দিচ্ছেন। তিনি হিন্দুস্থানি রান্নার একটি কোষগ্রন্থ তৈরি করতে চাচ্ছেন। বিশাল হিন্দুস্থানের নানান অঞ্চলে কত ধরনের রান্নাই-না হয়। সব একত্রিত থাকলে গবেষকদের জন্যে সুবিধা। হিন্দু বিধবারা (যারা নানান কারণে সতীদাহের হাত থেকে বেঁচে গেছে) মাছ-মাংস খেতে পারে না। তাদের জন্যে বিচিত্র সব নিরামিষ রান্না হয়। বিচিত্র নিরামিষের একটি খেয়ে সম্রাট আনন্দ পেয়েছেন। কাঁঠাল নামের একটি কাঁচা ফল থেকে এই নিরামিষ তৈরি হয়। খেতে মাংসের মতো লাগে। সম্রাট শুরুতে ধরতেই পারেন নি তিনি নিরামিষ খাচ্ছেন, মাংস না। হিন্দুস্থানি রান্নার আকরগ্রন্থ তৈরির বাসনার মূলে আছে কাঁঠালের নিরামিষ।

সম্রাট ঠিক করেছেন, জাদুবিদ্যার বইটির অনুবাদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি চৌসাতে থাকবেন। শের খাঁ’র সঙ্গে সন্ধি করে দিল্লী ফিরে যাবেন। পেছনে শক্র রাখা কোনো কাজের কথা না।

সন্ধির শর্ত নিয়ে আলোচনার জন্যে সম্রাটের দূত শায়েখ খলিলকে শের খাঁ’র কাছে পাঠানো হলো। শর্তগুলো নিম্নরূপ–

প্ৰথম শর্ত

শের খাঁ তার অবস্থান থেকে পেছনে সরে যাবেন, যাতে ইচ্ছা করলেই মোঘল বাহিনী কীর্তিনাশা নদী পার হতে পারে।

দ্বিতীয় শর্ত

শের খাঁ তার পুরোনো জায়গির বাংলা ও বিহার ফিরে পাবেন ঠিকই, তবে তাকে নিয়মিত কর পরিশোধ করতে হবে। তিনি খুৎবা পড়বেন সম্রাট হুমায়ূনের নামে। টাঁকশালের মুদ্ৰাও মোঘল সম্রাটের নামে তৈরি হবে।

তৃতীয় শর্ত

শের খাঁ’র এক পুত্রকে (সম্রাটের পছন্দ সাইফ খাঁ) থাকতে হবে দিল্লী দরবারে, সম্রাটের নজরদারিতে।

চতুর্থ শর্ত

শের খাঁ স্বয়ং হুমায়ূনের সামনে উপস্থিত হয়ে তাঁর কর্মকাণ্ডের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন। তিনি আফগান এবং মোঘল সুসম্পর্কের জন্যে ভূমিকা রাখবেন।

শের খাঁ প্রতিটি শর্ত মেনে নিলেন। নিজের অবস্থান থেকে কুড়ি মাইল পেছনে সরে গেলেন। হুমায়ূনের কীর্তিনাশা নদী অতিক্রমে কোনো বাধা রইল না।

সম্রাট তাঁর বিশাল বাহিনী নিয়ে নদী অতিক্রম করলেন না, তবে তিনি সপ্তাহে একদিন নদীর তীরে স্বয়ং উপস্থিত হতে লাগলেন। ওই বিশেষ দিনে দুই শুড়ের হস্তী শাবককে গোসল করানো হয়। গোসলের সময় সে তার দুই শুড় দিয়ে একসঙ্গে আকাশে পানি ছুঁড়ে মারে। সেই পানি বৃষ্টির মতো তার গায়ে নেমে আসে। অদ্ভুত দৃশ্য।

মঙ্গলবার দ্বিপ্রহর। সম্রাট কীর্তিনাশা নদীর তীরে। হান্তীশাবকের স্নানদৃশ্য দেখছেন। সম্রাটের সঙ্গে আছেন। বৈরাম খাঁ। বৈরাম খাঁকে চিন্তিত এবং বিষগ্র দেখাচ্ছে। হস্তীশাবকের জলকেলি দেখে তিনি তেমন আনন্দ পাচ্ছেন না। সম্রাট বললেন, বৈরাম খাঁ, আপনাকে চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?

বৈরাম খাঁ বললেন, আমি চিন্তিত বলেই মনে হয় চিন্তিত দেখাচ্ছে।

চিন্তিত হওয়ার মতো কোনো ঘটনা কি ঘটেছে?

আমি শের খাঁকে নিয়ে চিন্তিত। সে সাপের মতো ধূর্ত।

সম্রাট হাসতে হাসতে বললেন, সাপ ধূর্ত না, ভীতু প্রাণী। শের খাঁ যদি সাপও হয় সেই সাপ এখন গর্তে ঢুকেছে। সাপ যখন গর্তে ঢোকে সোজা হয়ে ঢোকে।

বৈরাম খাঁ বললেন, সাপ যখন গর্ত থেকে বের হয় তখন কিন্তু আবার একেবেঁকেই চলে।

এই সাপ সহজে গর্ত থেকে বের হবে না।

বৈরাম খাঁ ক্লান্ত গলায় বললেন, শের খাঁ ছাড়াও চিন্তিত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। আপনার ভাই কামরান মীর্জা নিজের নামে খুৎবা পাঠ শুরু করেছেন। নিজের নামে স্বর্ণমুদ্রা বের করেছেন।

সম্রাট বললেন, এটি কামরানের শিশুসুলভ কার্য। শিশুদের সব কাজ গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে নেই। যথাসময়ে সে ক্ষমা প্রার্থনা করবে।

এবং আপনি তাকে ক্ষমা করে দেবেন?

হ্যাঁ।

আপনার আরেক ভ্রাতা হিন্দাল মীর্জাকে রসদের জন্যে পাঠানো হয়েছিল। তিনি কুড়ি হাজার অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে রসদ সংগ্রহে বের হয়ে আর ফিরে আসেন নি। খবর পাওয়া গেছে। তিনি দিল্লীর দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। মনে হচ্ছে তারও দিল্লীর সিংহাসনে বসার বাসনা।

সম্রাট একটি শের আবৃত্তি করলেন। ফার্সি শের, যার ভাবাৰ্থ–

বৃদ্ধকে সম্মান করো, এই সম্মান তাঁর অভিজ্ঞতার কারণে, যুবককে সমীহ করো, এই সমীহ তার তারুণ্যের কারণে, শিশুকে ভালোবাসো, এই ভালোবাসা তার শিশুসুলভ কর্মকাণ্ডের জন্যে।

বৈরাম খাঁ বিরস গলায় বললেন, প্রতিটি শের কবির ব্যক্তিগত ধ্যানধারণার ফসল। ব্যক্তিগত কোনো কিছুই সর্বজনীন হতে পারে না। যাই হোক, আমি হস্তীশাবকের স্নান দেখার জন্যে আসি নি। আমি শের খাঁর কাছ থেকে একটি পত্র পেয়েছি। পত্রটি আপনাকে পড়ে শোনানোর জন্যে এসেছি। সম্রাটের অনুমতি পেলে পত্রটি পড়তে চাই।

পড়ুন। বৈরাম খাঁ পত্রটি পড়লেন :

সিংহের চেয়ে সাহসী, দিল্লীর সূর্য সম্রাট হুমায়ূনের প্রিয়ভাজন, বৈরাম খাঁ।

আমার অভিনন্দন এবং সালাম।

আপনি ইতিমধ্যে নিশ্চয়ই অবগত হয়েছেন যে, সন্ধির সকল শর্ত মেনে আমি আমার বাহিনী নিয়ে দূরে সরে গেছি। আমার পুত্র সাইফ খাঁকে নির্দেশ দিয়েছি সে যেন সম্রাটের সঙ্গে দিল্লী যাত্রা করে।

আমি যে-কোনো এক শুভদিনে সম্রাটের সামনে উপস্থিত হব। তাঁর পদচুম্বনের দুর্লভ সুযোগের আশায় কালযাপন করছি।

এক্ষণ, আপনাকে পত্রদানের কারণ ব্যাখ্যা করি। আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, ঝাড়খণ্ডের দলপতিদের চোরা গোপ্ত হামলায় আমি বিপর্যন্ত।

সম্রাট হুমায়ূনের দীন সেবক হিসেবে এবং দিল্লীর সিংহাসনের প্রতি অতি অনুগত ভৃত্য হিসেবে আমি কি আপনার কাছ থেকে কিছু পরামর্শ পেতে পারি?

ঝাড়খণ্ডের দলপতিদের কীভাবে সমুচিত জবা দেওয়া যায়—এই বিষয়ে পরামর্শ।

সম্রাটের অনুমতি সাপেক্ষে আপনি যদি রাজি থাকেন তাহলে আপনাকে সসম্মানে আমার তাঁবুতে আনার ব্যবস্থা আমি করব।

পত্রের উত্তরের অপেক্ষায় থাকলাম।

ইতি
আপনার গুণমুগ্ধ,
মোঘল সম্রাট হুমায়ূনের দীন সেবক,
শের খাঁ

সম্রাট বললেন, পত্রের কী জবাব দেবেন বলে ঠিক করেছেন?

বৈরাম খাঁ বললেন, আপনি যে জবাব দিতে বলবেন আমি সেই জবাবই দেব।

আমি মনে করি শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে আপনি শের খাঁ’র সঙ্গে দেখা করতে পারেন।

আপনার যদি এরকম নির্দেশ হয়। আমি যাব। এখন আপনার অনুমতি নিয়ে আমি তাঁবুতে ফিরে যেতে চাই। বাংলা মুলুকের প্রচণ্ড তাপে আমি বিপর্যন্ত বোধ করছি।

সম্রাট বললেন, আপনি নিজের তাঁবুতে ফিরে যান। বিশ্রাম করুন।

বৈরাম খাঁ তাঁবুতে ফিরেই শের খাঁ’র পত্রের জবাব দিলেন। সেখানে লিখলেন,

পাঠানদের প্রতিনিধি
শের খাঁ,
আপনার পত্র পাঠ করেছি। আমার পক্ষে কোনোক্রমেই সম্রাট হুমায়ূনকে একা ফেলে আপনার কাছে যাওয়া সম্ভব না।

ক্ষমাপ্রার্থনাপূর্বক

বৈরাম খাঁ

দিন বৃহস্পতিবার। সময় সুবেহ্‌ সাদেক।

শের খাঁ তার দুই পুত্র এবং প্রধান সেনাপতি খাওয়াস খাকে নিয়ে গোপন বৈঠকে বসেছেন। শের খাঁ বললেন, আজ মধ্যরাতে আমরা মোঘল বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়বা। কারও কিছু বলার আছে?

কেউ জবাব দিল না। খাওয়াস খাঁ বললেন, আজকের রাতটা কি বিশেষ কারণে ঠিক করা হয়েছে?

শের খাঁ বললেন, হ্যাঁ। আমরা মুসলমানরা দিনগণনা করি চন্দ্র দেখে। সেই হিসাবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে শুক্রবারের শুরু। শুক্রবারে মুসলমানরা যুদ্ধযাত্রা করে না। মোঘল বাহিনী নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাবে। আমরা মুসলমান হয়েও ঝাঁপিয়ে পড়ব।

খাওয়াস খাঁ বললেন, দিন নির্ধারণ ঠিক আছে।

শের খাঁ বললেন, মোঘল বাহিনী সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত হবে এই বিষয়ে আমি একশত ভাগ নিঃসন্দেহ। আমি ঝাড়খণ্ডের দলপতির নামে একটা মিথ্যা গল্প তৈরি করেছি। বারবার তার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেছি। মোঘলরা তা বিশ্বাস করেছে। আমাদের দুটা লাভ হয়েছে। এক, মোঘলদের বিশ্বাস অর্জন। দুই, দ্রুত যুদ্ধযাত্রা করার অনুশীলন।

শের খাঁ’র পুত্র সাইফ খাঁ বললেন, বারবার ঝাড়খণ্ডের দলপতির বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা যে একটি অনুশীলনের অংশ তা আমি আগে বুঝতে পারি নি।

শের খাঁ বললেন, এখন আমি কিছু কঠিন নির্দেশ দেব। এইসব নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে।

প্রথম নির্দেশ

সম্রাট হুমায়ূনকে কোনো অবস্থাতেই হত্যা বা গ্রেফতার করা যাবে না। তাকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে।

শের খাঁ’র পুত্ৰ জালাল খাঁ বললেন, আপনার এই নির্দেশের পেছনে কারণ কী?

শের খাঁ বললেন, একটিই কারণ। মানুষ হিসেবে আমি সম্রাটকে অত্যন্ত পছন্দ করি। আমি আমার দিক থেকে তার কোনো অমঙ্গল হতে দেব না।

দ্বিতীয় নির্দেশ

সম্রাটের পরিবারের সমস্ত নারী ও শিশু এবং তার হেরেমের নারীদের কোনোরকম অসম্মান বা ক্ষতি করা যাবে না।

তৃতীয় নির্দেশ

যে-কোনো মূল্যে বৈরাম খাঁকে হত্যা করতে হবে। বৈরাম খাঁ সিংহের মতো সাহসী আবার শৃগালের চেয়েও ধূর্ত। বৈরাম খাঁ বিহীন হুমায়ূন কোনো শক্তিই না।

শের খাঁ বললেন, এখন খাওয়াস খাঁ’র দায়িত্ব হলো বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে ঝাড়খণ্ডের চেরুহ। দলপতির বিরুদ্ধে মিথ্যা যুদ্ধযাত্রা করা। সম্রাট হুমায়ূন যেন খবর পান। আপনি দলপতিকে শায়েস্তা করতে যাচ্ছেন-আমি সেই ব্যবস্থা করব। আপনি সন্ধ্যা নামার পর ফিরে আসবেন।

খাওয়াস খাঁ বললেন, আমি কি এখনই যাত্রা করব?

শের খাঁ বললেন, এই মুহুর্তে।

ভোরবেলা নাশতা খেতে খেতে হুমায়ূন শুনলেন, শের খাঁ’র বিশাল বাহিনী খাওয়াস খাঁ’র নেতৃত্বে চেরুহ দলপতির বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেছে।

হুমায়ূন দুঃখিত গলায় বললেন, শের খাঁ বেচারা ভালো ঝামেলায় আছে।

সারাটা দিন সম্রাটের আনন্দে কাটল। তিনি তার কন্যা আকিকা। বেগমের সঙ্গে পাশা খেললেন। আকিকা বেগম পাশা খেলায় পিতাকে হারিয়ে দিলেন। সম্রাট কন্যার কাছে হেরে প্রভূত আনন্দ পেলেন। তিনি একটি শের আবৃত্তি করলেন। এই শেরটির ভাবাৰ্থ–

সেই ব্যক্তিই সৌভাগ্যবান যে বুদ্ধিতে নিজ পুত্ৰ-কন্যার হাতে পরাস্ত হয়।

আকিকা বেগম বলল, বাবা, আমি তোমাকে বুদ্ধিতে হারাই নি। পাশার দানে হারিয়েছি।

হুমায়ূন হাসতে হাসতে বললেন, একই ব্যাপার।

অম্বা মেয়েটির সঙ্গেও কিছু কথা বললেন। হুমায়ূন বললেন, আমার এখানে তুমি কি সুখে আছ?

অম্বা বলল, মহা সুখে আছি। আমি ইসলাম ধর্ম গ্ৰহণ করতে চাই।

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। আরও চিন্তা করো। সম্রাট দুপুরে আচার্য হরিশংকরের সঙ্গে বসলেন। তাঁর অনুবাদ শুনলেন। সর্বমোট দশ পৃষ্ঠা অনুবাদ হয়েছে। সম্রাট আচার্যকে দশটি রৌপ্যমুদ্রা দিলেন।

মাগরেবের নামাজের পর কোনোরকম খবর না দিয়ে সম্রাট উপস্থিত হলেন জেনানা তাঁবুতে। মহিলারা অভিভূত। অনেকদিন তাঁরা সম্রাটের দর্শন পায় না।

হুমায়ূন বললেন, দিল্লী ফিরে গেলে কেমন হয়?

সবাই একসঙ্গে বলল, খুব ভালো হয়।

আমরা এক সপ্তাহের মধ্যে দিল্লীর দিকে রওনা হব।

মহিলাদের আনন্দের সীমা রইল না। তাদের আগ্রহে সম্রাট রাতের খাবার জেনানা তাঁবুতে গ্ৰহণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। রাতের খাওয়ার শেষে গানবাজনার আয়োজন করা হলো।

আনন্দেরও এক ধরনের ক্লান্তি আছে। সম্রাট সেই ক্লান্তি নিয়ে রাতে ঘুমুতে গেলেন।

শের খাঁ’র বাহিনী কীর্তিনাশা নদীর উপরের কাঠের পুল দিয়ে পার হলো। শের খাঁ বিস্মিত হলেন। এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি পুল, সেখানে কোনো পাহারা নেই। শের খাঁ’র হস্তীবাহিনী কীর্তিনাশা সাঁতরে পার হলো।

মোঘল বাহিনীর পেছনে শের খাঁ’র সৈন্যদল। মোঘলরা আছে কীৰ্তিনাশা এবং গঙ্গার সঙ্গমস্থলে। পাঠানদের আক্রমণ শুরু হলে মোঘলদের যেতে হবে নদীর দিকে। শের খাঁ’র নির্দেশে কীর্তিনাশার কাঠের পুল ভেঙে দেওয়া হলো।

শের খাঁ’র বাহিনী ঘুমন্ত মোঘল সেনাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মোঘল অশ্বারোহীরা তাদের অশ্বের পিঠে জিন পরানোর সময়ও পেল না।

সম্রাটের ঘুম ভাঙল ‘পালাও’ ‘পালাও চিৎকারে। সম্রাট বিস্মিত হয়ে বললেন, কী হয়েছে?

জওহর আবতাবচি ভীত গলায় বলল, আমরা শের খাঁ কর্তৃক আক্রান্ত হয়েছি, এবং পরাজিত হয়েছি। মোঘল সৈন্যদের প্রায় সকলেই হত।

সম্রাট বললেন, আমি কি দুঃস্বপ্ন দেখছি?

জওহর আবিতাবচি বলল, না। সম্রাট, আপনাকে এক্ষুনি পালাতে হবে।

আহত মোঘল সেনাদের আর্তচিৎকার শোনা যাচ্ছে। মহিলা এবং শিশুদের কান্না শোনা যাচ্ছে।

হুমায়ূন ভেবে পেলেন না, তার তাঁবু কেন আক্রান্ত হয় নি। শের খাঁ’র উচিত ছিল সবার আগে সম্রাটকে হত্যা করা। এখানে কি শের খাঁ’র কোনো হিসাব আছে?

সম্রাট ঘোড়ায় চড়ে কীর্তিনাশা নদীর পাড়ে গেলেন। পুল ভাঙা। শত শত মোঘল সৈন্য পুলে উঠে সেখান থেকে ঝাঁপ দিয়ে পানিতে পড়ছে। নদীর স্রোতে ভেসে চলে যাচ্ছে। হাতিগুলিরও মনে হয় মস্তিষ্ক বিকৃতি হয়েছে। তারা কিছুতেই পানিতে নামবে না। অথচ এরা শিক্ষিত হাতি। যুদ্ধক্ষেত্রের সব পরিস্থিতির জন্যে তৈরি।

হুমায়ূন পেছন দিকে তাকালেন, তার তাঁবুতে আগুন জ্বলছে। আগুন ছুটে যাচ্ছে জেনানা তাঁবুর দিকে। আগুনের লেলিহান শিখায় আকাশ লাল। সম্রাট হুমায়ূনের ইমাম সাহেব উচ্চস্বরে আযান দিচ্ছেন, আল্লাহু আকবার। আল্লাহু আকবার। মহাবিপদের সময় আযান দিতে হয়। আজ মোগলদের মহাবিপদ।

সম্রাট ঘোড়া নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিলেন। মুহুর্তের মধ্যে ঘোড়া পানিতে তলিয়ে গেল। সম্রাট নিজেও তলিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ শুনলেন, কে যেন বলছে আমি আপনার দিকে একটা বাতাস ভর্তি মশক ছড়ে দিচ্ছি। আপনি মশক ধরে নদী পার হওয়ার চেষ্টা করুন।

তুমি কি আমাকে চেনো?

আপনি মোঘল সম্রাট হুমায়ূন।

তোমার নাম কী?

আমি নাজিম। ভিস্‌তিওয়ালা নাজিম। আপনি মশক শক্ত করে ধরে ভাসতে থাকুন।

নদীর প্রবল স্রোতে হুমায়ূন ভেসে যেতে শুরু করেছেন। তিনি দূর থেকে বললেন, আমি যদি বেঁচে যাই, যদি দিল্লীর সিংহাসনে বসতে পারি। তাহলে তোমার সৎকর্মের প্রতিদান আমি দেব। একদিনের জন্যে হলেও তুমি দিল্লীর সিংহাসনে বসবে।

ভোর হয়েছে।

হুমায়ূন-পত্নী বেগা বেগম শের খাঁ’র হাতে বন্দি হয়েছেন। ভয়ে এবং আতঙ্কে তিনি অস্থির। পরাজিত সম্রাটের স্ত্রীর জন্যে কী অসম্মান অপেক্ষা করছে তা তিনি জানেন। রাজপুত রমণীরা এমন অবস্থায় আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে জহর ব্ৰত পালন করেন। মুসলমানদের জন্যে আত্মহত্যা নিষিদ্ধ বলে এমন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না।

বেগা বেগমকে শের খাঁ’র সামনে উপস্থিত করা হলো। শের খাঁ বললেন, আপনি কাঁদছেন কেন?

বেগা বেগম বললেন, অসম্মানের ভয়ে কাঁদছি।

মা, শুনুন। আপনি যা ইচ্ছা করবেন তা-ই করা হবে। আমি আপনাকে মা ডেকেছি। পুত্রের হাতে মা’র কোনো অসম্মান হবে না এটা আপনি জানেন। আপনি কী চান বলুন?

আমি দিল্লী যেতে চাই।

আপনাকে এবং আপনার সঙ্গে যেসব মহিলা এবং শিশু আছে তাদের সবাইকে আমি এক্ষুনি দিল্লী পাঠাবার ব্যবস্থা করছি।

সম্রাট হুমায়ূনের নয়নমণি আকিকা বেগম এবং তার এক বান্ধবী অম্বাকে পাওয়া যাচ্ছে না।

আমি তাদের সন্ধানে লোক পাঠাচ্ছি। মা, আপনার আর কিছু কি লাগবে?

বেগা বেগম বললেন, অজুর পানি লাগবে। জয়নামাজ লাগবে। আমি দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ব।

নফল নামাজ শেষে প্রার্থনায় বসে হুমায়ূন-পত্নী বেগা বেগম বললেন, হে পরম করুণাময়, তোমার বান্দা শের খাঁ যে সম্মান আমাকে দিয়েছে সেই সম্মান তুমি তাকে বহুগুণে বর্ধিত করে ফেরত দিয়ে। হুমায়ূন-পত্নী হয়েও আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করছি, শের খাঁ যেন তার জীবনে কখনোই কোনো যুদ্ধে পরাজিত না হয়। (*চৌসার যুদ্ধের পর শের খাঁ কখনোই কোনো যুদ্ধে পরাজিত হন নি। তাঁর মৃত্যু হয়েছিল নিজের একটা কামানের বিস্ফোরণে।)

শুক্রবার। জুম্মার নামাজের সময় হয়েছে। শের খাঁ’র হাতে বন্দি সম্রাট হুমায়ূনের ইমামকেই নামাজ পড়াতে বলা হলো। ইমাম খুৎবায় হুমায়ূনের নাম নিলেন।

শের খাঁ বললেন, খুৎবা পাঠে সামান্য ভুল হয়েছে। ভুল কী হয়েছে ইমাম সাহেব জানেন। তাঁকে নতুন করে খুৎবা পাঠ করতে বলা হচ্ছে।

দ্বিতীয় দফায় খুৎবায় শের খাঁর নাম পাঠ করা হলো। নামাজের শেষে শের খাঁ নিজেকে ভারতের সম্রাট ঘোষণা করে শাহ্‌ উপাধি গ্ৰহণ করলেন। শের খাঁ হলেন শের শাহ্।

০৯. আপনি খুশি না আয়ে

আপনি খুশি না আয়ে
না আপনি খুশি চলে,
লাই হায়াত আয়ে,
কাজা লে চলি চলে।

(পৃথিবীতে নিজের খুশিমতো আসি নি, খুশিমতো চলেও যাব না। জীবন হাত ধরে নিয়ে এসেছিল বলেই এসেছি। মৃত্যু হাত ধরে নিয়ে চলে যাবে, তখন চলে যাব।)

সম্রাট হুমায়ূন মশক বুকে জড়িয়ে গঙ্গা নদীর তীরে শুয়ে আছেন। কখন নদীর স্রোত তাকে তীরে এনে ফেলেছে, তিনি জানেন না। অবসাদে, ক্লান্তিতে, হতাশা ও বিষণ্ণতায় তার চোখ বন্ধ। তিনি ঘুম এবং জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থায় আছেন। তার চোখের পাতা বন্ধ। সেই বন্ধ পাতা ভেদ করেও সূর্যের আলো তার চোখে ঢুকে যাচ্ছে। চোখ কটকট করছে, কিন্তু তিনি মাথা ফেরাতে পারছেন না।

আপনার কী হয়েছে?

সম্রাট অনেক কষ্টে চোখ মেললেন। ঘোর কৃষ্ণবর্ণের এক রমণী কলসি হাতে তার সামনে দাঁড়িয়ে। সে গঙ্গার পানি নিতে এসেছিল। রমণীর বয়স অল্প। মুখশ্ৰী কোমল।

আপনি কে?

সম্রাট বললেন, আমি বাদশাহ হিন্দুস্থান।

রমণী বলল, বাদশাহ হিন্দুস্থান থাকবেন সিংহাসনে। কাদাপানিতে না।

পায়ে সামান্য কাঁটা ফুটলেও হাতির মতো প্ৰাণী অচল হয়ে যায়। আমি পায়ে কাঁটা-ফোটা হাতি। তুমি কি আমাকে কোনো খাবার দিতে পার?

আমার ঘরে ছাতু ছাড়া কিছু নেই। গুড় দিয়ে ছাতু মেখে দিলে খেতে পারবেন?

পারব। কিছু দুধ কি জোগাড় করতে পারবে? আমার শরীরের এই অবস্থায় দুধ বলকারক।

দুধের ব্যবস্থা করতে পারব।

তুমি যে সেবা আমাকে করবে তা হাজার গুণে আমি ফেরত দেব। আমি ঋণ রাখি না। তোমার নাম কী?

লছমি বাই। আমি বুঝতে পারছি আপনার নড়াচড়ার শক্তিও নেই।

আপনি শুয়ে থাকুন। আমি খাবার এবং লোকজন নিয়ে আসছি।

শুকরিয়া। আমি যে হিন্দুস্তানের সম্রাট এটা কি বিশ্বাস হচ্ছে না?

না। আপনি এক দুর্ভাগা মজনুন (পাগল)।

ভালো বলেছ, আমি এক দুর্ভাগা মজনুন।

লছমি বাই চলে গেল। তাঁর গায়ের উপর দিয়ে একটা শকুন চক্কর খাচ্ছে। এটা অলক্ষণ। শকুন আগেভাগে মৃত্যুর খবর পায়। এই শকুনটা কি বুঝে ফেলেছে তিনি মারা যাচ্ছেন? ক্লান্ত অবসন্ন সম্রাট উড়ন্ত শকুন দেখতে দেখতে আবারও ঘুমিয়ে পড়লেন।

বটগাছের নিচে দু’জন মোঘল চিন্তিত ভঙ্গিতে বসা। শের শাহ’র একদল সৈন্য বটগাছ ঘিরে আছে। তাদের কাছে খবর আছে এই দুজনের একজন দুর্ধর্ষ সেনাপতি বৈরাম খাঁ। বৈরাম খাঁকে হত্যা করে তার কাটা মাথা শের শাহ-কে দেখাতে হবে।

তোমাদের মধ্যে কে বৈরাম খাঁ?

দুজনই বলল, আমি বৈরাম খাঁ। দু’জনের একজন বৈরাম খাঁ। অন্যজন আবুল কাশেম খাঁ। তিনিও সম্রাট হুমায়ূনের একজন সেনাপতি।

তোমাদের মধ্যে একজন মিথ্যা কথা বলছ। সে কে? আঙুল তুলে দুজনই একে অন্যকে দেখালেন।

বৈরাম খাঁ’র চেহারা বৈশিষ্ট্যহীন। ছোটখাটো মানুষ। মুখের চামড়া কুঁচকানো। মাথার চুল খাবলা খাবলা করে উঠে গেছে। অন্যদিকে কাশেম খাঁ অসম্ভব রূপবান। স্বাস্থ্যু-সৌন্দর্যে ঝলমলে একজন মানুষ। কাশেম খাঁ’র মাথায় একটাই চিন্তা-যে-কোনোভাবেই হোক বৈরাম খাঁকে রক্ষা করতে হবে। অসহায় সম্রাট হুমায়ূনের এই মুহুর্তে বৈরাম খাঁকে দরকার। আবুল কাশেম খাকে না পেলেও সম্রাটের চলবে।

কাশেম খাঁ শের শাহ’র সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমরা চেহারা দেখে বুঝতে পারছি না কে বৈরাম খাঁ? ওই উজিবুকটা আমার নফর। সে মুনিবের জীবন রক্ষা করতে গিয়ে বৈরাম খাঁ সেজেছে। তার কত বড় স্পর্ধা!

শের শাহু’র সৈন্যদের কাশেম খাঁ’র কথা যুক্তিযুক্ত মনে হলো। তারা সঙ্গে সঙ্গেই কাশেম খাঁকে হত্যা করে তার কাটা মুণ্ডু নিয়ে উল্লাস ধ্বনি করতে করতে শের শাহ’র তাঁবুর দিকে রওনা হলো। আসল বৈরাম খাঁ’র দিকে কেউ ফিরেও তাকাল না।

ইতিহাস কাউকে কাউকে মনে রাখে। আবার কাউকে রাখে না। বৈরাম খাঁ’র বীরত্বগাথা ইতিহাস মনে রেখেছে। কাশেম খাঁ’র বীরত্বগাথা মনে রাখে নি।

প্রবল জ্বরে হুমায়ূন ঘোরের মধ্যে চলে গেছেন। তিনি গঙ্গা নদীর তীরেই কাদামাখা অবস্থায় পড়ে আছেন। বর্ষার ক্লান্তিহীন বর্ষণ হচ্ছে। নদীর পানি ফুলে ফোঁপে উঠছে। পানি উঠে এসেছে কোমর পর্যন্ত। ধুপ ধুপ শব্দে নদীর পাড় ভাঙছে। হুমায়ূনের ধারণা হলো, পাড় ভেঙে তিনি আবারও নদীতে পড়বেন। এবার পড়লে আর রক্ষা নেই। মাশকের বাতাস বের হয়ে গেছে। সম্রাট চেষ্টা করলেন হামাগুড়ি দিয়ে এগুতে। পারলেন না। আশ্চর্যের ব্যাপার শকুনটা এখনো আছে। তার মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করছে। এই পাখিটির কাছে জীবন্ত প্ৰাণী অর্থহীন। মৃত প্রাণীই শুধু অর্থবহ। তিনি আবারও জ্ঞান হারালেন। অচেতন অবস্থায় তাঁর মনে হলো আকিকা বেগম তাকে ডাকছে—পিতাজি পিতাজি। তার মেয়ে কখনো তাকে পিতাজি ডাকে না। আজ কোন ডাকছে? তাকে পিতাজি ডাকে অম্বা নামের মেয়েটা। আকিকা কি অম্বার কাছ থেকে পিতাজি ডাক শিখেছে?

হুমায়ূনের কন্যা আকিকা বেগম এবং অম্বা আছে আচার্য হরিশংকরের সঙ্গে। হরিশংকর এই দুজনকে নিয়ে পালিয়েছিলেন। হরিশংকর বলেছিলেন, তোমরা আমার দুই কন্যা। আমার জীবন থাকতে তোমাদের কিছু হবে না। আমি তোমাদের লুকিয়ে রাখব। পরিস্থিতি শান্ত হলে দিল্লী পাঠানোর ব্যবস্থা করব।

হরিশংকর অম্বাকে তার গ্রামের মানুষদের হাতে তুলে দিলেন। সহমরণ থেকে পালিয়ে আসা মেয়ে হলো কলঙ্কের কলসি। এই কলসি চূৰ্ণ হওয়া প্রয়োজন। যারা এই কাজে সাহায্য করবে তারা সবাই পুণ্যের ভাগ পাবে। হরিশংকরের পুণ্য প্রয়োজন।

গঙ্গার তীরে রাতারাতি আগুন করে জ্বলন্ত অগ্নিতে অম্বাকে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। ভয়াবহ চিৎকারে অম্বা ডাকল, আকিকা। আকিকা।

আকিকা বেগম বান্ধবীকে বাঁচানোর জন্যে দৌড়ে আগুনে ঢুকে গেল। আগুনের লেলিহান শিখা আকাশ স্পর্শ করছে। সেই আগুনের ভেতর দুই বান্ধবী দুজনকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করছে, পিতাজি! পিতাজি!

সম্রাট অচেতন জগৎ থেকে চেতন জগতে ফিরলেন। তিনি অবাক হয়ে লক্ষ করলেন, তিনি মাটির ঘরে দড়ির এক চৌপায়ায় শুয়ে আছেন। তাঁর গায়ে দুৰ্গন্ধ কাঁথা। মাথার কাছে কুপি জুলছে। কুপি থেকে বুনুকা বুনকা কালো ধোঁয়া উঠে ঘর অন্ধকার করে দিচ্ছে। গালভাঙা এক প্রৌঢ় খালি গায়ে তার পায়ের কাছে বসে আছে। প্রৌঢ় তার পায়ে তেল ঘষছে। চার-পাঁচ বছর বয়সের এক উলঙ্গ ছেলে কুকুরের মতো হামাগুড়ি দিয়ে বসে একদৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। ঘরের ভেতর চুলা জুলছে। মাটির হাঁড়িতে কিছু রান্না হচ্ছে। ঝাঁঝালো গন্ধ আসছে। গঙ্গার পাড়ে দেখা হওয়া তরুণীই রাঁধছে। তরুণীর নাম সম্রাটের মনে পড়ল-লছমি বাই।

সম্রাটকে চোখ মেলতে দেখেই তরুণী প্রৌঢ়কে চোখে ইশারা করল। প্রৌঢ় এগিয়ে এসে সম্রাটের মাথা তুলে ধরল। লছমি মাটির ভাড় সম্রাটের মুখের কাছে ধরে বলল, মহিষের গরম দুধ। খেলে বল পাবেন।

হুমায়ূন দুধ পান করলেন। হ্যাঁ এখন কিছুটা ভালো লাগছে। সম্রাট বললেন, জায়গাটার নাম কী?

বীরভূম।

গ্রামের নাম কী?

নোকরা।

এই নামগুলি মনে রাখতে হবে। সম্রাট ঠিক করেছেন, তিনি যদি দিল্লীতে ফিরে আবার সিংহাসনে বসতে পারেন তাহলে হতদরিদ্র এই পরিবারের ভাগ্য ফিরিয়ে দেবেন। এই কারণেই নামগুলি মনে রাখা দরকার। তিনি বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন, লছমি বাই, বীরভূম, নোকরা। লছমি বাই, বীরভূম, নোকরা। লছমি বাই, বীরভূম, নোকরা…

সম্রাটের কথায় বাচ্চা ছেলেটা মজা পেয়ে হেসে উঠতেই প্রৌঢ় এসে সশব্দে তার গালে চড় দিল। চড় খেয়েও বাচ্চাটির কোনো ভাবান্তর হলো না। তার মুখ এখনো হাসি হাসি।

আচার্য হরিশংকর ভীত চোখে তাকিয়ে আছেন শের শাহ’র দিকে। শের শাহের লোকজন তাকে ধরে এনেছে।

শের শাহ বললেন, সম্রাটের মেয়ে আকিকা বেগম কোথায়?

হরিশংকর বললেন, আমি জানি না। জেনানা মহলে যখন হইচই শুরু হলো সে ছুটে গেল নদীর দিকে। আমার ধারণা সে নদীতে ড়ুবে মরেছে।

তোমার সঙ্গে একটা পুঁটলিতে বেশ কিছু ধনরত্ন পাওয়া গেছে। এগুলি কোথায় পেয়েছ?

সম্রাট হুমায়ূন উপহার হিসেবে আমাকে দিয়েছেন।

ধনরত্বের মধ্যে কানের দুল আছে, গলার হার আছে। এগুলি কি তিনি তোমাকে উপহার হিসেবে দিয়েছেন?

আমার এক কন্যার জন্যে এইসব উপহার।

আমি যে এখন দিল্লীর সম্রাট এটা কি জানো?

জানি।

সম্রাটের সামনে মিথ্যা বলা যায় না এটা জানো?

হরিশংকর চুপ করে রইলেন।

শের শাহ্ বললেন, হুমায়ূনের মেয়ে আকিকা বেগমের মৃত্যুর জন্য তুমি দায়ী। তোমাকে আমি মৃত্যুদণ্ড দিলাম। তুমি জ্ঞানী মানুষ। আমি জ্ঞানকে সম্মান করি। কাজেই তোমাকে একটা বিশেষ সুবিধা আমি দেব।

সম্রাট শের শাহ’র অনেক দয়া।

শের শাহ্ বললেন, হ্যাঁ আমার অনেক দয়া। তবে পরাজিত মোঘল সম্রাট হুমায়ূনের মতো দয়া আমার নেই। তোমাকে যে বিশেষ সুবিধা আমি দেব তা হলো কোন পদ্ধতিতে তুমি মৃত্যু চাও তা তুমি ঠিক করবে। আমার হাতে অনেক পদ্ধতি আছে। যেমন–

১. হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে মৃত্যু।

২. শূলদণ্ড।

৩. তলোয়ার দিয়ে মাথা কেটে আলাদা করা।

৪. আগুনে পুড়ে মৃত্যু।

হরিশংকর শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। তাঁর ঠোঁট কাঁপছে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। শের শাহ্ বললেন, তুমি নিজে যদি তোমার পছন্দের কোনো বিশেষ পদ্ধতিতে মরতে চাও তাও করা হবে। বলো কী পদ্ধতিতে মরবে?

হরিশংকর কিছু বলতে পারলেন না। শের শাহ তাকে আগুনে পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দিয়ে দলবল নিয়ে বের হলেন—সম্রাট হুমায়ূনের খবর পাওয়া গেছে। গ্রাম নোকরা, জেলা বীরভূম।

লছমি বাইয়ের বাড়ি শের শাহ’র সৈন্যরা ঘিরে রেখেছে। লছমি বাইকে আনা হয়েছে শের শাহ’র সামনে। শের শাহ ঘোড়ার উপর বসে আছেন। তাঁর দুইপাশে দুই পুত্র। তারাও ঘোড়ার পিঠে। শের শাহ বললেন, তোমার নাম?

লছমি বাই।

হুমায়ূন কোথায়?

জানি না।

তুমি তাকে সেবা-শুশ্রুষা করেছ?

হ্যাঁ।

তুমি কি তাঁর পরিচয় জানতে?

উনি নিজেকে হিন্দুস্তানের সম্রাট বলেছিলেন। আমি বিশ্বাস করি নাই।

হুমায়ূন কোন পথে পালিয়েছেন?

লছমি জবাব দিল না। চুপ করে রইল।

তিনি কোন দিকে গেছেন তা জেনেও যদি না বলো তাহলে তোমার শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। এখন বলো।

আমি বলব না।

শের শাহ তার বড় পুত্ৰ জালাল খাঁ’র দিকে তাকিয়ে বললেন, হুমায়ূন নামের ওই মানুষটার কী অদ্ভূত ক্ষমতা লক্ষ করেছ? মেয়েটি কিছুক্ষণ তাঁর সঙ্গে ছিল। এই কিছুক্ষণেই তার মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। সে হুমায়ূনকে রক্ষা করবে, বিনিময়ে প্রাণ দিতেও প্রস্তুত। এই ঘটনা আমাদের জন্যে ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদ।

দুঃসংবাদ কেন?

জাদুকরী ক্ষমতার হুমায়ূনের মতো মানুষরা যা কিছু হারায় সবই ফিরে পায়। মানুষের ভালোবাসার কারণে ফিরে পায়। মানুষের ভালোবাসা আমরাও যেন ফিরে পাই সেই চেষ্টা এখন থেকেই করতে হবে।

জালাল খাঁ হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লেন। শের শাহ্ লছমি বাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি একজন অসুস্থ, হতাশ এবং ভগ্নহৃদয় মানুষকে সেবা-যত্ন করে সুস্থ করেছ। তাঁকে রক্ষার চেষ্টা করেছ। মানুষটি আমার শক্র হলেও তোমার আচরণে আমি খুশি। এই স্বর্ণমুদ্রাটি রাখো। আমার বকশিশ।

লছমি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, নড়ল না। লছমি বাইয়ের স্বামী মুখভর্তি হাসি নিয়ে এগিয়ে এল।

সম্রাট হুমায়ূন নদীপথে আগ্রার দিকে রওনা হয়েছেন। অতি সাধারণ মাছ ধরার নৌকা। নৌকার মাঝি তিনজনই বলশালী। তারা আরোহীর পরিচয় জানে না।

হুমায়ূন দুপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে যাচ্ছেন। কয়েকবারই তাঁর মনে হলো, পৃথিবী এত সুন্দর কেন? তার হাতে কাগজ-কলম নেই, তিনি মনে মনে একটি শের রচনা করলেন। শেরটির ভাবাৰ্থ–

আমরা বাস করি সুন্দরের মধ্যে
সুন্দরকে ঘিরে থাকে অসুন্দর।
যেমন পুণ্যের চারদিকে থাকে
পাপের শক্ত খোলস।
ভাগ্যবান সেইজন যে অসুন্দরের পর্দা ছিঁড়ে
সুন্দর দেখে। পুণ্যের কাছে যায় পাপের
শক্ত খোলস ভেঙে।।

সম্রাট নৌকার পাটাতনে শুয়ে আছেন। আকাশ মেঘে ঢাকা। হিন্দুস্থানের কঠিন রোদ এখন আর তার চোখে লাগছে না। আরামদায়ক বাতাসে চোখ বুজে আসছে। তাকে ঘুমুলে চলবে না। জেগে থাকতে হবে।

তিনি চোখ বন্ধ করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে লাগলেন। শের শাহ্‌কে অতি দ্রুত পরাজিত করতে হবে। তিনি কি ভাইদের সাহায্য পাবেন? অবশ্যই পাবেন। ভাইদের প্রতি স্নেহ এবং মমতার কোনো অভাব তিনি দেখান নি। সাধারণ নিয়মে সিংহাসনে বসার পরপর ভাইদের হত্যা করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে কেউ বিদ্রোহ করতে না পারে। তিনি তা করেন নি। তিনি পিতার আদেশ মনে রেখেছেন।

মৃত্যুর আগে সম্রাট বাবর পুত্র হুমায়ূন মীর্জার হাত ধরে বলেছিলেন, আমার মন বলছে তোমার ভাইরা তোমাকে অনেক যন্ত্রণা দেবে, তারপরেও তুমি তাদের প্রতি কোমল থাকবে। যে ভাইদের প্রতি কোমল থাকে, আল্লাহপাক তার প্রতি কোমল থাকেন। নৌকার মাঝির কথায় তার চিন্তা বাধাগ্ৰস্ত হলো।

নৌকার মাঝি বলল, হুজুর, বিশাল একটা নৌকা আমাদের পিছনে পিছনে আসছে। আমাদের থামতে ইশারা করছে। আমরা কি থামাব?

হুমায়ূন শুয়ে রইলেন। জবাব দিলেন না। তার কাছে কোনো জবাব নেই।

নৌকার মাঝি বলল, ওই নৌকায় সৈন্য আছে। আমরা না থামলে বিরাট সমস্যা হবে।

শের শাহ’র সৈন্য?

মাঝি বলল, সে রকমই অনুমান করি। চারদিকেই এখন শের শাহ’র সৈন্য।

হুমায়ূন বললেন, ছোট কোনো খালে নৌকা ঢুকিয়ে দিতে পার?

পারি। তাতে লাভ হবে না। আমরা ওদের নজরের মধ্যে আছি। খালে নৌকা ঢোকালে ওরাও খালে ঢুকবে।

হুমায়ূন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন।

হুজুর! ওরা খুব কাছে চলে এসেছে।

হুমায়ূন হতাশ গলায় বললেন, আসুক। আর তখনই শুনলেন ওই নৌকা থেকে কে একজন বলছে—হিন্দুস্থানের মহান সম্রাট হুমায়ূন কি নৌকায় আছেন?

কণ্ঠস্বর হুমায়ূনের পরিচিত। অবিকল বৈরাম খাঁ’র গলা। প্রচণ্ড মানসিক চাপে মানুষের মাথা এলোমেলো হয়ে যায়, তখন সে নানান ধরনের ভ্রান্তির মধ্যে পড়ে। তার বেলাতেও কি এরকম হয়েছে?

সম্রাট উঠে বসলেন। অবাক হয়ে দেখলেন, পনেরো জনের মতো মোঘল সৈন্য নিয়ে বৈরাম খাঁ নৌকায় দাড়ানো।

সম্রাটের চোখে পানি এসে গেল। তিনি মনে মনে বললেন, বৈরাম খাঁকে পেয়েছি। আমার আর কোনো ভয় নেই।

বৈরাম খাঁ। ভালো আছেন?

সম্রাট ভালো থাকলেই আমি ভালো।

আপনাকে দেখে আমি বুকে এক শ’ হাতির বল পাচ্ছি। আল্লাহপাকের দরবারে হাজার শুকরিয়া। নৌকার তিন মাঝি হতভম্ব হয়ে তাকাচ্ছে। তারা ঘটনা কিছুই বুঝতে পারছে না।

হরিশংকরকে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপের সব ব্যবস্থা সম্পন্ন। বৃষ্টির পানিতে কাঠ ভেজা থাকায় আগুন ধরাতে সমস্যা হচ্ছিল। কাঠে তাপিন এবং গালা ঢেলে এই সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। এখন সুন্দর আগুন জুলছে। হরিশংকর মন্ত্রমুগ্ধের মতো জ্বলন্ত আগুনের দিকে তাকিয়ে আছেন। অগ্নিমন্ত্র পাঠ করে সাধু-সন্তরা আগুন নেভাতে ও জ্বালাতে পারেন। হরিশংকর জানেন তিনি সাধু-সন্তদের একজন না। অগ্নিমন্ত্র তার ক্ষেত্রে কাজ করবে না, তারপরেও তিনি অগ্নিমন্ত্র জপ করার চেষ্টা করলেন। কিছুতেই মন্ত্রের প্রথম চরণ মনে এল না, মাঝখানের একটা লাইন শুধু মাথায় আসছে—

যা অগ্নিদায়েনো নমঃ ভূপে…

এই সময় হঠাৎ করে বিরাট হইচই শুরু হলো। সম্রাট হুমায়ূন নাকি ধরা পড়েছেন। তাকে এখানে আনা হচ্ছে। সম্ভবত হুমায়ূনকেও অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হবে। চরম বিশৃঙ্খলার সুযোগে হরিশংকর পালিয়ে গেলেন।

সম্রাট হুমায়ূনের ধরা পড়ার সংবাদ মিথ্যা। ধরা পড়েছে কামানচির এক সেনাপতি তোরাবি জান।

জুলন্ত অগ্নিতে তোরাবি জানকে নিক্ষেপ করা হলো।

১০. ভগ্নহৃদয় হুমায়ূন

ভগ্নহৃদয় হুমায়ূন আগ্ৰায় পৌঁছেছেন। ফরমান জারি করেছেন, তিনি মাগরেবের নামাজের আগে কারও সঙ্গেই দেখা করবেন না। সম্রাট রোজা রেখেছেন। সূর্যাস্তের পর রোজা ভেঙে নামাজ আদায় করবেন। তারপরই যদি তার মন চায় তিনি পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেন। ঘনিষ্ঠজনদের একটি তালিকাও তিনি জওহর আবতাবচির কাছে দিয়েছেন। তালিকায় আছেন তাঁর মা, কামরান মীর্জার মা এবং বোন গুলবদন।

সম্রাট বিছানায় শুয়ে আছেন। চোখ বন্ধ। তাঁর সামান্য শ্বাসকষ্টও হচ্ছে। গঙ্গা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় ডানপায়ে ব্যথা পেয়েছিলেন। সেই ব্যথা এখন প্রবল। পা ফুলে উঠেছে। তাঁর শোবার ঘরের দরজা আধাখোলা। দরজার বাইরে রুপার ছোট ঘণ্টা। সেই ঘণ্টা বেজে উঠল। সম্রাট বিরক্ত গলায় বললেন, আমি ফরমান জারি করেছি। কারও সঙ্গেই সাক্ষাৎ করব না।

কোমল নারীকণ্ঠ দরজার বাইরে থেকে বলল, আমি সম্রাটের কাছে আসি নি। আমি আমার ভাইয়ের কাছে এসেছি।

গুলবদন! কী চাও?

আমি আমার ভাইকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ কাঁদতে চাই।

এসো। ভেতরে এসো।

গুলবদন ছুটে এসে বিছানায় শোয়া হুমায়ূনকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন।

হুমায়ূন বোনের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে নিজেও কাঁদলেন। একটি শের আবৃত্তি করলেন। যার অর্থ, পৃথিবীর পবিত্রতম বস্তু হলো গভীর দুঃখ থেকে নিঃসৃত অশ্রুধারা।

গুলবদন বললেন, আমি সম্রাটের জন্যে দুটি আনন্দসংবাদ নিয়ে এসেছি। সম্রাট অনুমতি দিলে সংবাদ দুটি তাঁকে দেব।

হুমায়ূন বললেন, আমার বোন গুলবদন সম্রাটের অনুমতি ছাড়াই যা ইচ্ছা বলতে পারে। সে সম্রাটের অনুমতির ঊর্ধ্বে।

প্রথম সুসংবাদ। আপনার বিদ্রোহী ভাইদের শুভবুদ্ধি জাগ্রত হয়েছে। তারা আপনার ক্ষমার অপেক্ষায় আছে। মোঘল সাম্রাজ্যের প্রবল দুঃসময়ে তারা একত্রিত হয়ে আপনার সঙ্গে শের শাহ’র বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করবে। কামরান মীর্জা পঁচিশ হাজার সৈন্য নিয়ে প্রস্তুত। আপনার অনুমতি পেলে সে শের শাহ’র বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করবে।

সম্রাট বললেন, এই সংবাদে আমি পরম করুণাময় আল্লাহপাকের দরবারে শুকুরগোজার করছি। দ্বিতীয় সুসংবাদটি বলো।

আপনি কামরান মীর্জার কাছ থেকে জাদুবিদ্যার একটি বই অনেকদিন থেকে চাচ্ছিলেন। কামরান মীর্জা বইটি নিয়ে এসেছেন। তিনি নিজে আপনার হাতে তুলে দেবেন।

সম্রাট দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, জাদুবিদ্যার অতি মূল্যবান একটি বই আমাকে শের শাহ্ দিয়েছিলেন। আফসোস সেই বইটা নাই। হারিয়ে ফেলেছি।

গুলবদন বললেন, সম্রাট শুধু বই কেন, অনেক কিছুই তো আপনি হারিয়ে ফেলেছেন।

ঠিক বলেছ। আমার প্রাণপ্ৰিয় কন্যা আকিকা বেগম নাই। তাকে নিয়ে অদ্ভুত সব দুঃস্বপ্ন দেখি। পালিয়ে যাওয়ার আগে কেন যে মেয়েটাকে নিজের হাতে হত্যা করলাম না!

গুলবদন বললেন, যা কিছু ঘটে আল্লাহপাকের নির্দেশেই ঘটে। এই ভেবে শান্তি পাওয়ার চেষ্টা করুন।

সম্রাট বললেন, এই ভেবে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা আমি সবসময় করি। তাতে লাভ হয় নি। মন শান্ত হয় না। মনের উপর কর্তৃত্ব মানুষের নেই। মন’ আল্লাহপাকের হাতে।

কথা শেষ করেই সম্রাট হঠাৎ কাঁদতে কাঁদতে তার আদরের কন্যাকে ডাকতে লাগলেন, মা আকিকা। আয় আমার কোলে আয় মা।

হতাশ এবং ক্লান্ত হুমায়ূন আগ্ৰায় ফিরে প্রবল জ্বরের মধ্যে পড়লেন। কোনো চিকিৎসাতেই জ্বরের উপশম হলো না। হুমায়ূনভগ্নি গুলবদন ভাইয়ের রোগমুক্তির জন্যে এক মাস রোজা মানত করলেন।

জ্বরের দশম দিনে সম্রাট বিছানায় উঠে বসলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, শাসনকার্য পরিচালনায় তিনি এখন সক্ষম। আগামীকাল থেকে দরবারে বসবেন।

হুমায়ূনের রোগমুক্তি উপলক্ষে আনন্দ-উৎসবের আয়োজন করা হলো। সম্রাটের ওজনের সমপরিমাণ ওজনের রৌপ্যমুদ্রা গরিবদুঃখীদের বিতরণ করা হলো।

সম্রাট দরবারে বসেছেন। তাঁর ভাইরাও উপস্থিত। হুমায়ূন তিন ভাইয়ের জন্য উপহার ঘোষণা করলেন। প্রত্যেকেই একটি করে ঘোড়া, পোশাক, এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা পেলেন। তিনজনকেই একটি করে নীলকান্তমণি দেওয়া হলো। দরবারে উপস্থিত আমীররা নীলকান্তমণির সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে মারহাবা মারহাবা ধ্বনি দিলেন। সম্রাট অত্যন্ত আবেগময় ভাষায় বললেন, আমার তিন &