Monday, May 20, 2024
Homeগোয়েন্দা গল্পআলাস্কা অভিযান (তিন গোয়েন্দা) - রকিব হাসান

আলাস্কা অভিযান (তিন গোয়েন্দা) – রকিব হাসান

তিন গোয়েন্দা সিরিজ - রকিব হাসান

বাঁয়ে তীক্ষ্ণ মোড় নিল বুশ প্লেন। ফায়ারওয়ালে বুট চেপে ধরে নিজেকে সামলাল পাইলটের পাশের সিটে বসা মুসা। থাবা দিয়ে ধরে ফেলল মাথার ওপরের হাতলটা। জানালা দিয়ে তাকাল হাজার ফুট নীচে।

পাইলট ডিউক আইকহ্যাম বুড়ো আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, ওই, যে গ্লিটার টাউন।

শহরটাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে মুসা। যেদিকেই তাকায়, শুধু গাছ আর গাছ। সাদা রঙের চওড়া একটা কাস্তে চলে গেছে যেন গাছের জঙ্গলকে ভেদ করে। ওপর থেকে মহাসড়কের মত লাগছে কাস্তেটাকে। কিন্তু মুসা জানে, ওটা রাস্তা নয়, নদী। ইউকন রিভার। বছরের এ সময়টায় নদীর পানি জমাট বরফ। দশ ফুট পুরু হয়ে বরফের স্তর পড়েছে। শহরটা চোখে পড়ল হঠাৎ। নদীর দিকে মুখ করা। দূর থেকে বাড়ি-ঘরগুলোকে খেলনার মত লাগছে। ওখানেই চলেছে কিশোর ও মুসা।

দারুণ! চিৎকার করে বলল মুসা। সাংঘাতিক!

হাসল ডিউক। এটা সত্যিকারের বুশ কান্ট্রি। নির্জন। বিশাল এলাকা জুড়ে কোন মানুষের দেখা পাবে না।

বিগ কান্ট্রি আলাস্কা! বিড়বিড় করে বলল পিছনের সিটে বসা কিশোর। এয়ারস্ট্রিপটা কই, ডিউক? শুরুতে মিস্টার ডিউক বলেছিল, কিন্তু ডিউক জোরে হাত নেড়ে বাতাসে থাবা মেরে জানিয়ে দিয়েছে, শুধু ডিউক। মিস্টার-ফিস্টার ভাল্লাগে না আমার।

ডিউকের হাসিটা চওড়া হলো। আছে তো। ওই যে নীচেই। এক মাইল চওড়া, দুই হাজার মাইল লম্বা।

তারমানে নীচের ওই বরফে ল্যাণ্ড করবেন? অবাক হলো মুসা।

এত অসমান…

আগে আরও খারাপ ছিল, ডিউক জানাল। গেল শীতে এখানকার লোকে সমান করে দিয়েছে। আমার নামার সুবিধের জন্য। আচমকা সামনের দিকে নিচু হয়ে গেল প্লেনের নাক। গাছের ওই সারি দুটো দেখছ? ওগুলোই রানওয়ের নিশানা। দুটোর ঠিক মাঝখানে নামালে আর কোন ভয় নেই।

থ্রটল অ্যাডজাস্ট করল ডিউক। ফ্ল্যাপ নামিয়ে, গতি কমিয়ে নামার জন্য তৈরি হচ্ছে।

শূন্য থেকে পাথর পড়ার মত ঝপ করে অনেকখানি নীচে নেমে এল প্লেন। এয়ার পকেটে পড়েছে। পেটের মধ্যে পাক দিয়ে উঠল মুসার। ডিউকের সঙ্গে কথা বলাটা এখন নিরাপদ নয়। কাঁধের ওপর দিয়ে ফিরে তাকাল কিশোরের দিকে। দারুণ একটা অ্যাডভেঞ্চার হবে, কী বলো? জোসিও আমাদের দেখলে খুশি হবে। বিশ্বাসই করতে পারবে না, ওর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে সত্যি সত্যি চলে আসব আমরা।

তা ঠিক, মাথা ঝাঁকাল কিশোর।

জোসি মানে জোসেফ টিনুক। ওদের বন্ধু। অ্যাথাবাস্কান। গ্লিটারের স্থানীয় অধিবাসী। জন্মের পর থেকেই নীচের ওই খুদে শহরটায় বাস করছে। ব্যুরো অভ ইণ্ডিয়ান অ্যাফেয়ার্সের স্পন্সর করা খেলাধূলার প্রোগ্রামে ফুটবল খেলতে কিছু দিনের জন্য লস অ্যাঞ্জেলেসে যাবার সুযোগ পেয়েছিল। কয়েক হপ্তা কাটিয়ে এসেছে তিন গোয়েন্দার সঙ্গে, রকি বিচে। ফিরে আসার সময় গ্লিটার টাউনে ওদেরকে দাওয়াত করেছিল জোসি। বসন্তের ছুটিতে স্কুল বন্ধ হতেই তাই বেরিয়ে পড়েছে কিশোর ও মুসা। আলাস্কাও দেখা হবে, ভগ জে রেসে বন্ধুকে সাহায্যও করতে পারবে। অ্যাঙ্কারেজ থেকে শুরু হয় ইডিটাররাডের বিখ্যাত এই কুকুর-দৌড়।

বাবা-মার সঙ্গে নিউ ইয়র্কে যেতে হয়েছে রবিনকে, তাই আসতে পারেনি। ওর বাবা মিস্টার মিলফোর্ড ওখানকার একটা বড় পত্রিকায় কাজ নিয়েছেন। যদি ভাল লাগে, ওখানেই থেকে যাবেন, রকি বিচে আর ফিরবেন না। আপাতত ওখানকার কোনও একটা স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হবে রবিনকে। বন্ধুদের ছেড়ে যেতে হচ্ছে বলে দুঃখে কাতর হয়ে পড়েছিল রবিন। মুসা তো কেঁদেই ফেলেছিল। মন খারাপ হয়ে। গিয়েছিল কিশোরেরও।

শক্ত হয়ে বসো, ডিউকের কথায় ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে এল কিশোর।

প্লেনের নাক আরও নামিয়ে দিল ডিউক।

মাথার ওপরের হ্যাণ্ডেলটায় মুসার আঙুলের চাপ আরও শক্ত হলো। ওপর থেকে নীচে তাকিয়ে ওর মনে হচ্ছে, প্লেনটা নামছে না, বরং বিশাল ধরণীই দ্রুতবেগে উঠে আসছে ওদের দিকে।

আরও গতি কমাল ডিউক। জয় স্টিক টেনে নাক সোজা করল। সামান্য সামনে ঠেলে দিল স্টিকটা। নদীর বরফ স্পর্শ করল প্লেনের স্কি। রিভার্স-এ দিল প্রপেলার। থ্রটল বাড়িয়ে দিল। গর্জন করে উঠল ইঞ্জিন। থরথর করে কেঁপে উঠল প্লেনের শরীর। আঁকি খেল দুতিনবার। নাচতে নাচতে এগিয়ে গেল কয়েক গজ। তারপর থেমে গেল।

হাত বাড়িয়ে সুইচ টিপে মোটর বন্ধ করে দিল ডিউক। জোরে নিঃশ্বাস ফেলল। হঠাৎ করে নীরবতা এসে ধাক্কা মারল যেন কানের পর্দায়। রীতিমত ব্যথা হচ্ছে কানে।

পার্কার জিপার তুলে দাও, বলতে বলতে দরজা খোলার হ্যাণ্ডেলের দিকে হাত বাড়াল ডিউক। এখানকার ঠাণ্ডা কিন্তু ভয়ানক। বাতাস ছাড়াই তাপমাত্রা নেমে যায় শূন্যের নীচে, আর যখন বাতাস বয়, তখন তো ভয়াবহ অবস্থা।

পার্কার জিপার তুলে দিয়ে প্লেন থেকে নেমে এল কিশোর ও মুসা।

আমরা যে এসেছি শহরবাসী কি জানে? কথা বলার সময় নিজের মুখ থেকে বেরোনো বাতাস মুহূর্তে বরফের কণা হয়ে যেতে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মুসা।

তা তো জানেই, ডিউক বলল। ও, বুঝতে পারনি তা হলে, জানানোর জন্যই তো শহরের ওপর দিয়ে চক্কর দিয়ে এলাম। ব্যাগেজ কম্পার্টমেন্ট খুলে কিশোর-মুসার ডাফেল ব্যাগগুলো বের করে বরফের ওপর নামিয়ে রাখল ও।

গ্লিটার টাউন, চারপাশে তাকাতে তাকাতে বিড়বিড় করে নিজেকেই প্রশ্ন করল কিশোর, আজৰ নাম। নেটিভ আমেরিকান

শহরগুলোর সাধারণত এ রকম নাম হয় না।

ফ্রেইট কম্পার্টমেন্ট থেকে নানা রকম বাক্স আর প্যাকেট টেনে নামাতে শুরু করল ডিউক। সেই গোল্ড রাশের যুগে… গোন্ড রাশ বোবো তো?

যে সময়টায় সোনার খোঁজে খেপা হয়ে গিয়েছিল মানুষ, কিশোর জবাব দিল। পাগলের মত সোনা খুঁজে বেড়াত, স্বর্ণসন্ধানের সেই যুগটাকে বলে গোন্ড রাশ। স্বর্ণসন্ধানীদের বলে প্রসপেক্টরস।

হ্যাঁ, মাথা ঝাঁকাল ডিউক। একশো বছর আগে সেই গোন্ড রাশের যুগে হাজার হাজার খনি-শ্রমিক আর প্রসপেক্টরস এসে হানা দিয়েছিল এখানকার পাহাড়-পর্বতগুলোয়। চকচকে সোনা-বোধহয় এই কথাটার ওপর ভিত্তি করেই ওরা শহরটার নাম রেখেছিল গ্লিটার টাউন। ভীষণ পছন্দের জায়গা ছিল এটা ওদের কাছে। কিন্তু সব কিছুরই শেষ আছে। ধীরে ধীরে এখানকার সোনা শেষ হয়ে এল। চলে গেল বাইরে থেকে আসা খনি-শ্রমিকেরা প্রায় সবাই…।

কিশোর! নদীতীরের দিকে আঙুল তুলল মুসা, দেখো, ও জোসি না?

ওর মতই তো লাগছে, কিশোরের কণ্ঠে উত্তেজনা।

প্রায় এক শ গজ দূরে মাঝারি উচ্চতার একটা গাট্টাগোট্টা মূর্তিকে দ্রুত এগিয়ে আসতে দেখা গেল বরফে ঢাকা নদীতীর ধরে। পার্কার হুড পিছনে নামানো। চওড়া মুখ, উঁচু চিবুক আর কালো চুল দেখে দূর থেকেও বন্ধুকে চিনতে পারল মুসা।

টান দিয়ে যার যার ব্যাগ তুলে নিল কিশোর ও মুসা। প্রায় ছুটতে শুরু করল জোসির দিকে।

কিশোর! মুসা! চিৎকার করতে করতে জোসিও ছুটে এল। কাছে এসে হাত মেলাল। পিঠ চাপড়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল, কেমন আছ?

ভাল, জবাব দিল কিশোর।

রবিন আসেনি?

নাহ্, আসতে পারেনি। নিউ ইয়র্কে।

আহহা, তাই। ও এলে খুব ভাল হতো।

তা তো হতোই। কিন্তু কী আর করা।

পথে কোন অসুবিধে হয়নি তো?

হয়েছে কি না টেরই পাইনি, এতই কুঁদ হয়ে ছিলাম। দেখার মত জায়গা।

ডিউকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে জোসির পিছু পিছু শহরের দিকে হেঁটে চলল কিশোর-মুসা। গ্লিটারকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেল। দুই সারি পাহাড়ের মাঝখানে উপত্যকায় গড়ে উঠেছে শহরটা। ছড়ানো ছিটানো কাঠের কেবিনগুলো জড়সড় হয়ে আছে তীব্র শীতে। ধাতব স্টোভের পাইপ বেরিয়ে গেছে কেবিনের ছাত ফুড়ে। সেগুলো দিয়ে সাদা ধোয়া উঠে যাচ্ছে সুমেরুর পরিষ্কার নীল আকাশে।

জোসি বলল, তোমাদের কেবিনের স্টোভটা চালু করা দরকার। ঠিক আছে নাকি কে জানে। অনেকদিন চালু করা হয় না। আগে ওটা আমার কেবিন ছিল। আব্বা-আম্মা ফেয়ারব্যাংকসে জুততার ফ্যাক্টরিতে চাকরি করতে চলে যাবার পর থেকে বহুদিন ঢুকিও না ওখানে, দেখাও হয় না। এখন ওদের বড় কেবিনটায় আমি থাকি। চাচা-চাচীর ওখানে খাই।

জোসি জানাল, ওর চাচার নাম জেফরি, চাচী এরিনা।

চলতে চলতে শহরের একমাত্র দোতলা বাড়িটার দিকে চোখ পড়ল মুসার। এটাও কাঠের তৈরি। সামনের দিকে কাঠের সাইনবোর্ডের লেখাগুলো জোরে জোরে পড়ল ও, জেনারেল স্টোর, প্রোপ্রাইটরলুক স্টার্লিং। বলল, সিনেমায় দেখা পুরানো ওয়াইল্ড ওয়েস্টের মত করে লিখেছে।

হাসল জোসি। তা ঠিক। পুরানো আমলে বুনো পশ্চিমের মতই স্টেজকোচ আর ওয়্যাগন ট্রেন আসত এখানেও, এখন আসে ডিউকের এরোপ্লেন। ফেয়ারব্যাংকসে মালের অর্ডার দেয় লুক। ওর দোকানে যদি কিছু না পাও, গ্লিটারের আর কোথাও সেটা পাবে না, ওই জিনিসটা ছাড়াই চালাতে হবে তোমাকে।

নদীর দিক থেকে ইঞ্জিনের শব্দ শোনা গেল। ফিরে তাকাল তিন কিশোর।

ডিউক চলে যাচ্ছে, জোসি বলল। সপ্তাহে একবার করে মালপত্র আর ডাক নিয়ে আসে ও।

নদীর দুই তীরে প্রুস গাছের সারি। মাঝখানের বরফে ঢাকা নদীর ওপরের অস্থায়ী রানওয়ে ধরে ছুটতে শুরু করল প্লেনটা। হঠাৎ লাফিয়ে উঠল বিশাল রাজহাঁসের মত। মোড় নিয়ে উড়ে গেল পশ্চিমে।

শহরের ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সাদা একটা বাড়ি দেখাল জোসি। ছোট ছোট জানালা। অ্যাসেম্বলি রুম। পুরানো আমলে গোল্ড রাশের দিনে ওটাকে ড্যান্স হল হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এখন শহরের লোকে ওখানে সভাটভা করে।

বাড়িটার প্রবেশ পথের একপাশে বুলেটিন বোর্ড। তাতে বড় বড় দুটো পোস্টার লাগানো। একটা পোস্টার ভাল কাগজে মেশিনে ছাপা। গ্লিটার টাউনের ভবিষ্যৎ উন্নতিতে যারা বিশ্বাসী, তাদেরকে হ্যাঁ ভোট দিতে অনুরোধ করা হয়েছে। আরেকটা পোস্টার সস্তা কাগজে, হাতে লেখা। যারা লিখেছে তাদের স্লোগান শহর বাঁচাতে চাইলে না ভোট দিন।

কী ব্যাপার? পোস্টার দুটো দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল কিশোর, শহরে নির্বাচন নাকি?

নির্বাচন না, জোসি জানাল, থিম পার্ক কর্পোরেশন নামে একটা কোম্পানি গ্লিটারকে টুরিস্ট স্পট বানাতে চায়। এ ব্যাপারে এখানকার জনগণের মতামত যাচাইয়ের জন্য এই ভোটের ব্যবস্থা।

ডিজনি ওয়ার্ল্ডের মত কোন কিছু? জড়সড় হয়ে কুঁকড়ে থাকা কেবিনগুলোর দিকে তাকাল মুসা।

হাসল জোসি। কেন, আইডিয়াটা খারাপ মনে হচ্ছে? এ রকম একটা আদিম জায়গাকে থিম পার্ক বানাবে, বিশ্বাস করতেই কষ্ট হয়, তাই না?

শহরের লোকের প্রতিক্রিয়া কী? কিশোর জিজ্ঞেস করল। তারা কী বলে?

এ সব ক্ষেত্রে সাধারণত যা হয়, মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ থিম পার্কের পক্ষে, কেউ বিপক্ষে।

সামনে মূল রাস্তাকে ক্রস করে গেছে আরেকটা রাস্তা। সেটা ধরে দ্রুত এগিয়ে আসছে একজন মানুষ। বড় বড় চুল প্রায় জট পাকিয়ে গেছে। গায়ে সবুজ পার্কা। পরনে উলের ঘন বুনটের ভারী প্যান্ট। দোমড়ানো। ময়লা। নিচুস্বরে জোসিকে জিজ্ঞেস করল মুসা, কে লোকটা?

টেক্স ফেরানি। লোকে ডাকত গোল্ড ফেরানি। ডাকতে ডাকতে এখন গোল্ড হয়ে গেছে ওর ডাকনাম, জোসি বলল। শহরের বাইরে ছোট্ট একটা গোল্ড ক্লেইম আছে ওর। গোল্ড ক্লেইম বোঝো?

মাথা ঝাঁকাল মুসা। সোনা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে এমন জায়গার বৈধ মালিক।

হ্যাঁ। গোল্ড এক বিচিত্র চরিত্র।

সোনা মানে তো বিরাট ব্যাপার, মুসা বলল। কিন্তু এ লোকটাকে দেখে খাবার পায় বলেই মনে হয় না।

আসলেই তা-ই, টাকা নেই ওর। পঞ্চাশ বছর কাটিয়েছে সোনা খুঁজে খুঁজে। এখনও কিছুই করে উঠতে পারল না বেচারা। তবে আশা ছাড়েনি, সোনা খোজায় ওর বিরাম নেই।

জোসির সঙ্গে শহরের ভিতর দিয়ে এগিয়ে চলল কিশোর-মুসা। শহরের অন্যপাশে এসে একটা কেবিন দেখিয়ে জোসি বলল, ওইটা আমার চাচার কেবিন।

তোমার চাচার ছেলেমেয়ে নেই? মুসা জানতে চাইল।

আছে। এক মেয়ে। নাম মুনস্টোন। তোমাদের এগিয়ে আনার জন্য আমার সঙ্গে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু লাকড়ি কেটে আনাটাও জরুরি। সেজন্য বনে গেছে। অসুবিধে নেই, পরেও দেখা করতে পারবে। আর ওই যে কেবিনটা দেখছ, এটা তোমাদের।

চাচার কেবিন থেকে দশ-বারো গজ দূরে আরেকটা ছোট কেবিনে কিশোরদেরকে নিয়ে এল জোসি। দুটো বাংক। একগাদা কম্বল। এ ছাড়া একটা টেবিল, একটা চেয়ার, আর পেটমোটা এক পুরানো চুলা আছে। মাটিতে বিছানো ভালুকের চামড়ায় তৈরি একটা মাদুর। চুলার পাশে একটা কাঠের খোলা বা লাকড়িতে বোঝাই।

এখানে থাকতে তোমাদের কষ্ট হবে না তো? জোসি জিজ্ঞেস করল। তোমাদের বাড়ির মত আরাম পাবে না আগেই বলে দিচ্ছি।

আমার তো খারাপ লাগছে না, হাতের ব্যাগটা একটা বাংকে নামিয়ে রাখল কিশোর। বরং মনে হচ্ছে আরামেই থাকতে পারব। শোনো, আমাদের নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। বহু খারাপ জায়গায় থেকে অভ্যাস আছে আমাদের।

ঠিক, মুসা বলল। ওসব জায়গার তুলনায় কেবিনটা তো পাঁচতারা হোটেল।

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল জোসি। বন্ধুদের থাকার জায়গা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিল ও, বোঝা গেল। জিজ্ঞেস করল, আমার জেটানা কুকুরগুলো দেখবে?

নিশ্চয়ই, জবাব দিতে এক মুহূর্ত দেরি করল না মুসা।

কেবিন থেকে বেরিয়ে শহরের সীমানা ধরে এগিয়ে চলল ওরা। এক জায়গায় কতগুলো কেনল চোখে পড়ল। কুকুরের ঘরগুলোর কাছে প্রায় দুই ডজন কুকুর বাধা। ওদের দেখে জোর গলায় চচামেচি শুরু করল ওগুলো। প্রচুর লাফালাফি আর লেজ নেড়ে স্বাগত জানাল।

সবগুলো তোমার কুকুর? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল মুসা।

হ্যাঁ। এখানে আছে একুশটা। তবে ইডিটারোড রেসে বারোটার বেশি ব্যবহার করব না। হাতে আরও সময় নিয়ে আসা উচিত ছিল তোমাদের। তাহলে রেসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেখে যেতে পারতে।

থাকতে পারলে খুশিই হতাম, মাথা ঝাঁকাল কিশোর। কিন্তু কী করব, স্কুল খুলে যাবে।

স্কুল কামাই দিয়ে হলেও থাকতে রাজি আছি আমি, মুসা বলল। রেসের শেষ দেখতে না পারলে মনে খুঁতখুঁতি থেকে যাবে।

নাহ্, রেসের জন্য স্কুল কামাই দেয়া ঠিক হবে না, কিশোর বলল।

বেশির ভাগ দর্শকই রেসের শুরুটা কেবল দেখে, জোসি বলল। অনেক লম্বা পথ। অ্যাঙ্কারেজ থেকে নৌম পর্যন্ত এগারোশো মাইল। এতখানি তো আর সঙ্গে সঙ্গে যাওয়া সম্ভব না।

হাঁ করে তাকিয়ে রইল মুসা। এগারোশো মাইল!

একটা কুকুরের কাছে গিয়ে দাঁড়াল জোসি। ওদের প্রতিটি নড়াচড়া লক্ষ করছে কুকুরটা। ওর নাম ডায়মণ্ডহার্ট।

হীরকহৃদয়, বিড়বিড় করল কিশোর।

কী বললে?

ডায়মণ্ডহার্টের বাংলা করলাম।

আচ্ছা, হাসল জোসি। বাংলা নামটাও শুনতে ভাল লাগছে। সুন্দর একটা ছন্দ আছে। কিন্তু এখন আর বাংলা নামে ডাকলে সাড়া দেবে না ওটা, নইলে রেখেই দিতাম।

বড় একটা হাস্কি কুকুরের পাশে বসে ওটার গলা জড়িয়ে ধরল জোসি। কুকুরটার গায়ের রঙ সাদা আর ধূসরে মিশানো। চোখ টলটলে নীল। আদর পেয়ে জোরে জোরে লেজ নাড়তে লাগল। কিশোর ও মুসার দিকে তাকাল জোসি। ও আমার লিড ডগ।

মানে নেতা কুকুর? মুসা বলল।

মাথা ঝাঁকাল জোসি। হ্যাঁ।

মনিবের গাল চেটে দিতে লাগল ডায়মণ্ডহার্ট। হেসে মুখ সরিয়ে নিল জোসি।

দলের সবচেয়ে মূল্যবান সদস্য লিড ডগ, জোসি বলল। হোয়াইট আউটের মধ্যে পড়লে ওকে ছাড়া নিস্তার পাওয়া কঠিন।

হোয়াইট আউট কী? মুসা জানতে চাইল।

তুষার ঝড়, জোসি বলল। যখন তখন শুরু হয়ে যায়। এতই ঘন হয়ে তুষার পড়ে, নিজের হাতও দেখা যায় না। ভয়ঙ্কর ব্যাপার। তবে ডায়মণ্ডহার্টের মত একটা হাস্কি সঙ্গে থাকলে নিরাপদ। পথের মোড়ে কোনখানে কী বিপদ ওত পেতে আছে, নদীর বরফের স্তর কোথায় অতিরিক্ত পাতলা, ভার সইতে না পেরে ভেঙে যাবে, আগে থেকেই সব বুঝতে পারে। ওকে ছাড়া ইডিটারোড রেসে অংশ নেয়ার কথা ভাবতেই পারি না আমি।

রেস শেষ হতে কতদিন লাগে? জানতে চাইল কিশোর।

সেটা অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। ঘুরে ঘুরে প্রতিটি কুকুরের মাথা চাপড়ে আদর করে দিতে লাগল জোসি। তবে মোটামুটি এগারো-বারোদিনের মত লাগে। ভীষণ বিপজ্জনক আর উত্তেজনায় ভরা এই রেস।

কুকুরগুলোর ওপর নিশ্চয় খুব চাপ পড়ে? মুসার প্রশ্ন।

তা পড়ে। তবে সেটা ওরা পছন্দও করে। শূন্যের বিশ ডিগ্রি নীচে নেমে যায় তাপমাত্রা। শরীর গরম হতে চায় না। মাশিঙের জন্য অস্থির হয়ে ওঠে ওরা।

মাশিং কী? কুকুরের খাবার?

হাসল জোসি। উঁহু। ডগস্লেজিঙের স্থানীয় নাম মাশিং। ফরাসি শব্দ মার্শা থেকে এসেছে শব্দটা। এর মানে চলো যাই।

কিশোর জিজ্ঞেস করল, রেসের সময় বাইরের সহযোগিতা পাওয়া যায়?

মাথা নাড়ল জোসি। না। ইডিটারোড রেসে যা যা করার রেসারকে একলাই করতে হয়। নিজের খাবার, কুকুরের খাবার, কাপড়-চোপড়, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বয়ে নিয়ে যেতে হয়। টিকে থাকার জন্য যা কিছু প্রয়োজন, সব সঙ্গে নিতে হয়।

মুসা বলল, তারমানে নিয়ম-নীতি খুব কঠোর।

কঠোর না হয়ে উপায় নেই, জোসি বলল। ইডিটারোড রেসটা শুধু খেলা বা প্রতিযোগিতা নয়, রেসার তৈরিতেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। সেই উনিশশো পঁচিশ সাল থেকে এ নিয়ম চালু আছে। নৌমে সেবার মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল ডিপথেরিয়া। সারা শহরে কোথাও এর ওষুধ ছিল না। গাড়ি আসার রাস্তা ছিল না। প্লেন নামতে পারত না। কিন্তু আলাস্কার কিছু বেপরোয়া ডগস্লেজ মাশার প্রচণ্ড তুষার ঝড়ের তোয়াক্কা না করে অ্যাঙ্কারেজ থেকে নৌমে ওষুধ পৌঁছে দিয়েছিল। বাঁচিয়ে দিয়েছিল শহরটাকে। সেই থেকে ইডিটারোড রেসের গুরুত্ব ভীষণভাবে বেড়ে গেছে এই এলাকার লোকের কাছে। নিউ ইয়র্ক সিটির সেন্ট্রাল পার্কের বিখ্যাত কুকুরের মূর্তিটার কথা নিশ্চয় জানো, বাল্টোর মূর্তি। নৌমের সেই উদ্ধারঅভিযানে একটা দলের লিড ডগ ছিল বাল্টো। ওষুধ আনার পর থেকে হিরো হয়ে গেছে। ডায়মণ্ডহার্টের মাথা চাপড়ে দিতে আবার নিচু হলো ও। আমাদের ডায়মণ্ডও বাল্টোর চেয়ে কম নয়, কি বলিস ডায়মণ্ড? এবারের ইডিটাররাডে আমরাই জিতব। পঞ্চাশ হাজার ডলারের পুরস্কার বাড়িতে আনব।

শিস দিল মুসা। ওর মুখ থেকে বেরোনো বাতাসে তুষারকণার লম্বা একটা রেখা তৈরি হলো। পঞ্চাশ হাজার!

বেশি মনে হচ্ছে? হাসতে লাগল জোসি। তবে এতে যে পরিমাণ বিপদ, সেই তুলনায় টাকাটা খুব বেশি না। পদে পদে মৃত্যুর আশঙ্কা। কুকুর ছাড়া একশো গজও যেতে পারবে না।

হাঁটতে হাঁটতে শহরে ফিরে এল ওরা। ওদের বয়েসি আরেকটা ছেলেকে উল্টো দিক থেকে আসতে দেখা গেল। জোসির মত ওর পরনেও চামড়ার পার্কা আর উলের প্যান্ট। মাথার হুড তুলে দেয়া। অন্য দিকে নজর। ওদের যেন দেখেইনি।

ও টেড সিউল, জোসি বলল। গলা চড়িয়ে ডাকল, এই টেড, শোনো। এরা আমার বন্ধু। মেহমান। লস অ্যাঞ্জেলেসের রকি বিচ থেকে এসেছে।

থামল টেড। তবে জোসির দিকে তাকাল না।

টেডও রেসে অংশ নিচ্ছে, জানাল জোসি। ইডিটারোড রেসে এই প্রথমবারের মত প্রতিযোগিতা করতে যাচ্ছি আমরা। গোটা শহর আমাদের নিয়ে উত্তেজিত। অনেকেই বলাবলি করছে প্রতিযোগিতা আমার আর টেডের মধ্যেই হবে। দুজনের যে কোন একজন জিতব।

জ্বলন্ত চোখে জোসির দিকে তাকাল টেড। আমি না জিততে পারলে তোমাকেও জিততে দেয়া হবে না, কথাটা মনে রেখো। তার জন্য যদি আমাকে…

কথাটা শেষ করল না ও। ঝট করে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চলে গেল।


দীর্ঘ একটা মুহূর্ত সেদিকে তাকিয়ে থেকে জোসিকে জিজ্ঞেস করল কিশোর, ও অমন করল কেন?

জানি না, বিষন্ন মনে হলো জোসিকে। সেই ছোটবেলা থেকে আমাদের বন্ধুত্ব। কিছুদিন থেকে কী যে হয়েছে ওর, একেবারেই সহ্য করতে পারে না আমাকে। ডগ রেসে বার বার আমার কাছে পরাজয়টা মেনে নিতে পারছে না বোধহয়।

প্রতিযোগিতায় হারজিত তো আছেই, মুসা বলল। তার জন্য এত শত্রুতা? নিশ্চয় তুমি ওর চেয়ে ভাল মাশার, নইলে জেতো কেন?

মাশার! বাহ, চমৎকার উচ্চারণ, হাসি ফুটল জোসির মুখে। শেখো, শেখো, শিখে ফেললা আমাদের ভাষা। কঠিন কিছু না।

মুসার মনে হলো ওর প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল জোসি।

যে রাস্তা ধরে চলেছে ওরা, সেটা গেছে একটা ভোলা চতুরের ধার দিয়ে। পঞ্চান্ন গ্যালনের অনেকগুলো বড় বড় ড্রাম রাখা আছে চত্বরে। পাশে একটা ছোট্ট ছাউনি। ছাউনির ভিতর থেকে আসছে ইঞ্জিনের শব্দ।

কীসের শব্দ জানতে চাইল মুসা।

জেনারেটর, জোসি বলল। ডিজেলে চলে। ওই ড্রামগুলোতে ডিজেল ভর্তি। গরমকালে ইউকনে যখন বরফ থাকে না, তখন বার্জে করে নিয়ে আসা হয়। হিসেব করে বিদ্যুৎ খরচ করতে হয় আমাদের। বসন্তে বরফ গলা শুরু হওয়ার আগে তেল ফুরিয়ে গেলে বিপদ। জেনারেটর চলবে না। বিদ্যুৎ বন্ধ। অন্ধকারে থাকতে হবে রাতের বেলা।

চিন্তিত অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে হেঁটে চলেছে কিশোর। শহরটা বড় বেশি নিঃসঙ্গ। অস্বস্তি লাগছে ওর। এখানে সব কিছু ঠিকঠাক মত চললে কোন ভয় নেই। কিন্তু যে কোন অঘটন কিংবা অনিয়ম ঘটলে, তা সে যত সামান্যই হোক না কেন, শহরটাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

টেড সিউলের কথা ভাবল কিশোর। রহসময় আচরণ করেছে। জোসিকে জিজ্ঞেস করল, জোসি, টেড যে তোমাকে শাসিয়ে গেল, কতটা ক্ষতি করতে পারে?

আগে আগে হাঁটছে জোসি। ফিরে তাকিয়ে জবাব দিল, বাদ দাও ওর কথা। কামড়ের চেয়ে ঘেউ ঘেউ বেশি।

হেসে রসিকতা করল মুসা, হাস্কিগুলোর মত।

হাস্কিরা ভীষণ প্রয়োজনীয় প্রাণী, হাসিটা ফিরিয়ে দিল জাসি। টেডের সমস্যাটা হলো, ও শুধুই ফাস্ট হতে চায়। কিন্তু সব তো আর ওর পছন্দমত চলবে না।

কখনও হেরেছ ওর কাছে? কিশোর জিজ্ঞেস করল।

একবার প্রায় হেরে গিয়েছিলাম।

তারমানে হারনি। বুঝলাম, এ জন্যই জেদ বেড়ে গেছে ওর,মুসা বলল। জেদ থেকে শত্রুতা।

প্রতিযোগিতা যত বড় মাপের হয়, উত্তেজনা তত বাড়ে। কিশোর জানে, ইডিটারোড রেসের মত কুকুর-দৌড়ের এতবড় প্রতিযোগিতা পৃথিবীর আর কোথাও হয় না। তাতে অংশ গ্রহণ করতে পারাটাও বিরাট সম্মানের ব্যাপার। স্বাভাবিকভাবেই গ্লিটারবাসীরা এ নিয়ে উত্তেজিত। দুটো দলে ভাগ হয়ে গেছে তারা। কারও সাপোর্ট জোসির পিছনে, কারও টেডের। হেরে গেলে ভক্তদের কাছে মুখ দেখাতে পারবে না এই দুশ্চিন্তায়ই নিশ্চয় খিটখিটে হয়ে গেছে টেড।

মোড় নিয়ে আরেকটা পায়ে চলা পথে নামল ওরা। লম্বা একজন মানুষকে আসতে দেখল। গায়ে সবুজ পার্কা। পরনে সবুজ টুয়িলের প্যান্ট।

বিগস আসছে, জোসি বলল। ইলকিস বিগস্। কোম্পানির লোক।

কিশোর জিজ্ঞেস করল, কোন কোম্পানি?

থিম পার্ক কর্পোরেশন, বললাম না তখন। গ্লিটারেও একটা থিম পার্ক বানাতে চায়। প্রতি শীতেই গ্লিটারে এসে হাজির হয় ও। কোম্পানির পক্ষে প্রচার চালায়। এবার একেবারে আটঘাট বেঁধে এসেছে। ভোট না নিয়ে আর যাবে না। হা-না একটা কিছু সিদ্ধান্ত জেনে তবেই যাবে।

মুখে ঝলমলে হাসি নিয়ে দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে এল বিগস্। হ্যালো, জোসি। কিশোর-মুসাকে দেখাল। এরাই নিশ্চয় তোমার রকি বিচের বন্ধু। কিশোর কোন জন, আর মুসা কোন জন?

ও কিশোর, দেখিয়ে দিল জোসি। আর ও মুসা। ইডিটারোড রেসে আমাকে সাহায্য করবে।

কিশোর ও মুসার দিকে তাকিয়ে আন্তরিক হাসি হাসল বিগস্। আলাস্কায় স্বাগতম। তোমরা আসতে না আসতে কীভাবে জেনে গেলাম ভেবে অবাক হচ্ছ নিশ্চয়? এখানে খবর খুব দ্রুত ছড়ায়। আচ্ছা যাই, পরে কথা হবে। জরুরি কাজ আছে আমার।

চলে গেল বিগস্।

লোকটা কিন্তু খুব আন্তরিক, মুসা বলল। কাজের প্রতি ভীষণ সিরিয়াস।

মনে হয়, জোসি বলল।

মনে হয় মানে? তোমার সন্দেহ আছে নাকি?

বাদ দাও, হাত নেড়ে যেন বিগসকে উড়িয়ে দিল জোসি। চলো।

আবার পা বাড়াল ওরা। কিছুদূর এগোতে জোসির কেবিনটা চোখে পড়ল। এটাতেই কিশোরদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিন পাশে বন, একপাশে নদী। নদীর দিকটা ভোলা থাকায় রোদ পাওয়া যাবে।

চাচা-চাচীর কেবিনের দিকে তাকাল জোসি। জানালার পর্দা টানা দেখে বলল, ও, এখনও আসেনি। এত দেরি করছে কেন? তোমরা এখন বিশ্রাম নেবে?

মুসা বলল, ঘরে যেতে ইচ্ছে করছে না। তবে তোমার জরুরি কাজ থাকলে…

আমার কাজ নেই, জোসি বলল। শ্লেজে চড়ে ঘুরবে?

চেঁচিয়ে উঠল মুসা, নিশ্চয়ই!

চলো, চলো! জবাব দিতে এক মুহূর্ত দ্বিধা করল না কিশোরও।

কুকুরগুলোর কাছে ফিরে এল ওরা। স্টোরেজ শেড অর্থাৎ মালপত্র রাখার ছাউনি থেকে ওক কাঠে তৈরি স্লেজটা বের করতে জোসিকে

সাহায্য করল দুজনে।

স্লেজের আকার দেখে মুসা অবাক। এত লম্বা?

প্রচুর খাবার আর জিনিসপত্র সঙ্গে নিতে হয়, জোসি বলল। চলার পথে ঘুমানোর কাজটাও গাড়িতেই সারতে হয়। বড় করে তো বানাতেই হবে।

গাড়ির সঙ্গে লম্বা এক সারি লাগাম জুড়ে দিতে লাগল জোসি। কী ঘটতে যাচ্ছে বুঝে ফেলল কুকুরগুলো। আগ্রহ আর উত্তেজনায় প্রচণ্ড চিৎকার আর লাফালাফি শুরু করল।

গাড়িতে জোতা শিখবে? জিজ্ঞেস করল জোসি।

এতে শেখার কি আছে? মুসা বলল, লাগাম পরিয়ে দিলেই হয়।

না, হয় না। উল্টোপাল্টা লাগালে হবে না। এরও নিয়ম আছে। গাড়ির কাছ থেকে সারি দিয়ে নিয়ে যেতে হবে। গাড়ির একেবারে কাছে যে কুকুরগুলোকে বাঁধা হবে, ওগুলোকে বলে হুইল ডগ। আগের কুকুর পিছে, আর পিছের কুকুর আগে বাঁধলে ঠিকমত টানতেই পারবে না।

একটা কুকুরের বাঁধন খুলে স্লেজের একেবারে কাছের সুটটার সামনে নিয়ে এল জোসি। প্যাড লাগানো লাগামটা পরিয়ে দিতে লাগল। বাধা দিল না কুকুরটা।

ওদের মনিব কে, সেটা ওদেরকে ভালমত বুঝিয়ে দিতে হবে, জোসি বলল। দুর্বলতা প্রকাশ করা চলবে না কোনভাবেই। বাঁধন খুলে কীভাবে কুকুরকে নিয়ে আসতে হয়, দেখলে। এখন যাও। মুসা, তুমি রেড লাইটকে নিয়ে এসো। আর কিশোর, তুমি হোয়াইট ক্লাউডকে।

কোনটা রেড লাইট আর কোনটা হোয়াইট ক্লাউড, আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল জোসি। বাঁধন খুলে কলার ধরে কুকুর দুটোকে স্লেজের কাছে টেনে নিয়ে এল কিশোর ও মুসা। সেগুলোকে লাগামের সঙ্গে জুড়ে দিতে লাগল জোসি। ডায়মওহার্টের পালা এল সবশেষে। চোখের আন্দাজে মেপে দেখল কিশোর। টানার সময় গাড়ি থেকে প্রায় চল্লিশ ফুট দূরে থাকবে এই নেতা-কুকুরটা। কুকুরের এই স্লেজ চালানোর জন্য অনেক জায়গা লাগে।

প্রচণ্ড শক্তি ও আত্মবিশ্বাসে ভরা একটা পাওয়ার হাউসে পরিণত হয়েছে যেন হাস্কি কুকুরের সম্মিলিত দলটা। ক্রমাগত লেজ নেড়ে নেড়ে লাফানো শুরু করেছে কুকুরগুলো। ছোটার জন্য অস্থির। যেন শুধু এ কাজটা করার জন্যই বেঁচে আছে ওরা। গাড়ি টেনে নিয়ে দৌড়ানোটা যেন ওদের নেশা।

ভালমত দৌড় করিয়ে আনতে হবে ওদের, জোসি বলল। গাড়িতে ওজন দরকার। মালপত্র তো নেই, সে-জায়গাটা তোমরা পূরণ করো। গাড়িতে গিয়ে বসো।

উঠে বসল মুসা। মুখোমুখি বসল কিশোর। শ্লেজের পিছনে রানারের ওপর উঠে দাঁড়াল জোসি।

দারুণ গাড়ি। স্টিয়ারিং হুইল নেই। অ্যাক্সিলারেটর নেই, মুসা বলল।

সিটবেল্ট নেই। এয়ারব্যাগ নেই, বলল কিশোর।

হাসাহাসি করতে লাগল তিনজনে।

কাঁধের ওপর দিয়ে ফিরে তাকাল ডায়মণ্ডহার্ট। উত্তেজনায় কাঁপছে। কিশোরের মনে হলো, কুকুরটাও যেন মজা পাচ্ছে ওদের রসিকতায়।

কুকুরগুলোর উদ্দেশ্যে চিৎকার করে উঠল জোসি, হাইক! হাইক!

জমাট তুষারে পা বসিয়ে টান দিল কুকুরগুলো। একসঙ্গে ঝাঁপ দিল সামনের দিকে। অসমতল বরফের ওপর দিয়ে ঝাকি খেতে খেতে নদীর দিকে ছুটল স্লেজ। আচমকা এই তীব্র গতিবেগ অবাক করল কিশোর ও মুসাকে।

হাইক! হাইক! আবার চিৎকার করে উঠল জোসি। বাঁ পায়ের ভর রানারে রেখে ডান পা নামিয়ে লগি দিয়ে নৌকা বাওয়ার মত করে ঠেলা মারছে, গতি বাড়াতে সাহায্য করছে কুকুরগুলোকে।

পার্কার গলার কাছের ফিতে বাধল কিশোর। মাথার হুড তুলে কান ঢাকল। বাতাসে বরফের ছোঁয়া। হাঁটার সময় এত গতিও থাকে না, এত বাতাসও লাগে না। কনকনে ঠাণ্ডা ইতিমধ্যেই ওর নাক-গাল অসাড় করে দিয়েছে।

নদীর পাড়ে পৌঁছল গাড়ি। জমাট বরফের ওপর গাড়িটা লাফিয়ে ওঠার সময় থাবা দিয়ে গাড়ির ধার খামচে ধরল কিশোর। ওর মনে হলো, আকাশে উড়াল দিয়েছে স্লেজ।

মহা আনন্দে চিৎকার করে উঠল মুসা, ইয়াহু!

পিচ্ছিল বরফে উঠে আসায় গতি বেড়ে গেল স্লেজের। আরও জোরে টানতে লাগল কুকুরগুলো। গতি বাড়ানোর জন্য ওগুলোরও যেন রোখ চেপে গেছে।

চিৎকার করে বলল জোসি, আরে থাম, থাম!

শীতের রৌদ্রালোকে ঝকঝক করছে সাদা বরফ। চোখে লাগে। চোখের পাতা সরু করে চারপাশে তাকাতে লাগল কিশোর। দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত সীমাহীন আলাস্কার বরফে ঢাকা এই আদিম প্রকৃতিতে কিছুই নড়ছে না, কোন শব্দ নেই, একমাত্র বরফের ওপর দিয়ে ছুটে চলা স্লেজ ও একপাল কুকুরের নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া।

সামনে দুই ভাগ হয়ে গেছে পথটা। চিৎকার করে ডায়মণ্ডহার্টকে নির্দেশ দিল জোসি, জি! ডায়মণ্ড, জি!

মুহূর্তে ডানে মোড় নিল ডায়মণ্ডহার্ট।

ডানে ঘোরার জন্য জি, কিশোর বলল, বাঁয়ে ঘোরাতে হলে?

হউ! জোসি বলল। স্লেজ ডগকে প্রথম যে দুটো শব্দ শিখতে হয়, তা হলো এই জি আর হউ।

ভীষণ ঠাণ্ডা! মুসা বলল।

হ্যাঁ।

তাপমাত্রা এখন শূন্যের বিশ ডিগ্রি নীচে।

নদীর ওপর দিয়ে কোণাকুণি ছুটছে স্লেজ। বহু ব্যবহৃত পথটা দেখে বোঝা যায় মাত্র একটা স্লেজ চালিয়ে এই রাস্তা তৈরি করা সম্ভব নয়। শহরের অন্য মাশাররাও নিশ্চয় এই পথ ব্যবহার করে। লাকড়ি আনতে নদী পেরিয়ে বনে যায়। ইউকন নদীটা শীতকালে হয়ে যায় গ্লিটারবাসীর মহাসড়ক।

কে আসে দেখো! জোসি বলল।

একসঙ্গে ফিরে তাকাল কিশোর-মুসা দুজনেই।

ওদিকে নয়, বাঁয়ে তাকাও, জোসি বলল।

গলা লম্বা করে বাঁয়ে তাকাল কিশোর। নদীর তীর ধরে আরেকটা কুকুর-বাহিনীকে এগিয়ে আসতে দেখল। জোসিকে জিজ্ঞেস করল, কে, টেড নাকি? তোমার সঙ্গে রেস খেলতে আসছে?

নাহ্, প্র্যাকটিস করছে।

দৌড়াচ্ছে তো খুব জোরে, বিড়বিড় করল মুসা। পালাচ্ছে নাকি?

পালাবে কেন? টেডের দিকে তাকিয়ে আছে জোসি। গাড়িতে মালপত্র নেই, বোঝা নেই, সে-কারণেই গতি বেশি। এভাবে প্র্যাকটিস করাটা ভুল। তাতে আসল রেসের সময় যখন বোঝা নিয়ে দৌড়াবে কুকুরগুলো, অনভ্যস্ততার কারণে অসুবিধে হবে ওদের। যা ইচ্ছে করুকগে, আমার কী।

টেডকে ভাল করে দেখার জন্য অনেকখানি ঘাড় ঘোরাল কিশোর।

আচমকা চেঁচিয়ে উঠল, জোসি, এত ধােয়া কেন শহরে?

কাঁধের ওপর দিয়ে ফিরে তাকাল জোসি। চমকে গেল সে-ও। হুয়া! হুয়া! বলে উত্তেজিত চিৎকার করে থামতে বলল কুকুরগুলোকে। এত জোরে ব্লেড-ব্রেক চেপে ধরল, তুষারে বসে গেল ব্রেকের ব্লেড। নৌকার মত দুলে উঠল স্লেজ। প্রচণ্ড ঝাঁকি লাগল।

দাঁড়িয়ে গেল ডায়মণ্ডহার্ট সহ বাকি কুকুরগুলো।

কিছু একটা হয়েছে, চিন্তিত ভঙ্গিতে ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে আছে জোসি। শহরের একধারে কালো ধোয়ার মোটা একটা রেখা আকাশে উঠে যাচ্ছে।

কীসের ধোঁয়া? জানতে চাইল মুসা।

চাচার কেবিনে আগুন লেগেছে! জোসি বলল।


স্লেজ থেকে নেমে পড়ল জোসি। চেঁচিয়ে বলল, নামমা! নামো! গাড়ি ঘোরাতে হবে!

লাফিয়ে নামল কিশোর-মুসা। দৌড় দিল জোসির পিছনে। রুক্ষ বরফ। লাগাম পরা অবস্থায়ই কুকুরগুলোকে টেনে নিয়ে এল ওরা। গ্লিটারের দিকে মুখ করাল। স্নেজের মুখও ঘুরিয়ে দিল একই দিকে।

লাফ দিয়ে আবার স্নেজে গিয়ে উঠল কিশোর-মুসা। লাগাম ধরে চিৎকার করে উঠল জোসি, ডায়মণ্ডহার্ট! হাইক! হাইক!

সামনে ঝাঁপ দিল কুকুরটা। বরফে নখ বসাল। ওর পেশীবহুল শক্তিশালী বুকে চেপে বসল চামড়ার লাগাম। দেখাদেখি বাকি কুকুরগুলোও একই কাজ করল। ছুটতে শুরু করল স্লেজ।

নদীর ভাটির দিকে চলেছে এখন ওরা। জেফরি টিনুকের কেবিনের ওপর কুণ্ডলী পাকিয়ে উড়ছে কালো ধোঁয়া।

ফুল স্পিডে কুকুরগুলোকে ছুটিয়ে নিয়ে চলল জোসি। চিৎকার করে ক্রমাগত নির্দেশ দিতে থাকল, টান, ডায়মণ্ড, টান! টেনে যা!

লাগামের সঙ্গে গা মিলিয়ে দেহটাকে টান টান করে ফেলেছে ডায়মণ্ডহার্ট। জরুরি অবস্থা আঁচ করে ফেলেছে কুকুরগুলো।

জোসি, কী হয়েছে বলো তো? এতক্ষণে জিজ্ঞেস করার সুযোগ পেল কিশোর।

বুঝতে পারছি না, চিন্তিত ভঙ্গিতে জবাব দিল জোসি। অনেক কিছুই ঘটতে পারে। তবে আগুন লাগাটা এখানে ভয়ানক ব্যাপার। পুরো শহরটাই কাঠের তৈরি।

টেডের দিকে তাকাল কিশোর। শহর থেকে দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছে ওর স্লেজ। অবাক হলো কিশোর। আগুন দেখেনি নাকি? ওকে বলা দরকার।

চিল্কার করে ডাকল জোসি, টেড! এই টেড!

ফিরেও তাকাল না টেড। যেন জোসির ডাক ওর কানেই ঢোকেনি।

আবার ডাকল জোসি। এবারও তাকাল না টেড। কুকুর-বাহিনী নিয়ে ছুটতে ছুটতে সরে যেতে লাগল শহর থেকে দূরে।

থামল না কেন? মুসার প্রশ্ন।

এতদূর থেকে বোধহয় আমার ডাক শুনতে পায়নি, জবাব দিল জোসি।

কিন্তু কিশোরের যথেষ্ট সন্দেহ হলো। সমতল জমাট বরফের ওপর দিয়ে এমনিতেই শব্দ চলে বহুদূর। তা ছাড়া এখানে বাধা দেবার মতও কিছু নেই। জোসিকে উপেক্ষা করার জন্য শুনেও না শোনার ভান করেছে টেড। জরুরি কাজে সহায়তা করার জন্য ওকে ডাকা হয়েছে, সেটা নিশ্চয় বুঝতে পারেনি।

ওদেরকে নদীতীর পার করিয়ে আনল ডায়মণ্ডহার্টের দল। কেবিনের কাছের সমতল জায়গাটায় পৌঁছল স্লেজ। গাড়ি থামাল জোসি। লাফিয়ে নামল কিশোর ও মুসা।

ইতিমধ্যে শহরের লোক জড় হয়ে একটা স্বেচ্ছাসেবী অগ্নিনির্বাপক-বাহিনী গঠন করে ফেলেছে। নারী-পুরুষ সবই আছে তাদের মধ্যে। সবার হাতে বালতি। কেবিনের কাছ থেকে লম্বা সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে ওরা। সারির এক মাথা একটা পানির ট্যাংকের কাছে, অন্য মাথা কেবিনের কাছে। হ্যাণ্ড পাম্প লাগানো একটা লম্বা হোস পাইপ নিয়ে দৌড়ে এল তিনজন লোক।

দমকল নেই? চারপাশে তাকিয়ে দমকলের গাড়ি খুঁজতে লাগল মুসার চোখ।

নাহ, জোসি জানাল।

ট্যাংক থেকে পানি নিয়ে বালতি এগিয়ে দিতে থাকল অগ্নিনির্বাপকদের বালতি-বাহিনী। কেবিনের সবচেয়ে কাছে দাঁড়িয়েছে চওড়া কাঁধওয়ালা একজন শক্তিশালী পুরুষ। পাশের লোকটার হাত থেকে বালতি নিয়ে পানি ছুঁড়ে দিচ্ছে আগুনের ওপর। খালি বালতিটা পাশের লোকটাকে ফিরিয়ে দিয়ে আরেকটা ভরা বালতি নিচ্ছে ওর হাত থেকে। হাতে হাতে খালি বালতিটা চলে যাচ্ছে ট্যাংকের কাছে, পানি ভর্তি হয়ে আবার ফিরে আসছে প্রথমজনের হাতে। পানি বহনের কাজ দ্রুত চলছে এভাবে।

তুষার সরানোর একটা বেলচা তুলে নিয়ে কিশোরের দিকে ছুঁড়ে দিল জোসি। আরেকটা দিল মুসাকে। তৃতীয় আরেকটা নিজে নিয়ে চিৎকার করে বলল, আগুনে তুষার ফেলতে থাকো। বেলচা তুলে দেখাল, ওই যে আমার চাচা-চাচী।

বেলচায় করে তুষার তুলে নিয়ে কেবিনের খোলা জানালা দিয়ে ভিতরে ছুঁড়ে দিল কিশোর। ফেলতে থাকল এভাবে। কঠিন কাজ। অল্পক্ষণেই হাঁপিয়ে গেল। মুখ দিয়ে বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে বরফ-কণায় রূপান্তরিত হচ্ছে বাতাস। বিচিত্র আকৃতি। কোনটা রিঙ, কোনটা লম্বা। মুসাও পাল্লা দিয়ে তুষার ফেলছে ঘরের ভিতর। ঘোঁৎ-ঘোৎ শব্দ বেরোচ্ছে মুখ দিয়ে। এখন ওদের সঙ্গে এসে যোগ দিয়েছে আরও অনেকে। জ্বলন্ত কেবিনটা ঘিরে ফেলেছে অগ্নিনির্বাপক-বাহিনী।

তুষার ফেলার দিকেই কিশোরের নজর ছিল এতক্ষণ, এখন খেয়াল করে দেখল, আগুনের শিখা আর দেখা যাচ্ছে না। শুধু ভলকে ভলকে উঠে যাওয়া সাদা ধোঁয়া। আগুনের কারণে দূরে সরে থাকতে বাধ্য হয়েছিল এতক্ষণ মেরুর ঠাণ্ডা। সুযোগ পাওয়ামাত্র কামড় বসাল আবার। গায়ে। কিশোরের মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল শিহরণ বয়ে গেল।

আগুনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জেতা মানুষগুলো উল্লাসে চিৎকার করে উঠল। চওড়া হাসি ফুটল কিশোর-মুসা-জোসির মুখেও। একে অন্যের পিঠ চাপড়ে দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করল ওরা।

চাচা-চাচী আর চাচাত বোন মুনস্টোনের সঙ্গে কিশোর ও মুসাকে পরিচয় করাতে টেনে নিয়ে গেল জোসি। স্তব্ধ হয়ে গেছে টিনুক পরিবার। সহায়-সম্পত্তি বলতে যা ছিল ওদের, কেবিনটার সঙ্গে সঙ্গে সব গ্রাস করে নিয়েছে আগুন।

খুব খারাপ লাগছে আমার, মিস্টার টিনুক, সহানুভূতির সুরে কিশোর বলল।

জোর করে মুখে দুর্বল হাসি ফোটালেন জোসির চাচী। জবাবটা তিনিই দিলেন। থ্যাংক ইউ। মিস্টার বলা লাগবে না, ওকে শুধু জেফরি বললেই চলবে। আমাকে এরিনা। আমরা এখানে অত সৌজন্য আর ফর্মালিটির ধার ধারি না। তোমাদের জন্য আমারও খারাপ লাগছে। গ্লিটারে এলে বেড়াতে, আর এ সময়ই এ রকম একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। খাতির-যত্নও করতে পারব না ভালমত। আজ রাতটা কোথায় কাটাব, সেটাই জানি না।

অত চিন্তা করছ কেন, চাচী, জোসি বলল। আমাদের বড় কেবিনটাতেই থাকো। ধীরে সুস্থে তোমাদের কেবিনটা আবার বানিয়ে নিয়ো।

নিজেদের কেবিনের পোড়া দরজার কাছে গিয়ে ভিতরে উকি দিলেন জোসির চাচা। দেখে, ফিরে এলেন আগের জায়গায়।

মুন জিজ্ঞেস করল, কী দেখলে, বাবা?

মুনকে দেখছে মুসা। বয়েসে ওদের চেয়ে বছরখানেকের ঘোট। সুন্দরী। গভীর নীল চোখ।

পিছন দিকটাতেই ক্ষতি বেশি হয়েছে, জেফরি জানালেন। কিছু জামা-কাপড় আর ফার্নিচার বোধহয় বাঁচানো যাবে।

বাঁচানো গেলেও সাফ করতে জান বেরোবে, মুন বলল। যে পরিমাণ কালিঝুলি আর ছাই পড়েছে।

স্টোভটা জ্বেলে দিয়ে আসি, জোসি বলল।

মুসা জিজ্ঞেস করল, আমরা কোনও কাজে লাগতে পারি?

মাথা নাড়ল জোসি, না। আমিই পারব।

যে কেবিনে কিশোরদের থাকতে দিয়েছে, তার পরের কেবিনটার দিকে এগোল জোসি।

জেফরির দিকে ফিরল কিশোর। আগুন লাগল কীভাবে?

জানি না, মাথা নাড়লেন জেফরি। লাকড়ি আনতে বনে গিয়েছিলাম আমরা। ফিরে এসে দেখি জানালায় আগুনের আলো। দেখেই বুঝে গেলাম, চিমনির আগুন না।

কী করে বুঝলেন? জিজ্ঞেস করল মুসা।

জবাব দিতে যাচ্ছিলেন জেফরি, বাধা দিল মুন। ফিসফিস করে বলল, বাবা, আস্তে। ব্ৰিণ্ডল জ্যাক আসছে।

শক্ত হয়ে গেল জেফরির চোয়াল। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, আসতে দাও!

ঘুরে তাকাল কিশোর। ব্ৰিণ্ডল জ্যাককে দেখল। চেহারা আর ভাবভঙ্গি সন্দেহ জাগায়। মুখে বিচিত্র বাঁকা হাসি। ঠোটের এক কোণ বাঁকিয়ে হাসে। চোখে কুটিল দৃষ্টি।

দুঃখই লাগছে, জেফ, জ্যাক বলল। অবশ্য এমনিতেও পুরানো হয়ে গিয়েছিল কেবিনটা, নতুন আরেকটা বানাতে হতই। দেরি না করে শুরু করে দাও, বানাতে সময় লাগবে না। যে কাজটা ভাল, পারো, সেটা বাদ দিয়ে কেন যে জানোয়ার ধরতে যাও বুঝি না। ওসব তোমার কর্ম নয়। একটা পরামর্শ দিই শোনো, এখনও সময় আছে, জানোয়ার ধরা বাদ দিয়ে কেবিনের ব্যবসায় লাগো। গ্লিটারকে যদি সত্যিই থিম পার্ক বানানো হয় কখনও-এবং আমার বিশ্বাস, হবে-তাহলে কাজের অভাব হবে না তোমার।

তোমার পরামর্শ ছাড়াই এতকাল কাটিয়েছি, বাকি দিনগুলোও কাটাতে পারব! কঠিন কণ্ঠে বললেন জেফরি।

জ্যাকের ঠোটের কোণে হাসিটা বাড়ল। এই একটিবার অন্তত আমার পরামর্শ তোমাকে শুনতেই হবে, জেফ, নইলে শীতে জমে মরবে। যদি চাও তো তোমার কেবিন বানানোয় সাহায্য করতে পারি আমি।

ব্যঙ্গ করছে কি না জ্যাক বোঝা গেল না।

ভুরু কুঁচকে গেল জেফরির। চোখের পাতা সরু হয়ে এল। এত হাসি কেন তোমার মুখে, ব্ৰিণ্ডল? আগুন লাগানোয় তোমার হাত ছিল না তো?

না, ছিল না, সহজ কণ্ঠে জবাব দিল জ্যাক। থাকলে নিভানোয় সাহায্য করতে আসতাম না। তুমি তোক ভাল না, জেফ, তাই অন্যের জায়গায় ফাঁদ পেতে শয়তানি করতে পারো, কিন্তু আমি তো আর তোমার মত নই। যাক, কেবিনটা পুড়ে যাওয়ায় কিছুদিন শান্তিতে থাকতে পারব। এখানে তোমাকে কেবিন বানানোয় ব্যস্ত থাকতে হবে, বনে গিয়ে আমার ফাঁদ পাতায় বাগড়া দিতে পারবে না। টেনে টেনে হাসতে লাগল ও।

মুঠোবদ্ধ হয়ে গেল জেফরির হাত। শঙ্কিত হলো কিশোর। হাতাহাতি না বেধে যায়।

মুসাও চোখের পাতা সরু করে জ্যাকের দিকে তাকিয়ে আছে।

আগুনটা কীভাবে লেগেছে বলে তোমার ধারণা? জেফরি জিজ্ঞেস করলেন।

এটা কোনও প্রশ্ন হলো? জ্যাক বলল, ম্যাচের কাঠি, মশালের আগুন, ঘরের মধ্যে হ্যারিকেন উল্টে পড়া… কাঠের কেবিনে আগুন ধরানোটা কোন ব্যাপারই না। যেভাবেই ধরুক, তোমার কেবিনটার জন্য আমার দুঃখ হচ্ছে, জেফ। কিন্তু কী আর করবে। অ্যাক্সিডেন্ট তো আর বলে কয়ে আসে না।

ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল জ্যাক। ওর পিছু নিতে যাচ্ছিলেন জেফরি। ধরে ফেললেন এরিনা। না না, যেয়ো না।… বাইরে ঠাণ্ডা লাগছে। ঘরে চলো। চা খাই। রাতের খাওয়ার ব্যবস্থাও করতে হবে।

বাবা-মা চলে গেলে কিশোরদের দিকে ফিরল মুন। ফাঁদ পাতা নিয়ে বাবা আর ব্ৰিণ্ডল আঙ্কেলের ঝগড়াটা চিরকালের। দেখা হলেই শুরু করে। ঝগড়া না করে ওই সময়টা যদি থিম পার্ক নিয়ে মাথা ঘামাত, ভাল করত। থিম পার্কের কথা জোসি তোমাদের কিছু বলেছে নাকি?

বলেছে, জবাব দিল মুসা। পার্ক বানানোর ব্যাপারে তোমার বাবার কী মত?

বাবা পুরোপুরি এর বিপক্ষে, মুন বলল। বাবা বলে, থিম পার্কটা হতে দিলে আমরা হয়ে যাব সার্কাসের জানোয়ার। টুরিস্টরা আসবে, এমন ভঙ্গিতে তাকাবে আমাদের দিকে, যেন আমরা অদ্ভুত কোন জীব। প্রকৃতির মাঝে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকারও হারাব আমরা।

কিশোর জিজ্ঞেস করল, ব্রিণ্ডল জ্যাক কী বলে? সে কোন্ পক্ষে?

কীভাবে বলি? ও একটা অদ্ভুত চরিত্র। বাবা যদি কিছু করে, সে করবে ঠিক তার উল্টো। জেদ করেই যেন করে এ সব। হয়তো এ ক্ষেত্রেও বিপক্ষেই যাবে।

সেজন্যই কি তোমাদের কেবিনে আগুন ধরাল? হেসে বলল মুসা।

মুসার দিকে তাকাল মুন। না, এত পাগল না! শহরের বাড়িঘর যে সব কাঠের তৈরি, তা তো নিশ্চয় দেখেছ। শীতকালে শুকিয়ে ঠনঠনে হয়ে থাকে। বাতাস বইছে না বলে আজ বেঁচে গেছি। একটু বাতাস থাকলেই আমাদের কেবিনের আগুন সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ত। পুড়ে ছাই হতো গোটা শহর। পাগল হয়ে না গেলে এখানকার কোন লোক কারও ঘরে আগুন দেবে না, সেটা যার ঘরই হোক।

দুজনকে নিয়ে জোসিদের কেবিনে ঢুকল মুন। ঘরের ভিতরটা এখনও ঠাণ্ডা। তবে স্টোভের আগুনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে। ঘর গরম হতে দেরি হবে না। গায়ের পার্কা খুলে ফেললেন এরিনা। ঝুলিয়ে রাখলেন দরজায় গাঁথা হুকে। পাঁচ গ্যালনের একটা ক্যান থেকে কেটলিতে পানি ঢেলে চুলায় চাপালেন।

দুটো খালি ক্যান তুলে নিতে নিতে মুন বলল, আরও পানি লাগবে। ঝর্না থেকে নিয়ে আসিগে।

একটা ক্যান দাও আমার হাতে, হাত বাড়াল মুসা। আমিও তোমার সঙ্গে যাই।

হাসল মুন। দরকার নেই। তুমি ভাবছ আমার কষ্ট হবে? এ সব আমাদের দৈনন্দিন কাজ, জন্মের পর থেকে করে আসছি। শ্লেজ নিয়ে চলে যাব। কোনও অসুবিধে হবে না।

মুন বেরিয়ে গেলে জোসি ঢুকল। মলিন হাসি হেসে বলল, খুব বিরক্ত লাগছে, না? আমাদের জীবন এমনই। বিপদে ভরা। নানা

প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে আমাদের টিকে থাকতে হয়।

জোসি, এরিনা বললেন, তুমি চলে যাওয়ার পর ব্ৰিণ্ডল এসেছিল। আরেকটু হলেই হাতাহাতি বেধে যাচ্ছিল দুজনে।

কী নিয়ে? থিম পার্ক?

ঝগড়া তো করল ফাঁদ পাতা নিয়ে, তবে আমার মনে হয় থিম পার্কের পরিকল্পনাটাই আসল কারণ। তোমার চাচা যেহেতু পার্ক বানানোর বিপক্ষে, জানা কথা ব্ৰিণ্ডল যাবে পক্ষে, সব সময় উল্টো, এটাই তো হয়ে আসছে। ভোটটা শেষ হলে বাঁচি। এদিক ওদিক কিছু একটা হয়ে যাক। শহরটাকে দুই ভাগ করে ফেলেছে ওই থিম কোম্পানি। সবার ওপর সবাই খেপা। এমন তো কখনও হয়নি। এ কী গজব নেমে এলো!

কোন দল জিতছে? জানতে চাইল কিশোর।

মুখ বাঁকাল জোসি। বোঝা যাচ্ছে না। আগামী হপ্তায় ভোটাভুটি শেষ হওয়ার আগে বুঝতে পারবও না কিছু। কেউ মুখ খোলে না। কে যে কাকে সাপোর্ট করছে, বোঝা কঠিন।

লুক স্টার্লিঙের কথাই ধরা যাক। সে কাকে সাপোর্ট দিচ্ছে, কিছুতেই বুঝতে দেয় না, এরিনা বললেন। চালাক তোক তো। ওর দোকান থেকে মাল কেনা বন্ধ করে দেবে এই ভয়ে কাস্টোমারদের বুঝতে দেয় না কোন পক্ষ সমর্থন করে ও। সবার মন রক্ষা করে চলতে চায়।

অকারণ ভয়, জেফরি বললেন। লোকে ওর দোকান থেকে জিনিস কিনতে বাধ্য, কেউ ওকে পছন্দ করুক বা না করুক।

টেডের ব্যাপারটা কী? জিজ্ঞেস করল মুসা।

হাসল জোসি। টেডের এখন একটাই ভাবনা, ইডিটারোড রেসে আমাকে পরাজিত করা। এ ছাড়া ওর মগজে আর কোন চিন্তা খেলে না। ওর বাবা মিস্টার সিউল থিম পার্কের পক্ষে। শুনলাম, ব্ৰিণ্ডলও গিয়ে তার সঙ্গে খাতির জমিয়েছে।

সিউলকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি আমি, জেফরি বললেন। চুপ করে থাকে, কোন জবাব দেয় না। মুশকিল। ওদের ধারণা, পার্ক হলে শহরের ক্ষতি না হয়ে বরং লাভ হবে, আয় বেড়ে যাবে লোকের।

জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল কিশোর। মাত্র কয়েক গজ দূরে মাথা তুলে রেখেছে কালোবন। জেফরি, জোসি, জোসির বাবা-সবার কেবিনই এই বনের মধ্যে। কেউ আগুন লাগাতে চাইলে বনের ভিতর দিয়ে এসে সহজেই কাজটা সেরে যেতে পারে। জেফরিকে কথাটা বলতে যাচ্ছিল কিশোর, কিন্তু তার আগেই জানালায় এসে পড়ল একটা ভারী জিনিস। ঝনঝন করে ভেঙে পড়ল কাঁচ।


লাফ দিয়ে সরে গেল মুসা। কাঁচের টুকরো থেকে বাঁচাতে দুই হাত ঝটকা দিয়ে উঠে এল মুখের সামনে। কেবিনের মেঝেতে এসে পড়ল একটা মোটা আধপোড়া লাকড়ি। সময়মত মাথাটা সরিয়ে ফেলায় অল্পের জন্য লাগেনি মাথায়। জানালা দিয়ে ওকে সই করেই বোধহয় ছুঁড়ে মেরেছিল কেউ।

এক টানে হুক থেকে পার্কাটা খুলে নিয়ে দরজার দিকে দৌড় দিল মুসা। ছাড়বে না লোকটাকে।

কিন্তু বাইরে এসে মুনস্টোনকে ছাড়া আর কাউকে চোখে পড়ল। জে নিয়ে আসছে মুন। বিশ গজ দূরে রয়েছে এখনও। তার পক্ষে এত তাড়াতাড়ি লাকড়ি ছুঁড়ে আবার স্নেজের কাছে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। তা ছাড়া সে ছুঁড়তেই বা যাবে কেন?

মুন চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল মুসা, এদিক দিয়ে কাউকে যেতে দেখেছ?

না! জবাব দিল মুন। কী হয়েছে?

কিশোরও বেরিয়ে এল। মুসাকে জিজ্ঞেস করল, লোকটাকে দেখেছ নাকি?

মাথা নাড়ল মুসা। না!

তারমানে পালিয়েছে, চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল কিশোর।

কাছে এল মুন। ততক্ষণে জেফরি আর জোসিও বেরিয়ে এসেছে। জেফরির হাতে একটা লাকড়ি। লাঠির মত করে ধরেছেন।

ওদের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল কিশোর। নেই। আমার মনে হয় বনের ভিতর দিয়ে পালিয়েছে।

সব শুনে মুখ কালো হয়ে গেল মুনের। জ্বলে উঠল চোখ। কী শুরু হলো আমাদের শহরটায়!

হাতের দিকে তাকালেন জেফরি। লাকড়ি দেখে অবাক হলেন। ওটা কীভাবে এসেছে তার হাতে, মনে করতে পারলেন না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, এখানে দাঁড়িয়ে থেকে আর লাভ নেই। কেবিনে চলো। ভাঙা জানালাটা বন্ধ করা দরকার। ঘরে ঠাণ্ডা ঢুকবে।

সারি দিয়ে ঘরে ঢুকল সবাই।

কালো রঙের একটা প্লাস্টিকের চাদর খুঁজে বের করল জোসি। কাঁচভাঙা জানালার ফোকরটা বন্ধ করতে ওকে সাহায্য করলেন জেফরি। ঝাড়ু দিয়ে কাচের টুকরোগুলো মেঝে থেকে সরিয়ে ফেললেন এরিনা। তারপর চা ঢাললেন। চা খাওয়ার জন্য সবাই এসে টেবিলে বসল।

জোসির দিকে তাকালেন এরিনা। তোমার ঘর তো শূন্য। কোনও খাবারই নেই। আমাদেরগুলোও পুড়ে ছাই। দোকানে যেতে হবে।

আমি লিস্ট বানাচ্ছি।

চামচ দিয়ে নেড়ে চা ঠাণ্ডা করছে কিশোর। বলল, আগুন লাগার কারণ এখনও জানি না আমরা। আপনাআপনি লেগেছে, না কেউ লাগিয়ে দিয়েছে জানি না। তবে কড়িটা আপনাআপনি উড়ে আসেনি। কেউ জানালা দিয়ে ছুঁড়ে মেরেছে। নীচের ঠোট কামড়াল। তারপর চামচটা রেখে মুখ তুলে তাকাল। কে?

সেটা তো আমিও বুঝতে পারছি না! ধরতে পারলে আজ…দাঁত কিড়মিড় করলেন জেফরি।

এ সব ঘটনা এখন ডালভাত হয়ে গেছে গ্লিটারে, মুন বলল। থিম পার্ক বানানো নিয়ে ঝগড়া করে শহরটাই ধ্বংস হয়ে যাবে মনে হচ্ছে।

মুনের কথা সমর্থন করল জোসি। ইদানীং প্রায়ই ছোটখাট দুর্ঘটনা ঘটে যাচ্ছে শহরে। আগেও যে একেবারে ঘটত না তা নয়, তবে এখনকার মত এত বেশি না।

তারমানে তোমরাই একমাত্র লক্ষ্য নও? কিশোরের প্রশ্ন। কিশোরের দিকে তাকাল মুন। কিশোর, তোমাদের কথা সব আমাকে বলেছে জোসি। তোমরা গোয়েন্দা। অনেক জটিল রহস্যের সমাধান করেছ। আমাদের গ্লিটারের রহস্যটার সমাধান করতে পারবে?

কেন, পুলিশ কিছু করতে পারছে না?

দমকল বাহিনী যেমন নেই-আগুন লাগলে আমাদের নিজেদেরকেই আগুন নিভাতে হয়-দেখলেই তো, পুলিশও নেই আমাদের শহরে, কথাটা বলে আবার মুদির লিস্ট দেখায় মন দিলেন এরিনা।

পুলিশ না থাকলেও দরকার পড়লে স্টেট ট্রুপারদের ডাকতে পারি আমরা, মুন বলল। তবে কখনও ওদের ডাকার প্রয়োজন পড়েনি। এবার মনে হয় পড়বে।

হুঁ, মাথা ঝাঁকাল কিশোর। আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা আমরা করব।

এখানে, আলাস্কার এই দুর্গম অঞ্চলে জীবনযাত্রা মোটেও সহজ নয়, কিশোর, জোসি বলল। সব সময় কোন না কোন বিপদ লেগেই আছে। তোমাদের রকি বিচের মত নিরাপত্তা আর সুযোগ-সুবিধা পাবে

এখানে। কলের চাবিতে মোচড় দিলে সাপ্লাইয়ের পানি আসে না, হাসপাতাল নেই, একশো মাইলের মধ্যে একজন ডাক্তারও নেই।

সে-কারণে সাধারণ ছোটখাট দুর্ঘটনাকে আমরা তেমন কিছুই মনে করি না, এরিনা বললেন। সব কিছু নিয়ে ভাবতে গেলে টিকতে পারতাম না। অনেক কিছুই মনে রাখি না আমরা। কিন্তু কেউ আমাদের কেবিনে আগুন দিলে, সেটা আমরা ভুলতে পারি না।

আপনাদের বিরুদ্ধে কার এমন আক্রোশ থাকতে পারে? জিজ্ঞেস করল মুসা।

ব্ৰিণ্ডল জ্যাক, একসঙ্গে বলে উঠলেন এরিনা ও মুন। এরিনা বললেন, শিকারের ওই জায়গাটা নিয়ে দশ বছর হলো জেফরির সঙ্গে ঝগড়া। এখনও মিটমাট হলো না।

অস্বস্তি বোধ করছেন জেফরি। জ্যাক বদমেজাজী, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু ঘরে আগুন দেয়ার মত এতবড় একটা অন্যায় কাজ সে করবে বলে আমি মনে করি না। কিন্তু আমি ভাবছি আরেকজনের কথা। ইডিটারোড রেসে জিততে পারলে ভাল টাকা পাওয়া যায়। এ সময় আমাদের ঝামেলায় ফেলে দিতে পারলে রেসে মনোযোগ দিতে পারবে না জোসি।

তাই বাধা দিয়ে আমাকে রেসে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে চাইছে, এই তো বলতে চাও? ভুরু নাচাল জোসি। তুমি কি টেডকে সন্দেহ করছ, চাচা? ঝামেলা পাকিয়ে আমাকে যদি ঠেকাতে চায়, লাভ হবে না, আমি ওকে ছাড়ব না…।

জেফরির দিকে ফিরল কিশোর। আঙ্কেল, থিম পার্ক বানানোয় আপনি বিরোধিতা করছেন। আপনি দলের নেতা। এ নিয়ে আপনার সঙ্গে শত্রুতা করছে না তো বিপক্ষের কেউ?

জানি না। তবে ইলকিস বিগস মরিয়া। ওর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। তবে তাই বলে কারও ঘরে আগুন দেয়ার মত খারাপ লোক না ও।

ভাবছি, আমি আর কিশোর গিয়ে একটু ঘোরাঘুরি করে খোজখবর নিয়ে আসব কি না, মুসা বলল। আমরা এখানকার বাসিন্দা নই। লোকে আমাদের সঙ্গে মন খুলেই কথা বলবে।

তা ঠিক, হাসল জোসি। দুজন চিকাকোকে সন্দেহ করবে না লোকে।

কিশোর জিজ্ঞেস করল, নতুন কেউ এলে তাকে চিকাকো বলে নাকি?

জোসি বলল, হ্যাঁ। এক শীত কাটানোর পর চিকাকোর বদলে তোমরা হয়ে যাবে সাওয়ার-ডো, অর্থাৎ টক হয়ে যাওয়া ময়দার তাল। শব্দটা চালু করেছিল পুরানো আমলের স্বর্ণসন্ধানীরা। রুটি বানাতে ময়দার সঙ্গে ঈস্টের বদলে সাওয়ার-ডো ব্যবহার করত ওরা…

রুটি, রুটি! মনে করিয়ে দিয়ে ভাল করেছ, এরিনা বললেন। ময়দা দরকার। আরও কিছু টুকিটাকি জিনিস। মুসা, যদি জেনারেল স্টোরের দিকে যাও তোমরা, জিনিসগুলো নিয়ে এসো। পারবে?

পারব,মুসা বলল।

এই যে লিস্ট।

ভালই হলো, কিশোর বলল। জিনিস কেনার ছুতোয় সহজেই স্টোরের মালিকের সঙ্গে কথা বলতে পারব।

কেবিন থেকে বেরিয়ে হেঁটে চলল দুজনে। কিছুদূর যেতে সামনে পড়ল গোল্ড ফেরানি। মাথায় এখন লাল ঘেঁড়া টুপি। গায়ে একটা সবুজ পার্কা।

থাকতে এসেছ নাকি এখানে? রুক্ষ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল বুড়ো।

না, রেস দেখতে এসেছি, মুসা বলল। ইডিটারোডের ডগ রেস।

বাঁকা চোখে ওদের দিকে তাকাল গোল্ড। নাকি সোনা খুঁজতে?

না, সোনা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই। আমাদের আগ্রহ ডগ রেসে।

সত্যি কথা বলল।

সত্যি কথাই বলছি।

ভাল। শোনো ইডিটারোডের সব খবর আমার জানা। টেড আর জোসি রেসে অংশ নিতে যাচ্ছে, তা-ও জানি। এটা গ্লিটারের জন্য একটা বড় খবর। তারচেয়েও বড় খবর আছে এখানে, যার দেখার চোখ আছে সে ঠিকই দেখতে পাবে।

কী খবর? কিশোরের প্রশ্ন।

নাকের একপাশে টোকা দিল গোল্ড। তা বলব না। গোপন ব্যাপার। চলি। কয়েক পা গিয়ে ফিরে তাকাল লোকটা। সোনার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাতে যেয়ো না, তাহলে বিপদে পড়বে।

কিশোরের দিকে তাকাল মুসা। ও কী বলল, কিছুই তো বুঝলাম। সোনার খনিটনি পাওয়া গেছে নাকি এখানে? যেটা এখনও গোপন রয়েছে?

কী জানি! চিন্তিত ভঙ্গিতে কিশোর বলল। তবে আমার মনে হয় না। এখানে কোন কথা গোপন থাকে না। সোনার খনির মত এতবড় একটা খবর… সময় হলেই জানা যাবে। চলল।

শহরের ভিতর দিয়ে হাঁটার সময় চারপাশে নজর রেখে চলল মুসা। অনেক কিছুই দেখার আছে। একটা কেবিনের ছোট্ট জানালার কাছে বসে আছে দুটো ছোট ছেলে। মার্বেলের মত গোল কালো চোখ। খানিক দূর গিয়ে একজন বুড়ো মানুষের সঙ্গে দেখা। চেহারায় বয়েসের ভঁজ। পিঠে বাঁধা লাকড়ি, বোঝার ভারে কুঁজো। আরেকটা কেবিনের পাশ কাটানোর সময় ঘরের দরজায় বসা দুটো হাস্কি কুকুর লাফ দিয়ে উঠে দুজনের দিকে দাঁত খিচানো শুরু করল।

জেনারেল স্টোরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে মুসা বলল, অকারণে থিম পার্ক করতে চাইছে না ওরা। টুরিস্ট এখানে সত্যি আসবে। দেখার অনেক কিছু আছে।

স্টোরের সামনে এসে দাঁড়াল দুজনে। ঠেলা দিয়ে দরজার পাল্লা খুলল। ওপরে লাগানো একটা ঘণ্টা টুং-টাং করে বেজে উঠল। ঘরে ঢোকার পর পাল্লা লাগানোর সময় আবার বাজল ঘণ্টা।

জেনারেল স্টোরের চেহারাটা মুসার অনুমানের সঙ্গে মিলল না। এত কিছু দেখবে আশা করেনি। ঘরের মাঝখানে পেটমোটা বিরাট একটা কালো রঙের লোহার স্টোভ বসানো। সামনে রাখা দুটো পুরানো কাঠের চেয়ার। দেয়ালের অসংখ্য তাক জিনিসপত্রে বোঝাই। টিনের খাবার থেকে শুরু করে ঘড়ি, হাতুড়ি, হারিকেন, সব আছে। কাপড়ের বস্তায় ভরা ময়দা, চাল আর পোষা জানোয়ারের খাবার ঘরের কোণে স্থূপ করে রাখা। কাঠের একটা কেবিনেট আছে, তাতে ভর্তি উলের শার্ট, প্যান্ট, দস্তানা, মোজা আর লাল রঙের প্লেইড ক্যাপ। ঘরের পিছনে বুনো জানোয়ারের রোমশ চামড়ার স্থূপ। শিকারিদের কাছ থেকে কেনা।

কাউন্টারের ওপাশ থেকে বেরিয়ে এলেন যিনি, একেবারে খাপে খাপে মানিয়ে গেছেন এই পরিবেশের সঙ্গে। বয়েস পঞ্চাশ। হাড্ডিসর্বস্ব লম্বা শরীর। মস্ত টাক। শার্ট আর টাইয়ের ওপরে নীল-সাদা ডোরাকাটা অ্যাপ্রন।

জোসেফ টিনুকের বন্ধু তোমরা, দোকানী বললেন, লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে এসেছ। আমি লুক স্টার্লিং। আমাকে মিস্টার স্টার্লিং ডেকে জিভে ব্যথা করার দরকার নেই। শুধু লুক বলবে।

এখানে কি কেউ মিস্টার শব্দটা সহ্য করতে পারে না নাকি? প্রশ্ন না করে পারল না মুসা।

না, পারে না। এই বুনো প্রকৃতির মধ্যে ওই শব্দটা খুব বেমানান, রীতিমত কানে পীড়া দেয়। তো, কী কী জিনিস দরকার?

এরিনার দেয়া লিস্টটা বের করে দেখাল কিশোর।

নিজেরাই তুলে নাও, লুক বললেন।

মুসাকে ইশারা করল কিশোর। লিস্ট মিলিয়ে তাক থেকে জিনিসগুলো তুলে নিতে লাগল মুসা।

সাংঘাতিক কাণ্ড, বুঝলে, ওই আগুন লাগার কথা বলছি, ওপরের তাকে রাখা কিছু টিনের খাবার নামিয়ে আনার জন্য একটা মই বেয়ে উঠে গেলেন লুক। সে-কারণেই বলি, নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকা দরকার। এমনই দরিদ্র অবস্থা শহরটার, ছোটখাট একটা দমকলবাহিনী পোরও সামর্থ্য নেই। তবে, থিম কোম্পানি যদি আসে…

আপনি কি ওদের আসা চান, মিস্টার স্টার্লিং? মুসা জিজ্ঞেস করল।

বলেছি না মিস্টার বলার দরকার নেই। শুধু লুক। হ্যাঁ, তোমার প্রশ্নের জবাব হলো, আমি নিরপেক্ষ। আমি হলাম দোকানদার। আমার জন্য সব সমান। পক্ষপাতিত্ব করে কাস্টোমারদের বিরাগভাজন হতে চাই না। দলাদলিটা ওরাই করুক। শহরবাসী যে সিদ্ধান্ত দেবে, সেটাই আমি নির্দ্বিধায় মেনে নেব। তবে ইলকিস বিগৃসের কথায়ও যুক্তি আছে, অস্বীকার করতে পারব না। ওর কোম্পানি আলাস্কার বহু জায়গাতেই এ ধরনের টুরিস্ট স্পট বানিয়েছে। লোকে কী চায় ওরা জানে…

দরজার ঘণ্টা বাজল। থেমে গেলেন তিনি। ঘরে ঢুকল একটা লোক, এখানকার রোদ আর বরফের সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে, দেখেই বোঝা যায়। গায়ে পুরানো মলিন পার্কা। কাউন্টারে রাখা বড় একটা বয়েম দেখিয়ে পঁচিশ সেন্ট দামের ক্যাণ্ডি চাইল।

ক্যাণ্ডি বের করে দিলেন লুক। লোকটার হাত থেকে পাঁচ সেন্টের পাঁচটা মুদ্রা নিয়ে ঝনাৎ করে ড্রয়ারে ফেললেন। লোকটা বেরিয়ে গেলে বললেন, ওর নাম জো সারটন। চার ছেলেমেয়ের বাপ। ওদের মুখে খাবার যোগাতে হয়। কাপড়ের অবস্থা দেখেই তো বুঝলে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। থিম পার্ক হলে ভাল চাকরি পাবে। টাকা আসবে। অবস্থা ফিরে যাবে।

তারমানে থিম পার্কের পক্ষে ভোট দিচ্ছে ও? কিশোর বলল।

অন্যদিকে চোখ ফেরালেন লুক। উঁহু। জো স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছে হ্যাঁ ভোটের মধ্যে সে নেই। কিন্তু ভাল থাকতে চাইলে ওর হ্যাঁ ভোটই দেয়া উচিত।

এরিনার লিস্টের সমস্ত জিনিসপত্র দুটো কার্ডবোর্ডের বাক্সে প্যাকেট করে দিলেন লুক। একটা কাচের বাক্স ভর্তি অ্যাথাবাস্কান হস্তশিল্পের দিকে মুগ্ধ চোখে কিশোরকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বললেন, অনেক দামি ওগুলো। নেবে?

মেরিচাচীর জন্য একটা শো-পিস নেয়ার কথা ভাবছে কিশোর। হাসল। এখন না। পরে। জিনিসগুলো খুব সুন্দর।

ক্যালকুলেটর বের করে জিনিসের দাম হিসেব করলেন লুক। বিল বানালেন। টিনুকদের বাকির খাতায় লিখে রাখব। তোমরা এসো আবার। বাড়ি ফেরার আগে এসো। সস্তায় ভাল কী দেয়া যায়, চিন্তা করে দেখব।

অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, লুক, কিশোর বলল।

দুটো বাক্স নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এল মুসার পিছন পিছন।

বাইরে আসতেই বিগসের সঙ্গে দেখা। বলল, এমন কোনও জিনিস নেই যা লুকের দোকানে পাবে না। সব ধরনের খবরাখবর আর মন্তব্যও পাবে, বিনে পয়সায়। সম্ভব হলে এর জন্যও পয়সা নিত। মুখে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে, কিন্তু ভীষণ লোভী। থিম পার্কের কথা কিছু বলল নাকি? পক্ষে না বিপক্ষে?

পক্ষে-বিপক্ষে বোঝা গেল না, মুসা জানাল। তবে থিম পার্ক হলে শহরের গরিব মানুষদের দুঃখ ঘুচবে, এ কথাটা জোর দিয়েই। বললেন।

বিগ বলল, আমাদের নিজেদের স্বার্থ তো আছেই। তবে সত্যি সত্যি আমরা গিটারের মানুষকে সাহায্য করতে চাই। বাইরের সাহায্য ওদের প্রয়োজন।

কিন্তু আপনার কোম্পানি থিম পার্ক বানাতে গেলে তো অনেক কিছু বদলাবে, তাতে জায়গাটার মৌলিকত্ব নষ্ট হবে, কিশোর বলল।

হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবে উন্নতি যে হবে, এটাও তো ঠিক। যে কোনও পরিবর্তনের কথা শুনলেই ভয় পায় লোকে, নতুন কিছুকে গ্রহণ করতে শঙ্কিত হয়। আমার কাজ হলো ওদের বুঝিয়েশুনিয়ে ভুল ভাঙাননা, থিম পার্কের পক্ষে ভোট দিতে রাজি করানো; বোঝননা, এখানে থিম পার্ক হওয়াটা ওদের জন্য কতটা জরুরি।

কিন্তু কী করে বোঝাবেন?

কেন, ভাল ভাল কথা বলব। ওদের উন্নতির কথা শোেনাব, ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাব। আচ্ছা, এখন যাই। সময় নেই, পরে কথা বলব। হোম অফিসের সঙ্গে কথা বলা দরকার। টেলিফোন-টেলিগ্রাফ কিছুই তো নেই গ্লিটারে, লুকের টু-ওয়ে রেডিওটাই একমাত্র ভরসা। আমাদের থিম পার্ক হলে টেলিফোন সুবিধা পাবে এখানকার মানুষ। আদিমতা বর্জন করলে আমরা আধুনিকতার সুযোগ-সুবিধা পৌছে দেব ওদের কাছে।

দোকানে ঢুকে গেল বিগস্।

হাঁটতে লাগল কিশোর ও মুসা। কিছুদূর এগোতেই চিৎকার শুনে পাক খেয়ে ঘুরে দাঁড়াল দুজনে। নদীর ধারে লম্বা একটা নৌকার কাছে। বসে বরফ চাপড়ে বিলাপ করতে দেখল জো সারটনকে।


তাড়াতাড়ি বাক্স দুটো মাটিতে নামিয়ে রেখে দৌড় দিল কিশোররা। বরফে ঢাকা পিচ্ছিল নদীর ঢালে বসে রয়েছে জো সারটন। পাশে পড়ে আছে একটা দোমড়ানো তেরপল। নৌকার ওপর থেকে তুলে এনেছে।

পাড়ের ওপর থেকেই জিজ্ঞেস করল কিশোর, কী হয়েছে?

ফিরে তাকাল জো। আঙুল তুলে নৌকাটা দেখাল।

নৌকার তলায় চোখ পড়তে থমকে গেল কিশোর। অসংখ্য ফুটো।

বিলাপ করতে করতে জো বলল, এখন আমার কী হবে! এমনভাবে ফুটো করেছে, এই নৌকা আর মেরামত করা যাবে না। আমি এখন মাছ ধরব কী দিয়ে! ছেলেপুলে নিয়ে না খেয়ে মরব!

কিশোর জিজ্ঞেস করল, কে করল এই ফুটো?

তা কী আর দেখেছি? দেখলে কি আর করতে দিতাম?

জোর চিৎকারে লোক জমায়েত শুরু হলো। নৌকার অবস্থা দেখে সবাই থ। কীভাবে ফুটো হয়েছে জানতে চায় সবাই।

এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম, জো বলল। তেরপলটা নৌকার ওপর থেকে সরানো দেখে টেনে দিতে গিয়েছিলাম। দেখি এই অবস্থা। বলেই আবার বিলাপ শুরু করল, হায়রে! কে আমার এতবড় সর্বনাশ করল রে!

ফুটোগুলো পরীক্ষা করল মুসা। কিশোরকে বলল, গজাল দিয়ে করেছে।

কিশোর জিজ্ঞেস করল, কখন ফুটো করল? রাতে? কিন্তু গজালের মাথায় হাতুড়ি দিয়ে পিটানোর শব্দ তো শোনা যাওয়ার কথা।

চারপাশে তাকাল ও। কোথায় কী আছে দেখল। জেনারেল স্টোরটা বাদ দিলে কাছাকাছি দুটো কেবিন আছে। একটা বন্ধ। লোক থাকে কি না বোঝা গেল না। অন্যটার চিমনি দিয়ে হালকা ধোঁয়া উঠছে।

মিস্টার সারটন, কিশোর জিজ্ঞেস করল, শেষ কখন নৌকাটা ভাল দেখে গেছেন আপনি?

জবাব দিল না জো। যেন কিশোরের কথা শুনতেই পায়নি। আসছে বসন্তে মাছ ধরার মৌসুমে কী ভয়ানক অসুবিধেয় পড়বে লোকটা অনুমান করে কষ্ট হলো কিশোরের। আবার জিজ্ঞেস করল, শেষ কখন নৌকাটা ভাল দেখে গেছেন?

জো বলল, মনে নেই। সম্ভবত রোববারে।

সেদিন নৌকাটাকে ভাল দেখেছিলেন?

দেখেছি।

আপনাকে বিপদে ফেলার জন্যই কি কেউ নৌকাটা নষ্ট করে দিয়েছে, কি মনে হয় আপনার?

জানি না, জানি না, আমি কিছু জানি না! অস্থির ভঙ্গিতে দুই হাত নাড়তে নাড়তে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল জো। প্রশ্ন শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে গেছি আমি, আর ভাল লাগে না। সবারই খালি প্রশ্ন আর প্রশ্ন! ইডিটাররোডে কে জিতবে-জোসি না টেড? এ বছর স্যামনের মৌসুমে কেমন মাছ পড়বে? কাকে ভোট দেব? এখন শুরু হয়েছে নৌকা নিয়ে প্রশ্ন। অসহ্য!

এত প্রশ্ন কারা করে আপনাকে?

এই যে, তুমিই তো করছ। তোমার মত এমন অনেকেই আছে। অধৈর্য ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল জো। তেরপল তুলে নৌকাটা ঢেকে দিল আবার। যদিও এ নৌকা ঢেকে রাখার আর কোন যুক্তি দেখতে পেল না কিশোর।

দর্শকরা চলে যাচ্ছে। বেশির ভাগই শহরের দিকে। সবচেয়ে কাছের কেবিনটাতে গিয়ে ঢুকল এক মহিলা।

চলো তো, মুসাকে বলল কিশোর, একটু গোয়েন্দাগিরি করে আসি।

মুসাকে নিয়ে ছোট কেবিনটার কাছে এসে দাঁড়াল ও। দরজায় টোকা দিল।

খুলে দিল এক মহিলা। কী চাই?

নিজেদের পরিচয় দিয়ে কিশোর বলল, জো সারটনের নৌকাটা কে নষ্ট করেছে জানার চেষ্টা করছি আমরা। গত কয়েক দিনে কখনও হাতুড়ি পিটানোর শব্দ কানে এসেছে আপনার? বিশেষ করে রাতের বেলা?

হাতুড়ির শব্দ শুনিনি, তবে দুই রাত আগে লুক স্টার্লিং লাকড়ি কাটছিল।

সেটা কি অস্বাভাবিক? মুসার প্রশ্ন।

অস্বাভাবিকই তো, মহিলা বলল। সব সময় দিনের বেলায়ই লাকড়ি কাটে ও। ইলেকট্রিক করাত দিয়ে।

লাকড়ি কাটতে দেখেছেন তাঁকে? না শুধু করাতের শব্দ শুনেছেন?

শুধু করাতের শব্দ, ভুরু কোঁচকাল মহিলা। কেন, তোমাদের কি ধারণা করাত দিয়ে জোর নৌকার তলা ফুটো করেছে?

উঁহু! জবাব দিল মুসা। করাত দিয়ে ওভাবে ফুটো করা যায় না।

মহিলাকে ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে এল ওরা।

যাওয়ার পথে লুকের দোকানে থামল দুজনে। লাকড়ি কাটার কথা জিজ্ঞেস করল। লুক জানালেন, তিনি লাকড়ি কাটেননি। রাতের বেলা কাটেনও না। মহিলা করাতের শব্দ শুনে থাকলে ভুল শুনেছে। হতে পারে মুজ হরিণের ডাক শুনেছে, হেসে বললেন। ভুল করে বোকা মুজটা হয়তো লোকালয়ে ঢুকে পড়েছিল।

আপনি ওই বোকা মুজটার ডাক শুনেছেন?

না। আমার বেডরুমটা দোতলার এমন জায়গায়, রাস্তায় খুব জোরে কোন শব্দ না হলে শোনা যায় না।

দ্বিতীয়বার লুকের দোকান থেকে বেরিয়ে এল কিশোর ও মুসা। দোকানের বাইরে ফেলে যাওয়া টিনুকদের বাক্স দুটো নিয়ে কেবিনে ফিরে চলল।

তুষারে ঢাকা নির্জন পাহাড়ী রাস্তা। দুই পাশে কেবিন। ঠাণ্ডার ভয়ে দরজা লাগানো। মুসা বলল, দিনের বেলায়ই লোক চলাচল নেই। রাতে অত ঠাণ্ডার মধ্যে কে বেরোবে? লুকের বোকা মুজের ধারণাটাই বোধহয় সত্যি।

কিন্তু মুজ তো আর গজাল ঠুকে নৌকা ফুটো করতে পারবে না, কিশোর বলল। জোর নৌকাটা যে নষ্ট করেছে সে মানুষ। জানে, রাতে বেরোলে কারও চোখে পড়বে না। সহজেই কাজ সেরে চলে যেতে পারবে।

আচ্ছা, জোর নৌকা নষ্ট করা, টিনুকদের কেবিনে আগুন লাগানো আর জোসির ঘরে লাকড়ি ছুঁড়ে মারার মধ্যে কোন সম্পর্ক নেই তো?

থাকতে পারে, চিন্তিত ভঙ্গিতে জবাব দিল কিশোর। কাকতালীয় ঘটনা আমি বলব না একে। কী রকম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এখানে বাস করে মানুষ, দেখেছ? একটানা দীর্ঘ শীত। সারা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন। কর্মহীন ঘরে বসে থাকা। স্নায়ুতে ভীষণ চাপ পড়ে। মাথায় গোলমাল হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়। আর পাগল হয়ে গেলে কী না করে মানুষ। যাদের দেখতে পারে না তাদের ওপর আক্রোশ মেটানোর চেষ্টা যদি করে থাকে এ রকম কোনও পাগল, আমি অবাক হব না।

ভাবছি, ব্ৰিণ্ডল জ্যাকের সঙ্গে জো সারটনের সম্পর্কটা কেমন? নিজেকেই প্রশ্ন করল মুসা। জোসি হয়তো বলতে পারবে।

অর্ধেক পথ এসে জোসির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ওদের। জোসি বলল, এলে। আমি তো আরও ভাবলাম, হারিয়েই গেলে বুঝি তোমরা।

জো সারটনের নৌকাটার কথা জোসিকে জানাল মুসা। তারপর জ্যাক আর জোর সম্পর্ক নিয়ে যে কথাটা ওর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল এতক্ষণ, সেটা বলল।

বহু বছর ধরেই ওদের সম্পর্ক ভাল না, জোসি জানাল। তবে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। জ্যাকের সম্পর্ক কারও সঙ্গেই ভাল না, একমাত্র টেডের বাবা মিস্টার সিউল ছাড়া।

কিশোরের মনে পড়ল, জো বলছিল ইডিটারোড নিয়ে নানারকম প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে ওকে। ডগজে রেসের সঙ্গে জো কোনভাবে জড়িত কি না, জোসিকে জিজ্ঞেস করল।

ও একজন প্রথম শ্রেণীর রেসার, জোসি বলল। আশপাশের পঞ্চাশ মাইলের মধ্যে ওর মত মাশার নেই। হাস্কি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান। তবে এখন আর মাশিং করতে পারে না। কয়েক বছর আগে ছেলের অপারেশনের টাকা জোগাড়ের জন্য বাধ্য হয়ে গাড়িসহ কুকুরগুলোকে বিক্রি করে দিয়েছিল। বেচারা!

দুঃখজনক! আফসোস করল মুসা। কিন্তু সে যদি আর রেসে অংশ গ্রহণ না-ই করে, লোকে ইডিটাররোড রেসের ব্যাপারে ওকে প্রশ্ন করে কেন?

করবেই তো। সে রেস বিষেশজ্ঞ। সম্ভবত, কার ওপর বাজি ধরা উচিত সেটা বুঝতে চায় লোকে। ইডিটারোডের ডগ রেস এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় রেস। বহু টাকার জুয়া চলে। প্রতি বছর বহু লোক ধনী হয়, আবার বহু লোক সর্বস্বান্তও হয়। আমার আর টেডের ওপরও গ্লিটারের লোকে এবার বাজি ধরবে, জানা কথা।

কথা বলতে বলতে কেবিনে পৌঁছল ওরা। বাক্স নিয়ে ভিতরে ঢুকল। জোসি জিজ্ঞেস করল, আরেকবার প্র্যাকটিস রানে গেলে কেমন হয়? পরিশ্রম না করালে চর্বি জমে যাবে কুকুরের গায়ে, অলস হয়ে পড়বে ওরা।

ভালই তো হয়,মুসা বলল। আমি রাজি।

কিশোর বলল, আমারও কোন আপত্তি নেই।

কুকুরের গলায় লাগাম পরাতে জোসিকে সাহায্য করল দুজনে। নদীতে উঠে গতি বাড়াল কুকুরগুলো। লেজ উঁচু করে দিয়েছে। হাঁ করা চোয়ালের এক কোণ দিয়ে বেরিয়ে পড়েছে লাল জিভ।

যাচ্ছি কোথায়? কিশোরের প্রশ্ন।

মিঙ্ক রিভারে, জোসি জানাল। স্লেজের পিছনের রেইলে দাঁড়িয়েছে ও। বার বার পা নামিয়ে ঠেলা দিচ্ছে স্লেজের গতি বাড়ানোর জন্য। বেশি দূরে না।

কত দূর? মুসা জানতে চাইল।

এই পাঁচ মাইল। হাস্কির জন্য এটা কোন দূরত্বই না।

তা তো বুঝতেই পারছি, কিশোর বলল। ইডিটারোড রেসে এগারোশো মাইল দৌড়াবে যারা, তাদের জন্য পাঁচ মাইল আর কী। কটা দল অংশ নিচ্ছে এবার?

নদীর ওপরের বরফের স্তর মসৃণ নয় মোটেও। অসমতল। এবড়ো-খেবড়ো। টিলা-টক্করও আছে। লাফিয়ে উঠল স্লেজ। টিলা পেরিয়ে আসার পর কিশোরের কথার জবাব দিল জোসি, সত্তরআশিটা দল হবে।

হিসেব করল মুসা, সত্তর-আশিটা দলে অন্তত হাজারখানেক কুকুর। অ্যাংকারেজে একটা দেখার মত দৃশ্য হবে

নদীর ওপাড়ে তাকাল ও। পাহাড়ে তো তেমন তুষার দেখছি না। গলে যায় নাকি?

থাকলে তো গলবে, জোসি বলল। শুনে অবাক হবে, আমাদের এদিকটা আসলে এক ধরনের মরু অঞ্চল। বছরে বারো ইঞ্চির বেশি তুষারপাত হয় না। এই বরফ তো তৈরি হয়েছে নদীর পানি জমে।

সামনে রাস্তাটা দুই ভাগ হয়ে গেছে। চেঁচিয়ে উঠল জোসি, জি, ডায়মণ্ড, জি!

দলের কুকুরগুলোকে নিয়ে ডান দিকের পথটা ধরে ছুটল ডায়মণ্ডহার্ট।

আরও মাইল দুই এগোনোর পর ইউকন থেকে সরে এল জোসি, অপেক্ষাকৃত সরু আরেকটা নদীর ওপর দিয়ে স্লেজ ছোটাল। বন্ধুদের জানাল, মিংক রিভারে যাবার এটা শর্টকাট।

মিনিট দশেক পর গতি কমিয়ে দিল কুকুরগুলো। চিন্তিত মনে হলো জোসিকে।

কী হয়েছে? জানতে চাইল কিশোর। দ্বিধা করছে জোসি। সামনে নরম বরফ।

বকের মত গলা বাড়িয়ে দিয়ে সামনে তাকাল কিশোর। ওর চোখে বরফের স্তরে কোন তফাৎ ধরা পড়ল না।

নদীর তলায়ও ঝর্না আছে এখানে, জানো বোধহয়। বরফের স্তর পাতলা হয়ে যাওয়ার কারণটা ব্যাখ্যা করল জোসি, সেগুলো থেকে গরম পানি বেরিয়ে নীচের দিকের বরফ গলিয়ে দেয়। বছরের এ সময়টাতেই এ ঘটনা বেশি ঘটে।

সামনে তো আর এগোনো যাবে না বোঝা যাচ্ছে, মুসা বলল। কী করবে এখন? গাড়ি ঘোরাবে?

এমন একটা জায়গায় চলে এসেছে, ঘোরানোটাও আর সহজ নয়, বুঝে গেছে কিশোর। এখন কুকুরগুলোকে ঘোরাতে হলে পাতলা বরফে উঠতেই হবে।

ইজি, ডায়মণ্ড, ইজি! মোলায়েম স্বরে আদেশ দিল জোসি।

দৌড়াননা বাদ দিয়ে হেঁটে চলেছে কুকুরগুলো। চোখে অস্বস্তি। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে।

ইজি, ডায়মণ্ড, সাবধান করল জোসি।

থেমে গেল ডায়মণ্ডহার্ট। চারপাশে তাকাতে লাগল।

হাইক! হাইক! চিৎকার করে উঠল জোসি। নদীর কিনারের দিকে সরে যেতে চায়।

কিছু যদি ঘটে… বলতে গেল জোসি।

বন্দুকের গুলি ফোটার মত শব্দ হলো। ঝট করে ফিরে তাকাল কিশোর। স্লেজের ডান পাশের বরফে চওড়া একটা ফাটল চোখে পড়ল। তীরের কাছে নিরাপদ জায়গায় পৌছে গেছে কুকুরগুলো। কিন্তু নদীর মাঝখানের পাতলা বরফ স্লেজের ভার সইতে পারছে না।

জোসি, কী করব আমরা? চেঁচিয়ে উঠল কিশোর। নেমে যাব?

না-না! চেঁচিয়েই জবাব দিল জোসি। বসে থাকো, যেভাবে আছ!

জমাট বাতাসে প্রতিধ্বনি তুলল যেন তীক্ষ্ণ একটা শব্দ। অনেকটা বন্দুকের গুলির মত, তবে আরও জোরে। বরফের স্তর ভেঙে গেছে। লাফিয়ে নামল জোসি। রেইল চেপে ধরে স্লেজটাকে আটকানোর চেষ্টা করল।

বরফের ভাঙা স্তরের সঙ্গে সঙ্গে ডান পাশে কাত হয়ে যাচ্ছে, স্নেজু। পিছলে নেমে যেতে শুরু করল পানির দিকে।


উঠে দাঁড়াল মুসা। দুই হাত দুই পাশে ছড়িয়ে দিয়ে ভারসাম্য বজায়ের চেষ্টা করল। কাজ হলো না। স্লেজের রেইল এসে ওর গোড়ালি ধরে টান মারল। পিছনে উল্টে পড়ল ও। ফুসফুসের সমস্ত বাতাস বেরিয়ে গেল। বরফ-শীতল পানি যেন গিলে নিল ওকে।

বরফের কিনার খামচে ধরার চেষ্টা করল ও। বরফের নীচে আটকে পড়ে বাস্তবে কাউকে মরতে দেখেনি, তবে সিনেমায় দেখা ভয়ঙ্কর দৃশ্যগুলো ফুটে উঠল চোখের সামনে। নদীর তলায় জুতো ঠেকল। পানি বেশি না। সোজা হয়ে দাঁড়ালে বুক পানি হয়। দশ ফুট চওড়া একটা ফোকর তৈরি হয়েছে বরফে। কিশোর আর জোসির নাম ধরে চিৎকার করে ডাকতে লাগল।

ভয় নেই, দাঁড়িয়ে থাকো, জবাব দিল কিশোর। তোমাকে তুলে আনার ব্যবস্থা করছি আমরা।

বরফের মত ঠাণ্ডা পানি মারাত্মক বিপজ্জনক। দেহের অতি মূল্যবান উত্তাপ শুষে নিয়ে দ্রুত শীতল করে ফেলছে দেহটাকে। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে, নিজেকে বোঝাল মুসা। ওপরে ওঠার জন্য দাপাদাপি করলে আরও দ্রুত ফুরাবে জীবনীশক্তি।

ধীরে ধীরে পানি আর ভাঙা বরফের টুকরো বুক দিয়ে ঠেলে কিনারের দিকে এগোতে পারে, কিন্তু সাহস করল না। স্রোতের টানে বা অন্য কোনভাবে যদি ডুবে গিয়ে বরফের স্তরের নীচে চলে যায়, আর বেরোতে পারবে না।

দাঁড়িয়ে রইল ও। গায়ের চামড়ায় সুচ ফুটাচ্ছে ভীষণ ঠাণ্ডা পানি।

ওদিকে জেটাকে আটকে ফেলেছে কুকুরের দল, পানিতে পড়তে দেয়নি–স্লেজের মধ্যে পাগলের মত কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে কিশোর ও জোসি। অমন করে কী খুঁজছে ওরা, বুঝতে পারছে না মুসা। অবশেষে সোজা হয়ে দাঁড়াল জোসি। হাতে একটা কুড়াল। দৌড় দিল বনের দিকে।

ও এখন যাচ্ছে কোথায়? আমি এদিকে জমে মরছি! চিৎকার করে বলল মুসা।

তোমাকে বাঁচানোর জিনিস আনতে গেছে, কিশোর বলল। নড়াচড়া কোরো না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকো।

পা অবশ! সাড়া পাচ্ছি না! দাঁতে দাঁতে বাড়ি খাচ্ছে মুসার।

হামাগুড়ি দিয়ে মুসার দিকে এগোতে শুরু করল কিশোর। দূরত্ব মাত্র কয়েক ফুট, কিন্তু এই পরিস্থিতিতে সেটাও অনেক। চড়চড় শব্দ করে উঠল বরফ।

ফিরে যাও, কিশোর! চিৎকার করে উঠল মুসা। বরফ তোমার ভার সইতে পারছে না।

চুপ করে থাকো। আমার কাজ আমাকে করতে দাও।

তুমিও যদি পানিতে পড়ে যাও, তাতে আমার কোন উপকার হবে। তারচেয়ে জোসির জন্য অপেক্ষা করো। ও জানে, এখন কী করা দরকার, আমরা জানি না।

ঠিকই বলেছে মুসা। অনিচ্ছাসত্ত্বেও পিছিয়ে গেল কিশোর। বার্চের একটা লম্বা ডাল হাতে ছুটে বেরোতে দেখা গেল জোসিকে। দৌড়ে আসতে লাগল।

কিশোর, নদীর পাড়ে পা রেখে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ো, জোসি বলল। শক্ত করে আমার গোড়ালি চেপে ধরে রাখবে।

কী করতে চাও?

বরফের স্তরে দেহের ওজন সমানভাবে ছড়িয়ে দেয়া গেলে সহজে ভাঙবে না বরফ। উপুড় হয়ে শুয়ে খুব সাবধানে ইঞ্চি ইঞ্চি করে মুসার দিকে এগোতে শুরু করল জোসি। ডালটা সামনে বাড়িয়ে দিল। মুসা, দেখো তো নাগাল পাও নাকি?

ডান হাত যতটা সম্ভব লম্বা করে দিল, মুসা। আঙুলের মাথা থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে রয়েছে ডালের মাথা। কিন্তু এখন এটাকেও বিশাল দূরত্ব মনে হচ্ছে। পারছি না তো!

আরেকটু আগে বাড়ল জোসি। বিপজ্জনক জায়গায় চলে এসেছে। এখন?

আবার হাত বাড়াল মুসা। ডালের মাথা এখনও ওর নাগালের বাইরে।

প্রাণপণে জোসির গোড়ালি চেপে ধরে রেখে প্রায় ককিয়ে উঠল কিশোর, চেষ্টা করো, মুসা। ডালটা ধরো।

বড় করে দম নিল মুসা। দেহের শক্তি নিঃশেষ হয়ে আসছে।

ডালটা আরও ইঞ্চি দুয়েক ঠেলে দিল জোসি। এবার?

ডালের মাথায় লক্ষ্য স্থির করল মুসা। তারপর প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে ঝাপ দিল। হাত ফসকালে সোজা চলে যেত বরফের তলায়, কিন্তু শেষ মুহূর্তে ধরে ফেলল ডালের মাথা। পা উঠে গেল ওপরে। তাতে দেহটা পুরোই ডুবে গেল বরফ-শীতল পানিতে। শরীর অবশ হয়ে যাওয়াতে ঠাণ্ডাও আর অতটা টের পাচ্ছে না। বুঝতে পারছে, মোটেও ভাল লক্ষণ নয় এটা।

এই তো পেরেছ! ধরে রাখো! খবরদার, ছাড়বে না! চিৎকার করে উঠল কিশোর।

দুই হাতে ধরো, জোসি বলল।

বড় করে দম নিল মুসা। নদীর পিচ্ছিল মাটিতে পা ঠেকাল আবার। ভালমত ধরতে না পারলে ডাল থেকে হাত ছুটে যাবে। অন্য হাতটাও বাড়িয়ে দিল। ডালের গায়ে শক্ত হয়ে চেপে বসল ওর আঙুল।

গুড! ধরে রাখো! ছাড়বে না! জোসি বলল। ইঞ্চি ইঞ্চি করে পিছানো শুরু করল। ডালের সঙ্গে মুসাকেও টেনে নিয়ে আসতে লাগল।

জোসিকে আরও তাড়াতাড়ি পিছাতে সাহায্য করল কিশোর। মুসার মনে হলো অনন্তকাল ধরে টানার পর অবশেষে পানি থেকে তুলে আনা হলো ওকে।

আনন্দে চেঁচিয়ে উঠে মুসার পিঠ চাপড়ে দিল কিশোর।

জোসি বলল, এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করা যাবে না। ডায়মণ্ডহার্টকে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে কিশোর-মুসাকে নিয়ে শক্ত জায়গায় চলে এল ও।

কম্বল দরকার, কিশোর বলল।

থরথর করে কাঁপছে মুসা। ভীষণ শীত থেকে বাঁচার জন্য কুঁকড়ে ফেলেছে শরীর।

সবার আগে ওর কাপড় খোলা দরকার, জোসি বলল।

এই ঠাণ্ডার মধ্যে! কিশোর অবাক।

যা বলছি, করো। ভিজে কাপড় গায়ের উত্তাপ শুষে নিচ্ছে। যত দেরি করবে ততই ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। কিশোর; স্লেজে ইমারজেন্সি কিট আছে, জলদি আনো। ওটার মধ্যে স্পেস ব্ল্যাঙ্কেট পাবে। স্পেশাল কম্বল। ওর কাপড়-চোপড় সব খুলে ফেলে গায়ে কম্বল জড়াও। আমি আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা করি।

মুসার আঙুল অবশ। জিপার, বোতাম, কিছুই খোলার ক্ষমতা নেই। কাপড় খুলতে ওকে সাহায্য করল কিশোর। তারপর আলট্রাথিন মেটালিক কম্বলটা জড়িয়ে দিল গায়ে।

দাঁতের কাঁপুনি বন্ধ করতে পারছে না মুসা। এর মধ্যেও জোক বলে শীত ভুলে থাকার চেষ্টা করল। হাসল কিশোর। কথা বোলো না।

না বলে পারছি না তো…

বাদামি রঙের এক গুচ্ছ ঘাস নিয়ে ফিরল জোসি। একটা সমতল পাথর থেকে বরফ সরিয়ে ঘাসগুলো রাখল তার ওপর।

কী ঘাস? জানতে চাইল কিশোর।

মেঠো ইঁদুরের বাসা, জোসি বলল। জ্বলে কী রকম দেখো।

শুকনো ডাল ভেঙে ঘাসগুলোর ওপর ছড়িয়ে দিল ও। তারপর পানি নিরোধক একটা হোল্ডার থেকে দিয়াশলাই বের করে আগুন ধরাতে ব্যস্ত হলো।

চোখের পলকে আগুন ধরে গেল ঘাসে। তাতে ডালপাতা ফেলে আগুনটা বাড়াল জোসি। তৈরি হয়ে গেল অগ্নিকুণ্ড। আগুনের ধার ঘেঁষে বসল তিনজনে। ওদের দেহ যেন শুষে নিতে লাগল প্রাণদায়ী সেই উত্তাপ। হাত-পায়ের সাড় ফিরতে মুখ তুলে তাকাল মুসা। হাসি ফুটল মুখে। কিশোর আর জোসির মাঝেও সংক্রামিত হলো ওর হাসি।

মুসার ভিজা কাপড় আগুনের আঁচে শুকাতে দিয়ে নাস্তা খেতে বসল ওরা। ইমারজেন্সি কিট থেকে বের করল পিচফল আর হার্ডট্যাক ক্র্যাকার অর্থাৎ লবণ মাখানো শুকনো গরুর মাংসের টুকরো। একটা ক্যানে কিছু তুষার গলিয়ে নিয়ে স-নিডলের চা বানাল জোসি। অবশেষে শহরে ফিরে যাওয়ার মত বল পেল মুসা শরীরে। আগুন নিভিয়ে, স্লেজ ঘুরিয়ে, শহরে যেতে তৈরি হলো ওরা।

একদিনের জন্য যথেষ্ট প্র্যাকটিস হয়েছে, কি বলল? হেসে ভুরু নাচাল জোসি।

একদিন না, তিন দিন, কিশোর বলল।

উঁহু, মাথা নাড়ল মুসা, তিন মাস।

যে পথে এসেছিল, সে-পথেই ইউকনে ফিরে এল ওরা। নদীর মাঝখান দিয়ে চলল। আর কোন বিপত্তি ঘটল না। নিরাপদেই ওদেরকে পার করে আনল ডায়মণ্ডহার্ট। হঠাৎ গোঁ গোঁ করে উঠল কুকুরটা। বার বার ফিরে তাকাচ্ছে জোসির দিকে।

জোসি বলল, হ্যাঁ, আমিও দেখেছি!

কাকে? কিশোরের প্রশ্ন।

ডায়মণ্ডহার্টের সঙ্গে কথা বলছি আমি, জোসি বলল। আমাদের দিকেই আসছে দলটা। ডায়মও আগে দেখেছে। দেখে আমাকে জানিয়েছে।

কী করে বুঝলে তুমি? জিজ্ঞেস করল মুসা।

প্র্যাকটিস আর অভিজ্ঞতা দিয়ে, জবাব দিল জোসি।

কই, আমি তো কিছু দেখছি না, কিশোর বলল। আকাশ আর বরফ ছাড়া।

গতি কমাল না ডায়মণ্ডহার্ট। তবে অন্য দলটাকে দেখার জন্য সারাক্ষণ মাথা উঁচু করে রাখল।

এ পথেই আসছে এখনও? জোসিকে জিজ্ঞেস করল মুসা।

হ্যাঁ, জোসি জবাব দিল। চিনতে পেরেছি ওকে। টেড।

এত দূর থেকে চিনলে? মুসা অবাক। শুধু ওই কালো বিন্দুগুলো দেখে?

হ্যাঁ, মাথা ঝাঁকাল জোসি। এ সব আমাদের শিখতে হয়। এখানে দূর থেকে যে চিনতে পারবে না, যে কোন সময় ভয়ানক বিপদ হতে পারে তার। আমি এখান থেকেই বলে দিতে পারব দলটা কত বড়, কত গতিতে ছুটছে, কত দক্ষ মাশার।

কিন্তু টেড এখানে কী করছে? কিশোরের প্রশ্ন।

প্র্যাকটিস, জবাব দিল জোসি।

পঞ্চাশ গজের মধ্যে চলে এল টেড। ভঙ্গিতেই বোঝা যাচ্ছে রাস্তা ছাড়ার কোন ইচ্ছেই নেই ওর। ঝামেলা করতে চাইল না জোসি। ডায়মণ্ডহার্টকে থামতে বলে ব্রেক চাপল। জেটা রাস্তা থের্কে নামাতে জোসিকে সাহায্য করল কিশোর ও মুসা। জোসি কুকুরগুলোকে রাস্তা থেকে সরিয়ে এনে চুপ থাকতে বলল।

সোজা ওদের দিকে ছুটে এল টেড। গতি কমাল না। দ্রতা করেও একটা কথা বলল না কারও সঙ্গে।

জোসি চুপ। তাকিয়ে আছে কিশোর-মুসা। রাস্তা দখল করে রেখে নিজেকে শক্তিমান প্রমাণের চেষ্টা করছে টেড। তবে জোসি বুদ্ধিমান। এ মুহূর্তে কিছু বলার অর্থ ঝগড়া বাধানো। সেটা এড়াতে চাইছে ও। ইডিটারোড রেসের আগে মারামারি করে কুকুরগুলোর ক্ষতি করতে রাজি নয়।

বারো ফুটের মধ্যে চলে এল টেড। হাত তুলে ওকে থামার ইশারা করল জোসি। সামনের দিকে নজর টেডের। জোসিকে দেখেও না দেখার ভান করল। শ্লেজের হুস হুস শব্দ তুলে পাশ কেটে বেরিয়ে গেল।

এত অভদ্র তো দেখিনি! রেগে গেল মুসা।

সাবধান করতে চেয়েছিলাম ওকে, যাতে পাতলা বরফে না ওঠে, গম্ভীর শোনাল জোসির কণ্ঠ।

উঠুক। ঠাণ্ডা পানিতে পড়লে বুঝবে মজা, কিশোর বলল। মরবে, কি বলো? মুসা তো বেঁচে গেল।

এখনও পুরোপুরি বাঁচিনি, পরিস্থিতি হালকা করার জন্য হাসল মুসা। কাপড়ই শুকায়নি ঠিকমত। আরাম পাচ্ছি না।

স্লেজটা রাস্তায় তুলল জোসি। আবার ছুটল।

শহরটা নজরে আসতেই গতি বেড়ে গেল কুকুরগুলোর। লেজ নাড়াও বেড়েছে। শক্তিশালী পেশিতে নতুন শক্তি সঞ্চারিত হয়েছে।

নদীতীরের রাস্তা ধরে দলটাকে ছুটিয়ে নিয়ে এল ডায়মণ্ডহার্ট। কেনলের কাছে এসে থামল।

লাগাম খুলতে জোসিকে সাহায্য করল কিশোর ও মুসা। কুকুরগুলোকে খাবার আর পানি দিল জোসি। তারপর কিশোরদের নিয়ে ঘরে ফিরে চলল।

কেবিনের কাছাকাছি প্রায় চলে এসেছে ওরা, হাত তুলল মুসা, মুন না?

জোসি বলল, কিছু হয়েছে!

মুন ওদের দেখে দৌড়ে আসতে শুরু করল।

জোসি, কয়েক গজ দূরে থাকতে চেঁচিয়ে উঠল মুন, জলদি চলো! বাবার শরীর খুব খারাপ।

কী হয়েছে?

জানি না। খাওয়ার পর থেকে কেমন করছে। চোখে পানি এসে গেছে মুনের। জোসি, আমার ভয় লাগছে। বাবা যদি মরে যায়!


একটা মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে মুনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল জোসি। পরক্ষণে ঝটকা দিয়ে ঘুরে কেবিনের দিকে ছুটল। পিছনে ছুটল কিশোর ও মুসা। হুড়মুড় করে কেবিনের দরজা দিয়ে ঢুকে থমকে দাঁড়াল।

বিছানায় কুঁকড়ে পড়ে আছেন জেফরি। দুই হাতে পেট চেপে ধরে গোঙাচ্ছেন। পাশে বসা এরিনা। ভিজা কাপড় দিয়ে বার বার জেফরির কপাল মুছে দিচ্ছেন।

এগিয়ে গিয়ে জেফরির কাঁধে হাত রাখল জোসি। চাচীকে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?

মাথা নাড়লেন এরিনা। জানি না। হঠাৎ করেই বলল পেটে ব্যথা। তারপর থেকে বেড়েই চলেছে। বিছানায় থাকতে পারছে না।

আমার ভয় লাগছে, বলে কিশোর-মুসার দিকে তাকাল মুন। কিছু একটা করা দরকার।

উঠে দাঁড়ালেন এরিনা। জোসি, এ অবস্থায় তোমার চাচাকে আমার একা রেখে যাওয়া উচিত হবে না। বনে যাবে? কী আনতে হবে জানোই তো।

দরজার দিকে পা বাড়াতে গিয়ে ফিরে তাকাল জোসি।

কিশোরদের বলল, তোমরাও এসো। আমাকে সাহায্য করবে।

পায়ে চলা পথ ধরে বনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করল কিশোর, কোথায় যাচ্ছ?

বনে, জোসি বলল।

তা তো বুঝলাম, মুসা বলল। কী আছে ওখানে?

ভেষজ ওষুধ। চাচীর মা আর নানী খুব ভাল কবিরাজ ছিলেন। চাচী তাঁদের কাছ থেকেই কবিরাজি শিখেছে।

আর তুমি?

চাচীর কাছে।

ইণ্ডিয়ানদের অসাধারণ কবিরাজি জ্ঞানের কথা শুনেছে কিশোর। শত শত বছর নানারকম গাছ, পাতা আর শিকড়-বাকড় দিয়ে কঠিন কঠিন রোগের সফল চিকিৎসা করে আসছে তারা। ইদানীং বড় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলোও ইণ্ডিয়ানদের এ সব ওষুধের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এ সব ভেষজ সম্পর্কে বিশদভাবে জানতে গবেষক দল পাঠাচ্ছে ইণ্ডিয়ান অঞ্চলে।

বনের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মিনিট বিশেক পরেই কিশোর লক্ষ করল, গাছপালার চেহারা বদলে যাচ্ছে। পিছনে ফেলে এসেছে প্রুস গাছের ঘন জঙ্গল। সামনের জায়গাটা মোটামুটি পাতলা। বার্চ আর অ্যাসপেন গাছ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। স্নান সূর্যালোক চিকচিক করছে পাতাঝরা গাছগুলোর ডালে জমে থাকা বরফে।

বড় একটা ওক গাছ দেখাল জোসি। ওটার গোড়ার তুষার চেঁছে ফেলে দিলে এক ধরনের শ্যাওলা পাবে। তুলে নিয়ে এসো।

দৌড়ে গিয়ে কাজ শুরু করে দিল কিশোর ও মুসা। তুষার ফেলে দিতেই বেরিয়ে পড়ল বিচিত্র চেহারার শ্যাওলা। ভিজা মাটির গন্ধে ভরা। জোসি তখন অন্য জিনিস জোগাড়ে ব্যস্ত। বরফ খুঁড়ে এক জাতের চিরসবুজ উদ্ভিদ খুঁজে বের করল। উপড়ে নিল কয়েকটা গাছ। কালো রঙের চেরি-বার্ডের এক টুকরো বাকল কেটে নিল। এলডার ঝোপের শিকড় নিল। আর নিল দুই ধরনের গাছের দুটো নরম ডাল। এ গাছগুলো কিশোরের অচেনা।

কাজ শেষ করতে দশ মিনিট। দৌড়ে গ্লিটারে ফিরে চলল তিনজনে। ফেরার পথে গতি বেশি, কারণ ঢাল বেয়ে নামছে। কেবিনে ঢুকতে বিচিত্র সুবাস নাকে ঢুকল ওদের। স্টোভের ওপর কালো রঙের একটা কেটলিতে পানি ফুটছে, তাতে কিছু মিশিয়েছেন এরিনা, সেটার গন্ধই বেরোচ্ছে। জোসির হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে ডাল-পাতা, শিকড়, বাকল, শ্যাওলাগুলো বের করে কেটলির পানিতে মিশানো শুরু করলেন।

কিশোর জিজ্ঞেস করল, জেফরি আঙ্কেল কীজন্য অসুস্থ হয়েছেন, আপনি বুঝতে পেরেছেন?

মাথা ঝাঁকালেন এরিনা। মনে হয়। আপেলটাতে বোধহয় খারাপ কিছু ছিল। ওটা খাওয়ার পর থেকেই পেটব্যথা শুরু।

আপনারা খাননি? আপনি আর মুন?

না। ও একাই খেয়েছে।

জোসি বলল, ঘরে আপেল আছে তাই তো জানতাম না।

ছিলও না, মুন জানাল। ইলকিস বিগ এক ঝুড়ি তাজা ফল উপহার দিয়ে গেছে।

মুসার দিকে তাকাল কিশোর। চোখে চোখে কথা হয়ে গেল। দুজনের মনে একই ভাবনা। জেফরিকে উপহার পাঠাল কেন বিগস? সে জানে বিরোধী দলের নেতা জেফরি। ফল পাঠানোটা ঘুষ না তো? ঘুষ হোক আর যা-ই হোক, মারাত্মক বিষে ভরা এই উপহার।

আপেলের মধ্যে বিষ ঢুকিয়ে দেয়নি তো বিগস? বিশ্বাস হতে চাইছে না কিশোরের। তবে উদ্দেশ্যটা বোঝা যাচ্ছে। জেফরি সহ তার পরিবারের লোকেরা অসুস্থ হয়ে পড়লে থিম পার্কের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলায় মনোযোগ দিতে পারবেন না তিনি। তাঁর কেবিন পোড়ানো, জো সারটনের নৌকা নষ্ট করা, সব এই পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ। ধরে নেয়া যায়, পার্কের সপক্ষের কেউ এই অকাজগুলো করেছে।

বছরের এ সময়ে তাজা ফল পেল কোথায় বিগস্? জোসির প্রশ্ন।

কেটলিতে চাপানো ওষুধ নাড়তে নাড়তে ফিরে তাকালেন এরিনা। নিশ্চয় প্লেনে করে এনেছে। আমরা মনে করেছিলাম আমাদের কেবিনের শোক ভোলাতে, আমাদের খুশি করতে ফলগুলো উপহার দিয়েছে বিগস্।

দেয়ার সময় কিছু বলেছে? জানতে চাইল মুসা।

ও নিজে নিয়ে আসেনি, এরিনা জানালেন।

টেডকে দিয়ে পাঠিয়েছে, মুন বলল।

এক মিনিট এক মিনিট, ভুরু কুঁচকে গেছে কিশোরের। টেড সিউল? ও আনতে গেল কেন?

মুন বলল, লুক স্টার্লিঙের অনুরোধে।

এরিনা বললেন, লুকের কাছ থেকে অর্ডার পেলে খাবার আর অন্যান্য জিনিস ফেয়ারব্যাংকস থেকে নিয়ে আসে ডিউক আইকহ্যাম। লুক তখন সেগুলো নিজেই যার যার ঠিকানায় পৌছে দেয় কিংবা টেডের মত কাউকে দিয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করে।

আরও প্রশ্ন করার জন্য মুখ খুলতে যাচ্ছিল কিশোর, হাত তুলে বাধা দিলেন এরিনা। মোটা একজোড়া দস্তানা পরে নিয়ে গরম কেটলিটা ধরে উঁচু করলেন। একটা মাটির পাত্রের মুখে পরিষ্কার এক টুকরো কাপড় রাখল মুন। তাতে কেটলির তরল পদার্থ ঢালতে লাগলেন এরিনা। কাপড়টা ছাঁকনি হিসেবে কাজ করল। মাটির পাত্র থেকে সেই তরল পদার্থ আবার বড় হাতায় করে চিনামাটির মগে নিলেন তিনি। তাতে সামান্য ঝর্নার পানি ঢেলে, অল্প একটু মধু মিশিয়ে ঠাণ্ডা করে নিয়ে গেলেন জেফরির কাছে।

বাবাকে বিছানায় উঁচু করে ধরল মুন। মগটা জেফরির ঠোটের কাছে ধরলেন এরিনা। ওষুধ খেয়ে আবার বিছানায় শুয়ে পড়লেন জেফরি।

এরিনাকে জিজ্ঞেস করল কিশোর, আচ্ছা, আন্টি, ফলের যে ঝুড়িটা দিয়ে গেল, তার মধ্যে কি নাম লেখা কোন কার্ড বা নোট ছিল?

ড্রেসারের ওপর থেকে একটা কার্ড নিয়ে এলেন এরিনা। কিশোরের হাতে দিলেন। দেখার জন্য কাত হয়ে এল মুসা। লেখা রয়েছে ইলকিস বিগস, ফিল্ড রেপ্রেজেনটেটিভ, থিম পার্ক। কার্ডের উল্টো দিকের সাদা অংশে হাতে লেখা কথাটার বাংলা মানে করলে দাঁড়ায়: অনেক শুভেচ্ছা। ইলকিস।

হ্যাঁ, কার্ডটা বিগসেরই, কোন সন্দেহ নেই, কিশোর বলল। কিন্তু জেফরি আঙ্কেলের নাম তো নেই কোথাও। এমনও তো হতে পারে কার্ডটা অন্য কাউকে দিয়েছিল বিগস। বিগসই উপহার পাঠিয়েছে বোঝানোর জন্য সেই লোক কার্ডটা ফলের ঝুড়িতে ভরে দিয়েছে।

টেড সিউলের মত কেউ? মুসার প্রশ্ন।

হতে পারে।

কিশোরের দিকে তাকাল জোসি। তুমি বলতে চাও ফলগুলোতেই গোলমাল?

ল্যাবরেটরি টেস্ট না করে শিওর হওয়া যাবে না। কিন্তু কোন কিছুর বিনিময়েই ওই আপেলে কামড় বসাতে রাজি নই আমি।

রাগে লাল হয়ে গেল জোসির মুখ। টেড যদি ভেবে থাকে আমার পরিবারের ওপর হামলা চালিয়ে, তাদের ক্ষতি করে ইডিরাটোড রেসে আমার অংশ নেয়া বন্ধ করাবে, মস্ত ভুল করছে ও। ওকে আমি ছাড়ব না।

ওর বাহুতে হাত রাখল মুন। জোসি, না জেনে কাউকে দোষারোপ করা ঠিক না। অন্য কেউও তো এ সব শয়তানি করে থাকতে পারে? টেড সিউলকে দোষী বানানোর জন্য।

ওর কথায় যুক্তি আছে, মনে মনে স্বীকার করল কিশোর।

পারলে কিছু একটা করো, এরিনা বললেন। আরও খারাপ কিছু ঘটে যাবার আগেই।

টেবিল থেকে ওষুধের মগটা তুলে নিয়ে আবার জেফরির কাছে গেলেন এরিনা। কেমন লাগছে এখন?

কোলাব্যাঙের স্বর বেরোল জেফরির গলা দিয়ে, ভাল।

আরেকটু দেব?

চোখ-মুখ কুঁচকে জেফরি বললেন, তোমার ওই ভয়াবহ জিনিস!

হাসলেন এরিনা। স্বাদটা খারাপ, তবে ওষুধ হিসেবে খুবই ভাল, অস্বীকার করতে পারবে না।

উঠে বসার চেষ্টা করলেন জেফরি। কাঁধ চেপে ধরে শুইয়ে দিলেন এরিনা। রেস্ট নাও। তোমার এখন বিশ্রাম দরকার।

সন্ধ্যার পর এরিনা বললেন, মুজের মাংসের কাবাব বানাব। আনতে পারবে?

উঠে দাঁড়াল মুসা। পারব।

কোথায় রেখেছেন? জানতে চাইল কিশোর।

আমাদের কেবিনের পিছনের ছাউনিতে, এরিনা বললেন। হুকে ঝোলানো আছে, আস্ত একটা রান। ছুরি, করাত সবই পাবে ওখানে।

লণ্ঠন জ্বেলে দিল জোসি। বাতি হাতে বাইরের অন্ধকারে বেরিয়ে এল কিশোর ও মুসা। উজ্জ্বল বড় বড় তারা মেরুর আকাশে ঘন হয়ে ফুটে আছে। কাছেই একটা পেঁচা ডাকল। মানুষের সাড়া পেয়ে ঝোপের মধ্যে ছুটে পালাল ছোট কোন জানোয়ার।

এ রকম সাধারণ একটা ছাউনির মধ্যে মাংস রাখে! মুসা বলল।

হাসল কিশোর। ভয় নেই। শীতকাল। নষ্ট হবে না। ছাউনির ভিতরের তাপমাত্রা এখন ডিপ ফ্রিজের চেয়ে কম নয়।

তারমানে মাংস জমাট বেঁধে বরফের মত শক্ত হয়ে গেছে। করাত ছাড়া কাটা যাবে না।

পোড়া কেবিনটার কাছে পৌঁছল ওরা। এখনও ধােয়ার গন্ধ বেরোচ্ছে। পাশ দিয়ে ঘুরে আসতে ছাউনিটা চোখে পড়ল। দরজা খুলল মুসা। ভিতরে ঢুকল দুজনে।

লণ্ঠন উঁচু করে ঘরের মধ্যে খুঁজতে লাগল কিশোর। বাঁয়ে একটা কাঠের বাক্স। তার ওপর রাখা চামড়ার স্তুপ, ফাঁদ পেতে ধরা হয়েছিল বুনো জানোয়ারগুলোকে। জমে শক্ত হয়ে গেছে। পিছনের দেয়ালে ঝোলানো কাঠ চেরাই করার একটা অনেক বড় করাত। চালাতে দুজন লাগে। বড় একটা বেতের ঝুড়িতে রাখা প্রয়োজনীয় নানারকম যন্ত্রপাতি।

সবই তো আছে দেখছি, কিন্তু মাংস কোথায়? চারপাশে তাকিয়ে খুঁজতে লাগল মুসা।

লণ্ঠনটা আরও উঁচু করে ধরল কিশোর। বিম থেকে বড় একটা হুক ঝুলছে। নিশ্চয় ওটাতেই ঝোলানো ছিল মাংসের টুকরো।

তাহলে এখন গেল কোথায়… কিশোর, দেখো!

মুসার কণ্ঠস্বর চমকে দিল কিশোরকে। চরকির মত পাক খেয়ে ঘুরে দাঁড়াল। ছাউনির কাঠের দেয়ালে কালো রঙ দিয়ে আঁকা একটা হৃৎপিণ্ড। মাঝখানে একটা ছুরি গাঁথা।


স্তব্ধ হয়ে ছুরিটার দিকে তাকিয়ে আছে দুজনে। দীর্ঘ একটা মুহূর্ত কেটে গেল। অবশেষে মুখ খুলল মুসা, মাংসের টুকরোটা হুক থেকে খুলে নিয়ে গেছে কেউ।

গম্ভীর হয়ে মাথা ঝাঁকাল কিশোর। মনে হয়।

কোন বুনো জানোয়ার অত ওপরে নাগাল পাবে না। নেকড়ে ততা পাবেই না, ভালুকেও পাবে না। তাহলে মানুষের খাবার চুরি করতে এল এ কোন জানোয়ার?

মানুষ-জানোয়ার, জবাব দিল কিশোর। খাওয়ার জন্য চুরি করলে মাপ করে দেয়া যেত। কিন্তু আমি শিওর, টিনুকদের ভয় দেখানোর জন্য করেছে। বোঝাতে চেয়েছে, দেখো, কত সহজেই আমি কত বড় ক্ষতি করে দিতে পারি। বসন্তকাল না আসা পর্যন্ত এখন না খেয়ে থাকো।

দেয়ালের কাছে গিয়ে ছবিটা শুকে দেখল কিশোর। তাজা রঙ। ঘণ্টা দুয়েক আগে এঁকেছে।

এক মুহূর্ত ভাবল মুসা। বলল, দুই ঘণ্টা আগে ফল নিয়ে এসেছিল টেড। ফলের ঝুড়ি রেখে ফিরে যাওয়ার সময় মাংসের টুকরোটা বের করে নিয়ে যাওয়া ওর জন্য সহজ।

যে কারও জন্যই সহজ। মাত্র কয়েক পা দূরে বন। ভিতর দিয়ে এলে কারও চোখে পড়বে না।

কিন্তু নিল কীভাবে? মুসার প্রশ্ন। মুজের একটা আস্ত রান কাঁধে করে বয়ে নিতে পারবে না। অনেক ওজন।

কম করে হলেও পঞ্চাশ কেজি। কিন্তু আমি ভাবছি টিনুকরা এখন খাবে কী? শিকারের মৌসুমের তো এখনও অনেক দেরি। কী যেন ভাবল কিশোর। চলল তো, বাইরে গিয়ে দেখি। কোন সূত্র পাই কি না।

কেরোসিন-লণ্ঠনের কাঁপা কাঁপা অতি সামান্য আলো। তবে চিহ্নটা খুঁজে বের করতে বেগ পেতে হলো না ওদের। এক ইঞ্চি চওড়া দুটো গভীর রেখা চলে গেছে বরফের ওপর দিয়ে। রেখা দুটোর মাঝখানের দূরত্ব দেড় ফুট।

ডগশ্রেজের দাগ না, মুসা বলল। তাহলে দাগের মাঝখানের দূরত্ব আরও বেশি হতো।

ঝর্না থেকে পানি আনতে গিয়েছিল মুন, মনে আছে? হাতে টানা একটা স্লেজ নিয়ে গিয়েছিল সে…

নীচের চোয়াল স্কুলে পড়ার অবস্থা হলো মুসার। কিশোর, তুমি মুনকে সন্দেহ করছ?

না না, তা করছি না, কিশোর বলল। তবে পানি আনার পর ছাউনির বাইরে রেখেছিল হয়তো স্লেজটা। আর তাতে করে মাংস বয়ে নিতে পারে চোর।

মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে ভালমত দাগগুলো দেখল মুসা। হ্যাঁ, স্টেজে করেই নিয়েছে। দেখো, ডানের রেখাটার চেয়ে বায়ের রেখাটা বেশি গভীর। বোঝার ভারে হয়েছে। আর বোঝা মানে মাংস। ভারী দিকটা রাখা ছিল গাড়ির বাঁ পাশে।

অন্ধকারে জোসির ডাক শোনা গেল, কিশোর? মুসা?

জোসি, আমরা এখানে, জবাব দিল মুসা।

জোসি এলে ওকে সব জানাল ওরা। অ্যাথাবাস্কান ভাষার তুবড়ি ছোটাল জোসি। একটা বর্ণও বুঝল না দুজনে।

এই দেখো, স্লেজের দাগ, লণ্ঠনটা উঁচু করে ধরল কিশোর।

ওকে অবাক করে দিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল জোসি। একটা রেখার ওপর গাল চেপে ধরল। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, চাচার স্লেজ। চুরিটা করেছে সূর্য ডোবার ঠিক পর পর।

কী করে বুঝলে? কিশোরের প্রশ্ন।

রেখা ছুঁয়ে, জোসি বলল। চলো, দেখি চোরটা কোনদিকে গেছে।

বনের ভিতর দিয়ে পঞ্চাশ গজ মত এগিয়ে হাত তুলল জোসি। দাঁড়াও। ঝোপের মধ্যে কী যেন পড়ে আছে। কিশোর, লণ্ঠনটা বা দিকে উঁচু করো তো।

উঁচু করে ধরল কিশোর। চোখের পাতা সরু করে তাকাল মুসা। অন্ধকারে একটা কালো কী যেন পড়ে থাকতে দেখল।

হাসল জোসি। ওটাই আমাদের মুজের মাংস। যাক, রাতে আর খেয়ে থাকতে হবে না।

আস্ত একটা রান সহ এক পাশের অনেকখানি মাংস। টুকরোটা ছাউনিতে বয়ে নিল এল ওরা।

তোমরা কাটতে থাকো, আমি আসছি, ছাউনি থেকে বেরিয়ে গেল জোসি। দাগ ধরে ধরে চোরের সন্ধানে এগোল। কয়েক মিনিট পর ফিরে এসে জানাল, ওর কাছে যেতে পারলাম না। ভীষণ চালাক। স্লেজটা নেয়নি। ঝোপের মধ্যে মাংস ফেলে দিয়ে জেটা এনে রেখে গেছে আবার ছাউনির কাছে।

কিশোর বলল, আমি জানতাম, চুরির উদ্দেশ্যে চুরি করেনি চোর। ভয় দেখাতে চেয়েছে।

হ্যাঁ, জোসিও কিশোরের সঙ্গে একমত। চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল, প্রথমে আমাদের কেবিনে আগুন, তারপর জানালা দিয়ে লাকড়ি ছুঁড়ে মারা, তারপর আপেলে বিষ দেয়া, আর সবশেষে এই মাংস চুরি। কেউ একজন আমাদেরকে প্রচণ্ড ঘৃণা করে।

পরদিন সকালে জোসি ওর কুকুরগুলোকে দেখতে গেল, কিশোর ও মুসা চলল শহরে, রহস্যের তদন্ত করতে। প্রথমেই যার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল, সে ইলকিস বিগ্‌স্।

হাই, বয়েজ, দেখেই হাসিমুখে চেঁচিয়ে উঠল বিগ। তারপর? গ্লিটারে কেমন কাটছে সময়?

ভাল, জবাব দিল কিশোর। এই ফলের ঝুড়ির ব্যাপারে কিছু কথা ছিল।

বলে ফেলল। কীসের ফল?

ওই যে গতকাল আপনি যেটা পাঠিয়েছিলেন টিনুকদেরকে, মুসা বলল।

আমি ফল পাঠাইনি। তবে মনে করিয়ে দিয়ে ভালই করলে। ওদের তো সবই পুড়ে গেছে। কিছু খাবারটাবার পাঠানো উচিত। শুনলাম, কাল রাতে নাকি ওদের খাবারও চুরি করে নিয়ে যাচ্ছিল। এ সময়ে কারও মাংস চুরি যাওয়ার মানে ভয়ানক বিপদ। স্রেফ না খেয়ে মরতে হবে।

কিন্তু আপনি জানলেন কীভাবে? কিশোরের প্রশ্ন।

তোমাদেরকে তো আগেই বলেছি, এখানে খবর খুব দ্রুত ছড়ায়। ফলের ঝুড়ির কথা কী যেন বলছিলে?

এক ঝুড়ি তাজা ফল দিয়ে আসা হয়েছিল টিনুকদের বাড়িতে, তাতে আপনার কার্ড ছিল, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বিগসের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে কিশোর। চেহারার কোন পরিবর্তন দেখল না। ওই ঝুড়ির আপেল খেয়ে অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন জেফরি আঙ্কেল। প্রায় মরার দশা।

কঠিন হয়ে গেল বিগসের দৃষ্টি। তোমরা কী বলতে চাও, বুঝতে পারছি। কিন্তু কাল কাউকে ফল পাঠাইনি আমি,

তাহলে ঝুড়িতে দেয়া কার্ডটা? মুসার প্রশ্ন।

গ্লিটারের অর্ধেক লোকের কাছেই আমার কার্ড আছে, বিগ বলল। যে কেউ আমার কার্ড ঝুড়িতে রেখে দিতে পারে। যা-ই হোক, আমাকে এখন যেতে হবে। জরুরি কাজ আছে।

তাড়াহুড়া করে চলে গেল বিগস্।

কিশোর বলল, অন্য কেউ পাঠিয়েছিল আপেলের ঝুড়িটা।

কে পাঠিয়েছিল জানি আমরা, মুসা বলল। জোসির বিরুদ্ধে যার প্রচণ্ড আক্রোশ। জোসির রেস জেতা যে বন্ধ করতে চায়। প্রয়োজনে তার আত্মীয়-স্বজনের ক্ষতি করে হলেও।

চলো, লুককে জিজ্ঞেস করে দেখি তিনি কী বলেন। তাঁর টুওয়ে রেডিওটাও লাগবে। থিম পার্কের ব্যাপারে মিস্টার সাইমনকে একটু খোঁজ-খবর করতে বলব।

বিখ্যাত গোয়েন্দা মিস্টার ভিকটর সাইমন, খোড়া গোয়েন্দা বইতে তিন গোয়েন্দার সঙ্গে তাঁর পরিচয়। এরপর থেকে তার সঙ্গে বহু কেসে কাজ করেছে তিন গোয়েন্দা। কখনও তিনি ওদের সহায়তা চেয়েছেন, কখনও তিন গোয়েন্দা ওঁর সাহায্য নিয়েছে।

ভালই হয়, কিশোরের কথায় মুসাও একমত। চলো।

দোকানেই পাওয়া গেল লুককে। রেডিও ব্যবহার করতে চাইল কিশোর। ওদেরকে দোকানের পিছনের ঘরে নিয়ে গেলেন লুক। ফেয়ারব্যাংকসে যোগাযোগ করা হলো প্রথমে। সেখান থেকে লাইন দেয়া হলো রকি বিচে। একটা টেলিফোন রিসিভার কিশোরের হাতে ধরিয়ে দিলেন লুক।

মাইক্রোফোনে হাত চাপা দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিশোর। লুকের দিকে তাকাল।

বুঝতে পারলেন তিনি। অ, একা কথা বলতে চাও। তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

গ্লিটারে কী ঘটছে, সংক্ষেপে মিস্টার সাইমনকে জানাল কিশোর। তবে ওর সন্দেহের কথা চেপে গেল। কারণ একটা ছোট শর্ট ওয়েভ রেডিও সেট-এর সাহায্যে যে কেউ ওদের গোপন কথা শুনে নিতে পারবে।

সবশেষে বলল, সার, একটা কোম্পানি এখানে থিম পার্ক বানাতে চায়। কোম্পানিটা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই। ব্যাপারটা খুব ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে আমার কাছে। এ ব্যাপারে আপনি কিছু জানেন নাকি?

আলাস্কার গ্লিটারে থিম পার্ক? না, জানি না তো, মিস্টার সাইমন বললেন। তবে ইন্টারেস্টিং বলছ যেহেতু, খোঁজ নেয়া যেতে পারে। ঘণ্টাখানেক পরে আবার যোগাযোগ কোরো এই নম্বরে।

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল কিশোর। মিস্টার সাইমন ওর ইঙ্গিত বুঝতে পেরেছেন। মুসাকে বলল, ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই জানাবেন। ফলের ঝুড়িটার কথা আর আপাতত জিজ্ঞেস করব না লুককে। মিস্টার সাইমন কী বলেন আগে শুনি। তারপর।

দোকান থেকে বেরিয়ে এল দুজনে। পরের পঁয়তাল্লিশ মিনিট টেডকে খুঁজে বেড়াল ওরা। রাস্তায় কয়েকজন জানাল, সকালে টেডকে দেখেছে। কিন্তু কিশোর-মুসা ওর দেখা পেল না।

দোকানে ফিরে এল ওরা। আবার মিস্টার সাইমনের সঙ্গে যোগাযোগ করল কিশোর। কথা শেষ করতে মিনিটখানেকের বেশি লাগল না এবার। লাইন কেটে দিয়ে মুসাকে জানাল, কোম্পানিটার কোন বদনাম নেই, তবে টাকার টানাটানিতে পড়েছে। থিম পার্কের প্ল্যান কার্যকর করতে না পারলে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে যাবে ওদের পক্ষে।

মাথা দোলাল মুসা। হু। তারমানে ভোটে জিততেই হবে ওদের, যেভাবেই হোক। আর জেতার জন্য হয়তো বিষ খাইয়ে মানুষ মারতেও পিছ-পা হবে না। খুবই জোরাল মোটিভ।

খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে নিল কিশোর, কাছাকাছি। লুক আছে কি না। কণ্ঠস্বর নামিয়ে বলল, কিন্তু বিগ তো ফলের ঝুড়ি পাঠানোর কথা স্বীকার করল না।

অপরাধী কি আর সহজে কিছু স্বীকার করে? মুসা বলল, চলো, লুকের সঙ্গে কথা বলি।

দোকানের মূল ঘরে ফিরে এল ওরা। চকচকে পালিশ করা কাউন্টারের ওপাশে তাকের ওপর কনডেন্সড মিল্কের টিন সাজাচ্ছেন লুক। ফিরে তাকিয়ে হাসলেন। কি, কথা হলো?

হ্যাঁ। থ্যাংক ইউ, জবাব দিল কিশোর। আচ্ছা, লুক, কাল আপনি টিনুকদের বাড়িতে ফলের ঝুড়ি পাঠিয়েছিলেন?

মাথা নাড়লেন লুক। আমি না, বিগ দিয়েছিল। আমি টেডকে দিয়ে জেফরির বাড়িতে পাঠিয়েছি। কেন?

আশ্চর্য! মুসা বলল। আপনার দোকানে আসার আগে বিগসের সঙ্গে দেখা হয়েছে আমাদের। স্বীকারই করল না।

তাই নাকি? আমার এই কাউন্টারের ওপর পেয়েছি ঝুড়িটা। তাতে বিগৃসের একটা কার্ড আর একটা নোট ছিল। নোটে অনুরোধ করে লেখা ছিল, ঝুড়িটা যাতে টিকদের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করি। আমি ভাবলাম বিগসই রেখে গেছে।

কিশোর জিজ্ঞেস করল, নোটটা আছে?

না। ফেলে দিয়েছি। কী যেন মনে পড়তে মাথা দোলালেন। মনে হচ্ছে, শুধু বিস্ না, গোল্ডও এতে জড়িত। ওকে দিয়েই করিয়েছে।

বুড়ো প্রসপেক্টর?

মাথা ঝাঁকালেন লুক। কাউন্টারের দিকে চোখ নামালেন। মানুষের গোপন কথা অন্য কাউকে জানাতে ভাল লাগে না আমার। চোখ তুলে বিব্রত হাসি হাসলেন। কিন্তু মনে হচ্ছে তোমাদের বলা উচিত। কাল রাতে বিগসকে গোল্ডের হাতে টাকার তোড়া দিতে দেখেছি। চুপি চুপি দিচ্ছিল। এত টাকা কেন দিল গোল্ডকে? শুধু শুধু নিশ্চয় নয়? কিছু করানোর জন্য দিয়েছে।

কীভাবে দেখলেন? জানালা দিয়ে। কি জানি কি মনে হলো, রাতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলাম, তখন দেখলাম।

লুককে ধন্যবাদ দিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এল দুই গোয়েন্দা। রাস্তায় নেমে কিশোর বলল, গোন্ডের সঙ্গে কথা বলা দরকার।

একটা কেবিন দেখে থামল ও। গোল্ডকে কোথায় পাওয়া যাবে জিজ্ঞেস করে জেনে নিল।

পাহাড়ী রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল ওরা। শহরকে পিছনে ফেলে এগিয়ে চলল। পায়ে চলা সরু পথটা পুরানো দিনের গোন্ড রাশ যুগের কথা মনে করিয়ে দেয়।

গোন্ডের সোনার খনিটা শহর থেকে বিশ মিনিটের হাঁটা পথ। বরফ জমে থাকা সরু নালার ওপাশে মলিন একটা কুঁড়ে, প্রথম চোখে পড়ল কিশোরের। মুসাকে দাঁড়াতে বলে এগিয়ে গিয়ে গলা চড়িয়ে ডাকল, হাই, গোন্ড?

জবাব পেল না।

আরেকটু কাছে গিয়ে আবার ডাকল।

মৃদু পদশব্দ শুনে ঘুরে তাকাতে গেল। পারল না। পিছন থেকে ওর গলা পেঁচিয়ে ধরল একটা বাহু। চাপ বাড়াতে বাড়াতে শ্বাসরুদ্ধ করে দিল।


জটিল কিছু যন্ত্রপাতি দেখে কৌতূহল হয়েছিল মুসার, দেখার জন্য আগের জায়গা থেকে সরে চলে এসেছিল, সে-কারণেই কিশোরকে আক্রান্ত হতে দেখেনি। চাপা চিৎকার শুনে ফিরে তাকাল। গোল্ডের সবুজ পার্কা আর লাল ক্যাপ চিনতে পারল। কিশোরের গলা জড়িয়ে ধরে রেখেছে পোন্ড।

বন্ধুকে সাহায্য করতে ছুটল মুসা।

তবে ওর সাহায্যের প্রয়োজন হলো না। গোন্ডের কনুই আর কজি চেপে ধরে হঠাৎ ঝটকা দিয়ে পাশে সরে গেল কিশোর। জুজুৎসুর প্যাচ হ্যামারলক-এ আটকে ফেলল বিস্মিত গোন্ডকে।

ছাড়ো ছাড়ো! ব্যথা দিচ্ছ তো আমাকে! চেঁচিয়ে উঠল গোল্ড। আমি বুড়ো মানুষ!

আমাকে ধরার আগে কথাটা ভাবা উচিত ছিল আপনার। গোল্ডকে ছেড়ে দিয়ে দ্রুত দুই কদম পিছিয়ে গেল কিশোর। গোল্ড যদি আবার কিছু করতে চায়, পাল্টা ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত ও।

ভুরু দুটো কুঁচকে রেখে বাহুর ওপরের অংশ ডলতে লাগল গোল্ড। আমার ওপর নজর রাখছিলে তুমি। এ সব আমার ভাল লাগে না।

নজর রাখতে আসিনি, আপনার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি, জবাবটা দিল মুসা। আপনাকে ঘাবড়ে দিতে চাইনি। বলেই বুঝল ভুল কথা বলে ফেলেছে।

ঘাবড়ে দেবে! চিৎকার করে উঠল গোল্ড, আমাকে? কেউ আমাকে ঘাবড়ে দিতে পারে না!

না না, তাড়াতাড়ি বলল মুসা, আসলে চমকে দিতে চাইনি।

মাটিতে থুতু ফেলল গোল্ড। আমাকে কেউ চমকেও দিতে পারে। পিছন থেকে এসে টেক্স ফেরানিকে অবাক করবে, এত সহজ। আমি তোমাদের আসার শব্দ শুনেছি। তোমাদের গন্ধ পেয়েছি…

ওকে থামিয়ে দেয়ার জন্য কিশোর বলল, আমরা এসেছি আপনার সঙ্গে কথা বলতে।

গোল্ডের ঝোপের মত ভুরুজোড়া কুঁচকে গেল। চোখে সন্দেহ। কী কথা?

থিম পার্ক সম্পর্কে আপনি কী ভাবছেন জানতে এলাম। গ্লিটারবাসীদের কাকে ভোট দেয়া উচিত?

উজ্জ্বল হলো গোল্ডের চেহারা। জরিপ চালাতে এসেছে, আগে বলবে তো। আমার মনে হয় সবারই হ্যাঁ ভোটে ভোট দেয়া উচিত। না দিতে যাবে কেন?

থিম লাইফের আইডিয়াটা তারমানে আপনার পছন্দ হয়েছে?

না হওয়ার কোন কারণ আছে? টাকা আসবে, প্রচুর টাকা! পকেট ভর্তি করে আনবে টুরিস্টরা। আমার খনি দেখতে আসবে। এখানকার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়ে উঠবে এটা। পুরানো গোল্ড রাশের দিনগুলোর একটা চিত্র পাবে লোকে। বছর দুএকের মধ্যেই

অবসর নেয়ার মত টাকা কামিয়ে ফেলতে পারব আমি। ফ্লোরিডায় চলে যাব।

প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকাল গোল্ড। বের করে এনে সামনে বাড়িয়ে দিল। দেখো।

দুর্বল সূর্যালোকে চকচক করে উঠল হাতের তালুতে রাখা মটরদানার সমান একটা সোনার নুড়ি।

সোনা! চেঁচিয়ে উঠল মুসা।

দাঁত বের করে হাসল গোন্ড। একটা ভাঙা দাঁতের গোড়া দেখা গেল।

এখানে পেয়েছেন? জিজ্ঞেস করল কিশোর।

হ্যাঁ। ঘুরে দাঁড়িয়ে বরফে ঢাকা একটা খাঁড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল গোল্ড। ওর সঙ্গে তাল রেখে হাঁটতে হিমশিম খেয়ে গেল কিশোর ও মুসা।

খাড়িতে পেয়েছি এই নুড়ি, অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে গোল্ড। মহা শয়তান ওই খাড়ি, ভীষণ চালাক। কিন্তু আমি ওটার চেয়েও চালাক। আমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পারবে না। হাজার হাজার বছর ধরে ওপরের ওই পাহাড় থেকে নালা বেয়ে খাড়িতে এসে পানি পড়ে। বয়ে নিয়ে আসে সোনা। খাড়ির পানি ইউকনে গিয়ে পড়ে। একবার বড় নদীতে সোনা চলে গেলে সেটা আর পাওয়া যায় না। তার আগেই খাড়ি থেকে বের করে নিতে হয়। সেটাই করছি আমি।

আপনি কি প্যান করে সোনা বের করেন? কিশোর জানতে চাইল।

সিনেমায় প্যান করতে দেখেছে ও। বড় বড় চালনির মত জিনিস নিয়ে সোনার খনির ধারে নালার অগভীর পানিতে দাঁড়িয়ে থাকে স্বর্ণসন্ধানীরা। চালনি দিয়ে পানি থেকে নুড়িপাথর, মাটি, কাদা, বালি সব ঘেঁকে তোলে। চালনি নেড়ে নেড়ে সোনার ডো আবর্জনা থেকে আলাদা করে ফেলে। পাথরের চেয়ে সোনা ভারী। তাই আলাদা করতে অসুবিধে হয় না।

প্যান করে বোকারা, গোল্ড বলল। আমি প্রেসার মাইন ব্যবহার করি।

কাঠের একটা লম্বা সরু সেচযন্ত্রের মত জিনিস দেখাল ও। ওটা দেখছ? গরমকালে নালার বুক থেকে চেঁছে তুলে আনা কাদাপানি আমি ঢেলে দিই ওটাতে। পানি, কাদা, সব গড়িয়ে পড়ে যায়। আর সোনা ভারী বলে তলানি হয়ে বাক্সে পড়ে থাকে। গুঁড়ো, নুড়ি, টুকরো, সব।

মুসা জিজ্ঞেস করল, সোনা কতটা পাওয়া যায় এখানে?

বলব না, ওদের দিকে চোরা চাহনি দিল গোল্ড। তবে একটা তথ্য জানাতে পারি। এখনকার দিনে সোনা পেতে চাইলে খনিতে খুঁজে লাভ হবে না, তাতে খাটনিই বাড়বে। আসল সোনা এখন টুরিস্টদের পকেটে।

হাসল কিশোর। আপনার কথায় কিন্তু মনে হচ্ছে থিম পার্ক কোম্পানির কাছে ঘুষ খেয়েছেন।

ধূর! একটা আধলাও দেয় না, জবাব দিল গোল্ড।

কিন্তু আমরা যে শুনলাম, আপনি নাকি ইলকিস বিগসের হয়ে কাজ করেন? মুসা বলল, আপনাকে নাকি অনেক টাকা দিতে দেখেছে।

মুঠোবদ্ধ হয়ে গেল গোল্ডের হাত। কে দেখেছে?

লুক স্টার্লিং, মুসা বলল।

ওর কথা! আস্ত মিথুক! ভঙ্গি দেখে মনে হলো সামনে লুককে পেলে এখনই ঘুসি মেরে বসত গোল্ড। ওর অবর্তমানে বাতাসে মারল। ও আমাকে দেখতে পারে না। যেদিন থেকে বুঝে গেছে, আর সবার মত আমাকে ঠকাতে পারবে না, সেদিন থেকেই আমার পিছে লেগেছে। আজ পর্যন্ত ইলকিস বিগ আমাকে কিছু দেয়নি, বকবকানি ছাড়া।

কথা বলতে যাচ্ছিল কিশোর। থামিয়ে দিল গোল্ড। যাও এখন। আর কোনদিন যেন আমার এলাকায় না দেখি। শুরু থেকেই সন্দেহ হচ্ছিল তোমরা কারও স্পাই, এখন দেখছি ভুল করিনি।

গোল্ডের কাছ থেকে আর কিছু জানা যাবে না। শহরে ফিরে চলল কিশোররা।

কিশোর বলল, লুক আর গোল্ড, দুজনের মধ্যে একজন মিথ্যে বলছে। কোনজন? গোল্ড যদি ইলকিস বিগসের হয়ে প্রচারের কাজ করেই থাকে, সেটা অন্যায় নয়, লুকানোর দরকার কী?

জবাব দিতে যাচ্ছিল মুসা। দূর থেকে আসা শব্দ শুনে থেমে গেল। ঘাড়ের নোম দাঁড়িয়ে গেল। কিশোর! নেকড়ে!

হাসল কিশোর। হ্যাঁ, ডাকটা নেকড়ের ডাকের মতই। গোল্ড আমাদের ভয় দেখাচ্ছে।

কিন্তু মেনে নিতে পারল না মুসা। শহর এখান থেকে কতদূর?

কেন? ভুরু নাচাল কিশোর। তুমি ভাবছ নেকড়েরা শহরের সীমানায় ঢোকে না?

দেখো, কিশোর, ইয়ার্কি না! ফিরে তাকাল মুসা। নীরব কালো গভীর বন। বনের ভিতর কিছু ছায়ার নড়াচড়া। ওগুলোকে শুধু ছায়া ভেবেই সান্ত্বনা পেতে চাইল ও।

লুকও মিথ্যে বলে থাকতে পারেন, আগের প্রসঙ্গে ফিরে গেল কিশোর। গোন্ডের সঙ্গে তাঁর শত্রুতা। বুড়োর বিরুদ্ধে বলতেই পারেন।

শহরে সীমানার বাইরের শেষ ঢালটা পেরোচ্ছে ওরা, এমন সময় শহরের প্রান্তের একটা কেবিন থেকে বিগত্সকে বেরোতে দেখল। মুসা বলল, ভোটর প্রচার করতে বেরিয়েছে। যাই বলল, ভীষণ পরিশ্রমী লোক। চলো, গোেল্ডকে টাকা দিয়েছে কি না জিজ্ঞেস করি।

বিগসও ওদের দেখেছে। দাঁড়িয়ে গেল। ওরা কাছে গেলে জিজ্ঞেস করল, খনি দেখতে গিয়েছিলে নাকি?

কী করে জানলেন? কিশোরের প্রশ্ন।

অনুমান। ওদিক থেকেই এলে তো।

গোল্ড ফেরানির প্রেসার মাইন দেখতে গিয়েছিলাম, কিশোর জানাল।

ভালই করেছ, বিগ বলল। এখানকার একটা দর্শনীয় জায়গা। ঠিকঠাক করে নিয়ে টুরিস্ট আকৃষ্ট করার উপযুক্ত করা গেলে গোল্ড রাশ টাউন হিসেবে কদর বেড়ে যাবে গ্লিটারের।

মুসা বলল, আপনাদের থিম-প্ল্যান নিয়ে গোল্ড কিন্তু খুব আশাবাদী।

মাথা ঝাঁকাল বিগ্‌স। হবেই। ওর ওই খনি ওকে স্টার বানিয়ে দেবে। হলিউডের ছবিতে যে সব স্বর্ণসন্ধানীদের দেখো, সবাই অভিনেতা, ওর মত আসল স্বর্ণসন্ধানী ওরা কোথায় পাবে? গ্লিটারে থিম পার্কের সবচেয়ে বেশি বেতনভোগী কর্মচারী হয়ে গেলেও অবাক হব না।

আমি তো ভেবেছিলাম, এখনই বেতন পাওয়া শুরু করেছে গোল্ড, বিগৃসের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য বলল কিশোর।

তীক্ষ্ণ হয়ে গেল বিগসের দৃষ্টি। কার কাছে শুনলে? শুনেছি, যার কাছেই হোক, কিশোর বলল। কথাটা ঠিক কি বলুন।

গ্লিটারে থিম পার্কের একমাত্র বেতনভোগী কর্মচারী আমি, বিগস জবাব দিল। আরও কেউ যদি নিজেকে গ্লিটারের কর্মচারী বলে দাবি করে থাকে, কেন করছে আমি জানি না। যাই, অনেক কাজ। এখনও বহু লোককে বোঝননা বাকি।

চলে গেল বিগস।

ও ছাড়া গ্লিটারে থিম পার্কের আর কোন কর্মচারী নেই, হয়তো ঠিকই বলেছে, বিড়বিড় করল কিশোর, কিন্তু কোম্পানির কাছ থেকে কারও ঘুষ খেতে তো কোন অসুবিধে নেই। কোম্পানির হয়ে যদি কাউকে ঘুষ দিয়ে থাকে বিগস্…

নোংরা কাজ করানোর জন্য, কথাটা শেষ করল মুসা। তারমানে, এখন থেকে বিগসের ওপর নজর রাখতে হচ্ছে আমাদের।

এগিয়ে চলল ওরা। পায়ে চলা যে পথটা ধরে চলেছে, সেটা দিয়েই জোসির কুকুরের কেনলগুলোর কাছে যেতে হয়। মোড় পেরোলেই দেখা যাবে। কুকুরের উত্তেজিত চিৎকার শোনা গেল।

মোড়ের অন্যপাশে এসে জানা গেল উত্তেজনার কারণ। চিৎকার করে বলল কিশোর, মুসা, দেখো, একটা কুত্তা দড়ি ছিড়ে পালিয়েছে।

ঘরের কাছে খুঁটিতে বাঁধা থাকে কুকুরগুলো। একটা খুঁটির দড়ি ছেড়া। মুসা বলল, কামড়ে কেটে ফেলেছে।

দৌড়ে আসতে দেখা গেল জোসিকে। কাছে এসে হেঁড়া দড়িটা দেখে মুখ কালো হয়ে গেল। সর্বনাশ! রেড লাইট পালিয়েছে!

প্রতিটি কুকুরের কাছে গিয়ে কানের কাছে মোলায়েম স্বরে কথা বলে বলে ওগুলোকে শান্ত করতে লাগল ও। চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল কিশোররা। কুকুরগুলো শান্ত হলে জোসি বলল, সাংঘাতিক ক্ষতি হয়ে গেল। রেড লাইট ডায়মণ্ডহার্টের সহকারী। ডায়মণ্ড অসুস্থ হলে কিংবা অন্য কোন কারণে স্লেজ টানতে না পারলে রেড লাইট নেতৃত্ব দেয়। ইস, নেকড়েগুলোর ডাক শুনেই কেন যে চলে আসিনি!

নেকড়ের ডাক আমরাও শুনেছি, মুসা বলল।

দলের শক্তি বাড়ানোর জন্য পোষা কুকুরকে লোভ দেখিয়ে ডেকে নিয়ে যায় নেকড়েরা, জোসি বলল। জ্যাক লণ্ডনের কল অভ দি ওয়াইল্ড পড়নি? আবার কুকুরগুলোর কাছে গিয়ে মৃদু স্বরে ওগুলোর সঙ্গে কথা বলতে লাগল ও।

কী মনে হতে রেড লাইটের খুঁটির কাছে গিয়ে দাঁড়াল কিশোর দড়ির ছেড়া মাথাটা হাতে নিয়ে পরীক্ষা করতে লাগল। ফিরে তাকিয়ে ইশারা করল মুসাকে।

মুসাও দেখল দড়িটা। সুতোর ছেড়া মাথাগুলো এত মসৃণ কেন? দাঁত দিয়ে কাটলে কিংবা টানাটানি করে ছিড়লে তো এত সমান হয় না।

ঠিকই বলেছ, মাথা ঝাঁকাল কিশোর। ধারাল ছুরি দিয়ে কাটার মত। মানে বুঝতে পারছ? দড়ির বেশির ভাগটাই কেটে রেখেছিল কেউ। কুকুরটা দুই-চার টান দিতেই বাকিটুকু ছিড়ে গেছে।

দূর থেকে আবার শোনা গেল নেকড়ের ডাক। সঙ্গে সঙ্গে চেঁচানো শুরু করল কুকুরগুলো। জোসি বলল, ইজি, বয়েজ, ইজি।

তুমি ওদেরকে শান্ত করো, জোসিকে বলল কিশোর। আমি আর মুসা গিয়ে রেড লাইটকে খুঁজে আনি।

বাধা দিতে গিয়েও কী ভেবে দিল না জোসি।

রেড লাইটের পায়ের ছাপ অনুসরণ করে বনের মধ্যে এসে ঢুকল কিশোর ও মুসা।

কুকুরটা অনেক বড়। থাবাও বড়। তুষারে গভীর হয়ে ডেবে গেছে। অনুসরণ করা সহজ।

নীচের দিকে চোখ নামিয়ে হাঁটছে দুজনে। কিশোর বলল, আমরা যখন মোড়ের অন্যপাশে, কুকুরগুলো তখন চেঁচাননা শুরু করেছিল। মনে আছে?

মাথা ঝাঁকাল মুসা। হ্যাঁ।

আমার ধারণা, ওই সময়ই দড়ি ছিড়ে বনের দিকে দৌড় দেয় রেড লাইট। আর তাই যদি হয়ে থাকে, বেশি দূরে যায়নি ও।

পায়ের ছাপ ধরে এগোতে থাকল ওরা। বন থেকে বেরিয়ে ছোট্ট এক টুকরো খোলা জায়গা পেরিয়ে আবার বনে ঢুকে গেছে কুকুরটা।

কাঁপা কাঁপা তীক্ষ্ণ চিৎকার থেমে থেমে ভেসে এল বনের ভিতর থেকে। পরস্পরের দিকে তাকাল কিশোর-মুসা। সাবধান হয়ে গেল।

কাছেই নেকড়েগুলো, কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে বলল মুসা। তারমানে কুকুরটাও আছে।

বনের ভিতর দিয়ে এগোতে এগোতে গাছপালার ফাঁক দিয়ে সামনে ছোট্ট আরেক টুকরো খোলা জায়গা চোখে পড়ল ওদের। ওরা বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল ডাকাডাকি।

বরফের মত জমে গেল যেন দুজনে। বাতাস স্তব্ধ। কোথাও কোন শব্দ নেই। ভূতুড়ে লাগল এই হঠাৎ নীরবতা। গায়ে কাঁটা দিল।

আস্তে করে গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল বাদামি-ধূসর একটা মাদী নেকড়ে। বড় জাতের কুকুরের সমান। দাঁড়িয়ে গেল ওদের দিকে তাকিয়ে।

১০
একটু পর আরও তিনটে নেকড়ে বেরোল বন থেকে। পাশাপাশি প্রায় গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ক্ষুধার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিশোর-মুসার দিকে। নেকড়েগুলোর হাঁ করা মুখের ভিতর থেকে লম্বা জিভ বেরিয়ে ঝুলে পড়েছে। কিশোরের মনে হলো, শিকারের অসহায়ত্ব দেখে নীরব হাসি ফুটেছে ওদের মুখে। খুব সামান্য লেজ নড়ানো বাদ দিলে একেবারেই মূর্তি।

কিশোর, কী করব? বিড়বিড় করল মুসা।

ওদের বলল, আমরা যুদ্ধে বিশ্বাসী নই, শান্তি চাই। ওদের নেতার কাছে নিয়ে যেতে বলো, বিড়বিড় করেই জবাব দিল কিশোর।

রসিকতা ছাড়ো। বাঁচার কোন বুদ্ধি আছে?

আছে। নড়বে না। ওদের মতই মূর্তি হয়ে যাও। আমরা ওদের হামলা করতে পারি, এ ধারণাটা যাতে কোনমতেই ওদের মাথায় না ঢোকে। আমরা যে ভয় পেয়েছি, সেটাও বুঝতে দেবে না।

বুঝলাম।

পিছিয়ে গিয়ে দেখতে পারি ওরা কী করে, কিশোর বলল। খুব ধীরে।

সাবধানে এক পা পিছনে সরল দুজনে। আরেক পা ফেলল। ওদের সঙ্গে যেন অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা রয়েছে নেকড়েগুলো, টান লেগে ঠিক ততখানিই এগোল, ওরা যতখানি পিছিয়েছে। তারপর দুই পাশের দুটো নেকড়ে ডানে-বাঁয়ে একটুখানি করে সরে গেল।

চলে যাবে? মুসার প্রশ্ন।

ভুলেও ভেবো না, সতর্ক করল কিশোর। আমাদের ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে। এভাবেই হামলা চালায় নেকড়েরা।

বাহ্, দারুণ একটা খবর শোনালে। কিন্তু তুমি তো নেকড়ে গবেষক নও। ওরা কী করবে জানলে কীভাবে?

বই পড়ে আর ন্যাশনাল জিওগ্রাফি দেখে।

নেকড়েগুলো আকারে হাস্কি কুকুরের চেয়ে বড়। দূর অতীতে কোনও এক সময় বোধহয় একই গোত্রের প্রাণী ছিল ওরা, রক্তের সম্পর্ক রয়েছে। কুকুরের তুলনায় নেকড়েগুলো অনেকটাই রোগাটে, ছিপছিপে। চোখে রাজ্যের খিদে। কিশোর জানে, কুকুরের চোয়ালের চেয়ে নেকড়ের চোয়াল দ্বিগুণ শক্তিশালী।

কিশোর, মুসা জিজ্ঞেস করল, ওরা যেভাবে আমাদের ঘিরে ফেলতে চাইছে, একেই কি সাঁড়াশি আক্রমণ বলে?

জানি না। তবে ওরা যা চাইছে, সেটা ঘটতে দেয়া যাবে না।

ঠেকাব কীভাবে?

ভাবছে কিশোর। ভোলা জায়গায় রয়েছে ওরা। বনের ভিতর কি নিরাপদ? না বিপদ আরও বেশি? বনে ঢোকা ছাড়া আর কোন উপায়ও দেখছে না। বন পেরিয়ে শহরের সীমানায় চলে যেতে হবে। কিন্তু তাতেও কি রক্ষা পাবে? সত্যিই কি শহরের সীমানায় ঢোকে না নেকড়েরা? সন্দেহ আছে কিশোরের।

মুসা, ডানে দেখো! ফিসফিস করে বলল মুসা।

ডান দিকের বন থেকে বেরিয়ে এসেছে একটা বড় হাস্কি। দুলকি চালে হেঁটে আসতে লাগল ওদের দিকে।

ওটাই বোধহয় রেড লাইট, কিশোর বলল।

মনে হয়, মুসা জবাব দিল। রেড লাইট হোক বা না হোক, ওটা আমাদের পক্ষে থাকলেই আমি খুশি।

নেকড়েগুলোর কাছাকাছি এসে থেমে গেল কুকুরটা। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গরগর শুরু করল। চাপা, ভয়ঙ্কর শব্দ। থেমে গেল নেকড়েগুলো। তুষারে ঢাকা বনের এই মরণ-নাটকের নতুন অভিনেতার দিকে নজর দিল।

এটাই সুযোগ, কিশোর বলল। পিছাতে থাকো। বনের মধ্যে ঢুকেই দেবে দৌড়।

কয়েক সেকেণ্ডেই বনে ঢুকে পড়ল দুজনে। একটা মুহূর্ত আর দেরি করল না। দৌড়ানো শুরু করল। বুটের চাপে ভাঙছে পাতলা তুষারের স্তর। জুতো ডেবে যাওয়াটা একটা অসুবিধে। আরেক অসুবিধে, দৌড়ালে হাঁপাতে হয়। দ্রুত শ্বাস টানার সময় নাক দিয়ে ঢুকে যায় কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস। এ রকম আবহাওয়ায় এভাবে দ্রুত বাতাস টানার কারণে ফুসফুস জমে গিয়ে মানুষ মারা যাওয়ার গল্প শুনেছে কিশোর। তবে সেটা পরের ভাবনা। আপাতত নেকড়ের আক্রমণ থেকে বাঁচতে হবে।

পাতলা হয়ে এল বন। পায়ে চলা একটা পথের ওপর এসে পড়ল দুজনে। শহরের দিকে মুখ করে দৌড়াতে থাকল। দূরে একটা টিলার মাথায় উঠে আসতে দেখল জোসি আর ওর কুকুরের দলকে। থেমে গেল কিশোর। ওর প্রায় ঘাড়ের ওপর এসে পড়ল মুসা। তবে ধাক্কাটা লাগল না। ধপ করে পথের ওপরই বসে পড়ল দুজনে। হাঁপাতে লাগল বিপজ্জনকভাবে।

কাছে এসে স্লেজ থামাল জোসি। গাড়ি থেকে নেমে এল। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?

ভারী দম নিল কিশোর। ঢোক গিলে বলল, নেকড়ে।

আমাদের ঘিরে ফেলা শুরু করেছিল, মুসা জানাল। রেড লাইট আমাদের বাঁচিয়েছে।

অসীম সাহসে নেকড়েগুলোর মুখখামুখি হলো কুকুরটা, কিশোর বলল। ধমকানো শুরু করল। সুযোগ পেয়ে দৌড় দিলাম। ভুল করেছি। ওকে এভাবে ফেলে আসাটা উচিত হয়নি।

না, ভুল করনি। এটাই চেয়েছিল ও, জোসি বলল। তোমাদের পালানোর সুযোগ করে দিয়েছে। তোমরা যাও। আমি রেড লাইটকে আনতে যাচ্ছি। নেকড়েগুলো যেই বুঝবে কুকুরটা ওদের দলে যোগ দিতে চায় না, ধরে মেরে ফেলবে।

একা যাবে? কিশোর বলল। আমরা আসি?

দরকার নেই, জোসি বলল। নেকড়ে আমাদের কিছু করতে পারবে না। দেখছ না, কত কুকুর নিয়ে যাচ্ছি। গম্ভীর হয়ে গেল ও। আমি ভয় পাচ্ছি রেড লাইটের কথা ভেবে। ওকে জ্যান্ত পেলে হয়! ওকে হারালে…

স্লেজে ধাক্কা দিল জোসি। কুকুরগুলোকে বলল, হাইক! হাইক!

ছুটতে শুরু করল কুকুরের দল। মুহূর্তে টিলার ওপাশে অদৃশ্য হয়ে গেল।

সেদিকে তাকিয়ে থেকে চিন্তিত ভঙ্গিতে কিশোর বলল, কিন্তু কুকুরটার দড়ি কাটল কে? অবাক লাগছে আমার!

শহরের দিকে রওনা হলো দুজনে।

দড়ি কাটার খবরটা কি জোসি জানে? মুসার প্রশ্ন।

মনে হয় না। তবে জানার পর কী খেপা যে খেপবে সেটা আন্দাজ করতে পারছি। এই কুকুরগুলোই ওর সব।

শহরের কেবিন আর কাঠের ছাউনিগুলো নজরে এল। খপ করে মুসার হাত চেপে ধরে কিশোর বলল, দেখলে?

কী? এদিক ওদিক তাকাল মুসা।

আস্তে কথা বলো! ওই ছাউনিটার দিকে তাকাও।

একটা ছাউনির দরজা ফাঁক হয়ে আছে। সেটা দিয়ে চুপি চুপি বেরিয়ে এল একটা ছায়ামূর্তি।

কী করছে ও? মাংস চুরি?

জানি না, তাকিয়ে আছে কিশোর। তবে ওর ভাবভঙ্গি সুবিধের মনে হচ্ছে না। শয়তানি মতলব আছে। চলো তো দেখি।

ওদের দেখে ফেলল লোকটা। ছুটতে শুরু করল। ছাউনির পাশ ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল।

ঢাল বেয়ে যত দ্রুত সম্ভব ছাউনির কাছে নেমে এল কিশোর ও মুসা। কোথাও দেখল না লোকটাকে।

বুঝলাম না, চারপাশে তাকাতে তাকাতে বলল বিস্মিত মুসা, কোথায় উধাও হলো?

ফিরে তাকাল কিশোর। দেখল লোকটাকে। পাহাড়ের ওপরের বনে ঢুকে যাচ্ছে। ওই যে যাচ্ছে! বলেই দৌড় দিল ও। মুসা ছুটল ওর পিছনে।

পাঁচ মিনিট পর হাল ছেড়ে দিল ওরা। ওদের চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে লোকটা। পিছু নিয়ে এখন ধরা অসম্ভব। তা-ও যদি নেকড়েগুলোর কাছ থেকে পালাতে গিয়ে শক্তি খরচ করে না ফেলত, এক কথা ছিল।

ধূর, গেল চলে! হাঁপাতে হাঁপাতে বলল মুসা। ছাউনিতে কী করছিল?

কিছু একটা কুমতলব তো নিশ্চয় ছিল, নইলে পালাল কেন? জবাব দিল কিশোর। ভালমত দেখেছ?

দেখেছি। সবুজ পার্কা। সামান্য এই সূত্র দিয়ে ওকে চিনতে পারব বলে তো মনে হচ্ছে না। কী করতে ঢুকেছিল, ছাউনিটাতে ঢুকে দেখা দরকার।

মাথা নাড়ল কিশোর। চুরি করে অন্যের ঘরে ঢোকাটা ঠিক হবে। তবে ছাউনিটা কার, সেটা জানা যেতে পারে। জেফরি আঙ্কেলকে জিজ্ঞেস করব।

কেবিনে ফিরে শুধু মুনকে পেল ওরা। মুন জানাল, বাবার শরীর ঠিক হয়ে গেছে। ঘরে বসে থাকতে ভাল লাগছিল না, মাকে নিয়ে তাই মিটিঙে গেছে। আমিও রওনা হচ্ছিলাম। যাবে নাকি?

কীসের মিটিং? জানতে চাইল মুসা।

ভোটের আগের শেষ মিটিং। শহরের সব লোক যাবে অ্যাসেম্বলি হলে, থিম পার্ক নিয়ে আলোচনার জন্য। জোসি কই? সে-ও তো যেতে চেয়েছিল।

রেড লাইট দড়ি ছিড়ে পালিয়েছে। ওকে খুঁজতে গেছে, কিশোর জানাল।

সর্বনাশ! কুকুরটাকে না পেলে মস্ত ক্ষতি হয়ে যাবে। রেড লাইট ওর দলের সবচেয়ে ভাল কুকুরগুলোর একটা। ইডিটারোড রেসেরও আর দেরি নেই। এ সময় রেড লাইটকে খোয়ালে খুব বেকায়দায় পড়ে যাবে।

পার্কা পরে বেরিয়ে এল মুন। অ্যাসেম্বলি হলে রওনা হলো তিনজনে। হাঁটতে হাঁটতে বন্ধুকে বলল মুসা, ওকে কি ওখানে পাওয়া যাবে?

কাকে? বুঝতে পারল না কিশোর।

যাকে আমরা তাড়া করেছিলাম।

কী জানি। যদি যায়ও ও, চিনতে পারব না। শহরের অনেকেই সবুজ পার্কা গায়ে দেয়। কোনজন আমাদের লোক বুঝব কীভাবে?

অ্যাসেম্বলি হলে এসে দেখল লোকে ভরে গেছে। পিছনের সারিতে সিট পেল ওরা। নেতা গোছের একজন সভা আরম্ভ করার নির্দেশ দিলেন। তাঁকে চেনে না কিশোররা।

মিস্টার সিউল, টেডের বাবা, ফিসফিস করে বলল মুন।

প্রথমে বিগসকে কিছু বলার অনুরোধ জানালেন মিস্টার সিউল।

গ্লিটারে থিম পার্ক হলে শহরবাসী কী কী সুবিধে ভোগ করবে, তার ওপর বক্তৃতা দিল বিগস্। ঘুম পাচ্ছে কিশোরের। হাততালির শব্দে চমকে জেগে গেল। দেখে বিগ বসে পড়েছে। গোল্ড ফেরানি উঠে দাঁড়িয়েছে। বক্তৃতা শুরু করল। পুরো সজাগ এখন কিশোর। কান খাড়া করে শুনতে লাগল।

গ্লিটারে আমাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম আমরা করে যেতে পারব, কোনটাই বন্ধ হবে না, গোল্ড বলছে। আমি খনিতে কাজ করতে পারব, শিকারীরা শিকার করতে পারবে, জেলেরা মাছ ধরতে পারবে। অমানুষিক পরিশ্রম করেও কোনমতে টিকে আছি এখন আমরা। অবস্থা যা দেখা যাচ্ছে, আর কিছুদিন পর না খেয়ে থাকতে হবে। খনিতে এখন আর সোনা মেলে না। সোনা এখন টুরিস্টের পকেটে, ডলার হয়ে ঢুকে গেছে। ওদের পকেট থেকে ওগুলো বের করে আনতে না পারলে আমাদের উন্নতি হবে না। কিন্তু বের করার জন্য গ্লিটারে ওদেরকে ডেকে আনা দরকার। থিম পার্ক কোম্পানি নিজেরাও টাকা কামাতে চাচ্ছে, আমাদেরও ভাগ দিতে চাচ্ছে, তাহলে সমস্যাটা কোথায়? এ সুযোগ আমাদের হাতছড়া করা উচিত হবে না।

অর্ধেকের মত শ্রোতা জোর করতালি দিয়ে স্বাগত জানাল গোল্ডের বক্তব্যকে। যারা দিল না, তাদেরও অনেককেই এই বক্তৃতা শোনার পর দ্বিধান্বিত মনে হচ্ছে। থিম পার্কের পক্ষে ভোট দেবে কি না সেটা ভাবছে বোধহয়।

জেফরি উঠে দাঁড়ালেন। গোল্ড ঠিকই বলেছে।

অবিশ্বাসের গুঞ্জন উঠল শ্রোতাদের মাঝে। পার্কের পক্ষ নিয়েছেন ঘোর বিরোধী জেফরি! অবাক হলো কিশোর।

ঠিক বলেছে গোল্ড, আবার বললেন জেফরি, অন্তত একটা ব্যাপারে। আমাদের আয় কমে গেছে। আর কমলে না খেয়ে থাকতে হবে। আমরা সেটা জানি। আয়ের নতুন পথ খোঁজা উচিত আমাদের, তা-ও জানি। কিন্তু আমার মতে থিম পার্কই এর সমাধান নয়।

পাশে বসা মুনকে জোরে নিঃশ্বাস ফেলতে শুনল কিশোর। স্বস্তির।

শত শত বছর ধরে, জেফরি বলে চলেছেন, এখানকার মাটি আর প্রকৃতির সঙ্গে মিলে-মিশে বাস করেছেন আমাদের পূর্বপুরুষরা, আমরাও করছি। শীতের আগে আমরা বনে গিয়ে মুজ শিকার করি, গরমে স্যামন ধরি নদীতে। দীর্ঘ শীতের মাসগুলোতে আমরা কুকুরের ট্রেনিং দেই। আমাদের হস্তশিল্পের কদর দুনিয়াজোড়া। আমাদের ইতিহাস, আমাদের ঐতিহ্য, সব আমরা নষ্ট করব টাকার লোভে টুরিস্ট ডেকে আনলে। আমাদের স্বকীয়তা বলতে আর কিছু থাকবে না তখন। আমাদের শহর আমাদের থাকবে না। হাজার হাজার মাইল দূরের অফিসে বসে এ শহরটাকে নিয়ন্ত্রণ করবে এমন কিছু মানুষ, গ্লিটারবাসীর কাছে যারা পুরোপুরি অচেনা। আমরা কি ওদের ডেকে এনে নিজের সর্বনাশ করতে চাই? ভালমত ভেবে দেখা দরকার।

বসে পড়লেন জেফরি। আবার অর্ধেকের মত শ্রোতা জোর করতালি দিয়ে তাঁকে সমর্থন করল।

বিগস উঠে দাঁড়িয়ে বলল, জেফরি, আপনার বক্তব্যকে আমি যথেষ্ট সম্মান করি। আপনার উদ্বেগের কারণও আমি বুঝি। কিন্তু একটা কথা কি আপনি জানেন, থিম পার্ক কোম্পানি আপনাদের প্রতি আকৃষ্টই হয়েছে আপনারা আপনাদের ঐতিহ্য বজায় রাখতে পেরেছেন বলেই? আপনার কি মনে হয় সে-সব ধ্বংস করে দিতে চাইব আমরা? তাতে নিজের পায়ে নিজেরা কুড়াল মারব। পুরানো সব কিছু ধ্বংস করে দিলে টুরিস্টদের কী দেখাতে আনব? আমি আপনাকে পরিষ্কারভাবে বলে দিতে চাই…

কথা শেষ হলো না ওর। প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠল অ্যাসেম্বলি হল।

১১
তুমুল শোরগোল। অ্যাসেম্বলি হলের অনেকেই সিট থেকে মেঝেতে ঝাঁপ দিয়েছে। বহু প্রশ্ন আর চিৎকার-চেঁচামেচির স্রোত বয়ে গেল জনাকীর্ণ ঘরটায়। কে যেন একজন চেঁচিয়ে উঠল, এই চলো চলো, বেরোও! মরবে নাকি এখানে থেকে! দরকার নেই আমাদের থিম পার্কের!

হুড়াহুড়ি করে দরজার দিকে ছুটল বহু লোক। বাইরে থেকে চিৎকার শোনা গেল, আগুন! আগুন!

এই থামুন থামুন! শান্ত হোন! সব হট্টগোলকে ছাপিয়ে শোনা গেল মিস্টার সিউলের কণ্ঠ। অহেতুক ঠেলাঠেলি করবেন না। ঘরের মধ্যে কোন বিপদ নেই। বাইরে থেকে এসেছে বিস্ফোরণের শব্দ।

আতঙ্কিত জনতার কাছ থেকে মুনকে টেনে সরাল কিশোর ও মুসা। তারপর দুজনে হাতে হাত ধরে ওকে মাঝখানে রেখে একটা ব্যারিকেড তৈরি করল উন্মত্ত জনতার ধাক্কাধাক্কি থেকে বাঁচানোর জন্য। শহরের গণ্যমান্য কয়েকজন নানাভাবে বুঝিয়ে জনতাকে থামানোর চেষ্টা করছে। দরজার কাছ থেকে ওদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে এসে চেয়ারে বসাতে চাইছে। দ্রুত কমে এল আতঙ্ক।

জেফরির চিঙ্কার শোনা গেল, দরজার কাছ থেকে সরে আসুন। বাতাস ঢোকা বন্ধ করে দিচ্ছেন তো।

ঘুরে তাকাল মুসা। একটা চেয়ারের ওপর দাঁড়ানো দেখতে পেল জেফরিকে। দুই হাত মুখের কাছে জড় করে চিৎকার করে আবার বললেন তিনি, যারা আগুন নেভাতে পারে তাদের বেরোতে দিন আগে। সরুন। সরে যান দরজার কাছ থেকে।

কেমন বোকা বোকা লাগছে মানুষগুলোকে। কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। ধীরে ধীরে সরে যেতে শুরু করল দরজার কাছ থেকে। ডজনখানেক লোক, যাদেরকে জেফরির কেবিনের আগুন নিভাতে দেখেছিল মুসা, এক দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। তাদের পিছু পিছু আরও অনেকেই বেরোনো শুরু করল।

চলো, আমরাও যাই, কিশোরকে বলল মুসা।

জনতার লম্বা সারিতে একটা ফাঁক দেখে তার মধ্যে নিজেদের ঢুকিয়ে নিল ওরা। মনে হলো সারিটা আটকে গেছে। আগেও যায় না, পিছেও যায় না। তারপর আচমকা স্রোতের ধাক্কায় কুটোর মত বেরিয়ে চলে এল সরু দরজাটা দিয়ে। ঠাণ্ডা বাতাসে দম নিতে লাগল হাঁ করে।

এমনিতে বাইরের বাতাস তাজাই থাকে, তবে এখন পুরোপুরি তাজা বলা যাবে না। ধূসর ধােয়ার চাদর ছড়িয়ে পড়েছে। কোনখানে ওই ধোয়ার উৎপত্তি, বুঝতে সময় লাগল না।

হায় হায়, আমার দোকান! চিৎকার করে উঠলেন লুক স্টার্লিং। আমার দোকানে আগুন লেগেছে।

দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে দৌড়ানো শুরু করলেন তিনি। তাঁর ঠিক পিছনেই রইল কিশোর ও মুসা। অর্ধেক পথ এসে কিশোর বলল, দোকান না, দোকান না, আগুন লেগেছে পিছনের কোন কিছুতে।

মুসাও দেখল। আগুন আর ধোঁয়া উঠছে দোকানের পিছনে বেশ খানিকটা দূরের একটা কাঠের ছাউনি থেকে। অবাক হলো। এটাই সেই ছাউনি, যেটা থেকে একজন লোককে বেরোতে দেখে তাড়া করেছিল ওরা।

কাজে লেগে গেছে অগ্নিনির্বাপক বাহিনী। বালতি বালতি পানি ছুঁড়ে দিচ্ছে ভাঙা জানালা দিয়ে ভিতরে। কিশোররা ওদের কাছে পৌঁছতেই ধুড়স করে বিকট শব্দে ছাত ধসে পড়ল। ফাঁকা পেয়ে লাফ দিয়ে গাছের মাথার কাছে উঠে গেল আগুন।

ফ্যাকাসে মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল লুক স্টার্লিংকে। কাছে গিয়ে দাঁড়াল মুসা। বলল, ভাগ্যিস দোকানে লাগেনি।

ওই ঘরে কী আছে? পিছন থেকে জিজ্ঞেস করল কিশোর।

জঞ্জাল আর আজেবাজে বাতিল জিনিস, লুক জবাব দিলেন। পুড়ে গেলেই ভাল।

আপনার দোকান থেকে দূরেই আছে ওগুলো, কিশোর বলল। ওখান থেকে আগুন ছড়াবে না।

কিন্তু লাগল কীভাবে? মুসার প্রশ্ন। বিস্ফোরণের শব্দ শুনে তো মনে হলো বোমা ফেটেছে।

এমন অনেক জিনিস আছে ফাটলে বোমার মত শব্দ হয়, লুক বললেন। গোটা দুই পাঁচ গ্যালনের জেরিক্যান ছিল ভিতরে। যদি সামান্য পেট্রলও থেকে থাকে ওগুলোর কোনটাতে, আর গরম করা হয়, ভিতরে যে বাষ্প তৈরি হবে, তাতে বোমা ফাটার মতই শব্দ হবে।

তারমানে আপনি বলতে চাইছেন প্রথমে আগুন লেগেছে, জেরিক্যানগুলোকে গরম করেছে, তারপর বিস্ফোরণ? কিশোরের প্রশ্ন।

কী করে বলি? দেখার জন্য আমি তো আর এখানে ছিলাম না। সবার সঙ্গে মিটিঙে ছিলাম। তোমরা জিজ্ঞেস করলে, তাই কীভাবে আগুন লাগতে পারে ধারণা দিলাম মাত্র। অস্থির হয়ে উঠেছেন লুক। কিশোরদের কাছ থেকে সরে গেলেন।

আগুন নিভানোর পর নিজেদের কেবিনে ফিরে এল গোয়েন্দারা। আলোচনায় বসল।

এই প্রথম একটা দুর্ঘটনা ঘটল, মুসা বলল, যা জোসির রেসকে কোনভাবে প্রভাবিত করবে না। থিম পার্কের বিরোধিতা যারা করছে, তাদেরকে ভয় দেখানোর জন্যও ঘটানো হয়ে থাকতে পারে এটা।

কিন্তু লুক তো থিম পার্কের বিপক্ষে নন, কিশোর বলল। তাহলে তাঁর ঘর পোড়ানো হলো কেন?

সেটাই তো বুঝতে পারছি না। ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে রহস্য!

কিশোর বলল, তবে, আগের রহস্যগুলোর সঙ্গে এই ছাউনি পোড়ানোর সম্পর্ক আছে। সন্দেহভাজনদের সংখ্যা এখন কমিয়ে আনা সম্ভব। মিটিঙের সময় আমাদের জানামতে কে কে টাউন হলের বাইরে

ছিল?

টেডকে দেখিনি ওখানে, মুসা বলল।

জোসিও ছিল না।

তারমানে তুমি জোসিকেও সন্দেহ করো?

এখনও করছি না, কিশোর বলল। টাউন হলের বাইরে কে কে ছিল সেটা মনে করার চেষ্টা করছি আপাতত। লুকের কথাই ঠিক মনে হচ্ছে। আগুনটা আগে লেগেছে, তারপর বিস্ফোরণ। আর যদি বোমা ফাটিয়ে আগুন লাগানো হয়, ফাটানো হয়েছে টাইমার দিয়ে। তখন আবার সন্দেহভাজনদের সংখ্যা বেড়ে যাবে। যে কেউ ঘটাতে পারে এ রকম দুর্ঘটনা, মিটিঙে সে-লোক থাকুক বা না থাকুক।

দমে গেল মুসা। কিশোরের কথায় প্রথমে মনে হয়েছিল, রহস্য সমাধানের দোরগোড়ায় পৌছে গেছে। এখন মনে হচ্ছে, এ রহস্য ভেদ করা এত সহজ নয়।

দরজায় টোকা শুনে উঠে গিয়ে খুলে দিল ও। জোসি দাঁড়িয়ে আছে।

ঘরে ঢুকল জোসি। পার্কাটা খুলে নিতে নিতে বলল, রেড লাইটকে পাওয়া গেছে।

ভাল আছে ও? চেঁচিয়ে উঠল মুসা।

আছে। কিন্তু ভীষণ দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে আমাকে। ওকে কেনলে রাখতে গিয়ে ছেঁড়া দড়িটা দেখলাম। কেউ কেটে রেখেছিল।

মাথা ঝাঁকাল কিশোর। আমরাও দেখেছি। তোমাকে বলার সুযোগ পাইনি।

টেড যে এতদূর যাবে তা কল্পনাও করতে পারিনি, ছোট্ট ঘরটার মধ্যে পায়চারি শুরু করল জোসি। কী করতে চাইছে ও? যুদ্ধ? ও কি বুঝতে পারছে না ও যতটা ক্ষতি করছে আমার, আমিও ততটাই করতে পারি? এ ভাবে দুজনে ঝগড়া আর একে অন্যের ক্ষতি করতে থাকলে লাভ কিছু হবে না, বরং ক্ষতি, রেসে আর অংশ নিতে পারব না।

টেডকে দেখেছ নাকি? মুসা জিজ্ঞেস করল। ওর সঙ্গে কথা আছে আমাদের।

মাথা নাড়ল জোসি। দেখিনি। হয়তো কুকুরগুলোকে প্র্যাকটিস করাতে নিয়ে গেছে। এখন তো ওর একমাত্র কাজই হলো প্র্যাকটিস। আমিও অবশ্য তা-ই করতাম। কিন্তু দুর্ঘটনাগুলো বাধা দিচ্ছে আমাকে। ভয় লাগছে, প্র্যাকটিস করাতে না পারলে চর্বি জমে যাবে কুকুরগুলোর গায়ে। তাতে ক্ষিপ্রতা হারাবে ওরা। আমাকে আটকে ফেলে এটাই করাতে চাইছে কি না টেড, কে জানে!

পরদিন খুব সকালে লুকের ছাউনিটা দেখতে চলল কিশোর ও মুসা। বাতাসে ছাই আর পোড়া কাঠের ঝাঁঝাল গন্ধ৷ প্রচণ্ড তাপে গলে বিকৃত, কালো হয়ে গেছে বড় বড় ক্যান। বিছানার একটা গদি পুড়েছে, প্রিংগুলোই শুধু অবশিষ্ট আছে, কাপড়, রবার সব পুড়ে ছাই। পুরানো একটা সোমোবাইল, আগেই হয়তো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, এখন পোড়া দেহটা পড়ে আছে।

কী খুঁজছ? কিশোরকে ছাতের একটা কড়িকাঠ সরাতে দেখে জিজ্ঞেস করল মুসা।

অস্বাভাবিক কিছু, জবাব দিল কিশোর।

হাসল মুসা। এখানে স্বাভাবিক কোটা? সবই তো অস্বাভাবিক।

মিনিট বিশেক খোঁজার পর হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল কিশোর, মুসা, দেখো!

পুরানো মডেলের একটা অ্যালার্ম ঘড়ি দেখাল ও চাবি ঘুরিয়ে দম দেয়া হতো।

সোমোবাইলটার মতই আরেকটা জঞ্জাল, আগ্রহ দেখাল না মুসা।

তা ঠিক। কিন্তু আসল জিনিসটাই চোখে পড়েনি তোমার। বারো নম্বর লেখাটার ঠিক মাঝখানে একটা পিন ফুঁড়ে বেরিয়ে আছে। ঘণ্টার কাঁটা আর মিনিটের কাঁটা দুটোকেই এক জায়গায় আটকে দিয়েছে।

আরে তাই তো! এতক্ষণে উৎসাহ দেখা গেল মুসার। ব্যাটারিতে দুটো তার লাগিয়ে তারের এক মাথা মিনিটের কাটায়, আরেক মাথা ঘণ্টার কাঁটায় লাগিয়ে দিলে, বোমার টাইমার বানিয়ে ফেলা যায়।

এ ধরনের ঘড়ি কোথায় দেখেছি আমি, তা-ও মনে পড়ছে, কিশোর বলল। লুক স্টার্লিঙের দোকানের তাকে। পোড়া ঘড়িটা দেখিয়ে বলল, এটা কার কাছে বিক্রি করেছিলেন, মনে করতে পারবেন নিশ্চয়।

চলো, জিজ্ঞেস করি।

দোকানে ঢুকে ওরা দেখল দোকানের মেঝে ঝাড় দিচ্ছেন লুক।

পেলে কিছু? মুখ তুললেন না তিনি, নিজের কাজে মনোযোগ। দেখলাম, পোড়া ছাইয়ের গাদায় কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছ।

এই যে, এটা পেলাম, পোড়া, বাতিল ঘড়িটা দেখাল কিশোর।

ও, ওটা। দশ বছর আগে ফেলে দিয়েছিলাম।

হতাশ হলো মুসা। কিছুদিনের মধ্যে কেউ কিনেছে এ রকম ঘড়ি?

কিনলে তো বেঁচেই যেতাম, তাকের দিকে আঙুল তুললেন লুক। ওই দেখো, কত ঘড়ি পড়ে আছে। বড় শহর হলে কবে বেচে ফেলতাম। ওসব জায়গায় সময়ের খুব দাম। আর এখানে লোকের অফুরন্ত সময়। অ্যালার্ম ক্লক কারও কাজে লাগে না।

দোকান থেকে বেরোতেই বিগসূকে দেখতে পেল ওরা। হনহন করে হেঁটে চলে যাচ্ছে শহরের বাইরে। বার বার ফিরে তাকাচ্ছে। কেউ পিছু নিল কি না দেখছে বোধহয়।

কোথায় যায়? মুসার প্রশ্ন।

চলো, দেখে আসি।

বিগস্ এখনও ওদের দেখেনি। বেশ অনেকটা দূর থেকে ওকে অনুসরণ করে চলল দুজনে। মিনিট পাঁচেক পর মুসা বলল, এ রাস্তা দিয়ে একমাত্র গোল্ডের বাড়িতেই যাওয়া যায়।

ওখানে যাচ্ছে কেন? নিজেকেই যেন প্রশ্ন করল কিশোর। গোল্ডের কাছে তো আর থিম পার্কের উপকারিতা বয়ানের দরকার নেই। গোল্ড এমনিতেই ওর পক্ষে।

সেটাই তো ভাবছি।

গোল্ডের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল বিগস্। টোকা দেবার আগেই খুলে গেল দরজা।

তারমানে বিগস্ আসবে গোল্ড জানে, ফিসফিস করে বলল মুসা। আরেকটু কাছে যেতে পারলে ভাল হতো। কী বলে শুনতে পারতাম।

পা টিপে টিপে এগোল দুজনে। কেবিনের পাশ ঘুরে এসে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে কান পাতল। বিগসকে বলতে শুনল, আগুন লাগানো, বোমাবাজি, এ সব কিন্তু মোটেও পছন্দ হচ্ছে না আমার!

এ সব আমাকে বলছ কেন? রেগে গেল গোল্ড।

কোম্পানির বদনাম হয়ে যাচ্ছে, বিগস বলল। এই শয়তানি বন্ধ করা দরকার।

গোল্ডও চেঁচিয়ে উঠল, আমাকে ধমকানোের তুমি কে? আমার যা খুশি আমি করব। আগুন লাগাতে ইচ্ছে করলে লাগাব, বোমা মারতে ভাল লাগলে মারব। তোমার গা জ্বালা করলে ইউকন নদীতে ঝাঁপ দিয়ে ঠাণ্ডা করোগে।

মুসার দিকে তাকাল কিশোর। এক ভুরু উঁচু করল। গোল্ডের কথায় মনে হচ্ছে অপরাধগুলো সে-ই করেছে।

তুমি ভাবছ এ সব করে কোম্পানির মস্ত উপকার করছ? বিগসের ঝাঁঝাল কণ্ঠ। এমনিতেই পরিস্থিতি ভীষণ নাজুক। শহরের লোকের মানসিকতা এই ভাল তো এই মন্দ। কোন সিদ্ধান্তই নিতে পারছে না। এখন এ সব দুর্ঘটনা ঘটতে থাকলে পরিস্থিতি কোনদিকে মোড় নেবে বুঝতে পারছ না? আমি এ সব বন্ধ করাব। বুঝলে, করিয়ে ছাড়ব?

আমার বাড়িতে এসে আমাকেই ধমক! গর্জে উঠল গোল্ড।

বিগও কম যায় না। আমি তোমাকে এ সব করতে বলিনি। পাগলামি করে কোটি ডলারের প্রোজেক্ট ধ্বংস করবে, আর আমি হাত গুটিয়ে বসে থাকব যদি ভাবো, ভুল করছ।

হঠাৎ শক্ত হয়ে গেল কিশোর। ওদের পিছনের ঝোপে কী যেন নড়ছে। বড় কোন জানোয়ার হতে পারে। ফিরে তাকাল ও। ভয়ের শীতল শিহরণ বয়ে গেল মেরুদণ্ডে।

ঝোপ থেকে বেরিয়ে এল বিশাল এক বাদামি ভালুক। কিশোরদের দেখে যেন হোঁচট খেয়ে থেমে গেল। পিছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে মানুষের মত সোজা হয়ে দাঁড়াল। হাঁ করা মুখের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসেছে টকটকে লাল জিভ আর হলুদ রঙের মারাত্মক দাঁত।

ওর দিকে তাকিয়ে রাগে গোঁ-গোঁ করল জানোয়ারটা।

দিশেহারা হয়ে পড়ল কিশোর। কী করবে, বুঝতে পারছে না।

১২
ভিতরের কথা ভালমত শোনার জন্য জানালায় কান পেতে দাঁড়িয়েছিল মুসা। ভালুকের গোঁ-গোঁ শুনে চমকে গেল। কেবিন থেকে শোনা গেল বিগ্‌সের কথা, কীসের শব্দ!

ভালুক, গোল্ডের জবাব। দাঁড়াও, আসছি।

আঙুলের ইশারায় মুসাকে একটা পাথরের চাঙড় দেখাল কিশোর।

মাথা ঝাঁকাল মুসা। মুহূর্ত পরেই কেবিনের দরজা খুলে গেল। শব্দ শুনে দরজার দিকে মুখ ফেরাল ভালুকটা। এই সুযোগে এক দৌড়ে গিয়ে পাথরের আড়ালে লুকাল কিশোর ও মুসা। ভালুক আর গোল্ডকে দেখতে পাচ্ছে এখান থেকেও।

এই ব্যাটা, বন্দুক চিনিস? হাতের রাইফেল দেখিয়ে হুমকি দিল গোল্ড। জলদি ভাগ। নইলে দুনিয়া থেকে ভাগাব।

গর্জে উঠল ভালুক। নড়ল না।

রাইফেল নেড়ে আবার চেঁচিয়ে উঠল গোল্ড, ভাগ! ভাগ! জলদি ভাগ! হোল্কা হাঁদা কোথাকার। কথা কানে যাচ্ছে না? ভাগ বলছি।

আবার গর্জে উঠল ভালুক। তবে গলার জোর কমে গেছে।

ও, ভাল কথায় যেতে ইচ্ছে করে না! রাইফেলের নল আকাশের দিকে তুলে গুলি করল গোল্ড।

আর সাহস ধরে রাখতে পারল না ভালুকটা। ঝোপঝাড় ভেঙে ছুটে পালাল। বনে যাওয়ার আগে থামল না আর।

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল মুসা। ভয় পাচ্ছিল, তাড়া খেয়ে ভালুকটা ওদের দিকে ছুটে আসে।

গুলি করলে না কেন? গোল্ডের পিছন থেকে কথা বলল বিগ।

অকারণে মেরে লাভ কী? পরক্ষণে হেসে উঠল গোল্ড। ও, ভালুকের মাংস খেতে চেয়েছিলে? আগে বললে না কেন…

আমি যাচ্ছি, বিগৃস্ বলল। যা বললাম, মনে রেখো।

আমি যা বললাম, তুমিও মনে রেখো, গোল্ডও পাল্টা জবাব দিল।

দরজা লাগানোর শব্দ হলো। বিগসের পায়ের শব্দ ক্রমশ দূরে চলে গেল। আর বসে থেকে লাভ নেই। উঠে দাঁড়াল কিশোর। চলো, যাই।

শহরে ফেরার পথে মুসা বলল, গোল্ডকে কিন্তু বিগসের লোক মনে হলো না।

কী জানি! আমি ঠিক বুঝতে পারছি না!

আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে পুরো ব্যাপারটাই একটা নাটক, মুসা বলল। আমাদেরকে দ্বিধায় ফেলার জন্য করেছে। নিশ্চয় আমাদেরকে পিছু নিতে দেখেছিল বিগস্। কেবিনে ঢুকে ইশারায় কোনভাবে গোল্ডকে বুঝিয়ে দিয়েছে আমরা পিছু নিয়েছি। তারপর দুজনে ঝগড়ার নাটক করেছে।

মাথা নাড়ল কিশোর। উঁহু, আমার তা মনে হয় না। কেন এ সব করছে অপরাধী, আসল কারণটা না জানলে ওকে ধরা কঠিন হবে। এখনও আমরা জানি না, এ সবের মূলে থিম পার্ক, না অন্য কিছু। দড়ি কেটে রেড লাইটকে ছেড়ে দেয়ার সঙ্গে ভোটেরই বা কী সম্পর্ক?

জবাব না পেয়ে চুপ হয়ে গেল মুসা।

শহরে ঢুকল ওরা। মুনকে দেখল। ঢাল বেয়ে নেমে আসছে। কাঁধে ময়দার বস্তা। দূর থেকে ওদের চিনতে পেরে হাত নাড়ল মুন। বস্তাটা নামিয়ে রেখে ওদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। ওরা কাছে গেলে বলল, মনে মনে তোমাদেরকেই খুঁজছিলাম। একটা জিনিস দেখে এলাম। জরুরি কি না জানি না, তোমরা শুনলে হয়তো বুঝবে।

কী জিনিস? জানতে চাইল কিশোর। দ্বিধা করতে লাগল মুন। তারপর বলল, পোস্ট অফিসে গিয়েছিলাম, আমাদের নামে কোন চিঠি এসেছে কি না দেখতে। ইলকিস বিগসও গিয়েছিল চিঠি নিতে।

এত তাড়াতাড়ি পোস্ট অফিসে চলে গেল? ভুরু কোঁচকাল মুসা। একটু আগে তো দেখে এলাম।

কোথায় দেখেছ?

গোল্ডের ওখানে।

আমি দেখেছি কয়েক মিনিট আগে, মুন জানাল। বহু চিঠি এসেছে ওর নামে। ওর একটা চিঠির ঠিকানা দেখে ফেলেছি।

কিশোর জিজ্ঞেস করল, কী দেখলে?

অন্যের চিঠি চুরি করে দেখাটা অভদ্রতা, জানি, মুন বলল, কিন্তু চোখ চলে গেলে কী করব?

কার ঠিকানা? অধৈর্য হয়ে হাত নাড়ল মুসা।

চোখের পাতার বড় বড় পাপড়ি নাচাল মুন। নীল চোখে অস্বস্তি। ডিনামাইট!

মানে?

খামের গায়ের ফিরতি ঠিকানাটা ফেয়ারব্যাংকসের নর্থফিল্ড ডিনামাইট কোম্পানির। ডিনামাইট কোম্পানি থেকে বিগসের নামে কেন চিঠি আসে? খটকা লাগে না?

মাথা ঝকাল কিশোর। লাগে।

তথ্যটা কাজে লাগবে তোমাদের?

লাগতে পারে।

খুশি হলো মুন। আমি যাই। ময়দার ভারী বস্তাটা অবলীলায় কাঁধে তুলে নিয়ে স্বচ্ছন্দ গতিতে পাহাড়ী রাস্তা ধরে হেঁটে চলল।

কিশোরের দিকে ফিরল মুসা। ভুরু নাচাল। ডিনামাইট কোম্পানিকে বিগসের কী দরকার?

ডিনামাইট দিয়ে ঘরবাড়ি ওড়ানো যায়, ঠোট কামড়াল কিশোর।

ছাউনি পোড়ানো যায় না?

চিন্তিত ভঙ্গিতে মুসার দিকে তাকাল কিশোর। চলো। বিগসকে পেলে জিজ্ঞেস করব।

শহরের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলল দুজনে। গ্লিটার এতই ছোট শহর, কেউ রাস্তায় বেরোলে দেখা হবেই। ঠিকই পেয়ে গেল বিগৃকে। একটা কেবিন থেকে বেরোচ্ছে।

হাই, বয়েজ, ওদের দেখে উল্লসিত গলায় হাঁক ছাড়ল ও। গ্লিটার তোমাদের কেমন লাগছে?

ভালই লাগত, জবাব দিল কিশোর। কিন্তু এত উত্তেজনা, আগুন, বোমাবাজি, ডিনামাইট… আচ্ছা, নর্থফিল্ড ডিনামাইট কোম্পানির নাম শুনেছেন?

রাগ দেখা গেল বিগসের চোখে। সামলে নিয়ে হাসল। শুনেছি, তবে আজই প্রথম। খবরটা এত তাড়াতাড়ি কে দিল তোমাদের? পোস্ট অফিস থেকে কেউ চুরি করে খামের ঠিকানা দেখে গেছে নিশ্চয়?

আপনিই তো বলেছিলেন এখানে কোন কথা গোপন থাকে না, হেসে বলল কিশোর। হঠাৎ করেই আপনার কাছে চিঠি লিখে বসল কোম্পানিটা?

হ্যাঁ। প্রাইস লিস্ট পাঠিয়েছে।

কেমন কাকতালীয় না ঘটনাটা? লুক স্টার্লিঙের ঘরে বোমা ফাটার একেবারে পরদিনই বিস্ফোরক কোম্পানির প্রাইস লিস্ট এসে হাজির।

কাকতালীয়ই, জবাব দিল বিগস। আমি ওদের কাছে প্রাইস লিস্ট চাইনি। ডিনামাইটের কোন প্রয়োজন নেই আমার। লাগলে

তো লুকের কাছ থেকেই নিতে পারতাম।

কুঁচকে গেল মুসার ভুরু। লুক ডিনামাইটও বিক্রি করে?

করে। খনির কাজে লাগে ডিনামাইট। তা ছাড়া গাছের বড় বড় গুঁড়ি উপড়ানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়। প্রয়োজনীয় জিনিস, চাহিদা আছে, লুকের দোকানে পাওয়া না যাওয়ার কোন কারণ নেই। চলি। পরে দেখা হবে। পা বাড়িয়েও ফিরে তাকাল বিগস্। তোমাদেরকে একটা উপদেশ দিই, যদিও শুনতে ভাল লাগবে না; সেই পুরানো প্রবাদটা জানো তো, বেশি কৌতূহলে বিড়াল মরে?

চলে গেল বিগ। কিশোরের দিকে তাকাল মুসা। ও কি হুমকি দিয়ে গেল আমাদের?

তাই তো মনে হলো।

ওর কথা বিশ্বাস করেছ?

করা কঠিন, কিশোর বলল। কিন্তু দোষীই যদি হবে, প্রাইস লিস্ট পাঠানোর কথা স্বীকার না করলেও পারত।

চালাকি করেছে। স্বীকার না করলেই বরং বেশি সন্দেহ করতাম ওকে। ও সেটা জানে। কিন্তু আমি ভাবছি শেষ কার কাছে ডিনামাইট বিক্রি করেছেন লুক, জানতে পারলে ভাল হতো।

চলো না গিয়ে জিজ্ঞেস করি।

দোকানের কাছাকাছি এসে লুককে দেখতে পেল মুসা। নদীর ধারে একটা অদ্ভুত মেশিনের সামনে দাঁড়ানো। ওই যে।

তার দিকে এগোল দুজনে।

কয়েক গজ দূরে থাকতে বলল কিশোর, কী করছেন?

আচমকা ডাক শুনে ভীষণ চমকে গেলেন লুক। ফিরে তাকালেন। তোমরা! উফ, হার্ট অ্যাটাক করিয়ে দিয়েছিলে। ছায়ার মত হাঁটো। একটু শব্দ হয় না।

ঝরঝরে পুরানো মেশিনটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল মুসা, কী মেশিন? চাঁদ থেকে আনালেন নাকি?

না, বৃহস্পতি গ্রহ থেকে, হাসলেন লুক। সামলে নিয়েছেন। এর নাম ফিশহুইল। গরমকালে নদীর বরফ গলে গেলে স্রোতের মুখে বসিয়ে দেয়া হয়। স্রোতের টানে চাকা ঘোরে। চাকায় লাগানো এই যে তারের থলিগুলো দেখছ, এগুলো ডোবে আর ভাসে। ডুবে যাওয়া থলিগুলো স্যামন মাছে ভর্তি হয়ে ওপরে উঠে আসে, ওপরেরগুলো তখন নীচে চলে যায়। মাছগুলো আপনাআপনি একটা বাক্সে পড়তে থাকে। খালি থলি নীচে নামে, ভরা থলি ওপরে ওঠে। এভাবেই চলতে থাকে মাছ ধরা।

দারুণ মেশিন তো, মুসা বলল। আপনার?

না, জো সারটনের। একটা লোককে এটার কাছে ঘুরঘুর করতে দেখে সন্দেহ হয়েছিল। দেখতে এসেছি, এটাও নষ্ট করে দিল কি না, বেচারার নৌকাটার মত। নৌকাটা নষ্ট করে খুব খারাপ কাজ করেছে।

লোকটাকে চিনতে পেরেছেন?

দ্বিধা করলেন লুক। পিছন থেকে দেখেছি তো, ঠিক চিনতে পারিনি। তবে হাঁটার ভঙ্গি গোল্ড ফেরানির মত। তোমরা কোথায় যাচ্ছিলে?

আপনার কাছেই এসেছি। কথা ছিল।

দোকানে চলো।

কয়েক সেকেণ্ড নীরবে ফিশহুইলটার দিকে তাকিয়ে থেকে ঘুরে দাঁড়াল কিশোর। লুকের সঙ্গে তার দোকানের দিকে এগোল। হাঁটতে হাঁটতে ডিনামাইটের কথা জিজ্ঞেস করল।

নাহ, দুচার দিনের মধ্যে কারও কাছে বিক্রি করিনি, লুক বললেন। শেষ বিক্রি করেছি শীতের শুরুতে। আমার ছাউনিটার কথা ভুলতে পারছ না তোমরা, তাই না? তবে লিখে দিতে পারি, ডিনামাইট দিয়ে পোড়ায়নি। ডিনামাইটের দাম আছে। মাছি মারতে কামান দাগতে যাবে না। আমি শিওর, আগুন লাগার মূলে ওই জেরিক্যানের পেট্রল। দোকানের বারান্দায় উঠে গেলেন তিনি। ফিরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ডিনামাইটের কথা মাথায় এল কেন তোমাদের?

বিগসের কাছে ডিনামাইট কোম্পানি চিঠি দিয়েছে, ফস করে বলে ফেলেই বুঝল মুসা, গোপন তথ্য ফাঁস করে দেয়াটা ভুল হয়ে গেছে।

তাই নাকি? তাহলে তো চিন্তার কথাই… দোকানে ঢুকে গেলেন লুক।

নিজেদের কেবিনে ফিরে চলল দুই গোয়েন্দা। মুসা বলল, আমাদের চোখ এড়িয়ে ফিশহুইলটার কাছে কীভাবে গেল গোল্ড, বুঝতে পারছি না। রাস্তা তো মোটে ওই একটা। এমন নির্জন রাস্তা দিয়ে একজন লোক হেঁটে গেল আর আমাদের চোখে পড়ল না, এত কানা তো এখনও হইনি।

লুক তো বললেনই পিছন থেকে দেখেছেন। গোল্ড কি না শিওর নন তিনি। চিন্তিত ভঙ্গিতে জবাব দিল কিশোর। আচ্ছা, গোল্ডকে বিপদে ফেলার জন্য মিথ্যে কথা বলেননি তো?

তা কেন বলতে যাবেন?

কারণ, তিনি গোল্ডকে দেখতে পারেন না।

তা নাহয় বললেন। কিন্তু ফিশহুইলটার কাছে তো কেউ একজন নিশ্চয় গিয়েছিল। নইলে দেখতে যেতেন না লুক। সেই লোকটা কে?

বিগ নয়, এটা ঠিক। লুকের রহস্যময় লোকটা যখন ফিশহুইলের কাছে, বিগ তখন আমাদের সামনে। আমাদের সঙ্গে কথা বলছিল।

রাস্তার মোড়ের কাছে আসতে ওপাশ থেকে কুকুরের চিৎকার কানে এল। হুকুম শোনা গেল, হাইক! হাইক!

মোড় ঘুরে ছুটে এল টেড সিউলের কুকুরবাহিনী।

হাইক! হাইক! বলে চেঁচিয়ে কুকুরগুলোকে গতি বাড়ানোর নির্দেশ দিতে থাকল টেড। স্লেজ নিয়ে ছুটে আসছে ঢাল বেয়ে। কিশোর-মুসা সেই পথের ওপরই দাঁড়ানো। ওদের দেখেও দেখল যেন টেড।

দাঁত বেরিয়ে গেছে সামনের নেতা-কুকুরটার। বিকট মুখভঙ্গি। কিশোরের কাছ থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে রয়েছে। থামার কোন লক্ষণই নেই।

স্লেজটা গায়ের ওপর এসে পড়বে।

১৩
এক ধাক্কায় কিশোরকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিল মুসা। লাফ দিয়ে নিজেও সরে গেল একপাশে। বেরিয়ে থাকা বরফের টুকরোয় হোঁচট খেল কিশোর। সামলাতে পারল না। বরফে ঢাকা ঢাল বেয়ে গড়ানো শুরু করল। মুসা দাঁড়িয়ে রইল। চেঁচিয়ে বলল, টেড, দাঁড়াও, তোমার সঙ্গে কথা আছে…

জবাবে দস্তানা পরা হাত তুলে ঘুসি দেখাল টেড।

রেগে গেল মুসা। থাবা দিয়ে টেডের বাড়ানো হাতটা ধরে ফেলল। কজিতে মোচড় দিয়ে মারল হ্যাচকা টান। এটা আশা করেনি টেড। রানারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। স্লেজ থেকে উড়ে এসে পড়ল রাস্তার ওপর। সতর্ক হয়ে গেল বুদ্ধিমান কুকুরগুলো। কয়েক গজ এগিয়ে দাঁড়িয়ে গেল।

ধীরে ধীরে উঠে বসল টেড। মাথার পিছনে ব্যথা পেয়েছে, হাত বোলাচ্ছে সেখানে। বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মুসার দিকে।

কিশোরও উঠে এসেছে।

রাগ যায়নি মুসার। চিৎকার করে উঠল, কী মনে করো তুমি নিজেকে, টেড? আমাদের ওপর কীসের রাগ তোমার? গ্লিটারে যখনই কোন দুর্ঘটনা ঘটছে, তার আশপাশে দেখা যাচ্ছে তোমাকে। টিনুকদের কেবিনে যখন আগুন লেগেছিল, তোমাকে স্লেজ নিয়ে ছুটে পালাতে দেখেছি। বিষ মেশানো আপেল এনে দিয়েছ তুমি ওদেরকে। কাল যখন লুকের ছাউনিতে বোমা ফাটানো হলো, টাউন হলের মিটিঙে ছিলে

তুমি। আমি আরõ