Monday, April 22, 2024
Homeথ্রিলার গল্পরহস্য গল্পঅদ্ভুতুড়ে - শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

অদ্ভুতুড়ে – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

১. ভাইপো মানিক

ভাইপো মানিক একটা পেল্লায় মোটরবাইক কিনেছে, আর সেইসঙ্গে একটা চকচকে নতুন হেলমেট। মোটরবাইকটায় দারুণ শব্দ হয়। ভটভট করে সারা শহর দাবড়ে বেড়ায় মানিক। নন্দবাবু এটা লক্ষ্য করেছেন। ভাইপো মানিককে তিনি বিশেষ পছন্দ করেন না। কারণ মানিক ভূত, ভগবান আর মাদুলিতে বিশ্বাস করে না। কোষ্ঠী বা কররেখা বিচার সম্পর্কে তার মতামত শুনলে যে-কোনও জ্ঞানী মানুষেরই মাথায় খুন চাপবার কথা। সাধু সন্ন্যাসী ফকির ইত্যাদির প্রতি মানিকের ব্যবহার মোটেই ভদ্র নয়। সেই কারণেই মানিকের ওপর নন্দবাবু খুশি নন। তবে তিনি নিজে সাতে-পাঁচে থাকেন না। কারও সঙ্গে তর্ক করতে ভালবাসেন না। মানুষকে ক্ষমা করতে তিনি সর্বদাই প্রস্তুত। কিন্তু মুশকিল হল, ইদানীং মানুষ ক্ষমাটমা বিশেষ চায় না।

যাই হোক, নন্দবাবু মানিকের মোটরবাইক এবং হেলমেটটা লক্ষ করছেন ক’দিন ধরেই। না, মোটরবাইকটাকে ততটা নয়, যতটা লাল টুকটুকে চমৎকার হেলমেটটাকে। নন্দবাবু এমনিতে সাধুগোছের লোক। বিয়ে-থা করেননি। কায়কল্প প্র্যাকটিস করেন। তার এক ভৌত ক্লাব আছে। প্রতি শনি ও মঙ্গলবার সেখানে কয়েকজন মিলে ভূত-প্রেত নিয়ে গবেষণামূলক কাজকর্ম করেন। সপ্তাহে দুদিন জ্যোতিষচর্চা আর দু’দিন ধর্মালোচনা। রবিবারটা নন্দবাবু মৌন থাকেন, উপবাসও করেন। জাগতিক মায়া-মোহ তাঁর বিশেষ নেই।

কিন্তু মানিকের লাল টুকটুকে হেলমেটটা দেখার পর থেকেই নন্দবাবু ভারি উচাটন হয়ে পড়েছেন। হেলমেটটা নাকি আছাড় মারলেও ভাঙবে না, এমন শক্ত কাঁচতন্তু দিয়ে তৈরি। সামনে আবার প্লাস্টিকের ঢাকনা আছে। কানে ইয়ার-প্লাগ লাগানোর ব্যবস্থা আছে, যাতে ইচ্ছে করলেই বধির হয়ে থাকা যায়। এইসব শোনার পর থেকেই নবাবুর কেমন যেন মনটা চঞ্চল হচ্ছে। ভারি ইচ্ছে হচ্ছে হেলমেটটা একবার চুরি করে হলেও মাথায় দেন।

অনেকভাবে মনকে সংযত করতে চেষ্টা করেছেন নবাবু। কিন্তু কোনও কাজই হয়নি।

মনকে বলেছেন, “ওরে মন! সবই তো ছেড়েছিস, পৃথিবীর যত মায়া-মোহ বিসর্জন দিয়ে অনেক ওপরে উঠে পড়েছিল গ্যাস-বেলুনের মতো। তা হলে কেন রে ওই তুচ্ছ হেলমেট তোকে টনছে?”

মন সঙ্গে সঙ্গে কুপিত হয়ে জবাব দেয়, “দ্যাখো হে নন্দবাবু, তুমি ভীষণ ঘড়েল লোক। আমাকে গ্যাস-বেলুন বানিয়ে দিব্যি নিজে গাট হয়ে বসে বসে মজা দেখছ। আরে বাপু, ত্যাগ যে করবে, ত্যাগের আগে তো একটু চেখে দেখতে হবে যে, যে-জিনিসটা ত্যাগ করছি সেটা কীরকম।”

“তা তো বটে রে বাপু, কিন্তু ওরে মন, হেলমেট আর এমন কী-ই বা জিনিস!”

“আগে জিনিসটা পরো, দ্যাখো, ওটা দিয়ে কী কাজ হয়, তারপর না হয় একদিন ত্যাগ করে দিও।”

নন্দবাবু সুতরাং হার মানলেন।

শীতকাল। মানিক বাড়িতে নেই। তার মোটরবাইকটাও নেই। শুধু হেলমেটটা পড়ে আছে অবহেলায়। বাড়িতে আজ পিঠে-পায়েস তৈরি হচ্ছে হই হই করে। এলাহি কাণ্ড। সন্ধের সময় নন্দবাবু তার ভুতুড়েক্লাবে যাবেন বলে তৈরি হচ্ছিলেন। হঠাৎ তাঁর হেলমেটটার দিকে নজর পড়ল। বারান্দার একটা হুকে সেটা ঝুলে আছে।

দরজার কাছ থেকে ঘরে ফিরে এলেন নন্দবাবু। লোভে বুকটা দুড়দুড় করছে। “ওরে মন!”

“বলে ফ্যালো।”

“কী করব বল।”

“এ সুযোগ ছেড়ো না হে। মানিক রাত দশটার আগে ফিরবে না।”

“কাজটা অন্যায় হবে না তো?”

“আরে না। কত লোক কত বড় বড় অন্যায় করে হেসেখেলে বেড়াচ্ছে।”

“তা বটে। তা হলে পরি?”

“পরো। তবে তোমার ওই ধুতি-পাঞ্জাবির সঙ্গে তো হেলমেট মানাবে না হে। বাক্স খুলে সুট বের করো!”

নন্দবাবু আঁতকে উঠে বললেন, “স্যুট! বলিস কী রে মন? ওই ম্লেচ্ছ পোশাক যে আমি ছেড়ে দিয়েছি।”

“ছেড়েই যখন দিয়েছ, তখন আর পরতে দোষ কী? কথায় আছে না, “তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথা’; তার মানে হল, ত্যাগ করে ভোগ করো’। যাও, পোশাকটা পরে ফ্যালো, দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

নন্দবাবু হার মানলেন। বাক্স খুলে পুরনো স্যুট বের করে লজ্জিতভাবে পরলেন। সুবিধে হল যে, তার ঘরটা একতলায় এবং বাড়ির পেছন দিকে। এদিকটায় কেউ থাকে না। একটু পুরনো অন্ধকার আর স্যাঁতসেঁতে কয়েকখানা ঘর বহুঁকাল ধরে পড়ে আছে তালাবন্ধ হয়ে। এই নির্জনতায় থাকার অনেক সুবিধে নন্দবাবুর। কেউ উঁকিঝুঁকি মারে না, ডিস্টার্ব করতে নামে না। সামনের বারান্দায় শুধু মোটরবাইকটা রাখতে মানিক আসে।

স্যুট পরে নন্দবাবু বেরোলেন। তারপর দেওয়াল থেকে হেলমটটা নামিয়ে মাথায় পরলেন। বেশ ভারী। ভিতরে গদি দেওয়া আছে। হেলমেটটার গায়ে কয়েকটা বোম-টোতামও আছে।

হেলমেটটা মাথায় দেওয়ার পরই নন্দবাবুর একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল। মনে হল, তিনি যেন নন্দবাবু নন। অন্য কেউ।

বাড়ির পেছন দিকে আগাছার জঙ্গলে ছাওয়া একটা বাগান আছে। বেশ বড় বাগান। এখন আর এই বাগানের পরিচর্যা কেউ করে না। কেউ আসেও না এদিকে। সেই বাগানের ভিতরে একসময়ে বেশ চওড়া সুরকির রাস্তা ছিল। এখন সেই রাস্তা ঘাসে ঢেকে গেছে। সাপখোপের আস্তানা হয়েছে ঝোঁপজঙ্গলগুলো। এই পথ দিয়েই নন্দবাবু যাতায়াত করেন।

বাগান পেরিয়ে ফটক। ফটকের ওপাশে একটা গলি। খুবই নির্জন গলি। স্যুট পরা নন্দবাবু হেলমেট-মাথায় গলিতে পা দিয়ে চারদিকটা ভাল করে দেখে নিলেন। না, কেউ কোথাও নেই।

স্যুটের সঙ্গে মানিয়ে আজ বুটজুতোও পরেছেন তিনি। বহুঁকাল পড়ে ছিল বুট দুটো, শক্ত দরকচা মেরে গেছে। পায়ে সাঙ্ঘাতিক লাগছে হাঁটতে গিয়ে। হেলমেটটাও যে এত ভারী, তা কে জানত!

গলিটা পার হয়ে নন্দবাবু রাস্তায় পড়লেন। শীতকাল। মফস্বলের শহরে খুব জেঁকে শীতও পড়েছে এবার। রাস্তায়-ঘাটে লোকজন বিশেষ নেই। থাকলেও ক্ষতি ছিল না, এ রাস্তায় আলো নেই, এবং ঘন কুয়াশা পড়েছে আজ। সুতরাং নন্দবাবুকে কেউ দেখতে পাচ্ছে না।

নন্দবাবু ধীর গম্ভীর মানুষ, তার কোনও চপলতা দেখা যায় না কখনও। কিন্তু আজ এই কুয়াশামাখা সন্ধ্যায় সুট, বুট এবং হেলমেট পরে নির্জন রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তার শিস দিতে ইচ্ছে হচ্ছিল। একটু ইংরেজি নাচ নাচতে ইচ্ছে করছিল।

নন্দবাবু বললেন, “ওরে মন, মন রে! এসব হচ্ছেটা কী?”

“খারাপটা কী হচ্ছে বাপু! শিস দিতে ইচ্ছে হলে দাও না।”

“খারাপ শোনাবে না?”

“কেন, শিস তো তুমি ভালই দাও। আগে তো শিস দিয়ে বেশ পায়রা ওড়াতে।”

‘দূর পাগল! যখন সংসারী ছিলাম, তখন কত কী করেছি। এখন আর ওসব মানায়?”

“খুব মানায়। কেউ শুনছে না, দাও দেখি একটু শিস।”

নন্দবাবু আবার হার মানলেন। শিস দিতে গিয়ে দেখলেন, শব্দ হচ্ছে না তো!

একটু পরেই অবশ্য ভুল ভাঙল। হেলমেট পরা বলে বাইরের শব্দ আদপেই তাঁর কানে আসছে না। হেলমেটটা একটু তুলতেই তিনি শুনতে পেলেন, তার ঠোঁটে চমৎকার সুরেলা শিস বাজছে।

বেলতলাটা বেশ অন্ধকার! চারদিকে ঝোঁপঝাড়ে জোনাকি জ্বলছে। বাঁ ধারে শাঁখচুন্নির জলা। তার ওপাশে একটা মস্ত পোড়ো বাড়ি। না, একে পোড়ো বাড়ি বলার চেয়ে ধ্বংসাবশেষ বলাই ভাল। এক সময়ে এক নীলকর সাহেব মস্ত প্রাসাদ বানিয়েছিল আমোদ-ফুর্তির জন্য। সেই বাড়ির এখন ওই দশা। বিস্তর মানুষ ওখানে গুপ্তধন খুঁজতে গেছে। ভূতের বাড়ি বলেও একসময়ে অখ্যাতি ছিল। শীতকালে এক সাধু এসে প্রায়ই ওখানে আস্তানা গাড়ত। কিছুদিন চোর ডাকাতদেরও ডেরা হয়েছিল বাড়িটা। এখন আর কেউই ওখানে যায় না। চারদিকে এক ধরনের কাঁটাগাছের দুর্ভেদ্য জঙ্গল হয়েছে। নন্দবাবু এবং তার ভুতুড়ে ক্লাবের সদস্যরা ও বাড়িতে অনেকবার ভূত খুঁজতে হানা দিয়েছেন। কিন্তু ওবাড়ির ভূতেরা দেখা দেয়নি।

শ্যামবাবু বলেছিলেন, ভূত পুরনো হয়ে গেলে সেয়ানা হয়ে ওঠে। সহজে দেখা দেয় না।

রাধাগোবিন্দবাবু ভূতের ব্যাপারে খুবই বিশেষজ্ঞ লোক। থিওসফিক্যালি সোসাইটির সদস্য ছিলেন। ভূত দেখেছেন বহুবার। শ্যামবাবুর কথায় তিনিও সায় দিয়ে বললেন, “ওই হয়েছে মুশকিল, পুরনো ভূতরা সহজে দেখা দিতে চায় না। নতুন যারা ভূত হয়েছে, তারা পৃথিবীর মায়া কাটাতে পারে না কিনা, তাই হকেনকে দেখা দেয়।”

ফটিকাবু কখনও ভূত দ্যাখেননি, তবে ভূতের ওপর তার অগাধ বিশ্বাস। ভূত দেখার জন্য তিনি অনেক ঘুরে বেড়িয়েছেন। পোডড়া বাড়ির সন্ধান পেলেই গিয়ে হাজির হন। শ্মশানে কারখানায় নিশুত রাতে গিয়ে বসে থাকেন। এমন কী, ভূতের দেখা পেলে মা কালীকে জোড়া পাঁঠা দেবেন বলে মানতও করে রেখেছেন। তিনি একটু রেগে গিয়ে বললেন, “নতুন-পুরনো জানি না মশাই, আজ অবধি আপনারা একটা ভূতেরও ব্যবস্থা করতে পারলেন না। এমন চলতে থাকলে শেষ অবধি আমাকে আমার সেজো শালার কাছে একশো টাকা বাজি হারতে হবে। শুধু তা-ই নয়, নিজের কান মলে স্বীকার করতে হবে যে, তার কথাই ঠিক, ভূত বলে কিছু নেই।”

এ-কথায় সাত্যকিবাবু হাঁ-হাঁ করে উঠে বললেন, “দেখা পাননি বলেই যে নেই, এটা তো যুক্তি হল না মশাই। আপনি দ্যাখেন না, কিন্তু আমি তো দিব্যি দেখি। এই পরশু দিন একটা মশার-আকৃতি ভূত মশারির মধ্যে ওড়াওড়ি করছিল। যতবার তালি দিয়ে মারতে যাই, ততবার ফশকায়। শেষ অবধি সেটা নাকের ডগায় এসে খুব যখন নাচানাচি করতে লাগল, তখন ভাল করে দেখলুম, মশা নয় একরত্তি একটা ভূত।”

ফটিকবাবু খ্যাক করে উঠে বললেন, “মানুষ মরে যদি ভূত হতে পারে, তো মশা মরেই বা হবে না কেন? আমি তো গোরুর ভূত, গণ্ডারের ভূত, গাছের ভূতও দেখেছি।”

ফটিকবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, “আমার মেজো শালাকে এসব কথা বললে হা হা করে হেসে উঠবে যে।”

নন্দবাবু বেলতলায় দাঁড়িয়ে হেলমেটের কাঁচের স্বচ্ছ ঢাকার ভিতর দিয়ে অন্ধকার ধ্বংস্তূপের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন। নিজের কাছে স্বীকার করতে তার লজ্জা নেই যে, আজ অবধি তিনি জলজ্যান্ত ভূত দেখতে পাননি। ভূতের আভাস অবশ্য পেয়েছেন। ভূত-ভূত অনুভূতিও হয়েছে, কিন্তু চোখের সামনে একেবারে স্পষ্ট দেখা আর হল কই?

ভাবতে ভাবতে একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে যেই পা বাড়িয়েছেন, অমনি ধড়াম্ করে মাথার ওপর কী যেন একটা এসে পড়ল।

নন্দবাবু ভীষণ চমকে গিয়েছিলেন। মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। আর তাজ্জবের কথা, নন্দবাবু ভারি চমৎকার সুরেলা একটা গান শুনতে পেলেন।

হতভম্বের মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে নন্দবাবু নিচু হয়ে দেখলেন, একটা পাকা বেল পায়ের কাছে পড়ে আছে। গাছ থেকে সদ্য ঘেঁড়া। মাথায় হেলমেট না থাকলে এই বেল তার মাথা ফাটিয়ে দিতে পারত।

বেলটা কুড়িয়ে নিয়ে নন্দবাবু দাঁড়িয়ে রইলেন। গানটা কোথা থেকে আসছে? হেলমেটের মধ্যে তো বাইরের শব্দ ঢোকে না। তবে এটা ঢুকছে কী করে?

সন্দিহান হয়ে নন্দবাবু হেলমেটটা খুললেন। এবং অবাক হয়ে বুঝতে পারলেন বা বুঝতে পেরে অবাক হলেন যে, দুনিয়ার প্রযুক্তিবিদ্যা অনেক এগিয়ে গেছে। এই হেলমেটটায় টেপরেকর্ডার লাগানো আছে। মাথায় বেল পড়ায় ঝড়াক করে টেপরেকর্ডার চালু হয়ে গান বেরিয়ে আসছে।

নন্দবাবু গানটা বন্ধ করার চাবি খুঁজে পেলেন না। গানসুদ্ধ হেলমেটটা ফের পরে নিয়ে ভুতুড়ে ক্লাবের দিকে হাঁটতে লাগলেন। কানে গান বাজতেই লাগল।

ভৌত ক্লাবটা একটা ভারি জব্বর জায়গায়। মিত্তিরবাবুদের পোড়ো বাড়ির একাংশে একখানা ঘর আছে। চারদিকে আগাছার জঙ্গল। দিনে-দুপুরেও মানুষ আসে না। সন্ধের পর শুধু শেয়ালেরা ঘোরাঘুরি করে। কৃষ্ণপক্ষে জায়গাটা এত ঘুরঘুট্টি অন্ধকার থাকে যে, নিজের হাতখানা অবধি ঠাহর হয় না।

নোনাধরা দেওয়াল, আধভাঙা দরজা-জানলা, সোঁদা গন্ধ মিলে-মিশে বেশ একটা ভূত-ভূত ভাব। ঘরে একখানা কাঠের টেবিলের ওপর মড়ার খুলি আর পাশে একখানা মোমবাতি জ্বলছে। কয়েকখানা কাঠের চেয়ারে ভৌত ক্লাবের সদস্যরা বসে আছেন। তাদের বয়স ত্রিশ থেকে শুরু করে আশি অবধি। শীতকাল বলে সকলেই একটু মুড়িসুড়ি দিয়ে বসে আছেন। মুড়ি আর গরমাগরম বেগুনি এসে গেছে। দলের সবচেয়ে কমবয়সী সদস্য গিরিজা একটা কেরোসিন-স্টোভে চা তৈরি করছে। আড্ডা জমজমাট।

এমন সময়ে মাথায় হেলমেট আর হাতে পাকা বেল নিয়ে নন্দবাবু ঘরে ঢুকতেই একটা হইচই গেল।

ফটিকবাবুর ভূত-তৃষ্ণা বা ভূত-ক্ষুধা আজকাল এত বেড়েছে যে, তিনি আজকাল সর্ষের মধ্যেও ভূত দেখার চেষ্টা করেন। নন্দবাবুকে দেখে তিনিই প্রথম সোৎসাহে চেঁচিয়ে উঠলেন, “এই তো, এতদিনে বুঝি মা কালী মুখ তুলে চাইলেন…”

রাধাগোবিন্দবাবুর ভয় অন্যরকম। কিছুদিন আগে তিনি সাইকেলে চেপে যাওয়ার সময় রাস্তায় একটা গোরুকে ধাক্কা দেন। তাতে একজন পুলিশম্যান এসে তাঁকে যাচ্ছেতাই অপমান করেছিল। রাধাগোবিন্দবাবুর প্রতিশোধস্পৃহা সাঙ্ঘাতিক। দু’একদিন বাদেই এক দুপুরবেলা বটগাছের বাঁধানো চাতালে সেই পুলিশম্যানটাকে বসে বসে ঘুমোতে দেখে রাধাগোবিন্দবাবু তার টুপিটা তুলে নিয়ে চম্পট দিয়েছিলেন। অবিমৃষ্যকারিতা আর কাকে বলে! পুলিশ হল স্বয়ং সরকারবাহাদুরের জবরদস্ত প্রতিনিধি। পুলিশের টুপি চুরি করা যে সাঙ্ঘাতিক অপরাধ তা তিনি পরে ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছেন। কিন্তু টুপিটা গিয়ে ফেরত দিয়ে আসার সাহস আর তার হয়নি। পুলিশকে তার ভীষণ ভয় করে আজকাল। সর্বদাই তিনি আশঙ্কা করছেন, কখন এসে পুলিশ তার ওপর চড়াও হবে।

নন্দবাবুকে দেখে রাধাগোবিন্দবাবু তাই তারস্বরে বলে উঠলেন, “আমি চোর না বাবা, আমি চোর না। মা কালীর দিব্যি, টুপিটা বাতাসে উড়ে রাস্তায় পড়ে গিয়েছিল, আমি ঝেড়েঝুড়ে তুলে রেখেছি যত্ন করে…”

সাত্যকিবাবু খুব ভাল করেই জানেন যে, ভিন গ্রহ থেকে অজানা সব জীব কিভূত সব মহাকাশযানে করে প্রায়ই পৃথিবীতে চলে আসে। খবরের কাগজে প্রায়ই উফো’র খবর থাকে। নন্দবাবুকে দেখে তার বিন্দুমাত্র সন্দেহ রইল না যে, এ হল সেই প্রাণীদেরই একজন। তিনি আঁ-আঁ করে দু’বার দুটো দুর্বোধ্য শব্দ করে উঠলেন। তার মনে হল, ভিন গ্রহের জীব তো সাদামাঠা বাংলা ভাষা বুঝতে পারবে না, তবে সংস্কৃত দেবভাষা, সেটা বুঝলেও বুঝতে পারে। কিন্তু সংস্কৃতে তিনি বেজায় কাঁচা। সুতরাং যা মনে পড়ল, তাই চেঁচিয়ে বলে যেতে লাগলেন, “ভো ভো আগন্তুকঃ অহং সাত্যকি চট্টরাজ্য। অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িস্যামি মা শুচঃ। রক্ষ মাম। নরঃ নরৌ নরাঃ।”

শ্যামবাবু ভালমন্দ কিছু না বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি আলোয়ান, সোয়েটার, জামা আর গেঞ্জির ভিতর হাতড়ে পৈতে খুঁজে বারে করে কাঁপতে কাঁপতে গায়ত্ৰীমন্ত্র বেশ চেঁচিয়েই জপ করতে লাগলেন।

হারানবাবুর বয়স আশির ওপর। চোখে ভাল ঠাহর পান না। কিন্তু একটা বিটকেল কিছু যে ঘরে ঢুকেছে, তা আঁচ করে সে-ই যে চোখ বুজে ফেলেছেন, আর চোখ খোলার নাম নেই। চোখ বুজে হুঁহুঁ করে মৃদু মৃদু আওয়াজ ছাড়তে ছাড়তে বলতে লাগলেন, “ই, এর মতো ওষুধ নেই হে বাছাধন। ভূত হও, প্রেত হও, রাক্ষস হও, যমদূত হও, চোখটি বুজে ফেললে আর ভয়টি দেখাতে পারবে না।”

কে একজন ‘পুলিশ, পুলিশ’ বলে চেঁচাচ্ছিল। আর-একজন রামনাম করতে গিয়ে কাশতে লাগল। একজন চেয়ার উলটে পড়ে গেল।

গিরিজা প্রথমটায় একটু থতমত খেয়ে গেলেও ততটা ঘাবড়ে যায়নি। সে বলে উঠল, “আচ্ছা, সবাই মিলে যে কী পাগলের কাণ্ড বাধালেন? লোকটা কে আগে দেখুন।”

নন্দবাবু এতটা প্রতিক্রিয়া আশা করেননি। তবে তিনি এতে খুশিই হলেন। বহুঁকাল ভারি সাদামাঠা জীবনযাপন করেছেন। তাকে কেউ ভয় খায় না, সমীহ করে না, বাড়ির চাকর বাকরেরা পর্যন্ত তেমন খাতির দেখায় না তাঁকে। আজ তাকে দেখে যে সকলে একেবারে চমকে উঠে ভিরমি খাওয়ার জোগাড়, এতে নিজের ওপর তার একটা বিশ্বাস এসে গেল।

নন্দবাবু গম্ভীর মুখে মড়ার খুলিটার পাশে পাকা বেলটা রেখে হেলমেট খুললেন। একটা চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ে ফটিকবাবুর দিকে চেয়ে বললেন, “আপনি নাকি এখনও ভূত দ্যাখেননি?”

ফটিকবাবু নন্দবাবুর দিকে কটমট করে চেয়ে বললেন, “না, দেখিনি। আপনার মতো বেরসিকও জীবনে দেখিনি। ভাবলাম মা কালী বুঝি আজ মুখ তুলে চাইলেন। তা নয়, ভূতের বদলে নন্দবাবু। ছ্যাঃ ছ্যাঃ, জীবনটায় ঘেন্না ধরে গেল।”

“তা হলে আমার চেয়ে ভূতের গুরুত্বই আপনার কাছে বেশি?

“আলবাৎ বেশি। খুঁজলে কয়েক লাখ কয়েক নন্দবাবু পাওয়া যাবে, কিন্তু ভূত পাওয়া যাবে কি?”

নন্দবাবু বিজ্ঞের মতো একটু হাসলেন। তারপর বললেন, “যাবে। এইমাত্র ভূতের হাত থেকে কোনওক্রমে প্রাণ হাতে করে চলে আসতে পেরেছি।”

ফটিকবাবু সোৎসাহে দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, “কোথায়?”

“বেলতলায়। ওই পাকা বেলটা আমার মাথা তাক করে ছুঁড়ে মেরেছিল। ভাগ্যিস মাথায় হেলমেট ছিল। নইলে…”

ফটিকবাবু আবার নিরুৎসাহ হয়ে বসে পড়ে বললেন, “তার মানে, ভূত দ্যাখেননি, ভূতের ঢেলা খেয়েছেন।”

“ওই হল।”

“ফটিকবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “মোটেই দুটো জিনিস এক হল না।”

একটা তর্ক বা ঝগড়া বেধে উঠছিল, কিন্তু সকলে মাঝখানে পড়ে ব্যাপারটা আর এগোতে দিল না। সকলেরই কৌতূহল হেলমেট, স্যুট ইত্যাদি নিয়ে।

নন্দবাবু মুড়ি আর বেগুনির সঙ্গে চায়ে চুমুক দিয়ে একটু লাজুক মুখে ঘটনাটা বিস্তারিত বলতে লাগলেন।

কথার মাঝখানে গিরিজা হঠাৎ বলে উঠল, “কিন্তু নখুড়ো, আপনি হেলমেটটা পেলেন কোথায়?

“কেন বাপু, আমার ঘরের দরজায় দরদালানের পেরেকে ঝোলানো থাকে। সেখানেই পেয়েছি।”

“কটার সময়?”

“ওই তো সাড়ে পাঁচটা হবে।”

“হতেই পারে না।”

“তার মানে?”

‘ঠিক পাঁচটা পঁয়ত্রিশ মিনিটে মানিকের সঙ্গে জামতলার মোড়ে আমার দেখা হয়েছে। মাথায় লাল হেলমেট পরে মোটরবাইকে চড়ে সে কালীতলায় থিয়েটার দেখতে যাচ্ছে।”

নন্দবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, “গিরিজা, বড়দের সঙ্গে ইয়ার্কি করতে নেই।”

গিরিজাও গম্ভীর হয়ে বললে, “নখুড়ো, নেহাত মানিকের কাকা বলেই আপনাকে খুড়ো বলে ডাকি, নইলে স্কুলে কলেজে আপনি আমার মাত্র তিন ক্লাস, ও ওপরে পড়তেন। ইয়ার্কির বাধা নেই। তবে আমি এখন মোটেই ইয়ার্কি করছি না।”

নন্দবাবু আরও গম্ভীর হয়ে বললেন, “তা হলে ভুল দেখেছ।”

গিরিজাও গম্ভীরতর হওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলল, “আমার চোখ দারুণ ভাল। ভুল দেখার প্রশ্নই ওঠে না।”

“তা হলে বানিয়ে বলছ।”

“আপনি ঘুরিয়ে আমাকে মিথ্যেবাদী বলছেন?”

আবার সবাই হাঁ-হাঁ করে মাঝখানে পড়ে বিবাদটা আর গড়াতে দিল না। ফটিকবাবু বললেন, “এসব নিয়ে সময় নষ্ট করে লাভ কী? ভূত নামানোর চেষ্টা করুন সবাই। শালার কাছে আমার আর মুখ দেখানোর জো নেই।”

শ্যামবাবু বেজার মুখ করে বললেন, “আজ কি ভূত নামানো সহজ হবে? আমার গায়ত্ৰীমন্ত্র জপ আর যোগেশবাবুর রামনামের চোটে ভূতেরা কয়েকশো মাইল তফাতে চলে গেছে।”

ফটিকবাবু লাঠিগাছ হাতে করে উঠে পড়লেন। বললেন, “তা হলে আর এখানে মিছে সময় নষ্ট করে লাভ কী! আজ বাড়িতে কড়াইশুটির কচুরি হচ্ছে, দেখে এসেছি।”

রাধাগোবিন্দবাবু বলে উঠলেন, “দাঁড়ান ফটিকবাবু, আমিও আপনার সঙ্গে ই বেরোব, আজ আমার বেয়াই-বেয়ান এসেছেন। বাজারটা একটু ঘুরে যেতে হবে, যদি টাটকা মাছ-টাছ পাওয়া যায়।”

এমনি করে প্রায় সকলেই একে-একে উঠে পড়তে লাগলেন। ঘরটা ফাঁকা হয়ে গেল একসময়।

একা নন্দবাবু মড়ার খুলির সামনে মোমবাতির আলোয় আনমনা হয়ে বসে রইলেন। মনটায় একটা ধন্দ-ভাব। একটা সন্দেহ। একটু রহস্য।

গিরিজা যদি মিথ্যে কথা না বলে থাকে, তা হলে এই হেলমেটটা এল কোথা থেকে?

তিনি হাত বাড়িয়ে হেলমেটটা তুলে নিলেন। মোমবাতির আলোয় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগলেন। দেখতে অনেকটা তো মানিকের হেলমেটের মতোই।

রাত বাড়ছে। বাইরে একঝাঁক শিয়াল ডাকল। হু হু করে উত্তরে একটা হাওয়া ভূতের নিশ্বাসের মতো বয়ে গেল। ঝিঝি ডাকছে। টিকটিকি রহস্যময় ভাবে টিকটিক করে উঠল। মোমবাতির শিখা কেঁপে-কেঁপে উঠল হঠাৎ।

নন্দবাবুর হঠাৎ কেমন যেন গা’টা ছমছম করে উঠল। তিনি হেলমেটটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। বেরোতে যাবে বলে পা বাড়িয়েছেন, হঠাৎ শুনতে পেলেন, কে যেন জুতোর আওয়াজ তুলে এদিকে আসছে।

দরজাটা ভেজানো। নন্দবাবু দরজার দিকে তাকিয়ে চিন্তা করে দেখলেন, আজ ভৌত ক্লাবের দু’জন সদস্য অনুপস্থিত ছিলেন। নরেনবাবু আর সনাতনবাবু। রাত এখন বেশি হয়নি। হয়তো তাঁদেরই কেউ আসছেন।

নন্দবাবু আবার বসে পড়লেন। এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে গিয়ে তাঁর কোনও লাভ নেই। এই সময়টা বাড়িতে ছেলেপুলেগুলো ভারি চেঁচিয়ে পড়া মুখস্থ করে। সেজদা যদুলাল কানে কম শোনেন বলে খুব জোরে রেডিও ছেড়ে বসে থাকেন। নন্দবাবুর ঠাকুমা’র সঙ্গে বুড়ি দাসী মোদার বচসাও হয় ঠিক এই সময়ে। নন্দবাবুর বাবা ডাকসাইটে ভুবন রায় ঠিক এই সময়েই ছেলেদের ডেকে বকাঝকা করেন। বাড়িটায় শান্তি নেই।

নন্দবাবু পায়ের শব্দটার উদ্দেশে চেঁচিয়ে বললেন, “আসুন নরেনবাবু, আসুন সনাতনবাবু।”

পায়ের শব্দটা এগিয়ে এল বটে, কিন্তু দরজা খুলে কেউ ঘরে ঢুকল না। নন্দবাবু স্পষ্ট শুনতে পেলেন, ঘরের পাশ দিয়ে পায়ের শব্দটা ভিতরের সিঁড়িঘরের দিকে চলে যাচ্ছে।

এই ভাঙা বাড়িতে বলতে গেলে বাইরের দিকের এই একখানা ঘরই আস্ত আছে। ভিতর বাড়িটা একেবারেই ভাঙাচোরা এবং রাজ্যের ডাঁই করা আবর্জনায় অতিশয় দুর্গম।

“কে? কে যায়?”

নন্দবাবুর চেঁচানির কেউ জবাব দিল না। পায়ের শব্দটা ধীরে ধীরে ধ্বংসস্তূপে ঢাকা বাড়িটার মধ্যে মিলিয়ে গেল।

নন্দবাবু আর এক সেকেন্ডও দেরি করলেন না। এক লাফে গিয়ে দরজা খুলে ছুটতে লাগলেন। শক্ত জুতোয় পা ছিঁড়ে যেতে লাগল, তবু থামলেন না।

একেবারে নিজের ঘরটিতে পৌঁছে হ্যাঁ-হ্যাঁ করে হাঁফাতে লাগলেন। খানিকক্ষণ জিরোবার পর হঠাৎ খেয়াল হল, হেলমেটটা তিনি ভৌত ক্লাবের ঘরেই ফেলে এসেছেন।

২. ভুবন রায়ের বয়স পঁচাশি

ভুবন রায়ের বয়স পঁচাশি বটে, কিন্তু তাঁকে বুড়োমানুষ বললে অপমানই করা হবে। ভুবন রায় ওলিম্পিকে দেশের হয়ে ওয়েটলিফটিং করে এসেছেন যৌবন কালে। একটা মেডেল পেলেও পেয়ে যেতে পারতেন। পারলেন না কেবল খাওয়ার প্রতি তাঁর সাঙ্ঘাতিক লোভের জন্য। প্রতিযোগিতার দিন সকালবেলায় তিনি একরাশ মাংস আর ডিম খেয়ে অ্যায়সা ওজন বাড়িয়ে ফেলেছিলেন যে, তাঁকে লাইট-হেভি গ্রুপের প্রতিযোগিতায় নামতে দেওয়া হল না। কর্মকর্তারা বললেন, “তোমাকে হেভিওয়েটে কমপিট করতে হবে।” তবে ভুবন রায় দমবার পাত্র নন। কোমর বেঁধে হেভিওয়েট গ্রুপের দৈত্য-দানবদের সঙ্গেই প্রতিযোগিতায় নেমে পড়লেন। আশ্চর্যের বিষয়, তিনি ষষ্ঠ স্থান দখল করেছিলেন। লাইট-হেভি গ্রুপে হলে যে সোনার মেডেল জয় করা তাঁর পক্ষে মোটেই কঠিন হত না, এ কথা সবাই স্বীকার করেছিল। তা ভুবন রায়ের জীবনটাই এমনি। মিলিটারিতে বেশ উঁচু পর্যায়ের অফিসার ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভালরকম লড়াই করেছেন। কিন্তু যুদ্ধ যেই থামল, অমনি তাঁর জীবনটা আলুনি হয়ে গেল। মিলিটারিতে চাকরি করবেন, অথচ যুদ্ধ করবেন না, এটা তাঁর কাছে এক অসহ্য ব্যাপার। দেশের জন্য যুদ্ধ করতে করতে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ বিসর্জন দেবেন, এটা তাঁর অনেক দিনের সাধ। কিন্তু যুদ্ধ থামবার পর দেশ স্বাধীন হয়ে গেল এবং সবাই শান্তির বাণী কপচাতে লাগল দেখে তিনি ভারি চটে গেলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখলেন, “ভারতবাসীরা যুদ্ধ করেনি বলেই মানুষ হয়ে উঠতে পারছে না। যুদ্ধ বাধালে দেশের যুবশক্তি ধ্বংস হয়ে যাবে, জাতীয় চরিত্র গঠিত হবে না। যুদ্ধই জাতীয় সংহতি সৃষ্টি করে। অতএব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি একটা যুদ্ধ ঘোষণা করুন।” বলাই বাহুল্য, এ চিঠির প্রতি প্রধানমন্ত্রী তেমন গুরুত্ব দেননি, তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কাছে চিঠিটা পাঠিয়ে দেন। আর প্রধানমন্ত্রীকে ওই চিঠি লেখার দরুন ভুবন রায়ের কোর্ট মাশাল হওয়ার জোগাড়। ভুবন রায় তাতেই কী খুশি। কোর্ট মার্শাল হয়ে যদি গুলি খেয়ে মরতে হয়, তা হলেও একরকম দেশের জন্য প্রাণ দেওয়ার শামিল হবে ব্যাপারটা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তা হল না। নতুন সরকার দয়ার অবতার, শান্তির বাণী ছাড়া মুখে কথা নেই। তাই তাঁকে ক্ষমা করে দেওয়া হল। ভুবন রায় ঘেন্নায় নাক সিঁটকে মিলিটারির চাকরি ছেড়ে দিলেন। তারপর এই গঞ্জে এসে গ্যাঁট হয়ে বসে দুধের ব্যবসা শুরু করলেন। মেলা গোরু কিনে ফেললেন এবং দুধ, মাখন, ঘি তৈরি করে বাড়ি বাড়ি ফিরি করে বেড়াতে লাগলেন। খাঁটি ঘি-দুধের অভাবেই যে বাঙালির স্বাস্থ্যের এত অবনতি, তাতে সন্দেহ কী? কিন্তু গঞ্জের মানুষের তেমন পয়সা নেই। সবাই ধারবাকিতে ঘি দুধ- কেনে, কিন্তু পরে আর ধার শোধ করতে পারে না। ভুবন রায়ের ব্যবসা লাটে উঠল। এরপর তিনি জুতোর দোকান খুললেন। তাতেও বিশেষ সুবিধে হল না। অবশেষে চাষবাস শুরু করার পর তাঁর কপাল খুলে গেল।

ভুবন রায়কে ভয় পায় না, এমন লোক গোটা পরগনায় নেই। ছেলেরা কেউ তাঁর চোখের দিকে চেয়ে কথা বলতে সাহস পায় না। শুধু তাই নয়, এখনও প্রত্যেকদিন রাত্রিবেলা তিনি তাঁর চার ছেলেকে ডেকে সামনে দাঁড় করিয়ে প্রায়ই বকাঝকা করেন। বড় ছেলেন বয়স পঞ্চাশের ওপর। সবচেয়ে ছোটটির বয়স পঁচিশ। সবাই প্রাপ্তবয়স্ক কিন্তু ভুবন রায় তাঁদের নাবালক ছাড়া কিছুই মনে করেন না।

ইদানীং ভুবন রায়ের মাথায় বিজ্ঞান ভর করেছে। একদিন ছাদে বেড়াতে বেড়াতে তিনি হঠাৎ দেখতে পেলেন, গোটা দুনিয়াটাই জ্যামিতিতে ভরা। ছাদটা একটা আয়তক্ষেত্র, চাঁদটা একটা বৃত্ত, সুপুরি গাছগুলো সরলরেখা এবং চারদিকে আর যা-যা আছে, সব কিছুই জটিল জ্যামিতিক নকশা ছাড়া আর কিছুই নয়। জ্যামিতি ও ঘন জ্যামিতি।

আর একদিন তিনি দুধ, কলা আর খই মেখে ফলার খেতে গিয়ে হঠাৎ বোধ করলেন, এ তো রসায়ন। দুধ, কলা আর খই মেশানো এই যে পদার্থটি একে রাসায়নিক সংমিশ্রণ বলা যায় না কি? এই যে জল খাচ্ছেন, এও তো এইচ টু-ও! চারদিকেই ভুবন রায় তখন রাসায়নিক বিক্রিয়া দেখতে লাগলেন।

একদিন তাঁর নাতনি বাবলি ফিজিক্স পড়ছিল। পাশের ঘর থেকে ভুবন রায় আলোর প্রতিসরণের অত্যাশ্চর্য ব্যাপারটা শুনে খুবই উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। তাই তো! পদার্থবিদ্যাই তো আসল বিদ্যা।

আবার আড়াই টাকা করে সের সাতাশ পো দুধের দাম কত, এটা একদিন গয়লাকে বোঝাতে গিয়ে যখন হিমশিম খাচ্ছেন, তখন গয়লা অনায়াসে দামটা বলে দেওয়ায় ভুবন রায় নিজের অঙ্কবোধের অভাবে ভীষণ মুষড়ে পড়লেন। তারপর থেকেই দুপুরবেলা নাতি-নাতনিদের অঙ্কের বই নিয়ে চুপিচুপি আঁক কষা শুরু করেন।

ভুবন রায়ের বড় ছেলে রামলাল কলেজে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। অতিশয় নিরীহ মানুষ। ভুবন রায় একদিন সন্ধেবেলা তাঁকে ডেকে পাঠালেন।

‘‘আজ্ঞে?”

“তুমি তো একজন বিজ্ঞানী, না কি?”

রামলাল মাথা চুলকে বললেন, “আজ্ঞে, বিজ্ঞানী বললে বাড়াবাড়ি হবে। তবে বিজ্ঞানের অধ্যাপক বটে।

“ওই হল। নিজেকে ছোট ভাবতে নেই হে, বিনয়বশেও না। তুমি তো বি এস-সি আর এম এস-সি’তে সোনার মেডেলও পেয়েছিলে।”

“যে আজ্ঞে।”

“আর তারপরেই তোমার দম গেল ফুরিয়ে। সোনার মেডেল পাওয়া ছেলেদের যদি এই হাল হয়, তবে দেশের বিজ্ঞান কোথায় পড়ে আছে! ওদিকে জাপানিরা, মার্কিনিরা বিজ্ঞানে ধড়াধ্বড় এগিয়ে যাচ্ছে, আকাশে মানুষ পাঠাচ্ছে, যন্ত্রকে দিয়ে কথা কওয়াচ্ছে, আর তুমি মুখের ফেকো তুলো বিজ্ঞানের বক্তৃতা দিয়ে মাসে মাসে দু-পাঁচশো টাকা রোজগার করেই আহ্লাদে আটখানা! ছ্যা ছ্যা।”

রামলাল লজ্জায় দীনতায় মাথা নামিয়ে রইলেন।

ভুবন রায় অতিশয় কঠোর দৃষ্টিতে ছেলে দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বললেন, “আমি লক্ষ্য করেছি, তোমার কোন নিজস্ব ল্যাবরেটরি নেই। কলেজের ল্যাবরেটরিতেও তুমি কদাচিৎ যাও। অর্থাৎ হাতে কলমে বিজ্ঞানচর্চার পাট তোমার উঠেই গেছে।”

“আজ্ঞে, তা-ই বটে।”

“সেই জন্যই তো বলছিলাম, ঢাল নেই, তরোয়াল নেই, নিধিরাম সর্দার। যে বিজ্ঞানীর পরীক্ষাগার নেই, সে আবার কিসের বিজ্ঞানী?”

“যে আজ্ঞে।”

ভুবন রায় আত্মপ্রসাদের হাসি হেসে বললেন, “তোমার বয়স অল্প, সুতরাং এগুলো নতুন করে সবই শুরু করা যায়। আমি ঠিক করেছি, আমাদের পুরনো গোয়ালঘরটা একটু সারিয়ে নিয়ে একটা পুরোদস্তুর ল্যাবরেটরি বানিয়ে ফেলব। গোয়ালটা বেশ লম্বা আর বড়। কাজের পক্ষে চমৎকার হবে।”

রামলাল ভারি অবাক হলেন। কিন্তু প্রতিবাদ করার মতো বুকের বল খুঁজে না পেয়ে মিনমিন করে বললেন, “তার যে অনেক খরচ!”

ভুবন রায় অবিকল বন্দুকের আওয়াজ বের করলেন গলা দিয়ে, “খরচ! ভুবন রায় কবে খরচকে ভয় পেয়েছে শুনি! বিজ্ঞান-চেতনার অভাবে দেশটা উৎসন্নে যাচ্ছে। তুমি একটা গোল্ড মেডালিস্ট হয়েও দিন-দিন হাবাগে!বা হয়ে যাচ্ছ, আর আমি খরচের ভয়ে হাত গুটিয়ে থাকব?”

“আজ্ঞে, তা বটে।”

“বিজ্ঞান শিখেছিলে কি মুখস্থবিদ্যা জাহির করে মাসের শেষে দু’চারশো টাকা আয় করে উঞ্ছবৃত্তিতে জীবন কাটাবে বলে? আবিষ্কারকই যদি না হলে, তা হলে শিখে লাভটা হল কী?”

“যে আজ্ঞে।”

“তুমি কাল থেকেই লেগে পড়ো। কলকাতায় চলে যাও, যা-যা যন্ত্রপাতি লাগে, সব কিনে নিয়ে এসো। কাজে লেগে পড়ো। আমারও খানিকটা বিজ্ঞান পড়া আছে। তোমার অ্যাডভাইসার হিসেবে আমিও থাকব, হাতে-কলমে কাজ করব। এখনও কত কী আবিষ্কার করার আছে। এই ধরো না কেন, তোমার মায়ের তো খুব পান খাওয়ার নেশা, রোজ রাশি রাশি সুপুরি কুচোতে হয়। সুপুরি কুচোনোর একটা যন্ত্র যদি বানিয়ে ফেলতে পারো তো কত উপকার হয়। আমাদের হারু নাপতের চোখে ছানি আসছে, সেদিন ও আমার কানের ডগাটা প্রায় হেঁটে ফেলেছিল কাঁচি দিয়ে। ভাবছিলাম যদি চুল ছাঁটার একটা যন্ত্র তৈরি করা যায় তো মন্দ হয় না। জিনিসটা হবে অনেকটা হেলমেটের মতো, মাথায় পরে কিছুক্ষণ বসে থাকলেই চুল চমৎকার কাটা হয়ে যাবে। তারপর এরকম আরও কত কী বের করে ফেলা যায়। নিত্যি নতুন জিনিস আবিষ্কার করার আনন্দই আলাদা।”

“যে আজ্ঞে।”

“যাও, কাল থেকেই কাজে লেগে পড়ো। আর শোনো, ফিজিক্স, কেমিস্ত্রি, বায়োলজি সব রকম এক্সপেরিমেন্টের জন্যই যন্ত্রপাতি চাই। বুঝলে?”

“যে আজ্ঞে।” সুতরাং রামলালকে কলকাতায় যেতে হল। কিছুদিনের মধ্যেই কলকাতা থেকে মেলা যন্ত্রপাতি এসে পড়ল। রামলাল মাসখানেক ভূতের মতো খেটে ল্যাবরেটরি সাজিয়ে ফেললেন।

ভুবন রায় ব্যবস্থা-ট্যাবস্থা দেখে খুশি হয়ে বললেন, “শোনো হে রামলাল, প্রতি সপ্তাহে একটা করে নতুন জিনিস আবিষ্কার করতে হবে, এইরকম একটা প্রতিজ্ঞা করে কাজে লেগে পড়ো। পিছনে আমিও আছি।”

রামলাল বেজার মুখ করে বললেন, “যে আজ্ঞে।”

কিন্তু কী আবিষ্কার করবেন তা ভেবে ভেবে কূল পেলেন না। ভুবন রায় কিন্তু মহা উৎসাহে যন্ত্রপাতি নিয়ে তুমুল কাজে লেগে গেলেন।

একদিন হাতে একটা কাঁচের বাটি নিয়ে ‘ইউরেকা! ইউরেকা!’ বলে চেঁচাতে চেঁচাতে ল্যাবরেটরি থেকে বেরিয়ে এলেন ভুবন রায়। সবাইকে বাটির মধ্যে একটা কাদার মতো থকথকে জিনিস দেখাতে লাগলেন।

সবাই জিজ্ঞেস করল, “জিনিসটা কী?”

ভুবন রায় মাথা নেড়ে বললেন, “এখনও ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। তবে আর দুটো এক্সপেরিমেন্টের পরেই বোঝা যাবে।”

সকলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

পরদিনই ভুবন রায় ফের ‘ইউরেকা! ইউরেকা!’ করে বেরিয়ে এলেন। হাতে একটা টেস্ট টিউবের মধ্যে সবুজ তরল পদার্থ।

সবাই জানতে চাইল, জিনিসটা কী?

ভুবন রায় মৃদু হেসে বললেন, “বুঝতে পারবে হে, কয়েকদিনের মধ্যেই বুঝতে পারবে।”

কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল, ভুবন রায় অনেকগুলো জিনিস আবিষ্কার করে ফেলেছেন। একটা কাঁচের গোলকের মধ্যে তিনটে কাঁচের গুলি, একটা দেশলাইয়ের বাক্সের মতো দেখতে যন্ত্র, বেশ কয়েকটা কেমিক্যাল। কিন্তু এগুলো দিয়ে কী হবে, তা আর কেউ জিজ্ঞেস করতে সাহস পেল না।

বিজ্ঞানীরা অনেক সময়ে এমন সব জিনিস আবিষ্কার করে ফেলেন, যা বস্তুত মানুষের কোন কাজেই লাগে না। এরকম একটা অর্থহীন বিখ্যাত আবিষ্কার হল জলিপাট্টি। জলিপাট্টি একটা পুডিং এর মতো জিনিস। কিন্তু মেঝেয় ফেলে দিলে কাঁচের মতোই ভেঙে যায়। আবার কোনও পাত্রে রেখে দিলে কিছুক্ষণ পর তা তরল হয়ে গড়িয়ে যেতে থাকে। বিজ্ঞানীরা আজ অবধি একে কোনও কাজে লাগাতে পারেননি। আর একটা জটিল যন্ত্রও আবিষ্কার করা হয়েছিল, যার মধ্যে চালিত সমস্ত বিদ্যুৎ-প্রবাহই শূন্যে পর্যবসিত হয়। যন্ত্রটা আজও কোন কাজে লাগানো যায়নি। কিন্তু এইসব আবিষ্কার বিজ্ঞানচর্চার অবশ্যম্ভাবী কিছু লেজুড়।

আবিষ্কারগুলো কেমন হল, তা ভুবন রায় একদিন রামলালের কাছে জানতে চাওয়ায় রামলাল বিজ্ঞানের এইসব নিষ্ফল আবিষ্কারের কিছু ঘটনার কথা মনের ভুলে বলে ফেলেছিলেন। ভুবন রায় ছেলের ওপর এমন খাপ্পা হয়ে গেলেন যে, রাত্রে সেদিন জলস্পর্শ করলেন না, এবং সারারাত ল্যাবরেটরিতে জেগে কালজয়ী কিছু একটা আবিষ্কার করার জন্য উঠেপড়ে লেগে রইলেন। তিন-চারদিন তাঁর নাওয়া-খাওয়ার হুঁশ রইল না।

তারপর একদিন একটা দূরবীনের মতো যন্ত্র নিয়ে বেরিয়ে এসে সগর্বে সবাইকে বললেন, “ইউরেকা! ভুত দেখার যন্ত্র আবিষ্কার করেছি।”

শুনে সবাই আঁতকে উঠল।

কিন্তু সমস্যা হল, যন্ত্রটা চোখে দিয়ে ভুবন রায় নানা আকৃতির অজস্র ভূত দেখতে পান বটে, এবং তার ধারাবিবরণীও দিতে থাকেন, “ওই যে একটা শুটকো ভুত পান্তা ভাত খাচ্ছে… ওই যে একটা পেত্নি আকাশে চুল ছড়িয়ে দাঁত বের করে হাসছে… ওই তো শিবচন্দ্র কামারের ভূত হরিহর পালের ভূতকে ধরে ঠ্যাঙাচ্ছে…” ইত্যাদি, কিন্তু সেই যন্ত্র দিয়ে আর কেউ অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না। কিন্তু সে কথা ভুবন রায়কে বলে, এমন সাহস কার?

রামলালকেও স্বীকার করতে হল যে, যন্ত্রটা দিয়ে আবছা আবছা ভৌতিক কিছু দেখা যায় বটে।

ভুবন রায় চটে উঠে বললেন, “আবছা-আবছা মানে, স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে। ভাল করে দ্যাখো।”

রামলাল আমতা-আমতা করে বললেন, “আজ্ঞে স্পষ্টই।”

“কী দেখছ বলো।”

অগত্যা রামলাল বানিয়ে বলতে লাগলেন, “আজ্ঞে একটা রোগা আর একটা মোটা ভুত কুস্তি করছে… আর একটা পেত্নি ডালের বড়ি দিচ্ছে…”

“তবে?” বলে খুব হাসলেন ভুবন রায়। তারপর ছেলেকে বললেন, “কিন্তু তুমি কী করছ? এখনও তো একটাও কিছু আবিষ্কার করতে পারলে না।”

“আজ্ঞে না।”

“সাত দিন সময় দিলাম। কিছু একটা করে দেখাও। দীর্ঘদিন মাস্টারি করে মাথার বারোটা বাজিয়েছে। মাথাটা এবার খাটাও।”

“যে আজ্ঞে।”

সুতরাং রামলালকে কাজে লাগতে হল। কী করবেন, তা তিনি ভেবেই পাচ্ছিলেন না।

একদিন তিনি বসে বসে ভুবন রায়ের আবিষ্কৃত জিনিসগুলি নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলেন। হঠাৎ তাঁর মনে হল, ল্যাবরেটরির মধ্যে একটা যেন কিছু ঘটছে।

.

ল্যাবরেটরিতে কী ঘটেছে তা রামলাল বুঝতে পারলেন না বটে, কিন্তু তাঁর মনে হল, বিশাল গোয়াল ঘরটার কোনও একটা প্রান্তে কেউ একজন নড়াচাড়া করছে।

রামলাল খুবই ভিতু মানুষ। তিনি সভয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কে ওখানে?”

কেউ থাকার কথাও নয়। ল্যাবরেটরির একটামাত্র দরজা। রামলাল ঢুকেছেন এবং নিজের হাতে ছিটকিনি বন্ধ করেছেন। সুতরাং কে হতে পারে?

রামলালের প্রশ্নের জবাব অবশ্য কেউ দিল না। কিন্তু রামলাল সুস্পষ্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলার শব্দ পেলেন। তারপর শুনলেন, ক্যাবিনেট খুলে কে যেন একটা টেস্টটিউব বের করল। তারপর একটা টিউবের মধ্যে একটা তরল জিনিস পড়ার শব্দ হল।

রামলাল শিউরে উঠলেন। তারপরই তারস্বরে “রাম… রাম… রাম… বাবা রেমা রে ….”, বলে চেঁচাতে চেঁচাতে দড়াম করে এসে দরজায় ধাক্কা খেলেন। ছিটকিনিটা কোনওরকমে খুলে এক লাফে উঠোনে পড়ে দৌড়তে গিয়ে আছাড় খেলেন। গোড়ালি মচকে গেল। তা সত্ত্বেও উঠে ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে ছুটতে লাগলেন। মুখে “বাঁচাও… বাঁচাও…” চিৎকার।

কিন্তু মুশকিল হল, ল্যাবরেটরিটা বাড়ির পিছন দিকে এবং অনেকটা দূরে। এদিকটায় অনেকটা ফাঁকা জমি, বাগান। কেউ তাঁর চেঁচানি শুনতে পেল না। বকুলগাছের তলায় রামলাল আবার বড় ঘাসে পা আটকে পড়ে গেলেন এবং সেখান থেকে সভয়ে ল্যাবরেটরির দিকে একবার চেয়ে দেখতে গিয়ে তিনি একেবারে হাঁ।

প্রকাণ্ড দরজাটা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল, ল্যাবরেটরির মধ্যে কে যেন দিব্যি আলোগুলো নিভিয়ে দিয়েছে। অন্ধকারে একটা বুনসেন বানারের আগুন দেখতে পেলেন রামলাল।

এরপর মচকানো পা নিয়েই যে দৌড়টা দিলেন রামলাল, তেমন দৌড় বোধহয় কার্ল লিউসও ওলিম্পিকের একশো মিটারে দৌড়তে পারেনি।

ভুবন রায় ক্রু কুঁচকে রামলালের দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর হঠাৎ বললেন, “দৌড়ে এলে মনে হচ্ছে! বাঃ, খুব ভাল। এতদিনে যে নিজের শরীরের দিকে নজর দিয়েছ, এতে আমি খুব খুশি। তবে এখন রাত ন’টা বাজে। এ সময়টায় দৌড়নোই ভাল।”

রামলাল হ্যাঁ-হ্যাঁ করে ফাঁফাচ্ছিলেন যে, কথার জবাব দেওয়ার মতো অবস্থা ছিল না!

ভুবন রায় তাকে উদ্দেশ করে বললেন “সকালে উঠে দৌড়নোই ভাল। মাইলটাক দৌড়লেই দেখবে তোমার মতো নীরেট মাথাও কেমন চনমন করে উঠছে।”

হ্যাঁ-ত্যা করতে করতেই রামলাল মাথা নেড়ে জানালেন যে, যথা আজ্ঞে।

ভুবন রায় ছেলের দিকে চেয়ে হঠাৎ কিছু মনে পড়ায় বললেন, “ওঃ হো, তোমাকে বলতে ভুলে গেছি। আমি একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট পেয়েছি। বুড়ো মানুষ। তুমিও তাঁকে চিনবে। হাইস্কুলের সায়েন্সের টিচার ছিলেন। নাম দুলাল সেন। তিন কুলে কেউ নেই, অভাবেও পড়েছিলেন খুব। তার ওপর আবার কানে একদম শুনতে পান না। আজ থেকে তিনি আমাদের ল্যাবরেটরিতেই রয়েছেন। একেবারে কোণের দিকে একটা চৌকি পেতে দিয়েছি, সেখানেই থাকছেন আর একটু-আধটু কাজকর্মও করছেন। ল্যাবরেটরিতে গেলেই তাঁকে দেখতে পাবে।”

এ কথায় রামলাল ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন বটে, কিন্তু কিছু বলার জো নেই। হাঁফাতে-হাঁফাতে করুণ নয়নে চেয়ে রইলেন বাবার দিকে। তারপর ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে বেরিয়ে ঠাকুমার কাছে গিয়ে বসলেন।

রামলালের ঠাকুমা, অর্থাৎ ভুবন রায়ের মা হরমোহিনী দেবীর বয়স একশো এক বছর। তাঁর হাঁকেডাকে সবাই অস্থির। ডাকসাইটে ভুবন রায় এই দুনিয়ায় একমাত্র মাকেই ডরান। হরমোহিনীর বকাবকির চোটে এ-বাড়িতে ঝি-চাকর থাকতে চায় না, কাকপক্ষী আসতে চায় না, এমনকী কুকুর-বিড়াল অবধি এ বাড়িকে এড়িয়ে চলে। শুধু বুড়ি দাসী মোক্ষদাই হরমোহিনীকে ভয় খায় না। আর তার সঙ্গেই রোজ সন্ধেবেলা হরমোহিনীর তুলকালাম ঝগড়া হয়। আজও হচ্ছিল।

হরমোহিনীর পায়ে বাতের ব্যথা। তাতে গরম রসুনতেল মালিশ করতে বসেছে মোক্ষদা। কিছুক্ষণ মালিশ চলার পর হরমোহিনী হঠাৎ বললেন, “হ্যাঁ রে মোক্ষদা, ব্যথা আমার বাঁ হাঁটুতে, আর তুই কোন্ আক্কেলে আমার ডান হাঁটুতে মালিশ করতে লেগেছিস?”

মোক্ষদা সপাটে বলল, “হাঁটু তো তুমিই এগিয়ে দিল বাপু। আমি কি হাঁটু বেছে নিয়েছি? আমি তেমন বাপের মেয়ে নই যে, পরের হাঁটু নিয়ে বাছাবাছি করব। আর এও বলি বাপু, এটা তোমার বাঁ হাঁটুই।”

হরমোহিনী উঁচুতে গলা তুলে বললেন, “বড় মুখ বেড়েছে তোর মোক্ষা, এটা যদি আমার বাঁ হাঁটুই হবে তা হলে ব্যথাটা আমার ডান হাঁটুতে হচ্ছে কী করে?”

তা তোমার যদি ব্যাথা নিত্যি নিত্যি হাঁটু বদল করে তা হলে আমার আর কী করার আছে? তোমার খিটখিটে স্বভাব, কেবল ঝগড়া করবে বলে গলা চুলকোয়। নইলে ঠিকই বুঝতে পারতে যে, ব্যথা তোমার বাঁ হাটুতেই।”

“ওলো ভালমানুষের বেটি লো, আমাকে উনি হাঁটু চেনাতে এলেন। পাঁচ কুড়ি এক বয়সে কত হাঁটু দেখেছি তা জানিস? হাঁটুর তুই কী জানিস লা? আমার হাঁটু, আমার ব্যথা, আর উনি এলেন আমাকে হাঁটু চেনাতে!”

“তা বেশ বাপু, ঘাট মানছি। স্বীকার করছি হাঁটুও তোমার, ব্যথাও তোমার। কিন্তু কোন্ আকেলে তুমি তোমার বাঁ হাটুকে ডান হাঁটু বলে চালানোর চেষ্টা করছ বলো তো! তুমি যে দেখছি দিনকে রাত করতে পারো।”

“কখন আবার বাঁ হাঁটুকে ডান হাঁটু বললুম বল তো! ওম্মা, কী মিথ্যেবাদী রে! আমি তোকে বলিনি, ব্যথা আমার বাঁ হাঁটুতে। আর তুই মালিশ করছিস ডান হাঁটুতে?”

“বলেছ। আমিও কানে কালা নই যে শুনিনি। তুমি হাঁটুটা লেপের তলা থেকে ঠেলে বের করে দিলে, আমিও মালিশ করতে লাগলুম। এটা তোমার বাঁ হাঁটু ডান, তা নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথাটা শুনি! তোমার হাঁটু তুমি বুঝবে, আমার মালিশ করার কাজ মালিশ করে যাব।”

“তাই যদি হবে তা হলে বড় গলা করে আমাকে আমার হাঁটু চেনাচ্ছিস কেন?”

“নিজের হাঁটু যদি নিজেই না চেনো তা হলে লোকে আর কী করবে? তাও বলি বাপু, ভীমরতি ধরেছে সে কথা স্বীকার করলেই তো ল্যাটা চুকে যায়।”

“ভীমরতি আমাকে ধরবে কেন র‍্যা, ভীমরতি ধরেছে তোকে। নইলে কি আর ডান হাঁটুতে মালিশ করিস? আজ বেশ বুঝতে পারছি, কেন রসুন তেল নিত্যি মালিশ করেও আমার বাঁ হাঁটুর ব্যথাটা কমছে না। কী বুদ্ধিই না তোকে ভগবান দিয়েছেন! রোজ সন্ধেবেলা আমি একটু ঝিমোই, আর তুই মুখপুড়ি, এসে বাঁ হাঁটুর বদলে চুপিচুপি আমার ডান হাঁটুতে মালিশ করে যাস!”

“ভীমরতি নয় গো, তোমার মাথায় জিন-পরি কিছু ভর করেছে। তখন থেকে বলছি, এ-তোমার ডান হাঁটু নয়, এটা বাঁ হাঁটুহ, তাও কেন যে টিকির-টিকির করে যাচ্ছ?”

“ওরে আবাগির বেটি, এটা বাঁ হলে, আমার অন্য হাঁটুটা তা হলে কী? সেটাও কি বাঁ হাঁটু? তুই কি তা হলে বলতে চাস, বিধাতা আমাকে দু-দুটো হাঁটু দিলেন। আর দুটোই বাঁ হাঁটু? আর তাই যদি হবে তা হলে এতকাল আমি সেটা জানতে পারতুম না? তুই আমাকে বুঝিয়ে বল দেখি, এটা বাঁ হলে আমার অন্য হাঁটুটা কী হয়?”

“এ তো কানা মানুষও জানে গো, একটা বাঁ হলে অন্যটা ডান হবেই। কিন্তু তোমার মতো মানুষকে ভগবান যদি দুটো বাঁ হাঁটুহ দিয়ে থাকেন তাহলে আশ্চর্যের কিছু নেই। তোমার সবই তো অশৈলী কাণ্ড।”

“কী এমন তোকে বললুম বল তো মোক্ষদা যে, আমার হাঁটু নিয়ে খুঁড়ছিস! তখন থেকে পইপই করে বোঝাচ্ছি, ওরে মোক্ষদা, ভালোমানুষের মেয়ে, যদি এই হাঁটুটা আমার বাঁ হাঁটুই হবে তা হলে আমার অন্য হাঁটুটায় ব্যথা হচ্ছে কেন? তুই কি বলতে চাস ব্যথাটা আমার ডান হাঁটুতে? বাঁ হাঁটুতে নয়? এতকাল ধরে কি তবে আমি লোককে মিথ্যে করে বানিয়ে বলে আসছি যে, ব্যথাটা আমার বাঁ হাঁটুতে?”

“তাই তো বলছি গো, নিজের হাঁটু যে নিজে চেনে না তার কি মাথার ঠিক আছে। একশো বছর পার করলে বু এতদিনে ডান বাঁ চিনলে না, কেমন মানুষ তুমি বলে তো! পরের জিনিস তো আর নয়, একেবারে নিজের সহোদর দুটো হাঁটু। পাঁচটা-দশটাও নয়, মাত্র দু’খানা। একখানা ডান, একখানা বাঁ। তাও যদি চিনতে তোমার একশো বছরে না কুলোয়, তবে আর এ জন্মে তোমার হাঁটুজ্ঞান হবে না।”

“খুব যে গলা তুলে ঝগড়া করছিস, ডাক দেখি পাঁচজনকে। যা, গিয়ে মোড়ল মাতব্বর-মুরুব্বিদের ধরে নিয়ে আয়। সালিশ করুক। তারাই ঠিক করুক কোন্টা আমার বাঁ হাঁটু, আর কোন্টা ডান। তারপর তোমার মুখের মতো জবাব দেব। ভুবনটাকে ডাক তো, যা…”

‘আর সালিশ বসাতে হবে না। মোড়ল-মাতব্বরদের তো আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই, তাঁরা আসবেন তোমার হাঁটুর বিচার করতে! সালিশ বসলে লজ্জার আর বাকি থাকবে না কিছু। সারা শহরে টিটি পড়ে যাবে। সবাই বলে বেড়াবে, ভুবন রায়ের মা হরমোহিনী নিজের দু’খানা হাঁটু একশো বছরেও চিনে উঠতে পারেনি। ছিঃ ছিঃ।”

দু’জনের ঝগড়া চরমে উঠেছে। হরমোহিনী লেপটেপ সরিয়ে ফেলে রীতিমত টানটান হয়ে বসেছেন তাঁর প্রকাণ্ড খাটের বিছানার ওপর। মোক্ষদাও আংরা জ্বালা মেটে হাঁড়িটা সরিয়ে সেঁক দেওয়ার ফ্লানেলের ভাঁজ করা কাপড়গুলো ফেলে তৈরি হয়ে বসেছে।

এমন সময় ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে রামলাল ঘরে ঢুকে পড়লেন। “ঠাকুমা!”

নাতিপুতিদের কাছে হরমোহিনী ভারি নরম। দেখলেই মেজাজ ঠাণ্ডা হয়ে যায়। একগাল হেসে বললেন, “আয় দাদা, আয়। হাঁফাচ্ছিস কেন ভাই?”

“সে অনেক কথা ঠাকুমা। শুধু হাঁফাচ্ছিই না গো, ল্যাংচাচ্ছিও। দেখছ না, পায়ের পাতায় কেমন রগ টানা দিয়েছে!”

“ওম্মা গো, মচকালি কী করে? নিশ্চয়ই ইস্কুলে দুষ্টু ছেলেগুলোর সঙ্গে হুটোপাটি করতে গিয়েছিলি!”

রামলাল করুণ একটু হাসলেন। ঠাকুমার ভীমরতির কথা তাঁর অজানা নয়। তবে রামলালকে ইস্কুলের ছেলে মনে করাটা বড় বাড়াবাড়ি।

রামলাল বললেন, “তাই গো ঠাকুমা। এবার দাও তো তোমার সেই চুনা হলুদের পট্টি বেঁধে।”

হরমোহিনীর নিজের হাতের চুন-হলুদের গরম পট্টি বহুঁকাল ধরে এই বাড়ির ছেলেপুলেদের ব্যথা-বেদনার পরম ওষুধ। হরমোহিনী তাড়াতাড়ি উঠে বললেন, “ওরে ও মোক্ষদা, যা তো মা, একটু চুন-হলুদ মিশিয়ে নিয়ে আয়, আংরায় গরম করে লাগিয়ে দিই।”

মোক্ষদা গজগজ করতে লাগল, “ডান হাঁটু বাঁ হাঁটুর জ্ঞান নেই, ছেলে বুড়োর জ্ঞান নেই, উনি আবার আমাকে হাঁটু চেনাতে লেগেছিলেন!”

এই কথাতে হরমোহিনী ফের জো পেয়ে নাতিকে সাক্ষী মেনে বললেন, “বল তো ভাই, এটা আমার কোন্ হাঁটু, ডান না বাঁ?”

রামলাল মাথাটাথা চুলকে বললেন, “ঠাকুমা, এ তো তোমার বাঁ হাঁটু বলেই সন্দেহ হচ্ছে।”

‘তবেই বল ভাই, মোক্ষদা হারামজাদি কিছুতেই মানছে না যে, এটা আমার বাঁ হাঁটু। তখন থেকে বলেই যাচ্ছে, আমি নাকি আমার হাঁটু চিনি না! কলিকাল কি আর সাধে বলে রে ভাই, হাঁটুর বয়সী মেয়ে সে এল আমাকে হাঁটু চেনাতে!”

মোক্ষদা ফোঁস করে উঠে বলল, “দুনিয়াসুদু লোক জানে যে, ওটা তোমার বাঁ হাঁটু। শুধু তুমিই জানতে না। তখন থেকে বলে যাচ্ছ যে, ওটা তোমার ডান হাঁটু।”

হরমোহিনী কপালে হাত দিয়ে বললেন, “কোথায় যাব মা, আবাগির বেটি বলে কী? কখন তোকে বললাম রে যে, এটা আমার ডান হাঁটু?”

আবার একটা ঝগড়া পাকিয়ে উঠছিল। রামলাল বিপদ দেখে তাড়াতাড়ি ঠাকুমার পাশে বসে পড়ে বললেন, “আমার যে খিদে পেয়েছে গো ঠাকুমা, কিছু খেতেটেতে দেবে নাকি?”

খাওয়ার কথায় হরমোহিনীকে যত বশ করা যায়, তত আর কিছুতে নয়। তিনি মনে করেন, ছেলেপুলেরা যত খাবে তত তাদের বুদ্ধি খুলবে, তত উন্নতি হবে।”

“খাবি ভাই?” বলে একগাল হাসলেন হরমোহিনী। তারপর উঠে জালের আলমারি খুলে একটি সর বের করে তাতে মিছরির গুঁড়ো ছড়িয়ে দিলেন।

“খা দেখি বসে বসে। সবটা খা।”

রামলালের খিদে নেই। তবু খেতে লাগলেন। সেই দৃশ্য দেখে ফোকলা মুখে খুব আহ্লাদের হাসি হাসতে লাগলেন হরমোহিনী।

ঠিক এই সময়ে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে নন্দবাবু ঘরে ঢুকলেন।

হরমোহিনী তাঁকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, “নন্দ না কি রে?”

“হ্যাঁ ঠাকুমা।”

“তা তুই কোত্থেকে এলি ভাই? সবাই যে বলে তুই সাধু হয়ে হিমালয়ে চলে গেছিস!”

“এখনও যাইনি ঠাকুমা।”

“তা হলে তোর দেখা পাই না কেন? তুইও কি পা মচকেছিস? কে তোকে ল্যাং মারল?”

৩. ভুতোর মাথায় যখন পরি ভর করে

সবাই জানে, ভুতোর মাথায় যখন পরি ভর করে তখন একটা কিছু হবেই।

ভূতো এ-বাড়ির ছেলে নয়। এমনকী আত্মীয় পর্যন্ত নয়। তবু ভুতো এ বাড়ির একজন হয়ে গেছে। আগে তাকে দিয়ে বাড়িতে চাকর বাকরের কাজ করানো হত। তারপর তার খোলতাই মাথা আর নানা বাহাদুরি দেখে তাকে ইস্কুলে ভর্তি করা হয়েছে। বাড়ির ছেলেদের সঙ্গে সেও পড়ে। বলতে গেলে সে-ই হল সদার পোড়ো।

তবে মুশকিল হল মাঝে-মাঝে তার মাথায় পরি ভর করে। কিন্তু পরি ভর করাটা কী?

তা ভুতো জানে না। তবে ভুতোর ভাষায়, সেই যে-বার দেশে খুব আকাল হল, তখন আমার বাবা একদিন আমাকে কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। সংসারে শুধু আমি আর বাবা-ই তো ছিলাম। মা কোকালে মরে গিয়েছে। তা বাবার কাঁধে করে যাচ্ছি তো যাচ্ছিই। চারদিকে পোড়া মাঠ, ঘাস নেই, পাতা নেই, গাঁ-গঞ্জ সব খরায় জ্বলে পুড়ে খাক। নদী, নালা, পুকুর, কুয়ো, টিপকল সব শুকনো। তেষ্টায় বাপ-ব্যাটার গলা কাঠ। তা সন্ধেবেলা আমরা একটা ভুতুড়ে বাড়িতে পৌঁছে গেলুম। বাবা বলল, “ওখানেই বাপ-ব্যাটায় রাত কাটাব।” বাবা গামছা পেতে আমাকে শুইয়ে দিয়ে বলল, “তুই একটু জিরো, আমি চিড়ে-মুড়ি কিছু একটু জোগাড় করে আনছি।” তা বাবা গেল, আর আমিও শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। ধকল তো বড় কম যায়নি। তারপর হল কি, হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। দেখি কি, কোথায় সেই ভাঙা পুরনো বাড়ি, আর কোথায় বা বাবা। আমি দেখলুম, দিব্যি একটা ঘরের মধ্যে নরম বিছানায় আমি শুয়ে আছি। চারদিকে সব আমার বয়সী ছেলেমেয়ে। তবে সকলের পিঠেই একজোড়া করে ফিনফিনে পাখনা লাগানো। তারা বেশ উড়ছে, হাঁটছে, বসছে। কী সুন্দর সব চেহারা। আমি চোখ মেলতেই সবাই এসে আমাকে ঘিরে দাঁড়াল। আমি তো ভয় পেয়ে কেঁদে কেটে একশা। তারা আমার চোখের জল মুছিয়ে দিল, অনেক খাবার দিল, শরবত দিল, খেলনা দিল। আমি যতবার বাবার কাছে যাওয়ার বায়না করি ততবারই তারা কেবল মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে, আর তাদের মুখগুলো ভারি করুণ হয়ে যায়। তারা তাড়াতাড়ি আমাকে আরও খেলনা দিল, মজার মজার সব গল্প বলল, গান গাইল, নাচল। আমি বাবার দুঃখ ভুলেই গেলুম। তাদের ভারি সুন্দর বাগান ছিল। সেখানে বারোমাস রামধনু ফুটে থাকে আকাশে। সেখানে কখনও অন্ধকার হয় না। কারও কখনও অসুখ করে না, কেউ কখনও মরে না। সে ভারি মজার জায়গা।

“তারপর কী হল?”

“একদিন একটা কালোমতো রাগি পরি এসে বলল, ‘এসব কী হচ্ছে? পৃথিবীর একটা ছেলেকে তোমরা কেন রেখেছ! যাও, ওকে রেখে এসো।’ ব্যস, সেইদিন পরিরা আমার চোখে পলক বুলিয়ে ঘুম পাড়াল। ঘুম যখন ভাঙল তখন দেখি, একটা গাছতলায় শুয়ে আছি। সেখান থেকেই তো রামলাল-জ্যাঠামশাই আমাকে নিয়ে এলেন এ বাড়িতে। কিন্তু আমার মনে হয়, পরিরা এখনও আমাকে ভালবাসে। মাঝে-মাঝে আমি হঠাৎ শুনতে পাই, কারা যেন চুপিচুপি আড়াল থেকে আমাকে ডাকে, ভুতো! এই ভুতো! তোমার কি খিদে পেয়েছে? তোমার কি অসুখ করেছে? আমিও তখন তাদের কথার জবাব দিই। মাঝে মাঝে ঘুম থেকে উঠে দেখি, আমার বালিশের পাশে একটা খেলনা পড়ে আছে হয়তো। কখনও হয়তো একবাক্স সন্দেশ। অসুখ করলে কে যেন আমাকে এসে হাওয়া করে, মাথায় জলপট্টি দেয়।”

ভুতোর পরির গল্প সবাই জানে। কিন্তু সবাই বিশ্বাস করে না।

ভুতোকে মোটেই পছন্দ করে না ছোট দাদু। ছোট দাদু হলেন ভুবন রায়ের সেজো ভাই ত্রিভুবন রায়। তিনি বিখ্যাত হোমিওপ্যাথি ডাক্তার, অনেক মরা মানুষ বাঁচিয়েছেন বলে শোনা যায়।

সেবার ফটিকবাবুর মায়ের সন্ন্যাস-রোগ হল। ত্রিভুবনবাবু গিয়ে নাড়ী ধরে বললেন, “রাত কাটবে না। চারটে বেজে তেরো মিনিট উনিশ সেকেন্ডে মারা যাবেন।”

ভুতো কাছেই ছিল। ফশ করে বলে বসল, “বললেই হল? অ্যাকেসিস ওয়ান এম দাও না। বুড়ি একশো বছর বাঁচবে।”

ত্রিভুবন ভুলোকে ছাতাপেটা করতে উঠেছিলেন।

কিন্তু ফটিকবাবু ভুতোর পরির গল্প বিশ্বাস করতেন। তিনি অ্যাকেসিস ওয়ান এম এনে খাওয়ালেন। আর ফটিকবাবুর মা সকালবেলায় গা ঝাড়া দিয়ে উঠে চান-টান করে ঠাকুরপুজোয় বসে গেলেন। কে বলবে যে, তাঁর শক্ত অসুখ হয়েছিল।

এই ঘটনায় ত্রিভুবনবাবুর কিছু অখ্যাতি হল।

এরপর নরেনবাবুর বাবার হল কলেরা। ত্রিভুবন ডাক পেয়ে দেখতে গেছেন, সঙ্গে ওষুধের বাক্স নিয়ে ভুতো। ত্রিভুবন যে ওষুধটা দিতে গেলেন সেটা দেখে ভুতো চোখ কপালে তুলে বলল, “ও কী দিচ্ছ? ও খেলেই রুগির চোখ উলটে যাবে।”

ভুতকে পেল্লায় একটা ধমক দিয়ে ত্রিভুবন সেই ওষুধই দিলেন, আর সঙ্গে সঙ্গে নরেনবাবুর বাবা চোখ উলটে গোঁ-গোঁ করতে লাগলেন। যায়যায় অবস্থা।

ভুতো তাড়াতাড়ি বাক্স থেকে আর একটা শিশি বের করে দু’ফোঁটা খাইয়ে দিল। আর রুগি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এল। পরদিন থেকে একেবারে চাঙ্গা।

সেই থেকে ভূতোর ওপর ত্রিভুবন হাড়ে হাড়ে চটা।

শুধু ত্রিভুবনই নন, ভুতোর ওপর চটা আরও অনেকেই, কিন্তু সে কথা পরে হবে।

এ বাড়ির ছেলেপুলেরা ভুতোকে পেয়ে দারুণ খুশি। ভুতো চমৎকার ঘুড়ি লাটাই বানাতে পারে, পাখির খাঁচা বানাতে পারে, গাছের মগডালে উঠে ফলপাকুড় পাড়তে পারে। চমৎকার গল্প বলতে পারে, বাঁশি বাজাতে পারে, আরও অনেক কিছু পারে। কিন্তু তার যেটা সবচেয়ে বড় গুণ তা হল, পরিদের সঙ্গে তার যোগাযোগ।

মাঝে-মাঝে যখন তার মাথায় পরি ভর করে, তখন সে অদ্ভুত-অদ্ভুত কথা বলে। তার চাউনিটা অন্যরকম হয়ে যায়। চেহারাটাও যেন পালটে যায় তখন।

রায়বাড়ির একতলায় কোণের দিকে পড়ার ঘর। সন্ধেবেলা সেখানে ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে পড়তে বসে। অনাদি-মাস্টার পড়াতে আসেন। দুর্দান্ত রাগি আর রাশভারী অনাদিবাবুকে শুধু ছাত্ররাই নয়, ছাত্রদের বাবারাও ভয় পান।

আজ অনাদিবাবু কোথায় শ্রাদ্ধের নেমন্তন্ন খেতে গেছেন। সুতরাং আজ ছুটি। পড়ার ঘরে বসে মন্টু, গদাই, লালু, হৈমন্তী, কাজু, টিকলি, নিমাই, সব কিছুক্ষণ গলা ছেড়ে পড়ার পরই ভুতোকে চেপে ধরল, “ভুতোদা, একটা গল্প বলো।”

ভুতো বই-খাতা সরিয়ে রেখে একগাল হেসে বলল, “গল্প শুনবে? কিন্তু দাঁড়াও, আমার মাথার মধ্যে কেমন একটা রিমঝিম হচ্ছে।”

সবাই চেঁচিয়ে উঠল, “পরি! পরি!”

ভুতো হাত তুলে সবাইকে চুপ করতে ইঙ্গিত করল, তারপর চোখ বুজে বসে রইল।

হঠাৎ দেখা গেল ভুতোর মুখটা কেমন যেন স্বপ্ন-স্বপ্ন হয়ে যেতে লাগল। এমনিতে ভুতো দেখতে কালো আর রোগা! মুখোনা শুকনো আর লম্বামতো। কিন্তু এখন তার মুখ দিয়ে যেন একটা আলোর আভা বেরোতে লাগল।

সে বিড়বিড় করে বলল, “দাদামশাই ভূতের যন্তরটা তৈরি করে ভাল কাজ করেননি। অনেক ভোগাবে।”

লালু বলে উঠল, “ভূতের যন্ত্র? আরে, সেটা তো আমি নিজে চোখ রেখে দেখেছি, কিছু দেখা যায় না।”

ভুতো মাথা নেড়ে বলল, “এখনও দেখা যায় না বটে, কিন্তু একদিন দেখা যাবে, তখন বিপদ হবে। আর দুলাল সেনকে নিয়েও বিপদ হবে।”

লালু ফের বলল, “কিন্তু দুলাল সেন-স্যার তত ভাল লোক।”

ভুতো মাথা নেড়ে বলল, “ভাল বলেই তো বিপদ।”

সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল।

গদাই বলল, “কিন্তু দুলাল সেন স্যার তো সেই কামারপাড়ায় থাকেন। তাঁকে নিয়ে আমাদের বিপদ কিসের?”

ভুত ফের মাথা নেড়ে বলল, “মোটেই কামারপাড়ায় থাকেন না। তিনি দাদামশাইয়ের ল্যাবরেটরিতে থানা গেড়েছেন।”

ল্যাবরেটরিটা বাচ্চাদের কাছে একটা দারুণ কৌতূহলের জায়গা। যেখানে নানারকম মজার কাণ্ডকারখানা হয় বলে তারা শুনেছে। কিন্তু তালা দেওয়া থাকে বলে তারা ঢুকতে পারে না। ভুবন রায়ের কঠিন নিষেধাজ্ঞা আছে, বাচ্চারা যেন খবার কেউ ওখানে না ঢোকে। সেখানে দুলাল সেন আছে শুনে বাচ্চারা ফের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।

হঠাৎ লালু লাফিয়ে উঠে বলল, “চল তো দেখে আসি। দুলাল স্যার ভীষণ ভালমানুষ। আমরা বললেই ঢুকতে দেবেন।”

একথায় সবাই হইহই করে উঠে পড়ল।

ধ্যান ভেঙে গেলে ভুতোও বাচ্চাদের মতোই হয়ে যায়। তখন আর সে অদ্ভুত অদ্ভুত কথা ভাবেও না, বলেও না। বাচ্চাদের চিৎকার-চেঁচামেচিতে ভুতো চোখ চাইল। তার ধ্যানটা কেটে গেছে।

“ভুতোদা, তুমিও চলো।”

“চলো।”

টিকলি সাবধান করে দিয়ে বলল, “কিন্তু পা টিপেটিপে, দাদু টের পেলে আস্ত রাখবে না।”

সামনে ভুতো, পিছনে সারবন্দী ছেলেমেয়েরা খুব সাবধানে চুপিচুপি ঘর থেকে বেরিয়ে অন্ধকার বাগানে নেমে পড়ল। সামনে ঝোঁপঝাড়, ঘাসজমি, খানাখন্দ। ল্যাবরেটরিটা বাড়ি থেকে বেশ খানিকটা তফাতে।

ল্যাবরেটরির কাছে এসে ভুতো বলল, “দাঁড়াও, আগে জানলা দিয়ে ভিতরে কী হচ্ছে দেখে নিই।”

বাচ্চারা ছড়িয়ে পড়ে এক-একটা জানলা দিয়ে ভিতরটা দেখার চেষ্টা করল।

কাজু টিকলিকে একটা ঠেলা দিয়ে বলল, “ওই দ্যাখ, দুলাল স্যার বেলুন ফোলাচ্ছেন।

“বেলুন?” বলে টিকলি বড় বড় চোখে চেয়ে দেখল।

বাস্তবিকই দেখা গেল, দুলাল সেন নিবিষ্ট মনে একটা সিলিন্ডারের মুখে একটার-পর-একটা বেলুন লাগিয়ে ফুলিয়ে তুলছেন। তারপর সেগুলোর মুখে সুতো বেঁধে ছেড়ে দিচ্ছেন। বেলুনগুলো গিয়ে সিলিং-এ ঠেকে জমা হচ্ছে।

.

এই ল্যাবরেটরিতে কেন তাঁকে আনা হয়েছে এবং এখানে তাঁকে কী কাজ করতে হবে তা দুলাল সেন খুব ভাল বুঝতে পারেননি। ভুবন রায় তাঁকে অনেকক্ষণ ধরে বিজ্ঞান-বিষয়ক গবেষণার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে এক দীর্ঘ বক্তৃতা শুনিয়েছেন। কিন্তু শোনালে কী হবে, কানের গুণে দুলাল সেন তাঁর বিন্দুবিসর্গও বুঝতে পারেননি।

ভুবন রায় বললেন, “নিত্যনতুন আবিষ্কার করতে হবে।”

দুলাল সেন শুনলেন, “নিত্যানন্দকে ঘর পরিষ্কার করতে হবে।”

ভুবন রায় বললেন, “বিজ্ঞান নিয়েই পড়ে থাকুন, বিজ্ঞানের বান ডাকিয়ে দিন। দুলাল সেন শুনলেন, “শিকনি ঝেড়ে মরে থাকুন, শিকদারকে চাঁদে পাঠিয়ে দিন।”

কথাগুলোর অর্থ হয় না। তবে দুলাল সেন এটা টের পান যে, কানে তিনি কিছু খাটো। তাই যা শোনেন তাই তিনি বিশ্বাস করেন না। ভেবে ভেবে অর্থ বার করার চেষ্টা করেন। এই যেমন ঘর পরিষ্কার করতে হবে’ কথাটা, এটাকে নিয়ে অনেক ভেবে বুঝলেন, এখানে নিশ্চয়ই ল্যাবরেটরি ঝটপাট দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে না। বিশেষ করে নিত্যানন্দ নামে কাউকে তিনি চেনেনও না। শিকনি ঝেড়ে মরে থাকুন, শিকদারকে চাঁদে পাঠিয়ে দিন’- এ কথাটারও তেমন কোনও অর্থ দাঁড়াচ্ছে না। কিন্তু ভাবতে ভাবতে একটা অর্থ তিনি ঠিকই বের করে ফেলবেন।

তবে ভুবন রায়ের লোকজন গিয়ে যখন তাঁকে তাঁর বাসা থেকে একরকম তুলে আনল, তখনই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে। তবে তিনি এতে খুশিই হয়েছিলেন। বাড়িওয়ালা কিছুদিন যাবৎ তাঁর ওপর খুব হামলা করছিল।

কিন্তু যেখানে এনে তাঁকে ফেলা হল, সে জায়গাটা দেখে তিনি খুব অবাক। এ যে এক ল্যাবরেটরি! বিশাল ঘর। নানা যন্ত্রপাতি। তারই এক কোণে একটা চৌকি পাতা। একধারে উনুন আছে। দিব্যি থাকার জায়গা। দুলালবাবু খুশিই হলেন ব্যবস্থা দেখে। রাঁধেন বাড়েন খান ঘুমোন। কোনও চিন্তা নেই। তবে মাঝে মাঝে তাঁর মনে হয়, নিত্যানন্দকে দিয়ে কি ঘর পরিষ্কার করানো দরকার? শিকনি ঝেড়ে মরে থাকা কি তাঁর পক্ষে সম্ভব? আর শিকদারকে চাঁদে পাঠানোর বন্দোবস্তও তো কিছু করা যাবে বলে মনে হচ্ছে না।

সেদিন সকালে ভুবন রায় ল্যাবরেটরিতে এসে অনেকক্ষণ ধরে একটা কিছু আবিষ্কার করার চেষ্টা করলেন। দুলাল সেন মিটমিট করে চেয়ে দেখলেন। তারপর ভুবন রায় তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা, বেগুনের মধ্যে হরমোন ইনজেকশন করলে কী হয়?”

দুলালবাবু শুনলেন, “বেলুনের মধ্যে গণ্ডগোল পাকিয়ে দিলে ঘি হয়?”

কথাটা দুলাল সেন স্বীকার করে নেবেন কি না তা মাথা চুলকে অনেকক্ষণ ভাবলেন। ভুবন রায় তাঁর আশ্রয়দাতা, কাজেই উনি কিছু জিজ্ঞেস করলে আন্দাজে একটা জবাব দিতেই হয়।

দুলাল সেন মিনমিন করে বললেন, “হতেও পারে।”

কিন্তু তারপর থেকে আকাশ-পাতাল ভেবেও তিনি বুঝতে পারছেন না বেলুন থেকে কী করে ঘি হবে, আর বেলুনের মধ্যে গণ্ডগোলই বা পাকানো যায় কী ভাবে?

দুলালবাবু তবু বাজার থেকে একগাদা বেলুন কিনে আনলেন এবং তাদের মধ্যে নানারকম গণ্ডগোল পাকানোর কথা ভেবে দেখলেন। অবশেষে তাঁর মনে পড়ল, ছেলেবেলায় তাঁর খুব গ্যাস-বেলুন ওড়ানোর শখ ছিল। কিন্তু বড্ড গরিব ছিলেন বলে তাঁর বাবা গ্যাস-বেলুন কিনে দিতে পারেননি। এতকাল পরে এতগুলো বেলুন একসঙ্গে পেয়ে তাঁর খুব ইচ্ছে হল, গ্যাস-বেলুন ওড়াতে।

গ্যাসের অভাব নেই। মস্ত একটা সিলিন্ডার মজুত রয়েছে।

দুলালবাবু রাত্রিবেলা মহানন্দে বেলুনে গ্যাস ভরে-ভরে মুখ বেঁধে ছেড়ে দিচ্ছিলেন আর সেগুলো গিয়ে সিলিঙে ঠেকে জমা হচ্ছিল।

“বাঃ, বাঃ, চমৎকার। বেলুনের মধ্যে দিব্যি গণ্ডগোল পাকিয়ে উঠছে। এবার ঘি নিয়েই যা একটু মুশকিল…!”

হঠাৎ দুলালবাবুর চোখে পড়ল, কাঁচের শার্শির বাইরে সারি সারি মুখ। সবাই তাঁর দিকেই চেয়ে আছে।

আচমকা এই দৃশ্য দেখে ভিতু মানুষ দুলাল সেন ভয় খেয়ে “বাপ রে” বলে এমন একটা লাফ মারলেন যে, তিনিও প্রায় গ্যাস-বেলুনের মতোই সিলিঙে গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছিলেন। অল্পের জন্য মাথাটা বেঁচে গেল।

এই দৃশ্য দেখে বাইরে সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। শুধু মন্টুই ভীষণ বেজার হয়ে পড়ল। কারণ স্কুলে সে হল হাই জাম্পের চ্যাম্পিয়ান। এই তো মোটে দু’দিন আগে স্কুলের অ্যানুয়াল স্পোর্টসে সাড়ে পাঁচ ফুটের ওপর লাফিয়ে ফাস্ট প্রাইজ পেয়েছে। কিন্তু দুলালবাবুর মতো বৃদ্ধ মানুষকে দাঁড়ানো অবস্থায় যতটা লাফিয়ে উঠতে দেখল, তাতে তার চোখ ট্যারা। তার হিসেবমতো দুলাল-স্যার কম করেও পৌনে ছ’ফুট লাফিয়েছেন। দুলাল স্যার যদি চেষ্টা করেন

তা হলে তো অনায়াসে সাড়ে ছয় থেকে সাত ফুট লাফাতে পারবেন।

লালু মন্টুকে কনুইয়ের গুঁতো দিয়ে বলল, “মন্টু দুলাল স্যারের কাছে তোর এখনও অনেক কিছু শেখার আছে।”

মন্টু গম্ভীর হয়ে বলল, “হুঁ।”

দুলালবাবুও একটা লাফ দিয়েই বুঝতে পারলেন যে, তিনি বেশ ভালই লাফাতে পারেন। তাঁর হাঁটু ঝনঝন করল না, কোমর কনকন করল না, মাথা বনবন করল না। নিজের এই লাফ দেখে তিনি নিজেই বেশ খুশি হলেন। এবং আর একবার লাফাবেন কি না ভাবতে লাগলেন। আসলে লাফ দিতে গিয়ে তিনি কেন লাফিয়েছেন সেটাই বেবাক ভুলে গেছেন। তিনি যে ভয় পেয়েছেন সেটাও তাঁর মনে পড়ল না। তিনি মালকোঁচা মেরে দুটো বৈঠকি দিয়ে ফের লাফানোর তোড়জোড় করতে লাগলেন।

মন্টু মুখ চুন করে বলল, “এবার যদি স্যার লাফান তা হলে খুব খারাপ হবে।”

লালু পালটা প্রশ্ন করল, “কী খারাপ হবে?”

মন্টু বলল, “বুড়ো বয়তে এত লাফঝাঁপ কি ভাল? কোমরে চোট লাগতে পারে। আমাদের উচিত স্যারের লাফ বন্ধ করা।”

লালু মাথা নেড়ে বলল, “মোটেই সেটা উচিত হবে না। দুলাল স্যারের যা এলেম দেখছি, তাতে ওঁকেই এখন এ-জেলার চ্যাম্পিয়ান বলতে হয়। তুই তো ওঁর কাছে নস্যি।”

ল্যাবরেটরির ভিতরে দুলাল স্যার শেষ অবধি দ্বিতীয় লাফটা দিতে পারলেন না। সিলিন্ডারের মুখে একটা বেলুন পরানো ছিল। সেটা বেড়ে বেড়ে বিশাল আকৃতি ধারণ করে অবশেষে দুম করে ফাটল। আর ছেঁড়া রবার ছিটকে এসে লাগল দুলাল-স্যারের নাকে।

ঘটনাটা কী ঘটেছে তা দুলাল স্যার বুঝতে পারলেন না। কিন্তু নাকে ভুতুড়ে ঘুসির মতো একটা ঘা খেয়েই তিনি ফের “বাবা গো” বলে চিৎকার করে মাটিতে বসে পড়লেন।

এই দৃশ্য দেখে ভুতো আর থাকতে পারল না। জানলার পাল্লা একটানে খুলে সে ভিতরে ঢুকল। তারপর দুলাল-স্যারকে তুলে একটা চেয়ারে বসিয়ে একটু তুলো ভিজিয়ে নাকে ধরল।

দুলাল-স্যার মিটমিট করে চেয়ে দেখলেন, একগাদা বাচ্চা তাঁকে ঘিরে ফেলেছে। মুখগুলো এবার তাঁর খুবই চেনা-চেনা ঠেকল।

মণ্ট খুবই গম্ভীর হয়ে বলল, “স্যার, আপনার কিন্তু লাফালাফি করা উচিত নয়।”

দুলাল স্যার শুনলেন, ‘হারাকিরি করা উচিত হয়।’

তিনি সবেগে মাথা নেড়ে বললেন, “খুব খারাপ। হারাকিরি করা খুব খারাপ।”

এতগুলো বাচ্চাকে পেয়ে দুলাল স্যার খুবই খুশি হয়ে উঠে পড়লেন। সবাই চেঁচাতে লাগল, “স্যার আমরা বেলুন নেব।”

“বেগুন খাবে? তা এই অসময়ে বেগুন কোথায় পাব? তার চেয়ে বরং একটা করে বেলুন নাও সবাই।”

বেলুন পেয়ে বাচ্চারা দারুণ খুশি হয়ে চেঁচামেচি করতে লাগল, এই, আমারটা সবচেয়ে বড়। ইঃ, আমারটা বলে কত সুন্দর। উঃ, তোরটা তো কেলেমার্কা, আমারটা কেমন লাল টুকটুকে। তোরটা তো লাউয়ের মতো, আমারটা কী সুন্দর একটা বলের মতো!

বাচ্চাদের মধ্যে যারা একটু বড় তারা বেলুন নিয়ে মাতামাতি না করে ল্যাবরেটরির বিভিন্ন জিনিস ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। কেউ বকযন্ত্র নাড়াচাড়া করতে লাগল, কেউ বা বুনসেন বানার জ্বালানোর চেষ্টা করতে লাগল, কেউ বিভিন্ন শিশি থেকে নানারকম কেমিক্যাল একটা টেস্ট-টিউবে ঢেলে মেশাতে লাগল।

গদাই আর নিমাই বিজ্ঞানের ভাল ছাত্র। তারা নানারকম-এক্সপেরিমেন্ট করতে লেগে গেল।

মন্টু তার টেস্ট-টিউবে রাজ্যের কেমিক্যাল ঢেলে বুনসেন বানারে চাপিয়ে দিয়ে চেঁচিয়ে বলল, “এইবার আমি এমন একটা জিনিস আবিষ্কার করব না যে, পৃথিবীতে হই-চই পড়ে যাবে।”

জিনিসটা বুনসেন বানারে চাপানোর পরই একটা কটু গন্ধ ছাড়তে শুরু করল। বাচ্চার সবাই নাকে চাপা দিয়ে ‘ইঃ, এঃ” করতে লাগল।

কিছুক্ষণ বাদে একটা নীলাভ ধোঁয়া গলগল করে বেরোতে লাগল টেস্ট-টিউব থেকে। সারা ঘর নীল ধোঁয়ায় ভরে যেতে লাগল।

ভুতো চেঁচিয়ে বলল, “পালাও! পালাও!” বাচ্চারা দুদ্দাড় করে দৌড়ে পালাতে লাগল।

হঠাৎ দুম শব্দ করে টেস্ট টিউবটা ফেটে চারদিকে একটা নীল আলো চমকে উঠল।

দুলাল স্যার অনেকদিন হল পৃথিবীর কোনও শব্দই ভাল শুনতে পান না। কিন্তু টেস্ট টিউব ফাটবার আওয়াজটা তিনি আজ পরিষ্কার শুনতে পেলেন। শব্দটা এত তীক্ষ্ণ যে, তাঁর কান তো খুলে গেলই, ফের শব্দের চোটে তালাও লেগে গেল।

চারদিকে নীল ধোঁয়া আর কটু গন্ধটা টের পেয়ে দুলাল স্যার সচকিত হলেন। তাঁর আর একবার লাফ দেওয়ার ইচ্ছে হল। এবারও অবশ্য ভয়ে। কিন্তু দিতে পারলেন না!

কেমন যেন অবসন্ন ঘুম-ঘুম একটা ভাব ভর করল শরীরে। তিনি ধীরে ধীরে মেঝের ওপর বসে পড়লেন। তারপর হাই তুলতে লাগলেন। তারপর ধীরে ধীরে শুয়ে পড়লেন মেঝের ওপর।

বাচ্চারা সবাই ল্যাবরেটরি থেকে বেরিয়ে দৌড়ে পালাল।

শুধু ভুতো, মন্টু আর গদাই একটু দুরে দাঁড়িয়ে কাণ্ডটা দেখতে লাগল।

মন্টু বলল, “কী হবে ভুতোদা?”

ভুতো মাথা নেড়ে বলল, “কিছু বুঝতে পারছি না। তুমি কিসের সঙ্গে কী মিশিয়েছিলে মনে আছে?”

“না তো! শিশির গায়ে লেখাগুলোও পড়িনি। আন্দাজে উলটোপালটা মিশিয়ে দিয়েছি।”

গদাই বলল, “দুলাল-স্যার যদি মরে যান, তা হলে কী হবে?”

মন্টু ভয়ে-ভয়ে বলল, “যাঃ, মরবেন কেন?”

গদাই গম্ভীর হয়ে বলল, “দেখছিস না, এখনও কেমন গলগল করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে!”

মন্টু খুব ভয় পেয়ে গম্ভীর হয়ে গেল। তারপর ফিসফিস করে বলল, “আমাদের উচিত এখন পালিয়ে যাওয়া।

গাদাই মাথা নেড়ে বলল, “পালিয়ে লাভ নেই। দাদু ঠিক ধরে ফেলবে। এই কুকীর্তি কার যখন জানতে চাইবে, তখন তোর নাম বলা ছাড়া উপায় নেই।”

মন্টু কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “দাদু মেরে ফেলবে তা হলে।”

গদাই গম্ভীর হয়ে বলল, “তা হলে তোর টপ মার্বেলটা দিবি? আর তিনফলা ছুরিটা। আর লাটাইটা। আর….।”

মন্টু ঘাড় নেড়ে বলল, “দেব।”

রামলালের ভারি রাগ হচ্ছিল। একে তো বাবা ভুবন রায়ের কাছে বকুনি খেয়েছেন, তার ওপর ল্যাবরেটরিতে ভূত দেখে দৌড়, পা মচকানো এবং অবশেষে জানতে পারা যে, ভূত নয়, নোকটা নিতান্তই দুলাল সেন। নিজের বাবার ওপর রাগ করার সাহস তাঁর নেই। কিন্তু রাগটা ভিতরে বেশ পাকিয়ে উঠছে। কারও ওপর যদি এখনই ঝাল না ঝাড়া যায় তাহলে এই রাগটাই রাত্তিরে পেটে অম্বলে পরিণত হয়ে কষ্ট দেবে। রামলালের ওই এক রোগ, রাগ হলেই অম্বল হয়ে পেটে ভীষণ ব্যথা হয়। অবশ্য রাগটা প্রকাশ করতে পারলে আর কোনও ভাবনা নেই।

ঠাকুমা চুন-হলুদ দিয়ে যখন তাঁর পায়ে পট্টি বেঁধে দিচ্ছিলেন, তখন রামলাল কটমট করে তাঁর ভাই নন্দলালের দিকে তাকালেন। নন্দলাল সাধু মানুষ, একাবোকা থাকেন, সাত চড়ে রা কাড়েন না। সুতরাং রাগ দেখানোর উপযুক্ত লোক।

রামলাল তাই হঠাৎ ধমক দিয়ে বললেন, “অ্যাই নন্দ, খুব তো সায়েন্স পড়েছিলি। বল তো এইচ-টু-এস-ও-ফোর কিসের ফর্মুলা?”

নন্দবাবুর অবস্থাও বিশেষ ভাল নয়। ভুতুড়ে ক্লাবে হেলমেট ফেলে এসেছেন, পায়ে নতুন জুতোর ফোস্কা, খিদে পেয়েছে। তিনি দাদার দিকে চেয়ে উদাস গলায় বললেন, “সায়েন্স! আমি এখন সায়েন্সের অনেক ঊর্ধ্বে উঠে গেছি। সায়েন্স ফায়েন্স কিছু নয়! ওসব এলেবেলে জিনিস, বুজরুকি।”

রামলাল প্রকাণ্ড একটা ধমক দিয়ে উঠলেন, “যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা! সায়েন্স কিছু নয়। যত কিছু তোমার ওই সব ভণ্ডামিতে! আস্পদ্দাটা তো বেশ বেড়ে গেছে দেখছি।”

নন্দবাবু একটু থতমত খেয়ে গেলেন। এ বাড়ির নিয়ম হল, জ্যেষ্ঠকে সবসময়ে সম্মান দিতে হবে, তা তিনি কোনও অন্যায় কাজ করলেও। দুর্বিনীত ব্যবহার করা চলবে না। নন্দবাবু তাঁর দাদার সঙ্গে ছেলেবেলায় বিস্তর ঝগড়া কাজিয়া, মারপিট করেছেন বটে কিন্তু বড় হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা কননি। তার ওপর তিনি এখন হাফসন্ন্যাসী। শরীরে রাগ বলে বস্তুটিই নেই।

নন্দবাবু নিমীলিত নয়নে সামনের দেওয়ালটার দিকে চেয়ে বললেন, “সায়েন্স টায়েন্স আর আমার লাইন নয় দাদা। আমি তার চেয়ে ঢের মূল্যবান সম্পদ পেয়েছি।”

রামলাল তুবড়ির মতো জ্বলে উঠে বললেন, “কী! সায়েন্সের এত বড় অপমান! সায়েন্সের চেয়ে বড় সম্পদ পেয়েছিস! গবেট, গোমুখ কোথাকার। পয়সা খরচ করে ওকে লেখাপড়া শেখানো হলো, তা সব ভস্মে ঘি ঢালা!”

‘কিন্তু দাদা।”

“চোপ রও বেয়াদব! ফের মুখে মুখে কথা কওয়া হচ্ছে! যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা! সারাদিন তুই নীচের ঘরে বসে করিস কী? মারণ-উচাটন আর ভূক্ত নামানো? নাকি জ্যোতিষী? বিজ্ঞানের চর্চা করে দুনিয়ার মানুষ যখন তাজ্জব তাজ্জব জিনিস আবিষ্কার করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে তখন তুই ঘরের কোণে বসে ওসব আনসায়েন্টিফিক মারণ-উচাটন করছিস! তোর লজ্জা হয় না!”

বলতে বলতে রামলাল স্পষ্টই টের পাচ্ছিলেন, তাঁর পেটের অম্বল ভাবটা কেটে যাচ্ছে। বেশ চনমনে লাগছে তাঁর। আর দু-চার মিনিট চালাতে পারলেই কেল্লা ফতে।

নন্দবাবু কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন, রামলাল গর্জন করে উঠলেন, “ফের মুখে-মুখে কথা বলা হচ্ছে! উনি ভৌত ক্লাবে ভর্তি হয়েছেন! এঃ, একেবারে গোল্লায় যাওয়ার রাস্তা পরিষ্কার করা হচ্ছে। তার ওপর আবার জ্যোতিষী! আহাম্মক কোথাকার!”

নন্দবাবু আর রা কাড়লেন না, মাথাটি নিচু করে নিজের ঘরে ফিরে এলেন। ওদিকে রামবাবুর রাগটা জল হয়ে গেছে ‘পেটটা হাল্কা লাগছে’ অম্বল হওয়ার ভয় আর নেই।

নন্দবাবু নিজের ঘরে চিতপাত হয়ে শুয়ে অনেকক্ষণ উদাস নয়নে চেয়ে রইলেন। একটু আগে দোতলা থেকে নামবার সময় রান্নাঘর থেকে নানা সুখাদ্য রান্নার গন্ধ আসছিল। এ বাড়ির পাঁচক ঠাকুরটি নতুন। লোকটা হরেকরকম রান্না জানে বলে শুনেছেন নন্দবাবু। কখনও খাননি। নিজের রান্না নন্দবাবু নিজেই বেঁধে নেন। ঘরের কোণে স্টোভ আছে। কিন্তু আজ একাদশী বলে নন্দবাবুর রান্নার ঝামেলাও নেই। এবেলা সাপ্ত ভেজানো খাবেন। মুশকিল হল, ভাল রান্নার গন্ধ পাওয়ার পর থেকেই তাঁর আর সাগু গেলার ইচ্ছে হচ্ছে না। বাড়ির পুরনো চাকর রাখাল এসে দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ল। পুরনো লোক বলে তার ভারি দাপট। কাউকে তেমন গ্রাহ্যটাহ্য করে না।

৪. নন্দবাবুর দিক চেয়ে রাখাল বলল

নন্দবাবুর দিক চেয়ে রাখাল বলল, “কী গো সন্নিসিঠাকুর, বলি আজও কি পেটে গামছা বেঁধে পড়ে থাকবে? আজ যে চমৎকার খাসির মাংস দিয়ে বিরিয়ানি রান্না হয়েছে। সঙ্গে ফুলকপির রোস্ট, আলুর চপ, চিংড়ির মালাইকারি আর কমলালেবুর পায়েস।”

নন্দবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেল, “তোমরা খাওগে। আমার খাওয়া ঘুচে গেছে।”

‘মা-ঠাকরোন তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন, বলেছেন নন্দটাকে ধরে-বেঁধে নিয়ে আয়। উপোস থেকে থেকে ছেলেটা আমার আধখানা হয়ে গেল।”

নন্দবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, “আজ আমার একাদশী রাখালদা। বিরক্ত কোরো না।”

“আরে একাদশী তো সারা বছরই আছে। উপোস করতে চাইলে শুধু একাদশী কেন, অমাবস্যা, পূর্ণিমা অনেক পাবে। কিন্তু এমন খ্যাঁটখানা তো আর নিত্যি হবে না। আজ তিতলির জন্মদিন বলে কথা!”

নন্দবাবু শুকনো মুখে মাথা নাড়লেন, “ও হয় না, রাখালদা। লোভ আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।”

রাখাল তার পাকা চুলে ভর্তি মাথাটা নেড়ে বলল, “নাঃ, তোমার মাথাটাই দেখছি গেছে। এই বয়েসেই যদি তুমি এত কিছু ত্যাগ করে বসে থাকো, তবে বুড়ো বয়সে ত্যাগ করার যে আর কিছুই থাকবে না। আমাদের দেশে এক হতুকিবাবা ছিল। সব ছাড়তে ছাড়তে শেষে হকিতে এসে ঠেকেছিল। দিনান্তে একখানা হত্ত্বকি চিবিয়ে জল খেত। সারা দিনমানে আর কিছু নয়। তারপর একদিন বিশ্বনাথ দর্শন করতে গিয়ে সেই হকিও ছেড়ে দিল। পুঁকতে ধুকতে মরতে বসেছিল। তারপর এক ঘোড়েল লোক গিয়ে তার কানে কানে বলল, আরে, সব ছেড়েছ, কিন্তু কেক-বিস্কুট-পাউরুটি তো আর ছাড়োনি। ওগুলো খেয়ে প্রাণটা বাঁচাও। তা হকিবাবার তখন এতই খিদে যে, কথাটা লুফে নিল। কেক-বিস্কুট খেয়ে প্রাণটা বলি হকিবাবার। আমি তাই বলি, ওরকম দুর্দশা হওয়ার আগেই নিজেকে সামলাও।”

নন্দবাবু পাশ ফিরে শুয়ে বললেন, “তুমি এখন যাও রাখালদা। আমার সাঙ্গু ভেজানো আছে।”

রাখাল কটমট করে নন্দবাবুর দিকে চেয়ে থেকে বলল, “ভাল জিনিসকে অবহেলা করলে কী হয় জানো? মা লক্ষ্মীর শাপ লাগে আত্মাকে কষ্ট দিতে নেই।”

নন্দবাবু একটু হেসে বললেন, “তুমি আত্মার তত্ত্বই জানো না। আত্মার কখনও খিদে পায় না আত্মার খাওয়া নেই, ঘুম নেই, তেষ্টা নেই।”

“বটে! তবে আত্মাটা আছে কী করে?”

“সেটাই তো রহস্য।”

“তবে থাকো তোমার রহস্য নিয়ে শুঁটকি মেরে।”

রাখাল রাগ করে চলে গেল।

রাখাল চলে যাওয়ার পর একা ঘরে নন্দবাবু চোখ বুজে প্রাণপণে মন থেকে বিরিয়ানি, চপ, রোস্ট ইত্যাদির চিন্তা তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

এমন সময় দীর্ঘশ্বাসের শব্দ হল। নন্দবাবু চমকে উঠে চারদিকে চাইলেন। ঘরে কেউ নেই।

নন্দবাবু আবার চোখ বুজলেন।

কে যেন বলে উঠল, “কাজটা খারাপ হল হে নন্দবাবু।”

নন্দবাবু ফের চমকে উঠে চারদিকে চাইলেন। কেউ নেই।

হঠাৎ নন্দবাবু বুঝতে পারলেন, কথা বলছে আর কেউ নয়। তাঁর মন।

মন বলে উঠল, “কাজটা খুব বিবেচকের মতো করলে না হে নন্দলাল। আর একটু ভেবেচিন্তে দেখলে পারতে।”

নন্দবাবু উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, “বলিস কী রে মন? একাদশীতে বিরিয়ানি?”

“নন্দবাবু, তোমার সাধন-ভজন সবই ভস্মে ঘি ঢালা হল।”

“তার মানে কী রে মন?”

“বলছিলাম, যে-সাধক সাধন-ভজন করতে করতে ওপরে উঠে গেছে, তার কাছে আর কি খাদ্যাখাদ্য ভেদ থাকে? তার কাছে মুরগিও যা, গঙ্গাজলও তাই।”

“ওসব বলিসনি রে মন। তোর লোভ তোকে ওসব বলাচ্ছে।”

“আমি বলি কি নন্দবাবু, শাস্ত্রে একটা কথা আছে, তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ। কথাটার মানে জানো?”

“খুব জানি। ত্যাগ করে ভোগ করো।”

“তবেই বোঝো, কেমন দামি কথা। যা ত্যাগ করবে, তা ভোগ করতে আর বাধা কিসে? ছেড়েই যখন দিয়েছ তখন আর খেতে বাধা কিসের?”

“ওরে লোভী মন, তুই আর আমাকে কুপথে নিস না, ত্যাগের জলে নিজেকে ধুয়ে নে। পরিচ্ছন্ন হ।”

“মেলা ফ্যাচফ্যাচ কোরো না তো নন্দবাবু, ভাল রান্নাও একটা শিল্পকর্ম, বুঝলে? তাকে অবহেলা করলে শিল্পকেই অপমান করা হয়।”

“অনেক তো খেয়েছিস রে মন, আর কেন? এবার ওপরে ওঠ। ওপরে ওঠ।”

“তা উঠতে রাজি আছি। তবে দোতলা অবধি। তুমিও গা তোলো হে নন্দবাবু। রান্নাঘরটা একেবারে ম-ম করছে গন্ধে। ওই সাগুর গোলা যদি আজও তোমাকে গিলতে হয় তবে বরং ওর সঙ্গে একটু বিষ মিশিয়ে নাও। বৈরাগ্যের একেবারে চরম হয়ে যাবে।”

নন্দবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “মন, তুই হচ্ছিস বিষাক্ত সাপের মতো। তোকে ঝাঁপিতে বন্ধ না করলে আর উপায় নেই।”

“বটে! আমাকে ঝাঁপিতে ভরবে? অত সোজা নয় হে নন্দবাবু। তোমার চেয়ে ঢের বড় বড় লায়েককে দেখেছি।”

নন্দবাবু এবার বেশ রেগে গিয়ে ধমক দিলেন, “চুপ কর বলছি। নইলে কিন্তু খারাপ হয়ে যাবে।”

“খারাপ আর এর চেয়ে কী হবে হে নন্দবাবু? ওপরে সবাই বসে কোমরের কষি খুলে ভালমন্দ খাচ্ছে, আর তুমি একতলার ঘরে বসে সাগুদানা আর পাকা কলা গিলছ, এর চেয়ে খারাপ আর কী হবে হে?”

নন্দবাবু বুঝলেন, আর দেরি করা ঠিক হবে না। খিদে বেশ চাগাড় দিচ্ছে। নন্দবাবু উঠে পড়লেন এবং সাগু মেখে খেতে বসে গেলেন।

কিন্তু দুঃখের বিষয় সাগু তাঁর গলা দিয়ে নামল না। দু-এক গ্লাস খাওয়ার পরই বিস্বাদে মন ভরে গেল। নন্দবাবু ঢকঢক করে পেট ভরে জল খেয়ে নিলেন। তারপর শুয়ে পড়লেন।

কিন্তু মধ্যরাতে নন্দবাবুর ঘুম ভেঙে গেল। তিনি স্পষ্ট শুনতে পেলেন, কে যেন কাঁদছে।

“কে কাঁদে?” বলে নন্দবাবু উঠে বসলেন।

কে যেন জবাব দিল, “তোমার পেট হে।”

নন্দবাবু অবাক হয়ে বললেন, “পেট! পেট কেন কাঁদবে?”

“গরিব-দুঃখীরা কাঁদে কেন নন্দবাবু? গরিব বলেই তো কাঁদে। তোমার পেটটাকে যে তুমি গরিব করে রেখেছ, বেচারার যে কিছুই করার নেই। তাই কাঁদছে।”

নন্দবাবু নিজেও টের পেলেন, সত্যিই তাঁর দারুণ খিদে পেয়েছে, খিদেটা রাগী একটা হুলো বেড়ালের মতো তার পেটটাকে আঁচড়ে কামড়ে ফালাফালা করে ফেলেছে।

মন একটু হেসে বলল, “ওঠো হে নন্দবাবু।”

“উঠে কী করব?”

“দোতলায় যাও নন্দবাবু। এখনও কিছু আছে বোধহয়।”

“ছিঃ মন, ওকথা বলতে নেই।”

“তোমার খিদে কিন্তু রেগে উঠছে নন্দবাবু। কাজটা ভাল হচ্ছে না। রাত এখন নিশুতি, কেউ টেরটিও পাবে না।”

নন্দবাবু বিরস মুখ করে বললেন, “তোর পেটে বড় জিলিপির প্যাঁচ রে মন।”

“নন্দবাবু, উপোস করে ধর্ম হয় না। খারাপই যদি হবে তবে বিরিয়ানি জিনিসটার সৃষ্টি হল কেন বলো? ওঠো নন্দবাবু, না উঠলে আমি তোমার সঙ্গে এমন ঝগড়া লাগাব যে, সাধন-ভজন চুলোয় যাবে।”

“উঠছি রে মন, উঠছি।”

নন্দবাবু উঠলেন, তারপর সিঁড়ি বেয়ে অনিচ্ছের সঙ্গে ওপরে উঠতে লাগলেন।

ওদিকে নিশুত রাতে ল্যাবরেটরির মধ্যে দুলালবাবুও চোখ মেলে চাইলেন।

চেয়ে তাঁর মনে হল, কী যেন একটা নেই।

কী নেই? দুলালবাবু উঠে বসে চারদিকে চাইলেন। কিন্তু কিছু বুঝতে পারলেন।

দুলালবাবুর হঠাৎ খেয়াল হল, তাই তো! আমি লোক্টা কে? আমার নাম কী? আমি কোথায় ছিলাম? এখানেই বা এলাম কী করে?

এসব প্রশ্নের কোনও সদুত্তর পাওয়া গেল না।

দুলালবাবু উঠে চারদিকটা ঘুরে ঘুরে দেখলেন। চারদিকে মেলা অকাজের জিনিস। শিলিং-এ গুচ্ছের গ্যাসবেলুন।

দুলালবাবুর হঠাৎ নজরে পড়ল, একটা বেঁটেমতো লোক অন্ধকারে ঘাপটি মেরে বসে আছে একটা টেবিলের তলায়।

দুলালবাবু গিয়ে লোকটাকে হঠাৎ জাপটে ধরলেন।

“এই, আমি কে?”

লোকটা ভড়কে গিয়ে ককিয়ে উঠল, “আজ্ঞে?”

“আমি কে, বল শিগগির।”

লোকটা মাথা নেড়ে বলল, “আজ্ঞে, সেটা বলা খুব শক্ত। আপনি যে কে তা আপনি ছাড়া আর কে জানবে বলুন। তবে আমি হচ্ছি গে পাঁচু মোদক।”

দুলালবাবু লোকটাকে আরও একটু কষে চেপে ধরে বললেন, “পাঁচু মোদক! নামটা চেনা-চেনা ঠেকছে!”

লোকটা ককিয়ে উঠে বলল, “আজ্ঞে, অত জোরে ধরবেন না। আমার হাড়গোড় তেমন পোক্ত নয়। ভাঙলে আর এ বয়সে জোড়া লাগবে না।”

“নামটা চেনা-চেনা ঠেকছে কেন বলো তো হে।”

এই বলে দুলালবাবু লোকটাকে ছেড়ে দিলেন। লোকটা অমনি ধুপ করে মেঝের ওপর বসে পড়ে কিছুক্ষণ ‘উঃ, আঃ করে নিয়ে বলল, “হাড়গোড় একেবারে নড়িয়ে দিয়েছেন মশাই। আপনার মতো গুণ্ডা প্রকৃতির লোক আমি জীবনে দেখিনি। লোহার ভীমও চূর্ণ হয়ে যায়।

দুলালবাবু আত্মবিস্মৃত হয়েছেন। পুরনো কথা তাঁর মনে নেই। তিনি যে নিতান্তই রোগা, দুর্বল এবং ভীরু প্রকৃতির মানুষ এটাও তিনি ভুলে বসে আছেন। লোকটার দিকে খনিকক্ষণ চেয়ে থেকে তিনি বললেন, “তোমার নামটা আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। চমৎকার নাম। পাঁচু মোদক। আজ থেকে নামটা আমি নিলুম। তুমি অন্য নাম নাও।”

পাঁচু মোদক নিজের গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “তা নিতে পারেন, তবে পয়সা লাগবে।”

“তুমি কি নাম বিক্রি করো নাকি?”

“আগে কখনও করিনি, কেউ চায়ওনি। আজই প্রথম। বউনি বলে কথা। কম করেই দেবেন না হয়। পাঁচ টাকা।”

দামটা খুব বেশি বলে মনে হল না দুলালবাবুর। কিন্তু দরাদরি করার মজ্জাগত অভ্যাস যাবে কোথায়? তিনি একটু চিন্তিতভাবে বললেন, “পাঁচ টাকা! দরটা একটু বেশি হয়ে গেল না!”

পাঁচু মাথা নেড়ে বলল, “নামের তো একটা রেট আছে মশাই। পাঁচ অক্ষরের নাম, অক্ষরপ্রতি একটা করে টাকা এমন কি বেশি?”

দুলালবাবু কর গুনে দেখলেন, পাঁচু মোদক পাঁচ অক্ষরের নাম বটে। একেবারে জলের মতো সোজা হিসেব। তিনি মাথা নেড়ে বললেন, “তা বটে!”

পাঁচু সোৎসাহে বলল, “তার ওপর ভেবে দেখুন, আপনাকে বেচে দিচ্ছি বলে বাপের দেওয়া নামটা আমি তো আর ব্যবহারও করতে পারব না। সেই জ্ঞান বয়স থেকেই লোকে পাঁচু-পাঁচু বলে ডেকে আসছে। এখন থেকে তো আর পাঁচু নামে সাড়াও দেওয়া চলবে না। দুঃখের কথাটা একটু ভেবে দেখবেন তো।”

দুলালবাবুর চোখ ছলছল করতে লাগল। বললেন, “নামটা দিতে যদি তোমার কষ্ট হয় তা হলে বরং থাক আমি বরং অন্য কোনও নাম…”

পাঁচু জিভ কেটে তাড়াতাড়ি দুলালবাবুর পায়ের ধুলো নিয়ে বলল, “কী যে বলেন আজ্ঞে, শুনলেও পাপ হয়। আমার নামটা যে আপনি নিলেন সেটাও আমার কম ভাগ্যি নাকি। আর দিয়ে যখন ফেলেছি তখন আর ফেরত নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।”

দুলালবাবু নিশ্চিন্ত হলেন। আসলে তাঁর এখন একটা নাম ভীষণ দরকার। নাম ছাড়া কি মানুষের চলে? তিনি গিয়ে তাঁর টিনের তোরঙ্গটি খুলে পাঁচটা টাকা বের করে পাঁচুর হাতে দিয়ে বললেন, “তা তুমি করোটরো কী?”

পাঁচু মাথা চুলকে বলল, “আজ্ঞে কথাটা বলা কি উচিত হবে? কী করি তা শুনলে আপনি হয়তো খুশি হবেন না।”

“কেন বলো তো?”

পাঁচু বুঝে গেছে, লোকটা পাগল, বোকা আবার হাবা। তাই সে খুব নিশ্চিন্ত হয়ে বলল, “কাজটা অবশ্য খুবই ভাল। লোকে ভাল চোখে না দেখলেও এ কাজে মোটা লাভ।”

“কী বলো তো?”

পাঁচু খুব লজ্জার সঙ্গে মাথা চুলকে বলল, “আজ্ঞে, ওই চুরি আর কি।”

দুলালবাবু চুরি কথাটা খুব চেনেন। কিন্তু কী করলে চুরি করা হয়, তা তাঁর মনে পড়ল না। তাই তিনি পাঁচুর দিকে চেয়ে বললেন, “আমারও কিছু একটা করা দরকার। কাজ ছাড়া কি মানুষ থাকতে পারে? তা চুরি ব্যাপারটা কী আমাকে একটু বুঝিয়ে দাও তো! আমিও লেগে পড়ি।”

পাঁচু জুলজুলে চোখে কিছুক্ষণ দুলালবাবুর দিকে চেয়ে থেকে ভাল করে লোকটাকে জরিপ করে নিল। বলল, “কাজটা কিছু শক্ত নয়। রেতের বেলা যে-কোনও বাড়িতে ফাঁক বুঝে ঢুকে পড়বেন। তারপর সাড়াশব্দ না করে মালপত্র যা পাবেন সরাতে থাকবেন।”

দুলালবাবু সাগ্রহে বললেন, “তারপর?”

“তারপর আমার হাতে এনে দেবেন। আমি সেসব মালপত্র বেচে পয়সা এনে দেব আপনাকে। আর টাকা-পয়সা যদি সরাতে পারেন, তা হলে তো কথাই নেই। যা আসে তা-ই লক্ষ্মী।”

দুলালবাবুরও ব্যাপারটা বেশ পছন্দ হয়ে গেল। তিনি খুশি হয়ে হাতে হাত ঘষতে ঘষতে বললেন, “বাঃ। এ তো খুব সোজা কাজ।”

“কাজ যেমন সোজা, তেমনি আমার মজাও আছে। গেরস্তর সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে-খেলতে সময়টাও বেশ কেটে যায়। হাত-পায়ের দিবি ব্যায়াম হয়, বুদ্ধি খোলে, চোখ কান সব সজাগ হয়ে ওঠে, ভয়ডর সব কেটে যায়। চুরি করতে নামলে মানুষের মেলা উপকার হয় মশাই।”

দুলালবাবুর দেহ-মন চনচন করছিল, তিনি একেবারে টগবগ করতে লাগলেন উৎসাহে। বললেন, “তা হলে কখন কাজে নামব?”

“শুভস্য শীঘ্রম। এখন তো মোটে রাত দেড়টা কি দুটো। এখনই নেমে পড়লে হয়।”

দুলালবাবু ল্যাবরেটরিটার চারদিক চেয়ে দেখে নিয়ে বললেন, “এখান থেকে কিছু সরানো যায় না?”

পাঁচু ঠোঁট উলটে বলল, “এরকম সব বিটকেল জিনিস জন্মে দেখিনি বাবা। এসব অকাজের জিনিস কে-ই বা কিনবে? এ-জিনিস আমাদের লাইনের জিনিস নয় পাঁচুবাবু।”

পাঁচুবাবু সম্বোধন শুনে দুলালবাবু ভারি খুশি হয়ে বললেন, “তা হলে কী করা যায়?

পাঁচু একটু খাটো গলায় বলল, “এ বাড়িতে মেলা জিনিস। যদি কৌশল করে একবার ঢুকতে পারেন তো একেবারে পাথরে পাঁচ কিল।”

দুলালবাবু পিঞ্জরাবদ্ধ সিংহের মতো পায়চারি করতে করতে বললেন, “নিশ্চয়ই পারব। পারব না মানে? পারতেই হবে। কিন্তু আমার এখন ভীষণ খিদে পেয়েছে।”

একগাল হেসে পাঁচু বলল, “আজ্ঞে আমাদের তো খিদে পেয়েই আছে। যখন তখন পায়। তো তার জন্যে চিন্তা নেই। বাবুদের বাড়িতে আজ ভাল রান্নাবান্না হয়েছে। তার কিছু এখনও আছে বোধহয়। গিয়ে ঢুকে পড়ুন না আজ্ঞে।”

দুলালবাবু রাজি হয়ে গেলেন। বললেন, “তুমিও সঙ্গে চলো। তা ইয়ে তোমাকে এখন থেকে কী নামে ডাকব বলো তো! নাম কিনতে গেলে তো মুশকিল।

মাঝরাতে তো আর কেউ নাম বেচবার জন্য বসে নেই। তবে আমার ঠাকুর্দার নাম ছিল নরহরি। আপনি আমাকে বরং নরহরি বলেই ডাকবেন।”

দুলালবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “তাই হবে। তা হলে এখন কাজ শুরু করা যাক।”

“যে আজ্ঞে।”

দুলালবাবু ল্যাবরেটরি থেকে বেরিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটতে লাগলেন। পেছনে একটু তফাতে পাঁচু। আনন্দে দুলালবাবু শিস দিতে লাগলেন।

পাঁচু পিছন থেকে সতর্ক গলায় বলল, “আজ্ঞে শব্দ-টব্দ করবেন না। চুরিতে শব্দ করা বারণ কিনা।”

“ঠিক আছে নরহরি। মনে থাকবে।”

দু’জনে মিলে প্রকাণ্ড বাড়িটার চারদিক ঘুরে দেখে নেওয়ার পর দুলালবাবু বললেন, “এবার ঢুকি?”

“কীভাবে ঢুকবেন?”

“কেন, দরজা ভেঙে।”

পাঁচু জিভ কেটে বলল, “ওরকম হুটোপাটি করবেন না। এসব কাজে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হয়। আর বুদ্ধি খাটাতে হয়।”

পাঁচু তার ঝোলা থেকে একটা যন্ত্র বের করে একটা জানালায় খুটখাট করে কী একটু করল। তারপর পাল্লাটা অনায়াসে খুলে গোটা দুই শিক কেটে ফেলল। বলল, “যান এবার ঢুকে পড়ুন।”

“আর তুমি?”

“আজ্ঞে আমি ওই আমগাছটার তলায় বসে বরং একটু জিরোই। বড্ড ধকল গেছে মশাই। আপনাকে দেখতে রোগাপাতলা বটে, কিন্তু গায়ে মশাই পাগলা হাতির জোর। যা জাপটে ধরেছিলেন, গা-গতরে ব্যথা হয়ে আছে।”

‘বটে?”

পাঁচু মাথা নেড়ে বলল, “শুনেছি পাগলদের গায়ে খুব জোর হয়।”

“আমি কি পাগল নরহরি?”

“তা একটু পাগল তো সবাই। উনিশ-বিশ, ও নিয়ে ভাববেন না। দুনিয়ায় যত ভাল-ভাল কাজ তো পাগলেরাই করেছে কিনা।”

দুলালবাবু এ কথাতেও খুশি হয়ে বললেন, “তা হলে পাগল হওয়াটা খারাপ নয়!”

“আজ্ঞে না। আপনার ভিতরে ঢোকার রাস্তা করে দিয়েছি। ঢুকে পড়ুন।”

দুলালবাবু বেড়ালের মতো লাফ মেরে জানালায় উঠে ভিতরে ঢুকে পড়লেন। চুরির চেয়ে সোজা কাজ পৃথিবীতে কিছু আছে বলে তাঁর মনে হল না। তিনি ঢুকে চারদিকে চেয়ে দেখলেন। প্রথমেই চোখে পড়ল, দেওয়ালের সঙ্গে দাঁড় করানো একগাছ ঝাঁটা।

“পেয়েছি!” বলে দুলালবাবু গিয়ে বিজয়-গর্বে ঝাঁটাগাছ তুলে নিয়ে জানলার কাছে ছুটে এসে উত্তেজিত গলায় ডাকলেন, “নরহরি।”

নরহরি ছায়ার মতো এগিয়ে এসে বলল, “চেঁচাবেন না পাঁচুবাবু। একদম স্পিকটি নট। কিছু পেলেন?”

“এই যে।” দুলালবাবু ঝাঁটাগাছটা এগিয়ে দিলেন।

পাঁচু চাপা গলায় বলল, “পেতল-কাঁসা দেখুন। ঝাঁটা দিয়ে কোন কচু হবে?”

দুলালবাবু মাথা নেড়ে ফের চারদিকে খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু খিদের চোটে পেটে এমন ছুঁই ছুঁই করছে যে, দুলালবাবু আর থাকতে পারলেন না। এ-ঘর ও ঘর ঘুরে খাবার খুঁজলেন খানিক। তারপর সামনে সিঁড়ি দেখে দোতলায় উঠলেন।

হঠাৎ তাঁর নাকে বেশ ভাল-ভাল খাবারের গন্ধ আসতে লাগল। গন্ধ অনুসরণ করে তিনি একটা ঘরে এসে ঢুকলেন। তারপর আলো জ্বাললেন। খুঁজতে খুঁজতে একটা জালের আলমারির মধ্যে বাটিতে ঢাকা মেলা খাবার দেখে তাঁর চোখ চকচক করতে লাগল। দুলালবাবু তিন-চারটে বাটি বের করে নিলেন। তারপর চেয়ার-টেবিলে বসে মহানন্দে খেতে শুরু করে দিলেন।

হঠাৎ দরজার কাছে একটা শব্দ হল। দুলালবাবু তাকিয়ে দেখলেন, একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে।

দুলালবাবু লোকটাকে গ্রাহ্য না করে খেয়ে যেতে লাগলেন।

৫. নন্দবাবু রান্নাঘরে

নন্দবাবু রান্নাঘরে এত রাতে কাউকে দেখবেন বলে আশা করেননি। মনে তাঁরও ভয়। চুরি করে খেতে এসে ধরা পড়লে কেলেঙ্কারির একশেষ। কিন্তু উঁকি না দিয়েও পারেননি। এত রাতে চোরটোর কেউ যদি ঢুকে পড়ে থাকে তা হলে তো মুশকিল। নন্দবাবু চোরকেও কিছু কম ভয় পান না। চোরদের ধর্মবোধ নেই, মায়াদয়া নেই, বিপদে পড়লে তারা খুন-জখমও করে থাকে বলে তিনি শুনেছেন।

তাই খুব সাবধানে দেওয়ালের আড়াল থেকে উঁকি মেরে দেখে নিলেন, ভিতরে লোকটা কে।

যা দেখলেন, তাতে তাঁর চক্ষুস্থির হয়ে গেল। ঝুলে পড়ল চোয়াল। হাঁ-মুখের মধ্যে একটা উড়ন্ত মশা ঢুকে চক্কর খেতে লাগল। স্বপ্ন দেখছেন নাকি? দুলাল স্যার এত রাতে তাঁদের রান্নাঘরে ঢুকে খাচ্ছেন এ তো পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্যের ঘটনা!

এখানে বলে রাখা ভাল, দুলাল স্যারকে যে ভুবন রায় ল্যাবরেটরির কাজে লাগিয়েছেন, এটা নন্দবাবুর জানা ছিল না। জানা অনেকেরই ছিল না। কারণ ভুবন রায় যখন যা খুশি করতে ভালবাসেন, কাউকে কিছু জানানোর দরকার আছে বলে মনে করেন না।

নন্দবাবু চোখ কচলালেন, নিজের গায়ে চিমটি দিলেন। তারপরও তাকিয়ে দেখলেন, সেই একই দৃশ্য। দুলালবাবু খাচ্ছেন। এবং পরিমাণটাও ফ্যালনা নয়। এরকম রোগা মানুষ অতটা বিরিয়ানি বা মাংস কী করে খাবেন, সেটাও একটা মস্ত প্রশ্ন।

এই প্রশ্নটা মাথায় উকুনের মতো কুটকুট করতে থাকায় নন্দবাবু ভারি ভাবিত হয়ে মাথা চুলকোতে গেলেন, ফলে কনুইয়ের ধাক্কায় দরজা খচাং করে নড়ে উঠল এবং দুলালবাবু তাঁর দিকে একবার চেয়ে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে চোখটা সরিয়ে নিয়ে ফের খেয়ে যেতে লাগলেন।

ছাত্রবয়সে নন্দবাবু দুলালবাবুর কাছে পড়েছেন। নন্দবাবু ছাত্র হিসেবে তেমন সুবিধের ছিলেন না। তার ওপর বাঁদর ছেলে বলে নাম-ডাকও ছিল। দুলালবাবুর হাতে বিস্তর চড়-চাপড় আর বেত খেয়েছেন এককালে। ভারি রাগী লোক। এখনও দুলালবাবুর প্রতি সেই ভীতিটা তাঁর রয়ে গেছে।

কিন্তু দৃশ্যটা স্বপ্ন না বাস্তব? তার একটা ফয়সালা হওয়া দরকার। তাই নবাবু খুব কষে গলাখাঁকারি দিয়ে মৃদু স্বরে অতিশয় বিনয়ের সঙ্গে বললেন, “ইয়ে…..।”

দুলালবাবু বিরিয়ানির ভিতর থেকে একটা মোটা হাড় খুঁজে পেয়ে আরামে চিবোতে-চিবোতে একবার তাঁর দিকে চেয়ে দেখে নিলেন। কিন্তু কোনও কথা বললেন না। ইয়ে….. তো কোনও প্রশ্ন নয় যে, জবাব দিতেই হবে।

নন্দবাবু ফের মাথা চুলকোলেন এবং আর একটু সাহস সঞ্চয় করে বললেন, “স্যার, ভাল আছেন তো!”

দুলালবাবু একথাটারও জবাব দিলেন না। ফুলকপির রোস্টটা আজ খুব উতরেছে। এক কামড় খেয়েই তাঁর চোখ বুজে এল আরামে।

নন্দবাবু এবার ঘরের মধ্যে সাহস করে ঢুকলেন। তারপর একগাল হেসে বললেন, “স্যারের দেখছি বেশ খিদে পেয়েছে!”

দুলালবাবু এবার লোকটার দিকে বিরক্তির সঙ্গে চেয়ে বললেন, “চুপ করে বোসো। খাওয়ার সময় কথাটথা বলতে নেই।”

নন্দবাবু মাথা নেড়ে গম্ভীরভাবে বললেন, “বটেই তো।”

বলে সামনেই খুব সাবধানে বসলেন। স্যারের সামনে জীবনে কখনও চেয়ারে বসেননি। তবে এখন বয়স-টয়স হয়েছে, তাই বসলেন। বসে চোখের পাতা ফেলতে পারলেন না।

দুলাল-স্যার অন্তত আধসের মাংস আর সেরটাক বিরিয়ানি সাফ করে দিয়েছেন। অন্যান্য উপকরণও সেই পরিমাণে। সবশেষে উনি জমাটি এক জামবাটি ভর্তি পায়েস খুবই স্নেহের সঙ্গে কাছে টেনে নিতেই নন্দবাবুর মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, “বাব্বাঃ”!

দুলালবাবু ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি কে?”

নন্দবাবু একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। দুলালবাবুর তাঁকে না-চেনার কথা নয়। দিন-তিনেক আগেও বাজারে দেখা হয়েছে দুলালবাবু উবু হয়ে বসে মন দিয়ে বাছছিলেন। নন্দবাবুকে দেখে বলে উঠলেন, “কী রে হনুমান, আঁকটাক ঠিকমতো করছিস তো!”

নন্দবাবুর আর আঁক কষার দরকার নেই। কিন্তু সে কথা সেদিন আর বলতে সাহস হয়নি।

তা এই কদিনেই এমন কী হল যে, দুলাল স্যার তাঁকে চিনতে পারছেন না? নন্দবাবু ফের মাথা চুলকে বললেন, “আমি নন্দ, স্যার। আমাকে চিনতে পারছেন না?”

দুলালবাবু ভ্রূ কুঁচকে নন্দবাবুর মুখের দিকে চেয়ে থেকে বললেন, “নন্দ?”

“হ্যাঁ স্যার। নন্দলাল রায়।”

দুলালবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “বাঃ, নামটা তত বেশ। তা কত দাম পড়ল?”

নন্দবাবু অবাক হয়ে বললেন, “কিসের দাম?”

“নামটা তো কিনতে হয়েছে বাপু। আমি পাঁচু নামটা কিনেছি পাঁচ টাকায়। লোকটা ভাল, ইচ্ছে করলে আরও বেশি চাইতে পারত।”

নন্দবাবু মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে না পেরে বললেন, “নাম কিনেছেন?”

“না কিনে করি কী বলল, নাম ছাড়া কি কাজ চলে?”

“কেন স্যার, আপনার নাম তো দুলাল সেন!”

“দুলাল সেন! আমার নাম আবার কবে দুলাল সেন ছিল?”

“ছিল কেন স্যার, এখনও আছে। আপনি তো জলজ্যান্ত দুলাল সেন।”

দুলালবাবু একটু ভাবলেন। তারপর পায়েসের বাটি থেকে এক খাবলা তুলে খেতে-খেতে বললেন, “তা সেটা আগে বলতে হয়। পাঁচ-পাঁচটা টাকা গচ্চা দিয়ে একটা নাম কিনে ফেলেছি, সেটা তো আর ফেলে দিতে পারি না। তুমি বরং দুলাল সেন নামটা কিনে নাও, ওই পাঁচ টাকাই দিও। প্রতি অক্ষরে এক টাকা করে, জলের মতো সোজা হিসেব।”

নন্দবাবুর সন্দেহ হল, দুলালবাবুর মাথার একটু গণ্ডগোল দেখা দিয়েছে। এরকম হতেই পারে। নন্দবাবু সারা জীবন কেবল আঁক কষে গেছেন আর ঝুড়ি ঝুড়ি বিজ্ঞানের বই পড়ে গেছেন। অত বই পড়লে আর আঁক কষলে মাথা খারাপ হতেই পারে।

নন্দবাবু দুঃখিতভাবে জিব দিয়ে একটু চুকচুক শব্দ করে বললেন, “আহা।” দুলালবাবু এবারও ভ্রূ কুঁচকে নন্দবাবুর দিকে চাইলেন। তারপর বললেন, “তা হলে কিনছ?”

নন্দবাবু মাথা চুলকে বললেন, “আমার তো নাম একটা আছে স্যার। একটা থাকতে আর একটা নাম কেনা কি উচিত?”

“তোমার নামটা যেন কী বললে!”

“আজ্ঞে নন্দদুলাল রায়।”

নাক কুঁচকে দুলালবাবু বললেন, “বাজে নাম। বিশ্রী নাম। পচা নাম। দুলাল সেন নামটা কত সুন্দর। তোমাকে বেশ মানাবেও হে। শস্তায় দিচ্ছি।”

নন্দবাবু সাধারণত কারও সঙ্গে রঙ্গরসিকতা করেন না। তাতে মনটা লঘু হয়ে যায়। তবু এখন কেমন যেন একটু রসিকতা করার লোভ সামলাতে পারলেন না। বললেন, “আজ্ঞে শস্তা কোথায়? বেজায় আক্রা। প্রতি অক্ষর দশ পয়সা দরে পাওয়া যায়।”

দুলালবাবু হাঁ করে চেয়ে থেকে বললেন, “বলো কী? নরহরি যে বলল, অক্ষর একটাকা করে!”

“নরহরি কে স্যার?”

“সে আমার শাকরেদ। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।”

“কিসের শাকরেদ?”

“আমরা চুরি করতে বেরিয়েছি। খুব ভাল কাজ। সোজাও বটে।”

নন্দবাবু চোখ গোল করে বললেন, “চুরি!”

দুলালবাবু একগাল হেসে বললেন, “খুব সোজা কাজ। লোকের বাড়ি ঢুকে সব জিনিসপত্র চুপিচুপি সরিয়ে ফেলতে হয়। সেগুলো নরহরিই বেচে পয়সা এনে দেবে। তুমিও আমাদের সঙ্গে নেমে পড়ো কাজে। চুরি করলে বুদ্ধি বাড়ে, সাহস বাড়ে, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব বাড়ে, চোখ কান-নাক সব সজাগ হয়। চুরির মতো জিনিস নেই।”

“বলেন কী স্যার? এ যে ভূতের মুখে রাম নাম।”

“তার মানে কী?”

“আপনি যে খুবই সাধু লোক ছিলেন। পঁচিশ বছর আগে কার কাছ থেকে যেন একটা পোস্টকার্ড ধার করে বাবাকে চিঠি লিখেছিলেন, পঁচিশ বছর ধরে সেই পোস্টকার্ডের জন্য আপনার মানসিক যন্ত্রণা হত। পরে সেই লোকটার ছেলেকে খুঁজে বের করে একটা পোস্টকার্ডের ধার শোধ করেছিলেন! এ গল্প আপনি নিজেই আমাদের বলেছিলেন।”

দুলালবাবু দ্রুতবেগে জমাট পায়েস খেতে-খেতে ভারি আরাম বোধ করতে করতে বললেন, “পোস্টকার্ড! সেটা কী জিনিস বলো তো!”

নন্দবাবু খুবই হতাশ হয়ে দুলালবাবুর দিকে চেয়ে রইলেন।

দুলালবাবু পায়েসের বাটি শেষ করে একটা ঢেকুর তুলে বললেন, “বাঃ, দিব্যি খাওয়া হল। এবার কাজ।”

“কী কাজ স্যার?”

“বাসনপত্রগুলো সব চুরি করতে হবে। আর গয়নাগাঁটিও। চলো তো ছোঁকরা, আমার সঙ্গে একটু হাত লাগাবে। নরহরি বাইরে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে।”

নন্দবাবু হাসবেন কি কাঁদবেন তা বুঝতে পারলেন না। স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলেন। দুলাল সেন তাঁর চোখের সামনেই বাসনপত্রগুলো গুছিয়ে পাঁজা করে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। বলে গেলেন, “এগুলো চালান করে দিয়েই ফের আসছি এবাড়িতে দেখছি মেলাই জিনিস।”

দুলালবাবু খোলা জানালাটার কাছে এসে আহ্বাদের গলায় ডাকলেন, “নরহরি।”

সঙ্গে সঙ্গে জানলায় পাঁচুর ছায়া উদয় হল।

“এই যে ধরো। আরও জিনিস আছে।”

পাঁচু বাসনগুলো নিয়ে খুশি হয়ে বলল, “বড় সময় নিচ্ছেন যে পাঁচুবাবু। আরও একটু তাড়াতাড়ি করলে হয় না?”

দুলালবাবু হেসে বললেন, “খাচ্ছিলুম তো। বেশ খাওয়া হল। তাও তাড়াতাড়িই হত, একটা লোক এসে খামোখা নানা কথা জুড়ে দিল।”

আঁতকে উঠে পাঁচু বলল, “লোক! বলেন কী! তা হলে তো ধরা পড়ে গেছেন।”

“আরে না। তাকেও দলে ভিড়িয়েছি। সে এখন গয়নাগাঁটি নিয়ে আসছে।”

পাঁচু অবিশ্বাসের চোখে চেয়ে থেকে বলল, “কাজটা ঠিক করেননি পাঁচুবাবু। চুরির সময় অন্যদিকে মন দিতে নেই।”

দুলালবাবু একটু লজ্জা পেয়ে বললেন, “আচ্ছা, এবার মন দিয়েই চুরি করছি।”

পাঁচু বাসনগুলো নিয়ে গামছায় পোঁটলা বেঁধে ফেলল। তার মনে হল, এবারে সরে পড়াই বুদ্ধিমানের কাজ। লোকটা পাগল। ধরা পড়তে আর দেরি নেই। যা বাসনপত্র পেয়েছে পাঁচু তা বেচলে চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা হেসেখেলে হয়ে যাবে। বেশি লোভ করা ভাল নয়।

পাঁচু বাসনের পোঁটলাটা পিঠে ফেলে রওনা দিল।

আর হঠাৎ দুটো লোহার মতো হাত এসে পিছন থেকে জাপটে ধরল তাকে।

.

আচমকা ধরা পড়ে পাঁচু আঁতকে উঠেছিল ঠিকই, তবে বহুদিনের শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতার ফলে ঘাবড়ে গেল না। চেঁচামেচিও করে উঠল না। শুধু বজ্র আঁটুনিতে ‘কোঁক, কোঁক’ করে কয়েকটা শব্দ বেরোল মুখ দিয়ে। পাঁচু খুব বেকায়দায় পড়ছে। বুঝতে পেরে অমায়িক হেসে মোলায়েম গলায় বলল, “কে রে তুই দাদুভাই, অমন করে কি ধরতে আছে রে? বুড়ো হয়েছি না? তার ওপর এই দ্যাখ দাদুভাই, তোর ঠাকুমা একগাদা বাসন ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে বলল, যাও, বেয়াইবাড়ি পৌঁছে দিয়ে এসো। তা মাইল তিনেক পথ হেঁটে এই একটু জিরেন নেব বলে। ভাবছিলাম।”

পিছন থেকে যে সাপটে ধরে আছে সে এবার ক্রুদ্ধ গলায় বলল, “তুমি একটা জোচ্চর!”

পাঁচু জিভ কেটে বলল, “ওকথা বলবেন না বাবুমশাই। এই ভোরবেলায় দেবতারা সব বেড়াতে বেরোন কিনা। শুনে ফেলবেন। আর শুনলেই চিত্তির। সোজা স্বর্গে ফিরে গিয়ে আমার পুণ্যির খাতে যা জমা হয়েছিল সব ঢ্যাঁড়া মেরে দেবেন। এই ভোরবেলাটায় তাই পাপ কথা বলতে নেনই। পাপ কাজও করতে নেই।”

“কিন্তু তুমি যে জোচ্চোর!”

পাঁচু চাপের চোটে দমসম হয়ে পড়েছিল। আর কয়েকবার কোঁক-কোঁক শব্দ করে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “আজ্ঞে, আপনি যদি খুশি হন তা হলে বলি, আমি জোচ্চোরই বটে। এবারে ফাঁসটা একটু আলগা করুন, নইলে যে খুনের দায়ে ধরা পড়বেন বাবুমশাই।”

“নামের দাম অক্ষর-প্রতি কত ঠিক করে বলো তো এবার বাছাধন।”

ভয়ের চোটে এতক্ষণ গলাটা চিনতে পারছিল না পাঁচু, যদিও চেনা-চেনা লাগছিল। এবার চিনতে পেরে একগাল হেসে বলল, “ওঃ, পাঁচুবাবু নাকি? তা এই তো এক পাঁজা বাসন গস্ত করলেন, দিব্যি হাত হয়েছে, এর মধ্যে হঠাৎ আবার মেজাজ বিগড়োল কেন?”

দুলালবাবু অত্যন্ত ক্রুদ্ধ গলায় বললেন, “নন্দবাবু বলেছে, নামের দাম প্রতি অক্ষরে দশ পয়সা। আর তুমি জোচ্চুরি করে নিয়েছ এক টাকা করে।”

পাঁচু অত্যন্ত বিনয়ী গলায় বলল, “নামের বাজার এবেলা-ওবেলা ওঠানামা করে। তবু বলি পাঁচুবাবু, উটকো লোকের কথায় না নাচাই ভাল। নন্দবাবু নামের জানেটা কী? আর নানান নামের নানান দর। পাঁচু নামটা কি যেমন-তেমন নাম? চন্দ্রবিন্দু থাকলে নামের দর একটু বেশি পড়েই যায়। দেখে আসুন না নামের বাজারটা। এবার যদি দয়া করে একটু ছাড়েন তো ভাল হয়। হাড়গোড় যে গুঁড়িয়ে গেল পাঁচুবাবু।”

দুলালবাবু ছাড়লেন। বললেন, “তা হলে জোচ্চুরি করোনি?”

জিভ কেটে পাঁচু বলল, “আপনার সঙ্গে! কী যে বলেন।”

“জোচ্চুরি না করলে পালাচ্ছিলে কেন?”

চোখ কপালে তুলে বলল, “পালাচ্ছিলুম? কখনো নয়। আমার চোদ্দপুরুষে কেউ কখনও পালায়নি। একটু আলগা দিচ্ছিলুম আর কি!”

‘নন্দলাল যে বলল, ওই যে লোক্টা পালাচ্ছে, গিয়ে ধরুন!”

‘মহা মিথ্যেবাদী। যে নামের দাম নিয়ে জল ঘোলা করে তাকে কি বিশ্বাস করতে আছে?”

“আছে,” বলে হঠাৎ নন্দবাবু হাতে একটা লাঠি নিয়ে এগিয়ে এলেন।

“বাবা গো!” বলে পাঁচু দৌড়তে লাগল। তার পিছু পিছু নন্দবাবু।

দুলালবাবু ঘটনার আকস্মিকতায় একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। কী করা উচিত তা বুঝতে পারলেন না। হঠাৎ তাঁর মনে পড়ল, মেলা কাজ বাকি। এখনও সোনাদানা গয়নাগাঁটি চুরি করা হয়নি। বাড়িটা ভর্তি কেবল জিনিস।

দুলালবাবু আবার জানলা গলে ভিতরে ঢুকে পড়লেন। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই তিনি ঘর থেকে নানা জিনিস বের করে আনতে লাগলেন। জলের কুঁজো, কুলো, কৌটো, ছেঁড়া জুতো থেকে শুরু করে মগ, বালতি কিছুই বাদ দিলেন না। দেখতে দেখতে জানলার বাইরে মেলা জিনিস স্থূপাকার হয়ে জমে উঠল। দুলালবাবু খুব খুশি হলেন। বাঃ, চুরিটা দিব্যি জমে উঠেছে।

দোতলায় উঠে তিনি যখন ভুবন রায়ের ঘরে হানা দিলেন, তখন তিনি চুরির নেশায় হন্যে হয়ে উঠেছেন।

ভুবন রায়ের ঘরে মেলাই জিনিস। তবে বেশির ভাগই বাজে জিনিস। দুলালবাবু অনেক জিনিস নীচে নামিয়ে আনলেন। তারপর তাঁর নজর পড়ল ভুবন রায়ের লোহার আলমারিটার দিকে। কিন্তু আলমারি চাবি দেওয়া।

দুলালবাবু গিয়ে ভুবন রায়কে ডাকাডাকি করতে লাগলেন, “এই যে মশাই, ও দাদু, আলমারির চাবিটা একটু দিন তো! দেরি হয়ে যাচ্ছে যে!”

ভুবন রায়ের ঘুম খুব গাঢ়। সহজে ভাঙে না। কিন্তু এত ডাকাডাকিতে মড়াও উঠে বসে।

দুলালবাবুকে দেখেই ভুবন রায় বললেন, “কিছু আবিষ্কার করে ফেলেছেন নাকি?”

দুলালবাবু একগাল হেসে বললেন, “কত কী!”

“এর মধ্যেই?” বলে ভুবন রায় তাড়াতাড়ি উঠে বসলেন, “তা কী আবিষ্কার করলেন শুনি?”

দুলালবাবু খুব গম্ভীর হয়ে আঙুলের কর গুনে-গুনে বলতে লাগলেন, “প্রথমেই আবিষ্কার করলাম একটা ঝাঁটা। তারপর বিরিয়ানি, ফুলকপি, পায়েস, তারপর জুতো, জামা, কৌটো…”

ভুবন রায় স্বপ্ন দেখছেন কি না বুঝতে না পেরে নিজের গায়ে চিমটি কেটে নিজেই উঃ করে উঠলেন।

দুলালবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, “এখন ওই আলমারির মধ্যে কী আছে সেইটি আবিষ্কার করতে হবে। চাবিটা দিন তো।”

ভুবন রায় ভ্রূকুটি করে বললেন, “আপনি কানে কম শোনেন জানতাম। কিন্তু এতটাই যে কম শোনেন, তা জানা ছিল না। আমি আপনাকে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কাজে লাগিয়েছি, আর আপনি রাতদুপুরে আমার বাড়িতে ঢুকে ঝাঁটা জুতো আবিষ্কার করছেন।”

দুলালবাবু মাথা চুলকোতে লাগলেন, তাঁর মাথাটা যেন কেমন ঝিমঝিম করছে। কানে কম শোনেন! অথচ তিনি তো দিব্যি শুনতে পাচ্ছেন! অথচ কথাটা তাঁর মিথ্যে বলেও মনে হচ্ছিল না। কী যেন তাঁর মনে পড়তে লাগল অল্প-অল্প করে।

ভুবন রায় আবার ধমকের সুরে বললেন, “ছিঃ দুলালবাবু, আপনার কাণ্ডজ্ঞান যে এতটাই কম তা আমার জানা ছিল না।”

দুলালবাবুর মাথাটা খুব রিমঝিম করতে লাগল। একটু আগেও আর একজন তাঁকে দুলালবাবু বলে ডেকেছিল বটে। নামটা তাঁর চেনা-চেনাও ঠেকছে যে!

আচমকাই দুলালবাবুর মাথাটা কেমন যেন বোঁ করে ঘুরে গেল। তিনি চোখে অন্ধকার দেখলেন। তারপর পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারালেন।

ওদিকে নন্দবাবু পাঁচুর পিছনে ছুটতে ছুটতে যেখানে এসে হাজির হলেন, সেটা তাঁদের ভৌত-ক্লাব। ক্লাবের পিছনে সেই ভাঙা বাড়ি। চারদিক ঝিমঝিম করছে, নির্জন।

বুড়ো হলেও লোকটা যে বেশ জোরে দৌড়তে পারে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। আর নন্দবাবু নিজে যে এখনও ভালরকমই দৌড়তে পারেন তা তাঁর জানা ছিল না।

ভৌত ক্লাবের কাছে চোরটা গা-ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করছিল।

নন্দবাবু তাকে ডেকে বললেন, “ওহে নরহরি, তোমার ভয় নেই। পালিও না।”

পাঁচু ওরফে নরহরি একটা গাছের আড়াল থেকে বলল, “ভয় আছে কি নেই, সেটা বুঝব কী করে?”

নন্দবাবু খুশিয়াল গলায় বললেন, “তোমার দৌড় দেখে আমি খুশিই হয়েছি।”

পাঁচু চাপা গলায় বলল, “আজ্ঞে কর্তা, আপনিও কিছু কম যান না।”

নন্দবাবু বললেন, “হেঃ হেঃ, তা বলতে পারো বটে। দৌড়ঝাঁপে আমার কিছু এলেম ছিল এককালে।”

“এখনও আছে।” বলে বিগলিত মুখে পাঁচু শিশুগাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। সে বুঝে গেছে, আজ রাতে এ-শহরে পাগলের সংখ্যা বেজায় রকমের বেড়ে গেছে।

নন্দবাবু ভৌত ক্লাবের ভেজানো দরজাটা ঠেলে খুলে ফেলে বললেন, “এসো, একটু জিরিয়ে নেওয়া যাক। বড্ড জলতেষ্টা পেয়েছে।”

পাঁচুরও যথেষ্ট ধকল গেছে। এই বয়সে এত হুটোপাটি কি সয়? সেও নন্দবাবুর পিছু পিছু ঘরে ঢুকে মেঝের ওপর বসে পড়ল, “যে আজ্ঞে”।

নন্দবাবু মোমবাতি জ্বাললেন, তারপর কুঁজো থেকে জল গড়িয়ে খেলেন। তারপর পাঁচুর দিকে চেয়ে বললেন, “এটা কিসের ক্লাব জানো?”

পাঁচু একগাল হেসে বলল, “তা আর জানব না? এ হল ভুতুড়ে কেলাব।”

“ভৌত-ক্লাব।”

“ওই হল। আপনারা সব সাঁঝের বেলায় এখানে বসে ভূত-প্রেত নামানোর জন্য চেষ্টা করেন। তবে তাঁরা নামেন না।”

নন্দবাবু মাথা নেড়ে দুঃখের সঙ্গে বললেন, “ঠিকই বলেছ, আমাদের একজন তো ভূত দেখার জন্য কত চেষ্টাই করলেন। শালার কাছে তাঁর মুখ দেখানোই ভার হয়েছে।”

পাঁচু খুব হাসল। হাসতে হাসতেই বলল, “আজ্ঞে, ভূতের কোনও অভাব নেই। চারদিকে মেলা ভূত।

নন্দবাবু সোজা হয়ে বসে বললেন, “বলো কী।”

পাঁচু গম্ভীর হয়ে বলল, “আমরা হলুম তো রাতচরা মানুষ। নিশুতি রাতেই আমাদের কাজ কারবার শুরু হয় কি না, আমরা তো বিস্তর ভূত দেখতে পাই।”

নন্দবাবু সাগ্রহে বললেন, “কেমন?”

“এই তো পরশু দিনই নিস্তারিণী ঠাকুমাকে দেখলুম। কদমতলার বেলগাছ থেকে ঠ্যাং ঝুলিয়ে বসে আছেন। গতকালও বগলা দত্তের সঙ্গে দেখা, পুকুরে নেমে চান করছিলেন। তারপর ধরুন, কুমোরপাড়ার মোড়ে যদি যান, দেখবেন নাথু মুচি বসে বসে জুতো সেলাই করছে, তার একটু দূরেই হারা নাপতে চুল ছাঁটছে। তারপর ধরুন, এই ভৌত-ক্লাবের পিছনেই তো গত তিনশো বছর ধরে হরিহর মিত্রমশাই বসবাস করে যাচ্ছেন। সেই চুনোট ধুতি, গোঁফে সেই তুরতুরে আতর, গিলে কলা পাঞ্জাবি, পাঁচ আঙুলে পাঁচখানা আংটি, তেমনি দাপুটে মেজাজ। এখনও কথায় কথায় মোহর বখশিশ করেন, চটে গেলে চাবুক।”

‘অ্যাঁ! তা দেখাতে পারো?”

“সে আর শক্ত কী? তবে কিনা…”

৬. দুলালবাবুর যখন চেতনা ফিরল

দুলালবাবুর যখন চেতনা ফিরল তখন সকাল হয়েছে। ঘরে পুবের জানালা দিয়ে বেশ খানিকটা রোদ এসে ঘরটা ঝলমল করছে আলোয়। আর সেই আলোয় ভুবন রায় ভূত-দেখা চোখে দুলালবাবুর মুখের দিকে চেয়ে কাঠ হয়ে বসে আছেন।

দুলালবাবু নিজের পরিস্থিতিটা বুঝতে একটু সময় নিলেন। তিনি প্রথম যে জিনিসটা বুঝতে পারলেন, সেটা অতিশয় বিস্ময়কর। বাইরে পাখি ডাকছে। বহুঙ্কাল পাখির ডাক শোনেননি। আরও অনেক কিছুই শোনেননি। হঠাৎ পাখির ডাক এত জোরে কানের পর্দায় এসে লাগছিল যে, তিনি দু’কানে আঙুল দিয়ে উঠে বসলেন।

তারপর ভুবনবাবুর দিকে চেয়ে বললেন, “বড্ড বেশি আওয়াজ করছে পাখিগুলো।”

ভুবন রায় এমন কাঠ হয়ে বসে আছেন যে, তাঁকে তাঁর স্ট্যাচু বলে মনে হচ্ছিল। দুলালবাবুর কথায় হ্যাঁ-না কিছুই করলেন না, তবে খানিকটা হাঁ করে যেমন চেয়েছিলেন তেমনিই চেয়ে রইলেন।

দুলালবাবু দুটো কান দুই আঙুলে কিছুক্ষণ খোঁচাখুঁচি করে নিয়ে বললেন, “বেশ খিদেও হচ্ছে মশাই। পেট রীতিমতো চোঁচোঁ করছে।”

কে যেন পিছন থেকে অত্যন্ত বিস্মিত গলায় বলে উঠল, “খিদে? আপনার আবার খিদে পাচ্ছে?”

দুলালবাবু ঘাড়টা ঘুরিয়ে দেখলেন, দরজার কাছে আরও দুটো প্রস্তরমূর্তি। একজন রামলাল, অন্যজন নন্দলাল। দুজনের মুখই একটু করে হাঁ।

দুলালবাবু খুব গম্ভীর হয়ে বললেন, “কেন বাপু, খিদে পাবে না-ই বা কেন? খিদে পেলে কি দোষ হয় কিছু? নাকি তোমাদের বাড়িতে খিদে পাওয়ার নিয়ম নেই? এমন ভাবখানা করছ যে, খিদে কথাটা জীবনে এই প্রথম শুনলে। বলি তোমাদের খিদে-টিদে পায় না?”

দুলালবাবুর এরকম কড়া ধমকানিতে নন্দবাবু বেশ ঘাবড়ে গিয়ে মাথা চুলকোতে-চুলকোতে আমতা-আমতা করে বললেন, “না, খিদের আর দোষ কী? খিদে পেতেই পারে। আমাদেরও পায়। তবে কিনা কাল রাত দুটোর সময় আপনি একাই এক পালোয়ানের ভোজ খেয়েছেন। এত তাড়াতাড়ি আবার খিদে পেয়ে থাকলে ভালই, স্বাস্থ্যের লক্ষণ! তার মানে হজমটজম ভালই হচ্ছে। আর ইয়ে…”

দুলালবাবু নিজের এই বেয়াদব ছাত্রটির দিকে কিছুক্ষণ ভ্রূ কুঁচকে চেয়ে থেকে বললেন, “কাল রাত দুটোয় কে আমাকে ভোজ খাওয়াল বলো তো? আমি

তো নেমন্তন্নবাড়িতে যাওয়া ছেড়েই দিয়েছি।”

নন্দবাবু সখেদে বললেন, “নেমন্তন্ন তো আপনাকে করাও হয়নি স্যার। আপনি নিজেই আমাদের রান্নাঘরে ঢুকে স্বহস্তে নিজেকে পরিবেশন করেছেন। তারপর বাসনগুলো বেঁধে নিয়ে আপনার শাকরেদদের হাতে চালান করে এলেন। সব স্বচক্ষে দেখা।”

দুলালবাবু আর সহ্য করতে পারলেন না। টপ করে দাঁড়িয়ে নন্দলালের গালে চটাস করে একখানা চড় বসিয়ে বললেন, “বাঁদর ছেলে, আবার মিথ্যে কথা বলা হচ্ছে!”

চড় খেয়ে নন্দবাবু চোখে অন্ধকার দেখলেন। ক্রমে সেই অন্ধকারে অনেক সরষে ফুল ফুটে উঠতে দেখলেন। তাঁর পায়ের তলা থেকে মেঝেটাও কে যেন, কার্পেটের মতো টেনে নিল। নন্দলাল কাটা কলাগাছের মতো পড়ে গেলেন।

রামলাল এই কাণ্ড দেখে তড়াক করে দরজার ওপাশে গিয়ে লাফ দিয়ে পড়লেন। একসময়ে তিনিও দুলালবাবুর ছাত্র ছিলেন। আর দুলালবাবুর মস্ত দোষ হল একজন ছাত্র দোষ করলে শুধু তাকে মেরেই ক্ষান্ত হতেন না, আরও দু পাঁচজনকে ফাউ হিসাবে ঠেঙিয়ে নিতেন। সেই কথা রামবাবুর খুব মনে আছে। ভুবনবাবু নীরবে দৃশ্যটা দেখলেন। কয়েক সেকেন্ড হাঁ হুঁ কিছু করলেন না।

তবে হাঁ করে যেমন চেয়েছিলেন, তেমনিই চেয়ে রইলেন দুলালবাবুর দিকে।

দুলালবাবু তাঁর দিকে চেয়ে বললেন, “বেয়াদবটার কথা শুনলেন? আমি নাকি রাত পটোয়….”

ভুবনবাবু একটা মস্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাঁ বন্ধ করলেন। তারপর দুলালবাবুর দিকে চেয়ে বললেন, “বলবান লোক আমি পছন্দই করি দুলালবাবু। আপনার গায়ে যে যথেষ্ট জোর হয়েছে, এতে আমি খুবই খুশি। কিন্তু সত্যকে চাপা দেওয়ার জন্য গায়ের জোর খাটানোটা বোধহয় ভাল কাজ নয়।”

দুলালবাবু মাথা চুলকোতে লাগলেন। বললেন, “আপনার মতো মান্যগণ্য লোককে কী করে বলব। কিন্তু কথাটা ডাহা মিথ্যে।”

ভুবনবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “মোটেই মিথ্যে নয়। কাল যে মাঝরাত্তিরে আপনি রান্নাঘরে ঢুকে খেয়েছেন, তার যথেষ্ট প্রমাণ আছে। আর বাসনকোসনও যে সরিয়েছিলেন তার সাক্ষী হিসেবে পাঁচু মোদক নামে একটা লোককেও নন্দলাল ধরে এনেছে। সে আমাদের নীচের তলার ঘরে বসে রয়েছে।”

দুলালবাবুর চোখ দুখানা বিস্ফারিত হয়ে গেল, “পাঁচু মোদক? কস্মিনকালেও এরকম নাম শুনিনি।”

“শুধু তাই নয় দুলালবাবু, নন্দলালের কাছে ধরা পড়ে নিজেকে আপনি পাঁচু মোদক বলে চালানোর চেষ্টা করেছিলেন। আর আপনি যে চুরি করতেই বাড়িতে ঢুকেছেন, সে-কথাও কবুল করেছেন। ঘটনা অনেক ঘটে গেছে দুলালবাবু, কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনা হচ্ছে, আপনি আমাদের আসল দুলালবাবু নন। আমাদের দুলালবাবু ছিলেন রোগা মানুষ, বুড়ো, কানে একেবারেই শোনেন না, নিরীহ। কিন্তু আপনি রীতিমতো স্বাস্থ্যবান, হিংস্র, সুপুরুষ। সুতরাং আমি জানতে চাই, আপনি লোকটা কে? আর আমাদের আসল দুলালবাবুই বা কোথায় গেলেন? আমার ঘোরতর সন্দেহ, আসল দুলালবাবুকে আপনি গুম করেছেন। খুনও করে থাকতে পারেন।”

দুলালবাবু এত অবাক হলেন যে, মুখ দিয়ে বাক্য সরল না। অনেকক্ষণ বাদে বললেন, “এ-সবের মানে কী? কী সব বলছেন ভুবনবাবু?”

ভুবনবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, “অস্বীকার করছি না যে, আপনার সঙ্গে দুলালবাবুর চেহারার অনেক মিল আছে। কিন্তু মিল থাকলেই যে একজন অন্যজন হয়ে যা-খুশি করবেন, তা তো হয় না!”

দুলালবাবু এবার নিজের দিকে তাকানোর একটা অক্ষম চেষ্টা করলেন। তাঁর মনে হল, তিনি আগের মতো রোগা নেই। হাত-টাতগুলো বেশ সবল আর শক্তিমান দেখাচ্ছে। ছাতিটাও চওড়া মনে হচ্ছে। গায়ে বেশ শক্তি অনুভব করছেন। না, তিনি তো বাস্তবিকই তা হলে দুলাল সেন নন।

দুলালবাবু হঠাৎ বললেন, “আপনার কাছে আয়না আছে!”

ভুবনবাবু পশ্চিমের দেওয়ালে টাঙানো আয়নাটা দেখিয়ে দিয়ে বললেন, “ওই তো!” দুলালবাবু গিয়ে আয়নায় নিজের মুখোনা ভাল করে দেখলেন। সেই আগেকার রোগা ভাঙা বুড়োটে মুখ এ তো নয়। রীতিমতো অল্পবয়সী একটা মুখ। দুলালবাবু হঠাৎ বুঝতে পারলেন, কোথায় একটা বস্ত বড় গণ্ডগোল হয়ে গেছে।

ভুবনবাবু বললেন, “কী হল, আপনি কে তা বুঝতে পারলেন?”

দুলালবাবু দুঃখিতভাবে মাথা নেড়ে বললেন, “না। ঠিক চিনে উঠতে পারছি। অথচ চেনা-চেনা ঠেকছে।”

“তা হলে?”

দুলালবাবু মাথা চুলকে বললেন, “তা হলে…”

ভুবনবাবু অত্যন্ত কঠিন চোখে দুলালবাবুর দিকে চেয়ে বললেন, “তা হলে আপনাকে পুলিশে দেওয়া উচিত কি না?”

নন্দবাবু থাপ্পড় খেয়ে ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন। এবার গালটা হাতের তেলোয় ঘষতে ঘষতে উঠে বসে বললেন, “খুব উচিত।”

দুলালবাবু আর একবার ভাল করে নিজের মুখোনা দেখলেন। প্রথমটায় ঘাবড়ে গেলেও বারবার দেখার পর নিজের মুখোনা তাঁর বেশ পছন্দই হল। এর আগে তাঁর যে রোগা, ভাঙা লম্বাটে, বুড়োটে মুখোনা ছিল, সেটা তাঁর বিশেষ পছন্দও ছিল না। তাই আয়নায় মুখ দেখা তিনি প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। মুখোনা দেখতে-দেখতে তিনি খুশি হয়ে একটু হেসেও ফেললেন। তারপর হঠাৎ বুদ্ধি খাঁটিয়ে বললেন, “কিন্তু পুলিশে দেবেন কাকে? আমি যে কে, সেটাই তো বুঝতে পারছি না।”

ভুবনবাবু গম্ভীর গলায় বললেন, “পুলিশের ভয়ে ওরকম অনেকেই নিজের পরিচয় গোপন করে। তঁতোর চোটে নামধাম সবই শেষে বেরিয়ে পড়ে।”

রামলাল একটু ভয়েভয়ে ফের ঘরে ঢুকে বললেন, “তা ছাড়া কাল রাতে কে বা কারা আমাদের ল্যাবরেটরিতে একটা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। আমার মনে হয়, তাতে আপনার হাত থাকা অসম্ভব নয়। আমার আরও মনে হয়, দুলালবাবু কোনও একটা অত্যাশ্চর্য আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। আর সেটা নষ্ট করার জন্যই আপনি বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন।”

দুলালবাবু নিজের মুখ দেখতে-দেখতে বেশ নেশায় পড়ে গেছেন। বাঃ ভারি ভাল দেখতে লাগছে তো মুখোনা। আর শরীরটাও যেন শক্তপোক্ত দেখাচ্ছে। গায়ে-গতরে যেন শক্তির একটা বন্যা বয়ে যাচ্ছে। হাত-পা নিশপিশ করছে কিছু একটা করে ফেলার জন্য। তিনি সুতরাং হাতের গুলি ফুলিয়ে রামলালের দিকে দু’পা এগিয়ে গিয়ে বললেন, “কিন্তু আমাকে আটকে রাখবে কে? পুলিশের হাতেই বা তুলে দেবে কে? তুমি নাকি?”

রমলাল সভয়ে দু’পা পেছিয়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি নন্দবাবুর দিকে আঙুল তুলে বলে উঠলেন, “আমি না, ও।”

“বটে!” বলে দুলালবাবু নন্দলালের দিকে ফিরে দাঁড়ালেন।

নন্দবাবু খুব অবাক হয়ে বললেন, “আমি মোটেই বলিনি যে, আপনাকে আটকে রাখব। কোন্ দুঃখে বলুন?”

দুলালবাবু একটা হুঙ্কার দিয়ে বললেন, “পুলিসকে খবর দিয়েছে কে?”

রামলাল কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে উঠলেন, “কেউ দেয়নি। দেওয়ার কথা ভাবিনি পর্যন্ত আমরা।”

নিজের দুই কাপুরুষ সন্তানকে খুব সমালোচকের চোখে লক্ষ করছিলেন ভুবন রায়। তাঁর ছেলে হয়ে এরা যে কেন এত ভীরু আর দুর্বলচিত্ত হল, তা তিনি বুঝে উঠতে পারলেন না।

কিন্তু ভুবন রায় নিজে কাপুরুষ নন। রীতিমতো সাহসী ও সক্ষম। সুতরাং তিনি বললেন, “দেখুন মশাই, আপনাকে আমিই পুলিশে দেব বলেছি।”

দুলাল সেন হো-হো করে হেসে উঠলেন। তারপর বুক ফুলিয়ে বললেন, “পুলিশ আসার আগেই আমি সরে পড়ছি। যদি পারেন তো আটকানোর চেষ্টা করুন।”

এই বলে দুলালবাবু দরজার দিকে এগোতেই ভুবনবাবু তাঁর মজবুত বেতের লাঠিটা বাগিয়ে পথ আটকালেন। দুলাল সেন অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ভুবন রায়ের হাত থেকে লাঠিটা ছিনিয়ে নিয়ে স্রেফ দু’হাতের চাপে মটাত করে দুমড়ে ফেললেন। তারপর গটগট করে দরজা দিয়ে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে হাওয়া হয়ে গেলেন।

নন্দলাল, রামলাল আর ভুবনবাবু পরস্পরের দিকে তাকিয়ে কী বলবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না।

.

ভুবনবাবু যে চটেছেন, তা তাঁর কান দেখলেই বোঝা যায়। ভুবন রায়ের কান তখন নড়ে। ভয়ঙ্কর রেগে গেলেই এটা হয়।

তিনি তাঁর দুই অপদার্থ ছেলের দিকে রোষকষায়িত-লোচনে চেয়ে কিছুক্ষণ তাঁদের ভস্ম করে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। তারপর অতিশয় শীতল কঠিন গলায় বললেন, “তোমরা অপদার্থ, ভীরু এবং কাপুরুষ। তোমাদের মতো ছেলেকেই শাস্ত্রে কুলাঙ্গার বলা হয়ে থাকে রামলাল!”

“যে আজ্ঞে।”

“দুলালবাবুর লাশ যেভাবেই হোক খুঁজে বের করতে লেগে যাও। মনে রেখো, লাশ পাওয়া না গেলে তোমার অন্নজল বন্ধ, নন্দলাল!”

“আজ্ঞে বলুন।”

“তুমি অত্যন্ত অকর্মণ্য আর বায়ুগ্রস্ত হয়ে পড়ছ। তোমার ভিতরে একটা ভালরকম ওলটপালট দরকার। যাও, নীচে ভিতরের ঘেরা মাঠে একনাগাড়ে দেড়শো ডিগবাজি খাও। গুনে-গুনে দেড়শো। আমি জানালা নিয়ে নজর রাখব।”

রামলাল আর নন্দলাল দু’জনেই মাথা চুলকোতে লাগলেন। কিন্তু জানেন, ভুবন রায়ের আদেশ অমান্য করলে ঘোরতর সমস্যা দেখা দেবে।

রামলাল কাঁচুমাচু মুখে বললেন, “ইয়ে আমার মনে হচ্ছে দুলালবাবু মরেননি। কাজেই তাঁর লাশও পাওয়া যাবে না।”

“দুলালবাবু যদি না-ই মরে থাকেন, তবে গেলেন কোথায়?”

রামলাল এই প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারলেন না। তাই মাথা চুলকোতে-চুলকোতে লাশ খুঁজতে বেরিয়ে পড়লেন।

নন্দবাবু বিরস মুখে ভিতরের ঘেরা-মাঠে নেমে সভয়ে চারদিকে চেয়ে দেখলেন। ভাইপো-ভাইঝিরা কাছাকাছি আছে কি না। তারপর নিতান্তই অনিচ্ছের সঙ্গে এবং রাগে গরগর করতে করতে ডিগবাজি খেতে শুরু করলেন।

দেখতে-না-দেখতে পিলপিল করে ভাইপো-ভাইঝি, ভাগ্নে-ভাগ্নিরা এসে জুটে গেল চারদিকে। এত বড় একটা মানুষকে প্রকাশ্যে ডিগবাজি খেতে তারা কখনও দ্যাখেনি।

“ও কাকু, তুমি ডিগবাজি খাচ্ছ কেন?”

“কাকু, তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল?”

“মামা গো, তুমি তো দিব্যি ডিগবাজি খেতে পারো দেখছি!”

নন্দবাবু হাসি-হাসি মুখে করে বললেন, “ডিগবাজি খাওয়া খুব ভাল। সাহেবরা বলে, ডিগবাজিতে স্মৃতিশক্তি বাড়ে, গায়ে জোর হয়, খিদে হয়।”

“তা হলে আমরাও খাই?”

“যা-না, খা। যত খুশি খা।”

সঙ্গে সঙ্গে মাঠময় ডিগবাজির হররা পড়ে গেল। এতে নন্দবাবুর মনের জ্বালাটা একটু জুড়োল। বেশ ভালই লাগতে লাগল তাঁর। দেড়শোর জায়গায় তিনি ও শ’দুই ডিগবাজি খাবেন বলে মনে-মনে স্থির করে ফেললেন।

ওপরের জানালা দিয়ে দৃশ্যটা খুব মনোযোগ দিয়েই দেখলেন ভুবন রায়। দেখতে-দেখতে তাঁর শৈশবের স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল। ডিগবাজি খাওয়া, আর্চ করা, ব্যাঙ লাফ দেওয়া, কত কী করেছেন ছেলেবেলায়।

ভুবন রায় আর থাকতে পারলেন না। দোতলা থেকে তরতর করে নেমে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে ডিগবাজি খেতে শুরু করলেন।

কাণ্ড দেখে নন্দবাবু ভয়ে জড়োসড় হয়ে বললেন, “বাবা, করছেন কি? এই বয়সে ডিগবাজি খাচ্ছেন, কোমর-টোমরে লেগে যাবে যে!”

ভুবন রায় ভ্রূ কুঁচকে বললেন, “এ তো তোমাদের মতো পলকা কোমর নয়। ভুবন রায়ের কোমরের ওপর ইমারত তোলা যায় বুঝলে! দেখলুম তো, মাত্র দেড়শোটা ডিগবাজি খেতেই তোমার জিভ বেরিয়ে গেল। দেখবে, সত্যিকারের ডিগবাজি কাকে বলে? তবে দ্যাখো।” বলে ভুবনবাবু আবার টপাটপ ডিগবাজি খেতে লাগলেন।

এমন সময় ওপর থেকে একজন দাসী এসে বলল, “কতাবাবু আপনার মা আপনাকে আর ডিগবাজি খেতে মানা করে দিয়েছেন।”

ভুবনবাবু মাকে ভক্তিও করেন, ভয়ও খান। সুতরাং ক্ষান্ত দিলেন। নাতি নাতনিরা ভুবনবাবুকে ভয়ঙ্কর ভয় পায়। তাঁর ডিগবাজি দেখে সবাই হকচকিয়ে গিয়েছিল। ভুবনবাবু চলে যাওয়ার পর ফের সবাই হল্লা শুরু করে দিল।

একটা ঝোঁপের আড়াল থেকে রামলাল সন্তর্পণে ভুতোকে ডাকলেন, “ভুতো, ভুতো, শুনে যা বাবা।”

ভুতো একটু অবাক হয়ে এগিয়ে গেল, “কী বলছেন?”

“একটু এদিকে আয়। তোর সঙ্গে একটা গোপন কথা আছে।” রামলাল ভুতোকে নিয়ে ল্যাবরেটরিতে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে একগাল হাসলেন।

“তুই বেশ ভাল ছেলে।”

ভুতো এই প্রশংসাবাক্যে খুবই অবাক হল। কারণ, রামলাল বিজ্ঞানের লোক বলে ভুতোকে মোটেই পছন্দ করেন না। ভুতোকে যে পরি নিয়ে গিয়েছিল বা ভুতো যে অনেক সময় অনেক অশৈলী কথা বলে ফেলে, তাকে তিনি বুজরুকি বলেই মনে করেন। আর ভুতো এইসব কারণে রামলালের চক্ষুশূল। কাজেই আজ এই সমাদর দেখে ভুতো মনে-মনে প্রমাদ গুনল।

রামলাল ওপরের দিকে চেয়ে খানিকক্ষণ গলা চুলকোলেন। তারপর বললেন, “বুঝলি ভুতো, আমাদের দুলালবাবু এই ঘরেই রাতে কোনও এক সময়ে, মানে, কী যে হয়েছিল, তা আমি ঠিক জানি না। তবে সকাল থেকে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বুঝলি?”

ভুত চোখ গোল করে বলল, “ভাল করে খুঁজে দেখেছেন?”

রামলাল মাথা নেড়ে বললেন, “না, খুঁজে এখনও দেখিনি অবশ্য। তবে দেখে লাভও নেই। বলছিলাম কি, ভুতো, তোর তো সব ইয়েটিয়ে আছে শুনতে পাই। ওই কী যেন বলে।”

ভুত মাথাটা নীচু করে বলল, “আমার কী আছে?”

রামলাল খুব আমতা-আমতা করে বললেন, “আমি হলাম তো বিজ্ঞানের লোক, বুঝলি! আমি ওসব বিশ্বাস-টিশ্বাস করি না।”

ভুতো খুব বিনয়ের সঙ্গে বলল, “বিশ্বাস করার দরকার কী?”

রামলাল গলাটা কষে আবার চুলকে নিয়ে বললেন, “না, মানে, বিশ্বাস না করলেও, বলছিলাম কি, বিজ্ঞানের বাইরেও তো কত জিনিস আছে। আমরা আর কতটুকু খবর রাখি বল।”

ভুতো মাথা নেড়ে বলল, “বিজ্ঞানের বাইরে আবার কী থাকবে?”

রামলাল ভুতোর ঘাড়ে হাত রেখে মিষ্টি করে একটু হেসে বললেন, “বলছিলাম কি, যদি দুলালবাবুর একটা হদিস তোর ওই পরিরা দিতে পারে, তবে বড় ভাল হবে।”

ভুতো অবাক হয়ে বলল, “দুলালবাবুর জন্য পরিদের ডাকাডাকি করে কী হবে? আমরা সবাই মিলে খুঁজে ধরে নিয়ে আসছি।”

রামলাল কাঁদো কাঁদো হয়ে বললেন, “তাহলে খুব ভাল হয় বাবা। জ্যান্ত বা মরা যে-কোনও অবস্থাতেই তাকে খুঁজে পাওয়াটা খুব দরকার। নইলে আমাকে কাঠ-উপোস করে থাকতে হবে।”

.

ডিগবাজি খেয়ে ভুবন রায়ের মনটা বেশ প্রফুল্ল হয়ে উঠল। তিনি ভাবলেন, পাঁচু মোদক যদিও চোর এবং অনধিকার অনুপ্রবেশকারী তবু অতিথি তো! একটু খোঁজখবর নেওয়া দরকার।

তিনি যখন তালা খুলে নীচের তলার অন্ধকার ঘরখানায় গিয়ে ঢুকলেন, তখন হাতে লাঠিটা বাগিয়ে ধরা। ট্যান্ডাই-ম্যান্ডাই করলে বা পালাতে চেষ্টা করলে কাজে লাগবে।

ঘরে ঢুকে দেখলেন, পাঁচু মোদক মেঝের ওপর শুয়ে ভোঁস-ভোঁস করে ঘুমোচ্ছে। তবে সাড়া পেয়ে উঠে বসল। পালানোর কোনও চেষ্টাই করল না। প্রকাণ্ড হাই তুলে আড়মোড়া ভেঙে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল, “সারারাত বিস্তর ধকল গেছে মশাই, কাঁচা ঘুমটা কি না ভাঙালেই চলত না?”

ভুবন রায়ের সঙ্গে এরকমভাবে কেউ কথা বলে না। কাজেই তিনি একটু দমে গিয়ে বললেন, “তোমাকে তো ঘুমনোর জন্য ধরে রাখা হয়নি।”

পাঁচু মোদক ‘ফুঃ শব্দ করে গা থেকে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, “ধরে তো রেখেছেন কচু। জানালার তিনটে শিক নড়বড় করছে, পশ্চিমের দেওয়ালটা এক জায়গায় নোনা ধরে ঝুরঝুরে হয়ে আছে। পাঁচুকে ধরে রাখা অত সহজ নয় মশাই। ইচ্ছে করলেই পালাতে পারতুম। শুধু পাগলা বাবুটির খবর না নিয়ে যেতে ইচ্ছে করল না বলেই এখনও আছি।”

“বটে!”

পাঁচু মাথা নেড়ে বলল, “তা বাবু, এটা কি ভিখিরির বাড়ি, নাকি হাড় কেপ্পনের আচ্ছা?”

“কেন বলো তো?”

“সকাল থেকে দাঁতে দানাটা কাটিনি, কেউ একটু খবরও নিল না মশাই। এটা কী রকম ব্যবহার আপনাদের?”

ভুবন রায় এবার লজ্জিত হলেন। চোর-ছ্যাচড় যাই হোক, একটু তদারক করা দরকার ছিল।

ভুবন রায় বললেন, “কিছু মনে করে না বাপু, ঝামেলায় একটু দেরিই হয় গেছে। বোসো, খাবারের ব্যবস্থা হচ্ছে।”

পাঁচু গম্ভীর গলায় বলল, “একটু মোটা ব্যবস্থাই করবেন। গরিবের খিদে একটু বেশি কিনা।”

ভুবন রায় কাজের লোকদের ডাকাডাকি করলো জলখাবারের হুকুম হল। এবং একটু বাদে ছ’খানা গরম রুটি আর আলু-কপির তরকারি সাজিয়ে দেওয়া হল পাঁচুর সামনে।

পাঁচু ঠা-ঠা করে হেসে উঠে বলল, “ছ’খানা! ছ’খানা! উরে বাবা, হাসতে হাসতে মরে যাব। এ যে আমার চেয়ে গরিব লোকের বাড়ি, অ্যাঁ!

ভুবন রায় উত্তেজিত হয়ে বললেন, “এটা কি মামার বাড়ি নাকি হে বেয়াদব? ওই ছ’খানার বেশি একখানাও আর নয়। বেশি খাওয়া আমি একদম পছন্দ করি না।”

পাঁচু আর দ্বিরুক্তি না করে খাওয়া শুরু করে দিল। বলল, “একটু চা পাব। তো কাবাবু? বেশ বড় এক গেলাস? চায়ে অভ্যেস অবশ্য আমার নেই। দুধই খাই, তা আপনাদের মতো কেপ্পনের বাড়িতে তো আর দুধের আশা নেই। চা দিয়েই চালাতে হবে। তবে একটু যেন বেশি করে দুধ দিয়ে করে, দেখবেন।”

খাওয়া শেষ করার পর চায়ের গেলাসটি হাতে নিয়ে পাঁচু খুব ভাবুকের মতো ভুবনবাবুর দিকে চাইল।

ভুবনবাবু আগাগোড়া তার হাবভাব তীক্ষ্ণ নজরে দেখে নিচ্ছিলেন। লোকটাকে তাঁর খুব উঁচুদরের ঘড়েল বলে মনে হচ্ছিল। অমায়িক, কিন্তু সাঙ্ঘাতিক ধূর্ত।

ভুবনবাবু গলাখাঁকারি দিয়ে তৈরি হলেন। বললেন, “দ্যাখো বাপু, তুমি অত্যন্ত পাজি লোক। তোমার ব্যবস্থা পরে হবে। কিন্তু তোমার শাগরেদটির পরিচয় আমাদের আগে দরকার।”

পাঁচু একটু গম্ভীর হয়ে বলল, “বললে প্রত্যয় হবে না, কিন্তু আমার শাগরেদ টাগরেদ নেই। আগে দু-চারজনকৈ শাগরেদ করে খুব শিক্ষা হয়েছে কিনা, শিখিয়ে-পড়িয়ে যেই মানুষ করলাম অমনি যে-যার নিজের পথ দেখা। তারপর মশাই সেই শাগরেদদের সঙ্গেই পাল্লা টানতে হল। একবার তো গোপেশ্বর ঘটকের ঠাকুরদালানে সেঁদিয়েছি, অমনি ষণ্ডা দারোয়ানটা মহা শোরগোল তুলল। তখন করি কী? তাড়াতাড়ি কুম্ভক করে একেবারে ব্যাঙের মতো চ্যাপটা হয়ে বিগ্রহের সিংহাসনের তলায়, মশাই কী বলব, বেড়ালেরও যেখানে সেঁধোবার জায়গা নেই সেখানে ঘাপটি মারতে গিয়ে দেখি আর এক মক্কেলও সেখানে কুম্ভক করে পড়ে আছে। কার এত ক্ষমতা দেখতে গিয়ে কী দৈখলম জানেন? আমারই এক শাগরেদ। বড় ঘেন্না হল মশাই জীবাটার ওপর। একবার তো ঠিক করেই ফেললুম যে, এ-ব্যবসা আর নয়। কিন্তু নেশাট এমন যে…..”

“তা হলে লোকটি কে?”

পাঁচু চা শেষ করে একটা ঢেকুর তুলে বল, “মিষ্টিটা বড় কম দিয়েছেন, আর দুধটাও বড্ড টানটান এ চা কি ভদ্দরলোকে খেতে পারে? আমাদের চা হবে একেবারে গুড়ে গরগরে, দুধের সর ভাসবে আর চায়ের কাথটিও হবে বেশ ঘন, তবে চা?”

ভুবনবাবু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করলেন তারপর বললেন, “এবার আসল কথায় এস বাপু। বাবুটি কে?”

“আজ্ঞে তা তো আপনাদেরই জানবার কথা। আপনাদের গোয়ালঘরে ভুল করে ঢুকে পড়ে ভারি কেলেঙ্কারিতে পড়ে গিয়েছিলুম। সেইখানে বাবুটিও পড়েছিলেন। ঘরে কেমন যেন বিদঘুঁটে একটা গন্ধ, আর ধোঁয়াটে ভাব। হঠাৎ গা ঝাড়া দিয়ে উঠে আমাকে এমন ধরলেন যে, প্রাণ যায় আর কি। দেখলুম, বাবুটি বোকাসোকা ভালমন্দ গোছের, গোবরগণেশই বলা যায়, ছিটিয়ালও বটেন। কিন্তু মানুষটি বেশ ভদ্র, নিজের নামই তাঁর মনে নেই। আমার বড় কম ধকল যায়নি মশাই বাবুটিকে নিয়ে। তার একটা নাম দিতে হল, কাজটাজও শেখাতে হল, তারপর তো সবই জানেন।”

“তা হলে বাবুটিকে তুমি চেনো না?”

পাঁচু মাথা চুলকে বলল, “একেবারে চিনি না বলাটা কী ঠিক হবে। মুখোনা চেনাই বটে, তবে নামধাম জানি না। আমার আবার বড়লোকদের সঙ্গে কারবার। গরিব গুবোদের তত্ত্ব খুব বেশি জানা নেই। বাবুটি বোধহয় মাস্টারি-টাস্টারি কিছু করতেন।”

ভুবনবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, “ভিজে বেড়াল। যাকগে, প্রশ্ন হল, সেই মাস্টারমশাই গেলেন কোথায়? তাঁকে তো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে আর একটা লোক কোথা থেকে এসে উদয় হয়েছিল, রীতিমত গুণ্ডা প্রকৃতির। লোকটা পালিয়ে গেছে। এই দু’নম্বর লোকটা কে?”

“আজ্ঞে, আমি দু’নম্বরদের কথা কিছু জানি না।”

“খুব জানো। না জানলে চলবে কী করে? এই গুণ্ডা লোকটা দুলালবাবুকে হয় গুম না হয় খুন করেছে।”

পাঁচু মাথা নেড়ে বলল, “অঙ্কটা মিলছে না।”

“তার মানে?”

পাঁচু একগাল হেসে বল্ল, “আপনারা লেখাপড়া জানা লোক তো! তা লেখাপড়া জানা লোকদের একটা ভারি মুশকিল হয়। তারা নিজেদের বুদ্ধি তেমন খাটাতে পারে না। মাথাটা অন্য সব পণ্ডিতদের কাছে বাঁধা রাখা থাকে তো! আপনারা হলেন সব লেখাপড়া জানা লোক! আমাদের মাথায় ওসব আজেবাজে আগডম-বাগডম জিনিস নেই। যা পাবেন তা খাঁটি জিনিস।”

“আচ্ছা বেয়াদব তো।”

পাঁচু গম্ভীর হয়ে বলল, “তা আজ্ঞে বেয়াদবি হয়তো একটু হচ্ছে। কিন্তু আপনাদের বুদ্ধিরও বলিহারি যাই। দুটো লোককে আপনার পেলেন কোথায়? লোক তো একটাই। আপনাদের চোখের সামনেই লোকটা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিল। তারপর যখন পাশ ফিরল তখন সেই লোকটাই অন্য লোক হয়ে গেল কীভাবে?”

ভুবনবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, “আমাদের দুলালবাবু মোটেই চোর ছিলেন। গুণ্ডা তো হওয়ার উপায়ই তাঁর নেই। তা ছাড়া ওরকম হাবভাব আর হাতের গুলিও তার কস্মিনকালে ছিল না। সুতরাং আমাদের চোখে ধূলো দেওয়া অত সহজ নয় হে। লোক দুটোই ছিল। একজন দুলালবাবু, অন্যজন তোমার শাগরেদ।”

পাঁচু মাথাটা নেড়ে নেড়ে খানিকক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, “না মশাই, অঙ্কটা ঠিকঠাক মিলছে না। আমাকেই মেলাতে হবে। এসব আপনাদের কর্ম নয়। বাবুটিকে খুঁজে তো আগে বার করি।”

“তার মানে? তোমাকে কি আমি ছেড়ে দিচ্ছি নাকি? মোটেই ভেবো না যে, চালাকি করে পালাবে। পুলিশ আসছে।”

পাঁচু মিষ্টি করে হেসে বলল, “এজন্যই তো লেখাপড়া-জানা লোকদের কিছু হয় না। মাথাটা খেলে না কিনা। পাঁচু মোদক কি এতই সোজা লোক মশাই? পুলিশ ডেকে তাকে ধরাবেন! গত ষাট বছরে এই শর্মা একবারও পুলিশের হাতে ধরা পড়েনি, তা জানেন?”

ভুবন রায় ভারি অবাক হলেন। ডাকসাইটে ভুবন রায়ের মুখের ওপর কথা বলার মতো বুকের পাটাওয়ালা লোক তা হলে এখনও এই শহরে আছে? তাও আবার একটা ছিচকে চোর! এত অবাক হলেন যে, তিনি কথাই বলতে পারলেন না।

পাঁচু মোদক যথেষ্ট অভিমান-ভরা গলায় বলল, “এইরকম ঘরে আটকে রেখে আপনারা আমাকে কী অপমানটাই না করলেন। পাঁচু মোদককে আটকাতে হলে লোহার ঘর লাগে মশাই। তাও পেরে উঠবেন না। লোহা কেটে পাঁচু ঠিক পালাবে। আমি তো লজ্জায় অধোবদন হয়ে আছি তখন থেকে। মনে-মনে ভাবছি, ওরে পাঁচু, তোর হল কী? তোকে যে এরা কুকুর-বেড়ালের সমান জ্ঞান করছে!”

ভুবনবাবুর গলাধাকরি দিয়ে বললেন, “বেশি কথা বলার দরকার নেই। পুলিশ আসছে! যা বলার তাদের কাছে বোলো।”

“পুলিশের সঙ্গে কথা! ও-বাবা। পুলিশের সঙ্গে কথা বলা শুরুর বারণ। বললে আঠারোবার গঙ্গাস্নান করতে হবে। তা বাবু, পেন্নাম হই, আজকের মতো বিদেয় হচ্ছি।”

এই বলে পাঁচু উঠে দাঁড়াল।

ভুবনবাবু কিছু বুঝে উঠবার আগেই পাঁচু একটা বেড়ালের মতো লাফ দিয়ে জানালায় উঠে চোখের পলকে দু’খানা শিক সরিয়ে বাইরে লাফিয়ে পড়ল।

ভুবনবাবু চেঁচাতে লাগলেন, “পালাল! পালাল! ধর রে তোরা, ধর!”

চেঁচানিতে লোকজন ছুটে এল। কিন্তু ঘটনাটা কী ঘটেছে; তা বুঝতে যে সময়টা গেল, তাতে পাঁচু মোদকের একেবারে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাওয়ার কথা। তবু লোকে লাঠিসোঁটা আর দড়িদড়া নিয়ে খোঁজাখুঁজি করতে বেরিয়ে পড়ল।

রামলাল তাঁর বাবাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “ভগবান যা করেন, মঙ্গলের জন্যই করেন। ওইসব ডেনজারাস লোক যত দূরে থাকে ততই ভাল।”

ভুবনবাবু খ্যাঁক করে উঠলেন, “কাপুরুষের মতো কথা বোলো না। লোকটাকে আমাদের পুলিশের হাতে দেওয়া উচিত ছিল। তোমরা এতগুলো লোক থাকতেও দিনে-দুপুরে সকলের চোখের সামনে দিয়ে একটা জলজ্যান্ত লোক কী করে গায়েব হয়ে যায়, বলতে পারো?”

“লোকটা বোধহয় কোনও ম্যাজিক-ট্যাজিক জানে। কালাচাঁদ সাধু তো দিনে দুপুরে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। সেইরকমই কিছু…”।

ভুবনবাবু ছেলের দিকে কটমট করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, “এই তোমার বিজ্ঞানমনস্কতা? তুকতাক, মাদুলি কবচ, ভূত-প্রেত এইসব যদি বিশ্বাস করতে শুরু করে, তাহলে কী হবে জানো? তোমার ল্যাবরেটরিতে ক’দিন পরে ঘাস গজাবে। হুঁ, উনি আবার বিজ্ঞানী! কুলাঙ্গার কোথাকার!”

রামলাল এই ভর্ৎসনায় খুবই লজ্জিত হয়ে মাথা নিচু করলেন।

কিন্তু কথাটা নাবুর খুব লাগল। তিনি যদিও বাবাকে খুবই ভয় পান, কিন্তু তুকতাক ভূত-প্রেত ইত্যাদির অপমান ঠিক হজম করতে পারলেন না খুবই বিনীতভাবে তিনি বললেন, “কিন্তু বাবা, ওসবই আছে।”

ভুবনবাবু হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, “কী আছে বললে?”

নন্দবাবু আমতা-আমতা করে বললেন, “আজ্ঞে স্বচক্ষেই দেখেছি যে…”

নন্দবাবু ভুবনবাবুর ভাবসাব দেখে দু’পা পিছু হটে বলেন, “আমাদের ভৌত ক্লাবের অনেকেই কিন্তু দেখেছে।”

ভুবনবাব আর একটা হুঙ্কার ছাড়লেন, “ভৌত ক্লাব। কতগুলো পাগল তর ইডিয়ট মিলে একটা গাঁজাখুরি আড্ডা বসিয়েছে, আর তাদের সব গু-গল্প আমাকে বিশ্বাস করতে হবে। তোমার অধঃপতন দেখে আমি অবাক হয়ে যাই। ভূত-প্রেত নিয়ে মানুষ কখন মাথা ঘামায় জানো? যখন তার হাতে কোনও কাজ থাকে না। কাজের লোকেরা কখনও বাজে ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামায় না। বহুদিন নিষ্কর্মা বসে থেকে-থেকে তোমার মাথাটাই অকেজো হয়ে গেছে।”

নবাবু এই অভিযোগের কোনও সদুত্তর খুঁজে পেলেন না। আসলে বলার মতো অনেক কথাই আছে, তবে সেগুলো এখন বললে ভুবন রায় তাঁকে ছিঁড়ে ফেলবেন।

ভুবন রায় তাঁর দুই অপদার্থ পুত্রের দিকে বাঘা চোখে নীরবে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বললেন, “পাঁচু মোদক, তার শাগরেদ আর আমাদের দুলালবাবু- এই তিনজন লোককে খুঁজে বের করা খুবই জরুরি। যদিও আমাদের তেমন কিছু চুরি যায়নি এবং খুনখারাবি বা মারদাঙ্গাও হয়নি, কিন্তু এসব ছোটখাটো ব্যাপারকে উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতে বিপদে পড়তে হবে। আমার তো ঘোর সন্দেহ হচ্ছে, গত কিছুদিন যাবৎ আমি যেসব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার করেছি, সেগুলোর ফর্মুলা বাগানোর জন্যই দুষ্টু লোকের আনাগোনা শুরু হয়েছে।”

এই সময়ে ভুবন রায়ের তৃতীয় পুত্র শ্যামলাল এসে ঘরে ঢুকল।

শ্যামলালকে বাইরে থেকে বুঝে ওঠা খুবই শক্ত। কারণ শ্যামল কথাবার্তা খুবই কম বলে। তার বয়স পঁচিশের মধ্যেই। এই বয়সেই সে এমন গম্ভীর হয়ে থাকে যে, তাকে ছেলেমানুষ বলে মনে হয় না। সে মাঝে-মাঝে কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যায় এবং কখনও কখনও এক-দেড় মাস পর হঠাৎ আবার ফিরে আসে। ভুবন রায় প্রথম-প্রথম তাকে খুবই শাসন করতেন। কিন্তু শ্যামলাল নীরবে শাসন-মারধর বকাঝকা সহ্য করে যায়, কখনও প্রতিবাদ করে না, এবং সে কোথায় যায় তাও কাউকে বলে না। ভুবন রায় তাঁর এই রহস্যময় ছেলেটিকে বিশেষ পছন্দ করেন না বটে, কিন্তু ঘটানও না। দি-পনেরো আগে শ্যামলাল উধাও হয়ে গিয়েছিল।

ভুবন রায় শ্যামলালের দিকে ভ্রূ কুঁচকে চেয়ে থেকে বললেন, “তুমি আবার কোথা থেকে উদয় হলে?”

শ্যামলাল জবাব দিল না, নীরবে চেয়ে রইল।

ভুবন রায় বলেন, “তোমরা এক একজন এক একরকম। বাড়িটা ক্রমেই চিড়িয়াখানা হয়ে উঠছে। যাকগে, তোমরা এখন যে যার কাজে যাও। আমি ল্যাবরেটরিতে গিয়ে এখন বিজ্ঞানচর্চা করব, বিজ্ঞান নিয়ে বসে থাকলে মাথায় বাজে জিনিস ঢুকতে পারে না।

শ্যামলাল হঠাৎ নীরবতা ভঙ্গ করে বলল, “আমার একটা কথা ছিল।”

“কী কথা?”

“আপনি একটা ভুল করছেন।”

ভুবন রায় এমন অবাক বহুঁকাল হননি। চোখ গোল করে বললেন, “ভুল! আমি!”

“আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনি বলছেন কাল রাতে আমাদের বাড়িতে দু’জন চোর ঢুকেছিল। কিন্তু কথাটা ঠিক নয়।”

“তার মানে?”

“চোর একজনই ঢুকেছিল। সে পাঁচু মোদক। দ্বিতীয় লোকটা দুলালবাবু। আপনি দুলালবাবুকে চিনতে পেরেছিলেন, কিন্তু তবু কেন কে জানে তাকে ফের অন্য একটা লোক বলে ধরে নিচ্ছেন।”

ভুবন রায় খুবই অবাক হয়ে বললেন, “রাতের বেলা তাঁকে আমি দুলালবাবু বলে ভুল করেছিলাম ঠিকই। কিন্তু সকালের আলোয় দেখলাম লোকটার বয়স অনেক কম, দিব্যি তাগড়া চেহারা আর হাবভাবও অন্যরকম।

‘ঠিকই দেখেছেন। আমাদের রোগাভোগা দুলালবাবুরই এটা অন্য চেহারা।”

“বলো কী? তুমি কি বলতে চাও যে, দুলালবাবু নিজের চেহারা পালটে ফেলতে পারেন? এই বিজ্ঞানের যুগে কি ওসব বুজরুকি চলে?”

শ্যামলাল মাথা নেড়ে বলল, “আমি বিজ্ঞানের বিষয়ে কিছুই জানি না। তবে বিজ্ঞানও নানারকম ভেলকি দেখাতে পারে। লোকটা যে দুলালবাবুই, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।”

“তুমি কী করে বুঝলে?”

“আমি নিজের চোখে ব্যাপারটা দেখেছি।”

“কী দেখেছ?”

“আপনি তো জানেন যে, আমি পনেরো দিন আগে নিরুদ্দেশ হয়ে যাই। কাল অনেক রাতে আমি ফিরে এসেছি। কিন্তু এসে প্রথমে বাড়ির মধ্যে না ঢুকে ল্যাবরেটরির দিকে যাই। কারণ ল্যাবরেটরিতে একটা অদ্ভুত আলো দেখা যাচ্ছিল।”

“বটে!”

“আজ্ঞ হ্যাঁ। শুধু ভালোই নয়, ল্যাবরেটরি থেকে একটি রঙিন বেও বেরোচ্ছিল। আমি গিয়ে কাঁচের শার্শি দিয়ে উঁকি মেরে দেখি, দুলালবাবু মেঝের ওপর পড়ে আছেন। আমি চট করে ঢুকতে ভরসা পাইনি। ভয় হয়েছিল, এই গ্যাসটা বোধহয় বিষাক্ত। তাই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আমি ল্যাবরেটরিতে ঢুকে দুলালবাবুকে পরীক্ষা করে দেখলাম, উনি মারা যাননি। তবে নাড়ির গতি বেশ বেশি ছিল। মাঝে-মাঝে কেমন যেন কেঁপে-কেঁপে উঠছিলেন।

ভুবনবাবু এবার ব্যগ্র হয়ে বললেন, “তারপর?”

“তারপর এক অত্যাশ্চর্য ঘটনা দেখলাম। আমার চোখের সামনে দুলালবাবুর চেহারার মধ্যে একটা পরিবর্তন ফুটে উঠতে লাগল।”

“কী রকম পরিবর্তন?”

“প্রথমে দেখলাম, দুলালবাবুর মুখের চামড়ায় যে-সব ভাঁজটাজ ছিল, সেগুলো মিলিয়ে গিয়ে চামড়াটা বেশ টান-টান হয়ে উঠছে। রোগা শরীরটার মাসলগুলো যেন ঠেলে উঠতে চাইছে। আর বয়সটা যেন বেশ কমে যাচ্ছে।”

“বলো কী?”

“আজ্ঞে যা বলছি সব সত্যি। নিজের চোখে দেখা।”

“তখন তুমি কী করলে?”

“প্রথমে ভুতুড়ে কাণ্ড ভেবে একটু ভড়কে গিয়েছিলাম। তারপর মনে পড়ল, ল্যাবরেটরিতে আমি একটা আলো আর ধোঁয়া দেখেছি। তাই উঠে গিয়ে টেবিলের ওপরটা ভাল করে দেখলাম।”

“কিছু পেলে?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ। মনে হল, একটা ছোটখাটো বিস্ফোরণের মতো কিছু ঘটে গেছে। একটা টেস্টটিউবের মধ্যে একটা জিনিস দেখে খুবই অবাক হলাম। সেটা থেকে তখনও একটা বিকিরণ বেরিয়ে আসছিল। অবশ্য দেখতে-দেখতেই সেটা মিলিয়ে গেল। তবু আমি টেবিলের ওপরে রাখা ভাঙা শিশিগুলো পরীক্ষা করে দেখলাম। আমার মনে হল, দুলালবাবু কোনও একটা এক্সপেরিমেন্ট করছিলেন।”

“বটে!” ভুবনবাবুর চোখে-মুখে রীতিমত আলো ফুঠে উঠল।

“আজ্ঞে হ্যাঁ। দুলালবাবু বোধহয় যৌবন ফিরে পাওয়ার কোনও ফর্মুলা আবিষ্কার করে ফেলেছেন। শিশিগুলো অধিকাংশই পুড়ে কালো হয়ে গেছে। তবে আমি কয়েকটা শিশির লেবেল থেকে কেমিক্যালগুলোর নাম টুকে নিতে পেরেছি। বাকিগুলো পারিনি।”

ভুবনবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “এ তো যুগান্তকারী ঘটনা।”

শ্যামলাল বলল, “যে আজ্ঞে। তবে দুলালবাবু ছাড়া এই ঘটনা বোধহয় আর ঘটানো যাবে না। কারণ অন্তত সাত-তাটটা শিশি-বোতল একেবারেই নষ্ট হয়ে গিয়েছে।”

ভুবনবাবু বিজ্ঞের মতো হেসে বললেন, “কুছ পরোয়া নেই। কোন কোন শিশি কাজে লাগানো হয়েছিল, তা অনায়াসে বাই সিম্পল প্রসেস অব এলিমিনেশন বের করা যাবে। আমাদের কাছে সব কেমিক্যালের লিস্ট করা আছে। যেগুলো পাওয়া যাবে না সেগুলোই কাজে লাগানো হয়েছে বলে ধরতে হবে।”

“যে আজ্ঞে।”

“তোমাকে যতটা গবেট মনে করতাম, শ্যামলাল, তুমি বোধহয় ততটা নও। যাকগে, এখন ল্যাবরেটরিতে গিয়ে ব্যাপারটা দেখি।”

.

দুলাল সেন ভুবনবাবুর বাড়ি থেকে সেই যে বেরিয়ে এসেছিলেন, তারপর থেকেই তার একটা বিরাট সমস্যা দেখা দিয়েছে। তিনি পরিষ্কার বুঝতে পারছেন যে, তিনি আর আগেকার দুলাল সেন নন। আবার পুরনো দুলাল সেনকে যে মন থেকে তাড়াবেন তাও পারছেন না। ফলে এখন একটা মানুষের মধ্যেই দু-দুটো মানুষ ঢুকে বসে আছে।

সবেগে রাস্তা দিয়ে সোজা অনেকটা হাঁটলেন দুলালবাবু। আসলে তার যাওয়ার কোনও তেমন জায়গা নেই। তাঁর তৈজপত্র বলতে যা-কিছু তা হল একটা টিনের সুটকেস আর শতরঞ্চিতে বাঁধা বিছানা। তা সে-দুটো ভুবনবাবুর ল্যাবরেটরিতেই পড়ে আছে, উদ্ধার করার কোনও আশা আপাতত নেই। সেখানে নিশ্চয়ই এতক্ষণে পুলিশ গিসগিস করছে। তবে দুলালবাবু জিনিসপত্রের জন্য বিশেষ চিন্তিত নন। তাঁর এখন প্রধান চিন্তা হল, নিজের ভিতর দু-দুটো মানুষকে তিনি সামলাবেন কী করে?

ভেবেচিন্তে তিনি দেখছেন যে তার ভিতরে একটা হল সাবেক দুলাল। সে লোকটা নিরীহ, শান্ত, ভালমানুষ, ভিতু, বুড়োটে। আর একটা হল নতুন দুলাল। সে মহা চ্যাংড়া, গুণ্ডা, ফচকে, ইয়ারবাজ, সাহসী, মারকুট্টে। ফলে দুই দুলালে বনিবনা হচ্ছে না।

রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি স্পষ্ট টের পাচ্ছিলেন, তাঁর ভিতরকার সাবেক দুলাল আর নতুন দুলালের মধ্যে বেশ-একটা ঠেলাঠেলি, ওঁতেওঁতি লেগে পড়েছে। তবে নতুন দুলালের মধ্যে মসমস করছে জোর আর তেজ।

দুলালবাবু হঠাৎ রাস্তা থেকে একটা আধলা ইট তুলে নিয়ে হালদারবাবুর টিনের চালে ধাঁই করে ছুঁড়ে মারলেন। পিলে চমকে দেওয়ার মতো শব্দ হল।

দুলালবাবুর ভিতরকার সাবেক দুলাল হাঁ-হাঁ করে বলে উঠল, “এসব কী হচ্ছে? এসব তো মহা অন্যায় কাজ! এ যে ঘোরতর দুষ্টুমি!”

নতুন দুলাল জবাবে বলে উঠল, “রাখো, রাখো, তোমার ভালমানুষি। এই হালদার তোমার অভাবের সময় নিজের গবেট ছেলেকে চার মাস পড়িয়ে নিয়ে মাত্র এগারো টাকা ঠেকিয়েছিল, তা মনে আছে হে!”

“আহা, তাতে কী! বিদ্যাদান মহা পুণ্যকর্ম। টাকা-পয়সা কিছু নয়।”

“নয় মানে? টাকা-পয়সা কিছু নয় বললেই হল? এখন পকেটে গোটা-দশেক টাকা থাকলে নবীন ময়রার দোকানে বসে গরম-গরম কচুরি আর হালুয়া খাওয়া যেত না?”

এদিকে চালে ঢিল পড়ায় খিটকেল হালদারবাবু রে-রে করে তেড়ে বেরিয়ে এলেন। এসে দুলালবাবুকে দেখে তাজ্জব। আমতা-আমতা করে বললেন, “দুলালবাবু যে! তা ঢিলটা কে মারল দেখেছেন নাকি?”

দুলালবাবু বুকটা একটু চিতিয়ে বললেন, “আমিই মেরেছি। আপনি লোকটা খুবই খারাপ। ভীষণ রকমের খারাপ।”

হালদার চোখ পাকিয়ে বললেন, “বটে! কে বলল আমি খারাপ?”

“আমিই বলছি।”

“আপনার তো খুব তেল হয়েছে দেখছি!”

“মুখ সামলে কথা কইবেন।”

“বটে! না হলে কী করবেন শুনি!”

দুলালবাবু আর একটা ইট তুলে নিলেন। তাঁর বিবেক বলল বটে যে, কাজটা ঠিক হচ্ছে না, তবু ধাঁই করে সেটাও টিনের চালে মারলেন তিনি।

হালদারবাবু এক লাফে এসে দুলালবাবুর টুটি টিপে ধরলেন। কিন্তু নতুন দুলালের সঙ্গে পারবেন কেন? দুলালবাবু এক ঘুসিতে তাঁকে সাত হাত দূরে ছিটকে ফেলে হাঃহাঃ করে হেসে উঠলেন।

ওদিকে হালদারের ছেলে শিবু বেরিয়ে এসে বাপের হেনস্তা দেখে আর থাকতে পারল না। সে মহা গুণ্ডা প্রকৃতির। ছুটে এসে সে দুলালবাবুকে জাপটে ধরে বলল, “স্যার, আপনাকে আমি মারব না, শত হলেও মাস্টারমশাই, কিন্তু পুলিশের হাতে তুলে দেব।”

দুলালবাবু ফের অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে শিবুকে স্রেফ বেড়ালছানার মতো তুলে দূরে ছুঁড়ে দিলেন।

এই কাণ্ড দেখে চারদিক থেকে লোকজন ছুটে আসতে লাগল। দুলালবাবু আর দাঁড়ালেন না। তাড়াতাড়ি অন্য রাস্তায় ঢুকে ছুটতে ছুটতে ভিন পাড়ায় চলে এলেন। তাঁর বেশ ফুর্তি লাগছিল। নাঃ, এতদিনে বেঁচে থাকাটাকে প্রথম উপভোগ করা যাচ্ছে।

এই পাড়াতে ফটিকবাবুর বাস। ফটিকবাবুর সঙ্গে একসময়ে খুব দহরম-মহরম ছিল। সেই সময় একদিন ফটিক তাঁর কাছ থেকে দশটা টাকা ধার নিয়েছিল। এতকাল ঘটনাটা খেয়াল ছিল না দুলালবাবুর। এখন স্মৃতিশক্তি প্রখর হয়ে ওঠায় মনে পড়ে গেল।

তিনি সোজা গিয়ে ফটিকের দরজায় কড়া নাড়তে নাড়তে হেঁড়ে গলায় ডাকলেন, “ফটিক! ফটিক!”

ফটিকবাবু ঘুম থেকে উঠলেও ভাল করে ঘুমের রেশ কাটিয়ে উঠতে পারেননি। গতকাল রাতে ভূতের খোঁজে মহানন্দ কাঁপালিকের ডেরায় রাত তিনটে অবধি ধরনা দিয়ে বসে ছিলেন। ভূত দেখতে পাননি। তাই মেজাজটাও খিচড়ে আছে। তাঁর শালা খুব ঠেস দিয়ে কথা বলছে আজকাল। বাজিটা একরকম হেরেই গেছেন বলা যায়।

দুলাল সেনকে দেখে তিনি বিশেষ আহ্লাদিত হলেন না। হাই তুলে বললেন, “দুলালদা যে! এত সকালে কী মনে করে?”

“বছর-পাঁচেক আগে তুমি দশটা টাকা ধার নিয়ে আর শোধ দাওনি। আমি এখন গরম কচুরি খেতে যাচ্ছি, বড্ড খিদে পেয়েছে। দশটা টাকা দাও।”

ফটিকবাবু একটু কৃপণ লোক। চোখ কপালে তুলে বললেন, “দশটা টাকা! ধার! এসব কী বলছ দুলালদা? আমার তো মনে নেই!”

“চোপ, দুলাল সেন একটা পেল্লায় ধমক দিয়ে বললেন, “তোমার মনে না থাকলেও আমার আছে। টাকাটা দাও শিগগির।

ফটিকবাবু কেমন যেন স্তম্ভিত হয়ে খানিকক্ষণ দুলালবাবুর দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “উঁহু, তুমি তো দুলালবাবু নও হে চাঁদু? আমাদের দুলাল সেন রোগা-ভোগা মাস্টার-মানুষ, তার এত তেজ নেই। তোমাকে দেখতে খানিকটা ওরকম হলেও সে তো নও!”

দুলালবাবুর এই ভয়টাই ছিল। তাঁর চেহারায় দুলালবাবুর আদল থাকলেও একটা মস্ত পরিবর্তনও যে ঘটে গেছে, তা তিনি বেশ টের পাচ্ছেন। কিন্তু তা বলে তা হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা যায় না। নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্য। তার ওপর প্রচণ্ড খিদেও পেয়েছে। ভ্যাজর-ভ্যাজর করলে তো চলবে না।

দুলালবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, “সোজা আঙুলে যে ঘি উঠবে না, তা আমি আগেই জানতুম হে। আমি মুখচোরা আর লাজুক মানুষ বলে তোমরা খুব জো পেয়ে গেছ, না? এবার শঠে শাঠ্যং। আমি আর সেই সাবেক দুলাল নই। টাকাটা ছাড়বে কি না!”

ফটিকবাবু হঠাৎ “বাঁচাও, বাঁচাও, ডাকাত! ডাকাত!” বলে বিকট চেঁচাতে লাগলেন।

দুলালবাবু খপ করে ফটিকবাবুর মুখটা চেপে ধরে অন্য হাতে পটাং করে একটা চড় কষালেন তাঁর গালে। ফটিকবাবু চোখে অন্ধকার দেখে বসে পড়লেন।

দুলাল সেন ঘরে ঢুকে বালিশের পাশে রাখা ফটিকবাবুর মানিব্যাগ থেকে দশটা টাকা নিয়ে বেরিয়ে এলেন। ফটিকবাবুর উদ্দেশে বললেন, “দশটা টাকাই নিলাম, এই দেখে রাখো। সুদ ধরলেও পাঁচ বছরে আরও গোটা পাঁচেক টাকা বেশি হয়। কিন্তু আমি সুদখোর নই বলে শুধু আসলটা নিয়েই ছেড়ে দিচ্ছি।”

আর কোনওদিকে দৃকপাত না করে দুলালবাবু সটান গিয়ে ময়রার দোকানে হাজির হলেন। গরম কচুরির গন্ধে জায়গাটা মাত হয়ে আছে।

দুলালবাবু বাজখাই গলায় হুকুম দিলেন, “দশটা কচুরি আর এক পোয়া হালুয়া।”

নবীন ময়রা দুলালবাবুকে চেনে। নিতান্তই পেটরোগা গোবেচারা মানুষ। জীবনে কেউ তাঁকে দোকানে বসে কুপথ্য করতে দ্যাখেনি। তার ওপর মানুষটার হাবভাবও যেন কেমন-কেমন!

কচুরি ক’টা স্রেফ দু’মিনিটে উড়িয়ে এবং হালুয়া এক মিনিটে নস্যাৎ করে দুলালবাবু উঠে আড়মোড়া ভেঙে বললেন, “না, এসব হালকা-পলকা জিনিসে কি পেট ভরে?”

নবীন ময়রার হঠাৎ দয়া হল। বলল, “মাস্টারমশাই, আপনি যে কচুরি ভালবাসেন তা তো জানতাম না। আচ্ছা, আপনি বসুন, পেট ভরে যা খুশি খান, আজ আপনাকে দাম দিতে হবে না। আপনার চেষ্টাতেই না গবেট ছেলে রেমো পাশ করতে পেরেছিল। ওরে, মাস্টারমশাইকে আরও দে!”

দুলালবাবু ফের বসে গেলেন এবং তারপর যা খেতে লাগলেন, সে-একটা দৃশ্যই বটে। স্বয়ং নবীন আর তার কর্মচারীরা দুলালবাবুর খাওয়া দেখে এমন বিহ্বল হয়ে গেল যে, কাকে এসে জিলিপি তুলে নিয়ে গেল, বেড়াল এসে দুধ খেয়ে যেতে লাগল, কড়াইতে কচুরি পুড়ে ঝামা হয়ে গেল।

নবীন ময়রা দু’হাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে বললেন, “সাক্ষাৎ বৃকোদরের দেখা পেলাম আজ। চক্ষু সার্থক, ময়রাজন্মও সার্থক। ওরে মাস্টারমশাইকে আরও দে, হাঁ করে দেখছিস কী?”

তা দুলালবাবুর তাতে আপত্তি হল না। এক ঝুড়ি কচুরি আর এক বারকোশ হালুয়া খেয়ে ডজন-চারেক জিলিপি আর সেরটাক রাবড়ি চালিয়ে দিলেন ভিতরে। তারপর ঠেলে-ওঠা পেটটার ওপর একটু তেরে-কেটে-তাক বাজিয়ে নিয়ে বললেন, “না, এতেই দুপুর পর্যন্ত চলে যাবে।”

খেয়েদেয়ে মনটা বেশ প্রসন্ন লাগল দুলালবাবুর, হাসিমুখেই বেরিয়ে পড়লেন। শরীরটা চনমন করছে একটা কিছু করার জন্য। দৌড়তে ইচ্ছে করছে, লাফাতে ইচ্ছে করছে, ছুঁড়তে হচ্ছে করছে।

দুলালবাবু খানিকদূর হেঁটে যেতেই দেখতে পেলেন বি.এন. ক্লাবের মাঠে খুব জম্পেশ করে ক্রিকেট খেলা হচ্ছে। বি.এন. মানে বিবেকানন্দ ক্লাব। এই অঞ্চলে বিবেকানন্দ ক্লাবের খুব নামডাক। তারা জেলার শ্রেষ্ঠ ক্রিকেট টিম। বাঘা-বাঘা সব বোলার আর ব্যাটসম্যান খেলে। বাঘা সেন আর বিক্রম সিংহ দুই সাঙ্ঘাতিক ফাস্ট বোলার। তেজেশ বাগ আর সূর্যজিৎ পালধি বিখ্যাত ব্যাটসম্যান। তারাই সব খেলছে।

দুলালবাবু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ খেলা দেখলেন। তাঁর মনে হল বাঘা সেন-এর বল মোটেই তেমন জোরালো নয়। বিক্রম সিংহও নিতান্তই ম্যান্তামারা।

ধুতিটা একটু গুটিয়ে পরে নিলেন দুলালবাবু। তারপর সোজা মাঠের মধ্যে ঢুকে গেলেন।

“এই যে বাঘা, ও কী বল করছ ভাই? এই কি হাতের জোর? দাও তো। দেখি আমাকে একবার।”

বাঘা সেন দুলালবাবুর প্রাক্তন ছাত্র। মাস্টারমশাইকে সে ভালই চেনে। জীবনে খেলাধুলার ধারে-কাছেও ঘেঁষেননি দুলালবাবু। তাই সে অবাক হয়ে বলল, “স্যার, আপনি বল করবেন?”

দুলালবাবু হাত বাড়িয়ে বললেন, “আরে দ্যাখোই না, কীরকম করি।”

বাঘা তাড়াতাড়ি বলটা দুলালবাবুর হাতে দিল। দুলালবাবু বল করার কায়দাটা খানিকক্ষণ দেখে মনে মনে রপ্ত করে নিয়েছেন। অনেকটা দৌড়ে এসে তিনি বলটা হাত ঘুরিয়ে চমৎকার ছেড়ে দিলেন।

ব্যাট করছিল বিখ্যাত সূর্যজিৎ। বলটা পিচে পড়েই এমন অদৃশ্য হয়ে গেল যে, সূর্যজিৎ ব্যাট হাতে হাঁ করে রইল। ততক্ষণে অবশ্য বলটা তার লেগ আর মিডল স্টাম্প উপড়ে দিয়ে বাউন্ডারিতে চলে গেছে।

চারধারে নিস্তব্ধতা নেমে এল বিস্ময়ের। তারপরেই অবশ্য সবাই হাততালি দিয়ে উঠল।

সূর্যজিৎও দুলালবাবুর পুরনো ছাত্র। সে এগিয়ে এসে বলল, “স্যার, আপনার ভিতরে যে এত বড় একজন ফাস্ট বোলার লুকিয়ে ছিল, তা তো কখনও টের পাইনি।”

দুলালবাবু একটু উচ্চাঙ্গের হাসি হেসে বললেন, “ক্রমে ক্রমে আরও কত কী টের পাবে!”

মাত্র চার ওভারের মধ্যেই দুলালবাবু দশজনকে আউট করে দিলেন। চারদিকে একটা হইচই পড়ে গেল। বি.এন. ক্লাবের সেক্রেটারি স্বয়ং এসে বললে ‘দুলালবাবু আপনি আমাদের ক্লাবে জয়েন করুন।”

দুলালবাবু মিটমিট করে হেসে বলল&