হযরত ঈসা আঃ এক মুসাফির ও তিনটি রুটি শিক্ষণীয় ঘটনা

একদা হযরত ঈসা (আঃ) কোথাও সফরে যাচ্ছিলেন। এমন সময় এক ইহুদী আরজ করল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার সফরের সঙ্গী হতে চাই। হযরত ঈসা (আঃ) বললেন, ঠিক আছে; তুমি যখন আমার সাথে যেতে চাচ্ছ তাহলে চল। অতঃপর দু’জনে মিলে হাঁটতে শুরু করল। অনেক দূর যাওয়ার পর তারা ক্লান্ত হয়ে গেল এবং পেটে ক্ষিধে অনুভব করল। তাই এবার কোথাও বসে নাস্তা করার মনস্থ করল। দু’জনের নিকট মােট ৩টি রুটি ছিল।

দুটি রুটি দু’জনে খাওয়ার পর হযরত ইসা (আঃ) বললেন, ভাই! তুমি একটু বস। আমি আসছি। একথা বলে তিনি চলে গেলেন। এদিকে ইহুদীর মনে লােভের তীব্র বাসনা জেগে উঠলাে। সে ভাবলাে, যদি আমি তৃতীয় এই রুটিটি লুকিয়ে রাখি তাহলে অন্য সময় একা খেয়ে নিতে পারবাে। তাই সে উহাকে তার ব্যাগের মধ্যে লুকিয়ে রাখলাে। একটু পরে হযরত ঈসা (আঃ) ফিরে এসে প্লেটে রুটি না দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, ভাই! তৃতীয় রুটি কোথায়? সে অকপটে জবাব দিল “আমি জানি না”।

হযরত ঈসা (আঃ) কথা না বাড়িয়ে বললেন, ঠিক আছে, চল আমরা সামনে অগ্রসর হই। তারা পুনরায় হাঁটতে লাগলাে। কিছুদূর যাওয়ার পর হযরত ঈসা (আঃ) তিনটি হরিণ দেখতে পেলেন। তিনি হাত দিয়ে ইশারা করে একটি হরিণকে ডাকলেন । সাথে সাথে উহা তার সামনে এসে উপস্থিত হলাে। অতঃপর তিনি উহাকে জবাই করে নির্দেশ দেওয়া মাত্র মুহুর্তের মধ্যেই উহার গােশত ভূনা হয়ে গেল। এবার তারা অত্যন্ত পরিতৃপ্তির সাথে উহা ভক্ষণ করলেন।

খাওয়া শেষে হযরত ঈসা (আঃ) হরিণটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আল্লাহর হুকুমে আবার জিন্দা হয়ে যাও। তৎক্ষণাত উহা জিন্দা হয়ে বনের দিকে চলে গেল। এদিকে ইহুদী বেচারা অত্যন্ত আশ্চর্যের সাথে তার সামনে সংঘটিত বিস্ময়কর এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করছিল। এবার হযরত ঈসা (আঃ) তাকে লক্ষ্য করে বললেন, যে আল্লাহ আমাকে এরূপ অলৌকিক কাজ দেখানাের ক্ষমতা দান করেছেন তার কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করছি, সত্য করে বল, তৃতীয় রুটি কোথায়?

ইহুদী এবারও বলল ‘আমি কিছুই জানি না।’ হযরত ঈসা (আঃ) বললেন, ঠিক আছে সামনে চল। কিছু দূর সামনে যাওয়ার পর তাদের সামনে একটি নদী পড়ল। কিন্তু নদী পার হওয়ার মত নৌকা, লঞ্চ, স্টীমার কিছুই সেখানে ছিল না। হযরত ঈসা (আঃ) এবারও আরেকটি অলৌকিক ঘটনা ইহুদীকে দেখালেন। তিনি তার হাত ধরে পানির উপর দিয়ে স্বচ্ছন্দে ওপারে চলে গেলেন। এতে ইহুদী পূর্বের তুলনায় আরাে বেশী আশ্চার্যাম্বিত হল।

কিন্তু এবারও যখন হযরত ঈসা (আঃ) তাকে বললেন, যে আল্লাহ তােমাকে এতবড় অলৌকিক কান্ড দেখালেন তাঁর নামের কসম খেয়ে বলছি, তৃতীয় রুটি কোথায়? কিন্তু এবারও সে পূর্বের মতই জবাব দিল। বলল, আমি কিছুই জানিনা। হযরত ঈসা (আঃ) বললেন, ঠিক আছে সামনে অগ্রসর হও। কিছুদূর যাওয়ার পর তিনি কতগুলাে বালি একত্রিত করে সেগুলােকে লক্ষ্য করে বললেন, স্বর্ণে পরিণত হয়ে যাও। সাথে সাথে বালিগুলাে সােনায় পরিণত হয়ে গেল।

অতঃপর তিনি এগুলােকে তিনভাগে ভাগ করে বললেন, একভাগ তােমার, একভাগ আমার। আর তৃতীয় ভাগ ঐ ব্যক্তি যার নিকট তৃতীয় রুটি রয়েছে। এবার ইহুদী স্বর্ণের লােভে সত্য কথা বলে দিল। বলল, তৃতীয় রুটি আমার কাছেই আছে। হযরত ঈসা (আঃ) তাকে বললেন, সত্য কথাই যখন বললে, তবে লও এই সকল সােনা তােমারই। একথা বলে তিনি সবগুলাে স্বর্ণ তার হাতে সােপর্দ করে অন্যদিকে চলে গেলেন। ঘটনাক্রমে সে পথে দুই ডাকাত কোথাও যাচ্ছিল।

তারা স্বর্ণ নিয়ে এক ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হল। ভাবলাে, আজকে আর কষ্ট করে দূরে যেতে হলাে না। এখানেই শিকার পাওয়া গেল। তারা প্রথমে ধারালাে অস্ত্র দিয়ে স্বর্ণের মালিক ইহুদীকে মেরে ফেলতে উদ্যত হলাে এবং পরে যাবতীয় স্বর্ণ নিয়ে যাওয়ার মনস্থ করলাে। কিন্তু ইহুদী অত্যন্ত কাকুতি মিনতি করে বললাে, ভাই, তােমরা আমাকে হত্যা। করাে না। চল, আমরা তিনজনে এই স্বর্ণগুলাে ভাগ করে নেই।

তারা এ প্রস্তাবে রাজী হলাে।। অতঃপর ইহুদীর পরামর্শক্রমে সেই দু’ডাকাতের একজন খাদ্য দ্রব্য ক্রয়ের উদ্দেশ্যে বাজারে গেল। সে বাজার থেকে ভাল ভাল খাবার ক্রয় করল, কিন্তু ফিরার পথে লােভ নামক মহা ব্যাধি তাকে আক্রান্ত করলাে। চকচকে এই স্বর্ণের সবগুলাে একাই পাওয়ার জন্য তার হৃদয় মন ব্যাকুল হয়ে উঠলাে। এই স্বর্ণে অন্যেরা ভাগ বসাবে একথা কিছুতেই তার মন মেনে নিতে পারল না। তাই সে সিদ্ধান্ত নিল, যেভাবেই হােক তাদেরকে হত্যা করে যাবতীয় স্বর্ণের মালিক সে একাই হবে।

যা হােক, এ সিদ্ধান্তকে বাস্তবায়নের জন্য সে খাবারের সাথে বিষ মিশিয়ে দিল। ভাবলাে, এ খাবার খেয়ে তারা মরে গেলে আমি স্বাচ্ছন্দে সবগুলি স্বর্ণ একাই লাভ করতে পারবাে। এদিকে স্বর্ণের কাছে রয়ে যাওয়া দুই ব্যক্তির মনেও লােভের তীব্র আকাঙখা জাগ্রত হলাে। তারা পরামর্শ করলাে, সে খাবার নিয়ে আসার সাথে সাথে আমরা তাকে হত্যা করে ফেলবাে এবং তার স্বর্ণগুলােও আমরা দুজনে ভাগ করে নিব। একদিকে তারা খাবার নিয়ে আগমনকারী ব্যক্তিকে হত্যার উদ্দেশ্যে খঞ্জর হাতে নিয়ে সম্পূর্ণ প্রস্তুত; আর অন্যদিকে সেও বিষ মিশ্রিত খাবার খাওয়ায়ে তার দুই সাথীকে দুনিয়া থেকে চির বিদায় দিয়ে যাবতীয় স্বর্ণ লাভ করার অদম্য আগ্রহ ও লােভী মন নিয়ে সামনে অগ্রসর হচ্ছে।

যা হােক, লােকটি যখন খাবার নিয়ে তাদের নিকট উপস্থিত হল তখন পূর্বের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুজন একত্রে হামলা করে তাকে হত্যা করে ফেলল। এবার তাদের খুশি দেখে কে? কারণ এখন তাে যাবতীয় স্বর্ণ তাদের ভাগ্যেই জুটবে। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, বিষ মিশ্রিত খাবার খাওয়ার সাথে সাথে তারাও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। আর স্বর্ণ তার আপন স্থানেই পড়ে রইল। অতি লােভের কারণে কারাে ভাগ্যে। স্বর্ণতাে জুটলােই না উপরুন্তু সকলকে প্রাণও দিতে হল। তাই বলা হয়লােভে পাপ পাপে মৃত্যু।

পরবর্তী সময়ে হযরত ঈসা (আ.) ঐ পথে যাওয়ার সময় দেখলেন, স্বর্ণগুলাের তিনদিকে তিনটি লাশ পড়ে আছে। লাশগুলি দেখে তিনি সবকিছুই বুঝতে পারলেন। তাই আপনা আপনিই তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল “হে দুনিয়া! আফসােস! শত আফসােস তােমার জন্য তােমার লােভে পড়ে কত মানুষ তাদের জিন্দেগী বরবাদ করল!”

প্রিয় পাঠক! এ ঘটনা থেকে আমাদের এ শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত যে, অতি মাত্রায় ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার ধন-দৌলত কামাই করার বাসনা মানুষকে বরবাদ ও ধ্বংস করে ছাড়ে। তাই আল্লাহ আমাদেরকে যা কিছু দিয়েছেন তার উপর সন্তুষ্ট থেকে মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য। সকলকেই তৈরী নেয়া উচিত।

What’s your Reaction?
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0

You May Also Like