তিন গোয়েন্দা – কঙ্কাল দ্বীপ

তিন গোয়েন্দা - কঙ্কাল দ্বীপ

ডেভিস ক্রিস্টোফার:”ডুবুরি-পোশাক পরে সাগরে ডুব দিয়েছ কখনও ?”
প্যাসিফিক স্টুডিও। বিখ্যাত চিত্রপরিচালকের অফিসে বসে আছে তিন গোয়েন্দা। বিশাল টেবিলের ওপাশে বসা মিস্টার ক্রিস্টোফারের দিকে চেয়ে বলল মুসা আমান,
মুসা আমান: “হ্যাঁ, স্যার,ডুবেছি। গতকাল শেষ পরীক্ষা দিয়েছেন আমাদের ইন্সট্রাকটর। পাস করেছি ভালভাবেই।”
কিশোর পাশা: “অভিজ্ঞ ডুবুরি নই আমরা। তবে নিয়মকানুন সব জানি। ফেস মাস্ক আর ফ্লিপার আছে আমাদের তিনজনেরই।”
ডেভিস ক্রিস্টোফার:”গ্যাস ট্যাংক আর অন্যান্য যন্ত্রপাতি ?”
কিশোর পাশা: “যখন দরকার হয়, ভাড়া করে আনি।”
ডেভিস ক্রিস্টোফার: “গুড।মনে হয় কাজটা করতে পারবেতোমরা।”
রবিন মিলফোর্ড: “কাজ !”
ডেভিস ক্রিস্টোফার:”হ্যাঁ। একটা রহস্যের কিনারা করতে হবে। সেজন্যেই ডেকেছি তোমাদের। আর হ্যাঁ, এক-আধটু অভিনয়ও করতে হবে।”
মুসা আমান: “অভিনয় ?”
ভুরু কোঁচকাল মুসা।

“কিন্তু আমরা তো স্যার, অভিনেতা নই। কিশোর অবশ্য মাঝেমধ্যে টেলিভিশনে. . .”
ডেভিস ক্রিস্টোফার:”অভিজ্ঞ অভিনেতার দরকার নেই ওদের। মুসা, তোমার বাবা কোথায় আছে এখন জান?”
মুসা আমান: “জানি, স্যার,”
অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান মুসার বাবা রাফাত আমান। ছবির শুটিঙের সময় বিভিন্ন যন্ত্রপাতি তদারকির ভার থাকে তাঁর ওপর।
“ফিলাডেলফিয়ায় ।”
ডেভিস ক্রিস্টোফার: “ভুল বললে,”
হাসলেন পরিচালক।
“রাফাত এখন একটা দ্বীপে।”
মুসা আমান: “কিন্তু বাবা তো গিয়েছিল ডিরেক্টর জন নেবারের সঙ্গে ! এসকেপ ছবির শুটিঙে।”
ডেভিস ক্রিস্টোফার: “জনেরসঙ্গেই আছে। ছবির একটা বিশেষ দৃশ্যের জন্যে পুরানো পার্ক দরকার। স্কেলিটন আইল্যাণ্ডে আছে তেমনি একটা পার্ক।”
রবিন মিলফোর্ড: “স্কেলিটনআইল্যাণ্ড !”
ভুরু কুঁচকে গেছে রবিনের।
“শুনে মনে হচ্ছে জলদস্যুদের দ্বীপ।”

ডেভিস ক্রিস্টোফার: “ঠিকইধরেছ। এককালে জলদস্যুদের ঘাঁটি ছিল ওই দ্বীপ। নামটা সত্যিই অদ্ভুত। আজওনাকি ভুতের উপদ্রব রয়েছেওখানে। বালির তলা থেকে মাঝে মধ্যেই বেড়িয়ে পড়ে মানুষের কঙ্কাল। ভীষণ ঝড়ের পর কখনও-সখনও সৈকতে পড়ে থাকতে দেখা যায় সোনার মোহর। বেশি না, একটা দুটো। ভেবে বস না, গুপ্তধন আছে স্কেলিটনআইল্যাণ্ডে। অনেক খোঁজাখুঁজি করা হয়েছে, পাওয়া যায়নি। উপসাগরের তলায় হয়ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কিছু মোহর। ঝড়ের সময় ঢেউয়ের ধাক্কায় সৈকতে এসে পড়ে।”
কিশোর পাশা: “এবং ওই দ্বীপেই যেতে বলছেন আমাদেরকে ?”
আগ্রহে সামনে ঝুঁকল কিশোর।
“রহস্যের কিনারা করতে ?”
ডেভিস ক্রিস্টোফার:”হ্যাঁ। দু’জন সহকর্মীকে নিয়ে আছে ওখানে মুসার বাবা। পার্কটার জঞ্জাল পরিষ্কারের জন্যে লোক লাগিয়েছে। কিন্তু গোলমাল শুরু হয়ে গেছে প্রথম দিন থেকেই। জিনিসপত্র চুরি যাচ্ছে। স্থানীয় একজন লোককে পাহারাদার নিযুক্ত করা হয়েছে, কিন্তু চুরি ঠেকান যাচ্ছে না। ভাবনায়পড়ে গেছে জন। খবর পাঠিয়েছে আমাকে।”
কিশোর পাশা: “আমাদের কাজ কি ?”
ডেভিস ক্রিস্টোফার: “আসছিসে কথায়। এসকেপ ছবিটার প্রযোজক আমি। ঠিক করেছি, তোমাদেরকে পাঠাব। নাম যা-ই হোক, দ্বীপটা কিন্তু খুব সুন্দর। চারদিক ঘিরে আছে আটলান্টিক উপসাগর, গভীরতা খুবই কম। ওখানে ইচ্ছেমত ডোবাডুবি করতে পারবে তোমরা। কেউ কিছু সন্দেহ করবে না। ভাববে, তিনটে ছেলে গুপ্তধন খুঁজছে।”
কিশোর পাশা: “খুব. . . খুবই ভাল হবে, স্যার।”
ডেভিস ক্রিস্টোফার: “জনেরসঙ্গে কোম্পানির একজন লোকআছে, জোসেফ গ্র্যাহাম। দক্ষ ডুবুরি। ভাল ছবি তুলতে পারে, বিশেষ করে পানির তলায়। দরকার পড়লেসে তোমাদেরকে সাহায্য করতে পারবে। আরও একজন আছে, জনের সহকারী, পিটার সিমনস্। সে-ও সাহায্য করবে তোমাদের। তা-ছাড়া মুসার বাবা তো আছেই। গুপ্তধন শিকারির ছদ্মবেশে চোর ধরার চেষ্টাকরবে। আর হ্যাঁ, তোমরা গোয়েন্দা, অপরিচিত কারও কাছে সে কথা ঘুণাক্ষরেও প্রকাশ করবে না।”
রবিন মিলফোর্ড: “খুব মজা হবে ! তবে,”
রবিনের গলায় দ্বিধা,
“বাবা যেতে দিলে হয়।”
ডেভিস ক্রিস্টোফার: “না দেবার তো কোন কারণ দেখি না। খরচ-খরচা সব কোম্পানির। তোমাদের স্কুল ছুটি। তাছাড়া ওখানে মুসার বাবা আছে। দরকার হলে আমিও না হয় ফোন করব মিস্টার মিলফোর্ডকে। কিশোর, তোমারকোন অসুবিধে আছে ?”
কিশোর পাশা: “নাহ্। মুসা আর রবিন যাচ্ছে। তাছাড়া রাফাত চাচা আছে ওখানে, অমত করবে না মেরিচাচী।”
মুসা আমান: “তো কখন রওনা হচ্ছি আমরা ?”
ডেভিস ক্রিস্টোফার:”আগামী কালই বেরিয়ে পড়।বাড়িতে গিয়ে জিনিসপত্র গুছিয়ে নাওগে। বিকেলে প্লেনের টিকেট পাঠিয়ে দেব। হ্যাঁ, রবিন, তোমাকে একটা জিনিস দিচ্ছি,”
ড্রয়ার খুললেন পরিচালক। একটা বড় খাম বের করে ঠেলে দিলেন টেবিলের ওপর দিয়ে।
“এতে একটা ম্যাগাজিন আছে।রেকর্ড আর রিসার্চের ভার যখন তোমার ওপর, তুমি রাখ এটা। স্কেলিটন আইল্যাণ্ডের ওপর একটা সচিত্র ফিচার আছে। পড়ে দেখ। অনেক কিছু জানতে পারবে দ্বীপটা সম্পর্কে।”
উঠে দাঁড়াল তিন গোয়েন্দা।

ডেভিস ক্রিস্টোফার:”যাত্রা শুভ হোক তোমাদের।”
–“থ্যাংকু, স্যার,”
বলে বেরিয়ে এলো তিন কিশোর।
রবিন মিলফোর্ড: “ওই যে, কঙ্কাল দ্বীপ !”
প্রায় চেঁচিয়ে উঠল রবিন।
এই বাংলা নামটা শিখেছে কিশোরের কাছ থেকে। স্কেলিটন আইল্যাণ্ড-এর চেয়ে ছন্দময়।
কিশোর পাশা: “কই ! . . . কোথায় !”
মুসা আমান: “দেখি দেখি !”
দু’জনে একই সঙ্গে ঝুঁকে এলো জানালার কাছে, রবিনেরগায়ের ওপর দিয়ে। লম্বা,সরু উপসাগরের ওপর দিয়ে উড়ে চলেছে প্লেন। আঙুল তুলে দেখাল রবিন। তাদের নিচেই একটা ছোট্ট দ্বীপ। ঠিক যেন একটা মানুষের মাথার খুলি।
রবিন মিলফোর্ড: “ম্যাপের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।”
কৌতূহলী চোখে অদ্ভুত দ্বীপটার দিকে চেয়ে আছে তিন গোয়েন্দা। মিস্টার ক্রিস্টোফারের দেয়া ম্যাগাজিন পড়ে জেনেছে ওরা অনেক কিছু। তিনশো বছরেরও বেশি আগে জলদস্যুদের ঘাঁটি ছিল কঙ্কাল দ্বীপ। অনেক খোঁজাখুঁজি করা হয়েছে, পাওয়া যায়নি গুপ্তধন। তার মানে এই নয় যে, ধনরত্ন লুকানো নেই। হয়তোদ্বীপে নেই, কিন্তু উপসাগরের তলায় থাকতে বাধা কোথায় ? নিশ্চয় পানির তলায় কোথাও লুকানোআছেই গুপ্তধন। তিন গোয়েন্দার আশা, খুঁজে পাবে ওরা।
আরেকটা ছোট দ্বীপ নজরে পড়ল।
কিশোর পাশা: “ওই যে, দ্য হ্যাণ্ড ! হস্ত।”
মুসা আমান: “আর ওগুলো নিশ্চয় দ্য বোনস।”
আঙুল তুলে দেখাল। কঙ্কাল দ্বীপ আর হস্তের মাঝামাঝিএক সারি ছোট প্রবাল-প্রাচীর দেখিয়ে বলল মুসা।
“ইয়াল্লা ! এত তাড়াতাড়ি এসে পড়লাম !
দুপুরের খাওয়াই হজম হয়নি এখনও !”
রবিন মিলফোর্ড: “দেখ, দেখ! হাতের আঙুল। ওগুলো সরু প্রবাল-প্রাচীর ! পানির তলায় রয়েছে, অথচ ওপর থেকে কি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে !”
কিশোর পাশা: “হস্তে যাব একদিন। প্রাকৃতিক ফোয়ারা দেখব। কখনও দেখিনি।”
দ্বীপগুলোকে পেছনে ফেলে এলো প্লেন। মূল ভূখণ্ডের ওপর এসে পড়েছে। নিচে একটা গ্রাম। নাম ফিশিংপোর্ট। ওখানেই উঠবে তিন গোয়েন্দা। একটা বোর্ডিং হাউসে ঘর ভাড়া করে রাখা হয়েছে তাদের জন্যে।
ভিড়ের ভেতর থেকে বেরিয়েএগিয়ে আসছে বেঁটে মোটা এক লোক। লালচে নাক।
–“এই যে,”
কাছে এসে বলল লোকটা।
“নিশ্চয়ই হলিউড থেকে এসেছ ? তোমাদেরকে নিয়ে যেতে পাঠানো হয়েছে আমাকে!”
তিন কিশোরকে দেখছে সে। ছোট ছোট চোখে শীতল চাহনি।
“কিন্তু তোমরা গোয়েন্দা! বয়স্ক লোক আশা করেছিলাম আমি।”
স্থির হয়ে গেল রবিনের পাশে দাঁড়ানো কিশোর।
কিশোর পাশা: “আমরা গোয়েন্দা আপনার তো জানারকথা নয়।”
–“আরও অনেক কিছুই জানি,”
দাঁত বের করে হাসল লোকটা।

“এখন এসো। গাড়ি অপেক্ষা করছে। তোমাদের মালপত্র যাবে অন্য গাড়িতে। আমারটায় জায়গা নেই। হলিউড থেকে অনেক জিনিসপত্র এসেছে, বোঝাই হয়ে গেছে।”
ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল লোকটা। পেছনে চলল তিন গোয়েন্দা। পুরানো একটা স্টেশন ওয়াগনের সামনে এসে দাঁড়াল।
–“জলদি উঠে পড় গাড়িতে।আধ ঘণ্টা লেগে যাবে যেতে।”
আকাশের দিকে তাকাল।
“তার আগেই ঝড় এসে পড়বে কিনা কে জানে !”
আকাশের দিকে মুখ তুলল রবিন। পশ্চিম দিগন্তে ছোট্ট এক টুকরো কালো মেঘ, ছড়িয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে।ঢাকা পড়েছে সূর্য। আজ আরবেরোতে পারবে বলে মনে হয়না। মেঘের চূড়ার কাছে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে থেকে থেকে। ঝড় আসবে, ভীষণ ঝড়।
পেছনের সিটে উঠে বসল তিন কিশোর। ড্রাইভিং সিটে বসললোকটা। গাড়ি ছাড়ল। এয়ারপোর্ট ছাড়িয়ে এসে রওনা হল উত্তরে।
কিশোর পাশা: “আপনার সঙ্গেএখনও পরিচয়ই হল না, মিস্টার, . . . “
–“হান্ট বলেই ডাকবে আমাকে। সবাই তাই ডাকে,”
বলতে বলতে এক্সিলারেটরে পায়ের চাপ বাড়াল লোকটা।তাড়াতাড়ি যেতে হবে। দ্রুত নামছে অন্ধকার।
কিশোর পাশা: “হ্যাঁ, মিস্টার হান্ট, আপনি কি সিনেমা কোম্পানিতে কাজ করেন ?”
হান্ট: “সব সময় না।”
এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে আপন মনেই বিড়বিড় করল,
“ঝড় আসছে ! রাত নামতে দেরি নেই !
নিশ্চয় বেরোবে আজ নাগরদোলার ভূত !
ইসস্, বোকামিই করলাম ! বেরোনোই উচিত হয়নি !”
শিরশির করে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল রবিনের মেরুদণ্ড বেয়ে।
নাগরদোলার ভূত ! কঙ্কাল দ্বীপের ওই ভূতের কথা লেখা আছে ম্যাগাজিনে। বাইশ বছর আগে প্লেজার পার্কের নাগরদোলায় চড়েছিল এক সুন্দরী তরুণী। নাম, স্যালি ফ্যারিংটন।
হঠাৎ উঠল ঝড়। পার্কে আরওঅনেকেই এসেছিল সেদিন, তাড়াহুড়ো করে পালাল। থেমে গেল নাগরদোলা। স্যালিকে নামতে বলল দোলারচালক। কিন্তু নামল না মেয়েটা। দোলা আবার চালাতে অনুরোধ করল। ঝড়েরমধ্যে নাগরদোলায় চড়তে কেমন লাগে, দেখতে চায়।
কিছুতেই মেয়েটাকে নামাতে পারল না চালক। ঝড়বেড়েই চলল। নিরাপদ জায়গায় গিয়ে আশ্রয় নিলো সে। স্যালি বসে রইল কাঠের ঘোড়ার গলা আঁকড়ে ধরে। হঠাৎ পড়ল বাজ। পড়লএসে একেবারে নাগরদোলার ওপর।
বজ্রপাতে মারা গেল স্যালি। এর কয়েক হপ্তা পরেই আরেক ঝড়ের রাতে নাকি দেখা গেল, আলো জ্বলে উঠেছে নাগরদোলায়। পার্ক বন্ধ হয়ে গেছে বিকেলেই। কে জ্বাললো আলো ! কয়েকজন লোক সঙ্গে নিয়ে মোটরবোটেকরে দেখতে গেলেন পার্কের মালিক মিস্টার স্মিথ। দ্বীপের কাছে গিয়ে দেখলেন, ঘুরছে নাগরদোলা। একটা কাঠের ঘোড়ায় চেপে বসেছে সাদা একটা মূর্তি। হঠাৎ দপ করে নিভে গেল সমস্ত আলো। থেমে গেল দোলা।
কয়েক মিনিট পরে তীরে ভিড়ল বোট। দোলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল লোকেরা। একটা রুমাল খুঁজে পেল, মহিলাদের রুমাল।
এক কোণে সুতো দিয়ে তোলা হয়েছে দুটো অক্ষরঃ এস এফ।
গাড়ি থেকে নামল তিন গোয়েন্দা। বোটটা দেখে অবাক। এত-বড় মুভি-কোম্পানি, এর চেয়ে ভাল বোট জোগাড় করতে পারলনা ! নাকি হান্টের নিজের বোট ওটা ?
কিশোর পাশা: “আমাদের মালপত্র ?”

হান্ট: “ওগুলোর জন্যে ভাবতে হবে না। নিরাপদেই পৌঁছে যাবে বোর্ডিং হাউসে। জলদি এসো, বোটে ওঠ। এখনও অনেক পথ বাকি।”
বোটে উঠল ওরা। মোটরের ওপরঝুঁকল হান্ট। একটা বোতাম টিপে দিতেই স্টার্ট হয়ে গেল পুরানো ইঞ্জিন। ঢেউ কেটে ধুঁকতে ধুঁকতে এগিয়ে চলল বোট। একবার এদিক কাত হচ্ছে একবার ওদিক। ডুবেই যাবে যেন। ভয়ে বুক কাঁপছে তিন কিশোরের।
এলো বৃষ্টি। প্রথমে গুঁড়ি গুঁড়ি, জোর বাতাসের ধাক্কায় রেণু রেণু হয়ে আছড়ে পড়ল গায়ে। তারপর নামল বড় বড় ফোঁটায়। পাতলা ক্যানভাসের ঢাকনার তলায় গুটিসুটি হয়ে বসল তিন কিশোর। অল্পক্ষণেই ভিজে চুপচুপে হয়ে গেল।
মুসা আমান: “রেনকোট নেই?”
চেঁচিয়ে বলল মুসা।
“এভাবে বসে থাকলে বোট ডুবে যাবার আগেই মরবো !”
মাথা ঝোঁকাল হান্ট। দড়ি দিয়ে বাঁধল হুইলের একটা স্পোক। দড়ির অন্য মাথা দিয়ে বাঁধল বোটের গায়ে একটা খুঁটির সঙ্গে। কোনদিকেই এখন ঘুরতে পারবেনা হুইল। উঠে গিয়ে একটা ছোট আলমারি খুলল। বের করেআনল চারটে হলুদ রেনকোট। একটা নিজে পরল। বাকি তিনটে দিল তিন কিশোরকে।
হান্ট: “পরে ফেল,”
চেঁচিয়ে বলল হান্ট। বাতাসের গর্জন, আস্তে কথাবললে শোনা যায় না।
“বোটেই রাখতে হয় এগুলো। কখন বৃষ্টি আসে, ঠিকঠিকানা তো নেই।”
মুসার গায়ে ঠিকমত লাগল কোট, কিশোর আর রবিনের গায়ে বড় হল। তাতে কিছু যায় আসে না এখন। গায়ে পানি না লাগলেই হল।
আবার গিয়ে হুইল ধরল হান্ট। অনবরত বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বেড়েছে বাতাসের বেগ। আকারে বড় হয়েছে ঢেউ। ধরেই নিয়েছেছেলেরা, যে-কোন মুহূর্তে উল্টে যেতে পারে বোট।
বিদ্যুতের আলোয় ডাঙা দেখা গেল সামনে। ছেলেদের মনে হল, জেটি ছাড়ার পর কয়েক যুগ পেরিয়ে গেছে। ডাঙার কাছে চলে এলো বোট। জেটি চোখে পড়ল না। অবাক হয়ে দেখল ছেলেরা, চ্যাপ্টা একটা পাথরের ধারে এসে বোট রেখেছে হান্ট। পানির তলা থেকে বেরিয়ে আছে পাথরটা।
হান্ট: “লাফাও, লাফিয়ে নামো !”
চেঁচিয়ে বলল হান্ট।
“গড নোজ !”
নীরবে একে একে লাফিয়ে তীরে নেমে এলো ছেলেরা।
কিশোর পাশা: “আপনি নামবেননা ?”
চেঁচিয়ে বলল কিশোর।
ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে বোট।
হান্ট: “নামা যাবে না,”
চেঁচিয়ে জবাব দিল হান্ট।
“পথ ধরে এগোও। ক্যাম্পে পৌঁছে যাবে।”
ইঞ্জিনের আওয়াজ বাড়ল। দ্রুত সরে গেল বোট। দেখতেদেখতে হারিয়ে গেল ঝড়ো রাতের অন্ধকারে। বাতাসের তাড়নায় গায়ে যেন সুচ ফুটাচ্ছে বৃষ্টি। মাথা নুইয়ে রাখতে হল তিন কিশোরকে।
মুসা আমান: “চল, পথটা খুঁজে বের করি !”
মাথা ঝুঁকিয়ে সায় দিল কিশোর।
হঠাৎ শোনা গেল শব্দটা। অদ্ভুত। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে যেন কোন বিশাল দানব।
হু-উ-উ-উ-উ-হু-ই -শ-শ ! হু-উ-উ-উ-উ-হু-ই -শ-শ !
রবিন মিলফোর্ড: “শুনছ ! কিসের শব্দ !”
আবার শোনা গেল অদ্ভুত আওয়াজ।
কিশোর পাশা: “কিছু একটা আছে দ্বীপে। আবার বিদ্যুৎচমকালেই দেখার চেষ্টা করব! তোমরাও কর।”
যেদিক থেকে শব্দ এসেছে, সেদিকে তাকিয়ে রইল তিন গোয়েন্দা। বিদ্যুৎ চমকাল। ক্ষণিকের জন্যে দেখল ওরা, ছোট্ট এক দ্বীপে দাঁড়িয়ে আছে। এটা অন্য কোন দ্বীপ, কঙ্কাল দ্বীপ এত ছোট না।
একটা টিলা, উটের কুঁজের মত ঠেলে বেরিয়ে আছে দ্বীপের গা থেকে। আশপাশে ছোটবড় পাথরের ছড়াছড়ি। এদিক ওদিক দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা গাছ, বাতাসের ঝাপটায় মাথা নুইয়ে ফেলেছে। কোন পথ চোখে পড়লনা, দেখা গেল না ক্যাম্প।
অদ্ভুত শব্দ হল আবার। ঠিকএই সময় আবার বিদ্যুৎ চমকাল। অবাক হয়ে দেখল তিন কিশোর, কুঁজের ঠিক মাঝখান থেকে তীব্র গতিতে আকাশে উঠে যাচ্ছে পানি, বিশাল এক ফোয়ারা। বাতাসের আঘাতে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে ছিটকে পড়ছে পানি, অদ্ভুত আওয়াজ হচ্ছে সে-জন্যেই।
কিশোর পাশা: “প্রাকৃতিক ফোয়ারা ! কঙ্কাল দ্বীপ না, এটা হস্ত !”
স্তব্ধ হয়ে গেল অন্য দু’জন।

তাদেরকে হস্তে নামিয়ে দিয়ে গেল কেন হান্ট ? এই ভয়াবহ ঝড়ের রাতে নির্জনদ্বীপে ফেলে রেখে গেল কেন?
মুসা আমান: “এখানে নামিয়ে দিয়ে গেল কেন হান্ট,”
কপালে লেগে থাকা পানির কণা মুছতে মুছতে বলল মুসা,
“বুঝতে পারছি না।”
রবিন মিলফোর্ড: “ভুল করেছে হয়ত। কঙ্কাল দ্বীপভেবে হস্তে নামিয়ে দিয়েগেছে।”
কিশোর পাশা: “না। ভুল করেনি। ইচ্ছে করেই এখানে ফেলে গেছে ব্যাটা। প্রথম থেকেই লোকটাকে ভাল লাগেনি। আমরা গোয়েন্দা, জানল কি করে ? কোথাও কিছু একটা গোলমাল হয়েছে !”
মুসা আমান: “যা খুশি হোকগে,”
মুসার গলায় হতাশা।
“না খেয়ে না মরলেই হল। কেউ আমাদেরকে খুঁজে . . . “
কিশোর পাশা: “সকালে খুঁজেপাবে। ভোর রাতেই মাছ ধরতেবেরোয় জেলেরা।”
রবিন মিলফোর্ড: “কিন্তু এদিকে কোন জেলে-নৌকা আসারকথা না,”
রবিনের গলায় সন্দেহ।
“পড়নি, এক ধরনের লাল পরজীবী কীটের আক্রমণে নষ্ট হয়ে গেছে এখানকার ঝিনুক ? খাওয়া নিরাপদ নয়। মেলভিলের একেবারে দক্ষিণে ঝিনুক তুলতে যায়এখন জেলেরা। ফিশিং-পোর্টের এদিকে আসে না। আরকিছুদিন এভাবে চললে গ্রামছেড়ে চলে যাবে সবাই।”
কিশোর পাশা: “তবু, কেউ না কেউ আসবেই। আমরা নিরুদ্দেশ হয়েছি, জানবেনরাফাত চাচা। খোঁজখবর শুরুহয়ে যাবে। আজ এখানে নেমেবরং ভালই হল। ফোয়ারাটা দেখতে পেলাম।”
আর বিশেষ কিছু বলার নেই কারও। চুপ হয়ে গেল ওরা। বাইরে ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে, কিন্তু খোঁড়লের ভেতর মোটামুটি নিরাপদ। যেমন হঠাৎ আসে, তেমনি হঠাৎই আবার চলে যায় এ-অঞ্চলের ঝড়। তিন কিশোর আশা করল, সকাল নাগাদ থেমে যাবে। শিগগিরই ঢুলতে শুরু করল ওরা।
হঠাৎ তন্দ্রা টুটে গেল মুসার। কোথায় আছে বুঝতেইপেরিয়ে গেল কয়েক মুহূর্ত। তারা চোখে পড়ল।ঝড় থেমে গেছে। তন্দ্রা ছুটে যাবার এটাই কি কারণ? না। চোখে আলো পড়েছিল। এখন আবার পড়ল। শ’খানেক গজ দূর থেকে আসছে, তীব্র আলোর রশ্মি। এক মুহূর্ত স্থির থাকল, তারপরেই সরে গেল আবার আলো।
লাফিয়ে দাঁড়াতে গিয়ে মাথায় বাড়ি খেল মুসা।”ইয়াল্লা !” বলে চেঁচিয়ে উঠে আবার বসে পড়ল। সাবধানে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এলো খোঁড়লের বাইরে। গা থেকে রেনকোট খুলে নাড়ে নাড়তেচেঁচিয়ে বলল,
মুসা আমান: “এখানে ! আমরা এ-খা-নে !”
মুসার পাশে এসে দাঁড়াল রবিন আর কিশোর।
আবার আলো পড়ল মুসার গায়ে। তারপরেই সরে এসে পড়ল রবিন আর কিশোরের ওপর। এক মুহূর্ত স্থির রইল। চকিতের জন্যে একবার উঠে গেল আকাশের দিকে। একশো গজ দূরে নৌকার পাল দেখতে পেল তিন গোয়েন্দা।
মুসা আমান: “দ্বীপের গায়ে ভিড়েছে নৌকা ! আমাদেরকে যেতে বলছে . . . “
আকাশে তারার আলো। আবছা অন্ধকার। হাঁটতে শুরু করলতিন গোয়েন্দা। আবার জ্বলে উঠল টর্চ।
রবিন মিলফোর্ড: “দেখ দেখ !আমাদেরকে পথ দেখাচ্ছে !”
বৃষ্টিতে ভিজে পিচ্ছিল হয়ে আছে মাটি। দৌড়ানো তো দূরের কথা, তাড়াতাড়িহাঁটাই যাচ্ছে না। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে একবার আছার খেল মুসা। পাথরে ঘষা লেগে ছড়ে গেল হাঁটু।
পানির কিনারে এসে থামল তিন গোয়েন্দা। তীরে ভিড়েছে ছোট একটা পালতোলানৌকা। পাশে বালিতে দাঁড়িয়ে আছে তাদেরই বয়সী এক কিশোর। পরনে পানি নিরোধক জ্যাকেট। প্যান্টটা গুটিয়ে হাঁটুর কাছে তুলে নিয়েছে।
তিন গোয়েন্দার মুখে আলো ফেলল ছেলেটা। দেখল। তারপরনিজের মুখে আলো ফেলে দেখাল ওদেরকে। হাসিখুশি একটা মুখ। রোদেপোড়া তামাটে চামড়া। কোঁকড়া কালো চুল। কালো উজ্জ্বল এক জোড়া প্রাণবন্ত চোখ।
–“হাল্লো !”
ইংরেজিতে বলল ছেলেটা। কথায় বিদেশী টান।
“তোমরা তিন গোয়েন্দা, না?”
অবাক হল তিন কিশোর। তাদেরপরিচয় এখানে গোপন নেই কারও কাছেই !
ঢোল পিটিয়ে জানানো হয়েছে যেন !
পাপালো হারকুস: “স্কেলিটনআইল্যাণ্ড এখন পিছনে। গায়ের দিকে এগোচ্ছি আমরা।”
পেছনে ফিরে চাইল তিন গোয়েন্দা। দেখা যাচ্ছে না দ্বীপ। শুধু কালো অন্ধকার। হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল রবিন,
রবিন মিলফোর্ড: “দেখ দেখ !আলো !”
একসঙ্গে জ্বলে উঠেছে অনেকগুলো আলো, ঘুরছে। শোনা যাচ্ছে অদ্ভুত একটা ধাতব শব্দ। আস্তে আস্তে বাড়ছে ঘোরার বেগ। দেখতে দেখতে আলোর এক বিশাল আংটিতৈরি হয়ে গেল।
মুসা আমান: “ইয়াল্লা !”
ফিসফিস করে বলল মুসা।
“নাগরদোলা ! নিশ্চয় ঘোড়ায় চেপে বসেছে স্যালি . . . “
কিশোর পাশা: “পাপু ! নৌকা ঘোরাও ! দেখব, কিসে ঘোরাচ্ছে নাগরদোলা !”
পাপালো হারকুস: “আমি পারবনা ! স্যালির ভূত ! ঝড় থেমেছে একটু আগে। এখন এসেছে দোলায় চড়তে !
ইসস্, নৌকাটা আরও জোরে চলছে না কেন ! একটা মোটর যদি থাকত . . . “

সোজা ফিশিং-পোর্টের দিকে ছুটে চলেছে নৌকা। খুশিই হয়েছে মুসা আর রবিন। হতাশ হয়ে কিশোর। সত্যিকারের ভূত দেখার ইচ্ছে তার অনেকদিনের। এমনএকটা সুযোগ হাত-ছাড়া হয়ে গেল।
অন্ধকারে উজ্জ্বল আলোর রিঙ তৈরি করে ঘুরেই চলেছেনাগরদোলা। বাইশ বছর আগে মরে যাওয়া তরুণীর প্রেতাত্মা . . . কথাটা ভাবতেই শিউরে উঠল রবিন।
হঠাৎ থেমে গেল ধাতব শব্দ।নিভে গেল আলো। এত তাড়াতাড়ি নাগরদোলা চড়ার শখ মিটে গেল স্যালির প্রেতাত্মার . . . আশ্চর্য ! – ভাবল কিশোর। অন্ধকারের দিকে চেয়ে বসেআছে সে। চিমটি কাটছে নিচের ঠোঁটে।
আরও আধ ঘণ্টা পর মিসেস ওয়েলটনের বোর্ডিং হাউসে এসে উঠল তিন গোয়েন্দা। সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোনে সিনেমা কোম্পানিকে জানিয়ে দিল মিসেস।
গরম পানিতে গোসল করল তিন গোয়েন্দা। খাওয়া সারল। গরম বিছানায় উঠল। কম্বলটা গায়ের ওপর টেনে দিতে দিতে বলল কিশোর,
কিশোর পাশা: “ভূতটা দেখতেপারলে ভাল হত !”
মুসা আমান: “আমার তা মনে হয় না,”
ঘুম-জড়িত গলায় বলল মুসা। শুয়ে পড়ে কম্বলটাটেনে নিলো গায়ের ওপর।
রবিন কিছু বলল না। ঘুমিয়ে পড়েছে।
কয়েক মিনিট পর . . .
দ্রুতগতি একটা স্পীডবোটে বসে আছে তিন গোয়েন্দা। কঙ্কাল দ্বীপের দিকে ছুটেচলেছে বোট। ফিশিং-পোর্টকে গ্রাম বলা হয়, আসলে ছোটখাটো শহর ওটা। ঘুরে দেখার ইচ্ছে ছিল ওদের, কিন্তু সময় মেলেনি।
রাতের বেলা অন্ধকারে কিছুই দেখেনি ছেলেরা। এখনদেখল, অসংখ্য ডক আর জেটি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এদিক ওদিক। সেই তুলনায় নৌকা-জাহাজ অনেক কম। বুঝতে পারল, ওগুলো সব চলে গেছে উপসাগরের দক্ষিণে।
ফিশিং-পোর্টের সীমানা খুব বেশি বড় না। লোকসংখ্যা আগে অনেক ছিল, ইদানীং নাকি কমে গেছে। ব্যবসা ভাল না, থেকে কি করবে লোকে ? কৌতূহলী চোখেকঙ্কাল দ্বীপের দিকে তাকিয়ে আছে ওরা। মাইল-খানেক দূরে আছে এখনও। প্রচুর গাছপালা দ্বীপে। উত্তরপ্রান্তে একটা ছোট পাহাড়।
কঙ্কাল দ্বীপের দক্ষিণে একটা পুরানো জেটির গায়ে এসে ভিড়ল বোট। পাশেই খুঁটিতে বাঁধা আরেকটা মোটর বোট। একপাশ থেকে ঝুলছে বিশেষ সিঁড়ি। স্কুবা ডাইভিঙের সময় খুবকাজে লাগে।
জেটির ধার থেকে পথ চলে গেছে। আগে আগে চললেন মিস্টার আমান। পেছনে তিন কিশোর। শিগগিরই একটা খোলাজায়গায় এসে পৌঁছুল ওরা।ঝোপঝাড় কেটে পরিষ্কার করে ফেলা হয়ে জায়গাটা। একপাশে দুটো ট্রেলার দাঁড়িয়ে আছে। বড় বড় কয়েকটা তাঁবু খাটানো হয়েছে মাঝখানে।
রাফাত আমান: “ওই যে, মিস্টার জন নেবার, ডিরেক্টর। গতকাল এসে পৌঁছেছেন ফিলাডেলফিয়া থেকে ! জরুরি কাজ সেরে আজইফিরে যাবেন আবার।”
হর্ন-রিম চশমা পরা একজন লোক এগিয়ে আসছেন। বয়েস চল্লিশের কাছাকাছি। পেছনে তিনজন লোক। একজনের চুল ধূসর। সে-ই পিটার সিমনস, এসকেপের সহকারী পরিচালক, পরে জেনেছে তিন গোয়েন্দা। আরেকজনের চুল সোনালি, নাবিকদের মত ছোট ছোট করে ছাঁটা। যুবক। জোসেফ গ্র্যাহাম। তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে বিশাল-দেহী এক লোক। চওড়াবুকের ছাতি। বাঁ হাতটা ঝুলছে বেকায়দা ভঙ্গিতে, বোঝাই যায় অকেজো। কোমরে ঝুলছে রিভলভার। জিম রিভান, গার্ড।
রাফাত আমান: “আমাদের ক্যাম্প,”
তাঁবুগুলো দেখিয়ে বললেন মিস্টার আমান।
“বার্জে করে আনা হয়েছে ভারি মালপত্র। আমরা এখন লোক কম। কয়েকদিন পরে শূটিঙের কাজ শুরু হলেই আসবে আরও অনেকে। আসবে দামি যন্ত্রপাতি। তখন আর ওই তাঁবুতে কুলাবে না। আরও কয়েকটা ট্রেলার দরকার পড়বে।”
কাছে এসে গেলেন পরিচালক।
রাফাত আমান: “সরি, মিস্টার নেবার। দেরিই হয়ে গেল।”
জন নেবার: “না না, ঠিক আছে,”
হাত তুললেন পরিচালক।
ছেলেদের দিকে একবার তাকালেন। আবার ফিরলেন মিস্টার আমানের দিকে।
“কিন্তু এখানকার অবস্থা তো বিশেষ সুবিধের মনে হচ্ছে না। সবই বলেছে পিটার। আর হপ্তা-খানেকের ভেতর নাগরদোলাটা ঠিক না করা গেলে, স্কেলিটন আইল্যাণ্ডের আশা বাদই দেব। ক্যালিফোর্নিয়া য় ফিরে গিয়ে স্টুডিওতেই একটা পার্ক সাজিয়ে নেব। নাগরদোলা আনা যাবে ভাড়া করে। তবে এখানে করতে পারলে ভালই হত। সবকিছু আসল। তাছাড়া দ্বীপের দৃশ্য, উপসাগরের দৃশ্য, খুবই চমৎকার।”
রাফাত আমান: “আশা করছি, ঠিক করে ফেলতে পারব। কাঠমিস্ত্রিকে খবর দিয়ে পাঠিয়েছি।”
জন নেবার: “তা পাঠিয়েছেন, কিন্তু আসবে কিনা যথেষ্ট সন্দেহ আছে,”
গম্ভীর গলায় বললেন পরিচালক।
“সারা শহর জেনে গেছে, গতরাতে ভূত দেখা গিয়েছে।নাগরদোলা ঘুরেছে।”
রাফাত আমান: “ভূত ভূত ভূত!”
মুঠো হয়ে গেল মিস্টার আমানের হাত। চেহারা কঠোর,
“ওই ভূতের শেষ দেখে ছাড়বআমি।”

পায়ে পায়ে এসে পরিচালকের পেছনে দাঁড়িয়েছে জিম রিভান। আস্তে করে কেশে উঠল।
জিম রিভান: “মাফ করবেন, স্যার, গতরাতের ভূতটা বোধহয় আমিই।”
গাছপালার ভেতর দিয়ে পাহাড়ের দিকে উঠে গেছে একটা পায়ে চলা পথ। আগের রাতের ঝড়ে ভেঙে পড়েছে অনেক গাছপালা। পথের ওপর ডালপাতা বিছিয়ে আছে। ওসবের মধ্যে দিয়ে চলতে অসুবিধে হচ্ছে, বিশেষ করেরবিনের। তার ভাঙা পা সারেনি পুরোপুরি।
দশ মিনিট পর পাহাড়ের মাথার কাছে উঠে এলো ওরা। পাহাড় না বলে বড় টিলা বলাই উচিত। কিন্তু নাম পাহাড়, জলদস্যুর পাহাড়।ঠিক চূড়ার কাছে গুহামুখ,খুদে একটা আগ্নেয়গিরি যেন। ভেতরে উঁকি দিল তিন গোয়েন্দা। অন্ধকার।
ভেতরে পা রাখল ওরা। তেরছাহয়ে নেমে গেছে সুড়ঙ্গ। সুড়ঙ্গ পেরিয়ে একটা গুহায় এসে ঢুকল তিন কিশোর। বেশ বড় হলরুমের মত গুহা। লম্বাটে।
শেষ প্রান্তটা সরু। সুড়ঙ্গ দিয়ে আলো এসে পড়ছে, গুহার ভেতরে আবছা অন্ধকার।
গুহার মাটি আলগা, হাঁটতে গেলে পা দেবে যায়। অসংখ্যবার খোঁড়া হয়েছে প্রতিটি ইঞ্চি, তার প্রমাণ।
নিচু হয়ে একমুঠো মাটি তুলে নিলো কিশোর। আঙুলের ফাঁক দিয়ে ছাড়তে ছাড়তেবলল,
কিশোর পাশা: “গুপ্তধন খুঁজেছে লোকে। গত সোয়াশোবছরে কয় সোয়াশো বার খোঁড়া হয়েছে এখানকার মাটি, আল্লাই জানে ! সব গাধা ! এমন একটা খোলা জায়গায় এনে গুপ্তধন লুকিয়ে রাখবে, জলদস্যুদের এত বোকা ভাবল কি করে !”
মুসা আমান: “ঠিক,”
মাথা ঝাঁকাল মুসা। আঙুল তুলে সরু প্রান্তটা দেখিয়ে বলল,
“ভেতরে আরও গুহা আছে মনে হচ্ছে ! টর্চ আনলে ঢুকতে পারতাম।”
কিশোর পাশা:”গোয়েন্দাগিরি করছ, গুহায় ঢুকতে এসেছ, টর্চ আননি কেন ?”
হাসল কিশোর। রবিনের দিকে ফিরল,
“তুমি এনেছ ?”
মুসা আমান: “গুহায় ঢুকব, ভাবিনি।”
রবিন মিলফোর্ড: “আমিও ভাবিনি।”
কিশোর পাশা:”গোয়েন্দাদের জন্যে টর্চ একটা অতি দরকারি জিনিস, সব সময় সঙ্গে রাখা উচিত,”
আবার হাসল কিশোর।
“তবে, আমিও রাখতে ভুলে যাই। আজ গুহায় ঢুকব, জানি, তাই মনে করে সঙ্গে নিয়ে এসেছি !”
গুহার সরু প্রান্তে এসে দাঁড়াল ওরা। টর্চ জ্বাললকিশোর। পাথুরে দেয়াল। দেয়ালে অসংখ্য তাক, প্রাকৃতিক। মসৃণ। এখানেই ঘুমাত হয়ত জলদস্যুরা, ঘষায় ঘষায় মসৃণ হয়ে গেছে। কে জানে, বন্দিদেরকে হয়ত হাত-পা বেঁধে এখানেই ফেলে রাখা হত ! অসংখ্য ফাটল, খাঁজ দেখা গেল দেয়ালের এখানে ওখানে। একপাশে, মাটি থেকেফুট ছয়েক উঁচুতে একটা খাঁজে এসে স্থির হয়ে গেলটর্চের আলো। সাদা একটা বস্তু। ওপরের দিকটা গোল।
মুসা আমান: “খাইছে রে !”
চেঁচিয়ে উঠল মুসা। ঘুরে দাঁড়িয়েই ছুট লাগাতে গেল।
তারপরেই ঘটল অদ্ভুত একটা কাণ্ড ! চমকে থেমে গেল সে।
তাকের ওপর বসে আছে যেন মানুষের মাথার খুলিটা। চক্ষু কোটর দুটো এদিকে ফেরানো। দাঁতগুলো বীভৎস ভঙ্গিতে হাসছে নীরব হাসি,দুই পাটি দাঁতের মাঝে সামান্য ফাঁক। ওই ফাঁক দিয়েই এলো যেন কথাগুলোঃ
–“ভাগ, ভেগে যাও জলদি !”
দী-র্ঘ-শ্বা-স . . .
“আমাকে শান্তিতে একা থাকতে দাও ! এখানে কোন গুপ্তধন নেই !”
পাপালো হারকুস: “তারপর ?”
খুলিটা পেছনে ছুঁড়ে ফেলে দিল পাপালো হারকুস।
“চিনতে পার ?”
কিশোর পাশা: “নিশ্চয়। প্রথমে দৌড় দিয়েছিলাম, তারপরই মনে হল গলাটা কেমনচেনা চেনা। টর্চ তুলে নিতে আসার সাহস করেছি সেজন্যেই।”
পাপালো হারকুস: “তারমানে,ভয় পাইয়ে দিতে পেরেছি তোমাদের ?”
আবার হাসল পাপালো।

“জলদস্যুর ভূত ভেবে কি একখান কাণ্ডই না করলে !”
মুসা আর রবিনের গোমড়া মুখের দিকে চেয়ে আবার হা হা করে হেসে উঠল সে।
কিশোর পাশা: “আমি ভয় পাইনি,”
গম্ভীর গলায় বলল কিশোর।
“শুধু চমকে গিয়েছিলাম। মুসা আর রবিন . . . “
দুই সহকারীর পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে থমকে গেল সে। ভেড়া বনে গেছে যেন মুসা আর রবিন।
রবিন মিলফোর্ড: “আমিও ভয় পাইনি,”
বিড়বিড় করল রবিন।
“পা দুটো কথা শুনল না, কি করবে ! খালি ভাগিয়ে নিয়ে যেতে চাইল . . . “
মুসা আমান: “আমারও একই ব্যাপার ! খুলির ওদিক থেকে কথা শোনা যেতেই পা দুটো চনমন করে উঠল। ছুটিয়ে বের করে নিয়ে যেতেচাইল গুহার বাইরে। তাই, ইচ্ছে করেই তো হোঁচট খেলাম . . . “
হো হো করে হেসে উঠল পাপালো।
পাপালো হারকুস: “দারুণ কৌতুক ! হাঃ হাঃ হাঃ . . . “
কিশোরও হেসে ফেলল। হাসিটাসংক্রমিত হল মুসা আর রবিনের মাঝেও।

রবিন মিলফোর্ড: “দু’ডলারেদু’জন মানুষের খাওয়া হয়!!”
চোখ কপালে উঠল রবিনের।
“বেঁচে আছ কি করে ?”
পাপালো হারকুস: “আছি, কোনমতে,”
সহজ গলায় বলল পাপালো।
“পুরানো ভাঙা একটা কুঁড়েঘরে ঘুমাই। এক সময় ঝিনুকরাখত ওখানে জেলেরা। কাজে লাগে না এখন, ফেলে রেখেছে। ভাড়া দিতে হয় না আমাকে। সীম আর রুটি কিনতেই খরচ হয়ে যায় দু’ডলার। মাছ ধরতে জানি, তাই বেঁচে আছি। বাবা অসুস্থ। ভাল খাওয়া দরকার। কিন্তু কোথায় পাব? মাঝে মাঝে বাবার কষ্ট দেখলে আর সইতে পারি না। ছুটে বেরিয়ে আসি কুঁড়ে থেকে। পাগলের মত ঘুরে বেড়াই উপসাগরে, খুঁজে ফিরি সোনার মোহর। মানুষেরদয়া আমি চাই না, ঈশ্বর আমাকে সাহায্য করলেই যথেষ্ট।”
অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বলতে পারল না আর। নোনাপানি ছুঁয়ে ছুঁয়ে আসছে হাওয়া, শাঁই শাঁই শব্দ, সাগরের দীর্ঘশ্বাস যেন।
কোমরের বেল্টে গোঁজা ছুরিখুলে নিয়ে খামোখাই মাটিতে গাঁথছে পাপালো। থমথমে পরিবেশ হালকা করার জন্যে হাসল।
পাপালো হারকুস: “নিজের দুঃখের সাতকাহনই গেয়ে চলেছি ! আসল কথা থেকে দূরেসরে গেছি অনেক। হ্যাঁ, কি যেন জিজ্ঞেস করছিলে ?”
মুসা আমান: “গতরাতে এত তাড়াতাড়ি আমাদেরকে খুঁজে পেলে কি করে ?”
পাপালো হারকুস: “সকালে হাক স্টিভেনের ওখানে বাসনমাজছিলাম। হঠাৎ কানে এলো,হাসাহাসি করছে কয়েকজন লোক। একজন বললঃ গোয়েন্দা, না ! গোয়েন্দা আনাচ্ছে ! আসুকনা আগে ! হাত দেখিয়ে ছাড়ব ব্যাটাদের !”
নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটতে কাটতে হঠাৎ থেমে গেল কিশোর।
কিশোর পাশা: “হাত ! শব্দটাকোন বিশেষ ভঙ্গিতে উচ্চারণ করেছিল ?”
পাপালো হারকুস: “তুমি কি করে বুঝলে ! ওই শব্দটা বলার সময় জোর দেয় সে। ঝড়ের সময়ই তোমাদের নিরুদ্দেশের খবর ছড়িয়ে পড়ল। বুঝে গেলাম, কোথায়পাওয়া যাবে তোমাদেরকে।”
কিশোর পাশা: “দ্য হ্যাণ্ড. . . হস্ত. . . হাত,”
বিড়বিড় করল কিশোর। চিমটি কাটছে ঠোঁটে।
পুরানো গলাবন্ধ শার্টের তলায় হাত ঢোকাল পাপালো।
পাপালো হারকুস: “আমাকে যখন বিশ্বাস কর তোমরা. . . একটা জিনিস দেখাচ্ছি. . .,”
ছুরিটা মাটিতে রেখে চামড়ার তেল চিটচিটে একটাথলে বের করে আনল সে। প্লাস্টিকের সুতোয় বাঁধা মুখ। বাঁধন খুলল পাপালো।
পাপালো হারকুস: “চোখ বন্ধকর সবাই,”
হাসি হাসি গলায় বলল।
“হাত বাড়াও।”
হাসল তিন গোয়েন্দা। চোখ বন্ধ করে হাত সামনে বাড়াল।
সবার ডান হাতের তালুতে একটা করে বস্তু রাখল পাপালো।
পাপালো হারকুস: “এবার চোখখোল !”
অবাক হয়ে দেখল তিন গোয়েন্দা, তিনটে পুরানো সোনার মোহর।
বুড়ো আঙুলের সাহায্যে চকচকে মুদ্রার ধারটা পরীক্ষা করল রবিন। ক্ষয়েগেছে। লেখা পড়ল।
রবিন মিলফোর্ড: “ষোলোশো পনেরো !”
চোখ বড়বড় হয়ে গেছে তার।
“এত পুরানো !”
কিশোর পাশা: “স্প্যানিশ ডাবলুন !”
হাতের মোহরটার দিকে চেয়েআছে কিশোর।
“জলদস্যুদের গুপ্তধন !”
মুসা আমান: “ইয়াল্লা ! কোথায়, কোথায় পেয়েছ এগুলো ?”
কিশোর পাশা: “দশ লাখ ডলার!”
ভুরু কুঁচকে গেছে কিশোরের।
জিম রিভান: “হ্যাঁ,”
অকেজো বাঁ হাত দেখিয়ে বলল জিম।
“ওই টাকার জন্যেই আমার হাতটা গেল . . . “
কৌতূহলী হয়ে পড়ল তিন গোয়েন্দা। কাহিনীটা শোনাতে অনুরোধ করল জিমকে।
জিম রিভান: “এক পরিবহন কোম্পানিতে চাকরি করতাম সে সময়। টাকা-পয়সা কিংবা মূল্যবান জিনিসপত্র এক জায়গা থেকেআরেক জায়গায় পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব নিত কোম্পানি। আমি ছিলাম একটাআর্মার কারের গার্ড। ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে পৌঁছে দিতে হত বিভিন্ন জায়গায়। কিছু নিয়মিত কাজ ছিল। তার মধ্যে একটাঃপ্রাইভেট ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়ে মেলভিলেরন্যাশনাল ব্যাংকে জমা দিয়ে আসা। দিয়ে আসতাম। ঠিকঠাক মতই চলছিল সব। নির্দিষ্ট কোন একটা পথে চলাচল করতাম না আমরা। আজ এ পথে গেলে পরের বার অন্য পথে, তারপরের বার আরেক পথে। নির্দিষ্ট কোন সময়ওমেনে চলতাম না। ডাকাত লুটেরাকে ফাঁকি দেবার জন্যেই এই সাবধানতা। কিন্তু তারপরেও একদিন ঘটেগেল অঘটন . . . “
জিমের কথা থেকে জানা গেল, ঘটনার দিন, ফিশিং-পোর্টেরএক ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে মেলভিলে চলেছিল আর্মার কার। গাড়িতে দু’জন লোক। ড্রাইভার আর জিম। পথে এক জায়গায় গাড়ি থামিয়ে দুপুরের খাবার খেতে নামল দু’জনে। গাড়িটা পথের পাশে পার্ক করে তালা লাগাল সিন্দুকে।তারপর ঢুকল রেস্টুরেন্টে। বসল গিয়ে জানালার কাছে, ওখান থেকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল গাড়িটা।
খাওয়া শেষ করে বেরোল দু’জনে। হঠাৎ পাশের একটা পুরানো সিডান গাড়ি থেকে বেড়িয়ে এলো মুখোশপরা দু’জন লোক। হাতে রিভলভার।ড্রাইভারের পায়ে গুলি করল একজন। আরেকজন বাড়ি মারল জিমের কাঁধে, মাথায়। সঙ্গে সঙ্গে বেহুঁশ হয়ে পড়ল জিম।
গার্ডের পকেট থেকে সিন্দুকের চাবি বের করে নিলো ডাকাতেরা। আর্মার কারে উঠে বসল। গুলির শব্দকানে গিয়েছিল একজন কনস্টেবলের। ছুটে এলো সে।গুলি করল দুই ডাকাতকে লক্ষ্য করে। একজনের হাতে গুলি লাগল। গাড়ি নিয়ে পালিয়ে গেল ডাকাতেরা।
পুলিশ স্টেশনে ফোন করে দিল কনস্টেবল। সাড়া পড়েগেল। রোড ব্লক করে দিল পুলিশ। কড়া পাহারা বসে গেল রাস্তায় রাস্তায়।
সাঁঝের একটু পরে পাওয়া গেল গাড়িটা, রক্তাক্ত। খালি। একটা পরিত্যক্ত বোটহাউসের কয়েক মাইল দূরে। বোঝা গেল, জলপথে পালিয়েছে ডাকাতেরা।
মাঝরাতে কোস্ট গার্ডদের পেট্রল বোট একটা সাধারণ বোটকে ভাসতে দেখল উপসাগরে, কঙ্কাল দ্বীপের কাছাকাছি। বোটের একজন কি যেন ফেলছে পানিতে। তাড়াতাড়ি কাছে চলে এলো কোস্ট গার্ডের বোট। দু’জনলোক অন্য বোটটাতে। দুই ভাই, ডিক এবং বার্ড ফিশার। দু’জনেই খুব ক্লান্ত, হাল ছেড়ে দিয়েছে। বাডের বাহুতে গুলির ক্ষত, রক্ত ঝরছে ! লুট করা টাকার একটি নোটও পাওয়া গেল না বোটে।
জিম রিভান: “ব্যাপারটা বুঝেছ তো ? নোটের বাণ্ডিলপানিতে ফেলে দিয়েছিল দুইডাকাত। অনেক খোঁজাখুঁজি করা হয়েছে পরে, কিন্তু একটা নোটও আর পাওয়া যায়নি। পানিতে ভিজে নিশ্চয় গলে-ছিঁড়ে গিয়েছিল কাগজের নোট।”
মুসা আমান: “মহা-হারামী তো ব্যাটারা। ধরা পড়ল বটে, কিন্তু টাকা ফেরত দিল না। তা ব্যাটাদের জেলহয়েছিল তো ?”
জিম রিভান: “হয়েছিল। হোভারসনের রিভলভারের বুলেটে আহত হয়েছে বাড। কিন্তু বমাল ধরা যায়নি, তাই মাত্র চার বছর করে জেল হয়ে গেল দুই ভাইয়ের। জেলখানায় ভাল ব্যাবহারের জন্যে অর্ধেক শাস্তি মওকুফ করে দেয়া হয়েছে ওদের। ছাড়া পেয়েছে হপ্তা দুয়েক আগে। কিন্তু আমার হাত আর ফিরে পেলাম না,”
জিমের কণ্ঠে ক্ষোভ।

“কাজও গেল কোম্পানি থেকে।এরপর আর ভাল কোন কাজ পাইনি আজ পর্যন্ত। ইচ্ছে করে, ব্যাটাদেরও হাত ভেঙেদিই . . . “
রাফাত আমান: “এই যে, যাও, বোটে উঠে পড়। চোখ বুজে নির্ভর করতে পার জোসেফের ওপর। খুব ভাল ডুবুরি।”
ছেলেদেরকে বোটে তুলে দিয়ে চলে গেলেন মুসার বাবা।
বোট ছাড়ল জোসেফ গ্র্যাহাম। বেশ বড়সড় বোট। এক জায়গায় স্তূপ করে রাখা ডুবুরির সাজ-সরঞ্জাম। ওগুলো দেখিয়ে বলল জোসেফ,
জোসেফ গ্র্যাহাম: “আধুনিকজিনিস। খুব ভাল। তো, ডুবুরির কাজ কেমন জান-টান?”
মুসা জানাল, প্রাথমিক পরীক্ষায় পাশ করেছে ওরা।সুরকেল ব্যবহার করতে জানেভালই।
জোসেফ গ্র্যাহাম: “গুড। এ-বি-সি-ডি থেকে আর শুরু করতে হল না।”
দ্রুত এগিয়ে চলেছে বোট। হলুদ একটা বয়ার কাছে এসেথামিয়ে দিল জোসেফ। নোঙর ফেলল।
জোসেফ গ্র্যাহাম: “আমাদেরনিচে একটা ভাঙা জাহাজ আছে।
না না, কোন গুপ্তধন নেই। ডুবে যাওয়া বেশ কয়েকটা জাহাজ আছে এদিককার পানিতে। সব ক’টাই তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে ডুবুরিরা। আমাদের নিচে আছে একটা স্প্যানিশ ইয়ট,অনেক বছর আগে ডুবেছে। এখানে মাত্র পঁচিশ ফুট গভীর পানি। নিশ্চিন্তে ডুব দিতে পার। ডিকম্প্রেশনের ভয় নেই।”
ফেস মাস্ক আর ফ্লিপার পরেনিলো ছেলেরা। টেনেটুনে পরীক্ষা করে দেখল জোসেফ। ঠিকমতই পরা হয়েছে। একটা আলমারি খুলে গ্যাস ট্যাংক, হোস কানেকশন আর ভারি ডাইভিং বেল্ট বের করল সে।
জোসেফ গ্র্যাহাম:”এখানকার পানি খুব ভাল। পরিষ্কার, গরম। ওয়েটসুট পরার দরকার নেই।
রবিন, প্রথমে তুমি চল আমার সঙ্গে। সব সময় কাছাকাছি থাকবে, আলাদা হবে না মুহূর্তের জন্যেও।বুঝেছ ?”
মাথা কাত করে সায় দিল রবিন।
গ্যাস ট্যাংক বাড়িয়ে দিল জোসেফ।
জোসেফ গ্র্যাহাম: “এগুলো পরে নাও।”
পরে নিতে লাগল রবিন। তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকে চেয়ে রইল জোসেফ।
নাহ্, পরতে জানে ছেলেটা। ভালই শিক্ষা দিয়েছে ইনস্ট্রাক্টর, ভাবল সে।
বোটের পাশ থেকে ঝুলে আছে দড়ির সিঁড়ি। সিঁড়ি বেয়ে পানিতে নামল জোসেফ।সাগরের দিকে পিঠ দিয়ে হাত ছেড়ে দিল সিঁড়ি থেকে। ঝুপ করে পড়ল চিত হয়ে। ডুবে গেল। তার পর পরই একই কায়দায় ডুবল রবিন।
ফ্লিপার নেড়ে দ্রুত ডুবেচলল। জোড়া লেগে গেছে পায়ের ভাঙা হাড়। কোন অসুবিধে হচ্ছে না সাঁতরাতে। কুসুম গরম পানি। স্বচ্ছ। খুব ভাল লাগছে তার।
নতুন এক পৃথিবীতে এসে প্রবেশ করেছে যেন।
নিচে একটা বিশাল কালো ছায়া ! ডুবে যাওয়া ইয়ট। জোসেফের পাশাপাশি জাহাজটার দিকে নেমে চলল রবিন।
কাত হয়ে পড়ে আছে ইয়ট। সামনের দিকে বিরাট এক ফাটল হাঁ করে আছে। আরও কাছে গিয়ে দেখা গেল, শ্যাওলায় ঢেকে আছে জাহাজের গা। আশেপাশে সাঁতরে বেড়াচ্ছে ছোট ছোটমাছ।
রবিনের আগে আগে সাঁতরাচ্ছে এখন জোসেফ। ফ্লিপার নেড়ে চলে গেল জাহাজের ওপর দিয়ে, পেছন দিকে।
দুটো বড় গলদা চিংড়ির ওপর নজর আটকে গেল রবিনের।আরও কাছ থেকে দেখার জন্যেএগিয়ে গেল। হঠাৎ জোরে ঝাঁকুনি লাগল পায়ে। থেমেযেতে হল।
কিছু একটা শক্ত করে চেপে ধরেছে তার ডান পা।

পানির তলায় এই প্রথম বিপদে পড়ল রবিন। আতঙ্কিতহয়ে পড়ল। জোরে লাথি মেরে পা ছাড়ানোর চেষ্টা করল। পারল না। চাপ বাড়ল পায়ে। পেছনে টানছে।
পেছনে ফিরে চাইতে গেল রবিন। ফেস মাস্কে হাত লেগে গেল নিজের অজান্তেই।সঙ্গে সঙ্গে যেন অন্ধ হয়ে গেল সে, সামনের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। পানি ঢুকে পড়েছে মাস্কেরভেতর। উত্তেজনায় ভুলে গেল, কি করে পানি বের করে দিতে হয়।
হঠাৎ কাঁধ চেপে ধরল কেউ। চমকে উঠল রবিন। ধরেই নিলো, দানবটা এবার শেষ করতে এসেছে তাকে।
কিন্তু না, পিঠের ট্যাংকেতিন বার আলতো টোকা পড়ল। জোসেফ ফিরে এসেছে তাকে উদ্ধার করতে। শান্ত হয়ে এলো রবিন। উত্তেজনা আর আতঙ্ক চলে গেল। মনে পড়ল, কি করে পানি বের করে দিতে হয়।
মাথা ডানে ঘোরাল রবিন। আস্তে করে এক আঙুলে চাপ দিল মাস্কের বাঁ পাশে। সামান্য ফাঁক হল মাস্ক। জোরে শ্বাস ফেলল সে। বুদবুদ তুলে বেরিয়ে গেল বাতাস, সঙ্গে নিয়ে গেল মাস্কের ভেতরের পানি। আঙুল সরিয়ে আনতেই আবার জায়গা মত বসে গেল মাস্ক।অন্ধকার সরে গেল চোখের সামনে থেকে।
প্রথমেই জোসেফের ওপর চোখ পড়ল রবিনের। এদিক ওদিক মাথা নাড়ছে লোকটা। আঙুল তুলে পেছনে দেখাল। ফিরে চাইল রবিন।
হায় হায়, এর জন্যেই এত ভয় পেয়েছে সে ! জাহাজের একটা দড়ি পেঁচিয়ে গেছে তার পায়ে।
বাঁকা হয়ে দড়ি ধরল রবিন। খুলে ফেলল পা থেকে।নিজের ওপরই রাগ হচ্ছে। অযথা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। কয়েক ফুট দূরে সরে গেছে জোসেফ। হয়ত এখুনি ওঠার ইঙ্গিত করবে।
কিন্তু না, উঠল না জোসেফ। ডান হাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর মাথা এক করে একটারিং তৈরি করল। দেখাল রবিনকে। তার মানে, সব কিছু ঠিকঠাকই আছে। পাশে চলে এলো রবিন।দু’জনে সাঁতরে চলল আবার।
পুরো জাহাজের সামনে থেকে পেছনে একবার সাঁতরাল ওরা।তারপর চারদিকে এক চক্কর দিল। আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে ছোট ছোট মাছ। ভয় পাচ্ছে না। দু’জন সাঁতারুকে বড় জাতের কোন মাছ মনে করছে হয়ত।
অসংখ্য গলদা চিংড়ি দেখতেপেল রবিন।
ইস্, একটা স্পীয়ার গান যদি থাকত সঙ্গে !
কয়েকটাকে ধরে নিয়ে যাওয়া যেত।
আরও কিছুক্ষণ সাঁতরাল ওরা। তারপর ওপরে ওঠার ইঙ্গিত করল জোসেফ।
ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠতে লাগল দু’জনে, কোনরকম তাড়াহুড়ো করল না। মোটর বোটের তলা দেখা যাচ্ছে, অদ্ভুত কোন দানব যেন।
ভুস‌্স্ করে পানির ওপর মাথা তুলল দু’জনে।
দড়ির সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল জোসেফ। তাকে অনুসরণ করল রবিন।
মুসা আমান: “কেমন লাগল ?”
আগ্রহী গলায় বলল মুসা। হাত ধরে রবিনকে বোটে উঠতেসাহায্য করল।
রবিন মিলফোর্ড: “ভালই লাগত, কিন্তু গুবলেট করে ফেলেছি। দড়ি পেঁচিয়ে গিয়েছিল পায়ে। মাথা ঠিকরাখতে পারিনি।”

বিছানা গোছগাছ করছে মিসেসওয়েলটন। মুসার বালিশটা টান দিয়ে সরিয়েই স্থির হয়ে গেল।
মিসেস ওয়েলটন: “আরে ! সোনার মোহর ! এটা এলো কোত্থেকে !”
ভুরু কুঁচকে তাকাল কিশোরের দিকে।
“তোমরা খুঁজে পেয়েছ, না? স্কেলিটন আইল্যাণ্ডে ?”
কিশোর পাশা: “মুসা পেয়েছে।”
কানে বাজছে জোসেফ গ্র্যাহামের হুঁশিয়ারিঃখবরদার ! কেউ যেন জানতে নাপারে !
কিন্তু চেপে রাখা গেল না।ফাঁস হয়ে গেল মুসার বোকামির জন্যে।
মিসেস ওয়েলটন: “স্কেলিটনআইল্যাণ্ডেই পেয়েছে তো?”
কিশোর পাশা: “না, উপসাগরে। দ্বীপ থেকে অনেকদূরে।”
মিসেস ওয়েলটন: “তাজ্জব কাণ্ড ! প্রথম দিন পানিতে ডুব দিয়েই মোহর পেয়ে গেল !”
কিশোরের দিকে তাকাল। চোখেসন্দেহ।
“লোকের ধারণা, শুটিঙ-ফুটিঙ কিছু না, আসলে মোহর খুঁজতে এসেছে দলটা। ক্যাম্প করেছে দ্বীপে। ক্যাপ্টেন ওয়ান ইয়ারের আসল ম্যাপটা পেয়ে গেছে ওরা কোনভাবে।”
কিশোর পাশা: “হুঁ,”
চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা ঝোঁকাল কিশোর। সেজন্যেই কি বিরক্ত করা হচ্ছে সিনেমা কোম্পানিকে। কেউ হয়ত চাইছে, কোম্পানি দ্বীপ থেকে চলে যাক।
“. . . কিন্তু মিসেস ওয়েলটন, সত্যি বলছি, কোন ম্যাপ নেই কোম্পানির কাছে। ওরা গুপ্তধন খুঁজতেআসেনি। ছবি তুলতেই এসেছে।আপনার এখানে অনেকেই আসে, তাদের ভুল বিশ্বাস ভেঙে দেবার চেষ্টা করবেন।”
মিসেস ওয়েলটন: “তা করব। কিন্তু আমার কথা বিশ্বাস করবে বলে মনে হয় না। একবার কোন কথা ওদের মাথায় ঢুকলে আর সহজে বেরোতে চায় না।”
কিশোর পাশা: “হ্যাঁ, এই যেমন, নাগরদোলার ভূতের কথাও বেরোতে চাইছে না। আচ্ছা, আপনাকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করব, জবাব দেবেন ? সারাজীবন এখানেই বাস আপনার, এখানকার অনেক কিছুই জানেন।”
মিসেস ওয়েলটন: “নিশ্চয় বলব, যা জানি,”
হাসল মহিলা।
“ঘরটা গুছিয়ে নিই। নিচেওকয়েকটা কাজ আছে। তুমিও নিচেই চলে এসো। কফি খেতে খেতে কথা বলব।”
কিশোর পাশা: “ঠিক আছে।”
রবিনের ব্যাগ থেকে ম্যাগাজিনটা বের করে নিলো।
“আমি যাচ্ছি। আপনি আসুন।”
ড্রইংরুমে এসে বসল কিশোর।পড়ায় মন দিল।
কাজ সেরে এলো মিসেস ওয়েলটন। হাতে দু’কাপ কফি।
ম্যাগাজিনটা বন্ধ করে পাশে রেখে দিল কিশোর। হাতবাড়িয়ে একটা কাপ তুলে নিলো।
আরেকটা সোফায় বসে পড়ল মিসেস ওয়েলটন।
মিসেস ওয়েলটন: “হ্যাঁ, এবার কি বলতে চাও।”
কিশোর পাশা: “ওই স্কেলিটনআইল্যাণ্ড। প্রথমেই বলুন,ওটা ভূতুড়ে হল কি করে ?”
জানা আছে তার, তবু স্থানীয় একজনের মুখে শুনতে চায়।
খুলে বলল সব মিসেস ওয়েলটন। ফীচারে লেখা তথ্যের সঙ্গে তার কথা হুবহু মিলে গেল। একটা কথাজানা গেল, যেটা লেখা নেই। প্লেজার পার্ক পরিত্যক্ত হবার অনেক বছর পর আবার দেখা দিতে শুরু করেছে স্যালি ফ্যারিংটনের ভূত !
বেশ ঘন ঘন দেখা যাচ্ছে ইদানীং।
কিশোর পাশা: “জেলেরা, যারা দেখেছে, তাদেরকে কতখানি বিশ্বাস করা যায়?”
মিসেস ওয়েলটন: “তা সঠিক বলা মুশকিল ! তিলকে তাল করার অভ্যাস আছে জেলেদের।তবে ওই তিলটা থাকতেই হবে।আরেকটা ব্যাপার, স্কেলিটনআইল্যাণ্ডে ভূত আছে, শুধুশুধু বানিয়ে বলতে যাবে কেন ওরা ?”
কেন বলতে যাবে, কোন ধারণা নেই কিশোরের। তবে, জেলেরাপুরোপুরি মিছে কথা বলেছে,এটাও ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না তার।
কিশোর পাশা: “ঠিক ক’বছর আগে থেকে দেখা দিতে শুরু করেছে স্যালি ফ্যারিংটনের ভূত ?”
মিসেস ওয়েলটন: “সঠিক বলতে পারব না। তবে বছর দুই-তিন আগে থেকে !

সিনেমা কোম্পানি এলো, ক্যাম্প করল দ্বীপে। চুরিযেতে লাগল তাদের জিনিসপত্র, কিন্তু চোর ধরা পড়ল না। ভূতে নিয়ে যায় যেন জিনিসপত্রগুলো !একেবারে গায়েব ! নাহ্, কিছু একটা রহস্য আছে দ্বীপটায় ! কি, বলতে পারবনা !”
কিশোরও মিসেস ওয়েলটনের সঙ্গে একমত। কিছু একটা রহস্য আছে কঙ্কাল দ্বীপের।
কিন্তু কি সে রহস্য !!
চমৎকার হাওয়া, ফুলে উঠেছেপাল। তরতর করে এগোচ্ছে ছোট নৌকা। আশেপাশে কোন নৌকা-জাহাজ নেই। অনেক দূরে দক্ষিণ দিগন্তে কয়েকটা কালো বস্তু, মাছ ধরা নৌকা।
কঙ্কাল দ্বীপের জেটিতে এসে নৌকা বাঁধল পাপালো, রবিন আর মুসার অনুরোধ। ডুবুরির সাজসরঞ্জাম নেবে ওরা। তবে আগে জোসেফ গ্রাহামের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে।
অনুমতি দিল জোসেফ। তাড়াহুড়ো করে চলে গেল প্লেজার পার্কের দিকে।
মোটর বোটের আলমারি খুলে মুসা বের করল ফ্লিপার, মাস্ক, গ্যাস ট্যাংক। দু’জনের জন্যে। পাপালোর দরকার নেই। ওসব সরঞ্জাম ছাড়াই সাগরে ডুব দিতে অভ্যস্ত সে। কি ভেবে, পানির তলায় ব্যবহারের উপযোগী দুটো টর্চও নিয়ে নিলো।
আবার এসে উঠল ওরা নৌকায়। বাঁধন খুলল পাপালো। আবার নৌকা ছাড়ল।
উজ্জ্বল রোদে ঝিকমিক করছেপানি। ছোট ছোট ঢেউয়ে তালেতালে দুলছে নৌকা। চুপ করেবসে থাকতে থাকতে ঝিমুনি এসে গেল দুই গোয়েন্দার।
গান ধরল পাপালো। ভাষাটা বুঝতে পারল না দুই গোয়েন্দা। নিশ্চয় গ্রীক। চোখ মেলে চাইল ওরা। চোখে পড়ল দ্য হ্যাণ্ড, হস্ত। যেখানে দু’রাত আগে রহস্যজনক ভাবে আটকা পড়েছিল ওরা।দ্রুত এগিয়ে আসছে বোট। গতি কমছে না মোটেই। লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল পাপালো।
পাপালো হারকুস: “আরে, পাথরে বাড়ি লাগাবে তো ! তলা খসাবে !
এ-ই-ই ! বোট থামাও ! বাড়ি লাগবে পাথরে !”
কমল না বোটের গতি। ইঞ্জিনের শব্দে পাপালোর চিৎকার কানে গেল না হয়ত চালকের।
উঠে দাঁড়াল মুসা আর রবিন।তিনজনে হাত নেড়ে নেড়ে চিৎকার করতে লাগল, বোট থামাতে বলল।
আরও এগিয়ে এলো বোট। হুইল ধরে রাখা চালককে দেখা যাচ্ছে। মাথার বড় হ্যাটেরকাণা টেনে নামানো। চেনা গেল না লোকটাকে। ছেলেদের চিৎকার তার কানে গেল কিনাবোঝা গেল না, তবে হঠাৎ বদলে গেল ইঞ্জিনের শব্দ। গতি কমে গেল বোটের। ব্যাকগীয়ার দিয়েছে হয়ত।
সাঁ করে ঘুরে গেল বোটের নাক। গতি এখনও অনেক। কাত হয়ে গেল একপাশে, উল্টেই যাবে যেন। সোজা হয়ে গেল আবার। তারপরই ঘটল অঘটন।
বোটের ঠিক সামনেই পাপালোরনৌকা। শেষ মুহূর্তে নৌকাটা দেখতে পেল বোধহয় চালক। সরে যাবার চেষ্টা করল কিনা, বোঝা গেল না। প্রচণ্ড জোরে আঘাত হানল ইস্পাতের তৈরি ভারি বোটেরনাক, নৌকার মাঝামাঝি। ঢুকে গেল ভেতরে।
একটা মুহূর্ত এক হয়ে রইল দুটো জলযান !
জোরে গর্জে উঠল মোটর বোটের ইঞ্জিন। ঝটকা দিয়ে নৌকার ভেতর থেকে বের করে আনল নাক। মোড় ঘুরে সোজা ছুটল খোলা সাগরের দিকে।
বোবা হয়ে গেছে যেন ছেলে তিনটে। হাঁ করে চেয়ে আছে ভাঙা নৌকাটার দিকে। দ্রুততলিয়ে যাচ্ছে ওটা।
মুসা আমান: “ইয়াল্লা !!
কাপড়-চোপড়, ঘড়ি, সব গেল আমাদের !”
রবিন মিলফোর্ড: “বাড়ি ফেরার পথ বন্ধ !
আটকা পড়লাম এই দ্বীপে ! দ্বিতীয়বার !”
স্তব্ধ হয়ে গেছে পাপালো। কিছুই বলার নেই তার। মুঠোহয়ে গেছে হাত। বোবা চোখে চেয়ে আছে সাগরের দিকে।
তার সব আশা সব ভরসা যেন তলিয়ে গেছে ওই ছোট নৌকাটার সঙ্গে সঙ্গে।
নাক দিয়ে অনবরত পানি গড়াচ্ছে। রুচি নেই। এক গ্লাস দুধ দিয়ে কোনমতে একটা স্যাণ্ডউইচ গিলে নিলো কিশোর। তারপর বেরিয়েপড়ল।
বোর্ডিং হাউসের কয়েকটা বাড়ি পরেই ডাক্তার রোজারের চেম্বার, মিসেস ওয়েলটনকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়েছে কিশোর।
রাস্তায় লোকজন কম। কলোনি,টাইপের কয়েকটা বাড়ি পেরিয়ে এলো কিশোর। রঙ চটেগেছে, প্লাস্টার উঠে গেছেজায়গায় জায়গায়। কয়েকটা খালি দোকান পেরল। দরজায় ঝুলছে “ভাড়া দেয়া হইবে” নোটিশ। পরিষ্কার বোঝা যায়, ফিশিংপোর্টের সময় খুব খারাপ যাচ্ছে।
আশেপাশের বাড়িগুলোর তুলনায় ডাক্তার রোজারের বাড়িটা নতুন। লাল ইটের তৈরি, ছোটখাট, ছিমছাম। ওয়েটিং রুমে ঢুকল কিশোর। দুটো বাচ্চা নিয়ে বসে আছেএক মহিলা। খানিক দূরে বসেছে দু’জন বৃদ্ধ, শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনের দেয়ালের দিকে।

কিশোরের দিকে তাকাল ডেস্কের ওপারে বসা নার্স।ডাক্তারের চেম্বারের দরজা দেখিয়ে দিল। সোজা ঢুকে যেতে বলল।
মাঝারি আকারের একা কামরা।এক পাশে একটা ছোট ডেস্ক। কাছেই একটা বিছানা, ওতে শুইয়ে পরীক্ষা করা হয় রোগীকে। দু’পাশের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটাআলমারি। সাদা রঙ করা। ওষুধের শিশি বোতলে ঠাসা।
ডেস্কের ওপাশে বসে আছেন ডাক্তার রোজার। ধূসর হয়ে এসেছে চুল। একটা স্যাণ্ডউইচ খাচ্ছেন।
ড‌ঃ রোজার: “হ্যাল্লো, কিশোর পাশা,
তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছি। এসো, বসো।”
স্যাণ্ডউইচটা খেয়ে নিলেন ডাক্তার। এক ঢোক কফি খেয়েউঠে দাঁড়ালেন। বিছানায় গিয়ে শুতে ইঙ্গিত করলেন কিশোরকে।
দ্রুত অভ্যস্ত হাতে কিশোরের নাক গলা কান পরীক্ষা করলেন ডাক্তার। গলায় স্টেথো লাগিয়ে হার্টবিট শুনলেন। টোকা দিয়ে পরীক্ষা করলেন বুক। তারপর ব্লাডপ্রেশার দেখলেন।
ড‌ঃ রোজার: “হুঁমম,
ঠাণ্ডা লাগিয়েছ ভাল মতই। এখানকার আবহাওয়া সহ্য হয়নি . . . “
আলমারি খুলে একটা শিশি বের করলেন ডাক্তার। একটা ছোট খামে কয়েকটা বড়ি ঢেলেনিলেন। খামটা কিশোরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
“ভাবনা নেই। চার ঘণ্টা পরপর দুটো করে বড়ি খেয়ো। দু’দিনেই সেরে যাবে। তবে হ্যাঁ, নড়াচড়া বেশি করে না, বিশ্রাম নেবে। সাগরেরধারে কাছে যাবে না।”
কিশোর পাশা: “ঠিক আছে।”
এক মুহূর্ত দ্বিধা করল।
“আচ্ছা, স্যার, আমাকে কয়েকমিনিট সময় দিতে পারবেন ? কিছু কথা . . . “
ড‌ঃ রোজার: “লাঞ্চ টাইম,”
কিশোরের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ডাক্তার।
“খেতে খেতে কথা বলতে পারব। ওইটুকু সময় পাবে।”
ঘুরে ডেস্কের ওপাশে চেয়ারে বসে পড়লেন আবার তিনি।
“হ্যাঁ, শুরু কর। কি জানতে চাও ?”
কথা শেষে পথে এসে নামল কিশোর। পাশ কাটিয়ে চলে গেল একটা গাড়ি। ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষার আওয়াজ হল। পিছিয়ে এলো গাড়িটা। কিশোরের পাশেএসে দাঁড়িয়ে পড়ল।
হোভারসন: “এই যে, খোকা,”
জানালা দিয়ে মুখ বের করে ডাকলেন পুলিশ চীফ,
“কোথায় গিয়েছিলে ?”
কিশোর পাশা: “ডাক্তারের কাছে।”
হোভারসন: “কেন ?”
কিশোর পাশা: “সর্দি।”
হোভারসন: “ও।
হ্যাঁ, শুনেছ, হান্টকে ধরতে পারিনি। ব্যাটা পালিয়েছে।”
কিশোর পাশা: “পালিয়েছে ?”
হোভারসন: “একটা মালবাহী জাহাজে কাজ নিয়েছে। আজ সকালে ছেড়ে গেছে জাহাজটা।কয়েক মাসের মধ্যে ফিরবে না। ওর এক বন্ধুকে ধরেছিলাম। ওই ব্যাটা বলল,গোয়েন্দা জেনে তোমাদেরকে নিয়ে একটু মজা করছে হান্ট। আমার কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছে না।”
কিশোর পাশা: “আমারও না।”
হোভারসন: “কিন্তু কি আর করা ? ব্যাটাকে তো ধরতে পারলাম না। ঠিক আছে, চলি। তোমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখব। নতুন কিছু জানতে পারলে জানাব।”
গাড়ি চালিয়ে চলে গেলেন হোভারসন। আবার বোর্ডিং হাউসের দিকে হাঁটতে লাগল কিশোর। চিমটি কাটছে নিচেরঠোঁটে . . .
লোকটার ওপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল কিশোর। পাশের একগলি থেকে আচমকা বেরিয়ে এসে পথ রোধ করেছে তার। হালকা-পাতলা। কুৎসিত হাসিতে বিকৃত হয়ে আছে মুখ।
–“এই ছেলে, দাঁড়াও,
তোমাকে কিছু উপদেশ দেব।”
কিশোর পাশা: “নিশ্চয় নিশ্চয়, বলুন কি বলবেন ?”
চেহারা বোকা বোকা করে রেখেছে কিশোর। ইচ্ছে করলেই চেহারাটাকে এমন হাবাগোবা করে তুলতে পারে সে। এতে কাজ দেয় অনেক সময়,দেখেছে।
–“আমার উপদেশ, হাড়গোড় আস্ত রাখতে চাইলে হলিউডে ফিরে যাও। সঙ্গে নিয়ে যাওসিনেমা কোম্পানিকে। ফিশিংপোর্টে তোমাদেরকে কেউ চায় না।”
দু’দিকের কান পর্যন্ত বিস্তৃত হল লোকটার কুৎসিতহাসি। তার হাতের দিকে চোখপড়ল কিশোরের। বাঁ হাতের উল্টো পিঠে উল্কিতে আঁকা ছবি। স্পষ্ট নয়। তবে বুঝতে অসুবিধে হয় না, ছবিটা জল-কুমারীর। ভয়ের ঠাণ্ডা একটা শিহরণ উঠে গেল কিশোরের মেরুদণ্ড বেয়ে।
কিশোর পাশা: “ঠিক আছে, স্যার,”
ভোঁতা গলায় বলল কিশোর।
“বলব ওদেরকে। কিন্তু কে যেতে বলছে, কার নাম বলব ?”
–“বেশি চালাকির চেষ্টা কোরো না, ছেলে,”
কর্কশ গলায় বলল লোকটা।
“ভাল চাইলে আজই ঘরের ছেলেঘরে ফিরে যাও।”
হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল লোকটা। গট গট করে হেঁটে আবার ঢুকে পড়ল গলিতে।
লোকটা চলে যাবার পরও কয়েকমুহূর্ত তার গমন পথের দিকে চেয়ে রইল কিশোর। চেপে রাখা শ্বাসটা ফেলল শব্দ করে। তারপর আবার হাঁটতে শুরু করল বোর্ডিং হাউসের দিকে।
একটা ব্যাপারে এখন নিশ্চিত কিশোর।
দ্বীপে সিনেমা কোম্পানির থাকাটা বরদাস্ত করতে পারছে না কেউ একজন।পাপালো হারকুস: “আমার নৌকা !”
বিড়বিড় করে বলল পাপালো। জোর করে ঠেকিয়ে রেখেছে চোখের পানি।
“নৌকা নেই। গুপ্তধন খোঁজার আশা শেষ !”
রবিন মিলফোর্ড: “তাই তো !”
পাপালোর কত বড় ক্ষতি হয়ে গেছে, এতক্ষণে বুঝতে পারলযেন রবিন।
“কিন্তু একাজ করল কেন লোকটা ? দুর্ঘটনা, নাকি ইচ্ছে করেই ?”
পাপালো হারকুস: “ইচ্ছে করে !”
রাগ প্রকাশ পেল পাপালোর গলায়।
“নইলে থামত ও। এসে জিজ্ঞেস করত, বোটটা কার। দুঃখ প্রকাশ করত।”
রবিন মিলফোর্ড: “ঠিকই বলেছ। কিন্তু কেন ?
তোমার নৌকা ভেঙে দিল কেন? কার কি লাভ ?”
পাপালো হারকুস: “আমি মোহরখুঁজে বেড়াই, এটা লোকের পছন্দ না,”
কাঁদো কাঁদো গলায় বলল পাপালো।
“জেলেরা দেখতে পারে না আমাকে। এই উপসাগর ওদের। এতে বাইরের কারও ভাগ বসানো সইতে পারে না।”
দীর্ঘ
এক
মুহূর্ত
নীরবতা . . .
যতদূর চোখ যায়, কোন নৌকা বা জাহাজের চিহ্নও নেই।
আর কতক্ষণ থাকতে হবে এ-দ্বীপে ?
রবিন মিলফোর্ড: “তোমার নৌকা গেল। দামি অনেক জিনিসপত্র গেল আমাদেরও।”
মুসা আমান: “হ্যাঁ,”
গম্ভীর হয়ে আছে মুসা।
“অনেক দামি।”
একে অন্যের দিকে চেয়ে আছেদুই গোয়েন্দা। দু’জনের মনে একই ভাবনা। এক সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল দু’জনে,
–“ওগুলো তো তুলে আনতে পারি আমরা !”
বিষণ্ণতা ঝেড়ে ফেলল পাপালো। হাসল।
পাপালো হারকুস: “নিশ্চয় পারি। চল। আমি সাহায্য করব তোমাদেরকে।”
তাড়াহুড়ো করে ডুবুরির পোশাক পরে নিলো আবার রবিনআর মুসা। পানিতে নামল। হেঁটে চলল। ডুব দিল গভীর পানিতে এসে।

পাশাপাশি ভেসে আছে মুসা আর রবিন। তল থেকে পাঁচ ফুট ওপরে। বিচিত্র শব্দ তুলে ব্রীদিং টিউব থেকে বেরিয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে বুদবুদ। পাশ দিয়ে অলস ভঙ্গিতে ভেসে চলে গেল এক ঝাঁক সাগর-কই, ঢুকে পড়ল সামনে দেয়ালের গর্তে, হারিয়ে গেল অন্ধকারে।
মণি ছাড়া বিশাল এক চোখের মত দেখতে লাগছে সুড়ঙ্গ-মুখটাকে।
এক কোণ থেকে আরেক কোণের দৈর্ঘ্য বারো ফুট।
চোখের মাঝামাঝি জায়গার উচ্চতা ফুট পাঁচেক।
ধারগুলো মসৃণ, শেওলা জন্মাতে পারে না স্রোতের জন্যে।
সুড়ঙ্গ-মুখের বিশ ফুট দূরে পড়ে আছে পাপালোর নৌকাটা। দুলছে। জায়গা বদলকরছে ধীরে ধীরে। এগিয়ে আসছে এদিকেই। সেদিকে একবার চেয়েই চোখ ফিরিয়ে নিলো রবিন। নৌকার প্রতি খেয়াল দেবার সময় নেই এখন।
দুই গোয়েন্দার হাতে টর্চ।সুড়ঙ্গে ঢুকতে ইতস্তত করছে।

পাপালোর কথামত, কোন বিপদ নেই গুহায়। কম্পাস খুঁজতেএসেছিল সে। পায়নি। উঠে যাবার সময়ই নজরে পড়েছে সুড়ঙ্গ-মুখটা। কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে এসেছে ওটার কাছে। ঢুকে পড়েছে।
ভেতরের দিকে প্রথমে সরু হয়ে, তারপর ধীরে ধীরে প্রশস্ত হয়ে গেছে সুড়ঙ্গ।খানিকটা এগিয়ে পেছনে ফিরেচেয়েছে পাপালো। সুড়ঙ্গ-মুখ দেখা যাচ্ছে, ইচ্ছে করলে ফিরে যাওয়া যায়। কিন্তু ফেরেনি সে। সামনে কি আছে, দেখার ইচ্ছে।
দম ফুরিয়ে আসতেই টনক নড়েছে পাপালোর। সামনে অন্ধকার, কি আছে কে জানে !
পেছনে তাকিয়ে দেখেছে, অনেক দূরে আলো। এতদূর যেতে পারবে না, তার আগেই দম ফুরিয়ে যাবে।
পাপালো হারকুস: “আতঙ্কে ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল হাত-পা,”
দুই গোয়েন্দাকে বলছে পাপালো।
“কিন্তু মাথা গরম করলাম না। ফিরে যাবার চেষ্টা করলে মরবো। সামনে এগোলে হয়ত বেঁচে যাব। সুড়ঙ্গটা কোন গুহায় গিয়ে শেষ হলে বাতাস পেয়ে যেতে পারি। প্রাণপণে সাঁতরে চললাম। খানিকটা এগোতেই আলো চোখে পড়ল। ভরসা পেলাম। আলোর দিকে উঠতে লাগলাম। ভুসস করে মাথা ভেসে উঠল পানির ওপরে। দম নিয়ে তাকালাম চারদিকে। আবছা অন্ধকার। একটা গুহায় ঢুকেছি আমি। দ্বীপের তলায়। শেওলায় ঢাকা একটা পাথুরে তাকে উঠে বসলাম। জিরিয়ে-নিয়ে নামব ভাবছি, এই সময়ই হাতে লাগল শক্ত জিনিসটা। শেওলার ভেতরে আটকে আছে। কৌতূহল হল। তুলে নিলাম।
ও মা ! সোনা !
তালগোল পাকানো মোহর !
গুহার তলায় অন্ধকার। দেখাযায় না কিছু। আমার বিশ্বাস, আরও গুপ্তধন আছেওখানে।”
পানির তলায় গুহা, জলদস্যুর গুপ্তধন, আর কি চাই !
সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল দুই গোয়েন্দা, ঢুকবে ওখানে। কোনরকম সরঞ্জাম ছাড়া পাপালো যদি পারে, আধুনিক ডুবুরির সরঞ্জাম নিয়ে ওরাঢুকতে পারবে না কেন ? তাড়াতাড়ি চলে এসেছে এখানে। কিন্তু সুড়ঙ্গ-মুখের চেহারা দেখেই ভয় ঢুকে গেছে মনে। ইতস্তত করছে ভেতরে ঢুকতে।
এই সময় ওপর থেকে নেমে এলো পাপালো। দুই গোয়েন্দার পাশ কাটিয়ে সুড়ুৎ করে ঢুকে পড়ল সুড়ঙ্গে।
আর দ্বিধা করার কোন মানে হয় না। যা থাকে কপালে, ভেবে, ঢুকে পড়ল দু’জনে।
পাপালোকে দেখা যাচ্ছে। অনেক সামনে রয়েছে সে। ওর মত তাড়াতাড়ি সাঁতার কাটতেপারছে না দুই গোয়েন্দা। পাথুরে দেয়ালে ঘষা লাগলে ছাল চামড়া উঠে যাবে। টিউবকিংবা পিঠের ট্যাংকের ক্ষতি হতে পারে। তাই সতর্ক থাকতে হচ্ছে ওদের।
মাঝে মধ্যে উপরের দিকে টর্চের আলো ফেলছে ওরা। হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেল পাথরের দেয়াল। উঠতে শুরু করল দুই গোয়েন্দা। বিশ ফুট . . . তিরিশ ফুট . . .
আচমকা মাস্ক বেরিয়ে এলো পানির ওপরে।
টর্চের আলো ফেলল দু’জনে। একটা পাথরের তাকে উঠে বসেআছে পাপালো। পা দুটো ঝুলছে পানিতে। মাথার চার পাঁচ ফুট ওপরে গুহার ছাত এবড়োখেবড়ো, রুক্ষ ! পিচ্ছিল শেওলায় ঢাকা তাকেপাপালোর পাশে সাবধানে উঠেবসলো দুই গোয়েন্দা।
পাপালো হারকুস: “দ্য হ্যাণ্ডের পেটে এসে ঢুকেছি আমরা। কেমন লাগছে গুহায় ঢুকে ?”
রবিন মিলফোর্ড: “বেশ ভালইতো ! আমাদের আগে নিশ্চয় এখানে কেউ ঢোকেনি !”
চারদিকে টর্চের আলো ঘুরিয়ে আনল একবার রবিন। নির্দিষ্ট কোন আকার নেই গুহাটার। পানির সমতল থেকেছাতের উচ্চতা একেক জায়গায়একেক রকম, চার থেকে ছয় ফুটের মধ্যে। গুহার এক প্রান্তে দু’দিকের দেয়াল অনেক কাছাকাছি, মাঝে পরিসর কম। আলো আসছে ওদিক থেকেই।
টর্চ নিভিয়ে নিলো ওরা। আবছা আলো গুহার ভেতরে। পাথরে পাথরে ধাক্কা খেয়ে কুলকুল শব্দ তুলছে পানি। দেয়ালের গা আঁকড়ে ধরে আছেসরু শেওলা জাতীয় উদ্ভিদ। ঢেউয়ের তালে তালে দুলছে, ওঠানামা করছে ভয়াবহ কোন অজানা দানবের রোম যেন। শিউরে উঠল রবিন।
রবিন মিলফোর্ড: “নিশ্চয় কোন ফাটল আছে গুহার ছাতে।আলো আসছে ওপথেই।”
গুহার দূরতম প্রান্তের দিকে চেয়ে বলল সে।
পাপালো হারকুস: “ফোয়ারা!”
প্রায় চেঁচিয়ে উঠল পাপালো।
“এবার বুঝেছি। ওই ফাটল দিয়েই পানি ছিটকে বেরোয় ঝড়ের সময়। কেউ জানে না, তলায় একটা গুহা আছে। লোকের ধারণা, ফাটলটা সাগরের অতলে কোথাও নেমে গেছে।”
রবিন মিলফোর্ড: “ঠিক ঠিক!”
মনে পড়ল, দু’রাত আগে ঝড়ের সময় কি করে পানি ছিটকে উঠেছিল টিলার চূড়ার ছিদ্রদিয়ে। অনেক আগেই ওই ফোয়ারা আবিষ্কার করেছে লোকে। জানত না, কেন শুধু ঝড়ের রাতেই পানি ছিটায় ওটা।
“একটা কথা !”
হতাশ কণ্ঠে বলল রবিন।
“আমরাই যদি গুহাটা প্রথম আবিষ্কার করে থাকি, গুপ্তধন আসবে কোথা থেকে এখানে ?”
মুসা আমান: “তাই তো !”
গুঙিয়ে উঠল মুসা।
“এটা তো ভাবিনি !”
পাপালো হারকুস: “আমরাই প্রথম নই, তাই বা জানছি কিকরে ? এত হতাশ হবার কিছু নেই। একটা মোহর যখন পেয়েছি, আরও পাবার আশা আছে। রবিন, টর্চটা দাও তো,দেখে আসি।”
ওপরে বসে ধীরে ধীরে পানিরতলায় আলো নেমে যেতে দেখল দুই গোয়েন্দা।
মুসা আমান: “মোহর লুকানোরজন্যে এরচে ভাল জায়গা আর হয় না। কিন্তু রবিন, মনে হয় তোমার কথাই ঠিক। আমাদের আগেও কেউ এসেছিল এখানে।”
তলায় নেমে গেছে পাপালো। এদিক ওদিক আলো নড়তে দেখল মুসা আর রবিন।
সময় কেটে যাচ্ছে। পাপালো আর ওঠে না। নিচে আলো নড়াচড়া করছে। নাহ্, দম রাখতে পারে বটে গ্রীক ডুবুরির ছেলে। ঝাড়া আড়াই মিনিট পরে উঠে এলো পাপালো। উঠে বসল দুই গোয়েন্দার পাশে।
পাপালো হারকুস: “ঠিকই বলেছ, রবিন। গুপ্তধন নেই এখানে। শামুক-গুগলির সঙ্গে কিছু কিছু এ-জিনিস আছে।”
মুঠো খুলে দেখাল সে।
অবাক হয়ে দেখল দুই গোয়েন্দা, পাপালোর হাতে দুটো মোহর।
মুসা আমান: “ইয়াল্লা !!
গুপ্তধন নেই, তাহলে এগুলোকি !”

উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে কিশোর। লাঞ্চের সময় ফেরারকথা, অথচ বিকেল হয়ে গেল, এখনও ফেরেনি রবিন আর মুসা। কোন অঘটন ঘটেনি তো?
ম্যাগাজিনটা টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়াল কিশোর। জানালার সামনে এসে দাঁড়াল। উপসাগরের পুরো উত্তর প্রান্তটা চোখে পড়েএখান থেকে। কিন্তু কই, কোন ছোট পালের নৌকা তো চোখে পড়ছে না !
ঘরে এসে ঢুকল মিসেস ওয়েলটন। হাতে দুধের গ্লাসআর বিস্কুট। টেবিলে নামিয়ে রাখল।
মিসেস ওয়েলটন: “নিশ্চয় খিদে পেয়েছে তোমার, কিশোর,”
পেছন থেকে বলল বাড়িওয়ালী।
“নাও, এগুলো খেয়ে নাও। রবিন আর মুসা ফেরেনি এখনও?”
কিশোর পাশা: “না,”
ঘুরে দাঁড়াল কিশোর।
“লাঞ্চের সময়ই ফেরার কথা,এখনও ফিরছে না ! কোন বিপদেই পড়েছে মনে হয় !”
মিসেস ওয়েলটন: “এত ভাবছ কেন ? হয়ত বড়শি ফেলে মাছ ধরছে। ভুলেই গেছে ফেরার কথা।”
বেরিয়ে গেল বাড়িওয়ালী।
নিশ্চিন্ত হতে পারল না কিশোর। বসে পড়ল টেবিলের সামনে। বিস্কুট চিবোতে চিবোতে ম্যাগাজিনটা টেনে নিলো আবার। কঙ্কাল দ্বীপ নিয়ে লেখা ফীচারের জায়গায়জায়গায় পেন্সিল দিয়ে দাগ দিয়েছে। আবার দেখতে লাগল ওগুলো। ভাবনা চলছে মাথায়।
বাইশ বছর আগে বজ্রপাতে মারা গেছে স্যালি ফ্যারিংটন। সুযোগটা নিয়েছে মেলভিলের পার্কের মালিক। গুজব ছড়িয়ে দিয়েছেস্যালির ভূত দেখা গেছে প্লেজার পার্কে।
তারপর ?
প্রায় বিশ বছর আর ভূতের দেখা নেই। হঠাৎ করেই দেখাদিতে শুরু করেছে আবার বছরদুই আগে থেকে। দেখেছে অশিক্ষিত, কুসংস্কারে ঘোরবিশ্বাসী জেলেরা। তাদের কথায় বিশ্বাস করে কঙ্কাল দ্বীপে লোক যাতায়াত বন্ধ হয়ে গেছে।
এলো সিনেমা কোম্পানি। প্লেজার পার্কে কয়েকটা দৃশ্য শূটিং করবে। তাদেরকে উত্যক্ত করা শুরুহল।
কেন ?
দ্বীপে ক্যাম্প করে তারা কার কি ক্ষতি করছে ? মালিক বিরূপ নয় তাদের ওপর, তাহলে ভারাই দিত না।
তাহলে কে ?
ঝটকা দিয়ে খুলে গেল দরজা।ভাবনার জগত থেকে ফিরে এলোকিশোর। ঘরে এসে ঢুকল জোসেফ গ্র্যাহাম। উত্তেজিত।
জোসেফ গ্র্যাহাম: “কিশোর,পাপালো হারকুসকে দেখেছ ?”
কিশোর পাশা: “সকালে দেখেছি। ওর নৌকায় করে সাঁতার কাটতে গেছে রবিন আর মুসা। ফেরেনি এখনও।”
জোসেফ গ্র্যাহাম:”সারাদিন পাপালোর সঙ্গে!”
প্রায় চেঁচিয়ে উঠল জোসেফ।
“ওরা দু’সেট একোয়ালঙ নিয়েগেছে ! প্র্যাকটিস করবে বলে, দিয়ে দিলাম !”
কালো হয়ে গেছে তার মুখ।
“ওই হারামি গ্রেসানটার সঙ্গে গুপ্তধন খুঁজছে না-তো ওরা ?”
জবাব দিল না কিশোর। চেয়ে আছে জোসেফের মুখের দিকে। সতর্ক হয়ে উঠেছে।
জোসেফ গ্র্যাহাম: “ওদেরকেখুঁজতে যাওয়া দরকার। ওই গ্রেসানটার বাচ্চা এমনিতেই যা করেছে, তার ওপর আরও কিছু . . . “
থেমে গেল সে ! কিশোরের দিকে তাকাল।
“আমি চললাম খুঁজতে।”
কিশোর পাশা: “আমিও যাব,”
সর্দি লেগেছে, ভুলে গেল কিশোর। তার এখন ভাবনা, তিন বন্ধুকে খুঁজে বের করা।
জোসেফ গ্র্যাহাম: “এসো,”
বলেই ঘুরে দাঁড়াল জোসেফ।
জেটিতে বাঁধা আছে ছোট একটা মোটর বোট। উঠে বসল জোসেফ আর কিশোর। ইঞ্জিন গর্জে উঠল। ছুটে চলল বোট।
‘এমনিতেই যা করেছে . . . ‘ কথাটার মানে কি, জানার কৌতূহল হচ্ছে কিশোরের। কিন্তু জিজ্ঞেস করতে পারলনা। কথা বলার মেজাজে নেই জোসেফ। থমথমে গম্ভীর মুখ।
হুইলে চেপে বসেছে আঙুল।
মোহরের নেশায় আর কোন দিকেই খেয়াল নেই তিনজনের।
গোটা পঞ্চাশেক মোহর খুঁজেপেয়েছে। কোমরের থলেতে ঢুকিয়ে রেখেছে ওগুলো পাপালো।
জোয়ার এসেছে, প্রথম খেয়ালকরল পাপালো।
পাপালো হারকুস: “চল, বেরিয়ে পড়ি। আর মোহর নেই এখানে।”
মুসা আমান: “ঠিক। গত আধ ঘণ্টায় আর একটাও পাইনি। খিদেও লেগেছে। চল, যাই।”
আগে আগে চলল মুসা। সুড়ঙ্গ-মুখে আটকে থাকা নৌকাটা প্রথম দেখতে পেল সে-ই। ওপরের দিকটা এপাশে।সুড়ঙ্গের ছাতের একটা খাঁজে ঢুকে গেছে মাস্তুলের আগা। বাইরে থেকে ধাক্কা দিচ্ছে স্রোত। শক্ত হয়ে আটকে গেছে নৌকা।
টর্চের আলোয় সব পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে রবিন। সামনের দৃশ্য সে-ও দেখল। এগিয়ে গেল দু’জনে। ধাক্কাদিল নৌকার গায়ে। নড়াতে পারল না। পারবেও না, বুঝে গেল।
ঠিক এই সময় ওদের পাশে এসে থামল পাপালো। এক মুহূর্ত চেয়ে রইল নৌকাটার দিকে। বুঝে গেল যা বোঝার। ডিগবাজি খেয়ে ঘুরল। তীরেরমত ছুটে চলে গেল গুহার দিকে। তার দম ফুরিয়ে গেছে। গুহায় ফিরে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।
মুসা আর রবিনও খেয়াল করল এতক্ষণে, ট্যাংকে গ্যাস ফুরিয়ে এসেছে। আরেকবার প্রাণপণ চেষ্টা করল নৌকাটা সরানর। ব্যর্থ হয়েপাপালোর পথ অনুসরণ করল।
মিনিট
দুয়েক
পর . . .
তাকে বসে আছে তিন কিশোর। কোমর ছাড়িয়ে উঠে এসেছে পানি।
পাপালো হারকুস: “ভালমতো ফাঁদে আটকেছি আমরা !
জোয়ার যতই বাড়বে, নৌকাটা আরও শক্ত হয়ে আটকাবে।”
মুসা আমান: “হ্যাঁ,”
বিষণ্ণ কণ্ঠে বলল মুসা।
“এমন কাণ্ড ঘটবে, কে জানত?”
রবিন মিলফোর্ড: “আমি কিন্তু আগেই খেয়াল করেছিলাম। স্রোতের টানে ধীরে ধীরে সরে আসছে নৌকাটা। গুরুত্ব দিইনি তখন ব্যাপারটাকে। যা হবারতা-তো হল, এখন কি করব ?”
দীর্ঘ নীরবতা . . .
কেউ কোন পরামর্শ দিতে পারল না।
পাপালো হারকুস: “জোয়ার নামার সময় হয়ত টানের চোটেনেমে যাবে নৌকাটা।”
মুসা আমান: “কিন্তু কয়েক ঘণ্টা থাকবে জোয়ার ! তারপরও যদি নৌকা না নামে।”
রবিন মিলফোর্ড: “ততক্ষণ আমরা বাঁচব কিনা তাই বা কে জানে !”
রবিনের গলায় আতঙ্ক।
“আরও বড় সমস্যা আসছে !”
পাপালো হারকুস: “কি বললে?”
ঝট করে রবিনের দিকে ফিরল পাপালো।
রবিন মিলফোর্ড: “দেখ !”
হাতের টর্চের আলো পড়েছে ছাতে।
“ভেজা ভেজা। শেওলা লেগে আছে।”
মুসা আমান: “তাতে কি ?”
রবিন মিলফোর্ড: “জোয়ারের সময় ওখানে উঠে যায় পানি,”
রবিনের গলা কাঁপছে।
“খাঁচায় ভরে ইঁদুরকে পানিতে চুবিয়ে রাখলে যা হয়, আমাদেরও সেই অবস্থা হবে !”
কারও মুখে কথা নেই আর। গুহার দেয়াল ছলাৎ-ছলাৎ বাড়ি মারছে পানি।
ধীরে ধীরে উঠে আসছে ওপরে .. .
পাপালো হারকুস: “শোন ! মোহর পেয়েছি, এটা ফাঁস করব না আমরা।”
রবিন মিলফোর্ড: “কেন ? এখানে কি করতে এসেছি, বলতে হবে না ?”
পাপালো হারকুস: “বলব ডুবেডুবে সাঁতার কাটছিলাম। হঠাৎ নজরে পড়ে গেল গর্তটা! বুঝলাম সুড়ঙ্গ। ভেতরে কি আছে দেখার জন্যে ঢুকে পড়লাম। মোহর পেয়েছি বললে ফিরে এসে আবার খোঁজার সুযোগ হারাব।”
রবিন মিলফোর্ড: “হারালে হারাব। এখানে দ্বিতীয়বার আর ঢুকতে চাই না আমি। মোহরের বস্তা পড়ে থাকলেও না। যার খুশি এসে নিয়ে যাক।”
মুসা আমান: “আমারও একই কথা। এত ভাবছ কেন ? যা মোহর ছিল, সব তুলে নিয়েছি আমরা। আর নেই। জোয়ারের সময় কোনভাবে এসে পড়েছিল হয়ত। ভেবো না, সিন্দুক-ফিন্দুক নেই এখানে।”
পাপালো হারকুস: “তা হয়ত নেই, কিন্তু বালির তলায় আরও মোহর থাকতে পারে। এটাই আমার শেষ সুযোগ। আরেকটা নৌকা কিনতে হবে, বাপকে বাঁচাতে হবে। ক’টা মোহর পেয়েছি ? চল্লিশ ? পঞ্চাশ ? তিন ভাগের এক ভাগ ক’টা হবে ? নৌকাই তো কিনতে পারব না।”
রবিন মিলফোর্ড: “ঠিক আছে।আপাতত ব্যাপারটা ফাঁস করবনা আমরা। আরেকবার খুঁজে দেখার সুযোগ . . . “
মুসা আমান: “মুসা আমান আর আসছে না এই গুহায় ! তুমি আসতে চাইলে আসতে পার, পাপালো। কোথায় মোহর পেয়েছি কাউকে না বললেই তোহল।”
পাপালো হারকুস: “মোহর পেয়েছি, এই কথাটাও গোপন রাখতে চাই এখন। একবার কেন, আরও দশবার আসতেও ভয় পাব না আমি। কপাল খারাপ তাই বিপদে পড়ে গেছি। কে ভাবতে পেরেছিল, সুরঙ্গ-মুখে এসে নৌকা আটকাবে ? এমন ঘটনা সব সময় ঘটে না।”
মুসা আমান: “জোসেফ আর কিশোর কতখানি কি করছে, কে জানে ! কোষ্ট গার্ডকে খবর দিতে গিয়ে থাকলেই সেরেছে।ফিরে এসে আর পাবে না আমাদেরকে।”
রবিন মিলফোর্ড: “নৌকাটা সরাতে শক্তি দরকার। ভেঙে ফেলতে হবে, কিংবা শাবল দিয়ে চাড় মেরে বের করে নিতে হবে।”
মুসা আমান: “অনেক সময় লেগে যাবে তাতে,”
ঢেউয়ের ধাক্কায় কাত হয়ে গেল মুসা। আগাছা আঁকড়ে ধরে সামলে নিলো।
“তাক থেকেই ফেলে দেবে দেখছি ! . . . হ্যাঁ, যা বলছিলাম। কমসে কম দু’ঘণ্টা তো লাগবেই। ততক্ষণে আমরা শেষ !”
রবিন মিলফোর্ড: “কিশোর জেনেছে আমরা এখানে আছি। কিছু একটা ব্যবস্থা করে ফেলবেই ও। ঠিক বের করে নিয়ে যাবে আমাদের, দেখ।”
পাপালো হারকুস: “সেই প্রার্থনাই কর।”
তীর থেকে শ’খানেক ফুট দূরে ভাসছে এখন মোটর বোট।ইঞ্জিন নিউট্রাল। হাল ধরেছে কিশোর। জোসেফ ডুবুরির পোশাক পরছে।
জোসেফ গ্র্যাহাম:”পাগলামির সীমা থাকা উচিত!”
আপনমনেই বিড়বিড় করল জোসেফ। ওয়েট বেল্ট আঁটল কোমরে। বোটের কিনারে গিয়েদাঁড়াল। ফিরে চাইল।
“এখানেই থাক। পরিস্থিতি দেখে আসি আমি। কোষ্ট গার্ডকে খবর দেয়ার সময় আছে কিনা কে জানে !”
ফেস মাস্ক টেনে দিল সে। একটা আণ্ডারওয়াটার টর্চ হাতে নিয়ে নেমে গেল পানিতে।
বড় একা একা লাগছে কিশোরের। দক্ষিণে অনেক দূরে এক সারি নৌকা, মাছ ধরা শেষ করে ফিরে চলেছে ফিশিং-পোর্টে। এদিকে কেউ আসবে না। গুহায় আটকা পড়ে মরতে বসেছে তিন বন্ধু। ওদেরকে কি উদ্ধার করতে পারবে শেষ পর্যন্ত ?
অতি ধীরে গড়িয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে যেন সময়। কিশোরের মনে হল এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখল, জোসেফ গেছে মাত্র পাঁচ মিনিট আগে। আরও পাঁচমিনিট পরে ভেসে উঠল জোসেফের মাস্কে ঢাকা মুখ।দ্রুত উঠে এলো সে বোটে। মাস্ক সরাল মুখ থেকে। চেহারা ফ্যাকাসে, উদ্বিগ্ন।
জোসেফ গ্র্যাহাম:”সাংঘাতিক শক্ত হয়ে আটকেছে ! কোথাও ধরে যে টানদেব, সে জায়গাই নেই। কোষ্ট গার্ডকেই খবর দিতে হবে। শাবল কিংবা ক্রো-কারছাড়া হবে না।”
জোসেফের মুখের দিকে চেয়ে আছে কিশোর।
কিশোর পাশা: “তাতে তো অনেক সময় লাগবে ! কমপক্ষে দু’ঘণ্টা !”
আস্তে মাথা ঝাঁকাল জোসেফ।
জোসেফ গ্র্যাহাম: “তা-তো লাগবেই। কিন্তু আর কি করার আছে ? বড় কোন গর্ত নেই টিলার। থাকলে ও পথে দড়ি নামিয়ে দিয়ে টেনে তোলা যেত।”
জোসেফের কথা কানে ঢুকছে কিনা কিশোরের, বোঝা গেল না। নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটছে সে।
কিশোর পাশা: “মিস্টার গ্র্যাহাম ! নৌকাটাকে টেনে বের করে আনলেই হয় !”
জোসেফ গ্র্যাহাম: “টেনে বের করব ! কি করে ?”
কিশোর পাশা: “মোটর বোটের সাহায্যে। খুব শক্তিশালী ইঞ্জিন এই বোটটার। নোঙরেরদড়িও অনেক লম্বা। নোঙরের একটা আঁকশি নৌকায় গেঁথে .. . “
জোসেফ গ্র্যাহাম: “কিশোর,তুমি একটা জিনিয়াস !! ঠিক বলেছ ! এখুনি যাচ্ছি আমি!”
জোসেফ গ্র্যাহাম: “আমি যাচ্ছি। দড়ি ধরে তিনবার টানব। ফার্স্ট-গিয়ারে দিয়ে আস্তে আস্তে জোর বাড়াবে। নৌকাটা সুড়ঙ্গ-মুখ থেকে খসে এলে বুঝতেই পারবে। থেমে যাবে তখন। গুহায় ঢুকে ওদেরকে বের করে আনব আমি . . .
আর হ্যাঁ, টানতে টানতে হঠাৎ যদি সামনে লাফ দিয়ে ছুটতে শুরু করে বোট, বুঝবে, নৌকা থেকে নোঙর খসে গেছে। এখানে নিয়ে আসবে আবার বোট। আমার ওঠারঅপেক্ষা করবে। ঠিক আছে ?”
মাথা ঝোঁকাল কিশোর।
নেমে গেল জোসেফ।
আবার অপেক্ষার পালা। দড়ি ধরে বসে রইল কিশোর। দুরুদুরু করছে বুকের ভেতর। একবার টান পড়ল দড়িতে। নোঙর গাঁথছে হয়ত জোসেফ।
এক মিনিট কাটল . . . দুই মিনিট . . . হঠাৎ টান পড়ল দড়িতে।
জোরে জোরে, তিন বার।
লাফ দিয়ে উঠে এলো কিশোর। ড্রাইভিং সিটে বসেই গিয়ারদিল। ধীরে ধীরে চলতে শুরুকরল বোট। তারপর থেমে গেল হঠাৎ করেই। টান টান হয়ে গেছে দড়ি।
এক্সিলেটরে চাপ বাড়াচ্ছে কিশোর। হুইলে হাতের আঙুল চেপে বসেছে। নোঙর বাঁধা দড়ির মতই টান টান হয়ে গেছে তার স্নায়ু। গর্জন বাড়ছে শক্তিশালী ইঞ্জিনের।
প্রথম কয়েক মুহূর্ত কিছুইঘটল না। তারপর সামনে বাড়তে লাগল বোট, ধীরে, অতিধীরে। এক ইঞ্চি দু’ইঞ্চি করে। বিশাল মরা তিমিকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে যেনটাগ-বোট। হঠাৎ সামনে লাফ দিল বোট।
সেরেছে !
ভাবল কিশোর।
গেছে হয়ত ছুটে।
কিন্তু না, যতখানি জোরে ছোটা উচিত তত জোরে এগোচ্ছে না তো বোট !
তারমানে নৌকাটা আটকে আছে নোঙরে। ওটাকে টেনে নিয়ে চলেছে বোট।
বিশ ফুট . . . পঞ্চাশ ফুট . .. একশো ফুট দূরে গিয়ে ইঞ্জিন নিউট্রাল করে দিল কিশোর। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই থেমে দাঁড়াল বোটটা।
সিট থেকে উঠে পেছনে চলে এলো কিশোর। কোমরের বেল্ট থেকে ছুরি খুলে নিয়ে কেটেনিলো দড়ি। ফিরে এসে বসল আবার ড্রাইভিং সিটে।
আবার আগের জায়গায় বোট ফিরিয়ে নিয়ে এলো কিশোর। অপেক্ষা করতে লাগল।
এক মিনিট . . . দুই মিনিট . ..
ভুসস করে বোটের পাশেই ভেসে উঠল একটা মাথা। জোরেশব্দ করে শ্বাস নিলো পাপালো হারকুস। বোটের গা ঘেঁষে এলো। থলেটা ছুঁড়ে দিল ভেতরে। চেঁচিয়ে বলল,
পাপালো হারকুস: “জলদি লুকাও ওটা ! ভেতরে মোহর ! কারও কাছে ফাঁস করা চলবে না এখন !”
হাত ধরে আগে পাপালোকে বোটে উঠতে সাহায্য করল কিশোর। তারপর ভেজা থলেটা তুলে নিয়ে সিটে রেখে ওটারওপরেই বসে পড়ল। লুকানোর এর চেয়ে ভাল জায়গা আর নেই বোটে।
কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল পাপালো, এই সময় ভেসে উঠল রবিন। পরক্ষণেই মুসা। দু’জনকে উঠতে সাহায্য করলকিশোর আর পাপালো।
মুসা আমান: “যাক, উদ্ধার করলে শেষ পর্যন্ত !”
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল মুসা।
“বাঁচার আশা ছিলই না !”
রবিন মিলফোর্ড: “জোসেফের ভাবভঙ্গিতে মনে হল, খুব রেগে গেছে।”
মুসা আমান: “সব শুনলে বাবাও খেপবে !”
কথার ধরনেই বোঝা গেল, ভয় পাচ্ছে মুসা।
“তবে যা-ই হোক, কিছু মোহর পেয়েছি। পাপালো বলেনি ?”
কিশোর পাশা: “থলেটার ওপরেই বসে আছি। এখন মোহরের কথা থাক। পরে সব শুনব।”
রবিন মিলফোর্ড: “কাজটা খুব খারাপ হয়ে গেছে,”
পিঠে বাঁধা গ্যাস ট্যাংক খুলতে খুলতে বলল রবিন।
“কিন্তু দোষ আমাদের নয়। পাপালোর নৌকাটাকে ধাক্কা দিয়ে ভেঙে . . . “
কিশোর পাশা: “চুপ !”
রবিনকে থামিয়ে দিল কিশোর।
“জোসেফ। সব জানানোর দরকারনেই ওকে। রেখেঢেকে বলবে।”
বোটের পাশে ভেসে উঠেছে জোসেফ। এক হাতে দড়ির কাটাপ্রান্ত। বাড়িয়ে দিল ওটা।ধরল কিশোর। বেঁধে দিল ক্যাপস্টানের সঙ্গে। তাড়াতাড়ি এসে বসল আবার সিটে।
বোটে উঠে এলো জোসেফ। ধীরেসুস্থে খুলে নিলো ফেস মাস্ক, ফ্লিপার, গ্যাস ট্যাংক।
নীরবে অপেক্ষা করছে ছেলেরা। ওদের দিকে তাকাল জোসেফ।
জোসেফ গ্র্যাহাম: “তারপর? খুব তো দেখালে !”
রবিন মিলফোর্ড: “আমরা . . .”
শুরু করেও থেমে গেল রবিন।

হাত তুলেছে জোসেফ।
জোসেফ গ্র্যাহাম: “আর সাফাই গাইতে হবে না। যা করার করেছ। তবে তোমাদের ড্রাইভিং এখানেই শেষ। গোয়েন্দাগিরিও। মিস্টার আমানও তাই বললেন। শুরু থেকেই আমার মত ছিল না। বাচ্চাকাচ্চা দিয়ে কাজ হবে না কিছুই। শুধু শুধু বাড়তি ঝামেলা !”
নীরব রইল ছেলেরা।
পাপালোর দিকে ফিরল জোসেফ।
জোসেফ গ্র্যাহাম: “তারপর? চোরের কি খবর ? অনেক হারামীপনা করেছ, এবার জেলখাটগে।”
জোসেফ কি বলছে, কিছুই বুঝতে পারল না ছেলেরা।
“হাঁ করে আছ কেন ?”
পাপালোর দিকে চেয়ে বলল জোসেফ।
“গতরাতে একটা ট্রেলারের জানালা ভাঙা হয়েছ। ছোট ফোকর। বড় মানুষ ঢুকতে পারবে না ওই ফোকর দিয়ে, গোটা দুয়েক লেন্স চুরি গেছে। কম করে হলেও হাজার ডলার দাম। ভুল করে একটা ছুরি ফেলে গেছে চোর।”
স্থির চোখে পাপালোর দিকে তাকিয়ে আছে সে।
“ছুরিটা কার, জান ? তোমার!
আর জানালার ওই ফোকর দিয়ে তোমার পক্ষেই ঢোকা সম্ভব।”
বোবা হয়ে গেছে যেন চার কিশোর। হাঁ করে চেয়ে আছে জোসেফের দিকে।
জোসেফ গ্র্যাহাম: “তোমার শয়তানী খতম। হোভারসনকে খবর দেয়া হয়েছে। ফিশিং-পোর্টে ফিরে গিয়েই তার দেখা পাবে।
কপালে তোমার অনেক দুঃখ আছে, পাপালো হারকুস, এই বলে দিলাম।”
রবিন মিলফোর্ড: “পাপালোকেপুলিশে দিল ওরা !”
বিষণ্ণ কণ্ঠে বলল রবিন।
“কাজটা উচিত হয়নি।”
মুসা আমান: “হ্যাঁ,”
আস্তে মাথা দোলাল মুসা।
“আমার কিন্তু এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না, লেন্সগুলো ও চুরি করেছে।
কিশোর, তুমি কি বল ?”
কোন জবাব দিল না গোয়েন্দা-প্রধান , যেন শুনতেই পায়নি। দুই বন্ধুরকাছ থেকে দূরে, লিভিং রুমের আরেক প্রান্তে সোফায় বসে আছে। গভীর চিন্তায় মগ্ন।
বিকেলের মাঝামাঝি। বাইরে ঝমাঝম বৃষ্টি। সারাদিন বাইরে বেরুতে পারেনি ওরা।বৃষ্টি না থাকলেও অবশ্য পারত না। মিস্টার আমানের কড়া নির্দেশঃ একা কোথাও যেতে পারবে না ওরা। যেতে হলে তাকে জানাতে হবে। লোকসঙ্গে দিয়ে দেবেন। গতকাল বিকেলে ছেলেদের অবাধ্যতার ওপর কড়া বক্তৃতা দিয়েছেন তিনি। আন্তরিক দুঃখিত হয়েছেন ওদের কাজে, সেটাও জানিয়েছেন বার বার।
মুসা আমান: “কিশোর !”
গলা চড়িয়ে ডাকল মুসা।
“কি বলছি, শুনছ ? আমার ধারণা, লেন্স পাপালো চুরিকরেনি। তুমি কি বল ?”
কেশে উঠল কিশোর। এখনও পুরোপুরি যায়নি সর্দি।
কিশোর পাশা: “না। পাপালো চুরি করেনি। সাক্ষী প্রমাণ সব ওর বিরুদ্ধেই যাচ্ছে যদিও। ওর ছুরি পাওয়া গেছে ট্রেলারের ভেতর, তাজ্জব কাণ্ড !”
রবিন মিলফোর্ড: “দুই দিন আগে হারিয়েছিল ওটা। ও তাইবলেছে।”
কিশোর পাশা: “এখন কেউ বিশ্বাস করবে না একথা,”
বলেই আবার কাশতে লাগল কিশোর। কাশি থামলে বলল,
“ধরেই নিয়েছে সিনেমা কোম্পানি, তাদের সমস্যা শেষ। চোর ধরা পড়েছে, আর কি?”
রবিন মিলফোর্ড: “কঙ্কাল দ্বীপের রহস্যটা আসলে কি? অনুমান করেছ কিছু ?”
কিশোর পাশা: “কেউ একজন চায় না, কঙ্কাল দ্বীপে লোক যাতায়াত করুক, কিংবা বাস করুক। এ-ব্যাপারে আমিশিওর। কিন্তু কেন চায় না, বুঝতে পারছি না এখনও।”
মিসেস ওয়েলটন: “এই যে, ছেলেরা, চীফ কথা বলতে চান তোমাদের সঙ্গে।”
হোভারসন: “মিসেস ওয়েলটন, ওদের সঙ্গে একটু কথা বলতেচাই, প্লীজ . . . “
মিসেস ওয়েলটন: “ওহ্, শিওর শিওর,”
দরজা ভেজিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল মিসেস ওয়েলটন।
রেনকোটটা খুলে দরজার পাশের হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখলেন চীফ। সোফায় বসলেন।সিগারেট বের করে ধরালেন ধীরেসুস্থে।
হোভারসন: “তারপর, ছেলেরা,
পাপালোর পজিশন খুব খারাপ।লেন্স দুটো পাওয়া গেছে। ওর বিছানার তলায়।”
রবিন মিলফোর্ড: “কিন্তু পাপালো চুরি করেনি।”
রাগ প্রকাশ পেল রবিনের গলায়।
“আমরা জানি ও করেনি।”
হোভারসন: “হয়ত করেনি। কিন্তু সব সাক্ষী-প্রমাণ ওর বিরুদ্ধে যাচ্ছে। সবাইজানে, বাবার চিকিৎসার জন্যে গ্রীসে ফিরে যাবার জন্যে পাগল হয়ে উঠেছে ও।”
মুসা আমান: “উঠেছে, ঠিক। কিন্তু সেজন্যে চুরি করবেনা সে। তাছাড়া টাকা তার আছে। এবং আরও পাবার সম্ভাবনা আছে।”
হোভারসন: “তাই !”
তিনজনের দিকেই একবার করে তাকালেন হোভারসন।
“ওর টাকা আছে ? আরও পাবার সম্ভাবনা আছে ! কি করে ?”
মুখ ফসকে কথা বেশি বলে ফেলেছে, এখন আর ফেরার পথ নেই। মোহরের কথা বলতেই হবে চীফকে। তবু চুপ করে রইল মুসা।
হোভারসন: “ছেলেরা, পাপালোকে আমি পছন্দ করি, তার ভাল চাই। এখন বলত, সত্যি সত্যি কি ঘটেছিল গতকাল। বিপদে পড়েছ, এবং উদ্ধার করে আনা হয়েছে, ঠিকই। কিন্তু কেন পড়েছ বিপদে ? কেন গিয়ে ঢুকেছ ওই সুড়ঙ্গে। শুধুই কৌতূহল? নিশ্চয় না। হয়ত তোমাদেরভয়, গুপ্তধনের কথা ফাঁস হয়ে গেলে দলে দলে ছুটে আসবে লোক। শূটিঙে বিঘ্ন ঘটাবে। কিন্তু পাপালোর দিকটাও ভেবে দেখতে হবে তোমাদের। ওকে হাজত থেকে বের করে আনতে চাও না ?”
দ্বিধা করছে তিন গোয়েন্দা। শেষে মন স্থির করে নিলো কিশোর।
কিশোর পাশা: “হ্যাঁ, স্যার, চাই।”
মুসার দিকে ফিরল।
“থলেটা নিয়ে এসো।”
দোতলায় চলে গেল মুসা। পাপালোর থলেটা নিয়ে ফিরে এলো। থলের মুখ খুলে হোভারসনের পাশে ঢেলে দিল মোহরগুলো। মৃদু টুংটাং আওয়াজ তুলে সোফায় পড়ল পঁয়তাল্লিশটা স্প্যানিশ ডাবলুন।
টেবিলে খাবার দেয়া হল। খেতে বসল ছেলেরা। কাছেই একটা চেয়ারে বসে এটা ওটা বাড়িয়ে দিচ্ছে মিসেস ওয়েলটন। বলি বলি করছে কি যেন। শেষ পর্যন্ত আর থাকতে না পেরে বলেই ফেলল,
মিসেস ওয়েলটন: “গুপ্তধন খোঁজার জন্যেই তাহলে এসেছতোমরা। দেখলাম . . . “
ঝট করে মাথা তুলল কিশোর।
কিশোর পাশা: “কি দেখেছেন?”
মিসেস ওয়েলটন: “সত্যি বলছি, চুরি করে কারও কিছু দেখার অভ্যেস নেই আমার। দেখতে এসেছিলাম, চীফ চলে গিয়েছে কিনা। দেখলাম, বসেআছে, পাশে একগাদা ডাবলুন।ভাবলাম, খুব জরুরী কোন কথা আলোচনা করছ তোমরা। বিরক্ত না করে চলে গেলাম।”
একে অন্যের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করল তিন গোয়েন্দা। খাওয়া বন্ধ।
কিশোর পাশা: “কাউকে বলেছেন একথা ?”
মিসেস ওয়েলটন: “কোন্ কথা?”
কিশোর পাশা: “আমরা গুপ্তধন খুঁজে পেয়েছি . . .”
মিসেস ওয়েলটন: “নাহ্,”
এদিক ওদিক মাথা নড়ল মিসেসওয়েলটন,
“তেমন কাউকে না। ফোনে শুধু আমার ঘনিষ্ঠ তিন বান্ধবীকে জানিয়েছি। আমারই মত কম কথা বলে। পেটে বোমা মারলেও আমারই মত মুখে তালা লাগিয়ে রাখবে। কাউকে কিচ্ছু বলবেনা . . . “
কিশোর পাশা: “হুঁ,”
চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা ঝোঁকাল কিশোর।
“কয়েকটা মোহর পেয়েছে মুসাআর রবিন। তবে স্কেলিটন আইল্যাণ্ডে নয়।”
মিসেস ওয়েলটন: “আমাকে বোকা বানাতে পারবে না, ইয়ং ম্যান,”
নিজের বুদ্ধির ওপর খুব বেশি ভক্তি মিসেস ওয়েলটনের।
“আগামী কাল ভোর থেকেই লোকযেতে শুরু করবে স্কেলিটন আইল্যাণ্ডে।
গুপ্তধন খুঁজতে . . . “
বলতে গিয়েই থেমে গেল। মনেপড়ে গেছে, একটু আগে বান্ধবীদের প্রশংসা করে বলেছে, মুখে তালা লাগিয়ে রাখবে ওরা। কথা ঘোরানর চেষ্টা করল,
“মানে, আমি বলতে চাইছি, যদি আর কেউ শুনে ফেলে আর কি ! চীফ হোভারসনও তো জেনেগেল . . . “
কিশোর পাশা: “তিনি কাউকে বলবেন না, কথা দিয়েছেন।”
মিসেস ওয়েলটন: “ওহ্, আমি যাই !”
তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল মিসেস ওয়েলটন।
“দুধ পুড়ে যাচ্ছে . . . “
মুসা আমান: “কাম সারছে !!”
কিশোরের মুখে শোনা বাঙালিবুলি ঝাড়ল মুসা।
“এতক্ষণে জেনে গেছে হয়ত আদ্দেক শহর ! আগামী কাল ভোর হতে না হতেই ভিড় লেগে যাবে কঙ্কাল দ্বীপে। শূটিঙের বারোটা বাজল ! সব দোষ আমাদের !”
রবিন মিলফোর্ড: “এরপর রাফাত চাচাকে মুখ দেখাব কি করে আমরা !”
মুসা আমান: “লোক ঠেকাতে না পারলে সর্বনাশ হয়ে যাবে ফিল্ম কোম্পানির !
কিশোর, তুমি কিছু বল।”
চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে কিশোর। নির্লিপ্ত। মুখ তুলল,
কিশোর পাশা: “একটা বুদ্ধিএসেছে আমার মাথায়। আগে খেয়ে নিই, তারপর বলছি। তোমরাও খেয়ে নাও।”

কিশোর পাশা: “মুসা, রবিন, জলদি ওঠ ! রহস্যের সমাধান করে ফেলেছি !”
চোখ মেলল দুই সহকারী গোয়েন্দা। হাই তুলতে তুলতে তাকাল কিশোরের দিকে।
মুসা আমান: “কি হয়েছে ?”
ঘুম-জড়িত গলায় জানতে চাইলমুসা।
“দুঃস্বপ্ন দেখেছ ?”
কিশোর পাশা: “না !”
উত্তেজিত কণ্ঠ কিশোরের।
“জলদি কাপড় পর ! কঙ্কাল দ্বীপ যেতে হবে ! রহস্যের সমাধান করে ফেলেছি !”
লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসলমুসা আর রবিন।
মুসা আমান: “ইয়াল্লা !! বলবল . . . “
বলল কিশোর।
রবিন মিলফোর্ড: “কিশোর, তোমার তুলনা নেই !”
বন্ধুর প্রশংসা না করে পারল না রবিন।
“ঠিক ! ঠিক বলেছ ! একেবারেখাপে খাপে মিলে যাচ্ছে সবকিছু !”
কিশোর পাশা: “ইস‌্স্, একটা গাধা আমি !”
রবিনের কথায় কান দিল না কিশোর।
“আরও আগেই বোঝা উচিত ছিল !জলদি যাও। আমিই যেতাম, কিন্তু সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা . . . “
মুসা আমান: “না না, তোমার যাবার দরকার নেই,”
হাত নেড়ে বলল মুসা।
“তুমি শুয়ে থাক। আমরাই পারব। কিন্তু বাবাকে জানালেই তো পারি। জিমকে নিয়ে তারাও আমাদের সঙ্গে গেলে . . . “
কিশোর পাশা: “না,”
মাথা নাড়ল কিশোর।
“আমার অনুমান ভুলও হতে পারে। তা হলে খেপে যাবেন রাফাত চাচা। তোমরা দু’জনেই খুঁজে বের করগে আগে। পেলে, সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে জানাবে তাদেরকে।”
পাঁচ মিনিটেই কাপড় পরে তৈরি হয়ে গেল রবিন আর মুসা। টর্চ নিলো দু’জনেই।দরজা খুলে বেরিয়ে গেল নিঃশব্দে।
শুয়ে পড়ল আবার কিশোর। ঘুমএলো না। ক্ষোভে-দুঃখে ছটফট করছে।
কেন লাগল ঠাণ্ডা ? কেন এই হতচ্ছাড়া সর্দি ধরে বসল তাকে ! নইলে তো রবিন আর মুসার সঙ্গে সে-ও যেতে পারত। রাতটা দ্বীপেই থেকেযেত। তারপর ভোর না হতেই গুপ্তধন শিকারিদের খেলা .. .
গুপ্তধন শিকারি !
আবার লাফিয়ে উঠে বসল কিশোর। ভুল হয়ে গেছে, মস্ত ভুল ! ভয়ানক বিপদে ঠেলে পাঠানো হয়েছে রবিন আর মুসাকে ! খুন হয়ে যেতে পারে ওরা, খুন . . .
গায়ের জোরে দাঁড় টানছে মুসা। প্রায় উড়ে চলেছে ছোট্ট নৌকা। এক জেলের কাছথেকে নৌকাটা ভাড়া নিয়েছে সে। সামনের গলুইয়ের কাছে বসে আছে রবিন। চেয়ে আছে সামনের দিকে। তারার আলোয় অদ্ভুত দেখাচ্ছে কঙ্কাল দ্বীপকে।

রবিন মিলফোর্ড: “এসে গেছি!”
মোড় ফেরাল মুসা। জেটির কাছে গেল না। প্লেজার পার্কের দিকে এগিয়ে চলল।
ঘ্যাঁচ করে বালিতে এসে ঠেকল নৌকার সামনের অংশ। লাফিয়ে নেমে পড়ল রবিন। মুসাও নামল। দু’জনে টেনে নৌকাটাকে তুলে আনল ডাঙায়।
মুসা আমান: “চল, পার্কের ভেতর দিয়ে এগোই,”
নিচু গলায় বলল মুসা।
“পার্ক পেরিয়ে রাস্তায় নামব, সেদিন যেপথে গুহায় গিয়েছিলাম। খুব সাবধান। জিম টের পেলে চেঁচামেচি শুরু করবে।”
রবিন মিলফোর্ড: “হ্যাঁ। তবে সঙ্গে ও গেলে ভালই হত।
. . . অন্ধকারে গুহাটা খুঁজে পাব তো ?”
মুসা আমান: “মনে হচ্ছে পাব।”
দ্বিধা করল এক মুহূর্ত। গাঢ় অন্ধকার। নীরব-নিস্তব্ধ।
সৈকতে ঢেউ আছড়ে পড়ার একটানা মৃদু ছল-ছলাৎ শব্দনীরবতাকে আরও গভীর করে তুলেছে যেন।
“চল, এগোই।”
আগে আগে চলেছে মুসা। মাঝেমাঝে টর্চ জ্বেলে দেখে নিচ্ছে সামনের পথ। এসে ঢুকল পার্কে।
কালো আকাশের পটভূমিতে কিম্ভূত এক দানবের মত দেখাচ্ছে সাগর-দোলাটাকে।পাশ কাটিয়ে নাগরদোলার কাছে চলে এলো দু’জনে। মোড় ঘুরে এগোল। পেছনের ভাঙা বেড়ার কাছে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল।
মুসা আমান: “নাহ্, একা যাবনা !”
ফিসফিস করে বলল মুসা।
“বাবাকে জাগাব গিয়ে। ভয় পাচ্ছি, তা নয়। আমাদেরকে বোর্ডিং হাউস থেকে বেরোতেনিষেধ করেছে, তবু বেরিয়েছি। কোন বিপদে পড়ারআগেই তাকে জানিয়ে রাখা ভাল।”
রবিন মিলফোর্ড: “ঠিকই বলেছ। চল যাই। তাঁকে জানিয়ে গেলে আর কোন ভয় থাকবে না আমাদের।”
ক্যাম্পের দিকে পা বাড়াতেগিয়েই থমকে গেল দু’জনে। ধড়াস করে উঠল বুকের ভেতর।
কেউ এসে দাঁড়িয়েছে পেছনে।বিশাল-দেহী কেউ।
–“খবরদার !! যেখানে আছ, দাঁড়িয়ে থাক !”
শোনা গেল গর্জন।
বরফের মত জমে গেল যেন দুই গোয়েন্দা।
জিম রিভান: “আরে একি ! তোমরা ! এত রাতে চোরের মত এখানে কি করছ ?”
দু’জনের চোখের ওপর থেকে আলো সরাল জিম, নিচের দিকে ফেলল।
“ভাগ্যিস, মেরে বসিনি ! এতরাতে এখানে কি করছ তোমরা ?”
রবিন মিলফোর্ড: “দ্বীপের রহস্য ভেদ করে ফেলেছে কিশোর। তার অনুমান ঠিক কিনা দেখতে এসেছি।”
জিম রিভান: “দ্বীপের রহস্য !! কি বলতে চাইছ ?”
মুসা আমান: “সত্যিই গুপ্তধন লুকানো আছে এখানে। কিশোরের তাই ধারণা।”
জিম রিভান: “গুপ্তধন !!”
ছেলেদের কথা বিশ্বাস করতেপারছে না যেন গার্ড।
“কিসের গুপ্তধন ?”
মুসা আমান: “ওই যে . . . “
থেমে গেল মুসা।
তার আগেই কথা বলতে শুরু করেছে রবিন।
রবিন মিলফোর্ড: “আপনর কথাথেকেই সূত্র খুঁজে পেয়েছেকিশোর।”
জিম রিভান: “আমার কথা থেকে।”
বিড়বিড় করল জিম।
“কিছুই বুঝতে পারছি না !”
রবিন মিলফোর্ড: “সেদিন সকালে বললেন না, দুই বছর আগে আর্মার্ড কার লুট করেছিল দুই ভাই ? ডিক আর বাড ফিশার ? যারা বাঁ হাত নষ্ট করে দিয়েছে আপনার।”
জিম রিভান: “হ্যাঁ হ্যাঁ।কিন্তু তাতে কি ?”
মুসা আমান: “আপনি আরও বলেছেন,”
রবিনের কথার খেই ধরল মুসা।
“কোস্ট গার্ডেরা দু’জনকে ধরে ফেলে। উপসাগরে একটা বোটে ছিল দুই ভাই। কিছু ফেলছিল পানিতে। চোরাই টাকা ফেলেছিল ওরা, লোকের ধারণা।”
জিম রিভান: “তাই তো করেছিল।”
রবিন মিলফোর্ড: “এবং,”
মুসার কথার খেই ধরল রবিন।
“ঠিক দুই বছর আগে থেকেই কঙ্কাল দ্বীপে আবার ভুতেরউপদ্রব শুরু হল। টাকা লুটহল দু’বছর আগে, স্কেলিটন আইল্যাণ্ডের পাশে ধরা পড়লদুই ডাকাত, দীর্ঘ বিশ বছর পর আবার গোলমাল শুরু করল দ্বীপের ভূত। ভয় দেখাতে লাগল লোককে। ঘটনাগুলো একটার সঙ্গে আরেকটার মিল যেন খুব বেশি। সন্দেহ জাগল কিশোরের।”
জিম রিভান: “এত ভণিতা না করে আসল কথা বলে ফেল তো !”
অধৈর্য হয়ে উঠেছে জিম।
মুসা আমান: “বুঝতে পারছেননা এখনও ? বোটে করে পালাতে গেল দুই ডাকাত, ইঞ্জিন খারাপ হয়ে গেল হঠাৎ। ওরা তখন স্কেলিটন আইল্যাণ্ডের কাছাকাছি। এত ঝুঁকি নিয়ে এতগুলো টাকা লুট করেছে, পানিতে ফেলে দেবে সহজে ? মোটেই না। কোনভাবে বোটটা তীরে ভিড়িয়ে দ্বীপে উঠেছিল ওরা। টাকাগুলো লুকিয়ে রেখেছিল। তারপর বোটটা তীরে ভিড়িয়ে দ্বীপে উঠেছিল ওরা। টাকাগুলো লুকিয়ে রেখেছিল। তারপর বোট নিয়ে ভেসে পড়েছিল আবার।
কোস্টগার্ডের বোট আসতে দেখে টাকা পানিতে ফেলার ভান করেছিল, ফেলেছিল আসলেঅন্যকিছু। ভারি কিছু, যা সঙ্গে সঙ্গে তলিয়ে গিয়েছিল।
বমাল ধরা না পড়লে খুব বেশি দিন জেল হবে না, ঠিকইবুঝতে পেরেছিল ওরা। জেল থেকে বেরোলে আর কোন ভয় নেই। দ্বীপে এসে টাকাটা নিয়ে দূর কোন দেশে চলে যাবে। কেউ কিছু সন্দেহ করবে না। মাত্র হপ্তা-দুয়েক হল ছাড়া পেয়েছে ওরা। সেদিন কিংবা তার পরের দিনই এসে টাকা নিয়ে যেতে পারত, কিন্তু মুশকিলকরেছে সিনেমা কোম্পানি। দিকে এলে ওদের চোখে পড়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। ডিক আর বাডকে ঘোরাফেরা করতে দেখলে পুলিশের সন্দেহ জাগতে পারে। সে ঝুঁকি ওরানেয়নি।”
জিম রিভান: “সর্বনাশ ! কি গল্প শোনাচ্ছ ! এখানেই টাকা লুকিয়ে রেখেছে ডিক আর বাড ! কোথায়, কিছু বলেছে কিশোর ?”
রবিন মিলফোর্ড: “কিশোরের ধারণা, শুকনো উঁচু কোন জায়গায় লুকানো হয়েছে। কাপড়ের ব্যাগে ভরা কাগজেরটাকা, মাটির তলায় পুঁতে রাখলে পচে যাবে। শুকনো উঁচু সবচেয়ে ভাল জায়গা দ্বীপে . . . “
জিম রিভান: “গুহা !!”
প্রায় চেঁচিয়ে উঠল জিম।
“সেই পুরানো গুহার ভেতরে! কোন তাকের পেছনের খাঁজে! খাঁজের ভেতরে থলেগুলো ঢুকিয়ে সামনে কয়েকটা পাথরফেলে রাখলেই কেউ দেখতে পাবে না ! সন্দেহও করবে নাকিছু !”
মুসা আমান: “কিশোরেরও তাইধারণা। টাকাগুলো একমাত্র ওখানেই নিরাপদে থাকবে।”
জিম রিভান: “ইস‌্স‌্,”
অস্থির হয়ে উঠেছে জিম।
“দুটো বছর ধরে টকাগুলো ওখানে রয়েছে ! ঘুণাক্ষরেওমাথায় এলো না ব্যাপারটা ! যদি কোনভাবে বুঝতে পারতাম. . . ইস‌্স‌্ ! চল চল, দেখি,সত্যিই আছে নাকি . . . “
রবিন মিলফোর্ড: “আগে রাফাত চাচাকে ডেকে নিয়ে আসি।”
জিম রিভান: “দরকার নেই, ওঁরা ঘুমোক। আমরা বের করেনিয়ে আসি আগে। টাকার বস্তা দেখিয়ে চমকে দেব ওঁদেরকে।”
মুসা আমান: “কিন্তু . . . “
বলতে গিয়েও থেমে গেল মুসা।
ঘুরে হাঁটতে শুরু করেছে জিম। ফিরে চেয়ে বলল,
জিম রিভান: “এসো আমার সঙ্গে।”
অন্ধকারে দু’পাশের গাছপালাগুলোকে অদ্ভুত দেখাচ্ছে। জিমের পিছু পিছু এগিয়ে চলেছে দুই গোয়েন্দা। কেন যেন খচখচ করছে দু’জনের মন। এভাবে যাওয়া ঠিক হচ্ছে না।
রবিন মিলফোর্ড: “উফ্‌ফ্!!”
হঠাৎ শোনা গেল রবিনের চিৎকার।
গাছের আড়াল থেকে বেরিয় এসে জোরে কাঁধ খামচে ধরেছে কেউ।
“মিস্টার রিভান ! কে জানি. . . “
মুখ চেপে ধরল কঠিন একটা থাবা।
পেছনে আরেকটা চাপা শব্দ শুনতে পেল রবিন। মুসার মুখও আটকে দেয়া হয়েছে, অনুমান করল।
ফিরে দাঁড়াল জিম। এগিয়ে এলো কাছে।
কিন্তু এ-কি !!
সামান্যতম অবাক হল না তো !কোমরের খাপ থেকে রিভলভারওবের করল না !
জিম রিভান: “চমৎকার ! চেঁচামেচি করতে পারেনি !”
কি ভীষণ বিপদে পড়েছে, বুঝতে অসুবিধে হল না দুই গোয়েন্দার।
ভাবছে রবিন, ‘ঠিকই অনুমান করেছে কিশোর। কঙ্কাল দ্বীপের ওই পুরানো গুহাতেই লুকানো আছে টাকাগুলো। কিন্তু দুই ফিশারের সঙ্গে জিমেরও যোগসাজশ আছে, একথা কিশোরওকল্পনা করেনি। আজ রাতেই টাকা নিতে আসবে দুই ডাকাত, এটাও ভাবেনি।
আগামী কাল ভোর থেকেই শুরুহবে গুপ্তধন খোঁজা, নিশ্চয় ঘোষণা করা হয়েছে রেডিওতে। দ্বীপের কোন জায়গা খোঁজা বাদ রাখবে নাওরা। কেউ না কেউ আবিষ্কারকরে ফেলবে টাকার থলেগুলো।তাই, ঝুঁকি নিয়েও চলে এসেছে ওরা। টাকাগুলো বের করে নিয়ে যাবার জন্যে। যাবার আগে ওকে আর মুসাকে .. . ‘
আর ভাবতে চাইল না রবিন। চারদিক নীরব নিঃশব্দ। কানে আসছে শুধু নৌকার গায়ে ঢেউয়ের বাড়ি লাগার মৃদু ছলছলাৎ।
হঠাৎ আরেকটা শব্দ কানে এলো রবিনের। খুবই মৃদু। বোটের সঙ্গে কিছুর ঘষা লেগেছে, আলতো করে একবার দুলে উঠল। চোখের কোণ দিয়েদেখতে পেল সে, বোটের ধারে একটা মাথা। আবছা।
অতি সাবধানে উঠতে লাগল মাথাটা। গলা দেখা গেল . . . কাঁধ . . . বোটের ভেতরে চলে এলো সে। হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে এলো। উঁকি দিয়ে তাকাল একবার তীরের দিকে। আবার মাথা নামাল। রবিন আরমুসার পাশে এসে থামল।
এক মুহূর্ত ঘন ঘন শ্বাস ফেলার শব্দ কানে এলো রবিনের। কানের কাছে ফিসফিস করে উঠল একটা কণ্ঠ,
–“চুপ ! আমি পাপালো !”
পাপালো ! ও কি করে এলো এখানে ! অবাক হয়ে গেল দুই গোয়েন্দা। ওর তো এখন জেলেথাকার কথা !
কিছু একটা বলতে চেষ্টা করল রবিন, গোঙানির শব্দ হল।
পাপালো হারকুস: “চুপ ! কোনকথা নয় !”
ছুরি দিয়ে বাঁধন কাটতে লাগল পাপালো। মাত্র কয়েক সেকেণ্ড, কিন্তু রবিনের মনে হল কয়েক যুগ পেরিয়ে যাচ্ছে।
কাটা হয়ে গেল বাঁধন। মাথাতুলতে গেল মুসা। হাত দিয়েচেপে নামিয়ে দিল পাপালো।
পাপালো হারকুস: “খবরদার, দেখে ফেলবে ! পেছনের দিকে এগোও। পানিতে নামতে হবে।”
হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গেল মুসা। তার পেছনে রবিন। সবার পেছনে পাপালো।
“নেমে পড় ! খুব সাবধান ! কোন শব্দ যেন না হয় ! হালের দণ্ডটা ধরে থাকবে। আমি আসছি।”
হাজারো প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে মনে, পরে জিজ্ঞেস করবে পাপালোকে। আস্তে করেনেমে এলো রবিন। শব্দ হল অতি সামান্য, ঢেউয়ের ছলছলাৎ ঢেকে দিল সে শব্দ।
রবিনের পর পরই নামল মুসা।চলে এলো পেছনে। রবিন ধরে রেখেছে হালের দণ্ড। সে-ও এসে ধরল।
মুসা আমান: “খাইছে !”
রবিনের কাছে মুখ এনে বলল মুসা।
“ও এলো কি করে !”
রবিন মিলফোর্ড: “জানি না !তবে এসে পড়ায় বেঁচে গেলামবোধহয় !”
ফিসফিস করে বলল রবিন।
বান মাছের মত পিছলে পানিতে নামল পাপালো। নিঃশব্দে। দুই গোয়েন্দার কাছে চলে এলো।
পাপালো হারকুস: “এসো আমারসঙ্গে। খুব সাবধানে সাঁতরাবে ! কোন আওয়াজ যেন না হয় !”
তীরের ধার ধরে সাঁতরে চললপাপালো, নিঃশব্দে। তাকে অনুসরণ করল দুই গোয়েন্দা।
রবিন ভাবছে, জ্যাকেট আর প্যান্ট খুলে নিতে পারলে ভাল হত !
কালো পানি। আবছা কালো তিনটে মাথা, ভাল করে খেয়াল না করলে দেখাই যায় না। কোনরকম শব্দও করল না ওরা। মিনিট দশেক পরে একটাজায়গায় এসে পৌঁছুল। সাগরের দিকে সামান্য ঠেলেবেরিয়ে আছে এখানে সৈকত। ওটা ঘুরে আরেক পাশে চলে এলো। বোটটা আর দেখা যাচ্ছে না। জিম রিভানের দৃষ্টির বাইরে চলে এসেছে ওরা।
তীরের দিকে ফিরে সাঁতরাতেশুরু করল পাপালো। অনুসরণ করল দুই গোয়েন্দা।
বালিতে ঢাকা সৈকত নেই এখানে। পানির ওপর নেমে এসেছে ঝোপ ঝাড় আর ছোট ছোট গাছ। একটা শেকড় ধরে উঠে গেল পাপালো। এগিয়ে গিয়ে থামল দুটো বড় পাথরের মাঝে। মুখ বের করে উঁকি দিল। তার পাশে এসে দাঁড়ালদুই গোয়েন্দা। ওরাও উঁকি দিল।
প্রায় তিনশো ফুট দূরে মোটর বোটটা। তারার আলোয় আবছা। জিম রিভানের মূর্তিটা আরও কাছে।
পাপালো হারকুস: “এবার কথাবলতে পারি,”
নিচু গলায় বলল পাপালো।
“আমাদেরকে দেখতে পাবে না ওরা।”
–“এখানে এলে কি করে ?”
একই সঙ্গে প্রশ্ন করল দুইগোয়েন্দা।
পাপালো হারকুস: “তোমাদের সঙ্গে কথা বলে শিওর হয়ে এসেছেন হোভারসন, আমি চোর নই। কাজ শেষ করে ফিরে এসেছেন তখন জজ সাহেব। নিজের পকেট থেকে জামিনের পঞ্চাশ ডলার দিয়ে দিয়েছেনচীফ। জামিন হয়েছে হাক স্টিভেন। হাজত থেকে বাড়ি নিয়ে গেলেন আমাকে হোভারসন। খাওয়ালেন। তারপর ছাড়লেন।”
রবিন মিলফোর্ড: “কিন্তু এখানে এলে কি করে ?
কি করে জানলে আমরা এখানে এসেছি ?”
পাপালো হারকুস: “সোজা বাসায় চলে গেলাম। বাবাকে যতটা খারাপ অবস্থায় দেখব ভেবেছিলাম, তত খারাপ নয়। পড়শি এক মহিলা দেখাশোনা করেছেন। বেরিয়ে এলাম বাইরে। সাগরের দিকে চেয়ে বসে ভাবতে লাগলাম। ছুরিটাট্রেলারে গেল কি করে ? আমাকে চোর বানানর জন্যে কেউ একজন ফেলে রেখেছিল ওখানে ছুরিটা, কে ?
ছুরিটা হারিয়েছি পরশু, যেদিন গুহায় ঢুকেছিলাম। জিম রিভান তাড়া করল, পালালাম। তার পর থেকেই আরপাইনি ছুরিটা। তারমানে তাড়াহুড়োয় খেয়াল করিনি, ওটা রেখেই পালিয়েছিলাম।
এরপর একটা মাত্র লোকের হাতেই পড়তে পারে জিনিসটা,জিম রিভান।
তার পক্ষেই ট্রেলারে ঢোকাসহজ, অবশ্যই দরজা দিয়ে। লেন্স চুরি করা সহজ। ট্রেলারের জানালা ওই ভেঙেছে, ছুরিটা ফেলে রেখেছে মেঝেতে। ব্যাটার ওপর চোখ রাখা দরকার মনে করলাম। ঘাটে বাঁধা একটা নৌকা চুরি করে নিয়ে চলে এলাম দ্বীপে।
নৌকাটা একটা ঝোপের ধারে বেঁধে রেখে চলে গেলাম ক্যাম্পের কাছে। পার্কের দিকে এগোতে দেখলাম জিমকে।পিছু নিলাম। পার্কের পরে ছোট একটা জংলা পেরিয়ে সৈকতে বেরোল সে। দূরে একটা মোটর বোট দেখলাম। হাতের টর্চ সেদিকে করে তিনবার জ্বালাল-নেভাল জিম। তীরে এসে ভিড়ল বোট। তাজ্জব হয়ে দেখলাম, নামল দুই ভাই, ডিক আর বাড ফিশার।”
মুসার দিকে ফিরল পাপালো। হাসল।
পাপালো হারকুস: “দাঁড় খুবভাল টানতে পার না তুমি, মুসা। ছপাৎ ছপাৎ শব্দ হচ্ছিল। লুকিয়ে পড়ল তিনজনে। তোমাদের তীরে ওঠার অপেক্ষায় রইল।
তারপর আর কি ? বোকার মত ধরা পড়লে . . . “
রবিন মিলফোর্ড: “সত্যি, তুমি না এলে প্রাণেই মারাপড়তাম আজ।”
পাপালোর কাঁধে হাত রাখল রবিন।
পাপালো হারকুস: “শ্ শ্ শ্!!”
ঠোঁটে আঙুল রাখল পাপালো।
“ফিশার ব্যাটারা আসছে !”
দুটো মূর্তি এগিয়ে এসে দাঁড়াল জিমের কাছে। দু’জনের হাতে দুটো বড় প্যাকেট;
দশ লক্ষ ডলার।
ডিক ফিশার: “সব ঠিক আছে ? কোন গোলমাল নেই তো ?”
জিম রিভান: “না, গোলমাল নেই। শোন, আমার ভাগের টাকাটা দিয়ে দাও।”
বাড ফিশার: “পরে, বোটে উঠেদেব। ডিক, জলদি কর। চল উঠেপড়ি।”
পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে আছে জিম। ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে দিল বাড। এগিয়ে গেলবোটের দিকে।
বোটে উঠে পড়ল দুই ভাই।
বাড ফিশার: “আরে !”
চেঁচিয়ে উঠল বাড।
“বিচ্ছু দুটো কোথায় ! জিম,তুমি ছেড়ে দিয়েছ ওদেরকে!”
জিম রিভান: “আমি ছাড়িনি !”
রেগে গিয়ে বলল জিম।
“যাবে কোথায় ? আছে, দেখ !”
বাড ফিশার: “নেই !”
কর্কশ গলা বাডের।
জিম রিভান: “কই, দেখি,”
বলতে বলতে এগিয়ে এলো জিম।আলো ফেলল বোটে।
“আরে, সত্যিই নেই দেখছি ! গেল কোথায় ! এক চুল নড়িনি আমি জায়গা ছেড়ে !”
ডিক ফিশার: “দেখি, প্যাকেটটা দাও,”
হাত বাড়াল ডিক।
“জলদি নেমে গিয়ে ধাক্কা দাও। এখুনি পালাতে হবে।”
জিম রিভান: “কিন্তু আমার ভাগ ?
দুটো বছর অপেক্ষা করেছি। পুরো দশ লাখ পেলেও আমার হাতের দাম হবে না। সেটা না হয় না-ই বললাম। তোমরা তো পালাবে, আমি যাব কোথায়? ছেলে দুটো পালিয়েছে। গিয়ে বলে দেবে সব। জেলে যাব তো !”
ডিক ফিশার: “সেটা তোমার ব্যাপার। বাড, ধাক্কা দাও।”
স্টার্টারে চাপ দিল সে।
ধাক্কা দিতে গিয়েও থেমে গেল বাড। গায়ে ওপর ঘেঁষে এসেছে জিম।
জিম রিভান: “খবরদার ! প্যাকেট দুটো দিতে বল ডিককে। নইলে . . . “
ডিক ফিশার: “বাড !”
শোনা গেল ডিকের আতঙ্কিত চিৎকার।
“বাড, স্টার্ট নিচ্ছে না !জিম, ইঞ্জিনের কি করেছ ?”
জিম রিভান: “আমি কিচ্ছু করিনি।”
ডিক ফিশার: “ইঞ্জিন তো স্টার্ট নিচ্ছে না, এখন কি করব ?”
জিম রিভান: “সেটা তোমাদেরব্যাপার। প্যাকেট দুটো দাও, জলদি !”
আবার চেষ্টা করল ডিক, আবার, কিন্তু স্টার্ট হল না ইঞ্জিন।
অবাক হয়ে দেখল দুই গোয়েন্দা, নীরব হাসিতে ফেটে পড়ছে পাপালো।
রবিন মিলফোর্ড: “কি হল !”
ফিসফিস করে বলল রবিন।
পাপালো হারকুস:”স্পার্কিং প্লাগের তার ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছি।
হারামজাদারা ! এবার যাও ! পালাও ! ওই হারামির বাচ্চা ডিকই আমার নৌকা ভেঙেছে। ওই বোট দিয়েই। এইবার পেয়েছি কায়দায়। চল,ক্যাম্পে গিয়ে লোক ডেকে আনি।”
উঠতে যাবে, এই সময় কানে এলো ইঞ্জিনের শব্দ। বসে পড়ল আবার পাপালো, দ্বীপেরদিকেই এগিয়ে আসছে একটা বড়মোটর লঞ্চ।
কাছে এসে গেল লঞ্চ। আলো জ্বলে উঠল, সার্চ লাইট। সোজা এসে পড়ল ফিশারদের বোটের ওপর।
এক লাফে বোট থেকে নেমে এলো ডিক। ছুটল। হকচকিয়ে গেল জিম। এই সুযোগে থাবা মেরে তার হাতের রিভলভার ফেলে দিল বাড। ভাইয়ের পেছনে ছুটল সে-ও।পাপালো হারকুস: “আরে ! ব্যাটারা এদিকেই আসছে। দাঁড়াও, দেখাচ্ছি মজা !”
দ্রুত হামাগুড়ি দিয়ে সামনে এগোল সে।
কাছে এসে গেল ডিক। আর দু’কদম ফেললেই ঝোপ পেরিয়েযাবে। ঠিক তার পেছনেই রয়েছে বাড।
দাঁড়িয়ে উঠে হঠাৎ সামনে পা বাড়িয়ে দিল পাপালো। হোঁচট খেল ডিক। হুমড়ি খেয়ে পড়ল মাটিতে। ভাইয়ের গায়ে হোঁচট খেল বাড। পড়ে গেল সে-ও।
ডকের ওপর গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল পাপালো। একনাগাড়ে কিলঘুষি মারতে লাগল। চেঁচাতেলাগল,
পাপালো হারকুস:”হারামজাদা ! আমাকে হাজতেপাঠিয়েছিলি !
ডাকাতের বাচ্চা ডাকাত ! চোর বানিয়েছিলি আমাকে . . .”
উঠে দাঁড়াল বাড। পাপালোর চুল ধরে হ্যাঁচকা টানে সরিয়ে আনল ভাইয়ের ওপর থেকে। চিত করে শুইয়ে ফেলল। পাথরে জোরে ঠুকে দিল মাথা। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পা তুলল পাপালো বুক সই করে।
মাথা নুইয়ে খ্যাপা ষাঁড়েরমত ছুটে গেলো মুসা। নিগ্রোর খুলি কতখানি শক্ত, তলপেটে অনুভব করল বাড। হুঁক্‌ক্ করে একটা শব্দ বেরোল মুখ থেকে। চিতহয়ে পড়ে গেল। তার ওপর পড়ল মুসা।
চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে উঠতে গেল ডিক, পরল না। পিঠের ওপর লাফিয়ে এসে বসেছে রবিন। আবার হাত-পা ছড়িয়ে উপুড় হয়ে পড়ে গেল সে।
ঝাড়া দিয়ে গায়ের ওপর থেকেমুসাকে ফেলে দিল বাড। উঠেদাঁড়াল হাঁচড়ে-পাঁচড়ে। এই সময় এসে পড়ল জিম। জ্যাকেটের কলার চেপে ধরে সোজা করল বাডকে। ঠেলে নিয়ে চলল সামনের দিকে। ষাঁড়ের জোর তার গায়ে। ওর এক হাতের সঙ্গেই পেরে উঠলনা বাড। ঠেলে বাডকে পানিরধারে নিয়ে চলল জিম।
জিম রিভান: “আমার সঙ্গে চালাকি ! দেখাচ্ছি মজা !”
বাডকে নিয়ে পানিতে পড়ল জিম। কোমর পানি। উঠে দাঁড়াল আবার। মাথা তুলল বাড। জ্যাকেটের কলার এখনওজিমের হাতে। বাডকে ঠিকমত দম নিতে দিল না জিম। চুবাতে লাগল একনাগাড়ে। রাগে পাগল হয়ে উঠছে সে। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।
রবিনকে গায়ের ওপর থেকে ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়াতে গেল ডিক। এবারেও পারল না।প্রায় একসঙ্গে এসে হাজির হয়েছে মুসা আর পাপালো। দু’হাতে ডিকের দু’পা ধরে উঁচু করে ফেলল মুসা। টান দিল। হাত বাড়িয়ে একটা ছোটগাছের গোড়া ধরে ফেলল ডিক।লাথি মেরে হাতটা সরিয়ে দিল পাপালো।
পাপালো হারকুস: “এ হারামজাদাকেও পানিতে ফেল!”
তিন কিশোরের সঙ্গে পেরে উঠলো না ডিক। হিড়হিড় করে টেনে তাকে পানির ধারে নিয়ে এলো ওরা।
বাডকে ছাড়ছে না জিম। চোবাচ্ছে এখনও। মেরেই ফেলবে যেন। তার পাশেই ডিককে নিয়ে এসে পড়ল তিন কিশোর।
বাডকে ছেড়ে দিয়েই ডিকের ঘাড় চেপে ধরল জিম। তাকে চুবাতে শুরু করল।
–“হয়েছে ! ছাড় !”
শোনা গেল একটা গম্ভীর আদেশ।
“মেরে ফেলবে তো !”
চমকে ফিরে চাইল তিন কিশোর। তাদের পেছনে কয়েক হাত দূরে এসে গেছে দুটো নৌকা। একটা নৌকায় দাঁড়িয়েআছেন পুলিশ চীফ হোভারসন। এক হাতে রিভলভার, আরেক হাতে টর্চ।
হোভারসন: “ছাড় ! এই জিম শুনতে পাচ্ছ।”
ডিককে ছেড়ে দিল জিম। সরে যাবার তাল করছিল বাড, তাকে চেপে ধরল। দিল আরেক চুবানি।
হোভারসন: “হয়েছে হয়েছে ! মেরে ফেলবে, ছেড়ে দাও !”
দুই ডাকাত আর জিমকে টেনে ডাঙায় তুলল কয়েকজন পুলিশ।হাতকড়া পরিয়ে দিল।
পাপালো হারকুস: “আরে ! ব্যাটারা এদিকেই আসছে। দাঁড়াও, দেখাচ্ছি মজা !”
দ্রুত হামাগুড়ি দিয়ে সামনে এগোল সে।
কাছে এসে গেল ডিক। আর দু’কদম ফেললেই ঝোপ পেরিয়ে যাবে। ঠিক তার পেছনেই রয়েছে বাড।
দাঁড়িয়ে উঠে হঠাৎ সামনেপা বাড়িয়ে দিল পাপালো। হোঁচট খেল ডিক। হুমড়ি খেয়ে পড়ল মাটিতে। ভাইয়ের গায়ে হোঁচট খেল বাড। পড়ে গেল সে-ও।
ডিকের ওপর গিয়ে ঝাঁপিয়েপড়ল পাপালো। একনাগাড়ে কিল ঘুষি মারতে লাগল। চেঁচাতে লাগল,
পাপালো হারকুস:”হারামজাদা ! আমাকে হাজতেপাঠিয়েছিলি !
ডাকাতের বাচ্চা ডাকাত ! চোর বানিয়েছিলি আমাকে . .. “
উঠে দাঁড়াল বাড। পাপালোরচুল ধরে হ্যাঁচকা টানে সরিয়ে আনল ভাইয়ের ওপর থেকে। চিত করে শুইয়ে ফেলল। পাথরে জোরে ঠুকে দিল মাথা। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পা তুলল পাপালোবুক সই করে।
মাথা নুইয়ে খ্যাপা ষাঁড়ের মত ছুটে গেলো মুসা। নিগ্রোর খুলি কতখানি শক্ত, তলপেটে অনুভব করল বাড। হুঁক্‌ক্ করে একটা শব্দ বেরোল মুখ থেকে। চিত হয়ে পড়ে গেল।তার ওপর পড়ল মুসা।
চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে উঠতে গেল ডিক, পরল না। পিঠের ওপর লাফিয়ে এসে বসেছে রবিন। আবার হাত-পা ছড়িয়ে উপুড় হয়ে পড়ে গেল সে।
ঝাড়া দিয়ে গায়ের ওপর থেকে মুসাকে ফেলে দিল বাড। উঠে দাঁড়াল হাঁচড়ে-পাঁচড়ে । এই সময় এসে পড়ল জিম। জ্যাকেটের কলার চেপে ধরে সোজা করল বাডকে। ঠেলে নিয়ে চলল সামনের দিকে। ষাঁড়ের জোর তার গায়ে। ওর এক হাতের সঙ্গেই পেরে উঠল না বাড। ঠেলে বাডকে পানির ধারে নিয়ে চলল জিম।
জিম রিভান: “আমার সঙ্গে চালাকি ! দেখাচ্ছি মজা !”
বাডকে নিয়ে পানিতে পড়ল জিম। কোমর পানি। উঠে দাঁড়াল আবার। মাথা তুলল বাড। জ্যাকেটের কলার এখনওজিমের হাতে। বাডকে ঠিকমত দম নিতে দিল না জিম। চুবাতে লাগল একনাগাড়ে। রাগে পাগল হয়ে উঠছে সে। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।
রবিনকে গায়ের ওপর থেকে ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়াতে গেল ডিক। এবারেও পারল না।প্রায় একসঙ্গে এসে হাজিরহয়েছে মুসা আর পাপালো। দু’হাতে ডিকের দু’পা ধরে উঁচু করে ফেলল মুসা। টান দিল। হাত বাড়িয়ে একটা ছোট গাছের গোড়া ধরে ফেললডিক। লাথি মেরে হাতটা সরিয়ে দিল পাপালো।
পাপালো হারকুস: “এ হারামজাদাকেও পানিতে ফেল!”
তিন কিশোরের সঙ্গে পেরে উঠলো না ডিক। হিড়হিড় করে টেনে তাকে পানির ধারেনিয়ে এলো ওরা।
বাডকে ছাড়ছে না জিম। চোবাচ্ছে এখনও। মেরেই ফেলবে যেন। তার পাশেই ডিককে নিয়ে এসে পড়ল তিনকিশোর।
বাডকে ছেড়ে দিয়েই ডিকেরঘাড় চেপে ধরল জিম। তাকে চুবাতে শুরু করল।
–“হয়েছে ! ছাড় !”
শোনা গেল একটা গম্ভীর আদেশ।
“মেরে ফেলবে তো !”

চমকে ফিরে চাইল তিন কিশোর। তাদের পেছনে কয়েকহাত দূরে এসে গেছে দুটো নৌকা। একটা নৌকায় দাঁড়িয়ে আছেন পুলিশ চীফহোভারসন। এক হাতে রিভলভার, আরেক হাতে টর্চ।
হোভারসন: “ছাড় ! এই জিম শুনতে পাচ্ছ।”
ডিককে ছেড়ে দিল জিম। সরেযাবার তাল করছিল বাড, তাকে চেপে ধরল। দিল আরেক চুবানি।
হোভারসন: “হয়েছে হয়েছে! মেরে ফেলবে, ছেড়ে দাও!”
দুই ডাকাত আর জিমকে টেনে ডাঙায় তুলল কয়েকজন পুলিশ। হাতকড়া পরিয়ে দিল।বিশাল টেবিলে পড়ে থাকা মোহরের ছোট স্তূপের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে আছেন মিস্টার ডেভিস ক্রিস্টোফার।
ডেভিস ক্রিস্টোফার:”হুম্‌ম্,”
মাথা ঝোঁকালেন পরিচালক।
“তোমাদের এই অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী নিয়ে খুব ভাল একটা ছবি হবে। ভাবছি, পুরোটাই শূটিং করব স্কেলিটন আইল্যাণ্ড আর আশেপাশের দ্বীপগুলোতে। যেখানে যা যা যেভাবে ঘটেছে, ঠিক তেমনি ভাবে। পাপালোর চরিত্রটা তাকে দিয়েই অভিনয় করালে কেমন হয় ?”
–“খুব ভাল হয় !”
একই সঙ্গে বলে উঠল তিন গোয়েন্দা।
ঘড়ি দেখলেন পরিচালক।
ডেভিস ক্রিস্টোফার: “ঠিক আছে। নতুন কোন রহস্যের খোঁজ পেলে জানাব।”
ইঙ্গিতটা বুঝল তিন কিশোর।উঠে দাঁড়াল। মোহরগুলো টেনে নিলো মুসা। বেছে বেছে একটা ভাল মোহর– যেটা কম ক্ষয় হয়েছে, তুলে নিয়ে বাড়িয়ে ধরল।
মুসা আমান: “এটা আপনাকে দিলাম, স্যার। আপনার সংগ্রহে রেখে দেবেন।”
ডেভিস ক্রিস্টোফার:”থ্যাংক ইউ, মাই বয়,”
মোহরটা নিতে নিতে বললেন পরিচালক।
ঘর থেকে বেরিয়ে গেল তিন গোয়েন্দা।
হাতের তালুতে নিয়ে মোহরটার দিকে চেয়ে রইলেনমিস্টার ক্রিস্টোফার। বিড়বিড় করলেন,
ডেভিস ক্রিস্টোফার:”সত্যিকারের জলদস্যুর গুপ্তধন !”
হাসলেন আপন মনেই।
“দারুণ ছেলেগুলো ! কী সুন্দর সুন্দর কাহিনীর জন্ম দিচ্ছে ! ভাবছি, এরপরকি অ্যাসাইনমেন্ট দেয়া যায় তিন গোয়েন্দা কে !”

You May Also Like