সম্রাট আকবর ও বীরবলের একটি শিক্ষামূলক গল্প

সম্রাট আকবর ছবি

একদিন সম্রাট আকবরের মাথায় তিনটি প্রশ্ন আসে, তিনি কিছুতেই সেই প্রশ্ন গুলির সমাধান খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তাই তিনি সভাসদদের মাঝে বললেন, “যে আমার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারবে তাকে পুরস্কৃত করা হবে।“ প্রশ্ন গুলি অনেকটা এরকম-

-এমন কি জিনিস আছে যেটি বর্তমানেও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে?
– এমন কি আছে যেটি বর্তমানেও নেই, আর ভবিষ্যতেও থাকবে না?
-এমন কি জিনিস আছে, যেটি বর্তমানে থাকলেও ভবিষ্যতে থাকবে না?

এরপর তিনি বললেন- “শুধুমাত্র উত্তর দিলে হবে না, উত্তরের সাথে সাথে যথাযথ উদাহরণও দিতে হবে।“ উপস্থিত সবাই চিন্তায়, মগ্ন হয়ে যায়। কারও মুখ থেকে কোনো উত্তর বের হচ্ছে না দেখে বীরবল বলে উঠলেন-“হুজুর আপনার প্রশ্নের সঠিক উত্তর আমি দিতে পারব, কিন্তু তার জন্য আপনাকে আমার সাথে আপনার রাজ্য ঘুরতে হবে, তাহলে আপনি যথাযথ উদাহরণের সাথেই আপনার উত্তর পেয়ে যাবেন।“

এরপর সম্রাট আকবর ও বীরবল সুফির ছন্দবেশ ধারণ করে, বেড়িয়ে পড়লেন।

কিছুক্ষণ পর তারা বাজারে পৌঁছে গেলেন। এরপর তারা একটি দোকানে ঢুকে পড়লেন। এরপর বীরবল দোকানীকে বললেন- “আমরা ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের জন্য একটি মাদ্রাসা তৈরি করতে চাই, এরজন্য আপনাকে এক হাজার টাকা দিতে হবে।“ এটি শুনে দোকানি তার হিসাব রক্ষককে একহাজার টাকা দিতে বললেন। এবার বীরবল বললেন- “আমি যখন টাকা নিব, তখন আমি আপনার মাথায় জুতোর বারি মারব। প্রত্যেকটা টাকার জন্য একটা করে বারি আপনার মাথায় আমি মারব, রাজী থাকলে বলেন।“

এই কথাটি শোনার পর, দোকানের এক কর্মচারী দারুন রেগে গেল, সে বীরবলকে মারতে উদ্যত হল, কিন্তু দোকানের মালিক তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “হ্যাঁ আমি তৈরি, কিন্তু আমার একটি শর্ত আছে আপনাকে, আমাকে বিশ্বাস জোগাতে হবে যে, আমার দেওয়া টাকা মাদ্রাসা তৈরির কাজেই লাগানো হবে, অন্য কোথাও ব্যয় করা হবে না।“

এই কথাটি বলে, দোকানের মালিক মাথা নিচু করে বললেন- “জুতো মারা শুরু করুন।“ এটি দেখার পর বীরবল দোকানীকে কিছু না বলেই, সম্রাট আকবর কে নিয়ে দোকানের বাইরে চলে এলেন।

এরপর তারা চুপচাপ রাস্তা দিয়ে আবার হাঁটতে লাগলেন। এবার বীরবল বলতে শুরু করলেন- “সম্রাট, দোকানে যা কিছু হয়ে গেল তার মানে দাঁড়ায় যে, দোকানদারের কাছে আজ টাকা আছে, আর সেই টাকাকে সে মহৎ কাজে ব্যয় করতে চায়, যাতে ভবিষ্যতেও তার নাম থেকে যায়।

সুতরাং এর অর্থ দাঁড়ায়- নিজের মহৎ কাজের মাধ্যমে মানুষ স্বর্গে নিজের জায়গা করে নিতে চায়। অর্থাৎ আপনি বলতে পারেন যে, তার কাছে আজ যা আছে, ভবিষ্যতেও তা থাকবে। আর এটিই হল আপনার প্রথম প্রশ্নের উত্তর।

এরপর তারা হাঁটতে হাঁটতে একজন ভিক্ষুকের কাছে যায়। তারা দেখল যে, একজন মানুষ সেই ভিক্ষুককে কিছু খাবার দিচ্ছেন, আর সেই খাবারটি প্রয়োজনের অতিরিক্ত। এরপর বীরবল সেই ভিখারিটির কাছে গিয়ে বললেন- “আমার অনেক খিদে লেগেছে, আমাকেও কিছু খাবার দিন।“

এই কথাটি শোনার পর সেই ভিক্ষুক খুব রেগে গেলেন, এবং বললেন- “পালা এখান থেকে, কি জানি কোথা থেকে এসে জোটে এরা।“

এরপর সম্রাট ও বীরবল কিছু না বলে এগিয়ে চললেন।

যেতে যেতে বীরবল বললেন- “হুজুর এখন যে ঘটনাটি ঘটল সেটি হল আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর। এই ভিক্ষুকটি নিজেকে ঈশ্বরের সেবক মনে করেন, অথচ তিনি সাধারণ মানুষকেই খুশি করতে পারেন না, ঈশ্বরকে কি খুশি করবেন? এর মানে দাঁড়ায় যেটি আজ তার কাছে আছে, সেটি ভবিষ্যতে আর তার কাছে থাকবে না।“

এরপর তারা আরও এগিয়ে যেতে লাগলেন।

এরপর তারা দেখলেন, একজন তপস্বী গাছের নীচে বসে তপস্যা করছেন। বীরবল সেই তপস্বীর কাছে গিয়ে, তার সামনে কিছু অর্থ রেখে দিলেন। এটি দেখে তপস্বীটি বললেন-“এগুলিকে শীঘ্র এখান থেকে সরাও। এই টাকা গুলি নিলে বেইমানী হবে, আর বেইমানী করা টাকা আমার চাই না।“

“হুজুর এটি হল আপনার পরের প্রশ্নের উত্তর, এর মানে হল এখন তার কাছে কিছুই নেই, কিন্তু সে কিছু অর্জনের চেষ্টা করছে। তাই বর্তমানে তার কাছে সুখ নেই ঠিকই, কিন্তু ভবিষ্যতে তার কাছে অনেক সুখ থাকবে।“

প্রশ্নের এরূপ উত্তর পেয়ে সম্রাট আকবর বেজায় খুশি হলেন। এরপর আকবর ও বীরবল রাজমহলের দিকে পা বাড়ালেন।

What’s your Reaction?
+1
0
+1
2
+1
0
+1
2
+1
1
+1
0
+1
0

You May Also Like