শহরে যেতে (অরণ্যের দিনরাত্রি-৩) – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

অরণ্যের দিনরাত্রি - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

পরের দিনই ওদের অবশ্য একবার শহরে যেতে হলো। প্রথমদিন ঠাণ্ডা কুয়োর জলে স্নান করার পর সঞ্জয়ের একটু সর্দি লেগেছে—ওষুধ কেনা দরকার। নেশা করলে পরের দিন ভোরে অসীমের মাথা ধরে—তার অ্যাসপিরিন লাগবে। তা ছাড়াও ওদের খেয়াল হয়েছিল, ওরা কেউই চিরুনী আনেনি, একজন কেউ আনবেই—এই ভেবে কেউই নিজে চিরুনী আনেনি। রবির চুল চাপ বাঁধা, কোঁকড়ানো, তার চিরুনী না থাকলেও চলে, শেখরের স্বভাব যখন-তখন বাঁ হাতের আঙুলগুলো চুলের মধ্যে চিরুনীর মতন চালানো, কিন্তু অসীম ও সঞ্জয়ের চুল অবাধ্য, বিশেষত সঞ্জয় যথেষ্ট শৌখিন প্রকৃতির, যতবার সে মুখ ধোয়—ততবারই চুল আঁচড়ে নেওয়া তার চাই, সুতরাং চিরুনী একটা দরকারই।

খবরের কাগজ পড়ার ইচ্ছে অবশ্য কারুরই নেই, কিন্তু মাদ্রাজ টেস্টে ওয়েস্ট ইণ্ডিজের সঙ্গে ইণ্ডিয়া হারলো কি জিতলো, সে খবরটা অন্তত না জানলে চলে না। তা ছাড়া, সকালবেলা চায়ের সঙ্গে ডিমসেদ্ধ খাওয়া বহুদিনের অভ্যাস, দু’দিন ডিম না পেয়ে ওরা উসখুস করছে। অসীমের মত এই যে, রান্না নিয়ে বেশি ঝঞ্ঝাট করার মানে হয় না বটে, কিন্তু গরম ভাতের সঙ্গে খানিকটা মাখন পেলে যে-কোনো জিনিসই সুখাদ্য হয়ে উঠবে। একটা মাখনের টিন কিনলে খুব ভালো হয়। সিগারেটেরও স্টক রাখা দরকার।

চৌকিদার রতিলালের বউয়ের খুব অসুখ, সে লোকটা খুব বিব্রত হয়ে আছে। উনুন ধরাচ্ছে, চা বানিয়ে দিচ্ছে, বাথরুমের ট্যাঙ্কে জল ভরছে ঠিকই, কিন্তু মাঝে মাঝেই সে রেল লাইনের ওপারে নিজের গ্রামে ফিরে যাচ্ছে। লখা আশেপাশে ঘুরঘুর করছে সব সময়, যে কোনো হুকুম তামিল করার জন্য উদ্‌গ্রীব, কিন্তু রবির ধারণা লোকটা বড্ড বেশি চোর, ওকে দিয়ে সব জিনিস আনানো উচিত নয়।

ডাকবাংলোর পেছন দিকে ফাঁকা মাঠ, সেখান দিয়ে বাজার ও স্টেশন সর্ট-কাট হয়। চা খাবার পর কিছুক্ষণ আলস্য করে, ওরা সবাই শহরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লো। যার যা দরকার একবারেই কিনে আনা ভালো। দাড়ি কামানোর সরঞ্জাম অবশ্য ওরা সবাই এনেছে, কিন্তু আজ সকালে দাড়ি কামাবার ইচ্ছে কারুরই দেখা গেল না। এই জঙ্গলের মধ্যে আর কে দেখতে আসছে—দরকার কী ওসব ঝামেলার। সঞ্জয় অবশ্য নিজের ধারালো গালে দু’একবার হাত বুলালো, কিন্তু চুল আঁচড়ানোই যাচ্ছে না যখন—

আবার সেই নোংরা বাজার, রেডিওর চিল্লানি, হোটেলের ভাল-ডাল গন্ধ। সেইসব কৌতূহলী চোখ, নীল ডুমো ডুমো মাছি। রাস্তার কাদা শুকিয়ে এসেছে, কিন্তু তাতে বহু মানুষের পায়ের ছাপ আঁকা।

টিনের মাখন পাওয়া গেল না—অতিরিক্ত হলদেটে রঙের স্থানীয় মাখন কিনতে হলো—অত্যন্ত বেশি দাম দিয়ে। চিরুনী জুটলো—প্লাস্টিকের সস্তা চিরুনী। একটা দোকান থেকে দশ প্যাকেট সিগারেট কিনতে—সে দোকানের সব সিগারেটই শেষ হয়ে গেল। চটের থলে বিছিয়ে গুচ্ছের আলু পেঁয়াজ কুমড়ো পটল নিয়ে বসেছে দু’একজন, কিন্তু ডিমের কোনো দেখা নেই। মঙ্গলবারের হাট ছাড়া ডিম অসম্ভব। একটা হোটেলের সামনে তারের ঝুড়িতে ডিম ঝোলানো রয়েছে, কিন্তু সে ডিম আলাদা বিক্রি হবে না, সুতরাং ওরা সেখান থেকেই চারটে ডিমসেদ্ধ খেয়ে নিলো। বেশ বোঝা যাচ্ছে, জঙ্গলের শান্ত আবহাওয়া ছেড়ে এই নোংরা বাজারে এসে ওরা কেউ খুশী হয়নি। তবু, তৎক্ষণাৎ ফিরে যাবার পক্ষেও একটা কিছু অতৃপ্তি রয়ে যাচ্ছে।

ঘুরতে ঘুরতে ওরা চলে এলো স্টেশনের পাশে। সেই বটগাছ তলার বাঁধানো বেদিতে আজও দশ-বারোটা সাঁওতাল মেয়ে খালি ঝুড়ি নিয়ে বসে আছে। পরস্পর জটলা ও হাসাহাসি করছিল, ওদের দেখে থেমে গেল। অসীম বললো, আশ্চর্য দেখ, এখন প্রায় দশটা বাজে, আজও ওরা এখানে বসে আছে। কে ওদের কাজ দেবে বুঝতে পারি না।

রবি জবাব দিলো, সবাই কি আর কাজ পায়, হয়তো দু’একজন কাজ পায়।

—কাল ভোরবেলা যে-ক’জন দেখেছিলাম, আজ এত বেলাতেও তো প্রায় সেই ক’জন দেখছি!

—তুই গুনে রেখেছিলি বুঝি?

—না, ঐ যে নীলপাড় শাড়ি পরা ফচকে মেয়েটা সবার সামনে বসে আছে, কালও তো ওকে দেখেছিলাম। আমার কাজ দেবার হলে আমি ওকেই প্রথমে কোনো কাজ দিতুম।

—তাই দে না। কোনো একটা কাজের ছুতো বানিয়ে নে।

—মন্দ বলিসনি, এদের কয়েকজনকে দিয়ে ডাকবাংলোয় আর একটা ঘর তুলে নিলে হয়।

—ডাকবাংলোয় কেন? জঙ্গলের মধ্যে যে-ভাঙা বাড়িগুলো দেখলুম, সেগুলো নিশ্চয়ই বেওয়ারিস, সেগুলোই ওদের দিয়ে সারিয়ে আমরা নিয়ে নিলে পারি!

মেয়েগুলো হাসি ও কথা থামিয়ে ওদের দিকে চেয়ে আছে। ওরা ওখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সিগারেট টানলো। সাঁওতাল মেয়েদের বয়েস ঠিক বোঝা যায় না। কিন্তু পনেরো থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে বয়েস সবার নিশ্চিত। নীলপাড় শাড়ি পরা মেয়েটির বয়েসই কম সবচেয়ে। অন্য মেয়েরা চোখ ফিরিয়ে আছে, কিন্তু সে এই নতুন চারটে বাবুর দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে। কালো পাথরের মতন আঁটো স্বাস্থ্য মেয়েটার, সাদা শাড়িটা কিন্তু বিস্ময়কর রকমের ফরসা। ওদের কারুরই শাড়ি ময়লা নয়, জঙ্গলে থাকে, কুলির কাজ করতে এসেছে, কিন্তু ধুলোবালি মেখে আসেনি। এমন কি ওদের মুখ ও শরীরের চকচকে চামড়া দেখলে মনে হয়—ওদের শরীরেও এক বিন্দু ময়লা নেই।

যারা ভদ্দরলোক, যারা বাবু, তারা প্রকাশ্যে অন্তত সাঁওতাল মেয়েদের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে না—এইটাই অলিখিত নিয়ম। এইসব অঞ্চলের হাটে-বাজারে, রাস্তায় অনবরত সাঁওতাল মেয়েরা ঘোরে তাদের ব্লাউজহীন বুক ও ছেঁড়া শাড়ি নিয়ে— কিন্তু কেউ তাদের দিকে চেয়ে দেখবে না। কেউ বলবে না, বাঃ, ঐ মেয়েটির স্বাস্থ্য কি সুন্দর! কিন্তু এই চারজন—এরা নতুন বাবু, এরা কলকাতার লোক, এরা বাজারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মেয়েগুলোকে দেখছে। রবি একদৃষ্টে চেয়ে আছে নীলপাড় মেয়েটির দিকে।

শেখর বললো, হঠাৎ যেন এদের দেখলে আগেকার সেই ক্রীতদাসদাসীদের বাজারের কথা মনে পড়ে। ওরা যেন নিজেদের বিক্রি করার জন্য বসে আছে, যদি কেউ কখনো কেনে।

রবি বললো, চল না, আমরা প্রত্যেকে এক-একজনকে কিনে নিয়ে যাই।

—“উঁহু। এসব বাজে মতলব করিসনি, ঝঞ্জাট হবে অনেক। একটা সত্যি আশ্চর্য লাগে, ওরা রোজ চাকরি পায় না, তবু ওরা হাসাহাসি করে কি করে? দিব্যি তো বসে হাসছিল এতক্ষণ।

সত্যিই, ওরা চলে যাবার জন্য পেছন ফিরতেই সব মেয়েরা কি একটা কথায় একসঙ্গে হেসে উঠলো, হাসির ধমকে এ-ওর গায়ে ঢলে পড়লো, সেই নীলপাড় শাড়ি পরা ফচকে মেয়েটা হাতের ঝুড়ি উলটো করে মাথায় বসিয়ে খল খল করে হাসতে লাগলো। রবি অনেকবার পেছন ফিরে নিজের ঠোঁটে সেই হাসির জবাব দিয়ে অস্ফুট স্বরে বললো, আশ্চর্য!

শেখর আবার বললো, সত্যি, কুলি-মজুরের কাজ করুক আর যাই করুক, হাসিটা ওদের রানীর মতন!

সঞ্জয় বললো, রানীর মতন? তুই ক’টা রানীকে হাসতে দেখেছিস রে? স্বচক্ষে একটাও রানী দেখেছিস?

—সিনেমায় অনেক দেখেছি!

ফেরার পথে মাঠের সর্ট-কাট দিয়ে না এসে ওরা পাকা রাস্তাই ধরেছিল, দেখা গেল, দূর থেকে রতিলাল ছুটতে ছুটতে ওদের দিকেই আসছে। কাছে এসে হাঁফাতে হাঁফাতে বললো, রেঞ্জারবাবু আসিয়েছেন, আপলোককে বোলাতে বুললেন।

রবি ভুরু কুঁচকে বললো, কেন, রেঞ্জারবাবু আমাদের ডাকবেন কেন?

—সাহেব তো বাতাতা, আপলোককা কোই রিজার্ভ নেহি থা।

—জরুর হ্যায়!

—ঠিক হ্যায়, উনসে বাতচিত তো কর লিজিয়ে। সাহাব বোলা তুরন্ত সাহেবলোগকো বোলাও, ঐসি লিয়ে হম—

রবি ধমকে উঠে বললো, রেঞ্জার তোদের কি এমন সাহেব যে, ডাকলেই যেতে হবে? সাহেবকে গিয়ে বলল, আমাদের যখন সময় হবে তখন যাবো। এখন আমাদের সময় হবে না।

রতিলাল তবু দাঁড়িয়ে আছে দেখে রবি ফের ধমক দিয়ে বললো, দাঁড়িয়ে রইলে কেন? যাও! তোমার সাহেবকে গিয়ে বলো, আমরা এক ঘণ্টা বাদে ফিরবো—সাহেব যেন আমাদের জন্য অপেক্ষা করেন।

বন্ধুদের দিকে ফিরে নিম্নস্বরে রবি বললো, ডাকা মাত্র গেলে প্রেস্টিজ থাকে না। আমরা ওর হুকুমের চাকর বুঝি? চল, একটু দেরি করে যাবো, শহরের ঐ দিকটা বরং দেখে আসি।

ওরা উলটোদিকে ফিরে শহরের অন্যদিকে রওনা হলো। এদিকে বিশেষ কিছু নেই, তবু চোখে পড়লো একটা অসমাপ্ত স্কুল, ইঁটখোলা, শিবমন্দির, কয়েক ঘর মধ্যবিত্তর বাড়ি! কিছুদূর যেতে না যেতেই ফাঁকা মাঠ শুরু হলো। দু’একটা সরষে-ক্ষেতে একরাশ ফুল ধরেছে, হলুদ-রঙা ঢেউ উঠছে হাওয়ায়। মাঠের মাঝখানে একটা প্রকাণ্ড কালো রঙের পাথর, পাথরটার মাথার উপর ঠিক ছাতার মতন একটা পাকুড়গাছ। ওদের তো এদিকে সত্যি কোনো দরকার নেই, শুধু খানিকটা সময় কাটানো, তাই ঐ পাথরটার ওপর কিছুক্ষণ বসে আবার চলে যাবে এই ভেবে পাথরটার দিকে এগুলো।

সকাল ন’টাও বাজেনি, তবু এর মধ্যেই রোদ চড়া হয়ে এসেছে। এদিকে জঙ্গল নেই, বহুদূর পর্যন্ত ঢেউ খেলানো মাঠ। সেই মাঠ জুড়ে ঝকঝক করছে রোদ্দুর। এক ঝাঁক হরিয়াল উড়ে গেল মাথার ওপর দিয়ে, দূরে শোনা গেল ট্রেনের শব্দ।

এরকম জায়গায় এলেই হঠাৎ মনে হয় যে, পৃথিবীটা মোটেই গোল নয়, চৌকো। পৃথিবী কখনো ঘোরে না, স্থির হয়ে থাকে। সময়ের কোনো গতি নেই। রবি সিগারেটের টুকরোটা ছুঁড়ে দিয়ে বললো, মাত্র কাল সকালে এসেছি—অথচ এরই মধ্যে মনে হচ্ছে যেন অনেক কাল ধরে এখানে আছি।

মাঠের মাঝখানে এই জায়গাটা ঢিবির মত উঁচু হয়ে উঠেছে, বেশ পরিষ্কার। খুব ভালো পিকনিকের জায়গা হয়, না রে?—রবি বললো। —তা কলকাতার কাছাকাছি এই রকম জায়গা হলে পিকনিকের পক্ষে ভালো হতো, কিন্তু আমরা আছি জঙ্গলের মধ্যে, সুতরাং বনভোজন বলতে যা বোঝায়—

কথা বলতে বলতে ওরা থেমে গেল। পাথরটার পাশ থেকে ছোটছেলের খিলখিল হাসি ও মেয়েদের গলা শোনা যাচ্ছিল। ওরা ঢিবিটার ওপর উঠে এসে পাথরটার এপাশে তাকালো। দু’টি মহিলা, একটি তিন-চার বছরের বাচ্চা ছেলে ও একজন বুড়ো দরওয়ান।

মহিলা দু’টি চমকে ওদের দিকে তাকালো, ওরাও এক পলক চেয়ে দেখে ভাবছিল, চলে যাবে কিনা, এমন সময় শেখর পরম স্বস্তির সঙ্গে বলে উঠলো, ঠিকই মনে হয়েছিল কাল, চেনা-চেনা—তুমি জয়া নও? প্রেসিডেন্সি কলেজের—

দু’জনের মধ্যে যে-মেয়েটির স্বাস্থ্য ঈষৎ ভারী, প্রতিমার মতন মুখের গড়ন—তার মুখে ক্ষণিক আশঙ্কা ও প্রতীক্ষা ফুটে উঠেছিল, তারপরই খুশীতে ঝলসে উঠলো, বললো, আরেঃ, তাই তো, শেখরবাবু! আমিও প্রথমটায় ভেবেছিলুম—কাল সকালে আপনারাই এসেছেন, না? বম্বে মেলে—

—তুমি কি করে জানলে?

—বাঃ, কাল আমাদের গেটের পাশ দিয়ে আপনাদের যেতে দেখলুম, এখানে তো কেউ বড় একটা আসে না।

—তোমরা ঐ ত্রিপাঠীদের বাড়িতে থাকো বুঝি? কাল তো তোমরা ব্যাডমিন্টন খেলছিলে, আমাদের দেখলে কখন?

—মেয়েরা খেলার সময়েও সব দিকে চোখ রাখে। এখানে হঠাৎ এলেন যে?

—তোমরা এখানে কেন?

—বাঃ, এখানে তো আমার শ্বশুরবাড়ি।

—ও, তোমার বিয়ে হয়ে গেছে?

—কবে-দু’বছর আগে। এই যে আমার ছেলে, আর এ আমার বোন, অপর্ণা।

চেহারা দেখলে দু’বোন বলে চেনাই যায় না, অপর্ণা ছিপছিপে, একটু বেশি লম্বা, কমলা রঙের শাড়িটা এমন আঁট করে পরা যে একটু দূর থেকে দেখলে শালোয়ার-কামিজ বলে ভুল হয়। সে গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছিল, হাতে একটা বড় লাল-সাদা বল, এবার বলটা ফেলে দিয়ে হাত জোড় করে বললো, নমস্কার। আপনারা বেড়াতে এসেছেন বুঝি?

অপর্ণা হচ্ছে সেই ধরনের মেয়ে, যার দিকে তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিয়ে আবার তাকাতে হয়। প্রথমেই এক দৃষ্টিতে ওর চোখের দিকে চেয়ে থাকা যায় না। ওর বয়েস কুড়ি-একুশের বেশি হবে না, কিন্তু ওর মুখে চোখে একটা বিরল সপ্রতিভ সরলতা আছে। প্রথম পরিচয়ের কোনরকম লজ্জা বা আড়ষ্টতা নেই। সাবলীলভাবে ও নমস্কারের ভঙ্গিতে হাত তুললো, কথা বললো ঝর্নার জলের মতন স্বচ্ছ গলায়।

শেখর উত্তর দিলো, হ্যাঁ বেড়াতেই। আমার বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই—এর নাম রবি চৌধুরী, ভালো স্পোর্টস্‌ম্যান, যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে ক্রিকেট ক্যাপ্টেন ছিল। ওর নাম অসীম মল্লিক, ওদের নিজেদের চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেসি ফার্ম আছে, আর ও হচ্ছে সঞ্জয় ব্যানার্জি—জয়া, তুমি ওকে দেখেছো বোধহয়, প্রেসিডেন্সিতে আমাদের চেয়ে এক ইয়ার জুনিয়ার ছিল, এখন পাটকলে লেবার ওয়েলফেয়ার অফিসার হয়েছে—লেবাররা অবশ্য ওর কাছ থেকে ওয়েলফেয়ার চায় না।

জয়া বললো, রুণি, আর ইনি হচ্ছেন শেখর সরকার, আমরা একসঙ্গে প্রেসিডেন্সিতে হিস্ট্রি অনার্স পড়তুম। উঃ, কতদিন পর দেখা—সাত আট বছর, না? সেই পারমিতার বিয়ের সময়।

শেখর বললো, আমিও কাল তোমায় এক ঝলক দেখে চিনতে পেরেছিলুম, তারপর ত্রিপাঠীদের বাড়ি শুনে কি রকম গুলিয়ে গেল। আমার বন্ধুদের বললুম। ওরা তো বিশ্বাসই করতে চায় না, তোমার মতন কোনো সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় থাকতে পারে!

জয়া এ কথায় কিছু বললো না, শুধু মুখ টিপে হাসলো। তারপর জিজ্ঞেস করলো, আপনার নিশ্চয়ই এখনো বিয়ে হয়নি?

—না! কেন?

—আপনাকে দেখলেই বোঝা যায়।

শেখর একটু বিব্রত হয়ে বললো, ভ্যাট! কিন্তু তোমার এই ধ্যাধ্‌ধেড়ে গোবিন্দপুরে বিয়ে হলো কি করে?

—আমার মোটেই এখানে বিয়ে হয়নি। আমার বিয়ে হয়েছে বর্ধমানে, আমার শ্বশুরের এখানে একটা বাড়ি আছে—এখানকার জলে ওঁর খুব উপকার হয় বলে মাঝে মাঝে আসেন—আমিও সঙ্গে আসি।

অপর্ণা বললো, আপনারাই বা হঠাৎ এখানে বেড়াতে এলেন কেন?

অন্য কেউ কিছু উত্তর দেবার আগেই রবি বলল, ঐ যে—এখানকার জল খুব ভালো, সেই শুনেই এলাম।

সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। অপর্ণা ঠোঁট উলটে বললো, জল খেতে আবার কেউ আসে নাকি? আমি তো পাঁচদিনেই হাঁপিয়ে উঠেছি। এমন বিশ্রী জায়গা—মেজদি’রা যে কি করে থাকে—একটা কিছু দেখবার নেই—

শেখর বললো, কেন, জঙ্গলটা তো বেশ সুন্দর।

—আমার জঙ্গল ভালো লাগে না।

শেখর বললো, আমরা ইচ্ছে করেই এরকম একটা নাম-না-জানা জায়গায় এসেছি, জঙ্গলের মধ্যে নিরিবিলি কাটাবো বলে—কিন্তু তোমরাও যে কেন এই সময়ে এলে! এখন সন্দেহ হচ্ছে।

—কেন, আমরা এসে কি অসুবিধে করলুম?

—তোমাদের দেখার পর আমার বন্ধুরা কি আর জঙ্গলের নিরিবিলিতে থাকতে চাইবে?

জয়া হাসতে হাসতে বললো, তাহলে তো আমরা এসে খুব ভালোই করেছি।

—কেন?

—চার-চারটে এমন ভালো ভালো ছেলে জঙ্গলে এসে সন্ন্যাসী হতো—আমরা সেটা বন্ধ করতে পারবো।

হাসি শেষ করে শেখর বললো, তোমার ছেলেটি বেশ সুন্দর হয়েছে, জয়া। নাম কী ওর?

—দেবকুমার।—তোমার নাম বলো, কাকুদের কাছে তোমার নাম বলো ছোটন।

—জয়া, তোমার স্বামী এখানে আছেন? আলাপ করতে হবে।

—না

—উনি তোমাদের সঙ্গে আসেননি বুঝি?

জয়া এ কথার উত্তর তক্ষুনি না দিয়ে বোনের দিকে তাকালো। অপর্ণা দ্রুত ওদের চারজনের মুখের প্রতীক্ষা দেখে নিয়ে—হঠাৎ চোখ ফিরিয়ে মাটি থেকে বলটা তুলে নিলো। তারপর জয়ার ছেলের হাত ধরে বললো, চলো ছোটন, এবার বাড়ি যাই আমরা। এ কি, বলটা ফেলে দিলে? চলো, বাড়ি যাবো—দাদু একা বসে আছেন!

জয়া অপেক্ষারত বুড়ো দারোয়ানকে বললো, পরমেশ্বর, খোকাবাবুকে নিয়ে তুমি এগিয়ে চলো, বাড়ি যেতে হবে। ঐ বলটা কুড়িয়ে নাও—হ্যাঁ, হ্যাঁ, লক্ষ্মী ছোটন, আর হাঁটে না এখন, দরওয়ানজীর কোলে উঠে পড়ো, লক্ষ্মীসোনা, বিকেলবেলা আবার বেড়াতে বেরুবো, তখন তুমি আবার নিজে নিজে হাঁটবে। —রুণি, ওর জুতোটা পরিয়ে দে তো—

দরওয়ান ছেলেকে কোলে নিয়ে খানিকটা এগিয়ে গেলে জয়া মাটির দিকে চোখ নিচু করলো, গলার স্বরে খুব দুঃখ ফুটলো না, কিছুটা উদাসীন ভাবে বললো, আমার স্বামী বেঁচে নেই।

—সে কি?

—বিলেতে একটা ট্রেনিং নিতে গিয়েছিল, তারপর সেখানে নিজের ঘরে কেউ এসে ওকে খুন করে যায়…কাগজে বেরিয়েছিল…।

একটুক্ষণ ওরা সবাই চুপ করে রইলো। জয়ার ভরাট স্বাস্থ্য, সারা পিঠজোড়া কালো কোঁকড়ানো চুল, নানান রঙে রঙীন একটা ছাপার শাড়ি পরেছে—সেই জন্যই বোধহয় খবরটা বেশি আঘাত দিলো।

অসীম বললো, হ্যাঁ, বছর দু’এক আগে—কাগজে আমিও দেখেছিলাম মনে আছে, ইঞ্জিনিয়ার, কেন খুন হয়েছিল, কারণ জানা যায়নি। আপনারা কিছু জানতে পারেননি?

জয়া ও অপর্ণা একবার চোখাচোখি করলো, তারপর জয়া অনেকটা স্বাভাবিক শান্ত গলায় বললো, না। ওখানকার পুলিশ শেষ পর্যন্ত জানিয়েছে-খুন নয়, আত্মহত্যা।

শেখর আঁতকে উঠে বললো, আত্মহত্যা! মানুষ এখনো আত্মহত্যা করে নাকি? আত্মহত্যা কেন করেছিলেন?

জয়া ও অপর্ণা চকিতে আরেকবার চোখাচোখি করলো। এবার যেন একটা ছোট্ট বিষণ্ণ নিঃশ্বাস উড়ে গেল, সেই সঙ্গেই ভেসে এলো জয়ার উত্তর, না, সেরকম কোনো কারণ কেউ জানতে পারেনি।

যে জন্যই হোক, রবির কাছে যেন মনে হলো, খুনের চেয়ে আত্মহত্যাটা অপমানজনক। কেননা, সে বেশ রাগত সুরেই বলে উঠলো, আত্মহত্যা মোটেই নয়, ওরকম একজন লোক শুধু শুধু আত্মহত্যা করতেই বা যাবেন কেন! তাও বিলেতে বসে? ওখানকার পুলিশ কালপ্রিটকে ধরতে পারেনি, তাই আত্মহত্যা বলে চালিয়েছে। আজকাল ওখানকার পুলিশও হয়েছে আমাদেরই মতন, একেবারে যা-তা, এই তো সেদিন অতবড় একটা মেল ট্রেন ডাকাতি হয়ে গেল ইংলণ্ডে, পুলিশ তো একজনকেও—।

অপর্ণাকে দেখা গেল যথেষ্ট বুদ্ধিমতী, সে বিষয় পরিবর্তনের এই সুযোগ বিন্দুমাত্র উপেক্ষা না করে সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করলো, কোন্‌ ট্রেন ডাকাতি?—এবং সে রবির কাছ থেকে ট্রেন ডাকাতির পুরো গল্পটা শুনতে চেয়ে ওদের মাঝখানে সরে এলো।

টিলা থেকে জয়াদের বাড়ি প্রায় পনেরো মিনিটের পথ, সেই পথটুকু আসতে আসতে গল্প ঘুরে গেল অন্যদিকে; যখন গেট পর্যন্ত পৌঁছলো তখন জয়ার মুখেও আবার ক্ষীণ হাসি ফুটেছে, অপর্ণা সহজে হাসতে চায় না—ঠোঁট অল্প ফাঁক করে বুঝিয়ে দেয় যে, আরেকটু ভালোভাবে বলতে পারলে ঠিক হাসতুম! রবি তবু তাকে হাসাবার চেষ্টা করে যাচ্ছিল এবং না হাসলেও অপর্ণার হাঁটার ছন্দে লঘুতা এসেছিল। পরমেশ্বর আগেই পৌঁছে দেবকুমারের হাত ধরে গেট খুলে দাঁড়িয়ে আছে। জয়া বললো, আসুন, ভিতরে এসে বসবেন একটু। আমার শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে আলাপ করে যান। ওঁর সঙ্গে কথা বলতে আপনাদের ভালোই লাগবে। অনেক বিষয়ে পড়াশুনো করেছেন।

রবি ভেতরে যাবার জন্য পা বাড়িয়েছিল, শেখর বললো, না, এখন থাক। পরে আসবো রবি, রেঞ্জারের সঙ্গে একবার তো দেখা করতেই হবে।

রেঞ্জারের কথা রবি ইতিমধ্যেই ভুলে গিয়েছিল, এখন মনে পড়তেই বললো, হ্যাঁ, ও ব্যাপারটা চুকিয়ে ফেলা দরকার।

অপর্ণা বললো, তা হলে কাল সকালে আপনারা আসুন-না, আজ বিকেলে হবে না। বিকেলে আমাদের একটু ঘাটশীলায় যাবার কথা আছে। কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে চলে আসুন, এখানেই আমাদের সঙ্গে চা খাবেন।

ওরা প্রায় সমস্বরে বলে উঠলো, হ্যাঁ, হ্যাঁ, চমৎকার! আপনাদের বাড়িতে ডিম আছে তো?

—তা আছে, কিন্তু হঠাৎ শুধু ডিম কেন?

সঞ্জয় বললো, সকালে চায়ের সঙ্গে ডিমসেদ্ধ না পেয়ে আমাদের খুব অসুবিধে হচ্ছে। এখানে একদম ডিম পাওয়া যাচ্ছে না।

জয়া হাসতে হাসতে বললো, যাচ্ছে না বুঝি? ঐ জঙ্গলের মধ্যে ডাকবাংলোয় কেউ এক রাত্তিরের বেশি থাকে? খাবারদাবার এখানে তো কিছুই পাওয়া যায় না প্রায়। আমাদের বাড়িতে এসে থাকুন না—এখানে অনেক ঘর আছে।

শেখর বললো, না, না, আমরা জঙ্গলেই থাকবো ভেবে এখানে এসেছি। যদি অবশ্য খুব বিপদে পড়ি, তা হলে এখানে চলে আসতে পারি।

—বিপদে পড়ার সম্ভাবনা আছে বুঝি?

—বলা যায় না। ডাকবাংলোয় রিজার্ভেশান নিয়ে একটু ঝামেলা করছে। দেখা যাক কি হয়। আচ্ছা, কাল সকালে আসবো।

—ঘুম থেকে উঠেই চলে আসবেন। আমাদের কিন্তু খুব সকাল সকাল চা-খাওয়ার অভ্যেস!

ডাকবাংলোর সামনে জীপ দাঁড় করানো। বারান্দায় ইজিচেয়ারে রেঞ্জার বসে বসে পা দোলাচ্ছে, খাকি প্যান্ট ও সাদা সার্ট পরা শক্ত সমর্থ পুরুষ, হাতে পাইপ। লোকটির মুখখানা কঠিন ধরনের, কিন্তু ঠোঁট ফাঁক করা, লোকটি একা একাই বসে আপন মনে হাসছে অথবা গান করছে।

রবি সিগারেট অর্ধেক অবস্থাতেই ফেলে দিলে, পকেট থেকে চুরুট বার করে ধরালো। ওর ধারণা চুরুট মুখে থাকলে ওকে খুব ভারিক্কী দেখায়। গলার আওয়াজও তখন ইচ্ছে করে গম্ভীর করে ফেলে। একাই আগে এগিয়ে গিয়ে বললো, নমস্কার! লোকটি তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো, তারপর হাত জোড় করে দু’বার বললো, নমস্কার, নমস্কার। আপনারাই বুঝি এখানে বেড়াতে এসেছেন? কী সৌভাগ্য আমাদের, এসব জংলা জায়গায় তো কেউ আসে না—লোকে যায় ঘাটশীলা, তবু আপনারা এলেন—বসুন, বসুন।

রবি প্রশ্নবোধক ঝোঁক দিয়ে বললো, আপনি?

লোকটি বললো, আমি এ অঞ্চলের ফরেস্ট রেঞ্জার, আমার নাম সুখেন্দু পুরকায়স্থ, বেহারেই ছেলেবেলা থেকে…এ অঞ্চলে ট্যুরে এসেছিলাম, হঠাৎ ফরেস্টার বললে, কে চারজন আন-অথরাইজড্‌ লোক বাংলোয় এসেছে। তা আমি বললুম, আরে মশাই, যান না, গিয়ে দেখুন তারা কে, বাঘ-ভাল্লুক তো নয়। তা জঙ্গলের চাকরিতে বাঘ-ভাল্লুককেও ভয় করলে চলে না—তা ওরা নিশ্চয়ই ভদ্দরলোক…ফরেস্টার এমন ভীতু, নিজে আসতে চায় না।

রবি বললো, আন-অথরাইজড হবার কি আছে? খালি বাংলো দেখে এসেছি, যা চার্জ লাগে দেবো। এর মধ্যে আবার গণ্ডগোলের কি আছে?

লোকটি অত্যন্ত বিনীত ভাবে হেসে বললো, তা তো বটেই, তা তো বটেই, ঠিক কথা বলেছেন। ফরেস্ট বাংলো খালি থাকলেও সব সময় সব লোককে দেবার নিয়ম নেই অবশ্য, তাছাড়া, এই ইয়ে, মানে, রেলওয়ে রিসিটকে রিজার্ভেশান শ্লিপ বলে চালানোরও কোনো সিস্টেম নেই এদিকে, তবে, মানে, আপনারা এসেছেন—

রবি এই প্রথম হাসলো। দেখে মনে হয়, অতিকষ্টে হাসতে রাজী হলো। চুরুট আবার জ্বালতে জ্বালতে বললো, ওসব চৌকিদারের জন্য, সে তো খুলতেই চাইছিল না, তাইই আর কি—আপনাদের সঙ্গে দেখা হলেই বুঝিয়ে বলতুম। ফরেস্টারই বা আমাদের সঙ্গে দেখা করেনি কেন?

—দরজার চাবি খোলার দায়িত্ব চৌকিদারের। এই সামান্য অপরাধেই তার চাকরি যেতে পারে। দেখবেন, ওর চাকরিটা যেন না যায়, গরীব লোক, তা ছাড়া শুনলুম বৌয়ের অসুখ। আমি অবশ্য চাকরি দেবার বা খাবার লোক নই।

—আপনি এবার কাজের কথাটা বলুন তো? আপনার বক্তব্যটা কি? বুঝতেই পারছেন, আমরা এসেছি যখন—তখন চলে তো আর যাবো না! রিজার্ভেশান থাক আর নাই থাক—আমরা এখানে থাকবোই। তার জন্য কি করতে হবে আমাদের? আপনি কিছু আলাদা টাকা চাইবার জন্য এত ভূমিকা করছেন? কত টাকা বলুন, বিবেচনা করে দেখবো।

লোকটি হঠাৎ স্থির ভাবে রবির চোখের দিকে চেয়ে রইলেন, তারপর অদ্ভুত ভাবে এক রকমের হাসলেন। গলার স্বর বদলে অসহায় ভাবে বললেন, আমাদের এ লাইনে উপরি রোজগার যে একেবারে নেই, সে কথা বলতে পারি না, আছে বটে, কন্ট্রাক্টররা যখন চুক্তির বেশি গাছ কাটে, তখন পাই। কিন্তু টুরিস্টদের কাছ থেকে ঘুষ নেবার অভ্যেস আমাদের নেই। এর আগে কেউ দিতেও চায়নি। আপনারা ক’দিন থাকবেন?

—কোনো ঠিক নেই। সাতদিন, দশদিন, কিছুই ঠিক করিনি।

—এই জঙ্গলে সাতদিন-দশদিন থাকবেন?

—কোনো ঠিক নেই। যে-ক’দিন আমাদের ভালো লাগবে সেই ক’দিন থাকবো!

—তা হলে তো কিছুই বলার নেই। আপনাদের তো আমি চলে যেতে বলতে পারি না। আর আমি বললেই বা আপনারা যাবেন কেন! তবে ডিভিশনাল কনজারভেটরের এদিকে আসবার কথা আছে, তিনি সঙ্গে বৌ নিয়ে চলাফেরা করেন সব সময়, তাঁর আবার শ্বশুরবাড়ি এদিকেই—।

রবি রুক্ষ গলায় বললো, ঠিক আছে, কনজারভেটর এলে তাঁর সঙ্গেই কথা বলবো, আপনার সঙ্গে বেশি কথা বলে লাভ নেই।

শেখর এবার এগিয়ে এসে বললো, বাংলো খালি আছে বলেই আমরা আছি। কনজারভেটর বা অন্য কেউ এলে আমরা তখুনি ছেড়ে চলে যাবো। আমাদের থাকবার জায়গার অভাব নেই।

নতুন লোকের সঙ্গে কথা শুরু করার জন্যই বোধহয় রেঞ্জার আবার আগেকার বিনীত ভাব ফিরিয়ে আনলেন, না, না, আপনাদের চলে যেতে হবে তা তো বলিনি। কনজারভেটর আসতেও পারেন, না আসতেও পারেন। আসবার কথা আছে, কিন্তু কথা থাকলেও ওঁরা সব সময় আসেন না। ওঁরা হলেন বড় অফিসার, সব সময় কথার ঠিক রাখা তো ওঁদের মানায় না। তবে যদি আসেন, তবে ডি. এফ. ও. সাহেবও আসবেন বোধহয়, সাধারণতঃ তাই আসেন। রাত্তিরে থাকলে—দু’খানা ঘরই ওঁদের লাগে।

—ঠিক আছে, তিনি যে মুহূর্তে আসবেন, সেই মুহূর্তেই আমরা ঘর ছেড়ে দেবো।

রবি শেখরকে সরিয়ে দিয়ে বললো, কেন, ছাড়বো কেন? এটা কি কনজারভেটরের শ্বশুরবাড়ি নাকি? উনি যখন খুশী আসবেন, তখনি ওনাকে ঘর ছেড়ে দিতে হবে?

শেখর রবির দিকে একটা হাত তুলে বললো, আঃ রবি, মাথা গরম করিসনি। ওদের যদি সে রকম কোনো আইন থাকে, আমরা বাংলো ছেড়ে দিয়ে জয়াদের বাড়ি চলে যাবো!

রবি বললো, না, আমি জয়াদের বাড়ি যাবো না। আমি এখানেই থাকবো। এই লোকটা কি হিসেবে বলছে আমাদের ঘর ছাড়তে হবে?

রেঞ্জার তাড়াতাড়ি বলে উঠলো, তাই কি আমি বলেছি! ঘর আপনাদের ছাড়তেই হবে—এমন কোনো কথা নেই। আমি বলেছি যদি কনজারভেটর সাহেব আসেন এবং যদি থাকতে চান। তা ছাড়া, সেদিন সাহেবের মেজাজ কী-রকম থাকে, তার ওপরও নির্ভর করছে। মেজাজ ভালো থাকলে তিনি আমায় ডাকেন সুখেন্দু বলে, আর গরম থাকলেই বলবেন পুরকাইট। তেমনি, মেজাজ ভালো থাকলে তিনি হয়তো আপনাদেরই অনেক খাতির করবেন, আপনাদেরই এখানে থাকতে দিয়ে গাড়ি হাঁকিয়ে চলে যাবেন অন্য বাংলোয়। আবার খারাপ থাকলে প্রথমেই চৌকিদারের চাকরি যাবে, তারপর, বুঝলেন না, অত বড় বড় সাহেবদের তো মেজাজ এক রকম থাকলে মানায় না!

শেখর হাসতে হাসতে বললো, ভারি তো একজন সরকারি অফিসার, তার মেজাজে আমাদের কি আসে-যায়? তার মেজাজ ভালো-খারাপ থাকার ওপরই আমাদের ভাগ্য নির্ভর করছে নাকি?

রেঞ্জারও স্মিত হেসে বললো, না স্যার, আপনাদের ভাগ্য কেন নির্ভর করবে! অন্যদের ভাগ্য…! বড় অফিসারদের তো মেজাজ না থাকলে মানায় না!

রবি বললো, কী মুশকিল, এত কথার দরকার কি? ডাকবাংলোয় থাকা কি একটা বিরাট ব্যাপার নাকি? আফটার অল, পাবলিক প্রপার্টি, খালি রয়েছে তাই আছি। তার আবার এত ঝামেলা!

লোকটি হঠাৎ বলে উঠলেন, আচ্ছা, আমি চলি। নমস্কার।

বারান্দা থেকে লাফিয়ে নিচে নেমে আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, উইস ইউ ভেরী গুড টাইম। ভাববেন না, আমি আপনাদের চলে যাবার কথা বলতে এসেছিলাম। আপনারা থাকলে আমার কোনো স্বার্থও নেই, ক্ষতিও নেই। আমি শুধু বলতে এসেছিলাম, দেখবেন, চৌকিদারটার চাকরি না যায়। কনজারভেটর এলে সেই দিকটা একটু দেখবেন।

—শুধু শুধু ওর চাকরি যাবে কেন?

সুখেন্দু পুরকায়স্থ এবার মলিন ভাবে হাসলেন। বিষণ্ণভাবে বললেন, এক ডাকে সাড়া দিতে পারেনি বলে আমি অন্তত চারজন চৌকিদারের চাকরি যেতে দেখেছি। এ লোকটার তো আবার বউয়ের অসুখ!

তিনি আস্তে আস্তে হেঁটে গিয়ে জিপে উঠলেন। আবার একবার হেসে গাড়ি ঘোরালেন। চলে যাবার পর শেখর বললো, লোকটা ভালো কি খারাপ ঠিক বোঝাই গেল না। আজকাল বেশির ভাগ লোককেই বোঝা যায় না।

রবি বললো, লোকটা দু’চারটে টাকা বাগাবার তালে ছিল নিশ্চয়ই। শেষ পর্যন্ত সাহস পেলো না।

—আমার তা মনে হয় না।

—যাকগে, এ পর্যন্ত তো চুকলো। এরপর কনজারভেটর এলে দেখা যাবে। রতিলাল, এ রতিলাল, চা বানাও—!

পরক্ষণেই রবি প্রসঙ্গ বদলে বলে, তোর ঐ জয়া মেয়েটা কিন্তু বেশ! খুব স্যাড—এর মধ্যেই স্বামী মারা গেছে—তোর সঙ্গে ওর কিছু ছিল-টিল নাকি?

শেখর অন্যমনস্কভাবে বলে, না, সেরকম কিছু না। দেখলি না, ওর বিয়ে হয়ে গেছে—সে খবরই আমি জানতাম না।

Facebook Comment

You May Also Like