রঙিন পাখির পালক (অরণ্যের দিনরাত্রি-৪) – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

অরণ্যের দিনরাত্রি - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

একটা বিচিত্র রঙীন পাখির পালক উড়তে উড়তে এসে পড়লো অতসী ফুলগাছগুলোর ওপরে। সঞ্জয় এগিয়ে গিয়ে পালকটা কুড়িয়ে নিলো। কোন্ পাখির পালক সেটা দেখার জন্য চাইলো এদিক-ওদিক। পাখিটাকে দেখা গেল না। অন্যমনস্কভাবে সঞ্জয় এগিয়ে গেল জঙ্গলের দিকে।

ডাকবাংলোর সীমানার ঠিক প্রান্তে জঙ্গলের মধ্যেই একটা সিমেন্টের বেঞ্চ বাঁধানো রয়েছে, সঞ্জয় একা গিয়ে বসলো সেটার ওপর। রঙীন পালকটা নিজের মুখে বুলোতে লাগলো। পালকটা যেন ফুল, নাকের কাছে সেটা এনে সঞ্জয় গন্ধ শোঁকার চেষ্টা করলো। কোনো পাখির গন্ধও সেটাতে লেগে নেই।

সিমেন্টের বেঞ্চটার এক পাশে কয়েকটা বনতুলসীর আগাছা হয়ে আছে। দুটো ফড়িং একসঙ্গে একটা ফুলের ওপর বসার চেষ্টা করছে। ঐটুকু ছোট একটা ফুলের ওপর দু’জনের বসার জায়গা নেই, ওরা দু’জনে মারামারি করতে করতে উড়ে যাচ্ছে—আবার এসে বসছে সেই একই ফুলে। আরও তো ফুল রয়েছে, তবু ঐ একটা ফুলের ওপরই বসার জন্য দু’জনের লোভ। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সঞ্জয় আরও অন্যমনস্ক হয়ে গেল।

অপর্ণাকে দেখে সে চমকে উঠেছিল। মিঃ বিশ্বাসের মেয়ে অনুরাধার সঙ্গে কি আশ্চর্য মিল! সেইরকম টিকোলো নাক, সেইরকম ভুরুর ভঙ্গি, বেশি উজ্জ্বল চোখ। অথচ অপর্ণা জয়ার বোন—সুতরাং মিঃ বিশ্বাসের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক থাকার কথাই নয়। তবু অপর্ণাকে দেখলেই অনুরাধার কথা মনে পড়ে। কিন্তু অনুরাধার চেয়েও তার বাবা মিঃ রথীন বিশ্বাসের কথা মনে পড়ছিল সঞ্জয়ের। অথচ ওসব কথা আর মনে করবে না বলেই তো সঞ্জয় বেড়াতে এসেছে বন্ধুদের সঙ্গে।

শ্যামনগরের জুট মিলের জেনারেল ম্যানেজার মিঃ বিশ্বাস। শুধু ম্যানেজার নয়, তাঁর শ্বশুরের কোম্পানি—সুতরাং অর্ধেক মালিকও বলা যায়। লম্বা শরীর, বাহান্ন বছর বয়সেও অটুট স্বাস্থ্য, এখনো টেনিস খেলতে হাঁপান না। সঞ্জয় সামান্য লেবার ওয়েলফেয়ার অফিসার—তার সঙ্গে মিঃ বিশ্বাসের খুব বেশি অন্তরঙ্গতা থাকার কথা নয়, কিন্তু সঞ্জয়ের কাকার সঙ্গে তিনি বিলেতে এক ফ্ল্যাটে ছিলেন ছাত্রজীবনে—সেই সূত্রে তিনি সঞ্জয়কে বাড়িতে ঘন ঘন ডেকে পাঠান। সঞ্জয়ের দিকে হুইস্কির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলেন, সঞ্জয়, আজ সন্ধ্যেটা কি করা যায় বলো তো! এ উইকটা বড্ড খাটুনি গেছে—চলো, গাড়ি নিয়ে কলকাতায় ঘুরে আসা যাক।…গ্রেট ইস্টার্নে সাপার খেলে কেমন হয়? টেলিফোন করে দ্যাখো না—একটা টেবল পাওয়া যাবে কিনা! বাড়িতে বসে কোয়ায়েট ইভিনিং কাটাবো, বুঝলে, ওটা আমার ধাতে সয় না!…বিলেতে থাকার সময় তোমার কাকার সঙ্গে এক একদিন সন্ধ্যেবেলা…আমার গিন্নী আবার আশেপাশে আছেন কিনা দেখো—উনি এসব শুনলে আবার…আঃ, সে-সব গুড ওল্ড ডেইজ…

অনেক বড় বড় অফিসার বাড়ি ফিরেই পোষা কুকুরকে আদর করেন, কুকুর নিয়েই সারা সন্ধ্যেটা কাটিয়ে দিতে পারেন। তেমনি সঞ্জয় বুঝতে পারে, মিঃ বিশ্বাস বাড়ি ফিরে আরাম করে গা ছড়িয়ে বসার পর একজন শ্রোতা চান। সে শ্রোতা নিজের স্ত্রী বা ছেলেমেয়ে হলে চলবে না, চাকর-বাকর বা আত্মীয়স্বজন হলেও হবে না। একজন যুবক, শক্ত সমর্থ পুরুষ—তার কাছে মিঃ বিশ্বাস নিজের যৌবনের গল্প বলবেন। বোঝাতে চাইবেন, তাঁর নিজের যৌবনে তিনি এখনকার যে-কোনো যুবকের চেয়েও দুর্ধর্ষ ছিলেন, শোনাবেন নিজের নানান দুঃসাহসিক কীর্তি ও কৃতিত্ব। সেই যুবকের প্রতি তিনি প্রচ্ছন্ন স্নেহের সুরে নানান হুকুম করবেন—তার সামনে দুরন্তবেগে গাড়ি চালিয়ে কিংবা দু’তিন ধাপ সিঁড়ি লাফিয়ে উঠে তিনি প্রমাণ করতে চাইবেন—এখনো তিনি যে-কোনো যুবকের চেয়ে বেশি যুবক। সঞ্জয় এ ব্যাপারটা টের পেয়েছিল, বুঝেছিল এই জন্যই প্রতি সন্ধ্যেবেলা জেনারেল ম্যানেজার মিঃ বিশ্বাস তাকে ডেকে পাঠান। বুঝতে পেরেও সঞ্জয় বিশেষ কিছু আপত্তি করেনি। কারণ, মিঃ বিশ্বাস কথাবার্তা বেশ ভালোই বলতে পারেন। অনবরত নিজের সম্পর্কে গল্প করলেও রসিকতাবোধ আছে খানিকটা। জেনারেল ম্যানেজারের ডাক অগ্রাহ্য করা যায় না।

তা ছাড়া অনুরাধার সঙ্গে দেখা হবার আকর্ষণও ছিল। অনুরাধার দিকে সঞ্জয় কোনো লোভের চোখে তাকায়নি। অনুরাধা বড় বেশি জ্বলন্ত—এইসব মেয়েকে হাত দিয়ে ছুঁতে ভয় করে। সব সময় চোখ দুটো চঞ্চল অনুরাধার—কথায় কথায় ঝরঝর করে ইংরেজি বলে—আবার অর্গান বাজিয়ে গায় রবীন্দ্রসঙ্গীত, বাবার সঙ্গে সমানভাবে টেনিস খেলে এসেই আবার জানালা দিয়ে আলু-কাবুলিওয়ালাকে ডাকাডাকি করে—বাড়ির কারুর বারণ না শুনে দারুণ ঝাল-মেশানো আলু-কাবলি খেতে খেতে জিভ দিয়ে উস্ উস্ শব্দ করে। সঞ্জয় অনুরাধার প্রতি মনে মনে লোভ রাখতেও সাহস পায়নি। শুধু এক দারুণ বাসনা ছিল অনুরাধাকে দেখার, মাঝে মাঝে তার সঙ্গে একটা দুটো কথা বলার। মিঃ বিশ্বাসের কথা শুনতে শুনতে অনুরাধাকে এক ঝলক দেখতে পেলেই তার মন খুশী হয়ে যেতো।

মিঃ বিশ্বাস একদিন বললেন, সঞ্জয়, আজ দুপুরে দেখলাম ঐ রতন বলে ছেলেটা তোমার সঙ্গে খুব হাত পা নেড়ে গল্প করছে! ওসব ছেলেকে বেশি নাই দিও না—

সঞ্জয় বলেছিল, কেন, ও ছেলেটা তো বেশ ছেলে। ভালো কাজ জানে—

—না, না, কিস্যু কাজ করে না—শুধু দল পাকায়। ওসব দল-পাকানো ডার্টিনেস আমি দু’চক্ষে দেখতে পারি না। যদি কিছু গ্রিভান্স থাকে—সোজা এসে আমাকে বলবে—তা ছাড়া তুমি ওদের ইন্টারেস্ট দেখছো—

রতন ছেলেটিকে দেখে সঞ্জয় অবাক হয়েছিল। খুব সবল চেহারা, ফরসা গায়ের রং, কিন্তু সব সময় একটা ময়লা খাকী প্যান্ট আর হলদে গেঞ্জি পরে থাকে। বয়লারের দারুণ গরমে কাজ করতে করতে ওর মুখের রং খানিকটা জ্বলে গেছে। মুখখানা দেখে খুব চেনা-চেনা মনে হয়েছিল সঞ্জয়ের, দু’একটা প্রশ্ন করতেই পরিচয় বেরিয়ে পড়েছিল।

মাথার ঝাঁকড়া চুল নাড়িয়ে রতন বলেছিল, আপনি ঠিকই ধরেছেন স্যার, আমার নাম রতন আচায্যি, আপনাদের গাঁ মামুদপুরের পুরুত ঠাকুর যোগেন আচায্যিরই ছেলে আমি। কি করবো স্যার, পাকিস্তান হবার পর রিফুউজি হয়ে চলে এলাম—লেখাপড়া আর কিছু হলো না—বাবাও মন্তর-ফন্তরগুলো শেখাবার আগে মরে গেলেন। ঘণ্টা নেড়ে তবু ভণ্ডামির কারবার চালানো যেতো—তার থেকে এই বেশ আছি। গায়ে খেটে রোজগার করছি। ওসব সংস্কৃত-ফংস্কৃত বলতে গেলে আমার দাঁত ভেঙে যেতো!

পুরুত বংশের ছেলে, ওর বাপ-ঠাকুরদা চিরকাল ঠাকুর পুজো করে কাটিয়েছে—কিন্তু সে আজ মজুরের কাজ করছে—এবং সেজন্য কোনো গ্লানি নেই—এই ব্যাপারটা সঞ্জয়ের বেশ ভালো লেগেছিল। মাঝে মাঝে সে রতনের সঙ্গে তার দেশের গল্প, বাড়ির গল্প করতো।

জুট মিলে একদিন একটা ছোটোখাটো দাঙ্গা হয়ে গেল দু’দল শ্রমিকের মধ্যে। সেদিন সন্ধ্যের পর মিঃ বিশ্বাস একটু বেশি নেশা করে ফেললেন। তীব্র কণ্ঠে তিনি বললেন, সঞ্জয়, আজকের কালপ্রিটদের একটা লিস্ট তৈরি করে ফেলো—ওসব গুণ্ডা—বদমাশদের আমি আমার মিলে রাখবো না।

সঞ্জয় বললো, হ্যাঁ, পুলিশ ইনভেস্টিগেট করছে—

—ওসব পুলিশ-ফুলিস না। আমাদের নিজেদের মিলের শ্রমিকদের আমরা চিনবো না? আমি সব রিপোর্ট পেয়েছি—ঐ যেগুলো দল পাকায়, ইউনিয়ান করে—সব ক’টাকে চিনি!

সঞ্জয় একটু অবাক হয়ে বললো, কিন্তু আজকের দাঙ্গাটার মধ্যে তো খানিকটা বাঙালী-বিহারী ফিলিং ছিল—ইউনিয়নের লোকরা বরং থামাতে গিয়েছিল।

—মোটেই না, ওসব ওদের চালাকি! ঐ তোমার সেই রতন, তার এক চেলা আছে। কি যেন নাম, দাঁড়াও—আমার কাছে কাগজে লেখা আছে—এত চেষ্টা করছি এদের উন্নতি করার—আমি চাই শ্রমিকদের স্ট্যাণ্ডার্ড অব লিভিং উন্নত হবে, ওরা মানুষের মতন বাঁচবে, বেশি খাটবে—বেশি রোজগার করবে—তা নয়, কতগুলো সুইণ্ডলার পলিটিসিয়ানের প্যাঁচে ভুলে ইউনিয়ান আর দল পাকানো—এতে দেশের কোনোদিন উন্নতি হবে বলতে চাও! শ্রমিকরা যতদিন বস্তিতে থাকবে—ততদিন দেশের উন্নতি নেই। ওদেরও ভালোভাবে বাঁচতে দিতে হবে—তার জন্য দরকার হলো কাজ, আরও কাজ—বুঝলে, কাজ না করে শুধু ইউনিয়ন আর ভোট—

আবেগে মিঃ বিশ্বাসের গলা কাঁপতে থাকে। সঞ্জয় সিগারেটে টান দিতে ভুলে যায়। অনুরাধা এই সময় ঘরে ঢুকলো। একটা অদ্ভুত ব্লাউজ পরেছে অনুরাধা—কনুই পর্যন্ত হাতা—সেখানে ফ্রিল দিয়ে ফুলের মতন তৈরি করা, গলার কাছটাও ফুল-ফুল ধরনের, গত শতাব্দীর মেমসাহেবদের মতন মনে হয়—এবং সেই ব্লাউজে অপূর্ব দেখাচ্ছে অনুরাধাকে। সারাদিনের দুর্ভাবনা ও উত্তেজনা ভুলে গিয়ে সঞ্জয় তার দিকে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকে। অনুরাধা মুক্তোর মতন দাঁত দেখিয়ে হাসলো, বললো, তোমরা দু’জনে এত সীরিয়াস ফেস্ করে বসে আছ কেন? সঞ্জয়দা, ক্যারম খেলবে?

সঞ্জয় কিছু উত্তর দেবার আগেই মিঃ বিশ্বাস বললেন, দাঁড়াও মা-মণি, আমাদের কাজগুলো আগে সেরে ফেলি। এসো সঞ্জয়, আগে রিপোর্টটা তৈরি করে ফেলা যাক। বদমাশগুলোর সব ক’টাকে কাল ছাঁটাই করে দেবো।

অনুরাধা বললো, সঞ্জয়দা, আজ রাত্রে এখানে খেয়ে যান-না। আমি আজ একটা পুডিং-এর এক্সপেরিমেন্ট করেছি!

সঞ্জয় সঙ্গে সঙ্গে রাজী হয়ে যায়। অনুরাধা তার সঙ্গে নেহাত ভদ্রতাই করছে, তবু অনেকক্ষণ অনুরাধার সাহচর্য পাবার লোভে সঞ্জয় আর দ্বিরুক্তি করে না। মিঃ বিশ্বাস উঠে গিয়ে কোটের পকেট থেকে একটা কাগজ এনে বললেন, এই নাও, এতে বদমাশগুলোর নাম আছে। এদের অপরাধের ডেফিনিট প্রুফ আছে আমাদের কাছে, তুমি এক্ষুনি নোটিশ তৈরি করে ফেলো। আমি চাইছি এদের উন্নতি করতে, আর এরা নিজেরা নিজেদের পায়ে কুড়ল বসাবে। এই এরিয়ার আর কোন মিল-ফ্যাক্টরিতে আমাদের মতন মজুরদের বাথরুমে ফ্রি সাবান সাপ্লাই করা হয়, খোঁজ নিয়ে দেখো তো!

একটু বেশি রাত্রে সঞ্জয় যখন নিজের কোয়ার্টারে ফিরছিল, তখন দেখতে পেলো রাস্তার মোড়ে একদল লোক জটলা করছে। একটু গা ছমছম করে উঠেছিল তার। দাঙ্গার উত্তেজনা রয়েছে, তাকে মজুররা হয়তো মালিক পক্ষের লোক বলে ভাবে, হঠাৎ আক্রমণ করে বসা বিচিত্র নয়। মিঃ বিশ্বাস তাঁর গাড়ি করে পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, সঞ্জয় আপত্তি করেছিল। পাঁচ-সাত মিনিটের পথ—এজন্য গাড়ি নেবার কোনো মানে হয় না।

দঙ্গল থেকে দু’জন লোক এগিয়ে এলো সঞ্জয়ের দিকে। সঞ্জয় চিনতে পারলো রতনকে। উত্তেজিত উগ্র মুখ। বললো, স্যার, আমাদের শ্রমিক আন্দোলনকে যেভাবে বানচাল করে দেওয়া হচ্ছে—

সঞ্জয় রুক্ষভাবে বললো, এত রাত্রে সে-কথা আমাকে বলতে এসেছে কেন?

—এত রাত্রেই আসতে হলো, আপনাকে একটা ব্যাপারে সাক্ষী থাকতে হবে।

—সাক্ষী? আমি?

—হ্যাঁ, স্যার। এই, ভিখুরামকে এদিকে নিয়ে আয় তো!

সেই দঙ্গলের চারজন লোক একজন লোককে টানতে টানতে নিয়ে এলো। সে লোকটার প্রচণ্ড নেশা, পা টলছে, চোখ দুটো লাল—একজন তাকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে বললো, বল, স্যারের কাছে বল কত টাকা পেয়েছিস!

সঞ্জয় বিস্মিতভাবে জিজ্ঞেস করলো, এসব কি ব্যাপার?

রতন বললো, আজকের দাঙ্গাটা কেন হলো, সেটা নিজের কানে আপনি শুনে রাখুন!

—আমার কাছে কেন? পুলিশের কাছে যাও!

—বাঃ, আপনি আমাদের অফিসার—আপনি জানবেন না?

সঞ্জয় মনে মনে একটু হাসলো। কারুর উপকার কিংবা ক্ষতি করার কোনো ক্ষমতাই তার নেই। সে শুধু চাকরি করছে। শ্রমিকরা তাকে মাইনে দেয় না, মাইন দেয় মালিক। মালিকের কথা মতন কাজ না করলে—তাকেই চাকরি থেকে ছাড়িয়ে দেওয়া হবে। তার জায়গায় অন্য লোক এসে—সেই কাজ করবে।

রতন হঠাৎ সেই মাতালটার গালে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে বললো, বল না, শালা, বড় সাহেবের কাছ থেকে তুই কত টাকা পেয়েছিস।

সঞ্জয় রেগে উঠে ধমকে বললো রতনকে, রতন, তুমি ভদ্রবংশের ছেলে, মিলে কাজ করতে এসেছো—সৎভাবে কাজ করবে সেটাই আশা করেছিলাম। তার বদলে এরকম গুণ্ডামি-বদমাইশী।

রতন রাগলো না, হেসে বললো, শুনুন স্যার, গুণ্ডামি-বদমাইশী কে করে! এই ভিখুরাম মদ খেয়ে সব স্বীকার করেছে—বড় সাহেবের পেয়ারের লোক ঘণু সরকার ভিখুকে আড়াইশো টাকা দিয়েছে মারামারি বাঁধাবার জন্য। শুধু ভিখু একা নয়, বাঙালিদের মধ্যেও দু’তিনজন পেয়েছে—দু’দলকে না উসকালে মারামারি হবে কেন? মারামারি কেন বাঁধিয়েছে জানেন—যাতে আমাদের ইউনিয়নটা ভেঙে যায়—আমরা যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাবি জানাবো—সেটা যাতে না হয়—সেই জন্যই দলাদলি মারামারি লাগিয়ে—আপনি তো জানেনই স্যার, পর পর দু’বছর পাটের ওভার-প্রোডাকসন হয়েছে রেট নেমে যাচ্ছে—সেইজন্য কোম্পানি চায় কাজ কমাতে, লোক ছাঁটাই করতে—কিন্তু আমাদের শ্রমিক-মজদুর ঐক্য কিছুতেই নষ্ট করা যাবে না—আমরা জান দিয়ে ইউনিয়নটাকে বাঁচাবো। মজদুরের আবার বাঙালি-বিহারী কি! মজদুরের কোনো জাত নেই—

সঞ্জয় বেশ হকচকিয়ে রতনের বক্তৃতা শোনে। পুরুতের ছেলে রতন সংস্কৃত উচ্চারণ করতে ভয় পেলেও বাংলা-ইংরিজি মিশিয়ে বেশ জোরালো ভাবে এসব বলতে শিখেছে। হঠাৎ সঞ্জয়ের মনে পড়লো, কাল সকালেই মিলের গেটে নোটিশ ঝুলবে। ছাঁটাইয়ের নোটিশ—যে দশজন ছাঁটাই হবে, তার মধ্যে রতনেরও নাম আছে। রতন বলছে, ও ইউনিয়ানটাকে জান দিয়ে বাঁচাবে—কিন্তু কাল থেকে মিলের মধ্যে ওর ঢাকাই বন্ধ। হঠাৎ সঞ্জয়ের একটা দারুণ ঘৃণা জন্মালো। সেই ঘৃণা মিঃ বিশ্বাসের ওপর, অনুরাধার ওপর, নিজের ওপর, এমন কি ঐ ভিখুরাম আর রতনের ওপরেও। সঞ্জয়ের মনে হলো, চারদিকে থু-থু করে থুতু ছেটায়। চতুর্দিকেই নোংরা।

শেষ পর্যন্ত সমস্ত রাগ এবং ঘৃণা এসে জমা হয়েছিল নিজের ওপরেই। মিঃ বিশ্বাসের খুব বেশি দোষ সে দেখতে পায়নি। সঞ্জয় এত বোকা নয় যে, মিল পরিচালনার এইসব গতানুগতিক পদ্ধতি সে বুঝতে পারবে না! প্রতিবাদ না করুক, সে যে না-বোঝার ভান করেছিল সে শুধু অনুরাধার সাহচর্য পাবার জন্য। অথচ, সেই অনুরাধাকে পুরোপুরি পাবার চেষ্টা কিংবা লোভ রাখার মতন দুঃসাহসও তার নেই—সেইজন্যই বেশি রাগ নিজের ওপর।

সঞ্জয় তারপর এই ব্যাপারটা নিয়ে অনেক ভেবেছে। দিনের পর দিন। নিজের জন্য সে কোনো পথ খুঁজে পায়নি। ভাবতে ভাবতে শেষ পর্যন্ত সে বুঝতে পেরেছিল—এসব ব্যাপার যদি সে ভুলে থাকতে না পারে—তবে তার কোনো উপায় নেই। হয়তো সে পাগল হয়ে যাবে। পৃথিবীতে অনেক কল-কারখানাতেই এরকম ছাঁটাই, হয়, মারামারি হয়—সঞ্জয় তার কি করবে? সে বড়জোর চাকরি ছেড়ে দিতে পারে। তারপর? সুতরাং ভুলে থাকাই একমাত্র উপায়।

অরণ্যে এসে এসব তো সে ভুলতেই চেয়েছিল। ভেবেছিল, সভ্য জগতের সবকিছু এই অরণ্যের বাইরে পড়ে থাকবে। সঞ্জয় অনেকখানি ভুলতেও পেরেছিল, হঠাৎ জয়ার বোন অপর্ণাকে দেখে মনে পড়লো অনুরাধার কথা। সঞ্জয়ের একটু মন খারাপ হয়ে গেল—চোখের সামনে ভেসে উঠলো অনুরাধার ছিপছিপে চঞ্চল শরীরটা। অথচ অনুরাধা তার কেউ না। অনুরাধার সঙ্গে সে একদিনও গাঢ় স্বরে কথা বলেনি। শুধু তাকে দেখতে পাওয়ার লোভেই সঞ্জয় তার মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিতে রাজী ছিল!

কয়েকটা ইঁটের টুকরো তুলে নিয়ে সঞ্জয় সেই বনতুলসী ফুলের ওপর বসা ফড়িং দুটোর দিকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারতে লাগলো। একটাও লাগলো না। ফড়িং দুটোর মধ্যে এখন ভাব হয়ে গেছে—তারা দু’জনেই কোনোক্রমে সেই একটা ফুলের ওপর বসেছে। সঞ্জয় হাত বাড়িয়ে ওদের ধরতে গেল। পারলো না, দুটোই উড়ে গেল একসঙ্গে। তখন সঞ্জয় সেই ফুলটাকে ছিঁড়ে আনলো, দেখতে চাইলো, ফুলটার এমন কি বিশেষত্ব আছে!

অনেকক্ষণ থেকেই কার ডাক শোনা যাচ্ছিল। সঞ্জয় এবার উৎকর্ণ হলো। রবি আর অসীম মাঝে মাঝে তার নাম ধরেই ডাকছে। বেঞ্চটা থেকে উঠে সঞ্জয় ফিরে এলো ডাকবাংলোর দিকে। বারান্দায় অসীমকে দেখে বললো, কি রে, ডাকছিস কেন?

—বাঃ, এতক্ষণ কোথায় ছিলি? রান্না চাপাতে হবে না?

—আমার রাঁধতে ভালো লাগছে না। কাল বেঁধেছি বলে আজও আমি রাঁধবো নাকি? তোরা বসে বসে আড্ডা দিবি—আর আমি একা রান্নাঘরে থাকবো!

—আজ তো মাংস-ফাংস নেই, সংক্ষেপে কিছু একটা করে দে-না বাবা! রতিলালকে বলে কাল থেকে রান্নার লোক যোগাড় করতেই হবে একটা। নিজেরা রেঁধে খাওয়া যাবে না। আজ এ বেলাটা তুই চালিয়ে দে।

সঞ্জয় বললো, আমি রাঁধতে পারি—কিন্তু সবাইকে এসে রান্নাঘরে বসতে হবে, আমি একা থাকবো না। তোরা এসে আলু-পেঁয়াজ কেটে দিবি—বেশিক্ষণ একা থাকতে আমার ভালো লাগে না।

রতিলাল উনুন ধরিয়ে দিয়ে গেছে, মোটা মোটা কাঠের গুঁড়ি, উনুনে ঠাসা, আগুন জ্বলছে দাউ দাউ করে। ডেকচিতে ভাত চাপিয়ে দিয়ে তার মধ্যেই ওরা আলু আর পেঁয়াজ ফেলে দিলো সেদ্ধ করার জন্য, আজ আর মুর্গী আনা হয়নি, শুধু ভাতে-ভাতই খাওয়া হবে মাখন দিয়ে।

রান্নাঘরটা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং প্রশস্ত। ডেকচি, কড়াই এবং চিনেমাটির বাসনপত্র ঝকঝকে করে মাজা। রতিলাল লোকটা ফাঁকিবাজ নয়। কিন্তু বউয়ের অসুখে বড়ই বিব্রত হয়ে পড়েছে।

ভাত যখন প্রায় ফুটে এসেছে, তিনজন স্নান করে নিতে গেছে এমন সময় রান্নাঘরের পেছনে শুকনো পাতা ভাঙার শব্দ ও মেয়েলি চুড়ির আওয়াজ শোনা গেল। রবি শুধু বসে ছিল রান্নাঘরে। সে তাড়াতাড়ি বাইরে এসে উঁকি মারলো। দেখলো, ঝুড়ি হাতে নিয়ে তিনটে সাঁওতাল মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে গাছের আড়ালে, মুখে একটু একটু হাসি। মেয়েগুলো প্রায় সমান লম্বা, সমান বয়েস, সমান কালো রং। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে তারা। কিন্তু ওদের দাঁড়াবার ভঙ্গিতে যেন খানিকটা লজ্জা এবং অপরাধবোধ মিশে আছে। ওদের মধ্যে একজনকে রবি চিনতে পারলো, সেই নীল-পাড় শাড়ি পরা মেয়েটি। এরা তিনজনই বাজারের কাছে সেই সিমেন্টের বেদীতে ঝুড়ি হতে বসে ছিল। রবি জিজ্ঞেস করলো, কি চাই এখানে? মেয়েগুলো কোনো সাড়াশব্দ করলো না। রবি আর একটু এগিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কি রে, কি চাই তোদের এখানে? মেয়েগুলো এবারও কোনো উত্তর দিলো না, অপরাধী হেসে নতমুখী হলো।

হঠাৎ রবির মুখ-চোখ বদলে গেল, এক ঝলক রক্ত এসে মুখ লাল হয়ে গেল, চোখ দুটো উজ্জ্বল দেখালো, সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে রবি একেবারে ওদের সামনে এসে দাঁড়ালো। বিনা দ্বিধায় সেই নীল-পাড় মেয়েটির হাত নিজের হাতে ধরে সস্নেহে জিজ্ঞেস করলো, কি রে?

সেই মেয়েটি এবার উত্তর দিলো, বাবু, তোদের ইখেনে কোনো কাম দিতে পারিস?

রবি আলতোভাবে মেয়েটির মসৃণ চিবুক তুলে ধরে বললো, এখানে তোরা কি কাজ করবি রে পাগলি? অ্যাঁ?

যেন রবিই এই জগৎ-সংসারের সব কিছুর মালিক, সেই হিসেবেই মেয়েটি তার কাছে অভিযোগ জানালো, পাঁচদিন কোনো কাম মিললো নাই তো কি করবো? রেলের বাবুরা গুদাম বানাইছিল তো কাম মিলছিল, সেও তো বনধো করলো—

রবির শরীরটা যেন কাঁপছে, চোখ দুটো যেন ফেটে আসবে, কিন্তু গলার স্বর আশ্চর্য স্নেহময়, নালিশ-করা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে সে বললো, ইস্‌, কি সুন্দর তোকে দেখতে, আয়, আয়—

—তিনজনকেই লিতে হবে কিন্তুক। আমরা ঘর সাফা করবো, পানি তুলে দেবো।

—তোদের কিচ্ছু করতে হবে না। আয়, আয়—

—দু’টাকা রোজ লিই।

রবি মেয়েটির দু’কাঁধে তার দু’হাত রাখলো, আদুরে ভঙ্গিতে বললে, দু’টাকা? এত সুন্দর তোকে দেখতে—

মেয়েটা রবির হাত ছাড়িয়ে সরে গেল না। শুধু একটু ঘন ঘন নিশ্বাসে তার বুক দুলছে। অভিমানীর মতন দাঁড়িয়ে রইলো। অন্য দুটি মেয়ে একটু আড়ষ্ট, তাদের মধ্যে থেকে একজন বললো, আমরা সব কাম পারবো বাবু, কাপড় কাচা করে দুবো, জুতা ভি পালিশ করতে জানি—দু’টাকা রোজ দিবি—

—দেবো, দেবো, আয় ভেতরে আয়।

গলার আওয়াজ পেয়ে এবার শেখর উঁকি মেরেছিল, সদ্য স্নান সেরেছে, এখনো তার পরনে শুধু তোয়ালে, শেখর হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলো, এই রবি, ও কি করছিস?

রবি মুখ ফেরালো, সম্মোহিতের মতন রহস্যময় তার মুখ, অদ্ভুত ধরনের হেসে প্রায় ফিসফিস করে বললো, এরা কাজ চাইতে এসেছে। নিজে থেকে এসেছে, বিশ্বাস কর, নিজে থেকে—

শেখর কৌতুহলী হয়ে এগিয়ে এলো। একটি মেয়ের কাঁধে তখনো রবির হাত দেখে একটু হেসে চোখ দিয়ে রবিকে নিষেধ করলো। তারপর বললো, তোমরা এখানে কি কাজ করবে? এখানে তো কোনো রাজমিস্ত্রীর কাজ হচ্ছে না! আমরা দু’দিনের জন্য বেড়াতে এসেছি—

মেয়ে তিনটিই প্রায় সমস্বরে বলে উঠলো, আমরা সব কাম পারবো বাবু! দু’টাকা রোজ দিবি—পাঁচদিন আমাদের কোনো কাম মেলেনি—

রবি সোৎসাহে বলে উঠলো, হ্যাঁ, হ্যাঁ, সব কাজ পারবে! কি সুন্দর মুখখানা দ্যাখ!

শেখর একটু অবাক হলো, রবির মুখের চেহারা, গলার আওয়াজ, সবই যেন কি রকম বদলে গেছে। অত্যন্ত উত্তেজনায় রবি কাঁপছে। শেখর এক মুহুর্তে নিজের বয়সের চেয়েও ঢের বেশি বয়স্ক হয়ে গিয়ে একটা বড় নিঃশ্বাস ফেললো, তারপর বললো, না, এদের বাংলোয় রাখা যাবে না। গণ্ডগোল হবে!

রবি বললো, না, না, কিছু গণ্ডগোল হবে না। রবি সেই মেয়েটিকে প্রায় আলিঙ্গন করে বললো, আয় রে, তোরা সব ভেতরে আয়। দু’টাকার অনেক বেশি পাবি।

শেখর দ্রুত এগিয়ে এসে ঝটকা দিয়ে রবিকে সরিয়ে বললো, ভাগ্‌! ওসব মতলব মোটেই করিস না।

রবি পরম অনুনয়ের ভঙ্গিতে শেখরের হাত ধরার চেষ্টা করে বললো, এরা কাজ চাইতে এসেছে, এরা খেতে পাচ্ছে না, বুঝছিস না—

—আমাদের এখানে কোনো কাজ নেই—এই, তোমরা যাও।

—অনেক কাজ আছে। কী রকম সুন্দর দেখতে, আঃ, কল্পনা করা যায় না!

—বাজে বকিস না। এই, তুমলোগ যাও-না! বোলতা হ্যায় তো—ইধার কুছ কাম নেহি হ্যায়।

অসীমও সাড়া পেয়ে এসেছিল। রবি এবার অভিমানী শিশুর মতন ঝাঁঝালো গলায় বললো, শেখর, তোর এটা বাড়াবাড়ি। আচ্ছা, এদের দিয়ে রান্নার কাজও করানো যায় না? মাত্র দু’টাকা রোজ—আচ্ছা, তোরাই বল—আমরা নিজেরা রেঁধে মরছি!

অসীম হাসতে হাসতে বললো, ব্যাপারটা কিন্তু রবি খুব খারাপ বলেনি। রান্নার কাজটা করতে পারে—মেয়েলি হাতের রান্না না হলে কি আর খেয়ে সুখ আছে!

রবি উৎসাহিত হয়ে মেয়েদের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলো, কি রে, তোরা রান্নার কাজ পারবি না? খানা পাকানো?

শেখর দৃঢ় স্বরে বললো, আমি অত্যন্ত আপত্তি করছি কিন্তু। আমি এসব ব্যাপার মোটেই পছন্দ করি না।

—তোর একা আপত্তি করার কোনো মানে হয় না।

শেখর রবির চোখের দিকে তাকালো। তারপর হঠাৎ অসীমের দিকে ফিরে বললো, এই অসীম, তুইও রবিকে তাল দিচ্ছিস কেন? দেখছিস না, ওর মাথার ঠিক নেই!

রবি চেঁচিয়ে উঠলো, বেশি বেশি সর্দারি করিস না—শুধু তোরই মাথার ঠিক আছে, না? তোকে কেউ লীডার করেনি। আমি আমার যা ইচ্ছে তাই করবো! রবি আবার হাত বাড়িয়ে সেই মেয়েটাকে ধরতে গেল।

শেখর ওদের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে রবিকে বাধা দিলো। রবি এবার খানিকটা হতাশভাবে বললো, এবার কি নিজেদের মধ্যে মারামারি করতে হবে নাকি? তুই কি করছিস শেখর? ওরা নিজেরাই আমাদের কাছে এসেছে—আর আমরা ওদের তাড়িয়ে দেবো?

এই সময় চৌকিদার রতিলাল এসে হাজির হলো, চিন্তা-ভাবনায় তার মুখে অনেক ভাঁজ, মেয়েগুলোকে দেখেই সে দুর্বোধ্য ভাষায় চিৎকার করে উঠলো। চৌকিদারকে দেখে মেয়েগুলোও পিছু হটতে শুরু করেছিল, এবার তারা দ্রুত পালাতে লাগলো। চৌকিদার এদের দিকে ফিরে বললো, ইসব মেয়েগুলোকে ইধার ঢুকতে দিবেন না বাবু। আইনে মানা আছে। ইয়ারা সব—

রবি বললো, কেন, ওরা এলে হয়েছে কি? তুমি নিজে তো—

তাকে থামিয়ে দিয়ে শেখর বললো, না, ঠিক আছে, আমিই ওদের চলে যেতে বলছিলাম।

সারা দুপুর রবি গুম হয়ে রইলো, কারুর সঙ্গে বিশেষ কথাবার্তা বলতে চাইল না। বারান্দায় একা ইজিচেয়ারে শূন্য দৃষ্টি মেলে বসে রইলো। বিকেলবেলা বেড়াতে যাবার প্রস্তাবেও রবি বিশেষ সাড়া দিলো না, উদাসীন ভাবে বললো, তোরা ঘুরে আয়। আমি আর আজ যাবো না।

সঞ্জয় একটা ইংরিজি গোয়েন্দা গল্প খুলে নিয়ে বসেছিল, সেও রবির কথা শুনলো, তা হলে আমিও যাবো না, বইটা না শেষ করে পারছি না। অসীম আর শেখরই বেরোলো, যাবার আগে অসীম বক্ৰহাস্যে বললো, রবির বোধহয় আজ তপতীর কথা মনে পড়ে গেছে।

শেখর বললো, থাক ও কথা, ও কথা বলিস না। রবি আরও রেগে যাবে।

—আজকাল আর রাগে না। তপতীর নাম শুনলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

—ক’ বছর হলো রে?

—সত্যি মেয়েটা বড় দুঃখ দিয়েছে রবিকে। আমি হলে আরও ভেঙে পড়তুম।

বেড়াতে আর কোথায় যাবে, সেই তো একই জঙ্গল। জঙ্গলে বেশিক্ষণ বেড়াতে ভালো লাগে না, জল যেমন অন্য জল দেখলেই গড়িয়ে যেতে চায়, মানুষও সেইরকম মানুষ চায়। কিছুক্ষণ জঙ্গলের মধ্যে ঘোরাফেরা করে ওরা আবার এলো সেই পাকা রাস্তায়, দু’জনে কোনো যুক্তি করেনি—তবু ওরা সেই মহুয়ার দোকানেরই পথ ধরলো। যাবার পথে চোখে পড়লো সেই ভাঙা মিলিটারি ব্যারাক থেকে অল্প অল্প ধোঁয়া উঠছে। অসীম বললো, ওখানে কারা রয়েছে, চল তো দেখে আসি?

নিবন্ত উনুন থেকে তখনো ধোঁয়া বেরুচ্ছে, সেই আদিবাসী মেয়ে তিনটি শালপাতায় ভাত বেড়ে সেখানে সদ্য খেতে বসেছে। ওদের দেখে অভিমানী চোখে তিনজনেই একবার তাকালো, তারপর আবার খাওয়ায় মনঃসংযোগ করলো। দেখেই শেখর বললো, চল!

অসীম তবু দাঁড়িয়ে রইলো, একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো ওদের দিকে। তিনটি মেয়ে—তাদের বয়েস পনেরো থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে যে-কোনো জায়গায়, কিন্তু শরীরে তারা ভরাট যুবতী,তাদের সামনে শালপাতায় ঢালা শুধু ভাত আর ধুঁধুল সেদ্ধ, নিঃশব্দে খেয়ে চলেছে। দু’জন পুরুষ দাঁড়িয়ে সেই খাওয়া দেখছে—জঙ্গলের মধ্যে তখন আবছা অন্ধকার।

শেখর অসীমের হাত ধরে টেনে বললো, চল!

অসীম তবু নড়লো না, অস্ফুটভাবে বললো, এখন খাচ্ছে? এদের বাড়ি নেই?

—থাকবে না কেন? কিছু দূরে বোধহয় এদের গ্রাম—সারাদিন কাজ খুঁজেছে, আর ফিরে যায়নি।

অসীম পিছন ফিরে কিছুদূর হেঁটে তারপর বললো, দুপুরে তুই ওদের তাড়িয়ে দিলি কেন? তোর গোঁয়ার্তুমি—ওরা দুটো খেতে পেতো অন্তত।

—ওদের খাওয়ানোর জন্য তোর অত মাথাব্যথা কিসের রে?

—দুপুরে আমাদের কতগুলো ভাত বেশি হয়েছিল—কুকুরকে খাওয়ালাম। তাতে ওদের তিনজনের অনায়াসে খাওয়া হয়ে যেতো। তুই শুধু শুধু এমন চেঁচামেচি আরম্ভ করলি!

—ভালোই করেছি।

—তার মানে? জঙ্গলের মধ্যে বিকেল পাঁচটার সময় ধুঁধুল সেদ্ধ দিয়ে ভাত গিলছে! আমরা ওদের দুটো খাওয়াতে পারতুম না?

—দু’দিন আগে আমরা এখানে ছিলুম না। দুদিন পরেও আমরা থাকবো না। ওদের খাওয়ানোর দায়িত্ব আমাদের নয়!

—এটা তোর বাজে যুক্তি। যে ক’দিন আমরা থাকবো, সে ক’দিন তো খেতে পেতো, কাজের জন্য কিছু টাকাও দিতে পারতুম।

—আমাদের ওখানে থাকলে ওদের দ্বারা কোনো কাজ হতো না। কী হতো, তুই ভালো ভাবেই জানিস—

—হলেই বা, তাতেই বা আপত্তি কি? ওরা তো জেনেশুনেই এসেছিল—রবি ওদের কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়িয়েছিল—ওরা আপত্তি করেনি। খেতে না পেলে ওসব নীতি-ফিতির কোনো মানে হয় না!

—সেই জন্যই তো আমি আপত্তি করছিলুম। কয়েকটা মেয়ে খেতে পারছে না বলেই সেই সুযোগ নিয়ে তাদের শরীর আমরা ছেঁড়াছেঁড়ি করবো?

—করতুমই যে তার কোনো মানে নেই।

—তুই রবির চোখ-মুখ লক্ষ্য করিসনি?

—রবির বুকের মধ্যে প্রচণ্ড অভিমান রয়েছে তপতীর জন্য। আমার তো তাই মনে হয়, এদের নিয়ে কিছুটা ছেলেখেলা করলে রবির পক্ষে ভালই হতো—কিছুদিন অন্তত তপতীর কথা ভুলে থাকতে পারতো। তুই দিন দিন এত মরালিস্ট হয়ে উঠছিস কেন?

—মরালিটির প্রশ্ন নয়। তোকে একটা কথা বলি অসীম, মেয়েদের সম্বন্ধে তোর চেয়ে আমার অভিজ্ঞতা খানিকটা বেশি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, একটা মেয়েকে ভোলার জন্য অন্য যে-কোনো একটা মেয়েকে জড়িয়ে ধরলে কিছু লাভ হয় না। তাতে অভিমান আরও বেড়ে যায়।

—তোর নিজেরও ব্যথা আছে বুঝি সে রকম?

—ব্যথা কার না আছে? আমার অন্য রকম ব্যথা। সে কথা থাক।

—শেখর, তোকে তোর নিজের কথা জিজ্ঞেস করলেই হঠাৎ চেপে যাস কেন বল তো? আমি লক্ষ্য করেছি, তুই মাঝে মাঝে খুব গম্ভীর হয়ে যাস। কি ব্যাপার তোর?

শেখর হা-হা করে হেসে উঠে বললো, তুই যে দেখছি গোঁফ খাড়া করে আমার গোপন কথা শোনার জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে উঠেছিস! আমার কিছু ব্যাপার নেই।

মহুয়ার দোকানে আজ একটু বেশি ভিড়। তা ছাড়া দৃশ্য প্রায় একই রকম, লাইন দিয়ে সবাই মাটিতে বসে গেছে। আশ্চর্য, সেই মেয়েটার মরদ আজও অজ্ঞান—মেয়েটা টানাটানি করছে তাকে। সাইকেলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুটো লোক, এরা মহুয়া খেতে আসেনি, এদের অন্য মতলব। সমস্ত জায়গাটায় একটা অসহ্য ধরনের মিষ্টি গন্ধ।

চাটের দোকানে আজ মেটুলির ঝোল রান্না হয়েছে, ওদের দেখেই দোকানদার হৈ-হৈ করে ডাকতে শুরু করে দিলো। এক বোতল মহুয়া কেনার পর অসীম আর শেখর মেটুলির ঝোল একটুখানি চেখে দেখলো। অসম্ভব ঝাল, শেখর শালপাতাটা ছুঁড়ে দিয়ে উস্ উস্ করে হাওয়া টানতে টানতে বললো, বাপ্‌স! আগুন ঝাল, মেরে ফেললে একেবারে! উস্।

দোকানদার হাসতে হাসতে বললো, ঝালই তো ভাল বাবু, মহুয়ার সঙ্গে। ঐ দেখেন সাঁওতালগুলো কি রকম কাঁচা লঙ্কা খেয়ে ল্যায়, দুটা চুমুক দিন আর ঝাল লাগবেনি।

একবার ঝাল খেলে আরও খেতে ইচ্ছা করে। অসীম বেশি ঝাল খেতে পারে, তার তত আপত্তি নেই-ই। অসীম বললো, এখান থেকেই মেটের তরকারি আর আলুর দম কিনে নিয়ে গেলে হয়, রাত্তিরে তাহলে আর কিছু খাবার লাগবে না।

কিন্তু শেখর সঙ্গে কোনো টাকা আনেনি। অসীমের সঙ্গে মাত্র পাঁচ টাকা। তাহলে আর মহুয়া কেনাই হয় না। রবির জন্য কিছুটা নিয়ে যাওয়া উচিত। ভিড়ের মধ্যে এক কোণে লখাকে দেখতে পেয়ে অসীম বললো, লখাকে পাঠালেই তো হয়! বাংলোয় গিয়ে সঞ্জয় বা রবির কাছ থেকে টাকা চেয়ে আনবে।—এই লখা, লখা—

ওরা এখানে এসে পৌঁছবার পর থেকেই লখা ওদের সঙ্গে আঠার মতন লেগে ছিল। লোকটা এমনিতেই বেশ বাধ্য এবং বিনীত, সবরকম ফাই-ফরমাশ খাটতেই রাজী। কিন্তু একটু হাত-টান আছে, জিনিস পত্র কিনতে পাঠালে ফিরে এসে খুচরো পয়সা সহজে ফেরত দিতে চায় না। দিলেও এমন হিসেব দেখায়—যাতে স্পষ্ট কারচুপি ধরা পড়ে। আর কেউ লক্ষ্য করেনি বিশেষ, কিন্তু রবি এই নিয়ে লখাকে ধমকেছে। এমনিতে রবি টাকা-পয়সার হিসেব গ্রাহ্য করে না—যখন পকেটে টাকা থাকে দু’হাতে ওড়ায়-ছড়ায়, বকশিস দেবার সময় তার হাতই সবচেয়ে দরাজ। কিন্তু, কেউ তাকে ঠকাচ্ছে টের পেলেই সে বিষম খিটখিটে হয়ে ওঠে।

লখার চোখ লাল, চুল খাড়া হয়ে উঠেছে, তবু সে অনুগত ভাবে এগিয়ে এসে বললো, কী হুজুর?

—তোর বেশি নেশা হয়েছে নাকি? একটা কাজ করতে পারবি?

লখা লাজুক হেসে বললো, নেশা কি, এই তো এইটুকুন, আধাপোয়া…ফরমাইয়ে আভি তুরন্ত।

—ঠিক আছে, তুই একবার বাংলোতে গিয়ে বাবুদের কাছ থেকে আমাদের জন্য দশটা টাকা নিয়ে আয়। আচ্ছা, বাবুদের জন্য এই এক বোতল মহুয়া দিচ্ছি নিয়ে যা, তুই নিজে খবরদার খাবি না, ফিরে এলে তোকে বকশিশ দেবো—

লখা হঠাৎ মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে নাটকীয় ভাবে বললো, আমার বকশিশ চাই না বাবু, আমাকে কলকাতা নিয়ে গিয়ে একটা নোকরি দিন। এখানে কিছু মেলে না।

লখা শেখরের পা ধরতে গিয়েছিল, শেখর বিব্রত ভাবে পা সরিয়ে নিয়ে বললো, আরে আরে, এর বেশি নেশা হয়ে গেছে দেখছি! ছাড়, ছাড়, কলকাতায় চাকরি সস্তা নাকি?

—না বাবু, আমাকে কলকাতা নিয়ে চলুন! এখানে কিছু মেলে না—

লখার চোখ দিয়ে টপ টপ করে জলের ফোঁটা পড়তে লাগলো। মাতালের চোখে জল দেখলে সবারই হাসি পায়। এমন কি অন্য মাতালরাও হাসে। অসীম ও শেখর পরস্পর চোখা চোখি করে মুচকি হাসলো। শেখর কৌতুকের ছলে জিজ্ঞেস করলো, তুই কলকাতায় যেতে চাস কেন? এখানে তোর বাড়ি-ঘর খেত-খামার আছে, হাঁস-মুর্গীও পুষছিস—এসব ছেড়ে কলকাতায় গিয়ে কি করবি? ওখানে কিছু খাবারদাবার পাওয়া যায় না!

দুঃখিত মাতালের মুখ খুব করুণ, বড় বেশি করুণ বলেই হয়ত হাস্যকর লাগে। সেই রকম মুখ তুলে লখা বললো, খাওয়া তো জনম ভোরই আছে, কিন্তু ইসব জাগায় কোনো টাকা নেই বাবু! কলকাতায় নোকরি করে দুটো পয়সা কামাবো—দু’বছর আগে ঐ শালা মুলিয়া কাহার কলকাতার ফেকটারিতে কাম নিলো—এখন সে হাতে ঘড়ি লাগায়। সিগ্রেট খায়—রোয়াব কি!—আমাকে কলকাতায় নিয়ে চলুন, আপনাদের গোলাম হয়ে থাকবো।

ফের সে পা ধরতে আসতেই শেখর বললো, কলকাতায় গিয়ে এ রকম নেশা করবি নাকি? তা হলে পুলিশে ধরবে।

—না বাবু, আমি কিরা করে বলছি, ইসব আর ছুঁবো না। ধরম সাক্ষী—আপনারা রাজা লোক—

অসীম বললো, ঠিক আছে, তোকে আমাদের অফিসে চাকরি করে দেবো, এখন যা তো। কতক্ষণে আসবি?

—আধা ঘণ্টা, বিশ মিনি, দৌড়কে যাবো।

দু’ঘণ্টার মধ্যেও লখা এলো না। চাটওয়ালাকে খাবারের অর্ডার দিয়ে রাখা হয়েছিল, সে আর কারুকে বিক্রি করেনি, তার কাছে লজ্জায় পড়তে হলো। এদিকে পাঁচ সিকে দিয়ে আর এক বোতল মহুয়া খাবার ফলে শেখর আর অসীমের বেশ নেশা হয়ে গেল।

সেই মাতাল মেয়েটা বার বার এসে বলতে লাগলো, এ বাবু, থানায় ধরে লিয়ে যাবি না? লিয়ে চল না, এ বাবু!

অসীম পকেট থেকে এক গাদা খুচরো পয়সা বার করে মেয়েটার হাতে ঝরঝর করে ঢেলে দিয়ে বললো, নাচ দেখাবি? নে, নাচ দেখা!

মেয়েটা অত্যন্ত ব্যস্ততার সঙ্গে পয়সাগুলো গুনলো, সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়ে দোকান থেকে একটা কোয়ার্টার বোতল কিনে এনে নিজের অজ্ঞান মরদকে ধাক্কা দিয়ে বললো, লে মুংরা। বাবুলোক খিলালো। মরদটা সঙ্গে সঙ্গে চোখ ও মুখ খুললো, এবং মেয়েটা তার ঠোঁটের ফাঁকে বোতল ধরতে চুক চুক করে বেশ খেতে লাগলো এবং একটু বাদে আবার চোখ বুজলো। মেয়েটা নিজে বাকি অর্ধেকটা খেয়ে, হাতের তালু দুটো বার বার মুছলো নিতম্বের কাছে শাড়িতে তারপর মাথার ওপর হাত দুটো তুলে তালি বাজাতে বাজাতে বললল, লাচ দেখবি?

মেয়েটা অত্যন্ত লচকে দু’বার কোমর দোলালো, আবার বললো, লাচ দেখবি? বাঁ পায়ের গোড়ালিতে ভর দিয়ে এক পাক ঘুরে ফের সেই প্রশ্ন, লাচ দেখবি? কাল হাটবার, আজ আখুনি লাচ দেখবি? দুটো হাত দু’পাশে ছড়িয়ে সে নিপুণ ছন্দে বুক দোলালো, একটা পা সামনে এগিয়ে দিতে ভোজালির মতন তার ঊরুর কিছুটা অংশ দেখা গেল, পাগলাটে গলায় সে আবার বললো, লাচ?

নেশা করার সময় এইসব আদিবাসীরা বেশি কথা বলে না। গুরুতর দায়িত্বপূর্ণ কাজ সারার ভঙ্গিতে পাতার ঠোঙায় মদ ঢালে এবং এক চুমুকে শেষ করে ঝিম মেরে বসে থাকে। কথা বললেও বলে আস্তে আস্তে, ফিস ফিস করে।

সেই দীর্ঘস্থায়ী অপরাহ্নে শুঁড়িখানার সামনের চাতালে গুটি পঞ্চাশেক লোক নিঝুম হয়ে বসে আছে, তাকিয়ে আছে মেয়েটার দিকে। মেয়েটার অতিরিক্ত নির্লজ্জতায় কারুর কারুর মুখ অপ্রসন্ন, কেউ কৌতুক পাবার জন্য উদ্‌গ্রীব—কিন্তু কোনো কথা বলল না। তা ছাড়া ওরা যেন জানে যে, কলকাতার এইসব ছোকরা বাবুদের নানা রকম পাগলামি থাকে—মুখ বুজে সেগুলো দেখে যাওয়াই ভালো। বাবুরা তাদের সঙ্গে এক জায়গায় বসে মদ খাচ্ছে কেন, অনায়াসেই তো নোকর পাঠিয়ে কিনে নিয়ে যেতে পারতো! সবাই তো তাই করে!

মেয়েটা ঠিক নাচলো না। অসীম তাকে নাচতে বলায় হঠাৎ যেন সে বিষম অহংকারী হয়ে উঠলো। খানিক আগে যে একটু মদের জন্য ভিক্ষে করছিল—এখন সে হঠাৎ রহস্যময়ী হয়ে উঠলো। নাচ শুরু করলো না। কিন্তু যাদুকরীর মতন ভঙ্গিতে অসীমের চারপাশে ঘুরে ঘুরে তার আঁট শরীরটা দুলিয়ে প্রশ্ন করতে লাগলো, লাচ দেখবি?

যেন সমস্ত নৃত্যকলাকে সে ভেঙে টুকরো টুকরো করছে, তারপর এক-একটা টুকরো ছিঁড়ে দিচ্ছে অসীমের দিকে। বুভুক্ষুর মতন অসীম সেই এক-একটা টুকরো লুফে নিচ্ছে। মেয়েটা আর এক পা এগিয়ে এলো অসীমের দিকে, সাপের মতন শরীরটা সামনে পেছনে দোলালো, একবার মাত্র, ভোজালির মতন ঊরুটা আরেকবার দেখালো, তারপর হাত বাড়িয়ে বললো, দে—।

অসীমের চোখ দুটো হঠাৎ ঝাপসা হয়ে এসেছে। পৃথিবীটা একবার মাত্র দুলে উঠলো। সে অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলো, কি দেবো?

মেয়েটা ঠিক সেই রকমই দাঁড়িয়ে, যেন নাচের মাঝখানে কোনো এক জায়গায় থেমে গিয়ে চিত্রার্পিত মূর্তি, ঊরুর কাছে তার হাতটা মা কালীর মুদ্রার মতন, সে আবার তীব্ৰস্বরে বললো, দে!

অসীম যেন খুব ভয় পেয়েছে, সমস্ত মুখমণ্ডলে তার দুর্বোধ বিস্ময়, উঠে দাঁড়িয়ে সে বললো, কি? কি?

সাইকেল হেলান দেওয়া লোক দুটোর সঙ্গে শেখর কথা বলছিল, সেই মুহূর্তে শেখর পেছন ফিরে অসীমের দিকে তাকিয়ে ইংরেজিতে চেঁচিয়ে বললো, ডোন্ট টাচ দ্যাট গার্ল অসীম, দ্যাট উইল ইনভাইট ট্রাবল্।

অসীম উন্মত্তের মতন দু’তিন পা এগিয়ে এসে অস্বাভাবিক রকম চিৎকার করে বলে উঠলো, আই ডোন্ট কেয়ার! তুই হুকুম করছিস কেন, আমি তোর হুকুম শুনতে চাই না। আমার যা ইচ্ছে তাই করবো—

সাইকেলওয়ালা লোক দুটো অন্যপ্রদেশী পাইকার। এইসব অঞ্চলের হাট থেকে মালপত্র কিনে নিয়ে অন্য প্রদেশে চালান দেয়। কখনো কখনো কুলি-কামিন চালান দেবার ঠিকাদারী কাজও করে। শেখর ওদের সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতির বিষয়ে আলোচনা করছিল। অসীমের অবস্থা দেখে সে দ্রুত সেদিকে এগিয়ে গেল।

অসীমের গলার স্বর বদলে গেছে, চোখের দৃষ্টি অচেনা, ঠিক মতো দাঁড়াতে পারছে না! শেখর ওর দু’হাত চেপে ধরে বললো, অসীম, কি যা-তা বলছিস! মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর?

অসীম জোর করে হাত ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করে বললো, মেয়েটা কী চাইছে আমার কাছে? আমি দেখতে চাই।

—কি আবার চাইবে? চল এবার বাংলোয় ফিরি—লখাটা এলো না—

—আমি এখন যাবো না!

শেখর মেয়েটার দিকে ফিরে এক ধমক দিয়ে বললো, এই, তুই আবার কি চাস? বাবু তো পয়সা দিয়েছে একবার—এখন যা, ভাগ্‌!

মেয়েটা শেখরের কথা গ্রাহ্যই করলো না। স্থির ভাবে চেয়ে আছে অসীমের দিকে। অসীমের চোখও চুম্বকের মতন মেয়েটার দিকে আটকানো। ক্রুদ্ধ বাঘের লেজ আছড়ানোর মতন মেয়েটা সমস্ত শরীরটা মুচড়ে একবার নাচের প্রাক্‌ভঙ্গি করলো। সম্মোহন করার মতন হাত বাড়িয়ে বললো, এবার দে! দিবি না?

অসীম চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করলো, কি দেবো? কি?

শেখরের দিকে ফিরে আবার বললো, কি চায়? কি দিতে বলছে?

শেখর মেয়েটাকে গ্রাহ্যই করছে না, কিন্তু অসীমের পরিবর্তনে সে খুবই অবাক হয়। শান্ত ভাবে অসীমকে বোঝাতে চায়, কিছু না—আমাদের মাতাল ভেবে…

—না, না, ও কি যেন বলতে চাইছে!

মেয়েটা খিলখিল করে হেসে উঠে বলে, না দিয়ে তুই যাবি কোথায়? দিতে হবে—

অসীম হাত বাড়িয়ে মেয়েটাকে ধরার চেষ্টা করতেই শেখর ওকে বাধা দেয়।

—কিছু না। একদম বাজে মেয়েছেলে, এখানে বেশি বাড়াবাড়ি করলে বিপদ হবে বলছি।

—বিপদ! আমার কোনো বিপদ হবে না। কত বড় বিপদ আমি কাটিয়ে এসেছি, তুই জানিস না? আমি একটা মেয়েকে খুন করেছিলাম।

—কি যা-তা বকছিস! চল এবার।

—মোটেই যা-তা বকছি না। তুই জানিস না?

—তখন তোকে অতটা খেতে বারণ করলুম। সহ্য করতে পারিস না যখন—তখন এতটা খাস কেন? একটু খেয়েই বকবক—

অসীম আড়চোখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে দেখে নিয়ে শেখরকে গোপন কথা বলার ভঙ্গিতে বললো, বাজে বকবক করছি না মোটেই, কেউ জানতে পারেনি, আমি একটা মেয়েকে খুন করেছিলাম—আঃ রক্ত, কি রক্ত—

—সেটা খুন নয়, দুর্ঘটনা। তুই এত দিনেও —

—আলবত খুন। আমি নিজে…

এখানে সবাই বাংলা বোঝে, অসীমের চিৎকারে সবাই উৎকর্ণ, সাইকেলে হেলান দেওয়া লোক দুটো চোখ সরু করে উদ্‌গ্রীবভাবে তাকিয়ে আছে। শেখর আর উপায়ান্তর না দেখে অসীমের কলার ধরে প্রবল ঝাঁকানি দিয়ে বললো, কি হচ্ছে কি? অসীমের চৈতন্য শেষ সীমায় এসেছিল, ঐ ঝাঁকানিতেই সে মাটিতে ঝুপ করে পড়ে গেল অজ্ঞান হয়ে।

মেয়েটা থুতনিতে আঙুল দিয়ে বিস্ময়ের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছিল, যেন তার ঐ বিস্ময়ও নাচেরই একটা ভঙ্গি। এবার সে ঘুরে গিয়ে নিচু হয়ে বললো, লে মুংরা, তু-ও বেহোঁস, বাবুও বেহোঁস, আর একটো বাবু পাগলা—হি-হি-হি-হি—। তার হাসির শব্দ এমন তীক্ষ্ণ যে চাটওয়ালা ওদিক থেকে ধমকে উঠলো, এ সুরি, আভি চুপ যা, বেহুদা রেণ্ডি কাঁহাকা!

শেখর বিপন্নভাবে এদিক ওদিক তাকালো। যদি লখাটা এখনো আসতো। —কিন্তু তার কোনো পাত্তা নেই। শেখর চাটওয়ালাকে বললো, এক ঘটি জল দেবে ভাই?

লোকটা সঙ্গে সঙ্গে দোকান থেকে নেমে এসে বললো, চলিয়ে না, আমি বাবুকে আপনা সাথ পৌঁছা দিয়ে আসছি।

শেখর উৎসাহিত হয়ে বললো, তাহলে তো খুব ভালো হয়। তুমি আমার সঙ্গে গেলে মাংসের দামটা দিয়ে দেবো ওখানে।

—দামের জন্য কি! আপনোক রাজা আদমি। কাল দাম লিয়ে লিতম।

—না, কাল আর এখানে আসবো না।

চোখ-মুখে খানিকটা জলের ঝাপটা দিতেই অসীমের জ্ঞান ফিরলো। দুর্বল ভাবে খানিকটা হেসে বললো, কী? অজ্ঞান হয়েছিলাম? কখন?

শেখর বিরক্তির সঙ্গে বললো, এখন ফিরতে পারবি তো?

—হুঁ।

অসীম চারদিকে একবার তাকিয়ে নিলো, মেয়েটার দিকে চোখ পড়তেই চিন্তিত ভাবে প্রশ্ন করলো, মেয়েটা কি চাইছিল রে?

—মাথা আর মুণ্ডু? নে, এখন ওঠ।

অসীম তবু আচ্ছন্নের মতন বসে রইলো। দু’হাতের তালু দিয়ে কিছুক্ষণ চোখ কচলে সম্পূর্ণ অন্ধকার থেকে আবার আবছা আলোয় ফিরে এসে বললো, জানিস শেখর, আমি হঠাৎ খুব ভয় পেয়েছিলুম! ঐ মেয়েটা কি হিপ্‌নোটিজম্‌ জানে?

শেখর বললো, কি আবোলতাবোল বকছিস! মেয়েটা আরও কিছু পয়সা বাগাবার তালে ছিল।

মাংসওয়ালা শেখরের কথায় সায় দিয়ে বললো, হ্যাঁ বাবু, ঠিক বলিয়েছেন, ও ছোক্‌রিটা একেবারে বে-হুদা বেশরম্!

অসীম সব কথা মন দিয়ে শুনছিল না। বার বার তাকাচ্ছিল মেয়েটার দিকে। মেয়েটা তীক্ষ্ণ চোখে অসীমের দিকেই তাকিয়েছিল। শেখর অসীমকে ধাক্কা দিয়ে বললো, কি রে, মাথাটা একেবারে খারাপ করে ফেলবি নাকি?

—আমার মাথাটা সত্যি গুলিয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ মনে হয়েছিল, মেয়েটা যেন আমার কাছে এসে প্রতিশোধ নিতে চাইছে।

শেখর ধমকে উঠলো, প্রতিশোধ আবার কি? যত রাজ্যের আজেবাজে কথা মাথায় ভরে রেখেছিস!

সন্ধ্যে গাঢ় হয়ে উঠেছে। দোকানের সামনে জ্বলে উঠেছে হ্যাজাক। সেটার থেকে আলোর বদলে ধোঁয়া ছড়াচ্ছে বেশি। রকের ওপর অসীম আধ-শোয়া, তার দু’পাশে শেখর আর মাংসওয়ালা—যেন একটা নাটকের দৃশ্য, অন্যলোকগুলো সেই ভাবেই তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। অসীম আপন মনেই বললো, না, মেয়েটা পয়সা চায়নি! ওকে নাচ দেখাতে বললুম, তার বদলে ও কি রকম আমার সামনে দাঁড়িয়ে—যেন ও আমার সব গোপন কথা জানে, সবার সামনে আমাকে…

—ওসব কিছু আমি শুনতে চাই না। এখন যাবি কিনা বল!

দু’জনে দুদিক থেকে তুলে ধরতেই অসীম নিজের পায়ে উঠে দাঁড়ালো, সার্ট-প্যান্টের ধুলো ঝেড়ে অকারণে বিরক্ত মুখে বললো, দূর ছাই! তারপর মেয়েটার দিকে আর না তাকিয়ে হনহন করে এগিয়ে গেল একাই। কিছুটা রাস্তা আসতেই প্রায় সুস্থ হয়ে উঠলো! আরও খানিকটা এসে অসীম রাস্তার ধারে হড় হড় করে বমি করলো। তারপর থেকে সে আবার হালকা, স্বাভাবিক পায়ে হাঁটতে হাঁটতে গুন গুন করে গান ধরলো।

সেই গানের সঙ্গে শেখর যোগ দিল না। বন্ধুদের মধ্যে একজন কেউ মাতাল হয়ে গেলে অন্যদের নেশা কেটে যায়। অসীমকে সামলাতে গিয়ে শেখরের সব মেজাজ নষ্ট হয়ে গেছে। শেখর এখন গম্ভীর ভাবে অপ্রসন্ন মুখে হাঁটছিল। ঐ মেয়েটার কথা শেখর এবার নিজেও একটু ভেবে দেখলো। মেয়েটার ব্যবহার সত্যিই খানিকটা রহস্যময় অদ্ভুত। কিন্তু জঙ্গলের মানুষের রীতি-নীতি তো খানিকটা আলাদা হবেই!

মাংসওয়ালা সঙ্গে সঙ্গে আসছিল, শেখর তাকে জিজ্ঞেস করলো, জঙ্গলের মধ্যে কোনো সর্ট-কাট আছে কিনা। লোকটি জানে। ওরা জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়লো। টর্চ নেই, এখানে নিবিড় অন্ধকার, মাঝে মাঝে চাঁদ-ভাঙা আলো। পরস্পরের পায়ের শব্দ শুনে শুনে ওরা হাঁটতে লাগলো। হঠাৎ অসীম একটা ফুলগাছের সামনে দাঁড়ালো। গাছটা একটু অদ্ভুত, কাঁধ-সমান উঁচু—কিন্তু গাছটায় একটাও পাতা নেই, শুধু থোকা থোকা সাদা ফুল। অসীম জিজ্ঞেস করলো, এটা কী ফুলগাছ?

মাংসওয়ালা বললো, কি জানি বাবু! তবে, সাঁওতালগুলাক্‌ তো ই ফুলকে বলে নিমিঠু। পরবের দিনে ওরা এ ফুল মাথায় দেয়!

শেখর একটা থোকা ভেঙে নিয়ে গন্ধ শুঁকলো। এতক্ষণ বাদে সে পরিপূর্ণ গ্লানিমুক্ত গলায় বললো আঃ! কি সুন্দর গন্ধ—আগে তো এ ফুল দেখিনি!

Facebook Comment

You May Also Like