রেবেকা (নক্ষত্রের রাত-৪) – হুমায়ূন আহমেদ

চোখ মেলে রেবেকা বুঝতেই পারল না সে কোথায়। তার চারদিকে অপরিচিত গন্ধ। অপরিচিত অদ্ভুত শব্দ। সে কি তার নানার বাড়িতে? যে-কোন অচেনা জায়গায় ঘুম ভাঙলেই প্রথম যে-জিনিসটি তার মনে আসে, সেটা হচ্ছে–এটা কি নানার বাড়ি? ব্রহ্মপুত্রের উড়ে-আসা হওয়ায়-ভর্তি একটি প্রাচীন কোঠায় তার ঘুম ভাঙলঃ বিছানার চাদরটি কপূরের গন্ধমাখা, পায়ের কাছে বিশাল কোলবালিশ। রেলিং দেওয়া ঘন কালো রঙের খাটটাকে সব সময়ই মনে হত সমুদ্রের মতো বিশাল।

এটা নানার বাড়ি নয়। এর সব কিছুই অদ্ভুত। হোস করে একটা শব্দ হচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে শো-শোঁ আওয়াজ। আবার খানিকক্ষণ নিস্তব্ধতা। আবার হোস করে শব্দ।

রেবেকা উঠেবসল। মাঝারি ধরনের একটা ঘর। দুদিকের দেয়াল জুড়ে পর্দাঢাকা বিশাল কাঁচের জানালা। পর্দার রঙ হালকা সবুজ। ঘরের দেয়ালের রঙ ধবধবে সাদা, যেন কিছুক্ষণ আগে কেউ এসে চুনকাম করে গিয়েছে। মেঝেতে গাঢ় সবুজ রঙের শ্যাগ কাৰ্পেট। নতুন দূর্বাঘাসের মতো কোমল। পা রাখতে মায়া লাগে। ঘরে আসবাবপত্র তেমন কিছু নেই। এক পাশে ছোট্ট একটা লেখার টেবিল টেবিলের ওপর অদ্ভুত ডিজাইনের একটি টেবিলল্যাম্প। এত সুন্দর হয় মানুষের ঘর: রেবেকা উঠে গিয়ে জানালার পর্দা সরাল। যত দূর চোখ যায়–বরফ-সাদা প্রান্তর। বা পাশে পুতুলের বাড়ির মত এক সারি বাড়ি। হঠাৎ করে স্বপদৃশ্যের মতো লাগে। স্বপ্নের সব সুন্দর ছবিই মন খারাপ করে দেয়। এটিও দিচ্ছে। মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে রেবেকার, কান্না পেয়ে যাচ্ছে। সে তাহলে আমেরিকায় এসে পড়েছে? তার চোখের সামনে আমেরিকা?

বাসায় যেদিন খবর নিয়ে এল সে তিন মাসের ট্রেনিং-এ যাচ্ছে, কেউ প্রথমে বিশ্বাস করল না। বাবা বললেন, সত্যি-সত্যি কোনো চান্স আছে? রেবেকা বলল, আমি একুশ তারিখ যাচ্ছি। চিঠি পড়ে দেখা বাবা সেই চিঠি প্রায় দশ বার পড়লেন এবং হঠাৎ এমন উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। উত্তেজনায় তার মাথা ধরে গেল, তিনি দুই হাতে কপালের রগ টিপে ধরে গম্ভীর হয়ে বসে রইলেন। মা অবাক হয়ে বললেন, কী লিখেছে চিঠিতে? রেবা সত্যি যাচ্ছে? পড় না শুনি।

বাবা বললেন, একুশ তারিখ রওনা হতে হবে।

কোন মাসের একুশ তারিখ?

এই মাসের। আবার কোন মাসের?

কী উত্তেজনা চারদিকে। মা গুটিসুটি অক্ষরে তার সমস্ত আত্মীয়স্বজনকে চিঠি লিখলেন–র সংবাদ এই যে, রেবা স্কলারশিপ লইয়া আমেরিকা যাইতেছে। তাহার যাত্রার দিন ধার্য হইয়াছে এই মাসের একুশ তারিখ। সে ইতিমধ্যেই তিসার

জন্য গিয়াছে। ভিসার জন্য চার তারিখে ইন্টারভিউ হইবে। তবে স্কলারশিপ আমেরিকা সরকারের, কাজেই ভিসা পাওয়া ইনশা আল্লাহ্ কোনো সমস্যা হইবে না।…

রেবেকা এক দিনেই বাসার অন্য সবার চেয়ে আলাদা হয়ে গেল। সবাই সমীহ করে কথা বলে। সামনের বাসার জজ সাহেব পর্যন্ত এক দিন রাস্তায় দাঁড় করিয়ে অনেক গল্প করলেন।

শুনলাম, আমেরিকা যাচ্ছ?

জ্বি-চাচা।

গুড, ভেরি গুড। কোন স্টেট?

নর্থ ডাকোটা।

নর্থ ডাকোটায় যাই নি কখনো। সাউথ ডাকোটায় গিয়েছিলাম। মাউন্ট রাশমূর দেখতে। চার প্রেসিডেন্টের মূর্তি আছে পাহাড়ের গায়ে–পাথর কেটে করা। মূর্তির নাকই হল গিয়ে তোমার আট মিটার। যাচ্ছ কবে?

একুশ তারিখে।

কোন এয়ারলাইনস?

তা এখনো জানি না চাচা। টিকেট হয় নি এখনো।

ভালো ভালো। খুব খুশির সংবাদ।

তাঁর মুখ দেখে অবশ্যি মনে হয় না তিনি খুশি হয়েছেন, কিন্তু মার মুখ দেখে। যে-কেউ বলে দিতে পারে, বড়ো একটা সুখের ঘটনা ঘটেছে তাঁর জীবনে। এই ঘটনাটা পরিচিত অপরিচিত কাউকে জানাতেও তিনি কখনো দেরি করেন না। এত আচমকা এই প্রসঙ্গ নিয়ে আসেন যে রীতিমতো লজ্জা লাগে। হয়তো দোকানে কিছু একটা কিনতে গিয়েছে রেবেকা, সঙ্গে মা আছেন। জিনিসটি পছন্দ হয়েছে, এখন কেনা হবে। মা বলে বসবেন, খামাখা এত দাম দিয়ে এটা কেনার কোনো মানে হয়? ছ দিন পর আমেরিকা যাচ্ছি। সেখানে কিনে নিবি, সস্তায় পাবি।

রেবেকা বুঝতে পারে, মা মনে-মনে অপেক্ষা করেন–দোকানী বলবে, আমেরিকা যাচ্ছে বুঝি? কবে? বেশির ভাগ দোকানী কোনো রকম আগ্ৰহ দেখায় না। দু-এক জন অবশ্যি জিজ্ঞেস করে। তাদের দোকান থেকে মা কিছু-না-কিছু। কিলবেনই। যাবার সময় হাসিমুখে বলবেন, আচ্ছা, তাহলে যাই রে ভাই।

কী উত্তেজনার দিনই না গিয়েছে। কুমিল্লা থেকে বড় দুলাভাই তার নামে এক হাজার টাকা মানিঅৰ্ডার করে পাঠিয়ে দিলেন। কুপনে লেখা–বিদেশ যাবার আগে যদি টুকিটাকি কিছু কেনার দরকার হয় সেই জন্যে। টাকা পাঠানটা দুলাভাইয়ের নতুন ব্যাপার নয়। কোনো একটা কিছু হলেই দুলাভাইয়ের কাছ থেকে টাকা চলে আসবে। টুটুল ক্লাস সিক্সে বৃত্তি পেল। দুলাভাই এক শ টাকা পাঠালেন। ফরিদা একটা লেটার পেয়ে ফাস্ট ডিভিশনে ম্যাট্রিক পাস করল, দুলাভাইয়ের মানিঅৰ্ডার চলে এল।

তারা কত বার বলেছে, শুধু টাকা পাঠান কেন দুলাভাই, এটা-সেটা কিনে পাঠাবেন।

কী কিনব বল? কিছুই মনে ধরে না।

আপনার মনে ধরার দরকার কি? আপাকে সঙ্গে নিয়ে কিলবেন।

আচ্ছা, পরের বার থেকে তাই করব।

দুলাভাই লোকটা বোকাসোকা ধরনের। থলথলে মোটা, বিয়ের এক বছরের মধ্যে বেশ উঁচু একটা ভুড়ি বাগিয়ে ফেললেন। সেই ভুড়ি নিয়ে খালিগায়ে শস্ত্রবাড়ির রান্নাঘরে শাশুড়ির পাশে বসে মাছ কাটা দেখেন, তালপাতার হাওয়া খেতে খেতে সস্তা ধরনের রসিকতা করেন। সেই রসিকতা শুনে মা হেসে বাচেন না। আপা কত বার বলে, খালিগায়ে তুমি বাবা-মার সামনে ওভাবে চলাফেরা কর, ছিঃ ছিঃ।

কী করব বল, গরম লাগে।

গরম লাগে, ফ্যানের নিচে বসে থাক। রান্নাঘরে বসে আছ কেন?

গল্পগুজব করবার জন্যে বসি। রাগ কর কেন?

বাবুকে কোলে নিয়ে বসার ঘরে গিয়ে খানিকক্ষণ বস তো, প্লীজ।

আচ্ছা বাবা আচ্ছা, যাচ্ছি। লেবুর সরবত বানিয়ে পাঠাও তো। গরমটা কাবু করে ফেলছে।

এখন লেবুর সরবত বানান যাবে না। লেবু নেই ঘরে।

মা সঙ্গে সঙ্গে টুটুলকে পাঠাবেন লেবু কিনতে। দুলাভাইয়ের মুখের কথা এ বাড়িতে অমোঘ আদেশ। বাবা-মা দুজনেই দুলাভাইকে জিজ্ঞেস না-করে কিছু করতে পারেন না। ফরিদা সায়েন্স পড়বে না আর্টস পড়বে? দুলাভাইয়ের কাছে। চিঠি গেল। তিনি যা বলবেন তাই। টুটুল সাইকেল কিনবে। বাবা কিছুতেই দেবেন। না। তার ধারণা, সাইকেল নিয়ে রাস্তায় বেরলেই এ্যাক্সিডেন্ট হবে। টুটুল কুমিল্লায় গিয়ে দুলাভাইকে ধরল। তিনি চিঠি লিখে দিলেন। টুটুল সাইকেল নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে প্রথম দিনই ঠেলাগাড়ির সঙ্গে এ্যাক্সিডেন্ট করে হাত ভেঙে ঘরে এল। বাবামা কেউ দুলাভাইয়ের বিরুদ্ধে একটি কথাও বললেন না।

রেবেকার মনে ক্ষীণ ভয় ছিল, দুলাভাই হয়তো বলে বসবেন, মেয়েমানুষ একা-একা এত দূর যাবে কি? আমেরিকা জায়গাটাও মেয়েদের জন্যে তেমন সুবিধে না। তাহলেই সৰ্বনাশ হত। ভাগ্যিস দুলাভাই কিছু বলেন নি। মানিঅর্ডার পাবার দু দিন পর তার উপদেশ-ভর্তি দীর্ঘ চিঠি এসে পড়ল। পুনশ্চতে লেখা–ইটের ভাটায় আগুন দেওয়া হবে বলে এখন আসতে পারছি না, তোমার রওনা হবার দিন সাতেক আগে আসব।

বাবা-মা তাতে রাজি হলেন না। টুটুলকে পাঠিয়ে দিলেন নিয়ে আসবার জন্যে। টুটুল নিয়ে এল।

দুলাভাই ঘরে ঢুকে প্রথম যে-কথাটা বললেন, সেটা হচ্ছে–একটা ভালো ছেলে আছে আমার হাতে, ঠিকানা নিয়ে এসেছি। বাবা-মা যেন এই কথাটা শোনবার জন্যেই অপেক্ষা করছিলেন। তাঁরা প্রায় লাফিয়ে উঠলেন। টুটুল বিকট স্বরে চেঁচাতে লাগল, ছোটআপার বিয়ে, ছোটআপার বিয়ে।

দুলাভাই ম্যাজিশিয়ানের ভঙ্গিতে ছেলের ছবি বের করলেন। সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ল ছবির উপর। টানাটানি করতে গিয়ে ছবির কোণা ছিঁড়ে গেল। স্টুডিওতে তোলা বোকা-বোকা ধরনের চেহারার একটা মানুষ। একুশ তারিখে যার আমেরিকা যাত্রা, তার বিয়ে হয়ে গেল তের তারিখে সেই বিয়েও অদ্ভুত। ছেলে তার মামা আর ছোটচাচাকে নিয়ে মেয়ে দেখতে এসেছে। ছেলের বাবা আসতে পারেন নি, অসুস্থ।

মেয়ে দেখে তাদের পছন্দ হল। ছেলের মামা বললেন, এক জন মৌলবী ডেকে নিয়ে আসুন, বিয়ে পড়িয়ে দেওয়া যাক। আমি ছেলের বাবার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে এসেছি। মেয়ে যখন চলে যাচ্ছে, সময়ও তো নেই হাতে, কী বলেন?

বড়ো দুলাভাই সঙ্গে সঙ্গে কাজী খুঁজতে বের হয়ে গেলেন। রাত এগারটার সময় বিয়ে পড়ান হয়ে গেল।

পাশের ঘরে খুটখুট শব্দ হচ্ছে। রেবেকা ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে দরজা খুলে বের হল। যেমানুষটি কাল রাতে তাকে নিয়ে এসেছে সে এগিয়ে এসে বলল, ঘুম ভালো হয়েছে?

ভালো। অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছি?

না, বেশিক্ষণ না। ঘন্টা তিনেক। এখন মাত্র আটটা বাজে।

আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, লম্বা ঘুম দিয়েছি।

বড়ো রকমের জানির পর এ-রকম হয়। ঘন্টাখানেক ঘুমালেই মনে হয় অনেকক্ষণ ঘুমান হল। কিছুক্ষণ পর আবার ঘুম পায়। খিদে হয়েছে? ব্রেকফাস্ট তৈরি করি?

এই লোকটিকে এখন অন্য রকম মনে হচ্ছে। এ যেন অন্য লোক। রাতে তালগাছের মতো লম্বা লাগছিল। এখন লাগছে না। যতটা বয়স্ক মনে হচ্ছিল, ততটা বয়স্ক মনে হচ্ছে না। ছোটমামার চেহারার সঙ্গেও এর কোন মিল নেই।

ব্রেকফাস্ট খুব সুবিধের হবে না। ঘরে কিছু ছিল না। আমি নিজে ভোরবেলায় কিছু খাই না, তাই কিছু রাখা হয় না। আসুন, টেবিলে আসুন।

রেবেকা অবাক হয়ে তাকাল। এই লোকটি এখন তাকে আপনি-আপনি করে বলছে কেন?

রেবেকা, আমি আপনার ডরমিটরিতে ফোন করেছিলাম। আপনার সব ব্যবস্থা করা আছে ওখানে। নাশতা খাবার পর আপনাকে দিয়ে আসব। আপনি চা খাবেন, না কফি? এখানে ভালো চা পাওয়া যায় না। কফি খুব ভালো। ব্রাজিলের কফিনিস থেকে তৈরী।

আমি চা খাব।

রেবেকা খানিকক্ষণ ইতস্তত করে বলল, কাল রাতে আপনি আমাকে তুমিতুমি করে বলছিলেন। এখন আপনি-আপনি করছেন কেন?

রাতে তুমি-তুমি করে বলছিলাম বুঝি? কেন, আপনার মনে নেই?

না। মনে নেই।

এ বাড়িতে আপনি একাই থাকেন?

হ্যাঁ, একা থাকি। কিছু দিন আমার এক বন্ধু ছিল–ফরিদ। এখন একা।

রেবেকা অন্যমনস্ক হয়ে গেল। এই লোকটিকে এত চেনা-চেনা লাগছে কেন? খুব পরিচিত কারো চেহারার সঙ্গে এর মিল আছে। কিন্তু কার চেহারা?

আমি এয়ারলাইনস-এ টেলিফোন করেছিলাম, ওরা আপনার সুটকেস ট্রেস করেছে। দশটায় যেতে বলেছে। সেখান থেকে আমরা সুটকেস নেব, তারপর আপনাকে রেখে আসব ডরমিটরিতে।

কোথায়?

যেখানে ওরা আপনার জায়গা করেছে। রুম নাম্বার সিক্স। আমি ওদের টেলিফোন করেছিলাম।

ও।

আপনি দেশে একটা টেলিগ্রাম করে দিন যে ঠিকমত পৌঁছেছেন। ওরা সবাই নিশ্চয়ই খুব চিন্তিত হয়ে অপেক্ষা করছে। বাসায় টেলিফোন থাকলে টেলিফোন করা যেতে পারে।

টেলিফোন নেই।

পাশের কোনো বাসায় আছে, যারা ডেকে দেবে?

জজ সাহেবের বাসায় আছে, কিন্তু ওদের নাম্বার জানি না।

তাহলে টেলিগ্রামই করা যাক। ঠিকানা বলুন।

রেবেকা ঠিকানা বলল।

বলুন কী লিখব?

রিচড সেফলি।

পাশা হাসিমুখে বলল, আপনার এই টেলিগ্রাম আপনার সব আত্মীয়স্বজন পড়বে। কাজেই আরো দুটি লাইন যোগ করে দিই? ওদের ভালো লাগবে।

রেবেকা কিছুই বলল না। পাশা বলল, আমি লিখলাম–নিরাপদে পৌছেছি। তোমাদের সবার জন্য খুব মন খারাপ লাগছে। এত সুন্দর দেশ, কিন্তু মোটও ভালো লাগছে না।

রেবেকা তাকিয়ে আছে একদৃষ্টিতে। তার চোখ ভিজে উঠছে। পাশা বলল, পাঠাব এ টেলিগ্রাম?

হ্যাঁ, পাঠান।

আপনার এই মন-খারাপ ভাব দু-এক দিনের মধ্যেই কেটে যাবে। যখন পড়াশোনা শুরু হবে, তখন দেখবেন দম ফেলার সুযোগ পাচ্ছেন না। এবং দেখতে দেখতে দেশে ফেরার দিন এসে যাবে। কী আনন্দ হবে, চিন্তা করে দেখুন।

রেবেকা লক্ষ করল, তার চোখে পানি এসে যাচ্ছে। সে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। পাশা নরম গলায় বলল, বিদেশ থেকে দেশে ফেরার আনন্দ ভোগ করবার জন্যেই সবার কিছু দিন বিদেশে থাকা উচিত। ফেরার সময় সবাই একটা নেশার ঘরে থাকে। যাই দেখে তাই কিনে ফেলতে চায়। আমি আমার এক বন্ধুকে দেখেছি, সে তাদের বাড়ির কাজের ছেলেটির জন্যে পঁয়ত্রিশ ডলার দিয়ে একটা ডিজিট্যাল ঘড়ি কিনল। অথচ সেই ছেলেটিকে সে কোনো দিন দেখেও নি। চিঠিপত্রে এক-আধ বার তার নাম এসেছে।

রেবেকার চোখ পানিতে ভরে উঠেছে। সে উঠে দাঁড়াল। বাথরুমে গিয়ে সে খানিকক্ষণ কাঁদবে।

পাশা মেয়েটির প্রসঙ্গে বেশ কিছু ব্যাপার লক্ষ করল–এই মেয়ে এক বারও আপনাকে ধন্যবাদ, এই কথাটি বলে নি। এক জন মানুষ রাতদুপুরে তাকে নিয়ে এসেছে, সব রকম ঝামেলা মেটাবার চেষ্টা করছে–এই দিকটি যেন তার চোখেও পড়ছে না। যেন সমস্ত ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক, এরকমই হওয়া উচিত। এর কারণ কী?

একটিমাত্র কারণ–হয়ত এই মেয়ে নিজের পরিবারের বাইরে কারো সঙ্গে তেমন মেশে নি। পরিবারের লোকজনের কাছ থেকে যে-ব্যবহার সে পেয়ে এসেছে তাতেই সে অভ্যস্ত। বাইরের একটি মানুষ এরকমই ব্যবহার করবে বলে তার ধারণা। তাছাড়া দেশের বাইরে নিজের দেশের মানুষদের সব সময়ই খুব আপন মনে হয়। ওদের কাছ থেকে আত্মীয়দের মতো ব্যবহার চোখে পড়ে না। সেটাই তো স্বাভাবিক।

Facebook Comment

You May Also Like