প্রফেসর ওয়ারাডিংটন (নক্ষত্রের রাত-৮) – হুমায়ূন আহমেদ

নক্ষত্রের রাত - হুমায়ূন আহমেদ

প্রফেসর ওয়ারাডিংটন বললেন, রেবেকা, লাঞ্চ-ব্রেকের সময় তুমি কি আমার ঘরে এক বার আসবে?

ওয়ারডিংটনের মুখে মিটিমিটি হাসি। যেন রহস্যময় কোন ব্যাপার আছে তাঁর ঘরে।

এক জন অপেক্ষা করবে তোমার জন্যে।

কে?

তা বলব না। সে তোমার জন্যে একটা সারপ্রাইজ হিসাবেই থাক। আগেভাগে কিছু বলতে চাই না।

লাঞ্চ-ব্রেক পর্যন্ত আবোলতাবোল অনেক কিছু ভাবল রেবেকা। এমনকি এক বার কল্পনা করল, নাসিম এসে বসে আছে। যেন কোনো অদ্ভুত উপায়ে ব্যবস্থা করে চলে এসেছে। সে ঢুকে দেখবে ঘিয়ে পাঞ্জাবি-পরা একটি মানুষ, যার কথাবার্তা আশ্চর্য রকমের কোমল এবং যে কিছুক্ষণ পরপরই টেবিলে আঙুল দিয়ে ঠক ঠক ঠক করে। এই অভভ্যসটি সে কোত্থেকে জুটিয়েছে কে জানে!

ওয়ারডিংটনের ঘরে ষাট বছর বয়েসী এক বুড়ি বসে ছিল। তার গায়ে দারুণ চকমকে পোশাক। ঠোঁটে কড়া মেরুন রঙের লিপস্টিক। সে বিরক্ত মুখে ক্ৰমাগত সিগারেট টানছে।

ওয়ারডিংটন বললেন, পরিচয় করিয়ে দিই–এ হচ্ছে লুসি, আমার স্ত্রী। এঁর কথাই তোমাকে বলছিলাম। আর এই মেয়েটি রেবেকা। বাংলাদেশ থেকে এসেছে।

লুসি চোখ নাচাল। ওয়ারডিংটন বললেন, এই মেয়ের হাতের ডিজাইনের কথাই বলছিলাম। বিয়ের সময় এরা হাতে এই ডিজাইন করে। রেবেকা হাত মেলে ধর।

রেবেকা হাত মেলে ধরল। লুসি তীক্ষ চোখে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ। তার মধ্যে তেমন কোনো উৎসাহ দেখা গেল না।

লুসি, তুমি ছবি তুলবে বলছিলে। ছবি তোল।

লুসি নিতান্ত অনিচ্ছাতেই ছবি তুলতে গেল। যেন তার নিজের কোন ইচ্ছা নেই। নেহায়েতই স্বামীকে খুশি করা। রেবেকার মন খারাপ হয়ে গেল। এক জন বুড়ি মুখ ব্যাজার করে তার ছবি তুলছে–দৃশ্যটি সুখের নয়।

বুঝলে লুসি, এরা বিশ্বাস করে, এই ডিজাইন যত বেশি দিন থাকে, এরা বিবাহিত জীবনে ততই সুখী হয়।

তাই নাকি?

হ্যাঁ, এই মেয়েটির হাতে অনেক দিন ধরে আছে। এ খুব সুখী মেয়ে। তাই না রেবেকা?

রেবেকা বলল, আমি কি এখন যেতে পারি স্যার?

না, পার না। চেয়ারটায় বস। কথা আছে তোমার সঙ্গে।

রেবেকা বসল।

ওয়ারডিংটন হাসিমুখে বললেন, তুমি কি ইউনিভার্সিটিতে পি-এইচ, ডি প্রোগ্রামের ব্যাপারে উৎসাহী?

রেবেকা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

আমি তোমার কথা ফ্যাকাল্টিতে আলাপ করেছি। তুমি যদি উৎসাহী হও তাহলে তোমাকে গ্রাজুয়েট স্টুডেন্ট হিসেবে নেওয়া যাবে।

রেবেকা কী বলবে ভেবে পেল না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো নয়। কিন্তু আমার নিজের কাছে একটি ফাণ্ড আছে। মাকো তেল কোম্পানির ফাণ্ড। সেখান থেকে তোমাকে আমি রিসার্চ স্টুডেন্ট হিসেবে গ্রান্ট দিতে প্রস্তুত আছি। তুমি ভেবেটেবে আমাকে বলবে। অবশ্যি খুব একটা সময়ও হাতে নেই। স্প্রিং কোয়ার্টারে এনরোল্ড হতে হলে কয়েক দিনের মধ্যেই তোমাকে এ্যাপ্লাই করতে হবে।

রেবেকা বসে-বসে ঘামতে লাগল। বলে কি এই বুডো? সে করবে পি-এইচ. ডি? যার অনার্স এবং এম. এস-সি দুটোতেই সেকেণ্ড ক্লাস, তাও শেষের দিকে।

শোন রেবেকা, আমার মনে হয় না তোমার সরকার বা তোমার অফিস এতে কোনো আপত্তি করবে। বিনে পয়সায় তারা এক জনকে ট্ৰেইণ্ড করতে পারছে। ঠিক না?

জি-স্যার, ঠিক।

আমি যদি রেবেকা হতাম, তাহলে খুব খুশি হয়েই রাজি হতাম। এটা আমার মনে হয় বেশ একটা ভালো সুযোগ।

স্যার, আমি রাজি।

এখনই রাজি হবার দরকার নেই, তুমি ভেবে দেখা সময় আছে।

প্রফেসর ওয়ারডিংটন ড্রয়ার খুলে কিছু ফরম্ বের করলেন।

তোমার জন্যে ফরম্ আনিয়ে রেখেছি। মনস্থির করে এগুলো ফিলআপ করবে। তোমার সঙ্গে সার্টিফিকেটগুলো কি আছে?

জ্বিনা স্যার। ঐসব তো আনি নি।

সার্টিফিকেটগুলোর ফটোকপি নিশ্চয়ই আছে। তোমার কাছে না থাকলেও আমাদের কাছে আছে। শর্ট কোর্সে এনরোল্ড হবার আগে তোমাকে এসব পাঠাতে হয়েছে। কাজেই সার্টিফিকেটের কপি যোগাড় করতে কোনো অসুবিধা নেই।

রেবেকা চুপ করে রইল।

আমার উৎসাহ দেখে তুমি আবার ভাবছ না তো যে, তোমার প্রেমে পড়ে গেছি। ইচ্ছা থাকলেও উপায় নেই। আমার স্ত্রীকে তো দেখছ, শক্ত মহিলা। হা-হা-হা! কি লুসি, ঠিক বলছি না?

লুসি হাই তুলল। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, এ ধরনের কথাবার্তায় তার কোনো উৎসাহ নেই।

রেবেকা বলল, স্যার, আমি এবার আসি?

ঠিক আছে, যাও।

বুড়িটিকেও এখন আর খারাপ লাগছে না। ভালোই লাগছে। বুড়ি তার দিকে হাত বাড়াল।

গুড লাক, রেবেকা।

থ্যাঙ্ক ইউ।

বুড়ি রেবেকা উচ্চারণ করল খুব পরিষ্কারভারে, অবিকল বাঙালী মেয়েদের মতো।

ছবি ডেভেলপ করলেই তোমাকে পাঠান হবে।

রেবেকা দ্বিতীয় বার বলল, থ্যাঙ্ক ইউ।

বাকি দিনটা কাটল উত্তেজনার মধ্যে। ম্যাট্রিক পরীক্ষা শুরু হবার ঠিক আগের কয়েক ঘন্টা যেরকম লাগে সেরকম কোনো কিছুতেই মন বসছে না। সব কিছুই কেমন অস্পষ্ট, ছাড়া-ছাড়া, বুকের মধ্যে একটা চাপা ব্যথাবোধ।

মেইল বক্সে চিঠি আছে। দেশের চিঠি। খামের ওপরের লেখা দেখে মনে হয় টুটুলের লেখা। কিন্তু কেন যেন খুলে দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে না। আরিয়ে রত্মা এক বার জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে তোমার? সে আরিয়ে রত্নাকে কিছু বলল না। ড. রেলিংএর ফুড পয়জনিংয়ের লেকচারের কিছুই তার মাথায় ঢুকল না। শুধু আবদুল্লাহ্ যখন উঠে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলল, ফুড পয়জনিং দরিদ্র দেশে হয় না। কারণ দরিদ্র দেশে ফুডই নেই। দরিদ্র দেশের মানুষ যা খায়, সবই হজম করে ফেলে। হা-হা- হ্যাঁ। তখন রেবেকা খানিকটা সচেতন হল। কারণ ড. রেলিং তার দিকে তাকিয়ে আছেন।

রেবেকা, দরিদ্র দেশের প্রতিনিধি হিসেবে এ প্রসঙ্গে তোমার মতামত কী?

রেবেকা চোখমুখ লাল করে বলল, বাংলাদেশ দরিদ্র দেশ নয়।

বেশ বড় রকমের একটা হাসির হল্লা উঠল চারিদিকে। রেবেকা দাঁড়িয়েই রইল। হাসির কারণ সে পরিষ্কার বুঝতে পারছে না। ড. রেলিং বললেন, বেশ, তুমি তাহলে একটি ধনী দেশের প্রতিনিধি হিসেবেই তোমার মতামতটা বল।

আবার একটা হাসির হল্লা। ড. রেলিং নিজেও হাসছেন। রেবেকার চোখের সামনে হঠাৎ সব ঝাপসা হয়ে উঠতে শুরু করল। সে বুঝতে পারছে, এখন আর তার কিছু করার নেই। চোখের পানি আটকাবার আর কোনো পথ নেই।

সমস্ত ক্লাস নিঃশব্দ। ড. রেলিং হতভম্ব। সামান্য রসিকতায় একটি বয়স্ক মেয়ে এইভাবে কাঁদতে পারে তা তিনি কল্পনাও করেন নি।

মি ইন হাত ধরে রেবেকাকে বসাল। রুমাল এগিয়ে দিল তার দিকে। এই ছোটখাট মেয়েটি কখনোই ক্লাসে কোনো কথাবার্তা বলে না। গুছিয়ে কিছু বলার মতো ইংরেজি জ্ঞানও তার নেই। কিন্তু সে শান্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে চমৎকার ইংরেজিতে বলল, চীন দেশ এক সময় দরিদ্র ছিল। সবাই হাসাহাসি করত মহান চীনকে নিয়ে। তাতে মহাচীনের কোনো ক্ষতি হয় নি। একটি দেশ যতই দরিদ্র হোক, তাকে নিয়ে রসিকতা করার স্পৰ্ধা কারোর থাকা উচিত নয়।

ড. রেলিং কুইজের কাগজপত্র দিয়ে দিলেন। বারবার রুমাল চোখের উপর চেপে ধরে প্রশ্নের উত্তর লিখল রেবেকা।

সুন্দরভাবে যেদিনটি শুরু হয়েছিল, কী কুৎসিতভাবেই না তা শেষ হচ্ছে।

বাড়ি থেকে আসা চিঠিটা অনেক মোটা। অনেকগুলি বাড়তি টিকিট সেখানে। সেই চিঠিও খুলে পড়তে ইচ্ছা করছে না। রেবেকা তার চব্বিশ বছরের জীবনে এত লজ্জিত, এত অপমানিত বোধ করে নি। কুইজ জমা দেবার সময় ড. রেলিং বললেন, রেবেকা, আজ বিকেলে আমার সঙ্গে এক কাপ কফি খাওয়ার সময় কি তোমার হবে?

হবে, স্যার।

বেশ, মেমোরিয়াল ইউনিয়নে চলে আসবে। ক্লাস শেষ করেই চলে আসবে। পরীক্ষা মেন দিলে?

ভালো।

কেমন ভালো? বেশ ভালো?

হ্যাঁ, বেশ ভালো।

তুমি বেশ স্মার্ট মেয়ে। আই লাইক ইউ।

রেবেকা কিছু বলল না। কঠিন চোখে তাকিয়ে রইল, কিছুই ভালো লাগছে না। এমন কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে আরেক বার কেঁদে ফেলবে।

মেমোরিয়েল ইউনিয়ন ফাঁকা। আবহাওয়ার অবস্থা বিশেষ ভালো নয়। প্রচুর তুষারপাত হচ্ছে। রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যাবার সম্ভাবনা। সবাই বাড়ি চলে যাচ্ছে তাড়াহুড়ো করে। ড. রেলিং বিরাট এক কাপভর্তি কফি এবং দুটো ডোনাট নিয়ে বসে আছেন। রেবেকা তার সামনে এসে বলল।

কই, তোমার কফি কোথায়?

আমি কফি খাই না, স্যার।

অন্য কিছু খাও। চা খাও।

আমার স্যার খেতে ইচ্ছা করছে না।

কথায় কথায় স্যার বলছ কেন তুমি? তোমাকে তো আগেই বলেছি, আমাকে নাম ধরে ডাকবে।

রেবেকা কিছু বলল না। ড. রেলিং কফির কাপে লম্বা চুমুক দিয়ে বললেন, আজ তুমি কিছুটা অপমানিত বোধ করেছ বলে আমার ধারণা। আমি তার একটি প্রধান কারণ। তার জন্যে তোমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। কাউকে অপদস্থ করা আমার পেশা নয়। তবে রেবেকা, কোনো ব্যাপারেই এত সেনসিটিভ হওয়া ঠিক না। বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত দরিদ্র দেশ, এটা তুমি নিজেও খুব ভালো করে জান। আমরা সবাই জানি। জানা সত্তেও দেশকে দরিদ্র বললে তুমি একটা শিশুর মতো আচরণ করবে এটা ঠিক না। এই ইউনিভার্সিটিতে অনেক আগে একটি বাংলাদেশী আণ্ডারগ্রাজুয়েট ছাত্র তোমার মতোই শিশুসুলভ আচরণ করেছিল। তার দেশ সম্পর্কে কে যেন কী বলেছে, সে ঘুষি মেরে তার দুটি দাঁত ভেঙে ফেলেছে। পুলিশ পর্যন্ত গড়িয়েছিল ব্যাপারটা।

ড. রেলিং দম নেয়ার জন্যে থামলেন। রেবেকা কী বলবে বুঝতে পারল না। ড. রেলিং গম্ভীর গলায় বলতে লাগলেন, আমি স্বীকার করলাম, তোমরা তোমাদের দেশকে দারুণ ভালোবাস। অথচ আমি যত দূর জানি, তোমাদের দেশে সামরিক শাসন চালু আছে। যে-দেশের মানুষ তার দেশকে এত ভালোবাসে, তারা কী করে সামরিক শাসন চুপচাপ মেনে নেয়। এবং আমি শুনেছি, যে-ব্যক্তিটি তোমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল নায়ক, তাকে সপরিবারে মেরে ফেলা হয়েছে এবং কেউ একটা কথাও বলে নি। আমি যা বলছি তা কি সত্যি?

হ্যাঁ, সত্যি।

তোমাদের দেশের প্রতি যে ভালোবাসা তা কেমন ভালোবাসা, বল তো রেবেকা?

রেবেকা চুপ করে রইল।

চল, ওঠা যাক। আবহাওয়ার অবস্থা ভালো নয়। যে-হারে বরফ পড়ছে, তাতে মনে হয় আগামীকাল রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যাবে। উইকএণ্ড শুরু হবে এক দিন আগে। তুষারপাতের দৃশ্যটি তোমার কাছে কেমন লাগে রেবেকা?

অপূর্ব!

তোমার দেশে এত সুন্দর দৃশ্য কি আছে?

আমাদের দেশের বৃষ্টিও খুব সুন্দর।

তবুও তোমার দেশই থাকবে শ্ৰেষ্ঠ? হা-হা-হা।

রেবেকাও হাসতে থাকল। তার মনের গ্লানি কেটে যেতে শুরু করেছে। কী অপূর্ব একটি দৃশ্য বাইরে। লক্ষ লক্ষ শিমূল গাছের তুলেবিচি হঠাৎ করে যেন ফেটে গেছে।

শিশুদের দল রাস্তায় নেমে গেছে। বরফের বল বানিয়ে এক জন অন্য জনের গায়ে ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারছে। বল যার গায়ে লাগছে, সে যথেষ্ট ব্যথা পাচ্ছে বলেই মনে। হয়। কিন্তু কাঁদছে না।

কিছুক্ষণ পরপর সবাই মিলে নরম বরফে গড়াগড়ি করছে। ড. রেলিং বললেন, এই জাতীয় কোন দৃশ্য কি আছে তোমাদের দেশে? এরকম গড়াগড়ি করার দৃশ্য?

রেবেকা হাসিমুখে বলল, উৎসবটুৎসব উপলক্ষে মাঝে মাঝে মাটিতে পানি ঢেলে কাদা তৈরি করা হয়, তারপর সবাই মিলে সেই কাদায় গড়াগড়ি করে।

সেই দৃশ্যটি এত সুন্দর?

না, এত সুন্দর না।

যাক, তাহলে একটি দিকে আমরা জিতে রইলাম।

ড. রেলিংগলা ফাটিয়ে হাসতে লাগলেন। রেবেকাও হাসতে শুরু করল। এখন তার চমৎকার লাগছে।

রাত নটার মধ্যে এক ফুট বরফ পড়ল। আবহাওয়া দফতর বলল, বাকি রাতে আরোদু ফুটের মতোবরফ পড়তে পারে। তুষারঝড়ের একটা আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে। ঘন্টায় পঞ্চাশ থেকে সত্তর কিলোমিটার বেগে গাস্টি উইণ্ড হবার কথা। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কাউকে বের না হবার পরামর্শ দেওয়া হল।

রেবেকা সকাল-সকাল শুয়ে পড়ল। টেবিল-ল্যাম্প জ্বালিয়ে খাম খুলল। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, চিঠিটার কথা তার মনেই ছিল না। ঘুমুতে যাবার আগমুহূর্তে মনে পড়েছে। চিঠি লিখেছে টুটুল। টুটুল এত গুছিয়ে লিখতে পারে, তা রেবেকা কল্পনাও করে নি।

ছোট আপা,

কেমন আছ তুমি?

সবাইকে বড়ো বড়ো চিঠি লিখেছ, কিন্তু আমার কাছে মাত্র তিন লাইনের নোট। আমি কী দোষ করলাম? আমি অনেক চিন্তা করে নিজের একটা দোষ খুঁজে পেয়েছি। এয়ারপোর্টে তোমাকে বিদায় দিতে এসে সবাই কাদছিল, শুধু আমি কাদি নি। এই জন্যেই কি আমাকে ছোট চিঠি?

কিন্তু হোট দুলাভাইও তো কাঁদেন নি। তাকে তুমি ঠিকই লম্বা- চিঠি লিখছ। এর মধ্যে তাকে তিনটি চিঠি লিখে ফেলেছ। তার মধ্যে একটি চিঠি ফরিদা আপা চুরি করে নিয়ে এসেছে। এবং সবাই পড়েছে। এমন কি মা-ও পড়েছে। সেই চিঠি নিয়ে খুব হাসাহাসি হয়েছে। ছোট দুলাভাই ফরিদা আপার ওপর খুব রাগ করেছেন।

যাই হোক, হোট দুলাভাই প্রায়ই আমাদের বাসায় আসেন। সাধারণত রাতের বেলা খাবার সময়টায় আসেন। খাওয়াদাওয়ার পর গল্প করতে-করতে এগারটা বাজিয়ে ফেলেন। তখন আমরা আর তাকে যেতে দিই না।

বুঝলে আপা, তাকে প্রথম দেখে যেরকম গভীর মনে হয়েছিল, তিনি সে রকম নন। খুব গল্পবাজ। ফরিদা আপা তার নাম দিয়েছে মিঃ বকবকর। এই নিয়ে মা ফরিদা আপাকে খুব বকা দিয়েছে। দেখ তো মায়ের কাণ্ডকারখানা। আমরা দুলাভাইয়ের সঙ্গে কি বলি না-বলি, তার মধ্যেও তার থাকা চাই।

গত পরশুদিন রাতে একটা মজার কাণ্ড হয়েছে। বড়ো দুলাভাই তার ব্যবসার কাজে ঢাকা এসেছেন। খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। বাবা বিরাট এক কাতলা মাছ কিনলেন দুশ পচাত্তর টাকা দিয়ে। সেই মাছের মাথাটা কোন জামাইকে দেবেন তা নিয়ে মা খুব চিন্তিত। গোপনে মিটিং করছেন ফরিদা আপার সঙ্গে। ঠিক করা হল, বড়ো দুলাভাইকে দেওয়া হবে।

কিন্তু কী কাণ্ড, শেষ মুহূর্তে দেখা গেল সেটা দেওয়া হয়েছে ঘোট দুলাভাইকে। বড়োপা সঙ্গে সঙ্গে মুখ কালো করে ফেলল।

ছোট দুলাভাই অবশ্যি মাছটা তুলে দিলেন বড়ো দুলাভাইকে এবং বললেন–আমি মাছের মাথা খাই না। আমার কিন্তু ধারণা, তিনি ঠিকই খান।

চিঠি পড়তে পড়তে বারবার চোখ ভিজে উঠছিল। নতুন পল্টন লাইনের সংসার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আহু, কী গভীর আনন্দ সেখানে।

মার্থা বলল, এক চিঠি তুমি ক বার করে পড়, বল তো রেবেকা? অনেক বার।

এত সময় নষ্ট কর কেন তোমরা? আমাদের মতো করতে পার না? এই দেখ না, আমার হাসবেও আমাকে কার্ড পাঠিয়েছে।

মার্থা কার্ড এগিয়ে দিল। সেখানে একটি শুকনো ধরনের লোকের ছবি। সে হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে। মুখে থার্মোমিটার। নিচে লেখা প্ৰিয়তমা, তোমার বিরহে আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছি। পাশেই এক বিশালবা নার্স। ছবিটি এ রকম, যেন বিরহটা নার্সের কারণেই বোঝায়।

কি রকম ফানি কার্ড, দেখলে? সে যা বলতে চাইছে বলা হল। রসিকতাও করা হল। সময় নষ্ট হল না। আমাকেও চিঠি লিখতে বসতে হবে না। আমিও একটা কার্ড কিনে পাঠাব। সেখানেও ফানি কিছু লেখা থাকবে।

কিন্ত সে লেখাগুলি তো অন্যের। তোমার নিজের কথা তো নয়।

সেইসব কাউই কিনবে যার লেখাগুলো তোমার নিজের লেখা বলে মনে হয়। তাহলেই হল। তাছাড়া যারা এইসব কাৰ্ড লিখছে, তারা দারুণ বুদ্ধিমান লোক। মনের ভাব এরা অনেক গুছিয়ে বলতে পারে।

তারা রাত এগারটার দিকে ঘুমুতে গেল। বাইরে ঝড়ের মাতামাতি।

অনেকক্ষণ পর্যন্ত ঘুম এল না রেবেকার। তার বারবার ইচ্ছা করতে লাগল ড. ওয়ারডিংটনের এই খবরটি পাশা নামের মানুষটিকে জানাতে।

এত রাতে টেলিফোন পেলে সে কি বিরক্ত হবে? বোধহয় হবে না। কিছু কিছু মানুষকে দেখলেই মনে হয়, এরা কখনই কোনো কারণে বিরক্ত হয় না। নাসিম সেরকম এক জন মানুষ।

মার্থাকে সঙ্গে নিয়ে তার জন্যে মজার একটা কার্ড কিনলে কেমন হয়? ফরিদা কোনট-না-কোনোভাবে সেটা চুরি করে ফেলবে। সবাইকে দেখিয়ে আরেক কাণ্ড করবে।

Facebook Comment

You May Also Like