রম্য গল্প: ‘প্রেমের কক্ষপথ’

রম্য গল্প: 'প্রেমের কক্ষপথ'

ঢাকার বাড়িওয়ালা। বুঝেন তো ঢাকার বাড়িওয়ালা মানে কি? তাও আবার পুরান ঢাকার। বাড়িওয়ালা কসাই মানে মাংসের ব্যবসা করে। একজন আল্লাহভীরু লোক। কিন্তু চেহারার কারণে গুন্ডাপান্ডা মনে হয়। তাও আবার হাতে যদি চাপাতি থাকে কথা নাই।
একটা গান আছে না!

” ছুরি- চাপাতি, দড়ি-দাউ বাইর কর
পাইপগান, সর্টগান হাতে নিয়া চলে।”
দেখে মনে হয় এমন গোছের লোক।

এদিকে একটি ছেলে চকবাজারের একটি রুম খোঁজছে। কারণ সে চকবাজারে নতুন ও একটি ক্লিনিকের ডাক্তার। সারাদিন হলো কোন টু-লেট দেখতে পেলো না। দেখবে কি করে? এত গলি! হাঁপাতে লাগল।
– কি এলাকারে বাবা? একটা রুমও খালি নাই।
-আবে ঐ, খালি আছে, রুম লাগবনি। তয় মিয়া ব্যচেলর হইব না। কি কাম করেন?
-আমি ডাক্তার। চেম্বার এখানে নিয়েছি। মনে হয় না বাসা পাব আর। চলি।
-আবে ঐ হৈমন্দির পো, বাসায় চলেন, বাসা ভাড়া দিমু।
– ব্যচেলর দিবেন না বললেন যে।
– ডাক্তার মানুষ। মানসের চিকিৎসা করেন। এক্কের পেশা। আপনার জন্য ব্যচেলর হব।

বাসায় আসল ছেলেটি। রুম পছন্দ হয়েছে সাথে বেলকুনি ছিল বিধায় রক্ষে। যাবার সময় লোকটি বলল,
– আবে ঐ, সব মাইনা লইতে পারুম। তয় আমার মেয়ের লগে টানকি মারা চলব না। ফষ্টিনষ্টি চলব না হু।

এ বলে বাড়িওয়ালা চলে গেল। যা ভাবছেন আসলে তা না বাড়িওয়ালা যথেষ্ট ভদ্রলোক।

মাস খানেক পর। ডাক্তার কাজ করছেন। এমন সময় মাথার উপরে ছাদে খটখট শব্দ। মেজাজ গেল বিগড়ে। ডাক্তারও লাঠি নিয়ে খটখট শব্দ করে। যেন যেমন কর্ম তেমন ফল।

পরের দিন বাড়িওয়ালার মেয়ে বলল,
– আপনি তো আচ্ছা অভদ্র লোক। অভদ্র ডাক্তারও বটে। আপনি খটখটে শব্দ করা লাগে।
– তার মানে ঐ খটখট শব্দের উৎস আর কেউ না। আপনি?
– আপনি কি মেডিসিন? নাকি অন্য কিছু?
– ওওও। আমি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। অন্য চিকিৎসাও করি।
– কিসের চিকিৎসা?
– মনের চিকিৎসা।
– তাই?
– হুম।
– বলুন তো ডাক্তার। আমার মনে কি চলছে?
– কি আর চলবে? আমি ঐ ডাক্তারটা কেমন সেটা বাজিয়ে দেখে যেতে এসেছেন।
– মুটেও না।
– আপনি কি মাথায় হাতে রেখে বলতে পারবেন।
– আচ্ছা, আপনি তো আচ্ছা দুষ্ট।
– ডাক্তার রোগীর রোগের লক্ষণ জেনেই ঔষধ দেয়।
– আপনি আমার কি রোগ দেখলেন?
– চোখে দেখছি প্রেম রোগ।
– যা, বলেন না আপনি।
– আমি কি মিথ্যা বলছি?
– না। মিথ্যা বলবেন কেন?
– আসলে তোমাকে দেখে আমারও ভাল লেগেছে।

বাড়িওয়ালা বাড়ি ফিরে এসে বলল,
– আবে ঐ কি এত কথা, রুমে যা।
– যাই বাজান।
– এই ডাক্তার সাহেব, আমার ও আপনার কথা নিচের বাগানে একটি কুঠুরি আছে। ওখানে চিরকুট দিবেন। আর আপনার ছবি দিবেন। ওটা দেখব। বাজান মনে হয় এসব জানলে খবর আছে।

এভাবে চলতে থাকে পুরোটা বছর। রমজান আসে। শেষ হতে চলে। ঈদের জন্য মাংসের চাহিদা ব্যপক। বাড়িওয়ালা বেশ চাপে থাকে। ছেলে নাই তাই নিজেই ক্রেতার চাপ সামলায় বাড়িওয়ালা।

ডাক্তার চিঠি লিখে যা পড়ে যায় যায় বাড়িওয়ালা কাছে। চিঠি পড়ে বাড়িওয়ালা মাথা ঘুরে পড়ে যায়। আর সৌদি থেকে চিঠি আসে তা ভুলক্রমে বাড়িওয়ালার কাছে না গিয়ে ডাক্তারের কাছে যায়। বাবাকে বাঁচাতে দৌড়ে যায় ডাক্তারের কাছে।
– আবে ঐ ডাক্তার সাহেব। এটা কি কইচ্ছেন? আপনার চিঠিখান পড়ে বাজান তো ফিট খাইচ্ছে গো।
– দাঁড়াও আমি আসছি।

– তোমার বাজানের কিচ্ছু হয় নাইক্কা। আমি ইনজেকশন দিলাম। পাঁচ মিনিট পর তিনি সুস্থ হবেন ইনশাআল্লাহ।
পাঁচ মিনিট পর—
– আবে ঐ মিয়া কি লিখচো এইসব? ওর পাত্র তো ঠিক। সৌদি থাকে।
– চাচা কি মনে না করলে? সৌদি থেকে এ চিঠিটি আসছে।
– আবে ঐ, চিঠিখান দেও দেহি।

শ্রদ্ধার চাচা,
আমি আপনার ছেমরিরে বিয়া করতাম নাইক্কা। আমি সৌদি তো শাদি করেলচি। পারলে মাফ করে দিয়ান।

ইতি
আবে কালাচাঁন।

– আবে ঐ, আমি দুধ কলা দিয়া কাল সাপ পালচি। ও আমার কথা রাখে নাইক্কা।

ডাক্তার বলল, ওনাকে একা থাকতে দিন। উনি একাই মাংসের বিক্রিতে চাপ সামলাতে পারচেন না। বয়স হয়েছে। তাই উনাকে আর কসাইয়ের কাজ বন্ধ করলে ভাল হয়।

– আবে ঐ ডাক্তার। তোমারে ভুল বুজেচ্চি। আমার কোন অমত নাইক্কা। আমার বেটিরে তোমার হাতে তুইলা দিবার চাই, কি কও মিয়া?
– ( মেয়ের মা) জামাই ভাল ডাক্তার। দেহ নাই কত চুন্দর চিকিৎসা করল।
– আবে ঐ ছেমরি, তুই তো বাজানরে কইলেই পারতি।

– আবে ঐ, ডাক্তার! আমার ছেমরি কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা। তোমার সাথে মানাব। হপাই আমার কোন কথা নাইক্কা।

ডাক্তার ও বাড়িওয়ালা মেয়ের প্রেমের কক্ষপথ এমনি ছিল। যে কক্ষপথ ধরে প্রেম টা পৌঁছে যায় বিয়ের কোঠাতে।

একটা ডায়ালগই বেশি মনে পড়ে। তবে আমার বেলায় জিজেদেরকে বলব-

” আবে ঐ, হৈমন্দির পোরা, আমার বিয়েতে দাওয়াত লইয়ো কিন্তু!!!!!!”

– আনিছুর রহমান লিখন

You May Also Like